Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    গল্পসংগ্রহ – অজেয় রায়

    লেখক এক পাতা গল্প994 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    বুড়ো মানুষ

    বাড়ির সামনে চৌকোনা জেন্টস রুমালের মতো একটুখানি লন। দুদিক থেকে ঢ্যাঙঢেঙে লম্বা তিন ঠেঙে বাড়িগুলো জিরাফের গলা বাড়িয়ে আছে। যেন সুবিধে পেলেই লনখানাকে খুবলে খেয়ে নেবে। মোয়ারটা পড়ে আছে এক দিকে অনড় অচল হয়ে। কেউই সেটাকে আর চালাতে পারছে না। কেউ বলতে অবশ্য সিনহাসাহেব তিরাশি, এবং তাঁর কুক-কাম-বেয়ারা-কাম-মালি জগদীশ—সাতাত্তর। সিনহাসাহেব, এক্স আই. সি. এস.-এর যত্নের খাওয়া-মাখা শরীর, বংশগতির কৃপাধন্য শরীরের কাঠামো, রঙের মরা-হাতি-লাখ টাকা জেল্লা, সাদা বাবরি চুলে হেয়ার-ক্রিমের অপিচ্ছিল ঝিলিক। শীতের সকালে-বিকালে ঢোলা পাতলুন আর। জোববা কিংবা শার্ট-প্যান্ট-পুলোভার পরা থাকলে বেশ জলুসদার বুড়োই মনে হয়। পাশে সাতাত্তর বছরের জগদীশ বেয়ারা কোমর-বাঁকা, পায়ের ব্যথায় প্রায় ডিঙি মেরে হাঁটনদার। চুল বলতে তিন গাছি, দাঁত বলতে এক পাটি, কিন্তু চাষি বংশের জিনের ঐতিহ্যে জগদীশের স্ট্যামিনা এখনও তিনটে সিনহাসাহেবকে কাত করতে পারে। সুতরাং জগদীশ সিনহাসাহেবের কুক-কাম-বেয়ারা-কাম-মালি, খুঁড়িয়ে হলেও চালিয়ে যাচ্ছে। পঁচিশ বছরের নোকর। রজতজয়ন্তীরই বছর এটা।

    শেয়ালকাঁটা, পাথরকুচি আর দুবেবা ঘাসের বুনটে জংলা হয়ে আছে লনটা। অতএব ডেকচেয়ার পেতে লনে বসার বিকেল-বিলাস, তারও কাল হয়ে এল। সকালের পুবেল রোদ দ্বাদশীর চাঁদ একতলার বারন্দাতে পড়ে। সাজানো, সাফসুতরো এই বারান্দাখানই ইদানীং সবচেয়ে বেশি। আন্দামানি বেতের খানকয়েক শৌখিন চেয়ার, তাতে ঝকঝকে রঙের ভেলভেটের কুশন। তবে এসব চেয়ারে সিনহাসাহেব আর আরাম পান না। তাঁর জন্যে বরাদ্দ আছে ঠাকুরদার আমলের সেগুন কাঠের আরাম চেয়ার। খাঁজ কাটা পেছন দিকে। ইচ্ছেমতো ধাপ কে-ধাপ হেলানো যায়।

    বসেছেন সিনহাসাহেব। এখন ছোটো হাজারি করবেন। পিঠটা নিম সোজা। পাশে ছোটো তেপাইতে ডেনচারের কৌটো। সাহাবের গায়ে ভারী সাটিনের জোববা। ভেতরে দু-তিন দফা পোশাক-আশাক আছে। শীত জানান দিচ্ছে। যাযাবর হাঁসের মতো ট্রাঙ্কো-বাকস থেকে বেরিয়ে পড়েছে—উলিকট, ড্রয়ার, সার্জের শার্ট, স্যুট, টাই, স্লিপোভার, পুলোভার, কাশ্মীরি শাল। মায় কুলুর গরম যাপার। মাসখানেক কি দেড়েক সব সিনহাসাহেবের শীতকাতুরে আদুড় গায়ে ঝুপঝাপ নামবে, বাসা বাঁধবে, ওম দেবে নেবে। তারপর হুশশ। জগদীশ বেয়ারারই হয় ঝঞ্ঝাট। কাচাও রে, রোদে দাও রে, তোলো রে, চোদ্দোবার করে ঝাড়ো, ভাঁজ করো, সোজা হাঙ্গামা নাকি? তবে করবেই বা কে? মেমসাহেব গত হয়েছেন তা আজ বছর দশ না বাবো? বারোই হল বোধ হয়। তা সেই তিনিই সকল কাজের কূটকচালি হাতে ধরে জগদীশকে শিখিয়ে চিনিয়ে গেছেন। শিখিয়েছেন, পাখি পড়া করে পড়িয়েছেন। কেক-পুডিং-শুক্তো-দমপোক্ত-সুপ-ইস্টু রোস্ট, রুপো পেতল ঝকঝকে করার কায়দা, কাঁচ চিনেমাটি সাফ করার কল, খাট-আলামারি-টেবিল-দেরাজ, পাথর-কাঠ-ধাতু তিন-চার-পুরুষ ধরে টুকে টুকে জমে-ওঠা জিনিসপত্তরের দেখভালের যাবতীয় করণকৌশল।

    কাশ্মীরি কাঠের ব্রেক ফাস্ট ট্রে-খানা দু হাতে ধরে নড়বড় নড়বড় করতে করতে জগদীশ কিচিন থেকে বেরিয়ে আসে। সায়েবের পাশ মুখ দেখা যাচ্ছে। চোখে পড়ার চশমা লাগানো, সোনালি চিড়িক মারছে। হাতের ওপর কাগজ, খুলে মেলে ধরেছে।

    ব্রেক ফাস্টো—চেয়ারের কাঠের হাতলের ওপর মাপ করে ট্রে-টা বসিয়ে দেয় জগদীশ।

    চিলিবিলি জোববার ঢোলা হাতার মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসে পাকা লোমলা লোল হাত। শিরার রংগুলো পর্যন্ত ফিকে হয়ে গেছে। মাটিতে ঝরে পড়া শুকনো ডালপালার আঙুল দিয়ে সায়েব টোস্টে মার্মালেট মাখায়। একটা দুটো কামড় দেয়, তা পর প্লেটের ওপর আর কিছু আছে কিনা খোঁজে, হাতড়ায়, যেন জানে না আর কিছু থাকবে না। কী যে ঢং রোজ সায়েবের? ডাক্তার তো সিদিনকেও বলে গেল দটি টোস্ট আর চা, বাস। ছানা খেতে পারো। তার রোজ রোজ কাঁচা ছানা আ মিষ্টি আ-লুনো তেনার মুখে রুচলে তো? মামালেটটা অনেক কষ্টে পারমিট করানো গেছে। এদিকে আবার চড়া প্রেশার, ডিম-ফিমও চলবে না। তা নয়তো, মেম সাহেবের হুকুম ছিল সকালবেলা সাহবকে রোজ ডিম দেবে। কড়া করে সেদ্ধ করে। রোজ।

    চা-টা ঢেলে দে, বিরক্ত গলায় বলে সাহেব।

    কষ্টে কোমর নুইয়ে ফুলকাটা সোনালি বর্ডার বোন চায়নার মধ্যে দু চামচ দুধ ঢালে জগদীশ, তারপর রুপোর পট থেকে চা ঢালতে থাকে। ফোঁটা ফোঁটা পড়ছে চায়ের লিকর ট্রে-ক্লথে। ভুরু কুঁচকে সেদিকে তাকিয়ে আছে সায়েব। চশমাটা পরা থাকায় ঠিকঠাক দেখতে পাচ্ছে না। জগদীশ একেবারেই দেখে না। তার এক চোখে ছানি।

    এ কি? লুঙি পরেছিস কেন? হঠাৎ সায়েবের বিরক্তিটা ফেটে বেরিয়ে পড়ে,–ডিসগাস্টিং!!

    জগদীশের ওপর-গায়ে উর্দি। অনেক দিনের পুরোনো, সুতো-ওঠা। তবু সাফ। কিন্তু কোমরে জড়ানো বাঁদিপোতার গামছার মতো নিখাদ লুঙ্গি। বাঁকা কোমরের উপর লুঙ্গি কষি টেনে বাঁধে জগদীশ।

    পাতলুন আর পরতে পারিনে।

    তা পারবি কেন? দিন দিন যেন… চায়ে আলগা চুমুক দেন সাহেব। জগদীশ জবাব দিল না।

    ডিসগাস্টিং! বললেন সিনহাসাহেব, তারপর নাক কুঁচকে আবার চায়ে চুমুক দিলেন।

    চিঠিপত্তর কিছু আছে?

    উর্দির পকেট থেকে দুখানা অন্তর্দেশীয় পত্র, আর একটা পোস্টকার্ড বার করল জগদীশ।

    এভাবে চিঠি দিতে কবে থেকে শুরু করলি? গেল কোথায় স্যালভারটা?

    অত রুপো আর বার করতে সাহস পাইনে। যা চোরের উৎপাত?

    বলি ভোগ করবে কে?-কুটি ক্রমেই ঘোর হচ্ছে সাহেবের।

    জগদীশ চিঠিগুলো পাশ-টেবিলে রেখে ব্রেকফাস্ট-ট্রে নিয়ে পাতিহাঁসের মতো নড়বড় নড়বড় করতে করতে চলে গেল। সাহেবের চোখের আড়ালটুকু হওয়ার ওয়াস্তা। মুখ নেড়ে ভেংচে উঠল।

    রুপো পালিশ করতে করতে গা-গতরে ব্যথা হয়ে গেল, তবু ছাড়বেনি, সায়েব তো নয় যম।

    সাহেবের সম্পর্কে শ্রদ্ধা, সমীহ এই বছরখানেক হল যেন উবে যাচ্ছে জগদীশের। হবেই। সম্পর্কের রজতজয়ন্তী তো। একটা না একটা চেঞ্জ হবেই। তা নয়তো সাহেবের এমন চড়া গলা মেজাজ যেমন সে কল্পনা করতে পারে না, তেমনি আড়ালে হলেও সে সাহেবকে ভ্যাঙাচ্ছে এমন দিন আসবে তা তার ভাবা ছিল না। কত রাশভারী ছিল সাহেব! চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলা যেত না।

    ভুরু কুঁচকে একখানা অন্তর্দেশীয় পত্র তুলে নিলেন সিনহাসাহেব। চিঠি ঘেঁড়ার জন্যে পাতলা রুপোর পেপারকাটার আছে একটা, সেটাও বোধহয় সিন্দুকে উঠেছে। ফ্যাড়াং করে চিঠির মুখ ছিঁড়ে ফেললেন সিনহাসাহেব। একটা খামে চিঠি পাঠাতে কি এদের বড্ড বেশি পয়সা খরচা হয়ে যায়।

    চিঠিটা একটা বিজ্ঞাপন। ছাপানো লেখা। কারা কাছাকাছি ডিপার্টমেন্টাল স্টোর খুলছে। যা-যা মানুষের নিত্যদিনের প্রয়োজন হতে পারে স-ব পাওয়া যাবে। চাই শুধু সদাশয় মহাশয়ের শুভেচ্ছা ও সহযোগিতা।

    ডিসগাস্টিং। দ্বিতীয় চিঠিটা অধৈর্য হাতে খুলে ফেললেন সিনহাসাহেব।

    মহাশয় এই পত্রটি পাইবামাত্র জয় মা বালিকা ব্ৰহ্মচারিণী এই মন্ত্রটি দশবার লিখিয়া প্রত্যহ দশবার জপ করিবেন। অতঃপর তিন দিনের মধ্যে এই পত্রের ত্রিশটি কপি করিয়া ত্রিশজন স্নেহভাজনের কাছে পাঠাইবেন। জনৈক প্রভাতবাবু পত্র পাইয়া নির্দেশ পালন করিলে সপ্তাহান্তে চার লক্ষ টাকা প্রাপ্ত হয়েন। জনৈক অধরবাবু পত্র পাইয়া নিশ্চেষ্ট ছিলেন। তিন সপ্তাহের মধ্যে তাঁহার একমাত্র সন্তানের প্রাণবিয়োগ হয়। …

    -রাবিশ!

    পোস্টকার্ডটা সবুজ রঙের। হরাল দাসপুর থেকে পরাণ হালদার লিখছে।

    সম্বৎসর ফসল ভালো হয় নাই। বাগান জমা দিয়াছি। সুবিধার দর অত্ৰত্য কেহই দিতে চায় না। মসুরি বুনিব। দুশোটি টাকা পাঠাইবা… ইত্যাদি ইত্যাদি।

    সিনহাসাহেব হাত থেকে ধুলোবালি ঝাড়ার মতো করে পোস্টকার্ডটা ঝেড়ে ফেললেন। জমিজমা বাগান পুকুর সব খাচ্ছিস, আবার দুশোটি টাকা পাঠাইবা!

    জগদীশ! জগদীশ! এগুলো সব ওয়েস্ট পেপার বাক্সেটে ফেলে দিগে যা…

    এই পোস্টোকাটটাও?

    আজ্ঞে, পোস্টোকাটটাও!

    রোদটা ক্রমে হাঁটু বেয়ে কোলে উঠছে। শরীরে এতক্ষণে একটা আরামের ঝিমঝিমুনি। ঠান্ডা রক্ত কুসুম-কুসুম গরম হয়েছে বুঝি বা। কাগজখানা উলটেপালটে মেলে ধরলেন তিনি। শরীর গরম করার আরেক কল এই কাগজ। দিনদুপুরে এক ডজন লোক মিলে মহিলার কাপড় খুলে নিয়ে তাকে পেটাচ্ছে, সরু গলির মধ্যে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল ঢ্যাঙা বহুতল, ক্যাজুয়ালটি সাতাশ জন। সাতাশ? না সাতাশি? প্রোমোটার মন্ত্রীমশাইয়ের আঁচলের তলায় বসে আছে। আহা স্নেহশীলা জননীমূর্তি। একশো কেন, দুশো অপরাধও ক্ষমা করবেন স্নেহকরুণ মুখে। চৌত্রিশ বছর আগে অবসর নিয়েছেন সিনহাসাহেব তখনও এসব ভাবা যেত না। একটা সভ্য মানুষের দেশ, সভ্য মানুষের শহর ছিল এসব। বিদেশেই বা কী হচ্ছে? এই ক্লিন্টন-দম্পতিটি কী? খানদানি ঘরের ছেলে-মেয়ে? পলিটিক্স তোরা করবি না তো করবেটা কে? কিন্তু হোয়াইট হাউজের স্টাফ মারা যাচ্ছে সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে? কদিন আগে ওয়াটার গেট কেলেঙ্কারি! ছি ছি! ছি! হতেন মিসেস সিনহা, দেখিয়ে দিতে পারতেন ফার্স্ট লেডি কেমন হতে হয়। বিজয়লক্ষ্মীর মতো হেয়ার স্টাইল ছিল, লেডি রাণুর মতো ফিগার। নীচের তলার লোকেরা সমীহ করত, ভয় খেত, সমান মাপের লোকেদের থেকেও অতিরিক্ত সম্রম আদায় করে নিতেন।

    জগদীশ পাশ দিয়ে সুট করে বেরিয়ে যাচ্ছে।

    কোথায় যাচ্ছিস? কাগজের আড়াল থেকে গলাটা তাঁর চাপা গর্জনের মতো শোনাল।

    এই একটু বাগানে।

    কেন? মোয়ারটা দেখবি নাকি? দেখতে ইচ্ছে হয়েছে?

    আজ্ঞে আমার নাতিটা এয়েচে। বকুলতলায় দাঁড়িয়ে আচে।

    যাও, তাড়াতাড়ি শুনে এসো, দেখো আবার ভেগে যেও না। ডেকে যেন পাই।

    গজগজ করতে করতে বাগানে নেমে গেল জগদীশ। দূরপাল্লার বাসে চড়ে, সাত রাজ্যির ধুলো খেতে খেতে নাতিটা এল, হাতে বোঝা, তা নাকি তাড়াতাড়ি শুনে এসতে হবে। মরণ অমন সায়েবের! সে নিয্যস সময় নেবে। একটা কথা সাতবার শুধোবে। নিজের তো ভিটেয় পিদিম দেখাতেও কেউ নেই। সেবার মেমসায়েব মারা গেলেন তবু একবার কেউ এল না, একজন নাকি থাকে অস্ট্রেলিয়া আরেক জন জার্মানে। ছেলেপুলে, নাতিনাতনি বুড়ো সায়েবেরও কি আর নেই। কিন্তু সায়েবগুলোর সব থেকেও কেউ থাকে না। কেউ নেই বলেই, মেমসায়েবের কথা স্মরণ করে এই অখাদ্য বুড়োর সেবাযত্ন সে করে যাচ্ছে, আজ কত বচ্ছর! রক্তে চিনি, গাঁটে ব্যথা, আদ্দেক জিনিস খাওয়া বারণ, বুকের কষ্ট, প্রেশার, কী নেই। তবু সন্ধেকালে ক পাত্তর ঢুকু-টুকু না হলে বাবুর ঘুম হবে না। কাচের বাসনে ছাড়া খাবে না, রুপোর গেলাস, রুপোর পট নইলে চলবে না, বিছানাতে একটি কোঁচ থাকবে না। জামাকাপড় সব টিপ-টপ, যখনকার যেমন তখনকার তেমনি চাই। বুকের ভেতরটা খুঁচিয়ে সে টের পায় মায়াও পড়ে গেছে খানিক। যতই হোক। সাহেবটার সঙ্গে তার নিজের এখন কী-ই বা তফাত! দুজনেই বেতো খুঁতো বুড়ো। সাহেবের কিছু হলে যেমন সে দেখে, তার কিছু হলেও তেমনি সাহেবের হোমিয়োপ্যাথিকের গুলি আছে। বড়ো ডাক্তারের বাড়া হয়েছে এদান্তে সাহেব। এই তো, সকালের কাগজটি বাসি হতে-না-হতেই আতশ কাচ আর হোমিয়োপ্যাথিকের মোটা বইখানা নিয়ে বসবে। দুই বুড়োর দাঁত কনকন, কান কটকট, জ্বর-জ্বারি, কষা পেট, আলগা পেট, তেতো মুখ, ম্যাজম্যাজ, মাথা ধরা, সর্দি সব কিছুর দাওয়াই ওই মোটা বইয়ের পেট থেকে বেরোয়।

    নাতির কথায় চৈতন্যে ফিরে আসে জগদীশ, মা বলছিল, একবার যদি হিমের শুরুতে যাও। রস খেতে যাবে তো সেই হিম পড়লে। নাতিটা ঘ্যানঘ্যান করে।

    কেন রে? এদিকে যে আমি নইলে সংসার অচল। কীসের দরকার তোদের?

    পুকুরের মাছ চুরি হয়ে যাচ্ছে, ফলপাকড় এনতার যে পাচ্ছে নিচ্ছে—মা বেধবা মানুষ! কেউ ভয়-ভীতি করতে চায় না।

    অ, তা যাবখন। খুব ধমক দিয়ে আসব সব ছিচকে চোরগুলোকে ডেকে। নাকি রে?

    জগদীশের মুখে খুশি খুশি হাসি। কৌতুকটুকু ধরতে পারে না নাতি। বলে, হ্যাঁ চোর-জোচ্চোর আবার ডেকে পাওয়া যায়। তুমিও যেমন ঠাকুর্দাদা!

    পেছন দিক দিয়ে খিড়কির দিকে আয় দিকি একবার—জগদীশ বলে, আমি সদর দিয়ে যাই। গিয়ে হুড়কো খুলে দিই।

    বারান্দায় উঠে জগদীশ দেখল সায়েব মুখে কাগজ-চাপা দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। নাক ডাকাচ্ছে বিচ্ছিরি আওয়াজে। নইলে মনে হতে পারত মটকা মেরে আছে। বুড়ো পাজি তো কম নয়। জগদীশ যেন তার বেয়ারা নয়, বিয়ে-করা পরিবার। চক্ষে হারাচ্চে। এই জগদীশ আর সেই জগদীশ। জগদীশ কোথায় যাচ্চে, কতক্ষণে ফিরল—এসব লক্ষ রাখাই যেন তার জেবনের সবচেয়ে বড়ো, কিংবা একমাত্তর কাজ।

    কিচিনের জানালা দিয়ে নাতিটাকে বাগানে ঘুরে বেড়াতে দেখল জগদীশ। ঘুরে ফিরে দেখচে। দেখার আর আছেটা কী! আসত মেমসায়েবের সময়ে! গোলাপে গোলাপে আলো বাগান দেখতে পেত। এখন ওই বকুল, একটা কলকে, কটা পাতাবাহার শত অযত্ন আছেদ্দাতেও মরে না, আর কিছু ফ্যাকাশে দোপাটি। বর্ষার পরেই শুয়ে পড়ে।

    খিড়কি খুলে ইশারা করে সে। নাতিটা ঢুকে আসে। আহা ছেলেমানুষ মুখখানা শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গেছে। সোজা পথ! ফ্রিজ থেকে অরেঞ্জ স্কোয়াশের শরবত করে দেয় সে। মাছের চপ গড়া আছে, বুড়ো সন্ধেবেলা পাত্তর চড়াবে, তখন লাগবে। তা তার হয়েও বেশি আছে। কখানা ভেজে দেয় সে নাতিকে।

    বড্ড ভালো হয়েছে গো ঠাকুরদাদা, তুমি করেচো?

    না তো কি ওই বুড়ো সাহেব করবে?–নাতি ঠাকুরদাদা হাসতে থাকে দুজনেই।

    গাঁয়ে গিয়ে তুমি আমাদের এমনি চপ করে দেবে?

    এমন মাছ কি সেখানে পাব ভাই?—জগদীশ আক্ষেপ করে। চুনোপুঁটি খয়রা-খলসে কুচো চিংড়ি দিয়ে তো আর চপ হয় না। পলিথিনের ব্যাগে চারখানা আরও মুড়ে দেয় জগদীশ।

    যা ছোটোকাটার জন্যে নিয়ে যা।

    পলি-প্যাক নিজের ঝোলায় পুরে নাতিটা ক্রমে চলে যায়। দু-তিনবার করে ফিরে ফিরে ঠাকুরদাদাকে দেখতে দেখতে যায়। আহা বড্ড মায়া ছোঁড়াটার। বয়সটা এখনই একটু ফাঁকা ফাঁকা আছে, এ সময়টাই বুড়োবুড়িদের একটু কাছ নেওটা হয় ছেলেপেলে। এ বয়সটা কেটে গেলে, সংসারের জোয়াল ঘাড়ে পড়লে আর চোখ-কানে দেখতে পাবে না। তখন…

    রাজির মা ঘর-দোর ঝাড়তে পুঁছতে এয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে থেকে সব না করালে মাঝখান দিয়ে ন্যাতা টেনে চলে যাবে। পেছনে পেছনে দোতলায় উঠতে থাকে জগদীশ।

    আমি করে নিচ্ছি, যাও না গো দাদু, নিজের কাজে যাও—রাজির মা মুখ ঘুরিয়ে বলে।

    আমার ওপরে কাজ আচে—গম্ভীর মুখে জগদীশ ওপরে উঠতে থাকে। কে জানে আজকে আবার কিছু সরাবার মতলব নিয়ে এসেছে কি না! বড্ড যেন উৎসাহ! ফ্রিজে রাখা দুধগুলো তো খেয়ে খেয়ে সেরে দিলে।

    জগদীশ! জগদীশ …সায়েব ডাকচে। ডাকুক, দরকারে তো ডাকছে না। ডাকচে স্বভাবে। এখন সে সাড়া দেবে না।

    বারান্দার আরামচেয়ারে পড়ে থাকলে বেলা বারোটা নাগাদ রোদটা হাঁটি-হাঁটি করে উঠে এসে ঠিক কপালের মধ্যিখানে ছ্যাঁকা দেয়। এখন লাঠিটা নিয়ে উঠে দাঁড়াতে হবে। বারান্দার দিকে সেগুন কাঠের পেল্লাই দরজা। এইটি তাঁকে এবার বন্ধ করতে হবে। লম্বা পেতলের ছিটকিনি। ওপরে, নীচে। নীচেরগুলো আর এখন লাগানো হয় না। দরজার কপাট বন্ধ করতে না-করতে ওপরে রঙিন কাচগুলো থেকে বর্ণিল ঝরনা কিলবিলিয়ে পড়তে থাকে বারন্দার কোলে। সাহেবের সাদা মাথায়, রঙিন জোববায়। নীল আলো, সবুজ আলো, হলুদ আলো।…সিনহা সাহেবের ছেলেরা। আর্মিতে ছিল একজন। প্লেন ক্রাশে মারা গেল। ফ্যামিলি এখন অস্ট্রেলিয়ায় থাকে। চোখে দেখেননি, কিন্তু নাতি তাঁরও আছে। মেঝের ওপর হলুদ কাচের আলোর মতো। স্পষ্ট, তবু নাতি তো। ছবিতে চেনেন! গত বছর বিয়ে করল, ছবি পাঠিয়েছিল।

    রংগুলো মাড়িয়ে মাড়িয়ে, বুড়ো বয়সের পাতলা চামড়ায় মেখেজুকে ঘরে গেলেন সিনহাসাহেব। একতলার ঘর বলে আঁধার লাগে, না বাইরের আলো থেকে এসেছেন বলে, বুঝতে পারেন না সিনহাসাহেব। বড্ড যেন ঘোর লাগছে। নইলে নাতি তাঁরও আছে। মুসৌরি থেকে সোজা স্কলারশিপ নিয়ে ক্লার্কে পড়তে গেল, সেখান থেকে জার্মানি। ছোটো ছেলেটা কোনোদিন আর মা-বাবার কাছে ফিরে আসেনি। ছোটো ছেলের ঘরের ছোটো নাতিটি পাহাড়ে চড়ে। এটাই নাকি তার পেশা। এভারেস্ট চড়তে বছর কয়েক আগে এসেছিল। সে সময়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করে যায়। নিজের নাতি বলে কোনো টানই অনুভব করেননি সিনহাসাহেব। চিনতেই পারেননি। পুরোদস্তুর জার্মান সাহেব একটি। কিন্তু যতই হোক তাঁর নাতিই তো! নাতি-নাতনি তাঁরও আছে। ওই বারান্দার মেঝেতে রঙিন আলোর কুচির মতো, ধরতে গেলেই ফসকে যায়।

    কষকষে গরম জলে চান করেও, এই দুপুরের দিক থেকে শীত শীত লাগতে থাকে সিনহাসাহেবের। ঘরদুয়োর আটকাঠ বন্ধ তবু যে কোত্থেকে ঠান্ডাটা আসছে ধরতে পারেন না তিনি। দুপুরের খাওয়া খেতে কোনোরকমে রান্নাঘরের সামনে পাতা টেবিলে যান। গরম গরম মুশুর ডালের সুপ, বরাদ্দের দু খানা রুটি, দু পিস মাছ খেতে থাকেন। একবার কড়া গলায় জিজ্ঞেস করেন, কী রে কুক কাম বেয়ারা, বুড়ো চোর, নিজের জন্যেও কি এই পিণ্ডিই রান্না করেছিস?

    আমার তো আর চিনি নেই রক্তে, আমি কেন পিণ্ডি খেতে যাব শুধুমুদু?

    তবে? কী করেছিস নিজের জন্যে? বিরিয়ানি, কালিয়া? কোফতা কাবাব?

    বিরিয়ানি-মানি মুখে রোচেই না…নিস্পৃহ মুখে জবাব দিল জগদীশ।

    তবে?

    একবাটি ডাল আর ডুমুরের ঘ্যাঁট সাহেবের পাতের পাশে নামিয়ে রাখল জগদীশ। বলল, এই তো।

    এঃ। বাগানের সেই ডুমুরঘন্ট! বারো মাস ছত্রিশ দিন এই-এ রান্না করবি?

    হপ্তায় এক দিন তো বাজার যাই, কত দিন থাকে সবজি? ছ-দিন হল, আবার কালকে যাব। বাঁধাকপি আনবখন।

    কেন ফুলকপি কি করেছে?

    প্রেশার চড়ে কেন?

    ধ্যাত্তেরি তোর প্রেশার। মাছের চপ করতে বলছিলুম যে!

    সন্ধেবেলায় দেব।

    সন্ধেবেলাও খাব, এখনও খাব।

    এখন খাবার মতো নেই।

    কেন? করলি তো অনেক, কত খাবি একা, ব্যাটা বুড়ো ভাম?

    নাতিটা এয়েছিল, গোটা কতক দিয়েচি…

    অ, নিজে খাবি, নাতিকে দিয়ে সাবড়াবি, তারপর পাত কুড়োনো যা থাকে কোনোরকমে আমাকে দিবি?

    বাঁকা কোমরে যথাসম্ভব তড়বড় করে কিচিনে ঢুকে যায় জগদীশ, দুটো নারকোল দু হাতে ধরে টেবিলের সামনে এনে রাখে। সংক্ষেপে বলে, এনেচে।

    আড়চোখে সেদিকে চেয়ে সাহেব বলে, বা বা বা। আমার রক্তে চিনির ছুতোয় নারকোলগুলো তো তোর গবভেই যাবে। মাঝখান থেকে আমার চপগুলো হাওয়া হয়ে গেল।

    জগদীশ ফুঁসছে। জোরে জোরে তার নিশ্বাস পড়ছে খেয়াল করে, হাসিটা লুকিয়ে ফেলেন সিনহাসাহেব। ফোঁস ব্যাটা ফোঁস। ফোঁস, ফোঁস, ফোঁস।

    দিনের বেলায় যেমন তেমন। সুযি ডোবার পর থেকেই সিনহাসাহেবের মেজাজ অন্যরকম হতে থাকে। থ্রি পিস স্যুট ওঠে অঙ্গে। কড়কড়ে শার্ট। জববর একাখানা টাই। চকচকে মকরমুখো ছড়িটা নিয়ে জুতো মোজা পরে মসমস করে সাহেব বারান্দায় বেড়াতে থাকেন।

    কে রে? কে ওখানে?

    গম্ভীর গলায় হাঁকডাক।

    ঘরে টিউব লাইট জ্বলে। একহারা ইংলিশ খাটটিতে ধবধবে বিছানার ওপর ফুলকাটা সুজনি পাতা, পুরোনো আসবাবগুলি ঝেড়ে পুঁছে ঝকঝক করছে। দেরাজের ওপর কাটাপ্পাসের ফুলদানিতে বাগানের লিলি। ঘরের দরজা খোলা, বারন্দায় টবের গাছগুলি দেখা যেতে থাকে।

    টেবিলের ওপর সোনালি পানীয়, লিমকার বোতল, অনেক যত্ন করে বাঁচিয়ে রাখা কাচের পানপাত্র, প্লেটে গরম গরম মাছের চপ। জগদীশ চুল ক-গাছি আঁচড়ে, ধবধবে উর্দি ওপর-গায়ে, মাদ্রাজি লুঙ্গি বাঁকা কোমরে তটস্থ হয়ে দাঁড়িয়ে। হাতে ছোট্ট ট্রেতে এক গেলাস জল। একটা ওষুধ খাবেন সাহেব।

    ওষুধটা খেলেন। জল খেলেন এক ঢোঁক। তারপরেই মেজাজটা কী রকম তিরিক্ষি গোছের হয়ে গেল। বাকি জলটা জগদীশের উর্দি লক্ষ্য করে ছুড়ে দিলেন। ফোঁস ব্যাটা, ফোঁস, ফোঁস।

    এ কী? এ কী? কী করছেন?

    যা যাঃ, নাতির কাছে যা…

    মুখের লালচে রঙটা আরও ঘোর। বোতল গেলাস ঘেরা, স্যুট-টাই পরা যেন একটা শয়তান বসে আছে।

    দূর। দূর এ বুড়ো যমের কাচে কাজ করা ঝকমারি বিড়বিড় করতে করতে উর্দির বুকের কাছটা উঁচু করে ধরে ঘর থেকে ছিটকে গেল জগদীশ।

    কী বললি? কী বললি?

    বলচি—এই বুড়ো যমের ভীমরতি হয়েছে—এখানে থাকা ঝকমারি,–চেঁচিয়ে খিচিয়ে উঠল জগদীশ।

    যা যা তবে … নাতির কাছে যা … ক্ষিপ্ত হয়ে চেঁচাতে লাগলেন সিনহাসাহেব। নিজের ঘরে গিয়ে উর্দি ছাড়তে ছাড়তে রাগে গরগর করতে লাগল জগদীশ। বেতো শরীরে শীতের সন্দেয় জল, আবার এঁটো জল। সে সাঙ্ঘাতিক চটে গেছে। মদো বুড়োর লালা মাখা জল। ছি ছি ছি। ঘেন্নায় গা শিরশির করছে তার। মরো এখন সন্ধের ঝোঁকে চান করে। মরি বাঁচি করে সে গায়ে জল ঢালতে থাকে। জল ঢালতে থাকে, জল ঢালতে থাকে।

    মাঝরাত্তিরে একবার সিনহাসাহেবের মনে হয়েছিল তিনি জেনারেল মানেকশ, যুদ্ধক্ষেত্রে পড়ে আছেন। আশেপাশে বোমার সপ্লিন্টার। লাশের গাদায় তিনি পড়ে আছেন। তাঁকে মৃত ভেবে চলে গেছে সব। প্রাণপণে একটা নিরাপদ জায়গায় যাবার চেষ্টা করেন তিনি সে সময়ে। পা দুটো যাচ্ছেতাই ভারী। মাথাটা তুলতে পারছেন না। তবু, বীরপুরুষ তো। এক সময়ে তাঁকে নিয়ে তাঁদের নিয়েই কাব্য লেখা হত, ছবি আঁকা হত। শত্রশিবিরের সীমানা থেকে আহত শরীর নিয়ে পালিয়ে আসতে থাকেন তিনি। দৈত্যের চোখের মতো আলো জলছে একখানা। তার সামনে নিয়ে পালানো চাট্টিখানা কথা নয়। তবু তিনি পালান। কিন্তু শেষরক্ষা সম্ভবত হল না। কারণ যতই এগোন, সেই একই কাঁটাতারের বেড়া, একই দানোচোখো আলো। একই বোমার সপ্লিন্টার চারদিকে ছাড়িয়ে থাকে। অবশেষে প্রবল আওয়াজ করে শত্রুপক্ষের জিপগুলো তাঁর দিকে গড়িয়ে আসতে থাকলে জেনি জেনি বলে চিৎকার করতে করতে তাঁর ঘুম ভাঙে। তিনি বুঝতে পারেন কেউ প্রাণপণে বাইরের দরজা ধাক্কাচ্ছে।

    লিমকার বোতল, হুইস্কির বোতল ভেঙে গড়াচ্ছে পানীয়ের তরল মিশেছে তার সঙ্গে; ঘরময় তীব্র অ্যালকোহলের গন্ধ। সকাল, কিন্তু টিউব লাইটটা দগদগে ঘায়ের মতে জ্বলছে।

    সিনহাসাহেব কোনোমতে নিজেকে টানতে টানতে বারান্দায় দরজায় এনে ফেললেন, দরজা খুললেন। রাজির মা।

    মাথায় কাপড় টেনে, কোমরে কাপড় গুঁজে রাজির মা অবাক চোখে সায়েবের দিকে তাকিয়ে ঢুকে এল।

    সিনহাসাহেব দেখলেন—তাঁর অঙ্গে থ্রি পিস স্যুট, জুতো মোজা…কোটময় বিশ্রী সব দাগ। মুখের অবস্থাও নিশ্চয়ই তথৈবচ। রাজির মা ঘরের খোলা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। তাড়াতাড়ি বালতি আনল। ভাঙা কাচ, আধ ভাঙা বোতল তুলছে, ঝাড়ছে ঘর, পুঁছছে। বিছানাটা নিভাঁজ নিপাট হরেই আছে, তবু একবার টেনেটুনে দিল। তারপর ফিরে দাঁড়িয়ে বলল, বেয়ারাদাদু কোথায় গেল আবার?

    কে জানে কোথায় বেরিয়েছে!

    খিড়কির দোরে তালা মেরে বেইরেচে দেখচি।

    চমকালেন সিনহাসাহেব।

    রাজির মা বলল, আপনি চানে যান, আমি দেখছি।

    অনেকক্ষণ ধরে চান করে, ওয়ার্ডরোব খুলে ধবধবে পাজামা, গরম পাঞ্জাবি বার করে পরলেন সিনহাসাহেব। পরতে পরতে মনে হল স্বপ্নটা স্টালিনগ্রাড, ফেয়ারওয়েল টু আর্মস, ব্রিজ অন দা রিভার কোয়াই—এইসব ছবির তালগোল জগাখিচুড়ি। কী যে দেখেছিলেন। কেন দেখেছিলেন কে জানে! জেনি জেনি বলে চেঁচাচ্ছিলেনই বা কেন? কেউ যদি শুনে ফেলত! জেনি বলে কাউকে তিনি বাস্তবিকই চেনেন না।

    গায়ে কুলুর যাপার জড়িয়ে, চুল আঁচড়ে ভদ্রলোক হয়ে বাইরে বেরিয়ে দেখেন রাজির মা ভীত মুখে দাঁড়িয়ে আছে।

    বেয়ারাদাদু চলে গেছে গো সায়েব।

    মানে?

    ওর ঘরে, বাক্স-টাক্স কিছু নি। দেয়ালের হুকে নুঙি, গামছা ঝুলত, সব ফাঁকা, ফর্সা। আপনাকে কিছু বলেনি?

    মাথাটা শুধু নাড়ালেন সিনহাসাহেব। তিনি বারান্দার আরামচেয়ারে বসলেন। সামনের দরজা খোলা। অকেজো লন মোয়ারটা পড়ে আছে।

    রাজির মা টোস্ট দিল, চা দিল, দুধ দিল। দুপুরবেলা দুধ পাঁউরুটির ব্যবস্থা করে দিল। বাড়ি থেকে ছুটে ছুটে এসে বিকেলের চা দিয়ে গেল। রাত্তিরেও দুধপাঁউরুটি ঢাকা রেখে দিল। সিনহাসাহেব নিজে ওষুধ বার করে করে খেলেন।

    রাজির মা বলল, দেখি একটা লোক জোগাড় করতে পারি কি না ঢ্যাঙা বাড়িগুলোর মাথায় রোদ টলটল করছে, লনে ছায়া। যদ্দূর পারে সাজিয়ে গুছিয়ে রেখে রাজির মা চলে গেল।

    দুদিন কি তিনদিনের মাথায়, তখন প্রথম শীতের অকাল গোধূলি। সিনহাসাহেব বারান্দায় বসে বসে দেখলেন গোধূলি মাখানো পথটি মাড়িয়ে মাড়িয়ে একটি শিশু আসছে। শিশু? না বালক? বালকই, কিন্তু সিনহাসাহেবের কাছে শিশুই। শিশু তেমন করে তিনি জীবনে দেখেননি। শিশুতে বালকে তফাত তাঁর বৃদ্ধ মগজের গলিঘুজির মধ্যে হারিয়ে গেছে।

    তিনি দেখলেন, গোধূলির জমাট অংশটি দিয়েই নিটোল হাত-পাগুলি গড়া। জলের মতো চোখ, ঘাসের মতো চুল, মোয়ার দিয়ে ছাঁটা ঘাস। দু-চার গুছি অবাধ্য দুবেবাঘাসের মতো গিঁটগ্রস্ত হয়ে কপালের দিকে বেড়ে এসেছে। হাতে পুঁটুলি, গোধূলি শিশুটি বারান্দায় উঠে এল।

    তুই কে?–যেন স্বপ্নের ঘোরে জিজ্ঞেস করলেন সাহেব।

    আমি ঝড়।

    কোত্থেকে এসেছিস?

    ওই তো—একটা দিক সে দেখাল ঠিকই, কিন্তু সেটা কোনদিক, কোনো বসতি নির্দেশ করছে কি না, সিনহাসাহেব ভালো বুঝলেন না। তাঁর মনে হল শিশুটি বুঝি ওপর দিকে আঙুল দেখাল। এখন, তার কী মানে হতে পারে, তিনি জানেন না, গ্রাহ্য করেন না।

    তোর পুঁটুলিতে কী আছে?

    পুঁটলির গিঁট খুলে ফেলল সে। ভেতরে একটি রংচঙে জামা, একটি লংক্লথের দড়ি পরানো ইজের, একটি লাটু-লেত্তি, একটি চাকা এবং দুটি মুড়ির মোয়া।

    তোকে কি রাজির মা পাঠিয়েছে?

    হাঁ করে চেয়ে রইল।

    দুর হাবলা ছেলে, কাজ করবি কী করে?

    এটা কী?-ঝড় হাত সোজা করে সামনে বাড়িয়ে আঙুল দেখিয়ে বলল।

    পিয়ানো। একে কটেজ পিয়ানো বলে। এই দেখো।

    সামনের টুলে বসে চাবি টিপলেন সিনহাসাহেব। দু হাতে।

    ঝড় অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

    থরো থরো অনভ্যাসের আঙুল থেকে ক্রমে শীত ঝরে যায়। বসন্ত আসে। ভুলে যাওয়া সুরগুলো মগজ থেকে হৃদয় পেরিয়ে আঙুল বেয়ে ঢুকে যায়, পিয়ানোর চাবি থেকে অবিশ্বাস্য স্থৈর্য আর মিষ্টত্ব নিয়ে বেরিয়ে আসে।

    মোজার্ট-বল মোজার্ট…

    মোদজাট-ঝড়ু বলে, জলের চোখে তাকায়।

    ওটা কী?–

    ঝড়র আঙুল এখন ওপর দিকে।

    শ্যান্ডেলিয়র। ঝাড়বাতি।

    বাতি? জ্বলে না।

    বালব নেই সব। দেখি। সুইচ টেপেন সাহেব। কয়েকটা বাতি জ্বলে ওঠে। যথেষ্ট ঝলমল করতে থাকে। ঝড় মুখ উঁচু করে তাকিয়ে থাকে।

    দেরাজের ওপর ফটো। সে দিকে তাকিয়ে ঝড় বলে, ওটা কে?

    ওটা জেনি-মৃদু মৃদু হাসতে হাসতে বলেন সিনহাসাহেব। তিলোত্তমা সিনহার ছবিটাও তাঁর দিকে তাকিয়ে যেন হাসিটা ফিরিয়ে দেয়।

    কী বোঝে ঝড় কে জানে, কিন্তু একবার সাহেবের দিকে তাকায়, একবার তিলোত্তমার ছবির দিকে তাকায়। সে-ও হাসে। জলের মতো হাসি।

    রান্না করতে পারিস?

    হ্যাঁ—আ-আ।

    অ্যাত্তোবড় করে মাথাটা হেলায় ঝড়।

    কী রান্না করবি?

    ছেলেটাকে নিয়ে রান্নাঘরে যান তিনি। আনাজপাতি কিছু কিনে রেখে গেছে রাজির মা। বলেন আমি কেটে দিচ্ছি, গ্যাস জ্বেলে দিচ্ছি-তরকারি করতে পারবি তো?

    এইবার ছেলে বলে, মা পারে।

    মা পারে, তুই পারিস না?

    দিদি পারে।

    অর্থাৎ পারে না, কিন্তু কবুল করবে না কিছুতেই। ভাঙবি তবু মচকাবি না! বটে!

    সিনহাসাহেব, পেঁপে আলু পেঁয়াজ টোম্যাটো ফুলকপি সব ড্যাব ড্যাবা করে কাটেন ছুরি দিয়ে। গ্যাস জ্বালেন। প্যান বসিয়ে তাতে ডেলা ডেলা মাখন গলান তারপর আনাজের টুকরোগুলো দিয়ে নাড়েন চাড়েন, নুন দেন, জল দেন, মরিচ দেন, একটু ময়দা গুলে দেন দুধে। ফ্রিজ থেকে বার করে দুধ গরম করেন। টোস্টারে টোস্ট বসান।

    ছেলে হাঁ করে দেখে পপ পপ করে তৈরি টোস্ট বেরিয়ে আসছে।

    ওর মধ্যে কী আছে?—সে আঙুল দিয়ে টোস্টারটা দেখায়।

    দানো আছে।—সিনহা হাসেন।

    ছেলেটা বোঝে ঘন্টা। কিন্তু হাসে, সে-ও হাসে।

    টেবিলে ম্যাট পেতে, দুটি প্লেট, দুটি বাটি, দুটি চামচ, দুটি গেলাস সাজান সিনহা, বলেন, দেখছিস?

    ঘাড় মস্ত করে হেলিয়ে ঝড় নীরবে জবাব দেয়। সে দেখছে।

    শিখছিস?

    হ্যাঁ—অ্যা—অ্যা।

    কাল টেবিল সাজাতে বললে পারবি?

    হ্যাঁ-আ-আ।

    আম্বা তো খু-উ-ব। হ্যাঁ-অ্যা-অ্যা। দেখা যাক কী পারিস আর কী না পারিস। কী কী রান্না করলি আজকে?

    পাঁউরুটি টোস, দুধ, ঝোল।

    বাস বাস বাস। খুব বেঁধেছিস। এখন খেতে বোস।

    ঝড় দু হাতে দুধের গেলাস ধরে খায়, ঠকঠক করে। ঠোঁটে দুধ লেগে যায়। তারপর দু হাতে কামড়ে কামড়ে টোস্ট খায়। সবশেষে স্টু খায়। একটা চমক লেগে থাকে তার দু চোখে।

    ভালো বেঁধেছিস?

    ফুলকপির ফুলের দিকটা কামড়ে ধরে, ঘাড় হেলিয়ে জবাব দেয় সে, ভালো। খাসা?

    খাসা।

    কালকে পারবি?

    হুঁ-উ।

    জগদীশের ঘরটায় রাত্তিরে ছেলেটাকে নিয়ে যান সিনহাসাহেব। ঠিক হবে কি বুঝতে পারেন না। তক্তপোশটা দেখান।—এইখানে শুবি রাত্তিরে, পারবি?

    হ্যাঁ।

    এবার হ্যাঁ-টা অত লম্বা নয় লক্ষ করেন সিনহা। জগদীশের কম্বল খুলে ছেলেটার গায়ে জড়িয়ে দেন।

    ঠিক আছে?

    হ্যাঁ।

    শীত করছে না?

    না।

    তবে আমি যাই?

    হুঁ-উ!

    কিন্তু রাত্তিরবেলা ঘুমের খুব ব্যাঘাত হল সিনহাসাহেবের। মাঝে মাঝেই মনে হতে লাগল ছেলেটা ভয়ে কাঁদছে। তিনি উঠে উঠে দেখে এলেন। সে এক হাঙ্গামা। ঘর থেকে ঘর, তারপর দালান, তারপর খাবার জায়গা, তার ওপাশে জগদীশের ঘর। সুইচ জ্বালতে জ্বালতে যাওয়া, নেবাতে নেবাতে আসা। দু বার উঠেছিলেন, দু বারই দেখলেন অগাধে ঘুমোচ্ছে কুকুরকুণ্ডলী হয়ে। গোল গোল হাত পাগুলো সব লম্বাটে হতে আরম্ভ করেছে, কী মসৃণ! হাত বুলিয়ে দিলেন তিনি। বুকের ওপর কান পেতে ধুকপুক শুনলেন। তব ঘুম ভাঙল না ছেলেটার। ছেলেমানুষের ঘুম! ন্যাতা হয়ে গেছে একেবারে। কিন্তু আরও একবার কান্না শুনলেন তিনি। ঘুমের ভেতর। স্বপ্নের কান্না। স্বপ্নে শুনলেন, স্বপ্নেই সমাধান করলেন। সকালবেলা আর সেসব বৃত্তান্ত মনে রইল না।

    পরদিন সকাল থেকেই ঝড় নিজের মতামত, ইচ্ছে-অনিচ্ছে বেশ জোরের সঙ্গে প্রকাশ করতে লাগল। যেমন ভোরবেলা উঠে সে তাঁর বারান্দার আমচেয়ারে শুয়ে দ্বিতীয়বার ঘুমিয়ে পড়ে। সিনহাসাহেবের ডাকে ঘুম ভেঙে চোখ কচলে প্রথমটা সে একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। তারপর বেশ সপ্রতিভভাবে উঠে এসে ঘোষণা করে ঘরের মধ্যে গরম জলের কল খুলে সে চান করবে। সেইমতো চান করে পুঁটলির থেকে রঙচঙে জামা ইজেরটি সে পরে এবং সেই মুড়ির মোয়ার একটি সাহেবকে দিয়ে অন্যটি নিজে খেতে থাকে, সাহেব যখন বললেন তাঁর দাঁত নেই, সে টেবিলের ওপর থেকে ডেনচারের কৌটো নিয়ে আসে দৌড়ে। এটাই সম্ভবত সাহেবকে তার প্রথম সেবা। তা সত্ত্বেও যখন মোয়া সাহেব খেতে পারেন না, তখন সে সেই কামড়ানো এটোকাঁটা মোয়া অবলীলায় খেয়ে নেয়।

    রাজির মা বেলায় এলে মুচকি হেসে সাহেব জিজ্ঞেস করেন, কোথা থেকে জোগাড় হল এত কাজের ছেলে?

    রাজির মা অবাক। তারপর দেখেটেখে বলল, ও মা! এ কী কাজ করবে গো সায়েব, এ যে দুধের ছেলে?…এই। তোকে কে পেটিয়েছে?

    ঝড় বারান্দার এক কোণ থেকে আর এক কোণে চাকা গড়াতে থাকে, কোনো জবাবই দেয় না।

    কেউ আপনার অসুবিধের খবর পেয়ে পেটিয়েছে মনে হয়। এক হিসেবে ভালো হল। সঙ্গে থাকবে। দেখুন হয়তো বেয়ারাদাদুই পেটিয়ে দিয়েছে।

    সে বাজার এনে দেয়। মুরগি, মাছ, পাঁউরুটি। রুটি গড়ে দিয়ে যায়। ঝড় বলে, ভাত খাব।

    ওরে ছেলে! তোমার জন্যে এখন আমায় ভাত বসাতে হবে। বলে বটে, কিন্তু একবাটি ভাত সে করে রেখে যায়।

    ঝড় বলে, ওপরে কী আছে? ওপরে যাব।

    আমি আর ওপরে যেতে পারি না।

    চলো না, আমি ধরে নিয়ে যাব।

    অনেকদিন পরে সুতরাং দোতলায় ওঠেন সিনহাসাহেব। ঘরগুলো খোলেন একটার পর একটা। উঁচু উঁচু পালং। আলমারি। দেরাজ। টেবিল। সিন্দুক। সিঁড়ি বেয়ে পালঙ্কে উঠে যায় ঝড়, একটু শুয়ে নেয়। সাহেব অপেক্ষা করেন।

    এর মধ্যে কী আছে?

    জামাকাপড় … ফটো …

    কার?

    জেনির বোধহয়।

    দেখব।

    অগত্যা তিনি আলমারি খোলেন। থরে থরে শাড়ি, জামা, ন্যাপথলিনের ওষুধ ওষুধ গন্ধ ছাড়ছে। ফটো অ্যালবাম খুলে ছবি সব দেখাতে হয় ঝড়কে। দেরাজের দিকে আঙুল দেখায় ঝড়।

    ওতে?

    দরকারি কাগজপত্র, দলিল, দস্তাবেজ…

    দেখব—

    একটা ড্রয়ার খুলে কাগজের পাহাড় দেখান সাহেব। দেয়ালে-টাঙানেনা ছবির দিকে তাকায় ঝড়। ওরা কে?

    ওটা বুদ্ধদেব।

    হাঁসটাকে আদর করছে কেন?

    লেগেছে, তির ছুড়েছে কেউ।

    ওটা কে?

    ওটা রামকৃষ্ণ ঠাকুর।

    হাত অমন করছে কেন?

    ধ্যান করছেন, ধ্যানে অমন হয়।

    তুমিও করো ধ্যান, করো, করো।

    সিনহাসাহেবকে দাঁড়িয়ে চোখ আধবোজা করতে হয়, ডিঙি মেরে মেরে তাঁর হাতের মুদ্রা ঠিক করে দেবার চেষ্টা করে দিতে থাকে ঝড়। দোতলায় বারান্দায় পৌঁছে তার আহ্বাদের সীমা থাকে না। দুরে বড়ো রাস্তার যানবাহনের ছবি একটুকরো দেখা যায় এ-বাড়ি ও-বাড়ি পাঁচিল টপকে টপকে। ঝড় ঘোষণা করে, বিলেত দেখা যাচ্ছে।

    মোয়ারটা এবার চলছে। একটু মোবিল দরকার ছিল। দিতেই সরসর করে চলছে। দুজনে মিলে লনটা পরিষ্কার করে ফেললেন। যতক্ষণ না রোদ বুকে ওঠে ততক্ষণ একখানা বই কিংবা ম্যাগাজিন নিয়ে এখন লনে বসে থাকা যাবে। ঝড়টা ততক্ষণ করুক না হুটোপাটি। চাকা নিয়ে, বল নিয়ে, কিংবা নিছক নিজেকে নিয়ে, একটা ছানা বেড়ালের মতো!

    এবং এ ভাবেই তাঁকে দেখে, অবাকতর অবাকতম হয়ে আবিষ্কার করে জগদীশ বেয়ারা। হাতে বাকসো, পরনে হেঁটো ধুতি, পিরান, আর ঘুঘু রঙের গরম চাদর, জগদীশ ফিরে আসছে। গলিতে ঢুকতেই অন্ধ গলির শেষে গেট দেখা যায়। গেটের ফাঁক দিয়ে দিয়ে উপছে পড়ে লনের সবুজ, সেগুন কাঠের পাট পাট দরজা। মাথায় রঙিন কাচের আলপনা। জগদীশ দেখে ছাঁটা ঘাসের ওপর ক্যাম্প চেয়ার পাতা, ঢোলা পাজামা, গরম পাঞ্জাবি পরে, কাশ্মীরি শাল লুটিয়ে, মুখে সিগারেট, বইয়ের পাতা উলটোচ্ছেন সিনহাসাহেব। পাকা চুলের কেশর, ঘাড় অবধি পড়ে কুঁকড়ে উঠেছে, কিন্তু ক্ষৌরি করেছেন। বেশ জলুসঅলা বুড়ো। পাকা আমটির মতো হয়তো নয়, তবে পাকা পেয়ারাটির মতো নিয্যস। গেট খুলে ভেতলে ঢুকে এল জগদীশ।

    কেমন আছেন?

    যেমন দেখছিস। দেশঘরের যত্ন আত্তি খাওয়া হল?

    তা হল, পায়ের কাছটিতে বাকসো আর থলে নামিয়ে বসে পড়ে জগদীশ, কুক-কাম-বেয়ারা-কাম-মালি। বুড়ো, কিন্তু চালিয়ে যাচ্ছে এখনও।

    ফিরলি যে?

    ও মা যাব কোতায়? আর মন টেকে? লনের ঘাস কে ছাঁটল?—অবাক অবাক, খুশি-খুশি গলা।

    এদিক ওদিক তাকালেন সিনহাসাহেব।

    ঝড় আর আমি।

    কে ডাকল, রাজির মা?

    কাকে?

    ওই ঝড় মিস্তরিকে? দূ

    র—মিস্তিরি-ফিস্তিরি নয়, ও একটা ছোট্ট ছেলে, আমার কাছে থাকে। এই তো, ঝড়-উ, ঝড়ো-ও কোথায় গেলি?

    এদিক ওদিক তাকিয়ে ঝড়কে তিনি দেখতে পেলেন না।

    এই তো এখানে খেলছিল। দেখ দিকিনি, দেখ। এগিয়ে গিয়ে দেখ।

    কিছুক্ষণ পর জগদীশ ফিরে এল।

    সারা বাড়ি ঘুরে দেখে এলুম। ছোটো ছেলে-ফেলে কোথাও নেই।

    বলিস কি রে?

    ছড়িটি পাশে শোয়ানো। তুলে নিয়ে হাঁটতে থাকেন সিনহাসাহেব।

    ঝড়-উ-উ। ঝড়ো-ও-ও-ও।

    বাগানের এক কোণে তার জামা ইজের শুকোচ্ছিল, নেই। চাকা গড়িয়ে খেলছিল বারান্দায়, দাগটুকুও যেন কে সযত্নে পুঁছে নিয়েছে।

    জগদীশকে সঙ্গে করে দোতলার আনাচকানাচও খুঁজে এলেন সিনহাসাহেব। সব ঘর খুলে খাটের তলা, আলমারির পেছন দেখে এলেন।

    ঝড় একটা সাবানের বলের মতো উবে গেছে।

    জগদীশ ক্রমেই গম্ভীর হয়ে যাচ্ছে। বললে, স্বপন দেখেছেন।

    ভীষণ দুশ্চিন্তায় ভালো করে রাগ করতেও ভুলে যান সাহেব, ভাবিত গলায় বলেন, তোকে দেখে ভয় পেয়েছে, ব্যাটা বুড়ো ভাম…

    তারপর আবার দুশ্চিন্তা তাঁকে পেয়ে বসে রাস্তায় বেরিয়ে যায়নি তো? গাড়ি ঘোড়ার রাস্তা…

    ভীষণ সন্দিগ্ধ চোখ সাহেবের দিকে চেয়ে থাকে জগদীশ। চেয়েই থাকে। কিন্তু রাজির মা এসে যখন সাহেবের কথায় সায় দেয়?

    দুধের ছেলে গা। পুঁটুলি নিয়ে এয়েছিল, কেমন সাজানা পুঁটুলি গা! যেন মা নিজে সাজিয়ে দিয়েছে। ভাত খেতে চাইলে, আমি বেঁধে দিই। সায়েব তাকে নিয়ে কত খেলা খেলেন, কত বাজনা শোনান, এটা কী ওটা কেন, ওমা! ক-দিন ঘরদোর মাত করে রেখেছিল যে! স্বপ্ন হবে কেন?

    জগদীশ ভালো করে সব শুনল, বলল, তা হলে ভূত। ভূতে পেয়েছিল তোদের।

    ওমা কী অলুক্ষুণে কথা!–রাজির মা তাড়াতাড়ি কাজ সেরে চলে গেল।

    তখন জগদীশ দোতলার বারান্দার গ্রিল, সিঁড়ির, খিড়কির কোল্যাপসিবল সব লাগায়, তালা টেনে-টুনে দেখে। রোদ চড়তে না চড়তে সে উদভ্রান্ত সাহেবকে বারান্দায় তোলে, সব বন্ধ ছন্দ করে দেয় বেলাবেলি। বিমূঢ় সাহেবের দিকে চেয়ে বলে, খুব সময়ে এসে পড়েছি যা হোক।

    ক্রমে বেলা গড়ায়, মেঝের কাচ-ঠিকরোনো আলোর ছায়া নাচে, চান হয়, লাঞ্চ হয়, দুপুরের এক টিপ ঘুম তাও হয়ে যায়। সন্ধেবেলা বোতল গেলাস সব সাজসরঞ্জাম রোজ দিনের মতো বার করতে যায় জগদীশ বেয়ারা। হাত নেড়ে না করেন সাহেব। পিয়ানোয় গিয়ে বসেন। অপটু হাতে পিয়ানোয় বিঠোফনের ঝড় তোলেন। অবশেষে নিত্যকার পাঁউরুটি-দুধের ডায়াবিটিক বরাদ্দ গলাধঃকরণ করবার পর শুতে যাবার সময় হয়। অনেকক্ষণ এ-পাশ ওপাশ করবার পর বৃষ্টি আসার মতো ঘুম আসতে থাকে ঝরকে ঝরকে। কোথাও কি কেউ কাঁদছে? ছোটো ছেলের কান্নার আওয়াজ শুনে মাঝ ঘুমে উঠে বসেন সিনহাসাহেব। উপবৃত্তাকার সব দালান বারান্দা পার হয়ে যান কান্নার খোঁজে। প্যাঁচানো প্যাঁচানো সিঁড়ি ওঠেন নামেন, মাঠের মতো অন্ধকার ছাদ, আগাছায় ছাওয়া বাগান সব পার হয়ে যান। কিছুতেই দিক ঠিক করে উঠতে পারেন না। শেষে না পেরেটেরে স্বপ্নের মধ্যে গুমরে গুমরে কাঁদেন। ছেলেমানুষের জন্যে বুড়ো মানুষের কান্না।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43 44 45 46 47 48 49 50 51 52 53 54 55 56 57
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleরহস্য সমগ্র – অজেয় রায়
    Next Article অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র – অজেয় রায়

    Related Articles

    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    বিপিনের সংসার – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    January 8, 2026
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

    ভয় সমগ্র – হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

    December 9, 2025
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

    কিশোর অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র – হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

    December 9, 2025
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

    প্রকাশ্য দিবালোকে – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

    November 18, 2025
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

    তারপর কী হল – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

    November 17, 2025
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত

    শর্ম্মিষ্ঠা নাটক – মাইকেল মধুসূদন দত্ত

    November 11, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Our Picks

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }