৭
বেশ ক’টা দিন কেটে গেল। মন্দির নির্মাণ, মূর্তি নির্মাণের কাজ স্বাভাবিক নিয়মেই চলছে। তবে আগের চেয়েও ভাস্করদের কাজের গতি বৃদ্ধি পেয়েছে। মাহবা সহ বেশ কিছু ভাষ্কর গভীর রাত পর্যন্তও এক-একদিন কাজ করছেন। মন্দিরের শীর্ষগাত্রে সেই ছায়ামূর্তিরও দেখা পায়নি কেউ। রাহিল দু-দিন মধ্যরাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেছে তাকে দেখার জন্য।
তবে সেদিন বিকালের পর মিত্রাবৃন্দার সঙ্গে আর বাক্যালাপের সুযোগ হয়নি রাহিলের। সূর্য ডোবার সময় সে আর সেই স্তম্ভর কাছে আসে না, ক্রীড়ারত নারীদের দলেও থাকে না। মন্দিরের ভিতরে নিজের কক্ষেই থাকে সে। রাহিলের জানা নেই এটা কি তার স্বেচ্ছা নির্বাসন নাকি কেউ তার গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করছে!
সূর্য ডোবার সময় প্রতিদিন রাহিল রোজ গিয়ে দাঁড়ায় সেই শূন্য প্রাঙ্গণে। একাকী দাঁড়িয়ে থাকে সে। একসময় অন্যপাশের চত্বরে সুরসুন্দরীদের কলহাস্য স্তিমিত হয়ে আসে, অন্ধকার নামতে থাকে মন্দির-প্রাঙ্গণে। কিন্তু মিত্রাবৃন্দা আসে না।
আজকাল রাহিল একটা ব্যাপার অনুভব করে, মিত্রাবৃন্দার প্রতি একটা প্রগাঢ় আকর্ষণ অনুভব করে। যে আকর্ষণ সূর্য ডোবার সময় টেনে নিয়ে যায় সেই শূন্য প্রাঙ্গণে। যেখানে এসে দাঁড়াত সেই নারী। তবে মিত্রাবৃন্দাকে সে একবার রোজ দেখতে পায় মাহবার কাজের জায়গাতে। কিন্তু সেখানে উপস্থিত থাকেন অনুদেব। মিত্রাবৃন্দার সঙ্গে সেখানে বাক্যালাপ সম্ভব নয়। নিশ্চল মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকা মিত্রাবৃন্দার চোখের তারা মুহূর্তর জন্য এসে স্থির হয় রাহিলের ওপর। তারপর আবার অন্যদিকে ঘুরে যায়। তার মুখের অভিব্যক্তিতে তেমন কিছু ধরা দেয় না।
এদিন বেশ রাতে নিজের কক্ষে ফিরে ঘুমাতে গেছিল রাহিল। সূর্য ডোবার আগে মন্দির-চত্বর পরিত্যাগ করার সময় অনুদেব রাহিলকে ডেকে জানিয়ে গেছেন, তিনি পরদিন সকালে মন্দির-চত্বরে আসবেন না। সম্রাট বিদ্যাধরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাবেন রাজপ্রাসাদে, তাঁর ফিরতে দ্বিপ্রহর গড়িয়ে যাবে। অনুদেব যদি না থাকেন আর বিকর্নাকে যদি কাজের অছিলায় দূরে সরিয়ে দেওয়া যায় তবে মূর্তি নির্মাণের জায়গাতেই বাক্যালাপ করা যেতে পারে মিত্রাবৃন্দার সঙ্গে। রাহিল জানতে পারে তার অনুপস্থিতির কারণ।
বৃদ্ধ ভাস্কর মাহবা নিশ্চই অনুদেব, চিত্রবানের থেকে ব্যাপারটা গোপন রাখবেন। এসব কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছিল রাহিল। কিন্তু শেষ রাতে হঠাৎ বাইরে থেকে প্রহরী সৈনিকদের চিৎকার চেঁচামেচির শব্দে ঘুম ভেঙে উঠে বসল সে। তার পরমুহূর্তেই এক সৈনিক তার কক্ষে প্রবেশ করে উত্তেজিতভাবে জানাল মন্দিরের পশ্চাদভাগে ওপর থেকে নেমে আসা পাথরখণ্ডর আঘাতে মারাত্মক জখম হয়েছে একজন! কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে তরবারি কোষবদ্ধ করে রাহিল ছুটল সেখানে।
ক্ষীণ চাঁদের আলোতে মাথার ওপরে যেখানে সেই প্রস্তরমূর্তি দাঁড়িয়ে আছে ঠিক তার নীচেই সে জায়গা। জায়গাটা মশালের আলোতে আলোকিত, রাহিলের সৈনিকরা ও মন্দির-রক্ষীবাহিনীর সবাই জড়ো হয়েছে সেখানে। রাত জাগা কয়েকজন ভাস্করও উপস্থিত আছেন। বৃত্তাকারে জায়গাটা ঘিরে রেখেছে তারা। সেই বেষ্টনি ঠেলে রাহিল প্রবেশ করল সে জায়গাতে।
মশালের আলোতে মাটিতে পড়ে আছে একজন। মাথার খুলি চুরমার হয়ে গেছে তার। রক্তে ভেসে যাচ্ছে চারপাশ। তবে এখনও সামান্য প্রাণ আছে তার দেহে। মৃদু মৃদু কাঁপছে তার দেহ। একটা বেশ বড় ভারী প্রস্তরখন্ড পড়ে আছে তার দেহের পাশে। এত বড় প্রস্তরখণ্ড পাশ থেকে ছুড়ে মারা যায় না। নিশ্চই তা ওপর থেকে পড়েছে লোকটার মাথায়। লোকটা বাঁচবে না। রক্তাক্ত মুখমণ্ডল হলেও রাহিল চিনতে পারল তাকে। এ হল সেই লোক যে ক’দিন আগে রাহিলের চিৎকার শুনে ঠিক এ জায়গাতে উঠে এসেছিল। সে জায়গাতে মন্দির-রক্ষীবাহিনীর প্রধান প্রকটাক্ষও দাঁড়িয়ে আছে। তার বিস্ফারিত চোখ দুটোতে স্পষ্ট আতঙ্কের ছাপ। কে যেন একসময় বলল, ‘মৃত্যুপথযাত্রীকে জল দাও।’ রাহিল দেখল ভিড়ের মধ্যে মাহবাও আছেন। তিনিই সম্ভবত বললেন কথাটা।
রক্ষীদলের একজন এগিয়ে কোমরের জল ভর্তি চামড়ার থলি থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল দিতে লাগল তার মুখে। জলের স্পর্শেই মনে হয় শেষবারের মতো চোখ মেলল লোকটা। তার ডান হাতটা একবার মন্দির শীর্ষের দিকে নির্দেশ করেই মাটিতে খসে পড়ল। বিস্ফারিত চোখ দুটো আকাশের দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে গেল। অন্ধকার কান্ডারীয় মন্দির শুষে নিল লোকটার প্রাণবায়ু। কী ইঙ্গিত করে গেল লোকটা? রাহিল একজনের হাত থেকে মশাল নিয়ে সেটা তুলে ধরল ওপর দিকে। আর তার দেখাদেখি আরও কয়েকজন একইভাবে মশাল তুলে ধরল মাথার দিকে। সম্মিলিত মশালের আলোতে মন্দিরের শীর্ষগাত্রের অস্পষ্টতা কিছুটা কেটে গেল।
রাহিল দেখতে পেল সেই নারীমূর্তির বিপরীত দিকের শূন্য তাকটার একটু নীচে পাথরখণ্ডের খাঁজে একটা বর্শা গাঁথা আছে! সম্ভবত ওই তাক লক্ষ্য করে নীচ থেকে ওই বর্শা ছুড়ে মেরেছিল লোকটা। লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে সেটা গেঁথে আছে পাথরের খাঁজে। কাকে লক্ষ্য করে বর্শা ছুড়েছিল সে? সে কী সেই প্রেতাত্মা? সেই কী ওপর থেকে পাথর ছুড়ে হত্যা করল লোকটাকে? সেই বর্শাটা দেখার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় মন্দির- রক্ষীবাহিনীর অন্যদের মধ্যেও আতঙ্ক সঞ্চারিত হল। তাদের একজন কম্পিত স্বরে বলে উঠল, ‘এ নিশ্চই সেই প্রেতাত্মার কাজ!’
রাহিল এক ধমকে থামিয়ে দিল তাকে। রাহিল উপস্থিত সৈনিকদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারল হঠাৎই একজন টহলরত সৈনিক এ-জায়গা থেকে লোকটার আর্ত চিৎকার ও ভারী কিছু পতনের শব্দ শুনতে পায়। সে ছুটে এসে দেখতে পায় মাটিতে পড়ে থাকা রক্তাক্ত লোকটাকে। তারপর সৈনিকের চিৎকারে অন্যরা সমবেত হয় সেখানে।
রাহিল একটু ভেবে নিয়ে বলল, ‘যদি লোকটাকে কেউ পাথর ছুড়ে মেরে থাকে তবে খুঁজে দেখতে হবে সে আততায়ী এখনও মন্দিরে আছে কিনা? আমার ধারণা সে কোনও প্রেতাত্মা নয়, হয়তো কোনও মানুষ। হয়তো সে এখনও মন্দিরেই আছে। তার অনুসন্ধান প্রয়োজন এখন। আর কিছু সময় পর ভোরের আলো ফুটবে। প্রধান ভাস্কর চিত্রবান উপস্থিত হবেন। তাঁর সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
রাহিল একটা মশাল হাতে সেই মৃতদেহ আগলে দাঁড়িয়ে রইল আর সেনা ও মন্দির-রক্ষীবাহিনীর লোকরা ছড়িয়ে পড়ল মন্দির-চত্বরে ঘাতককে খুঁজে পাওয়া যায় কিনা তা দেখার জন্য। যে ক’জন ভাস্কর সেখানে ছিল তারাও ফিরে চলল। শুধু যেতে গিয়েও রাহিলের ইশারায় দাঁড়িয়ে পড়লেন মাহবা।
সবাই সে জায়গা ত্যাগ করার পর রাহিল তাকে প্রশ্ন করল, ‘আপনি কি সারারাত মন্দির-প্রাঙ্গণেই ছিলেন? আপনার নজরে কি অস্বাভাবিক কিছু ধরা পড়েছে?’
মাহবা বললেন, ‘হ্যাঁ, ছিলাম। ফেরার কথা ছিল কিন্তু কাজ করতে করতে বিশ্রাম লাভের জন্য একটু বসতেই আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।’ এরপর তিনি একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘হ্যাঁ, আমি যেন একটা অদ্ভুত ব্যাপার দেখেছিলাম। অবশ্য তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় সেটা আমার মনের ভুলও হতে পারে।
‘আমি যেন দেখলাম একটা ছায়ামূর্তি চত্বর পেরিয়ে মন্দিরগাত্র বেয়ে ওপরে উঠে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। সেটা মধ্যরাতের ঘটনা হবে হয়তো। তারপর কিছুক্ষণ আগে সৈনিকের চিৎকারে আমার ঘুম ভাঙে। অন্য সবার মতো আমি এখানে উপস্থিত হই।’
তার জবাব শুনে রাহিল আর কিছু বলল না। মাহবা পা বাড়ালেন অন্যদিকে। এর কিছুক্ষণের মধ্যে আকাশে শুকতারা ফুটে উঠল। তারপর একসময় সেই তারা ক্ষীণ হতে হতে মুছে গিয়ে পুবের আকাশ লাল হতে শুরু করল। রাহিলের সৈনিকদল আর মন্দির-রক্ষীবাহিনীর লোকেরা এসে জানাল মন্দির-চত্বরে তারা কারো সন্ধান পায়নি।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়ল মন্দির চত্বরে। পর্ণকুটীর ছেড়ে দল বেঁধে ওপরে মন্দির-চত্বরে উঠে আসতে লাগল মজুর-শিল্পীর দল। খবরটা ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে, জায়গাটাতে ভিড় জমাতে শুরু করল তারা।
বিভৎস মৃতদেহটা দেখে কারও চোখে ফুটে উঠল ভয়ার্ত ভাব, কেউ বা আবার উত্তেজিতভাবে চাপাস্বরে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে করতে তাকাতে লাগল ভোরের আলোতে মাথার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সেই মূর্তি আর তাকটার দিকে। আর এর কিছুক্ষণের মধ্যে প্রধান ভাস্কর চিত্রবান এসে উপস্থিত হলেন সেখানে। আর তার সঙ্গে বিকর্নাও। চিত্রবান সেখানে উপস্থিত হয়েই প্রথমে মজুর-শিল্পীদের নিজেদের কাজে ফিরে যাবার নির্দেশ দিলেন। ফিরে গেল তারা। চিত্রবান এরপর রাহিলের কাছে জেনে নিলেন ঘটনাটা। চিন্তার স্পষ্ট ভাঁজ ফুঁটে উঠল তার কপালে।
রাহিল জানতে চাইল, ‘এই মৃতদেহর কী ব্যবস্থা করবেন?’
চিত্রবান বললেন, ‘সূর্যোদয়ের আগে মৃত্যু হয়েছে বল্লভের। মৃতদেহ বাসী হয়ে গেছে। আপাতত দেহটা নীচের চত্বরে স্থানান্তরিত করা হোক। তবে প্রধান পুরোহিতকে এই সংবাদ প্রেরণ করতে হবে। তিনি নগরীর অভ্যন্তরে রওনা হয়ে গেছেন সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে। বিকর্না আর প্রকটাক্ষ তোমরা নগরীতে যাও। প্রধান পুরোহিতকে এ সংবাদ জানিয়ে বলো যে সম্রাটের সঙ্গে সাক্ষাতের পর যথাসম্ভব দ্রুত তিনি যেন মন্দিরে ফিরে আসেন। আর সেনাধ্যক্ষ রাহিল, মৃতদেহ স্থানান্তরিত হওয়ার পর আপনার সৈন্যরা মন্দিরের অভ্যন্তরে আর একবার অনুসন্ধান চালাক কোথাও কেউ লুকিয়ে আছে কিনা তা দেখার জন্য।’
প্রধান স্থপতির নির্দেশ পালনের জন্য তৎক্ষণাৎ বিকর্না আর বিকটাক্ষ রওনা হল নগরীর উদ্দেশ্যে। যাবার আগে বিকর্না চিত্রবানের অলক্ষ্যে পিছনে তাকিয়ে একটা হাসি ছুড়ে দিয়ে গেল রাহিলের দিকে। রাহিল খেয়াল করল সেটা।
বল্লভ নামে মৃত লোকটার প্রতি একটু বাড়তি সম্মান প্রদর্শন করা হল। মজুরদের মতো পায়ে দড়ি বেঁধে তাকে স্থানান্তরিত করা হল না। মন্দির-রক্ষীদের কয়েকজন একটা বাঁশের চালি নিয়ে এল। তার ওপর মৃতদেহটাকে শুইয়ে নীচের চত্বরে নামান হল সেটা।
রাহিল এরপর তার সৈন্যদের নিয়ে এগোতে যাচ্ছিল আরও একবার মন্দির-চত্বর, মন্দিরের অভ্যন্তর ভালো করে খুঁজে দেখার জন্য। কিন্তু হঠাৎ মন্দির-প্রাঙ্গণের এক অংশ থেকে শোরগোলের শব্দ শোনা গেল। রাহিল, চিত্রবান আর তার সৈন্যদলকে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ছুটল সেদিকে।
মন্দির-প্রাঙ্গণের সে অংশে কাজ থামিয়ে জড়ো হয়েছে মজুরদের একাংশ। তাদের দৃষ্টি মন্দিরের মাথার দিকে নিবদ্ধ। রাহিলরা সেখানে উপস্থিত হতেই একজন মজুর মন্দিরগাত্রের মাথার দিকে আঙুল তুলে বলল ‘ওই! ওই!–‘
তার দৃষ্টি অনুসরণ করে রাহিল সেদিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল। প্রাঙ্গণ থেকে বেশ খানিকটা উঁচুতে মন্দিরগাত্রে বসে আছে অদ্ভুত এক জীব। আকারে সে সম্ভবত মানুষের চেয়ে বড়, ঘন কৃষ্ণবর্ণের লোমে ছাওয়া দেহ, লম্বা গোঁফ অলা মুখমণ্ডল অনেকটা মানুষেরই মতো। নীচে দাঁড়িয়ে থাকা মজুরদের উদ্দেশ্যে দাঁত খিঁচোচ্ছে প্রাণীটা। শ্বাপদের মতো হিংস্র দাঁত তার চোয়ালে। রাহিল এই অদ্ভুত জীব ইতিপূর্বে কোনওদিন দেখেনি। স্বগতোক্তির স্বরে সে বলে উঠল, ‘এ কোন জীব!’
উত্তরটা মিলল তার পাশে দাঁড়ান চিত্রবানের মুখ থেকেই। তিনি বলে উঠলেন, ‘সর্বনাশ! কীভাবে মুক্ত হল প্রাণীটা! এ হল নারী-যোনি-লোভী কৃষ্ণবানর। মজুররা যেখানে থাকে সেখানেই এক পিঞ্জরে আটক ছিল প্রাণীগুলো।’
তার কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই একইরকম দেখতে আরও দুটো প্রাণী কাছেই একটা তাকের আড়াল থেকে লাফিয়ে এসে হাজির হল সেখানে। তিনটে প্রাণী মিলে দাঁত খিঁচোতে লাগল সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে।
প্রধান স্থপতি ও প্রধান ভাস্কর চিত্রবান উদ্বিগ্নভাবে বলে উঠলেন, ‘ওদের এখান থেকে হঠাতে হবে। সুরকন্যাদের মূর্তি নির্মাণ চলছে, যোনির লোভে তাদের ওপর আক্রমণ করতে পারে এই কামুক নর-বানরেরা।’
তাঁর কথা শুনেই মনে হয় মন্দির-রক্ষীবাহিনীর একজন একটা প্রস্তরখণ্ড কুড়িয়ে নিয়ে সেটা সজোরে ছুড়ে মারল সেই অবমানবদের লক্ষ্য করে। সেটা তাদের গায়ে লাগল না। গিয়ে পড়ল তাদের কাছাকাছি একটা তাকের ওপর। সঙ্গে সঙ্গে এক কৃষ্ণবানর সেটা সংগ্রহ করে নিয়ে সেটা মানুষের মতো নীচের দিকে ছুড়ে মারল। তারপর লম্বা লাফে পুরো দলটাই এ-তাক ও-তাক অতিক্রম করে অন্তর্হিত হল অন্যদিকে।
রাহিলের মনে পড়ে গেল ভাস্কর মাহবার বলা কথা। অন্য একটা ভাবনাও এল তার মনে। সে চিত্রবানকে বলল, ‘এই কৃষ্ণবানররা মানুষের সমগোত্রীয় বলে মনে হয়। এমন হতে পারে যে মৃত মন্দিররক্ষী তাদের লক্ষ্য করেই বর্শা নিক্ষেপ করেছিল, আর এই কৃষ্ণবানরের দল পাথর নিক্ষেপ করেছিল তার উদ্দেশ্যে?’
চিত্রবান বললেন, ‘এমনটা হতেই পারে। এই বানরদের আচরণ মানুষের মতো। সম্ভবত কোনওভাবে মুক্তিলাভ করে তারাই এ ঘটনা ঘটিয়েছে।’
চিত্রবানের কপালে স্পষ্টই চিন্তার ভাঁজ ফুটে উঠল। তিনি এরপর বললেন, ‘এই বানররা সুযোগ পেলেই নারীদের আক্রমণ করবে। পিঞ্জরবদ্ধ অবস্থায় থাকার কারণে দীর্ঘকাল ধরে মানবযোনির স্বাদ থেকে ওরা বঞ্চিত। সে স্বাদ গ্রহণের চেষ্টা করবে ওই কামুক অবমানব, নগ্ন নারীরা আরও বেশি আকর্ষণ করবে তাদের। উন্মুক্ত স্থানে নারীমূর্তি নির্মাণ আর সমীচীন হবে না। কিন্তু কাজও অতি দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। ভাস্করদের মূর্তি নির্মাণের বাকি কাজ বদ্ধ জায়গাতে করতে হবে। এ মর্মে তাদেরকে আমি নির্দেশ দিচ্ছি।’
কথাটা শুনে রাহিলের মনে হল, ‘তাহলে এদিনও আর তার মিত্রাবৃন্দার সঙ্গে দেখা হল না।
চিত্রবান এরপর রাহিলের কাছে জানতে চাইলেন, ‘আপনার সৈন্যরা কি পশু ধরতে পারদর্শী?’
এত গম্ভীর পরিবেশের মধ্যেও তার কথা শুনে রাহিল হেসে ফেলে বলল, ‘যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যরা অনেক সময় শত্রুসেনাদের ধরে ঠিকই, কিন্তু এ বিদ্যায় আমার সৈন্যরা পারদর্শী নয়।’
চিত্রবান জবাব দিলেন, ‘আচ্ছা। অনুদেব ফিরে আসার পর তাঁর সঙ্গে আলোচনা করে ব্যাপারটা সম্বন্ধে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
এরপর কিছুটা স্বগতোক্তির স্বরেই তিনি আবার বললেন, ‘কিন্তু ওদের মুক্ত করল কে?’
কথাগুলো বলে তিনি আর দাঁড়ালেন না। উপস্থিত মজুরদের নিজেদের কাজে ফিরে যাবার নির্দেশ দিয়ে তিনি চিন্তান্বিতভাবে অন্যদিকে এগোলেন, সম্ভবত ভাস্করদের তার কথা জানাবার জন্য।
মৃতদেহ আগের জায়গা থেকে সরানো হয়ে গেছে, এ জায়গা থেকে মজুরদের জমায়েত ফাঁকা হয়ে গেল। রাহিল একই জায়গাতে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখার চেষ্টা করল যে সেই অদ্ভুত প্রাণীগুলোকে আবার দৃষ্টিগোচর হয় কিনা? তারপর সে এগোল মাহবার কাজের জায়গার দিকে। রাহিল জায়গাটাতে গিয়ে দেখল মাহবা আর বেশ কজন মজুর সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। মজুররা রজ্জুবদ্ধ করছে মিত্রাবৃন্দার অর্ধসমাপ্ত মূর্তিটাকে। মাহবা রাহিলকে বললেন, ‘প্রধান ভাস্কর নির্দেশ দিয়ে গেলেন উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে আর এ মূর্তি নির্মাণ হবে না। মন্দিরের অভ্যন্তরে এক কক্ষে নিয়ে যাচ্ছি মূর্তিটাকে। বাকি কাজ সেখানেই সম্পন্ন হবে।’
কথাটা শুনে রাহিল আবার হাঁটতে শুরু করল। এগোতে এগোতে সে ভাবতে লাগল ওই মন্দির রক্ষীবাহিনীর লোকটাকে হত্যা করল কে? ওই নারী-যোনি-লোভী অবমানব? নাকি কোনও মানুষ? যদি ওই বানরও তাকে হত্যা করে থাকে তবে তাদের মুক্ত করল কে? চিত্রবানকেও মন্দির-রক্ষীর মৃত্যুর চেয়েও এ ব্যাপারটা নিয়ে বেশি ভাবিত বলে মনে হল। তাহলে কি নির্দিষ্ট কোনও কারণ আছে তাদের মুক্ত করার পিছনে? দিনের বেলায় মন্দিরের অভ্যন্তর একবার অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। উন্মুক্ত, নির্জন সব কক্ষ। সেখানে কোনও লোকের আত্মগোপন করা অসম্ভব নয়।—এসব কথা চিন্তা করে রাহিল কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রবেশ করল মন্দিরের অভ্যন্তরে।
মজুর-ভাস্করের দল সাধারণত বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া মন্দিরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে না। কয়েকটি কক্ষ বর্তমানে বিকর্নার তত্বাবধানে আছে। বাকি কক্ষগুলো মানবশূন্য। রাহিল আর তার সৈন্যদের থাকার জায়গা মূল মন্দিরের বাইরের চত্বরে কয়েকটি কক্ষ আছে সেখানে।
ভিতরে প্রবেশ করে রাহিল একটার পর একটা কক্ষ, অলিন্দ ধীর পায়ে প্রদক্ষিণ করতে লাগল। কোথাও কেউ নেই, পুরু ঘাসের দেওয়ালের গায়ে জেগে আছে নানা দেবদেবী, পশুপাখির নানা মূর্তি। মন্দির নির্মাণ সম্পন্ন হলে, বিগ্রহ প্রতিষ্ঠার পর কক্ষগুলো নানা কাজে ব্যবহৃত হবে। কোনওটা হবে পুরোহিতদের বিশ্রাম কক্ষ, কোনওটা দেবদাসীদের আবাসস্থল, কোথাও ফুল, পূজার উপাচার সংগ্রহ করে রাখা হবে, কোথাও হবে দীপ প্রজ্বলনের ব্যবস্থা, কোথাও বা রন্ধনাগার। এই নির্জন কক্ষগুলো পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে লোক সমাগমে। কিন্তু আপাতত সবই শূন্য, সবই নির্জন। আলো-আঁধারি খেলা করছে নির্জন কক্ষগুলোতে।
এ-কক্ষ ও-কক্ষ পরিভ্রমণ করতে করতে হঠাৎই একটা কক্ষর ভিতর থেকে অস্পষ্ট একটা শব্দ পেয়ে রাহিল সেই কক্ষের সম্মুখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। কান খাড়া করতেই কয়েক মুহূর্তর মধ্যেই আবারও একটা মৃদু শব্দ ভেসে এল কক্ষর ভিতর থেকে।
নিশ্চিত কেউ আছে ভিতরে! রাহিল বাইরে দাঁড়িয়ে হাঁক দিল, ‘ভিতরে কে?’ কোনও জবাব দিল না।
তাহলে কি সেই আততায়ী লুকিয়ে আছে এই কক্ষে? মানুষ নাকি সেই কামুক বানর? রাহিল চকিতে তার তলোয়ার কোষমুক্ত করল। তারপর বেশ উচ্চকণ্ঠে হাঁক দিল, ‘কে আছ?’
কক্ষ থেকে দ্বারের সামনে যে বেরিয়ে এল তাকে দেখে বেশ অবাক হয়ে গেল রাহিল। সে মিত্রাবৃন্দা! মিত্রাবৃন্দা তাকে হাতের ইশারায় চুপ করতে বলে তাকে কক্ষে প্রবেশ করতে বলল।
রাহিল কক্ষে প্রবেশ করল। মিত্রাবৃন্দা তার সামনে দাঁড়িয়ে। মৃদু হাঁফাচ্ছে সে। তার সুডৌল স্তনযুগল মৃদু ওঠানামা করছে। মিত্রাবৃন্দা বলল, বিকর্না বা অনুদেব মন্দিরে কেউ নেই। সেই সুযোগে তোমাকে মন্দিরে ঢুকতে দেখে কথা বলতে এলাম।’
রাহিল বলল, ‘সায়াহ্নে, সূর্যাস্তের সময় তুমি আসো না কেন? আমি সেখানে তোমার প্রতীক্ষায় থাকি।’
মিত্রাবৃন্দা মৃদু হেসে জবাব দিল, ‘জানি, তুমি আমার প্রতীক্ষা করো। কিন্তু অনুদেবের নিষেধে আমার ওই সময় প্রাঙ্গণে বেরোনো নিষেধ। বিকর্না বেরোতে দেয় না আমাকে। ভাস্কর মাহবা যখন আমার মূর্তি নির্মাণ করেন, যখন তুমি এসে দাঁড়াও সেখানে, তখন মনে হয় তোমার দিকেই শুধু চেয়ে থাকি। কিন্তু সাহস হয় না। পাছে ব্যাপারটা অনুদেবের চোখে ধরা পড়ে তাই।’
মিত্রাবৃন্দার কথা শুনে বিস্মিত রাহিল জানতে চাইল, ‘পুরোহিত অনুদেব হঠাৎ তোমার গতিরোধ করলেন কেন? তাঁর অভিপ্রায় কী?’
মিত্রা জবাব দিল, ‘তিনি সবসময় চোখে চোখে রাখছেন আমাকে। তোমাকে দেখে আমি যে কম্পিত হয়েছিলাম, আমার কবরীবন্ধন থেকে পদ্মকোরক যে খসে পড়েছিল তা-ও খেয়াল করেছেন তিনি। আমার সঙ্গে তোমার সাক্ষাতের খবরও তার অগোচর নয়। বিকর্নাই হয়তো তাকে জানিয়েছে সেকথা। হয়তো তিনি আশঙ্কা করছেন যে তোমার সঙ্গে প্রেমজ সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছি আমি। তাই এই প্রতিবন্ধকতা।’
রাহিল তাতে বিস্মিতভাবে বলল, ‘কিন্তু তাতে কী যায় আসে প্রধান পুরোহিতের। যদি এ ঘটনা সত্যিও হয় তবে তাতে মন্দির রচনার কাজে তো বিঘ্ন ঘটার সম্ভাবনা নেই?’
মৃদু চুপ করে থেকে মিত্রাবৃন্দা জবাব দিল, ‘তা নেই। তবে অন্য কারণ আছে।’
‘কী কারণ?’
একটু ইতস্তত করে মিত্রা বলল, ‘প্রধান পুরোহিত আমার দেহের প্রতি আকর্ষিত। তিনি আমাকে শয্যাসঙ্গিনী রূপে পেতে চান। সে মর্মে তিনি ইঙ্গিতও দিয়েছেন আমাকে। তিনি চান না আমি অন্য কোনও পুরুষের সঙ্গে বাক্যালাপ করি।’
মিত্রার কথা শুনে চমকে উঠল রাহিল। সে বলল, ‘তুমি কি তার প্রস্তাবে সম্মত?’
মিত্রা মৃদু হেসে বলল, ‘না, সম্মত নই। আমি তাঁকে সে কথা জানিয়েও দিয়েছি। আমি আমার হৃদয় সঁপেছি অন্য কাউকে। এই শেষ কথাটা আমি অবশ্য তাঁকে অবগত করিনি।’
রাহিল প্রশ্ন করল, ‘কাকে?’
বেশ কিছুক্ষণের নিস্তব্ধতা। মিত্রা মাথা নত করে রইল। তারপর লজ্জিতভাবে অস্পষ্ট কণ্ঠস্বরে বলল, ‘এক সৈনিককে। তোমাকে।’
মিত্রার কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে এক শিহরণ অনুভূত হল রাহিলের বুকের ভিতর। কোনও নারী তো দূরস্থ, কোনও পুরুষও তাকে বলেনি এ কথা! এক অনাস্বাদিত অনুভূতি যেন গ্রাস করল তাকে। যুদ্ধব্যবসায়ীর জীবন রাহিলের। রক্ত, মৃত্যু, এ নিয়েই তার জীবন অতিবাহিত হয়েছে।
আজ এক নতুন কথা শুনল রাহিল। মিত্রার কথা যেন তার সৈনিকের কঠিন বর্ম খসিয়ে দিল। রাহিলের মনে হল তার সৈনিকের জীবন, তার শৌর্য্য, রক্তস্নান সব মিথ্যা। তার জীবনের একমাত্র সত্য তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সে মিত্রা। কান্ডারীয় মন্দিরের ক্রীতদাসী মিত্রাবৃন্দা! রাহিল কী জবাব দেবে বুঝে উঠতে না পেরে আঁধো অন্ধকারে মিত্রার মুখের দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তাকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে মিত্রা মৃদু শঙ্কিতভাবে বলে উঠল, ‘আর ক’দিনের মধ্যেই মূর্তি নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হবে। তারপর হয় আমাকে মুক্তি দেওয়া হবে নচেৎ ক্রীতদাসী হিসাবে বিক্রি করা হবে আমাকে। স্ত্রীর মর্যাদায় না হলেও তুমি কি ওই ক্রীতদাসী হিসাবে স্থান দেবে না আমাকে? ওই প্রস্তরখণ্ড আমারও মৃত্যুর কারণ হতে পারত, তবু আমি প্রাণরক্ষার চেষ্টা করেছি তোমার। সামান্য ক্রীতদাসী রূপেও কি তুমি আশ্রয় দেবে না আমাকে?’
মিত্রাবৃন্দার কাতর কণ্ঠস্বর অনুরণিত হতে লাগল রাহিলের কানে। রাহিলের জবাবের প্রত্যাশায় তার দিকে তাকিয়ে আছে মিত্রাবৃন্দা। রাহিল একসময় জবাব দিল, ‘না, মিত্রা ক্রীতদাসী নয়, তোমাকে আমার হৃদয়ে স্থান দিয়েছি আমি। আমি রক্ষা করব তোমাকে। এই সৈনিকের জীবন, যুদ্ধক্ষেত্রে রক্তস্রোত আমার ভালো লাগে না। তোমাকে নিয়ে এই মন্দির ত্যাগ করে অনেক দূরে চলে যাব। সৈনিকের সামান্য যেটুকু সঞ্চয় তা দিয়ে ঘর বাঁধব আমরা।’ এই বলে মিত্রার গণ্ডদেশ স্পর্শ করল রাহিল। এই প্রথম সে স্পর্শ করল কোনও নারীদেহ। যৌনতা নয়, এক অপার ভালো লাগা যেন অনুভূত হল মিত্রার গণ্ডদেশ স্পর্শ করে। এ অনুভূতি যেন মিত্রার মধ্যেও সঞ্চারিত হল। চোখের পাতা মুদে কেঁপে উঠল সে। হয়তো এর নামই ভালোবাসা।
রাহিল বাম হস্তে স্পর্শ করেছে মিত্রার গণ্ড, ডান হস্তে ধরা আছে তার তরবারি। দীর্ঘদিন সে সেই তরবারি ধরে আছে। সে তরবারি যেন আজ খুব ভারী মনে হচ্ছে রাহিলের। তার ইচ্ছা হচ্ছিল সে তরবারি দূরে ছুড়ে ফেলে আলিঙ্গন করে মিত্রাকে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে নিজেকে সংযত করল রাহিল। সে বুঝল তার দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সহযোগী সে তরবারির এখনও প্রয়োজন আছে। প্রয়োজন আছে মিত্রাবৃন্দাকে রক্ষা করার জন্যই।
একসময় রাহিল তার হাত খসিয়ে নিল মিত্রার গণ্ডদেশ থেকে। কিন্তু তার অঙ্গুলি যেন কেমন সিক্ত লাগছে। মিত্রার অশ্রু লেগে আছে সে হাতে। রাহিল বুঝতে পারল ব্যাপারটা।
মিত্রা চোখ মেলল। তারপর বলল, ‘এখন আমি যাই। কেউ আমার অনুসন্ধানে আসতে পারে।’ এই বলে মিত্রা ধীর পায়ে অন্তর্হিত হল কক্ষের অপর পার্শ্বে এক দ্বারের অন্তরালে। রাহিলও এরপর সে কক্ষ ত্যাগ করে, মন্দিরের অন্ত:পুর ত্যাগ করে এসে দাঁড়াল আলোকোজ্জ্বল মন্দির-প্রাঙ্গণে। আবারও অন্য সময়ের মতো মন্দির-চত্বর পরিভ্রমণ করতে লাগল সে। তবে এক ঘোরের মধ্যে।
মন্দির-চত্বরে মজুর-ভাস্করদের কোলাহল, হাতুড়ি-ছেনির শব্দ অতিক্রম করে তার কানে বাজতে লাগল মিত্রার কথাগুলো। রাহিল হিসাব কষতে লাগল কত সঞ্চয় আছে তার। প্রয়োজনে সে জীবনের সব সঞ্চয় দিয়ে ক্রয় করবে মিত্রাবৃন্দাকে।
বৈকালের কিছু আগে ব্যস্তসমস্ত হয়ে মন্দিরে ফিরলেন অনুদেব। তার সঙ্গে বিকর্না আর প্রকটাক্ষ। তিনি যখন মন্দিরে পদার্পণ করলেন তখন আবার মজুরদের মধ্যে শোরগোল উঠল, ‘ওই! ওই!’
আবার মন্দিরগাত্রে দেখা গেল সেই তিন অবমানবকে। মন্দিরের এক তাকে এসে বসেছে তারা। প্রথমবার ভোরবেলা দর্শন দেওয়ার পর ইতিমধ্যে বার কয়েক দর্শন দিয়েছে প্রাণীগুলো। তাদের দেখে প্রতিবারই শোরগোল উঠেছে। সেই চিৎকারে অন্তর্হিত হয়েছে কামুক অবমানবের দল। এবারও তার ব্যতিক্রম হল না। চিৎকার শুনে কোথায় যেন প্রাণীগুলো লুকাল। কিন্তু তার আগেই অনুদেব দেখতে পেলেন তাদের। চোয়াল শক্ত হয়ে গেল অনুদেবের। তিনি রক্ষীবাহিনীর লোকটার মৃত্যুর কথা শুনেছেন বিকর্নার কাছে, কিন্তু কৃষ্ণবাঁদরের মুক্তির ব্যাপারটা তিনি জানতেন না। কারণ, বিকর্নাদেরও জানা ছিল না ব্যাপারটা।
অনুদেব মন্দির-চত্বরে উপস্থিত হতেই প্রায় একইসঙ্গে রাহিল আর চিত্রবান উপস্থিত হল তাঁর সামনে। প্রধান পুরোহিত বেশ উত্তেজিতভাবে জানতে চাইলেন, ‘কখন, কীভাবে মুক্ত হল কৃষ্ণবানররা? কে মুক্ত করল?’
চিত্রবান বললেন, ‘ভোরের আলো ফোটার পরই ওদের দেখা যায়। হয়তো বা রাতেই মুক্ত হয়েছে। গতকাল দ্বিপ্রহরে যখন মন্দির-রক্ষীবাহিনীর বল্লারী ওদের খাবার দিতে যায়, তখনও ওরা নাকি বন্দিই ছিল।’
অনুদেব বললেন, ‘কোথায় বল্লারী?’
মাঝবয়সি একজন লোক এসে মাথা নীচু করে দাঁড়াল তাদের সামনে। কাঁপছে লোকটা।
অনুদেব তার উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলে উঠলেন, ‘কীভাবে মুক্ত হল বানরেরা? নির্ঘাত খাবার দেবার পর তুমি পিঞ্জরের অর্গল বন্ধ করোনি। তোমাকে আমি মৃত্যুদণ্ড দেব।’
লোকটা সঙ্গে সঙ্গে অনুদেবের পায়ে পড়ে কেঁদে উঠে বলতে লাগল, ‘বিশ্বাস করুন প্রভু, আমি নিশ্চিত অর্গল বন্ধ করেছিলাম। কোনও গাফিলতি করিনি। ওরা কীভাবে মুক্ত হল জানি না। বিশ্বাস করুন প্রভু…’
অনুদেব রুষ্টভাবে বলে উঠলেন, ‘তাহলে কি বলতে চাচ্ছিস ওরা নিজেরাই অর্গল মুক্ত করল? ভালো চাস তো দোষ স্বীকার কর।’
বল্লারী অনুদেবের পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘আমি সত্যিই অর্গল বন্ধ করেছিলাম প্রভু। দোহাই আমাকে দণ্ড দেবেন না। হয়তো অন্য কেউ মুক্ত করেছে ওদের…’
কী যেন একটা বলতে গিয়েও তার কথা শুনে কেমন যেন থমকে গেলেন অনুদেব। তারপর এক লাথিতে বল্লারীকে দূরে ছিটকে ফেলে খড়মের শব্দ তুলে হাঁটতে শুরু করলেন। তাকে অনুসরণ করল অন্যরা।
অনুদেবের সঙ্গে এসে রাহিলরা উপস্থিত হল মন্দিরের পশ্চাদভাগের সেই জায়গাতে যেখানে মৃত্যু হয়েছিল সে লোকটার। জায়গাটা ভালো করে দেখলেন তিনি। বেশ কিছুক্ষণ ধরে তাকিয়ে রইলেন মাথার ওপর সেই মূর্তিটা আর নীচে পাথরের খাঁজে আটকে থাকা বর্শাটার দিকে।
তারপর প্রশ্ন করলেন, ‘কোন প্রহরের ঘটনা এটা?’
রাহিল জবাব দিল, ‘শেষ প্রহরের।’
প্রধান পুরোহিত এবার চিত্রবানের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলেন, ‘সৈনিকরা ছাড়া রাত্রে মন্দির-প্রাঙ্গণে কোন কোন ভাস্কর-মজুররা ছিল?’
প্রধান স্থপতি জবাব দিলেন, ‘মজুররা কেউ ছিল না। তবে চারজন ভাস্কর আলাদা আলাদা স্থানে মূর্তি নির্মাণে নিয়োজিত ছিল।’
‘কারা তারা?’
‘সুসেন, মাধবরাজ, স্থূলকোটি আর মাহবা।’—জবাব দিলেন চিত্রবান।
‘মাহবা।’—অনুদেব যেন অস্পষ্টভাবে একবার নামটা উচ্চারণ করলেন চিত্রবানের কথা শুনে।
চিত্রবান এবার তাকে বললেন, ‘আমার কিন্তু অনুমান; ওই কৃষ্ণবানররাই পাথর নিক্ষেপ করেছে।’
অনুদেব বললেন, ‘হতেও পারে আবার নাও হতে পারে। মন্দির-রক্ষীর মৃত্যুর চেয়েও বড় কথা কৃষ্ণবানরের দল মুক্ত হল কীভাবে? বল্লারীর আচরণ দেখে মনে হচ্ছে সে সত্যি কথাই বলছে। তবে কে কী উদ্দেশ্যে মুক্ত করল ওদের?’
কথাটা বলে প্রশ্নর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করতে লাগলেন অনুদেব। তাঁর কপালে ফুটে উঠেছে চিন্তন রেখা।
বেশ কিছুক্ষণ ভাবার পর তিনি বললেন, ‘সুরসুন্দরীদের মন্দির প্রাঙ্গণে বেরোনো বন্ধ। ভাস্কররা যেন তাদের নিয়ে মন্দিরের অভ্যন্তরেই কাজ করে। তিন দিন পর অমাবস্যা। ভাস্করদের জানিয়ে দিন এই তিনদিনের মধ্যে মূর্তি নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করতে হবে এই নারীদের। চতুর্থ দিন সকালে নতুন নারীরা আসবে। মজুর-শিল্পীদের জানিয়ে দাও এ-ক’দিন কর্তব্যের সামান্য গাফিলতি চলবে না। আর একদল মজুর যাবে এই কান্ডারীয় মন্দির আর লক্ষণ মন্দিরের মধ্যবর্তী অংশে যে গুল্ম আচ্ছাদিত স্থান আছে সেখানে। দশ হাত পরিধি আর পঞ্চাশ হাত গভীর কূপ খনন করতে হবে সেখানে। সে কাজও অবশ্যই যেন তিনদিনের মধ্যে সম্পন্ন হয়।’
চিত্রবান বললেন, ‘কিন্তু ওই স্থান তো কূপখননের অনুপযুক্ত। জল উঠবে না।’
অনুদেব বললেন, ‘সম্রাটের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে আমার। ওই স্থানেই কূপ খনন করা হবে। এই রাজনির্দেশ না মানলে তুষানলে দগ্ধ করা হবে মজুরদের।’
চিত্রবানের প্রতি এ কথাগুলো বলার পর অনুদেব রাহিলের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘এই তিনদিন, তিনরাত আপনি আপনার সম্পূর্ণ সেনাদল নিয়ে মন্দিরে পাহারা দেবেন। কাউকে বিশ্রামে পাঠাবেন না। মন্দির-রক্ষীবাহিনীর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কাল অথবা পরশু আমি আবার সম্রাটের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাব। মহাসৈনাধ্যক্ষ উগ্রায়ুধের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করব। যাতে তিনি এখানে এক বৃহৎ সেনাদল মোতায়েন করেন কিছুদিনের জন্য।
মন্দির-রক্ষীবাহিনীর লোকটার মৃত্যু, কৃষ্ণবানরদের মুক্তি জানান দিচ্ছে আপনার এই ক্ষুদ্র সেনাদল বা মন্দির-রক্ষীবাহিনী এই মন্দিরের নিরাপত্তার পক্ষে যথেষ্ট নয়। তাছাড়া ভাস্কর-মজুরদের থাকার জায়গাতেও সৈনিকবাহিনী মোতায়েন করতে হবে। সৈন্যদের বড় দলটা চলে এলে আপনাদের ছুটি। আমি উগ্রায়ুধকে জানাব যে আপনার পদোন্নতি ঘটিয়ে নগরীর সেনাদলে সংযুক্ত করতে। তবে এই শেষ ব্যাপারটা নির্ভর করছে আগামী তিনদিন আপনার কর্মকুশলতার ওপর।’
রাহিল হঠাৎ তাঁকে প্রশ্ন করে ফেলল, ‘সুরসুন্দরীদের নতুন দল তো আসবে। যারা আছে তাদের কী করা হবে? মুক্তি দেওয়া হবে নাকি আবার দাসের হাটে বিক্রি করা হবে?’ প্রশ্নটা করা উচিত না হলেও মিত্রার কথা ভেবে প্রশ্নটা বেরিয়ে গেল তার মুখ থেকে।
অনুদেবের ঠোঁটের কোণে অস্পষ্ট হাসি ফুটে উঠল। তিনি প্রথমে বললেন, ‘ওদের সম্পর্কে আপনার বেশ আগ্রহ দেখছি!’
তারপর একটু থেমে বললেন, ‘বিক্রি করে দেবার ইচ্ছাই ছিল। কিন্তু বাধ সাধলেন স্বয়ং সম্রাট বিদ্যাধর। ওদের বিক্রি করা হবে না। সম্রাট বিদ্যাধরের অপার করুণা। তিনি ওদের মুক্তি দেবেন। ওদের কাউকেই আর ক্রীতদাসীর জীবন কাটাতে হবে না।’
খবরটা শুনেই খুশিতে নেচে উঠল রাহিলের মন। মুক্তি পেতে চলেছে মিত্রা। খবরটা পৌঁছে দিতে হবে তার কাছে। কিন্তু সে তার মনের ভাব গোপন রেখে প্রধান পুরোহিতকে বলল, ‘আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, এ তিনদিন আমি ও আমার সেনারা সর্বত্র সজাগ দৃষ্টি রেখে চলব।’
স্মিত হাসলেন অনুদেব। সম্ভবত তিনি সন্তুষ্ট হলেন রাহিলের কথায়। তবে তার কপালের ভাঁজ কমল না।
মন্দিরের সামনের অংশে আবার একটা শোরগোল উঠল। রাহিলরা অনুমান করল আবার নিশ্চই সে অংশে কৃষ্ণবানরের দেখা মিলেছে। চিত্রবান এবার অনুদেবকে বললেন, ‘ওই কৃষ্ণবানরদের নিয়ে কী করা হবে? বর্তমানে যে সুরসুন্দরীদের মূর্তি রচনা হচ্ছে তার বাকি কাজ নয় বদ্ধকক্ষে শেষ করা গেল। কিন্তু আবারও নতুন দল আসবে। তাদের নিয়ে নতুন মূর্তি নির্মাণ করবে ভাস্কররা। ওভাবে বদ্ধকক্ষে কাজ করা তো অসুবিধাজনক। সূর্যালোকে তাদের অঙ্গসৌষ্ঠব যেভাবে ভাস্করদের চোখে ধরা দেবে তা মশালের আলোতে দেবে না। তার ওপর মিথুন-মূর্তি বা নগ্নিকা মূর্তি যাঁরা রচনা করেন তাঁরা অনেকেই বৃদ্ধ। যুবকের দৃষ্টিশক্তি তাদের নেই।’
অনুদেব বললেন, ‘প্রাণীগুলোকে হত্যা করতে হবে। ওদের ভাস্কর্য রচনা হয়ে গেছে। আর ধরে রাখার প্রয়োজন নেই। একটু পরই সন্ধ্যা নামবে। আজ আর কিছু করা যাবে না। আজকের রাতটুকু ওদের থেকে সাবধানে থাকতে হবে। কাল সকালে তিরন্দাজ আসবে। তারা শর নিক্ষেপ করে হত্যা করবে ওদের।’
কথা শেষ করে রাহিলকে আর প্রকটাক্ষকে তাদের কর্তব্যর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে অনুদেব চিত্রবান আর বিকর্নাকে নিয়ে রওনা হলেন মন্দিরের সম্মুখ ভাগে। কীভাবে রাতপাহারার ব্যবস্থা হবে তা নিয়ে সামান্য কয়েকটা বাক্যালাপ করল রাহিল আর প্রকটাক্ষ। অন্ধকার নামল কিছুক্ষণের মধ্যেই। নিজের সৈন্যবাহিনীকে প্রথমে একত্রিত করে তাকে চারভাগে মন্দিরের চারদিকে নিয়োজিত করে রাতপ্রহরার কাজ শুরু হল। নির্বিঘ্নেই কেটে গেল সারা রাত। পুব আকাশে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করল একসময়।