১.০৭ সিকাসোয়
৭. সিকাসোয়
বারোই জানুয়ারী বারজাক মিশন এসে সিকাসো পৌঁছুলো, উপকূল থেকে কম ক’রেও সাতশো মাইল দূরে।
ল্যক্সপান্সিয়ঁ ফ্রাঁসেঈ যদিও আমেদে ফ্লরেঁসের কাছ থেকে আর-কোনো নিবন্ধ পায়নি, সেই বিখ্যাত সাংবাদিকটি কিন্তু রোজকার ঘটনা সব খুঁটিনাটি সমেত এখনও তাঁর নোটবইতে লিখে চলেছেন : তাঁর সেই নোটবই থেকেই পরের বৃত্তান্তটা নেয়া হয়েছে।
তাঁর নোটবই প’ড়ে জানা যায়, কান্কান থেকে সিকাসো অব্দি প্রায় একঘেয়ে বৈচিত্র্যহীন ভাবেই এগিয়েছে বারজাক মিশন, এমন-কোনো ঘটনাই ঘটেনি, যেটা অস্বাভাবিক বা অপ্রত্যাশিত ছিলো। কতগুলো রসিকতাও ছিলো তাতে, সাঁৎ- বেরাকে চাঁদমারি ক’রে, তাঁর সেই নামজাদা ভুলোমনের কাজকারবার নিয়ে। এছাড়া যেমন হয় পথে-ঘাটে, কতগুলো ঘটনা ঘ’টে যায়, কিন্তু কৌতূহল উসকে দেবার মতো উপকরণ তাতে কিছুই থাকে না। ৎশুমুকিকে দেখা গেছে তার পুরোনো দোস্ত তোঙ্গানেকে এড়িয়ে চলতে, বরং তার খাতির ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে অভিযানের প্রথম গাইড মোরিলিরের সঙ্গে—তবে এদের দোস্তি-দুশমনিতে কারুই কোনো আগ্রহ ছিলো না।
কেনিয়ালালার ভয়াবহ ভবিষ্যদ্বাণীগুলো যে শিগগিরই একদিন ফ’লে যাবে, এমন কোনো লক্ষণই দেখা যায়নি কোথাও। আমেদে ফ্লরেঁস নিয়মিত তার নিবন্ধগুলো লিখেই চলেছেন, কিছুতেই তাঁর সাংবাদিকের রুটিনে ফাঁক পড়ে না, আর নিয়মিত সেগুলো ৎশুমুকির হাতে তুলেও দিচ্ছেন-আর সে একগাল হেসে ব’লেও যাচ্ছে যে সেগুলো সে পাঠিয়ে দেবার ব্যবস্থা করবে; আর কোনোকারণে সেগুলো যদি যথাস্থানে না-পৌঁছে থাকে, সাংবাদিকের তা জানবার কোনোই উপায় ছিলো না। সাঁৎ-বেরা এখনও অশ্বপৃষ্ঠে উপবিষ্ট হ’তে পারে। জেন মোনাসের হৃদয়েও কোনো মস্ত আঘাত পড়েনি—অন্তত প্রকাশ্যে দেখা যায় এমন-কোনো মর্মভেদী-কিছু ঘটেছে ব’লে মনে করার কোনো কারণ নেই। তবে আলংকারিক অর্থে হৃদয়ের আঘাতটা ফ’লে-যাবার একটা সম্ভাবনা রয়েছে বটে—অন্তত ফ্লরেঁস সেই-মর্মে একটা-দুটো মন্তব্য ক’রে রেখেছেন। আর ঐ চতুর্থ ভবিষ্যদ্বাণী—যেটা সবচেয়ে গুরুতর এবং সাংঘাতিক, সেটা ফলবার কোনো, আবারও জোর দিয়ে বলা যায় কোনোই, লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। মিশন ধ্বংস হ’য়ে যায়নি এখনও —মিশনের কেউই ক্রীতদাস হিশেবে এখনও হাটে-বাজারে বিক্রি হয়নি। কাপ্তেন মার্সেনের তত্ত্বাবধানে শান্তিপূর্ণভাবেই অভিযাত্রীরা এগিয়ে যাচ্ছে তাদের অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে : দুশো খোলাতলোয়ার বজায় রেখেছে শান্তি, গাধাঘোড়াগুলোর ওপর দিয়ে ধকল গেলেও তাদের কারু মুখ থুবড়ে প’ড়ে টেশে যাবার কোনোই সম্ভাবনা নেই, আর সেই-যে নদীতে কিছু-কিছু মালপত্তর ভেসে গিয়েছিলো, তারপর তাঁদের লটবহর থেকে আর-কিছুই খোয়া যায়নি।
তাছাড়া, আমেদে ফ্লরেঁস তাঁর তৃতীয় নিবন্ধের শেষে যে অস্বস্তিকর সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন, সেটাকে সমর্থন ক’রে নতুন-কিছুই ঘটেনি। অভিযানের সারের ওপর অতর্কিতে এসে ঝাঁপিয়ে প’ড়ে কেউ কোনো হামলা চালায়নি, আর নতুন- কোনো কেনিয়ালালারও মুখোমুখি পড়তে হয়নি যে অভাবিত-সব ভাবী দুর্ঘটনার কথা ব’লে তাদের ঘাবড়ে দেবে। কাজেই মনে হয়, সাংবাদিকের অনুমান যদি ঠিকই হ’য়ে থাকে, কেউ-কেউ যদি এই মিশনকে ঘাবড়ে দিয়ে ফেরৎ পাঠাবার কোনো উদ্ভট মলবও এঁটে থাকে, সব দেখেশুনে এখন মনে হচ্ছে সে তার ঐ বদমলবটা বুঝি ত্যাগ করেছে।
সত্যি বলতে, ফ্লরেঁস নিজেও এই চক্রান্তটা সম্বন্ধে পুরোপুরি মনস্থির ক’রে উঠতে পারেননি। যে-আড়াইখানা তথ্যের ওপর ভর করে তিনি তাঁর সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন, সেগুলো ক্রমেক্রমে নিতান্তই অস্পষ্ট মনে হয়েছে-পরে মন থেকে মিলিয়ে গেছে। যদিও অভিযান গিয়ে সিকাসো পৌঁছোয়নি—ভবিষ্যৎবাণী তো বলেছিলো তার পর থেকেই শুরু হবে উৎপাত—তবু প্রতিদিনই ফ্লরেঁস আরো- বেশি আশ্বস্ত বোধ করেছেন: দিনের আলোয় সবসময়েই মনে হয়েছে কথাটা নিতান্তই-উদ্ভট আর আজগুবি : নিরীহ কালো লোকেরা হঠাৎ এমন-একটা সশস্ত্র বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালাতে যাবেই বা কেন?
ফ্লরেঁস অবশ্য যদি খেয়াল করতেন কিছুদিন পরেই অভিযান দু-ভাগ হ’য়ে দুটো দল দুটো ভিন্ন পথে পাড়ি জমাবে, তাহ’লে হয়তো তাঁর অস্বস্তিটা তিনি এমনভাবে উড়িয়ে দিতেন না।
কারণ সিকাসো থেকেই বারজাক মিশন দু-ভাগ হয়ে যাবে। একদল যাবে, খোদ বারজাকের নেতৃত্বে, নাইজার নদীর তীর ধ’রে, আর দাহোমে ঘুরে ফের ফিরে যাবে কোনোক্রিতে, অন্যদলটা বোদ্রিয়েরের নেতৃত্বে যাবে দক্ষিণদিকে– গ্রাঁ-বাসাম-এ। দুটো দলেরই সুরক্ষার জন্যে সশস্ত্র পাহারা দরকার হবে—ফলে যে সেপাইশাস্ত্রীরা সঙ্গে আসছে তারাও দুটো ভাগ হ’য়ে যাবে—একেক দলে থাকবে মোটে একশোজন সৈন্য।
সিকাসো আসলে পর-পর পাশাপাশি কতগুলো গ্রামকে ঘিরেই গ’ড়ে উঠেছে— গ্রামগুলোর মধ্যে আছে চাষের জমি, যথারীতি তাতা দিয়ে ঘেরা; তারই মধ্যে ফরাশি সরকার গ’ড়ে তুলেছেন একটা গড়, আর সৈন্যসামন্তের থাকার জন্যে ছাউনি আর ব্যারাক।
ঔপনিবেশিক পদাতিক বাহিনীর সঙ্গে-সঙ্গেই আছে সেনেগলি সেনাবাহিনী- অফিসাররা সবাই ফরাশি, এন-সি-ওও [নন-কমিশান্ড অফিসাররাও] তাই। এই তরুণ অফিসারদের আনন্দ উপচে পড়েছে, এই বারজাক মিশন এসে হাজির হ’তেই : কতদিন তারা দেশের লোকের মুখ দ্যাখেনি, প’ড়ে আছে এই বিদেশ- বিভূঁইতে। আনন্দটা উল্লাস হ’য়ে ফেটে পড়লো, যখন তারা আবিষ্কার করলে যে এই সেপাইশাস্ত্রীদের দায়িত্বে আছেন খোদ কাপ্তেন মার্সেনে, তাদেরই পুরোনো বন্ধু। আর উল্লাস প্রায় মহোল্লাসে পরিণ
