৫
কাজ করে চলে শিল্পী, মজুরদের দল। বেশ দ্রুতগতিতে কাজ চলছে। ভাস্করের দল প্রাণ সঞ্চার করছে কঠিন পাথরে। গড়ে উঠছে সুরসুন্দরীদের নগ্নিকামূর্তি। মিথুনমূর্তি নির্মাণের কাজও শুরু হয়েছে। মাহবাসহ আরও কয়েকজন প্রবীণ ভাস্কর সুরসুন্দরীদের মূর্তি নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গে সে- কাজেও নিযুক্ত। সাধারণত মিথুনমূর্তিগুলো রচিত হচ্ছে সূর্যোদয়ের পর কিছুসময় তারপর সূর্যাস্তের আগে। মিথুনমুদ্রায় নরনারীদের দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব নয়। একদণ্ড সময় তারা একটানা মিলিতভাবে থাকতে পারে। সকাল সন্ধ্যা মিলে দু-দণ্ড সময়। ওই সময়টুকু ভাস্কররা শুধু তাদের মূর্তি নির্মাণ করে। বাকি সময় তারা ব্যস্ত থাকে অন্য মূর্তি নির্মাণে।
মাঝে মাঝে মিথুনমূর্তিগুলো যেখানে নির্মিত হচ্ছে সেখানে গিয়ে উপস্থিত হয় রাহিল। ভাস্করদের কাজ দেখে। সূর্যোদয়ের সময় মন্দির-পূর্বভাগে, সূর্যাস্তের সময় পশ্চিম প্রান্তের চত্বরে মিথুনমূর্তি নির্মাণের কাজ হয়। যাতে সূর্যালোক ভালোভাবে এসে পড়ে মিথুনরত নরনারীর ওপর। সে জায়গা দুটো পশুচর্ম দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে।
যে ভাস্কররা সেখানে কাজ করছেন তারা, চিত্রবান, অনুদেব, বিকর্না ও সৈনাধ্যক্ষ রাহিল ছাড়া অন্যদের প্রবেশ নিষেধ ওই মিথুনমূর্তি নির্মাণের জায়গাতে। যাতে ভাস্করদের মনোসংযোগ নষ্ট না হয়, অথবা মিথুনরত যুগল কোনও অস্বস্তি বোধ না করে সে জন্যই এই ব্যবস্থা। তা ছাড়া আরও একটা কারণ আছে ওই জায়গাকে আবৃত করে রাখার। শ্রমিক মজুরের দল কামোদ্দীপক হয়ে উঠতে পারে ওই মিথুন-দৃশ্য দেখে। যা ভবিষ্যতে অন্য কোনও দুর্ঘটনার জন্ম দিতে পারে।
সেদিন বিকালে রাহিল মন্দির-চত্বর পরিভ্রমণ করতে করতে প্রথমে উপস্থিত হল পশ্চিম প্রাঙ্গণের সেই পশুচর্ম-ঘেরা জায়গার ভিতর। তিন জোড়া নরনারী সেখানে মিথুনরত ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে আছে। প্রথম যুগল দণ্ডায়মান ‘ব্যায়ত সন্মুখ’ মিথুন ভঙ্গিমায়, দ্বিতীয় যুগল ‘জানু কর্পূরা’ মিথুনরত অবস্থায় আর তৃতীয় জোড়ের পুরুষ একটা থামকে আশ্রয় করে নারীর সঙ্গে সঙ্গমরত ‘অবিলম্বতক আসনে’।
তিনজন বৃদ্ধ ভাস্কর তাদের সামনে রাখা প্রস্তরখণ্ডে ফুটিয়ে তুলছেন মিথুন মূর্তি। আরও একজন সেখানে উপস্থিত, সে বিকর্না। একটা থামের গায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে।
দিনশেষের শেষ উজ্জ্বল আলো এসে পড়েছে তিন জোড়া মিথুনরত নরনারীর গায়ে। সোনালি-মায়াবী আলো গায়ে মেখে সঙ্গমরত নারী-পুরুষরা দাঁড়িয়ে আছে। অঙ্গসৌষ্ঠবের দিক থেকে তিনজন নগ্ন পুরুষও কম সুন্দর নয়। তাদের পেশিবহুল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বেয়ে চুঁইয়ে পড়ছে ঘর্মবিন্দু আর সূর্যালোক। এই পুরুষরাও আসলে তার সঙ্গিনীদের মতো ক্রীতদাস। শ্রমিক-মজুরদের কাজের জায়গাতেই তারা থাকে। সুরকন্যাদের সঙ্গে তাদের পার্থক্য শুধু একটাই, মাঝে মাঝে মন্দির-রক্ষীবাহিনীর তত্বাবধানে চত্বরের বাইরে যাবার অনুমতি মেলে।
মিথুনরত নারী-পুরুষের মূর্তিগুলোকে হঠাৎ দেখলে কারো পাথরের মূর্তি বলে ভ্রম হতে পারে। পাথরের বুকে খোদিত হবার আগে তারা নিজেরাই যেন পাথর বনে গেছে। রাহিলের খুব বিস্ময়বোধ হয় ওদের দেখলে। কীভাবে এক দণ্ড সময় অমন নিশ্চলভাবে দাঁড়িয়ে থাকে ওরা! অনেক সময় দণ্ডায়মান অবস্থাতেই নারী অথবা পুরুষকে অপরের দেহ ভার বহন করতে হয়। ওই তো রাহিলের চোখের সামনে যে পুরুষ অবলম্বিতক আসন ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে সেই তো তার সঙ্গিনীর নিতম্ব বেষ্টন করে তার শরীরের সম্পূর্ণ ভার গ্রহণ করেছে নিজের বাহুযুগলের ওপর। অথচ সে কত স্থির, অচঞ্চল। শুধু তার বাহু চুঁইয়ে মাঝে মাঝে সোনালি ঘর্মবিন্দু নি:শব্দে ঝরে পড়ছে মাটিতে। রাহিল ঠিক বুঝতে পারে না এইসব মিথুনযুগল পরস্পরের স্পর্শে এই দণ্ডায়মান অবস্থায় কোনও রোমাঞ্চ অনুভব করে কিনা? এভাবে এতগুলো মানুষের চোখের সামনে মিলিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকলেও কি তাদের রক্তে কামনার আগুন প্রবাহিত হয়? নাকি তাদের শরীর রক্ত পাথরের মতোই শীতল থাকে, কোনও উত্তেজনা প্রবাহিত হয় না তাদের শরীরে? আর তাদের দিকে তাকিয়ে থাকলেও ভাস্করদের চোখগুলোও কেমন যেন স্থির। তাঁদের চোখগুলো মিথুনরত নারী-পুরুষের সৌন্দর্য শুষে নিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তাতে কোনও কামনার আগুন নেই। কাম যেন তাদের স্পর্শ করতে পারে না। পাথরের গায়ে শলাকা-হাতুড়ি দিয়ে কাজ করে চলেছেন তাঁরা।
রাহিল সেখানে উপস্থিত হলেও তার দিকে ভাস্কররা ফিরে তাকাল না। তাকাল শুধু একজন, বিকর্না। রাহিল বেশ কিছুক্ষণ বিস্মিতভাবে মিথুনরত নারী-পুরুষদের দিকে তাকিয়ে থাকার পর চোখ ফেরাতেই দেখতে পেল বিকর্না একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। তার ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত একটা হাসি।
আজকাল বিকর্নাকে দেখলে রাহিলের কেমন যেন অস্বস্তি হয়। বিকর্না অদ্ভুত হাসি নিয়ে তাকিয়ে থাকে রাহিলের দিকে। এদিনও তার ব্যতিক্রম হল না। একবার তার দিকে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিলেও রাহিল বুঝতে পারল বিকর্না তাকেই দেখছে! রাহিলের শেষ একবার চোখাচোখি হল বিকর্নার সঙ্গে। এবার বিকর্না চোখের ইশারায় কিছুটা তফাতে জানু কর্পূরা মিথুনযুগলের দিকে ইঙ্গিত করল। রাহিল সেদিকে তাকাল ঠিকই কিন্তু বিকর্না কী বলছে বুঝতে পারল না। বিকর্নার হাসিটা যেন ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। অস্বস্তিবোধের কারণে রাহিল আর সে জায়গাতে না দাঁড়িয়ে সেই ঘেরা জায়গার বাইরে বেরিয়ে আবার চত্বর প্রদক্ষিণ শুরু করল। রাহিলের চোখে পড়ল ভাস্কর আর প্রধান পুরোহিত মন্দির ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সূর্য ডুবতে শুরু করল। প্রাঙ্গণ থেকে নিজেদের কুঁড়েতে সার বেঁধে ফিরে চলল মজুরদের দল। চত্বর ফাঁকা হতেই নিজেদের আস্তানা ছেড়ে বেরিয়ে এল সুরসুন্দরীদের দল। সামান্য অবসরে তারা মেতে উঠল গোলক নিয়ে। ঘুরতে ঘুরতে সে জায়গাতে কিছুক্ষণের জন্য থামল রাহিল, তারপর আবার এগোল সামনের দিকে। বাঁক নিয়ে বেশ কিছুটা পথ এগিয়ে রাহিল দেখতে পেল একাকী দাঁড়িয়ে থাকা এক নারীকে।
মন্দির-ভিতের শেষ প্রান্তে কারুকাজমণ্ডিত একটা থামের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মিত্রাবৃন্দা। শেষ বিকালের কনে-দেখা-আলো এসে পড়েছে তার মুখে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে যেন কোনও সাধারণ নারী নয়, এক অপ্সরা যেন দাঁড়িয়ে আছে সেই স্তম্ভর সামনে। সূর্যদেবও যেন বিশ্রাম নেবার জন্য অস্তমিত হতে গিয়েও হঠাৎ কয়েক মুহূর্তর জন্য থমকে দাঁড়িয়েছেন এই সুন্দরীকে দেখে, বিদায়ের আগে আরো ভালো করে তার সৌন্দর্য চাক্ষুষ করার জন্য তার শেষ আলোটুকু ছড়িয়ে দিচ্ছেন মিত্রাবৃন্দার মুখমণ্ডলে। রাহিলের তাকে দেখে আজ মনে হল যত নারীদের এখানে আনা হয়েছে তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ সুন্দরী এই মিত্রাবৃন্দাই।
রাহিলের লোহার বেড়অলা ভারী পাদুকার শব্দেই সম্ভবত ফিরে তাকাল মিত্রাবৃন্দা। তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠল। মৃদু বিষণ্ণতা থাকলেও খুব সুন্দর সেই হাসি। সেদিনের সেই মূর্তি খসে পড়ার ঘটনার পর এত কাছাকাছি রাহিলের সঙ্গে আর সাক্ষাৎ হয়নি তার। মাঝে কয়েকবার অবশ্য রাহিল তাকে দূর থেকে দেখেছে। কখনও অন্য নারীদের সঙ্গে বিকর্নার কাছে তালিম নিতে, কখনও আবার দিনশেষে এক ঝলকের জন্য কোথাও নি:সঙ্গভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে। রাহিল মাঝে মাঝে দেখার চেষ্টা করে গোলক নিয়ে ক্রীড়ারত নারীদের ভিড়ে সে আছে কিনা? কিন্তু সেখানে সে থাকে না।
রাহিল কিছুক্ষণ আগে মন্দিরের ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে দেখেছে চিত্রবান আর অনুদেব মন্দির-চত্বর ছেড়ে চলে গেলেন। ভাস্কর-মজুরদের দলও প্রাঙ্গণ পরিত্যাগ করেছে।
চত্বরে এখন শুধু আছে গোলক নিয়ে ক্রীড়ারত সুরসুন্দরীরা। তারা সচরাচর এদিকে আসে না। তাদের চলাচল সাধারণত সীমাবদ্ধ থাকে তাদের বাসস্থানের সম্মুখে মন্দির-প্রাঙ্গণের সেই ক্ষুদ্র অংশে যেখানে গোলক নিয়ে খেলা করে তারা। মিত্রাবৃন্দার সঙ্গে বাক্যালাপ করলে এই মুহূর্তে তা কারো চোখে পড়ার সম্ভাবনা নেই। যদিও এ ব্যাপারে রাহিলের ওপর কোনও বিধিনিষেধ আরোপিত নেই। তবু…
মিত্রাবৃন্দার কাছ থেকে একটা বিষয় জানার আছে রাহিলের। একটু ইতস্তত করে রাহিল কয়েক-পা এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল তার সামনে। তারপর তার সঙ্গে বাক্যালাপ শুরুর উদ্দেশ্যে বলল, ‘গোলক নিয়ে ক্রীড়ারত নারীদের সঙ্গে তুমি থাকো না কেন? তুমি কি ক্রাড়ায় আগ্রহী নও?’
মিত্রাবৃন্দা হেসে জবাব দিল, ‘আমার একা থাকতেই ভালো লাগে।’
রাহিল তার জবাব শুনে মৃদু হাসল। তারপর বলল, ‘অন্য নারীরা তো গোলক নিয়ে একসঙ্গে আমোদ করে। তোমার একা থাকতে ভালো লাগে কেন?’
মিত্রাবৃন্দা সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল, ‘ওরা ওদের ভবিতব্যকে মেনে নিয়েছে।’
‘আর তুমি? তুমি মানোনি?’ জানতে চাইল রাহিল।
এ-প্রশ্নর জবাব দিল না মিত্রাবৃন্দা। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে পাল্টা প্রশ্ন করল, ‘তুমি এখানে ”মাহবা” নামের কোনও ভাস্করকে চেনো?’
রাহিল প্রশ্নটা শুনে কিছুটা অবাক হয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, চিনি। কিন্তু, কেন?’
মিত্রাবৃন্দা বলল, ‘বিকর্না বলেছে আগামীকাল থেকে ওই ভাস্কর আমার মূর্তি রচনা করবেন সূর্যোদয় থেকে।’ মৃদু শঙ্কার রেশ ফুটে উঠল তার কণ্ঠে। হাসিটা মুছে গেল। বিষণ্ণতা ফুটে উঠল তার চোখের তারায়।
রাহিল একটু চুপ করে থেকে জবাব দিল, ‘ভাস্কর মাহবা বৃদ্ধ মানুষ। বেশ ভালো মানুষ। তার দিক থেকে তোমার কোনও ক্ষতি হবে বলে মনে হয় না।’
রাহিলের কথা শুনে মিত্রাবৃন্দা কিছুটা আশ্বস্ত হল বলে মনে হল রাহিলের। মিত্রাবৃন্দার ঠোঁটের কোণে মুছে যাওয়া হাসিটা আবার ধীরে ধীরে ফুটে উঠল। সে রাহিলের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করল, ‘সৈনিক, এ মন্দিরে কতকাল আছ?’
রাহিল জবাব দিল, ‘তোমার মতোই মাসাধিক কাল। যেদিন তোমাদের এখানে আনা হল সেদিন প্রত্যুষেই আমিও এখানে উপস্থিত হয়েছি সীমান্তপ্রদেশ থেকে। মহাসৈনাধ্যক্ষ উগ্রায়ূধ নির্দেশ পাঠালেন এখানে আসার। চলে এলাম। ভ্রাম্যমান জীবন সৈনিকদের। যেখানে যাবার নির্দেশ পাই সেখানে যাই। তবে এতদিন সীমান্তের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে ছুটেই কেটেছে। মন্দিরের কাজে এই প্রথম নিযুক্ত হলাম।’
‘তোমার ঘর? পরিবার?’ জানতে চাইল মিত্রাবৃন্দা।
তার এই প্রশ্নটা এখানে কেউ তাকে করেনি। মৃদু হেসে রাহিল বলল, ‘ওর কোনওটাই আমার নেই। বহুদিন আগে একবার কলচুরিরা সীমান্ত অতিক্রম করে দখল করে নিয়েছিল এ রাজ্যের কিয়দংশ। এই খর্জ্জুরবাহক বা কাজুরাহোর সিংহাসনে তখন মহারাজ বিদ্যাধরের পিতা মহারাজ গণ্ডবর্মন। তিনি তাদের বিতাড়ন করলেন ঠিকই, কিন্তু পশ্চাদপসরণের সময় কলচুরিরা তাদের অধিগৃহীত গ্রামগুলোকে জ্বালিয়ে দিল, সমর্থ পুরুষদের হত্যা করল, নারীরা ধর্ষিতা হল, ছোট ছোট শিশুদের ধরে নিয়ে যাওয়া হল দাস-হাটে বিক্রি করার জন্য। অবশ্য এসব ব্যাপার বোঝার মতো বয়স আমার তখন ছিল না। কথাগুলো আমি পরে আমার প্রতিপালকের মুখে শুনেছি। সে ছিল একজন সৈনিক। গণ্ডরাজের সৈনিকদের সঙ্গে কলচুরিদের পশ্চাদ্ধাবন করতে করতে এক বনাঞ্চলে সওয়ারীবিহীন এক ঘোটকের পিঠে বাঁধা চামড়ার থলি থেকে সে উদ্ধার করে আমাকে। তখন আমার বছর দুই বয়স হবে। পরিজনহীন সেই সৈনিক প্রতিপালন করে আমাকে। ‘আরোহী’ বা ‘রাহী’হীন অশ্বে আমাকে পাওয়া যায় বলে আমার নাম হয় রাহিল। চোদ্দো বছর বয়সে সে আমাকে সেনাদলে ভর্তি করে দেয়। এর কিছুদিনের মধ্যে সেই বৃদ্ধ সৈনিকেরও মৃত্যু হয়। আমি ঘুরে বেড়াতে থাকি যুদ্ধক্ষেত্রে অথবা সীমান্ত প্রহরার কাজে। এই সেনাদলেও দেখতে দেখতে এক যুগ কেটে গেল। আমার কোনও ঘর নেই। যখন যেখানে পাঠানো হয় সেখানে যাই…’
নিজের কথা শেষ করে রাহিল তাকে প্রশ্ন করল, ‘তোমার ঘর কোথায়? তুমি কীভাবে উপস্থিত হলে এখানে?’
বিন্ধ্যপর্বতের মাথায় সূর্য ডুবে গেছে। ধীরে ধীরে অন্ধকার নামতে শুরু করেছে মন্দির-প্রাঙ্গণে। স্তম্ভ, মূর্তির নীচে জমাট বাঁধতে শুরু করেছে অন্ধকার। মিত্রাবৃন্দার মুখের উজ্জ্বলতাও ম্রিয়মান হয়ে আসছে। গোলক নিয়ে ক্রীড়ারত নারীদের অস্পষ্ট কোলাহলের শব্দও থেমে গেছে। রাহিলের প্রশ্ন শুনে মন্দিরগাত্রের কোণের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলল, ‘তুমি সোমনাথ নগরীর নাম শুনেছ?’
রাহিল জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, শুনেছি। সে তো অনেক দূরদেশ, শুনেছি সেখানে বিশাল এক মন্দির আছে।’
রাহিলের কথা শুনে মুহূর্তর জন্য যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠল মিত্রাবৃন্দার মুখ। সে বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, স্বর্ণখচিত বিশাল মন্দির। সোমনাথ মন্দির। সে মন্দিরের নামেই নগরীরও নামকরণ। এ মন্দিরের চেয়েও অনেক অনেক বিশাল মন্দির!’
রাহিলের মনে হল, একথা বলার সময় মিত্রাবৃন্দার চোখে যেন ভেসে উঠল রাহিলের অদেখা সেই মন্দিরের প্রতিচ্ছবি। কিন্তু কথাগুলো বলেই আবার থেমে গেল মিত্রাবৃন্দা। নিষ্প্রভ হয়ে এল তার চোখের দ্যুতি।
রাহিল বলল, ‘কী বলছিলে সেই মন্দিরের ব্যাপারে?’
মিত্রাবৃন্দা বলল, ‘হ্যাঁ, ওই মন্দিরেই থাকতাম। আরও অনেক মানুষ-লোকজন সেখানে থাকত। প্রতিদিন হাজারে হাজারে মানুষের সমাগম হত সেখানে। আমার বাবা ছিলেন মন্দিরের সেবায়েত পূজারি ব্রাহ্মণ। এক সহস্র ব্রাহ্মণ নিয়োজিত ছিল সেই মন্দিরের কাজে। আমরা নারীরা সেখানে ফুল সঞ্চয় করতাম, মালা গাঁথতাম, নৃত্যগীত করতাম, তবে আমরা দেবদাসী ছিলাম না। আমরা স্বাধীন ছিলাম সেই রত্নখচিত মন্দিরে। সেখানে গর্ভগৃহে একটা বিশাল সোনার শিকল ছিল। তার ওজন পাঁচ মন। সেই শিকল ঘণ্টার কাজ করত। সেই শিকল বাজিয়ে সূর্যোদয়ের আগে ব্রাহ্মণদের ঘুম ভাঙাতেন প্রধান পুরোহিত। আর সে শেকল বাজানো হত সন্ধ্যারতির সময়। একদিন মাঝরাতে বেজে উঠল সেই স্বর্ণশিকল। ব্রাহ্মণরা ঘুম ভেঙে উঠে দেখলেন দিগন্ত দিনের আলোর মতো রাঙা হয়ে গেছে মশালের আলোতে। পরদিন নগরীতে হানা দিল যবন মামুদের তুর্কী বাহিনী। যুদ্ধ শুরু হল। আমরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়লাম মন্দিরে। পঞ্চাশ হাজার মানুষ নিহত হল তুর্কীদের হাতে। তুর্কীরা হাজির হল মন্দির-চত্বরে। দ্বার বন্ধ করে পূজারি ব্রাহ্মণরাও মন্দির রক্ষার চেষ্টা করল। কিন্তু তাদের কাছে কোনও অস্ত্র ছিল না। বিল্বফল, কোষাকুষি, প্রদীপ দণ্ডকে অস্ত্র বানিয়ে তুর্কী তরবারির সঙ্গে কতক্ষণ লড়া যায়?
‘তুর্কীরা প্রবেশ করল মন্দিরে। ব্রাহ্মণদের রক্তে লাল হয়ে গেল মন্দির প্রাঙ্গণ। বিগ্রহ ভেঙে মন্দির লুঠ হল, কত শিশুকে যে বর্শা ফলকে গাঁথা হল, কত নারী যে ধর্ষিতা হল তার হিসাব নেই। ভূগর্ভস্থ এক কক্ষে আমরা কয়েকজন নারী লুকিয়ে ছিলাম, তুর্কীরা খুঁজে বার করল আমাদের। ক’জনের সেখানেই প্রাণ গেল দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়ে। বাকিদের অন্য সম্পদের সঙ্গে বেঁধে নিয়ে চলল তুর্কীরা। নারীও তো সম্পদ তাই না?’ এই বলে থামল মিত্রাবৃন্দা।
অন্ধকার গাঢ় হচ্ছে মন্দির-চত্বরে। সব কিছু অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে চারপাশে। অস্পষ্ট মিত্রাবৃন্দার মুখও। রাহিল প্রশ্ন করল, ‘তারপর?’
মিত্রাবৃন্দা জবাব দিল, ‘যে দলটা আমাদের ধরে নিয়ে যাচ্ছিল সেটা তুর্কীদের পশ্চাদবর্তী এক ক্ষুদ্র বাহিনী। এক রাতে জঙ্গলে তুর্কীদের তাঁবু থেকে পালালাম আমরা কয়েকজন নারী। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। কিছুদিনের মধ্যেই আমরা ধরা পড়ে গেলাম এক দস্যুদলের হাতে। এই নারীদেহ ছাড়া আমাদের কাছে লুঠ করার মতো তেমন কিছু ছিল না। আমরা ব্রাহ্মণকন্যা শুনে নীচু জাতের অরণ্যদস্যুরা আমাদের স্পর্শ করল না ঠিকই কিন্তু আমাদের তারা বেঁচে দিল এক দাসব্যবসায়ীর কাছে। তারপর এ-দাসবাজার থেকে ও-দাসবাজারে মালিকানা বদল হল আমার।
‘সবশেষে আমি এসে উপস্থিত হলাম উজ্জয়িনীর দাসবাজারে। ততদিনে আমি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি আমার সোমনাথ মন্দিরের সঙ্গিনীদের থেকে। অন্যত্র বিক্রি হয়ে গেছে তারা। আমিও হয়তো তাদের সঙ্গে বিক্রি হয়ে যেতাম, হইনি কারণ আমি অক্ষত যোনি বলে। বিত্তশালী লোকেরা অক্ষত যোনির দাসী বা অনেক মন্দিরের পুরোহিতরা অক্ষত যোনির দেবদাসী খোঁজে তাকে দেবতার কাছে উৎসর্গ করে নিজেরা ভোগ করার জন্য। অক্ষত যোনির সুন্দরীর দাম তাই দাসের হাটে সর্বাধিক। ক্রেতারা অনেকেই আমাকেই প্রথমে পছন্দ করত কিন্তু তাদের আমাকে ক্রয়ক্ষমতা থাকত না। উজ্জয়িনী থেকে যে দাসব্যবসায়ী আমাকে কিনল তার দলের সঙ্গে বৎসরকাল ঘুরে বেড়ালাম আমি।
‘অবশেষে ভালো দাম পেয়ে অন্যদের সঙ্গে সে আমাকে এখানে এনে অনুদেবের কাছে বেচে দিল। সে জানে আমি অক্ষত যোনি। দাস-ব্যবসায়ী তাকে বলেছে সে কথা। আমার মূর্তি তাই নাকি অন্য সুরাকন্যাদের সঙ্গে স্থান পাবে না মন্দিরগাত্রে, স্থান পাবে মন্দিরের গর্ভগৃহর প্রবেশমুখে। হয়তো সেজন্য আমাকে অন্য সুরসুন্দরীদের সঙ্গে না রেখে বেশ তফাতে একলা এক কক্ষে স্থান দেওয়া হয়েছে।’—কথা শেষ করল মিত্রাবৃন্দা।
অন্ধকারে ঢেকে গেছে মিত্রাবৃন্দার মুখ। রাহিল তার মুখমণ্ডলের অভিব্যক্তি বুঝতে না পারলেও শেষ কথাগুলো বলার সময় স্পষ্ট বিষণ্ণতা ধরা পড়ছিল তার কণ্ঠে।
রাহিল এবার তাকে তার আসল প্রশ্নটা জিগ্যেস করল—’তুমি তো আমাকে প্রথমে হত্যা করতে গেছিলে, তবে সেদিন আমার প্রাণরক্ষা করলে কেন? ওই মূর্তি সেদিন আমার ওপর খসে পড়লে মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী ছিল।’
মিত্রাবৃন্দা তার এ প্রশ্নের কোনও জবাব দিল না। কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে সে বলল, ‘অন্ধকার নেমে গেছে। কক্ষে ফিরতে হবে আমাকে। নচেৎ বিকর্না অভিযোগ জানাতে পারে। আবার হয়তো আমাকে পাঠানো হবে মন্দিরের ভূগর্ভস্থ সেই কক্ষে, এমনকী তার চেয়েও ভয়ঙ্কর কিছু ঘটতে পারে। কাল এখানে এলে আবার দেখা হবে।’ এই বলে মিত্রাবৃন্দা ধীর পায়ে হাঁটতে শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই হারিয়ে গেল তার নূপুরের নিক্কনধ্বনি। অন্ধকারে হারিয়ে গেল মিত্রাবৃন্দা।
অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রাহিল ভাবতে লাগল মিত্রাবৃন্দার কথা। কোথায় সেই সুদূরের সোমনাথ নগরী, আর কোথায় এই খর্জুরবাহক-কাজুরাহো! নারী বলেই হয়তো তার এই পরিণতি। মন্দিরের নির্মাণকার্য শেষ হলে এরপর কোথায় যাবে মিত্রাবৃন্দা? অক্ষত যোনির এই নারী হয়তো বহুভোগ্যা নারী হবে। তারপর একদিন যৌবন চলে যাবে তার। সে হয়তো তখন স্থান পাবে কান্ডারীয় মন্দিরের নীচের চত্বরে ভিখারিনীদের দলে। মন্দিরের গর্ভগৃহর সামনে শুধু সূর্যালোকে বা চাঁদের আলোতে জেগে থাকবে তার অক্ষতযোনিমূর্তি। সে মূর্তি দর্শনের অধিকারিনী হবে না ভিখারিনী মিত্রাবৃন্দা। তার কথা ভাবতে ভাবতে রাহিলের মন তার প্রতি কেমন যেন আদ্র হয়ে উঠল। আচ্ছা, রাহিল যদি পুরুষ না হয়ে নারী হত তবে বড় হয়ে ওঠার পর তার পরিণতিও কি একই হত? অন্ধকার মন্দির-প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে এসব কথা ভাবতে লাগল রাহিল। অন্ধকার কেটে গিয়ে ধীরে ধীরে চাঁদ উঠতে শুরু করল একসময়। একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল রাহিল।
এসবই নানা কথা ভাবছিল সে। হঠাৎ নিক্কনধ্বনিতে চিন্তা-জাল ছিন্ন হল তার। মিত্রাবৃন্দা কি আবার তবে ফিরে এল! সে চলে যাবার পর সেই স্তম্ভর গায়েই ভর দিয়ে দাঁড়িয়েছিল রাহিল। নূপুরধ্বনি শুনে সে পিছনে ফিরে দেখতে পেল তার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে বিকর্না। তার ঠোঁটে সেই অদ্ভুত অদ্ভুত হাসি। সে রাহিলকে প্রশ্ন করল, ‘তুমি এখানে দাঁড়িয়ে কী করছ? কোনও নারীর কথা ভাবছ?’
রাহিল মৃদু চমকে উঠে জবাব দিল, ‘সারা দিন মন্দির চত্বর প্রদক্ষিণ করে এখানে বিশ্রাম গ্রহণ করছি।’
বিকর্না তার পুরুষালি কণ্ঠস্বর যথাসম্ভব নরম করে বলল, ‘তা বটে। আমাকেও ওই নারীদের তালিম দেবার জন্য পরিশ্রম করতে হয় সারাদিন। সূর্য ডোবার পর অবসর মেলে।’
রাহিল মৃদু হাসল তার কথা শুনে। তার মুখে হাসি ফুটে উঠেছে দেখে বিকর্নার হাসিটাও যেন চওড়া হল। সে এরপর বলল, ‘তুমি তো সারাদিন মন্দির প্রদক্ষিণ করে বেড়াও। যেখানে মিথুনমূর্তি রচিত হচ্ছে সেখানে গিয়ে দাঁড়াও। তোমার ওই মিথুনমূর্তি দেখতে ভালো লাগে তাই না? তুমি যেমন স্তম্ভ ধরে দাঁড়িয়ে আছ তেমনই স্তম্ভ ধরে দাঁড়িয়ে থাকা অবলম্বতিক সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নারী-পুরুষের সঙ্গমমূর্তি খুব সুন্দর তাই না?’
রাহিল এবার বেশ অস্বস্তি বোধ করল বিকর্নার কথা শুনে। সে জবাব দিল, ‘সুরসুন্দরীদের প্রতি নজরদারীর জন্য আমাদের এখানে আসা। তাই যেখানে সুরসুন্দরীরা থাকে সেখানে দৃষ্টি রাখা আমার কর্তব্য। মিথুনমূর্তি দেখার জন্য আমি সেখানে উপস্থিত হই না।’ এ কথা বলে সে বিকর্নার সঙ্গে আর কথা না-বাড়াবার জন্য অন্যদিকে এগোল।
হাঁটতে হাঁটতে একসময় সে পৌঁছে গেল মন্দিরের পিছনের অংশে। প্রথমে একবার সে তাকাল চাঁদের আলোতে মন্দিরের নীচে কিছুটা দূরে প্রাচীরঘেরা মজুরদের কুঁড়েগুলোর দিকে। কোনও আলো জ্বলছে না সেখানে, কোনও শব্দও ভেসে আসছে না সেখান থেকে। দিনের শেষে অক্লান্ত পরিশ্রমের শেষে ওই সার সার কুঁড়েগুলোতে ঘুমাচ্ছে মজুরের দল। হয়তো তারা স্বপ্ন দেখছে ফেলে আসা প্রেয়সীর, সন্তানের, পরিজনের। যাদের কাছে হয়তো আর কোনওদিন ফেরা হবে না অনেকেরই। যে মন্দিরে তারা প্রাণ সঞ্চার করছে সে মন্দিরই হয়তো একদিন শুষে নেবে তাদের প্রাণবায়ু। এ মন্দিরের কোথাও কোনও প্রস্তরগাত্রে খোদিত থাকবে না তাদের নাম। শুধু তাদের অতৃপ্ত প্রেতাত্মারা সবার অলক্ষে দীর্ঘশ্বাস বয়ে বেড়াবে অন্ধকার নামার পর এই মন্দির প্রাঙ্গণে। ফেলে আসা যে প্রিয়জনের কাছে তারা আর কোনওদিন পৌঁছোতে পারবে না তাদের কাছে এই নিঝুম চন্দ্রালোকিত রাতে ক্ষণিকের স্বপ্নে হয়তো পৌঁছোবার চেষ্টা করছে ঘুমন্ত মজুর-ভাস্করদের দল।
মজুরদের ঘুমন্ত কুঁড়েগুলোর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর রাহিল মুখ তুলে তাকাল মন্দিরের শীর্ষগাত্রের দিকে। চন্দ্রালোকে সেই নির্জন তাকে একাকী দাঁড়িয়ে থাকা সেই নারীমূর্তিও দৃষ্টিগোচর হল রাহিলের। সেদিকে তাকিয়ে কয়েক মুহূর্তর মধ্যেই রাহিলের মনে হল সেই প্রস্তর মূর্তি যেন কাঁপছে!
হ্যাঁ, কাঁপছে সেই মূর্তি। কিছুক্ষণের মধ্যেই রাহিল বুঝতে পারল ব্যাপারটা। ওই মূর্তির উলটোদিকের তাকেই কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। তার কম্পমান ছায়া এসে পড়েছে প্রস্তরমূর্তির ওপর। তাই মনে হচ্ছে মূর্তিটা কাঁপছে।
কে ও! সেই কাপালিকের প্রেতাত্মা, নাকি অন্য কেউ? হ্যাঁ, রাহিল দেখতে পাচ্ছে চাঁদের আলোতে সেই তাকে অস্পষ্ট এক মূর্তিকে! রাহিল নিশ্চিত সেখানে কেউ দাঁড়িয়ে আছে! রাহিল মাটি থেকে একটা ছোট পাথরখণ্ড তুলে নিল। সেই তাক লক্ষ্য করে সে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘কে ওখানে?’
ঠিক সেই মুহূর্তে একখণ্ড মেঘ এসে ঢেকে দিল চাঁদটাকে। অন্ধকার নেমে এল মন্দিরের মাথায়, চারদিকে। রাহিল এবার হাঁক দিল, ‘ওখানে কে?’ তারপর অন্ধকারে সেই তাক অনুমান করে সেই পাথরখণ্ড সজোরে ছুড়ে মারল ওপরদিকে। তাকের গায়ে পাথরখণ্ডর আঘাত আর রাহিলের কণ্ঠস্বর অনুরণিত হল অন্ধকার মন্দির-প্রাঙ্গণে। আর এরপরই মেঘ কেটে গেল। উন্মুক্ত চাঁদের আলো আগের থেকে একটু বেশি যেন ছড়িয়ে পড়ল মন্দিরগাত্রে। রাহিল দেখল শূন্য তাক। কেউ কোথাও নেই। অথচ রাহিল নিশ্চিত চন্দ্রালোকে দাঁড়িয়ে থাকা ওই বিষণ্ণ নারীমূর্তির উলটোদিকের তাকেই দাঁড়িয়ে ছিল কেউ একজন।
রাহিলের চিৎকার শুনেই মনে হয় মশাল হাতে নীচ থেকে ওপরে উঠে এল মন্দির-রক্ষীবাহিনীর একজন। রাহিলকে সে প্রশ্ন করল, ‘কী হয়েছে?’
বিব্রত বোধ করল রাহিল। আসল কথাটা সে এড়িয়ে গিয়ে মন্দির- প্রাঙ্গণের একটা অন্ধকার অংশতে আঙুল নির্দেশ করে বলল, ‘ওখানে একটা ছায়া দেখলাম মনে হল তাই হাঁক দিলাম। তেমন কিছু ব্যাপার নয়।’
তার কথা শুনে আশ্বস্ত হয়ে আবার নীচে ফিরে গেল মন্দির-রক্ষী। সে ফিরে যাবার পর মন্দিরের সেই শূন্য তাকটা আরও একবার ভালো করে দেখে নিয়ে রাহিল ফিরে চলল বিশ্রাম নেবার জন্য।