Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026

    ভুতুড়ে ট্রেন – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026

    ব্রাহ্মণ ভূত – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    ডেজার্ট গড – উইলবার স্মিথ

    কাজী আখতারউদ্দিন এক পাতা গল্প539 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    ৩. একের পর এক পরিস্থিতি

    থিবিসে ফেরার এরপরের দিনগুলোতে পর একের পর এক পরিস্থিতিতে আমি নিজেকে জড়িয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।

    হাইকসো আর সর্বাধিরাজ মিনোজের মধ্যে যে রাজনৈতিক ঝড় বয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনা করার জন্য ফারাও সর্বক্ষণ আমাকে তার কাছে থাকতে বাধ্য করলেন।

    পরিস্থিতির গুরুত্ব আর বিপদ বিবেচনা করে এটন আর আমি একমত হলাম যে, আমাদের সমস্ত গোয়েন্দা অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলোর এখন নিজেদের মধ্যে যুদ্ধবিরতী ঘোষণা করে সাময়িকভাবে একে অন্যের সহযোগিতা করতে হবে। নিজেদের বাঁচামরা আর মিসরের অস্তিত্ব রাখার প্রয়োজনে আমাদের এটা করতে হবে।

    উত্তর দিক থেকে তথ্য আর খবরাখবর বয়ে নিয়ে আসা নাম না জানা বিভিন্ন নারী পুরুষ সারারাত আমাদের আলাদা আলাদা দরজা দিয়ে ঢুকে আবার অন্য দরজা দিয়ে বের হয়ে যেতে লাগলো। এছাড়া সংবাদবাহক কবুতরও সংবাদ নিয়ে আসতে লাগলো।

    এটন আর আমি গোয়েন্দাদের কাছ থেকে পাওয়া প্রতিটা তথ্য সাবধানে পরীক্ষানিরীক্ষা করার পর ফারাও আর তার নিজস্ব কর্মকর্তাদের কাছে পাঠাতাম।

    সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল রাজা বিওনের শবদাহ করার খবরটি। আমি তীর ছুঁড়ে তাকে মেমফিসের একটু আগে নীল নদীতে মেরে ফেলেছিলাম। বর্বর হাইকমোরা তাদের নিহত বীরদের দেহ আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে ফেলতো, ওরা আমাদের মতো উন্নত আর সভ্য জাতির মত মৃতদেহ মমি করতো না।

    আর একই সাথে ওরা তাদের দানবীয় দেবতা শেঠকে খুশি করার জন্য নরবলিও দিত। এটন আর আমি জানতে পারলাম ওরা একশো বন্দী মিসরীয় যোদ্ধাকে জীবন্ত অবস্থায় রাজা বিওনের চিতায় ছুঁড়ে পুড়িয়ে মেরেছে। তারপর বিওনের পরবর্তী জীবনের আনন্দের সঙ্গী হিসেবে আরও একশো কুমারীকেও একই চিতায় পুড়িয়ে মেরেছে।

    থিবসে একমাত্র আমিই প্রথম খবর পেলাম যে বিওনের শবদাহ সম্পন্ন করার পর তার ভাই গোরাব হাইকসোদের নতুন রাজা হয়েছে।

    গোরাবের প্রথম চিন্তা ছিল তার বড়ভাইয়ের মৃত্যু প্রতিশোধ নেওয়া। শেখ আবাদা আর আসিউতের মাঝের সীমান্তে মিসরীয় বাহিনীর মুখোমুখি অবস্থান করা তার প্রথম সারির সেনাবাহিনী থেকে সে দশ হাজার সৈন্য প্রত্যাহার করে নিল। গোরাবের এই সিদ্ধান্ত মিসরের জন্য আনন্দের বিষয় ছিল। সম্পূর্ণ সীমান্তে ফারাওকে সবসময় ব্যস্ত থাকতে হয়েছিল। এখন পর্যন্ত বিওনের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হলেও মিসরীয় পক্ষেও কম প্রাণহানি হয়নি।

    এখন ফারাওয়ের উপর থেকে চাপটা কমে যাওয়াতে তিনি তার অবস্থান সুসংহত করার সুযোগ পেলেন আর এদিকে গোরাব তার একচতুর্থাংশ সেনাকে উত্তরে তামিয়াতে আমার ফেলে আসা অক্ষত ক্রেটান সেনাবাহিনীর উপর আক্রমণ করার নির্দেশ দিল।

    গোরাব তার ভাইয়ের হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী ছিল। সেসময়ে সে রাজকীয় বজরায় রক্ষীবাহিনীর অধিনায়ক ছিল। সে দেখেছে কীভাবে ক্রিটের তিনটি তিনতলা জাহাজ তাদের উপর চড়াও হয়েছিল আর সে এও লক্ষ্য করেছিল মিনোয়ান সেনাবাহিনীর পোশাক পরা সেনাকর্মকর্তা আর সৈন্যরা সেই অকারণ আর বিশ্বাসঘাতক হামলা চালিয়েছিল।

    গোরাব দেখেছে যখন তার বড়ভাই পানিতে ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছিল, তখন একজন ক্রেটান তিরন্দাজ তার নিরস্ত্র ভাইকে তিনটি তীর ছুঁড়ে মেড়েছিল। তারপর সে তীরবিদ্ধ রাজা বিওনের মৃতদেহ পানি থেকে তুলে এনে চিতায় মশাল দিয়ে আগুন দেবার সময় কাঁদছিল। এরপর সে নিজহাতে হাইকসো রাজমুকুট মাথায় পরে ক্রিটের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল।

    ক্রিটের বিরুদ্ধে গোরাবের যুদ্ধ ঘোষণা করার কথা শুনে এটন আর আমি উল্লসিত হলাম। গুপ্তচরদের কাছ থেকে আমরা জানতে পারলাম, আমি যে ছোট জাহাজটি তামিয়াতে রেখে এসেছিলাম, তাতে করে ক্রিটের উচ্চপদস্থ কয়েকজন সেনাকর্মকর্তা ক্রিটে ফিরে গিয়েছে। ছোট জাহাজটিতে চল্লিশজনের বেশি মানুষের জায়গা না হওয়ায় বাকিরা তামিয়াতেই রয়ে গিয়েছিল। জাহাজটি ক্রিটে পৌঁছার পর তাদের অধিনায়ক তামিয়াত দুর্গে হাইকসোদের অতর্কিত হামলা আর পুরো সম্পদসহ তিনটি বিশাল জাহাজ লুট করে নিয়ে যাওয়ার কথা সর্বাধিরাজ মিনোজের কাছে সবিস্তারে খুলে বললো। সে আরও জানালো জলদস্যুরা তাদের পরিচয় গোপন করার কোনো চেষ্টাই করেনি। তারা পুরোপুরি হাইকসো সেনা-পোশাক পরেছিল আর সে তাদেরকে হাইকসো ভাষায় কথা বলতে শুনেছে।

    সর্বাধিরাজ মিনোজ সাথে সাথে তামিয়াতে আটকে পড়া বাদবাকি দুই হাজার ক্রেটান সৈন্য উদ্ধার করতে একটি রণতরী-বহর তামিয়াতে পাঠালেন। তবে জাহাজগুলো অনেক দেরিতে সেখানে পৌঁছালো।

    তার আগেই রাজা গোরাব তার দশ হাজার সৈন্য নিয়ে সেখানে পৌঁছে গিয়েছিল। ক্রেটানরা প্রাণপণ চেষ্টা করলো বাধা দিতে, কিন্তু গোরাব অধিকাংশ ক্রেটান সেনা হত্যা করলো। যারা বেঁচে ছিল তারা আত্মসমর্পণ করলো, গোরাব তাদের সবার মাথা কেটে নিয়ে কাটা মুণ্ডগুলো দিয়ে একটা পিরামিড বানিয়ে দুর্গের নিচে জেটিতে সাজিয়ে রাখলো। গোরাব চলে যাবার পর ক্রেটান রণতরীগুলো সেখানে পৌঁছে দেখতে পেল পিকৃত মানুষের মাথাগুলো রোদে পঁচছে আর শকুন সেগুলো ঠোকড়াচ্ছে। ওরা ফিরে গিয়ে সর্বাধিরাজ মিনোজকে সংবাদটি জানাল।

    সর্বাধিরাজ মিনোজ তার দেবতার বেদিতে দাঁড়িয়ে এর প্রতিশোধ নেবার প্রতিজ্ঞা করলেন। তারপর যুদ্ধ জাহাজ পাঠিয়ে পুরো উত্তর আফ্রিকার উপকূল জুড়ে সমস্ত হাইকসো বন্দর আর নৌঘাটির উপর হামলা চালিয়ে সবকিছু তছনছ করতে লাগলেন।

    এদিকে রাজা বিওনও উত্তর মিসরে তার অধীনস্থ এলাকায় বসবাস করা সকল মিনোয়ানদের উপর হামলা চালিয়ে প্রতিশোধ নিতে শুরু করলো। মিনোয়ানরা পরিশ্রমী এবং বুদ্ধিমান জাতি। এরা সবধরনের শিল্পকর্ম আর ব্যবসা বাণিজ্যে পটু ছিল। তবে ওরা অন্যান্য ব্যবসায়ীদের চেয়ে অনেক উন্নত ছিল। যেখানেই কোনো লাভের সুযোগ সেখানেই ওরা এসে হাজির হত।

    এছাড়া আর কীভাবে ক্রিটের মতো ছোট্ট একটি দ্বীপের অধিবাসীরা মধ্য সাগরের চতুর্দিকের স্থানগুলোতে প্রধান শক্তি হতে পেরেছিল?

    উত্তর মিসরে কয়েক হাজার মিনোয়ান বসবাস করতো। রাজা গোরাব সমস্ত শক্তি আর নিষ্ঠুরতা নিয়ে স্থানীয় অধিবাসীদের উপর চড়াও হল। ওরা মিনোয়ানদের ঘর থেকে টেনে বের করে আনলো। নারী আর এমনকি কমবয়সী মেয়েদেরকেও ধর্ষণ করলো। তারপর নারী, পুরুষ, শিশু নির্বিশেষে সকলকে মিনোয়ান মন্দিরে আটকে রেখে আগুনে পুড়িয়ে মারলো।

    কেউ কেউ দেশ থেকে পালাতে চেষ্টা করেছিল, কিন্তু খুব কমসংখ্যক মিনোয়ান সফল হল। যারা মধ্য সাগরের উপকূলের কাছাকাছি শহর আর বন্দরগুলোতে বসবাস করতো, তাদের মধ্যে সৌভাগ্যবান কিছু মিনোয়ানকে সর্বাধিরাজ মিনোজের জাহাজ উদ্ধার করলো। অন্যান্য যারা বেশি ভেতরে থাকতো তারা আরও ভেতরে মিসরের চারপাশের মরুভূমিতে পালিয়ে গেল। সেখানে পিপাসায় কাতর হয়ে আর নৃশংস বেদুঈনদের হামলায় ওরাও মারা গেল।

    যাইহোক কয়েকশো মিনোয়ান পরিবার দক্ষিণের মেমফিস আর আসিউত থেকে পালিয়ে হাইকসো রথ এড়িয়ে আমাদের যুদ্ধ সীমান্তরেখা পর্যন্ত পৌঁছলো। সেখানে সেনাপতি ক্রাটাসের নির্দেশে আমাদের লোকজন শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে সদয় ব্যবহার করলো।

    এই খবর শোনার সাথে সাথে আমি ঘোড়ায় চড়ে যত দ্রুত সম্ভব হাইকসোদের মুখোমুখি আমাদের সীমান্ত বাহিনীর কাছে গেলাম।

    এই বাহিনীর কয়েকজন পদস্থ সেনাকর্মকর্তাকে আমি অনেক আগে থেকে চিনতাম। ওরা আমার কাছেই বিজ্ঞান, যুদ্ধবিদ্যা শিখেছিল আর আমার সুপারিশেই ওরা বর্তমান সামরিক পদবী লাভ করতে পেরেছিল।

    এদের মধ্যে সেনাপতি রেমরেমকে থিবসের যুদ্ধ ক্ষেত্রেই ফারাও সম্মানিত করেছিলেন আর এখন সে সর্বাধিনায়ক জেনারেল ক্রাটাসের অধীনে একটি পল্টনের অধীনায়কত্ব করছে।

    আমি যখন হুইকে পাকড়াও করি তখন সে ছিল একজন অপরাধী আর এখন সে পাঁচশো রথীর এক ঊর্ধ্বতন অধিনায়ক। পুরোনো এইসব বন্ধু আর পরিচিতরা আমাকে তাদের শিবিরে পেয়ে খুব খুশি হল, এমনকি সেই তিরষ্কারযোগ্য অত্যন্ত দুশ্চরিত্র বুড়ো সর্বাধিনায়ক ক্রাটাসও। সন্ধ্যায় জেনারেল ক্রাটাস আমাকে মদ খাইয়ে মাতাল করার চেষ্টা করলো। পরে আমিই তাকে কোলে করে তার বিছানায় নিয়ে গেলাম আর যখন সে বমি করে সব বের করছিল তখন আমিই তার মাথা ধরে রেখেছিলাম।

    পরদিন সকালে সে আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে তার অধীনস্থ এক কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিল যেসব শরণার্থী রাজা গোরাবের কবল থেকে বেঁচে পালিয়ে এসেছে, তাদেরকে আমার সামনে হাজির করার জন্য।

    হতভাগ্য এই চল্লিশজন মানুষ কোনোমতে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসেছে, সাথে কিছুই আনতে পারেনি। তাদের পরিবারের কাউকে না কাউকে হাইকসোরা হত্যা করেছে।

    সারিবদ্ধ লোকগুলোকে পর্যবেক্ষণ করলাম, সম্মান দেখিয়ে মাঝে মাঝে দুএকটা প্রশ্ন করলাম।

    সারির একেবারে শেষ মাথায় তিনজনের একটি পরিবার জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পরিবারটির কর্তা আমিথায়ন থেমে থেমে মিসরীয় ভাষায় কথা বললো। তিন সপ্তাহ আগে সে মেমফিসে শস্য, মদ আর চামড়ার ব্যবসা করতো। সফল এই ব্যবসায়ীর নাম আমিও এতদুর থেকে আমার লোকজনের কাছে শুনেছিলাম। হাইকমোরা তার বাড়িঘর আর গুদাম পুড়িয়ে ফেলে আর তার স্ত্রীকে তার চোখের সামনেই ধর্ষণ করেছিল। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মহিলাটি সেখানেই মারা যায়।

    তার উনিশ বছর বয়সি ছেলেটির নাম ইকারিওন। তাকে দেখার সাথে সাথেই আমার ভালো লাগলো। লম্বাচওড়া বলিষ্ঠ গড়ন। ঘন কালো কোঁকড়ানো চুল আর সুন্দর মুখ। এতে ঘটনার পর তার বাবার মতো সে এতোটা ভেঙে পড়েনি।

    আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি নিশ্চয়ই তোমার নিজের হাতে বানানো ডানায় ভর করে উড়ে এসেছো?

    ইকারিওন হেসে উত্তর দিল, অবশ্যই। তবে আমি সূর্য থেকে অনেক দূরে ছিলাম প্রভু। তার নাম নিয়ে আমার রসিকতা করাটা সে ঠিকই বুঝেছিল।

    তুমি কি লেখাপড়া জান ইকারিওন?

    হ্যাঁ জানি। তবে আমার বোনের মত তেমন পছন্দ করি না।

    আমি মেয়েটির মুখের দিকে তাকালাম, সে তার বাপভাইয়ের পেছনে দাঁড়িয়েছিল। মেয়েটি দেখতে বেশ সুন্দর। লম্বা কালো চুল আর বুদ্ধিদীপ্ত উজ্জ্বল মুখ। তবে আমার রাজকুমারিদের মতো সুন্দর নয়। অবশ্য সুন্দর চেহারা আজকাল খুব একটা দেখা যায় না।

    প্রায় তেহুতির সমবয়সী মেয়েটি বললো, আমার নাম লক্সিয়াস, বয়স পনেরো। পরিষ্কার মিসরী ভাষায় সে কথাগুলো বললো, যেন সে জন্মসুত্রে একজন মিসরী।

    তুমি কি লিখতে পার লক্সিয়াস?

    হ্যাঁ পারি প্রভু। প্রাচীন পারসিক কুনিলিপি, মিসরীয় গূঢ়লিপি আর মিনোয়ন লিপি–তিন পদ্ধতিতেই লিখতে পারি।

    তার বাবা আমিথায়ন মাঝখান থেকে বলে উঠলো, সে আমার ব্যবসার হিসাবপত্র আর চিঠিপত্র লেখার কাজ করতো। খুবই বুদ্ধিমতি।

    আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি আমাকে মিনোয়ান ভাষা শেখাতে পারবে?

    কয়েকমুহূর্ত ভেবে সে বললো, পিরবো, তবে এটা নির্ভর করবে আপনার শেখার ক্ষমতার উপর প্রভু তায়তা। মিনোয়ান সহজ ভাষা নয়। আমি লক্ষ্য করলাম সে আমার পুরো নাম আর উপাধি ব্যবহার করেছে। এতে বোঝা গেল মেয়েটি আসলেই বুদ্ধিমতি।

    আমি তাকে আহ্বান জানিয়ে বললাম, একবার আমাকে পরীক্ষা করে দেখো। মিনোয়ান ভাষায় কিছু একটা বল।

    সে রাজি হয়ে বললো, ঠিক আছে। তারপর সে মিনোয়ান ভাষায় দীর্ঘ একটা বাক্য উচ্চারণ করলো।

    আমি তা পুনরুক্তি করলাম। শব্দ শুনে মনে রাখার আমার একজন। সংগীতশিল্পির মতো কান ছিল। যেকোনো মানুষের কথা শুনলে আমি তা সহজেই নকল করে বলতে পারি। এই ক্ষেত্রে আমি কী বলছি সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা ছিল না তবে যা আমি বলেছিলাম তা সঠিকভাবেই বলেছিলাম। ওরা তিনজনেই আমার দিকে হতবাক হয়ে তাকাল আর লক্সিয়াসের মুখ বিরক্তিতে লাল হল।

    সে আমাকে বললো, আপনি আমার সাথে তামাসা করছেন প্রভু তায়তা। আমার আপনাকে শেখাবার প্রয়োজন নেই। আপনি আমার মতোই বলতে পারেন। কোথায় শিখেছেন এই ভাষা? আমি কোনো উত্তর না দিয়ে একটা রহস্যময় হাসি হেসে চলে এলাম।

    হুইয়ের কাছ থেকে চারটি ঘোড়া ধার নিয়ে আমরা চারজন সেদিনই দক্ষিণে থিবসের পথে রওয়ানা দিলাম। ছোট এই পরিবারটির জন্য আমি শহরের দেয়ালের বাইরে মেশির নামে যে নতুন ভূ-সম্পত্তি লাভ করেছি তার একটি ছোট গ্রামে থাকার ব্যবস্থা করে দিলাম।

    প্রতিদিন কয়েকঘন্টা লক্সিয়াসের কাছে মিনোয়ান ভাষা শেখা শুরু করলাম। কয়েক মাসের মধ্যেই লক্সিয়াস বললো, আমাকে আর শেখাবার। মতো তার কাছে আর কিছু নেই।

    ছাত্র তার শিক্ষকের চেয়ে বেশি জেনেছে। আমার মনে হয় আপনি বরং আমাকে কিছু শেখাতে পারেন প্রভু তায়তা।

    আমার দুই রাজকুমারী আমার মতো এতো আগ্রহী ছাত্রী ছিল না। প্রথমে ওরা দুজনেই গোঁ ধরে জানাল, মিনোয়ান ভাষার মতো এমন একটি নীরস আর গেঁয়ো ভাষার প্রতি তাদের কোনো আগ্রহ নেই। তাছাড়া একটা মিনোয়ান চাষির মেয়ের সাথেও তাদের কোনো কাজ-কারবার নেই। ওরা জানাল এটাই ওদের দুজনের শেষ কথা। তেহুতি বলে চললো আর বেকাথা পাশে দাঁড়িয়ে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে চললো।

    আমি ওদের বড় ভাই ফারাও ত্যামোসের সাথে এ-বিষয়ে কথা বলতে গেলাম। আমি তাকে জানালাম আমাদের মিসরীদেরকে ক্রিটের সাথে সদ্য বেড়ে ওঠা সম্পর্ক থেকে সুবিধা নিতে হবে। আর এর অনেক কিছুই নির্ভর করছে আমাদের দুই রাজকুমারীর সর্বাধিরাজ মিনোজ আর তার রাজদরবারের সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করার উপর। তারপর তাকে জানালাম তার বোনদের বিষয়ে আমি কী পরিকল্পনা করেছি।

    ফারাও তার দুই বিদ্রোহী ছোট বোনকে ডেকে অনেকক্ষণ তাদের সাথে বিতর্ক করলেন। অবশ্য এই একতরফা বিতর্ক এমন কড়াভাবে করলেন আর এমন ভয় দেখালেন যে আমি দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম যে তিনি হয়তো আসলেই তা করবেন। রাজকুমারীরা এরপর তাদের শেষ সিদ্ধান্ত পাল্টালো। তবে এরপর বেশ কিছুদিন আমার সাথে মুখভার করে রইল।

    তবে বেশিদিন এই মুখভার রইল না, যখন আমি ওদের জন্য একটা পুরষ্কার ঘোষণা করলাম। প্রতি সপ্তাহ শেষে তাদের নতুন ভাষা শিক্ষক লক্সিয়াসের মতে যে বেশি উন্নতি করবে তাকে এই পুরষ্কার দেওয়া হবে। পুরষ্কারগুলো ছিল মেয়েদের কাছে আকর্ষণীয় জিনিস। এমিথায়ন শহরের বাজার থেকে আমার জন্য এগুলো খুঁজে আনতো।

    কিছুদিনের মধ্যেই ওরা পরিষ্কার মিনোয়ান ভাষায় বক বক আর তর্কবিতর্ক শুরু করলো। আর লক্সিয়াস ওদেরকে সরাইখানা আর বস্তির উপযোগী কথ্য ভাষা শেখাল। কয়েক মাস পর এই তিনকন্যা এই সমস্ত কথা শব্দ উচ্চারণ করে আমাকে অবাক করে দিতে শুরু করলো।

    এরপর ঐ ত্রিমূর্তি পরস্পরের এমন ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠলো যে ওদের সাথে থাকার জন্য রাজকুমারীরা লক্সিয়াসকে রাজকীয় হেরেমে নিয়ে এলো।

    .

    মেশির জমিদারির মালিকানার পাওয়ার পর মাঝে মাঝে আমি রাজপ্রাসাদ  থেকে মুক্তি নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে ইচ্ছামত ঘুরে বেড়াতাম। সাথে দুই রাজকুমারী আর তাদের সর্বক্ষণের সঙ্গী লক্সিয়াসও থাকতো। আমি ওদেরকে দুই পা দুইদিকে ঝুলিয়ে ঘোড়ায় চড়া শেখালাম। এটা যেকোনো মিসরী নারী পুরুষের জন্য একটা কৃতিত্বপূর্ণ কাজ, বিশেষত ফারাওয়ের বোনদের জন্যতো বটেই।

    এছাড়া আমি তিনকন্যার জন্য ওদের সামর্থ্য অনুযায়ী ধনুক বানিয়ে দিলাম। তীর ছোঁড়া শিখে নেবার পর ওরা ধনুকের ছিলা ঠোঁট পর্যন্ত টেনে আনতে পারতো আর একশো পা দূরত্বে ওদের জন্য যে লক্ষ্য আমি স্থির করে দিয়েছিলাম, সেই লক্ষ্যে তিনটির মধ্যে দুটো তীর লাগাতে পারতো। তীর ছোঁড়ার খেলায় আমি ওদের উৎসাহ যোগাতাম আর দিনের শেষে সবচেয়ে চৌকশ নারী তিরন্দাজের জন্য ভালো পুরস্কারের ব্যবস্থা করলাম।

    আমার লোকেরা যখন জমিতে ফসলের বীজ বুনতো তখন ঝাঁকে ঝাঁকে বন্য পাখি এসে বীজগুলো খেয়ে ফেলতো। তীর ছুঁড়ে শিকারের জন্য প্রতিটি পাখি বাবদ আমি মেয়েদেরকে অতিরিক্ত উপহার দিতে শুরু করলাম। শিঘ্রই ওরা প্রত্যেকে দক্ষ শিকারীতে পরিণত হল।

    আমি জানতাম ঘোড়ায় চড়া আর তীর ছোঁড়ার দক্ষতা পরবর্তী জীবনে ওদের খুব কাজে আসবে।

    যথাসাধ্য চেষ্টা করলাম আমার দুই রাজকুমারীর সাথে ভালো সময় কাটাতে কেননা একবার রাজপ্রাসাদে ফিরে গেলে ফারাওয়ের কাজে আমাকে খুব ব্যস্ত থাকতে হত। এমন কোনো দিন ছিল না যে কোনো না কোনো সমস্যা সমাধানে কিংবা কোনো বিষয়ে তাকে আমার উপদেশ কিংবা মতামত না দিতে হত। আমার কোনো মতামত তিনি প্রত্যাখান করলে আমি কিছুই মনে করতাম না, কেননা আমি জানি একটু পরেই একই বিষয়ে আমার মতকেই তিনি তার নিজের মত হিসেবে চালাবেন।

    .

    এসময়ে আমি আরেকটি সমস্যার সম্মুখিন হলাম। তামিয়াত দুর্গ থেকে ফারাও ত্যামোসের জন্য যে সম্পদ এনেছিলাম তার যথাযথ ব্যবহার কীভাবে করা যায় সে বিষয়ে চিন্তা করে এখনও কোনো উপায় বের করতে পারিনি।

    ফারাও অবশ্য এই সম্পদ তার প্রজাদের কল্যাণে ব্যবহারের জন্য উগ্রীব ছিলেন। তবে আমি ক্রিটের সর্বাধিরাজ মিনোজের ছাপ মারা রূপার বাঁট দিয়ে জাতীয় ঋণ পরিশোধ করা থেকে তাকে বিরত রেখেছিলাম।

    আমি তাকে বললাম, হে মহান ফারাও, আপনি আর আমি দুজনেই জানি মিনোয়ান গুপ্তচরেরা আমাদের মিসরের প্রত্যেক নগরে রয়েছে। ওদের যে কারও খুব বেশি সময় লাগবে না ক্রিটে খবর পাঠাতে যে থিবসের প্রতিটি দোকান আর সরাইখানায় ক্রিটের ষাঁড়ের প্রতাঁকের ছাপমারা রূপার বাঁটে ছেয়ে গেছে।

    ফারাও আঙুল তুলে তার বাবার সমাধিক্ষেত্রের দিকে নির্দেশ করে তিক্ত স্বরে বললেন, তাহলে তুমি বলতে চাচ্ছ যদি কোনোভাবে মিনোয়ানরা এই সম্পদের কথা জেনে ফেলে সেক্ষেত্রে এই কোষাগারের সম্পদ আমি কখনও খরচ করতে পারবো না?

    আমাকে মার্জনা করুন মহামান্য মিসর অধিপতি। আপনি মিসরীয় জাতির পিতা। এই সম্পদ আপনার, যেভাবে ইচ্ছা আপনি এটা খরচ করতে পারেন। তবে তার আগে এর চেহারা এমনভাবে বদলে নিতে হবে যেন, জীবিত কোনো মানুষ বিশেষত সর্বাধিরাজ মিনোজ যেন এটা চিনতে না পারে।

    এবার তিনি একটু সুর নরম করে বললেন, সেটা কীভাবে সম্ভব তায়তা?

    আমাদেরকে প্রতিটা রূপার বাট ভেঙে অর্ধেক ডেবেন সমান ওজনের ছোট ছোট মুদ্রার টুকরা তৈরি করতে হবে। তারপর প্রতি টুকরা মুদ্রার উপর আপনার মুখের ছবির ছাপ মারতে হবে।

    এবার ফারাও বিড়বিড় করে বললেন, হুমম! তাহলে তা আমার এই রূপার নতুন মুদ্রার নাম কী হবে? আমি জানতাম তার নিজের ছবি রূপার ছোট টুকরাগুলোর উপর থাকার কথা শুনে ফারাও খুশি হবেন।

    ফারাও অবশ্যই একটি নতুন নামের কথা ভেবে থাকবেন। তবে আমার একটা ধারণা এই মুদ্রাগুলোর নাম রূপার মেম দেওয়া যেতে পারে।

    এবার তিনি খুশি হয়ে মৃদু হেসে বললেন, আমার মনে হয় এটাই সঠিক হবে তাতা। আর নতুন এই রূপার মুদ্রায় অপর পিঠে কী ছবি থাকবে?

    আমি মাথা ঝুঁকিয়ে বললাম, অবশ্যই ফারাও সে সিদ্ধান্ত নেবেন।

    তিনি একমত হয়ে বললেন, অবশ্যই আমি তা নেব, তবুও তোমারও একটা মতামত আছে, তাই না?

    আমি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললাম, আপনার জন্মক্ষণ থেকে আমি আপনার সাথে আছি তাই না মহামান্য?

    হ্যাঁ, দেবতা হোরাস জানেন তুমি কতবার একথা আমাকে শুনিয়েছ। যখনই তুমি বর্ণনা কর প্রথম যে কাজটি আমি করেছিলাম, তা হল আমি তোমার উপর পেচ্ছাব করে দিয়েছিলাম, তখন ভাবি কেন আমি তখন আরও জোরে আর অনেকক্ষণ ধরে পেচ্ছাবটা করলাম না।

    আমি তার কথার শেষাংশটা না শোনার ভান করে বললাম, আমি সবসময় আপনার কাছাকাছি আর পেছনে বিশ্বাসী এবং অনুগত ছিলাম। আমার মনে হয় এই ঐতিহ্য বজায় রাখাই মঙ্গলজনক। একথা বলে আমি থামলাম কিন্তু ফারাও আমাকে কথাটা শেষ করতে বলে বললেন, বলে যাও। তবে আমি মনে হয় বুঝতে পারছি তুমি কোন দিকে যাচ্ছ।

    আমি অত্যন্ত বিনীতভাবে বলছি, হয়তো সবদিক বিবেচনা করে ফারাও রূপার মেম মুদ্রার পেছনে আহত বাজপাখির ছবি লাগাবার নির্দেশ দিতে পারেন। আমার কথা শেষ হতেই ফারাও জোরে হেসে উঠলেন।

    সত্যি তুমি কখনও আমাকে হতাশ করোনা তাতা। তুমি প্রথম থেকেই সবকিছু ভেবে রেখেছিলে! একটিা ভাঙা ডানাসহ বাজপাখির ছবি আমার ব্যক্তিগত গূঢ়লিপি।

    রাজানুকূল্যে আর কঠোর গোপনীয়তা বজায় রেখে আমি ম্যামোজের সমাধিক্ষেত্র এলাকায় একটি টাকশাল বসালাম। এই রূপার টুকরাগুলো বর্ণনা করার জন্য আমি মুদ্রা নামে একটি নতুন শব্দ ঠিক করলাম। ফারাও সাথে সাথে এর অনুমোদন দিলেন।

    এই মুদ্রা ব্যবস্থাটি ছিল আমার আরেকটি অর্জন যা আমাদের মিসরের উন্নতি আর অগ্রগতির জন্য অসাধারণ একটি সহায়তা হিসেবে প্রমাণিত হল। একটি সুষম মুদ্রানীতি আজকাল সরকার পরিচালনা আর ব্যবসা-বাণিজ্যের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি হাতিয়ার। এটা ছিল মিসরের প্রতি আমার অন্যতম একটি উপহার আর এটিই অন্যতম প্রধান একটি কারণ যেজন্য আমরা সবসময় পৃথিবীর সবচেয়ে অগ্রগণ্য জাতি হয়ে থাকবো। অবশ্য এরপর থেকে অন্যান্য জাতিও আমাদের অনুকরণ করেছে আর রূপার মেম এখন এমন একটি মুদ্রা যা পৃথিবীর সব দেশে স্বীকৃত এবং সানন্দে গৃহীত হয়েছে।

    আমার কনুইয়ের মৃদুস্পর্শ পেয়ে ফারাও তার পিতার সমাধিক্ষেত্রের নাম পরিবর্তন করে রাজকীয় টাকশাল নাম দিলেন। এরপর ফারাও আমাকে এই প্রতিষ্ঠানের প্রশাসক নিযুক্ত করলেন। এটা আমার অন্যান্য দায়িত্বের বাইরে বাড়তি আরেকটি দায়িত্ব। তবে যে কোনো দায়িত্ব পালনে আমি কখনও অনুযোগ করি না।

    প্রশাসক পদে আসীন হওয়ার পর আমার প্রথম কাজটি ছিল জারাসকে রাজকীয় টাকশালের অভিভাবক ও কোষাধ্যক্ষ নিযুক্ত করা। এ দায়িত্ব পালনে সহায়তার জন্য জারাসকে অধিনায়ক করে তার অধীনে এক পল্টন সেনা দিতে আমি ফারাওকে অনুরোধ জানালাম। অবশ্য এতে জারাস পুরোপুরি আমার অধীনে চলে আসবে।

    রাজকুমারী তেহুতি কৌশল করে জারাসকে তার হীরার আংটিটি পরীক্ষা করতে বাধ্য করেছিল আর এতে তার উদ্দেশ্য আমার কাছে পরিষ্কার হয়েছিল। তাই আমি অত্যন্ত সাবধানে তাকে নীলনদের পশ্চিম তীরে পৃথক করে রাখার ব্যবস্থা করেছিলাম। আমি জানি আমার আদরের রাজকুমারী যখন কোনোকিছু করতে মনস্থির করে তখন সেখান থেকে তাকে সরানো খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

    আমার শুধু একটাই চিন্তা ছিল যতক্ষণ তার যথোপযুক্ত নিয়তি নির্ধারণ করতে না পারি ততক্ষণ রাজকুমারী তেহুতি আর জারাসের মাঝে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখতে হবে। এটা পরিষ্কার, তার নিয়তি হচ্ছে একজন রানি এবং পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক ব্যক্তির সঙ্গিনী হওয়া। একজন সাধারণ সৈন্য সে যতই সুন্দর আর ভালো হোক না কেন, তেহুতি তার খেলার সাথী আর তাঁবুর সহগামি হতে পারে না।

    একটা বিষয় আমি জানতাম যে, রাজরক্তের সুন্দরী নারীর প্রতি সর্বাধিরাজ মিনোজের বিশেষ অনুরাগ আছে। তবে সত্যি বলতে কী কথাটা প্রমাণিত সত্য নয়। এটা আসলে একটা গুজব যা বার বার রটানোর ফলে সত্যে পরিণত হয়েছে।

    তবে আমার বিশ্বাস ছিল যে, এই অসীম শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব আমার দুই রাজকুমারীর অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ নিশ্চয়ই এড়াতে পারবেন না। আর এর মাধ্যমে আমি মিনোয়ানদেরকে আমার আর মিসরের মঙ্গলের কাজে লাগাত পারবো। নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দিলাম যে, রাজসিংহাসনে আসীন হওয়া আর এই বর্বর হাইকসোদের হাত থেকে আমাদের প্রিয় মিসরকে রক্ষা করার চেয়ে অধিক সম্মানিয় আর উচ্চতর আর কোনোকিছুই তেহুতি আশা করতে পারে না। এটা যখন সে বুঝতে পারবে তখন জারাসের মতো সাধারণ মানুষের প্রতি তার আকর্ষণ হারিয়ে ফেলবে।

    তবে ইতোমধ্যে এই চমৎকার যুবকটিকে রাজকীয় টাকশালের কাজে সমাধিক্ষেত্রের এলাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে রাখতে হবে যাতে সে নদী পার হয়ে রাজকীয় হেরেমের চারপাশে ঘুর ঘুর করার কোনো সুযোগ না পায়।

    .

    এ যাবত ফারাও আর রাজপরিষদের সমস্ত সদস্য সর্বাধিরাজ মিনোজ আর হাইকসো রাজা গোরাবের মাঝে বেড়ে উঠা সংঘর্ষের প্রতি খুবই আগ্রহ নিয়ে পর্যবেক্ষণ করছিলাম। আর যতদূর সম্ভব তাদের দুজনের মাঝে এই শত্রুতায় ইন্ধন যুগিয়ে যাচ্ছিলাম। দুর্ভাগ্যবশত তা যথেষ্ট ছিল না। ক্রিট অনেক দূরে অবস্থিত আর এর শাসকের সাথে আমাদের কোনো যোগাযোগ ছিল না।

    তেহুতি আর বেকাথাকে এই কাজে লাগাবার যথোপযুক্ত সময়ের জন্য অপেক্ষা করার সময় আমি ক্রিট আর সর্বাধিরাজ মিনোজ সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে চেষ্টা করলাম। একাজে এমিথাওন আর তার মেয়ে লক্সিয়াস আমাকে ঐ দ্বীপরাষ্ট্রের ইতিহাস, জনগণ, প্রাকৃতিক সম্পদ আর বিশেষত এর শাসকদের সম্পর্কে অত্যন্ত মূল্যবান তথ্য জানিয়ে সহায়তা করলো।

    ক্রিটের রাজা ছিল চারজন, আর সর্বাধিরাজ মিনোজ তার পদবী অনুযায়ী অন্য তিন রাজার উপর কর্তৃত্ব করতেন। তারা আলাদা আলাদা প্রাসাদে থাকতেন তবে এগুলো কুনুসসে প্রধান রাজপ্রাসাদের সাথে মার্বেল পাথরে ছাওয়া রাস্তার মাধ্যমে সংযুক্ত ছিল। মিসরে আমরা এদেরকে সাতরাপ কিংবা গভর্নর বলতাম, রাজা বলা হত না।

    আমার প্রশ্নের উত্তরে এমিথাওন জানাল সর্বাধিরাজ মিনোজের নগরদুর্গ কুনুসসের দেয়ালের বাইরে তিনলিগ দূরে একটি গ্রামে তার জন্ম হয়েছিল। তার বাবা রাজপ্রাসাদের একজন কর্মকর্তা ছিলেন আর ছোটবেলায় সে মিনোজের বিভিন্ন উৎসব আর শোভাযাত্রা দেখেছে। এ-যাবত যাদের সাথে আমি এ-বিষয়ে কথা বলেছি তাদের মধ্যে সেই প্রথম ব্যক্তি যে মিনোজকে সচক্ষে দেখেছে।

    এমিথাওন জানাল তিনি একজন জাঁকজমকপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, যিনি জনসমক্ষে বের হবার সময় মুখোশ পরে থাকতেন। ষাড়ের মাথার আকৃতিতে তৈরি মুখোশটি ছিল খাঁটি রূপার। প্রজারা কখনও তার মুখ দেখেনি।

    এমিথাওন জানাল, তিনি অমর। সেই আদিকালে যখন এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তখন থেকেই তিনি শাসন করে আসছেন।

    আমি মাথা নেড়ে ভাবলাম, তার প্রজারা কেউ যদি তার মুখ নাই দেখে থাকে তাহলে কীভাবে ওরা জানবে যে, একই ব্যক্তি এতোকাল শাসন করেছেন? আমার মনে হল দায়িত্বে থাকা একজন সর্বাধিরাজ মিনোজ মারা যাবার পর তার উত্তরাধিকারী রূপার ষাঁড়ের মুখোশটি পরে শাসনকাজ চালায়।

    এমিথাওন বলে চললো, তার একশো স্ত্রী রয়েছে। কথাটা শুনে আমি অবাক হবার ভান করলাম। সে আবার বলতে শুরু করলো, এজিয়ান সাগরের বিভিন্ন দ্বীপে অবস্থিত নগর রাষ্ট্রগুলো থেকে সর্বাধিরাজ মিনোজ স্ত্রী পেয়ে থাকেন। বছরে চারবার ঋতু পরিবর্তনের সময় যে উৎসব হয়, তখন উপঢৌকন হিসেবে এদের পাঠানো হয়।

    সর্বাধিরাজ মিনোজের কয়টি করদ রাজ্য আছে এমিথাওন?

    সে বললো, হে প্রভু, তিনি একজন পরাক্রমশালী শাসক। ক্রিট দ্বীপের তিনটিসহ তার অধীনে মোট ছাব্বিশটি করদ রাজ্য আছে।

    ক্রিট দ্বীপের ভৌগলিক বিবরণ আর এর লোকসংখ্যা সম্পর্কে এমিথাওন আমাকে অনেক কিছু জানাল। আমার কাছে এই দ্বীপের বেশ কয়েকটা মানচিত্র ছিল, কিন্তু প্রত্যেকটি ছিল ভিন্ন ভিন্ন। এমিথাওন এই মানচিত্রগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো, তারপর বিভিন্ন ভুল বিবরণ সংশোধন করে সঠিক একটি মানচিত্র বানাতে সহায়তা করলো। পূর্ণাঙ্গ এই মানচিত্রটিতে বিভিন্ন নগর, গ্রাম, বন্দর, জেটি, রাস্তাঘাট আর ক্রিটের পর্বতের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া গিরিপথগুলো দেখান ছিল।

    পারিবারিক সম্পর্ক থাকার কারণে এমিথাওন আমাকে মিনোয়ান সেনা আর নৌবাহিনী সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য পরিসংখ্যান জানাতে পারলো।

    পদাতিক সৈন্য ছিল প্রচুর। তবে এদের বেশিরভাগই ছিল অন্যান্য হেলেনিয় দ্বীপ, মেডেস এবং পূর্ব এশিয়ার ভাড়াটে আর্য সৈন্য। সে জানাল ক্রিট দ্বীপটি পার্বত্য এলাকা হওয়ার কারণে হাইকসো কিংবা মিসরের ফারাওয়ের তুলনায় মিনোয়ানদের রথের সংখ্যা খুব বেশি নয়।

    মনে হচ্ছে এই অভাব মেটাবার জন্য সর্বাধিরাজ মিনোজ একটি শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ে তুলেন যা, মধ্য সাগরের যেকোনো নৌবাহিনীর তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল। এমিথাওন এই নৌবাহিনীর বিভিন্ন ধরনের জাহাজের সংখ্যা আমাকে জানাতে পারলো।

    তবে এমিথাওন জাহাজের সংখ্যাটি এতো বেশি বলেছিল যে, আমার মনে হল সে অনেক বাড়িয়ে বলেছে। আবার ভাবলাম যদি আমার ভুল হয়ে থাকে আর এমিথাওনের কথিত সংখ্যাটিই সঠিক হয়, তাহলে বুঝতে হবে আসলেই সর্বাধিরাজ মিনোজ অত্যন্ত শক্তিশালী একজন শাসক।

    .

    এইসব খবরা-খবর সংগ্রহ করার পর আমি ভাবলাম এখন আমাদের সময় হয়েছে, মিনোয়ন আর হাইকসোদের মধ্যেকার এই লড়াইয়ে ক্রিটের পক্ষে সক্রিয় অংশগ্রহণ করা। আর এতে হয়তো আমরা যথেষ্ট চাপ প্রয়োেগ করে বর্বর হাইকসোদেরকে পরাস্ত করে আমাদের মাতৃভূমি থেকে তাদেরকে বিতাড়িত করতে পারবো।

    এটন আর আমি যেসব তথ্য আমাদের গুপ্তচরদের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছিলাম তা সমস্ত একত্রিত করে পরীক্ষানিরীক্ষা করলাম। আমার গবেষণা কর্মের বিশালতা দেখে সে খুবই অভিভূত হল, কেননা তার নিজেরগুলোর চেয়ে আমার তথ্য অনেক বেশি ছিল।

    অনেক তর্কবিতর্কের পর আমরা সবাই একমত হলাম যে, এখন সবচেয়ে ভালো হবে মিনোয়ানদের সাথে সরাসরি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা। আর ওদের সাথে একটি কার্যকর মৈত্রি চুক্তি করার দিকে এগিয়ে যাওয়া যাতে, এই

    দুই জাতি মিলে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী একটি শক্তিতে পরিণত হয়, যে শক্তিকে হাইকসোরা কখনও চ্যালেঞ্জ করার আশা করবে না।

    ঠিক তখনই উৎসাহের আতিশয্যে আমি একটা ভুল করে ফেললাম। এটনকে বললাম, আমার যদূর মনে পড়ে হাইকমোরা আকস্মিকভাবে মিসরে : হামলা করার আগে আমরা সবসময় ক্রিটের সাথে মোটামুটি একটি কূটনৈতিক সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলেছিলাম। যাইহোক হাইকসোরা উচ্চ মিসর দখল করে নেওয়ার পর আমাদের দেশের দক্ষিণাংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এতে ক্রিটের সাথে আর যোগাযোগ বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। হাইকসোরা আমাদের মাঝখানে ঢুকে দুটি দেশকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে।

    আমার কথা শুনে এটন কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকাল। আমি থামার পরও সে কোনো কথা না বলে চুপ করে রইল। আমি বাধ্য হয়ে তাকে বললাম, তোমার কী মতামত এটন? আমার কথাটি কি তোমার মনঃপুত হয়নি?

    সে আমার প্রশ্নের কোনো সরাসরি উত্তর না দিয়ে বরং আমার প্রথম কথাটায় ফিরে গিয়ে বললো, আমি কি ঠিক শুনেছি তায়তা? তুমি কি আসলেই একথা বলেছে যে, হাইকসোদের মিসর আক্রমণের আগের কথা তোমার মনে আছে?

    আমার বয়স নিয়ে আমি সাধারণত খুবই সাবধানতা অবলম্বন করি। এমনকি এটনের মতো যারা আমার কাছের মানুষ তারাও আমার আসল বয়সের চেয়ে অনেক কম জানে। যদি আসল বয়সটা ওদের জানাতাম, তাহলে ওরা আমাকে একজন পাগল মানুষ কিংবা খুব বেশি হলে একজন মিথ্যাবাদী মনে করতো। হাইকমোরা প্রায় নব্বই বছর আগে মিসর আক্রমণ করেছিল আর ঘটনাটা আমার স্পষ্ট মনে আছে। কিন্তু এখন ভুলটা আমাকে শোধরাতে হবে।

    প্রশ্নটা উড়িয়ে দিয়ে বললাম, কথাটা বলতে গিয়ে আমি একটু ঘোট পাকিয়ে ফেলেছিলাম। আসলে আমি বলতে চাচ্ছিলাম যতটুকু আমি পড়েছি আর শুনেছি, হাইকমোরা মিসর আক্রমণ করার আগে ক্রিটের সাথে আমাদের বন্ধুত্বমূলক সম্পর্ক ছিল। তারপর তাড়াতাড়ি বললাম, এখন যদি আবার তাদের সাথে বন্ধুত্বমূলক সম্পর্ক ফিরিয়ে আনতে চাই কিংবা কোনো ধরনের পারস্পরিক প্রতিরক্ষামূলক চুক্তি করার উদ্যোগ নিতে চাই, তাহলে তা সরাসরি করাটা খুবই শক্ত হবে। তুমি কি এতে একমত এটন?

    সে সাথে সাথে কোনো উত্তর দিল না। কেবল অদ্ভুতভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আমার গলা থেকে নিয়ে লেখার টেবিলের উপর রাখা দুইহাত খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে লাগলো। এটন জানে বয়সের রেখা একজন মানুষের এই দুই জায়গার উপর বেশি পড়ে।

    তবে এ-বিষয়ে আমি ব্যতিক্রম। থুতনিতে এখনও দাড়ি উঠেনি এমন একজন বালকের মতো আমার সারাদেহের চামড়া মসৃণ আর দাগহীন। সেখানে এটন আমার আসল বয়সের কোনো আলামত খুঁজে পেল না। সে চিন্তিত ভাবে মাথা নাড়তে নাড়তে আবার আমাদের পূর্বের আলাপের বিষয়ে ফিরে এলো।

    এবার গলার সুর নরম করে সে বললো, বর্তমান পরিস্থিতির বিষয়ে তুমি যা বলছে তা একেবারে সঠিক তায়তা। এখন সরাসরি মিনোজের সাথে যোগাযোগ করা প্রায় অসম্ভব। সমস্যাটা তুমি ঠিকই ধরেছো, এখন বল সমাধান কীভাবে করা যাবে।

    তুমি নিশ্চয়ই জানো আক্কাদ আর সুমের-এর রাজা নিমরদের রাজধানী ব্যবিলনে সর্বাধিরাজ মিনোজের একটা দুতাবাস আছে।

    এটন সায় দিয়ে বললো, অবশ্যই জানি। কিন্তু ব্যবিলনে ক্রিট রাষ্ট্রদূতের সাথে যোগোযোগ করার জন্য আমাদের দূত পাঠাতে চাইলেও, সেই সফরও তোমার সেই তামিয়াত দুর্গ আক্রমণ করার চেয়েও অনেক দুর্গম হবে।

    ঠিকই বলেছ এটন। এর দূরত্ব প্রায় দ্বিগুণ আর খুবই বিপজ্জনক আর অনিশ্চিত হবে। আমাদের দূতকে পূর্বদিকে লোহিতসাগর উপকূলের দিকে যেতে হবে। তারপর সাগর পার হয়ে বিশাল আর দুর্গম আরব মরুভূমি পাড়ি দিতে হবে। এটি এমন একটি জায়গা যা সমস্ত দয়ালু দেবতারা ত্যাগ করেছেন, এখানে বৈরী বেদুঈন গোষ্ঠিরা ঘুরে বেড়ায় আর বিচারের হাত এড়িয়ে চলা গলাকাটা দস্যু আর সমাজতাড়িত লোকজনদের বিচরণ রয়েছে। থিবস থেকে ব্যবিলনের দূরত্ব দেড় হাজার লিগেরও বেশি। আর সমস্যার এখানেই শেষ নয়।

    কেন নয় তায়তা? আমরাতো জানি ব্যবিলনে মিনোজের একটি দুতাবাস আছে?

    হ্যাঁ, তা আছে। তবে ক্রিট আর থিবসের মধ্যে একটা মৈত্রী চুক্তি করার মতো আলাপ আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা সেই রাজদূতের থাকার কথা নয়। সে বড়জোর একটা বার্তাসহ আমাদের দূতকে ক্রিটে সর্বাধিরাজ মিনোজের রাজদরবারে পাঠিয়ে দিতে পারবে। সেক্ষেত্রে আমাদের দূতকে মধ্য সাগরের একেবারে পুবপ্রান্তে গিয়ে টায়ার কিংবা সিডন বন্দরে গিয়ে একটা জাহাজ খুঁজতে হবে। তারপর সেই জাহাজের ক্যাপ্টেন নিতে রাজি হলেও তাকে শীতকালীন ঝড়, জলদস্যু আর হাইকসো যুদ্ধ জাহাজ এড়িয়ে মধ্য সাগরের অর্ধেক পর্যন্ত যেতে হবে। তারপরই সে ক্রিট দ্বীপের কুনুসসে সর্বাধিরাজ মিনোজের দুর্গে পৌঁছতে পারবে।

    এতে কত সময় লাগতে পারে বলে তোমার ধারণা তায়তা?

    ভাগ্য ভালো হলে আর দেবতা সহায় হলে প্রায় একবছর লাগবে আর নয়তো এর দ্বিগুণ সময় লাগবে।

    এটন একটু চিন্তা করে বললো, দুই বছরে অনেককিছু ঘটে যেতে পারে।

    আমি বললাম, এখানেই শেষ নয়। ফারাওয়ের কাছ থেকে বার্তা পাওয়ার পর সর্বাধিরাজ মিনোজ তার মন্ত্রণাপরিষদের সাথে বিষয়টা নিয়ে পরামর্শ করবেন, তারপর তার উত্তর নিয়ে একই পথে দূতকে থিবস ফিরতে হবে। পুরো সফরটা শেষ করতে প্রায় তিনচার বছর লেগে যাবে।

    এটন বললো, না! এতোদিন আমরা অপেক্ষা করতে পারি না। এর মধ্যে তো রাজা গোরাব তার এক লক্ষ হত্যাকারী দস্যু সৈন্য নিয়ে থিবস আক্রমণ করে বসবে। অন্য কোনো সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।

    তুমি ঠিক বলেছ প্রিয় বন্ধু এটন। এ-বিষয়ে তোমার মনে আর কোনো ভাবনা আছে? আমি সমস্যাটা আবার তার কাছে ফিরিয়ে দিলাম।

    বোকার মতো মুখ করে সে মৃদু হেসে বললো, তোমার মতো এই সমস্যাটা নিয়ে আমি ভাবিনি। আমার মনে হয় তোমার মনে কোনো পরিকল্পনা আছে, তাই না?

    আচ্ছা ধর, ফারাও একজন মিসরীয় রাষ্ট্রদূতকে নিয়োগ দিয়ে তার সাথে এমন একটি বিশাল বাহিনী দিলেন যা তাকে দ্রুত লোহিত সাগর আর এরপরের মরুভূমির দস্যুদল আর বেদুঈন গোষ্ঠীদের এড়িয়ে নিরাপদে সফর করতে সহায়তা করবে। আর যদি এই রাষ্ট্রদূতকে যথেষ্ট পরিমাণ রূপা দেওয়া হয়, যা দিয়ে সে টায়ার বন্দর থেকে বেশ বড় আর দ্রুতগামি একটা জাহাজ ভাড়া করতে পারবে। তারপর এই দ্রুতগামি জাহাজে সাগর পাড়ি দিয়ে জলদস্যু আর হাইকসো যুদ্ধ জাহাজকে এড়াতে পারে, তাহলে কেমন হয়?

    এবার এটনের চোখ উজ্জ্বল হল, সে বললো, হ্যাঁ ঠিক!

    আর এই চমৎকার জাহাজটি যদি সোজা ক্রিটের কুনুসসে পৌঁছাতে পারে? আর এই রাষ্ট্রদূতের কাছে যদি এমন উপঢৌকন থাকে যা সর্বাধিরাজ মিনোজ খুবই পছন্দ করেন? তারপর একদিকে মাথা হেলিয়ে চোখ সরু করে বললাম, তোমার কী কোনো ধারণা আছে কী ধরনের উপহার মিনোজের সবচেয়ে পছন্দ?

    এবার এটন হেসে বললো, মনে হয়, আছে বন্ধু। আমি যতদুর শুনেছি মিনোজের এমন এক জোড়া অণ্ডকোষ আছে যা আমাদের দুজনের মিলিয়ে নেই। অর্থাৎ যা থেকে আমরা বঞ্চিত হয়েছি তার চেয়ে ওগুলো কয়েকগুণ বেশি ওজনে ভারি। আর যে জিনিস নিয়ে আমরা মাথা ঘামাই না তার প্রতি তার তৃপ্তিহীন ক্ষুধা রয়েছে।

    তার কথা শুনে আমিও হাসলাম, যেন হাসা দরকার তাই। তবে আমার এই দৈহিক অসম্পূর্ণতার বিষয়টি আমার কাছে খুব একটা রসিকতা করার মতো বিষয় মনে হয় না।

    কিন্তু তায়তা এতে আমাদের কী লাভ বল? রাজা গোরাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এটা আমাদের কি কাজে আসবে? মিসরের সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব থিবসে ফারাওয়ের হাতেই থাকবে। তার প্রতিটা নির্দেশ এতো দূরে জানাতে হবে, যে কথা আমরা দুজনে এতোক্ষণ আলোচনা করলাম।

    আমি তার কথার উত্তরে মন্তব্য করলাম, আবারো তুমি সমস্যাটির ঠিক আসল জায়গায় হাত দিয়েছ। যাইহোক এ-বিষয়েও আমার কিছু চিন্তা আছে। যদি ফারাওয়ের এই রাষ্ট্রদূত রাজকীয় সীলমোহর বহন করে, তাহলে সে সময় নষ্ট না করে ক্রিটে মিনোজ আর তার সভাসদদের সাথে মিলে যুদ্ধে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রায়ই যুদ্ধে জয় এনে দেয়।

    এটন খুব জোরে জোরে মাথা নাড়তে নাড়তে বললো, কখনও না! যাকে তিনি সন্দেহাতীতভাবে বিশ্বাস করেন, তাকে ছাড়া আর কারও হাতে ফারাও সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব আর যুদ্ধ পরিচালনা করার ক্ষমতা তুলে দেবেন না।

    আচ্ছা বলতো এটন! তোমার কি মনে হয় মিসরে কি এমন কেউ নেই যাকে ফারাও ত্যামোস নিঃসন্দেহে বিশ্বাস করেন?

    না, আমার বিশ্বাস তেমন কেউ নেই। তারপর হঠাৎ কথা থামিয়ে সে আমার দিকে অবজ্ঞাভরে তাকিয়ে বললো, এই তায়তা! তুমি নিশ্চয়ই একথা বলছো না যে রাজকীয় সীলমোহরসহ ফারাও তোমার হাতেই মিসরীয় সেনাবাহিনীর উত্তরাঞ্চলের পুরো কর্তৃত্ব তুলে দেবেন? তুমি তো একজন সৈনিক নও তায়তা! যুদ্ধের কী জান তুমি?

    তুমি যদি আমার লেখা যুদ্ধের কলাকৌশল গ্রন্থটি না পড়ে থাক তাহলে এ-বিষয়ে আমার যোগ্যতা নিয়ে তোমার কিছু বলার অধিকার নিয়ে আমি প্রশ্ন তুলতে পারি। সেনা মহাবিদ্যালয়ের প্রতিটি ছাত্রকে এ-বিষয়ে সর্বশেষ জ্ঞান হিসেবে এই গ্রন্থটি পড়ানো হয়।

    আমি স্বীকার করছি এটা আমি কখনও পড়িনি। তোমার এই বিখ্যাত গ্রন্থটি খুব বেশি বড় আর এই বিষয়ে আমার তেমন আগ্রহও নেই; কেননা আমার মনে হয় না আমাকে কখনও কোনো সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিতে হবে। তবে আমি যা বলছি, তাহল পার্চমেন্ট কাগজে কিছু হিজিবিজি লেখা আর প্রকৃত যুদ্ধক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়াটা একরকম ব্যাপার নয়। তোমার কি কোনো সেনাবাহিনীকে সরাসরি নির্দেশ দেবার অভিজ্ঞতা আছে?

    এবার আমি গলার স্বর নরম করে বললাম, বেচারি এটন, তুমি আমার সম্পর্কে কত কম জান। এ-বিষয়ে কথা শেষ করার আগে আমি তোমাকে শুধু জানাচ্ছি আমাদের সেনাবাহিনীর প্রথম রথটি আমিই বানিয়েছিলাম। আর থিবসের যুদ্ধে ফারাও ত্যামোসের রথের চালকও ছিলাম আমি। আর যুদ্ধ চলাকালে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেবার সময় ফারাও আমার পরামর্শের উপর নির্ভর করতেন। যুদ্ধে আমার বিশেষ অবদানের জন্য ফারাও আমাকে সাহসিকতা আর প্রশংসার সোনার পদক দিয়েছিলেন। সেদিন তার জীবন রক্ষার দায়িত্ব তিনি আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। আবারও তা করতে পারেন।

    আমি এতোকিছু জানতাম না তায়তা। আমার ধৃষ্টতা ক্ষমা করো বন্ধু। তুমি সত্যি অনেক গুণের আঁধার।

    আমি অনেক সময় বিভিন্ন বিষয়ে এটনের নিজের অবস্থানটা তাকে মনে করিয়ে দেওয়াটা প্রয়োজনবোধ করতাম। তবে ক্রিট অভিযানের বিষয় নিয়ে ফারাওয়ের কাছে পেশ করার জন্য যে প্রতিবেদন তৈরি করতে যাচ্ছিলাম সে বিষয়ে তার সাহায্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। একবার সঠিক পথটা জানিয়ে দিলে সে খুঁটিনাটি সবকিছু খুব ভালো বুঝতে পারে।

    .

    এটনের মতো ফারাও আমার যোগ্যতা সম্পর্কে কোনো অবজ্ঞা দেখালেন না। বিশেষত তামিয়াত দুর্গে আমার সাম্প্রতিক সাফল্যের পর তিনি বরং ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। পুরো দুই দিন মিনোজের সাথে আমার যোগাযোগের পরিকল্পনাটির বিভিন্ন দিক নিয়ে আমার সাথে কথা বললেন। মাঝে মাঝে দুএকটা বিষয়ে প্রশ্ন তুললেন, তারপর আলোচনা শেষে বললেন, আমি তো তোমার পরিকল্পনায় কোনো খুঁত দেখতে পাচ্ছি না তাতা। তবে আমার মনে হয় জেনারেল ক্রাটাস আর তার সহকর্মীরা কোনো কোনো বিষয়ে আপত্তি করতে পারে।

    ফারাও আর তার পূর্ণ সভাসদদের উপস্থিতিতে আমি জেনারেল ক্রাটাসের সামনে আমার পরিকল্পনা তুলে ধরলাম। আমার কথা শোনার পর ক্রাটাস রেগেমেগে মুখ লাল করে লাফ দিয়ে উঠে পুরো রাজদরবারে দাপাদাপি করে বেড়াতে লাগলো। আমার নাকের সামনে আঙুল নেড়ে টেবিলের উপর ঘুসি মেরে চিৎকার করে সমস্ত দেবতাদের উদ্দেশ্যে সে ভবিষ্যৎ বিপদাশঙ্কা আর সর্বনাশের সতর্কবাণী উচ্চারণ করতে লাগলো। প্রকৃতিগতভাবে ক্রাটাস একজন নিষ্ঠুর ব্যক্তি হলেও সে একজন ভালো যোদ্ধা।

    চিৎকার, দাপাদাপি, দেবতাদের উদ্দেশ্যে শপথ ইত্যাদি করতে করতে মুখে ফেনা তুলে যখন সে আর কথা বলতে পারছিল না, ততক্ষণ আমি অপেক্ষা করলাম। তারপর আমি শান্তকণ্ঠে বললাম, একটা কথা আমি বলতে ভুলে গিয়েছিলাম জেনারেল ক্রাটাস। হুই আর রেমরেমকে আমি আমার সাথে ক্রিটে নিয়ে যেতে চাই। আমার দৃঢ় বিশ্বাস আপনি তাদের বদলি উপযুক্ত সেনাকর্মকর্তা খুঁজে নিতে পারবেন।

    ক্রাটাস বাকরুদ্ধ হয়ে কিছুক্ষণ আমার দিকে রইল, তারপর হঠাৎ সে হাসতে শুরু করলো। হাসির দমকে তার সারা শরীর কেঁপে উঠলো, টলতে টলতে পিছু হটে তার বিশাল বপু নিয়ে সে ধপাস করে চেয়ারে বসে পড়লো। এই চেয়ারটা বিশেষ করে তার জন্যই তৈরি করা হয়েছে আর সে যেখানেই যায় এটা সাথে নিয়ে যায়। কিন্তু এখন তার ওজনের ভারে চেয়ারের জোড়গুলো শব্দ করে প্রায় আলগা হয়ে যাবার জোগাড় হয়েছে।

    যেভাবে সে হঠাৎ হাসতে শুরু করেছিল, ঠিক সেরকমভাবে হঠাৎ হাসি থামিয়ে নিচু হয়ে পোশাকের ঘের উঠিয়ে মুখ মুছতে লাগলো। এতে তার পুরুষাঙ্গ পুরোপুরি অনাবৃত হয়ে সবার চোখের সামনে উন্মুক্ত হয়ে পড়লো। এরপর টিউনিকের ঘের হাঁটুর কাছে নামিয়ে দিয়ে সে স্বাভাবিক কণ্ঠে ফারাওকে উদ্দেশ্যে করে বলতে শুরু করলো, মহামান্য, তায়তার পরিকল্পনায় কিছু ভালো দিক দেখা যাচ্ছে। একমাত্র সে এই পরিকল্পনার কথা ভাবতে পারে এবং সভাসদদের সামনে তুলে ধরার মতো বুকের পাটা একমাত্র তারই আছে। তারপর সে গভীর অনুশোচনার ভান করে নিজের কপাল খামচে ধরে গভীরভাবে বললো, আমাকে ক্ষমা করুন ভদ্রমহোদয়গণ, আমি হয়তো ভুল রূপক ব্যবহার করে ফেলেছি। তারপর আবার সে হাসিতে ফেটে পড়লো।

    আমার বিশেষ অঙ্গটির অভাবের দিকে ইঙ্গিত করে তার রসিকতা করা সত্ত্বেও আমি ভাবলেশহীন চেহারা করার চেষ্টা করে বললাম, তাহলে আমি মনে করতে পারি যে, হুই আর রেমরেম আমার সাথে ক্রিট যাচ্ছে?

    নিয়ে যাও তায়তা। সামরিক যশ অর্জনের প্রতি তোমার উচ্চাভিলাষ প্রশংসার যোগ্য। আমার আশীর্বাদসহ আমার সর্বশ্রেষ্ঠ লোকদুজনকে নিয়ে যাও। হয়তো তোমাকে তোমার হাত থেকে ওরা রক্ষা করতে পারবে। যদিও আমার সন্দেহ কেউ হয়তো তা পারবে না।

    .

    ব্যবিলন যাত্রার প্রস্তুতি শেষ করতে প্রায় দুইমাস লেগে গেল।

    আমার বেশি দুশ্চিন্তা ছিল দুই রাজকুমারী আর তাদের সফরসঙ্গীদের স্বাচ্ছন্দ্য আর নিরাপত্তা নিয়ে। তাদের নিত্যকার প্রয়োজন মেটাবার জন্য ক্রীতদাস আর ভৃত্যের ৮৩ জনের একটি দল ছিল। এদের মধ্যে ছিল পাঁচক, রান্নাঘরের দাসী, শয়ন কক্ষের পরিচারিকা, পোশাকভাণ্ডারের কত্রী, প্রসাধন ও কেশপরিচর্যাকারী, শরীর মালিশকারী, বাদকদল এবং অন্যান্য পেশাদার আনন্দদানকারী। এছাড়া একজন গণক আর তাদের আধ্যাত্মিক প্রয়োজন মেটাবার জন্য মেয়েরা আনন্দ, ভালোবাসা আর মাতৃত্বের দেবী হাথোরের তিনজন নারী পুরোহিত নেবার জন্য বায়না ধরলো। আমার আপত্তি সত্ত্বেও ওদের বড়ভাই তাদের কোনো আবদারই বিফলে যেতে দিলেন না।

    ফারাওয়ের ধনভাণ্ডার এখন উপচে পড়ছে আর তিনি অকৃপণভাবে টাকা ঢালতে লাগলেন। এতোবছর হিসেব করে চলার পর এখন ইচ্ছামতো খরচ করতে পেরে তার বোনদের চেয়েও তিনি বেশি উপভোগ করছেন।

    এতে মেয়েরা উৎসাহিত হয়ে তাদের পোষা বেড়াল, বানর, পাখি আর শিকারী কুকুরের পরিচর‍্যা করার জন্য আলাদা লোক নিল। এগুলো ছিল রাজকীয় আস্তাবল থেকে যে বিশটি ঘোড়া বেছে নেওয়া হয়েছিল তার সহিস আর অন্যান্য লোকবলের অতিরিক্ত।

    আমি চেয়েছিলাম মেয়েদের পোশাকপরিচ্ছদ যেন সবচেয়ে উৎকৃষ্ট মানের হয়, যাতে ক্রিটে পৌঁছাবার পর সর্বাধিরাজ মিনোজ আর তার রাজদরবারের অমাত্যদের সামনে ওদের খুবই সুন্দর দেখায়। এ-বিষয়ে ফারাও আমাদের সাথে পরামর্শ করলেন, তারপর আমি দুই রাজকন্যার প্রত্যেকের জন্য যে চমৎকার পোশাকগুলো নকশা করেছিলাম, সেগুলো কাটা আর সেলাই করার জন্য মিসরের সর্বশ্রেষ্ঠ দর্জিদের নিয়োগ দেওয়া হল।

    মেয়েদেরকে সাথে নিয়ে আমি থিবসের বাজারের বিভিন্ন দোকান ঘুরে। প্রচুর চোখধাঁধানো গহনা কিনে নিয়ে এলাম। এগুলো দেখলে মিনোজ আর তার সভাসদরা আমাদের রাজ্যের সম্পদ আর গুরুত্ব বুঝতে পারবে। থিবস থেকে যাত্রা শুরু করার এক সপ্তাহ আগে তেহুতি আর বেকাথা একে একে সমস্ত পোশাক আর গহনা পরে ফারাও আর আমার সামনে এসে দাঁড়াল। আমি ওদের দেখে সন্তুষ্ট হয়ে ভাবলাম, যে কোনো মানুষ, সে রাজা হোক আর সাধারণ মানুষ হোক এদের দুজনের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারবে না।

    সফরের প্রস্তুতির এ-পর্যায়ে এসে মেয়েদুটোর উৎসাহ উদ্দীপনা বেড়ে গেল। তাছাড়া লক্সিয়াস যখন ওদেরকে ক্রিট দ্বীপের বর্ণনা দিল তখন ওরা আরও উত্তেজিত হয়ে পড়লো। ওরা জীবনে কখনও সমুদ্র দেখেনি আর সমুদ্র পাড়িও দেয়নি। উঁচু পর্বত কিংবা উঁচু গাছের ঘন জঙ্গলও দেখেনি। ওরা কখনও সেই পর্বত দেখেনি যার মুখ দিয়ে ধূঁয়া আর আগুন বের হয়। ওরা আমাকে আর লক্সিয়াসকে এসব বিষয়ে রাতজেগে একের পর এক প্রশ্ন করে যেতে লাগলো।

    পশ্চিমতীরে অবস্থিত রাজকীয় টাকশাল রাত দিন কাজ করে একশো বড় ক্রেটান রূপার বাট ভেঙে কয়েকগাড়ি রূপার মেম মুদ্রা তৈরি করা হলো। এগুলো দিয়ে আমাদের সফর আর ক্রিট আর বিদেশের অন্যান্য জায়গায় অবস্থানের খরচ জোগানো হবে।

    ব্যবিলন পর্যন্ত আমাদের কাফেলা পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য নীল কুমির রক্ষীদলের দুটো অশ্বারোহী পল্টন গঠন করা হল। এটি ছিল মিসরীয় সেনাবাহিনীর সবচেয়ে চৌকশ পল্টন। ফারাও প্রত্যেক সৈন্যকে বর্মসহ নতুন সমরসাজ, উঁচু চূড়াওয়ালা শিরস্ত্রাণ আর ঘোড়াসহ হাঁটুতে পরারও বর্ম দিলেন। এছাড়া অস্ত্র হিসেবে ওরা নিল বাঁকা ধনুক, তৃণ, তরবারি এবং ঢাল। এসব অস্ত্র আর বর্ম তৈরির খরচ পড়লো দুই হাজার রূপার ডেবেনেরও বেশি। যাইহোক এই জাঁকালো অস্ত্রশস্ত্র ইত্যাদি দেখার পর যে কেউ চমকে যাবে।

    আমি খরচের কথাটা বলার পর ফারাও বললেন, আমাদের মিসরের অস্তিত্বের খাতিরে এটি সামান্য খরচ। এ-বিষয়ে আমার সাথে এখন অভিযোগ তুলে লাভ নেই। এগুলো সব তোমার পরিকল্পনা তায়তা। এরপর আমি আর কোনো কথা বলতে পারলাম না।

    সফরের প্রস্তুতি এতো সুন্দরভাবে চলছিল যে, আমি বিন্দুমাত্র টের পাইনি যে রাজকুমারী তেহুতি এতে গভীরভাবে নিজেকে জড়িয়েছিল আর সেকারণেই সবকিছু এতো সুন্দরভাবে হচ্ছিল।

    .

    এপিফি মাসের শেষ দিনে আমি থিবস থেকে যাত্রা শুরু করতে চেয়েছিলাম, কেননা এই মাসটি সবসময় আমার জন্য শুভ ছিল। যাইহোক মল ত্যাগ করার পর সদ্য ত্যাগ করা মলের সামান্য নমুনা যখন আমি একটি পাত্রে আমার পছন্দের ভবিষ্যদ্বক্তার কাছে দিলাম, তিনি এটি পরীক্ষা করে সাবধান বাণী উচ্চারণ করে বললেন যে, এই তারিখটি শুভ নয়। এটা এড়াতেই হবে।

    তিনি আমাকে মেসোর মাসের প্রথম দিন পর্যন্ত যাত্রা বিলম্বিত করতে উপদেশ দিলেন। এ-যাবত তার ভবিষ্যদ্বাণী সবসময় বিশ্বাসযোগ্য ছিল। তাই আমি তার উপদেশ মতো আমার দুই রাজকুমারীসহ কাফেলার সকলকে সফর পিছিয়ে দেয়ার কথা জানিয়ে দিলাম।

    কোনো খবর না দিয়েই এক ঘন্টার মধ্যেই দুই রাজকুমারী ঝড়ের বেগে প্রাসাদে আমার বাসস্থানে এসে হাজির হল। দলনেতা ছিল তেহুতি আর সবসময়ের মতো বেকাথা একনিষ্ঠভাবে তার বড়বোনের অনুগামি হিসেবে হাজির হল।

    তুমি কথা দিয়েছিল তাতা! আর এখন কীরকম নিষ্ঠুরভাবে আমাদের আনন্দ মাটি করতে পারলে তাতা? কত যুগ ধরে আমরা এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করেছিলাম। তুমি কি আমাদেরকে আর ভালোবাসো না?

    আমি দুর্বলচিত্ত নই, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমি ইস্পাত কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারি, তবে আমার দুই রাজকুমারীর ক্ষেত্রে অবশ্যই নয়। ওরা যখন একত্রে আক্রমণ করে, তখন কোনো মানুষের পক্ষে তা প্রতিহত করা সম্ভব নয়, এমনকি আমিও পারি না।

    পরদিন ভোর হতেই আমি নীলনদ পার হয়ে ঘোড়ায় চড়ে রাজকীয় টাকশালের দিকে চললাম। রাজকুমারীদের দাবীমতো আমি সেখানে যাচ্ছিলাম সফরের পেছানো তারিখটা জারাসকে জানাতে আর তাকে বলতে যে সফর শুরুর আগেই যেন সে শেষ দশ বস্তা রূপার মেম মুদ্রা রাজপ্রাসাদের রাজকীয় ভাণ্ডারে জমা দেয়।

    সফরের জন্য আমরা দশ লাখের বেশি রূপা নিয়ে যাচ্ছিলাম। এপরিমাণ রূপা দিয়ে একটি রণতরী-বহর আর ভাড়াটে সেনার পুরো একটি বাহিনী গড়ে তোলা যায়।

    টাকশালে ঢোকার পর দেখলাম একটা কামারশালার মতো ভেতরে ভীষণ গরম আর প্রচণ্ড শব্দ হচ্ছে। কামারের হাপরের আগুনের শিখার গর্জন আর হাতুড়ির শব্দে কানে তালা লেগে যাচ্ছে।

    জারাসকে মেঝেতে দেখতে পেলাম। খালি গায়ে সে মাথার উপর একটা ব্রোঞ্জের হাতুড়ি তুলে ঘুরাচ্ছে। পেশিবহুল বাহু ঘামে চকচক করছে আর মুখ গাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। এই ছেলেটি এমন চরিত্রের যে, কোনো কাজ থাকলে তা না করে অলস বসে থাকতে পারে না। একজন উচ্চ পদস্থ সামরিক পদধারী হওয়া সত্ত্বেও সে টাকশালের একজন সাধারণ শ্রমিকের মতো মনেপ্রাণে পরিশ্রম করছে।

    তাকে দেখে আমি খুশি হলাম। বেশ কয়েক সপ্তাহ তার সাথে দেখা হয়নি আর আমি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম যে, তামিয়াতে অভিযানে একসাথে থাকার সময় আমি তার কতটা ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ আমার মনে দুঃখ হল যে ব্যবিলন আর কুনুসসের দীর্ঘ অভিযানে তাকে আমার ডান হাত হিসেবে নিতে সাহস পাচ্ছি না।

    জারাস আমাকে দেখেই আমার দিকে তাকাল। তারপর হাতুড়িটা পাথরের মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে হাত উঁচিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হাসলো।

    দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব থাকা সত্ত্বেও আমাকে তার স্বাগত জানাবার আন্তরিক ভঙ্গি দেখে আমি অবাক হলাম। সে সামনে এগিয়ে এসে বললো, আমি ভেবেছিলাম তুমি আমাকে ভূলে গিয়েছ আর এখানে পঁচতে ফেলে রেখে গেছ। তবে আমার জানা উচিত ছিল যে, তোমার মতো একজন মানুষ কখনও তার বন্ধুকে ভুলে যেতে পারে না। আমি আমার বর্ম পলিশ করে রেখেছি আর তরবারিও ধার দিয়ে রেখেছি। এখন তুমি হুকুম করলেই আমি যাওয়ার জন্য প্রস্তুত।

    আমি হতবুদ্ধি হয়ে পড়লাম আর অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে তাকে সাথে না নেওয়ার কথাটা সরাসরি বলতে পারলাম না।

    একটু হাসার চেষ্টা করে বরলাম, আমিও তোমাকে কম আশা করিনি। কিন্তু তুমি কী করে জানলে… আর কোনো কথা বলতে পারলাম না, কেননা আমার নিজেরই কোনো ধারণা নেই সে কি বলতে চাচ্ছে।

    আজ সকালেই যুদ্ধ পরিষদ থেকে আর্দালি নির্দেশটা নিয়ে এসেছিল। তবে আমি জানতাম তুমি নিশ্চয়ই আমাকে নেবার কথা বলেছে। তারপর একটু হেসে আবার বললো, উপরের মহলে তুমি ছাড়া আমারতো আর কোনো বন্ধু নেই।

    নির্দেশে কার সীলমোহর ছিল জারাস?

    নামটা জোরে উচ্চারণ করতে সাহস পাচ্ছি না, তবে… তারপর চারপাশে তাকিয়ে বেশ গোপনীয়তা নিয়ে সে তার কোমরের পেছনে ঝুলানো থলিটা থেকে সাবধানে একটা ছোট প্যাপিরাস কাগজ বের করলো। তারপর খুব যত্ন আর সম্মানের সাথে কাগজটা আমার হাতে দিল।

    কাগজটার উপর সীমাহরটা দেখেই চিনতে পেরে আমি চমকে উঠলাম। ফারাও? আমি অবাক হলাম যে এতে সামান্য বিষয়ে ফারাও নিজেকে জড়িত করেছেন।

    আর কে? এই কথা বলে জারাস আমার দিকে তাকাল, আমি কাগজটির ভাঁজ খুলে পড়লাম। পরিষ্কার আর বেশ ছোট একটি নির্দেশ।

    এখনি প্রভু তায়তার সরাসরি অধীনে নিজেকে উপস্থিত কর। এরপর থেকে তিনি তোমাকে যেসব নির্দেশ দেবেন, শেষ নিঃশ্বাস থাকা পর্যন্ত তা নিসংকোচে পালন করবে।

    এবার জারাস গলা নামিয়ে প্রায় ফিসফিস করে বললো, এবার আমরা কোথায় যাচ্ছি তায়তা? আর সেখানে গিয়ে কী করবো আমরা। নিশ্চয়ই জোর লড়াই হবে তাই না?

    আমি দৃঢ়ভাবে মাথা নেড়ে বললাম, সময় হলেই এই প্রশ্নের উত্তর দেব। এমুহূর্তে এর বেশি কিছু বলতে পারবো না। তবে প্রস্তুত থেক।

    সে হাতমুঠো করে আমাকে অভিবাদন করলো। তবে দাঁত বের করা হাসিটা থামালেও চোখদুটো চকচক করছিল।

    মুদ্রা সরবরাহের বিষয়ের আলাপটা শেষ করার পর দ্রুত প্রাসাদে ফিরে গেলাম। আমাকে এখুনি ফারাওয়ের সাথে দেখা করে জারাসকে দেওয়া তার নির্দেশটা বাতিল করাতে হবে। তবে আগাম খবর না দিয়ে আমিও সরাসরি রাজার সামনে যেতে পারি না। যেকোনো লোকের ফারাওয়ের সাথে সাক্ষাত করার একটি কঠোর নিয়ম পালন করা হয়।

    রাজপ্রাসাদে ফারাওয়ের প্রাসাদকক্ষের পাশের একটি কামরায় বেশ কয়েকজন লেখক মাটিতে বসে তুলি দিয়ে ঈজেলের উপর বিভিন্ন রাজকীয় বার্তা আর নির্দেশ লিখছিল। প্রধান লেখক আমাকে দেখেই চিনতে পেরে

    এগিয়ে এলো, তবে সে কোনো সাহায্য করতে পারলো না।

    ফারাও ভোরেই প্রাসাদ থেকে বের হয়ে গেছেন। কখন ফিরবেন কেউ জানেনা। আমি জানি এখানে থাকলে তিনি অবশ্যই আপনার সাথে কথা বলতেন প্রভু তায়তা। আমার মনে হয় আপনি একটু অপেক্ষা করে দেখতে পারেন।

    একথার উত্তরে কিছু বলার আগেই করিডোরের শেষ প্রান্ত থেকে ফারাওয়ের কণ্ঠস্বর শোনা গেল। পেছনে একদল রাজকর্মকর্তা আর অমাত্য নিয়ে ফারাও দৃঢ়পদক্ষেপে লেখার কামরায় ঢুকলেন। আমাকে দেখেই কাছে এসে আমার কাঁধে এক হাত রেখে বললেন, তোমাকে এখানে পেয়ে ভালোই হল। আবার তুমি আমার মনের কথা টের পেয়েই এসেছ তাতা। আমি নিজেই অবশ্য তোমাকে আসার জন্য খবর পাঠাতাম। এসো আমার সাথে। কাঁধে হাত রেখেই তিনি আমাকে ভেতরের কামরায় নিয়ে গিয়ে কতগুলো জটিল বিষয় নিয়ে আলাপ শুরু করলেন। তারপর হঠাৎ আমার সাথে কথা শেষ করার পর তার সামনে নিচু একটি টেবিলের উপর রাখা কতগুলো কাগজের দিকে মনোযোগ ফেরালেন।

    আমি আপনার সাথে একমুহূর্ত কথা বলতে চাই মেম। তিনি কাগজ থেকে মাথা তুলে আমার দিকে তাকালেন। ক্যাপ্টেন জারাস আর তার প্রতি নির্দেশের বিষয়টা…

    ফারাও একটু হতবুদ্ধি হয়ে তাকিয়ে বললেন, কে? কিসের নির্দেশ?

    ক্যাপ্টেন জারাস, যে আমার সাথে তামিয়াত গিয়েছিল।

    এবার তিনি উত্তর দিলেন, ওহ, সেই লোক! হ্যাঁ, যাকে তুমি ক্রিটে তোমার সাথে নিয়ে যেতে চেয়েছ। আমি বুঝলাম না তাকে সাথে নেবার জন্য আমার অনুমতির কি প্রয়োজন আর তুমি নিজেই বা কেন এ-ব্যাপারে আমার সাথে সরাসরি কথা বললে না। আমার বোনদেরকে কোনো বিষয়ে মধ্যস্থতা করার জন্য বলাতে তোমার চরিত্র নয়। তারপর আবার কাগজের দিকে নজর ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, যাইহোক কাজটা হয়ে গেছে। আশা করি তাতা তুমি সন্তুষ্ট হয়েছ, তাই না?

    আমি অবশ্যই সন্দেহ করেছিলাম এই নির্দেশের পেছনে কে আছে, তবে আমার রাজকুমারীদের বুদ্ধিমত্তা আর কূটকৌশল নিয়ে বেশি মাথা ঘামায় নি। এবারই সে প্রথম সামরিক নির্দেশের শৃঙ্খলায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছে। এখন আমাকে তড়িৎ যে কোনো একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে, হয় কাপুরুষের মতো আত্মসমর্পণ করতে হবে আর নয়তো রাজকুমারী তেহুতির সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়তে হবে, যে কোনোদিন নিজ স্বার্থে তার উচ্চ রাজকীয় ক্ষমতা ব্যবহার করেনি। কাজেই আমি মাথা নোয়ালাম।

    যা অনিবার্য তা মেনে নিয়ে বললাম, আপনি সত্যি মহান, হে মিসরাধিপতি, আমি সত্যি কৃতজ্ঞ।

    .

    সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়ে যাবার পর কাফেলা থিবসে থেকে যাত্রা শুরু করার জন্য প্রস্তুত হতেই আমি এটনকে একটা বার্তাবহ কবুতর ছাড়তে বললাম। এটি এর জন্মস্থান ব্যবিলনে মিসরীয় দূতাবাসের উদ্দেশ্যে উড়ে যাবে। এতে আমি আমাদের রাষ্ট্রদূতকে অনুরোধ জানিয়ে বার্তা পাঠালাম, যেন তিনি আক্কাদ আর সুমেরের রাজা নিমরদকে খবর দেন যে, রাজকুমারীরা একটি কূটনৈতিক সফরে তার রাজধানীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছেন। আর ফারাও ত্যামোস অত্যন্ত খুশি হবেন যদি মহামান্য রাজা নিমরদ রাজকুমারীদেরকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান।

    চারদিন পর আরেকটি কবুতর ব্যবিলন থেকে রাজা নিমরদের বার্তা নিয়ে থিবসে ফিরে এলো।

    দুই দেশের মাঝে সুসম্পর্কের কথা মনে করিয়ে দিয়ে রাজা জানিয়েছেন তিনি অবশ্যই রাজকুমারীদের সাদর অভ্যর্থনা জানাবেন এবং আশা করছেন যে, রাজকুমারীরা নিশ্চয়ই এখানে তাদের অবস্থান উপভোগ করবেন।

    এই বার্তা পাওয়ার সাথে সাথে আমি জারাসকে একটি শক্তিশালী অগ্রগামী দল নিয়ে থিবস থেকে লোহিত সাগরের সবচেয়ে কাছের উপকূল পর্যন্ত পথটি নিষ্কন্টক করার জন্য পাঠালাম। অজুহাত দেখালাম যেন আমাদের পথে কোনো দস্যুদল হামলা করার জন্য ওঁত পেতে নেই তা নিশ্চিত করতে যাচ্ছে। তবে আসল উদ্দেশ্যে ছিল তাকে আমার প্রিয় তেহুতির কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা।

    আমি বুঝতে পারলাম না তেহুতি কী করে আমার সব পরিকল্পনা জেনে ফেলে। সবজায়গায় তার গুপ্তচর আছে আর হারেম হচ্ছে ষড়যন্ত্র আর গুজবের একটি উর্বর ক্ষেত্র।

    অগ্রগামী দল নিয়ে যাবার জন্য জারাসকে সকালেই নির্দেশ দিয়ে আমি বাগানে বসে এককাপ চা খেতে খেতে গতকালের বিভিন্ন কাজের খতিয়ান নিয়ে ভাবছিলাম। ঠিক তখনই একটা ছায়ার মতো নীরবে সে আমার পেছন দিয়ে এসে দুই ঠাণ্ডা হাত দিয়ে আমার চোখ ঢেকে কানের কাছে ফিসফিস করে বললো, কে বলতো?

    আমি বলতে পারবো না কে এটা মহামান্য।

    ওহহ! তুমি নিশ্চয়ই উঁকি দিয়ে দেখেছ! সে প্রতিবাদ করে উঠলো তারপর আমার কোলে বসে দুই হাত দিয়ে আমার গলা জড়িয়ে ধরে বললো, আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি তায়তা। তুমি যা বল তাই আমি করতে পারি। এবার আমার একটা কথা রাখবে?

    অবশ্যই রাখবো, রাজকুমারী। যে কাজে তোমার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় আর মিসরের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হয়, সে কাজ ছাড়া আর যেকোনো কাজ আমি করতে রাজি।

    আমার এ-ধরনের কথা শুনে সে আতঙ্কিত হয়ে বললো, না না, এরকম কোনো ধরনের অনুরোধ আমি কখনও করবো না। যাইহোক এই ভয়ঙ্কর মরুভূমি উপর দিয়ে সুমের আর আক্কাদ যেতে অনেক সময় লাগবে। কোনো ধরনের আনন্দ না পেয়ে আমার বোন আর আমার খুবই একঘেয়ে লাগবে। তবে খুব মজা হতো যদি একজন কবি সাথে থেকে আমাদের গান আর কবিতা শোনাতো।

    এজন্যই কি তুমি ক্যাপ্টেন জারাসকে এই অভিযানে নেবার জন্য তোমার ভাই ফারাও ত্যামোসকে বলেছিলে?

    সে চোখ বড় বড় করে অবাক হয়ে বললো, ক্যাপ্টেন জারাস! তিনিও কি আমাদের সাথে যাচ্ছেন? কি চমৎকার তাই না? তিনি তো একজন জন্মগত কবি আর কী চমৎকার তার গানের গলা। আমি জানি তুমি তাকে পছন্দ কর। তিনি তো আমার আর বেকাথার সাথে দিনের বেলা ঘোড়ায় চড়ে যেতে যেতে আমাদের গান আর কবিতা শোনাতে পারেন, তাই না?

    প্রথম কথা হল ক্যাপ্টেন জারাস একজন প্রথম সারির সেনাকর্মকর্তা এবং যোদ্ধা, কোনো ভ্রাম্যমাণ চারণ কবি নন। আমাদের কাফেলায় একদল পেশাদার গায়ক-বাদক, অভিনেতা-অভিনেত্রী, ভাড়, যাদুকর, আর একটি ভল্লুকসহ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অন্যান্য পশুও আছে। জারাস আমাদের কাফেলার আগে আগে অগ্রগামী দলের দায়িত্বে থাকবে। সে আমাদের সবার নিরাপত্তার স্বার্থে সামনের পথে কোনো বাধা বিপত্তি থাকলে তা দূর করবে। বিশেষত তোমার আর তোমার ছোট বোনের নিরাপত্তার স্বার্থেই তা করবে।

    এবার তেহুতির ঠোঁট থেকে মন গলানো হাসিটা মুছে গেল। সে একটু পেছনে হেলে শীতল দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, কেন এমন করছো আমার সাথে তায়তা? আমি তো সামান্য একটা আবদার করেছি।

    আমি তার ডান হাতটি উপুড় করে ধরে হিরার আংটিটার দিকে দেখিয়ে বললাম, এটাই আমার কারণ, রাজকুমারী।

    সে এক ঝটকা মেরে হাতটা সরিয়ে নিয়ে পেছনে লুকাল। আমরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

    বুঝা গেল সে যুদ্ধের সীমানা মেলে ধরেছে আর তার রূপক ছুরিও বের করেছে। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে একবারও পেছন না ফিরে চলে গেল।

    .

    মেসোর মাসের প্রথম দিনে জারাস অগ্রগামী দলটি নিয়ে লোহিত সাগরের তীরে সাগাফা বন্দরে পৌঁছলো। সেখানে পৌঁছেই সে একটা কবুতর উড়িয়ে দিয়ে খবর পাঠাল যে, সাগরের তীরে ধাউ আর বজরার একটি বহর সে খুঁজে পেয়েছে। এগুলো আমাদের পুরো কাফেলাটি সাগর পার করে দেবার জন্য প্রস্তুত হয়ে রয়েছে। এই খবর পাওয়ার সাথে সাথে আমি সামনে এগোবার নির্দেশ দিলাম।

    কাফেলার একেবারে সামনে থেকে ফারাও ঘোড়ায় চড়ে আমাদের সাথে চললেন। নীল নদীর কাছে পাহাড়টির কাছে পৌঁছেই সবাই ঘোড়া থেকে নেমে পড়লো।

    ফারাওয়ের দুই পাশে কুশন লাগানো টুলে দুই রাজকন্যা বসলেন। সভাসদ আর উচ্চপদস্থ রাজকর্মকর্তারা এই তিনজনকে ঘিরে একটি বৃত্ত তৈরি করলো। তারপর ফারাও আমাকে ডাকতেই আমি তার কাছে এসে হাঁটুগেড়ে বসলাম। তিনি আমার সামনে দাঁড়িয়ে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন।

    আমি আমার সকল প্রিয় এবং অনুগত প্রজাদেরকে এই অনুষ্ঠানের সাক্ষী হতে আহ্বান জানাচ্ছি।

    তেহুতি আর বেকাথাসহ সকলে বলে উঠলো, ফারাওয়ের জয় হোক! তার ইচ্ছাকে সম্মানিত আর মান্য করা হোক!

    ফারাও দুই হাত দিয়ে শিকারী বাজপাখির ছোট্ট একটি সোনার মূর্তি মাথার উপর তুলে ধরলেন।

    এটা আমার বাজপাখির সীলমোহর আর আমার প্রতীক। এর বহনকারী ঈশ্বর-প্রদত্ত আমার সকল অধিকার নিয়ে কথা বলবে। উপস্থিত সকলে এটি লক্ষ্য করুন আর আমার ক্ষমতা আর আমার ভয়ানক রোষ সম্পর্কে সতর্ক হোন।

    তখনও হাঁটু গেড়ে বসা অবস্থায় থেকে আমি দুই হাত পেতে সামনে ধরতেই ফারাও ঝুঁকে বাজপাখির সীলমোহরটা আমার হাতে দিলেন।

    বিচক্ষণতার সাথে এটা ব্যবহার করুন সম্মানিত তায়তা। আবার পরবর্তী সাক্ষাতের সময় এটা আমাকে ফেরত দিন।

    আমি পরিষ্কার কণ্ঠে চেঁচিয়ে বললাম, হে মিসরাধিপতি, আপনার আদেশ শিরোধার্য।

    তিনি আমাকে ধরে দাঁড় করিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, হোরাস এবং মিসরের অন্যান্য সকল দেবতার শুভ দৃষ্টি আপনার উপর বর্ষিত হোক।

    তারপর তিনি ঘুরে তার বোনদেরকে বিদায় জানালেন। এরপর তিনি ঘোড়ায় চড়তেই দেহরক্ষীর দল তাকে ঘিরে দাঁড়াল। তারপর ঢাল বেয়ে নেমে দ্রুত দলবলসহ নীলনদের তীরে থিবসের দেয়ালের দিকে চললেন। কাফেলার শেষ অংশটুকু পার হয়ে দূরে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

    টিলার উপরে ক্রীতদাসেরা আমাদের বসার জন্য উটের লোমের তৈরি আসন বিছাল আর রোদ থেকে ছায়া দেবার জন্য মাথার উপর চাঁদোয়া টাঙাল। আমরা নিচে দূরে ফারাও আর তার সভাসদদের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলাম। ইতোমধ্যে কাফেলার অগ্রভাগ আমাদের কাছে এসে পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়ে চললো।

    প্রথমে ছিল কুমির রক্ষীদলের একটি পল্টন। তাদের ঠিক পেছন পেছন চলেছে পঞ্চাশটি উট আর এগুলোর আরব চালক। প্রতিটা উটের পিঠের কুঁজের দুই পাশে দুটো করে চারটি পানিভরা বিশাল চামড়ার মশক ঝুলছে। এগুলোর উপর নির্ভর করেই আমাদেরকে আরবের বিশাল মরুভূমি পাড়ি দিতে হবে।

    পানির মশকবহনকারী উটের সারির পেছনেই ঘোড়ায় চড়ে চলেছে কুমির রক্ষীবাহিনীর আরেকটি পল্টন। এরা পানির সরবরাহটি রক্ষা করবে আর যদি আমাদের উপর কোনো শত্রুর হামলা হয় তখন প্রয়োজন পড়লে পেছনে রাজকুমারীদের নিরাপত্তার কাজে সহায়তা করবে।

    যদিও আমি সিনাই উপদ্বীপ থেকে অনেক দূরে দক্ষিণ আর পূর্ব দিকে দিয়ে আমাদের যাত্রাপথ পরিকল্পনা করেছিলাম, তারপরও আমি কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি নই। হাইকসোরা এই জায়গাটি তাদের অধীনস্থ এলাকা মনে করে আর গোরাব কোনোভাবে আমাদের পরিকল্পনা জানতে পারলে তার রথিবাহিনী পাঠিয়ে আমাদের যাত্রায় বাধা দিতে পারে।

    এই দুই রক্ষীবাহিনীর পেছনে আরও পঞ্চাশটি উট তাঁবু, আসবাবপত্র আর অন্যান্য সরঞ্জাম বয়ে নিয়ে চলেছে। যাত্রাপথে প্রতিটি বিশ্রাম নেবার জায়গায় তাবু গাড়তে এগুলো প্রয়োজন হবে।

    এর পেছনে পায়ে হেঁটে চলেছে তবু অনুসরণকারী, ভৃত্য আর ক্রীতদাসের দল। কাফেলার পরের অংশে রয়েছে আরও বিশটি এক কুঁজওয়ালা উট। এগুলো রূপার মুদ্রার ভারী বস্তাগুলো বহন করছে।

    সবার শেষে ছিল কাফেলাকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়া কুমির রক্ষীবাহিনীর তৃতীয় পল্টন, অতিরিক্ত ঘোড়া, উট আর মালবাহী গাড়ি। আমরা যেখানে বসেছিলাম তার সমান সমান এগুলো আসতেই আমি আমাদের তবু গুটিয়ে নিতে নির্দেশ দিলাম।

    ঘোড়ায় চড়ে সামনে এগিয়ে আমরা মরুভূমির উপর দিয়ে চলা এক লিগ দীর্ঘ এই মিছিলের ঠিক মধ্যখানে আমাদের নির্দিষ্ট জায়গায় এসে পৌঁছলাম। বেয়াড়া রকম আকৃতির আর ধীর গতিতে চলা মানুষ আর পশুর এই দীর্ঘ মিছিলটি দশ দিন পর লোহিত সাগরের পশ্চিম তীরে পৌঁছল।

    .

    সাগাফা বন্দর থেকে ঘোড়া ছুটিয়ে এসে জারাস আমাদের সাথে দেখা করলো। সে আর তার প্রহরী ঘোড়ায় চড়ে কাফেলার পেছন দিকে একটু পিছিয়ে রাজকীয় দলের কাছে পৌঁছতেই দুই রাজকুমারীকে দেখতে পেয়ে ঘোড়া থেকে নামলো।

    তেহুতির সামনে এক হাঁটুগেড়ে বসে সে এক হাত মুষ্টিবদ্ধ করে তাকে অভিবাদন জানাল। প্রত্যুত্তরে তেহুতিও তার দিকে তাকিয়ে একটি প্রাণোচ্ছল হাসি দিল।

    ক্যাপ্টেন জারাস, আমি খুবই খুশি যে, ব্যবিলন পর্যন্ত সফরে আপনাকে আমরা পাবো। তামিয়াত দুর্গ থেকে আপনি আর প্রভু তায়তা ফেরার পর, আবৃত্তির ঢঙে সেখানে অভিযানের যে চমৎকার ধারা বর্ণনা আপনি দিয়েছিলেন, তা আমার ভালো মনে আছে। আমি খুব খুশি হবো যদি আপনি আমাদের সাথে আজ নৈশভোজে অংশ নেন আর কবিতা আবৃত্তি করে শোনান। আর ব্যবিলন পর্যন্ত সফরের বাকি অংশের বিষয়ে আমার ইচ্ছা এবং নির্দেশ যে, আপনি কাফেলা পাহারা দলের নেতৃত্বের দায়িত্ব অন্য কর্মকর্তার হাতে দিয়ে সরাসরি আমার বোন আমার নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবেন।

    আমি তাকে শোনাবার জন্য বেশ জোরে একটা নিঃশ্বাস নিলাম কিন্তু সে আমার চাপা প্রতিবাদ পুরোপুরি উপেক্ষা করে সমস্ত মনোযোগ জারাসের দিকে দিল। জারাসকে বেশ অপ্রস্তুত দেখাচ্ছিল আর উত্তর দিতে গিয়ে সে একটু তোতলাতে লাগলো। এই প্রথম তাকে এরকম করতে দেখলাম।

    মহামান্য রাজকুমারী, আপনার নির্দেশ শোনা মানেই তা পালন করা। তবে অনুগ্রহ করে আমাকে ক্ষমা করবেন। আমাকে এখুনি প্রভু তায়তার কাছে হাজির হতে হবে, যার হাতে ফারাও এই কাফেলার নেতৃত্ব দিয়েছেন আর যাকে রাজকীয় বাজপাখির সীল মোহর দিয়ে বিশ্বাস করেছেন।

    আমার প্রতি জারাসের বিশ্বস্ততা আর কার হাতে পূর্ণ কর্তৃত্ব রয়েছে, তা তেহুতিকে মনে করিয়ে দেবার চেষ্টা করতে দেখে আমি খুশি হলাম। সে বেচারা এখন তেহুতির কাছ থেকে পালিয়ে আসার জন্য ছটফট করছে।

    তার মাথার উপর আঘাত হানা এই রাজকীয় ঝড়ের তাণ্ডব থেকে তাকে উদ্ধার করার চেষ্টা থেকে আমি নিজেকে বিরত রাখলাম। তার কোনো নির্দেশ অমান্য হোক, তেহুতি তা মোটেই সহ্য করে না। তবে সে আবার আমাকে অবাক করলো। জারাসকে থামিয়ে না দিয়ে সে বরং মৃদৃ হেসে মাথা নেড়ে বললো, অবশ্যই তাই করুন ক্যাপ্টেন জারাস। একজন সৈনিক হিসেবে আপনার দায়িত্ব আর সবকিছুর ঊর্ধ্বে।

    জারাস আমার পাশে আসতেই আমি একটু পিছিয়ে রাজকুমারীদের কাছ থেকে একটু দূরে সরে এলাম, যাতে ওরা আমাদের কথা শুনতে না পারে। টিলার নিচেই সাগরের তীরে সাগাফার দালানকোঠাগুলো দেখা যাচ্ছে।

    আমার ইঙ্গিত পেয়ে জারাস গলা নামিয়ে জানাল যে, আমাদের জন্য অপেক্ষা করার সময় সে সুযোগ পেয়ে একটি দ্রুতগামি ধাউ নিয়ে দূরের সাগর সৈকতে এলো–কুম জেলে পল্লীতে গিয়েছিল। সেখানে গিয়ে সে নিশ্চিত হতে চাচ্ছিল যে, আমাদের বেদুঈন পথপ্রদর্শক আমাদের নির্দেশ পেয়ে তার লোকজন নিয়ে আমাদেরকে আরব মরুভূমি পার করাবার জন্য অপেক্ষা করছে কি না।

    সে একই লোক আল-নামজু, যে আমাদেরকে সিনাই উপদ্বীপ পার করে মধ্য সাগরের তীর আর তামিয়াত দুর্গে নিয়ে গিয়েছিল।

    জারাস খুশি হয়ে বললো, আপনি জেনে খুশি হবেন যে, আমাদের আসার খবর পাওয়ার পর গত দুই মাস ধরে আল-নামজু এখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। তার সাথে তার দুই ছেলেও রয়েছে। তবে সে তাদেরকে সামনে কাফেলা চলার পথে পানির উৎস আর মরুদ্যানগুলো দেখতে পাঠিয়েছে।

    আমি তাকে বললাম, শুনে আস্বস্ত হলাম। তারপর এক পাশে তাকিয়ে আবার বললাম, বলে যাও জারাস। মনে হয় তোমার আরও কিছু বলার আছে। সে একটু চমকে তাকাল।

    তারপর বললো, আপনি কী করে জানলেন… তার কথা থামিয়ে দিয়ে আমি বললাম, আমি কীভাবে জানলাম? আমি এজন্য জেনেছি যে, আমি জানি তুমি কোনো কথা লুকিয়ে রাখতে পারো না। এটাকে একটা দোষের চেয়ে বরং আমি গুণ বলবো।

    সে মাথা নেড়ে বললো, আমরা অনেকদিন ধরে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছি প্রভু। আমি ভুলে গিয়েছিলাম কীভাবে আপনি মানুষের মনের ভাবনা পড়তে পারেন। তবে আপনার কথাই ঠিক। আমি আরেকটি বিষয় আপনাকে বলতে যাচ্ছিলাম, তবে ভয়ও পাচ্ছিলাম, হয়তো আপনি মনে করতে পারেন যে, আমি শুধু শুধু আতঙ্কে ভূগছি।

    আমি তাকে নিশ্চিত করে বললাম, তোমার কোনো কথাই আমাকে এ ধরনের ধারণা করতে দেবে না।

    তাহলে বলছি শুনুন, যখন আমরা আল-নামজুর শিবিরে ছিলাম, তখন তিনজন শরণার্থীকে মরুভূমি থেকে সেখানে নিয়ে আসা হয়েছিল। ভীষণ আহত আর পিপাসায় কাতর লোকগুলো খুবই দুর্দশাগ্রস্ত ছিল। সত্যি বলতে কী আল-নামজুর তাঁবুতে আনার কিছুক্ষণের মধ্যেই একজন মারা গেল, আর আরেকজন কথা বলতে পারছিল না।

    আমি বললাম, কেন? কী হয়েছিল ওদের?

    প্রথমজনের সারা শরীরে গরম তলোয়ারের হ্যাঁকার দাগ ছিল। তার সারা শরীর পুড়ে গিয়েছিল। মরতে পেরে বরং সে দারুণ কষ্ট থেকে মুক্তি পেয়েছে। অন্য লোকটির জীব কেটে ফেলা হয়েছিল, সে একটা পশুর মতো গোঙাছিল।

    আমি জারাসকে বললাম, দয়াশীল হোরাসের দিব্যি, কী হয়েছিল ওদের?

    তৃতীয় লোকটির তেমন যখম হয়নি। সে জানাল, সে ছিল একটি কাফেলার প্রধান ব্যক্তি। পঞ্চাশটি উট আর সমসংখ্যক নারীপুরুষসহ সে তুরক নগর থেকে লবণ আর তামা নিয়ে আসছিল। পথে দস্যু জাবের আল-হাওয়াসাঈ তাদের উপর হামলা করে। এই লোকটি শেয়াল নামেই পরিচিত।

    আমি বললাম, আমি তার কথা শুনেছি। আরবের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর লোক সে।

    তাকে ভয় করার অনেক কারণ আছে। শুধু খেলাচ্ছলে সে কাফেলার অন্যান্য নারীপুরুষদের খাসী করে আর নাড়িভুড়ি বের করে ফেলে। অবশ্য এই শেয়াল আর তার লোকেরা বন্দীদেরকে হত্যা করার আগে নারীপুরুষ সবার। উপর যৌন নির্যাতন চালায়।

    এই শেয়াল এখন কোথায়? এই লোক কী জানে সে কোথায় গেছে?

    না। সে আবার মরুভূমির বুকে হারিয়ে গেছে। তবে একটা বিষয় নিশ্চিত যে, সে কাফেলার পথে ওঁৎ পেতে থাকবে।

    ঠিক সেই মুহূর্তে তেহুতি ঘোড়ায় চড়ে সেখানে উপস্থিত হয়ে জিনে বসে ঘুরে আমাদের দিকে তাকিয়ে বললো, এতো মনোযোগ দিয়ে তোমরা দুজন কী আলাপ করছো? এখানে এসে আমার আর বেকাথার পাশাপাশি চল। আর যদি তুমি জারাসকে গল্প শুনিয়ে থাক তবে আমরাও তা শুনবো।

    তার কথা আমিও দুবার না মেনে পারি না।

    আমরা দুজনেই ঘোড়া নিয়ে দুই রাজকুমারীর পাশাপাশি চলতে শুরু করলাম। বেশ কৌশল করে তেহুতি আমার আর জারাসের মাঝে তার ঘোড়াটা নিয়ে এলো, যাতে আমরা তাকে না শুনিয়ে কোনো আলোচনা করতে না পারি। সেই মুহূর্তে এবড়োথেবড়ো পাথুরে পথটি একটি পাহাড়ের চূড়ায় এসে শেষ হতেই তেহুতি ঘোড়ার রাশ টেনে ধরে খুশিতে চেঁচিয়ে উঠলো।

    দেখো! ঐ যে তাকিয়ে দেখো! এতো চওড়া আর এতো নীল কোনো নদী কখনও দেখেছ? শিংওয়ালা দেবতা হোরাসের দিব্যি, এটা আমাদের নীলনদের চেয়ে একশো গুণ বেশি চওড়া হবে। আমি তো এর অন্য পারও দেখতে পাচ্ছি না।

    জারাস তাকে জানাল, এটা নদী নয় মহামান্য। এটি লোহিত সাগর।

    তেহুতি সোৎসাহে বললো, কী বিশাল। জারাস তাকে ভালোভাবে চেনে, সে বুঝতে পারেনি যে তেহুতি না জানার ভান করছে। এটি নিশ্চয়ই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাগর?

    জারাস তার ভুল সংশোধন করে অত্যন্ত সম্মানের সাথে বললো, না রাজকুমারী। এটা সমস্ত সাগরের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। মধ্যসাগর সবচেয়ে বড় আর জ্ঞানী ব্যক্তিরা অনুমান করে বলেছেন, বিশাল অন্ধকার মহাসাগর, যার উপর পৃথিবী ভাসছে তা আরও বড়।

    তেহুতি চোখ বড় বড় করে প্রশংসার দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে, ক্যাপ্টেন জারাস, আপনি তো অনেক কিছু জানেন, প্রায় প্রভু তায়তার মতো। আপনাকে প্রতিদিন কয়েক ঘন্টা বেকাথা আর আমার সাথে ঘোড়ায় চড়ে এসব বিষয় জানাতে হবে।

    তেহুতিকে এতো সহজে তার মত থেকে ফেরানো সম্ভব নয়।

    .

    আরব মরুভূমি পাড়ি দেওয়া গত বছরের তামিয়াত দুর্গের অভিযানের চেয়ে অনেক কষ্টকর আর দুর্গম প্রমাণিত হল। সেবারের অভিযানে দুশো জনের চেয়ে কম লোক নিয়ে দ্রুত কম লটবহর নিয়ে গিয়েছিলাম। মিসর আর সিনাই উপদ্বীপের মাঝে কেবল সুয়েজ উপসাগর পার হতে হয়েছিল। সেটা পঞ্চাশ লিগের চেয়ে কম চওড়া ছিল।

    এবার আমাদেরকে সিনাই উপদ্বীপে না ঢুকে যতদূর সম্ভব দক্ষিণ দিক দিয়ে যেতে হচ্ছে। সিনাই উপদ্বীপে ঢুকলে গোরাব তার রথি বাহিনী পাঠিয়ে আমাদেরকে বাধা দিতে পারতো।

    বাধ্য হয়েই আমাদেরকে লোহিত সাগরের মূল অংশের সবচেয়ে চওড়া জায়গা দিয়ে পার হতে হচ্ছে। পঞ্চাশটি ভোলা ধাউয়ে এক হাজারের বেশি মানুষ আর পশু নিয়ে প্রায় দুশো লিগের চেয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে। ছোট নৌকাগুলোতে এক সাথে কেবল দশটা উটের জায়গা হয়। এতে বেশ কয়েকবার পারাপার করতে হবে।

    সমস্তু কিছু বিবেচনা করে আমি ধারণা করেছিলাম পুরো কাফেলা আরবে নিতে আমাদের কমপক্ষে দুইমাস লাগবে।

    রাজপরিবারকে মিসরীয় তীরে রেখে কাফেলার মূল অংশ সাগর পার হতে শুরু করলো। অভিজ্ঞতা থেকে আমি জানতাম রাজকুমারীদেরকে যাতে একঘেয়েমিতে পেয়ে না বসে সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে, কিংবা ওদের হাতে বেশি অবসর সময়ও দেওয়া যাবে না।

    রাজপরিবারকে কাফেলার বাদবাকি অংশ থেকে আলাদা করে রাখা হয়েছিল। আমাদের কাফেলাটি আকারে একটি ছোট গ্রামের মত হলেও এখানে একটি বড় শহরের সবধরনের সুবিধা আর আরাম আয়েশ ছিল।

    কয়েকদিন পর পর রাজকুমারীদের নিয়ে আমি শিকারে যেতাম। আমরা মরুভূমির চ্যাপ্টা পায়ের ছোট হরিণ শিকার করতাম কিংবা পাহাড়ে উঠতাম, যেখানে দীর্ঘ বাঁকানো শিংয়ের পাহাড়ি বুনো ছাগলের বিচরণ ছিল। এগুলোতে বিরক্তি ধরে গেলে মেয়েরা সাগরতীরে ঝাঁক বেঁধে থাকা অসংখ্য বুনো হাস আর রাজহংসির উদ্দেশ্যে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিকারি বাজ উড়িয়ে দিত।

    অনেকসময় ছোট দ্বীপে বনভোজনের আয়োজন করতাম। মেয়েরা সেখানে সাঁতার কাটতে কিংবা পানির নিচে প্রবাল জঙ্গলে তলোয়ার মাছ আর বড় সামুদ্রিক মাছের উপর বর্শা ছুঁড়ে শিকার করতো।

    তবে সকালে আমি ওদেরকে পড়াশুনা করতে বাধ্য করতাম। কাফেলার সাথে দুজন পণ্ডিত নিয়ে এসেছিলাম, যারা ওদেরকে লেখা, গণিত আর জ্যামিতি শেখাত। শ্রেণীকক্ষের কঠিন অধ্যয়নের ফাঁকে ফাঁকে আমোদ ফুর্তি আর মেয়েলি হাসি ঠাট্টাও চলতো। সারাদিনে এটাই ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় সময়। ওরা লক্সিয়াসের সাথে মিনোয়ান ভাষায় আড্ডা দিত। আমাকে বাদ দিত যেন আমি এই ভাষার একটি শব্দও বুঝি না। তিন জনের মধ্যে বয়সে লক্সিয়াস সবচেয়ে বড় হওয়ায় সে ওদের মেয়েলি নিষিদ্ধ আলাপগুলোতে সবজান্তা ভূমিকা পালন করতো। তবে পরিষ্কার বোঝা যেত তার সমস্ত বিদ্যা ছিল পুঁথিগত, তাই বিশদ বিবরণগুলো সে বানিয়ে বানিয়ে বলতো।

    এইসব আলোচনার মধ্য দিয়ে আমি ওদের মনে কী ভাবনা চলছে তা জানতে পারতাম।

    ওরা ওদের ভালোবাসার গল্প বলতো। লক্সিয়াস রেমরেমকে পছন্দ করতো। তবে তার সামনে হাজির হলে সে একেবারে পাথরের মূর্তির মতো হয়ে যেত। চোখ নামিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে লজ্জায় লাল হয়ে যেত, মুখে কোনো কথা যোগাত না। আমার মনে হয় রেমরেম রাজকীয় পরিষদের একজন সম্মানিত-সদস্য আর সে নিজে একজন সাধারণ মানুষ এবং বিদেশি, এই সত্যটুকু তার মনে সম্ভ্রম মিশ্রিত ভয় জাগিয়ে তুলতো। তবে রেমরেম যে বয়সে তার চেয়ে দ্বিগুণ বড়, তিনটে বউ আছে আর তার অস্তিত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসিন এতে সে কিছু মনে করতো না।

    এদিকে বেকাথা বিখ্যাত ঘোড়সওয়ার আর রথি হুইয়ের প্রতি আকৃষ্ট ছিল। সে মোটেই জানতো না যে, যখন তাকে আমি বন্দী করেছিলাম, তখন সে কুখ্যাত অপরাধি বস্তির রক্তের সম্পর্কের ভাই ছিল। আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করে তাকে সভ্য করে তুলেছিলাম। কিন্তু তারপরও অনেক সময় সে বর্বরোচিত আচরণ করতো, বিশেষত কৌতুক করার সময়। বেকাথা তার সাথে রথে চড়তে ভালোবাসতো। যখন সে এবড়োথেবড়ো জমির উপর দিয়ে রথ চালিয়ে নিয়ে যেত, তখন সে দুহাত দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে প্রচণ্ড জোরে চিৎকার করতো। ওরা অনেক সময় বিভিন্ন ধরনের অর্থহীন রসিকতা করে হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়তো। আর অনেক সময় ভোজ টেবিলে বসে খাওয়ার সময় বেকাথা তার দিকে রুটির টুকরা কিংবা ফল ছুঁড়ে মারতো।

    তেহুতি এসমস্ত থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতো আর কেউ এ বিষয়ে তাকে চাপাচাপি করতো না।

    সন্ধ্যায় আমরা বিভিন্ন রকম ধাঁধা, কবিতা, গান গেয়ে আর বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে সময় কাটাতাম।

    এভাবেই আমার তত্ত্বাবধানে থাকা এই তিন বালিকাকে আমি বিপজ্জনক কোনো কিছু করা থেকে বিরত রেখেছিলাম। শেষ পর্যন্ত মূল কাফেলা সাগর পার হওয়ার পর আমাদের যাওয়ার সময় এলো।

    আথির মাসের পনেরোতম দিনে সূর্য উঠার আগে আমরা সাগর সৈকতে সমবেত হলাম। তেহুতি আর বেকাথার সাহায্যে তিন নারী-পুরোহিত হাথোর দেবীর উদ্দেশ্যে একটি সাদা ভেড়া বলি দিল।

    দেবীর কাছে আমরা প্রার্থনা করলাম–যদি তিনি আমাদের প্রতি সদয় হোন এবং নিরাপদে সাগর পার করে দেন তাহলে আমরা তার উদ্দেশ্যে একটি উট বলি দেবো। এই মানতের পর আমরা ধাউয়ে চড়ে রওয়ানা হলাম।

    দেবী নিশ্চয়ই আমাদের প্রার্থনা শুনেছেন মিসরের দিক থেকে একটি দমকা হাওয়া পালে লেগে আমাদের নৌবহরকে দ্রুত ভাসিয়ে নিয়ে চললো। সূর্য অস্ত যাওয়ার আগেই আফ্রিকা আমাদের পেছনে ঢেউয়ের নিচে মিলিয়ে গেল।

    অন্ধকার হতেই প্রতিটি জাহাজের মাস্তুলের ডগায় একটা করে তেলের প্রদীপ জ্বালিয়ে দেওয়া হল, যাতে একে অপরকে দেখতে পারি। আকাশের তারা দেখে পথ ঠিক রেখে আমরা পুবমুখি চলতে লাগলাম। ভোর হতেই দূরে পরিষ্কার নীল আকাশের বিপরীতে আরবের তটরেখা নজরে পড়লো। সারাদিন দাঁড় বেয়ে চলার পর যখন সূর্য পশ্চিম দিগন্তের এক হাত উপরে এসে দাঁড়িয়েছে, তখন কুমিররক্ষীবাহিনীর পঞ্চাশজন সদস্য হাঁটু পানিতে নেমে ধাউগুলো টেনে সৈকতের শুকনো বালুভূমিতে নিয়ে তুললো। মেয়েরা তাদের সুন্দর ছোট ছোট পা না ভিজিয়ে এশিয়ার মাটিতে পা রাখতে পারলো। আমাদের অভ্যর্থনা জানাবার জন্য আমার পূর্বনির্দেশ মতো রাজকীয় শিবির উঁচুভূমিতে স্থাপন করা হয়েছিল।

    তবে এখানে বেশি দেরি করলাম না, কেননা প্রতিদিন প্রচুর মূল্যবান সুপেয় পানি খরচ হচ্ছিল।

    মূল কাফেলাটি আর মালপত্র বেশ কয়েকদিন আগেই চলে গেছে। ইতোমধ্যে ওরা নিশ্চয়ই একশো লিগেরও বেশি দূরত্ব পার হয়েছে। আরবভূমিতে নামার পরদিন আমরা ঘোড়া আর উটে চড়ে রওয়ানা দিলাম।

    .

    সাগর থেকে যতই দূরে এগিয়ে চললাম, ততই সূর্য মাথার উপর প্রচণ্ড তাপ ছড়াতে শুরু করলো। দূপুরের রোদে চলা খুবই কষ্টকর হয়ে দাঁড়াল। এরপর থেকে আমরা শেষ বিকেলের দিকে যখন সূর্যের তাপ কমে আসে তখন চলতে লাগলাম। সারারাত চলার পর ঘোড়া আর উটগুলোকে পানি দেওয়ার জন্য মধ্যরাতে কেবল এক ঘন্টা থামলাম। মূল কাফেলা থেকে পথের পাশে এগুলো আমাদের জন্য রেখে দেওয়া হয়েছিল। তারপর আবার ভোরে সূর্য ওঠার পর চলতে লাগলাম। এরপর যখন দুপুরের দিকে সূর্যের তাপ অসহনীয় হয়ে উঠলো, তখন আবার সেখানেই তাঁবু গেড়ে ছায়ার নিচে শুয়ে ঘামতে লাগলাম। সূর্য অস্তাচলে নামতেই আবার যাত্রা শুরু করতাম। এভাবেই চক্রাকারে চলতে লাগলো।

    পনেরো দিন আর রাত এভাবে চলার পর, শেষ পর্যন্ত মূল কাফেলার কাছে এসে পৌঁছলাম। ইতোমধ্যে চামড়ার পানির মশকগুলো অর্ধেকেরও বেশি খালি হয়ে এসেছে। শুধু তলানিতে কয়েক গ্যালন সবুজ রঙের কটু স্বাদের পানি পড়ে রয়েছে। আমি জনপ্রতি প্রতিদিন বাধ্যতামূলক চার মগ পানি বরাদ্দ করলাম।

    এবার আমরা আসল মরুভূমিতে ঢুকেছি। সামনে একের পর এক অসংখ্য বালিয়াড়ি যতদূর দেখা যায় চলে গেছে। আমাদের ঘোড়াগুলোর মধ্যে নিদারুণ যন্ত্রণার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। পিঠে খুব হালকা ভার নিলেও নরম বালিতে পা ডেবে গিয়ে ঘোড়াগুলোর চলতে খুব কষ্ট হচ্ছে। আমি ঘোড়াগুলো আরোহী মুক্ত করে অন্যান্য মুক্ত ঘোড়ার দলের সাথে কাফেলার সামনের দিকে পাঠিয়ে দিলাম। আর কয়েকটি শক্তিশালী উট বেছে নিয়ে মেয়েদেরকে আর দলের অন্যান্যদেরকে তাতে চড়তে বললাম।

    আল-নামজু আমাকে নিশ্চিত করলো সামনের পানির উৎসটি আর মাত্র কয়েকদিনের পথ। কাজেই আমি মেয়েদেরকে নিয়ে জারাস আর তার দলের লোকদের সাথে নিয়ে পানির কাছে পৌঁছাবার জন্য মূল কাফেলা ছেড়ে আগে আগে চলতে শুরু করলাম।

    আমাদেরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবার জন্য আল-নামজু তার বড় ছেলে হারুনকে সাথে দিয়েছিল। মূল কাফেলা থেকে দ্রুত এগিয়ে আমরা সারারাত চললাম, তারপর ভোরের প্রথম আলো দেখা দিতেই হারুন বিশাল একটি লাল ইট রঙা বালিয়াড়ির উপরে এসে থেমে দাঁড়াল। তারপর সামনের দিকে হাত তুলে দেখাল।

    সামনেই একটা পাহাড়ের চূড়া দেখা গেল। লম্বা লম্বা দাগযুক্ত পাহাড়টির অনুভূমিক স্তরগুলো ছিল বিভিন্ন রংয়ের, সোনালি থেকে শুরু করে চকের মতো সাদা তারপর লাল, নীল আর কালো। কয়েকটি স্তর বাতাসে ক্ষয়ে গিয়ে অন্যান্য স্তর থেকে আরও গাঢ় রং ধরেছে। এগুলো কতগুলো ঝুল বারান্দা আর গভীর দীর্ঘ গুহা তৈরি করেছে, যা দেখে মনে হচ্ছে যেন একজন উন্মাদ স্থপতি এগুলো তৈরি করেছে।

    হারুন জানাল, এর নাম ময়াগুহা। আরবি এই নামটি অনুবাদ করে আমি বুঝলাম এর নাম, পানির গুহা।

    হারুন আমাদেরকে এই খাড়া পাথুরে দেয়ালের নিচে নিয়ে গেল। একেবারে গোড়ায় এক পাশে একটা নিচু ছাদওয়ালা ফাটল চলে গেছে। একজন লম্বা মানুষ বাঁকা না হয়েও ঢুকতে পারবে, তবে একশো কদমের বেশি চওড়া আর গভীর। আর এমন অন্ধকার যে, আমি উপর থেকে দেখে বুঝতে পারলাম না এটা কতদূর পর্যন্ত চলে গেছে।

    হারুন বললো, এই গুহার নিচে পানি রয়েছে। রাজকুমারীরা আর লক্সিয়াস তাদের উটগুলোকে হাঁটু গেড়ে বসিয়ে কাঠের বাকা জিন থেকে লাফ দিয়ে নিচে নামলো। আমি ওদেরকে গুহামুখ দিয়ে ভেতরে নিয়ে চললাম। আর জারাস তার লোকজনসহ বাইরেই অপেক্ষামান থাকলো।

    আমাদের পায়ের নিচে পাথরের মেঝেটি ক্রমান্বয়ে ঢালু হয়ে নেমে গেছে, আর যতই আমরা নিচে নামলাম ততই দিনের আলো কমতে লাগলো আর বাতাস ঠাণ্ডা হয়ে এল। একসময় বাইরের সূর্যের তাপের তুলনায় তাপমাত্রা এমন কমে গেল যে আমরা কেঁপে উঠলাম।

    এবার আমি পানির গন্ধ অনুভব করলাম, আর পানি পড়ার ঝির ঝির শব্দও শুনতে পেলাম। আমার গলা পিপাসায় কাঠ হয়ে রয়েছে, ঢোক গিলতে পারছিলাম না। মুখে কোনো লালা নেই। মেয়েরা আমার হাত ধরে টেনে আমাকে নিচের দিকে নিয়ে চললো।

    সামনেই বিরাট একটা জলাধার দেখা গেল। গুহা মুখ থেকে আসা আলো পানির উপর পড়ে প্রতিবিম্ব সৃষ্টি করেছে। সেই আলোর কারণে মনে হল পানির রং একদম কালো। আর ইস্ততত না করে কাপড়চোপড় আর স্যান্ডেলসহ আমরা সবাই পানির উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। আমি হাঁটু গেড়ে বসে পানির কাছে চিবুক নামিয়ে নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পেলাম আর দেখলাম পানির রং কালো তো নয়ই বরং তেহুতিকে যে হীরাটি দিয়েছিলাম, সেই হীরার মতো টলটলে পরিষ্কার। মুখ ভরে পানি নিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিলাম।

    মেয়েরা জলাধারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমার আর ওদের পরস্পরের গায়ে পানি ছিটিয়ে উল্লাসে আর ঠাণ্ডায় চেঁচিয়ে উঠলাম। ওদের চেঁচামেচি শুনে জারাস ওর লোকজনসহ ঢালু মেঝে বেয়ে নিচে নেমে এলো। চিৎকার করে হাসতে হাসতে ওরাও অন্ধকার পানিতে নেমে পড়লো।

    পেটপুরে পানি খাওয়ার পর জারাসের লোকেরা সাথে যে পানির মশক নিয়ে এসেছিল, সেগুলো ভরে বাইরে উটের জন্য নিয়ে গেল।

    .

    হারুন হিসাব করে আমার সাথে একমত হল যে, মূল কাফেলার এখানে আসতে আরও তিনদিন লাগবে। এতে আমি খুব একটা উদ্বিগ্ন হলাম না, কেননা ক্লান্ত মেয়েরা একটু বিশ্রাম নিয়ে শক্তি সঞ্চয় করতে পারবে।

    তবে আমার আসল দুশ্চিন্তা ছিল এই জায়গাটির অরক্ষিত অবস্থানটি নিয়ে। চারপাশের একশা লিগের মধ্যে যেসব বেদুঈন গোষ্ঠি রয়েছে তাদের সবার নিশ্চয়ই এই পানির গুহার অবস্থান জানা আছে। আমাদের দলটি ছোট হলেও, সাথের পশু, অস্ত্রশস্ত্র আর বর্মগুলো বেদুঈন গোষ্ঠিদের কাছে খুবই দামী, বিশেষত দস্যুদের কাছে অবশ্যই আকর্ষণীয়। ওরা যদি জানতে পারে আমরা এই পানির গুহার কাছে রয়েছি আর আমাদের দলটি ছোট, তাহলে বেশ বিপদের সম্ভাবনা আছে। আমাদেরকে খুবই সতর্ক থাকতে হবে যেন কেউ অতর্কিতে আক্রমণ করে বসতে না পারে।

    জারাস তার লোকজনসহ পানি থেকে উঠে এলে আমি চতুর্দিকে পাহারা বসালাম।

    তারপর জারাস আর হারুনকে নিয়ে চারপাশে সম্প্রতি কোনো মানুষজনের আনাগোনা হয়েছিল কিনা তার চিহ্ন দেখতে বের হলাম।

    আমরা তিনজনেই অস্ত্র নিলাম। আমি এক কাঁধে আমার লম্বা ধনুকটি আর অন্য কাঁধে ত্রিশটি তীরভর্তি তূণ ঝুলিয়ে নিলাম। আর ডান কোমরের খাপে ব্রোঞ্জের তরবারিটাও নিলাম।

    সবচেয়ে কাছের বালিয়াড়ির মাথায় পৌঁছে আমরা আলাদা হলাম। তবে ঠিক করলাম, এক ঘন্টা পর সূর্য যখন মধ্য গগনে আসবে তখন আবার সবাই ময়াগুহায় ফিরে আসবো। জারাসকে উত্তরদিকে চক্রাকারে ঘুরে আসতে পাঠালাম। হারুন গেল উপত্যকার নিচে যে কাফেলা পথটি রয়েছে সেটা পরীক্ষা করতে। আর আমি দক্ষিণে উঁচু বালিয়াড়িগুলোর দিকে চললাম।

    চারদিক খোলা, লুকাবার কোনো জায়গা নেই। তারপরও আমি চেষ্টা করলাম এমনভাবে চলতে যাতে দূর থেকে কোনো শত্রু দেখতে না পায়।

    চারপাশের দৃশ্য দেখে আমি মুগ্ধ হলাম, রুক্ষ হলেও প্রকৃতি খুবই সুন্দর। শান্ত সাগরের বোবা ঢেউয়ের মতো একের পর অন্তহীন বালিয়াড়ি চলে গেছে। বাতাসের ঝাঁপটায় বালুর ঢেউয়ের এই চূড়াগুলো ক্ষয় হয়ে আমার চোখের সামনেই আকৃতির পরিবর্তন ঘটছে। কোনো মানুষের পায়ের ছাপ কিংবা পশুর ক্ষুরের চিহ্ন থাকলে দ্রুত মুছে যাবে।

    বেশ কিছুক্ষণ ঘুরেও সাম্প্রতিক কোনো মানুষ কিংবা পশুর আসার চিহ্ন এই অন্য জগতে দেখতে পেলাম না। হঠাৎ পায়ের কাছে চোখে পড়লো বালুর ভেতর থেকে রোদেপোড়া একটা হাড়ের টুকরা চকচক করছে। নিচু হয়ে হাড়টা বালু থেকে বের করে দেখলাম সোয়োলোর মতো একটা রাতের পাখির মাথার খুলি আর হা করা ঠোঁট। বাতাস নিশ্চয়ই অনেক দূর থেকে উড়িয়ে নিয়ে এসেছে।

    আমি আবার ঘুরে বালিয়াড়ির একপাশ দিয়ে গড়িয়ে নামলাম। নিচে নেমে ভূগর্ভস্থ পানির গুহাটির কাছাকাছি আসতেই ভেতর থেকে মেয়েলি গলার হাসাহাসির চিৎকার শুনতে পেলাম।

    জারাস আমার আগেই ফিরে এসেছে। সে আর তার লোকজন উটের পিঠ থেকে নেমে পশুগুলোকে গুহামুখের কাছেই প্রাকৃতিক ঝুলবারান্দার নিচে ছায়ায় বেঁধে রাখলো। তারপর ওরা উটগুলোকে দানাপানি দিতে শুরু করলো। আমি জারাসকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম,

    কিছু পেলে?

    না, কিছুই নেই।

    হারুণ কোথায়? সে এখনও ফেরেনি?

    সে উত্তর দিল, এখনও আসেনি। শিঘ্রই হয়তো এসে যাবে। আমি গুহামুখটার কাছে দাঁড়িয়ে একটু ইতস্তত করলাম। সবকিছু একেবারে স্বাভাবিক আর মনে হচ্ছে ঠিক আছে। তারপরও বুঝতে পারলাম না কী কারণে আমার মন অস্থির হয়ে উঠেছে, আর কোনোমতেই এই উদ্বেগের ভাবনাটা মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছিলাম না।

    গুহায় না ঢুকে পাহাড়ের একপাশ দিয়ে ঘুরে বিপরীত দিকে চললাম। গুহা মুখের কাছ থেকে সরে আমি পেছন দিকে এমন একটা জায়গায় এলাম যেখানে খাড়া পাহাড়ের গায়ে আরেকটি ফাটল দেখা গেল। এই ফাটলটা আগে দেখিনি। এক মুহূর্ত এটা পরীক্ষা করে ভাবলাম পাহাড়ের চূড়ায় উঠে দেখা যাক অন্য পাশে কী আছে। হাত বাড়িয়ে সামনে পাহাড়ের গায়ে হাত রাখলাম।

    সূর্যের তাপে পাহাড়ের পাথর এতো গরম হয়ে রয়েছে যে, মনে হল জ্বলন্ত কয়লার উপর হাত রেখেছি। তাড়াতাড়ি ছ্যাকা লাগা হাতটা সরিয়ে নিতেই হাত থেকে পাখির মাথার খুলিটা নিচে পড়ে গেল। ছ্যাকা লাগা আঙুলটা চুষতে চুষতে পাখির মাথার খুলিটা নেবার জন্য হাত বাড়িয়েই থেমে গেলাম।

    একটা পায়ের ছাপ, তবে আমার মেয়েদের কারও পায়ের ছাপ নয়। মসৃণ চামড়ার তলিওয়ালা স্যান্ডেল পরা একজন বড় পুরুষ মানুষের পায়ের ছাপ। এখনও পেছন থেকে মেয়েলি গলার আওয়াজ আর হাসিঠাট্টা আর জারাস আর তার লোকজনের কথা বলার অস্পষ্ট শব্দ শোনা যাচ্ছে। ঘুরে দাঁড়িয়ে এমন একটি জায়গায় দাঁড়ালাম, যেখান থেকে গুহামুখের সামনে দাঁড়ান আমাদের লোকদের দেখা যায়। এক ঝলক তাকিয়েই যা জানতে চেয়েছিলাম, তা নিশ্চিত হলাম। আমাদের সব লোকেরা সামরিক বিধিসম্মত পিতলের গজালখচিত তলিওয়ালা স্যান্ডেল পরে রয়েছে।

    তার মানে আমাদের মাঝে একজন আগন্তুক রয়েছে।

    আমার পরবর্তী চিন্তা হল মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে। ঘাড় ফিরিয়ে গুহার ভেতর থেকে মেয়েদের কথা বলার আওয়াজ শুনতে চেষ্টা করলাম। দুটো কণ্ঠ সাথে সাথে চেনা গেল, তবে তৃতীয়টি চিনতে পারলাম না। লোকদেরকে কিছু বুঝতে না দিয়ে ওদের পাশ কাটিয়ে গুহায় ঢুকলাম। পিছল পাথরের মেঝে বেয়ে দ্রুত জলাধারের কাছে পৌঁছলাম। অন্ধকার সয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটু অপেক্ষা করে তাকিয়ে দুটো মেয়ের ফ্যাকাশে রমণীয় শরীর আবছা দেখতে পেলাম। ওরা পানি নিয়ে খেলছে। তবে শুধু দুজনকে দেখা গেল।

    আমি চিৎকার করে উঠলাম, বেকাথা! তেহুতি কোথায়?

    পানি থেকে মাথা তুলে সে বললো, সে শেঠ দেবতার কাছে অর্ঘ্য দিতে গিয়েছে, তাতা! লাল-সোনালি চুলগুলো তার মুখে লেপ্টে রয়েছে।

    দৈহিক নিত্যকার ক্রিয়াকর্ম অর্থাৎ মলমুত্র ত্যাগ করার কথা বলতে গিয়ে ওরা এ-ধরনের মেয়েলি ভাষা ব্যবহার করতো।

    কোন দিকে গিয়েছে?

    আমি দেখিনি। সে শুধু জানাল সে এটা করতে বাইরে যাচ্ছে।

    তেহুতি একটু খুঁতখুঁতে স্বভাবের মেয়ে। আমি জানি এ-ধরনের শারীরিক ক্রিয়াকর্ম করার জন্য সে গোপন জায়গায় যাবে। এজন্য নিশ্চয়ই তার গুহার ভেতরে থাকার কথা নয়। নিশ্চয়ই বাইরে মরুভূমিতে গিয়েছে। আমি গুহামুখের কাছে ছুটে গেলাম। জারাস তার লোকজনসহ গুহামুখের বামদিকে জটলাবেঁধে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বাইরে পৌঁছেই আমি চিৎকার করে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, রাজকুমারী তেহুতিকে গুহা থেকে বের হতে দেখেছ?

    না, প্রভু।

    আর কেউ দেখেছে? তোমরা কেউ তাকে দেখেছ? সবাই মাথা নাড়লো।

    তেহুতি হয়তো ওদেরকে এড়িয়ে গেছে, মনে মনে ভাবলাম। ঘুরে পেছন দিকে যেখানে নতুন পায়ের ছাপটা দেখেছিলাম সেদিকে ছুটলাম।

    মিনতিভরে দেবতার কাছে প্রার্থনা করলাম, হে হোরাস, দয়া কর আমাকে! তারপর মনপ্রাণ দিয়ে দেবতার কাছে প্রার্থনা করতে শুরু করলাম, আমার চোখ খুলে দাও, হে হোরাস। আমাকে দেখিয়ে দাও। হে আমার প্রিয় দেবতা, আমাকে দেখতে দাও!

    কয়েকটি মুহূর্ত শক্ত করে চোখ বন্ধ করে রইলাম। তারপর যখন চোখ খুললাম, আমার দৃষ্টিশক্তি উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। মহান দেবতা হোরাস আমার প্রার্থনা শুনেছেন। আমি আমার অন্তর্চক্ষু দিয়ে দেখতে লাগলাম। চারপাশের রঙ আরও পরিষ্কার হল, আকৃতিগুলো আরও ধারালো হয়ে উঠলো।

    পাহাড়ের দেয়ালের নিচের দিকে তাকিয়েই আমি তাকে দেখতে পেলাম। এটা তেহুতি নয়, তবে একটু আগে যেখানে সে ছিল এটা তার স্মৃতি। অনেকটা তার নিজের প্রতিধ্বনি কিংবা ছায়া। উজ্জ্বলতার পাশে একটু ময়লা দাগ, ধরা-ছোঁয়া যায় না এমন একটি ছোট মেঘ। এমনকি একজন মানুষের আকৃতিও নয়, কিন্তু আমি জানি এটা সে। নেচে নেচে দূরে চলে যাচ্ছে।

    হঠাৎ আমার মনে হল তাকে কেউ তাড়া করছে, আর সে বিপদ থেকে বাঁচার জন্য চেষ্টা করছে। আমার বুকের মাঝে তার আতঙ্ক আমি অনুভব করতে পারলাম।

    গর্জে উঠলাম, জারাস, অস্ত্র হাতে নাও! পাঁচজনকে বেকাথা আর লক্সিয়াসের পাহারায় রেখে বাকিদের নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে আমার পিছু পিছু এস!

    জানি জারাস আমার কথা শুনেছে, তাই আর পেছন দিকে না তাকিয়ে সোজা তেহুতির যে ছায়া অনুভব করেছিলাম, সেদিকে ছুটলাম।

    হঠাৎ আমার দুই পায়ে যেন পাখনা গজাল। আমি দ্রুত থেকে দ্রুততর বেগে ছুটতে লাগলাম। কিন্তু ছোট্ট মেঘটিও আমার দৌড়ের সাথে পাল্লা দিয়ে আমাকে এর পথে গ্রাস করে নিয়ে চলেছে। হঠাৎ সামনে যেখানে রেখাঙ্কিত দেয়ালটা ঘুরেছে সেখানে এটা অদৃশ্য হয়ে গেল।

    উজ্জ্বল দীপ্তিটা আমার চোখ থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল। আমার পা ভারী হয়ে চলার গতি কমে এলো। যে জায়গাটি থেকে সে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল খুব চেষ্টা করে সেখানে পৌঁছলাম। সেখানে পৌঁছেই দম নিতে লাগলাম।

    পাগলের মতো চারপাশে তাকিয়ে কিছুই দেখতে পেলাম না।

    তারপর নিচে মাটির দিকে তাকাতেই বালুর উপর তার খালি পায়ের ছাপ চোখে পড়লো। দেয়ালঘেরা জায়গায় বাতাস পায়ের ছাপটি উড়িয়ে নিতে পারেনি। ছাপটা অনুসরণ করে সামনে তাকাতেই দেখলাম আরেকটু সামনে এগিয়েই ছাপটা আবার মুছে গেছে, তবে এবার বাতাসে মুছে যায় নি। বালুর উপর পুরুষ মানুষের স্যান্ডেলের মসৃণ তলির একাধিক ছাপ তার উপর পড়ে ছাপটা মুছেছে। বুঝা গেল না কতজন লোক, তবে মনে হল ১০/১২ জনেরও বেশি। এটা পরিষ্কার যে, এই লোকগুলো তেহুতিকে তাড়া করছে। যখন ওরা তাকে ধরবার চেষ্টা করেছিল, তখন সে নিশ্চয়ই লড়াই করেছিল। রেগে গেলে তেহুতি বন্য বেড়ালির মতো হয়ে যায়, তবে শেষ পর্যন্ত ওরা নিশ্চয়ই তাকে কাবু করে ফেলেছিল।

    তাকে টেনে পাহাড়ের এই প্রান্ত পর্যন্ত নিয়ে আসে। এখানে পাহাড়ের চূড়ার গায়ে আরেকটা ফাটল দেখা গেল, তবে এটা আগেরটার মতো বেশি চওড়া কিংবা এতো খাড়াও নয়।

    এটা অনেকটা একটা সিঁড়ির মতো, চিমনির মতো নয়। আমি সহজেই এটা বেয়ে উঠতে পারবো, তবে চূড়ায় উঠতে হলে উটের অন্য পথ খুঁজতে হবে। পেছনে তাকিয়ে দেখলাম জারাস প্রথম উটে চড়ে আমার কাছাকাছি এসে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে চিৎকার করলো, কী হয়েছে তায়তা? আমাদের কী করতে হবে?

    তেহুতিকে ধরে নিয়ে গেছে। ওরা হয়তো এখানে ওৎ পেতে ছিল। তেহুতি বাইরে ঘোরাফেরা করতেই ওরা তাকে তুলে নিয়ে যায়। তারপর উপরের দিকে চূড়ার ফাটলটার দিকে দেখিয়ে বলো, ঐখানে টেনে নিয়ে গেছে, আমাদের উটগুলো ওখানে উঠতে পারবে না।

    এরা কারা? কোথা থেকে এসেছে?

    জানি না জারাস। নিরর্থক প্রশ্ন করো না। পাহাড়ের নিচ দিয়ে গিয়ে উপরে উঠার একটা পথ খুঁজে বের করো। আমি এদিক দিয়ে সোজাসুজি ওদের পেছনে যাচ্ছি।

    আমি আমার অর্ধেক লোক আপনার পিছু পিছু পাঠাব। আর অন্যদেরকে নিয়ে বিকল্প পথ দিয়ে উপরে উঠে আপনার সাথে দেখা করবো।

    তার কথার কোনো উত্তর না দিয়ে আমি উপরে উঠতে শুরু করলাম। শুনতে পেলাম পেছনে জারাসের লোকেরা আসছে। ওরা আমার চেয়ে বয়সে তরুণ হলেও আমি ওদের আগে আগে চলতে লাগলাম।

    দেয়ালটি অর্ধেক চড়ার পর উপর থেকে মানুষের গলার আওয়াজ শোনা গেল। কয়েক সেকেন্ড থেমে শুনতে চেষ্টা করলাম। আরবি ভালো বলতে না পারলেও, কী বলছে তার সারাংশ বুঝতে পারি।

    উপরের লোকগুলো বেদুঈন, ওরা দ্রুত চলার জন্য একজন আরেকজনকে তাড়া দিচ্ছে। তারপর তেহুতির অস্ফুট অর্তনাদ শুনতে পেলাম। যে কোনো পরিস্থিতিতে এই কণ্ঠস্বর আমি চিনতে পারি। : আমি চিৎকার করে উঠলাম, তেহুতি, ভয় পেওনা! আমি আসছি, জারাসও তার লোকজনসহ আসছে।

    তার গলার আওয়াজ আমাকে তাড়না যোগাল। পূর্ণশক্তিতে আমি উপরের দিকে উঠতে শুরু করলাম। তারপর উপর থেকে ঘোড়ার জেষা ধ্বনি, মাটিতে খুরের শব্দ আর লাগামের টুংটাং শব্দ শুনতে পেলাম। লোকগুলো তাকে ঘোড়ার পিঠে চড়াচ্ছে।

    তেহুতি আবার চিৎকার করে উঠলো, তবে আরবদের চেঁচামেচিতে তার কথা বুঝা গেল না। তারপর ঘোড়ার পিঠে চাবুক মারার শব্দ শোনা গেল। ঘোড়ার ফোঁস ফোঁস নিঃশ্বাস আর নরম বালুতে খুরের থপথপ শব্দ শোনা গেল।

    বুঝতে পারলাম দস্যুরা এখানেই তাদের ঘোড়াগুলো বেঁধে রেখে গিয়েছিল। ওরা জানতে এখানে ওরা দ্রুত ফিরে আসতে পারবে, অথচ উটে চড়ে অন্য পথ দিয়ে আসতে আমাদের অনেক সময় লাগবে।

    শেষ কয়েক গজ হুমড়ি খেয়ে চললাম, তারপর চূড়ার কিনারায় পৌঁছে। একটু থেমে পরিস্থিতিটা বুঝার চেষ্টা করলাম।

    আমার সামনেই রোদে পোড়া ধূলিময় পোশাক আর মাথায় কেফায়া পরা ত্রিশ চল্লিশ জন আরব বেদুঈন দাঁড়িয়ে রয়েছে। বেশিরভাগই ইতোমধ্যে ঘোড়ায় চড়ে বসেছে আর অন্যান্যরা ছুটে চলেছে। বন্য চিৎকারে ওরা একে অন্যকে বিজয়ীর সুরে তাড়া দিচ্ছে।

    একজন দস্যু তখনও তেহুতির সাথে ধস্তাধস্তি করছিল। সে তেহুতিকে ঘোড়ার জিনের সামনে উপুড় করে শুইয়ে নিজে তার পেছনে উঠেছে। শক্তিশালী দেহের অধিকারী লোকটির কালো কোঁকড়ানো দাড়ি। শেয়াল ওরফে ডাকাত আল-হাওয়াসাঈর চেহারার যে বর্ণনা আল-নামজুর কাছ থেকে শুনেছিলাম, তার সাথে এর চেহারা বেশ মিলে যায়। তবে আমি নিশ্চিত হতে পারলাম না, এই সেই লোক কি না।

    তেহুতি দুই পা ছুঁড়ে চিৎকার করছিল, তবে লোকটি বেশ সহজেই এক হাত দিয়ে তার দুই হাত ঘোড়ার জিনের উপর চেপে রেখেছে। দেখলাম তার। পোশাক আর চুল তখনও জলাধারের পানিতে ভেজা।

    পেছনে তাকিয়ে সে চূড়ার কিনারায় আমাকে দেখতে পেল আর সাথে সাথে আশায় তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। আমি তার ঠোঁট নাড়া দেখে বুঝতে পারলাম সে আমার নাম উচ্চারণ করছে।

    তাতা! আমাকে বাঁচাও!

    মুক্ত হাতে ঘোড়ার লাগাম ধরে দস্যুটি ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে পেটে গুঁতো দিয়ে ঘোড়াটিকে পাথুরে পথের উপর দিয়ে ছুটাতে শুরু করলো। একবার পেছন ফিরে আমার দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে বিজয়ীর হাসি দিল। এখন আমি নিশ্চিত হলাম এই লোকই শেয়াল। আমার কেন জানি মনে হল সে আগে থেকে জানতো যে, আমরা ময়াগুহায় আসবো।

    তার দলটি চতুর্দিক দিক থেকে ঘিরে তাকে অনুসরণ করলো। আমি গুণতে পারলাম না ওরা কজন। এভাবে ওদেরকে চলে যেতে দেখে রাগে আমার সারা শরীর জ্বলে উঠলো।

    দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে কাঁধ থেকে লম্বা ধনুকটা নামিয়ে হাতে নিলাম। তিনটি দ্রুত প্রক্রিয়ায় ধনুকের গুণ টেনে সোজা করে তূণীর থেকে একটা তীর বের করে নেবার জন্য পেছনে হাত বাড়ালাম।

    লক্ষ বস্তুটি দ্রুত সরে যাচ্ছিল। আমি জানি আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তেহুতি আর দস্যুটি ধনুকের তীরের আওতার বাইরে চলে যাবে। বাম কাঁধ সামনে এগিয়ে লক্ষ্য স্থির করে, তীর ছোঁড়ার জন্য সঠিক ভঙ্গি নিয়ে প্রস্তুত হলাম। দিগন্তের উপরের দিকে চোখ তুলে আন্দাজ করতে চেষ্টা করলাম, তীরটি কতটুকু উঁচু করে ছুঁড়লে শেয়াল দস্যুর কাছে পৌঁছবে।

    বুঝতে পারলাম তেহুতি আর আমার মাঝে শেয়ালের দেহটি তেহুতিকে আড়াল করে রেখেছে। অর্থাৎ তার অজান্তে তীরের আঘাত থেকে বাঁচার জন্য সে তার দেহটিকে তেহুতির জন্য ঢাল করে রেখেছে। এবার আমি নির্ভয়ে তেহুতিকে আঘাত না করে তীর ছুঁড়তে পারবো। গুণ টেনে ঠোঁটে ছোঁয়ালাম। আমার বাহু আর দেহের উপরের প্রতিটি পেশি গুণটানা ধনুকের প্রচণ্ড ওজনের ভারে টান টান হয়ে রয়েছে। খুব কম লোকই আমার ধনুকটি পুরোপুরি টানতে পারে। এটা শুধু পাশবিক শক্তির বিষয় নয়। এর জন্য দরকার সুনির্দিষ্ট ভঙ্গি, সঠিক ভারসাম্য আর ধনুকের সাথে একাত্ম হওয়ার মতো অনুভূতি অর্জন করা।

    যখন আমি ধনুকের গুণ ধরে থাকা তিনটি আঙুল ছেড়ে দিলাম, এটা ঝটকা মেরে পেছন দিকে আমার বাহুর ভেতরের দিকে কেটে বসলো। সাথে সাথে ক্ষত স্থানটি থেকে রক্ত ঝরতে শুরু করলো। আমি আঘাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য চামড়ার হাতবন্ধনী লাগাবার সুযোগ পাইনি।

    কোনো ব্যথা অনুভব করলাম না। বরং উড়ে যাওয়া তীরের পিছু পিছু আমার হৃদয়ও ছুটে চললো। বুঝলাম নিখুঁতভাবে তীরটি ছুঁড়েছি। আমি জানি যে কুকুরটি তেহুতিকে অপহরণ করে নিয়ে যাচ্ছে সে এখুনি মরবে।

    তারপর হঠাৎ হতাশ হয়ে প্রচণ্ড আক্রোশে চিৎকার করে উঠলাম। লক্ষ্য করলাম লক্ষ্যবস্তুর ঠিক পেছন পেছন ছুটে চলা ঘোড়সওয়ারটি হঠাৎ লাইন থেকে সরে গেল। দেবতা হোরাস জানেন কেন সে এটা করলো, সম্ভবত পথে কোনো গর্ত এড়াবার জন্য সে এটা করেছে। কারণ যাই হোক সে আমার লক্ষ্যবস্তুকে আড়াল করে দিয়েছে। তাকিয়ে দেখলাম আমার তীরটা একটা ছো মারা বাজপাখির মতো তার পিঠের উপরের অংশে আঘাত করলো। সে পেছন দিকে মাথা ঘুরিয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠলো। হাত বাড়িয়ে তীরের ফলাটা ধরবার চেষ্টা করতে লাগলো। তবে এখনও সে আমার লক্ষ্যবস্তুকে আড়াল করে রেখেছে।

    আরেকটি তীর ছুঁড়লাম এই আশায় যে, হয়তো আহত লোকটি ঘোড়া থেকে পড়ে যাবে আর আলহাওয়াসাঈর দেহ উড়ন্ত তীরের আওতায় এসে যাবে। তবে আহত আরব লোকটি লাগাম আঁকড়ে ধরে ঘোড়ার পিঠেই বসে রইল। তারপর দ্বিতীয় তীরটি তার ঘাড়ের পেছনে আঘাত করার পর তার নিশ্চল দেহ ঘোড়ার পিঠ থেকে মাটিতে পড়ে ধূলায় গড়াগড়ি খেতে লাগলো।

    ইতোমধ্যে আল-হাওয়াসাঈ তীরের আওতার বাইরে চলে গেছে। আমি তার দিকে আরেকটি তীর ছুঁড়লাম, যদিও জানি এটা তাকে স্পর্শ করার সুযোগ পাবে না। নিজেকে আর সমস্ত অন্ধকারের দেবতাদের অভিসম্পাত করতে শুরু করলাম, যারা আল-হাওয়াসাঈকে আমার তীরের লক্ষ্য থেকে বাঁচিয়েছে। তীরটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে তার ঘোড়ার বিশ কদম পেছনে মাটিতে পড়ে গেল।

    আমার দুটো তীর বেঁধা মাটিতে পড়ে থাকা লোকটির দিকে আমি দৌড়ে গেলাম। সে মরার আগে তাকে দুএক ঘা দিয়ে তার কাছ থেকে তথ্য বের করতে হবে। কপাল ভালো থাকলে হয়তো যে লোকটি তেহুতিকে অপহরণ করেছে তার আসল পরিচয় আর কোথায় তাকে খুঁজে পাবো তা জানা যাবে।

    তবে তা হল না। আমি পৌঁছার আগেই নামহীন লোকটি মারা গেল। একটা চোখ উল্টে শুধু সাদা অংশটা দেখা যাচ্ছে, আর অন্য চোখটি প্রচণ্ড আক্রোশে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তারপরও আমি দুইতিনবার লাথি কষালাম। তারপর লোকটির পাশে বসে হাথোর, ওসিরিস আর হোরাস দেবতার কাছে আকুল প্রার্থনা করতে লাগলাম যেন, আমি পৌঁছা পর্যন্ত তেহুতি নিরাপদ থাকে।

    দেবতাদের বিষয়ে যে জিনিসটা আমি অপছন্দ করি তা হল যখন তাদের খুব প্রয়াজন হয় তখন তাদেরকে হাতের কাছে পাওয়া যায় না।

    সেখানে বসে জারাসের জন্য অপেক্ষা করতে করতে মৃত দস্যুটির দেহ থেকে আমার তীরটি কেটে বের করলাম। পুরো মিসরে আমার তীরের ফলার মতো আর কোনটি নেই।

    .

    প্রায় এক ঘন্টা পর জারাস পৌঁছল। বেদুঈন দস্যুদলটি ইতোমধ্যে দিগন্তের ওপারে অদৃশ্য হয়ে গেছে। সাধারণত যে কোনো বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে আমি আমার আবেগ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি। এটা বলতে আমি বুঝাচ্ছি কোনো শহরকে ধ্বংস করা, শত্রু সেনাদলকে নিশ্চিহ্ন করা এ-ধরনের পরিস্থিতি ইত্যাদি। তবে তেহুতিকে হারিয়ে আমি ভীষণভাবে রেগে রয়েছি, আমার সারা শরীর কাঁপছিল। যত দেরি হচ্ছে ততই আমার আবেগ উথলে উঠে টগবগ করে ফেটে পড়ছে।

    আমার সম্পূর্ণ রাগ জারাসের লোকদের উপর ঝাড়তে লাগলাম। ওরা ভিতু, কাপুরুষ, প্রয়োজনের সময়ে কোনো সাহায্য করতে পারলো না, এসব বলে চিৎকার করলাম।

    তারপর দূরে জারাসের উটগুলো আসতে দেখে আর দেরি না করে ছুটে তার দিকে গিয়ে চিৎকার করে তাকে দ্রুত আসতে তাগাদা দিলাম।

    সে কাছে আসতেই তিক্তকণ্ঠে তাকে তাড়াতাড়ি করতে বললাম, আবার সেও সমানভাবে চিৎকার করে তেহুতি কোথায় আছে, বেঁচে আছে কি না জানতে চাইল।

    ঠিক তখনই আমি বুঝতে পারলাম এই দুই তরুণ হৃদয়ের মাঝে যা চলছে, তা সাময়িক কোনো ধরনের মোহ নয় এটা অন্য কিছু। এটি সেই একই ধরনের আবেগ আর ভালোবাসা যা আমি তেতির মা রানি লস্ট্রিসের ক্ষেত্রে অনুভব করতাম। আমি দেখলাম তেহুতিকে হারিয়ে জারাস যে-রকম শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েছে, সে রকম আমিও এককালে তার মায়ের জন্য শোকাগ্রস্ত হয়েছিলাম।

    ঠিক সেই মুহূর্তে আমি বুঝলাম আমাদের তিনজনের জন্য এই পৃথিবী বদলে গেছে।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleশেবা – জ্যাক হিগিনস
    Next Article মাসুদ রানা ০৬৩-৬৪ – গ্রাস

    Related Articles

    কাজী আখতারউদ্দিন

    শেবা – জ্যাক হিগিনস

    July 17, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026
    Our Picks

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026

    ভুতুড়ে ট্রেন – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026

    ব্রাহ্মণ ভূত – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }