Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    তিস্তাপারের বৃত্তান্ত – দেবেশ রায়

    August 29, 2025

    অদ্বৈতপ্রকাশ – ঈশান নাগর

    August 29, 2025

    পৃথিবীর ইতিহাস – দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

    August 29, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • 🔖
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    Subscribe
    সাইন ইন
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    খাজুরাহ সুন্দরী

    ঐতিহাসিক হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত এক পাতা গল্প179 Mins Read0

    ৮

    আলো ফোটার পর প্রতিদিনের মতোই নির্দিষ্ট সময় মন্দির-চত্বরে হাজির হল ভাস্কর-মজুরদের দল। কিছু সময়ের মধ্যেই চত্বরে হাজির হলেন চিত্রবান আর অনুদেব। তাঁদের সঙ্গে চারজন লোক। কাঁধে ধনুক-শর। ঘোর কৃষ্ণবর্ণ তাদের চেহারা। রক্তবর্ণের বস্ত্রের খণ্ড বাঁধা কেশরাশি, ক’টি দেশে পশুচর্ম। রাহিলের তাদের দেখে মনে হল তারা বনচারী ব্যাধ সম্প্রদায়ের অনার্য লোক হবে। তাদের হাবেভাবে, শরীরে, পরিচ্ছদে বন্যতা প্রকট হয়ে আছে। সম্ভবত অনতিদূরে বিন্ধ্যপর্বতের পাদদেশই তাদের বিচরণভূমি।

    প্রতিদিন ভোরে মজুর-শিল্পীরা মন্দিরের সামনের চত্বরে একসঙ্গে জমায়েত হয়। তেমনই এদিনও এক জায়গাতে জমায়েত হল প্রধান ভাস্কর ও স্থপতি চিত্রবানের থেকে দায়িত্ব বুঝে নেবার জন্য। প্রকটাক্ষর তত্বাবধানে চিত্রবান মজুরদের একটা বৃহৎ দলকে পাঠালেন কান্ডারীয় মন্দির ও লক্ষণ মন্দিরের মধ্যবর্তী স্থানে পতিত জমিতে কূপ খননের জন্য। বাকিদের তিনি নির্দেশ দিলেন পূর্বদিনের কার্যে নিযুক্ত হতে। তাদের কাজ বুঝিয়ে দেবার পর চিত্রবান অনুদেবের নির্দেশমতো তাদের জানালেন যে মন্দিরে কৃষ্ণবানরের দর্শন পেলে কেউ যেন শোরগোল না করে, কৃষ্ণবানরেরা যেন ভীত না হয়। এবং তাদের মন্দিরশীর্ষে দেখলে সঙ্গে সঙ্গেই যেন অবগত করা হয় তাকে।

    চিত্রবানের নির্দেশ পেয়ে নিজেদের কাজে নিযুক্ত হল মজুর-ভাস্কররা। বিকর্নাও উপস্থিত হয়েছিল অনুদেবের কাছে। শর নিক্ষেপকারী ব্যাধদের একজনকে অনুদেব বিকর্নাকে অনুসরণ করতে বললেন। একজন লোককে নিয়ে বিকর্না অন্তর্হিত হল মন্দিরের অভ্যন্তরে। একই জায়গাতে দাঁড়িয়ে রইল রাহিল, চিত্রবান, অনুদেব ও তিনজন ব্যাধ।

    কিছু সময় অতিবাহিত হবার পর রাহিল আর বিকর্না ফিরে আসতে লাগল সঙ্গে এক অবগুণ্ঠনবতী নারীকে নিয়ে। তা ছাড়া বিকর্নার হাতে এক বৃহৎ কদলী ছড়াও আছে। তারা এসে দাঁড়াল অনুদেবের সামনে। তারপর সেই নারীকে দেখিয়ে অনুদেবের কাছে জানতে চাইল, ‘সাজ কেমন হয়েছে?’

    মুহূর্তের জন্য তার অবগুণ্ঠন উন্মোচন করল সেই নারী। কিন্তু তাকে দেখে অবাক হয়ে গেল রাহিল। নারী কোথায়! এ তো পুরুষ! সেই ব্যাধ, যে বিকর্নার সঙ্গে স্থানান্তরে গেছিল। নারীবেশে, কাঁচুলি, ঘাগড়া, কৃত্রিম কেশ এমনকী পায়ে নূপুর, কণ্ঠহার ইত্যাদি আভূষণে নারীবেশে সজ্জিত করা হয়েছে তাকে। অবগুণ্ঠনরত অবস্থায় কেউ তাকে পুরুষ ভাববে না।

    অনুদেব তার দিকে ভালো করে দৃষ্টিপাত করে বললেন, ‘অতি উত্তম।’

    ঠিক সেই সময় একজন মজুর এসে খবর দিল কৃষ্ণবানরদের মন্দিরের পূর্বভাগে শীর্ষগাত্রে দেখা গেছে। সেখানে একটা তাকে ভোরের আলোতে তারা বসে আছে। খবরটা পাবার সঙ্গে সঙ্গে অনুদেব সদলবলে চললেন সেদিকে।

    সে জায়গাতে পৌঁছে রাহিলরা দেখল খবর সঠিক। মন্দিরগাত্রের বেশ উঁচু একটা তাকে উজ্জ্বল আলোতে বসে আছে সেই তিন কৃষ্ণবানর। তারা প্রায় মানুষের মতো দেখতে। আকারেও মানুষের মতো। তবে তাদের সারা দেহ ঘন কৃষ্ণবর্ণের রোমে আচ্ছাদিত।

    সে জায়গাতে পৌঁছেই অনুদেব উপস্থিত মজুরদের সরিয়ে দিলেন সে জায়গা থেকে। একজন ব্যাধ সেই কদলী ছড়া নিয়ে উঠতে শুরু করল মন্দিরগাত্র বেয়ে, তাকে ওপরে উঠতে দেখেই কৃষ্ণবানরের পুরো দলটা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে দাঁত খিঁচোতে শুরু করল। প্রকাশিত হতে লাগল তাদের তীক্ষ্ণ স্বদন্ত।

    লোকটা কিছুটা ওপরে উঠে মন্দিরগাত্রের সর্বনিম্ন তাকটাতে রাখল সেই পক্ক কদলী ছড়া। তারপর সে নীচে নেমে এল। নারীবেশী সেই ব্যাধ ঠিক সে জায়গার ঠিক নীচে মন্দিরপ্রাঙ্গণে এক প্রস্তরখণ্ডর ওপর বানরদের দিকে পিছন ফিরে বসল।

    অনুদেব, চিত্রবান, রাহিল, বিকর্না ও অপর তিনজন ব্যাধ এরপর গিয়ে আত্মগোপন করল কিছুটা তফাতে প্রাঙ্গণের একপাশে স্তম্ভ-ঘেরা মণ্ডপের আড়ালে। যেখান থেকে মন্দিরগাত্র, নীচে বসে থাকা নারী সাজে সজ্জিত সেই ব্যাধকে দৃষ্টিগোচর হয়।

    নি:স্তব্ধভাবে কেটে গেল কিছু সময়। কৃষ্ণবানরদের দৃষ্টি পড়ল সেই পক্ক কদলীগুলোর ওপর। ক্ষুধার্ত তারা। এতদিন হয়ে গেল খাদ্য জোটেনি তাদের। সতৃষ্ণ নয়নে তারা তাকাতে লাগল সেই কদলী ছরা ও নীচের প্রাঙ্গণের দিকে। তারপর খাদ্যের আকর্ষণে তারা একে একে এ-তাক ও-তাক অতিক্রম করে লাফিয়ে নামতে লাগল নীচের দিকে। তারপর সর্বনিম্ন তাকে পৌঁছে কদলী ভক্ষণ করতে লাগল।

    রাহিল খেয়াল করল তার পাশে দাঁড়ানো তিনজন ব্যাধ শর যোজনা করল তাদের ধনুকে। কিন্তু তারা শর নিক্ষেপ করল না। রাহিলের চমকিত হতে তখনও আরও কিছু সময় বাকি ছিল।

    কদলী ভক্ষণ করে চলল কৃষ্ণবানরের দল। যখন তাদের ভক্ষণ প্রায় শেষ হতে চলেছে ঠিক সেই সময় পা নাড়িয়ে নূপুরের ছমছম শব্দ করল সেই নারীবেশী পুরুষ। শব্দটা কানে যেতেই চমকে উঠে নীচে প্রাঙ্গণের দিকে তাকাল সেই কৃষ্ণবানরের দল। প্রস্তরখণ্ডর ওপর বসে থাকা সেই ছদ্মনারীকে দেখতে পেল তারা।

    প্রাঙ্গণের চারপাশে আর কেউ নেই। উদরপূর্তির পর সেই নারীকে দেখে কেমন যেন চঞ্চলতা শুরু হল কৃষ্ণবানরদের মধ্যে। তাক থেকে ঝুঁকে পড়ে তারা দেখতে লাগল তাকে।

    রাহিল এবার ব্যাপারটা অনুধাবন করল। ছমছম শব্দে আবারও একবার মল বাজাল সেই ছদ্মনারী।

    কৃষ্ণবানরের দল চারপাশে তাকিয়ে দেখে নিল অন্য কেউ কোথাও আছে কিনা। তারপর নি:শব্দে তাক ছেড়ে নীচে নামল এক কৃষ্ণবানর। তারপর অন্য দুজনও। লক্ষ্য স্থির করে নিয়েছে তারা। উদরতৃপ্তির পর তাদের যৌনতৃপ্তি মেটাবে ওই নারী। কিছুটা তফাতে তফাতে তারা সন্তর্পণে এগোতে থাকল তাদের দিকে পিছন ফিরে বসে থাকা সেই নারীর দিকে।

    ঠিক এই সময় পাশ থেকে ধনুকের ছিলা টানার শব্দ হল। তিনটে শর একসঙ্গে ছুটে গেল সামনের দিকে। প্রথম কৃষ্ণবানর যখন লাফ দিল নারীদেহ লক্ষ্য করে, ঠিক তখনই তার পাঁজরে শর গিয়ে বিঁধল। বীভৎস চিৎকার করে উঠল প্রাণীটা। অপর দুটো শর লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে পাথুরে দেওয়ালে আঘাত পেয়ে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ তুলল।

    পশ্চাদগামী কৃষ্ণবানর দুটো আতঙ্কিত হয়ে প্রাঙ্গণ পেরিয়ে অন্যদিকে ছুটলেও প্রথম বানরটা শরবিদ্ধ অবস্থাতেই গিয়ে পড়েছে সেই ছদ্মনারীর ওপর। প্রচণ্ড ঝটাপটি শুরু হল তাদের দুজনের মধ্যে। ব্যাধ আর কৃষ্ণবানরের আর্তনাদে সচকিত হয়ে উঠল প্রাঙ্গণ।

    ব্যাধের দল ছুটল সেই মরণ আলিঙ্গনরত মানব আর অবমানবের দিকে।

    কিছুটা তফাতে দাঁড়িয়ে তারা দেখতে লাগল সেই লড়াই। আর শর নিক্ষেপের উপায় নেই। কারণ সেই শরের আঘাত লাগতে পারে লোকটার দেহেও। কিছু সময়ের মধ্যেই অবশ্য লড়াই থেমে গেল। মাটিতে রক্তস্রোতের মধ্যে পড়ে রইল নিশ্চল দুটো দেহ।

    রাহিলরা কাছে গিয়ে দেখল শরের আঘাতে কৃষ্ণবানরের মৃত্যু হয়েছে ঠিকই, কিন্তু মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে তার স্বদন্ত ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে নারীবেশী ব্যাধের কণ্ঠদেশ। মৃত্যুর আগে সেই কৃষ্ণবানর শাস্তি দিয়ে গেছে প্রতারককে। মৃত প্রাণীটার দিকে কাছ থেকে বিস্মিতভাবে তাকাল রাহিল। অবিকল যেন মানুষের মতো চেহারা তার। মুখমণ্ডলে আছে মানুষের মতো ঝোলা গোঁফ আর দাড়ি। তবে তার মুখমণ্ডল বীভৎস রূপ ধারণ করেছে। মুখগহ্বরের ভিতর থেকে উঁকি দিচ্ছে তীক্ষ্ণ স্বদন্ত। মানুষের যা থাকে না।

    প্রাণীটার দেহের যে জিনিসটা রাহিলের সবথেকে বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করল তা হল তার দীর্ঘ শিশুদেশ। তখনও দণ্ডায়মান সেই শিশুদেশ যেন নিষ্ফল আক্ষেপে কেঁপে চলেছে! নারী-যোনি-লোভী কামুক কৃষ্ণবানরের শিশু! মৃত কৃষ্ণবানরের অপর দুই সঙ্গী তখন মন্দিরপ্রাঙ্গণ, নীচের চত্বর অতিক্রম করে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে অনতিদূরে বনের গভীরে। রাহিল খেয়াল করল বিকর্না অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মৃত অবমানবের সেই দণ্ডায়মান শীষ্ণের দিকে।

    ব্যাধের দল ভাবতে পারেনি তাদের সঙ্গী নিহত হবে এভাবে। কিছুক্ষণ মৃত সঙ্গীর দিকে তাকিয়ে থেকে তারা মন্দির ছেড়ে রওনা হল বনের দিকে হত্যাকারী দুই বানরকে নিধনের জন্য।

    অনুদেব বললেন, ‘ব্যাধেরা বানর দুটোকে হত্যা করতে পারুক আর না পারুক তারা আর মন্দিরে আসবে বলে মনে হয় না। তবুও সাবধানে থাকতে হবে।’

    মৃত ব্যক্তি আর বানরের আর্ত চিৎকারে সেখানে উপস্থিত হয়েছিল কিছু মজুর। অনুদেব তাদের মৃতদেহ দুটোকে মন্দির-প্রাঙ্গণ থেকে দূরে স্থানান্তরের নির্দেশ দিলেন। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি মন্দির ত্যাগ করে রওনা হলেন সেখানে, যেখানে কূপ খনন করছে মজুরদের অন্য দল। বিকর্নাও তার সঙ্গী হল।

    তারা চলে যাওয়ার পর রাহিলের মনে হল মাহবা নিশ্চই মন্দিরের অভ্যন্তরে কোনও কক্ষে মিত্রার মূর্তি নির্মাণ করছেন। সেখানে মিত্রার উপস্থিতিও অসম্ভব নয়। কথাটা মাথায় আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রহরার অছিলায় রাহিল প্রবেশ করল মন্দিরের অন্ত:পুরে। মন্দিরের ভিতর এক নির্জন কক্ষেই রাহিল পেয়ে গেল মাহবাকে।

    মিত্রার মূর্তি নির্মাণের কাজ প্রায় শেষের পথে। মশালের আলোতে বৃদ্ধ ভাস্কর মাহবা তার বলিরেখাময় মুখ তুলে চাইলেন রাহিলের দিকে। ঠোঁটের কোণে তার আবছা হাসি ফুটে উঠল। রাহিল মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বা:, নির্মাণকার্য তো প্রায় সম্পন্ন করে ফেলেছেন! একেবারে জীবন্ত লাগছে মূর্তিটাকে!’

    বৃদ্ধ জবাব দিলেন, ‘গতকাল সারাদিন, সারারাত ধরে কাজ করেছি। আর একবার শুধু মিত্রাবৃন্দাকে এসে দাঁড়াতে হবে। আশা করছি আগামী কাল রাতের মধ্যেই আমার এই নির্মাণকাজ সম্পন্ন হবে।’

    এ কথা বলার পর তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি কি এখানে প্রস্তর মূর্তির সন্ধানে এসেছেন? নাকি রক্তমাংসর মূর্তির?’

    বৃদ্ধ ভাস্করের কথার ইঙ্গিত বুঝতে অসুবিধা হল না রাহিলের। এরপর তিনি বললেন, ‘মূর্তি নির্মাণের প্রথম দিন আপনি এসে দাঁড়াতেই কেঁপে উঠেছিল মিত্রাবৃন্দা। পদ্মকোরক খসে পড়েছিল তার কবরীবন্ধন থেকে। ব্যাপারটা আমি খেয়াল করেছি।’—এ কথা বলার পর কৌতুকের ভাব ফুটে উঠল তার বলিরেখাময় মুখে।

    রাহিল বুঝতে পারল এই বৃদ্ধর চোখকে ফাঁকি দিতে পারেনি সে। একটু ইতস্তত করে সে বলল, ‘মিত্রাবৃন্দাকে একটা সংবাদ দিতে এসেছিলাম, ভাবলাম হয়তো সে এখানে আছে। আপনার সঙ্গে দেখা হলে আপনিও সে সংবাদ তাকে দিতে পারেন।’

    ‘কী সংবাদ?’

    রাহিল বলল, ‘প্রধান পুরোহিত সম্রাটের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তিনি জানালেন সুরসুন্দরীদের আর দাসব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রয় করা হবে না। সম্রাট নাকি তাদের মুক্তি দিতে বলেছেন। সম্ভবত অমাবস্যার দিন, অর্থাৎ আর দু-দিনের মধ্যেই মুক্তি পাবে মিত্রাবৃন্দা।’

    তার কথা শুনে মাহবা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন তার দিকে। তারপর বললেন, ‘এ কথা আমি বিশ্বাস করি না।’

    রাহিল বলল, ‘অনুদেব আমাকে নিজ মুখে জানিয়েছেন এ কথা।’

    মাহবা বললেন, ‘মিত্রাবৃন্দা যদি মুক্তি পায় তবে আপনি কী করবেন তাকে নিয়ে? দাসী বানাবেন?’

    রাহিল জবাব দিল, ‘না, দাসী নয়, আমার সামান্য কিছু সঞ্চয় আছে, ইচ্ছা আছে সে সঞ্চয় দিয়ে তাকে নিয়ে ঘর বাঁধার। যুদ্ধব্যবসায়ীর পেশা আর ভালো লাগছে না আমার।’

    এ কথা বলার পর সে বলল, ‘আপনার সঙ্গে হয়তো আর দু-তিনদিন পর আর আমার সাক্ষাৎ হবে না। অনুদেব জানিয়েছেন আর দু-তিন দিনের মধ্যেই তিনি এক বৃহৎ সেনাদল আনয়ন করবেন এখানে। তারপর সম্ভবত আমার আর আমার ক্ষুদ্র সেনাদলের ছুটি হয়ে যাবে। সেনাদল আসার ব্যাপারে কথা বলার জন্য সম্ভবত আগামীকাল প্রধান পুরোহিত অনুদেব মহাসৈনাধ্যক্ষ উগ্রায়ুধের সঙ্গে পরামর্শ করতে যাবেন।’

    রাহিলের কথাগুলো শুনে এবার স্পষ্টতই চমকে উঠে বৃদ্ধ জানতে চাইলেন, ‘বৃহৎ সৈন্যদল আনয়ন করা হচ্ছে কেন?’

    রাহিল উত্তর দিল, ‘শিল্পী-মজুরদের বাসস্থানের ওপর নজর রাখা ও মন্দিরের নিরাপত্তা আরও সুদৃঢ় করার জন্য। পাথরচাপা পড়ে লোকটার মৃত্যু, কৃষ্ণবানরদের মুক্ত হওয়া—এসব ঘটনা সম্ভবত কোনও সন্দেহর উদ্রেক ঘটিয়েছে প্রধান পুরোহিতের মনে।’

    মাহবা সামান্য কিছু সময় ভেবে নিয়ে বললেন, ‘সৈন্যবাহিনীর আগমন, কূপ খনন কেমন যেন অশুভ ইঙ্গিত দিচ্ছে আমার মনে। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে কেমন যেন দুর্বিপাক নেমে আসতে চলেছে মন্দিরে। তার থেকে রক্ষা পাবে না সুরসুন্দরীরাও। আপনি এসবের পিছনে প্রধান পুরোহিতের প্রকৃত উদ্দেশ্য, সম্রাটের প্রকৃত উদ্দেশ্য জানার চেষ্টা করুন।’

    রাহিল বলল, ‘এ প্রসঙ্গে অনুদেব বা চিত্রবানকে প্রশ্ন করা সম্ভব নয়।’

    মাহবা বললেন, ‘চিত্রবানকেও সম্পূর্ণ বিশ্বাস করেন না অনুদেব। বিকর্না কাল নগরীতে অনুদেবের সঙ্গী হয়েছিল। সে কিছু জানলে হয়তো আপনাকে জানাতে পারে।’

    রাহিল বিস্মিতভাবে বলে উঠল, ‘সে আমাকে এ কথা বলবে কেন?’

    একটু চুপ করে থেকে মাহবা উত্তর দিলেন, ‘সে অনুদেবের প্রতি আসক্ত ছিল। দুজনের মধ্যে একটা সম্পর্ক ছিল। কিন্তু অনুদেব প্রত্যাখ্যান করেছে তাকে। আমি গতকাল আড়াল থেকে তাদের বাদানুবাদ শুনেছি। অনুদেব তাকে সতর্ক করেছেন যদি এ সম্পর্ক কারো কাছে প্রকাশ পায় তবে তিনি তার মৃত্যুদণ্ড দেবেন।’

    রাহিল চমকে উঠে বলল, ‘কিন্তু বিকর্না তো নারী নয়, বৃহন্নলা! কে কীভাবে আসক্ত হবে?’

    মাহবা বললেন, ‘বৃহন্নলা হলেও প্রতিটা মানুষের মতো তার মনে রক্তেও যৌনতা আছে। স্বাভাবিক নারী-পুরুষের মতো সে মিলিত হতে পারে না বলেই তার যৌন আকাঙ্ক্ষা আরও তীব্র। আর অনুদেবের কাম- লালসাও কম তীব্র নয়। তাদের দুজনের কথা শুনে বুঝেছি তিনি যৌনক্রীড়া করেছিলেন বিকর্নার সঙ্গেও। বিকর্না নিজেকে নারীরূপে কল্পনা করে। আমার অনুমান অনুদেব বর্তমানে আপনার প্রেয়সীর প্রতি আকর্ষণ বোধ করছেন।’

    রাহিল জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, মিত্রা আমাকে সে কথা জানিয়েছে।’

    মাহবা বললেন, ‘তাহলে জানবেন মিত্রাবৃন্দার মুক্তি সম্ভব নয়।’

    এ কথা শুনে রাহিল কী একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই কাছে একটা পদশব্দ শোনা গেল। বৃদ্ধ ভাস্কর সে শব্দ শুনে বললেন, ‘এবার আপনি যান। কাল অনুদেব নগরীতে যাত্রা করলে কর্মোপলক্ষ্যে মিত্রাবৃন্দাকে আমি এ-কক্ষে আনব। কাল ঠিক দ্বিপ্রহরে আপনি এ-কক্ষে আসবেন।’

    তার কথা শুনে রাহিল সে কক্ষ ছেড়ে, মন্দিরের অন্ত:পুর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এল।

    মাহবার সঙ্গে আলাপচারিতার পর বুকের মাঝে কেমন যেন কম্পন অনুভূত হতে লাগল রাহিলের। তাহলে কি মুক্তি পাবে না মিত্রাবৃন্দা? কার কথা ঠিক, অনুদেবের নাকি মাহবার? এ কথা ভাবতে ভাবতে মন্দির-প্রাঙ্গণ পরিক্রমা শুরু করল রাহিল।

    সে দেখতে পেল একসময় বিকর্না আর অনুদেব ফিরে এল। বিকর্না চলে গেল অন্ত:পুরের দিকে আর অনুদেব চিত্রবানকে সঙ্গে নিয়ে মন্দির-চত্বরে কাজের তদারকি করতে লাগলেন। বিকালবেলা মন্দির-প্রাঙ্গণে ফিরে এল সেই ব্যাধের দল।

    তারা জানাল যে জঙ্গলে তারা সন্ধান পায়নি কৃষ্ণবানরদের। অনুদেব তাদের নির্দেশ দিলেন পরদিনও জঙ্গলে একই কাজে নিযুক্ত থাকতে। তার নির্দেশ শুনে ব্যাধের দল প্রাঙ্গণ ছেড়ে নীচের চত্বর থেকে তাদের সঙ্গীর মৃতদেহ নিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। অনুদেবও কিছুক্ষণের মধ্যে মন্দির ছাড়লেন।

    মন্দির-প্রাঙ্গণের এক জায়গায় দাঁড়িয়েছিলেন প্রধান ভাস্কর চিত্রবান। দূরে পর্বতশ্রেণির আড়ালে সূর্য অস্ত গেছে। সেদিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছিলেন তিনি। রাহিলের কেন জানি মনে হল যে শেষবিকালের আলোতে কেমন যেন বিষণ্ণতা ধরা পড়েছে তার মুখে।

    রাহিল তার সামনে গিয়ে বলল, ‘সারাদিন মন্দির পরিভ্রমণ করলাম। গতকাল রাতের দুর্ঘটনা আর আজ সকালে কৃষ্ণবানরের হাতে ব্যাধের মৃত্যু ঘটেছে ঠিকই, কিন্তু মূর্তি নির্মাণ, মন্দির নির্মাণের কাজ ঠিকঠাকই চলছে বলে মনে হয়।’

    চিত্রবান মৃদু হেসে সংক্ষিপ্ত জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ।’

    রাহিল এরপর জানতে চাইল, ‘কূপ নির্মাণের কাজ কেমন চলছে?’

    চিত্রবান যেন মৃদু চমকে উঠে জবাব দিলেন, ‘ভালো।’ তারপর রাহিলকে বিদায় জানিয়ে মন্দির-প্রাঙ্গণ ত্যাগ করলেন।

    রাহিল এবার হাঁটতে শুরু করল অন্যদিকে। প্রাঙ্গণের যে অংশে সুরসুন্দরীদের দল অন্যদিন গোলক নিয়ে ক্রীড়ারত থাকে সে জায়গায় একসময় উপস্থিত হল রাহিল। সে জায়গা শূন্য। অনুদেবের নির্দেশে বাইরে বেরোনো নিষিদ্ধ হয়েছে সুরসুন্দরীদের। সে স্থান পেরিয়ে রাহিল সেই বাঁক অতিক্রম করে এসে দাঁড়াল সে জায়গায়, যেখানে সে প্রতীক্ষা করত মিত্রাবৃন্দার। সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল রাহিল।

    এর কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্ধকার নামল। সৈন্যরা মন্দিরের প্রত্যেক কোণে মশাল জ্বালাতে লাগল। প্রস্তুত হতে লাগল নৈশপ্রহরার জন্য। রাহিল যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানে এসে কাছেই এক স্তম্ভর গায়ে একটা মশাল গুঁজে দিয়ে গেল রাহিলের সৈন্যদলেরই একজন।

    চাঁদ উঠল একসময়। কিন্তু নখরের ফালির মতো চাঁদ। কোনও দীপ্তি নেই তাতে। আর একদিন পরই তো অমাবস্যা।

    একই জায়গাতে দাঁড়িয়ে মিত্রাবৃন্দার কথাই ভাবছিল রাহিল। সে এখন কী করছে? এই অন্ধকার মন্দিরের অন্ত:পুরে বসে সে হয়তো রাহিলের কথাই ভাবছে, স্বপ্ন দেখছে মুক্তির, রাহিলের সঙ্গে ঘর বাঁধার। তার কি স্বপ্ন পূরণ হবে? এসব কথা ভাবছিল রাহিল। হঠাৎ নূপুরের ছমছম শব্দ শুনল সে। তবে কি মিত্রা হাজির হল? ফিরে তাকাল রাহিল। না, মিত্রা নয় বিকর্না। সে এসে দাঁড়াল রাহিলের সামনে।

    রাহিল তাকাল তার অঙ্গসজ্জার দিকে। স্তম্ভগাত্রে প্রাোথিত মশালের আলো এসে পড়েছে তার গায়ে। বিকর্নার পরনে রেশমের বক্ষাবরণী আর ঘাগড়া। কণ্ঠে চন্দ্রহার, বাহুতে বাজুবন্ধনি আর হীরকখোচিত স্বর্ণবলয় ঝিলিক দিচ্ছে মশালের আলোতে। পায়ে তার নূপুরের ছমছম শব্দ। তাম্বুলে রঞ্জিত তার ওষ্ঠাধার, কবরীতে গোঁজা ফুলমালা।

    বিকর্নার বক্ষদেশ আজ যেন অনেক উন্নত বলে মনে হল রাহিলের। বক্ষ বিভাজিকাও প্রকট। হয়তো বা কৃত্রিমভাবে কোনও কৌশলে সে উন্নত করেছে তার বক্ষ। হঠাৎ সেই বক্ষের দিকে তাকালে তাকে নারী বলে ভ্রম হতে পারে। নারীবেশে সজ্জিত বিকর্না।

    বিকর্না হাসল রাহিলের দিকে চেয়ে, রাহিলও মৃদু হাসল তার উদ্দেশ্যে।

    বিকর্না বলল, ‘আমাকে কেমন দেখতে লাগছে আজ?’

    রাহিল জবাব দিল, ‘সুন্দর।’

    বিকর্না জানতে চাইল, ‘সুরসুন্দরীদের মতো?’ যথাসম্ভব কোমল স্বরে প্রশ্ন করল সে।

    রাহিলের হঠাৎ মনে পড়ে গেল ভাস্কর মাহবার কথা। হয়তো বৃহন্নলা বিকর্না খোঁজ দিতে পারে প্রধান পুরোহিত অনুদেবের ভাবনার কথা।

    তাই সে হেসে জবাব দিল, ‘অনেকটা তাই।’

    বিকর্না জানতে চাইল, ‘সত্যি?’

    রাহিল মনের ভাব গোপন করে বলল, ‘হ্যাঁ। সত্যি।’

    বিকর্না খুশি হল তার কথা শুনে। সে বলল, ‘তুমি আগেও জানিয়েছ এ কথা।’

    এরপর বিকর্না জানতে চাইল, ‘এখানে একলা দাঁড়িয়ে তুমি কী ভাবছ?’

    রাহিল জবাব দিল, ‘আর দু-দিনের মধ্যে সম্ভবত তোমাদের এই মন্দির ছেড়ে আমাকে চলে যেতে হবে। নতুন সেনাদল নিয়োজিত হবে। সেসব কথাই ভাবছি।’

    বিকর্না প্রথমে বলল, ‘হ্যাঁ, আমি জানি সে কথা।’ তারপর একটু ভেবে নিয়ে সে বলল, ‘তোমাকে এ মন্দিরের এক গোপন জিনিস দেখাব আমি।’

    বিস্মিত রাহিল জানতে চাইল, ‘কী জিনিস?’

    বৃহন্নলা বিকর্না বলল, ‘গোপন ব্যাপার। তুমি মন্দির পরিত্যাগ করার আগে আমি তা দেখাব তোমাকে। চত্বর ছেড়ে মন্দিরের পশ্চাতভাগ দিয়ে নীচে নামতে হবে সে জন্য। তুমি আমাকে অনুসরণ করো।’ এই বলে সে এগোল সেদিকে যাবার জন্য।

    রাহিল একটু ইতস্তত করে অনুসরণ করল তাকে।

    অন্ধকার মন্দির-প্রাঙ্গণ। সেখানে শুধু মশাল হাতে প্রহরারত সৈনিকরা। তারা রাহিল আর বিকর্নাকে দেখে কোনও সন্দেহ প্রকাশ করল না। ভাবল তারা কোনও অনুসন্ধান বা কর্মোপলক্ষ্যে একসঙ্গে কোথাও গমন করছে। রাহিলরা মন্দির-ভিত ছেড়ে নীচে নামার পর তাদের দেখে একই ধারণা হল মন্দির-রক্ষীবাহিনীরও। তারা কেউ কোনও প্রশ্ন করার ঔদ্ধত্য দেখাল না।

    বিকর্না তাকে নিয়ে হাজির হল মন্দির-প্রাঙ্গণের নীচে দক্ষিণ কোণে। জায়গাটা অন্ধকারাচ্ছন্ন। কেউ কোথাও নেই। বিকর্না চারপাশে একবার তাকিয়ে নিয়ে মন্দির-ভিতের এক জায়গাতে সজোরে ধাক্কা দিতেই পাথরটা সরে গিয়ে উন্মোচিত হল এক সুড়ঙ্গ। সেটা দেখিয়ে বিকর্না রাহিলকে বলল, ‘ভয় নেই। আমার সঙ্গে এই পাতালকক্ষে প্রবেশ করো।’

    বিস্মিত রাহিল তাকে অনুসরণ করে প্রবেশ করল সেই অন্ধকার পথে। সে পথ ঢালু হয়ে নেমে গেছে নীচের দিকে। অন্ধকারে রাহিল কিছু দেখতে পাচ্ছে না। সংকীর্ণ সুড়ঙ্গে সে এগিয়ে চলল বিকর্নার নূপুরের শব্দ অনুসরণ করে।

    বিকর্না একসময় থামল। অন্ধকার দেওয়ালের কুলুঙ্গি থেকে খুঁজে বার করল একটা মশাল। চকমকি পাথর ঘসে মশাল প্রজ্বলিত করল সে। রাহিল দেখতে পেল সে এক ভূগর্ভস্থ কক্ষে দাঁড়িয়ে আছে।

    বিকর্না তাকে বলল, ‘এ কক্ষ আমি আবিষ্কার করেছি। ওই দেখো—’

    রাহিল তার দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখল সেই কক্ষের এক কোণে রক্ষিত আছে এক স্বর্ণকলস। আর সেই কলসের সঙ্গে শৃঙ্খলবদ্ধ অবস্থায় আছে এক ক্ষুদ্র নরকরোটি! স্বর্ণকলসটি বসানো আছে এক বিশাল স্তম্ভের গায়ে।

    বিকর্না এগিয়ে গেল স্তম্ভের গায়ে সেই কলসের সামনে। তার সঙ্গে গিয়ে দাঁড়াল রাহিলও।

    স্তম্ভটা দেখিয়ে বিকর্না বলল, ‘এই স্তম্ভ হল কান্ডারীয় মন্দিরের প্রধান চারটি স্তম্ভর একটি। যাদের ওপর দাঁড়িয়ে আছে মন্দির। এই ক্ষুদ্র মুণ্ড এক বালকের, যাদের বলি দেওয়া হয়েছিল মন্দিরে ভিত্তি স্থাপনের সময়, আর এই সেই কলস যা উৎসর্গ করা হয়েছিল মন্দিরের নামে।’—এ কথা বলে বিকর্না উন্মোচিত করল সেই কলসের মুখের আচ্ছাদন।

    হঠাৎই যেন আলোকিত হয়ে উঠল সেই কক্ষ। আলোক বিচ্ছুরিত হল সেই কলস থেকে। হীরকখণ্ড, পদ্মরাগ মণি, মরকত মণির ঔজ্জ্বল্যে ভরে উঠল সেই কক্ষ। এক কলস দুর্মূল্য রত্ন!

    বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে উঠে রাহিল বলল, ‘এত সম্পদ মন্দির নির্মাণকল্পে উৎসর্গ করা হয়েছে! এত সম্পদ দিয়ে তো একটা রাজ্য ক্রয় করা যায়!’

    বিকর্না বলল, ‘হ্যাঁ, তাই। তবে মন্দিরের নামে উৎসর্গকৃত হলেও আসলে এ সম্পদ কৌশলে মন্দিরে লুক্কায়িত রেখেছেন সম্রাট। যাতে দৈব- দুর্বিপাকে এ সম্পদ কাজে আসে সম্রাটের। কলচুরিরা কোনও সময় সম্রাট বিদ্যাধরকে পরাজিত করে রাজকোষ লুণ্ঠন করলেও খোঁজ পাবে না এ সম্পদের।’

    বিকর্নার কথা শুনে এবার ব্যাপারটা অনুধাবন করল রাহিল।

    কিন্তু এরপর বিকর্নার কথা শুনে চমকে উঠল রাহিল। সে বলল, ‘এ সম্পদ আমাদের দুজনের হতে পারে। তুমি চাইলে এ কলস নিয়ে এ রাজ্য ছেড়ে আমরা অনেক দূরে চলে যাব। শুনেছি, চম্বা রাজ্যে বৃহন্নলারা গার্হস্থ্য জীবন পালন করে নারী অথবা পুরুষ রূপে। সেখানেই যাব আমরা।’

    বিকর্নার প্রস্তাব শুনে রাহিল এতটাই চমকে গেল যে সে কোনও জবাব দিতে পারল না।

    বিকর্না আবারও বলল, অমাবস্যার অন্ধকার রাতে আমরা এ কলস নিয়ে মন্দির ত্যাগ করব। ব্যাপারটা কেউ জানতেই পারবে না যতদিন না সম্রাট এই সম্পদ উদ্ধার করতে আসেন।

    রাহিল এরপর জবাব দিল, ‘আমি যুদ্ধ ব্যবসায়ী। চৌর্য্যবৃত্তি আমার পেশা নয়। যুদ্ধক্ষেত্রে আমি শত্রুকে হত্যা করি ঠিকই, কিন্তু তা দেশরক্ষার জন্য, সীমান্ত রক্ষার জন্য। এ কাজ করলে পাপ হবে, অন্যায় হবে।’

    বিকর্না বলে উঠল পাপ কি শুধু আমার তোমার হয়? সম্রাটের হয় না? অনুদেবের হয় না? এই যে অনুদেব আমাকে প্রতারিত করলেন, সম্রাটের নির্দেশে কূপ খনন করাচ্ছেন তাতে পাপ হবে না? অপরাধ হবে না?

    বিকর্না কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গেই রাহিল বলে উঠল, ‘কূপ খননের সঙ্গে পাপের সম্পর্ক কী?’

    রাহিলের কথা শুনে একটু চুপ করে গেল বিকর্না। সে বুঝতে পারল আবেগের বশে সে একটা বেফাঁস কথা বলে ফেলেছে। কিন্তু সে এ-ও বুঝল যে আর কিছু করার নেই। কারণ সে এই গুপ্তভাণ্ডার দেখিয়ে ফেলেছে রাহিলকে। এখন তাকে তার বিশ্বাস করতে হবে।

    সে বলল, ‘সম্রাট চান না যে এই সুরসুন্দরীদের মূর্তি অপর কেউ নির্মাণ করুক। হয়তো কোনও বিত্তশালী ক্রয় করল এদের, অথবা কলচুরিরা কোনওদিন এদের কাউকে ধরে নিয়ে গেল, তারপর এদের ভাস্কর্য তারা নির্মাণ করল কোথাও। তাতে নষ্ট হবে কান্ডারীয় মন্দিরের গরিমা। সম্রাট চান একমেবদ্বিতীয়ম হবে এই মন্দির। এ মন্দিরের কোনও অলঙ্করণ, কোনও ভাস্কর্য অন্য কোনও মন্দিরে থাকবে না। তাই…।’ থেমে গেল বিকর্না।

    উত্তেজিত রাহিল বলে উঠল, ‘তাই কী? থামলে কেন?’

    বিকর্না জবাব দিল, ‘তাই অমাবস্যার রাতে অথবা পরদিন প্রত্যুষে ওই কূপে নিক্ষেপ করে মাটি চাপা দেওয়া হবে সুরসুন্দরীদের। এক জায়গাতে থাকার কারণে কোনও ভাস্কর, মজুর এমনকী তোমার কোনও সৈনিকের সঙ্গেও সুরসুন্দরীদের কারও কারও সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে। সুরসুন্দরীদের কূপে নিক্ষেপ করার কাজে যাতে কোনও বাধা সৃষ্টি না হয় তাই প্রধান পুরোহিত বৃহৎ সৈন্যবাহিনী আনয়ন করতে চলেছেন।

    চমকে উঠল রাহিল। তার পায়ের নীচে মাটি টলে উঠল।

    বিকর্না এরপর রাহিলের বাহু আলিঙ্গন করে করুণ কণ্ঠে বলতে লাগল, ‘তোমাকে এত গোপন কথা জানালাম, তুমি আমাকে প্রতারিত কোরো না। এ সম্পদ নিয়ে আমরা অনেক দূরে চলে যাব। আমি যৌনক্রীড়ায় পারদর্শী। যে সুখ আমি তোমাকে দেব সে সুখ অন্য কোনও নারী তোমাকে দিতে পারবে না। প্রয়োজনে আমি রূপসি নারী ক্রয় করব তোমার জন্য। আমাকে প্রত্যাখ্যান কোরো না তুমি…’

    রাহিলের কানে প্রবেশ করছে না বিকর্নার কাতর আহ্বান। তার চোখে শুধু ভেসে উঠছে মিত্রাবৃন্দার মুখ। একটু ধাতস্থ হবার পর রাহিল বিকর্নার হাতটা খসিয়ে নিল তার দেহ থেকে। বিকর্নার উদ্দেশ্যে সে শুধু বলল, ‘তোমার বক্তব্য গোপন থাকবে অনুদেবের কাছে।’—এই বলে সে দ্রুত পা বাড়াল ভূ-গর্ভস্থ সেই কক্ষ ছেড়ে বাইরে বেরোবার জন্য। পিছনে পড়ে রইল বিকর্নার হাহাকার—’দোহাই সৈনিক আমাকে তোমার সঙ্গিনী করো, এ অভিশপ্ত জীবন থেকে মুক্ত করো আমায়…’

    মন্দির-প্রাঙ্গণে উঠে এল রাহিল। তাকে ভাস্কর মাহবার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ব্যাপারটা জানাতে হবে। সে যদি কোনওভাবে মুক্তির উপায় বাতলাতে পারে মিত্রাবৃন্দার। মন্দির-চত্বরে মশাল হাতে প্রহরা দিচ্ছে সৈনিকরা। রাহিলের নির্দেশে সতর্ক তারা। তাদের পাদুকার লোহার নালের শব্দ হচ্ছে মন্দির-প্রাঙ্গণে।

    রাহিলকে ব্যগ্রভাবে মন্দিরের অন্ত:পুরের দিকে এগোতে দেখে এক সৈনিক তাকে প্রশ্ন করল, ‘সৈনাধ্যক্ষ, কোনও ঘটনা ঘটেছে কি?’

    রাহিল থমকে দাঁড়িয়ে মৃদু হেসে জবাব দিল, ‘না, তেমন কোনও ঘটনা ঘটেনি। তবে আপনারা যেমন মন্দিরের বহির্দেশে প্রহরারত তেমনই মন্দিরের অন্ত:পুরও দেখে আসা প্রয়োজন। তাই মন্দিরের ভিতরটা দেখতে যাচ্ছি। মন্দিরের বহিরাংশে আপনারা সতর্কভাবে প্রহরার কাজে নিয়োজিত থাকুন।’

    রাহিলের কথা শুনে সে সৈনিক বলল, ‘হ্যাঁ, সৈনাধ্যক্ষ, এ ব্যাপারে আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আমাদের কর্তব্যে কোনও গাফিলতি হবে না।’

    রাহিল প্রবেশ করল মন্দিরের অন্ত:পুরে। সে প্রথম উপস্থিত হল মাহবার কাজের জায়গাতে সেই কক্ষে। মশালের ক্ষীণ আলোতে সে-কক্ষে একলা দাঁড়িয়ে আছে মিত্রাবৃন্দার মূর্তি। ভাস্কর মাহবা সেখানে নেই। কোথায় গেলেন তিনি?

    নিস্তব্ধ মন্দিরের অন্ত:পুর। কোথাও কোনও শব্দ নেই। কক্ষগুলোর অভ্যন্তরে খেলা করছে জমাটবাঁধা অন্ধকার। অন্ত:পুরের যে অংশে সুরসুন্দরীদের আবাস সেদিক থেকেও কোনও শব্দ আসছে না। অন্ধকার নামার সঙ্গে সঙ্গে হয়তো তারা ঘুমিয়ে পড়েছে। তাদের নিয়ে ভাস্করদের কাজ প্রায় শেষ। হয়তো আর একটা দিন তাদের দাঁড়াতে হবে মিথুনবদ্ধ হয়ে অথবা নগ্নিকা হয়ে।

    কারও কারও কাজ ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে। কেউ কেউ হয়তো সুখস্বপ্ন দেখছে মুক্তিলাভের। হয়তো বা নিদ্রিত মিত্রাবৃন্দাও সে স্বপ্নে বিভোর। কিন্তু তাদের কারো জানা নেই যে তাদের ভবিতব্য কী হবে সে ব্যাপারে ইতিমধ্যেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন সম্রাট ও প্রধান পুরোহিত। কূপ খোদিত হচ্ছে তাদের জন্য।

    বেশ কিছুক্ষণ সে কক্ষে অপেক্ষা করার পর যখন মাহবার দেখা মিলল না তখন রাহিল অনুমান করল হয়তো বা তিনি মন্দিরের পশ্চাদভাগের নিম্নদেশে ওই ভাস্কর-মজুরদের থাকার স্থানেই গেছেন। রাহিল সিদ্ধান্ত নিল সে-স্থানে গিয়েই সে খুঁজে বার করবে মাহবাকে। রাহিলের সে জায়গাতে যাওয়ার ক্ষেত্রে কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই। মন্দির-রক্ষীবাহিনীর কেউ যদি এ ব্যাপারে তাকে প্রশ্ন করে তবে সে জানাবে যে মন্দিরের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতেই সে সর্বত্র টহল দিচ্ছে। এ খবর কানে গেলে সম্ভবত খুশিই হবেন। তবুও যথাসম্ভব কম লোকের চোখে পড়াটাই বাঞ্ছনীয় রাহিলের কাছে।

    মন্দিরের সম্মুখভাগ ও পশ্চাদভাগে দুটি তোরণ আছে মন্দিরে প্রবেশের জন্য। সম্মুখ ভাগেরটা বৃহৎ ও অপর প্রান্তেরটা ক্ষুদ্রাকৃতির। অন্ত:পুরের ভিতর দিয়ে সেই ক্ষুদ্রাকৃতি তোরণের মাধ্যমে নির্গমনের জন্য এগোল রাহিল।

    একের পর এক অন্ধকার কক্ষ পেরিয়ে সে একসময় উপস্থিত হল সেই সোপানশ্রেণির কাছে। তাকে অতিক্রম করে গন্তব্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল সে। কিন্তু আকস্মিক হঠাৎ তার দৃষ্টি পড়ল সোপানশ্রেণির ওপর দিকে একটা বাঁকের মুখে। কোথা থেকে যেন আবছা আলো এসে পড়েছে সে জায়গাতে। রক্ষীরা মন্দিরের গাত্রের বহির্দেশে কয়েকটা নীচু তাকের গায়ে মশাল গুঁজেছে। হয়তো তারই কোনওটার আলো ছিদ্রপথে প্রবেশ করে সোপানশ্রেণির সেই বাঁকটা আলোকিত করেছে। রাহিল দেখতে পেল দীর্ঘবস্ত্রে আচ্ছাদিত এক ব্যক্তি অতি সন্তর্পণে সেই বাঁক অতিক্রম করে ওপরে উঠছে! কে ও! এত রাতে সে কোথায় উঠছে?

    থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল রাহিল। একবার তার মনে হল, যে ওপরে যাচ্ছে যাক, এই মুহূর্তে ভাস্কর মাহবাকে খুঁজে বার করাই তার প্রধান কর্তব্য। কিন্তু এরপরই তার খেয়াল হল ওই সোপানশ্রেণির মাধ্যমে গবাক্ষ অতিক্রম করে পৌঁছে যাওয়া যায় বহির্গাত্রের সেই রহস্যময় তাকের কাছে! ওই ছায়ামূর্তি কি ওখানেই যাচ্ছে? নিজের কৌতূহলকে সংযত করতে পারল না রাহিল। সে-ও ওপরে উঠতে শুরু করল।

    মার্জারের মতো নি:শব্দে সোপানের ধাপ অতিক্রম করে, বাঁক অতিক্রম করে ওপরে উঠে চলেছে লোকটা। বোঝাই যাচ্ছে এ-পথ তার চেনা। এ-পথে আসা-যাওয়া করে সে। সে জন্য এই অন্ধকার-অরক্ষিত সোপানশ্রেণিতে তার এমন সাবলীল গতি।

    সোপানশ্রেণির একপাশে অতল গহ্বর। সেদিকে অন্ধকারে পা-ফসকালেই মৃত্যু অবধারিত। কোনওরকমে অন্যপাশের দেওয়াল হাতড়ে রাহিল তাকে অনুসরণ করল। একসময় সোপানশ্রেণির শীর্ষে উঠে এল সেই ছায়ামূর্তি। গবাক্ষ দিয়ে মৃদু আলো এসে পড়েছে তার মুখে। কিন্তু তার মুখমণ্ডল বস্ত্রখণ্ড দ্বারা আচ্ছাদিত।

    গবাক্ষ দিয়ে বাইরে নির্গত হল লোকটা। রাহিলও পৌছে গেল সোপানশ্রেণির মাথায় তারপর সন্তর্পণে উঁকি দিল বাইরে। সে দেখল কৃষ্ণবর্ণের বস্ত্রে আচ্ছাদিত সেই ছায়ামূর্তি গবাক্ষ সংলগ্ন অলিন্দ থেকে গিরগিটির মতো দেওয়াল বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করেছে! লোকটা পৌঁছে গেল নারীমূর্তির উল্টোদিকের সেই তাকের কাছে। তারপর যেন ভোজবাজির মতো দেওয়ালের গায়ে মিলিয়ে গেল!

    মন্দিরের পশ্চাদংশে মশাল হাতে এক সৈনিককে আসতে দেখল রাহিল। সঙ্গে সঙ্গে রাহিল আত্মগোপন করল নিজেকে। সৈনিক একবার এসে দাঁড়াল তাকগুলোর ঠিক নীচে। মশাল উঠিয়ে দেখার চেষ্টা করল ওপরে কিছু দেখা যায় কিনা! তারপর আবার লোহার নাল লাগানো পাদুকার শব্দ তুলে অন্যদিকে চলে গেল। সে চলে যাবার পর কর্তব্য স্থির করে নিল রাহিল। ওই ছায়ামূর্তি নিশ্চই সে, যাকে সন্ন্যাসীর প্রেতাত্মা বলে ভাবছে সবাই।

    লোকটাকে অনুদেবের হাতে তুলে দেবার বিনিময়ে রাহিল মুক্তি প্রার্থনা করতে পারে মিত্রাবৃন্দার। রাহিল তার পাদুকা খুলে ফেলল, তরবারি নামিয়ে রাখল, তারপর গবাক্ষ দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে দাঁড়াল অলিন্দে। ভালো করে দেখার পর রাহিল বুঝতে পারল দেওয়ালগাত্রে কিছু খাঁজ আছে। খাঁজ বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল সে। খাঁজ থেকে হাত ফসকালেই নিশ্চিত মৃত্যু। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে পৌঁছে গেল মাথার ওপরের সেই তাকটাতে। তার কিছুটা তফাতে অন্য একটা তাকে আঁধো অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে সেই নারীমূর্তি।

    রাহিল দেখল যে তাকে সে দাঁড়িয়েছে সে তাকের সামনেই এক উন্মুক্ত গহ্বর। ছায়ামূর্তি কোথায় অদৃশ্য হল তা বুঝতে পারল রাহিল।

    সে-ও প্রবেশ করল সুড়ঙ্গে। সংকীর্ণ সুড়ঙ্গ কিছুটা এগিয়ে শেষ হয়েছে এক কক্ষে। মন্দিরের শীর্ষদেশ তবে নিরেট নয়! গোপন কক্ষ রয়েছে এখানে! রাহিল গিয়ে দাঁড়াল সেই কক্ষর সামনে।

    মশালের আলো জ্বলছে ভিতরে। রাহিল দেখতে পেল সেই মূর্তিকে একটা প্রস্তর ফলকের ওপর ঝুঁকে পড়ে কী যেন দেখছে সেই মূর্তি। পিছন থেকে তাকে ঘায়েল করে অনায়াসে কাবু করতে পারবে রাহিল। সে কটিদেশ থেকে ছুরিকা খুলে নিয়ে সন্তর্পণে প্রবেশ করল সেই কক্ষে, তারপর ধীরে ধীরে এগোতে লাগল লোকটার দিকে।

    লোকটা একমনে দেখে যাচ্ছে সেই ফলকটা। তার পায়ের সামনে ক্ষুদ্র শলাকা, ছেনি, হাতুড়ি ইত্যাদি পড়ে আছে। সেগুলোর কোনও কিছু উঠিয়ে নেবার জন্য মাটির দিকে ঝুঁকল লোকটা। রাহিল তার কাছে পৌঁছে গেছে। সে তার হাতটা ওঠাল লোকটার কাঁধে ছুরিকা বসিয়ে দেবার জন্য। বন্দি করার আগে আহত করে আতঙ্কিত-দুর্বল করতে হবে লোকটাকে। রাহিল হাতটা ওঠাল ঠিকই কিন্তু হাতটা নামাতে পারল না। কে যেন রাহিলের পিছন থেকে চেপে ধরল তার ছুরিকাবদ্ধ হাতটা। চমকে উঠে পিছনে ফিরে রাহিল দেখল তার হাত যে চেপে ধরেছে সে মাহবা!

    বিস্মিত রাহিল হাত থেকে খসিয়ে ফেলল ছুরিকা। সে বলে উঠল, ‘মাহবা আপনি?’

    মাহবা শান্ত স্বরে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, আমি।’

    সেই অবগুণ্ঠিত রহস্যময় মূর্তি তখন ফিরে দাঁড়িয়েছে রাহিলের দিকে। একটা ধারালো লৌহশলাকা তার হাতে। প্রয়োজনে সে সেটাকে অস্ত্রের মতো ব্যবহার করতে পারে।

    রাহিল মাহবাকে জিগ্যেস করল, ‘এখানে কী করছেন আপনারা? সেই প্রেতাত্মা কি আপনারাই কেউ, যে হত্যা করল মন্দির-রক্ষীবাহিনীর লোকটাকে?’

    মাহবা জবাব দিলেন, ‘আমরা এক অন্যায়ের প্রতিবিধানের চেষ্টা করছি এই গোপন কক্ষে। লোকটা আমাদের দেখে ফেলে বর্শা নিক্ষেপ করেছিল। ও ছাড়া কিছু করার ছিল না আমাদের। সে জীবিত থাকলে হয়তো এই গোপন কক্ষের সন্ধান পেয়ে যেত অন্যরা। আমাদের এত পরিশ্রম সব ব্যর্থ হত। আর হাতে সময় নেই আমাদের। সৈন্যবাহিনী চলে আসার আগে দ্রুত কাজ শেষ করতে হবে।’

    মাহবা কী বলছেন ঠিকঠাক বুঝতে না পেরে রাহিল বলল, ‘কী অন্যায়ের প্রতিবিধান? এ গোপন কক্ষ কীভাবে অজানা রইল অনুদেবের কাছে? মন্দিরের প্রধান স্থপতি-ভাস্কর চিত্রবানের তো অজানা থাকার কথা নয় এই গুপ্তকক্ষর কথা?’

    তার প্রশ্ন শুনে বৃদ্ধ ভাস্করের বলিরেখাময় মুখমণ্ডলে আবছা হাসি ফুটে উঠল। অবগুণ্ঠনাবৃত মূর্তি কিছুটা সরে দাঁড়াল সেই প্রস্তরফলকের গা থেকে। মাহবা অঙ্গুলি নির্দেশ করলেন সেই প্রস্তরফলকের দিকে। তার গায়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হরফে কী সব যেন খোদিত আছে।

    রাহিল জানতে চাইল, ‘কী খোদিত আছে ওতে?’

    রাহিলের প্রশ্ন শুনে এবার অবগুণ্ঠন খসিয়ে ফেলল সেই মূর্তি। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল রাহিল। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন প্রধান ভাস্কর চিত্রবান। তিনি বললেন, ‘সম্রাটের প্রশস্তি নয়, ওই ফলকে আমরা খোদাই করে যাচ্ছি ভাস্কর-মজুরদের নাম। সম্রাট নন, যারা নিজেদের রক্ত, ঘাম, অশ্রু দিয়ে রচনা করছে এই কান্ডারীয় মন্দির। এ মন্দিরের প্রস্তরখণ্ড শুষে নিল যাদের জীবন যৌবন তাদেরই নাম খোদিত হচ্ছে ওই ফলকে। যে মল্লখ একদিন সৃষ্টির আনন্দে উল্লাসে বলে উঠেছিল, ”এ মূর্তি আমিই নির্মাণ করেছি।”—সে আমার সহোদর। সম্রাটের আদেশে তার জিহ্বা উৎপাটিত করা হল।

    ‘অসহায়ভাবে সেদিন আমি তাকিয়ে দেখলাম সেই দৃশ্য। প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করার সাহস ছিল না। শাস্ত্রে বলে রাজরোষ বজ্রপাতের চেয়েও ভয়ঙ্কর। বজ্রপাত যেখানে হয় সেখানে শুধু আগুন জ্বলে। আর রাজরোষ দাবানলের মতো সবকিছুকে ধ্বংস করে। কিন্তু সেদিনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এ অন্যায়ের প্রতিবিধান করতে হবে। ভবিষ্যতের মানুষের কাছে প্রকাশ করতে হবে আসল সত্য। সুদূর ভবিষ্যতে নিশ্চিত সেদিনের কোনও-না-কোনও মানুষ সন্ধান পাবে এই কক্ষের। সেই ভবিষ্যতের মানুষের কাছে উন্মোচিত হবে এই কাণ্ডারীয় মন্দিরের প্রকৃত স্থপতিদের নাম। সেদিনের মানুষ শ্রদ্ধার সঙ্গে পাঠ করবে এই নামগুলো। মাহবা অক্ষরজ্ঞানহীন। সে নামগুলো বলে, আর আমি সেগুলো খোদিত করে যাই ওই ফলকে। আপনি রাজসৈনিক। আপনি কি এ সংবাদ পৌঁছে দেবেন অনুদেবের কাছে?’ কথা শেষ করে রাহিলের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলেন চিত্রবান।

    ঘটনার আকস্মিকতায় বাকরুদ্ধ হয়ে গেছিল রাহিল। একটু ধাতস্থ হবার পর সে বলল, ‘সম্পূর্ণ ব্যাপারটা অবগত না হলে হয়তো দিতাম। আপনাদের পরিবর্তে অন্য কেউ হলে তাকে প্রধান পুরোহিতের হাতে তুলে দিয়ে তার বিনিময়ে এক সুরসুন্দরীর মুক্তি প্রার্থনা করতাম। এক গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ পেয়ে সে ব্যাপারে ভাস্কর মাহবার সন্ধান করছিলাম আমি। ঠিক সে সময় আপনাকে সোপানশ্রেণি বেয়ে ওপরে উঠতে দেখে আপনাকে বন্দি করার অভিলাষ নিয়েই আমি এখানে হাজির হই।’

    মাহবা এবার জানতে চাইলেন, ‘কী গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ?’

    রাহিল জবাব দিল, ‘বিকর্না জানিয়েছে যে কূপ খোদিত হচ্ছে সুরসুন্দরীদের সেখানে নিক্ষেপ করার জন্য। আর সে কাজে যাতে কেউ বাধাদান করতে না পারে সেজন্য বৃহৎ সেনাদল আনয়ন করা হবে।’

    রাহিলের কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই কয়েক মুহূর্তর জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেল সারা কক্ষ। চিত্রবান প্রথমে সেই নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে বললেন, ‘আমিও এমনই অনুমান করছিলাম। কারণ, ওই স্থান কূপ খননের পক্ষে ঠিক উপযুক্ত নয়। মন্দিরের নির্মাণ কার্য সমাপ্ত হবার পর ভাস্কর-মজুরদের ভাগ্যেও সম্ভবত একই পরিণতি লেখা আছে। প্রস্তরখণ্ডের আঘাতে মন্দির- রক্ষীবাহিনীর মৃত্যুর ঘটনাটা যাতে কৃষ্ণবানরদের ওপর চাপানো যায় সেজন্য বানরগুলোকে মুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু সে ঘটনাও সন্দেহর উদ্রেক ঘটিয়েছে তার মনে। তিনি অনুমান করছেন তার অগোচরে মন্দিরে কিছু ঘটছে। এটাও সৈন্যবাহিনী আনয়ন করার পিছনে একটা কারণ।’

    রাহিলের চোখে শুধু ভাসছে মিত্রার মুখ। সে বলল, ‘আপনারা যদি মিত্রাবৃন্দার মুক্তির ব্যবস্থা করতে পারেন তবে আমি আপনাদের যে-কোনও সাহায্য করতে রাজি আছি।’

    চিত্রবান একটু ভেবে নিয়ে বললেন, ‘পরশু অমাবস্যা। কাল সূর্যোদয়ের পর নগরীতে যাবেন অনুদেব। পরশুর মধ্যে তিনি সুরসুন্দরীদের মিথুন মূর্তি রচনার কাজ শেষ করতে বলেছেন। অর্থাৎ এ দু-দিন সুরসুন্দরীরা নিরাপদ। শুধু মিত্রাবৃন্দা নয়, অন্যদেরও মুক্তির ব্যবস্থা করতে হবে। আর এক রাতের মধ্যে আমাদেরও এই ফলকে নাম খোদাইয়ের কাজ শেষ হয়ে যাবে। তারপর সবাইয়ের মুক্তির পথ খুঁজতে হবে আমাদের। আপনি যুদ্ধ ব্যবসায়ী, নিশ্চিতভাবে আপনার সাহায্যের প্রয়োজন হবে আমাদের। আমরা উপায় খুঁজব আপনার প্রেয়সীর মুক্তিলাভের। এবার আপনি ফিরে যান। কাল রাত এক প্রহরে আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে এখানে। কাল রাতে মন্দিরের পশ্চাদভাগে আপনার সেনাদল যাতে প্রহরা না দেয় সে ব্যাপারে আপনি ব্যবস্থা নেবেন।’

    মাহবা বললেন, ‘কাল নির্দিষ্ট সময় আপনি মূর্তি নির্মাণের কক্ষে আসবেন। আমি আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করাব মিত্রাবৃন্দার।’

    প্রধান ভাস্কর চিত্রবান এরপর নিয়োজিত হলেন প্রস্তরফলকে নাম রচনার কাজে। রাহিল সে কক্ষ ত্যাগ করে যে পথে সে সেই জায়গাতে পৌঁছেছিল ঠিক সে পথেই ফিরে এল নীচে মন্দির-প্রাঙ্গণে। তারপর অন্যদিনের মতোই পদচারণা শুরু করল।

    কাজ শেষ করে ভোরের আলো ফোটার আগেই মাহবা আর চিত্রবান নীচে এলেন। মাহবা তার কক্ষে ফিরে গেলেন, আর চিত্রবান অন্ধকারে মন্দির ত্যাগ করার আগেই হঠাৎই মুখোমুখি হয়ে গেলেন একজনের। অবশ্য তার কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি মন্দির ত্যাগ করলেন।

    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleরম্যরচনা ৩৬৫ – তারাপদ রায়
    Next Article সরস গল্প সমগ্র – তারাপদ রায়
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Demo
    Most Popular

    তিস্তাপারের বৃত্তান্ত – দেবেশ রায়

    August 29, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    তিস্তাপারের বৃত্তান্ত – দেবেশ রায়

    August 29, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Our Picks

    তিস্তাপারের বৃত্তান্ত – দেবেশ রায়

    August 29, 2025

    অদ্বৈতপ্রকাশ – ঈশান নাগর

    August 29, 2025

    পৃথিবীর ইতিহাস – দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

    August 29, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2025 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    Sign In or Register

    Welcome Back!

    Login below or Register Now.

    Lost password?

    Register Now!

    Already registered? Login.

    A password will be e-mailed to you.