আঁকাবাঁকা শেষ লেখা – সৈকত মুখোপাধ্যায়
আঁকাবাঁকা শেষ লেখা
বাস থেকে নেমে একবার রিস্টওয়াচটা চোখের কাছে তুলে ধরলেন উমাশঙ্কর চৌবে। মাত্র সাড়ে আটটা বাজে, অথচ মনে হচ্ছে যেন কত গভীর রাত। তাকিয়ে দেখলেন, ওঁর সঙ্গে শেষ অবধি যে পাঁচ-ছ’ জন প্যাসেঞ্জার জয়গাঁয় নেমেছিল, তারা হনহন করে পা চালিয়ে কুয়াশার মধ্যে মিলিয়ে গেল— অবিকল ভূতের মতন।
সার দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আরো অনেকগুলো বাসের মধ্যে একটা ফাঁকা জায়গা খুঁজে নিয়ে কুচবিহার-জয়গাঁ রুটের বাস ‘বাবা মহাকাল’ রাত্তিরের মতন গ্যারেজ হয়ে গেল। তারপর অত বড় টার্মিনাসটায় জ্যান্ত প্রাণী বলতে রয়ে গেল শুধু কুণ্ডলি পাকিয়ে শুয়ে থাকা দুটো নেড়ি কুকুর আর আপাদমস্তক সোয়েটারে মাঙ্কিক্যাপে ঢাকা একজন রোগা নাইটগার্ড। এমন নিশুতি নাইটে তিনি কাকে গার্ড দেবেন, কার কাছ থেকে গার্ড দেবেন এবং কীসের ভরসাতেই বা গার্ড দেবেন সেসব কথা ভাবতে ভাবতেই চৌবেসাহেব উত্তরদিকে হাঁটা লাগালেন। ওদিকেই জয়গাঁ থানা।
মাসটা যেহেতু ডিসেম্বর আর জায়গাটা পাহাড়তলি, তাই এই শহরের হাওয়ায় এখন আঁশবটির ধার। উইন্ডচিটারের কলারটাকে থুতনি অবধি তুলে দিয়েও উমাশঙ্কর চৌবে দেখলেন স্বস্তি পাচ্ছেন না। হাতদুটোকে জিনসের পকেটে ঢুকিয়ে তবে একটু শান্তি।
দু’ দিকের বন্ধ দোকানঘরগুলোর টিনের চালা থেকে ফুটপাথের ওপরে টপ টপ করে হিমের ফোঁটা ঝরে পড়ছে। ঘন কুয়াশায় দু’ হাত দূরের জিনিসও দেখা যাচ্ছে না। তবে তাতে অসুবিধে নেই, কারণ রাস্তায় লোকজন নেই বললেই হয়। চোখ বন্ধ করে হেঁটে গেলেও কারুর সঙ্গে ধাক্কা লাগবে না। আর এসব রাস্তা তো চৌবেসাহেবের হাতের তালুর মতন চেনা।
চাকরি-জীবনের শেষ দিকে, মানে সাত-আট বছর আগেও তাঁকে প্রায়ই আসতে হত এখানে। তখন তিনি ছিলেন জেলা পুলিশের অ্যাডিশনাল এসপি। অনেক সময় কোনো কেস নিয়ে একটানা তিন-চারদিনও জয়গাঁয় কাটিয়ে গিয়েছেন।
এখানে ভারত আর ভুটান গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এদিকে পাহাড়ের পায়ের কাছে ভারতীয় শহর জয়গাঁ, আর জয়গাঁ পেরিয়ে পাহাড়ে উঠতে শুরু করলেই ভুটান। কোথায় যে জয়গাঁর শেষ আর ভুটানি শহর ফুন্টশোলিং-এর শুরু বোঝা মুশকিল। এই জন্যেই জয়গাঁ অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য। এদিকে কোনো দুষ্কর্ম করে বর্ডারটা টপকে ওদিকে চলে যেতে পারলেই পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে। বর্ডারে খুব একটা কড়াকড়িও নেই। তার একটা বড় কারণ, ভুটানের সাপ্লাই-লাইন হল জয়গাঁ। ঘটি-বাটি, চাল- ডাল থেকে ফ্রিজ, টিভি সবই জয়গাঁ থেকেই ওখানে যায়। জয়গাঁর বাজারে ভুটানি টাকায় দিব্যি লেনদেন চলে, যদিও ব্যাপারটা বেআইনি।
যতদিন চাকরিতে ছিলেন ততদিন উমাশঙ্কর চৌবে জয়গাঁর আন্ডারওয়ার্ল্ডের অনেক খবর রাখতেন। কিন্তু রিটায়ারমেন্টের পর গত তিন বছরে তিনি সেই সব কন্ট্যাক্ট হারিয়ে ফেলেছেন। তবু বিনায়ক তাঁকে ডেকেছে এবং সেই ডাকে সাড়া দিয়েই তিনি আবার এত বছর পরে জয়গাঁয় এসেছেন।
ইনস্পেক্টর বিনায়ক বসু এখন জয়গাঁ থানার ওসি। বছর পঁয়ত্রিশের ইয়ং অফিসার। পরিশ্রমী এবং সৎ। বছর দুয়েক আগে ও যখন আলিপুরদুয়ার থানার ওসি ছিল তখন বারোবিশায় একটা খুনের ঘটনায় উমাশঙ্কর ওকে হেল্প করেছিলেন। সেই প্রথম আলাপ বিনায়কের সঙ্গে। তারপর থেকে কাজে- অকাজে বিনায়ক প্রায়ই উমাশঙ্করের কুচবিহারের বাড়িতে চলে আসে। বলে, আপনার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললে, কী বলব স্যার, মাথাটা বেশ পরিষ্কার লাগে। এই যে আপনি বলেন, ডিটেকশন করতে গেলে নিজে ক্রিমিনাল হয়ে যেতে হয়, ক্রিমিনালের চোখ দিয়ে সবকিছু দেখতে হয়, এইভাবে তো আমাদের ট্রেনিং ক্লাসে কেউ শেখায় না।
.
বিনায়ক ফোনটা করেছিল সন্ধে ছ’ টায়। বোঝাই যাচ্ছিল খুব টেনশনে আছে। গুছিয়ে কথা বলতে পারছিল না। চৌবেসাহেব যেটুকু বুঝতে পেরেছিলেন তা হল, এমন একজন কেউ মার্ডার হয়েছে, যে ছিল খুব ইম্পর্ট্যান্ট পারসন। দু-একটা কথা বলার পরেই বিনায়ক অধৈর্য স্বরে বলেছিল, ফোনে সব কথা বলতে পারব না স্যার। আপনি প্লিজ একবার জয়গাঁ চলে আসুন। আমি গাড়ি পাঠাচ্ছি।
উমাশঙ্কর চৌবে বিনায়কের মনের অবস্থা বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গেই রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। শুধু বলেছিলেন, গাড়িটা ফিরিয়ে নাও। মিছিমিছি সরকারি গাড়ির তেল পোড়ানোর মানে হয় না। এখন দশ মিনিট অন্তর কুচবিহার থেকে জয়গাঁর বাস ছাড়ছে। আমি বাস ধরে নিচ্ছি। তোমার জিপ এখানে আসার আগে আমি জয়গাঁ পৌঁছে যাব।
বিনায়ক আর তর্ক করেনি। উমাশঙ্কর চৌবে যে একজন ‘ম্যান অফ প্রিন্সিপল’ সেটা এতদিন তাঁর সঙ্গে মিশে বিনায়ক ভালোই বুঝে গেছে
জয়গাঁ পৌঁছনোর পর অবশ্য চৌবেসাহেব বেশিক্ষণ হাঁটবার সুযোগ পেলেন না। একটু বাদেই কুয়াশার মধ্যে দুটো হেড-লাইটের আলো ফুটে উঠল। থানার জিপটা এসে তাঁর সামনে দাঁড়াল। স্টিয়ারিং-এ হাবুল বসেছিল। পুরনো ড্রাইভার, একসময় চৌবেসাহেবের গাড়ি চালিয়েছে। গাড়িতে উঠে উমাশঙ্কর চৌবে প্রশ্ন করলেন, বোসসাহেব কোথায় হাবুল?
বড়সাহেব তো স্পট থেকে নড়েননি। সেই বিকেল পাঁচটা থেকে একটানা ওখানেই দাঁড়িয়ে আছেন।
হাবুলকে আর কিছু জিজ্ঞেস করা ঠিক হবে না ভেবে চৌবেসাহেব চুপ করে গেলেন।
প্রায় গড়াতে গড়াতেই হাবুল জিপ নিয়ে চলল থানার দিকে। এত ঘন কুয়াশায় এর চেয়ে বেশি স্পিডে যাওয়া সম্ভবও নয়। থানার বাড়িটার সামনে জিপটা পৌঁছনোর পর চৌবেসাহেব হাত বাড়িয়ে দরজার লক খুলতে যাচ্ছিলেন। হাবুল বলল, দাঁড়ান স্যার। আর এক মিনিট। চৌবেসাহেব অবাক হয়ে দেখলেন, থানার গেট ছাড়িয়ে জিপটা আরও কুড়ি গজ মতন গিয়ে দাঁড়াল। সেখানে রাস্তার ধারে একটা পান-সিগারেটের গুমটি দোকান ছাড়া আর কিছু ছিল না। জিপটাকে দেখতে পেয়ে বিনায়ক এগিয়ে এল। চৌবেসাহেবকে
নমস্কার করে বলল, আসুন স্যার।
গাড়ি থেকে নামার পর এই প্রথম চৌবেসাহেব বেশ কিছু লোককে একসঙ্গে দেখতে পেলেন। এত শীতের মধ্যেও তারা গুমটিটাকে ঘিরে ভিড় করে দাঁড়িয়েছিল। চেহারা দেখলে বোঝা যায় ওরা স্থানীয় লোক। চৌবেসাহেবকে নিয়ে বিনায়ককে এগিয়ে আসতে দেখে লোকগুলো সসম্ভ্রমে দু’ পাশে সরে গেল।
যে রাস্তাটা তৈরি হল সেটা ধরে চৌবেসাহেব পানের দোকানটার দিকে এগিয়ে গেলেন। দোকানের সামনেটা কর্ডন করা ছিল। সোলার-ব্যাটারি দিয়ে জ্বালানো দুটো জোরালো ল্যাম্পের আলোয় জায়গাটা বেশ আলো হয়ে ছিল। কর্ডনের ভেতরে তিনজন বন্দুকধারী কনস্টেবল ছাড়াও সিভিল-ড্রেসের চারজন ভদ্রলোক ঘোরাফেরা করছিলেন। বোঝাই যাচ্ছিল, ওঁরা পুলিশের ফোটোগ্রাফার এবং ফরেনসিক এক্সপার্ট। বিনায়ক ইশারায় চৌবেসাহেবকে কর্ডন পেরিয়ে এগিয়ে যেতে বলল। চৌবেসাহেব তাই করলেন। প্রথমে তাঁর নজর দোকানটার ওপরেই পড়ল।
এরকম দোকান আজকাল সব জায়গাতেই দেখা যায়। রিক্সার চাকার মতন চারটে চাকার ওপরে একটা কাঠের বাক্স বসালে জিনিসটার চেহারা যেমন দাঁড়ায়, দোকানটা ঠিক সেইরকমই। এই চাকা-লাগানো দোকানগুলোর সুবিধে হচ্ছে এক জায়গায় ব্যবসাপাতি না জমলে দোকানটাকে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে গিয়ে অন্য কোনো রাস্তার ধারে লাগিয়ে দেওয়া যায়। তাছাড়া রাস্তার ধারের জায়গা তো কারুর কেনা জায়গা নয়। কাজেই পুলিশ বা মিউনিসিপালিটি থেকে তাড়া দিলে অন্য কোথাও দোকান সরিয়ে নিয়ে যাওয়ারও সুবিধে।
গুমটিটার সাইজ একটা আলমারির চেয়ে বড় হবে না। এইসব দোকানের একটা টিপিকাল চেহারা থাকে। এটাও তার ব্যতিক্রম নয়। এদিকে- ওদিকে নানারকম পান-মশলা, হজমি, জোয়ান আর শ্যাম্পুর প্যাকেটের মালা ঝুলছে। দোকানের ঠিক গায়ে, মাটির ওপর ক্রেট ভর্তি করে রাখা আছে বোতলের জল আর কোল্ড ড্রিঙ্কস্। দেওয়ালের তাকে সিগারেট আর লজেন্স, বিস্কিটের প্যাকেট। সামনের দিকে পানের সরঞ্জাম— লাল কাপড়ে ঢাকা পানপাতার বান্ডিল, পেতলের তৈরি চুন-খয়েরের ঘটি আর খান দশেক ছোট ছোট কৌটো যার কোনোটার মধ্যে সুপুরি, কোনোটার মধ্যে মৌরি এইসব। সব কিছু সাজিয়ে রাখার পরে এই ধরনের দোকানগুলোতে দোকানদারের জন্যে খুব বেশি জায়গা পড়ে থাকে না। এখানেও ছিল না।
চৌবেসাহেব এবার দোকানদারের দিকে তাকালেন। বুড়ো লোকটা গুমটির ভেতরে পা মুড়ে বসেছিল। রোগা, লম্বা। বয়স মনে হল সত্তরের কাছাকাছি। মাথাভর্তি ধবধবে সাদা চুল। মুখ ভর্তি কয়েক কোটি খোঁচা খোঁচা দাড়িগোঁফ, তার একটাও কাঁচা নয়। খাঁড়া নাক আর তোবড়ানো লম্বাটে মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল লোকটা পাহাড়ি নয়।
লোকটার হাতদুটো কোলের ওপর ভাঁজ করে রাখা। মাথাটা দোকানের পেছনের দেওয়ালে হেলানো। চোখদুটো আধখোলা। যেন আকাশের দিকে তাকিয়ে গভীরভাবে কী চিন্তা করছে। সামনে দাঁড়িয়ে কোনো খরিদ্দার বলতেই পারত, আকাশ থেকে চোখটা নামান দাদু, একটু এদিকে তাকান! একটা পান দিন। খয়ের ছাড়া। শুধু এলাচ, মৌরি আর চমনবাহার।
উমাশঙ্কর চৌবে আপনমনে ঘাড় নাড়লেন। বলে লাভ হত না। লোকটার পাঁজরের বাঁ দিক থেকে একটা স্প্রিং-নাইফের বাঁটটুকু বেরিয়ে আছে। ফলাটা পুরোটাই শরীরের ভেতরে। রক্তে ভেসে গেছে দোকানের কাঠের পাটাতন।
.
দুই
চৌবেসাহেব ওখানে পৌঁছনোর আধঘণ্টার মধ্যে ফরেনসিক আর ফোটোগ্রাফারের কাজ শেষ হল। খুন হওয়া লোকটার বডি পুলিশের কালো ভ্যানে ওঠানোর তোড়জোর শুরু হয়ে গিয়েছিল। সেকেন্ড অফিসার রতন পাল বডি নিয়ে যাবে হাসিমারা হসপিটালে। জয়গাঁর সবচেয়ে কাছের বড় হসপিটাল ওটাই। বিনায়ক বলল, এখানকার কাজ আপাতত শেষ। চলুন স্যার। থানায় বসে ব্যাপারটা নিয়ে আপনার সঙ্গে একটু ডিসকাস করে নিই।
থানায় ওসির ঘরে বিনায়ক আর চৌবেসাহেব মুখোমুখি বসলেন। কথা শুরু করার আগে বিনায়ক আর্দালিকে বলে দিল, এখন যেন ঘরে কেউ না ঢোকে। তারপর বিনায়ক চৌবেসাহেবের দিকে ঘুরে বসল। বলল, দেখুন, ওই দোকানটা আমাদের থানার লোকজনের ওপরে নির্ভর করেই চলত। আমার আন্ডারে যে বাইশজন স্টাফ আছে তারা ওখান থেকে পান-সিগারেট কিনত। তাছাড়া ভিজিটররাও খুচখাচ জিনিসপত্তর কিনত। এরকম একটেরে রাস্তায় আর কে আসবে বলুন?
আজ পৌনে পাঁচটা নাগাদ আমার সেকেন্ড অফিসার, আপনি চেনেন তো ওকে, রতন পাল, সে নিজেই মোবাইলের রিচার্জ কার্ড কিনবার জন্যে ওই দোকানে গিয়েছিল। তখনও কালামভাই বেঁচে। রতনের সঙ্গে ওর গল্পটল্পও হয়েছিল।
কালামভাই বুঝি লোকটার নাম?
হ্যাঁ স্যার। পুরো নাম শাহজাদ কালাম। আমরা সবাই ওকে কালামভাই বলেই ডাকতাম।
তারপর?
তারপর ঠিক পাঁচটার সময় বাইরের বারান্দায় প্রবল হইচই। আমি তখন এই ঘরেই বসে আছি। তিনটে ভুটিয়া বউ রাস্তা দিয়ে যাবার সময় কালামভাইয়ের দোকানে খৈনি কিনতে দাঁড়িয়েছিল। তারা ওকে ওই অবস্থায় দেখে চিৎকার করতে করতে থানায় ঢুকে পড়েছিল।
খারাপ ওয়েদারের জন্যে আজ বিকেল থেকেই রাস্তায় লোক চলাচল ছিল কম। সেই সুযোগে খুনি এসে কাজ সেরে চলে গেছে। খুব একটা কঠিন কাজ তো নয়। ছোট্ট গুমটি। কেউ যদি চায়, একটু হাত বাড়ালেই দোকানদারকে হাতের নাগালে পেয়ে যাবে।
কথাটা শুনে চৌবেসাহেব বিরসমুখে বললেন, তার পক্ষেই সহজ কাজ, যে জানে ঠিক কোনখান দিয়ে ছুরি ঢুকলে অ্যাওর্টা ছেঁদা হয়ে যায়, ভিকটিম ঢুঁ শব্দ করার সুযোগ পায় না। এই মার্ডারার জানত।
হ্যাঁ স্যার, জানত। বিনায়ক সঙ্গে সঙ্গেই চৌবেসাহেবের কথায় সায় দিল। খুনটা করেছে তপা, এখানকার নামকরা সুপারি-কিলার। ওই তিনজন ভুটিয়া-বউ তপা বর্মনকে দোকানের পেছনের জঙ্গলের রাস্তা ধরে পালাতে দেখেছে।
ধরেছ তপাকে?
না স্যার। তপা এখানেই একটা সস্তার হোটেলে গা ঢাকা দিয়ে বসে আছে। তক্কে তক্কে আছে, কখন ভুটান-বর্ডারে চেকিং তুলে নিই। তখনই ওদিকে পালাবে। তবে ও জানে না, আমার দুজন লোক সারাক্ষণ ওকে শ্যাডো করছে। পালাতে ওকে দেব না।
তাহলে সমস্যাটা কী? আমাকে ডাকলে কেন? না, না, দাঁড়াও। বুঝতে পারছি, ব্যাপারটা অত সহজ নয়। খুনের মোটিভ কী?
চৌবেসাহেব তীব্রদৃষ্টিতে বিনায়কের মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে
চললেন, শাহজাদ কালাম একজন সামান্য পান-ওলা। সে কেন খুন হল বিনায়ক? তাছাড়া তুমিই বা এত অস্থির হয়ে পড়েছ কেন? ফোনে বলেছিলে ‘ইম্পর্ট্যান্ট পারসন’। কালামভাইয়ের কি আর কোনো পরিচয় আছে?
মাথা নীচু করে টেবিলের ওপর রাখা পেপার-ওয়েটটাকে দু’ আঙুলের মোচড়ে ঘোরাতে ঘোরাতে বিনায়ক উত্তর দিল— কালামভাই ছিল আমার ইনফর্মার।
.
তিন
চৌবেসাহেবকে আর কিছু জিজ্ঞেস করতে হল না। বিনায়ক বলে চলল—বছর দুয়েক আগে, আমি তখন সবে জয়গাঁ থানার চার্জ নিয়েছি। জয়গাঁর বাজারে ভুটানি টাকার সোর্স খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গেলাম কালামভাইকে। ও তখন হাওয়ালার কাজ করত। ভুটানের ক্রিমিনালরা একটা তাসকে ছিঁড়ে দু’ ভাগ করে একভাগ ওর কাছে পাঠিয়ে দিত। সঙ্গে মেসেজ, এই ছেঁড়া তাস নিয়ে যে তোমার কাছে যাচ্ছে, তাকে এত টাকা ইন্ডিয়ান কারেন্সিতে দিয়ে দাও।
পরে কোনো এক সময়ে ফুন্টশোলিং-এ গিয়ে সেই তাসের ছেঁড়া টুকরোটা বাকি অর্ধেকের সঙ্গে মিলিয়ে দিয়ে সমান অঙ্কের ভুটানি টাকা নিয়ে আসত কালামভাই। সেই টাকা ছড়িয়ে দিত এখানকার বাজারে।
কালামভাইকে দিয়ে সারা জীবন জেলের ঘানি ঘোরাতে পারতাম। ঘোরালাম না। আমার ওপরওলাদের সঙ্গে কথা বলে ওকে ইনফর্মার বানিয়ে ফেললাম। কালামভাই কৃতজ্ঞতায় আমার কেনা গোলাম হয়ে গেল। শুধু কৃতজ্ঞতাই নয় অবশ্য। আপনি তো জানেন, আমরা ইনফর্মারদের দু’ হাত খুলে ইনসেনটিভ দিই।
আমিই ওকে বুদ্ধি দিলাম, থানার সামনে একটা পানের দোকান খোলো। খরচাপাতিও আমিই দিয়েছিলাম। ওর ক্রিমিনাল সঙ্গীসাথীরা ওকে বাহবা দিল— ভালো বুদ্ধি বার করেছ তো কালামভাই। থানার লোকেদের
সঙ্গে জান পহেচান হয়ে যাবে। সারাক্ষণ নজর রাখতে পারবে কে যাচ্ছে, কে আসছে। আমাদের ইনফর্মেশন দেবে।
সেরকম নিরীহ কিছু ইনফর্মেশন আমিই কালামভাইয়ের হাত দিয়ে ওদের কাছে পৌঁছে দিতাম। আজ অমুক জায়গায় পুলিশ মদের ভাটি ভাঙবে। কাল ওখানে বোসসাহেবরা চোরাবাজারে রেইড করবে— এইসব আর কি! লোক দ্যাখানোর জন্যে একবার করে দলবল নিয়ে ঘুরেও আসতাম। দেখতাম কালামের ইনফর্মেশনের জোরে আমরা পৌঁছনোর আগেই সব হাওয়া। কিন্তু ওসব চুনোপুঁটি আমার টার্গেটে থাকত না। আমি ধরতাম রাঘব বোয়াল আর সেই বড় মাছেদের সন্ধান পেতাম কালামভাইয়ের কাছ থেকে।
ন্যাচারালি, ব্যাপারটা আমি ছাড়া আর কেউই জানত না। আমার কলিগেরাও না। জয়গাঁর মাফিয়াদের হাত যে কত লম্বা সে তো আপনি ভালোই জানেন। আমাদের হাতে তো কালামভাইয়ের মতন এক-দুজন ইনফর্মার। আর বিজয় পাটোয়া কিংবা রকি ওয়াংদির মতন মাফিয়াদের ইনফর্মার তো পুরো বাজারটাই। মাঝে মাঝে থানার বারান্দায় শুয়ে থাকা কুকুরটাকে অবধি সন্দেহ হয়—ব্যাটা আমাদের কথাবার্তা রকি কিংবা বিজয়ের কানে তুলে দিয়ে আসছে না তো।
ইন্টারেস্টিং— মন্তব্য করলেন চৌবেসাহেব। কিন্তু থানার সামনে কালামকে তুলে এনে তোমার কী সুবিধে হল?
সুবিধে হল কালামভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার।
চৌবেসাহেব বললেন, এই সেলফোনের যুগে যোগাযোগ রাখার জন্যে এত ভাবতে হল?
হল স্যার। কালামের বয়স সত্তর। প্রথম সেলফোন হাতে পেয়েছে পঁয়ষট্টি বছর বয়সে। মেসেজ টাইপ করতে পারত না। কোনোরকমে কল করতে আর কল রিসিভ করতে পারত। তাছাড়া ও যেখানে থাকত, সেই থাপাবস্তি হচ্ছে ক্রিমিনালদের ঘাঁটি। সেই জন্যেই আমি একদমই চাইতাম না যে ওর কল-রেজিস্টারে আমার নম্বর থাকে। কখন কার হাতে ওর মোবাইল পড়ে যায় তা কি বলা যায়?
বুঝলাম। কালাম কল-রেকর্ড ডিলিট করতে পারত না, তাই তো?
ঠিক ধরেছেন স্যার। তার চেয়ে এই ব্যবস্থাই ছিল ভালো। আমি রাতের দিকে একবার সিগারেট কেনার নাম করে ওর দোকানে যেতাম। খবরের মাপ ছোট হলে ও আমাকে মুখেই সেটা বলে দিত। আর বড় হলে চিরকুটে লিখে দিত। তবে প্রতিদিন তো আর খবর থাকত না। মাসে এক-দু’ বার।
চৌবেসাহেব একটা বড় নিশ্বাস ফেলে বললেন, আশা করি কালামকে ইনফর্মার হিসেবে পাওয়ার পর লাগাতার রেইড করে গেছ? কোটি কোটি টাকার স্মাগলড গুডস ধরেছ?
একটু গর্বের হাসি ফুটে উঠল বিনায়কের ঠোঁটে। বলল, হ্যাঁ স্যার। এসপি সাহেব নিজে আমাকে কনগ্র্যাচুলেট করেছেন।
তা করুন। কিন্তু রকি কিংবা বিজয়রা তো ঘাসে মুখ দিয়ে চলে না। তারা বুঝতে পেরে গেছে ওদের দলের মধ্যেই কেউ গদ্দারি করছে। তারপর… প্রশ্নটা সেখানেই। কালামভাই-ই যে সেই গদ্দার সেটা ওরা বুঝল কেমন করে? বিনায়কের উত্তরের জন্যে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে চৌবেসাহেব আবার প্রশ্ন করলেন, কালামভাই কীভাবে তোমাকে ইনফর্মেশন দিত? কোনো প্যাডের কাগজে? চিরকুটে?
ছোট কাগজের স্লিপেই লিখে দিত। তবে স্লিপটা ডাইরেক্ট আমার হাতে দিত না। সেটাকে আগে থাকতেই সিগারেটের প্যাকেটের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখত। আমি দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালে আমার হাতে সিগারেটের প্যাকেটটা তুলে দিত। আমি ওকে সিগারেটের দাম মিটিয়ে দিয়ে ফিরে আসতাম। কারুর কিছু বোঝার কথা নয়।
চৌবেসাহেব বললেন, ঠিক। যদি না কালাম নিজেই কোনো ভুল স্টেপ নিয়ে থাকে। হয়তো ও খবর জোগাড় করতে গিয়ে একটু বেশি কৌতূহল দেখিয়ে ফেলেছিল কিংবা রকি-বিজয়রা হিসেব করে দেখেছিল যারাই কালামের কাছে নোট ভাঙাতে আসছে, তারাই ধরা পড়ছে। এরকম হয়। ইনফর্মারকে খুব বেশিদিন গোপন রাখা যায় না।
দু’ হাতের পাতায় মুখ ঢেকে, ভেঙে-পড়া মানুষের গলায় বিনায়ক বলল, নিজেকে বড় অপরাধী মনে হচ্ছে স্যার। আমার জন্যে কাজ করতে গিয়ে বুড়ো মানুষটা খুন হল।
চৌবেসাহেব কোনো সমবেদনা-টমবেদনা জানাবার ধার দিয়েই গেলেন না। বরং হঠাৎ একটা উদ্ভট প্রশ্ন করলেন। বিনায়ককে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি ওর দোকান থেকে কোন ব্র্যান্ডের সিগারেট কিনতে বিনায়ক? গোল্ড ফ্লেক?
বিনায়ক হতভম্ব মুখে চৌবেসাহেবের দিকে তাকিয়ে রইল। চৌবেসাহেবের সামনে আজ অবধি সে কোনোদিন স্মোক করেনি। আর এই ঘরের মধ্যে গোল্ড ফ্লেকের পোড়া টুকরো দেখতে পাওয়ারও প্রশ্ন নেই, কারণ, বিনায়ক ঘরের মধ্যে সিগারেট খায় না। তাই সে কিছুতেই বুঝতে পারছিল না, চৌবেসাহেব ব্র্যান্ডের নামটা ঠিকঠাক বললেন কেমন করে। শেষকালে সে আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করল, কেমন করে বুঝলেন স্যার?
কালামের দোকানের তাকে সিগারেটের সবকটা ব্র্যান্ডই এক-দু’ প্যাকেট রাখা ছিল। ছিল না শুধু সবচেয়ে চালু ব্র্যান্ড-গোল্ড ফ্লেক। তখনই ব্যাপারটা চোখে লেগেছিল। এখন বুঝতে পারছি, বিশল্যকরণীর খোঁজে ওই মার্ডারার গন্ধমাদন নিয়ে গেছে। এতক্ষণে হয়তো ও হোটেলের ঘরে বসে একটা একটা করে প্যাকেট খুলে দেখেছে কোনটার মধ্যে কালামভাইয়ের লেখা চিরকুট রয়েছে।
.
চার
একজন আর্দালি দরজায় টোকা দিয়ে ঘরে ঢুকে ওঁদের সামনে সুগন্ধী চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে আবার দরজার পাল্লা টেনে দিয়ে বেরিয়ে গেল। চৌবেসাহেব চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ওই সুপারি-কিলারটা, কী যেন নাম, তপা না কি—ওকে ছেড়ে রেখেছ কেন? ওরা যাতে অ্যালার্মড না হয়ে যায়?
ইয়েস স্যার। কদিন আগেই কালামভাই আমাকে বলেছিল কলকাতা- পোর্ট থেকে কোকেনের একটা কনসাইনমেন্ট আসছে। কনসাইনমেন্টটা জয়গাঁ হয়ে ভুটানে ঢুকে যাবে। ও বলেছিল তক্কে তক্কে আছে, ক্যারিয়ারের খবর পেলেই আমাকে দিয়ে দেবে। আমার ধারনা, কালামভাই খুন হওয়ার একটু আগেই খবরটা পেয়েছিল। আর কালামভাই যে খবরটা পেয়েছে, সেই খবরটা পেয়ে গিয়েছিল রকি কিংবা বিজয়। সেই জন্যেই ওকে ওরা চট করে সরিয়ে দিল।
তবে এখনো আমি আশা ছাড়িনি স্যার। রকি কিংবা বিজয় জানে কালামভাই খতম হয়ে গেছে। তপা বর্মনও নিজের মতন ঘুরে বেড়াচ্ছে। নাও দে উইল প্রসিড উইথ দেয়ার অরিজিনাল প্ল্যান। আমার প্রথম কাজ ওই কোকেনের কনসাইনমেন্টটা ধরা। তা না হলে কালামভাইয়ের আত্মা শান্তি পাবে না। ওটা হাতে পেয়ে গেলেই আমি তপাকে অ্যারেস্ট করব।
কিন্তু ধরবে কেমন করে বিনায়ক? কালামভাই তো তোমাকে খবর দেওয়ার আগেই বেহেস্তে চলে গেল।
বিনায়ক চেয়ার ছেড়ে উঠে ঘরের কোণে স্টিল আলমারিটার মধ্যে থেকে একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট বার করে নিয়ে এল। তারপর ভেতরের জিনিসগুলো উপুড় করে ঢেলে দিল টেবিলের ওপর। চৌবেসাহেবের অভিজ্ঞ চোখ চিনতে ভুল করল না, ওগুলো মৃত কালামভাইয়ের জামা-প্যান্টের পকেট থেকে পাওয়া টুকিটাকি। সবই মামুলি জিনিস—চিরুনি, কলম, চাবি, দেশলাই। সেগুলোর মধ্যে থেকে বিনায়ক একটা কাগজের টুকরো বেছে নিল। তারপর সেটা চৌবেসাহেবের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, বেহেস্তে যাবার আগে কালামভাই আমাকে শেষ খবর দিয়ে গেছে।
এই কাগজটা পাবার পর থেকেই আমার মনে হচ্ছে, কালামভাই বুঝতে পেরেছিল ও মাফিয়াদের টার্গেট হয়ে গেছে। বুঝতে পেরেছিল, কোথাও ও একটা মারাত্মক ভুল করে ফেলে ধরা পড়ে গেছে। ও জানত, ওর হাতে আর বেশি সময় নেই। নাহলে বিকেল পাঁচটার সময় বসে আমাকে দেওয়ার জন্যে চিরকুট তৈরি করবে কেন? আমার সঙ্গে ওর দেখা করার সময় তো রাতে— রাত ন’ টা কিংবা দশটায়।
বিনায়কের স্বগতোক্তি শুনতে শুনতেই চৌবেসাহেব হাত বাড়িয়ে চিরকুটটা নিলেন। একটা ছোট রুলটানা প্যাডের পাতা। এরকম প্যাডে দোকানদারেরা জমাখরচের হিসেব লেখে। কাগজটা সমানভাবে টেবিলের ওপর পেতে চৌবেসাহেব সেটা মন দিয়ে দেখলেন। তারপর অবাক গলায় বিনায়ককে প্রশ্ন করলেন, এটা একটা ইনফর্মেশন?
বিনায়ক বলল, হ্যাঁ স্যার। কোনো ভুল নেই। এইরকম কাগজেই কালামভাই আমাকে বরাবর খবর লিখে দিত। এই রুলটানা পাতা, এই হাতের লেখা সবই আমার চেনা। আজকে ও যখন লিখছিল তখনই নিশ্চয় দোকানের পেছনের জঙ্গলে ছাওয়া ঢাল বেয়ে তপা হঠাৎ দোকানের সামনে চলে এসেছিল। কালামভাই বুঝেছিল কোনো গন্ডগোল হবে। ও চট করে প্যাড থেকে পাতাটা ছিঁড়ে প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে নিয়েছিল।
হ্যাঁ, সবই বুঝলাম। কিন্তু এর মানে কী?
বিনায়ক বলল, আমি জানি না স্যার। জানব বলেই তো আপনাকে এত কষ্ট দিলাম। আমার বিশ্বাস, আপনি এর মানে বার করতে পারবেন।
চৌবেসাহেব কোনো উত্তর না দিয়ে আবার সামনের টেবিলে রাখা কাগজটার দিকে তাকালেন। লাইন ভর্তি করে ইংরেজি বড় হাতের অক্ষরে দু’ লাইন লেখা। হাতের লেখা নীচু ক্লাসের ছাত্রের মতন বড়-বড়,
আঁকাবাঁকা। তবে পড়তে অসুবিধে হয় না। কাগজটায় লেখা আছে—MA SANKARI I AM HASIM.
.
পাঁচ
থানার বারান্দায় টাঙিয়ে রাখা পুরনো আমলের পেন্ডুলাম ঘড়িটায় টং টং করে এগারোবার ঘণ্টা বেজে উঠল। বিনায়ক ইতিমধ্যে অনেকবার চৌবেসাহেবকে অনুরোধ করেছে খেয়ে নিতে। উনি কর্ণপাত করেননি। শেষ অবধি রুটি- মাংসের থালাটা অফিসের ফাইল-কাভার দিয়ে ঢাকা দিয়ে সরিয়ে রেখেছে বিনায়ক।
কপালের দু’ দিকের রগ দুটো বুড়ো আঙুল দিয়ে চেপে ধরে চৌবেসাহেব গত পনেরো মিনিট ধরে একভাবে ঝুঁকে রয়েছেন কালামভাইয়ের আখরি খবরের দিকে।
মা শঙ্করী? মা শঙ্করী কে? হ্যাভ ইউ এনি আইডিয়া?—এই প্রশ্নটা এই নিয়ে পাঁচবার উনি করলেন বিনায়ককে।
বিনায়ক পঞ্চমবার একই উত্তর দিল—নো স্যার।
আই অ্যাম হাসিম! কেন? কেন মা শঙ্করীকে এইভাবে রং ইনফর্মেশন দিচ্ছে কালামভাই? হি ইজ নট হাসিম আফটার অল। হি ইজ কালাম, শাহজাদ কালাম টু বি প্রিসাইজ।
এই দ্বিতীয় প্রশ্নটাও এই নিয়ে পাঁচবার করা হল এবং বিনায়ক এটার উত্তরেও সেই একই কথা বলল, যা সে আগেও পাঁচবার বলেছে। স্যার, এটা মা শঙ্করীকে লেখা নয়। এটা আমাকে লেখা। বিনায়ক বোসকে।
ও কি তোমাকে বরাবর ইংরিজিতেই মেসেজ দিত?
হ্যাঁ, স্যার। তার কারণ আমি হিন্দি পড়তে পারি না, বিশেষ করে কালামভাইয়ের জড়ানো-মড়ানো হিন্দি হাতের লেখার আমি কিছুই বুঝতাম না। তার চেয়ে এই গোটা গোটা ইংরিজি অক্ষর বেটার ছিল।
হঠাৎ চৌবেসাহেব গা ঝাড়া দিয়ে সোজা হয়ে বসলেন। বারান্দার বেসিনে গিয়ে হাত ধুতে ধুতে ওখান থেকেই গলা তুলে বিনায়ককে বললেন, শরীরকে কষ্ট দিয়ে সিদ্ধিলাভ করা যায় না, বুঝলে বিনায়ক। বুদ্ধদেব বলেছেন। তারপর ঘরে ফিরে এসে গোগ্রাসে রুটিগুলোকে পেটে পুরে একটা তৃপ্তির ঢেকুর তুলে হাতটাত ধুয়ে নতুন করে কাগজটা নিয়ে বসলেন। বললেন, এসো, নতুন করে ভাবি
মা শঙ্করী। মা শঙ্করীকে চিঠিটা লেখা হচ্ছে না, কারণ এরকম আদ্যিকালের নাম নিয়ে আজকাল কোনো মহিলা ঘুরে বেড়ান না। তাহলে মা শঙ্করী একটা ইনফর্মেশন, যেটা তোমাকে দেওয়া হচ্ছে। মা শঙ্করী বললে কীসের কথা মনে পড়ে বলো তো। কোনো মন্দির? এদিকে অমন কোনো মন্দির আছে বলে তো জানি না।
কোনো দোকানের নাম? লটারির দোকান? মুদিখানা? উঁহু। কী যেন একটা মাথার মধ্যে আসছি আসছি করেও… ইয়েস! বিনায়ক।
বাস টার্মিনাস। বাস টার্মিনাস! বিনায়ক খাবি খেলো। বাস টার্মিনাসে কী?
আরে ওয়েস্ট বেঙ্গলের যে কোনো বাস টার্মিনাসে সারি দিয়ে ওরা দাঁড়িয়ে থাকে যে। তোমার মনে পড়ছে না? বাবা তারকনাথ, মা আনন্দময়ী, মা ঘাঘরবুড়ি। আমি দেখেছি। আজকেও একটু আগে দেখেছি, বাবা মহাকাল। দূরপাল্লার বাসগুলোর এরকম নাম হয়। ওই নামেই ডেলি-প্যাসেঞ্জাররা বাসগুলোকে চেনে।
ধরো… বিনায়ক, ধরো মা শঙ্করী একটা বাসেরই নাম। যে বাসে করে তোমার স্মাগলার এদিকে আসছে। তাহলে এরপরে কালামভাই তোমাকে কী জানাবে? সেই স্মাগলার কোথায় কবে কখন সেই বাস থেকে নামবে, তাই না? তুমি তো তিনশো পঁয়ষট্টি দিন এই চত্বরের সবকটা বাস টার্মিনাসকে আগলে বসে থাকতে পারো না। পারো কি?
বিনায়ক আগ্রহ নিয়ে কাগজটার ওপর ঝুঁকে পড়ল। যদিও পরের লাইনটাও ওর মুখস্থ হয়ে গেছে। I AM HASIM.
চৌবেসাহেব নিজের মনেই বলে চলেছিলেন— সময় আর স্থান। স্পেস অ্যান্ড টাইম। বাস কখন আসবে, কোথায় আসবে? মাই গুডনেস!
হঠাৎ চিৎকারে চমকে উঠল বিনায়ক।
চৌবেসাহেব বিনায়কের কব্জিটা খামচে ধরে বললেন, বিনায়ক আমি কী স্টুপিড! আই অ্যাম নয়। ওটা ওয়ান এ এম। কালামভাই সময় জানিয়েছে। রাত একটা।
বিনায়ক চোখ রগড়ে লেখাটা দেখল। সত্যিই তো। পুরো লেখাটার মধ্যে আরো দু’ বার I অক্ষরটা আছে। তার থেকে I AM-এর আই-টা একটু অন্যরকম। এর ওপরে নীচে কোনো হরাইজন্টাল লাইন নেই। একেবারে চাঁছাপোঁছা একটা সরলরেখা। আই নয়, ওয়ান। ওয়ান এ এম
বিনায়ক মরা মানুষের ওপরেও রাগ দেখিয়ে ফেলল— ওঃ, এইটা একটা লেখার ধরন? এ আর এমের মাঝখানে ফুটকি দেয়নি কেন?
মনখারাপের হাসি হেসে চৌবেসাহেব বললেন, মাথার ওপর বিপদ, বুকের মধ্যে ভয় নিয়ে কখনো লিখবার চেষ্টা করেছ বিনায়ক? করলে দেখতে তুমিও আইয়ের ডট আর টি-এর মাথা কাটার কথা ভুলে যাচ্ছ।
স্যরি।
কথা না বাড়িয়ে যেভাবে দাবা খেলবার সময় খেলুড়েরা বোর্ডের দিকে তাকিয়ে থাকে, সেই ভাবে চৌবেসাহেব কাগজটার দিকে ঝুঁকে পড়লেন। বললেন-মা শঙ্করী আসছে। রাত একটায়। কিন্তু কোথায়?
হাসিম। হাসিম আবার কোন জায়গা?
এক মিনিট গেল, দু’ মিনিট গেল। তিন মিনিটের মাথায় চৌবেসাহেব হঠাৎ চেয়ারের পিঠে গা এলিয়ে দিয়ে বিনায়কের দিকে চেয়ে একগাল হাসলেন। হাসতে হাসতেই বললেন, চেক-মেট।
মানে?
মানে প্রবলেম সলভড। আরে ধুর। ওটা হাসিম কেন হবে? হাসিমারা। কালামভাই HASIM-এর পরে আর তিনটে অক্ষর বসানোর সময় পায়নি – A, R, A। তার আগেই সুপারি-কিলারটা ওখানে পৌঁছে গিয়েছিল আর কালামভাইও কাগজটা ছিঁড়ে পকেটে পুরে ফেলেছিল। বুঝলে বিনায়ক? মা শঙ্করী বাসে চেপে রাত একটায় হাসিমারাতে এসে নামছে তোমার শিকার। নাইট-সার্ভিসের বাসগুলো তো কোনোদিনই জয়গাঁয় ঢোকে না, হাসিমারা হয়েই বেরিয়ে যায়, তাই না?
তাহলে বেরিয়ে পড়ো, আর দেরি কোরো না। না, না, আমাকে যেতে বোলো না। ভুলে যাচ্ছ কেন, আমি তো আর পুলিশ নই। একজন সিভিলিয়ান মাত্ৰ।
