Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    তিস্তাপারের বৃত্তান্ত – দেবেশ রায়

    August 29, 2025

    অদ্বৈতপ্রকাশ – ঈশান নাগর

    August 29, 2025

    পৃথিবীর ইতিহাস – দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

    August 29, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • 🔖
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    Subscribe
    সাইন ইন
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    খাজুরাহ সুন্দরী

    ঐতিহাসিক হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত এক পাতা গল্প179 Mins Read0

    ৬

    প্রতিদিনের মতো ভোরের প্রথম আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই কুক্কুটের ডাকে ঘুম ভাঙল রাহিলের। ঘুম ভাঙার পরই রাহিলের মনে পড়ল মিত্রাবৃন্দার কথা। শেষ রাতে অদ্ভুত এক স্বপ্ন দেখেছে সে। স্বর্ণখচিত বিশাল এক মন্দির-চত্বরে মিত্রাবৃন্দার সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছে রাহিল। অপরিচিত সেই মন্দির-চত্বরে হাজার হাজার মানুষের সমাগম। মিত্রাবৃন্দা রাহিলকে ঘুরিয়ে দেখাচ্ছে সেই মন্দির। ফুলমালাশোভিত সে মন্দিরে দিনের বেলাতেও সার সার প্রদীপ জ্বলছে। ঘৃত-ধূপ-ফুলমালার গন্ধে সুরভিত মন্দির-চত্বর ঘণ্টাধ্বনিতে মুখরিত। লোকজনের ভিড়ে মন্দিরের এ-প্রাঙ্গণ থেকে ও-প্রাঙ্গণ, এ-কক্ষ থেকে ও-কক্ষ ঘুরে বেড়াচ্ছে রাহিল। কত অদ্ভুত আশ্চর্য সুন্দর মূর্তি স্থাপিত সেই মন্দিরে। স্বর্ণালঙ্কার, হীরকখচিত সেইসব মূর্তি।

    চন্দনকাঠের মণ্ডপের নীচে দাঁড়িয়ে থাকা সেসব দেবদেবীর মূর্তি থেকে আলোক বিচ্ছুরিত হচ্ছে। মিত্রাবৃন্দা এক সময় তাকে বলল, ‘চলো, তোমাকে গর্ভগৃহ দেখাব।’ রাহিল তার সঙ্গে এসে দাঁড়াল গর্ভগৃহর সামনে। তার ভিতরে জমাট বাঁধা অন্ধকার। ভিতর থেকে ভেসে আসছে গম্ভীর কণ্ঠে সংস্কৃত মন্ত্রোচ্চারণের শব্দ আর চন্দনের গন্ধ। আর সেই গর্ভগৃহ থেকে অজগর সাপের মতো বিরাট এক সোনার শিকল বাইরে বেরিয়ে এসেছে। অন্ধকার গর্ভগৃহর দিকে তাকিয়ে মিত্রাবৃন্দা বলল, ‘ভয় নেই, ভিতরে এসো।’

    রাহিল তার সঙ্গে চন্দনকাঠের চৌকাঠ পার হয়ে ভিতরে প্রবেশ করতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময় ঝনঝন শব্দে পায়ের সামনে বেজে উঠল সেই সোনার শিকল। মন্ত্রোচ্চারণ থামিয়ে গর্ভগৃহ ছেড়ে বেরিয়ে এল মুণ্ডিত মস্তক শিখাধারী পুরোহিতের দল। তাদের চোখেমুখে উত্তেজনার ছাপ। রাহিলদের প্রায় ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে তারা ছুটল বাইরের মন্দির প্রাঙ্গণে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই আতঙ্কের কোলাহল ভেসে এল প্রাঙ্গণ থেকে ‘যবন এসেছে! যবন এসেছে!’

    সেই চিৎকার কানে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তরবারি কোষমুক্ত করল রাহিল। আতঙ্কের ভাব ফুটে উঠেছে মিত্রাবৃন্দার মুখে। রাহিল তাকে আশ্বস্ত করে বলল, ‘আমি থাকতে তোমার কোনও ক্ষতি হবে না। তুমি গর্ভগৃহে প্রবেশ করো, আত্মগোপন করো। আমি না-ফেরা পর্যন্ত তুমি গর্ভগৃহর অন্ধকারেই থাকো।’

    তার কথা শুনে মিত্রাবৃন্দা অবগুণ্ঠনে মুখ ঢেকে সঙ্গে সঙ্গে প্রবেশ করল গর্ভগৃহে। আর রাহিল তলোয়ার হাতে ছুটল মন্দির-প্রাঙ্গণে। শয়ে- শয়ে তুর্কী সেনা উঠে আসছে মন্দিরে। আতঙ্কিত নারীদের আর্ত চিৎকার, শিশুদের ক্রন্দনে মুখরিত মন্দির-চত্বর। মন্দির রক্ষীরা, শিখাধারী পুরোহিতরা প্রতিহত করার চেষ্টা করছে তুর্কীদের।

    রাহিল ঝাঁপিয়ে পড়ল সেই যুদ্ধে। ভয়ংকর সেই যুদ্ধ! সারাদিন ধরে চলল সেই যুদ্ধ। রাহিলের তরবারির আঘাতে কতজন তুর্কীর যে পাগড়িসহ মুণ্ড উড়ে গেল তার কোনও হিসাব নেই। অবশেষে সূর্য ডোবার কিছু আগে যুদ্ধ থামল। পশ্চাদপসরণ করল পরাজিত তুর্কীরা। রাহিল দেখল সে একা জীবিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে মন্দির-প্রাঙ্গণে। তার চারপাশে শুধু শবের পাহাড়! পাগড়িধারী তুর্কীর শব, শিখাধারী ব্রাহ্মণের শব, নারীর শব, শিশুর শব।

    রাহিল এরপর ছুটল গর্ভগৃহর দিকে মিত্রাবৃন্দার খোঁজে। অন্ধকার গর্ভগৃহ, শুধু কোথা থেকে যেন ক্ষীণ আলো আসছে ভিতরে। গর্ভগৃহর ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে অস্পষ্ট বিগ্রহ। বিশাল গর্ভগৃহর ভিতরে ভালো করে কিছু দেখা যাচ্ছে না। রাহিল সেই আধো অন্ধকারে চিৎকার করল, ‘মিত্রা তুমি কোথায়? আমি এসেছি। তুর্কীরা পরাজিত হয়েছে।’

    তার কথার প্রত্যুত্তর মিলল নূপুরধ্বনিতে। গর্ভগৃহর অন্ধকার কোণ থেকে বেরিয়ে রাহিলের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল অবগুণ্ঠনে ঢাকা এক নারীমূর্তি। হ্যাঁ, ওই তো মিত্রাবৃন্দা। রাহিলের সামনে এসে দাঁড়াল সে। দু-হাত প্রসারিত করল রাহিলকে আলিঙ্গন করার জন্য। রাহিলও তলোয়ার কোষবদ্ধ করে তার দিকে বাহু প্রসারিত করে বলল, ‘অবগুণ্ঠন উন্মোচন করো। আর শঙ্কার কোনও কারণ নেই।’

    মুহূর্তর জন্য থমকে দাঁড়াল সেই নারী। তারপর মুখমণ্ডলের আবরণ উন্মোচন করে এগিয়ে এল রাহিলকে আলিঙ্গন করার জন্য। রাহিলও তাকে আলিঙ্গন করতে যাচ্ছিল কিন্তু ঠিক সেই সময় কোথা থেকে যেন আলো এসে পড়ল অবগুণ্ঠন খসে পড়া মুখের ওপর। রাহিল দেখল যে মুখে সে চুম্বন করতে যাচ্ছিল তা মিত্রাবৃন্দার মুখ নয়, বিকর্নার মুখ। আর এরপরই অট্টহাস্য করে উঠল বিকর্না। সভয়ে পিছিয়ে এল রাহিল। বিকর্নার অট্টহাসি প্রতিধ্বনিত হতে লাগল অন্ধকার গর্ভগৃহে। তাকে আলিঙ্গন করার জন্য বিকর্না এগিয়ে আসতে লাগল। রাহিল সে জায়গা থেকে সরতে গেল, কিন্তু অন্ধকার স্বর্ণশিকলে জড়িয়ে গেল তার পা…

    ঠিক এ পর্যন্ত স্বপ্নটা দেখে কুক্কুটের ডাকে ঘুম ভেঙে গেল রাহিলের। প্রথমে তার মনে পড়ল মিত্রাবৃন্দার কথা, তারপর স্বপ্নর কথা। অদ্ভুত স্বপ্ন। রাহিলের মনে হল গত সন্ধ্যায় সে মিত্রাবৃন্দার কাছে, মন্দির-সোনার শিকল-তুর্কী হানার কথা শুনেছে। আর সে জন্যই সে এই স্বপ্ন দেখেছে। তবে স্বপ্নের শেষ অংশটা সত্যিই বড় অদ্ভুত!

    ঘুম ভাঙার কিছুক্ষণের মধ্যেই রোজকার মতো সঙ্গী সৈনিকদের নিয়ে অস্ত্রসজ্জিত হয়ে মন্দির-প্রাঙ্গণে এসে দাঁড়াল রাহিল। মজুর-ভাস্করদের দল উপস্থিত হতে শুরু করেছে মন্দিরে। দৈনন্দিন ব্যস্ততা শুরু হতে চলেছে। রাত-পাহারায় যে সৈনিকদল নিয়োজিত ছিল তাদের বিশ্রামে পাঠিয়ে নতুন সৈনিকদলকে কর্তব্য বুঝিয়ে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত মন্দির পরিভ্রমণ শুরু করল রাহিল।

    বেশ কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক ঘোরার পর রাহিলের হঠাৎ খেয়াল হল মিত্রাবৃন্দা তাকে বলেছিল আজ তার মূর্তি নির্মাণ শুরু করবেন ভাস্কর মাহবা। এ কথাটা মাথায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যাপারটা দেখার জন্য রাহিল এগোল যেখানে নগ্নমূর্তি নির্মিত হয় সে জায়গার দিকে। সেখানে অন্য একজন অন্য এক নারীমূর্তি রচনা করছেন। রাহিল এরপর এগোল মাহবার কাজের জায়গার দিকে। সেদিকে এগোতে এগোতে রাহিল ভাবল, মাহবার কাজের জায়গা তো উন্মুক্ত, তবে কি লোকচক্ষুর সামনেই মিত্রাবৃন্দার নগ্ন মূর্তি নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান স্থপতি ভাস্কর চিত্রবান বা প্রধান পুরোহিত অনুদেব? মিত্রাবৃন্দার প্রাথমিক অবাধ্যতার জন্য তারা কি এভাবে তাকে মানসিক শাস্তি দিচ্ছেন? এসব কথা ভাবতে ভাবতে রাহিল পৌঁছে গেল মাহবার কাজের জায়গাতে। হ্যাঁ, আর সেখানেই সে দেখতে পেল মিত্রাবৃন্দাকে।

    কোনও আচ্ছাদন নেই সে জায়গায়। ভাস্কর মাহবা, প্রধান পুরোহিত অনুদেব, বৃহন্নলা বিকর্না সবাই সেখানে উপস্থিত। রাহিল গিয়ে দাঁড়াল সে জায়গাতে। ভাস্কর মাহবার সামনে পূর্ণাবয়ব মানুষের আকৃতি রচনা করা যায় এমন এক প্রস্তরখণ্ড দণ্ডায়মান। তার ওপর কাঠকয়লা আঁচড়ে প্রথমে মিত্রাবৃন্দার চিত্র এঁকেছেন বৃদ্ধ ভাস্কর। তারপর ছেনির আঘাতে পাথরে রচনা করছেন মিত্রাবৃন্দার বহি:অবয়ব। তারা তিনজনই তাকিয়ে ছিল মিত্রাবৃন্দার দিকে। কিন্তু রাহিল সেখানে গিয়ে দাঁড়াতেই বিকর্না তাকাল রাহিলের দিকে। তার মুখে সেই অদ্ভুত হাসি।

    একবার তার প্রতি দৃষ্টিপাত করে রাহিল তাকাল মিত্রাবৃন্দার দিকে। কিন্তু তার বেশ দেখে রাহিল বেশ অবাক হয়ে গেল। ভূষণসজ্জিত মিত্রাবৃন্দা! মাথায় তার খোঁপা বাঁধা। সেখানে আলগোছে গোঁজা এক পদ্মকুঁড়ি। সিঁথিতে চূড়ামণি, কর্ণে কর্ণফুল, কণ্ঠে মুক্তাহার, চন্দ্রাহার, অঙ্গদ, বাহুতে কঙ্কন, কটিদেশে কটিকিঙ্কিনী, পায়ে নূপুর, পরনে সূক্ষ্ম রেশমবস্ত্রে সজ্জিতা মিত্রাবৃন্দা। তবে রাহিল তার দিকে ভালো করে তাকিয়ে বুঝতে পারল সেই সূক্ষ্ম কাঁচুলি-শাড়ি মিত্রাবৃন্দার দেহকে আড়াল করার জন্য পরানো হয়নি বরং তার দেহসৌষ্ঠবকে যেন আরও সুপ্রকট করার জন্য পরানো হয়েছে সেই স্বচ্ছ রেশমবস্ত্র। নগ্নিকা অপেক্ষা অনেক কামোদ্দীপক লাগছে এই নারীশরীরকে। কারণ মিত্রাবৃন্দার শরীর প্রায় দৃশ্যমান হলেও তার মধ্যে জেগে আছে অজানার হাতছানি। যা আকৃষ্ট করে পুরুষের কামভাবনাকে।

    অমলিন রেশমখণ্ড ভেদ করে পরিস্ফুট তার বিল্বস্তনের চন্দ্র অবয়ব। গভীর নাভি সহ উদর অনাচ্ছাদিত তার। ওই অমলিন কাপড়ের ঘাগড়ার আড়ালেই প্রকটিত তার কলস নিতম্ব, কামভাবে পূর্ণ ঊরু জঙ্ঘা। এত সুন্দর নারীদেহ কোনওদিন দেখেনি রাহিল। এমনকী পুরোহিত অনুদেবও মন্ত্রমুগ্ধর মতো চেয়ে আছেন সেই নারীদেহের দিকে। রাহিল নিশ্চিত হল সুরকন্যাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ সুন্দরী এই নারী।

    ছন্দময় ভঙ্গিমাতে পাথরের নিশ্চল মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে মিত্রাবৃন্দা। শুধু তার চোখের তারা মাঝে মাঝে কাঁপছে। পাথরের মূর্তির সঙ্গে শুধু এইটুকু পার্থক্য তার। ভালো করে লক্ষ না করলে তা খেয়াল করা যায় না। রাহিলও মন্ত্রমুগ্ধর মতো একবার তাকাতে লাগল মিত্রাবৃন্দার দিকে, আর একবার সেই প্রস্তরখণ্ডর দিকে। যেখানে বৃদ্ধ ভাস্কর মাহবার ছেনির আঁচড়ে ফুটে উঠছে মিত্রাবৃন্দার অবয়ব। দেখতে লাগল রাহিল। হঠাৎ মিত্রাবৃন্দার ঘূর্ণায়মান চোখের তারা রাহিলের দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে আরক্ত হয়ে উঠল মিত্রাবৃন্দার মুখমণ্ডল।

    পাথরের মতো অচঞ্চল মিত্রাবৃন্দা রাহিলকে দেখে যেন কেঁপে উঠল কোনও গোপন সঙ্কোচে-লজ্জায়। তার কবরীবন্ধন থেকে খসে পড়ল পদ্মকোরক। থেমে গেল ভাস্করের কাজ।

    মাহবা এবং অনুদেব দুজনেই মিত্রাবৃন্দার দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকালেন রাহিলের দিকে। পুরো ব্যাপারটাতে বেশ অস্বস্তিবোধ করল রাহিল। তারা দুজন কি ভাবছেন যে তাকে দেখেই কেঁপে উঠল মিত্রাবৃন্দা? তার দিকে তাকিয়েই আবার মিত্রাবৃন্দার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন ব্রাহ্মণ অনুদেব। ততক্ষণে অবশ্য মিত্রাবৃন্দার দৃষ্টি অন্যদিকে নিবদ্ধ হয়ে স্থির হয়ে গেছে। মাহবা এরপর ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন সেই রমণীর কাছে। তার পায়ের কাছে পড়ে থাকা সেই পদ্মকোরক সংগ্রহ করে তা যথাস্থানে স্থাপিত করে ফিরে এসে আবার নিজের কাজে মনোনিবেশ করলেন।

    রাহিল এরপর পা বাড়াল অন্যদিকে। কিন্তু কিছুটা এগোবার পরই পিছন থেকে ডাক শুনে সে তাকিয়ে দেখল অনুদেব তার পিছনে আসছেন। অনুদেব তার মুখোমুখি হয়ে প্রথমে বললেন, ‘পরিস্থিতি কেমন বুঝছেন?’

    ‘কী ব্যাপারে?’ জানতে চাইল রাহিল।

    পুরোহিত জবাব দিলেন, ‘এইসব নারীদের আচরণের ব্যাপারে? মজুর-ভাস্করদের ব্যাপারে?’

    রাহিল জবাব দিল, ‘সবই স্বাভাবিক বলেই তো মনে হয়। পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে ওরা। কেউ পালাবার প্রচেষ্টা করছে বলে মনে হয় না। শেষজনও তো বশ্যতা স্বীকার করল। আর ভাস্কর-মজুরদের আচরণেও কোনও অস্বাভাবিকতা লক্ষ করিনি।’

    রাহিলের শেষ কথাটা শুনে একটা অস্পষ্ট হাসি ফুটে উঠল অনুদেবের ঠোঁটে। তিনি বললেন, ‘এইসব নারীদের মূর্তি নির্মাণের কাজ আর এক পক্ষকালের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। তারপর আবার নতুন দল আসবে। খেয়াল রাখবেন তার মধ্যে যেন কোনও দুর্ঘটনা না ঘটে। বর্ষা নামার আগে দ্রুতগতিতে কাজ শেষ করার জন্য সূর্য ডোবার পরও কোনও কোনও মজুর বা ভাস্কর মন্দিরে থাকবে। তাদের ওপর বিশেষ নজর রাখবেন। আপনি দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করলে মহাসৈনাধ্যক্ষ উগ্রায়ুধের কাছে পদোন্নতির সুপারিশ করব আমি।’

    রাহিল জানতে চাইল, ‘মূর্তি নির্মাণের পর এসব নারীদের নিয়ে কী করা হবে?’

    পুরোহিত জবাব দিলেন, ‘নতুন নারীদের যে দল আসবে তাদের ক্রয় করার জন্য অর্থ সংগ্রহের জন্য কিছুদিনের মধ্যেই মহারাজ বিদ্যাধরের সাথে সাক্ষাৎ করব আমি। তাঁর সঙ্গে আলোচনা করে এদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

    অনুদেবের কথা শেষ হয়ে গেছে ভেবে তাঁকে অভিবাদন জানিয়ে এগোতে যাচ্ছিল রাহিল। কিন্তু অনুদেব বললেন, ‘দাঁড়ান আর একটা ব্যাপার জানার আছে। কাল সূর্য ডোবার পর আপনি মন্দির-চত্বরে কি কিছু দেখেছিলেন?’

    রাহিল বুঝতে পারল তার চিৎকার শুনে মন্দির-রক্ষীবাহিনীর যে লোকটা নীচ থেকে ওপরে উঠে এসেছিল সে বা তাদের প্রধান প্রকটাক্ষ ব্যাপারটা সম্বন্ধে অবগত করেছে তাকে। রাহিল বুঝতে পারল অনুদেব সূর্য ডোবার পর মন্দির পরিত্যাগ করলেও তার অনুপস্থিতির সময়কার প্রতিটা বিষয় সম্বন্ধে অবগত থাকেন তিনি।

    রাহিল জবাব দিল, ‘তেমন কিছু নয়, শুধু একটা ছায়া দেখেছিলাম মন্দির-চত্বরে।’

    রাহিলের উত্তর শুনে অনুদেব কয়েক মুহূর্ত কী যেন ভাবলেন। তারপর বললেন, ‘মন্দির-চত্বরে রাতে সতর্ক নজর রাখবেন। বিশেষত মন্দির-চত্বরের পিছনের অংশে। কোনও সময় সন্দেহজনক কিছু দেখলেই পরদিন সঙ্গে সঙ্গে আমাকে জানাবেন।’ একথা বলে তিনি আবার এগোলেন মাহবার কাজের জায়গার দিকে।

    রাহিল ভাবতে ভাবতে হাঁটতে শুরু করল—এই যে অনুদেব বারবার সতর্ক করেন তা কি শুধু আগাম সতর্কতা হিসাবে? না কি এর পিছনে কাজ করে অনুদেবের মনের কোণে জমে থাকা কোনও শঙ্কা? সবার অগোচরে তাহলে মন্দির-চত্বরে এমন কিছু কি ঘটে চলেছে যা অনুদেবের মনে শঙ্কার উদ্রেক ঘটাচ্ছে? সেই প্রেতাত্মার মূর্তির ব্যাপারটা কী? রাহিলের স্থির ধারণা গত রাতে সে কাউকে সেখানে দেখেছিল। সে কে? ব্যাপারটা রাহিলেরও ভালো করে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।

    রাহিল ঘুরতে ঘুরতে গিয়ে উপস্থিত হল মন্দিরের পিছনের অংশে। দ্বিপ্রহরের সূর্যালোকে মন্দিরের শীর্ষগাত্রে একাকী দাঁড়িয়ে আছে সেই নারীমূর্তি। তার উলটোদিকের তাকটাও সূর্যালোকে স্পষ্ট। দিনের আলোতে কোথাও কোনও অস্বাভাবিকতা নেই, অথচ রাত হলেই ও জায়গা কেমন রহস্যময় বলে মনে হয়! মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে নীচের চত্বরে বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকার পর রাহিলের মনে হল ওপরে উঠে কাছ থেকে ভালো করে ও জায়গাটা দেখে আসা যেতে পারে। মন্দিরের ভিতর থেকে একটা সোপানশ্রেণি ওপরে উঠতে দেখেছে সে। ব্যাপারটা তার মাথায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই সে জায়গা ছেড়ে উঠে রাহিল কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রবেশ করল মন্দিরের ভিতর।

    তারপর এ-কক্ষ সে-কক্ষ অতিক্রম করে সেই সোপানশ্রেণি বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করল। সংকীর্ণ সোপান ধীরে ধীরে ওপরে উঠে গেছে। পাশে কোনও আগল নেই। একটু অসতর্ক হলেই মৃত্যু নিশ্চিত। সাবধানে একটার পর একটা ধাপ অতিক্রম করে একসময় বেশ ওপরে উঠে একজায়গায় থামতে হল রাহিলকে। আর ওপরে ওঠার পথ নেই তার সামনে একটা পাথুরে দেওয়াল, আর একপাশে দেওয়ালে একটা গবাক্ষের মতো জায়গা। সম্ভবত ওই গবাক্ষ দিয়ে মন্দিরগাত্রের বাইরের তাকে পৌঁছোনো যায়। গুড়ি মেরে সেই ফোঁকড় দিয়ে বাইরে বেরিয়ে রাহিল দেখল সত্যি সে মন্দিরের শীর্ষগাত্রে এক উন্মুক্ত তাকে পৌঁছে গেছে। তবে সেই মূর্তির কাছে সে পৌঁছোতে পারেনি। তার মাথার ওপর হাত-কুড়ি তফাতে দাঁড়িয়ে আছে সেই মূর্তি আর তার বিপরীত দিকের শূন্য তাকটা।

    মন্দিরের মাথার অংশটা নিরেট। বহি:গাত্রের খাঁজ বেয়ে একমাত্র আরও ওপরে ওঠা যায়। যা রাহিলের পক্ষে সম্ভব নয়। ভালো করে মূর্তিটা যথাসম্ভব দেখার পর রাহিল তাকাল সামনের দিকে। এত উঁচু থেকে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। দূরের পাহাড়-বনানী এ সব কিছুই যেন কাছে মনে হচ্ছে। নীচের চত্বরের অনেকটাও দেখা যাচ্ছে ওপর থেকে। নীচে যারা ঘোরাফেরা করছে তাদের অনেকটা পুতুলের মতো লাগছে। কেউ অবশ্য তাকাচ্ছে না রাহিল যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেদিকে। ওপর থেকে একবার চিত্রবান আর অনুদেবকেও দেখতে পেল রাহিল।

    মন্দিরের পশ্চাদভাগের চত্বর অতিক্রম করে তারা অন্যত্র চলে গেলেন। রাহিল বুঝতে পারল এ জায়গা নজরদারির জন্য আদর্শ। মন্দিরের পশ্চাদভাগ আর পশ্চিম অংশের চত্বরের প্রায় পুরোটাই দেখা যায় তাকের এ অংশ থেকে। দীর্ঘক্ষণ সে জায়গা থেকে রাহিল নীচের চত্বরে সবার কাজকর্ম লক্ষ করল। তারপর সূর্য যখন পশ্চিমে ঢলে পড়ল রাহিল তখন নীচে নেমে এল। রাহিলের মনে হল মিত্রাবৃন্দার কথা। সে বলেছিল আজও সে একই জায়গাতে সূর্য ডোবার আগে আসবে। রাহিল বুঝতে পারছে সে কেমন যেন একটা আকর্ষণ অনুভব করছে মিত্রাবৃন্দার প্রতি। তবে কারণটা তার সঠিক জানা নেই।

    এক জায়গায় দাঁড়িয়ে রাহিল বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল মন্দির-চত্বর ফাঁকা হবার জন্য। ধীরে ধীরে ফাঁকা হল চত্বর। সে দেখতে পেল ছত্রধরদের সঙ্গে নিয়ে মন্দির-প্রাঙ্গণ ত্যাগ করলেন চিত্রবান ও অনুদেবও। এ দৃশ্য দেখার পরই রাহিল এগোল নির্দিষ্ট জায়গার দিকে। দিনের শেষ আলোতে যথারীতি একই জায়গাতে গোলক নিয়ে মেতে আছে সুরসুন্দরীরা। কলহাস্য মুখরিত সে-স্থান অতিক্রম করে রাহিল একসময় উপস্থিত হল সেই নির্দিষ্ট জায়গাতে। হ্যাঁ, সেখানে সেই স্তম্ভর সামনেই দাঁড়িয়ে আছে মিত্রাবৃন্দা। তবে সে আগের দিনের মতো অন্যদিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে নয়, তাঁর দৃষ্টি রাহিল যে বাঁক অতিক্রম করে এল সেদিকেই নিবদ্ধ ছিল। রাহিলের মনে হল সে যেন তার আসার জন্যই প্রতীক্ষা করছিল।

    রাহিল তার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই হাসি ফুটে উঠল তার ঠোঁটে। বিষণ্ণ নয়, নির্মল এক হাসি। রাহিলও হাসল। সে এরপর প্রশ্ন করল, ‘তুমি কি আজ সকালে আমাকে দেখতে গেছিলে?’

    রাহিল একটু ইতস্তত করে বলল, ‘তেমন ব্যাপার নয়। আসলে আমি মন্দির-প্রাঙ্গণে সর্বত্র ঘুরে বেড়াই। মাঝে মাঝে এখানে-ওখানে দাঁড়িয়ে ভাস্করদের কাজ দেখি। তেমনই পৌঁছে গেছিলাম যেখানে মাহবা তোমার মূর্তি রচনা করছেন সেখানে। তোমার অভিজ্ঞতা কেমন?’

    মিত্রাবৃন্দা প্রথমে জবাব দিল, ‘বৃদ্ধ ভাস্কর লোক ভালো। অনুদেব আর বিকর্নার অনুপস্থিতিতে তিনি আমার পরিচয় জানলেন, দু:খ প্রকাশ করলেন আমার পরিণতির জন্য। সূর্য ডোবার পর মন্দির-প্রাঙ্গণে, অথবা মন্দিরের কোনও কক্ষে আমাকে একাকী না থাকতে তিনি পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন আমাকে সাতদিন দাঁড়াতে হবে তাঁর সামনে। বাকি কাজটা তিনি নিজেই করে নেবেন।’ এ কথা বলার পর একটু থেমে সে বলল, ‘আজ ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকার সময় তোমাকে দেখতে পেয়ে বেশ লজ্জাবোধ হচ্ছিল।’

    রাহিল মৃদু বিস্মিত হয়ে বলল, ‘এতজনের মধ্যে আমাকে দেখেই তোমার লজ্জাবোধ হল কেন?’

    মিত্রাবৃন্দা তার কথার জবাব দিল না। দিনশেষের মায়াবী আলোতে শুধু একরাশ হাসি ছড়িয়ে পড়ল তার মুখে। এরপর সে জানতে চাইল, ‘আচ্ছা, মূর্তি রচনা শেষ হয়ে গেলে কি মুক্তি দেওয়া হবে আমাদের? নাকি আবার দাসের হাটে বেঁচে দেওয়া হবে আমাদের?’

    রাহিল বলল, ‘আমি এ ব্যাপার সম্বন্ধে নির্দিষ্ট কিছু জানি না। তবে শুনেছি ব্যাপারটা নিয়ে সম্রাট বিদ্যাধর আর পুরোহিত সিদ্ধান্ত নেবেন। এরপর নতুন নারীদের দল আসবে মন্দিরে।’

    সূর্য ডুবে যাচ্ছে পাহাড়ের আড়ালে। রাহিলের কথা শুনে বেশ কিছুক্ষণ ভাবার পর মিত্রাবৃন্দা বলল, ‘আচ্ছা, ধরো যদি মূর্তি রচনার পর আমাকে বিক্রি করা হয় তখন তুমি আমাকে কিনে নিতে পারো না? আমি তো অক্ষত যোনি।’

    রাহিল চমকে উঠল মিত্রাবৃন্দার প্রস্তাব শুনে। সে কী জবাব দেবে বুঝতে না পেরে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। মিত্রাবৃন্দা প্রতীক্ষা করতে লাগল রাহিলের জবাবের।

    প্রসঙ্গটা ঘুরিয়ে দেবার জন্য রাহিল একসময় বলল, ‘কাল তুমি সোমনাথ মন্দিরের কথা বলছিলে। সে মন্দিরের গল্প বলো।’

    সোমনাথ মন্দিরের কথা শুনেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল মিত্রাবৃন্দার চোখ। সে বলল, ‘হ্যাঁ, বিশাল ছিল সেই সোমনাথ মন্দির। সবচেয়ে বড় কথা গর্ভগৃহে শূন্যে ভাসমান ছিল বিগ্রহ। কত সোনা-রুপো, হীরা-পান্না! দশ সহস্র গ্রাম ছিল সেই মন্দিরের সম্পত্তি। পাঁচশো তরুণী মন্দিরের প্রবেশদ্বারে নৃত্যগীত করত। অনেক দূরের গঙ্গানদী থেকে প্রত্যহ জল এনে সেই জলে মন্দির-চত্বর ধৌত করে ফুলমালা দিয়ে সাজানো হত সেই মন্দির। তীর্থযাত্রীদের দেখাশোনা ও পূজা-অর্চনা করার জন্য এক সহস্র ব্রাহ্মণ থাকত মন্দিরে। চন্দ্রগ্রহণের দিন এক লক্ষ পুণ্যার্থীর সমাবেশ হোত সেখানে। কত মানুষ…’

    অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। ওপাশের প্রাঙ্গণে থেমে গেছে সুরকন্যাদের শব্দ। কথা বলতে বলতে হঠাৎ থেমে গেল মিত্রাবৃন্দা। একটা অস্পষ্ট শব্দ কানে যেতেই রাহিল পিছনে ফিরে দেখল বিকর্না সেখানে এসে দাঁড়িয়েছে। সম্ভবত মিত্রাবৃন্দার অনুসন্ধানেই সে এখানে এসেছে। সে একটু সন্দিগ্ধভাবে তাকাচ্ছে দুজনের দিকে। তাকে দেখে মিত্রাবৃন্দা আর দাঁড়াল না। সে দুজনকেই পাশ কাটিয়ে ফিরে চলল নিজের কক্ষে। মিত্রাবৃন্দার অপসৃয়মান ছায়ার দিকে তাকিয়ে থাকার পর বিকর্না রাহিলকে বলল, ‘কী কথা বলছিল ও?’ তার কণ্ঠস্বরে যেন সন্দেহের রেশ।

    তাকে আশ্বস্ত করার জন্য রাহিল বলল, ‘ওর ঘটনা তো জানো। ও ছুরিকাঘাত করতে গেছিল। তাই ওর সঙ্গে কথা বলে বোঝার চেষ্টা করছিলাম যে ওর আরও কোনও অপ্রীতিকর অভিসন্ধি আছে কিনা?’

    তার কথা বিকর্নার কাছে বিশ্বাসযোগ্য হল কিনা তা ঠিক বুঝতে পারল না রাহিল। সে এগোল মন্দিরের পিছনের অংশে যাবার জন্য। নিজের কক্ষে ফেরার আগে জায়গাটা একবার দেখে যাবে সে। ও-জায়গার ওপর বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন। কিন্তু কিছুটা এগোবার পর রাহিল বুঝতে পারল বিকর্না তাকে অনুসরণ করছে। সে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে বিকর্নাকে বলল, ‘তুমি কি আমাকে কিছু বলতে চাও?’

    বিকর্না জবাব দিল, ‘না, তেমন কিছু নয়। সারাদিন তো সুরসুন্দরীদের তালিম দিতে সময় কাটে। তাই তোমার সঙ্গে একটু চত্বর প্রদক্ষিণ করছি।’

    অন্ধকার নেমে গেছে মন্দির-প্রাঙ্গণে। আর কোনও কথা না বাড়িয়ে এগোতে থাকল রাহিল। আর তার সঙ্গে বিকর্না। চলতে চলতে বিকর্না একসময় প্রশ্ন করল, ‘সৈনিকের কাজে কত পারিশ্রমিক পাও তুমি?’

    রাহিল জবাব দিল, ‘মাসিক পাঁচ স্বর্ণমুদ্রা।’

    বিকর্না বলল, ‘তাহলে আমার পারিতোষক তোমার দ্বিগুণ। দশ স্বর্ণমুদ্রা। আমার প্রচুর স্বর্ণালঙ্কার আছে। রাজধানীর প্রধান পথে বাটিকা আছে। তা ছাড়া রূপোপজীবিনীদের এক আস্তানার কর্ত্রী আমি। সেখান থেকে আরও বিশ স্বর্ণমুদ্রা আয় হয় আমার। ওই দেহোপজীবিনীরা আমার ক্রীতদাস।’

    নি:সন্দেহে রাহিলের থেকে অনেক সম্পদশালী এই বৃহন্নলা। কিন্তু সে কেন হঠাৎ তাকে তার সম্পদের গল্প বলছে তা বোধগম্য হল না রাহিলের। তার কথা শুনতে শুনতে হাঁটতে লাগল সে।

    বিকর্না এরপর তাকে বলল, ‘এখানে আর থাকতে ভালো লাগছে না আমার। আনন্দহীন জীবন। আমি স্বাধীন, ক্রিতদাসী নই। প্রধান ভাস্কর চিত্রবান আমাকে এখানে এনেছিলেন। আমি যে উদ্দেশ্যে এখানে এসেছিলাম তা সফল হল না।’

    রাহিল একবার ভাবল সে প্রশ্ন করে তার উদ্দেশ্যটা কী ছিল? কিন্তু কথা না বাড়াবার জন্য প্রশ্ন করার থেকে বিরত রইল সে। এমনিতেই বিকর্নার উপস্থিতিতে অস্বস্তি বোধ করছে সে।

    রাহিল একসময় কিছুটা তফাত থেকে দেখতে পেল মাহবার কাজের জায়গাতে আলো জ্বলছে। মন্দিরের পশ্চাদভাগে যাবার আগে সে একবার এগোল সেদিকে। ঠিক এমন সময় বিকর্না হঠাৎ তাকে প্রশ্ন করল, ‘আচ্ছা, আমাকে তোমার কেমন লাগে?’

    প্রশ্নটা শুনে রাহিল বেশ ঘাবড়ে গেলেও সৌজন্যতাবশত সে সংক্ষিপ্ত জবাব দিল—’ভালো’।

    জবাব শুনে অন্ধকারে যেন হাসি ফুটে উঠল বিকর্নার মুখে। সে এরপর আর রাহিলকে অনুসরণ করল না। যে পথে সে এসেছিল সে পথেই ফিরে গেল অন্ধকারে।

    রাহিল এসে দাঁড়াল মাহবার কাজের জায়গাতে। মশালের আলোতে কাজ করছেন বৃদ্ধ ভাস্কর। প্রস্তরখণ্ডের গায়ে মিত্রাবৃন্দার প্রতিকৃতি আঁকা হয়েছে। ছেনি দিয়ে খুব সাবধানে আঁচড় কাটছেন ভাস্কর মাহবা।

    রাহিলকে দেখে বৃদ্ধ শিল্পী মৃদু হেসে বললেন, ‘সম্রাটের নির্দেশ, দ্রুত কাজ শেষ করতে হবে। তাই সূর্য ডোবার পরও মন্দির-প্রাঙ্গণে থাকতে হবে আমাকে।’

    রাহিল জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, অনুদেব আমাকে বলেছেন যে সূর্য ডোবার পরও মন্দির-প্রাঙ্গণে কাজ করবে শিল্পীরা।’

    সেখানে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ কাজ দেখার পর রাহিল এগোল মন্দিরের পশ্চাদংশের দিকে।

    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleরম্যরচনা ৩৬৫ – তারাপদ রায়
    Next Article সরস গল্প সমগ্র – তারাপদ রায়
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Demo
    Most Popular

    তিস্তাপারের বৃত্তান্ত – দেবেশ রায়

    August 29, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    তিস্তাপারের বৃত্তান্ত – দেবেশ রায়

    August 29, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Our Picks

    তিস্তাপারের বৃত্তান্ত – দেবেশ রায়

    August 29, 2025

    অদ্বৈতপ্রকাশ – ঈশান নাগর

    August 29, 2025

    পৃথিবীর ইতিহাস – দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

    August 29, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2025 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    Sign In or Register

    Welcome Back!

    Login below or Register Now.

    Lost password?

    Register Now!

    Already registered? Login.

    A password will be e-mailed to you.