ভবানী ভ্যানিশ – সৈকত মুখোপাধ্যায়
ভবানী ভ্যানিশ
দুপুর সবে বিকেলের দিকে হেলে পড়েছে। মাসটা অক্টোবর, তাই আকাশ কচুরিপানার ফুলের মতন নীল আর রোদ্দুরের রং গরদ-শাড়ির মতন হলুদ। একটা জলপাই-সবুজ উইলি জিপ কুচবিহার থেকে আলিপুরদুয়ার যাওয়ার মসৃণ পিচরাস্তা ধরে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়চ্ছিল। জিপের সামনের সিটে, ড্রাইভারের পাশে বসেছিল বিনায়ক। বিনায়ক বসু—আলিপুরদুয়ার থানার ওসি।
বিনায়ক বয়সে তরুণ। আদ্যোপান্ত সৎ অফিসার। তার এনার্জি নিয়েও কোনো প্রশ্ন নেই। একটা অমীমাংসিত অপরাধের ছড়ানো টুকরোগুলোকে যদি জিগ্-স পাজলের সঙ্গে তুলনা করা যায়, তাহলে বিনায়ক সেই টুকরোগুলোকে ঠিক খুঁজে-খুঁজে জড়ো করে এবং একটার পাশে আরেকটাকে বসিয়ে অপরাধের পুরো ছবিটা নিখুঁতভাবে তৈরি করে ফেলে। এ ব্যাপারে তার একগুঁয়েমির কথা পুলিশ ডিপার্টমেন্টের অনেকেই জানেন।
ছড়ানো টুকরো নিয়ে বিনায়কের কোনো সমস্যা নেই। তার সমস্যা হারানো টুকরো নিয়ে। যেখানে গিয়ে সূত্রের খেই হারিয়ে যায়, সেই জায়গাগুলোকে কল্পনা দিয়ে ভরাট করার ক্ষমতা বিনায়কের নেই এবং তখনই সে জিপের পেছনের সিটে বসে রয়েছেন যে বয়স্ক মানুষটি, তাঁর শরণাপন্ন হয়।
পেছনের সিটের ওই ভদ্রলোকের নাম উমাশঙ্কর চৌবে, রিটায়ার্ড অ্যাডিশনাল সুপারিন্টেন্ডেন্ট অফ পুলিশ। বয়স ষাটের ওপরে আরও তিন, কিন্তু মাথার সাদা চুলগুলো আর চোখের কোনার চামড়ায় শালিখপাখির পায়ের ছাপ ছাড়া তাঁর বাকি শরীরে বয়সের আর কোনো চিহ্ন নেই। ছিপছিপে শরীর, উজ্জ্বল চোখ। চাকরি-জীবনে তাঁর কাজের পদ্ধতি ছিল বিনায়কের ঠিক উলটো। উনি প্রায়ই বিনায়ককে বলেন, অপরাধীর মনের মধ্যে ঢুকে পড়ো, বুঝলে বিনায়ক। ভাবো, অপরাধীর জায়গায় থাকলে তুমি কী করতে। তাহলেই দেখবে প্রবলেম সলভড় হয়ে গেছে।
ওই থিয়োরিতে সত্যিই যে অপরাধের সমাধান করা যায় সেটা চৌবেসাহেব গত তিন বছরে বেশ কয়েকবার বিনায়ককে হাতেকলমে দেখিয়ে দিয়েছেন। প্রত্যেকবারই চৌবেসাহেব নড়াচড়া করেছেন কম, চিন্তা করেছেন অনেক বেশি এবং ওইভাবে চেয়ারে বসে চোখ কুঁচকে চিন্তা করতে করতেই বিনায়কের নিয়ে-আসা সমস্যাগুলোর সমাধান করে ফেলেছেন। তবে সেসব দেখার পরেও বিনায়ক হাত জোড় করে তাঁকে বলেছে, না স্যার, আমার দ্বারা সম্ভব নয়। আমি স্যার ফরেনসিক আর পোস্টমর্টেম রিপোর্ট দেখেই যতটা যা করার করব। তার পরেও যদি আটকাই, আপনি তো রইলেনই।
আছেন। বিনায়কের জন্যে চৌবেসাহেব সত্যিই আছেন… সবসময়ে আছেন। প্রথম থেকেই তিনি এই ছেলেটাকে কেন যে এত ভালোবেসে ফেলেছেন কে জানে! এমনিতে বই পড়া আর বাগান করা, এই দুটো কাজ ছাড়া তিনি এখন আর কিছুই করেন না। শুধু বিনায়কের ডাকেই হোমিসাইড ডিপার্টমেন্টের এককালের এই দুদে ডিটেকটিভ মাঝে মাঝে নিজের প্রাত্যহিক রুটিন ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। খুব শান্ত ভাবে সমস্যার সমাধান করে দিয়ে আবার ফিরে যান নিজের অবসরযাপনের প্রিয় জায়গায়— কুচবিহার এয়ারপোর্টের সামনে তাঁর দোতলা বাড়িটার ছাদের বাগানে।
জিপটা কুচবিহার শহর ছাড়িয়ে কিছুটা যাওয়ার পর চৌবেসাহেব বিনায়ককে বললেন, হ্যাঁ, পুরো ব্যাপারটা এইবার বলো তো বিনায়ক। ধীরেসুস্থে বলো। তখন তুমি একদিকে কী সব বলে যাচ্ছিলে আর আমি আরেকদিকে শেভ করছি, চুল আঁচড়াচ্ছি, শার্টের বোতাম আটকাচ্ছি, জুতোর ফিতে বাঁধছি। না করে করবটা কী? তুমি বললে পনেরো মিনিটের মধ্যে তৈরি হয়ে বেরোতে হবে। এমন তাড়া লাগালে যে, ভাবলাম আগুন লেগে গেল বোধহয় কোথাও। ওভাবে কিছু শোনা যায়? না মনে রাখা যায়?
আগুন সত্যিই লেগেছে স্যার। আপনি দেখতে পাচ্ছেন না। গোমড়ামুখে উত্তর দিল বিনায়ক। আমার কেরিয়ারে আগুন লেগে গেছে। কাল চাকরি থেকে বরখাস্ত হব। পরশু থেকে কী করব তা জানি না।
চৌবেসাহেব বললেন, চিন্তা কোরো না। যদি অন্য কাজ না পাও তাহলে আমার সঙ্গে টবে বেগুনগাছ করবে। তবে তার আগে বলো, কী হয়েছে? বিনায়ক কিছুক্ষণ থম মেরে বসে রইল। তারপর বলল, আপনি অলৌকিকে বিশ্বাস করেন স্যার?
চৌবেসাহেব রুমাল দিয়ে চশমার কাচ মুছতে মুছতে বললেন, নাঃ। তবে তাতে কিছু এসে যায় না। তুমি তোমার স্ট্যান্ড-পয়েন্ট থেকেই বলো।
বিনায়ক একটু ভেবে নিয়ে বলতে শুরু করল—আজকাল চারিদিকে তন্ত্রসিদ্ধ অমুক বাবা, ডাকিনিসিদ্ধা তমুক মা-র কারবার কেমন বেড়ে গেছে দেখছেন তো? খবরের কাগজ খুললেই দেখতে পাবেন তাদের বিজ্ঞাপন মারণ, উচাটন, বশীকরণ ইত্যাদি নানান সিদ্ধাইয়ে তারা নাকি সিদ্ধহস্ত। মামলা জিততে পারছেন না? অমুকবাবার কাছে যান। পরীক্ষায় এক চান্সে পাশ করতে চাইলে তমুক মা।
শামুকতলা বাজারের পেছনে একটা ভাঙা বাড়ির একতলায় এরকমই এক ডাকিনিসিদ্ধা কয়েক মাস আগে ব্যবসা ফেঁদেছিল। নাম নিয়েছিল মা ভবানী। বিজ্ঞাপনে কিংবা ঘরের মাথায় টাঙিয়ে রাখা সাইনবোর্ডে ওই নামটাই থাকত।
চশমাটা আবার চোখে পরে নিয়ে চৌবেসাহেব বললেন, ইন্টারেস্টিং। এইসব বাবা-মা সংক্রান্ত কোনো কেস আমার চাকরি-জীবনে হাতে আসেনি। তারপর বলে যাও।
ডাকিনিসিদ্ধা মা ভবানী নানারকম ভুজুংভাজুং দিয়ে লোকাল নিউজপেপারে বিজ্ঞাপন দিয়েছিল। পুরো শামুকতলা আর আলিপুরদুয়ার জুড়ে লিফলেটও ছড়িয়েছিল মেলা। বক্তব্য সব একই। যে কোনো সমস্যার সমাধানে ওর কাছে চলে যান। ও আপনার মঙ্গলের জন্যে যাগযজ্ঞ করবে। তারপর আপনাকে কবচ বা মাদুলি কিছু একটা পরিয়ে দেবে। ব্যস, আপনার সমস্যামুক্তি একেবারে গ্যারান্টেড।
মাস তিনেকের মধ্যে এদিকের অন্তত দশজন লোক হাতে-হাতে ফল পেয়ে গেল। খোলা বাজারে দাঁড়িয়ে তারা মুক্তকণ্ঠে মায়ের অলৌকিক ক্ষমতার কথা বলে বেড়াতে লাগল।
চৌবেসাহেব বিরক্ত মুখে বললেন, তার মানে মেয়েটা ভাড়া করা লোকেদের এইসব ফলস প্রোপাগান্ডার কাজে লাগিয়েছিল। এটাই ওই ধরনের বুজরুকদের টেকনিক। আচ্ছা, একটা কথা জিগ্যেস করি। এই ধরনের জোচ্চুরির ব্যবসায় চেহারাটা একটা বড় ফ্যাক্টর। মহিলাকে দেখতে কেমন? ইম্প্রেসিভ?
মহিলা নয় তো স্যার, মেয়ে। বয়স কত হবে? বড়জোর সাতাশ কিংবা আঠাশ। চেহারাটা রোগা বলে দেখতে লাগে আরো কম। গায়ের রং কালো। বোঁচা নাক। হনুর হাড়দুটো বেশ উঁচু। তার ওপর ডান গালে একটা বড় কাটা দাগ আছে; মনে হয় কখনো ছুরির কোপ টোপ খেয়েছিল। সব মিলিয়ে একদমই সুন্দরী বলা যায় না। তার ওপরে ওকে নাকি গাঢ় লাল শাড়ি ছাড়া অন্য কিছু পরে থাকতে দেখা যায়নি।
কিন্তু শুনেছি ওই বদখত চেহারার জন্যেই ডাকিনি হিসেবে ওকে দারুণ মানাতো। আধো অন্ধকার ঘরে ধূপ আর ধুনোর ধোঁয়ার মধ্যে যখন মা ভবানী তার এলো চুলে ভরা মাথাটা চালতে চালতে উৎকট চিৎকার করে ভূতপ্রেতদের ডাকাডাকি করত তখন নাকি ভক্তদের বুকের রক্ত হিম হয়ে যেত।
যাই হোক, যা বলছিলাম। আমার থানার এরিয়ার মধ্যে আস্তে আস্তে ওর ভক্ত বাড়তে শুরু করল। তার মধ্যে একজন হলেন শামুকতলার সবচেয়ে ধনী মানুষ— শ্যামলাল বর্মন। পাটের ব্যবসা, তামাকের ব্যবসা, করাতকল অনেক কিছু আছে ভদ্রলোকের।
একজন লোকের এত কিছু থাকলে মামলা-মোকদ্দমার অশান্তিও লেগেই থাকে। সেরকমই একটা প্রায় হারতে বসা মামলায় শ্যামলালবাবুর প্রতিপক্ষ কোর্টে যাওয়ার আগের দিন প্রবল ডেঙ্গুজ্বরে মারা গিয়েছিল। শ্যামলালবাবু তাঁর কাছের লোকেদের বলেছেন, ওসব ডেঙ্গি ডেঙ্গু কিছু নয়। মা ভবানী ওকে বাণ মেরেছিলেন।
এই ঘটনার পর শ্যামলালবাবু একেবারে মায়ের কেনা গোলাম হয়ে পড়লেন।
গত সপ্তাহে একদিন মা ভবানী শ্যামলালবাবু আর তার স্ত্রীকে ডেকে বলল যে, সে একটা অদ্ভুত সিদ্ধাই জানে। তার জোরে সোনা ডবল করা যায়।
বলো কী!
হ্যাঁ স্যার। টাকার লোভ কার না থাকে? বড়লোকদের আবার ওই লোভটা একটু বেশিই থাকে। তাই শ্যামলাল বর্মন আর তার স্ত্রী গতকাল ভোরবেলা মায়ের বাড়িতে গিয়ে হাজির হন। সঙ্গে একটা কাঁধব্যাগের মধ্যে করে নিয়ে যান অন্তত কুড়ি ভরি সোনার গয়না। আগের দিন সেগুলো ব্যাঙ্কের লকার থেকে বার করে এনেছিলেন শ্যামলালবাবু।
তারপর?
খুব গোপনে, ঘরদোর বন্ধ করে যজ্ঞ শুরু হল। যজ্ঞশেষে হোমের ছাইয়ের মধ্যে সোনার গয়না রেখে দিলে একঘণ্টা পরে দ্বিগুণ গয়না পাওয়া যাবে— এইটাই ছিল মা ভবানীর বক্তব্য। যজ্ঞ শেষ হতে সময় লাগল না। ছাইয়ের মধ্যে মা ভবানী নিজের হাতে বর্মন গিন্নির যাবতীয় গয়না ঢুকিয়ে রেখে, হাতটাত ধুয়ে, পাশের ঘরে বিশ্রাম নিতে গেল। গেল তো গেল, আর ফেরে না। কী সন্দেহ হতে শ্যামলালবাবু ছাইয়ের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে দেখলেন…
ছাই ছাড়া কিছু নেই, তাই তো।
এগজ্যাক্টলি স্যার।
তার মানে মেয়েটি গুণধর। হাতসাফাইও জানে। ছাইয়ের মধ্যে ঢোকানোর নাম করে লাল শাড়ির আঁচলের মধ্যে গয়নাগুলোকে পুরে ফেলেছিল। তারপর কী হল? শ্যামলাল চিৎকার শুরু করল?
এগজ্যাক্টলি স্যার।
মা নিশ্চয় ততক্ষণে হাওয়া?
হাওয়া হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু বেশিক্ষণ হাওয়ায় মিশে থাকতে পারেনি। খবর পেয়েই আমি শামুকতলা থেকে বেরোনোর সবকটা পয়েন্ট নাকাবন্দি করে দিয়েছিলাম। সন্ধে সাতটা নাগাদ মা ভবানী আমাদের জালে ধরা পড়ল। তখন সে লালশাড়ি ছেড়ে একটা সাদা শালোয়ার আর সবুজ কামিজ পরে নিয়েছে। পিঠ-ছাপানো চুলগুলোও একটা খোপায় বেঁধে ওড়নায় ঢেকে নিয়েছিল। আমাদের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্যে যা কিছু করা সম্ভব সবই করেছিল মেয়েটা, কিন্তু গালের ওই এক বিঘত লম্বা কাটা দাগ লুকোবে কোথায়? একবার মুখ থেকে ওড়নাটা সরে যেতেই ক্যাচ কট কট।
উমাশঙ্কর চৌবে বিনায়কের কাঁধে চাপড় মেরে বললেন, ব্রেভো বিনায়ক, ব্রেভো! সত্যি, তোমার মতন মেথডিক্যাল অফিসার আমি কমই দেখেছি। আমার আবার এই দিকটা খুব উইক ছিল। কিন্তু তাহলে যা করার তা তো করেই ফেলেছ। আমাকে হুড়ো দিয়ে তুলে আনলে কেন? গয়নাগুলো মেয়েটার কাছেই পেয়েছিলে তো?
বিনায়ক মুখ নামিয়ে বলল, না স্যার। পাইনি। কাল প্রায় সারারাত ধরে চেষ্টা করে গেছি গয়নার হদিশ বার করার জন্যে, বাট শি ইজ আ হাৰ্ড নাট টু ক্র্যাক। গয়না যে নিয়েছে তাই স্বীকার করাতে পারিনি। তার ওপর…
তার ওপর কী?
বিনায়ক একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে গাড়ির জানলা দিয়ে কিছুক্ষণ বাইরে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, আজ কিছুক্ষণ আগে কোর্টে নিয়ে যাবার সময় ভবানী পালিয়েছে। আপনি একটু আগে বললেন, অলৌকিক কাণ্ডে বিশ্বাস করেন না। তাই বললাম, ‘পালিয়েছে’। নাহলে বলতাম ‘ভ্যানিশ হয়ে গেছে’।
.
বিনায়কের কথা শুনে চৌবেসাহেব চমকে উঠলেন। বললেন, বলো কি? একটা ওইরকম কমবয়সি মেয়ে… একা… পুলিশ কাস্টডি থেকে পালাল? কী হয়েছিল ঘটনাটা বলো তো।
পরের পনেরো মিনিট ধরে বিনায়ক যা বলে গেল, তা এইরকম— কাল রাতটুকু ভবানী আলিপুরদুয়ার থানার লক-আপেই ছিল।
যতক্ষণ থানায় ছিল ততক্ষণ ভবানী পাহারাদারদের অকথ্য গালিগালাজ আর শাপমন্যি করেছে। এমনকী বিনায়ককেও নাকের সামনে আঙুল নাচিয়ে বলেছে, আপনার হিম্মত থাকলে আমাকে আটকে রাখবেন বড়বাবু। একজন ডাকিনিকে হাতকড়া পরিয়ে রাখা অত সহজ নয়। কোর্টে আপনি আমাকে নিয়ে যেতে পারবেন না।
বিনায়কের কেমন যেন মনে হয়েছিল মা ভবানীর আওয়াজের পুরোটাই ফাঁকা আওয়াজ নয়। এইসব ঠগেদের অনেক অ্যান্টিসোশাল চ্যালাচামুন্ডা জুটে যায়। হয়তো তারা কোর্টের রাস্তাতেই ওকে ছিনিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করতে পারে। তাই আজ সকাল দশটার সময় ভবানীকে কোর্টে নিয়ে যাওয়ার সময় সে বাড়তি সাবধানতা নিয়েছিল। ভবানীকে হাতকড়া পরিয়ে প্রিজন ভ্যানে তোলা হয়েছিল। সঙ্গে চারজন বন্দুকধারী পুরুষ কনস্টেবল তো ছিলই, তাছাড়াও ছিল দুজন মহিলা পুলিশ।
প্রিজন ভ্যানের পেছন-পেছন অন্য একটা গাড়িতে কোর্টের দিকে যাচ্ছিল বিনায়ক নিজে। সঙ্গে ছিলেন সরকারি উকিল আশুতোষ কানুনগো আর থানার সেকেন্ড অফিসার অতনু মিত্র। অর্থাৎ মোট আটজনের একটা দল ভবানীকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।
আলিপুরদুয়ার কোর্টের বারান্দায় উঠে ভবানী বলল, ওর ভীষণ গা গোলাচ্ছে আর মাথা ঘুরছে। মুখেচোখে একটু জল দিতে না পারলে ও তখনই অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবে।
কথাটা অবিশ্বাস করার কোনো কারণ ছিল না। বিনায়ক এবং বাকি সকলে জানত, মেয়েটা আগের দিন থেকেই প্রায় না খেয়ে, না ঘুমিয়ে রয়েছে। এ অবস্থায় শরীর খারাপ লাগা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাই বিনায়ক দুজন লেডি-কনস্টেবলকে বলেছিল, ভবানীকে নিয়ে লেডিজ ওয়াশরুমে যেতে এবং সেখান থেকে সোজা কোর্টরুমে চলে আসতে। বাকি স্টাফেরা সেখানেই ওদের জন্যে অপেক্ষা করবে।
কোর্ট বিল্ডিং-এর লম্বা বারান্দার একপ্রান্তে কোর্ট-রুম, আর অন্যপ্রান্তে লেডিজ ওয়াশরুম। বিনায়ক শেষবার ভবানীকে দেখেছে মহিলা-পুলিশ দুজনের মাঝখানে হাতকড়া বাঁধা অবস্থায় ওয়াশরুমের দিকে হেঁটে যেতে।
বড় জোর পাঁচ মিনিট বাদেই পরের পর পুলিশি হুইসলের আওয়াজে কোর্ট চত্বর কেঁপে ওঠে। বিনায়ক, অতনু আর তাদের সঙ্গী চার কনস্টেবল বারান্দা ধরে লেডিজ ওয়াশরুমের দিকে দৌড় লাগায় এবং খুব বেশি হলে দশ সেকেন্ডের মধ্যে সেখানে পৌঁছে দেখে, ওয়াশরুমের সামনে কিংবা ভেতরে কেউ নেই। পাশেই একটা দরজা ছিল যেটা দিয়ে বিল্ডিং-এর পেছনের জমিটায় নামা যায়। ওইদিক থেকেই হুইসলের আওয়াজ আসছিল। ওরা তখন বারান্দা থেকে ওই জমিটায় পৌঁছয় এবং দেখে দুই মহিলা কনস্টেবল বিপর্যস্ত মুখে ওয়াশরুমের পেছনের জমিতে দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে।
বিনায়কের প্রশ্নের উত্তরে মহিলা-পুলিশ দুজন জানায় যে, ভবানী ওয়াশরুমে ঢোকার একটু পরেই ভেতর থেকে লোহার ঝনঝন শব্দ শুনে ওরা দুজনেই দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে এবং দ্যাখে ওয়াশরুমের পেছনের জানলার গরাদ সরিয়ে ভবানী পালিয়েছে।
বিনায়ক ওদের জিগ্যেস করে, কতক্ষণ আগে শব্দটা শুনেছ? ওরা বলে, এই তো স্যার একমিনিটও হয়নি। দেখেই তো আমরা হুইসল বাজালাম। বিনায়ক ততক্ষণে চারদিকে নজর বুলিয়ে নিয়েছে। জমিটার তিনদিকে উঁচু পাঁচিল আর একদিকে কোর্ট-বিল্ডিং, যেখান থেকে বিনায়করা এখানে বেরিয়ে এসেছে। এখান থেকে বেরোনোর রাস্তা দুটো। কোর্ট-বিল্ডিং-এর ভেতরে ঢুকে, টানা-বারান্দা ধরে কোর্টের সামনের দিকে গিয়ে পড়া যায়। আর পাঁচিলের গায়ে বসানো একটা লোহার গেটের মধ্যে দিয়ে কোর্টের পেছনদিকে যাওয়া যায়।
টানা-বারান্দা ধরে ভবানী পালায়নি। তাহলে সে বিনায়কদের মুখোমুখি পড়ে যেত। বারান্দার দেওয়ালের গায়ে অন্য কোনো ঘরের দরজাও ছিল না যে, ভবানী সেখানে ঢুকে পড়বে।
আবার পেছনের গেট দিয়েও বেরোয়নি। কারণ, গেটের ওপাশে ধু ধু চাষের জমি। ধান কেটে নেওয়া এবড়ো-খেবড়ো জমির মধ্যে একটা সাইকেল যাবার মতন রাস্তাও নেই। লুকোবার মতন একটা ঝোপের আড়ালও কোথাও নেই। সেই খেতের মধ্যে ভবানী নামলে তাকে নিশ্চয় তখনো দেখা যেত। কিন্তু বিনায়ক আর তার সঙ্গীরা ভবানীকে ওই মাঠের মধ্যে কোথাও দেখতে পাচ্ছিল না।
কোর্ট-বিল্ডিং আর বাউন্ডারি ওয়ালের মাঝখানে যে জমি, যেখানে তখন ওরা দাঁড়িয়েছিল, সেখানে কয়েকটা দোকানঘর ছিল। সব মিলিয়ে চারটে। বিনায়ক নিশ্চিত হল, ভবানী ওই চারটে দোকানঘরেরই কোনো একটার মধ্যে গা-ঢাকা দিয়ে বসে আছে। এছাড়া আর কোথাও সে এত তাড়াতাড়ি পালাতে পারবে না।
এই কথাটা বুঝতে পারা মাত্রই বিনায়ক, অতনু মিত্র আর ছজন কনস্টেবল, মানে মোট আটজন পুলিশকর্মী আলাদা আলাদা ভাবে ওই দোকানগুলোর মধ্যে ঢুকে পড়ে। যাকে বলে ‘চিরুনি-তল্লাশি’ দোকানগুলোর মধ্যে তাই চালায় তারা এবং সেই তল্লাশি শুরু হয়ে গিয়েছিল গরাদ খসে পড়ার আওয়াজ পাওয়ার বড় জোর পাঁচ মিনিটের মধ্যে।
কিন্তু ভবানীকে কোথাও পাওয়া গেল না।
একটু আগে সেকেন্ড অফিসার অতনু মিত্র ফোন করে জানিয়েছেন, কোর্ট বিল্ডিং-এর সামনে বসানো সি.সি. টিভির ফুটেজ চেক করেও ভবানীকে পালাতে দেখা যায়নি। তাহলে ডাইনি ভবানী কি সত্যিকারেই হাওয়ায় মিলিয়ে গেল?
.
চৌবেসাহেব এতক্ষণ মন দিয়ে বিনায়কের স্টেটমেন্ট শুনছিলেন। এবার জিগ্যেস করলেন, দোকানগুলো কীসের?
উনি প্রশ্নটা করার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জিপটা একটা উঁচু পাঁচিলের গায়ে বসানো ছোট লোহার গেটের সামনে দাঁড়িয়ে গেল। চৌবেসাহেব বাইরের দিকে তাকালেন। তারপর হাসতে হাসতে বললেন, দেখেছো? এমন মন দিয়ে তোমার কথা শুনছিলাম যে, খেয়ালই করিনি কোর্টে পৌঁছে গেছি। যাই হোক, এখানে যখন আমাকে নিয়ে এসেছ তখন তুমি নিশ্চয় চাও যে, আমি নিজের চোখে একবার জায়গাটা দেখি?
বিনায়ক বিনীত ভঙ্গিতে মাথা ঝোঁকাল।
বেশ। তবে তার আগে একবার ওয়াশরুমের জানলার গরাদগুলো…
লোহার গেট খুলে জমিটার মধ্যে ঢুকলেন চৌবেসাহেব। অতনু মিত্র এবং সকালের সেই ছজন কনস্টেবল ওদের জন্যে অপেক্ষা করছিল। তারা এসে বিনায়কের পাশে দাঁড়াল। চৌবেসাহেব লম্বা লম্বা স্টেপ ফেলে ওদের দেখিয়ে দেওয়া জানলাটার নীচে গিয়ে দাঁড়ালেন। ওপরের দিকে মুখ তুলে কিছুক্ষণ ভবানীর মুক্তির পথটাকে নিরীক্ষণ করে বললেন, বাঃ! এটাই স্বাভাবিক। দেখেছো বিনায়ক? কোনো একজন মহাপ্রাণ ব্যক্তি কাঠের ফ্রেমটাকে আগে থাকতেই করাত দিয়ে জায়গামতন কেটে রেখেছিলেন। ওর ভেতরে গরাদগুলো আলতো করে বসানো ছিল। জাস্ট হাতের এক-একটা ছোট্ট মোচড়েই এক-একটা গরাদ খুলে আসার কথা। হয়তো টেনশনের চোটে হাত কাঁপছিল ভবানীর, তাই একটা গরাদ কোনোরকমে মেঝের ওপরে পড়ে যায়। নাহলে ও কিন্তু আরো অনেকটা সময় পেয়ে যেত।
বিনায়কও দেখেছিল ব্যাপারটা। সে বলল, তার মানে ভবানীকে সাহায্য করার লোক রয়েছে?
অফকোর্স রয়েছে। আমার তো এখন সন্দেহ হচ্ছে, নর্থইস্টের টেররিস্ট গ্রুপগুলোর কোনো একটার মেম্বার ও। এইভাবে অস্ত্র কেনার পয়সা তুলছে।
বিনায়কের মুখটা একটু ফ্যাকাশে দেখালো। ভবানীকে খুঁজে পাওয়াটা যে কতটা জরুরি সেটা ও হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছিল। কিন্তু কীভাবে খুঁজবে? মরিয়া হয়ে ও বলল, স্যার, একটু দোকানগুলোতে ঢুকবেন?
ওগুলো কি কর্ডন করে রেখেছ?
না স্যার। আমরা তো কিছু পাইনি। কোন গ্রাউন্ডে কর্ডন করব? পাবলিক খেপে যাবে তো। বলবে ওদের রুটি-রুজিতে হাত দিচ্ছি।
না না, ঠিক আছে। আমি কর্ডন করার কথা বলিওনি। জাস্ট জিগ্যেস করছিলাম। কিন্তু বিনায়ক, তুমি তো জানো, আমি এইসব সার্চিং টার্চিং-এর কাজে একদমই উৎসাহ পাই না। শার্লক হোমস আমার হিরো নন, আমার হিরো চেস্টারটনের ফাদার ব্রাউন। আহা! নোংরা পোশাক পরা আনস্মার্ট এক গেঁয়ো পাদরি। হোটেলের পর্দা ঢাকা কেবিনের মধ্যে বসে, শুধু একজন ওয়েটারের দু’ রকম স্টেপিং-এর শব্দ শুনে ক্রিমিনালকে ধরে ফেললেন। ভাবা যায়?
বিনায়ক হাতের ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে করুণ গলায় বলল, স্যার…!
আহা, শোনো না। সেই জন্যেই বলছি কী, তুমি তো তখন দোকানগুলো দেখেছ। তোমার চোখ-কানের ওপর আমার যথেষ্ট ভরসা রয়েছে। যা যা দেখেছিলে বলে যাও। আমি বেড়াতে বেড়াতে শুনি।
এই বলে চৌবেসাহেব সত্যিই বিনায়ক আর অতনুকে তাঁর দু’ পাশে নিয়ে জমিটার মধ্যে হাঁটতে শুরু করলেন। বাকি কনস্টেবলরা একটা গাছতলায় দাঁড়িয়ে রইল।
বিনায়ক বলতে শুরু করল, স্যার, দেখতেই পাচ্ছেন, দোকান মোট চারটে। সবকটারই পেটানো মাটির মেঝে, দরমার দেয়াল, টালির চাল।
চৌবেসাহেব তখন একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে পাঁচিলের গায়ে পোঁতা কয়েকটা পেরেকের দিকে একমনে তাকিয়ে ছিলেন। ওই অবস্থাতেই মন্তব্য করলেন, সরকারি জমিতে এর চেয়ে পাকাপোক্ত কনস্ট্রাকশন করতে কেউ সাহস পায় না। যে কোনো সময়েই অর্ডার হতে পারে— দোকান হঠাও। তখন এইসব দরমা, টালি, বেঞ্চি আর টেবিল নিয়ে এরা অন্য কোথাও চলে যাবে।
ঠিক বলেছেন স্যার। মুশকিল হচ্ছে, চারটে দোকানেরই মুখ রাস্তার দিকে। কোর্ট-বিল্ডিং কিংবা ওয়াশরুমের দিকটা পড়ে ওদের পেছনে। তাই ওই সময় দোকানে যারা ছিল সকলেই একবাক্যে বলেছে, কোনো মেয়ে জানলা দিয়ে লাফিয়ে নামল কিনা তা ওদের পক্ষে দেখা সম্ভব নয়। কথাটার মধ্যে যুক্তি আছে।
দোকানগুলো কীসের?
বলছি স্যার। একদম বাঁদিকেরটা, দেখতেই পাচ্ছেন, একটা জেরক্সের দোকান। হুকিং করে লাইন টেনেছে। যে কোনো কোর্ট-চত্বরেই এরকম দোকান কয়েকটা থাকে। মামলার কাগজপত্র কপি করায় তো লোকেরা। তবে আমরা যখন এসেছিলাম তখন দোকানটায় মালিক ছাড়া মাত্র দুজন লোক দাঁড়িয়েছিল।
তাদের মধ্যে ভবানী ছিল না?
না স্যার। আপনাকে আগেই বলেছি, ভবানীকে চিনতে ভুল হওয়ার কথা নয়। ওই চোয়াড়ে মুখ, পিঠ-ছাপানো চুল, গালে কাটা দাগ। তার ওপরে ওর হাতে তখন হাতকড়া ছিল স্যার। ও জিনিস পাঁচ মিনিটের মধ্যে খোলা কিংবা ভাঙা… এক হুডিনি হয়তো পারতেন।
চৌবেসাহেব হাঁটতে হাঁটতেই মন্তব্য করলেন— হুডিনি কিংবা ডাকিনি।
বিনায়ক একটু অভিমানী মুখে তার গুরুর দিকে তাকালো। যেন বলতে চাইল, আমার এই অবস্থাতেও আপনার মাথায় রসিকতা আসছে স্যার? গুরু ততক্ষণে একটা ইঁটের তৈরি ময়লা ফেলার ভ্যাটের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছেন। কোর্ট বিল্ডিং-এর যাবতীয় ময়লা নিশ্চয় প্ৰথমে ওই ভ্যাটটায় ফেলা হয়। তারপর ওখান থেকে মিউনিসিপালিটির লোকেরা তুলে নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ মুগ্ধদৃষ্টিতে জমানো ময়লার দিকে তাকিয়ে থেকে চৌবেসাহেব আবার হাঁটতে শুরু করলরেন। বললেন, কী হল? থামলে কেন? বলে যাও।
হ্যাঁ স্যার। জেরক্সের দোকানের পর ফুট ছয়েক গ্যাপ দিয়ে আরেকটা চালাঘর। ওটা সাইকেল সারানোর দোকান। দোকানে তখন তিনটে কমবয়সি ছেলে কাজ করছিল। তারা পুলিশ দেখে ভয়ে কেঁদে ফেলে আর কি! ভবানী ওখানে ছিল না।
নেক্সট।
তার পাশেরটা শিলিগুড়ির হংকং মার্কেটের ছিটকে আসা ছানা। যত রাজ্যের সস্তা চাইনিজ মাল— ছাতা, টর্চ, ভিডিও গেমস, পারফিউম আর গেঞ্জি-টেঞ্জি নিয়ে বসেছিলেন একজন মাঝবয়সি নেপালি মহিলা। একটু ডানদিকে তাকান স্যার। দেখতে পাবেন।
চৌবেসাহেব চাপা গলায় বললেন, আড়চোখে দেখে নিয়েছি। বয়স হয়েছে ভাই। এর চেয়ে বেশি দেখা শোভা পায় না। ওখানে ভবানী ছিল না, তাই তো?
ইয়েস স্যার।
তারপর? চার নম্বর?
একটু ওদিকে তাকিয়ে দেখুন স্যার— হ্যাঁ, ওই ভাতের হোটেলটা। দোকানটার সাইজ অন্যগুলোর চারগুণ। আর ভেতরে তখন অন্তত কুড়িজন লোক বসে খাওয়াদাওয়া করছিল। তাদের মধ্যে কোর্টের কেরানি, উকিল, মুহুরি থেকে শুরু করে গ্রাম থেকে আসা মক্কেল সবাই ছিল। আমরা স্যার প্রতিটি খরিদ্দারের সামনে দাঁড়িয়ে দেখেছি। রান্নাঘরে ঢুকে খুঁজেছি। এমনকী উনুনের পেছন, জলের ড্রামের ভেতর, কোথাও দেখতে ছাড়িনি। ফল হয়নি কিছুই।
চৌবেসাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে একটা গাছের গুঁড়ির গায়ে হাতের ছাতাটা ক’বার ঠুকলেন। তারপর বললেন, আশা করি যিনি জেরক্সের দোকানে ঢুকেছিলেন তিনি মেশিনের পেছনটা দেখেছিলেন।
হ্যাঁ স্যার।
যিনি সাইকেলের দোকানে ঢুকেছিলেন তিনিও দেখে নিয়েছিলেন যন্ত্রপাতির মধ্যে কোথাও একটা ভাঙা হাতকড়া পড়ে রয়েছে কিনা।
সেকেন্ড অফিসার অতনু মিত্রের মুখটা উজ্জ্বল হযে উঠল। সে বলল, আমি ঠিক ওই লাইনেই ভেবেছিলাম স্যার। আমিই ঢুকেছিলাম সাইকেল- সারাইয়ের দোকানটায়। কিন্তু না, ওরকম কিছু পাইনি।
চৌবেসাহেব বুঝদারের মতন ঘাড় নাড়লেন। তারপর বললেন, আশা করি চায়না-মালের দোকানের কাপড়জামার গাঠরির পেছনটা ভালো করে দেখা হয়েছিল।
বিনায়ক যথেষ্ট অফেন্ডেড ভঙ্গিতে বলল, কী বলছেন স্যার?
না না। আমি সবকটা পসিবিলিটির কথা বলছিলাম। তাহলে শেষ অবধি এটাই দাঁড়াল—ঘরেও নহে, পাড়েও নহে, ভবানী ছিল মাঝখানে। তাই না? কী বলো হে অতনু? বিনায়ক, আমি কি ঠিক বলছি?
অবাক গলায় বিনায়ক আর অতনু একসঙ্গে প্রশ্ন করল— কীসের মাঝখানে স্যার?
ওই কোর্ট বিল্ডিং থেকে দোকানঘরগুলোর মাঝখানে এই যে জমিটা, আমরা এখন যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, এখানে তখন কী ছিল? কারা ছিল? তোমরা দেখেছিলে?
অতনু মিত্র ঘোর-লাগা গলায় কোনোরকমে বলল— মনে পড়েছে। একটা ছাগল চড়ছিল স্যার। কিন্তু… কিন্তু… ভবানী কি তাহলে সত্যিই ডাইনি স্যার? ওকি ছাগল হয়ে গিয়েছিল?
