সেই হাত জ্যান্ত (উপন্যাস) – সৈকত মুখোপাধ্যায়
সেই হাত জ্যান্ত
আমি উমাশঙ্কর চৌবে, রিটায়ার্ড অ্যাডিশনাল এসপি, ওয়েস্টবেঙ্গল পুলিশ সার্ভিস। বয়স সিক্সটি-সেভেন। কুচবিহার এয়ারপোর্টের পাশে আমার একটা দোতলা বাড়ি আছে। সেখানেই আমি আর আমার স্ত্রী থাকি। আমার বাগানের শখ আছে।
বিনায়ক বসু আলিপুরদুয়ার থানার ওসি। রিটায়ারমেন্টের পরে যে- কটা কেসে মাথা ঘামিয়েছি, সবই ওই বিনায়কের জেদাজেদিতে। ও নিজে কোনো কেসে ঠেকে গেলে আমার শরণাপন্ন হয়। একটা সুবিধে আছে। বিনায়ক দৌড়োদৌড়ির কাজটা, মানে তথ্যটথ্য জোগাড়ের কাজটা খুব নিপুণভাবে নিজেই সেরে রাখে। আমার ভাগে পড়ে থাকে সেগুলোর বিশ্লেষণের দায়িত্ব। সেটা আবার চিরকালই আমার পছন্দের কাজ।
এর আগে অন্যের লেখায় আমার দু-একটা ইনভেস্টিগেশনের কথা আপনারা হয়তো পড়েছেন। তবে, এবার সাম্পা-গ্রামের ঘটনাটা আমার নিজের জবানিতেই লিখে রাখতে ইচ্ছে করছে। দুটো কারণে। প্রথমত, চাকরি-জীবনে কিংবা অবসর নেওয়ার পরেও যে-কটা ক্রাইমের শেকড় খুঁজে বার করতে হয়েছে, তাদের মধ্যে সাম্পার রহস্যটাই ছিল সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জিং। দ্বিতীয়ত, জীবনে এই প্রথমবার কিছুক্ষণের জন্যে হলেও আমার মনে হয়েছিল পৃথিবীতে অলৌকিকের অস্তিত্ব রয়েছে; রয়েছে ব্ল্যাক-ম্যাজিক।
মজার ব্যাপার হচ্ছে সেই বিনায়ক বসুর হাত ধরেই সাম্পার রহস্যময় ঘটনাবলি প্রথম আমার সামনে এল। যদিও বিনায়ক আলিপুরদুয়ার থানার ওসি আর সাম্পা-গ্রামটা হচ্ছে জোড়পোখরি পুলিশ স্টেশনের আন্ডারে; মানে ওর এখতিয়ারের বাইরে।
এখন যে ছেলেটি জোড়পোখরির অফিসার-ইন-চার্জ তার নাম সুরেশ তামাং। আমি যখন নর্থ-বেঙ্গলের অ্যাডিশনাল এসপি ছিলাম তখন সুরেশ তামাং সবে চাকরিতে জয়েন করেছে। সেই অর্থে বিনায়কের মতন সুরেশকেও আমার ছাত্র বলা চলে। ট্রেনিং-পিরিয়ডে সুরেশও নাকি ইনভেস্টিগেশন- প্রসেসের ওপর আমার লেকচার-টেকচার শুনে আমার ভক্ত হয়ে পড়েছিল। সুরেশ জানত, বিনায়কের মাধ্যমে উমাশঙ্কর চৌবের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে আর তাই ঠিক এক সপ্তাহ আগে, মানে মে মাসের বাইশ তারিখে সন্ধেবেলায়, সুরেশ আর বিনায়ক একসঙ্গে আমার বাড়িতে উপস্থিত হল।
সেদিন সুরেশ তামাং যা-যা বলেছিল, সবটাই এখানে লিখে রাখছি। অবশ্য তার ক’দিন পরেই সাম্পায় আমরা গিয়ে পৌঁছনোর পর থেকে আরো নানান ঘটনা ঘটে যায়। ন্যাচরালি সুরেশের প্রথম দিনের স্টেটমেন্টের মধ্যে সেগুলোকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। সেগুলোর কথা পরে লিখব।
যা বলছিলাম। প্রথম দিনে সুরেশ যতটুকু বলেছিল সেটুকুই আমাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ক্রাইমের পটভূমিকা, ক্রাইমের নেচার সব মিলিয়ে প্রথম থেকেই এমন কিছু অন্যরকমের ব্যাপার-স্যাপার ছিল, যেরকমটা আমাদের শহুরে পরিবেশে ভাবা যায় না। সেই জন্যেই সুরেশের নিজেরও ঘটনাগুলোকে ‘ক্রাইম’ বলতে খুব দ্বিধা ছিল। ও কথার মধ্যে বারবার ‘দুর্ঘটনা’ শব্দটা ব্যবহার করছিল।
যে কোনো ক্রাইম ঘটতে গেলে যে-উপাদানটা সবচেয়ে জরুরি সেটা হল মানুষ। মানুষ ছাড়া আর কোনো প্রাণী অপরাধ করে বলে জানি না। বেনারসের বাঁদরগুলো অবশ্য হোটেলের ঘরে ঢুকে মহা তাণ্ডব করে। একবার তো আমার অফিসের আইডেন্টিটি-কার্ড নিয়েই পালিয়েছিল। তবে সেটাকে ক্রাইম না বলে বাঁদরামি বলাই ভালো।
এই যে কেসটার কথা লিখছি, তার অকুস্থল, আগেই বলেছি, সাম্পা নামের একটা ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম, যেখানে হাতে-গোনা কয়েকটি মানুষ থাকে। সুরেশের কনফিউসনের সেটাও একটা বড় কারণ। ক্রিমিনাল হবার যোগ্য কাউকে ও খুঁজে পাচ্ছিল না ওই গ্রামে। ও জানত না, ক্রাইমের ইতিহাসে বহুবার দেখে গেছে যে, একজন দাগী অপরাধীর থেকেও নিখুঁতভাবে পুরো ছক সাজিয়ে খুন করেছেন একজন শান্ত, ভদ্র স্কুলশিক্ষক কিংবা নিরীহ গৃহবধূ।
.
জোড়পোখরি থেকে মানেভঞ্জং-টুমলিং-কালিপোখরি-সান্দাকফু হয়ে ফালুটের জনপ্রিয় ট্রেকিং-রুটটা অনেকেরই চেনা। কিন্তু ফালুট থেকে গোর্খের দিকে কিছুটা নেমে গিয়ে নেপাল সীমান্তের দিকে টার্ন নিলে এই পশ্চিমবঙ্গের মধ্যেই যে সাম্পা নামে একটা গ্রাম আছে, সেটা পাহাড়ি লোকেদের মধ্যেও অনেকেই জানে না। আমিও জানতাম না। সুরেশকে ওর চাকরিসূত্রেই জানতে হয়েছিল। কারণ, আগেই বলেছি, আইনত সাম্পা-গ্রামটা জোড়পোখরি থানার আন্ডারেই পড়ে। ব্রিটিশ সাহেবদের বানানো পুলিশ ম্যাপেও বোধহয় সেরকমটাই ছিল।
ছিল তো ছিল। তাতে জোড়পোখরি থানার অতীত কিংবা বর্তমানের কোনো বড়সাহেবেরই কোনো মাথাব্যথা ছিল না। সাম্পার ইতিহাসে কোনোদিন কোনো অপরাধ ঘটেনি, একটা ছিঁচকে চুরিও না। তার প্রধান কারণ ওই— মানুষের অভাব। সাম্পা-গ্রামে ওখানকার ভূমিপুত্র ছাড়া বাইরের লোকেদের যাতায়াত ছিল না। আর গ্রামবাসীরা সবাই ভারি শান্তিপ্রিয়। প্রায় সকলেই সকলের আত্মীয়। তাহলে মারদাঙ্গা, খুনোখুনি হবে কেন?
সুরেশ যখন সাম্পার শান্তিপূর্ণ পরিবেশের কথা বলছিল তখন আমি ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, সাম্পায় ট্যুরিস্ট যায় না? আচ্ছা, গাড়ির রাস্তা নেই বলে সাধারণ ট্যুরিস্টরা না হয় নাই গেল। কিন্তু ট্রেকার? জায়গাটার ন্যাচরাল- বিউটি কি কম?
সুরেশ উত্তরে বলেছিল, সাম্পার সৌন্দর্য নাকি স্বর্গকেও হার মানায়। তবু ওখানে এতদিন অবধি যে কোনো ট্রেকিং-গ্রুপ যেত না, তার দুটো কারণ। এক, সাম্পায় ভয়ঙ্কর জলকষ্ট। পুরো গ্রামের পানীয় জলের সোর্স বলতে গ্রামের অনেক নীচ দিয়ে বয়ে চলা একটা পাহাড়ি নদী। নদীটার নামও নাকি সাম্পা। সেখান থেকে পিঠে করে জলের জেরিক্যান বয়ে এনে গ্রামবাসীরা নিজেদের জলের প্রয়োজন মেটায়; বাড়তি লোকের চাপ নেওয়ার মতন অবস্থা তাদের নেই। আর দুই, সাম্পার মানুষেরা সুদূর অতীত থেকেই জীবিকায় পশুপালক। গোরু-মোষ নয়; ইয়াক, মানে চমরি গাই পোষে তারা। আর বৃষ্টির জলে অল্পস্বল্প রামদানা, ভুট্টা এই সবের চাষ করে। নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে ব্যবসায় নামার কথা তাদের মাথাতেই আসেনি কখনো।
সুরেশকে জিজ্ঞেস করলাম, এতদিন অবধি ট্যুরিস্ট যেত না বললে কেন? রিসেন্টলি কি অবস্থা কিছু বদলেছে?
সুরেশ বলল, বদলায়নি, তবে বদলানোর চেষ্টা শুরু হয়েছিল। সেখান থেকেই সব গন্ডগোলের সূত্রপাত।
ওর কথা শুনে বুঝলাম, জোড়পোখরি থেকে কয়েকজন পয়সাওলা লোক এই সান্দাকফু-ফালুট রুটের ট্রেকিং-এর ব্যবসাটা চালায়। সফল ব্যবসার নিয়মই হচ্ছে তাকে ক্রমাগত বাড়িয়ে চলতে হবে। সেই নিয়ম মেনে ওই শেঠেরা সান্দাকফু-ফালুট রুটের আশেপাশে নতুন-নতুন ট্যুরিস্ট-স্পট ডেভেলাপ করে যাচ্ছে। সাম্পার মতন সুন্দর একটা গ্রাম তাদের নজর এড়িয়ে বেশিদিন থাকতে পারে না। ওদের মধ্যে একজন সাম্পায় ট্যুরিস্ট-রিসর্ট বানানোর প্রথম স্টেপটা নিল। তার নাম সজ্জন আগরওয়ালা।
আগরওয়ালা পদবিটা শুনে অবাক হলাম না। আমি নিজে দীর্ঘদিন এদিকের পাহাড়ে পুলিশের উর্দি গায়ে চাপিয়ে ঘুরেছি। তাই জানি যে, এখানকার বেশিরভাগ ব্যবসার সামনে থাকে লোকাল লোকজন, কিন্তু মূলধন আর বুদ্ধি সবই মাড়োয়ারিদের। সান্দাকফু-ফালুট রুটে ট্যুর অর্গানাইজ করা ওরকমই একটা দারুণ লাভজনক ব্যবসা। বিশেষ করে এই কারণে লাভজনক যে, ভারতীয়দের তুলনায় ওই রুটের ট্রেকারদের মধ্যে বিদেশিদের সংখ্যা অনেক বেশি। পেমেন্ট পাওয়া যায় ডলারে কিংবা ইয়েনে। কাজেই জোড়পোখরির মাড়োয়ারিরা যে ওই ব্যবসায় টাকা ঢালবে, ল্যান্ডরোভার কিনবে, ট্রেকার্স হাট বানাবে, টেন্ট, স্টোভ, গ্যাস-সিলিন্ডার কুলি, কুক— এই সবের ব্যবস্থা করবে আর শেষমেষ লাভের ডলার ঘরে তুলবে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
সুরেশকে জিজ্ঞেস করলাম, সজ্জন কি সাম্পায় গিয়েছিল?
না স্যার। আপনি তো জানেন, এই মাফিয়া টাইপের লোকগুলো কখনোই নিজেরা সামনে আসে না। সজ্জনও কখনো সাম্পায় পা রাখেনি। ওর একজন হেঞ্চম্যান, মানে পোষা গুন্ডা ছিল। নাম, জ্যাকি সুব্বা। জ্যাকি জোড়পোখরিরই ছেলে, ত্রিশ বছর বয়স। টল, হ্যান্ডসাম। ভীষণ মিষ্টি করে কথা বলতে পারত, তাও আবার চার-পাঁচটা ভাষায়। ইংরিজি ছাড়াও ফ্রেঞ্চ আর জাপানিটাও কাজ চালানোর মতন বলতে পারত। আসলে সতেরো-বছর বয়স থেকে বিদেশি ট্যুরিস্টদের গাইড হিসেবে পাহাড়ে যেত জ্যাকি। সেখান থেকেই চলনে-বলনে কথায় ওই ঝকঝকে ব্যাপারটা চলে এসেছিল।
ওর একটা ব্যাপারেই কমতি ছিল। ডানহাতের মাঝের তিনটে আঙুল ছিল না। ও বলত, এভারেস্ট বেস-ক্যাম্পে একবার ব্লিজার্ডের মধ্যে পড়েছিল। তখনই নাকি ফ্রস্ট-বাইটে আঙুলগুলো খসে গিয়েছিল। তবে আমার ধারনা, ওর হাতের ওপর বম্ব বার্স্ট করেছিল কখনো।
সজ্জনের হয়ে এই জ্যাকি সুব্বা সাম্পায় গিয়েছিল। সেটা প্রায় একমাস আগের কথা। ঠিকঠাক বলতে গেলে এপ্রিলের এগারো তারিখ।
তারপর?
বলছি স্যার। তার আগে জ্যাকির চরিত্রের অন্য একটা দিকের কথা আপনাকে বলে নিই। গত পাঁচ বছরে আমাদের থানা-এলাকায় অন্তত তিনটে লোক নানারকম অদ্ভুত অ্যাকসিডেন্টে মরেছে। কখনো আন্ডার-কনস্ট্রাকশন বাড়ির ওপর থেকে কারুর মাথায় লোহার বিম খসে পড়েছে। কখনো নেশাগ্রস্ত অবস্থায় কেউ খাদের মধ্যে পড়ে গেছে। তিনটে কেসেই অ্যাকসিডেন্টের ঠিক আগে সজ্জনবাবুর হয়ে জ্যাকি ওদের কাছে নেগোশিয়েট করতে গিয়েছিল। যারা মারা গিয়েছিল তাদের আত্মীয়স্বজন কিংবা পাড়াপ্রতিবেশীদের মুখ থেকে যেটুকু কথা বার করতে পেরেছিলাম, তাতে বুঝতে পেরেছিলাম, ওরা প্রত্যেকেই জ্যাকির সঙ্গে বিবাদে জড়িয়েছিল। বুঝতে পারছেন নিশ্চয়ই, কী বলতে চাইছি।
বললাম, পারছি। সবকটাই সাজানো অ্যাকসিডেন্ট। আসলে খুন। কিন্তু তুমি জ্যাকির কথা বলতে গিয়ে পাস্ট-টেন্স ইউজ করছ কেন? ছেলেটা ছিল, ছেলেটা গিয়েছিল…।
সুরেশ একটু অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে তাকাল। ও বোধহয় ভাবতে পারেনি আমি ওর কথার আড়ালের কথাগুলোও এত মন দিয়ে শুনবো। তারপর ওর মতন ইংরিজিতে উত্তর দিল, আই অ্যাম ইউজিং পাস্ট-টেন্স বিকজ জ্যাকি ইজ পাস্ট। ওই সাম্পা-গ্রামে গিয়েই জ্যাকি মারা গেছে।
বিনায়ক এতক্ষণ চুপ করে বসেছিল। এবার হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে বলল, এই ডিটেইলসটা একটু মন দিয়ে শুনুন স্যার। খুবই অদ্ভুত। আমিই সুরেশকে বললাম, একবার স্যারের কাছে চল। চৌবেসাহেব সারাজীবন অলৌকিককে চ্যালেঞ্জ করে এসেছেন। ভবানী নামের টেররিস্ট গ্রুপের সেই মেয়েটা যখন আলিপুরদুয়ার কোর্টের চত্বর থেকে ভ্যানিশ হয়ে গিয়েছিল, তখনও তো আমরা ভেবেছিলাম ঘটনাটা অলৌকিক। হয়তো এবারেও সেরকম কিছু…।
আমি হাত তুলে বিনায়কের কথার স্রোত থামালাম। তারপর সুরেশকে বললাম, বলো।
সুরেশ বলল, সজ্জন আগরওয়ালার লোকজন নিশ্চয় আগেই সাম্পা- গ্রামটাকে সার্ভে করে এসেছিল। ওরা দেখেছিল, ওখানে যদি একটা ট্যুরিস্ট- রিসর্ট বানাতেই হয় তাহলে সেটা একটামাত্র জায়গাতেই বানানো সম্ভব। না, গ্রামের মধ্যে নয়। নীচে নদীর ধারে কোনো সমতল জমিতে। কারণ একটা রিসর্ট চালাতে গেলে যে পরিমাণ জলের প্রয়োজন হয়, একমাত্র ওখানেই সহজে অতটা জল পাওয়া যাবে। আগে বলতে ভুলে গেছি, সাম্পায় মোটর যাওয়ার রাস্তা যেমন নেই তেমনি বিদ্যুৎও নেই। কাজেই পাম্প চালিয়ে জল তোলার কথা ওখানে ভাবা যায় না। কিন্তু প্রবলেম হল ঝোরার ধারে ওরকম বড়সড় জমি রয়েছে মাত্র একটাই। বাকি সবটাই পাথুরে-জমি এবং মারাত্মক ঢালু। ওসব জমিতে কোনো কনস্ট্রাকশন সম্ভব নয়।
বললাম, তাতে অসুবিধে কী? ওই অ্যাভেলেবল জমিটাতেই সজ্জনের রিসর্ট তৈরি হত না হয়।
না স্যার। ওই জমিতে একটা বাড়ি অলরেডি রয়েছে। ঠিক বাড়িও বলা চলে না। একটা বড়সড় মনাস্ট্রি। ইয়েতির গুম্ফা।
এইবার আমি নড়েচড়ে বসলাম। বুঝলাম কাহিনির মধ্যে অলৌকিকের প্রবেশ ঘটছে। বললাম, এমন অদ্ভুত মনাস্ট্রির কথা তো জীবনে শুনিনি। ইয়েতি! মানে অ্যাবোমিনেবল স্নোম্যান? হিমালয়ের দুর্গম তুষারপ্রান্তরে যে বিশাল প্রাণীটিকে কখনো সখনো দেখা যায় বলে প্রবাদ আছে? তার আবার গুম্ফা!
হ্যাঁ স্যার। সুরেশ বলল। শুধু আপনি কেন, আমিও তো এই কেসটা হাতে নেওয়ার আগে ওই মনাস্ট্রির কথা শুনিনি। কেমন করে শুনব? সাম্পা- গ্রামটার কথাই বাইরের জগতের খুব কম লোক জানে। তার মধ্যেও ওই মনাস্ট্রির কথা জানে আরো কম লোক।
আমি আগ্রহ দেখিয়ে বললাম, অন্য প্রসঙ্গে যাবার আগে মনাস্ট্রিটার কথা একটু বলো তো, শুনি।
সুরেশ বলল, যতটা জেনেছি আপনাকে বলছি, স্যার! নদীর ধারে সেই একটুকরো সমতল জমিটার ওপরে একশো বছর আগে ওই মনাস্ট্রিটা তৈরি হয়েছিল। বন-সম্প্রদায়ের তিব্বতি লামারাই চিরকাল ওই মনাস্ট্রিতে পূজাপাঠ করেন। এখনো সেরকম দুজন লামা ওখানে রয়েছেন। বড় লামা সামডুপের বয়স প্রায় পঁচাত্তর বছর, আর ছোট লামা রিনচেং। তার বয়স তিরিশ-টিরি হবে। তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের দেবদেবীদেরই পুজো হয় ওই মনাস্ট্রিতে।
তবে ওই মনাস্ট্রির প্রধান আকর্ষণ একটা হাতের কঙ্কাল, যেটাকে ওরা বলে ইয়েতির হাত। দোতলায় একটা ঘরে হাতের কঙ্কালটা রাখা থাকে। বছরে একটা দিন, মকর সংক্রান্তির দিন, গ্রামবাসীদের দর্শনের জন্যে ঘরটা খুলে দেওয়া হয়। আমি অবশ্য লামাদের স্পেসাল পারমিশন নিয়ে হাতের কঙ্কালটা দেখেছি। কনুই থেকে আঙুল অবধি ডানহাতের হাড়। আমি তো মানুষের হাতের থেকে কিছু তফাত দেখলাম না। শুধু একটু যেন ছোট, হাড়গুলো একটু বেশি চওড়া। আর পুরনো হাড়ে যেমন হলুদ রং ধরে সেরকম রং।
হাতটাকে কি গ্রামের লোকেরা পুজো করে?
হ্যাঁ, পুজো করে। তবে সেটা ঠিক মঙ্গলকামনায় নয়। পুজো করে হাতের মালিক ওই ইয়েতির আত্মাকে শান্ত রাখার জন্যে। ওদের বিশ্বাস সে এক দুষ্ট আত্মা, ‘ইভিল স্পিরিট’। সে রাগলে খেতের ফসল নষ্ট হয়ে যায়।
চমরি গাইয়ের পালে মড়ক লাগে। আরো নানারকমের সর্বনাশ নেমে আসে সাম্পা-গ্রামে।
আচ্ছা, তারপর?
ওই মনাস্ট্রিটাই সজ্জন আগরওয়ালা ওখান থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল। সেটা আমার কাছে স্বীকারও করেছে। সজ্জনের প্রস্তাব ছিল, ওই পুরনো মন্দিরটার বদলে ও গ্রামের ভেতরে একটা নতুন মন্দির বানিয়ে দেবে। সেই প্রস্তাব নিয়ে দুজন লোক গত মার্চ-মাসে সাম্পায় গিয়েছিল।
সজ্জনের মুখেই শুনেছি, ওর প্রস্তাব শুনে গ্রামবাসীরাও খুশি হয়েছিল। গ্রামের কাছাকাছি আরো বড় আর আরো সুন্দর একটা গুম্ফা হোক এটা ওরা সকলেই চেয়েছিল। তাছাড়া ট্যুরিস্ট-রিসর্ট হলে গ্রামের ছেলেমেয়েরাই যে সেখানে চাকরি পাবে সেটাও ওরা জানত। ছোট লামা রিনচেং-ও একই কথা বলেছিল। গুম্ফা সরানোয় তারও কোনো আপত্তি ছিল না। সমস্যা হল দুজনকে নিয়ে। সবচেয়ে পাওয়ারফুল দুজন লোক বেঁকে বসল। একজন গ্রামপ্রধান নিংমা শেরপা। আরেকজন বড় লামা সামডুপ।
লামা সামডুপ প্রস্তাব শুনেই পরিষ্কার বলে দিয়েছিলেন, গুম্ফা যেখানে আছে সেখান থেকে এক-পাও সরাতে দেবেন না। কারণ হিসেবে বলেছিলেন, ইয়েতি-অপদেবতাটিকে গ্রামের কাছাকাছি নিয়ে গেলে ফল মোটেই ভালো হবে না।
প্রধান লামার কথার ওপরে কোনো কথাই চলে না। শুধু সাম্পা তো নয়, আশেপাশের সমস্ত পাহাড়ি গ্রামের মানুষের কাছে সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি উনিই। তাছাড়া গ্রামের লোকেরা ভেবে দেখল, ওঁর যুক্তিও ঠিক। অপদেবতার আসন নিয়ে নাড়াচাড়া করলে তিনি খেপে গিয়ে কী করে বসেন তার ঠিক কী? নিংমা শেরপাও প্রথম থেকেই গুম্ফা সরানোর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। বড় লামার সমর্থন পেয়ে তার জোর আরও বেড়ে গেল। সজ্জন আগরওয়ালার লোকদের মুখের ওপর বলে দিল, দরকার নেই আমাদের রিসর্টের। গুম্ফা যেমন আছে তেমনই থাকবে।
প্রথম দফার নেগোশিয়েসন ব্যর্থ হওয়ার পরে বরাবরের মতন জ্যাকি সুব্বা নিংমা আর বড় লামাকে ‘বোঝাবার’ জন্যে সাম্পা-গ্রামে গিয়েছিল। এগারোই এপ্রিল দুপুরবেলায় জ্যাকি ওখানে পৌঁছেছিল একাই। তখনই ও সোজা মনাস্ট্রিতে গিয়ে হাজির হয়েছিল। দুপুর থেকে সন্ধে অবধি ওখানে কাটিয়েছিল। সেদিন গ্রামপ্রধান নিংমাকেও গুম্ফায় ডেকে পাঠিয়েছিলেন লামা সামডুপ।
ছোট লামা রিনচেং নাকি গুম্ফা সরিয়ে নেওয়ার ভালো দিকগুলো লামা সামডুপকে বোঝাতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সামডুপ ছিলেন নিজের সিদ্ধান্তে অনড়। তাঁর বক্তব্য ছিল, ওই ইয়েতির হাত অত্যন্ত খতরনাক জিনিস। ওর শান্তি নষ্ট করলে ফল ভালো হবে না। গ্রামের মোড়ল নিংমাও আগের মতই বড় লামাকে সাপোর্ট করে গিয়েছিল।
অনেকক্ষণ বুঝিয়েও যখন কোনো ফল হল না, তখন বড় লামা আর নিংমাকে হুমকি দিয়ে জ্যাকি মনাস্ট্রি থেকে বেরিয়ে যায়। বলে যায়, ও আবার ফিরে আসবে এবং তখন আর এত কথা বলবে না। অ্যাকশন নেবে।
সেদিন গুম্ফা থেকে ফিরে, সারা-সন্ধে সাম্পার একমাত্র চায়ের দোকানটায় বসে সময় কাটিয়েছিল জ্যাকি। যারা সেদিন ওকে দেখেছে তারা জানিয়েছে, ও চুপচাপ জ্যাকেটের হুডে কান-মাথা মুড়ে এককোনে বসে টেবিলে তাস সাজিয়ে পেশেন্স খেলছিল আর দফায় দফায় নুন-চা আর মোমো খাচ্ছিল। রাত সাড়ে ন’ টায় চায়ের দোকানের ছেলেটা ওকে বলে, এবার দোকান বন্ধ করতে হবে। তখন জ্যাকি ওর ব্যাকপ্যাকটা তুলে নিয়ে অন্ধকার রাস্তায় নেমে যায়। পরেরদিন দুজন গ্রামবাসী আমাদের থানায় এসে জানায় যে জ্যাকি সুব্বার ডেডবডি ইয়েতি-গুম্ফার ব্যাক-ইয়ার্ডের মধ্যে পড়ে রয়েছে। এটা বারোই এপ্রিল দুপুরের কথা বলছি। সঙ্গে সঙ্গেই আমরা সাম্পায় রওনা হয়ে গিয়েছিলাম।
ডেডবডি মানে? মার্ডার?
আমার প্রশ্ন শুনে সুরেশ তামাংয়ের মুখটা কেমন যেন অসহায়ের মতন হয়ে গেল। পাশ থেকে বিনায়ক বলল, এইখানেই সমস্যা। এমন একটা অবস্থায় এবং এমন জায়গায় ডেডবডিটা পাওয়া গেছে যে, মার্ডার না অ্যাকসিডেন্ট বোঝা যাচ্ছে না। অলৌকিক ব্যাপার স্যার।
আমি বলছি।— বিনায়কের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে সুরেশ তামাং বলল, জ্যাকির ডেডবডিটা পড়েছিল গুম্ফার পেছনদিকের জমিতে। ওদিকে বাগান নেই। পুরো চত্বরটাই পাথরের টালি দিয়ে বাঁধানো। সেই পাথরের উঠোনের একদিকে হাত-পা ছড়িয়ে উপুড় হয়ে পড়েছিল জ্যাকি। ওর ঘাড়টা ভেঙে গিয়েছিল।
জিজ্ঞেস করলাম, কোনো ইনজুরি-মার্ক? গলায় হাতের মুঠোর কালশিটে? মাথার পেছনে ব্লান্ট ওয়েপনের বাড়ি?
না স্যার, সেরকম কিছু ছিল না।
বললাম, তাহলে এর মধ্যে ক্রাইম কোথায়? অলৌকিকের প্রশ্নই বা আসছে কেন? সিম্পলি পা পিছলে আলুরদম হতে পারে না?
দুটো কারণে আসছে স্যার। প্রথমে বলি, পা পিছলে পাথরের ওপরে পড়ে গিয়েও মানুষ মরতে পারে ঠিকই, তবে যদি বেকায়দায় মাথার পেছনদিকে চোট লাগে, তবেই। নাহলে বড়জোর হাড়টাড় ভাঙবে। ঘাড় মটকে যাবে না। তাছাড়াও ওর মুখে আর শরীরের অনেক জায়গায় রক্ত জমাট বেঁধে কালশিটে পড়ে গিয়েছিল। আমার ডেডবডি দেখে যেটা মনে হয়েছিল, পোস্টমর্টেম রিপোর্টেও সেটাই কনফার্মড হয়েছে। ওকে কেউ পাথরের উঠোনের ওপর আছাড় মেরেছিল। এতই জোর ছিল সেই আছাড়ে যে, শুধু ওর ঘাড়টাই ভেঙে যায়নি, থুতনির হাড় আর কলার-বোন দুটোও ভেঙে কয়েক টুকরো হয়ে গিয়েছিল। কোমরের হাড়ও ভেঙেছিল। পা পিছলে পড়ে গেলে এরকম সিভিয়ার ইনজুরি হয় না স্যার।
এগ্রিড। দ্বিতীয় কারণের কথা কী বলছিলে?
এটাই আমাদের আরো পাজলড করে দিচ্ছে স্যার। সেদিন সারাদিন দফায় দফায় ভারি বৃষ্টি হয়েছিল। সন্ধের পরে আকাশ পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল অবশ্য। তাই পাথরের উঠোনটায় কাদা জমেছিল, আর তার ওপরে আমরা পরিষ্কার ফুটপ্রিন্টও পেয়েছিলাম। শুধু জ্যাকির ক্লাইম্বিং-শ্যয়ের দাগ। আর কারুর নয়। তার মানে আর কেউ ওইসময়ে ওখানে ছিল না। যদি কেউ ওকে পেছন থেকে ফলো না করে কিংবা ওকে সামনে দাঁড়িয়ে চ্যালেঞ্জ না করে তাহলে ওকে ওইভাবে মারবে কে? সামওয়ান হু কুড ফ্লাই?
একটু বিরক্ত হয়েই বললাম, প্রথমেই সবকিছু এত জটিল করে ভাব কেন? আমি একটা পসিবিলিটির কথা বলছি, দ্যাখো, পছন্দ হয় কিনা। সেদিন রাতে জ্যাকি লুকিয়ে-লুকিয়ে গুম্ফার পেছনদিক দিয়ে বাগানে ঢুকেছিল। তুমি একটু আগে বলেছিলে, ইয়েতির হাতটা গুম্ফার দোতলার একটা ঘরে রাখা থাকে। জ্যাকি কোনোভাবে পেছনের দেওয়াল বেয়ে দোতলার সেই ঘরের জানলায় উঠে গিয়েছিল। ওর প্ল্যান ছিল হাতের কঙ্কালটাকে চুরি করে নিয়ে পালানো। হাত না থাকলে গ্রামবাসীদের মনে ইয়েতি-ভূতের ভয়ও থাকবে না। আর ভয় না থাকলে গুম্ফা সরানোর কাজটায় ওরা বাধাও দেবে না।
সুরেশ কফির কাপে একটা বড়সড় চুমুক দিয়ে কেমন যেন মজা পাওয়া মুখে আমার দিকে তাকাল। বলল, বলে যান স্যার। শুনছি।
না, আর খুব বেশি কিছু বলার নেই। বিকেলেও বৃষ্টি হয়েছিল বললে। গুম্ফার পাথরের দেওয়াল কার্নিশ সবকিছু পেছল থাকার কথা। তার ওপরে তীব্র ঠান্ডায় জ্যাকির হাত-পাও নিশ্চয় জমে গিয়েছিল। কাজেই গুম্ফার দোতলা থেকে, মানে প্র্যাকটিকালি আমাদের শহুরে বাড়ির তিনতলার চেয়ে বেশি হাইট থেকে জ্যাকি নীচে পড়ে গিয়েছিল। এইভাবেও জ্যাকি মারা গিয়ে থাকতে মারে। মার্ডার নয়, সুপারন্যাচরালও নয়। সিম্পল অ্যাকসিডেন্ট। এবার বলো হাসছিলে কেন।
সুরেশ থতমত খেয়ে বলল, না স্যার… ইয়ে, মানে স্যরি স্যার। আই অ্যাকচুয়ালি অ্যাপ্রিশিয়েটেড ইয়োর অবজার্ভেসনস। জ্যাকির মোটিভ নিয়ে আপনি যা বললেন, তার সঙ্গে আমি একশোভাগ একমত। ও নিশ্চয় ইয়েতির হাড়টা চুরি করতেই গিয়েছিল। আর যেহেতু গুম্ফার সামনের আর পেছনের দুটো দরজাই ভেতর থেকে আটকানো থাকে তাই জানলা দিয়ে ঘরে ঢোকা ছাড়া ওর কাছে অন্য কোনো উপায়ও ছিল না। আলটিমেটলি পারত না যদিও…
কেন?
দোতলায় যে-ঘরটায় ইয়েতির হাড় রাখা আছে সেই ঘরের দেওয়ালের গায়ে পাশাপাশি তিনটে জানলা রয়েছে ঠিকই, কিন্তু ওগুলোকে বাইরের দিক থেকে দেখতেই শুধু জানলার মতন। আসলে অনেক বছর আগেই ওই তিনটে জানলাকে ভেতর থেকে পার্মানেন্টলি সিল করে দেওয়া হয়েছিল। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় সাধারণ কাঠের পাল্লা, কিন্তু ভেতরের দিকে ইঁটের গাঁথনি তোলা আছে। কোনো একটা সময়ে ওই মনাস্ট্রির কর্তারা বাইরের সৌন্দর্য বাঁচিয়ে এই প্রোটেকশনের ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু জ্যাকির পক্ষে অত কথা জানা সম্ভব নয়। ও কোনোদিন দোতলার ওই ঘরে ঢোকেনি। কাজেই, আপনার ধারনা ঠিক হতেই পারে।
আর তাছাড়া দোতলায় ওঠাটাও অত ডিফিকাল্ট নয়। দেওয়াল বেয়ে উঠতে হবে না। পেছনের উঠোনে, বিল্ডিং-এর দেওয়াল ঘেঁষেই একটা বিশাল প্রেয়ার-হুইল রয়েছে। যে মোটা-খুঁটিটার মাঝখানে মেটালের সিলিন্ডারটা বসানো আছে সেই খুঁটিটার মাথা একেবারে ইয়েতির ঘরের একটা জানলা বরাবর। ওই খুঁটিটা বেয়ে একটা বারো-তেরো বছরের ছেলেও জানলার কার্নিশ অবধি উঠে যেতে পারে। কিন্তু তবু আমি বলব, জ্যাকি ওপর থেকে পড়ে মরেনি।
কেন?
কারণ, এটা আমার আগেই বলা উচিত ছিল, জ্যাকির ডেডবডিটা পড়ে ছিল ওই মনাস্ট্রির বিল্ডিং-এর বেস থেকে কুড়ি-ফিট সাত ইঞ্চি দূরে। আমি নিজে মেজারিং-টেপ দিয়ে ডিসট্যান্সটা মেপেছিলাম। বিল্ডিং-এর ছাদ থেকে কিংবা জানলা থেকে পড়ে গিয়ে ঘাড় মটকে গেলে সে তো ওখানেই পড়ে থাকত। কুড়ি-ফুট দূরে বডি সরিয়ে নেবে কে? আগেই তো বলেছি, ওই চত্বরটায় জ্যাকি ছাড়া আর কারুর ফুটপ্রিন্ট পাইনি।
তাছাড়া বাগানের বেড়ার পর থেকে গুম্ফার দেওয়াল অবধি জ্যাকির যে একসারি জুতোর দাগ ছিল, তাতে জুতোর ডগাগুলো সবই ছিল গুম্ফার দিকে মুখ ঘোরানো। মানে ওগুলো গুম্ফার দিকে যাওয়ার চিহ্ন। ফেরার কোনো চিহ্ন পাইনি আমরা। সত্যিই যেন কেউ ওকে ওই দেওয়ালের কাছেই পাকড়ে ধরে কুড়ি-ফিট দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল।
.
সুরেশ হঠাৎই কথা থামিয়ে চুপ করে গেল। আমি ঘরের সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে প্রাণপণে এগারোই-এপ্রিল রাতের ছবিটা মনে-মনে আঁকবার চেষ্টা করছিলাম, যদি সেই ছবির মধ্যে কোথাও খুঁজে পাই জ্যাকির মৃত্যুরহস্যের উত্তর। দেখছিলাম, নিস্তব্ধ পাহাড় আর বন। নিদ্রিত গ্রাম সাম্পা। আকাশের অর্ধেক চাঁদের বুক থেকে যত না আলো ঝরছে তার চেয়ে বেশি ছায়া তৈরি হচ্ছে। সেই সব ছায়ার আড়াল ধরে তিরিশ বছরের তরুণ জ্যাকি সুব্বা একটা চিতাবাঘের মতন গুঁড়ি মেরে ঢুকে পড়ল ইয়েতি-গুম্ফার পেছনের জমিতে।
আর কোনো ছায়া নেই। জ্যাকি ছাড়া আর কোনো মানুষও নেই গুম্ফার উঠোনে। ফুটপ্রিন্টের কথা যদি ঠিক হয় তাহলে ও ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল মনাস্ট্রির মূল বাড়িটার দিকে। তারপর?
ও কি প্রেয়ার-হুইলের খুঁটি বেয়ে ওপরে উঠেছিল? নাকি তার আগেই…
উঠুক বা না উঠুক, ও যে গুম্ফার দেওয়াল অবধি পৌঁছেছিল, সেটা ফুটপ্রিন্ট থেকে পরিষ্কার। তারপর কী হল? ওই গুম্ফার দেওয়ালের কাছ থেকে কোন্ শক্তি ওর অত বড় শরীরটাকে ছুঁড়ে ফেলল কুড়ি-ফিট দূরে? এতটাই জোরে ছুঁড়ে ফেলল যে, শরীরের অনেকগুলো হাড় ভেঙে গেল। মৃত্যু হল ওর। হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ল। সুরেশকে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা, কোনো চিৎকার-টিৎকার শোনা যায়নি? লামা দুজন আর গ্রামের লোকেরা কী বলছেন?
সুরেশ বলল, দেখেছেন। বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। অফকোর্স চিৎকার শোনা গিয়েছিল। যাকে বলে মরণ চিৎকার। প্রায় গোটা গ্রাম শুনতে পেয়েছিল; ছোট লামা তো শুনেছিলেন বটেই। ওই চিৎকার শুনেই তো গ্রামের লোকেরা গুম্ফার দিকে দৌড়তে শুরু করে আর তারপর ওখানে পৌঁছে দ্যাখে এই কাণ্ড। সবার আগে ছোট লামা রিনচেং গুম্ফার পেছনের দরজা খুলে বেরিয়ে আসে। ছেলেটা প্রখর বুদ্ধিমান। ওই চেঁচিয়ে-মেচিয়ে গ্রামবাসীদের বাগানের ভেতরে ঢোকা থেকে নিরস্ত করে আর সেই জন্যেই আমরা এভিডেন্সগুলো ইনট্যাক্ট পাই। বড় লামা তখনই বেরোননি। উনি অসুস্থ। সন্ধের পরে পারতপক্ষে বাইরে বেরোন না।
সুরেশ যা বলল সবটাই মন দিয়ে শুনলাম। তারপর জিজ্ঞেস করলাম, চিৎকারটা কেমন ছিল। কতক্ষণ ধরে চেঁচিয়েছিল জ্যাকি? একবার? অল্প সময়? নাকি অনেকক্ষণ ধরে?
সুরেশ মাথা চুলকোতে চুলকোতে বলল, এই রে। সেটা তো জানা হয়নি। ওটা কি জানা দরকার ছিল?
বললাম, ছিল বইকি। যাগগে। এখন সাম্পায় কী চলছে?
সুরেশ বলল, এই ঘটনার পর থেকেই শুধু সাম্পা নয়, আশেপাশের অন্যান্য পাহাড়ি গ্রামগুলোতে অবধি ইয়েতি-দেবতার প্রভাব-প্রতিপত্তি ভয়ঙ্কর বেড়ে গেছে। সকলেই বলাবলি করছে, ইয়েতি-ভূতই জ্যাকিকে আছড়ে মেরেছে। আগামী বিশ বছরের মধ্যে ওই মনাস্ট্রিকে অন্য কোনো জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব। অথচ সজ্জন আগরওয়ালাও ছোড়নেবালা আদমি নয়। সে ক্রমাগত চাপ দিচ্ছে, জ্যাকি সুব্বা কীভাবে মারা গেছে, জোড়পোখরি থানা যেন ইমিডিয়েটলি তার রিপোর্ট জমা দেয়।
ওর হাত অনেক লম্বা। বিশ্বাস করবেন না স্যার, শুধু কলকাতার হাইকম্যান্ড নয়, দিল্লি থেকে অবধি আমার ওপরে চাপ আসছে। বেশ বুঝতে পারছি, আর দিন পনেরোর মধ্যে এই ঘটনার কিনারা করতে না পারলে আমার চাকরি বাঁচানো মুশকিল হবে। অথচ আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। আপনি আমাকে হেল্প করুন স্যার, প্লিজ।
অবাক হয়ে বললাম, আমি কীভাবে হেল্প করব সুরেশ? এত দূরে বসে…
সুরেশ বলল, আমি সবকিছু অ্যারেঞ্জ করে দিচ্ছি। আপনি শুধু একবার সাম্পায় চলে যান। আমি নিশ্চিত, একবার ওখানে গেলে আপনি ঠিক ধরে ফেলবেন কে কালপ্রিট। কীভাবে সে মার্ডারটা করেছিল।
বিনায়ক একগাল হেসে বলল, চলুন স্যার। কাজও হয়ে যাবে আর বেড়ানোও হয়ে যাবে।
আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘চলুন স্যার’ মানে? তুমিও যাবে নাকি?
বিনায়ক লজ্জিতমুখে বলল, আমি অলরেডি চারদিনের ছুটি নিয়ে নিয়েছি।
তুমি কি ধরেই নিয়েছিলে আমি যাব?
বিনায়ক বলল, ইয়েস স্যার। আনসলভড মিস্ট্রি অ্যাট অ্যান আননোন মনাস্ট্রি। উমাশঙ্কর চৌবের পক্ষে এর টান যে এড়ানো সম্ভব নয় সেটা যদি না জানি তাহলে বৃথাই এতদিন আপনার চেলাগিরি করেছি।
ছোকরা ঠিকই ধরেছিল। সাম্পার ওই রহস্যের টান আমি এড়াতে পারলাম না। যদিও তখনো অবধি আমার মনে হয়নি এর পেছনে কোনো অলৌকিক শক্তির হাত রয়েছে। ভেবেছিলাম, জ্যাকি সুব্বার মৃত্যুর পেছনে খুব সহজ কোনো ব্যাখ্যা রয়েছে, যেটা সুরেশের চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে।
অলৌকিকের কথাটা মনে এসেছিল আরো দু’ দিন পরে। তখন আমরা সাম্পায়।
.
একেকজন মানুষকে দেখলেই মনে হয় তাদের শরীরটারই বয়স বেড়েছে, মনটার নয়। সাম্পায় পৌঁছে দেখলাম, গ্রামের মোড়ল নিংমা শেরপা ঠিক ওইরকম একজন মানুষ। ছোটোখাটো গাঁট্টাগোঁট্টা চেহারা। বয়স মনে হয় পঞ্চাশের আশেপাশে হবে। মুখে সারাক্ষণ হাসি লেগে আছে। ওই নিংমা শেরপার বাড়িতেই আমার আর বিনায়কের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল।
বাংলাটা নিংমা মন্দ বলে না, তবে এত হাজার-হাজার বাংলা শব্দের মধ্যে ‘হাবিজাবি’ শব্দটাকে তার এত পছন্দ হয়েছে কেন বলতে পারব না। প্রতিটি বাক্যের মধ্যে সম্ভব-অসম্ভব সব জায়গায় সে ওই শব্দটাকে ঢুকিয়ে দিচ্ছিল। যেমন সেদিন সাম্পায় পৌঁছনোর পরে জিজ্ঞেস করেছিলাম, লাঞ্চে কী খাওয়াচ্ছ নিংমাভাই? ও উত্তর দিল রাইস, চিকেন আর হাবিজাবি দিয়ে খেয়ে নেবেন স্যার। এখানে খুব বেশি কিছু পাওয়া যায় না। খেতে গিয়ে দেখলাম, টেবিলে চিকেনকারি ছাড়াও কালো উড়ৎ ডাল রয়েছে, স্কোয়াস আর আলুভাজি রয়েছে, রসুনের চাটনি রয়েছে। সেগুলোকে কোনোমতেই হাবিজাবি বলা যায় না।
নিংমা কিন্তু গ্রামের অধিকাংশ লোকের মতন পশুপালক নয়। ও কার্পেন্টার। বাড়ির পেছনের উঠোনে ওর ছুতোরখানা রয়েছে। সেখানে ও জানলা-দরজার পাল্লা, টেবিল-চেয়ার— এইসব বানায়।
নিংমার পরিবার বলতে কেবল ও আর ওর গিন্নি জিনা। ছেলেমেয়ে নেই ওদের। গল্প করতে করতে নিংমা বেশ ইন্টারেস্টিং একটা তথ্য দিল। ওর পূর্বপুরুষরা নাকি মনাস্ট্রি তৈরির সময়েই তিব্বত থেকে সাম্পায় এসেছিল। ওই মনাস্ট্রির যত কাঠের কাজ, সব ওর গ্রেট-গ্র্যান্ডফাদার আর গ্র্যান্ডফাদারের হাতে বানানো। নিংমার কাজের মধ্যে অবশ্য সেই শিল্প নেই। তবে পারফেকশন রয়েছে।
প্রথমদিন দুপুর থেকে সন্ধে অবধি নিংমার তিন-কামরার বাংলোবাড়ির পেছনের বাগানে বসেই কেটে গেল। এমন আশ্চর্য ভিউ-পয়েন্ট পুরো হিমালয়ে আর ক’টা আছে জানি না। চোখের সামনে প্রায় একশো আশি ডিগ্রি কোণে ঝকমক করছে স্নো-রেঞ্জ। কাঞ্চনজঙ্ঘা, পান্ডিম, জানু, কাব্রু— এদের তো পেলিং কিংবা দার্জিলিং থেকেও দেখা যায়। যাকে দেখা যায় না তাকেও এখান থেকে দিব্যি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম। এভারেস্ট।
বাঁদিকে অনেক দূরে একটা পাহাড়ের চূড়ায় লিলিপুটদের ঘরবাড়ির মতন কটা ঘর দেখা যাচ্ছিল। ওটাই সেই জনপ্রিয় স্পট— ফালুট। ওখান থেকেই আমরা পায়ে হেঁটে সাম্পায় নেমে এসেছি। বাগানের বেড়ার ওদিক থেকে সবুজ ঘাসজমি ঢালু হয়ে নেমে গেছে গভীর খাদের পেটে। সেই ঘাসজমির এখানে- ওখানে কয়েকটা পাইনগাছ। ঘাসজমিতে চরে বেড়াচ্ছিল সাম্পা-গ্রামের পালিত ইয়াকগুলো। ইয়াকের গলার কাঠের ঘণ্টার ডিংডং আওয়াজ সেই নিস্তব্ধ দুপুরে বহু দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়ছিল।
দেখলাম, জমির কোনো-কোনো অংশ পাইনের গুঁড়ি আর তারকাঁটা দিয়ে ঘেরা। ওইগুলো চাষের জমি। এখন জমিতে ফসল নেই। তবে ফসল যে হয় তার প্রমাণ পেতে বেশিদূর তাকাতে হচ্ছিল না। সাম্পা-গ্রামের সমস্ত বাড়ির ছাদে রামদানার লাল আর ভুট্টাবীজের হলুদ কার্পেট শুকোচ্ছে। চারিপাশের অনেক রুক্ষ্ম পাহাড়ের মাঝখানে সেই রঙিন টুকরোগুলোকে দেখে চোখের ভারি আরাম হচ্ছিল।
আর ওখানে বসেই ডানদিকে তাকালে চোখে পড়ছিল, অনেক নীচে আঁকাবাঁকা রুপোর ফিতের মতন সাম্পা-নদী। ওই নদীটার জলের ভরসাতেই সাম্পা-গ্রাম গড়ে উঠেছে। খালি চোখেই বুঝতে পারছিলাম, সাম্পা-নদী পাথরের বুক কেটে এগিয়েছে আর সেই জন্যেই তার পাড়ে মাটি বলে কিছু নেই। জলধারার দু’ পাশে শুধুই বড়বড় বোল্ডার আর ধারালো নুড়িপাথরের স্তূপ। তবু প্রকৃতির কোন খামখেয়ালে কে জানে, একটা মাত্র জায়গায় সেই পাড়ের পাথর জায়গা করে দিয়েছে একটা ফুটবল মাঠের মতন বড়সড় সবুজ জমিকে। ওই জমিটার মাঝখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে ইয়েতির গুম্ফা। কাঠের তৈরি প্যাগোডা-শেপের একটা দোতলা বাড়ি।
নিংমার বাড়ির মতন সত্তর-আশিটা বাড়ি নিয়ে সাম্পা-গ্রাম। প্রত্যেকটা বাড়িই কাঠ আর পাথর দিয়ে তৈরি। প্রতিটি বাড়িরই সামনে একটুকরো ফুলের বাগান আর পেছনে সব্জির ক্ষেত। ওই পেছনের জমিতেই একটা করে জ্বালানি কাঠের মাচানও রয়েছে। রয়েছে মুরগি আর শুয়োরের খোঁয়াড়। ইয়াকদের জন্যে গোয়াল লাগে না। পশুগুলো অনেকটাই বন্য স্বভাবের; ওরা খোলা জায়গাতেই থাকে। অবশ্য তুষারপাত শুরু হলে তখন ওই পেছনের জমিতেই ওদের জন্যে একটা কিছু অস্থায়ী ব্যবস্থা করে দিতে হয়। তবে আমরা তো গেলাম মে মাসে। তখন পাহাড়ে ভালোই বৃষ্টি হচ্ছিল। দেখলাম, বুগিয়াল জুড়ে গজিয়ে উঠেছে কচি-কচি ঘাস আর ইয়াকরাও মহানন্দে মহাভোজে মেতেছে।
দ্বিতীয়দিন সকালে আমি আর বিনায়ক গুম্ফা দেখতে গেলাম। ঢুকলাম সামনের দরজা দিয়েই। এরকম মনাস্ট্রি সারাজীবনে অনেক দেখেছি। সেই ছায়া-ছায়া হলঘর। দরজার উলটোদিকের দেওয়ালে বোধিসত্ত্ব-র সোনালি দারুমূর্তি। তামার কারুকাজ করা বিশাল প্রদীপে মাখন জ্বলছে, কাঠের দেওয়ালের গায়ে নানারকমের ছায়া কাঁপছে। কাঁপছে দেওয়ালের গায়ে গাঢ় রং দিয়ে আঁকা নানান দেবদেবীর ছবি। মেঝের ওপরে বেশ কিছু আরতির বাদ্যযন্ত্র নামানো— করতাল, ডমরু, রামশিঙা।
অন্য অনেক গুম্ফার চেয়েই এই গুম্ফাটা আয়তনে ছোট। কিন্তু দেওয়ালের গায়ে আর সিলিং-এ কাঠখোদাইয়ের এমন আশ্চর্য নমুনা আমি পশ্চিমবঙ্গ কিংবা সিকিমের অন্য কোনো মনাস্ট্রিতে দেখিনি। এর তুলনা যদি আর কোথাও থাকে তাহলে তা রয়েছে হিমাচলপ্রদেশের প্রাচীন মন্দিরগুলোয়। আমি দেওয়ালের কাছে গিয়ে সূক্ষ্ম আলপনার মতন সেই কাঠখোদাইয়ের কাজ দেখছিলাম। পেছন থেকে নিংমা শেরপা বলল, এই সব আমার পূর্বপুরুষদের হাতের কাজ স্যার।
জানি, আগেও বলেছিলে।
হ্যাঁ স্যার। এর প্রায় অর্ধেক আমার দাদুর বাবার হাতের কাজ। তারপরেও যে জায়গা ফাঁকা ছিল, তার অনেকটাই দাদু ভরাট করেছিলেন। সেও প্রায় আশি বছর আগের কথা। আমার দাদুই শেষবার বাটালির কাজ করেছে এই মন্দিরে।
প্রশ্ন করলাম, তারপর? এখনো তো নিচের দিকের দেওয়ালে অনেক খালি জায়গা। তোমার বাবা কিংবা তুমি ওখানে ফুল ফোটালে না কেন?
নিংমার মুখটা কেমন যেন করুণ হয়ে গেল। বলল, নাঃ। আমরা আর সেরকম হাবিজাবি কাজ শিখতে পারলাম কই? বাবাও জানতেন না, তাই আমিও জানি না।
বুঝলাম, এক্ষেত্রে হাবিজাবি মানে অসাধারণ। গ্র্যান্ডপা, গ্রেট গ্র্যান্ডপাদের মতন কাজ নিংমা কিংবা ওর বাবা শিখে উঠতে পারেনি। কেন কে জানে! মানুষের দুঃখের জায়গায় হাত দিতে নেই। কথা পালটে নিয়ে বললাম, নিংমাভাই, একবার এখানকার পুরোহিত দুজনের সঙ্গে দেখা করা যায়?
নিংমা বলল, নিশ্চয়। ছোট লামা রিনচেংকে তো বোধহয় কিচেনেই পেয়ে যাবেন। তবে বড় লামা কথা বলতে রাজি হবেন কিনা জানি না। উনি আজকাল বেশিরভাগ সময় নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে ধ্যান করেন। ভোরে বোধিসত্ত্বের আরতির সময়টুকু ছাড়া ঘর থেকে বেরোন না। চলুন।
নিংমার পেছন-পেছন আমি আর বিনায়ক প্রেয়ার-হলের পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে একটা টানা বারান্দায় পড়লাম। বারান্দা বলতে যেরকম খোলামেলা ব্যাপার চোখে ভাসে এটা সেরকম নয়। পাথর আর কাঠ দিয়ে তৈরি একটা লম্বা সুড়ঙ্গের মতন লাগছিল জায়গাটাকে। সিলিং-এর ঠিক নীচে কয়েকটা ঘুলঘুলির মধ্যে দিয়ে আলোর বিম এসে পড়ছিল পাথরের মেঝের ওপরে। তাতে জায়গাটার অন্ধকার মোটেই দূর হচ্ছিল না। বুঝতে পারছিলাম, ওই দেওয়ালেরই ওপাশে পেছনের উঠোন। দেয়ালটার একপ্রান্তে শালকাঠের তৈরি দুর্গের দরজার মতন বিশাল একটা দরজা। পাল্লা দুটো ভেতর থেকে প্রকান্ড একটা খিল দিয়ে আটকানো ছিল। নিংমা বলল, হাবিজাবি পালাপার্বণ না থাকলে ওই দরজা খোলা হয় না। অন্যপ্রান্তে দোতলায় উঠবার কাঠের সিঁড়ি।
সেই আলো-আঁধারির মধ্যেই দেখলাম একদিকের দেওয়ালের গায়ে পাশাপাশি তিনটে ঘরের দরজা। নিংমা বলল, ডানদিকের প্রথম দরজাটা
বড় লামা সামডুপের ধ্যানঘরের দরজা। ঘরের দরজা দেখলাম ভেতর থেকে আটকানো। সামনে দিয়ে যাবার সময় গুনগুন করে মন্ত্র পড়ার শব্দও পেলাম মনে হল।
পরের ঘরটা স্টোর রুম। দরজায় তালা ঝুলছিল।
এই দুটো ঘর পেরিয়ে আমরা তৃতীয় ঘরটার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই খাবারের সুগন্ধ পেলাম। খোলা দরজা দিয়ে দেখতে পেলাম টকটকে লাল বাকু গায়ে ধপধপে ফরসা একটা ছেলে কাঠের উনুনের ওপরে চাপানো বড় ডেকচিতে খুন্তি চালাচ্ছে। নিংমার ডাক শুনে লামা রিনচেং ঘুরে দাঁড়ালো। তারপর ডেকচিটা উনুন থেকে নামিয়ে, তোয়ালে দিয়ে হাত মুছতে মুছতে ভাঙাভাঙা হিন্দিতে আমাদের ডাকল— আসুন, আসুন। ভেতরে আসুন। জুতো খুলতে হবে না। আমাদের ঠান্ডার দেশ। সকলেই সারাক্ষণ পায়ে চটি বা জুতো পরে থাকি। দেখুন না, আমিও পরে রয়েছি। দেখলাম সত্যিই, ছোট লামার পায়ে একটা সস্তা প্লাস্টিকের চটি।
আমি আর বিনায়ক পায়ে-পায়ে কিচেনের ভেতরে ঢুকলাম। দেখলাম, এই মনাস্ট্রির সঙ্গে দুর্গের বিশেষ তফাত নেই। এই রান্নাঘরটারও পাথরের দেওয়াল। দেওয়ালের অনেক উঁচুতে একটাই মাত্র ছোট্ট জানলা। একশো-বছর ধরে উনুনের ধোঁয়া জমতে-জমতে ছাদের মোটা-মোটা কড়িকাঠগুলো কালো হয়ে গেছে।
দিনের আলো ঢুকতে পায় না বলেই বেলা-এগারোটার সময়েও সিলিং থেকে ঝোলানো বড় লণ্ঠনটা জ্বলছিল। লণ্ঠনের পাশাপাশি পেঁয়াজ–রসুনের গোছা, শুকনো মাংসের টুকরো, নুডলসের পাঁজা— এসবও ঝুলছিল ছাদ থেকে। চারটে কাঠের উঁচু টুলের ওপরে আমরা চারজন বসলাম। নিমা আমার সঙ্গে ছোট লামার পরিচয় করিয়ে দিল এই বলে যে, আমি একজন রিটায়ার্ড পুলিশ অফিসার। ওসি সুরেশ তামাং-এর অনুরোধে জ্যাকি সুব্বার মৃত্যুর তদন্ত করতে এসেছি।
হিন্দিতেই লামা রিনচেং-কে জিজ্ঞেস করলাম, জ্যাকি সুব্বা কীভাবে মারা গেছে কোনো আইডিয়া আছে?
খেয়াল করেছিলাম, রিনচেং-এর মুখে সবসময় কেমন যেন একটা অস্বস্তি, একটা ভয়-ভয় ভাব জড়িয়ে থাকে। যখনই নিংমার চোখে ওর চোখ পড়ছিল, তখনই সেটা আরো বেড়ে যাচ্ছিল। আমার প্রশ্ন শুনে ও আরো গম্ভীর হয়ে গেল। বলল, বিশ্বাস করুন, আমার কোনো ধারনা নেই। আপনাকে ওসিসাহেব নিশ্চয় বলেছেন, কাদার ওপরে কোনো পায়ের ছাপ ছিল না। তবু ওই লোকটার মৃতদেহ পড়েছিল প্রায় বিশ ফুট দূরে। যদি বলে থাকেন, একদম ঠিক বলেছেন। এটা কেমন করে সম্ভব আমি জানি না।
আমি বললাম, কেন? গ্রামবাসীরা যা বলছে তুমি সেটা বিশ্বাস কর না? ইয়েতি জ্যাকিকে গুম্ফার দেওয়াল থেকে তুলে ছুঁড়ে ফেলেছিল।
রিনচেং একটু ইতস্তত করে বলল, চৌবেসাহেব, অপদেবতা যে নেই সেটা সবচেয়ে ভালো জানি আমি। আমি গত দশ বছর ধরে প্রতি রাতে ওই ইয়েতির ঘরে শুচ্ছি। দিনের বেলাতেও বেশিরভাগ সময় ওই ঘরেই থাকি। ওটাই আমার ঘর। আমি জানি, ওই হাড়ের টুকরোগুলো নিজেদের ইচ্ছেয় এক
চুল সরে যেতে পারে না। প্রয়োজন পড়লে ওদের ধরে সরাতে হয়। ওরা আবার কাকে জড়িয়ে ধরবে?
আমার পাশ থেকে গ্রামপ্রধান নিংমা দাঁতে দাঁত পিষে বলল, এই মন্তব্যের জন্যে তুমি পস্তাবে ছোট লামা। আমি বড় লামাকে বলব, তোমার মতন নাস্তিকের লাল পোশাক কেড়ে নিয়ে তোমাকে সঙ্ঘ থেকে দূর করে দিতে।
ছোট লামা মরিয়ার মতন জেদি গলায় বলল, বোলো মোড়ল। তোমার যা প্রাণে চায় বোলো। আমি আমার বিশ্বাস থেকে নড়ব না।
নিংমা ক্রুদ্ধমুখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, এসব হাবিজাবি লোকের সঙ্গে কথা বলে সময় নষ্ট করছেন কেন চৌবেসাহেব? চলুন, আপনাকে বড় লামার সঙ্গে কথা বলিয়ে দিচ্ছি।
আমি নিংমাকে বললাম, তুমি বাইরে গিয়ে দাঁড়াও। আমি ছোট লামার সঙ্গে আর কয়েকটা কথা বলেই বেরিয়ে যাচ্ছি।
নিংমা বোধহয় একটু অপমানিত বোধ করল। আফটার অল, সে এই গ্রামের মোড়ল। তাকে ঘরের বাইরে অপেক্ষা করতে বলবে কোথাকার কে কুচবিহারের উমাশঙ্কর চৌবে? ও ঘাড় গোঁজ করে বসে রইল।
বিনায়ক কয়েক-সেকেন্ড ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎই খাঁটি পুলিশি কায়দায় ওর কাঁধটা জড়িয়ে ধরে একটা হ্যাঁচকা টান মেরে ঠান্ডা-গলায় বলল, চলো নিংমা। আমরা দুজনেই বাইরে গিয়ে দাঁড়াই।
ওরা দুজন বেরিয়ে যাওয়ার পরে আমি রিনচেংকে একদম পয়েন্ট- ব্ল্যাঙ্ক প্রশ্ন করলাম— গুম্ফা যদি গুম্ফার জায়গাতেই থেকে যায় তাহলে কার কার লাভ?
রিনচেং বলল, লাভ কারুর নেই সাহেব। কিন্তু এখান থেকে এই গুম্ফা সরে গেলে ক্ষতি ছিল দুজনের। এক, বড় লামার। বহুবছর ধরে ইয়েতির হাতের যে-কালাজাদু গড়ে উঠেছে, সেটা ভেঙে যেত। প্রমাণ হয়ে যেত যে, ওই হাত আসলে কয়েকটা হাড়ের টুকরো ছাড়া আর কিছুই নয়। তার ফলে গ্রামবাসীদের চোখে ইয়েতি-গুম্ফার আর সেই সঙ্গে আমাদের, মানে পুরোহিতদের সম্মানও কমে যেত। আমি অবশ্য তাতে অখুশি হতাম না।
আর দ্বিতীয়জন?
ওই নিংমা শেরপা। ওর মানসম্মান পুরোপুরি বড় লামার মানসম্মানের সঙ্গে জড়িত।
অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কেন?
লোকটা গ্রামপ্রধান হিসেবে অপদার্থ। আসলে অলস। সাম্পা একটা দুর্গম গ্রাম হতে পারে। কিন্তু একটু চেষ্টা করলে এই গ্রামের গরিব লোকগুলোর জন্যেও অনেক সরকারি সাহায্য নিয়ে আসা যায়। উন্নত জাতের গোরুর ব্রিডিং, সোলার-পাওয়ার, জল, রাস্তা— অনেক গ্র্যান্ট পাওয়া যায় সরকার থেকে। তার জন্যে একটু দার্জিলিং-এ দৌড়োদৌড়ি করতে হয়। নিংমা শেরপা ওসব কিছুই করবে না। গ্রামের সব দুর্ভাগ্যের জন্যে ইয়েতি-দেবতাকে দায়ী করে বসে থাকে। আর এ ব্যাপারে ওকে সমর্থন করেন বড় লামা।
বরাবরই কি ওদের দুজনের রিলেশনটা এইরকমই ছিল? একটু ভেবে উত্তর দিও।
রিনচেং বলল, ভেবেই বলছি চৌবেসাহেব। সত্যি কথা বলতে কী এই ব্যাপারটা নিয়েই আমি গত একমাস ধরে ভাবছি। বড় লামা আর নিংমার মধ্যে একটা বোঝাপড়া অনেকদিন ধরেই ছিল। তবে এই গুম্ফা সরানোর কথাবার্তা শুরু হওয়ার পর থেকেই দেখছি, বড় লামা যেন নিংমা শেরপাকে হিপনোটাইজ করে ফেলেছেন। উনি যা বলছেন, নিংমা তাই শুনছে। উনি যা বোঝাতে বলছেন, নিংমা গ্রামবাসীদের তাই বোঝাচ্ছে। আর এখানকার লোকেরা বড় সরল। গুম্ফার লামা আর গ্রামপ্রধানের কথা ওদের কাছে ভগবানের মুখের কথার মতনই শিরোধার্য।
মনে একটা প্রশ্ন জাগল। এই রিনচেং ছেলেটা যেরকম প্রতিবাদী, তাতে বড় লামা সামডুপ ওকে সহ্য করছেন কেমন করে?
সেই প্রশ্নটাই করলাম। ছোট লামা করুণ হেসে বলল, সহ্য করছেন কে বলল? নেহাত আমাদের নিয়োগ হয় লাদাখের মূল মনাস্ট্রি থেকে। নাহলে কবেই আমাকে এখান থেকে বার করে দিতেন।
বুঝলাম। তোমার কাছ থেকে আর কয়েকটা কথা জেনে নিই। আচ্ছা রিনচেং! যে-আর্তনাদটা শুনে তুমি বাইরে বেরিয়ে গিয়েছিলে, সেটা কেমন ছিল? একবারই, অল্পক্ষণের জন্যে? নাকি বেশ কিছুক্ষণ ধরে, বারবার?
রিনচেং ভুরু কুঁচকে কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল, আমি ঠিক নিশ্চিত নই। তবে জ্যাকি নিশ্চয় বেশ কয়েকবার চেঁচিয়েছিল। আমার ঘুম খুব গাঢ়। একবার চিৎকার করলে জাগতাম বলে মনে হয় না।
বেরিয়ে কী দেখলে?
দেখলাম, উঠোনের একদিকে জ্যাকি সুব্বার মৃতদেহটা পড়ে রয়েছে। উপুড় হয়ে, হাত-পা ছড়ানো।
আর কাউকে দ্যাখোনি? কোনো অন্য ধরনের শব্দ শুনতে পাওনি? একটু মনে করার চেষ্টা করে দ্যাখো তো।
রিনচেং কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে ভাবল। তারপর বলল, কাউকে দেখিনি তো নিশ্চয়। দেখলে ভুলতাম না। তবে আপনার প্রশ্ন শুনে মনে পড়ল, একটা অদ্ভুত শব্দ শুনেছিলাম। একবারই মাত্র।
কেমন শব্দ? আমি খাড়া হয়ে বসলাম।
রিনচেং বলল, খুব পুরনো তেলহীন একটা চাকাকে ঘোরাবার চেষ্টা করলে যেমন ক্যাঁঅ্যাঅ্যাচ করে শব্দ হয়, সেইরকম। শব্দটা কোত্থেকে আসছে দেখবার জন্যে ঘাড় ঘুরিয়েছিলাম…
ঘাড় ঘুরিয়েছিলে মানে শব্দটা তোমার পেছনদিক থেকে এসেছিল?
হ্যাঁ। আমি যখন গুম্ফার দরজা দিয়ে বেরিয়ে জ্যাকির দিকে বেশ কিছুটা এগিয়ে গেছি, তখনই শব্দটা শুনেছিলাম। প্রথমে ভেবেছিলাম, আমাদের বারান্দার দরজার পাল্লাটাই কেউ ঠেলা দিয়ে খুলল। কিন্তু কেই বা খুলবে? বড় লামা তো নিজের ঘরে ঘুমোচ্ছিলেন। আর তাছাড়া আমি বেরোবার সময় দরজাটাকে যেভাবে ঠেলে ভেজিয়ে দিয়ে এসেছিলাম, সেইভাবেই ছিল। একচুলও ফাঁক হয়নি।
তারপর?
উৎসটাকে ধরতে পারিনি বলেই ওই শব্দটার কথা ভুলে গিয়েছিলাম। তাছাড়া, তারপর থেকেই এত ঝামেলা শুরু হল। বুঝতেই পারছেন, গ্রামের লোকেদের উঠোনে ঢোকার চেষ্টা ঠেকাতেই আমাদের কালঘাম বেরিয়ে গিয়েছিল।
‘আমাদের’ মানে?
আমি আর মোড়ল নিংমা শেরপা। ওই সবার আগে পৌঁছেছিল এখানে।
বুঝলাম। ঠিক আছে রিনচেং। আমি আরো দু’ দিন এখানে রয়েছি। তার মধ্যে যদি অস্বাভাবিক কিছু দ্যাখো বা শোনো, আমাকে জানিও।
জানাব স্যার। রিনচেং আমাকে বিদায় দিয়ে আবার রান্নার জায়গায় ফিরে গেল।
বারান্দার একদিকে বিনায়ক আর নিংমা আমার জন্যে অপেক্ষা করছিল। আমি নিংমাকে বললাম, একবার বড় লামার সঙ্গে দেখা করা যায়, নিমা?
নিংমা এমনিতেই ফূর্তিবাজ মানুষ। দেখলাম ওর মুখ থেকে ইতিমধ্যেই মেঘ কেটে গেছে। একগাল হেসে বলল, আমি ডাকলে উনি দেখা করেননি এরকম কখনো হয়নি। তার ওপর আপনাদের মতন হাবিজাবি মানুষ এসেছেন শুনলে… আসুন স্যার।
বড় লামার ঘরের দরজায় নিংমা বেশ জোরে কয়েকবার টোকা মারল। সঙ্গে নিচু গলায় আর যা-যা বলল, তার মধ্যে যদিও আমি আর বিনায়ক শুধু ‘পুলিশ” শব্দটাই শুধু বুঝতে পেরেছিলাম, তবু আরো কিছু নিশ্চয় ছিল যাতে সঙ্গে সঙ্গেই ঘরের ভেতর থেকে কাঠের খড়মের খট-খট শব্দ দরজার দিকে এগিয়ে এল। বড় লামা ভেতর থেকে দরজা খুলে দিলেন।
দেখলাম, বড় লামার সঙ্গে ছোট লামার তফাত শুধু মুখের আঁকিবুকির সংখ্যায়। রিনচেঙের মুখের চামড়া টানটান আর এঁর মুখ দেখলে মনে হয় একশোটা শালিখপাখি তাদের পায়ের ছাপ ফেলে গেছে। সেটাকে যদি হিসেবে না ধরি তাহলে দুজনের মধ্যে আর বিশেষ তফাত নেই। সেই একই রোগা লম্বাটে গড়ন, একইরকম ধপধপে ফরসা গায়ের রং। মাথায় চুল কিংবা গোঁফদাড়ি থাকলে তবু না হয় কাঁচা-পাকায় কিছুটা তফাত হত, কিন্তু দুজনের কারুরই তো সেসব বালাই নেই। একেবারে পরিষ্কার করে কামানো
যদিও বড় লামার বয়স পঁচাত্তর, তবু দেখলাম চলাফেরাতে এখনো বেজায় চটপটে। আমাদের ভেতরে ঢোকার রাস্তা করে দিয়েই যেভাবে বিদ্যুৎগতিতে ঘুরে দাঁড়ালেন এবং দ্রুতপায়ে ফিরে গিয়ে, পায়ের কাঠের খড়ম দুটো বিছানার পাশে ছেড়ে রেখে, একলাফে চৌকির ওপর চড়ে বসলেন, তাতে আমারও একটু হিংসে হল। আমার বয়স ওঁর থেকে কিছুটা কমই হবে। তবু ওই ফিটনেসটা বজায় রাখার জন্যে আমাকে প্রতিদিন সকালে অনেকক্ষণ ঘাম ঝরাতে হয়।
সে যাই হোক, বড় লামা চৌকির ওপরে আসনপিঁড়ি হয়ে গুছিয়ে বসলেন। চারিদিকে হলুদ জরাজীর্ণ পুঁথির স্তূপ। চার-দেওয়ালের অনেকটা অংশই তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের বিভিন্ন দেবদেবীর ছবি আর ভয়ঙ্কর সব মুখোশে ঢাকা। তবে যেটুকু জায়গা ফাঁকা রয়েছে সেখানেই আশ্চর্য কারুকার্য করা কাঠের প্যানেল। নিংমার মুখের দিকে একবার তাকিয়ে দেখলাম, ও সম্মোহিতের মতন সেই কাঠের প্যানেলগুলোর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। স্বাভাবিক। ওরই পূর্বপুরুষদের কীর্তি ওইসব কাঠের প্যানেল।
বড় লামা আমাকে আর বিনায়ককে আপাদমস্তক একবার দেখে নিয়ে শুদ্ধ বাংলায় বললেন, বলুন বাবুজী, কী জানতে চান। তারপর আমাদের অবাক মুখের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বললেন, দশ বছর বয়সে ধরমশালার মঠে যে সন্ন্যাসীটির কাছে বৌদ্ধধর্মের পাঠ নিতে শুরু করেছিলাম, তিনি ছিলেন বাঙালি। একটানা সাত বছর তাঁর সঙ্গ পেয়েছিলাম। আর জানেন তো, মানুষ ওই বয়সে যা শেখে তা সারা জীবনেও ভোলে না। বাংলাকে তাই আমার পিতৃভাষা বলতে পারেন।
আমি বললাম, বাঁচালেন। আমার আবার হিন্দিটা কোনোকালেই ভালো আসে না, যদিও নাম শুনে অনেকে উত্তর-ভারতের লোক বলেই ভুল করে। আচ্ছা, গুরুজী! এই যে গুম্ফার বাগানে একটা লোকের মৃত্যু হল, এ-ব্যাপারে আপনার কী ধারনা?
