২. পরবর্তী ভূমিকা
এখন আমাদের পরবর্তী ভূমিকা পালন করার সময় হয়েছে। তামিয়াত দুর্গ থেকে ক্রিটানদের যেসব সামরিক উর্দি আর অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার করেছি, সেগুলো ডেকে এনে রাখার নির্দেশ দিলাম। তারপর হাসি তামাশার মধ্য দিয়ে আমাদের লোকেরা হাইকসো উর্দি খুলে মিনোয়ান সামরিক উর্দি পরলো। ওদের চকচকে শিরস্ত্রাণ আর কারুকাজ করা তলোয়ার থেকে শুরু করে হাঁটু পর্যন্ত লম্বা পাতলা নরম চামড়ার বুট জুতা পরলো।
আকেমি আর দিলবার উভয়ের উপর আমার কড়া নির্দেশ ছিল, ওদের লোকেরা যেন হাইকসো উর্দি আর সাজসরঞ্জামের একটা টুকরাও নদীতে ছুঁড়ে
ফেলে। স্রোতে ভাসতে ভাসতে এগুলোর কোনো একটি টুকরাও যদি তামিয়াত দুর্গের মিনোয়ান সেনাদের হাতে পড়ে তাহলে আমার সব কৌশল ফাঁস হয়ে যাবে।
ক্রিটানরা সহজেই বুঝতে পারবে কীভাবে তাদের বোকা বানানো হয়েছে। কাজেই খুলে ফেলা সমস্ত হাইকসো সামরিক উর্দি আর অন্যান্য সাজসরঞ্জাম বোঁচকা বেঁধে নিচের ডেকে লুকিয়ে রাখা হল।
পেছন থেকে অনুকুল বাতাস পেয়ে আমাদের পালগুলো ফুলে উঠেছে, সারিবদ্ধ দাঁড় চালিয়ে বেশ দ্রুত আমরা দক্ষিণদিকে ভেসে চললাম। মিনোয়ানদের এই জাহাজ তিনটি ছিল সমুদ্রের বুকে সবচেয়ে দ্রুতগামী জাহাজ। এতো মানুষ আর রূপার বিশাল ওজন সত্ত্বেও জাহাজগুলো বেশ দ্রুত চলছিল।
বদ্বীপ আর অসংখ্য শাখানদী পেছনে ফেলে শেষ পর্যন্ত আমাদের জাহাজ তিনটি মূল নদীতে চলে এলো। তিনটি জাহাজ একটি অন্যটির সাথে পাল্লা দিয়ে ভেসে চললো। এক জাহাজের নাবিকেরা অন্য জাহাজের নাবিকদের উদ্দেশ্যে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে মারতে লাগলো আর রসিকতা করতে লাগলো।
নোঙর করা মাছধরা নৌকা আর মালামাল বোঝাই ছোট ছোট নৌকার পাশ কাটিয়ে আমরা সামনে এগিয়ে চললাম। নৌকাগুলো পাশ কাটিয়ে যাবার সময় আমি উপরের ডেক থেকে নিচে নৌকাগুলো দেখতে পাচ্ছিলাম। মাঝিমাল্লাদের মধ্যে হতবাক চেহারার কয়েকটা মিসরীয় মুখ চোখে পড়লেও বেশিরভাগই ছিল হাইকসো।
এই দুই জাতির পার্থক্য আমি সহজেই ধরতে পারি। আমার মিসরীয় ভাইদের সুন্দর বুদ্ধিদীপ্ত মুখ, উঁচু কপাল, বড় বড় চোখ আর নিখুঁত চেহারা। অর্থাৎ একবার তাকালেই বুঝা যায় এরা উচ্চ জাতি।
আর হাইকসোদের মধ্যে এই ধরনের চেহারা খুব কম দেখা যায়। অবশ্য আমি শুধু শুধু পক্ষপাতিত্ব করে ওদের বিরুদ্ধাচরণ করছি না। তবে ওদেরকে ঘৃণা করার আমার অনেক কারণ আছে। ওরা সবাই চোর-ডাকাত। নিষ্ঠুরতা আর অত্যাচার করাতেই ওদের আনন্দ। ওদের নিকৃষ্টমানের আর অশ্লীল ভাষা শুনলে যেকোনো সভ্য মানুষের কানে শ্রুতিকটু মনে হবে। ওরা সবচেয়ে বিশ্রী দেবতা শেঠের পূজা করে। আমাদের দেশ দখল করে ওরা আমাদের দেশের মানুষদের ক্রীতদাস বানিয়েছে।
তবে আমার মধ্যে কোনো গোঁড়ামি নেই। যাদের তা আছে তেমন লোকদের আমি ঘৃণা করি। আসলে আমি অনেক চেষ্টা করেও হাইকসো জাতির মধ্যে প্রশংসনীয় কোনো চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাই নি। দেবতারা জানেন এটা আমার দোষ নয় যে, আমি তেমন কিছু ওদের মাঝে খুঁজে পাইনি।
এই জাতির মানুষগুলোর দিকে তাকাতে তাকাতে আমার মনে একটা ভাবনা জাগলো যে, ভবিষ্যতে কোনো এক সময় ওদের প্রতি আমার বিরাগ ভাবটি আরও সঠিক আর দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রকাশ করাটাই সঠিক হবে। কিছু একটা করে ওদেরকে এমন শিক্ষা দিতে হবে যাতে রাজা বিওনও বুঝতে পারবে কাজটা সঠিক হয়েছে।
সেই দিনটি হবে সকল মিসরীয়দের জন্য একটি খুশির দিন। কথাটা ভাবতেই আমার ঠোঁটে মৃদু হাসি খেলে গেল। চিন্তাটায় আরেকটু শান দিয়ে ভাবলাম আর দেরি করে লাভ কি? পুরো পরিকল্পনার ছকটা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমার মনে ভেসে উঠলো।
নিচের ডেকে ক্যাপ্টেনের কেবিনে একটা লেখার টেবিল আর কিছু পাকানো প্যাপিরাস কাগজ দেখেছিলাম। ক্রিটানরা শিক্ষিত জাতি। ওরা কীলককার হস্তলিপি পদ্ধতি ব্যবহার করে যা সুমেরিয়দের সাথে মিলে না। এই সঙ্কেতগুলো আমি পড়তে আর চিনতে পারলেও সেসময়ে মিনোয়ানদের ভাষার সাথে পরিচিত ছিলাম না।
জানা কথা হাইকসোরা পুরোপুরি অশিক্ষিত। তবে আমার গুপ্তচরেরা আমাকে জানিয়েছিল ওরা কয়েকজন মিসরীয় লেখককে বন্দী করে ক্রীতদাস বানিয়ে, তাদেরকে দিয়ে আমাদের লিপি পড়ে, লিখে আর অনুবাদ করিয়েছে।
আমি আরও জেনেছি ওরা এই লিপিকারদের কাছ থেকেই শিখেছে, কীভাবে পাখির সাহায্যে অনেক দূরে বার্তা পাঠানো যায়। বানরের মতো হাইকলোরাও নকল করতে পটু। কোনো উদ্ভাবনী চিন্তা দিয়ে ওরা কোনো সমস্যার সমাধান করতে পারে না। অন্য লোকের মহৎ ভাবনাকে ওরা নিজেদের বলে চালিয়ে দেয়।
জারাসের সাথে কথা শেষ করে আমি দ্রুত মূল ডেকের নিচে কেবিনে গেলাম। লেখার সরঞ্জামগুলো আমি যেখানে দেখে গিয়েছিলাম সেখানেই রয়েছে। সুন্দর কারুকাজ করা একটা কাসকেটের মধ্যে এগুলো রাখা ছিল। কাসকেটের উপরে আইবিস পাখির মাথাওয়ালা লেখার দেবতা থথের একটা ছোট চিত্র আঁকা রয়েছে।
আমি ডেকে আসন গেড়ে বসে লেখার বাক্সটা খুললাম। খুশি হয়ে দেখলাম, ভেতরে বিভিন্ন আকারের প্যাপিরাস কাগজ ছাড়াও বেশ কয়েকটি তুলি আর কালির ব্লক রয়েছে। এছাড়া ঘোড়ার কেশর বুনে তৈরি করা চারটে ছোট ছোট গুটলিও বাক্সটায় রয়েছে। খাওয়ার জন্য আমরা যে-ধরনের সাধারণ কবুতর পালন করি তার পায়ে এই গুটলিগুলো বাঁধা যায়। এই কবুতরগুলোর আশ্চর্য ধরনের একটি অভ্যাস আছে, যে-জায়গায় ওরা ডিম ফুটে বের হয় সেখানে ওরা ফিরে যেতে পারে। আর পায়ে ছোট্ট বার্তাবহনকারী গুটলি বেঁধে দিলে তাও বহন করে নিয়ে যায়।
আমি দ্রুত হাতে কবুতরের পায়ের বার্তাবহনকারী গুটলিতে বাধার মত ছোট একটা প্যাপিরাসের টুকরা নিলাম। তারপর একটা সরু তুলি আর লেখার কালি গুড়া করে নিলাম।
লেখার বিষয়টিবস্তু আমার মনেই ছিল, তাই নতুন করে ভাবনা চিন্তা করার দরকার পড়েনি। খুব ছোট ছোট অক্ষরে পরিষ্কার লেখার হাত ছিল আমার।
শুরু করলাম যথারীতি সম্ভাষণ দিয়ে, উচ্চ ও নিচের মিসরের ফারাও হে, মহাপরাক্রমশালী বিওন। যদিও সে এই ধরনের কিছু নয়, তবুও এই ধরনের পদমর্যাদার প্রতীক সে পছন্দ করে। আমি, ক্রিটের সর্বাধিরাজ মিনোজ আপনাকে সম্ভাষণ জানাচ্ছি। আমাদের বন্ধুত্বের নিদর্শন স্বরূপ আমি মহামান্যের জন্য রূপাভর্তি তিনটি বিশাল জাহাজ পাঠাচ্ছি। এপিফি মাসের দ্বিতীয় দিনে নীল নদের বদ্বীপে তামিয়াতে আমার ঘাঁটি থেকে জাহাজগুলো রওয়ানা দেবে। আশা করি একই মাসের পঞ্চম দিনে মেমফিসে আপনার রাজধানীতে এগুলো পৌঁছে যাবে। এই ঘটনার খবর আপনার নজরে আসার আগে যাতে কোনো দুষ্ট লোকের হাতে না পড়ে সেজন্য শেষ মুহূর্তে খবরটি বিলম্বিত করা হয়েছে। আমার বিশ্বাস যে সম্মান প্রদর্শন করে এই উপহারসামগ্রীগুলো আপনার বরাবর পাঠানো হয়েছে, তা আপনি যথাযথ আগ্রহের মনোভাব নিয়ে গ্রহণ করবেন।
কালি শুকাবার সাথে সাথে কাগজটা পাকিয়ে কবুতরের পায়ে বাঁধার গুটলিতে রেখে এরাবিক আঠা দিয়ে সিল করলাম। তারপর কেবিন থেকে বের হয়ে নিচের ডেকে নেমে মালামাল রাখার খোলের দরজায় কাছে গেলাম।
জারাস লাথি মেরে দরজার তালা ভেঙে ফেলার পর আর মেরামত করা হয়নি। হাতে ঠেলতেই দরজাটা খুলে গেল। পেছন ফিরে দরজাটা বন্ধ করলাম। যে সিন্দুকটা খুলে ভেতরের মালামাল দেখছিলাম, সেটার ডালা তখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। আমার ড্যাগার দিয়ে চাড় দিয়ে ডালাটা খুললাম। তারপর সিন্দুকটার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে ভেতর থেকে একটা রূপার বাঁট বের করলাম। ভারি বঁটটা আমার কোমরবন্ধের সাথে বাঁধা ছোট থলের ভেতরে ঢুকিয়ে রাখলাম। তারপর উপরে ডেকে গিয়ে জারাসের পাশে আমার জায়গায় পৌঁছলাম। চুপিচুপি তার সাথে কথা বললাম যাতে কেউ না শুনতে পারে।
এক ঘন্টার মধ্যেই আমরা কুনটুস নদীবন্দরে পৌঁছে যাবো। সেখানে বিওনের শুল্ক ফাঁড়ির লোকেরা চলাচলকারী সমস্ত জাহাজ থেকে শুল্ক আদায় করে…
জারাস আমার কথা থামিয়ে দিয়ে বললো, এসব নিয়ে আপনি চিন্তা করবেন না প্রভু তায়তা। আমাদের ওরা দেরি করাতে পারবে না। আমরা মশা তাড়াবার মতো ওদেরকে তাড়িয়ে দেব…
না, জারাস। তুমি তোমার বৈঠা আর পাল গুটিয়ে রাখবে। আর শুল্কদপ্তরের নৌকা কাছে আসতে স্বাগত জানাবে। ওরা কাছে এলে যথাযথ সম্মান দেখাবে। শুল্ক কর্তাকে বায়না দিয়ে রাখতে হবে। কেননা তার সহযোগিতা প্রয়োজন পড়বে। তারপর জারাসকে কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে আমি জাহাজের অন্যপাশে সরে গেলাম। আসলে আমি নিজেও নিশ্চিত নই কুনটুসে পৌঁছার পর কী হতে পারে।
নদীতে ভাসমান সমস্ত নৌকা পাশ কাটিয়ে আমরা দ্রুত এগিয়ে চললাম। এই নীল নদীর বুকে আমরাই সবচেয়ে দ্রুতগামি জলযান ছিলাম। আশেপাশের সমস্ত নৌকা আমাদের জন্য পথ ছেড়ে দিয়ে সরে পড়লো। ওরা কেউ জানেনা আমরা কে, তারপরও তখনকার অস্থিতিশীল অবস্থায় যে কোনো শান্তিপ্রিয় মানুষ কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে চাইবে না।
নদীর আরেকটা চওড়া বাঁক পেরোতেই সামনে পূর্বদিকের তীরে কুনটুস নদীবন্দর দেখা গেল। শহরের উপরে একটা পাহাড়ে উঁচু পাথরের পাহারা একটা চৌকি টাওয়ার দেখেই আমি চিনতে পারলাম। টাওয়ারের মাথায় বড় এটা কালো পতাকা উড়ছে। এটা হচ্ছে শুল্কদপ্তরের প্রতীক। আমি জানি টাওয়ারের উপরে নজরদারি লোক থাকবে লক্ষ্য রাখতে যেন কোনো জলযান শুল্ক না দিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে না পারে।
আমরা বন্দরের কাছাকাছি হতেই বন্দরের পাথরের জেটি থেকে কালো পতাকা উড়িয়ে একটা শুল্ক নৌকা আমাদের পথ আটকাতে এগিয়ে এলো। আমি জারাসকে নির্দেশ দিলাম পাল আর বৈঠা গুটিয়ে নিচে নামিয়ে রাখতে যাতে ওরা আমাদের কাছে পৌঁছতে পারে। শুল্ক নৌকার ডেকে ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কয়েকজন হাইকসো সেনা দাঁড়িয়েছিল। নৌকাটা জাহাজের কাছে ভিড়তেই জারাস একপাশে ঝুঁকে চিৎকার করে ওদের একজনের সাথে আলাপ শুরু করে জানতে পারলো, লোকটার নাম গ্রাল–সে প্রাদেশিক শুল্ক কর্মকর্তা।
আলাপচারিতা হাইকসো ভাষায় হতে দেখে আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। গ্রাল নামে এই লোকটি মিনোয়ান ভাষায় কথা বললে, আমরা কীভাবে ওদেরকে বুঝাতাম যে একটি মিনোয়ান জাহাজে কেন কেউ তাদের ভাষায় কথা বলতে পারছে না। ঠিক তখনই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম প্রথম সুযোগেই এই ভাষা শিখে নেবো। বিদেশি ভাষা শেখার ব্যাপারে আমার বিশেষ দক্ষতা রয়েছে। আমি স্থির নিশ্চিত যে, কয়েকমাসের মধ্যেই ক্রিটের অধিবাসীদের মতোই ওদের ভাষায় আমি কথা বলতে পারবো।
শুল্ক নৌকার ডেক থেকে রাজা বিওনের নামে গ্রাল দাবি করলো, তাকে যেন আমাদের জাহাজে উঠার অনুমতি দেওয়া হয়। আমার শেখা মতো জারাস কোনো আপত্তি না করে নাবিকদের নির্দেশ দিল একটা দড়ির মই নামিয়ে দিতে যাতে গ্রাল জাহাজে উঠতে পারে। ছোটখাট লোকটি একটা বানরের মতো ক্ষিপ্রগতিতে দড়ির মই বেয়ে উঠতে লাগলো।
জারাসকে সে জিজ্ঞেস করলো, আপনিই কি এই জাহাজের ক্যাপ্টেন? আমার দায়িত্ব আপনাদের মালামালের তালিকা পরীক্ষা করা।
জারাস সম্মতি জানিয়ে বললো, অবশ্যই স্যার। তবে এর আগে দয়া করে আমার কেবিনে এসে আমাদের চমৎকার মিনোয়ান ওয়াইনের স্বাদ নিন, তারপর আপনার কাজ শুরু করুন। তারপর সে বন্ধুসুলভভাবে ছোটখাট লোকটির বাহু ধরে তাকে সিঁড়ি বেয়ে নিচে মাস্টারের কেবিনে নিয়ে চললো।
এ পর্যন্ত আমি নিজেকে ওদের কাছ থেকে আড়ালে রেখেছিলাম। নিচে কেবিনের দরজা বন্ধ হওয়ার জোরে শব্দ পাওয়ার পর আমি সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলাম।
জারাস আর আমি এই সাক্ষাতকারের ব্যাপারে আগেই পরিকল্পনা করেছিলাম। কেবিনের দেয়ালে একটা ছিদ্র করেছিলাম, যাতে ভেতরে কী কথাবার্তা হয় তা দেখা আর শোনা যায়। এখন দেখলাম আমার উঁকি দেবার ছিদ্রটার দিকে মুখ করে জারাস লোকটিকে বসিয়েছে। লোকটির সারা মুখে আঁচিল। জারাসের দেওয়া ওয়াইন মুখ ভরে পান শুরু করতেই তার গলা এমনভাবে ফুলে গেল যেন একটি বিশাল ব্যাঙ তার প্রিয় খাবার, জল-ইঁদুর গিলে খাচ্ছে। এই দৃশ্যটি দেখে আমি হতবাক হয়ে গেলাম।
জারাস অত্যন্ত ভদ্রতা দেখিয়ে তাকে বললো, আপনি নিশ্চয়ই জানেন রাজা বিওন আমাদের জাহাজের চলাচলের জন্য শুল্ক মওকুফ করেছেন।
গ্রাল তার মদের গ্লাস নামিয়ে বললো, সেটা আমি বিবেচনা করবো, ক্যাপ্টেন। তবে সেক্ষেত্রেও আমি আমার খরচ দাবি করবো। তারপর একটা ধূর্ত হাসি দিয়ে বললো, অবশ্য পরিমাণটা নগণ্য, এব্যাপারে আমি আপনাকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি।
জারাস ঘাড় নেড়ে সায় দিয়ে বললো, অবশ্যই। আমাদের সকলকে বাঁচতে হবে। তবে আপনার সাথে একান্তে আলাপ করার সুযোগ পেয়ে আমি সত্যি কৃতজ্ঞ। আমাদের আসার খবর দিয়ে মেমফিসে রাজা বিওনের কাছে আমার একটা বার্তা পাঠানো দরকার। তাকে জানাতে হবে সর্বাধিরাজ মিনোজের কাছ থেকে আমি উপহার হিসেবে বিপুল পরিমাণে রূপার বাট নিয়ে যাচ্ছি। একথা বলে জারাস টেবিলের নিচ থেকে একটা রূপার বাঁট বের করলো। এটা আমি তাকে আগেই দিয়ে রেখেছিলাম। টেবিলের উপর বাঁটটা রেখে সে বললো, এটা তার একটা নমুনা।
গ্রাল ধীরে ধীরে হাতের মগটা টেবিলে রেখে রূপার বাটটির দিকে একদৃষ্টিতে তাকালো। তার চোখদুটো মনে হচ্ছে কোটর বের হয়ে আসছে। মুখ হা করতেই তার চোয়াল ঝুলে পড়লো। খোঁচা খোঁচা দাড়ি বেয়ে মুখ থেকে মদ চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়তে লাগলো। মনে হল সে কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। সম্ভবত জীবনে কখনও সে এ-ধরনের সম্পদ চোখে দেখেনি।
জারাস বলে চললো, এখানে কুনটুসে কি আপনার কাছে বার্তাবহনকারী কবুতর আছে? যে পাখি মেমফিসে উড়ে গিয়ে রাজা বিওনের কাছে আমার আগমন সংবাদ নিয়ে যেতে পারবে?
