Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026

    ভুতুড়ে ট্রেন – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026

    ব্রাহ্মণ ভূত – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    জুল ভের্ন অমনিবাস ৩ (তৃতীয় খণ্ড) – অনুবাদ : মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

    জুল ভার্ন এক পাতা গল্প289 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    ২.১-২.৪ আরেকটা রহস্যময় ঘটনা

    দ্য মিস্টিরিয়াস আইল্যাণ্ড ২
    পরিত্যক্ত

    ২.১ আরেকটা রহস্যময় ঘটনা

    ঠিক সাত মাস আগে বেলুন-যাত্রীর দল মার্কিন মুলুক থেকে গৃহযুদ্ধের একেবারে মাঝখানে লিঙ্কন আইল্যাণ্ডে এসে পড়েছিলেন। সেই সময়টুকুর মধ্যে তারা যতদূর অনুসন্ধান করেছেন, তার মধ্যে কোনো মানুষ চোখে পড়েনি। দ্বীপে যে কোনো মানুষ থাকে, তার কোনো প্রমাণ এর মধ্যে পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া, দ্বীপে যে কোনোকালে কোনো মানুষ পদার্পণ করেনি, দ্বীপের চারদিক ঘুরে সেই ধারণাই তাদের মনে বদ্ধমূল হয়েছিল। কিন্তু এক মুহূর্তের মধ্যেই তাদের সেই বদ্ধমূল ধারণা ধূলিসাৎ হয়ে গেল। পেনক্র্যাফটের দাঁত যা ভেঙেছে তা একটি বুলেট, আর বুলেটটি নিঃসন্দেহে কোনো বন্দুক থেকে বেরিয়ে এসেছে। আর, মনুষ্যেতর কোনো প্রাণী নিশ্চয়ই বন্দুক ব্যবহার করে না।

    পেনক্র্যাফট যখন বুলেটটি টেবিলের উপর রাখলে, সবাই বিস্ময়-বিমূঢ় চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। এই ঘটনা থেকে যে-সব ব্যাপার ঘটবার সম্ভাবনা আছে, নিমেষের মধ্যে তাও একের পর এক তাদের মনে জেগে উঠল। অতিপ্রাকৃত কোনো-কিছু ঘটলেও বোধহয় তারা এত বিমূঢ় হয়ে পড়তেন না। সাইরাস হার্ডিং বুলেটটা হাতে তুলে নিলেন, বারকয়েক ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখলেন সীসের বলটি, হাতের তালুতে বারকয়েক গড়িয়ে নিলেন, তারপর পেনক্র্যাফটের দিকে তাকিয়ে বললেন : তুমি ঠিক জানো, যে-পিকারিটি এই বুলেটে আহত হয়েছে সেটির বয়েস তিন মাসের বেশি হবে না?

    অসম্ভব। পেনক্র্যাফট উত্তর করলে : পিকারিটির বয়স কোনোমতেই তিন মাসের বেশি হতে পারে না। ফাঁদে যখন এটিকে আমি দেখতে পাই, তখনও এ মায়ের দুধ খাচ্ছিল।

    হুঁ! আরো গম্ভীর হল হার্ডিং-এর মুখ। তাই থেকে প্রমাণ হয় যে তিন মাসের মধ্যে অন্তত একবার এই দ্বীপে গুলি ছোঁড়া হয়েছে!

    এবং সেই গুলিতে একটি প্রাণী আহত হয়েছে। স্পিলেট যোগ করলেন।

    তার তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না। বললেন সাইরাস হার্ডিং : এই ঘটনা থেকে এইসব ধারণা করা যায় যে, আমাদের আসবার আগেও দ্বীপে কোনো মানুষ ছিল, কিংবা তিন মাসের মধ্যে কোনো ব্যক্তি এই দ্বীপে এসে পৌঁছেছে। এই লোকগুলো কিংবা লোকটি কি প্রায়ই এখানে আসে, না হঠাৎ কোনো জাহাজড়ুবির ফলে এসে পৌঁছেছে, সে-প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু সেই লোকেরা ইওরোপীয় কিংবা মালয় বোম্বেটে, শত্রু কিংবা মিত্র—যা-ই হোক না কেন, আগে থেকে কিছু আন্দাজ করবার কোনো উপায় নেই। এখনও তারা এই দ্বীপে আছে, না দ্বীপ ছেড়ে চলে গেছে, তাও আমরা জানি না। কিন্তু এই প্রশ্নগুলো এত গুরুত্বপূর্ণ যে, যে করেই হোক শিগগিরই এর উত্তর আমাদের পেতেই হবে।

    অসম্ভব। পেনক্র্যাফট তড়াক করে চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠল : আমরা ছাড়া লিঙ্কন আইল্যাণ্ডে আর-কোনো লোক থাকে না, থাকতে পারে না। দ্বীপটা তো আর খুব বড়ো নয়! যদি অন্য লোকেরা এই দ্বীপে থাকত, তবে এতদিনে নিশ্চয়ই অন্তত তাদের একজনেরও দেখা আমরা পেতুম।

    না-থাকলেই ভালো। কিন্তু বিপরীতটা অত্যন্ত বিস্ময়কর হলেও বাস্তব হতে পারে। হার্বার্ট বললে।

    যদি মনে করতে হয় যে পিকারিটি তার দেহে একটি বুলেট নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছিল, তবে তা-ই হবে সবচেয়ে বিস্ময়কর। স্পিলেট বললেন।

    হার্ডিং বললেন : এ-কথা সন্দেহাতীতভাবে সত্যি যে, তিন মাসের মধ্যে অন্তত একটি বন্দুক এই দ্বীপে গর্জে উঠেছে। নিশ্চয়ই অল্পদিনের মধ্যে এই দ্বীপে জনসমাগম হয়েছে, কেননা মাউন্ট ফ্র্যাঙ্কলিনের চুড়ো থেকে যখন আমরা সারা দ্বীপ পর্যবেক্ষণ করেছিলুম, তখন যদি কেউ এই দ্বীপে থাকতো তবে নিশ্চয়ই তা দেখতে পেতুম। এমনও হতে পারে, কয়েক হপ্তার মধ্যে জাহাজড়ুবি হয়ে কোনো-কেউ এই দ্বীপে এসে উঠেছে। তবে এখনও কিছু ঠিক করে বলা চলে না।

    আমাদের খুব সাবধান হতে হবে। সাংবাদিকের কণ্ঠস্বর শোনা গেল।

    আমিও তাই বলি, বললেন হার্ডিং, কেননা, মালয় দারাও এ-দ্বীপে আসতে পারে।

    পেনক্র্যাফট বললে : সারা দ্বীপ আমাদের খুঁজে দেখতে হবে। কিন্তু তার আগে একটা ক্যানু তৈরি করলে ভালো হয় না কি, ক্যাপ্টেন? এর সাহায্যে আমরা নদীপথেও অনুসন্ধান চালাতে পারবো-দ্বীপের উপকূলভাগও ঘুরে দেখতে সুবিধে হবে।

    তোমার পরিকল্পনা খুব ভালো, কিন্তু আমরা সেজন্যে অপেক্ষা করতে পারি না। একটা চলনসই নৌকো বানাতে কম করেও একমাস সময় লাগবে।

    হ্যাঁ, যদি একটা সত্যিকার ভালো নৌকো তৈরি করি। কিন্তু আমরা তো আর সমুদ্রযাত্রা করছি না। মার্সি নদীতে চলাচলের উপযোগী একটা ক্যান তৈরি করতে পাঁচদিনের বেশি সময় লাগবে না।

    পাঁচ দিন লাগবে একটা নৌকো বানাতে? নেব চেঁচিয়ে উঠল।

    হ্যাঁ, নেব। রেড-ইণ্ডিয়ানদের ধরনের একটা নৌকো বানাতে এর বেশি সময় লাগবে না।

    কাঠের নৌকো? তখনো নেবের কৌতূহল অপগত হয়নি।

    হ্যাঁ, কাঠের নৌকো। আমি আবারও বলছি ক্যাপ্টেন, পাঁচ দিনের মধ্যেই কাজ শেষ হয়ে যাবে।

    যদি পাঁচদিনের মধ্যে তৈরি করা যায়, তাহলে ভালো। হার্ডিং বললেন : কিন্তু একদিন আমাদের খুব সতর্ক থাকতে হবে। গ্র্যানাইট  হাউসের আশপাশের অরণ্যের মধ্যেই একদিন তোমাদের শিকার সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।

    পেনক্র্যাফটের আশা আর পূর্ণ হল না। তার ভোজ-পর্ব অবশ্য তারপরে নিরাপদভাবেই শেষ হল। তাহলে এই দ্বীপে এঁরা ছাড়াও অন্য লোক আছে। বুলেট যখন পাওয়া গেছে, তখন আর এই সম্পর্কে কোনো প্রশ্নই উঠতে পারে না। এবং এই আবিষ্কারে এঁদের আশঙ্কা ও অস্বাচ্ছন্দ্য বিপুল পরিমাণে বেড়ে গেল।

    সাইরাস হার্ডিং আর গিডিয়ন স্পিলেট ঘুমোতে যাওয়ার আগে ব্যাপারটা সম্পর্কে খানিকক্ষণ আলোচনা করলেন। এই ঘটনার সঙ্গে কি দ্বীপে-ঘটে-যাওয়া রহস্যময় ঘটনাগুলোর কোনো সম্পর্ক আছে? খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে ব্যাপারটা সম্পর্কে আলোচনা করে হার্ডিং বললেন : ভালো কথা, এই ঘটনা সম্পর্কে আপনি কি আমার অভিমত জানতে চান? আমার অভিমত হল, যত আঁতিপাঁতি করেই দ্বীপটা আমরা খুঁজে দেখি না কেন, আমরা কিন্তু কিছুই দেখতে পাবো না।

    পরদিনই পেনক্র্যাফট তার কাজে লেগে গেল। মার্সি নদীতে চলাচলের উপযোগী ছোটোখাটো একটা সাধারণ ক্যানু বানাবে বলেই ঠিক করেছিল সে। ঝড়ে অরণ্যের অনেকগুলো বড়ো-বড়ো গাছ উপড়ে পড়েছিল, সুতরাং কাঠের জন্যে ওঁদের আর ভাবতে হল না।

    সেইদিনই হার্বার্ট একটি খুব উঁচু গাছের আগায় উঠে সারা দ্বীপটা তন্ন-তন্ন করে দেখেছিল। কিন্তু বলা বাহুল্য, সন্দেহজনক কিছুই তার চোখে পড়েনি। অনেকক্ষণ ধরে সে চারদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছিল। কিন্তু না, কোথাও কিছুই নেই।

    সাইরাস হার্ডিং চুপচাপ হার্বার্টের অনুসন্ধানের ফলাফল শুনলেন, তারপর বারকয়েক মাথা ঝাঁকালেন; কিন্তু কিছুই বললেন না। বোঝা গেল, গোটা দ্বীপটা তন্ন-তন্ন করে খুঁজে না-দেখলে এই সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্ত করা চলবে না।

    এর দু-দিন পরেই, আটাশে অক্টোবর এমন-একটি ঘটনা ঘটল যে তার জন্যে একটা সন্তোষজনক ব্যাখ্যা খুবই জরুরি হয়ে পড়ল। গ্র্যানাইট  হাউস থেকে দু-মাইল দূরে সমুদ্রসৈকতে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে অকস্মাৎ হার্বার্ট আর নে একটি বিরাটাকার কচ্ছপ দেখতে পেলো। দেখেই হার্বার্ট চেঁচিয়ে উঠল : নেব শিগগির এসে আমায় সাহায্য করো।

    নেব দৌড়ে হার্বার্টের কাছে এসে দাঁড়াল।কী বিরাট জানোয়ারটা। কিন্তু কী করে এটাকে ধরা যায়?

    এর চেয়ে সোজা আর-কিছু নেই, নেব। উত্তর করলে হার্বার্ট : যদি আমরা কোনোমতে এটাকে উলটে ফেলতে পারি, তবে এটা আর পালাতে পারবে না। তাড়াতাড়ি তোমার কুড়ুলটা নিয়ে এসো তো!

    বিপদ বুঝতে পেরেই কচ্ছপটা তার পাগুলো আর মুখটা ভিতরে ঢুকিয়ে নিয়ে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। হার্বার্ট আর নেব তাদের কুড়ল কচ্ছপটার দেহের নিচে ঢুকিয়ে চাপ দিয়ে ওটাকে উলটে ফেললে। কচ্ছপটা প্রায় তিন ফুট লম্বা, আর তার ওজন হবে প্রায় চারশো পাউণ্ড।

    চমৎকার! নে চেঁচিয়ে উঠল : পেনক্র্যাফট এটার কথা জানতে পারলেই আহ্বাদে আটখানা হয়ে উঠবে। কিন্তু এখন এটাকে নিয়ে কী করা যায়? যে-রকম ওজন, তাতে এটাকে গ্র্যানাইট  হাউসে তো নিয়ে যেতে পারবো না!

    এখানেই পড়ে থাক। উত্তর করলে হার্বার্ট : একবার যখন এটাকে উলটে ফেলতে পেরেছি, তখন এটা আর-কখনও পালাতে পারবে না। কাঠের গাড়িটা এনে এটাকে গ্র্যানাইট  হাউসে নিয়ে যাওয়া যাবে। কাজের সুবিধের জন্যে হার্ডিং-এর নির্দেশে তারা একটা কাঠের গাড়ি আগেই প্রস্তুত করে নিয়েছিল।

    ফিরে-যাওয়ার আগে হার্বার্ট আর নেব কচ্ছপটার চারপাশে বড়ো-বড়ো কয়েকটা পাথর দিয়ে একটা দেয়ালের মতো তৈরি করলে। তারপর সমুদ্রে-সৈকত ধরে-ধরে ওরা দুজনে গ্র্যানাইট  হাউসে ফিরে এল। পেনক্র্যাফটকে একেবারে তাক লাগিয়ে দেয়ার জন্যে হার্বার্ট কচ্ছপটার খবর আর কারু কাছে ভেঙে বললে না। দু-ঘণ্টা পরে ওরা দুজনে কাঠের গাড়ি নিয়ে সমুদ্র সৈকতে ফিরে এলো। কিন্তু, কী আশ্চর্য! কচ্ছপটাকে আর সেখানে দেখা গেল না। অবাক হয়ে দুজনে দুজনের মুখের দিকে তাকালে। পাথরগুলো তখনও সে-জায়গায় পড়ে আছে, কিন্তু কচ্ছপটারই শুধু দেখা নেই।

    নেব বললে : তাহলে এই জন্তুগুলো আপনা-আপনিই উলটে যেতে পারে?

    তা-ই তো দেখা যাচ্ছে! হতবুদ্ধি হয়ে বললে হার্বার্ট : এটা এমনিভাবে অদৃশ্য হয়ে গেছে শুনে নিশ্চয়ই ক্যাপ্টেন হার্ডিংও হতভম্ব হয়ে যাবেন।

    নেব ঠিক করে ফেললে তাদের এই দুর্ভাগ্যের কথা কাউকে বলবে না। সে বললে : এই ব্যাপারটা কাউকে বলা চলবে না।

    না নেব, বরং ঠিক তার উলটো। এই ব্যাপারটা বলতেই হবে আমাদের। বললে হার্বার্ট।

    তারপর দুজনে খালি গাড়িটাই ঠেলতে ঠেলতে গ্র্যানাইট  হাউসে ফিরে এলো। হার্ডিং, স্পিলেট আর পেনক্র্যাফট তখন নৌকোর কাজে ব্যস্ত। কী-কী ঘটেছে, সংক্ষেপে হার্বার্ট সবাইকে খুলে বললে। পেনক্র্যাফট তো শুনেই চেঁচিয়ে উঠল : মহামূখ!

    কিন্তু নেব বললে : আমাদের কোনো দোষ নেই! আমরা ওটাকে উলটে রেখে এসেছিলাম।

    তাহলে তোমরা ভালো করে উলটে রাখোনি। বললে পেনক্র্যাফট।

    তখন হাবার্ট খুলে বললে কচ্ছপটা যাতে পালাতে না-পারে তার জন্যে কী সতর্ক ব্যবস্থা তারা অবলম্বন করেছিল।

    শুনে পেনক্র্যাফ্ট বললে : ব্যাপারটা তাহলে সম্পূর্ণ অলৌকিক!

    ক্যাপ্টেন, আমি ভেবেছিলুম, হার্বার্ট বললে, একবার কচ্ছপদের উলটে দিতে পারলে তারা আর-কখনো পালাতে পারে না।

    সে-কথা সত্যি। হার্ডিং বললেন : আচ্ছা, বলো তো সমুদ্র থেকে কত দূরে তোমরা ওটাকে উলটে রেখে এসেছিলে?

    খুব বেশি হলে পনেরো ফুট দূরে হবে। তখন ভাটার সময়, না?

    হ্যাঁ, ক্যাপ্টেন।

    হার্ডিং বললেন : বালির মধ্যে কচ্ছপরা যা করতে পারে না জলের মধ্যে তা পারে। জোয়ার এলে পর জলের মধ্যে এটা হয়তো নিজেই উলটে গিয়েছিল, তারপর আস্তে-আস্তে

    গভীর সমুদ্রে চলে গেছে।

    কী গর্দভ আমরা! নেব বললে : এই সোজা ব্যাপারটাও আমরা এতক্ষণ বুঝতে পারিনি।

    পেনক্র্যাফট বললে, ঠিক এই কথাটাই আমি তোমাদের বলতে যাচ্ছিলাম।

    সাইরাস হার্ডিং যে-ব্যাখ্যাটা দিলেন, নিঃসন্দেহে তা গ্রহণযোগ্য। কিন্তু তিনি নিজেই কি সেই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হয়েছিলেন? এমন কথা কোনোমতেই বলা চলে না।

    ***

    নয়ই অক্টোবর ক্যানুটা তৈরি হয়ে গেল। পেনক্র্যাফট তার প্রতিজ্ঞা রেখেছে, পাঁচ দিনের মধ্যেই ক্যানু সম্পূর্ণ করেছে। লম্বায় বারো ফুট হবে ক্যানুটা, আর ওজনে কোনোমতেই দুশো পাউণ্ডের বেশি নয়। ক্যানুটাকে জলে ভাসাতে কোনো অসুবিধেই হল না। ক্যানুটাকে বয়ে নিয়ে-যাওয়া হল তীরের বেলাভূমিতে-ভরা জোয়ারের সময় আপনা থেকেই জলে ভাসল ক্যানটা? পেনক্র্যাফট উৎফুল্ল কণ্ঠে জানালে যে ভালোভাবেই কাজ সাঙ্গ হয়েছে। প্রথমে একে পরীক্ষা করে দেখা হবে ঠিক হল।

    সবাই গিয়ে বসলেন ক্যানুতে। পেনক্র্যাফ্ট ক্যানু ছেড়ে দিলে। আবহাওয়া তখন চমৎকার। জলও শান্ত। নিরাপদেই ক্যানুটা মার্সি নদীর ধীর স্রোতে এগিয়ে চলল। হার্বার্ট আর নেব বৈঠা চালাতে লাগল, আর পেনক্র্যাট হাল ধরে বসে রইল। দক্ষিণ থেকে একটু হালকা হাওয়া বইছিল। দুই বৈঠার জোরে অনায়াসেই এগিয়ে চলতে লাগল ক্যানু। গিডিয়ন স্পিলেট একহাতে পেনসিল অন্য হাতে নোটবুক নিয়ে আলতোভাবে তীরের একটা স্কেচ করে চলছিলেন।

    নেব, হার্বার্ট আর পেনক্র্যাফট দ্বীপের এই নতুন অংশে ভ্রমণ করতে-করতে কথা বলছিল। সাইরাস হার্ডিং নিঃশব্দে তীরের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তার দৃষ্টি দেখে মনে হচ্ছিল তিনি যেন কোনো আশ্চর্য দেশে এসে পড়েছেন।

    প্রায় পৌনে-এক ঘণ্টা চলবার পর ক্যানু ম্যাণ্ডিবল অন্তরীপের একেবারে সম্মুখবিন্দু পর্যন্ত এসে পৌঁছল। পেনক্র্যাফট তখন ফেরবার উদ্যোগ করতে লাগল। এমন সময় হার্বার্ট উঠে দাঁড়িয়ে একটা কালো জিনিশের দিকে তর্জনী নির্দেশ করে বললে তীরের ওই জিনিশটা কী, বলুন তো?

    তক্ষুনি নির্দিষ্ট দিকে তাকালেন সকলে। সাংবাদিক বললেন : কিছু-একটা আছে ওখানে। মনে হচ্ছে কোনো জাহাজের ভাঙা টুকরো।

    আমি দেখতে পেয়েছি জিনিশটা! চেঁচিয়ে উঠল পেনক্র্যাফট : সিন্দুক, সিন্দুক! মনে হয় জিনিশপত্রে ভরা।

    সাইরাস হার্ডিং বললেন, তীরে নৌকো ভেড়াও।

    বারকয়েক বৈঠা চালানোর পর নৌকো এসে ঠেকল। সবাই তীরে নামলেন। না, পেনক্র্যাফট কোনো ভুল করেনি। দুটো সিন্দুক সেই তীরের বালুরাশির মধ্যে অর্ধপ্রোথিত হয়ে পড়ে আছে।

    হার্বার্ট বললে : তাহলে এই দ্বীপের কোনো অংশে জাহাজড়ুবি হয়েছে!

    তা-ই তত মনে হচ্ছে, উত্তর করলেন স্পিলেট।

    সদা-অস্থির পেনক্র্যাফটের কৌতূহল আর-কোনো বাধা মানল না। কিন্তু কী আছে এই সিন্দুকে? কী আছে? বন্ধ দেখছি সিন্দুকটা-খুলবো কী করে? একটা বড়ো-শড়ো পাথরের টুকরো দিয়ে অবিশ্যি—এই বলে সে বড়ো একটা পাথর তুলে নিলে হাতে।

    তক্ষুনি হার্ডিং তাকে বাধা দিলেন : পেনক্র্যাফট, বললেন তিনি : একঘণ্টার জন্যেও কি তুমি একটু সুস্থির হতে পারবে না?

    কিন্তু ক্যাপ্টেন, ভাবুন তো—হয়তো এখানে আমাদের অভাব মেটানোর উপযোগী সবকিছুই আছে!

    সে আমরা কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখতে পাবো, পেনক্র্যাফট, উত্তর করলেন হার্ডিং : কিন্তু এখন সিন্দুকটা ভাঙবার কোনো দরকার নেই। আর-কিছু কাজে লাগুক না-লাগুক, ভেঙে এটাকে নষ্ট করবে কেন? আগে গ্র্যানাইট  হাউসে নিয়ে যাই, সেখানে সহজেই সিন্দুক না-ভেঙে খোলবার ব্যবস্থা করা যাবে।

    ঠিক, বললে পেনক্র্যাফট, আপনার কথাই ঠিক, ক্যাপ্টেন।

    তখন সিন্দুক দুটিকে জলে ভাসিয়ে দেয়া হল, তারপর বেঁধে দেয়া হলো ক্যান সঙ্গে। এইভাবে সহজেই ভাসিয়ে-ভাসিয়ে সিন্দুকটিকে গ্র্যানাইট  হাউসে নিয়ে যাওয়া যাবে অনেক পরিশ্রমও বাঁচবে। কিন্তু এখন প্রশ্ন হল, এই সিন্দুক দুটি এলো কোত্থেকে? চারদিক আঁতিপাঁতি করে খুঁজে দেখলেন সকলে। কিন্তু সন্দেহজনক কিছুই চোখে পড়ল না। কিন্তু তা সত্ত্বেও এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহই নেই যে, কাছাকাছি কোথাও নিশ্চয়ই কোনো জাহাজড়ুবি হয়েছে। বুলেটের সঙ্গে কি এই জাহাজড়ুবির কোনো সম্পর্ক আছে? দ্বীপের অন্য-কোনো অংশে কি নতুন-কোনো আগন্তুক দলের আবির্ভাব ঘটেছে? এখনও আছে কি তারা এখানে? তবে এ-কথা ঠিক যে, এই আগন্তুকরা মালয় বোম্বেটে নয়, কেননা সিন্দুকের গড়ন দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, এর নির্মাতা কোনো মার্কিন কিংবা ইওরোপীয়।

    গ্র্যানাইট  হাউসে এনে সিন্দুক দুটিকে অতি সন্তর্পণে খোলা হল। সিন্দুক দুটি তখনও খুব ভালো অবস্থায় ছিল, তাতে বোঝা গেল যে খুব বেশিক্ষণ জলে ভাসেনি। সিন্দুক খুলতে গিয়ে বোঝা গেল যে, যাতে স্যাৎসেতে না-হয়ে যায় সেইজন্যে খুব ভালো করে প্যাক করা হয়েছিল।

    সিন্দুকের ডালা খুলতেই সবাই একসঙ্গে ঝুঁকে পড়লেন। সঙ্গে সঙ্গে সবাই আনন্দে চেঁচিয়ে উঠলেন। এমন-কোনো জিনিশ নেই যা এই সিন্দুকে নেই। যেন দ্বীপবাসীদের সুবিধের দিকে নজর রেখেই কেউ জিনিশপত্রগুলো সিন্দুকে থরেথরে সাজিয়ে রেখেছে। যন্ত্রপাতি, হাতিয়ার তৈরির সূক্ষ্ম কলকজা, কাপড়-চোপড় বই-পত্র-কী-যে ওই সিন্দুক দুটোয় নেই তা ভেবে বলা অসম্ভব। অল্পক্ষণের মধ্যেই স্পিলেট তার নোটবইয়ে জিনিশপত্রগুলোর একটা তালিকা তৈরি করে ফেললেন। সেই ফিরিস্তিতে কী-কী ছিল পাঠকদের সুবিধের জন্যে তা হুবহু নিচে তুলে দেয়া হল :

    যন্ত্রপাতি : একাধিক-ফলাওলা তিনটি ছুরি, দুটি কুঠার, দুটি করাত, তিনটি হাতুড়ি, স্কেল, দুটি অ্যাজ (adzcs), একটি শাবল, ছ-টি চিজেল, দুটি ফাইল, তিনটি ব্র্যাদা, দুটি খুন্তি, দশটি ব্যাগ-ভর্তি পেরেক আর স্কু, বিভিন্ন আকারের তিনটি দা, দু-বাক্স সূঁচ।

    হাতিয়ার : দুটি ফ্লিট-লক বন্দুক, দুটি কার্তুজ বন্দুক, দুটি হালকা ওজনের রাইফেল, পাঁচটি বড়ো কুঠার, চারটি কৃপাণ, পচিশ পাউণ্ড ওজনের দুটি বাক্স-ভর্তি বারুদ, বারোটি কার্তুজের বাক্স।

    সূক্ষ্ম কলকজা একটি সেক্সটান্ট, একটি অপেরা-গ্লাস, একটি টেলিস্কোপ, একবাক্স জ্যামিতিক যন্ত্রপাতি, একটি নাবিকদের কম্পাস, একটি ফারেনহাইট থার্মোমিটার, একটি ব্যারোমিটার, একটি বাক্সের মধ্যে ফোটো তোলবার সব সরঞ্জাম।

    কাপড়-চোপড় : দু-ডজন শার্ট-দেখে মনে হয় পশমের তৈরি—আসতে কোনো অজ্ঞাত উদ্ভিদ থেকে প্রস্তুত, ঐ জিনিশেরই তিন ডজন মোজা, আর কয়েক জোড়া দস্তানা।

    রান্নাবান্নার জিনিশ : একটি লোহার কড়াই, দুটি সস্প্যান, তিনটি ডিশ, দশটি ধাতুনির্মিত থালা, দুটি কেটলি, একটি স্টোভ, দু-প্রস্থ ছুরি-কাটা।

    বইপত্র : একটি বাইবেল, একটি পৃথিবীর মানচিত্র, বিভিন্ন পলিনেশীয় ইডিয়মের একটি অভিধান, একটি প্রকৃতি-বিজ্ঞানের অভিধান (ছয় খণ্ডে সম্পূর্ণ), তিন রীম শাদা কাগজ, দুটি মোটা বাঁধানো খাতা—তবে প্রত্যেকটির পাতাই শাদা।

    এ-কথা মানতেই হবে, বললেন স্পিলেট : এই সিন্দুকের মালিক যিনি ছিলেন, তিনি একজন ব্যবহারিক মানুষ 1 যন্ত্রপাতি, কলকজা, অস্ত্রশস্ত্র, জামা-কাপড়, রান্নাবান্নার জিনিশ, পুঁথিপত্র—সবকিছুই তিনি সিন্দুকে ভরেছিলেন। তিনি বোধহয় আগে থেকেই আঁচ করেছিলে, আঁচ করেছিলেন যে জাহাজড়ুবি অনিবার্য, আর সেজন্যেই আগে থাকতে প্রস্তুত হয়ে ছিলেন।

    গম্ভীর গলায় উচ্চারণ করলেন হার্ডিং : আর-কিছুই চাইবার নেই!!

    আর-একটা জিনিশও মানতেই হবে, বললে হার্বার্ট : সিন্দুকের মালিক কোনোক্রমেই কোনো মালয় বোম্বেটে নয়। এমনও হতে পারে, কোনো মার্কিন বা ইওরোপীয় জাহাজ এ-অঞ্চলে ঝঙ্গা-তাড়িত হয়ে এসেছিল, তখন দরকারি জিনিশপত্র রক্ষা করবার জন্যে যাত্রীরা এইগুলি সিন্দুকে ভরেছিল। আপনি কী বলেন, ক্যাপ্টেন?

    খুব সম্ভব তোমার কথাই ঠিক। বললেন সাইরাস হার্ডিং : জাহাজড়ুবির সম্ভাবনা দেখা দেয়াতেই হয়তো ওই জিনিশপত্রগুলো সিন্দুকে ভরা হয়েছিল।

    ফোটো তোলবার সরঞ্জামগুলো পর্যন্ত? পেনক্র্যাফট বিস্মিত কণ্ঠে বললে।

    সত্যি-বলতে কি, ফোটো তোলবার সরঞ্জামগুলো বাক্সে ঢোকানোর পিছনে কী কারণ থাকতে পারে, তা আমি আন্দাজ করতে পারছি না। তার চেয়ে আরো গুলিবারুদ কিংবা কাপড়-চোপড় বেশি দরকারি।

    আচ্ছা, সাংবাদিকের কণ্ঠস্বর শোনা গেল : এই জিনিশপত্রগুলোর মালিক বা নির্মাতার নাম-ধাম দেখলে হয় না?

    তখন প্রত্যেকটি যন্ত্রপাতি, অস্ত্রশস্ত্র তন্নতন্ন করে পরীক্ষা করা হল, কিন্তু কোথাও নির্মাতার কোনো নাম-ঠিকানা পাওয়া গেল না। ব্যাপারটা রহস্যময়। বিশেষ করে অস্ত্রশস্ত্রে। নির্মাতার নাম-ধাম পাওয়া যাওয়ার কথা, কিন্তু সেখানেও কিছু লেখা নেই। আরেকটা আশ্চর্য ব্যাপার হল, প্রত্যেকটি জিনিশই আনকোরা নতুন—একেবারে চকচক করছে। আর এমনভাবে জিনিশগুলো সিন্দুকে সাজানো ছিল যে, বোঝা গেল ধীরে-সুস্থে একটি-একটি করে প্রত্যেকটি জিনিশ সিন্দুকে ভরা হয়েছে। সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার হল যে বইপত্রগুলোতে কোথাও প্রকাশক বা মুদ্রাকরের নাম দেখা গেল না। এ-রকমটা সচরাচর দেখা যায় না। সবমিলিয়ে গোটা ব্যাপারটাই সাইরাস হার্ডিং-এর কাছে কেমন-কেমন ঠেকল। কিন্তু যেখান থেকেই সিন্দুক দুটো আসুক না কেন, লিঙ্কন আইল্যাণ্ডের অধিবাসীদের কাছে এদের মূল্য অসীম। অবশ্য এ-পর্যন্ত দ্বীপের প্রাকৃতিক সম্পদকে প্রভূত বুদ্ধি ও পরিশ্রমের দ্বারা তারা উপযুক্তভাবে কাজে লাগিয়েছেন। বোঝা যাচ্ছে, ঈশ্বরের অভিপ্রায় এটাই যে তারা যেন জীবনযাত্রা অনায়াসে নির্বাহ করেন। নইলে অকস্মাৎ এই সিন্দুক দুটো পাওয়া যাবে কেন?

    এতসব জিনিশ পেয়েও পেনক্র্যাফট অবিশ্যি পুরোপুরি সন্তুষ্ট হল না। তার মনে হল, পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান জিনিশটাই সিন্দুকে নেই। তা হল তামাক। সে বললে, অন্তত আধ পাউণ্ড তামাক যদি থাকতো তবে আমি একেবারে দুনিয়ার বাদশা হয়ে যেতে পারতুম?

    তার কথা শুনে না-হেসে পারলেন না কেউ।

    এই সিন্দুক-দুটো হাতে আসবার দরুন একটা ব্যাপারে সবাই একমত হলেন : তন্নতন্ন করে গোটা দ্বীপে অভিযান চালাতে হবে। ঠিক হল, পরদিন ভোরবেলাতেই যাত্রা শুরু হবে। মার্সি নদীর একেবারে পশ্চিম প্রত্যন্তে পৌঁছুতে হবে। যদি জাহাজড়ুবির ফলে কোনো ভাগ্যহত এই দ্বীপে উঠে থাকে, তবে সম্ভবত সে রসদবিহীন। সুতরাং অবিলম্বে তাকে সাহায্য করা কর্তব্য।

    ওই নতুন জিনিশপত্রগুলো গোছগাছ করে গ্র্যানাইট  হাউসে রাখতে-রাখতেই বাকি দিনটুকু কেটে গেল।

    এই দিনটা—এই উনত্রিশে অক্টোবর—ছিল রবিবার। রাত্রে ঘুমোতে যাওয়ার আগে হার্বার্ট হার্ডিংকে অনুরোধ করলে বাইবেল থেকে একটা অংশ পড়ে শোনাতে। হার্ডিং বাইবেলটা হাতে নিয়ে যেই খুলতে যাবেন অমনি পেনক্র্যাফট বললে : দাঁড়ান, ক্যাপ্টেন, একটু থামুন। আমার একটা কুসংস্কার আছে। বইটার যে-কোনো পাতা খুলে, প্রথম যেখানে আপনার চোখ পড়ে সে-জায়গাটা পড়ে শোনান। আমাদের এই অবস্থার সঙ্গে খাপ খায় কি না মিলিয়ে দেখা যাক।

    পেনক্র্যাফটের কথা শুনে হার্ডিং একটু হাসলেন। তারপর চোখ বুজে বইটা খুললেন। আগে থেকেই যেন কেউ ওই পাতাটা চিহ্নিত করে রেখেছিল, তা চোখ খুলেই বুঝতে পারলেন হার্ডিং। প্রথমেই তার চোখ পড়ল, পেনসিলের দাগ-দেয়া একটি শ্লোকের উপর। সেন্ট ম্যাথুর সুসমাচারের সপ্তম অধ্যায়ে আছে সেই শ্লোকটি। উদাত্ত কণ্ঠে হার্ডিং শ্লোকটি পাঠ করলেন : যে প্রার্থনা করে, পূর্ণ হয় তার সর্ব কামনা; যে পরিশ্রম করে, সে প্রাপ্ত হয় তার সর্ব-আকাঙিক্ষত বস্তু।

    .

    ২.২ আরো আশ্চর্য ঘটনা

    পরদিন তিরিশে অক্টোবর সবাই অভিযানের জন্যে তৈরি হলেন। দ্বীপবাসীরা এখানে এসে বর্তমানে এমন অবস্থায় পৌঁছেছেন যে, এখন আর অন্যের সাহায্যের প্রয়োজন তাদের নেই, বরং তারাই অন্যদের সাহায্য করতে পারেন। মার্সি নদী বেয়ে যত-দূর-সম্ভব ততদূর পর্যন্তই তাঁরা যাবেন বলে ঠিক হলো। অস্ত্রশস্ত্র, রসদপত্র সব ক্যানুতে ওঠানো হলো। দুটো কুঠার নেয়া হলো যাতে ঘন অরণ্যের মধ্যে পথ করে চলা যায়। আর নেয়া হল টেলিস্কোপ আর পকেট-কম্পাস। যাত্রার আগে সাইরাস হার্ডিং সবাইকে সতর্ক করে দিলেন এই বলে যে, বন্দুক সঙ্গে নেয়ায় তার আপত্তি নেই, কিন্তু একটি গুলিও যেন বাজে খরচ করা না-হয়।

    ছ-টার সময় সবাই ক্যানুতে উঠলেন। টপও সঙ্গে চলল। তারপর মার্সি নদীর মুখ থেকে দ্বীপের নতুন অংশের দিকে এগিয়ে চলল ক্যানু। ঘণ্টা-দেড়েক আগেই জোয়ার শুরু হয়েছিল। সুতরাং কানু দ্রুতবেগেই গন্তব্যস্থানের দিকে এগিয়ে চলল। কিছুক্ষণ বাদে নদী আস্তে-আস্তে একটু-একটু করে প্রসারিত হচ্ছে বলে মনে হল। দু-দিকে চিরহরিৎ উদ্ভিদের ঘন ঝোপ শূন্যে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে, মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে নদী। তীরের সেই বন আর উঁচু ঝোপঝাড়ের জন্যে ক্যানু ছায়ার মধ্যে দিয়েই এগিয়ে যাচ্ছিল।

    কিছুদূর এগিয়ে ক্যানু থামল। তীরে নেমে চারদিকে খুঁজলেন তাঁরা। কিন্তু জনমানবের কোনো চিহ্নই দেখা গেল না। আবার তখন নৌকোয় উঠে সবাই এগিয়ে চললেন। এইভাবে চারদিক তন্ন-তন্ন করে খুঁজতে খুঁজতে এলেন সকলে। মাইল-চারেক যাওয়ার পর সবাই আবার তীরে নামলেন। ঘন অরণ্যের মধ্যে কুঠার দিয়ে পথ করে নিয়ে কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজি হল। এই নিয়ে চলতে চলতে সপ্তম বার তীরে নামলেন তারা। কিন্তু মানুষের কোনো চিহ্নই দেখা গেল না। পেনক্র্যাফট এবার দুটো জ্যাকামার পাখি মারলে। এই পাখির নাম থেকে অরণ্যের নাম দেয়া হল জ্যাকামার অরণ্য।

    অভিযান এগিয়ে চলল। লিঙ্কন আইল্যাণ্ডের পশ্চিম প্রত্যন্ত তখনো মাইল পাঁচেক দূরে। সাইরাস হার্ডিং একেবারে মার্সি নদীর শেষ সীমা পর্যন্ত অভিযান চালাবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। হয়তো একেবারে দ্বীপের পশ্চিম প্রান্তে জাহাজড়ুবির ফলে ভাগ্যহত ব্যক্তিদের সাক্ষাৎ পাওয়া যাবে।

    মার্সি নদীর তীরে এক ধরনের উঁচু গাছের সারি দেখতে পাওয়া গেল। এই গাছপালাগুলো প্রধানত অষ্ট্রেলিয়া, নিউজীল্যাণ্ড, মধ্য ইওরোপ ও উত্তর আফ্রিকায় দেখতে পাওয়া যায়। এইসব গাছকে ইংরেজিতে বলে ফিবার-ট্রি, বাংলায় তর্জমা করলে যার মানে দাঁড়ায়, জুর-গাছ। এই গাছগুলো জ্বরকে প্রতিরোধ করে বলেই এগুলোর এই নাম। মার্সি নদীর তীর ঘেঁসে জুর-গাছের সারি দূর পশ্চিমে এগিয়ে গেছে। তারই মধ্য দিয়ে আরো মাইল-দুয়েক এগিয়ে গেল ক্যানু।

    ইতিমধ্যে বেলা গড়িয়ে আসছে। সাইরাস হার্ডিং বুঝতে পারলেন যে, একদিনের মধ্যে কোনোরকমেই দ্বীপের পশ্চিম প্রত্যন্তে পৌঁছোনো যাবে না। সুতরাং তিনি ঠিক করলেন যে একটা সুবিধেমতো জায়গা বেছে রাত কাটানোর জন্যে তাঁবু ফেলবেন। ইতিমধ্যে মার্সি নদীর জল ক্রমশ অগভীর হয়ে পড়ছিল ভাটার দরুন; অথচ তখনও আরো পাঁচ মাইলের মতো এগুনো বাকি। সুতরাং সেখানেই, সেই অজানা অরণ্য অঞ্চলেই, রাত্রিবাসের ব্যবস্থা। করবেন বলে ঠিক করলেন হার্ডিং।

    পেনক্র্যাফট ক্যানু তীরের দিকে নিয়ে গেল। তীরের গাছপালার মধ্যে একঝাক বানর বসে কিচির-মিচির করছিল। বানরগুলো তাদের দেখতে পেয়েছিল। কিন্তু বানরদের হাবভাবে ভীতির কোনো চিহ্নই দেখা গেল না। স্পষ্টই বোঝা গেল যে, এই প্রথম তারা দ্বীপে মানুষের দেখা পেল।

    তখন বেলা চারটে বাজে ক্যান নিয়ে আর এনো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ল। এদিকে তীরও ক্রমশ খাড়া হয়ে উঠেছে। হার্ডিং বুঝতে পারলেন যে তারা ক্রমশই মাউন্ট ফ্র্যাঙ্কলিনের পাদদেশের নিকটবর্তী হচ্ছেন। সুতরাং শিগগিরই তীরে নৌকো ভেড়ানো কর্তব্য।

    হার্বার্ট শুধোলে : এখন আমরা গ্র্যানাইট  হাউস থেকে কত দূরে সরে এসেছি?

    প্রায় মাইল-সাতেক, উত্তর করলেন হার্ডিং : আন্দাজ করে বলছি অবশ্য। স্রোতের টানে আমরা উত্তর-পশ্চিম দিকে এসেছি। আজ আমরা এখানে নৌকো ভিড়িয়ে রাতটা কাটাবো, আর কাল ভোরবেলাতেই নৌকো তীরে বেঁধে রেখে পায়ে হেঁটে চারদিকে ঘুরে-ফিরে দেখবো। পেনক্র্যাফট, তুমি চেষ্টা করে দ্যাখো, আরো-একটু এগুনো যায় কি না।

    একটু পরেই হার্ডিং নৌকো থেকে জলপ্রপাতের গম্ভীর ধ্বনি শুনতে পেলেন। নদী এখানে প্রায় কুড়ি ফুট চওড়া হবে; আরো সামনে ক্রমশ সরু হয়ে গেছে। হার্ডিং-এর বুঝতে বিলম্ব হল না যে তারা একেবারে মার্সি নদীর উৎসমুখের কাছে এসে পৌঁছেছেন।

    তখন বিকেল পাঁচটা 1 শেষ বিকেলের সোনালি রশ্মি মার্সির উৎসমুখের জলে পড়ে ঝিকমিক করছে। একটু দূরেই মাউন্ট ফ্র্যাঙ্কলিনের গা থেকে অঝোর ধারায় বিশাল জলরাশি নেমে আসছে। সূর্যের রক্তিম আলো সেই ঝরনার জলে পড়ে একটা রামধনুর বর্ণালি সৃষ্টি করেছে। হার্ডিং ঠিক করলেন, এবার তীরে নৌকো ভেড়াতে হবে।

    তক্ষুনি তীরে নৌকো ভেড়ানো হল। জায়গাটা দেখতে ভারি সুন্দর। ঘন একসার গাছের নিচে বেশ খানিকটা জায়গা পরিষ্কার করে নেয়া হল। ঠিক হল সেখানেই রাত্রিবাস করা হবে। শিগগিরই কিছু কাঠ-কুটো জড়ো করে আগুন জ্বালিয়ে-দেয়া হল, যাতে বন্যজন্তুরা আগুন দেখে ওঁদের আক্রমণ করতে সাহস না-পায়। সারাদিন পরিশ্রম করার দরুন খুব খিদে পেয়েছিল। শিগগিরই আহার সেরে নেয়া হল। তারপর ঠিক হল, রাত্রে নেব আর পেনক্র্যাফট পালা করে পাহারা দেবে। অবশ্য রাত্রে কোনো-কিছুই ঘটল না। পরদিন, একত্রিশে অক্টোবর, ভোর পাঁচটার সময় সবাই যাত্রার জন্যে তৈরি হয়ে নিলেন। তারপর প্রাতরাশ সেরে নিয়ে বেলা দুটোর সময়ে দ্বীপের পশ্চিমে উপকূলের সন্ধানে রওনা হয়ে পড়লেন। বলা বাহুল্য, আজকের যাত্রাটা পদব্রজেই শুরু হলো।

    পশ্চিম উপকূলে পৌঁছতে কত সময় লাগবে, হার্ডিং তা মোটামুটি একটা আন্দাজ করে নিয়েছিলেন। পথে যদি কোনো বাধা-বিপদ উপস্থিত না-হয়, তাহলে দু-ঘন্টা লাগবে, একটু কম-বেশি হতে পারে। গত রাত্রে বুনো জানোয়ারদের হাঁক-ডাক শোনা গিয়েছিল বলে অস্ত্র-শস্ত্র প্রস্তুত করেই সবাই রওনা হলেন। সাইরাস হার্ডিং চললেন সকলের আগে-আগে।

    দ্বীপের এই অংশের জমি অসমতল। কোথাও চড়াই, কোথাও উরাই। প্রথম-প্রথম বনের মধ্যে অসংখ্য বানরের সাক্ষাৎ পাওয়া গেল। তারা যে কখনো এর আগে মানুষ দ্যাখেনি, তার প্রমাণ পাওয়া গেল এঁদের দেখে তাদের বিস্ময়চকিত ভঙ্গি থেকে। বিভিন্ন জাতের বরাহ, হরিণ, ক্যাঙারু ইত্যাদির সাক্ষাতও পাওয়া গেল পথে। শিকারের জন্যে অবশ্য পেনক্র্যাফটের হাত নিশপিশ করছিল, তবে এভাবে সময় নষ্ট করা উচিত হবে না বলেই সে অনেক কষ্টে তার লোভ সামলালে। তবে, ফেরার পথে সে-যে জানোয়ারগুলোকে একহাত দেখে নেবে, স্বভাবসিদ্ধ উচ্চ কণ্ঠে বারবার সে-কথা জাহির করতে সে মোটেই ভুলল না।

    প্রায় সাড়ে-নটার সময় অকস্মাৎ তাদের পথরোধ করে দাঁড়াল খরস্রোতা একটি ঝরনাধারা।

    নৌকো চালানোর সুবিধেও নেই, অথচ পায়ে হেঁটেও পার হওয়া একরকম অসম্ভব।

    হার্ডিং বললেন, খুব-সম্ভব এই ঝরনার জল সমুদ্রে গিয়ে পড়েছে। এই জলধারা অনুসরণ করে গেলেই আমরা বোধহয় দ্বীপের পশ্চিম উপকূলে পৌঁছতে পারবো। একটু এগিয়ে দেখা যাক।

    স্পিলেট বললেন, এক মিনিট দাঁড়ান। আগে এটার একটা নাম দিয়ে নেয়া যাক। দ্বীপের ভূগোল অসম্পূর্ণ রাখা উচিত হবে না। হার্বার্ট, তুমিই একটা নাম দাও না এই ঝরনার।

    আগে দেখা যাক ঝরনাটা কোথায় গিয়ে পড়েছে, বললে হার্বার্ট।

    বেশ বললেন হার্ডিং, তবে খামকা এখানে না দাঁড়িয়ে এগিয়ে চলো।

    অরণ্যের মধ্য দিয়ে পথ চলতে যত-সময় লাগছিল, এবার ঝরনাধারার গা ঘেঁষে চলতে তার চেয়ে অনেক কম সময় লাগল। মাঝে-মাঝে পথের মধ্যে বড়ো-বড়ো জানোয়ারের পায়ের ছাপ দেখা গেল। বোঝা গেল, তৃষ্ণার্ত জানোয়ারেরা এই ঝরনার জল পান করতে প্রায়ই এসে থাকে। ইতিমধ্যে ঝরনার স্রোতের তীব্রতা দেখে হার্ডিং বুঝতে পারলেন যে, দ্বীপের পশ্চিম উপকূল তারা যত দূরে বলে আন্দাজ করেছিলেন—আসলে সেটা তারও দূরে।

    ক্রমশ ঝরনার জলধারা প্রসারিত হয়ে পড়তে লাগল। স্রোতের তীব্রতাও আস্তে-আস্তে কমতে লাগল। দু-তীরের গাছপালা এমনভাবে জড়াজড়ি করে ছিল যে, তার মধ্য দিয়ে দৃষ্টি চলে। কিন্তু এ-অঞ্চলে যে কোনো মানুষের বাস নেই, তা অবশ্য স্পষ্টই বোঝা গেল। কেননা টপ একবারও ডাকছিল না। অথচ আশপাশে যদি কোনো আগন্তুকের পদসঞ্চার ঘটে থাকে, কিংবা কারু উপস্থিতি থেকে থাকে তবে নিশ্চয়ই টপের মতন চালাক কুকুর না-ডেকে ছাড়তো না। এবার হার্বার্ট সবার আগে-আগে চলতে লাগল।

    প্রায় সাড়ে দশটার সময় হঠাৎ হার্বার্ট যখন সমুদ্র! সমুদ্র! বলে চেঁচিয়ে উঠল তখন হার্ডিং বিস্মিত হলেন। আরো কয়েক মিনিটের মধ্যে সবাই সমুদ্র সৈকতে এসে দাঁড়ালেন। তাদের চোখের সামনে ছড়িয়ে পড়ল দ্বীপের জনশূন্য পশ্চিম উপকূল।

    কিন্তু দ্বীপের উপকূলভাগের সঙ্গে কী আকাশ-পাতাল পার্থক্য পূর্ব উপকূলের! গ্র্যানাইট  পাথরের কোনো খাড়াই পাহাড়ের গা, কিংবা বিশালাকার কোনো পাথরের চাই, অথবা হলুদ রঙের বালুময় বেলাভূমি—কিছুই ওদিকে নেই। শুধু তীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে অন্ধকার ভরা ঘন অরণ্য।

    এবার সেই খরস্রোতা স্রোতস্বিনীটির নামকরণ করা হল। এর নাম দেয়া হল ফলস্ রিভার। ফলস্ রিভার থেকে রেপ্টাইল এণ্ড পর্যন্ত গহীন অরণ্যের অপর্যাপ্ত শ্যামলিমা।

    সেই সমুদ্রসৈকতের একদিকে ঈষৎ উঁচু একটি ঢিবির মতন দেখা গেল। সেখানে গিয়ে বসলেন সবাই। বেশ খিদে পেয়েছিল। এবার সবাই আহার সেরে নিলেন।

    উঁচু ঢিবির মতো থাকায় উপরদিকে সমুদ্রের দিগন্ত পর্যন্ত দৃষ্টিক্ষেপ করা গেল। সেই সীমাহারা নীলকান্তমণির মতো সমুদ্রে একটিও পালের চিহ্ন নেই। তীরের কোথাও কোনো কিছু দেখা গেল না। একটু জিরিয়ে, সাড়ে এগারোটার সময়, হার্ডিং প্রত্যাবর্তনের উদ্যোগ করলেন।

    রেপ্টাইল এণ্ড থেকে ফলস্ রিভার, প্রায় বারো মাইল দূরে হবে। এমনিতে এইটুকু পথ অতিক্রম করতে ঘণ্টা-চারেক সময় লাগে। কিন্তু ঘন অরণ্যের মধ্য দিয়ে পথ করে চলতে হবে বলে প্রায় দ্বিগুণ সময় লাগবার কথা।

    সমুদ্রের এইদিকে কখনও যে কোনো জাহাজড়ুবি হয়েছিলে, তার কোনো প্রমাণ পাওয়া গেল না। অবশ্য স্পিলেট বললেন যে সমুদ্রের ঢেউয়ের দরুন হয়তো জাহাজড়ুবির কোনো চিহ্নই এখানে দেখা যাচ্ছে না, তাই বলে এ-কথা মনে করা অসংগত যে এখানে কোনো জাহাজড়ুবি হয়নি। সাংবাদিকের এই যুক্তি ন্যায়সংগত। এ ছাড়া, বুলেটের ঘটনাটি থেকেই প্রমাণিত হচ্ছে যে, তিন মাসের মধ্যে কেউ এই দ্বীপে নিশ্চয়ই বন্দুক ছুঁড়েছে। সুতরাং বুলেট-রহস্যের কোনো সমাধানই এখন পর্যন্ত হল না।

    তখন পাঁচটা বাজে—কিন্তু রেপ্টাইল এণ্ড তখনও মাইল দু-এক দূরে স্পষ্টই বোঝা গেল যে, মার্সি নদীর তীরে কাল যেখানে তারা রাত কাটিয়েছিলেন সেখানে পৌঁছুতে পৌঁছুতে অন্ধকার হয়ে যাবে। সাতটার সময় সবাই রেপ্টাইল এণ্ডে এসে পৌঁছুলেন। এখানেই সমুদ্রতীরের অরণ্য শেষ হয়েছে। নুড়ি-পাথর আর বালি-ভরা বেলাভূমি শুরুই হয়েছে এখান। থেকেই। রাত্রি নেমে আসায় এখানে এসেই সেদিনকার মতো যাত্রা স্থগিত রাখা হল। দূর পশ্চিমে অরণ্য যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানে হার্বার্ট বাঁশঝাড় আবিষ্কার করলে। এই বাঁশঝাড় দ্বীপবাসীদের কাছে এক মূল্যবান সামগ্রী রূপে দেখা দিল। কেননা বাঁশ নানান কাজেই ব্যবহার করা যায়। বিশেষ করে এমন ধরনের বাঁশ দেখা গেল, যার মূল সেদ্ধ করে খেতে বেশ সুস্বাদু।

    এমন সময় হঠাৎ একটা বুনো জানোয়ারের গর্জন শোনা গেল। সচমকে হার্বার্ট আর পেনক্র্যাফট তাকিয়ে দেখলে, হাত-কয়েক দূরেই একটা জাগুয়ার, লাফ মারবার উদ্যোগ করছে। সঙ্গে-সঙ্গেই গর্জন করে উঠল পেনক্র্যাফটের বন্দুক। কিন্তু দুর্ভাগবশত গুলি ব্যর্থ হল। অন্ধকারে ভীষণভাবে জ্বলে উঠল জাগুয়ারের ভাটার মতো চোখদুটো। গিডিয়ন স্পিলেট শিকারী হিশেবে নাম কিনেছিলেন। এবার উপর্যুপরি কয়েকবার গর্জন করে উঠল তার রাইফেল। সঙ্গে সঙ্গে গুলির আঘাতে ছিটকে পড়ল জাগুয়ারটা–দু-একবার এঁকেবেঁকে উঠল তার দেহটা, তারপরই নিঃসাড় হয়ে গেল।

    তখন সবাই জাগুয়ারটার কাছে দৌড়ে গেলেন। দেখা গেল অব্যর্থলক্ষ্য স্পিলেটের একটি গুলি জাওয়ারটার চোখে লেগেছে। জাগুয়ারটার চামড়াটাকে গ্র্যানাইট  হাউসের একটি মূল্যবান সামগ্রী হিশেবে ব্যবহার করা যাবে বলে সবাই খুশি হয়ে উঠলেন।

    হার্বার্ট তো উচ্ছ্বসিত হয়ে স্পিলেটকে অভিনন্দন জানালেন। স্পিলেট বললেন, কেউ যদি কোনোরকমে জাওয়ারের চোখে গুলি চালাতে পারে, তবে তার সাফল্য অনিবার্য।

    ইতিমধ্যে হার্ডিং কাছেই একটা গুহা আবিষ্কার করেছিলেন। সবাই সেই জায়ারটাকে বয়ে নিয়ে এলেন গুহায়। ঠিক হল এই গুহাতেই রাত্রিবাস করবেন সবাই। নেব গুহার বসে জাগুয়ারটার চামড়া ছাড়াতে লাগল। অন্যরা বন থেকে শুকনো কাঠ-কুটো নিয়ে এলেন। তারপর গুহার মুখে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হল যাতে কোনো জানোয়ার গুহায় ঢুকতে না পারে। হার্ডিং-এর নির্দেশমতো বেশ কিছু বাঁশও ঝাড় থেকে কেটে আনা হয়েছিল।

    খাওয়া-দাওয়া সেরে বন্দুকে গুলি ভরে নিয়ে শুলেন সবাই। শোবার আগে হার্ডিং গুহামুখের অগ্নিকুণ্ডে একরাশ বাঁশ গুঁজে দিয়ে এলেন। একটু বাদেই বাঁশের গাঁটগুলো ভীষণ শব্দ করে ফাটতে লাগল। এই শব্দে যে বুনো জানোয়াররা ভয় পাবে, এ-বিষয়ে হার্ডিং-এর কোনো সন্দেহ ছিল না। বুদ্ধিটা অবিশ্যি হার্ডিং-এর আবিষ্কার নয়। মার্কো পোলোর ভ্রমণবৃত্তান্তে আছে, তাতাররা নাকি বহু শতাব্দী আগে থেকেই এভাবে বুনো জানোয়ারদের তাদের তাঁবুর কাছ থেকে দূরে সরানোর ব্যবস্থা করতো।

    রাত্রিটা নিরাপদেই কাটল। পরদিন সকালে ওঁদের সামনে এই প্রশ্ন জাগল : এখন কি ফিরে যাবেন, না দ্বীপের বাকি অংশটুকু অর্থাৎ দক্ষিণ উপকূলও পর্যবেক্ষণ করে আসবেন? গিডিয়ন স্পিলেট প্রস্তাব করলেন যে অভিযানে যখন একবার বেরিয়ে পড়েছেন, তখন তা সম্পূর্ণ করে যাওয়াই উচিত। শুধোলেন : এখান থেকে ক্ল অন্তরীপ কতটা দূরে হবে?

    প্রায় তিরিশ মাইল— বললেন হার্ডিং, কেননা, সমুদ্রতীর তো এঁকেবেঁকে গেছে।

    তিরিশ মাইল! উত্তর করলেন স্পিলেট, গোটা দিনই লেগে যাবে তবে। তবুও আমার মনে হয়, দক্ষিণ উপকূল ধরেই গ্র্যানাইট  হাউসে পৌঁছুনো ভালো।

    কিন্তু হার্বার্ট বললে, ক্ল অন্তরীপ থেকে গ্র্যানাইট  হাউস অন্তত দশ মাইল দূরে।

    মোট তাহলে চল্লিশ মাইল হল— বললেন হার্ডিং। কিন্তু তবু মিস্টার স্পিলেটের প্রস্তাব মতো কাজ করা ভালো। আজকেই যদি ঐ-দিকটা দেখে আসা যায়, তবে পরে অভিযানে না-বেরুলেও চলবে।

    সে-কথা তো বুঝলুম বললে পেনক্র্যাফট, কিন্তু ক্যান? ক্যানুটা যে মার্সি নদীর উৎসমুখে বাঁধা রইল।

    তা থাক না। উত্তর করলেন স্পিলেট, একদিন যখন রয়েছে, তখন আরো দু দিন না-হয় রইলোই। তাতে কিছু একটা এসে-যাবে না।

    এবার নেব বললে, সমুদ্রতীর ধরে যদি আমরা ক্ল অন্তরীপে পৌঁছুতে চাই তবে তো আমাদের মার্সি নদী পেরুতে হবে।

    পেনক্র্যাফট বললে, তার আর ভাবনা কী? ডালপালা দিয়ে না-হয় একটা ভেলা তৈরি করে নেয়া যাবে। ঐ ভেলা বানানোর ভার আমিই নিচ্ছি, তোমাদের সেজন্যে আর মাথা ঘামাতে হবে না। এখনও আমাদের কাছে আরেক দিনের উপযোগী খাবার আছে। এছাড়া এ-দ্বীপে শিকারেরই বা অভাব কোথায়? চলো নেব,-খামকা সময় নষ্ট করে লাভ নেই।

    ভোর ছটার সময়েই অভিযাত্রীদল রওনা হয়ে পড়ল। গুলিভরা বন্দুক নিয়ে এগিয়ে চলল সবাই। এবারকার যাত্রায় টপ চলল সবার আগে-আগে। বেলা একটার সময় সকলে ওয়াশিংটন বে-র অন্য প্রান্তে এসে পৌঁছুলেন। ইতিমধ্যে তারা প্রায় বিশ মাইল পথ অতিক্রম করেছেন। এত হাঁটাহাঁটির দরুন সবাই পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। একটু জিরিয়ে সবাই আহার সেরে নিলেন।

    এখান থেকেই উপকূলরেখা অমসৃণ হতে শুরু করেছে। বড়ো-বড়ো পাথরের চাই ইতস্তত ছড়িয়ে আছে উপকূলে। সেই পাথরের উপরে এসে আছড়ে পড়ছে সমুদ্রের ঢেউ। পথে অগুনতি পাথরের টুকরো ছড়িয়ে পড়ে ছিল বলে তাদের হাঁটতে কষ্ট হতে লাগল রীতিমতো। তীক্ষ্ণ চোখে চারদিকে তাকাতে-তাকাতে চললেন সকলে। কিন্তু সেই উপকূলে এমন কোনো চিহ্ন দেখা গেল না, যাতে সম্প্রতি এখানে কোনো জাহাজড়ুবি হয়েছে বলে মনে করা যেতে পারে। কোথাও কোনো জাহাজের ভগ্নাংশের ক্ষুদ্রতম চিহ্নও নেই।

    বেলা তিনটে বাজল। অভিযাত্রীদল নীরবে এগিয়ে চললেন। এমন কোনো চিহ্ন কোথাও দেখা গেল না যাতে বোঝা যেতে পারে যে কখনও এই দ্বীপে কোনো মানুষ বাস করতে কিংবা এখনও করে। নীরবতা ভাঙলেন গিডিয়ন স্পিলেট। বললেন, তাহলে এ-কথা ভেবেই আমাদের সান্ত্বনা পেতে হবে যে, লিঙ্কন আইল্যান্ডের আধিপত্য নিয়ে কেউ আমাদের সঙ্গে কোনো কলহ করতে আসছে না।

    কিন্তু সেই বুলেটটা? বললে হার্বাট, সেটা তো আর কল্পনা নয়।

    সে-প্রশ্ন উঠতেই পারে না! ভাঙা দাঁতের কথা স্মরণ করে বলে উঠল পেনক্র্যাফট।

    তাহলে গোটা ব্যাপারটা থেকে কী সমাধান বার করবো আমরা? সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন।

    এই সমাধান, উত্তর করলেন ক্যাপ্টেন : তিন মাস কিংবা তারও আগে একটি জাহাজ, ইচ্ছে করেই হোক আর অনিচ্ছাসত্ত্বেই হোক, এই দ্বীপে এসে ভিড়েছিল। অবিশ্যি প্রশ্ন উঠতে পারে যে এই দ্বীপে যদি একদা জাহাজ ভিড়েছিল, তার কোনো চিহ্নই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না কেন? কিন্তু এ-কথা মানতেই হবে যে এই দ্বীপে বর্তমানে আমরা ছাড়া অন্য–কোনো মানুষ থাকে না। অন্তত আমরা তো তার প্রমাণ পাইনি।

    নেব বললে, তাহলে সেই জাহাজটি লিঙ্কন আইল্যাণ্ড ছেড়ে আবার চলে গেছে? ঈশ! আগে যদি জানা যেতো তবে হয়তো দেশে ফেরা যেতো!

    হয়তো যেতো, বললে পেনক্র্যাফট, কিন্তু সে সুযোগ আমরা যখন হারিয়েছি তখন সে সম্পর্কে আর-কোনো প্রশ্ন উঠছে না। বরং গ্র্যানাইট  হাউসকে আরো ভালো করে গড়তে হবে এখন।

    এমন সময় টপ সাংঘাতিকভাবে ঘেউ-ঘেউ করে চেঁচিয়ে উঠল। একটু পরেই দেখা গেল, সামনের ঘন গাছপালার মধ্য থেকে টপ কাদা-চটচটে একটা ছেড়া কাপড়ের টুকরো মুখে নিয়ে ছুটে বেরিয়ে আসছে। সঙ্গে-সঙ্গে নেব ঐ ছেঁড়া কাপড়ের টুকরো হাতে তুলে নিলে। টপ আবারও ডাকতে শুরু করলে। উত্তেজিত হয়ে সে যেভাবে একবার বনে প্রবেশ করছিল আবার বেরিয়ে আসছিল, তা দেখে বোঝা গেল যে সে সবাইকে তার সঙ্গে আসবার জন্যে প্রার্থনা করছে।

    এবার বুলেট-রহস্যের নিষ্পত্তি হবে-বললে পেনক্র্যাফট : আহত কিংবা মৃত কোনো জাহাজড়ুবি-হওয়া লোকের সঙ্গে নিশ্চয়ই দেখা হবে আমাদের।

    সকলে টপের পেছনে-পেছনে বনের মধ্যে প্রবেশ করলেন। হার্ডিং-এর নির্দেশমতো সবাই বন্দুকও প্রস্তুত করে নিলেন। কিন্তু বনের বেশ-খানিকটা দূর যাওয়ার পরও কোনো জনমানবের সাক্ষাৎ না-পেয়ে তাঁরা হতাশ হয়ে পড়লেন। সেই বনের মধ্যে কোনো দূরকালে কোনো মানুষ একবারের জন্যেও পদার্পণ করেছিল কি না বোঝা গেল না। খানিকটা সামনে ঘন গাছপালার মধ্যে হঠাৎ গাছের সংখ্যা একটু বিরল হয়ে যাওয়ায় চৌকো-মতন একফালি জমি দেখা গেল। টপ সেখানে পৌঁছেই থমকে দাঁড়ালো। তারপর আবার ডাকতে লাগলো।

    সতর্ক তীক্ষ্ণ চোখে চারিদিকে তাকালেন সবাই। কিন্তু না, কোথাও কিছু নেই। গাছে কিংবা ঝোপে-ঝাড়ে কেউ বসে নেই-কোনো মানুষের চিহ্নমাত্র নেই।

    সাইরাস হার্ডিং বললেন, টপ, ব্যাপার কী তোমার?

    টপ আরো জোরে জোরে ডেকে উঠল। ঠিক সেই সময় পেনক্র্যাফট চেঁচিয়ে উঠল; বাঃ! চমৎকার! আশ্চর্য!

    কী? জানতে চাইলেন স্পিলেট।

    আমরা সমুদ্র পার হলেই যা-কিছুর দেখা পাবো বলে ভেবেছিলুম। বললে পেনক্র্যাফট, কিন্তু শূন্যের কথা আমাদের মনেই হয়নি।ওই দেখুন-উপরে, গাছের ডগায়।

    পেনক্রাফটের নির্দেশ মতো উপরে তাকালেন সবাই। পরক্ষণেই চেঁচিয়ে উঠলেন স্পিলেট : আরে! বেশ মজা তো! এ যে আমাদের হাওয়াই নৌকো—আমাদের বেলুনটা। বাতাসে ভাসতে-ভাসতে এই গাছের মাথায় এসে আটকে গেছে!

    তক্ষুনি উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠল পেনক্র্যাফট : এখনও বেশ ভালো আছে বেলুনের কাপড়! তাই থেকেই কয়েক বছরের জামা কাপড় পাবো আমরা। কী মজা! রুমাল আর শার্ট বানানোর হ্যাঙামাও অনেকখানি কমে গেল। মিস্টার স্পিলেট, যে-দ্বীপের গাছে শার্ট ঝোলে, সে-দ্বীপকে আপনি কী বলবেন?

    লিঙ্কন আইল্যাণ্ড। হেসে বললেন গিডিয়ন স্পিলেট।

    এই আবিষ্কারও যে সৌভাগ্যসূচক, তাতে আর সন্দেহ কী! বেশ কয়েকশো গজ কাপড় বেলুনটি করতে লেগেছিল। সুতরাং এইভাবে বেলুনটির দেখা পেয়ে সবাই খুশি হয়ে উঠলেন। এখন প্রধান কর্তব্য, গাছের মগডালে উঠে বেলুনটাকে নিচে নামিয়ে আনা। এবং সে-কাজটা খুব সহজ নয়। নে, হার্বার্ট আর পেনক্র্যাফট তক্ষুনি তরতর করে গাছে উঠে গেল। তারপর বেলুনটাকে নামিয়ে আনবার জন্যে চেষ্টা করতে লাগল।

    ঘণ্টাদুয়েক চেষ্টার পর বেলুনটাকে নিচে নামানো গেল। বেলুনটার নিচের দিকটাই শুধু সাংঘাতিকভাবে ফেঁসে গেছে, নইলে এখনও বাকি অংশটা ভালোই। এছাড়া একরাশ দড়ি-দড়াও পাওয়া গেল বেলুনের কল্যাণে। ভাগ্য যখন প্রসন্ন থাকে তখন আকাশ থেকে সম্পদ আসে এই প্রবাদও যে মিথ্যে নয়, এটা বুঝতে আর কারু বাকি রইল না।

    বেলুনটার ওজন নেহাত কম নয়। এত ভারি জিনিশ এখান থেকে গ্র্যানাইট  হাউসে নিয়ে যাওয়া মুশকিলের ব্যাপার। সুতরাং একটা নিরাপদ জায়গায় এটা রেখে যাওয়া কর্তব্য। আধঘণ্টা ঘোরাঘুরির পর একটা অপরিসর গুহায় মতো দেখা গেল। সেটাই আপাতত গুদাম ঘরের কাজ করল। এখানেই বেলুনটাকে এখনকার মতো রেখে দেয়া হল। গুহার কল্যাণে ঝড়-বৃষ্টি এবার বেলুনটির ক্ষতি করতে পারবে না।

    জায়গাটার নাম দেয়া হল পোর্ট বেলুন। তারপর ছটার সময় সবাই আবার তাদের অভিযাত্রায় রওনা হয়ে পড়লেন।

    এবার খানিকটা এলেই সামনে পড়বে মার্সি নদী। নদী পার হওয়ার জন্যে একটা সেতু তৈরি করা প্রয়োজন। তা যদি এখন সম্ভব না-হয়, তবে আপাতত কাজ চালাবার জন্যে একটা ভেলা বানাতে হবে। পরে সময়মতো সেতু তৈরি করে কাঠের গাড়ি এনে বেলুনটাকে গ্র্যানাইট  হাউসে নিয়ে যাওয়া যাবে। ক্যানুটা হাতের কাছে থাকলে অবিশ্যি এক্ষুনি বেলুনটিকে নিয়ে যাওয়া যেতো, কিন্তু ক্যানুটা তো মার্সি নদীর উৎস-মুখে বেঁধে রেখে আসা হয়েছে। মনে-মনে এইসব কথা আলোচনা করতে-করতে সবাই এগিয়ে চললেন।

    ইতিমধ্যে সন্ধে নেমে এল। আলো ঝাপসা হয়ে-হয়ে একসময় অন্ধকার হয়ে গেল।

    এমন সময় সবাই ফ্লোটসাম পয়েন্টে এসে পৌঁছলেন। এই জায়গাতেই সেই মূল্যবান সিন্দুকদুটো পাওয়া গিয়েছিল। ফ্লোটসাম পয়েন্ট থেকে গ্র্যানাইট  হাউসের দূরত্ব চার মাইল। মার্সি নদী অভিমুখে এবার এলেন সবাই। ওঁরা যখন মার্সি নদীর তীরে এসে পৌঁছলেন, তখন মধ্যরাত্রি।

    মার্সি নদী সেখানে প্রস্থে প্রায় আশি ফুটের মতো। এবার এই আশি ফুট কী করে অতিক্রম করা যায়, সেই হল সমস্যা। পেনক্র্যাফট আগে বলেছিল যে ভেলা বানিয়ে সে নদী পেরুবার ব্যবস্থা করবে, সুতরাং এবার সেই কাজে রত হতে হল তাকে।

    সারাদিনের পরিশ্রমে সকলের দেহে-মনে তখন একটা অবসাদ নেমে আসছে। খিদেয়, তেষ্টায় তখন সবাই অতিরিক্ত ক্লান্ত, গ্র্যানাইট  হাউসে পৌঁছে খাওয়া-দাওয়া সেরে ঘুমনোর জন্যে ব্যস্ত। নদী পেরুতে পারলেই হল-তারপর তো গ্র্যানাইট হাউস মিনিট পনেরোর রাস্তা…।

    ঘন অন্ধকার-ঢালা রাত্রি। পেনক্র্যাফট তার প্রতিজ্ঞা রক্ষা করবার জন্যে উঠে-পড়ে লাগল কাজে। সে আর নেব দুটো গাছ কাটতে শুরু করে দিলে। সাইরাস হার্ডিং আর স্পিলেট নদীর তীরে বসে-বসে অপেক্ষা করতে লাগলেন, গাছ কাটা কখন সাষ্ট হয়। হার্বার্ট কাছেই নদীর তীরে ইতস্তত ঘুরে বেড়াতে লাগল। হঠাৎ মার্সি নদীর দিকে তর্জনী নির্দেশ করে চেঁচিয়ে উঠল : আরে! কী ভাসছে এখানে?

    পেনক্র্যাফট তক্ষুনি কুঠার হাতে নদীতীরে ছুটে এল। জলের মধ্যে কী-একটা অস্পষ্ট জিনিশ ভাসছিল। সেদিকে তাকিয়েই সে বলে উঠল : ক্যান! একটা ক্যানু!

    সবাই এগিয়ে গেলেন। অবাক চোখে দেখতে পেলেন যে একটা ক্যানু স্রোতের টানে ভেসে আসছে তীরের দিকে।

    পেনক্র্যাফট চেঁচিয়ে ডাকলে : নৌকোয় কে আছো!

    কিন্তু কোনো উত্তর পাওয়া গেল না। নৌকোটা তীরের দিকে ভেসে আসতে লাগল।

    তীর থেকে তখন নৌকোটা মাত্র ফুট বারো দূরে, এমন সময় অবাক কণ্ঠে পেনক্র্যাফট বলে উঠল : আরে! এ-যে আমাদেরই নৌকোটা! কোনোমতে বাঁধন ছিঁড়ে স্রোতের টানে ভাসতে-ভাসতে চলে এসেছে! ঠিক সময়েই এসে পৌঁছেছে নৌকোটা!

    আমাদের নৌকো! গম্ভীর অথচ ধীর কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন সাইরাস হার্ডিং।

    পেনক্র্যাফটের কথাই ঠিক। এঁদেরই নৌকো এটি। কোনো কারণে দড়ি ছিঁড়ে যাওয়ায় স্রোতে ভাসতে ভাসতে এদিকপানে এসেছে।

    লম্বা একটা বাঁশের সাহায্যে তক্ষুনি নৌকোটা তীরে টেনে আনল পেনক্র্যাফট আর নেব। নৌকো তীরে ভিড়তেই হার্ডিং উঠে প্রথমে দড়িটা পরীক্ষা করলেন। দেখা গেল, পাথরে ঘষা খেয়ে-খেয়ে দড়িটা ছিঁড়ে গেছে। স্পিলেট ফিশফিশ করে হার্ডিংকে বললেন : তবু ব্যাপারটা আমার কাছে আশ্চর্য লাগছে।

    আশ্চর্য? কী যেন ভাবতে ভাবতে বললেন হার্ডিং : হ্যাঁ, আশ্চর্য তো নিশ্চয়ই!

    আশ্চর্য হোক বা না-হোক, ঠিক সময়েই এসে পৌঁছেছে ক্যানটা। তারা যদি মধ্যযুগে বাস করতেন, তবে হয়তো মনে করতেন এ কোনো অপার্থিব ব্যাপার। কিন্তু এই ঊনবিংশ শতাব্দীতে অলৌকিককাণ্ডে বিশ্বাস করেন কী করে! হার্ডিং মনে-মনে বললেন : তবু আমি জানি কেউ-একজন অলক্ষে থেকে আমাদের সাহায্য করে চলেছে। কিন্তু কে সেই ব্যক্তি? এত খোঁজাখুঁজি সত্ত্বেও তাকে দেখতে পেলুম না কেন?

    কোনো উত্তর না-পেয়ে হার্ডিং-এর মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল।

    একটু বাদেই তারা নদীর অপর তীরে পৌঁছুলেন। ক্যানুটা ধরাধরি করে চিমনির কাছেই সমুদ্র সৈকতে তুলে আনা হল। তারপর সবাই গ্র্যানাইট  হাউসের দড়ির সিঁড়ির দিকে এগুলেন।

    এমন সময় কেন যেন টপ রুদ্ধ কণ্ঠে গজরাতে লাগল। নেব ছিল সকলের আগে। দড়ির সিঁড়ি বেয়ে উঠতে গিয়ে সে থমকে দাঁড়ালে।

    কী সর্বনাশ! সিঁড়ি কোথায় গেল?

    .

    ২.৩ ঘটনার আবর্ত

    নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন সাইরাস হার্ডিং। একটা কথাও বেরুলো না তার মুখ দিয়ে।

    অন্যরা অন্ধকারেই হাড়ে হাড়ে দেখল গ্র্যানাইট  পাথরের দেয়াল। তবে কি হাওয়ায় একটু নড়ে গিয়েছে সিঁড়িটা?.. কিন্তু না সিঁড়িটা সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়েছে।

    মিনিট কয়েক পরে পেনক্র্যাফটের হতভম্ব স্বর শোনা গেল : লিঙ্কন আইল্যাণ্ড দেখছি শেষ পর্যন্ত অলৌকিকের রাজত্ব হয়ে উঠল।

    অলৌকিক নয়, পেন্যাফট, বললেন স্পিলেট : খুব সহজ ব্যাপার। আমাদের সবার অনুপস্থিতির সুযোগে কেউ-একজন এসে গ্র্যানাইট  হাউস দখল করেছে এবং সিঁড়ি উপরে তুলে ফেলেছে।

    কেউ-একজন। চেঁচিয়ে উঠল নাবিক। কিন্তু কে সে?

    যে বুলেট ছুঁড়েছিল, সে ছাড়া আর কে! সাংবাদিক জবাব দিলেন।

    অধৈর্য হয়ে উঠল পেনক্র্যাফট, পরক্ষণেই ভীষণ স্বরে চেঁচিয়ে উঠল : কে আছো গ্র্যানাইট  হাউসে? কে?

    উত্তরে মৃদু-একটা হাসির শব্দই শোনা গেল। সে-হাসি মানুষের, না অন্য কোনো জীবের, তা ভালো বোঝা গেল না। দ্বীপে তারা আছেন সাত মাস হল। এতদিনের মধ্যে একের পর এক রহস্যময় ঘটনা ঘটেই চলেছে, এর মীমাংসা তাঁরা এখনও করতে পারেননি। কিন্তু এবার ঘটনার আবর্তে তারা যে আশ্চর্য বিস্ময়ের সম্মুখীন হয়েছেন, তার সঙ্গে আগেকার অন্য-কোনোকিছুর তুলনাই হয় না। এই ব্যাপারটির গুরুত্বের কথা মনে পড়তেই একটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় ভাব আচ্ছন্ন করল সবাইকে। বিস্ময়ে দু-চোখ যেন বিস্ফারিত হয়ে ফেটে পড়তে চাইছে।

    অবশেষে বহুক্ষণ বাদে সাইরাস হার্ডিং-এর গম্ভীর কণ্ঠস্বর শোনা গেল : বন্ধুগণ! এখন আমাদের সামনে একটিমাত্র পথ খোলা আছে—সে হল দিনের জন্যে অপেক্ষা করা। দিনের আলোয় পরিস্থিতি অনুযায়ী কাজ করতে হবে আমাদের। কিন্তু এখন সবাই চিমনিতে ফিরে চলল। হয়তো আহারের ব্যবস্থা করা চলবে না, কিন্তু চিমনিতে নিরাপদে ঘুমুনো যাবে।

    পেনক্র্যাফট হতভম্ব কণ্ঠে আবার জিগেস করলে : কিন্তু কে আমাদের এ-রকম করে বিপদে ফেলল?

    সে কে—তা জানা গেল না। হার্ডিং-এর প্রস্তাব কাজে পরিণত করা ছাড়া এখন তাদের করবার অন্য কিছু ছিল না। সবাই চিমনির দিকে রওনা হলেন। চিমনিতে প্রবেশ করে সবাই শুয়ে পড়লেন বটে, কিন্তু কারু চোখেই ঘুম এলো না। গ্র্যানাইট  হাউসে তাদের সবকিছু রয়েছে-অস্ত্রশস্ত্র, যন্ত্রপাতি, রসদ-সবকিছু। কে সেই ব্যক্তি, যার জন্যে গ্র্যানাইট  হাউস তাদের হাতছাড়া হয়ে গেল?

    পুবের আকাশ দিনের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠতে-না-উঠতেই গুলিভরা বন্দুক হাতে করে সবাই গ্র্যানাইট  হাউসের নিচের জমিতে এসে দাঁড়ালেন। তখনও একটু-একটু কুয়াশা ছিল। তবু গ্র্যানাইট  হাউসের বন্ধ জানলাগুলো স্পষ্টই দেখা গেল। ভঁরা যে-রকম দেখে গিয়েছিলেন সেইরকমই পড়ে আছে গ্র্যানাইট  হাউস। তফাতের মধ্যে, সদর দরজাটা একেবারে হাট করে খোলা। কেউ-একজন যে গ্র্যানাইট  হাউসে প্রবেশ করেছে, সে-বিষয়ে এখন আর কোনো সন্দেহই নেই। সিঁড়ির উপরের অংশটা আগের মতোই ঝুলছে, শুধু নিচের দিকটাই টেনে তোলা হয়েছে মধ্যবর্তী প্ল্যাটফর্মে।

    অবাঞ্ছিত আগন্তুকরা যে আর-কাউকে গ্র্যানাইট  হাউসে ঢুকতে দিতে চায় না, তা স্পষ্টই বোঝা গেল। আবারও চেঁচিয়ে উঠল পেনক্র্যাফট, কিন্তু কোনো উত্তর পাওয়া গেল না।

    ইতিমধ্যে সূর্য উজ্জ্বল হলুদ রঙ ছড়াতে-ছড়াতে আকাশে উঠে এসেছে। রোদের আলোয় স্নান করতে লাগল গ্র্যানাইট  হাউস। কিন্তু গ্র্যানাইট  হাউসের ভিতর-বাহির তবু মৃত্যুর মতো নীরব হয়ে পড়ে রইল। যদিও সিঁড়ির অবস্থা দেখে সকলের মনে প্রশ্ন জাগল, সত্যিই কি কেউ গ্র্যানাইট  হাউসে ঢুকেছে? যদি কেউ তাদের অনুপস্থিতিতে গ্র্যানাইট  হাউসে প্রবেশ করে থাকে, তবে নিশ্চয়ই এখনও সে ওখানেই আছে। কিন্তু কী করে এই খাড়া পাহাড় বেয়ে উপরে ওঠা যায়!

    হঠাৎ হার্বার্টের মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। সিঁড়ির যে-শেষাংশ পাহাড়ের গায়ে ঝুলছে। কোনোরকমে যদি তা একবার নিচে নামানো যায়, তাহলেই সব মুশকিল আসান হয়ে যায়। হার্বার্ট ভাবলে, ওদের কাছে তীরধনুক আছে, তীরের পেছনে দড়ি বেঁধে যদি সেই সিঁড়ির শেষ পা-দানির ফাঁকের মধ্য দিয়ে তীর ছোড়া যায়, তবে হয়তো সিঁড়িটা আবার ভূমি স্পর্শ করবে। সৌভাগ্যবশত বেলুনের দড়িদড়াগুলো সঙ্গেই নিয়ে এসেছিলেন ওঁরা। সুতরাং হার্বার্ট তক্ষুনি তার বুদ্ধিকে কাজে পরিণত করতে লেগে গেল। বারকয়েক চেষ্টার পর দড়িবাঁধা তীর সিঁড়ির শেষ পা-দানির মধ্যকার ফাঁক দিয়ে গলে বেরিয়ে গেল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই কে যেন সজোরে হ্যাচকা টান মেরে সিঁড়িটা আরো উপরে তুলে নিয়ে গেল।

    রাস্কেল! চেঁচিয়ে উঠল পেনক্র্যাফট : যদি বন্দুক ছোড়বার সুযোগ পাই তবে তোমাদের মজা দেখিয়ে দেবো!

    কিন্তু কে সিঁড়িটা টেনে তুলল? জিগেস করলে নেব।

    কে? কেন, তুমি দ্যাখোনি? পেনক্র্যাফট বললে : একটা বানর-ওরাংওটাংও হতে পারে! ব্যাবুন গোরিলা হওয়াও বিচিত্র নয়। গ্র্যানাইট  হাউস দখল করেছে বানরের দল–আমাদের অনুপস্থিতিতে ওই বানরগুলোই উপরে উঠে সিঁড়ি টেনে তুলে নিয়েছে।

    পেনক্র্যাফটের কথা যে মিথ্যে নয়, পরমুহূর্তেই তার প্রমাণ পাওয়া গেল। গ্র্যানাইট  হাউসের জানলায় একপাল বানরের মাথা দেখা গেল। পেনক্র্যাফট তখুনি বন্দুক তুলে ট্রিগারে চাপ দিল। বন্দুকের গর্জন থামতে-না-থামতেই একটি বানর গ্র্যানাইট  হাউসের জানলা থেকে ছিটকে পড়ল শূন্যে, তারপর সেই বানরের মৃতদেহটা সশব্দে নিচে পড়ে গেল। অন্য বানরগুলো কিন্তু সেই মুহূর্তে জানলা থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল।

    যে-বানরের মৃতদেহটা নিচে পড়ল দেহ তার বিশাল শিম্পাঞ্জি, গোরিলা কিংবা ওরাংওটাং হবে। প্রাণীবিজ্ঞানের ছাত্র ভালো করে লক্ষ করে জানালে যে মৃতদেহটা ওরাংওটাং-এর।

    মৃতদেহটার দিকে তাকিয়ে নেব বললে : জানোয়ারটা সত্যিই জানোয়ার।

    কিন্তু তবু সমস্যার নিষ্পত্তি হল কই? বললে পেনক্র্যাফট : কী করে আমরা উপরে উঠবো?

    ঠিক এমন সময় ঘটনার ধারা একেবারে পালটে গেল। সবাই যখন নিচু হয়ে ওরাংওটাংটাকে দেখছে, এমন সময় টপ হঠাৎ সাংঘাতিকভাবে চেঁচিয়ে উঠল। দেখা গেল, কোনো অজ্ঞাত কারণে ভীত-গ্রস্ত হয়ে ওরাংওটাং-এর দল পালাতে শুরু করেছে। তারা সাংঘাতিকভাবে চাচাতে শুরু করলে, তারপর একটার ঘাড়ে আরো-একটা পড়ে কয়েক মিনিটের মধ্যেই তারা গ্র্যানাইট  হাউস পরিত্যাগ করে পালিয়ে গেল। কেউ-বা উপর থেকে সোজা লাফ দিলে নিচে, তারপর একেবারে চুর্ণ-বিচুর্ণ হয়ে গেল।

    ঠিক এমন সময় হঠাৎ দেখা গেল, আস্তে-আস্তে গড়িয়ে সিঁড়ি নেমে আসছে।

    কী ব্যাপার! বললে পেনক্র্যাফট : ভারি আশ্চর্য তো!

    সিঁড়িতে পা দিতে-দিতে নাতিস্ফুট কণ্ঠে সাইরাস বললেন : ভারি আশ্চর্য!

    একটু সাবধান হয়ে, ক্যাপ্টেন, বললে পেনক্র্যাফট : এখনও হয়তো গোটাকয়েক রাস্কেল উপরে আছে!

    দেখা যাক, বলতে-বলতে ক্যাপ্টেন সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগলেন। অন্যরা তাকে পায়ে-পায়ে অনুসরণ করলে।

    কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাই গ্র্যানাইট হাউসে উঠে এলেন। তন্ন-তন্ন করে চারদিক খুঁজলেন সবাই। না, কেউ কোথাও নেই। কিন্তু তাহলে সিঁড়িটা নিচে ফেললে কে? ঠিক এমন সময় একটা চ্যাঁচামেচি শোনা গেল, চীৎকার করতে করতে একটা বিশালদেহী ওরাংওটাং প্রবেশপথ থেকে বেরিয়ে এসে ভাড়ার ঘরে ঢুকল। পেনক্র্যাফট তার কুঠার তুলে ওরাংওটাংটার মুণ্ডচ্ছেদের ব্যবস্থা করতে যেতেই হার্ডিং বললেন : একে মেরো না, পেনক্র্যাফট। মনে রেখো, এ-ই আমাদের জন্যে সিঁড়ি নিচে ফেলে দিয়েছিল।

    এমন স্বরে হার্ডিং কথাগুলো বললেন যে, তিনি যে ঠাট্টা করছেন না তা বুঝতে বিন্দুমাত্র অসুবিধে হল না।

    তারপর বেশ খানিকক্ষণ চেষ্টা করে সবাই মিলে ওরাংওটাংটিকে গ্রেপ্তার করলেন। ওরাংওটাংটি প্রতিরোধের বিশেষ চেষ্টা করলে না, বোঝা গেল কোনো অজ্ঞাত কারণে সে ভয় পেয়েছে।

    ওরাংওটাংরা খুব চালাক। শুধু আকারেই মানুষের সঙ্গে ঈষৎ তফাৎ, নইলে মানুষই বলা চলতো ওদের। আর পেনক্র্যাফটের কথামতো ওরাংওটাংরা যে কথা বলতে পারে না সেইটে ভারি আপশোশের ব্যাপার। তবে ডারউইনের কথামতো বলা যায় যে, ওরাংওটাংরা মানুষেরই পূর্বপুরুষ! সেই কারণেই ক্যাপ্টেন এ-কথা বললেন যে, একটু শিখিয়ে-পড়িয়ে নিলে ওরাংওটাংটা ওঁদের ভূতের কাজ করতে পারবে। অবিশ্যি এর মধ্যে একটি যদি আছে। যদি পোষ মানে, তবেই তো।

    পেনক্র্যাফট তো তক্ষুনি ওরাংওটাংটার কাছে গিয়ে বলল : কী হে ওরাং সাহেব, ভালো তো।

    ওরাংওটাংটা জবাবে এমন একটা শব্দ করে উঠল, যার মধ্যে রাগের কোনো আভাস নেই।

    আবারও পেনক্র্যাফট শুধোলে : তুমি আমাদের দলে যোগ দেবে তো? না কি, সাইরাস হার্ডিং-এর দলে যোগ দেয়া তোমার অপছন্দ?

    আবারও ওরাংওটাংটা অমনি একটা শব্দ করলে।

    কিন্তু বাছা, আগেই তোমাকে বলে রাখছি, খাবার-দাবার ছাড়া মাইনে কিন্তু আমরা দিতে পারবো না।

    আবারও ওরাংওটাংটি যা শব্দ করলে তাকে ইতিবাচক বলা যেতে পারে।

    গিডিয়ন স্পিলেট মন্তব্য করলেন : তোমাদের কথাবার্তা বন্ধ করো তো, পেনক্র্যাফট। অসহ্য লাগছে আমার।

    পেনক্র্যাফট উত্তর দিলে : আর যা-ই হোক, বাছা আমার বিশেষ অবাধ্য নয়। কম কথা বলে–এটা একটা সুলক্ষণ।–হ্যাঁ বাছা, মনে থাকবে তো, কোনো মাইনে পাবে প্রথমটা। তবে যদি তোমার কাজ দেখে আমরা খুশি হই, তাহলে একসঙ্গে দ্বিগুণ মাইনে পাবে।

    এইভাবেই ওদের দল ভারি করলে ওরাংওটাংটি। পেনক্র্যাফট তার নাম দিল জুপিটারসংক্ষেপে জাপ। কেউ সে নামে আপত্তি করল না। সুতরাং মাস্টার জাপ গ্র্যানাইট  হাউসেই থেকে গেলেন।

    এরপর তাদের প্রথম কর্তব্য হল, নিচে-পড়ে-থাকা মৃত ওরাংওটাংগুলো সম্বন্ধে একটা ব্যবস্থা করা। সবাই মিলে ওরাংওটাংগুলোকে বনের ধারে নিয়ে কবর দিয়ে দিলেন। সেকাজ সাঙ্গ হবার পর হার্ডিং জানালেন, এবার তাঁদের সর্বপ্রথম কর্তব্য হল, মার্সি নদী পারাপারের জন্যে একটি সেতু নির্মাণ করা। তারপর মুসমন ইত্যাদি জর জন্যে একটি বাসস্থান তৈরি। এই দুই কাজ সাঙ্গ হলে অসুবিধে অনেক কমে যাবে। মুসমনদের বাসস্থান কোথায় হবে, সে-জায়গাটার কথাও ক্যাপ্টেন সবাইকে জানালেন। তিনি বললেন, রেড ক্রীকের আশপাশে কোনোখানে সেটা তৈরি করলে সুবিধে হয়।

    পরদিন তেসরা নভেম্বর থেকে সবাই উঠে-পড়ে লাগলেন মার্সি নদীর উপর সেতু নির্মাণে। সমস্ত যন্ত্রপাতি, সাজসরঞ্জাম নিয়ে সবাই মার্সি নদীর তীরে এসে পৌঁছুলেন। সেতুটা এমন জায়গায় নির্মাণ করা হবে ঠিক হল, যে-জায়গা থেকে দ্বীপের সর্বত্র চলাচলের একটা সুরাহা হয়। মার্সি নদীর এই সেতু তৈরি করতে তিন সপ্তাহ সময় লাগল। এই সময়টুকু সাংঘাতিক খাটতে হল সবাইকে। তারপর বিশে নভেম্বর সেতুর কাজ সম্পূর্ণ হল। বাঁশ আর কাঠ দিয়েই সেতুটা তৈরি করা হল বটে, কিন্তু তবু খুব মজবুত হল।

    এ ক-দিনের মধ্যে মাস্টার জাপ আস্তে-আস্তে ওঁদের পোষ মেনেছে জাপকে যা করতে দেখিয়ে দেয়া হয়, নীরবে সে তা পালন করে। এ ছাড়া টপ আর জাপের মধ্যে বন্ধুত্বও হয়েছে। অবসর সময়ে দুজনে একসঙ্গে বসে খেলা করে।

    ইতিমধ্যে সেই একদানা গম থেকে বেশ-খানিকটা গম পাওয়া গেল। দশটি অঙ্কুর। বেরিয়েছে সেই গমের দানা থেকে, আর এক-একটা অঙ্কুরে আশিটা করে গমের দানা পাওয়া গেল। সুতরাং আটশো গমের দানা পেলেন তাঁরা। অবিশ্যি পেনক্র্যাফটের সতর্কতা ব্যতীত তাঁদের এই প্রথম চাষ সফল হত কি না বলা দুষ্কর।

    এবার দ্বিতীয় চাষের জন্যে একটা জমি তৈরি করা হল, আর সেই জমির চারদিকে উঁচু করে বাঁশের বেড়া দেয়া হল। আর পাখিদের তাড়াবার জন্যে কাকতাড়ুয়াও তৈরি করা হল। তারপর সেই আটশোটি গমের দানা রোপণ করলেন তারা।

    একুশে নভেম্বর হার্ডিং দ্বীপের মধ্যে জল সরবরাহের জন্যে একটা খাল কাটবার মৎলব করলেন। ঠিক হল, পশ্চিম সমভূমি ঘুরে লেক গ্ল্যান্টের দক্ষিণ কোণ বেষ্টন করে সেই খাল এসে পড়বে মার্সি নদীর প্রথম বাঁকে। বারো ফুট চওড়া আর ছ-ফুট গভীর হবে সেই খাল।

    ডিসেম্বরের প্রথম পক্ষের মধ্যেই সেই খাল কাটা হয়ে গেল। অবিশ্যি এজন্যে আপ্রাণ পরিশ্রম করলেন সবাই।

    ডিসেম্বর মাসে গরম পড়ল অত্যন্ত ভয়ানক। তবু সেই ভয়ানক গরমের মধ্যেই সবাই মিলে কাজ চালিয়ে গেলেন। এবার তাদের প্রথম কাজ হল, পোষমানা পশুপাখির জন্যে খোয়াড় তৈরি করা। লেক গ্ল্যান্টের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে দুশো বর্গগজ জমি জুড়ে সেই খোঁয়াড় তৈরি করা হবে ঠিক হল। খুব শক্ত করে বাঁশ আর কাঠ দিয়ে চারদিকে বেড়া দেয়া হল। তারপর পাখিদের জন্যে কাঠ দিয়ে কয়েকটা খুপরিও তৈরি করা হল। তারপর সবাই খোঁয়াড়ের অধিবাসী সংগ্রহের জন্যে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন।

    প্রথমে ধরা হল দুটি টিনামুস, তারপর লেক গ্ল্যান্টের কাছ থেকে এক-ডজন হাঁস। পেলিক্যান, জল-মুরগি ইত্যাদি ধরবার জন্যে আর কষ্ট করতে হল না, আপনা থেকেই তারা খোয়াড়ের অধিবাসীদের দল ভারি করলে। তারপর আস্তে-আস্তে পাঁচটি ওনাগা (জিব্রা এবং কনাগার মধ্যবর্তী একজাতীয় চতুষ্পদ; খুব ভালো দৌড়ুতে পারে), গোটা-সাতেক মুসমন এবং আরো দু-এক জাতের জীব এসে খোঁয়াড়ে ভিড় করলে। তারা অবিশ্যি আপনা থেকে আসেনি, অনেক হ্যাঙ্গামার পর ধরতে হয়েছে তাদের। তারপর একটা বেশ বড়ো-শড়ো গাড়ি প্রস্তুত করলেন সবাই। ঘোড়া না-পাওয়া গেলেও ওনাগা পাওয়া গেছে। ওনাগার সাহায্যেই গাড়ি চালানো যাবে।

    পেনক্র্যাফট নিয়েছিল খোয়াড়ের ভার। কয়েক দিনের মধ্যেই সে ওনাগাদের পোষ মানিয়ে ফেললে। তারও কয়েক দিন পর প্রথম যেদিন ওনাগার গাড়ি ছুটল দ্বীপে, সেদিন তো পেনক্র্যাফট রীতিমত হৈ-চৈ বাধিয়ে বসল।

    ইতিমধ্যে বেলুন থেকে পাওয়া লিনেনের সাহায্যে পরনের কাপড়ের একটা সুরাহা হয়ে গেল। সিন্দুকের মধ্যে উঁচ ছিল, তারই সাহায্যে লিনেনের জামা-কাপড় বানানো হল। বিছানার চাদর ইত্যাদিও তৈরি করা হল। অর্থাৎ, এক কথায়, বেশ-একটু স্বাচ্ছন্দ্য এলো তাদের জীবন-যাত্রায়।

    বলা বাহুল্য যে, এ ক-দিন জাপ দ্বীপবাসীদের ঘর-গেরস্থালির কাজে বেশ খানিকটা সাহায্য করতে শুরু করেছে। এভাবেই জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত কেটে গেল।

    আঠারোশো ছেষট্টি খ্রিস্টাব্দের শুরু থেকেই ভয়ানক গরম পড়ল। তাই বলে ওঁদের শিকার কিন্তু বন্ধ রইল না। আশুতি, পিকারি, ক্যশিবরা, ক্যাঙারু ইত্যাদি শিকারও করা হল, ধরাও হল খোয়াড়ের অধিবাসীদের সংখ্যাবৃদ্ধির জন্যে।

    ইতিমধ্যে জাপ রীতিমতো ওস্তাদ খানশামা হয়ে উঠেছে। একদিন দেখা গেল ন্যাপকিন হাতে সে ওঁদের ডিনার টেবিল তদারক করবার জন্যে তৈরি। মনোযোগী জাপ থালা পালটে, ডিশ এনে, গেলাশে জল দিয়ে, এমন গম্ভীরভাবে আপন কাজ করে চলল যে, হার্ডিং পর্যন্ত না-হেসে পারলেন না। সবচেয়ে বেশি হৈ-চৈ করতে লাগল পেনক্র্যাফট। একটু পরেপরেই সে বলতে লাগল : জাপ, একটু সুপ! জাপ, লক্ষ্মী জাপ, একটু জল!—ইত্যাদি। ইত্যাদি।

    প্রত্যেকবারই নীরবে জাপ সকলের চাহিদা সরবরাহ করতে লাগল। তা কাজে একটুও গোলমাল হল না। তাই দেখে পেনক্র্যাফট বললে : সত্যি জাপ, এবার তুমি দ্বিগুণ মাইনে চাইতে পারো।

    বলা বাহুল্য যে, জাপ গ্র্যানাইট  হাউসের ঘরকন্নার ভার এবার থেকে, বলতে গেলে, পুরোপুরিই নিয়ে নিলে নিজ হাতে। এখন তো সে গ্র্যানাইট  হাউসের একজন পুরোদস্তুর মেম্বার। তার গাল-গল্প, হাসি-খেলা সব চলে টপের সঙ্গে। টপ বোধহয় এবার জাপের জন্যে প্রাণ পর্যন্ত দিতে পারে, আর টপের জন্যে প্রাণ দিতে জাপও সর্বদা তৈরি।

    জানুয়ারির শেষ দিকে দ্বীপের একেবারে মাঝখানে তাঁদের কাজ শুরু হল। ঠিক হল যে, রেড ক্রীকের উৎসের কাছে ফ্র্যাঙ্কলিন পর্বতের পাদদেশে একটি কোর্যাল তৈরি করা হবে। গ্র্যানাইট  হাউস থেকে পাঁচ মাইল দূরে কোর‍্যালের নির্মাণস্থান ঠিক করা হল। হার্ডিং তাঁর এঞ্জিনিয়ারসুলভ নৈপুণ্যের সঙ্গে শিগগিরই কোর‍্যালের একটা প্ল্যান তৈরি করে ফেললেন। জানোয়ারদের আশ্রয় নেয়ার জন্যে শেডও থাকবে কোর‍্যালে। তারপরেই সবাই কোর‍্যাল তৈরির কাজে উঠে-পড়ে লাগলেন। খুব মজবুত করে বানানো হল কোর্যাল। চারপাশে দেয়া হল শক্ত বেড়া। কোর‍্যালের কাজ শেষ হতে-হতে তিন সপ্তাহ লেগে গেল। তারপর শুরু হল কোর‍্যালের জন্যে জানোয়ার সংগ্রহের পালা। যদিও অনেক পরিশ্রম করতে হল, তবুও কোনো নালিশ রইল না তাদের। কেননা, শিগগিরই কোর‍্যাল প্রায় ভর্তি হয়ে গেল।

    সারা ফেব্রুয়ারি মাসে উল্লেখযোগ্য কোনো ঘটনা ঘটল না। যন্ত্রচালিতের মতো এতে লাগল সকলের কাজ। কোর‍্যালে যাওয়ার জন্যে রাস্তাটা সুগম করা হল, পোর্ট বেলুনের সঙ্গেও যাতে সহজে সংযোগ করা যায়, সেইজন্যে সেখানে যাওয়ার জন্যেও ভালো করে রাস্তা তৈরি করা হল।

    শীত আসবার আগেই যাতে রসদের একটা ব্যবস্থা করা যায়, সেইজন্যে নানান রকম শাকসজিরও একটি বাগান করা হল। উদ্ভিদতত্ত্ব হার্বার্টের ভালো পড়া ছিল বলে সে-ই এই কাজে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করলে। দ্বীপের সমতল ভূমির জমি বেশ উর্বর ছিল বলে বাগানের কাজেও তাদের ব্যর্থতা বরণ করতে হল না। ক্রমশ গরমের দিন প্রায় শেষ হয়ে গেল। এই গ্রীষ্মকালে দিনের তীব্র উত্তাপের পর সন্ধেবেলা সমুদ্রের ঠাণ্ডা হাওয়ায় প্রসপেক্ট হাইটের উপর বসে-বসে ভঁরা গল্পগুজব করতেন।

    সেখানে শুধু গল্পগুজবই হত না, নির্ধারিত হত ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা। মাঝে-মাঝে স্বদেশের কথাও উঠতো। যুদ্ধ কি শেষ হয়েছে এতদিনে? কে জিতল লড়াইয়ে? নিঃসন্দেহে জেনারেল গ্র্যান্ট রিচম দখল করেছেন। আহা! যদি একটা খবরের কাগজ পাওয়া যেত কোনোরকমে! এদিকে চব্বিশে মার্চ আসছে শিগগিরই। প্রায় এক বৎসর পূর্ণ হতে চলল লিঙ্কন আইল্যাণ্ডে আসবার পর থেকে। যখন তারা দ্বীপে উপস্থিত হয়েছিলেন, তখন ছিলেন ভাগ্যহত কয়েকজন ব্যক্তিমাত্র। আর এখন? জ্ঞানবৃদ্ধ ক্যাপ্টেনের আশ্চর্য প্রখর বুদ্ধি আর সকলের সম্মিলিত পরিশ্রমের দরুন এই নির্জন দ্বীপকে তারা বাসযোগ্য করে তুলতে পেরেছেন। এইসব কথা আলোচনা করতে-করতে অনাগত ভবিষ্যতের জন্যে নতুন-নতুন পরিকল্পনা করতেন তারা।

    অবিশ্যি সাইরাস হার্ডিং এই ধরনের আলাপ-আলোচনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নীরব হয়ে থাকতেন। নিঃশব্দে তিনি শুনতেন তার সঙ্গীদের কথাবার্তা, কখনো-কখনো তরুণ হাবার্টের কল্পনাবিলাসে তার ঠোঁটে হাসির ঝিলিক খেলে যেতো, কখনো-বা পেনক্র্যাফটের আজব বা আজগুবি প্ল্যান শুনে সশব্দে হেসে উঠতেন তিনি। কিন্তু সবসময়েই তাঁর মাথায় ঘুরে বেড়াতে একটি জিনিশ। সে হল সেই রহস্যময় ঘটনাবলি, সেই আশ্চর্য-আশ্চর্য ব্যাপার, যার কোনো মীমাংসা করা এখনও সম্ভব হয়নি। দ্বীপে যে কোনো-একজন লোক আছে, সে-বিষয়ে হার্ডিং প্রায় নিঃসন্দেহ। কিন্তু সে কে? থাকেই বা কোথায়? তাদের সাহায্য করছে অথচ দেখা দিচ্ছে না কেন?-না এ করছে অথচ দেখা দিচ্ছে না কেন?-না, এর কোনো উত্তরই খুঁজে পাননি হার্ডিং।

    মার্চের প্রথম সপ্তাহে হঠাৎ আবহাওয়া বদলে গেল। পয়লা তারিখ ছিল পূর্ণিমা, গরমও পড়েছিল অসহ্যরকম। কিন্তু দুই তারিখে আকাশে গজরাতে লাগল বজ্র, পূর্বদিক থেকে বইল হাওয়া, ঝড়ের সম্ভাবনা জাগল বায়ুকোণে। সেই সম্ভাবনা সত্যি-সত্যিই উম্মত্ত ঝক্সায় পরিণত হল। এই বিশ্রী আবহাওয়ার স্থিতিকাল হয়েছিল এক সপ্তাহ। বাইরের কোনো কাজ আপাতত হাতে না-থাকায় এই ঝড়ের সময় সবাই গ্র্যানাইট  হাউসের গেরস্থালির কাজে মন দিলেন। বন্দুক রাখবার জন্যে ব্ল্যাক বানালেন, রান্নাবান্নার কিছু-কিছু সরঞ্জাম তৈরি করা হল, টেবিল আর তাকও বানানো হল গোটাকয়েক।

    মাস্টার জাপের কথা কেউ ভুলে যায়নি। এবার ভাড়ার ঘরের পেছনে একটা পার্টিশন দিয়ে সম্পূর্ণ একটা ঘর ছেড়ে দেয়া হল তার দখলে। ইতিমধ্যে জাপ তার কাজে-কর্মে আরো দুরস্ত হয়ে উঠেছে। তার কাজের ধারা দেখে সবসময়েই হৈ-চৈ করতে পেনক্র্যাফট। দিন-দিন তার কাজের উন্নতি হচ্ছে দেখে পেনক্র্যাফটের উৎসাহও বেড়ে চলল।

    দ্বীপবাসীদের স্বাস্থ্যে কোনো দোষত্রুটি ছিল না। এই এক বছরে হার্বার্ট তো দু ইঞ্চি লম্বাই হয়ে গেছে। অন্য-সবার স্বাস্থ্যও নিখুঁত ছিল।

    মার্চের নয় তারিখে এই তুমুল ঝড় থামল, কিন্তু সারা মার্চ মাস জুড়েই আকাশ মেঘ মুড়ি দিয়ে রইল। প্রায়ই বৃষ্টিপাত হত, মাঝে-মাঝে বেজায় কুয়াশাও পড়তো। এরই মধ্যে একটি স্ত্রী-ওনাগার বাচ্চা হল। কোর‍্যালে মুসমনের সংখ্যাও বেশ বৃদ্ধি পেলে।

    একদিন কথায়-কথায় পেনক্র্যাফট ক্যাপ্টেন হার্ডিংকে বললে : ক্যাপ্টেন, আপনি একবার বলেছিলেন যে, সিঁড়ির পরিবর্তে গ্র্যানাইট  হাউসে ওঠবার জন্যে একটা যন্ত্র বানানো সম্ভব। এবার সেই কাজে লাগলে হয় না?

    খুবই সহজ ওটি বানানো। কিন্তু সত্যিই কি এর কোনো প্রয়োজন আছে?

    নিশ্চয়ই, ক্যাপ্টেন। নিছক প্রয়োজনের তাগিদেই তো এতদিন কাজ করে এসেছি, এবার একটু স্বাচ্ছন্দ্যের দিকে নজর দিলে কোনো ক্ষতি নেই। আমাদের কাছে হয়তো এ-স্বাচ্ছন্দ্যের জিনিশ বলে মনে হতে পারে, কিন্তু মালপত্র তোলবার ব্যাপারে এ আমাদের প্রয়োজনের কোঠায় পড়ে। মালপত্র নিয়ে এই লম্বা সিঁড়ি বেয়ে ওঠা ভারি অসুবিধে, তাছাড়া বিপজ্জনকও।

    বেশ, পেনক্র্যাফট, তোমার কথা রাখতে পারি কি না চেষ্টা করে দেখা যাক। বললেন সাইরাস হার্ডিং।

    কিন্তু আপনার তো কোনো মেশিন নেই।

    বানিয়ে নেবো।

    স্টীম মেশিন? শুধোল পেনক্র্যাফট : বাষ্প-চালিত?

    না, একটি হাইড্রলিক লিফট বানাবো। তার জন্যে দরকার তীব্রস্রোত জলের।

    আর, বলা বাহুল্য, এই যন্ত্র তৈরি করবার প্রধান উপাদানের কোনো অভাবই ছিল না। ছোট্ট ঝরনাটির তীব্র স্রোতধারা গ্র্যানাইট  হাউসের অভ্যন্তর দিয়ে প্রবাহিত হত, তাকে কাজে লাগাবার পরিকল্পনা করেছেন হার্ডিং। যে-সংকীর্ণ ফাটল দিয়ে এই জলধারা অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে প্রথমে তাকে আরো চওড়া করা হল—এমনভাবে, যাতে তীব্রবেগে তার জলধারা প্রবাহিত হয়। ভিতরের কূপটি দিয়ে এই জল গিয়ে পড়তো সমুদ্রে। সেই নিম্নগামী জলধারার নিচে ক্যাপ্টেন প্যাডেল-সমেত একটি সিলিণ্ডার লাগালেন। শক্ত, লম্বা একটা তার দিয়ে সেই সিলিণ্ডারের সঙ্গে একটি চাকা যোগ করে দেয়া হল। এইভাবে একটি দড়ির সাহায্যে গ্র্যানাইট  হাউসের নিচের ভূমি স্পর্শ করা গেল। আর সেই দড়ির সঙ্গে একটি ঝুড়ি সংযুক্ত করে দেয়া হল এইভাবেই জলধারাকে কাজে লাগিয়ে ক্যাপ্টেন তাঁর হাইড্রলিক লিফট তৈরি করলেন।

    সতেরোই মার্চ হাইড্রলিক লিফট প্রথম কাজ করল। সাফল্য দেখে সবাই আনন্দে চেঁচিয়ে উঠলো, এবার সিঁড়ির ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়া হল। মালপত্র তো বটেই, এছাড়াও টপ এবং জাপ সেই লিফটের সাহায্যেই ওঠানামা করতে লাগলে।

    এবার সাইরাস হার্ডিং কাচ বানানোর পরিকল্পনা করলেন। মৃৎপাত্র নির্মাণের জন্যে যে-চুল্লিটা প্রস্তুত করা হয়েছিল, এবারে সেটি কাজে লাগল। কাচ তৈরি অবিশ্যি সহজ নয়। সম্মিলিত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও উপর্যুপরি বেশ কয়েকবার সেই কাজে ব্যর্থ হতে হল ওঁদের।

    অবশেষে ক্যাপ্টেন হার্ডিং কাচের কারখানা তৈরি করতে সক্ষম হলে তুমুল হৈ-চৈ–এর সঙ্গে সবাই তাকে অভিনন্দন জানালে। কাচ বানাতে যে-সব উপকরণ লাগে, যেমন–বালি, খড়ি, সোড়া (কার্বনেট অথবা সালফেট-যে-কোনো একটি) কিছুরই অভাব ছিল দ্বীপে। এইভাবে অল্পদিনের মধ্যেই কারখানা তৈরি হয়ে গেল। কাচ তৈরির জন্যে যে-পাইপের প্রয়োজন লোহা দিয়ে একটি টিউব তৈরি করে সে অভাব পূরণ করা হল। জলের টিউবটা হল ছ-ফুট লম্বা—দেখতে অনেকটা বন্দুকের ব্যারেলের মতো। আটাশে মার্চ থেকে কাচ তৈরি শুরু হল। প্রথম-প্রথম বালি খড়ি আর সোডার সংমিশ্রণ উপযুক্ত পরিমাণে না-হওয়ায়, যে-কাচ তৈরি হল তা মোটেই স্বচ্ছ হল না। অল্পক্ষণের মধ্যেই অবিশ্যি সেই ত্রুটি সংশোধন করে নিলেন হার্ডিং। তার পর থেকে স্ফটিকের মতো চকচকে, উজ্জ্বল স্বচ্ছ কাচ পেতে মোটেই অসুবিধে হল না। সেই কাচ দিয়ে প্রথমে গ্র্যানাইট  হাউসের জানলা তৈরি করা হল। তারপর তৈরি করা হল নানান ধরনের পাত্র। প্রায় শ-খানেক বোতল, পাঁচ জন গেলাশও তৈরি হল। এইসব কাচের জিনিশের গড়ন মোটেই সুদৃশ্য হল না, কেমন তেড়াবেঁকা, দেখলেই হাসি পায়। এই কাজের ভার ছিল প্রধানত হার্বার্টের উপর। হার্বার্টকে উৎসাহ দেয়ার জন্যেই হার্ডিং সবাইকে এই নিয়ে হাসিহাসি করতে বারণ করে দিলেন। অবিশ্যি অন্যরা এমনিতেও হাসত না। কেননা, ছাঁচ ছাড়াই যে এভাবে কাজ চালাবার উপযোগী জিনিশপত্র তৈরি করা যাচ্ছে, এ তো আর কম প্রশংসার ব্যাপার নয়।

    ইতিমধ্যে একদিন শিকার করতে বেরিয়ে হার্বার্ট আর হার্ডিং একটি মূল্যবান গাছ আবিষ্কার করলেন। গাছটি হল কাইকাস রিভল্যুতা। প্রকৃতি-বিজ্ঞানের ছাত্র বলে হার্বার্টই গাছটিকে চিনতে পেরেছিল। হার্বার্ট জানালে যে এই গাছের টিশু এক ধরনের ময়দার মতো পদার্থ পাওয়া যায়, খাদ্য হিশেবে যার আস্বাদ নিতান্ত ফ্যালনা নয়।

    তার কথা শুনে হার্ডিং বললেন : সোজা কথায়, এটি তাহলে রুটি-গাছ?

    হ্যাঁ, একে রুটি-গাছই বলা চলে। ব্রেডফ্রট ট্রি।

    এটি একটি মূল্যবান আবিষ্কার, বললেন হার্ডিং:যতদিন না আমরা আমাদের খেতের ফসল পাচ্ছি, ততদিন এই গাছ আমাদের আহার জোগাবে। কিন্তু তোমার গাছটা চিনতে ভুল হয়নি তো, হার্বার্ট?

    না, হার্বার্টের ভুল হয়নি। হার্বার্ট গাছের একটা ভাল ভেঙে নিলে। এক ধরনের ময়দার মতো গুড়ো টিশু দিয়েই সেই ডাল গঠিত। প্রকৃতির আহার জোগানোর ক্ষমতা কত অসীম, এ-কথা চিন্তা করে হার্ডিং ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিলেন। আশপাশে আরো-কয়েকটি এই জাতের গাছ দেখা গেল। যে-জায়গায় তাঁরা গাছগুলো পেলেন, সে-জায়গার অবস্থান দ্বীপের পশ্চিম প্রান্তে। গ্র্যানাইট হাউসে ফিরে হার্ডিং এই মূল্যবান আবিষ্কারের কথা সবাইকে জানালেন। পরদিন সবাই মিলে সেই জায়গার উদ্দেশ্যে বেরুলেন। যখন তারা ফিরে এলেন, দেখা গেল তারা বিপুল পরিমাণে কাইকাসের ডাল সংগ্রহ করে এনেছেন। যদিও এটি অবিকল শাদা রঙের ময়দার মতো হল না, তবু দেখতে অনেকটা সেই রকমই হল।

    কোর‍্যালের প্রাণীদের একটি বৃহৎ সংখ্যা রচনা করেছিল ওনাগা, ছাগল আর ভেড়া। তাদের দুধ এবার পেতে লাগলেন তারা। ওনাগার গাড়ির সাহায্যে কোর্যাল আর গ্র্যানাইট হাউসের মধ্যে সংযোগ রক্ষার বিশেষ অসুবিধে হত না।

    যত দিন গেল, ততই উন্নতি হতে লাগল তাঁদের অবস্থার। খুঁতখুঁত করবার মতো কিছুই ছিল না তাদের। ক্রমে-ক্রমে লিঙ্কন আইল্যাণ্ডই যেন তাদের স্বদেশ হয়ে উঠতে লাগল।

    দ্বীপে প্রয়োজনীয় কোনোকিছুরই অভাব না-থাকায়, ক্রমশ এই দ্বীপকে ভালোবাসতে শুরু করলেন তাঁরা। কিন্তু তবু মাতৃভূমির মাটি টানে সকলের মন। মনের মণিকোঠায় উঁকিঝুঁকি মারে ক্ষীণ আশা। আহা! একবার যদি একটি জাহাজ যায় এই দ্বীপের পাশ দিয়ে! তখন হয়তো-বা সংকেতের সাহায্যে দৃষ্টি আকর্ষণ করা যাবে সেই জাহাজের।

    সেদিন পয়লা এপ্রিল, রবিবার। দিনটা ছিল ঈস্টার ডে। হার্ডিং আর তার সঙ্গীরা সেদিন খানিকক্ষণ বিশ্রাম গ্রহণ করলেন। আবহাওয়া ছিল প্রসন্ন। প্রার্থনার পরে সেই আবহাওয়ার মতোই শুচি হয়ে উঠল তাদের মন।

    রাত্রে খাওয়া-দাওয়ার পরে সবাই প্রসপেক্ট হাইটের উপরে একটি বারান্দার মতো জায়গায় গা এলিয়ে বসলেন। খানিকক্ষণ সবাই একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন অন্ধকার দিকচক্রবালের দিকে। তারপর দ্বীপের কথাই আলোচনা করতে লাগলেন। প্রশান্ত মহাসাগরের এমন-এক নিরালা অঞ্চলে তাদের দ্বীপ অবস্থিত যে, কোনো জাহাজ তৈরি করে সমুদ্র পাড়ি দেয়া সহজসাধ্য নয়।

    এমন সময় গিডিয়ন শিলেট প্রশ্ন করলেন : আচ্ছা ক্যাপ্টেন হার্ডিং, সিন্দুকে সেক্সট্যান্ট পাওয়ার পর আপনি কি আর আমাদের দ্বীপের অবস্থান নিরূপণের চেষ্টা করেছেন?

    না, উত্তর করলেন সাইরাস।

    আপনি তো আগে নক্ষত্র দেখে, আর গাছের ছায়া ইত্যাদি দেখে দ্বীপের অবস্থান আন্দাজ করেছিলেন। সেক্সট্যান্ট ব্যবহার করলে সেই সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হওয়া যেতো না কি?

    কী দরকার খামকা? বললে পেনক্র্যাফট : দ্বীপটার অক্ষাংশ আর দ্রাঘিমাংশ যা-ই হোক না কেন, দিব্যি আরামে-গরমে আছি তো।

    এমনও তো হতে পারে, বললেন স্পিলেট, এই দ্বীপের কাছাকাছি কোনো লোকালয় আছে, অথচ আমরা জানি না।

    বেশ। কালকেই আমরা দ্বীপের সঠিক অবস্থিতি জেনে নেবো, বললেন হার্ডিং : অন্যসব কাজে ব্যস্ত না-থাকলে আরো আগেই তা জানতে পারতুম।

    আমার কিন্তু মনে হয়, বললে পেনক্র্যাফট, ক্যাপ্টেন আগে যা নিরূপণ করেছিলেন তাই ঠিক। যদি দ্বীপটি এর মধ্যে স্থানচ্যুত না-হয়ে থাকে, তবে ক্যাপ্টেনের হিশেবে কোনোই ভুল হয়নি।

    সে দেখা যাবে কাল।

    পরদিন দোসরা এপ্রিল সেক্সট্যান্টের সাহায্যে হার্ডিং সতর্ক হয়ে দ্বীপের অবস্থিতি নির্ধারণে রত হলেন। তার পর্যবেক্ষণের ফল থেকে জানা গেল যে, যন্ত্র ব্যতিরেকে তিনি যা নিরূপণ করেছিলেন, প্রায় সেইটেই দ্বীপের অবস্থিতি। তাঁর প্রথম পর্যবেক্ষণের ফল ছিল এইরকম :

    পশ্চিম দ্রাঘিমারেখা : ১৫০° থেকে ১৫৫°-র মধ্যে।

    দক্ষিণ অক্ষাংশ : ৩০° থেকে ৩৫°-র মধ্যে।

    এবারের পর্যবেক্ষণের ফলে সঠিক অবস্থান দাঁড়াল :

    ১৫০°৩ দ্রাঘিমারেখা এবং ৩৪°৫৭ দক্ষিণ অক্ষাংশ।

    দেখা গেল, আগের বারে যন্ত্রপাতি না-থাকা সত্ত্বেও সাইরাস হার্ডিং হিশেবে খুব-বেশি। তফাৎ করেননি।

    স্পিলেট বললেন, আমাদের তো একটি মানচিত্র আছে। প্রশান্ত মহাসাগরের ঠিক। কোনখানটায় আমাদের দ্বীপ, এবার তা দেখা যাক।

    হাবার্ট তক্ষুনি মানচিত্র নিয়ে এল। প্রশান্ত মহাসাগরের মানচিত্র বের করা হল।

    কম্পাসের সাহায্যে হার্ডিং লিঙ্কন আইল্যাণ্ডের অবস্থিতি নিরূপণ করে হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলেন : আরে! প্রশান্ত মহাসাগরের এ-অঞ্চলে আগে থেকেই আরেকটা দ্বীপ আছে!

    একটা দ্বীপ! চেঁচিয়ে উঠল পেনক্র্যাফট : কী নাম?

    টেবর আইল্যাণ্ড।

    গুরুত্বপূর্ণ কোনো দ্বীপ?

    না, জনমানবহীন একটা হারানো দ্বীপ এটি।

    আমরা তবে টেবর আইল্যাণ্ডে যাবো, বললে পেনক্র্যাফট।

    আমরা!

    হ্যাঁ, ক্যাপ্টেন। আমি একটা ডেক-সমেত নৌকো তৈরি করবার ভার নিচ্ছি। তার সাহায্যেই আমরা টেবর আইল্যাণ্ডে যাবো। আমাদের দ্বীপ থেকে কত দূরে ওই দ্বীপ?

    উত্তর-পূর্ব দিকে প্রায় দেড়শো মাইল দূরে। উত্তর করলেন হার্ডিং।

    দেড়শো মাইল? এত কাছে? বললে পেনক্র্যাফট : আবহাওয়া ভালো থাকলে, অনুকূল হাওয়া পেলে আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যেই ওই দ্বীপে পৌঁছুনো যাবে।

    এ-কথা শুনে সবাই ঠিক করলেন যে, অক্টোবরের আগেই একটা পালের জাহাজ তৈরি করতে হবে। তারপর বের হওয়া যাবে সীমাহারা নীল সমুদ্রে, নতুন অ্যাডভেনচারের সন্ধানে।

    .

    ২.৪ সন্দেহ তবু গেল না

    পেনক্র্যাফটের মগজে যখন কোনো কাজের কথা ঢোকে, তখন সে-কাজ শেষ না হওয়া। অব্দি তার আর শান্তি নেই; অক্টোবর মাস এলেই টেবর আইল্যাণ্ডে যেতে হবে, সুতরাং উপযুক্ত নৌকো তৈরি করবার জন্যে তার মন ভারি ব্যস্ত হয়ে উঠল। অক্টোবরের অবিশ্যি এখনও ছ-মাস বাকি। এই সময়ের মধ্যে নৌকো তৈরি করতেই হবে। হার্ডিং এক-একজনের ওপর এক-একরকম কাজ ভাগ করে দিলেন। তিনি আর পেনক্র্যাফট নিলেন নৌকো তৈরির ভার; স্পিলেট আর হাবার্টের উপর পড়ল শিকার করে খাদ্যের ব্যবস্থা করবার ভার; আর ঠিক হল, নেব জাপকে নিয়ে রান্নাবান্না করবে।

    উপযুক্ত গাছ বেছে নিয়ে সেই গাছ চিরে তা করা হল। চিমনি আর প্রসপেক্ট হাইটের মাঝখানে ডকইয়ার্ড বানিয়ে পঁয়ত্রিশ ফুট লম্বা নৌকোর কাঠামো তৈরি করা হল। তারপর শুরু হল হার্ডিং আর পেনক্র্যাফটের সকাল-সন্ধে পরিশ্রম।

    এদিকে হার্বার্টকে নিয়ে স্পিলেট শিকারে বেরুতে লাগলেন প্রত্যহ।

    তিরিশে এপ্রিল তারা পশ্চিম দিকে গহন বনে শিকার করতে গেলেন।স্পিলেট চললেন আগে-আগে, হাবার্ট পেছন-পেছন। একটু খোলামেলা জায়গায় এলে পর স্পিলেট ঝোঁপের মতে নিবিড় এক ধরনের গাছ দেখতে পেলেন। তার পাতার গন্ধ কী-রকম যেন কটু। আঙুরের মতো থোকা-থোকা ফুল ফুটে আছে। তার মধ্যে আবার ছোটো-ছোটো ফলও রয়েছে। ডালগুলো সোজা। পাতাগুলো একটু লম্বাটে ধরনের। একটা ডাল ভেঙে হার্বার্টকে দেখালেন স্পিলেট। শুধোলেন : হার্বার্ট, এটা কী গাছ?

    গাছ দেখেই চিনতে পারলে হার্বার্ট। বললে : মিস্টার স্পিলেট, খুব মূল্যবান গাছ আবিষ্কার করেছেন আপনি! এর জন্যে পেনক্র্যাফট আপনার কাছে চিরজীবন কেনা হয়ে থাকবে।

    স্পিলেট জিগেস করলেন, এটা কি তামাকের গাছ?

    হ্যাঁ, বললে হার্বার্ট। যদিও খুব ভালো তামাক নয়, তবু এটা যে তামাকের গাছ, সে-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

    তাহলে তো পেনক্র্যাফটের জোর বরাত বলতে হবে, হাসলেন স্পিলেট। আনন্দে ও একেবারে দিশেহারা হয়ে যাবে!

    হার্বার্টের মাথায় তক্ষুনি একটা মৎলব এলোমিস্টার স্পিলেট, বললে সে : এখন পেনক্র্যাফটকে এই সম্পর্কে কিছু বলা চলবে না। গোপনে তামাক তৈরি করে একেবারে পাইপে ভরে নিয়ে, ওকে উপহার দেয়া হবে।

    স্পিলেট আর হার্বার্ট অনেক তামাকপাতা সংগ্রহ করে গ্র্যানাইট  হাউসে ফিরে এলেন। পাতাগুলো গোপনে রাখা হল। তারপর চুপি-চুপি সাইরাস হার্ডিং আর নেবকে এর কথা জানিয়ে দেয়া হল। পাতাগুলো শুকিয়ে কেটে ব্যবহারের উপযুক্ত করে তুলতে লাগল প্রায় মাস-দুয়েক। পেনক্র্যাফট এই সম্পর্কে একটি কথাও জানতে পারলে না। সে সবসময় নৌকোর কাজ নিয়েই থাকতো। গ্র্যানাইট  হাউসে আসতো মাত্র একবার—আহার ও বিশ্রামের জন্যে।

    ইতিমধ্যে, প্রকাণ্ড একটা জন্তু লিঙ্কন আইল্যাণ্ডের চারদিকে প্রায় দু-মাইল দূরে সমুদ্রে সাঁৎরে বেড়াতে লাগল। দ্বীপবাসীরা জন্তুটাকে দেখে বুঝতে পারলেন যে সেটা একটা বিরাট তিমি।

    পেনক্র্যাফট বললে, আহা! তিমিটা শিকার করতে পারলে চমৎকার হত? এই বলে আপশোশ করতে-করতে সে তার কাজে চলে গেল।

    এদিকে এক আশ্চর্য ব্যাপার ঘটল। দেখা গেল, তিমিটা যেন কিছুতেই লিঙ্কন আইল্যাণ্ড ছেড়ে যেতে চাইছে না। পেনক্র্যাফট তো একেবারে অস্থির! তিমিটাকে মারতেই হবে! কী কাজের সময়, কী বিশ্রামের সময়—সবসময়েই যেন তিমিটা তার চোখের সামনে ভেসে। বেড়াতে লাগল। অবশেষে তেসরা মে দ্বীপবাসীদের পক্ষে যা আশার অতীত ছিল, আপনা থেকেই তা ঘটে গেল। নেব রান্নাঘরের জানলার কাছে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বলল, আরে! কী আশ্চর্য! তিমিটা সমুদ্রতীরে আটকা পড়ে গেছে।

    গিডিয়ন স্পিলেট আর হার্বার্ট তখন শিকারে বেরুবার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছিলেন। হাতের বন্দুক ফেলে দিয়ে তারা ছুটলেন সমুদ্রের দিকে! হার্ডিং আর নেবুও তাঁদের অনুসরণ করলেন। বলা বাহুল্য, পেনক্র্যাফ্টও ছুট লাগালে সেই দৃশ্য দেখতে।

    গ্র্যানাইট  হাউস থেকে তিন মাইল দূরে ফ্লোটসামী পয়েন্ট, সেখানেই পাওয়া গিয়েছিল মাল-সমেত সিন্দুক। দেখা গেল জোয়ারের সময় সেখানে এসেই আটকা পড়েছে তিমিটা। উদ্ধার পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। সবাই বল্লম, কুড়ল প্রভৃতি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ছুটলেন। মার্সি নদীর উপরকার সেতুটি পেরিয়ে সমুদ্রতীরে তিমিটার কাছে পৌঁছুতে প্রায় বিশ মিনিট সময় লাগল। দূর থেকে দেখতে পাওয়া গেল, বিশালকায় তিমিটার দেহের উপরে অগুনতি পাখি উড়ে বেড়াচ্ছে। তিমিটা পড়ে আছে নিশ্চল হয়ে, একটুও নড়াচড়া নেই। আরো কাছে গিয়ে দেখা গেল, সেটা মরে পড়ে আছে। তার বাঁ-পাশে পাঁজরের মধ্যে একটা হারপুন বিধে আছে।

    স্পিলেট বললেন, তাহলে দেখছি লিঙ্কন আইল্যাণ্ডের কাছেই তিমি-শিকারী কেউ রয়েছে!

    তা না-ও হতে পারে— বললে পেনক্র্যাফট-অনেক সময় দেখা গেছে পাঁজরে হারপুন নিয়ে তিমি হাজার-হাজার মাইল চলে যায়। এই তিমিটা হয়তো অ্যাটলান্টিক মহাসাগরে আহত হয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে চলে এসেছে। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এই বলে পেনক্র্যাফট হারপুনটা টেনে বার করল। দেখা গেল সেটার বাঁটের মধ্যে লেখা রয়েছে :

    মারিয়া স্তেলা,
    ভিনিয়ার্ড।

    ভিনিয়ার্ড হল নিউ-ইয়র্কের একটা বন্দর, সেখানেই পেনক্র্যাফটের জন্ম হয়েছিল। মারিয়া স্তেলা জাহাজটি সমুদ্রে ঘুরে বেড়ায় তিমি-শিকারের জন্যেই।মারিয়া স্তেলার কথাও পেনক্র্যাফট জানতো। সে হারপুন মাথার উপর ঘোরাতে-ঘোরাতে মনের আবেগে বারবার বলতে লাগল : মারিয়া স্তেলা আমি চিনতুম। পয়লা শ্রেণীর জাহাজ! হবে না-ই বা কেন? ভিনিয়ার্ডের জাহাজ তো!

    তিমিটা পচতে শুরু করার আগেই তার শরীর থেকে দরকার-মতো মাংস আর হাড় বের করে নিতে হবে। পেনক্র্যাফট আগে একবার একটা তিমি-ধরা জাহাজে কাজ করেছিল। তিমির চর্বিটারই সবচেয়ে বেশি দরকার। সেজন্যে পেনক্র্যাফট বেছে-বেছে শুধু চর্বিটুকুই কেটে নিলে। যে-সব হাড় ভবিষ্যতে কাজে লাগবে, সেগুলোও কেটে বার করা হল।

    বহুদিনের খাদ্যের সন্ধান পেয়ে ইতিমধ্যেই অনতি পাখি এসে ভিড় করেছিল। সহজে তারা তিমিটাকে ছেড়ে যেতে চায়নি। শেষটায় বন্দুক ছুঁড়ে তাদের তাড়ানো হল। দ্বীপবাসীরা অবিশ্যি কাজের অংশটুকু কেটে নিয়ে তিমির বাকি শরীরটুক পাখিদের ছেড়ে দিলেন।

    এরপর ফের নবোদ্যমে নৌকোর কাজ শুরু হল। শ্রান্তিহীন পেনক্র্যাফ্ট আশ্চর্য পরিশ্রম করতে লাগল দিনরাত। সবাই মিলে ঠিক করলেন, পেনক্র্যাফটকে এত পরিশ্রমের পুরস্কার দিতে হবে। দিন ঠিক হল একত্রিশে মে। সেদিন পেনক্র্যাফটকে সেই পুরস্কার দিয়ে দস্তুরমতো তাক লাগিয়ে দেয়া হবে।

    সেদিন রাত্রিবেলা খাওয়ার পর পেনক্র্যাফট যখন টেবিল ছেড়ে উঠতে যাবে, তখন গিডিয়ন স্পিলেট তাকে বাধা দিলেন। বললেন : আর-একটু জিরিয়ে নাও হে—এত তাড়াতাড়ি চলে গেলে হবে না। এখনও একটা জিনিশ বাকি আছে।

    না, মিস্টার স্পিলেট–বললে পেনক্র্যাফট, অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে। আমি এখন আমার কাজে যাবো।

    বেশ, তাহলে অন্তত এককাপ কফি খেয়ে যাও।

    না-না-আর-কিছুরই দরকার নেই।

    আহা! বললেন স্পিলেট : তাহলে একটু তামাকই খেয়ে যাও না-হয়!

    তামাক! পেনক্র্যাফট একেবারে লাফিয়ে উঠল।

    সঙ্গে-সঙ্গে স্পিলেট তামাক-ভরা পাইপটা তার দিকে বাড়িয়ে ধরলেন, আর হার্বার্ট একটুকরো জ্বলন্ত কয়লা হাতে নিয়ে তার কাছে এগিয়ে এলো। কী-যেন বলতে চেষ্টা করলে পেনক্র্যাফট, কিন্তু তার মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরুল না। হাত বাড়িয়ে পাইপটা নিয়ে মুখে দিলে সে। তারপর পাইপে আগুন ধরিয়ে চোখ বুজে কেবল টানের পর টান! তারপর একগাল ধোঁয়া ছেড়ে পূর্ণ তৃপ্তির স্বরে বলে উঠল : তামাক! একেবারে সত্যি-সত্যি তামাক! এ-যে আশাতীত!

    একটু বাদে সে আবার প্রশ্ন করলে : তা, এ-আবিষ্কারটা কার? হার্বার্টের বুঝি?

    না, পেনক্র্যাফট!—বললে হার্বার্ট : এটি মিস্টার স্পিলেটেরই আঙ্কিার।

    মিস্টার স্পিলেট! এই কথা বলেই পেনক্র্যাফট স্পিলেটকে এমনভাবে বুকে জড়িয়ে ধরলে যে স্পিলেটের একেবারে দম বন্ধ হয়-হয়।

    কোনোমতে পেনক্র্যাফটের কবল থেকে নিজেকে মুক্ত করে তিনি বললেন : ধন্যবাদ সকলকেই দাও তুমি। হার্বার্ট গাছটাকে চিনতে পেরেছিল, হার্ডিং তামাক তৈরি করেছিলেন, আর এমন-একটা কথা চেপে রাখতে নেবেরও কম কষ্ট হয়নি!

    জুন মাসের গোড়া থেকেই বেশ শীত পড়ল। এবার সকলের প্রধান কাজ হল শীতের পোশাক তৈরি করা। কোর‍্যালে যতগুলো মুসমন ছিল সবগুলোরই লোম কেটে ফেলা হল–এই লোম দিয়ে গরম কাপড় তৈরি করতে হবে। কাজটা খুব সোজা নয়। সুতো কাটবার কল নেই, কাপড় বোনবার কল নেই—এককথায়, কোনো সরঞ্জামই নেই। উপায় ঠিক করলেন সাইরাস হার্ডিং। প্রথমে লোমগুলোকে জলে ধুয়ে পরিষ্কার করে নেয়া হল। তারপর আবার সোডার জলে ধুয়ে নেয়া হল। এখন ওগুলোকে চেপে পাৎলা চাদরের মতো করে নিতে পারলে ফেল্টের মতন একটা জিনিশ প্রস্তুত হবে। দ্বীপবাসীদের কাপড় হিশেবে এই হালকা ফেল্টের চাদরই ঢের। খুব বড়ো-বড়ো কাঠের ডিশ বানিয়ে তাতে সাবান-মাখানো পশম রাখা হল। তারপর কাঠের মুগুর দিয়ে সজোরে একনাগাড়ে চাপ দিতে-দিতে সমস্ত পশমকে জমাট বাঁধিয়ে বেশ পাৎলা ফেল্টের মতো তৈরি করে নেয়া হল। এই ফেল্টের চাদর দিয়ে কোট-প্যান্ট হল। এবার আর ভাবনা কীসের? এখন শীত এলেও কোনো পরোয়া নেই।

    পরোয়া নেই বলাতেই বোধহয় বিশে জুন থেকে ভয়ানক শীত পড়ল। বাইরে কাজ করা একেবারে অসম্ভব হয়ে উঠল। কাজেই বাধ্য হয়ে পেনক্র্যাফটকে নৌকোর কাজ স্থগিত রাখতে হল। পেনক্র্যাফটের খুব ইচ্ছে, নৌকো তৈরি হলেই টেবর আইল্যাণ্ডের উদ্দেশে সমুদ্রে পাড়ি জমানো।

    লিঙ্কন আইল্যাণ্ড থেকে টেবর আইল্যাণ্ড দেড়শো মাইল দূরে। শুধু-শুধু দ্বীপ দেখতে যাওয়ার জন্যে সমুদ্রপথে একটা নৌকোয় চড়ে যাওয়াটা সাইরাসের পছন্দ হল না। নৌকো যদি মাঝপথে কোনো ঝড়ের পাল্লায় পড়ে, তবে আর বাঁচোয়া নেই। তবু পেনক্র্যাফটের জেদ, টেবর আইল্যাণ্ডে যাবেই। হার্ডিং ওকে বোঝালেন, কিন্তু সে কিছুতেই বুঝতে চাইলে না। বরং বললে : আমি তো আর লিঙ্কন আইল্যাণ্ড ছেড়ে একেবারে চলে যেতে চাইছি।, একবার টেবর আইল্যাণ্ড দেখেই চলে আসবো।

    হার্ডিং বললেন : দেখবার আর কী আছে? টেবর আইল্যাণ্ড নিঃসন্দেহে লিঙ্কন আইল্যান্ডের চেয়ে ভালো নয়।

    সে আমি জানি, একগুয়ের মতো ঘাড় নাড়লে পেনক্র্যাফট : তবু একবার দেখে আসবো। আপনি ভাববেন না। ভালো আবহাওয়া দেখে রওনা হলেই তো ঝড়বৃষ্টির ভয় থাকবে না। আমি শুধু হার্বার্টকে সঙ্গে নিয়ে যাবো, আপনি এতে আর কোনো আপত্তি করবেন না। আমার ভরসা আছে, ঈশ্বরের অনুগ্রহে কোনো বিপদেই পড়বো না। নৌকোটা শেষ হলে একবার যখন সেইটেতে চড়ে দেখবেন কেমন মজবুত, তখন আর আপনার কোনো ভাবনা থাকবে না।

    জুন মাসের শেষে বরফ পড়তে শুরু হল। কোর‍্যালে অনেক জন্তু ছিল, সুতরাং সেখানে খাবার-দাবারের নিয়মিত জোগান দেয়া দরকার। তাই ঠিক হল সপ্তাহে একদিন কোর‍্যালে গিয়ে খবর নিয়ে আসতে হবে। অবিশ্যি কোর‍্যালে জন্তুদের খাদ্যের পরিমাণ যথেষ্ট রাখা হয়েছিল, তবু সবাই সতর্কতার জন্যে এই ব্যবস্থা ঠিক করলেন।

    এদিকে গিডিয়ন স্পিলেট ভাবছিলেন তাঁদের লিঙ্কন আইল্যাণ্ডের খবরটা কোনোরকমে কোনো মহাদেশে পৌঁছে দেয়া যায় কি না। দুটি উপায় অবিশ্যি আছে। এক হলকাগজে সমস্ত ঘটনা লিখে সেই কাগজটুকু বোতলে বন্ধ করে তাতে এমনভাবে ছিপি এঁটে দেয়া, বোেতলের মধ্যে যাতে একফোঁটাও জল না-ঢোকে। সেই বোতল সমুদ্রে ভাসিয়ে দিলে, সেটা হয়তো একদিন কোনো দেশে গিয়ে লাগতে পারে। আর দু-নম্বর হল, চিঠি লিখে পায়রার গলায় বেঁধে পায়রাটাকে ছেড়ে দেয়া। কিন্তু পায়রাই হোক আর বোতলই হোক–বারোশো মাইল বিস্তৃত সমুদ্র পেরিয়ে যাওয়া কোনোটার পক্ষেই সম্ভব নয়। এমনধারা কথা ভাবাও বাতুলতা। কিন্তু এই কল্পনা-বিলাসের সাফল্যের একটা সুযোগ হঠাৎ একদিন এসে হাজির হল।

    বিশে জুন হার্বার্ট একটা আলবাট্রস পাখিকে গুলি করেছিল। গুলিটা লেগেছিল পাখিটার পায়ে সবাই মিলে অনেক চেষ্টার পর পাখিটাকে পাকড়াও করলেন। অ্যালবাট্রস হাঁসজাতীয় পাখি। রঙ শাদা ধবধবে। পাখা মেললে দশ ফুট লম্বা হয়। এর মতো ওড়বার শক্তি অন্যকোনো পাখির নেই।

    স্পিলেট সব ঘটনা লিখে ফেললেন। সেই কাগজটা ব্যাগের মধ্যে পুরে ব্যাগটা অ্যালবাট্রসের গলায় বেঁধে দেয়া হল। এই লেখার সঙ্গে একটা আবেদনও ছিল। তাতে ছিল : এই ব্যাগটা কারু হাতে পড়লে অনুগ্রহ করে নিউইয়র্ক হেরাল্ড কাগজের আপিশে পাঠিয়ে দেবেন। এরপর পাখিটাকে ছেড়ে দেয়ার সঙ্গে-সঙ্গে তার পাখা ঝটপট করে উঠল, তারপর গলায় ব্যাগটি নিয়ে সে দেখতে-দেখতে সমুদ্রের উপর দিয়ে সীমাহারা নীল আকাশে মিলিয়ে গেল।

    শীত শুরু হতেই সবাই গ্র্যানাইট  হাউসের মধ্যে থেকে ঘরোয়া কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। নৌকোর জন্যে একটা পাল তৈরি করতে হবে। বেলুনের আবরণের কল্যাণে কাপড়ের কোনো অভাব নেই। পেনক্র্যাফট উঠে-পড়ে লাগল পাল তৈরির কাজে।

    জুলাই মাসে ভয়ানক শীত পড়ল। খাবার-ঘরেও আরেকটা চুল্লির ব্যবস্থা করা হল। খাওয়াদাওয়ার পর এই চুল্লির ধারে বসে সবাই যে যার কাজ করেন, পড়াশোনা করেন, কখনোবা গল্প-গুজব করেন। একদিন সবাই চুল্লির ধারে বসে কাজ করছিলেন, এমন সময় টপ হঠাৎ ভীষণভাবে ডেকে উঠল। শুধু ডাকা নয়, সেইসঙ্গে কুয়োটার মুখের চারপাশে ছুটোছুটি করতে লাগল। এই সময় জাপও গরু-গর করতে লাগল। ঠিক রাগের গর্জন নয়-টপ আর জাপ যেন কোনো কারণে ব্যস্তসমস্ত হয়ে উঠেছে।

    স্পিলেট বললেন : কুয়োটার যোগ আছে সমুদ্রের সঙ্গে। বোধহয় কোনো সমুদ্রের কন্তু কুয়োর তলায় জিরোতে আসে।

    পেনক্র্যাফট ধমক দিয়ে জাপ আর টপকে চুপ করালে! ধমক খেয়ে জাপ তার ঘরে চলে গেল। টপ চুপ করলে বটে, কিন্তু সেই ঘরেই রইল, আর মধ্যে মধ্যে গোঁ-গোঁ করে শব্দও করতে লাগল। এই সম্পর্কে আর-কোনো আলোচনা হল না। কিন্তু এই ঘটনায় কেন যেন সাইরাস হার্ডিং খুব গম্ভীর হয়ে গেলেন।

    গোটা জুলাই মাস ধরেই একটানা তুষার-ঝড় চলল। শীত গত বছরের মতো তেমন নাহলেও, তুষারঝড়ের তীব্রতা এবার হল বেশিরকম। এই ঝড়ের সময় বাইরে বেরুনো বিপজ্জনক। চারদিকেই গাছ-গাছালি ভেঙে পড়তে থাকে। এই দুর্যোগের মধ্যেও সপ্তাহে একদিন করে কোর‍্যালের খবর নেয়া বাদ পড়ত না। মাউন্ট ফ্রাঙ্কলিনের আড়ালে থাকার দরুন ঝড়ে কোর‍্যালের কোনো ক্ষতি হয়নি বটে, কিন্তু ওঁরা প্রসপেক্ট হাইটের উপরে যে পাখির বাসা তৈরি করেছিলেন, তার খুব ক্ষতি হয়েছিল।

    আগস্টের প্রথম সপ্তাহে আকাশ অনেকটা শান্ত হল বটে, কিন্তু হিম পড়ল বেশি। তেসরা আগস্ট স্পিলেট, পেনক্র্যাফট, হার্বার্ট আর নেব একদিন শিকারে বেরুলেন। ট্যাড়ন মার্শ-এ বিস্তর বুনো হাঁস, স্নাইপ, টীল প্রভৃতি পাখি চরে বেড়ায়। সবাই ট্যাডর্ন মার্শ-এর দিকে রওনা হল। সাইরাস হার্ডিং তাদের সঙ্গে গেলেন না; বললেন : গ্র্যানাইট  হাউসে বসে আমাকে অনেক কাজ করতে হবে, তোমরা যাও।

    সবাই পোর্ট বেলুনের পথে রওনা হলেন। সেই পথেই জলাভূমিতে যেতে হয়। যাওয়ার আগে তারা জানিয়ে গেলেন যে সন্ধের আগেই তারা গ্র্যানাইট  হাউসে ফিরে আসবেন। টপ আর জাপও তাঁদের সঙ্গে গেল। সবাই মার্সি নদীর সেতুটা পেরিয়ে গেলে হার্ডিং গ্র্যানাইট  হাউসে ফিরে এলেন। তার মনে একটা উদ্দেশ্য ছিল, সেজন্যেই তিনি শিকারে যাননি। তার উদ্দেশ্য ছিল, গ্র্যানাইট  হাউসের কুয়োটা খুব ভালো করে পরীক্ষা করা। টপ কেন কুয়োর মুখের চারদিকে ডেকে ডেকে ছুটে বেড়ায়? আর যখনই এ-রকম করে, তখনই কেন অমন অস্থির হয়ে ওঠে? সেদিন জাপও কেন টপের মতো অত ব্যস্ত হয়ে উঠেছিল? সমুদ্র ছাড়া অন্যকিছুর সঙ্গে কি কুয়োটার যোগ আছে? দ্বীপের দিকেও কি এর কোনো পথ গিয়েছে?-এইসব প্রশ্নের উত্তর বের করবার জন্যেই হার্ডিং ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন। ঠিক করেছিলেন যে অন্যদের অনুপস্থিতিতে একলা এ-কাজটা করবেন। এবার সেই সুযোগ এসেছে। লিফট তৈরি হবার পর থেকে দড়ির সিঁড়িটা ব্যবহার হত না। এই সিঁড়ির সাহায্যে কুয়োর নিচে নামা খুব সহজ। এর একটা মাথা শক্ত করে বেঁধে হার্ডিং গোটা সিঁড়িটা কুয়োর মধ্যে ঝুলিয়ে দিলেন। তারপর রিভলভার আর ছুরি কোমরবন্ধের মধ্যে খুঁজে লণ্ঠন হাতে সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগলেন।

    কুয়োর ধারটা অসমান নয়, তবে মধ্যে-মধ্যে ছুঁচলো পাথর যেন মাথা বাড়িয়ে আছে। এইসব পাথরের সাহায্যে কোনো চটপটে জর পক্ষে কুয়োটার মুখ পর্যন্ত উঠে আসা বিচিত্র নয়। কিন্তু হার্ডিং এমন-কোনো চিহ্ন দেখতে পেলেন না যা থেকে মনে হতে পারে যে সম্প্রতি কোনো জন্তু এই পাথরের সাহায্যে উপরে ওঠবার চেষ্টা করেছে।

    আরো নিচে নামলেন হার্ডিং। কিন্তু তবু সন্দেহজনক কিছুই তার নজরে পড়ল না।

    সিঁড়ির শেষ ধাপ পর্যন্ত নামবার পর জল দেখা গেল। নিষ্কম্প, স্থির জল। হার্ডিং কুয়োর দেয়াল ঠুকে দেখলেন। একবারে নিরেট গ্র্যানাইট  পাথরের দেয়াল। না, এর মধ্যে দিয়ে কোনো পথ নেই।

    অনুসন্ধান শেষ করে সাইরাস হার্ডিং উপরে উঠে এলেন। তারপর সিঁড়িটা তুলে নিয়ে কুয়োর মুখ বন্ধ করে দিলেন। এরপর খাবার-ঘরে বসে ভাবতে লাগলেন।

    কিছুই তো দেখতে পাওয়া গেল না। কিন্তু তাহলেও কিছু-একটা কুয়োর মধ্যে আছেই। অত মধ্যে-মধ্যে যে এসে থাকে, সে-সম্বন্ধে কোনো প্রশ্নই উঠতে পারে না। অনুসন্ধানের। ফলে সন্দেহজনক কিছুই দেখতে পাওয়া না-গেলেও, সন্দেহ গেল না হার্ডিং-এর।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleজুল ভের্ন অমনিবাস ২ (অনুবাদ : মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়)
    Next Article জুল ভের্ন অমনিবাস ৪ (চতুর্থ খণ্ড) – অনুবাদ : মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

    Related Articles

    জুল ভার্ন

    জুল ভের্ন অমনিবাস ১ (প্রথম খণ্ড) – অনুবাদ : মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 16, 2025
    জুল ভার্ন

    জুল ভের্ন অমনিবাস ৪ (চতুর্থ খণ্ড) – অনুবাদ : মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 16, 2025
    জুল ভার্ন

    জুল ভের্ন অমনিবাস ২ (অনুবাদ : মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়)

    August 14, 2025
    জুল ভার্ন

    জুল ভের্ন অমনিবাস ৫ (পঞ্চম খণ্ড) – অনুবাদ : মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 14, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026
    Our Picks

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026

    ভুতুড়ে ট্রেন – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026

    ব্রাহ্মণ ভূত – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }