Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026

    হেরুক – সৌমিত্র বিশ্বাস

    March 24, 2026

    বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)

    March 24, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    জুল ভের্ন অমনিবাস ২ (অনুবাদ : মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়)

    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় এক পাতা গল্প759 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    ৪. পা বাড়ালেই রাস্তা

    ১৬. পা বাড়ালেই রাস্তা

    উভয়সংকট আর কাকে বলে! কিন-ফোর অবস্থা বরং আগের চেয়েও এখন আরো বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। ওয়াং-এর সাহসে যে শেষ অব্দি কুলিয়ে ওঠেনি, তা ঠিক; তার কাছ থেকে এখন আর কোনো আশঙ্কাই নেই। কিন্তু যে-নামজাদা তাই-পিংটির কাঁধে সে দায়িত্বটা দিয়ে গেছে, বুকে ছুরি বসাতে তার কি হাত কাঁপবে একবারও? শুধু তা-ই নয়, তার হাতে আবার এমন একটা দলিল রয়েছে, তাতে সে যে শাস্তির হাত থেকে বেঁচে যাবে, তা-ই নয়, সঙ্গে-সঙ্গে বিনিময়ে আবার পঞ্চাশ হাজার ডলারও পাবে। এমনিতেই তাই-পিংদের বুকে দয়া-মায়া নেই, তার উপরে আবার এই দলিল!

    কী করবে ভেবে না-পেয়ে মাটিতে পা ঠুকলো কিন-ফো, বিড়বিড় করে বললো, না, যথেষ্ট হয়েছে আর নয়! ব্যাপারটার এক ফয়সালা করতেই হবে যে-কোনোভাবে! কী পরামর্শ দেয় জানবার জন্য ক্রেগ আর ফ্রাইয়ের হাতে ওয়াং-এর চিঠিটা তুলে দিলে কিন-ফো। তারা প্রথমেই জানতে চাইলো যে ওয়াংকে সে-চিরকুটটা লিখে দিয়েছিলো, তাতে ২৫ তারিখকেই চুক্তির শর্ত পূরণ করার শেষ তারিখ হিশেবে উল্লেখ করা ছিলো কি না।

    না। তারিখের জায়গাটা ফাঁকা রেখে ওয়াংকে চিরকুটটা লিখে দিয়েছিলুম পরে যাতে ইচ্ছেমতো একটা তারিখ সে বসিয়ে দিতে পারে। পাজির পাঝাড়া ওই লাও-শেন তো যখন খুশি তখন ছুরি বসাতে পারে–সময় নিয়ে কোনো বাধ্যবাধকতা তার নেই।

    কিন্তু আপনার বিমার মেয়াদ তো, ক্রেগ আর ফ্রাই বললো, তিরিশেই ফুরিয়ে যাচ্ছে। লাও-শেন নিশ্চয়ই এটুকু বোঝে যে তার এক ঘণ্টা পরেও ছুরি চালালে তার কোনো লাভ হবে না। না, যা করবার তা সে হয় তিরিশের আগেই করে ফেলবে, নয়তো আপনার বেণীর ডগাটিও ছোঁবে না।

    এ-কথার উত্তরে খুব-একটা বাগবৈদগ্ধ্য দেখানো যায় না। অস্বস্তি বোধ করে কিন-ফো ঘরের মধ্যে পায়চারি শুরু করে দিলো। লাও-শেন লোকটাকে আমাদের খুঁজে বার করতেই হবে। যেখানেই থাক না কেন, তাকে আমাদের চাইই। ওয়াংকে যে-অভয়পত্র লিখে দিয়েছিলুম, সেটাকে ফেরৎ পেতেই হবে–যা হয় হবে, যত দাম লাগে দেবো, তবু চিরকুটটা ফেরৎ চাই–তার জন্যে যদি পঞ্চাশ হাজার ডলারও দিতে হয়, তাতেও আমি পেছপা হবো না।

    অবিশ্যি যদি তাতেও পান, তাহলেই, ক্রেগ সায় দিলে।

    যদি পাই–পেতেই হবে আমাকে–পাবোই!

    কিন্তু কিন-ফো ক্রমশ উত্তেজিত হয়ে উঠতে লাগলো। আপনারা কি ভেবেছেন আমি কেবলই মুখ বুজে কেবল একের পর এক হতাশা সহ্য করে যাবো? আরো দ্রুত পায়ে সে খানিকটা পায়চারি করে নিলো। কয়েক মিনিট পরে বললো, আবার বেরিয়ে পড়ছি আমি!

    আমরাও আছি সঙ্গে, ক্রেগ আর ফ্রাই জানালো তাকে।

    আমি আবার বেরুচ্ছি। আপনারা যা ইচ্ছে তাই করতে পারেন–কিন্তু আমি আর এক মুহূর্তও দেরি করবো না।

    আমরাও যে সঙ্গে যাবো, তা তো বলাই বাহুল্য, এক নিশ্বাসে বললো ক্রেগ আর ফ্রাই।

    সে আপনাদের অভিরুচি, কিন-ফো আবারও বললো।

    আপনাকে একা বেরুতে দিলে আমাদের গাফিলতি হবে–কম্পানি তো আমাদের সেই জন্যে নিয়োগ করেনি।

    বেশ, কিন-ফো বললো, তাহলে আর একটুও সময় নষ্ট করা চলবে না।

    লাও-শেনকে খুঁজে বার করাটা খুব কঠিন কাজ হবে না বোধহয়। পাজির হদ্দ লোটা, কুকর্মের জন্য দেশজোড়া তার নাম; ফলে দু-তিন জায়গায় খোঁজখবর নেবার পরেই জানা গেলো যে তাই-পিং বিদ্রোহে তার সক্রিয় ভূমিকা ছিলো বলে বিদ্রোহ নির্মূল হবার পর উত্তরে গিয়ে পে-চি-লি উপসাগরের শাখা লিয়াও-তং উপসাগরের ধারে বিখ্যাত চিনের প্রাচীরের কাছে সে আস্তানা গেড়েছে। বিদ্রোহের অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে সরকার যে-ভাবে আপোস করেছিলেন বা শাস্তি দিয়েছিলেন, তার সঙ্গে তেমন কিছুই করেননি–চোখ বুজে উচ্চবাচ্য–করে তাকে একেবারে চিন সীমান্তের বহির্দেশে যেতে দিয়েছেন–আর সেখানে লাও-শেন পরমানন্দে দস্যুবৃত্তি অবলম্বন করে কাল কাটাচ্ছে। ওয়াং তার উপর যে-কাজের ভার দিয়েছে, সে-কাজ হাশিল করার সে-যে যোগ্যতম ব্যক্তি তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

    আরো ভালো করে সন্ধান নেবার পর জানা গেলো সম্প্রতি নাকি লিআও তং উপসাগরের একটা ছোটো বন্দর ফু-নিনের আশপাশে দেখা গেছে। লাও-শেনকে : শুনে কিন-ফো অবিলম্বে সেখানেই যাবে বলে মনস্থির করে নিলো। লোকটার পুরো হদিশ না-পাক, কয়েকটা সূত্র পেতে পারে তো নিদেন।

    প্রথমে অবশ্য লা-ওর কাছে গিয়ে এই নতুন জটিলতার কথাটা জানিয়ে । আসা উচিত। শুনে লা-ও যেভাবে ভেঙে পড়লো, তা দেখলে কষ্ট হয়। অশ্রুঝরা চোখে তার দিকে তাকিয়ে ধরা গলায় সে মিনতি করে বলল, কিন-ফো যেন কিছুতেই ওই ভাড়াটে খুনীটার ধারে-কাছেও ঘেঁষে না–বরং চিন ছেড়েই চলে যাক অন্যকোথাও। পাগল নাকি! লাও-শেনের কাছে। যাবে? বরং পৃথিবীর দূরতম প্রান্তে গিয়ে আশ্রয় নেওয়া উচিত!

    কিন-ফো যথাসাধ্য সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করলো। বুঝিয়ে বললো যে পৃথিবীর কোনো কোনায় গিয়েও সে কোনো শান্তি পাবে না–যখনই মনে পড়বে যে তার জীবন এক অর্থপিশাচ নরাধমের দয়ার উপর নির্ভর করে আছে, তখনই জীবন তার কাছে দুর্বহ হয়ে উঠবে। বরং লোকটাকে খুঁজে বার করতেই হবে, যেমন করে তোক–টাকা চায় সে? বেশ, টাকাই দেবে সে তাকে–তবু সেই সর্বনেশে কাগজটা তাকে উদ্ধার করতেই হবে যেমন করে হোক–আর তার দৃঢ় বিশ্বাস যে এ-কাজে সে সফল হবে। তারপরেই চটপট ফিরে আসবে সে পেইচিং–রাজসভায় অশৌচ কাটার আগেই সে ফিরে আসবে–কোনো ভয় নেই। আমাদের বিয়েটা কিছুদিন স্থগিত থেকে একদিক থেকে ভালোই হলো কিন্তু, সব শেষে সে বললো, একটা পলকা সুতোয় আমার প্রাণ ঝুলছে–যে-কোনো মুহূর্তে ছিঁড়ে যেতে পারে–আর এই অবস্থায় তুমি আমার স্ত্রী হলে কী ভীষণ হতো ভেবে দ্যাখো তো!

    না, না, ধরা গলায় বলে উঠলো লা-ও, ও-কথা বোলো না। বরং তোমার স্ত্রী হলেই তোমার সঙ্গে যে-কোনোখানে যাবার দাবি করতে পারতুম আমি–প্রত্যেকটি ভয়ংকর মুহূর্তে তোমার পাশে-পাশে থাকতে পারতুম তাহলে!

    উঁহু, বরং এটাই ভালো হয়েছে, বললো কিন-ফো, হাজার বার বিপদে পড়তে হয়, তাও সই! হাজারবার মরেতে হয়, তাও-ভালো–তবু তোমাকে এমন ঝামেলায় যেন কখনো না ফেলি।

    শুনে লা-ও আরো দুঃখ পেলো। তার ওই অঝোর কান্না দেখে কিন-ফোর চোখেও জল এসে গেলো। কোনোমতে আমি তাহলে…বলে তার আলিঙ্গন থেকে নিজেকে ছিনিয়ে নিয়ে বেরিয়ে গেলো।

    সেদিন সকালবেলাতেই কিন-ফোরা সদলবলে তং-চু ফিরে গেলো। এত করে বিশ্রাম চাচ্ছে সুন, কিন্তু বারে-বারেই তাকে আবার রাস্তায় বেরিয়ে পড়তে হচ্ছে–দুঃখে তার মনে হলো পৃথিবীতে তার মতো পোড়াকপাল বুঝি আর কারু নেই। কিন্তু কী আর করা যাবে?

    কিংকর্তব্য, প্রথমেই সেটা ঠিক করে নেয়া উচিত। ডাঙা দিয়ে যাবে, না জলপথে? ডাঙা দিয়ে যাওয়া মানে এমন অঞ্চল দিয়ে যাওয়া যেখানে মৃত্যুর আশঙ্কা পদে-পদে। তবু চিনের প্রাচীর পেরিয়ে আরো-দূরে যাবার সম্ভাবনা না-থাকলে সেই ঝুঁকিও তারা হয়তো নিতো, কিন্তু ফু-নিন বন্দরটা আরো পুবে অবস্থিত–কোনো জলপোতের ব্যবস্থা করতে পারলে অনেকটা সময় বাঁচানো যায় : তাহলে দু-তিন দিনেই পৌঁছানো যাবে সেখানে। খোঁজ খবর নিতে লাগলো কিন-ফো : কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা গেলো এই মুহূর্তেই নাকি পাই-হো নদীর মোহনায় ফু-নিন গামী একটি জাহাজ নোঙর করে আছে–যদি এক্ষুনি একটা শাম্পানে করে রওনা হতে পারে, তাহলে অনায়াসেই জাহাজটাকে ধরা যেতে পারে। হ্যাঁ, জায়গা আছে–বিফল হয়ে ফিরে আসতে হবে না।

    ক্রেগ আর ফ্রাই মাত্র একটি ঘন্টা সময় চাইলো : বেশ অনিচ্ছাসত্ত্বেও কিন-ফো শেষ পর্যন্ত তাদের এক ঘণ্টার জন্য ছুটি দিলে : জাহাজডুবি হলে প্রাণ বাঁচাবার জন্য নানারকম পোশাক-আশাক নিয়ে এলো তারা : আগেকার দিনের লাইফবেল্ট তো কিনলোই, সেই সঙ্গে সামান্যতম ঝুঁকি না-নিয়ে কিনলো কাপ্তেন বোয়াতোর নবাবিষ্কৃত ভাসা-পোশাক।

    চটপট তৈরি হয়ে নিয়ে ২৬শে অপরাহেই তারা পাই-হো নদীর ছোট্ট ফেরি-স্টিমার পেই-তাং-এ গিয়ে উঠলো.। নদী এমন এঁকেবেঁকে গেছে যে তংচু থেকে মোহানা অব্দি সোজাসুজি গেলে যতটুকু পথ পেরুতে হতো, তার প্রায় দ্বিগুন পথ পেরোতে হয় স্টিমারকে। নদীর পাড়গুলো মনুষ্যনির্মিত খালের জলও বেশ গভীর–সেইজন্যই বেশ ভারি-ভারি স্টিমারও যেতে পারে। তাই নদীর অন্য শাখার–প্রায় সমান্তরালভাবে দ্বিতীয় শাখাটা চলে গেছে–চেয়ে এখানে জলযানের ভিড় স্বভাবতই অনেক বেশি।

    ছোট্ট দ্রুত স্টিমারটি বয়াগুলোর মধ্য দিয়ে ভেসে চলে এলো, তার ঘূর্ণমান চাকার হলদে জল ছিটকে যাচ্ছে, মাঠের মধ্যে সেচের জন্য যে-সব খাল গেছে তাদের জল ফুলে-ফুলে উঠেছে। শহরতলির উঁচু প্যাগোডাটি পেরিয়ে এলো স্টিমার চট করে, তারপর নদী হঠাৎ তীক্ষ্ণ বাঁক নিয়েছে বলে চুড়োটি হারিয়ে গেলো দৃষ্টি থেকে। জোয়ার এলে কী হবে, তেমন প্রশস্ত নয় : কোথাও তীরে বালির চড়া কোথাও-বা ঝোঁপঝাড়; আর তারই ধার ঘেঁষে গড়ে উঠেছে মাতাও, হে-সি-ভো, নন-ৎসাই আর ইয়াংসুন গ্রাম–তারই মধ্যে সবুজ বনের ফাঁকে-ফাঁকে গড়ে উঠেছে সুন্দর কতগুলো ছোটো পল্লি।

    অল্প পরেই তিয়েন-সিনকে দেখা গেলো কাছে। স্টিমার যাবে বলে পুবদিকের ঝোলানো সাঁকোটা তুলে দিতে কিঞ্চিৎ দেরি হলো, তার উপরে বন্দরে নানা মাপের নানা ধরনের জাহাজের ভিড় বলে তার মধ্যে দিয়ে পাশ কাটিয়ে যেতে বেশ বেগ পেতে হলো স্টিমারকে। নোঙর-করা ছোটো-ছোটো জাঙ্ক বা শাম্পানগুলোর মধ্য দিয়েই স্টিমার চালিয়ে যেতে বিন্দুমাত্র ইতস্তত করলেন না কাপ্তেন–নোঙর ছিঁড়ে শাম্পানগুলি ভেসে গেলো। যদি বন্দরপাল বলে কেউ থাকতেন, তাহলে এই বিশৃঙ্খলাকে আরো বাড়িয়ে তুলেছেন বলে হয়তো টেরটা পাইয়ে দিতেন।

    ক্রেগ আর ফ্রাই কিন্তু স্থির করছিলো যে কিন-ফোর পাশ থেকে কখনো একচুলও নড়বে না। অবস্থা পরিবর্তনের ফলে দায়িত্বটা আরো বেড়ে গেছে বলেই তারা বোধ করেছিলো। ওয়াংকে তবু চোখে দেখলে চিনতে পারতো–তাকে দেখতে পেলেই আরো সাবধান হতে পারতো। কিন্তু এই লাও-শেন–এই নৃশংস ও ভয়ংকর তাই-পিংটিকে কস্মিনকালে চোখেও দ্যাখেনি তারা–জাহাজের যাত্রীদের মধ্যে যে-কেউ সে হতে পারে–যে-কোনো মুহূর্তে ছুরি সে বসাতে পারে। যথেষ্ট সাবধান আছে তো তারা? চোখ-কান খোলা আছে তো ঠিকমতো? আক্ষরিকভাবেই আহারনিদ্রা ত্যাগ করে বসলো তারা। খাবার জন্যেও সময় দেবার জো নেই তো ঘুমুবার সময় পাবে কোত্থেকে?

    সুন তো প্রথম থেকেই চঞ্চল ও ব্যাকুল হয়ে আছে; তার অস্থিরতার কারণ কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন; সমুদ্রযাত্রার কথা ভেবেই তার হাত-পা-ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। নদীর জল শান্ত ও নিস্তরঙ্গ হলে কী হবে, সমুদ্র যতই এগিয়ে এলো, ততই তার মুখ-চোখ শুকিয়ে আমশি হয়ে গেলো।

    সমুদ্র তাহলে যাওনি কোনো দিন? ক্রেগ জিগেশ করলো তাকে।

    জীবনে না–, সুন জানালে।

    ফ্রাই বললো, তোমাকে দেখে তো মনে হচ্ছে না সমুদ্র তোমার ভালো লাগবে।

    মোটেই ভাল্লাগে না।

    মাথা ঠিক রেখো কিন্তু, ক্রেগ বললো।

    আর মুখ বন্ধ রেখো সবসময়, ফ্রাই উপদেশ দান শেষ করলো।

    বেচারা সুনকে দেখে বোঝা গেলো যে মুখ বন্ধ রাখতে তার কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু ক্রমশ বিস্তীর্ণ-হয়ে-আসা জলের দিকে এমন করুণ চোখে তাকিয়ে রইলো যাতে অবশ্যম্ভাবী ও আসন্ন সমুদ্রপীড়ার যাবতীয় শঙ্কা ও ভয় জেগে উঠলো। কোনো কথা না-বলে সে একেবারে স্টিমারের ঠিক মাঝখানটিতে গিয়ে বসলো।

    এরই মধ্যে নদীতীরের দৃশ্য ঈষৎ বদলে গেছে। বামতীরের চেয়ে ডানতীর বেশ খানিকটা উঁচু-বামতীর শুধু নিচু নয়, জলোচ্ছ্বাসে জীর্ণ ও ভাঙা-চোরা। দূরে বিস্তীর্ণ প্রান্তর জুড়ে গম, যব, জনারের খেত–কোটি-কোটি অধিবাসীকে খেতে দিতে হয়ে বলে চিন যে একটুকরো জমিও অনাবাদী ফেলে রাখতে পারে না, খেতগুলো যেন এ-কথাই বোঝাতে চাচ্ছে পথিকদের। সর্বত্র জমির মধ্যে খাল কেটে-কেটে সেচের জল নিয়ে যাওয়া হয়েছে; বাঁশবেতের তৈরি কলকৌশল দিয়ে জল তুলে তুলে সবদিকে ছড়িয়ে দেবার ব্যবস্থা দেখা গেলো। ইতস্তত ছড়িয়ে আছে হলদে মাটি দিয়ে তৈরি ছোটো ঘর-বাড়ি-বাড়ির সামনে আপেল বাগান-ন্যান্ডির বিখ্যাত আপেলের চেয়ে এ-আপেল কোনোদিক দিয়ে খাটো নয়। তীরে কোথাও-কোথাও দেখা গেলো একদল লোক পোষা করমোরান্ট পাখি দিয়ে মাছ ধরছে; সমুদ্রের পাখি করমোরান্ট প্রভুর ইঙ্গিতে ছোঁ মেরে জলে পড়ে ডুব দেয়, যখন উঠে আসে জল থেকে ঠোঁটের ফাঁকে জ্যান্ত মাছ ছটফট করে–পাখিদের গলায় এমন-এক ধরনের আংটা পরানো তাতে বেচারারা অতিভোজী হলেও মৎস্যশাবকটিকে নিজেরা গিলে ফেলতে পারে না। স্টিমারের শব্দ আর ধোঁয়া দেখে লম্বা নুয়েপড়া ঘাসের ডগা থেকে ভয় পেয়ে উড়ে-উড়ে পালিয়ে যাচ্ছে ছোট্ট পাখিরা : ঘুঘু, হাঁড়িচাচা, লড়য়ে চড়ুই, কাক।

    কিন্তু নদীতীর আশ্চর্য শান্ত আর নিরালা হলে কী হবে, নদীতে শশব্যস্ত শাম্পান, তঙ্কাদিরি, স্টিমারের অভাব নেই। যত ধরনের জলপোত সম্ভব, সব দেখা যাবে এই নদীতে। অবতল ছাত দিয়ে কামান-বন্দুক আড়াল করে রাখা লডুয়ে-জাঙ্ক, তাদের কোনো-কোনোটার জন্য আবার দুইসারি বৈঠা রয়েছে কোনোটার আবার রয়েছে হাতে-ঠেলা চাকা; আছে শুল্ক বিভাগের দ্বিমাস্তুল জাঙ্ক–গলুইয়ে সব ভয়ংকর কাল্পনিক জানোয়ারের মুণ্ড-আঁকা, আর পিছন দিকটা সেই জানোয়ারেরই ল্যাজের মতো; আর আছে ব্যবসায়ীদের পেল্লায় জাঙ্ক-দেশের দামি-দামি মালপত্র-সমেত এই জাঙ্কগুলোই প্রতিবেশী সমুদ্রের ভীষণ টাইফুনের সঙ্গে পাল্লা দেয়; যাত্রীবাহী জাঙ্কগুলো উজানে গেলে গুন টেনে যায়, আর ভাটির টানে যখন তরতর করে এগোয় তখন বৈঠা চালায় মাল্লারা–একমাত্র তাদেরই ভাড়া সবচেয়ে কম; আর আছে মান্দারিনদের প্রমোদতরী–মস্ত সব বজরা–পিছনে ল্যাংবোটের মতো ডিঙিনৌকা বাঁধা। উপরন্তু কত ধরনের যে শাম্পান রয়েছে, তার ইয়ত্তা কে দেবে। পাল তুলে যাচ্ছে শাম্পানগুলোে-আর সত্যি, তিনটে তক্তা দিয়েই তৈরি হয় শাম্পান, নাম থেকে যা বোঝা যায়। এমনকী পিঠে বাচ্চা বেঁধে মেয়েরা সুষ্ঠু ছোটো শাম্পানগুলো চালায়। মাঝে-মাঝে চোখে পড়ে পেল্লায় কাঠের ভেলা মাঞ্চুরিয়ার কাঠুরেদের সম্পত্তি ভেলাগুলো আসলে ছোটোখাটো ভাসন্ত গ্রাম যেন–উপরে কেবল কুটিরই তৈরি করা হয় না, এমনকী মস্ত সব মাটির জালায় শাকশজি ফলানো হয়।

    তীরে কিন্তু গ্রামের সংখ্যা বেশি নয়। তিয়েনৎসিন থেকে তাকু অব্দি নদীতীরে মাত্র কুড়িটা পাড়া-গাঁ আছে কি না সন্দেহ। মাঝে-মাঝে আগুন ধরানো ইটের পাঁজা চোখে পড়ে–তার ধোঁয়া আর পেই-তাং এর চোঙ দিয়ে বেরুনো জোলো হাওয়া কখনো চারপাশে ঝাঁপশা করে দেয় ধোঁয়াশায়; সন্ধেবেলায় মাঝে-মাঝে চোখে পড়ে শাদা-শাদা লম্বাটে মূর্তি : খুব সুন্দর করে সাজানো এই শ্বেত প্রতিভাস সন্ধ্যালোকে যেন জ্বলজ্বল করে : আশপাশের খনির লবণের স্তূপ নাকি এগুলো। এই ফাঁকা ও বিমর্ষ জেলার মধ্য দিয়ে পেই-হো বয়ে যাচ্ছে–যার আশপাশে কেবল ধূ-ধূ করে বালি আর নুন, ধুলো আর ছাই–অন্তত মঁসিয় দ্য বোভোআ-র বর্ণনায় তা-ই পাওয়া যাবে।

    সূর্যোদয়ের আগেই তাকু পৌঁছুলো ছোটো স্টিমারটি। উত্তর-দক্ষিণে কেবল দুর্গপ্রাচীরের ভগ্নস্তূপ পড়ে আছে : ১৮৬০ সালের ২৪শে আগস্ট যখন জেনারেল কোলিনোর নেতৃত্বে যুদ্ধজাহাজ নিয়ে ইংরেজ আর ফরাশি বাহিনী নদীর মোহানা দিয়ে ঢুকে পড়ে, তখন প্রতিরোধ করতে গিয়ে কামানের মুখে দুর্গপ্রাচীর উড়ে গিয়েছিলো। ছোট্ট সরু একটুকরো জমি পড়ে আছে ফাঁকা–তার মালিক নাকি ফরাশিরা–এখনো সেখানে রাশি-রাশি স্মৃতিস্তম্ভ দেখা যাবে–সেই যুদ্ধে যাদের মৃত্যু হয়েছিলো তাদের সম্মানে এই স্মৃতিফলকগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

    নদীর মুখটাতেই মস্ত এক বালির চড়া। সেইজন্য বাধ্য হয়ে পেইতাং তার যাত্রীদের তাকুতে নামিয়ে দিলে। ছোটো হলেও তাকু বেশ নামজাদা শহর–মান্দারিনরা যদি রেললাইন বসাতে দেন তাহলে তার গুরুত্ব আরো বেড়ে যাবে, উন্নতিও হবে হু-হু করে।

    ফু-নিন-এর জাহাজটা সেদিনই ছেড়ে যাবে বলে নষ্ট করার মতো সময় ছিলো না মোটেই। জাহাজটার নাম স্যাম-ইয়েপ; তীরে খামকা সময় নষ্ট করে কী হবে ভেবে একটা শাম্পান ভাড়া করে কিন-ফো তক্ষুণি স্যাম-ইয়েপে গিয়ে ওঠবার বন্দোবস্ত করলে।

    .

    ১৭. জাঙ্কের নাম স্যাম-ইয়েপ

    সপ্তাহখানেক আগে একটি চিনা-ক্যালিফরনিয়ান কম্পানির ভাড়াকরা মার্কিন জাহাজ তাকু বন্দরে নোঙর ফেলেছিলো। সান ফ্রান্সিসকোর লরেল হিল সমাধিস্থলে তিং-তং কম্পানির হেড আপিশ; আমেরিকায় যে-সব চৈনিক মারা যায় তাদের মৃতদেহ চিনমুলুকে ফিরিয়ে আনাই ছিলো এই কম্পানির কাজ–আর ব্যাবসাটা যে-বেশ কেঁপে উঠছিলো তার কারণ ছিলো এই যে চিনেরা শাস্ত্রের অনুশাসন মেনে স্বদেশের মাটিতেই শেষ আশ্রয় চাইত। জাহাজটা ভাড়া করেছিলো এই তিং-তং কম্পানিই। গন্তব্যস্থল : কোয়াংতুং : ২৫০টা কফিন ছিলো জাহাজে–কিন-ফোরা যে-জাহাজে আশ্রয় নিলে মার্কিন জাহাজটা থেকে ৭৫টা কফিন খালাশ করে সেটায় তোলা হয়েছে–এই কফিনগুলো আরো উত্তুরে প্রদেশে যাবে। সত্যি-যে, এই আবহাওয়ায় ও এই সময়ে কোনো বছরই উত্তরে যেতে দু-দিনের বেশি লাগে না জলপথে–আর এই মুহূর্তে লিয়াও-তং-এর উদ্দেশে অন্যকোনো জাহাজেরও যাবার কথা নেই–এই দুই কারণেই এই জাহাজটিতে কফিনগুলো ভোলা হয়েছে, না-হলে। কখনো ঠিক এ-ধরনের জাহাজ কম্পানি বাছতো না।

    স্যাম-ইয়েপ আসলে একটি সিন্ধুগামী জাঙ্ক –মাত্র তিনশো টন ওজন হবে সর্বসমেত। কোনো-কোনো হাজার-টনি জাঙ্ক মাত্র ছ-ফিট জল টানে বলে নদীর চড়ার উপর দিয়েও চলে যেতে পারে। দৈর্ঘ্যের তুলনায় প্রস্থ বেশি হয় জাঙ্কের, তলার কাঠের ফ্রেমের তুলনায় উপরের কড়ি আর নোঙরের উঁটি হয় এক-চতুর্থাংশ। হাওয়া না-থাকলে খুব-একটা তাড়াতাড়ি চলতে পারে না। কোনো জাঙ্ক, কিন্তু লাট্রর মতো নিজেদের কীলকের উপর ঘুরতে পারে সে–এই একটা সুবিধা তার আছে। হালগুলি মস্ত হয়, আর ছোটো-ছোটো ছাদা থাকে তাতে–চিনদেশে এই প্রথার খুব চল আছে, কিন্তু তার ফলে মাল্লাদের কোনো সুবিধে হয় কি না, এ-সম্বন্ধে মতভেদ আছে। তা যা-ই হোক না কেন, এটা বলতেই হয় যে এই জাঙ্কগুলোই সাহসে ভর করে জলঝড়ের মধ্যে দিয়ে নদীর মোহনায় বা সমুদ্রের মধ্যে চলাফেরা করে–আর এ-রকম একটি তথ্যও পাওয়া গেছে যে কোয়াংতুঙের একটি মার্কিন প্রতিষ্ঠান একটি জাঙ্ক ভাড়া করেই সান ফ্রান্সিসকোয় চা আর চিনেমাটি পাঠিয়েছিলো : তারা যে বার-দরিয়াতেও হিমশিম খায় না, এটা তারই এক নজির। তাছাড়া চিনেরা যে মাল্লা হিশেবে ভালো হয় এ-কথাও যোগ্য ব্যক্তিরা বলে থাকেন।

    স্যাম-ইয়েপ আসলে আধুনিক জাঙ্ক : জাহাজের খোল আর কাঠামোটা ইওরোপীয় কেতায় তৈরি। বাঁশ জুড়ে-জুড়ে খোলটা তৈরি তার, ভিতরে যাতে জল চুঁইয়ে না-ঢোকে সেইজন্য দুই বাঁশের মধ্যেকার ফাঁকা কাম্বোদগার দড়ি, গলন্ত আলকাত্রা, শন, আর রজন দিয়ে আঁটা–তার ফলে ভিতরে কিছুতেই জল ঢুকতে পারে না, জল সেঁচার জন্য কোনো পাম্প নেবার দরকার নেই বলেই বরং মনে করা হয়। সে ভেসে থাকে যেন হালকা কর্ক; কাঠের নোঙর হলেও বেশ মজবুত আর টেকসই; জাহাজের পাল আর দড়িদড়া তালপাতার তন্তু দিয়ে তৈরি বলে অত্যন্ত নমনীয়; মাস্তুল আছে দুটি;–অর্থাৎ সবদিক দিয়েই ছোটোখাটো সমুদ্রযাত্রার পক্ষে স্যাম-ইয়েপ খুব উপযোগী।

    বাইরে থেকে দেখে এটা বোঝবার উপায় নেই যে আপাতত স্যাম-ইয়েপ একটি বিপুল শবাধারে পরিণত হয়েছে : বাক্স-বাক্স চা, গাঁট রেশমি কাপড়, চৈনিক গন্ধদ্রব্যের প্যাকেটের বদলে এখন যে এই জাহাজ কতগুলি বিমর্ষ শবাধার বহন করে নিয়ে যাচ্ছে, বাইরে থেকে দেখে তা বোঝবার উপায় নেই। অন্য সময় যে-রকম জমকালো সাজ থাকে, তা যে এবার ত্যাগ করা হয়েছে, তা নয়; জাহাজের গলুয়ে আর পিছনে তেমনি ঝলমলে নিশেন আর ফিতে উড়ছে হাওয়ায়; গুলুয়ের গায়ে মস্ত একটা লাল চোখ আঁকা, যেন কোনো একচোখা সমুদ্রদানবের অপলক দৃষ্টি; মাস্তুলের ডগায় উড়ছে চৈনিক পতাকা; পাটাতনে দুটো কামানে রোদ পড়ে চকচক করছে। জাহাজকে দেখলেই মনে হয় যেন কোনো উৎসবে এক্ষুনি যোগ দিতে যাবে। যে-হতভাগ্যরা শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করবার সময় স্বদেশের পাঁচ হাত মাটিই কেবল চেয়েছিলো, তাদের মৃতদেহ বহন করে নেবার মতো বিষণ্ণ ও শোকাহত দায়িত্বই কি সে পালন করছে না? কিন-ফো আর সুনের কাছে কিন্তু এই শবাধার মোটেই মনখারাপকরা বিষয় বলে মনে হলো না। মার্কিন গোয়েন্দা দুটি অবশ্য অন্যকোনো জাহাজে উঠতে পেলেই খুশি হতো–কিন্তু কিন-ফোর গায়ে লেপ্টে-থাকা ছাড়া তাদের আর-কোনো কাজ নেই বলে তারাও স্যাম-ইয়েপে উঠতে বাধ্য হলো।

    কাপ্তেন, আর ছ-জন মাল্লা–জাঙ্ক চালাতে এই ক-জন লোকই মোটে লাগ শোনো যায়, চিনদেশেই নাকি নাবিকদের দির্শিকা আবিষ্কৃত হয়েছিলো; এ-কথা সত্যি কিনা কে জানে, তবে এটা ঠিক যে চিনে মাল্লারা কদাচ ওই দির্শিকা ব্যবহার করে না, আর স্যাম-ইয়েপের হর্তাকর্তা কাপ্তেন ইনও কোনোকালে ডাঙার হদিশ হারাবেন না বলে ওই সাধারণ নিয়মের কোনো ব্যতিক্রম ছিলেন না।

    কাপ্তেন ইন ছোট্ট হাশিখুশি বাঁচাল মানুষটি-হাসি লেগেই আছে মুখে–এক চিরন্তন আন্দোলনের জলজ্যান্ত উদাহরণ। এই মুহূর্তও সুস্থির থাকতে পারেন না তিনি, হাত-পা-চোখ সবই কেবল এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর তার মুখ যেমন দ্রুত চলে, তারাও তেমনি। সবসময়ে মাল্লাদের ধরে ধমকাচ্ছেন, এ-কাজে ও-কাজে পাঠাচ্ছেন; অথচ আসলে কিন্তু নাবিক হিসেবে তার জুড়ি সহজে পাওয়া যাবে না–সবসময় জাহাজ তার নিয়ন্ত্রণে থাকে, উপকূলের প্রত্যেকটা বালি তার নখদর্পণে, এখানকার জল তো তার প্রিয় বন্ধু। কিন-ফো যে-বিপুল অর্থ জাহাজভাড়া হিশেবে দিয়েছিলো, তা তার ফুর্তিকে একফোঁটাও কমাতে পারেনি-ষাট ঘণ্টার কোনো যাত্রায় দেড়শো তায়েল পাওয়া–এমন ভাবে নিত্য ছপ্পর ফেঁড়ে না।

    কিন-ফো তার দেহরক্ষীদের জায়গা হলো জাহাজের পিছন দিকে, আর সুন জায়গা পেলো গলুয়ের কাছে। জাহাজের কাপ্তেন আর মাল্লাদের অত্যন্ত তীক্ষ্ণ চোখে নিরীক্ষণ করে ক্রেগ আর ফ্রাই এই সিদ্ধান্তে এলো যে অন্তত এদের সন্দেহ করার কোনো কারণ নেই। লাও-সেনের সঙ্গে এদের দহরম-মহরম আছে বলে মনে হয় না, কারণ কিন-ফো নিতান্তই দৈবাৎ এসে উঠেছে এই জাঙ্কে। যে-কোনো সমুদ্রযাত্রাতেই কতগুলো বিপৎপাতের সম্ভাবনা থাকে–তা ছাড়া আর-কোনো বিশেষ বিপদের সম্ভাবনা আছে বলে তাদের মনে হলো না, ফলে কড়াকড়ি খানিকটা হ্রাস করায় তারা অসংগতি কিছু দেখলে না।

    আর তারা কড়াকড়ি খানিকটা কমানোতে কিন-ফো একলা হতে পেরে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। নিজের কামরায় গিয়ে সাত-পাঁচ ভাবতে লাগলো সে, তার নিজের মতে সবই অবশ্য দর্শন-চিন্তা। যখন কোনো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছিলো না, যখন ছিলো ইয়ামেনের বিলাসপ্রাচুর্যে, তখন সুখ কাকে বলে জানতো না। এখন যত ঝামেলা বাড়ছে, বিঘ্ন-বিপত্তিতে যত নাজেহাল হচ্ছে তত তার মন বদলে যাচ্ছে : এখন যদি একবার ওই মারাত্মক চিঠিটা হাতে পায়। তাহলে হয়তো অবশেষে জানতে পারবে সুখ কাকে বলে। ওই নিদারুণ চিরকুটটি যে সে ফিরে পাবেই এ-বিষয়ে তার কোনো সংশয়ই নেই। প্রশ্নটা কেবল টাকার : লাও-শেনকে পঞ্চাশ হাজার ডলার দিলেই কিন-ফোর জীবন-মরণ লাও-শেনের কাছে অর্থহীন ঠেকবে; বরং কিন-ফোকে হত্যা করলে লাও-শেনের ঝামেলা বাড়বে বৈ কমবে না–শাংহাই যেতে হবে তাকে তাহলে, সেন্টেনারিয়ানের আপিশে ধন্না দিতে হবে, আর সরকার এখন তার সম্বন্ধে তেমন কৌতূহলী না-হলেও কোনো প্রাক্তন বিদ্রোহীর পক্ষে তবু তাতে যথেষ্ট ঝুঁকি থেকে যাবে। সেদিক থেকে সে রেহাই পাবে যদি সে কিন-ফোকে চিরকুটটা বেচে দেয়। একমাত্র গণ্ডগোল হলো তাই-পিংটি যদি তাকে আচমকা আক্রমণ করে বসে–সে কোনোরকমে টের পাবার আগেই। লাও-শেনের গতিবিধি কিছুই তার জানা নেই, অথচ উলটো দিকে লাও-শেন হয়তো তার সব ক্রিয়া-কলাপের উপরেই কড়া নজর রেখেছে–সেদিক থেকে লাও-শেনের নিজের এলাকায় পা ফেলবামাত্র তার বিপদের আশঙ্কা আরো অনেক বেড়ে যাবে। তবু কিন-ফো যথেষ্ট আশা পোষণ করলো মনে-মনে–সব বিপত্তি চুকে গেলে কী করবে না-করবে তার একটা ঝলমলে খশড়া তৈরি করলো মনে-মনে, যার মধ্যে পেইচিঙের সেই তরুণী বিধবাটির ভূমিকা নেহাৎ নগণ্য হলো না।

    সুন কিন্তু তখন একেবারেই অন্য কথা ভাবছিলো। নিজের কুঠুরিটায় চিৎপাত হয়ে শুয়ে সে পে-চি-লি উপসাগরের জলদেবতাদের কাছে তার শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করলো। চিন্তাসূত্রকে বিন্যস্ত করে যে তার প্রভু কিংবা ওয়াং কিংবা দস্যু লাও-শেনকে অভিশাপ দেবে, সে-ক্ষমতাও তখন তার ছিলো না। আই-আই-ঈয়া! আহাম্মকের হদ্দ সে, নির্বোধ, মাথা-মোটা, এমনকী ধ্যানধারণাতেও উজবুম্মুখখার চুড়ান্ত! চায়ের পেয়ালা কিংবা ভাতের থালা ছাড়া আর-কিছুই ভাবার তার ক্ষমতা নেই! আই-আই-ঈয়া! সমুদুরে যেতে চায় এমন লোকের চাকরি নেয়ার চেয়ে আহাম্মকি আর কী-ইবা হতে পারে! আস্ত বেণীটাই মানৎ করলো সে-মস্তকমুণ্ডন করে শ্রমণ হয়ে যাবে সে, খুরে-খুরে দণ্ডবৎ, আর চাকরিবাকরি করে কাজ নেই–কেবল একবার এখন ডাঙায় পা দিতে পারলে হয়। হলদে কুত্তা-হা, হ্যাঁ, একটা হলদে কুত্তা এখন তার নাড়িভুড়ি ছিঁড়ে খাচ্ছে! আই-আই-ঈয়া!

    অনুকূল দক্ষিণে হাওয়ায় পূর্ব-পশ্চিমে ছড়িয়ে থাকা বালুতীর ধরে তিন-চার মাইল এগিয়ে গেলো স্যাম-ইয়েপ। পেরিয়ে গেলো পে-তাং-এর মোহানা যার কাছে একদা ইওরোপীয় সামরিক বাহিনী অবতরণ করেছিলো; যথা সময়ে পেরিয়ে এলো তাউ নদীর মোহানায় শাতুং, চিয়াং-হো আর হাই-ভে-সে। উপসাগরের এদিকটা একেবারেই পরিত্যক্ত; পাই-হোর কুড়ি মাইল এ-পাশে আর জাহাজ-টাহাজ খুব একটা আসে না–কেবল কয়েকটা সদাগরি জাঙ্ক মাঝে-মাঝে অল্প দুরে কোথাও যাবার জন্য পাড়ি দেয়। আর আসে গোটা বারো জেলে-ডিঙি, তাছাড়া তীরের কাছে জনমানবের সাড়া মেলে না–আর বার-দরিয়ার দিক তাকালে দেখা যায় অনন্ত দিগন্ত–কোথাও কোনো জাহাজের চিহ্নও নেই।

    ক্রেগ আর ফ্রাই যখন দেখলে যে পাঁচ-ছ টনি জেলেডিঙিগুলোতেও দু-একটা কামান রয়েছে, তখন কাপ্তেন ইনকে সবিস্ময়ে তার কারণ জিগেশ করলে। জলদস্যুদের হাত থেকে রেহাই পাবার জন্যই কামান থাকে নৌকোয়, এ-কথা শুনে ক্রেগ কি-রকম বিচলিত হয়ে উঠলো। জলদস্যু? পে-চি-লি উপসাগরে নিশ্চয়ই জলদস্যু উপদ্রব নেই?

    কেন? পে-চি-লি উপসাগরে চিনের অন্যান্য সমুদ্রের চেয়ে বোম্বেটেদের উপদ্রব কম হবে কেন? ধবধবে শাদা দু-পাটি দাঁত বের করে হেসে উলটে জিগেশ করলেন কাপ্তেন।

    আপনি দেখছি বোম্বেটেদের ভয়ে মোটেই কম্পিত নন? বললো ফ্রাই।

    কেন? হতভাগারা যাতে কাছে ভিড়তে না-পারে সেজন্য দুটো কামান নেই আমার? বললেন ইন।

    কামানগুলোয় গোলাভরা আছে তো? ক্রেগ জানতে চাইলো।

    সাধারণত থাকে–তবে এখন অবশ্যি নেই।

    এখন নেই কেন? ফ্রাই জিগেশ করলে।

    কারণ এখন জাহাজে কোনো গোলাবারুদ নেই, শান্তস্বরে বললেন কাপ্তেন।

    তাহলে আর ও-কামান কোন কাজে আসবে? ক্রেগ আর ফ্রাই একযোগে বিস্ময় প্রকাশ করলো।

    আবার হেসে ফেললেন কাপ্তেন। জাঙ্কে যদি আফিং কিংবা চা থাকতো; তাহলে না-হয় বোম্বেটেদের বাধা দেবার একটা মানে হতো; কিন্তু এখন যে-মাল নিয়ে যাচ্ছি, তাতে–কথাটা সম্পূর্ণ না-করেই তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে তিনি কঁধ ঝাঁকালেন। আপনারা দেখছি জলদস্যুর ভয়ে থরহরি কম্পমান, কাপ্তেন ইন বললেন, অথচ আপনাদের সঙ্গে কোনো দামি জিনিশই তো দেখছি না।

    ক্রেগ আর ফ্রাই জানালে যে বোম্বেটেদের হাতে আক্রান্ত না-হতে চাইবার একটা বিশেষ কারণ আছে তাদের। তারপর জানতে চাইলো কী মাল যাচ্ছে না-যাচ্ছে তা বোম্বেটেরা টের পায় কী করে। কাপ্তেন ইন হাত তুলে মাস্তুলের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন : অর্ধনমিত একটি শাদা নিশেন উড়ছে মাস্তুলে! বললেন, এর মানে কী, তা বোম্বেটেরা জানে। কফিন ভর্তি একটা জাহাজে খামকা চড়াও হয়ে কী লাভ?

    কিন্তু, ক্রেগ তবু যুক্তি উপস্থাপিত করলো।ববাম্বেটেরা তো এটা ভাবতে পারে যে ওই শাদা নিশেনটা কেবল একটা ধাপ্পা মাত্র–হয়তো নিজের চোখে দেখে নিশ্চিন্ত হবার জন্যই আক্রমণ করে বসলো–

    তাহলে করুক গে আক্ৰমণ, ইন তার কথা হেসেই উড়িয়ে দিলেন, যেমন খালি হাতে আসবে, তেমনি খালি হাতে ফিরে যাবে।

    ক্রেগ আর ফ্রাই আর-কোনো কথা বললো না বটে, কিন্তু কাপ্তেনের মতো অতটা নিশ্চিন্ত হতে পারলো না। একটা তিনশো টনি জাহাজে যদি কিছুই না-থাকে, তবু শুধু সেটাই বোম্বেটেদের কাছে এমন কী মন্দ ঠেকবে! কিন্তু এখন কেবল শান্ত হয়ে আসন্ন দুঃসময়ের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া কী-ই বা করার আছে তাদের। তেমন নিদারুণ কিছু ঘটবে না –এই আশাটাই কেবল করা যেতে পারে।

    কাপ্তেন অবিশ্যি যাত্রা যাতে নির্বিঘ্ন ও শুভ হয় তার জন্য কোনোদিকে কোনো ত্রুটি রাখেননি। জাহাজ ছাড়বার আগে সমুদ্রদেবতার নামে একটা মোরগ উৎসর্গ করেছেন, এখনো সামনের মাস্তুলটায় তার পালক ঝুলছে; মোরগটার রক্ত ছিটিয়ে দেয়া হয়েছে জাহাজটার পাটাতনে–সেই সঙ্গে এক পেয়ালা মদ উপুড় করে দেয়া হয়েছে খোলে–অর্থাৎ পুজোয় কোনো ত্রুটি রাখতে চাননি তিনি।

    কিন্তু মোরগটা যথেষ্ট হৃষ্টপুষ্ট ছিলো না বলেই হোক বা মদটা খুব ভালো জাতের ছিলো না বলেই হোক–জলের দেবতা কিন্তু পুজোয় মোটেই তুষ্ট হননি। সেই দিনই হঠাৎ আবহাওয়া স্বচ্ছ ও জ্যোতির্ময় হওয়া সত্ত্বেও দুম করে এলো বিষম ঘূর্ণিহাওয়া–চিন সমুদ্রে এই ঝড় এমন আচমকা আসে যে জগতের শ্রেষ্ঠ নাবিকেরও সাধ্য নেই তা আগে থেকে আন্দাজ করে।

    সন্ধ্যা আটটা নাগাদ স্যাম-ইয়েপ অন্তরীপ পেরিয়ে উত্তর-পুব উপকূল ধরে দ্বিগুণ বেগে চলে যেতে চেয়েছিলো; অন্তরীপ পেরুলে হয়তো অনুকূল হাওয়া পেতে জাহাজটি –আর কাপ্তেন ইনের আন্দাজ মতো চব্বিশ ঘণ্টার আগেই ফু-নিন পৌঁছে যেতে পারতো।

    পৌঁছোবার সময় যতই এগিয়ে এলো, ওই চিঠিটা হাতে-পাবার জন্য কিন-ফোর অস্থিরতা ততই বেড়ে যেতে লাগলো। আর সুন তো তীরে পৌঁছুতে চেয়ে একেবারে খেপেই গেলো। ক্রেগ আর ফ্রাই মনে-মনে হিশেব করে দেখলো আর তিন দিন হলেই সেন্টেনারিয়ানের এই মক্কেলের পাহারাদারির দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে। ৩০শে জুন মধ্যরাত্রে কিন-ফোর বিমার মেয়াদ উত্তীর্ণ হবে–আর কোনো কিস্তি না-দিলেই তখন সব উৎকণ্ঠার অবসান হয়ে যাবে।

    কিন্তু যেই স্যাম-ইয়েপ লিয়াং-তং উপসাগরের মুখে পৌঁছুলো, অমনি হঠাৎ উত্তর-পুবে দিক-বদলালো হাওয়া; একটু পরেই আবার দিক পালটে উত্তর থেকে এলো হাওয়া–দুঘণ্টা পরেই হাওয়া এলো আবার উত্তর-পশ্চিম থেকে। কাপ্তেন ইনের জাঙ্কে যদি কোনো তাপমান যন্ত্র থাকতো, তাহলে দেখা যেতে পারদ হঠাৎ অনেকটা নেমে গেছে আর বাতাসের এই আকস্মিক তনূভবন দেখে বোঝা যেতো যে টাইফুন আসন্ন, বায়ুমণ্ডল আলো করে যার আন্দোলন এখন শুরু হয়ে গেছে। প্যাডিংটন আর মোরির পর্যবেক্ষণের সঙ্গে যদি তাঁর পরিচয় থাকতো, তা হলে তিনি তক্ষুনি জাহাজের দিক-পরিবর্তন করে উত্তর-পুব দিকে গিয়ে সেই ঘূর্ণি হাওয়ার হাত এড়াবার চেষ্টা করতেন। কিন্তু তাপমান যন্ত্রের ব্যবহার তার জানা ছিলো না–সাইক্লোনের রীতি প্রকৃতিও তার অজ্ঞাত ছিলো। একটা মোরগ তো উৎসর্গ করেছেন–সব তাণ্ডবের হাত থেকে বাঁচাবার রক্ষাকবচ নয় কি সেটা? কিন্তু যতই কুসংস্কার থাক না কেন, বিপদের মুখে তিনি যেভাবে হাল ধরে দাঁড়ালেন, তাতে বোঝা গেলো তিনি কত বড় নাবিক–একজন ইওরোপীয় কাপ্তেন বিজ্ঞানের যাবতীয় আবিষ্কারের সাহায্য নিয়ে যা করতেন, স্বজ্ঞা ও সহজাত শক্তির বলেই তিনি ঠিক তার সঙ্গে পাল্লা দিলেন।

    টাইফুনটা আসলে বেশি জাগয়া জুড়ে শুরু হয়নি বলেই তার বেগ ছিলো ভয়ংকর; চরকির মতো পাক খাচ্ছে হাওয়া, আর সেই ঘুরুনির বেগ কম করে ঘণ্টায় ষাট মাইল। ভাগ্যিশ, হাওয়া স্যাম-ইয়েপ পুব দিকে তাড়িয়ে নিয়ে গেলো, না-হলে তীরে আছড়ে পড়ে জাঙ্কটা একেবারে চূর্ণ হয়ে যেতো।

    এগারোটার সময় ঝড় একেবারে তুমুল আকার ধারণ করলে। কাপ্তেন ইনের মুখের হাসি তখন মিলিয়ে গেছে–কিন্তু তাই বলে তিনি কাণ্ডজ্ঞান ও উপস্থিতবুদ্ধি হারিয়ে বসেননি। হাল ধরে আশ্চর্য কৌশলে এই হালকা জলযানটিকে তিনি চালিয়ে নিতে লাগলেন–ঢেউয়ের মাথায় একেকবার অনেক উঁচুতে ভেসে ওঠে জাহাজটা, আর সেই অবস্থাতেই তিন যে-সব হুকুম দেন, টাল শামলাতে-শামলাতে মাল্লারা বিনাবাক্যব্যয়ে তাই পালন করে।

    কিন-ফো তার কামরা থেকে বেরিয়ে দেয়াল ধরে দাঁড়িয়ে আকাশ আর সমুদ্রের চেহারা পর্যবেক্ষণ করছিলো। বাতাসের তোড়ে মেঘগুলো যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে তখন, পাঁজা-পাঁজা মেঘ নেমে এসেছে পাক খেতে-খেতে–এত নিচে নেমে এসেছে যে বুঝি এক্ষুনি ঢেউ ছোঁবে। আর কালো রাতের মধ্যে শাদা ঢেউগুলো যেন কোন গোপন অনির্ণেয় রাগে ফুলে-ফুলে উঠতে যাচ্ছে। কিন-ফোর মোটেই অবাক লাগছিলো না একটুও। দুর্ভাগ্য তার জন্য যে-সব ভয়ংকর বিপত্তি সাজিয়ে রেখেছে, এই ঝড় তো তারই একটা অংশ মাত্র। এই গ্রীষ্মকালে ষাট ঘন্টার রাস্তা অন্য-কেউ হলে দিব্যি নির্বিঘ্নে পেরিয়ে যেতে কিন্তু সেই কপাল কি আর তার হবে?

    ক্রেগ আর ফ্রাই বরং অনেক বেশি অস্বস্তি ভোগ করছে তখন–নিজেদের প্রাণের মায়া তারা করে না, কিন্তু সেন্টেনারিয়ানের স্বার্থের কথা ভেবে তাদের অস্বস্তির সীমা নেই। কেবল তিরিশে জুন মাঝরাত অব্দি কোনোমতে বেঁচে থাকলেই হলো–তারপরে তাদের বা কিন-ফোর কী হয় না-হয় তা তারা মোটেই পরোয়া করে না।

    সুন তো প্রথমেই প্রাণ হাতে করে নিয়ে জাঙ্কটায় উঠেছিলো–কাজেই এই ঝড়ে তার কাছে অবস্থার কোনো উনিশ-বিশ ঘটেছে বলে বোধ হলো না। আবহাওয়া ভালো কি মন্দ, ঝড়তুফান কি নিস্তরঙ্গ সমুদ্র–সবই তার কাছে সমান। আই-আই-ঈয়া! ওই কফিনগুলোয় যারা শুয়ে আছে, তারাই দিব্যি আছে–সমুদ্রের এই চণ্ড রূপে তাদের কিছুই এসে যাচ্ছে না; ঈশরে! সেও যদি তাদের মতো কফিনে শুয়ে থাকতে পারতো! আই-আই ঈয়া!

    জাঙ্কটা কিন্তু তিন ঘণ্টা ধরে সত্যি বিষম অবস্থায় ছিলো। একটু যদি বেকায়দায় হালে মোচড় পড়ে, তাহলেই আর দেখতে হতো না–পাটাতনের উপর দিয়েই সমুদ্র ছুটে বয়ে যেতো। বালতির মতো ডিগবাজি খেয়ে উলটে যেতো না বটে, কিন্তু আস্ত খোলটায় জল ভর্তি হয়ে ডুবে যেতে পারতো। ঢেউয়ের মাথায় যেমন ভাবে বারেবারে উৎক্ষিপ্ত হচ্ছে, তাতে তাকে যেমন কোনো নির্দিষ্ট দিকে চালানো অসম্ভব, তেমনি এটাও বোঝা দুষ্কর সত্যি কোনদিকে সে ভেসে যাচ্ছে। ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিলো বলেই বুঝি শেষটায় বিশেষ জখম না-হয়ে জাঙ্কটা ওই ভীষণ টাইফুনের ঠিক মাঝখানটায় গিয়ে পড়লো-ষাটমাইল জোড়া এই প্রচণ্ড তাণ্ডবের মাঝখানটা কিন্তু রাগি সমুদ্রের মাঝখানে কোনো শান্ত হ্রদের মতো নিস্তরঙ্গ হয়ে আছে–কেন্দ্রস্থলের দু-তিন মাইল জায়গার মধ্যে ঢেউও যেমন নই, বাতাসের প্রতাপও তেমনি ঢের কম।

    কুটো গাছটির মতো জলে পাক খেতে-খেতে এখানে এই নিরাপদ জায়গায় এসে পৌঁছেছে জাঙ্কটি। তিনটে নাগাদ হঠাৎ যেন জাদুবলে ওই ঘূর্ণিঝড়ের তেজ কমে এলো, আর ওই ছোট্ট হ্রদের চারপাশের গর্জে-ওঠা জলস্তম্ভ যেন বেমালুম কোথায় মিলিয়ে গেলো। কিন্তু সকাল যখন হলো, তখন আশপাশে কোথাও ডাঙার কোনো চিহ্নই দেখা গেলো না। স্যাম-ইয়েপ যেন কোনো বিপুল নীল তরল মরুভূমিতে দাঁড়িয়ে আছে একা : যেমন ফাঁকা অন্তরিক্ষ, সমুদ্রও ঠিক তেমনিই।

    .

    ১৮. শবাধারের জাগরণ

    এ আমরা কোথায় এলাম, কাপ্তেন ইন? সব বিপদ কেটে যাবার পর কিন-ফো জিগেশ করলো।

    কী করে বলবো? ততক্ষণে কাপ্তেনের মুখে আবার হাসি ফুটে উঠেছে। কিছুই তো বুঝতে পারছি না!

    পে-চি-লি উপসাগরে আছি তো?

    অসম্ভব নয়।

    না কি হাওয়ার টানে লিআও-তং উপসাগরেই চলে এসেছি?

    তাও খুবই সম্ভব!

    আমাদের জাঙ্ক কোথায় গিয়ে ভিড়বে তাহলে?

    হাওয়া যেখানে নিয়ে যাবে!

    কখন?

    তা আমি আপনাকে বলি কী করে?

    কিন-ফোর মেজাজ খারাপ হতে আরম্ভ করলো। খাঁটি চিনেম্যান জানে, সে একটি চৈনিক প্রবচন আওড়ালো, সে কোথায় আছে।

    ওঃ, ও-কথা! ও-সব ডাঙাতেই খাটে, সমুদুরে নয়, আকর্ণ দন্তবিকাশ করলেন কাপ্তেন।

    কিন-ফো অধীর হয়ে উঠলো। এ-কথায় এত হাসির কী আছে?

    কাঁদবার কিছু তো দেখছি না, অমনি ইনের ব। শোনা গেলো।

    সত্যি, হয়তো তেমন বিপজ্জনক হয়ে ওঠেনি অবস্থাটা, কিন্তু এটা তো অস্বীকার করবার জো নেই যে কাপ্তেন ইন নিজেই জানেন না জাঙ্কটা এখন বারদরিয়ার কোনখান ভেসে আছে; দির্শিকা ছাড়া কেমন করেই বা বুঝবেন ঝড় স্যাম-ইয়েপকে কোথায় তাড়িয়ে নিয়ে এসেছে। হাওয়া তো। আর একদিক থেকে বয়নি, বারে-বারেই দিক পালটেছে : গোটানো পাল আর অকেজো হাল তো আস্ত জাঙ্ককে ঝড়ের হাতে খেলনা জাহাজ বানিয়ে তুলেছিলো।

    কিন্তু জাঙ্কটা ঝড়ের হাতে পড়ে যে-সমুদ্রেই এসে পড়ুক না কেন, তাকে পশ্চিমমুখো চালানো ছাড়া আর-কোনো উপায় নেই বোধহয়–অন্তত সে-বিষয়ে দ্বিধা করা উচিত নয়, কেননা একমাত্র সেদিকে গেলেই শেষ পর্যন্ত ডাঙার দেখা পাবার সম্ভাবনা থাকবে। আকাশে এখন আবার সূর্য উঠেছে, যদিও আলো আর তেমন প্রখর নয়; সাধ্য থাকলে কাপ্তেন হয়তো তক্ষুনি সব পাল খাঁটিয়ে সূর্যের পিছন-পিছন ছুটে যেতেন–কিন্তু হাওয়ার নামগন্ধও নেই কোথাও–টাইফুনের পরে প্রকৃতি যেন অবসন্ন হয়ে আছে–একটু নড়াচড়ার ক্ষমতাও যেন আর-কারু নেই : শুধু মসৃণ জল আর ফেনার মধ্যে স্থির হয়ে ভেসে আছে জাহাজ, এক চুলও নড়ছে না। সমুদ্রের উপর ভারি একটা বাষ্পের আস্তরণ ঝুলে আছে যেন : আগের রাতের তাণ্ডবের একেবারে উলটো আবহাওয়া, দেখে কে ভাববে যে একটু আগেই জল আর বাতাস অমন ক্ষিপ্ত ও উৎক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলো। সমুদ্র যখন এমনি অদ্ভুতভাবে শান্ত হয়ে যায়, চিনে মাল্লারা তাকে শ্বেত শান্তি বলে।

    কতক্ষণ থাকবে এ-অবস্থা? কিন-ফো জিগেশ করলো।

    কে জানে! কাপ্তেনকে একটুও উদ্বিগ্ন দেখালো না। গরমকালে সাধারণত কয়েক হপ্তা ধরে এই শান্ত অবস্থা থাকে সমুদ্রের।

    কয়েক সপ্তাহ! কিন-ফো আঁৎকে উঠলো, আপনি কি ভেবেছেন আমি সপ্তাহের পর সপ্তাহ এখানে এইভাবে থাকবো?

    কী করবো বলুন? গুন টেনে নিয়ে না-গেলে তো যাবার কোনোই উপায় নেই।

    গোল্লায় যাক জাঙ্কটা! কেন যে মরতে এটায় উঠেছিলুম!

    আপনাকে দুটো ছোট্ট পরামর্শ দিলে কিছু মনে করবেন না তো? অন্যদের মতো মেনেই নিন না অবস্থাটা–এ-রকম গজগজ করে কী লাভ–আবহাওয়া তো আর আপনি বদলাতে পারবেন না? বরং আমি যা করতে যাচ্ছি, তা-ই করুন : বিছানায় শুয়ে নাক ডাকিয়ে নিন খানিকটা। এই দার্শনিক বচন ওয়াংকেই মানাতো; কাপ্তেন এই পরম তত্ত্বকথাটি আউড়ে নিজের কামরায় চলে গেলেন; ডেকের উপর কেবল দু-তিনজন মাল্লা রইলো তদারক করার জন্য।

    কী করবে বুঝতে না-পেরে কিন-ফো মিনিট পনেরো পায়চারি করলো ডেকে; তারপর চারপাশে তাকিয়ে ওই পরিত্যক্ত ও নিদারুণ দৃশ্যটিকে আরেক বার ভালো করে দেখে নিয়ে সে মনস্থির করে ফেললো। ক্রেগ আর ফ্রাই তখন জাঙ্কের পিছন দিকের রেলিঙে হেলান দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়েছিলো–বোধহয় কোনো বাক্যবিনিময় না-করেও পরস্পরের ভাবনা তারা বুঝতে পারছিলো। কিন-ফো তাদের কিছু না-বলেই ডেক ছেড়ে চলে গেলো। কাপ্তেনের সঙ্গে এতক্ষণ কিন-ফোর কী কথাবার্তা হয়েছে, তা সবই তারা দুজনে শুনেছিলো, কিন্তু দেরি হবে শুনে কিন-ফো অত্যন্ত উত্ত্যক্ত ও অস্থির হয়ে উঠলেও তারা কিন্তু মোটেই চঞ্চল হয়নি। সময় যত নষ্ট হবে, কিন-ফোর জীবনও ততই নিরাপদ হবে, কারণ যতক্ষণ সে স্যাম-ইয়েপে থাকবে, ততক্ষণ অন্তত লাও-শেন কর্তৃক আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা কম। তাছাড়া তাদের দায়িত্বের মেয়াদও শেষ হয়ে এসেছে–আর দু-দিন কাটাতে পারলেই–বাস্,–তারপরে যদি আস্ত একটা তাই-পিং বাহিনীও তাকে বধ করতে আসে, তাহলে তাকে রক্ষা করার জন্য চুলের ডগাটি পর্যন্ত বিসর্জন দেবার কথা ওঠে না। কাণ্ডজ্ঞানওলা ইয়াঙ্কি তারা–সেন্টেনারিয়ানের এই মক্কেলের দাম যদ্দিন দু-লাখ ডলার থাকবে, তদ্দিনই কেবল তাদের দায়িত্ব–তারপরে কিন-ফো যে-চুলোতেই যাক না কেন তাতে তাদের কোনো কৌতূহল নেই।

    এই অবস্থায় প্রচণ্ড খিদে নিয়ে মধ্যাহ্নভোজে বসলে তাদের বাধা দেবে কে? আর খাদ্যবস্তু চমৎকার : একই রেকাবি থেকে খেলো তারা, দুজনেই সমান-সমান রুটি আর মাংস খেলো, বিডুল্‌ফের স্বাস্থ্য কামনা করে একই পরিমাণ মদ্য পান করলো তারা, আর শেষে সিগারেট যখন ধরালো, তখনও সিগারেটেরও সংখ্যা রইলো দুজনেরই সমান। জম্মের দিক থেকে শ্যামদেশীয় যমজ না-হতে পারে, রুটি আর অভ্যেসের দিক থেকে কিন্তু তা-ই।

    সারা দিন কেটে গেলো অঘটন দুর্ঘটন ছাড়াই এক ভাবে; আকাশ তেমনি পশমিনা রইলো সর্বক্ষণ, সমুদ্র তেমনি মসৃণ ও নিস্তরঙ্গ–আর একঘেয়ে আবহাওয়ায় কখনোই কোনো চাঞ্চল্য দেখা গেলো না।

    বিকেল চারটে নাগাদ সুন ডেক-এ দেখা দিলে। টলছে সে; মাতালের মতো বেশামাল ও টলটলায়মান, যদিও এমন ব্রহ্মচর্য ও সংযম তার মধ্যে কখনো দেখা যায়নি। গাত্রবর্ণ নীল আর সবুজের মাঝামাঝি–হলদেটে হবার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে–হয়তো পুনরায় ডাঙায় পা দিলে আবার আগের মতো কমলা রঙের হয়ে যাবে। রেগে যখন তিনটে হয়েছিলো তখন সমস্ত শরীর রক্তবর্ণ ধারণ করেছিলো–ফলে অতি অল্প সময়েই বুঝি সে ইন্দ্রধনুর সব রঙ ফোঁটাতে পারে শরীরে। অর্ধমুদিত তার নয়ন, রেলিঙের ওপাশে তাকাবার সাহস তার নেই; স্খলিত চরণে ক্রেগ আর ফ্রাইয়ের কাছে এসে সে জিগেশ করলে, তাহলে পৌঁছে গেলুম বলে?

    উঁহু, তারা উত্তর দিলে।

    এখনো পৌঁছুবার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না?

    উঁহু।

    আই-আই-ঈয়া, কাৎরে উঠলো সে, মাথা ঘুরে পড়ে গেলো মাস্তুলের তলায়, এমনভাবে ছটফট করতে লাগলো যেন বিকারের ঘোরে আছে, আর তার ছোট্ট অর্ধচ্ছিন্ন বেণীটা কুকুরের ল্যাজের মতো নড়ে-নড়ে উঠলো।

    সকালবেলাতেই কাপ্তেন ইন অত্যন্ত বিচক্ষণভাবে বলেছিলেন যে পাটাতনে নামবার জন্য খোলের গায়ে যে-সব ঘুলঘুলি রয়েছে তা খুলে দেবার জন্য : খোলের মধ্যে টাইফুনের সময় জল ঢুকেছিলো, রোদ পড়ে তা শুকিয়ে যেতে পারে। ক্রেগ আর ফ্রাই অনেকক্ষণ থেকে ডেক-এ পায়চারি করছিলো, মাঝে-মাঝে গিয়ে থেমে পড়ে নিচে উঁকি দিয়ে দেখছিলো–শেষকালে কৌতূহল যখন চরম হয়ে উঠলো, তারা নিচে গিয়ে সব দেখে আসবে বলে ঠিক করলো।

    উপর থেকে যে-জায়গাটা দিয়ে আলো আসে, তা ছাড়া পুরো খোলটাই ঘুটঘুঁটে অন্ধকারে ঢাকা। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে অন্ধকার চোখে সয়ে গেলে ওই অদ্ভুত মাল-ভরা খোলের মধ্যে পথ খুঁজে পেতে অসুবিধে হয় না।

    অন্যান্য জাঙ্কের মধ্যে খোলগুলোর মধ্যে খুপরি করা থাকে–এটা কিন্তু সে-রকম নয়, পুরোটাই ভোলা, আর পুরো খোলটা ওই অদ্ভুত মালে ভরা মাল্লাদের শোবার জায়গা জাঙ্কের সামনের দিকটায়। পাশে একটার উপর আরেকটা করে ফু-নিন-গামী পঁচাত্তরটা কফিন সাজিয়ে-রাখা : প্রত্যেকটা কফিন ভালো করে বেঁধে-রাখা আংটার সঙ্গে যাতে জাহাজের দুলুনিতে ওগুলো পড়ে না-যায়, আর দু-পাশের কফিনের মধ্য দিয়ে গেছে পথ–যার শেষ প্রান্ত ঘুলঘুলি থেকে অনেক দূরে বলে অন্ধকারে ঢেকে পড়ে আছে।

    আস্তে পা-টিপেটিপে এগুলো ক্রেগ আর ফ্রাই, যেন কোনো মস্ত সমাধিভবনের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। তাদের কৌতূহলের সঙ্গে কিঞ্চিৎ ভয় আর রোমাঞ্চ মেশানো। কফিনগুলোর মাপ নানারকম, অল্প কয়েকটিই কেবল দামি ও কারুকাজ করা, বাকিগুলো নিরাভরণ ও অতি সাধারণ। দারিদ্র যাদের প্রশান্ত মহাসাগরের ওপারে তাড়িয়ে নিয়ে গেছে, তাদের মধ্যে অল্প কয়েক জনই কেবল ভাগ্য ফেরাতে পারে; নেভাদা, কলোরাডো আর ক্যালিফরনিয়ার খনিতে কাজকর্ম করে বড়োলোক হয় কেবল অল্প লোকেই; প্রায় সবাই। যেমন-কে-তেমন সেই অবিচ্ছিন্ন দারিদ্রেই মারা যায় । কিন্তু গরিব-বড়োলোক নির্বিশেষে সবাইকেই ব্যতিক্রমহীনভাবে সমান সযত্নে মৃত্যুর পর স্বদেশে ফেরৎ পাঠিয়ে দেয়া হয়।

    এর মধ্যে গোটা দশেক কফিন দামি কাঠে তৈরি : চৈনিক কল্পনা যে কতভাবে কোনো কফিনকে সজ্জিত করতে পারে, এ-ক-টা কফিন তারই জমকালো নজির। বাকিগুলো কেবল হলদে রং-করা চার টুকরো তক্তা জুড়ে বদখৎ ভাবে তৈরি; প্রত্যেকটার গায়ে মৃত ব্যক্তির নাম-ধাম লেখা। ক্রেগ আর ফ্রাই যেতে-যেতে কফিনগুলোর নাম পড়তে লাগলো : ইয়ুন-পিং-ফুর লিয়েন-ফো, ফু-নিন-এর নান-লুন, কিন-কিয়ার শেন-কিন, কুঠি-লি কোআর লুং-আং। অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে প্রত্যেকটি মৃতদেহ ফেরৎ পাঠানো হয়, যাতে চৈনিক প্রান্তর, বিতান কি সমভূমিতে এই হতভাগ্যরা তাদের শেষ আশ্রয়টুকু খুঁজে পায়।

    খুব ভালো করেই বাঁধাছদা রয়েছে, ফিশফিশ করে বললো ক্রেগ। ফ্রাই ফিশফিশ করে পুনরাবৃত্তি করলো, খুব ভালো করে বাঁধা–

    সান ফ্রান্সিসকো বা নিউইয়র্ক থেকে-আসা কোনো মালের গাঁট দেখে যে-ভাবে মন্তব্য করতো, তেমনি শান্ত গলায় তারা তাদের মত ব্যক্ত করলো।

    শেষ প্রান্তটায় ঘুটঘুঁটে আঁধার; এখানে এসে তারা ফিরে তাকিয়ে দেখলো ও-পাশ থেকে সাময়িক গোরস্থানে ঝাঁপশাভাবে আলো এসে পড়ছে ডেকের দরজা দিয়ে; ফিরে যাবে ভাবছে, এমন সময় খুট করে একটা শব্দ হতেই তারা থমকে দাঁড়ালো।

    ইঁদুর বোধহয়, বললো তারা। তারপরে ক্রেগ প্রথমে বললো, কিন্তু ইঁদুররা তো চালের বস্তাই পছন্দ করবে বেশি, আর ফ্রাই বললো, কিংবা ভুট্টার গাঁটরি—

    খুটখুট আওয়াজটা কিন্তু মোটেই থামেনি। শব্দটা অনেকটা নখ বা থাবা দিয়ে কাঠের গায়ে আঁচড়ানোর মতো। আওয়াজটা উঠছে ডান দিক থেকে, ঠিক তাদের মাথার কাছেই–অর্থাৎ একেবারে উপরের কফিনগুলো থেকে।

    শশি শশি করে আওয়াজ করে ইঁদুরকে তারা ভয় দেখাতে চাইলো। আঁচড়ের শব্দ কিন্তু তবু থামলো না। রুদ্ধশ্বাসে চুপ করে দাঁড়িয়ে কান খাড়া করে রইলো তারা।

    আওয়াজটা যে কোনো কফিনের মধ্য থেকে আসছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

    নিশ্চয়ই মরে যাবার আগেই কাউকে কফিনে পুরে দিয়েছে, বললে ক্রেগ।

    কিংবা হয়তো মরে গিয়েছে বলে ভেবেছিলো–এখন আবার বেঁচে উঠেছে, ফ্রাই তার মত ব্যক্ত করলো।

    কফিনটার কাছে গিয়ে তারা ডালায় হাত দিলে; ভিতরে যে কারু নড়াচড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে, তাতে আর কোনো সন্দেহই নেই এখন।

    দুজনেই মৃদু স্বরে বলে উঠলো, কোনো অনিষ্ট ছাড়া আর কী হতে পারে এর মানে!

    একই সঙ্গে দুজনের মধ্যে একটি ভাবনার উদয় হয়েছে–নিশ্চয়ই কোনো নতুন বিপদের কবলে পড়বে কিন-ফো, তাদেরই জিম্মাদারিতে যে আছে; আর মৃতের পুনর্জীবনলাভ নিশ্চয়ই তারই ইঙ্গিত।

    কফিনের ডালাটা আস্তে-আস্তে ভিতর থেকে খুলে যাচ্ছে দেখে তারা হাত সরিয়ে নিলো। একটুও চাঞ্চল্য প্রকাশ না-করে তারা দেখতে লাগলো এর পর কী হয়। একচুলও নড়লো না তারা। অন্ধকার অত্যন্ত গাঢ় বলে স্পষ্ট করে কিছু দেখা যায় না, এটা ঠিক; কিন্তু তা সত্ত্বেও বামপাশের আরেকটা কফিনের ডালাকে তারা যে উত্তোলিত হতে দেখলো, তা মোটেই তাদের চোখের ভুল নয়। পরক্ষণেই কার গলা যেন ফিশফিশ করে কথা বলে উঠলো–অন্য আরেকটি মৃদু স্বর তার সাড়া দিলে।

    কনো? তুমি?

    তুমি তো, ফা-কিয়েন?

    আজ রাত্তিরেই তো হবে ব্যাপারটা?

    হ্যাঁ, আজ রাত্তিরেই।

    চাঁদ ওঠবার আগেই?

    হ্যাঁ, ঠিক দ্বিতীয় প্রহরে।

    অন্য-সবাই এ-কথা জানে তো?

    হ্যাঁ, সবাইকেই বলে দেয়া হয়েছে!

    ঝামেলাটা চুকে গেলে বাঁচতুম!

    সে তো আমরাও বাঁচতুম!

    ছত্রিশ ঘণ্টা ধরে একটা কফিনে শুয়ে-থাকা মোটেই ইয়ার্কি নয়!

    ঠিক বলেছো।

    কিন্তু কী আর করালাও-শেনের হুকুম; তামিল করতেই হবে।

    শ্‌-শ্‌-শ্‌–চুপ! ও কীসের আওয়াজ?

    লাও-শেনের নাম শুনেই অজান্তেই আপনা থেকে ক্রেগ আর ফ্রাই নড়ে উঠেছিলো–ওই শেষ অস্ফুট কথাটুকু তারই জের। কিন্তু পরক্ষণেই তারা শামলে নিলে–টু শব্দটি না-করে পাথরের মতো স্থির দাঁড়িয়ে রইলো।

    একটুক্ষণ সবই চুপচাপ রইলো, তারপর কফিনের ডালাগুলো আবার আস্তে বন্ধ হয়ে যেতেই সেখানে নিরেট স্তব্ধতা নেমে এলো।

    চুপি-চুপি হামাগুড়ি দিয়ে ক্রেগ আর ফ্রাই ফিরে এলো; ডেকে উঠেই কোনো কথা নয়,সোজা নিজেদের কামরায় গিয়ে ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিলো তারা। এখানে বললে আর কারু কানে পৌঁছুবার সম্ভাবনা নেই।

    যে-মড়া কথা বলে, ক্রেগ বাক্যটা শুরু করলো; আর ফ্রাই তার জের টেনে বললো, সে এখনো সত্যি মরেনি।

    এই ভৌতিক পরিবেশে লাও-শেনের নাম শোনবামাত্র পুরো ব্যাপারটা তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে। কাজ হাশিল করার জন্য তাই-পিং সর্দারটি যে লোক লাগিয়েছে, আর তারা যে কাপ্তেনের অজ্ঞাতসারেই জাঙ্কে এসে উঠেছে–এটা বুঝতে বেশি সময় লাগে না। মার্কিন জাহাজ থেকে কফিনগুলো নামাবার পর দু-তিন দিন পড়ে ছিলো বন্দরে-স্যাম-ইয়েপ-এর আগমনের অপেক্ষা করছিলো কফিনগুলো; আর সেই অবসরে কতগুলো কফিন থেকে মৃতদেহ সরিয়ে ফেলে লাও-শেনের অনুচরেরা গিয়ে লুকিয়ে থেকেছে। কিন-ফো যে স্যাম-ইয়েপের যাত্রী হবে, এটা তারা আগে থেকেই কী করে জানতে পারলো সে-একটা রহস্য বটে; কিন্তু এখন তাদের মনে পড়লো যে জাহাজঘাটায় তারা কয়েকটি সন্দেহজনক লোককে আশপাশে ঘুরঘুর করতে দেখেছিলো। শেষকালে যদি সেন্টেনারিয়ান তাদের নিয়োগ করা সত্ত্বেও এমনভাবে দু-লাখ ডলার হারিয়ে বসে, তাহলে তাদের আর বদনামের সীমা থাকবে না।

    কিন্তু তাই বলে হাল ছেড়ে দিয়ে উপস্থিত বুদ্ধি হারিয়ে ফেলার পাত্তর তারা নয়; একটা অপ্রত্যাশিত ও বিষম বিপদের মুখোমুখি পড়েছে হঠাৎ, এমনকী ভেবেচিন্তে যে একটা ভালো ফন্দি আঁটবে তারও কোনো অবসর নেই–যা করতে হয় রাত দ্বিতীয় দণ্ডের আগেই খুব-একটা আলোচনা করে দেখার সুযোগও এখন নেই; আর তাছাড়া একটাই তত পথ খোলা আছে। সামনে-রাত দ্বিতীয় দণ্ডের আগেই কিন-ফোকে এই জাঙ্ক থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে।

    কিন্তু কথাটা বলা যত সহজ সোজা, কাজে খাটানো মোটেই তা নয়। জাঙ্কে মাত্র একটা নৌকো আছে–জরুরি অবস্থার জন্য; সেটাও আবার এমনি ভারি আর বিতিকিচ্ছি যে জাহাজশুদ্ধ সব মাল্লা লেগে যাবে সেটাকে জলে নামাতে গেলে। তাছাড়া কাপ্তেন নিজেই যদি এই চক্রান্তের সাহায্যকারী হয়ে থাকেন তো মাল্লারা যে মোটেই সাহায্য করবে না তা-তো বলাই বাহুল্য। কাজেই নৌকো করে পালাবার কথাই ওঠে না।

    সাতটা বেজে গেলো। কাপ্তেন এখনও তার কামরা থেকে বেরোননি। এমনও তো হতে পারে যে তিনি স্বচক্ষে এই ভীষণ কর্মটি দেখতে চান না–নিরিবিলি নিজের কামরায় বসে অপেক্ষা করছেন কখন নির্দিষ্ট সময় অত্বিক্রান্ত হয়ে যায় আর সব ল্যাঠা চুকে যায়। জাঙ্কটা বাতাসে আর ঢেউয়ে তাড়িত হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে, কোথাও কোনো পাহারার ব্যবস্থা নেই : কেনই বা থাকবে? শুধু গলুইয়ের কাছে রেলিঙে হেলান দিয়ে বসে-বসে একটি মাল্লা ঢুলছে। যদি কোনো ডিঙি বা শাম্পান থাকতো, তাহলে এর চেয়ে ভালো পালাবার সুযোগ পাওয়া যেতো না। জাহাজে আগুন লেগে গেলেও বুঝি তারা পালাবার জন্য এত ব্যস্ত ও উত্তেজিত হতো না। হঠাৎ দুম করে একটা ভাবনা খেলে গেলো মাথায়; আলোচনা করে সময় নষ্ট করার আর অবসর নেই; এক্ষুনি, এই মুহূর্তেই, কাজে খাটাতে হবে এটা।

    কিন-ফোর কামরার দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে আস্তে-আস্তে গিয়ে ধাক্কা দিলো তাকে। কিন-ফো তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। আবার তাকে ধাক্কা দিলো তারা।

    ধড়মড় করে উঠে বসলো সে, আপনারা আবার কী চান?

    যত কম কথায় পারে পুরো ব্যাপারটা তারা খুলে বললো; কিন-ফো কিন্তু সব শুনে মোটেই ভীত হলো না, একটু ভেবে সে বললে, গুণ্ডাগুলোকে জলে ছুঁড়ে ফেললেই তো হয়–

    তার কোনো প্রশ্নই ওঠে না, তক্ষুনি তারা বলে উঠলো।

    তাহলে আমরা কি কিছুই করবো না, জিগেশ করলো কিন-ফো।

    যা বলি তা-ই করুন, ক্রেগ বললো, আমরা ফন্দি এঁটে ফেলেছি।

    শুনি কী ফন্দি, কিন-ফো যেন কিঞ্চিৎ বিস্মিত হলো।

    টু-শব্দটি না করে এই পোশাকটি নিয়ে পরে ফেলুন–চটপট তৈরি হয়ে নিন–কোনো প্রশ্ন করবেন না!

    হাতে একটা মোড়কে জড়ানো পুলিন্দা ছিলো–সেটা খুললো তারা। কাপ্তেন বোয়া-কর্তৃক সদ্য আবিষ্কৃত চার প্রস্থ সাঁতারের পোশাক রয়েছে। ভিতরে। কিন-ফোকে এক প্রস্থ দিয়ে বললে, দুটি আমাদের জন্য ও আরেকটা সুনের।

    যান, গিয়ে সুনকে নিয়ে আসুন, কিন-ফো বললে।

    সুন এমন ভঙ্গিতে এলো যেন সে হঠাৎ চলৎশক্তি হারিয়ে পঙ্গু হয়ে পড়েছে।

    কিন-ফো বললো, এটা পরে নে—

    কিন্তু সুনের তখন নিজে থেকে ও-পোশাক পরার কোনো ক্ষমতাই নেই। সে কেবল আই-আই-ঈয়া বলে কাত্রাতে লাগলো। আর অন্যরা তাকে ধরাধরি করে ওই জলনিরোধী-পোশাকে ঢুকিয়ে দিলে।

    ততক্ষণে আটটা বেজে গেছে; সবাই তারা প্রস্তুত; চারটে মস্ত সীল মাছ যেন তারা, এক্ষুনি বরফ-জমা জলে ঝাঁপিয়ে পড়বে যেন;–অবশ্যি সুনকে এমন ঢিলেঢালা ও অলবডে দেখাচ্ছিলো যে সীল মাছের মতো অমন নমনীয় জীবের সঙ্গে তার কোনো তুলনাই হয় না।

    জাঙ্কটি তখন নিবাত-নিষ্কম্প সমুদ্রে স্থির ভেসে আছে; ক্রেগ আর ফ্রাই কামরার একটা ঘুলঘুলি খুলে আস্তে ধাক্কা দিয়ে কোনো গড়িমশি না-করে প্রথমে সুনকে সমুদ্রে ফেলে দিলে। কিন-ফোও সাবধানে নেমে পড়লো; ক্রেগ আর ফ্রাই নামলো সব শেষে-ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে চারপাশে তাকিয়ে নিশ্চিত দেখে নিলো সব নলটল জোড়াতাড়া ঠিক আছে কি না।

    এত সাবধানে ও নিঃশব্দে তারা জলে নেমে পড়লো যে স্যাম-ইয়েপ থেকে যে চারজন যাত্রী কেটে পড়েছে, এটা কেউ জানতেই পেলো না।

    .

    ১৯. অকূল পাথারে

    কাপ্তেন বোয়াতের পোশাকটা নানা গাছের আঠা জমিয়ে তৈরি : পা-ঢাকা জামা, ঢিলে গাত্রবাস, আর টুপি–এই তিন প্রস্থে পোশাকটা সম্পূর্ণ। নিরন্ধ্র এই পোশাকে জল ঢোকে না বটে, কিন্তু ঠাণ্ডার কাছে তা মোটেই অভেদ্য হতো না–যদি-না দুটো আলাদা স্তরে খানিকটা হাওয়া জমিয়ে রাখার ব্যবস্থা থাকতো। এই বাতাসই আসলে এটাকে জলের উপর ভাসিয়ে রাখে আর ঠাণ্ডার হাত থেকে বাঁচায়না-হলে অনেকক্ষণ ভোলা জলে পড়ে থাকলে ঠাণ্ডা লাগতো।

    পোশাকের ভিন্ন-ভিন্ন অংশ এমনভাবে জোড়া দেয়া হয়েছে, যাতে জল নিরোধ করতে পারে। গোড়ালির তলায় পাজামা যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানে পায়ের চেটোর নিচে ভারি সোল রয়েছে জুতোর মতো; কোমর পর্যন্ত উঠে এসেছে এই পাজামা, ধাতুর কোমরবন্ধ দিয়ে আটকানো থাকে–আর পোশাকটা এত ঢিলে যে হাত-পা নাড়তে কোনো অসুবিধে হয় না। ছোট্ট বুক-ঢাকা জামাটা ওই কোমরবন্ধের সঙ্গেই আটকানো থাকে; গলাবন্ধটি নিরেট, আর শিরস্ত্রাণটি আটকানো থাকে তারই সঙ্গে–আঁটোভাবে কপাল গাল আর চিবুকের উপর স্থিতিস্থাপক দিয়ে আঁটা থাকে টুপিটা শুধু চোখ, মুখ, আর নাকই খোলা থাকে। জামার সঙ্গে গোটা কয়েক ওই গাছের আঠার নল লাগানো থাকে–যাতে ভিতরে হাওয়া খেলতে পারে; হাওয়ার ঘনতা এমনভাবে নিয়ন্ত্রিত করা যায় যে কেউ ইচ্ছে করলে গলা বা কোমর ডুবিয়ে খাড়া ভেসে থাকতে পারে–কিংবা কখনো চিৎ হয়ে শুয়ে থাকতে পারে জলের উপরে–কখনোই আশঙ্কার কিছু থাকবে না–সবসময় ইচ্ছে মতো হাত-পাও নাড়তে পারবে।

    এই ভাসা-কলের ব্যাবহারিক প্রয়োজনীয়তা ইতিমধ্যেই এর ভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে আবিষ্কর্তা আমাদের কাছে যথেষ্ট সাধুবাদ দাবি করতে পারেন। পোশাকটাকে সম্পূর্ণ করে-তোলার জন্য সেই সঙ্গে আরো কতগুলো জিনিশ থাকে : কাঁধে ঝোলানো থাকে একটি জলনিরোধ থলি, দরকারি জিনিশপত্তর রাখা যায় যাতে; আর থাকে ছোট্ট একটা লাঠি–পায়ের চেটোর নিচে ভারি সোলের গায়ে একটা একটা ছোট্ট খাপে সেটা বসাবার ব্যবস্থা আছে–একটা ছোট্ট পাল তুলে দেয়া যায় ইচ্ছে করলে ওই লাঠির গায়ে টাঙিয়ে; আর আছে হালকা একটা বৈঠা–দরকার-মতো সেটাকেই হাল হিশেবে ব্যবহার করা যায়, অন্য সময়ে দাঁড়ের কাজই করা যায় ওটা দিয়ে।

    এইসব শরঞ্জাম নিয়ে প্রস্তুত হয়ে কিন-ফো, ক্রেগ, ফ্রাই আর সুন অকূল পাথারে ভেসে পড়লো : দাঁড় টেনে কিছুক্ষণের মধ্যেই জাঙ্কটি থেকে অনেক দূরে চলে এলো তারা। ঘুটঘুটি কালো রাত : কাপ্তেন ইন বা তার কোনো স্যাঙাৎ যদি তখন ডেকে উপস্থিত থাকতো, তাহলে তারা কিছুতেই পলাতকদের দেখতেই পেতো না : তারা যে পালাচ্ছে, সেই অন্ধকারে এটা কেউ ভুলেও সন্দেহ করতে পারতো না।

    ছদ্মবেশী শবটি যে-দ্বিতীয় প্রহরের কথা বলেছিলো, তা আসলে মধ্যরাতেই শুরু হবে; সুতরাং কিন-ফোদের হাতে কয়েক ঘণ্টা অতিরিক্তি সময় আছে, যার ফলে স্যাম-ইয়েপ থেকে বেশ কিছু মাইল দূরে চলে যাবার সুযোগ পাবে তারা। তখন অত্যন্ত মৃদু হাওয়া বইছে, জল ছলছল করে উঠছে; কিন্তু তবু দূরে যেতে হলে ওই দাঁড় টানা ছাড়া আর কিছুর উপরই নির্ভর করার উপায় নেই।

    কয়েক মিনিটের মধ্যেই কিন-ফো, ক্রেগ আর ফ্রাই এই অদ্ভুত পোশাকে অভ্যস্ত হয়ে গেলো : এত চটপট তারা নৈপুণ্য অর্জন করে ফেললো যে মুহূর্তে ইচ্ছেমতো যে-কোনো ভঙ্গিতে যে-কোনো দিকে যেতে তাদের কোনো অসুবিধে হলে না। সুনকে অবিশ্যি গোড়ার দিকে টেনে নিয়ে যেতে হলো, কিন্তু সেও শিগগিরই তার হৃত শক্তি ফিরে পেলো : জাঙ্কে যখন ছিলো তার চেয়েও অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করছে সে জলের মধ্যে। সমুদ্রপীড়ার কষ্ট আর মাথা-ঘুরুনি ভাব আর নেই : জাহাজের মধ্যে ছিটকে পড়ে গড়াগড়ি যাওয়া কিংবা লোফালুফি হওয়ার চেয়ে সমুদ্রে দিব্যি বুক পর্যন্ত ডুবিয়ে ভেসে থাকতে পেরে তার স্বস্তি আর আহ্বাদের সীমা ছিলো না।

    কিন্তু সমুদ্রপীড়া আর না-থাকলে কী হবে, ভয়ে তার হাত-পা তবু ভিতরে সেঁধিয়ে যাচ্ছিলো। হাঙরেরা গিলে খাবে, ছিঁড়বে তাকে টুকরো-টুকরো করে–এই ভয় এমনভাবে তার বুকের মধ্যে হানা দিচ্ছিলো যে বারেবারে সে পা দুটি টেনে দেখছিলো হাঙরগুলো ছিঁড়ে খেয়ে গেলো এক না। এটা অবশ্যই বলতে হয় যে তার এই আতঙ্ক মোটেই ভিত্তিহীন ছিলো না।

    কিন-ফোকে নিয়ে যেন লোফালুফি খেলছে তার অদৃষ্ট। এই আশ্চর্য ভাগ্যের জন্যেই একেবারে চিৎ হয়ে শুয়ে দাঁড় টেনে-টেনে এগুচ্ছে তারা–যখনই ক্লান্ত লাগে, বিশ্রামের জন্য লম্বের মতো উঠে দাঁড়ায়, না-হলে চিৎ-সাঁতারই দেয় সর্বক্ষণ। জাঙ্ক ছেড়ে আসার পর এক ঘণ্টা কেটে গেছে, আর তারা এসেছে আধ মাইল দূরে। বিশ্রাম নেবার জন্য বৈঠার গায়ে হেলান দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো তারা, ফিশফিশ করে কী কর্তব্য তা-ই নিয়ে আলোচনা করতে লাগলো।

    পাজির পাঝাড়া ওই কাপ্তেনটা! অনেকক্ষণ ধরে মন্তব্যটা করতে চাচ্ছিলো ক্রেগ, এবার প্রথম সুযোগেই বলে ফেললো।

    লাও-শেনটাই বা কী কম পাজি, শুনি? ফ্রাই যোগ করে দিলো।

    আপনারা এতে অবাক হয়েছেন নাকি? কিন-ফো বললে, আমি আর এখন কিছুতেই অবাক হই না।

    একটা কথা আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না, ক্রেগ বললো, ওই হতভাগাগুলো কী করে আগেভাগেই জানতে পেরেছিলো যে আপনি ওই জাঙ্কে গিয়েই উঠবেন?

    কিন-ফো শান্তগলায় বললে, তা, ওদের হাত থেকে যখন বেঁচে গেলাম, তখন আর এ-কথা জেনেই বা কী হবে!

    বেঁচে গেলেন? ক্রেগ যেন স্তম্ভিত : স্যাম-ইয়েপ যতক্ষণ কাছাকাছি থাকবে, ততক্ষণ আমরা মোটেই নিরাপদ নই।

    কী করবো তাহলে বলুন, কিন-ফো জানতে চাইলো।

    কিঞ্চিৎ জলযোগে করে নবোদ্যমে আমাদের রওনা হতে হবে আবার, যাতে সকাল হবার আগেই স্যাম-ইয়েপের দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যেতে পারি।

    ফ্রাই তার পোশাকে আরো কিছু হাওয়া ঢুকিয়ে দিয়ে আরো ভেসে উঠতে লাগলো, শেষটায় যখন কোমর পর্যন্ত ভেসে উঠলো তখন কাঁধের জলনিরোধী থলিটা খুলে তার ভিতর থেকে একটা গেলাশ আর বোতল বার করে আনলো। ব্র্যাণ্ডি দিয়ে ভরে কিন-ফোর হাতে তুলে দিলে সে গেলাশটা, আর কিন-ফোকে বিশেষ অনুরোধ-উপরোধ করার আগেই গেলাশটা সে গলায় একেবারে উপুড় করে দিলো। ক্রেগ আর ফ্রাই নিজেরাও ব্র্যাণ্ডি খেলে-সুনের কথাও মোটেই ভুললো না।

    গেলাশটা শূন্য করে ফেলতেই সুনকে জিগেশ করলো ক্রেগ, এখন কেমন লাগছে?

    ধন্যবাদ–আগের চেয়ে অনেক ভালো, বললে সুন, কিন্তু কিঞ্চিৎ নিরেট খাবার পেলে ভালো হতো।

    আলো ফুটলেই আমরা ছোটোহাজরি সেরে নেবো–তখন তোমাকে চা-ও দেয়া হবে।

    সুন মুখ বেঁকালো। ঠাণ্ডা চা?

    না, না, গরম– বললে ক্রেগ।

    এবার সুনের চোখমুখ ঝলমল করে উঠলো। কিন্তু সে আপনি পাবেন কোত্থেকে? সে জানতে চাইলো।

    কেন, আগুন জ্বেলে গরম করে নেবো।

    তাহলে আর সকাল অব্দি অপেক্ষা করার কী দরকার? সুন যুক্তি উত্থাপন করলো।

    ওহে আহাম্মক, আমাদের আলো কাপ্তেন ইন আর তার স্যাঙাৎদের চোখ পড়ুক, এটাই তুমি চাও না কি!

    না, না—

    তাহলে বরং ধৈর্য ধরে উপযুক্ত সময়ের জন্য অপেক্ষা করো।

    এই কথোপকথন চলাকালীন কিন– ফোর দলের অবস্থা হাস্যকর দেখাচ্ছিলো; ঈষৎ ঢেউয়ে তারা একরাশি কর্কের মতো উঠছে নামছে–কিংবা বলা যায় পিয়ানো বাজাবার সময় রিডগুলো যেমন ওঠে-নামে, তাদের দশাও তখন ছিলো তেমনি।

    এবার কিন-ফো বললো, একটু-একটু হাওয়া আসছে বোধহয়।

    তাহলে পাল টাঙিয়ে দিই বরং এবার– বলে উঠলো ক্রেগ আর ফ্রাই। কিন্তু তারা যেই তাদের ছোটো মাস্তুলগুলো খাড়া করার চেষ্টা করছে, সুন হঠাৎ বিষম আতঙ্কে প্রচণ্ড আর্তনাদ করে উঠলো।

    চুপ কর, আহাম্মক! তীব্র রাগে ফিশফিশ করে উঠলো কিন-ফো, তুই কি চাস আমরা ওদের হাতে ধরা পড়ি?

    মনে হলো– তোলালো সুন, মনে হলো যেন একটা রাক্ষস–একটা ভীষণ হাঙর–দেখলাম কাছে। আমার গায়ে তার গা ঠেকে গেলো পর্যন্ত!

    তন্নতন্ন করে দেখলো ক্রেগ আশপাশে, তারপর জানালো নিশ্চয়ই সুন ভুল করেছে, হাঙরের ল্যাজের ডগাটি পর্যন্ত নেই কোথাও।

    কিন-ফো তার প্রিয় ভৃত্যটির কাঁধে হাত রাখলো। শোন, সুন, ভিতুর মতো চাচাবি না অমন–যদি তোর ঠ্যাংদুটোও ছিঁড়ে খায়, তবু চীৎকার করবি না, বুঝলি?

    ফের যদি চাঁচাবে তো, ফ্রাই যোগ করলো, তোমার জামা ছুরি দিয়ে টুকরো করে দিয়ে তোমায় সাগরের তলায় পাঠিয়ে দেয়া হবে : সেখানে তুমি যত ইচ্ছে চেঁচিয়ে, কেউ বারণ করবে না।

    এ-রকম ধাতানি খেয়ে বেচারা সুন বিন্দুমাত্র সান্ত্বনা না-পেলেও আর টু শব্দটি করতে সাহস করলো না। মনে হলো তার দুঃখকষ্ট বুঝি আর কোনোদিনও শেষ হবে না : এ-রকমভাবে আতঙ্কে বুক ঢিপঢিপ করে মরার চেয়ে সমুদ্রপীড়ার কষ্ট আর এমন কী মন্দ ছিলো!

    কিন-ফো ভুল বলেনি–সত্যি হাওয়া আসছিলো তখন। অনেক সময় মৃদু হাওয়া দেয় মাঝরাতে, সকালবেলাতেই আবার চলে যায় : এটা যদি সে-রকম কোনো হাওয়াও হয়, তবু স্যাম-ইয়েপের সঙ্গে তাদের ব্যবধান বাড়িয়ে তোলবার জন্য একে পূর্ণ মাত্রায় কাজে খাঁটিয়ে নিতে হবে। লাও-শেনের শাগরেদরা যখন আবিষ্কার করবে যে কিন-ফো আর তার কামরায় নেই, তখন তারা যে তার সন্ধানে চারপাশ তোলপাড় করে ফেলবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই, যদি তাদের একজনকেও তারা দেখতে পায়, তাহলে জাঙ্কের ওই ভারি শাম্পানটা মুহূর্তে তাদের বন্দীত্ব আরো সহজসাধ্য করে তুলবে। সেই জন্যেই সকাল হবার আগে যতদূরে যেতে পারবে, ততই তাদের মঙ্গল।

    ভাগ্যিশ হাওয়া বইছিলো পুব দিক থেকে। ওই টাইফুন তাদের কোথায় নিয়ে এসেছে, কে জানে? এটা কি লি আও-তং উপসাগর, না কি পে-চি-লি উপসাগর–না কি ভয়ংকর পীত সমুদ্র? কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। তবে হাওয়া যদি তাদের তাড়িয়ে পশ্চিমে উপকূলের দিকে নিয়ে যায়, তাহলে পাই-হো নদীর মুখে কোনো সদাগরি জাহাজ হয়তো তাদের দেখতে পেয়ে তুলে নেবে–কিংবা তীরের কাছে যে-সব জেলেডিঙি দিনরাত শশব্যস্ত ঘুরে বেড়াচ্ছে, তারাও হয়তো উদ্ধার করতে পারে তাদের। কিন্তু হাওয়া যদি পশ্চিম থেকে আসতো, আর স্যাম-ইয়েপ যদি সেই হাওয়ায় কোরিয়ার দক্ষিণে এসে পড়তো, তাহলে কিন-ফোদের উদ্ধারের কোনো আশাই থাকতো না। তাহলে হয়তো কালক্রমে বার-দরিয়ায় ভেসে চলে যেতো, কিংবা শেষটায় জাপানের উপকূলে গিয়ে ঠেকতো তাদের মৃতদেহ–পরনের এই পোশাকের জন্য মরে-যাবার পরেও ডুবতো নো, ভেসে পচে চলে যেতো ওই সূর্যোদয়ের দেশে।

    এখন রাত দশটা হবে বোধহয়। চাঁদ উঠবে মাঝরাতের একটু আগে : নষ্ট করার মতো এক মুহূর্তও সময় নেই। ক্রেগ আর ফ্রাই যেমনভাবে বলে দিলো, তেমনিভাবে পাল তুলে দেবার সব ব্যবস্থা করা হলো। ব্যবস্থাটা অবশ্যি খুবই সহজ : প্রত্যেকটা পোশাকের ডান পায়ের তলায় একটা করে মাপ-মতো গর্ত রয়েছে, ওই ছোটো লাঠিটা যাতে ওখানে ঢুকিয়ে মাস্তুলের মতো তুলে দেয়া যায়। প্রথমে তারা চিৎ হয়ে শুয়ে হাঁটু মুড়ে ডান পাটা হাতের নাগালে এনে ওই মাস্তুলটা জায়গামতো বসালো : তার আগেই অবশ্য ছোটো পালটা তারা মাস্তুলে টাঙিয়ে দিয়েছিলো। ফ্রাই আর ক্রেগের সংকেতে তারা একসঙ্গে দড়ি টেনে তেকোণা পালটার উপর দিক একেবারে মাস্তুলের ডগায় নিয়ে গেলো, তারপর দড়িটা আঁটো করে ওই ধাতব কোমরবন্ধে বেঁধে নিলো, আর পালের তলার দিকের দড়িটা হাতে শক্ত করে ধরে থেকে একটা নৌবহরের মতো ভেসে চললো।

    দশ মিনিটের মধ্যেই তারা স্বচ্ছন্দে ও নিরাপদে ভেসে-যাওয়ার কৌশল আয়ত্ত করে ফেললো। একে অন্যের মধ্যে সমান ব্যবধান রেখে তারা সহজেই ভেসে চলে গেলো : গাংচিলেরা যেমন করে হাওয়ায় ডানা ছড়িয়ে আলগোছে ভেসে যায়, তেমনিভাবেই এগিয়ে গেলো তারা। কোনো ঢেউ ছিলো না বলে তাদের এগিয়ে যেতে আরো সুবিধে হলো : জল ছলকে উঠে বা ঢেউ উঠে-নেমে তাদের চলায় কোনো ব্যাঘাত সৃষ্টি করলো না।

    সুন অবিশ্যি দু-তিনবার ক্রেগ আর ফ্রাইয়ের নির্দেশ ভুলে গিয়ে বোকার মতো ঘাড় ফিরিয়ে দেখতে গিয়েছিলো পিছনে, আর তার ফলে কয়েক টোক লবণ জল গিলেছিলো। অভিজ্ঞতা থেকেই, অবিশ্যি, পরে সে অনেকটা শিখে ফেললো। তবু ওই হাঙরের ভয় সে কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে পারছিলো না। তাকে অবিশ্যি ব্যাখ্যা করে বোঝানো হলো যে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকলে বিপদের সম্ভাবনা অনেক কম থাকে, কারণ হাঙরের হাঁ এমনভাবে তৈরি যে শিকারের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে চিৎ না-হলে চলে না, সেই জন্যই কোনো ভাসমান বস্তুকে কামড়ে ধরা তার পক্ষে কঠিন; তাকে আরো বলা হলো যে সব আমিষখোর জীবই সাধারণত সচল কোনো-কিছুর চেয়ে নিস্তেজ বা নিষ্প্রাণ দেহই বেশি পছন্দ করে। সুন তো শুনেই ঠিক করে ফেললো যে আর কখনো সে স্থির হয়ে পড়ে থাকবে না। আর এই সংকল্প করার সঙ্গে-সঙ্গেই আগের চেয়ে অনেক ভালো বোধ করলো সে।

    প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে ভেসে চললো এই অদ্ভুত বহর। এর চেয়ে কম সময়ে জাঙ্কের পাল্লা পেরিয়ে যাওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব ছিলো না–আবার এর চেয়ে বেশি দূর গেলে হয়তো একেবারে অবসন্ন হয়ে পড়তো। এর মধ্যেই তো ওই পালের দড়ি টেনে ধরে থাকার জন্য হাতদুটো টনটন করতে শুরু করে দিয়েছে।

    থামার সংকেত করলো ক্রেগ আর ফ্রাই। তক্ষুনি পালগুলো ঢিলে করে গুটিয়ে ফেলা হলো, আর সবাই–কেবল সুন ছাড়া অবিশ্যি–খাড়া হয়ে সাবধানি অবস্থায় ফিরে এলো আবার।

    বিশ্রামের সময় পাঁচ মিনিট, ক্রেগ বললো কিন-ফোকে।

    আরেক গেলাশ ব্রাণ্ডি পাবেন এবার, জানালো ফ্রাই।

    দুটো প্রস্তাবেই কিন-ফো সাগ্রহে সম্মতি জানালো। উত্তেজক কোনো-কিছু এখন সত্যি ভারি দরকারি। জাঙ্ক ছেড়ে বেরিয়ে পড়ার কিছু আগেই সান্ধ্যভোজ চুকিয়ে ফেলেছিলো বলে আপাতত সকাল পর্যন্ত কোনো খাদ্য না-পেলেও চলবে। ঠাণ্ডাও লাগছে না মোটেই : জল আর তাদের দেহ–এই দুয়ের মধ্যে বাতাসের একটা আস্তর রয়েছে বলে ঠাণ্ডা লাগছেই না, জলে ঝাঁপিয়ে পড়ার পর থেকে গাত্ৰতাপ এখনো একফোঁটাও কমেনি।

    স্যাম-ইয়েপকে দেখা যাচ্ছে নাকি এখনো? ফ্রাই তার থলি থেকে একটি দূরবিন বার করে পুবদিকে দিগন্তের দিকে তাকালো : কিন্তু আকাশের ঝাঁপশা বাতাবরণে জাঙ্কটির কোনো চিহই দেখা যাচ্ছে না। একটু কুয়াশা পড়েছিলো

    সে-রাতে; আকাশে বিশেষ তেমন তারা নেই, অনেক দূরে শুধু মিটমিট করে কয়েকটি জ্বলছে। ক্ষীণ পাণ্ডুর চাঁদ অবিশ্যি উঠে আসবে একটু পরে হয়তো তখন কুয়াশা সরে যাবে।

    পাজিগুলো নিশ্চয়ই এখনো ভোঁশ-ভোশ করে নাক ডাকাচ্ছে, বললে ফ্রাই।

    বাতাসের সুবিধে নিলো না তো ওরা, ক্রেগ বললো।

    কিন-ফো দড়ি টেনে পালটাকে টানটান করে মেলে মিলে; আর দেরি না-করে এক্ষুনি আবার রওনা হওয়া উচিত; অন্যরাও তাকে অনুসরণ করলে তক্ষুনি–হাওয়া এখন আগের চেয়েও অনেক কমে গেছে।

    তারা যাচ্ছিলো পশ্চিমমুখো, তাই পুবদিকে যখন চাঁদ উঠবে তখন তারা দেখতে পাবে না। তবে জ্যোৎস্নায় অবশ্য বিপরীত দিগন্তও ঈষৎ উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে : আর পশ্চিম দিগন্তটাই ভালো করে দেখা দরকার তাদের। সমুদ্র আর আকাশের মিলনরেখার কোনো স্পষ্টগোল দাগের বদলে যদি ভাঙা-ভাঙা আলোছায়া আঁকাবাঁকা দাগ দেখা যায়, তবেই বুঝতে পাবে যে ডাঙা দেখা যাচ্ছে। আর উপকূল সেদিকটা যেহেতু খোলা ও খাড়িহীন, সেইজন্য অনায়াসে ও নির্বিঘ্নেই তারা তীরে গিয়ে উঠতে পারবে।

    বারোটা নাগাদ মাথার উপরে ভিজে ও স্ট্যাৎসেঁতে জলীয় বাষ্পের উপর ক্ষীণ আলো ছড়িয়ে পড়লো একটু : সমুদ্রের তলা থেকে প্রায়-বর্তুল এক চাঁদ উঠে আসছে, এটা তারই ইঙ্গিত। কিন-ফো বা তার সঙ্গীরা কেউই ঘাড় ফিরিয়ে পিছনে তাকাবার চেষ্টা করলো না। এদিকে আবার হাওয়াও এলো নবোদ্যমে, আর যেমন ওই কুয়াশার আবরণকে ছিঁড়ে উড়িয়ে নিয়ে গেলো, তেমনি তাদের পালেও ধাক্কা দিলো সজোরে–আর তার ফলে ফেনিল রেখা এঁকে তারা বেশ জোরেই এগিয়ে চললো। আবহাওয়া ক্রমেই স্বচ্ছ হয়ে আসছে; তারাগুলো আরো স্পষ্টভাবে ঝিকমিক করছে আকাশে; আর তামাটে-লাল চাঁদটি আস্তে-আস্তে উজ্জ্বল রুপোলি হয়ে উঠে চারপাশ আলো করে দিলো।

    আর তক্ষুনি ক্রেগ তীব্র স্বরে একটি দিব্যি করে বসলো। চেঁচিয়ে বললো, ওই যে, জাঙ্ক–

    পাল খাঁটিয়ে এগুচ্ছে হুড়মুড় করে, ফ্রাই অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো।

    তক্ষুনি পাল চারটে নামিয়ে নিলো তারা, মাস্তুলগুলো খুলে ফেলা হলো পায়ের তলার খোপ থেকে। সোজা হয়ে তারা পিছনে তাকিয়ে দেখলো : সত্যি, চাঁদের আলোয় দেখা গেলো জাঙ্কটি কোনো মস্ত প্রেতের মতো সবগুলো পালের বাহু বাড়িয়ে দিয়ে মাইলখানেক এগিয়ে এসেছে।

    কাপ্তেন ইন যে অবশেষে কিন-ফোর পলায়নের সংবাদ শুনে ফেলেছেন, তাতে সন্দেহ নেই। আর তক্ষুনি বেরিয়ে পড়েছেন তাদের সন্ধানে। পলাতকেরা যদি এবার আলো-পড়া জলতল থেকে চোখে না-পড়ার কোনো উপায় বের করতে না-পারে, তাহলে মিনিট পনেরোর মধ্যেই কাপ্তেন ও তার স্যাঙাৎদের হাতে ধরা পড়ে যাবে।

    মাথা নামিয়ে নিন! ক্রেগ বলে উঠলো।

    তার নির্দেশের মর্মার্থ অনুধাবন করতে কোনো অসুবিধে হলো না। পোশাকের ভিতর থেকে আরো কিছু হাওয়া বার করে দেয়া হলো, জলের আরো তলায় চলে গেলো চারজন–কেবল মুখটা ভেসে রইলো জলের উপর। নিঃশব্দে কোনো নড়াচড়া না-করে তারা রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করতে লাগলো।

    স্যাম-ইয়েপতখন দ্রুত এগিয়ে আসছে–সবচেয়ে উঁচু আর বড়ো পালটা কালো ছায়া ফেলেছে সমুদ্রে : পাঁচ মিনিটের মধ্যেই জাঙ্কটি তাদের আধমাইলের মধ্যে চলে এলো। মাল্লাদের ছোটাছুটি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তখন; কাপ্তেন ইন দাঁড়িয়ে আছেন সারেঙের খুপরিতে, হাল ধরে। হঠাৎ এমন সময় ভীষণ শোরগোল উঠলো জাঙ্কে; একদল লোক ছুটে এলো ডেকের উপর, মাল্লাদের আক্রমণ করে। ভয়ানক চাচামেচি উঠলো স্যাম-ইয়েপে : রক্ত-জল-করা ক্রুদ্ধ ও রুষ্ট গর্জন, মারমার কাট-কাট আওয়াজ, আর তারই সঙ্গে মেশা যন্ত্রণা আর হতাশা-মেশানো আর্তনাদ। তার পরেই হঠাৎ সব স্তব্ধ হয়ে গেলো একসময়; সব হৈ-চৈ থেমে গেলো মুহূর্তে; শুধু ঝপাং-ঝপাং আওয়াজ হতে থাকলো জাঙ্কের পাশে-বোঝা গেলো ডেক থেকে মৃতদেহ ছুঁড়ে ফেলা হচ্ছে জলে।

    তাহলে কাপ্তেন ইন আর তার মাল্লারা লাও-শেনের স্যাঙাৎ নন? বেচারা! ওই বোম্বেটেগুলো কফিনের মধ্যে জাহাজে উঠেছিলো কেবল জাঙ্কটা একসময় দখল করে নেবার জন্যে। যাত্রীদের মধ্যে যে কিন-ফোও আছে, তা দস্যুগুলো মোটেই জানতো না। কিন্তু যদি এখন জাঙ্কে তাকে তারা দেখতে পেতে তাহলে এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে দস্যুগুলো তাদের একফোঁটাও দয়া করতো না।

    স্যাম-ইয়েপ কিন্তু এগিয়েই এলো। চট করে প্রায় তাদের উপর এসে পড়লো, ভাগ্য নেহাই সদয় ছিলো বলে পালের ছায়া পড়লো তাদের উপর। তবু তারা চট করে ডুব দিলো জলের তলায়। আবার যখন মাথা তুললো জাঙ্কটি তখন পাশ কাটিয়ে চলে গেছে–আর তাদের কোনো ভয় নেই এখন।

    জাঙ্কটির দিকে তাকিয়েছিলো বলে প্রথমে ভেসে-আসা মৃতদেহটা তাদের চোখে পড়েনি; হঠাৎ চোখে পড়তেই দ্যাখে কাপ্তেন ইনের মৃতদেহ-বুকে একটা ছোরা বেঁধা। তাঁর ঢিলে পোশাকের অসংখ্য ভাজই তাঁকে এতক্ষণ ভাসিয়ে রেখেছে। শেষকালে যখন পোশাকটা সম্পূর্ণ ভিজে গেলো, তিনি ডুবে গেলেন চিরদিনের মতো–আর-কোনো দিনই ভেসে উঠবেন না এই সলিলশয্যা থেকে। সেই সৌম্য সদাহাস্যময় মানুষটি নেহাৎই দুর্ভাগ্যবশত চিন সমুদ্রের নৃশংস ও দুর্ধর্ষ বোম্বেটেদের হাতে নিহত হয়ে গেলেন।

    দশ মিনিট পরেই জাঙ্কটি পশ্চিম দিগন্তে মিলিয়ে গেলো–আর সেই ধূ-ধূ জলের মধ্যে বিপুল সমুদ্রে ভেসে চললো তারা চারজন : কিন-ফো, ক্রেগ, ফ্রাই আর অবসন্ন সুন।

    .

    ২০. সাগরের নেকড়ে

    তিন ঘণ্টার আগেই সকাল হয়ে এলো, আর ভালো করে আলো ফোটবার আগেই জাঙ্কটি পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে গেলো দিগন্তে। যদিও তারাও সেই দিকেই যাচ্ছিলো, তবু আগেই ন-দশ মাইল এগিয়ে গিয়েছিলো বলে স্যাম-ইয়েপের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলা তাদের পক্ষে সম্ভব হলো না।

    সুতরাং সেই দিক থেকে বিপদ আসার সম্ভাবনা আপাতত অন্তত নেই; তাই বলে অবস্থাটা মোটেই কিন্তু সন্তোষজনক নয়। যতদুরে চোখ যায় ডাঙার কোনো চিহ্নও চোখে পড়ে না; কোথায় যে আছে–পে-চি-লি উপসাগরে, না পীত সমুদ্রে–তাও এখনো ঠিক করে বুঝে উঠতে পারেনি তারা।

    অবশ্য জাঙ্কটা যে-দিকে গেছে, সেই দিকে গেলেই যে একসময়-না একসময় ডাঙা পাওয়া যাবে তাতে অন্তত সন্দেহ নেই; অল্প-অল্প হাওয়ায় কেঁপে উঠছে এখন সমুদ্র, কাজেই ওই পশ্চিম দিকেই পাল টাঙিয়ে এগুতে থাকা ভালো।

    দশ ঘন্টা ধরে কোনো খাদ্য পড়েনি পেটে; এবার এই তীব্র ক্ষুধার কিঞ্চিৎ উপশম করে নেয়া উচিত।

    প্রাতরাশটা ভালোই হবে আমাদের, ক্রেগ আর ফ্রাই জানালো।

    ছোটোহাজরির প্রস্তাবে সানন্দে সম্মতি দিলে কিন-ফো। সুন তো আহ্বাদে জিভ দিয়ে ঠোঁট দুটো একটু চেটেই নিলে : ছোটোহাজরির কথায় এবার কিয়ৎক্ষণের জন্যে হাঙরের খাদ্য হবার ভয়টা তার চলে গেলো।

    আবার সেই জলরোধক থলিটার প্রয়োজন পড়লো। ফ্রাই তার ব্যাগ থেকে খানিকটা রুটি আর কিঞ্চিৎ শুকনো মাংস বের করে আনলো : খাদ্যতালিকা অবিশ্যি কোনো নামজাদা চিনে রেস্তোরাঁর মতো বিপুল ও বিচিত্র নয়, তবু পরমানন্দে তা-ই তারা গলাধঃকরণ করলে।

    ওই থলির মধ্যে আরো-একদিনের উপযোগী খাদ্যাদি ছিলো : ক্রেগ আর ফ্রাইয়ের ধারণা তার মধ্যেই তীরে পৌঁছে যাবে। কিন-ফো অবিশ্যি তাদের এই অতি-আশার কারণটি জানতে চাইলো; উত্তরে তারা বললে যে আবার কপাল ফিরে যাচ্ছে বলেই নাকি তাদের মনে হচ্ছে: ওই ভয়ংকর জাঙ্কের হাত থেকে তারা অনায়াসে রেহাই পেয়েছে। আর কিন-ফোর প্রহরায় নিযুক্ত হবার সম্মান লাভ করার পর থেকে এ-রকম নিরাপদ অবস্থায় নাকি কোনোদিনই তারা ছিলো না। জগতের সব তাই-পিংও যদি একযোগে চেষ্টা করে তাহলেও তারা এখানে আপনাকে খুঁজে পাবে না, বললো ক্রেগ। আর আপনি যে দু-লাখ ডলারের সমান, এ-কথাটা মনে রাখলে বলতে হয় আপনি বেশ ভালোই ভেসে যাচ্ছেন জলে, যোগ করলো ফ্রাই।

    কিন-ফো হেসে ফেললো। আমি যে ভেসে যেতে পারছি, সে তো আপনাদেরই সৌজন্যে। আপনারা না-থাকলে কাপ্তেন ইনের মতোই দুর্দশা হতো আমার।

    মস্ত এক টুকরো রুটি গিলতে-গিলতে সুন বললে, আমার অবস্থাটাও কি তার চেয়ে খুব-কিছু ভালো হতো?

    কিন্তু আপনাদের এত কষ্ট বৃথা যাবে না, কিন-ফো বললে, আপনাদের কাছে আমার যে কত ঋণ তা আমি কিছুতেই ভুলবো না।

    আমাদের কাছে আপনার কোনো ঋণই নেই, বললে ক্রেগ, আমরা সেন্টেনারিয়ানের ভৃত্য মাত্র।

    আর আমাদের একমাত্র আশা এই যে, ফ্রাই যোগ করে দিলে, সেন্টেনারিয়ান যাতে কোনোকালে আপনার কাছে ঋণী না-থাকে।

    কিন্তু স্বার্থ বা উদ্দেশ্য যা-ই থাক না কেন কিন-ফো তাদের জ্বলন্ত-প্রবল আনুগত্য দেখে মুগ্ধ না-হয়ে পারলো না। এ-বিষয়ে আমরা বরং পরে আলোচনা করবো, সে বললে, লাও-শেনের কাছ থেকে একবার চিঠিটা ফেরৎ পেয়ে নিই–

    ক্রেগ আর ফ্রাই কেবল মুচকি হেসে নিজেদের মধ্যে চোখ চাওয়াচায়ি করে নিলে, কোনো কথা বললো না।

    ঠাট্টা করে সুনকে চা নিয়ে আসতে বললে কিন-ফো। এই-যে, দিচ্ছি, সুন তার প্রভুর রসিকতার উত্তরে কিছু বলে-ওঠবার আগেই বললে ফ্রাই।

    আবার তার থলি খুলে সে ছোট্ট একটা যন্ত্র বার করে আনলো– বোয়াতোর পোশাকের অচ্ছেদ্য অংশ বলে যন্ত্রটা গণ্য হতে পারে–যুগপৎ বাতি আর ছোট্ট স্টোভের কাজ চলে এটা দিয়ে। একটা কর্কের পায়ে বসানো উপরে-নিচে ছিপি লাগানো পাঁচ-ছ ইঞ্চি লম্বা একটা ফাঁপা নলচে–অনেকটা হামামগুলোয় যে ভাসন্ত তাপমান যন্ত্র দেখা যায়, তার মতো দেখতে। জলের উপর সেটা রেখে, ফ্রাই দু-হাতে দুটো ছিপে ঘুরিয়ে দিতেই নলচেটার ভিতর থেকে নীল রঙের অগ্নিশিখা বেরিয়ে এলো–বেশ বড়ো শিখাটা, মন্দ তাপ ছড়ায় না। এই রইলো আপনার উনুন, বললে ফ্রাই।

    সুন তার চোখ দুটোকে বিশ্বাস করতে পারছিলো না। রগড়ে নিয়ে ভালো করে দেখে বলে উঠলো, আরে! আপনি দেখছি জলেই আগুন জ্বালিয়ে দিলেন!

    হ্যাঁ, জল আর ক্যালশিয়াম ফসফারেট (প্রস্ফুরক খড়ি) মিশিয়েই এই আগুন বানিয়েছে ও, বললে ক্রেগ।

    যন্ত্রটা আসলে এমনভাবে তৈরি হয়েছে যাতে প্রস্ফুরক খড়ির অনন্য বৈশিষ্ট্যটি কাজে লাগানো যায় : জলের সংস্পর্শে এলেই প্রস্ফুরক খড়ি প্রস্ফুরক উজানের জন্ম দেয় আর এই গ্যাস স্বতঃস্ফূর্তভাবে জ্বলে ওঠে : জলে বা বাতাসে এই জ্বলন্ত গ্যাস কিছুতেই নেভে না। সেই জন্যই আজকাল উন্নত মানের সব জীবন-তরীতেই আলো জ্বালাবার জন্য এই গ্যাস ব্যবহার করা হয়–জল ছোঁবার সঙ্গে-সঙ্গেই দীর্ঘ অগ্নিশিখা জ্বলে ওঠে জীবন তরীতে–আর তার ফলে কোনো মিশকালো রাতেও কেউ জাহাজ থেকে জলে পড়ে গেলেও তক্ষুনি সেই শিখা দেখে তার উদ্ধারের ব্যবস্থা করা যায়।

    সেই জ্বলন্ত উজানের উপর ক্রেগ পানীয় জলে-ভরা একটা ছোটো সসপ্যান ধরে রইলো : এইসবও ওই থলি থেকেই পাওয়া। জল ফুটে উঠতেই চায়ের কেলিতে ঢেলে দিলে সে, আগেই অবশ্য কিছু চা-পাতা সেখানে ছেড়ে দেয়া হয়েছিলো। সবাই এবার চা-পাতা ভিজানো জল পান করলে : এমনকী কিন-ফো আর সুনও, চিনে কায়দায় প্রস্তুত না-হওয়া সত্ত্বেও, এই চায়ে কোনো দোষ খুঁজে পেলে না। বরং এই চা যেন তাদের ছোটো হাজরিকে একেবারে সম্পূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ করে দিলে। এখন কোথায় আছে তারা, সেটাই কেবল জানতে হবে এবার। অদূর ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই এই বোয়াতে-পোশাকে একটি করে সেক্সটান্ট ও ক্রুনোমিটার থাকবে : তখন হয়তো জাহাজডুবির পরে তারা কোথায় আছে নাবিকদের এটা বুঝতে কোনো অসুবিধেই হবে না।

    ছোটোহাজরির পর দলটা আবার পাল তুলে দিয়ে এগিয়ে চললো। হাওয়া আর বন্ধ হলো না, কয়েক ঘণ্টা ধরে ক্রমাগত বয়ে চললো, হাল ধরে দিক-নিয়ন্ত্রণ করার কোনো চেষ্টাই করতে হলো না তাদের–বাতাসই তাদের পশ্চিম দিকে নিয়ে চললো। এইভাবে চিৎ হয়ে শুয়ে ভেসে-ভেসে যাচ্ছে বলে বড় ঘুম পাচ্ছিলো তাদের : কিন্তু এ-অবস্থায় ঘুমের কথা চিন্তা করাও উচিত নয়–ঘুম-ঘুমভাবটা কাটিয়ে ওঠবার জন্য ক্রেগ আর ফ্রাই শৌখিন সাঁতারুদের মতো চুরুট ধরিয়ে টানতে লাগলো।

    বেশ কয়েকবার নানা রকম জলজন্তুর লম্ফঝম্ফ সুনকে একেবারে ভয়ে আধমরা করে রেখে গেলো; তাদের বেশির ভাগই অবশ্য নিরীহ শুশুক, পিঠ বাঁকিয়ে জলের উপর ধনুকের ছিলার মতো উঠেই আবার ভুউশ করে ডুবে গেলো তারা– বোধহয় তাদের দেশে এই অদ্ভুত আগন্তুকদের দেখে কিঞ্চিৎ ভীত আর বিস্মিতই হলো তারা। শুশুকরা কখনো একা থাকে না, ঝাঁক বেঁধে তীরের মতো ছুটে আসে তারা, আর তাদের মস্ত চিক্কণ-মসৃণ দেহ জলের তলায় পোকরাজের মতো চকচক করে ওঠে; কখনো-বা জলের উপর পাঁচ-ছ ফিট লাফিয়ে উঠছে তারা, শূন্যেই ডিগবাজি খাচ্ছে সার্কাসের জীবের মতো–আর তাতেই তাদের পেশীর নমনীয়তা স্পষ্ট হয়ে চোখে পড়ছে। প্রচণ্ড তাদের বেগ, দ্রুতগতিসম্পন্ন কোনো জাহাজের চেয়েও অনেক বেশি –দেখে কিন-ফো মনে-মনে ভাবলে এই লম্ফঝম্ফ ঝাঁকুনি ও ডিগবাজি সত্ত্বেও এরা যদি তাকে গুন টেনে নিয়ে যেতো, তাহলে বেশ ভালোই হতো।

    দুপুরবেলার দিকে হাওয়া যেন দপদপ করলো খানিকক্ষণ, তারপর একেবারেই বন্ধ হয়ে গেলো। ছোটো পালগুলি ঝুলে লেপ্টে গেলো মাস্তুলের গায়ে; পালে কোনো টানটানভাব রইলো না, পিছনে রইলো না কোনো ফেনিল শাদা রেখা।

    ভারি মুশকিল হলো তো, বললে ক্রেগ।

    হা মস্ত ঝামেলায় পড়া গেলো, সায় দিলে ফ্রাই।

    শেষটায় তারা একেবারে নিশ্চল হয়ে গেলো। নামানো হলো মাস্তুল, গোটানো হলো পাল, আর তারা সবাই এবার খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে দিগন্তের দিকে তাকালো।

    এখনো দিগন্তরেখা একেবারেই ফাঁকা। না দেখা গেলো কোনো উড্ডীন পাল, না বা ধোঁয়ার রেখা। প্রখর সূর্য জ্বলছে মাথার উপরে, হাওয়া থেকে সব আর্দ্রতা শুষে নিয়েছে সে-পালা ও তনুভূত হয়ে গেছে হাওয়া : জমাট আঠার ডবল আস্তরণ না-থাকলেও এই জলে তাদের মোটেই ঠাণ্ডা লাগতো না।

    পর-পর যা ঘটে গেছে সম্প্রতি, তাতে ক্রেগ আর ফ্রাই মনে-মনে বেশ উৎফুল্ল হয়েই উঠেছিলো, কিন্তু এবার খানিকটা অস্বস্তি বোধ না-করে পারলো না। গত ষোলো ঘণ্টায় তারা কতদূর এসেছে, তারা তার কিছুই জানে। : কোথাও কোনো ডাঙা বা চলন্ত জাহাজের চিহ্নও কেন দেখা যাচ্ছে না, এই ব্যাপারটা ক্রমশ যেন রহস্যময় ও ব্যাখ্যাতীত হয়ে উঠছে। তবু তারা কিংবা কিন-ফো এত সহজে হাল ছেড়ে দেবার পাত্র নয় : আরেকটি দিন চালিয়ে দেবার মতো খাদ্য আছে সঙ্গে–আবহাওয়াও বেশ ভালোই হঠাৎ ঝড় ওঠবার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না; তার ঠিক করলো দাঁড় বেয়েই এবার এগুবে। যাত্রার সংকেত করা হলো–লোকখনো চিৎ-সাঁতার দিয়ে কখনো বুক-সাঁতার দিয়ে ওই দাঁড়ের সাহায্যে তারা পশ্চিমদিকে এগিয়ে চললো।

    জোরে কিন্তু এগুতেই পারলো না। প্রথমত কায়িক শ্রমের অভ্যেস নেই তাদের, দ্বিতীয়ত ওভাবে বৈঠা চালানোও খুব ক্লান্তিকর। সুন বেচারার তো নালিশের অবধি রইলো না; সে এতই পিছিয়ে পড়লো যে সে যাতে তাদের ধরে ফেলতে পারে অন্যদের বারেবারে থেমে গিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করতে হলো। কিন-ফো তাকে ধমকালো, গালি-গালাজ দিলো, এমনকী ভয়ও দেখালো : কিন্তু সবই বৃথা হলো; ওই টুপির তলার তার বেণী নিরাপদ, এটা সুন জানে; কিন্তু তবু ওরা যদি তাকে ফেলেই চলে যায় এই ভয়ে সে খুব একটা পিছিয়ে পড়তেও অবশ্য সাহস করলো না কখনো।

    দুটো নাগাদ কয়েকটা গাংচিল দেখতে পেলো তারা; এটা ঠিক যে মাঝে-মাঝে গাংচিলেরা সমুদ্রের উপর অনেক দূর উড়ে চলে আসে, তবু তাদের দেখে খানিকটা ভরসা পেলো তারা : ডাঙা হয়তো কাছেই আছে, গাংচিলের আগমন হয়তো তারই পূর্বাভাস।

    ঘণ্টাখানেক পরে তারা একরাশ সিন্ধু-শৈবালের জালে জড়িয়ে পড়লো : অনেক চেষ্টাচরিত্র করে তবে তারা হাত থেকে উদ্ধার পেলে তারা; মাছ জালে পড়লে যেমন ছটফট করে চারদিকে চেষ্টা করে দ্যাখে কোনোদিক দিয়ে বেরুনো যায় কি না, তাদের অবস্থাও অনেকটা সেই রকমই হলো : শেষটায় মুক্তি পাবার জন্য ছুরি ব্যবহার করতে হলো তাদের। আর এই অভাবিত গোলযোগ আধঘণ্টা সময় নষ্ট হলো তাদের, আর মাঝখান থেকে খামকা আরো ক্লান্ত হয়ে পড়লো।

    চারটের সময় অবসাদে নির্জীব হয়ে তাদের আরেকবার থামতে হলো। হঠাৎ হাওয়া এলো আবার সজোরে, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বাতাস এবার এলো দক্ষিণ দিক থেকে। যেহেতু পালকে নিয়ন্ত্রণ করার কোনো উপায় নেই, সেই জন্য তারা পাল খাটাতেই সাহস পেলে না : কে জানে, শেষকালে উত্তরমুখো যেতে-যেতে পশ্চিমদিকে যতটুকু এগিয়েছে তাও হয়তো জলাঞ্জলি যাবে।

    থেমে রইলো তারা অনেকক্ষণ। অবসন্ন হাত-পাকে বিশ্রাম দেয়া ছাড়াও কিঞ্চিৎ খাদ্যগ্রহণ করলে তারা, কিন্তু প্রাতরাশের মতো তেমন উৎফুল্ল হলো না এই সান্ধ্যভোজ। গতিক বিশেষ সুবিধের নয় এখন; রাত্রি আসন্ন, দক্ষিণা পবনের বেগও বর্ধমান : এই অবস্থায় ঠিক যে কী করা উচিত, তা কেউ বুঝে উঠতে পারলো না।

    কিন-ফো বিরস বদনে তার বৈঠায় হেলান দিয়ে ভেসে রইলো; মুখ বোজা, জ কুঞ্চিত, বিপদের আশঙ্কার চেয়েও বিমূঢ় ভাবটাই তাতে বেশি। সুন ফ্যাচফাঁচ করে নাকি সুরে জগৎসংসারের বিরুদ্ধে নালিশ জানিয়ে চললো-হাঁচির দমক শুরু হলো তার–যেন ইনফ্লুয়েনজা হয়েছে। ক্রেগ আর ফ্রাই বুঝতে পারছিলো যে ওই ঝুলি থেকে আশু কর্তব্য নির্ধারণ করে একটা কিছু বার করে ফেলা উচিত–কিন্তু এ-অবস্থায় কী করবে তা-ই বুঝতে পারছিলো না।

    এমন সময়ে দৈবাৎ তাদের সব বিমূঢ়তার অবসান হয়ে গেলো। পাঁচটা নাগাদ দক্ষিণ দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে তারা দুজনেই একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠলো : পাল দেখা যাচ্ছে! পাল!

    তাদের ভুল হয়নি। সত্যি, প্রায় মাইল তিনেক দূরে থেকে একটা পাল-তোলা জাহাজ তাদেরই দিকে এগিয়ে আসছে–যদি হঠাৎ গতিপথ না-বদলায় তাহলে একেবারে তাদের গা ঘেঁষেই যাবে জাহাজটা। আর এক মুহূর্তও নষ্ট করা চলবে না, এক্ষুনি তার দিকে ধাবমান হতে হবে। কিছুতেই মুক্তির উপায় ফশকে ফেলা চলবে না। তক্ষুনি দাঁড় বেয়ে-বেয়ে তারা রওনা হয়ে পড়লো : আর নতুন হাওয়ায় ক্রমশ কাছে এগিয়ে আসতে লাগলো ওই জাহাজ। আসলে জাহাজ নয়, মস্ত বড়ো একটা জেলে ডিঙি, কিন্তু তা থেকে একটা জিনিশ স্পষ্ট বোঝা যায় যে ডাঙা আর খুব দূরে নয়, কারণ চৈনিক মৎস্যজীবীরা কদাচিৎ দূর সমুদ্রে মাছ ধরতে আসে।

    অন্যদের তাড়াতাড়ি আসতে বলে কিন-ফো সর্বশক্তি দিয়ে বৈঠা চালাতে লাগলো, ছোটো নৌকোর মতো দ্রুত ছিটকে যেতে লাগলো যেন সে; সুনও-সবাই যাতে তাকে ফেলে রেখেই না-চলে যায় এই ভয়ে–এত জোরে তার দাঁড় ব্যবহার করলো যে বেগে প্রভুকে বুঝি ছাড়িয়েই গেলো সে।

    আর আধমাইল গেলেই জেলে-নৌকোর কাছে গিয়ে পৌঁছুবে তারা : এখনো যদি জেলেদের কেউ তাদের লক্ষ করে না-থাকে, তখন তাদের হাঁক ডাক কানে যাবে নিশ্চয়ই। একটা ভয় অবশ্য আছে : জলের মধ্যে এমন কিম্ভুত দর্শন চারমূর্তিকে দেখে তারা না আবার ভয় পেয়ে অন্য দিকে নৌকো ছুটিয়ে দেয়। কিন্তু চেষ্টা তো তাদের করতেই হবে–হাল ছেড়ে দিলে তো চলবে না।

    প্রায় যখন কাছে এসে পড়েছে, তখন সুন-সে-ই উৎসাহে ও ভয়ে সকলের আগে ছিলো তখন–বিষম আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠলো। হাঙর! হাঙর!

    এবার আর এটা কোনো মিথ্যে আশঙ্কা নয়। দশ-বারো হাত দূরেই হাঙরের পাখনা দেখা গেলো : যে-সে হাঙর নয়, নেকড়ে হাঙর বলে একে; চিন সমুদ্রের এই হিংস্র জীবটির জল-রাক্ষস নাম যে মোটেই বেমানান নয় তা সমুদ্রের এই ভীষণ নেকড়েটিকে দেখেই বোঝা গেলো।

    ছুরি বার করো, ছুরি বার করো, চেঁচিয়ে উঠলো ক্রেগ আর ফ্রাই।

    তক্ষুনি সবাই ছুরি বার করে নিলে, কিন্তু সুন বিচক্ষণতাকেই সাহসের অন্য নাম ভেবে চটপট পিছিয়ে চলে গেছে। হাঙরটা তখন দ্রুত এগিয়ে আসছে। তাদের দিকে; এক মুহূর্তের জন্য তার সম্পূর্ণ দেহটা জলের উপর ভেসে উঠলো : সবুজ ফুটফুটওলা সেই বিকট দেহটা মুহূর্তের জন্য পুরো দেখতে পেলে তারা। অন্তত ষোলো ফুট হবে সে লম্বায়–সে যে জলের ভীষণ রাক্ষস, তাতে সত্যি কোনো সন্দেহ রইলো না।

    ধনুকের ছিলার মতো পিঠটা বাঁকিয়ে কিন-ফোর দিকে ছিটকে আসার উদ্যোগ করলে হাঙরটা; কিন-ফো মাথা গরম করলে না মোটেই, অত্যন্ত শান্তভাবে দাঁড়টায় ভর দিয়ে যেন লাফিয়ে তার সামনে থেকে চলে গেলো। ততক্ষণে ক্রেগ আর ফ্রাইও কাছে এসে পড়েছে : আত্মরক্ষা বা আক্রমণ দুয়েরই জন্য তৈরি তারা তখন।

    হাঙরটা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো ততক্ষণে, কিন্তু আবার সে শিকারের উপর লাফিয়ে পড়ার জন্য তৈরি হয়ে নিলো। তার বিকট ও প্রকাণ্ড মুখে নিষ্ঠুর

    তগুলো হিংস্র ক্ষুধায় চকচক করে উঠেছে। কিন-ফো আবারও তার দাঁড়ে ভর দিয়ে লাফাবার চেষ্টা করতে গেলো, কিন্তু হাঙরের চোয়ালে গিয়ে পড়লো দাঁড়টা, আর মটাৎ করে দু-টুকরো হয়ে ভেঙে গেলো। আবার পিঠ বাঁকিয়ে হাঙরটা তার শিকারের দিকে ছুটে আসবে, এমন সময় জল রক্তরাঙা হয়ে উঠলো। ক্রেগ আর ফ্রাই তাদের তীক্ষ্ণ ও মস্ত মার্কিন ছুরি দিয়ে এই ভীষণ জন্তুর শক্ত চামড়া ভেদ করতে পেরেছে অবশেষে। তার বিকট মুখটা হাঁ হলো একবার; তারপর দাঁতের পাটির উপর দাঁতের পাটি এসে পড়লো প্রচণ্ড জোরে। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় ছটফট করছে হাঙরটা, ল্যাজ ঝাঁপটাচ্ছে প্রবলভাবে, আর তারই এক ঝাঁপটায় ফ্রাই প্রায় দশ ফুট দূরে ছিটকে পড়লো। ক্রেগ ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠলো, যেন ওই প্রচণ্ড ল্যাজের ঝাঁপটা তারই গায়ে পড়েছে; ফ্রাই কিন্তু মোটেই জখম হয়নিঃ জমাট আঠার পোশাক তাকে আহত হওয়া থেকে বাঁচিয়েছে : দ্বিগুণ উৎসাহে সে আবার ছুরি হাতে এগিয়ে এলো আক্রমণ করতে।

    হাঙরটা তখন যন্ত্রণায় বারেবারে পাক খাচ্ছে। কিন-ফো তার ভাঙা দাঁড়টা হাঙরের চোখে চেপে ধরার চেষ্টা করলো : এত কাছে ছিলো যে আরেকটু হলে ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতো সে, কিন্তু তবু প্রাণপণে দাঁড়টা সে তার চোখে বিধিয়ে দিয়ে চেপে রইলো, আর ক্রেগ আর ফ্রাই তার বুকে ছুরি বসিয়ে দেবার চেষ্টা করলো আপ্রাণ। অবশেষে তাদের চেষ্টা সফল হলো বোধহয়, কারণ একবার প্রচণ্ডভাবে ছটফট করেই হাঙরটা ওই রাঙা জলে ডুবে গেলো।

    হুরে! হুরে! বিজয়োল্লাসে ছুরি নাচাতে-নাচাতে চেঁচিয়ে উঠলো ক্রেগ আর ফ্রাই।

    ধন্যবাদ! রুদ্ধশ্বাস কিন-ফো কেবল তার কৃতজ্ঞতা জানাতেই পারলে, ধন্যবাদ!

    ধন্যবাদের কোনো দরকার নেই, বললে ক্রেগ, ওই রাক্ষুসে জানোয়ারের মুখে দু-লাখ ডলার চলে যাক, এটা কে চায়!

    ফ্রাই সোৎসাহে তার কথা সমর্থন করলে।

    কিন্তু সুন তখন কোথায়? ভিতুর ডিম, সবেগে বৈঠা চালিয়ে সে তখন জেলেডিঙির অতি কাছে গিয়ে পৌঁছেছে। কিন্তু তার এত সাবধানতা বুঝি ক্রন্দনেই শেষ হয়!

    ধীবরেরা হঠাৎ নৌকোর কাছে এমন অদ্ভুত একটা জলজন্তু দেখে ধরবার জন্য শশব্যস্ত হয়ে উঠলো; কোনো সীল মাছ বা শুশুক যেভাবে ধরে, সেইভাবেই তারা ওপর থেকে মস্ত বঁড়শিওলা একটা দড়ি ফেলে দিলে জলে, বঁড়শিটা সুনের কোমরবন্ধে আটকে গেলো, তারপর একটু পিছলে গিয়ে তার ওই জমাট আঠার পোশাক চিরে পিঠ আঁচড়ে দিলো। কেবল ওই পাজামাটাই আছে তখন তার : মুণ্ডু রইলো জলের তলায়, পা-দুটো শূন্যে, আর ওই অবস্থায় বঁড়শি-বেঁধা সুন ডিগবাজি খেলো জলে।

    কিন-ফো, ক্রেগ আর ফ্রাই ততক্ষণে কাছে পৌঁছেছে; স্পষ্ট সুবোধ্য চিনে ভাষায় তারা ধীবরদের ডাকতে লাগলো। কথা-কওয়া সীল মাছ দেখে ধীবরদের মধ্যে তো বিষম আতঙ্কের সাড়া পড়ে গেলো। প্রথমে তারা পাল খাঁটিয়ে চম্পট দেবার মলব করলে, কিন্তু অবশেষে কিন-ফো ছোটোখাটো বক্তৃতা দিয়ে যখন তাদের বোঝাতে পারলো যে সে আসলে একজন চৈনিক মাত্র তবেই ধীবরেরা তাকে আর ওই দুই মার্কিনকে নৌকোয় তুলে নিল। তারপর সুনকে আস্তে-আস্তে টেনে তোলা হলো দড়ি টেনে, আর একটি ধীবর তাকে তুলে নেবার জন্য তার বেণী ধরে টান দিলে সজোরে। আস্ত বেণীটাই খশে চলে এলো তার হাতে, আর সুন অমনি আবার ঝপাৎ করে জলে গিয়ে পড়লো। অবশেষে নানা কসরৎ করে তার কোমরে দড়ি জড়িয়ে ধীবরেরা তাকে নৌকোয় তুলে আনতে পারলে।

    পেটের সব লবণজল ওয়াক-ওয়াক করে দেবার সময় দিলো না কিন-ফো, সুনের কাছে গিয়ে বললো : তাহলে তোর ওটা নকল বেণী? পরচুলা?

    হ্যাঁ, হুজুর, বললে সুন, আপনার মেজাজ তো জানতাম। আসল বেণী নিয়ে আপনার কাছে চাকরি করার সাহস ছিলো নাকি আমার!

    এমন করুণ ও কাতর গলায় সে কথাটা বললে যে কিন-ফো আর হাসি চাপতে পারলে না : অন্যদের সঙ্গে হো-হো করে হেসে উঠলো।

    ধীবরদের ডেরা নাকি ফু-নিন-এই, যেখানে যাবার জন্য কিন-ফো ব্যাকুল হয়েছিলো বলেই এত কাণ্ড; ফু-নিন বন্দর নাকি আর মাত্র পাঁচ মাইল দূরে, জানতে পারলো তারা।

    সেদিনই সন্ধে আটটা নাগদ তারা নিরাপদে ফু-নিন-এ অবতরণ করলে : বোয়াতো পোশাক ছেড়ে আবার সাধারণ পোশাকে জেটিতে এসে পা দিলে তারা।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleজুল ভের্ন অমনিবাস ৫ (পঞ্চম খণ্ড) – অনুবাদ : মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    Next Article জুল ভের্ন অমনিবাস ৩ (তৃতীয় খণ্ড) – অনুবাদ : মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

    Related Articles

    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

    জুল ভের্ন অমনিবাস ১ (প্রথম খণ্ড) – অনুবাদ : মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

    November 14, 2025
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

    জুল ভের্ন অমনিবাস ৪ (চতুর্থ খণ্ড) – অনুবাদ : মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

    November 14, 2025
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

    জুল ভের্ন অমনিবাস ৩ (তৃতীয় খণ্ড) – অনুবাদ : মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

    November 14, 2025
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

    জুল ভের্ন অমনিবাস ৫ (পঞ্চম খণ্ড) – অনুবাদ : মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

    November 14, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026
    Our Picks

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026

    হেরুক – সৌমিত্র বিশ্বাস

    March 24, 2026

    বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)

    March 24, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }