খেলার নাম খুন (গল্প) – সৈকত মুখোপাধ্যায়
খেলার নাম খুন
অজিত বর্মনের ঘরের মধ্যে বোমা ফেটেছে। ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে অজিত বর্মনের শরীর।
খবরটা যখন প্রথমবার শুনল তখন বিনায়কের মনে হয়েছিল বোমাটা অজিতবাবুর ঘরে নয়, তার নিজের পায়ের নীচে ফেটেছে এবং ফেটেছে একেবারে আচমকাই। তা না হলে তার চারপাশের পৃথিবীটা অমন দুলছে কেন? কেনই বা তার মাথায় কিছু ঢুকছে না?
বিনায়ক মানে বিনায়ক বসু-আলিপুরদুয়ার থানার ওসি। বয়স বত্রিশ। প্রবল পরিশ্রমী, সৎ এবং বাইরের কঠিন আবরণের নীচে একজন নরম মনের মানুষ।
নিহত অজিত বর্মনের পরিচয়টা অবশ্য এত সংক্ষেপে দেওয়া যাবে না, কারণ তাঁর কথা বলতে গেলে তাঁদের পারিবারিক ব্যবসার কথা, অজিতবাবুর দাদা অসীম বর্মনের কথা এবং অবশ্যই সন্ত্রাসবাদী যুগল বসুমাতারির কথা বলতে হবে। না হলে তিনি কেন খুন হলেন সেটা বোঝা যাবে না।
আলিপুরদুয়ারের পুবদিকে, বাংলা-আসাম সীমান্তে, বারোবিশা বলে একটা শহর আছে। বর্মনরা সেখানকার বনেদি কাঠ ব্যবসায়ী। তাদের ষাট বছরের পুরনো করাতকলের নাম ডুয়ার্স শ মিল।
অজিত বর্মনের দাদুর আমলে ব্যবসা ছিল জমজমাট। তখন অরণ্য- সংরক্ষণ আইন এত জোরদার হয়নি। আসামের জঙ্গলের দামি দামি কাঠ বর্মনদের করাতকলে চেরাই হয়ে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ত।
তারপরে আইনের কড়াকড়ি হল। উত্তরবঙ্গের বহু করাতকলের মতন বর্মনদের ডুয়ার্স শ মিলও কাঠের অভাবে ধুঁকতে লাগল। এইভাবেই বেশ কয়েকটা বছর কেটে গেল। তারপর কয়েক বছর আগে ডুয়ার্স শ মিল আবার জেগে উঠল। বর্মনদের গোলায় রাতের অন্ধকারে দামি দামি গাছের প্রকাণ্ড সব গুঁড়ি, যাকে ব্যবসার পরিভাষায় বলে ‘লগ’, ঢুকতে শুরু করল। আবার রাত পোহানোর আগেই সেসব লগ চেরাই হয়ে পাচার হতে লাগল কলকাতায়।
আসলে আসামের জঙ্গলে তখন আক্ষরিক অর্থেই ‘জঙ্গলের রাজত্ব’ শুরু হয়ে গিয়েছিল। সন্ত্রাসবাদী পরিচয়ের আড়ালে একদল খুনে গুন্ডা সেখানে সমস্ত সরকারি পাহারা উড়িয়ে দিয়ে নিজেদের রাজত্ব কায়েম করে বসেছিল। আর তাদেরই এক নেতা যুগল বসুমাতারির সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল অজিত বর্মনের দাদা অসীম বর্মন।
যুগল বসুমাতারি আর তার দলবল জঙ্গলে কাঠ কাটবার সময় বন্দুক হাতে চোরা-কাঠুরেদের প্রোটেকশন দিত। তাদেরই লোকজন হাতে স্টেনগান নিয়ে ট্রাকের ড্রাইভারের পাশে বসে সেই সব লগ পৌঁছিয়ে দিত ডুয়ার্স শ মিলের উঠোনে। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের লোকজন কিংবা পুলিশ সব কিছু জানলেও তাদের আটকাবার ক্ষমতা ধরত না।
চোরাই কাঠের ব্যবসায় কয়েক বছরের মধ্যেই অসীম বর্মন লালে লাল হয়ে উঠল। পুরনো আমলের টিনের চাল দেওয়া বাংলো বাড়ি ভেঙে ফেলে সেখানে পাকা দোতলা বাড়ি তুলল। আট সিটের গাড়ি কিনল। তবে সকলেই বুঝতে পারত, সমস্ত টাকা তার একা হজম করার সাহস ছিল না। মোটা রকমের একটা ভাগ নিশ্চয় যুগলকেও দিতে হত।
মাত্র পাঁচবছর অসীম বর্মনের এই সুসময় চলেছিল।
তারপর আবার চাকা ঘুরল।
আসামের জঙ্গলে মিলিটারি ক্র্যাক ডাউন শুরু হল। অন্যান্য বহু সন্ত্রাসবাদী গ্রুপের মতন যুগল বসুমাতারির দলও ভেঙেচুরে ছত্রাখান। ফলে অসীম বর্মনের কাঠের ব্যবসাও আবার শুকিয়ে গেল।
এই পুরো সময়টাতেই অজিত বর্মনের ভূমিকা ছিল নিছক দর্শকের। অজিত এবং অসীম— দুই ভাইয়ের চরিত্রে আকাশ পাতাল তফাত। অজিত বর্মন যখন জন্মেছিলেন, তখন তাঁদের ব্যবসার খুবই দুরবস্থা। ফলে তিনি ব্যবসায় ঢোকার কথা ভাবেনইনি কখনো। বিএ পাশ করে বারোবিশারই একটা প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। শেষ দিন অবধি সেই কাজই করে গেছেন। দুই ভাইয়ের জীবনযাত্রা ছিল সম্পূর্ণ দুই রকমের। অজিতবাবু সাধারণ পোশাকআশাক পরতেন। বই কেনাটাকে যদি বাজে খরচা ধরা হয় তাহলে সেটুকুই ছিল তার বাজে খরচ। খুব বেশি কথা বলতেন না, তবে যেটুকু বলতেন তার পেছনে ওঁর বুদ্ধি এবং জ্ঞানের ছাপ থাকত। বারোবিশার লোকজন তাই অজিত মাস্টারমশাইকে খুবই সম্মানের চোখে দেখত।
উলটোদিকে অসীম বর্মনের স্বভাবে দাম্ভিকতা ছিল খুব বেশি। ব্যাচেলর অসীম খাওয়াদাওয়া, বিলাসব্যসনে অনেক পয়সা ওড়াত।
দুই ভাইয়ের মধ্যে বাইরে কোনো মিল না থাকলেও ভালোবাসার অভাব ছিল না। রক্তের টান বলে একটা ব্যাপার আছে। সেটা কোনো যুক্তি মানে না। অসীম বর্মন দোতলাটা ভাইকে থাকবার জন্যে ছেড়ে দিয়েছিল। অবশ্য তার অন্য একটা কারণও থাকতে পারে। রাতবিরেতে শ মিলের কম্পাউন্ডে গাড়ি ঢুকলে তাকে তাড়াহুড়ো করে বাইরে বেরোতে হত। একতলায় থাকলে সেদিক থেকে সুবিধে হত।
শুধু যদি চোরাই কাঠের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যেত তাহলেও অসীমের খুব একটা অসুবিধে ছিল না। কারণ, তার জমানো টাকা খুব একটা কম ছিল না। আলিপুরদুয়ারে একটা বাড়ি বানিয়েছিল। সেটা থেকেও নিয়মিত মোটা ভাড়া পেত। কিন্তু সমস্যাটা হল অন্য জায়গায়। যুগল বসুমাতারি যখন তখন এসে অসীম বর্মনের কাছ থেকে টাকা দাবি করতে লাগল। তাকে নতুন করে দল তৈরি করতে হবে। ভাঙাচোরা দলকে আবার অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সাজিয়ে তুলতে হবে। তার জন্যে অনেক টাকার প্রয়োজন। অসীম ছাড়া আর কে দেবে সেই টাকা?
একটা সময়ের পরে অসীম কিন্তু বেঁকে বসল। স্বাভাবিক। তখন তো আর যুগলের কাছ থেকে তার কোনো সুবিধে পাবার আশা নেই। তাহলে কেন সে টাকা দেবে? দুজনের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি হতে লাগল এবং এরকমই এক ঝগড়ার মধ্যে মত্ত অবস্থায় হঠাৎ যুগল বসুমাতারি অসীমের মাথায় রিভলবার ঠেকিয়ে ফায়ার করে দিল।
ঘটনাটা ঘটেছিল গভীর রাতে। হয়তো যুগল খুন করে নিরাপদেই পালাতে পারত, যদি না ঠিক সেই সময়েই দাদার উত্তেজিত চিৎকার শুনে অজিতবাবু নীচে নেমে আসতেন। সিঁড়ির শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে অজিতবাবু গুলির শব্দ শোনেন। তারপরেই দেখেন দাদার ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে আসছে যুগল বসুমাতারি। রিফ্লেক্স অ্যাকশনেই অজিতবাবু যুগলকে চেপে ধরে চিৎকার করতে আরম্ভ করেন। প্রতিবেশীরা সেই চিৎকার শুনে ছুটে আসে এবং সকলে মিলে যুগলকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়।
যুগল বসুমাতারিকে বিনায়ক বসুই লক আপে ঢুকিয়েছিল, যেহেতু সেই ছিল এই কেসের ইনভেস্টিগেটিং-অফিসার।
কেসটা খুব সহজ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু হল না। কারণ, ওয়েপন অফ মার্ডার, অর্থাৎ যে অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল সেটাকে খুঁজে পাওয়া গেল না। যে কোনো মার্ডার কেসে এই অস্ত্রটা ভয়ঙ্কর গুরুত্বপূর্ণ। অস্ত্রের ওপরে খুনির ফিঙ্গার প্রিন্ট থাকে। মৃতের শরীরের ভেতরে যে বুলেট পাওয়া যায় তার সঙ্গে আগ্নেয়াস্ত্রের সম্পর্ক প্রমাণ করা যায়। গুরুত্বটা এই সব কারণেই। এর ওপরেই মামলার সাফল্য কিংবা বিফলতা অনেকটা নির্ভর করে।
যুগল বসুমাতারির রিভলবারটা যে খুঁজে পাওয়া গেল না, সেটা অলৌকিক কোনো ব্যাপার নয়। সন্ত্রাসবাদীরা সব সময়ে বনে থাকে না, বিপদে পড়লে তারা লোকালয়ের সাধারণ মানুষের মধ্যেই মিশে যায়। বিনায়ক ভালো করেই জানত, বারোবিশারই বেশ কিছু ছেলে পয়সার লোভে যুগল বসুমাতারি দলে কাজ করে। খুনের ঘটনার সেই রাত্রে, যখন যুগলকে আটকানোর দিকেই সবার নজর ছিল, তখন এরকমই কেউ নিশ্চয়ই চট করে খোলা ঘরে ঢুকে অস্ত্রটা হাতিয়ে নিয়ে পালায়। বিনায়ক পরে সেই অস্ত্রের খোঁজে চিরুনি তল্লাসি চালিয়েও সেটাকে আর খুঁজে পায়নি।
অতএব বিনায়কের হাতে রইলেন কেবল অজিত বর্মন। প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে তাঁর সাক্ষ্যর ওপরেই নির্ভর করেছিল অসীম বর্মন হত্যা মামলার ভাগ্য।
এই সহজ সত্যটা পুলিশ দপ্তর যেমন জানত তেমনি সন্ত্রাসবাদীরাও নিশ্চয় জানত। তাই এটাও সকলেই বুঝতে পারছিল যে, অজিত মাস্টারমশাইয়ের প্রাণটা একটা সরু সুতোর ওপরে ঝুলছে। যুগল বসুমাতারির দলের মূল টার্গেট এখন হবে অজিত বর্মন। তাকে যে কোনো ভাবে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে পারলে যুগলের মুক্তি অনেকটাই নিশ্চিত।
সবাই যা বুঝবে বিনায়ক বসুর মতন ছুঁদে পুলিশ-অফিসার তা বুঝবে না, এটা তো হয় না। অতএব যুগল বসুমাতারিকে হাজতে পোরার পরেই দ্বিতীয় কাজ যেটা বিনায়ক বসু করেছিল, সেটা হল, বর্মনবাড়ির চারপাশে চব্বিশ ঘণ্টা সশস্ত্র পুলিশি প্রহরার ব্যবস্থা করা।
তবু শেষরক্ষা হল না। কাল বাদে পরশু কোর্টে মামলা উঠবার কথা। আর আজ সকাল সাতটায় বিনায়ক বসুর মোবাইলে খবর এল— অজিত বর্মনের দোতলার ঘরে প্রচণ্ড এক বিস্ফোরণ ঘটেছে। ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে অজিত বর্মনের শরীর।
বিনায়কের পায়ের তলার মাটি দুলে উঠল।
.
২
পরেরদিন সকালবেলা।
কুচবিহার এয়ারস্ট্রিপের লাগোয়া একতলা বাড়িটার ছাদের পাঁচিলে হাত রেখে দাঁড়িয়েছিল বিনায়ক। চারিদিকে অজস্র ফুলের টব। মরশুমি ফুলগাছের চারা লাগানো হয়েছে। গার্ডেন চেয়ারও রয়েছে কয়েকটা। মাঝে একটা বেতের টেবলের ওপর রয়েছে আজকের খবরের কাগজ। এ বাড়ির কাজের লোক বিনায়ককে এই পর্যন্ত নিয়ে এসে বলেছিল, একটু বসুন। বাবু এখনি আসবেন।
কিছুক্ষণ একটা চেয়ারে বসে কাগজের কয়েকটা পাতা উলটেছিল বিনায়ক। কিন্তু বোধহয় মানসিক অস্থিরতার জন্যেই বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারেনি। উঠে পায়চারি করতে শুরু করেছিল।
শরৎকাল এসে গেছে। সকালেই একপশলা বৃষ্টি হয়ে যাওয়ার ফলে আকাশ এখন ঘন নীল। বছরের এই সময়টায় কুচবিহার শহরের উত্তর দিগন্তে দাঁড়িয়ে থাকা ভুটান-পাহাড়ের সারি বেশ স্পষ্টভাবে চোখে ধরা দেয়। সেইদিকে তাকিয়েই দাঁড়িয়েছিল বিনায়ক।
হঠাৎ পেছন থেকে কে যেন বলে উঠল—সত্যি, পুলিশের চাকরিতে ছুটি পাওয়া এক সমস্যা। পুজোর সময় আরেকবার দার্জিলিং যেতে পারলে তো ভালোই লাগত। কিন্তু পারবেন কি?
এত চমকে উঠল বিনায়ক যে, বলবার কথা নয়। বিনায়ককে ঘুরে দাঁড়াতে দেখে বয়স্ক মানুষটি মুচকি হেসে আবার জিজ্ঞেস করলেন, কী? ঠিক বলিনি?
কিন্তু আপনি আমার মনের কথা জানলেন কেমন করে?
এলিমেন্টারি, মাই ডিয়ার বিনায়ক। বিনায়ক বসু, তাই তো?
হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন। বসু। কিন্তু আমি যে দার্জিলিং-এ যাওয়ার কথা ভাবছি, সেটা আপনি বুঝলেন কেমন করে?
আপনি প্রথমে একদৃষ্টিতে অনেকক্ষণ ওই পাহাড়গুলোর দিকে তাকিয়েছিলেন। তারপর আপনার নজর ঘুরে গেল আপনার বাঁ হাতের কব্জির ওই রিস্টব্যান্ডটার দিকে। ইয়াক-বোন মানে চমরিগাইয়ের হাড় দিয়ে বানানো, তান্ত্রিক মোটিফ আঁকা ওই রিস্টব্যান্ডগুলো দার্জিলিং ম্যালের পাশে হাবিব মল্লিকের দোকানে ছাড়া আর কোথাও পাওয়া যায় না। রিস্ট-ব্যান্ডটার দিকে তাকিয়ে আপনি নিশ্চয় গত বারের ট্যুরটার কথাই ভাবছিলেন, কারণ আপনার মুখে একটা তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠেছিল। তারপর আপনি কী করেছিলেন মনে পড়ছে কি?
আপনিই বলুন।
আপনি এগিয়ে গিয়ে টেবলে রাখা ওই ডেস্ক-ক্যালেন্ডারটার দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন। আপনার মুখটা হতাশায় ভরে গিয়েছিল। কারণ, পুজোর আর মাত্র পনেরোদিন বাকি। অথচ এই সময়েই অজিত বর্মনের হত্যাকারী আপনাকে বিশ বাঁও জলে ফেলে দিয়ে গেছে। ওই ঘরের জানলায় দাঁড়িয়ে আমি পুরোটাই দেখেছি। তারপরেও কি মনের কথাটা আন্দাজ করা খুব শক্ত? চলুন, বসা যাক।
একটা গার্ডেন চেয়ার টেনে নিয়ে ভদ্রলোকের মুখোমুখি বসতে বসতে বিনায়কের এই প্রথমবারের জন্যে মনে হল, কোথাও একটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে। কারণ, উলটোদিকের ওই বয়স্ক মানুষটির নাম উমাশঙ্কর চৌবে। আর তার ডিটেকশনের বহর এই মাত্র যা দেখা গেল, তা বাজপেয়ি সাহেবের কথার সঙ্গে অক্ষরে অক্ষরে মিলে যাচ্ছে।
ওঁর সম্বন্ধে বাজপেয়ি সাহেব বলেছিলেন, তদন্তের যে পর্যায়ে গিয়ে অন্য অফিসারেরা আটকে যেতেন, সেখান থেকেই উমাশঙ্কর চৌবের কাজ শুরু হত। গতকাল বাজপেয়ি সাহেবই দিশাহারা বিনায়ককে বলেছিলেন, রিপোর্টে যদি লেখো অজিত বর্মনের ঘরে ভূতে আরডিএক্স রেখে গেছে,
কিংবা উনি নিজেই আরডিএক্স ফাটিয়ে আত্মহত্যা করেছেন, তাহলে তোমার সম্মান বাড়বে না বিনায়ক। তার চেয়ে তুমি একবার চৌবেসাহেবের কাছে যাও। উনিও পুলিশ সার্ভিসেই ছিলেন। গত বছরেই অ্যাডিশনাল এসপি হিসেবে রিটায়ার করেছেন। হয়তো উনি তোমাকে একটা রাস্তা দেখাতে পারবেন। আমি ফোনে ওঁকে তোমার কথা বলে রাখছি।
সেই মতোই এখানে এসেছে বিনায়ক।
ইতিমধ্যে কাজের লোকটি দু’ কাপ চা আর স্ন্যাক্স রেখে গিয়েছিল। ইশারায় বিনায়ককে চা পান করতে বলে চৌবেসাহেব সরাসরি কাজের কথায় চলে এলেন। বললেন, মিস্টার বাজপেয়ির কাছ থেকে মোটামুটি পুরো ঘটনাটা শুনেছি। তবে আপনার কাছ থেকে কয়েকটা ডিটেইলস জানতে চাই।
আপনি প্রশ্ন করুন স্যার। আমি উত্তর দিচ্ছি।
উমাশঙ্কর চৌবে প্রথমেই প্রশ্ন করলেন, দোতলায় অজিতবাবুর সঙ্গে আর কে কে থাকতেন?
ওঁর স্ত্রী আর মেয়ে।
তারা নিশ্চয় বোমা রাখবেন না? একটু সন্দেহের জায়গা রেখেই যেন বললেন তিনি। বিনায়কের মনে পড়ল, গোয়েন্দা গল্পের প্রথম সূত্র– কাউকে সন্দেহের ঊর্ধ্বে না রাখা।
সে উত্তর দিল—না স্যার। হ্যাপি ফ্যামিলি। তাছাড়া মেয়েটার বয়েস মাত্র বারো বছর। অজিতবাবু একটু দেরি করে বিয়ে করেছিলেন।
ওকে। এই কদিন ওঁরা কেউই বাড়ির বাইরে বেরোননি শুনলাম।
ঠিক তাই। ওঁর যা কিছু প্রয়োজন সেই সবই আমার লোকেরা এনে দিয়েছে। ওঁর স্কুল এবং ওঁর মেয়ের স্কুল, দু’ জায়গাতেই ছুটি চলছিল। সেটাও একটা সুবিধে ছিল।
বাড়ির ভেতরে ঢোকেওনি কেউ?
একমাত্র কাজের মেয়ে বেনু। বেনু দশবছর ও বাড়িতে কাজ করছে। ওর ব্যাকগ্রাউন্ড আমরা খুব ভালো করে চেক করেছি। ওকে সন্দেহ করা যায় না।
বাড়ির একতলায় কারা থাকেন?
অজিতবাবুর দাদা অসীমবাবু অবিবাহিত ছিলেন। উনি গ্রাউন্ড ফ্লোরে একাই থাকতেন। এই মুহূর্তে তাই একতলাটা ফাঁকাই পড়ে আছে। আন্ডার লক অ্যান্ড কি।
তাহলে বাকি থাকছে লুকিয়ে ঢোকার সম্ভাবনা।
সেটা অসম্ভব স্যার। চব্বিশ ঘণ্টা পালা করে ছ’ জন আর্মড পুলিশ ওই বাড়ি ঘিরে রেখেছিল। বাড়ির দরজা দুটো। একটা সামনে, একটা পেছনে। দুটো দরজার সামনেই পুলিশ পোস্টিং ছিল।
আপনার লোকগুলি আশা করি সন্দেহের ঊর্ধ্বে?
অ্যাবসল্যুটলি। দে ওয়্যার হ্যান্ড-পিকড়। পুরো ব্যাটেলিয়নের মধ্যে থেকে বাছাই করে ওদের নিয়ে এসেছিলাম।
বাড়ির সামনে বারান্দা রয়েছে?
আছে। রাস্তার ওপরেই খোলা বারান্দা।
একটু ইতস্তত করে বিনায়ক যোগ করল— আপনি কী সন্দেহ করছেন, বুঝতে পারছি স্যার। কেউ যদি রাস্তা থেকে বোমাটা ছুঁড়ে দিয়ে থাকে, তাই তো? কিন্তু সেক্ষেত্রেও দুটো ব্যাপার রয়েছে। এক, ওই রাস্তাটা খুবই নির্জন। গেটের কাছে যে গার্ড থাকত তার চোখ এড়িয়ে কেউ ওখান থেকে কিছু ছুঁড়ে দিয়ে পালাতে পারবে না। দুই, বোমটা বারান্দায় ফাটেনি। ফেটেছে অজিতবাবুর ঘরে। যে ঘরে বসে উনি পড়াশোনা করতেন, সেখানে। রাস্তা থেকে সে ঘর দেখা যায় না।
আই সি। উমাশঙ্কর চৌবে কিছুক্ষণ মাথা নীচু করে কী যেন ভাবলেন। তারপর বিনায়ককে জিজ্ঞেস করলেন, ঘটনাটা কখন ঘটেছিল?
সকাল সাড়ে সাতটায়।
ফরেনসিক কী বলছে?
শুধু আরডিএক্সটুকুই বলতে পারছে। আপনি তো জানেন, ছোট ঘরে আরডিএক্স এক্সপ্লোসন মানে আর সব কিছু ধোঁয়া হয়ে যাওয়া।
ঠিক। ঘণ্টায় সাত হাজার মাইল।
স্যার!—উমাশঙ্কর চৌবের কথাটা ঠিক ধরতে না পেরে বিনায়ক তার মুখের দিকে তাকাল।
আরডিএক্স এক্সপ্লোসনের শক্-ওয়েভের কথা বলছিলাম। সেভেন থাউজ্যান্ড মাইল পার আওয়ার। আর কোনো সূত্র খুঁজে না পাওয়ারই কথা। অদ্ভুত জিনিস এই আরডিএক্স। এমনিতে লোহা বা পাথরের মতনই স্টেবল অথচ মোমের মতন নমনীয়। হাতুড়ি মারুন, ছুঁড়ে ফেলুন, দোমড়ান, মোচড়ান বিস্কুটের মতন পাতলা ফালি করুন, ইচ্ছেমতন শেপ দিন। কিচ্ছু হবে না। কিন্তু যে কোনো ভাবে ডিটোনেটর দিয়ে ভেতরে একটা স্পার্ক দিন। তখন ওই নিরীহ জিনিসটাই আজকের পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী মৃত্যুদূত। কথাটা বলে কেমন অদ্ভুতভাবে যেন হেসে উঠলেন চৌবেসাহেব।
তবে হাসিটা পরমুহূর্তেই মুছে গেল। উনি দু’ হাতের মধ্যে চিবুক রেখে গভীর চিন্তার মধ্যে ডুবে গেলেন।
বেশ কিছুটা সময় কেটে যাওয়ার পরে উমাশঙ্কর চৌবে হঠাৎ মুখ তুলে বললেন, অজিত বর্মনের সারা দিনের রুটিনটার সম্বন্ধে কিছু বলতে পারবেন?
কেন পারব না? উনি বরাবরই ঘুম থেকে উঠতেন সকাল ছ’ টায়। আগে বাড়ির সামনের রাস্তায় ঘণ্টাখানেক হাঁটতেন। গৃহবন্দি হয়ে যাওয়ার পর আর সেটা পারতেন না। তার বদলে ছাদে কিছু ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ করে, সাতটার সময় স্ত্রী আর মেয়ের সঙ্গে বসে চা খেতেন। সাড়ে সাতটায় চলে যেতেন নিজের পড়ার ঘরে। সেখানে বসেই নিউজপেপারে চোখ বোলাতেন। অন্যান্য বই পড়ার থাকলে কিংবা স্কুলের খাতা টাতা দেখার থাকলে ওই ঘরে বসেই দেখতেন। স্কুল খোলা থাকলে সাড়ে ন’ টায় বেরিয়ে স্নান-খাওয়া করে স্কুলে যেতেন। স্কুল থেকে ফিরে একটু টিভি দেখতেন। নিউজ চ্যানেলগুলোই দেখতেন বেশি। তারপর আবার বই পড়া। এগারোটায় শুয়ে পড়তেন।
ঘটনার দিনও এই রুটিন মেনেই উনি এগোচ্ছিলেন। সাতটায় চা খেয়ে সাড়ে সাতটায় পড়ার ঘরে ঢুকেছিলেন। তার ঠিক পরে পরেই প্রচণ্ড শব্দে বোমাটা ফাটে।
পার্সেল বোমার ব্যাপারটা নিশ্চয় ভেবেছেন? মানে ধরুন, যদি পার্সেলে কোনো বইটই এসে থাকে, যার মধ্যে বোমাটা লুকোনো ছিল।
প্রথমেই সেই সম্ভাবনার কথা ভেবেছিলাম। কিন্তু গত সাতদিনে পার্সেল কেন, কোনোরকম চিঠিই আসেনি। এলে আমার লোকেরা জানতে পারত। ওদের বলে রেখেছিলাম, প্রতিটি জিনিস যেন পরীক্ষা করে ওঁর হাতে দেওয়া হয়।
একটু ইতস্তত করে বিনায়ক বলল, পুরো ঘটনাটাই তো আপনাকে বললাম স্যার। যেটুকু বলিনি সেটা হল, আগামীকাল বেলা এগারোটায় কোর্টে কেস উঠছে। সুপারিন্টেন্ডেন্ট অফ পুলিশ বাজপেয়ি সাহেব তাঁর সমস্ত প্রভাব খাটিয়ে প্রেস আর টেলি-মিডিয়াকে ওই সময় অবধিই আটকে রেখেছেন। তার পর ওরা সবাই মিলে আমার ওপর নেকড়ের মতন লাফিয়ে পড়বে। বাজপেয়ি সাহেব বলে দিয়েছেন, তখন তিনি আমাকে আর বাঁচাতে পারবেন না। হয়তো আমার চাকরিটাই চলে যাবে। তার আগে যদি এটুকু জানতে পারতাম, বোমাটা কে, কীভাবে ঘরের মধ্যে প্ল্যান্ট করে গেল।
উমাশঙ্কর চৌবে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর যে কথাটা বললেন, সেটার সঙ্গে বিনায়কের উদ্বেগের সরাসরি কোনো সম্পর্ক খুঁজে বার করা মুশকিল। বললেন, আমরা ছোটবেলায় একটা খেলা খেলতাম, বুঝলেন বোস সাহেব।
বিনায়ক ঠিক শুনতে পেয়েছে কি না বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, খেলার কথা বলছেন স্যার?
হ্যাঁ, হ্যাঁ। খেলা… খেলা। একেবারে ছেলেখেলাই বলা যায়, কারণ, বেশি ভূগোল পড়ে ফেললে খেলাটা আর খেলা যায় না। ক্লাস টু থ্রি অবধিই ওই খেলা খেলা যায়। খেলাটার নাম ম্যাপ-পয়েন্টিং। একজন ম্যাপের মধ্যে একটা খুদে অক্ষরে লেখা নাম বেছে নিয়ে অন্য খেলুড়েকে বলবে সেটা খুঁজে বের করতে। সময়ের মধ্যে খুঁজে বার করতে না পারলে অপোনেন্ট হেরে গেল। ও খেলা তো আমরাও খেলেছি স্যার। কিন্তু তার সঙ্গে এই কেসের কী সম্পর্ক?
আপনি খেলেছেন? আচ্ছা যখন খেলতেন, তখন আপনার প্রতিদ্বন্দ্বীকে কীরকম নাম খুঁজে বের করতে বলতেন?
আমি?—একটু ভেবে নিয়ে বিনায়ক বলল, ধরুন, নীল রঙে আঁকা সমুদ্রের মধ্যে ছোট্ট একটা দ্বীপের নাম খুঁজতে বলতাম। এত ছোট ছোট হরফে ওগুলো লেখা থাকত যে অন্যেরা ভারি মুশকিলে পড়ে যেত।
মুশকিলে পড়ত। কিন্তু হেরে যেত কি?
সত্যি কথা বলতে কি, বেশিরভাগ সময়েই হারত না। খুঁজে খুঁজে ঠিক বার করে দিত। এতদিন বাদেও বিনায়কের গলায় যেন একটু আফশোস ফুটে উঠল।
চৌবেসাহেব স্নিগ্ধ হেসে বললেন, আমি কিন্তু বেশিরভাগ সময়েই জিততাম। কেন জানেন? আমি খুঁজতে বলতাম টাকলামাকান কিংবা আন্দিজ কিংবা সাইবেরিয়ান স্তেপ্। সারা পাতা জুড়ে বড় বড় অক্ষরে লেখা থাকতো ওই নামগুলো। একসঙ্গে চোখে ধরাই যেত না। কীভাবে খুঁজে বার করবে তাহলে আমার বন্ধুরা?
বিনায়ক যেন একটু একটু বুঝতে পারছিল, উনি কী বলতে চাইছেন তাই সে চুপ করে শুনে যেতে লাগল চৌবেসাহেবের কথা।
ক্রাইমের ব্যাপারটাও একদম এইরকম। চোখের সামনে যত বেশি ছড়িয়ে থাকে ততই ধরা কঠিন হয়ে যায়। তবে, মনে হচ্ছে অজিত বর্মনের হত্যারহস্যের ছড়িয়ে পড়া অক্ষরগুলোকে আমি দেখতে পাচ্ছি।
.
আরো মিনিট পনেরো চৌবেসাহেবের সঙ্গে কথা বলার পর বিনায়ক যখন কুচবিহার থেকে আলিপুরদুয়ারের রাস্তায় গাড়ি ঘোরালো, তখন তার মুখ থেকে হতাশার কালো মেঘ অনেকটাই কেটে গেছে। চৌবেসাহেব কিছু অ্যারেঞ্জমেন্ট করে রাখতে বলেছেন। কাল ভোরবেলাতেই উনি বারোবিশা যাবেন। সরকারি গাড়ির সুবিধে নিতে রাজি হলেন না। বললেন, অন প্রিন্সিপল, রিটায়ারমেন্টের পর থেকে সরকারি গাড়ি চাপি না। আমি পাবলিক বাসেই যাতায়াত করব।
.
৩
বারোবিশা শহরের প্রধান রাস্তাটা যেখানে শহরের শেষ সীমায় পৌঁছেছে, সেই জায়গাটা বেশ সুন্দর। চওড়া রাস্তার দু’ পাশে বড় বড় কৃষ্ণচূড়া, সেগুন আর শিশু গাছের সারি। তাদের মঝে অনেকটা ব্যবধানে এক একটা বাড়ি। এরকমই একটা দোতলা বাড়ির সামনে বড় লোহার গেটের ওপরে লেখা ডুয়ার্স শ মিল।
এখন আর বাড়িটার চারপাশে পুলিশ পোস্টিং নেই।
সকাল সাতটা। রাস্তায় লোক চলাচল নেই বললেই হয়। শুধু বর্মনদের বাড়ির সামনে একটা লরি দাঁড়িয়ে রয়েছে। কয়েকজন মিস্ত্রি এত সকালেই বিস্ফোরণের ফলে জমা হওয়া রাবিশ ঝুড়িতে ভরে ওই লরির মধ্যে বোঝাই করার কাজ শুরু করে দিয়েছে।
কাজ চলছে। পনেরো মিনিট কেটে গেল। কুড়ি মিনিট। শহরের দিক থেকে একটা সাইকেল দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসছে। পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের একটা ছেলে সাইকেলটা চালাচ্ছে। কোনো কোনো বাড়ির সামনে সাইকেলটাকে কয়েক মুহূর্তের জন্যে দাঁড় করিয়ে সে দৌড়ে ঢুকে যাচ্ছে বাড়ির কম্পাউন্ডের মধ্যে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ফিরে এসে লাফ মেরে সাইকেলে উঠে রওনা দিচ্ছে পরের বাড়িটার দিকে।
প্রতি সকালের এ এক খুব পরিচিত দৃশ্য। কাগজওলা খবরের কাগজ বিলি করে যাচ্ছে।
বর্মনবাড়ির সামনে এসে ছেলেটা আর সাইকেল থেকে নামল না। বরং একটা পা মাটিতে রেখে সে সাইকেলের হ্যান্ডেলে ঝোলানো ব্যাগের মধ্যে থেকে একটা কাগজ টেনে বার করল। সুতলি দড়ি দিয়ে গোল করে বাঁধা কাগজটাকে সে অভ্যস্ত হাতে পাঁই করে ছুঁড়ে দিল দোতলার বারান্দার দিকে। এও খুব পরিচিত দৃশ্য। সারা ভারতের সব শহরেই এ দৃশ্য দেখা যায়।
শুধু তার পরের দৃশ্যটাই খুব একটা স্বাভাবিক নয়। যে চারজন মিস্ত্রি রাবিশের ঝুড়ি মাথায় লরিটার দিকে এগোচ্ছিল, তারা একসঙ্গে মাথা থেকে ঝুড়ি ফেলে দিয়ে সাইকেলওলাকে ঘিরে দাঁড়াল। তাদের প্রত্যেকের হাতে এখন একটা করে রিভলবার।
খবরের কাগজ বিলি করা ছেলেটা এতই হতভম্ব হয়ে পড়েছিল যে, সে পালাবার বা বাধা দেওয়ার কোনো চেষ্টাই করল না। ডুয়ার্স শ মিলের টিনের চালার আড়াল থেকে একটা পুলিশ জিপ গেট পেরিয়ে ধীরে ধীরে রাস্তায় বেরিয়ে এল। তার মধ্যে ছেলেটাকে তুলে দেওয়ার পর, পেছনের সিট থেকে নেমে এলেন উমাশঙ্কর চৌবে।
চারজন মিস্ত্রির মধ্যে একজন ছদ্মবেশের গামছা দিয়ে মুখটা মুছে নিয়ে বলল, এর কথা আমরা ভাবিইনি স্যার।
আপনাকে বলেছিলাম না বোস সাহেব, ম্যাপ পয়েন্টিং-এর কথা? চোখের সবচেয়ে সামনে যে থাকে, তাকে দেখতে পাওয়াই সবচেয়ে কঠিন। মজা দেখুন, আপনিই আমাকে অজিত বর্মনের প্রতিদিনের কাগজ পড়ার অভ্যেসের কথা বলেছিলেন। অথচ সেই কাগজের মধ্যেই যে আরডিএক্স থাকতে পারে সেটা ভেবে দ্যাখেননি।
বিনায়ক বলল, এখন পুরো ঘটনাটাই যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি স্যার। অজিত বর্মন বারান্দা থেকে প্রতিদিনের মতন কাগজের মোড়কটা কুড়িয়ে নিলেন। ওজনের নিশ্চয় সামান্য হেরফের হয়েছিল। তবে আজকাল তো মাঝেমাঝেই কাগজের সঙ্গে সাপ্লিমেন্টের আট-দশ পাতা বাড়তি থাকে। কাজেই ও নিয়ে তাঁর মনে কোনো সন্দেহ জাগেনি।
তারপর তিনি নিজের ঘরে ঢুকে, সুতলির বাঁধন খুলে, গুটিয়ে রাখা কাগজটাকে সোজা করার চেষ্টা করলেন, যেমন প্রতিদিনই করেন। শুধু সেইদিন, ওই কাজটা করার সঙ্গে সঙ্গে, কাগজের ভাঁজে লুকিয়ে রাখা একটা হালকা ফিউজ ক্যাপ ভেঙে গেল। অ্যাকটিভ হয়ে গেল ডিটোনেটর। আরডিএক্সের পাতের মধ্যে দিয়ে ছুটে গেল স্পার্ক এবং বিস্ফোরণে টুকরো টুকরো হয়ে গেল অজিত মাস্টারমশাইয়ের শরীর।
একদম তাই। বিনায়ককে পাশে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে উমাশঙ্কর চৌবে মন্তব্য করলেন। কাগজওলা ছেলেটির সম্বন্ধে খোঁজ নিয়ে দেখুন। আমার মনে হয়, ও জেনুইন কাগজওলাই হবে। এক টিপে রাস্তা থেকে দোতলা-তিনতলার বারান্দায় কাগজ ছুঁড়ে দেওয়ার বিদ্যেটা কোনো টেররিস্টের পক্ষে চার-পাঁচদিনে আয়ত্ব করা সম্ভব নয়। সম্ভবত যুগল বসুমাতারির শাগরেদরা ওকে টাকার লোভ দেখিয়ে বা ভয় দেখিয়ে দলে টেনেছিল। ওকে ইন্টারোগেট করলে কিং- পিনগুলোর হদিশ পেয়ে যাবেন।
স্যার! হঠাৎই দাঁড়িয়ে পড়ে চৌবেসাহেবের হাত দুটো জড়িয়ে ধরল বিনায়ক। আপনি যে আমাকে কত বড় লজ্জার হাত থেকে বাঁচালেন। এখন অন্তত আমি খুনিগুলোকে ধরে কোর্টে প্রোডিউস করতে পারব। আপনি না থাকলে সেটুকুও পারতাম না।
কী যে বলো ভায়া। এই প্রথম উমাশঙ্কর চৌবে বিনায়ককে তুমি বলে ফেললেন। এসব কথা ছেড়ে দিয়ে বরং দার্জিলিং-এর হোটেলটা বুক করে ফেলো। পুজোর সময় বড় ভিড় হয় ওখানে।
একটা আগুয়ান বাসকে হাত দেখিয়ে দাঁড় করিয়ে, চট করে উঠে পড়লেন উমাশঙ্কর চৌবে।