বড় লামা জবাব দিতে মোটেই সময় নিলেন না। বললেন, দেবতা তার গুম্ফার রক্ষার ভার নিজেই নিয়েছেন। তাছাড়া আর কী? অসভ্য ছেলেটা ইয়েতি-দেবতার হাড় চুরি করতে এসেছিল। শিক্ষা পেয়েছে।
অত্যন্ত ভক্তিভরে পরের প্রশ্নটা করলাম। —গুরুজী! এই যে সারা ভারতবর্ষ জুড়ে লক্ষ-লক্ষ মন্দির-মসজিদ-গুম্ফা-গুরুদ্বারা রয়েছে, তাদের মধ্যে আর কোথাও তো ইয়েতির পুজো হয় না। এই গুম্ফা সেদিক থেকে একেবারে যাকে বলে ইউনিক। এই ইয়েতির হাতের ইতিহাসটা একটু বলবেন। উনি বললেন, সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আর কেউ বেঁচে নেই। আমিও চল্লিশ বছর আগে এই গুম্ফার ভার নেবার পর তৎকালীন বৃদ্ধ লামাদের মুখে যা শুনেছি সেটাই বলছি। ঘটনাটা ঘটেছিল আজ থেকে আশি বছর আগে। তখন এই গুম্ফা ছিল প্রায় নতুন। গ্রামটাও ছিল অনেক ছোট। আর বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ বলতে গেলে কিছুই ছিল না। তখনই ওই উত্তরদিকের হুয়াংবোচে গ্লেসিয়ার বেয়ে গ্রামের সীমানায় নেমে আসে এক ইয়েতি। তার তাণ্ডবে গ্রামের মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল।
ইয়েতিটা ইয়াকগুলোকে মেরে ফেলছিল। এমনকী কয়েকটা বাচ্চাকে অবধি উঠিয়ে নিয়ে চলে গিয়েছিল। আপনারা তো জানেন, ইয়েতিকে চোখে দেখা যায় না। দেখা যায় তার পায়ের ছাপ আর নিশুতি রাত্তিরে দূর থেকে তার ডাক ভেসে আসে। কিন্তু তাদের কখনো গ্রামের মানুষের ওপরে হামলা করতে দেখা যায়নি।
সাম্পা-গ্রামের লোকজন তখন যিনি প্রধান লামা ছিলেন, সেই লামা নামগিয়ালের পায়ে পড়ল— প্রভু আমাদের বাঁচান। লামা নামগিয়াল ধ্যানে বসে জানতে পারলেন, ইয়েতিটার ওপরে আসলে অপদেবী কার্মার ভর হয়েছে। অপদেবী কার্মা এই গুম্ফা আর সাম্পা-গ্রামের ওপর রুষ্ট হয়ে ইয়েতিকে পাঠিয়েছিলেন আমাদের ধ্বংস করার জন্যে।
আমি বড় লামার কথার মাঝখানেই জিজ্ঞেস করলাম, কেন? অপদেবী রুষ্ট হলেন কেন?
বড় লামা বললেন, সে আবার এক অন্য গল্প। এই যে গুম্ফার দেওয়ালে কাঠের কারুকার্য দেখছেন, এগুলো সাধারণ ফুল-লতা-পাতা কিংবা পশুপাখির ছবি নয়। আপনারা খেয়াল করে দেখবেন, পৃথিবীর কোনো ফুল- লতা-পাতা কিংবা পাখির সঙ্গে এদের চেহারার মিল নেই। এই যে নিংমা শেরপাকে দেখছেন, এর দাদু ছিলেন একইসঙ্গে শিল্পী এবং সাধক। তিনি স্বপ্নের মধ্যে এক অপূর্ব বাগান দেখতে পান। এসব তার স্বপ্নে পাওয়া গাছপালা আর পাখি। তিনি স্বপ্নে-পাওয়া সেইসব গাছপালা আর জীবজন্তুকে বাটালির ঘায়ে কাঠের ওপরে ফুটিয়ে তুলছিলেন। সেটাই হয়েছিল অপরাধ।
কেন? অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম।
বড় লামা বললেন, উনি বুঝতে পারেননি, যে-বাগানটাকে উনি দেখেছেন, সেটা ছিল দেবী কার্মার গোপন উপবন। এমনকী একদিন নিংমার দাদু স্বপ্নের মধ্যে এক অপূর্ব সুন্দরী নারীকে সেই বাগানে দেখে তার মূর্তি কাঠের ওপরে খোদাই করতে শুরু করলেন। কেমন করে জানবেন, সেই নারীই ছিলেন অপদেবী কার্মা। সেদিনই অবশ্য গুম্ফার ছাদে বজ্রপাত হল। বজ্রপাতে মারা গেলেন নিংমার দাদু। পুড়ে ছাই হয়ে গেলেন। কিন্তু ততক্ষণে ক্ষতি যা হবার হয়ে গেছে। দেবী কার্মা ইয়েতিকে পাঠিয়ে দিয়েছেন সমস্ত কারুকার্য সমেত এই গুম্ফা ধ্বংস করার জন্যে।
তারপর? প্রশ্নটা আমি করিনি, বিনায়ক করেছিল। ও দেখলাম চোখ গোলগোল করে বড় লামার গল্প গিলছে।
তখন লামা নামগিয়াল তাঁর ধ্যানমন্ত্রের দ্বারা শুভশক্তি বোধিসত্ত্বকে আহ্বান করে আনলেন। এক পক্ষকাল ধরে বোধিসত্ত্বর সঙ্গে ইয়েতির যুদ্ধ হল। শেষে ইয়েতি প্রাণ হারাল। বোধিসত্ত্ব লামা নামগিয়ালকে আদেশ দিলেন, ইয়েতির হাতের হাড়কে এই গুম্ফায় রেখে পুজো করতে হবে। কারণ, সে তো আসলে অপদেবী কার্মারই অংশ। বুঝলেন?
মাথাটা ঝিমঝিম করছিল। তবু যথাসম্ভব নির্বিকারমুখে বললাম, বুঝলাম। আচ্ছা গুরুজী! সেদিন, মানে এগারো তারিখ রাতে যখন ঘটনাটা ঘটল, তখন আপনি কী করছিলেন?
আমি ঘুমোচ্ছিলাম, বাবুজী। আমি প্রতিদিনই রাত নটার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ি, উঠি ভোর পাঁচটায়। ওরা আমাকে আর জাগায়নি। জানে আমি অসুস্থ মানুষ।
বড় লামাকে প্রণাম জানিয়ে আমরা তিনজন বেরিয়ে এলাম। সামনের দরজা দিয়েই বেরোলাম, তবে আমি আর বিনায়ক প্রায় একসঙ্গেই নিমাকে বললাম, একবার পেছনের উঠোনটা ঘুরে যাব। গেলামও তাই।
দিনের আলোতেই ওই উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কেমন যেন গা ছমছম করে উঠল। এত নিৰ্জন, এত নিস্তব্ধ। উঠোনের উত্তর সীমানার বেড়ার ঠিক নীচেই খাদ। তার ওপাশ থেকে শুরু হয়েছে পাহাড়ের ঢেউ। যতদূর চোখ যায়, জঙ্গল… শুধু জঙ্গল। একটা পাখি অবধি উড়ছে না কোথাও। এই মুহূর্তেই যদি এখানে একটা লোক আরেকজনকে খুন করে, তার কোনো সাক্ষী থাকবে না। রাত দশটার সময় এই উঠোনের চেহারা কী হবে, অনুমান করতে পারছিলাম।
ঘটনার পর অনেকগুলো দিন কেটে গেছে। তার মধ্যে অনেকবার বৃষ্টি হয়েছে, ঝড় উঠেছে। ঝাঁটপাটও পড়েছে নিশ্চয়। কাজেই আমরা আজ নতুন কোনো ব্লু খুঁজে পাব তেমন আশা করছিলাম না। তবু পুরো উঠোনটাই ঘুরে দেখলাম। সুরেশ যেদিন আমার বাড়িতে এসেছিল, সেদিনই আমার স্মার্টফোনে কয়েকটা ছবি হোয়াটসঅ্যাপ করে দিয়ে গিয়েছিল। এখন সেই ছবিগুলোকে আসল জায়গার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলাম। ঠিক কোনখানটায় বেড়ার ফাঁক গলে জ্যাকি এই উঠোনে ঢুকেছিল। কোনদিক দিয়ে এগিয়ে গিয়েছিল গুম্ফার কাছে। কোথায় ওর ডেডবডি পড়েছিল। ছবিতে ওর পায়ের ছাপ ধরে-ধরে নিজেও হাঁটলাম।
ব্যাপারটা সত্যিই বুঝতে পারছিলাম না। পতনজনিত মৃত্যু! কিন্তু পতনটা হল কোথা থেকে? সত্যিই কি অমিত শক্তিশালী কেউ ওকে………। নাঃ। কীসব অযৌক্তিক চিন্তা করছি! নিজের ওপরেই নিজে রেগে গেলাম।
গুম্ফার ছাদের দিকে তাকালাম। ঢালু প্যাগোডার মতন ছাদ। ভেতর থেকে সিঁড়ি নেই, বাইরে থেকে মই, কিচ্ছু নেই। একটা গিরগিটির পক্ষেও ওই ছাদে চড়া অসম্ভব। ওখান থেকে কাউকে ছুঁড়ে ফেলাও সমান অচিন্তনীয়।
এবার তাকালাম প্রেয়ার-হুইলটার দিকে। বিশাল প্রেয়ার-হুইল। মূল সিলিন্ডারটা, মানে যেটার মধ্যে মন্ত্রপূত কাগজ থাকে, সেটা মনে হল তামা দিয়ে তৈরি। সিলিন্ডারটার সারা গায়ে মন্ত্র খোদাই করা ছিল।
সিলিন্ডারটা আবার বসানো রয়েছে একটা আলকাতরা মাখানো পাইনগাছের গুঁড়ির নীচের দিকে আর গুঁড়িটা পোঁতা রয়েছে কংক্রিটের একটা ছোট বেদির মধ্যে। ঠিক পোঁতা নেই, তাহলে তো ওটা ঘুরতই না। বেদির গর্তের মধ্যে উঁকি মেরে দেখলাম, লরির চাকার মতন মস্ত একটা বল-বেয়ারিং-এর ঠিক মাঝখানে খুঁটিটা বসানো রয়েছে। সেই জন্যেই ঠেলা দিলে খুঁটিটা ঘোরে।
গর্তের মধ্যে আরো একটু মুখটা নামিয়ে দিয়ে দেখলাম, মরচে-ধরা বিশাল বেয়ারিংটার গায়ে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে ‘জেসপ অ্যান্ড কোম্পানি’র নাম। দেখে বেশ চমৎকৃত হলাম। হাওড়া ব্রিজ আর দিল্লির পার্লামেন্ট হাউস তৈরির মূল কারিগর যে-কোম্পানি, তাদের তৈরি করা মেশিনের পার্টস দুর্গম এক পাহাড়ি গ্রামের গুম্ফায় প্রেয়ার-হুইল ঘোরাচ্ছে। ভাবা যায়?
নিংমা হঠাৎ এগিয়ে এসে আমাকে টেনে সরিয়ে নিল। বলল, এসব একশো বছর আগের কলকব্জা। সেফটির মতন হাবিজাবি ব্যাপারগুলো তখন অত মানা হত না। অত কাছে যাবেন না।
দেখলাম, ওর মুখে উদ্বেগ। একটু লজ্জিতই হলাম। সত্যিই, ওইভাবে গর্তের মধ্যে মুখ বাড়ানো ঠিক হয়নি।
ওখান থেকে চলে আসার আগে বিনায়ক গায়ের জোর দিয়ে প্রেয়ার- হুইলটায় একটা ঠেলা মারল। মারতেই সেটা ওই পাইনগাছের গুঁড়ি সমেত দিব্যি নিঃশব্দে দুপাক ঘুরে এল। আরেকবার ভালো করে পুরো প্রেয়ার- হুইলটার আপাদমস্তক মাপলাম। সুরেশ তামাং-এর অবজার্ভেসনের প্রশংসা না করে পারলাম না। সত্যিই একটা বারো-বছরের ছেলেও লাফ মেরে ওই সিলিন্ডারটার মাথায় চড়তে পারবে এবং তারপর অনায়াসেই নারকোলগাছে চড়ার মতন করে খুঁটির মাথাতেও উঠে পড়তে পারবে বরং আরো সহজেই পারবে, কারণ নারকোলগাছের গায়ে খাঁজ কাটা থাকে না। এই পাইন-লগটার গায়ে এখানে-ওখানে দিব্যি খোপ কাটা রয়েছে। নিংমাকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, ওই খোপগুলো উৎসবের সময় নিশান-লাগানো দড়ি বাঁধতে কাজে লাগে। আপাতত ওগুলো পা রাখার জায়গা হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
সে না হয় হল। নাহয় ধরেই নিলাম, জ্যাকি সুব্বা ওই খোপগুলোতে পা রেখে পাইন-লগের ডগায় পৌঁছেছিল এবং তারপর সেখান থেকে ইয়েতির ঘরের কার্নিশে। কিন্তু তাতে কী প্রমাণিত হল? ওই প্রেয়ার-হুইলের ডগা কিংবা জানলার কার্নিশ যাই হোক, সেখান থেকে অত দূরে— প্রায় কুড়ি ফুট দূরে— ওর প্রকাণ্ড শরীরটা এসে পড়ল কেমন করে?
.
সাম্পায় আমাদের আসার পর থেকে ধরলে এটা তৃতীয় দিনের কথা। আগামীকাল অবধি এখানে রয়েছি। পরশু সকালে আমরা পায়ে হেঁটে সাম্পা থেকে গোর্খে হয়ে সিকিমের হিলে অবধি চলে যাব। সুরেশ বলেছে দুজন কনস্টেবলকে পাঠিয়ে দেবে আমাদের নিয়ে যাবার জন্যে। হিলে থেকে গাড়িতে জোড়পোখরি।
এখনো অবধি জ্যাকির অদ্ভুত মৃত্যুর কারণ সম্বন্ধে কোনো ধারণাই তৈরি করে উঠতে পারিনি। তবে একটা লাভ হয়েছে। সাম্পা-গ্রামটা যে ঠিক স্বর্গপুরী নয়, এখানেও যে নানারকমের স্বার্থের টানাপোড়েন রয়েছে, সেটা বুঝতে পেরেছি। হ্যাঁ, অপরাধ এখানেও ঘটতে পারে। ঘটেছে।
আরো একটা ভয়ঙ্কর ব্যাপার ইতিমধ্যে ঘটে গেছে। আমি আর বিনায়ক মারা যেতে পারতাম, অল্পের জন্যে মরিনি। কী হয়েছিল, বলি।
কাল সন্ধেবেলা থেকেই ওয়েদার বিগড়ে গিয়েছিল। পাহাড়ের এই উচ্চতায় আবহাওয়ার এমন খামখেয়ালিপনা কিছুই অস্বাভাবিক নয়। নিমা শেরপার বাড়ির বন্ধ জানলার শার্সির সামনে মুখোমুখি চেয়ার নিয়ে বসে আমি আর বিনায়ক দেখছিলাম কেমন করে তাণ্ডব ঘনিয়ে আসছে। সন্ধে ছ’টা নাগাদ একটা জোরালো হাওয়া বইতে শুরু করল। এদিক-ওদিক থেকে গ্রামবাসীদের উদ্বিগ্ন চিৎকার ভেসে আসছিল। আমাদের ঘরে তড়িঘড়ি দুটো হ্যারিকেন জ্বেলে দিয়ে নিংমার স্ত্রী জিনা বলল, ঘর থেকে বেরোবেন না সাহেব। এখনই ঝড় শুরু হবে।
জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কোথায় যাচ্ছ?
ও বলল, ইয়াকগুলোকে মাঠ থেকে ফিরিয়ে আনতে।
আমি বললাম, নিংমা কোথায়?
জিনা মুখ বেঁকিয়ে উত্তর দিল, কে জানে। দুপুরের পর থেকেই তো দেখছি না। গেছে কোথাও মোড়লি মারতে। এই বলে বেরিয়ে গেল।
তারপর তো শুরু হল ঘন ঘন বিদ্যুৎচমক আর বজ্রপাত। নিকষ অন্ধকারের মধ্যে একেকবার করে আকাশ ফালাফালা করে বিদ্যুত চমকাচ্ছে আর বহুদূরে পাহাড়ের মাথায় ফালুটের ঘরবাড়িগুলো সাইকোডেলিক পিকচারের মতন মুহূর্তের জন্যে ধরা দিয়েই মিলিয়ে যাচ্ছে। দেখতে পাচ্ছি, শুধু মাথার ওপরে আকাশটাই মেঘে ছেয়ে গেছে তাই নয়, মেঘ জমেছে পায়ের নীচেও।
একটু পরে সত্যিই বৃষ্টি নামল। সে কী ভয়ঙ্কর বৃষ্টি। মনে হচ্ছিল আকাশ থেকে মাটির ওপরে কোটি-কোটি জলস্তম্ভ আছড়ে পড়ছে। তার মধ্যেই ভিজে চুপ্পুর হয়ে বাড়ি ফিরল জিনা আর নিংমা। একসঙ্গেই ফিরল দুজনে।
রাত ন’টা নাগাদ বৃষ্টি একটু ধরল। নিংমা আমাদের ঘরে ঢুকে বলল, চলুন স্যার। এইবেলা ডিনারটা সেরে নেবেন চলুন।
আগে বলা হয়নি, নিংমার বাড়ির কিচেন-কাম-ডাইনিং রুমটা মূল বাড়ির পেছনে, বাগানের শেষপ্রান্তে। বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে বেরোলেই ঢালু ঘাসজমি। সেটা ধরে বড়জোর চল্লিশ ফুট গেলেই খাদের কিনারা। কিচেনটাও ওখানেই— ওই খাদের ধার ঘেঁষে। অনেকগুলো সর-সরু পায়ে চলা রাস্তা। তার মধ্যে মাত্র একটাই পৌঁছেছে কিচেনের দরজায়। বাকিগুলো খাদে ঝাঁপ মেরেছে।
প্রথমদিন এখানে পৌঁছেই নিংমাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, খাদের দিকটায় বেড়া দাওনি কেন? অমন বিপজ্জনক রাস্তাগুলো বানানোরই বা কী দরকার ছিল?
তাতে নিংমা একগাল হেসে বলেছিল, আপনাদের কাছে খাদ। হাবিজাবি ইয়াকগুলোর তো ওটাই চরে খাওয়ার জায়গা। আমি থোড়াই ওই রাস্তাগুলো বানিয়েছি। ইয়াকদের পায়ে-পায়ে রাস্তা তৈরি হয়ে গেছে।
তবে আমার অস্বস্তি বুঝতে পেরে নিংমা সাবধানতা নিয়েছিল ঠিকই। একটা হালকা বাঁশের বেড়ায় সাদা রং করে কিচেনের রাস্তাটার মুখে খাড়া করে দিয়েছিল। আমরা রাতে ওই বেড়াটা লক্ষ করে ঠিক রাস্তায় পা রাখতাম।
সেদিন আমি আর বিনায়ক বাগানে পা দিয়ে দেখলাম এমন ঘন অন্ধকার যে, পায়ের নীচের রাস্তাটাও ভালো করে দেখা যাচ্ছে না। ফোন নিয়ে বেরোইনি বলে আফশোস হল। কাছে মোবাইলগুলো থাকলে তখন অন্তত ফ্ল্যাশলাইটটা জ্বালাতে পারতাম। তবে কিচেনের রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখা বাঁশের বেড়াটা দেখা যাচ্ছিল ঠিকই। দুজনে কথা বলতে-বলতে সেই বেড়া অবধি ঠিকঠাকই পৌঁছে গেলাম। কিচেনের ভেতরে জিনার জ্বালিয়ে- রাখা লণ্ঠনের আলো দেখা যাচ্ছিল। জিনা আর নিংমার কথা বলার আওয়াজও শুনতে পাচ্ছিলাম। আর বড়জোর বিশ-পা গেলেই ওখানে পৌঁছে যাবো। ঠিক তখনই বিনায়ক আমার কাঁধটাকে শক্ত করে চেপে ধরে আমাকে দাঁড় করিয়ে দিল।
আমি চমকে উঠে বললাম, কী হল?
বিনায়ককে উত্তর দিতে হল না। ঠিক সেই সময়েই একবার বিদ্যুৎ চমকে উঠল। দেখলাম আমরা দুজনেই খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে রয়েছি। এর পরের পদক্ষেপে আমরা গড়িয়ে পড়তাম খাদের নীচে।
আমার মতন শক্ত মানুষেরও গাটা শিরশির করে উঠল। পায়ে-পায়ে পেছোতে পেছোতে বিনায়ককে বলাম, থ্যাঙ্ক ইউ বিনায়ক। তুমি বুঝলে কেমন করে?
বিনায়ক খাদের মুখে ফুটে থাকা কয়েকটা সাদা স্নেক-লিলি ফুলের গোছার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, কাল যখন ডিনার সারতে এসেছিলাম, তখন কিচেনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে দেখেছিলাম ফুলগুলোকে। কাছে যেতে সাহস পাইনি। আজ হঠাৎ পায়ের কাছে ওদের দেখে চমকে উঠেছিলাম। প্রথমে ভেবেছিলাম, স্নেক-লিলি কি সাপের মতন বুকে হেঁটে কিচেনের রাস্তায় চলে এল। তারপর বুঝলাম, আমরাই কোনোভাবে ওদের কাছে চলে এসেছি–বিপজ্জনক রকমের কাছে।
কিচেনের কাঠের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে নিংমাকে বললাম, বেড়াটাকে কে সরিয়ে অন্য রাস্তাটার ওপরে রেখে দিল নিংমাভাই? মরতে বসেছিলাম যে আরেকটু হলে।
নিংমা আর জিনা দুজনেই তাই শুনে টর্চ নিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে গেল। কপাল চাপড়ে, মাথার চুল ছিঁড়ে, ঝড়কে শাপমন্যি করে সে এক তাণ্ডব বাঁধিয়ে তুলল। ওদের বক্তব্য ছিল, ঝড়ের দাপটেই ওই হালকা বেড়াটা নিজের জায়গা থেকে উড়ে এসে ওখানে পড়েছে। মনে হল, সেটা হতেই পারে। আর কথা না বাড়িয়ে আমি, বিনায়ক আর নিংমা মিলে ধরাধরি করে বেড়াটাকে যথাস্থানে সরিয়ে রেখে কিচেনে ঢুকে খেতে বসলাম।
খাওয়াদাওয়ার পাট চুকিয়ে আমরা ঘরে ফিরে এলাম। ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই আবার মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হল।
আর কোনো কাজ ছিল না বলে হ্যারিকেনের দম কমিয়ে রেখে শুয়ে পড়লাম। তবে তখনই ঘুম এল না। মন বলছিল, বাঁশের বেড়াটা ঝড়ে সরে যায়নি। কেউ ওটাকে সরিয়ে দিয়েছিল।
তারপর একটা সময় ঘুমে চোখ জুড়ে এলেও অন্যদিনের মতন ঘুম তেমন গাঢ় হল না। একবার যেন উত্তরের তুষারশৃঙ্গগুলোর ওদিক থেকে একটা একটানা ডাক শুনতে পেলাম— ইংরিজিতে যাকে বলে ‘হাউলিং’। ইয়েতি কি সত্যই রয়েছে?
.
আজ সকালে ঘুম ভেঙে দেখলাম, আকাশে মেঘের ছিটেফোঁটা নেই। যতদূর চোখ যায় আশ্চর্য নীল এক আকাশ। কচুরিপানা-ফুলের পাপড়ির মতন নরম এক নীল। আমাদের ঘরের জানলা দিয়েই দেখতে পাচ্ছিলাম পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু কয়েকটা স্নো-পিক। বেলা যত বাড়ছিল ততই সেই পাহাড়গুলো সোনা থেকে রুপোয় বদলে যাচ্ছিল। চারিদিকের এই স্বর্গীয় পরিবেশের সঙ্গে মানানসই দুটো অপরূপ সবুজ পাখি জানলার বাইরের ব্লুবেরি গাছের ডালে এসে বসল। গ্রিন ম্যাগপাই।
কাল রাতের সেই আতঙ্কের কথা ভেবে নিজের ওপরেই নিজের ধিক্কার জন্মাল। আমি কি যুক্তিবুদ্ধি হারিয়ে ফেলছি? ইয়েতি যদি কোনো পাশবিক শক্তিই হয়, তাহলে সে পশুর মতনই সরাসরি আক্রমণ করবে। ভুলপথে চালিয়ে, খাদে ফেলে কাউকে মারবার কথা ভাববে না। ওরকম ভাবনা পৃথিবীতে একটিই প্রাণী ভাবে— তার নাম মানুষ। বিনায়কের পিঠে ঠেলা দিয়ে বললাম, ওহে, ওঠো, ওঠো! উঠে পড়ো। সাতটা বেজে গেছে।
বিনায়ক কম্বলের তলা থেকে কোনোরকমে চোখদুটো বার করে বলল, কোথায় যাবেন স্যার?
আমি বললাম, মর্নিং-ওয়াকে। পুরনো অভ্যেস। ছাড়তে পারি না।
চলুন। বিনায়ক অনিচ্ছাসত্ত্বেও আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসল এবং আধঘণ্টার মধ্যে তৈরিও হয়ে নিল। তবে ও দেখলাম কাল রাতের ঘটনার পর সাবধান হয়েছে। জ্যাকেটের ভেতরের পকেটে সার্ভিস-রিভলভারটা ঢুকিয়ে নিতে ভুলল না।
বেরোবার সময় দেখলাম, নিংমাভাইয়ের ঘরদুটোয় বাইরে থেকে হুড়কো টানা। তালা লাগানো নেই। এই গ্রামে কেউ দরজায় তালা লাগায় না। আমরা কিচেনের দিকে গেলাম। ইচ্ছে ছিল এক কাপ করে গরম চা খেয়ে তারপর হাঁটতে বেরোবো। কিন্তু সে গুড়ে বালি। কিচেনের দরজাও দেখি বাইরে থেকে বন্ধ।
সাধারণ ট্যুরিস্ট হলে আমরা নিশ্চয় গ্রাম ছাড়িয়ে যে-রাস্তাটা আরো ওপরের দিকে উঠে গেছে সেই রাস্তাটাই ধরতাম, কারণ, ওইদিকেই ঘন পাইনের বন, ওদিকেই ভিউ-পয়েন্ট। কিন্তু আমরা দুজনেই এসেছি একটা কাজ নিয়ে আর সেই কাজের জায়গা একটাই। আমি আর বিনায়ক উৎরাই পথটাই ধরলাম। গ্রাম ছেড়ে বেরিয়ে যাবার আগে যে পথ ইয়েতির গুম্ফার পাশ কাটিয়ে গেছে। আমরা ইয়েতি-গুম্ফাতেই যাব।
সরু পাথুরে রাস্তাটা ধরে গড়গড় করে প্রায় তিনশো-ফিট নেমে রিভারবেডে পড়লাম। দেখলাম এক আশ্চর্য দৃশ্য। তিনদিন আগে সাম্পায় আসার সময় যে-নদীতে পায়ের পাতা ডোবানোর মতন জলও ছিল না, কাল রাতের বৃষ্টির ফলে সেই নদীতেই এখন বুনো হাতি ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতন স্রোত। বোল্ডার থেকে বোল্ডারে ধাক্কা খেয়ে তীব্রবেগে ছুটে চলেছে রাশিরাশি দুধের ফেনার মতন জল। তার গর্জন শুনলে বুক হিম হয়ে আসে।
রিভারবেডের পাশে-পাশে নদীর মতোই এঁকেবেঁকে চলে গেছে পাথুরে রাস্তা। সেই রাস্তা ধরে আধ-কিলোমিটার হেঁটে গেলেই ইয়েতি-গুম্ফায় পৌঁছে যাবো। সেদিকেই হাঁটছিলাম। রাস্তায় কারুর সঙ্গে দেখা হবে ভাবিনি। কিন্তু একটা বাঁক ঘুরতেই দেখতে পেলাম, একজন কিংবা দুজন নয়, প্রায় কুড়িজন পাহাড়ি মেয়ে… মেয়ে নয়, বউ বলাই ভালো, কারণ তারা সকলেই মাঝবয়সি, গিন্নিবান্নি… নদীর ধারে একটা পাথরের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে কী যেন করছে। প্রথমে ভেবেছিলাম, ওটা বোধহয় ছোটোখাটো একটা মন্দির। ওই মহিলারা বোধহয় পুজো দিতে এসেছে। কিন্তু আরেকটু কাছে যেতেই দেখতে পেলাম, ওদের সবার কাছেই একটা করে ভুট্টাদানায় ভর্তি ছোট মাপের বস্তা রয়েছে।
খুব কৌতূহল হল। রাস্তা ছেড়ে ঘরটার দিকে এগিয়ে গেলাম।
একজন বৃদ্ধা ঘরটার দরজার কাছে বসেছিলেন আর পয়সা নিয়ে একজন-একজন করে মহিলাকে ঘরে ঢুকতে দিচ্ছিলেন। আমি ওই বৃদ্ধার কাছে গিয়ে আমার মার্কামারা হিন্দিতে প্রশ্ন করলাম, ইধার কেয়া চল রহা হ্যায়, নানিজী?
বৃদ্ধা তাঁর ভারি রংচঙে ওড়নাটা সাদা চুলে ভরা মাথার ওপরে তুলে দিয়ে, আমার চেয়েও করুণ হিন্দিতে যা উত্তর দিলেন তাতে আমি এবং বিনায়ক দুজনেই চমৎকৃত। ওর কথা থেকে বুঝলাম, ওই ঘরের ভেতরে একটা আটাকল চলছে আর কলটা ঘুরছে নদীর জলের তোড়ে। যাকে ইংরিজিতে বলে ‘ওয়াটার মিল’। গ্রামের বউরা ওই ওয়াটার-মিলে নিজেদের চাষের ভুট্টা ভাঙিয়ে নিয়ে যেতে এসেছে।
এ জিনিস আমি আগে কখনো দেখিনি। পাথরের ঘরটার পাশ কাটিয়ে খুব সাবধানে আমি আর বিনায়ক রিভারবেডে নেমে গেলাম। পেছনদিক থেকে মিলটার কর্মপদ্ধতি পরিষ্কার বুঝতে পারলাম। ভারি সরল পদ্ধতি। একটা কাঠের মোটা খুঁটির নীচের দিকে স্টিলের পাত দিয়ে তৈরি চারটে পাখনা লাগানো রয়েছে। খুঁটির মাথার দিকটা মেঝে ফুঁড়ে উঠে গেছে ওই পাথরের ঘরটার ভেতরে। জলের স্রোত ওই পাখনা কিংবা ‘প্রপেলর’-গুলোর গায়ে ধাক্কা মেরে পুরো খুঁটিটাকেই বনবন করে ঘোরাচ্ছে। বুঝতে অসুবিধে হল না, খুঁটির সঙ্গে সঙ্গে ঘরের ভেতরে একটা লোহার যাঁতা টাইপের কিছুও নিশ্চয় ঘুরছে, যার মধ্যে পেষাই হচ্ছে ভুট্টাদানা।
হঠাৎই একটা জিনিস চোখে পড়তেই চমকে উঠলাম। দেখলাম ঘুরন্ত প্রপেলরগুলোকে একসঙ্গে ধরে রেখেছে যে লোহার রিং-টা, তার গায়ে নির্মাতার লোগো আর নামের মার্কা। জেসপ অ্যান্ড কোম্পানি। মাথার মধ্যে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। প্রায় এক দমে খাড়া পাড় বেয়ে আবার উঠে এলাম ঘরটার সামনে। পেছন থেকে বিনায়ক সাবধান করছিল— আস্তে স্যার, আস্তে। পড়ে যাবেন যে। কিন্তু আমার তখন ওর কথা শোনার উপায় নেই। আরো প্রবল একটা টান আমাকে সামনের দিকে টানছিল। একটা আলো। একটা ব্লু
আবার সেই বৃদ্ধার সামনে এসে দাঁড়ালাম। হাঁপাতে-হাঁপাতে জিজ্ঞেস করলাম, নানিজী, এই কল কত পুরনো? কে বানিয়েছিলেন? বৃদ্ধা অবাক চোখে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলেন, এই কল-তো প্রায় ওই গুম্ফার সমান বয়সি। মানে আশি বছরের পুরনো হবে। শুনেছি, গুম্ফা তৈরির সময় যে লোহা, চাকা, কাঠ আর বেয়ারিং-টেয়ারিং বেঁচে গিয়েছিল, তাই দিয়ে আমাদের মোড়ল নিংমার দাদু এই কল বানিয়ে দিয়েছিলেন। আশি বছর ধরে গ্রামের লোকের উপকার করে যাচ্ছে এই কল। বৃদ্ধা শিরা ওঠা হাতদুটো জোড় করে কপালে ঠেকালেন।
বিনায়ক আমার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে সব কথাই শুনছিল। আমি ওর দিকে ফিরে চাপা গলায় বললাম, চলো।
আমার বলার মধ্যে নিশ্চয় এমন একটা কিছু ছিল, যাতে ও কোনো প্রশ্ন না করে রাস্তা ধরে গুম্ফার দিকে পা বাড়িয়েছিল। আমি ওর কাঁধ ধরে টান দিয়ে বললাম, রাস্তা দিয়ে গেলে হবে না। এদিকে এসো। এই বলে মহিলাদের চোখ এড়িয়ে একটু ঘুরপথে আবার রিভারবেডেই নেমে পড়লাম।
বিনায়ক খুব সাবধানে প্রশ্ন করল— কোথায় যাচ্ছি স্যার?
বললাম, আমরা গুম্ফার দিকে যাব। ইনফ্যাক্ট গুম্ফাতেই যাব। তবে রাস্তা দিয়ে নয়, এই রিভারবেড ধরে হাঁটব।
বিনায়ক বেজার-মুখে বলল, আসবার সময় ম্যাডামকে কথা দিয়ে এসেছিলাম, আপনি যাতে হাড়গোড় আস্ত নিয়ে ফিরতে পারেন সেই দায়িত্ব আমার। কিন্তু কথাটা বোধহয় রাখতে পারলাম না। বলতে-না-বলতে বিনায়ক নিজেই পেছল পাথরের ওপরে পা স্লিপ করে একটা আছাড় খেল। তারপর আমার হাত ধরে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আপনার খেয়ালগুলো কিন্তু বেশ অদ্ভুত স্যার। এইটা একটা হাঁটার মতন রাস্তা হল?
‘হাঁটার মতন রাস্তা’ যে নয়, সেটা স্বীকার করতেই হল। আগেই লিখেছি বোধহয়, এই নদীর ধারে বালি নেই, মাটি নেই— শুধুই পাথর। নানান সাইজের, নানা রঙের ছোট নুড়ি, মাঝারি ঢেলা আর বড় বোল্ডার। তবে ছোটই হোক আর বড়, তাদের সবার মধ্যে দুটো জায়গায় মিল রয়েছে। এক, কাল রাতের বৃষ্টির পরে প্রতিটা পাথরই পেপারওয়েটের মতন পেছল হয়ে রয়েছে, আর দুই, সব পাথরই ব্লেডের মতন ধারালো খোঁচায় ভর্তি। তার ওপরে প্রায় ঘাড়ের ওপর দিয়ে ভীমগর্জনে বয়ে চলেছে সাম্পা-নদী। সেই নদীর জলে অসাবধানে একবার পা পড়লে কোথায় টেনে নিয়ে চলে যাবে, ইয়েতি মালুম।
আছাড় বাঁচিয়ে সাবধানে হাঁটতে-হাঁটতে আমি বললাম, কারণ আছে বিনায়ক, কারণ আছে। মনে একটা সন্দেহ জেগেছে। যদি সত্যি হয়, তাহলে জ্যাকির মৃত্যুরহস্য ভেদ করব। আর যদি সত্যি না হয়, তাহলে…।
বিনায়ক অনেকবছর ধরে আমার সঙ্গে ঘুরছে। ও আর কোনো প্ৰশ্ন করল না। জানত, উত্তর পাবে না। আমার এই এক বদ রোগ। যখন শিকারের গন্ধ পাই তখন শুধু নাকই কাজ করে… মুখ বন্ধ হয়ে যায়।
মিনিট পনেরো হাঁটার পরে ইয়েতি-গুম্ফার ঠিক নীচে গিয়ে পৌঁছলাম। এখান থেকে ঘাড় উঁচু করে তাকালে গুম্ফার দোতলার ছাদ আর প্রেয়ার-হুইলের ওপরের অংশটুকু দেখতে পাচ্ছিলাম। পাড়ের আড়ালে বাগান-টাগান সব ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। তাতে একদিক থেকে নিশ্চিন্ত হলাম। ওই বাগানে কিংবা একতলায় যদি দুজন লামা কিংবা ভক্তদের মধ্যে কেউ ঘোরাঘুরিও করেন, তাহলে তারাও আমাদের দেখতে পাবেন না।
আগেই বলেছি, এই জায়গাটায় নদীর তীরে পাথর নেই। সেই জন্যেই বেশ ঘন ঝোপঝাড় গজিয়ে উঠেছে। আমরা দু’ হাতে সেই ঝোপ ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। বিনায়ক আর না পেরে জিজ্ঞেস করল, কী খুঁজছেন বলুন তো।
যা খুঁজছিলাম সেটা তো পেলাম না। বোধহয় ভুলই ভেবেছিলাম বুঝলে বিনায়ক। আমি খুঁজছিলাম সুইস-গেটের মতন একটা কিছু, যেটা গুম্ফার দিকে নদীর স্রোতের একটা অংশকে টেনে নিয়ে যাবে।
বিনায়ক অবাক হয়ে বলল, আগে বলবেন তো। ওরকম একটা কী যেন পেরিয়ে এলাম মনে হয়। চলুন, দেখাচ্ছি।
বিনায়ক ভুল বলেনি। এসব ব্যাপারে বিনায়ক বসু ভুল বলে না। এমনি এমনি ওকে এত স্নেহ করি না। ছেলেটার অবজার্ভেশন-পাওয়ার মারাত্মক।
বড়জোর কুড়ি-পা পিছিয়ে গিয়ে বিনায়ক নদীর তীরে একটা ঝোপের ডালপালা দু-হাত দিয়ে সরিয়ে, ইশারায় আমাকে ডাকল। আমি ওর হাতের ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে দেখলাম, ঠিক সেই জায়গাটায় একটা পাথরের ব্লক দিয়ে বাঁধানো চওড়া ড্রেনের মুখ দেখা যাচ্ছে। মুখটাকে ঢেকে রেখেছে একটা লোহার গেট, যেটার মাথার কাছে গাড়ির স্টিয়ারিং-এর মতন একটা লোহার হ্যান্ডেল লাগানো রয়েছে। পাশ দিয়ে যেতে-যেতে বিনায়ক এই লোহার হ্যান্ডেলটাকেই দেখতে পেয়েছিল। এখন দুজনেই দেখলাম তার নীচে লোহার গেট, যেখান থেকে আমাদের পায়ের নীচ দিয়ে পাথরে বাঁধানো সুড়ঙ্গটা চলে গেছে ইয়েতি- গুম্ফার বাগানের দিকে। সাম্পার জল ছলাৎছল শব্দ করে ওই বন্ধ গেটের গায়ে ধাক্কা মেরে চলেছে।
হ্যান্ডেলটার কাছে চোখ নিয়ে গিয়ে আর যেটা আশা করেছিলাম সেটাও দেখতে পেলাম। জেসপ অ্যান্ড কোম্পানির খোদাই করা নাম।
পুরো সিস্টেমটা একবার ভালো করে দেখে নিয়ে বিনায়ককে বললাম, বুঝলে বিনায়ক। বোঝাই যাচ্ছে, ওই হ্যান্ডেলটাকে ঘোরালে লোহার গেটটা ওপরে উঠে যাবে আর সঙ্গে সঙ্গে সাম্পা-নদীর জল তীব্রবেগে ঢুকে পড়বে ওই সরু ড্রেনের ভেতরে। জলের ফোর্স আরো বেড়ে যাবে।
আরেকটা ওয়াটার মিল? অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল বিনায়ক।
হ্যাঁ, সিস্টেমটা একই। আমরা গুম্ফার বাগানে দাঁড়িয়ে প্রেয়ার হুইলের যতটুকু দেখতে পেয়েছি, তার নীচেও আরো অনেকখানি নেমে গেছে ওই পাইনগাছের গুঁড়ি। ওটাই অ্যাকচুয়ালি পুরো সিস্টেমটার বেস। আর এই পাথর- বাঁধানো ক্যানালটাও এখান থেকে একদম সরলরেখায় চলে গেছে রিভারবেডের লেভেলে ওই প্রেয়ার-হুইলের বেস অবধি। সেখানে প্রেয়ার-হুইলের একদম গোড়ায় কয়েকটা বড় মেটালের পাখনা, মানে প্রপেলার লাগানো আছে—ঠিক যেমন প্রপেলার তুমি একটু আগে ওই ফ্লাওয়ার মিলের নীচে দেখে এলে। যখন নদীতে বান আসে তখন এই সুইস-গেট খুলে দিলেই জলের তোড় ড্রেনের মধ্যে দিয়ে ছুটে গিয়ে ধাক্কা মারে প্রপেলারের গায়ে। বিদ্যুৎবেগে ঘুরতে শুরু করে প্রেয়ার-হুইল।
বিনায়ক প্রায় মিনিট-খানেক চুপ করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর কেটে কেটে বলল— তার মানে, ওই প্রেয়ার-হুইলটাকে যেমন বাগানে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে ঠেলে ঘোরানো যায় তেমনি এখান থেকে জলের তোড়েও ঘোরানো যায়। এবার বুঝতে পারছি স্যার। যে রাতে জ্যাকি মারা গিয়েছিল, তার আগের রাতেও বৃষ্টি হয়েছিল। তার মানে সেই রাতেও নদীতে এরকমই বান ডেকেছিল। কেউ দূর থেকে লক্ষ রেখেছিল জ্যাকির ওপরে। ও যে-মুহূর্তে প্রেয়ার হুইলের খুঁটিটার ওপরে চড়েছে তখনই সেই লোকটা এখানে এই হ্যান্ডেলটা ঘুরিয়ে সুইস-গেট খুলে দিয়েছে। বন-বন করে ঘুরতে শুরু করেছে প্রেয়ার-হুইল। চিৎকার করে উঠেছে জ্যাকি— একবার, দুবার, তিনবার। ওর আঙুলহারা হাতের মুঠি ক্রমশ আলগা হয়ে গেছে। তারপর একটা সময় ও ওই তিনতলা সমান উঁচু খুঁটির ডগা থেকে ছিটকে পড়েছে প্রায় কুড়ি ফুট দূরে, পাথর দিয়ে বাঁধানো চাতালের ওপরে। ঘাড় ভেঙে মারাও গেছে সঙ্গে সঙ্গে।
আমি বললাম, পারফেক্ট। আমি নিজেও এত সুন্দর করে ঘটনাটাকে ডেসক্রাইব করতে পারতাম না। শুধু আর দুটো ডিটেইলস এর সঙ্গে যোগ করে নাও। কানে শোনা যায় এমন দুটো ডিটেইলস। দুটোই আমাকে বলেছে ছোট লামা রিনচেং।
একটা হচ্ছে জ্যাকির বারবার চিৎকার। কোনো মানুষ যদি মারা যাওয়ার আগে লড়বার সুযোগ না পায়, সে একবারই চিৎকার করে ওঠে। তারপর মারা যায়। এখানে জ্যাকি কিছুক্ষণ লড়েছিল। ঘুরন্ত পাইন-লগটাকে ওর আঙুলকাটা হাত আর পা দিয়ে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করেছিল। সেই জন্যেই ও বেশ কয়েকবার চিৎকার করার সময় পেয়েছিল।
আরেকটা শব্দের কথা রিনচেং আমাকে বলেছিল। ও যখন জ্যাকির আর্তনাদ শুনে গুম্ফার ভেতর থেকে দৌড়ে বাগানে বেরোচ্ছে, তখন তেলহীন চাকার চক্করের মতন একটা ক্যাঁচকোঁচ শব্দ শুনেছিল। আমি এতক্ষণ বুঝতে পারছিলাম না শব্দটা কীসের হতে পারে। এখন বুঝতে পারছি। রিনচেং সেদিন যখন জ্যাকির ডেডবডির দিকে দৌড়ে যাচ্ছিল, নদীর ধারে দাঁড়িয়ে তার অনেক আগেই খুনি লোকটা দেখে নিয়েছে, জ্যাকি প্রেয়ার-হুইলের ডগা থেকে ছিটকে গেছে। কাজ শেষ। তখনই সে সুইস-গেট নিশ্চয় বন্ধও করে দিয়েছিল। কিন্তু তারপরেও ইনার্সিয়া অফ মোশনে ওই সিস্টেমটা এক-পাক ঘুরেছিল আর সেই শেষ রোটেশনের শব্দটাই রিনচেং শুনতে পেয়েছিল।
বিনায়ক নিজের মনেই বলল, ওসি সুরেশ তামাংকে এসব কথা কেউ বলেনি?
না। বোঝাই যাচ্ছে এই প্রেয়ার-হুইলের নীচে বসানো ওয়াটার-মিলের পুরো সিস্টেমটাই কোনো অজ্ঞাত কারণে সত্তর আশি বছর ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। হয়তো আশি বছর আগে যেসব পালা-পার্বণে ওটা সারাদিন একনাগাড়ে ঘোরানো হত, সেসব পালা-পার্বন অনেক বছর আগে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তাই সাম্পা-গ্রামের লোকেদের কারুরই স্মৃতিতে নেই যে, কোনোদিন জলের তোড়ে তাদের গ্রামের প্রেয়ার-হুইল ঘুরত। যদি তাদের মনে থাকত, তাহলে কেউ না কেউ পুলিশ এনকোয়ারিতে সে কথা জানাত ঠিকই।
বিনায়ক বলল, কিন্তু এবার আসল কথাটা বলুন। সেই লোকটা, মানে খুনিটা কে? আমার একজনের নামই মাথায় আসছে।
মুচকি হেসে বললাম, মনে হচ্ছে আমি আর তুমি একইরকম হাবিজাবি ভাবছি। নিংমা শেরপা ছাড়া আর কারুর নাম ভাবতেই পারছি না।
একটু থেমে যোগ করলাম, লোকটার সম্বন্ধে এভাবে ভাবতে খারাপ লাগছে, বিনায়ক। কিন্তু না ভেবেই বা কী করব বলো। এভিডেন্স যে তাই বলছে।
বিনায়ক বলল, এভিডেন্স কোথায় স্যার? লোহার গেটটার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, এটাকে বড় জোর একটা অ্যাসাম্পসন বলা যায়… একটা ধারণা। কিন্তু ‘এভিডেন্স’ তো অন্য জিনিস।
আমি একটু হেসে বললাম, সম্ভবত আজ থেকে দশ-বারো বছর আগে আমিই তোমাদের ‘এভিডেন্স অ্যাক্ট’-এর ক্লাস নিয়েছিলাম।
স্যরি স্যার।
শোনো বিনায়ক, এভিডেন্স আছে! এই যে আমরা নিংমার বাড়িতে অতিথি হিসেবে থাকবার জায়গা পেলাম, এটা ঠিক কো-ইনসিডেন্স নয়। আমি সুরেশকে বলেছিলাম, নিংমাকে রিকোয়েস্ট করতে যেন ওর বাড়িতে আমাদের থাকতে দেয়। থানার ওসির রিকোয়েস্টে না করার সাহস হয়নি নিংমার। সেই জন্যেই আমরা এই বাড়িতে রয়েছি।
বিনায়ক অবাক হয়ে বলল, তাই! কিন্তু কেন স্যার? এখানে আসার আগেই ওকে কেন সন্দেহ করেছিলেন?
কারণ জ্যাকির পোস্টমর্টেমে দেখা গিয়েছিল, ওর রক্তে হালকা ড্রাগ রয়েছে, যেটা মৃত্যুর বড়জোর আধ ঘন্টা আগে খাবারের সঙ্গে ওর স্টমাকে ঢুকেছিল। ড্রাগটার নেচার এমনই, যেটা কাফ-সিরাপেও পাওয়া যায়। খেলে হাত-পায়ের ওপরে কন্ট্রোল একটু কমে আসে, আর কিছু হয় না। দেখবে, যে-কারণে এই ধরনের অনেক কাফ-সিরাপের শিশির গায়ে সাবধানবাণী লেখা থাকে— খাওয়ার পরে ড্রাইভ করবেন না।
বিনায়ক চোখ বড় বড় করে বলল, সুরেশ আমাকে কিছু বলেনি তো।
আমি বললাম, আমাকেও বলেনি। তোমরা সেদিন আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবার ঘণ্টাখানেক পরে আমি সুরেশকে ফোনে বলেছিলাম, জ্যাকির পোস্টমর্টেম রিপোর্টের কপি আমাকে হোয়াটস অ্যাপ করতে। সেই রিপোর্টে জ্যাকির স্টমাকে ড্রাগের ব্যাপারটা দেখে আবার সুরেশকে ফোন করে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ও ব্যাপারটা নিয়ে কী ভাবছে? সুরেশ বলেছিল, জ্যাকির মতন আন্ডার-ওয়ার্ল্ডের ছেলেরা অনেক ধরনের নেশাভাং করে। এটাও সেরকমই কিছু হবে। আমার কিন্তু তা মনে হয়নি। যদিও তখনই এটার সঙ্গে ওর অদ্ভুত মৃত্যুর কী যোগ থাকতে পারে সেটা বুঝতে পারিনি।
ঠিক আছে স্যার। তাই নাহয় হল। কিন্তু তাতেও নিংমা শেরপা পিকচারে আসছে কেমন করে?
বললাম, তোমার কী মনে আছে, সেদিন সন্ধে থেকে রাত অবধি জ্যাকি এই গ্রামেরই একমাত্র চায়ের দোকানটায় বসে নুন-চা আর মোমো খেয়েছিল? তারপর ওই দোকানটা থেকেই হাঁটা লাগিয়েছিল মনাস্ট্রির দিকে। সুরেশকে খোঁজ নিয়ে দেখতে বলেছিলাম, দোকানটার মালিক কে।
তারপর?
খোঁজ নিয়ে আমাকে জানিয়েছিল, দোকানটার মালিক নিংমা শেরপা। ছুতোরখানার পাশাপাশি ওটা ওর আরেকটা ব্যবসা। নিংমা নিজে প্রতিদিন দোকানে থাকে না, কর্মচারী দিয়ে কাজ চালায়। তবে সেদিন নিংমা নিজেই ছিল দোকানে।
বিনায়কের ভুরু দুটো আবার কুঁচকে গেল। বলল, এবার বোধহয় যোগসূত্রটা আমিও বুঝতে পারছি স্যার। যতই ডানহাতের তিনটে আঙুল কম থাক, তবু জ্যাকি ছিল একজন ক্লাইম্বার। শেষ মুহূর্তেও যদি কোনো রকমে ঘুরন্ত পাইনলগ বেয়ে নেমে আসে— তাই নিংমা কোনো চান্স নেয়নি। ওর খাবারে এমনভাবেই ড্রাগ মিশিয়েছিল যাতে ও হেঁটে গুম্ফা অবধি যাওয়া কিংবা খুঁটি বেয়ে ওপরে ওঠার মতন কাজগুলো ঠিকই করতে পারে, শুধু রিফ্লেক্স অ্যাকশনগুলো একটু ঢিলে হয়ে যায়।
এগজ্যাক্টলি।
আরেকটা কথা বলব স্যার? আমার মনে হচ্ছে, জ্যাকির মাথায় গুম্ফার নৈশ অভিযানের পুরো প্ল্যানটা গেঁথে দিয়েছিল নিংমা নিজে। ওই জ্যাকিকে বুঝিয়েছিল, কীভাবে প্রেয়ার-হুইল বেয়ে গুম্ফার দোতলায় সহজেই ওঠা যায়। কীভাবে জানলা খুলে চুরি করে আনা যায় ইয়েতির হাড়। জ্যাকি কী করবে না করবে সে সম্বন্ধে আগে থেকে না জানলে নিংমা কেমন করেই বা এখানে এসে দাঁড়িয়ে থাকবে? হিসেবমতন এখানে পৌঁছনোর জন্যে ওকেও তো জ্যাকির পেছন-পেছনই বেরিয়ে আসতে হয়েছিল।
আমি তোমাকে ফুল-মার্কস দিলাম। আমারও ধারণা, এগারো তারিখ নদীতে বান আসতে দেখে নিংমার মাথায় এই চমৎকার খুনের পরিকল্পনাটা গজিয়ে উঠেছিল। পূর্বপুরুষদের অসামান্য কীর্তির কথা ও নিশ্চয় বাবার মুখে ছোটবেলা থেকে শুনেছে। শুধু তাই নয়, আমার ধারণা, একজন দক্ষ মিস্ত্রি হিসেবে ও নিজে কখনো-না-কখনো এই সুড়ঙ্গের মধ্যে ঢুকে দেখেছিল, ওয়াটার-মিলটা এখনো কাজ করতে পারে কি না। দেখেছিল, হ্যাঁ, পারে। যদি বৃষ্টি হয়, যদি সাম্পা-নদীতে হড়পা বান আসে, তাহলে ওই আটাভাঙানোর কলের মতন গুম্ফার প্রেয়ার-হুইলকেও জলের তোড়ে ঘোরানো যেতে পারে।
তাহলে ব্যাপারটা এভাবে ভাবা যায়। এগারো তারিখ সন্ধেবেলায় নিংমা জ্যাকিকে গিয়ে বলেছিল, সজ্জন আগরওয়ালা যদি ওকে একটা বড়সড় পেমেন্ট দেয়, তাহলে ও আর বড় লামার দলে থাকবে না। জ্যাকির রাজি না হওয়ার কোনো কারণ ছিল না। ওই সাদামাটা গ্রাম্য ছুতোরমিস্ত্রি যে ওকে খুন করতে চাইছে সেটা ও ভাববে কেমন করে?
তারপর নিংমা এক ঢিলে দুই পাখি মারল। একদিকে জ্যাকি নিকেশ হল। অন্যদিকে ইয়েতির ভয়ঙ্কর প্রতিশোধের নমুনা দেখে গ্রামবাসীদের হাড় হিম হয়ে গেল। ইয়েতি রইল ইয়েতির সম্মানের জায়গায়।
বিনায়ক বলল, হঠাৎই মনে পড়ে গেল স্যার, কাল আপনি যখন প্রেয়ার-হুইলের বেদির মাঝখানে ওই গর্তটার দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন, তখন নিংমাই সেফটির দোহাই দিয়ে আপনাকে টেনে সরিয়ে নিয়েছিল। পাক্কা শয়তান একটা।
বললাম, আমি আজ কিছুতেই তোমার সঙ্গে দ্বিমত হতে পারছি না, বিনায়ক। আমার হল কী?
.
আমরা দুজন রিভার-বেড থেকেই হাঁচড়ে-পাঁচড়ে নুড়িবাঁধানো রাস্তায় উঠে এলাম। দেখলাম ঠিক ইয়েতি-গুম্ফার পেছনের উঠোনের গেটের সামনে পৌঁছে গেছি। সেটাই স্বাভাবিক অবশ্য। সুইস-গেটটা তো প্রেয়ার-হুইলের সঙ্গে এক সরলরেখাতেই থাকবে। তবেই না নদীর স্রোত তার পূর্ণ শক্তি নিয়ে প্রপেলারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। আঁকাবাঁকা নালা হলে সেটা তো সম্ভব হত না।
সে যাই হোক, আমি বিনায়ককে বললাম, চলো একবার ছোট লামা রিনচেঙের সঙ্গে একটু কথা বলে আসি। রিনচেং বলছে শুধু গ্রামের মধ্যে ক্ষমতা ধরে রাখার জন্যেই নাকি নিংমা বড় লামার সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। কিন্তু এই থিয়োরিটা আমি পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছি না। হিমালয়ের শান্ত একটা গ্রামের একজন অধিবাসী, যার কোনো ক্রিমিনাল রেকর্ড নেই, সে শুধু মোড়লের পোস্টটা ধরে রাখবার জন্যে একটা খুন করবে, এটা বিশ্বাস করা কঠিন। এর পেছনে অন্য কোনো গল্প আছে, আর থাকলে সেটা জানবে মনাস্ট্রির লামারা।
বিনায়ক একটু চিন্তিতমুখে বলল, তাই তো। যদি জানতাম মনাস্ট্রি শিফটিং-এর সময় ওর পূর্বপুরুষদের শিল্পকর্মগুলো নষ্ট হবে, তাহলেও নাহয় নিংমার বিরোধিতার একটা কারণ বুঝতাম। কিন্তু সজ্জন আগরওয়ালা তো কথা দিয়েছে, প্রতিটা ছবি, প্রতিটা বাসন, বাদ্যযন্ত্র আর কারুকার্য করা কাঠের প্যানেল একদম যত্ন করে নতুন বাড়িতে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দেবে। মানে, নতুন মনাস্ট্রি হবে একেবারেই পুরনো মনাস্ট্রির রেপ্লিকা। তাহলে?
সেই ‘তাহলে’র উত্তরটাই আমরা রিনচেঙের কাছে সরাসরি জানতে চাইলাম। রিনচেংকে আজ কেন জানি না খুব সন্ত্রস্ত দেখাচ্ছিল। প্রথমে আমরা কিচেনেই বসেছিলাম। কিন্তু ও এদিক-ওদিক তাকিয়ে বলল, এখানে কিছু বলা যাবে না। ওপরে চলুন।
ওপরে? মানে দোতলায়? মানে ইয়েতির ঘরে!— খুব অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করলাম।
হ্যাঁ। বলেছিলাম না, আমি ওই ঘরেই থাকি। ওই ঘরটাকে নীচের ঘরগুলোর তুলনায় সেফ বলে মনে হয়। আমি রাতেও ওই ঘরে শুই।
কিন্তু তোমার ভয়টা কীসের?
রিনচেং শুকনো মুখে বলল, আমি…আমি একটা অদ্ভুত জিনিস জানতে পেরে গেছি। না জানলেই বোধহয় ভালো হত। এখন আমার প্রাণের ভয় রয়েছে।
আমার সিক্সথ সেন্স বলল, রিনচেং ওই কী যেন জেনে ফেলার কথা বলছে, তার মধ্যেই আমার প্রশ্নের উত্তরটাও লুকিয়ে রয়েছে। মানে নিমার আসল মোটিভের কথা। রিনচেং আমাকে বলতেই চায়। কিন্তু ও ভয় পাচ্ছে।
আমি ওকে বললাম, ভয় কী রিনচেং? তুমি তো আমাদের পরিচয় জানো।
রিনচেং শুকনো হেসে বলল, ওই পুলিশের তকমার কথা বলছেন তো? ওগুলো কাল সকালে আবার গায়ে লাগিয়ে নেবেন চৌবেসাহেব। কাল সকালে… যখন জোড়পোখরি থানার আর্মড কনস্টেবলরা আপনাদের এসকর্ট করে হিলে অবধি নিয়ে যাবার জন্যে এখানে পৌঁছবে। তার আগে অবধি আপনারা নিজেই নিরাপদ নন। আপনারা আমাকে কীভাবে রক্ষা করবেন?
বিনায়কের মুখটা সঙ্গে সঙ্গে লাল হয়ে উঠল। ও সবেমাত্র ‘এক্সকিউজ মি’ বলে কী একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই রিনচেং হাত তুলে ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল, এই মনাস্ট্রি থেকে যে-কোনো দিকে দশ কিলোমিটার চলে যান— আপনি একটা মানুষ কেন, একটা কুকুরেরও দেখা পাবেন না। তার ওপরে আপনারা সমতলের লোক। পুরো পাহাড়টাই আপনাদের জন্যে বধ্যভূমি। কতভাবে আপনাদের মেরে ফেলা যায় জানেন? এখান থেকে নিংমার বাড়ি অবধি হেঁটে যাওয়ার মধ্যেই আপনার মাথায় একটা পাথর খসে পড়তে পারে। আপনি পা স্লিপ করে খাদে পড়ে যেতে পারেন। কাজেই বেশি সাহস দেখাবেন না।
আমার সঙ্গে সঙ্গেই মনে পড়ে গেল কাল রাতের সেই খাদের কিনারা। সত্যিই, মৃত্যুর একচুল দূর থেকেই ফিরে এসেছিলাম তো। বিনায়কেরও নিশ্চয় একই কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। সত্যিই খুব অসহায় অবস্থার মধ্যে পড়ে আছি আমরা।
হঠাৎই দরজার দিকে চোখ পড়তেই আমাদের সেই ভয়টা দশগুণ বেড়ে গেল। দেখলাম কিচেনের দরজার দুটো পাল্লায় দুটো হাত রেখে দাঁড়িয়ে রয়েছে নিংমা শেরপা। ও যে কখন এসেছে, কতক্ষণ ধরে আমাদের কথাবার্তা শুনছে, কিছুই খেয়াল করিনি। তবে আমাদের চোখে চোখ পড়তেই ও একগাল হেসে বলল, জিনা আপনাদের ডাকতে পাঠাল স্যার। সকালে চা-টা অবধি খাননি। চলুন, ও আপনাদের জন্যে গরম-গরম থুকপা নিয়ে বসে আছে।
নিংমাকে বললাম, চলো নিংমাভাই, আসছি। তারপর গলা নামিয়ে ফিসফিস করে রিনচেংকে বললাম, দুপুরের খাওয়াদাওয়ার পর চলে আসব।
ও নিঃশব্দে ঘাড় হেলিয়ে সম্মতি জানাল।
নিংমার পাশ কাটিয়ে আমি আর বিনায়ক কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পরে পেছন থেকে ভেসে আসা কয়েকটা কথা কানে ঢুকল। নেপালিভাষায় নিংমা বলল, ছোট লামা! এর জন্যে তোমাকে অনেক বড় দাম চোকাতে হবে।
প্রায় একইভাবে রিনচেং উত্তর দিল, তোমার যা ক্ষমতা আছে করে নিও মোড়ল। প্রভু বোধিসত্ত্বের ছায়ায় রয়েছি। ইয়েতিকে ভয় পাই না।
আমি আর বিনায়ক কিছুই না শোনার, কিছুই না দেখার ভান করে প্রেয়ার-হলের ভেতর দিয়ে সামনের দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম। সেখান থেকে সামনের রাস্তায়। একটু পরেই নিংমা জোরে পা চালিয়ে আমাদের সঙ্গ ধরল। কৈফিয়ত দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল, এই ছোট লামার স্বভাব ভালো নয়। তিনমাস আগে আমার কাছ থেকে এক হাজার টাকা ধার নিয়েছিল। এখনো ফেরত দিচ্ছে না।
কোনো উত্তর দিলাম না। প্রাণপণে আন্দাজ করার চেষ্টা করছিলাম, ছোট লামা কোন গোপন কথা জেনে ফেলেছে? সেটা জানা জরুরি… ভীষণ জরুরি। হাতে আর সময় বেশি নেই। আগামীকাল এই সময়ে আমরা বার্সের দিকে রওনা হয়ে গেছি। যা করার, যা জানার সবই আজ রাতের মধ্যে সেরে ফেলতে হবে।
তখনো জানতাম না, রিনচেঙের নিজের মুখ থেকে সেই কথা আর কোনোদিনই আমরা জানতে পারবো না।
জলখাবারে গরম-গরম থুকপা খেয়েছিলাম। দুপুরে ভাতের সঙ্গে চিকেন তো ছিলই, আর ছিল সব্জি আর শাকপাতা মেশানো খোসা-সমেত কালো উড়ৎ ডাল। সব্জিগুলো চিনতে পেরেছিলাম, পাতাগুলোকে পারিনি। একটু তিতকুটে স্বাদ হলেও গন্ধটা ভালো লেগেছিল। প্রায় একবাটি ডাল খেয়ে নিয়েছিলাম।
বিনায়ক খায়নি। একবার মুখে দিয়েই ডালের বাটি সরিয়ে রেখেছিল। ওর খাবারের স্বাদের ব্যাপারে খুঁতখুঁতুনি বেশি।
বিকেল থেকেই শুরু হল পেটে অসহ্য যন্ত্রণা, বমি আর লুজ-মোশন। বিনায়কের কিছু হয়নি।
বিছানায় শুয়ে জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখছিলাম, নিংমার বাগানে বেলেডোনা-গাছের বেড়া। ভাবছিলাম ওই বিষাক্ত পাতাগুলোর লাল রং কত সহজেই উড়ৎ ডালের কালোর মধ্যে মিশে যেতে পারে।
জিনা আর নিংমা পালা করে আমাকে দেখে যাচ্ছিল আর বাঙালিদের হজমশক্তি যে এত দুর্বল, সেটা জানা ছিল না বলে বারবার দুঃখ প্রকাশ করছিল। কোনো উত্তর দিচ্ছিলাম না। নিজের সংযম দেখে নিজেই অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম।
বিনায়ককে সামলে রাখাই মুশকিল হচ্ছিল। ও বারবার আমাকে নুন-চিনির জল করে খাওয়াচ্ছিল আর ফিসফিস করে বলছিল, একবার শুধু পারমিশন দিন স্যার। আমি ওই নিংমার বাচ্চাকে পাশের ঘরটায় ঢুকিয়ে থার্ড ডিগ্রি দিই। আর তা না হলে বলুন, পায়ে হেঁটে এখনই হিলে হয়ে জোড়পোখরি চলে যাই। ফোর্স নিয়ে ফিরে আসি।
আমি ওকে বোঝাচ্ছিলাম, পাগলামি কোরো না। নিংমা যদি সামান্যতম আঁচ পায় যে, আমরা জ্যাকির মৃত্যুর কারণ ধরে ফেলেছি, আমরা ওকে সন্দেহ করছি, তাহলে ও সিম্পলি হাওয়া হয়ে যাবে। পৃথিবীর কোনো পুলিশ এই সিঙ্গালিলা স্যাঙ্কচুয়ারির ভেতর থেকে ওকে খুঁজে বার করতে পারবে না। আর তুমি যাবেটাই বা কোথায়? যদি এখনই বেরোও, তাহলেও সাত ঘণ্টার হাঁটাপথ পেরিয়ে হিলে পৌঁছতে তোমার রাত ন’টা বেজে যাবে। ওই ছোট্ট গ্রামে অত রাত্রে কোন যানবাহনটা পাবে তুমি? তার চেয়ে এখানেই থাক। তুমি কাছে থাকলে আমিও নিরাপদ থাকব।
তারপর একটু ইতস্তত করে বললাম, তাছাড়া এখানে তোমার আরো একটা জরুরি কাজ আছে বিনায়ক। আমার যা অবস্থা তাতে আজকের দিনটা আর বিছানা ছেড়ে উঠতে পারব না বলেই মনে হচ্ছে। সেক্ষেত্রে তোমাকে একাই একবার ইয়েতি-গুম্ফায় যেতে হবে। দেখা করতে হবে রিনচেঙের সঙ্গে। তবে সে কাজটাও সহজ হবে না।
বিনায়ক বলল, কেন স্যার?
নিংমা জানে, রিনচেং সুযোগ পেলেই আমাদের সেই গোপন কথা বলে দেবে। কাজেই ও আর জিনা পালা করে আমাদের এই ঘরে আর গুম্ফায় নজর রাখবে।
বিনায়ক রাগে গড়গড় করে উঠল। বলল, চুলোয় যাক জিনা, চুলোয় যাক নিংমা। আমি যাব। কে আমাকে আটকায় দেখি।
ও তখনই বেরিয়ে যাচ্ছিল। হয়তো সেটাই ভালো হত। তখন বিনায়ক যদি মনাস্ট্রিতে চলে যেত তাহলে হয়তো আরেকটা খুন, সাম্পার দ্বিতীয় খুনটা আর হত না। কিন্তু সেটা হল না। ঠিক তখনই আমার আবার নতুন করে একটা বমি আর পেটে যন্ত্রণার দমক এল। চোখে অন্ধকার দেখলাম। বিনায়ক আমাকে নিয়ে সেই যে ব্যস্ত হয়ে পড়ল, তারপর আবার ফুরসত পেল সন্ধের পরে।
এর মধ্যে পুরো সময়টাই জিনা আর নিংমাও আমাদের সঙ্গে ছিল। ওরা দফায় দফায় গরম জল নিয়ে এসেছে, নুন-চিনির জল করে এনেছে। তারপর একটা সময় যন্ত্রণাটা একটু কমে এল। মনে হয় বেলেডোনার বিষটা ততক্ষণে অনেকটাই বেরিয়ে গিয়েছিল। একটা এমন আরাম সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল যে আমার চোখ দুটো ঘুমে জড়িয়ে এল। মনে আছে, ঘুমিয়ে পড়ার আগে একবার রিস্টওয়াচটা দেখতে পেরেছিলাম। রাত আটটা বেজে দশ।
সেই ঘুম ভেঙেছিল বিনায়কের উত্তেজিত ডাকাডাকিতে। তখন রাত দশটা। এর মাঝের সময়ের ঘটনাটুকু আমি বিনায়কের জবানিতেই লিখছি। কারণ, ও যা বলেছে তার বাইরে আমার কিছু জানবার কথা নয়, যেহেতু আমি তখন ঘুমোচ্ছিলাম।
বিনায়ক বলেছিল, আপনি ঘুমিয়ে পড়ার পর কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলাম। তারপর হঠাৎই মনে হল, এটা বসে থাকার সময় নয়। জানি না নিংমাকে কোন খুনি প্রবৃত্তি চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেই প্রবৃত্তির উৎস যাই হোক, ওর বুদ্ধিকে তা আচ্ছন্ন করেনি। এখনো অবধি ও এমন কিছু করেনি যাতে সরাসরি ওর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
মনে হল, ছোট লামা রিনচেংকে নিংমা খুন করতে পারে। আমাদের সামনেই তো ও আজ সকালে ছোট লামাকে হুমকি দিয়ে এসেছিল— তোমাকে ইয়েতি ছাড়বে না। আর এখন তো আমরা জানিই, নিংমাই ইয়েতি। একবার পুরো বাড়িটায় টহল দিয়ে এলাম। কাউকে দেখতে পেলাম না। কিচেনের দিকে কিছুটা এগোতেই জানলায় ভেসে উঠল জিনার মুখ। বুঝলাম, ও বাড়ির দিকে নজর রাখছিল। ওখান থেকেই চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল, কোনো প্রয়োজন আছে কিনা। আমি বললাম, না। তারপর জিজ্ঞেস করলাম, নিংমাভাই কোথায়? জিনা উত্তর দিল, সাহেবের জন্যে কোনো দাওয়াই-টাওয়াই পাওয়া যায় কিনা খুঁজতে বেরোলো।
মনে মনে বললাম, একেই বলে সাপ হয়ে ছোবলানো আর ওঝা হয়ে ঝাড়া। ও নাকি খুঁজতে যাবে আপনার ওষুধ। বেটা নিশ্চয় গুম্ফার দিকেই গিয়েছে। আমি চুপচাপ পেছনের বাগান থেকে বাড়িতে ঢুকলাম। আমাদের ঘরের দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে পা টিপে-টিপে বেরিয়ে গেলাম। না সামনের গেট দিয়ে বেরোইনি। ওটা জিনার কিচেনের জানলা দিয়ে দেখা যায়। বেরিয়েছিলাম একটা সাইড দিয়ে, বেড়া টপকে।
আপনি তো জানেন, রাত সাড়ে আটটা মানে সাম্পায় অনেক রাত। রাস্তায় কারুর সঙ্গে দেখা হয়নি। শুধু ভয় লাগছিল, খুনেটা চুপচাপ আমাকে ফলো করছে না তো। গ্রাম ছাড়িয়ে গুম্ফার রাস্তায় পা দিয়েই জ্যাকেটের ইনার- পকেট থেকে রিভলবারটা বার করে হাতে নিয়ে নিলাম। সাবধানের মার নেই।
বিশ্বাস করবেন না, ওইভাবে বিনা উপদ্রবে গুম্ফার সামনের হলঘরটায় ঢুকে গেলাম। কেউ বাধা দিল না, কারুর সঙ্গে দেখা হল না। তারপরে হল পেরিয়ে পেছনের অন্ধকার বারান্দায়— সেখানেও কেউ নেই। রান্নাঘরে রিনচেং নেই। বড় লামার ঘর যথারীতি ভেতর থেকে খিল এঁটে বন্ধ করা। আজ আর ভেতর থেকে ওঁর স্তোত্রপাঠের শব্দ পাইনি অবশ্য।
ঠিক তখনই দোতলা থেকে তীব্র একটা আর্ত-চিৎকার ভেসে এল। পুলিশের চাকরি করতে গিয়ে এই চিৎকার আমাকে আগেও শুনতে হয়েছে— এটা মরণ চিৎকার। একমাত্র প্রাণটা বেরিয়ে যাবার সময়েই মানুষের গলা দিয়ে এই বীভৎস আওয়াজ বেরিয়ে আসে। আমি দিগবিদিক জ্ঞান হারিয়ে একসঙ্গে দুটো-তিনটে করে পাথুরে সিঁড়ির ধাপ টপকে দোতলার বারান্দায় উঠে গেলাম। সেই বারান্দাও অন্ধকার। তার মধ্যেই চিকমিক করছিল ইয়েতির ঘরের দরজার পাল্লায় লাগানো পেতলের কারুকাজগুলো। মনে পড়ল, রিনচেং বলেছিল, ও রাত্রিবেলায় ওই ঘরেই শোয়। আমি দৌড়ে গিয়ে দরজায় ধাক্কা মারলাম একবার, দুবার, তিনবার। নাঃ, কোনো সাড়া নেই। তবে একবার যেন গলা দিয়ে বেরিয়ে আসা ঘড়ঘড়ানির মতন একটা আওয়াজ পেলাম।
আর ভাবার সময় ছিল না। কিছুটা পেছিয়ে গিয়ে ছুটে গিয়ে দরজার পাল্লায় শোলডার-চার্জ করলাম। তিনবারের বার ভেতরের কাঠের খিল ক্র্যাক করে গেল। আমি ঘরের ভেতরে এক-পা দিয়েই স্ট্যাচু হয়ে গেলাম। ঘরের এককোনায় একটা কেরোসিনের ল্যাম্প জ্বলছিল। তার আলোয় পরিষ্কার দেখতে পেলাম বিছানার ওপরে উপুড় হয়ে শুয়ে রয়েছে রিনচেং। পিঠের দুটো শোলডার-ব্লেডের মাঝখানে খাড়া হয়ে রয়েছে মেটালের তৈরি গুপ্তির হাতল। মাথাটা একদিকে হেলে পড়েছে।
রিফ্লেক্স-অ্যাকশনেই আমি বাঁহাতে মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইটটা জ্বালিয়ে, রিভলবারের ভিউ-ফাইন্ডারটাকে ঠিক তার পাশে তাক করে ধরলাম। তারপর দুটো হাতকেই একসঙ্গে ঘরের চারপাশে ঘুরিয়ে নিয়ে এলাম। কিন্তু কাউকে দেখতে পেলাম না।
অথচ আপনি যদি ঘরটা দ্যাখেন, তাহলে বুঝতে পারবেন, ওই ঘরে একটা বেড়াল লুকিয়ে থাকারও জায়গা নেই। আসবাব বলতে একজন শোবার মতন একটা বিছানা। ভুল বললাম, বিছানা নয়। তক্তা। কৃচ্ছ্রসাধনের চরম অবস্থা যাকে বলে। চারটে ইঁটের ওপরে একটা সরু কাঠের তক্তা পাতা ছিল। তার ওপরে পাতার জন্যে একটা কম্বল, আরেকটা কম্বল গায়ে দেওয়ার জন্যে। এই হচ্ছে ছোট লামার বিছানা। তাছাড়া দরজার ঠিক মুখোমুখি দেওয়ালের গায়ে ঠেস দিয়ে রাখা একটা কাচের শোকেসের মধ্যে রয়েছে ইয়েতির হাত। বিছানায় ছোট লামার বড়ি ছাড়া আর কিছু দেখিনি। শোকেস শোকেসের জায়গাতেই ছিল। জানলাগুলো সবই ভেতর থেকে ইঁটের গাঁথনি দিয়ে বোজানো। দরজাও একটাই, যেটা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। যেটাকে সেইমাত্র আমি নিজে ভেঙেছি।
ব্যাপারটার মধ্যে যে একটা ইমপসিবল-অ্যাঙ্গেল রয়েছে সেটা ভাবতেই আমার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। ঠিক তখনই আমার সেই ভয়কে চোদ্দগুণ বাড়িয়ে দিয়ে আমার পেছন দিকে দাঁড়িয়ে কে যেন খিকখিক করে হেসে উঠলো।
ঘাড় ফিরিয়ে দেখি সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে নিংমা শেরপা। আমাকে তাকাতে দেখে বলল, কী ছোটসাহেব, বিশ্বাস হল তো ইয়েতির অলৌকিক ক্ষমতায়?
ওকে দেখামাত্র একটা অদ্ভুত ব্যাপার হল। ভয়ের জায়গায় সঙ্গে সঙ্গে ফুঁসে উঠলো রাগ, ঘৃণা। মাথায় রক্ত চড়ে গেল। কেন, কীভাবে, কখন রিনচেং খুন হল— কিচ্ছু ভাবিনি। শুধু মনে হচ্ছিল ওই জানোয়ারটাই রিনচেংকে খুন করেছে। আমি ওকে তাড়া করলাম। কিন্তু আমি ওর কাছে পৌঁছনোর আগেই নিংমা কাঠবেড়ালির মতন তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে গেল। পেছন- পেছন আমিও দৌড়লাম। অন্ধকার বারান্দার পুরোটাই যখন প্রায় পেরিয়ে গেছি, তখনই হঠাৎ পেছন থেকে কে যেন নেপালি-ভাষায় প্রশ্ন করল, কী হয়েছে?
একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম, বড় লামা তাঁর ধ্যানঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন। আমি চিৎকার করে বললাম, আপনি ওপরে যান। আমি যতক্ষণ না ফিরে আসছি, কাউকে ঢুকতে দেবেন না। বুঝতে পারলাম না, উনি আমার কথা শুনতে পেলেন কিনা। পায়ের আওয়াজ পাচ্ছিলাম না। তাই দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাবার আগে আরেকবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম, উনি ইতিমধ্যেই প্ৰায় সিঁড়ির বাঁকে পৌঁছে গেছেন। আমি ফেরার পরেও দেখেছি, উনি ওই ইয়েতির ঘরের দরজায় দাঁড়িয়েই থরথর করে কাঁপছেন।
উঁচুনীচু পাহাড়ি রাস্তায় শয়তানটাকে চেজ করে প্রায় দু-কিলোমিটার দৌড়নোর পরেও ওকে ধরতে পারলাম না। আপনাকে সব জানানোই ঠিক মনে হল। তাই ফিরে এলাম।
.
বিনায়কের কথা শুনতে-শুনতেই আমি গায়ে জ্যাকেট চাপিয়ে নিয়েছিলাম, মাথায় টুপি। যখন পায়ের জুতোর ফিতে বাঁধছি তখনই অনেক লোকের উত্তেজিত গলার আওয়াজ পেলাম। আওয়াজটা আসছিল বাইরে থেকে, মানে নিংমা শেরপার বাড়ির বাগান থেকে।
আমি আর বিনায়ক বাইরে বেরোতেই আমাদের দিকে অনেকগুলো আঙুল উঠে এল। ওদের অভিযোগ বুঝতে পারছিলাম। আমরাই ইয়েতির ঘুম ভাঙিয়েছি। আমাদের পাপেই ছোট লামা রিনচেংকে মরতে হয়েছে। আমরা যেন এই মুহূর্তে গ্রাম ছেড়ে চলে যাই।
চাপাগলায় বিনায়ককে বললাম, কোনো কথা না বলে মুখ নীচু করে গুম্ফার দিকে হাঁটা লাগাও। তুমি পুলিশে চাকরি করো। নিশ্চয় জানো, ‘মব’ কোনো যুক্তি মানে না। মবের সঙ্গে তর্ক চলে না। শুধু খেয়াল রাখো, নতুন করে যেন ওদের রাগের আগুনে ঘি না পড়ে।
বিনায়কও চাপা গলায় বলল, বুঝতে পারছি। আসলে এখানে একটা মাস-হিস্টিরিয়া শুরু হয়ে গেছে। লোকজন ইয়েতির আতঙ্কে পাগলের মতন আচরণ করছে। অবশ্য ওদেরই বা দোষ দেব কেমন করে? আমার নিজেরই তো মাথাটা কেমন যেন পাগল-পাগল লাগছে। একটা বন্ধ ঘরের মধ্যে ছোট লামা খুন হয়ে গেল। আমি প্রায় সামনে দাঁড়িয়ে দেখলাম। এর কী ব্যাখ্যা দেব স্যার, অলৌকিক ছাড়া?
আমি কোনো উত্তর না দিয়ে আরেকটু জোরে পা চালাবার চেষ্টা করলাম। আমার ইয়েতিকে ভয় লাগছিল না। ভয় লাগছিল ওই মাস- হিস্টিরিয়াকেই। ওরা যদি দলে দলে গুম্ফার ভেতরে ঢুকে পড়ে, যদি ওদের পায়ে-পায়ে সমস্ত এভিডেন্স নষ্ট হয়ে যায়।
.
গুম্ফায় পৌঁছে দেখলাম, এক আশ্চর্য পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। অত রাতেও প্রায় আট-দশটা হ্যাজাকবাতির আলোয় সামনের বাগানটা আলো হয়ে রয়েছে। শুকনো পাইনপাতার ধুনুচি জ্বলছে। চলছে ক্রমাগত মন্ত্রপাঠ। থেকে থেকেই বেজে উঠছে ঝাঁঝর, করতাল আর রামশিঙ্গা। কয়েকজন লোক বড় বড় বাঁশের চোঙার মধ্যে থেকে গুম্ফার সীমানা বরাবর মন্ত্রপূত ছাং মানে লোকাল মদ ছেটাচ্ছিল। কেউ বলে না দিলেও বুঝতে অসুবিধে হল না, এইসবই হচ্ছে ক্রুদ্ধ আত্মাকে শান্ত করার চেষ্টা।
আসরের মাঝখানে যে-দুজন বসেছিলেন, আমাদের ঢুকতে দেখেই তারা জ্বলন্ত চোখ মেলে তাকালেন। গ্রামপ্রধান নিংমা শেরপা আর বড় লামা সামডুপ। বড় লামা কয়েকজন ইয়ং ছেলেকে চোখের ইশারায় কাছে ডেকে ফিসফিস করে কী যেন বললেন। তারা আমার আর বিনায়কের দিকে এগিয়ে এসে ভদ্রভাষাতেই বলল, আপনাদের রিকোয়েস্ট করছি, গুম্ফার ভেতরে পা দেবেন না। এটা অবিশ্বাসীদের জায়গা নয়। এই গ্রামটাই আপনাদের মতন অবিশ্বাসীদের জন্যে নয়।
আমি শান্তভাবে বললাম, কেন? আমরা কী করেছি?
উনি— দশাসই চেহারার একটা লোক বিনায়কের দিকে আঙুল তুলে বলল— উনি আমাদের গ্রামপ্রধানের গায়ে হাত দেবার সাহস দেখিয়েছেন। এরপরেও যে আমরা আপনাদের গ্রাম থেকে বার করে দিচ্ছি না, তার কারণ আপনারা অতিথি। নিংমাভাইয়ের অতিথি, আমাদের সবার অতিথি।
অন্য একজন বলল, আপনারা ফিরে যান। নিংমাভাইয়ের বাড়িতেই ফিরে যান। কেউ আপনাদের কোনো ক্ষতি করবে না। তবে কাল অবশ্যই সাম্পা ছাড়বেন।
আমি বললাম, ঠিক আছে, চলে যাচ্ছি। শুধু তার আগে একবার ইয়েতি-দেবতার ঘরটা দেখে আসতে দিন। কথা দিচ্ছি, কোনো জিনিসে হাত দেব না। কোনো ছবি তুলব না। শুধু একবার ছোট লামাকে শেষ দেখা দেখেই ফিরে আসব।
ওরা আর কিছু বলার আগেই জমায়েতের কেন্দ্রস্থল থেকে নিমা শেরপা চেঁচিয়ে উঠল। হ্যাঁ, হ্যাঁ, যেতে দে ওঁদের। বড়সাহেব নিজের চোখে দেখে আসুন একটা অবিশ্বাসী কী শাস্তি পেয়েছে। দেখে আসুন আর বাড়ি ফিরে গিয়ে ওঁদের মনিব সজ্জন আগরওয়ালাকে বলুন, গুম্ফা সরানোর কথা চিন্তা করলে, ওর ওপরেও একদিন এরকম শাস্তির খাঁড়া নেমে আসবে। এই বিজয়! তুই সাহেবদের সঙ্গে যা। দেখবি, ওরা যেন কোনো জিনিস জায়গা থেকে না সরান।
একটা বছর কুড়ি-একুশের জোয়ান ছেলে আমাদের কাছে এসে বলল, চলুন।
আড়চোখে দেখলাম বিনায়কের মুখটা রাগে টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। আমি ওকে বললাম, শান্ত হও বিনায়ক। অবস্থাটা বোঝো। পুরো গ্রামের বিরুদ্ধে তুমি একা যেতে পারবে না। ইতিমধ্যেই নিংমাকে তাড়া করে ওদের খেপিয়ে দিয়েছ। আর খেপিও না। চলো।
আমি আর বিনায়ক ওই বাগানের জমায়েতের পাশ কাটিয়ে সটান উঠে গেলাম দোতলায়। আমি আগে ওপরে উঠিনি। দেখলাম একতলার নকশা থেকে দোতলার নকশা একেবারেই আলাদা। এখানে সিঁড়ি দিয়ে উঠেই বেশ চওড়া এক টুকরো দালান। তবে সেটা একতলার দালানের মতন অতটা লম্বা নয়। সিঁড়ির মুখোমুখি, দালানের উলটোদিকে, একটাই মাত্র ঘরের দরজা। তার মানে দোতলার পুরোটা জুড়ে এই একটাই ঘর, যেখানে ইয়েতির হাড়ের অধিষ্ঠান। দরজার পাল্লা দুটো তখনো আধখোলা অবস্থায় কব্জার সঙ্গে ঝুলছিল। বুঝলাম, বিনায়কের শোল্ডার-চার্জের ধাক্কায় শুধু খিলই ভাঙেনি, কব্জাও আলগা হয়ে গেছে।
ঘরটার ভেতরে তখনো ঠিক আগের জায়গাতেই কেরোসিনের ল্যাম্পটা জ্বলছিল এবং ঠিক আগের মতনই বিছানার ওপরে উপুড় হয়ে পড়ে ছিল ছোট লামা রিনচেঙের মৃতদেহ। তার পিঠের মাঝখানে যেটা গাঁথা রয়েছে সেই অস্ত্রটাকে বাংলায় বলে ‘গুপ্তি’। ওর অর্ধেকটা হাতল আর অর্ধেকটা ধারালো ফলা। ফলাটাকেও একটা খাপের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখা যায়। তখন পুরো জিনিসটাকে একটা সাধারণ ছোট লাঠির মতন দেখতে লাগে।
গুপ্তির খাপটা বিছানার পাশে মেঝেতে পড়েছিল।
আমাদের সঙ্গে যে ছেলেটা এসেছিল, বিজয়, তাকে জিজ্ঞেস করলাম অস্ত্রটা চেনে কিনা? সে বলল, হ্যাঁ, চিনি। দেখছেনই তো এই ঘরের দেওয়ালে পুরনো আমলের আরো অস্ত্রশস্ত্র ঝুলছে। তার মধ্যেই, ওই উত্তরের দেওয়ালের মাঝবরাবর, চাকুটাকে ঝুলতে দেখেছি।
ছেলেটা দেওয়ালের যে-অংশটার দিকে আঙুল দ্যাখালো, সেদিকে এগিয়ে গিয়ে দেখলাম, ভুল বলেনি। ওখানকার দেওয়ালের কিছুটা অংশে লম্বা ফ্যাকাশে একটা দাগ। দেখলেই বোঝা যায় ওখান থেকে ওই মাপেরই কিছু একটা খুলে নেওয়া হয়েছে।
এবার বিছানার কাছে এগিয়ে গেলাম। দেখলাম মৃতদেহের পা থেকে পেট অবধি কম্বলে ঢাকা। মাথাটা উপুড় অবস্থাতেও একদিকে সামান্য কাত হয়েছিল, তাই চোখ দুটো দেখতে পেলাম। ঘুমের মধ্যেই কি খুন করা হয়েছে ওকে? মনে হল না। তাই যদি হত, তাহলে চোখ দুটো এমন বিস্ফারিত হয়ে থাকত না।
বিনায়ক পেছন থেকে আস্তে করে ডাকল— স্যার।
মুখ না ফিরিয়েই বললাম, একটা ইন্টারেস্টিং জিনিস খেয়াল করেছ? কী স্যার?
ভালো করে দ্যাখো। আলখাল্লায় তিন জায়গায় তিনটে ছ্যাঁদা। তার মানে মোট তিনবার স্ট্যাব করা হয়েছে। প্রথম দু’ বার পাঁজরার হাড়ে লেগে ছুরি ছিটকে উঠেছে। তৃতীয়বার হাড়ের ফাঁক খুঁজে পেয়েছে। অথচ তুমি মাত্র একবারই চিৎকার শুনতে পেয়েছিলে। আরো একটা কথা।
কী স্যার?
অপদেবতাকেও তাহলে আনাড়ি খুনির মতন মোক্ষম জায়গাটা হাতড়ে বেড়াতে হয়?
বিনায়ক মাথা চুলকোতে চুলকোতে বলল, প্রবলেম হচ্ছে মার্ডার হতে গেলে একজন মার্ডারার লাগে। তাকে ঘরে ঢুকতে হয়।
আমি বললাম, ঠিক। সেক্ষেত্রে একটা পসিবিলিটির কথা ভেবে দেখেছ বিনায়ক? এখনো অবধি সবচেয়ে বেশি সন্দেহ করা যায় তোমাকে।
আমাকে! মানে? বিনায়ক আমার হাত খামচে ধরল। ওর চোখদুটো গোলগোল হয়ে গেছে।
আমি বললাম, কেন করব না? তোমার গল্পটা যদি বিশ্বাস না করি? যদি বলি দোতলা থেকে কোনো আর্তনাদ ভেসে আসেনি। তুমি দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে ঘুমন্ত রিনচেংকে খুন করেছ। এছাড়া এই মুহূর্তে আর কোনো এক্সপ্ল্যানেশন তো মাথায় আসছে না।
এক্সেলেন্ট স্যার, এক্সেলেন্ট। এই আপনার বিবেক? আপনি কি… আপনি কি মানুষ?
মানুষই, তবে একটু নিস্পৃহ ধরনের মানুষ। যাই হোক, শোনো। উত্তেজিত হ’য়ো না। তোমাকে সন্দেহ করছি না। তুমি আমার বন্ধু বলে করছি না, তা নয়। কয়েকটা ঘটনা ইন্ডিকেট করছে যে, তুমি খুনটা করনি…
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই খোলা দরজার দিকে চোখ পড়ল। চেঁচিয়ে উঠলাম— কে? কে? ওখানে? আমার চিৎকার শুনে আমাদের সঙ্গী সেই ছেলেটা আর বিনায়ক একসঙ্গে দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে গেল। কিছুক্ষণ আঁতিপাঁতি করে এদিক-সেদিক খুঁজে এসে বলল, কই কাউকে তো দেখতে পেলাম না।
পাজলড হয়ে বললাম, তাই? তাহলে কী ভুল দেখলাম? স্পষ্ট মনে হল একটা রোমশ জানোয়ার যেন… যাগগে, চলো। আমরা এবার ফিরি। ভাই তুমি কাউকে বলো এই দরজাটায় তালা দিয়ে রাখতে।
ছেলেটা বাধ্যর মতন ঘাড় হেলাল। আমি আর বিনায়ক সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে এলাম।
বড় লামা আর নিংমা শেরপা দুজনেই আমাদের দেখে জমায়েত ছেড়ে উঠে এল। নিংমা বলল, ধরতে পারলেন নাকি রিনচেঙের খুনিকে?
আমি ভ্যাবলার মতন মুখ করে মাথা নাড়লাম। বললাম, জীবনে এই প্রথম এমন আশ্চর্য সিচুয়েশনের মধ্যে পড়লাম, বুঝলেন নিংমাভাই। একটা পাথরের সিন্দুকের মতন ঘর। ভেতর থেকে দরজা বন্ধ। অথচ সেই ঘরের ভেতরে একজনকে পিঠে ছুরি মেরে খুন করা হল। নাঃ। সত্যিই বলছি, আমার মাথায় কিছু ঢুকছে না।
আমার কথা শুনে নিংমা আর বড় লামার মুখের পাথুরে ভাব একটু নরম হয়ে এল। নিংমা বলল, আমাদের কয়েকজন লোক সান্দাকফুর দিকে রওনা হয়ে গেছে। সান্দাকফু থেকে মোবাইলের টাওয়ার পাওয়া যায় জানেন নিশ্চয়ই। তার মানে এতক্ষণে হয়তো সুরেশ তামাংসাহেব ছোট লামার মৃত্যুর খবরও পেয়ে গেছেন। কাল ভোরেই উনি বডি নিয়ে যাওয়ার জন্যে চলে আসবেন। আপনারা দুজনেও ওদের সঙ্গেই ফিরে যান।
আমি বললাম, নিশ্চয়ই। আর এখানে থেকে কী করব? একটা খুনের রহস্যের জট ছাড়াতে এসেছিলাম। উলটে আরেকটা হত্যার জটে জড়িয়ে পড়লাম। ঠিক আছে গুরুজী, আবার পরে কখনো দেখা হবে। আর আমার এই ভাইটি যদি কর্তব্যের খাতিরে আপনাদের সঙ্গে কোনো দুর্ব্যবহার করে থাকে তাহলে ওকে ক্ষমা করে দেবেন।
বড় লামা বললেন, না না, সে কী কথা? ক্ষমার প্রশ্ন আসছে কোথা থেকে? উনি তো ওর ডিউটিই করেছেন। যাই হোক, মিস্টার চৌবে। আপনি বুজুর্গ আদমি। আপনি একটু সজ্জন আগরওয়ালাকে বোঝাবেন, ইয়েতির অভিশাপ নিয়ে আমরা যা বলেছিলাম, তা মিথ্যে নয়। উনি যেন এখানে রিসর্ট বানানোর প্ল্যানটা এবারে ক্যানসেল করেন।
বললাম, নিশ্চয় বলব। আচ্ছা চলি। গুডনাইট।
নিংমার বাড়িতে আমাদের জন্যে নির্দিষ্ট ঘরটায় পৌঁছনোর আগে অবধি বিনায়ক একটাও কথা বলল না। পুরো রাস্তাটাই গুম হয়ে হাঁটলো। ঘরে ঢুকে দেখলাম, আমাদের দুজনের রাতের খাবার টেবিলে ঢাকা দেওয়া রয়েছে। আমি কিছু খেলাম না। বিনায়ক কোনোরকমে ঠান্ডা তরকারি দিয়ে দুটো রুটি গলাধঃকরণ করল। তারপর একটা চেয়ার টেনে নিয়ে আমার মুখোমুখি বসে বলল, এবার বলুন তো স্যার, কোন-কোন কারণে আপনি আমাকে আপনার সন্দেহের আওতা থেকে বাদ দিলেন।
আমি বললাম, এক নম্বর, তুমি দরজা ভেঙে ঢোকার পরেও রিনচেং তোমাকে খুনের সহজ সুযোগ দেওয়ার জন্যে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে রয়েছে, এটা জাস্ট ভাবা যাচ্ছে না। দরজার পাল্লায় প্রথম ধাক্কাটার সঙ্গে সঙ্গেই যে কেউ বিছানা ছেড়ে উঠে আসত। ভেতর থেকে দরজা চেপে ধরত। বাঁচার জন্যে মরিয়ার মতন স্ট্রাগল করত আর সারা ঘরে সেই স্ট্রাগলের চিহ্ন ছড়িয়ে থাকত। এখানে তেমন কিছু দেখলাম না। তার মানে, মোস্ট প্রোব্যাবলি, তুমি ঘরে ঢোকার আগেই ওর মৃত্যু হয়েছিল। আর দুই, নিস্তব্ধ রাত্তিরে একটা আর্তনাদ, তারপরে তিনবার কাঠের দরজার ওপরে তোমার শোলডার-চার্জিং- এর আওয়াজ— এত শব্দের পরেও বড় লামা ঘর থেকে বেরোননি। উনি বেরিয়েছেন, যখন তুমি নিংমাকে তাড়া করে গুম্ফা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছ, তখন উনি এত দেরি করলেন কেন?
বিনায়ক অবাক হয়ে বলল, সত্যিই তো। কেন?
উত্তর না দিয়ে ঘড়ি দেখলাম। রাত দুটো। বললাম, মন বলছে কাল খুব ভোরে উঠে পড়তে হবে আমাদের। শুয়ে পড় বিনায়ক। আমি সন্ধেবেলায় অনেকক্ষণ ঘুমিয়ে নিয়েছি। এবার ওই চেয়ারটায় বসে একটু ভাবব।
হ্যারিকেনের আলোটাকে ঢিমে করে দিয়ে জানলার ধারে চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসলাম। একটু বাদে বিছানা থেকে বিনায়কের আক্ষেপ শুনতে পেলাম—এই প্রথম উমাশঙ্কর চৌবেকে হেরে যেতে দেখলাম।
আর কোনো কথা বলল না। ঘুমিয়ে পড়েছিল নিশ্চয়।
আমি সারা রাত ঘুমোইনি। বিনায়ককে অনেকবার বলেছি, ব্লু, এভিডেন্স এসব দিয়ে কোনো ক্রাইমকে পুরোটা বোঝা যায় না। বুঝতে হয় কল্পনা দিয়ে। ডিটেকটিভকে মনে-মনে ক্রিমিনাল হয়ে যেতে হয়। ক্রিমিনালের চোখ দিয়ে ক্রাইমের সময় ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোকে আবার রি-কনস্ট্রাক্ট করতে হয়।
রাত যেটুকু বাকি ছিল, আমি বসে-বসে সেই অসম্পূর্ণ চিত্রনাট্যটাই তৈরি করলাম। কাল ভোরে সুরেশ তামাং এখানে পৌঁছলে ওকে সবটাই বলতে হবে তো।
.
ভোর হল। পৃথিবীর অপরূপতম ভোরগুলোর মধ্যে একটা। জানলার শার্সির সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। হাতের তালু দিয়ে কাচের গায়ে জমে থাকা ভাপের পাতলা চাদরটা মুছে দিতেই দেখতে পেলাম ছাইয়ের স্তূপের মতন পাহাড়গুলোর একদম চুড়োর কাছটায় কে যেন একটা করে সিঁদুরের ফোঁটা পরিয়ে দিয়ে চলে গেছে। পাখিগুলোও কম্পিটিশনে নেমেছিল কে কত মিষ্টি করে গান গাইতে পারে। দিগন্ত থেকে নীচে চোখ নামিয়ে দেখলাম, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের উর্দি গায়ে আটজন লোক সামনের রাস্তা ধরে হেঁটে আসছে। ডাক দিলাম, বিনায়ক! উঠে পড়ো। সুরেশ আর তার টিম এসে গেছে।
সুরেশ আমাদের ঘরে ঢুকল। তবে তার আগে ওর সহকর্মীদের নির্দেশ দিল গুম্ফায় চলে যেতে। ওদের মধ্যে দুজন একটা ভাঁজ করা স্ট্রেচার বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। বুঝতে পারলাম, ফালুট অবধি ছোট লামার ডেডবডি ওই স্ট্রেচারে করেই নিয়ে যাওয়া হবে।
সব কাজ সারা হলে সুরেশ আমার মুখের দিকে তাকাল এবং যাকে বলে আঁতকে উঠল। বলল, এ কী অবস্থা হয়েছে স্যার আপনার চোখমুখের! শরীর খারাপ?
ওকে সংক্ষেপে বললাম কালকের অসুখের অগ্রপশ্চাৎ এবং তার সঙ্গেই বললাম ছোট লামার অলৌকিক মৃত্যুর পটভূমি। সুরেশের মুখের অবস্থা দেখে মায়া হচ্ছিল। ও নিজের মনে বিড়বিড় করে বলল, কালকেও লালবাজার থেকে ফোন এসেছিল। আগামীকাল রিপোর্ট সাবমিট করতে হবে। জানি না, কী বলব। এখনো জ্যাকির মৃত্যুর ব্যাপারেই কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারলাম না, তার ওপরে ছোট লামার এই অলৌকিক মৃত্যু।
ইতিমধ্যে বিনায়ক চোখেমুখে জল দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল। তিনজনে বারান্দায় তিনটে চেয়ার টেনে নিয়ে বসলাম। একটু পরেই জিনা এসে ঠকাস ঠকাস করে আমাদের সামনের টি-টেবলে তিন কাপ চা নামিয়ে রেখে চলে গেল। একবারও কারুর মুখের দিকে তাকাল না। মনে-মনে হাসলাম। অবাঞ্ছিত অতিথিকে বিদায় হতে বলার কায়দাটা সারা দুনিয়ায় এক।
নিংমা মনে হয় কাল রাতে আর বাড়ি ফেরেনি। জিনাও ওর চায়ের দোকানের কর্মচারীটিকে নিয়ে বেরিয়ে গেল। আমি গুছিয়ে বসে সুরেশকে বললাম, আমার রিপোর্ট কিন্তু তৈরি ওসিসাহেব। আপনি অনুমতি দিলে পেশ করি।
সুরেশ আর বিনায়ক দুজনেরই মুখ দুটো একসঙ্গে হা হয়ে গেল। সুরেশ বলল, ইজ ইট! আমি তো ভাবলাম আপনিও আমাদের মতন যাকে বলে ঘেঁটে আছেন।
আজ্ঞে না।
জ্যাকি খুন হয়েছিল?
অবশ্যই। খুনি কে?
নিংমা শেরপা।
সুরেশকে জলস্রোতে চালিত প্রেয়ার-হুইলের মেকানিজম সবিস্তারে বোঝালাম। বললাম, মাটির ওপরে যতটা অংশ রয়েছে, মানে পাইন-লগ আর মেটাল-সিলিন্ডার, ওখান থেকে আর কিছু পাবে না। পাইন-লগটায় তাড়াহুড়ো করে আলকাতরা লাগানো হয়েছে। মেটাল-সিলিন্ডারটাও পালিশ করা হয়ে গেছে। তবে আমার ধারণা, মাটির নীচে যে পার্টসগুলো রয়েছে, তার কোনোটায় নিংমা শেরপার তেলকালি মাখা হাতের ছাপ এখনো খুঁজলে পেয়ে যাবে। বাকিটার জন্যে ওকে থানায় বসিয়ে ইনটারোগেট করতে হবে।
সুরেশ একটু অনিশ্চিত-ভঙ্গিতে বলল, ও কি কনফেস করবে?
আমি বললাম, করবে। নিংমা হার্ডকোর ক্রিমিনাল নয়। সাইকোপ্যাথ একটা পার্টিকুলার বিষয়ই ওর মধ্যে খুনের প্রবৃত্তি জাগিয়ে তোলে। ও যদি বুঝতে পারে তুমি সেই বিষয়টা জানো, তাহলেই ও ব্রেক ডাউন করবে।
সুরেশ বলল, আমি! মানে… আমি তো ও ব্যাপারে কিছুই জানি না।
বিনায়ক আমার দিকে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, আপনি জানেন স্যার?
বললাম, জানি বিনায়ক। এই সেই লামা’স সিক্রেট। রিনচেং আমাদের যে গোপন কথাটা বলে যেতে চেয়েছিল। সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। তার আগে দ্বিতীয় খুনের ঘটনাটা যেভাবে রিকনস্ট্রাক্ট করেছি সেটা তোমাদের বলি। নাহলে তোমাদের মাথা থেকে অলৌকিকের ধোঁয়াশাটা কাটবে না।
এ-কথা ঠিক, যেভাবে বন্ধ ঘরের মধ্যে রিনচেং খুন হয়েছে, সেটা ইমপসিবল ক্রাইমের পর্যায়ে পড়ে। কিন্তু সত্যিকারেই তো আর প্রকৃতির দুনিয়ায় অসম্ভব কিছু ঘটে না। যা ঘটে তা প্রকৃতির নিয়ম মেনেই ঘটে। রিনচেং মোটেই বন্ধ ঘরের মধ্যে খুন হয়নি। কীভাবে খুন হয়েছে সেটা বলার আগে বিনায়ককে কয়েকটা কথা জিজ্ঞেস করি।
বিনায়কের চোখেমুখে তক্ষুনি তীব্র কৌতূহল ফুটে উঠল। হি ইজ রিয়েলি আ কীন স্টুডেন্ট অফ ক্রিমিনোলজি। ও সবসময়েই শিখতে চায়। চেয়ারের সামনের দিকে এগিয়ে এসে, হাতের দুই তালুর মধ্যে চিবুক রেখে বলল, আই অ্যাম রেডি। প্লিজ শ্যুট।
আমি বললাম, গতকাল রাত ন’টা নাগাদ মনাস্ট্রির পেছনের অন্ধকার বারান্দায় দাঁড়িয়ে তুমি যে-মুহূর্তে আর্ত চিৎকারটা শুনতে পেয়েছিলে, তুমি ধরেই নিয়েছিলে ওটা রিনচেঙের আর্তনাদ। কারণ তুমি জানতে রিনচেং দোতলায় ইয়েতির ঘরে ঘুমোয়। তাই না?
হ্যাঁ স্যার।
একইভাবে ইয়েতির ঘরের দরজায় দু-চারবার নক করার পরেও যখন সাড়া পেলে না, তখন তোমার মনে হল দরজাটা ভেঙে ফেলা জরুরি। কারণ, ছোট লামা নিজেই আমাদের বলেছিল, ও বিপদের আশঙ্কা করছে। কাজেই তুমি দরজা ভেঙে ফেললে।
হ্যাঁ স্যার।
অর্থাৎ তুমি যাই করছিলে, করে চলেছিলে পূর্ব-অনুমানের ভিত্তিতে। ইংরিজিতে যাকে বলে প্রি-কনসিভড নোশনস। একইভাবে দরজা ভাঙার পরে যখন তুমি দেখলে লাল আলখাল্লা গায়ে দিয়ে মুণ্ডিতমস্তক শীর্ণকায় এক ব্যক্তি উপুড় হয়ে পড়ে আছে এবং তার পিঠের মাঝখানে একটা কিছু খাড়া হয়ে রয়েছে, তখনই তোমার মনে হল ওটা রিনচেং না হয়ে যায় না। রিনচেং খুন হয়েছে। আমি জানি বিনায়ক, তোমার অবজার্ভেশন-পাওয়ার মারাত্মক আলখাল্লাটার রং যদি লাল না হয়ে অন্য কিছু হত, তাহলে তুমি দেখতে পেতে ওই পোশাকে কোনো রক্ত লেগে নেই। এক্ষেত্রেও তোমার প্রি-কনসিভড নোশনস তোমাকে বলেছিল, রক্তের দাগ আছে। আলখাল্লার লাল রঙের সঙ্গে মিশে আছে।
বিনায়ক কোনো উত্তর দিল না, শুধু ওর চোখ দুটো একটু বড় হয়ে গেল।
তুমি আর এগিয়ে গিয়ে মৃতদেহটাকে কাছ থেকে দেখার চেষ্টা করলে না। তুমি ভাবলে না, ওই গুম্ফায় আরেকজন থাকে, যে ঠিক একইরকম লম্বা, রোগা এবং যার মাথাও কামানো। উপরন্তু যার পোশাক ওই একই— লাল আলখাল্লা।
সুরেশ এবং বিনায়ক একসঙ্গে বলে উঠল— বড় লামা!
এগজ্যাক্টলি
আবার ওরা দুজনে একসঙ্গে কথা বলে উঠল— কিন্তু তিনি তো বহাল তবিয়তে বেঁচে আছেন।
আমি কোথায় বললাম, তিনি মারা গেছেন? তিনি শুধু একটা আধো অন্ধকার ঘরে, কম্বলের স্তূপের মধ্যে শরীরের অনেকটা ঢুকিয়ে উপুড় হয়ে শুয়েছিলেন এবং পিঠের মাঝখানে কম্বলের ভাঁজের মধ্যে কোনোভাবে আটকে রেখেছিলেন গুপ্তির খালি খাপটাকে— যেটার সঙ্গে নাকি গুপ্তির হাতলের চেহারায় কোনোই তফাত নেই। তুমি একপলক দেখে ধরে নিলে হাতলটা শরীরের বাইরে জেগে আছে আর ফলাটা ঢুকে গেছে পিঠের মাংসের ভেতরে। তিনি আরেকটা কাজ করেছিলেন। ওইভাবে শুয়েই তিনি গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠেছিলেন।
সেই চিৎকার শুনে তুমি দৌড়ে উঠে গেলে দোতলায় এবং ইয়েতির ঘরের দরজা ভেঙে ফেললে। মোবাইল-ফ্ল্যাশলাইটের আলোয় ঘরের চারিদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলে। তোমার মনে হল বন্ধ এবং জনশূন্য ঘরের ভেতরে খুন হয়েছে রিনচেং। তোমার এই মনে হওয়াটা খুব জরুরি ছিল ওদের জন্যে। ওরা চেয়েছিল তোমার মতন একজন পুলিশ অফিসারের সাক্ষ্য থেকেই উঠে আসুক ইয়েতির অলৌকিক ক্ষমতার প্রমাণ।
কিন্তু ওদের সমস্যা হত, যদি তুমি তার পরে ঘরে ঢুকে মৃতদেহের মুখ দেখতে যেতে। কাজেই ঠিক সেই মুহূর্তে সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে তোমাকে টেনে নিয়ে উলটোদিকে চলে গেল নিংমা।
ছোটবেলায় ফুটবল খেলেছ নিশ্চয়। ধরো মিডফিল্ডারের পায়ে বল। সে নিজের টিমের ফরোয়ার্ডদের পজিশন নেওয়ার জন্যে একটু অপেক্ষা করছে। দেখছে কাকে পাস দেওয়া যায়। ঠিক তখনই একজন ফরোয়ার্ড হঠাৎ বল-ছাড়াই গোলের দিকে দৌড় শুরু করল। বিপক্ষের ডিফেন্ডাররা ভাবলো বলটা ওর কাছেই যাবে। ওরা যখন তাকে আটকাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল তখন মিডফিল্ডারের কাছ থেকে একটা নিখুঁত পাসে বলটা গিয়ে পৌঁছলো একদম ফাঁকায় দাঁড়িয়ে থাকা অন্য একজন ফরোয়ার্ডের পায়ে। সে গোল দিয়ে চলে এলো। প্রথম ফরোয়ার্ডের ওই দৌড়টাকে ফুটবলমাঠের পরিভাষায় বলে “ডামি রান’। নিংমা শেরপা কাল রাতে ডামি-রান দিয়ে তোমাকে উলটোদিকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। গোল-মাউথ ফাঁকা পড়েছিল বড় লামার জন্যে।
বিনায়ক খুব চাপাগলায় জিজ্ঞেস করল, কী করেছিলেন বড় লামা? ওর হাবভাব দেখে বুঝতে পারছিলাম, বড় লামা যে কী করেছিলেন সেটা ও এবার নিজেও অনেকটা আন্দাজ করতে পারছে।
বললাম, একতলায় বড় লামার ঘরে কাল বড় লামা শোননি। উনি শুয়েছিলেন দোতলায় ইয়েতির ঘরে। বড় লামার ঘরে শুয়েছিল, রিনচেং। আমার কাছে প্রমাণ আছে। রিনচেং একতলা থেকে বড় লামার ওই চিৎকার এবং তারপরেই তোমার দরজা ভাঙার শব্দ নিশ্চয় শুনেছিল। কিন্তু ও বুঝতে পারেনি ঠিক কী ঘটছে। ও প্রাণভয়ে বন্ধ দরজার আড়ালে লুকিয়েছিল আর দরজার ফাটলে চোখ রেখে বুঝবার চেষ্টা করছিল, কী হয়েছে। তারপর যে- মুহূর্তে ও দেখল তুমি নিংমাকে তাড়া করে নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছ তখন ও কিছুটা নিরাপদ বোধ করল এবং ঘর থেকে বেরিয়ে এসে তোমাকে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে। তুমি ভাবলে প্রশ্নটা করলেন বড় লামা।
এটা ঠিক যে রিনচেং বড় লামার ধ্যানঘর থেকেই বেরিয়ে এসেছিল। কিন্তু তুমি দুটো জিনিস ভাবলে না। এক, বড় লামা তোমাকে প্রশ্নটা করতেন বাংলায়, নেপালিতে নয়। আর দুই, বড় লামা সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেলে কাঠের খড়মের শব্দ পেতে। তুমি যেমন বলেছ তেমন নিঃশব্দে উনি উঠতে পারতেন না।
বিনায়ক অনুশোচনার ভঙ্গিতে ডাইনে-বাঁয়ে দুবার মাথা নাড়ল।
এবার যা বলব সেটা পুরোটাই আমার কল্পনা। তবে একমাত্র এভাবেই ঘটনাটা ব্যাখ্যা করা যায়। রিনচেং ইয়েতির ঘরে ঢুকে বড় লামার শরীরের ওপর ঝুঁকে পড়ল। ও-ও ভেবেছিল বড় লামা খুন হয়েছেন। ও ঝুঁকে পড়ামাত্রই বড় লামা বিদ্যুতগতিতে উপুড় থেকে চিৎ হয়ে গেলেন। দুটো হাতকে ঘুরিয়ে নিয়ে এলেন ছোট লামার পিঠের ওপরে। তার মধ্যে একটা হাতে আগে থাকতেই ধরা ছিল গুপ্তির হাতল। এবার দু-হাতের মুঠোয় সেই হাতলটাকে চেপে ধরে, তিনি খোলা ফলাটাকে সজোরে বসিয়ে দিলেন ছোট লামার পিঠের মাঝখানে। দু’বার ঠিক জায়গায় লাগলো না। তৃতীয়বারে ছোট লামা রিনচেং লুটিয়ে পড়ল। ছোট লামা কি চিৎকার করে উঠেছিল? জানবার উপায় নেই। কারণ তখন গুম্ফার মধ্যে দুজন লামা ছাড়া আর কেউ ছিল না।
তারপর বড় লামা রিনচেঙের প্রাণহীন শরীরটাকে নিজের বুকের ওপর থেকে সরিয়ে, বিছানা থেকে নেমে এলেন। দাঁড়িয়ে রইলেন ঘরের বাইরে। এতক্ষণে ইয়েতির ঘরে সত্যিকারেই একটা মৃতদেহ এল, যার পিঠের মধ্যে দিয়ে ঢুকে গেছে সত্যিকারের গুপ্তির ফলা।
আমি কথা শেষ করলাম। সুরেশ আর বিনায়ক দুজনেই কিছুক্ষণ থম হয়ে বসে রইল। তারপর বিনায়ক বলল, শুধু একটা কথাই বুঝতে পারছি না, স্যার। কাল ওদের দুজনের শোয়ার জায়গা ওলোটপালোট হয়ে গেল কেমন করে?
সুরেশ বলল, আমারও একটা প্রশ্ন আছে। আপনি একটু আগে বলেছিলেন নিংমার মনে খুনের প্রবৃত্তি জেগে ওঠে একটা পার্টিকুলার বিষয় নিয়ে। সেটা কী?
আমি বললাম, তোমাদের দুজনের প্রশ্নের উত্তরই আমি দিতে পারছি, কারণ রিনচেং উত্তরগুলো আগেই দিয়ে গেছে। নাহলে পারতাম না। এই বলে আমি জ্যাকেটের পকেট থেকে একটা কাগজ বার করলাম।
ওটা কী? কোথায় পেলেন?
রিনচেঙের মোজার মধ্যে। ও যে আমাদের জন্যে কিছু লিখে রেখে যাবে এ ব্যাপারে মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম। সাধারণত কোনো মানুষ যখন মৃত্যুর আশঙ্কা করে, অথচ তার কিছু জানিয়ে যাওয়ার থাকে, তখন সে সেটাকে লিখেই রাখে। আর ওই শত্রুপুরীর মধ্যে রিনচেং তো আর সেই গুপ্তকথা দেওয়ালের ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখবে না, রাখবে নিজের পোশাকের মধ্যে কোথাও। তাই কাল তুমি, আমি আর সেই বিজয় বলে ছেলেটা যখন ইয়েতির ঘরে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম, তখন হঠাৎই চেঁচিয়ে উঠেছিলাম— কে? কে ওখানে?
তোমরা ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরে প্রথমেই রিনচেঙের মোজা দুটোর ওপরে হাত বুলিয়ে দেখেছিলাম। ও তো ঘুম থেকে উঠে এসেছিল। তাহলে পায়ে মোজা পরেছিল কেন, সেটা আগেই আমাকে ভাবিয়ে তুলেছিল। তাহলে কি মোজার মধ্যে দামি কিছু আছে? যাই হোক, আমার আন্দাজ ভুল হয়নি। তোমরা ঘরে ফিরে আসার আগেই এটা হস্তগত করে লুকিয়ে ফেলি।
সুরেশ জিজ্ঞেস করল, কী লেখা আছে ওই কাগজে?
প্রথমে লেখা আছে, বড় লামা গতকাল রিনচেং-কে নিজেই একতলার ধ্যানঘরে শুতে বলেছিলেন। আসলে বলেছিলেন, কিছু পুরনো পুঁথির নকল তৈরি করে রাখতে, যেগুলো নাকি উনি লাদাখের কোনো একটা মঠে পাঠানোর কথা ভাবছেন। বুঝতেই পারছ, এটা একটা অছিলা ছাড়া কিছু নয়— ঘর বদলাবদলি করার অছিলা। রিনচেং চালাকিটা ধরতে পারেনি। ও ভেবেছিল ভালোই হল। এই সুযোগে একটা বহুদিন ধরে চলে আসা মিথ্যের কথা ও আমাদের জন্যে লিখে ফেলতে পারবে। এই হল বিনায়কের প্রশ্নের উত্তর।
আর দ্বিতীয় যে কথাটা লিখেছে, সেটার মধ্যে থেকে যদিও সুরেশের প্রশ্নের উত্তর বেরিয়ে আসবে, তবু সেটা এমনই অবিশ্বাস্য, এমনই হাড় হিম করে দেওয়া একটা তথ্য যে, বিশ্বাস করতে মন চায় না। মনাস্ট্রির পুরনো পুঁথি ঘাঁটতে গিয়ে মাত্র কয়েকদিন আগে রিনচেং এই গোপন কথাটা জেনে ফেলে। ইয়েতির হাতের হাড় বলে যে হাতটাকে গত আশি বছর ধরে এই মনাস্ট্রি থেকে প্রচার করা হচ্ছে সেগুলো আসলে নিংমার দাদু তাকদেন শেরপার ডানহাতের হাড়।
তাকদেন শুধুই একজন অসাধারণ শিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন বন-গোষ্ঠীর তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের ওপরে একজন অথরিটি। তাঁর মনে হয়েছিল, তিব্বতের যে-তন্ত্রবিদ্যা পরবর্তীকালে অতীশ দীপঙ্করের সময়ে বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল, এই গুম্ফার দেওয়ালে তার মূল আরাধ্য কিছু দেবদেবীর মূর্তি আলাদা করে খোদাই করে রাখা উচিত। এ ব্যাপারে তিনি ধরমশালা কিংবা লাদাখের বন-গোষ্ঠীর প্রধান পুরোহিতদের বারনও শোনেননি।
লাদাখের বনগোষ্ঠীর মহাসঙ্ঘ তখন ঘোষণা করে, তাকদেন শেরপা একজন ডাইন, মানে উইজার্ড। সেই অপরাধে তাঁকে মৃত্যুদণ্ডও দেওয়া হয়।
তখনকার গুম্ফার সাধুরা তাকদেনের দেহটা যে কোথায় লোপাট করে
দিয়েছিল, সেটা কেউ জানে না। বজ্রপাতের রটনাটা একেবারেই মিথ্যে। হয়তো সাম্পা-নদীর জলেই ভাসিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু লাদাখের মহাসঙ্ঘের নির্দেশ ছিল তাঁর ডানহাতের হাড়টাকে যেন এই গুম্ফায় রেখে দেওয়া হয়। কারণ একটাই— ডাইনের ওই হাত থেকে যাতে দ্বিতীয় কোনো ডাইন জন্মাতে না পারে বৌদ্ধ দেবদেবীরা সেটা দেখবেন।
রিনচেং লিখেছে, আশি বছর আগে সাম্পা ছিল হাতে গোনা কয়েকজন মেষপালকের আস্তানা। তখনো জায়গাটা পুরোদস্তুর গ্রামের চেহারা নেয়নি। তবু তখনকার মনাস্ট্রির পরিচালকেরা ভয় পেয়েছিলেন, যদি সেই মেষপালকেরাই ধর্মের নামে এই নিষ্ঠুরতা বরদাস্ত না করে। যদি তারা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে।
যখন ভাবছি যে ওই মানুষটাই আশি বছর আগে সদ্য মেষপালক থেকে চাষি হয়ে ওঠা লোকগুলোর জন্যে ওয়াটার-মিল বানিয়ে দিয়েছিলেন, তখন গুম্ফার সাধুদের এই আশঙ্কাটা উড়িয়ে দিতে পারছি না। গ্রামের লোকেদের মধ্যে তাকদেনের জন্যে একটা শ্রদ্ধার আসন ছিল নিশ্চয়ই।
আরো একটা ভয় ছিল গুম্ফার পরিচালকদের মনে। যদি গ্রামবাসীরা এই নিষ্ঠুরতা দেখে বন গোষ্ঠির বৌদ্ধধর্মের প্রতি বিমুখ হয়ে ওঠে।
তাই প্রথম থেকেই প্রচার করে দেওয়া হল, ওই হাড় আসলে ইয়েতির হাড়। যখন যিনিই গুম্ফার প্রধান লামা হতেন, তিনি আসল ইতিহাস জেনেই কাজে যোগ দিতেন। তবে তাকে মন্ত্রগুপ্তির শপথ নিতে হত। ইয়েতির হাড় যে আসলে ইয়েতির হাড় নয়, তাকদেন নামে এক বিদ্রোহী শিল্পীর হাতের হাড়, এ কথা তাঁরা নিজের উত্তরসূরিকে ছাড়া আর কাউকেই বলতে পারতেন না।
নিজের ক্ষমতা নির্বিঘ্ন রাখার জন্যে লামা সামডুপ প্রথম এই শপথ ভাঙলেন। সজ্জন আগরওয়ালা যখন বড় লামার আসন টলিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিল তখনই তিনি নিংমাকে জানিয়ে দিলেন সব কথা। বললেন, ওই হাড়ের সম্মান আসলে তোমার বংশের সম্মান। ওই হাড়কে যদি আজ সজ্জন আগরওয়ালার ঠিকাদারেরা এদিক থেকে ওদিকে টানাটানি করে নিয়ে যায়, তাহলে গ্রামবাসীদের মনে ওর আর কোনো মর্যাদা থাকবে না। তুমি পূর্বপুরুষের মর্যাদা রক্ষা করো, আমি তোমাকে সাহায্য করব।
গুম্ফার বড় লামার মতন একজন প্রাজ্ঞ মানুষের মুখ থেকে ক্রমাগত এই কথা শুনে নিংমা হিপনোটাইজড হয়ে গেল। ওর মনে হল, তাই তো! সত্যি হোক কিংবা মিথ্যে হোক, জেনে হোক কিংবা না জেনেই হোক, আমার দাদুর দেহাবশেষই তো এতদিন পুজো পেয়ে আসছিল।
এই মান মর্যাদা রক্ষা করা শুধু নয়, তাকে আরো বাড়িয়ে তোলার লক্ষ্যে দুটো খুন হল। প্রথমবার জ্যাকি সুব্বাকে খুন করল নিংমা। বড় লামা সব জেনেও মুখ বুজে রইলেন। দ্বিতীয়বার ছোট লামাকে খুন করলেন লামা সামডুপ। তাঁকে সবরকমে সাহায্য করল নিমা
আমি রিনচেঙের শেষ চিরকুটটা সুরেশের হাতে তুলে দিয়ে বললাম, এভিডেন্স হিসেবে এটা কাজে লাগবে। বাকিটা ওই যে বললাম, তোমার ইন্টারোগেশনের ওপর নির্ভর করছে। তবে আমি আবারও বলছি, নিংমা কো- অপারেট করবে। এইসব সাইকোপ্যাথরা নিজেদের দুষ্কর্ম নিয়ে বেশিরভাগ সময়েই গর্ব অনুভব করে। লুকোতে চায় না। বুক বাজিয়ে বলতেই চায়।
.
মোটামুটি এই ছিল সাম্পা-গ্রামে আমার চারদিনের ভ্রমণকাহিনি; যদি আপনারা একে ভ্রমণ বলে মানতে চান।
সেদিন আমরা সবাই একসঙ্গেই সাম্পা থেকে জোড়পোখরির দিকে রওনা হয়েছিলাম। আমাদের সঙ্গে ছিলেন দুজন নতুন সহযাত্রী— বড় লামা এবং নিংমা।
জোড়পোখরি থেকে আমি আর বিনায়ক চলে গিয়েছিলাম যথাক্রমে কুচবিহার আর আলিপুরদুয়ারে নিজেদের বাড়ির দিকে। বড় লামা আর নিমা জোড়পোখরি থানার লক-আপে পুলিশের অতিথি হয়েছিলেন।
আমার অনুমানে ভুল ছিল না। শুনলাম, নিংমা সবকিছুই কনফেস করেছে। তাই এখনো ওই দুজনে জেলের ভাতই খাচ্ছে।
সুরেশ ওদের এগেনস্টে যে চার্জশিট জমা দিয়েছে, বড়কর্তারা নাকি তার মধ্যে ভয়ঙ্কর বুদ্ধিমত্তার ছাপ দেখেছেন। সুরেশ বড়কর্তাদের বলেছিল, এসবই উমাশঙ্কর চৌবেসাহেবের কৃতিত্ব। আমি কিছুই করিনি।
পুলিশ ডিপার্টমেন্টের এখনকার বড়সাহেবরা অনেকেই আমাকে চেনেন না। তাঁরা যখন প্রশ্ন করেছেন, উমাশঙ্কর চৌবে আবার কে, তখন সুরেশ তাদের সংক্ষেপে বলেছে, একজন মানুষ, যিনি অবসর নেন না।
***
