৩
একপক্ষ কাল সময় কেটে গেল দেখতে দেখতে। রাহিল নিয়োজিত আছে একই কাজে। নিয়মিতভাবে তারা দিনে-রাতে টহল দেয় মন্দির-চত্বরে। মাঝে মাঝে দু-একজন ভাস্কর বা মজুরদের সঙ্গে মামুলি কথা-বার্তা হয় তার। কেউ-ই খুব বেশি বাক্যালাপ করতে চায় না। তারা এড়িয়ে চলতে চায় রাহিল আর তার রক্ষীদলকে। সম্ভবত এর পিছনে তাদের কোনও চাপা আতঙ্ক কাজ করে। কঠিন অনুশাসনে বাঁধা তাদের জীবন।
সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে মন্দির-চত্বরে ভেরী বেজে ওঠে। সমবেত হয় মজুরের দল। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত তারা নিয়োজিত থাকে নিজেদের কাজে। জোরকদমে চলছে মন্দির নির্মাণের কাজ। সারা দিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে তারা। তারপর দিনের শেষে ধুকতে ধুকতে সার বেঁধে নিজের কুটিরে ফিরে যায় তারা। মাঝে একটা দুর্ঘটনা অবশ্য ঘটেছিল। একটা পাথরখণ্ড ভাঙতে গিয়ে নাক-মুখ দিয়ে রক্ত তুলে মারা গেল এক মজুর। পাথর ভাঙতেই তার ভিতর জমে থাকা বিষবাষ্প বেরিয়ে এসেছিল। তাতেই মৃত্যু হল লোকটার।
এ ঘটনা নাকি আগেও ঘটেছে। তবে রাহিল ব্যাপারটা চাক্ষুষ করল এই প্রথম। তার চোখের সামনেই ছটফট করতে করতে মারা গেল লোকটা। তার শূন্য দৃষ্টি শুধু চেয়ে রইল আকাশের দিকে। কাজ থামিয়ে সেখানে এসে দাঁড়িয়েছিল মজুর-ভাস্করের দল। মৃতদেহ ঘিরে বৃত্তাকারে নিশ্চুপভাবে দাঁড়িয়ে ছিল তারা। এমন সময় খবর পেয়ে সেখানে এসে উপস্থিত হলেন চিত্রবান আর অনুদেব। মন্দির-চত্বরে শোক জ্ঞাপন নাকি শাস্ত্রমতে নিষিদ্ধ, সবচেয়ে বড় কথা কাজ থেমে গেছে। কাজেই তারা দুর্ঘটনাস্থল থেকে হটিয়ে দিলেন তাদের। তারপর অনুলোমের নেতৃত্বে কয়েকজন মৃতদেহের পায়ে দড়ি বেঁধে অন্য মজুরদের চোখের সামনে দিয়ে শৃগাল-কুকুরের মৃতদেহ যেমন নিয়ে যাওয়া হয় তেমনই টানতে টানতে মন্দির-চত্বরের বাইরে কোথায় যেন ফেলে এল সেই দেহটাকে। ভাস্কর-মজুরদের কেউ কোনও কথা বলেনি এ-ব্যাপারে।
রাহিলের শুধু মনে হয়েছিল সেদিন ভাস্কর-মজুরদের পাথরের গায়ে হাতুড়ি-শলাকা ঠোকার শব্দ যেন অন্যদিনের তুলনায় অনেক প্রকট শোনাচ্ছিল মন্দির-প্রাঙ্গণে। মনের ভিতরের নিষ্ফল আক্রোশকে প্রশমিত করার জন্য যেন তারা জোরে জোরে ঘা দিচ্ছিল পাথরের গায়ে। অবশ্য এ ভাবনাটা রাহিলের মনের ভুলও হতে পারে।
মন্দির-চত্বরের সর্বত্র প্রখর দৃষ্টি রেখে চলেন প্রধান ভাস্কর চিত্রবান আর অনুদেব। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কোনও কাজ সম্পন্ন হচ্ছে কিনা, যেখানে কোনও মূর্তি বা পাথরখণ্ড স্থাপনের কথা ঠিকমতো বসানো হয়েছে কিনা, কারোর কাজের গতি শ্লথ হয়েছে কিনা,—সব ব্যাপারেই তাঁদের শ্যেনপক্ষীর তীক্ষ্ণ নজর।
অনুদেবের পায়ের খড়মের শব্দ পেলেই সজাগ হয়ে যায় মজুর-শিল্পীর দল। তাদের দুজনের সঙ্গে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকবার বাক্যালাপ হয়েছে রাহিলের। অনুদেব তাকে প্রতিবারই তার কর্তব্য সম্বন্ধে সচেতন করে দিয়েছেন, বিশেষত সতর্ক দৃষ্টি রেখে চলতে বলেছেন সেই সুরসুন্দরীদের প্রতি। খোঁজ নেবার চেষ্টা করেন মজুরদের আচরণ সম্বন্ধে। সুরসুন্দরীদের কেউ অবশ্য এখনও পর্যন্ত পালাবার দু:সাহস দেখায়নি। ভবিতব্যকে তারা মেনে নিয়েছে, বশ্যতা স্বীকার করেছে বিকর্নার। মন্দিরের ভিতরে একটা কক্ষে তাদের রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বিকর্না ইতিমধ্যে তাদের বেশ কিছু তালিম দিয়েছে। একদিন তাদের লজ্জাবোধ ভাঙানোর জন্য উন্মুক্ত বক্ষে শিল্পী-মজুরদের চোখের সামনে দিয়ে দ্বিপ্রহরে মন্দির প্রদক্ষিণ করানোও হল। মজুর-ভাস্করের দল যে যার কাজ থামিয়ে কয়েক মুহূর্তের জন্য চোখ তুলে দেখল তাদের। তবে সে দৃষ্টিতে যৌনতা বা কামলালসা ছিল না, বরং তাদের দেখে কারও কারও চোখে ফুটে উঠেছিল স্পষ্ট বিষণ্ণতা। হয়তো এই নারীদের দেখে তাদের মনে পড়ে গেল বহু দিন আগে ফেলে আসা স্ত্রী, প্রেয়সী অথবা কন্যার কথাও।