চৌবেসাহেব কিছু বলার আগেই বিনায়ক চাপা গলায় অতনুকে ধমক দিল, ইয়ু প্লিজ শাট আপ।
চৌবেসাহেব হঠাৎ গোড়ালির ওপর ভর দিয়ে পোঁ করে ঘুরে দাঁড়ালেন। তারপর সবাইকে অবাক করে দিয়ে লম্বা লম্বা পায়ে হেঁটে ফিরে গেলেন সেই ইঁট দিয়ে বাঁধানো নোংরা ফেলার ভ্যাটটার দিকে। ওটার সামনে দাঁড়িয়ে গলা তুলে ডাকলেন, বিনায়ক! সবাইকে নিয়ে এদিকে এসো! এগুলো কী? বলো, এগুলো কী? এগুলো দেখার পরেও তোমরা আমাকে বিশ্বাস করতে বলছ, এখানে ছাগল ছাড়া কেউ ছিল না?
চৌবেসাহেবের এই রুদ্রমূর্তি দেখে ওরা সবাই পায়ে-পায়ে ওঁর পাশে গিয়ে দাঁড়াল। ঘাড় বাড়িয়ে দেখল, জমা করা জঞ্জালের একদম ওপরের লেয়ারে পড়ে আছে ডেলা ডেলা চুল, পুরনো খবরের কাগজের টুকরো, তার গায়ে শুকনো সাবানের ফেনা। টিপিকাল কোনো নাপিতের দোকানের ঝাঁটিয়ে ফেলা ময়লা।
বিনায়ক আমতা আমতা করে বলল, মনে পড়েছে স্যার। এই গাছতলাটাতে বসে একটা নাপিত একজনের চুল কাটছিল।
চুল কাটছিল না দাড়ি কামাচ্ছিল?
বিনায়কের চোখ দুটো বিস্ফারিত হয়ে গেল। সে বলল, স্যরি স্যার। আই ওয়াজ রং। দাড়ি কামাচ্ছিল। কিন্তু… কিন্তু আপনি কেমন করে…?
এতক্ষণ এটা মনে পড়েনি কেন?
কড়া গলায় কথাটা বলেই চৌবেসাহেব ফিক করে হেসে ফেললেন। বললেন, তোমাদের দোষ নেই। আমাদের ব্রেনের ধর্মই এই। যে জিনিসটাকে সে অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করে সেটাকে অহেতুক মাথার মধ্যে জমিয়ে রাখে না। তোমরা নাপিতের ব্যাপারটা প্রথম দর্শনেই অপ্রয়োজনীয় মনে করেছিলে। কেন বলো তো?
সেকেন্ড অফিসার অতনু মিত্র মুখ নীচু করে বলল, আমরা স্যার ভবানীকে, মানে একটা মেয়েকে খুঁজতে এসেছিলাম। যে জায়গাগুলোর সঙ্গে একজন মেয়ের সম্পর্ক আমরা কিছুতেই ভাবতে পারি না, তার একটা হল রাস্তার ধারের ইঁটের সেলুন। সেই জন্যেই ওই নাপিতটাকে মনে রাখিনি। কিন্তু স্যার, এখনো ঠিক বিশ্বাস করতে পারছি না। ওদের মধ্যেই একজন কি তাহলে ভবানী ছিল?
আমি বাজি রাখছি, যে লোকটাকে তোমরা নাপিতের সামনে বসে গালে সাবান লাগাতে দেখেছিলে, সেই ছিল ভবানী। এই ট্র্যান্সফর্মেশনের জন্যে ঠিক পাঁচ-মিনিট সময় প্রয়োজন। বিশ্বাস হচ্ছে না? বেশ। স্টেপগুলো আমি বলে যাচ্ছি, তোমরা পর পর মিলিয়ে নাও।
স্টেপ ওয়ান। ভবানী জানলা দিয়ে লাফিয়ে এই জমিটায় নামল। ওর সাহায্যকারী এদিকে তখন ইঁট পেতে, নাপিতের বাক্স নিয়ে রেডি। ওই বাক্সের মধ্যেই নিশ্চয় ছোট করাতটাও ছিল, যেটা দিয়ে ও রাত থাকতেই বাথরুমের জানলার ফ্রেম কেটে রেখেছিল। অবশ্য জানলাটা যে ওই অবস্থায় থাকবে, সেই খবরটা কেমন করে ভবানীর কানে পৌঁছল, তা বলতে পারব না। সম্ভবত তোমাদের থানায় টেররিস্টদের ইনফর্মার আছে এবং সেটা খুব সিরিয়াস ব্যাপার। তোমাদের থানায় যারা চা দিতে আসে, যারা ঘরদোর ঝাড়পোঁছ করে, তাদের সম্বন্ধে ভালো করে খোঁজখবর নাও।
নাম্বার টু, সেই নাপিত চট করে ভবানীকে সামনে বসিয়ে একটা সাদা চাদর দিয়ে তার গলা থেকে হাঁটু অবধি মুড়ে দিল। সেরকমটাই নাপিতদের দস্তুর। ঢাকা পড়ে গেল ভবানীর সবুজ কামিজ। ঢাকা পড়ে গেল হাতের হাতকড়া। তখন ওর দিকে তাকালে দেখতে পেতে শুধু সাদা সালোয়ার, যেটাকে ছেলেদের পাজামা বলে ভুল করা মোটেই অস্বাভাবিক নয়।
ততক্ষণে এই ম্যাডাম দুজন বাগানে এসে ওয়াশরুমের জানলার দিকে তাকিয়ে বাঁশি বাজাতে শুরু করেছেন। এদিক পানে হয়তো একনজর তাকিয়েও ছিলেন। কিন্তু নাপিতের সামনে যে চাদর মুড়ি দিয়ে বসে চুল কাটে, সে তো হান্ড্রেড পার্সেন্ট ব্যাটাছেলে। আমাদের ব্রেন সেইভাবে ভাবতেই অভ্যস্ত। আর আমরা তো খুঁজছি একটা মেয়েকে। তাই ওঁরা নজর নিয়ে গেছেন দূরের মাঠের দিকে। দেখতে চেয়েছেন ওখান দিয়ে কেউ পালাচ্ছে কিনা।
নাম্বার থ্রি, নাপিত মশাই ঠিক এক-মিনিটের মধ্যে ভবানীর পিঠ ছাপানো চুলের গোছাকে কাঁচি দিয়ে কেটে নামিয়ে ফেললেন।
এই অবধি বলেই চৌবেসাহেব হঠাৎ একজন কনস্টেবলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ভাই, যদি কিছু মনে না করেন, একবার ওই ডাস্টবিনের ময়লাগুলোকে আপনার লাঠি দিয়ে উলটে-পালটে দেখে আসুন তো, মেয়েদের লম্বা চুলের গুছি পান কিনা। পেয়েছেন? গুড। জানতাম পাবেন।
আচ্ছা, এবার নাম্বার ফোর। বিনায়ক, তুমি হুইসলের শব্দ শুনে দলবল নিয়ে এখানে পৌঁছে গেছ। কিন্তু এদিকে তো ততক্ষণে নাপিতভায়ার ভবানীর গালে সাবান লাগানোর কাজও শেষ; কাজেই ভবানীর ডান গালের সেই এক বিঘত লম্বা কাটা দাগও অদৃশ্য। তোমরা পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেলে। যাবার সময় নিশ্চয় চেয়ে দেখলে এদিকে। কিন্তু ভবানী ততক্ষণে কমপ্লিটলি ট্র্যান্সফর্মড। না হাতের হাতকড়া, না সবুজ কামিজ, না গালের কাটাদাগ। তোমরা দেখলে, একজন কালো, লম্বা চোয়াড়ে-মার্কা ছেলে, তার ঘাড় অবধি চুল। দাড়ি কামানোর জন্যে গালে সাবান লাগিয়ে বসে আছে।
অবশ্য তখন একটু যদি ভাবতে, অন্তত তোমরা ছেলেরা তো ভাবতেই পারতে যে, দাড়ি কামানোর সময় তো গায়ের চাদরটা নাপিতেরা খুলে দেয়। খুলে দিয়ে একটা ছোট তোয়ালে বুকের ওপর ফেলে দেয়। এখানে সেরকম হচ্ছে না কেন? তবে এটাও ঠিক, ওই অবস্থায় এত সূক্ষ্ম চিন্তা মাথায় আসে না। যাই হোক। আপাতত চার নম্বর অবধিই ভাবতে পারছি। এরপর ভবানী আর তার সাহায্যকারী কী করেছিল নিশ্চিতভাবে বলা মুসকিল। মনে হয় ময়লাগুলো ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে, ওই চাদর জড়ানো অবস্থাতেই ভবানীকে নিয়ে সেই নাপিত দালানের রাস্তা ধরে কোর্টের সামনের দিকে চলে গিয়েছিল। খুব একটা তাড়াহুড়ো করার দরকার পড়েনি, কারণ, তোমরা তো তখন এদিকে চার-চারটে দোকানে সার্চিং নিয়ে ব্যস্ত।
ওদের জন্যে নিশ্চয় একটা গাড়ি ততক্ষণে কোর্ট-বিল্ডিং-এর সামনে চলে এসেছে। ওরা সেই গাড়িতে চেপেই পালিয়েছে। সি.সি.টিভি-র ফুটেজটা যদি আরেকবার দেখো অতনু, তাহলে গায়ে সাদা চাদর জড়ানো একটা ছেলেকে নিশ্চয় গাড়িতে উঠতে দেখবে।
বিনায়ক পকেট থেকে রুমাল বার করে কপালের ঘাম মুছল। তারপর বলল, আর কি ওদের ধরার কোনো উপায় আছে স্যার?
চৌবেসাহেব একটু চিন্তা করে বললেন, দ্যাখো বিনায়ক। আমার মনে হয়, ভবানীর ওই যে শাগরেদ, সে সত্যিকারেই পেশায় নাপিত। নাপিত না হলে যে কাজগুলো বললাম তার কোনোটাই খুব তাড়াতাড়ি করতে পারত না। মেয়েদের চুলের মোটা গুছি কেটে ফেলা সহজ কথা নয়। খুব তাড়াতাড়ি ব্রাশে সাবানের ফেনা বানাতে গেলেও তৈরি হাত লাগে। কাজেই তুমি একটা জিনিস ট্রাই করে দেখতে পারো। মা ভবানীর লোক-ঠকানো ব্যবসার একেবারে গোড়ার দিকে যে দশটা লোক ওর প্রশংসা করে বেড়াত, তাদের মধ্যে কেউ নাপিত ছিল কিনা খোঁজ নাও। যদি দেখ ছিল, তাহলে তো বাকি কাজটা সহজ।
আরে না না। আমাকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার দরকার নেই। তুমি তো জানো, আমি রিটায়ার করার পর থেকে পারতপক্ষে সরকারি গাড়িতে চাপি না আমি স্ট্যান্ড থেকে কুচবিহারের বাস ধরে নিচ্ছি।
চৌবেসাহেব কিছু ভুল বলেননি। মা ভবানীর শাগরেদদরের মধ্যে একজনের সত্যিই শামুকতলায় সেলুন ছিল। লোকটার নাম ছিল পরেশ বসুমাতারি। রাজ্য-পুলিশের গোয়েন্দারা পরেশকে দু’ দিন বাদে শিলিগুড়ি থেকে গ্রেফতার করে। তাকে ইনটারোগেট করে ভবানীকে হাতে পেয়ে যায় বিনায়ক। শ্যামলাল বর্মনের কুড়ি ভরি সোনার গয়না তো উদ্ধার হয়ই, তার চেয়েও বড় কথা, নর্থ-ইস্টের একটা কুখ্যাত টেররিস্ট গ্রুপের শামুকতলায় গজিয়ে ওঠা ঘাঁটির খোঁজও পাওয়া যায়। হঠাৎ অ্যাটাক করে সেই ঘাঁটি থেকে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার করে আলিপুরদুয়ার থানার পুলিশ আর আর্মির যৌথ বাহিনী। দুজন জঙ্গি-নেতা ধরাও পড়ে।
খবরের কাগজে যেদিন সকালে বিনায়কের নাম দিয়ে সেই খবর ছাপা হল, সেইদিন বিকেলে কুচবিহার এয়ারপোর্টের সামনের দোতলা বাড়িটার ছাদের বাগানে চৌবেসাহেবকে নমস্কার করে বিনায়ক বলল, আমার খুব লজ্জা করছে স্যার।
চৌবেসাহেব তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, আচ্ছা পাগল তো। লজ্জা আবার কীসের? তুমিই তো সব করলে।
