Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    তিস্তাপারের বৃত্তান্ত – দেবেশ রায়

    August 29, 2025

    অদ্বৈতপ্রকাশ – ঈশান নাগর

    August 29, 2025

    পৃথিবীর ইতিহাস – দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

    August 29, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • 🔖
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    Subscribe
    সাইন ইন
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    খাজুরাহ সুন্দরী

    ঐতিহাসিক হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত এক পাতা গল্প179 Mins Read0

    ২

    ভোরবেলা কুক্কুটের ডাকে ঘুম ভাঙল রাহিলের। কিছুক্ষণের মধ্যে তৈরি হয়ে নিল সে। তারই মধ্যে মন্দির-চত্বরে শুনতে পেল অসংখ্য মানুষের কলরব। ক্রমশ সে শব্দ বাড়তে লাগল। সৈনিকের বর্মপোশাক পরে কোমরে শস্ত্র গুঁজে বিশ্রাম গ্রহণ করা পাঁচজন সৈনিককে নিয়ে সে যখন মন্দিরপ্রাঙ্গণে এসে দাঁড়াল তখন অনেক লোক সমবেত হয়েছে সেখানে। গতকাল যেসব শিল্পী ভাস্করের দল মন্দির চত্বরে ছিল তাঁরা তো আছেনই তার সঙ্গে সমবেত হয়েছে কয়েকশো মজুরের দল।

    প্রধান ভাস্কর চিত্রবানকেও দেখতে পেল সে। ব্যস্তসমস্ত হয়ে তিনি এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছেন। চাবুক হাতে কিছু অস্ত্রধারীকেও দেখতে পেল সে। তারা মন্দিরের নিজস্ব রক্ষীদল। দূরের বিন্ধ্যপর্বতমালার ওপর থেকে সূর্যালোক ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে মন্দিরনগরীতে। কুয়াশার আবরণ মুছে চারপাশে কিছুটা তফাতে তফাতে উঁকি দিচ্ছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মন্দিরগুলোর শীর্ষদেশ। বহু প্রাচীন এ নগরী, প্রাচীন ওইসব মন্দির।

    চান্দেল রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রবর্মন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এ নগরীর। তারপর তার বংশধররা একে একে গড়ে তোলেন এইসব মন্দির। যার সিংহভাগ নির্মিত হয়েছে মহারাজ বিদ্যাধরের পিতা মহারাজ গণ্ডবর্মন ও পিতামহ মহারাজ ঢঙ্গবর্মনের আমলে। এই কান্ডারীয় মন্দিরের ভিত্তি প্রস্তরও স্থাপন করেছিলেন মহারাজ গণ্ডবর্মন। তাঁর ইচ্ছা ছিল তিনি এমন এক মন্দির নির্মাণ করবেন যার শিখর, গঠনশৈলী, ভাস্কর্য ছাপিয়ে যাবে তাঁর পূর্বপুরুষদের যাবতীয় কীর্তিকে।

    মন্দিরনগরী খর্জ্জুরবাহকের সর্বশ্রেষ্ঠ মন্দির হবে এই কান্ডারীয় মন্দির। কিন্তু কাজ শুরু হবার আগেই মৃত্যু হল চান্দেলরাজ গণ্ডর। তার অসম্পূর্ণ কাজ সম্পাদনের দায়িত্ব নিয়েছেন মহারাজ বিদ্যাধর। শুধু জেজাকভূক্তিরই নয়, পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মন্দির রূপে কান্ডারীয় মন্দিরকে গড়ে তুলছেন তিনি। হাজার বছর পরও যে স্থাপত্যর দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাবে ভবিষ্যতের মানুষ।

    মহারাজ বিদ্যাধরের এই মন্দিরপ্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে মাথা নত করে স্মরণ করবে এই অতুলনীয় শিল্পকীর্তির স্রষ্টা মহারাজ বিদ্যাধরকে। মাতঙ্গেশ্বর, লক্ষণ, বরাহমিহির, এসবের ওপর যুগ যুগ ধরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকবে কান্ডারীয় মহাদেব মন্দির। এ মন্দির যতকাল ধরার বুকে দাঁড়িয়ে থাকবে ততদিন মানুষের কাছে বেঁচে থাকবে চন্দ্রবর্মনের এই রাজবংশের নাম। মহারাজ বিদ্যাধর এই মন্দির উৎসর্গ করতে চলেছেন তাঁর আদি পূর্বপুরুষ মহারাজ চন্দ্রবর্মনকে।

    চান্দেল মহারাজ চন্দ্রবর্মনের এখানে এই নগরী প্রতিষ্ঠানের পিছনে এক পৌরাণিক আখ্যান আছে। সৈনিক রাহিলও শুনেছে সে গল্প—প্রাচীনকালে বারাণসীর গাহিরওয়াড়রাজ ইন্দ্রজিতের গৃহদেবতার পূজারি ছিলেন হেমরাজ নামে এক ব্রাহ্মণ। তাঁর কন্যা হেমবতী ছিলেন বালবিধবা। তাঁর সঙ্গে দেহমিলনের আগেই মৃত্যু হয় তার স্বামীর। উদ্ভিন্ন যৌবনের অধিকারী হেমবতী বঞ্চিত ছিলেন পুরুষ-স্পর্শ থেকে।

    এক রাতে পদ্ম সরোবরে স্নান করতে নেমেছেন হেমবতী। মাথার ওপর চন্দ্রদেব তখন বেরিয়েছেন নৈশ অভিসারে। তিনি হঠাৎ ওপর থেকে কমল সরোবরে দেখতে পেলেন সেই নগ্নিকাকে। কে এই রূপসি নারী? যাঁর যৌবনের কাছে ম্লান হয়ে যাচ্ছে চন্দ্রালোকে প্রস্ফুটিত সেই পদ্মও? অপরূপার শুভ্র শঙ্খের মতো স্তনযুগল যেন তাকিয়ে আছে আকাশের দিকেই। তার রূপে মুগ্ধ হয়ে চন্দ্রদেব নেমে এলেন মাটিতে। নগ্নিকা তখন জানু পর্যন্ত জলে ডুবিয়ে আপন খেয়ালে জলক্রীড়ায় মেতে আছেন সেই সরোবরে। এমন সময় চন্দ্রদেব গিয়ে আলিঙ্গন করলেন তাকে।

    পুরুষের প্রথম স্পর্শে জেগে উঠল নারী শরীর। হেমবতী তাঁর মৃণালবাহু দিয়ে চন্দ্রদেবের গলা আলিঙ্গন করলেন। মিলিত হল দুজনের ওষ্ঠ-শরীর। সারা রাত ধরে চলল সেই রতিক্রীড়া। একসময় চন্দ্রদেবের ফিরে যাবার সময় হল, সূর্যদেব উদিত হবেন কিছুক্ষণের মধ্যেই।

    চন্দ্রদেবের আলিঙ্গন-মুক্ত হতেই হেমবতীর স্মরণ হল তিনি বাল-বিধবা। চন্দ্রদেবের সঙ্গে মিলনের ফলে যে সন্তান জন্ম নেবে তার পরিচয় তিনি কী দেবেন? সমাজ তো তাঁকে ধর্মনাশিনী ব্যভিচারিণী বলবে? তিনি চন্দ্রদেবকে বললেন তাঁকে তাঁর সঙ্গে নিয়ে যেতে।

    চন্দ্রদেব এবার তাঁর ভুল বুঝতে পারলেন। তিনি তাঁকে বললেন, ‘তোমাকে আমার সঙ্গে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তুমি এ নগরী ছেড়ে দূরে চলে যাও। এখান থেকে অনেক দূরে বিন্ধ্যপর্বতের পাদদেশে নদীঘেরা বৎসদেশে অনেক খর্জ্জুরকুঞ্জ দেখতে পাবে। সেখানে গিয়ে এক পুত্রসন্তানের জন্ম দেবে তুমি। আমি তোমাকে বর দিচ্ছি, অসীম তেজশালী হবে তোমার পুত্র। সে একদিন ওই খর্জ্জুরবাহক অঞ্চলে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করবে। রাজা হবে তোমার পুত্র।’ এই বলে চন্দ্রদেব আকাশে মিলিয়ে গেলেন।

    হেমবতী নির্দেশ পালন করলেন চন্দ্রদেবের। তিনি চলে এলেন এই খর্জ্জুরবাহকে। জন্ম দিলেন এক পুত্রসন্তানের। তার নামকরণ করা হল চন্দ্রবর্মন।

    অসীম তেজদীপ্ত সাহসী পুরুষ হিসাবে বড় হয়ে উঠতে লাগলেন তিনি। কথিত আছে মাত্র চোদ্দো বছর বয়সে তিনি নাকি খালি হাতে সিংহ শিকার করেন। তার শৌর্য্যে আকৃষ্ট হয়ে স্থানীয় ছোট ছোট অরণ্যচারী দলপতিরা স্মরণ নিল চন্দ্রবর্মনের। জোটবদ্ধ হল সবাই। সেই প্রাচীন বৎসদেশ তখন প্রতিহারদের সাম্রাজ্যের অধীন। চন্দ্রবর্মন বা নান্নুকের নেতৃত্বে বিদ্রোহ ঘোষণা করা হল প্রতিহারদের বিরুদ্ধে। বিদ্রোহী নেতা চন্দ্রবর্মন তারপর এই খর্জ্জুরবাহক অঞ্চলেই চন্দ্রবংশের প্রথম রাজধানী স্থাপন করেন। চন্দ্রবর্মনের মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসেন তার পুত্র জেজাক। তার সময় থেকেই এই রাজ্য পরিচিত হয় জেজাকভূক্তি নামে।

    জেজাকের পর সিংহাসনে বসেন রাহিল। সৈনাধ্যক্ষ রাহিলের নামকরণ সেই রাহিলরাজের নাম অনুকরণেই। রাজা রাহিলের পর বংশপরম্পরায় একে একে সিংহাসনে বসেন রাজা হর্ষ, রাজা লক্ষণ। রাজা লক্ষণবর্মন প্রতিহারদের থেকে কলঞ্জর দুর্গ জয় করে নিয়ে প্রতিহারদের থেকে প্রকৃত অর্থে জেজাকভূক্তিকে মুক্ত করে এ অঞ্চলে স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। রাজ্যে স্থিতি ফিরে আসে। লক্ষণবর্মন শুরু করেন মন্দির নির্মাণের কাজ।

    যদিও গত দুশো বছর ধরে এখনও প্রতিহারদের সঙ্গে বৈরতা চলছে। সীমান্ত অঞ্চলে এখনও মাঝে মাঝে হানা দেয় প্রতিহাররা, কলচুরিদের সঙ্গেও যুদ্ধবিগ্রহ লেগেই থাকে। কিন্তু তারই মধ্যে মন্দির-নির্মাণ কখনও থেমে থাকেনি। লক্ষণবর্মনের সময় থেকেই এখানে গড়ে উঠেছে একের পর এক মন্দির। মন্দিরনগরী হিসাবে গড়ে উঠেছে জেজাকভূক্তির রাজধানী খর্জ্জুরবাহক। মহারাজ বিদ্যাধরও পূর্বপুরুষদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে গড়ে তুলছেন এই কান্ডারীয় মহাদেব মন্দির।

    মন্দির-প্রাঙ্গণে টহল দিতে শুরু করল রাহিল। এবার সে এই কর্মযজ্ঞের ব্যাপ্তি বুঝতে পারল। অসংখ্য মজুর, অসংখ্য ভাস্করের দল একসঙ্গে কাজ করে চলেছে। কেউ কাঁধের বাঁকে পাথর ঝুলিয়ে আনছে। পাথর ভাঙছে কেউ, কেউ আবার মূর্তি নির্মাণে ব্যস্ত। হলুদ বর্ণের বেলে পাথরের মূর্তি সব।

    মন্দির-প্রাঙ্গণের ঠিক মাঝখানে সিংহর সঙ্গে খালি হাতে যুদ্ধরত এক মানুষের মূর্তি। সিংহর বুকের সামনে হাঁটু মুড়ে বসে বাঁ-হাতে সে ধরে রেখেছে সিংহর উদ্যত থাবা আর ডান হাতে চেপে ধরেছে সিংহর টুঁটি। চান্দেল রাজবংশর প্রতীক এই মূর্তি। চান্দেলদের পতাকাতেও আঁকা থাকে এই মৌর্য মূর্তি। এ মূর্তি আসলে চান্দেলরাজদের আদি পুরুষ চন্দ্রবর্মনের মূর্তি।

    ঠিক এভাবেই নাকি তিনি সিংহ শিকার করেছিলেন। এ মূর্তি আগেও অনেক জায়গাতে দেখেছে রাহিল। কিন্তু কান্ডারীয় মন্দিরের এই ভাস্কর্য যেন শিল্পীর ছোঁয়ায় একদম জীবন্ত হয়ে উঠেছে। যুদ্ধরত সিংহ ও মানবের প্রত্যেক মাংসপেশী পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে সেই মূর্তিতে। এ ছাড়া মন্দির- চত্বরের বিভিন্ন জায়গাতে খোদিত হয়েছে বিভিন্ন শার্দূল মূর্তি। কল্পিত, অপার্থিব, জীবজন্তুর মূর্তি রচিত হয়েছে শিল্পীর কল্পনায়। সিংহর মস্তক, ঘোড়ার গ্রীবা, ষাঁড়ের কুজঅলা পিঠ, বাজপাখির নখরযুক্ত থাবা। অদ্ভুত সব মূর্তি!

    কালো পাথরের তৈরি মূর্তি এ অঞ্চলে দেখা যায় না। কিন্তু তেমনই একটা দণ্ডায়মান পুরুষমূর্তি হঠাৎ মন্দিরচত্বরের একপাশে দেখতে পেল রাহিল। তাকে ঘিরে কাজ করছে ভাস্করের দল। কৌতূহলবশত সে এগিয়ে গেল সে জায়গাতে। একটা বর্শায় ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেই মূর্তি। কিন্তু কাছে গিয়ে সেই মূর্তির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর নিজের ভুল বুঝতে পারল রাহিল।

    মূর্তি নয়, সে একজন জীবন্ত মানুষ! নগ্ন হয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে পাথরের মূর্তির মতো। চোখের পাতা পর্যন্ত তার কাঁপছে না। অপরূপ অঙ্গসৌষ্ঠবের অধিকারী সেই যুবক। প্রশস্ত বুক, ক্ষীণ কটি, দাঁড়াবার ভঙ্গিতে তার প্রত্যেকটা মাংসপেশি দৃশ্যমান। তার চেহারা দেখে রাহিলের মনে হল এই পাহাড়-জঙ্গল-ঘেরা দেশে যেসব আদিম অনার্য গোষ্ঠী বাস করে এ যুবক তাদেরই কেউ হবে।

    তাকে ঘিরে থাকা ভাস্করের দল পাথরের ওপর কীলক আর হাতুড়ির আঘাতে এঁকে চলেছে তার অঙ্গসৌষ্ঠব। সূর্যালোক যেন পিছলে নামছে যুবকের তৈলাক্ত স্কন্ধ, ঊরু, নিতম্ব বেয়ে। বেশ কিছু সময় সেখানে দাঁড়িয়ে সেই যুবক আর ভাস্করদের কাজ দেখল রাহিল। সত্যিই কী অসীম অনুশীলন সেই যুবকের! একবার কী একটা ছোট পাখি তাকে পাথরের মূর্তি ভেবে তার কাঁধের ওপর বসল, তারপর আবার উড়ে গেল।

    সে জায়গা ছেড়ে রাহিল এরপর ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবে আবার ঘুরতে লাগল মন্দির-প্রাঙ্গণে। সূর্যের তেজ ক্রমশ প্রখর হচ্ছে মাথার ওপর। ভাস্কর, মজুরদের গা বেয়ে চুঁইয়ে পড়তে শুরু করেছে স্বেদবিন্দু। তবু তার মধ্যে কাজ করে চলেছে সকলে। কেউ মূর্তি গড়ছে, কেউ পাথর ভাঙছে। ছেনি-হাতুড়ির শব্দে মুখরিত মন্দিরপ্রাঙ্গণ।

    টহল দিতে দিতে একসময় আবার তাদের দেখতে পেল রাহিল। গতকাল যেসব নারীদের এখানে আনা হয়েছিল তাদেরকে। তবে সবাইকে নয় যাদের সুরাকন্যা হিসাবে নির্বাচিত করা হয়েছিল তাদের। তাদের পোশাকের ভিন্নতা আজ আর নেই। তাদের সবার পরনেই নীলবর্ণের মেখলা, শুভ্র বক্ষাবরণী উন্মুক্ত পিঠে সুতো দিয়ে বাঁধা। কারুকাজ করা স্তম্ভর মাথার ওপর একটা ছাদের নীচে তাদের নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিকর্না। সে কী সব নির্দেশ দিচ্ছে তাদেরকে। সম্ভবত তাদের স্নান করিয়ে নতুন পোশাক পরিয়ে মন্দির চত্বরে আনা হয়েছে তালিম দেবার জন্য। এখনও জল ঝরছে তাদের চুল বেয়ে।

    সূর্যালোক চিকচিক করছে নাভিকূপে, বক্ষ বিভাজিকায় জমে থাকা জলবিন্দু। কারও কারও মুখে মৃদু বিষণ্ণতা থাকলেও আতঙ্কর ভাবটা যেন অনেকটাই কেটে গেছে। দু-একজনের ঠোঁটের কোণে যেন আবছা হাসিও ফুটে আছে। তাদের দেখে রাহিলের মনে হল একঝাঁক প্রজাপতি যেন সমবেত হয়েছে সেই ছাদের নীচে।

    কাজ শুরু করে দিয়েছে বিকর্না। বিভিন্ন হস্তমুদ্রা তাদেরকে দেখাচ্ছে সে। তাকে অনুকরণ করছে সুরসুন্দরীরা। কিছুটা তফাতে দাঁড়িয়ে রাহিল দেখতে লাগল সেই দৃশ্য।

    হঠাৎ রাহিলের মনে পড়ে গেল সেই নারীর কথা। যে ছুরিকাবিদ্ধ করতে গেছিল চিত্রবান আর অনুদেবকে। তাকে কি এখানেই রাখা হয়েছে? নাকি স্থানান্তরিত করা হয়েছে অন্য কোথাও? সুরসুন্দরীদের তালিম দিতে দিতে একসময় পিছন ফিরে রাহিলকে দেখতে পেল বিকর্না। পুরু ঠোঁটে তার উদ্দেশ্যে হেসে চোখ মটকাল বিকর্না। কেমন একটা অস্বস্তিবোধ হল রাহিলের। সে আর সেখানে দাঁড়াল না। মন্দিরের মূল কাঠামোকে বেড় দিয়ে এগোতে লাগল পিছনের দিকে।

    মন্দিরের এ অংশে লোকজনের চিৎকার-চেঁচামেচি অপেক্ষাকৃত কম। কিছুটা তফাতে তফাতে কয়েকজন ভাস্কর বসে নিবিষ্ট মনে তাদের কাজ করে চলেছে। রাহিলের পদশব্দ শুনে হয়তো মুহূর্তর জন্য একবার তাকাচ্ছে তার দিকে তারপর আবার কাজে মন দিচ্ছে। তাদের হাতুড়ির আঘাতে বেলেপাথরের ওপর ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে ফুল-লতাপাতার অলঙ্করণ অথবা কোনও নারীমূর্তি।

    সূর্য যখন ঠিক মাথার ওপর তখন মন্দির-চত্বরের পিছনের অংশে পরিচিত একজনকে দেখতে পেল রাহিল। গতদিন এখানে আসার পর এ লোকটার সঙ্গে তার মৃদু পরিচয় হয়েছিল। লোকটার নাম মাহবা। অন্যদের থেকে বেশ কিছুটা তফাতে দাঁড়িয়ে মূর্তি গড়ছেন বৃদ্ধ ভাস্কর মাহবা। কৃষ্ণবর্ণের দেহ, পরনে মালকোঁচা দেওয়া কাপড়, উন্মুক্ত পিঠের মধ্যভাগ পর্যন্ত নেমে এসেছে রুপালি কেশগুচ্ছ, অসংখ্য বলিরেখাময় মুখমণ্ডল।

    রাহিলের পায়ের শব্দ পেয়ে তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে আবার নিজের কাজে মনোনিবেশ করলেন ভাস্কর। তাঁর সঙ্গে বাক্যালাপ করার জন্য কিছুটা তফাতে একটা পাথরের ওপর বসল রাহিল। এক পূর্ণাবয়ব অপ্সরার মূর্তি গড়ছেন ভাস্কর। নৃত্যের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে সেই নারী। দু-হাত দিয়ে বুকের কাছে ধরা আছে একটা প্রস্ফুটিত পদ্ম। যেন সে তার হৃদয়কমল নিবেদিত করতে চলেছে কারো চরণে। অসাধারণ শিল্পসুষমামণ্ডিত মূর্তি। কঠিন পাথরে প্রাণ সঞ্চার করেছেন শিল্পী। মূর্তি নির্মাণের কাজ প্রায় সম্পূর্ণ। বৃদ্ধ শিল্পী এখন একটা লৌহশলাকা দিয়ে ঘসে মেজে মসৃণ করছেন তার বাহুযুগল।

    কিছু সময় বসে তাঁর কাজ দেখার পর তার সঙ্গে বাক্যালাপ শুরু করার জন্য রাহিল বলল, ‘অসম্ভব সুন্দর মূর্তি নির্মাণ করেছেন আপনি।’

    রাহিলের কথা কানে যেতেই লোহার পাতটা খসে পড়ল বৃদ্ধ ভাস্করের হাত থেকে। চমকে উঠে রাহিলের দিকে কয়েকমুহূর্ত তাকিয়ে থেকে তিনি প্রথমে বললেন, ‘আপনি কি আমাকে পরীক্ষা করতে এসেছেন?’

    তারপর বললেন, ‘না, আমি এ-মূর্তি নির্মাণ করিনি। এ-মূর্তি, এ-মন্দির সবকিছু নির্মাণ করেছেন জেজাকভূক্তির সম্রাট মহারাজ বিদ্যাধর।’

    তার কথা শুনে মৃদু বিস্মিত হয়ে রাহিল বলল, ‘এ-মন্দির মহারাজ বিদ্যাধর নির্মাণ করাচ্ছেন জানি। কিন্তু এই নারীমূর্তি তো আপনার হাতে নির্মিত। আমি সে কথাই বলছি। সম্রাট তো নিজের হাতে মন্দির, মূর্তি নির্মাণ করেননি। পরীক্ষা করার কথা কী বলছেন?’

    তার কথায় বৃদ্ধ ভাস্কর বললেন, ‘না, না, এ-মূর্তি সম্রাটই নির্মাণ করেছেন।’

    রাহিল এবার তার কথা শুনে হেসে ফেলে বলল, ‘কী বলছেন! সম্রাট নিজের হাতে পাথর কুঁদে এ-মূর্তি নির্মাণ করেছেন! এ-মূর্তি তো নির্মাণ করেছেন আপনি বা অন্য কোনও শিল্পী বা ভাস্কর।’—এ-কথা বলে রাহিল আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু বৃদ্ধ ভাস্কর বেশ আতঙ্কিতভাবে বললেন, ‘দোহাই আপনার চুপ করুন। এ-কথা কেউ শুনলে আমার বিপদ হবে। আর আপনিও বিপদে পড়তে পারেন।’

    বিস্মিতভাবে রাহিল জানতে চাইল, ‘বিপদে পড়ার মতো কী কথা বললাম আমি?’

    ভাস্কর মাহবা কয়েক মুহূর্ত তার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে দৃষ্টি ফেরালেন অন্যদিকে। তাদের কিছুটা তফাতে একটা স্তম্ভর সামনে উবু হয়ে বসে ছোট ছোট পাথরের টুকরো ভাঙছে একজন। মাহবা তার উদ্দেশ্যে হাঁক দিলেন, ‘মল্লখ, এদিকে এসো।’

    ডাক শুনে লোকটা ধীর পায়ে এগিয়ে এসে দাঁড়াল তাদের সামনে। তার সারা অঙ্গে ধুলো-পাথরের গুঁড়ো মাখা, মাথার চুলে জট পড়ে গেছে, সামান্য একটা বস্ত্রখণ্ড কোনওক্রমে লজ্জা নিবারণ করছে তার। চোখের দৃষ্টি কেমন যেন উদভ্রান্ত। কিন্তু সৈন্যবেশে অস্ত্রসজ্জিত রাহিলকে দেখে তার সেই উদভ্রান্ত চোখেই স্পষ্ট আতঙ্কের ভাব ফুটে উঠল। বৃদ্ধ ভাস্কর রাহিলকে বললেন, ‘আপনি ওকে কিছু একটা প্রশ্ন করুন।’

    লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে রাহিল বুঝতে পারল তার বয়স বেশি নয়। যুবকই বলা চলে তাকে। রাহিল লোকটাকে প্রশ্ন করল ‘তুমি কি ভাস্কর? নাকি মজুর? কতবছর কাজ করছ এখানে?’

    মুখ খুলল সেই যুবক। কিন্তু কথার পরিবর্তে তার গলা দিয়ে অস্পষ্ট গোঁ-গোঁ শব্দ বেরোতে লাগল। ভালো করে খেয়াল করার পর রাহিল বুঝতে পারল যে লোকটার জিভ নেই। কিছুক্ষণ ধরে নিষ্ফলভাবে কথা বলার চেষ্টা করে থেমে গেল সেই যুবক। তার বোবা চাহনি তাকিয়ে রইল রাহিলের দিকে।

    মাহবা এরপর তাকে ইঙ্গিত করল নিজের জায়গাতে ফিরে যাবার জন্য। আতঙ্কিত চোখে রাহিলের দিকে তাকাতে তাকাতে নিজের জায়গাতে ফিরে গেল সেই যুবক।

    বিস্মিত রাহিল বৃদ্ধ ভাস্করকে প্রশ্ন করল, ‘ও.কে.?’

    মাহিবা তাকে বললেন, ‘সামনের মন্দির-প্রাঙ্গণে সিংহর সঙ্গে যুদ্ধরত একটা মানবমূর্তি আছে সেটা কি আপনি দেখেছেন? রাজবংশের প্রতীক ওই মূর্তি। এই মূর্তি নির্মাণ করেছিল এই যুবক ভাস্কর। তারপর…।’

    রাহিল বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, দেখেছি। অসাধারণ সুন্দর সেই মূর্তি আমাকে বিস্মিত করেছে। কিন্তু তারপর কী?’

    একটু চুপ করে থাকার পর বৃদ্ধ চাপাস্বরে বললেন, ‘হ্যাঁ, অসাধারণ সুন্দর মূর্তি। ওই মূর্তি নির্মাণ করেছিল মল্লখ-ই। মূর্তিনির্মাণ-কার্য সম্পন্ন হওয়ার পর সে একদিন চিৎকার করে বলে উঠেছিল, ‘দেখে যাও কী আশ্চর্য মূর্তি নির্মাণ করেছি আমি। এই মূর্তি যতদিন অক্ষত থাকবে ততদিন মানুষ স্মরণ করবে ভাষ্কর মল্লখকে।’ আর তারপর…।’

    ‘তারপর কী?’ ব্যাগ্র হয়ে জানতে চাইল রাহিল।

    মাহবা আবারও কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। একটা বিষণ্ণ হাসি ফুটে উঠল বৃদ্ধর ঠোঁটের কোণে। তিনি ধীরে ধীরে বললেন, ‘যুবক মল্লখের কথাটা কীভাবে যেন পৌঁছে গেছিল প্রধান পুরোহিত অনুদেবের কানে। হয়তো বা সম্রাট বিদ্যাধরের কানেও। সাধারণ ভাস্কর আমরা। বংশপরিচয়হীন অজ্ঞাত কুলশীল। একজন তুচ্ছ ভাস্কর কিনা রাজকৃতিত্বের অংশীদার হতে চায়! এই মন্দির নির্মাণের একমাত্র কৃতিত্বের অধিকারী শুধু চান্দেল সম্রাট বিদ্যাধর। আর কেউ নয়। ভাস্কর মল্লখের এই ধৃষ্টতা কেন সহ্য করবেন সম্রাট, প্রধান ভাস্কর বা পুরোহিতশ্রেষ্ঠ অনুদেব? তার এই অমার্জনীয় অপরাধের শাস্তি দিতে তাকে শুধু ভাস্কর থেকে মজুরে পদচ্যুতি করা হল তাই নয়, যাতে সে দ্বিতীয়বার এ কথা উচ্চারণ করতে না পারে, আর অন্য ভাস্কররাও যাতে এ কথা বলার দু:সাহস ভবিষ্যতে না দেখাতে পারে সে জন্য প্রধান পুরোহিত অনুদেবের আদেশে জিভ কেটে নেওয়া হল মল্লখের। এখন ও পাথর ভাঙার কাজ করে।’ কথাগুলো বলে মাথা নীচু করলেন বৃদ্ধ ভাস্কর। রাহিল তারই মাঝে দেখতে পেল তার দু-চোখের কোণ চিকচিক করছে।

    রাহিল এবার অনুধাবন করল ব্যাপারটা। রাহিল কিশোর অবস্থাতে যোগ দিয়েছিল যুদ্ধক্ষেত্রে। সৈন্যবাহিনীর নিয়মকানুন তার বিলক্ষণ জানা আছে, কিন্তু এসব অনুশাসন, রীতিনীতি তার জানা নেই।

    রাহিলের দিকে আবার মুখ তুলে তাকালেন ভাস্কর। বিষণ্ণ হেসে তিনি বললেন, ‘ওই যে কাছে-দূরে দেখুন সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে বরাহমন্দির, লক্ষণমন্দির, মাতঙ্গেশ্বর মন্দির। প্রাচীন মন্দির সব। যদি আপনি কাউকে জিগ্যেস করেন যে ওইসব কারা গড়েছেন তবে লোকে বলবে রাজা গণ্ড, রাজা ঢঙ্গ, রাজা লক্ষণের নাম।

    লক্ষণমন্দির তো চান্দেলরাজ লক্ষণ বা যশোবর্মনের নিজের নামেই পরিচিত। শিল্পী-মজুরদের নাম কেউ জানে না, এমনকী প্রধান ভাস্করের নামও নয়। শিল্পী-মজুররা শুধু কাজ করে যাবে। যদি কোনও মানুষ ভবিষ্যতে কোনও মন্দির-মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়, মনে মনে তারিফ করে বহুযুগ আগের কোনও অজানা-অনামী শিল্পীকে, তবে সেটাই স্রষ্টার একমাত্র প্রাপ্তি।’

    রাহিল এরপর এ প্রসঙ্গে আলোচনা না করে বলল, ‘মজুর, ভাস্কররা কি আশেপাশের গ্রাম থেকে আসেন? কাল তো এত লোক দেখিনি। আজ সব কোথা থেকে এল?’

    মাহবা জবাব দিলেন, ‘কাল সুরসুন্দরীদের এখানে আনা হবে বলে মন্দিরের কাজ বন্ধ ছিল। বহু বছর পর একদিনের জন্য ছুটি পেয়েছিল সবাই। তাই মন্দিরে লোক সমাগম কম ছিল। আমরা ভাস্কর-মজুররা সব ওখানেই থাকি।’ এই বলে তিনি মন্দির-ভিত থেকে নীচের দিকে দূরে একটা জায়গা আঙুল তুলে দেখালেন।

    মন্দিরের পিছন থেকে নীচে নেমে দু-পাশে উঁচু গাছের গুঁড়ির প্রাচীর দেওয়া একটা রাস্তা গিয়ে মিশেছে সেখানে। সে জায়গাও তেমনই উঁচু প্রাচীরবেষ্টিত। আর তার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য ছোট ছোট কুঁড়েঘর। দূর থেকে কেমন যেন বিবর্ণ, বিষণ্ণ দেখাচ্ছে জায়গাটাকে। মাহবা সেদিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ওখানেই মন্দির নির্মাণ শুরু হবার পর থেকে আছি আমরা।’

    ‘আর সংসার পরিজন?’

    ‘না ওখানে শুধু আমরাই থাকি। সংসার পরিজন আমরা যে যেখানে রেখে এসেছিলাম, হয়তো তারা সেখানেই আছে, অথবা নেই। ওই থাকার জায়গা আর এই মন্দির-চত্বর ছেড়ে আমরা কেউ বাইরে যেতে পারি না। আমাদের সঙ্গে সাক্ষাতের হুকুম নেই কারও। প্রায় এক যুগ হয়ে গেল আমরা এমনই আছি। যতদিন না নির্মাণকার্য শেষ হয় ততদিন কেউ ঘরে ফিরতে পারব না আমরা। চান্দেলরাজের এমনই নির্দেশ। কতজন তো কাজ করতে করতে মারাই গেল। আর ঘরে ফেরা হল না তাদের। কেউ এই মন্দির-চত্বরেই মারা গেল পাথর চাপা পড়ে, কেউ আবার মারা গেল পাথরের ধুলোতে শ্বাস টেনে। অনেক পাথরের ধুলোতে বিষ থাকে।’

    এ কথাগুলোর পর যেন সম্বিত ফিরে পেয়ে বৃদ্ধ বললেন, ‘আমাকে মার্জনা করবেন। অনেক কথা বলে ফেললাম আপনাকে। বৃদ্ধ হয়েছি তো। অনেক সময় অনেক কথা অবান্তর বলে ফেলি। দোহাই আপনার, এই কথোপকথন যেন অন্য কারও কানে না যায়। তাহলে এই বৃদ্ধ বয়সে আমারও অবস্থা হয়তো ওই মল্লখের মতো হবে।’

    রাহিল তাঁকে আশ্বস্ত করে বলল, ‘আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। এ কথোপকথন আমি গোপন রাখব।’

    তার কথা শোনার পর মাহবা আবার মনোনিবেশ করলেন নিজের কাজে।

    রাহিল বেশ কিছু সময় ধরে একই জায়গাতে আছে। দিনের আলোতে একবার মন্দির-চত্বরটা ঘুরে দেখা দরকার। তাই সে এগোল সামনের দিকে মন্দিরের পিছনের অংশে। কিছুটা এগিয়েই একটা বাঁকের মুখে আসতেই রাহিলের কানে এল একটা কথোপকথন। কেউ একজন বলল, ‘ভিতের নীচ থেকে দাঁড়িয়ে সে প্রেতমূর্তি দেখেছে বলছ?’

    প্রশ্নর জবাবে কে একজন জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, রাত্রি তখন প্রায় দুই প্রহর হবে। নীচে তখন টহল দিচ্ছিল সে। মন্দিরের শীর্ষগাত্রে ওই মূর্তির ঠিক উলটোদিকে ওই তাকের ওপর সে ওই তান্ত্রিকের প্রেতমূর্তি দেখতে পায়।’

    প্রথমজন এবার উত্তরদাতাকে ধমকের সুরে বলল, ‘চুপ করো। নির্ঘাত মদিরা পান করেছিল লোকটা। একথা দ্বিতীয় কারও কানে গেলে আতঙ্ক সঞ্চারিত হবে মজুর-ভাস্করদের মনে। তাতে নির্মাণকার্যের গতি ব্যাহত হবে। এজন্যই তোমাদের ওপর আর ভরসা না করে রাজসৈন্যদের মন্দিরে মোতায়েন করার বন্দোবস্ত করতে হল।’

    তাদের কথা শুনতে শুনতে বাঁক ঘুরতেই রাহিল দেখতে পেল চিত্রবান আর অনুদেব একজন অস্ত্রধারীকে নিয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁদের সকলের দৃষ্টি মন্দিরের পশ্চাতভাগে শীর্ষদেশের দিকে নিবদ্ধ। সেখানে অনেক উঁচুতে তাকের গায়ে একাকী দাঁড়িয়ে আছে পাথরের তৈরি এক নারীমূর্তি। এতটা নীচ থেকে তাকে অনেকটা ছোট পুতুলের মতো দেখাচ্ছে।

    রাহিল তাদের মুখোমুখি হয়ে গেল। তাকে দেখামাত্রই আলোচনা থেমে গেল তাদের। ভাস্কর আর পুরোহিত একবার নিজেদের মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় করে নেবার পর চিত্রবান তাকে প্রশ্ন করলেন, ‘মন্দিরটা আপনি ভালো করে ঘুরে দেখে নিচ্ছেন তো?’

    ‘হ্যাঁ, দেখছি। যদিও পুরোটা এখনও দেখা বাকি’—রাহিল জবাব দিল।

    চিত্রবান এরপর প্রথমে বললেন, ‘আপনার খোঁজই আমরা করছিলাম।’ তারপর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই অস্ত্রধারীকে দেখিয়ে বলল, ‘এ হল প্রকটাক্ষ। মন্দিরের নিজস্ব রক্ষীবাহিনীর প্রধান।’ প্রকটাক্ষর চোখ দুটো সত্যিই প্রকট। তার অক্ষিগোলক দুটো যেন সত্যিই অক্ষিকোটর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে। সে কেমন একটা সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকাল তার দিকে। তারপর অনিচ্ছাকৃতভাবেই যেন মাথা ঝুঁকিয়ে সম্ভাষণ জানাল তাকে।

    চিত্রবান এরপর বললেন, ‘প্রকটাক্ষ ও তার লোকেরা রাতে মন্দির-ভিতের নীচে চারপাশে পাহারা দেবে। আর আপনারা মন্দির চত্বরে। প্রয়োজনবোধে আপনি ওদের ওপরে ডেকে নেবেন। রাতে তো আমি বা অনুদেব মন্দির-চত্বরে থাকি না। নিরাপত্তার ব্যাপারে সেসময় কোনও প্রয়োজন হলে দুজনে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন।

    পুরোহিত অনুদেব বললেন, ‘বিকর্না আজ থেকে মন্দির-চত্বরে সুরসুন্দরীদের তালিম দিতে শুরু করেছে। ওদের দিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখবেন। আর একটা কথা জানাই আপনাকে। মজুর ভাস্করদের মধ্যে কারা যেন অসন্তোষ ছড়াবার চেষ্টা করে মাঝে মাঝে। মহারাজ বিদ্যাধর তাদের এত ভালো অবস্থায় রেখেছেন তবু তাদের খুশি করা ভার। মহারাজ যশোবর্মনের আমলেতে ভাস্কর-মজুরদের পায়ে লোহার বেড়ি পরানো থাকত। সেটাই সঠিক ছিল। মহারাজ বিদ্যাধর উদার প্রকৃতির মানুষ। সেই উদারতার সুযোগ নেবার চেষ্টা করে কেউ কেউ। আপনি যদি এমন কিছু কখনও দেখেন বা শোনেন যাতে আমাদের বিরুদ্ধে চক্রান্তের ইঙ্গিত আছে বলে মনে হয় সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জানাবেন। সম্রাটের সেবক আমরা। তাঁর প্রতিনিধি হিসাবে মন্দির নির্মাণের কাজে নিয়োজিত আছি। মন্দির-নির্মাণ কাজে কোনও বাধা রাজদ্রোহের সামিল।’

    রাহিল জবাব দিল, ‘অবশ্যই।’ সুরসুন্দরীদের প্রসঙ্গ ওঠায় তার মনে পড়ে গেল গতকালের সেই নারীর কথা। সে জানতে চাইল, ‘সেই যুবতী কোথায়? কাল যাকে রজ্জুবদ্ধ করা হয়েছে?’

    চিত্রবান বললেন, ‘সে এখন ভূগর্ভস্থ কক্ষে বন্দি। সে জায়গাও আপনার দেখা দরকার। এদিকে আর একটু এগোলেই দেখবেন নীচে নামার সোপানশ্রেণি। কাল আপনার সতর্কতায় আমরা খুশি।’

    রাহিল জিগ্যেস করল, ‘তার ভবিষ্যত কী?’

    প্রধান পুরোহিত বললেন, ‘আপাতত সে ওখানেই থাকবে যতদিন সে সুরসুন্দরী হতে না চায়।’

    ভাস্কর এবার বললেন, ‘আমরা এখন অন্যত্র যাব। মন্দিরের নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনও আলোচনা তা সেরে নিন প্রকটাক্ষর সঙ্গে।’—এই বলে তিনি অনুদেবকে নিয়ে এগোলেন রাহিল যে পথে এসেছে সেদিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই হারিয়ে গেল প্রধান পুরোহিত অনুদেবের খড়মের শব্দ। রাহিল তাকাল প্রকটাক্ষের দিকে। সে বিকট নয়নে সন্দিগ্ধভাবে তাকিয়ে আছে রাহিলের দিকে। রাহিল লোকটার সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলার জন্য মৃদু হাসল তার দিকে। লোকটা কিন্তু হাসল না।

    সে বলল, ‘এই মন্দিরের নিরাপত্তার ব্যাপারে আমরাই যথেষ্ট ছিলাম। আপনাদের কোনও প্রয়োজন ছিল না। এই মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর নির্মাণের সময় থেকেই আমরা এখানে আছি। আপনারা বহিরাগত। এখানের কিছুই আপনারা জানেন না। কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে তা আমাদেরই ব্যবস্থা নিতে হবে।’—এই বলে আর কোনও কথা না বাড়িয়ে সে এগোল অন্যদিকে। তার আচরণে রাহিল বুঝতে পারল যে তাদের আগমনে স্পষ্টতই অসন্তুষ্ট লোকটা।

    সে চলে যাবার পর আবার এগোতে শুরু করল রাহিল। কিছুটা এগিয়েই সে দেখতে পেল সেই ভূগর্ভস্থ কক্ষের প্রবেশমুখ। মন্দির চাতাল থেকে সংকীর্ণ সোপানশ্রেণি নেমে গেছে নীচের দিকে। সে জায়গা একবার দেখার জন্য রাহিল নামতে শুরু করল সেই সোপানশ্রেণি বেয়ে। ভূগর্ভের এক সুড়ঙ্গে উপস্থিত হল রাহিল। এঁকে-বেঁকে সুড়ঙ্গ এগিয়েছে সামনের দিকে। আধো অন্ধকার সুড়ঙ্গ। মাঝে মাঝে কিছুটা তফাতে তফাতে দেওয়ালের গায়ে মশাল গোঁজা আছে। সেই আলোতে তার সামনের অংশ আলোকিত হলেও কেমন যেন অপার্থিব অধিভৌতিক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে সুড়ঙ্গে। কোথাও কেউ নেই।

    নির্জন সুড়ঙ্গ ধরে এগোতে লাগল রাহিল। কিছুটা এগোবার পরই রাহিল দেখতে পেল পথের একপাশে শাল খুঁটির গরাদ ঘেরা ছোট ছোট কক্ষ। নীচু ছাদ, তিন দিকে নিষ্প্রাণ পাথুরে দেওয়াল-ঘেরা কক্ষ। তারই একটাতে তাকে দেখতে পেল রাহিল।

    প্রায় অন্ধকার সেই কক্ষের এক কোণে হাঁটু মুড়ে বসে আছে সেই যুবতী। রাহিল সেখানে গিয়ে দাঁড়াতেই সম্ভবত তার মৃদু পদশব্দ শুনেই চমকে উঠে তাকাল সে। রাহিলও দেখতে লাগল তাকে। কিছুক্ষণ তার প্রতি দৃষ্টিপাত করার পর রাহিল পা বাড়াচ্ছিল ফেরার জন্য। ঠিক সেই সময় উঠে দাঁড়াল সেই যুবতী। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে গরাদ ধরে সে দাঁড়াল। রাহিল ভালো করে তাকাল তার দিকে। যুবতীর চোখে আর কোনও আক্রোশ আছে বলে তার মনে হল না। কেমন যেন অসহায় দৃষ্টি জেগে আছে তার চোখের তারায়। তার সম্বন্ধে জানার জন্য রাহিল তাকে প্রশ্ন করল, ‘তোমার নাম কী?’

    রাহিল আশঙ্কা করেছিল হয়তো এ নারী তার ভাষা বুঝতে পারবে না। কিন্তু সে মৃদুস্বরে জবাব দিল, ‘মিত্রাবৃন্দা।’

    অর্থাৎ সংস্কৃত বুঝতে পারে সে। অর্থাৎ খুব দূরদেশ থেকে তাকে সংগ্রহ করে আনা হয়নি। চান্দেল, কলচুরি, প্রতিহারদের অনেকেই এ ভাষায় কথা বলে। চান্দেলদের রাজভাষাও সংস্কৃত।

    এরপর বিড়বিড় করে সে কী যেন বলতে লাগল রাহিলের উদ্দেশ্যে।

    রাহিল তা দেখে তাকে প্রশ্ন করল, ‘তুমি কী বলছ?’

    যুবতীর কম্পিত ওষ্ঠ থেমে গেল। কয়েক মুহূর্ত রাহিলের দিকে তাকিয়ে থেকে সে হাতছানি দিয়ে তাকে কাছে ডাকল। রাহিল কাষ্ঠ- শলাকার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

    তাকে আরও কাছে আসার ইঙ্গিত করল সেই রমণী। যেন অতি সঙ্গোপনে সে কিছু বলতে চায় তাকে।

    রাহিল একটু ইতস্তত করে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল শলাকার সামনে। সেই নারী অপর দিক থেকে এগিয়ে এল তার কাছে। তার ওষ্ঠ, বক্ষবিভাজিকা হাত বাড়ালেই স্পর্শ করতে পারবে রাহিল। শলাকা ধরে দাঁড়াল যুবতী। ফিসফিস করে সে কী যেন বলতে শুরু করল। সে কী বলছে তা বোঝার জন্য তার মাথাটা এগিয়ে দিল শলাকার গায়ে। আর এরপরই এক কাণ্ড ঘটল। হঠাৎ সেই রমণীর চোখ জ্বলে উঠল। আর তার পরমুহূর্তেই কাষ্ঠশলাকার ফাঁক দিয়ে হাত গলিয়ে সেই রমণী চেপে ধরল রাহিলের গলা।

    কঠিন সেই নিষ্পেষণ। দমবন্ধ হয়ে আসছে রাহিলের। সে-ও হাত চেপে ধরল তার। সৈনিকের শক্তির কাছে পরাস্ত হল যুবতী। রাহিলের কণ্ঠদেশ থেকে ছিন্ন হল যুবতীর বাহু। রাহিল তারপর ধাক্কা মারল তাকে। সেই অভিঘাতে ঘরের পাথুরে দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়ল রমণী। তারপর চিৎকার করে উঠল, ‘কাল তুমি আমার ছুরিকাবদ্ধ হাত চেপে ধরেছিলে কেন?’

    ঘটনার আকস্মিকতার ঘোর কাটিয়ে রাহিল কঠিন স্বরে বলে উঠল, ‘তুমি ভাস্কর বা পুরোহিতকে ছুরিকাঘাত করতে যাচ্ছিলে তাই। এখনও তুমি আমাকে হত্যা করার চেষ্টা করলে। এর জন্য কঠিন শাস্তি হতে পারে তোমার।’

    রমণী আর্তনাদ করে উঠল, ‘না, আমি কাউকে হত্যা করতে চাইনি। ওই ছুরিকা আমি নিজের বুকেই বসাতে যাচ্ছিলাম।’ এ কথা বলেই সে মাটি থেকে উঠে আবার ছুটে এল শলাকার কাছে। তারপর একটানে বক্ষ আবরণী খসিয়ে ফেলে বলে উঠল, ‘দোহাই তোমার, তোমার ওই তলোয়ার বিদ্ধ করো আমার বুকে। আমাকে মুক্তি দাও, মুক্তি দাও…।’

    এ কথাগুলো বারে বারে বলতে বলতে কাষ্ঠশলাকার গায়ে মাথা ঠুকতে লাগল সেই রমণী। রাহিল হতভম্বর মতো সেখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে পা বাড়াল বাইরে যাবার জন্য। সেই হতভাগ্য নারীর ক্রন্দনধ্বনি পাক খেতে লাগল সুড়ঙ্গের নিষ্প্রাণ পাথুরে দেওয়ালে।

    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleরম্যরচনা ৩৬৫ – তারাপদ রায়
    Next Article সরস গল্প সমগ্র – তারাপদ রায়
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Demo
    Most Popular

    তিস্তাপারের বৃত্তান্ত – দেবেশ রায়

    August 29, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    তিস্তাপারের বৃত্তান্ত – দেবেশ রায়

    August 29, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Our Picks

    তিস্তাপারের বৃত্তান্ত – দেবেশ রায়

    August 29, 2025

    অদ্বৈতপ্রকাশ – ঈশান নাগর

    August 29, 2025

    পৃথিবীর ইতিহাস – দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

    August 29, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2025 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    Sign In or Register

    Welcome Back!

    Login below or Register Now.

    Lost password?

    Register Now!

    Already registered? Login.

    A password will be e-mailed to you.