চণ্ডরাজার বলি – ১
১
নভেম্বর ০৯, ২০১৩
অফিস থেকে দিন তিনেকের ছুটি নিয়ে বর্ধমান যেতে হয়েছিল, তবে সেটা নিছক দেশের বাড়ি থেকে ঘুরে আসার জন্য নয়, দীর্ঘদিন ধরে চলা শরিকি মামলায় আদালতে হাজিরা দেওয়ার উদ্দেশ্যে।
বাড়ি এসে শুনলাম তপন এরমধ্যে বারকয়েক ঘুরে গেছে। গতকাল এসে আমার দেখা না পেয়ে দরজা থেকেই ফিরে গেছিল আর আজকে তো রীতিমতো ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করার পর জগন্নাথকে নিজের নম্বর দিয়ে গেছে, বিষয়টা নাকি জরুরি। শুনে বেশ অবাক হলাম, কারণ দীর্ঘদিন ওর সঙ্গে কোনও যোগাযোগ নেই। শেষ দেখা হয়েছিল দু-বছর আগে ওদের পাড়ার দুর্গাপুজোয়, তারপর ও যেন কোথায় উধাও হয়ে গেছিল। তবে এসব অবশ্য নতুন ব্যাপার কিছু নয়, সেই কলেজের আমল থেকেই দেখছি ওর স্বভাবটাই এমন ভবঘুরে গোছের, হুট করে কখন যে কোথায় চলে যেত তারপর ঠিক তেমনই একদিন হাসতে হাসতে এসে হাজির হয়ে বলত ‘জানিস ছোট পিসির বাড়ি যাচ্ছিলাম মাঝখানে কালিপাহারি বলে একটা স্টেশন দেখে কেমন যেন মনে হল, নেমে পরলাম, জায়গাটা যে কি সুন্দর চোখে না দেখলে বুঝবি না, থেকেই গেলাম কয়েকটা দিন’ এই হচ্ছে তপন! ও যে কখন, কোথায় নোঙর ফেলে স্বয়ং ঈশ্বরও বোধহয় তার খোঁজ রাখেন না। যাইহোক জগন্নাথের থেকে নম্বর নিয়ে ফোন লাগালাম। এখানে জানিয়ে রাখি আমি পকেটে মোবাইল নিয়ে ঘুরি না তাই যখন- তখন ফস করে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায় না। এ নিয়ে অফিসেও বিস্তর অভিযোগ শুনতে হয়েছে কিন্তু আমার আবার একা থাকার বাতিকটা এত প্রবল যে ওসব গায়ে মাখলে চলে না।
ফোনের ওপার থেকে তপনের স্বর ভেসে এল এখুনি একবার দেখা করতে চায়। সন্ধে নাগাদ যাব জানিয়ে ফোন রেখে দিলাম। রাস্তার ধকলে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম তাই আর দেরি না করে গরম জলে স্নান সেরে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম।
দমদম ক্যান্টনমেন্টের গোরাবাজার এলাকার তস্য গলিতে তপনের পৈতৃক বাড়ি। পাতাল রেলের দৌলতে ভবানীপুর থেকে এসে হাজির হতে অবশ্য খুব বেশি ঝঞ্ঝাট পোহাতে হয় না। এ বাড়িতে আগেও বারকয়েক এসেছি তবে বাড়িটাকে কখনো এতটা হতশ্রী বলে মনে হয় নি আজ যা হল। গোটা বাড়িটাই অন্ধকারে ডুবে ছিল। পলেস্তরা খসা দেওয়ালের জায়গায় জায়গায় ফাটল থেকে বট-অশ্বত্থের ঝুড়ি বেড়িয়ে বাড়িটাকে যেন শক্ত মুঠোয় পেঁচিয়ে ধরেছে। উপরে তাকিয়ে দেখলাম কাঠের রংচটা জানলাগুলো সব পেরেক ঠুকে বাইরে থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেললাম, বাড়ির যখন এমন বদহাল অবস্থা না জানি মালিকের দশা কেমন হয়েছে?
কলিং বেলে চাপ দিয়ে বুঝলাম ওটা কাজে ইস্তফা দিয়েছে। বাধ্য হয়ে পাল্লায় ঝোলানো লোহার কড়া ধরে কয়েকবার ঝাকুনি দিলাম। সামান্য পরে ভিতর থেকে তপনের কণ্ঠস্বর ভেসে এল—’কে জয়ন্ত নাকি’?
-‘হ্যা’।
-‘আসছি একমিনিট’। একটা চটি পরা পায়ের আওয়াজ ক্রমশ ভিতর থেকে এগিয়ে আসতে শুরু করল তারপর বিশ্রী শব্দ তুলে কাঠের ভারী দরজা খুলে গেল। হ্যারিকেন হাতে বেঁটেখাটো চেহারার একজন অচেনা লোক সামনে দাঁড়িয়ে। লোকটা ভিতরে আসার ইঙ্গিত করল। ভিতরে চেয়ে দেখলাম গায়ে আপাদমস্তক শাল জড়িয়ে তপন ঘরের মাঝামাঝি দাড়িয়ে রয়েছে, আমাকে দেখে আপ্যায়নের হাসি হেসে বলল—’জয়ন্ত তুই আমার ডাকে সাড়া দিয়ে আজ এখানে এসেছিস, এবারে স্বেচ্ছায় এই বাড়িতে প্রবেশ কর’। তপনের কথাগুলো কেমন যেন উদ্ভট লাগল, তাহলেও কথা না বাড়িয়ে ভিতরে ঢুকলাম, চৌকাঠ ডিঙিয়ে ভিতরে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গে অদ্ভুত একটা অস্বস্তি যেন জাঁকিয়ে ধরল। বাড়ির ভিতরের অবস্থাও বাইরের থেকে বিশেষ সুবিধের নয়। জায়গায় জায়গায় ছড়িয়ে থাকা মাকড়শার জাল এড়িয়ে একপাও এগোনো সম্ভব নয়। গুমোট দমবন্ধ করা পরিবেশ, মনে হচ্ছিল হঠাৎ যেন কোন গুহায় প্রবেশ করলাম। তপনের হাতে একটা জ্বলন্ত টর্চ আছে সেটার আলো সিঁড়ির দিকে ফেলে বলল—’চল উপরে গিয়ে বসা যাক’।
-‘লোডশেডিং নাকি’?
-‘ইলেকট্রিক সাপ্লাই থেকে লাইন কেটে দিয়ে গেছে’।
-‘দারুণ! জানলাগুলো ওইভাবে পেরেক দিয়ে আঁটা কেন’? তপন কৈফিয়ত দিল—’দু-বছর মতো বাড়িটা খালিই পরেছিল, আর জানিস তো চোর আর চামচিকের প্রথম টার্গেটই হচ্ছে, ফাঁকা বাড়ি খুঁজে নিজের মতো করে গুছিয়ে নেওয়া, তবে শীতকাল তো তাই খুব অসুবিধে হচ্ছে না, আর তা ছাড়া দিন দুয়েকের মধ্যে ফের বেড়িয়ে পড়ব, তাই ভাবছি যেমন আছে থাকুক’। তপনের পিছু পিছু দোতলায় ওর শোবার ঘরে গিয়ে হাজির হলাম। ঘরটায় টিমটিম করে হ্যারিকেন জ্বলছিল। তপন চেয়ার দেখিয়ে বলল—’তুই বস আমি বৃন্দাবনকে বলি চায়ের ব্যবস্থা করুক’। তপন চলে গেল চায়ের ব্যবস্থা করতে আর আমি আবছা আলো আধারিতে একাই বসে রইলাম। অবকাশ পাওয়া মাত্র একটা বিরক্তির ভাব মনের ভিতরে দানা বাঁধতে শুরু করল। এ বাড়িতে আমি অবশ্য আগেও এসেছি, তখন বাড়িটা বাসিন্দাদের উপস্থিতিতে প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর ছিল! সে তুলনায় আজকের এই ভুতুড়ে পরিবেশটা কেমন যেন অসহ্য লাগছে। তপন চা নিয়ে এল, বোধহয় আগে থেকেই তৈরি করা ছিল তাই বেশি সময় লাগেনি। চায়ে চুমুক দিয়ে বললাম—’এই বৃন্দাবনটা আবার কোত্থেকে জুটল’?
