চণ্ডরাজার বলি – ৫
৫
তপন টেবিলের উপর রাখা সিগারেটের প্যাকেটটা আমার দিকে এগিয়ে ধরল, বললাম—’তোকে তো বলেইছি আমি এসব ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করছি’। তপন সামান্য হেসে বলল—’তা চেষ্টাটা একদিনের জন্য স্থগিত রাখলে হয় না, একা একা সিগ্রেট খেতে আবার একদম ভালো লাগে না, আমার জন্য না হয় একটা’! কি আর করি? শুনেছি লোকে নাকি অনুরোধে ঢেঁকি গেলে আমি না হয় ধোঁয়া গিললাম, অগত্যা একটা তুলেই নিলাম, তপন লাইটার জ্বেলে মুখের সামনে তুলে ধরল, অনেকদিন পরে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললাম—’কিন্তু পঁয়ষট্টি বছরের বুড়োর, বাইশের তরুণী জুটল কি করে’? তপন মুচকি হেসে বলল—’টাকার জোরে কি না হয়! পরে শুনেছিলাম ওটা মোড়লের তৃতীয় পক্ষ, আগের দুটো বউও কিন্তু বহাল তবিয়তে বেঁচে আছে, এই মেয়েটির বাবা সম্ভবত মোড়লের কাছে কিছু টাকা ধার করেছিল, বাকিটা বুঝে নিতে হবে’। —’হুম’! কিন্তু এদিকে রাত যে প্রায় সাড়ে ন-টা। এবার আমার যাওয়া উচিত, বেশি দেরি হলে বাস, মেট্রো কিছুই আর পাব না, তবে তোর গল্পটা নেহাত মন্দ লাগছে না, আর কতটা বাকি আছে’? তপন আমন্ত্রণের সুরে বলল—’তার থেকে, থেকেই যা না ভাই, একটা রাতের তো ব্যাপার, তোর জন্য কাচা পায়জামা-পাঞ্জাবি রাখা আছে, তেমন অসুবিধে কিছু হবে না। আর সামান্য অসুবিধে হলেই বা কি’! ভেবে দেখলাম রাতটা থেকে যাওয়াই যুক্তিসঙ্গত। তপন খুশি হয়ে বলল—’তাহলে তুই জামাকাপড় পালটে আয়, আর আমি বৃন্দাবনকে বলি আর এক রাউন্ড চায়ের ব্যবস্থা করতে’।
তপন হাঁক পাড়তে বৃন্দাবন আলো দেখিয়ে পাশের ঘরে নিয়ে গেল। সেখানে গিয়ে দেখলাম ব্যবস্থা মোটামুটি করাই আছে। ঝাড়পোঁছ করা পরিচ্ছন্ন ঘরটার অর্ধেক জুড়ে থাকা খাটের উপর বালিশ, চাদর পরিপাটি করে মেলা, আলমারি থেকে পায়জামা-পাঞ্জাবি বের করে খাটের উপর রেখে বৃন্দাবন চলে গেল। আমি ঘরের লাগোয়া বাথরুমে গিয়ে কল খুলে দিলাম, যা আশঙ্কা করেছিলাম তাই হল, কলে জল নেই, তবে বাথরুমের কোণে দেখলাম দু-বালতি জল ধরে রাখা, ভালো করে হাত-মুখ ধুয়ে, গায়ে পোশাকটা চড়িয়ে তপনের ঘরে ফেরত এলাম। তপন চায়ের সরঞ্জামগুলো ঘাটাঘাটি করছিল,আমাকে দেখে বলল—’বৃন্দাবন চা একটু বেশি করে ফেলেছে। মনে হয় দু-কাপ করেই হবে’। বললাম—’মন্দ কি! চা অধিকান্ত না দোষায়’! তপন বিস্কুটের প্লেটটা এগিয়ে দিতে একটা গোটা ক্রীম ক্র্যাকার মুখে চালান করে চিবুতে চিবুতে বললাম—’তবে যাই হোক না কেন, শীতের সন্ধ্যায় তোর ভুতুড়ে গপ্পোটা কিন্তু জমে উঠেছে এবার আর ব্রেক না কষে বাকিটুকু চালিয়ে যা’। তপন আমার কথায় চটে গেল না, উলটে একচিলতে অদ্ভুত হাসি ওর ঠোঁটের কোণে খেলে গেল। রহস্যভরা কণ্ঠে বলল—’জয়ন্ত আজকের এই রাত্তিরটা কাটার আগেই আমার প্রতিটা কথাই যে ধ্রুব সত্য সে বিশ্বাস যে তোর হবে সেটা নিশ্চিত’। তপনের কথার উত্তরে হাই তুলে বললাম—’বেশ চ্যালেঞ্জটা নেওয়া গেল, তারপর শিকারের অভিজ্ঞতাটা শুনি’!
তপন বলতে শুরু করল—’ত্রিলোচনের কথামতো রাত আটটা নাগাদ মন্দিরের কাছে পোড়া বটতলার থানে গিয়ে হাজির হলাম। যদিও ওদের এই অভিযানে আমি সামিল নই, তা হলেও ভাবলাম একবার গিয়েই দেখি যদি ত্রিলোচনের মত পালটায় তা হলে বেশ একটা রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা হবে। পোড়া বটতলায় দিনের বেলা আগেও কয়েকবার গেছি কিন্তু রাতে গিয়ে যা দেখলাম তাতে বুকের ভিতরে ছ্যাঁত করে উঠল। জঙ্গলের মধ্যে গ্রামটা দিনের বেলাতেই নিস্তব্ধ নির্জন থাকে, আর রাতে তো কথাই নেই, সূর্যাস্ত হতেই ঘরে ঢুকে কুলুপ আটাই এখানকার রেওয়াজ। এখানকার মানুষ-ভূত-প্রেত-জিন-পরী-ডাইন সমেত সবকিছুতেই বেজায় বিশ্বাসী, আর রাতের অন্ধকারে এই পোড়া বটতলায় একা দাঁড়িয়ে, আমিও নির্দ্বিধায় হলপ খেয়ে বসলাম যে ওসব কিছুই ঘোর বাস্তব। চারধারে তাকিয়ে মানুষ তো দূরের কথা কোথাও একটা জন্তু কিংবা পাখিও চোখে পড়ল না। এদিকে একটানা ঝিঁঝিঁর ডাকে কানে তালা লাগার জোগাড়। গ্রামের বস্তি এখান থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে, ফেরত যাব নাকি ভাবছি এমন সময় ওদিক থেকে একটা চলমান আলোর ফালি চোখে পড়ল, আলোর রেখাটা দুলতে দুলতে ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে এগিয়ে আসতে লাগল।
কয়েক মিনিট পরে জ্বলন্ত লণ্ঠন হাতে ত্রিলোচন আর মোড়ল এসে হাজির হল। ত্রিলোচন আমাকে দেখে হাসল—’তু বাবু বড় ঢীট আছিস দেখছি, এই জঙ্গলে কীসের শিকার করবি? শেষে নিজেই না শিকার হয়ে যাস’। উত্তর দেওয়া নিষ্প্রয়োজন, চুপ করেই রইলাম। ত্রিলোচনই বলে চলল—’উই হারামজাদা বাঁকেবিহারী দানোর ভয়ে ভেগেছে, উর হিসাব আমি পরে লিবো, আজ রাতে তিনজনের দরকার লাগবে, ভাবলাম তবে তরেই লি সেইজন্য তোর আস্তানায় গেছিলাম, গিয়ে দেখি তু শালা সেখানে লাই, তখুনি বুঝেছি তু হারামি এখানেই থাকবি’। মোড়ল কাধের ঝোলাটা নামিয়ে তার থেকে একটা শিশি বের করে সামান্য ঝাকিয়ে ত্রিলোচনের হাতে তুলে দিল, ‘তুলসী আর নিশিগন্ধার রস’, সম্পূর্ণ ভেষজ উপায়ে তৈরি প্রাকৃতিক মস্কিউটো রেপেলেন্ট। ত্রিলোচন প্রথমেই হাতের চেটোয় খানিকটা তেল ঢেলে নিল তারপর সেই তেল বেশ করে শরীরে ঘসতে লাগল। এরকম বারদুয়েক করে শিশিটা আমার দিকে এগিয়ে দিল। আমার অবশ্য এসবের প্রয়োজন নেই, জঙ্গলে দরকার লাগবে ভেবে ওডোমস সঙ্গেই রেখেছিলাম, সেটা কাজে লেগে গেছে। মোড়ল এবার শিশির বাকি রসটা উপুড় করে নিজের গায়ে ঢেলে দিল। তারপর দু-হাত দিয়ে ভুঁড়ি আর বুকে কচলাতে শুরু করল। ত্রিলোচন এবার আলখাল্লার পকেট থেকে গাঁজার কল্কে বের করে টান দিতে শুরু করল, পরপর দুটো টান দিয়ে সে খানিক ধাতস্থ হল, কল্কেটা আমার হাতে আসতে আমিও বেশ যুত করে একটা দম দিলাম, মনের মধ্যে একটা অকারণ উদ্বেগের ভাব তৈরি হয়েছিল, দ্রব্যগুণে সেটা তৎক্ষণাৎ মিলিয়ে গেল। মোড়ল ইতিমধ্যে ঝোলা থেকে অস্ত্রশস্ত্র সব বের করতে শুরু করেছে। পরপর বেরোল দুটো ধনুক, গুচ্ছখানেক তীর, টাঙ্গি আর একটা বড় ছুরি। ত্রিলোচন বলল—’দ্যাখ বাবু তোর যেটা পছন্দ হয় তুলে নে’। তির-ধনুক দেখে লোভ হয়েছিল, কিন্তু ও জিনিস যে আমার হাতে বাগ মানবে না সেটা বুঝতে অসুবিধে হল না। ছুরিটা হাতে তুলে নিলাম। যা হওয়ার এতেই হবে। আলখাল্লার পকেট থেকে ত্রিলোচন একটা লাল ফুলের মালা বের করল, এই মালাটাই আজ সে মোড়লের মেয়ের গলায় পরিয়েছিল। মালাটা জমির উপর রেখে ত্রিলোচন বলল—’এখন এটাই আমাদের পথ দেখাবে’। ত্রিলোচন হাঁটু গেড়ে বসে মালাটায় কড়ে আঙুল ঠেকিয়ে অস্পষ্ট স্বরে মন্ত্রোচ্চারণ করতে লাগল। বেশ কিছুক্ষণ এভাবে কেটে যাওয়ার পর সে যেন কাউকে আহ্বান করে সজোরে হাততালি মারল। অদ্ভুত কাণ্ড! কোথাও একফোঁটা হাওয়া নেই, যাকে বলে একেবারে নিথর অবস্থা অথচ মালাটা ছিটকে গিয়ে একহাত দূরে পড়ল। ত্রিলোচন সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে হুকুমের সুরে বলল—’তোর ঘাটিতে চল, চণ্ডিবাবার কিড়ে’! মালাটা কোন অদৃশ্য শক্তির বলে এবার রুক্ষ মেঠো রাস্তার উপর দিয়ে ঘষটাতে ঘষটাতে চলতে শুরু করল। ত্রিলোচন চাঁপা স্বরে বলল—’সবাই ওটার পিছে চল আর সাবধান কেউ টুঁ শব্দটি অবধি করবে না’। নির্জন নিস্তব্ধ রাতে গভীর বনের মধ্যে দিয়ে চলমান মালাটার পিছনে ত্রিলোচন ছুটে চলল, তার পিছনে রাম-দা হাতে মোড়ল, সবার শেষে আমি। মনের কোণে যেটুকু সংশয় ছিল, ততক্ষণে কর্পূরের মতো উবে গেছে। দুপুরবেলা ত্রিলোচনের কাণ্ডকারখানা দেখে খটকা লেগেছিল, ভেবেছিলাম সবই বুঝি ধাপ্পাবাজি, কিন্তু এখন নিজেকেই ছেলেমানুষ মনে হচ্ছে, জঙ্গলের মধ্যে রহস্যভরা এই রাতে একমাত্র ভরসা ত্রিলোচন। জ্যোৎস্না আলোকিত থমথমে রাতে, দু-ধারে ঘন গাছপালার মাঝখান দিয়ে মেঠো পথ ঘসে ঘসে মালা এগিয়ে চলেছে, পিছনে আমাদের দলটা। প্রায় আধ কিলোমিটার রাস্তা হবে এভাবে চলার পর পথের একপাশে একটা মোরগঝুটি গাছের নুইয়ে পরা ডালে মালাটা জড়িয়ে থেমে গেল। সাঙ্গে সাঙ্গে আমাদেরও চলার গতি স্তব্ধ হল। ত্রিলোচন নাক টেনে যেন কীসের গন্ধ শুঁকল তারপর দারুণ রোষে গর্জন করে উঠল—’তোর মতলব আমি বুঝেছি! দেখি তু ক্যামনে না যাস’! ত্রিলোচন আবার উচ্চস্বরে মন্ত্রোচ্চারণ শুরু করল, তারপর ফের একবার হাততালি, মালা টুপ করে ডাল থেকে খসে চলা শুরু করল। আমরা ফের ওটাকে অনুসরণ করা শুরু করলাম। অকস্মাৎ মালাটা মেঠো পথ ছেড়ে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পরল। এবার পথ চলাটা সত্যি কষ্টকর হয়ে পরল। পথ বলতে এখানে অবশ্য আর কিছু নেই, যেখানে সেখানে গজিয়ে ওঠা বুনো ঝোপঝাড় আর পায়ের নীচে লম্বা ধারালো ঘাস। একটা কাঁটা গাছে ঘষা খেয়ে হাতের নুনছাল উঠে রক্তারক্তির উপক্রম হল, কিন্তু এখন ওসব ধর্তব্যের মধ্যে আনলে চলবে না। ভয় হল সঙ্গীদের থেকে পিছিয়ে না পরি, জোরকদমে হাটা লাগালাম। বেশ কিছুক্ষণ ধরে কখনও ঝোপঝাড় ডিঙিয়ে কখনও দেওয়ালের মতো পথ আটকে থাকা গাছের শক্ত শক্ত ডাল কেটে চলার মতো পথ বানিয়ে শেষে একটা ন্যাড়া জায়গায় এসে পৌঁছোলাম। মালাটা জমির এক কোণে গিয়ে স্থির হয়ে পরল। ত্রিলোচন মন্ত্র পড়তে পড়তে মালাটা হাতে তুলে নিয়ে সুতো ধরে টান দিতেই ফুলগুলো সব ছড়িয়ে পরল। দ্রুত হাতে ফুলগুলোকে এক জায়গায় জড়ো করে ত্রিলোচন বলল—’শালাকে এখানেই খুন করে পুতে রেখেছে, এই জায়গার মাটি না পেলে উ দানোরে জব্দ করা যাবে না’। মোড়ল উদ্বিগ্ন স্বরে বলল—’দাদাঠাকুর তুমি সব জানো’। ত্রিলোচন আমাদের উদ্দেশ্যে বলল—’তোরা দুজনা মন দিয়ে শোন, এবার আমরা ভেন্ন হব, তিনটে করে ফুল আর একমুঠো কবরের মাটি, আমাদের সবার হাতে থাকবে, এখান থেকে তিনকোশ দূরে গেলে জঙ্গলের মাঝে বাবুলালের টিলা পড়বে। সেখানে গিয়ে এই ফুল গুলা জ্বালায়ে দিয়া আর এই কবরের মাটি টিলার মাটির সঙ্গে মিলে দিলে বিপদ কাটবে’। আমি শঙ্কিত হয়ে বললাম—’কিন্তু আমরা তো সবাই একসঙ্গে যেতে পারি, আলাদা যেতে হবে কেন’? ত্রিলোচন নেতিবাচক ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলল—’না তা হয় না, তেমন ধারা নিয়ম নাই, আমি যাব সূতা নদীর ধার ঘেসে, মোড়ল তু উত্তর-পুবের কোণ ধরে জঙ্গলের রাস্তা ধরবি, আর বাবু তু পুব দিকে যা, জঙ্গলের মধ্যে এটাই সব থেকে সোজা রাস্তা, সোজাসুজি হাটবি তো সাড়ে তিন কোশ পরে বাবুলালের টিলা পড়বে’। তিনটে করে লাল ফুল আর একমুঠো মাটি ত্রিলোচন আমাদের দুজনের হাতে তুলে দিল। আমি রুমাল বের করে তার মধ্যিখানে ফুল আর মাটি রেখে শক্ত করে গিট পাকিয়ে প্যান্টের পকেটে পুরে নিলাম। ত্রিলোচন গম্ভীর স্বরে বলল—’এতক্ষণে ও প্রেতের দেহমধ্যি কিন্তু দারুণ জ্বলুনি ধরসে, উ কিছুতেই মোদের পুরো পথ যেতি দিবে না, এক এক করে আমাদের সবার পেছু নেবে, ভয় দেখাবে, যে ভয় পাবে তাকে মেরে পাঁকে ফেলে দেবে, তুরা কিন্তু ভয় পাবি না, সাহস করে এগিয়ে যাবি’। মোড়ল ত্রিলোচনের পা ছুয়ে প্রণাম করে বলল—’আজ্ঞা হোক দাদাঠাকুর’! তারপর ধীর পায়ে হেঁটে গভীর জঙ্গলের মধ্যে মিলিয়ে গেল। এবার আমার পালা, আমি মনের মধ্যে প্রচুর দ্বিধা নিয়ে ত্রিলোচনের থেকে বিদায় নিয়ে বললাম —’আসছি ত্রিলোচন’। ত্রিলোচন আঙুল নাচিয়ে দিকনির্দেশ করল —’ওই যে বাবু ওই হল পুব দিক, ওখান দিয়েই সোজা হাটা দিবি’। আমার উৎসাহ এর মধ্যে থিতিয়ে এসেছে, কিন্তু সেসব প্রকাশ করে আর কাজ নেই! এগিয়ে যাচ্ছিলাম, ত্রিলোচন পিছন দিয়ে বলে উঠল—’একটা কথা বাবু, ভয় খারাপ কিন্তু লোভ আরও বেশি খারাপ জিনিস, কোনও ফাঁদে পা দিবি না, দিলে কিন্তু মরবি। মনে রাখবি এই জঙ্গলে আজকের রাতে সব কিন্তু মিছে, আর হ্যাঁ খরগোসটাকে দেখতে পেলে ছুরি বসিয়ে দিবি, যা বাবু, বেঁচে ফেরত আয়! জয় চণ্ড বাবার জয়’।
৬
কি ভয়ংকর নির্জন আর নিস্তব্ধ সাতকোশিয়ার এই জঙ্গল, অরণ্যপ্রেমী, যারা ঘড়ির অ্যালার্ম বাজলে পরে বিছানা ছেড়ে উঠে, সফট ড্রিঙ্কের বোতল হাতে নিয়ে হাতির পিঠে চড়ে বা জিপে সওয়ার হয়ে অরণ্য ভ্রমণে অভ্যস্ত তারা গহন গভীর বনাঞ্চলের এমন বীভৎস রূপ কল্পনাও করতে পারবেন না। রক্ষে রাতটা পূর্ণিমা, মাঝ আকাশে একটা গোল থালার মতো চাঁদ উঠেছে। সেটাকে দেখে মনে জোর আনার চেষ্টা করলাম। হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে চোখ ধাধিয়ে গেল সেইসঙ্গে বাজ পড়ার করকড়াত শব্দ। মনে হল বুঝি বৃষ্টি হবে। দু-পাশে ঘন শাল, শিমূলের সমারোহ, মাঝখানে এক চিলতে সরু মেঠো জঙ্গুলে পথ যার উপর শুকনো গাছের পাতা ঝরে ঝরে কার্পেটের মতো সৃষ্টি করেছে। প্রতি পদক্ষেপে নিজের পায়ের খসখসে শব্দে নিজেই চমকে উঠছিলাম। কিছুটা পথ এভাবে চলার পর যেখানে পৌঁছোলাম সেখানে জঙ্গল আরও গভীর আরও ঘন আকার ধারণ করেছে এখানে আর শুধু পায়ের তলায় কার্পেট নয় মাথার উপর চাঁদোয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে দেখলাম। দু-ধারের বড় বড় গাছের শাখা-প্রশাখা গুলো জড়াজড়ি করে ছাতা মতো তৈরি করেছে। এবারের পথ কেমন যেন স্যাঁতস্যাঁতে আবছা অন্ধকারাচ্ছন্ন, মাঝেমধ্যে অবশ্য ডালপালার ফাঁকফোকর দিয়ে জ্যোৎস্নার আলো ঠিকরে পড়ছিল, নাহলে হয়তো এগিয়ে চলাটাই দায় হয়ে পরত। হঠাৎ ঘাড়ের পাশটাতে কার গরম নিঃশ্বাসের ছোঁয়া লাগল। ভয়ংকর চমকে পিছন ফিরে চাইলাম। যতদূর চোখ যায় দেখলাম, কেউ কোথাও নজরে পড়ল না। হয়তো মনের ভুল! ফের চলা শুরু করলাম। মনে একটা অসন্তোষ ক্রমশ দানা বাঁধছিল। আমার ধারণা হয়েছিল ত্রিলোচনের সঙ্গে অভিযানে গিয়ে নতুন ধরনের অভিজ্ঞতা হবে। কোথায় তির-ধনুক, বল্লম হাতে খরগোসের শিকার করব, সেখানে একাকী এই মহারণ্যে উন্মাদের মতো অনির্দিষ্টের যাত্রা করছি। সব কথা খোলাখুলি না জানিয়ে ত্রিলোচন আমাকে ঠকিয়েছে! ত্রিলোচনের ওপর দারুণ রাগে হাতের ছুরিটা আড়াআড়ি ভাবে বা থেকে ডান দিকে চালিয়ে দিলাম, অদ্ভুত কাণ্ড! ছুরিটা হাওয়া কেটে অদৃশ্য কোন দেহধারীর শরীরে গেঁথে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে আর্তচিৎকার করে সেই দেহহীন জীবটা ছুটে পালাল। তার ভারী পায়ের চাপে মাটিতে পরে থাকা শুকনো ডালপালার টুকরো মট মট করে ভেঙ্গে যেতে লাগল। আমি হতভম্বের মতো দাড়িয়ে রইলাম! এসব যে কি ঘটছে? চোখে দেখা যাচ্ছে না অথচ জিনিসটার অস্তিত্ব বেশ টের পাচ্ছি। সম্বিৎ ফিরতে ফের জোরকদমে হাটা দিলাম। এই জঙ্গলটাকে আমার হঠাৎ অতি ভয়ানক জায়গা বলে মনে হতে শুরু করেছে। বেশ কিছুটা চলার পর টের পেলাম একটা অস্পষ্ট আওয়াজ আমার পেছু নিয়েছে, সেটা কারও পায়ে চলার, সাবধানে পেছু তাকিয়ে অবশ্য কাউকে দেখতে পেলাম না, আমি চললে সেটা চলে, আমি থমকে দাড়িয়ে গেলে সেটাও দাড়িয়ে যাচ্ছে। একবার কায়দা করে চলার মাঝে হঠাৎ নিথর হয়ে থেমে যেতেই আমার অনুসরণকারী ফাঁদে পরল। অসতর্ক পদক্ষেপ ফেলে সে বুঝিয়ে দিল, এসব আর যাই হোক আমার মনের কষ্টকল্পনা নয়। জীবটাকে চোখে দেখা না গেলেও, চোট আঘাত যে সেটার বেশ গায়ে লাগে সেটা একটু আগেই বুঝতে পেরেছি, মনে জোর এনে আমি চলার গতি আরও বাড়িয়ে দিলাম, কিছুটা পথ এভাবে যাওয়ার পর তিরবেগে ঘুরে ছুরি দিয়ে আঘাত হানলাম। এবারে ছুরি আর কিছুতে ঠেকল না শুধু বনবন করে খানিক হাওয়া কেটে ফেরত চলে এল। আমি প্রাণপণ অস্ত্রটা এদিক-ওদিক শুন্যে আছড়াতে লাগলাম তবে আমার অদৃশ্য শত্রু এবারে বেশ সতর্ক হয়েই রয়েছে। সে যেন আমার মূর্খামি দেখে মজা পেয়ে হেসে উঠল, কি বিশ্রী চেড়া সেই শব্দ! এই পৃথিবীর কোনও মানুষ এভাবে হাসতে পারবেই না। ভয়ে আতঙ্কে এবার আমার কালঘাম ছুটে গেল। দারুণ ত্রাসে দিগ্বদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটতে শুরু করলাম, গাছের উপর থেকে ঝুলে থাকা ডালগুলো চাবুকের মতো গায়ে, মুখে আছড়ে পড়তে লাগল। গালের একপাশটা ফেটে ঝরঝর করে রক্ত পড়তে লাগল। কতক্ষণ এভাবে ছুটেছি জানি না, একসময় হয়তো ভীষণ ক্লান্ত হয়ে দাড়িয়েছি একটু জিরিয়ে নেওয়ার জন্য, এলোপাথাড়ি পদশব্দটা একেবারে কাছে চলে এল, আওয়াজটা এবারে আরও স্পষ্ট আরও নির্ভুলভাবে শুনতে পাচ্ছি, অশরীরী অনুসরণকারী নিজেকে লুকিয়ে রাখার আর কোনও তোয়াক্কা করছে না। বিশ্রাম মাথায় উঠল! ভিতর থেকে কে যেন বলে উঠল ”পালাও”! আবার দৌর লাগালাম। কতটা পথ এভাবে ছুটে পার হলাম কে জানে, একসময় বুকে প্রচণ্ড হাঁপ ধরে গেল, মুখ দিয়ে ফেনা ঝড়ছিল, শরীরের ভিতরে যে ব্যাটারিটা আছে তার চার্জ এতক্ষণে পুরোপুরি ফুরিয়ে এসেছিল, মাথা ঘুরে ঘাসবনের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়লাম।
ছোটার ক্ষমতা আর একদমই ছিল না, একটা ঝাঁকড়া গাছের গোঁড়ায় বসে হাপাতে লাগলাম। খানিক ধাতস্থ হতে অনুভব করলাম পিছনের অদৃশ্য বিভীষিকাটা অন্তত এই মুহূর্তে আমার ধারেকাছে নেই। চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম জঙ্গল এখানে খানিকটা হালকা হয়ে এসেছে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছিল, যদি কোথাও এক বিন্দু জলও পেতাম? সামনে কোথাও যদি একটা পুকুর ডোবা কিছু খুঁজে পাওয়া যায়! বিশ্রামের ফলে তেষ্টার বেগ খানিকটা কমল। পথ চলা শুরু করব ভাবছি, অকস্মাৎ মিষ্টি সুরেলা একটা স্বর কানে এল। মেয়েলী কণ্ঠে কেউ গুনগুন করে গানের কলি ভাঁজছে। ভয়ে ভয়ে দুর্বল স্বরে—’কে’? বলতেই গানটা থেমে গেল। এরপর কিছুক্ষণ কান পেতে শোনার চেষ্টা করলাম কিন্তু অরণ্যের নিজস্ব কিছু আওয়াজ ছাড়া অন্য কিছুই কানে এল না। কাছাকাছির মধ্যে একটা প্যাঁচার তীক্ষ্ন কর্কশ ডাক আর কোন একটা বিবস প্রাণীর মরণপণ আর্তনাদে আঁতকে উঠলাম! প্যাঁচাটা বোধহয় শিকার ধরেছে। পরের কিছু মুহূর্ত অসহায় জন্তুটার ছটফটানি আর আর্তচিৎকারের বেগ ক্রমশ কমতে কমতে শেষে একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেল। হঠাৎ লক্ষ করলাম একটা লম্বা কালো ছায়া মাথার ওপর চক্রাকারে ঘুরতে শুরু করেছে, উপর দিকে চেয়ে দেখলাম ডানাওয়ালা একটা রোমশ বাদুড় মাথার উপর পাঁক খেয়ে ক্রমশ নীচে, আমার দিকেই এগিয়ে আসছে, ভয়ের সঙ্গে সঙ্গে এবার একটা ঘৃণার অনুভূতিও আমাকে গ্রাস করল, মাটির উপর থেকে একটা পাথর তুলে বাঁদুড়টাকে তাক করে ছুড়ে মারলাম, পাথরটা জানোয়ারটার ডানা ঘেসে চলে গেল, এক চুলের জন্য লাগল না, ডানা ফড়ফড়িয়ে জন্তুটা অন্যদিকে উড়ে গেল, আর আমিও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। হঠাৎ নারীকণ্ঠের অপ্রত্যাশিত আহবান কানে এল—’বাবু’! আওয়াজটা কয়েক হাত দূরের বুনো ঝোপটার দিক থেকে এসেছে। ভয়ে বিস্ময়ে সেদিকে তাকালাম। মুহুর্তখানেক বিরতির পর আবার স্বরটা ভেসে এল—’বাবু আমি শাওনি, তোর সঙ্গে দেখা করতে এসেছি’।—’কে শাওনি’? হাতের ছুরিটা শক্ত করে ধরে উঠে দাঁড়ালাম। নারীকণ্ঠ তাড়াতাড়ি বলে উঠল—’এদিক পানে আসিস নে বাবু, মোর গায়ে কাপড় নাই’। চমকের ওপর চমক! বলে কি? নারীকণ্ঠ ফের বলল—’আমি মোড়লের বউ শাওনি, আজ তুই আমাদের ঘরে এলি যে’। একরাশ অবিশ্বাস নিয়ে বললাম—’তুমি এখানে কিভাবে এলে? তোমার তো এখন ঘরে থাকার কথা’? নারীকণ্ঠ বলল—’তুই বুঝিস নাই বাবু! এসব ওই ওঝা আর আমার মরদের চালাকি! গেরামের লোকগুলোকে না ঠকালে কি ওদের চলে’? আমার সংশয় প্রবল আকার ধারণ করল, বললাম—’তোমার কথা বিশ্বাস করিনা। তুমি এখনি বাইরে এসে দাড়াও’। লাস্যময়ী কণ্ঠস্বরটা প্রলুব্ধ করা সুরে বলল—’বাবু তু বড় লুচ্চা দেখি, মোরে ন্যাংটো দেখতি তোর মনে সাধ জেগেছে, তাই না রে? তবে দ্যাখ’। ঝোপের আড়াল থেকে এবার একটি পুর্নাবায়ব নারী শরীর প্রকাশিত হল। যুবতীটি পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত অবিশ্বাস্যভাবে নগ্ন। মেয়েটির সুঠাম গড়ন নিটোল স্বাস্থ্য। মুখশ্রী সুশ্রী, ভারী নিতম্ব, বুকের উপর পুরুষ্টু স্তনগুলো যেন ভরা বেলুনের মতো ফুলে উঠেছে। এক মাথা ঢেউ খেলানো অবিন্যস্ত চুল কাধে পিঠে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। বুভুক্ষু দু-চোখ দিয়ে যুবতী শরীরের গোপন ভাঁজগুলো গিলে খাচ্ছিলাম। মেয়েটি রহস্যময় হ্যাঁসি হেসে বলল—’মোরে দেখতে সুন্দর না রে বাবু’! অস্ফুট স্বরে বললাম—’হ্যাঁ’। যুবতীটি দু-হাত সামনের দিকে এগিয়ে দিয়ে আমন্ত্রণের সুরে বলল—’তবে আয় বাবু মৌজ করি’! কিছুক্ষণের জন্য যেন শরীরের ভিতর হরমোনের গতিবেগ প্রচণ্ড বৃদ্ধি পেয়ে মস্তিষ্কের দখল নিয়ে ফেলেছিল, কামভাব এত প্রবল হয়ে উঠেছিল যে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পায়ে পায়ে ওর দিকে এগিয়ে গেলাম। একসময় রহস্যময়ী নারীমূর্তির একেবারে কাছে চলে এলাম, এতটাই যে ওকে এবার হাত দিয়ে ধরতে পারব। এতটা বলে তপন যেন শিউরে উঠল তারপর চোখ বন্ধ করে একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলল। আমি রুদ্ধশ্বাসে শুনছিলাম অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলাম—’তারপর কি হল’। তপন সামান্য চুপ করে শান্ত স্বরে বলল—’আমি বেঁচে গেলাম, সেদিনের পরও আমার বেঁচে থাকা ছিল, হয়তো বৃহৎ কোন প্রাপ্তির জন্য, তা ছাড়া আর কোনও যুক্তি নেই, যাইহোক ততক্ষণে মেয়েটার একদম কাছে এসে পড়েছি, আর তর সইছিল না, ওর উপর ঝাঁপিয়ে পরতেই যাচ্ছিলাম এমন সময় তীব্র আলোর ঝলকানি আর কান ফাটানো বাজ পড়ার শব্দ, বাজটা খুব কাছেই পড়েছে একটা বুনো ঝোপের উপর, ঝোপটা দাউদাউ করে জ্বলতে শুরু করল আর প্রচণ্ড কম্পনে আমিও হাতখানেক দূরে ছিটকে পড়লাম। সামলে উঠে যে দৃশ্য দেখলাম তা এখনো মাঝে মাঝে দুঃস্বপ্ন হয়ে আমার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। দেখলাম সুশ্রী যুবতীটি একটা কুৎসিত ডাইনির রূপ নিয়েছে, জীবটা যেন আপ্রাণ চেষ্টা করছে নিজের দেহের সবকটা অংশকে একজায়গায় ধরে রাখতে কিন্তু পারছে না। একটু একটু করে তার দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সব গলে ধোঁয়া হয়ে গেল। এবার দেখা গেল খরগোসটাকে, আমার হাতের নাগালের মধ্যে, ঘাসের উপর দাঁড়িয়ে, তার লাল চোখের স্থির দৃষ্টি সোজাসুজি আমার উপর নিবদ্ধ। দুর্বল, কাঁপা হাতে ছুরিটা মাটি থেকে তুলে নিলাম। কিন্তু দু-পা এগোতেই ওটা ছুটে পালিয়ে গেল। এমন সময় আকাশ ভেঙে অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামল। ততক্ষণে আমার শিরায় শিরায় ভয়ের কাঁপন শুরু হয়েছে, আমি ঝড়-বৃষ্টির পরোয়া না করে জঙ্গলের কাদামাখা পথ দিয়ে ছুটে চললাম।
৭
অনেকটা পথ এভাবে ছোটার পর জলকাদায় পা পিছলে মুখ থুবড়ে পড়লাম। চোয়ালে দারুণ আঘাত লাগল, মনে হল মুখটা যেন ফেটেই গেছে। হাত ঠেকিয়ে বুঝলাম থুতনি চিড়ে রক্ত ঝরছে। একরাশ কাদা মেখে যখন উঠে দাঁড়ালাম দেখলাম একটা ন্যাড়া জায়গায় এসে হাজির হয়েছি। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো কাটার মতো গায়ে ফুটছিল। কয়েক মিটার এগিয়ে গেলে আবার জঙ্গলের ঘনত্ব বাড়ছে সেদিকে গেলে হয়তো কোনও গাছের তলায় আশ্রয় পেতে পারি ভেবে হাঁটা থামালাম না। এবার হঠাৎ বৃষ্টিটা যেভাবে শুরু হয়েছিল সেভাবেই থেমে গেল। জলে ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধের সঙ্গে নাম না জানা বুনো ফুলের সুগন্ধ মিশে আশেপাশের পরিবেশটাকে যেন মাতিয়ে দিচ্ছিল। অন্যরকম পরিস্থিতি হলে জঙ্গলের এমন মোহিনী রূপ দেখে এই আমিই হয়তো ধন্য হয়ে যেতাম, কিন্তু আজকের এই রাতে অস্তিত্ব রক্ষা ছাড়া বাকি সব কিছুই আমার কাছে অর্থহীন।
হাটতে হাটতে একটা ঢালু জমির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, এখানে জমা জলে চাঁদের প্রতিকৃতিটা গোল চাকতির মতো পড়েছিল। সেদিকে নজর পড়তেই ঘাবড়ে গেলাম! একজন বলিষ্ঠদেহী আদিবাসী যুবকের প্রতিকৃতিও ওই আয়নার মতো জলে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে, ছেলেটি রোষকষায়িত দৃষ্টে সোজা আমার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। চকিতে পিছন ঘুরে কাউকে দেখতে না পেয়ে ফের ওই জলের দিকে তাকিয়ে দেখলাম অদ্ভুত মূর্তিটি অদৃশ্য হয়েছে! আজ রাতে বোধহয় নতুন করে কিছুতেই আর অবাক হওয়ার সুযোগ নেই। মনে হচ্ছিল কাল সকাল পর্যন্ত মাথা ঠিক রাখাটাই এখন আমার সামনে সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ, এই রাতের শেষে মাত্র দুটো সম্ভাবনার কথাই আমার মাথায় ঘুরছে। এই জঙ্গলের কোনও অদ্ভুত জীবের হাতে যদি বেঘোরে মারা না পরি তাহলে মস্তিকের বিকল হওয়াটা একপ্রকার অবধারিত।
হাটছি তো হাটছি! মনে হচ্ছে পথ আর ফুরাবে না। হাতের ঘড়িটা বৃষ্টির জলে ভিজে আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। তবে যদ্দুর মনে হয় রাত দেড়টা-দুটো তো হবেই, বাবুলালের টিলা আর কতদূর? ক্লান্ত শরীরটা আর চলতে চাইছে না, কিন্তু মাঝ রাস্তায় থেমে গিয়ে বিপদের বোঝা বাড়ানো ছাড়া অন্য কোনও উপকার হবে বলে তো মনে হল না, ধীর পায়ে চলতে চলতে নিজেকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলাম, আর কিছু না হোক অন্তত পেছু নেওয়া অশরীরীটা বিদায় নিয়েছে, এবারে কোনওরকমে টিলা অবধি পৌঁছোতে পারলে যদি বিপদ কাটে। এই মনোভাব অবশ্য বেশিক্ষণ টিকল না, আমার মনে অকারণ গজিয়ে ওঠা স্বস্থির আমেজটাকে দুরমুশ করে কেউ হঠাৎ যেন আমার দিকেই ছুটে আসতে শুরু করল, কাঁদামাখা ভিজে মাটির ওপর তার লম্বা লম্বা পায়ের ছাপগুলো আমার বিস্ফারিত চোখের পলক ফেলার আগেই একেবারে কাছে চলে এলো, এরপর হাওয়ার প্রচণ্ড একটা বেগ আমাকে বুনো ঘাসজমির ওপর আছড়ে ফেলে দিল, অদৃশ্য শত্রু আমার বুকের উপরে বসে এবারে সাঁড়াশির মতো হাত দিয়ে গলা টিপে ধরল, প্রচণ্ড চাপে দম আঁটকে এলো, মনে হচ্ছিল শেষ সময় বুঝি উপস্থিত! কিন্তু জীবন রক্ষার তাগিদে মানুষ অনেক সময় অসম্ভবকেও সম্ভব করে ফেলে, অমানুষিক চেষ্টায় থাবাটাকে ঠেলে নিজেকে মুক্ত করলাম, ম্যাজিকের মতো অশরীরী দুশমন আবার অদৃশ্য হয়ে গেল! পালটা হামলা করল না। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে এদিক-ওদিক চাইছি তক্ষুনি নজরে পড়ল খরগোসটা আমার পায়ের কাছে ঘাসের উপর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে, মুহূর্তটাক সময় নষ্ট না করে ছুরিটা তুলে খরগোসটাকে লক্ষ্য করে আঘাত হানলাম। জন্তুটাও দ্রুত লাফ দিল তবে ততক্ষণে ছুরির ফলাটা ওর পিঠের খানিকটা মাংস উপড়ে ফেলেছে। বীভৎস অপার্থিব হাহাকারে জঙ্গল কেঁপে উঠল। দানবটার কাতর আর্তনাদ আমার কানে যেন মধুর সংগীতের মতো উপভোগ্য মনে হল। উৎকট আনন্দে আমিও গলা ফাটিয়ে হেসে উঠলাম।
রাতভর অজ্ঞাত বিভীষিকার সঙ্গে যুঝতে যুঝতে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পরেছিলাম। পূবের আকাশে নজর পড়তে দেখলাম অন্ধকার ফিকে হয়ে আসছে, রাত শেষ হতে চলল। হাতে আর বিশেষ সময় নেই। শ্রান্ত ক্ষতবিক্ষত শরীরটাকে টানতে টানতে এগিয়ে নিয়ে চললাম।
শেষমেশ একটা রুক্ষ পাথুরে জমির উপর এসে পৌঁছোলাম। জমিটার মাঝ বরাবর একটা পাথুরে ঢিপি, এটাই বোধহয় সেই বিখ্যাত বাবুলালের টিলা।
ত্রিলোচন আর মোড়ল দেখলাম টিলার একপাশে বসে গাঁজায় দম দিচ্ছে, বুঝলাম ওরা অনেক আগেই পৌঁছে গেছে। দুজনে আমাকে দেখে উঠে দাঁড়াল। ত্রিলোচন উৎফুল্ল স্বরে বলল—’বাবু তোকে জ্যান্ত দেখে ভালো লাগছে, সবই রাজার ইচ্ছে। দে ফুল দে, মাটি দে’? রুমালটা বের করে ত্রিলোচনের হাতে তুলে দিলাম, ত্রিলোচন সবার আগে রুমালের ভিতর হেঁজে যাওয়া ফুল আর মাটিটাকে আলাদা করল। তিনজনের নিয়ে আসা মাটির তিনটে দলা একসাথে করে পিণ্ড বানিয়ে মন্ত্র পড়ে সেটার পুজো করল তারপর দু-হাতের অঞ্জলিতে পুড়ে এগিয়ে গেল বাবুলালের টিলার দিকে। টিলার উপর খানিকটা মাটি হাত দিয়ে সরিয়ে গর্ত মতো করে সেখানে পিণ্ডটা চেপে ধরল, আর তখুনি যেন ইলেকট্রিক শক খেয়ে ছিটকে পরল।
বিস্ময়ের ঘোর কাটতে দেখলাম ত্রিলোচন টিলার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে বিড়বিড় করে কিসব যেন বলছে, সেইমুহূর্তে আতংঙ্কের যে ছাপ ওর মুখে দেখতে পেলাম তা আমার চেনা বেপরোয়া লোকটার চরিত্রের সঙ্গে একেবারেই বেমানান।
এরকম প্রায় একনাগাড়ে মিনিট পাঁচেক চলার পরে ত্রিলোচন টিলার পাথরের উপর কান পাতল। এসব যে কি হচ্ছে, তা ত্রিলোচন বলে না দিলে আমার বোঝার উপায় অবশ্য নেই। চোখের সামনে যা কিছু ঘটে চলেছে দেখে যেতে লাগলাম। অকস্মাৎ ত্রিলোচনের মধ্যে অদ্ভুত পরিবর্তন হল, সে হঠাৎ ক্ষেপে গিয়ে প্রচণ্ড চিৎকার করে বলল—’এই মোড়লের বাচ্চা, সত্যি কথা বল ওই লাশ ওখানে কে পুতেছে’? মোড়লের দিকে চোখ পড়তে অবাক হয়ে দেখলাম, লোকটার মুখ যেন অকস্মাৎ রক্তশূন্য হয়ে পড়েছে, ঘর্মাক্ত কপালের বলিরেখাগুলো অস্থিরভাবে ওঠা নামা শুরু করেছে, জিভ দিয়ে ঠোঁট চেটে মোড়ল কাঁপা কাঁপা স্বরে বলল—’আমি কি করে জানব দাদাঠাকুর’? ত্রিলোচন হিংস্র স্বরে বলল—’বাবুলালের টিলার সামনে মিছে বলার সাজা জানিস? তবে তোর হ্যাঁপা তুইই সামলা, আমি এই চললাম’। ত্রিলোচন কাঁধে ঝোলা তুলে নিয়ে পা বাড়াবার উদ্যোগ করতেই মোড়ল ত্রিলোচনের পায়ে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ল।
মোড়ল কাঁতর কণ্ঠে বিলাপ করতে লাগল—’হ্যা দা-ঠাকুর ও পাপ আমিই করেছি, কিন্তু না করেই বা কি করতাম, কুন মরদের বাচ্চা এমন আছে যে নিজের বিহা করা বউরে অন্য মরদের সঙ্গে শুতি দেখেও চুপ করে থাকে, আমিও তাই মেরে হিসেব চুকিয়েছি’। ত্রিলোচন মোড়লকে ঠেলে পা ছাড়িয়ে নিল, খানিক পরে মোড়ল ধাতস্থ হয়ে বলল—’শাওনির সঙ্গে বিহা হওয়ার পর ও যখন যা চেসে সব দিসি, এমনকী আগের দুই বউরেও অবজ্ঞা করেসি অরি জন্যি কিন্তু দা-ঠাকুর এ বড়ই বেইমানের জাত, একদিন শুনতে পেলাম শাওনি চুপি চুপি পাশের গেরামের কোন জোয়ান মদ্দের সঙ্গে দেখা করে, পিথমে এ খবর বিশ্বাস করি নাই কিন্তু পরে মনে হল একবার বুঝেই নি, ঠিক কি আর ভুলই বা কি। একদিন ওরে লুকিয়ে ধাওয়া করি জঙ্গলের রাস্তা ধরলাম, দেখি কি না চৌরি গ্রামের মানিক সাহুর জোয়ান ছেলে ওই রাখহরির সঙ্গে মাগি ল্যাংটো শুয়ে আমার মুখে, আমার বাপ চোদ্দোগুষ্টির মুখে চুনকালি লাগাসে। মাথায় রক্ত উঠে গেল দা-ঠাকুর, হাতের রাম-দা দিয়ে মারলাম হারামজাদার মাথায় এক বাড়ি, এক কোপেই শেষ। মাগিকে চুলের মুঠি ধরে ঘরে এনে বন্ধ করলাম, আর রেতের দিকে আমার ভাইরে সঙ্গে নিয়া জঙ্গলের মধ্যে লাশ গেড়ে দিলাম, কেউ কুথাও জানতে পারল না। কিন্তু হারামজাদা রাখহরি মরেও শান্তি দিল না, বদলা নিতে ভূত হয়ে মাগির শরীরে ভর করল, সে এবার শাওনিকে নিয়ে যেতে চায়। এর বেশি আর কিছু নেই দা-ঠাকুর, এবার তুমিই আমার বিচার করো’! পোরখাওয়া জাঁদরেল লোক মোড়ল শিশুর মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। আমি অবাক হয়ে মধ্যরাত্রির এই অদ্ভুতুড়ে নাটকের শেষ অধ্যায় দেখছিলাম আর ভাবছিলাম, আজ রাতটা যদি এই অর্ধসভ্য বুনো লোকগুলোর মধ্যে এভাবে বনেবাঁদারে ঘুরে না কাটাতাম তাহলে মরার আগে জানতেও পারতাম না আমার জ্ঞানের পরিধি কত ক্ষুদ্র। ত্রিলোচন গুম হয়ে বসেছিল, কিছুক্ষণ পরে বলল—’তুই যা করেছিস মোড়লের ব্যাটা তা হয়তো ন্যায্য, কিন্তু আমারে সব কথা না বলে ভুল করেছিস, যদি আজ রাতে কারও একটা ক্ষেতি হত তাহলে কি হত সে ভেবেছিস’? মোড়ল মাথা নীচু করে বসে রইল, একথার কোনও উত্তর দিল না। ত্রিলোচনই ফের বলল—’যা এবার বাবুলালের সামনে গিয়ে ছমা মাগ, তবেই তর ওই মাটি উ লিবে, নচেৎ নয়’। মোড়ল ত্রিলোচনের নির্দেশমতো নতজানু হয়ে টিলার সামনে বিশ্রুম্ভালাপ করতে লাগল আর আমি মনে মনে ভাবতে লাগলাম মোড়লের বাকি জীবনটা বোধহয় যুবতী স্ত্রীকে পাহারা দিতেই চলে যাবে।
কিছু পরে ত্রিলোচন বলল—’চলে আয় রে মোড়ল, বাবুলাল তোরে মাপ করসে কি না এবার বুঝা যাবে! সব আগে আগুন জ্বালবার ব্যবস্থা দ্যাখ দেখি’।
মোড়ল কয়েকটা শুকনো ডাল জোগাড় করে আগুন ধরিয়ে দিল, আর ওদিকে ত্রিলোচন মাটির দলাটা ফের একবার টিলার গায়ে লেপে দিল, তবে এবারে আর কোনওরকম বিপত্তি ঘটল না। কাঠের চিতাটা ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে একসময় জ্বলে উঠতেই ত্রিলোচন মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতে একটা একটা করে ফুল তাতে নিক্ষেপ করতে লাগল। প্রতিটা ফুলের আহুতিতেই জঙ্গল কাঁপিয়ে ভুতুড়ে মরাকান্না আমাদের শরীরের রক্ত হিম করে দিচ্ছিল। ত্রিলোচন শেষ ফুলটা কপালে ঠেকিয়ে অঞ্জলি করে জ্বলন্ত অগ্নিতে প্রদান করা মাত্র কান্নার শব্দটা থেমে গেল। মোড়ল কিছু বলতে যাচ্ছিল ত্রিলোচন ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চুপ থাকার ইঙ্গিত করে সামনের দিকে দেখাল। দেখে চমকে উঠলাম, সেই খরগোসটা হঠাৎ যেন একহাত দূরে মাটি ফুড়ে গজিয়েছে। প্রাণীটার শেষ সময় উপস্থিত। ধুঁকতে ধুঁকতে মুখে ফেনা তুলে ছোট্ট দেহটা থরথর করে কেঁপে উঠল। সামনের আর পিছনের পা দুটো টান টান করে ছড়িয়ে উলটে পড়ল, আর তখুনি ক্লান্ত, নির্জীব চোখের পাতাদুটো শেষবারের মতো বন্ধ হয়ে গেল। তখন আমরা তিনজন সেই রুক্ষ জমির উপর, বাবুলালের টিলার সামনে নিস্তব্ধ নির্বাক হয়ে দাড়িয়ে রয়েছি, আমার মনে তখন ঝড় উঠেছে। এই বত্রিশ বছরের জীবনে আজকের রাতটা নিঃসন্দেহে সবথেকে অবিস্মরণীয়। ত্রিলোচনের ডাকে হুশ ফিরল—’চল বাবু ঘরে চল’। ত্রিলোচনের নির্দেশে মোড়ল মৃত প্রাণীর শবটা হাতে তুলে নিল, ওটা সূতা নদীর জলে ভাসিয়ে দিলে কাজ শেষ হবে। সেদিন শ্রান্ত শরীরটা টানতে টানতে কোনওরকমে গ্রামে ফিরে এসেছিলাম, শরীর ক্লান্তিতে ভেঙে পড়লেও মন কিন্তু ছিল আশ্চর্যরকমের সতেজ আর উদ্দীপ্ত। ভাগ্যক্রমে এমন একটা জগতের সন্ধান আমি পেয়ে গেছি, যেটা এতদিন শুধু রূপকথার বইয়েই পড়ে এসেছি, তবে দুঃখের বিষয় হল আমার এমন দুর্দান্ত সব অভিজ্ঞতা শিক্ষিত মানুষের কাছে পাগলের প্রলাপ ছাড়া অন্য কিছুই বিবেচিত হবে না। সাংবাদিকতার পেশায় আমার উন্নতির সম্ভাবনা যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রয়ে গেল।
৮
এতটা শুনে আমি বললাম—’তপন তাড়াতাড়ি একটা সিগ্রেট ছাড় দেখি’। তপন অবাক হয়ে বলল—’সেকি বললি যে আর খাবি না’। হেসে বললাম—’তোর এই গাঁজাখুরি গপ্পো হৃদয়ঙ্গম করতে হলে খানিকটা ধোয়ার সাহায্যের বিশেষ প্রয়োজন অন্যথায় মাথায় গোলযোগ বাধতে পারে’। তপন সিগারেট বের করে আমাকে দিল আর নিজেও একটা ধরিয়ে বলল—’অবশ্য তোর বিশ্বাস না হওয়াটাই স্বাভাবিক, তবে গল্পের পরের অংশটায় আমাদের কাজের বিষয় আছে, আর এবারে প্রমাণ হাতেনাতে পাবি’। কৌতূহলী হয়ে বললাম—’সেটা কিরকম’? তপন মুচকি হাসল, বলল—’একটু ধৈর্য ধরে শোন না, কথা দিচ্ছি আর বেশি বোর করব না’। তপন আবার বলতে শুরু করল।
সেদিন বিকেলে মোড়ল এলাহি ভোজের আয়োজন করল। গ্রামের লোকেদের পেটপুরে খাওয়ার ব্যবস্থা তো রইলই, ত্রিলোচনের জন্য আলাদাভাবে আস্ত একটা ছাগল ঝলসে পাঠিয়ে দেওয়া হল সেইসঙ্গে আতপ চালের ভাত আর চোলাই করা মদের হাড়ি। ত্রিলোচন স্বাভাবিক- ভাবেই খোশ-মেজাজে ছিল। গত রাতের কেরামতির পর এলাকায় তার প্রভাব প্রতিপত্তি যে অনেকগুণ বেড়ে গেছে, সে আনন্দে মাত্রাছাড়া মদ্যপান করতে লাগল। একসময় ত্রিলোচন হুশ হারিয়ে পুরোপুরি মাতাল হয়ে পড়ল।
সে রাতে নেশার ঘোরে মত্ত ত্রিলোচন তার গোপন কথা আমার কাছে প্রকাশ করে ফেলল। যা শুনলাম তাতে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। মন্দিরের গর্ভগৃহে একটি পাঁচ বছরের শিশুকে কয়েদ করে রাখা হয়েছে। ছেলেটির যখন ছ-মাস বয়স তখনই নাকি তাকে অপহরণ করে নিয়ে আসা হয়েছিল। ছেলেটি এলেবেলে কেউ নয়, ওড়িশার একটি বিখ্যাত রাজপরিবারের সন্তান, যাদের প্রভাব প্রতিপত্তি আজকের দিনেও যথেষ্টই রয়েছে। নরবলি চণ্ডরাজার অতীব প্রিয় আর সে বলি যদি রাজবংশের কারও হয়, তাতে এই দেবতা বিশেষ প্রীত হন। বলির দাতাকে চণ্ডরাজা অলৌকিক শক্তি প্রদান করেন। সে অপরিমিত ধনসম্পদের অধিকারী হয়, একশো বছরের জীবদ্দশায় ভোগ-বিলাস আর অপর্যাপ্ত ক্ষমতার অধীশ্বর হয়ে সেই ব্যক্তি নাকি চূড়ান্ত পদ অর্জন করে। ত্রিলোচন নিজে অবশ্য বাচ্চা চুরি করেনি করেছে অন্য লোকে। এতবছর ধরে ত্রিলোচন সেই রহস্যময় ব্যক্তির আদেশ পালন করে চলেছে, আর বছর দেড়েক ব্যস তারপর শিশুটিকে বলি দিয়ে ত্রিলোচনের রেহাই। মনিব কথা দিয়েছে নিজের সৌভাগ্যের ভাগ সে সহযোগীকে দেবে। আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বাকি খবরগুলো জেনে নিলাম। ত্রিলোচন দিনে একবার একা গিয়ে ছেলেটিকে খাইয়ে আসে, অন্য কাউকে কখনো ওর সামনে যেতে দেওয়া হয়নি তাই দ্বিতীয় কোনও মানুষের মুখ ইতিমধ্যে ছেলেটি দেখেও নি। প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী চণ্ডদেবের উদ্দেশ্যে বিশেষ নরবলি এভাবেই উৎসর্গ করা হয়। ত্রিলোচন এযাবৎ ছেলেটির সঙ্গে কখনও একবারের জন্যেও বাক্যালাপ করেনি অতএব ছেলেটির পৃথিবীর কোনও ভাষার সঙ্গেই পরিচয় ঘটেনি। আগাগোড়া অন্ধকূপে জীবন কাটানোর ফলে স্বাভাবিকভাবেই ছেলেটির বুদ্ধিরও কিছুমাত্র বিকাশ ঘটে নি। স্বল্প পরিসরে আবদ্ধ থেকে থেকে চলাফেরা করার ক্ষমতাও তার নেই। বলি দেওয়ার কায়দা আর দরকারি মন্ত্রগুলো একটা কাগজে নোট করে নিলাম। এরপর ত্রিলোচন ডমফাই করে তার মনিবের নাম আমার সামনে উল্লেখ করল। নামটা শোনামাত্র আতঙ্কের স্রোত শরীরের মধ্যে দিয়ে বয়ে গেল। সামনে ভয়ংকর বিপদ! ‘মদের নেশা কেটে যাওয়ার পর ত্রিলোচনের যদি আমাকে বলা কথা সব মনে পড়ে যায়, তা হলে পিতৃদত্ত প্রাণটি নিয়ে আর ফিরত যেতে হচ্ছে না। অনেক ভেবে স্থির করলাম বোকা সাজব, ত্রিলোচনের গুপ্ত রহস্য যে জেনে ফেলেছি ঘুণাক্ষরেও তার ইঙ্গিত দেব না। তারপর দেখা যাক কি হয়’!
‘এরপর দু-তিনটে দিন কেটে গেল, আজকাল ত্রিলোচন আমাকে দেখলে এড়িয়ে চলে, মৌতাতে মজে সে যে বেফাঁস কিছু বলে ফেলেছে সে হুশ তার হয়েছে, তবে ঠিক কতটা? তা সে এখনো ভালোমতো ঠাহর করে উঠতে পারেনি। ত্রিলোচন কায়দা করে আমার পেট থেকে কথা বের করার চেষ্টা করেছিল, আমি না বোঝার ভান করে গা বাঁচিয়েছি, তাতে অবশ্য ওর সন্দেহ মেটেনি, আমি বিপদের গন্ধ পেতে শুরু করলাম, ত্রিলোচন ঘোট পাকাচ্ছে! সে যে তার রহস্যের অবাঞ্ছিত অংশীদারকে টিকিয়ে রাখতে চায় না, সেটা বোঝবার মতো বোধবুদ্ধি আমার ছিল। ভগীরথপুর থেকে তিন কিলোমিটার হেঁটে গেলে বাস রাস্তা, সকাল ন-টায় সেখান থেকে কেওনঝাড়ের বাস পাওয়া যায়, আমি গ্রামের একটা ছেলেকে দিয়ে ত্রিলোচনের কাছে খবর পাঠালাম, জানালাম এক আত্মীয়ের অসুস্থতার সংবাদ পেয়ে তড়িঘড়ি কলকাতার উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে হয়েছে, এক ফাঁকে বৃন্দাবনকে ডেকে কয়েকটা জরুরি নির্দেশ দিয়ে গেলাম। ভগীরথপুর থেকে কেওনঝাড় বাসে করে পৌঁছোন গেল, সেখান থেকে গাড়ি পালটিয়ে সোজা ভদ্রক। গলায় একটা সোনার চেন ছিল। ওটা বেঁচে হাতে কিছু নগদ এল, এবার একটা সস্তার হোটেলে দিন সাতেকের জন্য ঘাপটি মেরে পরে থাকা। ত্রিলোচন যার এজেন্ট তার হাতের নাগাল টপকে এই ভদ্রক শহরেও আমি তিলমাত্র নিরাপদ নই, তবে ভরসা একটাই! ত্রিলোচন ধুরন্ধর লোক, সে যে মৌতাতে মজে মনিবের গুপ্তরহস্য ইয়ার-দোস্তদের কাছে ফলাও করে জাহির করেছে, সেটা আবার বড় মুখ করে বলে নিজের বিপদ ডেকে আনবে, এতটা মূর্খ ওকে ভাবতে পারছিলাম না।
আমার মাথায় তখন অন্য চিন্তা। পিছনের সাড়িতে পরে থাকা নগণ্য একটা সংবাদপত্রের অস্থায়ী নিউজ রিপোর্টারের এই চাকরিটা ছাড়া আমার সম্বল আর কিছুই নেই। জীবনে উন্নতির স্বপ্ন নেহাতই দুরাশা। অন্যদিকে, ত্রিলোচনের কথা যদি সত্য হয় আর যদি বাচ্চাটাকে একেবারে কলকাতার মাঝে এনে ফেলা যায় তাহলে কত বড় ব্রেকিং নিউজ তৈরি হবে, সেটা ভাবতেও রোমাঞ্চ হল। রাতারাতি বিখ্যাত হওয়ার এমন সুযোগ জীবনে আর হয়তো পাওয়া যাবে না। বলা বাহুল্য এতে ঝুকিটাও কিছু কম নয়, একেবারে যাকে বলে প্রাণ হাতে নিয়েই এই অভিযানে নামতে হবে, উচ্চাশার সামনে ভয় বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারল না। ঠিক করলাম পরিস্থিতির মোকাবিলা করব, হয় জিতব না হয় তো মরব। পরিকল্পনা মতো পুরো দুটো সপ্তাহ অপেক্ষা করলাম, বৃন্দাবনকে বলা ছিল ওদিকে নজর রাখতে আর কোনও খবর পেলে যেন আমাকে জানায়, এই দু-সপ্তাহে শুধু একবার মাত্র বৃন্দাবনের ফোন এসেছে, যা শুনলাম তাতে চিন্তার পরিমাণ বাড়ল। ত্রিলোচন সাবধান হয়ে গেছে, আগে মাঝে মধ্যে পাহারায় ঢিলেমি দিলেও এখন প্রায় সর্বক্ষণ সে কড়া নজর রেখে চলেছে। দারোয়ান দুজন সন্ধের পর চলে গেলে আজকাল ত্রিলোচন নিজেই রাতভর জেগে নজর রাখছে। বুঝলাম আমার কাজ কঠিন থেকে দুরূহ হতে চলেছে। আর বেশি সময় কোনওভাবেই নষ্ট করা যাবে না, ভদ্রক মফঃস্বল শহর, বেশিদিন এখানে বসে থাকলে স্থানীয় লোকের সন্দেহ হতে পারে, ঠিক করলাম, আপাতত কলকাতায় ফেরত যাব তারপর নাহয় মাসদুয়েক পরে ফের দেখা যাবে। হঠাৎ সেদিনই বৃন্দাবনের ফোন এল, গত রাতে নাকি ত্রিলোচন গলা অবধি মদ খেয়ে প্রচুর মাতলামি করেছে, সে নিজে দেখেছে, বুঝলাম ত্রিলোচন ঢিলে দিয়েছে, পাঁড় মাতাল কি আর বেশিদিন মদ ছেড়ে থাকতে পারে! যে জিনিসগুলো আমার দরকার সেগুলো তাড়াতাড়ি জোগাড় করে নিলাম, একটা বড় সাইজের ট্র্যাভেল লাগেজ, একটা সাত সেলের টর্চ আর প্রচুর পরিমাণে টয়লেট প্যাড। ভদ্রকের বেহেরা ট্র্যাভেলসকে বলে একটা টাটা সুমো গাড়ির ব্যবস্থা করা গেল। বেলা গড়িয়ে গেলে গাড়িটা নিয়ে ভগীরথপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। ভগীরথপুর গ্রামে গাড়ি ঢোকবার মতো রাস্তা নেই, তাই সেটাকে বাস রাস্তার একপাশে রেখে, হাতে স্যুটকেশটা নিয়ে পায়ে হেঁটে গ্রামে প্রবেশ করলাম। তবে ঠিক যেদিকে গ্রামের জনবসতি সেদিকটা এড়িয়ে জঙ্গলের ভিতর একটা ঝাঁকড়া গাছের আড়ালে লুকিয়ে রইলাম। সন্ধে সাতটা পর্যন্ত এখানে লোক চলাচল করে, চাইছিলাম না তাদের কারও নজরে পরে যাই ওদিকে আবার গাড়িতে বসে থাকলে ড্রাইভারের মনে সন্দেহ জাগতে পারে তাই দুদিক বাঁচাতে এমন ব্যবস্থা নিতে হল। রাত ন-টা অবধি আত্মগোপন করার পরে নিশ্চিত হলাম, গ্রামে আজ রাতে আর কেউ জেগে বসে নেই, এবার সাবধানে বেড়িয়ে পরলাম। নিস্তব্ধ নির্জন চেনা গ্রাম্য পথ দিয়ে বৃন্দাবনের বাড়ির সামনে চলে এলাম। বৃন্দাবন গোয়ালে খাটিয়া পেতে শুয়েছিল, আমি শিষ দিতে বাইরে বেড়িয়ে এল। ওর কাছে খবর পেলাম, কয়েকদিন মদ, গাঁজা কিছু না ছুয়ে ত্রিলোচন সজাগ থেকে মন্দির পাহারা দিয়েছে, তবে বিগত দুদিন হল সে আবার তার পুরোনো অভ্যাসে ফিরত গেছে। বুঝলাম ভাগ্য আমার সহায়, মনে মনে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানিয়ে মন্দিরের দিকে হাটা দিলাম, এবারে সঙ্গে বৃন্দাবন চলল।
বৃন্দাবনকে মন্দির থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়াতে বলে আমি একাই ভিতরে ঢুকলাম। মন্দিরে পৌঁছে সে রাতে যা দেখলাম আগেও অনেকবার দেখেছি।
ত্রিলোচন আকণ্ঠ মদ গিলে বেহুশ হয়ে চাতালে এলিয়ে পড়ে আছে, আমি ওর কোমর থেকে সাবধানে চাবির গোছা বের করে মন্দিরের দরজা খুলে সটান ঢুকে পরলাম। গর্ভগৃহের ভিতরে আলোর কোন ব্যবস্থাই নেই একেবারে নিকষ্যি অন্ধকার। পায়ে কয়েকটা চলন্ত মাংসপিণ্ডের ছোঁয়া লাগতেই আঁতকে উঠলাম। টর্চলাইটটা এখানে খুব কাজে এল, আলো ফেলে দেখলাম মেঝের উপর অসংখ্য মেঠো ইঁদুর কিলবিল করছে, গামবুটের গুঁতো দিয়ে ঠেলে সেগুলোকে একদিকে সরিয়ে দিলাম, এবার বেদির উপর চণ্ডরাজার মূর্তিতে আলো ফেলতেই বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল। দেবতার অবয়বটা বড়ই অদ্ভুত? কি হিংস্র লোলুপ চোখের দৃষ্টি, বড় বড় দাঁত বের করে যেন গিলে খেতে চাইছে আর সবথেকে আশ্চর্যের বিষয় বড় অদ্ভুত রকমের জীবন্ত। মূর্তিটার চোখে চোখ রাখতে অস্বস্তি হচ্ছিল, অন্যদিকে চোখ সরালাম, এবারে তাকে খুঁজে বের করতে হবে যার জন্য এই অভিযান। টর্চের আলোয় ঘরটা খুটিয়ে খুটিয়ে দেখে বুঝতে পারলাম এখানে তেমন কিছু নেই, এবারে মূর্তির পিছনের দেওয়ালে গিয়ে হাতড়ে একটা বন্ধ দরজা দেখতে পেলাম। সামান্য ঠেলতেই দরজাটা খুলে গেল, ঘরের ভিতর থেকে মৃদু অস্পষ্ট গোঙানির শব্দ কানে আসছিল। ঘর না বলে ওটাকে অবশ্য চোরকুঠুরি বলাই ভালো, অত্যন্ত নীচু ছাদ, আর দুদিকে সংকীর্ণ পাথুরে দেওয়াল, কোনওরকমে মাথা বাঁচিয়ে ঢুকে দেখলাম, তক্তপোষের ওপর কঙ্কালসার চেহারার একটা ছেলে বেঁকেচুরে শুয়ে, ছেলেটিকে টেনে হিঁচড়ে কোনওরকমে বাইরে এনে ফেললাম। হঠাৎ কি মনে হতে মূর্তির তলায় বেদিটা হাতড়ে দেখলাম, বুনো ফুল দিয়ে ঢাকা একটা ছোট সাইজের গোলাকৃতি পাথরে হাত ঠেকল। অনুমান করলাম এটাই এই দেবতার প্রতিষ্ঠা করা প্রাণ ভোমরা আর উপরের মূর্তিটা নিছক আবরণ। কোনও কিছু না ভেবেই শিলাখণ্ডটা রুমালে জড়িয়ে পকেটে পুরে নিলাম। ছেলেটাকে কাঁধে তুলে সদর দরজা ঠেলে বের হতে গিয়ে এবারে ত্রিলোচনের মুখোমুখি হয়ে পরলাম, নেশার ঘোর কিছুটা কাটার ফলে সে তখন টলতে টলতে এদিকেই এগিয়ে আসছিল, টর্চের জোরালো একটা ঘা মেরে ওকে মাটিতে শুইয়ে তাড়াতাড়ি বেড়িয়ে পরলাম। সবার আগে ছেলেটাকে স্যুটকেশে ভরে ফেললাম, তারপর দেড় কিলোমিটার রাস্তা গ্রামের ভিতর দিয়ে বাক্সটা বহন করে এনে গাড়িতে তুললাম। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা চলার পর ভোর রাতের দিকে গাড়ি এসে পৌঁছোল কসবা নারায়ণগড়ে। মফঃস্বল শহরটা বাংলা ওড়িশার বর্ডারে। আগে থেকেই ব্যবস্থা করে রেখেছিলাম, আমার পরিচিত একজনের গেস্ট হাউসে, আমরা স্যুটকেশ সমেত উঠলাম। এখান থেকে হলদিয়া ধরে কলকাতা যেতে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যাপার, কিন্তু সঙ্গে থাকা বাচ্চাটার জন্য বিরতি নেব ঠিক করলাম, গাড়ি আর ড্রাইভার পালটানোও জরুরি, তা ছাড়া লং-জার্নির ধকল ছেলেটা নিতে পারবে না, জন্মাবধি চোরকুঠুরিতে বন্দি থাকার ফলে ছেলেটার চোখ কোনওরকম আলো সহ্য করতে পারবে না মোটামুটি আন্দাজ করে নিয়েছিলাম, তাই যে ঘরে থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল তার জানলাগুলো পর্দায় ঢেকে দিলাম, কিন্তু তাতেও উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি না হওয়ায় ওকে লাগেজের মধ্যেই রেখে দেওয়া স্থির করলাম।
বেলার দিকে প্রভাসদাকে ফোন করলাম।
প্রভাসদা তো একেবারে আকাশ থেকে পরলেন। প্রশ্নে প্রশ্নে একেবারে ব্যতিব্যস্ত করে তুললেন। এতদিন কোথায় ছিলাম? সমীরণের ইন্টারভিউয়ের কি হল? কোনওরকমে প্রভাসদাকে থামিয়ে বললাম, কাল কলকাতায় ফিরছি, উনি যেন বিরাট একটা খবরের জন্য তৈরি থাকেন। আসল ব্যাপারটা যে কি সেটা আর ভাঙলাম না। কাল যখন ছেলেটাকে প্রকাশ্যে এনে হাজির করব তখন চোখের সামনেই দেখতে পাবে। এবার সমস্যা হল ছেলেটিকে নিয়ে, নতুন পরিবেশে ঘাবড়ে গিয়ে মুখ দিয়ে অদ্ভুত সব শব্দ বের করতে শুরু করল। আপাতত আফিম গোলা জল খাইয়ে ওকে শান্ত করলাম। দিনের বেলায় ওকে নিয়ে ঘোরাঘুরি করা অনুচিত, বাক্সসমেত ধরা পরলে যে ছেলেধরা বিবেচনায় গণধোলাই নিশ্চিত প্রাপ্য সেটা সহজেই অনুমেয়। গাড়ির ব্যবস্থা করলাম সেদিন মাঝরাতে।
হোটেলের ম্যানেজার নির্মল সাধুখাঁর সঙ্গে আগে থেকেই আলাপ ছিল পেশার সূত্রে, ভদ্রলোক বেশ খাতিরযত্ন করলেন। আগেভাগে জানিয়ে রাখলাম আমাদের কামরায় রুম সার্ভিসের প্রয়োজন নেই, আমার অনুমতি বিনা যেন ওঘরে কেউ না ঢোকে। ভদ্রলোক কথায় কথায় বললেন হোটেলের বাগানে তিনি একটি শখের চিড়িয়াখানা গড়ে তুলেছেন, এবং সেটা আমাকে দেখাতে চান, এইমুহূর্তে ঘর থেকে বেশিক্ষণ বাইরে থাকাটা অনুচিত কাজ তাই একটা অজুহাত দিয়ে আবার ঘরেই ফেরত এলাম।
সেদিনটা ছেলেটার দিকে নজর রাখতে রাখতেই কেটে গেল। যদিও আফিমের প্রভাবে ওর হুশ প্রায় ছিলই না তা হলেও সতর্কতায় ঢিলে দিলাম না, যতক্ষণ না কলকাতায় পৌঁছতে পারছি, বিপদের আশঙ্কা থাকছেই। গাড়ি আসবে রাত বারোটায়, ছেলেটাকে ফেনা ভাত আর পেঁপে সেদ্ব খাইয়ে, নিজেও ডিনার সেরে একটা ম্যাগাজিনের পাতা ওলটাচ্ছিলাম, বোধহয় তখন রাত দশটা হবে, হঠাৎ পেটে একটা ব্যথা অনুভব করলাম। তপন তলপেটের দিকে ইঙ্গিত করে বলল—’এখানে’! ব্যথাটা ক্রমশ বাড়তে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যে অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরাতে শুরু করলাম। বৃন্দাবন ভয় পেয়ে ম্যানেজারকে ডাকতে যাচ্ছিল আমি বারণ করলাম, এই ঘরে কাউকে আসতে দেওয়া যায় না, আর আমি নিজে একমুহূর্তের জন্যেও ওই বাক্সটা ছেড়ে যেতে পারি না। আমার মোবাইলে ডাক্তার চ্যাটার্জির নম্বরটা সেভ করা ছিল, মোবাইলটা খুঁজতে প্যান্টের পকেটে হাত দিতেই ছ্যাঁকা খেলাম! কি কারণে বা সুতির কাপড় ভীষণ তেঁতে উঠেছে। পকেট ঝেড়ে যা বেরোল সেটা আর কিছু নয়, রুমালে জড়ানো চণ্ডরাজার পাথর যেটা আমি একদিন আগে ভগীরথপুরের মন্দির থেকে তুলে এনেছি। পাথরটা থেকে একটা অদ্ভুত নীল আলো ঠিকড়ে বেরোচ্ছিল। আমি তাড়াতাড়ি পাথরটা রুমালে জড়িয়ে ড্রয়ারে রেখে দিলাম, এসব জিনিস বৃন্দাবনের চোখে পড়লে মুশকিল হতে পারে। আমি বৃন্দাবনকে কাজের অছিলায় বাইরে পাঠিয়ে দিলাম। এবারে ভালো করে পাথরটা চেক করা দরকার, অদ্ভুত একটা বিষয় নজরে পড়ল, পাথরটা যতই তেঁতে থাকুক না কেন এর দাহিকা শক্তি কিন্তু একেবারেই নেই, অন্যথায় প্যান্টের কাপড়ে এতক্ষণে আগুন লেগে যেতে বাধ্য। অথচ শিলাটায় হাত দিলেই ছ্যাঁকা খাচ্ছি, ত্রিলোচনের বলা কয়েকটা কথা হঠাৎ মনে পরল, চণ্ডরাজার যখন তেষ্টা পাবে সে তেষ্টা মেটাতে না পারলে পূজারির সর্বনাশ। চণ্ডরাজার তৃষ্ণা কিসে মিটবে? রক্তে! ব্যথাটা আর সহ্য করা যাচ্ছিল না, দরজায় খিল এঁটে ব্যাগ থেকে দাড়ি কামানোর ব্লেডটা বের করলাম। ব্লেডটা আড়াআড়িভাবে ডান হাতের তর্জনীর উপর চালিয়ে দিলাম। তীক্ষ্ন যন্ত্রণার সঙ্গে একটা অগভীর ক্ষতের সৃষ্টি হতেই তাজা রক্তের ধারা ক্ষতস্থান থেকে বুরবুরি দিয়ে উঠল। তাড়াতাড়ি আঙুলটা চণ্ডরাজার পাথরের উপর মেলে ধরলাম। ফোঁটা ফোঁটা রক্ত শিলাখণ্ডের মাথায় গড়িয়ে পড়তে লাগল। নীল আলোটাও অকস্মাৎ স্থিমিত হয়ে এল। পাথরটা ছুয়ে দেখলাম সেটা খানিক ঠাণ্ডা হয়ে এসেছে। পেটের যন্ত্রণা খানিকটা কমল কিন্তু পুরোপুরি সেরে গেল না। ত্রিলোচনের কথাগুলো মনে করার চেষ্টা করলাম, কিছু কিছু মনে পড়ল, চণ্ডরাজার নৈবেদ্যে রক্তের সঙ্গে প্রাণও অর্ঘ, অন্যথায় সেবা অসম্পূর্ণ। স্থির করলাম তবে প্রাণও উৎসর্গ করব। ‘সে রাত্রে যে কি কষ্ট করে সাধুখাঁর সাধের চিড়িয়াখানা থেকে একটা গিনিপিগ চুরি করেছিলাম সে শুধু আমিই জানি’।
৯
তপন সামান্য বিরতি নিয়ে বলল—’আমার কাহিনি এখানেই শেষ, এরপর দেড়টা বছর শুধু টাফ স্ট্রাগল করে গেছি। পেরেছি তার কারণ বোধহয় ভাগ্যও আমার কিছুটা সহায়, ছেলেটিকে চুরি করার পরের দিনই সি-আর-পি-এফ সমীরণের ডেরা ঘিরে ফেলে এনকাউন্টার করে ওর বেশিরভাগ স্যাঙাতকে যমের দুয়ার দেখিয়ে দিয়েছিল, নকশালদের দলের কয়েকজন আত্মসমর্পণ করে বাকি ঘাটিগুলোর খবর পুলিশকে দিয়ে দিয়েছিল, সমীরণ প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে যেতে পারলেও তার অবস্থা এখন রাস্তার কুকুরের মতোই, পুলিশের তাড়ায় কোনও জায়গায় স্থির হওয়ার জো তার আর নেই। তবে এতকিছুর পরেও বাচ্চাটাকে সঙ্গে নিয়ে চলাফেরা করা যে কি কষ্টকর সেটা ভুক্তভোগীই জানবে। অচেনা পরিবেশ দেখলেই ছেলেটির নার্ভাস ব্রেকডাউন ঘটে যায়, তখন বিকট চিৎকার করতে করতে মুখ দিয়ে ফেনা তুলে অজ্ঞান হয়ে পরে। আজন্ম শুয়ে থেকে থেকে ওর চলাফেরার শক্তি একেবারেই নষ্ট হয়ে গেছে, দৃষ্টিশক্তিও রীতিমতো ক্ষীণ, পরে রক্ত পরীক্ষা করে জানতে পেরেছি এরমধ্যেই ডায়াবেটিসসহ আর কিছু জটিল স্নায়বিক সমস্যা ওকে ধরে নিয়েছে। ত্রিলোচনের কল্যাণে আর যাই হোক ছেলেটিকে মানুষের পর্যায়ে ফেলা যায় না। ছেলেটির যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করব সে সুযোগও পেলাম না কারণ বিপদ ততদিনে আমার ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করেছে, এরপর শুরু হল আমার পলাতক জীবন, কখনও বাংলার কোনও গ্রামে, কখনও বা ঝাড়খণ্ডের মফঃস্বল শহরে তো কখনও আসামের কোনও অখ্যাত পাড়াগাঁ, কোথাও থিতু হয়ে বসতে পারিনি, যেখানেই গেছি টের পেয়েছি শত্রুরা আমার পিছু নিয়েছে, একবার তো দেওঘরের বাজারে ক্ষণিকের জন্য একজন অচেনা লোককে দেখে ভীষণ ঘাবড়ে গেছিলাম, দাড়ি-গোঁফ ছেঁটে আর দস্তুরমতো প্যান্ট-শার্ট পড়লেও ত্রিলোচন সেদিন আমার চোখকে ফাঁকি দিতে পারেনি। তবে আশ্চর্যের বিষয় ওরা দূর থেকে নজর রেখেই এযাবত ক্ষান্ত দিয়েছে, কিন্তু ঠিক কেন সে উত্তর আমার কাছে নেই, তপন একমুহূর্ত চুপ করে বলল—’এবারে আশা করি বুঝেছিস জানলাগুলো ওভাবে বন্ধ রাখার দরকার কেন হয়ে পরেছে, তা ছাড়া আর একটা ব্যাপার আমার উদ্বেগ বাড়িয়েছে, আজ মাংসের দোকানে বৃন্দাবন একটা পরিচিত মুখ দেখে দারুণ ভয় পেয়ে গেছিল, লোকটা সমীরণের অ্যাকশন স্কোয়াডের মেম্বার, একই গ্রামের বাসিন্দা হওয়ার ফলে বৃন্দাবন ওকে ভালোমতোই চেনে’।
আমি এতক্ষণ রুদ্ধশ্বাসে তপনের অভিজ্ঞতা শুনছিলাম এবারে ও থামতেই জিগ্যেস করলাম—’আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না! বাচ্চাটাকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর প্রয়োজনটাই বা কিসের? নিউজ কভার করেই তো তোর কাজ হয়ে যেত! বাকিটা পুলিশের কাজ’। তপন গম্ভীরভাবে মাথা নেড়ে বলল—’নট ব্যাড, সেক্ষেত্রে নামডাক হয়ত কিছুটা হতো, প্রভাসদার শুয়ে পড়া কাগজ একটা ব্রেকিং নিউজ পেত, আর কে বলতে পারে হয়তো বড় কোনোও সংবাদপত্রের নজরেও পরে যেতে পারতাম। কিন্তু নাঃ সেটা হত বোকামো। বিরাট প্রাপ্তির সম্ভবনাকে পায়ে ঠেলে তুচ্ছ কানাকড়িতে মন ভরানো’! শেষের কথাগুলো বলে তপন একটা রহস্যময় হাসি হেসে সিগারেট ধরাল। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন তপনের মুখের প্রতিবিম্ব উলটোদিকের দেওয়াল আয়নায় পড়েছে, সেদিকে চোখ পরতেই চমকে উঠলাম, কি হিংস্র আর পাশবিক লাগছিল সেই মুখের অভিব্যক্তি। তপন আমার দিকে স্থির দৃষ্টে চাইল, ওর দৃষ্টিতে কি যেন একটা ছিল, শিকারি বেড়াল যেমনভাবে ফাঁদে পরা নেংটি ইঁদুরকে জরিপ করে, যেন তেমন কিছু।
তামাকের ধোঁয়ার জালে বদ্ধ ঘরের ভুতুড়ে পরিবেশটা ক্রমশ আরও বেশি করে জমাট হয়ে আসছিল, তপন একটা জীবন্ত মাংসপিন্ড নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে! কি তার উদ্দেশ্য? তবে সেটা আর যাই হোক না কেন নিশ্চয়ই সৎ নয়! জিগ্যেস করলাম—’তা হলে তুই চণ্ডের প্রবাদে বিশ্বাস করিস’? তপন মৃদু হাসল, কথার উত্তর দিল না। বিপদের গন্ধ পাচ্ছিলাম, মনের ভাব গোপন করার চেষ্টা করে স্বাভাবিকভাবে জিগ্যেস করলাম—’এসব কথা আমাকে ডেকে এনে শোনালি কেন? আর ছেলেটাই বা কোথায়’?
তপনের ঠোঁটের কোণের রহস্যময় হাসিটা চওড়া হয়ে উঠল, অদ্ভুত স্বরে বলল—’প্রথম প্রশ্নের উত্তর হল তোর সাহায্য ছাড়া আমার উদ্দেশ্য সফল হওয়ার নয়, এমন কিছু আছে যা শুধু তুই পারবি, সেজন্য একটু কষ্ট দিলাম। দ্বিতীয়টা হচ্ছে এবাড়ির স্টোর রুম’।
—’তোর মতলবটা কি বল তো’? তপন হঠাৎ নরম হয়ে অনুনয়ের সুরে বলল—’জয়ন্ত প্লিজ আমার কথাগুলো একটু মন দিয়ে শোন। আমাদের এই চেনাজানা জগতের পাশাপাশি এমন একটা প্যারালাল জগৎ আছে যার বিষয়ে আমাদের কোনও ধারণাই নেই। ঢেঙ্কানলের জঙ্গল আর পাহাড়ের প্রবাদ চণ্ডরাজার উদ্দেশ্যে বিশেষভাবে প্রতিপালিত সাত বছর বয়সী রাজপুরুষের বলি নিবেদন করলে তিনি নরকের দরজা খুলে আবির্ভূত হন, যার বলির দানে তিনি দরজা খুলতে পারেন সেই ব্যক্তিকে অসীম ক্ষমতা প্রদান করেন, তবে এখানে যে নিয়মটা খাটে, ছেলেটিকে যেমন রাজ পরিবারের সন্তান হতে হবে তেমন বলিও তিনি শুধুমাত্র কোনও রাজপুরুষের হাত থেকেই গ্রহণ করবেন’। এতক্ষণে তপনের অভিসন্ধিটা পরিষ্কার হয়ে চোখের সামনে ভেসে উঠল, বুঝলাম ও আমাকে রাজা ঠাউরেছে। রুঢ় স্বরে বললাম—’মনে হচ্ছে আমাকে দিয়ে কসাইয়ের কাজ করাতে চাস তাইত’? তপন তক্তপোষ থেকে উঠে এসে আমার হাত চেপে গাঢ় স্বরে বলল—’ক্ষুরটা শুধু গলার উপরে হালকা চেপে ধরবি, সামান্য একটু রক্ত ব্যস, বাকি যা করার আমি করব’। দারুণ রাগে গায়ের রক্ত যেন মাথায় চড়ে গেল, তপনের হাত ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়ালাম, বললাম—’তোর মাথা খারাপ হয়েছে বলে তো আমারও হয়নি’। তপন বলল—’আসল কথাটা বলাই হয়নি, ভেবে দ্যাখ জয়ন্ত জীবনের যা কিছু স্বপ্ন, উচ্চাশা সব তুড়ি মেরে পূরণ করে ফেলব আমরা, আমি আর তুই। আমরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনীদের মতো বাঁচব, সবকিছু আমাদের হাতের মুঠোয় হবে’। আমার হঠাৎ মনে হল তপনের মাথাটা বোধহয় বিগড়েছে! হয়তো সবই ওর বানানো গল্প। ভাবলাম ব্যাপারটা একবার তলিয়েই দেখা যাক, বললাম—’তা ছেলেটাকে আগে একবার দেখি তারপর নাহয় সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে’।
একচিলতে স্টোর রুমটা সিঁড়ির ঠিক নীচে। আগেই বলেছি এবাড়িতে ইলেকট্রিক আলোর বালাই নেই, মোমের হালকা আলোয় অন্ধকার যতটা দূর হচ্ছিল তার চেয়ে বেশি পরিমাণে যেন চারপাশ থেকে ঘিরে ধরছিল। বৃন্দাবন তালার ছ্যাঁদার মধ্যে চাবি ঘুড়িয়ে খুলছিল, এখানকার পরিবেশ গোটা বাড়ির তুলনায় যেন আরও মাত্রাতিরিক্ত অপয়া আর ভুতুড়ে, বিরক্ত হয়ে বললাম—’এখানে কোনও মানুষকে কেউ রাখতে পারে’? তপন মৃদুস্বরে বলল—’তোকে তো বলেইছি ও আলো সহ্য করতে পারে না, তা ছাড়া বাজে সব জিনিস সরিয়ে ঘরটাকে পরিষ্কার করে বিছানা পেতে দেওয়া হয়েছে, ও ভালোই আছে’। দরজা খুলে গেল। মোমের হালকা আলোয় কিছুই ঠাহর করতে পারছিলাম না। তপন বলল—’ঘরের কোণে খাট পাতা রয়েছে’।
এবারে তাকে দেখতে পেলাম, খাটের উপর বেকেচুরে শুয়ে থাকা একটা শীর্ণ মনুষ্যাকৃতি। আগেভাগে জানা না থাকলে একে মানুষ বলে ভাবতেও বোধহয় অসুবিধে হত। ছেলেটি কেমন যেন অসার মেরে পরে রয়েছিল। তপন মৃদুস্বরে বলল—’আফিং খেয়ে বেহুশ হয়ে রয়েছে’। মেরুদণ্ড দিয়ে বরফের স্রোত বয়ে গেল। তাহলে তপন এতক্ষণ সত্যি কথাই বলে চলেছে। বিপদের মুখে যে শুধু এই অর্ধমৃত মানব সন্তানটিই একমাত্র নয় আমিও পুরোমাত্রায় আছি সেটা হৃদয়ঙ্গম করতে আর দেরি হল না। তপন বলল—’ত্রিলোচনের হিসেব মতো কাল ছেলেটির সাত বছর পূর্ণ হবে, সূর্যাস্ত চারটে বেজে সাতান্ন মিনিটে। ছ-টা নাগাদ সন্ধের অন্ধকার নেমে আসবে আর তারপরই আমরা ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলব’। মনের ভাব গোপন রেখে বললাম—’ভালো কথা বাইরে চল তা হলে’। বৃন্দাবন ঘরটায় ফের একবার তালা ঝুলিয়ে দিল। আমরা আবার একতলার বাইরের ঘরটায় চলে এলাম। তপন বলল—’তা হলে জয়ন্ত এবারে উপরে গিয়ে বসা যাক’। আমি সুযোগ বুঝে বললাম—’তপন মাথাটা কেমন যেন ভারী ভারী লাগছে, ভাবছি শোবার আগে একটু তাজা হাওয়া খেয়ে আসব। আমি একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসছি’। তপন সন্দেহজনক দৃষ্টে চেয়ে বলল—’কিন্তু আজ রাতে যে আমাদের কারও, বাইরে যাওয়া চলবে না। কাল কাজ মিটে গেলে অবশ্য আর কোনও বাধা থাকবে না’। প্রতিবাদ করে বললাম—’তার মানে কি আমি তোর বন্দি’? তপন মাথা নেড়ে বলল—’ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা কর জয়ন্ত, সমীরণের লোকেরা এই বাড়ির উপর লুকিয়ে নজর রাখছে, তোকে ঢুকতে দেখেছে নিশ্চয়ই, এখন তুই রাস্তায়ঘাটে ঘুরলে যদি একটা বিপদ ঘটে তাহলে’! আমি পালটা যুক্তি দিতে যাচ্ছিলাম, তপন কান না দিয়ে বলল—’অবশ্য যতক্ষণ তুই এই বাড়ির ভিতর আছিস চিন্তার কিছু নেই, আমার কাছে বিপদের মোকাবিলা করার মতো অস্ত্র আছে’। তপন এবার ওর ফতুয়ার পকেট থেকে একটা রিভলভার বের করল। রিভলভারটা আমার দিকে উঁচিয়ে তপন ঠাণ্ডা গলায় বলল—’দেখে নে জয়ন্ত! বিহারের মুঙ্গের থেকে জোগাড় করেছি, এটাকে দেশি পিস্তল বলে, লাইসেন্স নেই কিন্তু তাই বলে মানুষ খুন করা যাবে না এমন কিছু নয়’। তপন সামান্য কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে চেয়ে ধীরেসুস্থে বলল—’তা হলে উপরে গিয়ে বসা যাক’।
অনিচ্ছাসত্ত্বেও তপনের সঙ্গে চললাম। প্রচণ্ড রাগে তখন আমি ফেটে পরতে চাইছি, তপন যেটা করছে সেটা বন্ধুত্বের নামে চরম বিশ্বাসঘাতকতা, কিন্তু এর যথোপযুক্ত শিক্ষা ওকে দিতে হলে আপাতত মাথা ঠাণ্ডা রাখতেই হবে। তপন ঘরে ফিরেই নির্বিকারে গল্প জুড়ল, গত দেড় বছরে যেসব অসুবিধে ভোগ করে ছেলেটাকে এতদূর নিয়ে এসেছে তার বিস্তারিত বিবরণ দিতে লাগল। আমার শোনার মতো মন ছিল না। তপন যে ছেলেটাকে হত্যা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সে তো পরিষ্কার বোঝাই যাচ্ছে, তারপর ওর কাছে কার্তুজ ভরা একটা পিস্তলও রয়েছে, সামনা সামনি-বিরোধ করাটা বোকামি হতে পারে। ঘড়িতে বারোটা বাজতে তপন ব্যস্ত হয়ে পরল, বলল—’শুয়ে পরা যাক জয়ন্ত, এখন কালকের দিনটা ভালোভাবে কাটলে হয়’! তপন ডাক দিতেই বৃন্দাবন এসে আলো দেখিয়ে পাশের ঘরে নিয়ে গেল। ঘরে ঢোকামাত্র বৃন্দাবন বাইরে থেকে দরজা এঁটে দিল, তালা মারার শব্দটা কানে অসহ্য লাগল, জীবনে এই প্রথম মোবাইল ফোন ব্যবহার না করার জন্য সাংঘাতিক পস্তালাম। দুশ্চিন্তা আর দুর্ভাবনায় কপালের দু পাশে শিরাগুলো দপদপ করতে লাগল।
