৯
ভোরের আলো ফুটল একসময়। কুয়াশা তখনও ভালোভাবে কাটেনি। রাহিল দেখতে পেল মন্দির-চত্বরে উঠে এলেন অনুদেব। এত ভোরে তিনি সাধারণত মন্দিরে উপস্থিত হন না। তিনি সাধারণত উপস্থিত হন আরও কিছু সময় পর মন্দির-প্রাঙ্গণে শিল্পী-মজুরদের দল উপস্থিত হলে। চত্বরে উঠে তিনি দ্রুত প্রবেশ করলেন মন্দিরের অন্ত:পুরে। তিনি মন্দিরের ভিতরে অন্ত:পুরে প্রবেশ করার পর রাহিল এসে দাঁড়াল সেই প্রবেশপথের সামনের চত্বরে। নিত্যদিন সেখানে এসে সমবেত হয় ভাস্কর-মজুরের দল। চিত্রবান এসে তাদের দৈনন্দিন কাজ বুঝিয়ে দেন।
একসময় মজুরের দল ধীরে ধীরে এসে উপস্থিত হতে লাগল সেখানে। চিত্রবানও সেখানে উপস্থিত হলেন। আর এরপরই অনুদেব মন্দিরের অন্ত:পুর ত্যাগ করে বেরিয়ে এলেন। বাইরে তিনি মুখোমুখি হয়ে গেলেন রাহিল আর চিত্রবানের। মুহূর্তের জন্য যেন একবার অপ্রস্তুত ভাব ফুটে উঠল অনুদেবের মুখে। কিন্তু তারপরই তিনি নিজেকে যেন সামলে নিয়ে বললেন, ‘অতি প্রত্যুষে নিদ্রাভঙ্গ হল। নগরীতে যেতে হবে আমাকে। ভাবলাম তার আগে একবার মন্দিরটা ঘুরে যাই। মন্দির-প্রাঙ্গণ তো সৈনিকবেষ্টিত থাকে। অন্ত:পুরটাই অরক্ষিত। তাই ভিতরে প্রবেশ করে সব কিছু পর্যবেক্ষণ করে এলাম। এ কথাগুলো চিত্রবানের উদ্দেশ্যে বলে রাহিলকে তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘রাত প্রহরার সময় সন্দেহজনক কিছু দৃষ্টিগোচর হয়েছে?’
রাহিল সংক্ষিপ্ত জবাব দিল—’না।’
রাহিলের উদ্দেশ্যে আবার তিনি প্রশ্ন করলেন—’রাত প্রহরার সময় মন্দিরের পশ্চাদভাগে প্রদক্ষিণ করেছিলেন?’
রাহিল জবাব দিল, ‘সৈনিকরা সে অংশ প্রদক্ষিণ করেছে, আমিও সে অংশে গেছিলাম। সেখানেও কোনও সন্দেহজনক ঘটনা দৃষ্টিগোচর হয়নি।’
অনুদেব এরপর চিত্রবানকে বললেন, ‘আমি নগরীর উদ্দেশ্যে রওনা হব। আশা করছি উগ্রায়ুধের সঙ্গে কথা বলে সৈন্য আনয়নের ব্যবস্থা করতে পারব। মূর্তি নির্মাণের কাজে যেন কোনও গাফিলতি না হয়। এ কাজ আর কূপ খননের কাজ আগামীকাল সূর্যাস্তের মধ্যেই সম্পন্ন হওয়া চাই। সর্বত্র দৃষ্টি রাখবেন আপনি। আমি সূর্যাস্তের পূর্বেই আবার মন্দিরে ফিরে আসব।’
প্রধান ভাস্কর চিত্রবান মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মতি প্রকাশ করলেন তাঁর কথায়।
পুরোহিত অনুদেব এবার পা বাড়ালেন মন্দির-চত্বর থেকে নির্গমনের উদ্দেশ্যে। ঠিক সেই সময় উপস্থিত জমায়েতের মধ্যে থেকে একজন মজুর হঠাৎ মন্দিরের শীর্ষদেশের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘আবার ওরা ফিরে এসেছে।’
মৃদু কলরব উঠল উপস্থিত মজুরদের মধ্যে। থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন অনুদেব। মজুরদের দৃষ্টি অনুসরণ করে অনুদেবসহ রাহিলরা দেখল মন্দিরগাত্রে মাথার ওপরের একটা তাকে বসে আছে দুটো কৃষ্ণবানর!
তাদের দেখে চিত্রবান বিস্মিতভাবে বলে উঠলেন, ‘সঙ্গীর মৃত্যুর পরও ওরা ফিরে এল এখানে!’
প্রধান পুরোহিত অনুদেব প্রথমে তাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সম্ভবত রাতের অন্ধকারে সবার অগোচরে এখানে ফিরে এসেছে ওরা।’
‘খাদ্যের লোভে?’ জানতে চাইলেন চিত্রবান।
অনুদেব জবাব দিলেন, ‘বনভূমিতে ওদের পর্যাপ্ত খাদ্য আছে। খাদ্যের সন্ধানে নয়। ওরা এখানে ফিরে এসেছে নারী-যোনির-লোভে। ওরা তো ইতর শ্রেণির প্রাণী মাত্র, ইতর অবমানব। সহস্র বৎসর ধরে মানব সমাজের মধ্যে অর্থ সম্পদ অর্জনের জন্য যে লড়াই চলে আসছে তা তো শেষ পর্যন্ত ওই মানবীযোনি লাভের জন্যই। প্রকৃতির নিয়ম অনুসারে শেষ অভিষ্ট তো ওই নারী-যোনিই।’
রাহিলের হঠাৎ মনে পড়ে গেল তিরবিদ্ধ সেই অবমানবের কথা। মৃত্যুর পরও তার উত্থিত শীষ্ণদেশ কাঁপছিল আকাশের দিকে চেয়ে।
চিত্রবান প্রধান পুরোহিতের কথা শুনে প্রশ্ন করল, ‘এখন কী কর্তব্য? সেই ব্যাধদের আবার মন্দির প্রাঙ্গণে আনয়ন করবেন? আমার কিন্তু স্থির বিশ্বাস যে ওরাই কিন্তু প্রস্তরখণ্ডের আঘাতে হত্যা করেছিল মন্দির-রক্ষীবাহিনীর লোকটাকে।’
প্রধান স্থপতি ভাস্করের কথা শুনে কিছু সময় কী যেন ভাবলেন প্রধান পুরোহিত। তারপর বললেন, ‘সুরসুন্দরীদের মূর্তি নির্মাণের কাজ, কূপ খননের কাজ আগামীকাল সূর্যাস্তের মধ্যে শেষ করতে হবে। ব্যাধের দল কৃষ্ণবানরদের ধরার জন্য মন্দিরে এলে সেসব কাজের গতি ব্যাহত হতে পারে। হয়তো বা প্রাণরক্ষার জন্য তখন ওই অবমানবের দল মন্দিরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করল। সুরসুন্দরীরা তো মন্দির প্রাঙ্গণে আসছে না তাই আপাতত ওই বানরদের নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। আপাতত ওদের শান্ত রাখা প্রয়োজন। প্রকটাক্ষকে বলে ওদের জন্য কদলির ব্যবস্থা করছি আমি। প্রাঙ্গণের নীচের চত্বরেই সে আছে। আর এক-দুদিনের মধ্যেই বৃহৎ সৈন্যবাহিনী আসবে। তিরন্দাজও থাকবে সে দলে। তারা এসে নিধন করবে ওই কৃষ্ণবানরদ্বয়কে। তারপর নতুন সুরসুন্দরীরূপে যারা নির্বাচিত হবে তাদের নিয়ে উন্মুক্ত মন্দির-প্রাঙ্গণে কাজ করতে অসুবিধা হবে না ভাস্করদের।’—এ কথা বলে তিনি রওনা হলেন মন্দির পরিত্যাগ করার জন্য। রাহিল আর চিত্রবানের মধ্যে একবার মৃদু দৃষ্টি বিনিময় হল। চিত্রবান এরপর দৈনন্দিন কাজ বুঝিয়ে দিতে লাগলেন মজুরদের। সাময়িক বিশ্রাম লাভের আশায় রাহিল এগোল তার বিশ্রামকক্ষের দিকে। কক্ষে ফেরার পর মিত্রাবৃন্দার কথা ভাবতে ভাবতে একসময় পরিশ্রান্ত রাহিলের চোখে ঘুম নেমে এল। সে স্বপ্ন দেখতে লাগল সে আর মিত্রাবৃন্দা ঘুরে বেড়াচ্ছে এক কুসুমকাননে। কতরকম ফুল ফুটে আছে, ফুলের সৌরভে আমোদিত চারপাশ।
ঘুরতে ঘুরতে মিত্রা একসময় রাহিলকে বলল, ‘তোমার জন্য আমি মালা গাঁথব।’—এ কথা বলার পর রাহিলকে দাঁড় করিয়ে রেখে সে এগোল পুষ্পশোভিত বৃক্ষর দিকে। কিন্তু কয়েক পা এগিয়েই সে আতঙ্কে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘ওই যে! ওই যে!’ রাহিল দেখতে পেল সেই বৃক্ষর আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে এক কদাকার কৃষ্ণবানরের মুখ। তার দৃষ্টিতে প্রকট কামলালসা। রাহিল সঙ্গে সঙ্গে তলোয়ার কোষমুক্ত করে ছুটে গেল সে জায়গাতে। মিত্রাকে ধরার জন্য বৃক্ষর আড়াল থেকে ঝাঁপ দিল সেই কামুক বানর। কিন্তু সে তাকে স্পর্শ করার আগেই রাহিল তার বুকে তলোয়ার বসিয়ে দিল। মাটিতে ছিটকে পড়ে বীভৎস মরণার্তনাদ করে উঠল সেই বানর। আর সেই আর্তনাদে যেন প্রলয়নাচন শুরু হল আশেপাশের বৃক্ষ শাখাগুলোতে।
প্রথমে প্রবল আন্দোলন শুরু হল গাছগুলোর মাথায়, তারপর সেই ওপর থেকে লাফ দিয়ে নামতে লাগল কৃষ্ণবানরের দল। রাহিল মিত্রার হাত ধরে বলল, ‘চলো এখান থেকে পালাতে হবে।’
ছুটতে শুরু করল তারা। কানন জঙ্গল ভেদ করে ছুটে চলল তারা। আর তাদের পিছনে বীভৎস চিৎকার করে ছুটে চলল কৃষ্ণবানরের দল।
একসময় তাদের চোখে পড়ল এক মন্দির। রাহিল তা দেখে বলল, ‘আরে এ তো লক্ষণ মন্দির! আর তার ওপাশেই কান্ডারীয় মন্দির। সেখানে আমার সেনা আছে। তুমি লক্ষণ মন্দিরে আত্মগোপন করো। আমি তোমাকে সেনা নিয়ে এসে উদ্ধার করছি।’ তার কথা শুনে মিত্রা ছুটতে শুরু করল লক্ষণ মন্দিরের দিকে। কিন্তু কিছুটা এগিয়েই সে হঠাৎ যেন অদৃশ্য হয়ে গেল। ভেসে এল তার আর্তনাদ! কী হল তার? রাহিল সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেল সে জায়গাতে। সে দেখল সদ্য নির্মিত এক গভীর কূপের মধ্যে পড়ে গেছে মিত্রাবৃন্দা। তার ওপরে ওঠার পথ নেই।
মিত্রাবৃন্দা নীচ থেকে ক্ষীণ কণ্ঠে রাহিলের উদ্দেশ্যে বলল, ‘তুমি পালিয়ে যাও। নইলে দু-জনকেই হত্যা করবে অবমানবের দল।’ রাহিল বলে উঠল, ‘না, আমি তোমাকে ফেলে কোথাও যাব না।’ ঠিক এই সময় আশপাশ থেকে শোনা গেল কৃষ্ণবানরদের চিৎকার, পদশব্দ। কূপের ভিতর থেকে মিত্রা আবার কাতর অনুরোধ জানাল—’পালাও সৈনিক, পালাও।’ কূপ আগলে তলোয়ার হাতে কৃষ্ণবানরদের জন্য প্রস্তুত হল রাহিল। এসে পড়ল কৃষ্ণবানরেরা। কিন্তু তাদের দেখে বেশ অবাক হয়ে গেল রাহিল।
ঘন কৃষ্ণবর্ণের দীর্ঘ রোমে আবৃত তাদের শরীর, আর সেই ধড়ের ওপর বসানো আছে শিখাধারী অনুদেবের মাথা! অনেক অনেক কৃষ্ণবানররূপী অনুদেব কামার্ত-হিংস্র দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। একজন অনুদেব তাকে আক্রমণ করার জন্য এগিয়ে আসতেই রাহিল তলোয়ারের এক কোপে তার মাথা কেটে ফেলল। সেই ছিন্ন মুণ্ড ছিটকে পড়ল কূপের গভীরে…
ঘুম ভাঙার পর রাহিল বেরিয়ে এল মন্দির-চত্বরে। এক জায়গায় প্রাোথিত আছে সময়স্তম্ভ। তার ছায়া দেখে রাহিল বুঝতে পারল দ্বিপ্রহর হতে চলেছে। মন্দির তাকে একঝলকের জন্য এক কৃষ্ণবানরকে দেখল সে।
কিছু সময় প্রাঙ্গণে ঘুরে রাহিল মন্দিরের অন্ত:পুরে প্রবেশ করল। ভাস্কর মাহবার কক্ষে প্রবেশ করে রাহিল দেখল সেখানে মিত্রাবৃন্দাকে নিয়ে এসেছেন মাহবা। রাহিলকে দেখে মাহবা বললেন আপনারা এই কক্ষে আলোচনা করুন, আমি দ্বারের বহির্দেশে দাঁড়িয়ে আছি। কেউ এদিকে এলে সতর্ক করে দেব। অনুদেব মন্দিরে নেই ঠিকই, কিন্তু তিনি সম্ভবত প্রকটাক্ষকে নিয়োজিত করে গেছেন নজরদারির জন্য। সে সাধারণত মন্দিরের অন্ত:পুরে থাকে না, কিন্তু আজ তাকে সুরসুন্দরীদের আবাসস্থলের চারপাশে ঘুরে বেড়াতে দেখলাম।’ কক্ষ ত্যাগ করলেন মাহবা।
কক্ষের এক কোণে আনতভাবে দাঁড়িয়ে ছিল মিত্রাবৃন্দা। রাহিল তার সামনে এগিয়ে গিয়ে তার হাত স্পর্শ করল। রাহিলের দিকে মুখ তুলে চাইল মিত্রা। তার আয়ত চক্ষুতে জেগে আছে বিষণ্ণতা। রক্তিম ওষ্ঠাধার মৃদু মৃদু কাঁপছে। রাহিলকে দেখে আবছা হাসি জেগে উঠল তাঁর ঠোঁটে। বেশ কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ ভাবে তারা তাকিয়ে পরস্পরের দিকে। মিত্রাবৃন্দা তারপর বলল, ‘আমার মুক্তি হবে না। তুমি আর আমার কথা ভেবো না।’
রাহিল প্রশ্ন করল, ‘কেন?’
মিত্রা বলল, ‘আজ সূর্যোদয়ের পর আমার কক্ষে এসেছিলেন অনুদেব। তিনি বলেছেন তার শয্যাসঙ্গিনী হলে সম্রাটকে বলে তিনি আমার মুক্তির ব্যবস্থা করবেন। তার প্রস্তাবে সম্মত না হলে আমার মৃত্যু ঘটবে। এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবার জন্য তিনি আমাকে আগামীকাল সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময় দিয়েছেন।’
রাহিল কি শেষ পর্যন্ত মাহবা ও চিত্রবানের সাহায্যে মিত্রাবৃন্দাকে রক্ষা করতে পারবে? অসীম ক্ষমতার অধিকারী রাজপুরোহিত অনুদেব। স্বয়ং মহাসম্রাট বিদ্যাধর তার পৃষ্ঠপোষক। বিশাল সম্রাটবাহিনীর সামনে তো শুষ্ক তৃণখণ্ডের মতো রাহিল-মাহবা-চিত্রবানেরা। তাদের পরিকল্পনা কতটুকু সফল হবে জানা নেই রাহিলের। এসব ভেবে নিয়ে রাহিল বলল, ‘তুমি সম্মত হও প্রধান পুরোহিতের প্রস্তাবে। তাতে তুমি মুক্তি পাবে কিনা জানি না, কিন্তু হয়তো তোমার প্রাণরক্ষা হবে।’
মিত্রা তার কথা শুনে তার হাতটা সজোরে আঁকড়ে ধরে বিষণ্ণ হেসে বলল, ‘তা সম্ভব নয় সৈনিক। সে কথা আমি সেই মুহূর্তেই জানিয়ে দিয়েছি। আমার এই সামান্য ক্রীতদাসীর জীবনের আর কী মূল্য আছে। তোমার কটিদেশের ওই ছুরিকা আমাকে দাও। সে যদি আমাকে আলিঙ্গন করতে আসে তাহলে ওই ছুরিকা আমি নিজের বুকে বসিয়ে দেব।’
রাহিল বলে উঠল, ‘না, এ হতে দেব না আমি। যতক্ষণ এ সৈনিকের দেহে প্রাণ আছে ততক্ষণ তোমাকে রক্ষা করব আমি।’
মিত্রা বলল, ‘আমি তুচ্ছ নারী। আমার জন্য তুমি নিজের জীবন বিপন্ন কোরো না সৈনিক। তুমি জেনো আমি তোমারই রইলাম।’—আবেগমোথিত কণ্ঠস্বরে কথাগুলো বলে থরথর করে কাঁপতে লাগল মিত্রাবৃন্দা।
ঠিক এই সময় ভাস্কর মাহবা কক্ষে প্রবেশ করে বললেন, ‘সতর্ক হন, প্রকটাক্ষ এদিকে আসছে!’
রাহিল শুধু মিত্রাবৃন্দাকে বলল, ‘তোমাকে মুক্ত করব আমি। ভাস্কর মাহবার নির্দেশের প্রতীক্ষা কোরো।’
মিত্রাবৃন্দা এরপর তার নির্দিষ্ট জায়গাতে গিয়ে দাঁড়াল। আর মাহবা তার প্রস্তরমূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে হাতে লৌহশলাকা তুলে নিল। যেন এতক্ষণ ধরে মিত্রাবৃন্দার মূর্তি রচনা করছিলেন তিনি। আর এর পরই প্রকটাক্ষ কক্ষে প্রবেশ করল।
সে রাহিলকে সে-কক্ষে দেখে একটু বিস্মিতভাবে বলল, ‘সৈনাধ্যক্ষ, আপনি এ-কক্ষে!’
রাহিল প্রথমে জবাব দিল, ‘কক্ষগুলো পরিভ্রমণ করতে করতে এখানে উপস্থিত হলাম। ভাস্করের কাজ দেখছি।’—এ কথা বলে সে পালটা প্রশ্ন করল, ‘তুমি তো অন্ত:পুরে আসো না? কার অনুসন্ধানে এখানে এলে?’
মন্দির-রক্ষীবাহিনীর প্রধান প্রকটাক্ষ জবাব দিল, ‘প্রভু অনুদেব আমাকে মন্দিরের অন্ত:পুরে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে বলে গেছেন। তাই আমিও কক্ষ পরিভ্রমণ করছি।’
এ কথা বলার পরই হঠাৎ তার ঘূর্ণায়মান প্রকটাক্ষদ্বয় স্থির হয়ে গেল মিত্রাবৃন্দা যেখানে দণ্ডায়মান সেখানে মাটির দিকে তাকিয়ে। তারপর সে বলে উঠল, ‘কিন্তু এ কী! এ অবস্থায় সুরসুন্দরীদের মূর্তি নির্মাণ তো শাস্ত্রমতে নিষিদ্ধ।’
তার কথা শুনে মাহবা আর রাহিল তার দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকাল মাটির দিকে। মিত্রাবৃন্দা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, দাঁড়িয়ে আছে সে জায়গাতে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত পড়ে আছে। মিত্রাবৃন্দা বর্তমানে রজ:স্বীলা। রাহিলের সঙ্গে মুহূর্তের জন্য দৃষ্টি বিনিময় হল মিত্রার। প্রগাঢ় লজ্জায় সঙ্গে সঙ্গে মাথা নত করল সে।
ব্যাপারটা ধরতে পেরে বৃদ্ধ ভাস্কর মাহবা প্রকটাক্ষকে বললেন, ‘রজস্বীলা অবস্থায় সুরসুন্দরীদের মূর্তি তৈরি নিষিদ্ধ আমি জানি। কিন্তু প্রধান পুরোহিতের নির্দেশ, আগামীকাল সূর্যাস্তের মধ্যে সুরসুন্দরীদের মূর্তি রচনার কাজ শেষ করতে হবে। তাই এ কাজ করছি আমি।’—এই বলে তিনি মূর্তি রচনার কাজে নিয়োজিত হলেন। তার কথা শুনে প্রকটাক্ষ কোনও মন্তব্য করল না। কিন্তু সে কক্ষের মধ্যেই দাঁড়িয়ে রইল। এ কক্ষে রাহিলের দীর্ঘ উপস্থিতি প্রকটাক্ষর মাধ্যমে অনুদেবের কানে গেলে তাঁর মনে সন্দেহর উদ্রেক হতে পারে। তাই রাহিল কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই কক্ষ ত্যাগ করল।
সূর্যাস্তের কিছু পূর্বে প্রধান পুরোহিত মন্দিরে প্রত্যাগমন করলেন। রাহিল, চিত্রবান, প্রকটাক্ষ উপস্থিত হল তার সামনে। অনুদেব প্রথমে জানতে চাইলেন, সুরসুন্দরীদের মূর্তি নির্মাণের অগ্রগতি সম্বন্ধে।
চিত্রবান তাকে জানালেন, ‘দুটি মূর্তি বাদে বাকি সব মূর্তি নির্মাণের কাজই শেষ হয়ে গেছে। বাকি দুটির কাজও কাল অপরাহ্নের মধ্যে শেষ হবে বলে ভাস্কররা জানিয়েছে।’
প্রধান পুরোহিত প্রশ্ন করলেন, ‘কোন দুটি মূর্তি?’
চিত্রবান জবাব দিলেন, ‘ভাস্কর স্থূলকোটি যে মিথুন মূর্তি রচনা করছেন সেটি এবং ভাস্কর মাহবা যে সুরসুন্দরী মূর্তি রচনা করছেন সেটি।’
প্রধান পুরোহিত বললেন, ‘প্রয়োজনবোধে তাদের আজ সারারাত মূর্তি নির্মাণে নিয়োজিত থাকতে নির্দেশ দিন। যে-কোনও উপায়ে আগামীকাল সূর্যাস্তের মধ্যে মূর্তি নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করতে হবে।’
চিত্রবান জানতে চাইলেন, ‘সৈন্য আনয়নের কাজ কী হল?’
প্রধান পুরোহিত জবাব দিলেন, ‘মহাসৈনাধ্যক্ষ উগ্রায়ুধ সে ব্যবস্থা করছেন। এক সহস্র সৈন্য তার নেতৃত্বে কাল রাতের মধ্যেই এসে উপস্থিত হবে। ওই অরণ্যর অভ্যন্তরে যে ফাঁকা স্থান আছে সেখানেই রাত্রিবাস করবে। পরদিন সূর্যোদয়ের সময় তারা মন্দিরে প্রবেশ করবে। মন্দিরের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করে অর্ধেক সেনা নিয়ে নগরীতে ফিরে যাবেন উগ্রায়ুধ। অর্ধেক সেনা এখানেই রয়ে যাবে। হয়তো ফেরার সময় আপনাদের সঙ্গী করবেন তিনি।’ এই বলে তিনি তাকালেন রাহিলের দিকে।
সূর্য ডুবতে চলেছে। সারা দিনের পরিশ্রম শেষে মজুরের দল সারিবদ্ধ হচ্ছে মন্দির-চত্বর ছেড়ে তাদের জীর্ণ কুটিরে ফিরে যাবার জন্য। সেদিকে তাকিয়ে অনুদেব বললেন, ‘আপনারা এবার রাতপ্রহরার জন্য প্রস্তুত হন। আজ আর কালকের রাতটাই শুধু। নতুন সেনাদল এলে আপনারা ভারমুক্ত হবেন। আগামীকাল সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই আমি মন্দিরে প্রবেশ করব।’—একথা বলে প্রকটাক্ষকে তাকে অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়ে অনুদেব এগোলেন মন্দির ত্যাগ করার জন্য।
তিনি প্রকটাক্ষকে নিয়ে চলে যাবার পর অন্যদিকে যাবার আগে চিত্রবান চাপা স্বরে রাহিলকে বলে গেলেন, ‘নির্দিষ্ট স্থানে মিলিত হব।’ তিনি চলে যাবার পর রাত্রি জাগরণের প্রস্তুতি শুরু করল রাহিল। সে প্রথমে এক জায়গাতে সমবেত করল তার সেনাদলকে। সে তাদের বলল, ‘আজ রাত্রে তোমরা মন্দিরের সম্মুখ ভাগে নিয়োজিত থাকবে। পশ্চাদভাগে যাবার দরকার নেই। ওখানে প্রহরার কাজে একলা নিয়োজিত থাকব আমি।’
একজন সৈনিক জানতে চাইল, ‘একলা কেন?’
রাহিল বলল, ‘রক্ষীবাহিনীর লোকটাকে যদি কোনও মানুষ হত্যা করে থাকে তবে সে নিশ্চই নির্দিষ্ট কোনও উদ্দেশ্য নিয়ে মন্দিরের পশ্চাদভাগে হানা দিয়েছিল বা তাকের ওপর উঠেছিল। আমি মন্দিরের পশ্চাদভাগে আত্মগোপন করে থাকব। তোমরা কেউ মন্দিরের ওই অংশে না গেলে ওই স্থানকে অরক্ষিত মনে করে আবার হানা দিতে পারে। তখন আমি তাকে বন্দি করব। প্রয়োজনবোধে তোমাদের ডাকব। আমি একটা ফাঁদ পাততে চাইছি তার জন্য। আমাদের হয়তো আর ক’দিনের মধ্যে এ মন্দির ছেড়ে চলে যেতে হবে। যাবার আগে হত্যাকারীকে ধরতে পারলে পুরস্কৃত হবার সম্ভাবনা আছে এ বাহিনীর।’
সৈনিকরা আশ্বস্ত হল তার কথায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্ধকার নামল। তারপর একসময় চাঁদ উঠল ঠিকই, কিন্তু সেই প্রায় অদৃশ্য চাঁদের আলো মন্দিরে এসে পৌঁছোচ্ছে না। সৈনিকের দল মশাল জ্বালিয়ে মন্দিরের সম্মুখভাগে প্রদক্ষিণ শুরু করল। রাহিল তাদের সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ সময় অতিবাহিত করল। তারপর অন্ধকার ভেঙে মন্দিরের পশ্চাদভাগে উপস্থিত হল। মাথার ওপরের সেই তাকে দণ্ডায়মান অস্পষ্ট নারীমূর্তির দিকে তাকিয়ে রাহিল ভাবতে লাগল মিত্রাবৃন্দার কথা। প্রহর এগিয়ে চলল। এক প্রহরে দূরের বনভূমিতে প্রহর ঘোষণা করল শৃগালের দল। ঠিক সেই সময় রাহিল দেখতে পেল দুই ছায়ামূর্তি উপস্থিত হয়েছে মাথার ওপরের সেই তাকে। চিত্রবান আর মাহবা। তারা যেন হাত নেড়ে উপরে উঠে আসতে বললেন রাহিলকে। তাদের দেখার পরই পশ্চাদভাগ দিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করল রাহিল।
তারপর গতরাতের মতোই সোপানশ্রেণি দিয়ে ওপরে উঠে দেওয়ালগাত্র বেয়ে তাকে পৌঁছে, সুড়ঙ্গপথে রাহিল পৌঁছে গেল সেই গোপন কক্ষে। গতরাতের মতোই মশাল জ্বলছে সেখানে।
দুই ভাস্কর সেখানে সেই ফলকে খোদাইয়ের কাজ করছিলেন। রাহিল সেখানে উপস্থিত হলে কাজ থামালেন তারা। রাহিলকে ফলকটা দেখিয়ে চিত্রবান বললেন, ‘শ্রমিক-ভাস্করদের নাম উৎকীর্ণ করার কাজ শেষ। সুরসুন্দরীদের নামও এই ফলকে খোদিত করে যাব আমরা। তারাও তো শ্রমিক, যৌন শ্রমিক। সে কাজটুকুও রাতের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে।’
রাহিল বলল, ‘কিন্তু, মিত্রাবৃন্দা ও সুরসুন্দরীদের মুক্তির কী উপায় হবে? আজ সূর্যোদয়ের সময় মিত্রাবৃন্দার কক্ষে গেছিলেন অনুদেব। তিনি তাকে তাঁর কামলালসা নিবৃত্ত করার কথা বলেছেন। নচেৎ তার মৃত্যু নাকি অবশ্যম্ভাবী। আমি মিত্রাবৃন্দাকে পুরোহিতের প্রস্তাবে রাজি হতে বলেছিলাম তাতে যদি তার প্রাণরক্ষা পায় সেজন্য। কিন্তু মিত্রাবৃন্দা অসম্মত সে প্রস্তাবে। সে সেকথা জানিয়েছে অনুদেবকে। তবু তিনি আগামীকাল সূর্যাস্ত পর্যন্ত আর একবার ভেবে দেখার সময় দিয়েছেন মিত্রাবৃন্দাকে।’
বৃদ্ধ ভাস্কর মাহবা বললেন, ‘মিত্রাবৃন্দা যদি অনুদেবের প্রস্তাবে রাজিও হয় তবুও তার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। এ ঘটনা মিত্রাবৃন্দার মাধ্যমে ভবিষ্যতে প্রচার হলে কলঙ্ক লাগবে অনুদেবের গায়ে, তার প্রতিষ্ঠায়। অকৃতদার অনুদেব সব রিপুকে জয় করেছেন বলে প্রচারিত। তার সেই ভাবমূর্তিকে সম্রাটের সামনে রক্ষা করতে সে তার যৌনলালসা মোচনের পর হত্যা করবে মিত্রাবৃন্দাকে। তারপর তার দায় চাপাবে মানবী-যোনি-লোভি ওই দুই কৃষ্ণবানরের ওপর। ঠিক যেভাবে তিনি ওই তান্ত্রিক যোগীর বামার হত্যার দায় চাপিয়েছিলেন কৃষ্ণবানরদের ওপর। ওই মৃতা নারীর হাতে ধর্ষক-হত্যাকারীর চিহ্ন স্বরূপ যে ছিন্ন উপবীত ধরা ছিল সে উপবীত আসলে অনুদেবেরই। এ মন্দিরে একমাত্র তিনিই উপবীত ধারণ করেন। প্রাথমিক অবস্থায় তিনি কৃষ্ণবানরদের নিধনের চেষ্টা করলেও পরবর্তী সময় তাঁর মাথায় নিশ্চই আবারও এ পরিকল্পনা খেলেছে। সেজন্যই তিনি প্রকটাক্ষকে নির্দেশ দিলেন কদলি ছড়া দিয়ে কৃষ্ণবানরদের আপ্যায়ন করার জন্য।’—একটানা কথাগুলো বলে থামলেন বৃদ্ধ ভাস্কর।
‘তবে? আপনাদের কী পরিকল্পনা?’ জানতে চাইল রাহিল।
প্রধান ভাস্কর চিত্রবান বললেন, ‘আগামীকাল সূর্যাস্ত পর্যন্ত মিত্রাবৃন্দা নিরাপদ। তারপর আপনি মিত্রাবৃন্দা ও অন্য নারীদের নিয়ে মন্দির ত্যাগ করে অরণ্য প্রদেশ দিয়ে চলে যাবেন কলচুরি সীমান্তে। অমাবস্যার রাতে আপনাদের সন্ধান পাবে না সম্রাটের সেনারা।’
রাহিল বলল, ‘কিন্তু আমি তো সে পথ চিনি না। আর কলচুরিরাই বা আমাদের আশ্রয় দেবে কেন?’
প্রধান ভাস্কর জবাব দিলেন, ‘ওই অরণ্যপ্রদেশে একদল যাযাবর উপজাতি উপস্থিত হয়েছে যারা প্রকৃতপক্ষে কলচুরিদের গুপ্তচর। আমি একজনকে পাঠিয়েছিলাম তাদের কাছে। হীরকখণ্ডের বিনিময়ে তারা আপনাদের কলচুরিদের রাজধানী ত্রিপুরীতে পৌঁছে দিতে সম্মত হয়েছে। অরণ্যে প্রবেশ করার পর রাতের অন্ধকারে তারাই পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে আপনাদের। যারা মহারাজ বিদ্যাধরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে কলচুরিরা তাদের আশ্রয় দেয়।’
‘আর আপনারা?’
মাহবা বিষণ্ণ হেসে বললেন, ‘এতজন মজুর-ভাস্করদের নিয়ে একসঙ্গে কি পালিয়ে যাওয়া সম্ভব? চান্দেলবাহিনীর হাতে সবাই ধরা পড়ে যাব। আমরা দুজন হয়তো আপনার সঙ্গী হতে পারতাম। কিন্তু তাদের এখানে ফেলে রেখে আমরা যাই কীভাবে? আমরা এখানেই থাকব। তাদের ভাগ্যর সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে আমাদের ভাগ্য। শুনছি কলচুরি আর প্রতিহাররা সম্মিলিতভাবে নাকি চান্দেলরাজ্যে আক্রমণ হানার প্রস্তুতি নিচ্ছে। যদি তেমন কিছু ঘটে তখন হয়তো মুক্তি পাব আমরা…’
তাঁর কথা শুনে রাহিল বলল, ‘আপনাদের কথা বুঝলাম, কিন্তু মন্দির- রক্ষীবাহিনী বা অনুদেবের চোখ এড়িয়ে আমরা মন্দির পরিত্যাগ করব কীভাবে?’
চিত্রবান এ প্রশ্নর জবাব দিলেন, ‘আপনার সৈন্যরা কি আপনার নির্দেশ পালন করে চলবে? যদি তাদের উৎকোচ হিসাবে হীরকখণ্ড দেওয়া হয় তবে কি তারা আপনাকে অনুসরণ করবে? আমাদের পরিকল্পনার সফলতার ক্ষেত্রে এটা জানা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।’
রাহিল একটু ভেবে নিয়ে বলল, ‘তারা আমার দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সঙ্গী। তা ছাড়া সৈনাধ্যক্ষর নির্দেশ পালন করে অধস্তন সৈনিকরা। যতক্ষণ না আমার চেয়ে উচ্চপদমর্যাদার কোনও সৈনাধ্যক্ষ এসে আমার নির্দেশ খণ্ডন করছে ততক্ষণ তারা আমার আজ্ঞাবাহী। এটাই নীতি প্রত্যেক যুদ্ধব্যবসায়ীর কাছে।’
চিত্রবান বললেন, ‘আপনার সেনারাই প্রতিহত করবে মন্দির-রক্ষীদের। প্রধান পুরোহিতকে সাহায্য করতে প্রকটাক্ষর নেতৃত্বে একমাত্র তারাই বাধার সৃষ্টি করতে পারে আপনাদের। আর এ কাজে সহায়তা করার জন্য আপনার সৈনিকদের একটা করে হীরকখণ্ড দেবেন। যার মূল্য একজন যুদ্ধব্যবসায়ীর সারা জীবনের উপার্জন থেকে অনেক বেশি।’
রাহিল বিস্মিতভাবে বলল, ‘আপনারা বারবার হীরকখণ্ডের কথা বলছেন, কিন্তু তা আমি সংগ্রহ করব কীভাবে?’
চিত্রবান তার পোশাকের ভিতর থেকে একটা ছোট চর্মথলি বার করলেন। তার মুখ উন্মোচিত করতেই মশালের আলোতে ঝলমল করে উঠল তার ভিতরে থাকা হীরকখণ্ডগুলো। চিত্রবান বললেন, ‘বিকর্না আমাকে দিয়েছে। যদিও সামান্যই আমি এ জিনিস সংগ্রহ করেছি তার কাছ থেকে।’
বিস্ময়ের যেন শেষ নেই রাহিলের। সে বলল, ‘বিকর্না হীরকখণ্ডগুলো কেন দিল আপনাকে?’
চিত্রবান বললেন, ‘কাল শেষ রাতে যখন এ কক্ষ ত্যাগ করে মন্দিরের অন্ত:পুর থেকে নির্গত হতে যাচ্ছি তখন আমরা দুজন মুখোমুখি হয়ে গেলাম। ভূগর্ভ থেকে হীরকপূর্ণ স্বর্ণকলস নিয়ে মন্দিরেরই কোনও কক্ষে তা লুকিয়ে রাখার জন্য মন্দিরে প্রবেশ করছিল বিকর্না। সে ভয় পেয়ে গেল আমার হাতে ধরা পড়ে গিয়ে। আমি অবশ্য সামান্য কিছু হীরকখণ্ড নিয়ে কলস ফিরিয়ে দিলাম বিকর্নাকে। ব্যাপারটা অনুদেবের কাছে গোপন থাকবে এ ব্যাপারে আমরা পরস্পরের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কাল সূর্যাস্তের পর সে-ও মন্দির ত্যাগ করবে। তবে সে আপনাদের সঙ্গে যাবে না। সে যাবে হিমালয়ের পাদদেশে চম্বা রাজ্যে। সেখানে সে সেই সম্পদ দিয়ে কোনও সম্ভ্রান্ত সুন্দর পুরুষকে প্রলুব্ধ করে তার সঙ্গে ঘর বাঁধবে। আমাকেও সে তার সঙ্গী হবার প্রস্তাব দিয়েছিল।
রাহিল বলল, ‘আমাকেও সে একই প্রস্তাব দিয়েছিল।’
চিত্রবানের কথা শেষ হলে মাহবা বললেন, ‘আমার ধারণা সূর্যাস্ত হলেই অনুদেব উপস্থিত হবেন মিত্রাবৃন্দার কক্ষে। মিত্রাবৃন্দার সম্মতির অপেক্ষা আর তিনি করবেন না। তাঁকেও রাত্রির মধ্যে তাঁর পরিকল্পনা সফল করতে হবে। মুহূর্তর জন্যও তাদের মুখোমুখি সাক্ষাৎ হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। অঘটন ঘটতে পারে। নতুন কোনও পরিকল্পনা করতে পারেন চিত্রবান। কাল দ্বিপ্রহরে মূর্তি নির্মাণের পর প্রথমে মিত্রাকে আমি কক্ষে ফেরাব। তারপর অন্ধকার নামলেই তাকে রেখে আসব বিকর্না যে কক্ষ থেকে কলস উদ্ধার করেছে সেই কক্ষে। সেখান থেকেই আপনি তাকে নিয়ে অন্যদের সঙ্গী করে যাত্রা শুরু করবেন সীমান্তের উদ্দেশ্যে।’
রাহিল বলল, ‘আপনাদের পরিকল্পনা এবার স্পষ্ট হল আমার কাছে। কিন্তু এর বিনিময়ে আমাকে আপনাদের কী কাজ করতে হবে বলুন?’
কয়েক মুহূর্তর জন্য নিস্তব্ধতা নেমে এল সেই ঘরে। তারপর চিত্রবান বললেন, ‘আপনাকে করতে হবে আসল কাজটা। যা না করলে কারো মুক্তিলাভ সম্ভব নয়। আমাদের সবাইকেও চূড়ান্ত বিপদের সম্মুখীন হতে হবে ভবিষ্যতে।’
‘কী সেই কাজ’? জানতে চাইল রাহিল।
মৃদু দৃষ্টি বিনিময় হল দুই ভাস্করের মধ্যে। বৃদ্ধ ভাষ্কর মাহবা, রাহিলের চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বললেন, ‘মন্দির পরিত্যাগের আগে হত্যা করতে হবে প্রধান পুরোহিত অনুদেবকে।’
চিত্রবান এরপর বললেন, ‘আমরা ভাস্কর। ক্ষত্রিয় বা যুদ্ধ ব্যবসায়ী নই। মন্দির-রক্ষীবাহিনীর লোকটাকে আমরা ধরা পড়ার আতঙ্কে ওপর থেকে প্রস্তরখণ্ড নিক্ষেপ করে ঘটনাচক্রে হত্যা করেছি ঠিকই, কিন্তু সামনাসামনি কাউকে যুদ্ধক্ষেত্রে হত্যা করিনি আমরা। বিশেষত, সে ব্যক্তি যখন অনুদেব। তার ওপর যতই ঘৃণা থাক তাঁর সুকঠিন ব্যক্তিত্ব গ্রাস করে আমাদের। সর্পের চোখের দিকে তাকিয়ে অন্য প্রাণী যেমন সম্মোহিত হয়ে যায়, ক্ষমতা থাকলেও যেমন সে সর্পের গ্রাসে পরিণত হয় তেমনই হয়তো তাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েও কালসর্পের সম্মোহনে পরাস্ত হলাম আমরা। তাকে হত্যা করতে ব্যর্থ হলাম। তাই এ কাজের ভার আপনাকে নিতে হবে। পারবেন তো?’
রাহিলের চোখে ভেসে উঠল মিত্রাবৃন্দার মুখ। তাকে মুক্তি দিতেই হবে রাহিলকে। নিজের মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও যে রাহিলের জন্য প্রত্যাখ্যান করেছে অনুদেবের প্রস্তাব। মুহূর্তখানেক নীরব থেকে রাহিল জবাব দিল, ‘পারব। কিন্তু কীভাবে? তার মুণ্ডচ্ছেদ করব, নাকি ছুরিকা বিঁধিয়ে দেব তার পঞ্জরে?’
তার কথা শুনে আবছা হাসি ফুটে উঠল তাদের মুখে। চিত্রবান বললেন, ‘না, সেভাবে নয়। তার অস্ত্রেই তাকে ঘায়েল করতে হবে। যাতে পরদিন সূর্যোদয়ের পর সৈন্যবাহিনী যখন মন্দিরে প্রবেশ করবে তখন তারা ভাবে কৃষ্ণবানরের আক্রমণেই মৃত্যু হয়েছে তার। সৈন্যবাহিনী মন্দিরে এসে নিশ্চই দেখা পাবে কৃষ্ণবানরদের। আমি, ভাস্কর মাহবা বা অন্য ভাস্কর-মজুররা কেউই রাত্রিবাস করে না মন্দিরে। সে দায় তাই বর্তাবে না আমাদের ওপর।’
চিত্রবানের কথা শেষ হবার পর মাহবা তার পোশাকের মধ্যে থেকে কতগুলি ক্ষুদ্রাকৃতি অস্ত্র বার করে এগিয়ে দিল রাহিলের দিকে। সে অস্ত্রগুলো অঙ্গুরীয়র মতো ধারণ করা যায়। ক্ষুদ্রাকৃতি হলেও তা মারাত্মক অস্ত্র—বাঘনখ!
রাহিলের হাতে সেগুলি তুলে দিয়ে মাহবা বললেন, ‘মিত্রাবৃন্দাকে তার কক্ষ থেকে অপসারিত করার পর আপনি আত্মগোপন করবেন সেই কক্ষে। সূর্যাস্ত হলে অনুদেব নিশ্চিত গোপনে প্রবেশ করবেন সেই কক্ষে। আর তারপর…।’
প্রধান ভাস্কর চিত্রবান এরপর রাহিলের দিকে এগিয়ে দিলেন তার সৈন্যদের পারিতোষক দেবার জন্য সেই হীরকথলি…
নীচে নেমে আসার পর রাহিল আবার এসে দাঁড়াল মন্দিরের পশ্চাতভাগে। তিন প্রহর পর্যন্ত সে সেখানে থেকে চতুর্থ প্রহরে এসে সে মিলিত হল সম্মুখভাগে সেনাদলের সঙ্গে।