তেরো নম্বর ছোরা – সৈকত মুখোপাধ্যায়
তেরো নম্বর ছোরা
আজ বিনায়ক বসু পুরো গল্পের মুডে। সাধারণত চৌবেসাহেবের কাছে বিনায়ক দৌড়ে এসেছে মানেই বুঝতে হবে আলিপুরদুয়ার থানার তরুণ ওসিটি কোনো জটিল কেসে ফেঁসে গেছে। আজ কিন্তু ব্যাপারটা একদমই উলটো। ওদের থানার সেকেন্ড অফিসার নীলাদ্রি মিত্র একটা দারুণ কেস সলভ করেছে। চৌবেসাহেবের ছাদের বাগানে ওঁর মুখোমুখি একটা ডেক-চেয়ারে বসে আরাম করে চা খেতে খেতে বিনায়ক চৌবেসাহেবকে সেই কেস-হিস্ট্রিই শোনাচ্ছিল।
শুরুতেই বিনায়ক বেশ নাটকীয়ভাবে বলল, বুঝলেন স্যার, আফশোস শুধু একটাই। এত ভালো অফিসারটি পুলিশের চাকরি ছেড়ে দিচ্ছে।
চৌবেসাহেব একটু অন্যমনস্কভাবে বললেন, কে চাকরি ছেড়ে দিচ্ছে?
—নীলাদ্রি, স্যার। এই কেসটার ইনভেস্টিগেটিং-অফিসার।
—কেন?
—ও বলে, যে রোমান্টিক আইডিয়া নিয়ে ও পুলিশের চাকরিতে ঢুকেছিল, তার সঙ্গে বাস্তবের অভিজ্ঞতা একেবারেই মিলছে না। কোনো স্যাটিসফ্যাকসন পাচ্ছে না কাজ করে।
এখানে ক্রাইমের পেছনেও কোনো বুদ্ধির ছাপ নেই। মাঠের মধ্যে একশো লোকের সামনে দিনদুপুরে এক ভাই আরেক ভাইকে দা দিয়ে কুপিয়ে দিল কিংবা বাড়ির চাকর মালিককে খুন করে টাকা-গয়না হাতাল ঠিকই, কিন্তু সেসব নিয়ে উঠল গিয়ে কোথায়? না নিজের গ্রামের বাড়িতে— যেখানে তার জন্যে আগে থেকেই পুলিশের লোক ওয়েট করছে। এমন সব কেসে ইনভেস্টিগেশনের স্কোপ কোথায়? বুদ্ধির লড়াই লড়বে কার সঙ্গে? কথাগুলো ফেলে দেওয়ার মতন নয় স্যার।
চৌবেসাহেব মজা পাওয়া মুখ করে বললেন, তাই? তা নীলাদ্রি এখন কী করবে?
—ও কলেজ-সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় পাশ করে শ্রীরামপুর- কলেজে লেকচারারের চাকরি পেয়ে গিয়েছে। সামনের সপ্তাহেই জয়েন করবে। তবে তার আগেই দেখিয়ে দিয়ে গেল, বুদ্ধি কাকে বলে। একবারই চান্স পেয়েছিল বুদ্ধিমান ক্রিমিনালের মোকাবিলা করার। অ্যান্ড আই মাস্ট সে, হি হ্যাজ হ্যান্ডল্ড ইট ইন আ ওয়ান্ডারফুল ওয়ে। শুনবেন নাকি স্যার ঘটনাটা? এই কদিন আগের ঘটনা। কল্পেশ্বরের মেলা চলছিল তখন।
—বলো, শুনি। চৌবেসাহেব গায়ের চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে চেয়ারের ওপর পা তুলে বসলেন।
—খুনটা হয়েছিল কল্পেশ্বর মেলায় খেলা দেখাতে আসা ফেমাস সার্কাসের তাঁবুর মধ্যে। সার্কাসের একজন মহিলা-খেলোয়াড় খুন হয়েছিল। প্রথমে অবশ্য খুন বলে বোঝা যায়নি। সবাই ভেবেছিল অ্যাকসিডেন্ট।
চৌবেসাহেব বললেন, সবাই ভেবেছিল অ্যাকসিডেন্ট? তার মানে কি সার্কাসের কোনো খেলা চলাকালীন খুনটা হয়েছিল?
—একদম ঠিক ধরেছেন স্যার। নেচার অফ ক্রাইমটা বুঝতে গেলে ওই খেলার ডিটেলটা একটু আপনাকে মন দিয়ে শুনতে হবে। বলি?
—বলো, বলো। শুনব বলেই তো বসে আছি।
—প্রায় সমস্ত সার্কাসেই এটা খুব পপুলার একটা ইভেন্ট। ‘নাইফ- থ্রোয়িং’এর খেলা। আপনিও নিশ্চয় দেখেছেন। একটা মানুষ-প্রমাণ কাঠের চাকা লোহার ফ্রেমের ওপরে এমনভাবে ফিট করা থাকে যাতে সেটা ঘুরতে পারে। ওই চাকাটার মাঝখানে এসে দাঁড়ায় একটা মেয়ে। তার দু’ হাত আর পায়ের পাতা চামড়ার ফাঁসে আটকানো থাকে; নাহলে তো পড়েই যাবে। মাটির সঙ্গে সমকোণে, মানে খাড়াভাবে দাঁড়িয়ে থাকে মেয়ে সমেত চাকাটা। ‘ফেমাস সার্কাসে’ এই মেয়েটা ছিল সাবিত্রী, সাবিত্রী গুনশেখরন। কেরালার মেয়ে, বছর পঁচিশেক বয়েস।
আর চাকাটা থেকে হাত দশেক দূরে, একটা একচাকার সাইকেলের ওপর ভারসাম্য রেখে স্থির হয়ে দাঁড়াত কেশবন। সে-ও কেরালার লোক। প্রথমে শুনেছিলাম সাবিত্রীর সঙ্গে নাকি কেশবনের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। পরে অবশ্য জানলাম সেটা ঠিক নয়।
খেলাটার জন্যে আর লাগত দুজন সহকারী। একজন একচাকার সাইকেলের ওপর ব্যালেন্স করে দাঁড়ানো কেশবনের হাতে একটা একটা করে ধারালো ছোরা তুলে দিত। আর একজন হাতের ঠেলায় কাঠের চাকাটাকে একটা সমান স্পিডে ঘুরিয়ে যেত। সঙ্গে সঙ্গে ঘুরত সেই মেয়েটাও। এই চাকা ঘোরানোর কাজটা নাকি বহুদিন ধরেই নটরাজন নিজের হাতে করত।
—কে নটরাজন? প্রশ্ন করলেন ইনস্পেক্টর চৌবে।
বিনায়ক উত্তর দিল, নটরাজন আর কেশবন ছিল ফেমাস সার্কাসের দুই পার্টনার। কেশবনের খেলা যেমন ‘নাইফ-থ্রোয়িং’, নটরাজনের তেমনি ছিল বাঘ-সিংহের খেলা। একসময়ে ওর চাবুকের আওয়াজে নাকি কুড়িটা হিংস্র পশু একসঙ্গে ওঠাবসা করত। তখন ‘ফেমাস সার্কাস’-এর একনম্বর আইটেম ছিল বাঘের মুখে নটরাজনের মাথা ঢুকিয়ে দেওয়া। তারপরে হঠাৎই আইন করে সার্কাসে বাঘ-সিংহের খেলা বন্ধ করে দেওয়া হল। একই সঙ্গে বিদায় নিল নটরাজনের গ্ল্যামার। তখনই সাবিত্রী কেশবনের প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে তাকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছিল। তবে নটরাজন আর কেশবনের বন্ধুত্ব খুব গাঢ়। আলেপ্পির কাছে একই গ্রামে ওরা একসঙ্গে বড় হয়েছিল। তাই বরাবরই একে অন্যের খেলা দেখানোর সময়ে সাহায্য করতে এগিয়ে যায়।
—বেশ, তারপর সেদিন কী হয়েছিল বলো। জানতে চাইলেন চৌবেসাহেব।
—হ্যাঁ, ওই সাইকেলে বসা অবস্থাতেই পরপর বারোটা ছুরি সাবিত্রীর শরীর ঘিরে অব্যর্থ টিপ-এ গেঁথে দিত কেশবন। এরপর থাকত শেষ চমক। নটরাজন আঠা দিয়ে একটা লাল বেলুন আটকে দিত সাবিত্রীর মাথার মাত্র ইঞ্চি চারেক ওপরে। দর্শকাসন থেকে একজন কেউ এগিয়ে এসে একটা ফেট্টি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দিত কেশবনের চোখ দুটো। আর, কোনো সন্দেহের অবকাশ না রেখে, এর ওপরে আবার একটা কালো কাপড়ের থলি দিয়ে কেশবনের মাথা থেকে গলা অবধি ঢেকে দিত নটরাজন।
—ইন্টারেস্টিং! নড়েচড়ে বসলেন চৌবেসাহেব। তারপর?
এরপর তাঁবুর অন্যসব আলো নিভে গিয়ে, কাঠের চাকাটার একদম মাথার কাছে জ্বলে উঠত একটা নীল আলো— যাতে শুধু সাবিত্রী আর কেশবনকে ঘিরে একটু জায়গাতেই আলো পড়ত। চারিদিকের অন্ধকারের মধ্যে এই নীল আলোর বৃত্ত, আর চোখ বেঁধে ‘নাইফ-থ্রোয়িং’— এগুলোই কেশবনের ইনোভেশন। নিঃসন্দেহে খেলাটার আকর্ষণ এতে বেড়েছিল। এই নীল আলোর সুইচটা থাকত নটরাজনের হাতের কাছে।
—তারপর?
—এতক্ষণ যে চাকা ঘুরছিল সাবিত্রীকে মাঝখানে রেখে, তা এখন নটরাজনের হাতের চাপে একদম স্থির। চোখ বাঁধা অবস্থাতেই সাইকেলের ওপর ভারসাম্য রেখে ডান হাতটা বাড়িয়ে দিত কেশবন। সেই বাড়ানো হাতে তেরো নম্বর ছুরিটা ধরিয়ে দিয়ে, অ্যারেনা ছেড়ে দৌড়ে চলে যেত সহকারী ছেলেটি।
কেশবন ছুরি সমেত হাতটা মাথার ওপরে তুলত, শরীরটা সামান্য এদিক-ওদিক বাঁকিয়ে ঠিক করে নিত নিশানা। তারপর হঠাৎ-ই নীল আলোর মধ্যে দিয়ে কেশবনের নিক্ষিপ্ত ছুরি এক রুপোলি বিদ্যুতের রেখার মতন গিয়ে বিধত বেলুনটার গায়ে। যে দর্শকেরা এতক্ষণ উদ্বেগে স্তব্ধ হয়ে বসেছিল, সাবিত্রীকে অক্ষত দেখে তারা হাততালিতে ফেটে পড়ত। সাবিত্রী আর কেশবন হাতে হাত রেখে হাসতে হাসতে ত্যাগ করত অ্যারেনা। কিন্তু পরশু …
—হ্যাঁ, কী হয়েছিল বলো তো ঠিক করে।
—পরশু সন্ধের ‘শো’-এ বেলুনের বদলে সাবিত্রীর কণ্ঠমণিতে গিয়ে বিঁধেছিল তেরো-নম্বর ছুরিটা। মুহূর্তের মধ্যেই মারা যায় মেয়েটি।
এটা সন্ধে সাতটার শোয়ের শেষদিকে, মানে রাত ন’টা নাগাদ ঘটেছিল। আধঘণ্টার মধ্যেই নীলাদ্রি ওর দলবল নিয়ে কল্পেশ্বরের মেলায়, ‘ফেমাস সার্কাস’-এর তাঁবুতে পৌঁছে যায়। দর্শকশূন্য তাঁবুতে তখন সেই মরণঘূর্ণিকে ঘিরে হতভম্ব হয়ে বসেছিল নটরাজন, কেশবনসহ আরও প্রায় তিরিশজন বিভিন্ন বয়সের নারীপুরুষ। সকলেই প্রায় কেরালার লোক, ওই সার্কাসের কর্মী। সকলেই একবাক্যে বলল, এ এক ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা। আর সার্কাসে যারা খেলা দেখায় মৃত্যু তো তাদের নিত্য সহচর।
তবু নীলাদ্রির মন মানছিল না। সে ঘুরে গিয়ে দাঁড়ায় কাঠের চাকাটার পেছনে। দেখে অ্যারেনার একপাশে একটা মোটা খুঁটির গায়ে লাগানো সুইচ বোর্ড থেকে একটা ইলেকট্রিকের তার উঠে গেছে ফ্রেমের ওপরে লাগানো নীল আলোটার দিকে—ওই যে, যে আলোটা অন্যসব আলো নিভে যাওয়ার পরেও জ্বলত। কিন্তু মাঝপথে ওই তারটা থেকে আরেকটা তার বেরিয়ে গেছে কেন? দ্বিতীয় তারটার গতিপথ অনুসরণ করতে গিয়ে নীলাদ্রি দেখে ফ্রেমের আড়ালে সহজে চোখে পড়ে না এমন এক জায়গায় লাগানো আছে এই বস্তুটি।
পকেট থেকে একটা ইলেকট্রো-ম্যাগনেট বার করে চৌবে সাহেবের নাকের সামনে ধরল বিনায়ক, এরই গায়ে জড়ানো ছিল সেই দ্বিতীয় তারটি।
-মানে বুঝলেন?
চৌবেসাহেব ম্যাগনেটটা একবার হাতে নিয়ে সেটাকে দেখে আবার বিনায়কের হাতে ফিরিয়ে দিলেন। বললেন, বাঃ, গুড ফাইন্ডিং। অ্যাকসিডেন্ট নয়, এ তো খুন! বেলুনের দিকে ছুটে যাওয়া নিরীহ ছুরিটাকে সাবিত্রীর গলার দিকে নামিয়ে দিয়েছিল এই চুম্বকের টান। নিশ্চয় সাবিত্রীর গলার পেছনেই এটা লাগানো ছিল?
-একদম ঠিক ধরেছেন। তাহলে বলুন তো খুনটা কে করেছে?
—কেন? নটরাজন। সাবিত্রী ওকে বিয়ে করতে চায়নি, তারই শোধ নিল আর কি! ওর হাতেই তো আলোর সুইচ ছিল বললে। এমনই কল বানিয়েছিল শয়তানটা, যে আলোও জ্বলেছে, আর সাবিত্রীর মৃত্যুও নিঃশব্দে ওত পেতে দাঁড়িয়েছে তার গলার পিছনে। ভয়ঙ্কর!
বিনায়ক বলল, কিন্তু স্যার, নটরাজনই যদি ইলেকট্রো-ম্যাগনেটের ফাঁদ পেতে থাকে তাহলে কাজ মিটে যাওয়ার পরেই সে সেটাকে সরিয়ে ফেলল না কেন? সামান্য একটা আড়াইশো ওয়াটের নীল আলোয় গ্যালারি থেকে ওই চাকার পেছনে ঘন অন্ধকারে কে কী করছে তা বোঝা তো কারুর পক্ষেই সম্ভব ছিল না। আর নটরাজনের কাছাকাছি যে দুজন মানুষ ছিল তাদের মধ্যে সাবিত্রী ততক্ষণে মৃত, আর কেশবনের তো চোখ বাঁধা।
—তাও তো ঠিক। তাহলে কি নটরাজন নয়? নটরাজন কি না- জেনেই অন্য কারুর পাতা ফাঁদে পা দিয়েছিল? কে হতে পারে সেই খুনি?
—কেন, কেশবন।
—তার মানে? তুমি কী বলছ বিনায়ক? নটরাজনের অজান্তে কেশবন চাকার পেছনে ম্যাগনেট লাগিয়ে রেখেছিল? কিন্তু তা কী করে হবে বিনায়ক? নটরাজন ছিল ওর প্রিয় বন্ধু, আর সাবিত্রী ছিল কেশবনের বাগদত্তা। তাকে ও খুন করবে কেন?
—কিছু ফ্যাক্ট নীলাদ্রি খুঁজে বের করেছে। ফেমাস সার্কাসের পুরোনো কয়েকজন কর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জেনেছে যে, সাবিত্রী যেমন কিছুদিন আগে নটরাজনকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, তেমনি ক’দিন আগে বাতিল করেছিল কেশবনকেও। সাবিত্রী নিজে ছিল খুবই দক্ষ ট্রাপিজের খেলোয়াড়। ওকে উত্তর ভারতের বিখ্যাত ‘স্টার সার্কাস’ অনেক বেশি বেতন দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। এই মাসটাই ছিল ফেমাসের সঙ্গে সাবিত্রীর চুক্তির শেষ মাস।
—বুঝলাম। কিন্তু, তারপরেও তো কয়েকটা প্রশ্ন থেকে যায়।
-বলুন স্যার। আত্মপ্রত্যয়ের সুর বিনায়কের গলায়।
-এক, কেশবনের মোটিভ?
-একাধিপত্য। নটরাজন জেলে গেলে কেশবন আর ফেমাস সার্কাসের পার্টনার থাকত না। মালিক হয়ে বসত।
—কিন্তু, সাবিত্রীকে খুন করার কাজটা অমন কঠিন করে নিল কেন কেশবন? ও তো যে কোনো সময়েই, চোখ খুলেই, বারোটার মধ্যে একটা ছুরি সাবিত্রীর শরীরে গেঁথে দিতে পারত।
—এটাও বুঝতে পারছেন না? সে ক্ষেত্রে কি নটরাজনের কন্সপিরেসির থিয়োরিটা এত চমৎকার ভাবে দাঁড় করানো যেত?
—ঠিক আছে, এরপর আমার শেষ প্রশ্ন। কেশবন কীভাবে নিশ্চিত হয়েছিল যে চোখ বাঁধা অবস্থাতেও সে সাবিত্রীর গলাতে ছুরি বসাতে পারবে, লক্ষ্যভ্রষ্ট হবে না? সে যে প্রতিদিন সাবিত্রীর মাথার তিন ইঞ্চি ওপরে বেলুনটাকে বিঁধতে পারত— সেটা নিশ্চয়ই ওর দীর্ঘ অনুশীলনের ফল। কিন্তু মাথার তিন ইঞ্চি নীচে যে নতুন টার্গেটে ও পরশু ইচ্ছে করে ছুরি গেঁথেছে বলছ, সে ব্যাপারে তো আর কেশবনের প্র্যাকটিসের সুযোগ ছিল না। তাহলে?
—আপনি ঠিক ধরেছেন। হাঁটুর ওপর চাপড় মেরে চেঁচিয়ে উঠল বিনায়ক বসু। চোখ খোলা থাকলে যে কেশবন একটা উড়ন্ত মাছিকেও ছুরি দিয়ে দু’ টুকরো করে ফেলতে পারে, চোখ বাঁধা থাকলে সে একটা হাতিকে মারার ব্যাপারেও নিশ্চিত থাকতে পারত না। তাই আমার বিশ্বাস শুধু নটরাজনকে ফাঁসানোর জন্যই নয়, তেরো নম্বর ছুরিকে নিশ্চিতভাবে লক্ষ্যে চালিত করবার জন্যেও কেশবনের প্রয়োজন ছিল এই ছোট্ট বস্তুটির। হাতের মধ্যে ‘ইউ’ আকৃতির চুম্বকটিকে ঘোরাতে-ঘোরাতে বলল বিনায়ক, এ কেশবনকে দিয়েছে সিদ্ধি, আর নটরাজনকে দিত শাস্তি। এবার শুধু কেশবনের কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করতে হবে।
অনেকক্ষণ একনাগাড়ে কথা বলে বিনায়ক থামল। তারপর বলল, আপনার কী মনে হচ্ছে স্যার? এটা একটা আশ্চর্য ডিটেকশন নয়। আই উইল রিয়েলি রিয়েলি মিস দা বয়। আই মিন নীলাদ্রি।
চৌবেসাহেব মাথার পেছনে হাত দুটো ভাঁজ করে রেখে পা দুটো সামনে ছড়িয়ে দিলেন। বিনায়ক জানে, এটা ওঁর গভীর চিন্তার লক্ষণ। ও কিছুক্ষণ চৌবেসাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে ভয়ে-ভয়ে বলল, কী হল স্যার? এনি খটকা?
মেনি খটকাস, টু টেল ইউ দ্য ট্রুথ। তুমি আমার কয়েকটা প্রশ্নের জবাব দাও তো বিনায়ক। প্রথমে বলো, ওই ম্যাগনেটটা, ওটা কি নীলাদ্রি প্রথমবারেই সার্কাসের তাঁবুতে গিয়ে খুঁজে পেয়েছিল?
বিনায়কের চোখ দুটো গোল-গোল হয়ে উঠল। বলল, কেমন করে জানলেন? না! প্রথমবারে নয়। ওই দিনই একটু বেশি রাতের দিকে নীলাদ্রি আবার ফেমাস সার্কাসে ফিরে গিয়েছিল। ও আমাকে বলেছে, ওর মন বলছিল, ভাইটাল কোনো ক্লু মিস করেছে। সেই জন্যেই ও আবার গিয়েছিল ওখানে। তখনই ও চুম্বকটাকে খুঁজে পেয়েছিল। কিন্তু আপনি কেমন করে…
পরে বলছি। এবার বলো, তোমরা নিশ্চয়ই ফেমাস-সার্কাসের অফিস থেকে কাগজপত্র সিজ করেছো।
ইয়েস স্যার।
তার মধ্যে সাবিত্রীর নামে ইনসিওরেন্সের কোনো সার্টিফিকেট পেয়েছ?
বিনায়ক শক খাওয়ার মতন দাঁড়িয়ে উঠল। বলল, ইউ আর এ উইজার্ড। হ্যাঁ স্যার। পেয়েছি। পঁচিশ লক্ষ টাকার ইনসিওরেন্স কভারেজ। মাত্র গত বছরেই সার্কাস কোম্পানির টাকায় সাবিত্রীর নামে করানো হয়েছিল।
ও মারা গেলে টাকাটা কে পাবে?
দুই পার্টনার, মানে কেশবন আর নটরাজন সমানভাবে। কিন্তু এটা কি ইম্পর্ট্যান্ট?
ভীষণ ইম্পর্ট্যান্ট বিনায়ক। সাবিত্রীকে সার্কাসের দুই পার্টনার মিলে খুন করেছে। ওই পঁচিশ লক্ষ টাকা ডুবন্ত সার্কাসকে বাঁচাতে পারত। কাজেই ধরে নাও সার্কাসের স্বার্থে ওরা দুজনে মিলে সাবিত্রীকে বলি দিয়েছে।
বিনায়ক একরোখা গলায় বলল, কিন্তু ওরা যদি অ্যাক্সিডেন্ট থিয়োরিকেই কাজে লাগাবে, তাহলে চুম্বকটাকে সরিয়ে রাখল না কেন? এখনো তো সাক্ষ্য প্রমাণ সব কেশবনের বিরুদ্ধেই যাচ্ছে। ওই তো চুম্বকটাকে লাগিয়েছিল যাতে ছুরিটা সাবিত্রীর ঠিক গলার মাঝখানেই বেঁধে।
চৌবেসাহেব অধৈর্য গলায় বললেন,
—সরায়নি, তার কারণ, ওরা কেউই চুম্বকটার কথা জানত না। চুম্বকটা খুনের কাজে লাগেনি। আচ্ছা বিনায়ক, তুমি কি সত্যিই আমাকে বিশ্বাস করতে বলো যে একটা তীব্রবেগে ছুটে আসা ভারী ছোরার গতিবেগ বদলে দিতে পারে ওই ছোট একটা চুম্বক— আড়াইশো ওয়াটের বিদ্যুতে যা কাজ করে?
বিনায়ক বলল, তাহলে কি আপনি বলতে চান কেশবনের অলৌকিক ক্ষমতা ছিল, চুম্বক ছাড়া লক্ষ্যভেদের ব্যাপারে কীভাবে অমন নিশ্চিত ছিল কেশবন?
-যেভাবে ম্যাজিশিয়ানরা নিশ্চিত থাকেন চোখ বেঁধে বোর্ডে অঙ্ক কষার ব্যাপারে কিংবা ভিড়ের রাস্তায় গাড়ি চালানোর ব্যাপারে।
— মানে?
-মানে খুব সহজ। কেশবন একটা বহু পুরোনো ম্যাজিক ট্রিকের আশ্রয় নিয়েছিল। তুমি যখনই বলেছিলে দর্শকদের মধ্যে থেকে একজন এসে কেশবনের চোখে ফেট্টি বেঁধে যাওয়ার পরেও আবার নটরাজন একটা কালো ঢাকনা দিয়ে তার মাথা ঢেকে দিত, তখনই আমার কাছে পুরো ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। ওই ঢাকনাটা কেশবনের মাথার ওপর দিয়ে গলিয়ে দেওয়ার সময়েই হাতের দ্রুত এক টানে নটরাজন কেশবনের চোখের ফেট্টিটা নামিয়ে দিত। আর ঢাকনাটা কালো মশারির কাপড়ের মতন একরকমের কাপড় দিয়ে তৈরি। যার ফলে কেশবন তার মধ্যে দিয়ে পুরো বাইরের জগৎটাই দেখতে পেত; কিন্তু দর্শকরা বুঝতে পারত না যে কেশবনের চোখের বাঁধন সরে গেছে।
খেলা দেখানো হয়ে গেলে, আগে চোখের ফেট্টিটা স্বস্থানে সরিয়ে তারপর কাপড়ের ঢাকনাটা মাথা থেকে খুলত কেশবন।
অতএব, বুঝতেই পারছ, সাবিত্রীকে কেশবন ঠান্ডা মাথায় দেখেশুনে খুন করেছে এবং তার জন্য চুম্বকের কোনো প্রয়োজন ছিল না। অবশ্য নটরাজন পুরো ব্যাপারটাই জানত। সে এই খুনের সহযোগী।
কিন্তু তাহলে ওই ম্যাগনেট? ওটার তো কোনো প্রয়োজনই ছিল না। কোথা থেকে এল ওটা?
এই প্রশ্নের উত্তরটা দিতে খুবই খারাপ লাগছে বিনায়ক, বললেন উমাশঙ্কর চৌবে। নীলাদ্রির সম্বন্ধে তোমার ধারনাটা সম্পূর্ণ বদলে দিতে খুবই খারাপ লাগছে আমার। কিন্তু আমার ধারনা, আমি ঠিকই বলছি। তুমি নিজে একবার নীলাদ্রিকে জিজ্ঞেস করলে ও নিশ্চয়ই স্বীকার করবে। চুম্বকটাকে দ্বিতীয়বারে সার্কাসের তাঁবুতে যাবার সময় ও নিজেই পকেটে করে নিয়ে গিয়েছিল। নীলাদ্রিই চাকাটার পেছনদিকটায় ক্লু খুঁজবার নাম করে গিয়ে ওটাকে ওখানে লাগিয়ে দিয়েছিল।
কিন্তু কেন? কেন স্যার? বিনায়ক প্রায় চিৎকার করে উঠল।
চৌবেসাহেব চেয়ার ছেড়ে উঠে দোপাটিগাছের পাতা থেকে টোকা মেরে একটা ছোট মাকড়সাকে ফেলে দিয়ে বললেন, মানুষের মন বড্ড জটিল বিনায়ক। নীলাদ্রি পুলিশের চাকরি ছেড়ে চলে যাবার আগে তোমাকে দেখিয়ে দিতে চেয়েছিল, সুযোগ পেলে, একটা মনের মতন বুদ্ধিদীপ্ত ক্রাইম পেলেও তাদের সঙ্গে কতটা টক্কর দিতে পারে।
বাট আই অ্যাম সরি টু সে, ও পারেনি। এই ক্রাইমটার পেছনে নটরাজন আর কেশবনের অসাধারণ শয়তানি চাল ছিল। নীলাদ্রি সেটা ধরতে পারেনি। ও ভেবেছিল এটা একটা সিম্পল অ্যাকসিডেন্ট। সেটাকেই ও রং চড়িয়ে ক্রাইম বানাতে গিয়েছিল।
হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে বিনায়কের চোখে চোখ রেখে চৌবেসাহেব বললেন, এই ইনভেস্টিগেশনটা এখন তুমিই চালিয়ে নিয়ে যাবে। মনে হয় কেশবনের চোখের বাঁধনটা যে নকল ছিল সেটা প্রমাণ করতে অসুবিধে হবে না। ভালো করে জেরা করলে ওরা দুজন কনফেসও করে নেবে সবকিছু। কিন্তু আমার একটা রিকোয়েস্ট, পুরো রিপোর্টের মধ্যে এই চুম্বকের গল্পটার কোনো উল্লেখ কোরো না। রোমান্টিকরা মাঝে-মাঝে ভুল করে ফেলে। তাদের ক্ষমা করতে হয়।
বিনায়ক মাথা নীচু করে বলল, ওকে, স্যার।