ইদানীং তারা মন্দিরের মধ্যেই থাকে। মন্দিরের অভ্যন্তরে প্রবেশপথে সেজন্য সর্বসময় একজন সৈন্যকে অনুদেবের নির্দেশে মোতায়েন করেছে রাহিল। সাধারণত তারা দিনের বেলা খুব একটা বাইরে বেরোয় না। শুধু সূর্য ডুবে যাবার পর মজুরের দল যখন কুঁড়েতে ফিরে যায় তখন ধীরে ধীরে এক-একজন হয়তো বাইরে এসে দাঁড়ায় উন্মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেবার জন্য।
মাথার ওপর একসময় চাঁদ উঠতে শুরু করে। সেই আলো ছড়িয়ে পড়ে দূরের বনানীতে, বিন্ধ্যপর্বতমালায়। তারা তাকিয়ে থাকে সেদিকে। ওই বনানী, পর্বতমালার আড়ালে, হয়তো বা আরও অনেক দূরে একদিন যেখানে তারা ছিল, যেখানে হারিয়ে গেছে তাদের প্রিয়জনরা হয়তো ভাবে সেই জন্মভূমির কথা। উদীয়মান চন্দ্রালোকে বিষণ্ণতা ফুটে ওঠে তাদের চোখে। তারপর আবার তারা ফিরে যায় অন্ধকার মন্দিরগর্ভে।
সেদিন ভোরবেলাও অন্যদিনের মতো সঙ্গীদের নিয়ে মন্দির-চত্বরে এসে দাঁড়াল রাহিল। সুন্দর সকাল। বিন্ধ্যপর্বতের মাথা থেকে ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়েছে অনতিদূরে খর্জ্জুর কুঞ্জেরমাথায়, আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মন্দিরগুলোর শীর্ষদেশে। কান্ডারীয় মন্দিরের মাথার তাকগুলোতে কিছু বাজপাখির আস্তানা আছে। তারা ঝাঁক বেঁধে আকাশে পাক খাচ্ছে প্রভাতি সূর্যকিরণ ডানায় মেখে নেবার জন্য। মাঝে মাঝে তারা উড়তে উড়তে কর্কশ ডাক ছেড়ে উল্লাস প্রকাশ করছে।
মন্দির-চত্বরে শিল্পী-মজুরের দল কাজ শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আগের রাতে রাহিলের যে পাঁচজন সৈনিক পাহারার কাজে নিযুক্ত ছিল তারা এবার বিশ্রাম নিতে যাবে। রাহিলের আসার প্রতীক্ষায় এক জায়গাতে সমবেত হয়ে অপেক্ষা করছিল তারা। রাহিল তাদের কাছে উপস্থিত হয়ে প্রতিদিনের মতোই প্রশ্ন করল, ‘নিরুপদ্রবে রাত কেটেছে তো?’ সৈনিকদের মধ্যে যে সবচেয়ে প্রবীণ সেই বল্লভ নামের লোকটা বলল, ‘হ্যাঁ, নিরুপদ্রবেই কেটেছে। তবে একটা কথা জানানোর আছে আপনাকে।’
‘কী কথা?’
রাহিল অন্যদের থেকে একটু তফাতে এসে দাঁড়াল বল্লভকে নিয়ে। বল্লভ একটু ইতস্তত করে বলল, ‘যদিও ব্যাপারটা গুরুতর কিছু নয়, তবুও আপনাকে জানিয়ে রাখা প্রয়োজন মনে করছি। গতকাল তখন প্রায় মধ্যরাত্রি হবে। অন্য দিনের মতোই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে মন্দির-চত্বরে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম আমরা। আকাশে মেঘ ছিল, তা মাঝে মাঝে চাঁদকে ঢেকে দিচ্ছিল। অন্ধকার নেমে আসছিল মন্দির-প্রাঙ্গণে।
এমনসময় মন্দির-রক্ষীদলের একজন নীচ থেকে ওপরে উঠে এসে জানাল যে সে একজনকে নাকি দেখেছে মন্দিরের পিছনের অংশে। সামান্য লাঠির ওপর ভরসা করে সে সেখানে যেতে চাচ্ছে না। আমাকে তখনই তার সঙ্গে সেখানে যেতে হবে। সে যে নীচ থেকে চাঁদের আলোতে একজনকে মন্দিরশীর্ষের তাকের গায়ে দেখেছে সেটা হলফ করে বলল। বেশ উত্তেজিত দেখাচ্ছিল তাকে। লোকটার কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই আমি তার সঙ্গে গিয়ে উপস্থিত হলাম সে জায়গায়।
‘মন্দিরের পেছনের অংশে মাথার অনেক ওপরে একটা তাক আছে। সেখানে রয়েছে এক যক্ষিনীর মূর্তি। তার কিছুটা তফাতে উলটোদিকে একটা তাক। সেদিকে তাকিয়ে লোকটা বলল, ‘ওই তাকেই সে নাকি একজনকে দেখেছিল! আমি নীচ থেকে যতটুকু দেখা যায় সে জায়গা তা ভালো করে দেখলাম। কিন্তু আশেপাশে কাউকে দেখতে পেলাম না।
জায়গাটা অনেক উঁচুতে, তাছাড়া অত রাতে একাকী অত উঁচুতে কারো পক্ষে ওঠাটাও বিপজ্জনক। যদিও মন্দিরের মাথার দিকের তাকগুলোতে ছোট ছোট শার্দূলমূর্তি বসানো শুরু হয়েছে, কিন্তু আপনিও দেখেছেন যে সে সময় মজুরের দল পড়ে যাবার ভয়ে একে অপরের সঙ্গে রজ্জুবদ্ধ হয়ে ওপরে ওঠে। তার প্রান্তভাগ আবদ্ধ থাকে তাকের গায়ে। যাই হোক, বেশ কিছুক্ষণ সেই স্থানীয় রক্ষীর দৃষ্টি অনুসরণ করে আমি যখন চন্দ্রালোকে দাঁড়িয়ে থাকা সেই প্রস্তরমূর্তি ছাড়া কাউকে দেখতে পেলাম না তখন আমি লোকটাকে বললাম যে এত রাতে ওখানে ওঠা কারও পক্ষে প্রায় অসম্ভব।
নিশ্চই তার দৃষ্টিবিভ্রম ঘটে ছিল। এমনও হতে পারে যে মেঘ ও চাঁদের খেলায় ওই প্রস্তরমূর্তির ছায়া পড়েছিল উলটোদিকের তাকে। কিন্তু সে তবুও বলার চেষ্টা করল যে সে নিশ্চিতভাবেই সেখানে দেখেছে কাউকে। সে এ কথাগুলো বলার সময় এবার তার মুখ থেকে মদিরার গন্ধ টের পেলাম আমি। ব্যাপারটা সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে গেল আমার কাছে।
‘আমি তাকে তিরস্কার করে বললাম, মদিরা পান করে সে মন্দির পাহারার কাজে নিযুক্ত হয়েছে এ ব্যাপারটা আমি যথাস্থানে জানিয়ে দেব। সঙ্গে সঙ্গে ভয় পেয়ে গেল লোকটা। আমাকে অনুনয় বিনয় করতে লাগল ব্যাপারটা যাতে কারো কাছে প্রকাশ না করি সে জন্য। বিশেষত, এ ঘটনা পুরোহিত অনুদেবের কানে গেলে তার নাকি প্রাণ সংশয় ঘটতে পারে। শেষ পর্যন্ত আমি তাকে বললাম, এ ব্যাপার যেন দ্বিতীয়বার না ঘটে এই শর্তে ব্যাপারটা আমি গোপন রাখব। আমার কথা শুনে আশ্বস্ত হয়ে এরপর চত্বর ছেড়ে নীচে চলে গেল লোকটা। কিন্তু…।
‘কিন্তু কী?’ জানতে চাইল রাহিল।
সৈনিক বল্লভ বলল, ‘সে চলে যাবার পরও কিছুক্ষণ একাকী সে জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। ফেরার জন্য যখন আমি পা বাড়াচ্ছি তখনই হঠাৎ আমার চোখে পড়ল একটা জিনিস। এই যে এটা—’ —এই বলে বল্লভ তার পোশাকের ভিতর থেকে জিনিসটা বার করে তুলে দিল রাহিলের হাতে।
রাহিল ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল জিনিসটা। সূচিমুখ, ছোট অথচ ভারী লৌহশলাকা। এই শলাকা বা ছেনি দিয়ে পাথর ভাঙা নয়, পাথরের গায়ে সূক্ষ্ম অলঙ্করণ বা লেখার কাজ করে ভাস্কররা।
বল্লভ বলল, ‘ওই তাকের ঠিক নীচেই মন্দির-চাতালের দুটো পাথরের ফাঁকে গেথে ছিল জিনিসটা। যেন অনেক ওপর থেকে পড়ে পাথরে গেঁথে ছিল শলাকাটা। ওই তাক থেকেই হয়তো বা জিনিসটা পড়েছে? এইজন্য মৃদু হলেও একটা সন্দেহর উদ্রেক ঘটছে আমার মনে।’
রাহিল বলল, ‘আপনার কথার ইঙ্গিত আমি বুঝলাম। আপাতত ব্যাপারটা কাউকে জানানোর প্রয়োজন নেই। তবে রাত-পাহারার সময় মাঝে মাঝে গিয়ে দেখবেন ওই জায়গা। যদি কিছু নজরে আসে…।’
রাহিল এরপর বল্লভ ও রাত-পাহারায় নিযুক্ত অন্য সৈনিকদের বিশ্রামে পাঠিয়ে নতুন সৈনিকদের মন্দির-প্রাঙ্গণে নিয়োজিত করে ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে মন্দির প্রদক্ষিণ করার জন্য এগোল। সে যখন মন্দিরে প্রথম এসেছিল তখন একদিন চিত্রবান, অনুদেব আর প্রকটাক্ষ একই ব্যাপার নিয়ে সন্তর্পণে আলোচনা করছিল। প্রকটাক্ষর বক্তব্য ছিল আরও এক মন্দিররক্ষী নাকি ওই তাকের ওপর কাউকে দেখেছিল!
দৈনন্দিন কাজ শুরু হয়েছে মন্দিরে। চারপাশ থেকে ভাসতে শুরু করেছে ছেনি-হাতুড়ির শব্দ। একদল মজুর আবার রজ্জুবদ্ধ হয়ে মন্দির-গাত্রে ওঠার চেষ্টা শুরু করেছে শার্দূল বসাবার জন্য। ধীরে ধীরে থেমে থেকে সব কিছু লক্ষ করতে করতে এগোল রাহিল।
একসময় রাহিল মুখোমুখি হয়ে গেল প্রধান ভাস্কর চিত্রবানের। ব্যগ্রভাবে কোথায় যেন যাচ্ছিলেন তিনি। রাহিলকে দেখে থমকে দাঁড়ালেন তিনি। সৌজন্য বিনিময়ের পর তিনি রাহিলকে বললেন, ‘আজ থেকে তিনজন সুরসুন্দরীর মূর্তি নির্মাণ শুরু হল। ব্যাপারটার প্রতি দৃষ্টি রাখবেন।’
রাহিল জানতে চাইল, ‘কোথায়?’
কিছুটা তফাতে মন্দির-প্রাঙ্গণে একটা পাথুরে মণ্ডপের দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে অন্তর্হিত হলেন অন্যদিকে। রাহিল কৌতূহলবশত এগোল সেদিকে।
ফুলপাতার অলঙ্করণ আঁকা স্তম্ভর মাথায় পাথরের ছাদঅলা মণ্ডপ। সেখানে উপস্থিত হয়ে রাহিল দেখতে পেল তাদের। মণ্ডপের নীচে কিছুটা তফাতে তফাতে পাথরের মূর্তির মতো নৃত্যের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে তিনজন নারী। সম্পূর্ণ নিরাবরণ তাদের দেহ। কোথাও একটা সুতো পর্যন্ত লেগে নেই। সূর্যালোক কেড়ে নিয়েছে তাদের দেহের প্রতিটা খাঁজের গোপনীয়তা। না হলে তা ভাস্করের চোখে দৃশ্যমান হবে কীভাবে? কেমন করে সে কঠিন পাথরে ছেনির আঁচড়ে পাথরের ওপর ফুটিয়ে তুলবে সুন্দরীদের জীবন্ত প্রতিমূর্তি? নিরাবরণ দেহ হলেও রাহিল খেয়াল করে দেখল সেই নগ্নিকাদের হাতে কঙ্কণ ও পায়ে মল পড়ানো হয়েছে হয়তো বা তা মূর্তির সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য। তাদের কিছুটা তফাতে তিনটে বড় পাথরখণ্ড। তাদের আকার এমন যে তা দিয়ে পূর্ণাবয়ব মূর্তি রচনা করা যাবে সুরসুন্দরীদের। সেই পাথরের গায়ে কাঠকয়লা দিয়ে সামনে দণ্ডায়মান নগ্নিকাদের ছবি আঁকায় মগ্ন তিনজন প্রবীণ ভাস্কর।
ধীরে ধীরে পাথরের গায়ে ফুটে উঠছে নারীদেহের ছবি। মুখমণ্ডল, গ্রীবা, স্তন…। সুরসুন্দরীদের মাঝের জন বিম্ববতী। বিল্বফলের মতো স্তন তার। দু-পাশে দুজন শঙ্খিনী। ঘন সন্নিবিষ্ট শঙ্খর মতো স্তনযুগল। আঁকার কাজ নিপুণভাবে সম্পন্ন হলেই পাথর কাটার কাজ শুরু হবে। কিন্তু সেই পাথরের মূর্তি তৈরির কাজ শুরু হবার আগেই যেন পাথরের মূর্তিতে নিজেরাই রূপান্তরিত হয়েছে এই তিন নারী। তাদের তিনজনের দৃষ্টিই মাটির দিকে নিবদ্ধ। চোখের পলকও পড়ছে না। কোনও লজ্জাবোধই যেন আর কোনওদিন স্পর্শ করবে না সেই দৃষ্টিকে। নিজেদের লজ্জাবোধ খসিয়ে তারা শুধু যুগ যুগ ধরে যৌনতা জাগাবে অন্যের চোখে। নগ্ন করবে কামোদ্দীপক পুরুষের লালসাকে। মহাকাল যেন এ দায়িত্ব সঁপে দিয়েছে তাদের ওপর। তাই নগ্নিকা হয়েও পুরুষের সামনে তারা এত স্থির-অচঞ্চল।
রাহিলের আকস্মিক উপস্থিতিও কোনও প্রভাব ফেলল না তাদের চোখের তারায়। একইভাবে দাঁড়িয়ে রইল তারা। ভাস্কররা পাথরের গায়ে এঁকে যেতে লাগল নারীদের অঙ্গসৌষ্ঠব। রাহিলের উপস্থিতি তারাও যেন গ্রাহ্যের মধ্যে আনল না। নিবিষ্টভাবে করে যেতে লাগল নিজেদের কাজ। রাহিল বেশ অনেকক্ষণ সময় নিয়ে সেই নারীদের ও ভাস্করদের কাজ দেখল। তারপর সেই মণ্ডপ ছেড়ে বেরিয়ে আগের মতো চত্বর প্রদক্ষিণ শুরু করল। একসময় সে দূর থেকে সেই বৃদ্ধ ভাস্কর মাহবাকে দেখতে পেয়ে সেদিকে এগিয়ে গেল।
একই জায়গাতে অন্যদের থেকে কিছুটা তফাতে বসে কাজ করে লোকটা। সেদিনের কথাবার্তার পর ইতিমধ্যে আর রাহিলের সঙ্গে বাক্যালাপ হয়নি তার। যদিও চত্বরে টহল দেবার সময় প্রায় নিয়মিত প্রতিদিন পরস্পরের সঙ্গে দেখা হয়। রাহিলকে দেখে তিনি মাথা ঝুঁকিয়ে নীরব সম্ভাষণ জানান। কখনও বা তাঁর ঠোঁটের কোণে আবছা হাসি ফুটে ওঠে। তারপর আবার তিনি মনোনিবেশ করেন নিজের কাজে।
রাহিল এদিন কিন্তু তার পাশ দিয়ে এগিয়ে গেল না। লোকটার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। বৃদ্ধ ভাস্কর মাহবা যে মূর্তি নির্মাণ করছিলেন সে কাজ সম্পন্ন হবার পর মূর্তিটাকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আর তার পরিবর্তে মজুরের দল সেখানে রেখে গেছে মানুষের উচ্চতার এক পাথরখণ্ড। তার চারপাশে ঘুরে ঘুরে পাথরের গায়ে কখনও ঝুঁকে পড়ে আবার কখনও বা হাত বুলিয়ে কী যেন পরীক্ষা করছিলেন বৃদ্ধ ভাস্কর। রাহিলের পদশব্দে একবার তিনি ফিরে তাকালেন, প্রতিদিনের মতোই আবছা হেসে মাথা ঝুঁকিয়ে তাকে সম্ভাষণ জানিয়ে পাথরের গায়ে হাত বোলাতে লাগলেন।
রাহিল তাঁকে প্রশ্ন করল, ‘এ পাথর দিয়ে কী হবে?’
তিনি জবাব দিলেন, ‘সুরসুন্দরীদের মূর্তি নির্মাণ হবে। তার আগে পাথরটা পরীক্ষা করে দেখে নিচ্ছি পাথরে কোনও সূক্ষ্ম ফাটল আছে কিনা। মূর্তি নির্মাণ শুরু হবার পর হাতুড়ির আঘাতে সেই ফাটল প্রকট হয় তারপর মূর্তি ভেঙে যায়। কাজেই তার আগে পাথরটা ভালো করে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।’ এই বলে আবার পাথরের গায়ে হাত বোলাতে লাগলেন তিনি।
রাহিলের হঠাৎ মনে হল, এই বৃদ্ধ হয়তো তাকে একটা ব্যাপারে আলোকপাত করতে পারেন। ইনি তো মন্দির নির্মাণের সূচনাকাল থেকেই আছেন এখানে। তাকে প্রশ্ন করাটা সঠিক হবে কিনা ভাবতে ভাবতে শেষ পর্যন্ত সে বৃদ্ধ ভাস্করকে বলল, ‘আপনার থেকে একটা ব্যাপার জানার ছিল আমার।’
‘কী ব্যাপার? যদি জানা থাকে তবে জানাব।’ পাথরের গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে জবাব দিলেন তিনি।
রাহিল একটু ইতস্তত করে বলল, ‘মন্দিরের পিছনের অংশে মাথার ওপরে মন্দিরের শীর্ষদেশের কাছাকাছি একটা তাকে এক যক্ষিনী অথবা অপ্সরার মূর্তি আছে। তার ঠিক উলটোদিকের তাকে নাকি মধ্যরাতে একজন মানুষ বা প্রেতাত্মাকে দেখা যায়! কেউ কেউ নাকি দেখেছে তাকে! এ ব্যাপার সম্বন্ধে আপনি কোনও আলোকপাত করতে পারেন? ইতিপূর্বে ওই জায়গাকে কেন্দ্র করে কোনও ঘটনা কি ঘটেছিল?’
কথাটা কানে যেতেই মাহবা চমকে উঠে তাকালেন রাহিলের দিকে। স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি।
রাহিল তাকে আবার প্রশ্ন করল, ‘আপনি কিছু জানেন এ-ব্যাপারে?’
বৃদ্ধ ভাস্কর জবাব দিলেন, ‘এ ব্যাপারে আলোচনা করা নিষেধ। প্রধান পুরোহিতের কানে গেলে শাস্তি পেতে হবে।’
রাহিল তার কাছে গিয়ে তাঁর কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। এ-ব্যাপারে কেউ কিছু জানবে না।’
রাহিলের কথায় সম্ভবত আশ্বস্ত হলেন বৃদ্ধ ভাস্কর। তিনি তাকে নিয়ে এসে দাঁড়ালেন কিছুটা তফাতে মন্দির-প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে থাকা একটা শার্দূল মূর্তির আড়ালে। তারপর বলতে শুরু করলেন, ‘সে বেশ অনেকদিন আগের কথা। মন্দিরের শীর্ষদেশ নির্মাণের কাজ তখন শুরু হয়ে গেছে। যে তাকে ওই নারীমূর্তি বর্তমানে দাঁড়িয়ে আছে সে পর্যন্ত কাজ সঠিকভাবে হয়েছে। কিন্তু তার চেয়ে বেশি উচ্চতায় পাথর গাঁথার কাজ শুরু হতেই বিপত্তি দেখা গেল। সেদিকে পাথর বসালেই অন্য কোনও অংশের পাথর খসে পড়ে। মন্দির-শিখরের একটা অংশ নির্মিত হচ্ছে তো অন্য অংশ খসে পড়ছে। কিছুতেই ঠিকভাবে বসানো যাচ্ছে না পাথর। নির্মাণকার্য বন্ধ হওয়ার উপক্রম।
‘মন্দিরের প্রধান স্থপতি ও ভাস্কর চিত্রবান শেষ পর্যন্ত হিসাব কষে দেখলেন মন্দির নির্মাণের ভরকেন্দ্রে গন্ডগোল হয়েছে। সূক্ষ্ণ চ্যুতির কারণে সামান্য একটু হেলে গেছে ভরকেন্দ্র। ভিত্তি স্থাপনের সময় কোনও ত্রুটির কারণে বা তার কিছুদিন আগে বিন্ধ্যপর্বতাঞ্চলে ভূ-কম্পনের কারণেও ব্যাপারটা ঘটে থাকতে পারে। চিত্রবান আর প্রধান কারিগররা অনেক ভেবে, অনেক চেষ্টা করেও ব্যাপারটার সমাধান সূত্র খুঁজে পেলেন না। অবস্থা এমন দাঁড়াল যে, হয় মন্দির নির্মাণের কাজ বন্ধ করে দিতে হবে অথবা ভিতের ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা মন্দির ভেঙে তা আবার নতুনভাবে নির্মাণ করতে হবে, যা প্রায় অসম্ভব কাজ। সবচেয়ে বড় কথা এই ত্রুটির পিছনে যে কারণই থাক না কেন তার দায়িত্ব বর্তাবে প্রধান স্থপতি চিত্রবান ও প্রধান পুরোহিত অনুদেবের ওপর। রাজরোষ বর্ষিত হবে তাঁদের ওপর, মৃত্যুদণ্ডও অস্বাভাবিক নয়। কাজেই তারা দুজনই সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত হয়ে উঠলেন। এরপর আরও বিপদ হল। নির্মাণকাজ বন্ধ থাকলেও আপনা থেকেই পাথর খসে পড়া শুরু হয়ে গেল। ঠিক এমন সংকটময় মুহূর্তে হঠাৎই একদিন এখানে উপস্থিত হলেন একজন…।’
এ পর্যন্ত বলে থামলেন ভাস্কর। শার্দূল মূর্তির আড়াল থেকে উঁকি মেরে সেদিকে কেউ আসছে কিনা দেখে নিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন—’আপনি হয়তো জানেন যে ওই বিন্ধ্যপর্বতমালার পাদদেশে অনেক যোগীপুরুষ থাকেন যাঁরা তন্ত্রসাধনা করেন। অনেক অলৌকিক ক্ষমতা থাকে তাঁদের। তেমনই একজন রক্তাম্বর পরিহিত শশ্রূমণ্ডিত যোগীপুরুষ এসে হাজির হলেন মন্দির-চত্বরে। তবে তার বয়স খুব একটা বেশি নয়। আর তাঁর সঙ্গে পরমা সুন্দরী এক যুবতী, তাঁর সাধন-সঙ্গিনী।
তন্ত্রসাধকরা বামাচারী হন, সাধন-সঙ্গিনীদের নিয়ে ঘোরেন। যাইহোক, সেই যোগী মন্দির-ভিতের ওপর কাঠকয়লার আঁক কষে এক অদ্ভুত কথা বললেন। মন্দিরের ভিত্তি নির্মাণের সময় বলি দেওয়া হয়েছিল চারজন অষ্টমবর্ষীয় বালককে। আর তারপর তাদের ছিন্ন মুণ্ডগুলোকে প্রাোথিত করা হয়েছিল মন্দির-কাঠামোর চার কোণে চার প্রধান স্তম্ভর নীচে যাতে মন্দির নির্মাণে উৎসর্গীকৃত ওই বালকদের প্রেতাত্মারা ধরে থাকে মন্দির-কাঠামোকে। কিন্তু মুণ্ড প্রাোথিত করার কাজ নাকি ত্রুটিপূর্ণ ছিল। তাই স্তম্ভের তলদেশ ছেড়ে ওই বালকদের প্রেতাত্মারা নাকি বাইরে বেরিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছে মন্দিরের নির্মীয়মাণ চূড়ায়। তারা নাকি তাদের মা-দের খুঁজছে! যতদিন তারা মাতৃস্নেহ না পেয়ে হাহাকার করবে ততদিন হেলে থাকবে মন্দির, খসে পড়বে পাথর। তাদের অদৃশ্য হাহাকারে ধ্বংস হবে এই মন্দির!
‘তাহলে, এর প্রতিবিধান কী?
‘তান্ত্রিক বললেন, সে পথ তার জানা আছে। কোনও নারীর পাথরের মূর্তি আগে রচনা করতে হবে। সেই মূর্তি স্থাপন করতে হবে মাথার ওপরে যে পর্যন্ত মন্দির উঠেছে তেমন কোনও জায়গাতে। তারপর তন্ত্রসাধনার মাধ্যমে কোনও নারীর প্রেতাত্মাকে আহ্বান করবেন তিনি। সেই প্রেতাত্মাকে তিনি আবদ্ধ করবেন মন্দিরের শীর্ষদেশে ওই প্রস্তরমূর্তিতে। সেই প্রেতাত্মা ওই চার বালকের প্রেতাত্মাকে মাতৃস্নেহ দেবে। এভাবেই সংকট মোচন হবে। তখন চিত্রবান আর অনুদেবের কাছে অন্য কোনও পথ খোলা নেই। কাজেই তারা ভাবলেন, দেখা যাক না কী হয়? তারা সম্মত হলেন যোগীর প্রস্তাবে। কিন্তু নারীমূর্তি রচনার জন্য তো নারী দরকার। কোথা থেকে তা সংগ্রহ হবে।
‘দাসবাজার থেকে নারী সংগ্রহ করা তো সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তাছাড়া তখন যুদ্ধ চলছে কলচুরিদের সাথে। সীমান্তপথ বন্ধ। অনুদেব তখন যোগীকে বাস্তব অবস্থা জানিয়ে প্রস্তাব রাখলেন যদি তার সাধন সঙ্গিনীর মূর্তি রচনা করা যায়। প্রস্তাব মেনে নিলেন সেই তান্ত্রিক। কারণ, এক পক্ষকাল পরই অমাবস্যা তিথি। সেই তিথিতেই ওই প্রস্তরমূর্তিতে প্রেতাত্মাকে আবদ্ধ করতে চান তিনি।
‘কাজ শুরু হয়ে গেল। ভাস্কর চিত্রবানের নেতৃত্বে আমি আর ক’জন প্রবীণ ভাস্কর মূর্তি রচনার কাজ শুরু করলাম। জীবনে বহু সুন্দরী দেখেছি, বহু মূর্তিও রচনা করেছি, কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী অমন সুন্দরী নারী আমি আগে আর কোনওদিন দেখিনি। সে যেন সত্যিই স্বর্গ থেকে নেমে আসা কোনও অপ্সরা। যাই হোক নির্দিষ্ট সময় মূর্তি নির্মাণের কাজ শেষ হল।
অমাবস্যার দিন সকালে তাকে স্থাপন করা হল মন্দিরগাত্রে ওই শীর্ষদেশের তাকে। যোগী সারাদিন ব্যস্ত থাকলেন অনুষ্ঠানের উপচার সংগ্রহর কাজে। দিন কেটে গেল একসময়, মজুর-শিল্পীর দল ঘরে ফিরে গেল, শুধু মন্দির-চত্বরে রয়ে গেলাম চিত্রবান সহ আমরা ক’জন ভাস্কর যারা ওই মূর্তি নির্মাণ করেছিলাম। কারণ শাস্ত্রাচারের জন্য আমাদের উপস্থিতি প্রয়োজন ছিল…।’
আবার একটু থামলেন বৃদ্ধ ভাস্কর। দম নিয়ে ফের বলতে শুরু করলেন, ‘মন্দির-চত্বর ঢেকে গেল অমাবস্যার ঘোর অন্ধকারে। মধ্যরাতে ওই মূর্তি যেখানে স্থাপন করা হয়েছে ঠিক তার নীচে নরকরোটি, মদিরা ইত্যাদি নানা উপচার সাজিয়ে প্রেতাত্মাকে আহ্বান করে ওই মূর্তিতে বন্দি করার জন্য অগ্নিকুণ্ড জ্বালালেন সেই তান্ত্রিক যোগী। আর সেই কুণ্ড ঘিরে বসলাম উপস্থিত আমরা ক’জন।
‘অন্ধকার রাত্রিতে যোগীর উচ্চ কণ্ঠের মন্ত্রাচ্চারণ প্রতিধ্বনিত হতে লাগল মন্দির-চত্বরে। সেই শব্দে মাঝে মাঝে কর্কশ চিৎকারে ডানা ঝাপটাতে লাগল মন্দিরের তাকগুলোতে আশ্রয় নেওয়া শ্যেনপক্ষীর দল। মন্দির-চত্বরের হোমাগ্নির আলোক কীভাবে যেন ওপরে পৌঁছেছে। সেই আলোতে অস্পষ্ট দৃশ্যমান তাকের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সেই নারীমূর্তি। কেমন যেন ভৌতিক পরিবেশ রচিত হল মন্দির চত্বরে।
‘রাত্রি দুই প্রহরে যখন শেয়াল ডেকে উঠল তখন যজ্ঞের কাজ শেষ হল। আমাদের নরকরোটিতে মদিরা পরিবেশন করার পর যোগী বললেন, ”এবার আপনারা প্রত্যেকে কোনও মৃত নারীর কথা মনে মনে চিন্তা করুন।”—এই বলে তিনি স্থিরভাবে তাকিয়ে রইলেন অগ্নিকুণ্ডর দিকে। হয়তো তিনিও মনে মনে ভাবতে লাগলেন কোনও মৃত নারীর কথা। তিনি কোনও মৃত নারীর কথা ভাবতে বললেও আমার চোখে খালি ভেসে উঠতে লাগল সেই নারীর মুখ, যার মূর্তি রচনা করেছি আমি। ভাবলাম, দিনের পর দিন মূর্তি রচনা করার জন্য সে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকার জন্যই এ ঘটনা ঘটছে। একসময় সেই যোগী অগ্নিকুণ্ডর দিকে তাকিয়ে বললেন, ”তুমি কি এসেছ?” ‘
‘তাঁর কথার প্রত্যুত্তরেই যেন মাটি ছেড়ে কয়েক হাত লাফিয়ে উঠল।
‘যোগী এরপর বললেন, ”তবে তোমাকে আমি আবদ্ধ করলাম মন্দিরশীর্ষের ওই নারী মূর্তিতে। তোমার প্রেতযোনীর আবাসস্থল হল ওই মূর্তি। যুগযুগ ধরে ওখানেই থাকবে তুমি। মাতৃস্নেহ দেবে ক্রন্দনরত শিশুপ্রেতদের।”—এই বলে তিনি তাকালেন মাথার ওপরের সেই মূর্তির দিকে।
‘আমরাও তাকালাম সেদিকে। আমার দৃষ্টিবিভ্রম বা আলো-ছায়ার খেলা কিনা জানি না, নীচ থেকে আমার মনে হল তাঁর কথা শুনে মূর্তিটা যেন নড়ে উঠল। হাসি ফুটে উঠল যোগীর মুখে। প্রেতাত্মাকে ওই প্রস্তরমূর্তিতে আবদ্ধ করতে পেরেছেন তিনি। তান্ত্রিক এরপর নরকরোটিতে মদিরা নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে করোটিটা মূর্তির উদ্দেশ্যে তুলে ধরে বললেন, ”তোমার নাম বলো? এই সুরা তোমাকে উৎসর্গ করে তোমার তৃষ্ণামোচন করব আমি।”
‘তাঁর কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে অগ্নিকুণ্ড দপ করে জ্বলে উঠে একেবারে নিভে গেল। গাঢ় অন্ধকারে ডুবে গেল চারদিক। আতঙ্কে একযোগে ডানা ঝাপটে চিৎকার করে উঠল মন্দিরের তাকে বসা শ্যেনপক্ষীরা। সেই চিৎকারের মধ্যে কোনও নারীকণ্ঠ মিশে ছিল কিনা জানি না কিন্তু এরপরই সেই তান্ত্রিক যোগী হাতের করোটি ছুড়ে দিয়ে আর্তনাদ করে উঠলেন, ”এ আমি কার আত্মাকে প্রতিস্থাপিত করলাম মূর্তিতে!”—এ কথা বলেই ”আমার বামা কোথায়? বামা কোথায়? বলতে বলতে তার খোঁজে অন্ধকার মন্দির-চত্বরে ছুটতে শুরু করলেন।”
‘একটা মশাল নিয়ে তাকে অনুসরণ করলাম আমরা। অনেক খোঁজার পর শেষরাতে পাওয়া গেল তাকে। মন্দিরের ভিতর এক কুঠুরিতে পাওয়া গেল সেই রূপসির নগ্ন মৃতদেহ। তার সর্বাঙ্গে ক্ষতচিহ্ন। রক্তধারা গড়িয়ে পড়ছে তার ক্ষতবিক্ষত যোনি বেয়ে। ধর্ষণের পর গলা টিপে মারা হয়েছে তাকে। প্রাথমিকভাবে সেটা কোনও মানবী লোলুপ কৃষ্ণবানরের কাণ্ড। তেমন একটা বানর খাঁচা ছেড়ে পালিয়ে মন্দির-চত্বরে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। ধরা যাচ্ছিল না তাকে। সেটাই প্রমাণিত হত যদি-না মৃতার হাতে মিলত একটা জিনিস!’ এই বলে থেমে গেলেন মাহবা।
‘সেটা কী জিনিস?’ জানতে চাইল রাহিল।
একটু চুপ করে থেকে বৃদ্ধ জবাব দিলেন, ‘একটা ছিন্ন উপবীত। হত্যাকারী ধর্ষকের চিহ্ন।’
জবাব দিয়ে রাহিলের দিকে তাকিয়ে কাহিনির শেষ অংশ বলতে শুরু করলেন বৃদ্ধ—’ওই বীভৎস দৃশ্যর দিকে স্থির হয়ে যোগী তাকিয়ে রইলেন। ভোরের আলো ফুটতেই তিনি সে জায়গা ছেড়ে ছুটে বাইরে বেরিয়ে এলেন, তারপর আমরা তাঁকে বাধা দেবার আগেই তিনি মন্দিরগাত্র বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করলেন, এবং পৌঁছে গেলেন মূর্তিটা যে-তাকে বসানো হয়েছে তার উলটোদিকের তাকে। হয়তো মূর্তিটা যে-তাকে বসানো হয়েছিল সেখানেই তিনি পৌঁছোতেন কিন্তু অন্তরায় হয়ে দাঁড়াল দুই তাকের মধ্যে হাত-কুড়ির ব্যবধান। কাজেই সে তাকে দাঁড়িয়ে তিনি তাঁর বামার জন্য কখনও আর্তনাদ করতে লাগলেন, কখনও আবার বা অভিসম্পাত বর্ষণ করতে লাগলেন নীচে দাঁড়িয়ে-থাকা আমাদের প্রতি। তবে তারই মধ্যে আমরা একটা জিনিস খেয়াল করলাম যে মন্দিরশীর্ষ থেকে পাথর খসে পড়া বন্ধ হয়ে গেছে।
‘ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই রোজকার মতো মজুর-ভাস্করের দল সমবেত হল মন্দির-প্রাঙ্গণে। তারা সমবেত হয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগল মাথার ওপরের সেই দৃশ্য।
‘একসময় মন্দিরে এসে হাজির হলেন অনুদেবও। আগের দিন তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না। সমস্ত ঘটনা শুনে তিনি বললেন, ”এ নির্ঘাত সেই দুষ্ট বানরের কীর্তি। মানবী-যোনির লোভে সে আক্রমণ করেছিল তাকে। বাধা দিতে গিয়ে মৃত্যু হয়েছে বামার।” তিনি মৃতদেহটা জঙ্গলে ফেলে আসার ও যোগীকে নীচে নামানোর আদেশ দিলেন। মৃতদেহ বাইরে ফেলে আসা হলও ঠিকই, কিন্তু যোগীকে নীচে নামানো গেল না। কেউ তাকে নীচে নামানোর জন্য ওপরে উঠতে গেলেই তিনি ওপর থেকে পাথরখণ্ড ছুড়ে মারেন। আর তার সঙ্গে বর্ষিত হয়ে চলল অভিসম্পাত। বিশেষত, অনুদেব আর চিত্রবানের প্রতি।
‘এভাবেই কেটে গেল তিনদিন, তিনরাত। একই জায়গাতে রয়ে গেলেন যোগী। পাথর খসে পড়া কিন্তু বন্ধ হয়ে গেছে। এদিকে তার জন্য কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। মজুররা ওপরে ওঠার চেষ্টা করলেই তিনি পাথরবৃষ্টি করেন। শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলেন অনুদেব। চতুর্থদিন ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই অনুদেব একজন তিরন্দাজকে নিয়ে হাজির হলেন মন্দিরে। তির নিক্ষেপ করা হল তাকের ওপর যোগীকে লক্ষ্য করে। তিরবিদ্ধ যোগী মজুরদের চোখের সামনেই ছিটকে পড়লেন নীচে।
‘মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে এক অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল তান্ত্রিকের ঠোঁটের কোণে। তিনি অনুদেবের উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন, ”এভাবে আমাকে নামানো যাবে না। ওখানেই আমার বামার সঙ্গে থাকব আমি। তোর মৃত্যু দেখব ওপর থেকে।”—এ কথাগুলো বলার পরই আকাশে ঘূর্ণায়মান শ্যেনপক্ষীদের দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে গেল তাঁর চোখের মণি। তান্ত্রিকের দেহটা বাইরে ফেলে আসার পর ওপরে উঠে পাথর বসানোর কাজ শুরু করল মজুরের দল। আর কোনওদিন ওপর থেকে পাথর খসে পড়েনি ঠিকই, কিন্তু কোনও কোনও রাতে আজও কেউ কেউ নাকি ওই তাকে দেখতে পায় সেই যোগী তান্ত্রিককে। প্রধান পুরোহিত অনুদেবের কঠোর নির্দেশ, যে ঘটনা ঘটেছিল তা নিয়ে আলোচনা করা যাবে না। মজুরের দল ওই তাকটাকে এড়িয়ে চলে। ওখানে কোনও প্রয়োজন থাকলে দলবদ্ধভাবে ওখানে কাজ করতে ওঠে।’—দীর্ঘক্ষণ কথা বলার পর কথা শেষ করলেন বৃদ্ধ ভাস্কর মাহবা।
রাহিল তাঁর উদ্দেশ্যে বলল, ‘আমি খবর পেয়েছি যে আমি এখানে আসার পরও নাকি মন্দির-রক্ষীবাহিনীর অন্তত দুজন নাকি দুদিন দেখেছে সেই প্রেতমূর্তি। আচ্ছা আপনি বিশ্বাস করেন এ ব্যাপারটা?’
কয়েক মুহূর্ত রাহিলের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বৃদ্ধ ভাস্কর জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, বিশ্বাস করি, কারণ, আমিও তাঁকে দেখেছি।’
রাহিল অবাক হয়ে গেল তার কথা শুনে। কিন্তু রাহিলকে এরপর আর কোনও প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে শার্দূল-মূর্তির আড়াল ছেড়ে বেরিয়ে মাথা নীচু করে কী যেন ভাবতে ভাবতে বৃদ্ধ ভাস্কর এগোলেন তাঁর কাজের জায়গাতে রাখা পাথরটার দিকে।