-‘গত দু-বছর ধরে ও আমার সঙ্গেই আছে’, এবারে তপন পালটা প্রশ্ন করল—’বর্ধমানে গেছিলিস মানে তোদের ওই রাজবাড়ির ব্যাপারটা’? —’হ্যা’।
আমাদের গ্রামের পৈতৃক বাড়িটাকে কেউ রাজবাড়ি বললে কেমন যেন লজ্জা করে, যদিও এটা রুঢ় সত্য আজকের ওই ভাঙাচোরা বাড়িটা একদিন নৃপতিপুরের দোর্দণ্ডপ্রতাপ রাজাদের বাসস্থান ছিল। যুগ পালটে গেছে, রাজা আর রাজত্ব সবই কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে, পরে আছে শুধু ইট-সুরকি খসা জরাজীর্ণ একটা অট্টালিকা যাকে এখনো এলাকার লোকেরা রাজবাড়ি বলেই জানে। আর আছি আমরা কোন্দলরত কয়েকজন শরিক যারা ওই রাজাদের বংশধর। আমাদের বর্তমান অবস্থা আর সেকালের রাজাদের জাঁকজমকের মধ্যে এতই আকাশপাতাল তফাত যে ওসব কথা মুখে আনতেও সংকোচ হয়, ভয় হয় শুনে এই বুঝি কেউ বিদ্রুপ করে বসে। তপনের কথায় চিন্তার জাল কেটে গেল—’বিয়ে করেছিস’?
-‘নাঃ’ তপনকে এবার যেন খানিকটা নিশ্চিন্ত দেখাল—’বেশ করেছিস এরকম ঝাড়া হাত-পা বাচাই ভালো’।
-‘সেসব ঠিক আছে, কিন্তু তুই এই দু-বছর কোথায় ছিলি’? তপন সামান্য হেসে বলল—’সব বলছি, আগে বল রাতে মাটন কারি দিয়ে রুটি চলবে তো’? ‘বৃন্দাবন রান্না চাপাচ্ছে’। মাথা নেড়ে জানালাম দিব্যি চলবে। তপন একটু ভেবে বলল—’কাল তো রবিবার, অফিস যাওয়ার তাড়া যখন নেই রাতটা এখানেই থেকে যা’। চারপাশের গুমোট পরিবেশ দেখে মাথা নাড়লাম।—’সরি ভাই, যা করে রেখেছিস, এখানে ঘুম আসবে না তার থেকে আমার ওই এক কামরার ফ্ল্যাটই ভালো’।
তপন ম্লান মুখে বলল—’যা ভালো বুঝিস’।
-‘এবারে বল দেখি এতদিন কোথায় ডুব দিয়েছিলিস’?
-‘ভগীরথপুরে’।
-‘সেটা আবার কোথায়’?
-‘উড়িষ্যায়, ঢেঙ্কানলের কাছাকাছি জঙ্গল ঘেরা একটা গ্রাম’।
-‘হঠাৎ’!
তপন দীর্ঘশ্বাস ফেলল—’হঠাৎ বলে কিছু নেই রে ভাই, সবই ভাগ্য! এমনকী তোর আজকে আমার এখানে আসা অবধি’। তপনের কথার ভঙ্গিটা বড় অদ্ভুত লাগল, কেমন যেন রহস্যময় একটা ইঙ্গিত বহন করছিল, তা ছাড়া আবছা অন্ধকারের মধ্যে ঘরের বদ্ধ পরিবেশটাও অসহ্য লাগছিল, বললাম—’তপন অন্তত একটা জানলা খোলার ব্যবস্থা কর’।
—’ঘরে ঠাণ্ডা হাওয়া ঢুকবে যে, আমার আবার কয়েকদিন হল শরীরটা একদম ভালো যাচ্ছে না’।
—’এই নভেম্বর মাসে এত ঠাণ্ডা পাচ্ছিস কোথা থেকে! কলকাতাটা কি দার্জিলিং হয়ে গেল নাকি’?
তপন যেন বিষম চিন্তায় পরে গেল, সামান্য পরে বলল—’ওই কোণের জানলাটা ভিতর থেকে ছিটকিনি আঁটা, ওটা খুলে দিচ্ছি’, তপন ঠেলে জানলার পাল্লা দুটো খুলেদিল আর তখুনি একঝলক তাজা হাওয়া ঢুকে একটা শীতল আমেজ ধরিয়ে দিল অবশ্য সেইসঙ্গে রাস্তার ল্যাম্প-পোস্টের আলোয় ঘরের অন্ধকারও খানিক দূর হল, এবারে খানিকটা হালকা বোধ করলাম। তপন তক্তপোষের উপর বাবু হয়ে বসে সিগারেটের প্যাকেটটা আমার দিকে এগিয়ে দিল। হাত নেড়ে বললাম—’সরি ভাই ওসব আমার চলে না’, তপন খানিক অবাক হয়ে বলল—’কেন আগে তো চলত’? বললাম—’হ্যা কিন্তু আজকাল ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করছি’। তপন আর কথা না বাড়িয়ে নিজের সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করল, তারপর আয়েশ করে ধোয়ার রিং ছেড়ে বলল—’একটা বিশেষ দরকারে তোকে ডেকে আনলাম, তবে সেটা বলার আগে আমার এতদিনের কার্যকলাপ সম্বন্ধে একটু জানানো দরকার, গোড়া থেকে খুলে না বললে তুই বিষয়টা ভালো করে বুঝতে পারবি না’। তপন একমুহূর্ত চুপ করে যেন মনের মধ্যে গুছিয়ে নিল তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল।
‘দু-বছর আগের ঘটনা। কিডনির অসুখে ভুগে মা সবে মারা গেছেন, তুই তো জানিস এর ঠিক ছ-মাস আগেই পথ-দুর্ঘটনায় বাবারও মৃত্যু ঘটেছে, হঠাৎ আমি একদম একা হয়ে পড়লাম। শোকে-দুঃখে একেবারে ভেঙেই পরেছিলাম, এই বাড়িতে কত আনন্দের মুহূর্ত কাটিয়েছি, কিন্তু এবারে বাড়ির পালটে যাওয়া পরিবেশটা অসহ্য লাগতে শুরু করল, কিছুই ভালো লাগছিল না, সারাদিন কাজের মধ্যেই ডুবে থাকতাম, আর হাতে কাজ না থাকলে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতাম। কাজ অবশ্য ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হিসেবেই করছি কেননা পাকাপোক্ত চাকরি তখনও জুটিয়ে উঠতে পারিনি। সেদিন ‘দৈনিক জাগরণের’ হয়ে গেছিলাম একটা রাজনৈতিক দলের মিটিং কভার করতে, সঙ্গে ফটোগ্রাফার অনিল। কলেজ স্কোয়ারে মিটিং চলছে, মামুলি সব ব্যাপার, ভিতরের পাতায় হয়তো কয়েক কলাম জুড়ে বিবরণ থাকবে তার বেশি কিছু নয় হঠাৎ পরিচিত স্বর শুনে পিছন ফিরে চাইলাম, দেখলাম ভিড়ের মধ্যে যোগেন দাঁড়িয়ে আছে, আমার দিকে হাসিমুখে চেয়ে বলল—’তপনদা আপনার কাজ মিটলে পর কফি হাউসে একবার দেখা করতে পারবেন? জরুরি দরকার আছে তবে একা আসবেন অন্য কারও সামনে বলা যাবে না’। যোগেন কাজের ছেলে আগেও অনেকবার ওর কাছ থেকে গুরুত্ত্বপূর্ণ খোঁজখবর পেয়েছি, জানিয়ে দিলাম আমি অবশ্যই আসব। মিটিং শেষ হতে অনিলকে অফিসের দিকে রওনা করে আমি যোগেনের সন্ধানে বেড়িয়ে পরলাম। ও কফি হাউসের একটা কর্নার টেবিলে বসে চা খাচ্ছিল আমাকে দেখে উঠে পড়ল, বলল—’বাইরে চলুন দাদা এখানে বলা যাবে না, রাস্তায় যেতে যেতে বলব’। বইপাড়ার রাস্তায় তখন প্রতিদিনের মতো অসংখ্য মানুষের ঢল তার মধ্যে হাটতে হাটতে যোগেন ফিসফিস করে বলল—’নকশাল নেতা সমীরণের ইন্টারভিউ করবেন’? চোখ কপালে উঠল, বলে কি! চারটে রাজ্যের পুলিশ যাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে, ইতিমধ্যে যার নামে প্রায় শ-খানেক খুনের মামলা ঝুলছে সেই সমীরণের ইন্টারভিউ আমি করব! বিস্ময়ের ধাক্কা সামলে বললাম—’কিন্তু সমীরণ তো আজ পর্যন্ত কাউকে সাক্ষাৎকার দেয়নি তা ছাড়া বড় বড় কাগজ ছেড়ে আমাদেরকেই বা দেবে কেন’? যোগেনের ঠোঁটের কোণে চিলতে হাসি খেলে গেল, বলল—’সমীরণ ইন্টারভিউ দেবে নিজের প্রয়োজনে, সে চাইছে জনগণের কাছে তার বক্তব্য পৌঁছোক, আর ছোট কাগজ! এটা সমীরণ চাইছে কারণ তার মধ্যে সবসময় একটা অ্যান্টি এসট্যাবলিসমেন্ট ফিলিংস কাজ করে। অবশ্য আপনি না চাইলে অন্য কাউকে বলা যেতেই পারে’। আমি তাড়াতাড়ি বললাম—’কাউকে কিছু বলতে হবে না, তুমি শুধু বল কবে, কোথায় যেতে হবে’? যোগেন একটু ভেবে বলল—’কাল বিকেল চারটেয় এখানেই দেখা করবেন, বাকি কথা তখন হবে’।
২
‘দৈনিক জাগরণের’ প্রভাসদা শুনে লাফিয়ে উঠলেন—’এটা তোমার কেরিয়ারে কত বড় ব্রেক হতে পারে আন্দাজ করতে পারছ? তা ছাড়া ভেবে দ্যাখ নামকরা সব সংবাদপত্র থাকতে আমাদের কাগজে সমীরনের একসক্লুসিভ ইন্টারভিউ যখন ফলাও করে ছাপা হবে তখন এর ইমপ্যাক্টটা কি হবে! লেগে পড়ো হে’। বললাম—’কিন্তু ওদের একটা শর্ত আছে আমাকে একাই যেতে হবে সঙ্গে ফটোগ্রাফার গেলেও চলবে না’। সম্পাদককে এবার একটু চিন্তিত দেখাল, বললেন—’ডকুমেন্টেশনের বিষয়টা মাথায় রাখবে তপন, ইন্টারভিউটাকে কেউ যেন ফেক বলতে না পারে’। বলে আমার হাতে একগোছা নোট ধরিয়ে রসিদ লিখিয়ে নিলেন, আর আমিও তৈরি হলাম আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযানের জন্য।
যোগেনের ব্যবস্থা মতো হাওড়া থেকে ঢেঙ্কানলের উদ্দেশ্যে ট্রেন ধরে রওনা হওয়া গেল। কেওনঝাড় রোডে নেমে জনৈক সুশীল মহাপাত্রর সঙ্গে দেখা করার কথা। ভদ্রলোক আমার জন্য ষ্টেশনে অপেক্ষা করছিলেন, বললেন—’রাতে ওদের ক্যুরিয়র আসবে, ততক্ষণ আপনি আমার গেস্ট। খাওয়া-দাওয়া করবেন বিশ্রাম করবেন, আর হ্যাঁ, কেউ জিগ্যেস করলে বলবেন আপনি এখানে ঘুরতে এসেছেন। বুঝতেই পারছেন চারপাশে পুলিশের ফেউ ঘুরে বেড়াচ্ছে’। সুশীলবাবুর কথা অনুযায়ীই কাজ হল। ভদ্রলোকের বাড়ি ষ্টেশন থেকে মিনিট কুড়ির পথ, ঘোড়ার গাড়ি করে পৌঁছোন গেল, পরে ওনার অনুরোধে অনিচ্ছা সত্ত্বেও সর্ষের তেল মেখে স্নান সারতে হল তারপর বিউলির ডাল আর পাঁপড় ভাঁজা দিয়ে থালা ভরতি ভাত খেয়ে ঘুম দেওয়ার চেষ্টা করলাম আর একটা সময় ঘুমিয়েও পড়লাম। ঘুম ভাঙতে দেখি সন্ধে নেমে গেছে। সুশীলবাবু কোথাও বেড়িয়েছেন। সুশীলগিন্নি এক পেয়ালা গরম চা দিয়ে গেলেন। এখন আর কিছু করার নেই শুধু রাতের জন্য হাপিত্যেস করে বসে থাকা ছাড়া। একটু পরে ভদ্রলোক বাড়ি ফিরলেন, ফিরেই জমাটি আড্ডা জুড়ে দিলেন, সে আড্ডার সিংহভাগ জুড়েই রইল জঙ্গল আর আদিবাসীদের জীবনযাত্রার কথা, মানুষটি গ্রামের স্কুলের অঙ্ক শিক্ষক, অনেক বাধা বিপত্তির সঙ্গে লড়াই করে আজ এতদূর পৌঁছোতে পেরেছেন, সেজন্য হাবভাবে খানিক আত্মশ্লাঘাও আছে মনে হল, তবে ওইটুকু বাদ দিলে ভদ্রলোক একেবারেই সাদাসিধে আটপৌরে মানুষ। লক্ষ করছিলাম সুশীলবাবু আর সব বিষয়ে কথা বললেও রাজনীতির প্রসঙ্গ একেবারেই এড়িয়ে যাচ্ছেন, আর সমীরণের নাম উঠলেই যেন কুঁকড়ে যাচ্ছেন, বুঝতে পারলাম নেহাত দায়ে ঠেকেই ভদ্রলোককে কলকাতার রিপোর্টার আর মাওবাদি নেতার মাঝে স্যান্ডুইচ হতে হয়েছে। নকশাল রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ কোনও যোগ এর নেই। এরকম একজন নিপাট ভালো মানুষের বাড়িতে এইভাবে উপদ্রব করার জন্য লজ্জিত হয়ে পড়লাম। যদিও সুশীলবাবু ওসব কথা কানেই তুললেন না। বললেন—’রাখুন তো মশাই, তাও অনেকদিন পর একজন শহুরে মানুষের সঙ্গে গল্পগুজব হল, বাইরের দুনিয়ার ফার্স্ট-হ্যান্ড কিছু খবর তো পেলাম, আর আমরা তো এই জঙ্গল দেশের বাইরেই যেতে পারি না, আমাদের এখন জংলি বলাই সাজে’।
রাত ন-টা নাগাদ ভিতর থেকে ডিনারের ডাক পড়ল। দাওয়ায় বসে সুশীলবাবুর সঙ্গে রুটি দিয়ে কুমড়োর ঘ্যাট চিবুচ্ছি সুশীলবাবু বললেন —’তৈরি থাকবেন ওরা বারোটা নাগাদ আসবে’। নৈশাহার সাঙ্গ হতে সুশীলবাবু বিদায় নিয়ে অন্দরমহলের দিকে পা বাড়ালেন আর আমিও আমার জন্য বরাদ্দ ঘরটায় গিয়ে অপেক্ষায় বসলাম। পরের কয়েকটা ঘন্টা ঝিঁঝিঁর ডাক শুনে আর ঘড়ির দিকে অধৈর্যভাবে চাইতে চাইতে সময় কাটতে লাগল। প্রায় সাড়ে বারোটা নাগাদ আমার সজাগ কানে সদর দরজায় সাবধানী টোকার আওয়াজ ধরা পড়ল। বুঝলাম আমার বন্ধুরা এসে গিয়েছে। বাইরে একটা শশব্যস্ত পায়ের আওয়াজ, তারপর ছিটকিনি খোলার শব্দ। সামান্য বিরতির পর পায়ের শব্দটা এবার এই ঘরের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। দরজার বাইরে সুশীলবাবু চাপা স্বরে বললেন —’তপনবাবু একবার বাইরে আসবেন’। তৈরিই ছিলাম, কাধে ব্যাগটা ঝুলিয়ে বেড়িয়ে এলাম। বাড়ির প্রশস্ত উঠোনটায় তখন দুজন আগুন্তুকের আবির্ভাব হয়েছে। লোক দুটির পরনে খাকি প্যান্ট আর হাওয়াই শার্ট, দুজনেরই মুখ গামছা দিয়ে আড়াআড়িভাবে ঢেকে রাখা। সুশীলবাবুকে দেখলাম তঠস্থভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। লোকগুলো ওড়িয়া আর ভাঙা বাংলা মিশিয়ে যা বলল তাতে মাথা ঘুরে গেল। বিশেষ অসুবিধার জন্য সমীরণ ইন্টারভিউ বাতিল করেছে, এ বিষয়ে আর দ্বিতীয় কথা হবে না। লোকগুলোর শরীরী ভাষা আর বাচনভঙ্গিতে স্পষ্ট এরা কথা কানে তোলার পাত্র নয়, ওরা আর কালক্ষেপ না করে ঠান্ডা স্বরে বলে গেল, কাজ যখন হল না তখন শুধুমুধু এখানে সময় নষ্ট করার কোনও মানে হয় না, আগামীকাল সকাল আটটা চল্লিশের প্যাসেঞ্জারটা ধরলে বারোটার মধ্যে ভুবনেশ্বর পৌঁছোন যাবে। আর ভুবনেশ্বর থেকে কলকাতার গাড়ি পাওয়াটা কোনও ব্যাপার নয়। বুঝলাম এটা পরামর্শের মোড়কে পোরা আদেশের নামান্তর যার অন্যথা করলে এই জঙ্গল রাজ্যে আমার জীবনের মূল্য আর কানাকড়িও থাকবে না।
মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লাম, এর ফল আমার জন্য কতটা খারাপ হতে পারে সেটা শুধু আমিই জানি। প্রভাসদা আমার ওপর যে আস্থা রেখেছেন সেটা নষ্ট হতে বাধ্য কারণ ইন্টারভিউয়ের প্রস্তাবটা আমিই হাজির করেছিলাম। এরপর কি উনি আর আমার ওপর ভরসা রাখতে পারবেন? আমার অবস্থা দেখে বোধহয় সুশীলবাবুর দয়া হল। গলার স্বর যথাসম্ভব নামিয়ে বললেন—’সমীরণ যখন দেখা করবে না বলেছে তখন কারও সাধ্য নেই ওর ধারে কাছে যেতে পারে, তবে আপনি এতদূর এসে খালি হাতে ফেরত যাবেন। একটা খবরের সন্ধান আমি আপনাকে দিতে পারি যদি আপনার আগ্রহ থাকে’? সমীরণের ইন্টারভিউ করার চেয়ে গুরুত্ত্বপূর্ণ এই মুহূর্তে আমার কাছে আর কিছুই নেই তাও সুশীলবাবুর কথায় সাড়া দিলাম—’কি ধরনের খবর’? সুশীলবাবু গলার স্বর আরও নামিয়ে প্রায় ফিসফিস করে বললেন—’এখান থেকে প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার দক্ষিণে গেলে জঙ্গলের মধ্যে ভগীরথপুর গ্রামে নরবলি হয়’। শুনে চমকে উঠলাম! লোকটা বলে কি?—’বাবু রান্না হয়ে গেছে’। কর্কশ কণ্ঠস্বরে তপনের কথায় ছেঁদ পড়ল। বৃন্দাবন এসে হাজির হয়েছে। তপন খাট থেকে উঠে পড়ল—’খেয়ে নেওয়া যাক’।
—’কিন্তু তারপর কি হল’?
—’সেকথায় আসছি, ডিনারের পরে’।
৩
ঘড়িতে মোটে সোয়া আটটা বাজে কিন্তু শীতের সন্ধেয় অন্ধকারাচ্ছন্ন এই বাড়ির মধ্যে এখনই যেন মধ্যরাত্রির অনুভূতি হচ্ছে। একটা চাকাওয়ালা ট্রলি টেবিলের উপর স্টিলের থালায় রুটি আর চিনেমাটির পাত্রে খাসির মাংসের ঝোল সাজিয়ে বৃন্দাবন চলে গেল। তপন ওর খাবারের থালা নিয়ে উলটোদিকের চেয়ারে পা তুলে বসল, আর আমিও হাত ধুয়ে খেতে বসলাম। খিদেটা ভালোমতোই চেগেছিল, হাতে গড়া রুটির বড়সড় একটা টুকরো একখণ্ড মাংস সমেত ছিড়ে মুখের ভিতর চালান করে দিলাম।
বৃন্দাবনের রান্নায় ঝাল আর নুনের কিছুটা বাড়াবাড়ি থাকলেও খেতে নেহাত মন্দ লাগল না। তপনকে দেখলাম খুবই সামান্য পরিমাণে খেল, নামমাত্র মুখে দিয়েই বৃন্দাবনকে এঁটো বাসন নিয়ে যেতে বলল, আমি স্বপ্রশ্ন দৃষ্টে চাইতে বলল—’পেটপুরে খেলে ঘুম পেয়ে যাবে, আর আজ রাতে কিছু দরকারি কাজ আছে জেগে থাকতে হবে’। আমি আর কথা না বাড়িয়ে রুটি-মাংসে মন দিলাম। আমার সবেধন নীলমণি, জগন্নাথের রান্না অতি অখাদ্যি, যে খেয়েছে সে বুঝবে, সে তুলনায় বৃন্দাবনের রাঁধা মাংস তো অমৃত সমান, তপন বলল—’জয়ন্ত স্যালাড দিতে বলি, আর বৃন্দাবন বলছিল বাজার থেকে ফ্রেস কাঁচাগোল্লা নিয়ে এসেছে’। বিরক্ত হয়ে বললাম—’জিগ্যেস করার কি আছে, যা আছে তাড়াতাড়ি নিয়ে আয়’। তপন ব্যস্ত হয়ে—’হ্যা আসছি’ বলে হন্তদন্ত হয়ে বেড়িয়ে গেল আর তিন মিনিটের মধ্যেই ফেরত চলে এল তার দু-হাতে ধরা দুটো প্লেটের একটাতে কয়েকটা শসার টুকরো অন্যটায় খান চারেক মাখা সন্দেশ। শসাগুলোতে বৃন্দাবন যত্ন করে নুন, গুড়ো লংকা মাখিয়ে দিয়েছে সেগুলো গলাধঃকরণ করে মিষ্টির প্লেটটা হাতে তুলে নিলাম, তপনের দিকে চাইতে ও হেসে বলল—’তুই খা আমার জন্য রাখা আছে’। ভালো কথা, নৈশভোজ সাঙ্গ হল। এঁটো হাত ধুয়ে চেয়ারে এসে বসলাম।
তপন খাটের উপর আয়েশ করে বসে মুখে একচামচ মৌড়ি ফেলে চুষতে চুষতে আবার বলতে শুরু করল—’সুশীলবাবুই সব ব্যবস্থা করে দিলেন, ভগীরথপুরে কিছুদিন আগে মাটি খুঁড়ে একটা প্রাচীন মন্দির আবিষ্কার হয়েছে তাই ওখানে আজকাল সংখ্যায় খুব কম হলেও ট্যুরিস্টের যাতায়াত শুরু হয়েছে, আমিও রিপোর্টার কাম গবেষক সেজে রওনা দিলাম।
ভগীরথপুর গ্রাম একেবারেই অজ-পাড়াগাঁ। না আছে ইলেকট্রিসিটি না পাকা রাস্তাঘাট, সন্ধের পর পুরো গ্রামটাই অন্ধকারে ডুবে যায়। আধুনিক যুগের অগ্রগতির ঢেউ এখানে চরমপন্থি আন্দোলনের ধাক্কায় একেবারেই থমকে গেছে। সুশীলবাবু সতর্ক করেই দিয়েছিলেন, এখানে মোবাইল ফোন বা ক্যামেরা ব্যবহার করা যাবে না, অন্যথায় নকশালদের নজরে পরে যাওয়ার সম্ভাবনা। আমিও সেইমতোই ব্যবস্থা করলাম, মোবাইলটাকে সুইচ অফ করে ব্যাগের এক কোণে ঢুকিয়ে রাখলাম। আমার থাকার ব্যবস্থা হল সনাতন হাঁসদার বাড়িতে, নামমাত্র ভাড়ায় থাকার জন্য একটা খড়ের ছাউনি দেওয়া মাটির ঘর আর খাওয়ার ব্যবস্থাও ওনার সঙ্গেই হবে স্থির হল, যাকে শহরে বলে পেয়িং গেস্ট, সেই আর কি। যে মন্দিরটা দেখার অজুহাতে এসেছি, সেটা নেহাতই মামুলি একটা পোড়া মাটির মন্দির, কোনও গ্রাম্য জমিদারের খেয়ালে গড়া হিসেবি নির্মাণ, প্রত্নতত্ত্বে আমার সামান্য যেটুকু জ্ঞান আছে তাতে হলপ করে বলতে পারি, ইতিহাসের কোনও খেয়ালি পড়ুয়াও এর পিছনে বাড়তি সময় খরচ করবে না। আমি দুটোদিন ম্যাগ্নিফাইং গ্লাস হাতে নিয়ে মন্দিরের দেওয়ালগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম আর নোটবুকের পাতাগুলো হিজিবিজি লিখে ভরিয়ে ফেললাম। সমস্যা হল এই অজ-পাড়াগাঁয় বেশিদিন থাকলে স্থানীয় লোকের সন্দেহের উদ্রেক হতে পারে, যদিও কপাল জোরে সেইসময় সনাতনের মেয়ের বিয়ের তোড়জোড় চলছিল, সুযোগ বুঝে সনাতনের সামনে আহ্লাদে গদগদ হয়ে কথাটা পারলাম, আদিবাসী বিয়ের অনুষ্ঠান দেখাটা আমার জীবনের স্বপ্ন, সনাতন খুশি মনেই আমাকে নেমন্তন্ন করল আর আমিও হাতে দুটো সপ্তাহ বাড়তি সময় পেয়েই গেলাম। সনাতনের একটা ভাগ্নে আছে বৃন্দাবন, যাকে আমার সঙ্গে দেখছিস, ছেলেটির বাবা-মা ওর খুব ছোট বয়সেই গত হয়েছেন, বৃন্দাবনের মাথায় বুদ্ধিশুদ্ধি তেমন কিছু নেই, মামা-মামির গলগ্রহ বিশেষ, উদয়াস্ত খেটেও এই সংসারে সে যে মূল্যহীন তা বলাই বাহুল্য। ছেলেটা খুব সহজেই আমার নেওটা হয়ে পড়ল, অজ-পাড়াগাঁর এই পরিবেশ থেকে শহরের জাঁকজমক বৃন্দাবনকে খুব বেশিরকমের আকর্ষণ করে, ওর ধারণা সেখানে একবার গিয়ে পড়তে পারলেই জীবনের সব ইচ্ছা পূর্ণ হতে বাধ্য, ওর মন রাখার জন্য একদিন বললাম ওকে শহরে নিয়ে যাব যেখানে আমি থাকি।
গ্রামের শেষ প্রান্তে জঙ্গলের মধ্যে অনার্য দেবতা চণ্ডদেবের মন্দির। মন্দিরটা অত্যন্ত প্রাচীন, স্থানীয় লোকেদের বিশ্বাস সেটা নাকি সৃষ্টির আদিকাল থেকেই ওখানে আছে, তবে বাজে কথায় কান না দিয়েও স্থাপত্যের ধরন দেখে বলা যায় মন্দিরটা আর কিছু না হোক অন্তত তিনশো বছরের পুরোনো তো হবেই। সুশীলবাবুর কথামতো এখানেই নরবলি হয়ে থাকে। মন্দিরটায় চেষ্টা করেও ঢুকতে পারিনি, স্থানীয়েরা তো মন্দিরের দশ হাত দূর থেকেই প্রণাম করে পালায়, বিশেষ দিন ছাড়া এই মন্দিরে ঢুকলে নাকি দেবতার কোপে সর্বনাশ হতে বাধ্য। আমি অবশ্য গ্রাম্য সংস্কারে মাথা ঘামাই না কিন্তু যখনি ওদিকে গেছি, মন্দিরের পাহারাদার সুরকি হাতে তেড়ে এসেছে। মন্দিরটা সারাদিন পাহারা দেয় দুজন গাঁট্টাগোট্টা আদিবাসী যুবক, রাতের দিকে অবশ্য কোনও পাহারা থাকে না, তখন মন্দিরে থাকে ওখানকার পুরোহিত।
কয়েকটা দিন জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে কেটে গেল। মন্দির আর তার দেবতার ব্যাপারে কয়েকটা খবর এর মধ্যে জোগাড় হয়েছে। চণ্ডদেব জাগ্রত দেবতা, ভক্তের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করতে তিনি সর্বদা উদারহস্ত তবে পাল্লা দিয়ে তার রক্ত লোলুপতাও যেন লাগামছাড়া। গ্রামের লোকেরা হাঁস, মুরগি, পায়রা, মহিষ যার যেমন সামর্থ মানসিক করে আর বছরের একটা বিশেষ দিনে, দেবতার উদ্দেশ্যে বলির জন্য সেগুলিকে হাজির করানো হয়। রক্তের স্রোতে মন্দিরের চাতাল যখন থইথই করে তখন নাকি চণ্ড বিশেষ প্রসন্ন হন। এই মন্দিরে আপামর জনসাধারণের প্রবেশাধিকার বছরের শুধু ওই একটি বিশেষ দিনের জন্যই বরাদ্দ। মাঘ মাসের অমাবস্যা তিথির রাত যেটা এই অঞ্চলে ”চণ্ডের রাত” বলে বিখ্যাত, ঠিক তার পরের দিন সূর্যোদয়ের পর। ওই বিশেষ দিনটি বাদ দিলে বাকি বছরভর শুধুমাত্র একজন ব্যক্তিরই চণ্ডের সেবার অধিকার আছে আর সে হচ্ছে মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ত্রিলোচন, এমনকী গ্রামের যে দুজন যুবক পালা করে মন্দির পাহারা দেয় তাদেরও নাকি সদর দরজা ঠেলে চৌহদ্দির মধ্যে প্রবেশাধিকার নেই। পুরোহিত ত্রিলোচন সম্পর্কেও অদ্ভুত সব কথা কানে এল। লোকটা নাকি কপাল দেখে ভূত-ভবিষ্যৎ-বর্তমান বলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে, ইচ্ছেমতো যেকোনও লোককে সম্মোহনের দ্বারা বশীভূত করাটাও তার কাছে ছেলেখেলা তবে সবথেকে যেটা মারাত্মক সেটা হল যাকে তাকে বাণ মেরে পঙ্গু করে দিতে সে নাকি সিদ্ধহস্ত।
তপন যেন শ্বাস নেওয়ার জন্য থামল আর সুযোগ পেয়ে আমি বললাম—’যতসব মধ্যযুগীয় কুসংস্কার’। তপন সামান্য কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল, তারপর গভীর স্বরে বলল।—’শুরুর দিকে আমারও তেমন কিছুই মনে হয়েছিল, যাইহোক এই মুহূর্তে শুধু এটাই বলতে পারি ত্রিলোচনের অদ্ভুত ক্ষমতার পরিচয় আমি শীঘ্রই পেয়েছিলাম। এরপরের ঘটনা বলি’।
‘ত্রিলোচনকে দেখলাম গ্রামের লোকজন যমের মতো ভয় করে আর নেহাত দরকার না পড়লে ধারকাছ মাড়ায় না। আমি খোঁজখবর করে বুঝলাম আর কিছু না হোক দুটো জিনিসের প্রতি ওর আকর্ষণ দুর্নিবার! মদ আর গাঁজা। মনে হল ওদুটো জিনিস প্রয়োজনমতো জুগিয়ে গেলে লোকটার বন্ধুত্ব অর্জন করা সম্ভব। বাস্তবে হলও তাই। সম্পাদকের কাছ থেকে পাওয়া টাকার কিছুটা দেশি মদ আর গাঁজা কিনতে খরচ হয়ে গেল। ফলও মিলল হাতেনাতে, ত্রিলোচনের কপালে এমন উপুড়হস্ত বন্ধু আগে কখনও জোটেনি, যে না চাইতেই মদ, গাঁজার ভেট এনে মুখের সামনে হাজির করে। আমি অচিরেই ত্রিলোচনের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠলাম। তারপর থেকে আমার দিনের বেশিরভাগ সময় ত্রিলোচনের সঙ্গেই কাটতে লাগল। গাঁজার কল্কেতে দম দিয়ে আমরা দুজনে গ্রামের মাঠে-ঘাটে, শ্মশানে মশানে পরে থাকতাম, ত্রিলোচনের কাছে ছিল পাহাড়-জঙ্গলের অদ্ভুত সব কাহিনির অফুরন্ত স্টক, আর মাঝেমধ্যে শোনাত চণ্ডদেবের নানা অলৌকিক ক্ষমতার কাহিনি। এহেন ত্রিলোচন আবার নাকি মারাত্মক রকমের উচ্চাকাঙ্ক্ষী! তার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্বপ্ন হল জনৈক বাবুলাল ওঝার মতো নাম-যশ-প্রতিপত্তি অর্জন করা, এই জঙ্গলদেশে নেহাত আনাড়ি আমি, তাই ত্রিলোচনের উচ্চাশার পরিমাপ করতে পারলাম না। জঙ্গলের ভিতরে একটা বিশেষ স্থানে বাবুলালকে সমাধি দেওয়া হয়েছে, সেই জায়গাটাকে স্থানীয়েরা বাবুলালের টিলা বলে অভিহিত করে, এই টিলাটির নাকি আবার বিশেষ মাহাত্ম্য আছে, ত্রিলোচন বলল একদিন আমাকে সেখানে নিয়ে যাবে।
এই ত্রিলোচন লোকটি বড়ই জটিল প্রকৃতির, সময় সময় বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার করলেও ওর চরিত্রের সব থেকে বড় দোষ ছিল ওর আত্মভরিতায়, আমার জীবনে এত উদ্ধত আচরণের প্রদর্শন আগে কখনো দেখিনি, গ্রামের সাধারণ লোকজনকে তো সে মনুষ্যপদবাচ্য বলে মনেই করত না, আমাকে হয়ত কিছুটা অন্য চোখে দেখত, সেটা আমার শহুরে ব্যাকগ্রাউন্ডের জন্য হতে পারে, তবে পান থেকে চুন খসলেই আর রক্ষে ছিল না! সামান্য বিষয়েও যাচ্ছেতাই ভাষায় অপমান করে খেঁদিয়ে দিত, পরে আবার মাথা ঠাণ্ডা হলে ডেকে গল্প জুড়ত। আমি দাঁত চিপে সব সহ্য করছিলাম কেননা আমার অবচেতন মন যেন আমার মস্তিষ্ককে ক্রমাগত সংকেত দিচ্ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন এই আদিম গ্রামটার মধ্যে এমন কিছু আছে যেটা এই ছন্নছাড়া রিপোর্টারের জীবনের ধারা বদলে দিতে পারে, অতীতে মনের নির্দেশে গুরুত্ব না দিয়ে ঠকেছি, এবারে সিদ্ধান্ত নিলাম একটু ধৈর্য ধরে দেখব কি ঘটে?
একদিন ভরপেট চোলাই মদ আর শুয়োরের মাংস খেয়ে ত্রিলোচনের মনে বড় ফুর্তি জাগল, দরাজ কণ্ঠে বলল—’বাবু তুদের শহরের লোকগুলা বড় হারামি, আর মাগি-গুলো মুখে স্নো-পাউডার ম্যাখে নিজেরে হিরোনি ভাবে! আমাদের গেরামের ঘর-গেরস্থদের মানুষ বলেই মান্যি করে না, যত্ত শালা হারামজাদা হারামজাদির দল। তবে বাবু তুই উদের মতো না রে, তু শালা ভালো মানিষ আছিস, আয় তোরে আজ চেলা বানাই লি’। মহা মুশকিল হল! ত্রিলোচনের চেলা হওয়ার কোনও বাসনাই আমার নেই, কিন্তু সে কথা মুখে বললে বেমক্কা গালাগালি খাবার সম্ভাবনা, যতই এড়ানোর চেষ্টা করি ত্রিলোচনের জেদ ততোই বাড়ে, শেষে উপায়ন্তর না দেখে রাজি হতেই হল, ত্রিলোচন খুশি হয়ে বলল—’আয় তবে তোরে একটা শুকনো বাণ মারা শ্যাখায় দি, এতে করে তুই শত্তুরে জব্দ করতে পারবি তবে জানে কিন্তু মারতে পারবি না, জানে মেরে দিতে চাইলি কিন্তু অন্য জিনিস আছে, সে তোরে আমি পরে শিখায়া দিব’।
ত্রিলোচন এরপর আমাকে একটা মন্ত্র আর তার প্রয়োগ শিখিয়ে দিল, এই ক্রিয়ার জন্য যেসব জিনিসপত্র দরকার সেসবও বলে দিল, মনে প্রচুর অবিশ্বাস সত্ত্বেও ত্রিলোচনের সন্তুষ্টির জন্য আমি মন্ত্রটা মুখস্থ করে নিলাম। ত্রিলোচন এবার গুরুদক্ষিণা চাইল, মানিব্যাগটা প্যান্টের পকেট থেকে বের করা মাত্র ওর ভিতরে যা ছিল হ্যাঁচকা টানে কেড়ে নিয়ে দূর দূর করে খেঁদিয়ে দিল।
৪
ত্রিলোচনের সঙ্গে যত মিশছি তত অবাক হচ্ছি, লোকটা প্রথাগতভাবে অশিক্ষিত আর বুনো হলেও যে ক্ষুরধার বুদ্ধিসম্পন্ন সে বিষয়ে আমার তিলমাত্র সন্দেহ নেই। সুরা ছাড়া আর একটা বিষয়ে তার আকর্ষণ অতি তীব্র সেটা হচ্ছে নারী! সে আমাকে প্রায়ই শহরের মেয়েদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করে, গ্রামের মেয়েদের মধ্যে নাকি সেই জিনিসটাই নেই, যেটা আবার ওই শহুরে রমণীদের রয়েছে, আমি যতই বলি ও ব্যাপারটায় আমার অভিজ্ঞতা খুবই সামান্য ত্রিলোচন মানতে নারাজ! শেষে বানিয়ে বানিয়ে নানারকম রসালো গল্প উপস্থাপন করতে ত্রিলোচন বেজায় সন্তুষ্ট হল। লোভী স্বরে বলল—’বাবু আর দুটো বছর কোনওরকমে হু শব্দে কেটে যাক তারপর শহরে গিয়ে মৌজ করব, শহরের মাগিগুলা তো পয়সার ভুখা! তা তুই ওদের ট্যাঁক ভরে দিবিখন। আমি বিনীতভাবে জানাতেই যে এত পয়সা আমার কাছে কোনওদিন ছিল না এবং ভবিষ্যতেও কখনো হবে না, ত্রিলোচনের মুখ দেখে মনে হল সে যেন অবোধ বালকের নির্বুদ্ধিতায় বেশ মজা পেয়েছে, স্বস্নেহে বাৎসল্যে ভরা হাসি হেসে বলল—’তুর কাছে পয়সা কুথায়? পয়সা তোরে আমি দিব’। সেই বা এত পয়সা কোত্থেকে পাবে ঈশ্বর জানেন! কথায় কথায় ত্রিলোচন জানিয়েছে সে গত পাঁচ বছর ধরে কঠোর ব্রহ্মচর্য পালন করছে, কিন্তু কি উদ্দেশ্যে সেটা কিছুতেই বলতে চায় না। কি ঘটতে চলেছে আর দু-বছর পরে ত্রিলোচনের জীবনে সেটা একটা প্রহেলিকা! পাহাড় জঙ্গল ঘেরা সভ্য জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন এই আদিম গ্রামে সবকিছুই যেন রহস্যময় আর এর সবথেকে বড় রহস্য খোদ ত্রিলোচন ওঝা।
আমি মাঝে মধ্যেই নরবলির বিষয়টা উত্থাপন করে ত্রিলোচনের পেট থেকে কথা বের করার চেষ্টা করতাম কিন্তু ধূর্ত লোকটা উদাসিনভাবে শুধু একটাই জবাব দিত—’উসব আগে হত শুনছি, এখন কুথায় হয় কে জানে’! বুঝতে পারছিলাম এই লোককে কায়দা করা সহজ কাজ নয় এর যতটা প্রকাশ্যে ততটাই যেন গোপনে, এত ঘনিষ্ঠতা সত্ত্বেও সে আজ পর্যন্ত আমাকে মন্দিরের ভিতরে প্রবেশ করতে দেয়নি। কখনোসখনো অসতর্ক মুহূর্তে কিছু বলে ফেললেও তার মনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা গোপন তথ্যের হদিশ তাতে করতে পারছিলাম না। নেশার ঘোরে বলে ফেলা ত্রিলোচনের অসংলগ্ন কিছু কথার সূত্র ধরে একটা ধারণা ক্রমশ মনের মধ্যে দানা বাঁধছিল, যেটা শুধু একটা নির্দিষ্ট দিকেই ইঙ্গিত করছিল, রহস্যের কেন্দ্রবিন্দু ত্রিলোচনের পূজিত ওই চণ্ডমন্দির! যেখানে আমি এখনো পর্যন্ত পা রাখতে পারিনি। আমার কৌতূহল ক্রমশ বাড়ছিল!
একদিন ত্রিলোচন আমাকে বলল—’বাবু মোড়লের বউ-টারে দানোয় পেয়েছে, ছাড়াতে যাব, তুই সাথে যাবি’?
ভাবলাম মন্দ কি, নতুন একটা মজা দেখা যাবে! ত্রিলোচনের সঙ্গে আমিও মোড়লের বাড়ির উদ্দেশ্যে হাঁটা দিলাম। এই গ্রামে যে দু-তিন ঘর অবস্থাপন্ন ব্যক্তির বাস, মোড়ল তাদের মধ্যে একজন। টালি আর খড়ে ছাওয়া ইটের দেওয়ালের ঘর।বাড়ির সামনে বারান্দা আর প্রশস্ত উঠোন। সেখানে দড়ির খাটিয়ায় বসে মোড়ল আর একজন তামাক খাচ্ছিল, ত্রিলোচনকে দেখে শশব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল। উঠোনে অনেকগুলো লোক বসে, এরা গ্রামের সাধারণ সব মানুষ, মোড়লের দরকারে হাজিরা দিতে এসেছে। মোড়ল আমাদের খাতির করে খাটিয়ায় বসাল। ত্রিলোচনের দেখলাম তিরিক্ষি মেজাজ। ধমক দিয়ে জানতে চাইল এখনো চণ্ডের বলির উদ্দেশ্যে মোষের ব্যবস্থা হয় নি কেন? তা ছাড়া আজকাল মন্দিরের সেবার জন্য সিধের জোগান ঠিকমতো আসছে না কেন? মোড়ল হাতজোড় করে জানাল সবই তার দোষ, তবে কিছুদিন হল বাজার মন্দা চলাতে একটু অসুবিধে হয়ে গেছিল, ভবিষ্যতে এমন ভুল আর হবে না। ত্রিলোচন এবার একটু ঠাণ্ডা হল। খানিকটা তামাক টেনে মোড়লকে বলল রোগীকে এনে হাজির করতে। মোড়ল তাড়াহুড়ো করে বাড়ির ভিতর ছুটল আর এদিকে ত্রিলোচন নিজের কাজ শুরু করল, প্রথমেই কাধের ঝোলাটা হাতড়ে তার থেকে একটা গামছা বের করে উঠোনের নিকোনো মেঝের উপর পাতল। ঝোলা থেকে এরপর কয়েকটা লাল ফুল আর একটা তারের খাঁচা বের করে একটা একটা করে ওই গামছার উপর রাখল। দেখে চমকে উঠলাম খাঁচার মধ্যে একটা জীবন্ত খরগোস। খরগোসটা লম্বা কান দুটো খাড়া করে ভীত চোখে এদিক-ওদিক চাইছিল। খাঁচাটা এতই ছোট যে বেচারার নড়াচড়ার জায়গাও কিছু ছিল না। উপস্থিত জনতার মধ্যে একটা গুঞ্জন উঠল। মোড়লের বউকে এনে হাজির করা হয়েছে। আমার অবাক হওয়ার একটা সীমা আছে যেটা এই গ্রামে আসা ইস্তক প্রতিদিনই পরীক্ষার সম্মুখীন হচ্ছে আজকেও খুব ব্যতিক্রম ঘটল না। বছর পঁয়ষট্টির বৃদ্ধ মোড়লের বউ দেখলাম বছর বাইশের এক তন্বী যুবতী! মেয়েটির পরনের বেশ আলুথালু, শাড়ির আঁচল বুকের উপর থেকে সরে গিয়ে ব্লাউজের ফাঁক দিয়ে পুরুষ্টু ভাঁজটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, উপস্থিত পুরুষদের কয়েকজনের মুখ দেখে মনে হল যুবতী শরীরের এই অপ্রত্যাশিত প্রদর্শন তাদের কাছে বেশ একটা ফাউ। এদিকে মেয়েটিকে সামলানোই দায়। দুজন মহিলা আর মোড়লকে সে একাই যথেষ্ট বেগ দিচ্ছে, প্রবল আক্রোশে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করতে এই অতিমানবী কোনওরকম ত্রুটি করছে না। ত্রিলোচন দেখলাম কৌতুকের দৃষ্টিতে ঘটনাটি দেখছে যেন শেষ কথা যা বলার সেই বলবে এখন মোড়ল নিজের ক্ষমতার দৌড়টা একটু বুঝে নিক। বেশি অপেক্ষা করতে হল না, মোড়লের কালঘাম ছুটে গেল, কাতর স্বরে মিনতি করে বলল—’দাদাঠাকুর আর যে পারছি না, কিছু একটা করো’। ত্রিলোচন দাম্ভিক হেসে বলল—’ওকে আমার সামনে ওই আসনটায় বসা’। আর একদফা সংঘর্ষ শুরু হল। এবার ভিড়ের মধ্যে থেকে আরও এক-দুজন এসে হাত লাগাল, অতিকষ্টে অনিচ্ছুক মেয়েটিকে ধরে পাকড়ে বসানো গেল। ত্রিলোচন আলখাল্লার পকেট থেকে একটা ছোট শিশি বের করে জলের মতো তরল কিছু মেয়েটির গায়ে ছিটিয়ে দিল। ভোজবাজির মতো কাণ্ড ঘটল! যে মেয়েটা এতক্ষণ বুনো মোষের মতো ছটফট করছিল সে হঠাৎ মুহূর্তমধ্যে শান্ত হয়ে পড়ল। ভালো করে দেখে বুঝলাম ও কিন্তু শান্ত হয়নি। সাপ যেমন ক্ষণিকের জন্য সাপুড়ের বশে থেকে ফণা দুলিয়ে ছোবল মারার সুযোগ খোঁজে মেয়েটিরও এখন ঠিক তেমন অবস্থা। ত্রিলোচনের নির্দেশে মোড়লের দল দূরে সরে গেল। ত্রিলোচন এবার অদ্ভুত সব কাণ্ডকারখানা শুরু করল। প্রথমেই অদ্ভুত সুরে দুর্বোধ্য মন্ত্র উচ্চারণ করতে করতে একমুঠো কালো তিল ঝোলা থেকে বের করে ফুল গুলোর উপর ছড়িয়ে দিল তারপর একঘেয়ে সুরে সেইরকম মন্ত্র পরতে পরতে ফুলগুলো সুতো দিয়ে মালায় গেঁথে ফেলল, আমি এসব দেখে সেই মুহূর্তে মনে মনে ভাবছি ভণ্ডামির বহর আর কতদূর গড়াবে, তখুনি ত্রিলোচন সজোরে দু-হাতের চেটো দিয়ে তালি বাজিয়ে ফুলের মালাটা সামনে বসা মেয়েটির গলায় পরিয়ে দিল। যুবতীটি আচমকা সদ্য ডানা ছাটা মুরগির মতো কাতরাতে কাতরাতে ভয়ংকর আর্তনাদ করে উঠল। ত্রিলোচন অতি দ্রুত হাত চালিয়ে খাঁচা থেকে খরগোসটাকে বের করে মেয়েটির মুখের সামনে তুলে ধরল। দেখলাম ঝিমিয়ে পরা খরগোসটা সহসা অতিমাত্রায় চঞ্চল হয়ে পড়েছে। ত্রিলোচন যেন তাকে আর হাতে ধরে রাখতেই পারবে না এমনই তার ছটফটানি। হঠাৎ মেয়েটি কানফাটা তীব্র চিৎকার করে উঠোনে শুয়ে পড়ল আর তখুনি নিজের চোখে না দেখলে, কানে না শুনলে, হয়তো বিশ্বাস করতাম না, একটা হিংস্র অমানুষিক গর্জন যেটা শিরদাঁড়ায় হিমেল স্রোত বইয়ে দিল! শব্দটা এসেছে ত্রিলোচনের হাতে ধরা ছোট্ট খরগোসটা থেকে। কোনও অশুভ জাদুর প্রভাবে সুন্দর ছোট্ট প্রাণীটার আচমকা কুৎসিত রূপান্তর ঘটেছে। গায়ের সবকটা লোম খাড়া হয়ে ইতিমধ্যে সে একটা বিড়ালের আকারে পরিণত হয়েছে। সামনের পাটির দাঁত দুটো ঠেলে বেড়িয়ে এসে ধারাল ছুরির মতো চকচক করছে। তবে সবথেকে মারাত্মক ওর ভাবলেশহীন চোখ দুটোর বদলে যাওয়া উদ্দাম হিংস্র দৃষ্টি। ত্রিলোচন জন্তুটাকে উঠোনের মেঝেতে ছেড়ে দিল। মুক্তি পেতেই জানোয়ারটা তিন লাফে মোড়লের বাড়ির চৌহদ্দি ডিঙিয়ে বাঁশঝাড়ের মধ্যে সেঁধিয়ে গেল। গ্রামবাসীরা এতক্ষণ ভীত সন্ত্রস্তভাবে ভূত ওঝার খেলা দেখছিল এবারে সকলে একযোগে ত্রিলোচনের জয়ধ্বনি করে উঠল। মোড়ল বিগলিত স্বরে বলল—’দাদাঠাকুর তুই আমার বউরে বাঁচিয়ে দিলি, আর কখনও তোর কুন কথার অমান্যি করব না’। ত্রিলোচনকে স্পষ্টতই ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। সে গামছার খুট দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বলল—’কাজ এখনো বাকি আছে রে মোড়লের পো। ওই যে জানোয়ারটা জঙ্গলে ঢুকে গেল, ওর মধ্যে তোর কচি বৌয়ের প্রাণ-ভোমরা লুকিয়ে আছে, রাত কেটে সুয্যি ওঠার আগেই যে ওটাকে নিকেশ করে ফেলতে হবে, নইলে তোর বউটারে বাচায় কার বাপের সাধ্যি’! মোড়ল হাতজোড় করে বলল—’আদেশ দাও দাদাঠাকুর’? ত্রিলোচন গলার স্বর চড়িয়ে সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে বলল—’সবাই মন দিয়ে শুন, আমার দুটো মরদ বাচ্চা চাই যারা দানোর শিকারে যাবে, একজন এই মেয়ের সোয়ামি, আর একজন কে যাবি বল? উপস্থিত পুরুষরা নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল, শেষমেশ কিন্তু একটা হাতও উঠল না। আমার মাথায় একটা কথা ঘুরছিল, ত্রিলোচন গা ঘেসেই দাড়িয়েছিল, চাঁপা স্বরে বললাম—’ত্রিলোচন আমি যাব’। ত্রিলোচন আমার কথায় বিন্দুমাত্র গুরুত্ব না দিয়ে যুবকদের মধ্যে একজনের উদ্দেশ্যে হাঁক পারল—’হেই, জগনন্দনের ব্যাটা বাঁকেবিহারী, তু এদিকে আয় দিকি’। একজন বলিষ্ঠ দেহী যুবক এগিয়ে এল, ত্রিলোচন ছেলেটিকে আপাদমস্তক দেখে বলল—’দম আছে তোর? পারবি’? ছেলেটি বুক চিতিয়ে বলল—’একবার দেখোই না’! আমি এবার অধৈর্য হয়ে বললাম—’আমি শিকারে যেতে চাই আমাকেও নিয়ে চল’। ত্রিলোচন বিরক্ত হয়ে আমার দিকে ফিরল—’আমরা কি শিকার শিকার খেলতে যাচ্ছি? আজ রাতে ওই জঙ্গলে কি যে হবে, তা কে জানে? তুই বাবু ঘুরে ফিরে কলকাতায় ফেরত যা’। ত্রিলোচনের কথায় যেন বিদ্রুপের আভাস, সেই মুহূর্তে টের পেলাম চারপাশের ভিড়টার দৃষ্টি হঠাৎ আমার ওপর নিবদ্ধ হয়েছে। মোড়ল কেন জানি না হঠাৎ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
