Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    তিস্তাপারের বৃত্তান্ত – দেবেশ রায়

    August 29, 2025

    অদ্বৈতপ্রকাশ – ঈশান নাগর

    August 29, 2025

    পৃথিবীর ইতিহাস – দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

    August 29, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • 🔖
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    Subscribe
    সাইন ইন
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    খাজুরাহ সুন্দরী

    ঐতিহাসিক হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত এক পাতা গল্প179 Mins Read0

    ৪

    মন্দির-চত্বরেই রাহিলের দিন কাটে। প্রতিদিন সূর্যোদয় হয় বিন্ধ্যপর্বতের মাথায়। তার আলো মন্দির-প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই মজুর-ভাস্কররা উপস্থিত হয় মন্দিরে। আগের মতোই চত্বর জেগে ওঠে ছেনি-হাতুড়ি, পাথরখণ্ড ঘসটে টেনে নিয়ে যাওয়ার শব্দে। খুব দ্রুতগতিতে কাজ চলছে। আরও চারজন সুরসুন্দরীর মূর্তি নির্মাণ শুরু হয়েছে। মাহবাও একজন নগ্নিকার মূর্তি গড়ছেন। শিল্পী ভাস্কররা নিষ্প্রাণ পাথরের বুকে গড়ে তুলছেন সুন্দরীদের মূর্তি। মন্দিরের মাথার ওপর শার্দূল মূর্তি, পশুপাখিদের মূর্তি বসানোর কাজও চলছে।

    রাহিল ও তার লোকেরা ঘুরে দেখে সব কিছু। রাহিল নিজেও দিনে এবং রাতে পর্যায়ক্রমে পাহারা দেয় মন্দির-চত্বরে। রাত-পাহারার সময় মাঝে মাঝে সে হাজির হয় মন্দিরের পিছনের সেই অংশে। তাকিয়ে দেখে মাথার ওপরের পাথরের তাকে দাঁড়ানো সেই মূর্তির দিকে। মাহবার মুখে শোনা গল্পটা ওই নি:সঙ্গ মূর্তির দিকে তাকিয়ে মনে পড়ে যায় তার। যদিও রাহিল সেখানে অন্য কাউকে দেখতে পায়নি কোনওদিন। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অক্লান্ত পরিশ্রম করে মজুরের দল, শিল্পীদের দল। তারপর শ্রান্ত শরীরে তারা ফিরে যায় নিজের কুটীরে।

    প্রখর সূর্যালোকে সারাদিন উত্তপ্ত থাকে মন্দির চত্বর। মজুরদের ঘাম শুষে নেয় রুক্ষ পাথর। কিন্তু দূরে পাহাড়শ্রেণির আড়ালে সূর্য ডুবে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই পাথর ঠান্ডা হতে শুরু করে। অনতিদূরে দাঁড়িয়ে থাকা বনাঞ্চলের থেকে বাতাস প্রবাহিত হয় মন্দিরের দিকে। দিনের এই সময়টা বড় মনোরম। নিজেদের কক্ষ ছেড়ে সেইসময় দল বেঁধে মন্দির-চত্বরে বেরিয়ে আসে সুরসুন্দরীরা। তারা এখন অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ। হাতুড়ি-ছেনির শব্দ থেমে যাওয়ার পর, মজুররা চলে যাবার পর তাদের নূপুরের শব্দ বাজে মন্দির-প্রাঙ্গণে। কখনও দল বেঁধে পরিক্রমণ করে মন্দির-চত্বর, কখনও বা গোলক নিয়ে খেলা করে। দিনশেষে কলহাস্যে মুখরিত হয়ে ওঠে মন্দির-প্রাঙ্গণ। এমনকী তাদের দু-একজন কুশল বিনিময়ও করে রাহিল বা প্রহরারত অন্য সৈনিকদের সঙ্গেও।

    সূর্য ডোবার পর আকাশে চাঁদ উঠলে তারা মন্দির-প্রাঙ্গণে থাকে আরও কিছুক্ষণ। চন্দ্রিমাও যেন ম্লান হয়ে যায় তাদের রূপের কাছে। নচেৎ তারা ফিরে যায় মন্দিরের অন্ত:পুরের কুঠুরিতে। অদ্ভুত এক আঁধার নেমে আসে মন্দির-চত্বরে। এখন শুধু মন্দির-চত্বরে মশাল হাতে পাহারা দেয় রাহিলের সেনারা। তাদের মশালের আলোতে মন্দিরের অন্ধকার কাটে না। বরং চারপাশের অন্ধকারকে যেন আরও গাঢ় বলে মনে হয় রাহিলের। অন্ধকার-আবৃত মন্দিরের স্তম্ভ, মূর্তি, মণ্ডপের আড়াল থেকে কাদের যেন দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়! হয়তো এইসব দীর্ঘশ্বাস সেইসব শিল্পী-মজুরদের। যাদের আর কোনওদিন ঘরে ফেরা হল না, যাদের অদৃশ্য হাতের ছাপ খোদিত আছে এই নির্মীয়মাণ কান্ডারীয় মন্দিরের স্তম্ভে, প্রস্তরগাত্রে, অন্ধকার গর্ভগৃহে।

