Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    রুদ্রসমগ্র – রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

    January 8, 2026

    রান্না খাদ্য পুষ্টি – সিদ্দিকা কবীর

    January 8, 2026

    শহর খুলনার আদি পর্ব – আবুল কালাম সামসুদ্দিন

    January 8, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    চণ্ডরাজার বলি – সঞ্জয় ভট্টাচার্য

    সঞ্জয় ভট্টাচার্য এক পাতা গল্প221 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    চণ্ডরাজার বলি – ১৫

    ১৫

    রুদ্রপ্রসাদ বললেন—’খবরে বলেছে সমীরণ তার পুরোনো সহযোগী তপন দাসের সঙ্গে দেখা করার উদ্দেশ্যে দলবল সমেত দমদমের একটা বাড়িতে এসে হাজির হয়েছিল, গোপন সোর্স থেকে খবর পেয়ে পুলিশ ওই বাড়ি ঘিরে সমীরণকে সারেন্ডার করতে বলে, এরপর দু-পক্ষের গোলাগুলি বিনিময়ে ওখানে উপস্থিত সবার মৃত্যু ঘটে, সেদিন ঘটনাস্থলে অন্য অনেকের সঙ্গে তুমিও ছিলে, আর ছিল ছ-সাত বছরের একটা ছেলে, রিপোর্টে জানিয়েছে ছেলেটিকে পাচার করার উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, কিন্তু আমার মনে হয়েছে আসল ব্যাপারটা তা নয়’! কফির কাপ টেবিলের উপর রেখে রুদ্রপ্রসাদ বললেন—’আসল ব্যাপারটা কেউ জানে না, তাই না? অথবা পুলিসকে বলেছ আর তারাই তোমাকে সতর্ক করেছে, কারও কাছে বিশেষ করে মিডিয়ার সামনে মুখ না খুলতে’। রুদ্রপ্রসাদ যেন অন্তর্ভেদী দৃষ্টে আমার দিকে চেয়ে রয়েছেন, আমার অস্বস্তি বাড়ছিল, বললাম—’এর বাইরে আর কি খবর খুজছেন আপনি’?

    রুদ্রপ্রসাদ গম্ভীর স্বরে বললেন—’তাহলে তুমি বলবে না’?

    —’আমার যা বলার পুলিস আর প্রেসকে আগেই বলে দিয়েছি’।

    —’তুমি যে বলবে না তা আমি জানতাম, তবে শুনতে নিশ্চয়ই আপত্তি নেই, আমিই বলছি যদি কোথাও ভুল হয় শুধরে দিও! ছেলেটি ঢেঙ্কানলের চণ্ডমন্দিরে রাখা বলির উদ্দেশ্যে সংরক্ষিত একটা জীব। ঠিক যেমন ছাগল বা মোষকে বলি দেওয়ার জন্য খোয়ারে রেখে খাইয়ে-দাইয়ে মোটা করা হয় তেমনই কিছু। তবে ছাগল বা মোষের যেটুকু স্বাচ্ছন্দ্য থাকে অন্তত সূর্যের আলোটুকু দেখার, এখানে মনুষ্য সন্তানটির কপালে সেটাও জোটে না, তবেই সে চণ্ডের বলি হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে’। এতটা বলে রুদ্রপ্রসাদ থামলেন তারপর মুচকি হেসে বললেন —’গল্পটা এরকমই কিছু! তাই না জয়ন্তবাবু’? বললাম—’সবই তো জানেন দেখছি, তাহলে আমার কাছে আর কি প্রশ্ন আছে’? রুদ্রপ্রসাদ তীক্ষ্ন স্বরে বললেন—’প্রশ্ন আছে জয়ন্ত, লাখ টাকার প্রশ্ন! আমার কাছে স্পষ্ট নয় তুমি এসবের মধ্যে ঠিক কিভাবে জড়িয়ে পরলে? আর তার থেকেও বড় প্রশ্ন এই মুহূর্তে তোমার স্ট্যান্ড-টাই বা কি’? আমার একটু বিরক্তিবোধ হল, বললাম—’দেখুন আমার মনে হয়েছিল আপনি আমার জীবনে হঠাৎ গজিয়ে ওঠা এই অদ্ভুত পরিস্থিতির উত্তর পেতে সাহায্য করবেন, সেইজন্যেই আজকে এখানে আমার আসা, কিন্তু এখন তো দেখছি, উলটে আপনিই আমাকে জেরা করছেন’। রুদ্রপ্রসাদ শান্ত স্বরে বললেন—’জয়ন্ত এই যে তোমার জীবনের বিড়ম্বনা, দুঃস্বপ্ন দেখে নিয়মিত ঘুম নষ্ট হওয়া, কানের পর্দায় ভুতুড়ে চিৎকার, মাঝরাতে ইঁদুরের উৎপাত এসব কিন্তু বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা নয়, একটা শিকলের বৃত্তের মতো, এই শিকলের গোঁড়াটা কোথায় বাঁধা আছে আমি জানি, শেষ যে কোথায় মোটামুটি সে বিষয়েও কিছুটা আন্দাজ রয়েছে, কিন্তু মাঝখানের কয়েকটা সার্কেল মিসিং, সেই দুর্ঘটনার আগে পরে যা কিছু ঘটেছে আমাকে প্লিজ বল, আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারি কিন্তু সেটা তখুনি সম্ভব যখন তুমি আমাকে সে সুযোগটা দেবে’। রুদ্রপ্রসাদের উপর সামান্য হলেও আস্থা জন্মাল, লোকটার এই বিষয়ে কিছু জ্ঞান নিশ্চয়ই আছে, আমি তপনের নিমন্ত্রণে ওর বাড়িতে যাওয়া থেকে পরের ঘটনা যা ঘটেছে মোটামুটি সবই বললাম। রুদ্রপ্রসাদ সব শুনে হঠাৎ যেন চঞ্চল হয়ে পরলেন, হাতের আঙুলগুলো মট মট শব্দে ফাটাতে ফাটাতে অস্থিরভাবে ঘরের মধ্যে পায়চারী করা শুরু করলেন, একটু পরে আবার শান্ত হয়ে সোফায় বসে বললেন—’তোমার এই ব্যাপারটায় জড়িয়ে পড়ার কারণটা সবার আগে জানা দরকার ছিল, অন্য লোকের চাপিয়ে দেওয়া যে বোঝাটা এতদিন বয়ে চলেছ, এবারে নিজের চোখেই দ্যাখো তাতে ঠিক কি রয়েছে’! একটু থেমে রুদ্রপ্রসাদ বলা শুরু করলেন।

    ‘বিদেশের মাটিতে কাজে ব্যস্ত থাকলেও দেশের খবর আমি নিয়মিত রাখতাম। টিভিতে যখন দেখলাম নকশাল নেতা সমীরণ পুলিশের এনকাউন্টারে দলবল সমেত অক্কা পেয়েছে, বিচলিত হওয়ার প্রয়োজনবোধ করিনি, কিন্তু এরপর যখন জানতে পারলাম অস্বাভাবিকভাবে breed করা একটা বাচ্চা ছেলের মৃতদেহও একই জায়গা থেকে উদ্ধার হয়েছে, বিশ্রী একটা আশঙ্কায় মন দুলে উঠল। টিভিতে এরপর বলল ঘটনাস্থলে উপস্থিত সবাই মারা গেছে, খানিকটা নিশ্চিন্তবোধ করলাম, যদিও পরদিন ইন্টারনেটে কলকাতার কাগজ পরে জানতে পারলাম একজন এখনো বেঁচে আছে, হাসপাতালে লোকটির চিকিৎসা চলছে। আমি কলকাতায় আমার ভাই দেবুকে বলেছিলাম বিষয়টা যাচাই করে দেখতে, দেবু হাসপাতাল ঘুরে এসে জানাল, খবরটার মধ্যে কোনওরকম ভেজাল নেই, আমি একমুহূর্ত দেরি না করে দেশের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম, কয়েকটা দরকারি কাজ সারতে অনেকটা সময় খরচ হয়ে গেল, নাহলে অনেক আগেই তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করে ফেলতাম হয়তো। যাইহোক এবার কয়েকটা বছর পিছনে যাব, শুরু থেকেই বলছি, শুনলে সবকিছু স্পষ্ট হবে’। রুদ্রপ্রসাদ সামান্য থেমে যেন নিজের মনের মধ্যে কথা গুছিয়ে নিলেন তারপর শুরু করলেন।

    ‘বছর কুড়ির আগের ঘটনা,আমি সেসময় উড়িষ্যার কটক ইউনিভার্সিটির ভিজিটিং প্রফেসর, পড়াশোনার সঙ্গে অন্য কাজও অবশ্য ছিল। ভুবনেশ্বরের ষ্টেট মিউজিয়াম থেকে অনুরোধ করেছিল সম্প্রতি উদ্ধার হওয়া কয়েকটা তাম্রলিপির পাঠোদ্ধারের জন্য, শোনপুর জেলার বিখ্যাত সুবর্ণমেরু মন্দির থেকে চার কিলোমিটার দক্ষিণে একটা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আবিষ্কার হয়েছে, ইন্সক্রিপশনগুলো সেখান থেকেই এসেছে। মিউজিয়ামের নিয়ম অনুসারে আমাকে একটা বদ্ধ ঘরে লিপির পাঠ করতে হত, কাজ শেষ হলে আবার কিউরেটারের হাতে লিপিগুলো জমা দিয়ে তবেই বেরোতে পারতাম। একাজের জন্য সপ্তাহে তিনদিন আমাকে কটক থেকে ভুবনেশ্বর যাতায়াত করতে হত, ফাঁকে ফাঁকে কলেজের ক্লাস নেওয়াও অবশ্য চলছিল, সেখানেই আমার আলাপ হয়েছিল সমীরণ মাহাতো নামে একটি ছেলের সঙ্গে’।

    —’সমীরণ! মানে’?

    —হ্যাঁ, রুদ্র বললেন, এ সেই পরবর্তী কালের নকশাল নেতা সমীরণই বটে, ক্লাসভর্তি ছেলে-মেয়ের মধ্যে শ্যামলা রঙের চৌকস ছেলেটি আমার বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিয়েছিল, এত শার্প এতই মেধাবী, চাইলে অনায়াসে আই-আই-টি বা মেডিকেলে সুযোগ পেতে পারত কিন্তু জীবন নিয়ে তার চিন্তাধারা ভিন্ন প্রকৃতির হওয়ায় সে এই পথ বেছে নিয়েছে। সেইসময় আমি কলেজে পড়ানো আর তাম্রলিপির পাঠোদ্ধার করা ছাড়া অন্য একটা কাজেও হাত দিয়েছিলাম, উড়িষ্যার সোমবংশীয় রাজাদের ইতিহাস নিয়ে একটা গবেষণামূলক বই লিখছিলাম, সমীরণের উৎসাহ দেখে তাকে এই কাজে আমার সহকারী করে নিলাম, কিছুদিনের মধ্যেই সমীরণের কর্মক্ষমতার পরিচয় পেলাম, মহাফেজখানা, লাইব্রেরি ঘুরে ঘুরে প্রচুর বইপত্তর ঘেঁটে সঠিক সময়ে সঠিক নোটস জোগান দিয়ে আমার কাজ অনেকটাই সহজ করে দিয়েছিল, যদিও সত্যি কথা বলতে এরপরেই আমার বই লেখার উৎসাহে ভাঁটা পড়ল, কারণটা আর কিছু নয়, আমি লিপিগুলোর মর্মদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিলাম’! রুদ্রপ্রসাদ হঠাৎ থামলেন। ঘরের বন্ধ জানলার ধারে পেতলের প্রদীপগুলোর শিখা নিবু নিবু হয়ে এসেছিল, সেদিকে চেয়ে ভদ্রলোক উঠে একটা বোতল থেকে পরিমান মতো তেল ঢেলে দিতেই আগুন ফের উসকে উঠল। এবার রুদ্রপ্রসাদ আবার বলা শুরু করলেন।

    ‘তাম্রলিপিগুলোর পাঠোদ্ধার করে যা জানলাম তাতে আক্কেল গুড়ুম হওয়ার জোগাড় হল। ইতিহাসের এমন একটা চরিত্রের খোঁজ পেলাম যার কোথাও কোনও উল্লেখ নেই, অথচ তাকে সোমবংশীয়দের সঙ্গে রিলেট করা হচ্ছে, এই রাজাকে ছত্রে ছত্রে সাক্ষাৎ শয়তান বা মৃত্যুর দূতও বলা হয়েছে। তা ছাড়া এনার জীবনের সঙ্গে একটা রহস্যও জুড়েছিল, সে বিষয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত ওই লেখায় ছিল, নিজে ভালোমতো যাচাই না করে বিষয়টা তখুনি প্রকাশ করতে চাইছিলাম না, তা ছাড়া অন্য একটা ব্যাপারও ছিল, একটা উপবিদ্যার ইঙ্গিত, তাই মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাপারটা না ভেঙে নিজেই সবকিছু তলিয়ে দেখব ঠিক করলাম। রহস্যের প্রাথমিক গ্রন্থিটা হাতে এলেও মূল উৎস কিন্তু ইঙ্গিত করছিল জঙ্গলের মধ্যে একটা বিশেষ জায়গায়। হাজার বছর আগের সে জঙ্গল এখন আর আছে কি না সেটাও একটা প্রশ্ন ছিল। অনেক হিসেব-নিকেশ করে প্রচুর মাথা খাটিয়ে একটা ধারণায় পৌঁছোনো গেল, লিপিতে বর্ণিত সেই বনাঞ্চলের কিছুটা অংশ এখনো টিকে আছে, আজকের দিনে যেটা খুব সম্ভবত ঢেঙ্কানলের জঙ্গলে আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলের অংশ। ওই এলাকায় ভগীরথপুর গ্রামে একটা মন্দির আছে, মন্দিরটা চণ্ডমন্দির নামে খ্যাত, এই চণ্ড আর লিপির উল্লিখিত চণ্ড অভিন্ন বলেই আমার মনে হল, একবার ওখানে যেতে পারলে হয়তো রহস্যের চাবিকাঠি খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। যদিও অনুসন্ধান করে জানতে পারলাম আদিবাসীদের সেই মন্দিরে বাইরের লোকের প্রবেশ নিষিদ্ধ। স্থানীয়দের চোখ এড়িয়ে গোপনে প্রবেশ করার চিন্তাটা মাথায় ঘুরছিল কিন্তু নিজে গিয়ে ঘুরে দেখেশুনে যা বুঝলাম সে চেষ্টা করা বাতুলতা মাত্র, ধরা পড়লে আদিবাসীদের হাতে পিতৃদত্ত প্রাণটা খোয়া যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা, অতএব ও পরিকল্পনা বাতিল করতে হল। এরপর প্রচুর চেষ্টা করে, প্রশাসনের কিছু কর্তার সঙ্গে যোগাযোগ কাজে লাগিয়েও তিলমাত্র সুরাহা করা গেল না, আদিবাসীদের ধর্মীয় ভাবাবেগের ব্যাপারটা তো ছিলই তা ছাড়া ওই অঞ্চলটা নকশাল বেল্ট বলে কুখ্যাত, কাজে কাজেই কোথাও থেকে কোনওরকম সাহায্যের আশ্বাসই আমি পেলাম না। আমার সত্যান্বেষণ সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে এই পয়েন্টে এসে থমকে গেল। বলা বাহুল্য প্রচণ্ড হতাশ হয়ে পড়েছিলাম, কোনও কাজেই আর মন লাগছিল না। বই লেখা তো আগেই মাথায় উঠেছে, এবারে নানা অছিলায় ক্লাসও ফাঁকি দিতে শুরু করলাম। সমীরণ কয়েকদিন ধরেই আমার অমনোযোগ লক্ষ করছিল, একদিন সে আমাকে ধরে বসল, আমার অন্যমনস্কতার কারণ জানতে চাইল। আমি সমীরণকে ইতিমধ্যে স্নেহের চোখে দেখতে শুরু করেছি, তা ছাড়া ছেলেটি খুবই বুদ্ধিমান, ভরসা করা যেতেই পারে, দ্বিধা ঝেড়ে ওকে সবকিছু খুলে বললাম। সমীরণ আমার সব কথা মন দিয়ে শুনল তারপর বলল এই বিষয়টা ওর উপর ছেড়ে দিতে।

    এরপর কয়েকটা দিন কেটে গেল, আমি গবেষণার আশা একপ্রকার ছেড়েই দিয়েছি, এমন সময় সমীরণ জানাল ব্যবস্থা নাকি হয়ে গেছে, শর্ত শুধু একটাই কি করে বন্দোবস্ত হল সে নিয়ে প্রশ্ন করা চলবে না। আমি সানন্দে রাজি হয়ে গেলাম, ফল খাওয়া নিয়েই দরকার, গাছের খোঁজ করা আমার কাজ নয়। সেটা বোধহয় ফাল্গুন মাসের একটা শনিবার হবে, আদিবাসীরা সেদিন মেতেছিল এলাকার কোনও গ্রাম্য মেলায়, এমনিতেই এই মন্দিরে বড় কেউ আসেনা সেদিন তো এলাকাটা আরও শুনশান হয়েই ছিল। মন্দিরের বুড়ো পুরোহিতকে সমীরণ কিভাবে সামলেছিল জানি না কিন্তু সে আমাদের দুজনকে গোপনে মন্দিরে প্রবেশের সুযোগ করে দিয়েছিল, সমীরণের ব্যবস্থামতো গাড়িটা গ্রাম থেকে অনেক দূরে এক জায়গায় রেখে আমরা দুপুর নাগাদ ওই মন্দিরে গিয়ে হাজির হলাম, ক্যামেরা, ফ্ল্যাসলাইট সব কাঁধে ঝোলানো ব্যাগের মধ্যে নিয়ে আমরা মন্দিরের ভিতরে ঢুকলাম। মন্দিরের গর্ভগৃহে জমাটি অন্ধকার, দিনের বেলাতেও সূর্যের আলো ঢোকেই না বলতে গেলে। কি ভীষণ বিশ্রী দুর্গন্ধময় সে পরিবেশ, মেঝেতে শুকিয়ে যাওয়া চাপ রক্তের আস্তরণ আর যেখানে-সেখানে ছড়ানো-ছিটানো পশুদের চামড়ার টুকরো, হাড়, চণ্ড রাজার একহাত লম্বা মূর্তিটা দেখে যে সাধারণ গেরস্থদের পিলে চমকে উঠবে তা বলাই বাহুল্য। ‘তবে এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন আমার নেই, হাতে সময় অত্যন্ত কম, আমি মন্দিরের ভিতরের দেওয়ালে সুরকি দিয়ে গাঁথা শিলালিপিগুলোর ফটো তুলতে শুরু করে দিলাম। সমীরণ ফ্ল্যাসলাইটের আলো ফেলে কাজে সাহায্য করতে লাগল। বেদির পিছনে শিলালিপির টুকরো ঢাই হয়ে পরেছিল সেগুলি তুলে ঝোলায় পুরে ফেললাম, পরে বুঝেশুনে জুড়ে নিলেই হবে’।

    ১৬

    এতোটা বলে রুদ্রপ্রসাদ একটু থামলেন, তারপরে কফির পেয়ালায় চুমুক দিয়ে বললেন —’পরের কয়েকটা দিন আমি মেতে উঠলাম ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শিলালিপির টুকরো গুলোকে সঠিক ক্রমানুযায়ী জুড়ে খন্ডচিত্র-টাকে একটা স্পষ্ট রুপ দেওয়ার চেষ্টায়, সারাদিন কলেজের কাজে ব্যাস্ত থাকার পর সন্ধ্যে হলে কোয়ার্টারে আমার ঘরের দরজা, জানলা বন্ধ করে এই কাজ চলত, একাজে সমীরণও আমার সাথে হাত লাগাত, অনেক রাত অবধি কাজ করার পর ভোরের দিকে আমরা কয়েক ঘন্টা ঘুমিয়ে নিতাম, হাজার বছর অযত্নে পরে থাকার ফলে লিপির অনেকটাই নষ্ট হয়ে গেছিল, তবে যেটুকু উদ্ধার করা গেছিল তাতেই ইতিহাসে লুকিয়ে রাখা একটা অধ্যায়র ওপর থেকে পলি সরে গেল। লিপিগুলো সোমবংশীয় শাসক প্রথম জন্মেজয়ের সময়কালের, খুব সম্ভবত ৯০০ খ্রিস্টাব্দের আশেপাশে। এতে শিবদত্ত নামে একজন রাজার বিষয়ে উল্লেখ করা রয়েছে, আমার বইয়ে তুমি এর সম্মন্দে পড়েছ তবে সেটা জাস্ট ফ্র্যাকসান অফ দি ইন্সিডেন্ট, আসল বিষয়টা লেখা অনুচিত বিবেচনা করে এড়িয়ে গেছিলাম। যাইহোক মোদ্দা কথায় আসি, শিবদত্তের সঙ্গে গভীর জঙ্গলের মধ্যে একজন সাধুর আলাপ পরিচয় ঘটল, সাধুর অলৌকিক শক্তির পরিচয় পেয়ে সম্রাট তাকে নিজের রাজধানী সুবর্নপুরে এনে হাজির করলেন, রাজার সেসময় রীতিমতো কোনঠাসা অবস্থা, ঘরে বাইরে শত্রুদের মোকাবিলা করতে করতে পায়ের তলার জমি একটু একটু করে সরে যেতে বসেছে। সাধু বলভদ্র রাজাকে ভাগ্য পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিলেন, বিনিময়ে রাজা প্রাসাদ সংলগ্ন জমিতে বিশাল চণ্ডমন্দির গড়ে দিলেন, এখানে অবশ্য আপত্তি এলো রাজপরিবারের ভিতর থেকেই, বিশেষ করে রাজগুরু অনঙ্গদেব যাকে তাম্রলিপিতে বর্ণনা করা হয়েছে মহাজ্ঞানী রুপে তিনি এই বিদ্যা সাধনের ক্ষতিকারক দিকটা রাজাকে বোঝাবার চেষ্টা করেছিলেন, যদিও ওসব আপ্তবাক্যে কান দেবার মতো সদিচ্ছা সম্রাটের সেসময় একদমই ছিল না। অনঙ্গদেব ক্রমশ সম্রাটের বিষনজরে পরে যাচ্ছিলেন শেষে এমন একটা দিন এলো যখন বলভদ্রের মন্ত্রণায় রাজা শিবদত্ত গুরুর মৃত্যুদণ্ডের আদেশ জারি করলেন, অনঙ্গদেবের মুণ্ডচ্ছেদ করে জঙ্গলের মধ্যে পুতে দেওয়া হল, অনঙ্গদেব অবশ্য বুদ্ধিমান ব্যাক্তি ছিলেন, আগেভাগেই রাজার মতিগতি আঁচ করে ফেলেছিলেন, তাই সময় থাকতেই দরকারি কাজটা সেরে ফেললেন, চণ্ড বিনাশ পদ্ধতি একটা পুঁথিতে বিশদে লিপিবদ্ধ করে নিজের বিশ্বস্ত লোকের হাত দিয়ে তাঁর অন্যতম শিষ্য নেপাল রাজের দরবারে পাঠিয়ে দিলেন, সেই পুঁথি কিন্তু এখনো আজকের দিনেও নেপালরাজের ভল্টে রাখা আছে, আমি নিজে গিয়ে সেটা স্টাডি করে এসেছি, যদিও পুঁথির কিছুটা অংশ যত্নের অভাবে নষ্ট হয়ে গেছে তাহলেও চণ্ডের মোকাবিলা করার অন্তত একটা রাস্তা খুঁজে পাওয়া গেছে। যাইহোক অনঙ্গদেবের মৃত্যুর পর রাজার কাজে বাঁধা দেওয়ার মতো আর কেউ রইল না, এবার বলভদ্রের পরামর্শে রাজ পরিবারের একটি শিশুকে বলপুর্বক চণ্ড মন্দিরের অন্ধকার কুঠুরির খাঁচার মধ্যে বন্দি করে রাখা হল, বলভদ্র ছাড়া আর কারও অধিকার রইল না ছেলেটির কাছে যাবার। শিশুটি জীবনে না শুনল স্নেহভরা মিষ্টি আদরের কোন ডাক, না পেল মমতার একফোঁটা ছোঁয়া, সে শুধু দেখল বলভদ্রের রুক্ষ নির্দয় মুখ, একসময় ছেলেটির বয়স সাত পুর্ন হতে তাকে চণ্ডের উদ্দেশ্যে বলি দিয়ে রাজা শিবদত্ত চণ্ডের শক্তির অধিকারী হলেন। পরবর্তি সময়ে শিবদত্তের পরাক্রমে সমগ্র পুর্ব এবং মধ্য ভারত কেঁপে উঠেছিল। বিরুদ্ধ সব শক্তিকে পরাস্ত করে রাজা ক্ষমতার মিনারে প্রতিষ্ঠিত হলেন। প্রতিবেশী রাজ্যের শাসকরা বশ্যতা স্বীকার করে কোনোক্রমে মাথা বাচাল। অহঙ্কারে মত্ত শিবদত্তের উগ্রতার পরিমান দিন দিন বেড়েই চলেছিল, মতের সামান্য অমিলও দমন হতো অতি কঠোর শাসনে, খেয়াল খুশিমতো নির্দয় অত্যাচার চলত প্রজাদের ওপর, পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছিল বলভদ্রের দৌরাত্ম্য, নিজের সামনে অন্য কাউকে সে মনুষ্যপদবাচ্য বলেই গণ্য করত না। শিবদত্তের শাসনের জাঁতাকলে পরে ধনি-দরিদ্র, রাজা-প্রজা সকলের নাভিশ্বাস উঠতে আর বাকি ছিল না। একদিন হঠাৎ এই শিবদত্তের মৃত্যু ঘটল। এরপর যতটুকু জানা গেছে রাজপদের অধিকারী হলেন জন্মেজয়, প্রথম কাজ যেটা তিনি করেছিলেন, তা ওই বলভদ্রকে খতম করা, পরপরই চণ্ডমন্দির ধ্বংস করে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হল। তবে চণ্ডের প্রাণপ্রতিষ্ঠা করা শিলাটিকে নষ্ট করার সাহস বোধহয় সম্রাটের হয়নি। সেই পাথর আর এই ঘটনার যাবতীয় বিবরণ শিলালিপিতে অঙ্কিত করে ভগিরথপুরের আদি মন্দিরে পাঠিয়ে দেওয়া হল যেখান থেকে একদিন সেটা এই রাজধানীতে এসেছিল। এরপর প্রায় এগারশ বছরের পলি জমে ইতিহাসের পাতা থেকে রাজা শিবদত্ত আর তার আরাধ্য দুটোই যে কখন মুছে গেল, সে খোঁজ আর কেউ রাখেনি’।

    আমি এতক্ষণ মন দিয়ে শুনছিলাম, এবার বললাম —’বেশ ইন্টারেস্টিং সন্দেহ নেই, কিন্তু এই চণ্ডটি আবার কেমন দেবতা? আগে তো কখনো শুনেছি মনে পরছে না’। রুদ্রপ্রসাদ বললেন —’হিন্দু দেবতা নন, তিব্বতি বৌদ্ধ বা ওইধরনের কিছু, উঁহুঃ ইনি তাও নন, যতদূর বোঝা গেছে ইনি একেবারেই অনার্য, ভারতবর্ষে আর্যদের আগমনের পুর্বেই এর উৎপত্তি, আর্য সভ্যতার প্রভাবে আদিম বাসিন্দাদের ধর্ম আর সংস্কৃতির অনেকটাই বিস্মৃতির অন্ধকারে বিলুপ্ত হয়েছে, কিন্তু আজকের দিনেও এক শ্রেণীর আদিবাসীরা চণ্ডকে দেবতা বলে মান্য করে, তবে এই দেবতার প্রকৃতি কিন্তু সাত্ত্বিক নয় উল্টে ঘোর তামসীক, আদিবাসীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, চণ্ড হলেন নরকের অবিসংবাদী রাজা যিনি পৃথিবী আর নরকের মাঝের দরজাটাকে নিজের শক্তির দ্বারা বন্ধ রাখেন। দেবতাটির রক্তপিপাসা লাগামছাড়া, একবার এর জাগরণ হলে অসংখ্য মানুষের দুর্দশার কারন হতে বাধ্য, এর উপস্থিতির কুপ্রভাবে ব্যাধি, মৃত্যু হিংস্রতার বৃদ্ধি আর মনুষত্যের নাশ অবশ্যম্ভাবী। আজকের দিনে চণ্ডের সম্মন্দে খুব বেশি কিছু জানার উপায় আর নেই, তবে কয়েকটা শিলাচিত্র দেখে বুঝেছি দেবতাটি কিছু কিছু ছোট প্রাণীর ওপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করতে পারেন, যেমন ইঁদুর, মাকড়শা, আশা করি ইঁদুরের অস্বাভাবিক আচরণের কারনটা বুঝতে পারছ’।

    রুদ্রপ্রসাদ কফির কাপে চুমুক দিয়ে বললেন —’চণ্ড সাধারণত নিজের নরকের গণ্ডিতেই আবদ্ধ থাকে যতক্ষণ না কোন সাধক বিশেষ ক্রিয়ার মাধ্যমে তার উত্থানের ব্যাবস্থাটা পাকাপোক্ত করে ফেলছেন। নির্দিষ্ট পক্রিয়ার মাধ্যমে বিশেষ বলি নিবেদন করে কেউ তাকে আহ্বান করলে চণ্ড বায়ুমণ্ডলে নেমে এসে সেই সাধকের দেহে ভর করেন, চণ্ডের শক্তিতে বলিয়ান আহ্বানকারি সম্রাট তুল্য প্রতিপত্তি লাভ করেন, এই পৃথিবীর বুকে এমন কোন মানুষ নেই যে চণ্ডাশ্রিত ব্যাক্তির সামনে ঝুঁকতে বাধ্য হবেন না। কিন্তু আসল ঘটনাটা একটু অন্যরকম, এখানে সাধু বলভদ্র রাজা শিবদত্তকে পুরো সত্যটা বোধহয় বলেননি, বললে নিশ্চয়ই শিবদত্ত এই প্রস্তাবে সারা দিতেন না। চণ্ডের প্রবল সত্ত্বায় ধীরে ধীরে আবিষ্ট ব্যাক্তির নিজস্ব সত্ত্বা বিলোপ পেতে থাকে, একসময় সে পুরোপুরি চণ্ডের হাতের পুতুলে পরিণত হয়ে পরে। কখনো সখনো চেতনা ফিরত এলে সেই ব্যাক্তি উন্মাদের মতো আচরণ করতে বাধ্য। শিলালিপিতে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে শিবদত্ত মাঝে মধ্যে উন্মত্তের মতো আচরণ করতেন, অনেক সময় হয়ত নিজেকেই আহত করে ফেলতেন, সভাসদদের বলতেন তাকে হত্যা করতে কিন্তু ঘোর কেটে যেতেই ফের দেখা যেত সেই দুর্দান্ত পরাক্রমশালী সম্রাটকে। এখন কোনটা যে ঘোর আর কোনটা সচেতন অবস্থা তার উত্তর দেবার মতো আর কেউ নেই’।

    এতোটা শোনার পর আমি আর না বলে পারলাম না —’তা সমীরণের মতো বুদ্ধিমান লোক কি জেনেশুনেই নিজেকে চণ্ডের হাতে তুলে দিতে চেয়েছিল’? রুদ্রপ্রসাদের ঠোঁটের কোনে মুচকি হাঁসি খেলে গেল, বললেন —’এমন অনেক বিষয়ই ছিল যা ও জানত না, জানার সুযোগ পায়নি, সে অন্য কাহিনী, তোমাকে বলছি শোন, আমাদের রিসার্চ চলাকালীন হঠাৎ ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে একটা গোলমাল বাধে, কিছু ছাত্র প্রিন্সিপালকে বেদম মারধোর করে, ফলস্বরুপ পুলিস বিদ্রোহী ছাত্রদের গ্রেফতার করে, যার মধ্যে সমীরণও ছিল। দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় সমীরণকে ইউনিভার্সিটি থেকে রাসটিকেট করা হয়, এই ঘটনার ফলে সমীরণের প্রতি আমার মোহভঙ্গ ঘটে, যদিও সত্যি কথা বলতে কি ওর অভাব হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলাম, এমন করিতকর্মা সহকারী চাইলেই মেলে না। এর কিছুদিন পরে আমি কটকের কাজ সেরে কলকাতায় ফিরি। সঙ্গে করে নিয়ে আসি চণ্ডমন্দির থেকে সংগ্রহ করা শিলালিপি গুলো। আর হ্যা ততদিন আর্কেওলজিকাল ডিপার্টমেন্টকে জানিয়ে দিয়েছি ওই লিপির পাঠোদ্ধার আমাকে দিয়ে হবে না, কালের গর্ভে যা হারিয়ে গেছে সেটাকে নতুন করে জাগিয়ে তুলে কারও কোন উপকার হবে অন্তত আমার মনে হয়নি’।

    ১৭

    রুদ্রপ্রসাদ সামান্য একটু বিরতি নিয়ে বললেন—’এরপর দেখতে দেখতে প্রায় দশটা বছর কেটে গেল, সোমবংশীয়দের উপর আমার লেখা বইটার প্রথম এডিশনের পর দ্বিতীয় এডিশন বাজারে চলে এসেছে, আর কটকের স্মৃতিও ততদিনে আমার মন থেকে অনেকটাই ফিকে হয়ে পড়েছে, প্রতিদিনের মতো সেদিনেও কলেজ থেকে ফিরে স্নান সেরে পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম, তখন রাত আটটা কি সাড়ে আটটা হবে, দারোয়ান কিশোরীলাল এসে জানাল, কেউ একজন আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে, সাধারণত অ্যাপয়েন্টমেন্ট না থাকলে বাড়িতে আমি দেখা সাক্ষাত করি না, বিরক্ত হয়ে আগুন্তুককে ভাগিয়ে দেওয়ার কথাই বলতেই যাচ্ছিলাম, কিন্তু কিশোরীলালের হাতে ধরা চিরকুটে লেখা নামটায় চোখ আটকে গেল, ‘সমীরণ মাহাতো’। পুরোনো স্মৃতি তাজা হয়ে উঠল, তা ছাড়া সমীরণকে যে একবার দেখেছে সে বোধহয় জীবনে আর ভুলতে পারবে না, আমি কৌতূহলী হয়ে নীচে চলে এলাম, দেখলাম সমীরণই বটে, গায়ে সামান্য মেদ জমা ছাড়া চেহারার বিশেষ পরিবর্তন ঘটেনি। ওকে সোজা এনে বসালাম এই ঘরে, ঠিক ওই কাউচটাতেই এসে বসল যেখানে এখন তুমি বসে আছো। সমীরণ জানাল ইউনিভার্সিটি থেকে বিতারনের পর সে আর পড়াশোনা করার সুযোগ পায়নি, সেদিন গণ্ডগোলের সময় যা কিছু ঘটেছিল তা ক্ষণিকের উত্তেজনায় হয়ে গেছিল, সে আক্ষেপ তার জীবনভর থাকবে, ও আরও জানাল রাজনীতির সঙ্গে সমস্ত সংশ্রব ত্যাগ করে এখন পারিবারিক ব্যবসায় হাত লাগিয়েছে। এরপর সমীরণ হাতের ব্যাগ থেকে একটা বই বের করে টেবিলে রাখল, আমার লেখা সেই বইয়ের একটা কপি গতকাল তুমি পড়েছ, যাইহোক আমাদের মধ্যে ইতিহাস নিয়ে আড্ডা জমে উঠতে দেরি হল না, দেখে খুশি হলাম এত কিছুর পরেও সমীরণের হিস্ট্রির প্রতি আগ্রহ আগের মতোই রয়ে গেছে। কথায় কথায় সমীরণ জিগ্যেস করল, আমি কি সত্যিই বিশ্বাস করি রাজা শিবদত্ত আর চণ্ডদেবের কাহিনিটা নির্ভুল নাকি এর মধ্যে কোনও গোঁজামিল থাকতে পারে, আমি জোর গলায় বললাম, এর মধ্যে কোনও সন্দেহই থাকতে পারে না যে ঘটনাটা ঘটেছিল, অন্যথায় এত প্রাচীন শিলালিপিতে ঘটা করে এসবের উল্লেখ থাকত না, এরপর যে কাজটা আমি করলাম সেটার জন্য আমার আপশোস জীবনের শেষদিন পর্যন্ত থাকবে, আমার ব্যাক্তিগত সংগ্রহে থাকা দুটো শিলালিপি আলমাড়ি থেকে বের করে সমীরণকে দেখালাম, শিলালিপি গুলো অবশ্য সমীরণের সাহায্যেই উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল ভগীরথপুরের মন্দির থেকে। মন খুলে সেদিন সমীরণের সঙ্গে আলোচনা করেছিলাম চণ্ড পক্রিয়া সম্মন্দে, কোন বিষয় বাদ গেলে সমীরণ জিগ্যেস করে নিচ্ছিল, আমিও খুশি মনে জবাব দিতে কসুর করিনি, সমীরণের সাহায্য ছাড়া এই প্রোজেক্ট কখনই শেষ করতে পারতাম না, সুতরাং তার কিছুটা অধিকার নিশ্চয়ই রয়েছে বিষয়টা জানার, তাছাড়া যে কাজের পিছনে এতোটা শ্রম আর সময় ব্যায় করেছিলাম অন্তত একজন মানুষের সামনে হলেও তার সাফল্য প্রকাশ তো হল, কেউ একজন তো রুদ্রপ্রসাদ মিত্রের এলেম কিছুটা টের পেল। নিজের ঢাঁক নিজে পিটিয়ে যে বোকামো করে ফেলেছি সেটা টের পেতে দেরি হল না। আমাকে অবাক করে সমীরণ শিলালিপি গুলো দাবী করে বসল, সেগুলো নাকি সে কটকের মিউজিয়ামে জমা করবে। ধাক্কা সামলে আমি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিলাম সেটা করার হলে আমি নিজেই করতে পারতাম, এসব গুহ্য জিনিস লোকচক্ষে প্রদর্শন করা ঘোরতর অনুচিৎ। লিপির মর্মোদ্ধার করে যদি কেউ ওই শক্তিকে জাগিয়ে তোলে তাহলে যে বিপর্যয় নেমে আসবে তার দ্বায়িত্ত্ব কে নেবে? সমীরণ এবার অমার্জিত স্বরে বলল যে এই শিলালিপি গুলো ওড়িশার ঐতিহাসিক সম্পদ এবং এর সম্পুর্ন স্বত্ব একমাত্র ভূমিপুত্রদেরই হতে পারে, কলকাতায় বসে থাকা একটা বাঙালির কোন অধিকার নেই এসব জিনিস নিজের কুক্ষিগত করে রাখার। আমি জবাবে বললাম, শিলালিপি তো দেবই না, উল্টে নষ্ট করে দেব, লিপির রহস্য আমার সাথেই চলে যাবে। এরপর আরও কিছু উত্তপ্ত কথা কাটাকাটির পর সেরাত্রে সমীরণ বিদায় নিয়েছিল, এককালের প্রিয় ছাত্রের দুর্ব্যাবহারে মনে এমন দাগ পড়ে গেল, যে সিদ্ধান্তই নিয়ে বসলাম ভবিষ্যতে ছেলেটাকে আর কখনো প্রশ্রয় দেব না, তবে আমার বোধোদয়ের অবশ্য কিঞ্চিৎ বাকি ছিল! যেটা ঘটল পরদিন বিকেলে।

    কলেজ শেষ করে যথারীতি বাড়ি ফিরছি দেখলাম একটা পুলিসের ভ্যান আমাদের গেটের সামনে দাড়িয়ে রয়েছে! একজন উর্দিধারি অফিসারের সঙ্গে কিশোরীলাল কথা বলছিল, আমি স্বপ্রশ্ন দৃষ্টিতে এগিয়ে যেতে ও আমাকে দেখিয়ে ভদ্রলোককে বলল —’ইনিই আমাদের বাবুজি আছেন’। অফিসার আমার দিকে ফিরে অত্যন্ত রুক্ষস্বরে বললেন —’আপনিই রুদ্রপ্রসাদ মিত্র’?

    —’হ্যা, কি ব্যাপার’?

    —’চলুন আমার সঙ্গে’।

    —’কোথায়’?

    —সেটা গেলেই দেখতে পাবেন। লোকটার কথা বলার ধরনে অবশ্য ভদ্রতার লেশমাত্রও ছিল না।

    —’কি হয়েছে’?

    —’ভদ্রভাবে যাবে নাকি কলার ধরে গাড়িতে তুলব’? লোকটা দেখলাম আপনি থেকে তুমিতে নামতে সময় নিল না। পুলিস কর্মচারীটির সঙ্গে আরও কিছু সময় ধরে তীব্র বাদানুবাদ চলল, লোকটা দেখলাম কোনও কথাই কানে তুলতে রাজি নয়, হঠাৎ কেন যে আমাকে থানায় হাজিরা দিতে হবে সে বিষয়েও স্পষ্ট করে বলতে তার ভীষণ আপত্তি, এদিকে আশেপাশের বাড়ির বারান্দাগুলোতে ততক্ষণে প্রতিবেশীদের ভিড় জমা হতে শুরু করে দিয়েছে। এই রেনি পার্ক অঞ্চলে আমরা দীর্ঘদিনের বাসিন্দা, পুলিশের দারোগাটি যদি কোনও বাড়াবাড়ি করে বসে তা হলে পাড়ায় হাস্যস্পদ হতে দেরি হবে না, দেবুকে খবর দিতে বলে ঘোর অনিচ্ছাসত্ত্বেও প্রিজন ভ্যানে উঠে বসলাম, একজন সেপাই মুখের উপর দরজাটা বন্ধ করে তালা ঝুলিয়ে দিল। বদ্ধ ভ্যানে হতবুদ্ধির মতো বসে রইলাম, কলকাতা শহরের বুকে আমার সঙ্গে এমন কিছু যে ঘটতে পারে তা অকল্পনীয়! গাড়ি পার্কসার্কাস মৌলালি হয়ে থামল সোজা লালবাজারে। এখানে আমার ঠাই হল সেন্ট্রাল লক-আপে, কিছু মার্কামারা ক্রিমিনালের সঙ্গে একই গারদের চার দেওয়ালের মধ্যিখানে, অবশ্য তখনও পর্যন্ত আমি যে অন্ধকারে ছিলাম সেই অন্ধকারেই রয়েছি, যতবারই এভাবে আটক করার কারণ জিগ্যেস করেছি, জবাবে গালাগাল খেয়েছি। ভরসা একটাই কিশোরীলাল এতক্ষণে নিশ্চয়ই দেবুর সঙ্গে যোগাযোগ করে পুরো ঘটনা জানিয়ে দিয়েছে, আর খবর পেলে দেবু ব্যবস্থা নিতে দেরি করবে না, সেটা জানি। ব্যবস্থা অবশ্য হল এবং তাড়াতাড়িই, যে সেপাইটা একটু আগে আমাকে বিশ্রী গালমন্দ করেছিল সেই লোকটাই বিনয়ের অবতারের মতো গারদের দরজা খুলে বলল —’স্যার আপনাকে ডাকছেন’। সেপাইয়ের পিছন পিছন গিয়ে একেবারে গোয়েন্দা বিভাগের প্রধানের ঘরে হাজির হলাম। ভদ্রলোক উঠে দাড়িয়ে বললেন—’ছিঃ ছিঃ কি বিশ্রী ব্যাপার ঘটে গেল বলুন তো? আপনার মতো মানুষকে এভাবে হেনস্থা হতে হল, প্রদীপ তুমি জানো ইনি একজন খ্যাতনামা হিস্টোরিয়ান, তা ছাড়া বিখ্যাত কার্ডিওলজিস্ট ডাক্তার দেবপ্রসাদ মিত্রের দাদা, হোম সেক্রেটারি নিজে ফোন করে রিকোয়েস্ট করেছেন যেন এনার সঙ্গে সবরকম সহযোগিতা করা হয়। প্রদীপ দাস সেই অফিসারটার নাম যে আমাকে বাড়ি থেকে ধরে এনেছে, আরও একজন অফিসারের সঙ্গে ভদ্রলোক ডিসির টেবিলের অন্য প্রান্তের চেয়ারে বসেছিল। লোকটা চোয়াড়ের মতো ঘাড় গোঁজ করে বসে রইল, বুঝলাম হাতের শিকার ফসকে যাওয়াটা এর বিশেষ পছন্দ হয়নি। অ্যাথলেটের মতো চেহারার অল্পবয়েসি অন্য যে অফিসার এই ঘরে বসেছিল, সে এসে চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বলল—’বসুন’। ধপাস করে বসে বললাম—’আপনাদের এই অদ্ভুত আচরণের মানে কিন্তু এখনও বুঝতে পাচ্ছি না’? অল্পবয়েসি অফিসারটা যার নাম বলল প্রসূন রায়, পালটা প্রশ্ন করল—’কাল সন্ধে সাতটা থেকে রাত সাড়ে ন-টা পর্যন্ত আপনি কোথায় ছিলেন’।

    —’বাড়িতে, আবার কোথায়’?

    —’কি করছিলেন’?

    —’সামনের মাসে একটা কনফারেন্স আছে হায়দ্রাবাদে, তার স্পিচ রেডি করছিলাম’। প্রসূন তীক্ষ্ন স্বরে বলল—’আর কিছু ঘটেনি’?

    —’আমার একজন এক্স স্টুডেন্ট দেখা করতে এসেছিল, তার সঙ্গে কথা বলেছি’।

    —’স্টুডেন্টের নাম’?

    —’সমীরণ, সমীরণ মাহাতো’।

    —’সমীরণ এখন কোথায় আছে, জানেন’?

    —’সেটা আমি জানব কিভাবে, সে তো আমাকে বলে যায়নি’। পরের পনেরো মিনিট প্রসূন নানারকম প্রশ্ন করল, যার সবটাই সমীরণকে কেন্দ্র করে। সমীরণের গতিবিধি সম্পর্কে বাস্তবিকই কোনও ধারণা ছিল না তাই কোনও প্রশ্নেরই সোজা উত্তর দিতে পারলাম না। পুলিশের মুখে সেদিন সমীরণের বিষয় যা শুনলাম তাতে মাথা ঘুরে যাওয়ার জোগাড় হল, আমার একসময়ের প্রিয় ছাত্র সমীরণ মাহাতো এখন পুলিশের খাতায় একজন মোস্ট ওয়ান্টেড ক্রিমিনাল, নকশাল আন্দোলনের প্রথম সাড়ির নেতা, ইতিমধ্যে খুনজখম, দেশদ্রোহিতার প্রচুর অভিযোগ ওর বিরুদ্ধে রুজু হয়েছে, চারটে রাজ্যের পুলিস নাকি ওর উৎপাতে তটস্থ। ডিসি বললেন—’আমাদের সোর্স ঠিক সময়ে ইনফরমেশন কালেক্ট করতে পারেনি, ডিলে হওয়ার আরও কারণ, এগজ্যাক্ট কোনও বাড়িটায় ভিজিট করেছিল সেটা নিয়ে আননেসেসারি কনফিউশান তৈরি হয়েছিল, অবশেষে যতক্ষণে লোকেট করতে পারলাম সমীরণ হাত থেকে ফস্কে গেছে, তবে যাবে কোথায়, সর্বত্র চেকিং চলছে, যেখানেই ঘাপটি মেরে বসে থাকুক না কেন, পুলিশ ঠিকই খুঁজে বের করবে’। প্রদীপ দাস রাগে গজগজ করতে করতে বলল—’আর যারা বাস্টার্ডটাকে সাহায্য করছে তাদের কপালেও কিন্তু দুঃখ আছে’। মনে হল ইঙ্গিতটা যেন আমার দিকেই। ডিসি মৃদু ধমক দিয়ে বললেন—’আঃ প্রদীপ, আমাদের হাতে কোনও প্রমাণ নেই খেয়াল রেখো’। এরপর পুলিস আরও দু-চারটে অবান্তর প্রশ্ন করল, যার সঙ্গে আমার কোনও যোগসূত্রই নেই। উপর মহলের চাপ ছিল বলেই বোধহয় মনে সন্দেহ পুষেও শেষ পর্যন্ত পুলিস আমাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল। পরের দিন থেকেই টের পেলাম কিছু লোক আমাকে সর্বক্ষণ ফলো করে চলেছে, বুঝলাম পুলিস আমাকে নজরে রেখেছে, তাতে অবশ্য আমার উদ্বেগের কিছু নেই, কিন্তু অন্য একটা দুশ্চিন্তা ততক্ষণে আমাকে গিলে খেতে শুরু করেছে, প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে সমীরণ কীসের জন্য বালিগঞ্জের মতো জায়গায় হাজির হয়েছিল, অনেক ভেবে চিনতে যেটা মাথায় এল তাতে শরীরের রক্ত হিম হয়ে এল, সমীরণ নির্ঘাৎ চণ্ডের উত্থানের পরিকল্পনা নিয়েছে। শিলালিপিগুলো অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার হওয়া থেকে বাঁচানোর একটাই উপায় মাথায় এল, আমি আর দেরি করলাম না, আলমারি থেকে ওগুলো বের করে ভেঙে গুড়িয়ে ফেললাম, তারপর সেই ভাঙা পাথরের টুকরো বস্তায় পুরে জঞ্জালের ভ্যাটে ফেলে দিয়ে এলাম। রুদ্রপ্রসাদ এতটা বলে এবারে একটু থামলেন, পেয়ালায় চুমুক দিয়ে বুঝলাম কফি ঠান্ডা হয়ে গেছে, গলা খাকড়ে জিগ্যেস করলাম—’কিন্তু এর পরেও ত্রিলোচনের কাছে প্রণালিটা পৌঁছোল কিভাবে’? উত্তরে রুদ্রপ্রসাদ ম্লানভাবে হাসলেন, বললেন—’ইংলিশ ডিকশনারিতে ফটোগ্রাফিক মেমোরি বলে একটা শব্দ আছে শুনেছ হয়ত! লক্ষ্য লক্ষ্য মানুষের মধ্যে একজন দুজনের এমন শক্তিশালী মস্তিষ্ক থাকে, সমীরণ ছিল সেই বিরল প্রজাতির মানুষদের মধ্যে একজন, ও যদি সৃষ্টির পথে চলত তাহলে হয়ত ওর মধ্যে আমরা একজন অসামান্য প্রতিভাধর ব্যাক্তিত্বের খোঁজ পেতাম কিন্তু ও ধ্বংসের পথটাই বেছে নিয়েছিল তাই এই পরিনতি, এটা আন্দাজ করতে আমার বিশেষ অসুবিধে হয়নি যে দেখামাত্র সমীরণ শিলালিপির পুরো সারবস্তুটাই নিজের মাথায় কপি করে নিয়েছিল, আর লিপির পাঠ করা তো ওকে আমি নিজে হাতেই শিখিয়েছি’।

    রুদ্রপ্রসাদ এবার বললেন—’তবে একটা হিসেব কিন্তু এখনও মিলছে না, এই যে তোমার ঘাড়ে বন্দুক রেখে গুলিটা চালানো হল তারও কিছু বাঁধাধরা নিয়ম আছে, তোমার বন্ধু কি তোমাকে এই কাজের ঝুঁকি সম্বন্ধে কিছুই বলেনি? সেটা কি করে সম্ভব’? আমার এবার একটু রাগ হল, ক্ষুন্নভাবে বললাম—’আপনাকে তো আমি সবকিছুই খুলে বলেছি তারপরেও যদি আমাকে মিথ্যেবাদী মনে হয় তাহলে আর কথা বাড়িয়ে লাভ কি! রুদ্রপ্রসাদ সামান্য হেসে বললেন—’তোমার কথায় অবিশ্বাস করছি না, প্রথমবার দেখেই বুঝেছি, তুমি ছেলেটা ভালো তবে তেমন চালাক নও, তবে আবার এতটা নির্বোধও নও নিশ্চয়ই যে জেনেবুঝে ফাঁদে পা দেবে। কিন্তু তা হলেও হিসেবটা যে মিলছে না’!—’ঝুঁকি বলতে কি আপনি পুলিসের দিকটা বলছেন, হ্যাঁ সেটা তো ছিলই’।

    —’উঁহুঃ সেসব কিছু নয়, এই ক্রিয়ায় সহায়তা করার ফলে যে অপার্থিব প্রভাব তোমার উপর পড়বে আমি সেই বিপদের কথা বলছি’।

    —’তেমন কিছু আমার জানা নেই’। রুদ্রপ্রসাদ এবার যেন নিজের মধ্যে ডুবে গেলেন, কিছু পরে স্বগতোক্তি করার মতো বললেন—’অবশ্য অপশক্তির উপাসনায় শঠতার ব্যবহার অস্বাভাবিক নয়, এখানেও নিশ্চয়ই তেমন কিছুই ঘটেছে’।

    ঘড়ির দিকে চোখ পরল, এবারে বেড়িয়ে পরা দরকার, স্কুলের সময় হয়ে এসেছে প্রায়, ভাবছি ভদ্রলোককে বলে উঠে পড়ব, তখুনি রুদ্রপ্রসাদ উত্তেজিত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন—’জয়ন্ত ঘটনার শুরুতে তোমার অনুপস্থিতিতে ছেলেটি তোমার ফ্ল্যাটে নিজেই এসেছিল, তাই তো’?

    —’হ্যাঁ’।

    —’সেসময় ও কি ঘরে একাই ছিল’?

    —’হতে পারে, তবে সেটা জগন্নাথদাই বলতে পারবে’। ভদ্রলোক অধীরভাবে বললেন—’জয়ন্ত, বাড়ি যাও এক্ষুনি, জিনিসটা খোঁজ ওটা ওখানেই কোথাও আছে’। -‘কিন্তু খুঁজবটা কি’?

    —’দলিল! পাতি কথায় জাহান্নামের লাইফটাইম মেম্বারশিপ কার্ড, সেটা কাগজ, চামড়া এমনকী কাপড়েরও হতে পারে। এখানে মনে হয় কাগজেরই হবে’। উঠে দাঁড়িয়ে বললাম—’ঠিক আছে স্কুল থেকে ফিরে খুঁজব নাহয়’।

    —’স্কুল’! রুদ্রের মুখ দেখে মনে হল তিনি বোধহয় এখুনি হার্টফেল করে বসবেন, উৎকণ্ঠিত স্বরে বললেন—’তুমি এখনো বুঝতে পারছ না, কত বড় বিপদ আমাদের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে, কত মানুষের জীবন বিপন্ন হবে, জয়ন্ত প্লিজ যেটা বললাম, সেটা আগে করো, আর হ্যাঁ জিনিসটা হাতে আসা মাত্র আমাকে ফোন করবে’। মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতেই রুদ্রপ্রসাদ অরিন্দমকে ডেকে নিলেন আর আমার আপত্তি সত্ত্বেও ফের একবার ওই গাড়িতে সওয়ার হতে হল।

    গাড়ি হাজরা মোড়ে এসে পৌঁছোতে নেমে পড়লাম, এখান থেকে বাস ধরে স্কুলের উদ্দেশ্যে রওনা দেব, অরিন্দম অবাক হয়ে বলল—’কিন্তু জেঠু যে বলল, আপনি বাড়ি যাবেন’? বললাম—’স্কুলে না গেলে কি চাকরি থাকবে ভাই! কিন্তু তোমার জেঠুকে সেসব বলতে গেলে উনি হয়তো পিড়াপিড়ি করতেন, বয়স্ক মানুষ, তুমি একটু ওনাকে বুঝিয়ে বোল’। অরিন্দম চলে গেল আর আমিও বাসে উঠে পড়লাম, একটা কথা অবশ্য আমার মাথায় ঢুকছে না, সেদিন ছেলেটিকে চণ্ডের উদ্দেশ্যে বলি দেওয়ার আগেই পুলিসের আক্রমণে, চণ্ডের পৃষ্ঠপোষকরা সবাই তাদের ইষ্টদেবের সাধের নরকে গিয়ে ভিড় জমিয়েছে, তা হলে চণ্ডরাজা এই পৃথিবীতে আর কার উপর ভর করবেন? তা ছাড়া ছেলেটিকে বলিই বা দেওয়া গেল কোথায়? সে তো মারা গেল হার্টফেল করে! রুদ্রপ্রসাদ অকারণ দুশ্চিন্তা করে আমাকে টানাহ্যাঁচড়া করছেন। মোবাইলের রিংটোন বেজে উঠতে দেখলাম রুদ্রপ্রসাদ ফোন করেছেন, মহা মুশকিল! এখন কি যে বলি, হ্যান্ডসেট-টাকে সাইলেন্ট করে ব্যাগে রেখে দিলাম, এবারে যত ইচ্ছে ফোন করুক!

    ১৮

    স্কুল ইনস্পেক্টরের বিনা নোটিশের ইন্সপেকশনে সেদিন টিফিন টাইমের পরের পিরিয়ডগুলো আমাদের প্রচুর ব্যস্ততার মধ্যে কাটল। ভদ্রলোককে চা-মিষ্টি খাইয়ে যতক্ষণে বিদায় করা গেল ততক্ষণে ঘড়িতে প্রায় পাঁচটা বাজে, হেডমাষ্টার মশাইয়ের মুখে একটা চওড়া হাসি ফুটে উঠল, ভালোয় ভালোয় ব্যাপারটা মিটে গেছে যাহোক, খানাপিনার প্রস্তাব উঠল, হেডস্যার সবার আগে চাঁদা দিলেন, বাকি টাকা-টা সবাই মিলে জোগাড় করে ফিশফ্রাই আর মাটন কাটলেটের ভোজ খেয়ে যতক্ষণে বাড়ি পৌঁছোলাম ততক্ষণে প্রায় সাড়ে সাতটা বেজে গেছে। জগন্নাথদার মুখে উদ্বেগের ছাপ, আমাকে দেখে বলল—’নাতনির শরীর খারাপ, ডাক্তারের কাছে যেতে হবে, তোমার খাবার ঢাকা রইল, খেয়ে নিও’। জগন্নাথ চলে গেল, আমি কুটুসের সঙ্গে একটু খুনসুটি করে, টিভির সুইচ অন করলাম। হঠাৎ মোবাইলটার দিকে নজর পড়তেই চমকে উঠলাম, সারাদিনে প্রায় তেইশটা মিসড কল এসেছে, সবকটা কলই একজনের ফোন থেকেই এসেছে, রুদ্রপ্রসাদ। লজ্জিত হয়ে পড়লাম, ভদ্রলোকের কথা একদম ভুলেই মেরে দিয়েছি, উনি যেন কি একটা খুঁজতে বলেছিলেন? কীসের দলিল, কিন্তু খুঁজব কোথায়, এই ফ্ল্যাটে বেডরুম এই একটাই, এখানে কিছু লুকিয়ে রাখার জায়গাটাই বা কোথায়?

    ঘরে ফার্নিচার বলতে আমার খাট, একটা আলমারি, ছোট একটা টি-টেবিল আর দুটো কাঠের চেয়ার, প্রথমেই আলমারির উপর ছাদটা হাতড়ে দেখলাম, সেখানে কিছু নেই, এবার খাটটা নিয়ে পরলাম, গদি বালিশ, খাটের তলা অনেক ঘাটাঘাটি করেও হাতে কিছুই এল না, বারান্দাটা খুবই ছোট, ওখানের সম্ভাবনা নাকচ করলে বাকি রইল কিচেন আর বাথরুম, দুটো জায়গায় তন্নতন্ন করে খুঁজে লাভ শুধু হল বছরখানেক আগে হারিয়ে যাওয়া এক টাকার একটা কয়েন, রান্নাঘরে গ্যাসের তলায় পড়েছিল। রুদ্রপ্রসাদের উপর একটা বিরক্তি বেশ কিছুক্ষণ হল দানা বাঁধছিল এবার সেটা চরমে উঠল, লোকটা ছিটগ্রস্থ সন্দেহ নেই, হঠাৎ দেওয়ালে চোখ পরতে মনে হল ওদিকটাও একবার দেখে নেওয়া দরকার, বছর পাঁচেক আগে ডিসটেম্পার রং করা আমার এই ম্যাড়ম্যাড়ে দেওয়ালে ঝুলছে একটা সস্তা অজন্তা ওয়াল ক্লক আর আমার লেট বাবা-মায়ের কাঠের ফ্রেমে বাধানো ছবি। ঘড়িটা নাড়াচাড়া করে কিছু পেলাম না, ওটা যথাস্থানে রেখে এবার ছবিটা হাতে নিয়ে নাড়াঘটা করতেই জিনিসটা নজরে পরল। পিচবোর্ডের ফ্রেমের পিছনে একটা কাগজের টুকরো ভাঁজ করে প্লাস্টিক টেপ দিয়ে সেটে রাখা হয়েছে। কাগজের ভাজটা খুলে চোখের সামনে মেলে ধরতেই আমার নামে লেখা একটা চিঠি বের হল।

    ”জয়ন্ত

    আমি তপন দাস তোমার বাল্যবন্ধু, চিঠির মাধ্যমে তোমাকে আমার প্রতিনিধিরুপে চণ্ডদেবের উদ্দেশ্যে বলি অর্পণ করার আহ্বান জানাচ্ছি। তোমার পূর্বপুরুষ একসময় রাজা উপাধি প্রাপ্ত হয়েছিলেন, সেই সূত্রে তোমার ধমনীতে রাজরক্ত বইছে, তাই তুমি এই বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যম হওয়ার উপযুক্ত। চণ্ড সাধনার নিয়মানুসারে রাজগৃহে জন্মিত সাত বছরের বালককে উপাসক নিজের হাতে উৎসর্গ করবেন। এই কাজ নিদারুণ ঝুকিপূর্ণ, সামান্য বিচ্যুতিতে যেমন সাধকের জীবন বিপন্ন হতে পারে তেমন আবার অদ্ভুতভাবে, সফল হলেও সাধকের অনন্ত নরকবাস নিশ্চিত! তবে প্রত্যাশী ব্যক্তি আত্মরক্ষার জন্য একজন সহায়ক নিযুক্ত করতে পারেন, সহায়ককে দণ্ডদাস বলা হয়, যিনি বলির শরীরে প্রথম আঘাত হেনে রক্তপাত ঘটানোর সঙ্গে সঙ্গে পরিপূর্ণ কর্মফলের দ্বায়িত্ত্ব গ্রহণ করবেন, বলির কর্তা পরে প্রাণনাশক অভিঘাত করবেন এবং বলির রক্ত আর প্রাণ চণ্ডদেবকে উৎসর্গ করবেন।

    বলি সম্পন্ন হওয়ার ফলে আমরা দুজনে দু-রকম ফল প্রাপ্ত হব। দেবতার আশীর্বাদে বলির কর্তা অর্থাৎ আমি অপরিসীম ধনসম্পদ, পৃথিবীর উপর কর্তৃত্ব করার অপার সুখ এবং অটুট স্বাস্থ্য অর্জন করব। বলির দণ্ডদাস দায়ী থাকবে এর নেতিবাচক ফলের জন্য। অবশ্য চাইলে বলিকর্তা কোনও সহায়ক ছাড়া নিজেই কর্ম সম্পাদন করতে পারেন কিন্তু সেক্ষেত্রে এই কাজের দু-রকম প্রভাবই তাকে নিজেকেই ভোগ করতে হবে তাই একজন সহায়ক এই কার্যে বিশেষ প্রয়োজন। চণ্ডদেবের জাগরণের ফলে মহামারী, দুর্ভিক্ষ আর হানাহানির মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি ঘটবে। অসংখ্য মানুষের দুর্গতির ফলস্বরুপ যে কর্মরাশি সঞ্চিত হবে তা ভোগ করতে দণ্ডদাসকে অনন্ত নরকবাস করতে হবে, এবং এর থেকে মুক্তির কোনও উপায় নেই, এসব গোপনীয় বিষয়, বিধি পালন হেতু তোমাকে জানানো হচ্ছে। বিধি অনুযায়ী কোনও রাজপুরুষ স্বেচ্ছায় দণ্ডদাস হতে পারেন। তবে তাকে সম্পূর্ণ বিষয়ে অবহিত করার দায়িত্ব বর্তায় বলির কর্তার ওপরে। কর্তা চাইলে এ ব্যাপারে সামান্য ছলনার সাহায্য নিতে পারেন, তবে তা যেন কখনই বিধির মূল শর্তকে লঙ্ঘন না করে। তিন রকম উপায়ে এই কাজ করা যেতে পারে। সরাসরি প্রস্তাব করা। দূত মারফত আমন্ত্রণ জানানো অথবা লিখিতভাবে অনুরোধ জানানো। এক্ষেত্রে আমি কাগজে লিখে তোমার অনুমতি প্রার্থনা করছি, যদি তুমি দণ্ডদাসের ভুমিকা পালনে অনিচ্ছুক হও তাহলে এই কাগজের টুকরো ছিড়ে আগুনে পুড়িয়ে ফেলবে, এবং আজ এই মুহুর্ত থেকে ভবিষ্যতেও কখনো আমার দেওয়া কোনও খাদ্যবস্তু গ্রহণ করবে না। অন্যথায় এবিষয়ে তোমার নিষ্ক্রিয়তাকেই তোমার সম্মতি বলে গ্রাহ্য করা হবে। এই কাগজটাকে তোমার বাসগৃহে তোমার আয়ত্তের মধ্যে রাখা হল, তা সত্ত্বেও যদি তুমি গুরুত্বহীন বিবেচনা করে এর সন্ধান না করে এর পাঠ না কর, তবে সে গাফিলতি তোমার নিজস্ব এবং তার ফলও তোমাকেই ভোগ করতে হবে।”

    চিঠিটা অসাড় হয়ে পরা হাত থেকে টুপ করে খসে পড়ল। পুরোনো কিছু স্মৃতি হঠাৎ চোখের সামনে ভেসে উঠল। সেন্ট্রাল মডেল স্কুলে তখন আমি বোধহয় ক্লাশ এইটের ছাত্র, একটা ডাকাবুকো ধরনের ছেলে আমাদের সেকশনে ভরতি হল, নতুন ছেলেটির সঙ্গে আমার আর অরুণের ভারি বন্ধুত্ব হয়ে গেছিল। আমরা তিনজনে সর্বক্ষণ একসঙ্গে সময় কাটাতাম, জীবনের প্রথম সিগারেট খাওয়া থেকে প্রথমবারের জন্য স্কুল পালিয়ে সিনেমা যাওয়া সবই ঘটেছিল এই তপনের হাত ধরেই। আমাদের মধ্যে অরুণ ছিল পড়াশোনায় ক্লাসের মধ্যে সেরা আর তপন ছিল খেলাধুলোয় চৌকস, ওদের তুলনায় আমি ছিলাম নিতান্তই সাধারণ, টেনে পড়ার সময় তপন যখন ইন্টার স্কুল বক্সিং চ্যাম্পিয়ন হল, মনে আছে আমি টিফিনের জমানো পয়সা দিয়ে মিষ্টি কিনে বিতরণ করার সময় অঙ্ক স্যার মন্মথবাবুর ধ্যাতানি খেয়েছিলাম, স্যারের কথাগুলো আজও স্পষ্ট মনে আছে, সন্দেশ মুখে পুরে পাশে বসা ভূগোল স্যার পার্থবাবুকে বলেছিলেন ‘এই গাধাটা আর মানুষ হবে না’ স্কুলের গন্ডি টপকে অরুণ চলে গেল সায়েন্স নিয়ে পড়তে আর আমরা দুজন কমার্স নিয়ে ভরতি হলাম সিটি কলেজে। কলেজের পর আমি এই চাকরিটা পেয়ে যখন বর্তালাম তপন ওর অ্যাডভেঞ্চারাস স্বভাবের জন্য চলে গেছে সাংবাদিকতার পেশায়। এই সেই তপন, বন্ধুত্বের সংজ্ঞাটাই পালটে দিয়ে গেল আমার জীবনে। মন্মথবাবুর অবজ্ঞাসূচক ব্যঙ্গোক্তির মানে এতগুলো বছর পর আজকে হৃদয়ঙ্গম করতে পারলাম। কাগজের টুকরোটা যেন আমার বোকামো দেখে মুখ ভেংচাচ্ছিল, সব রাগ গিয়ে পরল ওটার ওপর, চিঠিটা দলা পাকিয়ে আগুন ধরিয়ে দিলাম, হঠাৎ কোথা থেকে যেন আবার সেই বিকট আর্তনাদটা ফেরত চলে এলো, এবারে অনান্য-বারের থেকে বৃহৎ আকার ধারন করে কানের পর্দাকে যেন ফাটিয়ে দেবে মনে হল, মিনিটখানেক পরে যখন আওয়াজটা থামল, ব্যাথায় আড়ষ্ট কানে হাত দিয়ে টের পেলাম সেখান থেকে একফোঁটা রক্ত গড়িয়ে গালের ওপর পড়েছে, ভৌতিক শব্দটা তাহলে আমার অস্থির মনের কষ্টকল্পনা নয়, বরঞ্চ ঘোরতর বাস্তব! ভয়ে বিস্ময়ে এবারে আমি একপ্রকার হতবুদ্ধি হয়ে পড়লাম।

    ১৯

    গমগমে অপার্থিব স্বরটা ধমকের সুরে বলল —’আমার বিরুদ্ধাচারন করার স্পর্ধা তোমার হল কি করে? আমি উত্তর না দিয়ে মাথা নিচু করে রইলাম। চারপাশে নিকষ্যি অন্ধকারের মধ্যে ভীষণ পঁচা দুর্গন্ধের মধ্যে হাঁটু গেড়ে বসে আছি, মনে হচ্ছিল আবার যেন সেই জঙ্গলের মধ্যে মন্দিরটায় পৌঁছে গেছি! কণ্ঠস্বরটা ফের বলল —’যার প্ররোচনায় তোমার মতিভ্রম হয়েছে, যথাসময়ে ভয়ংকর পরিনতি সে প্রাপ্ত হবে, কিন্তু তোমাকেও প্রাপ্য শাস্তি ভোগ করতে হবে’! সন্ত্রস্ত হয়ে বললাম —’ক্ষমা করুন, এমন ভুল আর হবে না’। অপার্থিব স্বরটা ভর্তসনার পারদ চড়িয়ে বলল —’প্রভুর কর্মে বাঁধা সৃষ্টি করার দণ্ড সেবককে ভোগ করতেই হয়’। আওয়াজটা এবার ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। গায়ের ওপর তীক্ষ্ন খড়খড়ে কিছুর ছোঁয়ায় ঘুম ভেঙে গেল। ধরমড়িয়ে বিছানার ওপর উঠে বসতেই নরম কয়েকটা মাংসপিণ্ড ছিটকে এদিক ওদিক গড়িয়ে পরল। ভীষণ ঘাবড়ে বেডসুইচ টিপে বাল্বের আলোয় যা দেখলাম তাতে ভয়ে ব্রহ্মতালু অবধি শুকিয়ে যাবার যোগার হল।

    ঘর ভর্তি অসংখ্য মেঠো ইঁদুর! কয়েকটা বোধহয় আমার গায়ের ওপর দিয়েই ঘোরাফেরা করছিল, আমি উঠে বসতে বিছানার ওপর গড়িয়ে পড়েছে। পায়ের ওপর একটা বিশ্রী শিরশিরানি অনুভব হতে দেখলাম, একটা পেল্লায় কালো ইঁদুর আমার ঊরুর ওপর দিয়ে চলে সোজা পেটের দিকে আসছে, হাতের চাপড়ে ওটাকে ছিটকে ফেলতেই ইঁদুরটা হিংস্র ভঙ্গীতে ঝাঁপিয়ে আমার ডান হাতের তর্জনীর ডগা কামড়ে ধরল! ছুড়ির মতো ধারাল দাঁতের চাপে আঙুলের নখ আর খানিকটা মাংস উপড়ে ফিনকি দিয়ে তাজা রক্তের ধারা ছড়িয়ে পড়ল বিছানা আর মেঝের ওপর। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে দেখলাম, কদাঁকার ইঁদুরটা চেড়া জিভ দিয়ে সেই গরম রক্ত চেটে গিলতে শুরু করেছে। কুটুসের কথা মনে পরতেই প্রচন্ড উৎকন্ঠা নিয়ে তাকালাম ওর বাক্সের দিকে, কিন্তু সেখানে তখন ওকে দেখতে পেলাম না, আলমারির তলায় কয়েকটা ধেড়ে ইঁদুরের হুড়োহুড়ি দেখে মনে হল ওখানে কিছু আছে, আর ঠিক তখুনি কুটুসকে টেনে হিঁচড়ে রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় ঘরের মাঝখানে এনে ফেলল নোংরা জন্তুর দল, কুটুসের দেহে এখনো প্রাণ বাকি আছে, যন্ত্রণাকাতর দৃষ্টে সে তাকিয়ে রয়েছে কড়িকাঠের দিকে, একটা মোটাসোটা ইঁদুর ওর পেটের ভিতর থেকে নাড়ীভুঁড়ি ছিড়ে টেনে ফেলছিল, গোটাকয়েক ইঁদুর এবার একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পরে ওর গায়ের মাংস খুবলে খেতে শুরু করল, প্রচণ্ড বিতৃষ্ণায় ভয় লোপ পেল, টেবিল ল্যাম্পটা হাতে তুলে নিয়ে ইঁদুরের দঙ্গলের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। ল্যাম্পের কভারটা দিয়ে ধেড়ে ইঁদুরটাকে মারতেই, কাঁচের টুকরো জন্তুটার গায়ে গেঁথে গেল, যন্ত্রনায় ছটফট করতে করতে ইঁদুরটা গড়িয়ে পরল, লাথি মেরে ওটাকে ঘরের অন্য দিকে পাঠিয়ে দিলাম, কিন্তু ততক্ষণে ইঁদুর বাহিনী একজোট হয়ে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। কি সাংঘাতিক তাদের বলিষ্ঠ দাঁতের দংশন! খাবলা খাবলা করে গায়ের চামড়া, মাংস উপড়াতে শুরু করে দিল, প্রথম দিকে ল্যাম্পের রড দিয়ে প্রাণপণ লড়াই দেবার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু আমার প্রতিরোধ বেশিক্ষণ টিকল না, সামলাতে না পেরে একসময় হুরমুরিয়ে মেঝের ওপর আছড়ে পড়লাম, রডটাও হাত থেকে খসে পড়ল। ইঁদুরগুলো লাফিয়ে লাফিয়ে আমার গায়ে উঠতে শুরু করল, শেষ চেষ্টা করছিলাম জন্তুগুলো যেন আমার মুখে বা গলায় কামড়াতে না পারে, কিন্তু ইঁদুরের সংখ্যা এতো বৃদ্ধি পাচ্ছিল, মনে হল বেশিক্ষণ আর বোধহয় ঝুঁজতে পারব না।

    হঠাৎ সদর দরজাটা আছড়ে দেয়ালে সজোরে ঠোকা খেয়ে খটাং করে শব্দ তোলার সাথে সাথে অনেক গুলো উজ্জ্বল আলোর ঝলকানি এসে পড়ল আমার মুখের ওপর, আর কয়েক সেকেন্ড পর উচ্চকণ্ঠের দুটো স্বগতোক্তি একসঙ্গে শুনতে পেলাম, ‘মাই গড শেষে এমন জঘন্য জিনিসও দেখতে হল’, আর ‘হায় রাম ইতনা চুহা’ কণ্ঠস্বর দুটো অবশ্য আমার পরিচিত।

    ‘ঘরের মধ্যে ঈশ্বর প্রেরিতের মতো এসে হাজির হয়েছেন রুদ্রপ্রসাদ, অরিন্দম আর কিশোরীলাল’।

    অরিন্দমের হাতে একটা গাড়ীর স্প্যানার ধরা, বিনাবাক্য-ব্যায়ে সেটা দিয়ে কড়িকাঠের কাছে ঘুরে বেড়ানো ইঁদুরটাকে ঘা মারতেই সেটা মুখ দিয়ে রক্ত উগড়ে লুটিয়ে পড়ল। রুদ্রপ্রসাদ উত্তেজিত স্বরে বললেন —’জয়ন্ত তোমার ফ্ল্যাটে লাঠি গোছের কিছু আছে’? খানকয়েক হকি-স্টিক রয়েছে রান্নাঘরে, স্কুলের ছেলেরা রেখে গেছে, সেদিকে ইঙ্গিত করতেই অরিন্দম বুটের তলায় ইঁদুরগুলোকে পিষতে পিষতে ছুটে গেল, রুদ্রপ্রসাদ এরমধ্যে দেয়াল হাতড়ে সুইচ বোর্ডটা খুঁজে পেয়ে গেছেন, টিউব লাইটের আলোয় ঘরটা আলোকিত হয়ে উঠল। হে ভগবান! গোটা কুড়ি ইঁদুর যদি আমাকে আক্রমণ করে থাকে তাহলে অন্তত দুশোটা ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, যেদিকে চোখ পড়ছিল শুধু বিশাল বিশাল কালো ধেড়ে ইঁদুর। টের পেলাম ইঁদুরগুলো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যুদ্ধে তেহাই দিয়ে এদিক ওদিক চাইছে, দ্রুত উঠে দাড়িয়ে গা থেকে ইঁদুরগুলোকে ঝেড়ে ফেললাম, অরিন্দম তখুনি ফিরে এলো হাতে স্টিক-গুলো নিয়ে। এরপর শুরু হল মূষিক নিধন যজ্ঞ। ইঁদুরদের চিঁ-চিঁ আর্তনাদ আর নির্দয় প্রহারের শব্দে ফ্ল্যাটের দেয়াল-কটা গমগম করতে লাগল। মূষিক-কূল এর মধ্যে রনে ভঙ্গ দিয়েছে, পাল্টা আক্রমনের বদলে তারা এখন পালাবার পথ খুঁজছে, আমার মনের জোর কিছুটা হলেও ফিরত এসেছে। বাথরুমে এক বোতল অ্যাসিড রাখা ছিল কোমোড পরিস্কারের জন্য, ছুটে গিয়ে সেটা নিয়ে এলাম। কুটুসের কান্নাভেঁজা চোখ দুটো স্মরণ করে ছিপি খুলে ঝাঁজাল অ্যাসিড ঢেলে দিলাম ইঁদুরের জমায়েতের মাঝখানে, মরণ চিৎকার করে জন্তুগুলো দিগ্বদিক জ্ঞ্যানশুনের মতো ছুটে গিয়ে দেয়ালের গায়ে অন্ধের মতো মাথা ঠুকতে লাগল, তার ওপর রুদ্রের দল দরাজ হাতে লাঠির ঘা মেরে মেরে সেগুলোর পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটাবার আয়োজন পুর্ন করতে লাগল, ইঁদুরগুলো যতই পালাবার চেষ্টা করুক না কেন ঘরের চারদিক আগলে থাকা আমাদের চারজনের বেদম মারের সামনে অবশেষে শেষ ইঁদুরটাও পিষ্ট হয়ে গেল। ঘরের মাঝবরাবর একটা মড়া ইঁদুরের ঢিপি তৈরি হয়ে গেল, রক্ত আর পোড়া মাংসের গন্ধে বমি পাচ্ছিল। রুদ্রপ্রসাদ ক্লান্ত হয়ে নোংরা মেঝেতেই বসে থুকঃ করে একদলা থুতু ফেলে বললেন —’এগুলো সব নর্দমা থেকে উঠে আসা কাঁদামাখা জন্তু, দেবতাটির দেখছি স্ট্যান্ডার্ডের বালাই নেই’। একটা ইঁদুর কোনোক্রমে বেঁচে গেছে, অরিন্দম লাঠি হাতে সেটার দিকে তেড়ে যেতেই রুদ্র বললেন —’উহু! ওটাকে ফলো করে দ্যাখ তো কোত্থেকে ঢুকল’? অরিন্দম ইঁদুরটার পিছনে ধাওয়া করে রান্নাঘর ঘুরে এসে জানাল ড্রেনের মুখে চাপা দেওয়া ইটের আগল সরে গেছে, ইঁদুরটা ওখান দিয়েই পালাল। রুদ্রপ্রসাদ আমার দিকে চেয়ে বললেন —’সবার আগে তোমার ওই ইনজুরি গুলোর চিকিৎসা দরকার, তারপর অন্য কথা। আর হ্যা তুমি আমাদের সঙ্গে এখুনি রেনি পার্কের বাড়িতে যাচ্ছ, আশা করি বুঝতেই পারছ এখানে থাকাটা তোমার পক্ষে আর সেফ নয়’!

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleমাধবীরা কেউ নেই – কোয়েল তালুকদার
    Next Article পাতালঘরের পিশাচ – অনীশ দাস অপু
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অসম্পূর্ণ বই
    আয়মান সাদিক
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    রুদ্রসমগ্র – রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

    January 8, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    রুদ্রসমগ্র – রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

    January 8, 2026
    Our Picks

    রুদ্রসমগ্র – রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

    January 8, 2026

    রান্না খাদ্য পুষ্টি – সিদ্দিকা কবীর

    January 8, 2026

    শহর খুলনার আদি পর্ব – আবুল কালাম সামসুদ্দিন

    January 8, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }