চণ্ডরাজার বলি – ২৫
২৫
গাড়িতে আসতে আসতে রুদ্রপ্রসাদকে জিগ্যেস করলাম—’আপনি রাজাসাহেবকে বলেননি, ওনার ছেলের গলায় ছুরি আমিই বসিয়েছিলাম’। রুদ্রপ্রসাদ শান্ত কণ্ঠে বললেন —’কি দরকার শুধুমুধু ওনার দুঃখ বাড়িয়ে, তা ছাড়া তুমি তো আর স্বেচ্ছায় কিছু করনি’। হোটেলে পৌঁছেই রুদ্রপ্রসাদ বললেন —’জয়ন্ত আর ঘন্টাখানেক সময় হাতে আছে। ঠিক বারোটার সময় আমরা ভগীরথপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করব, এখান থেকে মোটামুটি তিন ঘন্টা লাগবে, ওখানে ক্যাপ্টেন বিকাশ সবরহাল দায়িত্বে রয়েছেন, উনিই আমাদের বাকি ব্যবস্থা করে দেবেন, ভগীরথপুর থেকে আট কিলোমিটার দূরে ঘন জঙ্গলের মধ্যে আজকের রাতটা আমাদের ক্যাম্প করে থাকতে হবে, আসল কাজ শুরু হবে কাল সকালে, সূর্য ওঠার পর, এবারে সবার আগে আমরা লাঞ্চ করব তারপরে স্নান সেরে বাকি কথা কি বল’?
—’সাধারণত আমি স্নান আগে করি, খাই পরে’।
—’আমিও’, রুদ্র বললেন—’কিন্তু ইচ্ছে আছে পথে জংলা-চণ্ডী মন্দিরে মাকে প্রণাম করে যাব, আমাদের রাস্তাতেই পরবে। স্নান করেই তো মন্দিরে প্রবেশ করা উচিত, তাই না’।
—’বেশ চলুন তাহলে’। পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমরা আবার লিফটে সওয়ার হলাম, এবার লক্ষ্য একতলার রেস্টুরেন্ট। রুদ্রপ্রসাদ টেবিলে বসে খাসির মাংস, ভাত অর্ডার দিয়ে বসলেন, আমি তখন মেনু কার্ড ঘাটছি, দেখেশুনে বললাম—’উঁহু আমি মাংস খাচ্ছি না, এদের মেনুতে ক্র্যাব আছে দেখছি, আমি ওটা খাব’, রুদ্র উৎসাহিত হয়ে বললেন—’তাইতো! কাঁকড়ার ঝোল তো অমৃত-সমান, কতদিন যে খাইনি, বেশ দুটোই খাওয়া যাক তবে, কি বল’? আমার বলার অপেক্ষা না করেই অবশ্য রুদ্রপ্রসাদ মাংসের সঙ্গে কাঁকড়াও অর্ডার করে দিলেন, তারপর আমার দিকে ফিরে বললেন—’জয়ন্ত খাবার আসতে তো মনে হয় মিনিট দশেক লাগবেই, ততক্ষণে তুমি একটু রিসেপশনে গিয়ে খোঁজ নিয়ে এস না, আমাদের গাড়িটা এসে গেছে কি না’। রুদ্রপ্রসাদের কথামতো রিসেপশনে গিয়ে হাজির হলাম, চেক-ইন করার সময় যে মেয়েটিকে দেখেছিলাম এখনও তাকেই দেখতে পেলাম, বেঁটেখাটো শ্যামলা গড়ন, সুশ্রী চেহারা। আহামরি সুন্দরী কিছু না হলেও মেয়েটির মধ্যে একটা আলাদা চটক আছে অনুভব করলাম, রিসেপশন ফাঁকাই ছিল, মেয়েটি মিষ্টি হেসে বলল—’মে আই হেল্প ইউ স্যার’? আসার উদ্দেশ্য জানাতে মেয়েটি ফোন করে কারও সঙ্গে উৎকল ভাষায় খানিক কথা বলে জানাল—’ইয়োর কার কুড বি হিয়ার এনি মোমেন্ট’! ভালো কথা! চলে যাচ্ছিলাম, মেয়েটি এবারে আমাকে অবাক করে ভাঙা ভাঙা বাংলায় বলল—’চিন্তা করবেন না স্যার আমাদের স্টাফ ড্রাইভাররা খুব পাংচুয়াল’। আমি বললাম—’আপনি বেশ বাংলা জানেন, দেখছি’।
—’এখানে এত বাঙালি টুরিস্ট আসে যে কিছুটা শিখে গেছি’।
—’আচ্ছা’! মেয়েটি মিষ্টি হেসে বলল—’আপনার জন্য আর কিছু করতে পারি স্যার? চেক-ইন করার সময় লক্ষ করেছিলাম মেয়েটি যেন আড় চোখে ফিরে ফিরে চাইছিল, সেটা কিন্তু আমার বেশ ভালোই লাগছিল। একটু সাহস করে বললাম—’হ্যাঁ মানে আপনি কি কাছাকাছির মধ্যেই থাকেন’? মেয়েটির চোখের তারায় বিস্ময়ের চিহ্ন ফুটে উঠল, একটু সময় নিয়ে বলল—’হ্যা ক্যানাল রোডে, এখান থেকে অটোয় পাঁচ মিনিট লাগে’। আমার হঠাৎ উদয় হওয়া সাহসের দুর্দান্ত গতিবেগ দেখে এবারে আমি নিজেই বিস্মিত হয়ে পরলাম, কেননা পরের প্রশ্নটা আমার মুখ দিয়ে ততক্ষণে বেড়িয়ে গেছে—’আপনি বোধহয় অবিবাহিত তাই না’? মেয়েটি হাঁসফাঁস করতে করতে বলল—’হ্যা স্যার, তাই’।
—’ফাইন! যদি আপনার নামটা বলতে আপত্তি না থাকে’?
—’সোনালি রাউত’।
—’বেশ সুন্দর নাম’। মেয়েটি খানিকটা গুছিয়ে উঠেছে কারণ সে আমাকে এরপর জিগ্যেস করল—’কিন্তু স্যার আপনার নামটা তো বললেন না’।
—’জয়ন্ত সিংহ রায়’।
—’আপনি কি কোনও কাজে এসেছেন নাকি হলিডে’?
—’কাজেই বলতে পারেন’।
—’ও’। এবার যে কি বলব বুঝতে না পেরে বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইলাম, সোনালি আমার দিকে চেয়ে মিষ্টি করে হাসল। কিছু বলা দরকার, কিন্তু কি যে বলি! হঠাৎ মোবাইলটা টুংটাং শব্দ করে আমাকে বাঁচিয়ে দিল, মেসেজ এসেছে রুদ্রপ্রসাদ পাঠিয়েছেন, বাংলায় লেখা এক লাইন ‘বসে আছি পথো চেয়ে’। লাঞ্চের কথা ভুলেই মেরে দিয়েছিলাম, সোনালির কাছে অনুমতি নিয়ে ডাইনিংয়ের দিকে হাঁটা দিলাম।
আজকের দিনটা বড়ই আশ্চর্যের! এই আমি জয়ন্ত সিংহ রায় যে কিনা অপরিচিত মহিলাদের সঙ্গে সোজাসুজি কথা বলতেও এযাবৎ হেঁচকি তুলে এসেছে সে একজন সুন্দরী তরুণীর সঙ্গে পরিচয় বিনিময়ের প্রথম ধাপটা পেরিয়ে এল! রুদ্রপ্রসাদ টেবিলে খাবার সাজিয়ে বসেছিলেন, আমাকে দেখে বললেন—’কি হে খাবারগুলো যে ঠাণ্ডা হয়ে গেল’। আমি একটা বাজে অজুহাত দিয়ে বসে পরলাম, রুদ্রপ্রসাদ হঠাৎ অদ্ভুতভাবে চেয়ে বললেন—’দ্যাখো আমরা একটা বিশেষ কাজে এসেছি, এইভাবে হোটেলের স্টাফদের সঙ্গে মাত্রাতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা করা আমাদের শোভা পায় না’। অবাক হয়ে বললাম—’কার সঙ্গে আবার ঘনিষ্ঠ হতে দেখলেন’। রুদ্র তর্জনী তুলে আমার পিছনে ইঙ্গিত করলেন, ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম একটা চল্লিশ ইঞ্চি টিভিতে হোটেলের ভিন্ন ভিন্ন জায়গার ক্যামেরা ভিউ, রিসেপশনে এইমুহূর্তে সোনালি ল্যান্ড ফোনে কথা বলছে দেখলাম। বুড়োটা তাহলে বসে বসে আমার উপর নজর রাখছিল! লজ্জার মাথা খেয়ে খাবারে মন দিলাম, এখন মুশকিল হল এই বুড়ো ব্যাচেলরটাকে তরুণ হৃদয়ের উথালপাথাল কি করে বোঝানো যাবে জানিনা! চেষ্টা না করাটাই যুক্তিসঙ্গত। খেতে খেতে সোনালির কথাই ভাবছিলাম, মেয়েটি তেমন সুন্দরী হয়তো নয়, কিন্তু কি সুন্দর ওর ব্যবহার, এই প্রথম কোনও মেয়ে আমাকে এমনভাবে আকর্ষণ করল, যদি ওকে বিয়ে করতে পারতাম, অবশ্য আমি বাঙালি আর ও ওড়িয়া তাতে কি কোনও সমস্যা হতে পারে? কে জানে! হঠাৎ রুদ্রপ্রসাদ জলদগম্ভীর স্বরে বলে উঠলেন—’হ্যাঁ হ্যাঁ তোমার চান্স আছে, আমি বলছি হবে’। দারুণ চমকে বিষম খেলাম,—’কি হবে? কীসের চান্স’? রুদ্রপ্রসাদের মুখ দুষ্টু হাসিতে ভরে উঠেছে, বললেন—’ওই যে রিসেপশনের মেয়েটার কথা ভাবছ তো, আমার মনে হচ্ছে ও তোমাকে বেশ পছন্দই করেছে, আর তোমাদের বিয়ে হওয়াটাও কিন্তু অসম্ভব নয়’।
—’আপনাকে কে বলেছে আমি কোনও মেয়ের কথা ভাবছিলাম’।
—’সেকি’! রুদ্রপ্রসাদ অবাক হওয়ার ভান করলেন—’তোমার বয়স আর স্বাস্থ্য থাকলে আমি কিন্তু ওই নিয়েই ভাবতাম’।
—’আমি অন্য বিষয়ে চিন্তা করছিলাম’। মুখে বড়সড় একটা মাংসের টুকরো পুরে রুদ্রপ্রসাদ বললেন—’সত্যিই অন্য কথা ভাবছিলে তাহলে’? এই বুড়োটাকে আমি এতদিন যতটা ধড়িবাজ ভাবছিলাম, এখন দেখছি তার থেকেও কয়েক কাঠি ওপরে। মনে মনে তুলোধোনা করে খাওয়ায় মন দিলাম। এর মধ্যে রুদ্রের মোবাইল বেজে উঠেছে, ড্রাইভার এসে গেছে, আর আমাদের এখনি ঢেঙ্কানলের উদ্দেশ্যে বের হতে হবে। পরের কুড়ি মিনিটের মধ্যে আমাদের দুজনের স্নান হয়ে গেল, আর আমরা একটা টাটা সুমো গাড়িতে চেপে হোটেল ছাড়লাম, মনে একটা আক্ষেপ রয়ে গেল সোনালির সঙ্গে বোধহয় এ জীবনে আর কখনো দেখা হবে না।
২৬
কটক পেরিয়ে গাড়ি যত এগিয়ে যেতে লাগল ততোই রাস্তার অবস্থা খারাপ হতে শুরু করল, মাঝে মধ্যেই গাড়ি লাফিয়ে উঠছে আর মনে হচ্ছে আমাদের শরীরের নাট-বোল্টগুলো সব তাতে এক একটা করে খুলে পরবে, যদিও রুদ্রপ্রসাদ ড্রাইভারকে স্পষ্ট বলে দিলেন স্পিড কমানোর কোনও প্রয়োজন নেই, তিনটের মধ্যে পৌঁছে দিতে পারলে ডবল বখশিশ দেওয়া হবে। এরপর যেটা শুরু হল সেটা ভাষায় বর্ণনা করার ক্ষমতা আমার নেই, শুধু মনে হচ্ছিল এ যাত্রা যদি বেঁচে যাই তাহলে অন্তত সাতদিন লাগবে গায়ের ব্যথা সাড়তে। রুদ্রপ্রসাদের মধ্যে এবার একটা অদ্ভুত ভাবান্তর দেখা গেল, সে তার সহজাত রসবোধ, অফুরন্ত কথা বলার আগ্রহ সব যেন হঠাৎই হারিয়ে ফেলেছে, লক্ষ করলাম হাতের নখগুলো চিবিয়ে শেষ করার পর আঙুল মটকাতে শুরু করেছে, বুঝতে পারছিলাম চণ্ডরাজ্যের সঙ্গে আমাদের দূরত্ব যত কমছে, উত্তেজনাই হোক বা আতঙ্ক ততই অসমসাহসী লোকটাকেও একটু একটু করে কব্জা করে ফেলছে, আমার মনের অবস্থাও এককথায় বলতে গেলে শোচনীয়, রাজাসাহেব বলছিলেন আমরা নাকি চণ্ডের শিকার করতে যাচ্ছি! হাস্যকর! এখন চণ্ড কিভাবে আমাদের শিকার করে সেটাই হচ্ছে লাখ টাকার প্রশ্ন! সোনালির কথাও ভাবছিলাম, অবশেষে মনের মতো পাত্রী জুটল, কিন্তু বিয়ের স্বপ্ন অপূর্ণই রয়ে গেল। গাড়ি শহর থেকে গ্রামের সীমানা পেরিয়ে যে ধীরে ধীরে মহারণ্যের দিকে এগোচ্ছে তা ভালোই বুঝতে পারছিলাম, রাস্তার দু-ধারে গাছপালার ঘনত্ব ক্রমশ বাড়ছে। মানুষের সংখ্যা কমছে। একটা জায়গায় দেখলাম একপাল হনুমান রাস্তার সিংহভাগ জুড়ে বসে আছে, চলন্ত গাড়ি দেখেও ওদের নড়েচড়ে বসার কোনও লক্ষণ দেখা গেল না, ড্রাইভার খুব সাবধানে স্পিড কমিয়ে রাস্তা বের করে গাড়ি ছোটাল। বেলা প্রায় তিনটে নাগাদ আমরা আধা গ্রাম আধা জঙ্গল মার্কা একটা জায়গায় এসে পৌঁছোলাম, গ্রামটার নাম চৌরি। রুদ্রপ্রসাদের নির্দেশে ড্রাইভার গাড়ি থামাল। পিচ রাস্তা থেকে খানিক দূরে ঘন ঝোপের মধ্যে একটা মন্দিরের শতচ্ছিন্ন পতাকা দেখা যাচ্ছে, রুদ্রপ্রসাদ সেদিকে দেখিয়ে বললেন—’ওই যে মা জংলা-চণ্ডীর মন্দিরের চূড়া দেখা যাচ্ছে, চল আমরা আমাদের কর্মের সাফল্যের জন্য মায়ের কাছে শক্তি প্রার্থনা করি’। মন্দিরটা নিতান্তই সাধারণ। বড় বড় পাথরের টুকরো গেঁথে একটা উপাসনাস্থলের রূপ দেওয়া হয়েছে, পাথরের বেদির উপর মা কালী চামুণ্ডা রূপে পূজিত। প্রতিমার গলায় বুনো ফুলের মালা, পরনের বেশবাস চটের কাপড় দিয়ে তৈরি, দু-তিনজন গ্রাম্য আদিবাসী গোছের নারী-পুরুষ মন্দিরের সামনের চাতালে বসে সুর করে কালী-কীর্তন করছে, বুঝলাম এখানে আড়ম্বরের অভাব থাকলেও ভক্তির অভাব নেই। সামনে একটা ফুল কাম চা কাম মুদির দোকান ছিল, সেখানে কষ্টে-সৃষ্টে একটা জবার মালা জুটল, বাকি যা আছে সবই বুনো ফুল, রুদ্র জবার মালাটা কিনে নিলেন, আর একঝুড়ি ফুল তৈরি রাখতে বললেন। মন্দিরে এখন পুরোহিতকে দেখা যাচ্ছে না, রুদ্র মূর্তির পায়ের কাছে মালা রেখে হাতজোড় করে প্রার্থনা করলেন তারপর হাড়িকাঠ থেকে তেল সিঁদুর আঙুলের ডগায় তুলে নিজের আর আমার কপালে টিকা দিলেন। গাড়িতে ফিরে রুদ্র আমাকে জিগ্যেস করলেন—’মায়ের কাছে প্রার্থনা করলে’? —’নাঃ, যা হওয়ার তা হবেই’। রুদ্রপ্রসাদ কিছুক্ষণ পরে বললেন—’চণ্ডকে মাৎ দিতে গেলে চণ্ডীর কৃপা ছাড়া যে হওয়ার নয়, যাকগে তুমি ঠিকই বলেছ, যা হওয়ার তা হবেই’। দোকানি এসে এক ঝুড়ি ফুল দিয়ে গেল, রুদ্র ড্রাইভারকে ঝুড়িটা গাড়ির ডিকিতে রাখার নির্দেশ দিলেন, অবাক হয়ে বললাম—’ফুল মন্দিরে চড়াবেন না’। রুদ্র স্মিতহাস্যে বললেন—’এটা অন্য কাজে লাগবে’।
আরও মিনিট দশেক চলার পর গাড়ি মোরাম পাতা রাস্তা দিয়ে যে জায়গাটায় এসে দাঁড়াল রুদ্রপ্রসাদ জানালেন সেটাই নাকি ভগীরথপুর, আমার সর্বাঙ্গ দিয়ে একটা শিহরণ বয়ে গেল, এই সেই চণ্ডের রাজধানী! রূপকথার রাজ্য ভগীরথপুর গ্রাম? জায়গাটাকে জঙ্গলাকীর্ণ বললে কমই বলা হবে! এত ঘন গাছপালার সমাহার এত উঁচু উঁচু নাম না জানা মহীরুহ আমার জীবনে আগে কখনো দেখিনি। কাঁচা রাস্তার দু-ধার দিয়ে কয়েকটা খড়ের চাল চোখে পড়ল, এখান থেকেই বোধহয় গ্রামের শুরু যদিও সেখানে মানুষজন কাউকে দেখা গেল না, কয়েক পা এগোলেই ব্যারিকেড দিয়ে ঘেরা মিলিটারি চেক পোস্ট, সৈনিকের উর্দিধারি লোকজন ছড়িয়ে- ছিটিয়ে বসেছিল তাদের মধ্যে একজন এগিয়ে এসে জিগ্যেস করল—’আমরা মিঃ মিত্র অ্যান্ড পার্টি কি না’। রুদ্রপসাদ উত্তর দিতে ওয়ারলেসে খবর চলে গেল, একটু পরে একজন অফিসার এসে আমাদের কাগজপত্র দেখতে চাইলেন, এরপর কিছুসময় ধরে চলল প্রমাণপত্র পরীক্ষা করার পালা, অবশেষে সন্তুষ্ট হয়ে ভদ্রলোক নিজের পরিচয় দিলেন—’আমি ক্যাপ্টেন বিকাশ সবরহাল, হোম ডিপার্টমেন্ট থেকে অর্ডার ইস্যু করা হয়েছে যাতে এই অঞ্চলের দুটো গ্রাম জানুয়ারির ২৫ আর ২৬ তারিখ দু-দিনের জন্য এভাকুয়েট করে দেওয়া হয়, সে ব্যবস্থা হয়ে গেছে’। রুদ্রপ্রসাদ বললেন—’শুধু এইটা, অন্য অর্ডারটা কি আপনারা পাননি’? সবরহাল এবারে কাটা কাটা ইংরেজি উচ্চারণে বললেন—’হোম ডিপার্টমেন্ট হ্যাভ অ্যাডভাইজড দ্যাট মিঃ মিত্রা উইথ হিজ অ্যাসিসটেন্ট উইল বি দ্য অনলি পারসনস টু হ্যাভ অ্যান অ্যাকসেস টু দিস ফরেস্ট এরিয়া বিফোর নর্মালসি ইজ রিস্টোর্ড অন এইট পি এম টুয়েন্টি সিক্সথ অফ জানুয়ারি’। রুদ্রপ্রসাদ মাথা নেড়ে বললেন—’হ্যাঁ এবার ঠিক আছে’। সবরহাল চেড়া চোখে চেয়ে বললেন—’এরকম অদ্ভুত অর্ডারের মানে বুঝে উঠতে পারছি না, আপনাদের জানিয়ে রাখি সাতকোশিয়ার কোর ফরেস্ট থেকে মাঝে মধ্যেই একটা দুটো বাঘ এদিকে চলে আসে, বাঘ ছাড়া অন্য হিংস্র জন্তুও কিন্তু এসব জঙ্গলে আছে, যেমন নেকড়ে, লেপার্ড, আবার হাতির পালও কিছু কম ডেঞ্জারাস নয়, তবে সব কিছুর ওপরে রয়েছে মাওবাদি, যদিও এরিয়া এখন আমাদের কন্ট্রোলে তা হলেও কিছু নকশালপন্থী যে গা ঢাকা দিয়ে নেই সে গ্যারান্টি কেউ দেবে না’। রুদ্রপ্রসাদ শুধু বললেন—’ইনফরমেশনের জন্য ধন্যবাদ’।—’হোল্ড অন’! সবরহাল বললেন—’আরও কিছু বলা বাকি আছে, নীলু মাজির নাম আপনি শুনে থাকতে পারেন, নটোরিয়াস ক্রিমিনাল, মধুসূদনপুরের কাঠগোলায় ডাকাতি করে পালানোর সময় পুলিসের গুলি খেয়ে মরেছে, গ্যাংটাকে আমরা প্রায় শেষ করেই এনেছিলাম, সামান্য ভুলে নীলুর ভাই দিবাকর আর ওর কয়েকটা সঙ্গী আমাদের হাত ফস্কে এই জঙ্গলে গা ঢাকা দিয়েছে, এখন অবধি ট্রেস করা যায়নি। বাই চান্স যদি ওদের সামনে পড়ে যান তাহলে মনে রাখবেন, বনের বাঘের থেকে হয়তো একটু দয়ামায়া আশা করতে পারেন, বাট নট ফ্রম দিস হুলিগানস’। রুদ্রপ্রসাদ বাধ্য ছেলের মতো মাথা নাড়িয়ে বললেন—’ঠিক আছে আশা করব না’। সবরহাল অবাক দৃষ্টে রুদ্রপ্রসাদের মুখের দিকে চেয়ে বললেন—’শেষ কথাটা শুনে যান, আমাদের উপর নির্দেশ আছে দশ কিলোমিটার রেডিয়াসের বাইরে থাকতে, আপনাদের কোনও বিপদ হলে, এমনকী খবর পেলেও ছাব্বিশ তারিখ রাত আটটার আগে কিন্তু আমরা এই সার্কেলের ভিতর আসব না’। রুদ্রপ্রসাদের গলায় এবার বিরক্তির আভাষ, বললেন—’ফাইন অফিসার, এসব কিছুই আমার অনুরোধে সাড়া দিয়ে হোম ডিপার্টমেন্ট করেছে, এবার দয়া করে বলুন আমি যে জঙ্গলের মধ্যে একটা বিশেষ জায়গায় কিছু অ্যারেঞ্জমেন্ট রিকোয়েস্ট করেছিলাম তার কি ব্যবস্থা হয়েছে’? সবরহাল মাথা নাড়লেন—’হ্যাঁ হয়েছে’। —’ধন্যবাদ, তাহলে সেখানে আমাদের পৌঁছে দেওয়ার বন্দোবস্ত করুন’। —’এখান থেকে আড়াই কিলোমিটার রাস্তা মোটর সাইকেল যাবে, তারপরে হেঁটে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই’। রুদ্রপ্রসাদ ব্যাস্ত হয়ে বললেন—’শীতের বিকেল, ঝুপ করে অন্ধকার নেমে যাবে, তাড়াতাড়ি করুন প্লিজ’।
২৭
জঙ্গলের মধ্যে ফুটবল মাঠের মতো একটা ন্যাড়া জায়গা, চারপাশে প্রচুর গাছপালার মাঝে ফাঁকা মাঠটা বেশ একটা পিকনিক স্পটের মতো লাগছিল। মিলিটারির লোকেরা আমাদের জন্য পাশাপাশি দুটো তাবু খাঁটিয়ে দিয়েছেন, একটাতে আমাদের শোবার ব্যবস্থা অন্যটিতে রাজ্যের জিনিসপত্র ডাই করে রাখা, তাতে যে কি আছে তা ঈশ্বরই জানেন! রুদ্রপ্রসাদ সেই যে তাবুটায় ঢুকেছেন এখনও বের হননি, আমি অবশ্য কাজে সাহায্য করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু উনি বললেন দরকার পরলে ডাকবেন। আমি যেখানে বসে আছি সেখান থেকে ত্রিশ ফুট দূরে একটা বেশ বড়সড় মাটির ঢিপি, এই সেই বিখ্যাত বাবুলালের টিলা। তপনের মুখে এটার কথা শুনেছি, রুদ্রপ্রসাদ আজকের রাতটা টিলার চৌহদ্দির মধ্যেই কাটাবেন স্থির করেছেন।
ঘড়িতে এখন বিকেল সাড়ে পাঁচটা, একটু আগে সূর্যাস্ত হয়েছে। পড়ন্ত বিকেলের নিস্প্রভ আলোয় গভীর জঙ্গলের মাঝে বিদায়ী সূর্যের এমন অদ্ভুত রঙের খেলা, চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। আকাশটাকে কি দারুণ সিঁদুর রঙা লাল দেখাচ্ছে, এমন আকাশ কলকাতা শহরে নিশ্চয়ই কেউ দেখেনি! এখানে গাড়ির বিশ্রী শব্দ, বিষাক্ত ধোঁয়ার বালাই নেই, আছে ডালপালা ছড়ানো বিশাল বড় সব গাছ আর তাদের শাখা-প্রশাখায় কলকাকলি করা নাম না জানা পাখির দল, আমি একটা ডেকচেয়ারে বসে প্রকৃতির অদ্ভুত এই সৌন্দর্য উপভোগ করছিলাম, পায়ের আওয়াজ শুনে ফিরে চাইলাম, রুদ্রপ্রসাদ এসে আমার পাশের চেয়ারটায় বসলেন, হাতে দুটো কফির মগ, একটা আমাকে দিয়ে বললেন—’এখানে আকাশটা বেশ দেখাচ্ছে, না’!
—’অসাধারণ! আমরা কফি খেতে খেতে প্রকৃতির শোভা দেখছিলাম, একটু পরে আমি বললাম—’আমরা এখানে কেন এলাম? চণ্ড মন্দিরের কাছাকাছি থাকলেই তো সুবিধে হওয়ার কথা’। রুদ্রপ্রসাদ বললেন—’দেড়মাস আগে আমি যখন এই অঞ্চলটার সার্ভে করেছিলাম তখন জঙ্গলের শুধু এই অংশটাতেই যা একটু পজিটিভ ভাইব্রেশন পেয়েছিলাম। তুমি বোধহয় অবসার্ভ করনি! এই যে পাখির এত কিচিরমিচির সেটা এই অঞ্চলে অন্য কোথাও পেয়েছ’?
—’আরে তাই তো’! রুদ্রের কথায় খেয়াল হল চৌরি বা ভগীরথপুরের কোথাও সত্যিই পাখি চোখে পরেনি, পাখির ঝাঁক যেন সব দল বেঁধে এই গণ্ডির মধ্যেই এসে জড়ো হয়েছে।—’কিন্তু পাখিগুলো এমন করছে কেন’?
—’কারণ পশুপাখিদের মধ্যে অতীন্দ্রিয় বিষয়ের অনুভূতি মানুষের থেকে বেশি, চণ্ড জেগে উঠেছে জয়ন্ত, পাখির দলের কাছে সেই শক্তির স্পন্দন পৌঁছে গেছে, ওরা ভয়ে মন্দিরের ত্রিসীমানা ছেড়ে এতদূরে এখানে আশ্রয় নিয়েছে। হঠাৎ বুকের ভিতরটা যেন কেঁপে উঠল, বললাম—’তাহলে এখন কি করনীয়’? রুদ্র হালকা চালে বললেন—’সবার আগে কফিটা শেষ করবে, দুপুরে যে চমৎকার লাঞ্চটা খেয়েছিলাম সেটা এতক্ষণে হজম হয়ে গেছে সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে চিজ-কর্ন স্যান্ডউইচ নিয়ে এসেছি, তাই ভাবছি একরাউন্ড টেস্ট করে দেখলে কেমন হয়? অবশ্য আমাদের ইভিনিং স্ন্যাক্স, ডিনার, কালকের ব্রেকফাস্ট সবকিছুর মেনু কিন্তু ওই একটাই আইটেম, পরে বোর হলে কিন্তু চলবে না, আর হ্যাঁ এখনও ফ্লাক্স ভরতি কফি রয়েছে, মনের সুখে খাও, ফুরিয়ে গেলেও চিন্তার কিছু নেই, নেসক্যাফের একটা কৌটো ব্যাগের মধ্যেই রয়েছে’।
—’আপনি জানেন আমি কি জিগ্যেস করছি’? রুদ্রপ্রসাদ সামান্য চুপ করে থেকে হঠাৎ গম্ভীরভাবে বললেন—’মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে লাভ নেই জয়ন্ত, এতক্ষণে আমাদের দুজনেরই কিছুটা ধারণা হয়ে গেছে আমাদের প্রতিপক্ষ সম্বন্ধে, দিনেরবেলাটা তাও একপ্রকার, কিন্তু রাতের অন্ধকারে চণ্ডের শক্তির বহুগুণে বৃদ্ধি ঘটবে, তখন আমাদের জীবনের কানাকড়ি মূল্যও থাকবে না, এখন ভরসা ওই যে সামনে মাটির ঢিপিটা দেখছ ওখান থেকে যদি কিছু সাহায্য আসে’।
—’মানে’?
—’ওই মাটির ঢিপিটা দেখছ, ওটা আর কিছু নয়, তিনশো বছর আগের অরণ্যবাসী সিদ্ধপুরুষ বাবুলালের সমাধি, বাবুলাল হয়তো রক্ত-মাংসের শরীরে আজ আর বিদ্যমান নন, কিন্তু তার তপস্যার ভাইব্রেসন এখনও এই মাটিতে পাওয়া যায়, আমরা দুজনে আজ সন্ধ্যায় বাবুলালের কাছে প্রার্থনা করব, যদি আমাদের আহ্বান তার কাছে পৌঁছোতে পারে তাহলে চণ্ডের সঙ্গে এই লড়াইয়ে আমাদের ফিফটি-ফিফটি চান্স আছে ধরতে পারো’।
—’কাল সকালে কি হবে’?
—’আলো ফুটলে আমরা জঙ্গলের পথ ধরে বেড়িয়ে পড়ব, যে রাস্তা ধরে এসেছিলাম, অর্থাৎ সেই উত্তরদিকটা ধরেই হাঁটা লাগাব, মোটামুটি আট কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দেওয়ার পর, জঙ্গলের বর্ডার শেষ আর ভগীরথপুর গ্রাম শুরু, এই দুয়ের মাঝখানে চণ্ডরাজার মন্দির, যতদূর মনে হয় মন্দিরের ভিতর আমি ঢুকতে পারব না, বিশেষত কালকের দিনে চণ্ডের ইচ্ছের বিরুদ্ধে তার রিভার্স ম্যাগনেটিক ফিল্ড ভেঙে ঢোকা সাধারন কোনও মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়, পথে সে আমাকে যেকোনো উপায়ে আটকে দেওয়ার চেষ্টা নিশ্চয়ই করবে, এক্ষেত্রে জীবনহানির সম্ভাবনাটা কিন্তু খুব বেশি’। আমি উদ্বিগ্ন হয়ে বললাম—’তাহলে আপনি এই তাঁবুতেই থাকবেন, আমি গিয়ে বাকি কাজটা সেড়ে আসব’। রুদ্রপ্রসাদ সামান্য হেঁসে বললেন—’সেটা হয় না জয়ন্ত, এই কাহিনির সূত্রপাত আমার হাত দিয়েই ঘটেছে, শেষটা দেখার ভাগ্য হবে কি না জানিনা, কিন্তু মাঝপথে পালাতে পারব না, আমি ফেরত যাওয়ার জন্য আসিনি’। একটু বিরতির পর রুদ্রপ্রসাদ বললেন—’অবশ্য তোমার ভিতরে প্রবেশ করতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয়, তোমার মধ্যে চণ্ডের এনার্জির অংশ আছে, ভিতরে ঢুকে পাথরটা বেদিতে বসিয়ে আগুন ধরিয়ে দেবে, আর চণ্ডের মূর্তিটাও একইসঙ্গে ভেঙে টুকরো করে ফেলবে, এই কাজগুলো করে ফেলতে পারলেই, চণ্ড প্রস্থান নিতে বাধ্য হবে আর আমাদের অভিযান শেষ’।
—’আপনি যেভাবে বললেন, সবকিছু কি এতো সহজে হবে মনে হয়’? রুদ্রপ্রসাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—’জয়ন্ত আমাদের শত্রুকে চোখে দেখা যায় না, সে সর্বশক্তিমান কি না জানি না কিন্তু মাঝে মধ্যে সেরকমই মনে হচ্ছে, সে খল, ধূর্ত, সর্বত্রগামী, পিঁপড়ে এখানে হাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। তবে পিঁপড়েরও কিছু অ্যাডভান্টেজ নিশ্চয়ই আছে, হাতির কানের ভিতর যদি সে একবার ঢুকে যেতে পারে, অতবড় হাতিও কিন্তু তখন কাবু’। উত্তর দেওয়া নিষ্প্রয়োজন, চুপ করেই রইলাম। রুদ্রপ্রসাদ কৌতুকের স্বরে বললেন—’কিহে তোমার মুখ ঝুলে গেল কেন? নার্ভাস লাগছে নাকি’?
—’তা একটু লাগছে’। রুদ্রপ্রসাদ বললেন—’একটু পিছিয়ে যাও জয়ন্ত, আমাদের পূর্বপুরুষদের স্মরণ করো, যারা একসময় প্রবল পরাক্রান্ত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের পর্যন্ত তাদের সাধের কলকাতা শহর ছেড়ে পাততাড়ি গুটিয়ে সুদূর দিল্লিতে রাজধানী স্থানান্তর করতে বাধ্য করেছিল, আমরা শরীরে কিন্তু সেই লোকগুলোর রক্তই বয়ে বেড়াচ্ছি, এত ভয় আমাদের পোষায় না, এসো আমরা দুজনে সমস্বরে রবীন্দ্রনাথের একটা কবিতা আবৃত্তি করি’। তিতকুটে মুখে বললাম—’আপনি করুন, আমার এখন আসছে না’।
—’বেশ তাই হোক, মন দিয়ে শুনবে কিন্তু’।
”জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য চিত্ত ভাবনাহীন”—’লাইনটা শুনলে তো জয়ন্ত, এবারে পুরো কবিতাটা শোন, ভয় উড়ে যাবে। রুদ্রপ্রসাদ উদ্দাক্ত স্বরে আবৃত্তি শুরু করলেন, আর আমি জুড়িয়ে যাওয়া কফিতে চুমুক মেরে, পানসে মুখে বসে রইলাম।
সূর্যের আলো পুরোপুরি মিলিয়ে যেতেই জঙ্গল এবার অন্য ধরনের রূপ ধারণ করল। বিশাল বিশাল গাছগুলোকে দেখে মনে হচ্ছিল আমাদের চারপাশে যেন ঘন কালো ভুতুড়ে দেওয়াল তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে, সেদিকে যতবারই চোখ পড়ছে অমঙ্গলের আশঙ্কায় মন দুলে উঠছে, যে পাখিগুলো কলকাকলি করে বিকেলটা মাতিয়ে রেখেছিল, সেগুলো কি কোনও জাদুকাঠির ছোঁয়ায় এতো শান্ত, নিস্তব্ধ হয়ে গেল? নাকি ওরা সব ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পরেছে? উত্তর জানা নেই! আজকের রাতটা কৃষ্ণপক্ষ, অপরাহ্নের সিঁদুর রঙা আকাশটাকে কেউ এতক্ষণে থিকথিকে কালো ভেলভেট দিয়ে ঢেকে দিয়েছে, আশ্চর্য লাগছিল, কয়েক ঘণ্টা আগে প্রকৃতির যে অদ্ভুত সুন্দর রূপ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম সেই একই প্রকৃতির এমন বীভৎস রূপ দেখে আতঙ্কে শরীর হিম হয়ে আসছে, তবে ঠিক মৃত্যুভয় নয়, জনহীন এই প্রান্তরে রহস্যময়ী প্রকৃতির গহ্বরে যে কত অজ্ঞাত বিভীষিকা লুকিয়ে রয়েছে! জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ উপস্থিত হওয়ার মুহূর্ত পর্যন্ত তাদের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা নিয়েই আমি চিন্তিত, মরার আগে পর্যন্ত যে আর কি কি আমাকে ভোগ করতে হবে, তা একমাত্র ঈশ্বরই জানেন!
আমাদের তাবুর সামনে খোলা জায়গাটায় কাঠকুটো জমিয়ে আগুন জ্বালানো হয়েছে, মিলিটারির লোকেরা আমাদের জন্য সবরকম ব্যবস্থাই করে গেছেন, দ্বিতীয় তাবুটায় যত কাঠের টুকরো রাখা আছে দেখলাম, মনে হয় রাত-ভর জ্বাললেও ফুরোবে না। রুদ্রপ্রসাদ বললেন আগুনটা সারারাত জ্বালিয়ে রাখতে হবে, এতে আলো যেমন হবে, বুনো জন্তুও তাবুর কাছে ঘেঁষবে না। ঘড়িতে সময় দেখাচ্ছে সন্ধ্যা সাতটা, রুদ্রপ্রসাদ টিলার উপরটা সঙ্গে নিয়ে আসা ফুল দিয়ে সাজিয়ে মোমবাতি জ্বেলে দিলেন। আমার দিকে ফিরে বললেন—’জয়ন্ত তাবুর ভিতর দুটো আসন রাখা আছে নিয়ে এস দেখি’। আমি আসন আনতেই যাচ্ছিলাম রুদ্র ফের বললেন—’আর দুটো জলের বোতলও নিয়ে আসবে’। রুদ্রের কথামতো জিনিসপত্র এনে হাজির করতেই উনি বললেন—’হাত-মুখ ধুয়ে এস জয়ন্ত, আমাদের এখন আসনে বসতে হবে’। হাত-মুখ ধুয়ে যখন এলাম দেখলাম ততক্ষণে রুদ্রপ্রসাদ তৈরি হয়ে আসনে বসে পড়েছেন, গম্ভীর স্বরে বললেন—’আসনে বসো জয়ন্ত, এখন আমরা বাবুলালকে স্মরণ করব, মনে যেন সন্দেহ আর অবিশ্বাসের লেশমাত্র না থাকে, একমুহূর্ত চুপ থেকে রুদ্র আবার বললেন—’সাড়ে তিনশ বছর আগে বাবুলাল দেহ রেখেছেন, আজকের যুগে কেউ তাকে দেখেনি, জানেনা তিনি দেখতে কেমন ছিলেন, আমাদেরও তার অবয়ব সম্বন্ধে স্পষ্ট ধারণা নেই, আমরা তার শরীরের নয় আত্মার ধ্যান করব, আর মনে রেখ যদি কোনও বাধা উপস্থিত হয় তাহলেও স্থির থাকতে হবে’।
—’কেমন বাধা, বিপদজনক কিছু!
—’হতে পারে, তা হলেও! মনে রেখ জয়ন্ত এটাই আমাদের শেষ আশা’। রুদ্রপ্রসাদ চোখ বন্ধ করে ধ্যান শুরু করলেন, আর আমিও চোখ বন্ধ করলাম। যে লোক জীবনে কখনো ধ্যান করেনি তার পক্ষে এভাবে নিশ্চল হয়ে বসে থাকার মতো দুরূহ কাজ বোধহয় আর কিছু নেই। কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে থাকলাম, যতই চেষ্টা করি না কেন কিছুতেই বাবুলালের উপর মনোনিবেশ করতে পারছিলাম না। উটকো চিন্তাগুলো দল বেঁধে আসতে শুরু করল, আর আমি চেষ্টা করছিলাম সেগুলোকে দূরে ছুড়ে ফেলতে, এরপর যেন মস্তিষ্কের মধ্যে একটা যুদ্ধই বেধে গেল, শেষেমেষে তিতিবিরক্ত হয়ে চোখ মেলে চাইতে বাধ্য হলাম। ঠাণ্ডাটা এরমধ্যে আরও বেড়েছে, সোয়েটার ভেদ করে হাড়ে কাঁপন ধরিয়ে দেবে মনে হচ্ছে, পাশে রুদ্রপ্রসাদ পাথরের মূর্তির মতো ধ্যানমগ্ন হয়ে রয়েছেন, লক্ষ করে দেখলাম, ভদ্রলোকের নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের বেগও যেন ক্ষীণ হয়ে এসেছে। সামনে যে মোমবাতিগুলো জ্বলছিল তার মধ্যে শুধু দুটো এখনো টিকে আছে, বাকি সবকটাই হাওয়ার বেগে নিভে গেছে। ফের একবার চোখ বুজে বাবুলালের চিন্তায় রত হওয়ার চেষ্টা করলাম, হঠাৎ একটা তীক্ষ্ন কর্কশ শব্দ, ডানা ফরফর করে একটা বাদুড় মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল। পাশে রুদ্রপ্রসাদের দিকে চেয়ে বিস্ময়ের মাত্রা বাড়ল বই কমল না, সেই একইরকম নিথর, নিঃস্পন্দ হয়ে বসে রয়েছেন, মোমবাতিগুলো এতক্ষণে সবই নিভে গেছে। কতক্ষণ এই আসনে বসে রয়েছি? একঘন্টা! নাকি দু-ঘন্টা! আরও বেশি হলেও অবাক হব না, মনে হচ্ছে যেন একযুগ পেরিয়ে গেছে। এদিকে নতুন সমস্যা টের পাচ্ছিলাম, আসনে বসার আগে অতটা জল খাওয়া বোধহয় ঠিক হয়নি, তরল বর্জ শরীর থেকে বেরোনোর রাস্তা খুঁজছে, একটু হালকা হতে পারলে ভালো হত, কিন্তু রুদ্রপ্রসাদের কড়া নিষেধ, আসন ছেড়ে ওঠা চলবে না কোনওমতেই। প্রচুর অস্বস্তি নিয়ে ফের চোখ বন্ধ করলাম।
আরও কতক্ষণ কেটে গেল জানিনা, মনে হচ্ছে অনন্তকাল এইভাবেই বসে আছি। শরীরের মধ্যে মূত্রের বেগ এমন তীব্র আকার ধারণ করেছে, মনে হচ্ছে এখুনি নির্গমন না হলে বুঝি উন্মাদ হয়ে যাব। ওডোমসের প্রলেপটাও আর বিশেষ কাজ দিচ্ছে না, মশার ঝাঁক হুল ফুটিয়ে শরিরে দারুন জ্বলুনি ধরিয়ে দিচ্ছিল। রুদ্রপ্রসাদের যথারীতি কোন বিকার নেই, লোকটা বোধহয় ম্যাজিক জানে, এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও কিভাবে যে এমন স্থির থাকা যায়! তবে আমার সহ্যশক্তির কিন্তু একটা সীমা আছে যেটা ততোক্ষণে প্রায় পেরিয়ে এসেছি, ভাবছিলাম আসনে বসেই হালকা হয়ে যাব নাকি? ঠিক তখুনি ঘটল ঘটনাটা। এই গর্জন আমি আগেও শুনেছি, আলীপুরের চিড়িয়াখানায়, তখন ব্যাঘ্রপুঙ্গব ছিল লোহার গারদের ভিতর আর আমি ছিলাম খাঁচার বাইরে নিরাপদ দূরত্বে, কিন্তু আজকে এই মহারণ্যের খোলা বধ্যভূমিতে রয়েল বেঙ্গলের উপস্থিতি আমার হাড়ের মধ্যে দারুন ভঁয়ের কাঁপন ধরিয়ে দিল। আর থাকতে না পেরে চিৎকার করে উঠলাম —’আপনি শুনেছেন’? রুদ্রপ্রসাদ চোখ খুলেছেন, শান্ত অথচ দৃঢ় স্বরে বললেন —’শুনেছি, আসন ছেড়ে উঠবে না’। একমুহুর্ত সময়ও কাটল না, ফের সেই ভয়ংকর ব্যাঘ্রগর্জন, এবারে আরও কাছে আরও স্পষ্ট! ধড়মড় করে উঠে পালাতে যাচ্ছিলাম, রুদ্রপ্রসাদ সাঁড়াশির মতো হাতে চেপে ধরে বললেন —’পাগল হোয়োনা জয়ন্ত, উঠলেই বাঘের শিকার হবে, বাবুলাল আমাদের ডাকে সারা দিয়ে এসেছেন, ওনার উপস্থিতি আমি টের পাচ্ছি’। কথা শোনার মতো মনের অবস্থা আমার ছিল না, রুদ্রের বজ্রমুষ্ঠি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য প্রবল ধ্বস্তাধস্তি শুরু করে দিলাম। রুদ্রপ্রসাদের শরীরে যতই জোর থাকুক না কেন অর্ধেক বয়সি একজন যুবকের সঙ্গে পেরে ওঠার মতো শক্তি নিশ্চয়ই নেই, প্রচণ্ড জোর খাঁটিয়ে রুদ্রকে একপ্রকার কাবু করে ফেলেছি, হঠাৎ ঘরঘরে একটা শব্দ, আর চোখের সামনে মাত্র একহাতের মধ্যে আগুন রঙা ডোরাকাটা স্ট্রাইপ চলে ফিরে বেড়াতে লাগল! বাংলার বাঘ সাতকোশিয়ার অরণ্যে তার শিকার দুই বঙ্গসন্তানকে জ্বলন্ত ভাঁটার মতো চোখ দিয়ে জরিপ করছে, আমার শিথিল হয়ে পরা হাত থেকে রুদ্রের মুঠি আলগা হয়ে পড়ল, বাঘের তাড়া নেই, সে বুঝেছে এই শিকার একেবারেই সহজলভ্য, জন্তুটা চক্রাকারে আমাদের পাক খেতে লাগল। পালানোর আর কোনও উপায় নেই আর ক্ষমতাও নেই, জীবন্মৃতের মতো বসে রইলাম বাঘের কামড়ের অপেক্ষায়, পাশে বসা রুদ্রপ্রসাদের আকুল মিনতি কানে এল—’মহাপুরুষ আপনি এখানেই আছেন আমি জানি, ক্ষুদ্র স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে আপনাকে বিরক্ত করিনি, যদি আপনার এই ইচ্ছেই হয় যে আমরা আমাদের উদ্দেশ্য অসম্পূর্ণ রেখেই বিদায় নিই তবে তাই হোক’। আবার বিকট গর্জন, বেঙ্গল টাইগার হঠাৎ মন পালটে বিশাল লম্ফ দিয়ে জঙ্গলের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল, বাঘ আমাদের জ্যান্ত রেখেই বিদায় নিল। তবে কি বেঁচে গেলাম! এবার রুদ্রপ্রসাদের দিকে চোখ পড়ল, সে তখন বিস্ফারিত দৃষ্টে চেয়ে রয়েছে সামনের দিকে।
২৮
বাবুলালের টিলায় অদ্ভুত এক মূর্তির আবির্ভাব হয়েছে। থিকথিকে কালো জমাট বাঁধা একটা ছায়াশরীর টিলার উপর হাত-পা ছড়িয়ে বসে আমাদের দিকেই চেয়ে রয়েছে। রুদ্রপ্রসাদ হাতজোড় করে বললেন —’আপনিই কি বাবুলাল’? সামান্য বিরতির পর ওদিক থেকে উত্তর এল —’তোদের প্রয়োজন অত্যন্ত অধিক তাই আসতে হল’। রুদ্রপ্রসাদ বললেন—’আপনি জানেন আমরা এখানে কেন এসেছি, দয়া করে আমাদের সহায়তা করুন’। কিছুক্ষণ নিরুত্তর থেকে বাবুলাল এবার বললেন—’লড়াই তো নিজের সঙ্গেও, সেখানে কি জিততে পারবি’? রুদ্রপ্রসাদ চুপ করেই রইলেন, মনে হল আমার মতো তারও কথার মানে বোধগম্য হয়নি। একটু পরে বাবুলাল বললেন—’কঠিন সময়ে ধৈর্যের বাঁধন শক্ত করে বাধবি, মনে রাখবি কর্মক্ষয় হলে ব্রতের উদযাপন হবে’। —’আপনি আমাদের আশীর্বাদ করুন’। বাবুলালের ছায়ামূর্তি এবার অদৃশ্য হল। পরের কয়েকটা মুহূর্ত লাগল আমাদের দুজনের ধাতস্থ হতে, এরপর রুদ্রপ্রসাদ উৎফুল্ল স্বরে বললেন—’হয়েছে জয়ন্ত, আমরা আর দুর্বল নই, সিদ্ধপুরুষের শক্তি এখন আমাদের সঙ্গে আছে’।
—’হয়েছে আপনার জন্যই, আমি ধ্যানের নামে যত উটকো চিন্তা করে গেছি’।
—’না হে না, এই যে দেহমনে তীব্র তাপ সহ্য করেও আসনে টিকে ছিলে সেটাই তো তপস্যা’। রুদ্রপ্রসাদ উঠে দাঁড়িয়েছেন, বললেন—’মনে নতুন উদ্যম অনুভব করছি হে, চলো তাবুতে গিয়ে এবার ডিনার করা যাক’।
—’আপনি এগোন আমি আসছি’। রুদ্রপ্রসাদ হাঁটা দিতেই আমি ছুটলাম ঝোপের দিকে, ঝোপের সামনে দাঁড়িয়ে এবার সত্যিই মনে হল, অনেক কষ্টের পর যে ফল পাওয়া যায় তার স্বাদ যে কি মিষ্টি!
তাবুর কাছাকাছি যেতেই রুদ্র হাতছানি দিয়ে ডাকলেন, হাতের তেলোতে গুলির আকারে একটা নুড়িপাথর ধরা ছিল সেটা আমার মুখের উপর ঘুরিয়ে বললেন—’ভালো করে দেখে নাও জয়ন্ত, এটা চণ্ডরাজার প্রাণপাথর’। পাথরটা অবশ্য দেখতে অত্যন্ত সাধারণ, রাস্তার ধারে পরে থাকা কোনও ঢিলের টুকরোর মতোই সাদামাটা। রুদ্র মুচকি হেসে বললেন—’কি ভাবছ’?
—’এটা তো নেহাতই মামুলি একটা পাথর মনে হচ্ছে’। রুদ্রপ্রসাদ বললেন—’উঁহু ভুল! পৃথিবীর সবথেকে দামি হিরের খণ্ডও এর সামনে ফিকে, এই পাথরের বিশেষ ক্ষমতার জন্য, তবে সে ক্ষমতা ধ্বংসের আর বিনাশের, যাইহোক এটাকে এবার নিজের থেকে একমুহূর্তের জন্যেও আলাদা করবে না’। রুদ্র ভেলভেটের একটা ছোট বাক্সে পাথরটা পুরে আমার হাতে তুলে দিলেন আর আমিও নির্দ্বিধায় ওটা আমার প্যান্টের পকেটে চালান করে দিলাম।
আগুনটা নিবু নিবু হয়ে এসেছিল, তাঁবু থেকে কাঠ এনে চাপিয়ে দিতে ফের চেগে উঠল। অগ্নিকুণ্ডের কাছাকাছি চেয়ার পেতে আমরা নৈশভোজে বসলাম, আগুনের তাপে শীত খানিকটা দূর হচ্ছে নিশ্চয়ই, কিন্তু বাড়তি সমস্যা হল, প্রচুর পোকা এসে ভিড়ল, এদের কিছু কিছু কুণ্ডে পাঁক খেয়ে ঝাঁপ দিয়ে মরছে, ঝাঁকের বাকিগুলো কামড়ে আমাদের গা ফুলিয়ে দিচ্ছে।
পরপর কয়েকটা পোকা খেয়ে ফেলার পর রুদ্রপ্রসাদ বিরক্ত হয়ে বললেন—’ধুত্তরি! এর থেকে তাবুর ভিতরেই ভালো ছিল’। মিইয়ে যাওয়া স্যান্ডউইচ আর কফি খেয়ে যখন ডিনার শেষ করলাম, ঘড়িতে তখন রাত দশটা। রুদ্রপ্রসাদ বললেন—’শুয়ে পর জয়ন্ত, কাল অনেক ঝক্কি রয়েছে’।
—’আপনি ঘুমাবেন না’?
—উঁহু, এই অবস্থায় ঢিলে দেওয়া যাবে না, ওই যে আগুনটা জ্বলছে, ওটা নিভলে চলবে না, আমাদের মধ্যে একজনকে এই রাতটা জাগতেই হবে’। লজ্জিত হয়ে বললাম—’সেকি তাহলে আমি পাহারা দেব, আপনি শুয়ে পড়ুন’। রুদ্রপ্রসাদ সামান্য হেসে বললেন—’রাত দুটো অবধি আমি পাহারা দেব তারপর ঘুম পেলে তোমাকে ডেকে তুলব, এখন আর সময় নষ্ট না করে শুয়ে পর, কাল কথা হবে’।
শুয়ে শুয়ে আজকের সন্ধেয় ঘটা অদ্ভুত সব অভিজ্ঞতার কথা চিন্তা করছিলাম, বাবুলারের বিদেহী আত্মা যে হেয়ালিতে কিসব বলে গেলেন সেসবের মাথামুণ্ডু কিছুই বোধগম্য হয়নি, রুদ্র অবশ্য বলছিলেন সময় হলে নাকি সব জলের মতো স্পষ্ট হয়ে যাবে, এখন ওসব নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই। অবশ্য মাথা ঘামিয়েও যে বিশেষ সুরাহা কিছু করে উঠতে পারব সে ভরসা নেই। রুদ্র কিছু দরকারে তাবুর বাইরে গেছেন, এতক্ষণে ফাঁক পেতে পকেট থেকে ভেলভেটের বাক্সটা খুলে শিলাটা চোখের সামনে মেলে ধরলাম, সাধারণ এই পাথরের টুকরোটার নাকি অসীম ক্ষমতা! হবে হয়তো! গত কয়েকদিনে যা ঘটে চলেছে তাতে কোনও কিছুই তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার মতো মনের জোর আর নেই। দূর থেকে বাঘের গর্জন কানে এল, তবে এবারে আর আগের মতো ভয় করল না। একটা প্রকাণ্ড হাই তুলে পাথরটা যথাস্থানে রেখে দিলাম। চোখের পাতা দুটো ভারী হয়ে আসছিল, কম্বলটা টেনে পাশ ফিরে শুলাম।
অকস্মাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল, কেমন একটা শব্দে ধরমড়িয়ে উঠে বসলাম, মনে হল কেউ যেন তাঁবুর বাইরে নীচুস্বরে কথা বলছে, চেয়ে দেখলাম রুদ্রপ্রসাদের মাথা চেয়ারের উপর হেলে পরেছে, বিশ্রী স্বরে নাক ডাকছে, ভদ্রলোক যে কখন ঘুমিয়ে পরেছেন বোধহয় নিজেই টের পাননি, এদিকে শীতের পারদটা আরও কয়েক ডিগ্রী চড়ে গেছে, বাইরে আগুনটা মনে হল নিভে গেছে, রুদ্রের ঘুমে ব্যাঘাত না ঘটিয়ে তাবুর পর্দা সরিয়ে বাইরের দিকে চাইলাম, কিন্তু সন্দেহজনক কিছুই দেখতে পেলাম না। অগ্নিকুণ্ডটা জ্বালানির অভাবে আর হিম পরে পুরোপুরি বুজে গেছে। কি ঘন নিশ্ছিদ্র অন্ধকার বাইরে, গায়ে আষ্ঠেপৃষ্ঠে শাল জড়িয়ে টর্চটা হাতে নিয়ে তাঁবুর বাইরে এসে দাঁড়ালাম। পাশের তাবুটায় জ্বালানি কাঠ আছে, ওর থেকে কয়েকটা বের করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে সেদিকে গেলাম।
সবেমাত্র তাবুর ভিতরে ঢুকেছি অন্ধকারের মধ্যে থেকে কে যেন আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। হতভম্ব ভাবটা কাটিয়ে উঠতেই বুঝলাম যে আমাকে আক্রমণ করেছে সে ভূতপ্রেত কিছু নয়, নিতান্তই মানুষ, হাতের টর্চটা ঘুরিয়ে মারলাম লোকটার মাথা লক্ষ করে, একটা বিকট চিৎকার করে আক্রমণকারী ছিটকে পড়ল, ভারী শরীরের পতনে পায়ের তলায় জমিটা যেন সশব্দে কেঁপে উঠল, কিন্তু ততক্ষণে আরও কিছু লোক এসে যোগ দিয়েছে, তিন-চারটে লোক মিলে আমাকে মেঝের উপর চেপে ধরল, এবার আর আমার নড়াচড়া করার উপায়ও রইল না লোকগুলো দড়ি দিয়ে প্রথমে হাতদুটো পিছেমোড়া করে বাঁধল তারপর পা জোড়ায় শক্ত গিঁট দিয়ে চিত করে ফেলে দিল। আমি চিৎকার করার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু আততায়ীরা এবার আমার মুখের ভিতর একটা ন্যাকড়া ঢুকিয়ে সে উপায় বন্ধ করে দিল। মারের চোটে গাল, চোয়াল জ্বালা করছিল, কিন্তু এইমুহূর্তে নিজের থেকে উদ্বেগ বেশি হচ্ছিল রুদ্রপ্রসাদের জন্য।
অনেকটা সময়, মনে হচ্ছিল যেন অনন্তকাল ধরে ওইভাবে পরে থাকার পর ভোরের আকাশে আলো ফুটল। একটা বেঁটেখাটো চেহারার মিশকালো লোক এসে পায়ের বাঁধন খুলে দিয়ে উঠে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত করল। অতিকষ্টে উঠে দাঁড়াতেই লোকটা বিশ্রীভাবে ঘাড় ধাক্কা মারল, হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পরলাম, লোকটা যেন মজা পেয়েছে এমনভাবে খিঁখিঁ করে হেসে উঠল, ইচ্ছে হল লোকটাকে একটা ঘুষি মারি, হাত দুটো সামনের দিকে বাঁধা থাকলে তাও হয়তো কিছু করা যেত কিন্তু এরা যেভাবে পিছনের দিকে বেঁধেছে তাতে সত্যি খুব অসুবিধে হচ্ছে। লোকটা আমাকে ঠেলতে ঠেলতে অন্য তাবুটায় নিয়ে এল। ডেকচেয়ারের উপর রুদ্রপ্রসাদকে সুস্থ শরীরে বসে থাকতে দেখে নিশ্চিন্ত হলাম। রুদ্রের উলটোদিকের চেয়ারে একজন লোক বসে কথা বলছে, লোকটার বেশ লম্বা চওড়া চেহারা, মুখ ভরতি নোংরা দাড়ি-গোঁফ, মাথার লম্বা চুল বিনুনি করে বাঁধা। পরনে জিনসের প্যান্ট আর ময়লা শতচ্ছিন্ন টি-শার্ট। লোকটা আমাকে দেখিয়ে রুদ্রপ্রসাদকে বললেন—’এবার বিশ্বাস হল তো আপনার অ্যাসিসটেন্টকে আমরা মারিনি’। রুদ্রপ্রসাদ চড়া স্বরে বললেন—’এভাবে কেউ কারও হাত বাঁধে, খুলে দাও বলছি’। বিনুনি বাঁধা লোকটার ইঙ্গিতে যে লোকটা আমাকে ঠেলে নিয়ে এসেছিল সে দড়ির গিঁটটা খুলে হাত দুটো মুক্ত করে দিল। লোকটা এবার বলল—’আপনার কথা মতোই কাজ হচ্ছে কিন্তু মিত্রবাবু, আপনিও এবারে কো-অপারেট করুন’। রুদ্রপ্রসাদ তেঁতো মুখে বললেন—’আর কি সাহায্য করব বল? বিনুনি বাঁধা বলল—’আগে কিছু খাওয়ার বন্দোবস্ত করুন, আপনাদের সঙ্গে খাবারদাবার কি আছে’? রুদ্রপ্রসাদ বললেন—’ওই যে থার্মোকলের বাক্সটা দেখছ, ওতে কয়েকটা স্যান্ডউইচ আছে’। লোকটার চোখ যেন হঠাৎ জ্বলে উঠল, লোভীকণ্ঠে বলল—’স্যান্ডউইচ! আর কি আছে আপনার কাছে’? —’কফি আর বিস্কুট’।—’ওঃ দারুণ’। লোকটা প্রায় ছুটে গিয়ে বাক্স খুলে হামলে পড়ল। গোটা আষ্টেক স্যান্ডউইচ তখনও অবশিষ্ট ছিল, লোকটা বাক্সটা হাতে তুলে বলল—’কফি আছে বললেন’?
—’ওই কোণে আমার যে ব্যাগটা আছে ওর মধ্যে’। তৎক্ষণাৎ ব্যাগ খুলে নেসক্যাফের বয়েমটা হস্তগত করে লোকটি জিগ্যেস করল—’আর দুধ? দুধ নেই’? রুদ্রপ্রসাদ বিরক্ত হয়ে বললেন—’এখানে আমি দুধ কোথা থেকে পাবো’? লোকটা স্যান্ডউইচ আর কফি নিয়ে বিদায় হতেই আমি জিগ্যেস করলাম—’এরা কারা? কি চায়’? রুদ্রপ্রসাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—’বিপদ জয়ন্ত! যে লোকটার সঙ্গে দেখা হওয়াটা সবথেকে অনভিপ্রেত ছিল, সেই ফেরার দিবাকর মাজি অ্যান্ড গ্যাং’।
—’দিবাকর মাজি, নামটা শুনেছি মনে হচ্ছে’। —’কালকেই শুনেছ, ক্যাপ্টেন সবরহালের মুখে’।
—দাঁড়ান দেখি, একি সেই ডাকাত দিবাকর নাকি’?
—’একেই বোধহয় বলে ফ্রম ফ্রাইং প্যান টু ন্যাকেড ফ্লেম’।
—কিন্তু এরা আমাদের কাছে কি চায়’?
—’গুপ্তধন’।
—’গুপ্তধন’?
—’এদের বদ্ধমূল ধারণা, জঙ্গলের মধ্যে প্রচুর সোনাদানা, গুপ্তধন লুকিয়ে আছে, আর আমরা এসেছি সেগুলোর খোঁজ করতে’। আমার বিস্ময় চরমে উঠল, বললাম—’আপনি এদের বলেননি’?—’অনেক বলেছি, এদের মাথায় কোনও কথা ঢোকে না, আর বেশি বললে এতক্ষণে আমাদের লাশগুলো এই জঙ্গলের মধ্যে পরে থাকত, তাই অন্য রাস্তা ধরেছি, বলতে পারো ডিল করেছি’।
—’কীসের ডিল’?
—’বলেছি গুপ্তধন ওদের হাতে তুলে দেব, বিনিময়ে ওরা আমাদের মুক্তি দেবে’। ঢোঁক গিলে বললাম—’গুপ্তধনটা পাচ্ছেন কোথায়’? রুদ্রের চোখের কোনে দুষ্টুমির ঝলক খেলে গেল, বললেন—’গুপ্তধন চণ্ডের মন্দিরে, বেদীর তলায় পোতা আছে, বেদীটা ভেঙে ফেললেই যা খুঁজছে পেয়ে যাবে।
—’কিন্তু যখন পাবে না তখন কি হবে?
—’মেরে ফেলবে’, রুদ্র হালকা চালে বললেন ‘আর হ্যাঁ পেলেও কিন্তু পারিশ্রমিক ওই একই’। আমি আর নতুন করে উদ্বেগ নিতে পারছিলাম না, আজকাল নিত্যনতুন যেসব পরিস্থিতি গজিয়ে উঠছে তা বাস্তব না কল্পনা সেটা বুঝতেই যথেষ্ট বেগ পেতে হচ্ছে, চুলোয় যাক অভিযান, এখন একটু বিশ্রামের বিশেষ প্রয়োজন, চোখ বন্ধ করে তাবুর মাটিতে শুয়ে পরলাম। তন্দ্রা ভাঙল যখন দিবাকরের একজন স্যাঙাত দুটো কচুপাতায় করে মাছ সেদ্ধ আর বুনো ফল দিয়ে গেল। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম—’স্যান্ডউইচ তাহলে গেল’? রুদ্রপ্রসাদ খাবারে হাত লাগিয়ে বললেন—’ভুলে যাও, ওসব ওদের পেটেই গেছে’। মাছ তেলে না ভাঁজলে যে এত আঁশটে গন্ধও ছাড়তে পারে আগে জানা ছিল না, কোনরকমে গিললাম, ফলটা দেখতে অনেকটা পেয়ারার মতো হলেও খেতে কিন্তু একেবারেই বিশ্রী, কেমন যেন কষ কষ আর অতিরিক্ত নোনা, ফেলেই দিচ্ছিলাম রুদ্র বারণ করলেন, বললেন—’খাবার নষ্ট করো না জয়ন্ত, সারাদিনে আর জুটবে কি না সন্দেহ আছে’। একটু পরে দিবাকর তাবুতে এসে হাজির হল, তার হাতে আমাদের নিয়ে আসা আধখাওয়া স্যান্ডউইচ, চিবুতে চিবুতে বলল—’এসব টেস্টি খাবার প্রায় ভুলেই গেছি। দুই মাস ধরে আপনাদের মিলিটারি যেভাবে পিছনে লেগেছে’। রুদ্রপ্রসাদ শান্ত কণ্ঠে বললেন—’গুপ্তধন পেয়ে তুমি কি করবে দিবাকর’? জঙ্গলের সীমানা পেরোতে গেলে মিলিটারি আর সি-আর-পি-এফের কবলে পরবে, আর জঙ্গলের মধ্যে এসব কি কাজে লাগবে। দিবাকর মুচকি হেসে বলল—’এই সাতকোশিয়ার জঙ্গলে এমন অনেক পথ আছে যা শুধু মাটির নীচের ইঁদুর আর ভূমিপুত্রেরাই জানে, মিলিটারি আমাকে ছুঁতেও পারবে না, আমি শুধু একটা কনসাইনমেন্টের অপেক্ষায় রয়েছি, সোনা পেলে অবশ্য অন্য কথা, বিদেশে চলে যাব, নাম পালটালে জীবনও পালটে যাবে’। একটু থেমে দিবাকর বলল—’কফি পাঠাচ্ছি, খেয়ে তৈরি হয়ে নিন, আমাদের বেরোতে হবে’।
২৯
সকাল আটটা থেকে আকাশ কালো করে বৃষ্টি শুরু হল। যাকে বলে একেবারে মুষলধারে, সেই সঙ্গে প্রচণ্ড ঝড়ের বেগে বড় বড় গাছের ডালগুলো এমনভাবে নুয়ে পড়ে আছাড়ি বিছারি খেতে শুরু করল, ভয় হচ্ছিল তাবুর উপর না ভেঙে পড়ে। গাছের শাখা-প্রশাখায় বাসা বাঁধা পাখি আর বাঁদরগুলো ইতিমধ্যে দারুণ ত্রাসে প্রচণ্ড কোলাহল শুরু করে দিয়েছে। বাবুলালের টিলার ঠিক সামনেটায় একটা ঝাঁকড়া গাছের ডাল মট মট করে ভেঙে পরল। আমাদের চমকে দিয়ে একটা বাঁদর ছুটে এসে তাবুর মধ্যে ঢুকে একটা কোণায় থরথর করে কাঁপতে লাগল, মা বাঁদরের কোলে একরত্তি শিশু, লোকগুলোর মধ্যে একজন হ্যাট হ্যাট করে বানরটাকে তাড়াতে যাচ্ছিল রুদ্রপ্রসাদ আপত্তি করলেন—’আহা থাকুক না, দেখছ না কোলে বাচ্চা’। দিবাকরের ইঙ্গিতে লোকটা ক্ষান্ত হল। এবারে জলের স্রোত কূল কূল করে তাবুর মধ্যে ঢুকতে শুরু করল, একসময় আমাদের গোড়ালি অবধি ডুবে গেল, দমকা হাওয়ার দাপটে যেভাবে বৃষ্টির ছাঁট আসছিল তাতে তাবুর ভিতরে থেকেও আমরা আপাদমস্তক ভিজেই গেলাম। তাবুর দরজার কাপড় আগেই ছিড়ে গেছে, বাইরে চোখ পড়তে যে দৃশ্য দেখলাম তা একেবারেই অপ্রত্যাশিত! জলের বিরামহীন ধারা ধূসর একটা পর্দা তৈরি করে চোখের সামনে থেকে বাইরের জগৎকে আলাদা করে দিয়েছে। অদ্ভুত অভিজ্ঞতা! প্রকৃতির এই ভয়ংকর রুদ্ররূপ বোধহয় ভাগ্যে থাকলেই দেখা যায়। দিবাকর দুই স্যাঙাতসমেত তারস্বরে তেত্রিশ কোটি দেবদেবীর কাছে লোভনীয় সব মানসিকের প্রস্তাব পাঠাতে শুরু করল। আর তৃতীয় স্যাঙাত হাঁটু গেড়ে জলে থইথই করা মেঝেতে ক্রমাগত মাথা ঠুকে কাকে যে ডেকে চলেছে কে জানে? আর যাকেই ডাকুক, নিশ্চয়ই সমুদ্র দেবতাকে ডাকছে না বলেই আমার বিশ্বাস।
তাবুটা আর দুর্যোগের চাপ নিতে পারছিল না, এমনভাবে দুলছিল মনে হচ্ছিল ওটা বুঝি এখুনি ভেঙে পড়বে, হঠাৎ দুটো জিনিস একসঙ্গে ঘটে গেল। তাঁবুর কাপড়ের ছাদটা ফড়ফড় করে ছিড়ে দু-ভাগ হয়ে গেল, তার সঙ্গে সঙ্গে লোহার স্ট্যান্ডগুলোও প্রচণ্ড ঝন ঝন শব্দ তুলে কাঁপতে লাগল, ওই রডগুলো যদি বর্শার মতো গায়ে বিঁধে যায় তাহলে আর দেখতে হচ্ছে না, হুরমুড়িয়ে বাইরে বেড়িয়ে এসে আমরা এবার খোলা মাঠের মধ্যেই ভিজতে শুরু করলাম। খোলা আকাশের নীচে বৃষ্টির ধারালো ফোঁটাগুলো যেন কাঁটার মতো গায়ে ফুটতে লাগল।
বৃষ্টির বেগ একসময় কমে এল, যেমন আকস্মিক ভাবে শুরু হয়েছিল ঠিক তেমনই শেষ হয়ে গেল। কনঁকনে ঠাণ্ডায় দাঁতে দাঁত ঠোকাঠুকি লেগে যাচ্ছিল, গায়ের জামা, গেঞ্জি, সোয়েটার সব ভিজে একেবারে এঁকসা হয়ে গেছে। রুদ্রপ্রসাদ বললেন—’দিবাকর এখুনি আগুন জ্বালার ব্যবস্থা করতে হবে নাহলে এতগুলো লোক সব নিউমোনিয়ায় মারা পড়বে’। দ্বিতীয় তাবুটা ঝড়ে ভেঙেচুরে তুবড়ে গেলেও কিছু কাঠ এখনও অবশিষ্ট রয়ে গেছে দেখা গেল, তার থেকে দরকার মতো বের করে একটা অগ্নিকুণ্ড বানানো হল, কিন্তু ভিজে কাঠ কি সহজে জ্বলে! অবশেষে ওই তাবু থেকেই এক বোতল কেরোসিন পাওয়া গেল, এবারে কোনোক্রমে আগুনটা ধরানো গেল। সেঁক নিতে নিতে চারপাশে লক্ষ করে দেখলাম, এই একঘণ্টার বৃষ্টিতেই বেশ জল জাম গেছে, আর এই হঠাৎ বৃষ্টিটার জন্যই হয়ত সকাল ন-টাতেই অবিশ্রান্তভাবে ঝিঁঝিঁ আর ব্যাঙের কোরাস শুরু হয়ে গেল। দিবাকর গায়ের টি-শার্ট খুলে নিঙড়াতে নিঙড়াতে বলল—’এমন বিদঘুটে বৃষ্টি আগে কখনো দেখিনি, তা ছাড়া এই জানুয়ারি মাসে’! আমাদের থেকে খানিকটা দূরে বসে গুঙ্গা রাশি রাশি দড়ি নিয়ে কিসব বাঁধাছাঁদা করছে দেখলাম। আগুনের তাপে সবার জামাকাপড় মোটামুটি শুকিয়ে এসেছে, দিবাকর বলল—’চলুন মিত্রবাবু, বেড়িয়ে পরা যাক, অনেকটা হাঁটতে হবে, প্রায় বারো কিলোমিটার রাস্তা’। রুদ্রপ্রসাদ ভ্রু তুলে বললেন—’তুমি ঠিক জানো? পথ কিন্তু আট কিলোমিটার, বারো নয়’।
—’উঁহু, আপনারা যে রাস্তা দিয়ে এসেছেন সেখান দিয়ে যাচ্ছি না, আর্মির লোকেরা ওখানে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে নজর রাখতে পারে, আমরা যাব সূতা নদীর পশ্চিম দিকে, একেবারে ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে, রাস্তাটা সুবিধের নয়! কিন্তু সেফ, হঠাৎ অ্যাটাক হলে অনেক হাইড আউট পাওয়া যাবে’। দিবাকর এবার চাদু সম্বোধন করে যে লোকটাকে ডাকল সে এসে বিনা বাক্যব্যয়ে রুদ্রের প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিল, রুদ্রপ্রসাদ বিরক্ত হয়ে বললেন—’এ আবার কি ব্যাপার’? দিবাকর বলল—’একটু সার্চ হবে মিত্রবাবু, বুঝতেই পারছেন, রিস্ক নেওয়া যাবে না’। রুদ্রপ্রসাদের পকেট থেকে যে মানিব্যাগটা বের হল তাতে একগাছা নোট ছিল সেগুলো হস্তগত করে দিবাকর নিজের পকেটে পুরে ডেবিট ক্রেডিট কার্ডগুলো জলকাদার মধ্যে ফেলে দিল। রুদ্রপ্রসাদ শ্লেষের স্বরে বললেন—’যে জিনিস খুঁজছিলে সেটা পেয়েছ তো’? দিবাকর উত্তর না দিয়ে সহকারিকে ইঙ্গিত করতে সে এবার আমার পকেট ঘাটতে শুরু করল, প্রথমে যেটা বের হল সেটা আর কিছু নয়, ভেলভেটের বাক্সের মধ্যে রাখা চণ্ড রাজার পাথরটা, ভ্রু কুঁচকে দিবাকর বলল —’এটা কি রে’? বললাম—’এমনি রাস্তায় পড়েছিল, কুড়িয়ে নিয়েছি’, দিবাকর পাথরটা নিয়ে দুবার লোফালুফি করে ফের আমার পকেটেই রেখে দিল, এবার অন্য পকেট থেকে বের হল সরবিট্রেটের শিশি। শিশিটা ঝাঁকিয়ে দিবাকর জিগ্যেস করল—’এটা কি’?
—’ওষুধ আমার সঙ্গেই থাকে’। শিশির উপরের ঢাকনাটা খুলে দিবাকর প্রথমে খানিক শুঁকে দেখল তারপর হঠাৎ ট্যাবলেট সমেত শিশিটা একটা বুনো ঝোপের মধ্যে ছুড়ে ফেলে দিল। আমি প্রতিবাদ করে বললাম—’ওষুধটা ফেললে কেন, ওটা আমার সঙ্গে থাকলে কি অসুবিধে হবে’? দিবাকর উত্তরে মুখ খারাপ করে একটা বিশ্রী গালাগালি দিল, আমি প্রত্যুত্তর করতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু কাঁধে মৃদু চাপ দিয়ে রুদ্রপ্রসাদ নিষেধ করলেন।
গুঙ্গা কয়েক গাছা দড়ি হাতে হাজির হল। দিবাকর বলল—’মিত্রবাবু একটু কো-অপারেট করতে হবে যে, আপনাদের হাত দুটো বাঁধতে হচ্ছে’। —’কো-অপারেট তো করছি তাও এমন ব্যবহার করছ’? দিবাকর হেসে বলল—’সোনা না পাওয়া অবধি আমি কোনও রিস্ক নিতে পারি না, তা ছাড়া সরকারি অফিসারদের কখনো বিশ্বাস করতে নেই’। গুঙ্গা আমাদের দু-হাতের কবজি একগাছি দড়ি দিয়ে বেঁধে মাঝখানে একটা লম্বা ঘের রেখে দিল, অনেকটা হ্যান্ডকাপের মতো, তবে তেমন শক্ত করে বাঁধল না, প্রয়োজনে হাত কিছুটা ব্যবহার করা যাবে, আগ্নেয়াস্ত্রের সামনে নিরুপায় আমরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। রুদ্রপ্রসাদ হতাশ কণ্ঠে বললেন—’তোমাকে বলে রাখি আমি সরকারি চাকুরে নই’। দিবাকর হাসল কোনও উত্তর দিল না। গুঙ্গা এবারে একটা বিশেষ পদ্ধতিতে পাকানো দড়ি মুখের সামনে ঝোলাতে লাগল, অনেকটা ফাঁসির দড়ির মতো, প্রায় চার ফুট লম্বা দড়ির একটা প্রান্তে কুণ্ডলী পাকিয়ে একটা বৃত্ত তৈরি করা হয়েছে, অন্য প্রান্তটা সোজা লাইনে নীচের দিকে ঝুলছে। রুদ্রপ্রসাদ ভ্রু তুলে বললেন—’আমাদের ফাঁসি দেওয়ার মতলব করছ নাকি’? দিবাকর বিনয়ের অবতারের মতো জিভ কেঁটে বলল—’ছিঃ ছিঃ কি যে বলেন? জাস্ট একটু বাড়তি সুরক্ষা’। গুঙ্গা ফাঁসির দড়িগুলো আমার আর রুদ্রপ্রসাদের গলায় পরিয়ে দিল। রুদ্রপ্রসাদ রাগত স্বরে চিৎকার করলেন—’তুমি দেখছি একেবারেই অমানুষ, হাতে বন্দুক আছে বলে আমাদের এভাবে কুকুরের মতো টেনে নিয়ে যাবে’। দিবাকর চটল না, ঠাণ্ডা স্বরে বলল—’মিত্রবাবু কাজের কথা শুনে নিন, এটা একটা ম্যাজিক নট, গুঙ্গা বাঁধতে জানে, আপনারা যদি দৌড়োনোর চেষ্টা করেন, তখন টান পরলে এই নট সোজা গলায় আটকে যাবে, খোলার কোনও রাস্তা থাকবে না, তাই কোনওরকম চালাকি না করে শান্ত ছেলের মতো, সোনা কোথায় আছে দেখিয়ে দিন তারপর আপনাদের ছুটি’। দিবাকরের নির্দেশে এবারে আমাদের যাত্রা শুরু হল।
ঘন গাছপালার মধ্যে দিয়ে আমরা হেঁটে চলেছি। পথ বলতে যেটা আছে সেটা বোধহয় মানুষের পায়ের চাপে মাটির উপর যে সমানতা তৈরি হয় সেটুকুই, আদিবাসীরা বোধহয় এদিকে কাঠ কুড়াতে বা মধুর সন্ধানে যাতায়াত করে, যদিও এইমুহূর্তে তার অবস্থাও শোচনীয়। নরম কাদামাটিতে কখনো গোড়ালি অবধি ডুবে যাচ্ছিল তো কখনো প্রায় হাঁটু। এই দলে সবার আগে দিবাকর চলেছে, কাঁধে ঝোলানো রাইফেল আর হাতে আমাদের সঙ্গে নিয়ে আসা বিস্কুটের প্যাকেট। প্যাকেট খুলে দিবাকর গোছা গোছা বিস্কুট খেতে লাগল, মাঝে মধ্যে সঙ্গীদেরও একটা-দুটো করে দিতে লাগল, একসময় দু-প্যাকেট বিস্কুট সাবাড় করে বিশ্রী ঢেঁকুর তুলল। আমার গলায় যে ফাঁসটা ঝোলানো রয়েছে তার অন্যভাগটা গুঙ্গার হাতে ধরা, অনভ্যস্ত পথে চলতে সামান্য পিছিয়ে পরলেই, গুঙ্গা দড়ি ধরে বিশ্রী টান দিচ্ছিল যেন গোরু বাছুর টেনে নিয়ে যাচ্ছে। নিজেকে পশুর অধম মনে হচ্ছিল, জীবনে এত হত্যোদম আগে কখনো বোধ করিনি। এই লোকগুলো যাচ্ছেতাই রকমের বাজে, আর ওই গুঙ্গা এদের মধ্যে সবথেকে অভদ্র, যদি একটা সুযোগ পাই তাহলে এর শোধ তুলে ছাড়ব। রুদ্রপ্রসাদের গলার দড়ি দিবাকরের আর একজনের স্যাঙাতের হাতে ধরা, রুদ্রের থমথমে মুখের দিকে চেয়ে মনে হল সে যেন অপমান আর লাঞ্ছনার এই ওভারডোজ সহ্য করতে পারছে না। প্রায় চল্লিশ মিনিট এভাবে জলকাদা ঘেঁটে একটা সরু খালের সামনে এসে পৌঁছোলাম, এটাই বোধহয় সূতা নদী। নদীর পারে একটা উঁচু মতো টিলার সামনে দিবাকর থামতে বলল। দিবাকর রুদ্রকে উদ্দেশ্য করে বলল—’দশ মিনিট রেস্ট নেওয়া যাক, কি বলেন’? রুদ্রপ্রসাদ উত্তর না দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। রুদ্রের স্যাঙাতেরা আমাদের দড়ি ছেড়ে দিতে আমরা টিলার উপর গিয়ে বসলাম, দিবাকর আমাদের পাশে বসে রসিকতার ছলে বলল—’মিত্রবাবু দুর্যোগটা না হলে আজকে দারুণ একটা জিনিস আপনাদের খাওয়াতাম, কি হতে পারে বলুন তো’? রুদ্রপ্রসাদ কথার উত্তর দিলেন না দেখে দিবাকরই ফের বলল —’হরিণের মাংস! তোফা খেতে, আমি তো দু-মাস ধরে ওই খেয়েই আছি’। রুদ্রপ্রসাদ শ্লেষের স্বরে বললেন—’কতগুলো হরিণ মেরেছ ভাই, এযাবৎ’?
—’জানিনা, গুনে দেখিনি’।
—’হরিণ মারা তো নিষিদ্ধ’, একটু থেমে রুদ্র ফের বললেন ‘অবশ্য তুমি জীবনে কোন কাজটাই বা আইন মোতাবেক করেছ’। দিবাকর যেন দারুণ মজার একটা কথা শুনেছে এমনভাবে হেসে উঠল—’আইন মোতাবেক! হাঃ হাঃ’।
আবার পথ চলা শুরু হল, রাইফেলটা একজন সঙ্গীর হাতে চালান করে দিবাকর হাঁসুয়া দিয়ে ডালপালা কাটতে কাটতে যাচ্ছিল, কি মনে করে পিছিয়ে এসে রুদ্রপ্রসাদকে বলল—’মিত্র বাবু কতটা সোনা ওখানে থাকতে পারে মনে হয় আপনার’। রুদ্রপ্রসাদ যেন রহস্য করে বললেন—’কয়েক টন তো হবেই, গেলেই দেখতে পাবে’।
—’শুধু সোনা না অন্য কিছুও, কি বলেন’?
—’অনেক কিছু, রাজারা কি শুধু সোনা জমাত, হিরে জহরতও নিশ্চয়ই প্রচুর পরিমাণে থাকবে!’
দিবাকর বেশ খুশি হয়ে বলল—’মিত্রবাবু গুপ্তধন পেলে, আজকেই কিন্তু আপনাকে ছাড়ছি না, কালকে পেটপুরে হরিণের মাংস খাইয়ে তবেই যেতে দেব’।
—’ও’।
—’আরে আমাকেও তো একটু সেবার সুযোগ দেবেন! নাকি? ওই যে আপনারা কি বলেন না অতিথি দেবঃ ভবঃ’।
—’তা ভাই তুমি কি দেবতার সেবা এভাবেই করো নাকি? গলায় দড়ি বেঁধে টানতে টানতে’।
—’কি করব বলুন সরকারি লোককে তো আর বিশ্বাস করতে পারি না’।
—’তোমার মাথায় কি কথা ঢোকে না? যাকগে আর বলে লাভ নেই’। দিবাকরের মুখে কুটিল হাসি খেলে গেল, বলল—’বিপদে পরলে ওসব সবাই চেপে যায়’। নদীর পার ছেড়ে দস্যুরা আমাদের নিয়ে আরও ঘন জঙ্গলের ভিতর প্রবেশ করল, এখানকার গাছগুলো যেন গায়ে গায়ে লেগে আছে, চলতে গেলে ডালপালার সঙ্গে ঠোক্কর লাগছে, এদিককার পাতাগুলো যেমন খসখসে তেমনই রুক্ষ, শরিরের যেখানেই ছোঁয়া লাগছে জ্বালা ধরে যাচ্ছে, চুলকে চুলকে ফোস্কা পড়ার অবস্থা, অবশ্য চুলকানোর সুযোগও বিশেষ পাওয়া যাচ্ছে না, একটু দেরি হলেই গুঙ্গা দড়ি ধরে হ্যাঁচকা টানছে। অন্তত দেড়-দু কিলোমিটার এভাবে চলার পর এমন একটা জায়গায় এসে পৌঁছোলাম যেখানে জঙ্গল কেটে দু-ভাগে ভাগ হয়ে গেছে, মাঝখানে একটা জলাভূমির ওপারে আবার নিবিড় অরণ্য।
দিবাকরের হুকুমে এবার জলায় নামতে হল। জলায় জলের স্তর নেহাত কম নয়, প্রায় বুক অবধি কনকনে ঠাণ্ডা নোংরা জল ঠেলে আমরা এগোতে লাগলাম। দিবাকর আগে আগে যাচ্ছে, একটা হাঁসুয়া দিয়ে জলে আঘাত করে কচুরিপানা সরাতে সরাতে, তাও দলা দলা কচুরিপানা এসে গায়ে মুখে সর্বত্র জড়িয়ে যাচ্ছে, নর্দমার মতো পচা জলে একধরনের পোকার কামড়ে অস্বস্তি যেন শতগুণে বেড়ে গেল, মনে হচ্ছিল এবার বোধহয় উন্মাদই হয়ে যাব। প্রায় কুড়ি মিনিটের নরক যন্ত্রণার অবশেষে অবসান ঘটল, আমরা জলা ডিঙিয়ে এপারে চলে এলাম। গভীর অরণ্যের বুক চিড়ে ফের পথ চলা, দিবাকর আগে আগে চলেছে, মাঝখানে আমাদের দুজনের গলার দড়ি ধরে গুঙ্গা আর অন্য লোকটা, সবার পিছনে রাম-দা হাতে যে লোকটা, তার নাম কানহাইয়া। রুদ্রপ্রসাদের মুখের দিকে চেয়ে দেখলাম সেখানে এখন ক্রোধের পরিবর্তে হতাশা আর অবসাদের অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে, তবে কি উনিও সব আশা হারিয়ে ফেলেছেন, এতক্ষণ যেটুকু ভরসা পাচ্ছিলাম রুদ্রকে দেখেই, এবারে আমি যেন আরও দমে গেলাম। যেতে যেতে দিবাকর হঠাৎ থেমে গেল, হাত তুলে থামবার সংকেত করল। পিছনে আমরা পাঁচজন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। বনের মধ্যে যতদূর দেখা যাচ্ছে নিঝুম, নিস্তব্ধ, দিবাকর কান খাঁড়া করে যেন কিছু শোনার চেষ্টা করল, দলের বাকিরা ঘাবড়ে যাওয়া দৃষ্টে এদিক- ওদিক চাইতে লাগল, নাম না জানা একটা পাখির ডাক, গাছের আড়াল থেকে ভেসে আসছিল, সেটা না থাকলে এতক্ষণে এটাকে মৃতের জঙ্গল বলে বোধ হত। পাঁচ মিনিট পরে দিবাকর হাত নামাল, সংকেত শেষ, আবার যাত্রা শুরু হল, লতা-গুল্ম আর পচে যাওয়া রাশি রাশি পাতা মাড়িয়ে পথ চলা, কারও মুখে আর কোনও কথা নেই, মনে মনে ভাবছি রাত আটটার পর আর্মির লোকেরা যখন এলাকার দখল নেবে তখন হয়তো আমাদের ক্ষতবিক্ষত তাজা লাশগুলো উদ্ধার করবে, এই গভীর জঙ্গলে ডাকাতের হাতে মরাটাই বোধহয় আমার নিয়তি।
আমার চিন্তার জাল ছিন্ন হয়ে গেল কানের কাছে একটা আর্তচিৎকারে, মুহূর্তের জন্য কেউ যেন মরণ আর্তনাদ করেই স্তব্ধ হয়ে গেল। চকিতে পিছন ঘুরে যা দেখলাম তাতে গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল। পিছনে থাকা কানহাইয়ার পায়ের চপ্পলের একটা পাটি খুলে গড়াগড়ি খাচ্ছে আর সে নিজে? শুধু তার কোমরের নীচের অংশটাই দেখা যাচ্ছে, যেটা অতি দ্রুত একটা ঝোপের পিছনে মিলিয়ে গেল, দিবাকর রাইফেল থেকে ফায়ার করতে করতে সেদিকে ছুটে গেল, গুঙ্গা আর অন্য লোকটা ওদের নেতাকে অনুসরণ করল। দড়ির ফাঁসে টান পড়তে আমরা দুজনও ছুটতে বাধ্য হলাম। কুড়ি হাত দূরে ঝোপটার পিছনে কানহাইয়া জখম অবস্থায় পরে রয়েছে! গুলির শব্দে ভয় পেয়ে বাঘ অবশ্য শিকার ছেড়েই পালিয়েছে, কানহাইয়ার নিস্তেজ দেহে এখনো প্রাণ আছে, গলার খাঁজে ক্ষতস্থান থেকে রক্তের স্রোত বয়ে যাচ্ছিল। হিক্কার তুলতে তুলতে আহত লোকটার বুকটা যেন হাঁপরের মতো ওঠানামা করছিল। দিবাকর আর দুই সঙ্গী কিছুক্ষণ নীরব থেকে তাদের সহকর্মীকে শেষ বিদায় জানাল, তারপর রাইফেলের একটা গুলিতে কানহাইয়ার জীবন যন্ত্রণার পরিসমাপ্তি ঘটল।
