Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    তিস্তাপারের বৃত্তান্ত – দেবেশ রায়

    August 29, 2025

    অদ্বৈতপ্রকাশ – ঈশান নাগর

    August 29, 2025

    পৃথিবীর ইতিহাস – দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

    August 29, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • 🔖
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    Subscribe
    সাইন ইন
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    গণদেবতা – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এক পাতা গল্প408 Mins Read0

    ২৫. ঢাকের বাজনার শব্দ

    ঢাকের বাজনার শব্দে ভোরবেলাতেই–ভোরবেলা কেন—তখনও খানিকটা রাত্রি ছিল, যতীনের ঘুম ভাঙিয়া গেল। গাজনের ঢাক। পূর্বে চৈত্রের প্রথম দিন হইতেই গাজনের ঢাক বাজিত। গতবার হইতে পাতু দেবোত্তর চাকরান জমি ছাড়িয়া দেওয়ার পর, চৈত্রের বিশ তারিখ হইতে ঢাক বাজিতেছে। ভিন্ন গ্রামের একজন বায়েনের সঙ্গে নগদ বেতনে নূতন বন্দোবস্ত হইয়াছে। শেষরাত্রিতে ঢাকের বাজনাযতীনের বেশ লাগিল। ঢাকের বাজনার মধ্যে আছে একটা গুরুগম্ভীর প্রচণ্ডতা। রাত্রির নিস্তব্ধ শেষ প্রহরে প্রচণ্ড গম্ভীর শব্দের মধ্যেও একটি পবিত্রতার বেশ সে অনুভব করিল। দরজা খুলিয়া সে বাহিরে আসিয়া বসিল।

    সে আশ্চর্য হইয়া গেল;—গ্রামখানায় এই শেষরাত্রেই জাগরণের সাড়া উঠিয়াছে। ভেঁকিতে পিড় পড়িতেছে; মেয়েরা ইহারই মধ্যে পথে বাহির হইয়াছে। হাতে জলের ঘটি। চণ্ডীমণ্ডপে জল দিতে চলিয়াছে। রাঙাদিদি বড় বড় করিয়া তেত্ৰিশ কোটি দেবতার নাম করিতেছে-এখান হইতে শোনা যাইতেছে। জনকয়েক গাজনের ভক্ত স্নান শেষ করিয়া ফিরিতেছে—তাহারা ধ্বনি দিতেছে—বলো শি-বো-শিবো-শিবো-হে! হর-হর বোম্—হর-হর বোম্‌!

    যতীন সকালেই ওঠে, কিন্তু এই শেষরাত্রে সে কোনোদিন ওঠে নাই। পল্লীর এ ছবি তাহার কাছে নূতন। সে যখন ওঠে, তখন রাঙাদিদি ভগবানকে এবং পিতৃপুরুষকে গালিগালাজ আরম্ভ করে। মেয়েদের ঘরের পাট-কাম দেবাচনা শেষ হইয়া গৃহকর্ম আরম্ভ হইয়া যায়।

    অনিরুদ্ধের বাড়ির খিড়কির দরজা খুলিয়া গেল। আবছা অন্ধকারের মধ্যে ছায়ামূর্তির মত উচ্চিংড়ে ও গোবরা বাহির হইয়া গেল। তাহাদের পিছনে বাহির হইয়া আসিল পদ্ম, তাহার হাতেও জলের ঘটি।

    একটানা ক্যাঁ-কোঁ শব্দে একখানা সারবোঝাই গরুর গাড়ি চলিয়া গেল। শেষরাত্রি হইতেই মাঠের কাজ শুরু হইয়া গিয়াছে। সার ফেলার কাজ চলিতেছে। সারের গাড়িতেই আছে জোয়াল লাঙল। সার ফেলিয়া জমিতে লাঙল চষিবে। সেদিনের জলের রস এখনও জমিতে আছে। মাটির বতর এখন চমৎকার, অর্থাৎ রোদ পাইয়া কাদার আঠা মরিয়া মাটি চমৎকার চাষের যোগ্য হইয়াছে। লাঙলের ফাল কোমল মাটির মধ্যে আকণ্ঠ ড়ুবিয়া চিরিয়া চলিবে নিঃশব্দে, নির্বিঘ্নে, স্বচ্ছন্দ গতিতে ছানার তালের মধ্যে ধারালো ছুরির মতন। বড় বড় চাই দুইপাশে উলটাইয়া পড়িবে; অথচ লাঙলের ফালে এতটুকু মাটি লাগিবে না, সামান্য আঘাতেই চাইগুলা গুঁড়া হইয়া যাইবে। গরু মহিষগুলি চলিবে অবহেলায় ধীর অনায়াস গতিতে। এই কর্ষণের মধ্যে চাষীর বড় আনন্দ। অন্তরে অন্তরে যেন আনন্দের রস ক্ষরণ হয়।

    একসঙ্গে সারিবন্দি শোভাযাত্রার মত হাল গেল ছয়খানা; পিছনে চারখানা সারবোঝাই গাড়ি। বড় বড় হৃষ্টপুষ্ট সবলকায় হেলে-বলদগুলি দেখিলে চোখ জুড়াইয়া যায়। এগুলি সবই শ্ৰীহরি ঘোষের। ঘোষের ঘরে দশখানা হাল, কুড়ি জন কৃষাণ। ঘোষের সুপ্ৰসন্ন ভাগ্যদ্টার প্রতিফলন তাহার সর্বসম্পদে সুপরিস্ফুট।

    যতীন জামা গায়ে দিয়া বাড়ি হইতে বাহির হইয়া পড়িল। অতিক্ৰম করিয়া আসিয়া পড়িল মাঠে। দিগন্তবিস্তীর্ণ মাঠে। মাঠের প্রান্তে ময়ূরাক্ষীর বাঁধ, বধের গায়ে কচি সবুজ শরবনের চাপ। তাহারই ভিতর হইতে উঠিয়াছে—তালগাছের সারি। মধ্যে মধ্যে পলাশ-পালতে-শিমুল। শিরীষ-তেঁতুলের গাছ। গাছগুলির মাথার উপরে অস্পষ্ট আলোয় উদ্ভাসিত আকাশের গায়ে জংশন-শহরের কলের চিমনী। কলে ভো বাজিতেছে—একসঙ্গে চার-পাঁচটা কলে বাজিতেছে। বোধহয় চারিটা বাজিল।

    মাঠ পার হইয়া সে বাধে উঠিল। বাঁধ হইতে নামিল ময়ূরাক্ষীর চর-ভূমিতে। জল পাইয়া চরে বেনাঘাসগুলি সবুজ হইয়া উঠিয়াছে। তাহারই মধ্যে সযত্নকর্ষিত তার ফসলের জমিগুলির গিরিরঙের মাটি বড় চমৎকার দেখাইতেছে। জমির মধ্যে তরকারির চারাগুলি সাপের ফণার মত ডগা বাড়াইয়া লইতে শুরু করিয়াছে। ভোরবেলায় তিতির পাখির দল বাহির হইয়াছে খাদ্যান্বেষণে। উইয়ের ঢিবি, পিঁপড়ের গর্ত ঠোকরাইয়া উই ও পিঁপড়ে খাইয়া ফিরিতেছে। যতীনের সাড়ায় কয়টা তিতির ফরফর শব্দে উড়িয়া দূরে গিয়া জঙ্গলের মধ্যে লুকাইল।

    আকাশ লাল হইয়া উঠিতেছে। যতীন নদীর বালির উপর গিয়া দাঁড়াইল। পূর্বদিগন্তে চৈত্রের বালুকাগৰ্ভময়ী ময়ূরাক্ষী ও আকাশের মিলন-রেখায় সূর্য উঠিতেছে। কয়েকদিন পরেই মহাবিষুবসংক্রান্তি। ময়ূরাক্ষী এখানে ঠিক পূর্ববাহিনী।

    ময়ূরাক্ষী পার হইয়া সে জংশনের ঘাটে উঠিল। সপ্তাহে দুই দিন তাহাকে থানায় গিয়া হাজিরা দিতে হয়। অন্যান্য দিন সে চা খাইয়া থানায় যায়। আজ ভোরবেলার নেশায় সে বাহির হইয়া এতটা যখন আসিয়ছে; তখন জংশনে হাজিরার কাজটা সারিয়া যাওয়াই ঠিক করিল।

     

    গ্রামের পথে পা দিয়াই যতীন আবার এক হাঙ্গামার সংবাদ পাইল। হাঙ্গামায় হাঙ্গামায় কয়েকদিন হইতেই গ্রামখানার মন্থর জীবনযাত্রা অকস্মাৎ যেন তালভঙ্গ হইয়া গিয়াছে। আজ শ্ৰীহরির বাগানে কে বা কাহারা গাছ কাটিয়া তছনছ করিয়া দিয়াছে। গুজবে, জটলায়, উত্তেজনায় গ্রামখানা চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছে। চণ্ডীমণ্ডপে আটচালায় শ্রীহরি ঘোষ রাগে-দুঃখে অধীর হইয়া প্রায় মাথার চুল ছিঁড়িয়া বেড়াইতেছে। অকস্মাৎ তাহার মধ্য হইতে আজ বাহির হইয়া আসিয়াছে পূর্বের সেই বর্বর ছিরু পাল।

    গ্রাম হইতে অল্প দূরে–উত্তর মাঠে অর্থাৎ যেদিকে ময়ূরাক্ষী নদী—তাহার বিপরীত দিকে, বন্যাভয়-নিরাপদ মাঠের মধ্যে একটা মজা পুকুরে পঙ্কোদ্ধার করিয়া সেই পুকুরের চারিপাশে শ্ৰীহরি শখ করিয়া বাগান তৈয়ারি করিয়াছিল। অতীত দিনের চাষী ছিরুর সৃষ্টির নেশার সঙ্গে বর্তমানের আভিজাত্যকামী শ্ৰীহরির কল্পনা মিশাইয়া বাগানখানি রচিত হইয়াছিল। বহু দামি কলমের বহু চারা আনিয়া পুঁতিয়াছিল শ্ৰীহরি, মালদহ মুর্শিদাবাদ হইতে আমের কলম, কলিকাতা হইতে লিচু-জামরুলের কলম ও নানা স্থান হইতে কানাইবাশি, অমৃতসাগর, কাবুলী প্রভৃতি। কলার চারা সংগ্রহ করিয়া আনিয়াছিল। শুধু ফলের কামনাই নয়, ফুলের নেশাও তার ছিল–অশোক, চাপা, গোলাপ, গন্ধরাজ, বকুলের গাছও অনেকগুলি লাগাইয়াছিল।

    শ্ৰীহরির কল্পনা ছিল আরও অনেক। বাগানের মধ্যে শৌখিন দুই-কামরা একখানি ঘর, ঘরের সামনে পুকুরের দিকে খানিকটা বাঁধানো চত্বর হইতে নামিয়া যাইবে একটি বাঁধানো ঘাটের সিঁড়ি। সেই কল্পনায় কাঁচা ঘাটের দুই পাশে দুইটি কনকচাপার গাছ পুঁতিয়াছিল। অশোক ফুলের চারা বসাইয়াছিল—বাগানে ঢুকিবার পথের পাশেই। গাছগুলি বেশ একটু বড় হইলেই গোড়া বাঁধাইয়া বসিবার স্থান তৈয়ারি করিবার ইচ্ছা ছিল। সন্ধ্যায় সে বন্ধু-বান্ধব লইয়া বাগানে আসিয়া বসিবে, ইচ্ছা হইলে রাত্রে আনন্দ করিবে। গান-বাজনা-পান-ভোজন কঙ্কণার বাবুদের মত।

    গতরাত্রে কে বা কাহারা শ্ৰীহরি ঘোষের সেই বাগানটিকে কাটিয়া তছনছ করিয়া দিয়াছে। শ্ৰীহরি বলিতেছে—চিৎকার করিয়া বলিতেছে—তাদেরও মাথায় কোপ মিরব আমি!

    তাহার ধারণা যাহাদের গাছ সে কাটিয়াছে, এ কাজ তাহাদেরই। পঞ্চপাণ্ডবের প্রতি আক্ৰোশে অশ্বথামা যেমন নিষ্ঠুর আক্রমণে অন্ধকারের আবরণে পাণ্ডব শিশুগুলিকে হত্যা করিয়াছিল তেমনি আক্ৰোশেই কাপুরুষ শত্ৰু তাহার শখের চারা গাছগুলিকে নষ্ট করিয়াছে। শ্ৰীহরি ছাড়িবে না, অশ্বথামার শিরোমণি কাটিয়া সে প্রতিশোধ লইবে। থানায় খবর পাঠানো হইয়াছে। পথে ভূপালের সঙ্গে যতীনের দেখা হইয়াছে।

    হরেন ঘোষাল দস্তুরমত ভড়কাইয়া গিয়াছে। শ্ৰীহরির এই মূর্তিকে তাহার দারুণ ভয়। সে আমলে ছিরু পাল তাহাকে একদিন জলে ড়ুবাইয়া ধরিয়াছিল-ঘাড়ে ধরিয়া মুখ মাটিতে রগড়াইয়া দিয়াছিল। সে ব্রাহ্মণ বলিয়া ভয় করে না, ভদ্রলোক বলিয়া খাতির করে না। যতীন। ফিরিতেই সে শুষ্কমুখে আসিয়া কাছে বসিল, বলিল-যতীনবাবু, কেস ইজ সিরিয়াস! ভেরি সিরিয়াস! ছিরু পাল ইজ ফিউরিয়াস্! হি ইজ এ ডেঞ্জারাস ম্যান!

    জগন ঘোষ খুব খুশি হইয়াছে। সে ইহাকে সর্বোত্তম সূক্ষ্ম বিচারক বিধাতার দণ্ডবিচারের সঙ্গে তুলনা করিয়াছে। থার্ড ক্লাস পর্যন্ত পড়া বিদ্যায় সে আজ দেবভাষায় ইহার ব্যাখ্যা করিয়া দিলষণ্ডস্য শত্ৰু ব্যাঘ্রেন নিপাতিতঃ। অর্থাৎ ষাড়ের শত্ৰু বাঘে মারিয়াছে।

    দেবু বলিলনা ডাক্তার, কাজটা অত্যন্ত অন্যায় হয়েছে। ছিঃ!

    —তোমার কথা বাদ দাও ভাই, তুমি হলে ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির।

    দেবু কোনো উত্তর দিল না; রাগও করিল না। সে সত্য সত্যই দুঃখিত হইয়াছে। ওই গাছগুলি শ্ৰীহরি যত্নে পুঁতিয়াছিল—ফলও সে ভোগ করিত। শ্ৰীহরি তাহার গাছ কাটিয়াছে, তবু দুঃখ সে পাইয়াছিল। কাজটা অন্যায়। গাছপালার উপর তাহার বড় মমতা। ওইসব গাছ বড় হইত, ফুলেফলে ভরিয়া উঠিত প্রতিটি বৎসর; পুরুষানুক্রমে তাহারা বাড়িয়া চলিত। মানুষের চেয়ে গাছের পরমায়ু বেশি। শ্ৰীহরি, শ্ৰীহরির সন্তানসন্ততি তাহার উত্তরাধিকারী। তাহারও পরের পুরুষ ওই গাছের ফলে-ফুলে পরিতৃপ্ত হইত। দেবতার ভোগ দিত, গ্রামে বিলাইত, লোক তৃপ্ত হইত। সে গাছ কি এমনভাবে নষ্ট করিতে আছে?

    ভো শব্দে দৌড়াইয়া আসিয়া উচ্চিংড়ে বলিল—দারোগা এসেছে।

    হরেন চমকাইয়া উঠিল—কোথায়?

    উচ্চিংড়ে তখন বাড়ির মধ্যে গিয়া ঢুকিয়াছে। জবাব দিল গোবরা, সে উচ্চিংড়ের পিছনে ছিল, বলিল—সেই পুকুর দেখে গাঁয়ে আসছে।

    এবার জগনও শঙ্কিত হইয়া উঠিল, বলিল—যতীনবাবু, বেটা নিশ্চয় আমাদের সবাইকেই সন্দেহ করে এজাহার দেবে। পুলিশও বোধহয় আমাদেরই চালান দেবে। জামিনটামিনের ব্যবস্থা কিন্তু আপনাকেই করতে হবে। আপনি কংগ্রেসের সেক্রেটারিকে চিঠি লিখে রাখুন।

    দুর্গা আসিয়া দাঁড়াইল।–জামাই-পণ্ডিত।

    দুৰ্গা দেবু যতীনের তক্তপোশে শুইয়া ছিল, উঠিয়া বসিল। হ্যাঁ। বাড়ি এস।

    কেন রে?

    পুলিশ এসেছে, ঘর দেখবে। ডাক্তার, আপনার ঘরের সামনেও সিপাই দাঁড়িয়েছে। হরেন সর্বাগ্রে উঠিয়া বলিলমাই গড! মায়ের গীতাটা নিয়ে হয়েছে আমার মরণ।

    একজন পুলিশের কনস্টেবল জনতিনেক চৌকিদার লইয়া আসিয়া অনিরুদ্ধের তিন দরজায় পাহারা দিয়া বসিল।

    পথে যাইতে যাইতে দুর্গা বলিল জামাই-পণ্ডিত।

    —কি রে?

    –ঘরে কিছু থাকে তো আমাকে দেবে। আমি ঠিক পেট-অ্যাঁচলে নিয়ে বাইরে চলে যাব।

    –কি থাকবে আমার ঘরে? কিছু নাই!

    বাড়ির দুয়ারে সাব-ইন্সপেকটার নিজে ছিল; সে বলিলপণ্ডিত, আপনার ঘর আমরা সার্চ করব। দুগ্‌গা, তুই ভেতরে যাস নে!

    দুর্গা বলিল—ওরে বাবা, দুধের ঘটি রয়েছে যে দারোগাবাবু! আবার আমাকে নিয়ে পড়লেন। ক্যানে?

    হাসিয়া দারোগা বলিল-তুই ভারি বজ্জাত। কোথায় ঘটি আছে বল চৌকিদার এনে দেবে।

    দেবু বলিল—আসুন দারোগাবাবু। দুর্গা তুই বোস, ঘটি আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি।

    দারোগা বলিল-ঝরঝরে জায়গায় বোস, দুৰ্গা দেখিস–সাপে কি বিয়ে কামড়ায় না যেন!

    দেবু একটা জিনিসের কথা ভাবে নাই।

    পুলিশ বাড়ি-ঘর অনুসন্ধান করিয়া, দা-কুড়ুল-কাটারি বেশ তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে পরীক্ষা করিয়া দেখিল, তাহার মধ্যে গতরাত্রের কচি গাছ কাটার কোনো চিহ্ন আছে কি না। কিন্তু সেসব কিছু। পাওয়া গেল না। কাঁচা কাপড়গুলি পরীক্ষা করিয়া দেখিল—তাহাতে কলাগাছের কষের চিহ্ন আছে কি না। কিন্তু তাও ছিল না। পুলিশ লইল নূতন প্রজা-সমিতির খাতাপত্রগুলি। এই খাতাপত্রগুলির কথাই দেবুর মনে ছিল না। অন্য সকলের বাড়ি হইতে পুলিশ শুধু-হাতেই ফিরিয়া আসিয়াছিল।

    শ্ৰীহরি যতীনের নামেও এজাহার দিয়াছিল—তাহাকেও তাহার সন্দেহ হয়। শ্রীহরির বন্ধু। জমাদার সাহেব হইলে কি হইত বলা যায় না, কিন্তু সাব-ইন্সপেকটার শ্ৰীহরির এ কথা গ্ৰাহ্যই করিল না। বলিল—ঘোষমশায়, সবেরই মাত্ৰা আছে, মাত্রা ছাড়িয়ে যাবেন না।

    এ সংসারে যাহারা আপন সত্যের বিধান লঙ্ন করিতে চায়—বিধাতাকে সবচেয়ে বেশি মানে তাহারাই। বিধাতার তুষ্টিলাভ করিলে সর্বপ্রকার বিধান-লঙ্ন-জনিত অপরাধের দণ্ড লঘু হইয়া যায়—এই বিশ্বাসই তাহাদের জীবনে পরম আশ্বাস। শ্ৰীহরি তাড়াতাড়ি বলিলনানা-না। ওটা আমারই ভুল। ও আপনি ঠিক বলেছেন।

    যাহা হউক, দেবুর ঘর তল্লাশ করার পর দারোগা বলিলপণ্ডিত, আপনাকে আমরা অ্যারেস্ট করছি। আপনি প্রজা-সমিতির প্রেসিডেন্ট, এ কাজটা প্রজা-সমিতির দ্বারাই হয়েছে। বলেই সন্দেহ হচ্ছে আমাদের। অবশ্য এনকোয়ারি আমাদের এখনও শেষ হয় নি; উপস্থিত আপনাকে অ্যারেস্ট করলাম। চার্জটা অবিশ্যি থেফট!

    দেবু বলিল—থে চার্জ—চুরি? আমার বিরুদ্ধে?

    হাসিয়া দারোগা বলিল গাছ কাটা তো আছেই, সেটার সমন করবেন এসডিও। ঘোষের দুটো লোহার তারের জাফরি চুরি গেছে।

    —আমাকে চুরির চার্জে চালান দেবেন দারোগাবাবু? দেবু মর্মান্তিক আক্ষেপের সহিত প্রশ্ন করিল।

    অর্জুনের মত বীরকে সময়-দোষে নপুংসক সাজতে হয়েছিল, জানেন তো পণ্ডিত! ও নিয়ে দুঃখু করবেন না। বেলা তো অনেক হয়ে গেল, খাওয়াদাওয়া সেরেই নিন।

    দারোগার কথায় দেবু আশ্চর্য রকমের সান্ত্বনা পাইল। সে হাসিয়া বলিল—আপনি একটু জল-টল খাবেন?

    –চাকরি পেটের দায়ে পণ্ডিত। খাব নিশ্চয়। তবে আপনার ঘরেও না, ঘোষের ঘরেও নয়। আমাদের যতীনবাবু আছেন। ওখানেই যা হয় হবে।

    দারোগা আসিয়া যতীনের ওখানে বসিল।

    গ্রামের লোকেরা অবনত মস্তকে চারিপাশে বসিয়া ছিল। সকলেই সবিস্ময়ে ভাবিতেছিল–কে এ কাজ করিল।

    মেয়েরা আসিয়া জড়ো হইয়াছে—দেবুর বাড়ি। অনেকে উঠানের উপর ভিড় করিয়া দাঁড়াইয়াছে, কেহ কেহ দাওয়ার উপর বসিয়া পড়িয়াছে। বিলু যেন পাথর হইয়া গিয়াছে। দুর্গার চোখ দিয়া জল গড়াইয়া পড়িতেছে অনর্গল ধারায়। রাঙাদিদির আর বিলাপের শেষ নাই। পদ্ম বসিয়া আছে বিলুর পাশে। বিলুর দুঃখে সেও অপরিসীম দুঃখ অনুভব করিতেছে। মনে হইতেছে—আহা, এ দুঃখের ভার যদি সে নিজে লইয়া বিলুর দুঃখ মুছিয়া দিতে পারি। অবগুণ্ঠনের মধ্যে তাহার চোখ হইতেও টপ টপ করিয়া জল মাটির উপর ঝরিয়া পড়িতেছে।

    অকস্মাৎ ছুটিয়া আসিল উচ্চিংড়ে। লোকজনের ভিড়ের মধ্যে সুকৌশলে মাথা গলাইয়া একেবারে পদ্মের কাছে আসিয়া হাঁপাইতে হাঁপাইতে বলিল—শিগগির বাড়ি এস মা-মণি!

    যতীনের দেখাদেখি সে-ও পদ্মকে মা-মণি বলে।

    পদ্ম বিরক্ত হইয়া ঘাড় নাড়িয়া ইঙ্গিতে প্ৰশ্ন করিল—কেন?—সে অবশ্য বুঝিয়াছে, যতীনের তলব পড়িয়াছে, চাকরিতে হইবে।

    –কম্মকারকে যে দারোগাবাবু ধরে নিয়ে যাচ্ছে গো!

    পদ্মের বুকটা ধড়াস করিয়া উঠিল। তাহার সর্বাঙ্গ থরথর করিয়া কাঁপিতে আরম্ভ করিল। অনিরুদ্ধকে ধরিয়া লইয়া যাইতেছে! সে আবার কি কথা! একা পদ্ম নয়, কথাটায় সকলেই সচকিত হইয়া উঠিল।

    দেবু প্রশ্ন করিল—তার আবার কি হল?

    কম্মকার যে সাউখুড়ি করে বললে—আমাকে ধর হে। আমি গাছ কেটেছি। দারোগা অমনি ধরলে। বলতে বলতেই উচ্চিংড়ে যেমন ভিড়ের ভিতর দিয়া সুকৌশলে মাথা গলাইয়া প্রবেশ করিয়াছিল, তেমনি সুকৌশলেই বাহির হইয়া গেল।

    কোনোরূপে আত্মসংবরণ করিয়া পদ্মও মেয়েদের ভিড় ঠেলিয়া বাহির হইয়া আসিল।

    কামার-বউ! পদ্ম পিছন ফিরিয়া দেখিল, ডাকিতেছে দুর্গা।

    —দাঁড়াও, আমিও যাব।

    উচ্চিংড়ে কথাটা গুছাইয়া বলিতে পারে নাই, কিন্তু মিথ্যা বলে নাই। সত্যই বলিয়াছে। স্তব্ধ জনতার মধ্য হইতে নিতান্ত অকস্মাৎ অনিরুদ্ধ চোখ-মুখ দৃপ্ত করিয়া দারোগার সম্মুখে বুক ফুলাইয়া আসিয়া বলিয়াছিল—দেবু পণ্ডিতের বদলে আমাকে ধর। ও গাছ কাটে নাই, গাছ কেটেছি আমি।

    ডেটিনিউ যতীনের ঘরের দাওয়ায় বসিয়া ছিল দারোগা। তাহার সম্মুখে জমিয়া দাঁড়াইয়া ছিল একটি জনতা। সেই দারোগা হইতে সমবেত জনতা আকস্মিক বিস্ময়ে তাহার মুখের দিকে চাহিল।

    অনিরুদ্ধ বলিয়াছিল—কাল রেতে টাঙি দিয়ে আমি বেবাক গাছ কেটেছি; জাফরি দুটো তুলে ফেলে দিয়েছি চরখাই পুকুরের জলে।

    মিথ্যা কথা নয়। ধারালো টাঙি দিয়া অনিরুদ্ধ তাহাদের গাছ কাটার প্রতিশোধ তুলিয়াছে ছিরু পালের ওপর। উন্মত্ত প্রতিশোধের আনন্দে গাছ কাটিতে কাটিতে সে সেই অন্ধকার রাত্রে নাচিয়া নাচিয়া ঘুটিয়া বেড়াইয়াছে, আর ছোট ছেলেদের মত মুখে বলিদানের বাজনার বোল আওড়াইয়াছে—খা-জ্জিং-জ্জিং-জিনাক-জিং-জিং না-জিং-জিং-জিনাক। এ কথা কেহ জানে না, সে কাহাকেও বলে নাই, এমনকি পদ্মকে পর্যন্ত না। ওই ছেলে দুটাকে লইয়া পদ্ম আজকাল পৃথক শুইয়া থাকে; রাত্রে নিঃশব্দে অনিরুদ্ধ উঠিয়া গিয়াছিল, ফিরিয়াছেও নিঃশব্দে। সকালবেলা হইতে সে ছিকর আস্ফালন শুনিয়া মনে মনে কৌতুক বোধ করিয়াছে, পুলিশ আসিলেও সে একবিন্দু ভয় পায় নাই। ভোরবেলাতেই টাঙ্গিখানাকে সে আগুনে পোড়াইয়া সকল অপরাধের চিহ্নকে নিশ্চিহ্ন করিয়াছে। কাপড়খানাতে অবশ্য কলার কষ লাগিয়াছে—সেখানাকে অনিরুদ্ধ খিড়কির ঘাটে জলের তলায় পুঁতিয়া রাখিয়াছে। কিন্তু যখন দেবু পণ্ডিতকে দারোগা গ্রেপ্তার করিল—তখন সে চমকিয়া উঠিল।

    তাহার মনে একটা প্রবল ধাক্কা আসিয়া লাগিল। এ কি হইল? পণ্ডিতকে গ্রেপ্তার করিল? দেবুকে? এই মাত্র কিছুদিন হইল সে জেল হইতে ফিরিয়াছে। বিনাদোষে আবার তাহাকে ধরিল? এ গ্রামের সকলের চেয়ে ভালমানুষ, দশের উপকারী, তাহার পাঠশালার বন্ধু বিপদের মিত্র দেবুকে ধরিল? জগনকে ধরিল না, হরেনকে ধরিল না, তাহাকে ধরিল না? ধরিল পণ্ডিতকে? জনতার মধ্যে চুপ করিয়া মাটির দিকে সে ক্ষুব্ধ বিষণ্ণ মুখে ভাবিতেছিল। তাহার অপরাধের দণ্ড ভোগ করিতে দেবু-ভাই জেলে যাইবে? সমস্ত লোকগুলিই নীরবে হায়-হায় করিতেছে। আক্ষেপে সে অধীর হইয়া উঠিল। ভাবিতে ভাবিতে সে আর আত্মসংবরণ করিতে পারিল না। একটা অদ্ভুত ধরনের আবেগের প্রাবল্যে দৃপ্ত ভঙ্গিতে সে দারোগার নিকট আসিয়া নিজের হাত বাড়াইয়া বলিল, দেবু পণ্ডিতের বদলে আমাকে ধরা ও গাছ কাটে নাই, গাছ কেটেছি আমি।

    মুহূর্তে সমস্ত জনতা বিস্ময়ে হতবাক হইয়া গেল। একটা স্তব্ধতা থমথম করিতে লাগিল। দারোগা পর্যন্ত অনিরুদ্ধের দিকে বিস্ময়ে বিস্ফারিত দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিল। সেই স্তব্ধ এবং বিস্মিত পরিমণ্ডলের মধ্যে অনিরুদ্ধ সোচ্চারে নিজের সমস্ত দোষ কবুল করিয়া ফেলিল।

    ***

    এ স্তব্ধতা প্রথম ভঙ্গ করিল দেবু। উচ্চিংড়ের কাছ হইতে খবর পাইয়া বাড়ি হইতে ছুটিয়া আসিয়া তাহাকে জড়াইয়া ধরিয়া থরথর কম্পিত কণ্ঠে বলিল, অনি-ভাই, অনি-ভাই,কিছু ভেবো না অনি-ভাই! আমি প্রাণ দিয়ে তোমাকে ছাড়াতে চেষ্টা করব।

    অনিরুদ্ধ উত্তর দিতে পারিল নাগভীর আনন্দে বোকার মত আকৰ্ণবিস্তার হাসিয়া দেবুর মুখের দিকে চাহিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। অকস্মাৎ তাহার চোখ হইতে দরদর ধারে জল গড়াইতে লাগিল। সঙ্গে সঙ্গে দেবুও কাঁদিয়া ফেলিল। তাহার সঙ্গে আরও অনেকে, এমনকি যতীন এবং দারোগা পর্যন্ত চোখ মুছিতে লাগিল। সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের প্রত্যেকেই অনিরুদ্ধকে সাধুবাদ দিল।মানুষের মত কাজ করলে অনিরুদ্ধ এবার! এ একশোবার! শাবাশ, অনিরুদ্ধ, শাবাশ!

    ইহারই মধ্যে একটি উচ্চকণ্ঠ জনতার পিছন হইতে ধ্বনিত হইয়া উঠিল—শাবাশ ভাই শাবাশ! একশোবার শাবাশ!

    বিচিত্র ব্যাপার, এ কণ্ঠস্বর সর্বস্বান্ত ভিক্ষুক তারিণী পালের। উচ্চিংড়ের বাবার। লোকটা কালো, লম্বা, দাঁত উঁচু, খানিকটা ক্ষ্যাপাক্ষ্যাপা। অনিরুদ্ধের এই কাজটির মধ্যে সে কি করিয়া এক মহোল্লাসের সন্ধান পাইয়াছে।

    বাড়ির ভিতরে পদ্ম নির্বাক হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল, চোখ দিয়া তাহার শুধু জলই ঝরিতেছিল। তাহার বাক্য হারাইয়া গিয়াছে, চোখের জল গলিয়া গলিয়া পড়িতেছে। দুর্গা দাঁড়াইয়া ছিল অল্প দূরে। উচ্চিংড়ে ও গোবরা কাছেই ছিল; অনিরুদ্ধ ভিতরে আসিতেই তাহারা সরিয়া গেল। অনিরুদ্ধ এতক্ষণে সপ্রতিভভাবে হাসিয়া সকলের দিকে চাহিয়া বলিল—চললাম তা হলে!

    পদ্মের তখনও ভাত হয় নাই, যতীনেরও অল্প দেরি আছে। দেবু বলিল-আমার জন্য ভাতে-ভাত হয়েছে অনি-ভাই, তাই দুটো খেয়ে নেবে, চল।

    দেবুর ঘরেই খাইয়া অনিরুদ্ধ থানায় চলিয়া গেল।

    যাইবার সময় দারোগা দুর্গাকে একটা তলব দিয়া গেল, থানাতে যাবি একবার। তোর নামেও একটা রিপোর্ট হয়েছে।

    আজ যতীন নিজে রান্না করিল। উদ্যোগ করিয়া দিল উদ্দিংড়ে এবং গোবরা। দূরে দাঁড়াইয়া সমস্ত বলিয়া দিল দুর্গা।

    পদ্ম কিছুক্ষণ ঘরে বসিয়া ছিল, তাহার পর গিয়া বসিল খিড়কির ঘাটে। সেখানে বসিয়া। তীক্ষ্মস্বরে নামহীন কোনো ব্যক্তিকে উদ্দেশ করিয়া তীব্র নিষ্ঠুরতম অভিসম্পাত দিতে আরম্ভ করিল।

    —শরীরে ঘুণ ধরবে, আকাট রোগ হবে। শরীর যদি পাথর হয় তো ফেটে যাবে, লোহার হয় তো চলে যাবে। অলক্ষ্মী ঘরে ঢুকবে লক্ষ্মী বনবাস যাবে। ঘরে আগুন লাগবে, ধানের মরাই ছাইয়ের গাদা হবে।

    মনের ভিতর রূঢ়তর অভিসম্পাতের আরও চোখা-চোখা বাণী ঘুরিতেছিল—বউবেটা মরবে, পিণ্ডি লোপ হবে, জোড়া বেটা এক বিছানায় শুয়ে ধড়ফড় করে যাবে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মনের কোণে উঁকি মারিতেছিল—বিশীর্ণ গৌরবর্ণা এক সীমন্তিনী নারীর অতি কাতর করুণা-ভিক্ষু মুখ। অল্পে অল্পে সে চুপ করিয়া গেল।

    দুর্গা আসিয়া ডাকিল–কামার-বউ, এস ভাই, নজরবন্দিবাবু রান্না নিয়ে বসে আছেন। পদ্ম উত্তর দিল না।

    —খালভরি, উঠে আয় কেনে? পিণ্ডি খাবি না? তোর লেগে আমরাও খাব না নাকি?

    এবার আসিয়া এমন মধুর সম্ভাষণে ডাকিল উচ্চিংড়ে।

    পদ্ম উত্তর দিল—তোরা খা না গিয়ে হতভাগারা, আমি খাব না, যা।

    —খেতে দিছে না যি লজরবন্দিবাবু। তুমি না খেলে আমাদিকে দেবে না। নিজেও খায়। নাই। কৰ্ম্মকার তো মরে নাই—তবে তার লেগে এত কাঁদছিস ক্যানে?

    —তবে রে মুখপোড়া!–পদ্ম ক্রোধভরে তাহাকে তাড়া করিয়া আসিয়া সেই টানে। একেবারে বাড়ি ঢুকিয়া পড়িল।

    ***

    ঊনত্ৰিশে চৈত্র অনিরুদ্ধের মামলার দিন পড়িয়াছে। বিচার করিবার কিছু নাই; সে নিজেই স্বীকারোক্তি করিয়াছে। পুলিশের কাছে করিয়াছিল। হাকিমের কাছেও করিয়াছে। উকিলমোক্তার কাহারও পরামর্শেই সে তাহা প্রত্যাহার করে নাই। সে যেন অকস্মাৎ বেপরোয়া হইয়া উঠিয়াছে। সেই দিনের সর্বজনের বাহবা তাহাকে যেন একটা নেশা ধরাইয়া দিয়াছে। সাজা তাহার হইবেই। দেবু কয়েক দিনই সদর শহরে গিয়াছিল, উকিল-মোক্তারও দেওয়া হইয়াছে। কিন্তু সকল উকিল-মোক্তারে এক কথাই বলিয়াছে। সাজা দুই মাস হইতে ছয় মাস পর্যন্ত হইতে পারে। কিন্তু সাজা হইবে।

    ইহার মধ্যে ইন্সপেকটার আসিয়া একবার তদন্ত করিয়া গিয়াছে। প্রজা-সমিতির সহিত কোনো সংস্রব আছে কি না ইহাই ছিল তদন্তের বিষয়। ইন্সপেকটার তাহার ধারণা স্পষ্টই গ্রামের লোকের কাছে বলিয়া গিয়াছে—প্রজা-সমিতি এ কাজ করতে বলে নাই এটা ঠিক, কিন্তু প্রজা-সমিতি যদি না থাকত গ্রামে, তবে এ কাও হত না। এতে আমি নিঃসন্দেহ।

    দুর্গাকে ডাকা হইয়াছিল—তাহার বিরুদ্ধে নাকি রিপোর্ট হইয়াছে। কে রিপোর্ট করিয়াছে না বলিলেও দুর্গা বুঝিয়াছে। ইন্সপেকটার তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাহার দিকে চাহিয়া প্রশ্ন করিয়াছিল, শুনছি তোর যত দাগী বদমায়েশ লোকের সঙ্গে আলাপ, তাদের সঙ্গে তুই—ব্যাপার কি বল তো?

    দুর্গা হাত জোড় করিয়া বলিল-আজ্ঞে হুজুর, আমি নষ্ট-দুষ্ট—এ কথা সত্যি। তবে মশায়, আমাদের গায়ের ছিরু পাল। জিভ কাটিয়া সে বলিলনা, মানে ঘোষ মহাশয়, শ্রীহরি ঘোষ, থানার জমাদারবাবু, ইউনান বোর্ডের পেসিডেনবাবু—এর সব যে দাগী বদমাশ নোক-এ কি করে জানব বলুন! মেলামেশা আলাপ তো আমার এঁদের সঙ্গে।

    ইন্সপেকটার ধমক দিল। দুর্গা কিন্তু অকুতোভয়। বলিল—আপনি ডাকুন সবাইকে আমি মুখে মুখে বলছি। এই সেদিন রেতে জমাদার ঘোষমশায়ের বৈঠকখানায় এসে আমোদ করতে আমাকে ডেকেছিলেন-আমি গেছিলাম। সেদিন ঘোষমশায়ের খিড়কির পুকুরে আমাকে সাপে কামড়েছিল—পেরমাই ছিল তাই বেঁচেছি। রামকিষণ সিপাইজি ছিল, ভূপাল থানাদার ছিল। শুধান সকলকে। আমার কথা তো কারু কাছে ছাপি নাই।

    ইন্সপেকটার আর কোনো কথা না বাড়াইয়া কঠিন দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া বলিয়াছিল—আচ্ছা আচ্ছা, যাও তুমি, সাবধানে থাকবে।

    পরম ভক্তিসহকারে একটি প্রণাম করিয়া দুর্গা চলিয়া আসিয়াছিল।

    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleনাগিনী কন্যার কাহিনী – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    Next Article ধাত্রী দেবতা – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    Related Articles

    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    গল্পসমগ্র – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 23, 2025
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    হাঁসুলী বাঁকের উপকথা – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 23, 2025
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    রাইকমল – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 23, 2025
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    চৈতালী-ঘূর্ণি – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 23, 2025
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    ধাত্রী দেবতা – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 23, 2025
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    নাগিনী কন্যার কাহিনী – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 23, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Demo
    Most Popular

    তিস্তাপারের বৃত্তান্ত – দেবেশ রায়

    August 29, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    তিস্তাপারের বৃত্তান্ত – দেবেশ রায়

    August 29, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Our Picks

    তিস্তাপারের বৃত্তান্ত – দেবেশ রায়

    August 29, 2025

    অদ্বৈতপ্রকাশ – ঈশান নাগর

    August 29, 2025

    পৃথিবীর ইতিহাস – দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

    August 29, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2025 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    Sign In or Register

    Welcome Back!

    Login below or Register Now.

    Lost password?

    Register Now!

    Already registered? Login.

    A password will be e-mailed to you.