    মন্দিরের কঠিন পাথর শুষে নিল যাদের জীবন। রাত-পাহারার সময় এক-একদিন বেশ অস্বস্তি হয় রাহিলের। মনে হয় অন্ধকারের ভিতর থেকে কারা যেন চেয়ে আছে তার দিকে। মন্দির-প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে থাকা অন্ধকার মণ্ডপগুলোতে, শার্দূল মূর্তির আড়ালে কারা যেন চাপা স্বরে কথা বলছে! তারপর একসময় ধীরে ধীরে শুকতারা ফুটে ওঠে, লাল হতে শুরু করে পূবের আকাশ, আর একটা দিন শুরু হয়। এইভাবেই কাটে রাহিলের দিন।

    সেদিন দ্বিপ্রহরে মন্দির-চত্বরে ঘুরে বেড়াচ্ছিল রাহিল। এখানে ওখানে নিজেদের কাজে ব্যস্ত মজুর-ভাস্করদের দল। কেউ মূর্তি গড়ছে, কেউ পাথর ভাঙছে, একদল মজুর আবার মাথার ওপর মন্দিরগাত্রে উঠে মূর্তি স্থাপন করছে। প্রচণ্ড রোদের তেজ। ঘাম ঝরছে তাদের শরীর বেয়ে।

    ঘুরতে ঘুরতে রাহিল উপস্থিত হল সে জায়গাতে, যেখানে মণ্ডপের ভিতর সুরাকন্যাদের তালিম দিচ্ছে বিকর্না। কখনও নিক্কন ধ্বনি, কখনও সুন্দরীদের হাসির তরঙ্গ, কখনও বা বিকর্নার কর্কশ কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে মণ্ডপের ভিতর থেকে। তার কিছুটা তফাতে মন্দিরগাত্রের গা ঘেঁসে তার ছায়ায় বিশ্রাম নেবার জন্য দাঁড়াল রাহিল।

    রাহিলের ঠিক মাথার ওপরে একটা তাকে মূর্তি বসানোর কাজ করছে কয়েকজন মজুর। ছায়াতে দাঁড়িয়ে মণ্ডপের দিকে তাকিয়ে তার ভিতর থেকে ভেসে আসা কলহাস্য শুনতে শুনতে রাহিল ভাবতে লাগল এইসব নারীদের ভবিতব্য কী? মূর্তি নির্মাণের কাজ তো একদিন শেষ হয়ে যাবে, তারপর কি মুক্তি পাবে এরা? পেলেও কী সুদূর কোনও দেশে নিজেদের ঘরে ফিরে যেতে পারবে এইসব নারীর দল? তাদের কি গ্রহণ করবে পরিজনরা, নাকি রূপোপজীবিনী হিসাবে বাকি জীবনটা কাটাতে হবে তাদের? আবার হয়তো এমনও হতে পারে মূর্তি নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হবার পর আবার দাসের হাটে বেঁচে দেওয়া হবে তাদের।

    রাহিল ভাবল এ ব্যাপারটা নিয়ে একবার সে জানতে চাইবে চিত্রবান বা অনুদেবের কাছে। এই নারীর দল মন্দির ত্যাগ করলে রাহিলকেও নিশ্চই আবার ফিরে যেতে হবে সীমান্ত রক্ষার কাজে। এই সুরসুন্দরীদের প্রহরার জন্যই তো রাহিল আর তার ক্ষুদ্র সৈন্যবাহিনীকে মোতায়েন করা হয়েছে এখানে। সীমান্তে ফিরে যাওয়াই তার পক্ষে ভালো। হয়তো সীমান্ত-প্রহরার কাজ অনেক বেশি বিপজ্জনক, মৃত্যু সেখানে সবসময় অনুসরণ করে সৈনিকদের, যে-কোনও সময় তির এসে বিঁধতে পারে বুকে। কিন্তু তাহলেও সেখানে কিছুটা হলেও মুক্তির আনন্দ আছে। উন্মুক্ত প্রকৃতির কোলে পাহাড়-জঙ্গলে বিচরণ করা যায়। কিন্তু এ জায়গাতে থাকতে থাকতে মাঝে মাঝে আজকাল হাঁফিয়ে উঠছে রাহিল। বিশ্রামের কুঠুরি আর মন্দির চত্বর, এর বাইরে কোথাও যেতে পারে না সে।

    এক-এক সময় তার ওই সুরসুন্দরীদের মতোই বন্দি বলে মনে হয়, কখনও মনে হয় বাকি জীবনটা তাকে এই মন্দির-চত্বরেই কাটিয়ে দিতে হবে একঘেয়ে বৈচিত্রহীন জীবনের ওপর ভর করে। আবার কোনও সময় সে ভাবে, তার এই দায়িত্ব সম্পন্ন হলেই সৈন্যবাহিনীর কাজ ছেড়ে দেবে সে। সামান্য হলেও কিছু অর্থ সঞ্চয় করেছে রাহিল। তা দিয়ে সে স্বাধীন কোনও জীবিকা গ্রহণ করবে, কারও সঙ্গে ঘর বাঁধবে।

    রাহিলের কোনও পরিবার পরিজন নেই। কৈশোর থেকে এই যুবা বয়স পর্যন্ত সে সীমান্তেই যুদ্ধক্ষেত্রে কাটিয়েছে। সীমান্তে যখন উত্তেজনা স্তিমিত থাকে তখন সৈন্যদের ছুটি মঞ্জুর হয় ঘরে ফেরার জন্য। রাহিলের কোনও ঘর নেই, তার কোথাও ফেরার প্রয়োজন হয় না। সে তখন সীমান্তেই থাকে। ফিরে এসে গল্প শোনায় সৈনিকেরা। বৃদ্ধ পিতা-মাতার কথা, তাদের স্ত্রী-পুত্র-কন্যার কথা। সেসব আলোচনা শুনতে শুনতে রাহিলের তখন মনে হয় যদি কোথাও তার একটা ঘর থাকত…

    এসব কথাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিল রাহিল। হঠাৎ একজন সেই মণ্ডপ ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এসে দাঁড়াল। তাকে দেখে মৃদু চমকে উঠল রাহিল।

    সেই নারী! যে বন্দিনী ছিল ভূগর্ভস্থ কুঠুরিতে। যে চেপে ধরেছিল রাহিলের গলা! তার নামটাও মনে পড়ে গেল রাহিলের—মিত্রাবৃন্দা। তার পরনে এখন অন্য সুরসুন্দরীদের মতোই মেখলা আর সুতো বাঁধা বক্ষবন্ধনী। সে-ঘটনার পর আর সেই ভূগর্ভস্থ কক্ষে যায়নি রাহিল। একজন সৈনিককে সে নিয়োজিত করেছিল তাকে দেখে আসার জন্য। সে সৈনিক তাকে এই নারীর মুক্তির ব্যাপারে কিছু জানায়নি। সম্ভবত আজই মুক্তি পেয়েছে এই নারী। অর্থাৎ সে সম্মত হয়েছে সুরসুন্দরী হতে।

    মিত্রাবৃন্দা কেমন যেন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রাহিলের দিকে। রাহিল মৃদু হাসল তার উদ্দেশ্যে। সে কিন্তু হাসল না। আগের মতোই অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দিকে। রাহিল তার মনের ভাব পাঠ করতে পারল না। তবে কি এখনও রাহিলের প্রতি আক্রোশ জেগে আছে এই নারীর মনে? সেদিনের ঘটনাটা রাহিল সবার অগোচরেই রেখেছে। কারণ, ঘটনাটা চিত্রবান বা অনুদেবের ক্ষতি হতে পারত এই নারীর দ্বারা। রাহিল সেটা চায়নি। তাকে ওইভাবে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে কেমন যেন অস্বস্তিবোধ হল রাহিলের। সে অন্যদিকে পা বাড়াতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময় ঘটল এক অদ্ভুত ঘটনা।

    ঝড়ের বেগে তার দিকে ছুটে এল সেই নারী। রাহিল কিছু বুঝে ওঠার আগেই সজোরে তাকে ধাক্কা মেরে ছিটকে ফেলল কয়েক হাত তফাতে পাথুরে মাটিতে। আর এর পরমুহূর্তেই অন্য একটা প্রচণ্ড শব্দ কানে এল রাহিলের।

    ব্যাপারটা বুঝতে কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল রাহিলের। সে দেখতে পেল সে যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল ঠিক সেখানেই খণ্ডবিখণ্ড হয়ে পড়ে আছে একটা পাথরের শার্দূল মূর্তি। মাথার ওপর মন্দিরগাত্রের তাকে ওই মূর্তিটা বসানোর কাজ করছিল মজুরেরা। রজ্জুবন্ধনী ছিন্ন হয়ে ওপর থেকে খসে পড়েছে মূর্তি। এক পলকের জন্য মৃত্যুকে পাশ কাটিয়েছে রাহিল।

    শব্দ শুনে আশপাশ থেকে ছুটে এল মজুরের দল, মণ্ডপ ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এল বিকর্না। তার পিছন পিছন কয়েকজন সুরকন্যাও। কিন্তু ভূ-পতিত রাহিলকে উঠে দাঁড়াবার জন্য সাহায্য করতে এগিয়ে আসতে গিয়েও কী দেখে যেন তারা থমকে দাঁড়াল। রাহিল অবশ্য নিজেই উঠে দাঁড়াল দ্রুত। তারপর অন্যদের দৃষ্টি অনুসরণ করে সে-ও থমকে দাঁড়াল।

    রাহিল ভূ-পতিত হবার সময় চর্মবন্ধনী থেকে মুক্ত হয়ে কিছুটা দূরে ছিটকে পড়েছিল তার তলোয়ার। সেটা তুলে নিয়েছে মিত্রাবৃন্দা। কোষমুক্ত করেছে সে তলোয়ার। মিত্রাবৃন্দার দৃঢ় মুঠিতে ধরে থাকা ইস্পাতের তলোয়ার ঝিলিক দিচ্ছে সূর্যের আলোতে।

    যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করা সৈনিক রাহিলের তলোয়ার, যার সামান্য আঘাতে দ্বিখণ্ডিত করা যায় যে-কোনও মানুষকে! তলোয়ারটা সূর্যালোকে উঁচিয়ে ধরে স্থির দৃষ্টিতে অন্যদের দিকে তাকিয়ে আছে সে। তলোয়ার থেকে বিচ্ছুরিত সূর্যকিরণের মতোই মিত্রাবৃন্দার চোখ জ্বলছে। সে কি আক্রমণ করবে কাউকে? এ ব্যাপারটার জন্যই থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে সবাই।

    একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে মিত্রাবৃন্দা। অন্য সবাইও পাথরের মূর্তির মতো তাকিয়ে আছে তার দিকে। মুহূর্তর পর মুহূর্ত কেটে যাচ্ছে। হঠাৎ একটা দ্বিতীয় সম্ভাবনার কথা মাথায় এল রাহিলের। না, এই নারী আক্রমণ করবে না, তাহলে সে প্রাণ বাঁচাত না রাহিলের। তবে কি সে নিজের বুকেই বিঁধিয়ে দিতে চলেছে তলোয়ার? মুক্ত হতে চাচ্ছে তার অপমানিত লাঞ্ছিত অভিশপ্ত জীবন থেকে? এ কাজ আগে একবার করার চেষ্টা করেছিল সে। নিজের অজান্তেই যেন রাহিলের ডান হাতটা ধীরে ধীরে ওপরে উঠে গেল তাকে থামতে বলার জন্য। সেই হাতের দিকে তাকাল মিত্রাবৃন্দা।

    রাহিলের উদ্যত দক্ষিণ হস্ত সে নারীর চোখে কোনও বরাভয় মুদ্রা রচনা করল কিনা তা রাহিলের জানা নেই, কিন্তু মিত্রাবৃন্দার চোখের দৃষ্টি কিছুক্ষণের মধ্যেই স্বাভাবিক হয়ে গেল। সে কোষবদ্ধ করল তলোয়ারটা। কাছে এসে সুন্দরী কোষবদ্ধ তলোয়ার তুলে দিল সৈনিকের হাতে। রাহিল দেখল মুহূর্তের জন্য তার ঠোঁটের কোণে আবছা হাসি ফুটে উঠল তলোয়ারটা তার হাতে তুলে দেবার সময়। তারপর সে মাথা নত করে ধীর পায়ে বিকর্নার পাশ কাটিয়ে অন্তর্হিত হল মণ্ডপের ভিতর।

    বিকর্নাও বেশ বিস্মিত ব্যাপারটাতে। রাহিল তার দিকে তাকাতেই সে একবার হাসল তার দিকে চেয়ে। তারপর করতালি দিয়ে অন্য সুরসুন্দরীদের সঙ্গী করে প্রবেশ করল মন্ডপের ভিতর।

    কিছুক্ষণের মধ্যেই রাহিলের চারপাশ ফাঁকা হয়ে গেল। মজুরের দল ফিরে গেল নিজেদের কাজে। মণ্ডপের ভিতর থেকে আবার ভেসে আসতে লাগল নুপূরের শব্দ, সুন্দরীদের চপল উচ্ছ্বাস।

    বিকর্না আবার তাদের তালিম দিতে শুরু করেছে। রাহিলের একবার কেন জানি মনে হল একবার মণ্ডপের ভিতরে গিয়ে দেখে আসে সেই নারীকে। কিন্তু এ ব্যাপারটা সঠিক হবে কিনা বুঝতে না পেরে রাহিল সে ইচ্ছা ত্যাগ করে অন্যদিকে এগোল।

    রাহিল গিয়ে দাঁড়াল মন্দির-ভিতের অনুচ্চ প্রাচীরের সামনে। সেখানে দাঁড়িয়ে সে ভাবতে লাগল ঘটনাটা। নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে রক্ষা পেয়েছে সে। পাথরের মূর্তিটা ওই নারীর ওপরও পড়তে পারত তাকে ধাক্কা দেবার সময়। তাকে বাঁচাবার জন্য এতটা ঝুঁকি নিল সেই নারী! সে কি রাহিলের তলোয়ার হাতে দ্বিতীয়বার আত্মহত্যার চেষ্টা করতে যাচ্ছিল? এসব কথা, আরও নানা কথা সেখানে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল রাহিল।

    মাথার ওপর সূর্য হাঁটতে শুরু করল পশ্চিমে। কাছেই একটা বেদি দেখে এরপর সেখানে বসল রাহিল। সেখানে দীর্ঘসময় বসে বসে রাহিল লক্ষ রাখতে লাগল চারপাশে। একসময় সূর্যের তেজ কমে এল, ধীরে ধীরে সে মুখ লোকাতে শুরু করল পর্বতমালার আড়ালে। মন্দিরগাত্রের ছায়া ক্রমশ দীর্ঘ হতে শুরু করল, স্তিমিত হয়ে এল মজুরদের হাঁকডাক, পাথরের ওপর লৌহকীলকের আঘাতের শব্দ। দলবদ্ধ হয়ে চত্বর ছেড়ে নিজেদের কুঁড়েতে ফেরার প্রস্তুতি শুরু করল মজুরদের দল।

    মন্দিরের শীর্ষদেশের ছায়া যখন তার পা স্পর্শ করল তখন নিজের জায়গা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল রাহিল। কিছুটা এগোবার পরই তার ক্ষুদ্র সৈন্যবাহিনীর সবাই এসে দাঁড়াল তার সামনে। যে পাঁচজন দিনের বেলা চত্বরে প্রহরার কাজে নিযুক্ত হয়েছিল তারা ছাড়াও অন্য পাঁচজন বিশ্রামরত সৈনিক উপস্থিত হয়েছে সেখানে। পাহারা বদল হবে এবার। দিনমানে কর্তব্যরত সৈনিকদের বিশ্রামে পাঠিয়ে সামান্য কিছু কথা বলে নতুন দলকে রাত-প্রহরার কাজে নিযুক্ত করল সে।

    একদল সৈনিক এদিনের মতো বিশ্রাম নেবার জন্য ফিরে গেল মন্দির সংলগ্ন সৈনিকদের জন্য নির্ধারিত কক্ষে, আর পাঁচজনের নতুন দলটা ছড়িয়ে গেল মন্দির-চত্বরের নানা প্রান্তে রাত-প্রহরার প্রস্তুতির জন্য। রাহিল নিজে কিন্তু অন্যদিনের মতো প্রথম দলের সঙ্গে বিশ্রাম নেবার জন্য ফিরল না।

    সূর্য ডুবে গেছে বিন্ধ্যপর্বতমালার আড়ালে। বিদায়ী সূর্যের লাল আভাটুকু শুধু ছড়িয়ে আছে আকাশের বুকে। অরণ্যের দিক থেকে বাতাস বইতে শুরু করেছে মন্দিরের দিকে। সব শব্দ থেমে গেছে। প্রায় নিস্তব্ধ পরিবেশ। বেশ মনোরম লাগছে চারপাশ। বিশ্রামকক্ষ মানেই তো বদ্ধ জায়গা। তাই সৈনিকদের সঙ্গে বিশ্রামকক্ষে না ফিরে আরও কিছু সময় বাইরে থাকার জন্য রয়ে গেল রাহিল। সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গেই শীতল হয়ে আসছে মন্দির-প্রাঙ্গণ। শীতল হয়ে আসছে রাহিলের দেহ-মনও। ধীর পায়ে সে মন্দির প্রদক্ষিণ করতে শুরু করল।

    কিছুটা এগিয়েই সে দেখতে পেল একটা স্তম্ভর গায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ভাস্কর চিত্রবান। তাঁর দৃষ্টি অন্যদিকে নিবদ্ধ। তাঁকে দেখে তার দিকে এগোল রাহিল। তাঁর কাছাকাছি পৌঁছেই সে দেখতে পেল আরও কিছুটা তফাতে নিজেদের কক্ষ ছেড়ে মন্দির-প্রাঙ্গণে এসে দাঁড়িয়েছে সুরসুন্দরীরা। এই একটা সময়ই তারা বাইরে আসে কিছু সময়ের জন্য উন্মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে, নিজেদের মতো করে সামান্য কিছু সময় অতিবাহিত করতে। তাদের দিকেই তাকিয়ে আছেন চিত্রবান।

    রাহিল গিয়ে দাঁড়াল তাঁর পাশে। রাহিলের দিকে তাকিয়ে চিত্রবান একবার হাসলেন, তারপর আবার দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন ক্রীড়ারত নারীদের দিকে। ছোট একটা গোলক নিয়ে খেলছে ওরা। একজন ছুড়ে দিচ্ছে গোলক। মাটিতে পড়ে সেটা আকাশের দিকে লাফিয়ে উঠছে। সেই গোলক ধরার জন্য ছুটছে সবাই। নূপুরের শব্দ আর সুরসুন্দরীদের হাসির মূর্ছনা সে জায়গা থেকে ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে। দিনশেষের আলোতে এক ক্ষুদ্র নন্দনকানন যেন সৃষ্টি হয়েছে মন্দির-চত্বরে। গোধূলি আলোতে একদল অপ্সরা যেন নেমে এসেছে মর্তের বুকে। রাহিলও ভাস্করের পাশে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল সেই দৃশ্য। একসময় তার মুখ থেকে বেরিয়ে এল, ‘খুব সুন্দর!’

    চিত্রবানও জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, খুব সুন্দর!’

    এ কথা বলার পর চিত্রবান তাঁকে প্রশ্ন করল, ‘আপনি সাহিত্য পাঠ করেছেন কিছু?’

    তার প্রশ্ন শুনে একটু অবাক হয়ে রাহিল জবাব দিল, ‘না, ওসব পাঠ করার সুযোগ আমার হয়নি কোনওদিন। সামান্য অক্ষরজ্ঞান আছে। সামান্য সৈনিকের জীবনে অস্ত্র শিক্ষা ছাড়া অন্য কিছু জানার তেমন প্রয়োজন হয় না, সুযোগও হয় না। কিন্তু এ প্রশ্ন কেন?’

    নারীদের দিকে চোখ রেখেই ভাস্কর চিত্রবান বললেন, ‘আমার একসময় কাব্য পাঠের সামান্য সুযোগ ঘটেছিল। কালিদাস নামের এক প্রাচীন সংস্কৃত কবি এই গোলক নিয়ে লিখেছিলেন—’গোলক তুমি লাফাও, আরও উঁচুতে লাফাও প্রিয়ার ওষ্ঠাধার স্পর্শ করার জন্য। কিন্তু প্রতিবারই ভুল করে নীচে নেমে আসো। তোমার অন্তর্বেদনার সাক্ষী হয়ে থাকি আমি…’

    সুন্দর কাব্য। কিন্তু অনুদেবের সঙ্গী স্থপতি ভাস্কর চিত্রবানের মুখে কাব্য শুনে বেশ অবাক হয়ে গেল রাহিল। হয়তো রাহিলের চোখে ফুটে ওঠা বিস্ময় ভাব লক্ষ করেই ভাস্কর চিত্রবান তাঁর জানার কারণ ব্যাখ্যা করে বললেন, ‘হাতুড়ি-ছেনি দিয়ে ভাস্কর্য শিক্ষার সময় আমাদের শিক্ষার অঙ্গ হিসাবেই কিছু সাহিত্য পাঠ করতে হয়েছিল। বিশেষত সংস্কৃত সাহিত্যের বেশ কিছু স্থানে নারী-পুরুষের অঙ্গসৌষ্ঠবের বা সৌন্দর্যের বর্ণনা আছে। বিশেষত ঋষি বাৎসায়নের রচনাতে তো বহুবিধ যৌনক্রীড়ারও নিখুঁত বর্ণনা আছে। সে জন্য মূর্তি রচনার স্বার্থে বাৎসায়ন, কালিদাস সহ আরও কয়েকজনের রচনা আমাদের পাঠ করতে হয়েছিল। বহু প্রাচীন পাঠ। কিন্তু তার কিয়দংশ আমার এখনও মনে আছে। তবে পুনর্বার বাৎসায়ন পাঠে মনোনিবেশ করেছি আমি। এই কান্ডারীয় মন্দির হবে অনন্ত যৌবনের প্রতীক। এই মন্দিরে শুধু থাকবে যৌবনের উচ্ছ্বাস। তার প্রধান অনুসঙ্গ হিসাবে মন্দিরগাত্রে চিত্রিত হবে মিথুন মূর্তি, নগ্নিকাদের মূর্তি। শিশুক্রোড়ে মাতৃমূর্তি বা ও-ধরনের কোনও নারীমূর্তি স্থান পাবে না এখানে। ওইসব মিথুন-মূর্তি রচনার জন্য বাৎসায়ন পাঠ প্রয়োজন। এখানের কিছু প্রবীণ ভাস্কর এবং বিকর্নাও এ-পাঠে অত্যন্ত দক্ষ। এখন নগ্নিকা মূর্তি রচিত হচ্ছে, এরপর রচিত হবে মিথুনমূর্তি।’

    রাহিল জানতে চাইল, ‘আচ্ছা, মূর্তি রচনার পর এইসব নারীদের ভবিষ্যৎ কী?’

    ভাস্কর বললেন, ‘নারীদের তিনটে দল এখানে আসার কথা। একই দল দিয়ে সব মূর্তি রচনা করলে মূর্তি নির্মাণে পুনরাবৃত্তি ঘটবে। এরা প্রথম দল। এদের মূর্তি নির্মাণ সম্পন্ন হবার পর মুক্তি দেওয়া হবে। তারপর আবার নতুন সুন্দরীদের দল আসবে। তাদের নির্বাচন করে আবার কাজ শুরু করবে ভাস্কররা।’

    আরও দুটো দল আসবে! তার মানে আরও বেশ অনেকদিন তাদের প্রহরার কাজে নিযুক্ত থাকতে হবে রাহিলকে। এ কথা ভেবে রাহিলের মন একটু বিষণ্ণ হয়ে গেলেও একটা কথা জেনে বেশ ভালো লাগল যে মুক্তি দেওয়া হবে এইসব নারীদের।

    রাহিল জবাব দিল, ‘মুক্তিলাভের পর এই নারীর দল কোথায় যাবে?’

    চিত্রবান জবাব দিলেন, ‘বহু দূর দেশ থেকে সংগ্রহ করে আনা হয়েছে এদের। ওসব দূর দেশে কারো পক্ষেই আর ফেরা সম্ভব নয়। রূপের জন্য এদের দু-একজনকে হয়তো বিবাহ করবে ধাঙর, কশাই, চর্মকার, ব্যাধ—এসব নিম্নশ্রেণীর লোক। তবে এদের অধিকাংশই গণিকা হবে, বার্ধ্যক্ষে ভিখারিনী। মন্দির চত্বর ত্যাগ করার পর কিন্তু এদের আর কোনওদিন প্রবেশাধিকার নেই এ মন্দিরে। ওই যে দূরে লক্ষণমন্দিরের শীর্ষদেশ দেখা যাচ্ছে ওখানে কোনওদিন গিয়ে থাকলে দেখবেন মন্দিরের নীচের চত্বরে একপাশে সার বেঁধে বসে থাকে লোলচর্ম, শীর্ণ চেহারার কিছু অতিবৃদ্ধা। পূণ্যার্থীদের ভিক্ষান্নে প্রতিপালিত হয় তারা। কোনও সময় হয়তো বা মন্দিরের পূজারি বা সেবকরা তাদের উদ্দেশ্যে ওপর থেকে ছুড়ে দেয় কিছু ফলমূল। মন্দির চত্বরে ওঠার অধিকার নেই তাদের। অথচ তাদের ফেলে-আসা-যৌবন কিন্তু ধরা আছে ওই মন্দিরগাত্রেই। আমাদের সামনের গোলক নিয়ে ক্রিড়ারত নারীদের কেউ কেউ হয়তো একদিন লোলচর্ম নিয়ে এসে বসবে এই কান্ডারীয় মন্দিরের সোপানশ্রেণির নীচে ওই চত্বরে।’

    রাহিলের মনে পড়ে গেল মিত্রাবৃন্দার কথা। তাকেও কী একদিন লোলচর্ম নিয়ে নীচের ওই চত্বরে এসে বসতে হবে? ক্রীড়ারত নারীদের ভিড়ে সে নেই। আশেপাশে তাকিয়েও রাহিল তাকে দেখতে পেল না।

    রাহিল বলল, ‘এই সুন্দরীরা এখন আপনাদের বশ্যতা পুরোপুরি গ্রহণ করে নিয়েছে বলে মনে হয়। এমনকী যাকে ভূগর্ভস্থ কক্ষে বন্দি রাখা হয়েছিল তাকেও তো আজ বিকর্নার কাছে তালিম নিতে দেখলাম।’

    রাহিলের কথা শুনে তার মুখের দিকে তাকালেন চিত্রবান। কেমন অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল তার ঠোঁটে। তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ। অনেক চেষ্টা করে, অনাহারে রেখে এমনকী মৃত্যুভয় দেখিয়েও রাজি করানো যাচ্ছিল না তাকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনুদেবের কৌশলে কাজ হল। অবশেষে রাজি হল সেই বাঘিনী।’

    রাহিল জানতে চাইল, ‘কী কৌশল?’

    পাহাড়ের আড়ালে দিনের শেষ আলোটাও মিলিয়ে যাচ্ছে। অন্ধকারের চাদর ধীরে ধীরে গ্রাস করে নিচ্ছে চারপাশ। মন্দির-চত্বরেও আঁধার নামছে। খেলা সাঙ্গ হল রমণীদের। চিত্রবান-রাহিলকে বললেন, ‘আমাকে এবার ফিরতে হবে। চলুন, তার আগে আপনাকে দেখিয়ে দিয়ে যাই অনুদেব কী কৌশলে বশ করলেন ওই নারীকে।’ চিত্রবানের কথা শুনে তাকে অনুসরণ করল রাহিল।

    চিত্রবান রাহিলকে এনে দাঁড় করালেন মন্দিরগাত্রের সামনে এক জায়গাতে। আবছা আলোয় জায়গাটা জেগে আছে তখনও। কিছুক্ষণের মধ্যেই হারিয়ে যাবে অন্ধকারের আড়ালে। সে জায়গাতে দেওয়ালগাত্রের ভাস্কর্যগুলোর দিকে আঙুল তুলে চিত্রবান বললেন ‘ভালো করে দেখুন’

    অস্পষ্ট আলোতে দেওয়ালগাত্রে ফুটে আছে মিথুন-ভাস্কর্য। না, মানব-মানবীর মিথুন নয়। ইতর প্রাণীর সঙ্গে মানবীর মিথুন-ভাস্কর্য। এ ভাস্কর্য মন্দিরগাত্রে আরও বেশ কিছু জায়গাতে খোদিত আছে খেয়াল করেছে রাহিল। মানবীর সঙ্গে বানরের মিথুন, এমনকী অশ্ব, ষণ্ড, ব্যাঘ্রের সঙ্গেও মানবীর মিথুন-দৃশ্য খোদিত আছে কোথাও কোথাও। রাহিলের সামনে আঁধো-অন্ধকারে দেওয়ালগাত্রে খোদিত আছে বানরের সঙ্গে এক রমণীর মিথুন-দৃশ্য। রাহিল সেদিকে তাকাতেই চিত্রবান বললেন, ‘অন্যান্য ইতরপ্রাণী শুকর, ষণ্ড, অশ্ব ইত্যাদির সঙ্গে যে মিথুন-দৃশ্য আছে সেগুলো কল্পিত হলেও এ দৃশ্য কিন্তু কল্পিত নয়। ওই পর্বতমালার পাদদেশের অরণ্যে এই বৃহৎ কৃষ্ণবানর পাওয়া যায় যার স্বভাব, দেহের গঠন অনেকটাই মানুষের মতো। লক্ষ করে দেখুন চিত্রের বানরের গোঁফ-দাড়িও অনেকটা মানুষের মতো। কেউ কেউ বলেন এ জাতীয় বানরেরা নাকি আমাদের আদি পূর্বপুরুষ। এই পুরুষবানররা যৌন সম্ভোগের জন্য মানবীকেও আক্রমণ করে। সেই জঙ্গলপ্রদেশে একা কোনও নারীকে পেলে পুরুষ বানরেরা দল বেঁধে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। নারী যদি বাধা না দেয় তাহলে হয়তো তার প্রাণরক্ষা হয়। আর বাধা পেলে বানরের দল আঁচড়ে কামড়ে শেষ করে দেয় তাকে। ভাস্কর্যের প্রয়োজনে এ মন্দিরেও তেমন কিছু বানর আছে। মজুরদের থাকার জায়গাতে একস্থানে তাদের বন্দি রাখা আছে। তিনটি পুরুষবানর। দীর্ঘদিন ধরে মিথুন-স্বাদ থেকে বঞ্চিত তারা। ভূগর্ভে যে নারী বন্দিনী ছিল তাকে মৃত্যুভয় দেখিয়েও যখন কাজ হল না তখন অনুদেবের পরামর্শমতো ওই নারীকে হাজির করা হল এই চিত্রের সামনে। অনুদেব তাকে এই চিত্রের ব্যাপারে ব্যাখ্যা করে বললেন, সে যখন নগ্নিকা হতে রাজি নয় তখন তাকে মুক্তি দেওয়া হবে। কিন্তু তার আগে ওই তিন কৃষ্ণবানরকে ছেড়ে দেওয়া হবে তার কক্ষে। আর এতেই কাজ হল, সুরসুন্দরী হতে রাজি হল ওই নারী।’

    স্থপতি চিত্রবানের কথা শেষ হবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আঁধারে ঢেকে গেল মন্দির-চত্বর। কথা শেষ করে চিত্রবান পা বাড়ালেন সেদিনের মতো মন্দির ত্যাগ করার জন্য। তিনি মন্দির ছেড়ে চলে যাবার পরও একই জায়গাতে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল রাহিল। তারপর একসময় বিন্ধ্যপর্বতের মাথার ওপর চাঁদ উঠতে শুরু করল, আবছা আলো ছড়িয়ে পড়তে লাগল মন্দির-চত্বরে, রাহিল তখন নিজের কক্ষে ফেরার জন্য পা বাড়াল।

    মন্দিরের যে অংশে সুরসুন্দরীদের থাকার জায়গা, যে জায়গাতে বেলাশেষের আলো মেখে গোলক নিয়ে খেলছিল নারীরা, সে জায়গার পাশ দিয়ে নিজের কক্ষে ফেরার জন্য এগোতে এগোতে মুহূর্তের জন্য একবার চত্বরের সে জায়গাটায় থমকে দাঁড়াল রাহিল। শূন্য প্রাঙ্গণ, নিজেদের কক্ষে ফিরে গেছে সুরসুন্দরীদের দল। শুধু চত্বরের এক কোণে একজনকে দেখতে পেল রাহিল। একাকী চাঁদের দিকে মুখ তুলে বিষণ্ণভাবে তাকিয়ে আছে সে। রাহিল তাকে চিনতে পারল—’মিত্রাবৃন্দা’।

    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleরম্যরচনা ৩৬৫ – তারাপদ রায়
    Next Article সরস গল্প সমগ্র – তারাপদ রায়
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Demo
    Most Popular

    তিস্তাপারের বৃত্তান্ত – দেবেশ রায়

    August 29, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    তিস্তাপারের বৃত্তান্ত – দেবেশ রায়

    August 29, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Our Picks

    তিস্তাপারের বৃত্তান্ত – দেবেশ রায়

    August 29, 2025

    অদ্বৈতপ্রকাশ – ঈশান নাগর

    August 29, 2025

    পৃথিবীর ইতিহাস – দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

    August 29, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2025 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    Sign In or Register

    Welcome Back!

    Login below or Register Now.

    Lost password?

    Register Now!

    Already registered? Login.

    A password will be e-mailed to you.