চণ্ডরাজার বলি – ২০
২০
পথে যেতে যেতে টের পেলাম কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসছে সেইসঙ্গে ক্ষতগুলোতে অসহ্য জ্বালার অনুভূতি, রুদ্রপ্রসাদ পাশে বসে ছিলেন, আমার নুয়ে পরা মাথাটাকে নিজের কাঁধে আশ্রয় দিলেন, সাময়িকভাবে চেতনা হারিয়েছিলাম, তবে মাঝে মধ্যে অর্ধচেতন অবস্থায় যেন রুদ্রপ্রসাদকে দেখতে পাচ্ছিলাম। অবশেষে শরিরে ফের খানিকটা জোর ফিরত এলো, বিছানার ওপর উঠে বসে দিনের আলোয় জায়গাটা চিনতে পারলাম, কিছুদিন আগে এই ঘরেই রুদ্রপ্রসাদের সঙ্গে বসে কথা হয়েছিল। একটা কাঠের পালঙ্কে আমার জায়াগা হয়েছে, ঘরের মধ্যে সার্কেল করে এই দিনের বেলায়ও কয়েকটা হ্যারিকেন জ্বালানো রয়েছে, গুণে দেখলাম, সবশুদ্ধু আটটা, যেদিন প্রথমবার এই বাড়িতে পা রেখেছিলাম, সেদিনেও এমন কিছু চোখে পড়েছিল, তবে আজকের সংখ্যাটা বোধহয় আরও বেশি। জানালার পর্দাটা সরিয়ে রাস্তার দিকে চোখ রাখলাম, বালিগঞ্জের ব্যাস্ত রাস্তায় দুপুর বেলায় যানবাহনের মিছিল।একটু পরে রুদ্রপ্রসাদ ঘরে এলেন, আমাকে দেখে খুশি হয়ে বললেন —’এখন কেমন বোধ হচ্ছে জয়ন্ত’? মাথা নেড়ে জানালাম—’ভালো’। ভদ্রলোক এসে নাড়ি টিপে বললেন—’এখনো স্লো যাচ্ছে, তবে জ্বরটা যে ছেড়েছে সেটা ভালো লক্ষণ’।—’আমার হঠাৎ কি হল’?
—’ইঁদুরের কামড় থেকে ইনফেকশন! আর জ্বরটা বাই প্রোডাক্ট, গত দেড়দিন তুমি জ্বরের ঘোরে বেহুশ হয়ে ছিলে’। কৃতজ্ঞ হয়ে বললাম—’সেদিন ওই বিপদের সময় আপনারা আমাকে উদ্ধার না করলে! আর তার পরেও যেভাবে সেবা করলেন’। ভদ্রলোক আমাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই বললেন —’উদ্ধার না করলে কি হত মনে হয় তোমার’? একটু অবাক হয়েই বললাম —’হয়তো ওই রাক্ষুসে ইঁদুরগুলো আমাকে চিবিয়েই খেয়ে ফেলত’। রুদ্রপ্রসাদ কথাটা উড়িয়ে দিয়ে বললেন—’না হে যতটা হয়েছে তার থেকে খুব বেশি কিছু হত বলে মনে হয় না, যে ঘোড়াটা গাড়ি টানে, গাড়োয়ান তাকে মাঝে মধ্যে চাবুক মারে বশে রাখার জন্য, কিন্তু প্রাণে কি মেরে ফেলে? তা হলে গাড়ি কে টানবে বল? কোনওরকমে বললাম—’আমার কিন্তু ব্যাপারটা এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না’। রুদ্রপ্রসাদ যেন করুণার হাসি হাসলেন, বললেন—’দেবতাটির ক্ষমতার সামান্য পরিচয় তো পেলে, অবশ্য অবিশ্বাস করে যদি শান্তি পাও সে ভালো’। শিরদাঁড়া দিয়ে একটা শিহরণ বয়ে গেল, কাঁপা স্বরে বললাম—’এসব কি ঘটছে, বলুন তো’? রুদ্রপ্রসাদ বললেন—’আমার কথায় গুরুত্ব না দিয়ে যে ঠিক কাজ করোনি আশা করি এতক্ষণে বুঝতে পারছ। তখনি মনে হচ্ছিল, অঘটন কিছু একটা ঘটবেই! রাতের দিকে আর থাকতে না পেরে বেড়িয়েই পড়লাম, কিশোরী আর অরিন্দমকেও সঙ্গে নিলাম, অরিন্দমকে একটা অস্ত্র সঙ্গে রাখতে বলতে ও আর কিছু না পেয়ে গাড়ির স্প্যানারটাই তুলে নিল। তোমার ফ্ল্যাটে পৌঁছে সাড়া না পেয়ে একপ্রকার বাধ্য হয়ে দরজায় ঘা মারতে ছিটকিনিটা ভেঙে গিয়ে আমাদের ঢোকার রাস্তা করে দিল, ব্যাস’! কথার ফাঁকেই ঘরে পরিচারিকা প্রবেশ করল হাতে চিনেমাটির পাত্র নিয়ে। রুদ্রপ্রসাদ বললেন—’চিকেন স্টু-টা খেয়ে নাও গায়ে জোর পাবে’। লজ্জিত হয়ে বললাম—’এইভাবে আপনাদের উপর বোঝা হয়ে! আমার এবার বাড়ি যাওয়া উচিত’। রুদ্রপ্রসাদ আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন—’শরীর ঠিক না হওয়া পর্যন্ত কোথাও যাওয়ার নাম করবে না। আর বেশি সংকোচ হলে নাহয় হোটেল ভেবে পরে পেমেন্ট করে দিও, এখন স্যুপটা খাও দেখি’। রুদ্রের চাপাচাপিতে বাধ্য হয়েই স্টুয়ে চুমুক দিলাম। খেতে খেতেই বললাম—’চিঠিটা পেয়েছি, পুড়িয়েও ফেলেছি, স্যরি সেদিন আপনাকে ফোন করে উঠতে পারিনি, বিশ্বাস হচ্ছিল না তপন এতোটা নিচেও নামতে পারে?’। এরপর চিঠির সারবস্তু যতটা মনে ছিল রুদ্রকে জানালাম, রুদ্রপ্রসাদ নিঃশব্দে সব শুনলেন, মাঝখানে কোনও কথা বললেন না। আমার বক্তব্য শেষ হতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন —’যাইহোক খাওয়া-দাওয়া সেড়ে বিশ্রাম নাও, আমাকে একটা দরকারি কাজে কাছাকাছির মধ্যে যেতে হবে, ফিরতে মনে হয় রাত হয়ে যাবে, তুমি কিন্তু এরমধ্যে বাড়ির বাইরে যাবে না, চিন্তার কিছু নেই, অরিন্দম, কিশোরী বা রুমা কেউ না কেউ রাউন্ড দ্য ক্লক তোমার ঘরের সামনে বসে থাকবে’।
শীতের বিকেলে দিনের আলো বড্ড তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যায়, সাড়ে পাঁচটার মধ্যেই সন্ধের অন্ধকার ঘনিয়ে এল। বিছানা থেকে নেমে প্রশস্ত ঘরটার মধ্যে পায়চারী করার মতলবে সবে দাঁড়িয়েছি অরিন্দম কফির ট্রে হাতে প্রবেশ করল, আমাকে দেখে উৎফুল্ল স্বরে বলল—’এই যে জয়ন্তদা, আগের থেকে বেটার তো’? আমি হেসে বললাম—’সবই তোমাদের জন্য, এ জীবনে তোমাদের উপকার শোধ করতে পারব না, তবে এবার বোধহয় আমার বাড়ি যাওয়া উচিত’। অরিন্দম কাপে কফি ঢালতে ঢালতে বলল—’মাথা খারাপ নাকি আপনার, জেঠু এলে ওসব কথা ভাববেন, আসুন আগে এগুলোর ব্যবস্থা করা যাক’। ধূমায়িত কফির কাপের সঙ্গে প্লেটভরতি গরম পাকোড়া এগিয়ে দিয়ে, আমাকে খাবার জন্য অনুপ্রাণিত করে নিজেও সোৎসাহে খেতে শুরু করল। একটা প্রশ্ন না করে পারলাম না—’এই যে দিনের আলোর মধ্যে সর্বক্ষণ লন্ঠনগুলো জ্বলছে কেন’? অরিন্দম মুচকি হেসে বলল—’ওটা জেঠুর খেয়াল বলতে পারেন, দু-আড়াই মাস হল ব্যাপারটা শুরু হয়েছে, যেদিন উনি বিদেশ থেকে বাড়ি ফিরত এলেন সেদিন থেকেই নিয়ম করলেন চব্বিশ ঘন্টাই এ বাড়ির প্রতিটা ঘরে প্রদীপ জ্বলবে, দমকা হাওয়ায় প্রদীপের শিখাগুলো মাঝে মধ্যেই নিভে যাচ্ছিল তখন প্রদীপ পালটে হ্যারিকেন এল। অরিন্দম এবার একটু রহস্য করে বলল—’একটা ইন্টারেস্টিং জিনিস দেখবেন? তা হলে অবশ্য ছাদে যেতে হবে’।
অরিন্দমের সঙ্গে ওদের বাড়ির ছাদে গিয়ে যা দেখলাম সে জিনিস প্রতিবছর দীপাবলির রাতে আমরা দেখে থাকি, এ বাড়ির ছাদের আলসের, কার্নিস সর্বত্র রাশি রাশি প্রদীপ জ্বলছে। অরিন্দম সেদিকে চেয়ে বলল—’জেঠুর উদ্ভট খেয়াল’। আমি হেসে বললাম—’এটাকে তা হলে অকাল দীপাবলি বলা যেতে পারে, কি বল’? অরিন্দম বলল —’আমার মাথায় তো কিছুই ঢুকছে না! শুধু এইটুকু বলতে পারি, জেঠু কখনো কোনও যুক্তিহীন কাজ করেন না, যেদিন রাত্রে আপনি এ বাড়িতে এলেন, সেই রাত্রি থেকেই জেঠুর কড়া নির্দেশে প্রদীপের সংখ্যা ডবল করে দেওয়া হয়েছে, বেচারি কিশোরীলাল! রাতে দু-বার উঠে প্রদীপে তেল ভরতে ভরতে ওর ঘুমের টোটাল ভোকাট্টা হয়ে গেছে, এখন সারাদিন শুধু হাই তোলে আর চোখ মটকায়’। প্রদীপের জ্বলন্ত শিখাগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে আমি যেন হঠাৎ আলোর আভাষ পেলাম, মনে হচ্ছে রুদ্রপ্রসাদকে এবারে একটু বুঝতে শুরু করেছি, ধীরে ধীরে বললাম—’তোমার জ্যাঠার এই অদ্ভুত আচরণের উদ্দেশ্যটা বোধহয় আমি আন্দাজ করতে পারছি, তবে যতক্ষণ না, উনি নিজে থেকে জানাচ্ছেন আমার সংশয় দূর হওয়ার নয়’।
সে রাতে আর ভালো ঘুম হল না, একে তো নতুন জায়গা তারপর কেমন একটা অসোয়াস্তি বোধ যেন জাঁকিয়ে ধরল, সারারাত ধরে শুধু বিছানার উপর ছটফট করেই কাটালাম। সকালে দেবপ্রসাদ দেখা করতে এলেন, বললেন—’দাদা কাল রাতে ভুবনেশ্বরে গেছেন তবে মনে হয় বিকেলের আগেই ফিরবেন’।—’কিন্তু উনি তো বললেন, কাছাকাছির মধ্যে যাচ্ছেন’।—’হ্যাঁ বলছিলেন তো বর্ধমানের ওদিকটায় কোনও কাজে যাবেন তারপর হঠাৎ ফোন করে জানালেন এখুনি একবার ভুবনেশ্বরে না গেলেই নাকি নয়, তাই রাতে বাড়ি না ফিরে একেবারে ডাইরেক্ট এয়ারপোর্ট থেকেই চলে গেছেন। দাদা বিশেষ অনুরোধ করেছেন যতক্ষণ না উনি বাড়ি ফিরছেন আপনি এখানেই বিশ্রাম নেবেন’। দেবপ্রসাদ ঘড়ির দিকে চেয়ে বললেন—’আজকে আবার ও-টি রয়েছে, আমাকে বেরোতে হবে, অরিন্দম রইল তবে ও বোধহয় এখনও ঘুমোচ্ছে, কিছু দরকার লাগলে ওদের বলবেন’। দেবপ্রসাদ চলে গেলেন। একটু পরে রুমাদি এসে চা দিয়ে গেল। মহিলাটির হাই তোলা দেখে হাসি চাপলাম, মনে হচ্ছে কাল রাতে কিশোরীলালের বদলে প্রদীপের ডিউটি একে দিতে হয়েছে। আধঘন্টা পরে অরিন্দম এল, দাবার বোর্ড হাতে নিয়ে, বলল—’দাবা চলে জয়ন্তদা’? হেসে বললাম—’একটু-আধটু জানি ভাই, বেশি কিছু নয়’। অরিন্দম বলল—’তবে আগেই বলে রাখছি, আমাকে কিন্তু হারানো কঠিন, বাবা, জেঠু দুজনেই দাবা এক্সপার্ট কিন্তু আমার সঙ্গে পারে না’। অরিন্দম বোর্ডে ঘুটি সাজিয়ে বসল। পরের একঘণ্টায় তিনবার মাত খেয়ে রণে ভঙ্গ দিলাম, অরিন্দম জিতেছে, কৌতুকের স্বরে বলল—’কি হল মাথায় চাল আসছে না’।
—’কি করে আসবে বল, আমার বংশে তো আর তোমাদের মতো দাবার সমঝদার নেই’। অরিন্দম ঘুটি তুলতে তুলতে বলল—’কীসের সমঝদার আছে তাহলে’। মনে মনে ভাবছিলাম, বাবা বলতেন আমাদের প্রপিতামহ আর তাদের পিতৃপুরুষেরা নাকি অয়েল পেন্টিং-এর দারুণ বুঝদার ছিলেন, তবে যেটা বাবা বলেননি অন্য লোকের মুখে শুনেছি, আমার রসিক পূর্বপুরুষেরা নাকি কমবয়েসি বাইজি আর ঘোড়দৌড়ের মার্কামারা সমঝদার ছিলেন, তবে সেসব আর অরিন্দমকে বলে কাজ নেই। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অরিন্দম এবার একটু ব্যস্ত হয়ে পরল, বলল—’এবারে তাহলে উঠি, কলেজ যেতে হবে, রুমাদি রইল, রাতে দেখা হবে’। এরপর অরিন্দমও বিদায় নিল।
বালিগঞ্জের এই অভিজাত পাড়াটা দিনের বেলাতেও বেশ নিঝুম নিস্তব্ধ, জানলা দিয়ে রাস্তার ট্র্যাফিক দেখছিলাম, এখন আর করার কিছু নেই, শুধু রুদ্রপ্রসাদের অপেক্ষা ছাড়া। ভদ্রলোক এলে অনুমতি নিয়ে বাড়ি ফিরে যাব। সাড়ে বারোটা বাজলে রুমাদি এসে খাবার দিয়ে গেলেন, সরু আতপ চালের ভাত, কই মাছের ঝোল আর আলু ভাঁজা। খেয়ে-দেয়ে আজকের খবরের কাগজটা নিয়ে বসলাম, কাগজের ছত্রে ছত্রে শুধু খুন জখম, রাহাজানির খবর ভরতি, মাঝের পাতায় একটা ইন্টারেস্টিং খবর ছেপেছে, হঠাৎ এই শহরে ইঁদুরের উৎপাত খুব বেড়ে গেছে, বাড়িতে বাড়িতে, দোকানে, হাসপাতাল, শপিং মল সর্বত্র ইঁদুরের অস্বাভাবিক এই বাড়বৃদ্ধির বহরে শহরবাসী ব্যতিব্যস্ত, শহরতলী থেকে হাজারের সংখ্যায় ইঁদুরের দল কলকাতা অভিমুখে ধেয়ে আসছে। কর্পোরেশন থেকে ইঁদুর নিয়ন্ত্রণ করার বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হলেও এখনো পর্যন্ত কাজের কাজ কিছুই হয়নি, এরপর প্রথম পাতায় দেখলাম সাদা জ্বরের বিষয়ে লিখছে, জ্বরের প্রকোপ নাকি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, দলে দলে নতুন ইনফেকশনের খবর আসছে শহরের প্রতিটা কোণা এমনকী শহরতলী থেকেও। এখনও অবধি কোনও প্রাণহানি না ঘটলেও ডাক্তারদের ধারণা একবার শুরু হলে মৃত্যু ঠেকানোর মতো কোনও প্রতিষেধকই তাদের কাছে, অন্তত এইমুহুর্তে নেই। দুঃসংবাদে মনটা বিষণ্ণ হয়ে পড়ল। কতদিন হয়ে গেল, ভালো কোনও খবরই পাচ্ছি না, এমন কোনও খবর যাতে মনটা বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠতে পারে। এদিকে চোখের পাতাটা বেশ ভারী লাগছিল, পরপর দুটো হাইও পড়ল, তা ছাড়া এখন আমার কিছু করারও নেই, অগত্যা নরম বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম।
২১
বিকেল চারটে নাগাদ ঘরের বাইরে থেকে রুদ্রপ্রসাদের স্বর পেলাম, রুমাদিকে বলছিলেন ‘এই যে কাটলেটগুলো দেখছিস এসব কিন্তু যেখানে-সেখানে পাবি না, আমি শ্যামবাজারে গাড়ি থামিয়ে নিয়ে এসেছি, তোরা খা আর আমাদের দে, সবার আগে ভালো করে কফি বানা দেখি’ রুদ্রপ্রসাদ এবার ঘরে প্রবেশ করলেন, ভদ্রলোক বোধহয় এখুনি স্নান করেছেন, মাথার ভিজে চুল পরিপাটি করে ব্যাকব্রাশ করা, পাঞ্জাবি পায়জামার উপর শাল জড়িয়ে কাউচে বসে বললেন—’এই যে ইয়ংম্যান কেমন আছ? হেসে বললাম—’একদম ফিট! শুনলাম আপনি ভুবনেশ্বরে গেছিলেন’?
—’ওই একটা দরকারি কাজ টুক করে সেরে এলাম, তা এখানে তোমার কোনও অসুবিধে হচ্ছে না তো’?
—’অসুবিধে! কি বলছেন? আপনাদের আতিথ্যের তুলনা হয় না তবে এবারে অনুমতি দিন বাড়ি যেতে হবে’। রুদ্রপ্রসাদ যেন হাত দিয়ে আমার কথা উড়িয়ে দিয়ে বললেন—’হবে হবে, আগে শ্যামবাজারের বিখ্যাত মামার দোকানের কাটলেট নিয়ে এসেছি সেটা চেখে দেখবে না’। এবারে রুদ্র হাঁক পাড়লেন—’কি হল রে রুমা তোর কফির আর কত দেরি’। বলতে বলতেই রুমাদি খাবারের ট্রে হাতে নিয়ে ঢুকলেন। রুদ্রপ্রসাদ ট্রে-টা প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে বললেন—’ব্রেকফাস্টের পরে আর কিছু খাওয়া হয়নি বুঝলে, খিদেটা বেশ চাগার দিয়ে উঠেছে’। আমাকে খেতে ইঙ্গিত করে উনি নিজেও কাটলেটে বড়সড় একটা কামড় বসালেন। আমি কাটলেট হাতে তুলে বললাম—’আপনার হ্যারিকেন আর প্রদীপের ধাঁধাটা বোধহয় ধরতে পেরেছি’।
—’আচ্ছা, কি ধরেছ শুনি’?
—’এসব বোধহয় কোনও শক্তিশালী নেগেটিভ এনার্জিকে ঠেকিয়ে রাখার বন্দোবস্ত’।
—’রাইট’, রুদ্রপ্রসাদ বললেন—’তুমি এতক্ষণে কিছু কিছু বুঝতে শুরু করেছ, খারাপ কিছু যে এখনও এ বাড়ির চৌহদ্দির ভিতর থাবা বসাতে পারেনি সেটা কিছুটা ওই আগুনের শক্তিতেই বলতে পারো’।
—’কিন্তু আপনারা তো বাড়ির বাইরে যান! তখন’?
—সে ব্যবস্থাও আছে, রুদ্রপ্রসাদ শাল সরিয়ে ফতুয়ার কলার টেনে ধরতেই কবচের মতো কিছু দেখা গেল। বললেন—’এটা ধূমাবতীর কবচ, বিশেষভাবে মন্ত্রপূত’। আমি একটু অবাক হয়েই বললাম—’আপনাকে কিন্তু ঠিক কবচ টাইপের লাগে না’! রুদ্রপ্রসাদ সামান্য হেসে বললেন—’উপায় নেই ভায়া, জানো তো ক্রিকেট খেলতে হলে প্যাড গ্লাভস পড়তেই হয়’।
—’কয়েকটা বিষয় পরিষ্কার হচ্ছে না, বলিটা হল কিভাবে? ছেলেটাকে বলি দেওয়ার আগেই তো ওর মৃত্যু ঘটল! একদম নর্মাল ডেথ? রুদ্রপ্রসাদের খাওয়া হয়ে গেছিল, ন্যাপকিনে মুখ মুছতে মুছতে বললেন —’বলি যথাযথই হয়েছে, আর হয়েছে তোমার হাত দিয়েই, ছেলেটি হার্টফেল করার আগে তুমি ওর রক্তপাত করেছিলে, তারপরে অন্য কেউ কিছু করে ওঠার আগেই অকুস্থলে পুলিশের আবির্ভাব আর দলবল সমেত সমীরণের মহাপ্রস্থান। চণ্ডরাজা তোমার মাধ্যমে নিজের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বলি গ্রহণ করে নিয়েছে’। কথাটির অর্থ উপলদ্ধি করার সঙ্গে সঙ্গে আমার বাক্যস্ফুর্তিই যেন বন্ধ হয়ে গেল, রুদ্রপ্রসাদ এবার থমথমে স্বরে বললেন—’ওই যে কাণ্ডজ্ঞানহীন ছেলেটি তপন না কি যেন নাম, কত বড় একটা আহাম্মক সেটা ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছি না, অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে শুধু লোভে পরে নিষিদ্ধ গুপ্তবিদ্যার সাধন করতে গেছিল, অনধিকারী হয়ে যেদিন ও চণ্ডের গ্রাসে হাত দেওয়ার ধৃষ্টতা করেছিল সেদিনই নিজের ভাগ্যে ভয়ংকর পরিণতি আহ্বান করে ফেলেছিল, মৃত্যু তো সামান্য ব্যাপার, আমি নিশ্চিত ওর দেহাতীত আত্মা এই কুকর্মের ফলে অনন্তকাল কষ্ট ভোগ করবে’।
—’তাহলে সমীরণের মৃত্যুটা কি নেহাত দুর্ঘটনা’?
—’সমীরণ সংকল্প করে চণ্ডের বলির দায়িত্ব নিয়েছিল, কিন্তু নিজের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারেনি, ওর সেবার মধ্যে অবহেলাজনিত ত্রুটি ছিল। চণ্ড তাই ওর প্রাণ কেড়ে নিয়ে শাস্তি দিয়েছে, আর বলি গ্রহণ করেছে তৃতীয় ব্যক্তির মাধ্যমে অর্থাৎ তোমার হাত থেকে। তা ছাড়া জয়ন্ত, এটা অবিদ্যার সাধন, খুব কঠিন কাজ, আজ থেকে হাজার বছর আগে বলভদ্রের মতো কিছু অদ্ভুতকর্মা ব্যক্তি ছিল যারা এইসব লুপ্ত বিদ্যায় চূড়ান্ত পারদর্শী, কিন্তু মাঝখানে হাজার বছরের ধুলো জমে যোগসূত্রটাই খোয়া গেছে, শুধু গোটাকয়েক শিলালিপি পড়ে এ পথে এগোনো নিতান্তই পাগলামি’। আমি বললাম—’কিন্তু সমীরণ তো আর পাগল ছিল না, আপনার কথামতো সে তো জিনিয়াস ছিল’! রুদ্রপ্রসাদ ব্যঙ্গের হাসি হেসে বললেন—’সেইজন্যই তো মরল, একটা কথা আছে না অতি চালাকের গলায় দড়ি, ভেবেছিল একটু পরীক্ষা করেই দেখা যাক, বাস্তবে লাভ হলে ভালো, নাহলে কি আর হবে! কিন্তু ও যদি সবদিক খতিয়ে দেখত তাহলে বুঝত যেদিন এই কাজে হাত দিয়েছিল সেদিন থেকেই ওর পায়ের তলার জমি সরতে শুরু করেছিল, নতুবা জঙ্গলমহলের রাজা সমীরণকে কলকাতার রাস্তায় এমন কুকুরের মতো মরতে হয়’?
আমি পুরো বিষয়টাকে ছকে ফেলার চেষ্টা করছিলাম, হঠাৎ একটা ছবি যেন স্পষ্ট হতে হতে ফের কুয়াশার আড়ালে চলে গেল, বললাম—’আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে না তো? যদি সবকিছু তেমনই ঘটে থাকে যেমনটা আপনি বলছেন তাহলে তো আমার এতদিনে বিরাট কিছু প্রাপ্য ছিল, কিন্তু তেমন কিছু পেয়েছি বলে তো মনে পরছে না’! রুদ্রপ্রসাদ শান্ত কণ্ঠে বললেন—’কিছু পাওনি বলছ’?
—’অবশ্যই, স্কুলে কেরানিগিরি করি, মাইনে সামান্যই, এর মধ্যে কোনও ইনক্রিমেন্টও হয়নি, আর কোনও লটারিতে প্রাইজও ওঠেনি’। রুদ্রপ্রসাদ হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন—’একমিনিট বসো আসছি’। একমিনিট নাহলেও পাঁচমিনিটের মধ্যেই হাতে একটা বোতল নিয়ে ভদ্রলোক ফিরত এলেন, ছিপি খুলে দুটো গ্লাসে তরল পানীয় ঢেলে, একটা আমার দিকে এগিয়ে বললেন—’নাও হে’। অবাক হয়ে বললাম—’আমি মদ খাই না’। রুদ্রপ্রসাদ মৃদু হেসে বললেন—’মদ নয় ব্র্যান্ডি, খেলে নার্ভ স্ট্রং থাকে, এইমুহূর্তে এটা তোমার দরকার, আমি বলছি তুমি খাও’। বিশ্রী ঝাঁজাল স্বাদ তাও রুদ্রের অনুরোধে পুরো গ্লাসটা শেষ করতে হল। পানীয়ের প্রভাবেই বোধহয় মেজাজটা হঠাৎ হালকা লাগতে শুরু করল। রুদ্র আলমারি থেকে একটা পত্রিকা বের করে সামনে রাখলেন। পত্রিকাটির প্রচ্ছদপটে মুদ্রিত ”জার্নাল, ইন্ডিয়ান একাডেমী অফ ক্লিনিক্যাল মেডিসিন” রুদ্রপ্রসাদ বললেন—’এটা নিশ্চয়ই তোমার চোখে পরে নি, অরিন্দম মেডিকেল কলেজের লাইব্রেরি থেকে নিয়ে এসেছে, ওটার বারো নম্বর পাতায় একটা আর্টিকেল ছাপা হয়েছে, বেশ ইন্টারেস্টিং, প্রায় দু-মাস আগে, তারিখটা ৯ নভেম্বর, পিজি হসপিটালে একজন মরণাপন্ন যুবককে আশংকাজনক অবস্থায় ভরতি করা হয়, আহতের হৃৎযন্ত্রের একটা ধমনী, বন্দুকের গুলিতে মারাত্মক রকমের ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে পরেছিল, এমন পরিস্থিতিতে অবিলম্বে মস্তিষ্কে অক্সিজেনের ঘাটতি হওয়াটাই স্বাভাবিক তারপর ঠিক এক থেকে তিন মিনিটের মধ্যে ব্রেন ডেথ হওয়াটা অনিবার্য, কিন্তু এক্ষেত্রে ঘটনার প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট পরে ক্লিনিকাল ট্রিটমেন্ট চালু হওয়ার সময় দেখা গেছিল হৃৎযন্ত্র কোনও অদ্ভুত উপায়ে ক্রিয়া করছিল। মেডিক্যাল জার্নালে এই বিশেষ কেসটাকে মিরাকাল সার্ভাইভালের আওতায় নথিভুক্ত করেছে’। রুদ্রপ্রসাদ পত্রিকাটি আমার দিকে এগিয়ে দিলেন—’নিজের ছবি নিশ্চয়ই চিনতে পারবে’। ডাক্তারদের মুখে এমন কিছু কথা হাসপাতালে থাকতে শুনেছি কিন্তু গুরুত্ব দিইনি, আজকে ছাপার অক্ষরে সেসব দেখে হঠাৎ মাথা বোঁ করে ঘুরে উঠল, তবে কি! উলটোদিকের সোফায় বসে থাকা রুদ্রপ্রসাদের শানিত কণ্ঠস্বর চাবুকের মতো গায়ে আছড়ে পড়ল।—’তোমার মৃত্যু সেই দশ নভেম্বরের বিকেলেই হয়ে গেছে জয়ন্ত সিংহ রায়! জীবন ধারণের প্রতিটা নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের জন্য আজকের এই তুমি, চণ্ডরাজার ঋণী, তা ছাড়া তোমার জীবনের অন্যতম যে সমস্যা তার রহস্যও লুকিয়ে আছে এই ধাঁধার মধ্যেই, চণ্ড তোমাকে পৃথিবী আর পরলোকের মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ মিডিয়ামে রূপান্তরিত করেছে, ওপারের অতৃপ্ত আত্মারা তোমার দেহের সেতু অতিক্রম করে জীবনের স্বাদ চাঁখবার জন্য অধীর হয়ে পড়েছে, তাদের হুড়োহুড়ি আর হতাশ আস্ফালন, আর্তনাদের আকারে তোমার কানে কিন্তু এরমধ্যে কয়েকবার ধরা পড়েছে।
হাতে তেলের বোতল নিয়ে রুমাদি ঘরে আসতে আমাদের কথাবার্তায় ছেদ পড়ল, এক এক করে সব-কটা হ্যারিকেনে তেল ভরে শিখাগুলো একটু জোরালো করে মহিলা চলে যাচ্ছিলেন, রুদ্রপ্রসাদ বললেন—’রুমা আর এক কাপ কফি খাওয়াবি’। মহিলা সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে বিদায় নিলেন রুদ্রপ্রসাদ মোলায়েম স্বরে বললেন—’জয়ন্ত আমাকে ভুল বুঝো না। তোমার উপর কোনও কিছু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছি না, আমি শুধু চাই তুমি পুরো বিষয়টা ভালো করে বুঝে নাও তারপর যে সিদ্ধান্তই নেবে সেটা তোমার স্বাধীন ইচ্ছে’। মনের মধ্যে একটা উথালপাথাল শুরু হয়েছে এবার সেটা ঠেলে বাইরে আসতে চাইল, রুক্ষ স্বরে বললাম—’হেঁয়ালি না করে, বলুন তো আপনার মনের মধ্যে কি আছে’? রুদ্রপ্রসাদ বললেন—’বেশ তবে শোন, চণ্ডরাজা তোমার মাধ্যমে আগামী সাতষট্টি বছরের জন্য পৃথিবীর বুকে নিজের ধ্বংসলীলা চালাবেন, যেটা আমাদের প্রতিরোধ করতে হবে’। আমি অধৈর্য হয়ে বললাম—’তপন চিঠিতে লিখেছে দণ্ডদাসের আত্মাকে নরকে কষ্ট ভোগ করতে হবে সেটা কি ঠিক’? রুদ্রপ্রসাদ নেতিবাচকভাবে মাথা নেড়ে বললেন—’অন্তত এখানে ভুল কিছু নেই। তা ছাড়া এই অপশক্তির উত্থানে দুর্ভিক্ষ, খরা আর মহামারীতে প্রচুর জীবন ক্ষয় হওয়াটা অবশ্যম্ভাবী, মহামারী তো ইতিমধ্যে শুরুও হয়ে গেছে’! আমার ভ্রু দুটো বোধহয় কুঁচকে উঠেছিল, দেখে রুদ্র বললেন—’একরকম অসুখে যেটাকে সাদা জ্বর বলছে যার ফলে অনেক লোক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে খবর পাওনি’?
—’সেটাও কি এই কারণে’? আমার বিস্মিত প্রতিক্রিয়া দেখে রুদ্র ম্লান হাসলেন, বললেন—’তবে এখনও পর্যন্ত কেউ যে এই রোগে মারা যায়নি, সেটা অনেকটা এই শর্মার তৎপরতার জন্য বলতে পারো।
—’সেটা কিরকম’?
—’দশ নভেম্বরের বিকেলে, পুলিস নাগের বাজারের ওই বাড়িটা থেকে যা কিছু উদ্ধার করেছিল সেসব জমা আছে থানার মালখানায়, এর মধ্যে একটা গুলির আকারের পাথর যেটা চণ্ডরাজার প্রাণভোমরা, সেটার সামান্য অদলবদল হয়েছে, রাস্তার একটা নুড়ি-পাথর ওই গুদামে রেখে আসলটার জায়গা হয়েছে ত্রিপুরেশ্বরি কালী মন্দিরে মায়ের বেদির তলায়, চণ্ডরাজাটি যে এখনও অবধি তেমন দাঁত ফুটিয়ে উঠতে পারেন নি সেটা শুধুমাত্র এই একটি কারণেই’। আমার বিস্ময় চরমে উঠল, বললাম—’এটা কিভাবে সম্ভব হল’? রুদ্রপ্রসাদ দুর্বোধ্য ভাবে হাসলেন, বললেন—’টাকার জোরে কি না হয়! বাকিটা বুঝে নিতে তোমার অসুবিধে হওয়ার কথা নয়, আর মন্দিরের পুরোহিত আমার দীর্ঘদিনের পরিচিত’।
—এই নরকের রাজাটিকে কোনওভাবে ঠেকানো যায় না? রুদ্রপ্রসাদ চিন্তিত স্বরে বললেন—’অত্যন্ত কঠিন কাজ, শয়তানের সঙ্গে লড়াই করার মতো আত্মিক শক্তি কি আমাদের মধ্যে আছে? ঝড়ের সামনে খড়কুটোর মতো উড়ে যাব, তবে হ্যাঁ একটা ক্ষীণ উপায় হয়তো আছে, আর সেটাও যে কতটা সফল হবে জানি না, রাজগুরু অনঙ্গদেব চণ্ডবিজয় পুঁথিতে এ ব্যাপারে স্পষ্ট দিকনির্দেশ করে বলেছেন, চণ্ডের শক্তির ত্রিকোণ যদি নষ্ট করে দেওয়া সম্ভব হয় তাহলে চণ্ড পৃথিবীর বুক হতে বিদায় নিতে বাধ্য হবে’।
—’ত্রিকোণ! সেটা আবার কি’?
—’ত্রিকোণের প্রথম কোণটা হচ্ছে চণ্ডরাজার প্রাণ পাথর, যেটা এখন মন্দিরের বেদির তলায় পোতা রয়েছে, দ্বিতীয়টা হচ্ছে ভগীরথপুরের চণ্ড মন্দিরের ওই মূর্তি, আর তৃতীয় যে ত্রিকোণটা তৈরি হয়েছে সেটা হয়তো সাময়িক কিন্তু এর মধ্যে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ’। এতটা বলে রুদ্রপ্রসাদ থামলেন, একটু সময় নিয়ে বললেন—’আর তৃতীয় ত্রিকোণটা যে কি হতে পারে আশা করি তুমি আন্দাজ করতে পারছ’? একটা ভয়ংকর সম্ভাবনা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল, মুখে বললাম—’বলতে থাকুন, শুনছি’। রুদ্রপ্রসাদ স্থির দৃষ্টে চেয়ে বললেন—’সেটা অন্য কিছু নয়, তুমি নিজেই, চণ্ডের ত্রিকোণের সবথেকে ক্ষতিকারক আর অপরিহার্য শেষ বিন্দু’! টের পেলাম আমার কপালের দু-পাশের শিরাগুলো হঠাৎ বিশ্রীভাবে দপদপ করতে শুরু করেছে, আমি রগ দুটোকে ডান হাতের আঙুল দিয়ে টিপে ধরে শান্ত করার চেষ্টা করলাম। সামান্য পরে রুদ্রপ্রসাদের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম—’সময় ফুরিয়ে এসেছে জয়ন্ত, আর তিন দিন ব্যাস, এর পরে ধীরে ধীরে সে তোমার মনের দখল নিতে শুরু করবে, তোমার হাত দিয়েই তার প্রাণ পাথরের মুক্তি ঘটবে, কারও ক্ষমতায় কুলাবে না সেটা আটকানোর, আর ভগীরথপুরেও তুমি নিশ্চয়ই যাবে, তবে স্বেচ্ছায় কি না সে প্রশ্ন অবান্তর’! রুদ্রপ্রসাদকে থামিয়ে অধৈর্যভাবে বললাম—’আপনি আবার হেয়ালি করছেন! তিন দিন পরে আবার কি ঘটতে চলেছে’?
রুদ্রপ্রসাদ বললেন—’ঠিক তিনদিন পর অমাবস্যা, মাঘ মাসের অমাবস্যা, আদিবাসীদের মধ্যে এই তিথিটা চণ্ডের রাত বলে পরিচিত। দেবতাটির সে রাতে শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি ঘটবে, যতদূর মনে হয় ওইরাতেই চণ্ডরাজা জঙ্গল, মন্দির পরিত্যাগ করবেন আর তোমার শরীর-মন পুরোপুরি ভাবে কব্জা করে নিজের খেলা শুরু করবেন। আমি এতটা শুনে বললাম—’চণ্ড তা হলে ওইদিনটার অপেক্ষাই করছে’?
—’উপায় নেই, চণ্ডেরও কিছু লিমিটেশন আছে, বলি দেওয়ার সময় তুমি বিধিমতো চণ্ডের সামনে আত্মসমর্পণ করনি, ও কাজটা সমীরণের করার ছিল, ভগীরথপুরের নিষিদ্ধ মন্দিরে বসে চণ্ড বিগত দু-মাসের উপর তোমার পথ চেয়ে বসে আছে, কবে তুমি এসে তাকে মুক্তি দেবে, তবে চণ্ডের রাতে সব হিসেব-নিকেশ পালটে যাবে, তখন তুমি চণ্ডের ইচ্ছেমতো কাজ করতে বাধ্য। তারপরেই হাজার বছরের বন্দিদশা থেকে বেড়িয়ে রাজাটি যে কি তাণ্ডব ঘটাবেন সে একমাত্র ঈশ্বরই জানেন। আমি বললাম—’তাহলে কি আমার মৃত্যুতেই চণ্ডকে ঠেকানো যাবে’? রুদ্রপ্রসাদ মাথা নাড়লেন—’হ্যাঁ তবে আত্মহত্যা নয় আত্মবলিদান! কিন্তু সেটাও দস্তুরমতো নিয়ম অনুযায়ী করতে হবে। পারবে কি তুমি’? উত্তর দিতে ইচ্ছে করছিল না, চুপ করেই রইলাম, মনের মধ্যে যেটুকু জোর ছিল তা যেন হাওয়ায় উড়ে গেছে, নীরবতা ভেঙে রুদ্রপ্রসাদই ফের কথা বললেন—’যদি এমন একটা কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে মনের সায় না পাও তবে ঠিক আছে, আর যাই হোক এই পরিস্থিতির জন্য তুমি কোনওভাবেই দায়ী নও’। ঘরের পরিবেশ হঠাৎ অসহ্য লাগতে শুরু করল। বললাম—’আমি একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসতে চাই’। রুদ্রপ্রসাদ চিন্তিত স্বরে বললেন—’কিন্তু তোমার শরীর যে এখনও দুর্বল রয়েছে’।
—’থাকুক তা হলেও বেরোনো দরকার’। রুদ্রপ্রসাদ বললেন— ‘অরিন্দম এখন বোধহয় বেড়িয়েছে আমি কিশোরীলালকে বলছি গাড়ি বের করতে’। -‘গাড়ির প্রয়োজন নেই, আমি দিব্যি হেঁটে যেতে পারব’।
২২
উদ্ভ্রান্তের মতো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছিলাম। মাথার মধ্যে চিন্তাগুলো সব যেন জট পাকিয়ে গেছে, তার সঙ্গে আসন্ন মৃত্যুর ভয় আমাকে একেবারে অস্থির করে তুলল। একটা সিট খালি বাস পেয়ে গন্তব্য না জেনেই বসে পড়লাম। পার্ক স্ট্রিটের মোরে বাসটা এসে দাড়াতেই আবার কিছু না ভেবেই নেমে পরলাম। পার্ক স্ট্রিটের আলো ঝলমল করা রঙচঙে দোকান রেস্টুরেন্ট পানশালাগুলোতে আমোদ পেয়াসী সুসজ্জিত নারীপুরুষের ঢল নেমেছে। এত আনন্দ উল্লাসের মাঝে নিজেকে অর্বাচীন মনে হচ্ছিল, হাটতে হাটতে রাসেল স্ট্রিটের মাঝামাঝি পৌঁছোতেই বিরক্তি চরমে উঠল, এর থেকে গঙ্গার হাওয়া খেতে যাওয়া ভালো, একটা হলুদ ট্যাক্সি দাড় করালাম, সামান্য চাকরি করি, ট্যাক্সির বিলাসিতা আমাকে পোষায় না, অন্তত এতদিন পোষায় নি, কিন্তু জীবন-মৃত্যুর এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে এত হিসেব নিকেশ করতে আর মন চাইছিল না। গঙ্গার দিকে যেতে বলে গাড়িতে চেপে বসলাম। চলন্ত গাড়ির খোলা জানলা দিয়ে হুহু করে ঠান্ডা হাওয়া ঢুকছিল। এইসময় গঙ্গার হাওয়া খেলে নির্ঘাত জ্বর হতে বাধ্য, ভাবতেই হাসি পেল, শরীর খারাপ হলে নিশ্চয়ই চণ্ডরাজা নিজের দরকারে সারিয়ে নেবেন, আর সুস্থ থাকলে রুদ্রপ্রসাদ বলি দেওয়ার জন্য আবদার জুড়বেন। হঠাৎ বেশ রাগ হল, যদি কিছু লোক মরে কিছু লোকের সুখে যদি চোনা পরে তাতে আমার কি? মরে মরুক গে! আর আত্মার নরকস্থ হওয়া? আত্তা ফাত্তা দেখিনি জানিনা কি জিনিস, আগে তো প্রাণ ভরে বেঁচে নিই, পরে ভাবা যাবে। ট্যাক্সি আর্মেনিয়ান ঘাটের সামনে এসে দাঁড়াল। পকেট ঝেড়েঝুড়ে যা বেরোল তা ভাড়া চুকাতেই চলে গেল। ঘাটের উলটোদিকের ফুটপাথের উপর সৈনিক বেশে নেতাজির পূর্ণাবয়ব কাট-আউট দিয়ে সাজানো মঞ্চে তখন দেশাত্মবোধক গানের রেকর্ড বাজছিল। আজ তেইশে জানুয়ারি, নেতাজির জন্মদিবস। ছবির দিকে তাকিয়ে নেতাজির জীবনের কথা ভাবছিলাম।
চিন্তার জাল ছিন্ন হয়ে গেল, নারী কণ্ঠে বিলাপের স্বর কানে এল। একটা গাড়ি ঘাটের গেটে এসে দাঁড়িয়েছে তার থেকে নেমে কিছু লোক ঘাটের উদ্দেশ্যে এগিয়ে আসছে, দলটার মধ্যে একজন মহিলা, মহিলাটি কাঁদতে কাঁদতে মাঝে মধ্যে বুকফাটা আর্তনাদ করে উঠছেন। বুঝতে পারলাম এনার সন্তান বিয়োগ ঘটেছে। মহিলাটি মাঝবয়েসী, বছর পঁয়তাল্লিশ বয়স হবে হয়তো, তা হলে কত বয়স হবে মৃত ছেলেটির! চব্বিশ কি পঁচিশ, কি এসে গেল? ওর আর বয়স বাড়বে না! দলটা জলের ধারে গিয়ে জড়ো হল, আমি একটু দূরে সরে গেলাম, এ জিনিস আগে আমাকেও দু-বার করতে হয়েছে, বাবা-মায়ের অস্থি বিসর্জন করতে এমনই কোনও ঘাটের ধারে কোনও একসময়ে আমিও হাজির হয়েছিলাম, মহিলাটির বিলাপ কানে আসছিল ”খোকা তুই কোথায় গেলি, ফিরে আয়” শীতের রাতে এই ক্লেদাক্ত পরিবেশে আবার নতুন করে অনুভব করলাম কত ঠুনকো আর পলকা আমাদের অস্তিত্ব, অথচ কি সীমাহীন আমাদের জীবনের প্রতি মোহ।
মনের দুর্বলতা কেটে গেল। পকেট থেকে মোবাইল বের করে রুদ্রপ্রসাদকে ফোন করে জানালাম—’আমি রাজি, বলুন কি করতে হবে’? রুদ্রপ্রসাদের উদ্বিগ্ন কন্ঠস্বর শোনা গেল—’আগে বল তুমি এখন কোথায় আছো’?
—’আর্মেনিয়ান ঘাটে’।
—’জয়ন্ত তুমি ওখানেই থাকবে, অন্য কোথাও যাবে না, আমি এখুনি আসছি’।
শীতের সন্ধ্যেয় গঙ্গার ঘাট একেবারে লোকশুন্য, কনকনে ঠান্ডা জোলো হাওয়ায় মাঝে মধ্যেই দাঁতে দাঁত ঠোকাঠুকি লেগে যাছিল, তাও বসে জলের শোভা দেখছিলাম, এই সব দৃশ্য হয়ত আবার দেখার সুযোগ ঘটবে না। ভাটার সময় দেখলাম জল অনেকদূর সরে গিয়ে ছড়ানো ছিটানো ময়লা, প্লাস্টিক, বিশ্রী টিনের টুকরো দাঁত বের করে বেড়িয়ে পরেছে। জলের দিকে চেয়ে নিবিষ্ট মনে চেয়েছিলাম, রুদ্রপ্রসাদের ডাকে পিছন ফিরে চাইলাম, উনি ঘাটে এসে হাজির হয়েছেন, ভদ্রলোক ঘাটের সিঁড়িতে আমার পাশে বসে পরলেন। দুজনে নিঃশব্দে গঙ্গার শোভা দেখছিলাম, কিছুক্ষণ পরে রুদ্রপ্রসাদ মৃদুস্বরে বললেন —’সবদিক ভেবেই সিদ্ধান্ত নাও, সঙ্কল্পে যদি সফল হও তাহলে কিন্তু পরিনতিতে তোমার মৃত্যু অবধারিত’। উত্তর দিতে একটু সময় লাগল, যথাসম্ভব শান্ত স্বরে বললাম -‘আমার ভাবা হয়ে গেছে’। রুদ্রপ্রসাদের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বললেন —’জয়ন্ত গর্বে আমার বুক ফুলে উঠছে, তপন আর সমীরণের মতো লোকগুলো যে এখনও এই দেশটার বারোটা বাজিয়ে দিতে পারছে না সেটা তোমার মতো দু-চারটে ছেলে আছে বলেই’। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম—’তাহলে এবার আমায় কি করতে হবে’? রুদ্রপ্রসাদ বললেন —’সবার আগে চণ্ডের দান ফেরত দিতে হবে, এক্ষেত্রে নৃপতিপুরের রাজবাড়ি’। আমার বিস্ময় চরমে উঠল, বললাম -‘মানে! রাজবাড়ি আমি পেলাম কোথায়’? রুদ্রপ্রসাদ হেয়ালি করে বললেন —’এখনও হয়ত পাওনি কিন্তু পঁচিশ তারিখের পর নিশ্চয়ই পাবার সম্ভাবনা তৈরি হয়ে যাবে’।
—’কিভাবে’?
—’জয়ন্ত খবর তোমার কানে এসে পৌঁছোয়নি, কিন্তু তোমার জ্যাঠতুত দাদা কুণাল এইমুহূর্তে সাদা জ্বরের প্রকোপে কাহিল হয়ে পরেছে, অবস্থা মোটেই সুবিধের নয়’। রুদ্রপ্রসাদ দেখছি প্রতিমুহূর্তেই আমাকে অবাক করছেন, বললাম—’আপনি তো দেখছি সব খোঁজখবরই নিয়ে বসে আছেন’।
—’খোঁজ নেওয়ার থেকেও বেশি কিছু করেছি, কাল সকালে তোমার জ্ঞান ফিরতে তাড়াহুড়ো করে বেড়িয়ে পরেছিলাম, তোমার মনে আছে আশা করি। গেছিলাম নৃপতিপুরে তোমার এই মামলাবাজ দাদাটির খোঁজে, যেমনটি ভেবেছিলাম তেমনটাই পেলাম, দেখলাম কুণাল জ্ঞান হারিয়ে ঘরের মেঝেতে পরে রয়েছে, তোমাকে না জানিয়ে ওকে আমি এখানকার একটা নার্সিং হোমে ভরতি করেছি, দেবু ওর দেখাশোনা করছে। একমুহূর্ত আমার দিকে স্বপ্রশ্ন দৃষ্টে চেয়ে রুদ্র বললেন—’কাজটা আমি কি ঠিক করেছি, জয়ন্ত’? রুদ্রের প্রশ্নের সোজা উত্তর না দিয়ে বললাম—’নৃপতিপুরে কুণালের কিছু আত্মীয় রয়েছে যারা ওর জন্য হয়ত দুশ্চিন্তা করছে! তাছাড়া ওর ছেলে তো বাইরে কোথাও থাকে, তাকে না জানিয়ে’! রুদ্র আমার কথার মাঝখানেই বলে উঠলেন—’আত্মীয় স্বজন! ছোঁয়াচে রোগের ভয়ে সব পালিয়েছে! এই অবস্থায় ওর ছায়া মাড়াতেও কেউ রাজি নয়’।
—’কিন্তু ওর ছেলেকে তো খবরটা জানাতে হবে’।
—’খবর কাকে দেবে? যে মরতে বসেছে তাকে’!
—’মানে’?
—’মানে, দিন তিনেক আগে একটা পথ দুর্ঘটনায় কুণালের একমাত্র সন্তানটি সাংঘাতিকভাবে জখম হয়ে এইমুহূর্তে সাউথ চেন্নাই হসপিটালে চিকিৎসাধীন। ভেন্টিলেসন চলছে। কুণাল অবশ্য ঠিক সময়েই খবরটা পেয়েছিল, তড়িঘড়ি করে প্লেনের টিকিটও বুক করে ফেলেছিল কিন্তু শেষ অবধি ছেলের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো আর হোল না। রওনা হবার আগেই জ্বরের ঘোরে পরে গেল, আমি যখন গিয়ে পৌছলাম তখন ও বেহুঁশ হয়ে মেঝেতে পরে ছিল, জামার বুক পকেটে ছিল প্লেনের টিকিট আর হাসপাতালের ই-মেলের প্রিন্ট-আউট’। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম—’ছেলেটা কি বাঁচবে’?
—’পঁচিশ তারিখ বিকেল চারটে একত্রিশ পর্যন্ত! সূর্যাস্ত ওইসময়েই হচ্ছে কিনা! তারপর খুব সম্ভবত বাবা আর ছেলে দেশের দুটো ভিন্ন শহরে একই সময়ে মরতে চলেছে, এছারা আরও প্রায় সাতশো বত্রিশ জন সাদা জ্বরের রোগী, যারা এইমুহূর্তে শহরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভরতি, কেউ কেউ হয়তো একটু সেরেও উঠছে তারাও সবাই কিন্তু রাত কাটার আগেই একে একে মারা পড়তে বাধ্য, তবে এতসব কিন্তু সবেমাত্র সূচনা। এরপর যে কি ঘটবে সেটা ধারণা করা খুব মুশকিল ব্যাপার’। রুদ্রপ্রসাদ এবার আমার কাঁধে মৃদু চাপ দিয়ে বললেন—’শীতের রাতে গঙ্গার হাওয়াটা কিন্তু স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো নয়, আরও দুটো দিন অন্তত আমাদের শরিরটাকে সুস্থ্য রাখতেই হবে’। উঠে পরলাম। ঘাটের সামনের রাস্তায় গাড়ি পার্ক করা ছিল, রুদ্র নিজেই চালিয়ে নিয়ে এসেছেন, আমি পাশে বসে বললাম—’তাহলে নেক্সট স্টেপ-টা কি’? রুদ্রপ্রসাদ স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতে বললেন —’সবার আগে চণ্ডরাজার শিলাপাথর মন্দিরের বেদী থেকে খুঁড়ে বের করে নিতে হবে, পরবর্তি গন্তব্য হবে ভগীরথপূরের জঙ্গল-মন্দির, যেখানে ওই পাথর বেদীর ওপর রেখে আগুনে পুড়িয়ে দিতে হবে। যদি আমরা এই কাজে সফল হই তাহলে চণ্ডের পরাজয় হবে, সে পৃথিবীর বুক থেকে বিদায় নেবে, তবে এই সাফল্যের মূল্য কিন্তু আমাদের নিজেদের জীবন দিয়ে চুকাতে হবে, আগেই বলেছি তোমার জীবন আর চণ্ডের অস্তিত্ব একই সুতোয় জুড়ে রয়েছে’। শীতের রাতে ফাঁকা রাস্তা দিয়ে গাড়ি হুহু করে ছুটছিল, অল্পসময়ের মধ্যে ইডেন গার্ডেন্স পেরিয়ে পার্ক স্ট্রিট মল্লিক বাজার হয়ে বালিগঞ্জের রাস্তায় এসে পড়লাম। এতক্ষণ আমরা কোনও কথা বলিনি এবারে আমি বললাম—’কুণালের সঙ্গে একবার দেখা করা যায় না’।
—’কাল সকালে সে ব্যবস্থা হবে, আজকের রাতটা ভালো করে বিশ্রাম নাও। আমারও কয়েক ঘন্টা ঘুমের ভীষণ প্রয়োজন’।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে যখন উঠলাম তখন বেশ ঝরঝরে লাগছিল। রাত্রে বাড়ি ফিরে রুদ্রপ্রসাদ আমার হাতে কড়া ঘুমের ট্যাবলেট ধরিয়ে, নিজেও একটা খেয়ে নিলেন, সেটা না পেলে অবশ্য দুশ্চিন্তায় ঘুম আসত কি না বলা মুশকিল। তরতাজা মনে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক সময় সহজ হয়ে পরে, মনের সবরকম দ্বিধা-দ্বন্দ ঝেড়ে একটা জটিল সমস্যার চুড়ান্ত সমাধান করে ফেললাম, দু-পুরুষের মামলাটার এখানেই ইতি করতে হবে, এখন অপেক্ষা শুধু রুদ্রপ্রসাদের, সাড়ে সাতটা নাগাদ রুদ্রপ্রসাদ আর চায়ের পেয়ালা একসঙ্গেই চলে এলো। চা খেতে খেতে রুদ্রপ্রসাদ বললেন—’তাহলে যুদ্ধের জন্য তৈরি তো জয়ন্তবাবু’! বললাম—’হ্যাঁ আমি রেডি, কিন্তু সবার আগে কুণালের সঙ্গে দেখা করতে চাই, তারপরে একবার কোর্টে যেতে হবে, একটা কাজ আছে’। রুদ্রপ্রসাদ ঘড়ি দেখে বললেন—’তাহলে তো প্রচুর কাজ আছে হে, চল তাহলে ব্রেকফাস্ট সেরে বেড়িয়ে পরা যাক’।
দক্ষিণ কলকাতার একটা বিখ্যাত নার্সিং হোমে যতক্ষণে পৌঁছোলাম ততক্ষণে ঘড়িতে প্রায় সাড়ে আটটা, হাসপাতালের ভিজিটিং আওয়ার্সের যদিও দেরি আছে কিন্তু রুদ্রপ্রসাদ আগে থেকে ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন তাই অবাধেই তিনতলার কন্টেজিয়াস ওয়ার্ডে পৌঁছে গেলাম। কুণালকে শেষ দেখেছিলাম বর্ধমান সদর আদালতে, কত সাবলীল আর আত্মপ্রত্যয়ী লেগেছিল সেদিন, আর আজ! এ যেন সেই ডাকাবুকো কুণালের ভগ্নাংশ মাত্র! না কামানো কাঁচাপাকা দাড়ি গজাঁনো গাল দুটো ভেঙে যেন কোটরে ঢুকে গেছে, কপালের শিরাগুলো বিশ্রীভাবে ফুলে নীলচে আভার সৃষ্টি করেছে, হাতের শিরায় স্যালাইন বোতলের নল ঢোকানো। হাউজ ফিসিসিয়ান দেখলাম রুদ্রের পরিচিত, দেখতে পেয়ে এগিয়ে এলেন, রুদ্রপ্রসাদ জিগ্যেস করলেন—’কেমন আছে এখন’?
—’আগের থেকে ভালো, জ্ঞান ফিরেছে, এখন ঘুমোচ্ছে’।
—’দেখা করা যেতে পারে’? ডাক্তার সামান্য ইতস্তত করে বলল—’ঠিক আছে, তবে পেসেন্টের কিন্তু বেশি কথা না বলাই ভালো’। এরপর ডাক্তার নিজে থেকেই গিয়ে ধীরস্বরে কুণালকে ডাকতে ও হালকা চোখ মেলে চাইল। কুণালের চোখের তারায় বিস্ময়ের ছাপ স্পষ্ট, কারণ ও আমাকে দেখতে পেয়েছে। দুর্বল স্বরে জিগ্যেস করল—’আমি এখানে এলাম কিভাবে’? রুদ্রপ্রসাদ বললেন— ‘কুণালবাবু আপনার সাদা জ্বর হয়েছে, অজ্ঞান হয়ে ঘরের মেঝেতে পড়েছিলেন, রোগটা ছোঁয়াচে নিশ্চয়ই জানেন? আপনার নিজের লোকেরা কেউ দায়িত্ব নিতে চাইল না, আমি একপ্রকার বাধ্য হয়ে আপনাকে অ্যাম্বুলেন্সে চাপিয়ে এখানে নিয়ে এসেছি, তবে এতসব আমি করেছি আপনার এই ভাই জয়ন্তর জন্যে, যাকে আপনি পৈতৃক ভিটে থেকে উৎখাত করার কোনও চেষ্টায় বাকি রাখেন নি’। কুণাল এ কথার কোনও উত্তর দিল না শুধু হতবুদ্ধির মতো আমার দিকে চেয়ে রইল। আমি এগিয়ে গিয়ে কুণালের হাতে চাপ দিয়ে বললাম—’এখন কেমন বোধ হচ্ছে? কুণাল হঠাৎ শিশুর মতো ডুকরে কেঁদে বলল—’আমার ছেলে কৌশিকের অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে, ও কি বেঁচে আছে’? এবারেও রুদ্রপ্রসাদই উত্তর দিলেন, বললেন—’আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, আমার ছোট ভাই একজন নামী ডাক্তার সে পরিচিত কলিগদের মাধ্যমে আপনার ছেলের খোঁজখবর রাখছে, ওর চিকিৎসায় কোনও ত্রুটি যে হবে না সে গ্যারান্টি আমি দিচ্ছি, কুণালের ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া মুখ দিয়ে শুধু এটুকুই বের হল—’আচ্ছা’! রুদ্রপ্রসাদ এবার বললেন—’আর একটা কথা জেনে রাখুন আপনি আর আপনার ছেলে দুজনেই যদি এই ধাক্কা সামলে উঠে আরও কিছু বছর চালিয়ে যেতে পারেন, তার সব কৃতিত্ব কিন্তু আপনার এই ছোট ভাইটির’। আমি রুদ্রপ্রসাদকে থামিয়ে বললাম—’যাইহোক, কুণাল একটা দরকারি কাজে কলকাতার বাইরে যাচ্ছি, মনে হয় আমাদের আর কখনো দেখা হবে না। রাজবাড়ির প্রয়োজন আমার ফুরিয়েছে! আমার অবর্তমানে যাতে ও বাড়ির মালিকানা পেতে তোর অসুবিধে না হয় সে ব্যবস্থা অবশ্য করে যাব’। কুণাল বেকুবের মতো চেয়ে রইল। আমাদের কথার বিন্দু বিষর্গও সে বুঝতে পারেনি! আর এইমুহূর্তে না বোঝাটাই বাঞ্ছনীয়।
হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে রুদ্রপ্রসাদ জিগ্যেস করলেন কোর্টে কি করতে যাবে? বললাম—’ভাবছি, রাজবাড়িটার দানপত্র করে যাব, যাতে পরে কুণালের দখল নিতে অসুবিধে না হয়’। রুদ্রপ্রসাদ বললেন—’অ্যাবসার্ড! উইল করতে কত সময় আর টাকা খরচ হয় জানো? সে সময় আমাদের দিচ্ছে কে’?
—’তাহলে’? রুদ্রপ্রসাদ সামান্য চিন্তা করে বললেন—’অবশ্য একটা এফিডেভিট করা যেতেই পারে, তবে সেটা কতটা কার্যকারী হবে সঠিক বলতে পারব না, তবে কিছুটা কাজে লাগবে নিশ্চয়ই’।
—’আর হ্যাঁ ব্যাংকে কিছু টাকা জমানো আছে সেটা জগন্নাথদা যাতে পায়’! রুদ্রপ্রসাদ বললেন—’ব্যাংকে গিয়ে নমিনেসন ফর্ম ভরতে পারো তবে সেখানেও অনেক হ্যাপা, তার থেকে দুটো আলাদা আলাদা এফিডেভিট করা যাক, একটা কুণালের কাছে যাবে আর অন্যটা যাতে জগন্নাথ পায় সে ব্যবস্থা তুমি করবে’। পরের দু-ঘন্টায় দুটো ষ্ট্যাম্প পেপারে এফিডেভিট তৈরি হয়ে হাতে চলে এল। রুদ্রপ্রসাদ সেগুলো ব্যাগে পুরতে পুরতে বললেন—’আমার কাছে আপাতত থাকুক, রাতে দেবুকে দিয়ে যা বলার বলে দেব’। রুদ্রপ্রসাদ হঠাৎ বললেন—’জয়ন্ত আত্মীয়-বন্ধু কেউ আছে যার সঙ্গে শেষ দেখা করতে চাও’? উত্তর দিতে চিন্তা করার প্রয়োজন হল না, বললাম—’নাঃ আমার তেমন কেউ নেই। তবে একবার জগন্নাথদার বাড়ি যেতে হবে, কাগজটা দেবার আছে’। রুদ্রপ্রসাদ বললেন—’একটা কথা খেয়াল রেখো রাস্তায় বেশি ঘোরাঘুরি করাটা কিন্তু আমাদের দুজনের কারোর পক্ষেই ভালো নয়, তার থেকে দুজনের একসঙ্গে থাকাটাই নিরাপদ, আর হ্যাঁ তোমার কাজ মিটলে পর আমার সঙ্গে এক জায়গায় যাবে’?
—’কোথায়’?
—’গড়িয়ায়, ত্রিপুরেশ্বরী কালী মন্দিরে, চণ্ডের প্রাণ-ভোমরাটাকে মুক্তি দেওয়ার সময় এসে গেছে’। বললাম—’বেশ তো চলুন, যাব’। রুদ্রপ্রসাদ স্থিমিত স্বরে বললেন—’আজ সন্ধেটা দেবুকে বাড়িতে থাকতে বলেছি, ও ব্যস্ত মানুষ, কাজের জায়গায় অসুবিধে হবে, কিন্তু আমার অনুরোধ রাখবে বলেছে’, একটা প্রশ্ন না করে পারলাম না—’আপনি কি ওদের সব কথা খুলে বলে দিয়েছেন’?
—’মাথা খারাপ! তা হলে ওরা আমার কাজে বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে না? অবশ্য একটা চিঠিতে সব লিখে রেখেছি, যতক্ষণে সেটা হাতে পাবে’। রুদ্রপ্রসাদ আর কিছু না বলেই কথা শেষ করলেন। গাড়ি এবার চলল ভবানীপুরের গিরিশ মুখার্জি রোডের উদ্দেশ্যে, জগন্নাথদা আজকাল ওখানেই থাকেন।
২৩
২৪ জানুয়ারির দিনটা রুদ্রপ্রসাদের বাড়িতেই কেটে গেল, ইচ্ছে ছিল শেষের এই দিনটা আমার স্বর্গীয় বাবা-মার স্মৃতি জড়ানো ভবানীপুরের ফ্ল্যাটে গিয়ে কাটাব, এরপরে ভাগ্যে যে কি আছে, তা একমাত্র ঈশ্বরই জানেন? কিন্তু রুদ্রপ্রসাদ বললেন সেখানে পা রাখলে নাকি বিপদের সমূহ সম্ভাবনা, চণ্ডের দৃষ্টির অশুভ প্রভাবে ওখানকার বাতাবরণ আগে থেকেই দূষিত হয়ে রয়েছে, এরপর ওই চৌকাঠ ডিঙিয়ে প্রবেশ করলে আর দেখতে হবে না। অতএব সে পরিকল্পনা বাতিল করতে হল। মাঝখানে অবশ্য জগন্নাথদার বাড়ি থেকে ঘুরে এসেছি, খবর যা পেলাম তাতে উদ্বেগ বাড়ল বই কমল না, জগন্নাথদার পাঁচ বছরের নাতনি সাদা জ্বরে হাসপাতালে ভরতি, বেচারি জগন্নাথের দুর্ভোগ দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল। ত্রিপুরেশ্বরী মন্দিরে গিয়েও বিশেষ লাভ হল না, চণ্ডের পাথরটা রুদ্রপ্রসাদ দেখতেই দিলেন না, বললেন—’এই মুহূর্তে ওটার সংস্পর্শে এলে নাকি আমার মাথায় গণ্ডগোল বাঁধতে পারে, তবে একবার ভগীরথপুর পৌঁছলে অবশ্য ওটা আবার নাকি আমার হেপাজতেই থাকবে।
সেদিন বিকেলটা কাটল সদ্যপরিচিত মিত্র পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে গল্পগুজব করে, অদ্ভুত মানুষ এরা! সমাজের উচ্চপদে আসীন হওয়া সত্ত্বেও আত্মভরিতার ছিটেফোঁটা প্রকাশও এঁদের ব্যবহারে নেই, তাই বোধহয় আমার মতো সামান্য একজন কেরানিকে আপন করে নিতে এঁদের দ্বিধা হয়নি, অবশ্য কথা বলার মতো মনের অবস্থা আমার একেবারেই ছিলনা, চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে যে লোকটা এমন একটা অভিযানে যেতে চলেছে যেখান থেকে তার বেঁচে ফিরত আসার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে, সে আর কতটা মন খুলে হাসতে পারে! রুদ্রপ্রসাদকে দেখলাম একেবারেই নিরুত্তাপ, সে নিজেও যে এতবড় একটা ঝুঁকির সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেটা তার আচরণ দেখে বোঝার বিন্দুমাত্র উপায় নেই, দিব্যি আড্ডা মেরে মজা করে সময় কাটিয়ে দিল। কাল সকাল সাড়ে ছ-টায় ভুবনেশ্বরের ফ্লাইট, চারটের মধ্যেই বেরিয়ে পড়তে হবে, রুদ্রপ্রসাদ আগে থেকেই বলে রেখেছেন। ঘড়ির কাঁটা দশটার ঘর ছুতেই সবার থেকে বিদায় নিয়ে শুতে চলে গেলাম, যদিও ঘুম আসার কোনও লক্ষণই দেখা গেল না, অসংলগ্ন নানা চিন্তা করতে করতে রাত কাটতে লাগল, অনেক পরে বোধহয় একটু তন্দ্রা মতো এসেছিল, একটা চিঁচিঁ শব্দ শুনে ধরমড়িয়ে বিছানার উপর উঠে বসলাম, আজকাল এই নতুন উৎপাত হয়েছে, ইঁদুর চোখে দেখলে বা আওয়াজ শুনলেও কেমন যেন ভয়ে বুক কেঁপে উঠছে। আলো জ্বেলে ঘরের সর্বত্র, বিশেষ করে খাটের তলাটা ভালো করে খুঁজে কোথাও যখন ইঁদুরের চিহ্ন দেখতে পেলাম না, আবার বিছানায় গিয়ে আশ্রয় নিলাম, এরপর বাকি রাতটুকু আর চোখে ঘুম এল না, ঠিক চারটের সময় দরজায় টোকা পড়ল। রুদ্রপ্রসাদ এসে হাজির হয়েছেন, বললেন—’জয়ন্ত, আমাদের বেরোনোর সময় হয়েছে’।
গাড়ি হুহু করে ছুটে চলল বাইপাশের নির্জন রাস্তা দিয়ে, মালবাহী ট্রাক ছাড়া অন্য গাড়ি এইসময় পথে বিশেষ থাকার কথা নয়, নেইও। চালকের আসনে বসে অরিন্দম গাড়ি চালাচ্ছে, দেবপ্রসাদ পাশে বসে, পিছনের সিটে আমি আর রুদ্রপ্রসাদ। রাতে ঘুম না হওয়ার ফলে চোখ জ্বালা করছিল, আর সেই সঙ্গে মনে হচ্ছিল একটা তীব্র বিষণ্ণভাব যেন একটু একটু করে আমাকে গ্রাস করতে শুরু করেছে। রুদ্রপ্রসাদের ধারণা আমরা নাকি অ্যাডভেঞ্চারে চলেছি! কিন্তু আমার মতে চলেছি আত্মহত্যা করতে, তবে এ ছাড়া অন্য কি উপায়ই বা আমার সামনে আর অবশিষ্ট রয়েছে?
দু-নম্বর টার্মিনালে গাড়ি পার্ক করে অরিন্দম স্যুটকেস তিনটে একটা চাকাওয়ালা ট্রলিতে তুলে আমাদের খানিকটা এগিয়ে দিল, এরপরের চৌহদ্দি শুধুমাত্র যাত্রীদের গম্য। দেবপ্রসাদ রুদ্রকে উদ্দেশ্য করে বললেন—’সব কিছু নিয়েছিস তো’? রুদ্রপ্রসাদ মাথা নেড়ে বললেন—’তাই তো মনে হচ্ছে’।
—’আর সরবিট্রেট’! রুদ্র প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে জিভ কাটলেন। দেবপ্রসাদ আমার হাতে একটা ওষুধের শিশি ধরিয়ে দিয়ে বললেন—’জয়ন্ত উনি যা অন্যমনস্ক, ভরসা করা যায় না, তুমি প্লিজ এটা একটু কাছে রেখো, দাদার হার্টের যা অবস্থা, যেকোন সময় এটার দরকার পড়তে পারে’। আমি বিনা বাক্য ব্যয়ে ওষুধটা পকেটে পুরে নিলাম।
রুদ্রপ্রসাদ আর আমি আমাদের সঙ্গী দুজনকে বিদায় জানিয়ে ট্রলি ঠেলে নিয়ে চললাম, পরের আধঘণ্টার মধ্যে সিকিউরিটি চেক আর লাগেজ হস্তান্তর হয়ে গেল, রুদ্রপ্রসাদের হাতে যে হ্যান্ড ব্যাগেজ রয়েছে সেদিকে ইঙ্গিত করে বললেন—’চণ্ডের পাথরটা কিন্তু এতেই রয়েছে’। জীবনে প্রথমবার প্লেনে চড়লাম, সমস্যা হল সিট-বেল্ট নিয়ে, অবশ্য রুদ্র টের পেয়ে ওটা বেঁধে নিতে সাহায্য করলেন। ঘণ্টাখানেক পরেই উড়োজাহাজ এসে ভুবনেশ্বরের মাটিতে ল্যান্ড করল, রুদ্র এতক্ষণ পাশে বসে নাক ডাকিয়েছেন, এবারে ল্যান্ডিং-এর ঝাঁকুনিতে চোখ মেলে বললেন—’এসে গেল! ঘুমটা সবে জমাট বেঁধেছিল’। এয়ারপোর্ট থেকে বের হতেই বাইরে সাড়ি দিয়ে গাড়ির লাইন দেখতে পেলাম, এদের মধ্যে একজন উর্দিধারি ড্রাইভার রুদ্রপ্রসাদের নাম লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে ছিল, সেদিকে দেখিয়ে রুদ্র বললেন—’ওই যে হোটেল থেকে গাড়ি পাঠিয়েছে, চল হে’।
ডিজায়ার গাড়ির পিছনের সিটে বসে শহর দেখতে দেখতে যাচ্ছিলাম, আমার এতদিন ধারণা ছিল, ভুবনেশ্বর জায়গাটা বেশ ঘিঞ্জি আর ছোট, কিন্তু বাস্তবে দেখলাম অন্য কোনও বড় শহরের থেকে বিশেষ তফাত নেই, আর অবশ্যই কলকাতার মতো এখানকার ফুটপাথগুলো পুরোপুরি হকারের দখলে চলে যায়নি। গাড়ি মিনিট কুড়ি পরে একটা পেল্লায় হোটেলের সামনে এসে হাজির হল। হোটেল মেফেয়ার। চেক-ইন করেই রুদ্রপ্রসাদ তাড়া লাগিয়ে দিলেন, বললেন—’জয়ন্ত ফ্রেস হয়ে নাও, আমাদের এখুনি একজন বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করতে যেতে হবে, ব্রেকফাস্ট ওনার ওখানেই হবে, সেইরকমই কথা হয়ে আছে’। কার সঙ্গে দেখা করার জন্য এত তাড়া রুদ্র ভাঙলেন না বললেন, রাস্তায় যেতে যেতে বলবেন।
গাড়িতে যেতে যেতে রুদ্রপ্রসাদ বললেন, আমরা যাচ্ছি এখানকার রাজা নবীনচন্দ্র মহারাণার সঙ্গে দেখা করতে, রুদ্রপ্রসাদ সংক্ষেপে যা বললেন তাতে বুঝলাম এই রাজামশাইটি শুধু নামেই রাজা নন, নানারকম ব্যবসার কল্যাণে আজকের দিনেও এর বিষয়সম্পত্তির পরিমাণ কোনও রাজা-জমিদারেরই সমতুল্য, তা ছাড়া উড়িষ্যার রাজনৈতিক মহলেও নাকি ভদ্রলোকের বিশেষ প্রতিপত্তি। রুদ্রপ্রসাদ আরও বললেন—’আমাদের যাত্রার সব বন্দোবস্ত এই রাজাসাহেবই করে দিয়েছেন, ওনার সাহায্য না পেলে এই অভিযানের ব্যাপারটাই অসম্ভব হয়ে পড়ত’। আমি একটা দরকারি প্রশ্ন না করে পারলাম না, বললাম—’এনার এই অভিযানে আগ্রহটা কীসের’? রুদ্রপ্রসাদ অদ্ভুতভাবে বললেন—’সেটা আমি চাই, তুমি ওনার মুখেই শুনবে’। ব্যস্ত ট্র্যাফিকে দশ কিলোমিটার রাস্তা যেতে প্রায় মিনিট পঁচিশেক সময় লেগে গেল। শহরের অপেক্ষাকৃত অভিজাত এলাকা ফরেস্ট পার্কের বহুতল এমারেল্ড ম্যানসনে রাজাসাহেবের বাসস্থান। লিফটে করে বারো তলার যে ফ্ল্যাটটায় এসে হাজির হলাম তেমন কিছু আগে দেখিনি, নামেই ফ্ল্যাট! ফুটবল গ্রাউন্ডের আকারে বিলাসবহুল রাজকীয় বাসস্থান। প্রশস্ত ড্রয়িংরুমে মহার্ঘ আসবাবের মধ্যে পুরু ভেলভেটে মোড়া ডিভানে বসতে অনুরোধ করে সেক্রেটারি গেলেন রাজাকে খবর দিতে। পাঁচ মিনিট পরে রাজাসাহেব এসে হাজির হলেন, বয়স আন্দাজ পঞ্চাশ, গায়ের রং ধবধবে ফর্সা, চোখে রিমলেশ চশমা, মাথায় ব্যাকব্রাশ করা কাঁচা পাকা চুল। রুদ্রপ্রসাদ নমস্কারের ভঙ্গি করে উঠে দাঁড়ালেন সঙ্গে আমিও, রাজাসাহেব প্রতি নমস্কার করে আমার দিকে কৌতুহলী দৃষ্টিতে চেয়ে ঝরঝরে বাংলায় বললেন—’উনিই কি রাজকুমার’? রুদ্রপ্রসাদ বললেন—’হ্যাঁ ওর কথাই আপনাকে বলেছি’। আমার মনে হল রাজাসাহেব বোধহয় আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করছেন! রাজকুমার সম্বোধনের মানে কি? রাজাসাহেব আমাদের বসতে ইঙ্গিত করলেন, রুদ্রপ্রসাদ বললেন—’ওইদিকে কদ্দুর এগিয়েছে’। রাজাসাহেব আশ্বস্ত করার মতো করে বললেন—’আপনার কথা মতোই কাজ হচ্ছে আজ বিকেল চারটের আগেই গ্রামটাকে এভাকুয়েট করে দেওয়া যাবে’। রুদ্রপ্রসাদ বললেন—’আমার কিন্তু দশ কিলোমিটার রেডিয়াসের মধ্যে টোটাল সেকলুসান চাই, এমনকী আর্মির লোকেরাও যেন ফ্রেমে না থাকে’।—’এই কাজটা একটু কঠিন, দিল্লির হোম ডিপার্টমেন্টে বোঝাতে আমার কালঘাম ছুটে গেছে, তবে মনে হয় কাজ হয়ে যাবে’। কথার ফাঁকেই বেয়ারা কন্টিনেন্টাল ব্রেকফাস্ট এনে হাজির করল। মহার্ঘ ব্রেড, জ্যাম, পেস্ট্রি, ডিমসেদ্ধ, সসেজ, কফি আর কাঁচের পাত্র ভরতি কুঁচি কুঁচি করে কাঁটা ফলের টুকরো। আমার সংকোচ হচ্ছে বুঝেই বোধহয় রুদ্রপ্রসাদ কিছু কিছু খাবার খেতে শুরু করে দিলেন। রাজাও আমাকে খেতে অনুরোধ করলেন, একটা কথা মাথায় ঘুরছিল এবার জিগ্যেস করে ফেললাম—’আপনি তো বেশ বাংলা বলেন দেখছি’। রাজাসাহেব সামান্য হেসে বললেন—’কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন করেছি, বাংলাটা তখনই যা শেখার শিখে নিয়েছি’। রাজাসাহেব হঠাৎ সুর পালটে বললেন—’কুমার আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্য আমি যে কবে থেকে অপেক্ষা করে আছি, একটা প্রশ্নের সঠিক উত্তর শুধু আপনিই দিতে পারবেন! রাজাসাহেব ঠিক কি বলতে যাচ্ছিলেন জানি না, তবে এবারে আমার ধৈর্যহানি ঘটল, বলে ফেললাম—’প্লিজ আমাকে এভাবে কুমার-টুমার বলবেন না, আমার অবস্থা আপনার কোনও সাধারন কর্মচারীর থেকে খুব বেশি উন্নত কিছু নয়’। রাজাসাহেব যেন অকস্মাৎ খেই হারিয়ে ফেললেন, সামান্য পরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—’আমার উদ্দেশ্য আপনাকে নিয়ে মস্করা করা নয়, এই যে আজকের যুগেও রাজপরিবারের নাম বয়ে বেড়ানো এটা একটা অভিশাপের মতো, আমাদের দুজনের জীবনেরই সবথেকে বড় ট্র্যাজেডি! শুধুমাত্র এজন্যেই আমি আমার একমাত্র সন্তানকে হারিয়েছি আর আপনিও তো নিজের জীবন একরকম বিপন্ন করেই ফেলেছেন’। রাজাসাহেব এবারে কাউচ থেকে উঠে জানলার ধারে গিয়ে দাঁড়ালেন, আমার মনে হল উনি বোধহয় চোখের জল আড়াল করতেই এমনটি করলেন, ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে রুদ্রপ্রসাদ বললেন—’চণ্ডের উদ্দেশ্যে বলি দেওয়ার জন্য যে ছেলেটিকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল সে আর কেউ নয়, রাজাসাহেবের সন্তান প্রবীণচন্দ্র’। বিস্ময়ের ঘোরে মুখ দিয়ে শুধু এটুকু কথাই বের হল—’সেকি’? ঘরে একটা অদ্ভুত নীরবতার সৃষ্টি হল যেটা ভেঙে রাজাসাহেব বললেন—’বিয়ের অনেকগুলো বছর পরেও যখন সন্তানের মুখ দেখলাম না তখন আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলাম, অকস্মাৎ আমার স্ত্রী গর্ভবতী হলেন, আমাদের একটি পুত্রসন্তান হল, মিঃ মিত্র নিশ্চয়ই আপনাকে সব বলেছেন’? রুদ্রপ্রসাদ বললেন— ‘রাজাসাহেব আমি কিন্তু জয়ন্তকে কিছুই বলিনি, আমি চাইছিলাম ও এই বিষয়টা আপনার মুখ থেকেই শুনুক’। রাজাসাহেব এসে সোফায় বসলেন, বললেন—’আপনার ব্যাপারটা আমি মিত্রবাবুর কাছে শুনেছি, কিভাবে আপনি এসবের মধ্যে জড়িয়ে পড়লেন, সবকিছু। আমরা দুজনেই কিন্তু ভিক্টিমাইসড হয়েছি একটা অদ্ভুত কমন কারণে, আমাদের পূর্বপুরুষদের ফিউডাল স্ট্যাটাসের জন্য, তবে এতবড় ঝুঁকি যখন নিয়েছেন তখন সবকিছু বিশদভাবে জানা আপনার অবশ্যই প্রয়োজন, মিত্রবাবু যখন বলেননি তখন আমারই বলা উচিত, কিন্তু কিভাবে বলব, সেটাই ভাবছি।
২৪
ভুবনেশ্বর শহরে আমার বসবাস হলেও আমাদের পৈত্রিক বাড়ি উড়িষ্যার একটি প্রত্যন্ত এলাকায়, পরিবারের ঐতিহ্য অনুযায়ী পৈতৃক ভিটেতেই ছয়মাসের প্রবীণের অন্নপ্রাশনের অনুষ্ঠানের আয়োজন হল। জায়গাটা সেসময় ছিল নকশালদের শক্ত ঘাটি, যাইহোক সেসব নিয়ে আমি তেমন দুশ্চিন্তা বোধ করিনি কারণ স্থানীয় মানুষজনের কাছে এই আজকের যুগেও আমরা বাড়তি একটু সম্মান পেয়েই থাকি, তা ছাড়া পর্যাপ্ত পরিমাণে সিকিউরিটিও মোতায়েন করা হল যাতে সবকিছু নিরাপদে মিটে যায়, যদিও সমস্ত হিসেব-নিকেশ অনুষ্ঠানের আগের দিন বিকেলেই উলটে গেল, রাজবাড়ি থেকে তিন কিলোমিটার দূরে আমাদের কুলদেবতা চক্রপাণি মহাদেবের মন্দির, রীতি অনুসারে আমার স্ত্রী, প্রবীণকে নিয়ে মন্দিরে গেছিলেন, পরে জানতে পেরেছিলাম কিছু লোক আগে থেকেই গর্ভগৃহে লুকিয়েছিল, ইনফ্যাক্ট উগ্রপন্থীরা সেদিন পুরো মন্দিরটাই নিজেদের দখলে নিয়ে অপেক্ষা করছিল কতক্ষণে আমরা ওখানে পা রাখব, আমার স্ত্রীর মাথায় বন্দুকের বাট দিয়ে আঘাত করে ওরা আমার ছেলে আর আয়াকে নিয়ে মন্দিরের পিছনের দরজা দিয়ে উধাও হয়ে যায়, বাইরে যে গার্ড-রা নজর রাখছিল তারা টেরও পেল না ভিতরে কি ঘটে গেছে, যতক্ষণে বুঝল ততক্ষণে সব শেষ। এতটা বলে রাজাসাহেব থামলেন, সামনে রাখা কাঁচের গ্লাস থেকে জল খেয়ে সামান্য পরে বললেন—’আমার ধারণা হয়েছিল এসব র্যানসাম আদায়ের জন্য করা হয়েছে। আমিও ছেলেকে ফিরত পাওয়ার জন্য মূল্য চুকাতে রাজি ছিলাম, কিন্তু দিন তিনেক কেটে গেলেও কেউ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করল না, এর মধ্যে আয়া ফিরত এসেছে, কিছুই মাথায় ঢুকছিল না! টাকাপয়সা ছাড়া এই কিডন্যাপের অন্য কি উদ্দেশ্যই বা হতে পারে? আমার তেমন কেউ শত্রু আছে বলে মনে করতে পারছিলাম না, আমাদের এই সম্ভ্রান্ত পরিবারটির যোগাযোগ অনেক দূর বিস্তৃত, আমি কোনও পাথরই ওলটাতে বাকি রাখলাম না। পুলিসও যথাসাধ্য চেষ্টা করল কিন্তু কিছু কাজই হল না। এরমধ্যে একটা খবর কানে এল, মাও নেতা সমীরণ নাকি এই অপহরণের মূল চক্রি। আমি প্রচুর চেষ্টা করে সমীরণের সঙ্গে মিটিং অ্যারেঞ্জ করলাম, সমীরণ অবশ্য নিজে এল না, কিন্তু ফোনে কথা বলল, আমার অনুরোধ উপরোধ টাকার অফার সব উড়িয়ে সে ঝেড়ে অস্বীকার করল, এই ব্যাপারে নাকি তার কোনও ইনভলভমেন্টই নেই, তাই সে আমাকে কোনও সাহায্যই করতে পারবে না। কেন জানি না আমার মনে হয়েছিল লোকটা আগাগোঁড়া মিথ্যে কথা বলছে, কিন্তু সেসময় আমি ওর সামনে একেবারেই নিরুপায় একজন সাধারণ পিতা ছাড়া অন্য কিছু নই’। আমার একটু অবাক লাগল, জিগ্যেস করলাম—’আপনি নিজের সোর্স খাটিয়ে ছেলেকে উদ্ধার করলেন না কেন? পুলিশ রেড করলে তো হয়ে যেত’। রাজাসাহেব ম্লান হেসে বললেন—’আপনার মাও ইনসার্জেন্সি সম্বন্ধে ঠিক কি ধারণা আছে’? মাথা নেড়ে বললাম—’তেমন কিছু নয়, ওই খবরের কাগজে একটু-আধটু’, রাজাসাহেব আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন—’সেটা আমি বুঝেছি, এই যে উড়িষ্যার বিস্তীর্ণ জঙ্গল পাহাড়ে ঘেরা অঞ্চলটা, নামে ভারতবর্ষ হলেও এতদিন এই জায়গাটা একটা প্যারালাল অ্যাডমিনিসট্রেসনের অধীনে ছিল আর সে প্রশাসন ছিল এমন কিছু লোকেদের হাতে যাদের একজন ওই সমীরণ, অনেকগুলো বছর ইন্ডিয়ান আর্মিও এখানে পা রাখতে পারেনি, পুলিস তো দুরের কথা। তবে গত দু-বছরে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করল, সেন্ট্রাল কমব্যাট ফোর্স একটু একটু করে জমি দখল করছিল, আর নকশালরা পিছু হটছিল, মাওপন্থীদের মধ্যেও আত্মসমর্পণের ঢল নেমেছিল, শেষের দিকে পরপর কয়েকটা সিরিয়াস অ্যাসল্টে নকশালদের একেবারে কোমর ভেঙে গেল, সমীরণ যেন কর্পূরের মতো উধাও হয়ে গেল, আর আমার ছেলেরও কোনও হদিশ বের হল না, তবে আমার ছেলে যে ওর কব্জাতেই ছিল, সে বিষয়ে পাকা খবর পেয়েছিলাম। নতুন করে কোমর বাঁধলাম, সমীরণকে খুঁজে বের করবই, প্রচুর টাকা খরচ করে একটা কমব্যাট টিম তৈরি করলাম সমীরণকে ধাওয়া করে শিকার করার জন্য। এক্স আর্মি আর পুলিসের লোক দিয়ে তৈরি দলটার একটাই উদ্দেশ্য ছিল সমীরণকে ট্র্যাক করে আমার ছেলের সন্ধান। কিন্তু প্রতিবারেই সমীরণ পাঁকাল মাছের মতো হাত থেকে ফসকাতে লাগল, কখনো খবর পেতাম সমীরণকে দেখা গেছে আসামের কোনও গ্রামে তো আবার কখনো শুনতাম ঝাড়খণ্ডের কোনও এক মফঃস্বল শহরে গা ঢাকা দিয়ে রয়েছে, শুধু একবারই ওদের লেজের ডগা ধরা গেছিল, পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়ার কাছে আমার ছেলেদের সঙ্গে ওদের মুখোমুখি সংঘাত বেঁধে যায় এতে ওদের একটা লোক গুলি খেয়ে মরলেও সমীরণ আর ওর দলের বাকিরা পালিয়ে যায়। খুনোখুনি করা আমার উদ্দেশ্য ছিল না, সমীরণকে জ্যান্ত ধরার অভিপ্রায়ই ছিল, পুলিশের ঝামেলা এড়াতে এরপর কিছুদিন আমাকে এই ফলো-আপটা বন্ধ রাখতে হল। এরমধ্যে খবর পেলাম কলকাতায় পুলিস এনকাউন্টারে সমীরণের ডেথ হয়েছে, সঙ্গে একটা সাত বছরের বাচ্চাও সেখানে ছিল, সবকিছুই মিলে যাচ্ছিল, আমি ছেলেটির বডি ফ্লুইড জোগাড় করে ডি-এন-এ টেস্ট করে জানলাম আমার খোঁজ চালিয়ে যাওয়ার আর কোনও প্রয়োজন নেই’। রাজাসাহেব এতটা বলে থামলেন।
ঘরের আবহাওয়া হঠাৎ যেন অতিমাত্রায় বিষণ্ণ হয়ে পরল। কি বলব ভেবে পাচ্ছিলাম না, সামান্য পরে রুদ্রপ্রসাদ নৈঃশব্দ ভেঙে বললেন— ‘সেসময় চণ্ডের পাথরটা সংগ্রহ করার জন্য আমাকেও এই কেসটায় জড়িয়ে ধরতে হয়েছিল, সেটাতো তুমি জানোই, তখন ভিতর থেকে একটা খবর পেলাম, উড়িষ্যার একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি, যিনি আবার কার্যক্ষেত্রে একটি রাজপরিবারের সদস্যও বটে ভিক্টিমের ব্যাপারে অতিমাত্রায় উৎসাহী, রাজাসাহেবের খোঁজ পাওয়াটা খুব কঠিন হয়নি, আমি এসে ওনার সঙ্গে দেখা করলাম, আর সঙ্গে সঙ্গে শিকলের আর একটা বৃত্তও খুঁজে পেলাম। রাজাসাহেবের সন্তানকে নিশ্চয়ই ফেরত দিতে পারব না তবে আর কোনও পিতা যাতে এই কারণে সন্তানহারা না হন সে চেষ্টা অবশ্যই করব বলে ওনাকে কথা দিয়েছি, আর রাজাসাহেবও এই চণ্ড আগ্রাসন প্রতিরোধ করার জন্য যেমন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন তার তুলনা হয় না, নেপালের রাজপরিবারের সংগ্রহশালা থেকে চণ্ড-বিজয় পুঁথিটা যে দেখার সুযোগ পেয়েছি সেটা শুধু এনার জন্যেই, তা ছাড়া আমাদের এই অভিযানে যেভাবে প্রশাসনের সাহায্য লাগছে তা আমি কিছুতেই ম্যানেজ করতে পারতাম না’। রাজাসাহেব রুদ্রের কথা যেন হাত নাড়িয়ে উড়িয়ে দিয়ে বললেন—’আমার থেকে আপনার অবদান অনেক বেশি মিস্টার মিত্র, আপনি সব জেনেশুনে চুপ করে থাকতে পারতেন, এত বড় ঝুঁকিটা আপনার না নিলেও চলত! কিন্তু আপনি তো বিপদের পরোয়া করেননি, আর হ্যাঁ আমাদের দুজনের থেকেও যদি কেউ মহৎ থাকে তাহলে অবশ্যই এই যুবকটি, এত নিঃস্বার্থ মানুষ সত্যি আগে দেখিনি’। রাজাসাহেব হঠাৎ অপ্রত্যাশিতভাবে এগিয়ে এসে আমার হাতটা চেপে ধরলেন, গাঢ় স্বরে বললেন—’আমার ছেলের অন্তিম সময়ে তুমি তাকে দেখেছ, সে কেমন অবস্থায় ছিল? ওরা কি তার উপর অত্যাচার করত? তুমি যা কিছু দেখেছ আমাকে বলতে দ্বিধা করবে না’। অদ্ভুত পরিস্থিতি! রুদ্রপ্রসাদের দিকে চাইতে বুঝলাম চোখের তারায় উনি কিছু বলার চেষ্টা করছেন, পড়ে নিতে অসুবিধে হল না। রাজাসাহেবের হাতে চাপ দিয়ে বললাম—’ও খুব খারাপ ছিল না, তপন ওর ভালো দেখাশোনা করত আর শুনেছি তার আগে সমীরণের লোকেরাও ওর যত্নে কখনো ত্রুটি করেনি’। রাজাসাহেব কিছুক্ষণ আমার চোখে চোখ রেখে তেমনই দাঁড়িয়ে রইলেন তারপর হঠাৎ উৎকটভাবে হেসে বললেন—’যে প্রশ্নের উত্তর জানা আছে, তা যে কেন বোকার মতো করে ফেলি’? সন্তান শোকাতুর পিতাকে কি ভাষায় সান্ত্বনা দিলে উপশম ঘটবে আমার জানা নেই, চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম, রাজাসাহেব খানিক সামলে উঠলেন, বললেন—’ধন্যবাদ অনেকটা সময় দিলেন, ইচ্ছে ছিল দুপুরের লাঞ্চটা একসঙ্গে করি, কিন্তু আপনাদের তো আবার লম্বা রাস্তা পাড়ি দিতে হবে’, রুদ্রপ্রসাদ হাতঘড়িতে চোখ রেখে বললেন —’হ্যা আর দেরি করা যাবে না, সূর্যাস্তের আগেই ভগীরথপুরে পৌছতে হবে’।
