আট বছরের সিরিয়াল কিলার
আট বছরের সিরিয়াল কিলার
না, এটা গল্প নয়। সত্য ঘটনা। তবে কোনো কোনো ঘটনা গল্পকেও হার মানায়। সেই ঘটনা শুনলে বা পড়লে নিজের অজান্তেই শিরদাঁড়া দিয়ে হিমস্রোত নেমে যায়। এই ঘটনাই তেমনই।
বেশি দিন আগের কথা নয়। ২০০৭ সালের এক গ্রীষ্মের দুপুর। বিহারের ভগবানপুর থানার বাইরের দারোয়ান তার ছোট্ট টুলে বসে বসে ঝিমোচ্ছে। ঘুমের দাপটে তার মাথার টুপিটা মাঝে মাঝেই খুলে পড়ে যাচ্ছে মাটিতে, সে তৎক্ষণাৎ ঝুঁকে ধুলো-মাখা টুপিটা তুলে নিয়ে আবার মাথায় বসিয়ে ঘুমে ঢলে পড়ার তোড়জোড় করে ফেলছে।
অফিসার-ইন-চার্জ থেকে শুরু করে হাবিলদার সবাই প্রচণ্ড গরমে ঝিমিয়ে রয়েছে। এমনিতে এই এলাকা মোটামুটি শান্তিপ্রবণ, গ্রামের বুক চিরে চলে গিয়েছে সাতাত্তর নম্বর জাতীয় সড়ক, সেখানে টুকটাক চুরি-ছিনতাই, দুর্ঘটনা বা বেআইনিভাবে রাতের অন্ধকারে লরিতে মাটি পাচার ছাড়া বড়োসড়ো অপরাধ খুব একটা ঘটে না। থানার ও. সি. শত্রুঘ্ন কুমার মোটামুটি নিরুপদ্রবেই থাকেন।
থানার ল্যান্ডলাইনে ক্রি রি রিং শব্দে ফোনটা যখন এল, তখন হাবিলদার অবিনাশ নিজের সদ্য কেনা মোবাইল ফোন থেকে হবু স্ত্রী-র সঙ্গে প্রেমালাপ করছিল। অনেকদিন ধরে তার একের পর এক সম্বন্ধ আসছে, কিন্তু পণের দাবিদাওয়া না-মেলায় ভেঙেও যাচ্ছে। মাস দুয়েক হল এই মেয়েটির পরিবারের সঙ্গে পাকা কথা হয়েছে, মেয়ের বাপ তিন কিস্তিতে দহেজ মেটাবে, উপায়ান্তর না দেখে সেই অনুরোধ মেনেও নেওয়া হয়েছে। মেয়েটি খারাপ নয়, কলেজ অবধি লেখাপড়া করেছে, ঘরের কাজকর্মও জানে বেশ। আর দু-সপ্তাহ, তারপরই অবিনাশ নিজের গাঁও চলে যাবে বিয়ে করতে।
অবিনাশ কথা বলতে এত ব্যস্ত ছিল, প্রথমবার ধরার আগেই টেলিফোনটা নীরব হয়ে গেল। নিজের চেয়ারে এসে বসতে-না বসতে আবার বাজতে লাগল।
”একটু ধরো তো! জ্বালিয়ে খেল!” বিরক্ত মুখে অবিনাশ এবার দ্রুতপায়ে উঠে এসে ফোনটা ধরল, ”হ্যালো। ভগবানপুর পুলিশ স্টেশন।”
ওপারে চেঁচামেচি শোনা যাচ্ছে, কিন্তু বিশেষ কেউ কথা বলছে।
অবিনাশ আবার বলল, ”হ্যালো। কৌন বোল রহা হ্যায়?”
এবার চেঁচামেচি টপকে একটা উত্তেজিত করঠস্বর ভেসে এল, ”স্যার! হামলোগ হমলোগ মুসাহারি গাঁও সে হ্যায়।”
মুসাহারি ভগবানপুর থানার অন্তর্গত একটা গ্রাম। একেবারেই প্রত্যন্ত অজ পাড়াগাঁ, শদুয়েক লোকের বাস, শান্তশিষ্ট এলাকা বলেই পরিচিত। সেখানে এত চেঁচামেচি হচ্ছে কেন?
চিন্তিত অবিনাশ বলল, ”হাঁ বোলো। ক্যা হুয়া উধার?”
”স্যার! এখানে একটা খুন হয়েছে।”
”খুন!”
”হ্যাঁ স্যার। একটা ছ-মাসের বাচ্চা।”
অবিনাশ তড়িঘড়ি নিজের হবু স্ত্রী-কে বুঝিয়ে নিজের মোবাইল ফোনটা বন্ধ করল। ল্যান্ডলাইনের রিসিভারটাকে ভালো করে চেপে ধরে বলল, ”বাড়ির ঝামেলা নাকি? আসছি এখুনি!”
***
ও. সি. শত্রুঘ্ন কুমার যখন কনস্টেবল বিমল আর হাবিলদার অবিনাশকে নিয়ে মুসাহারি গ্রামে পৌঁছোলেন, তখন সেখানে থিকথিক করছে জটলা। এই গনগনে রোদেও লোকজন মাথায় গামছা চাপা দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সবার মুখ থমথমে। পুলিশি জিপ ধুলো উড়িয়ে ঢোকামাত্র গুঞ্জন বেড়ে গেল।
সবাই শশব্যস্তে জায়গা ছেড়ে দিল।
ও. সি. শত্রুঘ্ন কুমার অধৈর্যভাবে গাড়ি থেকে নামলেন। সারাটা রাস্তা তিনি হাবিলদার অবিনাশকে ধমক দিতে দিতে এসেছেন। ফোনে ভুলভাল শুনে ভুল রিপোর্ট দেওয়াটা অবিনাশের স্বভাব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই নিয়ে কতবার শোকজও খেয়েছে, তবু শিক্ষা হয়নি। মুসাহারি গ্রাম থেকে যখন ফোন গিয়েছিল, শত্রুঘ্ন কুমার নিজের কোয়ার্টারে লাঞ্চ সারতে গিয়েছিলেন। ফেরামাত্র অবিনাশ বড়োবড়ো চোখে বলল, মুসাহারি গ্রামে নাকি একজন সিরিয়াল কিলার ধরা পড়েছে। এই নিয়ে তৃতীয় খুন করেছে সে।
এই অবধিও মানা গিয়েছিল। তারপর যেটা বলল, তাতে থানাসুদ্ধু লোকের হেসে ওঠা ছাড়া উপায় নেই। সিরিয়াল কিলারের বয়স নাকি আট।
”কত?” শত্রুঘ্ন শুনে বিষম খেয়েছিলেন। কনস্টেবল বিমল হাসিতে ফেটে পড়েছিল, ”স্যার! বিয়ের আনন্দে অবিনাশ এখন দিনেদুপুরেও—বুঝলেন তো! হা হা!”
”আরে না। বাইরে খুব জোরে কীসের যেন আওয়াজ হচ্ছিল, তাই বোধহয়!” হাবিলদার অবিনাশও অপ্রস্তুতভাবে মাথা চুলকেছিল।
ও. সি. শত্রুঘ্ন কুমার, কনস্টেবল বিমল কিংবা হাবিলদার অবিনাশ কেউই তখন ভাবতে পারেন নি, কী অভিজ্ঞতার মুখোমুখি তারা হতে যাচ্ছে।
না, বিয়ের আনন্দে অবিনাশ মোটেই ভুল শোনেনি। বিহারের মুসাহারি গ্রামের ওই সিরিয়াল কিলারের বয়স সত্যিই আট বছর। সবেমাত্র কয়েকটি দুধে দাঁত পড়েছে, কয়েকটি নড়বড় করছে। পূর্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে কচিস্বরে সে হাসতে হাসতে বলছে, ”ইট দিয়ে বার বার মাথায় মেরেছি। ব্যাস! মরে গেছে।”
শিরদাঁড়া দিয়ে বরফকুচি নেমে যাচ্ছে তো? হ্যাঁ। অনিচ্ছাকৃত হত্যা নয়, ঠান্ডা মাথায় তিন তিনটে নৃশংস খুন। বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ খুনি সে। নাম অমরজিৎ সাদা।
***
অমরজিতের পরিবার ছিল ভয়ংকর গরিব। প্রথমে তারা থাকত বেগুসরাইতে। অমরজিতের বাবা সীতেশ কখনো অন্যের জমিতে খেটে, কখনো দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালাত। নির্দিষ্ট উপার্জন বলতে কিছুই নেই। বাড়িতে ভয়ংকর দারিদ্র্য। মা সাবিত্রী বাড়ির কাজের ফাঁকে ঠিকে ঝি-র কাজও করত। তা সত্ত্বেও ১৯৯৮ সালের এক সকালে অমরজিৎ যখন জন্মাল, তার বাবা-মা-র আনন্দের কোনো সীমা রইল না। দুজনের কেউই স্কুলমুখো হয়নি, ছেলের একখানা ভালো নাম রাখতে শরণাপন্ন হল স্থানীয় স্কুল মাস্টারের। স্কুল মাস্টার ভেবেচিন্তে নাম দিলেন ‘অমরজিৎ’।
”বহোত বঢ়িয়া সাব। কিন্তু এই নামটার মানে কী?” অমরজিতের বাবা জিজ্ঞেস করল।
অমর মানে যার মৃত্যু নেই। শেষ নেই। অমরজিৎ মানে অমরত্বকে যে জয় করে। তোমরা ওকে অমরদীপ নামেও ডাকতে পারো। অমরদীপ মানে যে আলো কোনদিনও নিভবে না।” মাস্টারমশাই ব্যাখ্যা করলেন, ”তোমাদের ছেলে এভাবেই সমাজে আলো ছড়িয়ে দিক। শিক্ষার আলো, মানবিকতার আলো।”
অমরজিতের বাবা-মা হাঁ করে শুনছিল। কিছুটা তাদের হৃদয়ঙ্গম হল, বাকিটা মাথার ওপর দিয়ে গেল। তবে এটুকু মর্মার্থ তারা উদ্ধার করতে পারল যে, বয়স্ক মাস্টারমশাই তাঁদের সদ্যোজাত শিশুপুত্রের শুভকামনা করছেন, আশীর্বাদ করছেন। হৃষ্টচিত্তে প্রণাম করে তারা বেরিয়ে এল।
ঈশ্বরের কী নিষ্ঠুর পরিহাস! ওই প্রবীণ শিক্ষক হোন বা অমরদীপের গরিব বাবা-মা-কেউ কি ভেবেছিল যে, এই ছেলে আলো ছড়াবে না, বরং জীবনের আলোটুকু শুষে নেবে অনেকগুলো মানুষের থেকে? তাও আবার সাত-আট বছর বয়সের মধ্যেই?
অমরজিৎ বড়ো হচ্ছিল। কিছুদিন পর বেগুসরাইতে কাজ পাওয়া বড়ো দুষ্কর হয়ে উঠল। ওদের দেশোয়ালি গাঁও বিহারের প্রত্যন্ত মুসাহারিতে। সেখান থেকে জ্যাঠা, কাকারা ডাকল।
”শহরে পড়ে থেকে কী হবে? গাঁও ফেরত চলে আয়। এখানে সবাই আছি। মিলেমিশে ঠিক কিছু না কিছু হয়ে যাবে।”
অমরজিতের বাবা-মা-র প্রস্তাবটা মনঃপূত হল। বেগুসরাইয়ের পাট চুকিয়ে তারা ফিরে এল স্বগ্রামে, মুসাহারিতে। শহরের ঘুপচি বস্তি থেকে গ্রামের খোলামেলা পরিবেশ। অমরদীপ বড়ো হতে লাগল। আর পাঁচটা শিশু যেমন হয়, অমরদীপ তার চেয়ে আলাদা ছিল না। পড়াশুনো, খেলাধুলো, হুটোপুটিতে কেটে যাচ্ছিল সময়। জ্ঞান হওয়া ইস্তক সে বুঝতে পারছিল, তার বাবা-মা গরিব। চাইলেই খেলনা বা খাবার জিনিস পাওয়া যায় না। সেইজন্য সে দুটো উপায় বের করেছিল। এক, প্রচণ্ড চিৎকার-চেঁচামেচি করত, কেঁদেকেটে একশা হত, তাতে বাবা মা একসময় বিরক্ত হয়ে, জমানো পুঁজি থেকে হলেও তাকে জিনিসটা কিনে দিত।
দু-নম্বর উপায়টা বেশ অন্যরকম। খেলনা পাওয়া যাচ্ছে না তো কী, হাতের কাছে যা আছে, সবকিছুই তো খেলনা। তোবড়ানো কড়াই, ভাঙা বালতি, জং-ধরা গাঁইতি, বাতিল প্লাস্টিক, ছেঁড়া ব্যাগ, হাতের কাছে যা পেত, অমরদীপ তা-ই নিয়েই খেলত। কল্পনা করে নিত, সেটাই খেলার জিনিস।
যত বড়ো হচ্ছিল, তত চুপচাপ হয়ে যাচ্ছিল অমরজিৎ। বন্ধুবান্ধব বেশি নেই, নিজের মনেই থাকত। ঘরে নুন আনতে পান্তা ফুরোয়, অমরজিতের বাবা-মা সীতেশ আর সাবিত্রী সে-সব নিয়েই ব্যস্ত।
২০০৬ সালে ঘটল প্রথম ঘটনাটা। অমরজিতের পিসি এসেছিল, দাদা-বউদিকে বলল, ”একটা ভালো কাজ পেয়েছি। পাটনা শহরে। সারাদিনের থাকা-খাওয়া। ভালো মাইনে দেবে। বছরে দু-বার বাড়ি আসা।”
”বাহ, সে তো ভালো কথা।” সীতেশ কাজ থেকে সবে ফিরেছিল। হাত-মুখ ধুতে ধুতে বোনের দিকে তাকাল, ”কিন্তু বিট্টু? ওকে নিয়ে কাজ করতে অসুবিধা হবে না?”
সীতেশের বোনের নাম লক্ষ্মী। স্বামী তাকে ছেড়ে চলে গেছে প্রায় মাসছয়েক হল। এমনিতে দুজনের মধ্যে অশান্তি মারধর গালিগালাজ লেগেই ছিল। ছেলে হওয়ার পর খরচ বাড়ছিল, সমানুপাতিক হারে বাড়ছিল লক্ষ্মীর স্বামীর নেশা আর দাম্পত্য কলহ। তবু স্বামী চলে যাওয়ার পর মাত্র আট মাসের শিশুপুত্র বিট্টুকে নিয়ে লক্ষ্মী ভয়ংকর বিপদে পড়েছে। তার স্বামী পাশের গ্রামের একটা ইটভাটায় কাজ করত। সেখানে গিয়ে বারকয়েক তদবির করেও লাভ হয়নি বিশেষ, তারা এখন কামিন অর্থাৎ মহিলা শ্রমিক নিচ্ছে না। লক্ষ্মীর গ্রামে সবাই প্রায় গরিব, সেখানে ঠিকে কাজেরও তেমন সুযোগ নেই। সীতেশ নিজেও বোনের জন্য দু-এক জায়গায় খোঁজ করেছে, কোনো লাভ হয়নি।
”ওকে নিয়ে যেতে পারব না রে দাদা!” শিশুপুত্রকে বুকে চেপে ধরে ঘুম পাড়াতে পাড়াতে ম্লান মুখে বলল লক্ষ্মী, ”ওরা বাচ্চা নিয়ে কাজ করতে দেবে না।”
”ও মা! তবে?” সাবিত্রী অবাক হয়ে বলল, ”এইটুকু দুধের ছেলেকে তুমি কোথায় রেখে যাবে?”
এবার লক্ষ্মীর চোখ ছলছল করে উঠল, ”তোমাদের কাছে, ভাবি। না বোলো না। আর কার কাছে রেখে যাব, বলো? কে আছে আমার আর?”
সাবিত্রী এবার বিব্রত চোখে স্বামীর দিকে তাকাল। সীতেশও স্ত্রীর সঙ্গে দৃষ্টিবিনিময় করল। সীতেশের কামধান্দার খবর একেবারেই ভালো নয়। ওদের নিজেদেরই একবেলা রান্না হচ্ছে। তার ওপর সাবিত্রী নিজেও কয়েক মাসের অন্তঃসত্ত্বা। একটা বাচ্চার দুধের খরচ কম নাকি?
লক্ষ্মী বুদ্ধিমতী, পলকের মধ্যে বুঝতে পারল। তার দাদা-বউদি মানুষ ভালো, কিন্তু আর্থিক অনটনে দুজনেই জেরবার। ও তড়িঘড়ি বলল, ”আমি টাকা পাঠাব, দাদা। প্রথম মাসের মাইনেটা পাওয়ার পর থেকেই বিট্টুর জন্য খরচ পাঠাব। ছ-টা মাসে একটু টাকা জমিয়ে নিয়ে তারপর ছেলেটাকে নিয়ে যাব। তোদের কাছে থাকলে বিট্টু মায়ের অভাব বুঝতে পারবে না রে। তাই…!”
এরপর আর কোনো কথা হয় না। যেদিন দুপুরের ট্রেনে পাটনা যাওয়ার কথা, সেদিন সকাল থেকে লক্ষ্মী ছেলেকে জড়িয়ে ধরে হাপুসনয়নে কাঁদছিল। আট মাসের অবোধ বিট্টু এখনও মায়ের কান্না বুঝতে শেখেনি, মায়ের চোখের জল যখন তার গালের ওপর টপটপ করে গড়িয়ে পড়ছিল, তখন সে একটু অবাক হচ্ছিল, পরক্ষণেই নিজের কচি কচি পা দুটো তুলে মায়ের গালের ওপর ঘষে দিয়ে বোধহয় মা-কে সান্ত্বনাই দিতে চাইছিল।
অজস্রবার চুমোয় চুমোয় ছেলেকে অস্থির করে দিয়ে চোখের জল মুছে লক্ষ্মী উঠে দাঁড়াল। নিজের চোখের কোণ থেকে কিছুটা কাজল নিয়ে লাগিয়ে দিল ছেলের কপালে। সাবিত্রীর হাত ধরে ভাঙা গলায় কিছু বলতে যাচ্ছিল, সাবিত্রী ওকে আশ্বস্ত করল, ”ভেবো না লক্ষ্মী। আমারও তো ছেলে আছে। ওকে আমি অমরজিতের মতো করেই রাখব। তুমি সাবধানে যাও।”
লক্ষ্মী চলে যাওয়ার পর কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল। একদিন সকালে সাবিত্রী বাজারে যাচ্ছিল। এই অবস্থায় এত হাঁটাচলা, ভারী কাজ করতে খুব অসুবিধা হয়। কিন্তু কী আর করা যাবে? শুয়ে-বসে থাকার ভাগ্য নিয়ে তো ও জন্মায়নি। সীতেশ ভোরবেলায় কাজে বেরিয়ে গিয়েছিল। বিট্টুকে বোতলে খানিকটা দুধ গুলে দিয়ে সাবিত্রী অমরজিৎকে ডাকল, ”আমি একটু দোকানে যাচ্ছি। ভাই খাচ্ছে, একটু পরেই ঘুমিয়ে পড়বে। ভাইকে দেখিস, বুঝলি? খাটের ধারে-টারে না চলে যায়!”
অমরজিৎ দরজার কাছে বসে একটা ভাঙা বোতল নিয়ে কী করছিল, মা চলে যেতে উঠে এসে ভাইয়ের পাশে বসল। এই কয়েকদিন সেভাবে সুযোগ হয়নি, ফাঁকা ঘরে অমরজিৎ ভালো করে দেখতে লাগল পিসতুতো ভাইকে।
কী অদ্ভুত! বাইরে জোরে হিন্দি গান বাজছে, রোদের তেজে চারদিক ঝলসে যাচ্ছে, আর একে দেখো! কেমন অবলীলায় চোখ বুজে দুধ খেয়ে যাচ্ছে।
মিনিটকয়েকের মধ্যে আট মাসের শিশুটির চোখ বুজে এল। বোতল ঢলে পড়ল একদিকে। সেখান থেকে কয়েক ফোঁটা দুধ পড়ে ভিজিয়ে দিল কাঁথাটা। বিট্টু শান্তিতে ঘুমোতে লাগল।
অমরজিতের সেদিকে ভ্রূক্ষেপ গেল না। সে গভীরভাবে নিরীক্ষণ করছিল শিশুটিকে। কী ছোটো একখানা মানুষ। হাতগুলো কী খুদে খুদে। কথাও বলতে পারে না বেচারা। সারাক্ষণ আ-উ আওয়াজ করে আর আঙুল চোষে। একে ধরে আচ্ছা করে পেটালেও কিছুই করতে পারবে না।
অমরজিৎ হাসতে হাসতে বিট্টুর হাতে জোরে একখানা চিমটি কাটল। শিশুটি ঘুমের মধ্যে আকস্মিক প্রচণ্ড ব্যথা পেয়ে চোখ বন্ধ করেই জোরে কেঁদে উঠল। অমরজিৎ এবার তার ছোটো ছোটো পা দুটো ধরে মুচড়োতে লাগল, চেপে ধরে উলটোদিকে টানতে লাগল।
বিট্টু প্রচণ্ড জোরে কাঁদছিল। তার চোখ দিয়ে জলের ধারা গড়িয়ে পড়ে ভিজিয়ে দিচ্ছিল বালিশ। কিন্তু অমরজিৎ থামছিল না। নিষ্পাপ শিশুটিকে যতভাবে পারা যায়, উত্ত্যক্ত করতে লাগল সে। কখনো পেটের মাঝখানটা খামচে ধরে টানতে লাগল, কখনো নাকের ফুটোর মধ্যে নিজের আঙুল কর্কশভাবে ঢুকিয়ে ঘোরাতে লাগল, কখনো বাচ্চাটার গালে ঠাস ঠাস করে নির্দয়ভাবে চড় মারছিল। প্রহারের নিষ্ঠুর শব্দ এবং অবোধ শিশুর তারস্বরে কান্না চাপা পড়ে যাচ্ছিল বাইরে সস্তার বক্সে চলা চটুল হিন্দির গানের নীচে।
বাচ্চাটা যত কাঁদছিল, অমরজিৎ তত হাসছিল। একঘেয়ে লয়ে কেঁদে-যাওয়া সেই আর্তনাদে কিছুটা বোধহয় উল্লসিতও হয়ে উঠছিল অমরজিৎ। বেশ নতুন ধরনের খেলা কিন্তু এটা!
প্রায় মিনিট পনেরো এভাবে চলার পর ও আস্তে আস্তে বাচ্চাটার গলায় হাত দিল। হাসিমুখে খুব ধীরে হাত বোলাতে লাগল সেখানে। এতক্ষণের অত্যাচার থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে শিশুটা থামল, কান্নার দমকে ফোঁপাতে ফোঁপাতে নিশ্বাস নিতে লাগল দ্রুত। কিন্তু বেশিক্ষণ পারল না। কারণ অমরজিতের সাত বছরের দুটো হাত ততক্ষণে সাঁড়াশির মতো চেপে বসেছে আট মাসের শিশুর গলার ভঙ্গুর কণ্ঠনালির ওপর।
বাচ্চাটার পা দুটো ছটফট করছিল, চোখ বড়ো বড়ো হয়ে আসছিল, অমরজিৎ হাসতে হাসতে হাতের জোর আরও বাড়িয়ে দিল। নিজের শরীরের সবটুকু দিয়ে ও চেপে বসল বাচ্চাটার গলায়।
কয়েক মুহূর্তমাত্র। বিট্টু ধীরে ধীরে স্থির হয়ে গেল।
অমরজিৎ হাতের চেটো দিয়ে কপালে জমে ওঠা বিন্দু বিন্দু ঘাম মুছল। ওর ঠোঁটের কোণে হাসিটা একইভাবে খেলা করছে। হাসতে হাসতে ও ভাবল, মেরে তো ফেলা গেল। এখন এটাকে ফেলা যায় কোথায়?
ভাবতে ভাবতে মরা শিশুটাকে কোলে নিয়ে অমরজিৎ বাড়ির পেছনদিকে বেরিয়ে এল। সেখানে সুবিস্তৃত শস্যখেত। একটা হাল আমলের হিন্দি গানের সুর গুনগুন করতে করতে ও বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে হাঁটতে লাগল।
যেন কিছুই হয়নি, সেভাবে ও হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিল, কোথায় পুঁতবে বাচ্চাটাকে? সামনে একটা আধলা ইট চোখে পড়ামাত্র ওর মাথায় আর-একটা মজার খেলা এল। মৃত শিশুটাকে মাটিতে শুইয়ে সেই ইটটা দিয়ে সজোরে সে আঘাত করল মাথায়। এমনিতেই আট মাসের নরম খুলি, অত জোরে ইটের আঘাতে মুহূর্তে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গেল মাথাটা। গরম রক্ত-মেশানো নরম ঘিলু ছিটকে বেরোল সেখান থেকে। কিছুটা রক্ত ছিটকে এসে লাগল অমরদীপের মুখে, জামায়।
ও অম্লানবদনে একটা কঞ্চি দিয়ে মাটি খুঁড়তে লাগল। ফুট দেড়েক খোঁড়ার পর ক্ষতবিক্ষত শিশুর দেহটা সেখানে ঢুকিয়ে দিয়ে মাটিচাপা দিয়ে দিল। তারপর ধীরেসুস্থে ফিরে এল বাড়িতে। স্নান করে ধোপদুরস্ত জামা পরল।
বাজারে টুকটাক কেনাকাটার পর সাবিত্রী গিয়েছিল রুটিনমাফিক গ্রামের মন্দিরে পুজো দিতে। প্রতিসপ্তাহেই যায়। তাই যখন ফিরল, তখন অনেকটা বেলা হয়ে আছে। অমরজিৎ তখন একখানা বাতিল হ্যালোজেন ল্যাম্প নিয়ে খেলছে।
সাবিত্রী শূন্য বিছানার দিকে তাকিয়ে অবাক হল। দুধ পড়ে অনেকটা জায়গা ভিজে গিয়েছে। অবাক চোখে ও বলল, ”বিট্টু কোথায় গেল?”
অমরজিৎ খেলা থামিয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে উজ্জ্বল হাসল।
সাবিত্রী কিছুই বুঝতে পারল না। মাঝেমধ্যে পাশের বাড়ির রিংকু এসে নিয়ে যায় বিট্টুকে। কিন্তু রিংকু এখন নেই, মামার বাড়ি গেছে। সীতেশও সকাল থেকে কাজে। তাহলে বিট্টু গেল কোথায়? ভূষণ নিয়ে গেল নাকি? তা হতে পারে। ভূষণের মা বাচ্চা ভালোবাসে খুব।
”কী রে, উত্তর দিচ্ছিস না যে?” সাবিত্রী পুজোর ডালা থেকে ফুল নিয়ে ছেলের মাথায় বুকে স্পর্শ করতে করতে বলল, ”কে নিয়ে গেল?”
”কেউ না।” অমরজিৎ মায়ের হাতে ধরা পুজোর ডালা থেকে হাত বাড়িয়ে প্রসাদ নিল। তারপর মিষ্টি খেতে খেতে হাসল, ”আমি ওকে মেরে ফেলেছি, মা!”
”কী?”
অমরজিৎ একরকমভাবে মিটিমিটি হাসতে লাগল।
একটু অধৈর্য হয়ে সাবিত্রী এবার চেঁচিয়ে উঠল, ”এই তেতেপুড়ে এসে ইয়ারকি ভালো লাগছে না, বাবু! বিট্টু কোথায় বল। তুই কি ওকে কোথাও লুকিয়ে রেখেছিস?”
এবার অমরজিৎ ওপর-নীচে ঘাড় নাড়ল।
লুকিয়ে রাখার কথা শুনে সাবিত্রী স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। মুখে গজগজ করতে লাগল, ”কোথায় লুকিয়েছিস? বেচারা কতক্ষণ কিছু খায়নি! সব সময় জানবি, ও মা-কে ছেড়ে আমার কাছে আছে, বাবু। মুখ ফুটে বলতে পারে না বটে, কিন্তু বাচ্চারা সব বোঝে। চল চল, স্নান করাতে হবে ওকে!”
অমরজিৎকে বাইরে যেতে দেখে সাবিত্রী পেছন পেছন বেরিয়ে এল, ”কার বাড়ি আবার রেখে এলি!”
অমরজিৎ হাসতে হাসতে খেতের মধ্যে গেল। কিছুক্ষণ আগে চাপা দিয়ে-যাওয়া গর্তটা কিছুটা খুঁড়ে মা-র দিকে তাকিয়ে হাসল, ”এই যে! এইখানে লুকিয়ে রেখেছি, মা!”
প্রচণ্ড রোদে চোখ ঝলসে যাচ্ছে, দাঁড়িয়ে থাকা দায়। তবু তারই মধ্যে সাবিত্রী কাঁপতে কাঁপতে বসে পড়ল।
অমরজিৎ যতটুকু খুঁড়েছে, তাতে বিট্টুর নিথর হয়ে-যাওয়া ছোট্ট হাতখানা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কয়েক মাস মাত্র পৃথিবীতে আসা দুর্বল শরীরটা পরিণত হয়েছে রক্তমাংসের তালে।
”ও মা গো!” সাবিত্রী ওখানেই জ্ঞান হারাল।
***
সেদিন সীতেশ ফিরল অনেক রাত করে। কাজে খুব খাটাখাটনি যাচ্ছে তার। অমরজিৎ ঘুমিয়ে পড়লেও সাবিত্রীর চোখে এক ফোঁটা ঘুম আসেনি। নিজের গর্ভজাত পুত্রের ঘুমন্ত শরীরের দিকে তাকিয়ে সে কখনো ভয়ে কেঁপেছে, কখনো কেঁদেছে, কখনো আতঙ্কে ছটফট করেছে। একে পোয়াতি, তার ওপর এই ভয়ংকর মানসিক চাপ, মনে হচ্ছিল যেকোনো মুহূর্তে ওর প্রাণটা চলে যাবে। এ কী করে ফেলল তার ছেলে! যত দারিদ্র্যই থাকুক-না কেন, সন্তানের প্রতি অযত্ন তো সে কখনো করেনি। কুশিক্ষাও দেয়নি। তবে কোথা থেকে এ কী হয়ে গেল!
সীতেশ এমনিতেই রগচটা লোক, বেশি মাথা খাটায় না। স্ত্রী-র মুখে সব শুনে সে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে গিয়ে অমরজিৎকে ঘুম থেকে তুলে বেধড়ক পেটাতে লাগল। প্রচণ্ড আঘাতেও অমরজিৎ চিৎকার করছিল না, ওর মুখে লেগে থাকা একচিলতে হাসিটা দেখে মা হয়েও সাবিত্রীর বুকের ভেতরটা হিম হয়ে যাচ্ছিল। মারতে মারতে হাঁপিয়ে যাওয়া স্বামীকে থামাতে থামাতে সে নিজেও অঝোরে কাঁদছিল।
যাকে শাসন করা হয়, তার যদি কোনো বিকার না থাকে, ভয়ংকর প্রহারেও তাপ-উত্তাপ না হয়, আত্মরক্ষার ন্যূনতম চেষ্টাটাও সে না করে, তবে কি আর মারধর করে সেই তৃপ্তিটা হয়? সীতেশেরও হল না। যত জোরে সে মারছিল, ততই কিশোর পুত্রের হাসি চওড়া হতে দেখে সে রাগতে রাগতে একসময় ক্লান্ত হয়ে মাটিতে বসে পড়ল। তার সারা শরীর ঘামে ভিজে উঠেছে। হাঁপাচ্ছে কুকুরের মতো।
সাবিত্রী গ্লাসে করে জল নিয়ে এল। ততক্ষণে অমরজিৎ যেন কিছুই হয়নি, এমনভাবে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়েছে। সীতেশ ঢকঢক করে অনেকটা জল খেয়ে বলল, ”কাউকে জানাওনি তো!”
”না!” সাবিত্রী ধরা গলায় বলল, ”আ-আচ্ছা, আমাদের বাড়িতে কি পুলিশ আসবে?”
”আমরা না জানালেই আসবে না।” খরচোখে তাকাল সিতেশ, ”কাউকে কিচ্ছু বোলো না। বাড়ির ব্যাপার, বাইরে যেন না যায়।”
”না না, আমি কাউকে বলব না!” সাবিত্রী ফিসফিস করল, ”কিন্তু… কিন্তু লক্ষ্মী এলে?”
সীতেশ একটু থমকে গেল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ”আমি সামলে নেব।”
কাকতালীয়ই বটে! লক্ষ্মীর আসার কথা ছিল ছ-মাস পরে, কিন্তু প্রথম মাসের মাইনে পেয়ে সে কিছুতেই ছেলেকে না দেখে থাকতে পারছিল না। মালিকের থেকে বলে কয়ে ছুটি নিয়ে সে ট্রেনে চাপল।
ওই ভয়ংকর ঘটনার ঠিক পনেরো দিনের মাথায় লক্ষ্মীকে ঢুকতে দেখে সাবিত্রীর বুকের ভেতরটা ধড়াস করে উঠল।
গ্রামে আসার আগে লক্ষ্মী মনের সুখে ছেলের জন্য এটা-সেটা কিনে এনেছে। ঝুমঝুমি, ছোটো খেলনা গাড়ি, গুঁড়ো দুধের কৌটো, আরও অনেক কিছু। এই একটা মাস যে তার কীভাবে কেটেছে, সে-ই জানে। স্বামীর নিয়মিত অত্যাচারের জন্য কোনোদিনই লক্ষ্মী তাকে ভালোবাসতে পারেনি। স্বামী ঘর ছেড়ে চলে যেতে সদ্যোজাত পুত্রকে নিয়ে অনিশ্চয়তার অকূল পাথারে পড়লেও মনের গভীর কোনো প্রকোষ্ঠে বোধহয় সে খুশিই হয়েছিল। নিত্যদিনের অশান্তি আর মারধরের হাত থেকে রেহাই পেয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখছিল ছেলেকে নিয়ে। এই এক মাস অনেক ভেবেছে সে। যত কষ্টই হোক, ছেলেকে ভালো স্কুলে পড়াবে ও। আরেকটু বড়ো হলে পাটনা নিয়ে চলে যাবে। কোনো কার্পণ্য করবে না।
ওকে দেখামাত্র সাবিত্রী যে ফ্যাকাশে হয়ে গেল, তা লক্ষ্মী খেয়াল করল না। উত্তেজিতভাবে ও ঘরে ঢুকল, কিন্তু বিছানায় ছেলেকে না দেখতে পেয়ে একটু বিস্মিত হল। কতদিন ছেলের গায়ের মিষ্টি গন্ধটা পায়নি, কাছে পেলেই নিজের বুকে চেপে ধরে থাকবে বেশ কিছুক্ষণ। ভাবতে ভাবতে সে বলল, ”ভাবি! আমার বিট্টু কোথায়?”
সাবিত্রীর চোখ-মুখ লাল হয়ে গেছে। মনে হচ্ছিল যেন মাথাটা ঘুরে যাবে, কোনোমতে খাটের বাজুটা চেপে ধরে নিজেকে সামলাল ও।
মায়ের মন, লক্ষ্মী যেন ভয়ংকর এক অশনিসংকেত পাচ্ছিল। ঘোলাটে চোখে চিৎকার করল ও, ”আমার বিট্টু কোথায়, ভাবি?”
কাটা কলা গাছের মতো কাঁপছিল সাবিত্রী, এমন সময় সীতেশ এসে সটান নিজের ছোটোবোনের পায়ে পড়ে গেল। ও নিজেও কাঁদছিল।
”আমি… আমি কিছুই বুঝতে পারছি না!” বিস্ফারিত চোখে বলল লক্ষ্মী, ”আমার ছেলেকে কী করেছ তোমরা?”
***
লক্ষ্মীকে সীতেশ কী বলে শান্ত করেছিল, কী উপায়ে মুখ বন্ধ করেছিল, তা আজও অজানা। তবে সন্তানের গুরু অপরাধ ধামাচাপা দিয়ে যে আগুন তারা নেভাতে চেয়েছিল, সেই আগুনের ভয়ংকর শিখা যে লকলকিয়ে উঠে একদিন তাদেরই পুড়িয়ে ছারখার করবে, সেটা তারা সম্ভবত তাদের দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারেনি।
আট মাস কেটে গেছে। সীতেশ ও সাবিত্রীর ফুটফুটে একখানা মেয়ে হয়েছে। তারা দুজনেই খুশি। আরও খুশি এই কারণে, অমরজিৎ বোনকে বড়ো ভালোবাসে। আর পাঁচটা দাদার মতো সে-ও বোনকে আগলে রাখে, তার সঙ্গে খেলে, হা হা করে হাসে। সেই হাসি দেখে সাবিত্রী আশ্বস্ত হয়, সারাদিনে অজস্রবার ঠাকুরকে ধন্যবাদ জানায়। নাহ, কোনো অপদেবতা নিশ্চয়ই ভর করেছিল সেদিন, ওর ছেলেটা আসলে অমন নয়! এই তো কেমন খেলছে দেখো বোনের সঙ্গে!
অমরজিৎ যেদিন নিজের মাস তিনেকের বোনকে খুন করল, সেদিন ছিল ছুটির দিনের দুপুরবেলা। শীতকাল। সারাসপ্তাহ হাড়ভাঙা খাটুনি যায়—, সীতেশ আর সাবিত্রী দুপুরবেলা ঘুমোচ্ছিল। পাশেই ঘুমোচ্ছিল তিন মাসের শিশুটি। অত ছোটো বয়সে তো মাতৃগর্ভের স্মৃতি পুরোপুরি মোছে না, দিনরাত্রির পার্থক্য করতে না পারায় ঘন ঘন ঘুম আসে, ঘুম যায়। সাবিত্রী ওকে ঘুম পাড়িয়েই নিজে শুয়েছিল, কিন্তু কিছুক্ষণ পরই তার ঘুম ভেঙে গেছে।
মেয়েটা ভারী লক্ষ্মী, ঘুম ভাঙলেও সে কান্নাকাটি করে না কখনো। নিজের মনে ছোটো ছোটো হাত-পা ছুঁড়ে ছুঁড়ে খেলে, কখনো নিজের মনেই হাসে। বাবা-মা ঘুমিয়ে পড়ার পর অমরদীপ চুপিসারে এসে বোনের পাশে বসল।
বোনকে তার ভালোই লাগে। কেমন নিজে নিজে হাসছে দেখো! মা বলে, এতটুকুন বয়সে বাচ্চারা নাকি ভগবানের সঙ্গে কথা বলে, তাই আপনমনেই হাসে। অমরদীপ বোনের মুখের কাছাকাছি গিয়ে হাসল।
বাড়িতে তিনটিমাত্র প্রাণী, বাচ্চাটা এর মধ্যেই তাদের মুখ বেশ চিনে গিয়েছে। চেনা মুখ এগিয়ে আসতে দেখে তার বড়ো বড়ো কালো চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। নিজের মতো করে সে চেনা মানুষটির প্রতি অকাতরে ভালোবাসা প্রকাশ করতে লাগল।
অমরজিৎ বোনের দিকে তাকিয়ে আন্তরিক হাসল। নরম গাল দুটো টিপে দিল। তারপর দু-হাত চেপে ধরল গলায়। প্রাণপণ চাপ দিতে লাগল। মিনিটখানেকের মধ্যে তিন মাসের শিশুটির শরীর নিস্পন্দ হয়ে গেল।
সাবিত্রী আর সীতেশ যখন ঘুম থেকে উঠল, তখন তাদের মেয়ের দেহ বরফের মত ঠান্ডা হয়ে গেছে।
দুজনেই থরথর করে কাঁপছে। সাবিত্রী কাঁপা-কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, ”তুই… তুই কী করেছিস? বোনকে তুই মেরে ফেললি?”
অমরদীপ চওড়া হাসল। গর্বের সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল, ”হ্যাঁ মা!”
”কেন? কেন খুন করলি তুই ওকে?” পাগলের মতো আর্তনাদ করল সীতেশ।
অমরজিৎ সরলভাবে কাঁধ নাচাল। বলল, ”এমনিই!”
ক্রোধে-দুঃখে-শোকে উন্মাদ হয়ে সীতেশ লোহার একখানা গাঁইতি নিয়ে তেড়ে গেল ছেলের দিকে, ”রাক্ষস! তুই একখানা রাক্ষস! আজ তোকে আমি মেরেই ফেলব।”
সাবিত্রী থরথর করে কাঁপছিল, তবু স্বামীকে আটকাতে গেল। চণ্ডাল রাগ সীতেশের, গাঁইতির আঘাতে আজ হয়তো শেষ করে দেবে ছেলেটাকে।
গাঁইতিটা জোর করে কেড়ে নিতে সীতেশ পাগলের মতো এলোপাথাড়ি মারতে লাগল ছেলেকে, ”তুই মানুষ নোস। তুই একটা অভিশাপ। তুই একটা পিশাচ!”
অমরজিৎ আগের বারের মতোই নীরবে হাসিমুখে প্রহার সহ্য করতে লাগল।
আর কয়েক মাস পর যখন অমরজিৎকে পুলিশি হেপাজতে নেওয়া হবে, যখন তার কথা শুনে গোটা দেশ বিস্ময়ে আতঙ্কে মূক হয়ে যাবে, তখন প্রখ্যাত সাইকোঅ্যানালিস্ট শামশাদ হুসেইন তার ওপর নানারকম মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা করে জানাবেন যে, অমরজিৎ হল স্যাডিস্ট। অর্থাৎ অন্যের ওপর অত্যাচার করে সে আনন্দ পায়।
পাপ-পুণ্য, উচিত অনুচিত, কিংবা ভালোমন্দের বোধই তার নেই।
প্রচণ্ড চিৎকারে আশপাশের বাড়ি থেকে প্রতিবেশীরা ছুটে এসেছে। মৃত শিশু, অমরজিৎকে মারধর, সীতেশ আর সাবিত্রীর উন্মাদের মতো আচরণে তারা বুঝে গেল কী হয়েছে। কিছু মাস আগে লক্ষ্মীর ছেলেকে হঠাৎ করেই দেখতে না পেয়ে তাদের মনে এমনিই একটা বড়ো খটকা বাসা বেঁধেছিল। আজ তাই দুয়ে দুয়ে চার করতে তাদের খুব একটা বেশি সময় লাগল না। সীতেশ সাবিত্রীর ছোট্ট ঘরে ভিড় ক্রমে বাড়তে লাগল।
মুরুব্বি গোছের এক প্রতিবেশী বৃদ্ধ বলল, ”সীতেশ, যত কষ্টই হোক, তুমি পুলিশে জানাও। এত বড়ো কাণ্ড চেপে যাওয়া ঠিক না।”
সীতেশ ততক্ষণে মারধরে ক্ষান্ত দিয়ে মাটিতে বসে পড়েছে। নিজের মনেই হাউহাউ করে কাঁদছে, চুল ছিঁড়ছে। ওদিকে অমরদীপ বেমালুম ঘরের অন্য কোণে বসে একটা তালা-চাবি নিয়ে খেলতে শুরু করেছে।
প্রকাশ বলে এক অল্পবয়সি ছেলে হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল, সীতেশ তাকে আটকাল। ওর গলা ভেঙে গেছে। লাল চোখে বলল, ”এটা বাড়ির ভেতরের ব্যাপার। থানায় জানিয়ে কোনো লাভ নেই প্রকাশ। ছেড়ে দে!”
দু দু-বার ছাড়া পেয়ে গেল অমরজিৎ। বাঘ রক্তের স্বাদ পেয়ে গেলে যেমন হয়, ওরও তা-ই হয়েছিল। তিন নম্বর খুনটা করতে তাই ও বেশি দেরি করল না।
মুসাহারি গ্রামের চুনচুন দেবী নামের অল্পবয়সি মেয়েটি সেদিন ছ-মাসের মেয়েকে কোলে নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। অনেক কাজ হাতে। বাজারে যেতে হবে, মেয়ের দুধ নিতে হবে, ফিরে এসে রেশন দোকানে লম্বা লাইন দিয়ে চাল, ডাল, তেল নিতে হবে। এত ঝক্কিঝামেলার মধ্যে বাচ্চা কোলে ঘোরা খুব মুশকিলের। গ্রামেরই প্রাইমারি স্কুলে ও মাঝে মাঝেই মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে যায়। ওর মেয়ে বড়ো শান্ত, নাম দিয়েছে খুশবু। ওদের নিজেদের ঘরে এখন বিদ্যুৎ আসেনি, স্কুলে ফ্যানের হাওয়ায় খুশবু আরামে ঘুমোয়। দিদিমণিরা ক্লাস নিতে নিতে এসে হলঘরে উঁকি মেরে দেখে যায়।
সেদিন স্কুলে পরীক্ষা চলছিল। গার্ড দিতে গিয়ে আর নানা কাজের ফাঁকে হলঘরে অনেকক্ষণ কেউ আসেনি। চুনচুন দেবী হাত ভর্তি জিনিস নিয়ে ফিরে এসে মেয়েকে দেখতে পেল না। সিলিং ফ্যান চলছে ঘটাং ঘটাং, মেয়ের বিছানা, বোতল যেমন তেমনই পড়ে রয়েছে, শুধু মেয়ে নেই।
চুনচুন দেবীর চিৎকারে ছুটে এল স্কুলের লোকজন, তারপর পাড়ার কয়েকজন। এবার আর কেউ দেরি করল না, সোজা চলে গেল সীতেশের বাড়ি। অমরদীপের মুখোমুখি হয়ে তারা জিজ্ঞেস করল, ”খুশবু বলে বাচ্চাটা কোথায়? তুই ওকে মেরে ফেলেছিস?”
অমরদীপ উজ্জ্বল মুখে হাসল। যেন খুব গর্বের কাজ, এভাবে বলল, ”হ্যাঁ গো। প্রথমে কিছুতেই মরছিল না। তারপর একটা ইট দিয়ে বার বার মাথায় মারলাম, তখন মরল। এই তো এদিকে এসো তোমরা। দেখাচ্ছি!”
সবুজ খেতের মধ্যে সদ্য খোঁড়া গর্তে নিষ্প্রাণ ক্ষতবিক্ষত খুশবুকে দেখে এবার আর গ্রামের লোকেরা দেরি করল না। সীতেশ আর সাবিত্রী সবার পায়ে পড়ছিল, ওদের সেই আবেদনে কর্ণপাত না করে খবর দিল ভগবানপুর থানায়।
ভারতবর্ষ তো বটেই, বিশ্বইতিহাসে অমরজিৎ সাদা এক এবং একমাত্র। মাত্র আট বছর বয়সের মধ্যে তিনখানা খুন করেছিল সে। তাও প্রতিটাই হাসতে হাসতে ও ভয় বা অনুতাপ ছাড়া। ভগবানপুর থানার ও. সি. শত্রুঘ্ন কুমার হোক বা অন্যরা, যে যতবার জেরা করেছে, অমরজিৎ হাসিমুখে উত্তর দিয়েছে। পরিষ্কার জানিয়েছে, কীভাবে খুনগুলো করেছে সে। খুশবু তো বটেই, আগের দুটো খুনের অকুস্থলও পুলিশদের নিয়ে গিয়ে দেখিয়েছে সে। থানায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে চলেছে জেরা, অবিনাশ, বিমল বা শত্রুঘ্ন সবাই একমত, হাসতে হাসতে সব বলেছে সে, অবলীলায় পুলিশের কাছে বিস্কুট চেয়ে খেয়েছে।
তাকে নিয়ে গোটা দেশে আলোড়ন পড়ে গিয়েছিল। ত্রাস ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা দেশে। সাইকোলজির অধ্যাপক থেকে মনোরোগের ডাক্তার, সবাই ওর সঙ্গে কথা বলে একটা বিষয়ে একমত হয়েছিলেন। অমরজিতের মধ্যে ভালো খারাপ, ঠিক-ভুলের কোনো বোধ নেই। ২০০৭ সালের জুন মাসে দিল্লির এইমস হাসপাতালের সাইকোথেরাপস্ট নন্দ কুমার সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, অমরজিতের মস্তিষ্কের কোনো একটা রাসায়নিক বৈষম্যের জন্য তার এসবে কোনো ভ্রূক্ষেপ বা তাপ উত্তাপ নেই। সে ভয়ংকর।
সাধারণত নাবালক অপরাধীদের নাম প্রকাশ্যে আনা হয় না। কিন্তু জনস্বার্থের কথা বলে পাবলিক করে দেওয়া হয়েছিল অমরদীপ সাদার নাম। ভারতীয় দণ্ডবিধি অনুযায়ী যত জঘন্য অপরাধই করে থাকুক না কেন, তিন বছরের বেশি নাবালকদের জেলে রাখা যায় না। অমরজিতের আঠেরো বছর বয়সের পর তাকে জুভেনাইল হোম থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। তারপর সে কোথায়, কী করছে। তা আজও রহস্যাবৃত। কেউ বলে, সে নিজের নাম পালটে ‘সমরজিৎ’ করেছে, কেউ বলে, সে এখন থাকে বিহারের মুঙ্গেরে।
মনোবিদরা জানিয়েছিলেন, অমরজিতের এই স্বভাবগত অপ্রকৃতিস্থতা জন্মগত, তা পালটাবার নয়।
১৯৯৮ সালে জন্ম হলে অমরজিতের বয়স এখন পঁচিশ। এবং একজন স্বাধীন যুবকের মতোই সে এখন আমাদের দেশের যত্রতত্র ঘুরে বেড়াচ্ছে।
লেখাটা লিখতে লিখতে হাতটা কেমন কেঁপে উঠল। আমার বা আপনার পাড়ায় সে লুকিয়ে নেই তো! গ্রামের শিক্ষক তার দ্বিতীয় নাম দিয়েছিলেন অমরদীপ। এই দীপ যে উজ্জ্বল নয়, নিকষকালো অন্ধকারে ঢাকা!
জানি না সে আজ কোথায়, তবে যুবক অমরজিতের রক্ত-মাখা হাতছানি থেকে আমাদের দেশের প্রতিটি শিশু নিরাপদ থাকুক। এটুকুই প্রাথনা।
