১৭. ইসরাইল
জেরুসালেমের দীর্ঘ ও মর্মান্তিক ইতিহাসে নগরীকে অনেকবার ধ্বংস করা হয়েছে, পুনঃনির্মাণও করা হয়েছে। ব্রিটিশদের আগমনে নগরীটি আরেক দফা পরিবর্তনের বেদনাদায়ক পর্বের মুখে পড়ে। ক্রুসেডার দখলদারিত্বের সংক্ষিপ্ত সময় বাদ দিলে জেরুসালেম প্রায় ১৩ শত বছর ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি নগরী হিসেবে বহাল ছিল। এখন সেই উসমানিয়া সাম্রাজ্য বিজিত হয়েছে, এই অঞ্চলের আরবদেরকে তাদের স্বাধীনতা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। প্রথমে ব্রিটিশ ও ফরাসিরা নিকট প্রাচ্যে ম্যান্ডেট ও প্রটেকটোরেট প্রতিষ্ঠা করলেও একে একে আরব রাষ্ট্র ও রাজতান্ত্রিক দেশ আত্মপ্রকাশ করতে থাকে। এগুলো হচ্ছে জর্ডান, লেবানন, সিরিয়া, মিসর ও ইরাক। এ প্রেক্ষাপটে অন্য সব কিছু একই রকমের থাকলে ফিলিস্তিনও স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারত। আর গুরুত্বপূর্ণ নগরী হিসেবে জেরুসালেম হতে পারত এর রাজধানী। কিন্তু তা ঘটেনি। ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের সময় জায়নবাদীরা নিজেদেরকে দেশটিতে প্রতিষ্ঠা করে একটি ইহুদি রাষ্ট্র সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। জেরুসালেম ধর্মীয় ও কৌশলগত মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিরাজ করে। এর মালিকানা নিয়ে ইহুদি, আরব ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিরোধে লিপ্ত হয়। শেষ পর্যন্ত ১৯৬৭ সালে ইহুদি সামরিক ও কূটনৈতিক উদ্যোগই সফল হয়, জেরুসালেম হয় ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইলের রাজধানী। বর্তমান সময়ে জেরুসালেমের আরব বৈশিষ্ট্য হলো অ্যালেনবাই ও তার সৈন্যদের নগরীতে প্রবেশ করার সময়কার ছায়ামাত্র।
জায়নবাদী বিজয় ছিল একটি নজিরবিহীন পশ্চাদগমন। ১৯১৭ সালে ফিলিস্তিনের মোট জনসংখ্যার ৯০ ভাগ ছিল আরব, জেরুসালেমের জনসংখ্যার ৫০ ভাগের সামান্য কম ছিল তারা। ইহুদি ও আরবরা অবাক দৃষ্টিতে পেছনের ঘটনার দিকে তাকায়। বিপুল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে জায়নবাদীরা তাদের সাফল্যকে প্রায় আশ্চর্য ঘটনা মনে করে; আরবরা তাদের পরাজয়কে বলে আল-নাকবা। এই শব্দটি দিয়ে আসমানি গজবের কাছাকাছি পর্যায়ের কিছু প্রকাশ করতে চায় তারা। সংগ্রামের লিখিত ভাষ্যের ব্যাপারে উভয় পক্ষের অতি সরলিকরণ বিস্ময়কর কিছু নয়। তারা একে নায়ক আর খলনায়ক হিসেবে বর্ণনা করে, সম্পূর্ণ ভালো আর মন্দ হিসেবে বিবেচনা করে, আল্লাহ ইচ্ছা বা আসমানি গজব হিসেবে অভিহিত করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা ছিল অনেক বেশি জটিল। মূলত জায়নবাদী নেতাদের দক্ষতা ও সম্পদের মাধ্যমেই ফলাফল নির্ধারিত হয়েছে। তারা প্রথমে ব্রিটিশ ও পরে আমেরিকান সরকারের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এসব নেতা কূটনৈতিক-প্রক্রিয়ার ধূর্ত-চালবাজি বুঝতে পেরেছিলেন। যখন কোনো পরাশক্তি তাদেরকে কিছু দিতে চাইত, প্রায় সবসময়ই তারা তা গ্রহণ করতেন, এমনকি তা যদি তাদের চাহিদা বা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কমও হতো। তবে শেষ পর্যন্ত তারা সবকিছুই পেত। জায়নবাদীরা তাদের নিজস্ব আন্দোলনের মধ্যে থাকা আদর্শগত বিভক্তিও উত্রাতে সক্ষম হয়। আরবরা ততটা সৌভাগ্যবান ছিল না। উসমানিয়া সাম্রাজ্যের হঠাৎ করে দুঃখজনক পতন ও ব্রিটিশদের আগমনে বিচলিত ফিলিস্তিনি আরব জাতীয়তাবাদী আন্দোলন বাস্তব রাজনৈতিক যৌক্তিকতা ও অনুভূতি উপলব্ধি করতে পারেনি। অথচ একদিকে ইউরোপিয়ান ও অন্য দিকে জায়নবাদীদের মোকাবিলা করার জন্য এর দরকার ছিল খুবই বেশি। তারা প্রবল টেকসই প্রতিরোধ গড়তে পারেনি, আবার পাশ্চাত্য কূটনীতির পদ্ধতিগুলোতেও অভ্যস্ত ছিল না। তারা অব্যাহতভাবে তাদেরকে দেওয়া যেকোনো প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করত এই আশায় যে প্রত্যাখ্যানের দৃঢ় ও আপসহীন নীতি জনসংখ্যাগত ও ঐতিহাসিকভাবে তাদের অধিকার বলে মনে হওয়া এলাকায় স্বাধীন আরব রাষ্ট্রের নিশ্চিত অধিকার পেয়ে যাবে। শুরুতে তারা বোকার মতো মনে করেছিল যে তাদের প্রতি ব্রিটিশদের কল্যাণকর উদ্দেশ্য রয়েছে। তাদের বারবারের ভেটোর ফলে তারা শেষ পর্যন্ত কিছুই পায়নি এবং ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর গৃহহীন, সমূলে উচ্ছেদ ও অধিকারহারা ফিলিস্তিনিদের স্থলাভিষিক্ত হয় অধিকারহারা, সমূলে উচ্ছেদ ও ভাসমান ইহুদিরা।
ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের সময় জেরুসালেম মন্থর ও বেদনাদায়ক এমন এক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয় যা একে আরব নগরী থেকে ইহুদি প্রাধান্যপূর্ণ নগরীতে পরিণত করে।
ব্রিটিশদের উদ্দেশ্য ও নীতিও ছিল বিভ্রান্তিকর ও সন্দেহজনক। উভয় পক্ষের কাছেই ব্রিটিশদের উদ্দেশ্যে পূরণের সাথে কাজ করা কঠিন বলে মনে হয়। মহাযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সরকার আরব ও ইহুদি উভয়কেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ১৯১৫ সালে তুর্কিদের বিরুদ্ধে হিজজের আরবদের বিদ্রোহ করতে উৎসাহিত করতে মিসরের হাইকমিশনার স্যার হেনরি ম্যাকমোহন মক্কার শরিফ হোসাইন ইবনে আলীকে প্রতিশ্রুতি দেন যে আরব দেশগুলোর ভবিষ্যত স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেবে ব্রিটেন। এর ফলে পবিত্র স্থানগুলো একটি ‘স্বাধীন সার্বভৌম মুসলিম রাষ্ট্রের অধীনে থাকবে। ফিলিস্তিন বা ইসলামের তৃতীয় পবিত্র স্থান জেরুসালেমের কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়নি। ম্যাকমোহনের প্রতিশ্রুতি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুস্বাক্ষর করা চুক্তি ছিল না, বরং এতে চুক্তির তাৎপর্য ছিল। ১৯১৬ সালে হোসাইন যখন টি ই লরেন্সের সহায়তায় আরব বিদ্রোহের ঝান্ডা উড়ালেন, তখন তেমনই মনে হয়েছিল। ম্যাকমোহনের এই চুক্তি নিয়ে আলোচনা করার সময়ই ব্রিটেন ও ফ্রান্স গোপন সাইকিস-পিকট চুক্তি নিয়ে কথাবার্তা বলছিল, যাতে উপদ্বীপের উত্তরে পুরো আরব বিশ্বকে ব্রিটিশ ও ফরাসি জোনে ভাগ করার কথা ছিল।
তারপর অ্যালেনবাইয়ের জেরুসালেম জয়ের ঠিক এক মাস পর ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জ তার পররাষ্ট্রসচিব আর্থার বেলফোরকে নির্দেশ দেন এই ঘোষণা-সংবলিত একটি চিঠি লিখতে লর্ড রথচাইল্ডকে :
মহাহান্য সরকার ফিলিস্তিনে ইহুদি জনগণের জন্য জাতীয় আবাসভূমি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী। আর এই লক্ষ্য হাসিলে সরকার সর্বাত্মক প্রয়াস চালাবে। তবে এটিও স্পষ্টভাবে মনে রাখতে হবে যে ফিলিস্তিনে বিদ্যমান অ-ইহুদি সম্প্রদায়গুলোর বেসামরিক ও ধর্মীয় অধিকারগুলো কিংবা অন্য কোনো দেশের ইহুদিদের ভোগ করা অধিকার ও রাজনৈতিক মর্যাদা সংস্কারে কিছু করা হবে না।
.
ব্রিটেন দীর্ঘ দিন ফিলিস্তিনে ইহুদিদের ফেরানোর কল্পনা লালন করেছে। ১৯১৭ সালে বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে তাদের কৌশলগত বিবেচনাগুলোও হয়তো কাজ করেছে। কৃতজ্ঞ ইহুদিদের ব্রিটিশ প্রটেক্টরেট হয়তো ওই অঞ্চলে ফরাসি উচ্চাভিলাষকে প্রতিরোধ করবে বলে মনে করা হয়েছিল। তবে বেলফোর তার সরকারের দেওয়া অত্যন্ত সঙ্ঘাতপূর্ণ প্রতিশ্রুতিগুলোর ব্যাপারে সচেতন ছিলেন। ১৯১৯ সালের আগস্টে এক স্মারকে তিনি উল্লেখ করেন যে ব্রিটেন ও ফ্রান্স জনগণের স্বাধীন ইচ্ছার ভিত্তিতে নিকট প্রাচ্যে জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে ফিলিস্তিনে ‘আমরা দেশটির বর্তমান অধিবাসীদের ইচ্ছার আলোকে কোনো কিছু করার প্রস্তাব করছি না।’
জায়নবাদের প্রতি চারটি পরাশক্তি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আর প্রাচীন ওই ভূমিতে বর্তমানে বসবাসরত সাত লাখ আরবের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও পছন্দ-অপছন্দের চেয়ে ভুল হোক বা ঠিক হোক, ভালো হোক বা মন্দ হোক, জায়নবাদ দীর্ঘ দিনের ঐতিহ্য বর্তমানের জন্য প্রয়োজনীয় ও ভবিষ্যতের জন্য ব্যাপক গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনায় শিকড় গেড়ে রয়েছে।
অবাক করা উদাসিন্যে বেলফোর সমাপ্তি টানলেন যে ‘ফিলিস্তিন সম্পর্কে বলা যায়, শক্তিগুলো এমন কোনো বক্তব্য দেয়নি, যা স্পষ্টভাবেই ভুল। লঙ্ঘন করা হতে পারে- এমন কোনো উদ্দেশ্যে তারা কোনো ধরনের বক্তব্য দেয়নি। ২ প্রশাসনের করা পরিষ্কার, সুস্পষ্ট বক্তব্যে এটি অর্থহীন কথা ছিল না।
ফিলিস্তিন ও জেরুসালেম ১৯১৭ সাল থেকে ১৯২০ সালের জুলাই পর্যন্ত ছিল ব্রিটিশ সামরিক নিয়ন্ত্রণে (অধিকৃত শত্রু এলাকার প্রশাসন)। সামরিক গভর্নর ছিলেন লে. কর্নেল রোন্যাল্ড স্টরস। তিনি ১৯১৬ সালের আরব বিদ্রোহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তার প্রথম কর্তব্য ছিল নগরীতে যুদ্ধে বিধ্বস্ত এলাকা মেরামত করা। পয়ঃনিষ্কাষণ ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়েছিল, পরিষ্কার পানির কোনো ব্যবস্থা ছিল না, রাস্তাগুলো আর চলাচল উপযোগী ছিল না। ব্রিটিশরা পবিত্র স্থানগুলোর পরিচালনার দায়দায়িত্ব নিয়ে অনেক বেশি আচ্ছন্ন ছিল। আর ভদ্র, মার্জিত ব্যক্তিত্ব স্টোর্স জেরুসালেমকে ভালোবাসতেন। তিনি ঐতিহাসিক স্থানগুলো সুরক্ষা করতে প্রো-জেরুসালেম সোসাইটি গঠন করেন তিন ধর্মের ধর্মীয় লোক ও স্থানীয় অভিজাত ব্যক্তিদের নিয়ে। এই সংস্থা সরকারি ভবন ও স্মৃতিসৌধগুলো মেরামত ও সংস্কারের কাজ সম্পাদন করত। বিদেশ থেকে অর্থ সংগ্রহের মাধ্যমে নগর পরিকল্পনা করা ও প্রাচীন স্থানগুলো সংরক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাদেরকে। এই সংস্থার গ্রহণ করা একটি অন্যতম কার্যকর সিদ্ধান্ত ছিল নগরীতে সব নতুন ভবনে অবশ্যই স্থানীয় হলুদাভ পাথর ব্যবহার করতে হবে। এই নির্দেশ এখনো অনুসরণ করা হয়। এটি জেরুসালেমের সৌন্দর্য সংরক্ষণে সহায়ক হয়।
অবশ্য উত্তেজনাও ছিল। বেলফোর ঘোষণা সম্পর্কে আরবদের আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়নি। তবে খবরটি ফাঁস হয়ে যায়। খবরটি তাদের কাছে বিস্ময়কর না হলেও সন্দেহজনক ও আতঙ্কমূলক ছিল। তারা লক্ষ করেছে যে সরকারি নোটিশগুলোতে ইংরেজি ও আরবি ভাষার পাশাপাশি হিব্রু ভাষাও চালু করা হয়েছে। এছাড়া প্রশাসনে ইহুদি আমলা ও অনুবাদকও নিয়োগ করা হয়েছে। তবে তারা তখনো আশা করছিল, ব্রিটিশরা তাদের স্বার্থের প্রতি ন্যায়বিচার করবে। স্টোর্সের ১৯১৮ সালে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিলে অন্তত তারা নিশ্চিত প্রাধান্য ধরে রেখেছিল। এতে ছয় সদস্যের মধ্যে প্রতিটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের দুজন করে ছিলেন। তবে মেয়র ছিলেন মুসলিম। স্টোর্স মেয়র পদে নিয়োগ দেন মুসা কাসিম আল-হোসাইনিকে। তার এখন দুজন সহকারী : একজন ইহুদি, অপরজন খ্রিস্টান। এই ব্যবস্থায় ইহুদিরা পুরোপুরি খুশি ছিল না। কারণ তারা এখন নগরীর জনসংখ্যার প্রায় ৫০ ভাগ। আরব মেয়ররা পদটিকে রাজনৈতিক মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করে বেলফোর ঘোষণার বিরুদ্ধে লড়াই করছেন বলে মনে হওয়াতেও তারা ক্ষুব্ধ হয়েছিল।
বিদেশ থেকেও বৈরী বার্তা আসত। বর্তমানে ব্রিটিশদের জয় করা জেরুসালেম নিয়ে ভ্যাটিকান তার উদ্বেগ প্রকাশ করে জানায়, এটি খ্রিস্টানদের হাতেই থাকা উচিত। খ্রিস্টান ধর্মের বেশির ভাগ পবিত্র উপাসনালয় যদি অ-খ্রিস্টানদের হাতে দেওয়া হয়, তবে তা হবে’ মর্মান্তিক ব্যাপার। নবগঠিত জাতিপুঞ্জের ১৯১৯ সালে কিং-ক্রেন প্রতিবেদনে উপসংহার টানে যে বেলফোর ঘোষণা বাস্তবায়ন করা উচিত নয়। এর বদলে ফিলিস্তিনের উচিত হবে সাময়িক কর্তৃত্ব লাভ করে সংযুক্ত আরব রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে সিরিয়ার সাথে যোগ দেওয়া। এই প্রতিবেদন কোনো কাজে আসেনি। এটি যখন বিবেচনার সময় এসেছিল, তখন প্রেসিডেন্ট উইলসনের মনোযোগ ছিল অন্যত্র, এটি শেলফে তুলে রাখা হয়েছিল।
নগরীতে ১৯২০ সালের ৪ এপ্রিল নবী মুসা উৎসবের সময় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এই অনুষ্ঠানের সূচনা করেছিল মামলুকেরা। ওই সময় জেরুসালেম পাশ্চাত্য ক্রুসেডারদের হুমকির মুখে ছিল। নতুন ক্রুসেডার অ্যালেনবাই নগরীতে আসার পর থেকে ফিলিস্তিনের আরবরা মনে করতে থাকল যে আল-কুদস আবার বিপদের মুখে। আরববিশ্বে ক্রুসেডারদের নিয়ে নতুন করে আগ্রহের সৃষ্টি হলো। কুর্দি সালাহউদ্দিন এখন আরব নায়ক বনে গেলেন। আর জায়নবাদীদের নতুন ক্রুসেডার কিংবা অন্তত ক্রুসেডে নিয়োজিত পাশ্চাত্যের হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হতে লাগল। নবী মুসা শোভাযাত্রা সবসময়ই প্রতীকভাবে পবিত্র নগরীর নিয়ন্ত্রণ লাভ বলে গণ্য হতো। কিন্তু এবার মুসলিম জনতা প্রথা ভেঙে ইহুদি মহল্লার মধ্য দিয়ে ছুটে গেল। আরব পুলিশ বাহিনী দাঙ্গাকারীর পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে, সহিংসতা শান্ত করতে ব্রিটিশ সৈন্যরা এলো না। ইহুদিরা তাদের নিজস্ব প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা করার কথা ভুলে গিয়েছিল। হতাহতদের বেশির ভাগই ছিল ইহুদি। ৯ জন নিহত ও ২৪৪ জন আহত হয়েছিল। জেরুসালেমে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও মাঝে মাঝে সহিংসতা ছিল। কিন্তু ১৯২০ সালের দাঙ্গা দেখাল যে পরিস্থিতি আরো অবনতির দিকে যাচ্ছে। এই ঘটনা ইহুদি ও ব্রিটিশদের মধ্যেও ফাটল সৃষ্টি করল। জায়নবাদীরা সাথে সাথে এই নির্যাতনের জন্য স্টোর্স ও প্রশাসনকে দায়ী করল। তাদের মতে, তারা আরবদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শন করেছে। এর পর থেকে ইহুদি ও আরব উভয় পক্ষই ‘অন্য দলের পক্ষাবলম্বনের জন্য ব্রিটিশদের দায়ী করতে থাকে।
বস্তুত, ব্রিটিশনীতির মধ্যেই সঙ্ঘাতের সহজাত উপাদান ছিল। ১৯২০ সালের এপ্রিলে নিয়োগ পাওয়া ফিলিস্তিনে ম্যান্ডেটরি শক্তিতে পরিণত হয় ব্রিটেন। জাতিপুঞ্জের ধারা ২২-এ জোর দিয়ে বলা হয়েছিল যে ব্রিটেন ‘সভ্যতার পবিত্র আমানতের আকারে [ফিলিস্তিনি জনগণের] কল্যাণ ও উন্নয়নের নীতিমালা’ প্রয়োগ করবে। তবে ব্রিটিশরা বেলফোর ঘোষণাও বাস্তবায়ন করছিল, ফিলিস্তিনে ইহুদি জাতীয় আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার পথও তৈরি করছিল। এই কাজ করার জন্য ও সার্বিকভাবে দেশের উন্নয়নে (ধারা ৪) সরকারি সংস্থা হিসেবে একটি জিউশ এজেন্সিও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এজেন্সির আরেকটি দায়িত্ব ছিল ‘ইহুদিদের জন্য ফিলিস্তিনি নাগরিকত্ব পাওয়ার ব্যবস্থা করার জন্য কাজ করা (ধারা ৬) ও ‘যথাযথ শর্তে ইহুদি অভিবাসনের ব্যবস্থা করা (ধারা ৭)। এসব পদক্ষেপ কি ফিলিস্তিনে ‘অইহুদি সম্প্রদায়গুলোর অধিকারের ওপর কোনো আঘাত সৃষ্টির বিপদ ছিল না?
ফিলিস্তিনে প্রথম বেসামরিক হাই কমিশনার হিসেবে ১৯২০ সালের জুলাই মাসে নিয়োগপ্রাপ্ত স্যার হারবার্ট স্যামুয়েল ছিলেন ইহুদি। এটি জায়নবাদীদের জন্য আশার নিদর্শন হলেও আরবদের কাছে ছিল অলুক্ষুণে বার্তা। স্যামুয়েল ছিলেন বেলফোর ঘোষণার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে তিনি দায়িত্ব পালনের পাঁচ বছর কালে আরবদের জোরালোভাবে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি তাদেরকে বলেন, তাদের ভূমি কখনো তাদের কাছ থেকে নেওয়া হবে না এবং কোনো ইহুদি সরকার কখনো মুসলিম ও খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠদের শাসন করবে না। এমন কিছু করা ‘বেলফোর ঘোষণার অর্থ নয়।’ তবে এসব আশ্বাস আরবদের ভয় প্রশমিত করতে পারেনি, তারা ইহুদিবৈরী হয়ে পড়েছিল। ব্রিটিশ উপনিবেশ সচিব উইস্টন চার্চিলের ১৯২২ সালের শ্বেতপত্রে একই যুক্তি অবতারণা করা হয় : আরব সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে কোনোভাবেই দমন করা হবে না। বেলফোর ঘোষণার ধারণাটি ছিল স্রেফ (সার্বিকভাবে নয়) ফিলিস্তিনের ভেতরে একটি কেন্দ্র সৃষ্টি করা, যেখানে ইহুদিরা কোনো দুর্ভোগ পোহানো ছাড়াই বাঁচতে পারবে। আবারো বলা যায়, কোনো পক্ষই খুশি হয়নি। আরবরা শ্বেতপত্র প্রত্যাখ্যান করে, অবশ্য পরে বেশি কিছু পাওয়া যাবে, এই আশায় ইহুদিবাদিরা তা গ্রহণ করে।
অবশ্য যেভাবেই হোক না কেন, ম্যান্ডেটের অধীনে জেরুসালেম সমৃদ্ধ হচ্ছিল বলে মনে হচ্ছিল। ক্রুসেডের পর প্রথমবারের মতো এটি ছিল ফিলিস্তিনের রাজধানী নগরী। ১৯২০-এর দশকে ইংল্যান্ডের মতো নতুন উদ্যান উপশহর গড়ে ওঠতে থাকে। এগুলো ছিল জেরুসালেমের আশপাশে মিউনিসিপ্যাল এলাকার বাইরে। তালপিয়ত, রেহাভিয়া, বায়িত বেগান, কিরয়াত মোশে ও বেইত হাকেরেম ছিল ইহুদি এলাকা। এসব এলাকায় পার্ক, খোলা জায়গা ও ব্যক্তিগত উদ্যান ছিল। এগুলো পুরনো নগরীর পশ্চিমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পুরনো নগরী প্রাচীরের পশ্চিমে একটি নতুন বাণিজ্যিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। গ্রিক অর্থোডক্স প্যাট্রিয়াচেটের কাছ থেকে এই জমি কেনা হয়েছিল : এর প্রধান রাস্তাটির নামকরণ করা হয়েছিল ইতিহাসবিদ ইলিজার বেন-ইয়েহুদার নামে। তিনি আধুনিক, কথ্য ভাষা হিসেবে হিব্রুর ব্যবহার পুনর্জীবন করেন। একটি দ্বিতীয় বাণিজ্যিক সেন্টারের কাজও শুরু হয় মাহানেহ ইয়েহুদা মার্কেটে। এছাড়া তালবিয়া, কাতামন ও বাকা ও সেইসাথে শেখ জারা ও ওয়াদি আল-যশে অভিজাত আরব এলাকা ছিল। আর ছিল আমেরিকান কলোনি। জেরুসালেমের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিবস ছিল মাউন্ট স্কপাসে হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয় উদ্বোধন। বেলফোর এতে সভাপতিত্ব করেছিলেন। এটি ছিল ফিলিস্তিনে তার প্রথম ও একমাত্র সফর। অনুষ্ঠানজুড়ে তার চিবুক বেয়ে প্রকাশ্যেই গড়িয়ে চোখের পানি ঝরছিল। তবে মনে হয় তিনি লক্ষ করেননি যে জেরুসালেমের রাস্তাগুলোতে আরবরা ধর্মঘট পালন করছে, নীরবে প্রতিবাদ করছে। তারা সুকে শোক প্রকাশের কালো পতাকাও উড়িয়েছিল।
জেরুসালেমে নতুন নতুন নেতার উদয় হয়েছিল। স্যামুয়েলের প্রথম নিয়োগগুলোর একটি ছিল মুফতি হিসেবে হাজি আমিন-আল হোসাইনিকে নিয়োগ। এটি জায়নবাদীদের আতঙ্কিত করেছিল। কারণ হোসাইনি ছিলেন চরমপন্থী আরব জাতীয়তাবাদী। তিনি ১৯২০ সালের দাঙ্গায় নেতৃত্বের ভূমিকায় ছিলেন। স্যামুয়েল সম্ভবত আশা করেছিলেন, হাজি আমিনকে কো-অপ্ট করার মাধ্যমে তাকে প্রশমিত করতে পারবেন। অবশ্য বেশির ভাগ ব্রিটিশের মতো তিনিও এই তরুণে সত্যিকার অর্থেই অভিভূত হয়েছিলেন। বিনয়ী, স্বল্পবাক, মর্যাদাসম্পন্ন এই নতুন মুফতিকে ক্রোধ-সঞ্চারকারী বলে মনে হতো না। পরের বছর তিনি সুপ্রিম মুসলিম কাউন্সিলের সভাপতি নিযুক্ত হন। এই নতুন সংস্থাটিকে গঠন করা হয়েছিল ফিলিস্তিনে ইসলামি প্রতিষ্ঠানগুলো তদারকি করার জন্য। তিনি এটিকেই ভিত্তি বানিয়ে বেলফোর ঘোষণার বিরুদ্ধে লড়াই করতে প্রস্তুত হলেন। তিনি হারামে একটি নির্মাণ ও সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিলেন। এর মানে হলো, তাকে বিপুল মাত্রায় প্রপাগান্ডা কার্যক্রমে অংশ নিতে হবে। জায়নবাদীরাও তাদের টেম্পল পুনঃনির্মাণের স্বপ্ন দেখছে বলে মুফতি দাবি করলেন। তিনি আরো জানালেন, এতে হারামের ওপর থাকা মুসলিম ইবাদতগাহগুলো অনিবার্যভাবেই বিপদে পড়বে। এসব অভিযোগ জায়নবাদী নেতাদের কাছে কল্পনাবিলাস বলে মনে হলো। তাদের বেশির ভাগই টেম্পলের ব্যাপারে কোনো আগ্রহ ছিল না, তারা ওয়েস্টার্ন ওয়ালের দিকেও তেমন যেত না। তবে এখন আমরা যা দেখছি, তাতে করে বলা যায়, হোসাইনির ভয় একেবারে ভিত্তিহীন ছিল না।
হোসাইনির নিয়োগের ফলে জেরুসালেমের আরবেরা পরস্পর বিপরীত অবস্থান নিয়ে দুই গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পরে। চরমপন্থীরা মুফতির দিকে ঝোঁকে, উদারপন্থীরা নতুন মেয়ার রাগিব আল-নাশাশিবির সাথে যোগ দেয়। এই মেয়র জায়নবাদের বিরোধিতা করলেও যখনই সম্ভব কর্তৃপক্ষের সাথে সহযোগিতা করার নীতিতে বিশ্বাস করতেন। স্যামুয়েল দৃশ্যত স্বীকার করে নিতে প্রস্তুত ছিলেন যে জেরুসালেম ব্যাপকভাবে ইসলামি নগরী। মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিল সম্প্রসারিত করা হয়, এখন এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল চারজন মুসলিম, তিনজন খ্রিস্টান ও তিনজন ইহুদি সদস্য। মেয়র অব্যাহতভাবে মুসলিম রয়ে গেছেন। তবে ইহুদিরা যাতে বেশি করে ভোট দিতে পারে, সেজন্য ভোটাধিকার সম্প্রসারিত করেন স্যামুয়েল। উভয় পক্ষের কাছে নিরপেক্ষ থাকায় হাই কমিমনার কাউকেই সন্তুষ্ট করতে পারেননি। ফিলিস্তিন ও জেরুসালেম নিয়ে জায়নবাদী ও আরবদের পারস্পরিকভাবে বর্জনশীল পরিকল্পনা থাকায় সঙ্ঘাত হয়ে পড়ে অনিবার্য।
জায়নবাদীদের স্বাভাবিকভাবেই তাদের নিজস্ব নায়ক ও পথপ্রদর্শক ছিল। ফিলিস্তিনিদের তাদের সংগ্রামে ইন্ধন দিতে নতুন করে কোনো পুরানতত্ত্ব ও মতাদর্শ সৃষ্টির প্রয়োজন পড়েনি। ফিলিস্তিন ছিল তাদের বাড়ি, তারা আল-কুদসে শত শত বছর ধরে বাস করছিল, এর পবিত্রতা উদযাপন করছিল। তাদের ভূমি ও নগরী সম্পর্কে বইপত্র লেখার কোনো প্রয়োজনীয়তা ছিল না তাদের : প্রিয়তমা স্ত্রীকে নিয়ে কোনো লোকের কি আবেগময় কবিতা লেখার দরকার পড়ে? তবে ফিলিস্তিনকে নিজেদের সাথে সম্পৃক্ত করার জন্য জায়নবাদীদেরকে বইপত্র লিখতে হয়েছিল। তারা অচেনা, বৈরী বিশ্বে তাদের নিজেদের একটি স্থান খুঁজে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় দেশটিতে এসেছিল। আলিয়া অবশ্য প্রায়ই যন্ত্রণাদায়ক হতো, বেদনাপূর্ণ অভিজ্ঞতা দিত। নতুন পথিকৃতদের বেশির ভাগই ১৯২০-এর দশকে দেশটি ত্যাগ করে : জীবন ছিল কঠিন, দেশটি ছিল অদ্ভূত। এটি তাদের দেশের মতো লাগেনি। ভূমিটির সাথে আধ্যাত্মিকভাবে নিজেদের সম্পৃক্ত করার জন্য তাদের দরকার ছিল যুক্তিনির্ভর মতাদর্শেরও বেশি কিছুর। তারা তাদের মতাদর্শগুলোকে সহজাতভাবেই কাব্বালার পুরনো আধ্যাত্মিক ভূগোলের দিকে চালিত করে। সূচনায় সেক্যুলার থাকা একটি আন্দোলন আধ্যাত্মিক মাত্ৰা নেয়।
এই জায়নবাদী কাব্বালাহর মুখ্য নায়কেরা জেরুসালেমে বাস করতেন না, পবিত্র নগরীকেন্দ্রিকও ছিলেন না তারা। রাশিয়ায় কাব্বালার সূচনাকারী এ ডি গর্ডন আলিয়া করেছিলেন তুলনামূলক তারুণ্যে, ৪৬ বছর বয়সে। ডেদানিয়ার তার কিবুজে তরুণ পথিকৃতদের সাথে মাঠে মাঠে কাজ করতেন তার সাদা দাড়ি দুলিয়ে। তার কাছে ফিলিস্তিনে অভিবান ছিল খুবই কঠিন : তিনি রাশিয়ার জন্য খুবই গৃহকাতরতা অনুভব করতেন। তার কাছে ফিলিস্তিনের নিকটপ্রাচ্যের ভূ- প্রকৃতি অচেনা মনে হয়েছিল। তিনি মাটিতে কাজ করার সময় যে অবস্থায় পড়তেন বলে বলতেন, আগেকার সময়ে সেটিকেই বলা হতো শেখিনার প্রকাশ। তার মনে হতো যে তিনি জেরুসালেমের ঈশ্বরের সংস্পর্শকে প্রায়শই ফুটিয়ে তোলা সেই আদি সামগ্রিকতায় ফিরে গেছেন। গ্যালিলিতে গর্ডন সেই সংস্পর্শ পেয়েছিলেন। প্রবাসে ইহুদিদেরকে যন্ত্রণাদায়ক ও অপ্রাকৃত জীবন কাটাতে হয়েছিল। গর্ডন তার কবিতা ও বক্তৃতায় তরুণ পথিকৃতদের শিক্ষা দিতেন। ভূমিহীন ও মাটি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তারা ঘেটৌর নাগরিক জীবনে নিজেদেরকে অনিবার্যভাবে অপরিণত করে ফেলেছে। তবে আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তারা নিজেদেরকে ঈশ্বর ও নিজেদের- উভয় থেকেই বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল। জুদা হ্যালেভির মতো গর্ডনও বিশ্বাস করতেন যে ইসরাইল ভূমি (ইরেজট ইসরায়েল) ছিল অনন্যভাবে ইহুদি চেতনার সৃষ্টি। তাদের কাছে ঐশী স্বচ্ছতা, অসীমতা ও জ্যেতি প্রকাশ করে। এটিই তাদেরকে সত্যিকারের স্বকীয় করে তোলে। এই সত্তার উৎস থেকে আলাদা হওয়ার কারণেই তারা ক্ষতিগ্রস্ত ও টুকরা টুকরা হয়ে গেছে। এখন ভূমির বিপুল পবিত্রতায় অবগাহন করে তাদের কর্তৃব্য হয়ে দাঁড়াল একেবারে নতুন হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলা। গর্ডন লিখেছেন, ‘আমাদের প্রত্যেকেরই প্রয়োজন হয়ে পড়ল নতুন করে সাজিয়ে নেওয়ার। ফলে অপ্রাকৃতিক, ত্রুটিপূর্ণ ও দলছুট ব্যক্তিকে নিজেকেই বদলে প্রাকৃতিক, সামগ্রিক মানবে পরিণত হওয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়ল, যে নিজের কাছে সত্যে পরিণত হবে।’ তবে গর্ডনের আধ্যাত্মিকতার মধ্যে আগ্রাসনের ইঙ্গিত ছিল : ইহুদিদেরকে অবশ্যই তার ভাষায় শ্রমের মাধ্যমে জয় করা ভূটিতে তাদের দাবি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে। শারীরিক কষ্টে নিজেদের নিয়োজিত করবে ইহুদিরা। ফিলিস্তিনের পবিত্রতায় সাড়া দিয়ে তারা এর সত্যিকারের মালিক হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে।
নেগেভের এসব জায়নবাদী বসতি স্থাপনকারীদের প্রথম কাজ ছিল ১৯৪৬ সালে তাদের প্রতিষ্ঠিত নতুন কিবুজের চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া তোলা। ইহুদিদের জন্য ‘লেবার জায়নবাদ’ ইতিবাচক ছিল। এদের সমাজবাদী মূল্যবোধ সত্ত্বেও তারা ফিলিস্তিনের থেকে আবর জনসাধারণকে বাদ দিয়েছিল। এমনকি এ ডি গর্ডনও আরবদেরকে ‘চরম নোংরা’, ‘ফালতু’, ও ‘ঘৃণ্য’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
প্রাচীন কালে থেকে ইহুদিরা জেরুসালেমে তাদের টেম্পলের আদি সম্প্রীতিতে একইভাবে ফিরে যেতে চাইত। কিন্তু গর্ডন জায়নবাদীদের শিক্ষা দিলেন যে শেখিনাকে আর মাউন্ট জায়নে পাওয়া যাবে না, বরং তাকে পাওয়া যাবে গ্যালিলির মাঠে-ময়দানে আর পাহাড়-পর্বতে। প্রাচীনকালে অ্যাডোদার অর্থ ছিল টেম্পলের উপাসনা। কিন্তু গর্ডনের কাছে অ্যাভোদার অর্থ হলো কায়িক শ্রম। অবশ্য অল্পসংখ্যক জায়নবাদী টেম্পল মাউন্টে অবিলম্বে প্রত্যাবর্তন প্রত্যাশা করছিল। লেবার জায়নবাদের সেক্যুলার নেতাদের মাধ্যমে কোণঠাসা ও উপহাসাম্পদের শিকার হওয়া ধর্মীয় জায়নবাদীরা একটি গ্রুপ গঠন করেছিলেন। তারা একে বলতেন ‘মিজরাচি’। তারা অধিকতর সনাতন ধারণায় জেরুসালেমকে বিশ্বের কেন্দ্ৰ মনে করতেন। তাদের নেতা ছিলেন রাব্বি আব্রাহাম আইজ্যাক কুক। তিনি ১৯২১ সালে জেরুসালেমের অ্যাশকেনাজিমের প্রধান রাব্বি হন। বেশির ভাগ অর্থোডক্স ইহুদি পুরো জায়নবাদী উদ্যোগের তীব্র বিরোধিতা করলেও কুক আন্দোলনকে সমর্থন করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে না-বুঝেই সেক্যুলার জায়নবাদীরা ঈশ্বরের রাজ্য গঠনে সহায়তা করছে। ভূমিতে ফেরা অনিবার্যভাবেই তাদেরকে তাওরাতে প্রত্যাবর্তনের দিকে চালিত করবে। কাব্বালিস্টবাদী কুক বিশ্বাস করতেন যে ইহুদিরা যখন ফিলিস্তিন থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিল, তখন সমগ্র বিশ্বের ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ঐশী সত্তা অ-ইহুদি বিশ্বের পাপাচারে অনুষ্ঠিত হওয়া প্রবাসের সিনাগগ ও ইয়েশিবাগুলোতে লুকিয়ে ছিল। এখন পুরো বিশ্বকে পরিত্রাণ করা হবে : বিশ্বের সব সভ্যতা আমাদের চেতনার রেনেসাঁসে নতুন করে জাগবে। সব বিবাদের অবসান ঘটবে, আমাদের পুনর্জাগরণের ফলে নতুন জন্মের আনন্দে সকল জীবন আলোকিত হবে।’ বস্তুত পরিত্রাণ ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছিল। কুক ইতোমধ্যেই তার মনের চোখে দেখতে পেয়েছিলেন যে পুনঃনির্মিত টেম্পল বিশ্বের কাছে ঐশী সত্তাকে প্রকাশ করছে :
এখানে টেম্পল তার ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সব মানুষ আর রাজ্যের সম্মান ও গৌরব নিয়ে। এবং এখানে আমরা আমাদের সামনে আনন্দ-ভূমির বয়ে আনা ফসল আনন্দচিত্তে গ্রহণ করি, এই আনন্দ-ভূমির শস্য ও মদে পরিপূর্ণ আমাদের মদ্য প্রস্তুত করার যন্ত্রের চমৎকারিত্বে আমাদের হৃদয় খুশি হয় এবং এখানে আমাদের আগে আবির্ভূত হয়েছিলেন টেম্পলের প্রভু, ইসরাইলের ঈশ্বরের পুরোহিত, পবিত্র-মানব ও দাসেরা।
.
এটি সুদূরের কোনো স্বপ্ন ছিল না : ‘আমরা অদূর ভবিষ্যতেই প্রভুর পর্বতের ওপর তাদেরকে আবার দেখতে পাব, এবং প্রভুর এসব পুরোহিতকে এবং তাদের পবিত্র উপাসনা দেখে এবং তাদের চমৎকার সঙ্গীত শুনে আমাদের হৃদয় ফুলে ওঠবে। অবশ্য জেরুসালেমের ফিলিস্তিনি মুসলিমদের মধ্যে বিপুল আনন্দ বয়ে আনার কোনো স্বপ্নাবিভাব ছিল না। রাব্বি কুক তার জীবদ্দশায় পাগলাটে ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কেবল আমাদের সময়েই তার ধারণাগুলো কার্যকারিতাসহ পূর্ণ স্বীকৃতি পেয়েছে।
হার্বার্ট স্যামুয়েলের উত্তরসূরি হিসেবে নিযুক্ত হন লর্ড প্লামার, ১৯২৫ সালে। তার আমলে ফিলিস্তিন ছিল আপত দৃষ্টিতে শান্তিপূর্ণ। ইহুদি সম্প্রদায় বা ইউশুব ম্যান্ডেটের অধীনে একটি সমান্তরাল রাষ্ট্র নির্মাণে ব্যস্ত ছিল। তার ছিল নিজস্ব সেনাবাহিনী (হাগানা), কিবুতজিম ও বাণিজ্যিক ইউনিয়নগুলোর (হিসতাদরুথ) সমন্বয়ে একটি পার্লামেন্টারি সংস্থাও ছিল। তাদের নিজস্ব করব্যবস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাশাপারি অনেক শিক্ষা, সাংস্কৃতিক ও দাতব্য সংস্থাও ছিল। জিওশ এজেন্সি (পশ্চিম জেরুসালেমের রেহাভিয়ায় ছিল এর সদরদফতর) ব্রিটিশ সরকারের কাছে ইউশুভের আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্বশীল সংস্থায় পরিণত হয়েছিল। আরবরা ছিল অনেক কম সংগঠিত। জায়নবাদের বিরোধিতা প্রশ্নে হোসাইনি ও নাশাশিবি উপদলের উত্তেজনায় তারা বিভক্ত ছিল। অবশ্য জায়নবাদী-আরব সঙ্ঘাতের উভয় পক্ষেই চরমপন্থীরা ক্রমাগত গুরুত্ব পাচ্ছিল। তারা আর বর্তমান অবস্থাকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিল না। চরমপন্থী জায়নবাদীরা ভ্লাদিমির জ্যাকোতিনস্কির আদর্শে আকৃষ্ট হয়েছিল। আর মুফতি তার অনুসারীদেরকে ব্রিটিশদের সাথে সহযোগিতা বন্ধ করতে আহ্বান জানাচ্ছিলেন।
সঙ্ঘাতটি উভয় জনগোষ্ঠীর গভীরতম আকাঙ্ক্ষার প্রতীক বিবেচিত নগরী জেরুসালেমে নতুন ও মর্মান্তিক অধ্যায়ের সৃষ্টি করে। ব্রিটিশদের আগমনের পর থেকে আরবেরা ওয়েস্টার্ন ওয়ালের প্রতি ইহুদিদের ভক্তিতে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেছিল। ঊনিশ শতকে মন্টেফিওর ও রথচাইল্ড উভয়ে প্রার্থনার এলাকাটি কেনার চেষ্টা করেছিলেন। ১৯১৮ সাল থেকে মুসলিমেরা লক্ষ্য করেছিল যে ইহুদিরা তাদের উপাসনাকালে চেয়ার, বেঞ্চ, পর্দা, টেবিল ও স্কুলসহ বেশি বেশি আসবাবপত্র নিয়ে আসছে। মনে হতে থাকে উসমানিয়া আমলের স্থিতিবস্থার যে ব্যবস্থা করা হয়েছিল, সেটি লঙ্ঘন করে তারা সেখানে একটি সিনাগগ নির্মাণ করতে যাচ্ছে। মুফতি তার অনুসারীদের সতর্ক করে দিয়ে বলেন, জায়নবাদীরা হারামের নিয়ন্ত্রণ লাভ করার পরিকল্পনা করছে। তিনি প্রাচীরে ইহুদিদের এসব কার্যক্রমকে বড় ধরনের উদ্যোগের আগে ছোট পরিবর্তন হিসেবে অভিহিত করেন। গোলযোগ ঘটে ১৯২৮ সালের যম কিপুরের প্রাক্কালে। জেরুসালেমের জেলা কমিশনার অ্যাডওয়ার্ড কি রোচ পুলিশপ্রধান ডগলাস ডাফকে নিয়ে পুরনো নগরীতে হাঁটছিলেন। তানজিকিয়া মাদরাসায় মুসলিম শরিয়াহ কোর্টে তাদেরকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তারা নিচে ইহুদি উপাসনা অনুষ্ঠানের দিকে তাকালে রোচ লক্ষ করেন যে প্রার্থনার সময় নারী ও পুরুষদের আলাদা করার জন্য একটি বেডরুমের পর্দা ব্যবহার করা হয়েছে। কক্ষে থাকা মুসলিম আলেমরা এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন, রোচ তাদের সাথে একমত হয়ে বলেন যে এটি স্থিতিবস্থার লঙ্ঘন। পর দিন ছিল যম কিপুর। পর্দা সরিয়ে ফেলার জন্য পুলিশ পাঠানো হয়। তারা উপস্থিত হয়েছিল উপাসনার সবচেয়ে ভাবগম্ভীর সময়ে। এ সময় নীরব উপাসনায় নিশ্চল অবস্থায় দাঁড়িয়েছিল উপাসনাকারীরা। উপাসনা শেষ হয়ে হওয়ার সাথে সাথেই সংবেদনহীনভাবে পুলিশ পর্দা সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করে। স্পষ্টভাবে অশ্রদ্ধা জ্ঞাপন করায় ইহুদিরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। ফিলিস্তিনজুড়ে ইউশুভ ক্রুদ্ধভাবে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ঈশ্বর অবমাননার অভিযোগ আনে।
মুফতি এখন নতুন প্রচারণা শুরু করলেন। তিনি জোর দিয়ে বলতে থাকেন যে স্থিতিবস্থা কঠোরভাবে পালন করতে হবে। প্রাচীরটি হারামের অংশ, এটি ইসলামি ওয়াকফের সম্পত্তি। এটি সেই স্থান যেখানে মুহাম্মদ (সা.) নৈশ সফরে বোরাককে বেঁধেছিলেন। ইহুদিদের উচিত হবে না আসবাবপত্র এনে কিংবা সোফার বাজিয়ে হারামে মুসলিমদের নামাজে বিঘ্ন ঘটিয়ে স্থানটিকে তাদের সম্পত্তি বিবেচনা করার মতো আচরণ করা। তারা ছিল যন্ত্রণাদগ্ধ। মুফতি ভক্তিকেন্দ্রিক আক্রমণও শুরু করেন। কাছেই ছিল একটি সুফি খানকাহ। হঠাৎ করেই জিকিরের শব্দ খুবই বেড়ে গেল, আর তা বিশৃঙ্খল বলে মনে হলো। প্রাচীরে ইহুদিরা যখন উপাসনা করত, ঠিক তখনই মোয়াজ্জিনেরা আজান দিতে লাগলেন। সবশেষে সুপ্রিম মুসলিম কাউন্সিল উপাসনা স্থানটির উত্তর দিকের প্রাচীর খুলে দিলো যাতে ওই রাস্তাটির অস্তিত্ব আর না বোঝা যায়। এতে করে পুরোটিই হারামের প্রান্ত দেশের সাথে মাগরিবি এলাকাকে সংযুক্ত হয়ে যায়। আরবরা ইহুদিদের উপাসনার সময় সেখান দিয়ে পশু নিয়ে যেত, সাবাতের সময় দেখিয়ে দেখিয়ে সিগারেট ধরাত। স্বাভাবিকভাবেই ইউশুভের, সেক্যুলার ও ধর্মীয়- সব ইহুদিই, বিশেষ করে ব্রিটিশেরা এই নীতিগর্হিত কাজগুলোকে অনুমোদন করায় অব্যাহতভাবে ক্রুদ্ধ ও অসন্তুষ্ট হচ্ছিল।
জুরিখে ১৯২৯ সালের গ্রীস্মে হয় ১৬তম জায়নবাদী সম্মেলন। প্রথম দিনে জ্যাবোটিনস্কি জ্বালাময়ী বক্তৃতায় জর্ডানের উভয় তীরে ইহুদি রাষ্ট্র (হোমল্যান্ড নয়) প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। সম্মেলনে উদারপন্থী জায়নবাদীদের মাধ্যমে তার প্রস্তাবটি বড় ব্যবধানে বাতিল হয়ে যায়। তবে আরবেরা এই ঘটনায় অত্যন্ত সতর্ক হয়ে যায়। তারপর এভের নবম দিনে (১৫ আগস্ট) জ্যাবোটিনস্কির তরুণ শিষ্যদের একটি গ্রুপ জেরুসালেমে ম্যান্ডেটরি অফিসের বাইরে বিক্ষোভ করে। তারপর তারা ওয়েস্টার্ন ওয়ালে গিয়ে ইহুদি জাতীয় পতাকা দোলায়, মৃত্যু পর্যন্ত তারা প্রাচীরটি রক্ষা করার সংকল্প ব্যক্ত করে। উভয় পক্ষে উত্তেজনা বাড়ে। পর দিন জুমার নামাজের সময় আরবরা হারামে সমবেত হতে শুরু করে। মুফতির কয়েকজন সমর্থক প্রাচীরে ইহুদি উপাসনালয়ের দিকে ছুটল। এবার পুলিশ দাঙ্গা দমন করে। তবে পরে একটি মর্মান্তিক ঘটনা বড় ধরনের সঙ্ঘাতের সূচনা করে। এক ইহুদি বালকের বল আরবদের একটি বাগানে পড়েছিল। এ নিয়ে দস্তাদস্তির একপর্যায়ে ছেলেটি মারা যায়। তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় জায়নবাদীরা ক্রুদ্ধভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। ২২ ও ২৩ আগস্ট ফিলিস্তিনি কৃষকেরা লাঠি ও ছুরি নিয়ে জেরুসালেমে আসে। কারো কারো কাছে আগ্নেয়াস্ত্র পর্যন্ত ছিল। ক্রোধ প্রশমিত করতে মুফতি কিছুই করলেন না। ওই শুক্রবারের জুমার খুতবায় আসলে উস্কানিমূলক কিছু বলেননি। কিন্তু তবুও নামাজের পর উত্তেজিত জনতা হারাম থেকে ছুটে গিয়ে সামনে যে ইহুদিই পড়েছে, তাকেই আক্রমণ করেছে। আবারো এ ধরনের ঘটনায় প্রতিশোধ নেওয়ার অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানায় ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ। লর্ড প্লামার ব্রিটিশ পুলিশ সদস্য কমিয়ে দিয়েছিলেন। তারা এখন এই সঙ্কট যথাযথভাবে মোকাবিলা করতে পারছিল না। পুরো ফিলিস্তিনে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। আগস্ট মাসের শেষ নাগাদ ১৩৩ জন ইহুদি নিহত ও ৩৩৯ জন আহত হয়। ব্রিটিশ পুলিশ ১১০ আরবকে হত্যা করে। তেল আবিবের কাছে ইহুদি পাল্টা হামলায় নিহত হয় আরো ছয় আরব।
