চণ্ডরাজার বলি – ৩০
৩০
চলছি তো চলছি, পথের যেন আর শেষ নেই। চলার অযোগ্য পথে দলের গতি রীতিমতো শ্লথ হয়ে পড়ছে, বিশেষ করে আমাদের দুজনের, জঙ্গলের পথে যেতে যেতে মাঝে মধ্যেই হরিণের দলের মুখোমুখি হয়ে পড়ছি, হরিণগুলো বেদম ভীতু, মানুষ দেখলেই ছুটে পালাচ্ছে, এরপর এল একটা শেয়াল, শেয়ালটা একটা রাজহাঁস ধরেছে, হাঁসটা ঘাড় ভেঙে শেয়ালের দাঁতের ফাঁকে ঝুলছিল, ফোঁটা ফোঁটা রক্ত জন্তুটার মুখ গড়িয়ে ভেজা মাটিতে পরছিল, আমার একটু আগে দেখা কানহাইয়ার পরিণতি মনে পড়ল। সবশেষে দেখলাম একটা শজারু কেমন যেন দুলকি চালে চলে গেল, সামনে থাকা মানুষদের বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে। ইতিমধ্যে দিবাকরের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ পালটে গেছে, বোধহয় সঙ্গীকে এভাবে হারানোর ধাক্কাটা সামলাতে পারছে না, থমথমে মুখে সে যথারীতি আগে আগে চলছে তবে মাঝে মধ্যেই গুঙ্গা আর চাঁদুর উপর চোটপাট করছে। ধমক খেয়ে লোক দুটোরও বোধহয় মেজাজ বিগড়ে গেছে তাই এরা মাঝে মধ্যে সম্পূর্ণ অকারণেই আমাদের গলার দড়িতে হ্যাঁচকা টান মারছে, প্রতিটা টানে দড়ি আর গলার দূরত্ব কমে আসছে, অসোয়াস্তি বাড়ছিল, দড়িটাকে গলা থেকে সরিয়ে রাখার জন্য আমি হাত দুটোকে লম্বালম্বি দড়ি আর গলার মাঝামাঝি রেখে দিলাম, বিষয়টা রুদ্রের হ্যান্ডলার চাদুর চোখে পড়েছে, সে হাঁটা বন্ধ করে আমার দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে চাইল, তারপর হঠাৎ বিশ্রী গাল দিয়ে ধাঁ করে চড় কষিয়ে দিল। রাগে আর অপমানে গায়ে যেন আগুন জ্বলে উঠল, ক্ষিপ্ত হয়ে হাত দুটো জোড়া করে লোকটাকে ঘুষি মারতে যাচ্ছিলাম, অবস্থা বুঝে গুঙ্গা দড়ি ধরে প্রচণ্ড টান মারল। টাল সামলাতে না পেরে ঘাস জমির উপর মুখ থুবড়ে পড়লাম, ফাঁসটা এবার গলার চারপাশে এমনভাবে চেপে বসল, মনে হচ্ছিল বুঝি জিভটা মুখের ভিতর থেকে ঠেলে বের হয়ে আসবে। রুদ্রপ্রসাদ হুঙ্কার ছেড়ে বললেন—’দিবাকর তোমরা দেখছি একেবারেই অমানুষ! আমাদের মধ্যে একটা ভদ্রলোকের চুক্তি হয়েছিল, তোমার গুপ্তধন চাই, আর আমি তোমাকে সেখানে পৌঁছে দেব, কিন্তু প্রথম থেকেই তুমি আমাদের সঙ্গে যে ব্যবহার করে চলেছ তা কেউ জানোয়ারের সঙ্গেও করে না। এবার আমি আর এক পাও নড়ব না, যদি ইচ্ছে হয় গুলি করে মেরে দাও’। রুদ্রপ্রসাদ সত্যি সত্যি ঘাসের উপর বসে পড়লেন। দিবাকর এতক্ষণ ঘটনার উপর নজর রাখছিল, মাঝখানে হস্তক্ষেপ করেনি, এবারে রুদ্রের কথার উত্তর না দিয়ে ধীর পায়ে চাদুর সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল—’হুকুম কার চলে এখানে’? চাদু কথার উত্তর না দিলেও দিবাকরের চোখ থেকে নিজের চোখ সরালো না, সে চোখের দৃষ্টিতে বিদ্রোহের আভাষ। দিবাকর গলার স্বর একপর্দা চড়িয়ে বলল—’তোকে আগেও বলেছি নিজের মর্জি খাটাতে হলে অন্য জায়গা দ্যাখ, শুয়োরের বাচ্চা তুই সর্দার হবি’। হঠাৎ দিবাকর গামবুট পরা পা তুলে চাদুর পেটে সজোরে লাথি মেরে বসল। প্রহারের বেগ সামলাতে না পেরে লোকটা একহাত দূরে ছিটকে পড়ল, যখন উঠল তখন তার চোখে আগুন জ্বলছে। হিংস্র স্বরে বলল—’তু মোদের লেতা লোস, লেতা যে ছিল মরে গেছে, আর শুয়ার হবে, তোর বাপ’। চাদু অকস্মাৎ দিবাকরের গালে প্রচণ্ড একটা থাপ্পড় কষিয়ে দিল। ঘটনার এই অপ্রত্যাশিত মোচড়ে দিবাকরও যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল, কিন্তু সেটা মুহূর্তের জন্য, তারপরেই হিংস্র শার্দুলের মতো চাদুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। শুরু হয়ে গেল সুন্দ উপসুন্দের লড়াই, দিবাকরের ঘুষিতে চাদুর মুখ ফেটে হা হয়ে গেল আর পরক্ষণেই চাদুর কনুইয়ের ঘা সোজাসুজি এসে লাগল দিবাকরের নাকে, দুজনে এবার জড়াজড়ি করে জলকাদার মধ্যে গিয়ে পড়ল, একফাঁকে চাদু পকেট থেকে ছোট একটা ছুরি বের করে ফেলেছে, সেটা চালিয়ে দিল দিবাকরের কণ্ঠনালি লক্ষ্য করে, ক্ষিপ্রতার সঙ্গে গলা বাঁচিয়ে নিলেও দিবাকর আঘাত এড়াতে পারল না, জামা ছিড়ে বুকের কাছটা কেটে রক্তারক্তি হয়ে গেল, তবে দিবাকর এতক্ষণে চাদুকে কব্জা করে ফেলেছে, ওর হাত থেকে ছুরিটা কেড়ে নিয়ে বসিয়ে দিল পাঁজরের গভীরে, ফিনকি দিয়ে রক্ত উঠল। গুঙ্গা এতক্ষণ অস্থিরভাবে সঙ্গীদের মারামারি দেখছিল এবার উন্মাদের মতো বিহ্বল হয়ে দড়ি ফেলে ছুটল, দিবাকরকে চেপে ধরে কিসব আকুতি জানাতে শুরু করল তার মানে বোঝা ভার। কাঁধে হঠাৎ অস্থির হাতের চাপ, রুদ্রপ্রসাদ অধীর স্বরে বললেন -‘হা করে দেখছ কি? ওরা এখন আমাদের দেখছে না, চল পালাই’।
জঙ্গলের গভীরে অনেকদূর চলে এসেছি। ভয় হচ্ছিল দিবাকর ধাওয়া করে আমাদের ধরে না ফেলে। রুদ্রপ্রসাদ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে প্রচণ্ড হাঁপাতে শুরু করলেন, একটু পরে সামান্য ধাতস্থ হয়ে বললেন—’এতটা রাস্তা যা ছুটলাম’। যদিও আমার মনে হল হাঁপানোর ধরনটা কেমন যেন অস্বাভাবিক, নিছক ক্লান্তির থেকে অন্যধরনের। রুদ্রপ্রসাদ বললেন—’মনে হচ্ছে ওরা কাছাকাছির মধ্যে নেই, সবার আগে নিজেদের মুক্ত করা যাক’। আমরা দুজনে এবার দড়ির গিঁটগুলো নিয়ে পড়লাম। হাতের বাঁধন খুলতে তেমন অসুবিধে না হলেও সমস্যা হল গলায় ঝোলা দড়িটা নিয়ে, ওটার প্যাঁচ খুলতে হিমশিম খেয়ে গেলাম, অবশেষে যখন খুলল, হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। রুদ্রের কথামতো দড়িটা বুনো ঝোপের আড়ালে ফেলে দিলাম, ফের যদি দিবাকরের পাল্লায় পড়তেই হয়, অন্তত বাঁধতে আর পারবে না। এবারে ভালো করে জঙ্গলের দিকে চাইলাম, যতদূর চোখ যাচ্ছে শুধু বনের ঘন পাঁচিল, প্রকাণ্ড সব গাছের পাতা জায়গায় জায়গায় যেন চাঁদোয়ার মতো সৃষ্টি করেছে, এমনিতেই দিনটা মেঘলা, যেটুকু আলো হয়তো আসত তাও এই পাতার আবরণ ভেদ করে ঠিকমতো আসতে পারছে না। ক্ষুতপিপাসা ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে পরতে চাইছে। সামনে একটা ঝাঁকড়া গাছে লাল টসটসে ফল ঝুলছে, হাত দিয়ে পেড়ে নিতেই রুদ্রপ্রসাদ হা হা করে উঠলেন—’মরবে নাকি! বিষফল কি না কে জানে’। ফলটা হাত থেকে ফেলে দিয়ে বললাম—’কিন্তু দারুণ খিদে পেয়েছে যে, তার কি করা যায়’? রুদ্রপ্রসাদ একটু ভেবে বললেন—’কাছাকাছির মধ্যে নিশ্চয়ই পুকুর-ডোবা কিছু থাকবে, আমাদের খুঁজে নিতে হবে’। সকালে যে তুমুল বৃষ্টিটা হয়েছে তার চিহ্ন সর্বত্র। গাছের পাতাগুলোর খাঁজে খাঁজে জল জমেছে, আমি কয়েকটা পাতায় মুখ লাগিয়ে জল চুষে খেলাম, এতে যাহোক গলা কিছুটা ভিজল, আমার দেখাদেখি রুদ্রপ্রসাদও তাই করলেন। ভাঙা ডালপালা পচা পাতা মাড়িয়ে আমরা আবার জঙ্গলের পথে চলতে লাগলাম। খানিকটা হাঁটার পর বললাম—’আমরা কি ঠিক পথে চলেছি না আরও ভিতরে ঢুকে পড়ছি’? রুদ্রপ্রসাদ চিন্তিত স্বরে বললেন—’একটা হিসেব কষেছি, তবে সেটার গ্যারান্টি দেওয়া যাবে না, দিবাকর নদীর পশ্চিম দিক ধরে বনের পথ ধরেছিল। তা হলে পূর্ব দিকে গেলে হয়তো আমরা আবার সূতা নদীর ধারে এসে পড়ব, একবার যদি সূতা নদী খুঁজে পাওয়া যায় তা হলে ধার ঘেঁষে চললে ভগীরথপুর গ্রামে পৌঁছোন সম্ভব’।—’আপনি নিশ্চিত এটা পুর্ব দিক’?
—’আমার হাতে কম্পাস নেই জয়ন্ত, তবে মনে হয় দিকভুল হয়নি’।
—’কিন্তু নদীর ধার দিয়ে গেলে তো আবার দিবাকরের পাল্লায় পড়ার সম্ভাবনা আছে’? রুদ্রপ্রসাদ বললেন—রিস্ক তো একটা রয়েইছে! তবে আমরা যেমন দলে দুজন, ওরাও এখন কিন্তু ঠিক তাই, শুধু আগ্নেয়াস্ত্রটাই যা তফাত গড়ে দিচ্ছে। আমরা এবার সূতা নদীর সন্ধানে পূর্বদিকে চলা শুরু করলাম।
জঙ্গলের একঘেয়ে দৃশ্য দেখতে দেখতে চলছিলাম, মাথায় রাজ্যের দুশ্চিন্তা, অনেকটা পথ অতিক্রম করার পর গাছপালা যেন এবার একটু হালকা হয়ে আসছিল, মনের কোণে আশা জেগে উঠল তবে কি জঙ্গলের সীমানা পেরিয়ে আসছি। রুদ্রপ্রসাদকে সে কথা বলতে গিয়ে দেখলাম ভদ্রলোক কিছুটা পিছিয়ে গেছেন, একটা শাল গাছের উপর ভর দিয়ে হাঁপাচ্ছেন, আমি পাশে গিয়ে বললাম—’শরীর খারাপ লাগছে নাকি’? রুদ্র যেন জোর করে মুখে হাসি ঝুলিয়ে বললেন—’ও কিছু নয়, মাঝে মধ্যে একটু হাঁপ ধরে, বয়স হচ্ছে তো, এসব অ্যাডভেঞ্চারের কি আর বয়স আছে’?
যেতে যেতে একটা ন্যাড়া মতো জায়গায় এসে পৌঁছোলাম, এখানকার ঘাস ছোট ছোট বনবাদাড়ও বিশেষ ঘন নয়, একটা বিষণ্ণ কর্কশ শব্দ কানে এল তারপর চোখের সামনে দিয়ে হঠাৎ যেন রঙের বন্যা বয়ে গেল। একটা ময়ূর! রংবেরঙের পেখম মেলে দুলকি চালে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ময়ূরটা আমাদের দেখে হঠাৎ থমকে গেল তারপর বোধহয় ভয় পেয়েই পেখম গুটিয়ে জঙ্গলের মধ্যে সেধিয়ে গেল। মাঠের মাঝখানে কয়েকটা মাটির ঢিপি চোখে পড়ল। ভাবলাম ওটার গায়ে হেলান দিয়ে একটু বিশ্রাম নেওয়া যাক, কিন্তু রুদ্রপ্রসাদ নিষেধ করে বললেন—’উঁহু! কেমন যেন লাগছে? একটু দেখতে দাও তো’! বড়সড় একটা পাথরের টুকরো তুলে ঢিপিতে ছুড়ে মারলেন, আর তক্ষুনি কিলবিল করতে করতে অসংখ্য কৃমি জাতীয় ক্ষুদ্র আকারের পোকা বেড়িয়ে এল, রুদ্রপ্রসাদ বললেন—’এগুলো হচ্ছে উইপোকা, আমাদের সবার বাড়িতেই এ জিনিস অল্পবিস্তর পাওয়া যাবে, তবে একত্রে কোটির ঝাঁকে যদি কোনও মানুষকে ছেঁকে ধরে তবে কিন্তু মুশকিল’!
৩১
হাটছি তো হাটছি, জঙ্গল যেন গোলকধাঁধা! এদিকে রুদ্রপ্রসাদের গতি ক্রমশ শ্লথ হচ্ছে, মুখে না বললেও তার শরীরের মধ্যে যে অসোয়াস্তির মাত্রা বাড়ছে বুঝতে পারছিলাম, হঠাৎ একটা অশ্বত্থ গাছের গোঁড়ায় রুদ্র হাঁটু ভেঙে বসে পড়লেন, মুখে যন্ত্রণার ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠল। আমি ধরতে চেষ্টা করতে রুদ্র আমার উপর এলিয়ে পড়লেন, রুদ্রের মাথা কোলে তুলে বললাম—’শরীর খারাপ লাগছে’? প্রচণ্ড হাঁপাতে হাঁপাতে রুদ্র বললেন—’এরকম আগেও হয়েছিল, ওষুধটা ছিল, প্রাণ বেঁচে গেছিল, কিন্তু আজ মনে হচ্ছে’। রুদ্র নিজের কথা শেষ করতে পারলেন না, মুখ থেকে দমকা ফেনা রক্ত বেড়িয়ে এল, গভীর জঙ্গলের মধ্যে এই পরিস্থিতিতে কি করা উচিত আমার মাথায় এল না, কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতো বসে রইলাম, সামান্য পরে রুদ্র বিকৃতস্বরে বললেন—’তোমাকে বিপদের মাঝে এভাবে ছেড়ে যেতে মন চাইছে না জয়ন্ত, কিন্তু সময় ফুরিয়েছে, আর্শীবাদ করি …।’
রুদ্রপ্রসাদ আর নিজের কথা শেষ করতে পারলেন না, বিস্ফারিত চোখের দৃষ্টি মেলে নিশ্চুপ হয়ে গেলেন।
প্রখ্যাত হিস্টোরিয়ান রুদ্রপ্রসাদ মিত্রের নিথর দেহটা পরে আছে একটা বট গাছের গোঁড়ায়, রুদ্রের মাথা কোলে নিয়ে আকাশপাতাল ভেবে চলেছি, বেশিদিনের আলাপ নয় তা হলেও এর মধ্যেই ওর সঙ্গে একটা আলাদা রকমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, রুদ্র আমাকে স্নেহের চোখে দেখতেন আর আমিও ওনাকে শ্রদ্ধা করতাম। অজ্ঞাত অতীতের প্রতি লাগাছাড়া কৌতূহলেই শেষমেশ ভদ্রলোকের এমন পরিণতি ঘটল। এই জঙ্গলপুরীতে রুদ্রপ্রসাদই ছিলেন আমার একমাত্র আশা ভরসা, সম্পূর্ণরূপে একা আমি কি করে রুদ্রের মিশন সফল করব তার কোনও ধারণা অবশ্য আমার নেই। অনেকটা সময় গড়িয়ে গেল, হয়তো দু-ঘণ্টা হবে কি তার থেকেও বেশি! মেঘ কেটে গিয়ে হালকা রোদ ফুটেছে, এ আলো পড়ন্ত সূর্যের, বিকেল হয়ে গেছে। রুদ্রের মৃতদেহে এরমধেই কাঠিন্যের লক্ষন দেখা দিয়েছে, চোয়ালের হাড় সামান্য হলেও বেঁকে গেছে। কোথা থেকে লাল পিঁপড়ের ঝাঁক এসে মৃত শরিরের সর্বত্র ঘোরাফেরা শুরু করল। আমি হাত দিয়ে পিঁপড়েগুলোকে ঝেড়ে ফেলে দিলাম, সাময়িক পিছু হটলেও কিন্তু ওরা নাছোড়বান্দার মতো লেগেই রইল, একটু পরে আবার এসে জুটল। মনে জোর আনার চেষ্টা করলাম, যে উদ্দেশ্যে রুদ্রপ্রসাদ প্রাণ দিলেন সেটাকে বিফলে যেতে দেওয়া যায় না, অন্তত একটা শেষ চেষ্টা আমাকে করতেই হবে। রুদ্রপ্রসাদের দেহটা একটা গাছের ডালের সঙ্গে লতানে কিছু শিকড় দিয়ে শক্ত করে বাঁধলাম, এতে দেহটা অন্তত হিংস্র জন্তুর হাত থেকে রক্ষা পাবে আশা করি, যদি জ্যান্ত ফিরত আসতে পারি তবে সসম্মানে রুদ্রের সৎকারের ব্যাবস্থা করব আর যদি হিংস্র এই অরণ্যের বলি হতেই হয় তাহলে অসমবয়সী প্রিয় বন্ধুকে এটাই আমার অন্তিম প্রণাম।
কোণাকুনি হাঁটছিলাম, বিদায়ী সূর্যের ঠিক উলটো দিকে, জঙ্গলের ঘনত্ব এবারে কমতে শুরু করেছে, আধঘন্টা মতো এভাবে চলার পর ঘাসজমি চোখে পড়ল, মাঝে মধ্যে অবশ্য মেহগনি গোছের গাছ একটা দুটো দেখা যাচ্ছিল। হঠাৎ একটা চড়াইয়ের মতো উচ্চতা ডিঙাতেই চোখের সামনে অভীষ্টপূরণ! আন্দাজ প্রায় দুশো মিটার দূরে সরু খালের মতো বয়ে চলেছে সূতা নদী! যথাসম্ভব দ্রুত ছুটে গিয়ে নদীর পারে হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। আঁজলা ভরে জল মুখে চোখে দিয়ে, আকণ্ঠ জল পান করে দেহমনে নতুন শক্তির জোয়ার বইল। সামান্য বিশ্রামের পর নদীর দুটো প্রান্ত ভালো করে দেখে বোঝার চেষ্টা করলাম। দক্ষিণ দিকে প্রকাণ্ড সব গাছের সাড়ি, অবশ্য উত্তর দিকের জঙ্গল এদিকের তুলনায় অনেকটাই হালকা, বোধহয় ওদিকটায় জনবসতি থাকতে পারে, ফের আমি হাঁটা শুরু করলাম। এবার দিশা উত্তরমুখি, ভগীরথপুর গ্রাম।
সূর্য ডোবার মুহূর্তে যে জায়গাটায় এসে হাজির হলাম সে এলাকাটা আমার পরিচিত, এখানে আমি আগেও এসেছি, তবে সজ্ঞানে নয় স্বপ্নে। গোলাকৃতি মাঠটার ওপারে গ্রামের শুরু আর যেদিকে আমি দাঁড়িয়ে রয়েছি এদিকটায় জঙ্গলের রাজ্য, মাঝখানে বর্ডারে মাথা তুলে দণ্ডায়মান চণ্ড রাজার মন্দির। মন্দিরটা ঠিক তেমনই যেমনটা স্বপ্নে দেখেছি। পা দুটো যেন পাথরের মতো জমাট বেঁধে মাটির সঙ্গে সেঁটে গেল, এত ঠাণ্ডার মধ্যেও কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে টের পেলাম, হঠাৎ দমকা হাওয়ার একটা বেগ উঠল মন্দিরের সামনে থেকে, শুকনো কাঠকুটো গাছের পাতা, দলা পাকিয়ে এসে যেন অদ্ভুতভাবে জড়িয়ে ধরল, কি ভীষণ সেই দমবন্ধ করা অবস্থা, কে যেন আখ মাড়াই কলে পিষে শরিরের হাড়গুলো গুড়িয়ে দেবে মনে হচ্ছিল, কানের কাছে ফিসফিস করে অমানুষিক একটা কণ্ঠস্বর আমার নাম ধরে ডাকল, আতংকে চিৎকার করে উঠলাম, অকস্মাৎ হাওয়ার বেগটা বিদায় নিল, কিন্তু ততক্ষণে দারুণ ভয় আমার শিরায় শিরায় কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে। সন্ধের কালো ছায়া চণ্ডমন্দিরের উপর দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে চলেছে। চণ্ডের রাজত্বে রাত নামছে, চণ্ডের রাত! আর অপেক্ষা করা একেবারেই চলে না, যে কাজের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়েছি তা সম্পূর্ণ করতে হবে। দ্রুতহাতে গাছের ভাঙা ডাল কাঠকুটো জোগাড় করে মন্দিরের পাঁচিলের সামনে জড়ো করতে শুরু করলাম। একসময় কাঠকুটোর একটা ছোটখাটো স্তূপ মতো হয়ে গেল, এবার দরকার এটাতে অগ্নিসংযোগ করা, একবার আগুনটা জ্বালিয়ে নিতে পারলে সেই আগুনে মন্দিরের ভিতরে বেদি আর পাথরটাকে জ্বালিয়ে দেওয়া সহজ হবে।
ভাবা সহজ, করা নয়! কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল কাঠের টুকরোগুলো বৃষ্টির জলে ভিজে ন্যাতা হয়ে গেছে, তার থেকেও বড় কথা আগুন ধরানোর জন্য যে দেশলাই বা লাইটারের প্রয়োজন সেটাই আমার কাছে নেই! রুদ্রপ্রসাদের প্যান্টের পকেটে লাইটার ছিল, কিন্তু আমার ভুলে সেটা ওখানেই রয়ে গেছে। আশেপাশে অনেক নুড়িপাথর পরেছিল, শুনেছি চকমকি পাথর ঠুকলে নাকি আগুন জ্বলে। দুটো পাথর তুলে একে অপরের সঙ্গে ঘষতে লাগলাম। পাথরে পাথরে ঘষা খেয়ে শুধু খড়খড়ে শব্দ হল, আগুন কিছুই জ্বলল না। পাথর দুটো ফেলে দিয়ে অন্য দুখানা তুলে নিলাম, এবারও শব্দই সার, পরের আধঘন্টা শ-খানেক পাথর ঘষে ঘষে হাতে দারুণ ব্যথা ধরে গেল কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হল না। হঠাৎ পিছনে পায়ের শব্দে ফিরে দেখলাম দিবাকর আর গুঙ্গা যেন মাটি ফুঁড়ে এসে হাজির হয়েছে।
দিবাকরের চোখ দুটো হিংস্র কুকুরের মতো জ্বলছিল, রাইফেল আমার দিকে তাগ করে বলল—’শুয়োরের বাচ্চা অনেক ছুটিয়েছিস, বুড়োটা কোথায়’? দিবাকরের রাইফেল দেখে আমার আর ভয় করল না, শান্তস্বরে বললাম—’তুমি সরবিট্রেটের শিশিটা ফেলে দিলে কেন? ওতে তোমার কোনও লাভটা হয়েছে’? দিবাকর রাইফেলের সেফটি ল্যাচ থেকে আঙুল সরিয়ে ট্রিগারে রেখে কাটা কাটা স্বরে বলল—’বুড়োটা কোথায়’?
—’উনি মারা গেছেন’। দিবাকর একমুহূর্তের জন্য চুপ করে তারপর বলল—’নিশ্চয়ই তোকে বলে গেছে, সোনা কোথায়’?
—’হ্যাঁ, মন্দিরের ভিতরে’। দিবাকর হুকুম জারি করল—’যা ভিতরে গিয়ে বের কর, খবরদার চালাকি করলে কিন্তু মরবি’। মনে মনে কর্তব্য স্থির করে ফেলেছি, মুখে বললাম—’সুড়ঙ্গে ভীষণ অন্ধকার সঙ্গে একজনের থাকা প্রয়োজন’। দিবাকরের ভ্রু কুঁচকে উঠেছে, বলল—’কীসের সুড়ঙ্গ’? আমি নির্বিকারে বললাম—’মন্দিরের ভিতর যে সুড়ঙ্গটা আছে তার দরজা চৌরি গ্রামের কালী মন্দিরের পিছনের জঙ্গলে আছে, রুদ্রপ্রসাদ আমাকে নকশা বুঝিয়ে দিয়েছেন’। দিবাকর সংশয় ভরা স্বরে বলল—’এমন কিছু তো আগে শুনিনি’?
—’ঠিক আছে তবে আমি একাই যাচ্ছি’। সামান্য ইতস্তত করে এবার দিবাকর বলল—’আমিও যাব তোর সঙ্গে, তুই আগে থাকবি আমি পিছনে’। মনে মনে হাসলাম, ইঁদুর শেষ পর্যন্ত ফাঁদে পড়ল! দিবাকর পা বাড়াতেই গুঙ্গা হঠাৎ চঞ্চল হয়ে উঠল, আকার ইঙ্গিতে আর অবরুদ্ধ স্বরে কিসব বলতে শুরু করল, বুঝতে পারলাম ও দিবাকরকে ভিতরে যেতে নিষেধ করছে। দিবাকর বিরক্ত হয়ে বলল—’ফালতু জিনিস নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় নয় এখন, ভিতরে কিছু থাকলে আগে ও মরবে, আমাদের কিছু হবে না’। গুঙ্গা এবার মরিয়া হয়ে দিবাকরের পা চেপে ধরল, কোনও কিছুর বিনিময়েই যে ও মন্দিরের ভিতর ঢুকবে না সেটা বুঝে বেশ মজা লাগছিল, দিবাকর গায়ের জোরে গুঙ্গাকে ঠেলে সপাটে ওর পাঁজায় লাথি ঝেড়ে বসল, লাথি খেয়ে গুঙ্গা মেঝেতে গড়িয়ে পড়েছিল, সামলে উঠেই পাইপাই করে ছুট লাগাল জঙ্গলের দিকে আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ঘন গাছপালার আড়ালে মিলিয়ে গেল। নিষ্ফল আক্রোশে সেদিকে চেয়ে দিবাকর আমার পিঠে রাইফেলের কুঁদো দিয়ে ঠ্যালা দিল।
কাঠের সদর দরজা ঠেলে আমরা ভিতরে প্রবেশ করলাম। বড়সড় চাতালের ওপারে মূল মন্দির, মাঝখানে মোরাম ফেলা পথের দু-পাশে ঘন আগাছার ঝাড়। দেখে মনে হল দীর্ঘকাল এই মন্দিরে কেউ পা রাখেনি। গর্ভগৃহের সামনে এসে দিবাকর ইতস্তত করে দাঁড়িয়ে পড়ল, সংকটের মুহূর্তেও হাসি পেল, ভয় দেখানোটাই যার পেশা, সে নিজেই কিনা ভয়ে হাঁসফাঁস করছে। বললাম—’তুমি এই থামটার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকো আমি ডাকলে ভিতরে আসবে’। দিবাকর বাধ্য ছেলের মতো কোনও প্রতিবাদ না করে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। মন্দিরের ভিতর নিকষ্যি অন্ধকার, কিছুই ঠাহর করা যাচ্ছিল না, কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর চোখ কিছুটা সয়ে যেতে হাতড়ে হাতড়ে বেদিটা খুঁজে পাওয়া গেল। প্যান্টের পকেট থেকে চণ্ডের প্রাণভোমরা বের করে বেদীর ওপর স্থাপন করতেই শরিরটা হঠাৎ ঝনঝন করে উঠল। মেঝেতে ছিটকে পরেছিলাম, সামলে উঠে দেখলাম পাথরটা ঘিরে একটা অপার্থিব নীল আলোর বৃত্ত তৈরি হচ্ছে, কিছুক্ষণের মধ্যে সে আলোর বলয় সম্পুর্ন হল। গমগমে অপার্থিব কণ্ঠস্বর ভেসে এলো —’জয়ন্ত সিংহ রায় সৌভাগ্যবান তুমি, এজীবনে চণ্ডের সেবার সুযোগ পেয়েছ, বলো তোমার ইচ্ছে কি’?
—’আপনার ইচ্ছেই আমার ইচ্ছে, আত্মসমর্পণ করছি’।
—’স্বাগত জয়ন্ত, সংশয় ত্যাগ করে পৃথিবীর বুকে অপার কর্তিত্ব আর রাজসুখ ভোগ করার জন্য তৈরি হও’। আমি হাতজোড় করে বললাম— ‘আপনার অসীম দয়া প্রভু, আপনার অহেতুক কৃপাবর্ষণে এই অধম সেবক ধন্য, বিনিময়ে কিছু দেওয়ার সামর্থ্য আমার নেই তবে সামান্য একটা উপহার এনেছি, কৃপা করে গ্রহণ করুন’। চণ্ডের তরফ থেকে প্রত্যুত্তর না পেয়ে ফের বললাম—’নিটোল স্বাস্থ্যের অধিকারী একটি মানব সন্তানকে আপনার শ্রীচরণে অর্পণ করতে হাজির করেছি, তাজা মাংস আর গরম রক্তের বলি গ্রহণ করুন প্রভু’। চণ্ডের অট্টহাসিতে এবার মন্দির কাঁপতে শুরু করল —’তাকে আমি দেখতে পাচ্ছি, তবে শুধু কি ওই রক্ত মাংসের নৈবেদ্য চণ্ডের তেষ্টা মিটবে’?
—তা কেন! রক্ত, মাংসের দেহর মধ্যে যে আত্মার আধিপত্য, সেটাকেও অনন্তকালের জন্য আপনার নরকের কুণ্ডে অর্পণ করার অনুমতি দিন প্রভু’। চণ্ডের হাসিতে এবারে মনে হচ্ছিল মন্দিরের ছাদটা বোধহয় ভেঙেই পরবে, গমগমে স্বরটা বলল—’গ্রহণ করলাম আমি গ্রহণ করলাম’। দিবাকর আর থাকতে না পেরে লাফিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকল, রাইফেল তাগ করে হিংস্র স্বরে বলল—’অ্যাই হারামি এসব কি নাটক হচ্ছে রে এখানে? কার সঙ্গে তুই কিসের ডিল করছিস’? হেসে বললাম—’ডিল শেষ দিবাকর এবার কর্মফল ভোগ করার জন্য তৈরি হও’। দিবাকর রাইফেলের নল আমার কপালে ঠেকিয়ে ট্রিগার টিপে দিল কিন্তু অদ্ভুতভাবে তা থেকে গুলি বের হল না। একটা অদৃশ্য শক্তি তাকে তুলে শুন্যে ছুড়ে দিল, দেখে মনে হল মন্দিরের সিলিঙের সঙ্গে দিবাকরের পেল্লায় দেহটা কেউ যেন আঠা দিয়ে সেঁটে দিয়েছে, দিবাকরের কাতর আর্তচিৎকার মন্দিরের দেওয়ালে দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরত আসতে লাগল। কিছু মুহূর্তের ব্যবধানের পরে যখন দিবাকরের প্রাণহীন দেহটা মেঝেতে আছড়ে পড়ল, দেখে মনে হল অজস্র জোঁকে যেন ওর শরীরের শেষ রক্তবিন্দুটুকুও চুষে ফেলেছে। দিবাকরের ঠিকরে বেড়িয়ে আসা চোখ দুটোতে আতঙ্ক আর যন্ত্রণার যে ছাপ ফুটে উঠেছে তা ভাষায় বর্ণনা করা অসম্ভব। গমগমে স্বরটা বলল—’অন্তিম বিধি পালন করো জয়ন্ত’। মাথা নত করে বললাম—’আমি প্রস্তুত’।
—’সন্ধ্যা মল্লিকার বৃক্ষে আজকের তিথিতে কৃষ্ণবর্ণ ফুল ফোটে সেই ফুল আর তোমার শরীরের দু-ফোঁটা রক্ত দিয়ে চণ্ডের অর্ঘ প্রস্তুত কর’।
—’করছি দেবতা’। চণ্ডের নির্দেশে গর্ভগৃহ থেকে বেড়িয়ে এলাম, মন্দিরের চৌহদ্দির মধ্যে আগাছার জঙ্গলের মধ্যে প্রচুর কালো রঙের ফুল ফুটে আছে, এরকম ফুল আগে কখনো দেখিনি, এটাই বোধহয় চণ্ডের সন্ধ্যামল্লিকা! ফুলে হাত দিতেই তীক্ষ্ন খোঁচা লাগল, এ ফুলের পাপড়িগুলোতে কেমন যেন রোয়া ওঠা ধারালো লোম ভরতি, অনেকটা শুঁয়োপোকার গায়ের সুঙের মতো। সাবধানে ফুল তুলে জড়ো করতে লাগলাম, হঠাৎ একটা তীক্ষ্ন কণ্ঠের ডাক শুনে চেয়ে দেখলাম সামনে একটা গাঢ় ছায়াশরীর এসে উপস্থিত হয়েছে, এ সেই কালকে দেখা বাবুলালের প্রতিচ্ছায়া। বাবুলাল ভর্ৎসনার স্বরে বললেন—’এমন নির্লজ্জের মতো বশ্যতা স্বীকারই যদি করার ছিল তবে আমার বিশ্রামে ব্যাঘাত ঘটিয়েছ কেন’? ভয় আর সংকোচের অনুভূতিগুলো এতক্ষণে আমার ভিতর থেকে পুরোপুরি হটে গেছে টের পেলাম, বেপরোয়া উত্তর দিলাম—’এতক্ষণ কোথায় ছিলেন আপনি? চণ্ডের বিরুদ্ধে যাওয়ার ক্ষমতা আমার নেই, যা হওয়ার তা হবেই’। বাবুলাল বললেন—’এই ভয়ংকর ইষ্টবিরোধী যজ্ঞের হোতা হোয়ো না জয়ন্ত, যে লাঞ্ছনা আর দুঃখের চরম পর্ব আজ ভোগ করেছ তাতে তোমার সঞ্চিত কর্মরাশি ক্ষয় হয়েছে, কষ্টের আগুনে পুড়ে তোমার আত্মা শুদ্ধ, পবিত্র ভাব ধারণ করেছে, আত্মবলিদানের এটাই প্রকৃষ্ট সময়’। আকস্মিকভাবে চোখের সামনে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠল। যে ভেজা কাঠের স্তূপে আমি অনেক চেষ্টা করেও আগুন ধরাতে পারিনি সেটাই কোনও অদ্ভুত মন্ত্রবলে লেলিহান শিখার উৎগার করতে লাগল। বাবুলালের যন্ত্রণাকাতর স্বর ভেসে এল—’শীঘ্র কর জয়ন্ত, চণ্ডের শক্তি আমাকে গ্রাস করতে শুরু করেছে, এরপর আর কিছু করার থাকবে না’। মনের মধ্যে জমে থাকা হতাশার ভাব হঠাৎ কেটে গেল, যুদ্ধ তাহলে এখনও শেষ হয়নি। ঊর্ধ্বশ্বাস ছুট দিলাম আগুনের কুণ্ড লক্ষ করে, তারপর অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে ঝাঁপ দিলাম সেই জ্বলন্ত চিতার মধ্যে।
কি অসহ্য এই দহন যন্ত্রণা! সুতির কাপড়ে আগুন ধরতে দেরি হল না, আগুনের শিখা শরীরের চামড়া পুড়িয়ে, মাংসে ছড়িয়ে পরল, উন্মাদের মতো দু-হাত মেলে ছুটলাম চণ্ডের গর্ভগৃহের দিকে, গর্ভগৃহের ভিতর তখন ছোটখাটো একটা ঘুর্ণিঝড় বইছে, অমিত শক্তিধর দুটো অদৃশ্য শক্তি যেন মরণপণ সংগ্রামে লিপ্ত। আগুনের ছটায় চণ্ডের বীভৎস মূর্তিটা চোখে পড়ল। সর্বশক্তি দিয়ে ওটাতে লাথি মারতেই মাটির কাঠামো ভেঙে দু-টুকরো হয়ে পড়ল। বেদি লক্ষ করে ঝাঁপিয়ে, জ্বলন্ত হাতে চণ্ডের পাথর চেপে ধরলাম, মুহূর্তের মধ্যে ঝড় থেমে গেল আর গর্ভগৃহের অন্দর আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল, মন্দিরের দেওয়ালগুলো যেন কোনও ম্যাজিকের প্রভাবে দাউ দাউ করে জ্বলতে শুরু করল। চণ্ডের বিকৃত স্বর মন্দিরের দেওয়ালগুলোতে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এল—’বিশ্বাসহন্তা সহস্র বৎসরের প্রতীক্ষা ব্যর্থ করে দিলি, তবে নরকের ফুটন্ত কুণ্ডের কারাগারই হোক তোর নিয়তি’। হঠাৎ অনুভব করলাম আমি একটা কুপকুপে অন্ধকার সুড়ঙ্গের মধ্যে দিয়ে চলেছি, ঠিক যেন পায়ে হেঁটে নয় কেমন ভেসে ভেসে, একটা সাঁড়াশির মতো কঠিন হাত বজ্রমুষ্ঠিতে চেপে আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে আর আমি যেন মহাসমুদ্রের অতল গভীরে তলিয়ে যাচ্ছি, নীচে আরও নীচে। চিন্তাভাবনার শক্তি এখনো কিছুটা আছে, পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি, ভীষণ আতঙ্কে চিৎকার করে প্রার্থনা করলাম—’মা কালী আমাকে বাঁচা মা, এ বিপদ থেকে উদ্ধার কর, দয়া কর জগজ্জননী’। মা কালী কি শুনলেন! অকস্মাৎ স্নিগ্ধ শ্বেত বর্ণের আলোয় চতুর্দিক ছেয়ে গেল, যে বজ্রমুষ্ঠি এতক্ষণ আমাকে কয়েদ করে নিয়ে যাচ্ছিল সেটা শিথিল হতে শুরু করল। কি শুচিশুভ্র আর পবিত্র ওই আলোর বলয়! চুম্বকের টানের মতো আমি ধীরে ধীরে ওই উজ্জ্বল আলোক বৃত্তের মধ্যে ডুবে যেতে লাগলাম।
সিক্সটি পারসেন্ট বার্ন নিয়ে কটকের শ্রীরাম মেডিকেল কলেজের বেডে যখন নিজেকে আবিষ্কার করলাম তখন আমার থেকে বিস্মিত বোধহয় আর কেউ হয়নি। তিনমাসে এই নিয়ে দুবার সাক্ষাৎ মৃত্যুকে ফাঁকি দিলাম, প্রথমবার শয়তানের পরিকল্পনায় আর এবারে বোধহয় ঈশ্বরের কৃপায়! অবাক হওয়ার অবশ্য এখনো অনেকটাই বাকি ছিল, কুণাল যেভাবে আমার দেখাশোনা করছিল তাতে দারুণ লজ্জায় পড়ে গেলাম, ওর মুখে শুনলাম ওর ছেলে বাবু বিপদ কাটিয়ে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছে, একফাঁকে দু-দিনের জন্য সময় বের করে কুণাল চেন্নাইয়ে গিয়ে ওর ছেলেকে কলকাতার হাসপাতালে শিফট করে নিয়ে এল। রাজাসাহেবও নিয়মিত আসছেন, ওর মুখে শুনলাম চণ্ডের মন্দির আগুনের দাবানলে পুরোপুরি ভস্মীভূত হয়ে গেছে। রুদ্রপ্রসাদের মৃতদেহ কলকাতায় তার পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, সেখানেই তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। আরও জানলাম যে দুরারোগ্য সাদা জ্বরে অসংখ্য মানুষ ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছিল সেটা যেন জাদুমন্ত্রে উধাও হয়েছে, রোগিরা সবাই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে এসেছে। শেষের এই খবরে মনটা দারুণ ভালো হয়ে গেল। যেখানেই থাকুন রুদ্রপ্রসাদ জেনে খুশি হবেন তার নিঃস্বার্থ বলিদান বৃথা যায়নি। রাজাসাহেব আর কুণাল মিলে এবারে আমাকে কলকাতার হাসপাতালে স্থানান্তরিত করার ব্যবস্থা করল। কিছুদিনের মধ্যে আমার ঠাই হল কলকাতার একটি নামী হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে, এই হাসপাতালেরই অন্য ডিপার্টমেন্টে বাবুর চিকিৎসা চলছে। এরপর একটা মাস বিছানায় শুয়েই কেটে গেল, কুণাল আর আমার মধ্যে আর কোনও মনোমালিন্যের অবকাশ নেই, আমরা দুজনে মিলে বর্ধমানের রাজবাড়ি নিয়ে একটা পরিকল্পনা ছকেছি, দেখা যাক সেটা কদ্দুর সফল হয়! কয়েকদিনের আগে-পরে আমি আর বাবু দুজনেই হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলাম। ফের একবার আমি জীবনের মূলস্রোতে ফিরত এলাম।
৩২
২৬ জানুয়ারি ২০১৯
২০১৩ নভেম্বর থেকে ২০১৪ জানুয়ারির মাঝের সেই ঝোড়ো দিনগুলির পরে কেটে গেছে আরও পাঁচটা বছর। জীবনে কিছু স্মৃতি কখনো ভুলে যাওয়া সম্ভব হয় না, উচিতও নয়! আর এখানে আমি চাইলেও ভুলতে পারব না, কখনো-সখনো অন্যমনস্কভাবে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আগুনে পোড়া নিজের কুৎসিত মুখটা দেখে নিজেই আঁতকে উঠি। আগুনে গলা আর মুখের চামড়া বিশ্রীভাবে পুড়ে গেছে, ঘা শুকোলেও জীবনের মতো দাগ রেখে গেছে। রাজাসাহেব প্লাস্টিক সার্জারির কথা বলেছিলেন, কিন্তু আমার মন চায়নি অহেতুক দান গ্রহণ করতে, তার থেকে এই বেশ ভালো আছি।
আজ ছাব্বিশে জানুয়ারি, প্রতিবছরের মতো এবারেও আমি রেনি পার্কে এসেছি রুদ্রপ্রসাদের স্মৃতিতে শ্রদ্ধার্ঘ জানাতে, দেবপ্রসাদ আর অরিন্দম খুব ধরে বসল আজকের দিনটা ওদের সঙ্গে কাটিয়ে যেতে কিন্তু সেটা সম্ভব নয়, গেস্ট হাউসে আজ ভিড় উপছে পড়েছে, কুণাল একা সামলাতে পারবে না, ওদের বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বর্ধমানের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম, ও হ্যাঁ বলাই হয়নি, নৃপতিপুরের রাজবাড়িকে আমরা একটা গেস্ট হাউসে পরিণত করেছি। তা ছাড়া কুণাল তীক্ষ্ন ব্যবসাবুদ্ধির পরিচয় দিয়ে বাড়ির পিছনের জমিটায় চিংড়ি চাষের ব্যবস্থা করে ফেলেছে, অপ্রত্যাশিত- ভাবে আমাদের এই উদ্যোগগুলো লাভের মুখ দেখেছে। সারা বছরই ওখানে যাত্রীদের আনাগোনা লেগে থাকে আর শীতের মরশুমে তো কথাই নেই। মোটের উপর খরচখরচা বাদ দিয়েও যা বেঁচে থাকে তাতে আমাদের ভালোই চলে যাচ্ছে। প্রায় দু-বছর হল স্কুলের চাকরি আর কলকাতার পাট চুকিয়ে আমিও বর্ধমানেই পাকাপোক্ত আসন গেড়েছি। এর মধ্যে আমার আবার নতুন একটা বাতিক গজিয়েছে, লেখালেখি করা। দু-বছর আগে যখন খাতা-কলম নিয়ে যুদ্ধ শুরু করি তখন মুখে কিছু না বললেও কুণাল মুচকি হেসেছিল, আবার সেই বইয়েরই যখন বেশ একটা ভালোমতো কাঁটতি হল, কুণালই আমাকে নতুন কিছু লেখার জন্য উৎসাহিত করতে লাগল। এবারের লেখাটা তাই ওকেই প্রথম পড়তে দিয়েছি। দুপুর নাগাদ আমাদের বাড়ি কাম গেস্ট হাউসে পৌঁছে কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। রাতে খাবার টেবিলে দেখা হতে কুণাল বলল—’তোর লেখাটা পড়ে শেষ করলাম, কিন্তু পাঠকেরা কি এসব অলৌকিক ঘটনায় বিশ্বাস করবে’? বললাম—’বিশ্বাস না করলেও চলবে, গল্প হিসেবে পড়লেও তো ক্ষতি নেই’। মুরগির ঠ্যাং চিবুতে চিবুতে কুণাল বলল—’উপন্যাসটার নাম কি রাখবি ভাবছিস’? বেদনাদায়ক কিছু ঘটনাপ্রবাহ মনের কোণে উঁকি দিল, ফুটফুটে সুন্দর একটা শিশু, ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাসে যাকে গবাদি পশুর অধম জীবনযাপন করে অকালে ঝড়ে যেতে হল পৃথিবীর বুক থেকে শুধুমাত্র কয়েকজন নরপিশাচের বিকৃত স্বার্থপূরণের উদ্দেশ্যে, চরম সংকটের মুহূর্তে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও যার দিকে বিন্দুমাত্র সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারিনি, এই উপন্যাস হোক তার বিষণ্ণ স্মৃতির উদ্দেশ্যে আমার অনুতপ্ত হৃদয়ের আন্তরিক শ্রদ্ধাঞ্জলি।
একমুহূর্ত চুপ করে থেকে উত্তর দিলাম
—’চণ্ডরাজার বলি’।
***
