Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026

    হেরুক – সৌমিত্র বিশ্বাস

    March 24, 2026

    বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)

    March 24, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    জুল ভের্ন অমনিবাস ৫ (পঞ্চম খণ্ড) – অনুবাদ : মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় এক পাতা গল্প989 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    ১.০৬ আমেদে ফ্লরেঁসের তৃতীয় নিবন্ধ

    ল্যক্সপান্‌সিয়ঁ ফ্রাঁসেঈর নিজস্ব সংবাদদাতা মঁসিয় আমেদে ফ্লরেঁসের তৃতীয় প্রতিবেদনটি বেরিয়েছিলো পাঁচই ফ্রেব্রুয়ারির সংখ্যায়। তখন কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি, হঠাৎ-শুধু দেখা যায় তাদের সুযোগ্য সংবাদদাতার কাছ থেকে তার পর থেকে আর-কোনো খবরই আসছে না।

    বারজাক মিশন
    [ নিজস্ব সংবাদদাতার প্রতিবেদন ]

    কানকান, ২৪শে ডিসেম্বর। আমরা গতকাল সকালে এখানে এসে পৌঁছেছি, এবং আগামীকাল বড়োদিনের ভোরবেলাতেই আমরা আবার বেরিয়ে পড়ছি।…

    বড়োদিন! আমার মন উড়ে চ’লে যাচ্ছে উৎসবের ঝলমলে এখান থেকে এত-দূরে! (কোনোক্রি থেকে চারশো মাইল দূরে চ’লে এসেছি আমরা।) কোনোদিন ভাবিনি যে এমনও স্বপ্ন একদিন দেখতে পাবো, যখন তুষারছাওয়া সমতলের কথা ভেবে আমার মনটা এমন হু-হু ক’রে উঠবে। আর অনেক বছর পর, এই-প্রথম সাধ জাগছে গিয়ে বসি লিভিংরুমে, ফায়ারপ্লেসের কাছে, শুধু এটাই নিজেকে বোঝাতে যে আমারও একটা বাড়ি আছে।

    কিন্তু এ-সব সাধআহ্লাদের কথার মধ্যে আমরা আর পাক খাবো না। বারজাক মিশনের সঙ্গে কী ক’রে এখানে এসে পৌঁছেছি, সেই বৃত্তান্তটাই বরং এখন লিপিবদ্ধ করা যাক। আগেকার লেখাটায় নিশ্চয়ই বলেছি যে যখন দাউএরিকোর গ্রামপ্রধান এসে তার আতিথ্য নিতে আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলো, তখন মলিক এসে রুদ্ধশ্বাসে তার ভাঙা-ভাঙা কথায় মাদমোয়াজেল মোর্‌নাসকে বলেছিলো ‘ওখানে যাবেন না কিন্তু! তাহ’লে আপনার প্রাণ যাবে!’

    এই কথাটার মানে কাপ্তেনই সঠিক বুঝতে পেরেছিলেন, এই কথাটাই গ্রামের বাইরে আমাদের ছাউনি ফেলতে উদ্বুদ্ধ করেছিলো তাঁকে, ঠিক যেখানটায় এসে আমাদের ঘোড়াগুলো থেমেছিলো। কাপ্তেন মার্সেনে, মলিকের সঙ্গে কী-সব আলোচনা করার পর, গাঁয়ের লোকদের কেটে পড়তে হুকুম দিয়েছিলেন। তারা তাদের শুভেচ্ছার কথা জানাতে-জানাতে একটু আপত্তিই করেছিলো, কিন্তু কাপ্তেন মার্সেনে তাদের ওজর-আপত্তিতে কোনো কান দেননি, তাদের তো চ’লে যেতে ব’লেইছেন, উপরন্তু হুমকি দিয়েছেন, খবরদার!, ছাউনির পাঁচশো গজের মধ্যে যেন কেউ এসে আর পা না-দেয়।

    মঁসিয় বোদ্রিয়ের যেহেতু বিচক্ষণতার বুকের বন্ধু, তিনিই সহর্ষে জোরালো ভাষায় কাপ্তেন মার্সেনের প্রস্তাবের সমর্থন করেছিলেন, যদিও এর-যে কারণ কী, তা তিনি আদপেই জানতেন না। মঁসিয় বারজাক অবিশ্যি এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে তাঁর বিতৃষ্ণা প্রকাশ করতে ভোলেননি। গাঁয়ের লোকেরা সদলবলে চ’লে যেতেই তিনি এসে বলেছেন; বেশ একটু রুষ্টরূঢ় সুরেই : ‘এই মিশনের দায়িত্ব কার ওপর, কাপ্তেন?’

    ‘আপনারই ওপর, মঁসিয় ল্য দেপুতে,’ ঠাণ্ডাগলায় ভদ্রভাবে জানিয়েছেন কাপ্তেন!

    ‘তাহ’লে কেন, আমার মত জিগেস না-ক’রেই, গাঁয়ের লোকের আতিথ্য উপেক্ষা ক’রে, এখানে তাঁবু খাটাতে বলেছেন আপনি? আর ঐ লোকগুলোকেই বা তাড়িয়ে দিয়েছেন কেন? ওদের তো আমাদের প্রতি যথেষ্ট-সহৃদয় ব্যবহার ছিলো।’

    প্রায়-নাটুকে ভঙ্গিতে কাপ্তেন, একমুহূর্ত অপেক্ষা ক’রে, শান্তস্বরে, বলেছেন : মঁসিয় ল্য দেপুতে, যদি মিশনের নেতা হিশেবে আপনারই ওপর ভার থাকে কোথায় কোন পথে কতটা সময় কাটিয়ে যাবেন, তা ঠিক ক’রে নেবার, তবে মনে রাখবেন আমারও ওপর একটা দায়িত্ব আছে, যেটা অমার পালন করা কর্তব্য—এবং সে-দায়িত্ব হ’লো আপনাদেরই নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা। এটা সত্যি- যে আমার আপনাকে হুঁশিয়ার ক’রে দেয়া উচিত ছিলো, আর একটা কৈফিয়ত্ত দেয়া উচিত ছিলো কেন আমি এমন ব্যবস্থা করছি। তবে আমার মনে হয়েছে আগে জরুরি কাজগুলোই আমার সেরে নেয়া উচিত। তাতে যদি মনে হয় আমি কোনো বিচ্যুতি ঘটিয়ে থাকি, তবে সেটা আপনি অনুগ্রহ ক’রে উপেক্ষা করলেই বাধিত হবো…’

    এ অব্দি, সবই ভালো। কাপ্তেন মার্সেনে আগে থেকে বলেননি ব’লে মাফ চাচ্ছেন, মঁসিয় বারজাকের তাতেই সন্তুষ্ট হওয়া উচিত। দুর্ভাগ্যবশত—সম্ভবত অন্য কোনোরকম প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্যেই—কাপ্তেন একটু যেন সংকুচিত; যদিও নিজের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ হারাননি কখনও, তবু একটা বেফাঁস কথা তিনি ব’লে ফেলেছেন, যাতে বারুদের স্তূপে যেন আগুনের ফুলকি পড়লো।

    ‘কর্তব্যকর্মে অবহেলা ঘটাইনি আমি, শুধু-একটু বিচ্যুতি… ‘

    ‘অবহেলা ঘটাননি? শুধু বিচ্যুতি…’ মঁসিয় বারজাক রেগে লাল, মুখে যেন কথাই সরছে না। তিনি মিদির মানুষ, এই মঁসিয় বারজাক। সেখানকার লোকদের শিরায়-শিরায় নাকি রক্তের বদলে পারদ থাকে। আমি বুঝতে পারি, দুর্দান্ত-একটা আহাম্মুকি হ’য়ে যাবে এক্ষুনি। রাগে কাঁপতে কাঁপতে তিনি বলেছেন : ‘তাহ’লে এখন কি অন্তত অনুগ্রহ ক’রে খুলে বলবেন আপনার অভিপ্রায় কী? নিশ্চয়ই কোনো প্রকাণ্ড ব্যাপার আছে যেজন্যে আপনি এ-কাণ্ড করেছেন!’

    এই-তো মুশকিল! এবার যে কাপ্তেনের মাথাগরম ক’রে ফেলার পালা। তিনি শুষ্কস্বরে শুধু বলেছেন : ‘এইমাত্র শুনেছি আমাদের বিরুদ্ধে এরা একটা ঘোঁট পাকাচ্ছে?’

    ‘ঘোঁট?’ মঁসিয় বারজাক বিদ্রূপের ভঙ্গিতে ঠোঁট বেঁকিয়ে বলেছেন। এই গাঁইয়াগুলো? তিম্বো থেকে মাত্র কুড়িমাইল দূরে।…সত্যি! লোকে পারেও বটে চিলের পেছনে কানের খোঁজে ছুটতে!.. তা এই ঘোঁটের কথাটা কে এসে বলেছেন, শুনি!’

    কাপ্তেন ছোট্ট ক’রে শুধু বলেছেন : ‘মলিক।’

    মঁসিয় বারজাক অট্টহাস্য জুড়ে দিয়েছেন। হাসির সে-কী দমক! ‘মালিক? সেই একরত্তি ক্রীতদাসী, যাকে একমুঠো সু দিয়ে আমি কিনেছিলুম!’

    এটা একটু বাড়াবাড়িই হয়েছে তাঁর। প্রথমত, মলিক কারু কেনাগেলাম নয়- কেননা ফরাশি সাম্রাজ্যে ক্রীতদাস থাকতেই পারে না। একজন সাংসদের সেটা জানা উচিত। আর তারপর, মলিক বেশ-একটু দামি মানুষই বটে, পঁচিশ ফ্রাংক তার দাম, তার ওপর ফাউ দিতে হয়েছে একটা গাদাবন্দুক আর থান কাপড়।

    তৎসত্ত্বেও, তিনি কিন্তু ব’লেই চলেছেন : ‘কুললে গোটা কয় সু দিয়ে তাকে কিনেছি! হ্যাঁ, মানতেই হয়, খুব-জোরদার উৎসই বটে খবরের, দারুণ-নির্ভরযোগ্য! হ্যাঁ, এবার আমি মানি, আপনার ভয়ে ভির্মি খেয়ে যাওয়াই উচিত হয়েছে!’

    কাপ্তেন আঘাতটা বেশ অনুভবই করেছেন। ‘ভয়ে ভির্মি খেয়ে যাবার ‘ কথায় তাঁর মুখটা কেমন যেন কুঁকড়েই গিয়েছে। শ্লেষ হজম করেছেন তখন, অনেক কষ্টে দমন করেছেন নিজেকে, কিন্তু দেখে মনে হচ্ছিলো রাগে যেন টগবগ ক’রে ফুটছেন।

    আপনার আতঙ্ক আপনার থাক-আমাকে তার ভাগ না-দিলেই বাধিত হবো, মঁসিয় বারজাক ক্রমশই যেন মাত্রা ছাড়িয়ে যেতে শুরু করেছেন, ‘আমি বাহাদুরি দেখাবো ব’লে ঠিক করেছি। তাই আমি গাঁয়েই যাচ্ছি ঘুমুতে, আর সেই দস্যুর ডেরা আমি একাই বাহাদুরি দেখিয়ে জয় ক’রে আসবো।’

    আহাম্মুকির নিদর্শনগুলো বিলক্ষণ স্পষ্ট হ’য়ে উঠছে। কিন্তু আমি কিছু বলবার আগেই কাপ্তেন ব’লে উঠেছেন, ‘মলিক ভুল করেছে কি না জানি না, তবে যেহেতু আমরা নিঃসংশয় নই সত্যি কেউ ঘোঁট পাকিয়েছে কি না, আমাকে সবদিক বিবেচনা ক’রে সাবধানের মার নেই প্রবচনটাকেই মানতে হয়েছে। আবারও মনে করিয়ে দিতে চাই : আপনাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব আমার ওপর। এ-বিষয়ে আমাকে সরকার থেকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে-এবং আমি এই নির্দেশ তাচ্ছিল্য করবো না-আপনার সমস্ত শ্লেষ ও বিদ্রূপ সত্ত্বেও।’

    ‘মানে?’

    ‘আপনি যদি সামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধায়কের নির্দেশ অমান্য করতে চান, নিষেধ উপেক্ষা ক’রে শিবির ছেড়ে বেরিয়ে যেতে চান, তবে আপনার তাঁবুর বাইরে আমাকে সশস্ত্র পাহারা বসাতে হবে। আমাকে ছাউনি বসাবার ব্যবস্থাটার তদারক করতে হবে, মঁসিয় ল্য দেপুতে, এখানে দাঁড়িয়ে খোশগল্প করবার আমার সময় নেই। দয়া ক’রে আপনাকে শুভরাত্রি জানাবার অনুমতি দিন।’ ব’লে কাপ্তেন তাঁর কেপি-তে হাতটা ছুঁইয়ে পলটনি কায়দায় আস্ত ঘুরে গিয়ে লম্বা-লম্বা পা ফেলে সেখান থেকে চ’লে গিয়েছেন; এবং মিদি থেকে নির্বাচিত সাংসদের তখন ঠিক খাবি খাবার দশা।

    আমি অবশ্য খুব-একটা ভুল করিনি আসল ব্যাপারটা আন্দাজ করতে।

    মঁসিয় বারজাকের রাগটা যে এমন দাবানলের মতো দাউ-দাউ ক’রে জ্ব’লে উঠেছে, তার কারণ এই ঠোকাঠুকিটা ঘটেছে মাদমোয়াজেল মোরনাসের ডাগর আঁখির সামনেই। তিনি একটা ভালোরকম ঝগড়া বাধাতে কাপ্তেনের পেছন নিতে যাবেন, এমন সময় তাঁকে মধুর সুভাষিত শুনে থমকে যেতে হ’লো :

    ‘আমাদের আপনার সঙ্গ থেকে বঞ্চিত করবেন না, মঁসিয় বারজাক। আপনাকে আগে না-জানিয়ে কাপ্তেন সত্যি অন্যায় করেছেন, তবে তার জন্যে তিনি তো ক্ষমাই চেয়েছেন, আপনিই বরং তাঁর আঁতে ঘা দিয়ে কথা বলেছেন। আপনার আপত্তি সত্ত্বেও, আপনার সুরক্ষার ব্যবস্থা ক’রে তিনি তো তাঁর দায়িত্বই শুধু পালন করছেন-আপনি রেগে গিয়ে নালিশ করতে পারেন, তাতে তাঁর উন্নতির আশাও উবে যেতে পারে-এত-সমস্ত জেনেও কর্তব্যে তিনি অবহেলা করেননি। আপনি যদি সজ্জন হন তো আপনার তাঁকে গিয়ে ধন্যবাদ দেয়া উচিত।’

    ‘এ বড্ড বাড়াবাড়ি হচ্ছে!’

    ‘দোহাই, শান্ত হোন। আমার কথাটা দয়া ক’রে শুনুন। আমি এইমাত্র মলিকের সঙ্গে কথা বলেছি। আমাদের বিরুদ্ধে যে ষড়যন্ত্রের জাল বেছানো হচ্ছে সে- কথাটা মলিকই এসে কাপ্তেনকে জানিয়েছিলো। আপনি কি কখনও দুং-কোনো- র কথা শুনেছেন? ‘

    মঁসিয় বারজাক উত্তরে মাথা নেড়েছেন। তখন আর তিনি ফুঁসছেন না বটে, কিন্তু বিশ্রী-একটা মুখভঙ্গি ক’রে আছেন।

    ‘আমি দুং-কোনো সম্বন্ধে জানি,’ অমনি ডাক্তার শাতোনের পাণ্ডিত্যের ঝুলি খুলে গিয়েছে। ‘এ এক মারাত্মক বিষ। বলিকে সে আটদিনের আগে মারে না- কিন্তু ঐ আটদিন কাটে মৃত্যুর চেয়ে ভয়ংকর। জানেন, কী ক’রে এই বিষ বানায়? ভারি-অদ্ভুত জিনিশ এটা—’

    মঁসিয় বারজাকের কানে কোনো কথা যাচ্ছে ব’লে মনে হচ্ছিলো না। নিভন্ত আগ্নেয়গিরি থেকে তখনও বুঝি ধোঁয়া বেরুচ্ছিলো।

    তাঁর হ’য়ে মাদমোয়াজেল মোর্‌নাসই জবাব দিলেন, ‘না, ডাক্তার, জানি না।’

    ‘দেখি, বুঝিয়ে বলতে পারি কি না,’ একটু বুঝি দ্বিধার সুরেই ডাক্তার শাতোনে বলেছেন, ‘যদিও ব্যাপারটা একটু কেমন যেন অশোভনই…যাক-গে, ব’লেই ফেলি! তাহ’লে শুনুন—দুং-কোনো বানাতে হলে তারা একটা মৃতদেহের গুহ্যদেশ দিয়ে জনারের শিষ ঢুকিয়ে দেয়। তিন হপ্তা পরে বার ক’রে এনে সেটাকে রোদ্দুরে শুকিয়ে নেয়, আর তারপর সেটাকে গুঁড়ো-গুঁড়ো ক’রে ফ্যালে। তারপর সেই গুঁড়ো তারা মিশিয়ে দেয় দুধে, কিংবা কোনো সুরুয়ায় কিংবা কোনো মদে-অৰ্থাৎ যে-কোনো পানীয়তেই। কোনো স্বাদ নেই ব’লে সে টেরও পায় না কী খাচ্ছে। আট-দশদিন বাদে শুরু হয় ফুলে-ওঠা : বিশেষ ক’রে তলপেট অবিশ্বাসভাব্যে ফুলে উঠে ফেটে পড়তে চায়। আর তার আটচল্লিশ ঘণ্টা বাদে আসে মৃত্যু- কোনো ওষুধ নেই, প্রতিষেধক নেই—কিছুই আর তখন ভুক্তভোগীকে বাঁচাতে পারবে না—’

    ‘আর এই ঘোঁটটাই পাকাচ্ছে গাঁয়ের লোকে,’ ব’লে উঠেছেন মাদমোয়াজেল মোর্‌নাস। ‘এখানে এসে পৌঁছুবার পর, মলিক শুনতে পায় দাউএরিকোর মোড়ল আশপাশের অন্যান্য গ্রামের মোড়লদের সঙ্গে শলাপরামর্শ করছে। দোলো সারোন—এই গাঁয়ের যুবরাজের নাম না কি দোলো সারোন—ঠিক হয়েছে সে অমায়িক ভঙ্গি ক’রে সাদরে আমাদের অভ্যর্থনা জানাবে, আমাদের কাউকে- কাউকে তার নিজের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানাবে-বাকিদের আপ্যায়ন করবে তার অন্যান্য স্যাঙাত্রা। তারা আমাদের ভুরিভোজ করাবে, কোনো স্থানীয় পানীয় খেতে দেবে সঙ্গে, আর আমরা তো আর প্রত্যাখ্যান করতে পারবো না-তাতে দস্তুরে বাধে। এদিকে, সেপাইশাস্ত্রীদেরও তারা ঐ পানীয় খাওয়াবে-কাল তারপর আমরা যথাসময়ে বেরিয়ে পড়বো, আর ক-দিন বাদেই টের পেতে শুরু করবো ঐ ভয়ংকর বিষের প্রকোপ!’

    ‘এদিকে এদিককার সমস্ত লোক শুধু সেই-সময়টারই তক্কে তক্কে থাকবে, আর একবার আমাদের কনভয়ের মধ্যে বিশৃঙ্খলা পাকিয়ে গেলেই, তারা আমাদের সব মালপত্তর লুঠপাট ক’রে নেবে—আর ঘোড়া আর গাধাগুলো সব নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা ক’রে নেবে। মলিক এই ষড়যন্ত্রের কথাটা জানতে পেরেই কাপ্তেন মার্সেনকে এসে হুঁশিয়ার ক’রে দিয়েছে। তারপর কী হয়েছে, সে তো আপনারা সব্বাই জানেন।’

    খবরটা শুনে আমাদের যে তখন কী অবস্থা হয়েছে, তা আর বলার মতো নয়। মঁসিয় বারজাক তো স্তম্ভিত, হতচকিত। কেবল দিগ্বজয়ী রাজার মতো মঁসিয় বোদ্রিয়ের ব’লে উঠেছেন : ‘কেমন? কী বলেছিলুম আমি? শুনুন, দেখুন, বাহবা দিন আরো আপনার এই সভ্য মানুষদের! হুঁ সভ্য, না হাতি! নরকের কীট একেকটা—বদমায়েশের হদ্দ!’

    ‘এ-যে আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না,’ প্রায় আর্তনাদ ক’রে উঠেছেন মসিয় বারজাক, ‘আমার মাথার মধ্যেটা কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে! এই হ’লো দোলো সারোন –আর এই তার অমায়িক ব্যবহার, বিগলিত বচন! ওহ্! শেষ-হাসিটা কিন্তু আমিই হাসবো। কালকেই আমি গোটা গাঁটায় আগুন ধরিয়ে দেবো, আর এই হতভাগা দোলো সারোনকে—’

    ‘ও-কথা ভুলেও ভাববেন না, মঁসিয় বারজাক,’ মাদমোয়াজেল মোর্‌নাস যেন আর্তনাদই ক’রে উঠেছেন। মনে রাখবেন আমাদের শয়ে শয়ে মাইল পাড়ি দিতে হবে। সুবিবেচনা চাই, বিচক্ষণতা…’

    মঁসিয় বোদ্রিয়ের তাঁর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলেছেন : ‘এর পরেও আপনারা অতটা রাস্তা পাড়ি দিতে চান? আমাদের কাছে যে-প্রশ্নটা করা হয়েছিলো তা এই : ‘নাইজার নদীর তীরে এই যে পালে-পালে লোক আছে, তারা কি এতই শিষ্টসভ্য যে তাদের হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা দেয়া চলে?’ আমার তো মনে হয়, আমরা তার উত্তরটা হাতে-নাতে পেয়ে গিয়েছি। গত ক-দিনে আমাদের যা অভিজ্ঞতা হয়েছে, বিশেষত আজ যে মোক্ষম অভিজ্ঞতা হ’লো, আমার তো মনে হয় সেটাই যথেষ্ট।’

    এ-রকমভাবে কোণঠাশা হ’য়ে মঁসিয় বারজাক যেন দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়েই ঘুরে দাঁড়াতে চেয়েছেন। কী-একটা বলবার জন্যে মুখ খুলতে যেতেই, তাঁকে থামিয়ে দিয়ে মাদমোয়াজেল মোর্‌নাস ব’লে উঠেছেন : ‘মঁসিয় বোদ্রিয়ের ভারি-তাজ্জব কথা বলছেন –যেন একটা সোয়ালো দেখেই বোঝা যায় এ-কোন্ মরশুম। সেই-যে এক ইংরেজ একবার ক্যালে বন্দরে একজন লালচুলের ফরাশিকে নামতে দেখে বলেছিলো, সব ফরাশিরই লালচুলই হয়, সে যেমন একজনকে দেখেই গোটা জাতটা তুলে কথা বলেছিলো এ যেন সেইরকম। যেন ইওরোপে কখনও খুনজখম রাহাজানি হয় না—যেন ইওরোপের লোক ভাজামাছটাও উলটে খেতে জানে না!’

    মঁসিয় বারজাক প্রচণ্ড জোরে মাথা দুলিয়ে এ-কথায় সায় দিয়েছেন। তাঁর জিভটা যেন একটা বক্তৃতা দেবার জন্যেই চুলবুল করছিলো। ‘ঠিক বলেছেন! একেবারে খাঁটি কথা! কিন্তু, মহোদয়গণ, আরেকটা কথাও আমাদের বিবেচনা ক’রে দেখতে হবে। এটা কি আদৌ ভাবা যায় যে প্রজাতন্ত্রের প্রতিনিধিরা, এক বৈপ্লবিক সংস্কারের চৌকাঠে গিয়ে না-পৌঁছেই…’

    বেড়ে গেলেন কিন্তু মঁসিয় বারজাক, চমৎকার!

    ‘না-পৌঁছেই, গোড়াতেই, বাচ্চাদের মতো ভয় পেয়ে গিয়ে হুড়মুড় ক’রে পালাবে? না, মহোদয়গণ, না। ফরাশি ঝাণ্ডা কাঁধে ক’রে ব’য়ে যাবার সম্মান যাদের ওপর ন্যস্ত হয়েছে তারা ডরপোক নয়, তাদের বিস্তর-কাণ্ডজ্ঞান আছে, দুর্জয় সাহস আছে, বলীয়ান পণ আছে—তারা কিছুতেই পিছু হঠবে না। বরং তারা ভালো ক’রেই জানে এমন কাজে কী সাংঘাতিক ঝুঁকি আছে, আর সব বিপদের কথা জানে ব’লেই, চোখের পাতা না-ফেলেই, সরাসরি তার মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়াবে তারা-সুপ্রস্তুত। সভ্যতার এই অগ্রদূতেরা…’

    বাহবা! কী-একখানা বক্তৃতা, আর কী-একখানা সময়ে তা অনর্গল নিঃসৃত হচ্ছে!

    ‘সভ্যতার এই অগ্রদূতেরা আহাম্মক নয়—তারা বিলক্ষণ সব বিবেচনা ক’রে দেখতে পারে, তারা একটামাত্র জিনিশ দেখেই সমস্তকিছু সম্বন্ধেই কোনো মন্তব্য ক’রে বসে না, তারা তো আর ঝাড়ুদার নয় যে ঝেঁটিয়ে যাবে সব, এত-বড়ো একটা মহাদেশ সম্বন্ধে একটা ঘটনা থেকেই স্বকপোলকল্পিত সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাবে! তার ওপর যে -সম্ভাবনাটার কথা আমরা শুনেছি, আমরা এখনও তা সত্যি কি না, যাচাই ক’রে দেখিনি। আমার পূর্ববর্তী বক্তা চমৎকার বলেছেন….

    পূর্ববর্তী বক্তা তো মাদমোয়াজেল মোর্‌নাস। তিনি সুমধুর হাসলেন এ-কথা শুনে, এই পূর্ববর্তী বক্তা; আর এই কথার তোড় বন্ধ ক’রে দেবার জন্যে গুণমুগ্ধ ভঙ্গি ক’রে হাততালি দিয়ে তাঁকে থামিয়ে দিলেন, আমরাও তাঁর দৃষ্টান্ত অনুসরণ ক’রে চটাপট হাততালি দিয়েছি—শুধু মঁসিয় বোদ্রিয়ের বাদে। কিন্তু তাঁর কথা না-বললেও চলে।

    ‘তাহ’লে এই কথাই রইলো,’ হাততালির মধ্যেই মাদমোয়াজেল মোর্‌নাস ব’লে উঠেছেন : ‘এই সিদ্ধান্তই তবে পাকা। অভিযান চলবেই, মাঝপথে পিঠটান দেবে না। শুধু এটাই বলতে চাই যে শুভবুদ্ধি বলে, অহেতুক রক্তপাতে আমরা যেন জড়িয়ে না-পড়ি-তাহ’লে হয়তো তার বদলা নেবার জন্যে আরো অনেকে খেপে উঠবে। আমরা যদি কোনো জ্ঞানগম্যি ধরি, তাহ’লে আমাদের প্রথম লক্ষ্য হবে শান্তিপূর্ণভাবে যাবার চেষ্টা করা—কোনো গণ্ডগোল বা ঝামেলা না-পাকানোই উচিত হবে। অন্তত এটাই হ’লো কাপ্তেন মার্সেনের মত।

    ‘বেশ, কাপ্তেন মার্সেনের মত যদি তা-ই হয়,’ মঁসিয় বারজাক সায় দিয়েছেন বটে, কিন্তু একটু যেন দ্বিধা থেকে গেছে কোথাও, পুরোটা যেন তাঁর মনঃপূত হয়নি।

    ‘অনুগ্রহ ক’রে বিদ্রূপ করবেন না, মঁসিয় বারজাক,’ মাদমোয়াজেল মোর্‌নাস বলেছেন, ‘আপনার বরং উচিত কাপ্তেনকে খুঁজে বার ক’রে তাঁর হাতে হাত মেলানো, তাঁকে সাহায্য করা। আপনিই তাঁকে ধমক দিয়েছেন, মঁসিয় বারজাক, আপনারই উচিত সন্ধির প্রস্তাব নিয়ে তাঁর কাছে যাওয়া। মনে রাখবেন, আমরা হয়তো আমাদের জীবনের জন্যে তাঁরই কাছে ঋণী হ’য়ে আছি।’

    মঁসিয়ে বারজাক মাথাগরম ক’রে ফ্যালেন বটে একটুতেই, তবে মানুষটা আসলে তিনি ভালোই। এ-রকম একটা নতিস্বীকার করতে হবে ভেবে তিনি একটু দোনোমনাই করেছেন প্রথমে, তারপর কাপ্তেন মার্সেনের খোঁজে চ’লে গিয়েছেন। কাপ্তেন মার্সেনে ততক্ষণে শিবিরের চারপাশে কড়াপাহারা বসাবার সব-ব্যবস্থা পাকা ক’রে ফেলেছেন।

    ‘একটা কথা বলবো, কাপ্তেন?’

    ‘হুকুম করুন, মঁসিয় ল্য দেপুতে,’ একটু আড়ষ্টভাবে সামরিক কেতায় বলেছেন কাপ্তেন মার্সেনে।

    ‘কাপ্তেন,’ মঁসিয় বারজাক বলেছেন, ‘আমরা দুজনেই কিন্তু একটু আগে ভুল করেছিলুম, তবে আমি হয়তো একটু-বেশিই মাথাগরম ক’রে ফেলেছি। সেজন্যে আমি ক্ষমা চাচ্ছি। আসুন, হাতে হাত মেলান।

    বলতেই হয়, তাঁর বলবার ধরনে না-ছিলো কোনো বানানো ভাব, না-বা অহেতুক বিনয়! কাপ্তেন মার্সেনে একটু লজ্জিতই হ’য়ে পড়েন। ‘আরে আরে, এ-কী কথা! আমি তো এর মধ্যেই পুরো ঘটনাটা ভুলেই গিয়েছি।’

    তাঁরা দুজনে সাগ্রহে হাতে হাত মেলান, আর আমার মনে হয় আর-কোনো অভাবিত উৎপাত না-হ’লে এঁদের এই বন্ধুতায় আর কখনও কোনো চিড় ধরবে না।

    বারজাক-মার্সেনে দ্বন্দ্বযুদ্ধের এমন অমায়িক পরিণাম দেখে আমরা সবাই যে  যার সুরক্ষিত আশ্রয়ের খোঁজে চ’লে গিয়েছি। আমার তাঁবুটায় ঢুকতে যাবো, দেখি—যেমন তাঁর ধরন-মসিয় দ্য সাঁৎ-বেরা তাঁবুতে নেই। পই-পই ক’রে বারণ ক’রে দেয়া সত্ত্বেও কি ইনি আবার শিবিরের বাইরে চ’লে গেলেন?

    আমার সঙ্গীদের কিছু না-ব’লেই আমি তাঁর খোঁজে বেরিয়ে পড়েছি। হঠাৎ তাঁদের পরিচারক তোঙ্গানের সঙ্গে দেখা। আমাকে দেখেই সে ব’লে উঠেছে ‘মাসা অজেনরের সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন? আস্তে-আস্তে পা ফেলে আসুন- কোনো শব্দ যেন না-হয়। ঐ দেখুন, লুকিয়ে আছেন! মাসা ভারি মজার মানুষ!’

    পাহারার সারের বাইরে খুদে একটা সোঁতার কিনারে আমাকে নিয়ে গেছে তোঙ্গানে, সেখানে, দেখি, একটা বেওবাব গাছের আড়ালে, লুকিয়ে আছেন মসিয় দ্য সাঁৎ-বেরা। তাঁকে খুবই ব্যস্ত দেখাচ্ছে, হাতে কী-একটা জীব ধ’রে আছেন, দূর থেকে তা আমি স্পষ্ট দেখতে পাইনি

    ‘এতোরি পাকড়েছেন,’ তোঙ্গানে বলেছে আমায়। এতোরি মানে ব্যাঙ, অর্থাৎ ভেক, অর্থাৎ দাদুরী।

    সাঁৎ-বেরা ব্যাঙটার মুখ খুলে তার মুখের মধ্যে একটা দু-দিকে-ধার লোহার শিক ঢুকিয়ে দিচ্ছেন। শিকটার মাঝখানে একটা টোনসুতো বাঁধা, তিনি সুতোটার অন্যদিকটা হাতে ধরে আছেন। আজব কাণ্ডটা হ’লো এই কর্মটি করার সময় সাঁৎ-বেরার ঘন-ঘন মর্মভেদী দীর্ঘশ্বাস পড়ছিলো, যেন নিদারুণ মনোকষ্টে তাঁর বুকটা ফেটে যাচ্ছে, কিন্তু তার যে কী-কারণ হ’তে পারে, তা আমি ভেবেই পাইনি। তবে হেঁয়ালিটার চাবিটা সম্ভবত আবিষকার করে ফেলতে পেরেছি। মনোকষ্টের কারণ আর-কিছু নয়, এই-যে বেচারা দাদুরীটিকে তিনি বর্বরভাবে যন্ত্রণা দিচ্ছেন সেটাই। যখন মাছধরার নেশা তাঁর কাণ্ডজ্ঞান ভুলিয়ে দেয়, তখনও তাঁর কোমল হৃদয় ব্যথিত হ’য়ে বিদ্রোহ ক’রে ওঠে। ব্যাঙটাকে তীরে ঘাসের ওপর, রেখে তিনি গুঁড়ি মেরে বসেন একটা গাছের আড়ালে –হাতে একটা মোটা লাঠি—তারপর অপেক্ষা ক’রে থাকেন। আমরাও তা-ই করি।

    তবে খুব-বেশিক্ষণ আর অপেক্ষা করতে হয়নি আমাদের। তক্ষুনি কিম্ভূত- কিমাকার একটা জীবের আবির্ভাব হয়, মস্ত-একটা গিরগিটির মতো দেখতে।

    ‘দেখছেন তো?’ ফিশফিশ ক’রে বলে তোঙ্গানে। ‘ভারি ভালোজাতের গুয়েউলে তাপে।’

    ‘বড়োমুখ?’ ডাক্তার আমাকে কালকেই বলেছেন সে হ’লো বিশেষজাতের ইগুয়ানা।

    বড়োমুখ ব্যাঙটাকে গিলে ফ্যালে, তারপর ফের জলে নেমে যাবার চেষ্টা করে। দড়িটায় বাঁধা প’ড়ে গেছে টের পেয়ে সে ছটফট করে, আর অমনি— সে যত আছড়ায় –লোহার ধারালো শিকটা তার গায়ে গেঁথে যায়। এবার বাছাধন আটকা পড়ে গেছে! সাঁৎ-বেরা, জীবটাকে নিজের দিকে টেনে আনেন আর লাঠিটা ওঠান।

    আরে, ব্যাপার কী? লাঠিটা আস্তে শিথিলভাবে প’ড়ে যায়, আর সাঁৎ-বেরা গুঙিয়ে ওঠেন…একবার, দু-বার, তিনবার লাঠিটা ওঠে মারাত্মক ভঙ্গিতে, কিন্তু একবার, দু-বার, তিনবার—তিনবারই সেটা শিথিলভাবে আলগোছে পড়ে, আর সঙ্গে পড়ে বুকভাঙা দীর্ঘনিশ্বাস।

    তোঙ্গানে এবার ধৈর্য হারিয়ে ফ্যালে। সে লাফিয়ে বেরোয় তার লুকোবার আস্তানা থেকে, আর সে-ই গিয়ে লাঠিটার এক প্রচণ্ড ঘায়ে তার প্রভুর দোলাচলের অবসান ঘটিয়ে দেয়—খতম ক’রে দেয় বড়োমুখকেও; তার যে এমন নাম কেন, তা-ই বোঝা দায়।

    সাঁৎ-বেরা আরেকটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন, তবে সেটা পরিতুষ্ট ভঙ্গিতে। তোঙ্গ ানে এর মধ্যেই ইগুয়ানাটিকে তুলে ফেলেছে মাটি থেকে। ‘কাল,’ সে জানিয়ে দেয় আমাদের, ‘কাল আমরা গুয়েউলে-তাপে খাবো। খেতে ভারি ভালো।’

    এবং, সত্যিই, ‘খুবই ভালো’ ছিলো।

    ষোলোই ডিসেম্বর আমরা ভোর-ভোর রওনা হ’য়ে পড়েছি। গ্রামটার পাশ দিয়েই এগিয়েছি আমরা, দেখেছি অত ভোরে দু-চারজন ছাড়া গাঁয়ের কেউই ঘুম থেকে ওঠেনি। সেই ধাড়ি বদমায়েশ, পালের গোদা, দোলা সারোন টেরিয়ে- টেরিয়ে তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখেছে আমরা সবাই সার বেঁধে পাশ দিয়ে চ’লে যাচ্ছি, আর বিদঘুটে-সব ভয়াবহ অঙ্গভঙ্গি করেছে তখন।

    নটার একটু আগে পায়ে-চলার পথ গিয়ে শেষ হয়েছে একটা নদীতে, যথারীতি পালে-পালে জলহস্তী আর বিকট-সব কুমির ভেসে বেড়াচ্ছে জলে। নদী পেরুবার সময় আমাদের সবাইকেই হুঁশিয়ার থাকতে হয়েছে। আমি খেয়াল ক’রে দেখি আগে কখনও আমরা এতটা সাবধানে এভাবে নদী পেরুইনি। হয় আমরা সাঁকো পেয়েছি, আর নয়তো জল এত-কম থেকেছে ঘোড়ার ক্ষুরও ভালো ক’রে সেই জলে ডোবেনি। এবার ব্যাপারটা একেবারেই অন্যরকম : এবার সামনে আছে দস্তুরমতো একটা নদী – সত্যিকার নদী। তবে যতটা ভেবেছি, ততটা জল ছিলো না; ঘোড়াগুলোর পাশ ছাড়িয়ে জল ওঠেনি, আর আমরা বিশেষ-কোনো মুশকিল বিনাই নদীটা পেরিয়ে যেতে পেরেছি।

    কিন্তু গাধাগুলোর বেলায় অতটা সহজ হয়নি। পিঠে বোঝা চাপানো, জবুথবু, গাধাগুলো নদীর পারে এসে সব ক-টা একসঙ্গে থেমে পড়েছে। সহিসরা তাদের মিথ্যেই তাড়া দিয়েছে, খুঁচিয়েছে, ওসকাতে চেয়েছে, কিন্তু তাদের কোনো তারতম্য নেই—তারা নট নড়নচড়ন ঠায় দাঁড়িয়ে থেকেছে, লাঠি দিয়ে খুঁচিয়েও কোনো লাভ হয়নি।

    ‘ওহ্, এতক্ষণে বুঝতে পেরেছি!’ সহিসদের একজন মন্তব্য করেছে, ‘এরা সদ্ধর্মে দীক্ষিত হ’তে চাইছে!’

    ‘হ্যাঁ-হ্যাঁ, গায়ে জল ছিটিয়ে দীক্ষা দিয়ে দাও!’

    প্রত্যেকেই তারপর আঁজলা ক’রে জল এনে জানোয়ারগুলোর মাথায় ঢেলে দিয়েছে, সাথে-সাথে কী-সব দুর্বোধ্য বুলি আউড়েছে।

    ‘স্মরণাতীত কাল থেকে এ-অঞ্চলে এই রীতি চ’লে আসছে,’ মঁসিয় তসাঁ আমাদের বুঝিয়ে বলেছেন। ‘প্রথম যেখানে হাঁটুজলের বেশি পেরুতে হয়, নিয়ম হ’লো আগে গাধাগুলোকে জল ছিটিয়ে দীক্ষা দিয়ে নিতে হবে—বাপ্তিস্ম আ-কি! দেখবেন, বাপ্তিস্ম শেষ হ’য়ে গেলেই এরা আর-কোনো গোল না-ক’রে চলতে শুরু করবে!’

    এবং একটুক্ষণ পরেই, সত্যি কিন্তু, গাধাগুলো তা-ই করেছে।

    তখন ছায়ার মধ্যে গরম হবে ৮৬° ডিগ্রি ফারেনহাইট। গাধাগুলো নিশ্চয়ই ভেবেছে ঠাণ্ডাজল গায়ে পড়লে ভালোই লাগবে, হয়তো জলে লাফঝাঁপ দিয়ে রীতিমতো স্নান সমাপন করতেই চেয়েছিলো—পুরোপুরি অবগাহন যাকে বলে। দু-তিনবার হেঁড়ে গলায় ডাক ছেড়ে, তারা জলে গিয়ে নেমেছে, বেশ ক’রে গড়াগড়ি খেয়েছে আর খুশির চোটে এতই নর্তনকুর্দন করেছে যে তাদের পিঠের বোঝাগুলোর বাঁধন আলগা হয়ে জলে ভেসে যেতে শুরু করেছে।

    টেনেই তুলতে হয়েছে তাদের, জল থেকে। সহিসরা কুঁড়ের বাদশাদের মতো ঢিলেঢালাভাবে মন্থর ভঙ্গিতে কাজ করছিলো। যদি-না কাপ্তেন মার্সেনের সেপাইশাস্ত্রী কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তো আমাদের আদ্ধেক লটবহর হয়তো ভেসেই যেতো-আমাদের রসদপত্র আমাদের উপহারসামগ্রী, আমাদের ব্যবসার উপকরণ,— সব-আর সেটা হ’তো এক অপূরণীয় ক্ষতি।

    মঁসিয় বারজাকের নাক থেকে তখন আগুন বেরুচ্ছে, অধীর হ’য়ে মেজাজ খারাপ ক’রে তিনি বাছা-বাছা ভাষায় প্রভঁসাল গালাগাল ছুঁড়ে দিতে লাগলেন অলস ঐ সব সহিসদের দিকে।

    মোরিলিরে তাঁর কাছে গিয়ে বলেছে : ‘মনি তিগুই [কম্যাণ্ডারসাহেব],’ মধুর স্বর তার, ‘অমন চ্যাঁচাবেন না।’

    চ্যাচাবো না!…যখন গাধাগুলো লক্ষ লক্ষ ফ্রাংকের মালপত্তর ডুবিয়ে ফেলতে চাচ্ছে!’

    ‘তাতে ফল হয় না,’ পথপ্রদর্শকটি বাৎলেছে, ‘আপনাকে মাথাঠাণ্ডা রাখতে হবে। জন্তুগুলো প’ড়ে গেলে, এখানকার লোকে নিজেদের মধ্যে কোন্দল করে কিন্তু আপনি ওদের মতো চ্যাঁচাবেন না। ওরা বড্ড-বাজেকথা বলে বটে, কিন্তু মন্দ লোক নয়। পরে, সকলেরই উপকার হবে।’

    আমি যা লিখে চলেছি এখানে, তা যথাযথ হ’লেও, আপনাদের হয়তো তেমন মনোরঞ্জন করবে না। তা যদি হয়, তো আমি নাচার। বারজাক মিশনের সঙ্গে বেরুবো বলে যখন ভেবেছি, তখন মাথায় ছিলো দুর্দান্ত একটা রোমাঞ্চকর ভ্রমণবৃত্তান্ত লিখবো, রগরগে আর রুদ্ধশ্বাস-এমন দুর্বার অভিযানের কাহিনী শোনাবো যে আপনাদের তাক লেগে যাবে ব’লেই ভেবেছি। আদিম অরণ্যের মধ্যে রহস্যময় সব ছায়ার আনাগোনা, প্রকৃতির সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই, বন্য জন্তুদের সঙ্গে মরণপণ যোঝাবুঝি, অগুনতি দস্যুদলের সঙ্গে ভয়ংকর সংঘাত— এইসমস্ত বিষয়ই ছিলো আমার মাথায়। এতদিনে কিন্তু আমার সব ঘোর কেটে গেছে—বিভ্রমের যাও বাকি আছে, তাও ঝেড়ে ফেলতে হবে আমায়। গভীর দুর্ভেদ্য বনানী মানে তো কিছু গাছপালা আর বেঁটেখাটো-সব ঝোপঝাড়। প্রকৃতি ঠাকরুন আমাদের নিয়ে মাথাই ঘামাননি, খামকা প্রচণ্ড-সব বাধা দিতে আসবেন কেন? আর জীবজন্তু? – হ্যাঁ, জলহস্ত্রী দেখেছি বটে, ভয়ানক-দেখতে কুমিরও-আর সংখ্যাতেও তারা নেহাৎ কম হবে না। তার সঙ্গে কিছু হরিণ, আর মাঝে-মাঝে চোখে পড়া হাতির কথাও না-হয় ব’লে দেয়া যায়। আর দস্যুরা মোটেই এসে চড়াও হয়নি, স্থানীয় লোকেরা মোটের ওপর সৌহাদ্যপূর্ণ ব্যবহারই করেছে—শুধু ধেড়ে বদমায়েশ দোলো সারোনের ব্যাপারটাই যা অন্যরকম। সত্যি-বলতে, ভারি- একঘেয়ে, বৈচিত্র্যহীন ভাবে আফ্রিকার অভ্যন্তরে এগিয়ে চলেছে বারজাক মিশন।

    এর মধ্যে দাউএরিকোর স্মৃতিই যা-একটু কেবল গোলমেলে। সেখান থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের প্রথমে চড়তে হয়েছে একটা টিলায়, তারপর আমরা নেমে এসেছি বাগারেইয়ায়-তিনকিসো উপত্যকায়। খুব-একটা উত্তেজক কিছু দেখতে পাইনি ‘বলেই বুঝি একসময় চোখে পড়েছে যে পেছনে না-থেকে ৎশুমুকি এখন সামনে এগিয়ে এসে মোরিলিরের পাশে-পাশে চলেছে। তাহ’লে কি তোঙ্গানের সঙ্গে কোনো ঝগড়া বাঁধিয়ে বসেছে নাকি ৎশুমুকি? সে আর মোরিলিরে -দুজনেই মুখে খই ফোটাচ্ছে, যেন কতকালের প্রাণের দোসর। তা যা-হয় হোক! ঝগড়াঝাঁটির বদলে গলাগলি ভাব হওয়াই অনেক ভালো!

    আর তোঙ্গানে? তাকে তো দেখে মনে হচ্ছে না তার সাথী তাকে ছেড়ে চ’লে-যাওয়ায় তেমন-একটা বিচলিত হয়েছে। কনভয়ের পেছনে সে বরং মলিকের সঙ্গেই এখন জমিয়ে ফেলেছে, আর বেশ প্রাণখুলেই চুটিয়ে কথাবার্তা বলছে দুজনে। এও তো ভালোই—যদি দুজনের মধ্যে ভাবভালোবাসা হ’য়ে যায়।

    বাগারেইয়া ছাড়িয়ে আবার আমরা ঝোপের মধ্যে এসে পড়েছি—ক্রমেই রুখুশুখু অনুর্বর জমিতে ঝোপগুলো আর নিবিড় থাকছে না—আর প্রতিদিনই তো আমরা বর্ষার মরশুম ছেড়ে দূরে চলে যাচ্ছি, তারপর আবার এসে পৌঁছেছি সমতলভূমিতে, আজ কানকান গিয়ে না-পৌঁছুনো অব্দি আর আমাদের সমভূমি ছেড়ে যেতে হয়নি।

    বাইশে, আমরা কুরুসায় দিজোলিবা পেরিয়ে এসেছি-আমাকে আশ্বস্ত ক’রে মঁসিয় তসাঁ জানিয়েছেন এইই হ’লো নাইজার; তবে কানকানেও দেখেছি বড়ো- একটা নদী, প্রথমটার দিকেই ছুটে চলেছে, উত্তরে তিরিশ মাইল এগিয়ে গিয়ে দুটো নদী মিলে গিয়ে একই জল হ’য়ে যাবে। এই-যে নদী, যাকে এরা মিলো ব’লে ডাকে, এরই বা তবে নাইজার নদীরই অংশ হ’তে বাধা কোথায়? মঁসিয় তসাঁ, একটু তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতেই আমার দিকে তাকিয়ে বলেছেন, উঁহু, এটা নাইজার নয়; তবে কেন নয়, সেটা তিনি আর খুলে বলেননি। এ-নদী, সে- নদী হোক বা না-হোক, তাতে আমার কী?

    আর অ্যাডভেনচার? জানতে চাচ্ছেন বুঝি, সে কোথায়? ন-দিন কেটে গেছে, অথচ কিচ্ছুটি ঘটেনি?

    না, ঘটেনি—যা ঘটেছে তা নেহাৎই-তুচ্ছ ব্যাপার!

    মিথ্যেই আমি আতশকাচের ঠুলি চোখে লাগিয়ে আমার নোটবইয়ের পাতায় চোখ বুলাই। শেষটায় মাত্র দুটি তথ্য খুঁজে পাই, যা হয়তো উল্লেখ করার যোগ্য। প্রথমটা নেহাৎই তুচ্ছ ব্যাপার। আর দ্বিতীয়টা? হ্যাঁ, ঐ দ্বিতীয়টা নিয়ে যে আমি কী ভাববো, কিছুতেই ভেবে-ভেবে তারই কুলকিনারা পাচ্ছি না।

    সংক্ষেপে তাহ’লে ব’লেই ফেলি প্রথমটা।

    দাউএরিকো ছাড়ার তিনদিন পরে, আমরা অনায়াসেই লুগানগুলের মধ্য দিয়ে চলেছি, বেশ-ভালো চষাজমি এইসব লুগানের, ফলনও হয়েছে, আর দেখে বোঝা গেছে আমরা একটা গাঁয়ের কাছে এসে পড়েছি—যখন তিনজন স্থানীয় লোক- কালা আদমিই – আমাদের দেখে ভয়ে আঁৎকে উঠে পাঁই-পাঁই করে ছুট লাগিয়েছে। আর যেতে-যেতে আর্তস্বরে খালি চেঁচিয়েছে মারফা! মারফা!’

    বাম্বারা ভাষায় মারুফা মানে বন্দুক। কিন্তু তাদের এই আতচীৎকারের কোনো মাথামুণ্ডুই আমরা বুঝতে পারিনি : কালা আদমিরা যাতে মিথ্যে ভয় না পায়, সেইজন্যে কাপ্তেন মার্সেনে আগেই তো বাংলেছেন, তাঁর সেপাইশাস্ত্রীরা সবাই যেন তাদের অস্ত্রশস্ত্র চামড়ার খাপে পুরে ফ্যালে-খাপগুলো এমন দেখতে বোঝা যায় না ভেতরে বন্দুক আছে, না অন্যকিছু আছে। কাজেই কোনো রাইফেলই তো কারু চোখে পড়ার কথা নয় তাহ’লে নিগ্রোরা হঠাৎ অমন ভয় পেয়ে পালালো কেন? যখন আমরা এই ধাঁধাটা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি আর কোনো থই পাচ্ছি না, এমন সময় আমরা শুনতে পেয়েছি ধাতব ঝনঝনানি, আর তারপরেই সাঁৎ- বেরার মুখ থেকে বিচ্ছিরি গালাগাল।

    ‘কী বদমায়েশ!’ খেপে একেবারে বোম সাঁৎ-বের্যা। ‘আমার ছিপ আর বঁড়শির বাক্সটায় নচ্ছারগুলো ঢিল ছুঁড়ছে। দেখুন একবার তাকিয়ে-সবগুলোই কেমন টোল খেয়ে গেছে! দাঁড়া, নচ্ছার, দাঁড়া-এক্ষুনি মজা দেখাচ্ছি তোদের!’

    হামলাবাজদের পেছনে তাড়া-ক’রে-যাওয়া থেকে অনেক হ্যাঙামা ক’রেই আমরা নিবৃত্ত করেছি তাঁকে—শেষটায় মাদমোয়াজেল মোর্‌নাস আসরে না-নামলে তাঁকে আর আটকানো যেতো না। তাঁর ঝকঝকে নিকেলের বাক্সটাকে রোদ্দুরে ঝিলিক দিয়ে উঠতে দেখে নিগ্রোরা ভেবেছে সেটা বুঝি কোনো রাইফেলের নল। সেইজন্যেই তাদের এমন ভয় আর অদ্ভুত আচরণ।

    আবার যদি এ-রকম ভুল বোঝে লোকে, আর আমাদের কোনো বিচ্ছিরি প্যাচের মধ্যে প’ড়ে যেতে হয়, এই কথা ভেবেই মঁসিয় বারজাক, মিনতি ক’রেই প্রায়, সাঁৎ-বেরাকে বলেছেন তাঁর এই অত্যুজ্জ্বল বাক্সটাকে গাধার পিঠে অন্যান্য মালপত্তরের মাঝখানে রাখতে। কিন্তু এই একগুঁয়ে মৎস্যশিকারীকে যুক্তি দিয়ে বোঝাবে কে? তিনি চেঁচিয়ে-মেচিয়ে জানিয়েছেন, তাঁর ছিপগুলো তাঁর সঙ্গছাড়া করতে জগতের কোনো শক্তিরই কোনো সাধ্য নেই। শেষটায় যাতে তাঁকে রাজি করানো গেছে, সেটা মন্দের ভালো একটা আপোষরফা : তাঁর ঝকঝকে দস্তার বাক্সটা তিনি কাপড় দিয়ে মুড়ে রাখতে রাজি হয়েছেন, যাতে আর রোদ্দুর প’ড়ে ওটা কারু চোখ ধাঁধিয়ে না-দেয় তার ঝিলিক-দেয়া প্রতিফলনে। সত্যি তাজ্জব মানুষ এই সাঁৎ-বেরা, এখন তিনি আমার বেশ ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

    অন্য ঘটনাটা ঘটেছে কান্কানে, আমরা সেখানে গিয়ে পৌঁছেছি প্রত্যাশিত সময়ের বারো ঘণ্টা পরে, তেইশে ডিসেম্বরের সকালবেলায়। দেরির কারণ? মোরিলিরেকে আবার কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না। বাইশে, আমরা যখন দ্বিতীয় দফায় রাস্তায় নামবো, হা কপাল!, কোথায় মোরিলিরে! আমরা তাকে সর্বত্র খুঁজেছি, চারপাশে তাবৎ খোঁজাখুঁজি কেবল মিথ্যে হয়রানিই হয়েছে, তার কোনো পাত্তাই নেই, অতএব বাধ্য হ’য়ে আমাদের তার জন্যে সবুর করতে হয়েছে।

    পরদিন, ভোর ফোটবার আগেই, ফের সে যথারীতি আপন স্থানে, যাত্রার জন্যে তৈরি, যেন কিছুই হয়নি। এবার সে তার অনুপস্থিতিটি আর অস্বীকার করতে পারেনি। সে কাঁচুমাচু মুখ ক’রে জানিয়েছে তাকে নাকি আগের ছাউনিটায় ফিরে যেতে হয়েছিলো, ভুল ক’রে কাপ্তেন মার্সেনের মানচিত্রগুলো সে সেখানে ফেলে এসেছিলো ব’লে। কাপ্তেন তাকে আচ্ছা-ক’রে ধমক লাগিয়েছেন, আর এত-সব তিরস্কার-ভর্ৎসনার পর মনে হয়েছে ব্যাপারটার এখানেই ইতি হ’য়ে গেছে।

    আমি হয়তো এ-ব্যাপারটার উল্লেখই করতুম না, যদি-না সাঁৎ-বেরা তাঁর তাজ্জব কায়দায় ব্যাপারটাকে আরো-গুরুতর ব’লে দেখাতে না-চাইতেন। সে- রাত্তিরে চোখে ঘুম আসছিলো না ব’লে তিনি নাকি উঠে পড়েছিলেন—আর ঠিক তখনই আমাদের গাইড শিবিরে ফিরে এসেছিলো। তারপর, খুব রহস্যময়ভাবে, চোখদুটো আরো-ঠিকরে বের করে বিস্ফারিত ভঙ্গি ক’রে, মোরিলিরে নাকি পশ্চিম থেকেও ফেরেনি, এবং কাপ্তেন মার্সেনের তাঁবুতেও যায়নি বরং এসেছে পুব থেকে, কান্কানের দিক থেকে, আমরা যেদিকটায় চলেছি; অতএব কিছুই সে ভুলে ফেলে রেখে আসেনি, এবং সে-সব সে খুঁজতেও যায়নি, বরং ডাহা মিথ্যেকথা বলেছে।

    কথাটা অন্য-কেউ বললে হয়তো এটা নিয়ে ভাবতো সবাই। কিন্তু, ওঃ, সাঁৎ- বেরা বলেছেন! তবে আর কী। যা ভুলোমন তার—উত্তর-দক্ষিণ পুব-পশ্চিম কাকে বলে সে-সম্বন্ধে তাঁর কি কোনো খেয়াল আছে?

    হ্যাঁ, যা বলছিলুম। বলেছি যে অন্য ঘটনাটা ঘটেছিলো কান্কানে। আমরা যখন হাঁটতে বেরিয়েছি—মাদমোয়াজেল মোর্‌নাস, মঁসিয় বারজাক, সাঁৎ-বেরা আর আমি এবং ৎশুমুকি আর মোরিলিরে আমাদের সব দেখাতে-দেখাতে চলেছে…

    দেখুন কাণ্ড! আমারও বোধহয় সাঁৎ-বেরার রোগে ধরেছে। স্পষ্ট ক’রে কিছুই গুছিয়ে বলতে পারছি না, পারম্পর্যটাই রক্ষা করা হয়নি, অতএব আমাকে একটু পেছিয়েই যেতে হবে।

    তবে জেনে রাখুন, গত ক-দিন ধ’রেই, মোরিলিরে প্রায় আমাদের কানের পোকা বের ক’রে ছেড়েছিলো সারাক্ষণ কেবল গুণকীর্তন করেছে কোনো ওঝার- না, ঠিক ওঝা নয়, একজন কেনিয়েলালাব (ভাবী-কথক, জ্যোতিষী,) সে নাকি কান্কানে থাকে। তার মতে এই কেনিয়েলালার নাকি চমকপ্রদ দিব্যদৃষ্টি আছে, আর বারে-বারেই আমাদের হাতে-পায়ে ধরেছে একবার তাঁর কাছে গিয়ে আমরা যেন ভবিষ্যৎ জেনে আসি। বলাই…বাহুল্য, আমরা সবাই তাকে একবাক্যে হাঁকিয়ে দিয়েছি। আমরা এই অ্যাদ্দুরে, আফ্রিকার অভ্যন্তরে, কোনো গণৎকারের সন্ধানে আসিনি- তা তাঁর দিব্যদৃষ্টি যত দূরেই দেখতে পাক না কেন।

    কিন্তু, আমরা যখন কান্কানে ঘুরতে বেরিয়েছি, আর ৎশুমুকি আর মোরিলিরে সব দেখাতে-দেখাতে চলেছে, হঠাৎ তারা একটা কুঁড়েঘরের সামনে এসে থমকে দাঁড়িয়ে গেছে—যেন তাদের পাগুলো কেউ ওখানেই পুঁতে দিয়েছে। কুঁড়েঘরটা অন্য-সব কুঁড়েঘরের চাইতে আলাদা নয় একটুও। দৈবাৎ নাকি—এই দৈব বোধহয় তাদের পায়ে-পায়েই চলে-আমরা নাকি সেই আশ্চর্য কেনিয়ালালার বাড়ির সামনে এসে হাজির হয়েছি। আবারও তারা আমাদের পরামর্শ দিয়েছে তাঁকে এবার দর্শন ক’রে আসতে। এবং আবারও আমরা সে-প্রস্তাবে রাজি হইনি। কিন্তু তারা কোনো মানা শুনলে তো! আবার তারা এই গুণিন—না গণৎকার—তা সে যেই হোক না কেন, তার গুণকীর্তন শুরু ক’রে দিয়েছে।

    আমরা কেনিয়ালালার কাছে যাই বা না-যাই তবে মোরিলিরেরই বা কী— কিংবা তার জিগরি দোস্ত ৎশুমুকিরই বা কী? এই দেশের কায়দাকানুনও কি এতটাই উন্নতি ক’রে বসেছে যে কেনিয়ালালাব কাছে আমাদের নিয়ে গেলে দালালি পাবে?

    আমরা যতই গররাজি হই, তাদের উৎসাহ কিন্তু মোটেই কমে না। শেষটায় এমন ঝোলাঝুলি করতে লাগলো যে ‘অগত্যা’ ব’লে আমরা রাজি হ’য়ে গেছি, তাতে যদি অশান্তিটা একটু কমে। আমরা গেলে হয়তো কেনিয়ালালার খাতির বেড়ে যাবে, এরা দুজনেও কিঞ্চিৎ দালালি পাবে-আর এ-তো নেহাৎই কয়েকটা কানাকড়ির মামলা।

    আমরা একটা কুঁড়েঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ি, যাচ্ছেতাই নোংরা, ঠিক যেন একটা আঁস্তাকুড়, শুধু একটা ঘুলঘুলি দিয়ে ক্ষীণ-একটু আলো এসে ঢুকছে ভেতরে। খোদ কেনিয়ালালা দাঁড়িয়ে আছে ঘরের ঠিক মাঝখানে। পাঁচ মিনিট ধ’রে নিজের ঊরু থাবড়ে সে আউড়েছে ইতি-তিলি অর্থাৎ ‘শুভমধ্যাহ্ন,’ কারণ তখন ঠিক দুপুরবেলাই বটে, তারপর একটা চাটাইয়ের ওপর ব’সে প’ড়ে আমাদের অমনি ব’সে পড়তে বলেছে।

    সে শুরু করে নিজের সামনে খুব-মিহি একরাশি বালি জড়ো ক’রে ঢিবি বানিয়ে, তারপরে একটা ঝাঁটা দিয়ে সেটা সে দু-দিকে ছড়িয়ে দেয় পাখার মতো। তারপর আমাদের কাছে সে একডজন কোলা নাট চায়, ছটা লাল আর ছটা শাদা, তারপর সে ক্ষিপ্রহাতে সেগুলো ঘোরায় বালির ওপর, আর কী-যেন দুর্বোধ্য- সব হ-য-ব-র-ল আওড়ায়; তারপর বালির ওপর সে বেছায় তাদের নানারকম আকৃতিকে, কখনও গোল, কখনও চৌকো, কখনও রুহিতনের মতো, কখনও আবার আয়তাকার, তারপরেই ত্রিভুজ অথবা বর্গক্ষেত্র ইত্যাদি, আর বারে-বারে নানারকম মুদ্রা ক’রে সে তাদের ওপর তার হাত দিয়ে, যেন তাদের সে আশিস জানাচ্ছে। অবশেষে সে সেগুলো সাবধানে গুছিয়ে জড়ো ক’রে নেয়, আর তার নোংরা হাতটা পাতে আমাদের সামনে-আমরা তাকে নজরানা দিই, আমাদের জিজ্ঞাসার ফি।

    এবং, সত্যি, এখন তাকে কেবল আমাদের জিজ্ঞাসা করাই বাকি শুধু। তার ওপর যেন দৈবশক্তি এসে ভর করেছে। সে বকবক শুরু ক’রে দেয়।

    ঘুরে-ফিরে আমরা তাকে কতগুলো প্রশ্ন করি, আর সে চুপচাপ ব’সে-ব’সে মন দিয়ে তা শোনে। সব প্রশ্নের জবাবই সে একসঙ্গে দেবে, সে আমাদের জানায়। আমরা যখন কথা বলা শেষ করবো, তখনই তার কথা বলার পালা শুরু হবে। সে বেশদ্রুতস্বরেই সোজাসুজি কথা বলে, যেন সে নিশ্চিত জানে সে কী বলছে। খুব-একটা উৎফুল্ল হবার মতো কিছু বলেনি, এই আমাদের বুজুর্গ বাজিকর- দুর্দান্ত ভেলাকিবাজ! তার ওপর আমাদের যদি বিন্দুমাত্র আস্থা থাকতো,—যেটা আমাদের আদৌ ছিলো না—তবে সে-ঘর থেকে আমরা ভয়তরাস নিয়েই ফিরে আসতুম, উদ্বেগে আমাদের মুখচোখ শুকিয়ে যেতো।

    সে শুরু করে গোড়ায় আমাকে পেড়ে ফেলেই। আমি জিগেস করেছিলুম জগতে আমি যা সবচেয়ে-মূল্যবান ব’লে মনে করি—অর্থাৎ আপনাদের যে-সব নিবন্ধ লিখে পাঠাচ্ছি—সেগুলোর গতি কী হবে। ‘শিগগিরই,’ বিদঘুটে একটা ভঙ্গি ক’রে এই বুজুর্গ আমায় তার ভাষায় বলে, আর আমি সেগুলো তর্জমা ক’রে দিচ্ছি : ‘শিগগিরই আর-কেউই তোমার কোনো হদিশ পাবে না—কোনো খবর না।

    তাহ’লে এই অশেষ-দুর্গতিভোগ আছে আমার কপালে! তবে এই ভেলকিবাজ তো বলেছে ‘শিগগিরই,’ অর্থাৎ এ-চিঠিটা নিশ্চয়ই আপনাদের কাছে পৌঁছে যাবে।

    কেনিয়ালালা তারপর পড়ে সাঁৎ-বেরাকে নিয়ে।

    ‘আপনি এমন-একটা চোটজখম পাবেন, সে ভবিষ্যদ্বাণী করে, ‘তাতে আপনার বসতে কষ্ট হবে।’

    আমি বঁড়শিগুলোর কথা ভাবি। এই জাদুগর একটু দেরি ক’রে ফেলেছে ভবিষ্যৎ বলতে গিয়ে—বুড়ো ধাপ্পাবাজ। তার মনটা অতীতে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যার ছায়ায় মোরিলিরে আর ৎশুমুকি নিশ্চয়ই আগেই একটু আলো ফেলে গেছে।

    এরপর মাদমোয়াজেল মোরনাসের পালা।

    আপনি হৃদয়ে আঘাত পাবেন,’ কেনিয়ালালা ঘোষণা করে।

    ও-হো!, খুব-আহাম্মক নয় তাহ’লে এই ধড়িবাজ লোকটা। লক্ষ ক’রে, দেখুন, সব কেমন ঝাপসা রেখেছে। স্পষ্ট ক’রে বলেনি, আঘাতটা শারীরিক না মানসিক হবে। আমার তো মনে হয় মাদমোয়াজেল যা আঘাত পাবেন তা মনেই। এবং আমার সন্দেহ একটু দৃঢ় হয় যে-আমাদের গাইডরা নিশ্চয়ই এখানে এসে খুব ক’রে কেচ্ছা গেয়ে গেছে। ভবিষ্যদ্বাণীটাকে আমি যে-অর্থে নিয়েছি, মাদ্‌মোয়াজেল মোর্‌নাসও নিশ্চয়ই সেই অর্থেই নিয়েছেন, কেননা দেখতে পাই তিনি একেবারে আরক্ত হ’য়ে উঠেছেন—যাকে বলে লজ্জারুণরাঙা। বাজি ধ’রে বলতে পারি, তিনি তখন কাপ্তেন মার্সেনের কথাই ভাবছিলেন।

    কিন্তু আমাদের জাদুগর বুজুর্গ যে চুপ মেরে গেছে! মঁসিয় বারজাকের দিকে কেমন একটা ক্রূর খলদৃষ্টিতে তাকায় সে। স্পষ্ট বুঝতে পারি, এখন আমরা সবচেয়ে ভয়ানক ভবিষ্যদ্বাণীটা শুনতে পাবো। সে ভবিষ্যদ্বাণী করে : ‘সিকাসোর ওপাশে, আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি একজন শাদামানুষ। এ তো দেখছি আপনাদের বরাতে হয় গোলামি, নয়তো মৃত্যু লেখা রয়েছে!’

    বাঃ, ভারি আমোদ জোগাতে পারে তো, এই আমাদের ধেড়ে-ঠাকুদ্দা!

    ‘শাদামানুষ?’ মাদ্‌মোয়াজেল মোর্‌নাস আউড়েছেন কথাটা। ‘কালা-আদমির কথা বলছো তুমি?’

    ‘আমি বলেছি, ‘শাদামানুষ’-শ্বেতাঙ্গ,’ অমনি দিব্যদৃষ্টিধারী কেনিয়ালালার ঘোষণা আসে, ‘সিকাসোর পরে আর যাবেন না, খবরদার। গেলেই–হয় গোলামি, নয় মৃত্যু!

    বাহুল্য হবে বলা যে আমরা হুঁশিয়ারিটাকে হালকাভাবেই নিই, লঘুচালে। সে- কোন কথকগায়ক যে আমাদের ফরাশি পাঠক বিশ্বাস করবে, যে ব’লে বসে যে একজন শ্বেতাঙ্গ এতই শক্তিমান যে আমাদের মতো এত-বড়ো এক বাহিনীটিকে ঘায়েল ক’রে দেবে?

    সেদিন সন্ধেবেলায়, এই গল্পটা নিয়ে আমরা হাসাহাসি করি—কেননা, সত্যি বলতে, এটা তো একটা গল্পই, ভারি-মজার গল্প। একটু ভীরু-মতো হ’লে কী হবে, এমনকী মঁসিয় বোদ্রিয়েরও সব শুনে-টুনে আমাদের হাসিরাশিতে যোগ দিয়ে বসেন—হাসেন না ঠিক, তবে তাঁর আননে ভয়তরাসও দেখা যায় না। তারপর পুরো গল্পটাকেই আমরা মন থেকে উড়িয়ে দিই।

    কিন্তু আজ সন্ধেয় আবার ব্যাপারটা আমার মনে প’ড়ে যাচ্ছে—যখন শুতে গিয়েছি তাঁবুতে। বেশ একটু মাথাই ঘামিয়েছি ব্যাপারটা নিয়ে, আর তারপর এমন-একটা সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছেছি যে…যেটা…কিন্তু আপনারা নিজেরাই বিচার ক’রে দেখুন ব্যাপারটা হেসে উড়িয়ে দেবার মতো কি না।

    প্রথমে সমস্যাটাকে গুছিয়ে নেয়া যাক।

    তথ্য আছে সবশুদ্ধ আড়াইখানা।

    ঐ আধখানা তথ্য হ’লো তিম্বোতে মোরিলিয়ের আকস্মিক অন্তর্ধান, আর তারপর আবার কান্কান আসার ঠিক-আগটায়-তার উধাও হ’য়ে-যাওয়া।

    অন্য-দুটো তথ্য হ’লো দুং-কোনো বিষ দিয়ে আমাদের খতম ক’রে দেবার ব্যর্থ চেষ্টা—এবং এই বুজুর্গ ভেলকিবাজের ভয়দেখানো ভবিষ্যদ্বাণী।

    এবার এই আড়াইখানা তথ্যকে একটু ঝাঁকিয়ে দেখা যাক।

    প্রথম তথ্য : এটা কি বিশ্বাসযোগ্য যে নগণ্য একটা গাঁয়ের মোড়ল দুশোজন সশস্ত্র সেপাই সমেত একটা আস্ত অভিযানবাহিনীকে ঘায়েল ক’রে দেবার উন্মাদ ষড়যন্ত্র করবে—বিশেষত যে-অঞ্চলটায় আমাদের সামরিক ব্যারাক আছে—তিম্বো থেকে পঁচিশ মাইল দূরে—যেখানে এমনকী একটা গড় পর্যন্ত বানিয়ে রেখেছে ফরাশি সেনাবাহিনী? না, এটা একেবারেই অবিশ্বাস্য। উঁহু, কিছুতেই এমন-কোনো ষড়যন্ত্রের কথা ভাবা যায় না।

    দ্বিতীয় তথ্য : এও কি বিশ্বাসযোগ্য যে ঐ ধান্দাবাজ কেনিয়ালালাব ভবিষ্যৎ প’ড়ে নেবার মতো অলৌকিক কোনো শক্তি আছে—কোনো অতিপ্রাকৃত দৈবায়ত্ত ক্ষমতা? না, তার যে এমন-কোনো ক্ষমতা নেই, সেটা সুনিশ্চিত।

    কিন্তু দুং-কোনোব ব্যাপারটাও মোটেই বিশ্বাসযোগ্য নয়-কেউ, মাথাখারাপ হ’য়ে না-গেলে, এমন-কোনো ষড়যন্ত্র পাকাবেই না। তার মানে, এটা একটা সাজানো ব্যাপার, ধাপ্পা, এমনভাবে সাজানো হয়েছে যে আমরা যেন সেটা বিশ্বাস ক’রে দারুণ ভড়কে যাই।

    তেমনি, এই কেনিয়ালালাও আগে যা-খুশি তা-ই ব’লে গেছে, অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়েছে, কোনো-কিছুই এতটা সুনিশ্চিতভাবে বলেনি যতটা দৃঢ়তা নিয়ে আস্থার সঙ্গে ঘোষণা করেছে : সিকাসো পেরুলেই, দাসত্ব অথবা মৃত্যু!

    সিদ্ধান্তটা তাহ’লে ক’রে ফেলতেই হয় : কেউ-একজন আমাদের ভয় দেখাতে চাচ্ছে।

    কে বা কারা? কেন? আপনারাই ভেবে বলুন।

    কে? সে-সম্বন্ধে আমার অন্তত ন্যূনতম ধারণাও নেই।

    কেন? উদ্দেশ্যটা তো পরিষ্কার; আমরা যাতে অভিযানটা মুলতুবি রেখে ভয়ে ভয়ে ফিরে যাই। কারু পক্ষে আমরা নিশ্চয়ই নিজেদের অজান্তেই বিষম বিপজ্জনক হ’য়ে উঠেছি। কেউ একজন চায় না যে সিকাসো পেরিয়ে আমরা আরো-ভেতরে চ’লে যাই।

    আর মোরিলিরে সংক্রান্ত ঐ আধখানা তথ্য? হয় সেটা নেহাৎ‍ই কাকতাল, তার পেছনে কোনো গূঢ় অভিসন্ধি নেই, সাঁৎ-বেরার যা ভুলোমন, তিনি যে কী দেখতে কী দেখেছেন, কে জানে। আর নয়তো, মোরিলিরে নিজেই তাদেরই দলের লোক, যারা আমাদের অমন ক’রে ভয় দেখাতে চাচ্ছে। কেনিয়ালালার কাছে আমাদের নিয়ে যাবার জন্যে তার অমন ব্যগ্রতা দেখে অবশ্য সেই সন্দেহটাই হয়। এমনও হ’তে পারে যে আমাদের ভয় দেখাবার জন্যেই তাকে কেউ ভাড়া করেছে। অন্তত এই-একটা ব্যাপার আমাদের তদন্ত ক’রে দেখতে হবে।

    আমার তো এমনই মনে হয়। একমাত্র ভবিষ্যৎই জানে, এ আমার রজ্জুতে সর্পভ্রম কি না। দেখা যাক : ভবিষ্যৎ কী বলে।

    আমাদে ফ্লরেঁস

    পুনশ্চ : ঝোপেব মধ্যে, কাকান থেকে একদিনের পথ দূরে, ২৬শে ডিসেম্বর।

    আগের দিনের চিঠির সঙ্গে এই পুনশ্চটাও জুড়ে দেয়া উচিত। ৎশুমুকি কথা দিয়েছে সে এটা আপনাদের কাছে পাঠিয়ে দেবার ব্যবস্থা করবে।

    কাল রাতে যা ঘটেছে, সেটা অত্যন্ত-অস্বাভাবিক ব্যাপার। যেমন ঘটেছে, তেমনই বলবো আমি। ব্যাখ্যা করার কোনো চেষ্টাই করবো না।

    আমরা কান্কান ছেড়েছি কাল সকালে, দুই দফায় লম্বাপথ পাড়ি দিয়েছি আমরা, সবশুদ্ধু কুড়িমাইল হবে, তারপর তাঁবু ফেলেছি একটা খোলামাঠে। এদিকটায় লোকজন তেমন থাকে না। শেষ যে-গ্রামটা আমরা পেরিয়ে এসেছি, দিয়াঙ্গনা, সেটা আমাদের বারোমাইল পেছনে প’ড়ে আছে—আর পরের গ্রামটা এখান থেকে তিরিশমাইল দূরে, সিকাসো।

    যেমন রোজ হয়, তেমনিভাবেই শিবিরের লোকজন ঘুমুতে গেছে।

    নিশুত রাত্রে আমরা হঠাৎ একটা অদ্ভুত আওয়াজ শুনে ধড়মড় ক’রে জেগে উঠেছি। কীসের আওয়াজ, আমরা কেউই বুঝতে পারিনি। একটা গুমগুমে গর্জন, অনেকটা যেন বাষ্পেচলা এনজিনের আওয়াজ; কিংবা হয়তো আরো-লাগসই হয়, যদি বলা যায় যে আওয়াজটা শুনে মনে হচ্ছিলো একসঙ্গে যেন হাজারটা পতঙ্গ গুঞ্জন ক’রে উঠেছে, না, ঐ ছোটোখাটো পতঙ্গ নয়—অতিকায়-সব পতঙ্গের আওয়াজ, একেকটা পতঙ্গ যেন হাতির মতো, আর মত্ত মাতঙ্গের মতোই যেন পতঙ্গগুলো বৃংহন ছাড়ছে।

    শাস্ত্রীদের জিগেস ক’রে জানা গেলো, এই বিদঘুটে গর্জনটা পশ্চিমদিক থেকেই শুরু হয়েছে আচমকা। প্রথমে ক্ষীণ ছিলো শব্দটা, ক্রমশ জোরালো হ’য়ে উঠেছে। আমরা যখন হুড়মুড় ক’রে তাঁবু থেকে বেরিয়েছি তখন আওয়াজটা যেন চরমে পৌঁছেছে : আজব ব্যাপার হ’লো মনে হচ্ছিলো আওয়াজটা যেন ওপর থেকে আসছে, হাওয়ায় ভেসে আসছে-আকাশ থেকে। যে-ই এই আওয়াজ করুক না কেন, সে আছে ঠিক আমাদের মাথার ওপরে। কিন্তু কী হ’তে পারে সে? মিথ্যেই আমরা চোখ রগড়ে আকাশের দিকে তাকিয়েছি। কিছুই ঠাহর হয়নি। অন্ধকারে কিছুই দেখবার জো ছিলো না। ঘন-মেঘ ঢেকে রেখেছে চাঁদ, রাত্তিরটা যেন ঘুটঘুটে-কালো, একটা তারাও দেখা যাচ্ছে না মেঘের জন্যে।

    যখন আমরা চোখ বিস্ফারিত ক’রে অন্ধকার ফুঁড়ে তাকাবার ব্যর্থ চেষ্টা করছি, আওয়াজটা মাথার ওপর থেকে পুবদিকে চ’লে গেছে, তারপর আস্তে-আস্তে মিলিয়ে গেছে, একটা থমথমে স্তব্ধতা নেমে এসেছে তারপর… কিন্তু আওয়াজটা পুরোপুরি মিলিয়ে যাবার আগেই, আবার শুনতে পাই আওয়াজটা ফের পশ্চিমদিক থেকে এগিয়ে আসছে। আগের বারের মতো এবারও আওয়াজটা ক্রমেই বেড়ে গিয়েছে, তারপর চরমে পৌঁছেছে—প্রায় ভোঁ-ভোঁ করেছে কানে, তারপর ফের পুবদিকে মিলিয়ে গেছে।

    আস্ত শিবিরটাই আতঙ্কে থরথর করেছে। কালো লোক যত ছিলো, সবাই মাটিতে মুখ গুঁজে সাষ্টাঙ্গে উপুড় হ’য়ে শুয়ে পড়েছে। শ্বেতাঙ্গরা সবাই কাপ্তেন মার্সেনকে ঘিরে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ফ্যালফ্যাল ক’রে তাকিয়ে থেকেছে আকাশে, তাদের মধ্যে তোঙ্গানে আর ৎশুমুকিও ছিলো, সম্ভবত শাদাদের সঙ্গে মিশে-মিশে তারাও শাদাদেরই মতো হ’য়ে উঠেছে। মোরিলিরেকে কিন্তু কোখাও দেখতে পাইনি আমি। হয়তো সেও ওখানে অন্য কালোদের মতো মাটিতে মুখ গুঁজে উপুড় হ’য়ে শুয়ে রয়েছে।

    পাঁচ-পাঁচবার সেই ভয়াবহ গর্জন রাতের আকাশ কাঁপিয়েছে, শুরু হয়েছে ক্ষীণ, পৌঁছেছে সপ্তমে, তারপর মিলিয়ে গেছে। তারপর আবার থমথমে স্তব্ধতায় ভ’রে গিয়েছে নিশুত রাত্রি-আর-কোনো আওয়াজ বিনাই একসময়ে ভোরও হ’য়ে গেছে।

    সকালবেলায় আরেকটা ঝামেলা, কিছুতেই সার বাঁধানো যায়নি। স্থানীয় লোকেরা ভয়েই জবুথবু, তারা আর-একপাও নড়বে না। কাপ্তেন মার্সেনে শেষকালে অনেক তুইয়ে-বুইয়ে তাদের রাজি করিয়েছেন লাইন ধরে দাঁড়াতে : তিনি তাদের আঙুল তুলে দেখিয়েছেন জ্বলজ্বলে সূর্যটাকে, নির্মেঘ আকাশে পুবদিকে সে উঠেছে। এখন তো আকাশে-বাতাসে অদ্ভুত-কিছু আজব-কিছু ভয়াবহ-কিছু ঘটছে না।

    শেষকালে আমরা বেরিয়ে পড়েছি, তিনঘণ্টা দেরি ক’রে।

    রাত্তিরের ঐ অদ্ভুত আওয়াজটাই, স্বভাবতই, আমাদের সব কথাবার্তার বিষয় হয়েছে, কিন্তু কেউই প্রহেলিকাটা ভেদ করতে পারেনি। আস্তে-আস্তে অবশ্য অন্য- সব বিষয়েও আমাদের আলোচনা মোড় ঘুরেছে। তারপর আমাদের ছাউনি থেকে বেরিয়ে দেড়মাইল এগিয়ে যাবার পর, কাপ্তেন মার্সেনে তিনিই সকলের আগে- আগে যাচ্ছিলেন – হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছেন-পশ্চিমদিকে, মাটির ওপর, চারইঞ্চি গভীর ক’রে জমির ওপর গোল-গোল দাগ, আস্তে-আস্তে দাগগুলো পুবদিকে চ’লে গেছে, তারপর মিলিয়ে গেছে হঠাৎ। এ-রকম দশ সার দাগ— দুটো-দুটো ক’রে পাঁচটা ভাগে বিভক্ত।

    কাল রাতের রহস্যময় ঘটনার সঙ্গে এই অদ্ভুত দাগগুলোর কি কোনো সম্বন্ধ আছে। প্রথমেই মনে হয় : না। কেননা আওয়াজটা উঠেছিলো আকাশে, এ- দাগগুলো আছে মাটিতে।

    অথচ এদের গন্তব্য মনে হয় একটাই—যাবার ধরনও এক-পশ্চিম থেকে পুবে। আর সংখ্যাও তো একই : পাঁচটা দলে ভাগ হওয়া চার ইঞ্চি গভীর দাগ, পাঁচ- পাঁচবার আকাশে গর্জন করেছে ঐ বিদঘুটে, কিম্ভূত, অদ্ভুত আওয়াজ।

    তাহলে?

    মানে কি এর?

    আমি, অন্তত, জানি না।

    আমাদে ফ্লরেঁস

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleএবং কালরাত্রি – মনোজ সেন
    Next Article জুল ভের্ন অমনিবাস ২ (অনুবাদ : মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়)

    Related Articles

    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

    জুল ভের্ন অমনিবাস ১ (প্রথম খণ্ড) – অনুবাদ : মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

    November 14, 2025
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

    জুল ভের্ন অমনিবাস ৪ (চতুর্থ খণ্ড) – অনুবাদ : মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

    November 14, 2025
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

    জুল ভের্ন অমনিবাস ৩ (তৃতীয় খণ্ড) – অনুবাদ : মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

    November 14, 2025
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

    জুল ভের্ন অমনিবাস ২ (অনুবাদ : মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়)

    November 14, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026
    Our Picks

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026

    হেরুক – সৌমিত্র বিশ্বাস

    March 24, 2026

    বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)

    March 24, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }