Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026

    ভুতুড়ে ট্রেন – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026

    ব্রাহ্মণ ভূত – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    জুল ভের্ন অমনিবাস ৩ (তৃতীয় খণ্ড) – অনুবাদ : মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

    জুল ভার্ন এক পাতা গল্প289 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    ৩.১-৩.৪ বোম্বেটেদের জাহাজ

    দ্য মিস্টিরিয়াস আইল্যাণ্ড ৩
    দ্বীপের রহস্য

    ৩.১ বোম্বেটেদের জাহাজ

    সবাই এসে ভিড় করলেন জাহাজের সামনে। পেনক্র্যাফট তো দৌড়ে এসেই দুরবিন লাগিয়ে সেই বিন্দুটিকে পরীক্ষা করে বললে : সত্যিই এটা জাহাজ!

    স্পিলেট শুধোলেন : জাহাজটা কি এদিকে আসছে?

    এখন তা বলা মুশকিল। এখন শুধু মাস্তুলের ডগা দেখতে পাচ্ছি বললে পেনক্র্যাফট : অন্য কিছুই দেখা যাচ্ছে না।

    হার্বার্ট প্রশ্ন করলে, এখন তাহলে কী করবো?

    হার্ডিং বললেন, অপেক্ষা করবো।

    এরপর অনেকক্ষণ পর্যন্ত সবাই নীরব হয়ে রইলেন। আশায়-উদ্বেগে-আশঙ্কায় সকলের মনই আলোড়িত হতে লাগল। লিঙ্কন আইল্যাণ্ডে আসার পর এ-রকম ঘটনা এই প্রথম। দীর্ঘকাল দ্বীপে সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে বাস করে দ্বীপটার উপর সকলেরই একটা মায়া পড়ে গিয়েছিল। যাই হোক, এই জাহাজের কাছে সভ্য জগতের খবর জানতে পারা যাবে। আমেরিকার খবরও পাওয়া যেতে পারে। তাই জাহাজটা দেখে আশঙ্কায় আনন্দে তোলপাড় চলতে লাগল সকলের মনে। পেন্যাফট মধ্যে-মধ্যে দুরবিন দিয়ে জাহাজটা দেখতে লাগল। তখনও কুড়ি মাইল পুবদিকে রয়েছে জাহাজটা। এখনো সেটাকে সংকেত করে কিছু জানানোর উপায় নেই। তবু দ্বীপের উপরে এত-বড়ো ফ্র্যাঙ্কলিন পর্বত যখন রয়েছে, তখন এটার উপর জাহাজের লোকের নজর পড়বেই।

    কিন্তু এখানে কেন এলো জাহাজটা? ম্যাপে তো প্রশান্ত মহাসাগরের এই অংশে টেবর আইল্যাণ্ড ছাড়া অন্য কোনো দ্বীপের অস্তিত্ব নেই!

    হার্বার্ট জিগেস করলে : এটা কি ডানকান জাহাজ?

    স্পিলেট বললেন : শিগগির আয়ারটনকে ডেকে পাঠাও। এটা ডানকান কি না, তা সেই বলতে পারবে।

    তক্ষুনি আয়ারটনকে তাড়াতাড়ি চলে আসতে টেলিগ্রাম করা হল।

    হার্বার্ট বললে : এটা যদি ডানকান জাহাজ হয়, তবে এটাকে দেখেই আয়ারটন চিনতে পারবে।

    হ্যাঁ, আর সৌভাগ্যবশত, আয়ারটন এখন ডানকানে যাওয়ার উপযুক্ত হয়েছেবললেন হার্ডিং : ঈশ্বর করুন, এটা যেন ডানকান জাহাজই হয়! অন্য-কোনো বেহুদা জাহাজ হলেই ভাবনার কথা! এসব জায়গার ভারি দুর্নাম। মালয় বোম্বেটে এসে হাজির হওয়াও বিচিত্র নয়। এলে অবশ্য আমরা আত্মরক্ষা করতে পারবো; কিন্তু আত্মরক্ষার দরকার না-হলেই ভালো।

    পেনক্র্যাফট বললে : জাহাজটা যদি লিঙ্কন আইল্যাণ্ডের খানিক দূরে এসে নোঙর ফ্যালে, তখন আমরা কী করবো?

    একটু ভেবে হার্ডিং উত্তর করলেন : তখন আমরা এই জাহাজের সঙ্গে কথাবার্তা চালাবো। তারপর এই জাহাজে চড়ে দ্বীপ ছেড়ে চলে যাবো। যাওয়ার আগে দ্বীপটাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নামে দখল করে নেবো। কিছুদিন পরে আবার আমরা ফিরে আসবো। এখানে উপনিবেশ করে থাকবে বলে তখন যদি কেউ আমাদের সঙ্গে আসতে চায়, তবে তাদেরও সঙ্গে করে আনবো। তখন লিঙ্কন আইল্যাণ্ড হবে প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে আমেরিকার একটা ঘাঁটি।

    বিকেল চারটের সময় আয়ারটন গ্র্যানাইট  হাউসে এলো। হার্ডিং তাকে জানলার কাছে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললেন : আয়ারটন, একটা জাহাজ দেখতে পাওয়া গেছে, সেইজন্যেই তোমায় ডেকেছি। দুরবিনটা দিয়ে ভালো করে দ্যাখো তো এটা ডানকান জাহাজ কি না?

    দুরবিন দিয়ে অনেকক্ষণ ভালো করে দেখে আয়ারটন বললে : একটা জাহাজ তো বটেই। কিন্তু আমার মনে হয় না যে এটা ডানকান।

    কেন ডানকান বলে মনে হয় না? শুধোলেন স্পিলেট।

    ডানকান হল একটা স্টীমশিপ, বললে আয়ারটন : কিন্তু আমি তো ধোঁয়ার কোনো চিহ্নই দেখছি না। অবিশ্যি এমনও হতে পারে, আগুন নিবিয়ে দিয়ে এখন শুধু পালে চলেছে, তাই ধোঁয়া দেখতে পাচ্ছি না। সেইজন্যে এটা আরো কাছে না-আসা পর্যন্ত কিছু বলার জো নেই। ততক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। এই বলে আয়ারটন ঘরের এককোণে চুপ করে বসে রইল।

    সবাই আবার জাহাজ সম্পর্কে অলোচনা করতে লাগলেন, কিন্তু আয়ারটন তাতে যোগ দিলে না। সাইরাস হার্ডিং গম্ভীরভাবে বসে চিন্তা করতে লাগলেন। জাহাজের এই আকস্মিক আগমন তার পছন্দ হয়নি। বরং বেশ-একটু ভাবনাই হল তার।

    ক্রমে জাহাজটা আরো-কাছে এলে পেনক্র্যাফট দুরবিন দিয়ে দেখলে, সেটা দ্বীপের দিকে একটু বেঁকে দাঁড়িয়ে আছে। এমনভাবে যদি চলতে থাকে, তবে শিগগিরই ক্ল অন্তরীপের পিছনে অদৃশ্য হয়ে যাবে। কিন্তু, তবু জাহাজটার উপরে নজর রাখতে হবে। এদিকে সন্ধে হয়ে এলো, আস্তে-আস্তে আলো কমে আসছে।

    স্পিলেট শুধোলেন : রাত হলে অন্ধকারে কী করা যাবে! একটা আগুন জ্বাললে হয় না? তা দেখে জাহাজের লোকে বুঝতে পারবে যে, এখানে একটা দ্বীপ আছে!

    প্রশ্নটা একটু গুরুতর। হার্ডিং-এর আশঙ্কা তখনও দূর হয়নি। তবু, আগুন জ্বেলে রাখাটাই উচিত বলে ঠিক হল। রাত্রে হয়তো জাহাজটা চলে যেতে পারে। এটা চলে গেলে আবার কি কোনো জাহাজ লিঙ্কন আইল্যাণ্ডের কাছে আসবে? এই সুযোগ হারালে হয়তো অনুতাপ করতে হবে পরে। তাই ঠিক হলনে আর পেনক্র্যাফট পোর্ট বেলুনে গিয়ে একটা অগ্নিকুণ্ড জ্বালাবে। তারা দুজনে যখন পোর্ট বেলুনে যাওয়ার দিকে প্রস্তুত হচ্ছে, তখন দেখা গেল, জাহাজটা হঠাৎ তার গতি ফিরিয়ে মুখ করেছে ইউনিয়ন বে-র দিকে। আয়ারটন দুরবিন নিয়ে খুব ভালো করে দেখতে লাগল জাহাজটাকে। প্রসন্ন আকাশে তখনও বেশ আলো আছে। আয়ারটন স্পষ্ট দেখতে পেলে, জাহাজে চিমনি নেই। সে বললে : অসম্ভব! এটা ডানকান জাহাজ হতেই পারে না।

    আরো ভালো করে দেখে সে বললে : জাহাজটা ভারি সুন্দর, বেশ মজবুত আর লম্বা। খুব দ্রুত চলতে পারে বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু কোন্ জাতের জাহাজ, সেটা বলা শক্ত। একটা নিশান উড়ছে, কিন্তু সেটার রঙ ঠিক বুঝতে পারা যাচ্ছে না।

    এবার পেনক্র্যাফট দুরবিন নিয়ে জাহাজটাকে দেখতে লাগল। বললে, এটা আমেরিকার নিশান নয়—মনে হয় নিশানটা একরঙা। এটার রঙ দেখে মনে হচ্ছে—

    নিশানটা ঝুলে পড়েছিল, ঠিক এইসময় হাওয়ার আবেগে আবার পৎ-পৎ করে উড়তে লাগল। আয়ারটন দুরবিনটা চোখে নিয়ে দেখে বলে উঠল : কী সর্বনাশ! নিশানের রঙ যে কুচকুচে কালো!

    সাইরাস হার্ডিং-এর ধারণাই তবে সত্যি হল? এটা কি তবে বোম্বেটে জাহাজ? বোম্বেটে জাহাজ লিঙ্কন আইল্যাণ্ডে আসবে কেন? তবে কি লিঙ্কন আইল্যাণ্ডকে বোম্বেটেরা ঘাঁটি করবে?

    সাইরাস হার্ডিং বললেন, জাহাজটা হয়তো শুধু চারপাশ দেখে-শুনেই চলে যাবে, দ্বীপে আসবে না। তাহলেও দ্বীপে যে মানুষ আছে, তা যেন বোম্বেটেরা জানতে না-পারে। আয়ারটন আর নেব গিয়ে উইণ্ড-মিলের প্রপেলারগুলো নামিয়ে ফেলুক, সেইটেই সবচেয়ে আগে চোখে পড়বে। তারপর গ্র্যানাইট  হাউসের দরজা-জানলাগুলো লতাপাতা দিয়ে ঢেকে দাও, আর সব আগুন নিভিয়ে ফ্যালো।

    হার্বার্ট বললে, বন-অ্যাডভেনচারের কী হবে?

    পেনক্র্যাফট বললে : বন-অ্যাডভেনচার পোর্ট বেলুনে একেবারে নিরাপদ। বাজি রেখে বলতে পারি, বোম্বেটেরা সেটা খুঁজেই বার করতে পারবে না।

    এভাবে সতর্কতা অবলম্বন করবার পর ঠিক হলবোম্বেটেরা যদি লিঙ্কন আইল্যাণ্ড দখল করতে চায়, তবে প্রাণপণে বাধা দিতে হবে। এবার জানতে হবে বোম্বেটেদের সংখ্যা কত, তাদের অস্ত্রশস্ত্রের অবস্থাই বা কেমন। কিন্তু জানবার উপায় কী? এদিকে মেঘলা আকাশে রাত্রি নেমে এসেছে। অন্ধকারে ঢাকা পড়ে গেল সবকিছু। জাহাজের আলো নেভাননা। সেটা ভালো করে দেখতেই পাওয়া যায় না। এমন সময় হঠাৎ অন্ধকারে একটা আলোর ফিনকি দেখা গেল, সঙ্গে সঙ্গে কামানের প্রচণ্ড গর্জন। জাহাজে তবে কামানও আছে!

    কামানের আওয়াজ পৌঁছুতে প্রায় ছ-সেকেণ্ড লাগল। তার মানে, তীর থেকে প্রায় সোয়া মাইল দূরে আছে জাহাজটা। এমন সময় একটা গুরু-গুরু শব্দ শোনা গেল। জাহাজ থেকে জলে পড়ল শেকল। গ্র্যানাইট  হাউসের ঠিক সামনে; অর্থাৎ সেখানেই নোঙর ফেলেছে জাহাজ।

    এতক্ষণে বোম্বেটেদের মৎলব বোঝা গেল। রাতটা কাটলেই তারা নৌকোয় চড়ে তীরে নামবে। হার্ডিংরা অবশ্য প্রস্তুত হয়েই আছেন সংঘর্ষের জন্যে, কিন্তু বুদ্ধি করে কাজ করতে হবে। অযথা রক্তপাত ঘটানো ঠিক হবে না। সৌভাগ্যবশত গ্র্যানাইট  হাউস দুর্ভেদ্য, দরজা-জানলাগুলো লতাপাতা দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছে। গ্র্যানাইট  হাউসে বোম্বেটেরা ঢুকতে পারবে না; কিন্তু খেত, পাখির বাসা, কোর‍্যাল—সবই তারা নষ্ট করে ফেলতে পারে।

    বোম্বেটেদের দলে ক-জন লোক আছে, সেইটেই সবচেয়ে আগে জানা দরকার। দশবারো জন লোক হলে হয়তো বাধা দেয়া যাবে, কিন্তু চল্লিশ-পঞ্চাশ জন লোক হলে বিপদের সম্ভাবনা। এছাড়া, বোম্বেটেদের যে কামানও আছে, তার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

    এমন সময় আয়ারটন বললে : ক্যাপ্টেন হার্ডিং, আমার একটা আরজি আছে। কী? শুধোলেন হার্ডিং।

    আয়ারটন বললে : জাহাজটায় গিয়ে দেখে আসতে চাই, ওদের লোকজনের সংখ্যা কত।

    কিন্তু, হার্ডিং বললেন : এতে যে প্রাণের ভয় আছে!

    থাকক। তবু আমি যাবো। বললে আয়ারটন : চুপি-চুপি সাঁতার কেটে যাবো জাহাজে। কিছু ভাববেন না। আমি খুব ভালো সাঁতার জানি। মাইল-দেড়েক দূরে আছে তো জাহাজটা? সে আমি সাঁৎরেই যেতে পারবো।

    হার্ডিং আবার বললেন : কিন্তু এতে যে তোমার প্রাণ হারাবার সম্ভাবনা আছে।

    প্রাণের ভয় আমি করি না। বললে আয়ারটন : আমার অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করবার জন্যেই আমি এ-কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইছি। আপনি আমায় অনুমতি দিন।

    এ-কথা শুনে হার্ডিং আর বাধা দিলেন না। কিন্তু পেনক্র্যাফট বললে : আমি আয়ারটনের সঙ্গে যাবো। আমি শুধু উপদ্বীপ পর্যন্ত যাবো আয়ারটনের সঙ্গে। বলা যায় না তো, এর মধ্যে বোম্বেটেদের কেউ তীরে নেমেছে কি না! তখন দুজন থাকলে ভালো হবে। আমি সেখানে আয়ারটনের জন্যে অপেক্ষা করবো আর ও জাহাজে চলে যাবে।

    আয়ারটন যাত্রার জন্যে প্রস্তুত হল। যে-দুঃসাহসের কাজে সে ঝাঁপিয়ে পড়তে চলেছে, তাতে মুহূর্তের অসতর্কতায় মৃত্যুর সম্ভাবনা। তবে রাতের অন্ধকারে গা-ঢাকা দিয়ে সে যদি কাজ হাসিল করতে পারে, তবে দ্বীপবাসীরা আসন্ন সংঘর্ষের জন্যে ভালো করে তৈরি হতে পারবেন। অন্য-সকলের সঙ্গে আয়ারটন আর পেনক্র্যাফট সমুদ্রতীরে নেমে এলো। আয়ারটন জামাকাপড় খুলে গায়ে খুব করে চর্বি মেখে নিলে, যাতে ঠাণ্ডাটা একটু কম লাগে। ইতিমধ্যে নেব গিয়ে মার্সি নদীর তীর থেকে ক্যানুটা নিয়ে এলো। তখন আয়ারটন সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পেনক্র্যাফটের সঙ্গে গিয়ে নৌকোয় উঠল। দেখতে-দেখতে নৌকো প্রণালীর অন্য পারে গিয়ে হাজির হল। অন্য-সকলে চিমনিতে গিয়ে ওদের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলেন।

    আয়ারটন আর পেনক্র্যাফট উপদ্বীপ পেরুবার আগে চুপি-চুপি চারদিক দেখে নিলে।, কোনো বোম্বেটেই তীরে নামেনি। নিরাপদে দ্বীপের অন্যধারে গিয়ে একটুও দ্বিধা নাকরে আয়ারটন সমুদ্রের জলে নেমে পড়ল। পেন্যাক্ট পাহাড়ের একটা ফাটলের মধ্যে আত্মগোপন করে তার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল।

    একটু আগে জাহাজে কয়েকটা আলো জ্বলেছিল। আয়ারটন নিঃশব্দে সেই আলো লক্ষ্য করে জাহাজের দিকে এগুতে লাগল। শুধু বোম্বেটেদের ভয়ই নয়, সমুদ্রে হাঙরও থাকতে পারে। কিন্তু আয়ারটন সেদিকে ভ্রুক্ষেপও করলে না। আধ ঘণ্টা পরে জাহাজের কাছে উপস্থিত হয়ে নোঙরের মোটা শেকলটা ধরে ফেললে। একটু জিরিয়ে নিয়ে আস্তে আস্তে উপরে ডেকের কিনারে গিয়ে দেখতে পেলে–নাবিকদের কামিজ ঝুলছে। সে একটা কামিজ আর প্যান্ট পরে চুপ করে বসে সব কথাবার্তা শুনতে লাগল। জাহাজের সব লোক তখনও ঘুমোয়নি। কয়েকজন জাহাজি বসে গল্প করছে। আয়ারটন শুনতে পেলে তারা বলাবলি করছে : খাশা জাহাজটা পাওয়া গেছে! সুন্দর চলে! নামটাও জুৎসই, স্পীডি! আমাদের কাপ্তেনও খাশা লোক? হ্যাঁ, বব হার্ডি বড়ো জব্বর কাপ্তেন!

    বব হার্ডি নামটা শুনে আয়ারটন চমকে উঠল অষ্ট্রেলিয়ায় থাকার সময় বব হার্ডিই কয়েদিদলের মধ্যে তার ডান-হাত ছিল। বব হার্ডি দুর্দান্ত সাহসী, একেবারে বেপরোয়া। নাবিক হিশেবেও খুব নিপুণ। অস্ট্রেলিয়ার পূর্বাঞ্চলে নরফোক আইল্যাণ্ডে বব হার্ডি স্পীডি জাহাজটি দখল করে। জাহাজের মধ্যে বন্দুক, কামান, গুলি-বারুদ, অন্যান্য হাতিয়ার, খাবারদাবার, যন্ত্রপাতি-কিছুরই অভাব ছিল না। হার্ডি তার কয়েদি সঙ্গীদের সাহায্যে জাহাজটি দখল করে প্রশান্ত মহাসাগরে লুঠতরাজ চালিয়ে বেড়াচ্ছে।

    বোম্বেটেরা মদ খেয়ে এইসবই আলোচনা করছিল। তারা কোনদিন কোনখানে কীকী করেছিল, সবই আয়ারটনের কানে এলো। এই নরফোক আইল্যাণ্ডেই দুর্দান্ত সব ইংরেজ। কয়েদিদের নির্বাসিত করা হত। বোম্বেটেদের অনেকেই ছিল পলাতক ইংরেজ কয়েদি। বেশির ভাগ বোম্বেটে ছিল জাহাজের পিছন দিকে। কয়েকজন যাত্রী ছিল ডেকের উপরে। তারাই এইসব কথা বলাবলি করছিল। আয়ারটন জানতে পারলে, বোম্বেটে জাহাজটা দৈবাৎ এই দ্বীপটিতে এসে পড়েছে। ব হার্ডি এই দ্বীপে আগে কখনো আসেনি। সমুদ্রপথে দ্বীপটা দেখতে পেয়ে দ্বীপে নেমে দেখার সাধ হয়েছে। উপযুক্ত মনে করলে সে এখানেই ঘাঁটি করবে।

    সাইরাস হার্ডিং আর তার সঙ্গীদের দৌলতে দ্বীপের বর্তমান অবস্থা এমনি লোভনীয় হয়েছে যে আয়ারটন বুঝতে পারলে, এই দ্বীপে একবার নামলে ব হার্ডি আর এখান থেকে নড়তে চাইবে না। সুতরাং বোম্বেটেদের সঙ্গে সংঘর্ষ অনিবার্য। লড়াই ব্যতীত অন্যকোনো পথ সামনে খোলা নেই। এদের একেবারে নির্মূল করে ফেললেও অন্যায় হবে না। কিন্তু লড়াইয়ের আগে জাহাজের অস্ত্রশস্ত্র আর লোকসংখ্যা জানতে হবে। আয়ারটন ঠিক করলে, যে করেই হোক এই খবরটা নিতেই হবে।

    ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই জাহাজের বেশির ভাগ লোক ঘুমিয়ে পড়ল। জাহাজের ডেক অন্ধকার। এই অন্ধকারের সুযোগটাই নিলে আয়ারটন। ডেকের উপরে গেল সে। ডেকের উপর ইতস্তত পড়ে আছে বোম্বেটেরা, ঘুমে অচৈতন্য। খুব সাবধানে আয়ারটন চারদিকে ঘুরে দেখল। জাহাজে চারটে কামান আছে, সবগুলোই আধুনিক ও মারাত্মক। ডেকের উপর দশজন লোক ঘুমিয়ে আছে, অন্যরা সম্ভবত নিচে।

    কথাবার্তা শুনে আয়ারটন জানতে পেরেছিল জাহাজে পঞ্চাশ জন লোক আছে। ছজন দ্বীপবাসীর পক্ষে নেহাৎ ফ্যালনা নয়। আয়ারটন মনে-মনে একটু সংকল্প করলে। এতে তার প্রাণ যাবে বটে, কিন্তু অন্যরা নিরাপদ হবেন। সে ঠিক করলে, বারুদ–ঘরে আগুন দিয়ে জাহাজটা সে উড়িয়ে দেবে। অবশ্য বোম্বেটেদের সঙ্গে তারও প্রাণ যাবে, কিন্তু তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত সম্পূর্ণ হবে।

    বারুদ-ঘর যে জাহাজের নিচে পিছন দিকে থাকে, নাবিক আয়ারটন তা জানত। পা টিপেটিপে সেদিকে চলল সে। মাস্তুলের কাছে গিয়ে দেখল, সেখানে একটা লণ্ঠন জ্বলছে। মাস্তুলের চারদিকে পিস্তল, বন্দুক ও অন্য-সব হাতিয়ার একটা র্যাকের মধ্যে সাজানো। সেই ব্ল্যাক থেকে একটা পিস্তল তুলে নিলে আয়ারটন। জাহাজ উড়িয়ে দিতে এই পিস্তলটাই যথেষ্ট। তারপর চুপি-চুপি নিচে নেমে বারুদ-ঘরের সামনে গিয়ে হাজির হল সে। বারুদঘরের দরজায় তালা দেয়া। আয়ারটনের গায়ে জোর ছিল অসাধারণ। তালাটি ধরে সজোরে চাপ দিতেই তালা ভেঙে দরজা খুলে গেল।

    ঠিক সেই মুহূর্তে পিছন থেকে একটা হাত এসে পড়ল আয়ারটনের কাঁধে। আয়ারটনের মুখের উপর আলো ফেলে ঢ্যাঙা একটা লোক কর্কশ কণ্ঠে প্রশ্ন করলে : তুমি এখানে কী করছো?

    আয়ারটন তক্ষুনি লোকটাকে চিনতে পারলে। সে আর কেউ নয়, স্বয়ং বব হার্ডি। ব হার্ডি অবশ্য আয়ারটনকে চিনতে পারলে না। সে জানতো, আয়ারটন অনেকদিন আগেই মারা গেছে। আয়ারটনের কোমরবন্ধ ধরে বব হার্ডি আবার জিগেস করলে : কী করছো তুমি এখানে?

    এ-কথার উত্তর না দিয়ে আয়ারটন এক হঁচকা টানে নিজেকে মুক্ত করে নিলে। বব হার্ডি চীৎকার করে উঠল : কে আছো, তোমরা শিগগির এসো!

    চীৎকার শুনে দু-তিনটে বোম্বেটে জেগে উঠল। তারা এসেই আয়ারটনকে পাকড়াবার চেষ্টা করলে। আয়ারটন পিস্তলের বাঁটের আঘাতে দুটি বোম্বেটেকে ধরাশায়ী করলে, কিন্তু তৃতীয় বোম্বেটের ছুরি এসে বিধল তার কাঁধে। এদিকে বব হার্ডি বারুদ-ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিয়েছে। ডেকের উপর বোম্বেটের পায়ের শব্দ শোনা গেল।

    আয়ারটন বেগতিক দেখে পালাবার মৎলব আঁটলে। আয়ারটন পর-পর দুটো গুলি ছুঁড়ল, একটা ব হার্ডিকে লক্ষ্য করে; কিন্তু হার্ডির তাতে অনিষ্ট হল না। শত্রুপক্ষ আচমকা এভাবে আক্রান্ত হয়ে বেজায় ঘাবড়ে গিয়েছিল। সেই সুযোগে আয়ারটন পিস্তল ছুঁড়ে লণ্ঠন চুরমার করে দিয়ে ডেকে ওঠবার সিঁড়ির দিকে ছুটল। অন্ধকার হয়ে যাওয়ায় আয়ারটনের সুবিধেই হল। সেই মুহূর্তে দু-তিনটে বোম্বেটে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিল। আয়ারটনের চতুর্থ গুলিতে একটা বোম্বেটে শেষ হল। অন্যরা হকচকিয়ে সরে গেল। তক্ষুনি আয়ারটন একলাফে ডেকের উপর উঠে এলো। বাকি দুটি গুলিতে একটি বোম্বেটেকে খতম করে আয়ারটন জাহাজের রেলিঙের উপর দিয়ে সমুদ্রে লাফিয়ে পড়ল। জাহাজ থেকে ছ-সাত ফুট যাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে চারদিকে মুহুর্মুহু বন্দুকের গুলি পড়তে লাগল।

    এতগুলো বন্দুকের আওয়াজ শুনে পেনক্র্যাফট খুব বিচলিত হয়ে উঠল। চিমনি থেকে অন্যরাও সমস্ত শুনতে পেয়েছিলেন। সবাই অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সমুদ্রতীরে ছুটে এলেন। আয়ারটন যে ধরা পড়ে মারা গেছে, সে-বিষয়ে তাদের কোনো সন্দেহ রইল না।

    দুর্ভাবনার মধ্য দিয়ে আধ ঘণ্টা কেটে গেল। বন্দুকের আওয়াজও বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু তবু পেনক্র্যাফট কিংবা আয়ারটনের কোনো দেখা নেই। তবে কি দস্যরা এসে উপদ্বীপটিই আক্রমণ করেছে? পেনক্র্যাফট আর আয়ারটনের সাহায্যের জন্যে কি তাদের

    যাওয়া উচিত নয়? কিন্তু যাবেন কী করে? তখন ভরা জোয়ার। প্রণালী পেরুনো অসম্ভব।

    নৌকোটাও অন্য তীরে রয়েছে। হার্ডিংদের দারুণ দুর্ভাবনা হল।

    অবশেষে রাত প্রায় বারোটার সময় পেনক্র্যাফট ও আহত আয়ারটন নৌকো করে এপারে এসে হাজির হল। তাদের দেখে সবাই জড়িয়ে ধরলেন।

    তক্ষুনি সবাই গিয়ে চিমনিতে আশ্রয় নিলেন। সেখানে গিয়ে আয়ারটন সবকিছু খুলে বললে। বোম্বেটে-জাহাজ উড়িয়ে দেয়ার জন্যে যে-ফন্দি করেছিল, তাও বলতে বাকি রাখলে না। সবাই আয়ারটনের সঙ্গে করমর্দন করলেন।

    দ্বীপবাসীদের অবস্থা এখন রীতিমতো সঙিন। বোম্বেটেরা জানতে পেরেছে যে, লিঙ্কন আইল্যাণ্ডে লোক আছে। তারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দল বেঁধে দ্বীপে নেমে আসবে। তখন লড়াই। অনিবার্য। সে-লড়াইয়ে হার হলে চরম সর্বনাশ অবশ্যম্ভাবী।

    পেনক্র্যাফট বললে, আমাদের আর রেহাই নেই! ওরা পঞ্চাশ জন, আর আমরা মাত্র ছ-জন।

    হ্যাঁ, বললেন হার্ডিং : আমরা ছ-জনই, তবে–

    তবে কী? শুধোলেন স্পিলেট : আর কেউ আছে নাকি আমাদের দলে? সাইরাস হার্ডিং নীরবে আকাশের দিকে তর্জনী নির্দেশ করলেন। মুখ ফুটে বললেন রহস্যময় সেই অজ্ঞাত শক্তির কথা, যে এতদিন তাদের উপকার করে এসেছে।

    নিরাপদেই কেটে গেল রাতটা। চিমনিতে থেকেই চারদিকে দৃষ্টি রাখলেন সবাই। দস্যরা দ্বীপে নামবার কোনো চেষ্টা করলে না। আয়ারটনকে গুলি করবার পর থেকেই জাহাজ নীরব নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। হয়তো চলেই গেছে। আসলে কিন্তু যায়নি। অন্ধকার ফিকে হলে পর কুয়াশার মধ্য দিয়ে দূরে অস্পষ্টভাবে দেখা গেল বোম্বেটেদের স্পীডিকে।

    এটা সবাই বুঝতে পেরেছিলেন যে, কুয়াশা যতক্ষণ আছে ততক্ষণই বাঁচোয়া। কেননা, কুয়াশার দরুন বোম্বেটেরা তাদের কোনো কাজই দেখতে পাবে না। এখন তাদের সর্বপ্রথম কর্তব্য হচ্ছে বোম্বেটেদের বুঝতে দেয়া যে, দ্বীপবাসীদের সংখ্যা বেশি—তারা বোম্বেটেদের বাধা দিতে সক্ষম।

    ঠিক হলদ্বীপবাসীরা তিন ভাগে ভাগ হয়ে যাবেন। একদল থাকবে চিমনিতে, একদল মার্সি নদীর মুখে, আর তৃতীয় দল উপদ্বীপে। বোম্বেটেরা যখন দ্বীপে নামতে চাইবে, তখন সেখানে তাদের বাধা দিতে হবে। প্রত্যেকে একটা করে বন্দুক নেবেন। গুলি-বারুদও যথেষ্ট আছে। পাহাড়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকলে বোম্বেটেদের আক্রমণের ভয় থাকবে না। এবং গ্র্যানাইট  হাউসে কেউ না-থাকলে সেটা বরং শত্রুর আক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকবে। ভয়ের কারণ আছে শুধু একটাই। এমনও হতে পারে যে, শত্রুর সঙ্গে মুখোমুখি লড়াই করাটা অনিবার্য হয়ে উঠল। যাতে মুখোমুখি লড়াই করতে না-হয়, সেজন্যে সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে। সেজন্যে সবসময়েই আড়াল থেকে লড়াই করতে হবে। দরকার হলে গুলি চালাতে হবে। কিন্তু লক্ষ্যটি যেন সবসময়েই ঠিক হয়, সেদিকে রাখতে হবে তীক্ষ্ণ নজর। কেননা অযথা গুলি নষ্ট করা চলবে না। এই ব্যবস্থা-মতো যাতে কাজ করা যায় সেইজন্যে নেব আর পেনক্র্যাফট তক্ষুনি গ্র্যানাইট  হাউসে গিয়ে প্রচুর পরিমাণ গুলি-বারুদ নিয়ে এলো। গিডিয়ন স্পিলেট আর আয়ারটনের বন্দুকের হাত নিখুঁত, তাদেরই রাইফেলদুটো দেয়া হল। হার্ডিং, পেনক্র্যাফট, নেব আর হার্বার্টের হাতে রইল বাকি চারটে বন্দুক। হার্বার্টের সঙ্গে হার্ডিং রইলেন চিমনিতে। এখান থেকে গ্র্যানাইট  হাউসের তলা পর্যন্ত সমস্ত দেখতে পাওয়া যাবে। নেবকে নিয়ে গিডিয়ন স্পিলেট গেলেন মার্সি নদীর মুখে। আয়ারটন আর পেনক্র্যাফট উপদ্বীপে গিয়ে দু-জায়গায় অপেক্ষা করবে। এইভাবে চারটে আলাদা-আলাদা জায়গা থেকে বন্দুকের আওয়াজ হতে থাকলে বোম্বেটেরা ভাববে দ্বীপে অনেক লোক আছে, এবং তারা আত্মরক্ষায় আদৌ অপারগ নয়। উপদ্বীপে যদি এর মধ্যেই বোম্বেটেরা নেমে পড়ে, আর তারা যদি বাধা দিতে না-পারে, কিংবা যদি মনে করে যে বোম্বেটেরা তখন ফেরার পথ আটকে ফেলতে পারে, তাহলে আয়ারটন আর পেনক্র্যাফট সঙ্গে-সঙ্গেই নৌকো করে ফিরে আসবে বলে ঠিক হল। এই ব্যবস্থার পর যে-যার জায়গায় রওনা হওয়ার আগে সবাই একে আরেকের সঙ্গে করমর্দন করে বিদায় নিলেন, তারপর যে-যার জায়গায় চলে গেলেন।

    তখন রাত ভোর হয়েছে। বেলা ছ-টা বাজে। একটু পরেই কুয়াশা পরিষ্কার হতে শুরু হল। বোম্বেটে-জাহাজটা এখন বেশ স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। কালো নিশানটা মাস্তুলে উড়ছে। দুরবিন দিয়ে সাইরাস হার্ডিং দেখতে পেলেন, কামানের নলগুলো দ্বীপকে লক্ষ্য করে বসানো। হুকুম পেলেই শুরু হবে তার তাণ্ডব দাপট। স্পীডি তখনো নীরব। প্রায় তিরিশ জন বোম্বেটে ডেকের উপর হাঁটাহাঁটি করছে। দুটি লোক দুরবিন দিয়ে দেখছে। লিঙ্কন আইল্যাণ্ডকে।

    রাত্রে জাহাজে যে-ঘটনাটা ঘটে গিয়েছে, বোম্বেটেরা তা তখনো ভালো করে বুঝে উঠতে পারেনি। লোকটা বারুদ-ঘরের দরজা ভেঙেছিল। তার সঙ্গে ধস্তাধস্তি নেহাৎ কম হয়নি। তার গুলিতে একজন বোম্বেটে মারা গেছে, আর দু-জন আহত হয়েছে। লোকটি কি বোম্বেটেদের গুলি খেয়েও নিরাপদে ফিরে গেছে? লোকটি এলো কোত্থেকে? উদ্দেশ্যই বা কী ছিল? বব হার্ডির বিশ্বাস, লোকটি এসেছিল বারুদে আগুন দিয়ে জাহাজ উড়িয়ে দেয়ার জন্যে। সত্যিই কি তাই ছিল উদ্দেশ্য? কে জানে! তবে একটা ব্যাপার স্পষ্টই বোঝা গেল যে, এই অজ্ঞাত দ্বীপটাতে লোকজন আছে। হয়তো তারা সংখ্যায় নেহাৎ কম নয়। হয়তো তারা দ্বীপটা রক্ষা করতে সক্ষম। কিন্তু সমুদ্রসৈকতে কিংবা পর্বত-চূড়োয়–কোথাও তো কাউকে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। সমুদ্রতীরও নির্জন। তবে কি লোকজন। দ্বীপের মধ্যে পালিয়ে গেছে, না আক্রমণের মৎলব আঁটছে? কে জানে! দেখাই যাক কী হয়।

    এমনি করে দেড় ঘণ্টা কেটে গেল। শেষে যখন দ্বীপের অধিবাসীদের পক্ষ থেকে আক্রমণের কোনো সম্ভাবনা দেখা গেল না, তখন একটা নৌকো ভাসিয়ে তাতে সাতজন বোম্বেটে চড়ে বসল। তাদের সঙ্গে বন্দুক আছে। একজনের হাতে আছে জল মাপবার দড়ি। চারজন বোম্বেটে বসেছে দাঁড়ে, অন্য দুজন বন্দুক হাতে করে নৌকোর মুখের কাছে হাঁটু গেড়ে প্রস্তুত হয়ে আছে। তাদের উদ্দেশ্য শুধু খবর নেয়া। নামবার মৎলব থাকলে নিশ্চয় সংখ্যায় আরো বেশি হত। নৌকোর গতি দেখে বোঝা গেল, বোম্বেটেরা ঠিক করেছে প্রণালীর মধ্যে প্রবেশ না-করে উপদ্বীপটায় গিয়ে নামবে।

    পাহাড়ের আড়াল থেকে আয়ারটন আর পেনক্র্যাফট দেখতে পেলে, নৌকো ঠিক তাদের দিকেই আসছে। তারা অপেক্ষা করতে লাগল, কতক্ষণে নৌকো বন্দুকের পাল্লার মধ্যে আসে।

    আস্তে-আস্তে, খুব সতর্কভাবে এগুতে লাগল নৌকো। তখন দেখা গেল, একজনের হাতে শিসে-বাঁধা দড়ি-সে মার্সি নদীর মুখে প্রণালীর গভীরতা মেপে দেখছে। তাতে মনে হল বব হার্ডির ইচ্ছে—জাহাজটাকে তীরের যথাসম্ভব কাছে আনা। নৌকো যখন উপদ্বীপ থেকে সাত-আটশো হাত দূরে, তখন থামল। হালের লোকটি উঠে দাঁড়ালে, তীরে নামবার মতো জায়গা পাওয়া যায় কি না দেখতে। ঠিক সেই মুহূর্তে দু-বার গর্জন করে উঠল বন্দুক, ধোঁয়া উঠল পাহাড়ের আড়াল থেকে। সঙ্গে-সঙ্গে হালের লোকটি আর যে জল মাপছিল—দুজনেই চিৎপটাং হয়ে নৌকোর মধ্যে পড়ে গেল। এর ঠিক পরক্ষণেই জাহাজ থেকে গর্জে উঠল কামান। সঙ্গে সঙ্গে কামানের গোলা এসে আয়ারটন আর পেনক্র্যাফটের মাথার উপরের পাহাড়ের চুড়োটাকে ভেঙে একেবারে চুরমার করে দিলে। সৌভাগ্যবশত তাদের দুজনের তাতে কোনো অনিষ্ট হল না।

    এদিকে মহা গণ্ডগোল বাধল নৌকোয়। হালের লোকটির জায়গায় আরেকজন এসে বসে নৌকোর মুখ ফেরালে।

    এ-রকম অবস্থায় জাহাজে ফিরে যাওয়াটাই স্বাভাবিক, কিন্তু নৌকো জাহাজের দিকে রওনা হল না, এবার চলল মার্সি নদীর মুখের দিকে। ওদের মৎলব হল প্রণালীতে ঢুকে আয়ারটন আর পেনক্র্যাফটের ফেরার পথ এমনভাবে আটকে ফেলবে, যাতে তারা জাহাজের কামান আর নৌকোর বন্দুকের মাঝখানে পড়ে যাবে। বোম্বেটেদের মৎলব বুঝতে পেরেও আয়ারটন আর পেনক্র্যাফট তাদের আশ্রয়টা ছাড়ল না। মার্সি নদীর মুখে আছেন স্পিলেট আর নেব, চিমনিতে রয়েছেন হার্ডিং আর হার্বার্ট। তাদের উপর নির্ভর করেই ওরা দুজনে লুকিয়ে রইলে। কুড়ি মিনিট পরে বোম্বেটেদের নৌকো যখন মার্সি নদীর মুখ থেকে চারশো হাত দূরে, তখন জোয়ার শুরু হল। নৌকো বুঝি-বা মার্সি নদীর মধ্যেই ঢুকে পড়ে। বোম্বেটেরা প্রাণপণে দাঁড় টেনে কোনোমতে নৌকোটাকে প্রণালীর মাঝখানেই রাখলে বটে, কিন্তু মার্সি নদীর মুখের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ দুটো গুলি এসে দস্যুদের আরো দুজনকে নৌকোর মধ্যে শুইয়ে দিলে নেব আর স্পিলেট দুজনেরই লক্ষ্য হয়েছিল অব্যর্থ। ধোঁয়া লক্ষ্য করে তক্ষুনি জাহাজ থেকে কামান গর্জে উঠল বটে, কিন্তু পাথর চুরমার করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারলে না।

    নৌকোয় এখন মাত্র তিনজন বোম্বেটে কার্যক্ষম। স্রোতের টানে তীরের মতো ছুটল নৌকো।

    নৌকোটা সাইরাস হার্ডিং আর হার্বাটের সামনে দিয়েই গেল, কিন্তু পাল্লার বাইরে ছিল বলে তাঁরা গুলি করলেন না। নৌকো উপদ্বীপের উত্তর দিক ঘুরে দুটো দাঁড়ের সাহায্যে জাহাজের দিকে ফিরে চলল।

    এ পর্যন্ত জয় হয়েছে দ্বীপবাসীদের। শত্রুদের চারজন লোক একেবারে যদি না-ও মরে থাকে, সাংঘাতিকভাবে যে আহত হয়েছে তাতে কোনোই সন্দেহ নেই। বোম্বেটেরা যদি এমনিভাবেই আক্রমণ করতে থাকে, যদি তারা আবার নৌকোয় চড়ে দ্বীপে নামবার চেষ্টা করে, তাহলে একটা-একটা করে তাদের খতম করতে পারা যাবে।

    আধঘণ্টা পরে নৌকোটা গিয়ে জাহাজের গায়ে ভিড়লে। সঙ্গে-সঙ্গে জাহাজে ভয়ানক শোরগোল চাচামেচি শুরু হয়ে গেল। রাগে আগুন হয়ে তক্ষুনি বারো জন নতুন দস্য লাফিয়ে পড়ল নৌকোয়। জাহাজ থেকে আরেকটা নৌকো নামানো হল, তাতে চড়ল আটজন লোক। প্রথম নৌকো ফের উপদ্বীপের দিকে চলল, দ্বিতীয় নৌকো চলল মার্সি নদীর মুখটা দখল করবার জন্যে।

    আয়ারটন আর পেনক্র্যাফটের অবস্থা খুব বিপজ্জনক হয়ে পড়ল। প্রণালী পেরিয়ে দ্বীপে চলে-যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

    তবু প্রথম নৌকোটা রাইফেলের পাল্লায় না-আসা পর্যন্ত তারা চুপ করে রইলে। নৌকো পাল্লায় আসার সঙ্গে সঙ্গে দুটো গুলি ছুটে গিয়ে নৌকোর লোকজনদের ছত্রভঙ্গ করে দিলে। তারপর আয়ারটন আর পেনক্র্যাফট আশ্রয় ছেড়ে ঊধর্বশ্বাসে ছুটল। তাদের উপর দিয়ে, চারপাশ দিয়ে মুহুর্মুহু গুলি ছুটল শত্রুপক্ষের, তবু একবারও ভুক্ষেপ করলে না তারা—লাফ দিয়ে গিয়ে উঠল নৌকোয়, তারপর প্রণালী পেরিয়ে একেবারে চিমনির আশ্রয়ে গিয়ে হাজির হল। এদিকে দ্বিতীয় নৌকো মার্সি নদীর মুখের কাছে উপস্থিত হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে ফের গর্জে উঠল বন্দুক। নৌকোর আটজন লোকের মধ্যে দুজন স্পিলেট আর নেবের গুলিতে ছিটকে পড়ল জলে। নৌকোটাও স্রোতের টানে জলের নিচের পাথরে লেগে মার্সির মুখের কাছে ড়ুবে গেল। যে ছ-জন দস্যু বেঁচে ছিল, তারা হাত উঁচু করে জল পার হল। তারপর মার্সি নদীর ডান পার ধরে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে ফ্লোটসাম পয়েন্টের দিকে অদৃশ্য হয়ে গেল।

    চিমনিতে ঢুকেই প্রশ্ন করলে পেনক্র্যাফট : ক্যাপ্টেন, এখন অবস্থাটা কী-রকম দাঁড়িয়েছে বলে মনে করেন?

    এখন লড়াইটা একটু নতুন ধরনের হবে, বললেন হার্ডিং : কারণ বোম্বেটেরা বোকা নয়। এমন-একটা অসুবিধের অবস্থায় তারা বেশিক্ষণ থাকবে না। জোয়ারের সময় হয়তো তারা জাহাজ নিয়েই ঢুকবে প্রণালীতে। তখন বন্দুক দিয়ে কামানের সঙ্গে লড়াই চালানো বড়ো সুবিধের হবে না। কামানের গোলার মুখে আমাদের আশ্রয়গুলো তখন আর নিরাপদ থাকবে না।

    এমন সময় চেঁচিয়ে উঠল পেনক্র্যাফট : জাহান্নমে যাক শয়তানগুলো! ওরা দেখছি সত্যিই জাহাজের নোঙর তুলতে শুরু করেছে। এবার গ্র্যানাইট  হাউসে গিয়ে আমাদের আশ্রয় নেয়া উচিত।

    আরেকটু অপেক্ষা করে দেখা যাক, কী হয়–বললেন হার্ডিং : কেননা, নেব আর স্পিলেট তো এখনও ওখানে থেকে গেলেন। অবশ্য তারা উপযুক্ত সময়েই এখানে এসে পড়বেন! আয়ারটন, তুমি তৈরি হয়ে নাও। তোমার আর মিস্টার স্পিলেটের বন্দুকের হাতের পরীক্ষা দেবার সময় এসেছে।

    সত্যই দেখা গেল, স্পীডি উপদ্বীপটার দিকে রওনা হওয়ার জন্যে একেবারে প্রস্তুত। জোয়ার শুরু হলেই প্রণালীর দিকে আসবে। কিন্তু প্রণালীতে প্রবেশ করা সম্পর্কে পেনক্র্যাফটের তখনো সন্দেহ ছিল।

    এমন সময় আয়ারটন চেঁচিয়ে উঠল : ব্যাপার সাংঘাতিক! স্পীড়ি রওনা হয়েছে!

    তখন হাওয়া ছিল দ্বীপের দিকে। স্পীড়ি পাল খাঁটিয়ে দ্বীপের দিকে আসতে লাগল। এত কাছে কামানের মুখে দ্বীপবাসীদের ভরসা কী! বন্দুক ছুঁড়ে আর-কোনো লাভ হবে না। তাহলে দস্যুদের বাধা দেয়া যায় কী করে?

    সাইরাস হার্ডিং গোটা ব্যাপারটা ভেবে দেখলেন। গ্র্যানাইট  হাউসে অবরুদ্ধ অবস্থায় কয়েক মাস পর্যন্ত থাকা যাবে, প্রচুর রসদ মজুত আছেন ভাড়ারে; কিন্তু তার পর কী হবে? বোম্বেটেরা তো দ্বীপের মালিক হয়ে বসলে সবকিছু তছনছ করে, ছারখার করে দেবে। এখন একটামাত্র আশা আছে। বব হার্ডি হয়তো প্রণালীতে ঢুকতে চেষ্টা করবে না, উপদ্বীপের বাইরেই থেকে যাবে। এত দূর থেকে কামানের গোলায় কোনো বিপদ হবে না।

    কিন্তু ততক্ষণে জাহাজ উপদ্বীপের কাছে এসে হাজির হয়েছে। তারপর ধীরে-ধীরে এগুতে লাগল প্রণালীর দিকে। এতক্ষণ পরে সব কিছুই স্পষ্ট বোঝা গেল। বব হার্ডি প্রণালীতে ঢুকে চিমনির উপর গোলা ছোড়বার মৎলব এঁটেছে।

    দেখতে-দেখতে স্পীডি এসে মার্সি নদীর মুখে দাঁড়ালে। গিডিয়ন স্পিলেট দেখতে পেলেন, সেখানে থাকলে বিষম শোচনীয় অবস্থার সম্ভাবনা, তাই নেবকে নিয়ে তিনি তাড়াতাড়ি চিমনিতে অন্য সকলের কাছে ফিরে এলেন। তাঁরা পাহাড়ের আড়ালে-আড়ালে চলে এসেছিলেন বলে কোনোরকমে শত্রুর গুলির হাত থেকে আত্মরক্ষা করতে পেরেছিলেন।

    তাঁদের দেখেই হার্ডিং বললেন : আমরা লুকিয়ে-লুকিয়ে গ্র্যানাইট  হাউসে গিয়ে আশ্রয় নেবো ঠিক করেছি।

    স্পিলেট বললেন : তবে আর দেরি কেন? শিগগিরই চলুন।

    সবাই চিমনি ছেড়ে চললেন। পাথরের দেয়ালের একটা বাঁকের আড়ালে থাকার দরুন জাহাজের লোকেরা তাদের দেখতে পেলে না। লিফটে উঠে গ্র্যানাইট  হাউসের ভিতর ঢুকতে পুরো এক মিনিটও লাগল না। টপ আর জাপকে আগেই গ্র্যানাইট  হাউসে বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। সবাই জানলার লতাপাতার ফাঁক দিয়ে দেখতে পেলেন, স্পীড়ি ক্রমশ প্রণালীর ভিতরে আসছে আর অবিরাম গোলা চালিয়ে চলেছে। ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে চিমনির পাথর। তারা আশা করেছিলেন যে গ্র্যানাইট  হাউস হয়তো বোম্বেটেদের নজর এড়িয়ে যাবে। সাইরাস হার্ডিং ভাগ্যিশ বুদ্ধি করে লতাপাতা দিয়ে জানলাগুলো বন্ধ করেছিলেন। এমন সময় হঠাৎ একটা গোলা এসে গ্র্যানাইট  হাউসের জানলায় লাগল।

    চেঁচিয়ে উঠল পেনক্র্যাফট : সর্বনাশ! ওরা আমাদের দেখে ফেলেছে।

    হয়তো-বা বোম্বেটেরা দ্বীপবাসীদের দেখতে পায়নি। অবিশ্রান্ত গোলাবর্ষণের দরুনই একটা গোলা আচমকা এসে জানলায় লেগেছে। এমন সময় হঠাৎ একটা তীব্র গভীর গর্জন, তার সঙ্গে-সঙ্গেই ভয়ানক আর্তনাদ শুনতে পাওয়া গেল। সবাই ছুটে গিয়ে জানলার কাছে দাঁড়ালেন। দেখতে পেলেন, জাহাজটা জলস্তম্ভের মতো একটা জিনিশের উচ্চণ্ড আক্ষেপে হঠাৎ উপরের দিকে উৎক্ষিপ্ত হয়ে ফেটে দু-ভাগ হয়ে গেছে।

    দশ সেকেণ্ডের মধ্যে স্পীডি খুনে বোম্বেটেদের নিয়ে অতল সমুদ্রগর্ভে ড়ুবে গেল। বিস্ময়ে গোল হয়ে গেল হার্বার্টের চোখ। অবাক গলায় সে বললে, স্পীডি উড়ে গেল!

    তক্ষুনি পেনক্র্যাফট আর নেবের সঙ্গে সমুদ্রতীরের দিকে রওনা হয়ে পড়ল হার্বার্ট। এই ব্যাপারটা এত আকস্মিক, এত অকল্পনীয়ভাবে সংঘটিত হল যে কেউ তখনো গোটা ব্যাপারটা ঠিক-ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না। অন্য-সকলেও সংবিৎ ফিরতেই পেনক্র্যাফটের সঙ্গে চললেন। সমুদ্রতীরে পৌঁছে দেখা গেল, স্পীডির কোনো চিহ্নই নেই। সমুদ্রে। ব্যাপারটা আগাগোড়া তখনও সকলের বোধগম্য হতে চাইছিল না।

    এমন সময় স্পিলেট প্রশ্ন করলেন : নৌকোটা ভেঙে যাওয়ার পর সেই ছটা বোম্বেটে যে মার্সির তীর দিয়ে পালিয়েছিল, তারা কোথায়? সবাই তখন সেইদিকে তাকালেন। কিন্তু কাউকেই দেখা গেল না। হয়তো তারা তাদের জাহাজটার দুর্দশা দেখে দ্বীপের ভিতরে পালিয়ে গেছে।

    হার্ডিং বললেন : ওদের কথা পরে ভাবা যাবে। ওদের হাতে বন্দুক আছে-এইটে ভারি সাংঘাতিক কথা। যাক, ওরাও ছ-জন—আমরাও ছ-জনই-সমান-সমান আছি দুদলই। কিন্তু ব্যাপারটা ভারি অপ্রত্যাশিত। ঠিক যেন অলৌকিক!

    অলৌকিক বলে অলৌকিক! বললে পেনক্র্যাফট : বোম্বেটগুলো ঠিক সময়টাতেই ধ্বংস হয়েছে, নইলে গ্র্যানাইট  হাউসে আর বেশিক্ষণ থাকা যেত না!

    স্পিলেট বললেন : আচ্ছা পেনক্র্যাফট, ব্যাপারটা ঘটল কী করে বলো তো?

    পেনক্র্যাফট বললে : কারণটা খুব সহজ। বোম্বেটে-জাহাজের তো আর যুদ্ধজাহাজের মতো আইনকানুন নেই! পলাতক কয়েদির দল তো আর শিক্ষিত নাবিক নয়! বারুদের ঘরটা ছিল খোলা, আর গুলি ছোড়বার সময় কখন হয়তো কোনো অসতর্ক লোকের হাত থেকে তাতে আগুন পড়ে গিয়েছিল। এ ছাড়া আর-কী কারণ থাকতে পারে?

    হার্ডিং বললেন : আসল ব্যাপারটা বোধহয় আমরা ভাটার সময় জানতে পারবো। তখন তো ভাঙা জাহাজটা ভেসে উঠবে জলের উপর। একটু অপেক্ষা করেই দেখা যাক।

    ইতিমধ্যে সবাই গ্র্যানাইট  হাউসে গিয়ে খাওয়াদাওয়া শেষ করে আবার সমুদ্রতীরে ফিরে এলেন। স্পীডির কাঠামোটা আস্তে-আস্তে ভাসতে শুরু করল। কাৎ হয়ে পড়ে আছে জাহাজটা। তলাটা আগাগোড়া দেখতে পাওয়া যায়। জলের নিচে কী-যে একটা বিরাট তাণ্ডবের ক্রিয়া হয়েছিল, তা বোঝবার সাধ্য নেই। সেই শক্তিই জাহাজটাকে কাৎ করে উপরে জলস্তম্ভ রূপে প্রকাশ পেয়েছিল। সবাই জাহাজের চারদিকে ঘুরে দেখতে লাগলেন।

    ভাঁটার সঙ্গে ক্রমে জাহাজটা ভেসে উঠলে পর সবাই, দুর্ঘটনার কারণটা না-হোক ফলটা দেখতে পেলেন। জাহাজের গলুইয়ের দিকে মুখ থেকে সাত-আট ফুট নিচে জাহাজের শরীরটার দু-পাশই চুরমার হয়ে গেছে। গলুই থেকে শুরু করে জাহাজের সমস্ত মেরুদণ্ড ফেটে জাহাজের শরীর থেকে আলাদা হয়ে গেছে। প্রায় কুড়ি ফুট জায়গা জুড়ে এতবড়ো ফুটো হয়েছে যে সে-ফুটো বন্ধ করা অসম্ভব। শুধু-যে তামার পাত আর তক্তা উড়ে গেছে তা নয়, পাতগুলোর আর মোটা-মোটা পেরেকগুলোরও কোনো অস্তিত্ব নেই। পেনক্র্যাফট আর আয়ারটন পরীক্ষা করে বললে যে জাহাজটাকে আর জলে ভাসানো অসম্ভব। ততক্ষণে আরো জেগেছে জাহাজ। এবার সহজেই যাওয়া যাবে ডেকের উপরে। সবাই কুড়ল হাতে করে ডেকের উপরে গিয়ে উঠলেন। চুরমার হয়ে গেছে ডেক। নানান ধরনের বাক্স, প্যাকিং কেস ছড়িয়ে রয়েছে চারদিকে। বেশিক্ষণ জলের নিচে থাকেনি বলে ভিতরের জিনিশপত্র শুকনো হওয়ারই কথা।

    সবাই তখন মালপত্র নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে আনতে লাগলেন। অনেক দেরি আছে জোয়ারের। তার মধ্যেই সব কাজ গুছিয়ে নিতে হবে। আয়ারটন আর পেনক্র্যাফট খুঁজতেখুঁজতে একটা কপিকল আর দড়ি পেলে। তারই সাহায্যে বড়ো-বড়ো সিন্দুক আর পিপে নৌকোয় চালান করে নিয়ে যাওয়া হল। জাহাজে জিনিশ ছিল নানান রকমের। বাসনকোশন, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি অজস্র রকম জিনিশ ছিল স্পীড়িতে। এতসব জিনিশ দেখে সকলের আনন্দের সীমা রইল না। হার্ডিং কিন্তু একটা জিনিশ লক্ষ করে ভারি অবাক হলেন। শুধু জাহাজের গলুইয়ের দিকটাই যে চুরমার হয়েছে তাই নয়, গলুইয়ের দিকে ভিতরের সবকিছুই নষ্ট হয়ে গেছে। দেখলেই মনে হয়, জাহাজের মধ্যে প্রকাণ্ড একটা বমশেল ফেটে গিয়েছে।

    ক্রমে জাহাজের পিছনের দিকে গেলেন সবাই। আয়ারটনের কথামতো সেখানেই বারুদ-ঘরটা থাকার কথা। সাইরাস হার্ডিং আগেই বুঝতে পেরেছিলেন যে বারুদ-ঘরে আগুন লাগেনি, বারুদের পিপেগুলো ব্যবহারের উপযুক্ত আছে। সচরাচর কোনো লাইনিং-দেওয়া বাক্সের মধ্যেই থাকে বারুদ, যাতে সহজে নষ্ট হতে না-পারে। বারুদ-ঘরের রাশি-রাশি গোলাবারুদের মধ্য থেকে বিশটা বারুদের পিপে বার করা হল। পিপেলোর সবকটাই তামার লাইনিং দেয়া 1 পেনক্র্যাফট বুঝতে পারলে, বারুদ-ঘর ফেটে পীডি ধ্বংস হয়নি, বরং বারুদ-ঘর যেখানে ছিল সেই জায়গাটারই ক্ষতি হয়েছে সবচেয়ে কম।

    পেনক্র্যাফট বললে : বারুদ-ঘর তো আস্তই আছে দেখছি; তবে দুর্ঘটনাটা কী করে হল শুনি? আমি এ-কথা নিশ্চয় করে বলতে পারি যে প্রণালীর জলে লুকোনো পাহাড়টাহাড় কিছু নেই। আমার মনে হয়, এই আশ্চর্য পরিত্রাণের আসল রহস্য আমরা কোনোদিনই বুঝতে

    পারবো না।

    অনুসন্ধানে বেশ কয়েক ঘণ্টা কেটে গিয়েছিল তাদের। এদিকে জোয়ার এসে গেল। এখন সব কাজ বন্ধ রাখতে হবে। জাহাজ জোয়ারের টানে ভেসে যাবে না, কেননা খুব গভীরভাবে তা বসে গিয়েছে। সুতরাং ভাবনার কিছুই রইল না; পরদিন এসে ফের কাজ শুরু করলেই চলবে। কিন্তু সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হল, আর-কোনোমতেই উদ্ধার করা যাবে না জাহাজটা। কাজে-কাজেই, যত শিগগির পারা যায় জাহাজের বাকি সরঞ্জামগুলো বাঁচাতে হবে।

    তখন বিকেল পাঁচটা। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি গেছে। সুতরাং সবাই খাওয়াদাওয়া সেরে নিলেন সব-আগে। জাহাজের মালগুলো পরীক্ষা করে দেখবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন সবাই। বেশির ভাগ বাক্সর মধ্যেই পোশাক-আশাক পাওয়া গেল, জুতো-মোজাও পাওয়া গেল। দেখে সবাই খুশি হয়ে উঠলেন। পিপে-পিপে গুলি-বারুদ, রাশি-রাশি বন্দুক, পিস্তল, চাষবাসের জিনিশ, ছুতোরের যন্ত্রপাতি, ফসলের বীজ-ভরা বাক্সকত-কী! আর সবই যেন একেবারে টাটকা। অল্প কিছুক্ষণ জলের নিচে থাকায় কিছুই নষ্ট হয়নি। গ্র্যানাইট  হাউসের ভাড়ারে জায়গার অভাব নেই, কিন্তু সারাদিন খেটেও এত-সব জিনিশ ভাড়ারে ভোলা যাবে না। চিমনিতে এনেই রাখা হয়েছিল মালপত্র; রাত্রে সেগুলোকে পাহারা দেয়ার ব্যবস্থা করা হল। সবাই পালা করে সারা রাত পাহারার কাজে ব্যস্ত রইলেন। পাহারার কারণ হল, স্পীড়ির ছ-জন বোম্বেটে যে দ্বীপের অরণ্যে লুকিয়ে আছে, তাদের কথা তো ভুলে গেলে চলবে না!

    উনিশে, বিশে আর একুশে অক্টোবর—এই তিন দিন ওই ভাঙা জাহাজ থেকে দরকারি জিনিশপত্র সংগ্রহ করতেই কেটে গেল। স্পীডির কল্যাণে লিঙ্কন আইল্যাণ্ডের অস্ত্রাগার পূর্ণ হল। গ্র্যানাইট  হাউসের ভাড়ার জিনিশপত্রে ভরে গেল। স্পীডির কামান চারটেও উদ্ধার করা সম্ভব হল। পেনক্রাফটের উৎসাহের শেষ নেই। এর মধ্যেই ঠিক করে ফেললে, গ্র্যানাইট  হাউসে কামান চারটে বসিয়ে নেবে, আর তাহলে ভবিষ্যতে কোনো জাহাজের সাধ্য হবে না দ্বীপের সামনে আসতে।

    মালপত্র সমস্ত জাহাজ থেকে নামানোর পর, তেইশে অক্টোবর রাত্রের দুর্যোগে বাকি জাহাজটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সেজন্যে অবশ্য কারুই আপশোশের কোনো কারণ ছিল না।

    স্পীড়ি জাহাজের দুর্ঘটনার পর, ভাটার সময়েও দুর্ঘটনার নিগূঢ় রহস্যের কোনো কারণ বোঝা যায়নি। রহস্যটা হয়তো অজ্ঞাতই রয়ে যেতো, কিন্তু তিরিশে নভেম্বরের একটা ঘটনায় তার নিষ্পত্তি হয়ে গেল।

    নেব সমুদ্র-সৈকত দিয়ে আসছিল। পথে লোহার একটা মোটা চোঙা দেখতে পেল, তাতে বিস্ফোরণের চিহ্ন রয়েছে। হার্ডিং অন্য সকলের সঙ্গে চিমনিতে বসে কাজ করছিলেন। এমন সময় নেব সেই চোঙাটা সেখানে এনে হাজির করলে।

    গভীর কৌতূহলের সঙ্গে নেবের হাত থেকে চোঙাটা নিয়ে পরীক্ষা করতে লাগলেন সাইরাস হার্ডিং। ক্রমশ তার মুখে মেঘ জমতে লাগল। সবাইকে অবাক করে দিয়ে তিনি বললেন : স্পীডির ধ্বংসের কারণ এবার বোঝা গেল। এই চোঙাটাই সেই অদৃশ্য কারণ।

    এই চোঙাটা স্পীডির ধ্বংসের কারণ! অবাক হয়ে চেঁচিয়ে উঠল পেনক্র্যাফট।

    হ্যাঁ, কেননা–গম্ভীর কণ্ঠে হার্ডিং বললেন : চোঙাটা একটা টর্পেডোর অবশিষ্ট অংশ।

    স্তম্ভিত হয়ে সবাই সমস্বরে বলে উঠলেন : টর্পেডোর অংশ।

    হ্যাঁ, বললেন হার্ডিং: টর্পেডোটা কে জাহাজের তলা লক্ষ্য করে ছুঁড়েছিল, এই প্রশ্ন করলে উত্তরে শুধু এই বলতে পারি যে, আমি ছুঁড়িনি। কিন্তু এটা কেউ-না-কেউ ছুঁড়েছিল, এবং দ্বীপে এক অতুলনীয় শক্তির পরিচয়ও তোমাদের অজানা নেই। এর দৌলতেই বোম্বেটেদের হাত থেকে আশ্চর্যভাবে পরিত্রাণ পেয়েছি আমরা।

    .

    ৩.২ হার্বার্ট আহত

    টর্পেডোটা দেখে বিস্ফোরণের সব বিষয় পরিষ্কার হয়ে গেল। আমেরিকার লড়াইয়ের সময় সাইরাস হার্ডিং নিজে পরীক্ষা করে দেখেছেন, টর্পেডোর ধ্বংসকারী শক্তি কীরকম সাংঘাতিক! এই শক্তির দরুনই প্রণালীর জলে সৃষ্টি হয়েছিল অসংখ্য উচ্চণ্ড জলস্তম্ভের। জাহাজের তলাটা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে পলকের মধ্যে সেটাকে ড়ুবিয়ে দিয়েছিল। যে-টর্পেডো বিশাল যুদ্ধ-জাহাজকে চোখের নিমেষে ধ্বংস করে ফ্যালে, তার কাছে স্পীডি তো তুচ্ছাতিতুচ্ছ একটা বস্তু মাত্র।

    হ্যাঁ, নিষ্পত্তি হল বিস্ফোরণ রহস্যের। কিন্তু প্রশ্ন হল, জলে টর্পেডো এলো কী করে?

    সাইরাস হাডিং গম্ভীর স্বরে সবাইকে বললেন : লিঙ্কন আইল্যাণ্ডে আমাদের হিতৈষী একজন কেউ যে গোপনে গা-ঢাকা দিয়ে রয়েছেন, সে-বিষয়ে কোনো সন্দেহই রইল না এখন। এই নিয়ে কতবার যে তিনি আমাদের রক্ষা করলেন, তার ইয়ত্তা নেই। এমনভাবে লুকিয়ে থেকে আমাদের উপকার করবার যে কী উদ্দেশ্য তাঁর, তা আমি ঠিক বুঝতে পারিনি। আয়ারটনও তার কাছে বিশেষ ঋণী। বোতলে যে-চিঠিতে আয়ারটনের আর টেবর আইল্যাণ্ডের অবস্থান জানিয়ে দেয়া ছিল, তা তারই কাজ। বেলুন থেকে যখন পড়ে গিয়েছিলুম, তখন তিনিই ঢেউয়ের মধ্য থেকে আমাকে বাঁচিয়েছিলেন। ফ্লোটসাম পয়েন্টে মালপত্র-ভরা সিন্দুকটি তিনিই রেখেছিলেন। পিকারির পেটে যে-গুলি পাওয়া গিয়েছিল, সেও তার কাজ প্রসপেক্ট হাইটের উপরেও তিনিই আগুন জ্বালিয়েছিলেন। এককথায়, এ পর্যন্ত যতগুলো অলৌকিক, রহস্যময় ঘটনা দ্বীপে ঘটেছে, যা দেখেশুনে আমরা তাজ্জব হয়ে গেছি সমস্তই তার কাজ। তিনি যেই হোন না কেন, আমরা তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। তার ঋণ আমাদের শোধ করা কর্তব্য।

    আপনি ঠিক কথাই বলেছেন ক্যাপ্টেন, বললেন স্পিলেট : এই অপরিচিত উপকারীর ক্ষমতা অমানুষিক! গ্র্যানাইট  হাউসের কুয়োর মধ্য দিয়ে উঠেই কি ইনি আমাদের কথাবার্তা পরামর্শ সব শোনেন? সিন্ধুঘোটকটাকে মেরে ইনিই কি টপকে বাঁচিয়েছিলেন? আপনাকেও কি উদ্ধার করেছিলেন ইনি? সব দেখে-শুনে তো তাই মনে হচ্ছে। কিন্তু তাহলে কি ইনি আমাদের মতো রক্তমাংসের মানুষ?

    হার্ডিং বললেন : হ্যাঁ, সত্যিই এর ক্ষমতা অতিমানবিক। এখনো অবশ্য অনেক রহস্য জানতে বাকি আছে। এঁর সন্ধান করতে পারলে সবকিছুই স্পষ্ট হবে। এখন কথা হচ্ছে, এই উপকারী বন্ধুটিকে কি খুঁজে বার করা উচিত? না, তার ইচ্ছেমতো তাকে গোপনে থাকতে দেওয়াই কর্তব্য? তোমরা কী বলে?

    নেব বললে : আমার মনে হয়, তার যখন ইচ্ছে হবে তখন তিনি নিজেই দেখা দেবেন। তা না-হলে হাজার খুঁজেও আমরা তার দেখা পাবো না।

    আমারও তাই মনে হয়, বললেন স্পিলেট : কিন্তু তাই বলে আমরা তাকে খুঁজে বার করবার চেষ্টা করবো না কেন? তার দেখা হয়তো পাবো না, কিন্তু তার প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করা হবে।

    এবার আয়ারটন কথা বলল। সে বললে : আমার মনে হয়, এই অজ্ঞাত ব্যক্তিকে তন্ন-তন্ন করে খুঁজে বার করা উচিত। হয়তো তিনি একলা থাকার দরুন কষ্ট পাচ্ছেন।

    তবে এই কথাই ঠিক হল বললেন হার্ডিং : যত-শিগগির-সম্ভব তাকে খুঁজতে শুরু করবো। দ্বীপের কোনো জায়গাই বাকি রাখব না। গুহা, গহ্বর—সবখানেই খুঁজে দেখবো।

    এরপর কিছুদিন সবাই চাষবাসে মন দিলেন। আর পেনক্র্যাফট গ্র্যানাইট  হাউসের সামনে কামান চারটে বসানোর জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। তার অনুরোধে কপিকলের সাহায্যে কামান চারটে গ্র্যানাইট  হাউসে তুলে নেয়া হয়েছিল। জানলাগুলোর মাঝখানে ফুটো করে কামান বানোর ঘর করা হল। কামানগুলোকে ঘষে-মেজে পরিষ্কার করে সাজানোর পর গ্র্যানাইট  হাউস যেন রীতিমতো একটা দুর্গ হয়ে উঠল।

    আটই নভেম্বর কামানগুলোর পাল্লা কতদূর পর্যন্ত, তা পরীক্ষা করে দেখবার ব্যবস্থা করা হল। চারটে কামানেই বারুদ পুরে দেয়া হল। অবশ্য বারুদের পরিমাণ হার্ডিংই ঠিক করে দিলেন। প্রথম কামানের গুলি উপদ্বীপের উপর দিয়ে সমুদ্রে যেখানে পড়ল, সে-জায়গাটা কত দূরে তা ঠিক-ঠিক বোঝা গেল না। ফ্লোটসাম পয়েন্টের কাছে যে-পাহাড়ের চুড়োটা ছিল, সেটা ছিল গ্র্যানাইট  হাউস থেকে তিন মাইল দূরে। দ্বিতীয় কামানের গুলি সেই চুড়োটাকে চুরমার করে দিল। ইউনিয়ন উপদ্বীপের কাছে যে বালিময় বেলাভূমি ছিল, সে-জায়গাটা গ্র্যানাইট  হাউস থেকে ছিল বারো মাইল দূরে। তৃতীয় কামানের গুলি বেলাভূমির উপরের বালি উৎক্ষিপ্ত করে সেখান থেকে লাফিয়ে সমুদ্রের জলে পড়ল। চতুর্থ কামানের গুলি পাঁচ মাইল দূরে ম্যাণ্ডিবল অন্তরীপের পাহাড়ে পাথর ভেঙে সমুদ্রের জলে পড়ল। কামানের পাল্লা দেখে সবাই খুশি হলেন। এবার আর কোনো ভয় নেই।

    এবার সকলের প্রধান কর্তব্য হল অনুসন্ধানের কাজ। এই কাজের পিছনে দুটি উদ্দেশ্য। এক নম্বর হল সেই অজ্ঞাত উপকারী বন্ধুকে খুঁজে বার করা, আর দু-নম্বর হল সেই সঙ্গে সেই ছ-টি বোম্বেটেরও খোঁজখবর নেয়া। অনুসন্ধানে নেহাৎ কম সময় লাগবে না। কাজে-কাজেই গাড়ি বোঝাই করে রসদপত্র নিতে হবে। কিন্তু একটা ওনাগার পা খোঁড়া ছিল, দু-একদিন অপেক্ষা না-করে সেটাকে দিয়ে গাড়ি চালানো সম্ভব নয়, সেটাকে কয়েকদিন জিরোতে দিতে হবে। তাই বিশে নভেম্বর পর্যন্ত যাত্রা বন্ধ রাখতে হল। সবাই ঠিক করলেন এ-কদিনে প্রসপেক্ট হাইটের কাজগুলো শেষ করবেন। আয়ারটনকেও একবার কোর‍্যালে যেতে হবে। সেখানে দু-দিন থেকে জন্তুগুলোর খাবারের ব্যবস্থা করে আবার সে গ্র্যানাইট  হাউসে ফিরে আসবে বলে ঠিক হল।

    নয়ই নভেম্বর ভোরবেলা আয়ারটন কোর্যাল অভিমুখে যাত্রা করলে। একটা ওনাগা জুতে গাড়িটাও তার সঙ্গে নিলে। যাওয়ার আগে হার্ডিং তাকে জিগেস করেছিলেন অন্যকাউকে সে সঙ্গে নিয়ে যাবে কি না। আয়ারটন কোনো সঙ্গী দরকার আছে বলে মনে করলে না। আপাতত তাে আর বিপদের কোনাে সম্ভাবনা নেই, একলা গেলেই যথেষ্ট। যদি অকস্মাৎ কোনাে বিপদ-আপদ এসে উপস্থিত হয়, ঠিক হ’ল সে তখনি টেলিংগমে খবর দেবে। আযাবটন যাত্রা কবার দু-ঘণ্টা পরেই আপদ জানালে যে সে নিরাপদে কোব্যালে পৌঁছেছে, আর কোব্যালে কোনােরকম গােলমাল নেই।

    আয়ারটন কোব্যালে চ’লে যাওয়ার দু-দিন পর দুপুরবেলার দিকে স্পিলেট প্রস্তাব করলেন : আয়ারটন তাে হয় আজ বিকেলে ফিরবে, নয় কাল ভােরে। এই ফাঁকে পাের্ট বেলুনে গিয়ে আমাদের বন-অ্যাডভেঞ্চারের হালটা দেখে এলে মন্দ হয় না। বােম্বেটেদেব চোখে বৃষ্টি পড়ে থাকে, তবে আমাদের বন-অ্যাডভেঞ্চারের যে কী দশা হয়েছে, কে জানে !

    হাতে কোনাে কাজ না থাকায় পাের্ট বেলুন অভিমুখে রওনা হলেন সবাই-শুধ সাইবাস হার্ডিং আর নেব রইলেন গ্র্যানাইট  হাউসে। দ্বীপের দক্ষিণ তীরে যাওয়ার পথটা ধ’রেই সবাই চললেন। সকলের হাতেই টোটা-ভরা বন্দুক। সকলে খুব সতর্কও। পথের দু-ধারে তা দৃষ্টি রেখে, মধ্যে-মধ্যে বনের ভিতর ঢুকে বােম্বেটেদের খোঁজ নিতে-নিতে অবশেষে সবাই পাের্ট বেলুনে এসে হাজির হলেন।

    বন্‌-অ্যাডভেঞ্চার নিরাপদেই আছে।

    পেনক্র্যাফটের একটা মস্ত ভাবনা দূর হয়ে গেল। সে বলল : এটা আমাদের খুব সৌভাগ্যের বিষয় নিঃসন্দেহে। বােম্বেটেরা যদি এটা দেখতে পেতাে, তবে নিশ্চয়ই এটায় চ’ড়ে চলে যেতাে।। তাহলেই আর আমাদের টেবর আইল্যান্ডে যাওয়া হতো না। অথচ টেবর আইল্যান্ডে গিয়ে আয়ারটনের খবর আর লিঙ্কন আইল্যাণ্ডের অবস্থান লিখে রেখে আসতে হবে, যাতে ডানকান এসে খবর জানতে পারে। নৌকোটা নিয়ে গেলেই সব পণ্ড হয়ে যেত।

    সবাই নৌকোর উপর চড়ে দেখা লাগলেন।

    পেনক্র্যাফট নোঙরের দড়িটা পরীক্ষা করে বলে উঠল : বা রে! এ তো ভারি আশ্চর্য ব্যাপার।

    কী হয়েছে পেনক্র্যাফট? শুধোলেন স্পিলেট।

    নোঙরের দড়িটায় গিঁট নতুন করে দেয়া। এ রকম গিঁট আমি কক্ষনো দিইনি। এই দেখুন।

    তোমার তো ভুল হতে পারে। বললেন শিলেট : গিঁট তুমিই দিয়েছে, এখন ভুলে গেছো।

    উঁহু, কক্ষনো না। দৃঢ় কণ্ঠে অস্বীকার করলে পেনক্র্যাফট : কিছুতেই হতে পারে। দেখতে পাচ্ছেন না, এটা ফসকা গেরাে? আমি কক্ষনো ফসকা গোে  গিঁট দিই না।

    স্পিলেট বুঝতে পারলেন যে পেনক্র্যাফটের কথাটা সত্য নয়। কেউ-না-কেউ যে বন- অ্যাডভেনচারকে চালিয়ে এনে আবার বেঁধে রেখেছে, সে বিষয়ে কোনাে সন্দেহ নেই।

    হার্বাট বললে : নৌকোটাকে এখান থেকে নিয়ে গিয়ে মার্সির মুখের কাছে রাখলে হয় না? গ্র্যানাইট  হাউসের খুব কাছেও হবে, আমরা ও সবসময় দেখতে পারবো।

    পেনক্র্যাফট উত্তর করলে : ‘নিয়ে গেলে ভালাে হত বটে, কিন্তু মার্সির মুখটা নৌকো। রাখবার পক্ষে ভারি খারাপ জায়গা। সেখানে সবসময়েই সাংঘাতিক ঢেউ থাকে। তাছাড়া, আমরা যখন কিছুদিনের জন্যে গ্র্যানাইট  হাউস ছেড়ে অভিযানে বেরুব, তখন বন অ্যাডভেনচার এখানেই বেশি নিরাপদে থাকবে।

    হার্বার্ট বললে : সে-কথা তাে বুঝলাম, কিন্তু এই ফাঁকে যদি দস্যুরা এসে বন অ্যাডভেনচার নিয়ে চলে যায়?

    মার্সির মুখে নিয়ে রাখলে কি তা নিবারণ করা যাবে? বললে পেনক্র্যাফট, এখানে এসে নৌকোটা দেখতে না-পেলে খুঁজে খুঁজে মার্সির মুখে গিয়ে তারা হাজির হবেই। তখন তাদের বাধা দেবে কে? তারপর আমরা সন্ধান শেষ করে ফিরে এসে যদি দস্যুদের কিছু করতে না পারি, তখন না-হয় নৌকোটা গ্র্যানাইট  হাউসের কাছে নিয়ে রাখা যাবে।

    সবাই গ্র্যানাইট  হাউসে ফিরে এসে সাইরাস হার্ডিংকে সব কথা বললেন। বন অ্যাডভেনচার সম্পর্কে বর্তমান ব্যবস্থাই তার পছন্দ হ’ল। তিনি পেনক্র্যাফটকে কথা দিলেন  যে, ভবিষ্যতে যাতে বন-অ্যাডভেনচার সর্বক্ষণ দৃষ্টির মধ্যে থাকে, সেজন্যে কাছেই কোথাও একটা কৃত্রিম বন্দর তৈরি করা যেতে পারে কিনা তা চেষ্টা করে দেখবেন।

    সেইদিনই বিকেলে আয়ারটনকে টেলিগ্রাম করা হ’ল কোর‍্যাল থেকে দুটো ছাগল আনাবার জন্যে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এই টেলিগ্রামের কোনাে উত্তর পাওয়া গেল না।

    সাইরাস হার্ডিং একটু অবাক হলেন। আয়ারটনের স্বভাব তাে এমন নয়। তবে কি এখন সে কোর‍্যালে নেই, না কি এর মধ্যেই সে গ্র্যানাইট  হাউসের দিকে রওনা হয়ে পড়েছে? দু-দিন তাে কেটে গেছে। দশ তারিখ বিকেলে কিংবা এগারােই সকালে সে ফিরে আসবেই। সবাই আয়ারটনের জন্যে অধীর হয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন।

    সন্ধের পর থেকে রাত দশটা পর্যন্ত আয়ারটনের কোনাে খোঁজ পাওয়া গেল না। ফের টেলিগ্রাম করা হ’ল কোর‍্যালে, কিন্তু তবু কোনাে জবাব এলাে না।

    বাপার দেখে মহা চিন্তায় পড়লেন সকলে। ব্যাপার কী? কোনাে বিপদ-আপদ হ’ল না তাে তার? সে কি কোর‍্যালে নেই, কিংবা থাকলেও নড়াচড়ার কোনাে ক্ষমতা নেই অর? এমনও হতে পারে টেলিগ্রামের কোনাে দোষ হয়েছে। তাহ’লে সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

    এগারােই নভেম্বর ভােরবেলা ঘুম থেকে উঠেই আবার টেলিগ্রাম করলেন হার্ডিং, কিন্তু কোনাে জবাব পাওয়া গেল না। খানিক পরে আবার চেষ্টা করা হল। তবু কোনাে ফল হ’ল না।

    তক্ষুনি সবাই কোর‍্যালের দিকে রওনা হয়ে পড়লেন, শুধু নেব রইল গ্র্যানাইট  হাউস পাহারা দেবার জন্যে। প্রসপেক্ট হাইট ছেড়ে কোর‍্যালের দিকে চললেন সবাই। হাতে গুলি-ভরা বন্দুক। সামান্য কোনাে সন্দেহজনক কারণ উপস্থিত হ’লেই গুলি চালাবেন। বলা বাহুল্য, টপও তাদের সঙ্গে-সঙ্গে চলল। টেলিগ্রাফের খুঁটি ধ’রে-ধ’রে এগুতে লাগলেন সকলে। প্রায় দু-মাইল পথ অতিক্রম করার পরও টেলিগ্রাফের লাইন খারাপ হওয়ার কোনাে কারণ বার করতে পারলেন না। কিন্তু তার পর থেকেই মনে হল যেন তার একটু ঢিলে হয়ে গেছে।

    হার্বার্ট সকলের আগে-আগে চলছিল। চুয়াত্তর নম্বর খুঁটির কাছে এসেই সে চেঁচিয়ে উঠল : তার ছিঁড়ে গেছে।

    সবাই তাড়াতাড়ি কাছে এসে দেখতে পেলেন, শুধু যে তারই ছিঁড়ে গেছে তা নয়, তারের খুঁটিটাও মাটিতে পড়ে আছে। এতক্ষণে টেলিগ্রাফের গােলমালের কারণ বুঝতে পারা গেল। বােঝা গেল যে গ্র্যানাইট  হাউসের টেলিগ্রামগুলাে কোর‍্যালে পৌঁছােয়নি। আরাে দেখা গেল, এ-খুঁটি হাওয়ায় উপড়ে ফ্যালেনি, কারা যেন খুঁটির গােড়ার মাটি খুঁড়ে ওটাকে ঠেলে ফেলে দিয়েছে, আর তারটা ছিঁড়ে দিয়েছে। এবং ছিঁড়েছে দু-এক দিনের মধ্যেই।

    পেনক্র্যাফট বললে : আর দেরি নয়। শিগগির কোর‍্যালে যেতে হবে আমাদের।

    সবাই তখন কোর‍্যালের প্রায় অর্ধেক পথ এসেছেন, আরাে প্রায় দু-মাইল পথ বাকি। এবার আরাে দ্রুত পায়ে এগুতে লাগলেন সকলে। আয়ারটন কথা দেয়া সত্ত্বেও কেন ঠিক সময়ে গ্র্যানাইট  হাউসে পৌঁছল না? সুতরাং স্পষ্টই বােঝা যাচ্ছে যে, বিশেষ কোনাে মৎলব হাসিলের জন্যেই কেউ কোর্যাল আর গ্র্যানাইট  হাউসের মধ্যেই যােগাযােগ বন্ধ করে দিয়েছে। এ-কাজ নিঃসন্দেহে বােম্বেটেদের। আয়ারটনের জন্যে সাংঘাতিক ভাবনা হ’ল সকলের। তবে কি বােম্বেটেদের হাতে নিহত হয়েছে আয়ারটন?

    যে-ছােট্ট নদীটার জলধারা কোর‍্যালের কাজে লাগতাে, অবশেষে সবাই সেই নদীর তীরে এসে হাজির হলেন। এখানে এসেই সাবধানে আস্তে আস্তে হাঁটতে লাগলেন সবাই। এমন সময় টপ হঠাৎ ক্রুদ্ধ আক্রোশে ডেকে উঠল। অবশেষে গাছ-গাছালির মধ্যে দিয়ে কোর‍্যালের বেড়া দেখতে পাওয়া গেল। আগের মতােই অটুট আছে বেড়াটি। দরজাটাও আগে যেমন বন্ধ থাকতাে, তেমনই বন্ধ রয়েছে। তবে জন্তু-জানােয়ারের ডাক, কিংবা আয়ারটনের সাড়াশব্দ-কিছুই পাওয়া গেল না। জায়গাটা যেন আশ্চর্য রকম নীরব হয়ে আছে।

    সাইরাস হার্ডিং অগ্রসর হলেন। সঙ্গীরা একটু পিছনে পিছনে সতর্ক হয়ে রইলেন, দরকার হ’লেই যাতে বন্দুক ছোঁড়া যায়। হার্ডিং দরজার খিল খুলে ভিতরে ঢুকতে যাবেন, এমন সময় টপ সাংঘাতিকভাবে ডেকে উঠল। সঙ্গে-সঙ্গে তীব্র শব্দ করে গর্জে উঠল একটা বন্দুক, আর শােনা গেল একটা যন্ত্রণাকাতর তীক্ষ্ণ আর্ত চীৎকার।

    বন্দুকের গুলিতে আহত হয়ে হার্বার্ট মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

    .

    ৩.৩ সালফেট অভ কুইনাইন 

    হার্বার্টের চীৎকার শুনেই হাতের বন্দুক ছুঁড়ে ফেলে দিলে পেনক্র্যাফট। ছুটে গেল তার কাছে, তারপর চেঁচিয়ে উঠল : শয়তানরা আমার বাছাকে মেরে ফেলেছ গাে, মেরে ফেলেছে।

    হার্ডিং আর স্পিলেট তক্ষুনি ছুটে গেলেন হার্বার্টের কাছে। উপুড় হয়ে বসলেন শিলে।হাৎস্পন্দন শুনতে পাওয়া যায় কিনা দেখলেন পরীক্ষা করে। তারপর বললেন : এখনাে বেঁচে আছে? এক্ষুনি ওকে কোলে করে নিয়ে যেতে হবে!

    হার্ডিং বললেন : গ্র্যানাইট  হাউসে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব। কোর‍্যালের ভিতরেই নিয়ে চলুন।

    এই ব’লেই কোব্যালে বেড়ার বাঁ পাশের কোণ ঘুরে ছুটলেন তিনি। কোণ ছাড়িয়েই এক সেটেকে দেখতে পেলেন–বন্দুক ছুঁড়ে হার্ডিং-এর টুপিটা উড়িয়ে দিলে সে।  সৌভাগ্যবশত গুলিটা কপালে লাগল না। দ্বিতীয়বার গুলি করতে না-দিয়ে হার্ডিং বিদ্যুদ্বেগে ছুটে গিয়ে তার ছুরিটা আমূল বোম্বেটের বুকে বসিয়ে দিলেন। চীৎকার করে মাটিতে পড়ে গেল বোম্বেটেটি।

    এই ফাঁকে পেনক্র্যাফট আর স্পিলেট হার্বার্টকে কোব্যালের ভিতরে ব’য়ে নিয়ে গিয়ে আয়ারটনের বিছানায় শুইয়ে দিয়েছেন। একটু পরে হার্ডিংও বিছানার পাশে গিয়ে উপস্থিত হলেন। হার্বার্টকে অচেতন দেখে পেনক্র্যাফট তখন পাগলের মতাে হয়ে উঠেছে। হার্ডিং আর স্পিলেট অনেক চেষ্টা ক’বেও তাকে শান্ত করতে পারলেন না। তারা বুঝতে পারলেন যে তাদের দুজনের উপরের নির্ভর করছে হার্বার্টের জীবন। ফৌজের সঙ্গে অনেকদিন ঘুরতে হয়েছিল বলে স্পিলেট ‘ফার্স্ট এড’ বেশ ভালাে করেই শিখেছিলেন। লড়াইয়ের সময়ে বহু সৈনিককে শুশ্রূষাও  করেছিলেন তিনি। সাইরাস হার্ডিং-এর সাহায্যে তিনি তক্ষুনি হার্বার্টের শুশ্রূষায় মন দিলেন।

    হার্বার্টের এমনিতর  একেবারে সংজ্ঞাহীন অবস্থা দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন স্পিলেট। বন্দুকের গুলি পাজরার হাড়ে লেগেছিল বলে ভয়ানকভাবে ধাক্কা খেয়েছিল হৃৎপিণ্ড।  সেজন্যেই, কিংবা অতিরিক্ত রক্তস্রাবের দরুনই, এমনিভাবে অচেতন হয়ে পড়েছিল হার্বার্ট। মৃত্যুর মতো পাংশুটে হয়ে গিয়েছিল তার মুখ। অত্যন্ত দুর্বল নাড়ি। অন্যান্য লক্ষণও খুব সাংঘাতিক।

    হার্বার্টের বুকের কাপড় খুলে ক্ষতস্থান ঠাণ্ডা জলে ধুয়ে রুমালের সাহায্যে রক্তস্রাব বন্ধ করা হল। গুলিটা লেগেছিল পাঁজরার তৃতীয় আর চতুর্থ হাড়ের মাঝখানে। সাইরাস হার্ডিং আর স্পিলেট ধরাধরি করে হার্বার্টকে পাশ ফিরিয়ে দিলেন। হার্বার্ট তখন এমনই মৃদু আর্তনাদ করে উঠল যে তারা ভয়ানক ঘাবড়ে গেলেন। হার্বার্টের বুকের অন্য পাশেও আরেকটি ক্ষত দেখা গেল। সেখান দিয়ে গুলিটা বেরিয়ে গেছে।

    সেই ক্ষতস্থান দেখেই স্পিলেট বললেন : ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, শরীরের মধ্যে গুলি নেই।

    এখন কেমন বোধ হচ্ছে? প্রশ্ন করলেন হার্ডিং।

    গুলি হৃদপিণ্ড স্পর্শ করেনি, বললেন স্পিলেট : তা যদি করতো, তাহলে এতক্ষণে মরে যেতো ও।

    বন্দুকের গুলি বেরিয়ে গেছে। কিন্তু বেরুবার সময় ভিতরে কী অনিষ্ট করে গেছে, তা বুঝবার ক্ষমতা ছিল না স্পিলেটের। তবে এ-কথা বুঝেছিলেন যে, ক্ষতস্থান যাতে পেকে ফুলে না ওঠে, তার চেষ্টা করতে হবে। পাকলে জ্বর তো হবেই, তার ফলও যে কী-রকম ভয়নক হবে, তা কে বলতে পারে। একটও দেরি না-ক’রে ক্ষতস্থানটি আগে ধুয়ে ফেলতে হবে। গরম জল দিয়ে ধুলে আবার রক্তপাতের আশঙ্কা আছে। এর মধ্যেই রক্তপার যতটুকু হয়ে গেছে, তাতেই ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়েছে হার্বার্ট। এইজন্যে স্পিলেট শুধু ঠাণ্ডা জলে ধুয়ে দেয়াই উচিত মনে করলেন।

    হার্বাটকে বাঁ-দিকে পাশ ফিরিয়ে শুইয়ে দেয়া হয়েছিল। সেই অবস্থাতেই রাখা হবে তাকে। তাহলে ভিতরেব পূঁয ক্ষতস্থানদুটি দিয়ে সহজেই বেবিয়ে যেতে পারবে। হার্বার্টের পক্ষে এখন দরকার সম্পূর্ণ বিশ্রাম। সুতরাং গ্র্যানাইট  হাউসে তাকে নিয়ে যাওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

    স্পিলেট ডাক্তার নন। তাই হার্বার্টের অবস্থা দেখে তিনি একটু উৎকণ্ঠা বোধ করলেন। কিন্তু মনোবল হারালেন না। বিছানার পাশে বসলেন তিনি। হার্ডিং কাছেই দাঁড়িয়ে রইলেন। পেনক্র্যাফট দাঁড়িয়ে তার শার্টটি ছিঁড়ে ক্ষত বাঁধবার জন্যে ব্যাণ্ডেজ আর লিণ্ট তৈরি করতে লাগল।

    পেনক্র্যাফট আগুন জ্বাললেন। উইলো গাছের ছাল সেদ্ধ করে হার্বার্টের জন্যে পানীয় জল প্রস্তুত হল। সেই পানীয় স্পিলেট মাঝে-মধ্যে হার্বার্টকে দিতে লাগলেন। ক্রমে জ্বর হল হার্বার্টের। সারা দিন আর রাত্রির মধ্যতে তার জ্ঞানই হল না। সবাই বিশেষ উৎকণ্ঠিত হয়ে রইলেন। অবস্থা বিশেষ ভালো নয়। কখন কী হয়, কিছুই বলা যায় না।

    পরদিন বারোই নভেম্বর একটু আশা জাগল সবার মনে। আচ্ছন্ন নিদ্রা থেকে জেগেছে হার্বার্ট। চোখ খুলে তাকালে চারদিকে।  সাইরাস, হার্ডিং, গিডিয়ন, স্পিলেট আর পেনক্র্যাফট—সবাইকে চিনতে পারলে।  _ _ _। দুর্ঘটনার কথা কিছুই জানতো না ও—ওকে সব কিছু খাইয়ে দেয়া হলো। স্পিলেট হাত জোড় করে অনুরোধ করলেন, ও যেন একেবারে স্থির হয়ে শুতে পড়ে। একটুও যেন নড়াচড়া না করে। ভয়ের কোনো কারণ নেই। কয়েকদিনের মধ্যেই ঘা শুকিয়ে যাবে।

    ঈশ্বরের আশীর্বাদই বলতে হবে। হার্বার্টের যন্ত্রণা আর বাড়ল না। ক্রমাগত ঠাণ্ডা জল দেওয়ার দরুন ঘা ফুলল কিংবা পেকে উঠল না। জ্বরও আর বাড়ল না। হার্বার্ট আবার চোখ বুজলে। কিন্তু তা বিপদের __ ঘুম নয়, স্বাভাবিক নিদ্রা।

    পেনক্র্যাফট জিজ্ঞেস করলেন, কোনো ভরসা পেয়েছেন কি? হার্বার্ট বাঁচবে তো?

    হ্যাঁ, নিশ্চয়ই বাঁচাতে পারবো, বললেন স্পিলেট : অবিশ্যি ঘা-টা গুরুতর। গুলিটাও হয়তো ফুশ-ফুশ ছুঁয়ে গেছে। তবে ভরসা এই যে, তেমন মারাত্মক আঘাত নয়।

    এই ছব্বিশ ঘণ্টা হার্বার্টের শুশ্রূষা ছাড়া অন্য-কোনো চিন্তা কারুর মনেই আসেনি। বোম্বেটেরা ফিরে এলে সাংঘাতিক বিপদ ঘটতে পারে। কিন্তু সে-কথা তখন কে ভেবেছে? হার্বার্টকে একটু সুস্থ দেখে সাইরাস হার্ডিং স্পিলেটের সঙ্গে কর্তব্য সম্পর্কে পরামর্শ করতে লাগলেন। পেনক্র্যাফট রোগীর পাশেই বসে রইল।

    তারা দুজনে প্রথমে কোর্যালটা ভালাে করে পরীক্ষা করলেন। আয়ারটনের কোনাে চিহ্নই দেখা গেল না। তবে কি বােম্বেটেরা তাকে ধরে নিয়ে গেছে? সাইরাস হার্ডিং একটা বােম্বটেকে খতম করেছেন, বাকি পাঁচটা পালিয়ে গেছে। যাওয়ার সময় নিশ্চয়ই তারা ওোর ক’রে আয়ারটনকে নিয়ে গেছে। কোর‍্যালের অবিশ্যি কোনাে ক্ষতি হয়নি। দরজা বন্ধ ছি, সেজন্যে জগুলােও পালিয়ে যেতে পারেনি। কুটিরের ভিতরে কিংবা বাইরে–কোনোখানেই টানাটানি কিংবা হুটোপাটির কোনো চিহ্ন নেই। আয়ারটনকে যে গুলি-বারুদ দেয়া হয়েছিল, শুধু তা-ই অদৃশ্য হয়েছে।

    হার্ডিং বললেন : বেচারি আয়ারটনকে নিশ্চয়ই ওরা হঠাৎ আক্রমণ করেছিল। তার গায়ে জাের আছে–লড়েছিল খুবই। কিন্তু অত জনের সঙ্গে একলা পেরে ওঠেনি।

    তা-ই হবে, বললেন স্পিলেট : আয়ারটনকে ধরবার পর তারা যে কোর‍্যালেই ছিল, সে-বিষয়ে কোনাে সন্দেহই নেই। আমাদের আসতে দেখেই পলিয়েছে।

    বনটাকে বােম্বেটে-শূনা না করলে চলছে না। বললেন হার্ডিং : পেনক্র্যাফট ঠিক কথা বলেছিল। এদের কুকুরের মতাে গুলি করে মারাই উচিত। পেনক্র্যাফটের কথাটা শুনলে এসব দুর্গতি আর হত না। হার্বার্টকে নিরাপদে গ্র্যানাইট  হাউসে না-নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতেই হবে।

    কিন্তু নেবের কী হবে? শুধােলেন গিডিয়ন স্পিলেট।

    নেব তাে বেশ নিরাপদেই আছে।

    আমাদের ফিরতে দেরি দেখে সে যদি খুঁজতে বেরােয়?

    সেটা খুবই সম্ভব, কিন্তু তার একা বেরিয়ে-পড়া উচিত হবে না। পথেই তাকে মেরে ফেলবে। যদি টেলিগ্রাফের লাইন ভালাে থাকতাে, তবে নেবকে সাবধান করতে পারতুম। এখানে পেনক্র্যাফট আর হার্বার্টকে একা রেখে কোনােমতেই যাওয়া যেতে পারে না। তাহ’লে আমিই গ্র্যানাইট  হাউসে যাই।

    উঁহু, সে কিছুতেই হতে পারে না, বললেন স্পিলেট :বােম্বটেরা নিশ্চয়ই কোর‍্যালের উপর নজর রেখে বনে কোথাও লুকিয়ে আছে। আপনি যদি যান, তাহলে একটা দুর্ঘটনার বদলে দুটো দুর্ঘটনার জন্যে আমাদের আপশশাশ করতে হবে।

    কিন্তু নেব্‌! বললেন হার্ডিং : চব্বিশ ঘণ্টা ধরে সে আমাদের খোঁজখবর পাচ্ছে না। সে তাে নিশ্চয়ই বেরিয়ে পড়বে। তাকে সাবধান করে দেয়ার কি কোনাে উপায় নেই?

    এমন সময় হঠাৎ টপের দিকে হার্ডিং-এর নজর পড়ল। টপ পায়চারি করতে-করতে তার দিকে তাকিয়ে যেন বললে, “কেন, আমি কি এখানে নেই?

    হার্ডিং ডাকবামাত্র টপ লাফিয়ে তার কাছে এল।

    স্পিলেট হার্ডিং-এর উদ্দেশ্য বুঝতে পারলেন। বললেন : ঠিক-টপই যাবে। সে কোর‍্যালের খবর নিয়ে গ্র্যানাইট  হাউসে যাবে, আবার গ্র্যানাইট  হাউসের খবর নিয়ে কোর‍্যালে ফিরে আসবে।

    এই ব’লে তক্ষুনি নােটবইয়ের পাতা ছিড়ে নিয়ে স্পিলেট লিখলেন : হার্বার্ট আহত। আমরা কোর‍্যালে আছি। তুমি খুব হুশিয়ার থেকে। গ্র্যানাইট  হাউস ছেড়ে কিছুতেই কোথাও যেয়াে না। বােম্বেটেদের কি দেখতে পেয়েছাে? টপকে দিয়ে উত্তর পাঠিয়ে। এই চিরকুটটা টপের গলায় বেঁধে দেয়া হ’লে হার্ডিং গ্র্যানাইট  হাউসের দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে তার পিঠ চাপড়াতে-চাপড়াতে বললেন : নেব্‌–নেব্‌–যাও।।

    বলা বাহুল্য যে টপ বুঝতে পারলে তাকে কী করতে হবে। হার্ডিং তাকে নিয়ে কোর‍্যালের দরজার কাছে গেলেন, তারপর আবার গ্র্যানাইট  হাউসের দিকে তর্জনী নির্দেশ করে বললেন : নেব, টপ ! নেব !’

    টপ লাফ দিয়ে সামনের বনে ঢুকল, তারপর পলকের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।

    স্পিলেট বললেন : টপ ঠিক যেতে পারবে

    হ্যাঁ, বললেন, হার্ডিং :’আর ফিরেও আসতে পারবে। এখন তাে দশটা বাজে, সাড়ে এগারােটার মধ্যেই টপ ফিরে আসবে।

    কোর‍্যালের দরজা বন্ধ করে আবার ঘরে এসে ঢুকলেন দুজনে। হার্বার্ট তখনাে অঘােরে ঘুমােচ্ছে। পেনক্র্যাফট ঠায় ব’সে ক্ষতের বাঁধনে ঠাণ্ডা জল দিয়ে চলেছে।

    এগারােটার সময় হার্ডিং আর স্পিলেট বন্দুক নিয়ে কোর‍্যালের দরজায় গেলেন। টপের সাড়া পেলেই দরজা খুলে দেবেন। মিনিট পনেরাে পরে হঠাৎ একটা বন্দুকের শব্দ শুনতে পাওয়া গেল, সঙ্গে সঙ্গে শােনা গেল কুকুরের ডাক।

    হার্ডিং দরজা খুললেন। প্রায় একশাে গজ দূরে বনের মধ্যে ধোঁয়া দেখে সেদিকে গুলি চালিয়ে দিলেন। সেই মুহূর্তেই টপ লাফিয়ে কোর‍্যালে এসে ঢুকল। হার্ডিং দরজা বন্ধ করে দিয়ে টপের দিকে তাকালেন। দেখা গেল, টপের গলায় একটা চিরকুট। হার্ডিং পড়লেন, নেব বড়াে-বড়াে হরফে লিখেছে : গ্র্যানাইট  হাউসের কাছে বােম্বেটেদের দেখা যায়নি। আমি বাইরে যাবাে না। হায়, ভাগাহত হার্বার্ট !

    বােম্বেটেরা তবে কাছেই রয়েছে-কোর‍্যালের উপরই তাদের নজর। সুবিধে পেলেই একজন-একজন করে সবাইকেই হত্যা করবে। সবাইকে এখন তবে খুব সতর্ক থাকতে হবে। বােম্বেটেদের সব বিষয়েই বেশি সুবিধে। তারা সবকিছুই দেখতে পারবে, কিন্তু তাদের দেখা যাবে না। তারা অকস্মাৎ আক্রমণ করতে পারবে, কিন্তু তাদের কিছুই করা যাবে না।

    হার্ডিং ঠিক করলেন, কোর‍্যালেই থাকবেন আপাতত। এখানে অবিশ্যি রসদপত্র প্রচুর আছে। দ্বীপবাসীদের আকস্মিক আগমনে সবকিছু ফেলেই বােম্বেটেদের পালাতে হয়েছিল কিনা।

    গােটা ঘটনাটা মনে-মনে সাজিয়ে নিলেই বােঝা যায় যে মার্সি নদীর মুখে নৌকো ডুবে যাওয়ার পর দস্যুরা যখন পালিয়ে গিয়েছিল, তখন থেকে বনে বনে ঘুরতে ঘুরতে শেষে কোর‍্যালে গিয়ে হাজির হয়েছিল। কোর‍্যাল তখন ছিল খালি। সুন্দর একটা কুটির, রসদপত্রও যথেষ্ট আছে। সেইজন্যে তারা সেখানেই আশ্রয় নিয়েছিল। তারপর আয়ারটন যখন কোর‍্যালে ফিরে গেল, তখন বােম্বটেরা অবিশ্যি প্রথমটায় খুব অবাক হয়েছিল। কিন্তু পরক্ষণেই ছ-জনে মিলে একজনকে হারিয়ে দেবে, সেটা আর বিচিত্র কী!

    পরে যা-কিছু হ’ল, সবই অনুমান করতে পারা যায়। এখন তারা সংখ্যায় একজন কম হলেও অস্ত্রশস্ত্র তাদের আছে। স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে তারা। বনে গেলে আক্রমণ করবে। হুঁশিয়ার থাকলেও সেই অনিবার্য আক্রমণে বাধা দেয়া যাবে না। সুতরাং এখন অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। হার্বার্ট ভালাে হয়ে উঠলে তাদের সঙ্গে একটা বােঝা পড়া করা যাবে। এখন প্রধান চিত্ত হ’ল হার্বার্টকে বাঁচানাে। | দশ দিনের দিন, বাইশে নভেম্বর হাবার্টের অবস্থা খানিকটা ভালাে দেখা গেল। তার মুখের ফ্যাকাশে ভাবটা দূর হতে লাগল। চোখদুটি উজ্জ্বল হয়েছে। সকলের দিকে তাকিয়ে এখন সে হাসে। পেনক্র্যাফটের সঙ্গে মধ্যে-মধ্যে থাও বলে। একদিন সে আয়ারটনের কথা জিগেস করলে-তাকে কেন সে দেখতে পায়। এমন অবস্থায় হার্বার্টকে বিচলিত করা উচিত হবে না ভেবে পেনক্র্যাফট বললে : ‘আয়ারটন নেবের কাছে। দুজনে মিলে গ্র্যানাইট হাউস পাহারা দেবে।

    হার্বাট শুধােলে : ‘বােম্বেটেদের আর দেখতে পাওয়া যায়নি?

    না। বললে পেনাফট : কিন্তু শয়তানদের খুঁজে বার করবাে। তুমি একেবারে সেরে উঠলেই দেখা যাবে শয়তানগুলাে সামনাসামনি এসে কিছু করতে ভরসা পায় কি

    হার্বার্ট আস্তে আস্তে ভালো হয়ে উঠতে লাগল র্যালের ঘরটা যতই ভালো হােক কেন, গ্র্যানাইট  হাউসে তাে স্বাচ্ছন্দ্যময় কিংবা নিরাপদ নয়। সেজন্যে সবাই অপেক্ষা করতে লাগলেন–কখন হার্টের অবস্থা তাকে স্থানান্তরিত করবার মতাে হয়।

    নেবের আর-কোনাে খবর পাওয়া যায়নি। কিন্তু সেজন্য কেউ উদ্বিগ্ন হলেন না। অকুতােভয় নেব দুর্ভেদ্য গ্র্যানাইট  হাউসের মধ্যে থেকে অনায়াসেই শত্রুর আক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারবে। টপকেও আর তাকে কাছে পাঠানাে হয়নি। খামকা ওকে বিপদের হাতে সপে দিয়ে লাভ নেই। কে জানে, হয়তাে তাকে তবে হারাতে হবে। এমন অবস্থায় বােম্বেটেদের সম্পর্কে কোন পথ অবলম্বন করা উচিত, সে বিষয়ে উনত্রিশে নভেম্বর হাডিং, স্পিলেট আর পেনক্র্যাফট মিলে পরামর্শ করতে বসলেন। হার্বার্ট তখন ঘুমোচ্ছিল।

    বোম্বেটেরা যদি কোনো একটা জায়গা লুকিয়ে থাকত,  আর সেই জায়গার সন্ধান তাদের জানা থাকতাে, তবে সরাসরি তাদের গিয়ে আক্রমণ করা হয়তো সম্ভব হত। কিন্তু তারা কোথায় লুকিয়ে আছে তা জানা নেই। এহেন অবস্থায় প্রথমে আক্রমণ করবে বোম্বেটেরাই, এবং এমন অতর্কিতে করবে যে কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব শেষ হয়ে যাবে। তাই বর্তমান অবস্থায় তাদের সােজাসুজি আক্রমণ করবার কোনাে প্রশ্নই উঠতে পারে না।

    স্পিলেট তখন জানালেন যে হার্বার্টের অবস্থা যেমন ক্রমশ ভালো দিকে চলেছে, তাতে মনে হয় আর দিন আষ্টেকের মধ্যেই তাকে গ্র্যানাইট হাউজে নিয়ে যাওয়া যাবে। এই সময়ে গ্র্যানাইট হাউস সংলগ্ন সমতল ভূমিতে চাষ করবার কথা—পুরােনাে ফসল কেটে ভাড়ারে তুলে নতুন বীজ রােয়ার সময়। এ-সময় কোর‍্যালে বন্দীর মতাে থাকার দরুন দ্বীপবাসীদের ক্ষতি হবে যথেষ্ট। কি উপায় কী? অবস্থা বুঝেই তাে ব্যবস্থা করতে হবে।

    সেদিনই বিকেলবেলার দিকে এমন-এক ঘটনা ঘটল, যাতে সমস্ত ঘটনাপ্রবাহের ধারা বদলে গেল।

    তখন হার্বার্টের ঘরে বসে সবাই কথাবার্তা বলছিলেন, এমন সময় টপ হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল। হার্ডিং ম্পিলেট আর পেনক্র্যাফট–সবাই বন্দুক নিয়ে বাইরে ছুটে এলেন। বাইরে বেড়ার নিচে টপ লাফাচ্ছে, ডাকছে। তার ডাকে কিন্তু আক্রোশের কিংবা রাগের ভাব নেই–কেমন যেন এটা আনন্দের স্পর্শ আছে তাতে। ব্যাপার কী?

    কেউ যেন আসছে।

    হ্যাঁ, আসছে বটে, বললেন হার্ডিং : আর, সে শত্রু নয়। হয়তাে-বা নেব্‌।

    এমন সময় কে যেন বেড়ার উপর দিয়ে লাফিয়ে কোর‍্যালের মধ্যে ঢুকল। সবাই সচমকে তাকিয়ে দেখলেন, সে হ’ল জাপ। সশরীরে এসে হাজির হয়েছেন জাপ। টপ তক্ষুনি ছুটে গিয়ে তাকে অভ্যর্থনা করলে।

    স্পিলেট বললেন : নেব নিশ্চয়ই জাপকে আমাদের কাছে পাঠিয়েছে।

    তাহলে নিশ্চয়ই জাপের কাছে নেবের চিঠি আছে। বললেন হার্ডিং। তখন দেখা গেল, জাপের গলায় একটা ব্যাগ ঝুলছে, সেই ব্যাগের মধ্যে নেবের চিঠি।

    চিঠির মধ্যে সকলে যখন পড়লেন : শুক্রবার সকাল ছটার সময় বােম্বেটেরা খেত চড়াও করেছে, তখন সবাই যে কী-রকম হতাশ হলেন, তা আশা করি না-বললেও চলবে। সবাই একে অন্যের খের দিকে তাকাতে লাগলেন। কারু মুখেই কোনাে কথা নেই। আবার এসে হার্বার্টের ঘরে ঢুকলেন সকলে। এখন তাদের কর্তব্য কী? প্রসপেক্ট হাইটে বােম্বেটেরা। কী সর্বনাশের কথা ! সবকিছু যে নষ্ট করে ফেলবে। আর উপায় নেই !

    সকলকে ঘরে ফিরে আসতে দেখে, বিশেষ করে জাপকে সঙ্গে দেখে, হার্বাট বুঝতে পারলে যে গ্র্যানাইট  হাউস বিপদ-আক্রান্ত। সে তক্ষুনি ব্যস্ত হয়ে উঠল। বললে : কাপ্তেন হার্ডিং, অলি গ্র্যানাইট  হাউসে যাবাে ! পথের কষ্ট কিছুই হবে না আমার। আমি যাবােই !

    স্পিলেট হার্বার্টের কাছে এসে দাড়ালেন। খুব মনোযোগ দিয়ে তাকে দেখলেন খানিকক্ষণ! তারপর বললেন : বেশ, তাহলে যাওয়াই হোক।

    তক্ষুনি পেনক্র্যাফট ওনাগার গাড়ি নিয়ে এলো। তারপর হার্বার্টকে বিছানা-শুদ্ধু ধরাধরি করে গাড়িতে শুইয়ে দেয়া হল। সবাই গুলিভর বন্দুক হাতে নিয়ে যাত্রার জন্য তৈরি হলেন।

    হার্ডিং জিজ্ঞেস করলেন : কোনো কষ্ট হচ্ছে না তো, হার্বার্ট?

    হট বললে : কিচ্ছু ভাববেন না আপনি আমি পথে মারা যাবাে না।

    হার্বার্ট মুখে একথা বললে বটে, কিন্তু তাকে দেখে গেল যে সে শুধু মনের জোরেই তার শারীরিক শক্তিকে এগিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। সাইরাস হার্ডিং তা দেখে ইতস্তত করতে লাগলেন, সত্যি-সত্যি যাত্রা করবেন কি না।

    কিন্তু যাত্রা না করলে হার্বার্ট নিরাশ হবে—হয়তো-বা আশাভঙ্গজনিত বেদনায় তার মৃত্যুও ঘটতে পারে। এইসব সাত-পাঁচ ভেবে হার্ডিং বললেন : বেশ। তবে এখন রওনা হওয়া যাক।

    কোর‍্যালের দরজা খােলা হ’ল। টপ আর জাপ চলল সবার আগে আগে। তারপর সাইরাল হার্ডিং আল গিডিয়ন স্পিলেট বন্দুক হাতে গাড়ির দু-পাশে, অব পেনক্র্যাফট ওনাগার লাগাম ধ’রে গাড়ির সঙ্গে-সঙ্গে–এইভাবে চলতে লাগলেন সকলে।

    আস্তে-আস্তে পথ চলতে চলতে ক্রমে তাঁরা চার-মাইল পথ অতিক্রম করে প্রসপেক্ট হাইটের কাছে এসে হাজির হলেন। একটু পরেই গাছের ফাঁক দিয়ে সমুদ্র দেখা গেল। গাড়ি এগিয়ে চলছিল; হঠাৎ এমন সময়ে গাড়ি থামালে পেনক্র্যাফট। তর্জনী নির্দেশ করলে খেতের দিকে ; বললে : বোম্বেটেগুলাে সব এক-একটা শয়তান।

    সবাই তাকিয়ে দেখলেন, উইণ্ডমিল আর পাখির বাসার মধ্য থেকে ধোঁয়া উঠছে। সেই ধোঁয়ার মধ্যে একজন লােককে চলাফেরা করতে দেখা গেল। সবাই চেঁচিয়ে তাকে ডাকলেন। নে শুনতে পেয়ে তাঁদের দিকে ছুটে আসতে লাগল। শােনা গেল, বােম্বেটেরা নাকি খেতের সর্বনাশ করে আধঘণ্টা আগে চলে গেছে।

    নেব জিগেস করলে : মিস্টার হার্বার্ট কেমন আছেন?

    গিডিয়ন ম্পিলেট গাড়ির কাছে এলেন। এসে দেখলেন, হার্বার্ট অজ্ঞান হয়ে গেছে।

    বােম্বেটেরা খেতের সর্বনাশ করে চলে গেছে, গ্র্যানাইট  হাউসের জন্যে আর-কোনাে আশঙ্কা নেই। কিন্তু সে-কথা তখন কারু মনেও এলাে না। সব চাপা পড়ে গেল হার্বাটের গুরুতর অবস্থায়।

    নড়া-চড়া করার দরুন কি হার্বার্টের ক্ষত নতুন করে আঘাত পেয়েছে? গিডিয়ন ম্পিলেট ঠিক করে কিছুই বুঝতে পারলেন না। হার্বার্টের জন্যে সবাই ভীষণ ভয় পেলেন। তক্ষুনি গাড়িটাকে পাহাড়ের নিচে এনে হার্বার্টকে রাখা হ’ল। তারপর ভিতরে আনবার পর হার্বার্টকে উপরে নিয়ে তার ঘরে শুইয়ে দেয়া হ’ল। ঘরে আনবার পর হার্বার্ট চেতনা পেয়ে একটু হাসলে। কিন্তু অতিরিক্ত দুর্বলতার দরুন কোনাে কথা বলতে পারলে না। স্পিলেট তার ক্ষতগুলাে ভালাে করে পরীক্ষা করলেন।কোনােটারই মুখ খুলে যায়নি। তবে কেন হার্বাটের অবস্থা খারাপ হ’ল? কেন তার দুর্বলতা এত বেড়ে উঠল হঠাৎ? আবার জুরবিকারের মােহনিদ্রা নেমে এলাে হার্বাটের চোখে। স্পিলেট আর পেনক্র্যাফট তার পাশে ব’সে রইলেন। এবার হার্ডিং নেবকে কোর‍্যালের সব ঘটনা খুলে বললেন। নে তাকে বােম্বেটেদের খেতের সর্বনাশ করে যাওয়ার কথা খুলে বললে।

    আগের দিন সন্ধের পরেই হঠাৎ বােম্বেটেরা এসে নদীর ধারের বনের কাছে হাজির হয়। নে তখন ছিল পাখির বাসার কাছে। বােম্বেটেরা নদী পেরুবার উপক্রম করছে দেখে নে গুলি চালালাে। গুলি কারুর গায়ে লাগল কি না, অন্ধকারে সেটা বুঝতে পারা গেল না। নেব দেখল যে বােম্বেটেরা তাতেও ভয় পেলাে না। তাই সে তাড়াতাড়ি গ্র্যানাইট  হাউসে ফিরে এলাে।

    এখন কী কর্তব্য তার? নিজের জন্যে কোনাে ভাবনা নেই। গ্র্যানাইট  হাউস দুর্ভেদ্য। কিন্তু বােম্বেটেরা খেতে ঢুকে পাখির বাসা ইত্যাদি নষ্ট করে ফেলবে–এ-খবর ক্যাপ্টেন হার্ডিং এর কাছে পাঠানাে উচিত। কিন্তু পাঠাবে কী করে? জাপ?–হ্যাঁ জাপ। চিঠি লিখে জাপকে দিয়ে কোর‍্যালে খবর পাঠাবে। জাপ বুদ্ধিমান। অনেকবার কোর‍্যালে গেছে। পথ বেশ জানে। তখন বিকেল বেলা। বনের মধ্যে দিয়ে জাপ কোর‍্যালে পোঁছুতে পারবে। বােম্বেটেরা এর বিন্দুবিসর্গ জানতেও পারবে না, কল্পনাও করতে পারবে না। সেই মুহূর্তে নে চিঠি লিখে জাপের গলায় বাঁধল। তারপর গ্র্যানাইট হাউসের দরজা থেকে মাটি পর্যন্ত লম্বা দড়ি ঝুলিয়ে দিয়ে জাপকে বললে : জাপ, জাপ! কোর‍্যাল !

    জাপের বুঝতে দেরি হ’ল না। দড়ি বেয়ে সমুদ্রতীরে নেমে ঊর্বশ্বাসে ছুটে বনের গহনে অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেল।

    এদিকে বােম্বেটেরা প্রসপেক্ট হাইট ছেড়ে চলে গেলে পর নে ছুটে সেখানে গেল আর আগুন নেভানাের জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করল, কিন্তু কৃতকার্য হ’ল না। এই সময়েই কোর‍্যাল থেকে অন্যরা হার্বার্টকে নিয়ে বনের প্রান্তে এসে হাজির হয়েছিলেন।

    পরদিন হার্বাট আর পেনক্র্যাফটের সঙ্গে স্পিলেট গ্র্যানাইট  হাউসে রইলেন, সাইরাস হার্ডিং নেবকে নিয়ে গেলেন মার্সি নদীর দিকে। নদীর বাঁ পাড়ে উঠে চারিদিকে দেখতে লাগলেন ! বােম্বেটেদের কোনাে চিহ্নই দেখা গেল না। নদীর অন্য পাড়ে বনের মধ্যে সন্দেহজনক কিছু নেই। বােধহয় বােম্বেটেরা জানতে পেরেছে যে কোৱ্যাল ছেড়ে সবাই চ’লে এসেছেন। কিংবা এমনও হতে পারে, প্রসপেক্ট হাইটের সর্বনাশ করে তারা মাসি নদীর তীর ধরে জ্যাকামার অরণ্যে প্রবেশ করেছে, আর এখনাে তাদের প্রত্যাবর্তনের কথা জানতে পারেনি। যদি প্রত্যাবর্তনের কথা তারা জানতে পেরে থাকে, তবে নিশ্চয়ই তারা কোর‍্যালের দিকে গেছে। কোর‍্যালে দরকারি মালপত্র আছে, লােকজন তাে সেখানে নেই–সেটা দখল করবার এইটেই প্রকৃষ্ট সময়।

    সাইরাস হার্ডিং নেবের সঙ্গে প্রসপেক্ট হাইটে গিয়ে দেখলেন, সবকিছু একেবারে তছনছ করে, ছারখার করে গেছে বােম্বেটেরা। শস্যখেতগুলাে পর্যন্ত মাড়িয়ে নষ্ট করেছে। সৌভাগ্যবশত গ্র্যানাইট  হাউসে যথেষ্ট বীজ ছিল বলে এই শসাের ক্ষতিপূরণ করাটা নিতান্ত অসম্ভব হবে না। পাখির বাসা, ওনাগার আস্তাবল-সবই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। জগুলাে ভীতগ্রস্ত হয়ে প্রসপেক্ট হাইটে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সবই ফের নতুন করে তৈরি করতে হবে।

    এইসব দেখেশুনে গম্ভীর-স্বভাব হার্ডিং-এরও রাগে সারা গা জ্বলে যেতে লাগল। কিন্তু কী-ই বা করা যায়? একটু দেখে-শুনে গ্র্যানাইট  হাউসে ফিরে এলেন তিনি।

    এদিকে হার্বার্টের অবস্থা ক্রমশ খারাপের দিকে এগিয়ে চলল। দুর্বলতা ক্রমেই বেড়ে চলল। মনে হল তার খুব সাংঘাতিক সংকট আসছে-সেই সংকটের হাত থেকে স্পিলেট হয়তাে-বা তাকে রেহাই দিতে পারবেন না। অবিরাম একটি আচ্ছন্ন অবস্থা আবৃত করে রইল হার্বার্টকে। প্রলাপের লক্ষণও দেখা দিতে লাগল। দেহের উত্তাপে অস্থির হয়ে উঠল সে। জ্বর একবার বাড়ছে, একবার কমছে। ক্রমশ কাপুনিও শুরু হল। নাড়ি খুবই দুর্বল। শরীরের চামড়া গেল শুকিয়ে। তৃষ্ণা বাড়ল অসহ্য রকম। এর উপর আবার হঠাৎ একবার মুখ আর সারা শরীর লাল হয়ে উঠল। তারপর ভয়ানক ঘাম হ’য়ে জ্বরটা খানিকটা কমে গেল। এই আক্রমণ ছিল প্রায় পাঁচ ঘণ্টা।

    গিডিয়ন স্পিলেট বুঝতে পারলেন, হাবার্টের সবিরাম জ্বর হয়েছে। যে করেই হােক, এই জ্বরকে বন্ধ করতে হবে, নইলে হার্বার্টের রেহাই নেই। কুইনাইন ছাড়া অন্যকিছুতে জ্বর থামবে না। কিন্তু কুইনাইন পাওয়া যাবে কোথায়?

    ম্পিলেট বললেন : লেকের ধারে উইলাে গাছ আছে। আমার মনে হয়, উইলাের ছালে কুইনাইনের কাজ একটু হতে পারে।

    তক্ষুনি সাইরাস হার্ডিং নিজে গিয়ে উইলাের খানিকটা ছাল তুলে আনলেন। সেই ছাল গুড়াে করে হার্বার্টকে খাওয়ানাে হল। রাত্রের মধ্যে বিশেষ-কোনাে পরিবর্তন দেখা গেল না। প্রলাপের ভাব রইল বটে, কিন্তু জ্বর আর বাড়ল না। এইভাবে পরের দিনও কাটল। আবার আশা জাগল পেনক্র্যাফটের মনে। স্পিলেট কোনাে উচ্চবাচ্য করলেন না। হয়তাে জ্বরটা পালা-জ্বর, পরের দিন ফের এসে চড়াও হবে। সেজন্যে তার উৎকণ্ঠার সীমা ছিল না। হার্বার্ট যেন একেবারে এলিয়ে পড়েছে। মস্তিষ্ক দুর্বল। সঙ্গে সঙ্গে বমির ভাব। লিভারের অবস্থাও খুব ভালাে না। এই সময়ে অতিরিক্ত প্রলাপের ভাব দেখে বােঝা গেল, ব্রেনও আক্রান্ত হয়েছে।

    হতবুদ্ধি হয়ে গেলেন শিলেট। হার্ডিংকে নিভৃতে ডেকে নিয়ে বললেন : ‘জুরটার ধরনধারণ মারাত্মক। একটা আক্রমণ কোনােরকমে পার হয়েছে। দ্বিতীয় আক্রমণ যদি উপস্থিত হয়, তার আগে থেকে যদি তৃতীয় আক্রমণটা বন্ধ করার ব্যবস্থা না-করতে পারি, তাহ’লে হার্বার্টের আর-কোনাে আশা নেই।

    উইলাের ছাল তাে দেয়া হয়েছে ! বললেন হার্ডিং।

    তাতে কী? বললেন শিলেট : উইলাের ছালেরও কুইনাইনের মতাে একটু গুণ থাকতে পারে বটে, কিন্তু এ-জ্বরে তাতে কিছু হচ্ছে না। এ-জ্বরে আগে থেকে কুইনাইন দিয়ে তৃতীয় আক্রমণ বন্ধ করতে না-পারলে মৃত্যু অনিবার্য।

    সৌভাগ্যবশত এই কথাবার্তার কিছুই পেনক্র্যাফট শুনতে পেলে না—শুনলে সে পাগল হয়ে যেতাে।

    সাতই ডিসেম্বর মধ্যদিনে দ্বিতীয় আক্রমণ শুরু হল। সাংঘাতিক হয়ে উঠল তার অবস্থা। মৃত্যু যেন দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসছে তার কাছে। অবস্থা এমন হ’ল যে, পেনক্র্যাফটকে সে-ঘর থেকে বাধ্য হয়ে সরিয়ে ফেলতে হ’ল। এই আক্রমণ রইল পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত। স্পষ্টই বােঝা গেল যে তৃতীয় আক্রমণের ধকল আর ধাক্কা হার্বার্ট আর সইতে পারবে না।

    রাত্রে অবস্থা হ’ল আরাে ভীষণ। উচ্চ কণ্ঠে প্রলাপ বকতে লাগল সে। তারপর শ্রান্ত হয়ে পড়ে রইল নির্জীবের মতাে। অনেকবার স্পিলেটের মনে হল, বুঝি-বা সে ম’রেই গেছে।

    পরদিন আটই ডিসেম্বর বার-বার জ্ঞান হারাতে লাগল হার্বার্ট। মাঝে-মাঝে কঙ্কালের মতাে হাতদুটি দিয়ে আঁকড়ে ধরতে লাগল বিছানার চাদর।

    স্পিলেট বললেন : আজ রাত্রের মধ্যে যদি জ্বর-নিকবার কোনাে শক্তিশালী ওষুধ না-দেয়া যায়, তবে হার্বার্ট নিশ্চয়ই মারা যাবে।

    আস্তে-আস্তে বেলা গড়িয়ে গেল। অন্ধকার নিয়ে নেমে এলাে রাত্রি। হয়তাে-বা হার্বার্টের জীবনের শেষ রাত্রি এটি। অকালেই সে বুঝি পৃথিবীর আলাে-হাওয়া ছেড়ে চলল। এই দারুণ জ্বরের একমাত্র ওষুধ যা, লিঙ্কন আইল্যাণ্ডে তার অস্তিত্ব নেই। রাত্রে ফের দারুন প্রলাপ শুরু হল। শেষ রাত্রে, প্রায় তিনটের সময়, অকস্মাৎ আর্তকণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল হার্বার্ট। প্রবল খিঁচুনিতে মনে হ’ল তার শরীর চুরমার হয়ে যাচ্ছে। নেব কাছে বসে ছিল, সে ছুটে গিয়ে পাশের ঘরের সবাইকে জানালে। এমন সময় টপ হঠাৎ কেন যেন অদ্ভুত গলায় ডেকে উঠল।

    সবাই হার্বার্টের ঘরে ছুটে গেলেন। অসহ্য যন্ত্রণায় হার্বার্ট তখন ছটফট করছিল। স্পিলেট তার হাতটা নিয়ে দেখলেন, নাড়ি খুব দ্রুত চলছে। তখন ভোর পাঁচটা। ভোরবেলাকার নরম সোনালি আলো এসে ছুঁয়েছে গ্র্যানাইট  হাউসের জানলা। প্রসন্ন, পরিচ্ছন্ন দিনের পূর্বাভাস যেন আকাশে বাতাসে। কিন্তু হায়! বেচারি হার্বার্টের এইটেই বুঝি শেষ দিন। বিছানার পাশের ছোট্ট টেবিলটার উপর সূর্যের সোনালি আলো এসে পড়ল আলতোভাবে। মৃদু, কোমল হাওয়া বইছে জানলা দিয়ে।

    এমন সময় পেনক্র্যাফট অনতিস্ফুট কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠে টেবিলের দিকে আঙুল দিয়ে দেখালে : সবাই দেখতে পেলেন, টেবিলের উপর ছোট্ট চৌকো একটা কাগজের বাক্স। অবাক কৌতূহল-ভরা কণ্ঠে হার্ডিং বাক্সটার উপরের আবরণের মধ্যে লেখা হরফগুলো উচ্চারণ করলেন :

    সালফেট অভ কুইনাইন!!

    .

    ৩.৪ আরো আশ্চর্য ঘটনা

    সালফেট অভ কুইনাইন!

    সংবিৎ ফিরতেই বাক্সটা খুললেন গিডিয়ন স্পিলেট। ভিতরে প্রায় দুশো গ্রেন শাদা পাউডার। একটু জিভে দিয়ে দেখলেন স্পিলেট। সাংঘাতিক তেতো লাগল। আর-কোনো সন্দেহ নেই। সত্যিই পাউডারটি কুইনাইন।

    স্পিলেটের নির্দেশমতো তক্ষুনি এক কাপ কফি বানিয়ে আনলে নেব। কফিতে আঠারো গ্রেন কুইনাইন মিশিয়ে একটু চেষ্টা করে খাওয়ানো হল হার্বার্টকে। সকলের মনে একটু আশাও ফিরে এলো। দ্বীপের অধিদেবতা ঠিক সময়েই আবার তাদের সাহায্য করেছেন। সুতরাং আর তাহলে ভয় নেই।

    কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অনেকটা শান্ত হল হার্বার্ট। এবার সবাই এই আশ্চর্য ঘটনাটি আলোচনা করতে লাগলেন। এই ব্যাপারে অধিদেবতার হাত সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট, সবচাইতে বেশি উজ্জ্বল। কিন্তু রাত্রে কী করে গ্র্যানাইট  হাউসে প্রবেশ করলেন তিনি? এ-কথার কোনো জবাব নেই। লোকটি নিজে যেমন অদ্ভুত, তার কাজকর্ম সবকিছুও তথৈবচ।

    সারাদিন, তিন ঘণ্টা পর-পর হার্বার্টকে কুইনাইন দেয়া হল।

    পরদিন হার্বার্টের অবস্থার সুস্পষ্ট পরিবর্তন দেখা গেল। এখনো বিপদ দূর হয়নি। পালা-জুরটা আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারে। খুব যত্নের সঙ্গে শুশ্রুষা চলল। এবার ওষুধ আছে হাতের কাছেই, আর ভয় কীসের?

    দশ দিন পরে, বিশে ডিসেম্বর থেকেই হার্বার্টের শরীরে রক্ত ফিরে আসতে লাগল।

    শরীর এখনো খুব দুর্বল, কিন্তু জ্বর আর ফিরে এলো না। পেনক্র্যাফটের তখন আনন্দ দ্যাখে কে? তৃতীয় আক্রমণের সময়টা যখন নিরাপদেই কেটে গেল, তখন সে আনন্দে দিশেহারা হয়ে স্পিলেটকে এমনভাবে আলিঙ্গন করল যে স্পিলেটর দম বন্ধ হবার উপক্রম।

    ডিসেম্বর মাস শেষ হয়ে গেল ভালোয়-ভালোয়। আঠারোশো সাতষট্টি খ্রিষ্টাব্দ শুরু হল বেশ সুন্দর। আকাশ উজ্জ্বল, প্রসন্ন, পরিচ্ছন্ন-সমুদ্রের বাতাস ঠাণ্ডা, নরম, মনোরম। হার্বার্ট ধীরে-ধীরে ভালো হয়ে উঠছে। গ্র্যানাইট  হাউসের জানলার পাশে সমুদ্রের হাওয়ায় বসে থাকতো সে। সেইজন্যে খিদে বাড়ল। নে তার জন্যে নানান রকম পুষ্টিকর আহার্য তৈরি করতো।

    এই সময়ের মধ্যে বোম্বেটেদের একদিনও গ্র্যানাইট  হাউসের ধারে কাছে দেখতে পাওয়া যায়নি। আয়ারটনেরও কোনো খবর পাওয়া গেল না। এতদিন তারা হার্বার্টকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন বলে বেচারি আয়ারটনের জন্য কিছুই করতে পারেননি। এবার হার্বার্ট একটু সুস্থ হতেই আয়ারটনের জন্যে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন হার্ডিং। হার্বার্ট আর হার্ডিং-এর বিশ্বাস আয়ারটন বেঁচে আছে, কিন্তু অন্যেরা ধরে নিলেন যে বোম্বেটেদের হাতে নিহত হয়েছে। সে। যা-ই হোক না কেন, হার্বার্ট সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে না-উঠলে এ-ব্যাপারের কোনো মীমাংসাই করা যাবে না।

    জানুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে হার্বার্ট বিছানা থেকে উঠতে শুরু করল। প্রথম দিনে এক ঘণ্টা, দ্বিতীয় দিনে দু-ঘণ্টা, তারপর তৃতীয় দিনে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত বসে থাকবার অনুমতি পেলে। ক্রমে জানুয়ারির শেষ দিকে স্পিলেট তাকে প্রসপেক্ট হাইটে আর সমুদ্রতীরে বেড়াবার অনুমতি দিলেন। পেনক্র্যাফট আর নেবের সঙ্গে গিয়ে সমুদ্রে স্নান করে তার আশ্চর্য উন্নতি হল।

    সাইরাস হার্ডিং ভাবলেন, এবার অনুসন্ধানে বেরুনো যেতে পারে। সেইজন্যে প্রস্তুতিও শুরু হয়ে গেল সঙ্গে-সঙ্গে। সবাই প্রতিজ্ঞা করলেন—বোম্বেটেদের সমূলে বিনাশ, আর অধিদেবতার অম্বেষণ অসম্পূর্ণ রেখে কিছুতেই গ্র্যানাইট  হাউসে ফিরবেন না। মার্সি নদীর বাঁ-তীরের অরণ্য পাহাড়-পর্বত যা-কিছু আছে, তা আগেই দেখা হয়েছে। কিন্তু ডানদিককার জায়গাগুলোক্ল অন্তরীপ থেকে শুরু করে রেপ্টাইল য়েণ্ড পর্যন্ত—ভালো করে দেখা হয়নি। তাই ঠিক হল, মার্সি নদীর ডান তীরে যত বন-জঙ্গল আর পর্বতের গুহা-গহ্বর আছে —সব আঁতিপাতি করে না-খুঁজে ক্ষান্তি দেয়া চলবে না।

    ওনাগাদুটি বিশ্রাম পেয়ে বেশ হৃষ্টপুষ্ট হয়েছে। রসদপত্র, বাসনকোশন, একটা স্টোভ–সবকিছুই গাড়িতে বোঝাই করা হল। বোম্বেটেরা যে স্বাধীনভাবে বনের মধ্যে লুকিয়ে আছে-সে-কথা ভুলে গেলে চলবে না। এই গভীর গহন অরণ্যের মধ্যে গুলি দু-পক্ষই চালাতে পারে। সুতরাং দ্বীপবাসীদের দলবদ্ধ হয়ে চলতে হবে, ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলে চলবে না। এও ঠিক হল যে, গ্র্যানাইট  হাউসে কেউ থাকবে না। টপ আর জাপও যাবে দলের সঙ্গে। দুর্ভেদ্য গ্র্যানাইট  হাউসে পাহারার কোনো দরকার নেই।

    চোদ্দই ফেব্রুয়ারি, যাত্রার আগের দিন।

    সেদিন ছিল রবিবার। সেদিনটা সবাই জিরোলেন; হার্বার্টের জন্যে জায়গা ঠিক হল গাড়ির ভিতরে, কারণ সে সুস্থ হয়ে উঠলেও তার শারীরিক দুর্বলতা অপগত হয়নি। পরদিন ভোরবেলা লিফটটা টুকরো-টুকরো করে তুলে রাখা হল। যে-সিঁড়িটা ছিল, সেটা চিমনিতে নিয়ে গিয়ে মাটিতে গর্ত করে পুঁতে রাখা হল-ফিরে এসে যাতে সেটা সহজে পেতে পারেন।

    সবাই গ্র্যানাইট  হাউস থেকে ইতিপূর্বেই নেমে এসেছিলেন, সেখানে ছিল শুধু পেনক্র্যাফট। সে তার কাজকর্ম শেষ করে মোটা একটা দড়ি বেয়ে সকলের শেষে এসে নামলে।

    চিমনির সামনে সমুদ্রতীরে গাড়িটা অপেক্ষা করছিল। হার্বার্ট প্রথম কয়েক ঘণ্টা গাড়িতেই যাবে। তবে, সে জাপকে তার পাশে বসিয়ে নিলে। জাপ অবিশ্যি তাতে কোনো আপত্তিই করলে না।

    মার্সি নদীর বাঁক পেরিয়ে গাড়ি প্রথমে বাঁ-তীর দিয়েই এক মাইল পথ গেল। সেখানে সেতুটি পেরিয়ে অরণ্যের গহনে প্রবেশ করল। সুদূর পশ্চিম পর্যন্ত বিস্তৃত সেই অরণ্য। কড়ল দিয়ে অরণ্যের মধ্য দিয়ে পথ করে-করে সবাই চলতে লাগলেন। মাঝে-মাঝে তাদের আসার সঙ্গে-সঙ্গে নানান জাতের পাখি, এবং ফ্ল্যাগুটি, ক্যাপিবরা, ক্যাঙারু প্রভৃতি জন্তু ডেকেডেকে পালিয়ে যেতে লাগল।

    সাইরাস হার্ডিং বললেন : জন্তুগুলোকে আগে যেমন দেখেছিলুম, এখন যেন তার চেয়ে ভিতু হয়েছে। সুতরাং এ-পথে নিশ্চয়ই বোম্বেটেরা যাওয়া-আসা করেছে। নিশ্চয়ই তাদের কিছু না কিছু চিহ্ন পাওয়া যাবে।

    সত্যিই, জায়গায়-জায়গায় দেখে মনে হল—যেন লোকজন সে-পথে গিয়েছে। ডালপালা ভাঙা, কোথাও-বা নরম মাটিতে পদচিহ্ন, আবার কোনোখানে পড়ে আছে ছাই। কিন্তু কোথাও একটা রীতিমতো আড্ডার জায়গা দেখা গেল না। সাইরাস হার্ডিং সবাইকে শিকার করতে বারণ করলেন। বন্দুকের আওয়াজ শুনলে বোম্বেটেরা হুঁশিয়ার হয়ে যাবে। তা ছাড়া শিকার করতে হলেই গাড়ি ছেড়ে দূরে যেতে হবে। হার্বার্টের গাড়ি নিঃসহায় রেখে যাওয়াটা মোটেই বাঞ্ছনীয় নয়।

    প্রথম দিন সন্ধের আগে গ্র্যানাইট  হাউস থেকে ন-মাইল দূরে একটা ঝরনার ধারে রাত্রি-বাসের ব্যবস্থা করা হল। ঝরনাটা গিয়ে পড়েছে মার্সি নদীতে। এই ঝরনাটার কথা আগে জানা ছিল না। সারাদিনের পরিশ্রমে সাংঘাতিক খিদে পেয়েছিল। সবাই খুব তৃপ্তির সঙ্গে আহার করলেন। এবার রাত্রিটা যাতে নিরাপদে কেটে যায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু বুনো জানোয়ারের কথা হলে অগ্নিকুণ্ড জ্বেলে ঘুমোলেই যথেষ্ট হত। কিন্তু বোম্বেটেদের চিন্তাটাই বেশি, সুতরাং আগুন জ্বাললে ফল হবে বিপরীত। আগুন দেখে ভয় পাওয়া দূরে যাক, তারা আরো অতর্কিত আক্রমণের সুবিধের জন্যে উৎসাহিত হয়ে উঠবে। এমন অবস্থায় সতর্ক পাহারার প্রয়োজন। ঠিক হল, এক দলে স্পিলেট আর পেনক্র্যাফট, অন্য দলে হার্ডিং আর নেব পাহারা দেবেন।

    নিরাপদেই কেটে গেল রাতটা। পরদিন ষোলোই ফেব্রুয়ারি আবার রওনা হলেন সবাই। বোম্বেটেদের আরো কিছু চিহ্ন পাওয়া গেল। এক জায়গায় দেখা গেল সদ্য-নেবানো আগুনের অবশিষ্ট। তার আশপাশে মাটিতে পদচিহ্ন। গুনে দেখা গেল, পাঁচজনের পায়ের দাগ। ষষ্ঠ ব্যক্তির পায়ের দাগ নেই।

    তাহলে দেখা যাচ্ছে, বললে হার্বার্ট : আয়ারটন তাদের সঙ্গে ছিল না।

    না, বললেন পেনক্র্যাফট : আর তাদের সঙ্গে ছিল না বলেই বোঝা যাচ্ছে যে শয়তানরা ওকে হত্যা করেছে। শয়তানগুলোর যদি একটা নির্দিষ্ট কোনো আস্তানা থাকতো, আর সেখানে একবার গিয়ে হাজির হতে পারতুম—

    কিন্তু এই প্রতিশোধে তো আয়ারটনকে ফিরিয়ে আনা যাবে না! ষষ্ঠ পদচিহ্ন যখন দেখা গেল না, তখন, ঈশ্বর, আয়ারটনকে দেখবার আশা বুঝি-বা ছাড়তে হয়?

    সেদিন সন্ধের আগে গ্র্যানাইট  হাউস থেকে চোদ্দ মাইল দূরে সবাই রাত কাটালেন। হার্ডিং হিশেব করে দেখলেন, রেপ্টাইল য়ে আরো পাঁচ মাইল দূরে। পরদিন সবাই একেবারে শেষ সীমায় গিয়ে হাজির হলেন। গোটা অরণ্য ঘুড়ে দেখা হয়েছে। কিন্তু বোম্বেটেদের আস্তানা দেখতে পাওয়া গেল না। দ্বীপের গুপ্ত অধিদেবতার বাসস্থানটিও অজ্ঞাতই থেকে গেল।

    পরদিন আঠারোই ফেব্রুয়ারি রেপ্টাইল য়েণ্ড আর নদীধারার মধ্যবর্তী অরণ্য-অঞ্চল খুব ভালো করে খুঁজে দেখা হল, কিন্তু বোম্বেটেদের কোনো পাত্তা পাওয়া গেল না।

    সাইরাস হার্ডিং বললেন, বোম্বটেরা তাহলে গেল কোন্ দিকে! আমার মনে হয়, বললেন পেনক্র্যাফট : তারা আবার কোর‍্যালেই ফিরে গেছে।

    আমার কিন্তু তা মনে হয় না, বললেন হার্ডিং, কারণ তারা জানে যে আমরা তাদের খুঁজে-খুঁজে কোর‍্যালেও যেতে পারি। কোর্যালটা তো তাদের শুধু ভাড়ার। সেখানে দিন কাটানোর মৎলব তাদের একটুও নেই।

    স্পিলেট বললেন : আমারও তা-ই মনে হল। মাউন্ট ফ্র্যাঙ্কলিনের কোথাও কোনো গুহার মধ্যেই নিশ্চয়ই তাদের আস্তানা।

    পেনক্র্যাফট বললে : তাহলে আর দেরি কেন? চলুন, কোর‍্যালেই যাওয়া যাক।

    না, বললেন হার্ডিং : শুধু তো বোম্বেটেদের আস্তানা বার করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়, পশ্চিম তীরের বনে-পর্বতে অধিদেবতার সন্ধানও করতে হবে।

    সেদিন বিকেলে নদীর কাছেই রাত কাটানোর ব্যবস্থা হল।

    উনিশে ফেব্রুয়ারি সবাই সমুদ্রতীর ছেড়ে নদীর বাঁ-দিকের তীর ধরে চললেন। মাউন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন এখান থেকে ছ-মাইল দূরে। নদীর উপত্যকা খুব ভালো করে দেখতে দেখতে খুব হুঁশিয়ার হয়ে কোর‍্যালের দিকে অগ্রসর হওয়াই ছিল হার্ডিং-এর মৎলব। কোর্যালটা যদি দস্যুরা দখল করে থাকে, তবে দস্যুদের সঙ্গে লড়াই করতে হবে। আর যদি কোর্যাল ফাঁকা থাকে তবে কোর‍্যালেই বাস করা হবে বলে ঠিক হল, কেননা সেখান থেকে মাউন্ট ফ্র্যাঙ্কলিনে অনুসন্ধান চালানো বেশি সুবিধের।

    মাউন্ট ফ্র্যাঙ্কলিনের খুব-বড়ো দুটি শাখার মধ্যকার সংকীর্ণ উপত্যকাটি ধরে তাঁরা চললেন। চারদিকে উঁচু পাথরের কৃপ। জমি অত্যন্ত এবড়ো-খেবড়ো। ইচ্ছে করলে আশপাশে একাধিক লোক লুকিয়ে থাকতে পারে। খুব সতর্ক হয়ে চললেন সবাই। বিকেল পাঁচটার সময় কোর‍্যালের বেড়া দেখতে যাওয়া গেল। কিন্তু কোর‍্যালে যাওয়ার আগে ভালো। করে খবর নিতে হবে সেখানে লোক আছে কি না। দিনের আলোয় সে-চেষ্টা করা বিপজ্জনক। এইভাবেই আহত হয়েছিল হার্বার্ট। কাজে-কাজেই রাত্রির ঘন অন্ধকারের জন্যে অপেক্ষা করতে হবে।

    রাত আটটার সময় স্পিলেট পেনক্র্যাফটের সঙ্গে যাওয়ার জন্যে তৈরি হলেন। হার্ডিং বলে দিলেন : তোমরা খুব হুঁশিয়ার হয়ে, সবকিছু বিবেচনা করে, কাজ কোরো। মনে রেখো, তোমরা শুধু দেখতে যাচ্ছো কোর‍্যালে লোক আছে কি নেই; সেটা দখল করতে যাচ্ছে না।

    তারপর দুজনে যাত্রা করলেন। গাছের নিচে গাঢ় অন্ধকার। দশ-পনেরো হাত দূরের কিছুই দেখা যায় না। একটু শব্দ হলেই তারা থমকে দাঁড়ালেন। এইভাবে খুব সাবধান হয়ে দুজনে এগুতে লাগলেন। ক্রমশ তারা অরণ্যের পরের খোলা জায়গাটায় এলেন–এর পর থেকে শুরু হয়েছে কোর‍্যালের বেড়া। এখানে এসেই তারা থেমে দাঁড়ালেন। আর ত্রিশ ফুট দূরেই কোর‍্যালের দরজা। দূর থেকে মনে হল দরজা যেন বন্ধ রয়েছে।

    এই ত্রিশ ফুট জায়গা পেরুনোই সবচেয়ে বিপজ্জনক। সত্যি, বেড়ার ভিতর থেকে যদি দু-তিনটে বন্দুকের গুলি ছুটে আসে তাহলে বিপদের সম্ভাবনা। এমন অবস্থায় খুব বিবেচনা করে কাজ করা চাই।

    উত্তেজনায় সাত-পাঁচ না-ভেবেই এগুতে যাচ্ছিল পেনক্র্যাফট, কিন্তু স্পিলেট তার হাত ধরে বাধা দিলেন। ফিশফিশ করে বললেন, আরেকটু পরেই ঘুটঘুটে অন্ধকার হবে, তখন এই জায়গাটা পেরুবার চেষ্টা করবো।

    আস্তে-আস্তে আরো ঘন হল অন্ধকার। স্পিলেট আর পেনক্র্যাফট বন্দুক-হাতে বুকে হেঁটে কোর‍্যালের দিকে এলেন। কোর‍্যালের দরজার কাছে এলে দেখা গেল, দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। তারা জানেন দস্যুরা কোর‍্যালের ভিতরেই আছে। বেড়ার ভিতরে কোনো শব্দ নেই। কোর্যাল একেবারে নিশ্চুপ, নিস্তব্ধ। তাঁরা ভাবতে লাগলেন বেড়া পেরিয়ে ভিতরে যাবেন কিনা। কিন্তু তাহলে যে হার্ডিং-এর কথা মানা হয় না। কাজেই হার্ডিং-এর কাছে ফিরে যাওয়াই তারা কর্তব্য বলে মনে করলেন। সন্তর্পণে ফিরে এসে তারা হার্ডিংকে সবকিছু খুলে বললেন।

    সব শুনে একটুক্ষণ কী যেন ভাবলেন হার্ডিং, তারপর বললেন : তবে আর দেরি নয়, চলো কোর‍্যালে। গাড়িটাও সঙ্গে করে নিয়ে যাবো। কেননা, গাড়িতে আমাদের সব জিনিশপত্র রয়েছে। তাছাড়া দরকার হলে গাড়িটাকে একটা ঢাল হিশেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে।

    তখন গাড়ি নিয়ে সবাই কোর‍্যালের দিকে চললেন। ঘন ঘাসের উপর দিয়ে চলছিলেন বলে কোনো শব্দই হল না। অন্ধকার তখন আরো ঘন হয়েছে। জাপ চলল সবার পিছনে। টপের গলায় দড়ি বেঁধে নিয়ে নে চলল সবার আগে-আগে।

    নিঃশব্দ পায়ে নিরাপদে খোলা জায়গাটা পেরিয়ে এসে সবাই কোর‍্যালের বেড়ার কাছে এসে হাজির হলেন। সেখানে জাপ আর টপকে গাড়ির সঙ্গে বেঁধে রেখে অন্য-সবাই দরজার দিকে চললেন। গিয়ে দেখলেন, দরজাটা একেবারে খোলা। সবাই স্তম্ভিত হয়ে গেলেন।

    পেনক্র্যাফট বললে : আমি শপথ করে বলতে পারি, একটু আগে দরজা বন্ধ দেখে গেছি!!

    ভাবনার কথা। বিপদেরও। দস্যুরা তাহলে কোর‍্যালের মধ্যেই আছে!

    সম্ভবত কেউ-একজন দরজা খুলে বাইরে গিয়েছে।

    কিন্তু আসল ব্যাপারটা কী করে বোঝা যাবে। এদিকে হার্বার্ট একটু ভিতরে ঢুকে পড়েছিল। সে দ্রুত পায়ে ফিরে এসে হার্ডিং-এর হাত চেপে ধরে উত্তেজিত কণ্ঠে বললে : ভিতরে একটা আলো।

    ঘরের মধ্যে?

    হ্যাঁ।

    তখন পাঁচজনেই এগিয়ে গিয়ে দেখলেন, ঘরের জানলা দিয়ে ক্ষীণ, কম্পিত একটা আলোকরেখা এসে পড়েছে বাইরে। হার্ডিং ফিশফিশ করে বললেন : এইই আমাদের সুযোগ। দস্যুরা ঘরের মধ্যে একসঙ্গে রয়েছে। জানতেও পারেনি যে আমরা এসেছি। এখন তো তারা হাতের মুঠোয়। এগিয়ে চলো সবাই!

    তখন দু-ভাগ হয়ে-এক দলে হার্ডিং পেনক্র্যাফট আর স্পিলেট, অন্য দলে হার্বার্ট আর নেবসবাই কোর‍্যালের বেড়া ধরে-ধরে এলেন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই কুটিরের বন্ধ দরজার কাছে গিয়ে হাজির হলেন সবাই। হার্ডিং শব্দহীন পায়ে চুপি-চুপি এগিয়ে জানলা দিযে উঁকি মারলেন। ভিতরের একটা টেবিলে আলো জ্বলছে। টেবিলের পাশেই আয়ারটনের সেই বিছানা। বিছানার উপরে কে-একজন শুয়ে আছে।

    হঠাৎ হার্ডিং পিছনের দিকে হঠে এসে নিচু, উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন : আয়ারটন! তক্ষুনি সজোরে দরজা খুলে সবাই ভিতরে ঢুকলেন। মনে হল, আয়ারটন ঘুমুচ্ছে। তার সারা গায়ে আঘাতের নীল দাগ। বোঝা যায়, নিষ্ঠুর অত্যাচার হয়েছে তার উপর।

    তার হাত ধরে ঝাঁকি দিলেন হার্ডিং, বললেন : আয়ারটন!

    কে? কে আপনি? চোখ মেলে ফ্যালফ্যাল করে হার্ডিং-এর দিকে তাকিয়ে বললে আয়ারটন। তারপর বললে : ও! আপনি! আপনারা এসেছেন?

    হ্যাঁ আয়ারটন, আমরা এসেছি।

    আমি কোথায়?

    কোর‍্যালে, তোমার সেই ঘরে।

    একা ছিলুম?

    হ্যাঁ একাই।

    কিন্তু, তারা হয়তো এক্ষুনি ফিরে আসবে! শিগগির অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তৈরি হোন!–এই বলেই আয়ারটন আবার এলিয়ে পড়ল।

    হার্ডিং বললেন : দস্যুরা কখন এসে আক্রমণ করবে, তার কিছু ঠিক-ঠিকানা নেই। পেনক্র্যাফ্ট, শিগগির গাড়িটা ভিতরে নিয়ে এসে কোর‍্যালের দরজা খুব ভালো করে বন্ধ করে দাও।

    পেনক্র্যাফট আর নেবকে নিয়ে এসে মুহূর্তেই দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন স্পিলেট। গিয়ে শুনলেন, টপ রাগে গোঁ-গোঁ করছে। এদিকে হার্ডিংও হার্বার্টকে নিয়ে বেরিয়ে এসেছেন। দরকার হলেই গুলি চালাবেন। কিন্তু কিছু দেখতে পাওয়ার আগেই শুনতে পেলেন, সেই মূহুর্তে ভীষণভাবে ডেকে উঠল টপ। দড়ি ছিঁড়ে ছুটল কোর‍্যালের পিছন দিকে। সবাই বন্দুক উঁচিয়ে তৈরি হয়ে রইলেন। এদিকে জাপও টপের কাছে ছুটে গেল। শুরু করে দিলে ভীষণ চাচামেচি।

    জাপের পিছন পিছন ছুটলেন সবাই। ছোট্ট ঝরনাটির কাছে এসে থামলেন। সেখানে চাঁদের উজ্জ্বল আলোয় দেখা গেল, ঝরনার ধারে পাঁচটা মৃতদেহ পড়ে আছে। মৃতদেহ পাঁচটা পাঁচজন বোম্বেটের!!

    এমন আশ্চর্য ব্যাপার ঘটল কী করে? কে হত্যা করলে দস্যুদের? আয়ারটন? উঁহু, অসম্ভব! মুহূর্ত আগেও সে বলেছিল-তৈরি হোন, কখন দস্যরা ফিরে আসে। এই কথা বলবার পরক্ষণেই সেই-যে জ্ঞান হারিয়েছে, এখনো সে-জ্ঞান আর ফিরে আসেনি। সুতরাং এ-অন্য-কারু কাজ। কিন্তু, সেই অন্য-কেউটি কে? কে?-

    সারা রাত্রি আয়ারটনের ঘরেই কাটালেন সবাই। পরদিন ভোরবেলা জ্ঞান ফিরে এলো আয়ারটনের। একশো চারদিন পরে সকলের সঙ্গে ফের দেখা হওয়ায় কী-রকম আনন্দের ব্যাপার হল, তা নিশ্চয় না-বললেও চলবে। এরপর আয়ারটন তার যতটুকু জানা ছিল সবকিছুই খুলেই বললে :

    —গত এগারোই নভেম্বর সে কোর‍্যালে যায়। তার পরদিনই রাত্রিবেলায় হঠাৎ বোম্বেটেরা এসে তার হাত-পা-মুখ এমনভাবে বেঁধে রাখলে, যাতে সে কথা বলতে না-পারে। তারপর তাকে মাউন্ট ফ্র্যাঙ্কলিনের নিচে একটা ঘন-অন্ধকার গহ্বরের মধ্যে নিয়ে রাখলে। সেই গহ্বরটাই ছিল বোম্বেটেদের আড্ডা। তাকে মেরে ফেলাই ঠিক হল। পরদিন যখন দস্যরা তাকে হত্যা করতে যাবে, এমন সময় দলের একটা বোম্বেটে তাকে হঠাৎ চিনতে পারলে : এ-যে অস্ট্রেলিয়ার সেই বেন জয়েস। তখন থেকে তাকে তাদের দলবদ্ধ করবার জন্যে বোম্বেটেরা আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। তারা এমন স্বপ্নও দেখতে শুরু করলে যে আয়ারটনের সাহায্যে দুর্ভেদ্য গ্র্যানাইট হাউস দখল করবে, হত্যা করবে সকলকে, তারপর মালিক হয়ে বসবে এই লিঙ্কন আইল্যাণ্ডের।

    কিন্তু যখন কোনোমতেই আয়ারটনকে হাত করা গেল না, তখন বোম্বেটেরা তার হাত, পা বেঁধে, মুখে রুমাল ঢুকিয়ে দিয়ে সেই গহূরে ফেলে রাখলে। এইভাবে সেই গহ্বরে প্রায় চার মাস ছিল আয়ারটন। বোম্বেটেরা কোর‍্যালে থেকে আয়ারটনের জন্যে সঞ্চিত আহার্য এনে আহার করতো, কিন্তু কোর‍্যালে বাস করতো না। এগারোই নভেম্বর দুজন বোম্বেটে কোর‍্যালে গিয়েছিল। সেখানে তারা হঠাৎ দ্বীপবাসীদের দেখতে পায়। তক্ষুনি একজন বোম্বেটে হার্বার্টকে গুলি করে। অন্য বোম্বেটেটাকে হার্ডিং হত্যা করেন। যে-বোম্বেটেটা আহত হয়নি, তার মুখে আয়ারটন হার্বার্টের মৃত্যু হয়েছে এই কথা শোনে। আসলে হার্বার্ট যে আহত হয়েছে, মারা যায়নি, একথা আয়ারটন জানতে পারেনি। আহত হার্বার্টকে নিয়ে সবাই যখন কোর‍্যালে ছিলেন, তার মধ্যে দস্যুরা কখনও সেই গহ্বর পরিত্যাগ করেনি। এমনকী খেত-খামারের সর্বনাশ করে ফের তারা ওই গহ্বরেই ফিরে এসেছিল।

    এর পর থেকে কিন্তু আয়ারটনের উপরে অত্যাচারের মাত্রা দ্বিগুণ বেড়ে গেল। দস্যরা গহ্বর ছেড়ে খুব কমই বেরুত। আয়ারটনও দ্বীপবাসীদের আর-কোনো খবর জানতে পারেনি। অবশেষে দস্যুদের অকথ্য, অসহ্য যন্ত্রণায় বেচারার দৃষ্টিশক্তি আর শ্রবণশক্তি প্রায় লোপ পেলো। তারপর কী-কী ঘটেছে, তা সে জানে না।

    এরপর আয়ারটন জিগেস করলে : আচ্ছা ক্যাপ্টেন, আমি তো গহ্বরে অজ্ঞান অবস্থায় বন্দী ছিলুম, কিন্তু এখানে এলুম কী করে?

    দস্যুরা যে ঝরনার পাশে মরে পড়ে আছে, বললেন হার্ডিং : সেইটেই বা হল কী করে?

    কী! সচমকে বললে আয়ারটন : কী! মরে পড়ে আছে!!—

    এই কথা বলেই আয়ারটন ওঠবার চেষ্টা করলে। সবাই তাকে ধরে তুললেন, তারপর সেইভাবে ধরে-ধরে সেই ছোট্ট ঝরনার দিকে নিয়ে চললেন। ততক্ষণে পূর্বাকাশ ফিকে হয়ে এসেছে। রাত প্রায় ভোর হয়-হয়। চারদিক বেশ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।

    ঝরনাধারার পাশে পাঁচটা মৃতদেহ-ঠিক যেমনভাবে ছিল তেমনি পড়ে আছে। এই দৃশ্য দেখে আয়ারটন একেবারে হতবাক হয়ে পড়ল। মনে হল, তার বুদ্ধি যেন লোগ। পেয়ে গেছে।

    তখন হার্ডিং-এর নির্দেশ অনুযায়ী পেনক্র্যাফ্ট আর নেব মৃতদেহগুলো ভালো করে পরীক্ষা করে দেখল। স্পষ্ট আঘাতের চিহ্ন কারু শরীরে নেই। তবে, একটা করে হাতের মতো লাল দাগ কারু বুকে, কারু পিঠে, কারু-বা কাঁধের উপর দেখতে পাওয়া গেল।

    স্পিলেট বললেন : এই দাগগুলোই আঘাতের চিহ্ন। কিন্তু, এ কোন্ অস্ত্রের আঘাত?

    এমন-কোনো অস্ত্রের আঘাত-বললেন হার্ডিং : যার ক্রিয়া বিদ্যুতের মতো।

    এমন সাংঘাতিক, প্রাণঘাতী আঘাত করলে কে?

    হার্ডিং বললেন : আর কে করবে? এও আমাদের সেই অজ্ঞাত উপকারী বন্ধুর কাজ। আয়ারটন, তোমাকেও তিনিই পর্বত-গহ্বর থেকে কোর‍্যালে এনে রেখেছিলেন।

    এরপর নেব আর পেনক্র্যাফ্ট ছাড়া অন্য-সবাই কোর‍্যালের ভিতরে চলে গেলেন। তারা দুজনে মৃতদেহগুলো দূরে বনের মধ্যে নিয়ে কবর দিলে।

    আয়ারটন দস্যুদের কবলে পড়বার পর যে-সব ঘটনা ঘটেছিল, সবকিছুই তাকে খুলে বলা হল। তারপর সাইরাস হার্ডিং বললেন : আমাদের কাজের অর্ধেকটা তো শেষ হল। দস্যুদের আর অস্তিত্ব নেই। কিন্তু, আমাদের ক্ষমতায় তো আর এ-কাজ সম্পন্ন হয়নি।

    যার ক্ষমতায় হয়েছে—বললেন স্পিলেট : তার খোঁজ করাই এখন আমাদের প্রধান কাজ। মাউন্ট ফ্র্যাঙ্কলিনের গুহা, গহ্বর, সমস্তকিছু তন্ন-তন্ন করে খুঁজে দেখতে হবে আমাদের।

    হার্ডিং বললেন : নিশ্চয়ই দেখতে হবে। তবে আমি আবারও বলছি, তিনি ইচ্ছে করে দেখা না-দিলে আমাদের কারু সাধ্য নেই যে তাকে খুঁজে বার করি।

    পেনক্র্যাফট বললে : আমাদের যে আরো-একটা কাজ বাকি রয়েছে। টেবর আইল্যাণ্ডে গিয়ে আয়ারটনের কথা জানিয়ে আসতে হবে।

    আয়ারটন শুধোলো : টেবর আইল্যাণ্ডে যাবে কী করে?

    কেন? বন-অ্যাডভেনচার-এ চড়ে!

    বন-অ্যাডভেনচার-এর অস্তিত্ব থাকলে তো! দিন-আষ্টেক আগে বোম্বেটেরা বনঅ্যাডভেনচার-এ চড়ে সমুদ্রে বেরিয়েছিল। এদের কেউ তো হার্ডির মতো নৌকো চালাতে জানতো না! কাজেই পাহাড়ে লেগে বন-অ্যাডভেনচার ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।

    আঁ! কী সর্বনাশ!–

    দারুণ দুঃখ পেলে পেনক্র্যাফট, অন্যরাও অত্যন্ত মর্মাহত হলেন।

    হার্বার্ট বললে : দুঃখ কোরো না, পেনক্র্যাফট, আমরা আরেকটা নৌকো বানিয়ে নেবো। এবার বানাবো আরো বড়ো করে।

    পেনক্র্যাফট বললে : সে-রকম নৌকো বানাতে অন্তত পাঁচ-ছ মাস লাগবে।

    কী আর করা যাবে। বললেন স্পিলেট : এ-বছর টেবর আইল্যাণ্ডে যাওয়াটা বন্ধই রাখতে হবে।

    এরপর, উনিশে ফেব্রুয়ারি অনুসন্ধান শুরু হল। মাউন্ট ফ্র্যাঙ্কলিনের গুহাগহুরের সীমাসংখ্যা ছিল না। দ্বীপবাসীরা একটা-একটা করে খুঁজে বার করে দেখতে লাগলেন। অগ্ন্যুৎপাতের সময় থেকে যে-সব টানেল আর নালাগুলো ছিল, যার ভিতর দিয়ে একদা কত গলিত লাভা ইত্যাদি বেরিয়েছে—সবই তন্ন-তন্ন করে খুঁজে দেখা হল।

    একটা গহ্বরের শেষপ্রান্তে এসে হাজির হলে পর সাইরাস হার্ডিং শুনতে পেলেন, যেন পাহাড়ের ভিতরে গভীর গুম-গুম একটা গর্জন হচ্ছে। স্পিলেট তার সঙ্গে ছিলেন। এই শব্দ তাঁরও কান এড়ালো না। মনে হল—পৃথিবীর অভ্যন্তরের বহুকালের নিভন্ত আগুন যেন আবার জ্বলতে শুরু করেছে। অনেকক্ষণ শুনে দু-জনে ঠিক করলেন—মাটির নিচে কোনোরকম রাসায়নিক ক্রিয়া শুরু হয়েছে, যার ফল অত্যন্ত বিপজ্জনক।

    স্পিলেট বললেন : তবে তো দেখছি আগ্নেয়গিরি একেবারে মরে যায়নি!

    হার্ডিং বললেন : মরা আগ্নেয়গিরিও আবার অনেক সময় প্রাণ পেয়ে জেগে ওঠে।

    স্পিলেট বললেন : মাউন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন যদি আবার অগ্ন্যুদ্গার করে তবে তো লিঙ্কন আইল্যাণ্ডের আর রেহাই নেই!

    তা মনে হয় না–বললেন হার্ডিং : অগ্নাদগার হলেও পুরোনো পথ দিয়েই গলিত ধাতু প্রভৃতি সব জিনিশ হ্রদের দিকে পাহাড়ের উপত্যকার দিকে চলে যাবে। গ্র্যানাইট  হাউসের কোনো বিপদ হবে বলে আমার মনে হয় না। তবু, এই অগ্ন্যুদ্গারটা হলে আমাদের পক্ষে সাংঘাতিক মারাত্মক হবে। এটা না-হওয়াই বাঞ্ছনীয়।

    সাইরাস হার্ডিং আর গিডিয়ন স্পিলেট গহ্বর থেকে বেরিয়ে অন্য সবাইকে এই সম্ভাব্য বিপদের কথা বললেন।

    শুনে পেনক্র্যাফট কথাটাকে উড়িয়েই দিলে। বললে : হুঁ, হোক না অগ্ন্যুৎপাত! আমাদের শুভাকাঙকী বন্ধুই তো রয়েছেন। তাহলে আর ভয় কী?

    সে যা-ই হোক, এত যে পরিশ্রম করা হল, কষ্ট করা হলতার কোনো ফলই হল না। কোনো খোঁজই পাওয়া গেল না সেই হিতাকাঙক্ষী বন্ধুর। তখন সবাই এ-কথা মানতে বাধ্য হলেন যে, দ্বীপের উপরটায় উনি থাকেন না। এই সিদ্ধান্তকে হতাশভাবে মেনে নিয়ে সবাই পঁচিশে ফেব্রুয়ারি গ্র্যানাইট  হাউসে ফিরে এলেন।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleজুল ভের্ন অমনিবাস ২ (অনুবাদ : মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়)
    Next Article জুল ভের্ন অমনিবাস ৪ (চতুর্থ খণ্ড) – অনুবাদ : মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

    Related Articles

    জুল ভার্ন

    জুল ভের্ন অমনিবাস ১ (প্রথম খণ্ড) – অনুবাদ : মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 16, 2025
    জুল ভার্ন

    জুল ভের্ন অমনিবাস ৪ (চতুর্থ খণ্ড) – অনুবাদ : মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 16, 2025
    জুল ভার্ন

    জুল ভের্ন অমনিবাস ২ (অনুবাদ : মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়)

    August 14, 2025
    জুল ভার্ন

    জুল ভের্ন অমনিবাস ৫ (পঞ্চম খণ্ড) – অনুবাদ : মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 14, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026
    Our Picks

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026

    ভুতুড়ে ট্রেন – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026

    ব্রাহ্মণ ভূত – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }