১
কান্ডারীয় মন্দিরের উঁচু ভিতের ওপর প্রশস্ত চত্বরে রক্ষী বাহিনীর ছোট্ট দলটার সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিল রাহিল। রাজনির্দেশে আজ সকালে সবেমাত্র তারা উপস্থিত হয়েছে এই মন্দিরনগরীতে, এই কান্ডারীয় মন্দিরে। রাহিল এ জায়গাতে আগে কোনওদিন আসেনি। চত্বরের এখানে- ওখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে নানা আকারের প্রস্তরখণ্ড, অর্ধসমাপ্ত নানা ধরনের মূর্তি, মন্দির নির্মাণের যন্ত্রপাতি। সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে-থাকা অবস্থাতেই রাহিল মাঝে মাঝে তাকাচ্ছিল পিছনের দিকে। অনেকটা পর্বত শৃঙ্গের মতোই ধাপে ধাপে আকাশের দিকে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে নির্মীয়মাণ বিশাল এক স্থাপত্য।
কান্ডারীয় মহাদেব মন্দির। চান্দেলরাজ বিদ্যাধরের নির্দেশে গত দশ বছর ধরে নির্মিত হচ্ছে এই মন্দির। মন্দিরের মূল কাঠামো নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে অনেক আগেই। মন্দিরগাত্রের অলঙ্করণের কাজও দুই-তৃতীয়াংশ সম্পন্ন হয়েছে। সেখানে রচিত হয়েছে নানা অলঙ্করণ, স্থাপিত হয়েছে নানা পশুপাখি, দেবদেবীর মূর্তি। তবে তারই মাঝে ত্রিভুজের মতো আকাশের দিকে উঠে-যাওয়া মন্দিরগাত্রে রয়েছে অসংখ্য ফাঁকা খাঁজ, উন্মুক্ত তাক। সেগুলো ভরাট হলেই সম্পূর্ণ হবে মহারাজ বিদ্যাধরের স্বপ্ন- মন্দিরের নির্মাণ।
হাজার বছর পরও যে মন্দির দেখে বিস্মিত হবে ভবিষ্যতের মানুষ, স্মরণ করবে চান্দেলধীপ বিদ্যাধরকে। এ পর্যন্ত মন্দিরের নির্মাণ কাজ যতটুকু সম্পন্ন হয়েছে তা দেখেই ঘোর লেগে যাবে মানুষের মনে। বিশেষত, ওই দেবদেবী আর পশুমূর্তিগুলো এতটাই জীবন্ত যে হঠাৎ দেখলে তাদের রক্ত-মাংসর প্রাণী বলে ভ্রম হয়। চত্বরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা কালো পাথরের তৈরি বিশাল হস্তীযূথকে প্রথম দর্শনে তো সত্যি ভেবেছিল রাহিল। এখানে সৈন্যদল নিয়ে আসার পর বেশ কয়েকজনের সঙ্গে সাক্ষাত হয়েছে রাহিলের। তাদের মধ্যে প্রধান ভাস্কর চিত্রবান, পুরোহিত অনুদেব যেমন আছেন তেমনই আছে মাহবার মতো সাধারণ ভাস্করও।
মাহবা বলছিল মন্দিরগাত্রের ওই শূন্য খোপ-তাকগুলো নাকি ভরাট করা হবে সুরসুন্দরী আর মিথুনমূর্তি দিয়ে। মন্দির বা স্থাপত্যে মিথুনমূর্তি থাকলে নাকি বজ্রপাত হয় না। তাই স্থাপন করা হবে মিথুনমূর্তি। যাতে হাজার বছর পরও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা পায় চান্দেলরাজদের মন্দিরময় রাজধানী খর্জুরবাহকের এই মহাদেব মন্দির। যদিও কী কারণে রাহিলের নেতৃত্বে এই ছোট্ট সেনাদলকে এখানে নিয়োজিত করা হল তা এখনও রাহিলের কাছে স্পষ্ট নয়।
প্রধান সেনাধ্যক্ষ উগ্রায়ুধ তাদের এখানে পাঠাবার আগে জানিয়েছেন এখানে এসে চিত্রবান আর অনুদেবের নির্দেশ পালন করতে হবে রাহিল আর তার ক্ষুদ্র সেনাদলকে। প্রাথমিক পরিচয়ে সেনাদলকে কী কাজ করতে হবে তা ব্যক্ত করেননি চিত্রবান বা অনুদেব। তাঁরা জানিয়েছেন যথাসময় রাহিলকে তাঁরা তার কর্তব্য সম্বন্ধে সচেতন করবেন।
সূর্য ঠিক মাথার ওপর। রাহিলদের কিছুটা তফাতে দাঁড়িয়েছিলেন প্রধান স্থপতি ভাস্কর চিত্রবান। মধ্যবয়সি, পরনে শুভ্রবসন। গাত্রবর্ণ ঘোর কৃষ্ণবর্ণ, আজানুলম্বিত পেশিবহুল হাত, কাঁধ পর্যন্ত নেমে আসা ঘন কুঞ্চিত কেশরাশি। ঠিক যেন কালো পাথরের তৈরি মূর্তি। আর তাঁর পাশেই দাঁড়িয়ে ব্রাহ্মণ অনুদেব। প্রৌঢ় অনুদেবের পরনে রক্তাম্বর, গায়ে একটা উড়নি। শুভ্র দেহ, মুণ্ডিত মস্তক, দীর্ঘ পুরুষ্টু শিখা নেমে এসেছে পিঠ পর্যন্ত। মধ্যাহ্নের সূর্যকিরণে মাঝে মাঝে ঝিলিক দিচ্ছে তার কর্ণকুন্তল।
প্রাথমিক পরিচয় বিনিময়ের সময় রাহিল জেনেছে যে অনুদেব এই মন্দিরনগরীতে যত মন্দির আছে তাদের পুরোহিতদের অধিপতি। পুরোহিত- শ্রেষ্ঠ তিনি। কিছুদিন পর কান্ডারীয় মন্দিরের নির্মাণকার্য সম্পন্ন হলেই মন্দিরনগরীর প্রধান মন্দিরের দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন অনুদেব। শাস্ত্রমতে যাতে এই মন্দির নির্মিত হয় তা দেখার দায়িত্ব অনুদেবের ওপরই ন্যস্ত। আর তাদের দুজনের কিছুটা তফাতে সম্ভ্রমের দূরত্ব রেখে দাঁড়িয়ে আছে তাদের জনা দশেক অনুচর। চিত্রবান, অনুদেবসহ তাদের অনুচরদের সবার দৃষ্টি সামনের দিকে নিবদ্ধ। বেশ কিছুটা তফাতে একটা খর্জ্জুরকুঞ্জের আড়ালে গিয়ে হারিয়ে গেছে মন্দিরচত্বর থেকে এগিয়ে যাওয়া পাথুরে রাস্তাটা। সেই বাঁকের দিকে তাকিয়ে কীসের যেন প্রতীক্ষা করছে সবাই।
একসময় প্রতীক্ষার অবসান হল। অনুদেবকে হাত তুলে দূরের বাঁকের দিকে দেখালেন চিত্রবান। খর্জ্জুরকুঞ্জর আড়াল থেকে বেরিয়ে আসছে একদল অশ্বারোহী। সঙ্গে বেশ কয়েকটা গো-শকট। তারা এগিয়ে আসছে মন্দিরের দিকে। তাদের দেখামাত্র চিত্রবান ঘাড় ফিরিয়ে রাহিলকে বললেন, ‘নীচে চলুন। ওরা আসার পর ওদের চারপাশে বৃত্তাকারে ব্যূহ রচনা করবেন।’ কথাগুলো বলার পর তিনি হাঁক দিলেন, ‘বিকর্না? বাইরে আসো। ওরা এসে গেছে।’
সেই হাঁক শুনে মলের ছমছম শব্দ করতে করতে বাইরে বেরিয়ে এল স্থূলকায়া একজন। পরনে ঘাগরা, কাঁচুলি। মাথার চুল ঝুঁটি করে বাঁধা। কুতকুতে চোখ, পুরু ঠোঁট, লাবণ্যর লেশমাত্র নেই সারা শরীরে। কোমরবন্ধনীতে গোঁজা আছে একটা ছোট্ট ছুরিকা। বাইরে বেরিয়ে সে একবার সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকাল রক্ষীবাহিনীর দিকে। যেন জরিপ করে নিল সবাইকে। রাহিল ভালো করে তাকে দেখার পর বুঝতে পারল এই বিকর্না আসলে একজন বৃহন্নলা।
সে বাইরে আসার পর তাকে আর তাদের অনুচরদের নিয়ে মন্দির ভিত থেকে নীচে শানবাঁধানো চত্বরে নামতে শুরু করল সবাই। সঙ্গীদের নিয়ে তাদের অনুসরণ করে চত্বরে এসে দাঁড়াল রাহিল। সেই অশ্বারোহীর দলটা তিনটে গো-শকট নিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে দাঁড়াল সে জায়গাতে। শকটগুলোর ওপর ছই নেই। তার পরিবর্তে পশুচর্মে আচ্ছাদিত বিরাট চারকোনা রাখা আছে। দলটা সেখানে এসে দাঁড়াতেই রাহিলের ইশারাতে রক্ষীরা ঘিরে ফেলল তাদেরকে।
ঘোড়সওয়ার আগন্তুকদের সকলের পরনেই লম্বা ঝুলের নোংরা পোশাক, মাথায় পাগড়ি, কোমরে বাঁকানো তরবারি, পায়ে ফিতে বাঁধা চর্মপাদুকা। তাদের মধ্যে একটা তামাটে ঘোড়ায় বসে থাকা স্থূলকায় একজন লোক মনে হয় দলপতি। তার কানের স্বর্ণকুন্তল, গলায় মুক্তমালার ছড়া, তরবারির হাতলটাও মনে হয় সোনার। অঙ্গুরীয়-খোচিত হাতে ধরা আছে একটা লম্বা চাবুক। লোকগুলোর পোশাক আর সর্বাঙ্গ ধুলো-মাখা দেখে রাহিল অনুমান করল লোকগুলো ভিনদেশি। যাযাবর শ্রেণির লোকও হতে পারে। দীর্ঘ পথ পরিক্রমা করে তারা এখানে এসেছে।
সেই স্থূলকায় লোকটা ঘোড়া থেকে নেমে চিত্রবান আর অনুদেবকে মাথা ঝুঁকিয়ে সম্ভাষণ জানিয়ে বিজাতীয় ভাষায় কী যেন বলল। তার কথা শুনে গো-শকটের দিকে তাকিয়ে সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন। দলপতি এরপর নির্দেশ দিলেন তার সঙ্গীদের ঘোড়া থেকে নেমে তারা খুলতে শুরু করল গো-শকটের আচ্ছাদন। আর সেগুলো সরে যেতেই চমকে উঠল রাহিল।
প্রত্যেক শকটের ওপর রয়েছে শাল কাঠের খুঁটির তৈরি খাঁচা। আর তার মধ্যে রয়েছে নারীর দল! যুবতী, কিশোরী! ঠিক যেমনভাবে বন্য পশুদের খাঁচায় রাখা হয়, ঠিক তেমনভাবে খাঁচায় রাখা হয়েছে তাদের। ভীত সন্ত্রস্তভাবে খাঁচার গরাদ ধরে তারা বাইরে তাকাচ্ছে, কেউ বা আবার ভয়ে কাঁপছে। রাহিল বুঝতে পারল ওরা ক্রীতদাসী, আর ওই মোটা লোকটা সম্ভবত দাসব্যবসায়ী। কিন্তু এদের এখানে আনা হয়েছে কেন? দেবদাসী বানাবার জন্য? কিন্তু মন্দিরনির্মাণ-কাজ তো এখনও শেষ হয়নি! তাদের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগল রাহিল।
খাঁচার আগল সরিয়ে মাটিতে নামানো শুরু হল নারীদের। মাটিতে পা রেখে তাদের কেউ ডুকরে কেঁদে উঠল, কেউবা আতঙ্কে বা দীর্ঘক্ষণ অন্ধকারে থাকার পর মধ্যাহ্নের সূর্যালোক সহ্য করতে না পেরে চোখ বন্ধ করে ফেলল। তিনটে গাড়ি থেকে নামানো হল মোট তিরিশজনকে। সারবদ্ধভাবে পাথুরে চত্বরে দাঁড় করানো হল তাদের।
যাদের আনা হয়েছে তাদের বয়স, পোশাক, গাত্রবর্ণের ভিন্নতা থাকা সত্বেও তাদের দেখে রাহিলসহ উপস্থিত সবাই একটা ব্যাপার স্পষ্ট উপলব্ধি করল, এই নারীরা তাদের অঙ্গসৌষ্ঠব বা মুখমণ্ডলের দিক থেকে প্রত্যেকেই আসামান্যা রূপসি। হাজারও মলিনতা, বিষণ্ণতা সত্বেও সৌন্দর্য যেন চুঁইয়ে পড়ছে তাদের দেহ বেয়ে। সবাই বেশ কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল তাদের দিকে। এরা কি মানবী, নাকি শাপভ্রষ্ট অপ্সরা! আকাশ থেকে খসে পড়েছে ধূলা-মলিন পৃথিবীতে।
বিস্ময় ভাব ফুটে উঠেছে প্রধান ভাস্কর আর পুরোহিত অনুদেবের চোখেও। তাই দেখে হলদে দাঁত বার করে নি:শব্দে হাসতে লাগল সেই দাস ব্যবসায়ী।
চিত্রবান আর অনুদেব এরপর চাপা স্বরে কী যেন আলোচনা সেরে নিয়ে ইশারা করলেন বিকর্নাকে। বৃহন্নলা এগিয়ে গেল সেই নারীদের দিকে। সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা নারীদের প্রথমে দাঁড়িয়ে ছিল একজন অষ্টাদশী। কদাকার বিকর্না তার দিকে এগোতেই নারী দলের ভিতরে মৃদু গুঞ্জন উঠল আতঙ্কে। তাই দেখে দাসব্যবসায়ী একবার তার হাতের চাবুকটা মাথার ওপর বাতাসে ঘুরিয়ে মাটিতে আছড়ালেন। হিংস্রতা ফুটে উঠল তার চোখে। সঙ্গে সঙ্গে সেই মৃদু গুঞ্জন থেমে গেল।
বিকর্না প্রথমে সেই অষ্টাদশী যুবতীর কাছে গিয়ে পোশাকের ওপর দিয়ে তার বুকে, নিতম্বে, পেটে, ঊরুতে হাত দিয়ে টিপে টিপে কী যেন পরীক্ষা করল। তারপর একইভাবে পরীক্ষা শুরু করল অন্য নারীদেরও।
রাহিল মৃদু বিস্মিতভাবে দেখতে লাগল ঘটনাটা। বৃহন্নলার খসখসে হাতের স্পর্শে ঘেন্নায় আতঙ্কে কুঁকড়ে উঠে চোখ বুজে ফেলছে কেউ। কেউ বা আবার স্থির অচঞ্চলভাবে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকছে। হয়তো তারা তাদের ভবিতব্যকে মেনে নিয়েছে অথবা তারা এত দু:খকষ্ট সহ্য করেছে যে নতুন কোনও কষ্ট তাদের স্পর্শ করতে পারছে না।
বেশ কিছুক্ষণ ধরে চলল বিকর্নার সেই পরীক্ষাপর্ব। শুধু পেটে হাত দেবার পর দুজন রমণীকে সে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিল। দাসব্যবসায়ীর অনুচররা সঙ্গে সঙ্গে তাদের দুজনকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে একটা গো-শকটের ওপর খাঁচার ভিতর ঢুকিয়ে দিল। অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আর্তনাদ করে উঠল তারা। তাদের একজন যেন কী কারণে খাঁচার মধ্যে দাঁড়িয়ে মুষ্টাঘাত করতে লাগল নিজের পেটে। যেন পাগল হয়ে গেছে সেই রমণী। তারপর সে একটানে গলা থেকে তার মঙ্গলসূত্র টেনে ছিঁড়ে খাঁচার বাইরে ছুড়ে ফেলল। সেটা এসে পড়ল রাহিলের পায়ের সামনে। রাহিল সেটা দেখে বুঝতে পারল ওই রমনী বিবাহিত।
বিকর্নার পরীক্ষাপর্ব মিটল এক সময়। হাসি ফুটে উঠল দাসব্যবসায়ীর মুখে। মাত্র দুজন ছাড়া সবাই নির্বাচিত হয়েছে প্রাথমিক পরীক্ষায়। আবছা হাসি ফুটে উঠল চিত্রবান আর অনুদেবের ঠোঁটের কোনাতেও। মুখবন্ধ রেশমের থলে হাতে চিত্রবানদের এক অনুচর এসে দাঁড়াল। চিত্রবান সেই থলেটা তুলে দিল দাসব্যবসায়ীর হাতে। স্থূলকায় লোকটা সেই থলেটা নিয়ে একবার ঝাঁকাল। মুদ্রার ঝনঝন শব্দ স্পষ্ট কানে এল রাহিলের। এরপর সেই দাসব্যবসায়ী চিত্রবানের সঙ্গে কথা বলে চড়ে বসল তার অশ্বে। কিছুক্ষণের মধ্যেই হতভাগ্য সেই দুই রমনীকে নিয়ে দাসব্যবসায়ীদের পুরো দলটা রওনা দিল কোনও অজানা গন্তব্যে। অন্য রমনীরা প্রথমে পূর্ববৎ দাঁড়িয়ে রইল।
রাহিলকে এবার চোখের ইশারায় কাছে ডাকলেন প্রধান ভাস্কর চিত্রবান। রাহিল তার কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই চিত্রবান বললেন, ‘এই নারীদের পাহারা দেবার কাজেই আপনারা নিয়োজিত থাকবেন। মন্দিরের নিজস্ব রক্ষীবাহিনী একটা আছে। তার প্রধানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব।’
প্রধান পুরোহিত অনুদেব বললেন, ‘খেয়াল রাখবেন এই রমনীদের মধ্যে কেউ যেন মন্দির চত্বর ছেড়ে পালাতে না পারে। নচেৎ রাজরোষ বর্ষিত হবে সবার ওপর।’
মাথা ঝুঁকিয়ে তাদের কথায় সম্মতিদান জানাল রাহিল। সে রক্ষীবাহিনীর অনু-অধ্যক্ষ মাত্র। রক্ষীদলের দশজনের দায়িত্ব সামলায় সে। রক্ষীবাহিনী বা সেনাদলের সর্বকনিষ্ঠ পদ তার। প্রতি একশোজন অনু-অধ্যক্ষর দায়িত্ব সামলান একজন উপাধ্যক্ষ, কুড়িজন উপাধ্যক্ষর ওপর একজন অধ্যক্ষ। আর চারজন অধ্যক্ষর মাথার ওপর চান্দেলরাজের প্রধান সেনাপতি, মহাসৈন্যাধ্যক্ষ অনুলোম। সেনাদলের কনিষ্ঠতম আধিকারিক হিসাবে নির্দেশ পালনই তার একমাত্র কাজ।
বৃহন্নলা বিকর্না এরপর সেই নারীদের নিয়ে রক্ষী-পরিবৃত অবস্থায় সোপানশ্রেণি বেয়ে উঠতে শুরু করল মন্দির-ভিতের ওপরের চত্বরে। আর তাদের পিছন পিছন এগোল চিত্রবান, অনুদেব, রাহিল ও অন্য ভাস্কররা। তাদের সঙ্গে এগোতে এগোতে রাহিল কৌতূহলবশত চিত্রবানকে প্রশ্ন করল, ‘এদের এখানে আনা হল কেন? দেবদাসী বানাবার জন্য?’
চলতে চলতে প্রধান ভাস্কর জবাব দিলেন, ‘না, দেবদাসী নয়, এদের দেখে সুরসুন্দরীদের মূর্তি রচনা করবেন ভাস্কররা। বিল্বফলের মতো স্তন, ক্ষীণ কটি, গভীর নাভিকুণ্ড, ভারী বীণার মতো নিতম্বযুক্ত এইসব নারীদের বাছাই করে আনা হয়েছে মগধ, উজ্জয়িনী, কামরূপ, কনৌজ, ত্রিপুরীর দাসবাজার থেকে। এদের কাউকে কাউকে মিথুন ভাস্কর্য বা যৌন ভাস্কর্য নির্মাণের কাজেও ব্যবহার করা হবে। তবে চূড়ান্ত নির্বাচন পর্ব এখনও হয়নি। সে পর্বে এদের মধ্যে যারা নির্বাচিত হবে তারাই সুরসুন্দরী হবে। বাকিরা দাসী হবে, সুরসুন্দরীদের পরিচর্যা করবে, প্রয়োজনে ভাস্করদের মনোরঞ্জন করবে। কাশ্মীর, উৎকল, ত্রিগর্ভ, চালুক, গন্ডরাজ্য, পশ্চিম উপকূলের বহু জাতির নারী আছে এই দলে।’
রাহিল জানতে চাইল, ‘চূড়ান্ত নির্বাচন কীভাবে হবে? দুজন নারীকে প্রাথমিক নির্বাচনে বাদ দেওয়া হল কেন?’
সোপানশ্রেণি বেয়ে মন্দির-ভিতের ওপর উঠতে উঠতে চিত্রবান দ্বিতীয় প্রশ্নের আগে জবাব দিয়ে বললেন, ‘কারণ, ওই দুই নারীর গর্ভে সন্তান আছে। যত দিন যাবে তত তাদের উদর স্ফীত হবে। ভাস্কর্য রচনার পক্ষে অনুপযুক্ত তারা। হয়তো গর্ভে বীজ ধারণ করেই দাসের হাটে তারা বিক্রির জন্য এসেছিল অথবা দাসব্যবসায়ীরা তাদের ধর্ষণ করেছে।’
পাশ থেকে অনুদেব গম্ভীরভাবে বললেন, ‘শাস্ত্রমতেও সন্তানসম্ভবাদের মিথুন ভাস্কর্য রচনা করা নিষিদ্ধ।’
চিত্রবান এরপর প্রথম প্রশ্নর জবাবে বললেন, ‘সুরসুন্দরীদের মূর্তি নির্মাণের ক্ষেত্রে বক্ষসৌন্দর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেই সৌন্দর্যই পরীক্ষা করা হবে এবার।’
কথা বলতে বলতে সবাই উঠে এল মন্দির-ভিতের ওপর। যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে মূল মন্দির। বিকর্না এক জায়গাতে সেই নারীদের জড়ো করে দাঁড় করিয়েছে। ভীত সন্ত্রস্ত চোখে তারা তাকিয়ে দেখছে চারপাশে। তারা ঠিক বুঝতে পারছে না কেন তাদের এখানে আনা হয়েছে। হঠাৎ মন্দির-ভিতের ওপর এক কোণে একটা জিনিসের ওপর চোখ পড়তেই ডুকরে কেঁদে উঠল এক নারী। সেখানে প্রাোথিত রয়েছে একটা হাড়িকাঠ। যে হাড়িকাঠে ভিতের ওপর মন্দির নির্মাণের আগে উৎসর্গ করা হয়েছিল চারজন বালককে। সেটা দেখে মেয়েটির সম্ভবত ধারণা হয়েছে তাদেরও বলি চড়াবার জন্য মন্দিরে আনা হয়েছে। কিন্তু বিকর্না কর্কশ গলায় ধমক দিতেই তার কান্না থেমে গেল। হাড়িকাঠটার দিকে তাকিয়ে কাঁপতে লাগল সে।
মন্দিরের প্রশস্ত প্রাঙ্গনে একটা নির্দিষ্ট জায়গাতে রাহিলকে সঙ্গে করে এসে দাঁড়ালেন চিত্রবান, অনুদেব ও তার সঙ্গীরা। সেখানে পাথুরে মাটিতে খড়ি দিয়ে বেশ বড় একটা বৃত্ত রচনা করা হয়েছে। সেই বৃত্ত ঘিরে দাঁড়িয়ে পড়ল ভাস্করদের দল। অন্য নারীদের রক্ষীদের হেফাজতে রেখে বিকর্না প্রথমে এক নারীকে এনে দাঁড় করাল বৃত্তর ঠিক মাঝখানে। তারপর কোমর থেকে ছুরি বার করল। তা দেখেই থরথর করে কাঁপতে শুরু করল মেয়েটা। বিকর্না ছুরি দিয়ে চিঁরে ফেলল তার ঊর্ধ্বাঙ্গের পোশাক, খসিয়ে ফেলল তার বক্ষ আবরণী। এতজন পুরুষের চোখের সামনে উন্মুক্ত হয়ে গেল তার ঊর্ধ্বাঙ্গ।
শঙ্খের মতো তার স্তন চেয়ে আছে আকাশের দিকে, ক্ষীন কটিদেশে নাভিকূপ এত গভীর যে সূর্যালোক সেখানে প্রবেশ করতে পারছে না। এত সৌন্দর্য কোনও নারীর হতে পারে! মেয়েটা একবার চেষ্টা করল দু-হাত দিয়ে তার স্তনযুগলকে আড়াল করার।
কিন্তু বিকর্না এক ঝটকায় তার মৃণালবাহুদুটোকে দু-পাশে নামিয়ে দিল। তারপর ভঙ্গি করে দেখাল কীভাবে বুক চিতিয়ে স্থিরভাবে দাঁড়াতে হবে আকাশের দিকে মুখ তুলে। চোখ বন্ধ করে আকাশের দিকে মুখ করে সেভাবেই দাঁড়াল সেই যুবতী। শুধু লজ্জা, অপমানে তার চোখের কোণ বেয়ে পাথুরে মাটিতে গড়িয়ে পড়ল কয়েক ফোঁটা অশ্রুবিন্দু। উপস্থিত সবাই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখতে লাগল তাকে। তার উন্মুক্ত অঙ্গের প্রতিটা খাঁজ, প্রতিটা বাঁক ছুঁয়ে যেতে লাগল ভাস্করদের চোখ।
রাহিলের কিন্তু বেশ অস্বস্তি হল এই দৃশ্য দেখে। উন্মুক্ত বক্ষ অনেক দেখেছে রাহিল। সীমান্ত অঞ্চলে জেজাকভূক্তির হয়ে যুদ্ধে কলচুরি আর যবনদের প্রতিহত করেছে সে। যবন সেনাদের রোমশ বুক, কলচুরিদের কালো কষ্টিপাথরের মতো বুক লক্ষ্য করে অনেকবার অস্ত্র হেনেছে রাহিল। কিন্তু এই উন্মুক্ত, কোমল, অশ্রুসিক্ত নারীবক্ষ দেখে কেমন যেন অস্বস্তি আর লজ্জাবোধ হতে লাগল তার।
মন্দির-প্রাঙ্গনে, দেওয়ালগাত্রে বিভিন্ন ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে আছে সার সার দেবদেবীর মূর্তি। অপূর্ব শিল্পসুষমামণ্ডিত যে মূর্তিগুলোকে কিছু সময় আগে রাহিলের জীবন্ত বলে মনে হয়েছিল এখন সে বুঝতে পারল ওই দেবমূর্তিগুলো নিছকই পাথরের মূর্তি। অস্বস্তি হলেও ব্যাপারটা কী ঘটতে চলেছে তা বোঝার জন্যই রাহিল চেয়ে রইল সেই দৃশ্যর দিকে।
বেশ কিছুক্ষণ সেই অপরূপাকে পর্যবেক্ষণ করার পর প্রধান ভাস্কর তার পোশাকের ভিতর থেকে একটা ক্ষুদ্র গোলক বার করলেন। আকারে সেটা কবুতরের ডিমের মতো হবে। তবে নিটোল গোলক। সম্ভবত হীরক গোলক হবে। সূর্যালোকে ঝলমল করছে সেটা। বৃত্তের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা যুবতীর দিকে কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে তাকালেন তিনি। তারপর অদ্ভুতভাবে গোলকটা নিক্ষেপ করলেন নির্দিষ্ট লক্ষ্যে।
গোলকটা ঠিক গিয়ে পড়ল যুবতীর উন্মুক্ত দুই বক্ষের ঠিক মাঝখানে। তারপর আটকে গেল সেখানেই। তা দেখে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠল প্রধান ভাস্করের ঠোঁটের কোণে। হাসি ফুটে উঠল অন্যদের ঠোঁটেও। রাহিল অনুমান করল সম্ভবত নির্বাচিত করা হল এই রমণীকে। বিকর্না তার বক্ষ থেকে সেই হীরক-গোলক তুলে নিয়ে প্রধান ভাস্করের দিকে তাকাল। তিনি ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ তুলে ধরলেন উপর দিকে। বিকর্না সেই গোলক ভাস্করের হাতে সমর্পণ করে পরীক্ষিত সেই নারীকে বৃত্তের বাইরে একপাশে দাঁড় করাল। তারপর নিয়ে এল আর এক নারীকে। তারও ঊর্ধ্বাঙ্গ উন্মোচন করে ছুড়ে দেওয়া হল গোলক। সে-ও বক্ষে ধারণ করল সেই গোলক।
পরীক্ষা পর্ব চলতে লাগল। মাথার ওপরের সূর্যও পশ্চিমে এগোতে শুরু করল। মাঝে একজন রমনীর দুই বক্ষর মাঝ দিয়ে গোলক গড়িয়ে পড়ল নীচে। সঙ্গে সঙ্গে চিত্রবান বৃদ্ধাঙ্গুল নীচের দিকে প্রদর্শন করলেন, তাকে অন্যপাশে দাঁড় করানো হল।
পরীক্ষাপদ্ধতিটা বোধগম্য হল রাহিলের। যে নারীর দুই স্তন ঘন সন্নিবিষ্ট, যাদের মধ্যে দিয়ে গোলক গড়িয়ে নীচে পড়ছে না তাদের নির্বাচন করা হচ্ছে সুরসুন্দরী রূপে। আর যাদের স্তন বিল্বের ন্যায় বর্তুলাকার বা শঙ্খের ন্যায় উদ্ভিন্ন হলেও স্তনযুগল ঘন সন্নিবিষ্ট নয় তাদের নির্বাচিত করা হচ্ছে দাসী হিসাবে। সত্যি অদ্ভুত এই বক্ষসৌন্দর্য পরিমাপের কৌশল!
অধিকাংশ নারীরাই নির্বাচিত হচ্ছে পরীক্ষায়। ক্রমশ চওড়া হচ্ছে চিত্রবানের ঠোঁটের কোণে হাসি। শুধু পুরোহিত অনুদেব আগের মতোই গম্ভীর। তিনি তীক্ষ্ণ নজরে পর্যবেক্ষণ করছেন সব কিছু আর মাঝে মাঝে শিখায় হাত দিচ্ছেন।
চলতে লাগল পরীক্ষা। মন্দিরের ছায়া পড়তে শুরু করল সামনের চত্বরে। একসময় তখন আর মাত্র দু-তিনজনের বক্ষসৌন্দর্য নির্ধারণ বাকি, রাহিলের পাশে দাঁড়িয়ে-থাকা অনুদেব গম্ভীর স্বরে রাহিলকে বললেন, ‘এইসব সুরসুন্দরী আর দাসীর দল আজ থেকে বিকর্নার তত্বাবধানে এই মন্দিরেই থাকবে। সুরসুন্দরীদের চৌষট্টি কলার বিভিন্ন মুদ্রার তালিম দেবে বিকর্না।
‘মন্দিরের পিছনের কুঠুরিতে রাত্রিবাস করবে এরা। উন্মুক্ত অবস্থাতেই থাকবে, মন্দির-প্রাঙ্গণেও বিচরণ করতে পারবে যদি-না কেউ কোনও নিয়মভঙ্গ না করে, অনুশাসন মেনে চলে। কিন্তু আপনারা খেয়াল রাখবেন এদের কেউ কোনও অবস্থাতেই মন্দির থেকে পালাতে না পারে। ভাস্কর বা মজুরদের কেউও যাতে তাদের কাউকে সঙ্গে নিয়ে চত্বর ছেড়ে অন্যত্র না যায়। প্রয়োজনবোধে আপনার রক্ষীরা শাসন করতে পারে সুরসুন্দরীদের। চপেটাঘাত, কেশ কর্ষণ, মুষ্টাঘাতও চলতে পারে, তবে অস্ত্রাঘাত কোনও সময়ই নয়। তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে তাদের অঙ্গ। ভাস্কর্যর কাজে আর তাকে লাগানো যাবে না। বহু ব্যয় করে এদের এখানে আনা হয়েছে। মনে রাখবেন, এই এক-একজন সুরসুন্দরী হীরকখণ্ডের চেয়েও দামি ভাস্করদের চোখে। এ ব্যাপারগুলো অবগত করুন আপনার সেনাদের।’
প্রধান পুরোহিতের কথা শুনে রাহিল এগোতে গেল কিছুটা তফাতে রক্ষীদলের কাছে যাওয়ার জন্য। একজন দীর্ঘাঙ্গী অপরূপা সামনে এগিয়ে আসছে বৃত্তে প্রবেশ করার জন্য। এখন আর তাদের হাত ধরে টেনে এনে বৃত্তের মাঝখানে দাঁড় করাতে হচ্ছে না বিকর্নাকে।
নবাগতাদের প্রাথমিক শঙ্কা, মৃত্যুভয় সম্ভবত কিছুটা কেটে গেছে, ভবিতব্যকেও মেনে নিয়েছে তারা। বিকর্নার ইশারায় একে একে এসে দাঁড়াচ্ছে বৃত্তের মাঝখানে। উন্মোচিত করছে তার বক্ষবন্ধনী। আত্মসমর্পণ করছে পুরুষের দৃষ্টির কাছে। সেই শুভ্রবর্ণা অপরূপাও এগিয়ে গেল বৃত্তের দিকে। বৃত্তের ভিতর প্রবেশ করেই সে ঘুরে দাঁড়াল প্রধান ভাস্করের দিকে। তারপর মাথা ঝুঁকিয়ে সম্ভাষণ জানাল চিত্রবান ও অনুদেবকে উদ্দেশ্য করে। এ কাজ ইতিপূর্বে অন্য কোনও নারী করেনি। তাকে দেখে চিত্রবানদের মনে হল এতক্ষণ যাদের তাঁরা দেখেছেন তাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সুন্দরী এই নারী। মাথায় একরাশ কুঞ্চিত ঘন কৃষ্ণবর্ণের কেশদাম, গাত্রবর্ণ রক্তাভ শঙ্খের ন্যায় উজ্জ্বল, টিকালো নাসা, ফুলের পাপড়ির মতো ওষ্ঠাধার, বক্ষাবরণী যেন ধরে রাখতে পারছে না তার যৌবনকে।
ঘন সন্নিবিষ্ট স্তনযুগলের উপরিভাগে গিরি-খাদের মতো বিভাজিকার দুর্নিবার হাতছানি, ক্ষীণ কটিদেশে আবৃত স্বচ্ছ রেশমবস্ত্রকে অতিক্রম করে দৃশ্যমান হচ্ছে গভীর নাভিকূপ। মৃদঙ্গর মতো নিতম্ব, মৃণালবাহু, কদলিবৃক্ষর মতো ঊরুসম্মিলিত সেই নারীর দিকে চেয়ে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন চিত্রবান আর প্রধান পুরোহিত। এ কি মানবী নাকি স্বর্গের অপ্সরা নেমে আসছে মন্দির-প্রাঙ্গণে! কোনও উপমাতেই তার সৌন্দর্য বিশ্লেষণ করা যায় না! তাদের বিমোহিত দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে যেন হাসি ফুটে উঠল সেই নারীর দীঘল হরিণী চোখে।
বৃত্তাকারে রাহিল এগোতে যাচ্ছিল তার বাহিনীর দিকে। কিন্তু সৈনিকের তৃতীয় নয়ন হঠাৎ ধরে ফেলল একটা ব্যাপার। সেই নারীর পশ্চাৎ ভাগ দেখতে পাচ্ছে রাহিল। সম্মোহনের দৃষ্টিতে প্রধান ভাস্কর আর পুরোহিতের দিকে তাকিয়ে-থাকা অবস্থাতেই তার ডান হাত চলে গেছে তার নিতম্বের ওপর কোমরবন্ধে। কী যেন একটা অনুভূতি সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক করে দিল রাহিলের সৈনিকসত্তাকে।
ভিড় ঠেলে সে লাফ দিল সেই যুবতীর দিকে। সে যখন সেই যুবতীর বাহু চেপে ধরল ঠিক তখন তার হাতে উঠে এসেছে একটা ধারালো ছুরিকা। হিংস্র বাঘিনীর মতো জ্বলে উঠেছে তার দুই চোখ। ছুরিটা সে বসিয়ে দিতে যাচ্ছিল তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রধান ভাস্কর বা পুরোহিতের বুকে। কিন্তু পারল না, তার আগেই রাহিল মুচড়ে ধরল তার হাত।
মৃদু আর্তনাদ করে উঠল সেই যুবতী। ধাতব ছুরিকা খসে পড়ল তার হাত থেকে। কয়েক মুহূর্তর মধ্যেই ব্যাপারটা ঘটে গেল। বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে উঠতে কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল সকলের। আর তারপরই বৃহন্নলা বিকর্না সেই ছুরি তুলে নিয়ে বসিয়ে দিতে যাচ্ছিল সেই যুবতীর বুকে, কিন্তু তাকে আগলে দাঁড়িয়ে রাহিল তাকাল চিত্রবান আর অনুদেবের নির্দেশের অপেক্ষায়। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়ে কিছুটা বিবর্ণ হয়ে গেছিলেন চিত্রবান, কিন্তু প্রধান পুরোহিতের চোখ কয়েক মুহূর্তর জন্য যেন হিংস্র শ্বাপদের মতো জ্বলে উঠল। রাহিল তাদের দিকে তাকাতেই চিত্রবান তাকালেন অনুদেবের দিকে।
অনুদেবের ক্রোধ যেন হঠাৎ স্তিমিত হয়ে গেল। তার পরিবর্তে তাঁর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল অন্যরকম একটা হাসি। শিখাতে একবার হাত বুলিয়ে নিয়ে তীব্র শ্লেষের সঙ্গে তিনি বললেন, ‘অরণ্যের হিংস্র বাঘিনীকে পোষ মানালে সে পালিত ব্যাঘ্র শাবকের চেয়ে ভবিষ্যতে অনেক বেশি কৌতুক প্রদর্শন করে। এই নারীকে রজ্জুবদ্ধ করে আপাতত কুঠুরিতে বন্দি করা হোক।’
তাঁর কথায় সম্মতি প্রকাশ করলেন প্রধান ভাস্কর, নিরস্ত হল বিকর্নাও। তা দেখে রাহিল একটা জিনিস অনুধাবন করতে পারল,—চিত্রবান এই কান্ডারীয় মন্দিরের প্রধান স্থপতি অথবা প্রধান ভাস্কর হতে পারেন ঠিকই, কিন্তু পুরোহিত অনুদেবের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা তাঁর অপেক্ষা বেশি। এখানে শেষ কথা বলেন সম্ভবত অনুদেবই।
তাঁর নির্দেশমতো মন্দিরের নিজস্ব রক্ষীরা সঙ্গে সঙ্গে নারীকে রজ্জুবদ্ধ করল। উপস্থিত কয়েকজন চিত্রবানের অনুচর সেই যুবতীকে নিয়ে এগিয়ে চলল মন্দিরের ভিতরে নির্দিষ্ট গন্তব্যে। সেই রমণী আর কোনও বাধা দিল না। শুধু রজ্জুবদ্ধ রক্ষীপরিবৃত অবস্থায় চলতে চলতে একবার ফিরে তাকাল রাহিলের দিকে। রাহিলের মনে হল সেই নারীর দু-চোখ দিয়ে যেন ঘৃণা বর্ষিত হল তার প্রতি। অসহ্য সেই দৃষ্টি। রাহিল চোখ ফেরাল অন্যদিকে।
মন্দিরের ছায়া ক্রমশ দীর্ঘতর হচ্ছে। দূরের বিন্ধ্যপর্বতমালার আড়ালে কিছুক্ষণের মধ্যে সূর্য অস্ত যাবে। রক্ষীরা সেই নারীকে নিয়ে চলে যাবার পর আরও একটা কাজ বাকি ছিল অনুদেবদের। একজন একটা জ্বলন্ত কাঠকয়লাপূর্ণ পাত্র নিয়ে এল। তার ভিতর গোঁজা আছে একটা লৌহশলাকা। আর সেই শলাকার মাথায় রয়েছে চান্দেলরাজের আঁক- সম্মিলিত শিলমোহর। সার বেঁধে সুরাকন্যা ও দাসীদের দাঁড় করাল বিকর্না। আর সেই লোকটা তাদের কাছে গিয়ে তাদের পিঠে এক এক করে সম্রাট-মুদ্রার ছাপ আঁকতে শুরু করল।
উত্তপ্ত লৌহশলাকার স্পর্শে যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠল নারীর দল। এ-ছাপ কোনওদিন উঠবে না। মন্দিরের সম্পত্তি হিসাবে দেগে দেওয়া হল তাদের। এ-কাজ শেষ হবার পর বিকর্না তাদের সবাইকে নিয়ে চলল মন্দির-প্রাঙ্গণের পিছনের দিকে তাদের রাত্রিবাসের জায়গাতে। অবসন্ন, বিষন্ন নারীর দল ধুঁকতে ধুঁকতে অনুসরণ করল বিকর্নাকে।
রাহিল নিজেও বেশ ক্লান্ত বোধ করল। গত দু-রাত সীমান্তপ্রদেশ থেকে সঙ্গীদের নিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে আসতে হয়েছে তাকে। দলের অর্ধেক সৈনিককে মন্দির-চত্বরে মোতায়েন করে বাকিদের নিয়ে চলল তাদের জন্য নির্ধারিত কক্ষে বিশ্রাম লাভের জন্য। কিছুক্ষণের মধ্যেই মন্দির-চত্বরে অন্ধকার নেমে এল। রাহিলের রক্ষীরা মশাল জ্বালিয়ে শুরু করল মন্দির প্রহরার কাজ।