Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026

    ভুতুড়ে ট্রেন – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026

    ব্রাহ্মণ ভূত – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    ট্রেজার – ক্লাইভ কাসলার

    মখদুম আহমেদ এক পাতা গল্প615 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    ২৫. আনঅফিশিয়াল ভিজিট

    ২৫.

    আমার এটা আনঅফিশিয়াল ভিজিট, হে’লা কামিলকে বললেন জুলিয়াস শিলার, সিনেটর পিটের স্কি লজের সিটিংরুমে ঢুকলেন ওঁরা। সবাই জানে এই মুহূর্তে কী ওয়েস্টে মাছ ধরছি আমি।

    বুঝতে পারছি, হে’লা কামিল বললেন। কুক আর সিকিউরিটি গার্ডদের সাথে কত আর কথা বলা যায়, আপনি আসায় আমি খুশি হয়েছি। আইসল্যান্ডে তৈরি খয়েরি রঙের সোয়েটার জ্যাকেট আর ম্যাচ করা প্যান্ট পরে জুলিয়াস শিলারকে অভ্যর্থনা জানিয়েছেন তিনি, জুলিয়াস শিলার যেমন স্মরণ করতে পারেন তার চেয়ে অনেক কম লাগল বয়স।

    পরনে বিজনেস স্যুট, তার সাথে পায়ে ছুঁচাল উগার জুতো আর হাতে অ্যাটাচি কেস থাকায়, স্কি রিসর্ট-এ কেমন যে বেমানান লাগছে ভদ্রলোককে। আপনার নিরাপদ সময়টা আরও সহনীয় করার জন্য আমার যদি কিছু করার থাকে, মিস কামিল…

    না, ধন্যবাদ। কোনো কাজে হাত দিতে পারছি না, এটাই অস্থির করে তুলেছে আমাকে।

    আর তো মাত্র কয়টা দিন।

    আপনাকে কিন্তু মোটেও আশা করিনি, দাঁড়িয়ে পড়লেন হে’লা কামিল, সরাসরি তাকালেন শিলারের দিকে।

    মিসরের স্বার্থ আছে এমন একটা ব্যাপারে কথা বলতে চাই আপনার সাথে। আমাদের প্রেসিডেন্ট ভাবছেন, সব কথা আপনাকে জানানো দরকার।

    ইঙ্গিতে একটা সোফা দেখিয়ে বসলেন হে’লা কামিল। চোখে প্রশ্ন, নির্লিপ্ত চেহারা।

    আপনার সহযোগিতা পেলে তিনি ভারি কৃতজ্ঞ বোধ করবেন।

    কোন ব্যাপারে?

    সোফায় বসে হাঁটুর ওপর রেখে অ্যাটাচি কেসটা খুললেন জুলিয়াস শিলার, ভেতর থেকে একটা ফোল্ডার বের করে বাড়িয়ে দিলেন হে’লা কামিলের দিকে। বেয়ারা চা দিয়ে গেল।

     

    আরও দেখুন
    বাংলা ই-বই
    গ্রন্থাগার
    বাংলা ভাষা
    অনলাইন বুক
    বাংলা কমিকস
    Library
    বাংলা উপন্যাস
    বাংলা ঐতিহাসিক স্থান ভ্রমণ
    বাংলা ভাষার বই
    বইয়ের

     

    ফোল্ডারের শেষ পাতাটি পড়া শেষ করে মুখ তুললেন হে’লা কামিল। তার চোখে অন্তর্ভেদী দৃষ্টি। এটা কি এখন পাবলিক নিউজ?

    মাথা ঝাঁকালেন জুলিয়াস শিলার। আজ বিকেলে ঘোষণা করা হবে যে, জাহাজটা পাওয়া গেছে। তবে আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরির কথাটা গোপন রাখা হচ্ছে।

    জানালা দিয়ে বাইরে, দূরে তাকালেন হে’লা কামিল। ষোলোশো বছর আগে আমাদের লাইব্রেরি হারানো আর আজ আপনাদের ওয়াশিংটন আর্কাইভ ও ন্যাশনাল আর্ট গ্যালারি পুড়িয়ে দেয়া দুটো প্রায় সমর্থক, তাই না?

    মাথা ঝাঁকালেন জুলিয়াস শিলার। সমার্থক।

    প্রাচীন বইগুলো উদ্ধার পাবার কোনো আশা আছে?

    এখনও আমরা জানি না। মোম ট্যাবলেগুলো অস্পষ্ট কিছু সূত্র দিতে পারছে। মাত্র। আইসল্যান্ড আর দক্ষিণ আফ্রিকার মাঝখানে যেকোনো জায়গায় লাইব্রেরিটা থাকতে পারে।

     

    আরও দেখুন
    বাংলা অনুবাদকের পরিষেবা
    বাংলা ইসলামিক বই
    বই
    বাংলা অডিওবুক
    বাংলা ই-বই
    বাংলা সংস্কৃতি বিষয়ক কর্মশালা
    বাংলা বিজ্ঞান কল্পকাহিনী
    Library
    বাংলা কমিকস
    বাংলা গল্প

     

    তবে আপনারা খুঁজে দেখতে চাইছেন, বললেন হে’লা কামিল, আগ্রহের সাথে সিধে হয়ে বসলেন তিনি।

    হ্যাঁ, একটা দল গঠন করা হয়েছে, কাজও শুরু করেছে তারা।

    আর কে জানে?

    প্রেসিডেন্ট, আমি, টিমের লোকজন, সরকারি দুচারজন কর্মকর্তা, আমাদের এক কী দু’জন বিশ্বস্ত বন্ধু।

    আমাদের প্রেসিডেন্টকে না জানিয়ে আমাকে জানানোর কথা ভাবলেন কেন?

    সোফা ছেড়ে কার্পেটের ওপর দিয়ে হেঁটে গেলেন জুলিয়াস শিলার, তারপর হে’লা কামিলের দিকে ফিরলেন। প্রেসিডেন্ট হাসান অদূর ভবিষ্যতে ক্ষমতায় না-ও থাকতে পারেন। তাকে জানানোর চেষ্টা করা হলে তথ্যটা ভুল লোকের হাতে পৌঁছে যেতে পারে।

    আখমত ইয়াজিদ।

     

    আরও দেখুন
    বাংলা অনুবাদকের পরিষেবা
    বাংলা ডিটেকটিভ থ্রিলার
    নতুন উপন্যাস
    বাংলা স্বাস্থ্য টিপস বই
    বাংলা বই
    বই
    অনলাইন বুক
    বাংলা ঐতিহাসিক স্থান ভ্রমণ
    উপন্যাস সংগ্রহ
    বাংলা বইয়ের সাবস্ক্রিপশন

     

    সত্যি কথা বলতে কি, হ্যাঁ।

    কিম্ভ পর হলেও আখমত ইয়াজিদকে তথ্যটা আপনারা জানাবেন। লাইব্রেরির খোঁজ পাওয়া গেলে সেটা মিসরকে ফিরিয়ে দেয়ার দাবি জানাবে সে। প্রতিটি মিসরবাসীর দাবি হবে সেটা। আমিও তাই চাইব।

    ব্যাপারটা আমরা বুঝি, বললেন জুলিয়াস শিলার। সে ব্যাপারে কথা বলার জন্যই আপনার কাছে আমার আসা। আমাদের প্রেসিডেন্ট চান, আপনার ভাষণে আবিষ্কারের কথাটা আপনি ঘোষণা করুন।

    কঠোর হলো হে’লা কামিলের দৃষ্টি। তাতে কী লাভ?

    আমরা চাইছি আবিষ্কারটা যেন আপানাদের বর্তমান প্রেসিডেন্টের পক্ষে জনমত তৈরিতে সাহায্য করে। মিসরকে কয়েকশো বিলিয়ন ডলারের খনিজ সম্পদের নকশা উপহার দিতে পারে আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি।

    রাগে লালচে হলো হে’লা কামিলের চেহারা। খোঁজ পেতে যেখানে কয়েক বছর লাগতে পারে, সেখানে কি করে আপনারা আশা করেন দেশবাসীকে আমি বলব, দাঁড়াও, তোমাদের সুদিন এসে গেছে, আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরির বদৌলতে আমরা ধনী হয়ে গেছ? মি. শিলার, মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে অনেক বাজে খেলা খেলেছেন আপনারা, এটাও সে রকম একটা নোংরা খেলা। মিসরবাসীকে মিথ্যে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য আমাকে আপনারা খুঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন, এতটা আশা করে বসে আছেন?

     

    আরও দেখুন
    সেবা প্রকাশনীর বই
    বিনামূল্যে বই
    বাংলা বই
    বাংলা রান্নার রেসিপি বই
    বাংলা ইসলামিক বই
    গ্রন্থাগার
    সাহিত্য পর্যালোচনা
    Books
    বাংলা বিজ্ঞান কল্পকাহিনী
    বইয়ের

     

    ধীরে ধীরে ফিরে এসে সোফায় আবার বসলেন জুলিয়াস শিলার। কোনো প্রতিবাদ করলেন না।

    আপনি ভুল করেছেন, মি, শিলার। আমি আমার সরকারের পতন দেখব, মোস্তাফা ইয়াজিদের পাঠানো খুনিদের হাতে মারা যাবার ঝুঁকি নেব, কিন্তু দেশবাসীকে মিথ্যে তথ্য সরবরাহ করতে পারব না।

    মহৎ ভাবাবেগ, শান্তকণ্ঠে বললেন জুলিয়াস শিলার। আপনার নীতির প্রতি আমার শ্রদ্ধা প্রকাশ করছি। তবে, এখনও আমার বিশ্বাস, প্ল্যানটা সব দিক থেকে ভালো।

    দেশের কাছে আমি মিথ্যেবাদিনী হয়ে যাব, বুঝতে পারছেন না? শেষ পর্যন্ত যদি লাইব্রেরিটার সন্ধান পাওয়া না যায়? পাওয়া না গেলে আপনারাও দুর্নামের ভাগীদার হবেন। এমনিতেও আপনাদের মধ্যপ্রাচ্য নীতি।

    একটা হাত তুলে বাধা দিলেন জুলিয়াস শিলার। হ্যাঁ, কিছু ভুল আমরা করেছি। কিন্তু, মিস কামিল, এখানে আমি আপনার সাথে মধ্যপ্রাচ্য নীতি নিয়ে কথা বলতে আসিনি।

     

    আরও দেখুন
    বাংলা বইয়ের সাবস্ক্রিপশন
    বইয়ের
    বাংলা শিশু সাহিত্য
    বাংলা ডিটেকটিভ থ্রিলার
    বই পড়ুন
    সাহিত্য পর্যালোচনা
    অনলাইন গ্রন্থাগার
    বাংলা বই
    অনলাইন বুক
    বাংলা ভাষা

     

    দুঃখিত। আপনাকে আমি কোনো সাহায্য করতে পারলাম না।

    কাঁধ ঝাঁকিয়ে জুলিয়াস শিলার বললেন, বেশ। প্রেসিডেন্টকে আপনার প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জানাব আমি। তিনি যে ভীষণ হতাশ হবেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অ্যাটাচি কেস হাতে নিয়ে সোফা ছাড়লেন তিনি, দরজার দিকে পা বাড়ালেন।

    দাঁড়ান! তীক্ষ্ণ আদেশের সুরে বললেন জাতিসংঘ মহাসচিব।

    দাঁড়ালেন জুলিয়াস শিলার, ধীরে ধীরে ঘুরলেন। প্লিজ?

    সোফা ছেড়ে দাঁড়ালেন হে’লা কামিল, কিন্তু এগিয়ে এলেন না। প্রমাণ করুন, লাইব্রেরির সন্ধান পাবার মতো পজিটিভ সূত্র আপনাদের হাতে আছে, হোয়াইট হাউসের অনুরোধ রক্ষা করব আমি। সূত্রগুলো নির্ভেজাল কি না সেটা আমি নিজে বুঝব।

     

    আরও দেখুন
    বই পড়ুন
    বাংলা বিজ্ঞান কল্পকাহিনী
    বুক শেল্ফ
    গ্রন্থাগার সেবা
    উপন্যাস সংগ্রহ
    বাংলা স্বাস্থ্য টিপস বই
    অনলাইন গ্রন্থাগার
    বাংলা উপন্যাস
    বাংলা ভাষার বই
    বাংলা রান্নার রেসিপি বই

     

    ভাষণে উল্লেখ করবেন?

    হ্যাঁ।

    কিন্তু ভাষণের আর মাত্র চারদিন বাকি। এত অল্প সময়ে…

    ওটাই আমার শর্ত।

    গম্ভীরভাবে মাথা ঝাঁকালেন জুলিয়াস শিলার। ঠিক আছে। ঘুরে দাঁড়িয়ে হন হন। করে এগোলেন তিনি।

    .

    শিলারের গাড়িটা প্রাইভেট রোড থেকে হাইওয়ে নাইনে বেরিয়ে এল। গাড়ি বা আরোহীকে চিনতে না পারলেও, এই প্রাইভেট রোড ধরে খানিক দূর গেলেই যে সিনেটর পিটের লজ দেখা যাবে তা ভালো করেই জানে মোহাম্মদ ইসমাইল। মার্সিডিটা চলে গেল স্কি শহর ব্রেকেনরিজ-এর দিকে।

     

    আরও দেখুন
    গ্রন্থাগার
    Books
    পিডিএফ
    বাংলা বই
    সাহিত্য পর্যালোচনা
    বাংলা ভাষার বই
    বাংলা সাহিত্য ভ্রমণ
    বাংলা ভাষা
    বাংলা স্বাস্থ্য টিপস বই
    সেবা প্রকাশনীর বই

     

    মার্সিডিজটা যে সরকারি গাড়ি, বুঝতে পারল মোহাম্মদ ইসমাইল। প্রাইভেট রোডের ওপর সশস্ত্র লোকজন হাঁটাচলা করছে, মাঝেমধ্যে কথা বলছে, রেডিও ট্রান্সমিটারে, রাস্তার মুখেই দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা ডজ ভ্যান। এসব দেখে মোহাম্মদ ইসমাইলের বুঝতে বাকি থাকল না, ওয়াশিংটন থেকে ইয়াজিদের এজেন্টরা যে তথ্য সংগ্রহ করেছে তা মিথ্যে নয়।

    একটা মার্সিডিজ-বেঞ্জ ডিলে সিডানের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে মোহাম্মদ ইসমাইল, গাড়ির ভেতর বসা লোকটাকে আড়াল করে রেখেছে সে, চোখে বাইনোকুলার নিয়ে খোলা জানালা দিয়ে প্রাইভেট রোডটার দিকে তাকিয়ে লোকটা। গাড়ির ছাদে একটা ব্ল্যাক, তাতে কয়েক সেট স্কি। মোহাম্মদ ইসমাইলের পরনে সাদা স্কি স্যুট, মুখেও সে একটা স্কি মাস্ক পরেছে। স্কি র‍্যাক অ্যাডজাস্ট করার ছলে আরেক দিকে মুখ ফেরাল সে, জিজ্ঞেস করল, দেখা হলো?

    আর এক মিনিট, বলল লোকটা। লজটা দেখছে সে, গাছের ফাঁক দিয়ে কোনো রকমে দেখা যাচ্ছে। লোকটার মুখ ভর্তি দাড়ি, মাথায় ঝাকড়া চুল।

     

    আরও দেখুন
    অনলাইন গ্রন্থাগার
    বাংলা সংস্কৃতি বিষয়ক কর্মশালা
    বই
    সেবা প্রকাশনীর বই
    সাহিত্য পর্যালোচনা
    বাংলা বইয়ের সাবস্ক্রিপশন
    PDF
    বাংলা অনুবাদ সাহিত্য
    অনলাইন বই
    বাংলা সাহিত্য ভ্রমণ

     

    তাড়াতাড়ি করো ঠাণ্ডায় কাপ ধরে যাচ্ছে। কী রকম বুঝছ?

    সব মিলিয়ে মাত্র পাঁচজন গার্ড। তিনজন বাড়ির ভেতর, দু’জন গাড়িতে। মাত্র একজন লোক বাড়িটাকে ঘিরে চক্কর দিয়ে আসছে ত্রিশ মিনিট পরপর। ঠাণ্ডা বলে কেউই বেশিক্ষণ বাইরে থাকছে না। তুষারের ওপর দিয়ে প্রতিবার একই পথ ধরে টহল দিচ্ছে ওরা। টিভি ক্যামেরার কোনো চিহ্ন দেখছি না। তবে, ভ্যানের ভেতর থাকতে পারে একটা, বাড়ির ভেতর নজর রাখছে।

    হামলাটা করা হবে দুদিক থেকে, মোহাম্মদ ইসমাইল প্ল্যান দিল। একদল বাড়িটা দখল করবে, দ্বিতীয় দলটা টহল গার্ড আর ভ্যানটাকে সামলাবে-হামলা হবে পেছন থেকে, যেদিক থেকে বিপদের সবচেয়ে কম সম্ভাবনা।

    আপনি কি আজ রাতেই হামলা করার চিন্তা করছেন? চোখ থেকে বাইনোকুলার নামিয়ে জিজ্ঞেস করল লোকটা।

    না, কাল। সকালে যখন আমেরিকান শুয়োরগুলো নাস্তা খাবে।

     

    আরও দেখুন
    অনলাইন বই
    বাংলা ভাষা শিক্ষার অ্যাপ
    বিনামূল্যে বই
    পিডিএফ
    বাংলা সংস্কৃতি বিষয়ক কর্মশালা
    বইয়ের
    উপন্যাস সংগ্রহ
    বাংলা ইসলামিক বই
    বাংলা গল্প
    অনলাইন বুক

     

    কিন্তু দিনের বেলা…বিপদ হতে পারে।

    আমরা কাপুরুষ নই যে অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে কাজ সারব, রেগে গেল মোহাম্মদ ইসমাইল।

    কিন্তু এয়ারপোর্টে ফেরার সময় শহরের মাঝখান দিয়ে যেতে হবে, প্রতিবাদ জানাল লোকটা। ট্রাফিক আর কয়েকশো স্কিয়ার থাকবে রাস্তায়। এ ধরনের অহেতুক ঝুঁকি নিতে রাজি হবেন না সুলেমান আজিজ।

    চরকির মতো আধপাক ঘুরে ঠাস করে লোকটার গালে চড় কষাল মোহাম্মদ ইসমাইল। এখানে নেতৃত্ব দিচ্ছি আমি! চাপা গলায় গর্জে উঠল সে। আমার সামনে ফের যদি তার নাম মুখে এনেছ তো খুন করে ফেলব! তার মাতব্বরি করার দিন শেষ হয়ে গেছে!

    লোকটা ভয়ও পেল না, নতও হলো না। তার কালো চোখে ঘৃণা ফুটে উঠল। আপনি আমাদের সবাইকে খুন করবেন! শান্তভাবে বলল সে।

     

     

    বিনিময়ে যদি হে’লা কামিল খুন হয়, তাতেও আমার আপত্তি নেই! হিস হিস করে বলল মোহাম্মদ ইসমাইল।

    .

    ২৬.

    অসাধারণ! পিট বলে।

    অভিজাত, সত্যি অভিজাত, বিড়বিড় করে বলে লিলি।

    মাথা নাড়িয়ে সায় দেয় জিওর্দিনো, একটা জিনিস!

    দুর্লভ গাড়ির একটা রিস্টোরেশন শপে দাঁড়িয়ে ওরা।

    গাড়িটা দর্শনীয় বটে। উনিশশো ত্রিশ সালে তৈরি, এল-টোয়েনটি নাইন কর্ড টাউন করে শোফারের জন্য গাড়ির সামনের অংশটা খোলা। রক্তবর্ণ শরীর, ফেন্ডার হালকা হলুদ, প্যাসেঞ্জার কমপার্টমেন্টের ওপর চামড়ার তৈরি ছাদও তাই। গাড়িটা লম্বা, সুন্দর অভিজত চেহারা ফ্রন্ট হুইল ড্রাইভ। আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ মিটার লম্বা পিটের কার্ড। প্রায় অর্ধেকটাই হুড দিয়ে ঢাকা, শুরু হয়েছে রেস-কার-টাইপ গ্রিল দিয়ে আর শেষ হয়েছে সরু উইন্ডশিল্ড দিয়ে।

     

     

    ট্যাক্সি ছেড়ে দিয়ে কর্ডে চেপে বসল ওরা তিনজন। পিট ড্রাইভিং সিটে, ছাদের নিচে প্যাসেঞ্জার কমপার্টমেন্টে লিলিকে নিয়ে জিওর্দিনো। ইন্টারস্টেট সেভেনটিতে বেরিয়ে এল অ্যান্টিক কার কর্ড। তুষার ঢাকা রকি পাহাড়ের দিকে যাচ্ছে ওরা। হুড ফেলে নিজেকে ঢাকল না পিট, মুখে ঠাণ্ডা বাতাসের ঝাঁপটা ভালো লাগছে। আট সিলিন্ডার ইঞ্জিনের আওয়াজ শুনছে ও, শুনছে এগজস্টের শব্দ। মেরামত করার পর কোথাও কোনো ত্রুটি নেই। মনটা খুশি হয়ে উঠল ওর। জানে না অদূর ভবিষ্যতে কি অপেক্ষা করছে ওদের জন্য। জানলে, সোজা গাড়ি ঘুরিয়ে ডেনভারের পথ ধরত।

    .

    হোটেলে পৌঁছে রিসেপশন থেকে দুটো মেসেজ পেল পিট। পড়ে পকেটে রেখে দিল।

    ড. রোথবার্গ তার বাড়িতে ডিনার খাবার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। রাস্তার ওপারেই তার বাড়ি।

    কখন? পেটে হাত বুলিয়ে আগ্রহের সাথে জানতে চাইল জিওর্দিনো।

    সাড়ে সাতটায়।

    হাত ঘড়িতে চোখ বুলালো লিলি। শাওয়ার নিয়ে চুল ঠিক করতে মাত্র চল্লিশ মিনিট সময় পাচ্ছি, আমি বরং কামরায় ঢুকি।

    পোর্টারের পিছু নিয়ে লিলি চলে যাবার সাথে সাথে জিওর্দিনোকে সাথে আসার ইঙ্গিত দিয়ে ককটেল লাউঞ্জে চলে এল পিট। বারমেইড অর্ডার নিয়ে সরে যাবার পর পকেট থেকে দ্বিতীয় মেসেজটা বের করে হাত ধরিয়ে দিল।

    জিওর্দিনো নিচু গলায় পড়ল, তোমাদের লাইব্রেরি প্রজেক্ট টপ প্রায়োরিটি পেয়ে গেছে। আগামী চার দিনের মধ্যে আলেকজান্দ্রিয়ার ঠিকানা খুঁজে বের করাটা অত্যন্ত জরুরি। লাক, ড্যাডি। মুখ তুলে পিটের দিকে তাকাল সে। পড়তে ভুল করিনি তো? মাত্র চারদিনের মধ্যে? স্কি করার কথা ভুলে যাও।

    ব্যস্ত হয়ে কী লাভ? বলল পিট। ইয়েজারের ভাগ্যে শিকে না ছেঁড়া পর্যন্ত আমাদের কিছু করার নেই। চেয়ার ছাড়াল ও তার একটা খবর নেয়া দরকার।

    হোটেলের লবি থেকে ফোন করল পিট। ইয়েজার, পিট বলছি। কতদূর এগোবে?

    এগোচ্ছি।

    কিছু পেলে?

    কয়েকটা কম্পিউটর কাজ করছে, ব্যাংকগুলোর জিওলজিকাল ডাকা, ক্যাসাব্লাঙ্কা থেকে জাঞ্জিবার পর্যন্ত, তন্নতন্ন করে যাচাই করা হচ্ছে। আফ্রিকা উপকূলে এমন কোনো স্পট নেই, যা তোমার নকশার সাথে মেলে। তিনটে অস্পষ্ট বা ক্ষীণ সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু পরে আমি সেগুলোও বাতিল করে দিয়েছি। ষোলোশো বছরে ল্যান্ডমাস ট্রান্সফরমেশন অবশ্যই ঘটেছে, সম্ভাবনাগুলোর সাথে তার হিসাব ধরলে কোনো মিলই আর পাওয়া যায় না।

    তোমার পরবর্তী পদক্ষেপ?

    উত্তর দিকে সার্চ করব। সময় আরও বেশি লাগবে। কারণ ব্রিটিশ দ্বীপগুলো ছাড়াও বাল্টিক সী আর সাইবেরিয়া স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর উপকূল রেখা ধরে কাজ করতে হবে আমাকে।

    চার দিনের মধ্যে শেষ করতে পারবে?

    তুমি তাগাদা দিলে ভাড়াটে কর্মীদের সংখ্যা বাড়াতে পারি।

    তাগাদা খুব জোরাল বলে ধরে নাও। আর্জেন্ট প্রায়োরিটি।

    ঠিক আছে, সাধ্যমতো চেষ্টা করব।

    ব্রেকেনরিজ, কলোরাভোয় রয়েছি আমরা। যদি কিছু পাও, ব্রেকেনরিজ হোটেলে খবর দেবে। ইয়েজারকে রুম আর ফোন নম্বর দিল পিট। ভালো কথা, তোমাকে এত খুশি লাগছে কেন?

    নদীটা কোথায় এখনও তা আমি জানি না, জবাব দিল হিরাম ইয়েজার, কিন্তু জানি কোথায় সেটা নেই।

    .

    হোটেল থেকে বেরিয়ে রাস্তা পেরোল ওরা, সাদা পাউডারের মতো তুষারে ঢাকা পড়ে গেল জামা-কাপড়। অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের ২২ বি নম্বরে থাকেন ড. বেরট্রাম রোথবার্গ। দরজা খুলে দিয়ে এমন আন্তরিকতার সাথে ওদেরকে তিনি অভ্যর্থনা জানালেন যেন কত বছরের পরিচয়। সিটিংরুমে, আগুনের চারপাশে বসালেন ওদেরকে। নিজে রান্না করতে শিখিনি, রেস্তোরাঁ থেকে দিয়ে যায়-আজ আটটার সময় দেবে। তার আগে একটু গরম হয়ে না, বাছারা! তিনি নিজেই সবার হাতে হুইস্কির গ্লাস ধরিয়ে দিলেন। পিট নিজেদের পরিচয় দিল না। সন্দেহ নেই, সিনেটর পিট আগেই ওদের সবার বর্ণনা পাঠিয়ে দিয়েছেন।

    বাবা বলছিলেন আপনি নাকি সারা জীবন ধরে আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরির ওপর গবেষণা করছেন।

    ছোটখাট মানুষটা, মোটা সোয়েটার আর ট্রাউজার পরে আছেন, দাড়ি আর গোঁফে ঢাকা পড়ে আছ ছোট্ট মুখটা। সলজ্জভাবে একটু হাসলেন তিনি। বত্রিশ বছর। ধুলো ঢাকা বুকশেলফ আর প্রাচীন পাণ্ডুলিপি ঘেঁটে শুধু চোখ নষ্ট করেছি, বোধ হয় বিয়ে করে সংসারী হলেই ভালো করতাম। তবে সাবজেক্টটা আমার কাছে রক্ষিতার মতো কখনও কিছু চায় না, শুধু দেয়। আমি যে তার প্রেমে পড়ে গেছি তাতে কোনো সন্দেহ নেই। গলা ছেড়ে হেসে উঠলেন প্রৌঢ় ইতিহাসবেত্তা। তারপর লিলির দিকে ফিরে বললেন, একজন আর্কিওলজিস্ট হিসেবে তুমি আমার অনুভূতি বুঝতে পারবে।

    লাইব্রেরিটা সম্পর্কে বলবেন আমাদের, প্লিজ? অনুবোধ জানাল জিওর্দিনো।

    ফায়ারপ্লেসের আগুনটা উসকে দিয়ে এলেন ড. রোথবার্গ। প্রাচীন দুনিয়ার একটা বিস্ময় ছিল আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি। গোটা সভ্যতার সমস্ত দলিলপত্র আর নমুনা ওখানে সংগ্রহ করে রাখা হয়েছিল। আধবোজা চোখে বলে গেলেন তিনি, যেন তাকে সমাহিত করা হয়েছে।

    গ্রিক ঈজিপশিয়ান আর রোমানদের মহৎ শিল্প আর সাহিত্য ইহুদিদের পবিত্র বাণী, প্রাচীন দুনিয়ার সেরা মেধাসম্পন্ন মনীষীদের জ্ঞান আর কীর্তি, দর্শনের বিস্ময়কর তত্ত্ব, সুর আর সঙ্গীতের অপূর্ব সব আবিষ্কার, প্রাচীন বেস্টসেলার, বিজ্ঞান আর মেডিসিনের যুগান্তকারী সব কৃতিত্ব, কী না জমা ছিল লাইব্রেরিটায়!

    ওটা কি সাধারণ মানুষের জন্য খোলা থাকত?

    মুর্খ বা ভিখিরীদের অবশ্যই প্রবেশাধিকার ছিল না, বললেন ড. রোথবার্গ। তবে গবেষক আর পণ্ডিতরা নিয়মিত যেতেন লাইব্রেরিতে-পরীক্ষা, যাচাই, অনুবাদ, সংশোধন করতেন তারা; ক্যাটালগ তৈরি করতেন। শুধু সংগ্রহশালা বললে ভুল হবে, ওটা ছিল দুনিয়ার প্রথম রেফারেন্স লাইব্রেরি। প্রতিটি আইটেম ক্যাটালগে ভোলা ছিল, সুন্দরভাবে সাজানো-গোছানো রাখা হতো।

    পরবর্তী সম্রাটরা এবং বহু জাতি আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরির ঋণ মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করেছে। প্রাচীন যুগে আর কোনো প্রতিষ্ঠানে এত জ্ঞান-সম্পদ ছিল না। প্লিনী, প্রখ্যাত রোমান পণ্ডিত, প্রথম খ্রিস্টাব্দে এনসাইক্লোপিডিয়া রচনা করেন। অ্যারিসটোফানেস, খ্রিস্টের জন্মের দুশো বছর আগে লাইব্রেরির প্রধান ছিলেন-তোমরা জানো, তিনিই প্রথম অভিধান রচনা করেন। ক্যালিম্যাচাস গ্রিক ট্র্যাজেডির বিখ্যাত লেখক, সবার আগে রচনা করেন হুজ হু! পণ্ডিত, অঙ্কশাস্ত্রবিদ ইউক্লিড জ্যামিতির ওপর প্রথম টেক্সটবুক লেখেন। সুষ্ঠুভাবে সাজিয়ে ব্যাকরণের নিয়মকানুন প্রথম প্রকাশ করেন। ডাইয়োনাইসিয়াস। আর্ট অব গ্রামার তার একটা মহৎ সৃষ্টি, প্রায় সব ভাষার জন্য ওটা একটা মডেল হয়ে ওঠে। এই সব মনীষীরা, আরও হাজার হাজার পণ্ডিতদের সাথে বসে আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরিতে কাজ করেছেন।

    আপনি যেন একটা ইউনিভার্সিটির বর্ণনা দিচ্ছেন, মন্তব্য করল পিট।

    ইউনিভার্সিটিই তো ছিল সেটা। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানভাণ্ডার। তখনকার দিনে লাইব্রেরি আর মিউজিয়ামটাকে এক করে বলাও হত তাই-হেলেনিস্টিক দুনিয়ার ইউনিভার্সিটি। সাদা মার্বেল পাথরের তৈরি বিশাল সব কাঠামোর মধ্যে পিকচার গ্যালারি ছিল, মূর্তিগুলোর জন্য ছিল আলাদা হলঘর, কবিতা পাঠের আসর বসত থিয়েটার হলে, পণ্ডিতরা জ্ঞানগর্ভ লেকচার দিতেন মঞ্চে দাঁড়িয়ে। লাইব্রেরির সাথে ডরমিটরি, ডাইনিং হল, চিড়িয়াখানা আর বোটনিক্যাল গার্ডেনও ছিল। প্রকাণ্ড আকারের দশটা হলঘরে রাখা হতো বই আর পাণ্ডুলিপি। সেগুলোর কয়েক হাজার ছিল হাতে লেখা, হয় প্যাপিরাসে নয়তো পার্চমেন্ট। লেখার পর সেগুলো গুটিয়ে ব্রোঞ্জ টিউবে ঢুকিয়ে রাখা হতো।

    দুটোর মধ্যে পার্থক্য কী? প্রশ্ন করল অ্যাল।

    প্যাপিরাস ট্রপিকাল প্লান্ট। মিসরীয়রা ওটার কাণ্ড থেকে লেখার জন্য কাগজের মতো এক ধরনের জিনিস তৈরি করত। পার্চমেন্ট, ভেল্যাম-ও বলা হয়, তৈরি হতো পশুর চামড়া থেকে-হাতি গরু ছাগল বা ভেড়ার বাচ্চার চামড়াই ব্যবহার করা হতো সাধারণত।

    এত দিনে ওগুলো নষ্ট হয়ে যাবার কথা নয়? জিজ্ঞেস করল পিট।

    প্যাপিরাসের চেয়ে বেশি দিন টেকার কথা পার্চমেন্টের, বললেন ড. রোথবার্গ। পিটের দিকে তাকালেন তিনি। মোলোশো বছর পর ওগুলোর অবস্থা কী হয়েছে নির্ভর করে কোথায় রাখা হয়েছে তার ওপর। মিসরীয় সমাধি থেকে পাওয়া তিন হাজার বছরের পুরনো প্যাপিরাসের লেখাও তো পড়া গেছে।

    গরম আর শুকনো আবহাওয়া।

    ধরুন, সুইডেন বা রাশিয়ার উত্তর উপকূল কোথাও আছে ওগুলো।

    চিন্তিতভাবে মাথা নিচু করলেন ড. নোথবার্গ। শীত ওগুলোকে সংরক্ষণ করবে, কিন্তু গরমের দিনে পচে যেতে পারে।

    লাইব্রেরিটাকে অক্ষত খুঁজে পাবার সম্ভাবনা ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসছে বুঝতে পেরে মন খারাপ হয়ে গেল পিটের। কিন্তু লিলি ওর মতো হাতাশ নয়। সে কণ্ঠস্বরে উত্তেজনা নিয়ে জিজ্ঞেস করল, আপনি যদি জুনিয়াস ভেনাটর হতেন, ড. রোথবার্গ, কী ধরনের বই আপনি রক্ষা করতে চাইতেন?

    কঠিন প্রশ্ন, চোখ পিট পিট করে লিলির দিকে ফিরলেন ড. রোথবার্গ। আমি শুধু আন্দাজ করতে পারি। সোফোক্লিস, ইউরিপেডিস, অ্যারিস্টটল আর প্লেটোর সমগ্র রচনা তো থাকবেই। আরও থাকবে, অবশ্যই, হোমার। তিনি বই লিখেছেন চব্বিশটা, কিন্তু অল্প দুচারটে হাতে পেয়েছি আমরা। আমরা ধারণা, গ্রিক, এট্রাসক্যান, রোমান ও ঈজিপশিয়ান মিলিয়ে পঞ্চাশ হার ভলিউম ইতিহাস অবশ্যই সাথে নিয়েছিলেন ভেনাটর, কারণ জাহাজের সংখ্যা তো আর কম ছিল না। ঈজিপশিয়ান বইগুলো অত্যন্ত মূল্যবান হবে, কারণ ওগুলো শুধু আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরিতে ছিল বলে প্রাচীন মিসরে জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য, শিল্প, ধর্ম ইত্যাদি বিষয়ে কিছুই আমরা আনতে পারিনি। এট্রাসক্যান সভ্যতা সম্পর্কেও প্রায় কিছুই আমরা জানি না অথচ ক্লডিয়াস তাদেরকে নিয়ে বড়সড় একটা ইতিহাস লিখেছিলেন-সেটাও নিশ্চয়ই লাইব্রেরির কোনো শেলফে আছে। ভেনাটরের জায়গায় আমি হলে হিব্রু আর খ্রিস্টান আইন ও ঐতিহ্য সম্পর্কে লেখাগুলোও সাথে নিতাম। ওগুলোয় হয়তো এমন সব তথ্য ও উপাদান আছে, যা আজকের খ্রিস্টান ধর্মের পণ্ডিতদের বেকায়দায় ফেলে দিত।

    বিজ্ঞান?

    বিজ্ঞানের ওপর অসংখ্য বই লেখা হয়েছে সে যুগে। ভেনাটর সেগুলো না নিয়ে পারেন না।

    রান্নার বইয়ের কথা ভুলে যাবেন না, লিলি বলে।

    হেসে উঠলেন ড. রোথবার্গ। ভেনাটর অত্যন্ত বিবেচক ও বুদ্ধিমান মানুষ ছিলেন, জ্ঞানের কোনো শাখাই তার চোখ এড়িয়ে যায়নি। শুধু রান্নাবান্না কেন, দৈনন্দিন প্রয়োজনের ওপর বা ঘর-গেরস্থালির ওপর লেখা বইও তিনি জাহাজে তুলেছিলেন বলে ধরে নেয়া যায়। সবার জন্যই কিছু না কিছু নিয়েছিলেন তিনি।

    বিশেষ করে প্রাচীন জিওলজিকাল ডাটা, বলল পিট।

    হ্যাঁ।

    আচ্ছা, এ কথা কি জানা গেছে, মানুষটা কেমন ছিলেন তিনি? লিলির প্রশ্ন।

    ভেনাটর?

    হ্যাঁ।

    তার যুগে তিনি সেরা বুদ্ধিজীবীদের অন্যতম ছিলেন। এথেন্সে পণ্ডিত বলে খ্যাতি ছিল তার, সেখানে তিনি শিক্ষকতা করতেন। আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি ও মিউজিয়ামের কিউরেটর হিসেবে ভাড়া করে নিয়ে আসা হয় তাকে। আমরা জানি, রাজনীতি আর সামাজিক বিষয় নিয়ে একশোর ওপর বই লিখেছেন তিনি, আজ থেকে চার হাজার বছরের পুরনো পটভূমি সন্ধানও সেসব বইতে পাওয়া যায়। কিন্তু তার কোনো বই-ই রক্ষা পায়নি।

    তাঁর সম্পর্কে আর কী জানেন আপনি? পিটের প্রশ্ন।

    খুব বেশি না। ভেনাটরের অনেক মেধাবী ছাত্র ছিলেন, যারা পরে বিখ্যাত হয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন অ্যানটিওক-এর ডায়োক্রেস। ডায়োক্লেস তার একটা রচনায় ভেনাটরের কথা উল্লেখ করেছেন-তার শিক্ষক নতুন কিছু প্রবর্তন বা আবিষ্কারের প্রতি নিবেদিত ছিলেন, এমন সব বিষয়ে গবেষণা চালাতেন তিনি, অন্যান্য পণ্ডিতরা সেসব বিষয়ে গবেষণা করতে ভয় পেতেন। যদিও খ্রিস্টান ছিলেন, তবে ধর্মকে তিনি সমাজবিজ্ঞান হিসেবে দেখতেন। আলেকজান্দ্রিয়ার বিশপ থিয়োফিলোস এর সাথে এই নিয়েই তার বিরোধ দেখা দেয়। ভেনাটরের বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লাগেন থিয়োফিলোস, রায় দিয়ে বসেন লাইব্রেরি আর মিউজিয়াম পৌত্তলিক ধ্যান-ধারণার ভাণ্ডার হিসেবে কাজ করছে। শেষ পর্যন্ত তিনি সম্রাট থিয়োডোসিয়াসকে লাইব্রেরি আর মিউজিয়াম পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দিতে রাজি করান। সম্রাট ছিলেন গোড়া খ্রিস্টান। পোড়ানোর সময় খ্রিস্টান আর অখ্রিস্টানদের মধ্যে তুমুল মারামারি শুরু হয়ে যায়। ধরে নেয়া হয়েছিল, থিয়োফিলোস-এর ফ্যানাটিকাল অনুসারীদের হাতে নিহত হন ভেনাটর।

    কিন্তু এখন আমরা জানি সংগ্রহের ভালো একটা অংশ নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন তিনি, বলল লিলি।

    রাস্তার ঝাড়ুদার লটারিতে এক মিলিয়ন ডলার পেলে যেমন খুশি হয়, সিনেটর পিটের মুখে গ্রিনল্যান্ডে তোমরা কী আবিষ্কার করেছ শুনে আমিও ঠিক সে রকম খুশি হয়েছি।

    ভেনাটর ওগুলো কোথায় রাখত পারেন, আপনি কোনো ধারণা দিতে পারেন? জিজ্ঞেস করল পিট।

    দীর্ঘ এক মিনিট চুপ করে থাকলেন ড. রোথবার্গ। তারপর শান্ত গলায় তিনি বললেন, জুনিয়াস ভেনাটর সাধারণ একজন মানুষ ছিলেন না। তিনি তার নিজের পথ অনুসরণ করছিলেন। জ্ঞানের পাহাড় ছিল তাঁর হাতে। বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তি, অমূল্য সম্পদ ভাবী বংশধরদের জন্য সংরক্ষণের ব্যাপারে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি তিনি ব্যবহার করেছেন। ষোলোশো বছর পেরিয়ে যেতে চলল অথচ আজও লাইব্রেরিটার কোনো সন্ধান আমরা পাইনি, এ থেকেই কি প্রমাণ হয় না যে লুকিয়ে রাখার ব্যাপারে অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি? পরাজয় স্বীকার করার ভঙ্গিতে হাত দুটো মাথার ওপর তুললেন তিনি। আমি কোনো সূত্র দিতে অপরাগ। ভেনাটরের বুদ্ধির নাগাল পাওয়া আমার সাধ্যের অতীত।

    কিন্তু আন্দাজ করতে অসুবিধা কী? জিজ্ঞেস করল পিট।

    ফায়ারপ্লেসে আগুন জ্বলছে, নৃত্যরত শিখাগুলোর দিকে দীর্ঘ কয়েক সেকেন্ড একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলেন ড. রোথবার্গ। আমরা ধারণা, ভেনাটর ওগুলো এমন এক জায়গায় রেখেছেন, যেখানে খোঁজার কথা ভাববে না কেউ।

    .

    ২৭.

    মোহাম্মদ ইসমাইলের হাতঘড়িতে সাতটা আটান্ন মিনিট। একটা ঝোঁপের আড়ালে শুয়ে, পাতার ফাঁক-ফোকর দিয়ে লজটার দিকে তাকিয়ে রয়েছে সে। দুটো চিমনির একটা থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। হে’লা কামিল, সে জানে, সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠেন, রাঁধতেও জানেন ভালো। তার অনুমানটাই ঠিক, গার্ডদের জন্য ব্রেকফাস্ট তৈরি করছেন তিনি।

    মরুর মানুষ, হিম শীতল ঠাণ্ডা তার সহ্য হচ্ছে না। গোড়ালি ব্যথা করছে, হাত পায়ের আঙুল দস্তানার ভেতর অসাড় হয়ে যাচ্ছে। হাটচলা করা সুযোগ থাকলে খুশি হতো সে। ধীরে ধীরে ভয়টা বাড়ছে তার, এভাবে তুষারের ওপর পড়ে থাকলে ক্ষিপ্রতা হারাবে সে। অপারেশনটা ভেস্তে যেতে পারে, কোনো উদ্দেশ্য পূরণ না করেই খুন হয়ে যেতে পারে প্রতিপক্ষের হাতে।

    এ সবই আসলে অনভিজ্ঞতার ফল। মিশনের সংকটময় মুহূর্তে অস্থির হয়ে উঠছে সে। হঠাৎ তার সন্দেহ হলো, আমেরিকান গার্ডরা তার উপস্থিতির কথা জেনে ফেলেনি তো? নার্ভাস হয়ে পড়ায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার বা উপস্থিত বুদ্ধি খাটাবার ক্ষমতা হারাচ্ছে মোহাম্মদ ইসমাইল।

    সাতটা উনষাট মিনিট। প্রাইভেট রোডে ঢোকার মুখে চট করে একবার তাকাল সে। ভ্যানটা সেই আগের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে। চার ঘণ্টা পর পর পালা বদল, লজ থেকে ভ্যানে আসে দু’জন, ভ্যান থেকে লজে ফিরে যায় অপর দু’জন। সময় ঘনিয়ে এসেছে, লজ থেকে দু’জন, যেকোনো মুহূর্তে বেরিয়ে আসবে। লজ থেকে ভ্যানটা একশো মিটার দূরে।

    বাড়ির পাশ ঘেঁষে একজন গার্ড টহল দিচ্ছে। বরফের ওপর দিয়ে ধীর পায়ে হাঁটছে সে। মোহাম্মদ ইসমাইলের দিকে আসছে লোকটা। নিঃশ্বাস বাস্প হয়ে যাচ্ছে বেরিয়েই। সতর্ক দৃষ্টি বেমানান কিছু দেখার জন্য ছটফট করছে।

    চারপাশের বৈচিত্র্যহীন দৃশ্য বা হাড় কাঁপানো শীত সিক্রেট সার্ভিস এজেন্টকে নিস্তেজ করতে পারেনি। দৃষ্টিপথের প্রতিটি জিনিস খুঁটিয়ে দেখে নিয়ে এগোচ্ছে সে। ডানে-বায়ে তাকাচ্ছে। আর এক মিনিটও নেই, তুষারের ওপর মোহাম্মদ ইসমাইলের পায়ের দাগ দেখতে পাবে সে।

    ভাগ্যকে অভিশাপ দিল মোহাম্মদ ইসমাইল, নড়েচড়ে তুষারের ভেতর আরও সেঁধিয়ে যাবার চেষ্টা করল। ঝোঁপের আড়ালে থাকলে কী হবে, সরু পাতা আর চিকন ডালের ফাঁক দিয়ে অবশ্যই তাকে দেখতে পাবে লোকটা। ওগুলো বুলেটও ঠেকাতে পারবে না।

    কাঁটায় কাঁটায় আটটা বাজল। সেই সাথে লজের সামনের দরজা খুলে বেরিয়ে এল দু’জন লোক। তাদের মাথায় ক্যাপ, গায়ে স্কি কোট। রাস্তা ধরে হেঁটে আসছে তারা, শান্তভাবে কথা বলছে, চোখ ঘুরিয়ে দেখে নিচ্ছে তুষার ঢাকা আশপাশ।

    পালাবদলের মুহূর্তে ভ্যানে লোক থাকবে চারজন, ইসমাইলের প্ল্যান ছিল ঠিক তখনই হামলা করবে তারা। হিসেবে ভুল হয়েছে তার, পজিশনে পৌঁছে গেছে সময়ের আগে। প্রাইভেট রোড ধরে পঞ্চাশ মিটারের মতো এগিয়েছে লোক দু’জন, এই সময় টহলরত গার্ড ইসমাইলের পায়ের ছাপ দেখতে পেল।

    দাঁড়িয়ে পড়ল সে, ট্রান্সমিটার ধরা হাতটা উঠে গেল ঠোঁটের কাছে। ঠোঁট ফাঁকই হলো শুধু, কোনো আওয়াজ বেরোল না, তার আগেই ইসমাইলের হেকলার অ্যান্ড কোচ এমপি-ফাইভ সাবমেশিন গানের গুলিতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল তার গলা।

    অনভিজ্ঞ ইসমাইল অসময়ে অ্যাকশন শুরু করতে বাধ্য হলো। পেশাদার কেউ হলে সাইলেন্সর লাগানো সেমিঅটোমেটিক ব্যবহার করত, গুলি করত মাত্র একটা, সেটা লাগত গার্ডের দুই চোখের ঠিক মাঝখানে। দশ রাউন্ড গুলি করে গার্ডের গলা আর বুক ঝাঁঝরা করে দিয়েছে সে, আরও বিশ রাউন্ডের মতো ছড়িয়ে পড়েছে সামনের বনভূমিতে। তার সঙ্গীদের একজন ব্যস্ততার সাথে ভ্যান লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছুড়ল একের পর এক, আরেকজন ভ্যানের দুপাশে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ল। একটা গ্রেনেড উইন্ডশিল্ড দিয়ে ভেতরে ঢুকল, জোরাল আওয়াজের সাথে বিস্ফোরিত হলো সেটা। সিনেমায় যেমন দেখা যায় তেমন কিছু ঘটলো না, আগুনের কুন্ডলী নিয়ে বিস্ফোরিত হলো না গ্যাস ট্যাংক। ভ্যানের শরীর ফুলে উঠল, ফেটে গেল, যেন পাকা একটা ফল।

    আরোহীদের দু’জনেই সাথে সাথে মারা গেছে।

    রক্ততৃষ্ণায় অধীরে দুই খুনি, কারও বয়সই বিশের বেশি নয়, বিধ্বস্ত ভ্যানের ওপর বার বার আঘাত হানল, রাস্তার ওপর যে আরও দু’জন সিক্রেট সার্ভিস এজেন্ট রয়েছে তাদের কথা ভুলে গেছে। ইতোমধ্যে গাছের আড়ালে গা ঢাকা দিয়েছে তারা, কাঁধ থেকে উজি নামিয়ে অব্যর্থ নিশানায় ঘায়েল করল আনাড়ি দুই আতঙ্কবাদীকে। ভ্যানের ভেতর সঙ্গী যারা রয়েছে তাদের আর সাহায্য দরকার নেই, বুঝতে পেরে লজের দিকে দ্রুত পিছু হটতে শুরু করল তারা, একজন ইসমাইলের সাথে গুলি বিনিময় করছে। কাছেপিঠে একটা বড় পাথর পেয়ে তার আড়ালে কাভার নিয়েছে ইসমাইল।

    ইসমাইলের প্ল্যানটা মার খেল আরও একটা কারণে। কথা ছিল, গুলির শব্দ হবার সাথে সাথে দশজন আতঙ্কবাদী লজের পেছনের দরজার দিকে ছুটবে। হাঁটু সমান উঁচু, আলগা তুষার বাধা দিল তাদেরকে। অনেক দেরি করে ফেলল তারা, লজের ভেতর থেকে সিক্রেট সার্ভিস এজেন্টরা ঝাঁক ঝাক গুলি ছুঁড়ে ঠেকিয়ে দিল তাদের।

    সন্ত্রাসবাদীদের একজন লজের উত্তর দেয়ালের নিচে অল্প সময়ের জন্য আশ্রয় পেল। গ্রেনেডের পিন খুলে জানালা লক্ষ্য করে ছুঁড়ে দিল সে। জানালার কাঁচ কতটা পুরু ধারণা করতে পারেনি, ধাক্কা খেয়ে ফিরে এল গ্রেনেড়। বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হবার আগে আতঙ্কে শুধু চেহারাটা বিকৃত করার সময় পেল সে।

    লাফ দিয়ে ধাপ পেরোল এজেন্ট দু’জন, সদর দরজা স্যাৎ করে ঢুকে পড়ল ভেতরে। বিরামহীন গুলি করছে সন্ত্রাসবাদীরা, একজনের পিঠে একটা বুলেট ঢুকল। পড়ে গেল লোকটা, তার শুধু পা দুটো দোরগোড়ায় দেখা গেল। এক সেকেন্ড পর টেনে ভেতরে ঢোকানো হলো তাকে, দড়াম করে বন্ধ হয়ে গেল দরজা।

    অবিরাম গুলিবর্ষণের সব কয়টা জানালার কাঁচ ভেঙে পড়ল, কিন্তু শক্ত কাঠের দেয়ালগুলোর তেমন কোনো ক্ষতিই হলো না। এজেন্টরা ইসমাইলের আরও দু’জন লোককে ফেলে দিল, তবে বাকি সবাই আড়াল নিয়ে এগিয়ে এল লজের আরও কাছাকাছি। এরপর তারা বিশ্ব মিটার দূর থেকে একের পর এক গ্রেনেড ছুঁড়তে শুরু করল জানালা লক্ষ্য করে।

    লজের ভেতর কারও মুখে কথা নেই। একজন এজেন্ট নির্দয় ধাক্কা দিয়ে আনছে সে, ইচ্ছে ফায়ারপ্লেসের মুখটা আড়াল করবে, এই সময় এক ঝাঁক বুলেট ঢুকল ঘরের ভেতর। দেয়ালে পিছলে তিনটে বুলেট ছুটে এল, লোকটার শিরদাঁড়া ভেঙে ভেতরে ঢুকল একটা, বাকি দুটো হৃৎপিণ্ড ফুটো করল। ডেস্কের আড়ালে বলে কিছুই দেখতে পেলেন না হে’লা কামিল, তবে কাঠের মেঝেতে পতনের শব্দটা তিনি শুনতে পেলেন।

    গ্রেনেডগুলো বিপজ্জনক করে তুলল পরিস্থিতি। কাছ থেকে গ্রেনেডের টুকরো রাইফেল বুলেটের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিকর। এজেন্টরা অভিজ্ঞ, নিশানাভেদে অব্যর্থ, কিন্তু এ ধরনের ব্যাপক হামলার জন্য তারা প্রস্তুত ছিল না। অ্যামুনিশন শেষ হয়ে এসেছে, হাতে আর মাত্র কয়েকটা ক্লিপ।

    ইসমাইল প্রথম গুলি করার সাথে সাথে ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে সাহায্য চাওয়া হয়েছে, কিন্তু জরুরি আবেদনটা ডেনভার সিক্রেট সার্ভিস অফিস হয়ে স্থানীয় শেরিফের কাছে পৌঁছতে মাঝখানে অপচয় হয়েছে মূল্যবান কয়েকটা মিনিট।

    স্টোররুমে বিস্ফোরিত হলো একটা গ্রেনেড, রং ভর্তি বড় একটা টিনের পাত্রে আগুন ধরে গেল। স্লেব্লোয়ারে ভরার জন্য যে গ্যাস ক্যানটা ছিল, বিস্ফোরিত হলো সেটা। দেখতে দেখতে লজের এক দিকের পুরোটা দেয়ালে আগুন ধরে গেল।

    আগুন ভালো করে ছড়াবার সাথে সাথে গোলাগুলি বন্ধ হয়ে গেল। চারদিক থেকে বৃত্তটাকে ছোটো করে আনল সন্ত্রাসবাদীরা। তাদের অটোমেটিক রাইফেল প্রতিটি জানালা আর দরজার দিকে তাক করা। আগুনের পুড়ে মরার ভয়ে লজের বাসিন্দারা বেরিয়ে আসতে বাধ্য হবে, ধৈর্যের সাথে সেই আশায় অপেক্ষা করছে।

    এজেন্টদের মাত্র দু’জন এখনও নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভাঙাচোরা, উল্টে পড়া ফার্নিচারের সাথে রক্তাক্ত স্তূপের মতো পড়ে আছে বাকি সবাই। আগুনের শিখা সগর্জনে কিচেন হয়ে পেছন দিককার সিঁড়ি লক্ষ্য করে ছুটল, ছড়িয়ে পড়ল ওপরতলার বেডরুমগুলোয়। এরই মধ্যে আয়ত্তের বাইরে চলে গেছে, ফায়ারব্রিগেড় ছাড়া আর কারও নেভাবার সাধ্য নেই। নিচের তলায় যারা রয়েছে, মৃত্যুর প্রহর গুনছে সবাই। আর বেশিক্ষণ এখানে তারা টিকতে পারবে না।

    শহরের দিক থেকে ভেসে আসা সাইরেনের আওয়াজ উপত্যকায় প্রতিধ্বনি তুলল।

    এজেন্টদের একজন ফায়ারপ্লেসের সামনে থেকে উল্টে পড়া ডেস্কটা সরাল। হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এলেন হে’লা কামিল। এজেন্টের সাথে ক্রল করে নিচু একটা জানালার দিকে এগোলেন তিনি।

    লোকাল শেরিফের ডেপুটিরা আসছেন, হাঁপাতে হাঁপাতে বলল এজেন্ট। সন্ত্রাসবাদীরা ওদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়বে। সেই সুযোগে লজ থেকে বেরোব আমরা। তা না হলে পুড়ে মরতে হবে।

    হে’লা কামিল শুধু নিঃশব্দে মাথা ঝাঁকাতে পারলেন। কানেও তিনি ভালো শুনতে পাচ্ছেন না। গ্রেনেডগুলোর বিস্ফোরণ তার কানে তালা লাগিয়ে দিয়েছে। তবে চেহারায় ভয় বা হতাশার চিহ্ন মাত্র নেই, শুধু চোখ দুটো ভিজে রয়েছে। তাকে রক্ষার জন্য এজেন্টদের অকাতরে প্রাণ দিতে দেখেছেন তিনি, তাদের জন্য প্রার্থনা ছাড়া আর কিছু করতে পারেননি। একটা রুমাল দিয়ে চোখ দুটো চেপে ধরলেন, ধোঁয়ায় ভরে আছে ঘরের ভেতরটা।

    বাইরে তুষারের ওপর শুষে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে মোহাম্মদ ইসমাইল। গোটা লজ দেখতে দেখতে অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হলো। জানালা দিয়ে ধোঁয়া আর শিখা বেরিয়ে আসছে। কেউ যদি এখনও বেঁচে থাকে, এক্ষুনি বেরিয়ে না এলে পুড়ে মরতে হবে তাকে।

    কিন্তু ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করার সময় নেই, বুঝতে পারল ইসমাইল। লাল আর নীল আলোর ঝলক দেখে টের পেয়ে গেছে সে, পুলিশের গাড়ির হাইওয়েতে পৌঁছে গেছে।

    টিমে ছিল বাবোজন, তাকে নিয়ে সাতজন বেঁচে আছে। কেউ আহত হলে তাকে মেরে ফেলতে হবে, আমেরিকান ইন্টেলিজেন্স অফিসাররা যেন ইন্টারোগেট করতে না পারে। সাংকেতিক ভাষায় নিজের লোকদের নির্দেশ দিল সে। বৃত্ত ভেঙে পিছিয়ে এল লোকগুলো, তারপর এন্ট্রান্স রোডের দিকে ছুটল।

    ডেপুটিদের প্রথম দলটা পৌঁছেই লজে ঢোকার রাস্তায় ব্যারিকেড তৈরি করর। একজন রেডিও যোগে রিপোর্ট অপরজন সতর্কতার সাথে জ্বলন্ত লজটার দিকে তাকাল, শক্ত করে ধরে রিভলভারটা ওদের কাজ হলো দেখা রিপোর্ট করা, ব্যাকআপ টিমের জন্য অপেক্ষায় থাকা।

    সশস্ত্র ক্রিমিনালদের বিরুদ্ধে কৌশলটা ভালো। কিন্তু অদৃশ্য আতঙ্কবাদীদের একটা বাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো কাজে লাগল না, কারণ তারা হঠাৎ করে গুলি ছুঁড়তে শুরু করল। পাল্টা আঘাতে হানার সুযোগ দেয়া হলো না, তার আগেই ডেপুটি দু’জন গুলি খেয়ে মারা পড়ল।

    এজেন্টদের একজন জানালা পথে উঁকি দিয়ে বাইরেটা দেখছে, তার ইঙ্গিতে হে’লা কামিল নিচু জানালা দিয়ে লাফ দিয়ে বাইরের তুষারের ওপর পড়লেন। তিনি দাঁড়াবার আগেই এজেন্টরা লাফ দিল। দু’জন তার দুপাশে পাঁচিল তৈরি করল, তাঁর দুটো হাত ধরে ছুটিয়ে নিয়ে চলল কোনাকুনি পথ ধরে হাইওয়ের দিকে।

    মাত্র ত্রিশ পা এগিয়েছে ওরা, ইসমাইলের একজন তোক দেখতে পেয়ে চিৎকার করে উঠল। ছুটন্ত, পলায়নরত মানুষগুলোর চারদিকে বুলেট-বৃষ্টি শুরু হলো। এজেন্টদের একজন আচমকা মাথার ওপর খাড়া করল হাত দুটো, যেন আকাশটাকে খামচে চাইছে। হোঁচট খেয়ে তিন পা এগোল সে। আছাড় খেল সটান। সাদা তুষার টকটকে লাল হয়ে উঠল।

    ওরা চেষ্টা করছে আমরা যেন হাইওয়ের দিকে যেতে না পারি। হাঁপাতে হাঁপাতে, ধমকের সুরে কথা বলছে সে, আমি আপনাকে কাভার দেব, ওদেরকে ঠেকাব। আপনি একা হাইওয়েতে পৌঁছতে চেষ্টা করবেন।

    এজেন্টের দিকে তাকিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করলেন হে’লা কামিল, কিন্তু লোকটা তার কাধ ধরে ঘুরিয়ে দিল, তারপর পিঠে হাত রেখে ঠেলে দিল সামনের দিকে। দৌড়ান, ফর গডস সেক, দৌড়ান! আর্তনাদ করে উঠল সে।

    কিন্তু এজেন্ট দেখল, এরই মধ্যে অনেক দেরি হয়ে গেছে। নিজেদের অজান্তেই হাইওয়েতে পৌঁছানোর জন্য ভুল একটা পথ বেছে নিয়েছে তারা। পথের শেষে, রাস্তার কাছাকাছি, জঙ্গলের ভেতর দাঁড়িয়ে রয়েছে দুটো মার্সিডিজ বেঞ্চ সেডান। উদ্ভ্রান্ত এজেন্ট উপলব্ধি করল, গাড়ি দুটো আতঙ্কবাদীদের। দিশেহারা বোধ করলেও, লোকটা তার কত ভুলল না। সন্ত্রাসবাদীরা হে’লা কামিলকে বাধা দেয়ার জন্য কোনাকুনি একটা পথ ধরে ছুটে আসছে। ওদেরকে সে ঠেকাতে পারবে না, জানে। নিজের প্রাণের মায়া ত্যাগ করতে পারলে দেরি করিয়ে দিতে পারবে। সেই সুযোগে, ভাগ্য যদি সহায়তা করে, হে’লা কামিল রাস্তায় উঠে যেতে পারবেন। ভাগ্য যদি আরেকটু সহায়তা করে, হাইওয়ের কোনো গাড়ি হয়তো তাকে দেখে দাঁড়াতে পারে।

    মৃত্যুকে তুচ্ছ জ্ঞান করে আতঙ্কবাদীদের দিকে সরাসরি ছুটল এজেন্ট, উজির ট্রিগারে আঙুল, কামানের গোলার মতো মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে অশ্রাব্য খিস্তি।

    মুহূর্তের জন্য ইসমাইল আর তার দল থমকে গেল, কারণ তাদের মনে হলো খোদ শয়তান ওদেরকে লক্ষ্য করে ছুটে আসছে। অবিশ্বাস্য দুটো সেকেন্ড পেরিয়ে গেল। তারপর তারা সবাই একেযোগে গুলি ছুড়ল। অকুতোভয় সিক্রেট সার্ভিস এজেন্ট বুলেটের আঘাতে ছিটকে পড়ল তুষারের ওপর। তবে তার আগে তিনজন শত্রুকে ধরাশায়ী করতে পেরেছে সে।

    গাড়ি দুটোকে হে’লা কামিলও দেখলেন। আরও দেখলেন, সন্ত্রাসবাদীরা তার দিকে ছুটে আসছে। পেছন থেকে কান ফাটানো গুলিবর্ষণের আওয়াজ পেলেন তিনি। লম্বা পা ফেলে ছুটছেন, হাঁপাচ্ছেন, হোঁচট খেয়ে ছোট একটা গর্তের ভেতর আছাড় খেলেন। জগিং করা অনেক দিনের অভ্যেস, লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে আবার ছুটলেন তিনি। দেখলেন সামনেই কালো অ্যাসফল্ট। ছোটার গতি কমালেন না, যদিও জানেন অবধারিত মৃত্যুকে তিনি শুধু দেরি করাতে পারছেন, এড়াতে পারছেন না। নিশ্চিতভাবে জানেন, দুচার মিনিটের মধ্যে তারও লাশ পড়ে থাকবে।

    .

    ২৮.

    ব্রেকেনরিজ থেকে হাইওয়ে ধরে রওনা হলো কর্ড। পুরনো গাড়ি হলে কী হবে, নতুন রং করা হয়েছে, সকালের রোদ লেগে চকমক করছে গা। লিফটের দিকে হেঁটে যাচ্ছে স্কিয়ারা, ষাট বছরের পুরনো গাড়িটাকে দেখে সহাস্যে হাত নাড়ল তারা। ঘেরা অংশে, পেছনের সিটে বসে ঝিমুচ্ছে অ্যাল জিওর্দিনো। লিলি বসেছে। পিটের সাথে বাইরে।

    ভোরে ঘুম ভেঙেছে পিটের ইতস্তত একটা ভাব নিয়ে। ব্রেকেনরিজে এসেছে অথচ স্কি করবে না, তা কি হয়? এর আগে যতবার এখানে এসেছে ও, তুষার ঢাকা পাহাড় আর প্রান্তরের ওপর ছোটছুটি করে পাঁচ বা সাতটা করে দিন মহা আনন্দে কাটিয়েছে। এবারের আসাটা অবশ্য কাজ নিয়ে, ড. ফোরম্যানের পরামর্শ দরকার ছিল। তাগাদা দেয়া হয়েছে, দুচারদিনের ভেতরে আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরির হদিশ বের করতে হবে। কিন্তু হিরাম ইয়েজার কোনো সূত্র না দেয়া পর্যন্ত পিটের কিছু করার নেই। করার যখন কিছু নেই, স্কি করার সুযোগটা গ্রহণ করা উচিত নয়?

    ঘুম থেকে তুলে প্রস্তাবটা দিতে যা দেরি, লিলি আর জিওর্দিনো লাফিয়ে উঠল। কোনো রকমে শাওয়ার সেরে, নাকেমুখে ব্রেকফাস্ট গুঁজে বেরিয়ে পড়েছে ওরা, যাচ্ছে স্কি সরঞ্জাম ভাড়া করার জন্য পরিচিত একটা দোকানে।

    এত সকালে আতশবাজি পোড়ায় কে? হঠাৎ অবাক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল লিলি।

    আতশবাজি নয়, বলল পিট, গুলিবর্ষণের তীক্ষ্ণ শব্দ আর গ্রেনেড বিস্ফোরণের ভোঁতা প্রতিধ্বনি আগেই ওর কানে গেছে। মনে হচ্ছে যেন পদাতিকে বাহিনী যুদ্ধে নেমেছে।

    আওয়াজটা আসছে ওদিকের জঙ্গল থেকে, একটা হাত তুলে দেখল লিলি। রাস্তার ডান দিক থেকে।

    কর্ডের গতি বাড়িয়ে দিল পিট, ডিভাইডার উইন্ডোর গায়ে নক করল। তন্দ্রা ছুটে গেল, সিটের ওপর সিধে হয়ে বসে জানালার কাঁচ সরাল সে। শোনো, বলল পিট।

    মুখে ঠাণ্ডা বাতাস লাগায় চোখ কোঁকাল জিওর্দিনো। কানের পেছনে হাত রাখল একটা। ধীরে ধীরে বিস্ময় ফুটে উঠল চেহারায় রাশিয়া ছত্রীসেনা পাঠিয়েছে?

    দেখো, দেখো–ওহে, গড! চেঁচিয়ে উঠল লিলি। জঙ্গলে আগুন ধরে গেছে?

    গাছপালার মাথার ওপর হঠাৎ ভাসতে দেঘা গেল কালো ধোয়া; ধোয়ার নিচে কমলা রঙের লকলকে শিখা। বড় বেশি ঘন, তাই না, ধোয়াটা? মন্তব্য করল জিওর্দিনো, আমি বলব, গাছপালা নয়, নিরেট কোনো কাঠামোয় আগুন ধরেছে-হয় কোনো বাড়ি, নয়তো দোচালায়।

    হ্যাঁ, শান্ত সুরে বলল পিট। কী ঘটছে না বুঝে নামা উচিত হবে না। প্রথমে পাশ কাটিয়ে যাব আমরা। অ্যাল, সামনে চলে এসো। লিলি, পেছনে বসো, মাথা নিচু করে থাকবে।

    কেন, আমাকে সামনে বসতে হবে কেন?

    তোমার প্রাণপ্রিয় বন্ধুকে কাভার দেয়ার জন্য, বলল পিট। তাড়াতাড়ি করো! ধমক লাগল ও। আমি সন্দেহ করছি, গোলাগুলি আর আগুন ধরাবার সাথে সন্ত্রাসবাদীরা জড়িত থাকতে পারে।

    সন্ত্রাসবাদী! কী বলছ! পিট, তুমি কি দুঃস্বপ্ন দেখছ?

    পিট জবাব দিল না। তাতেই যা বোঝার বুঝে নিল জিওর্দিনো। লিলিকে পেছনে আসতে সাহায্য করল সে, নিজে সামনে গিয়ে বসল।

    প্রাইভেট রোডের মুখ থেকে আধ মাইল দূরে, হাইওয়ের পাশে থেমে আরোহীরা যার যার গাড়ির আড়ালে গা ঢাকা দিয়ে উঁকি মারছে, কালো ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে অটোমেটিক রাইফেলের আওয়াজ শুনছে। শেরিফের অফিস থেকে এখনও কেউ পৌঁছায়নি দেখে অবাক হলো পিট। তার পরই ওর চোখ পড়ল বুলেটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত ভ্যানটার ওপর। প্রাইভেট রোডের মুখে একটা বাধা হয়ে রয়েছে ভ্যানটা।

    ডান দিকে তাকাল পিট, ধোঁয়া আর আগুন ছাড়িয়ে আরও সামনে কিছু দেখার চেষ্টা করল। এমন সময় হঠাৎ জঙ্গলের কিনারা থেকে ছিটকে বেরিয়ে এল একটা মূর্তি, সরাসরি কর্ডের দিকে ছুটে এল সে।

    ব্রেকের ওপর দাঁড়িয়ে পড়ল পিট, ডান দিকে স্টিয়ারিং হুইল ঘোরাল। নব্বই ডিগ্রি বাক নিয়ে রাস্তার ওপর আড়াআড়ি ঘুরে গেল কর্ড। পেভমেন্টের সাথে ঘষা খেল টায়ার। অবধারিত দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়ে স্থির পাথর হয়ে গেছে মূর্তিটা, ড্রাইভারের কাছ থেকে মাত্র এক মিটার দূরে।

    পিটের হার্টবিট বেড়ে গেল। সিট থেকে ঝুঁকে নারীমূর্তির দিকে ভালো করে তাকাল ও, চোখে ফুটে উঠল সমীহ আর অকৃত্রিম বিস্ময়।

    আ-আপনি। হে’লা কামিল হাঁপিয়ে উঠলেন। সত্যিই কি আপনি?

    মিস কামিল? শূন্য চোখে চেয়ে আছে পিট।

    ওহ্, থ্যাঙ্ক গড! ফিসফিস করে বললেন হে’লা কামিল। প্লিজ, সাহায্য করুন আমাকে! সবাইকে ওরা মেরে ফেলেছ! ওরা আ-আমাকে খুন করতে আসছে!

    পিট হুইলের পেছন থেকে, আর লিলি প্যাসেঞ্জার কম্পার্টমেন্ট থেকে নেমে পড়ল। পেছনের সিটে উঠতে হে’লা কামিলকে সাহায্য করল ওরা। কারা? জিজ্ঞেস করল পিট।

    আখমত ইয়াজিদের ভাড়াটে লোক। সিক্রেট সার্ভিসের সব কয়জন এজেন্টকে মেরে ফেলেছে। গাড়ি ছাড়ন, প্লিজ। এক্ষুনি এসে পড়বে ওরা!

    শান্ত হোন, তার একটা হাত ধরে মৃদু চাপ দিল লিলি, এই প্রথম লক্ষ করল মহাসচিবের কাপড়চোপড় ধোয়া লেগে কালো হয়ে আছে, চুল এলোমেলো। আপনাকে আমরা সরাসরি একটা হাসপাতালে নিয়ে যাব।

    তাড়াতাড়ি! জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রুদ্ধশ্বাসে বললেন হে’লা কামিল। দেরি করলে আপনারাও মারা পড়বেন।

    হে’লা কামিলের দৃষ্টি অনুসরণ করে ঘাড় ফেরাল পিট, আর ঠিক সেই সময় ঝোঁপ-ঝাড় ফুড়ে হাইওয়েতে বেরিয়ে এল মার্সিডিজ দুটো। এর সেকেন্ডের বেশি দেখল না ও, লাফ দিয়ে উঠে পড়ল ড্রাইভিং সিটে। ফার্স্ট গিয়ার দিয়েই মেঝের সাথে চেপে ধরল অ্যাকসিলারেটর, কর্ড ঘোরাল ওর জন্য খোলা একমাত্র দিকটায় ব্রেকেনরিজ-এর ফিরতি পথ ধরে ছুটল গাড়ি।

    স্পেয়ার টায়ারের মাথায় একটা আচ্ছাদন রয়েছে, সেটার ওপর বসানো রিয়ার ভিউ মিররে তাকাল পিট। মার্সিডিজ দুটো পিছু নিয়েছে, মাত্র তিনশো মিটার দূরে ওগুলো। পরমুহূর্তে দৃশ্যটা চুরমার হয়ে গেল একঝাঁক বুলেট ছুটে এসে আয়নার কাঁচ গুঁড়িয়ে দেয়ায়।

    মেঝের সাথে সেঁটে থাকুন! চিৎকার করল পিট।

    পেছনের অংশে ড্রাইভ শ্যাফট না থাকায় মেঝেতে প্রচুর জায়গা, হে’লা কামিলকে নিয়ে সেখানে কুণ্ডলী পাকাল লিলি।

    চিন্তা করবেন না, অভয় দিয়ে বলল ও। একবার শহরে পৌঁছতে পারলে আমরা নিরাপদ।

    মাথা নাড়লেন হে’লা কামিল। এ যাত্রা আমাদের কেউ বাঁচতে পারবে না। আমরা ফ্যানাটিকাল আতঙ্কবাদীদের পাল্লায় পড়েছি।

    সামনের সিটে কুঁকড়ে যতটা সম্ভব ছোট হয়ে গেছে অ্যাল জিওর্দিনো। এটার টপ স্পিড কত? তুমি জানো, এখনও আমি বিয়ে করিনি!

    এল-টোয়েনটি নাইনের টপ স্পিড রেকর্ড করা হয়েছে সাতাত্তর, জবাব দিল পিট, ওগুলো কী?

    ঝট করে ঘুরল জিওর্দিনো, দরজার ওপর ঝুঁকে উঁকি দিল পেছনে। সামনে থেকে দেখে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না কোনো মডেলেরর মার্সিডিজ, তবে সম্ভবত থ্রি হানড্রেড এস.ডি.এল.।

    ডিজেল?

    টার্বো চার্জড ডিজেল, ঘণ্টায় দুশো বিশ কিলোমিটার ছুটতে পারে।

    দূরত্ব কমছে?

    ছারপোকাকে বানর তাড়া করলে দূরত্ব কমে না বাড়ে? ঝাঁঝের সাথে পাল্টা প্রশ্ন করল জিওর্দিনো। শেরিফের অফিস অনেক দূরে থাকতেই ওরা আমাদেরকে ধরে ফেলবে।

    পায়ের চাপ দিয়ে মেঝের সাথে সেঁটে ধরল পিট ক্লাচ। গিয়ার বদলে থার্ডে দিল। কোথাও না থেমে নাগালের বাইরে থাকার চেষ্টা করব। থামতে যাচ্ছি দেখলেই এলোপাতাড়ি গুলি করবে ওরা, তাতে বহু নিরীহ মানুষ মারা পড়তে পারে। খুন করা ওদের এক ধরনের নেশা।

    আবার একবার পেছন দিকে তাকাল জিওর্দিনো। ওদের চোখের সাদা অংশটুকুও আমি দেখতে পাচ্ছি।

    .

    হাতের অস্ত্র জ্যাম হতেই ভাগ্যকে গালি দিল মোহাম্মদ ইসমাইল, মার্সিডিজ থেকে হাইওয়ের ওপর ছুঁড়ে ফেলে দিল সেটা। পেছনে বসা এক সঙ্গীর হাত থেকে আরেকটা অস্ত্র ছিনিয়ে নিল সে, জানালার দিকে ঝুঁকে এক ঝাঁক গুলি ছুড়ল কর্ড লক্ষ্য করে। মাজল থেকে মাত্র পাঁচটা শেল বেরোল, অ্যামুশিন ক্লিপ খালি হয়ে গেছে। আরেকটা ক্লিপের সন্ধানে পকেট হাতড়াতে শুরু করে আবার গাল দিল সে, ক্লিপটা বের করে স্লটে ঢোকাল।

    উত্তেজিত হয়ো না, শান্তভাবে বলল ড্রাইভার। সামনের এক কিলোমিটারের মধ্যেই ওদেরকে ধরে ফেলব। কর্ডের বাঁ দিকে থাকব আমরা, দ্বিতীয় মার্সিডিজ নিয়ে সাদ্দাম থাকবে ডান দিকে। দুদিক থেকে গুলি করে সব কটাকে পাঠিয়ে দেব জাহান্নামে।

    মাঝখানে যারা বাদ সেধেছে তাদের আমি নিজের হাতে মারতে চাই! গর্জে উঠল ইসমাইল।

    সুযোগ তুমি পারে। ধৈর্য ধরো।

    বলা যায়, বায়না ধরা শিশুর মতো, যার আবদার রক্ষা করা হয়নি, হাঁড়িপানা মুখ নিয়ে ধপাস করে সিটের ওপর বসে পড়ল ইসমাইল, চোখ পিট পিট করে তাকিয়ে থাকল সামনের গাড়িটার দিকে।

    মোহাম্মদ ইসমাইল নিকৃষ্টতম খুনিদের একজন। অপরাধবোধের সাথে তার পরিচয় নেই। হাসতে হাসতে একটা মাতৃসদন উড়িয়ে দিতেও তার বাধবে না। প্রথমশ্রেণীর খুনিরা তাদের কাজের ধরন-ধারণ নিয়ে মাথা ঘামায়, কাজটা সারার পর ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে চিন্তা করে, আরও নিখুঁত হবার চেষ্টা করে পরবর্তী কাজটায়। মোহাম্মদ ইসমাইলের কাছে এ সবের কোনো গুরুত্ব নেই। যথেষ্ট সময় আর মেধা খরচ না করায় তার প্ল্যানে স্কুল সব ভুল থেকে যায়, সেজন্য অঘটনও কম ঘটে না। ইতিমধ্যে দুবার দু’জন মানুষকে মারতে গিয়ে তাদের বদলে অন্য দু’জনকে মেরে এসেছে সে। এ ধরনের ঘটনা ইসমাইলের মতো খুনীদের আরও বিপজ্জনক করে তোলে। উত্তেজিত হাঙরের মতো অস্থিরমতি, কখন কী করবে ধারণা করা যায় না, ঘটনাচক্রে বাধা হয়ে দাঁড়ালে পাইকারি হারে নিরীহ মানুষজনকে খুন করবে। তার প্রেরণার উৎস হলো ধর্ম। তার ধারণা, ধর্মের নামে কাফেরদের খুন করে বিপুল সওয়াব হাসিল করছে সে। খুন করে ভারি মজা পায় মোহাম্মদ ইসমাইল, আরও খুন করা প্রেরণা অনুভব করে, ধরে নেয় আল্লাহ তার প্রতি বিশেষভাবে সন্তুষ্ট বলেই তাকে এত আনন্দ দান করছেন।

    গাড়ি আরও জোরে চালাও! ড্রাইভারকে তাগাদা দিল সে। মনে থাকে যেন, সব কয়টার মাথায় গুলি করতে চাই আমি! বেজন্মাদের আমি দেখিয়ে দেব!

    .

    ওরা বোধ হয় অ্যামুনিশন বাঁচাচ্ছে, কৃতজ্ঞচিত্তে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল জিওর্দিনো।

    আমাদেরকে মাঝখানে রেখে স্যান্ডউইচ তৈরি করতে চাইছি, বলল পিট। যাতে মিস না করে। রাস্তার দিকে চোখ, তবে মাথার ভেতর পালানোর পথ খোঁজার কাজ চলছে দ্রুত।

    একটা রকেট লঞ্চার পেলে আমি আমার রাজ্য হারাতেও রাজি আছি।

    ভালো কথা মনে করেছ। সকালে গাড়িতে ওঠার সময় কী যেন একটা ঠেকেছিল পায়ে, ঠেলে সিটের তলায় পাঠিয়ে দিই, বলল পিট।

    মেঝের দিকে ঝুঁকে পিটের সিটের নিচেটা হাতড়াল জিওর্দিনো। ঠাণ্ডা, শক্ত কী। যেন একটা ঠেকল হাতে। চেহারা ব্যাজার হয়ে উঠল তার। স্রেফ একটা সকেট রেঞ্চ, এ দিয়ে কিছুই হবে না।

    সামনে একটা জিপ ট্রেইল, স্কি রান-এর চূড়ায় উঠে গেছে। সাপ্লাই আর ইকুইপমেন্ট নিয়ে দুচারটে গাড়ি মাঝেমধ্যে যায় ওদিকে। জঙ্গল বা নালায় গা ঢাকা দেয়ার সুযোগ এনে দিতে পারে। হাইওয়েতে থাকলে বাঁচার কোনো আশা নেই।

    সামনে কতদূর?

    পরবর্তী বাঁকের কছাকাছি।

    কিন্তু হাইওয়ে ছাড়লে আমাদের স্পিড আরও কমবে, বলল জিওর্দিনো। ব্যাপারটা ফাঁদ হয়ে উঠবে না তো?

    তুমিই বলো।

    তৃতীয়বার পেছন দিকে তাকাল জিওর্দিনো। পঁচাত্তর মিটার দূরে ওরা, দূরত্ব প্রতি মুহূর্তে কমছে।

    ওদের গতি মন্থর করতে হবে।

    তুমি অনুমতি দিলে আমি আমার কুৎসিত চেহারাটা ওদেরকে দেখাতে পারি, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করতেও আপত্তি নাই, শুকনো গলায় প্রস্তাব রাখল জিওর্দিনো।

    তাতে কাজের কাজ কিছুই হবে না, ওরা আরও বরং খেপে উঠবে। না হে, তার চেয়ে এক নম্বর কাজে লাগাও।

    ব্রিফিংটা আমি মিস করেছি, ব্যাঙ্গের সুরে বলল জিওর্দিনো।

    ছোঁড়াছুড়িতে তোমার হাত কেমন?

    বুঝতে পেরে মাথা আঁকাল জিওর্দিনো। বাহনটাকে একটা সরলরেখায় ধরে রাখো, অ্যাল জিওর্দিনো-বম্ব এখন প্রতিপক্ষের ওপর নিক্ষিপ্ত হবে।

    খোলা টাউন কার আদর্শ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে চমৎকার উতরে গেলে। পেছন দিকে মুখ করে সিটে হাঁটু সাঁটিয়ে সিধে হলো জিওর্দিনো, ছাদের ওপর উঁচু হলো তার কাঁধ আর মাথা। লক্ষ্যস্থির করল সে, হাত তুলল, ছুঁড়ে দিল রেঞ্চটা। ধনুকের মতো বাঁকা একটা পথ তৈরি করে ছুটল হাতিয়ার, সামনের মার্সিডিজটাকে লক্ষ্য করে।

    পলকের জন্য থেমে গেল হৃৎপিণ্ড। রেঞ্চ টার্গেটে পৌঁছনোর আগেই বড় বেশি নিচে নেমে যাচ্ছে। টার্গেটে নয়, পড়ল হুডের ওপর। তবে পড়ে ছিটকে গেল, উইন্ডশিল্ডটা নিখুঁতভাবে চুরমার করে ঢুকে পড়ল ভেতরে।

    আতঙ্কবাদী ড্রাইভার জিওর্দিনোকে জিনিসটা ছুঁড়তে দেখেছিল। তার ক্ষিপ্রতা ভালো হলেও প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট ভালো নয়। ব্রেকে চাপ দিল সে, বন বন করে হুইল ঘোরাল রেঞ্চের পথ থেকে সরে যাবার জন্য, ঠিক তখনই হাজারটা টুকরো হয়ে গেল উইন্ডশিল্ডের কাঁচ, ছড়িয়ে পড়ল তার মুখে। স্টিয়ারিং হুইলের গায়ে বাড়ি খেয়ে মোহাম্মদ ইসমাইলের কোলের ওপর পড়ল রেঞ্চটা।

    দ্বিতীয় মার্সিডিজের ড্রাইভার ইসমাইলের ঠিক পেছনেই ছিল, সে দেখতেই পায়নি বাতাস চিরে একটা মিসাইল ছুটে আসছে। সামনের হেডলাইট হঠাৎ করে লাল হয়ে উঠতে দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল সে। পেছনে থেকে প্রথম মার্সিডিজকে ধাক্কা দেয়ার সময় অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল, দেখল ধাক্কা খেয়ে ঘুরে যাচ্ছে গাড়িটা, চোখের পলকে উল্টো দিকে অর্থাৎ তার দিকে মুখ করল সেটা।

    তুমি কি ঠিক এটাই চাইছিলে? ফুর্তির সাথে জিজ্ঞেস করল জিওর্দিনো।

    অক্ষরে অক্ষরে। শক্ত হও, অ্যাল, বাঁকের কাছে এসে পড়েছি। স্পিড কমাল পিট, সরু একটা তুষার ঢাকা পথে ঘুরিয়ে নিল কর্ডকে। পথটা আঁকাবাঁকা, কোনো কোনো বাকের পর উল্টো দিকে বিস্তৃত হয়েছে, তবে শেষ পর্যন্ত পৌঁছেছে পাহাড়ের চূড়ায়।

    পিচ্ছিল, অমসৃণ পথ। ভারী গাড়িটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে একশো পনেরো ঘোড়ার স্ট্রেইট-এইট ইঞ্জিনের ওপর খুব ধকল যাচ্ছে। স্প্রিংবহুল চেসিস সবাইকে নিয়ে টেনিস বলের মতো খেলতে লাগল।

    মেঝে থেকে তুলে নিজেদেরকে সিটের ওপর বসিয়েছে মহিলা আরোহীরা, দুজোড়া পা ডিভাইডার পার্টিশনটাকে পেঁচিয়ে রেখেছে, সিলিংয়ের স্ট্র্যাপ ধরে ঝুলে আছে।

    ছয় মিনিট পর জঙ্গলটাকে পেছনে ফেলে এল ওরা। রাস্তার দুধারে এখন বড়বড় বোল্ডার আর গভীর তুষার। পিটের প্রথম ইচ্ছে ছিল কর্ড ফেলে পালাবে ওরা, পাথর আর জঙ্গলে গা ঢাকা দিয়ে কেটে পড়বে। কিন্তু ইচ্ছেটা বাতিল করে দিতে হলো পাউডার-মিহি তুষার দেখে, পা ফেলামাত্র হাঁটু পর্যন্ত ডুবে যাবে। বিকল্প উপায় একটাই আছে, চূড়ায় উঠে যাওয়া, তারপর একটা চেয়ার লিফট নিয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে শহরে নামা, হারিয়ে যাওয়া ভিড়ের মধ্যে।

    আমরা ফুটছি, ঘোষণা করল জিওর্দিনো।

    র‍্যাডিয়েটর ক্যাপের চারদিকে থেকে বাষ্প উঠছে, আগেই দেখেছে পিট। টেমপারেচার গজের কাঁটাও উঠে গেছে হট লেখা ঘরে। এভাবে দৌড় খাটানো হবে ভেবে তৈরি করা হয়নি গাড়িটা, বলল ও। এখনও যে ভেঙে চারখানা হয়ে যায়নি সেটাই আশ্চর্য।

    রাস্তা শেষ হয়ে গেলে? কী করব আমরা?

    দুনম্বর প্ল্যানটা কাজে লাগাব। চেয়ার লিফটে চড়ে ধীরেসুস্থে নেমে যাব কাছাকাছি একটা সেলুনে।

    তোমার স্টাইলটা পছন্দ হলেও, না বলে পারছি না যে যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি, পেছন দিকে ইঙ্গিত করল জিওর্দিনো। বন্ধুরা ফিরে এসেছে।

    এত ব্যস্ত ছিল পিট, অনুসরণকারীদের খবর রাখার সময় পায়নি। দুর্ঘটনা সামলে নিয়ে দুটো মার্সিডিজই আবার নতুন উদ্যমে কর্ডটাকে ধাওয়া শুরু করেছে। ঘাড় ফিরিয়ে পেছন দিকে তাকাবারও অবসর পেল না ও পেছনের জানালার কাঁচ, হে’লা কামিল আর লিলির মাথার মাঝখানে, এক ঝাঁক বুলেটের আঘাতে গুঁড়িয়ে গেল, সামনের উইন্ডশিল্ড ফুটো করে বেরিয়ে গেল ঝাকটা। চোখের সামনে তিনটে ফুটো দেখতে পেল পিট, কিনারাগুলো এবড়োখেবড়ো। মহিলা আরোহীদের কিছু বলতে হলো না, আবার তারা আশ্রয় নিল গাড়ির মেঝেতে। এবার তারা চেষ্টা করল মেঝে ফুটো করে ভেতরে সেঁধোবার।

    আমরা সন্দেহ হচ্ছে, রেঞ্চটা ছুঁড়ে দেয়ায় ওদের খুব রাগ হয়েছে, আঁচ করল জিওর্দিনো।

    আমরা গাড়িটাকে যেভাবে ঠেলছে ওরা, আমারও খুব রাগ হচ্ছে!

    চুলের কাটার মতো তীক্ষ্ণ একটা বাঁক নিল পিট, গাড়ি সিধে করার সময় চুরি করে তাকাল ধাওয়ারত মার্সিডিজগুলোর দিকে। দৃশ্যটার মধ্যে বিপদের উপাদান যথেষ্ট পরিমাণেই রয়েছে।

    সামনের মার্সিডিজ এঁকেবেঁকে ছুটে আসছে। কর্ডের চাকা তুষারের ওপর গভীর গর্ত তৈরি করেছে, সেই গর্তের ফাঁদে পড়ার কোনো ইচ্ছে নেই ড্রাইভারের, উন্মত্ততার সাথে সারাক্ষণ হুইল ঘোরাচ্ছে সে। প্রতিটি বাকে পিছলে রাস্তা থেকে সরে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে দ্বিধা করছে না। প্রায়ই তুষারের স্তূপে আটকা পড়ছে চাকা। মার্সিডিজে স্লে টায়ার লাগানো নেই দেখে অবাক হলো পিট। ওর জানা নেই, নিজেদের পরিচয় গোপন রাখার জন্য গাড়িগুলো মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে চালিয়ে এনেছে সন্ত্রাসবাদীরা। অস্তিত্বহীন একটা টেক্সাটাইল কোম্পানির নামে রেজিস্ট্রি করা ওগুলো, হে’লা কামিলের জান কবচ করার পর দুটোকেই ফেলে যাওয়া হবে ব্রেকেনরিজ এয়ারপোর্টে।

    যা দেখল, মোটেও, খুশি হতে পারল না পিট। মাঝখানের দূরত্ব দ্রুত কমছে। ওরা মাত্র পঞ্চাশ মিটার পেছনে। পছন্দ হলো না অটোমেটিক রাইফেল হাতে লোকটাকেও, সামনের মার্সিডিজের ভাঙা উইন্ডশিল্ডের ফাঁক দিয়ে ব্যারেল বের করে ওদের দিকে লক্ষ্যস্থির করার চেষ্টা করছে সে।

    ভগ্নদূতেরা আসছে! চেঁচাল পিট, হুইলের নিচে মাথা লুকাল, ড্যাশবোর্ডের কিনারা দিয়ে কোনো রকমে দেখতে পাচ্ছে সামনের রাস্তা। সবাই নিচু হও!

    কথাগুলো মুখ থেকে বেরোতে যা দেরি, কর্ডের গায়ে আঘাত করল এক ঝাঁক বুলেট। প্রথম বিস্ফোরণে ডান দিকের ফেন্ডার মাউন্টিংয়ের ওপর শাখা স্পেয়ার টায়ার আর হুইল ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেল। পরের ঝক ছাদটাকে ফুটো করল। নিজের অজান্তেই মাথাটা আরও নামিয়ে নিল পিট। পেছনের দরজা থেকে ছিটকে বেরিয়ে গেল কজাগুলো, দরজাটাও উড়ে গেল বাতাসে ডানা মেলে। একটা গাছের সাথে ঘষা খেল কর্ড। বৃষ্টির মতো ঝরল কাঁচের টুকরো। মহিলা আরোহীদের একজন আর্তনাদ করে উঠল, দু’জনের মধ্যে কে বোঝা গেল না। ড্যাশবোর্ডে গাঢ় রক্তের পোচ দেখতে পেল পিট। পরমুহূর্তে উপলব্ধি করল, একটা কান এ-ফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়েছে বুলেট। কী আশ্চর্য, কৌতুকপ্রবণ ইটালিয়ান যুবক টু-শব্দটিও করল না।

    নির্লিপ্তভাবে ক্ষতটা স্পর্শ করল জিওর্দিনো, ভাবটা যেন ওটা অন্য কারও কান। তারপর মাথা কাত করে পিটের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে হাসল। আমার সন্দেহ হচ্ছে, কাল রাতে খাওয়া মদটুকু ফুটো দিয়ে বেরিয়ে আসছে।

    সিরিয়াস?

    দুহাজার ডলার লাগবে প্লাস্টিক সার্জারি করাতে, ফুটো হয়েছিল কিনা টেরও পাবে না। মহিলাদের কোনো খবর জানো?

    না তাকিয়েই জিজ্ঞেস করল পিট, লিলি, তোমরা ঠিক আছে তো?

    কাঁচের টুকরো চামড়ায় দুএকটা দাগ কেটেছে, প্রায় সাথে সাথে, উঁচু গলায় জবাব দিল লিলি। তাছাড়া আমরা অক্ষতই আছি।

    কর্ডের র‍্যাডিয়েটর থেকে বাষ্প এবার সশব্দ প্রতিবাদের সাথে বেরোচ্ছে। ইঞ্জিনের শক্তি কমছে, টের পেল পিট। সামনে শেষ বাক, তারপর চুড়া। গাড়িটাকে ঘোরানোয় মন দিল ও। পেছনের বাম্পারে প্রায় সেঁটে আছে প্রতিপক্ষরা।

    অতিরিক্ত উত্তাপে ইঞ্জিনের বেয়ারিংগুলো প্রতিবাদ জানাচ্ছে। আরও এক ঝাঁক বুলেট বামদিকের পেছনের ফেন্ডার গুঁড়িয়ে দিল, চ্যাপ্টা করে দিল টায়ারটাকে। কর্ডের পেছনের অংশ রাস্তা থেকে নেমে যেতে চাইছে, ধরে রাখার জন্য হুইলের সাথে যুদ্ধ করছে পিট। রাস্তার পাশে অসংখ্য বোল্ডার, গাড়ি ধাক্কা খেলে ছাতু হয়ে যাবে আরোহীরা।

    হুডের নিচ থেকে নীল ধোয়া বেরোতে দেখে পিট বুঝল, মারা যাচ্ছে কর্ড। রাস্তার কিনারায় পড়ে থাকা একটা পাথরকে এড়াতে পারেনি ও, অয়েল প্যানে খোঁচা লাগায় গর্ত তৈরি হয়েছে, ইঞ্জিনের নিচ থেকে ঝরে পড়ছে তেল। অয়েল প্রেশার গজ দ্রুত শূন্যের ঘরে নেমে এল। পাহাড় চূড়ায় পৌঁছানোর আশা ত্যাগ করাই ভালো।

    পিছলানো চাকা নিয়ে সামনের মার্সিডিজ শেষ বাকটা ঘুরতে শুরু করল। কর্ডের হুইল শক্ত করে ধরে অনবরত ঘোরাচ্ছে পিট। ধাওয়ারত শত্রুদের চেহারায় উল্লাস কল্পনা করতে পারল ও, তারা বুঝে ফেলেছে পালানোর কোনো উপায় নেই শিকারের।

    চারদিকে উদ্ভ্রান্তের মতো তাকিয়ে আশ্রয়ের কোনো সন্ধান দেখল না পিট। পা সম্বল কোথাও বেশিদূর যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। রাস্তার একদিকে তুষার আর বোল্ডার, আরেকদিকে ঝপ করে নেমে গেছে গভীর খাদ, মাঝখানের সরু রাস্তায় আটকা পড়েছে ওরা। ইঞ্জিন অচল হয়ে পড়েছে, একেবারে দাঁড়িয়ে পড়ার আগেই ঘটে যাবে যা ঘটার।

    মরিয়া হয়ে উঠল পিট, মেঝের সাথে চেপে ধরল অ্যাকসিলারেটর-পেড়াল গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে, সেই সাথে বিধাতা সাহায্য চেয়ে আবেদন জানাল ওপর মহলে।

    আশ্চর্যে, যুদ্ধবিধ্বস্ত প্রাচীন বাহনের এখনও কিছু দেয়ার আছে। জ্যান্ত একটা প্রাণীর মতো, লোহা আর ইস্পাতসহ কুঁকড়ে গেল কর্ড। ইঞ্জিনের আওয়াজ বদলে গেল, সামনের চাকাগুলো দেবে গেল তুষারের ভেতর, পরমুহূর্তে ছেড়ে দেয়া স্প্রিংয়ের মতো সামনে লাফ দিল কর্ড, একবারের চেষ্টাতেই উঠে এল চূড়ায়।

    পেছনে নীল ধোয়া আর সাদা বাষ্পের মেঘ উঠল, খোলা স্কি রান-এর মাথায় পৌঁছে গেল ওরা। ট্রিপল-চেয়ার স্কি লিফট ওদের একশো মিটার দূরেও নয়। কর্ডের সরাসরি নিচের ঢালে কেউ স্কি করছে না দেখে প্রথমে ভারি অবাক হলো পিট। লোকজন চেয়ার থেকে নেমে পড়ছে, ঘুরে যাচ্ছে লিফটের উল্টোদিকে, তারপর ছুটছে সমান্তরাল স্কি ট্রেইল ধরে।

    তারপর লক্ষ করল ও, ওর দিকের ঢালটা রশি দিয়ে আলাদা করে রাখা হয়েছে। বিপজ্জনক বলে এদিকে কাউকে কি করতে নিষেধ করা হয়েছে, রশির সাথে ঝুলে থাকা রঙিন বোর্ডগুলোয় তাই লেখা।

    রাস্তার এটাই শেষ মাথা, হতাশ কণ্ঠে বলল জিওনিনা।

    তার সাথে একমত হয়ে পিট বলল, লিফটের দিকে যাব, তা সম্ভব নয়। দশ মিটার পেরোবার আগেই গুলি করে আমাদের সব কয়টাকে ফেলে দেবে ওরা।

    তুষারের বল তৈরি করে ছুঁড়ে মারা যায়। নাকি আত্মসমর্পণ করার কথা ভাবছ?

    তিন নম্বর প্ল্যানের কথাটা ভুলে গেছ? তিরস্কার করল পিট।

    কৌতূহল নিয়ে পিটকে দেখল জিওর্দিনো। প্রথম দুটোর চেয়েও খারাপ হবে সেটা, এ আমি বিশ্বাস করি না। তার পরই তার চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠল। তুমি কী ভাবছ…ওহ, গড়, নো!

    মার্সিডিজ দুটো পৌঁছে গেল, প্রতিপক্ষ থুথু ছুড়লেও ওদের গায়ে লাগবে। কর্ডের দুপাশে চলে এসেছে প্রায়। হুইল মোচড় দিল পিট, গাড়িটাকে নামিয়ে দিল স্কি রান এ, অর্থাৎ বিপজ্জনক ঢালে।

    .

    ২৯.

    আল্লাহ সহায় হোন! উন্মাদ! ওরা উন্মাদ! বিড়বিড় করে বলল ইসমাইলের ড্রাইভার। ওদেরকে ধরা সম্ভব নয়।

    তাড়া করো! হুঙ্কার ছাড়ল ইসমাইল। যদি পালায়, তোমাকে আমি খুন করব!

    পালিয়ে যাবে কোথায়! হিসহিস করে বলল ড্রাইভার। দেখছ না, আত্মহত্যা করছে ওরা? পাহাড়ের মাথা থেকে সচল গাড়ি নিয়ে নামতে চেষ্টা করলে কেউ বাঁচে?।

    অটোমেটিক রাইফেলের ব্যারেলটা স্যাঁৎ করে ঘোরালো ইসমাইল, ড্রাইভারের কানে মাজল চেপে ধরল। বেজন্মা শুয়োর, ওদের ধর, নয়তো আল্লাহর কাছে পাঠিয়ে দেব তোকে!

    ইতস্তত করল ড্রাইভার, বুঝতে পারছে ধাওয়া করলেও, মৃত্যুর ঝুঁকি নিতে হবে, না করলেও। হাল ছেড়ে দিয়ে কর্ডের পিছু নিল সে, কিনারা থেকে ঢালে নামিয়ে আনল মার্সিডিজকে। আল্লাহ, অন্তত আমাকে তুমি রক্ষা করো!

    ভাঙা উইন্ডশিল্ডের ভেতর রাইফেলের ব্যারেল লম্বা করে ইসমাইল বলল, গাড়ি সিধে করে রাখো। দ্বিতীয় গাড়ির ড্রাইভার ইতস্তত করেনি, প্রথমটার পিছু পিছু নেমে এসেছে ঢালে।

    .

    জমাট বাঁধা শক্ত বরফের ওপর দিয়ে তীরবেগে নামছে কর্ড, প্রতি মুহূর্তে আরও বাড়ছে গতি। হুইলটা আলতোভাবে ছুঁয়ে আছে পিট, প্রায় ঘোরাচ্ছেই না। ব্রেকের ওপরও কোনো চাপ দিচ্ছে না। একটু এদিক-ওদিক হলেই চরকির মতো ঘুরতে শুরু করবে কর্ড। যদি আড়াআড়িভাবে পিছলাতে শুরু করে, অবধারিত পরিণতি হবে ঘন ঘন ডিগবাজি খাওয়া, পাহাড়ের গোড়ায় পৌঁছবে কিছু ভাঙা হাড় আর লোহালক্কড়।

    সিট বেল্টের প্রশ্ন তোলার জন্য এটা কি আদর্শ সময় নয়? জিজ্ঞেস করল জিওর্দিনো।

    মাথা নাড়ল পিট। উনিশশো ত্রিশে সে ধরনের কিছু ছিল না।

    বুলেটে ঝাঁঝরা পেছনের চাকার রাবার খসে যাওয়ায় ভাগ্যকে ছোট্ট একটা ধন্যবাদ দিল ও। চুপসে যাওয়া টায়ার থেকে মুক্ত হয়ে কাঠামোর জোড়া কিনারা বরফের গায়ে ভালোভাবে কামড় বসাতে পারছে, ভারসাম্য রক্ষায় সাহায্য পাচ্ছে পিট।

    স্পিডমিটারের কাঁটা ষাটের ঘরে উঠে গেল, এই সময় এক ঝাঁক মুঘলকে ছুটে আসতে দেখল ও তুষারের অতিকায় স্তূপ, দক্ষ স্কিয়াররা এ ধরনের বাধা পেরোতে ভালোবাসে। স্কি নিয়ে ঢাল পেরোবার সময় বাধাগুলো পিটেরও খুব প্রিয়। কিন্তু দুহাজার একশো বিশ কিলোগ্রাম ওজনের গাড়ি নিয়ে মুঘলদের মাঝখান দিয়ে পথ করে নেয়ার কথা ভাবতে পারে শুধু পাগলরা। অ্যাল ধারণা, পিট বর্তমানে তাদের ভূমিকাতেই অভিনয় করছে।

    আলতো স্পর্শে ট্রেইল থেকে সামান্য সরিয়ে দিল পিট গাড়িটাকে, চলে এল মসৃণ বরফে। সামনের পরীক্ষাটা সূচের ফুটোয় অলিম্পিক মশাল ঢোকানোর সাথে তুলনা করা যায়। আপনা থেকেই শরীরের পেশি শক্ত হয়ে গেল, ঝাঁকি খাবার জন্য তৈরি। এক চুল এদিক ওদিক হলে ছাতু হয়ে যাবে সবাই ওরা।

    একপাশে অনেকগুলো তুষার স্তূপ, আরেক পাশে সারি সারি গাছ, মাঝখান দিয়ে আঁকাবাঁকা পথ। কোনোটার সাথে ঘষা লাগল না, সরু পথ ধরে পরিষ্কার বেরিয়ে এল কর্ড। চওড়া, বাধাহীন ঢালে বেরিয়ে এসেই ঝট করে পেছন দিকে তাকাল পিট।

    প্রথম মার্সিডিজের ড্রাইভার কাণ্ডজ্ঞানের চমৎকার পরিচয় দিল। মুঘলদের এড়াবার জন্য কর্ডের ফেলে আসা চাকার দাগ অনুসরণ করল সে। দ্বিতীয় মার্সিডিজের ড্রাইভার হয় মুঘলদের দেখেনি বা বিপজ্জনক বলে মনে করেনি। নিজের ভুল বুঝতে পারল অনেক দেরিতে, ব্যস্ততার সাথে সংশোধনের জন্য গাড়িটাকে ঘন ঘন ডানে বায়ে ঘোরাল সে। এভাবে তিন কী চারটে মুঘলকে এড়াতে সফল হলো লোকা, তারপর একটার সাথে মুখোমুখি ধাক্কা খেল। গাড়ির সামনের অংশ তুষারের ভেতরে ঢুকে গেল, উঁচু হলো পেছনটা। নব্বই ডিগ্রি কোণ সৃষ্টি করে বুঝলে থাকল সেটা। তারপর শুরু হলো ডিগবাজি খাওয়া। নিরেট বরফে পড়ল, খাড়া হলো, আবার পড়ল, আবার খাড়া হলো-প্রতিবার গাড়ি থেকে কিছু না কিছু ছিটকে পড়ছে, শুধু আরোহীরা বাদে, কারণ ডিগবাজি খাওয়ায় চ্যাপ্টা হয়ে গেছে বডি, জ্যাম হয়ে গেছে দরজা। গাড়ি থেকে ছিটকে পড়লে আরোহীরা হয়তো প্রাণে বেঁচে যেত।

    মাউন্টিং থেকে ছিঁড়ে বেরিয়ে গেল ইঞ্জিন, ছিটকে জঙ্গলের দিকে চলে গেল। চাকা, ফ্রন্ট সাসপেনশন, রিয়ার-ড্রাইভ ট্রেন, এক এক সবগুলো চেসিস থেকে বেরিয়ে ঢাল বেয়ে সবেগে নামতে শুরু করল।

    যদি বলি একটা খতম, ব্যাকরণ সম্মত হবে কি? প্রশ্ন করল জিওর্দিনো।

    খুশি হবার কিছু নেই, দাঁতে দাঁত চেপে বলল পিট। সামনে তাকাও।

    সামনে তাকিয়ে উত্তেজিত হয়ে উঠল জিওর্দিনো। সামনে নতুন একটা ট্রেইল শুরু হতে যাচ্ছে, সেখানে উজ্জ্বল রঙের স্কি সুট পরা অনেক লোকের ভিড়। উইন্ডশিল্ড ফ্রেমের কিনারা ধরে সটান খাড়া হলো সে, উন্মত্তের মতো হাত নেড়ে চিৎকার জুড়ে দিল। কর্ডের জোড়া হর্ন বাজাচ্ছে পিট।

    চমকে উঠে ওদের দিকে ফিরল স্কিয়াররা। দেখল, দুটো ছুটন্ত গাড়ি প্রায় তাদের ঘাড়ের ওপর এসে পড়েছে। মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় আছে, ছিটকে একপাশে সরে গেল সবাই, কর্ডটাকে পাশ কাটাতে দেখল, দেখল তীরবেগে সেটাকে ধাওয়া করছে একটা মার্সিডিজ।

    ট্রেইলে উঁচু হয়েছে একটা স্কি জাম্প, নেমেছে একশো মিটার দূরে। তুষার ঢাকা র‍্যাম্প ঠিক কোথায় পাহাড়ের গায়ে মিশেছে, দেখার অবসর নেই পিটের। কোনো রকম ইতস্তত না করে স্টাটিং ড্রপ-অফ-এর দিকের র‍্যাডিয়েটর অর্নামেন্ট তাক করল

    লাফ দেবে, না? তাজ্জব জিওর্দিনো প্রশ্ন করল।

    চার নম্বর প্ল্যান, তাকে আশ্বস্ত করল পিট। শক্ত হও। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে পারি।

    আছে নাকি যে হারাবে?

    অলিম্পিক কমপিটিশনের জন্য যে ধরনের কাঠামো তৈরি করা হয়, এটা তার চেয়ে অনেক ছোট। এটা শুধু অ্যাবেটিক আর হটডগ প্রদর্শনীর জন্য ব্যবহার করা হয়। তবে র‍্যাম্পটা কর্ডকে ধারণ করার জন্য যথেষ্ট চওড়া, খানিকটা জায়গা পড়েও থাকবে। ক্রমশ উঁচু হয়েছে ঢালটা, তারপর সমতল খানিকটা বিস্তৃতি, সবশেষে দেবে গেছে র‍্যাম্প, ত্রিশ মিটার এগিয়ে গ্রাউন্ড-এর বিশ মিটার ওপরে হঠাৎ করে শেষ হয়ে গেছে।

    স্টার্টিং গেটের দিকে গাড়ি তাক করল পিট, কর্ডের চওড়া বডির আড়ালে লুকিয়ে রাখল স্কি জাম্প। সাফল্য নির্ভর করছে সময়জ্ঞান আর প্রয়োজনমতো স্টিয়ারিং হুইল ঘোরানোনার ওপর।

    একেবারে শেষ মুহূর্তে, সামনের চাকা স্টার্টিং লাইন পেরোবার আগেই, স্টিয়ারিং হুইল ঘোরানোর ওপর।

    একেবারে শেষ মুহূর্তে, সামনের চাকা স্টার্টিং লাইন পেরোবার আগেই, স্টিয়ারিং হুইলে মোচড় দিল পিট। কর্ডের পেছনটা ঘুরে গেল, চরকির মতো পাক খেতে শুরু করে র‍্যাম্পটাকে এড়িয়ে গেল গাড়ি। কর্ডের আকস্মিক অস্থিরতা লক্ষ করে ঘাবড়ে গেল ইসমাইলের ড্রাইভার, সংঘর্ষ এড়াবার জন্য সরলরেখা থেকে সরিয়ে নিল মার্সিডিজকে, স্টার্টিং গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকল নিখুঁতুভাবে।

    কর্ডকে সোজা পথে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছে পিট, ঘাড় ফিরিয়ে মার্সিডিজের দিকে তাকিয়ে আছে জিওর্দিনো। সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কিনারা থেকে নেমে গেল গাড়িটা। মুহূর্তের জন্য সেটাকে আকাশের গায়ে ডানাবিহীন মোটাসোটা একটা পাখির মতো লাগল। র‍্যাম্পের কিনারা ছাড়ার মুহূর্তে ঘণ্টায় একশো বিশ কিলোমিটার বেগে ছুটছিল ওটা। নিচে পড়ে প্রথমে ওটা চ্যাপ্টা হলো, তারপর গড়িয়ে নামার সময় খুলে খুলে পড়ল একেকটা পার্ট। পাইনগাছের সারিতে ধাক্কা খাওয়ার আগেই আরোহীরা সবাই দলা পাকিয়ে গেছে।

    আরেকটু হলে আমরাও আকাশে উড়তাম! ঢাক গিলে পিটকে তিরস্কার করল জিওর্দিনো।

    তার বদলে সম্ভবত পাতালে নামতে যাচ্ছি! সতর্ক করল পিট। গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে ফিরতি পথ ধরতে গিয়ে সফল হলেও, কর্ডের চাকা ঢালে নেমে এসে পিছলাতে শুরু করেছিল। স্টিয়ারিং হুইল ঘুরিয়ে পিছলানো সামলে নিয়েছে পিট, কিন্তু ঢাল বেয়ে পতনের গতি কমাতে পারছে না। ঢালের অর্ধেকটা পেরিয়ে আসতেই ব্রেকের শূন্য পুড়ে গেল, স্টিয়ারিং টাই রঙ বেঁকে গেছে, সেটাও একটা থ্রেড-এর মাথায় ঝুলছে। কর্ড ছুটে চলেছে তার অবধারিত পথে, সরাসরি একটা স্কি ফ্যাসিলিটি আর রেস্তোরাঁ বিল্ডিংয়ের দিকে, চেয়ার লিফটের গোড়ায়। একটা কাজই করার আছে রানর, করছেও তাই, বাচ্চাদের মতো অনবরত হর্ন বাজাচ্ছে।

    মহিলা আরোহীরা দ্বিতীয় মার্সিডিজের ধ্বংস চাক্ষুষ করেছে নির্দয় কৌতুল আর বিশাল স্বস্তিকর অনুভূতি নিয়ে। স্বস্তিটুকু ক্ষণস্থায়ী। ভবনটা সবেগে ছুটে আসছে দেখে আঁতকে উঠল তারা।

    মি. পিট, কিছুই কি আমাদের করার নেই? পেছন থেকে জিজ্ঞেস করলেন হেলা কামিল। প্রশ্নটা প্রায় বুলেটের মতো ছুটে এল।

    পরামর্শ দেয়ার অধিকার ইচ্ছে করলেই আপনি প্রয়োগ করতে পারেন, পাল্টা গুলি ছুড়ল পিট। পরমুহূর্তে ব্যস্ত হয়ে উঠল বাচ্চাদের তৈরি খেলাঘর এড়বার জন্য, খেলাঘরের চারপাশে তারা স্কি নিয়ে ছোটাছুটি করছে।

    স্কিয়ারদের প্রধান অংশটা মার্সিডিজের পতন দেখেছে, কর্ডের আওয়াজও তাদের কানে গেছে। ট্রেইলের একপাশে দ্রুত সরে গেল তারা, হাঁ করে পাশ কাটাতে দেখল গাড়িটাকে।

    চেয়ার লিফটের উঁচু প্রান্তটা থেকে ফোনে একাধিক গাড়ির দৌড় প্রতিযোগিতা সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে, বেস এরিয়া থেকে লোকজনকে সরিয়ে রয়েছে, স্কি ইনস্ট্রাকটররা। স্কি সেন্টারের ডান দিকে অগভীর একটা পুকুর রয়েছে, বরফে জমাট বাঁধা! পিটের ইচ্ছে, ওই পুকুরের ওপর পৌঁছানো। জমাট বাঁধা বরফ ভেঙে গেলে কর্ডের রানিং বোর্ড পর্যন্ত ডুবে যাবে, স্থির হবে গাড়ি। কিন্তু সমস্যা হলো, লোকজন কি ঘটে দেখার লোভে এমনভাবে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়েছে যে তাদের মাঝখানে রেস্তোরাঁ ভবন পর্যন্ত একটা করিডর তৈরি হয়েছে, পুকুরের দিকে যাবার কোনো পথ খোলা রাখেনি।

    আশা করতে পারি, গম্ভীর সুরে জিজ্ঞেস করল জিওর্দিনো, এবার তুমি ঝোলা থেকে পাঁচ নম্বর প্ল্যানটা বের করবে?

    প্ল্যান সব শেষ, বলল পিট। দুঃখিত।

    হে’লা কামিল গলা লম্বা করে তাকিয়ে আছেন সামনের দিকে। তাঁকে মিথ্যে অভয় দেবে, সে উৎসাহও পাচ্ছে না লিলি। সংঘর্ষ অনিবার্য, আর দেরিও নেই, বুঝতে পেরে পরস্পরকে তারা জড়িয়ে ধরল, তারপর একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়ল ড্রাইভিং সিটের পেছনে।

    স্কি আর পোল রাখা হয় র‍্যাকগুলোয়, কয়েকটার সাথে ধাক্কা খেল কর্ড। টুথপিকের মতো চারদিকে উড়ে গেল স্কি আর পোলগুলো। মুহূর্তের জন্য মনে হলো তুষারের ভেতর চাপা পড়েছে গাড়ি, তারপর বিস্ফোরণের মতো বেরিয়ে এসে আবার ছুটল সেটা, কংক্রিটের সিঁড়ি বেয়ে সরাসরি উঠে পড়ল বারান্দায়, কাঠের দেয়াল ভেঙে ঢুকে পড়ল ককটেল লাউঞ্জে।

    রুমটা খালি করা হয়েছে, রয়ে গেছে শুধু পিয়ানো বাদক। সে তার কি-বোর্ডের সামনে বসে আছে, বিস্ময়ে পঙ্গু। এক সেকেন্ড পর দেখা গেল আরও একজন রয়ে গেছে। বার-এর নিচ থেকে ধীরে ধীরে মাথা তুলল বারটেন্ডার, কর্ডটা ভেতরে ঢুকছে দেখে আবার ঝপ করে বসে পড়ল সে। চেয়ার-টেবিল খুঁড়িয়ে উন্মত্ত হাতির মতো ছুটে এল কর্ড, উল্টোদিকের দেয়াল ভেঙে নিচে লাফ দেয়ার পাঁয়তারা করল। দেয়ালের বিশ ফুট নিচে শক্ত বরফ।

    আশ্চর্যই বটে, দেয়াল ভাঙার পর গর্তের ভেতর খানিকটা নাক গলিয়ে দিয়ে স্থির হয়ে গেল কর্ড, বোঝা গেল লাফ দেয়ার কোনো ইচ্ছে ওটার নেই।

    র‍্যাডিয়েটরের হিসহিস শব্দ ছাড়া কামরার ভেতর ভৌতিক নিস্তব্ধতা নেমে এল। উইন্ডশিল্ড ফ্রেমের সাথে মাথাটা ঠুকে গেছে পিটের, চুলের আড়ালে সদ্য তৈরি ক্ষত থেকে গাল বেয়ে নেমে আসছে রক্ত। দেয়ালের দিকে ফিরল ও। দেয়ালের দিকে তাকিয়ে এমন স্থিরভাবে বসে আছে সে, যেন পাথরের মূর্তিতে পরিণত হয়েছে। ঘাড় ফিরিয়ে পেছন দিকে তাকাল পিট। মহিলা আরোহীদের দু’জনের চেহারাতেই প্রশ্নসূচক এখনও আমরা বেঁচে আছি! ভাব।

    বারটেন্ডার এখনও লুকিয়ে আছে, কাজেই পিয়ানো বাদকের দিকে ফিরল পিট। তিন পায়াওলা একটা টুলে হতভম্ব চেহারা নিয়ে বসে আছে সে। তার মাথায় কাত হয়ে রয়েছে ডার্বি হ্যাট, ঠোঁটের কোণে ঝুলে রয়েছে আধপোড়া সিগারেট, ছাইটুকু এখনও ঝরে পড়েনি। কি-র ওপর তাক করা রয়েছে তার হাত দুটো, গোটা শরীর আড়ষ্ট। রক্তাক্ত আগন্তুকের দিকে তাকাল সে, আগন্তুক হাসল।

    ক্ষমা করবেন, ভাই, সবিনয়ে বলল পিট। একটু বাজিয়ে শোনাবেন নাকি–ফ্লাই মি টু দ্য মুন?

    ৩০. দ্য লেডি ফ্ল্যামবোরো

    তৃতীয় পর্ব – দ্য লেডি ফ্ল্যামবোরো

    ১৯ অক্টোবর, ১৯৯১ উক্সমাল, ইউকাটান

    ৩০.

    চারদিকে বহুবর্ণ ফ্লাডলাইটের ছড়াছড়ি। অতিকায় কাঠামোর প্রতিটি পাথর শিল্পকর্ম, সেগুলোয় প্রতিফলিত হয়ে উজ্জ্বল আলো অতিপ্রাকৃত একটা আভা বিকিরণ করছে। প্রকাণ্ড পিরামিডের দেয়ালগুলো নীল করা হয়েছে, পিরামিডের মাথার ওপর জাদুকরের মন্দির গোলাপি আভায় উদ্ভাসিত। লাল স্পটলাইট দ্রুত ওঠানামা করছে সিঁড়ি বেয়ে, প্রতিবার রক্ত ঢেলে দেয়ার একটা ছবি ফুটে উঠছে ধাপগুলোর ওপর। উপরে, মন্দিরের ছাদে, সাদা কাপড়ে মোড়া একটা মূর্তি।

    নিজের দুদিকে হাত দুটো মেলে দিল টপিটজিন, মুঠো খুলল- তার এই ভঙ্গি পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে অনেক আগেই। সামনের দিকে সামান্য একটু ঝুঁকে নিচে তাকাল সে।

    ইউকাটান পেনিনসুলায় প্রাচীন মায়ান শহর উক্সমাল, মন্দির আর পিরামিডের চারদিকে গিজগিজ করছে মানুষ, হাজার হাজার ভক্ত মুখ তুলে তাকিয়ে আছে তার দিকে। টপিটজিন তার ভাষণ শেষ করল প্রতিবারের মতোই কীর্তন গাওয়ার সুরে আযটেক গান গেয়ে। সুরটা ধরতে পারল বিশাল জনতা, একযোগে গেয়ে উঠল তারাও।

    এই জাতির শক্তি, সাহস আর সাফল্য নিহিত রয়েছে আমাদের মধ্যে, আমরা যারা কখনোই অভিজাত বা ধনী হব না। আমরা অভুক্ত থাকি, মেহনত করি সেই সব নেতাদের জন্য যারা আমাদের চেয়ে কোনো অর্থেই বড় বা সৎ নয়। অবৈধ সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত কোনো রকম মহত্ত্ব বা গৌরবের অস্তিত্ব মেক্সিকোয় থাকবে না। আর নয় দাসত্ব। আর নয় মুখ বুজে শোষণ আর অত্যাচার সহ্য করা। ভদ্রবেশী অভিজাত আর ধনীদের শায়েস্তা করার জন্য, তাদের দুর্নীতি থেকে জাতিকে চিরকালের জন্য উদ্ধার করার জন্য, আবার একজোট হয়েছেন দেবতারা। তারা আমাদের জন্য নতুন এক সভ্যতা উপহার হিসেবে নিয়ে এসেছেন। সেটা আমাদেরকে গ্রহণ করতে হবে।

    ভাষণ শেষ হবার সাথে সাথে বহুরঙা আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে এল, শুধু উজ্জ্বল সাদা আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে থাকল একা টপিটজিন। তারপর অকস্মাৎ সাদা স্পটলাইটও নিভে গেল, সেই সাথে অদৃশ্য হলো মূর্তিটা।

    খোলা প্রান্তরে বহূৎসব জ্বলে উঠল ট্রাক বহর থেকে হাজার হাজার কৃতজ্ঞ ভক্তদের মধ্যে বিলি করা হলো বক্স ভর্তি খাবার। প্রতিটি বাক্সে নরম, সুস্বাদু রুটি আর মাংস আছে, আর আছে একটা করে পুস্তিকা। পুস্তিকাটা কার্টুন পত্রিকার মতো, প্রচুর ছবি, ক্যাপশন কম। ছবিতে দেখানো হয়েছে দৈত্য-দানবের চেহারা নিয়ে মেক্সিকো ছেড়ে পালাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট দো লরেঞ্জো আর তার মন্ত্রিসভার সদস্যরা, সীমান্তের ওপারে শয়তানরূপী আংকল স্যাম দুবাহু বাড়িয়ে তাদেরকে আলিঙ্গন করার জন্য তৈরি হয়ে আছে। প্রেসিডেন্ট আর তার সঙ্গীদের তাড়া করছে দেবতার চেহারা নিয়ে টপিটজিন, তার সাথে রয়েছে আরও চারজন আযটেক দেবতা।

     

    আরও দেখুন
    বই
    বাংলা অনুবাদ সাহিত্য
    Library
    গ্রন্থাগার সেবা
    PDF
    বাংলা ই-বুক রিডার
    বাংলা সংস্কৃতি বিষয়ক কর্মশালা
    বাংলা রান্নার রেসিপি বই
    বাংলা বিজ্ঞান কল্পকাহিনী
    বাংলা বই

     

    পুস্তিকায় নির্দেশের একটা তালিকাও স্থান পেয়েছে, বুদ্ধি দেয়া হয়েছে শান্তিপূর্ণ উপায়ে কিন্তু কার্যকরীভাবে সরকারের বিরুদ্ধাচরণ করার।

    খাবার বাক্স বিলি করার সময় স্বেচ্ছাসেবক যুবক-যুবতীরা টপিটজিনের নতুন শিষ্য সংগ্রহ ও তাদেরকে তালিকাভুক্ত করার দায়িত্বও পালন করল। গোটা ব্যাপারটার আয়োজন করা হয়েছে পেশাদারি দক্ষতার সাথে। মেক্সিকো সিটি দখল করে সরকারকে উৎখাত করার জন্য এক পা এক পা করে এগোচ্ছে টপিটজিন। শুধু উক্সমালে নয়, আরও বহু প্রাচীন আযটেক শহরে ভাষণ দিয়েছে সে। নিজের পক্ষে জনমত সৃষ্টিতে তার প্রতিটি ভাষণ অবিশ্বাস্য অবদান রাখছে। তবে আজ পর্যন্ত আধুনিক কোনো শহরে সমাবেশের আয়োজন করেনি সে।

    সন্ত্রষ্ট জনতা টপিটজিনের নামে জয়ধ্বনি দিতে শুরু করল। কিন্তু তাদের সে জয়ধ্বনি তার কানে গেল না স্পটলাইট নেভার সাথে সাথে দেহরক্ষীরা তাকে নিয়ে পিরামিডের পেছন দিকের সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসেছে বড়সড় একটা ট্রাক তথা সেমিট্রেইলর-এর পাশে। তাড়াহুড়ো করে ট্রাকে উঠে পড়ল টপিটজিন। স্টার্ট নিল ইঞ্জিন। ট্রাকের সামনে একটা প্রাইভেট কার থাকল, পেছনে থাকল আরেকটা। জনতার ভিড়ের মাঝখান দিয়ে ধীরগতিতে এগোল গাড়িগুলো, উঠে এল হাইওয়েত, বাঁক নিয়ে রওনা হলো ইয়ুক্যাটান রাজ্যের রাজধানী মারিডার দিকে।

     

    আরও দেখুন
    বাংলা অনুবাদকের পরিষেবা
    বাংলা সাহিত্য কোর্স
    বাংলা ডিটেকটিভ থ্রিলার
    গ্রন্থাগার সেবা
    বাংলা গানের লিরিক্স বই
    বাংলা ভাষার বই
    বাংলা উপন্যাস
    বুক শেল্ফ
    বাংলা শিশু সাহিত্য
    Books

     

    ট্রেইলরের ভেতরে দামি ফার্নিচার; একপাশে কনফারেন্স রুম, পার্টিশনের অপর দিকে টপিটজিনের লিভিং কোয়ার্টার।

    ঘনিষ্ঠ ভক্তদের সাথে আগামীকালের শিডিউল নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করল টপিটজিন। বৈঠক শেষ হলো, এই সময় দাঁড়িয়ে পড়ল ট্রাক, শুভরাত্রি জানিয়ে বিদায় নিল সবাই। প্রাইভেট কারে উঠে মারিডার একটা হোটেলে চলে গেল তারা।

    দরজা বন্ধ করে দিয়ে লিভিং কোয়ার্টার ঢুকল টপিটজিন। মাথা থেকে পালকের মুকুট খুলল সে, খুলল সাদা আলখেল্লা, পরনে থাকল একজোড়া স্ন্যাকস আর একটা স্পোর্টস শার্ট। কেবিনেট থেকে দামি এক বোতল হুইস্কি বের করল। প্রথম দুবার তাড়াতাড়ি গলায় ঢালল তৃষ্ণা নিবারণের জন্য, তারপর আয়েশ করে ছোট ঘোট চুমুক দিল গ্লাসে।

    পেশিতে ঢিল পড়ার পর ছোট্ট একটা খুপরিতে ঢুকল টপিটজিন, ভেতরে নানা ধরনের কমিউনিকেশন ইকুইপমেন্ট রয়েছে। একটা হোলোগ্রাফিক টেলিফোনের কোড করা নাম্বারে চাপ দিয়ে ঘুরল সে, খুপরির ঠিক মাঝখানে মুখ করল হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দিয়ে অপেক্ষায় আছে। ধীরে ধীরে অস্পষ্ট একটা ত্রিমাত্রিক মূর্তি ফুটে উঠতে শুরু করল। একই ভাবে হাজার মাইল দূরে টপিটজিনকেও দেখা যাচ্ছে।

     

    আরও দেখুন
    সাহিত্য পত্রিকা
    বাংলা ভাষা শিক্ষার অ্যাপ
    বাংলা ভাষার বই
    বাংলা স্বাস্থ্য টিপস বই
    বাংলা রান্নার রেসিপি বই
    বাংলা শিশু সাহিত্য
    বুক শেল্ফ
    বাংলা অনুবাদকের পরিষেবা
    বাংলা কবিতা
    বাংলা ই-বই

     

    একসময় পরিষ্কার হলো ছবিটা। আরেকজন তোক একটা আরাম কেদারায় বসে তাকিয়ে রয়েছে টপিটজিনের দিকে। তার গায়ের রং গাঢ়, ব্যাকব্রাশ করা চুলে চকচক করছে তেল। শক্ত, দামি পাথরের মতো ঝলমলে তার চোখ জোড়া। পাজামার ওপর আলখেল্লা পরেছে সে। টপিটজিনের স্ন্যাকস আর শার্ট প্রু কুঁচকে লক্ষ করল লোকটা, লক্ষ করল হাতে মদের গ্লাসটাও। বিপদের ঝুঁকি নিচ্ছ তুমি। এতটা বেপরোয়া হওয়া কি উচিত? ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করল সে, বাচনভঙ্গি আমেরিকান। এরপর মেয়েমানুষের দিকে ঝুঁকবে, কী বলো?

    হেসে উঠল টপিটজিন। শোনো ভাই, আমাকে লোভ দেখিয়ে না! বিজাতীয় কাপড়ে চব্বিশ ঘণ্টা নিজেকে ঢেকে রাখা, পোপের মতো আচরণ করা, তার ওপর কৌমার্য অক্ষুণ্ণ রাখা, প্রায় অসম্ভব একটা কাজ।

    কেন, একই কাজ তো আমাকেও করতে হচ্ছে।

    হ্যাঁ, তা হচ্ছে। কিন্তু আর যে পারি না!

    সাফল্য নাগালের মধ্যে চলে এসেছে, এখন তোমার অসতর্ক হওয়া সাজে না।

     

    আরও দেখুন
    সাহিত্য পত্রিকা
    বই
    বাংলা অডিওবুক
    বাংলা ই-বুক রিডার
    নতুন উপন্যাস
    বাংলা বিজ্ঞান কল্পকাহিনী
    বাংলা কবিতা
    বাংলা ভাষা
    বাংলা স্বাস্থ্য টিপস বই
    বাংলা অনুবাদ সাহিত্য

     

    হতে চাই না, হচ্ছিও না। আমার প্রাইভেসিতে নাক গলাবে এমন সাহস কারও নেই। যখন একা থাকি, ভক্তরা ধরে নেয় ঈশ্বরের সাথে যোগাযোগ করছি আমি।

    দ্বিতীয় লোকটা নিঃশব্দে হাসল। ব্যাপারটার সাথে আমিও পরিচিত।

    কাজের কথা শুরু করবে? জিজ্ঞেস করল টপিটজিন।

    ঠিক আছে। বলো কি ব্যবস্থা করেছ?

    সংশ্লিষ্ট লোকজন ছাড়া কাকপক্ষীও আয়োজনটার কথা জানে না। নির্দিষ্ট সময়ে সবাই যে যার জায়গায় উপস্থিত থাকবে। সমাবেশের জায়গাটা কোথায় জানার জন্য দশ মিলিয়ন পেসো ঘুস দিয়েছি আমি। বোকার দল তাদের কাজ শেষ করবে, তারপর তাদের বলি দেওয়া হবে। শুধু যে তাদের মুখ বন্ধ করাই উদ্দেশ্য তা নয়, আমাদের নির্দেশ পালনের জন্য যারা অপেক্ষা করছে তাদেরকে সতর্কও করা হবে।

     

    আরও দেখুন
    বাংলা সাহিত্য কোর্স
    বাংলা রান্নার রেসিপি বই
    Books
    পিডিএফ
    বাংলা স্বাস্থ্য টিপস বই
    বাংলা ভাষা
    অনলাইন বুক
    বাংলা বইয়ের সাবস্ক্রিপশন
    বাংলা ভাষা শিক্ষার অ্যাপ
    বাংলা গল্প

     

    আমার অভিনন্দন গ্রহণ করো। তোমার কাজ অত্যন্ত নিখুঁত।

    কৌশল আর বুদ্ধিমত্তা দেখানোর সুযোগ তোমাকে ছেড়ে দিয়েছি আমি।

    টপিটজিনের মন্তব্যের পর কয়েকটা মুহূর্তে নিস্তব্ধতার ভেতর কাটল, দু’জনেই যে যার চিন্তায় মগ্ন। অবশেষে নড়ে উঠল দ্বিতীয় লোকটা, গাউনের ভেতর থেকে ব্র্যান্ডির একটা বোতল বের করল, উঁচু করে দেখল টপিটজিনকে। তোমার স্বাস্থ্য।

    হেসে উঠে হুইস্কির গ্লাসটা টপিটজিনও উঁচু করল। যৌথ অভিযানের সাফল্য কামনায়।

    আমি দেখার অপেক্ষায় আছি, আমাদের মেধা আর পরিশ্রমের ফল ভবিষ্যৎকে কীভাবে বদলে দেয়।

    .

    ৩১.

     

    আরও দেখুন
    বাংলা লাইব্রেরী
    বাংলা ফন্ট প্যাকেজ
    বাংলা গানের লিরিক্স বই
    বাংলা ক্যালিগ্রাফি কোর্স
    বাংলা ডিটেকটিভ থ্রিলার
    বাংলা ভাষা শিক্ষার অ্যাপ
    বাংলা কমিকস
    PDF
    বই পড়ুন
    বাংলা উপন্যাস

     

    ডেনভারের অদূরে বাকলি এয়ারফিল্ড থেকে আকাশে উঠে পড়ল চিহ্নবিহীন বিচক্রাফট জেট বিমানটা। ইঞ্জিনের গর্জন কমেছে কিছুটা। তুষার ঢাকা রকি পর্বতমালার চূড়াগুলো পিছিয়ে পড়ল, বিচক্রাফট জেট আকাশের আরও ওপরে উঠে এল।

    প্রেসিডেন্ট শুভেচ্ছা জানিয়েছেন, আপনি যাতে তাড়াতাড়ি সেরে ওঠেন, ডেইল নিকোলাস বললেন। ঘটনার বর্ণনা শোনার পর ভয়ানক অসন্তুষ্ট হয়েছেন তিনি…

    তিনি উপলব্ধি করেছেন আপনার ওপর দিয়ে কী রকম বিশ্রী একটা ধকল গেছে, মন্তব্য করলেন জুলিয়াস শিলার।

    এবং তিনি আমাদের সবার পক্ষ থেকে ক্ষমাপ্রার্থনা করেছেন। বলেছেন, আপনার নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য যেকোনো ব্যবস্থা নিতে তৈরি আছে মার্কিন প্রশাসন।

    তাঁকে বললেন, আমি কৃতজ্ঞ, হে’লা কামিল উত্তর দিলেন। আমার তরফ থেকে তাঁর প্রতি একটাই অনুরোধ, আমার প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে যারা মারা পড়েছে তাদের পরিবারকে যেন উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

     

    আরও দেখুন
    Library
    বাংলা বই
    বাংলা কমিকস
    বাংলা লাইব্রেরী
    বাংলা স্বাস্থ্য টিপস বই
    বিনামূল্যে বই
    বাংলা ভাষা
    বাংলা ইসলামিক বই
    PDF
    বাংলা অডিওবুক

     

    জুলিয়াস শিলার নিশ্চয়ই দিয়ে বললেন, সে ব্যাপারে অবহেলা করা হবে না।

    একটা বিছানায় শুয়ে আছেন হে’লা কামিল, পরনে সাদা সুইট-স্যুট। তার ডান গোড়ালি প্লাস্টার করা হয়েছে। এক এক করে জুলিয়াস শিলার, ডেইল নিকোলাস ও সিনেটর পিটের দিকে তাকালেন তিনি। আমি সম্মানিত বোধ করছি, আপনাদের মতো ব্যক্তিত্ব নিউ ইয়র্কের পথে আমাকে সঙ্গদান করছেন।

    আপনি কিন্তু বিড়ালকেও হার মানিয়েছেন, মুচকি হেসে এই প্রথম কথা বললেন সিনেটর।

    হে’লা কামিলের ঠোঁট জোড়া সামান্য ফাঁক হলো। দ্বিতীয় ও তৃতীয় জীবন দান করার জন্য আপনার ছেলের কাছে আমি ঋণী। অদ্ভুত সময়ে হাজির হওয়ার বিরল ক্ষমতা আছে ওর।

    ডার্কের পুরনো গাড়িটার অবস্থা দেখেছি স্বচক্ষে। কেমন করে বেঁচেছেন সবাই, কে জানে। সিনেটর পিট বললেন।

    অত্যন্ত সুন্দর একটা বাহন ছিল, আফসোসের সুর ধ্বনিত হলো হেলার কণ্ঠে। নষ্ট হয়ে গেল।

     

    আরও দেখুন
    বাংলা ডিটেকটিভ থ্রিলার
    বাংলা কবিতা
    বাংলা ই-বুক রিডার
    বাংলা অনুবাদকের পরিষেবা
    বাংলা অনুবাদ সাহিত্য
    অনলাইন বই
    বাংলা শিশু সাহিত্য
    অনলাইন গ্রন্থাগার
    বাংলা বিজ্ঞান কল্পকাহিনী
    বাংলা ফন্ট প্যাকেজ

     

    কাশি দিয়ে ডেইল নিকোলাস বললেন, জাতিসংঘে আপনার ভাষণ প্রসঙ্গে কথা বলতে পারি, মিস কামিল?

    আপনার লোকেরা আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি সম্পর্কে নিরেট তথ্য প্রমাণ কিছু কি সংগ্রহ করতে পেরেছে? হেলার কণ্ঠে তীক্ষ্ণতা।

    চট করে জুলিয়াস শিলার আর জর্জ পিটের সাথে দৃষ্টি বিনিময় করলেন ডেইল নিকোলাস। জবাব দিলেন সিনেটর, ভালো করে সার্চ করার সময় পাইনি আমরা। চারদিন আগে যেখানে ছিলাম, আজও প্রায় সেখানে…

    ডেইল নিকোলাস ইতস্তত ভাব নিয়ে শুরু করলেন, প্রেসিডেন্ট বলেছেন,…তিনি আশা প্রকাশ করেছেন…

    সময় নষ্ট করার দরকার নেই, মি. নিকোলাস, হে’লা কামিল বাধা দিয়ে বললেন। আপনারা শান্ত হোন। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ভাষণে আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরির কথা বলব।

    আপনি মত পাল্টেছেন জেনে আমি আনন্দিত।

     

     

    যা ঘটে গেল, আমি আপনাদের কাছে অন্তত এইটুকু ঋণী।

    ডেইল নিকোলাস স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, আপনার ঘোষণা প্রেসিডেন্ট নাদাভ হাসানকে কিছু রাজনৈতিক সুবিধা এনে দেবে, অর্থাৎ আখমত ইয়াজিদ বেশ খানিকটা বেকায়দায় পড়বে। আমার তো ধারণা, ধর্মীয় মৌলবাদের বদলে জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রসার ঘটবে মিসরে।

    খুব বেশি কিছু আশা করো না, সতর্ক করলেন সিনেটর। দুৰ্গটা ধসে পড়ছে, আমরা শুধু ফাঁক-ফোকরগুলো ভরার চেষ্টা করছি।

    জুলিয়াস শিলার আশঙ্কা প্রকাশ করে বললেন, আমার ভয়, আখমত ইয়াজিদ মিস হে’লা কামিলের বিরুদ্ধে আরও মরিয়া হয়ে লাগবে।

    আমি তা মনে করি না, দ্বিমত পোষণ করলেন ডেইল নিকোলাস। নিহত আতঙ্কবাদীদের সাথে ইয়াজিদের যোগাযোগ যদি এফ.বি.আই, আবিষ্কার করতে পারে, আর যদি ষাট জন প্লেন আরোহীর মৃত্যুর জন্য তাকে দায়ী করা সম্ভব হয়, সাধারণ মিসরীয়রা তার ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেবে। সারা দুনিয়া যদি তার সন্ত্রাসী তৎপরতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠে, মিস হে’লা কামিলের ওপর আবার আঘাত হানতে সাহস পাবে না সে।

     

     

    একটা কথা ঠিক, মিসরীয়রা সুন্নি মুসলমান, শিয়া ইরানিদের মতো রক্তপিপাসু নয়-আমরা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে ধীরে ধীরে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে চাইব। তবে আপনার দ্বিতীয় ধারণাটি ঠিক নয়। আমি বেঁচে থাকা পর্যন্ত আখমভ ইয়াজিদ ক্ষান্ত হবে না। একের পর এক চেষ্টা করে যাবে সে, তাকে আমি সেধরনের ফ্যানাটিক হিসেবেই চিনি। হয়তো এই মুহূর্তেও আমাকে খুন করার প্ল্যান করছে সে।

    উনি ঠিক বলেছেন, সিনেটর একমত হলেন। আখমত ইয়াজিদের ওপর আমাদের কড়া নজর রাখা দরকার।

    জাতিসংঘে ভাষণ দেয়ার পর আপনার প্ল্যান কী? জিজ্ঞেস করলেন জুলিয়াস শিলার।

    আজ সকালে, হাসপাতাল ছাড়ার আগে, প্রেসিডেন্ট হাসানের একটা মেসেজ পেয়েছি আমি, বললেন হে’লা কামিল। তিনি আমার সাথে দেখা করার ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন।

    ডেইল নিকোলাস সাবধান করে দিয়ে বললেন, আমাদের চৌহদ্দি থেকে বেরিয়ে গেলে আমরা কিন্তু আপনার নিরাপত্তার ব্যাপারে কোনো রকম গ্যারান্টি দিতে পারব না, মিস কামিল।

     

     

    আপনাদের উদ্বেগের কোনো কারণ নেই, মৃদু হেসে হে’লা কামিল বললেন, প্রেসিডেন্ট সাদাত আততায়ীদের হাতে নিহত হবার পরে আমার দেশের সিকিউরিটি সিস্টেম বেশ সজাগ।

    জানতে পারি, মিস কামিল, সাক্ষাৎকারটি কোথায় অনুষ্ঠিত হবে? খোঁজ নিলেন। জুলিয়াস শিলার। নাকি অনধিকার চর্চা হয়ে গেল?

    গোপন কোনো ব্যাপার নয়। দুনিয়ার সবাই জানবে। উরুগুয়ের পান্টা ডেল এসটে-তে মিলিত হব আমরা, আমি এবং প্রেসিডেন্ট নাদাভ হাসান।

    তোবড়ানো, বুলেটে ঝাঁঝরা কর্ডটাকে গ্যারেজে নিয়ে আসা হয়েছে। চোখে অবিশ্বাস নিয়ে গাড়িটার চারদিকে ঘুরল একবার এসবেনসন। গাড়ির অবস্থা যদি এই হয়, আপনারা বেঁচে আছেন কীভাবে?

    গাড়ির মালিককে জিজ্ঞেস করো, পরামর্শ দিল অ্যাল জিওর্দিনো। তার একটা হাত স্লিংয়ে ঝুলছে, গলায় একটা পট্টি বাঁধা হয়েছে, ব্যান্ডেজ বাধা হয়েছে কানে।

    ছয়টা সেলাই পড়েছে, তবে সবগুলো চুলের ভেতর আড়ালে, তাছাড়া অক্ষতই বলা যায় পিটকে। গাড়ির নাকে হাত বুলাচ্ছে ও, ওটা যেন একটা পোষা প্রাণী।

    অফিসঘর থেকে খোঁড়াতে খোঁড়াতে বেরিয়ে এল লিলি। তার বাম গালে আঁচড়ের দাগ, ডান চোখে নিচটা ফুলে আছে।

    টেলিফোনে হিরাম ইয়েজার।

    মাথা ঝাঁকিয়ে এগিয়ে এল পিট। এসবেনসনের কাঁধে এক হাত রেখে বলল, আমার গাড়িটাকে আগের চেয়ে সুন্দর করে দাও।

    কমপক্ষে ছয় মাস, সঙ্গে প্রচুর টাকা লাগবে। জানাল এসবেনসন।

    সময়, টাকা কোনোটাই সমস্যা নয়, পিট বলে, সরকার দেবে বিল।

    ঘুরে দাঁড়িয়ে, অফিস ঘরে ঢুকে টেলিফোন উঠালো সে, হিরাম, আমার জন্য কোনো খবর আছে?

    বাল্টিক সাগর আর নরওয়ে উপকূল বাদ দিয়েছে আমি।

    কারণ?

    সেরাপিস লগ যে জিওলজিকাল বর্ণনা দিয়েছে তার সাথে ওই এলাকার বৈশিষ্ট্য মেলে না। রাফিনাস যে অসভ্যদের বর্ণনা দিয়েছে তার সাথে প্রথম দিককার ভাইকিংদেরও কোনো মিল নেই। সে যাদের কথা লিখেছে, তাদের সাথে বরং বেশ খানিকটা সিদিয়ানদের মিল খুঁজে পাওয়া যায়, তবে গায়ের রং আরও গাঢ়।

    কিন্তু সিদিয়ানরা এসেছিল সেন্ট্রাল এশিয়া থেকে, বলল পিট। সোনালি চুল বা ফর্সা চামড়া কোত্থেকে পাবে তারা এক সেকেন্ড চিন্তা করল ও। আচ্ছা, আইসল্যান্ডের কথা ভেবেছ? আরও প্রায় পাঁচশো বছর ভাইকিংরা ওখানে বসবাস করেনি। রাফিনাস হয়তো এস্কিমোদের কথা বলে থাকতে পারে।

    সম্ভব নয়, বলল ইয়েজার। চেক করে দেখেছি। এস্কিমোরা কখনোই আইসল্যান্ডে মাইগ্রেট করেনি। রাফিনাস পাইন বনের বর্ণনা দিয়েছে, আইসল্যান্ডে পাচ্ছ না। তাছাড়া, ভুলো না, ছয়শো মাইল লম্বা সাগর পাড়ি নিয়ে কথা বলছি আমরা, তার মধ্যে কয়েকটা সাগর সাংঘাতিক অশান্ত। ঐতিহাসিক মেরিন রেকর্ড বলছে, রোমান জাহাজের ক্যাপটেনরা তীরভূমিকে সাধারণত দুদিনের বেশি চোখের আড়াল করত না।

    এখন তাহলে কোথায় খোঁজ করব আমরা?

    ভাবছি আবার একবার পশ্চিম আফ্রিকার উপকূলে তল্লাশি চালাব। কিছু হয়তো চোখ এড়িয়ে গেছে।

    অসভ্যদের সন্ধান পেতে চাইছ তুমি, বলল পিট। কিন্তু সেরাপিস গ্রিনল্যান্ডে এল কী করে, এলে কি ব্যাখ্যা দেবে?

    কম্পিউটর আমাদের বাতাস স্রোতের হিসেবে দিলে বলতে পারব।

    আজ রাতে আমি ওয়াশিংটন যাচ্ছি, বলল পিট। কাল তোমার সাথে দেখা করব।

    ঠিক আছে, ম্লান কণ্ঠে বলল ইয়েজার।

    ফোন রেখে অফিস থেকে বেরিয়ে এল পিট। ওর চেহারা দেখে লিলি বুঝল, আশাজাগানিয়া কিছু ঘটেনি।

    ভালো কোনো খবর নেই, তাই না? পিটের পেছন থেকে জিজ্ঞেস করল সে।

    তার দিকে ফিরে কাঁধ ঝাঁকাল পিট। যেখান থেকে শুরু করেছিলাম, আবার সেখানেই ফিরে এসেছি।

    পিটের বাহু ধরে মৃদু চাপ দিল লিলি। হতাশ হয়ো না তো। ইয়েজার পারবে, তুমি দেখো।

    কিন্তু সে তো আর জাদুকর নয়!

    অফিসঘরে উঁকি দিল জিওর্দিনো। প্লেন ধরতে হলে এক্ষুনি বেরিয়ে পড়তে হয়, পিট।

    হেঁটে এসে এসবেনসনের উদ্দেশে মৃদু হাসল পিট। ওকে ভালো করে দাও, আমাদের সবার জীবন বাঁচিয়েছে গাড়িটা।

    তা করব, এসবেনসন বলে, কিন্তু কথা দিতে হবে বুলেট আর স্কি ঢালের থেকে দূরে থাকবে?

    ঠিক হ্যায়!

    .

    ৩২.

    পাবলিক গ্যালারিতে প্রশংসা আর হাততালির ঝড়; প্রধান ফ্লোরে বসে থাকা কূটনৈতিক নেতাদের সামনে কোনো রকম সাহায্য ছাড়াই মঞ্চে উঠে এলেন হে’লা কামিল। ক্রাচের সাহায্য নিয়ে হাঁটছেন তিনি। মাইকের সামনে একটু থেমে, জোরাল গলায় ভাষণ শুরু করলেন। স্পষ্ট, কাটা কাটা শব্দে। ধর্মের নামে নিরীহ লোকজনকে হত্যা থেকে বিরত থাকতে সবাইকে অনুরোধ জানালেন প্রথমে।

    আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি আবিষ্কারের সমূহ সম্ভাবনা ঘোষণা করার পর গুঞ্জন উঠল পুরো হলজুড়ে। তাকে হত্যা-প্রচেষ্টার জন্য সরাসরি আখমত ইয়াজিদকে দায়ী করলেন হেলা।

    এরপর, দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে তিনি বললেন, যেকোনো ভয়-ভীতি দেখিয়ে তাকে জাতিসংঘের মহাসচিবের পদ থেকে সরানো যাবে না।

    মঞ্চ থেকে হেলা নেমে যাওয়ার বহুক্ষণ পরেও চলতে থাকল হাততালি।

    .

    দারুণ এক মহিলা, প্রশংসা করে বললেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। তার মতো কাউকে পেলে মন্ত্রিসভায় থাকার জন্য অনুরোধ জানাতাম আমি। রিমোট কন্ট্রোলের বোতাম টিপে টিভি সেট বন্ধ করে দিলেন প্রেসিডেন্ট।

    চমৎক্তার বললেন মহিলা, সিনেটর পিট সায় দিলেন। শব্দচয়ন তুলনাহীন। আখমত ইয়াজিদকে একেবারে ধুয়ে দিয়েছেন।

    হ্যাঁ, প্রেসিডেন্ট বললেন, আমাদের জন্য সেরা একটা ভাষণ।

    সিনেটর জিজ্ঞেস করলেন, আপনি জানেন নিশ্চয়ই, মিস কামিল প্রেসিডেন্ট হাসানের সাথে আলোচনা করার জন্য উরুগুয়ে যাচ্ছে?

    ছোট্ট করে মাথা ঝাঁকালেন প্রেসিডেন্ট। ডেইল নিকোলাস জানিয়েছে আমাকে। সার্চ কেমন এগোচ্ছে, সিনেটর?

    লোকেশন খুঁজে বের করার জন্য নুমার কম্পিউটর ফ্যাসিলিটি কাজ করছে।

    এগিয়েছে কত দূর?

    চার দিন আগে যেখানে ছিলাম সেখানেই আছি আমরা।

    পেন ইউনিভার্সিটির একজনকে চিনি আমি, ট্রিপল-এ রিসার্চার বলা হয় তাকে, যদি মনে করেন তার সাহায্য নিতে পারেন আপনারা, পরামর্শ দিলেন প্রেসিডেন্ট।

    আজই যোগাযোগ করব আমি, বললেন সিনেটর।

    ধীর ভঙ্গিতে প্রেসিডেন্ট বললেন, প্রেসিডেন্ট নাদাভ হাসানের কাছে আর্টিফ্যাক্ট দেয়ার সময় ধীরে আখমতকে সরিয়ে দিলে কেমন হয়?

    আমিও তাই মনে করি। কিন্তু ইয়াজিদ যেন তেন লোক নয়।

    নিশ্চই নিখুঁতও নয়।

    তা বটে। কিন্তু আয়াতুল্লাহ খোমেনির মতো উন্মাদ নয় সে। চালাক লোক।

    সিনেটরের দিকে ফিরলেন প্রেসিডেন্ট। তার সম্পর্কে খুব কম জানি আমরা।

    সে দাবি করে, জীবনের প্রথম ত্রিশ বছর সিনাই মরুতে একা একা ঘুরে বেড়িয়েছে, আলাপ করেছে আল্লাহর সাথে।

    লোকটার উচ্চাশা আছে, মানতে হবে, তিক্ত হাসি ফুটল প্রেসিডেন্টের মুখে। পয়গম্বর হতে চায়। তার সম্পর্কে একটা রিপোর্ট তৈরি করতে বলেছিলাম সিআইএ চিফকে। বিশেষ করে ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে। দেখা যাক, কতদূর কী করল ওরা। ইন্টারকমে কথা বললেন তিনি, ডেইল, একটু আসবে?

    পনেরো সেকেন্ডের মধ্যে ওভাল অফিসে চলে এলেন ডেইল নিকোলাস।

    আমরা আখমত ইয়াজিদকে নিয়ে আলাপ করছিলাম, তাকে জানালেন প্রেসিডেন্ট। সিআইএ কি ওর জীবনবৃন্তান্ত পেয়েছে?

    ঘণ্টাখানেক আগে মার্টিন ব্রোগানের সাথে আমরা কথা হয়েছে। গবেষকরা এক কি দুদিনের মধ্যে ফাইল তৈরির কাজটা শেষ করতে পারবে বলে জানিয়েছে।

    শেষ হলেই সেটা আমি দেখতে চাই। সোফা ছেড়ে উঠলেন প্রেসিডেন্ট।

    ধরুন, বললেন সিনেটর, আগামী কয়েক সপ্তাহর মধ্যে আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরির অস্তিত্ব আবিষ্কার হলো। আমরা সম্ভবত লাইব্রেরির শিল্পকর্ম আর নবশাগুলো মিসরকে ফিরিয়ে দেব। কিন্তু তার আগে, আনঅফিশিয়ালি, গোটা ব্যাপারটা সম্পর্কে আগেই যদি একটা আভাস দিয়ে রাখি প্রেসিডেন্ট নাদাভ হাসানকে, কেমন হয় সেটা?

    হ্যাঁ, তার জানা দরকার। আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে আমার পক্ষ থেকে ব্যাপারটা তাকে জানান আপনি, সিনেটর।

    কাঁধ ঝাঁকালেন সিনেটর পিট। সরকারি বিমান পেলে মঙ্গলবার আমেরিকা ছেড়ে মিসরে উড়ে যেতে পারি আমি। প্রেসিডেন্ট হাসানকে গোটা ব্যাপারটা জানিয়ে আবার ফিরে আসব ওইদিন বিকেলেই।

    প্রেসিডেন্ট হাসানকে ব্যক্তিগতভাবে বলবেন, ইয়াজিদের বিরুদ্ধে তিনি যদি কোনো অ্যাকশন নিতে চান, আমি তাকে সর্বাত্মক সাহায্য করতে প্রস্তুত।

    বাজে আইডিয়া, সিনেটর পিট বললেন, এই প্রস্তাব ফাস হলে আপনার সরকার টলে যাবে।

    আপনার সতোর প্রতি আমার আস্থা আছে।

    দীর্ঘশ্বাস ফেললেন সিনেটর। লাইব্রেরির বই-পুস্তক, শিল্পকর্ম বিষয়ক কথাবার্তা আমি বলব। কিন্তু ইয়াজিদকে দুনিয়ার বুক থেকে সরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে আমার পক্ষে কিছু বলা সম্ভব নয়।

    নিজের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন প্রেসিডেন্ট। সিনেটরের সঙ্গে হাত মেলালেন।

    আমি কৃতজ্ঞ, বন্ধু। বুধবার আপনার রিপোর্টের আশায় থাকব।

    বিদায়, প্রেসিডেন্ট।

    ওভাল অফিস ছেড়ে বেরোনোর সময় সিনেটর পিটের মনে হলো, বুধবার সন্ধ্যেয় নির্ঘাত একা একা ডিনার করবেন প্রেসিডেন্ট।

    .

    ৩৩.

    আর মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে মূল ভূখণ্ডের পশ্চিমে ডুব দেবে সূর্য, এই সময় পাল্টা ডেল এসটের ছোট্ট বন্দরে সাবলীল ভঙ্গিতে ঢুকে পড়ল প্রমোদতরী লেডি ফ্ল্যামবোরো। মৃদুমন্দ দেখিনা বাতাসে উড়ছে ব্রিটেনের পতাকা।

    সুশোভিত, সুদর্শন একটা জাহাজ, দেখামাত্র চোখ জুড়িয়ে যায়। কখনোই একশোর বেশি আরোহী ভোলা হয় না। তাদের সেবা করার জন্য রয়েছে সমান সংখ্যক ক্রু সদস্য। সান হুয়ান থেকে আসার সময় এবার অবশ্য কোনো আরোহী নিয়ে আসেনি লেডি ফ্ল্যামবোরো।

    টু ডিগ্রিজ পোর্ট, কৃষ্ণাঙ্গ পাইলট বলল।

    টু ডিগ্রিজ পোর্ট, সাড়া দিল হেলমসম্যান।

    খাকি শর্টস আর শার্ট পরে আঙুলের মতো লম্বা মাটির বাড়তি অংশটির ওপর হিসেবি চোখ রেখে দাঁড়িয়ে থাকল পাইলট, মাটির বাড়তি এই অংশটাই আড়াল করে রেখেছে বে-কে। ধীরে ধীরে সেটাকে ছাড়িয়ে এল লেডি ফ্ল্যামবোরো।

    স্টারবোর্ডের দিকে ঘুরতে শুরু করো-হোল্ড স্টেডি অ্যাট জিরো এইট জিরো।

    নির্দেশ পুনরাবৃত্তি করল হেলমসম্যান, অত্যন্ত ধীরগতিতে নতুন কোর্স ধরল জাহাজ।

    আরও অনেক রংচঙে প্রমোদতরী ও ইয়ট রয়েছে বন্দরে। অর্থনৈতিক শীর্ষ সম্মেলন উপলক্ষ্যে ভাড়া করা হয়েছে অনেক জাহাজ, বাকিগুলো তাদের আরোহীদের নামাচ্ছে।

    নোঙর করার স্থান থেকে আধ কিলোমিটার দূরে থাকতে পাইলট নির্দেশ দিল ডেড স্টপ!

    শান্ত পানি কেটে আপন গতিতে এগোল লেডি ফ্ল্যামবোরো, দূরত্ব কমিয়ে এনে ধীরে ধীরে থামছে। সন্তুষ্ট হয়ে পোর্টেবল ট্রান্সমিটারে পাইলট জানাল, পজিশনে পৌঁছেছি আমরা। হুক ফেলল।

    নির্দেশটা বো-র দিকে পাঠানো হলো, সাথে সাথে পানিতে ফেলা হলো নোঙর। এতক্ষণে ইঞ্জিন বন্ধ করার নির্দেশ দিল পাইলট।

    সাদা ইউনিফর্ম পরা এক ভদ্রলোক ঋজু ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন, সহাস্য বদনে করমর্দনের জন্য পাইলটের দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিলেন তিনি। প্রতিবারের মতই নিখুঁত, মি. ক্যাম্পোস। ক্যাপটেন অলিভার কলিন্স বিশ বছর ধরে পাইলট হ্যারি ক্যাম্পোসকে চেনেন।

    আর যদি ত্রিশ মিটার লম্বা হতে জাহাজটা, কোনোমতেই বন্দরে ঢোকাতে পারতাম না। তামাকের দাগে কালো দাঁত বের করে হাসল ক্যাম্পোস। তবে আমরা ওপর নির্দেশ আছে, বন্দরেই নোঙর ফেলতে হবে, জেটিতে ভিড়তে পারব না।

    অবশ্যই নিরাপত্তার কারণে, আন্দাজ করা যায়, ক্যাপটেন বললেন।

    আধপোড়া একটা চুরুট ধরাল পাইলট। শীর্ষ সম্মেলনের প্রস্তুতি গোটা দ্বীপটাকে ওলটপালট করে ছেড়েছে। সিকিউরিটি পুলিশের হাবভাব দেখে মনে হয় প্রতিটি পাম গাছের আড়ালে একজন করে স্নাইপার লুকিয়ে আছে।

    ব্রিজের জানালা দিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার জনপ্রিয় খেলার মাঠের দিকে তাকালেন ক্যাপটেন। আশ্চর্য হবার কিছু নেই। সম্মেলন চলার সময় এই জাহাজে মেক্সিকো আর মিসরের প্রেসিডেন্ট থাকবেন।

    তাই? বিড়বিড় করে বিস্ময় প্রকাশ করল পাইলট। তাহলে সেজন্যই তীর থেকে দূরে রাখতে বলা হয়েছে আপনাকে।

    আসুন না, আমার কেবিনে বসে গলাটা ভিজিয়ে নেবেন, আমন্ত্রণ জানালেন ক্যাপটেন কলিন্স।

    অসংখ্য ধন্যবাদ, মাথা নেড়ে বলল ক্যাম্পোস। বন্দরের জাহাজগুলোর দিকে একটা হাত তুলল সে। আজ অনেক কাজ, আরেক দিন হবে।

    কাগজপত্র সেই করিয়ে নিয়ে বন্দর পাইলট ক্যাম্পোস নিজের বোটে নেমে গেল। হাত নাড়ল সে, তাকে নিয়ে চলে গেল বোট।

    এত আনন্দ আর কখনও পাইনি, কলিন্সের ফাস্ট অফিসার মাইকেল ফিনি বলল। এরা সবাই হাজির, কিন্তু আরোহী বলতে কেউ নেই। ছয় দিন ধরে আমার মনে হচ্ছে, মারা যাবার পর স্বর্গে পাঠানো হয়েছে আমাকে।

    কোম্পানির নির্দেশ, ক্রুরা যতটা সময় জাহাজ চালানোয় ব্যয় করবে, সেই একই পরিমাণ সময় ব্যয় করতে হবে আরোহীদের মনোরঞ্জনের জন্য। এই দায়িত্ব পছন্দ নয় মাইকেল ফিনির। অত্যন্ত দক্ষ একজন নাবিক সে, মেইন ডাইনিং সেলুনের কাছ থেকে যতটা সম্ভব দূরে সরে থাকে, খাওয়া-দাওয়া সারে সঙ্গী অফিসারদের সাথে, সারাক্ষণ জাহাজের খবরদারিতে ব্যস্ত থাকতে পছন্দ করে। শরীরটা তার প্রকাণ্ড, ড্রাম আকৃতির ধড়, আঁটসাট ইউনিফর্ম ছিঁড়ে সেটা যেন প্রতি মুহূর্তে বিস্ফোরিত হতে চাইছে।

    নেতাদের গালগল্প নিশ্চয়ই তুমি শুনতে চাইবে, কৌতুক করে বললেন ক্যাপটেন।

    চেহারায় অসন্তোষ নিয়ে মাইকেল ফিনি বলল, ভিআইপি প্যাসেঞ্জারদের সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। একই প্রশ্ন বারবার করা তাদের একটা বদঅভ্যেস।

    কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে আরোহী মাত্রেই শ্রদ্ধেয়, মাইক। আগামী কয়েকটা দিন নিজের আচরণের প্রতি লক্ষ রেখো, প্লিজ। অতিথি হিসেবে এবার আমরা বিদেশি নেতা আর রাষ্ট্রপ্রধানদের পাচ্ছি।

    জবাব দিল না মাইকেল ফিনি, সৈকতের দিকে তাকিয়ে আকাশছোঁয়া ভবনগুলো দেখছে। পুরনো শহরটায় যখনই আসি, প্রতিবার নতুন একটা হোটেল দেখতে পাই।

    হ্যাঁ, তুমি তো উরুগুয়েরই লোক।

    মন্টিভিডিয়োর সামান্য পশ্চিমে জন্ম আমার।

    বাড়ি ফেরার আনন্দটুকু উপভোগ করছো না?

    এ শহরে, শুধু শহরে কেন, এ দেশে আপন বলতে কেউ নেই আমরা। ষোলো বছর বয়স থেকে জাহাজে চাকরি নিয়ে সাগরে ঘুরে বেড়াচ্ছি, সাগরই আমার আসল ঠিকানা। মাইকেল ফিনি-র চেহারা হঠাৎ বিরূপ হয়ে উঠল। জানালার দিকে একটা হাত তুলে দেখল সে। ওই যে, ব্যাটারা আসছে-কাস্টমস আর ইমিগ্রেশন ইন্সপেক্টরের দল।

    প্যাসেঞ্জার নেই, ক্রুরাও কেউ তীরে নামছে না, রাবার স্ট্যাম্প মেরেই চলে যাবে ওরা।

    হেলথ ইন্সপেক্টরকে বিশ্বাস নেই, প্যাঁচ কষলেই হলো!

    পারসারকে জানাও, মাইক। তারপর ওদেরকে নিয়ে আমার কেবিনে চলো এসো।

    মাফ করবেন, স্যার, একটু বেশি খাতির করা হয়ে যাবে না? স্রেফ কাস্টমস ইন্সপেক্টরদের ক্যাপটেনের কেবিনে ডাকা কি উচিত?

    হয়তো একটু বেশি হচ্ছে, তবে বন্দরে থাকার সময় বিশেষ করে ওদের সাথে সদ্ভাভ রাখতে চাই আমি, ক্যাপটেন বললেন। বলা তো যায় না কখন আমাদের উপকার দরকার হয়।

    ইয়েস স্যার!

    লেডি ফ্ল্যামবোয়রার গায়ে বোট ভিড়ল, মই বেয়ে উঠে এল অফিসাররা। ইতোমধ্যে সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। হঠাৎ করে জাহাজের আলো জ্বলে উঠে ঝলমলে করে তুলল আপার ডেক আর সুপারস্ট্রাকচার। শহর আর অন্যান্য জাহাজের আলোকমালার মাঝখানে নোঙর করা লেডি ফ্ল্যামবোরোকে গহনার বাক্সে হীরের একটা টুকরো মনে হলো।

    উরুগুয়ের সরকারি অফিসারদের নিয়ে পাইলটের কেবিনের দিকে এগিয়ে আসতে দেখা গেল ফাস্ট অফিসার মাইকেল ফিনিকে। তাকে অনুসরণরত পাঁচজন লোককে খুঁটিয়ে লক্ষ করলেন ক্যাপটেন। অভিজ্ঞ মানুষ, তার চোখকে ফাঁকি দেয়া সহজ নয়। প্রায় সাথে সাথেই বুঝলেন তিনি, কোথায় কী যেন একটা মিলছে না। অন্তত পাঁচজনের মধ্যে একজনকে অদ্ভুত লাগল তাঁর। লোকটার মাথায় স্ট্র হ্যাট, এত চওড়া আর নিচে নেমে আছে যে তার চোখ দুটো দেখা গেল না। পরে আছে একটা জাম্পস্যুট। বাকি সবার পরনে স্বাভাবিক ইউনিফর্ম। ক্যারিবিয়ান দ্বীপগুলোর বেশির ভাগ অফিসারই এই ইউনিফর্ম পরে।

    অদ্ভুত লোকটা তার সঙ্গীদের পিছু পিছু আসছে মাথা নিচু করে। সবাইকে নিয়ে দোরগোড়ায় পৌঁছল মাইকেল ফিনি, একপাশে সরে দাঁড়িয়ে অফিসারদের আগে ঢোকার সুযোগ করে দিল।

    সামনে বাড়লেন ক্যাপটেন কলিন্স। গুড ইভনিং, জেন্টলমেন। লেডি ফ্ল্যামবোরোয় আপনাদের স্বাগত জানাই। আমি ক্যাপটেন অলিভার কলিন্স।

    কি ব্যাপার, অফিসাররা কেউ নড়ছে না বা কথা বলছে না কেন? মাইকেল ফিনির সাথে দৃষ্টি বিনিময় করলেন ক্যাপটেন। এই সময় জাম্পস্যুট পরা লোকটা এক পা সামনে বাড়লো। পা থেকে ধীরে ধীরে জাম্পস্যুটটা খুলে ফেলল সে, ভেতরে দেখা গেল সোনার কাজ করা সাদা ইউনিফর্ম, হুবহু ক্যাপটেন কলিন্স যেমন পরে আছেন মাথা থেকে স্ট্র হ্যাটটা নামাল সে, পরল একটা ক্যাপ, ইউনিফর্মের সাথে মানানসই।

    সাধারণত কোনো ব্যাপারেই দিশেহারা হন না ক্যাপটেন, কিন্তু আজ চোখের সামনে এ ধরনের একটা ঘটনা ঘটতে দেখে হতবাক হয়ে গেলেন। তাঁর মনে হলো, তিনি যেন একটা আয়নায় তাকিয়ে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখছেন। আগন্তুককে তার যমজ ভাই বলে অনায়াসে চালিয়ে দেয়া যায়।

    কে আপনি? বাকশক্তি ফিরে পেয়ে কঠিন সুরে জিজ্ঞেস করলেন ক্যাপটেন। কী ঘটছে এখানে?

    নাম জেনে আপনার কাজ নেই, সবিনয় হাসির সাথে বলল সুলেমান আজিজ। আপনার জাহাজের দায়িত্ব এখন থেকে আমি নিলাম।

    .

    ৩৪.

    চোরাগোপ্তা হামলার সাফল্য নির্ভর করে হতচকিত করে দেয়ার ওপর। সুলেমান আজিজ আর তার অনুচররা কাজটা এমন নিখুঁতভাবে সারল যে ক্যাপটেন, ফাস্ট অফিসার আর পারসার ছাড়া জাহাজের আর কেউ জানতেই পারল না তাদের জাহাজে বেদখল হয়ে গেছে। ওদের তিনজনকে ফাস্ট অফিসার মাইকেল ফিনি-র কেবিনে নিয়ে যাওয়া হলো, বাঁধা হলো হাত-পা, মুখে টেপ লাগানো হলো, বন্ধ দরজার ভেতর পাহারায় থাকল সশস্ত্র একজন লোক।

    সুলেমান আজিজের সময়ের হিসাবটাও নিখুঁত। উরুগুয়ের নির্ভেজাল কাস্টমস অফিসাররা মাত্র বারো মিনিট পর হাজির হলো জাহাজে। মাইকেল কলিগের প্রায় নিখুঁত ছদ্মবেশ নিয়েছে সে, অফিসারদের অভ্যর্থনা জানাল এমনভাবে যেন তাদের সাথে তার কতকালের পরিচয়। মাইকেল ফিনি আর পারসারের ভূমিকায় যে দু’জনকে বেছে নিয়েছে, বেশির ভাগ সময় ছায়ায় ভেতর থাকল তারা। দু’জনেই তারা অভিজ্ঞ নাবিক, যাদের ভূমিকায় নামানো হয়েছে তাদের সাথে চেহারার মিলও যথেষ্ট। তিন মিটারের বেশি দূর থেকে খুব কম লোকই তাদের চেহারার পার্থক্য ধরতে পারবে।

    অনুসন্ধান শেষ করে কাস্টমস অফিসাররা বিদায় নিল। কলিন্সের সেকেন্ড আর থার্ড অফিসারকে ক্যাপটেনের কেবিনে ডেকে পাঠাল সুলেমান আজিজ। এটাই হবে তার প্রথম ও কঠিনতম পরীক্ষা। এই দুই অফিসারের চোখকে যদি ফাঁকি দিতে পারা যায়, নিরীহ ও অজ্ঞ সহযোগী হিসেবে তার স্বার্থে আগামী চব্বিশ ঘণ্টা অমূল্য অবদান রাখবে তারা।

    প্লেন হাইজ্যাক করার আগে, ক্যাপটেন ডেইল লেমকের ভূমিকা গ্রহণের সময়, ছদ্মবেশ নেয়ার পদ্ধতিটা ছিল অন্যরকম। ডেইল লেমকেকে খুন করার পর অনায়াসে তার মুখের একটা প্লাস্টিক ছাঁচ তৈরি করে নিয়েছিল সে। লেডি ফ্ল্যামবোরোর ক্যাপটেন অলিভার কলিন্সকে খুন করার সুযোগ হয়নি তার, কাজেই তার ছদ্মবেশ নিতে গিয়ে মাইকেল কলিন্সের আটটা ফটো সংগ্রহ করে সে। কণ্ঠস্বর কলিন্সের সমান পর্দায় তোলার জন্য বিশেষ এক ধরনের মেডিসিন ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে শরীরে গ্রহণ করতে হয়েছে তাকে।

    দক্ষ একজন শিল্পীকে ভাড়া করে সুলেমান আজিজ, কলিন্সের ফটোগুলো দেখে লোকটা তাকে বানিয়ে দেয় একটা মূর্তি। ভাস্কর্যটি থেকে নারী ও পুরুষ, দুধরনের ছাঁচ তৈরি করা হয়। সেই ছাঁচ মুখোশ হিসেবে কাজে লাগায় সুলেমান আজিজ। কলিন্সের মুখের রং আনার জন্য মুখোশে ব্যবহার করা হয় গাছের দুধসাদা নির্যাস। ফোমের তৈরি কান লাগিয়েছে সুলেমান আজিজ। কলিন্সের চোখের রং পাবার জন্য কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহার করেছে। দাঁতে পরেছে টুথক্যাপ।

    ক্ষমা করবেন, জেন্টলমেন, ঠাণ্ডা লেগে গলাটা বসে গেছে।

    জাহাজের ডাক্তারকে খবর দেব? সেকেন্ড অফিসার হারবার্ট পারকার জিজ্ঞেস করল। দীর্ঘদেহী সে, রোদে পোড়া তামাটে রং গায়ের, শিশুসুলভ নিরীহ চেহারা।

    ভুল হয়ে গেছে, ভাবল সুলেমান আজিজ। ক্যাপটেন কলিন্সকে চেনে ডাক্তার, কাছ থেকে পরীক্ষা করলেই মুখোশটা চিনে ফেলতে পারে। এর মধ্যে তিনি আমাকে এক গাদা ট্যাবলেট দিয়েছেন, এখন ভালোর দিকে।

    থার্ড অফিসার, স্কটল্যান্ডের অধিবাসী, নাম আইজ্যাক জোন্স, কপাল থেকে লাল চুল সরিযে গলাটা সামনের দিকে লম্বা করল। আমাদের কিছু করার আছে, স্যার?

    হ্যাঁ, আছে বৈকি, মি. জোন্স! অফিসারদের ফটো দেখা আছে, নাম-ধামও জানা কাজেই আলাপ চালিয়ে যেতে সুলেমান আজিজের কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। আমাদের ভিআইপি প্যাসেঞ্জাররা কাল বিকেলে আসছেন। অভ্যর্থনা কমিটির নেতৃত্ব দেবে তুমি। একসাথে দু’জন প্রেসিডেন্টকে অতিথি হিসেবে পাওয়া দুর্লভ একটা সম্মান, স্বভাবতই কোম্পানি আশা করবে প্রথম শ্রেণীর আনুষ্ঠানিকতার আয়োজন করব আমরা।

    ইয়েস স্যার, দৃঢ়কণ্ঠে বলল জোন্স। ভরসা রাখতে পারেন।

    মি. পারকার।

    ক্যাপটেন।

    এক ঘণ্টার মধ্যে একটা বোট আসছে, কোম্পানির কার্গো নিয়ে। তুমি লোডিং অপারেশনের চার্জে থাকবে। আজ সন্ধ্যায় সিকিউরিটি অফিসারদের একটা দলও আসছে। তাদের থাকার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা করবে, প্লিজ।

    কার্গো নিতে হবে? নোটিশটা আরও আগে পেলে ভালো হতো না, স্যার? আর, আমি ভেবেছিলাম, মিসরীয় ও মেক্সিকোর সিকিউরিটি অফিসাররা আসবেন কাল সকালে।

    আমাদের কোম্পানির ডিরেক্টররা চিরকাল রহস্যময় আচরণ করেন, খানিকটা অভিযোগের সুরে বলল সুলেমান আজিজ। সশস্ত্র অতিথিদের কথা যদি বলেন, এ ক্ষেত্রেও কোম্পানির আদেশ কাজ করছে। সাবধানের মার নেই ভেবে তারা নিজেদের লোক রাখতে চাইছে।

    তার মানে একদল সিকিউরিটি অফিসার আরেকদল সিকিউরিটি অফিসারের ওপর নজর রাখবে?

    অনেকটা তাই। আমার ধারণা, লয়েডস ব্যাঙ্ক অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করা দাবি জানিয়েছে, তা না হলে বীমার রেট বাড়িয়ে দেবে।

    বুঝতে পারছি।

    কোনো প্রশ্ন, জেন্টলমেন?

    কারও কোনো প্রশ্ন নেই, অফিসাররা চলে যাবার জন্য ঘুরে দাঁড়াল।

    হারবার্ট, আরেকটা কথা, বলল সুলেমান আজিজ। কার্গো লোড করবে যতটা সম্ভব চুপচাপ আর তাড়াতাড়ি, প্লিজ।

    ঠিক আছে, স্যার।

    ডেকে বেরিয়ে গিয়ে হারবার্ট পারকার, আইজ্যাক জোন্সের দিকে তাকাল। শুনলে? উনি আমার নামের প্রথম অংশ ধরে ডাকলেন। ব্যাপারটা অদ্ভুত নয়?

    জোন্স নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে কাধ ঝাঁকাল। উনি বোধহয় সত্যি খুব অসুস্থ।

    ঠিক এক ঘণ্টা পরই লেডি ফ্ল্যামবোরার পাশে এসে থামল লোডিং ক্রাফট, সাথে সাথে একটা সেতুবন্ধ রচনা করা হলো। কার্গো লোড করার সময় কোনো বিঘ্ন ঘটল না। সুলেমান আজিজের বাকি লোকরাও, সবার পরনে বিজনেস স্যুট, পৌঁছল জাহাজে। চারটে খালি স্যুইট ছেড়ে দেয়া হলো তাদেরকে

    মাঝরাতের দিকে মাল খালাস করে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল ল্যান্ডিং ক্রাফট। লেডি ফ্ল্যামবোরোর সেতু তুলে নেয়া হলো। হোল্ডের ভেতর ঠাই পেয়েছে কার্গো, হোন্ডের বিশাল ডাবল ডোর বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

    মাইকেল ফিনি-র দরজায় তিনবার টোকা দিল সুলেমান আজিজ। সামান্য ফাঁক হলো কবাট, ভেতর থেকে উঁকি দিল সশস্ত্র গার্ড। কার্পেট মোড়া প্যাসেজওয়ের দুদিকে চট করে একবার তাকাল সুলেমান আজিজ, কেউ কোথাও নেই। তাড়াতাড়ি কেবিনের ভেতর ঢুকে পড়ল সে।

    গার্ডের দিকে তাকিয়ে ইঙ্গিত করল সে। নিঃশব্দে এগিয়ে গেল গার্ড। ক্যাপটেন মাইকেল কলিঙ্গের মুখ থেকে টেপটা খুলে দিল সে।

    কষ্ট দিতে হচ্ছে, সেজন্য সত্যি আমি দুঃখিত, ক্যাপটেন, বলল সুলেমান আজিজ। কিন্তু ধরুন, যদি আপনাকে আটকে না রেখে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে দিতাম, আপনি পালাতে চেষ্টা করতেন না? বা ক্রুদের সাবধান করতেন না?

    একটা চেয়ার আড়ষ্ট ভঙ্গিতে বসে আছেন ক্যাপটেন, হাত আর পা চেয়ারের সাথে বাঁধা, চোখে আগুন ঝরা দৃষ্টি। তুমি একটা নর্দমার কীট!

    তোমরা ব্রিটিশরা, জুতসই গাল দিতেও জানো না! হেসে উঠল সুলেমান আজিজ। আমেরিকানরা এ ব্যাপারে ওস্তাদ। তারা চার অক্ষরের শব্দ ব্যবহার করে যা বলে তারচেয়ে খারাপ খিস্তি আর হয় না।

    তুমি আমার ক্রুদের কোনো সাহায্য পাবে না।

    কিন্তু আমি যদি আমার লোকদের অর্ডার দিই, আপনার মহিলা ক্রুদের গলা কেটে সাগরে ফেলে দিতে? এদিকের পানিতে হাঙর আছে তা তো আপনি জানেনই।

    হাত-পা বাঁধা থাকলেও, রাগের মাথায় সুলেমান আজিজের দিকে লাফিয়ে পড়তে চাইল মাইকেল ফিনি। তার তলপেটে রাইফেলের মাজল চেপে ধরে বাঁধা দিল গার্ড চেয়ারে পিছিয়ে গেল ওয়েট, ব্যথায় কুঁচকে উঠল তার চেহারা।

    ক্যাপটেন একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন সুলেমান আজিজের দিকে। যা খুশি করতে পারো তুমি, টেরোসিস্টদের সাথে কোনো সহযোগিতার প্রশ্ন ওঠে না, দৃঢ়কণ্ঠে বললেন তিনি।

    সন্ত্রাসবাদী বলুন আর যাই বলুন, প্রথম শ্রেণীর প্রফেশনাল আমরা, শান্তভাবে ব্যাখ্যা করল সুলেমান আজিজ। কাউকে খুন করার কোনো ইচ্ছেই আমাদের নেই। টাকা চাই, আর তাই আমরা প্রেসিডেন্ট হাসান ও প্রেসিডেন্ট দো লরেঞ্জোকে আটক করব। আপনারা যদি বাধা হয়ে না দাঁড়ান, দুই সরকারের সাথে একটা সমঝোতায় আসব আমরা, টাকা নিয়ে চলে যাব।

    সুলেমান আজিজের মুখোশ আঁটা চেহারা খুঁটিয়ে পরীক্ষা করলেন ক্যাপটেন কলিন্স, লোকটা মিথ্যে বলছে কিনা বুঝতে চাইছেন। তার মনে হলো, লোকটা সত্যি কথাই বলছে। ভদ্রলোকের জানা নেই, সুলেমান আজিজের রয়েছে দুর্লভ অভিনয় প্রতিভা।

    তা না হলে তুমি আমার ক্রুদের খুন করবে?

    তাদের সাথে আপনাকেও।

    কী চাও তুমি?

    প্রায় কিছুই না। মি. পারকার আর মি. জোন্স আমাকে ক্যাপটেন কলিন্স বলে বিশ্বাস করে নিয়েছেন। কিন্তু আমার দরকার ফাস্ট অফিসারের সার্ভিস। আপনি তাকে আমার নির্দেশ মানার হুকুম দিন।

    কেন, মি, ফিনির সার্ভিস কেন দরকার তোমার?।

    আপনার কেবিনে ডেস্ক ড্রয়ারটা খুলে অফিসারদের পার্সোনাল রেকর্ড পড়েছি আমি, বলল সুলেমান আজিজ। মি. মাইকেল ফিনি এদিকের পানি সম্পর্কে জানেন।

    ঠিক কী চাইছ?

    একজন পাইলটকে জাহাজে ডাকার ঝুঁকি আমরা নিতে পারি না, ব্যাখ্যা করল সুলেমান আজিজ। কাল সন্ধের পর হেলম-এর দায়িত্ব ফিনিকে নিতে হবে, জাহাজটাকে চালিয়ে চ্যানেল থেকে বের করে নিয়ে যাবেন উনি খোলা সাগরে।

    শান্তভাবে প্রস্তাবটি বিবেচনা করলেন ক্যাপটেন। খানিক পর ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন তিনি। বন্দর কর্তৃপক্ষ খবর পাওয়ামাত্র প্রবেশপথ বন্ধ করে দেবে, ক্রুদের তোমরা খুন করার ভয় দেখাও আর নাই দেখাও।

    টের পাবে না। কালো রং করা একটা জাহাজ কালো রাতে অনায়াসে কর্তৃপক্ষের চোখকে ফাঁকি দিতে পারে।

    কতদূর যেতে পারবে বলে মনে করো? দিনের আলো ফোঁটার সাথে সাথে লেডি ফ্ল্যামবোরোর একশো মাইল ঘিরে চারদিকে গিজগিজ করবে পেট্রল বোট।

    তারা আমাদের খুঁজে পাবে না, আশ্বস্ত করার সুরে বলল সুলেমান আজিজ।

    সামান্য অস্থির দেখাল ক্যাপটেনকে। বললেই তো হবে না! লেডি ফ্ল্যামবোয়রার মতো একটা জাহাজকে কেউ লুকিয়ে ফেলতে পারে না।

    সত্যি কথা, বলল সুলেমান আজিজ, সবজান্তর হাসি ফুটে উঠল তার ঠোঁটে। অন্যের বেলায় সত্যি। কিন্তু আমি এটাকে গায়েব করে দিতে পারি।

    কাল সকালে অভ্যর্থনা অনুষ্ঠান, নিজের কেবিনে বসে নোট লিখছে আইজ্যাক জোন্স। দরজায় নক করে ভেতরে ঢুকল হারবার্ট পারকার। ক্লান্ত সে, ইউনিফর্ম ঘামে ভিজে আছে।

    ঘাড় ফিরিয়ে তার দিকে তাকাল জোন্স। লোডিং ডিউটি শেষ হলো?

    হ্যাঁ, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ।

    ঘুমোবার আগে এক ঢোক চলবে নাকি?

    তোমার স্কটিশ মল্ট হুইস্কি?

    ডেস্ক ছেড়ে উঠল আইজ্যাক জোন্স, ড্রেসারের দেরাজ থেকে একটা বোতল বের করল। দুটে গ্লাসে হুইস্কি ভরে ফিরে এল সে। ব্যাপারটাকে এভাবে দেখো-ভোররাতে নোঙর পাহারা দেয়ার দায়িত্ব থেকে মুক্তি পেয়েছ।

    কার্গো লোডিংয়ের চেয়ে সেটাই ভালো ছিল, ক্লান্ত সুরে বলল মার্টিন। তোমার কি খবর?

    এই মাত্র ডিউটি শেষ হলো।

    তোমার পোর্টে আলো না দেখলে ভেতরে ঢুকতাম না।

    সকালের অনুষ্ঠানটা সুন্দর হওয়া চাই, তাই খুঁটিনাটি বিষয়গুলো লিখে রাখছিলাম।

    ফিনিকে কোথাও দেখতে পেলাম না, তাই ভাবলাম তোমার সাথেই কথা বলি।

    এই প্রথম জোন্স লক্ষ করল পারকারের চেহারায় কেমন যেন একটা দিশেহারা ভাব। কী ব্যাপার, কী হয়েছে তোমার?

    গলায় হুইস্কি ঢেলে খালি গ্লাসটার দিকে তাকিয়ে থাকল পারকার। এ ধরনের কার্গো আগে কখনও তুলিনি আমরা। এটা একটা প্রমোদতরী, তাই না?

    এ ধরনের কার্গো মানে? কী তুলেছ তোমরা? কৌতূহলী হয়ে উঠল জোন্স। চুপচাপ বসে থাকল পারকার, শুধু এদিক ওদিক মাথা নাড়ল। তারপর মুখ তুলে তাকাল সে, বলল, পেইন্টিং গিয়ার। এয়ার কমপ্রেসার, ব্রাশ, রোলার আর পঞ্চাশটা ড্রাম-বোধ হয় রং ভর্তি।

    রং? জোন্স দ্রুত জিজ্ঞেস করল। কী রং?

    মাথা নাড়ল পারকার। তা বলতে পারব না। ড্রামের লেখাগুলো স্প্যানিশ।

    এর মধ্যে আশ্চর্য হবার কী আছে? রিফিটের সময় লাগবে মনে করে কোম্পানি ওগুলো হাতের কাছে রাখতে চাইতে পারে।

    আহা, সবটুকু আগে শোনোই না। শুধু ওগুলো নয়, প্লাস্টিকের বিশাল আকারের অনেকগুলো রোলও আমরা তুলেছি।

    প্লাস্টিক?

    প্লাস্টিক আর প্রকাণ্ড আকারের অনেকগুলো ফাইবারবোর্ড, বলল পারকার। অন্ত ত কয়েক কিলোমিটার তো হবেই। লোডিং ডোর দিয়ে বহু কষ্টে ঢোকানো গেছে। ভেতরে গুজতেই বেরিয়ে গেছে তিন ঘণ্টা।

    জোন্স তার খালি গ্লাসের দিকে আধবোজা চোখে তাকিয়ে থাকল। তোমার কি ধারণা, কোম্পানি ওগুলো নিয়ে কী করবে?

    চোখে বিস্ময় নিয়ে তার দিকে তাকাল পারকার, কপাল কুঁচকে উঠল। কী জানি! আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleদ্য ফাইভ সেকেন্ড রুল – মেল রবিন্স
    Next Article ড্রাগন – ক্লাইভ কাসলার

    Related Articles

    মখদুম আহমেদ

    রিভার গড – উইলবার স্মিথ

    November 8, 2025
    মখদুম আহমেদ

    দ্য সেভেনথ স্ক্রৌল – উইলবার স্মিথ

    November 8, 2025
    মখদুম আহমেদ

    ওয়াইল্ড জাস্টিস – উইলবার স্মিথ

    November 8, 2025
    মখদুম আহমেদ

    ড্রাগন – ক্লাইভ কাসলার

    November 8, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026
    Our Picks

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026

    ভুতুড়ে ট্রেন – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026

    ব্রাহ্মণ ভূত – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }