Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    তিস্তাপারের বৃত্তান্ত – দেবেশ রায়

    August 29, 2025

    অদ্বৈতপ্রকাশ – ঈশান নাগর

    August 29, 2025

    পৃথিবীর ইতিহাস – দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

    August 29, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • 🔖
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    Subscribe
    সাইন ইন
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    খাজুরাহ সুন্দরী

    ঐতিহাসিক হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত এক পাতা গল্প179 Mins Read0

    ১০

    ভোর। বিন্ধ্যাচল পর্বতের মাথা থেকে ধীরে ধীরে আলো ছড়িয়ে পড়ল বনানী ঘেরা মন্দিরগুলোর মাথায়, কান্ডারীয় মন্দিরের চত্বরে। মন্দিরগাত্রে, স্তম্ভগাত্রে, চত্বরে দাঁড়িয়ে থাকা মূর্তিগুলোর দিকে তাকাল রাহিল। তারাও যেন তাকিয়ে আছে রাহিলের দিকে। রোজ এই মূর্তিগুলোকে সারাদিনে বহুবার দেখে রাহিল, কিন্তু আজ সেই মূর্তিগুলোর দিকে তাকিয়ে তাদেরকে যেন বড় আপন মনে হল রাহিলের।

    পরদিন ভোরবেলা এ মন্দিরে আর তার সূর্যোদয় দেখা হবে না। তখন সে এই স্থান থেকে অনেক দূরে চলে গেছে। তার আর কোনওদিন ফেরাও হবে না এই কান্ডারীয় মন্দিরে। রাহিল এই প্রথম অনুধাবন করল এখানে থাকতে থাকতে এই মন্দিরের প্রতি একটা মায়া জন্মে গেছে তার। ওই তো সেই শার্দূল মূর্তি, প্রথম দিন যে মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে দেখেছিল সেই মূর্তিটাকে। তার কিছুটা তফাতে যে জীবন্ত হস্তিমূর্তি দাঁড়িয়ে তার আড়ালে দ্বিপ্রহরের সূর্যর তেজ থেকে নিজেকে আড়াল করার জন্য এসে দাঁড়াত রাহিল। আর ওই যে দূরে পূর্বকোণে যে স্তম্ভ দেখা যাচ্ছে, যার গায়ে খোদিত আছে এক অপ্সরা মূর্তি, তার গায়ে ভর দিয়ে দূরের পর্বতমালার দিকে চেয়ে থাকত সে। টুকরো টুকরো স্মৃতি ভিড় করছিল রাহিলের মনে।

    মজুর-শিল্পীদের অস্পষ্ট কোলাহল শোনা যাচ্ছে। দল বেঁধে তারা মন্দিরের দিকে আসছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই মন্দির-প্রাঙ্গণে উপস্থিত হবে তারা। নিয়োজিত হবে নিজেদের কাজে। কিন্তু তারা এসে উপস্থিত হওযার আগেই রাহিল দেখতে পেল প্রকটাক্ষকে সঙ্গে নিয়ে মন্দির-প্রাঙ্গণে উপস্থিত হলেন অনুদেব। প্রাঙ্গণের একপাশে দাঁড়িয়ে তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলতে লাগলেন। আর তারপরই চত্বরে উপস্থিত হলেন চিত্রবানও। প্রধান পুরোহিতকে দেখতে পেয়ে চিত্রবানও এগোলেন সেদিকে। রাহিলও এগোল এবার।

    প্রধান পুরোহিত তাদের দেখতে পেয়েই প্রকটাক্ষর সঙ্গে আলোচনা থামিয়ে দিলেন। তারা দুজন তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। অনুদেব তাদের প্রতি ভালো করে দৃষ্টিপাত করে রাহিলকে প্রশ্ন করলেন, ‘কাল রাতের কোনও বিশেষ সংবাদ আছে?’

    রাহিল জবাব দিল, ‘না, সব কিছুই স্বাভাবিক ছিল।’

    ‘আপনি রাতে মন্দিরের পশ্চাদভাগে কোন সময় গেছিলেন?’ জানতে চাইলেন অনুদেব।

    রাহিল উত্তর দিল, ‘আমি নিজে সেখানেই সারারাত প্রহরায় ছিলাম। রাত তিন প্রহর পর্যন্ত।’

    অনুদেব বললেন, ‘মন্দির-রক্ষীবাহিনীর একজন লোকের দাবি সে নাকি নীচ থেকে শেষ প্রহরে দুজন ছায়ামূর্তিকে দেখেছে ওই তাকের গায়ে।’

    চিত্রবান সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘ছায়ামূর্তির সংখ্যা বেড়ে গেল! একের বদলে দুজন! তবে আমার ধারণা ও লোকটা ভুল দেখেনি।’

    অনুদেব প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি কী বলতে চাচ্ছেন?’

    চিত্রবান মৃদু হেসে বললেন, ‘দুটো ছায়ামূর্তি অর্থাৎ নিশ্চিত ওই কৃষ্ণবানর দুটো হবে। তারা ওই অংশে গেছিল।’

    রাহিলও সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, প্রধান পুরোহিতের অনুমান সঠিক। একটু আগেই আমি ঠিক সূর্যোদয়ের মুহূর্তে দেখলাম মন্দিরের পশ্চাদভাগ থেকে তাক বেয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে বানর দুটো এদিকে আসছে।’ এই বলে একবার ঘাড় ফিরিয়ে বানর দুটোকে দেখা যায় নাকি সে ভান করে রাহিল তাকাল মন্দির-শীর্ষের দিকে।

    তাদের দুজনের একই বক্তব্য শুনে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে সম্ভবত বক্তব্যর সত্যতা যাচাইয়ের চেষ্টা করলেন অনুদেব। তারপর বললেন, ‘তবে একজনের গতিবিধি কিঞ্চিত সন্দেহর উদ্রেক ঘটাচ্ছে।’

    চিত্রবান জানতে চাইল, ‘কার?’

    প্রধান পুরোহিত জবাব দিলেন, ‘মাহবা নামের ওই বৃদ্ধ ভাস্করের। কাল রাতে তো সে মন্দিরেই ছিল। কিন্তু প্রথম প্রহরের পর দীর্ঘসময় সে অনুপস্থিত ছিল তার কক্ষে। কোথায় গেছিল সে? এই প্রকটাক্ষ তার কক্ষে গিয়ে তাকে পায়নি!’

    প্রকটাক্ষ মাথা নেড়ে সম্মতি প্রকাশ করল তার কথায়।

    রাহিল বলল, ‘ঠিক আছে, আমি তাকে সারাদিন নজরদারীর মধ্যে রাখব।’

    অনুদেব বললেন, ‘আগামী কাল সূর্যোদয় পর্যন্ত সময়কাল খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই আজকের রাতটা আমিও মন্দিরে কাটাব। প্রধান ভাস্কর আপনি সমস্ত মজুর-ভাস্করদের জানিয়ে দিন সূর্যাস্তের পর কোনও ভাস্কর-মজুররাই যেন মন্দির-চত্বরে না থাকে। সূর্যাস্তের পূর্বে ওই দুই ভাস্করেরও কাজ শেষ হয়ে যাবে নিশ্চই। আর মজুরদের জানিয়ে দিন আগামীকাল তাদের ছুটি। মন্দিরে আসার প্রয়োজন নেই। কাল সৈন্যবাহিনী আসবে, নতুন নারীদের দল আসবে, বেশি লোক থাকলে কাজের ব্যাঘাত ঘটবে।’

    শিল্পী-মজুরদের দল উপস্থিত হতে শুরু করেছে মন্দিরে। প্রধান পুরোহিত অনুদেব এরপর বললেন, ‘মন্দির পরিক্রমা করে কিছু সময়ের মধ্যে আমি যাব যেখানে কূপ খোদিত হচ্ছে সে-স্থানে। সে-স্থান একবার দেখে নেওয়া প্রয়োজন। তারপর আমাকে নিয়োজিত থাকতে হবে অন্য কাজে। উগ্রায়ুধ আর তার সেনাদল তো কাল প্রত্যুষেই মন্দির-প্রাঙ্গণে উপস্থিত হবে। উগ্রায়ুধের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় তিনি আমাকে একটি রণশঙ্খ উপহার দিয়েছেন। তাকে কিছু উপহার দেওয়াও আমার কর্তব্য। এক কাষ্ঠশিল্পীকে দারুকাঠের এক যক্ষীমূর্তি নির্মাণ করতে বলেছি। তা সংগ্রহ করতে হবে আমাকে। এসব কাজ মিটতে দ্বিপ্রহর অতিক্রান্ত হবে। তারপর বিশ্রাম লাভ করে সূর্যোদয়ের আগেই আমি ফিরে আসব মন্দিরে। আমি ফিরে এসে পরবর্তী নির্দেশ দেব। এই সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়, যতক্ষণ পর্যন্ত না ভাস্কর-মজুরদের দল মন্দির ত্যাগ করে ততক্ষণ তাদের প্রতি প্রখর দৃষ্টি রাখবেন। আর বিকর্নাকে জানিয়ে দিন সুরসুন্দরীদের ওপর বিশেষ দৃষ্টি রাখতে। তারা যেন তাদের নিজেদের কক্ষেই থাকে। আগামীকাল সেনাদল উপস্থিত হলে সূর্যালোকে উপস্থিত হবে তারা।

    রাহিল আর চিত্রবান মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মতি প্রকাশ করল তাঁর কথায়। প্রকটাক্ষকে সঙ্গী করে অনুদেব এরপর এগোলেন মন্দির পরিক্রমণের জন্য।

    চিত্রবান সমবেত মজুর-ভাস্করদের দিকে এগোবার আগে রাহিলের উদ্দেশ্যে চাপা স্বরে বললেন, ‘মিত্রাবৃন্দার ওপর লালসা চরিতার্থ করার জন্যই হয়তো প্রধান পুরোহিত মন্দিরে রাত্রিবাসের সিদ্ধান্ত নিলেন। অথবা এমনও হতে পারে কোনও কারণে সন্দেহর উদ্রেক ঘটেছে তাঁর মনে। তিনি মন্দির-চত্বর ত্যাগ করলেও প্রকটাক্ষ তার হয়ে মন্দির-চত্বরে নজরদারী করবে, আমাদের ওপরও নজরদারী চালাবে। অতএব সাবধান। আমি মন্দির-প্রাঙ্গণেই আছি। প্রয়োজন হলে আমার সঙ্গে শলা করবেন।’

    রাহিল নিজের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে রইল। চিত্রবান উপস্থিত হলেন মজুর-ভাস্করদের কাছে। তাদেরকে কাজ বুঝিয়ে দেবার আগে তাদের তিনি প্রধান পুরোহিতের নির্দেশ জানিয়ে দিলেন। পরদিন কাজে আসতে হবে না জেনে মৃদু আনন্দের কলরব উঠল শ্রমিকদের মনে। এ সৌভাগ্য তাদের বড় একটা হয় না। প্রধান ভাস্করের কথা শেষ হবার পর তাদের জমায়েত ভেঙে গেল। তারা নিয়োজিত হল দৈনন্দিন কাজে।

    প্রভু অনুদেব প্রথমে মন্দির প্রদক্ষিণ করে প্রবেশ করলেন অন্ত:পুরে। কিছু সময় পর তিনি সেখান থেকে বেরিয়ে এসে মন্দির-চত্বর পরিত্যাগ করলেন। প্রকটাক্ষ তাঁকে মন্দির-ভিতের নীচে পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আবার ওপরে ফিরে এল। রাহিল এরপর শুরু করল মন্দির পরিক্রমা।

    মন্দির-চত্বরের প্রায় প্রতিটা অংশেই শেষ একবারের জন্য উপস্থিত হতে লাগল রাহিল। ছুঁয়ে দেখতে লাগল দেওয়াল স্তম্ভর গায়ে দাঁড়িয়ে থাকা পরিচিত মূর্তিগুলোকে। তারই মাঝে চাপা শঙ্কা কাজ করতে লাগল তার মনে। নিজের বাহুর ওপর আস্থা আছে তার। সঙ্গে মাহবা আছেন, চিত্রবান আছেন, তার সৈনিকেরাও হীরকখণ্ডর বিনিময়ে রাজি হয়েছে তার সঙ্গী হতে, রাহিলের সঙ্গে তারাও এ রাজ্য ছেড়ে যাবে। কিন্তু অনুদেব অত্যন্ত ধূর্ত মানুষ। শেষ পর্যন্ত এমন কোনও ঘটনা ঘটবে না তো যাতে তাদের পরিকল্পনা বিনষ্ট হয়? মাঝে মাঝেই এ প্রশ্ন উঁকি দিতে লাগল রাহিলের মনে।

    সময় এগিয়ে চলল। একসময় সূর্য মাথার ওপর পৌঁছোল। তারও বেশ কিছু সময় পর ঠিক দ্বিপ্রহরে রাহিল মন্দিরের অন্ত:পুরে প্রবেশ করে এগোল মাহবার কক্ষের দিকে।

    সে কক্ষে প্রবেশ করেই রাহিল দেখতে পেল মিত্রাবৃন্দাকে। মাহবা মূর্তি নির্মাণের জন্য মিত্রাবৃন্দাকে নিয়ে এসেছেন কক্ষে। মাহবা রাহিলকে বললেন, ‘মিত্রাবৃন্দাকে জানিয়ে দিয়েছি আমাদের পরিকল্পনার কথা। কাজ শেষ করে ওকে ওর কক্ষে পৌঁছে আমি মন্দির ত্যাগ করব। তারপর সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে আবার ফিরে এসে ওকে নিয়ে যাব সেই ভূগর্ভস্থ কক্ষে। সেখান থেকে এই রমণীকে আপনি উদ্ধার করবেন।’

    রাহিল তাকাল মিত্রাবৃন্দার দিকে। মুক্তির আনন্দে, খুশিতে উদ্ভাসিত তার মুখ। আজ আর তার চোখের তারায় কোনও বিষণ্ণতা জেগে নেই। রাহিল তাকে প্রশ্ন করল, ‘তোমার ভয় করছে না তো?’

    ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে মিত্রাবৃন্দা জানাল—’না’।

    রাহিল এরপর তাকে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু কক্ষে প্রবেশ করল প্রকটাক্ষ। মুখে কিছু না বললেও সন্দিগ্ধভাবে তাকাতে লাগল ঘরের চারদিকে। মূর্তির চক্ষুদানের কাজ করছেন মাহবা। মিত্রাবৃন্দা পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। তাদের দেখতে লাগল রাহিল আর প্রকটাক্ষ। হঠাৎ কাজ থামিয়ে মাহবা তাদের দুজনের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘মূর্তি নির্মাণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ এবার আমি করব। অক্ষি-গোলকে দৃষ্টি- গোলক রচনা করব। আপনাদের উপস্থিতি আমার মন:সংযোগ নষ্ট করতে পারে। এ কাজের সময় ভাস্কর ছাড়া অন্য কেউ উপস্থিত থাকে না। অনুগ্রহ করে আপনারা কক্ষ ত্যাগ করুন। সময় বেশি নেই। প্রধান পুরোহিতের নির্দেশে সূর্যাস্তের আগেই মূর্তি নির্মাণ সম্পন্ন করে আমাকে মন্দির ত্যাগ করতে হবে।’ হয়তো তিনি মিত্রাবৃন্দার সঙ্গে একান্তে কোনও কথা বলার জন্যই এই কৌশল অবলম্বন করলেন।

    রাহিল সঙ্গে সঙ্গে প্রকটাক্ষর উদ্দেশ্যে বলল, ‘হ্যাঁ, এই কক্ষে বেশিক্ষণ আবদ্ধ থাকা উচিত হচ্ছে না। প্রধান পুরোহিত আমাদের সর্বত্র নজর দিতে বলেছেন।’

    অগত্যা, কিছুটা অনিচ্ছা সত্বেও যেন প্রকটাক্ষ রাহিলের সঙ্গে কক্ষ ত্যাগ করল। বাইরের প্রাঙ্গণে বেরিয়ে কেউ কারও সঙ্গে বাক্যালাপ না করে দুজনে এগোল দু-দিকে। রাহিল ঘুরে বেড়াতে লাগল প্রাঙ্গণে। মাঝে মাঝে তার সাক্ষাৎ হতে লাগল তার সৈনিকদের সঙ্গে। চোখের ভাষাতে তারা রাহিলকে জানিয়ে দিল তারা প্রস্তুত আছে। সূর্য যত পশ্চিমে এগোতে থাকল তত রাহিলের বুকের ভিতর উত্তেজনা বাড়তে লাগল। বিকাল হল একসময়। মন্দির-ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে রাহিল একসময় দূর থেকে দেখতে পেলেন অনুদেব আসছেন।

    শেষবিকালে রাত্র জাগরণের প্রস্তুতি নিয়ে মন্দির-চত্বরে উপস্থিত হলেন কান্ডারীয় মন্দিরের প্রধান পুরোহিত অনুদেব। তিনি গিয়ে দাঁড়ালেন মন্দির- প্রাঙ্গণের ঠিক সে জায়গাতে যেখানে মজুর-ভাস্করের দল প্রতিদিন কুটিরে ফেরার জন্য উপস্থিত হয়ে সারিবদ্ধভাবে মন্দির-প্রাঙ্গণ ত্যাগ করে। তিনি সেখানে গিয়ে দাঁড়াতেই প্রকটাক্ষ কোথা থেকে যেন আবির্ভূত হল তাঁর পাশে।

    রাহিলও উপস্থিত হল সেখানে। তিনি কোনও বাক্যালাপ করলেন না রাহিলের সঙ্গে। রাহিল আড়চোখে ভালোভাবে একবার দেখল অনুদেবকে। আজ অনুদেব অস্ত্রসজ্জিত। তার এক হাতে ধরা আছে একটা প্রকাণ্ড শূল, অন্য হাতে একটা রণশঙ্খ।

    পরনে শুভ্র পোশাকের বদলে রক্তাম্বর, মাথার পিছনে দীর্ঘ শিখা শক্তভাবে রেশমের ফিতে দিয়ে বাঁধা। তবে তাঁর পায়ে আজ খড়ম নেই, পদযুগল উন্মুক্ত। রাহিলের অনুমান হল যে নি:শব্দে চলার জন্যই তার পদযুগল আজ খড়মহীন। রক্তাম্বরে সজ্জিত, শূলবাহী, দানবাকৃতি, ঘোর কৃষ্ণবর্ণের প্রধান পুরোহিত অনুদেব কঠিন চোয়ালে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন সামনের ফাঁকা জায়গাটার দিকে। যেখানে এক-এক করে উপস্থিত হতে শুরু করেছে মজুরের দল। কিছু সময়ের মধ্যে সেখানে এসে উপস্থিত হলেন চিত্রবানও। তাকে দেখে প্রধান পুরোহিত শুধু জানতে চাইলেন, ‘দুই ভাস্করের মূর্তি নির্মাণ সম্পন্ন?’

    প্রধান ভাস্কর জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, তাদের কাজ সম্পন্ন।’

    বিন্ধ্য পর্বতের মাথার ওপর সূর্য ঢলে পড়ল। শিল্পী-মজুরদের দল সমবেত হল মন্দির-চত্বরে। তারপর সারবদ্ধভাবে তারা এগোল চত্বর ছেড়ে কুটিরে ফেরার জন্য। এক-একজন মজুর-ভাস্কর তাদের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, আর তাকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখছেন অনুদেব। একসময় হেঁটে গেলেন মাহবাও। রাহিল খেয়াল করল যে তার দিকে তাকিয়ে অনুদেবের চোখের দৃষ্টি যেন তার ওপর স্থির হয়ে গেল। তার দৃষ্টি বেশ কিছুক্ষণ অনুসরণ করল মাহবাকে। যতক্ষণ না মাহবা অদৃশ্য হলেন তাঁর দৃষ্টির বাইরে।

    মজুরদের শেষ লোকটা একসময় মন্দির-প্রাঙ্গণ পরিত্যাগ করল। অনুদেব এরপর তাকালেন অনতিদূরের বনভূমির দিকে। একটা আবছা কোলাহলের শব্দ যেন সেদিক থেকে ভেসে আসছে! যে শব্দটা মন্দির- প্রাঙ্গণে মজুরদের পদশব্দে কেউ খেয়াল করেনি। ধীরে ধীরে প্রধান পুরোহিতের ঠোঁটের কোণে আবছা হাসি ফুটে উঠল। কথা রেখেছেন মহাসৈনাধ্যক্ষ। তিনি ও তার সৈন্যরা উপস্থিত হতে শুরু করেছে ওই অরণ্যের আড়ালে। এবার অনেকটা নিশ্চিন্ত প্রধান পুরোহিত অনুদেব। এরপর তিনি বললেন, ‘সৈন্যবাহিনী ও মন্দির-রক্ষীবাহিনীর সবাইকে এখানে সমবেত করা হোক।’

    অনুদেবের নির্দেশে কিছুক্ষণের মধ্যেই সে কাজ সম্পন্ন করল রাহিল ও প্রকটাক্ষ। নিজ নিজ বাহিনীর লোককে সেখানে হাজির করল তারা। প্রধান পুরোহিতের সামনে দু-ভাগে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াল তারা।

    প্রধান পুরোহিত তাদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘কাল সূর্যোদয় হলেই বৃহৎ সেনাদল প্রবেশ করবে মন্দিরে। কিন্তু এই সূর্যাস্ত থেকে কাল সূর্যোদয় পর্যন্ত সময়কাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। কোনও অবস্থাতেই যেন সুরসুন্দরীদের কেউ মন্দির পরিত্যাগ না করতে পারে। দু-ভাগে বিভক্ত হয়ে প্রহরা দেওয়া হবে। সৈন্যদল থাকবে মন্দির-চত্বরে, আর মন্দির-রক্ষীবাহিনী আবৃত করে থাকবে মন্দিরের নীচের চত্বর। মন্দিরের অন্ত:পুরে প্রহরার তেমন প্রয়োজন নেই। ওই অংশে আমি নিজে দৃষ্টি রাখব। সবাই সতর্ক থাকবে। কারো কাজে সামান্য গাফিলতি হলে রাজনির্দেশে তার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। আর আজ রাতের নিরাপত্তা যদি তোমরা সুনিশ্চিত করতে পারো তবে তোমরা প্রত্যেকে পুরস্কৃত হবে। এবার তোমরা যাও। মন্দিরের বহিরংশে মশাল প্রজ্বলিত করে প্রহরার কাজ শুরু করো। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্ধকার নামবে।’

    অনুদেবের নির্দেশের পর কর্তব্য সম্পাদন করতে ছড়িয়ে পড়ল দুই বাহিনী। রাহিল শুধু অনুদেবের শেষ নির্দেশের প্রতীক্ষায় রইল। তিনি রাহিলকে বললেন, ‘আমি মন্দিরের সম্মুখভাগে আর আপনি পশ্চাদভাগে থাকবেন।’

    প্রধান ভাস্কর চিত্রবান জানতে চাইলেন, ‘আমার মন্দির-প্রাঙ্গণে উপস্থিতির প্রয়োজন আছে কি?’

    অনুদেব জবাব দিলেন, ‘আপনার রাত্রি জাগরণের প্রয়োজন দেখি না। আপনি মন্দির ত্যাগ করতে পারেন। তবে সূর্যোদয়ের প্রাক মুহূর্তেই মন্দিরে চলে আসবেন। সৈন্যবাহিনী মন্দিরে প্রবেশ করার সময় আপনার উপস্থিতি প্রয়োজন।’

    প্রভু অনুদেবের কথায় সম্মতি প্রকাশ করে তাঁর থেকে বিদায় নিয়ে মন্দির-প্রাঙ্গণ ত্যাগ করলেন চিত্রবান।

    অন্ধকার নামতে শুরু করল মন্দির-চত্বরে। ইতিমধ্যেই মন্দির-প্রাঙ্গণে জ্বলে উঠতে শুরু করেছে মশালের আলো।

    নিকষ কালো রাত্রি। মন্দির-প্রাঙ্গণে স্তম্ভ, দেওয়ালের গায়ে স্থানে স্থানে মশাল গোঁজা হয়েছে। কিন্তু সেই মশালের আলো মন্দির-প্রাঙ্গণের অন্ধকার দূর করতে পারছে না, বরং যেন আরও গাঢ় মনে হচ্ছে স্তম্ভ, মূর্তি, দেওয়ালের আড়ালে জমে থাকা অন্ধকার। আর তারই মাঝে পদচারণা করছে রাহিলের সৈন্যবাহিনী। ভৌতিক লাগছে তাদের অবয়বগুলো। অনুদেবও নিশ্চই মন্দির-প্রাঙ্গণে কোথাও আছেন এই অন্ধকারের মধ্যে।

    প্রাঙ্গণের নীচের চত্বরে প্রহরারত মন্দির-রক্ষীবাহিনীর লাঠি ঠোকার শব্দ কানে আসছে মাঝে মাঝে। তা ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই মন্দির-প্রাঙ্গণে। অমাবস্যার অন্ধকারে ডুবে আছে কান্ডারীয় মন্দির। রাহিল বেশ কিছুক্ষণ রক্ষীদের সঙ্গে অন্ধকারে পরিভ্রমণ করল। তারপর প্রবেশ করল মন্দিরের গাঢ় অন্ধকার ঢাকা অন্ত:পুরে। যে অংশে সুরসুন্দরীরা থাকে সে অংশরই কোনও এক কক্ষ থেকে শুধু মৃদু আলোর রেশ আসছে, বাকি অংশে রয়েছে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। কোনওরকমে হাতড়ে হাতড়ে অন্য সুরসুন্দরীদের কক্ষর বেশ কিছুটা তফাতে মিত্রাবৃন্দার জন্য নির্ধারিত কক্ষে প্রবেশ করল রাহিল। ইতিপূর্বে সে এই কক্ষে উপস্থিত না হলেও মন্দিরের অন্ত:পুর পরিক্রমণের সময় কিছুটা তফাত থেকে এ কক্ষ দেখেছিল রাহিল। রাহিল সে কক্ষে পৌঁছে চকমকি পাথর বার করে ঘসল। মুহূর্তর জন্য আলো ছড়িয়ে পড়ল সে-কক্ষে। না, মিত্রাবৃন্দা কক্ষে নেই, তবে এক অদ্ভুত সৌরভ টের পেল রাহিল। সে বুঝতে পারল কক্ষ চিনতে তার ভুল হয়নি, যতবার সে মিত্রার সামনে উপস্থিত হয়েছে ততবার সে টের পেয়েছে এই সৌরভ। রাহিল সে-কক্ষে পৌঁছে তার অন্ধকারতম কোণে গিয়ে দাঁড়াল।

    চিত্রবান আর মাহবার দেওয়া বাঘনখ অঙ্গুলিতে ধারণ করে অনুদেবের প্রতীক্ষা করতে লাগল সে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে খেয়াল করল একটা আবছা আলোকরেখা যেন এগিয়ে আসছে কক্ষের সামনের অলিন্দ ধরে। আলোক-উৎস তার দৃষ্টিগোচর না হলেও রাহিল অনুমান করল কেউ যেন মশাল হাতে এগিয়ে আসছে সেই কক্ষর দিকে। নির্ঘাৎ অনুদেব! রাহিল মানসিকভাবে প্রস্তুত হল তার কর্তব্য সম্পাদনের জন্য। অনুদেব কক্ষে প্রবেশ করলেই সে আচম্বিতে ঝাঁপিয়ে পড়বে তার ওপর। তারপর বাঘনখ দিয়ে তার উদর, কণ্ঠদেশ ফালাফালা করে দেবে।

    আলোটা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল কক্ষের দিকে। ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল কক্ষর বাইরের অলিন্দ। কিন্তু কক্ষর কাছাকাছি এসে হঠাৎ যেন স্থির হয়ে গেল সেই আলোকরশ্মি। তারপর যে-পথে এসেছিল সে- পথে মিলিয়ে গেল সেই আলোকরেখা। কক্ষদ্বারের বাইরের অলিন্দ আবার ডুবে গেল নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে। তবে কি অনুদেব নন, অন্য কেউ সেদিকে উপস্থিত হয়েছিল অন্য কোনও কর্মোপলক্ষ্যে? সুরসুন্দরীদের কেউ? ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করল রাহিল। সময় এগিয়ে চলল।

    দীর্ঘক্ষণ অন্ধকার কক্ষে আত্মগোপন করে অনুদেবের জন্য প্রতীক্ষা করলেও পুরোহিত যখন সে কক্ষে উপস্থিত হলেন না তখন রাহিলের মনে হতে লাগল যে অনুদেব কি টের পেয়েছেন যে মিত্রাবৃন্দা তার এই কক্ষে নেই? নাকি অনুদেব রাত আরও গভীর হবার জন্য প্রতীক্ষা করছেন? ওদিকে সেই ভূগর্ভস্থ কক্ষে মিত্রাও নিশ্চই অপেক্ষা করছে রাহিলের জন্য। সে রাহিলের খোঁজে বাইরে বেরিয়ে অনুদেবের হাতে ধরা পড়তে পারে। তা ছাড়া রাত্রির প্রথম প্রহরের মধ্যে তাকে সব কাজ শেষ করে মন্দির ত্যাগ করতে হবে। বনপথে পথ দেখাবার জন্য উপস্থিত থাকবে সেই যাযাবরেরা। তবে তাকে সবচেয়ে বেশি ভাবিত করল মিত্রাবৃন্দার ব্যাপারটা। হয়তো সে কোনওভাবে ধরা পড়ে গেছে অনুদেবের হাতে। হয়তো সব পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে তাদের। এসব ভেবে অস্থির হয়ে উঠল রাহিল। তারপর একসময় সে সত্যি কক্ষ ত্যাগ করল।

    মন্দিরের অন্ত:পুর থেকে বাইরে উপস্থিত হল রাহিল। মিত্রাবৃন্দা যে ভূগর্ভস্থ কক্ষে আছে সেখানে পৌঁছোতে হলে সোপানশ্রেণি বেয়ে নীচে নামতে হবে। কিন্তু সেখানে নিশ্চই মন্দির-রক্ষীবাহিনী প্রহরারত আছে। রাহিলকে নীচে নামতে দেখে তারা তাকে অনুসরণ করতে পারে। কাজেই বিকল্প পথে নীচে নামার সিদ্ধান্ত নিল রাহিল। ভূগর্ভে যে অংশে ওই কক্ষ, তার ঠিক ওপরের অংশের প্রাঙ্গণের অনুচ্চ প্রাচীর টপকে ভিতের খাঁজ বেয়ে অতি সহজেই সে পৌঁছে যেতে পারবে সুড়ঙ্গর মুখে। এ পরিকল্পনা মতো রাহিল মন্দির-প্রাঙ্গণ দিয়ে এগোল সে অংশের দিকে।

    হঠাৎ সে দেখতে পেল তার সামনে একটা থামের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল ছায়ামূর্তি। রাহিল সঙ্গে সঙ্গে আত্মগোপন করল মন্দির-গাত্রের অন্ধকারে। থামের আড়াল থেকে বাইরে বেরিয়ে সেই মূর্তি একবার চারপাশে তাকাল। রাহিল অনুমান করল সেটা একটা নারীমূর্তি। তার বুকের কাছে কী যেন একটা ধরা। চারপাশ ভালো করে দেখে নিয়ে সেই নারীমূর্তি অন্ধকারের মধ্যে দ্রুত এগোল রাহিল যেদিকে এগোচ্ছিল সেদিকে। কে ও? রাহিলও তার কিছুটা তফাতে অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে এগোল সেদিকে।

    মন্দিরের দেওয়ালের গা ঘেঁষে এগোচ্ছে সেই নারীমূর্তি। তার পিছনে রাহিল। একসময় তারা মন্দির-প্রাঙ্গণের সেই নির্দিষ্ট অংশে পৌঁছে গেল। সেখানে পৌঁছে মুহূর্তর জন্য থমকে দাঁড়াল সেই নারী। তারপর সে এগোল মন্দির-প্রাঙ্গণের অনুচ্চ প্রাকারের দিকে। রাহিল অনুমান করল ওই নারীও ওই প্রাকার টপকে সবার অলক্ষে মন্দির পরিত্যাগ করতে চলেছে। আর এরপরই এক অদ্ভুত ভয়ংকর ঘটনা ঘটল।

    রাহিল তার মাথার ওপরের তাকে একটা অস্পষ্ট শব্দ শুনল। পরমুহূর্তেই মাথার ওপরের তাক থেকে দুটো ছায়ামূর্তি লাফিয়ে পড়ল সেই নারীমূর্তির ঘাড়ে!

    মাটিতে পড়ে গেল সেই নারী। তার হাত থেকে কী যেন একটা পাথুরে মাটিতে ছিটকে পড়ে ধাতব শব্দ তুলল। সেই নারীর সঙ্গে ঝটাপটি শুরু হল সেই দুই ছায়ামূর্তির! মুহূর্তর মধ্যে ব্যাপারটা বুঝতে পারল রাহিল। কৃষ্ণবানর আক্রমণ করেছে ওই নারীকে। আর্তনাদ করে উঠল সেই মানবী। বীভৎস চিৎকার শুরু করল সেই বানররাও। সেই চিৎকারে মুহূর্তর মধ্যে খানখান হয়ে গেল রাত্রির নিস্তব্ধতা। রাহিল তলোয়ার কোষমুক্ত করল ঠিকই, কিন্তু কীভাবে সেই নারীকে ওই কামলোলুপ বানরদের থেকে মুক্ত করবে ভেবে পেল না। তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে আলিঙ্গন করে আছে ওই দুই বানর। অন্ধকারে অস্ত্র চালালে ওই নারীরও মৃত্যু হতে পারে।

    রাহিল থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। কিন্তু কয়েক মুহূর্তর মধ্যেই ব্যাপারটার নিষ্পত্তি হল। ওই চিৎকার চেঁচামেচির শব্দে সেখানে মশাল হাতে ছুটে এল রাহিলের দুই সৈনিক। মশালের আলোতে দৃশ্যমান হল সেই বীভৎস দৃশ্য। মাটিতে পড়ে আছে সেই নারী। আর তার দেহের ওপর বসে তাকে আঁচড়ে কামড়ে শেষ করছে দুই হিংস্র পিশাচ। মশালের আলোতে তাদের মুখমণ্ডলে ফুটে আছে হিংস্র কামোদ্দীপনা। এমন বীভৎস দৃশ্য ইতিপূর্বে দেখেনি রাহিলের সৈন্যরা। মুহূর্তর জন্য হতবাক হয়ে দাঁড়াল তারা।

    তারপর একজন তার হাতের জ্বলন্ত মশাল ছুড়ে মারল সেই বীভৎস প্রাণী দুটোকে লক্ষ্য করে। উলটোদিক থেকে ছুটে আসছে আরও কজন সৈনিক। আরও একজন মশাল ছুড়ে মারল তাদের লক্ষ্য করে। সেটা একটা বানরের পিঠে পড়ল। এবার ঘাবড়ে গেল সেই প্রাণীদুটো। নারীদেহ ত্যাগ করে চিৎকার করতে করতে মন্দির-প্রাঙ্গণ টপকে তারা লাফ দিল নীচের দিকে। তারপর বাইরের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

    রাহিলরা ছুটে গেল মাটিতে পড়ে থাকা সেই নারীমূর্তির কাছে। তার মশালের আলো ফেলল তার ওপর। কিন্তু সে নারী নয়, নারীবেশী বিকর্না। কিছুটা তফাতে মাটিতে পড়ে আছে সেই স্বর্ণকলস, আর তার থেকে চারপাশে ছিটকে পড়া হীরকখণ্ডগুলো মশালের আলোতে ঝিকমিক করছে। তবে বিকর্নার দেহে তখন আর প্রাণ নেই। তার কণ্ঠনালি ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে কৃষ্ণবানররা, রক্তে ভেসে যাচ্ছে তার দেহ।

    কান্ডারীয় মন্দিরের থেকে মুক্তি পেল না বিকর্নাও। মন্দিরের রুক্ষ পাথর শুষে নিচ্ছে হতভাগ্য বিকর্নার রক্ত। পালানো হল না তার। কান্ডারীয় মন্দিরের এই কালরাত্রিতে পরিসমাপ্তি ঘটল তার নিষ্ফল জীবনের। তার চোখ দুটো শুধু তাকিয়ে রইল অন্ধকার আকাশের দিকে।

    তার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল রাহিল। তারপর সৈনিকদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করল, ‘অনুদেব কোথায়?’

    একজন সৈনিক জানাল, মন্দিরের পশ্চাদভাগে তিনি নেই। অন্যরাও জানাল তারা দেখেনি তাকে।

    রাহিল বলল, ‘অনুসন্ধান করো তাঁর। তাকে দেখামাত্রই বন্দি করো। আমি মিত্রাবৃন্দাকে মন্দির-প্রাঙ্গণে নিয়ে আসছি। আর কেউ গিয়ে অন্য সুরসুন্দরীদের মুক্ত করো। যথাসম্ভব দ্রুত এই মন্দির ত্যাগ করব। আর তার আগে হত্যা করতে হবে অনুদেবকে।’—এই বলে সে একজন সৈনিকের হাত থেকে মশাল নিয়ে তলোয়ার কোষবদ্ধ করে প্রাকার অতিক্রম করে নীচে নেমে দাঁড়াল সেই সুড়ঙ্গর সামনে।

    সুড়ঙ্গর মুখ উন্মুক্ত। তার ভিতর জমাট বাঁধা অন্ধকার। মশালের আলোতে সে অন্ধকার সম্পূর্ণ দূর হচ্ছে না। রাহিল প্রবেশ করল সেই সুড়ঙ্গে। তারপর এক সময় সে পৌঁছে গেল সেই গোপন কক্ষের দ্বারপ্রান্তে। রাহিল প্রবেশ করল সেই কক্ষে। মশাল তুলে ধরে সে দেখার চেষ্টা করল মিত্রাকে। কিন্তু মিত্রা কোথায়? হঠাৎ সে শুনতে পেল মিত্রার মৃদু কণ্ঠস্বর–‘সৈনিক তুমি আমাকে নিতে এসেছ?’

    যেন অনেকদূর থেকে ভেসে আসছে সেই কণ্ঠস্বর! রাহিল তাকাল সেই শব্দের উৎস লক্ষ্য করে। মন্দির-কাঠামোর বিশাল স্তম্ভ যেখানে মাটিতে প্রাোথিত তার আড়ালের জমাট বাঁধা অন্ধকার থেকে ভেসে এসেছে সেই কণ্ঠস্বর।

    রাহিল মশাল উঁচিয়ে এগোল সেদিকে। স্তম্ভর আড়াল থেকে অন্ধকার সরে গেল। রাহিল সেখানে দেখতে পেল মিত্রাবৃন্দাকে। কিন্তু তাকে দেখেই সে চমকে উঠল।

    মাটিতে পড়ে আছে বিবস্ত্র মিত্রাবৃন্দা। রক্তস্রোত বইছে তার উন্মুক্ত যোনি বেয়ে। সারা দেহতে তার আঁচড় কামড়ের চিহ্ন। কেউ যেন ফালা ফালা করেছে তার শরীরটাকে। রাহিলকে দেখে এ অবস্থাতেও হাসি ফুটে উঠল তার ঠোঁটের কোণে। সে বলে উঠল, ‘আমি তোমার জন্য যে প্রতীক্ষা করে আছি।’

    রাহিল ঝুঁকে পড়ল তার ওপর। তারপর এক হাতে তার মাথাটা তুলে নিয়ে আর্তনাদ করে উঠল, ‘কৃষ্ণবানরের দল এখানেও এসে পৌঁছোল!’

    মিত্রা বলল, ‘কৃষ্ণবানর নয়, অনুদেব।’

    ‘অনুদেব! কীভাবে সে তোমার সন্ধান পেল?’ চিৎকার করে উঠল রাহিল।

    শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে মিত্রাবৃন্দার। কাঁপছে সে। তবু সে বিষণ্ণ হেসে হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, ‘এই অভিশপ্ত নারীদেহই আমাকে ধরিয়ে দিল… রজস্বলা নারীর রক্তবিন্দু অনুসরণ করে সে পৌঁছে গেল আমার কাছে…।’

    —একথা বলার পর সে রাহিলের গলা আলিঙ্গন করে আর্তনাদ করে বলে উঠল, ‘তোমার জন্য আমি নিজেকে সমর্পন করিনি অনুদেবের কাছে। আমার অক্ষত যোনিতে শূল ঢুকিয়ে আঘাত করেছে অনুদেব। আমাকে ছেড়ে যেও না তুমি…’

    রাহিল তার দেহ আলিঙ্গন করে বলে উঠল, ‘তুমি শান্ত হও। আমি তোমাকে ছেড়ে যাব না কোথাও…’

    ঠিক এই সময় একটা প্রচণ্ড শব্দ হল স্তম্ভর গায়ে। সেখানে ধাক্কা খেয়ে কিছুটা তফাতে ছিটকে পড়ল অনুদেবের শূল! রাহিল চমকে উঠে দেখল কক্ষের অপর এক কোণ থেকে উঁকি দিচ্ছে অনুদেবের হিংস্র মুখ। রাহিল সঙ্গে সঙ্গে মিত্রাবৃন্দার মাথাটা নামিয়ে রেখে এক লাফে সেই শূলটা তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। তার শূল লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে দেখে অনুদেব কক্ষ ত্যাগ করে ছুটলেন বাইরের দিকে। তাকে অনুসরণ করল রাহিল।

    অনুদেব সুড়ঙ্গ ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে ছুটলেন মন্দিরের পশ্চাদভাগের সোপানশ্রেণি বেয়ে ওপরে ওঠার জন্য। ইতিমধ্যে লড়াই শুরু হয়ে গেছে রাহিলের সেনা আর মন্দির-রক্ষীবাহিনীর মধ্যে।

    সোপানশ্রেণির মুখে রাহিলকে বাধাদান করতে এল প্রকটাক্ষ। রাহিল শূলের আঘাত হানল তার মাথা লক্ষ্য করে। তার একটা চোখ কোটর থেকে ছিটকে বাইরে মাটিতে পড়ল, তারপর সে নিজেও।

    মন্দির প্রাঙ্গণে উঠেই তার এক হাতে ধরা রণশঙ্খ বাজাতে বাজাতে ছুটতে লাগলেন অনুদেব। আর তার পিছনে ধাবমান রাহিল। শঙ্খনাদ, যুযুধান দুই পক্ষের অস্ত্রধ্বনি, আর্তনাদ ও আতঙ্কিত সুরসুন্দরীদের ক্রন্দনধ্বনিতে, সম্মিলিত বীভৎস শব্দে ফালা ফালা হয়ে যেতে লাগল অন্ধকার কান্ডারীয় মন্দির-চত্বর। একসময় অনুদেবের কাছাকাছি পৌঁছে গেল রাহিল। অনুদেব মন্দিরের অন্ত:পুরে আত্মগোপন করার জন্য ছুটলেন তার প্রবেশপথের দিকে।

    রাহিলের চোখে ভেসে উঠল মিত্রাবৃন্দার সেই রক্তস্নাত অবয়ব। দেহের সব শক্তি সঞ্চয় করে রাহিল সেই শূল নিক্ষেপ করল অনুদেবের দিকে। অনুদেবের আর মন্দিরে প্রবেশ করা হল না।

    রাহিলের শূলের ভীষণ আঘাত অনুদেবের পিঠ ফুঁড়ে, বক্ষ ভেদ করে তাকে এমনভাবে এক দণ্ডায়মান নগ্নিকা মূর্তির সাথে গেঁথে দিল যেন সেটা কোনও সঙ্গমরত যুগল মূর্তি। অনুদেবের প্রাণহীন দেহটা আটকে রইল সেই নারীমূর্তির সঙ্গে। এই কালরাত্রিতে সবার অলক্ষে দাঁড়িয়ে হয়তো কোনও যোগীপুরুষ হাসল এ দৃশ্য দেখে। ফলে গেল তার অভিশাপ।

    রাহিল এরপর দেখতে পেল মাহবা আর চিত্রবানকে। মন্দিরের ভিতর থেকে বাইরে এসে দাঁড়ালেন তারা। একঝলক শূলবিদ্ধ-অনুদেবকে দেখে নিয়ে চিত্রবান বললেন, ‘কাজ সাঙ্গ হয়েছে। এবার মন্দির-চত্বর ত্যাগ করতে হবে। ওই শুনুন, অরণ্যের দিক থেকে শঙ্খনাদ শুরু হয়েছে। অনুদেব শঙ্খ বাজিয়ে তাদেরকে বিপদ সংকেত করেছেন। আর কিছু সময়ের মধ্যেই হয়তো সৈন্যবাহিনী উপস্থিত হবে এখানে। মিত্রাবৃন্দা কোথায়?’

    রাহিল সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘তাকে ওপরে আনার জন্য আপনাদের সাহায্য প্রয়োজন। আসুন আমার সঙ্গে।’ এই বলে সে ছুটল ভূগর্ভস্থ সেই কক্ষর দিকে। তাকে অনুসরণ করলেন চিত্রবান আর মাহবা।

    রাহিলরা পৌঁছে গেল সেই কক্ষে। মিত্রাবৃন্দার অবস্থা দেখে শিউরে উঠে চিত্রবান বলে উঠলেন, ‘এখানেও হানা দিয়েছিল কৃষ্ণবানর?’

    রাহিল জবাব দিল, ‘না, তার চেয়েও ভয়ঙ্কর অনুদেব। তারই শূলের আঘাত।’

    রাহিল মিত্রাবৃন্দার মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে বলল, ‘চোখ খোলো মিত্রা। আমি তোমাকে নিতে এসেছি। এবার অনেক দূরে চলে যাব আমরা…’

    চোখ মেলল মিত্রা। রাহিলের দিকে তাকিয়ে আবছা হাসি ফুটে উঠল তার মুখে। সে বিড়বিড় করে বলে উঠল, ‘তোমাকে নিয়ে ঘরে ফিরে যাব আমি, আমার দেশে ফিরে যাব সোমনাথ নগরীতে। সেখানে বিশাল মন্দির, বাগিচা, কত প্রদীপ, ঘণ্টা। সেই ঘণ্টাধ্বনি শুনতে পাচ্ছি আমি। আমাদের সে ডাকছে। চলো ফিরে চলো…।’

    কথাগুলো বলার পর ধীরে ধীরে মুদে এল তার চোখের পাতা। তার চোখের কোল বেয়ে দু-ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল সৈনিকের বাহুতে। স্থির হয়ে গেল মিত্রার দেহ।

    মিত্রাবৃন্দার দেহটা ধরাধরি করে যখন সুড়ঙ্গর বাইরে মন্দিরের নীচের প্রাঙ্গণে আনা হল তখন যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে রাহিলের সৈনিকদের। তাদের অস্ত্রাঘাতে মন্দির-রক্ষীবাহিনীর আর একজনও জীবিত নেই। সুরসুন্দরীদের নিয়ে মন্দির ত্যাগ করার জন্য তাদের সঙ্গী করে নীচের প্রাঙ্গণে এসে দাঁড়িয়েছে সবাই। হাতে আর সময় নেই।

    মহাসৈনাধ্যক্ষর সৈন্যবাহিনী অগ্রসর হচ্ছে মন্দিরের দিকে। তাদের মশালের আলোতে লাল হয়ে গেছে বনভূমির আকাশ। তাদের রণভেরীর শব্দ রাত্রির নিস্তব্ধতা বিদীর্ণ করে ক্রমশ এগিয়ে আসছে। রাহিলের জন্যই প্রতীক্ষা করছিল তার সেনারা। তাকে দেখতে পেয়েই মশাল হাতে এগিয়ে এসে বৃত্ত রচনা করে ঘিরে দাঁড়াল সৈনিক ও সুরসুন্দরীরা। সেই বৃত্তর মাঝখানে মিত্রাবৃন্দার দেহ কোলে নিয়ে পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে রাহিল। মাথা নত করে তাদের দিকে চেয়ে রইল সকলে। দূরের মশালের আলো, রণদামামার শব্দ ক্রমশ এগিয়ে আসছে…

    একসময় এক প্রবীণ সৈনিক রাহিলের উদ্দেশ্যে বলল, ‘উঠে পড়ুন সৈনাধ্যক্ষ। আর দেরি হলে আমরা কেউ প্রাণে বাঁচব না। এবার মন্দির ত্যাগ করতে হবে।’

    রাহিল তাকাল তার দিকে। তারপর বলল, ‘তোমরা চলে যাও। আমি মন্দিরেই থাকব।’

    তার কথা শুনে কী বলবে বুঝতে না পেরে দাঁড়িয়ে রইল তার সৈনিকরা। অরণ্যের আড়াল থেকে এবার বাইরে বেরোতে শুরু করেছে মশালের আলো। বিরাট সেনাদল ধেয়ে আসছে মন্দিরের দিকে।

    রাহিলের চোখ পড়ল সেদিকে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পারল রাহিল। সে সেই প্রবীন সৈনিকের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনারা যাত্রা শুরু করুন। এই হতভাগ্য নারীদের আপনারা নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দিন। সম্ভব হলে তাঁদের ঘরে পৌঁছে দেবেন। সৈনাধ্যক্ষ হিসাবে এটাই আমার শেষ আদেশ। এ আদেশ পালন করুন।’

    রাহিলের কথা শুনে মাথা ঝুঁকিয়ে তাকে সম্ভাষণ জানাল সৈনিকরা। তারপর মশাল নিভিয়ে কান্ডারীয় মন্দির ত্যাগ করে এগোল অন্যপ্রান্তের জঙ্গল অভিমুখে। সে জায়গাতে শুধু দাঁড়িয়ে রইলেন চিত্রবান আর মাহবা।

    রাহিল এবার তাঁদের উদ্দেশ্যে বলল, ‘এ মন্দিরে আপনারা আমাদের স্থান দিন। যেখানে আর কেউ কোনওদিন স্পর্শ করতে পারবে না মিত্রাবৃন্দার শরীর। সে যে এখনও অক্ষতযোনি। আমি তাকে ছেড়ে যাব না বলে কথা দিয়েছি। আমরা দুজন আদি-অনন্তকাল একসঙ্গে থাকব। আপনারা আশ্রয় দিন আমাদের।’

    তার কথা শোনার পর কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে চিত্রবান বললেন, ‘হ্যাঁ, এ মন্দিরেই স্থান পাবেন আপনারা। এই কান্ডারীয় মন্দিরের সঙ্গে আমাদের মতো আপনারাও যে মিশে গেলেন। আসুন আমার সঙ্গে।’

    নীচ থেকে মন্দিরপ্রাঙ্গণে উঠে এলেন দুই ভাস্কর, মন্দির-চত্বর বেয়ে তাঁরা এগোলেন মন্দিরের ভিতরে প্রবেশ করার জন্য। মিত্রার দেহ কোলে নিয়ে তাদের অনুসরণ করছে রাহিল। প্রাঙ্গণের কোনও কোনও অংশে তখনও মশালের আলো জ্বলছে। সেই আলোতে মন্দিরগাত্রে, স্তম্ভগাত্রে আঁধো-অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে সুরসুন্দরীদের মূর্তি। তারা বিষণ্ণভাবে তাকিয়ে আছে রাহিল আর মিত্রাবৃন্দার দিকে। চত্বর অতিক্রম করে মন্দিরে প্রবেশ করল রাহিলরা। তারপর সোপানশ্রেণি বেয়ে একসময় তারা পৌঁছে গেল মন্দিরশীর্ষের সেই বহি: অলিন্দে। যেখানে মাথার ওপরের তাকে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে সেই একাকী নারীমূর্তি। আর এক মিত্রাবৃন্দা।

    রাহিলের একবার মনে হল ওপর থেকে দু-ফোঁটা জল এসে যেন তার গায়ে পড়ল। পাথরের গায়ে জমে থাকা জলকণা? নাকি তা সেই নারীমূর্তির অশ্রুবিন্দু? মিত্রাবৃন্দার দেহটাকে ধরাধরি করে তার উলটোদিকের তাকে তোলা হল। এর কিছুক্ষণের মধ্যে তারা পৌঁছে গেল সেই গোপন কক্ষে।

    একটা মশাল জ্বালালেন মাহবা। চিত্রবান রাহিলকে বললেন, ‘এ-কক্ষে যুগযুগ ধরে থাকতে পারবেন আপনারা। বাইরের প্রবেশপথ বন্ধ করে দিলে সৈনিকরা কোনওদিন খুঁজে পাবে না এ-কক্ষ। আর আপনাদের কাছেই আমরা সমর্পণ করলাম আমাদের সম্পদ, ওই ফলককে। যাতে ভবিষ্যতের মানুষের জন্য লেখা রইল সেইসব মানুষের নাম, যারা রচনা করল এই আশ্চর্য সুন্দর মন্দির, অথচ কান্ডারীয় মন্দিরের পাথর শুষে নিল যাদের জীবন।’

    রাহিল স্মিত হাসল তাদের কথা শুনে। তারপর ধীরে ধীরে অতি যত্নে নামিয়ে রাখল মিত্রাবৃন্দাকে। মিত্রার ঠোঁটের কোণে তখন যেন ফুটে উঠেছে আবছা হাসি। এক অদ্ভুত স্বর্গীয় প্রশস্তি যেন ফুটে উঠেছে তার মুখমণ্ডলে। রাহিলের নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে ঘুমোচ্ছে সুরসুন্দরী মিত্রাবৃন্দা। রাহিল চেয়ে রইল প্রেয়সীর মুখের দিকে।

    ফিরে যাওয়ার আগে একটা কাজ বাকি ছিল ভাস্করদের। চিত্রবান সেই ফলকে একটা নাম খোদাই করলেন—’রাহিল’।

    কাজ শেষ করে সেই কক্ষ ত্যাগ করলেন তাঁরা। সুড়ঙ্গর মুখ চিরদিনের জন্য বন্ধ করে নীচে নেমে অন্ধকার মন্দিরপ্রাঙ্গণে হারিয়ে গেলেন চিত্রবান আর মাহবা। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই কান্ডারীয় মন্দিরের দখল নিল চান্দেলরাজ বিদ্যাধরের সেনাদল। মশালের আলোতে মন্দির- চত্বরে কোনও জীবিত প্রাণীকে খুঁজে পেল না তারা। মন্দিরশীর্ষের অন্ধকার কক্ষে তখন মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে সৈনিক রাহিল আর সুরসুন্দরী মিত্রাবৃন্দা।

    লেখকের নিবেদন : কান্ডারীয় মন্দির খর্জ্জুরবাহক বা খাজুরাহর অন্যতম প্রধান স্থাপত্যকীর্তি, যা নির্মিত হয়েছিল চান্দেলরাজ গণ্ডবর্মনের (১০০২-১০১৭ খ্রি:) রাজত্বের শেষভাগ থেকে মহারাজ বিদ্যাধরের (১০১৭-১০২৯ খ্রি:) রাজত্বকালে। এ মন্দিরে কঠিন পাথরের বুকে শিল্পী ভাস্করের দল ফুটিয়ে তুলেছিলেন কোমল নারীদেহকে। নারীদেহর প্রতি পুরুষের সহজাত আকর্ষণ খাজুরাহর কান্ডারীয় মন্দিরের প্রস্তরগাত্রে জীবন্ত করে তুলেছিলেন অজানা অজ্ঞাত শিল্পীর দল তাঁদের মিথুনমূর্তি রচনার মাধ্যমে।

    কান্ডারীয় মন্দির নির্মাণের মধ্যযুগীয় সময়কাল কুয়াশাচ্ছন্ন। সেসময়ের ঘটনাপ্রবাহর সুস্পষ্ট বিবরণ কোথাও পাওয়া যায় না। তবে যতটুকু জানা যায় তা হল নারীমূর্তি রচনার জন্য, মডেল বানাবার জন্য নারী সংগ্রহ করে আনা হত দাসের হাট থেকে।

    কনৌজে বড় দাসবাজার ছিল। সেখানে নেপাল, কাশ্মীর, উৎকল রাজ্য, হিমালয়ের পাদদেশের চম্বা, দুর্গর (জম্মু), ত্রিগর্ভ (জলন্ধর), পূর্ব উপকূলের চালুক্য ও গঙ্গদেশ থেকে উপস্থিত হত ক্রীতদাসী নারীরা। পশ্চিম উপকূল থেকেও আসত তারা। মূর্তি নির্মাণের জন্য তাদের ক্রয় করত মন্দির কর্তৃপক্ষ। আমার এই উপন্যাস কোনও প্রামাণ্য ইতিহাস নয়। সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে রচিত আখ্যান মাত্র। যার কিছুটা ইতিহাস, কিছুটা কল্পনা মাত্র।

    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleরম্যরচনা ৩৬৫ – তারাপদ রায়
    Next Article সরস গল্প সমগ্র – তারাপদ রায়
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Demo
    Most Popular

    তিস্তাপারের বৃত্তান্ত – দেবেশ রায়

    August 29, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    তিস্তাপারের বৃত্তান্ত – দেবেশ রায়

    August 29, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Our Picks

    তিস্তাপারের বৃত্তান্ত – দেবেশ রায়

    August 29, 2025

    অদ্বৈতপ্রকাশ – ঈশান নাগর

    August 29, 2025

    পৃথিবীর ইতিহাস – দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

    August 29, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2025 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    Sign In or Register

    Welcome Back!

    Login below or Register Now.

    Lost password?

    Register Now!

    Already registered? Login.

    A password will be e-mailed to you.