চণ্ডরাজার বলি – ১০
১০
মোমবাতিটা জ্বলতে জ্বলতে একসময় নিঃশেষ হয়ে গেল। রাত যে কত গভীর হয়েছে এই দমবন্ধ করা পরিবেশে তা বোঝা যাচ্ছে না, আমি গভীর চিন্তানিমগ্ন অবস্থায় খাটের উপর বসে পরিস্থিতি তলিয়ে বোঝার চেষ্টা করছি। মাঝে মধ্যেই ভারী পায়ের শব্দ ঘুরে ফিরে আসছে। আমাকে শুধু ঘরে বন্দি করেই তপন ক্ষান্ত হয়নি, রাত জেগে রীতিমতো নজরদারিও চালাচ্ছে। খেলা শেষ হওয়ার আগে ও তা হলে ঢিলে দিতে রাজি নয়! কাল বলি দেওয়ার পর নিশ্চয়ই তপন তার কুকর্মের সাক্ষী রাখবে না, নিজেকে আর ছেলেটাকে বাঁচানোর জন্য ঝুঁকি আমাকে নিতেই হবে, মনে মনে তৈরি হলাম।
বাথরুমে এক বালতি জল তখনও অবশিষ্ট ছিল। সেটা তুলে এনে দরজার সামনে মেঝেতে ঢেলে দিলাম। চৌকাঠ ডিঙিয়ে জল দরজার বাইরে গড়িয়ে গেল। সামান্য পরে একটা পায়ের শব্দ দ্রুত বারান্দার অন্য প্রান্তে চলে গেল, বুঝলাম বৃন্দাবন তপনকে ডেকে আনতে গেল। একটু পরে জোড়া পায়ের ব্যস্ত পদশব্দ শোনা গেল, তারপর তপনের রুক্ষ স্বর কানে এল—’জয়ন্ত জল কোথা থেকে আসছে’? আমি অ্যালুমিনিয়ামের বালতিটা শক্ত হাতে ধরে দরজার একপাশে দাঁড়িয়ে রইলাম। তপন আবার জিগ্যেস করল—’জয়ন্ত উত্তর দে’! আমি সাড়াশব্দ না করে তেমনি দাড়িয়ে রইলাম। এবার টের পেলাম কেউ চাবি ঘুরিয়ে তালা খুলছে, আমি বালতিটা শক্ত হাতে ধরে তৈরি হলাম। দরজা খুলে গেল। একমুহূর্ত ইতস্তত করে একটা ছায়ামূর্তি ভিতরে প্রবেশ করল। যথাসম্ভব জোরে হাতের বালতিটা দিয়ে ছায়ামূর্তির মাথায় আঘাত করলাম। লোকটি বিকট শব্দ করে মেঝেতে চিৎপাত হয়ে পড়ল। যদিও ছুটে বের হতে বাধা পেলাম। তপন দরজা আগলে দাঁড়িয়ে রয়েছে, ওর হাতের উদ্যত পিস্তলটা সোজা আমার দিকে তাগ করা। অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে বালতিটাকে বোঁ করে ঘুরিয়ে তপনের মাথায় আঘাত হানলাম। তপন সতর্কই ছিল সরে গিয়ে নিজেকে বাঁচিয়ে নিল। ঠাণ্ডা গলায় বলল—’পাগলামি করিস না জয়ন্ত, ট্রিগারে চাপ পরে গেলে কি হত বলত’? আমি ক্ষিপ্ত হয়ে বললাম—’তপন তুই বিশ্বাসঘাতক? বন্দুক দেখিয়ে আমাকে দিয়ে মার্ডার করাতে চাস? এত নীচ তুই’? তপন সামান্য হাসল—’উপরে উঠতে গেলে তো একটু নীচে নামতেই হয়! তবে তোর আক্ষেপ রাখব না, বন্ধুত্বের খাতিরে ফেয়ার ডিল হবে! যদি আমাকে ঘায়েল করে সিঁড়ি পর্যন্ত যেতে পারিস তাহলে কথা দিচ্ছি তোর পথ কেউ আটকাবে না’। তপন পিস্তল পকেটে পুরে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তপন একসময়ের বক্সিং চ্যাম্পিয়ন। ওকে পরাস্ত করা মুশকিল। তবে কোনওরকমে যদি পিস্তলটা কবজা করতে পারি তা হলে অবশ্য বাজি আমার। একমুহূর্ত অপেক্ষা না করে মেঝে থেকে বালতিটা তুলে তপনের দিকে ছুড়ে মারলাম। বালতিটা তপনের মুখের উপর আছড়ে পরল। তপন এটার জন্য প্রস্তুত ছিল না, মুখ থুবড়ে সশব্দে বারান্দার উপর পরল। আমি তপনের উপর ঝাঁপিয়ে পরলাম। উদ্দেশ্য যে করে হোক ওর পকেট থেকে পিস্তলটা হাতিয়ে নেওয়া, তবে এবারে আর সুবিধা করে উঠতে পারলাম না। তপন সামলে উঠেছে। মুষ্টিযোদ্ধার কায়দায় জোরালো ঘুষি সোজা চালিয়ে দিল আমার থুতনির নীচের অংশটায়। দারুণ যাতনায় মনে হল চোয়ালের হাড়টা বুঝি ভাঙল। পরের ঘুষিটা তপন আড়াআড়ি চালাল নাকের ঠিক নীচে, দুই মাড়ির সন্ধিস্থলে, চোখে সর্ষেফুল দেখা কাকে বলে সেদিন বুঝলাম। হুরমুড়িয়ে মেঝেতে পরে গেলাম। প্রাণপণ চেষ্টা করে উঠতে যাচ্ছিলাম, তপনকে বলতে শুনলাম—’অনেক হয়েছে জয়ন্ত আর দরকার নেই’। কষের দুটো দাঁত মাড়ি থেকে ঝুলছিল, জিভেরও খানিকটা কেটে গেছিল, মুখে তাজা রক্তের বুনো গন্ধ যতটা কষ্ট দিচ্ছিল তার থেকেও বেশি যন্ত্রণা দিচ্ছিল তপনের হাতে ঠ্যাঙানি খাওয়ার লজ্জা। মাথা নীচু করে বৃন্দাবনের কাধে ভর দিয়ে সেই পুরোনো ঘরে ফিরত এলাম। সামান্য পরে তপন এল, হাতে একটা সিরিঞ্জ। তপন বলল—’ইনজেকশনটা নিলে রাতে ঘুমোতে পারবি, ব্যাথায় কষ্ট পেতে হবে না’। আমি প্রতিরোধ করলাম না। তপন সিরিঞ্জটা হাতের শিরায় ফুটিয়ে খালি করে দিল।
ইনজেকশনের প্রভাব কাটিয়ে যখন ঘুম ভাঙল টের পেলাম আমি সেই ঘরে বিছানার উপরে শুয়ে, মাথাটা অসহ্য রকম ভারী লাগছিল। হাত ঠেকিয়ে বুঝলাম নাক আর মুখ থেকে প্রচুর রক্ত গড়িয়ে শার্টের উপর জমাট বেঁধে শুকিয়ে গেছে। তৃষ্ণায় শুকিয়ে গলা যেন কাঠের মতো লাগছিল। এখন বোধহয় দিনের সময়, কারণ দরজার ফাঁক দিয়ে আলোর রেখা ঘরের মধ্যে প্রবেশ করছিল। এখন একটু জলের ভীষণ দরকার। খাট ছেড়ে উঠতে গিয়ে বুঝতে পারলাম শরীর অসম্ভব দুর্বল হয়ে পড়েছে। কোনওরকমে উঠে অন্ধকারের মধ্যে হাতড়াতে লাগলাম যদি কোথাও একটা জলের জগ কি কুঁজো পাওয়া যায়। এদিক-ওদিক হাতড়াতে হাতড়াতে হাতে কি যেন একটা ঠেকল। ধাতুর কোনও জিনিস হাতে ঠেকতেই ঠং করে শব্দ উঠল। তেপায়ার উপর ষ্টীলের একটা গ্লাশ রাখা ছিল সেটা মেঝেতে গড়িয়ে পড়েছে। আওয়াজটা বাইরে অপেক্ষমাণ বৃন্দাবনের কানে গেছে, সে দরজা খুলে আমার দিকে চাইল। ইঙ্গিতে জল চাইলাম। বৃন্দাবন দরজাটা খোলা রেখেই চলে গেল। ওরা বোধহয় বুঝে গেছে, নিজের পায়ে হেটে পালানোর শক্তি আর আমার নেই। একটু পরে বৃন্দাবন জলের গ্লাস নিয়ে এল। জলটা ঢক ঢক করে গলায় ঢেলে দিলাম। তেষ্টা মিটল না। আবার জল চাইলাম, বৃন্দাবন উত্তর না দিয়ে দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ করে চলে গেল। সামান্য পরে ঘরে তপন এল সঙ্গে বৃন্দাবন, একটা থালায় ডাল-ভাত টেবিলের উপর রেখে তপন বলল—’খেয়ে নে জয়ন্ত’। তপনের হাত থেকে খাবার নিতে ঘৃণা হচ্ছিল, বললাম—’খিদে নেই’। তপন মৃদুস্বরে বলল—’কালকে যা কিছু ঘটল তার জন্য ক্ষমা করে দিস ভাই, এসবের প্রয়োজন কিছুই ছিল না, তুই আমার দিকটা একটু ভেবে দ্যাখ, কতবড় ঝুঁকি আমি নিয়েছি, গত দেড়-দু বছর ছেলেটাকে নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে আমার জীবনের সবকিছু নষ্ট হয়ে গেছে, প্রতিদিন নিজের হাতে ওর মলমূত্র পরিষ্কার করছি, আমার সাংবাদিকতার কেরিয়ার চুলোয় গেছে। ব্যাংক ব্যালান্স সামান্য যা ছিল এই দেড় বছরে ডেবিট কার্ড ঘসে ঘসে সব গেছে। এখন শুধু একটাই ভরসা চণ্ডরাজার কৃপায়, যা গেছে যদি ফেরত পাওয়া যায়’। মুখ অন্যদিকে ঘুড়িয়ে বললাম—’যত সব কুসংস্কার’। তপন কিছু বলতে গিয়ে যেন সামলে নিল তারপর ধীরে ধীরে বলল—’ঠিক আছে তাই সই, তোর বিশ্বাস তখন হবে যখন নিজের চোখে দেখবি, আর কোনও আপত্তি না করে একটু কো-অপারেট করে দে ভাই’। বললাম—’তপন আমার মনে আর কোনও ভয় নেই, তুই চাইলে তোর ওই পিস্তলের একটা গুলি খরচা করতেই পারিস কিন্তু আমি একটা অসহায় বাচ্চার গলায় ছুরি বসাচ্ছি না, নেহাত দরকার থাকলে তুই নিজেই করে নে, আমার বিশ্বাস নামে রাজার থেকে যে ভবিষ্যতে রাজা হতে চলেছে, তোর ওই দেবতাটি তার হাতের কাজেই বেশি খুশি হবে’। তপন দীর্ঘশ্বাস ফেলল, বলল—’এখন আড়াইটে বাজে, হাতে আর মোটে তিন ঘন্টা সময় আছে, স্যরি জয়ন্ত বোঝাবার সময় নেই, আমার তাড়া আছে। তুই স্বেচ্ছায় সাহায্য করলে ভালো লাগত, কিন্তু উপায় যখন নেই’। তপন বৃন্দাবনকে ইঙ্গিত করল, দুজনেই এবারে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেল, আর দরজাও আগের মতো বাইরে থেকে বন্ধ হয়ে গেল। দেওয়ালের কোণে কাঠের জানলাটা বাইরে থেকে পেরেক দিয়ে আঁটা ছিল। সেখানে এবার উপুর্জপরি হাতুড়ির বারি পড়তে লাগল, বারকয়েক ঠোকার পর পাল্লাদুটো আলগা হয়ে খুলে পরল। জানলার বাইরে এবার বৃন্দাবনের মুখ দেখতে পেলাম। ও যেন ওখানে কিছু এনে জড়ো করছে। হঠাৎ গলগল করে ধোয়া ঘরের মধ্যে ঢুকতে শুরু করল, অসহ্য কটু গন্ধে ঘর কানায় কানায় ভরে উঠতে শুরু করল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই চোখ, গলা তীব্রভাবে জ্বলতে শুরু করল। এটা তপনের আর একটা শয়তানি বুদ্ধির নমুনা, জানলার বাইরে খড় আর শুকনো লংকা পুড়িয়ে ধোঁয়া তৈরি করছে। বিষাক্ত ধোঁয়ার বৃত্তে নিঃশ্বাস নেওয়া দুরূহ হয়ে পড়ল। প্রচণ্ড কাশির দমকে বুকের ভিতর থেকে এবার দলা দলা কফ আর রক্ত বেরিয়ে আসতে লাগল সেইসঙ্গে থিকথিকে কালো একটা পর্দা যেন অস্থির চোখ দুটোকে ঢেকে দিল।
১১
মুখের উপর ঠাণ্ডা জলের ঝাপটায় জ্ঞ্যান ফিরত এল। কেউ বালতি ভরে জল গায়ে মাথায় ঢেলে দিয়েছে। ঝাপসা দৃষ্টি মেলে দেখলাম সৈনিকের পোশাক পরা একজন লোক সামনে দাঁড়িয়ে। লোকটা আমার দিকে চেয়ে কাকে যেন হুকুমের সুরে কিসব বলল। কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। এরা আবার কারা? ধীরে ধীরে চেতনা ফেরত এল। ঘরের ভিতর চোখ চালিয়ে যা দেখলাম তা বেশ অপ্রত্যাশিত। আমাকে এরা আবার একতলার সেই স্টোর রুমটায় নিয়ে এসেছে। ঘরের একটা কোনে তপন চিত হয়ে পরে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। ওর জামাকাপড় তাজা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। তলপেটের কাছটায় গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে, বোধহয় ধারালো কিছু দিয়ে আঘাত করেছে। ওদিকে ঘরের অন্য প্রান্তে একটা কাঠের তক্তামতো দিয়ে বেদি তৈরি করা হয়েছে, যেখানে একটা পাথর বসিয়ে তাতে ফুল জল ঢেলে আলখাল্লা পরা একটা লোক পুজো করছে। সৈন্যবেশি লোকটা তীক্ষ্ন চোখে আমাকে জরিপ করছিল। এবারে কৌতুকপূর্ণ কণ্ঠস্বরে বলল—’রাজা মশাইয়ের জ্ঞান ফিরেছে দেখছি। অপদার্থ বন্ধুটির কল্যাণে ফালতু কষ্ট ভোগ করতে হল। তবে যার তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করলে পস্তাতে তো হবেই’। লোকটা এমনভাবে কথা বলছিল যেন আমার কতকালের চেনা বন্ধু, অনেকদিন পর হঠাৎ দেখা হয়েছে, জিগ্যেস করলাম—’আপনি কে’ লোকটি বিনয় দেখিয়ে বলল—’আমি সামান্য মানুষ, জঙ্গলের একজন জংলিও বলতে পারেন, আপনার বন্ধুর কেরামতি আর নিজের গাফিলতিতে এই শহরের পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছি, অধমের নাম সমীরণ মাহাতো’। চমকে উঠলাম! একি সেই কুখ্যাত নকশাল নেতা? সমীরণ মুচকি হেসে বলল—’মনে হচ্ছে রাজামশাই আমার নাম শুনেছেন’। গত চব্বিশ ঘণ্টায় যা কিছু ঘটেছে নতুন করে অবাক হওয়ার ক্ষমতাটাই দেখলাম হারিয়ে ফেলেছি, তপন আমাকে দিয়ে জঘন্য অপরাধ করাতে চাইছিল এখন এই লোকটা বোধহয় আমাকেই খুন করতে চাইবে, আমি চুপ করে পরে রইলাম। সমীরণ হেসে বলল—’তা হলে রাজামশাই বন্ধুর জন্য যে কাজটা করতে যাচ্ছিলেন সেটা এবার একটু আমাদের জন্য করতে হবে যে’।
-‘যদি না বলি’।
সমীরণ হাসল, ক্রুর নির্দয় হাসি, বলল—’তা হলে সেটাকে হ্যাঁ করতে আমার লাগবে ঠিক সাড়ে চার মিনিট, আমার প্যান্টের বা পকেটে একটা লোহার প্লাস আছে যেটা দিয়ে প্রথমে আপনার হাতের নখগুলো উপড়ে ফেলব, তাতে যদি কাজ না হয় তাহলে আবার ওই প্লাসের টানেই চোখের পাতা দুটো খুবলে নেব, এরপরেও যদি আপনি হ্যাঁ বলতে দেরি করেন তাহলে, আমার ডান পকেটে একটা ধারালো ক্ষুর আছে সেটা বের করব, ক্ষুরটা আপনার শরীরের বিশেষ অংশে বুলিয়ে সেটাকে কাটছাঁট করব, আর বিশ্বাস করুন এসব কিছু করতে আমার কিন্তু ওই সাড়ে চার মিনিট সময়ের বেশি লাগবে না’। বিশ্বাস করতে অসুবিধে হল না, এই ভয়ংকর লোকটা যা বলল তা নিশ্চয়ই করবে। হতাশায় মনোবল তলানিতে ঠেকল। আর সামান্য কিছু পরে যে আমি, ওই ছেলেটা, তপন কেউই প্রাণে বাঁচব না সেটা একপ্রকার নিশ্চিত, শুধুশুধু প্রতিরোধ করে জীবনের শেষ মুহূর্তটাকে নৃশংস করে তুলতে মন সায় দিল না। নির্জীবের মতো মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম। সমীরণ করুণার সুরে বলল—’সরি রাজামশাই, নিরপরাধ ব্যক্তির উপর জুলুমবাজি আমাদের নীতি বিরুদ্ধ কিন্তু এখানে সব দোষ আপনার অপদার্থ বন্ধুটার, তা ছাড়া লাস্ট মোমেন্টে একটা জলজ্যান্ত রাজার ছেলে কোথায় পাই বলুন’? সমীরণ এবারে আলখাল্লা পরা লোকটার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল, ভাষা না বুঝলেও, সমীরণ যে লোকটাকে ত্রিলোচন বলে সম্বোধন করছিল সেটা শুনতে পাচ্ছিলাম, এই লোকটাই কি তবে তপনের গল্পের ত্রিলোচন! হবে হয়তো! তপনের নাটকের সবকটা চরিত্রই আজ এখানে হাজির হয়েছে দেখছি। জীবনের শেষ মুহূর্ত নিজের দুর্ভাগ্যের কথা চিন্তা করছিলাম, রাজ বংশের উত্তরাধিকার হিসেবে আমার প্রাপ্য হয়েছে শুধু গোটাকয়েক ভাঙা ইট আর একফালি জমির টুকরো যার বখরা নিয়ে মামলা টানতে টানতে জীবন বরবাদ হতে চলেছে। কেরানির চাকরি করি, মাইনে যা পাই তাতে কষ্টেসৃষ্টে ডাল-ভাত জুটে যায়। রাজভোগ চোখে না দেখলেও, রাজদ্রোহ দেখা অদৃষ্টে ঘটে গেল।
বাড়ির ছাদে এদের একটা লোক বোধহয় মোতায়েন ছিল, লোকটা সিঁড়ি দিয়ে ছুটে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে ঝড়ের বেগে কিসব বলতে লাগল, সমীরণ আর তার শাগরেদরা হঠাৎ যেন বেশ চঞ্চল হয়ে পড়ল। আন্দাজ করলাম, পুলিশ বোধহয় কাছাকাছি এসে পড়েছে। সমীরণ ত্রিলোচনকে তাড়া লাগাল—’আর কতক্ষণ বাকি’? ত্রিলোচন শুকনো মুখে বলল আর দশ মিনিট ব্যাস। ফের শুরু হল একঘেয়ে সুরে ত্রিলোচনের মন্ত্রের জপ। মিনিট চারেক এভাবে কাটার পর একটা গমগমে শব্দ বাড়ির আধখসা ইটগুলোকে যেন কাঁপিয়ে দিল। বাইরে থেকে রাশভারী পুরুষকণ্ঠ মাইকে ঘোষণা করতে শুরু করল—’সমীরণ আমরা এই বাড়ি ঘিরে ফেলেছি, পালানোর কোনও পথ নেই। যদি আত্মসমর্পণ কর তাহলে কথা দিচ্ছি প্রানে মারব না’। সমীরণের মুখ দেখে মনে হল না সে বিশেষ বিচলিত হয়েছে। রাইফেল হাতে বন্ধ জানলার সামনে গিয়ে চিৎকার করে বলল—’আমি সমীরণ মাহাতো বলছি, আমরা আত্মসমর্পণ করব, কথা দিচ্ছি গোলাগুলি চলবে না শুধু কুড়ি মিনিট সময় দিন, ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা জানানোর জন্য’। সামান্য বিরতির পর বাইরে থেকে আওয়াজটা ফের শোনা গেল—’দশ মিনিট সময় দেওয়া যাবে, কিন্তু কোনওরকম চালাকি করলে গুলি চলবে’। এত কষ্টের মধ্যেও দেখে শ্রদ্ধা হল, সমীরণের মুখে হাসি? এই ঘোর সংকটেও! সমীরণের ইঙ্গিতে আমার হাত, পায়ের বাঁধন কেটে ফেলা হল। বিছানার উপর থেকে ছেলেটাকে দুজন রক্ষী মিলে মেঝেতে একটা চাদর পেতে শুইয়ে দিল। ছেলেটির ভাবলেশহীন চোখে অসীম ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠেছে, ও কিছু বুঝছে কি না কে জানে? ত্রিলোচন দুর্বোধ্য সব মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতে ছেলেটির কপালে কালো টিপ আর গলায় লাল ফুলের একটা মালা পড়িয়ে দিল। গাঢ় লাল টিপের ফোটা এবার আমার আর সমীরণের কপালেও দেগে দিল। এবারে একটা শান দেওয়া ধারাল ছুরি আমার হাতে তুলে দিয়ে ত্রিলোচন ছেলেটির গলায় কোপ দিতে ইঙ্গিত করল। ছুড়িটা ছেলেটির গলায় হালকা ঠেকিয়ে ধরলাম তবে চাপ দিতে পারলাম না, ত্রিলোচন আমার হাতের উপর নিজের হাত রেখে সামান্য চাপ দিল। ছেলেটি যাতনায় কঁকিয়ে উঠল, একটা অগভীর ক্ষতের সৃষ্টি হল, মাথা নীচু করে চোখ সরিয়ে নিলাম। রক্তের ধারা ছেলেটির গলার ক্ষত থেকে চুইয়ে পড়তে লাগল। ত্রিলোচন একটা হলুদ ফুলে রক্তটা ধরে চণ্ডরাজার পাথরের উপর রেখে সমীরণের দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টে চাইল। দু-হাত দিয়ে লম্বা তলোয়ার উঁচিয়ে সমীরণ ছেলেটার দিকে এগিয়ে যেতেই ত্রিলোচন সামনে থেকে সরে গেল। সমীরণ ছেলেটির গলা লক্ষ্য করে তলোয়ার উঁচিয়ে ধরল, ঠিক এসময়েই গুড়ুম করে কানফাটানো শব্দ হল! গুলির আঘাতে সমীরণের একজন স্যাঙাত ধরমড়িয়ে মেঝেতে শুয়ে পড়ল, আর এলোপাথাড়ি গুলি ঘরের সর্বত্র বৃষ্টির মতো পড়তে লাগল। পুলিশ বাড়ির কোনও ফাঁকফোঁকর খুঁজে ঢুকে পড়েছে, সমীরণের হাতে গুলি লেগে তলোয়ারটা ছিটকে পরে গেছে, যন্ত্রণায় মুখ বিকৃত করে সমীরণ রাইফেলটা তুলতে গেল কিন্তু সুযোগ পেল না, একটা গুলি কপাল ভেদ করে পিছনের দেওয়ালের গায়ে ঝোলানো ফোটো ফ্রেমটাকে চুরমার করে দিল। সর্দারের আকস্মিক পতনে হতবুদ্ধি স্যাঙাতের দলের এলোমেলো প্রতিরোধ, পুলিশের ঝোড়ো আক্রমণের সামনে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। একে একে সমীরণের দলের শেষ যোদ্ধাও ধরাশায়ী হল।
১২
পরের কয়েকটা দিন মারাত্মক জখম অবস্থায় হাসপাতালের বেডে শুয়ে কাটল। গুলি বদলের মাঝখানে পরে একটা বুলেট হার্টের কাছাকাছি বিঁধে গেছিল। ডাক্তারদের মতে ওই একটা চোটই মৃত্যুর যথেষ্ট কারণ হতে পারত, সেখান থেকে আমি যে এখনো বেঁচেবর্তে আছি সেটাই নাকি চরম বিস্ময়ের। কানাঘুষো শুনলাম ওরা নাকি আমার এই ব্যাপারটা মেডিকেল জার্নালে ছাপানোর কথা ভাবছেন। সেদিন রাতের পুলিশি অপারেশনের পর ওই বাড়ি থেকে শুধুমাত্র আমি আর তপনই শরীরে প্রাণ নিয়ে বের হতে পেরেছিলাম। যদিও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে, তপনের পরের দিন কোমাতেই মৃত্যু ঘটে, বৃন্দাবন তো আমার চোখের সামনেই গুলি খেয়ে ধরাশায়ী হয়েছিল, বাকি পাঁচজন, সমীরণ তার তিন শাগরেদ আর ত্রিলোচন সবাই এরপর পুলিসের গুলি খেয়ে ভবলীলা সাঙ্গ করতে দেরি করেনি।
পুলিশ বোধহয় সেদিন এনকাউন্টার করার আগাম ছক কষেই হানা দিয়েছিল, অন্য কোনও পরিকল্পনা তাদের ছিল বলে তো মনে হয়নি। গোটা ব্যাপারটায় যেটা একমাত্র দুঃখের বিষয় সেটা ওই নিরাপরাধ ছেলেটির অপমৃত্যু। বেচারার দুর্বল হৃদযন্ত্র এত ঝক্কি সামলে উঠতে পারেনি। হার্টফেল করে নিজের দুর্ভাগ্যজনক জীবন থেকে চিরতরে নিষ্কৃতি পেয়েছে, ভেবে স্বস্তি পেলাম এও একপ্রকার ভালোই হয়েছে, ওকি আর কোনদিনও সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফেরত যেতে পারত! তার থেকে বোধহয় এই পরিণতিই সমস্যার সেরা সমাধান।
পরের কয়েকটা দিন ভালোরকম ঝঞ্ঝাট পোহাতে হল। আমার সঙ্গে নিষিদ্ধ কোনও সংগঠনের যোগাযোগ পুলিস খুঁজে বের করতে না পারলেও অযথা হয়রানি করতে কসুর করল না। অবশেষে একদিন লালবাজার আমাকে ক্লিনচিট দিল। দুটো মাস পরে আবার জীবনে মুক্তির স্বাদ অনুভব করলাম।
২০১৪ জানুয়ারি মাস
কলকাতা শহরে বছর বছর ম্যালেরিয়া কি ডেঙ্গুর উপদ্রব আর নতুন কিছু নয়, কিন্তু বিগত কয়েক দিনে এমন একটা অদ্ভুত রোগের আমদানি হয়েছে যেটার সঙ্গে শহরবাসীর ইতিপূর্বে পরিচয় ঘটেনি। বিজ্ঞানীরা রোগটির নাম রেখেছেন ওয়াইট স্কারস এইলমেন্টস অথবা বাংলায় সাদা-জ্বর! একশ্রেণীর মেঠো ইঁদুর এই রোগের উৎস হলেও প্লেগের সঙ্গে এর কোনও সাদৃশ্য নেই। রোগটা অত্যন্ত ছোঁয়াচে, সংক্রামিত ব্যক্তি থেকে সুস্থ লোকের শরীরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। প্রথমেই সংক্রামিত ব্যক্তির শরীরের সর্বত্র সাদা সাদা বিন্দুতে ছেয়ে যাচ্ছে তারপর চব্বিশ ঘন্টার মধ্যেই প্রবল জ্বর, মাথা ব্যথা, রক্তবমি প্রভৃতি উপসর্গ দেখা যাচ্ছে, সেসময় কোনওরকম অ্যান্টি-বায়োটিক কি প্রিভেন্টিভ মেডিকেসন কিছুই কাজ দিচ্ছে না, আক্রান্ত ব্যক্তি প্রবল জ্বরে আচ্ছন্ন হয়ে কোমায় চলে যাচ্ছে, এমনকী কিছু ক্ষেত্রে রোগীর কিডনি পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে পড়ছে। আজকাল টিভি, সংবাদপত্র, রেডিও, পাড়ার আড্ডায়, এমনকী স্কুলের মিটিংয়েও শুধু এই বিষয় নিয়েই বিক্ষিপ্ত আলোচনা, শহরের বিভিন্ন অংশ থেকে আরও নতুন নতুন সংক্রমণের খবর আসতে শুরু করল, সরকারি মতে সংখ্যাটা পঞ্চাশের কাছাকাছি। বেসরকারী মতে অবশ্য আরও বেশি। বাস্তব আর গুজবের জাঁতাকলে পরে শহর জুড়ে ভয়ের চোরা স্রোত বয়ে চলেছে। হেলথ ডিপার্টমেন্ট থেকে নোটিশ জারি করেছে রোগীকে ঘরে রাখা চলবে না, সংক্রমণ ধরা পরার সঙ্গে সঙ্গে আই ডি তে ভরতি করতে হবে। আমি যে পাড়ায় থাকি সেখান থেকেও সংক্রমণের কয়েকটা খবর এসেছে আর এদের সবার অবস্থাই নাকি আশঙ্কাজনক।
যেদিন তপনের ফাঁদে পা দিয়ে ওর দমদমের বাড়িতে গিয়ে হাজির হয়েছিলাম সেদিন থেকেই খারাপ সময় যেন আমার পেছু নিয়েছে। ঝঞ্ঝাট ঝামেলার আর শেষ নেই। এর মধ্যে আবার নতুন কয়েকটা ফ্যাসাদ সৃষ্টি হয়েছে। আজকাল সময় সময় কানের কাছে একটা অদ্ভুত ফিসফিসানি শুরু হয়, একবার শুরু হলে আওয়াজটা অন্তত মিনিট খানেকের আগে থামতেই চায় না। প্রথম প্রথম শব্দটা নীচুগ্রামে অসংলগ্নভাবেই ভেসে আসে কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে সেটাই আবার প্রবল চিৎকারে পরিণত হয়ে কানের পর্দা ফাটিয়ে ফেলে দেওয়ার উপক্রম করে। যেন একাধিক ব্যক্তি, তারা নারীও হতে পারে আবার পুরুষও হওয়া অসম্ভব নয় সমবেত তীব্র আর্তনাদ জুড়ে দেয় আমার কানের পর্দা লক্ষ্য করে, সেসময় আর কিছু করার থাকে না, উন্মাদের মতো দু-কান চেপে বসে পরি, যদিও তাতেও রেহাই মেলে না, তবে হঠাৎ শব্দটা নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যায় ঠিক যেমনভাবে সেটা শুরু হয়েছিল তেমনভাবেই। দ্বিতীয় সমস্যাটা অবশ্য আগেরটার থেকে সামান্য নিরীহ হলেও কিছু কম অস্বস্তিকর নয়। একটা বিদঘুটে দুঃস্বপ্নে আজকাল প্রায় প্রতিরাতেই ঘুমের ভীষণ ব্যাঘাত ঘটছে। ঘুমন্ত অবস্থায় দেখা স্বপ্নের সামান্য অংশই লোকে মনে রাখতে পারে কিন্তু এক্ষেত্রে স্বপ্নটা এতবার দেখেছি যে আজকাল প্রায় খোলা চোখেই দেখতে পাচ্ছি।
রাতের অন্ধকারে নির্জন মেঠো রাস্তা দিয়ে হাঁটছি, পথের দুপাশে বড় বড় গাছপালা, মনে হচ্ছে হঠাৎ যেন কোন ঘন জঙ্গলের মধ্যে এসে পরেছি। কানের পাশ দিয়ে শনশন করে ঠাণ্ডা বাতাস কেটে বেড়িয়ে যাচ্ছে আর কে যেন অপার্থিব চাপা স্বরে বলছে ‘এগিয়ে চলো, ব্যাস আর একটুখানি’। কিছুটা পথ চলার পর একটা জায়গায় এসে পৌঁছলাম যেখানে মনে হল জঙ্গলের সীমানা শেষ আর জনবসতির শুরু। দূরে কয়েকটা খড়ের ছাওনি দেওয়া ঘর দেখা যাচ্ছে, কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতো দাড়িয়ে ছিলাম, হঠাৎ একটা দমকা হাওয়া আমাকে কাঁপিয়ে দিয়ে চলে গেল, সাথে সাথে ঘুমেরও দফা শেষ। স্বপ্নটা এখন রুটিনে পরিণত হয়েছে। ঘড়িতে সেসময় আড়াইটে কি তিনটে হবে, এরপরে আর কিছুতেই ঘুম আসতে চায় না, ভোরের আলো ফুটলে বাধ্য হয়ে মর্নিং ওয়াকে বের হয়ে পরি।
সেদিনও এমনি একটি অনিচ্ছার প্রাতঃভ্রমণ সেরে রানি শঙ্করী লেনে আমার ফ্ল্যাটে ফিরছি, পাশের ফ্ল্যাটের বৃদ্ধ সাহাবাবু দরজায় দাড়িয়ে একটি বছর কুড়ির সুদর্শন ছোকরার সঙ্গে কথা বলছিলেন আমাকে দেখে বললেন —’এই যে জয়ন্ত, এই ছেলেটি তোমাকে খুঁজছে’। ছেলেটিকে আগে কখনো দেখেছি মনে পরল না। জিজ্ঞাসু দৃষ্টে চাইতে ছেলেটি বলল —’স্যার
আপনার জন্য একটা চিঠি আছে আমার জ্যাঠা পাঠিয়েছেন’।
-‘কে আপনার জ্যাঠা’? -‘ওনার নাম রুদ্রপ্রসাদ মিত্র’। ছেলেটি একটা ভাঁজ করা কাগজের টুকরো এগিয়ে দিল। খুলে দেখলাম রুল টানা কাগজের ওপর কয়েক লাইন লেখা। ‘জয়ন্তবাবু যদিও আমরা একে অপরের পরিচিত নই, তবুও আমাদের এখুনি একবার দেখা হওয়া বিশেষ প্রয়োজন। আমার বিশেষ অনুরোধ যদি একবার বালিগঞ্জে আমার বাড়িতে আসেন, তাহলে আপনাকে কিছু গোপনীয় বিষয় অবহিত করতে পারি। শরির অসুস্থ্য না থাকলে নিজেই আসতাম, সেজন্য ক্ষমা চাইছি। দয়া করে একাই আসবেন, কারন অন্য কারও সামনে এ-প্রসঙ্গে আলোচনা করা যাবে না’। নীচে ভদ্রলোক কাঁপা কাঁপা হাতে সই করেছেন। চিঠির মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে না পেরে ছেলেটিকে জিগ্যেস করলাম—’ব্যাপারটা কি’? ছেলেটি জানাল চিঠির ব্যাপারে তার কোনও ধারণাই নেই, সে শুধু পিতৃব্যের আদেশ পালন করতে এসেছে। বড় বেয়ারা ধরনের অনুরোধ, এটা একটা ফাঁদও হতে পারে। স্পষ্ট জানিয়ে দিলাম এভাবে দুম করে কোথাও যাওয়া সম্ভব নয়। ছেলেটিকে দৃশ্যত হতাশ দেখাল বলল—’তাহলে গিয়ে কি বলব’?—’যা কথা হল তাই বলবেন’? আর কথা না বাড়িয়ে দরজা বন্ধ করে দিলাম। মাঝে মধ্যে অভদ্র হওয়াটাও যে প্রয়োজন সেটা বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে শিখে নিয়েছি।
কয়েকদিন পরে
স্কুলে হেডমাস্টার গিরিশবাবুর ঘরে গেছিলাম কয়েকটা দরকারি কাগজ সই করাতে, ভদ্রলোক তীক্ষ্ন চোখে আমাকে দেখছিলেন, হঠাৎ বললেন—’জয়ন্ত তোমার কি শরীর খারাপ? কয়েকদিন ধরে লক্ষ করছি, কাজের সময় ঝিমুচ্ছ! একটু ফাঁক পেলে টেবিলেই মাথা রেখে ঘুমিয়ে নিচ্ছ, এনার্জি লেভেলটা যেন ডাউন মনে হচ্ছে, ব্যাপারটা কি’? লজ্জিত হয়ে বললাম—’আমারই ভুল, তবে কথা দিচ্ছি এবার থেকে সাবধান হব’।
গিরিশবাবু আশ্বস্ত করা স্বরে বললেন—’জয়ন্ত তোমাকে তো আর নতুন দেখছি না, সমস্যাটা কোথায় আমাকে বলতে পারো, যদি অসুবিধে না থাকে’। উপায়ন্তর না দেখে গিরিশবাবুকে সবকথা খুলে বললাম, আজকাল আমার সঙ্গে যা-সব ঘটছে, এতে যেন মন কিছুটা হালকাও হল। ভদ্রলোক সব শুনে গম্ভীরভাবে বললেন—’ব্যাপারটাকে তোমার সিরিয়াসলি নেওয়া উচিত ছিল, এসব নিউরোলজিকাল ডিসর্ডার ছাড়া অন্য কিছু নয়। আমার চেনা ভালো নিউরোলজিস্ট আছে, একবার দেখিয়ে এস’। এরপর গিরিশবাবু ড্রয়ার থেকে বের করে ডাক্তারের ভিজিটিং কার্ড আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন, মাত্র দিন দুয়েকের মধ্যেই যে প্রখ্যাত নিউরোলজিস্ট ডাঃ নন্দীর মৌলালির চেম্বারে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেয়ে গেলাম সেটা বলা বাহুল্য গিরিশবাবুর হাতযশেই।
নিউরোলজিস্ট ডাঃ নন্দীর সঙ্গে দেখা করে সমস্যার কথা বলতে উনি বেশ মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা করলেন, তারপর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অনেক রকম প্রশ্ন করে বললেন—’যা ঝড়টা গেল আপনার উপর, তাতে মস্তিষ্কে একটা ভালোরকম ধাক্কা লেগেছে, একটা অ্যান্টি ডিপ্রেশান্ট লিখে দিচ্ছি, নিয়ম মেনে খাবেন, কানের উপর যে আওয়াজ শুনছেন সেটার বাস্তব ভিত্তি কিছু নেই, জাস্ট ইলিউশান, আর স্বপ্নটা! আপনার অবচেতন মনের উপর যে চাপ পড়েছে তারই প্রতিক্রিয়া। ইমিডিয়েটলি একটা সিটি স্ক্যান করাতে হবে। রিপোর্ট দেখে বোঝা যাবে আবার কোনও ইন্টারনাল হ্যামারেজ ঘটল কি না’! আমার মুখে বোধহয় চিন্তার রেখা ফুটে উঠেছিল, ডাক্তারবাবু আশ্বস্ত করে বললেন—’মানুষের জীবনে কখনও অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটে গেলে মস্তিষ্ক সাময়িকভাবে ব্যালান্স হারিয়ে আজগুবি সব কল্পনা করতে শুরু করে, আপনার ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা সেরকমই কিছু ঘটে থাকতে পারে। তবে চিন্তার কিছু নেই’। ডাক্তারকে সাতশো টাকা ফিস ধরিয়ে উঠে যাচ্ছিলাম, ভদ্রলোক হঠাৎ বললেন—’আপনি তো একা থাকেন, তাই না’? সম্মতিসূচক মাথা নাড়তে উনি বললেন—’একা মানুষকে ডিপ্রেশন বেশি করে কবজা করে, জানেন নিশ্চয়ই? একটা পোষ্য সঙ্গে রাখতে পারেন তো, কুকুর, বেড়াল, পাখি যা কিছু হোক, তাতে কিন্তু আপনার ভালোই হবে’।
ডাক্তারের চেম্বার মৌলালির মোড়ে ধর্মতলা স্ট্রীটে, সেখান থেকে শিয়ালদার বৈঠকখানা বাজার হাঁটাপথ, সস্তায় বাজার করার মতলবে ওপথে গিয়ে জিনিসপত্র ঘাটাঘাটি শুরু করলাম। বাজারে তখন মেলা ভিড়। ওই ভিড় ঠেলে কোনও কিছুই মনের মতো দামে পেলাম না। ফিরত যাওয়ার কথা ভাবছি, হঠাৎ চোখে পড়ল ফুটপাথের ধারে অনেকগুলো খাঁচা নিয়ে একটা লোক বসে রয়েছে। খাঁচাগুলোতে বিক্রির জন্য রয়েছে বেশ কিছু গিনিপিগ, খরগোশ আর হরেকরকমের পাখি। ডাক্তারের পরামর্শ মনে পড়ল, তা ছাড়া আমারও অনেক দিনের শখ একটা পাখি কি খরগোশ কিছু পুষি, পাখিগুলো বড্ড কিচিরমিচির করছিল, মনে হল এদের সঙ্গ আমার পোষাবে না, এবার অন্যদিকে চাইতে দেখলাম ছোট ছোট খাঁচায় গিনিপিগ আর খরগোশ রাখা আছে, বেশিরভাগ জন্তুগুলোর মধ্যেই কেমন যেন ক্লান্ত ঝিমুনিভাব, এর মধ্যে একটা খরগোশ দেখে মনে হল বেশ চঞ্চল আর স্বাস্থ্যবান। দুধ-সাদা বলের মতো প্রাণীটা তখন একটা গাজরের টুকরো মুখে পুরে চিবুচ্ছিল, আমি জালের ফাঁক দিয়ে ওর গায়ে আঙুল ছোঁয়াতে ওটা বড় বড় লাল চোখ মেলে আমার দিকে চাইল, তারপর জিভ বের করে আমার আঙুলের ডগাটা সামান্য চেটে আবার খাবারে মন দিল। দোকানদার বিস্মিত চোখে চেয়ে বলল—’আরে বাবু খরগোশ আপনাকে পসন্দ করেছে, একে বাড়ি লিয়ে যান, ভালো পোষ মানবে’। খরগোশটা আমারও বেশ পছন্দ হয়েছে। তবে দোকানির সামনে বেশি উৎসাহ না দেখানোটাই বুদ্ধিমানের কাজ, আরও দু-একটা পাখি দেখে, তারপর দাম জিগ্যেস করলাম। দোকানদার ঘাগু লোক, প্রথমেই দাম চড়িয়ে পাঁচশো টাকা চেয়ে বসল, ম্যারাথন দামাদামির পর তিনশ কুড়িতে রফা হল। দোকানদার পয়সা বুঝে নিয়ে খাঁচা হাতে তুলে দিয়ে বলল—’যান বাবু, সস্তায় দিয়ে দিলাম, কি করব ছাব্বিশ নম্বর আপনার পসন্দ হয়েছে’।
-‘এর নাম কি ছাব্বিশ নম্বর’?
দোকানদার হাসতে হাসতে বলল—’হা বাবু আমি ইদের নম্বরেই ডাকি, ওর পাশে বাদামি ছোপওয়ালা চুহাটা দেখছেন ওটা সাতাইশ নম্বর আছে’।
বাজার থেকে কয়েকটা গাজর আর বাঁধাকপির পাতা কিনে নিলাম, এগুলো কুটুসের লাঞ্চ আর ডিনার, ও হ্যাঁ আমি মনে মনে ওর নাম কুটুস রেখে দিয়েছি, ছাব্বিশ নম্বর জেলখানার কোনও কয়েদির ডাকনাম হতে পারে, আমার পোষা মিষ্টি এই খরগোসের তো কখনই নয়।
১৩
জগন্নাথ-দা আমার সঙ্গে বাবার সময় থেকেই আছেন, রান্নাবান্না তিনিই সব করেন, তবে রাতে থাকেন না, কাজ মিটিয়ে সন্ধের পর মেয়ের বাড়ি চলে যান। আমাকে দেখছেন ছোট বয়েস থেকেই তাই মাঝে মধ্যে কিঞ্চিৎ অভিভাবকত্ব ঝালিয়ে নেন। হাতের খাঁচাটা দেখে বললেন—’এ আবার কি এনে হাজির করলে’। বললাম—’সস্তায় পেয়েছি, পুষব’।—’পুষবে মানে’? জগন্নাথ-দা চোখ কপালে তুলে বলল—’তুমি তো হুটহাট বাইরে চলে যাও তখন এটার দেখাশোনা কে করবে’? বললাম—’কেন তুমি তো আছো, তুমিই নাহয় একটু খেয়াল রাখবে’। জগন্নাথ-দা বিরক্ত হয়ে গজগজ করতে করতে কিচেনের দিকে চলে গেল।
এরপর দু-তিনটে দিন কেটে গেল। সংসারে নতুন সদস্য কুটুস আসার পর থেকে বাড়ির পরিবেশটাই যেন পালটে গেছে, সবসময় একটা হুলুস্থুল ভাব। খরগোশের খাদ্যাভাস সম্বন্ধে আমি যে নিতান্তই অজ্ঞ তার প্রমাণ ইতিমধ্যে পেয়েছি। গাজর, বাঁধাকপি, শাকপাতার মতো একঘেয়ে খাবার খেতে খেতে ক্লান্ত হয়ে মুখের স্বাদ পালটানোর জন্য কুটুস এরমধ্যে আমার ডায়েরির কয়েকটা পাতা চিবিয়ে খেয়েছে। খবরের কাগজটা দেখলাম প্রথম পাতা থেকেই ঝাঁজরা, হজম হয়েছে কি না অবশ্য জানি না! তবে যা খেয়ে সে দারুণ উত্তেজিত আর আমি মুহ্যমান সেটা ড্রয়ারের উপর পেপার-ওয়েটে চেপে রাখা আমার পাঁচশ টাকার নোট-টা। জগন্নাথ-দা অবশ্য দেখলাম আমারই দোষ ধরল, বলল—’বাড়িতে খরগোশ পুষছ আর নিজের জিনিসপত্র টাকাপয়সা সামলে রাখতে পারো না’। ঠিক কথা! এবার থেকে কাগজপত্র, টাকাপয়সা সব যে ওর নাগালের বাইরে রাখতে হবে, কিঞ্চিৎ মূল্য চুকিয়ে সেটা মাথায় ঢুকল। পুরোনো একটা টেলিফোন ডিরেক্টরি বাড়ির এক কোণে পরেছিল, সেটাকে ওর দাঁতের ব্যায়ামের জন্য খাটের তলায় রেখে দিলাম। কুটুসের শোবার জন্য একটা প্লাইউডের ঘর মতো ব্যবস্থা করা গেছে, বাক্সটার মধ্যে বালিশ পেতে চমৎকার বিছানা তৈরি হল। সমস্যা এখন একটাই কুটুসকে কিছুতেই পটি ট্রেনিং দেওয়া যাচ্ছে না, ঘরের সর্বত্র বিষ্ঠা ত্যাগ করে সে আমাদের কাজ বাড়িয়েছে তবে আশ্চর্যের বিষয় জগন্নাথ-দা হাসিমুখেই সেসব পরিষ্কার করছে, বোঝা যাচ্ছে প্রথমে বিরক্ত হলেও ছোট্ট এই প্রাণীটাকে এখন সেও বেশ স্নেহের চোখেই দেখছে।
অ্যান্টি ডিপ্রেশান্ট খেয়ে বিশেষ কাজ হয়নি, অবশ্য আগের দুরাত্রি স্বপ্নটা দেখিনি তাই ঘুমটা মোটামুটি ভালোই হয়েছিল, কিন্তু আজ রাত্রে আবার সেই বিশ্রী স্বপ্নে ঘুমের দফারফা হয়ে গেল। আজ নতুন কিছু দেখলাম! প্রতিবারে স্বপ্নটা একটা নির্দিষ্ট জায়গায় এসে থমকে যেত। এতদিন শুধু জঙ্গল আর খড়ের ছাওনি দেওয়া ঘর দেখে এসেছি, কিন্তু আজকে প্রতিদিনের মতো নির্দিষ্ট জায়গায় এসে দাঁড়ানোর পর দৃষ্টি ঘুরে গিয়ে পড়ল একটা পুরোনো মন্দিরের উপর। পাঁচিল দিয়ে ঘেরা মন্দিরটার অবস্থান জঙ্গল আর গ্রামের মাঝামাঝি একটা মাঠের মধ্যে। সাদামাঠা মামুলি মন্দিরটার মধ্যে কি যেন অদ্ভুত আকর্ষণ রয়েছে! আমি নির্নিমেষে সেদিকে চেয়ে রইলাম। পাঁচিলের গায়ে সদর দরজাটা হঠাৎ নিজে থেকেই খুলে গেল আর আমিও সম্মোহিতের মতো সেদিকে চলতে লাগলাম। চৌকাঠ ডিঙিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে দেখলাম মূল মন্দিরটা পাঁচিল থেকে দশ বারো পা দূরে, মাঝখানে প্রশস্ত চাতালটা পেরিয়ে সেদিকে এগিয়ে গেলাম। মূল মন্দিরের দরজা হাট করে খোলা, আমি গর্ভগৃহে প্রবেশ করলাম, এখানে জমাট বাঁধা অন্ধকার, মনে হল হঠাৎ কোনও গুহায় ঢুকে পরেছি, একটা বিশ্রী গন্ধ নাকে আসতেই তীব্র বমির ভাব জেগে উঠল, কিন্তু বমি হল না, ধীরে ধীরে দুর্গন্ধ আর অন্ধকার দুটোই সয়ে যেতে লাগল। আমি সেই গাঢ় আধারের বৃত্তের মাঝে ভূতগ্রস্থের মতো বসে রইলাম। হঠাৎ একটা নীলচে আলোর জ্যোতি ওই জমাট অন্ধকারের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে লাগল, আমি হিতাহিত জ্ঞানশুন্য হয়ে সেদিকে চেয়ে রইলাম।
এবার একটা অপার্থিব স্বর ভেসে এল, কেউ আমার নাম ধরে ডাকল, আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো যেন আদেশের অপেক্ষা করছি, সেই অমানুষিক কণ্ঠস্বর বলল—’জয়ন্ত, সহস্র বৎসরের প্রতীক্ষা কি অসহনীয়, আমার এই জঠরের ভিতরে যে কি নিদারুণ দহন যন্ত্রণা! তোমার জিহ্বার দ্বারা কি আমার ক্ষুৎপিপাসার পরিতৃপ্তি হবে না’? আমার চিন্তাশক্তি লোপ পেয়েছে, কন্ঠস্বরের মালিকের সামনে আত্মসমর্পন করেও যেন সুখ, বললাম—’গ্রহণ করুন’।
—’এভাবে নয়, সশরীরে তুমি এই ক্ষেত্রে উপস্থিত হও, অবসান ঘটুক অনন্ত প্রতীক্ষার’। আমি সম্মোহিতের মতো বললাম—’কোথায় আসব’? কণ্ঠস্বরটা মিলিয়ে যেতে যেতে অনেক দূর হতে ভেসে এল —’ভগীরথপুর’।
ঘুম ভেঙে গেল। অন্ধকার ঘরে বিছানার উপর বসে নিজের হৃৎপিণ্ডের শব্দ নিজেই শুনতে পাচ্ছিলাম। স্বপ্নের এমন অদ্ভুত অগ্রগতি আমাকে দারুণ উদ্বেগের মধ্যে ফেলে দিল, তবে কি আমি জটিল মনোরোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছি? শীতের রাতেও কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে মনে হল। ধীরে ধীরে সম্বিৎ ফিরে এল। কোলের উপর নরম মাংসপিণ্ডের স্পর্শে টের পেলাম কুটুস জড়সড় হয়ে আমার গায়ের সঙ্গে লেপ রয়েছে। ভয়ে থরথর করে কাঁপছে, কিছু বুঝতে না পেরে ওর গায়ে হাত বোলাতে লাগলাম, এবারে ঘরের দিকে চোখ পড়তেই চমকে উঠলাম, অগুনতি গোলাপি রঙের জ্বলন্ত ফুটকিতে ঘরের মেঝে যেন থই থই করে ভাসছে। দ্রুত হাতে বেডসুইচ অন করে ফ্লুরোসেন্টের ফিকে আলোয় যা দেখলাম তাতে গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল! আর তখুনি কুটুসের ভয়টা চালান হয়ে আমার মধ্যেও ঢুকে পড়ল।
যেদিকে চোখ যাচ্ছে শুধু বিশাল বিশাল মেঠো ইঁদুর, এসব ইঁদুর ড্রেনে, মাঠে, চাষের খেতে বাস করে, গৃহস্থ বাড়ি এদের চড়ে বেড়ানোর জায়গা নয়। ইঁদুরের সংখ্যা অন্তত একশো তো হবেই। আর অত্যন্ত অদ্ভুত এদের আচরণ। সবকটা ইঁদুর একসঙ্গে ঘরের সর্বত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে কিন্তু এদের সবার চোখের দৃষ্টি সোজা আমার দিকেই তাক করা। এতগুলো ইঁদুর আমার বেডরুমে কি করছে? বিছানার উপর গুটিয়ে বসে হুস হুস শব্দ করে ভয় দেখানোর চেষ্টা করলাম, ইঁদুরগুলোর মধ্যে পেছু হটার কোনও লক্ষন দেখলাম না, এবারে আর কিছু না পেয়ে টিপয়ের উপর রাখা জলের জগটা ছুড়ে মারলাম ইঁদুরগুলোকে লক্ষ্য করে, এবারে কাজ হল, ইঁদুর গুলো পিছু হটল, সারিবদ্ধভাবে ইঁদুরের দল রান্নাঘরের দিকে যেতে শুরু করল। সর্বশেষ ইঁদুরটা যখন রান্নাঘরে ঢুকে গেল, সাহস করে খাট থেকে নেমে ওদের গতিবিধি লক্ষ করার চেষ্টা করলাম। কিচেনের মেঝেতে নিকাশির জায়গায় লোহার জালটা কিছুদিন হল ছিড়ে গেছে, সেখান দিয়েই দেখলাম ইঁদুরের দল নেমে গেল। ইঁদুরের এমন আচরণ বড়ই অদ্ভুত! জন্তুগুলো যেন অপেক্ষা করছিল কখন আমার ঘুম ভেঙে ওদের দিকে চাইব, আর এরকম শৃঙ্খলা মেনে চলা কি ইঁদুরের মতো কোনও প্রাণীর পক্ষে সম্ভব! এসব যে কি ঘটছে! সে রাতে আর ঘুমোতে ইচ্ছে করল না, চেয়ারে বসেই বাকি রাতটা কাটিয়ে দিলাম। সকালে মর্নিং ওয়াকে বেরোনো যেতে পারত কিন্তু কুটুসের কথা ভেবে আর গেলাম না, যদি ইঁদুরগুলো আবার ফিরত আসে? আটটার সময় জগন্নাথ এল। আমি স্কুলের জন্য তৈরি হয়ে নিলাম, যাওয়ার পথে একবার রাজমিস্ত্রিকে খবর দিতে হবে, প্লাস্টার করে ওই ফাটলটা এখুনি বন্ধ করা দরকার।
স্কুলের পর, রাসবিহারী মোড়ের এন জি মেডিকেয়ারে সিটি স্ক্যান করে ফিরতে প্রায় বিকেল পাঁচটা বেজে গেল। কাল রিপোর্ট পেলে আবার ডাক্তার নন্দীর সঙ্গে দেখা করতে হবে। বাড়ি পৌঁছে প্রথমেই জগন্নাথকে জিগ্যেস করলাম—’মিস্ত্রি এসেছিল’? জগন্নাথ অবাক হয়ে বলল—’কই না তো’! বিরক্তি চরমে উঠল, লোকটা তো বেজায় দায়িত্বহীন, ঠিক আছে কাল ঘাড় ধরে এনে কাজ করাব, জগন্নাথ আমাকে আশ্বস্ত করে বলল—’ও নিয়ে তুমি ব্যস্ত হোয়ো না, আমি ইটের টুকরো দিয়ে গর্ত বুজিয়ে দেব’।
—’তুমি পারবে’?
—’দেখোই না, তুমি শুধু সিমেন্ট বালির জোগাড় করো’।
আমি আর সময় নষ্ট না করে পাড়ার হার্ডওয়ারের দোকান থেকে একটা ইট আর পরিমাণ মতো বালি-সিমেন্ট এনে হাজির করলাম। জগন্নাথ লোহার হাতুড়ি দিয়ে ইটটাকে মাপে কেটে বালি-সিমেন্টের মিক্সচার দিয়ে ফাটলটা বুজে দিল, আর আমিও হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম, আশা করি আজ রাতে আর ইঁদুরগুলো উৎপাত করতে আসবে না, তাও সাবধানের মার নেই, বাতিগুলো সব জ্বেলেই শোব ঠিক করলাম, ডিনারের সময় টিভি চ্যানেলে খবর শোনা আমার পুরোনো অভ্যাস, টিভির সুইচ অন করে রাতের মেনু ডিমের কারি আর রুটি নিয়ে সবেমাত্র টেবিলে বসেছি হঠাৎ দরজায় বেলটা বেজে উঠল, দরজা খুলে যাকে দেখলাম তাতে বিরক্তি চরমে উঠল। সেদিনের সেই ছোড়াটা আবার এসে হাজির হয়েছে, ছেলেটি আমাকে দেখে সংকোচের সঙ্গেই বলল—’আমার জেঠু এসেছেন, আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান’।
বিরক্তি গোপন করে বললাম—’কোথায় উনি’?
ছেলেটির পিছনে একজন দীর্ঘদেহী মানুষ দাঁড়িয়েছিল, খেয়াল করিনি। ভদ্রলোক এগিয়ে এসে নমস্কার করে বললেন—’আমার নাম রুদ্রপ্রসাদ মিত্র, আপনাকে বিরক্ত করলাম, তবে বেশি সময় নেব না, যদি পাঁচ মিনিট সময় দেন তাহলে প্রয়োজনীয় কিছু কথা বলতে চাই। ভদ্রলোকের বয়স হলেও দেহ সুঠাম এবং ঋজু, উচ্চতা ছ-ফুটের মতো, মাথা ভরতি ধবধবে সাদা চুল। মুখের অভিব্যক্তি দেখে সামান্য রোগক্লিষ্ট মনে হলেও সেটা এর ব্যক্তিত্বে প্রভাব ফেলেনি। লোকটার চেহারা আর ব্যক্তিত্বের মধ্যে এমন কিছু আছে যা সম্ভ্রম আদায় করে নেবেই। দরজা খুলে ভিতরে আসার আহ্বান জানালাম কিন্তু ভদ্রলোক ফ্ল্যাটের ভিতর চেয়ে কেমন যেন আঁতকে উঠলেন তারপর সামলে বললেন—’এত রাতে আর আপনার অসুবিধে বাড়াতে চাই না, তার থেকে নীচে একটা চায়ের দোকান খোলা দেখলাম, আমরা তো সেখানে গিয়ে বসতে পারি। আমি আর কথা না বাড়িয়ে দরজা বাইরে থেকে লক করে নীচে নেমে এলাম, ভদ্রলোক আমার সঙ্গে কি কথা বলতে চাইছেন বোধহয় একটু শোনা দরকার।
হরির চায়ের দোকানের একটা কর্নার বেঞ্চে বসে চায়ের অর্ডার দিয়ে, রুদ্রপ্রসাদ বললেন—’জয়ন্তবাবু সবার আগে একটা জিজ্ঞাস্য আছে, সম্প্রতি আপনি কি কোথাও ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন, এই যেমন ধরুন কোনও জঙ্গল টঙ্গলে’। অবাক হয়ে বললাম—’তেমন কিছু তো ভাবিনি’। ভদ্রলোক যেন একটু খুশি হয়ে বললেন—’ঠিক আছে এবারে কয়েকটা ছবি দেখাব, একটু ভেবেচিন্তে বলুন তো এরকম কিছু রিসেন্টলি ঘটেছে কি না’? ভদ্রলোক এবার হাতের ব্যাগটা থেকে একটা খাম বের করলেন। খাম থেকে কয়েকটা সাদা-কালো স্কেচ টেবিলের উপরে ছড়িয়ে দিয়ে তুলতে ইঙ্গিত করলেন। প্রথম যে ছবিটা হাতে তুলে নিলাম সেটা হাতির পিঠে বসে থাকা কোনও একটা লোকের, রাস্তা দিয়ে হাতি চলেছে, দু-পাশে কিছু লোক সারিবদ্ধ হয়ে দাড়িয়ে রয়েছে। মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে না পেরে স্কেচটা টেবিলে রেখে দিলাম। চায়ে চুমুক দিতে দিতে ভদ্রলোক আমার দিকে নজর রাখছিলেন, বললেন—’পরের স্কেচটা দেখুন প্লিজ’। পরের স্কেচটা আরও অদ্ভুত, একটা বেদীর ওপরে একটা ছোট্ট গুলির মতো পাথর যেটা থেকে বোধহয় আলোর রেখা ঠিকরে বের হচ্ছে, বেদীর সামনে একজন লোক হাঁটু গেড়ে বসে রয়েছে, ভঙ্গিটা যেন আত্মনিবেদনের। পেটের ভিতর খিদেটা বিলক্ষণ জানান দিচ্ছে, আমার অপেক্ষায় বসে থাকা ডিমের কারির কথা ভেবে বিরক্ত হয়ে বললাম —’আর কতগুলো ছবি বাকি আছে’? রুদ্রপ্রসাদ আমার কথার সোজা উত্তর না দিয়ে বললেন —’জয়ন্তবাবু এই ছবিটার সঙ্গেও স্মৃতির যোগসূত্র যখন খুঁজে পাচ্ছেন না তার মানে হাতে এখনো সময় আছে’। পরের স্কেচটা হাতে তুলে নিলাম। এটাতে দুধারে ঘন গাছপালার মাঝখানে এক চিলতে রাস্তার ওপর একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে, রাস্তা যেখানে শেষ হচ্ছে সেখানে একটা ভাঙাচোড়া মন্দির। ছবিটা গভীর ভাবে দেখছিলাম, রুদ্রপ্রসাদের ডাকে হুঁশ ফিরল —’ছবিটা কি চেনা লাগছে’। ইতস্তত করে বললাম —’ঠিক বলতে পারব না তবে এরকম কিছু একটা বোধহয় স্বপ্নে দেখে থাকতে পারি’। রুদ্রপ্রসাদ তীক্ষ্ন স্বরে বললেন —’ওটা যদি স্বপ্ন হয় তাহলে এটা নিশ্চয়ই বাস্তব হবে, কি বলেন জয়ন্তবাবু’? হাতবদল হয়ে যে স্কেচটা এবার আমার হাতে এসে উঠল সেটা দেখে শিউড়ে উঠলাম। বিছানার ওপর পাজামা, গেঞ্জি পরে একটা লোক কুঁকড়ে বসে আছে আর তার চারপাশে ঘর জুড়ে অসংখ্য ইঁদুর। স্কেচটা আমার হাত থেকে টেনে নিয়ে রুদ্রপ্রসাদ বললেন —’এই বিশ্রী অভিজ্ঞতাটা যে আপনার হয়েছে তা আর মুখে বলে দিতে হবে না, আমার কাছ আরও কয়েকটা স্কেচ আছে তবে সেগুলো আর দেখাচ্ছি না, এবারে আপনাকে একটা ব্যাক্তিগত প্রশ্ন করব, দয়া করে আপনার বংশ পরিচয়টা যদি বলেন’?
—’মানে’? প্রশ্নটা বড় অদ্ভুত! আমি অবাক হয়ে ভদ্রলোকের দিকে চাইলাম, রুদ্রপ্রসাদ বললেন —’মানে আপনার পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ কি জমিদার বা কোন অঞ্চলের শাসনকর্তা ছিলেন’?
উত্তর দেওয়ার আগেই অবশ্য হরিদা এসে উপস্থিত হয়েছেন, বললেন—’এবার দোকান বন্ধ হবে’। রুদ্রপ্রসাদ বললেন—’হ্যা তাইতো’! আর পাঁচ মিনিট ব্যাস, ততক্ষণে ভাই তুমি আরও দু-কাপ চা আর গোটাকয়েক ক্রিম দেওয়া বিস্কুট দাও দেখি’। হরিদা অপ্রসন্ন স্বরে বললেন—’এখন আর চা বানানো যাবে না, বিস্কুট দিচ্ছি, কিন্তু আপনারা তাড়াতাড়ি করুন, আমায় বাড়ি যেতে হবে’। হরিদা চলে যেতে আমি বললাম—’অনেক আগে নৃপতিপুরের রাজারা আমাদের পূর্বপুরুষ ছিলেন’। রুদ্রপ্রসাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—’নিউজ পেপারে আপনার খবরটা ফলাও করে বেরিয়েছিল, আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরেছিলাম আর টিভিতেও দেখেছিলাম তবে আসল খবরের হদিশ কেউই বের করতে পারেনি, অবশ্য আমার যা বোঝার তখনি বোঝা হয়ে গেছিল। জয়ন্তবাবু এক্ষুনি সবকিছু আপনাকে খুলে বললে আপনি ধরতে পারবেন না, একটু হোমওয়ার্ক দরকার, একটা বই আপনাকে দিচ্ছি, আমারই লেখা, একটু সিরিয়াসলি পরবেন, পারলে এখুনি, আজ রাতেই, পুরো বইটা পড়তে হবে না, শুধু এর চৌত্রিশ থেকে একচল্লিশ নম্বর পাতা পর্যন্ত পড়লেই হবে, পড়া শেষ হলে আপনি যে আমার সঙ্গে কথা বলতে চাইবেন সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত, আমার নম্বর ওই বইয়ের পাতায় লেখা রইল, আমি রাতে জেগে পড়াশোনা করি, সুতরাং যখন খুশি ফোন করতে পারেন’।
১৪
ডিনার সেরে রুদ্রপ্রসাদের বই নিয়ে পড়লাম। ইংরেজিতে লেখা, নাম ‘‘Somavamshis—the history untold” বইয়ের ব্যাক কভারে লেখকের সংক্ষিপ্ত পরিচয় রয়েছে, ভদ্রলোক একসময় ক্যালকাটা ইউনিভারর্সিটির অধ্যাপক ছিলেন, নামের পিছনে কয়েকটা ভারী ভারী ডিগ্রিও দেখলাম। পেঙ্গুইন পাবলিশার্স থেকে ছাপা বইয়ে, সাল দেখাচ্ছে ২০০১ মানে প্রায় বারো বছর আগের প্রিন্ট। উড়িষ্যার সোমবংশীয় রাজাদের রাজত্বকালের ইতিহাস, রাজা জন্মেজয় থেকে শুরু করে কর্ণদেব পর্যন্ত প্রায় দুশো বছরের কাহিনি, আমি রুদ্রপ্রসাদের পরামর্শ অনুযায়ী চৌত্রিশ নম্বর পাতাটা খুলে চোখের সামনে মেলে ধরলাম। রুদ্রপ্রসাদ এখানে বিশেষ একজন রাজার কথা লিখছেন, যার অস্তিত্ব ইতিহাসে স্পষ্টভাবে প্রমাণ করা যায়নি, কিন্তু রিসেন্টলি কিছু খোঁজ পাওয়া গেছে যাতে মোটামুটি একটা আভাষ পাওয়া যাচ্ছে, যদিও এই রাজা আর তার সাম্রাজ্যের যথার্থতা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েই গেছে। রাজার আনুমানিক নাম শিবদত্ত। সময়টা ৮৫০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি, সোমবংশীয় প্রথম সম্রাট জন্মেজয়ের রাজত্বের কিছু আগের কথা। তবে এই শিবদত্ত সোমবংশীয়দের পূর্বপুরুষ ছিলেন কি না সে বিষয়ে স্পষ্ট মন্তব্য না করে একটা আকর্ষণীয় গল্পের উল্লেখ করা হয়েছে, রাজ্যাভিষেকের পর প্রথম কয়েকটা বছর সম্রাট শিবদত্তের মোটেই স্বস্তিতে কাটেনি, দুর্দান্ত সব শত্রুদের মোকাবিলা করতে করতে শিবদত্তের সেইসময় রীতিমতো টালমাটাল অবস্থা। সম্রাটের বিপদ যে শুধু বাইরের শত্রুদের থেকেই ছিল তা নয়, রাজপরিবারের গণ্ডির মধ্যেও ষড়যন্ত্রের বাষ্প ক্রমশ ঘনিয়ে আসছিল। এমনই কঠিন কোনও সময় রাজা শিবদত্ত মৃগয়া করতে গিয়ে হাজির হলেন, সাতকোশিয়ার বনাঞ্চলে। জঙ্গলের মধ্যে শিবদত্ত একজন সাধুর সন্ধান পান। সাধুর অলৌকিক ক্ষমতার পরিচয় পেয়ে সম্রাট স্বাদরে তাকে রাজধানী সুবর্নপুরে এনে প্রতিষ্ঠিত করেন। এই বিষয়টি নাকি ব্রহ্মেশ্বর মন্দিরের তাম্রলিপিতে উল্লেখ করা রয়েছে।
এই সাধু বলভদ্র ছিল গুপ্তবিদ্যায় পারদর্শী, রহস্যময় পুরুষ! সম্রাট শিবদত্তের হিতার্থে সে চণ্ড নামক দেবতার উদ্দেশ্যে রাজপরিবারের কোনও শিশুর বলি অবধি উৎসর্গ করেছিল।
পরের দিকে শিবদত্ত প্রবল পরাক্রান্ত চোলা আর কালাচুরিদের যুদ্ধে পরাস্ত করে রাজ্যের সীমানাই শুধু সুরক্ষিত করেননি, তা অনেকাংশে বাড়িয়ে নিতেও সক্ষম হয়েছিলেন। শিবদত্তের পরাক্রমে প্রতিবেশী রাজারা ভয়ে থরথরি কম্পমান হয়ে থাকত, নানা বহুমূল্য উপঢৌকন দিয়ে কোনওরকমে নিজেদের মাথা আর রাজত্ব বাঁচিয়ে চলা ছাড়া তাদের সামনে অন্য উপায় ছিল না। এই সাফল্যের কৃতিত্ব শিবদত্ত অর্পণ করেছিল মহান চণ্ড আর তার সেবক বলভদ্রকে, প্রতিদান স্বরুপ শিবদত্তের পৃষ্ঠপোষকতায় চণ্ডের বিশাল মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়েছিল রাজধানী সুবর্ণপুরে।
শিবদত্তের প্রশ্রয়ে বলভদ্রের প্রভাব প্রতিপত্তি উর্ধ্বমুখি হতে হতে শেষপর্যন্ত সর্বময় কর্তৃত্বের আকার ধারণ করেছিল যা আবার রাজ-পরিবারের সদস্য এবং সভাসদদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষের কারণ হয়ে পরেছিল। চাপা অসন্তোষ আর ক্ষোভের ফানুস সেদিন ফাটল যেদিন শিবদত্তের মৃত্যু ঘটল, পরবর্তী সম্রাট যযাতির আদেশে বলভদ্রকে রাজার চিতার পাশেই জ্যান্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল, আর খুব ইন্টারেস্টিং পয়েন্ট এটা যে শিবদত্তের জীবনীকালের সমস্ত প্রমাণ আর কীর্তির গাঁথাও ধ্বংস করা হল। কি এমন ঘটেছিল শিবদত্তের জীবনে যা ওই সাম্রাজ্যের ভাবমূর্তির পক্ষে ক্ষতিকারক হয়ে উঠেছিল? যাকে পুরোপুরি মুছে না ফেলা পর্যন্ত জন্মেজয়ের মতো ক্ষমতাশালী সম্রাটের পক্ষেও স্বস্তির শ্বাস নেওয়া সম্ভব হয়নি? কয়েকটা প্রশ্ন তুলে শিবদত্তের অধ্যায় শেষ করে দেওয়া হলেও আমার কৌতূহলের পারদ চড়ে গেল! দুটো এমন নাম এই বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসেছে, যেটা মাত্র কিছুদিন আগেই আমার জীবনটাই প্রায় তছনছ করে দিয়েছিল। চণ্ড আর তার বলি! ব্যাপারটা তলিয়ে না দেখলে শান্তি পাচ্ছি না। দ্বিধা কাটিয়ে রুদ্রপ্রসাদকে ডায়াল করলাম, ওপার থেকে গম্ভীর পুরুষকণ্ঠ ভেসে এল—’হ্যালো’।
নাম বলতেই ভদ্রলোক কোনওরকম ভনিতা না করে সোজা কাজের কথায় চলে এলেন।
—’জয়ন্তবাবু আপনার ফোনের অপেক্ষা করছিলাম, এখুনি একবার আমার বাড়ি আসতে পারবেন, অসুবিধে হবে না গাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি’।
—’এখন রাত এগারোটা’!
—’তাতে কি? তা ছাড়া আমাদের প্রয়োজনটাও যে মারাত্মক’।
—’আমি কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছি না’?
—’আপনি চলে আসুন, বোঝাবার দায়িত্ত্ব আমার’।
—’সরি এত রাতে আসতে পারছি না’। ভদ্রলোকের কণ্ঠস্বর এবারে একটু অপ্রসন্ন শোনাল, একমুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন—’ঠিক আছে তাহলে যদি কাল সকালে আসেন’।
—’সেটা অবশ্য হতে পারে’।
—’তাহলে কখন গাড়ি পাঠাব বলুন’?
—’ন-টা নাগাদ আসব, তবে গাড়ি পাঠাতে হবে না, আমি নিজেই চলে যাব’। শুভরাত্রি জানিয়ে এবার ফোন রেখে দিলাম।
সারাদিন অনেক দৌড়ঝাঁপ গেছে, তা ছাড়া কাল রাতে ঠিক করে বিশ্রাম অবধি হয়নি, ঘুমে চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে, কিন্তু ঘুমাতে সাহস পাচ্ছি না, মনের মধ্যে আতঙ্কের একটা বিশ্রী কাটা খচ খচ করে ফুটছে, ধেড়ে ইঁদুরগুলো আবার মাঝরাতে হামলা না চালায়? ফ্ল্যাটের আলোগুলো সব একসঙ্গে জ্বেলে রুদ্রপ্রসাদের বইয়েই ফের মনোনিবেশ করার চেষ্টা করলাম, একসময় কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম টেরই পেলাম না।
অ্যালার্মের শব্দে ঘুম যখন ভাঙল তখন ঘড়িতে পৌনে সাতটা। রাতে জমাটি ঘুম হওয়ার ফলে শরীর-মন দুটোই বেশ তাজা লাগছিল। ফ্ল্যাটের সর্বত্র খুঁটিয়ে দেখেও ইঁদুরের কোনও চিহ্ন খুঁজে পেলাম না, মনের মধ্যে যে উদ্বেগটা গজিয়ে উঠেছিল সেটা দূর হয়ে গেল। কুটুসের সঙ্গে কিছুক্ষণ খেলে সকালের প্রাত্যহিক কাজকর্মে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। আটটা নাগাদ জগন্নাথ এল, কুটুসকে ওর জিম্মায় রেখে বেড়িয়ে পরলাম, প্রথম গন্তব্য বালিগঞ্জের রেনি পার্ক তারপর যথারীতি স্কুলে যেতে হবে।
রাস্তা পারাপার করার জন্য সবেমাত্র এসে দাঁড়িয়েছি, একটা সাদা স্করপিও গাড়ি এসে গা ঘেঁসে দাঁড়াল। ড্রাইভারের সিটে বসে কাল রাতের ছেলেটি। ছেলেটি গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে বলল—’আমি ভাবলাম বুঝি দেরি হয়ে গেল, আপনি বোধহয় বেড়িয়ে পড়লেন’। গাড়ীতে উঠতে উঠতে বললাম—’কিন্তু এর কি দরকার ছিল? আমি তো বলেইছিলাম নিজেই চলে যাব’। ছেলেটি হেসে বলল—’স্যার জেঠু কাল রাত থেকেই আমাকে তাড়া লাগাচ্ছিলেন যেন গাড়ি নিয়ে তৈরি থাকি’। গাড়ি তেইশ পল্লির মোড় থেকে ইউ-টার্ন নিয়ে সোজা হাজরা রোডে এসে পৌঁছোল। সকালের দিকে রাস্তায় এখনো তেমন ট্র্যাফিকের ভিড় হয়নি, গাড়ি বেশ দ্রুত গতিতেই চলছিল, ছেলেটির সঙ্গে পরিচয় হল, ডাক্তারি পড়ছে, মেডিকেল কলেজের স্টুডেন্ট, নাম অরিন্দম, ওর জ্যাঠার সম্পর্কেও কিছু খোঁজখবর পাওয়া গেল ভদ্রলোক অবসর নেওয়ার পর ইতিহাসের কিছু বিষয় নিয়ে রিসার্চ করছিলেন, গত কয়েক বছর বিদেশে কোথাও ছিলেন, মাস দুয়েক হল দেশে ফিরত এসেছেন, সপ্তাহ তিনেক আগে নাকি ভদ্রলোক প্রথমবার অরিন্দমকে আমার নাম, ঠিকানা দিয়ে বলেন আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য, কিন্তু ঠিক সেদিনেই ওনার হৃৎযন্ত্রে সমস্যা হওয়ায় হাসপাতালে ভরতি হতে হয়, ডামাডোলের মধ্যে অরিন্দম এই ব্যাপারটা ভুলেই গেছিল, কিন্তু জ্ঞান ফিরতেই রুদ্রপ্রসাদ ফের তাগাদা দেওয়া শুরু করেন আমাকে ডেকে নিয়ে আসার জন্য। অরিন্দমের অবশ্য বিন্দুমাত্র ধারণা নেই তার জ্যাঠার হঠাৎ আমার মতো অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে কি দরকার থাকতে পারে! কথা বলার ফাকেই গাড়ি এসে পৌঁছল বালিগঞ্জের অভিজাত রেনি পার্ক এলাকায়। একটা লোহার গেটওয়ালা তিনতলা বাড়ির সামনে গাড়ি থামিয়ে অরিন্দম বলল—’আমরা এসে গেছি’। গেটের ভিতর একজন বলিষ্ঠদেহী দারোয়ান বসে হাতের তেলোতে খৈনি ডলছিল, সে দরজা খুলে দিতে আমি অরিন্দমের পিছন পিছন বাড়ির ভিতর প্রবেশ করলাম। একজন সৌম্যদর্শন ভদ্রলোক সামনে এসে দাড়িয়েছেন, নমস্কারের ভঙ্গি করে বললেন—’আমার নাম দেবপ্রসাদ মিত্র, রুদ্রপ্রসাদ আমার দাদা, আসুন ভিতরে আসুন’। ভদ্রলোককে অনুসরণ করে বাড়ির ভিতরে একটা সুসজ্জিত ড্রয়িং রুমে এসে পৌঁছোলাম, সেখান থেকে মার্বেল দিয়ে বাঁধাই করা সিঁড়ি দোতলার দিকে উঠে গেছে। ভদ্রলোক সিঁড়িতে পা রেখে বললেন—’দাদার ঘরটা দোতলায়, আমরা সেখানেই যাচ্ছি’। বললাম—’শুনলাম যে ওনার শরীরটা ঠিক নেই’। দেবপ্রসাদ বললেন—’হ্যা ওই হার্টের সমস্যা, মাঝখানে তো কয়েকটা দিন হাসপাতালেও থাকতে হল’। ভদ্রলোক এবার একটু গলা খাকড়ে বললেন—’দাদা কয়েকদিন হল আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্য উদগ্রীব হয়ে রয়েছেন, যদিও উনি আমাদের কাউকেই বলতে চাইছেন না ব্যাপারটা কি? আপনি এলেন এবারে উনি হয়তো স্বস্তি পাবেন’। এ বাড়িতে ঢোকা ইস্তক একটা অদ্ভুত জিনিস চোখে পড়ছে, এই দিনের বেলাতেও প্রতিটা জানলার ধারে আর বারান্দায় একহাত অন্তর একটা করে প্রদীপ জ্বালানো রয়েছে। তবে বড়লোকের খেয়াল ভেবে ওসব নিয়ে আর মাথা ঘামালাম না। দোতলায় উঠে লম্বা বারান্দা পেরিয়ে কোণের ঘরের দরজায় দেবপ্রসাদ টোকা মারতেই ভিতর থেকে গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল।—’ভিতরে এস’। ঘরের মাঝ বরাবর একটা কাউচে বসে রুদ্রপ্রসাদ টিভি দেখছিলেন, সেটা বন্ধ করে হাসিমুখে বললেন—’এস ভাই, আমার সামনে ওই সোফাটায় বস, ভালো কথা, তোমার বয়স কত’?
—’তেত্রিশ’।
—’আমার সাতষট্টি, তোমাকে তুমি বলে ডাকলে, আপত্তি নেই তো’? সম্মতি জানিয়ে বললাম—’কিচ্ছু না’।
—’আর তুমিও কিন্তু আমাকে রুদ্র বলেই ডাকবে, নামের আগে ওইসব মিস্টার টিস্টার আমার আবার ঠিক পোষায় না, আর জেঠু-কাকু-মেসোমশাই শুনলে কেমন যেন অ্যালার্জি হয়’।
—’সে ঠিক আছে কিন্তু আমি তো এখনও বুঝতে পারছি না’?
রুদ্র হাত নেড়ে বললেন—’এসেই যখন পড়েছ, আশা করি সবই বোঝাতে পারব, কিন্তু সবার আগে স্টিমুলেটিং কিছু চাই, কফি খেতে খেতে কথা বলা যাক, কি বল’? ভদ্রলোক এবার ভাইয়ের দিকে চেয়ে বললেন—’রমাকে বল কফির বন্দোবস্ত করতে’। দেবপ্রসাদ সম্মতি জানিয়ে ঘর থেকে নিষ্ক্রান্ত হলেন, রুদ্রপ্রসাদ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ভাইয়ের চলে যাওয়া দেখলেন, তারপর আমার মুখের দিকে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—’দুর্ভাগ্যের বিষয় যে তোমার সঙ্গে আমাকে এমন কিছু বিষয় নিয়ে বসতে হচ্ছে, যেটা না হলেই খুশি হতাম’।
‘সবার আগে নিজের পরিচয়টা দিই। আমার নাম তো জেনেছ, আমি একসময় ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের লেকচারার ছিলাম, পরে ডিপার্টমেন্টের হেড হই। প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে আমার যে পড়াশোনা আর রিসার্চ রয়েছে তার সমতুল্য এই দেশে খুব বেশি নেই, সে কথাটা জোরের সাথেই বলতে পারি, কয়েকটা বইও লিখেছি, যার একটার কিছুটা গতকাল তুমি পড়েছ। বিয়ে থাওয়া করিনি, এই ভাই আর ভাইপোই আমার পরিবার। গত তিন বছর গ্রীস গভর্নমেন্টের একটা বিশেষ প্রোজেক্ট নিয়ে কাজ করছিলাম, মাস দুয়েক আগে হঠাৎ এই কলকাতা শহরের বুকে ঘটে যাওয়া একটা ঘটনার খবরে তড়িঘড়ি দেশে ফেরত চলে আসি।’
রুদ্রের কথায় ছেদ পড়ল। কফি হাজির হয়েছে, বাড়ির পরিচারিকা ট্রে সাজিয়ে নিয়ে এসেছে। কফি ছাড়াও আছে কড়া পাঁকের সন্দেশ, কাজু বাদাম আর ক্রিম দেওয়া বিস্কুট। আমার মৃদু আপত্তি উড়িয়ে রুদ্র বললেন—’আমার তো ইচ্ছে ছিল দুজনে একসাথে লাঞ্চ করি কিন্তু তুমি প্রথমবার আসছ তাই আর জোর করলাম না’। কফির পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে রুদ্র বললেন—’কয়েক মাস আগে নকশাল নেতা সমীরণ মাহাতোর মৃত্যুসংবাদ এখানকার নিউজ পেপার আর টিভিতে বেশ ফলাও করে বেড়িয়েছিল। সেদিনের সেই ঘটনার তুমিই একমাত্র জীবিত সাক্ষী, এই যে এতবড় চোট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হল, তারপর সুস্থ হয়ে ফেরত আসা, এসবের কিরকম প্রভাব তোমার জীবনে পড়েছে’। একটু চিন্তা করে বললাম—’কিছু মানসিক সমস্যা ছাড়া আর কোনও অসুবিধে নেই’।
—’যেমন’?
—’আজকাল রাতে প্রায় একধরনের উদ্ভট স্বপ্ন দেখে ঘুম নষ্ট হয়ে পড়ছে তাছাড়া মাঝে মধ্যে কানের ওপর একটা চিৎকার, যেটা শুধু আমিই শুনতে পাই’। রুদ্রপ্রসাদ এবার পালটা প্রশ্ন করলেন—’তোমার কি মনে হয়, এসব কিছু কেন ঘটছে’?
—’পোস্ট ট্রমাটিক সাইকোলজিক্যাল ডিসর্ডার, ডাঃ নন্দীর তেমনই মত’। রুদ্রপ্রসাদ কথাটা উড়িয়ে দিয়ে বললেন—’এই ডাক্তারের কোনও ধারণাই নেই এসব কীসের জন্য ঘটছে, ইনফ্যাক্ট পৃথিবীর কোনও ডাক্তারই এমন সমস্যার সমাধান বাৎলাতে পারবে না, তবে আশা করব আজকে এই বাড়ি ছেড়ে বেরোনোর আগেই তোমার জ্ঞানচক্ষু কিছুটা হলেও নিশ্চয়ই খুলবে’।