গ্রাল ঘোৎ ঘোৎ করে মাথা নাড়লো। তার উত্তর দেবার মতো অবস্থা ছিল না আর চকচকে রূপারপিণ্ডটি থেকে সে চোখও সরাতে পারছিল না।
জারাস রূপারপিণ্ডটি আরেকটু তার দিকে ঠেলে দিয়ে বললো, এই পিণ্ডরূপাটিকে আপনার অমূল্য সেবার পারিশ্রমিক হিসেবে ধরে নিতে পারেন। আমাদের মহান দুই জাতির মধ্যে যে মতৈক্য রয়েছে এটা তার একটি নিদর্শন। তারপর সে আমার পত্রসহ পায়রার পায়ে বাধার গুটলিটা পিণ্ডরূপার পাশে রাখলো। এই বার্তাটি দয়া করে রাজা বিওনের কাছে পাঠাবার ব্যবস্থা করুন।
একটা বড় মাকড়সার মতো হাত বাড়িয়ে সে টেবিলের উপর থেকে পিণ্ডটা তুলে নিয়ে তার দাগেভরা চামড়ার জ্যাকেটের সামনে দিয়ে ভেতরে গলিয়ে দিল, তারপর কোমরের দড়িটা কষে বাঁধলো। প্রচণ্ড আবেগে তার হাত কাঁপছিল। পিণ্ডরূপারটার কারণে জ্যাকেটের পেটের নিচের দিকটা ফুলে রইল, তবে সে এক হাত দিয়ে সেটা বুকের কাছে আঁকড়ে ধরে রইল।
টলমলে পায়ে কোনো মতে উঠে দাঁড়াল আর অন্য হাতে আমার পত্রটা নিল। জারাসের দিকে ঝুঁকে অভিবাদন করে বললো, এবার আমি বুঝতে পেরেছি মহামান্য, আপনি উচ্চপর্যায়ের রাষ্ট্রিয় কর্মকাণ্ডে জড়িত আছেন। আমার এই অনধিকার চর্চার জন্য ক্ষমা করুন। তবে এই পত্রটি আমার একটি বার্তাবহনকারী পাখির মাধ্যমে রাজা বিওনের কাছে পাঠাবার সুযোগ পেয়ে আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি। আজ সূর্যাস্তের আগেই এটি রাজার হাতে পৌঁছে যাবে। আর আপনাদের এই চমৎকার জাহাজেও আপনারা পরশুর আগে মেমফিস পৌঁছতে পারবেন না।
আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ। আসুন আপনাকে নিরাপদে আপনার নৌকায় ফিরিয়ে নিয়ে যাই। এই কথা বলে জারাস তার দিকে হাত বাড়াবার আগেই সে সিঁড়ি বেয়ে উপরের ডেকের দিকে চলতে শুরু করলো।
জারাস আর আমি লক্ষ করলাম নৌকাটা কুনটুসের দিকে চলেছে। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে দেখলাম গ্রাল তার নৌকা থেকে নেমে গ্রামের দিকে হাঁটতে শুরু করেছে। এরপর আমি জারাসকে ইশারা করতেই সে পাল তুলে বৈঠা হাতে নিয়ে মাল্লাদের দক্ষিণের পথে যাবার জন্য তৈরি হতে বললো।
আমি পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখলাম কুনটুসের দালান কোঠার মধ্য দিয়ে একজন ঘোড়সওয়ার উপরে পর্যবেক্ষণ টাওয়ারের দিকে ছুটে চলেছে। আমি চোখে হাত দিয়ে রোদ আড়াল করে দেখলাম সে টাওয়ারের নিচে অপেক্ষামান সহিসের হাতে ঘোড়ার রাশটা দিয়ে উঁচু ভবনের ভেতরে অদৃশ্য হল।
একটু পরই একই লোককে দেখা গেল ভবনের চূড়ায় প্লাটফর্মে। সে দুই হাত উপরের দিকে তুলতেই তার হাত থেকে একটা বেগুনি রঙের পায়রা ডানা পতপত করতে করতে আকাশে উড়ে গেল।
তিনবার টাওয়ারটি চক্কর দিয়ে পাখিটি দক্ষিণমুখি উড়তে শুরু করলো। উপরের দিকে দ্রুত উড়তে উড়তে নদীর মাঝখানে এল। আমাদের একটা জাহাজের ঠিক উপর দিয়ে যাওয়ার সময় আমার মনে হল এর একটি পায়ে সেই পত্রসহ গুটলির আকৃতির কিছু একটা বাঁধা রয়েছে।
.
সারাবিকেল আমরা দক্ষিণমুখি চলতে লাগলাম। তারপর পশ্চিমতীরের পাহাড়গুলোর পেছনে সূর্য ডুবে যেতেই একটা নিরাপদ জায়গায় রাতের জন্য জাহাজ নোঙর করতে জারাসকে নির্দেশ দিলাম। সে একটা বাঁক পেরিয়ে নদীর একটা অগভীর জায়গা খুঁজে নিল।
আমি জানতাম গ্রাল ঠিকই হিসেব করে বলেছিল। মেমফিস থেকে আমরা এখনও প্রায় দেড়দিনের দূরত্বে রয়েছি। নোঙরের দিকে লক্ষ্য রাখতে জারাস প্রতি জাহাজে একজন করে লোক বসাল আর রাতের আঁধারে যাতে কোনো দস্যুদল হামলা করতে না পারে সেজন্য তীরেও পাহারা বসাল।
রাতে অগ্নিকুণ্ডের চারপাশে বসে খাবার খেতে খেতে আমি আমার তিন অধিনায়কের সাথে কীভাবে আমাদের জাহাজের মাথায় স্থাপিত ব্রোঞ্জের তীক্ষ্ণ ঠোঁট দিয়ে শত্রুর একটা জাহাজ গুঁতা মেরে ফুটো করা যায়, সেই কৌশল নিয়ে আলোচনা করলাম। নৌযুদ্ধের কলাকৌশল সম্পর্কে আমার রচিত বিখ্যাত গবেষণামূলক প্রবন্ধ রচনার সময় আমি এই কৌশলটি নিয়ে গবেষণা করেছিলাম। আমি তাদেরকে বিশদ ভাবে ব্যাখ্যা করলাম, কীভাবে নিজেদের জাহাজ আর লোকজনের ক্ষতি না করে শত্রুর জাহাজের ব্যাপক ক্ষতি করা যায়। আরও বললাম, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে সংঘর্ষের আগে নিজেদের লোকদেরকে আত্মরক্ষার কৌশল শেখাতে হবে।
কোনোধরনের অঘটন ছাড়াই শান্তিতে রাত কেটে গেল। ভোরের আলো ফোঁটার আগেই আমার প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম আর ভোর হতেই নোঙ্গর তুলে পাল তুলে আবার নদীতে ভাসলাম। আগের রাতে উত্তর পূর্ব থেকে জোর বাতাস বইতে শুরু করেছিল, সেই বাতাসের তোড়ে আমাদের জাহাজ আরও দ্রুতবেগে চলতে লাগলো। আমাদের লোকদের মাঝে প্রবল উৎসাহ জেগে উঠলো। এমনকি শিকলে বাধা ক্রীতদাসেরাও ভালো খাবার আর থিবসে পৌঁছার পর মুক্তি পাওয়ার আশ্বাসে দ্বিগুণ উৎসাহে দাঁড় বাইতে লাগলো। জাহাজের হালে দাঁড়িয়ে আমিও শুনতে পেলাম ওরা গান গাইছে।
আমার মনে হল জাহাজে একমাত্র আমার মনেই আমাদের এই দুঃসাহসিক উদ্যোগের ব্যাপারে কিছু সন্দেহ ছিল। থিবস ছেড়ে আসার পর সবকিছু এত মসৃণভাবে হয়ে চলেছিল যে, সবাই ভাবতে শুরু করেছিল আমি সকল ভুলভ্রান্তির উর্ধ্বে আর ওরাও অপরাজেয়। আমি জানতাম দুটি ধারণাই মিথ্যা। এমনকি আমিও জানিনা মেমফিস পৌঁছে কি দেখবো। মনে মনে অনুতপ্ত হয়ে ভাবতে শুরু করলাম, কেন বিওনকে আমাদের আসার আগাম খবর দেওয়ার মতো দুঃসাহস দেখালাম। হয়তো এটাই ভালো হতো যদি চুপি চুপি রাতের অন্ধকারে নিঃশব্দে দাঁড় বেয়ে তার রাজধানীতে পৌঁছাতে পারতাম। জাহাজের একপাশে দাঁড়িয়ে বিষয়টা নিয়ে চিন্তায় এতো মগ্ন ছিলাম যে জারাস পাশে এসে আমার পিঠে জোরে একটা চাপড় দিতেই চমকে উঠলাম।
আপনার সম্পর্কে অনেক কিছু শুনেছি তায়তা, কিন্তু কখনও বুঝতে পারিনি যে আপনি এতো বেপরোয়া। আমি জানি আপনি ছাড়া আর কেউ এই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ দুঃসাহসিক কাজ করার কথা কল্পনাও করতে পারবে না। আপনার এই বীরত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ড উদযাপন করার জন্য আপনার একটা বীরত্ব। গাঁথা রচনা করা উচিত। আর আপনি না করলে আপনার হয়ে আমি তা করবো। এই কথাটি শেষ করে সে আবার আমার পিঠ চাপড়ালো।
এই জায়গাটা মিসরীয় এলাকা হলেও অনেক বছর আগে শত্রুরা এটা দখল করে নিয়েছিল। ছোটবেলার পর আর কখনও আমি এখানে আসিনি। তাই সবকিছু আমার কাছে অচেনা মনে হচ্ছিল, আর বাকি সবাইও তাই ভাবছিল কেবল একজন ছাড়া।
সে ছিল ছাব্বিশতম রথীবাহিনীর মিসরীয় ক্রীতদাস রহিম, যাকে আমি তামিয়াত দুর্গেই মুক্তি দিয়েছিলাম। পাঁচ বছর আগে হাইকসোরা তাকে বন্দী করেছিল আর তারপর বাকি সময়ের অর্ধেক সে শেকলে বাঁধা অবস্থায় এই এলাকায় নৌকায় দাঁড় বাইতো।
আমার আর জারাসের পাশে দাঁড়িয়ে সে আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চললো। নদীপথের প্রতিটি বাঁক আর পানির নিচে লুকানো প্রতিবন্ধকতা সে আমাদেরকে দেখিয়ে নিয়ে চললো।
রাত হতেই আবার আমরা নোঙ্গর ফেলে সেখানেই থামলাম। তবে পরদিন সূর্য উঠার সাথে সাথেই আবার পাল তুলে নীল নদী বেয়ে এগিয়ে চললাম। আজ এপিফি মাসের পঞ্চম দিন, আমাদের আসার খবর দিয়ে এদিনটির কথাই আমি বিওনকে আগাম জানিয়েছিলাম।
ঘন্টা চারেক চলার পর উঁচু দুই তীরের মধ্যে একটা সরু বাঁকের ভেতরে ঢুকলাম। এর ভেতর থেকে বের হয়ে সামনে দুই লিগ পর্যন্ত বয়ে যাওয়া শান্ত প্রণালীরপানির প্রবাহের মধ্যে চলে এলাম।
রহিম বললো, মেমফিস পৌঁছার এটাই শেষ পর্ব। নদীর বামদিকের বাকের পর সামনের দুই তীর জুড়ে মেমফিস নগর ছড়িয়ে রয়েছে।
আমি জারাসকে নির্দেশ দিলাম, জাহাজ থামাও। যারা বৈঠা বাইছে তাদেরকে বল, সামনের বাঁকে পৌঁছা পর্যন্ত বিশ্রাম নিতে আর একটু পানি খেয়ে নিতে। এরপর আমি যখন গোত্তা মারার জন্য জোরে বাইতে বলবো তখন ওরা প্রস্তুত হবে। বাকি দুটি জাহাজও আমাদের নির্দেশ অনুসরণ করলো। তিনটি জাহাজই এখন প্রণালীর মধ্য দিয়ে কেবল পালের সাহায্যে ভেসে চলেছে।
নদীতে বিভিন্ন ধরনের জলযান দেখা যাচ্ছে। ছোট ডিঙি থেকে শুরু করে চেটালো একতলা পাল-তোলা জাহাজ, চারকোণা পালের জাহাজ আর এর সাথে বাধা বড় নৌকা পর্যন্ত। এর আগে নদীতে যেসব নৌকা আমরা পাশ কাটিয়ে এসেছি, তা থেকে এদের ব্যবহারর সম্পূর্ণ অন্যরকম মনে হচ্ছে। যদিও সম্মান দেখিয়ে আমাদের পথ ছেড়ে দিচ্ছে, তবে ভয়ে পালিয়ে যাচ্ছে না। আমাদের দেখে এই নৌকাগুলোর মাঝিমাল্লারা হাত উঠিয়ে স্বাগত জানালো।
আমি জারাসকে বললাম, আমাদের আগমন ওদের কাছে প্রত্যাশিত ছিল। মনে হয় কবুতরটি ঠিকই পথ চিনে ফিরে এসেছে।
জারাস আমার দিকে হতবাক হয়ে তাকিয়ে বললো, এটাই তো আপনি পরিকল্পনা করেছিলেন তাই না? অন্য কিছু তো আপনি আশা করেননি, প্রভু? তার কথা শুনে আমি মাথা নেড়ে অন্যদিকে তাকালাম। আমি জানি অধিকাংশ মানুষের তুলনায় আমি অনেক বিচক্ষণ আর কূটবুদ্ধিসম্পন্ন, তবে বুদ্ধির চেয়ে ভাগ্য আমার কাছে পছন্দনীয়, তবে ভাগ্যদেবী খুবই চঞ্চল। কখন কাকে ছেড়ে ভাগ্যদেবী চলে যান কেউ তা জানে না।
আমি নিচে দাঁড়ীদের বসার বেঞ্চের দিকে নামলাম। ওরা সবাই আমার দিকে হাসি মুখে তাকালো। কেউ কেউ দুএকটা হাসিখুশি মন্তব্য করলো, আমিও প্রত্যুত্তরে মৃদু হাসলাম। তবে এখানে আসার মূল লক্ষ্য ছিল বেঞ্চের নিচে লুকানো ধনুকগুলোতে গুণ লাগান আছে কি না আর তূণভর্তি তীর আছে কি না তা দেখা।
পেছন দিক থেকে বয়ে আসা জোর বাতাসের তোড়ে আমরা নদীর বুক চিরে দ্রুত এগিয়ে চললাম আর এদিকে সামনের বাঁকও দ্রুত এগিয়ে আসছে। কোনো ধরনের অস্থিরতা না দেখিয়ে সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলতে বলতে আবার জাহাজের হালে আমার জায়গায় ফিরে গেলাম।
দুপাশে তাকিয়ে নিশ্চিত হলাম আকেমি আর দিলবার আমাদের জাহাজের পেছনে দুইপাশে একটা তীরের ফলার মতো আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে রয়েছে। ওরা দুজনেই হাত তুলে আমাকে সম্মান জানাল আর সংকেত দিল যে আক্রমণের জন্য ওরা প্রস্তুত রয়েছে।
বাঁকে পৌঁছার সাথে সাথেই আমি জারাসের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে নির্দেশ দিলাম, বৈঠা হাতে নাও!।
সাথে সাথে আমাদের দুই পাশে রূপালি ডানা গজাল-বৈঠার পাতলা ডগাগুলো পানির উপরে চকচক করে উঠলো।
তারপর নির্দেশ দিলাম, বাওয়া শুরু কর! বলার সাথে সাথে একসাথে সমস্ত বৈঠা পানিতে নামলো আর বৈঠা টানা শুরু হল দ্বিগুণ বেগে। ঢাক বাদকরা বৈঠা বাওয়ার তালে তালে দ্রুতলয়ে ঢাক বাজিয়ে চললো।
হঠাৎ বাঁক পার হয়ে নদীর দুই তীরে বিস্তৃত মেমফিস নগরীর মুখোমুখি হলাম। মার্বেল পাথরের দেয়াল আর সুউচ্চ দালানের ছাদ থেকে সূর্য কিরণ ঠিকরে পড়ছে।
জাঁকালো রাজপ্রাসাদ আর মন্দিরগুলো দেখে মনে হল আমাদের প্রিয় থিবসের মতোই জমকালো একটি নগরী।
নদীর উভয় তীরেই তিন থেকে চার সারি নৌযান দেখা যাচ্ছে। আর প্রতিটি নৌযানে মানুষ দেখা যাচ্ছে। বেশিরভাগ নৌযান সাদা আর লাল পতাকা দিয়ে সাজানো। আমি জানতাম এটা হচ্ছে হাইকসোদের আনন্দ আর উৎসবের প্রতীক। উৎফুল্ল জনতা পামপাতা নেড়ে আমাদের স্বাগত জানাচ্ছে। সবার কণ্ঠে উজ্জ্বলতা আর উম্মাতাল গানে ভরপুর।
তবে আমাদের জাহাজ সামনে এগোবার জন্য নীল নদীর মাঝ বরাবর জায়গাটি সম্পূর্ণ খালি রাখা হয়েছে। জলপথের শেষ মাথায় সুসজ্জিত আর রং করা বেশ কয়েকটি বজরা আর ছোট ছোট নৌকা নোঙর করা রয়েছে। আর মাঝখানে রয়েছে সবচেয়ে বড় রাজকীয় বজরা। তবে এটিও আমাদের তিন জাহাজের তুলনায় ছোট।
জনতার কোলাহলের মাঝে আমি চিৎকার করে জারাসকে বললাম, আঘাত করার জন্য আরও জোরে বৈঠা বাইতে বল। মাঝখানের লাল বজরাটি বিওনেরই, এটা লক্ষ্য করে জাহাজ চালাও।
দুইহাত তুলে আমি রেশমি কাপড়ের টুকরাটি দিয়ে চোখের নিচ পর্যন্ত মুখ ঢেকে ব্রোঞ্জের শিরস্ত্রাণটা মাথায় পরলাম। আমি পুরোপুরি নিশ্চিত হতে চাই। যেন অসতর্ক কোনো মুহূর্তে বিওনের রাজদরবারের কেউ আমাকে চিনতে না পারে।
আমাদের জাহাজের হাল ধরে রাখা দুই নাবিক জাহাজের ব্রোঞ্জের ডগাটা রাজা বিওনের রাজকীয় বজরা বরাবর লক্ষ্য স্থির করে রয়েছে। পেছনে বাকি দুই জাহাজ অর্ধেক জাহাজ দূরত্বে রয়েছে যেন আমরাই প্রথম আঘাত হানতে পারি। বাদকরা ঢাকের ছন্দ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে আর আমি অনুভব করলাম ঢাকের তালে তালে আমার হৃৎস্পন্দনও চলেছে।
আমাদের সাথে লাল বজরার দূরত্ব দ্রুত গতিতে চারশো থেকে দুইশো কদম কমে এসেছে। আমি দেখতে পেলাম বজরারি চওড়া দিকটা নদীর স্রোত বরাবর রেখে নোঙর করা। উপরের ডেকে উঁচু ধাপের একটা পিরামিডের চারপাশে তাঁবুর মতো শামিয়ানা টানানো হয়েছে। শামিয়ানার নিচে একটা সিংহাসন আর তার উপর বসা একটা মানুষের মূর্তি দেখতে পেলাম। তবে এতদূর থেকে সবকিছু পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না।
সিংহাসনের চতুর্দিকে বর্শাধারী পাইক-বরকন্দাজ দাঁড়িয়ে রয়েছে। সবাই বর্ম আর অস্ত্রসজ্জিত। তাদের শিরস্ত্রাণ আর বুকের বর্ম দেখে মনে হচ্ছে রণসাজে সজ্জিত হয়ে প্রদর্শনী করছে।
রাজকীয় বজরার দুই পাশে আরও কিছু ছোট জলযান সারিবদ্ধভাবে নোঙর করা রয়েছে। এগুলোতে বিওনের সভাসদরা ভীড় করে রয়েছে। মনে হচ্ছে কয়েকশো হবে, তবে এত গাদাগাদি করে রয়েছে যে, প্রকৃত সংখ্যা গণনা করার কোনো উপায় নেই। মেয়েরা বেশিরভাগ দীর্ঘদেহী পুরুষের পেছনে ঢাকা পড়ে গেছে। সবাই হাসিখুশিতে মত্ত আর উল্লাসে হাত নাড়ছিল। কিছু কিছু পুরুষ উৎসব উপযোগী বর্ম আর ধাতব শিরস্ত্রাণ পরে রয়েছে। আর অন্যদের পরনে বিভিন্ন ধরনের রঙিন পোশাক।
বিশাল রাজকীয় তরীর পাশেই একটি ছোট জলযানে বাদকদল বর্বর ধরনের হাইকসো সুর বাজিয়ে চলেছে। ঢোলক, বীণা, ক্লারিওনেট, পশুর শিং, তুর্য, কাঠের বাঁশি সবমিলিয়ে বেসুরো আর বিকট আওয়াজ করে চলেছে।
আমরা এতো দ্রুত রাজকীয় তরীর দিকে ছুটে চলছিলাম যে, কাছাকাছি আসার পর এখন প্রায় সবকিছু পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম। পিরামিড আকৃতির মঞ্চের উপর রঙিন শামিয়ানার নিচে পেটানো রূপার সিংহাসনে বিওন বসে রয়েছে। তার পিতা রাজা সালিটিসের মৃত্যুর পর সে এই সিংহাসন দখল করেছে।
দেখার সাথে সাথেই আমি তাকে চিনতে পারলাম। এর আগে থিবসের যুদ্ধক্ষেত্রে তাকে আমি দেখেছিলাম। সে ছিল হাইকসো সেনাবাহিনীর বামবাহু, তার অধীনে চল্লিশ হাজার পদাতিক আর তিরন্দাজ ছিল। এমন লোককে সহজে ভোলো যায় না।
বিশালদেহী লোকটির বিরাট ভূড়ি জুড়ে বিপুলায়তন সাদা আল্লাখাল্লাটা একটা তাঁবুর মতো ফুলে রয়েছে। বেণি পাকানো কালো দাড়ি লম্বা হয়ে কোমর পর্যন্ত নেমে গেছে। বেণি পাকানো দাড়িতে উজ্জ্বল রূপা আর সোনার অলংকার লাগানো রয়েছে। সে একটা উঁচু মুকুটসহ পলিশ করা রূপার শিরস্ত্রাণ পরে রয়েছে, যাতে বিভিন্ন ধরনের উজ্জ্বল রত্ন লাগানো আছে। তাকে দেখতে একজন দেবতার মতো মনে হচ্ছিল। হাইকসোদের সবকিছু ঘৃণা করলেও তার সাজসজ্জা দেখে আমিও অবাক হলাম।
রাজা বিওন একহাত উঁচু করে হাতের তালু সামনের দিকে মেলে সম্ভবত আমাদের স্বাগত কিংবা আশীর্বাদ জানাচ্ছে। সঠিক বুঝা মুশকিল, তবে সে মৃদু হাসছিল।
আমি জারাসকে সংক্ষেপে কয়েকটা শব্দে রাজকীয় বজরার সবচেয়ে দুর্বল দিকটা দেখালাম। সেটা ছিল উঁচু মঞ্চের একটু সামনে।
ঐ জায়গাটা লক্ষ্য করে আঘাত হানবে।
এখন আমরা এতো কাছে এসে পড়েছি যে, এবার দেখতে পেলাম রাজা বিওনের মুখে আর হাসি নেই। মুখ হা করাতে তার চোয়াল নিচের দিকে ঝুলে পড়েছে, বাদামি ছোপ ছোপ ময়লা সামনের দাঁত দেখা যাচ্ছে। তারপর হঠাৎ সে মুখ বন্ধ করলো। শেষ মুহূর্তে সে আমাদের বৈরী মনোভাব টের পেয়েছে। লোমশ দুই থাবা সিংহাসনের হাতলে ঠেস দিয়ে উঠতে চেষ্টা করলো। কিন্তু সে খুব ধীরে উঠছিল।
রাজকীয় তরীর দুইপাশে নৌকাগুলোর উপর ভীড় করে থাকা সভাসদরা হঠাৎ তাদের দিকে ছুটে আসা জাহাজগুলোর ধাক্কার বিপদ সম্পর্কে সচেতন হল। মেয়েদের ভয়ার্ত চিৎকার আমাদের কানে ভেসে এলো। কিছু কিছু পুরুষ বজরার কিনারায় যাওয়ার জন্য ঠেলাঠেলি করতে করতে তরবারি কোষমুক্ত করে আমাদের উদ্দেশ্যে রণহুঙ্কার দিতে শুরু করলো। যারা সামনে ছিল তারা পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়লো। তাদের এই বিশৃঙ্খল অবস্থার মাঝে পর্বতের তুষারধ্বসের মতো আমরা তাদের উপর এসে পড়লাম।
হাইকসোদের সমস্ত চিৎকার আর হট্টগোল ছাপিয়ে জারাসের নির্দেশ শোনা গেল, বৈঠা সামলাও! আমাদের জাহাজের দুইপাশের দাড়ীরা পানি থেকে বৈঠা তুলে খাড়া করে জায়গামত সামলে রাখলো যাতে জাহাজের সংঘর্ষে এগুলো ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। নদীর শেষ কয়েকগজ খোলা জায়গা আমরা একই গতিতে পার হলাম।
আমি জারাসকে যে জায়গাটা দেখিয়েছিলাম ঠিক সেই জায়গাটি লক্ষ্য করে আমরা রাজকীয় বজরায় আঘাত হানলাম। বিকট মচমচ আওয়াজ তুলে ব্রোঞ্জের বিশাল ডগাটা সামনের বজরাটির কাঠ ভেদ করে ভেতরে ঢুকে পড়লো। সংঘর্ষের সাথে সাথেই দাড়ী বেঞ্চে বসা আমাদের বেশিরভাগ লোক ডেকে ছিটকে পড়লো। আমি শক্ত কাঠের বেঞ্চ ধরে নিজেকে সামলালাম। আমার চারদিকে কী ঘটছে সব আমি দেখতে পেলাম।
লক্ষ্য করলাম আমাদের জাহাজের পুরো শক্তি আর ওজন রাজকীয় বজরার এক পাশে ছোট একটি জায়গায় কেন্দ্রিভূত হয়ে আঘাত করেছে। একটা ভারি কুড়ালের ফলা যেমন এবটি কাঠের গুঁড়ি ফেড়ে ফেলে সেরকমভাবে আমরা এটা ফেড়ে ফেললাম। আমাদের জাহাজের ডগা বজরাটি চাপা দিতেই এর হালের কয়েক টুকরা আমাদের জাহাজের সামনের অংশের নিচে তলিয়ে গেল।
আমাদের জাহাজ ওদের উপর চড়াও হতেই আমি দেখলাম, শীতকালের ঝড়ো বাতাসের তোড়ে যেমন চিনার গাছের উঁচু ডাল থেকে পাতা ঝরে পড়ে, ঠিক তেমনি হাইকসো প্রহরীদলের সদস্যরা রাজকীয় পিরামিডের সিঁড়ির ধাপ থেকে ছিটকে পড়লো। আর রাজা বিওন সবচেয়ে উঁচু থেকে পড়লো। তার বিশাল দেহজুড়ে আলখাল্লাটা ফুলে গেল আর জটপাকানো দাড়ির বেণিগুলো মুখে আছড়ে পড়তে লাগলো। শূন্যে হাত পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে সে নদীতে পড়লো। আমাদের থেকে ত্রিশ কদম সামনে সে পানিতে ভাসছিল, পানি আটকে থাকায় তার আলআল্লাটা ফুলে গিয়ে তাকে ভাসিয়ে রেখেছিল।
আমার দুই পাশে বাকি দুটি জাহাজও হাইকসোদের অন্যান্য ছোট ছোট বজরাগুলোর গায়ে ধাক্কা মেরেছে। ওরা বেশ সহজেই বজরাগুলোর কাঠ চিড়ে ফেললো, বজরার উপরের যাত্রীরা আতঙ্কে চিৎকার করে ডেক থেকে পানিতে পড়ে গেল।
রাজকীয় বজরার ভাঙা অংশগুলো আমাদের তিনতলা জাহাজের দুইপাশ দিয়ে ছড়িয়ে পড়লো। পাল ঘেঁড়ার প্রচণ্ড চড়চড় শব্দ, দড়ি ছিঁড়ে ফট ফট শব্দ, কাঠ ফেটে যাওয়ার শব্দ আর জাহাজের হালের ধাক্কায় পিষে যাওয়া মানুষের আতঙ্কিত চিৎকার শোনা যাচ্ছে। আমাদের জাহাজের ডেকও একপাশে হেলে যাওয়ায় মানুষজন আর ডেকের উপরের বিভিন্ন জিনিসপত্র একদিকে সরে গেল।
তারপর আমাদের সুন্দর জাহাজটি ভাঙা বজরার ভাঙা অংশগুলো থেকে ছাড়া পেয়ে আবার ভারসাম্য ফিরে পেল এবং পানির উপর সোজা হয়ে দাঁড়াল।
জারাস আবার চিৎকার করে উঠলো, বৈঠা হাতে নাও! আমাদের লোকেরা আবার বেঁধে রাখা বৈঠাগুলো তুলে নিয়ে বাওয়ার জন্য আংটায় বসালো। জারাস আবার বলে উঠলো, পেছনে বাইতে শুরু কর! কেবল পেছনের বেঞ্চিতে বসা দাঁড়িরা বৈঠা পানিতে পৌঁছাতে পারছিল। সামনের বেঞ্চিতে বসা দাঁড়িরা রাজকীয় বজরার ভাঙা অংশগুলোর কারণে দাঁড় বাইতে পারছিল না।
যারা দাঁড় বাইতে পারছিল, তারা জোরে জোরে কয়েকবার বৈঠা চালিয়ে আমাদেরকে আটকে থাকা ভাঙা বজরার অংশ থেকে ছাড়িয়ে আনলো। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ভাঙা টুকরাগুলো পানিতে তলিয়ে গেল।
আমি অন্য তিনতলা জাহাজ দুটোর দিকে তাকালাম। দিলবার আর আকেমি তাদের অধীনস্থ লোকদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে নির্দেশ দিচ্ছিল। ওদের জাহাজের নাবিকরাও ঢাক পেটানোর তালে তালে দ্রুত বৈঠা চালিয়ে জাহাজদুটোকে জায়গামত ফিরিয়ে নিয়ে আসছিল।
নদীর পানিতে হাবুডুবু খেতে থাকা মানুষের মাথা দেখা যাচ্ছে, বাঁচার জন্য আপ্রাণ চেষ্টারত মানুষ আর ভাঙা টুকরায় নদী ভরে রয়েছে। ডুবন্ত নারী পুরুষের মরণপণ চিৎকার আর আর্তনাদ চারপাশে এক করুণ পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
দীর্ঘ এক মিনিট আতঙ্কিত হয়ে আমি এই বিভিষিকাময় হত্যাযজ্ঞ লক্ষ্য করলাম। অপরাধবোধ আর অনুতাপে আমি প্রায় বিধ্বস্ত হয়ে পড়ছিলাম। বিপর্যস্ত এই প্রাণীগুলোর দিকে শুধু হাইকসো পশু মনে করে আর তাদের দিকে তাকাতে পারছিলাম না। এরাও মানুষ, যারা নিজেদের জীবন বাঁচাবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে।
তারপর রাজা বিওনের দিকে নজর পড়ার সাথে সাথেই আমার এই অনুভূতি বদলে গেল। মনে পড়ে গেল নাকুয়াদার যুদ্ধে হাইকসো পশুরা যখন আমাদের চমৎকার আর সাহসী দুইশো তিরন্দাজকে বন্দী করেছিল তখন বিওন তাদের সাথে কী আচরণ করেছিল। যুদ্ধক্ষেত্রের উপরে শেঠ দেবতার মন্দিরের ভেতরে ওদেরকে আটকে রেখে জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে সেই দানবীয় দেবতার উদ্দেশ্যে অর্ঘ্য নিবেদন করেছিল।
এখন বিওন রাজকীয় বজরার একটা কাঠের তক্তা একহাতে ধরে রেখেছে আর অন্য হাতে তার রত্নখচিত তলোয়ার নিয়ে তার হেরেমের যে সব নারী কাঠের টুকরাটিতে আশ্রয় নিতে চেষ্টা করছিল তাদের মাথায় কোপ মারছিল। নির্দয়ভাবে সে তাদেরকে তাড়াচ্ছিল, কাউকেই সেই কাঠের খণ্ডটি ধরে ভেসে থাকার সুযোগ দিতে রাজি নয়। আমি লক্ষ্য করলাম সে আমার আদরের বেকাথার সমবয়সি একটি শিশুর মতো মেয়ের উপর তলোয়ার দিয়ে আঘাত করলো। তলোয়ারের ধারাল ফলার আঘাতে পাকা ডালিমের মতো মেয়েটির মাথা কেটে গেল। দরদর রক্ত ঝরতে লাগলো, তারপরও বিওন অশ্লীল ভাষায় মেয়েটিকে গালি দিয়ে আবার তলোয়ার দিয়ে কোপ মারলো।
আমি দ্রুত নিচু হয়ে সামনের বেঞ্চির নিচে রাখা গুন লাগান ধনুকটি তুলে নিলাম। তীরগুলো তূণ থেকে মাটিতে ছড়িয়ে পড়েছিল, একটা তীর নিয়ে ধনুকের ছিলায় লাগিয়ে ছিলাটা টেনে টান টান করলাম, তারপর সোজা হয়ে পূর্ণশক্তিতে তীর ছুঁড়লাম। যেকোনো নিপুণ তিরন্দাজের মতো ধনুকের ছিলা আমার ঠোঁট ছুঁতেই সেটা ঢিল করে দিতাম। কিন্তু আজ প্রচণ্ড রাগে আমার হাত কাঁপছিল, তাই তীরটা ছুঁড়ার সময় বাঁকা হয়ে ছুটলো।
লক্ষভ্রষ্ট হয়ে তীরটা বিওনের গলার বদলে কাঠের টুকরাটা ধরে রাখা হাতে বিধলো।
জারাস আর অন্যান্য যারা এটা লক্ষ করছিল, তারা উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠলো। ওরা ভেবেছিল আমি ইচ্ছা করে বিওনের হাতটা কাঠে বিধিয়েছি। এবার আরেকটা তীর তুলে নিয়ে ওদেরকে দেখাবার জন্য লক্ষ্য স্থির করে বিওনের অন্য হাতটাও কাঠের খণ্ডটার গায়ে বিধলাম। ক্রুশবিদ্ধ হবার মতো অবস্থা হয়ে সে একটা নেকড়ের মতো চিৎকার করে উঠলো।
মুলত আমার স্বভাব করুণাময়, তাই তাকে আর কষ্ট না দিয়ে তৃতীয় তীরটা ছুঁড়তেই তার গলা ভেদ করে চলে গেল।
আমার জাহাজের নাবিকেরাও আমাকে অনুসরণ করলো। ওরাও ধনুকে তীর জুড়ে জাহাজের পাশে দাঁড়িয়ে নিচে পানিতে শক্রর উদ্দেশ্যে বৃষ্টির মতো তীর ছুঁড়তে শুরু করলো।
যা ঘটছিল তা থামাবার মতো শক্তি আমার ছিল না। আমার লোকদের অনেকে এই জঘন্য হাইকসোদের হাতে তাদের বাপ আর অনেকে ভাই হারিয়েছে। তাদের মা বোনদের এরা বলাৎকার করেছিল।
কাজেই কিছুক্ষণ হাইকসো অভিজাতদের এই দুর্দশা তাকিয়ে দেখলাম, তারপর তীরবিদ্ধ শেষ মৃতদেহটা স্রোতে ভেসে যাওয়ার পর আমি আমার লোকদের থামতে বললাম।
অনুতপ্ত না হয়ে আমার লোকেরা উল্লাসে চিৎকার করতে করতে আবার দাঁড় হাতে নিল। হাইকসোদেরকে তাদের জঘন্য শেঠ দেবতার করুণায় ছেড়ে দিয়ে আমরা দক্ষিণদিকে থিবসে আমাদের আসল মিসর রাজ্যের দিকে এগিয়ে চললাম।
.
আমাদের বর্তমান মিসর রাজ্য আর হাইকসো গোত্র আমাদের দেশের যে এলাকা দখল করেছিল তার মাঝে কোনো পরিষ্কার সীমানাচিহ্নিত করা ছিল না। প্রায় প্রতিদিন সীমান্তে দুই পক্ষের মাঝে আক্রমণ, প্রতিআক্রমণ আর লড়াই হতো।
পেয়াইনি মাসের পঞ্চম দিনে আমরা থিবস ছেড়ে এসেছিলাম। এর মধ্যে সেনাপতি ক্রাটাস হাইকসো হামলাকারীদেরকে শেখ আবাদা নগরী থেকে বিশ লিগ দূরত্বে হটিয়ে দিয়েছিলেন। যাইহোক এখন এপিফি মাস চলছে, আমাদের অবর্তমানে অনেক পরিবর্তন নিশ্চয়ই ঘটেছে। তারপরও ওদেরকে অবাক করে দেবার মতো ব্যাপার আমরা ঘটিয়েছি।
হাইকসোদের সামনের সারির সৈন্য কিংবা সেনাপতি ক্রাটাসের অধীনে যুদ্ধরত আমাদের সৈন্যদের কেউ আশা করবে না যে মধ্যসাগরের তীর থেকে চারশো লিগ নদীপথ পাড়ি দিয়ে একটি মিনোয়ান রণ-নৌবহর হঠাৎ এসে হাজির হবে। তাই পরিচিত এলাকায় পৌঁছার পর তিনতলা জাহাজগুলোর মাস্তুলের ডগায় হাতে বানানো ফারাও ত্যামোজের নীল পতাকা উড়িয়ে দিলাম।
নীল নদীর দক্ষিণপ্রান্তে আমাদের তিনতলা জাহাজগুলোর মোকাবেলা করার মতো হাইকসো কিংবা মিসরীয় কোনো জাহাজই নেই। আমরা প্রমাণ করেছি যে, কেউ আমাদেরকে থামাতে পারবে না। অবশ্য হাইকসোরা পায়রা উড়িয়ে খবর পাঠিয়ে আমাদের আর মিসরের মাঝে অবস্থান করা তাদের সেনাবাহিনীকে সাবধান করে দিতে পারে। তবে পায়রা শুধুমাত্র তাদের ডিম থেকে ফোঁটার স্থানেই ফিরে যেতে পছন্দ করে, অন্য কোথাও কেউ পাঠাতে চাইলে তারা সেখানে যাবে না।
.
হাইকসসারা যখন আমাদেরকে নিজ ভূমি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল তার আগে আমাদের শাসক ছিলেন ফারাও ম্যামোজ। সে-সময়ে আমি, তায়তা ছিলাম প্রধান উজির ইনতেফের ক্রীতদাস। তিনি ছিলেন কারনাক মন্দিরের নোমার্ক বা প্রধান তত্ত্বাবধায়ক এবং উচ্চ মিসরের সকল বাইশটি নোম বা প্রদেশের প্রধান উজির। এছাড়াও তিনি নেক্রোপলিস এবং রাজকীয় সমাধিসৌধের রক্ষণাবেক্ষণের প্রশাসক ছিলেন।
জীবিত এবং মৃত সকল ফারাওয়ের সমাধি দেখাশোনার দায়িত্ব তার উপর ছিল। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল তিনি ফারাও ম্যামোজের সমাধিরও সরকারি স্থপতি ছিলেন।
তবে প্রভু ইনতেফের জন্মগত কোনো সৃষ্টিশীল প্রতিভা ছিল না। তিনি বরং ধ্বংসাত্বক কাজে পটু ছিলেন। তিনি একটি গরুবাছুরের খোয়াড় কিংবা কবুতরের খোপও তৈরি করতে পারতেন কিনা আমার সন্দেহ। তিনি শুধু রাজকীয় সেবায় সময় কাটাতেন আর কঠিন যে কাজগুলো নিজে করতে পারতেন না সেগুলো আমার কাঁধে চাপিয়ে দিতেন।
প্রভু ইনতেফের সাথে আমার তেমন সুখকর স্মৃতি ছিল না। তার অধীনস্থ লোকদের একজন গোলাম আমার উপর খোঁজা করার ছুরিটা চালিয়েছিল। সে ছিল একজন নিষ্ঠুর, নির্দয় মানুষ। তবে শেষপর্যন্ত অবশ্য আমি তার সাথে শেষ বোঝাঁপড়াটা করতে পেরেছি।
তবে সেই খুশির দিনটির অনেক আগে আমিই ফারাও ম্যামোজের চমৎকার সমাধিসৌধের সমস্ত কক্ষ, গুহাপথ আর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ঘরের নকশা করেছিলাম। তারপর এই বিশাল সৌধ নির্মাণ কাজে শ্রম দেওয়ার জন্য যেসব নির্মাতা, রাজমিস্ত্রি, শিল্পী আর কারিগরদের ডাকা হয়েছিল, তাদের সকলের কাজ আমি তত্ত্বাবধান করেছিলাম।
ফারাও ম্যামোজের বিশালাকায় পাথরের শবাধারটি একটি মাত্র গ্রানাইট পাথরখণ্ড কেটে তৈরি করা হয়েছিল। এর ভেতরে অনায়াসে একটির মাঝে আরেকটি, এভাবে মোট সাতটি রূপার কফিন রাখার জায়গা ছিল। সবচেয়ে মাঝখানের কফিনে ফারাওয়ের মমিকরা দেহটি রাখার কথা ছিল। এতে পুরো জিনিসটা অনেক ভারি আর বড় হয়ে যেত। এই জিনিসটি যথাযথ শ্রদ্ধার সাথে নীল নদীর তীরে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া মন্দির থেকে দুইশো গজ দূরত্বে রাজার উপত্যকার পাদদেশে সমাধিসৌধে নেওয়ার কথা ছিল।
এই স্থানান্তরের কাজটি করার জন্য আমি নীল নদীর তীর থেকে কালো মাটির সমতল জমির উপর দিয়ে তীরের মতো সোজা একটা খাল খনন করেছিলাম। ফারাওয়ের বজরা চলার মত খালটা যথেষ্ট চওড়া আর গভীর করা হয়েছিল।
দুর্ভাগ্যবশত হাইকসোরা আমাদেরকে আমাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করার আগে ফারাও ম্যামোজ একদিনের জন্যও তার সমাধিতে শুয়ে থাকতে পারেন নি। যখন আমরা দেশ ত্যাগ করে দীর্ঘ যাত্রা শুরু করেছিলাম, তখন তার স্ত্রী রানি লসট্রিস আমাদেরকে ফারাওয়ের মমিকরা দেহটি সাথে নিয়ে যেতে নির্দেশ দিয়েছিলেন।
এর অনেক বছর পর রানি লসট্রিস আরও দক্ষিণে কয়েক হাজার লিগ দূরে জঙ্গল এলাকা নুবিয়ানে আরেকটি সমাধিসৌধ নির্মাণের নকশা বানাতে নির্দেশ দিলেন। এখন সেখানেই ম্যামোজ শায়িত রয়েছেন।
এতোবছর যাবত রাজার উপত্যকায় মূল সমাধিসৌধটি শূন্য পড়ে রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল, আমার নকশা অনুযায়ী নীল নদীর তীরে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া মন্দির থেকে রাজকীয় সমাধি পর্যন্ত যে খালটা আমি খনন করিয়েছিলাম, তা এখনও চমৎকার অবস্থায় রয়েছে। আমি এটা জানতাম, কেননা মাত্র কিছুদিন আগে আমি আমার ছোট্ট দুই রাজকুমারিকে তাদের বাবার শূন্য সমাধি দেখাবার জন্য নদীর তীরে বেড়াতে নিয়ে গিয়েছিলাম।
এতোগুলো বছর কেটে যাবার পরও আমি ম্যামোজের শবাধারবাহী বজরার সঠিক আয়তন মনে করতে পেরেছি। আমার স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত প্রখর। আমি কখনও কোনো বিষয়, সংখ্যা কিংবা মুখ ভুলি না।
এবার আমি মিনোয়ান সম্পদবাহী তিনতলা জাহাজ তিনটির আয়তন পরিমাপ করলাম। তারপর জারাসকে বললাম জাহাজগুলো শান্ত পানিতে নোঙর করতে। এরপর সাঁতার কেটে জাহাজের তলায় গিয়ে অনুমান করলাম খোলে মূল্যবান সম্পদের ওজনসহ জাহাজটির কতটুকু পানি প্রয়োজন পড়বে। এই পরিমাপটি এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে একেক রকম হল।
সবকিছু দেখার পর খুশিমনে পানির উপরে ভেসে উঠলাম। এখন আমি ফারাও ম্যামোজের শববাহী বজরার সাথে আমাদের জাহাজের আয়তন মেলাতে পারবো। এই খালে আমাদের সবচেয়ে বড় জাহাজটি চলাচলের সময় দুই পাশে দশ কিউবিট জায়গা আর তলদেশে পনেরো কিউবিট জায়গা খালি রাখতে পারবে। আরও স্বস্তিদায়ক ব্যাপারটা হল এতো বছর ধরে আমি খালের দুইপাশে গ্র্যানাইট পাথরখণ্ড লাগিয়েছিলাম আর খালে সবসময় নীল নদীর পানি প্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য একধরনের জলকপাট আর পানি উত্তোলনের জন্য সেচযন্ত্র-শাডুফ তৈরি করেছিলাম।
আমার অভিজ্ঞতা থেকে আমি জেনেছি, যদি তুমি পরিপূর্ণ শ্রদ্ধার সাথে দেবতাকে সম্মান করে তার কাছে কিছু আশা কর, তাহলে তুমি নিশ্চয়ই তার প্রতিদান পেতে পার। যদিও দেবতারা অনেকসময় খামখেয়ালি হন, তবে এবার তারা ঠিকই আমাকে মনে রেখেছেন।
ঠিক করলাম সূর্যাস্তের পর খালে ঢুকবো। অন্ধকারে ফারাও ম্যামোজের অন্ত্যেষ্টি মন্দিরের নিচে পাথরের জেটিতে জাহাজ বেঁধে রাখলাম। অবশ্য ম্যামোজ এখন একজন দেবতা আর তার নিজের মন্দিরও নীল নদীর তীরে রয়েছে। এখান থেকে হেঁটেই জেটিতে পৌঁছা যায়।
মন্দিরটা বেশি বড় নয়। যখন আমরা থিবসের যুদ্ধে হাইকসোদের পরাজিত করে ফিরে এসেছিলাম তখন রানি লসট্রিস তার প্রয়াত স্বামীর স্মৃতির সম্মানে একটি মন্দির নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল তার স্বামীর প্রতি সম্মান দেখান আর নির্বাসন থেকে দেশে ফেরার জন্য দেবতার প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করা।
নিশ্চিতভাবে আমাকেই তিনি এই মন্দির নির্মাণের আহ্বান জানালেন। তার ইচ্ছা ছিল এমন একটি বিশাল আর জমকালো মন্দির নির্মাণ করা, যা মিসরের আর সবকিছুকে ম্লান করে দেবে। তিনি চেয়েছিলেন মন্দিরটিতে চারশো পুরোহিত থাকবে, তবে আমি অনেক বলে তাকে সংখ্যাটি কেবল চারজন পুরোহিতে নামিয়ে এনেছিলাম।
এখন আমি আর জারাস কাউকে না জানিয়ে নদী থেকে মন্দিরের পেছন দিক দিয়ে চক্রনাভি বা মূল অংশে ঢুকলাম। সেখানে পৌঁছে আমরা আবিষ্কার করলাম সেই চার পুরোহিত পাম থেকে তৈরি সস্তা মদ পান করে একটু মাতাল হয়ে আছেন। ওদের সাথে আরও দুইজন অল্পবয়সী নারীও ছিলেন। ওরা সবাই নগ্ন হয়ে একসাথে কাদামাটির ইটের তৈরি মেঝেতে গোল হয়ে হাঁটছিলেন আর পুরোহিতরা হাততালি দিয়ে জোরে জোরে কিছু মন্ত্রোচ্চারণের মতো চিৎকার করছিলেন।
আমরা পৌঁছার কিছুক্ষণ পর তারা আমাদের উপস্থিতি টের পেলেন, মেয়েদুটো দ্রুত দেবতা ম্যামোজের মূর্তির পেছনের গোপন দরজা দিয়ে ছুটে অদৃশ্য হয়ে গেল। এরপর আর তাদের আমরা দেখিনি।
ম্যামাজের এই চার পুরোহিতের আমার প্রতি যথেষ্ট ভক্তি রয়েছে। রানি লসট্রিসের মৃত্যুর আমি তাদের মাসিক মাসোহারা নিশ্চিত রেখেছিলাম। ওরা চারজনই আমার সামনে হাঁটুগেড়ে বসে আমাকে ভক্তিশ্রদ্ধা জানিয়ে দেবতার নামে আমার মাথায় আশীর্বাদ বর্ষণ করলো।
ওদের হাঁটু গেড়ে বসে থাকা অবস্থায় আমি রাজকীয় বাজপাখির সিলমোহরটা বের করে ওদের দেখালাম। এটা দেখে ওদের মুখে আর কথা জোগাল না। প্রধান পুরোহিত হামাগুড়ি দিয়ে সামনে এগিয়ে আমার পায়ে চুমু খাওয়ার চেষ্টা করলো। আমি পিছিয়ে গেলাম আর জারাস তাকে আর সামনে এগোতে দিল না।
তারপর আমি ঐ চার পুরোহিতকে সংক্ষিপ্তভাবে আর কঠোরভাবে বললাম ফারাও ত্যামোস ছাড়া আর কাউকেই যেন ঘুণাক্ষরেও এই তিনতলা ট্রাইরেম জাহাজ সম্পর্কে কিছু না বলা হয়। এছাড়া সারা দিনরাত মন্দিরে, শূন্য সমাধিসৌধ আর খালের দুইপাশে সশস্ত্র প্রহরা থাকবে। এরপর থেকে এই পবিত্র স্থানে কেবল ক্যাপ্টেন জারাসের অধীনস্থ লোকেরা ঢুকতে পারবে। আর একই প্রহরীরা নিশ্চিত করবে যেন এই চার পুরোহিত এই জায়গার মধ্যেই নিজেদেরকে অবরুদ্ধ করে রাখে।
পরিশেষে আমি প্রধান পুরোহিতকে সমাধি আর অন্যান্য স্থাপনায় ঢোকবার সমস্ত চাবির গোছা আমার হাতে দিতে নির্দেশ দিলাম। তারপর আমি আর জারাস জাহাজে ফিরে গেলাম।
রাজার উপত্যকার প্রবেশ পথ থেকে নদীর তীর পর্যন্ত জায়গাটি বিশ হাত ঢালু ছিল। তবে আমাদের প্রত্যেকটা জাহাজ এই উচ্চতায় তুলতে চারটি আলাদা জলকপাট বা গ্লুইস গেট প্রয়োজন। তারপরই এগুলোকে সমাধিসৌধে আনা যাবে। আমরা প্রথম জাহাজটি দাঁড় বেয়ে মন্দিরের নিচে জলকপাটের মধ্যে এনে এর দরজাটা বন্ধ করে দিলাম। এই জলাধারের মধ্যে পানির উচ্চতা বাইরের খালের চেয়ে পাঁচ হাত নিচু ছিল।
আমি আমার তিন জাহাজের অধিনায়কদের দেখালাম কীভাবে মাটির কপাটটি খুলতে হয়। উপরের খাল থেকে নিচের জলাধারে পানি নেমে ধীরে ধীরে বিশাল জাহাজটিকে উপরের জলাধারের সমান উচ্চতায় তুলে আনলো। কপাটটি বন্ধ হয়ে যাবার পর গুণ টেনে জাহাজটিকে পরবর্তী জলাধার পর্যন্ত নিয়ে যাবার জন্য আমাদের পঞ্চাশজন মানুষ অপেক্ষা করছিল। এর পেছনে দ্বিতীয় জাহাজটি উপরে তোলার জন্য একই প্রক্রিয়ায় কাজ শুরু হল।
এ-ধরনের কোনোকিছু আমার লোকেরা কখনও দেখেনি, অবশ্য এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই, কেননা এই পদ্ধতি আমিই আবিষ্কার করেছিলাম। সারা পৃথিবীতে এরকম পদ্ধতি আরেকটিও নেই। ওরা এতো অবাক হয়ে গিয়েছিল যে, ওদের মনে হয়েছিল এটা একধরনের জাদুকরী ব্যাপার।
সৌভাগ্যবশত এই কাজের জন্য আমার কাছে দুইশো মানুষ ছিল। মিনোয়ানরা যে ক্রীতদাসদের শিকলে বেধে নিচের ডেকে রেখেছিল ওরাও ছিল এদের মধ্যে। অবশ্য ওরা এখন মুক্ত মানুষ, তবে ওরা কৃতজ্ঞতাবশত সব কাজ করে যাচ্ছিল।
জাহাজটি উপরে তোলার জন্য উপরের জলাধার থেকে যে পানি সরানো হয়েছিল তা আবার ভর্তি করার প্রয়োজন ছিল। কয়েকটা সেচ করার শাদুফ যন্ত্র দিয়ে আমি নদী থেকে নতুন পানি পাম্প করে তোলার ব্যবস্থা করলাম। এগুলো ছিল দুই বিপরীত প্রান্তে ওজন রাখা বাকেট শিকল বা কপিকল, যা দুইজন মানুষ চালাতে পারে। এটি একটি পরিশ্রম সাধ্য কাজ যা, প্রত্যেক জাহাজের জন্য চারবার করে করতে হয়েছিল।
প্রথম জলকপাটের মধ্যে তোলার আগে প্রত্যেক জাহাজের পাল আর মাস্তুল উপরের ডেকে সমান করে বিছিয়ে রাখা হয়েছিল। তারপর জাহাজটি নলখাগড়া দিয়ে বুনা মাদুর দিয়ে ঢেকে ফেলা হয়েছিল, যাতে দেখে মনে হচ্ছিল এটা একটি আকৃতিহীন ময়লার স্তূপ। পরদিন সকালে থিবসের লোকজন ঘুম থেকে উঠে নদীর এপারে তাকালে অস্বাভাবিক তেমন কিছু দেখতে পাবে না। তিনটি তিনতলা জাহাজই অদৃশ্য হয়ে গেছে, যেন কখনও এগুলোর অস্তিত্ব ছিল না।
পরদিন সূর্যোদয়ের সময় আমরা সমতল ভূমির উপর দিয়ে জাহাজগুলো টেনে নিয়ে ম্যামোজের সমাধিসৌধের প্রবেশ পথের কাছে এসে বাঁধলাম। লোকগুলো এত পরিশ্রমের পর ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল, তাই আমি জারাসকে নির্দেশ দিলাম ওদের সবার খাবারের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়ে আরও কিছু শুকনো মাছ, বিয়ার আর রুটি দিতে আর দিনের বাকি গরম সময়টা বিশ্রাম নিতে বললাম।
পায়ে চলার পথ দিয়ে হেঁটে আমি মন্দিরে ঢুকলাম। মনে হল পুরোহিতরা গত সন্ধ্যার কষ্টসাধ্য যাবতীয় ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের ধকল কাটিয়ে উঠেছে। মন্দিরের ডিঙিতে করে ওরা আমাকে নদীর উপর দিয়ে নিয়ে চললো। আমার অভিযানের সফলতার খবর দেবার জন্য আমি ফারাওয়ের কাছে যাচ্ছি।
এই দায়িত্বটি আমি খুবই পছন্দ করি। ফারাওয়ের প্রতি আমার পরম ভক্তি ছিল, তবে এর চেয়েও বেশি ছিল তার মা লসট্রিসের প্রতি। তবে এইটুকুই শুধু বলবো যে, রাজপরিবারের সকল সদস্যের প্রতি আমার ভক্তি ছিল।
আমার অনুগত পুরোহিতরা আমাকে শহরের বাজারের কাছে নদীর তীরে সিঁড়ির কাছে নামিয়ে দিল। সকাল হলেও বাজারে লোক সমাগম যথেষ্ট ছিল। সরু গলি দিয়ে প্রাসাদের ফটকের দিকে হেঁটে চললাম। ভাঙাচোরা শিরস্ত্রাণ আর মুখ ঢাকা ময়লা মুখোশের কারণে কেউ আমাকে চিনতে পারেনি।
প্রাসাদের ফটকে পৌঁছার পর মুখ থেকে ছদ্মবেশ সরাতেই প্রাসাদ রক্ষীদলের অধিনায়ক সাথে সাথে আমাকে চিনতে পেরে শ্রদ্ধার সাথে অভিবাদন জানালো।
আমি তাকে বললাম, আমাকে এখনি ফারাওয়ের সাথে দেখা করতে হবে। একজন বার্তাবাহক পাঠিয়ে তাকে জানাও আমি তার সাথে দেখা করার জন্য আনন্দের সাথে অপেক্ষা করছি।
ক্ষমা করুণ প্রভু তায়তা। ফারাও থিবসে নেই। খুব শিগ্রি ফিরে আসবেন বলে মনে হয় না।
আমি মাথা নাড়লাম। একটু হতাশ হলেও খুব একটা অবাক হই নি। জানতাম ফারাও অধিকাংশ সময় উত্তরে হাইকসোদের বিরুদ্ধে অন্তহীন অভিযানে সময় আর শ্রম ব্যয় করেন। তাহলে আমাকে প্রাসাদ সরকার প্রভু এটনের কাছে নিয়ে চল।
এটনের কামরার দরজায় পৌঁছতেই সে ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। তারপর বললো, কী খবর বন্ধু? তোমার অভিযান কেমন হয়েছে?
আমি মুখ অন্ধকার করে বললাম, খবর বেশ গুরুতর। তামিয়াত দুর্গে সর্বাধিরাজ মিনোজের ধনভাণ্ডার লুট হয়েছে। আর রাজা বিওনকে হত্যা করা হয়েছে।
সে আমাকে দুই হাতে ধরে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো, তুমি আমার সাথে মজা করছো, তায়তা। যেকোন সৎলোক এটা শুনলেই কেঁদে ফেলবে! এমন জঘন্য কাজটা কে করলো?
আমি একটি হাত তার মুখের সামনে তুলে ধরে বললাম, হায়! একই হাত দুটো কাজই করেছে, এটন। যে হাতটি দেখলে তুমি চিনতে পারবে। সে
ধোকা খাওয়ার মত ভান করে হাতটার দিকে অবাক হয়ে তাকালো। এতোকাল। প্রাসাদ সরকার পদে টিকে থাকতে গেলে একজনকে অবশ্যই পাকা অভিনেতা হতে হয়।
তারপর সে মাথা নাড়তে নাড়তে প্রথমে মৃদুভাবে চুকচুক করলো, তারপর তার খুশির মাত্রা বেড়ে যেতেই হাসিতে ফেটে পড়লো। তার ভুড়ি থেকে শুরু করে শরীরের প্রতিটা অঙ্গ হাসির দমকে কাঁপতে শুরু করলো। তারপর হঠাৎ হাসি থামিয়ে পাশের প্রস্রাবখানায় ঢুকলো। প্রথমে একটু নীরবতা, তারপর জলপ্রপাত থেকে নীলনদের উপর পানির প্রবাহ পড়ার মতো শব্দ শুরু হল। বেশ কিছুক্ষণ এরকম চলার পর এটন ফিরে এলো।
তোমার ভাগ্য ভালো বন্ধু যে, আমি সময়মত প্রস্রাবখানায় পৌঁছতে পেরেছিলাম, আর নয়তো রাজা বিওনের মত তুমিও ডুবে মরতে।
তুমি কীভাবে জানলে যে, বিওন পানিতে ডুবে মরেছে?
তুমি সামনে যা দেখছো, তা ছাড়াও আমার অন্য কান আর চোখ আছে।
এতোই যদি জানো তবে মিনোজের সম্পদ সম্পর্কে কিছু বল?
সে অনুতপ্তভাবে মাথা নেড়ে বললো, এ-সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। তুমি হয়তো জানো।
আমি শুধু জানি যে, তুমি ভুল বলেছিলে।
কী ধরনের ভুল সেটা?
তুমি বলেছিলে এই সম্পদের পরিমাণ এক লাখ হবে, তাই না? সে মাথা নেড়ে সায় দিল।
পরিমাণটা দুঃখজনকভাবে ভুল বলেছিলে।
সে বললো, একথা প্রমাণ করতে পারবে?
আমি তাকে নিশ্চয়তা দিয়ে বললাম, এর চেয়েও ভালো কিছু বলতে পিরবো, এটন। আমি তোমাকে এটি ওজন করতে দেবো। যাইহোক প্রাসাদ ছেড়ে যাওয়ার আগে আমি ফারাওকে একটা বার্তা পাঠাতে চাই।
কামরায় এককোণে রাখা লেখার সরঞ্জামের দিকে দেখিয়ে এটন বললো, তুমি তোমার বার্তাটা লিখে ফেল, সন্ধ্যার আগেই ফারাও তার হাতে এটা পাবেন।
আমার বার্তাটি ছিল ছোট আর সাংকেতিক ভাষায় লেখা। এটনের হাতে বার্তাটা দিয়ে তাকে বললাম, কিছু মনে করো না। প্রায় দুই সপ্তাহ যাবত আমি স্নান করিনি আর পোশাক বদলাইনি। আমাকে এখনি নিজের ঘরে একটু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হতে হবে।
নিজের ঘরে পৌঁছাবার সাথে সাথে আমি একজন ক্রীতদাসকে রাজকীয় জেনানা মহলে পাঠালাম রাজকুমারিদের কাছে একটা বার্তা পৌঁছাতে।
মাত্র আমি উষ্ণ পানির চৌবাচ্চায় পা দেব, ঠিক তখনই দুই রাজকুমারি মরুর খামসিন ঝড়ের বেগে এসে পৌঁছাল। এই পৃথিবীতে একমাত্র তাদের সামনেই আমি পোশাক না পরা অবস্থায় দাঁড়াই। আর আমার ক্রীতদাসদের সামনে, ওরা অবশ্য আমার মতোই খোঁজা।
এখন তেহুতি আর বেকাথা আমার মার্বেল পাথরের স্নানের চৌবাচ্চার কিনারায় পা ঝুলিয়ে বসলো। বেকাথা তার ছোট্ট সুন্দর পাদুটো দোলাতে দোলাতে অনুযোগ করলো, তুমি যাওয়ার পর সবকিছু একেঘেয়ে লাগছিল। কী এমন তুমি করছিলে যে এতো দেরি হল ফিরতে তোমার? এখন কথা দাও, এরপর কোথাও গেলে আমাদের সাথে নিয়ে যাবে। এই কঠিন প্রতিজ্ঞা এড়াতে আমি গরম পানি মাথায় ঢালতে শুরু করলাম।
এবার তেহুতি কথা শুরু করলো, আমাদের জন্য কোনো উপহার এনেছো তায়তা? নাকি আমাদের কথা ভুলে গিয়েছিলে? বড়বোন হিসেবে খাঁটি জিনিসের মূল্য সে ঠিকই বুঝে।
আমি উত্তর দিলাম, অবশ্যই এনেছি। কী করে আমি আমার ছোট্ট দুই রাজকুমারির কথা ভুলে যেতে পারি। আমার কথা শুনে দুজনেই খুশিতে হাততালি দিয়ে উঠলো।
বিকাথা কিচমিচ করে বললো, দেখাও।
যাও পাশের কামরায় কৌচের উপর থেকে আমার ব্যাগটা নিয়ে এসো। বেকাথা একছুটে চলে গেল, তারপর নাচতে নাচতে চামড়ার ব্যাগটা হাতে ঝুলাতে বুলাতে ফিরে এলো।
তারপর ব্যাগটা কোলে নিয়ে মার্বেলের মেঝেতে আসন গেড়ে বসলো।
আমি বললাম, খোল! আমার রাজকুমারিদের কথা মনে রেখেই আমি তামিয়াত দুর্গে বন্দী মিনোয়ান সেনাকর্মকর্তাদের কাছ থেকে পাওয়া অলংকার থেকে দুটি অলংকার বেছে নিয়েছিলাম।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, দেখোত লাল কাপড়ে মোড়া একটা জিনিস আছে কি না?
হ্যাঁ, আছে তায়তা, এটা কি আমার? লালটা কি আমার জন্য এনেছ?
হ্যাঁ, অবশ্যই তোমার জন্য।
ছোট কাপড়ের পুটলিটা খুলতে গিয়ে উত্তেজনায় ওর হাত কাঁপছিল। সোনালি হারটা তুলে ধরতেই তার চোখ খুশিতে ঝিকমিক করে উঠলো। ফিসফিস করে সে বলে উঠলো, এতো সুন্দর জিনিস আমি কখনও দেখিনি।
হারটি থেকে ছোট ছোট দুটি মূর্তি ঝুলছে। ছোট হলেও মূর্তিদুটোর খুঁটিনাটি সবকিছু পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে। বড়টি ছিল একটি আক্ৰমণদ্যোত ষাঁড়ের মূর্তি। শিং দুটো বাঁকা করে আক্রমণের ভঙ্গিতে মাথা নোয়ান। সবুজ পাথরের ছোট ছোট দুটো চোখ। বঁড়টি একটি সুন্দর মেয়ের মূর্তিকে আক্রমণ করছিল। ভয়ংকর শিংদুটোর আওতার বাইরে মেয়েটি নাচছে। মাথায় ফুলের মালা আর বুকে দুটো লাল রুবি। মাথা পেছনে হেলিয়ে মেয়েটি হাসছিল।
হারটা দুই হাতে দোলাতে দোলাতে বেকাথা বললো, মেয়েটি এতো দ্রুত ছুটছে যে ষাঁড়টি কখনও তাকে ধরতে পারবে না।
ঠিক বলেছ তুমি। ভয়ঙ্কর বিপদের বিপরীতে মেয়েটি হল সৌন্দৰ্য্য। তুমি এটা পরলে বিপদ তোমাকে ছুঁতে পারবে না। এটা তোমাকে সবধরনের বিপদ থেকে রক্ষা করবে। ওর হাত থেকে হারটা নিয়ে ওর গলায় পরিয়ে পেছনের হুকটা লাগিয়ে দিলাম। সে নিচের দিকে তাকিয়ে কাঁধে ঝাঁকুনি দিতেই মূর্তিদুটো নেচে উঠলো। হেসে উঠতেই তাকে আরও সুন্দর দেখালো।
তেহুতি এতোক্ষণ ধৈর্য ধরে চুপ করে বসেছিল। আমি একটু অপরাধবোধ করে তার দিকে ফিরে বললাম, রাজকুমারি, তোমার উপহারটা ঐ নীল কাপড়ে মোড়ানো আছে।
সাবধানে কাপড়ের ভাঁজটা খুলতেই একটা আংটি ঝিকমিক করে উঠলো। সে দম আটকে চেঁচিয়ে উঠলো। এতো উজ্জ্বল জিনিস আমি কখনও দেখিনি।
আমি বললাম, এটা তোমার মধ্যমায় পর।
এটা খুব বড়। খুলে যায়।
তার কারণ এটা একটা বিশেষ ধরনের পাথর। তুমি এটা কোনো পুরুষকে দেখাবে না, শুধু...
শুধু কি?
শুধু যদি তুমি চাও সে তোমার প্রেমে পড়ক। আর নয়তো এটা তোমার হাতের তালুতে লুকিয়ে রাখবে। মনে রেখো এর জাদু শুধু একবারই কাজে আসবে। কাজেই খুব সাবধানে এটা কাউকে দেখাবে।
সে আঙুল দিয়ে আংটিটা শক্ত করে চেপে ধরে রাখলো। তারপর দৃঢ়কণ্ঠে উত্তর দিল, আমি চাই না কোনো পুরুষ আমাকে ভালোবাসুক।
কেন?
কারণ, ওরা শরীরে একটা বাচ্চা ঢুকিয়ে দিতে চেষ্টা করে। আর একবার বাচ্চাটা ভেতরে ঢুকলে আর বের হতে চায় না। আমি হেরেমে অনেক মহিলাকে চিৎকার করে আর্তনাদ করতে শুনেছি। আমি এরকম করতে চাই না।
আমি মৃদু হেসে বললাম, একদিন তুমি তোমার মত বদলাবে। তবে এই পাথরের আরও কিছু গুণের কারণে এটা বিশেষ ধরনের হয়েছে। বেকাথা বলে উঠলো, বল, কী এমন বিশেষ গুণ আছে এটার তায়তা?
একটা গুণ হল এটা পৃথিবীর সবচেয়ে শক্ত জিনিস। কোনো কিছু দিয়ে এটা কাটা যায় না, আর সবচেয়ে ধারালো ব্রোঞ্জের ড্যাগার দিয়েও এটার গায়ে আঁচড় কাটা যায় না। এজন্য এটাকে বলা হয় হীরা–সবচেয়ে কঠিন জিনিস। পানিতে ভিজে না। তবে যে মেয়ে এটা পরবে তার গায়ে এটা জাদুর মতো লেগে থাকবে।
সন্দেহের সুরে তেহুতি বললো, তোমার কথা আমি বিশ্বাস করি না তায়তা। এটা তোমার বানানো আরেকটা গল্প।
ঠিক আছে, দেখো আমার কথা ঠিক হয় কি না। তবে মনে রেখো, যদি তুমি কাউকে সত্যিকার ভালোবাস আর চাও যে সেও তোমাকে সারাজীবন ভালোবাসুক, তাকে ছাড়া আর কোনো পুরুষকে এটা দেখাবে না। জানি না কেন তাকে একথা বললাম, তবে মেয়েদুটো আমার কাছে গল্প শুনতে পছন্দ করে আর আমি কখনও তাদের হতাশ করি না।
টাব থেকে উঠে গা মুছার জন্য আমার প্রধান দাস রুস্তিকে ডেকে একটা তোয়ালে আনতে বললাম।
এবার তেহুতি অনুযোগ করে বললো, তুমি আবার চলে যাচ্ছো তায়তা। এখন সে বেশ বড় হয়েছে আর একজন সাবালিকার মতোই ভেবেচিন্তে কথা বলতে শিখেছে। মাত্র এক ঘন্টার জন্য এসে আবার চলে যাচ্ছ। এবার হয়তো চিরদিনের জন্য চলে যাচ্ছ। তার চোখে পানি চলে এসেছে।
আমি তোয়ালেটা ফেলে তাকে জড়িয়ে ধরে বললাম, না! না! এটা সত্য নয়। আমি শুধু পূর্ব তীরে তোমার বাবার শূন্য সমাধি পর্যন্ত যাচ্ছি।
বেকাথা বললো, যদি এ কথা সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে আমাদেরকেও সাথে নিয়ে চল।
কথাটা শুনে ভেবে দেখলাম প্রস্তাবটা মন্দ নয়। ওদের মতো আমারও ভালো লাগবে।
ছদ্ম অনিচ্ছা দেখিয়ে বলো, একটা সমস্যা আছে। আমরা খুব গোপন একটা কাজ করতে যাচ্ছি। তোমাদেরকে কথা দিতে হবে যা দেখবে তা কাউকে বলতে পারবে না।
কথাটা শুনে বেকাথার দুচোখ জ্বলজ্বল করে উঠলো, সে বললো, গোপন ব্যাপার! সমস্ত দেবতার নামে আমি শপথ করছি তায়তা, কাউকে কিছু বলবো না।
.
দুই রাজকুমারি, এটন আর আমি যখন ফারাও ম্যামোজের সমাধির ফটকের কাছে পৌঁছলাম, তখনও রত্নবোঝাই জাহাজ তিনটি এর কাছেই জেটিতে বাঁধা ছিল।
আমার অনুপস্থিতিতে জারাস ওর লোকজন নিয়ে কাজ করে চলছিল। আশেপাশের পাহাড়গুলো থেকে যেন আমাদেরকে না দেখা যায়, সেজন্য ওরা সমাধির চারপাশ ঘিরে নলখাগড়ার বেড়ার পর্দা দিয়ে ঢেকে রেখেছিল। আমার ইচ্ছা ছিল রাত জেগে সমস্ত জাহাজগুলো থেকে রতুগুলো নামিয়ে ফেলা। রাতের অন্ধকারের আড়ালে হাইকসো গুপ্তচরেরা এসে উঁকিঝুঁকি দিতে পারে। তাছাড়া আমাদেরকে মশাল জ্বালিয়ে কাজ করতে হবে, কাজেই গোপনীয়তা রক্ষার জন্য পর্দা খুবই জরুরী।
তামিয়াতে আমি যে অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলাম, তা কাজে লাগিয়ে এখনকার মাল খালাসের বিষয়টা পরিকল্পনা করলাম। দিলবার আর তার লোকজনকে প্রথম জাহাজের ডেক থেকে কাঠের তক্তা খুলে বারকোশের মত কাঠামো বানাতে বললাম। আট হাত চওড়া এই কাঠামোটি জাহাজের খোলের মুখে এঁটে যাবে। তারপর প্রতিটি জাহাজের খোলের মুখের ঠিক উপরের ডেকে তেপায়া টুল আর কপিকল স্থাপন করলাম। সেখান থেকে আমার লোকেরা ভারি কাঠের বারকোশগুলো নিচে নামিয়ে জাহাজের খোলে ঢুকালো। আর খোলের ভেতরে থাকা অন্য দল সিন্দুকগুলো কাঠের বারকোশের উপর সাজিয়ে রাখলো।
বিশটা করে সিন্দুক এভাবে খোল থেকে বের করে উপরে ডেকে তোলা হল, তারপর সেখান থেকে ঝুলিয়ে জেটিতে নামিয়ে রাখা হল।
তেহুতি জিজ্ঞেস করলো, এই সিন্দুকগুলোতে কী আছে তায়তা? আমি নাকে হাত রেখে খুব গোপনীয়তার ভাব দেখিয়ে বললাম, এটাই সবচেয়ে বড় রহস্য। তবে শিঘ্রই আমি তোমাদেরকে দেখাবো কী আছে এগুলোর ভেতরে। আর একটু ধৈর্য ধরে অপেক্ষা কর।
বেকাথা আমাকে মনে করিয়ে দিল, আমি কিন্তু বেশিক্ষণ ধৈর্য ধরতে পারবো না।
সার বেঁধে থাকা অনেক মানুষ সিন্দুকগুলো বারকোশ থেকে তুলে নিল। জেটি থেকে শুরু করে মানুষের সারি সমাধির প্রবেশ পথ দিয়ে চারধাপ সিঁড়ি নেমে রং করা সুসজ্জিত সুড়ঙ্গে ঢুকলো, তারপর বিশাল তিনটি কামরা পার হয়ে চারটি ধনাগারে পৌঁছলো। ফারাওয়ের শূন্য সমাধির চারপাশ ঘিরে ধনাগারগুলো স্থাপন করা হয়েছিল। বিশাল একটি পাহাড় কেটে আমি বিশ বছর ধরে দুই হাজার শ্রমিক লাগিয়ে এই প্রশস্ত দালানটি নির্মাণ করেছিলাম। কাজটি করতে পেরেছি বলে আমি এখনও গর্ববোধ করি।
দুই রাজকুমারিকে উদ্দেশ্য করে আমি বললাম, এই যে মেয়েরা, তোমরা আমাকে আর এটন চাচাকে সাহায্য করতে পারো। তোমরা দুজনেই গুণতে আর লিখতে পারো, যা এই বোকা লোকগুলোর একশো জনের মধ্যে একজনও পারে কি না সন্দেহ। কথাটা বলে আমি মাথা ঝাঁকিয়ে কাজ করা সারিবদ্ধ অর্ধনগ্ন লোকগুলোর দিকে দেখালাম।
এবার দুই বালিকাই হিসাব রক্ষকের কাজে লেগে পড়লো, যেন এটা একটা খেলা।
আমার নির্দেশ অনুযায়ী জারাস প্রথম ধনাগারে দুটো ভারী দাড়িপাল্লা স্থাপন করেছিল। আমি আর এটন এই দুটো পাল্লার ব্যবস্থাপনায় বসলাম। একটা একটা সিন্দুক পাল্লায় ঝুলাতেই আমি ওজনটা উচ্চারণ করতেই মেয়েরা লিখে রাখতে শুরু করলো। বেকাথা এটনের সাথে আর তেহুতি আমার সহকারী হিসেবে কাজ করতে লাগলো। ওরা একটা একটা সিন্দুকের ওজন একটা লম্বা প্যাপিরাস কাগজে লিখতে লাগলো আর দশটা সিন্দুকের ওজন হতেই সবগুলোর ওজন যোগ করে লিখতে লাগলো।
প্রথম কোষাগারে মোট ২৩৩ লাখ খাঁটি রূপা রাখা হল। এরপর আমি লোকজনদের একঘন্টা বিশ্রাম নিয়ে খাওয়াদাওয়া সেরে নিতে উপরে পাঠিয়ে দিলাম। আমরা একা হবার পর আমি আমার প্রতিজ্ঞামতো মেয়েদেরকে সিন্দুকের ভেতরে যে ধনরত্ন আছে তা দেখালাম। একটা সিন্দুকের ঢাকনা খুলে একটা রূপার পিণ্ড দেখার জন্য ওদের হাতে তুলে দিলাম।
বেকাথা ওরা গলার হারটায় হাত বুলাতে বুলাতে বললো, এটা আমার গলার হারের মত সুন্দর নয়।
চারপাশের সিন্দুকগুলোর দিকে তাকিয়ে তেহুতি জিজ্ঞেস করলো, এগুলো সব তোমার তায়তা?
আমি গম্ভীরভাবে উত্তর দিলাম, এগুলো সব ফারাওয়ের। আমার কথা শুনে সে মাথা নাড়লো। তারপর চারপাশে চোখ বুলিয়ে পরিমাণটা আন্দাজ করতে লাগলো। গণনা শেষ হওয়ার পর তার ঠোঁটে মৃদ হাসি দেখা গেল। তারপর সে বললো, আমরা তোমার কাজে খুবই খুশি তায়তা!
.
লোকজন আবার ফিরে এলে আবার ওদেরকে কাজে লাগালাম। ওরা
দাঁড়িপাল্লাটা দ্বিতীয় কোষাগারে নিয়ে চললো। এটা আগেরটার চেয়ে একটু ছোট, এতে আমরা আরও ২১৬ লাখ রূপা রাখলাম।
এমন সময় জারাস জেটি থেকে ফিরে এসে জানাল প্রথম দুটি তিনতলা ট্রাইরেম জাহাজের মাল সম্পূর্ণ খালাস করা হয়ে গেছে। এখন কেবল শেষ জাহাজে কিছু রূপা রয়ে গেছে।
সে একটু সতর্কসুরে বললো, ভোর হয়ে আসছে তায়তা। লোকজন সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। আসলে কাজ করতে করতে আমার খেয়ালই ছিল না যে কখন রাত শেষ হয়ে এসেছে। আমিও ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম, তবে অধিকাংশ লোকের তুলনায় আমার কর্মক্ষমতা অনেক বেশি ছিল।
তোমরা সবাই বেশ ভালো কাজ করেছ জারাস। তবে আমি তোমাদেরকে আরেকটু থাকতে বলবো। এখন জেটিতে গিয়ে দেখতে চাই আর কতটুকু কাজ বাকি আছে।
আর তখনই আমি একটা মারাত্মক ভুল করে ফেললাম।
পেছন ফিরে দেখলাম তেহুতি টুলে বসে মাথা নুইয়ে প্যাপিরাস কাগজ নিয়ে হিসেবের কাজ করছিল। একমাথা সোনালি চুল ঢেউয়ের মত নিচে নেমে তার মুখ ঢেকে ফেলেছিল। কাজের চাপে সে চুল আঁচড়াবারও সময় পায় নি।
তাকে বললাম, তেহুতি, তুমি একজন ক্রীতদাসির মতো অনেক পরিশ্রম করেছ। এখন আমার সাথে উপরে চল। রাতের শীতল বাতাসে একটু সতেজ হয়ে নেবে।
তেহুতি উঠে দাঁড়াল। মাথা ঝাঁকিয়ে মুখ থেকে চুল সরিয়ে জারাসের দিকে তাকাল। জারাসও তার দিকে তাকাল।
মশালের আলোয় আমি দেখলাম তেহুতির সবুজ চোখের মনিদুটো বড় হয়ে উঠেছে। আর একই সাথে শুনতে পেলাম অন্ধকারের দেবতার হাসি।
ওরা একজোড়া মার্বেল পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।
আমি তেতির চোখ দিয়ে জারাসের দিকে তাকালাম। যদিও আমি পুরুষের চেয়ে একজন নারীর সৌন্দর্য্যের সঠিক পরিমাপ করতে পারি, তবে আজ প্রথম লক্ষ্য করলাম যে, জারাস সাধারণের চেয়ে অনন্য। তার বংশ পরিচয় তেমন আহামরি না হলেও তার চতুর্দিক ঘিরে একধরনের কর্তৃত্বব্যঞ্জক আভা রয়েছে। তার ভাবভঙ্গি এবং আচরণ অভিজাত শ্রেণীর।
আমি জানি তার বাবা থিবসের একজন বণিক, নিজ প্রচেষ্টায় বিশাল ভাগ্য গড়ে তুলেছেন। ছেলেকে মানুষ করতে যথাসাধ্য করেছেন। জারাস বুদ্ধিমান। এবং রসজ্ঞান সম্পন্ন। একজন ভালো সৈনিক। তারপরও তার বংশ পরিচয়ের কারণে সে ত্যামোস রাজবংশের একজন রাজকুমারির সমকক্ষ হতে পারে না। যাইহোক ফারাও সিদ্ধান্ত নেবেন কে হবে রাজকুমারির উপযুক্ত পাত্র, তবে
আমার কাছ থেকে অবশ্যই এ বিষয়ে উপদেশ নেবেন।
অতিদ্রুত আমি ওদের দুজনের মাঝে দাঁড়িয়ে তাদের চোখাচোখি হওয়ার সুযোগটা ভেঙে দিলাম। তেহুতি এমনভাবে আমার দিকে তাকাল যেন আমি একজন আগন্তুক, যাকে সে আগে কখনও দেখেনি। তার হাত ছুঁতেই সে কেঁপে উঠে এবার আমার চোখে চোখ রাখলো।
আমি বললাম, এসো আমার সাথে তেহুতি। তারপর তার মুখের দিকে লক্ষ্য করলাম, সে অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে আমাকে বললো,
হ্যাঁ, অবশ্যই যাবো তায়তা। ক্ষমা কর, আমি একটু অন্যমনষ্ক হয়ে পড়েছিলাম। চল যাই।
আমি পথ দেখিয়ে তাকে কোষাগার থেকে বের করে আনলাম, জারাসও অনুসরণ করলো। তার প্রতিটি পদক্ষেপে মনে হচ্ছিল যেন, সে একটা ঘোরের মধ্যে রয়েছে। আমি তাকে ভালোকরেই জানতাম, তবে তার এরকম অবস্থা কখনও দেখিনি।
আবার আমি সেই তরুণ যুগলের মাঝখানে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে বললাম, তুমি নয় ক্যাপ্টেন জারাস। তুমি দাঁড়িপাল্লাটা পরের কামরায় নেবার ব্যবস্থা কর। তারপর তোমার লোকজন একটু বিশ্রাম নিতে পারে।
কেবল এখন বুঝতে পারলাম এদের দুজনের এর আগে কখনও দেখা হয়নি। তেহুতি রাজপ্রাসাদের হেরেমের ছোট্ট পৃথিবীতে বিচরণ করতো। সেখান থেকে সে উপযুক্ত সহচরী পরিবেষ্টিত হয়ে বাইরের জগতে পা রাখতো। সম্ভবত আমিই ছিলাম সেই প্রতিরক্ষামূলক শৃঙ্খলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
একজন সুন্দরী হিসেবে তার কুমারীত্ব রাজা এবং রাজ্যের জন্য অমূল্য। হয়তো কোন রাজকীয় অনুষ্ঠানের সময় দূর থেকে জারাস তাকে দেখেছে। তবে সে কখনও রাজপ্রাসাদের রক্ষীবাহিনীর দায়িত্বে ছিল না। তার সমস্ত সামরিক জীবন কেটেছে দূর রণাঙ্গণে কিংবা সামরিক প্রশিক্ষণে। আমি নিশ্চিত আজকের আগে এতো কাছ থেকে রাজকুমারির অসামান্য সৌন্দর্য্য দেখার সুযোগ তার কখনও হয়নি।
আমি তাকে দ্রুত নির্দেশ দিলাম, তোমার লোকজনদের খাওয়া দাওয়া করতে বল আর প্রত্যেককে অতিরিক্ত এক মগ বিয়ার দাও। আমি আবার নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ওদেরকে বিশ্রাম নিতে বল। একথা বলে আমি দুই রাজকুমারিকে নিয়ে উপরে চললাম। জারাস পেছন থেকে আমাদের দিকে তাকিয়ে রইল।
.
সমাধিগর্ভের ফটক থেকে বের হয়ে একটু থেমে পূর্বদিকে তাকিয়ে দেখতে পেলাম, ভোরের গোলাপি লাল আভা পুব আকাশে ফুটে উঠেছে। তারপর নিচে তাকিয়ে দেখলাম জারাস ঠিকই বলেছিল, সমস্ত লোকজন পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছে।
দ্রুত পায়ে তৃতীয় জাহাজটির সিঁড়ি বেয়ে ডেকে উঠতেই নদীর ওপার থেকে তুর্যধ্বনী শোনা গেল, আর সেই সাথে দ্রুতবেগে এগিয়ে আসা রথের চাকার শব্দও শোনা গেল। আমি জাহাজের রেলিং ধরে সামনে অন্ধকার নদীর তীরের দিকে তাকালাম।
অগুণতি মশালের আলো আর হট্টগোল থেকে বুঝা গেল ফারাও ফিরে এসেছেন। আমার বার্তা পেয়ে তিনি থিবসে ফিরেছেন। রাজার কাছাকাছি হলেই আমার বুক খুশিতে নেচে উঠে। আমি দ্রুত জাহাজের কাঠের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে নামতে আরও মশাল জ্বালতে আর রাজকীয় সম্মানের জন্য সৈন্যদের প্রস্তুত হতে নির্দেশ দিলাম।
একটুপরই অনুচরদের অনেক পেছনে ফেলে অন্ধকার ভেদ করে ফারাও নিজে রথ চালিয়ে উপস্থিত হলেন। আমাকে দেখার সাথে সাথে উল্লাসে চিৎকার করে আমাকে সম্ভাষণ জানিয়ে রথের রাশে হেলান দিলেন।
রাশটা তার সহকারীর হাতে ছুঁড়ে দিয়ে চাকা চলন্ত অবস্থায় রথ থেকে একলাফ দিয়ে মাটিতে নেমে বললেন, খুব ভালো লাগছে তায়তা তোমাকে দেখে। অনেক দিন দেখা হয় নি তোমার সাথে। তারপর একজন দক্ষ রথীর মতো মাটিতে পা ফেলে দ্রুত কয়েক পদক্ষেপে আমার কাছে পৌঁছালেন। সমস্ত লোকজনের সামনেই আমাকে বুকে জাপটে ধরে শূন্যে তুললেন। তার ছেলেমি দেখে আমার হাসি পেল।
একেবারে সত্যি কথা মহামান্য। অনেক দিন হয়ে গেল। এক ঘন্টা আপনি না থাকলে মনে হয় এক সপ্তাহ সূর্য উঠেনি।
এবার তিনি আমাকে মাটিতে নামিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। দেখলাম তার সারা দেহ ধূলিধূসরিত আর ময়লায় মাখামাখি হয়ে রয়েছে। বুঝা যাচ্ছে কষ্টকর একটি অভিযান থেকে সদ্য এসেছেন। তবে তার মাঝেও ফারাওয়ের মর্যাদা পরিস্ফুট হয়ে রয়েছে। পাশেই অপেক্ষারত বোনদের দেখে একের পর এক দুজনকেই বুকে জড়িয়ে আদর করার পর আবার আমার কাছে এলেন।
জেটিতে বাঁধা বিশাল তিনতলা জাহাজ তিনটে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এগুলো কি জাহাজ? মাস্তুল আর দাঁড় ছাড়াই এগুলো আমার দেখা যে কোনো জাহাজের চেয়ে দ্বিগুণ বড় মনে হচ্ছে। এগুলো কোথায় পেলে তায়তা? তাকে আমি যে বার্তা পাঠিয়েছিলাম তা ছিল সাংকেতিক আর সেখানে বিশদ বর্ণনা ছিল না। যাইহোক আমার উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করে সাথে সাথে আবার বললেন, ষণ্ডা-গুণ্ডার মতো চেহারার ওই লোকগুলোর পরিচয় কী? আমি তোমার সাথে মাত্র কয়েকজন লোক দিয়েছিলাম, আর এদিকে তুমি দেখছি তোমার নিজস্ব ছোট্ট একটা সেনাবাহিনী নিয়ে ফিরে এসেছ তায়তা।
তিনি জেটি থেকে সমাধির ফটক পর্যন্ত সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোর দিকে তাকালেন। তার কাছাকাছি যারা ছিল তারা কাঁধের বোঝা মাটিতে নামিয়ে নতজানু হয়ে তার প্রতি সম্মান দেখাতে শুরু করলো।
এদের চেহারা দেখে ভুল বুঝবেন না, মহামান্য। এরা ষণ্ডা-গুণ্ডা নয়। এরা মিসরের সাহসী তোক আর প্রকৃত যোদ্ধা।
আবার জাহাজ তিনটির দিকে তাকিয়ে বললেন, কিন্তু এই জাহাজগুলোর বিষয়টা কী? এগুলো সম্পর্কে কী বলবে?
আমি তাকে অনুরোধ জানিয়ে বললাম, দয়া করে আমার সাথে আসুন, নিরালায় বসে সবকিছু খুলে বলছি।
ঠিক আছে তায়তা। তুমিতো আবার সবসময় গোপনীয়তা পছন্দ কর, তাই না? তারপর তিনি সমাধির প্রবেশপথের দিকে এগিয়ে চললেন। আমিও ফারাও ত্যামোসকে অনুসরণ করে তার বাবার অনুমিত সমাধির দিকে এগোলাম।
প্রথম কোষাগারে ঢুকে কামরাভর্তি সারি সারি সাজানো কাঠের বাক্সগুলোর দিকে তাকালেন। তবে কোনো মন্তব্য করলেন না।
দ্বিতীয় কামরায় যাওয়ার আগে কেবল বললেন, আশ্চর্য, সমস্ত বাক্সের গায়ে সর্বাধিরাজ মিনোজের মার্কা মারা রয়েছে দেখছি। তৃতীয় কামরায় পৌঁছতেই এটন তাকে দেখে হাঁটুগেড়ে সম্মান জানাল।
আরও অবাক লাগছে তায়তা, আমার রাজপ্রসাদের পরিচালকও দেখছি তোমার এই গোপন ক্রিয়াকলাপের সাথে নিজেকে জড়িয়েছেন। তারপর ফারাও একটা কাঠের বাক্সের উপর বসে দুপা সামনে ছড়িয়ে দিয়ে বললেন, এবার বল তায়তা। সবকিছু খুলে বল।
আমি বললাম, তার চেয়ে ভালো হবে জিনিসটা আপনাকে দেখালে। তারপর আমি একটা বাক্সের ডালা খুলে চকচকে রূপার একটা পিণ্ড বের করে এক হাঁটু গেড়ে বসে রূপার পিন্ডটা তার হাতে তুলে দিলাম। তিনি জিনিসটা আমার হাত থেকে নিয়ে আস্তে আস্তে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলেন। আঙুলের ডগা দিয়ে ধাতুর উপর ছাপমারা চিহ্নটার উপর বুলিয়ে দেখলেন। ক্রিটের প্রতীক আক্রমণোদ্যত ষাঁড়ের মূর্তি আঁকা রয়েছে।
তারপর মৃদু কণ্ঠে বললেন, জিনিসটার চেহারা আর ওজন দেখেতো মনে হচ্ছে আসল রূপা। আসলেই কি তাই?
অবশ্যই এটা তাই ফারাও। এখানে আপনি যে-কটি সিন্দুক দেখছেন তার সবকটি এই রূপার বাটে ভরা।
আবার বেশ কিছু সময় চুপ করে রইলেন। তার ধূলিধূসরিত মুখের নিচে আমি দেখতে পেলাম প্রচণ্ড আবেগ। তারপর রুদ্ধকণ্ঠে বললেন।
এখানে কতটুকু আছে তাতা? এবার তিনি আমার সেই ছোটবেলাকার পুরোনো নাম ব্যবহার করলেন। যখনই আমার প্রতি ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন তখন এই নামে ডাকতেন।
আমিও আবার তার শিশুকালের নামে ডেকে বললাম, প্রত্যেকটা সিন্দুক ভরা, মেম। আমি ছাড়া আর কারও এই নামে ডাকার অধিকার নেই।
এসব কথা ছেড়ে আসল কথা বল তায়তা। বল কতটুকু রূপা তুমি আমার জন্য এনেছ? তার গলায় বিস্ময়ের সুর।
আমি উত্তর দিলাম, এটন আর আমি দুজনে মিলে এর বেশিরভাগ অংশ ওজন করেছি।
এতে আমার কথার উত্তর পাওয়া গেল না তাতা।
আমরা প্রথম দুটি জাহাজের পুরো অংশ আর তৃতীয়টার কিছু অংশ ওজন দিয়েছি। হিসেব করে মোট চার শো ঊনপঞ্চাশ লাখ পাওয়া গেছে। সম্ভবত আরও এক লাখের ওজন নিতে হবে। অবশ্য দেড়লাখও হতে পারে।
আবার তিনি চুপ করে মাথা নেড়ে ভ্ৰ কুঁচকালেন। তারপর বললেন, প্রায় ছয়শো লাখ। এতে থিবসের চেয়ে দ্বিগুণ বড় একটা নগরী গড়ে তোলা যাবে এর সমস্ত মন্দির আর প্রাসাদসহ।
একমত হয়ে আমিও মৃদুকণ্ঠে বললাম, আর দশ হাজার জাহাজ নির্মাণ করার পরও বেশ কয়েকটা যুদ্ধের খরচ যোগানোর মতো যথেষ্ট রূপা রয়ে যাবে মহামান্য ফারাও। এই পরিমাণ সম্পদ দিয়ে আপনি বর্বর হাইকসোদের কবল থেকে মিসরকে ফিরিয়ে আনতে পারবেন।
বিষয়টা উপলব্ধি করতে পেরে ফারাও একমত হলেন, আবেগে তার কণ্ঠস্বর উঠানামা করতে লাগলো, তুমি আমাকে প্রয়োজনীয় অর্থ দিয়েছ, যা দিয়ে আমি বিওন আর তার পুরো শক্তি ধ্বংস করতে পারবো।
এটন উঠে আমাকে আড়াল করে ফারাওয়ের সামনে দাঁড়িয়ে বললো, আপনি অনেক দেরি করে ফেলেছেন ফারাও। হাইকসোর বিওন ইতোমধ্যেই পানিতে ডুবে মরেছে। তারপর এক পাশে সরে গিয়ে আমার দিকে আঙুল তুলে বললো, তায়তা তাকে মেরে ফেলেছে।
এবার ফারাও আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, এটন যা বললো তা সত্যি? দেশের জন্য এতোকিছু করার পর তুমি বিওনকেও মেরে ফেলেছে?
আমি মাথা ঝুঁকে সায় দিলাম। গর্ব করাটা আমি ঘৃণা করি, বিশেষত আমার নিজের মধ্যে তা নেই।
সবকিছু খুলে বল তায়তা। ঐ দানবকে কীভাবে মারলে তার সবকিছু আমি জানতে চাই।
আমি উত্তর দেবার আগেই এটন মাঝখান থেকে বলে উঠলো, দয়া করে আর একবার আমার কথা শুনুন ফারাও। তারপর সে রাজার সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে বললো, এই কাহিনী আপনার পুরো রাজদরবারের সবার শোনা উচিত। জালিম হাইকসোদের উপর পূর্ণ বিজয়ের পর এটা আমাদের গৌরবময় সামরিক ইতিহাসের একটি অংশ হয়ে থাকবে। পরবর্তী প্রজন্ম তাদের সন্তানদের এই কাহিনী শোনাবে। আপনি যদি আমাকে অনুমতি দেন তাহলে আজ বিকেলে একটা বিজয়োৎসবের আয়োজন করবো। এতে রাজ্যের সমস্ত সভাসদ আর রাজপরিবারের সমস্ত সদস্য উপস্থিত থাকবেন। আর এই বিজয়োৎসব আমাদের ইতিহাসের এমন একটি সামরিক বিজয়কে সম্মান জানাবে যা আর কখনও হয়নি।
আপনি ঠিক বলেছেন এটন। তায়তা আমার জন্য এমন একটি কাজ করেছে যার প্রতি যথাযথ সম্মান দেখাতে হবে। এই অভূতপূর্ব সৌভাগ্যের কথা আমি এখুনি আমার সভাসদদেরকে জানাবো। আটজন সভাসদ এখন থিবসেই আছেন। সেনাপতি ক্রাটাস শিঘ্রই উত্তর থেকে আসছেন। আর আপনারা দুজনেই আছেন। আশা করি তিন চার ঘন্টার মধ্যেই রাজদরবারের সমস্ত সদস্যকে একত্রিত করতে পারবো।
ফারাওয়ের পোশাকের বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে আমি বললাম, এই সময়ের মধ্যে মাহামান্য ফারাও স্নান সেরে একটু বিশ্রাম নিয়ে নিতে পারবেন।
ঠিক বলেছ তায়তা। তবে গায়ের এই ময়লা কিন্তু পরিশ্রম আর হাইকসোদের রক্তের মূল্যে হয়েছে। যাইহোক দাসদের বল স্নানের পানি গরম করতে।
.
মিসরের পুরো রাজদরবার এক হওয়ার আগেই তৃতীয় তিনতলা জাহাজটি থেকে সমস্ত রূপার বাঁট নামিয়ে এনে দাঁড়িপাল্লায় ওজন করা হয়েছে। বিজয়োৎসবের প্রস্তুতি শেষ করার সাথে সাথে সূর্য অস্ত গেল।
আমি ফারাওকে খবরটা দিতে এলাম যে, অনুষ্ঠানের সমস্ত আয়োজন প্রস্তুত। প্রাসাদে ফিরে যাবার কষ্ট লাঘব করার জন্য আমি তার বাবার সমাধি কক্ষেই তার থাকার জন্য একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা করেছিলাম। এই কক্ষে কখনও কোনো মৃতদেহ আনা হয়নি, তাই এখানে মৃত্যুর গন্ধও নেই। শীতল এই জায়গাটি বেশ নীরব আর আরামদায়ক। তার দাসেরা তার জন্য বিছানা আর বহনযোগ্য কিছু আসবাবপত্রের ব্যবস্থা করেছিল।
তবে কোনো ধরনের বিশ্রাম না নিয়ে তিনি কামরায় পায়চারি করছিলেন আর তার তিনজন সচিবকে পত্রের তলিপি করছিলেন। পরিষ্কার পোশাকের উপর বুকে পোলিশ করা ব্রোঞ্জের বর্ম পরেছেন। এর উপরে সোনার কাজ করা। পরিষ্কার আর আঁচড়ানো কোঁকড়ানো চুল দেখে তাকে তার মায়ের মতোই সুন্দর দেখাচ্ছিল।
আমি নতজানু হতেই আমার কাঁধে এক হাত রেখে বাধা দিয়ে বললেন, না তায়তা। আমার একান্ত ইচ্ছা তোমাকে একজন মহান সদস্য করে আমার ভেতরের সভাসদদের একজন করে নেওয়া। তুমি আর আমার সামনে নতজানু হবে না।
আমি আমার নিজস্ব ভূমিকা নিয়ে বললাম, ফারাও অত্যন্ত দয়াশীল। আমি এমন সম্মানের যোগ্য নই।
তিনি একমত হয়ে বললেন, অবশ্যই তুমি তা নও। তবে আমি শুধু আমার সামনে তোমার এই নিচু হওয়াটা বন্ধ করতে চাই। শেঠের দিব্যি দিয়ে বলছি, তোমার এই কাজ দেখলে আমার মাথা ঝিম ঝিম করে। সোজা হয়ে দাঁড়াও তারপর বল মোট কত রূপা আমার জন্য এনেছ।
আমি আপনাকে বলেছিলাম ৬০০ লাখ ফারাও। তবে গণনার পর এই পরিমাণ থেকে বিশ লাখ কম পাওয়া গেছে।
আমার রাজ্য ফিরে পাবার জন্য আর তোমার মাথা উঁচু করার জন্য এটা অনেক বেশি। দরবারের সবাই কি এসেছেন?
সেনাপতি ক্রাটাসসহ সকলেই এসেছেন। তিনি এক ঘন্টা আগে থিবসে পৌঁছেছেন।
আমাকে সেখানে নিয়ে চল।।
সমাধিক্ষেত্রের ফটক থেকে বের হতেই আমি বুঝতে পারলাম এটন আমার সম্মানে কী বিশাল আয়োজন করেছে। উৎসবের পোশাক পরা রাজকীয় রক্ষিবাহিনীর মধ্য দিয়ে ফারাও আমাকে নিয়ে খালের তীরে স্থাপন করা বিশাল তাঁবুর দিকে এগিয়ে চললেন।
সেখানে পৌঁছেই দেখলাম রাজদরবারের সকল সদস্য সেখানে আমাদেরকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত রয়েছেন। সেখানে পুরো রাজপরিবার ছিল: তার দুই বোন, তার বাইশজন স্ত্রী আর ১১২ জন উপপত্নী। এছাড়া আরও ছিল অভিজাত সভাসদগণ, সেনাপতি, রাজ্য সদস্য আর অন্যান্য উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারি।
আমরা ঢুকতেই সবাই উঠে দাঁড়াল আর পুরুষরা তাদের তরবারি উঁচু করে আমার আর ফারাওয়ের যাওয়ার পথে একটা খিলান রচনা করলো। একইসাথে তাঁবুর বাইরে বাদকদল বীণা আর বাঁশির সমন্বয়ে একটি বিজয় সঙ্গীতের সুর বাজাতে শুরু করলো।
নির্দিষ্ট আসনে গিয়ে বসতে আমাদের বেশ সময় লাগলো। সমবেত প্রত্যেকে চাচ্ছিল আমাকে স্পর্শ করতে, আমার হাত ধরতে আর আমাকে অভিনন্দন জানাতে।
তাঁবুর ভেতরের দেয়ালের চারপাশে একটু পর পর এক মানুষ সমান উঁচু বিরাট মদের পাত্র সাজানো রয়েছে। সবাই যার যার আসনে বসার পর ভৃত্যরা লম্বা জার থেকে বড় বড় গ্লাসে লাল মদ ভরে দিল। একটা বড় মদ ভর্তি গ্লাস ফারাওয়ের সামে রাখতেই তিনি হাত দিয়ে সেটা ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বললেন।
এখানে আমরা তায়তাকে সম্বর্ধনা জানাতে এসেছি। তাকে ভালো লালমদ পরিবেশন কর, আজ গ্লাসে সেই প্রথম চুমুক দেবে।
আমি উঠে দাঁড়িয়ে গ্লাস হাতে নিয়ে ফারাওয়ের উদ্দেশ্যে তুলতেই বিশাল তাঁবুর মাঝে সবার চোখ তখন আমার দিকে ফিরলো।
সকল প্রশংসা ফারাওয়ের। তিনিই আমাদের মিসর। ফারাও আর মিসর ছাড়া আমরা কেবল ধূলোবালু। এছাড়া কোনো কিছুই সুন্দর নয়। তারপর গ্লাসটা ঠোঁটের কাছে নিয়ে বড় একটি চুমুক দিলাম। সমবেত নারীপুরুষ সবাই দাঁড়িয়ে আমার নামে হর্ষধ্বনি দিল। এমনকি ফারাও মৃদু হাসলেন।
আমি অনুভব করলাম আমি যত কম বলবো ওরা ততই আমাকে ভালোবাসবে, কাজেই আমি ফারাওয়ের উদ্দেশ্যে মাথা নুইয়ে সম্মান জানিয়ে আমার আসনে বসে পড়লাম।
ফারাও উঠে দাঁড়িয়ে ডান হাত আমার কাঁধে রেখে পরিষ্কার দৃপ্ত কণ্ঠে তার বক্তব্য শুরু করলেন।
তিনি কেবল বললেন, সম্মানিত রাজ-সদস্য তায়তা আমাকে অনুগ্রহ করেছেন। তিনি আমার এবং মিসরের জন্য বিরাট একটি কাজ করেছেন, এতো বড় কাজ তার আগে আর কেউ করেনি। আমিসহ প্রত্যেক জীবিত মিসরীয় আর পরবর্তী প্রজন্ম জন্ম গ্রহণ করবে তাদের সবার উচিত তাকে সম্মান জানানো।
আমি তাকে রাজকীয় উচ্চমর্যাদাপূর্ণ আসন দিয়েছি। এখন থেকে তিনি মেসিরের জমিদার তায়তা নামে পরিচিত হবেন। একথা বলার পর ফারাও একটু থামলেন। সবাই ভদ্রভাবে নীরব হয়ে রয়েছে। মেসির হচ্ছে নীল নদীর পুবতীরে একটি গ্রাম। থিবস থেকে ৩০ লিগ দক্ষিণে। কতগুলো মাটির কুঁড়েঘর আর সাধারণ কিছু মানুষ সেখানে বসবাস করছে। ফারাও এই ধাঁধাটা নিয়ে সবাইকে কিছুক্ষণ ভাবতে দিলেন।
এছাড়া আমি তাকে চিরকালের জন্য নীলনদের পূর্বতীর আর থিবসের দক্ষিণ দেয়ালের মাঝে যত রাজকীয় জমিদারি আছে সব কিছুর মালিকানা তাকে দিলাম।
এটা শোনার পর সমবেত সবাই অবাক হল আর সকলের মধ্য থেকে একটা গুঞ্জন উঠলো। মেসিরের নদীর তীর থেকে থিবস পর্যন্ত ত্রিশ লিগ জমি হচ্ছে পুরো রাজকীয় জমিদারির মধ্যে সবচেয়ে উর্বর।
তার এই মহৎ কর্ম দেখে আমি হতবাক হলাম। যাইহোক তার ডান হাতে চুম্বন দেবার সময় আমার মনে একটা দুষ্ট চিন্তা জাগলো যে, যেহেতু আমি তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী রাজা বানিয়েছি কাজেই আমার প্রতি এই অনুগ্রহ দেখিয়ে তিনি কোনো মন্দ কাজ করেননি।
এবার ফারাও রূপার মদের গ্লাসটি হাতে তুলে নিয়ে সমবেত সবার উদ্দেশ্যে বললেন, আমার রানি, আমার রাজকুমার আর রাজকুমারি, সম্মানিত সভাসদ এবং ভদ্রমহিলাগণ, আমি তায়তার প্রতি কৃতজ্ঞতা। তার প্রতি সম্মান দেখিয়ে আর তার দীর্ঘ জীবন কামনা করে এই সুরা পান করছি।
সবাই উঠে দাঁড়িয়ে পেয়ালা হাতে নিয়ে সমস্বরে বলে উঠলো, প্রভু তায়তার প্রতি কৃতজ্ঞতা, সম্মান আর দীর্ঘজীবন কামনা করছি।
মিসরের ইতিহাসে এটা সম্ভবত প্রথম কোন ঘটনা যে, মিসরীয় একজন ফারাও তার এক প্রজাকে সম্মান দেখিয়ে পান করলেন। তারপর তিনি নিজ আসনে বসে সকলকে বসার ইঙ্গিত করলেন।
খ্যাতি সবসময় সবার জন্য আসে না। এটন ভালো তবে শ্রেষ্ঠ নয়। নীল নদের পার্চ মাছের যে কাটাহিন পেটি পরিবেশন করা হয়েছিল, তাতে লবণ কম ছিল। আর মরুভূমির পাখির মাংসের কাবাব বেশি পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল। তাছাড়া রাজকীয় পাঁচককে সে বাহারাত মশলা খুব বেশি ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছিল। আমি হলে কাজটা আরও ভালো হত, যাই হোক মদটি মোটামুটি ভালো হওয়ায় খুব একটা অসুবিধা হয়নি।
ভোজের পর যখন সবাই ফুরফুরে মেজাজে রয়েছে তখন চারণকবির নাম ঘোষণা করার জন্য এটন উঠে দাঁড়াল। আমি মনে মনে ভাবতে লাগলাম এ জায়গায় আমি হলে কোন কবির নাম বলতাম। যেহেতু কবিতার বিষয়বস্তুই আমি নিজে, সুতরাং কবি পছন্দ করার কাজটা স্বভাবতই আমার করার কথা নয়। কাজেই আমি ধারণা করলাম রেজা কিংবা থোইয়াককেই এটন এই সম্মানসুচক কাজের জন্য বেছে নেবে।
কিন্তু সে সকলকে হতবাক করে দিল। প্রথমে সে মিসরের প্রখ্যাত চারণিকদের প্রশংসা করলো, তারপর বললো সে এমন একজনকে বেছে নিয়েছে যে আসল ঘটনার একজন চাক্ষুস সাক্ষী। অবশ্যই এটি একটি উদ্ভট চিন্তা। কখন এই ঘটনার বিবরণ একটা ভালো কাহিনীর উপাদান হিসেবে গুরুত্ব লাভ করেছে?
মহান ফারাও এবং উপস্থিত রাজপরিবারের সম্মানিত নারী সদস্যগণ, অনুগ্রহ করে সামনে এগিয়ে আসুন আর নীল কুমির রক্ষীবাহিনীর একজন সাহসী সেনাকর্মকর্তার কথা শুনুন, যিনি প্রভু তায়তার সাথে সাগরপাড়ি দিয়েছিলেন। তারপর সে একটু থেমে নাটকীয় ভঙ্গিতে বললো, এবার আসছেন ক্যাপ্টেন জারাস।
তাঁবুর পর্দা সরিয়ে জারাস ভেতরে ঢুকে ফারাওয়ের সামনে এসে নতজানু হল। সমবেত সকলেই নিশ্চুপ হয়ে তাকিয়ে রইল, এমনকি অন্যান্যদের মতো ফারাও নিজেও অবাক হলেন। আমি ভেবেছিলাম সমবেত সবার মাঝে একমাত্র আমিই নীল কুমির রক্ষীবাহিনীর ক্যাপ্টেন জারাসকে চিনতাম। তারপর হঠাৎ বিদ্যুৎচমকের মতো একটা কথা আমার মনে এলো।
আমি দ্রুত রাজকুমারী তেহুতির দিকে তাকালাম। সে সেনাপতি ক্রাটাস আর ফারাওয়ের কোষাধ্যক্ষ ম্যাডালেকের মাঝে বসেছিল। এখন সে টুলে বসে একটু সামনের দিকে ঝুঁকে অত্যন্ত আগ্রহসহকারে আর উজ্জ্বল চেহারা নিয়ে জারাসের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। সে এমন বোকা নয় যে, হাততালি দিয়ে বা তেমন কিছু করে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করবে যাতে বুঝা যায় যে, এটনের এই পছন্দে তার হাত আছে। তবে আমি ঠিকই বুঝতে পারলাম এটা তারই কাজ। যে কোনোভাবেই হোক সে এটনকে বাধ্য করেছে এই অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিতে।
আমি কখনও আমার দুই রাজকুমারির কূটনৈতিক দক্ষতাকে ছোট করে দেখিনি, কিন্তু এটা তো রীতিমতো ডাকিনীবিদ্যা। বেকাথার দিকে দৃষ্টি ফিরাবার সাথে সাথে বুঝতে পারলাম সেও এতে জড়িত রয়েছে।
ভোজ টেবিলের উল্টোদিকে বসে সে চোখ ঘুরিয়ে আর নানারকম অঙ্গভঙ্গি করে তার বড়বোনের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু তেহুতি তাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে চলেছে।
আমার বেশ রাগ হল। আবার জারাসের জন্য করুণাও হল। সে একজন চমৎকার যুবক, ভালো সৈনিক আর বাবা যেমন একজন ছেলেকে ভালোবাসে তেমনি তাকে আমি ভালোবাসতাম। আর এখন সে পুরো দুনিয়ার সামনে নিজেকে হাস্যাস্পদ করে তুলতে যাচ্ছে। হৃদয়হীনা দুই রাজকীয় শৃগালী এই ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর ফন্দী এঁটেছে।
জারাসের দিকে ফিরে তাকালাম। যে ভয়ঙ্কর বিপদে সে পড়তে যাচ্ছে সে সম্পর্কে তাকে উদাসীন মনে হল। সৈনিকের সাজ পরে সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বেশ সুন্দর লাগছে দেখতে। আমার ইচ্ছা হচ্ছিল কিছু একটা করে তাকে এই বিপদ থেকে বাঁচাই, কিন্তু আমি অসহায়। হয়তো একটা স্কুল ছাত্রের মতো হোঁচট খেতে খেতে সে আবৃত্তি করে যাবে, তবে তার সমস্ত প্রচেষ্টা এই কঠিন বিচারক কিংবা সমজদাররা রেজা কিংবা থোইয়াকের সাথে তুলনা করবে।
তারপর হঠাৎ আমি সচেতন হলাম মেয়েলি কণ্ঠের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, যেন আমার বাগানে বসন্তের ফুলের কেয়ারির উপর মৌমাছির ঝাঁক মধু আহরণ করতে করতে গুণগুণ করছে। ফিরে তাকিয়ে দেখলাম শুধু তেতি নয়, আরও অনেক বয়স্ক মহিলাও খোলাখুলি তার প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে। হাতপাখার আড়ালে ওরা মৃদু হাসছিল আর ফিসফিস করছিল। জারাস কখনও রাজদরবারে আসেনি, তাই ওরা কখনও ওদের কামুক নজর তার উপর ফেলতে পারেনি।
তারপর জারাস একবার কেশে প্রস্তুত হওয়ার ইঙ্গিত করতেই তাঁবুর মাঝে সবাই নিশ্চুপ হল। আমি দূরে মরুভূমি থেকে একটা শেয়ালের ডাক শুনতে পেলাম।
জারাস বলতে শুরু করলো। আমি জারাসকে যুদ্ধক্ষেত্রে তার অধীনস্থ লোকদেরকে নির্দেশ দিতে শুনেছি, কিন্তু কখনও তার কণ্ঠস্বরের গভীরতা কিংবা সুরেলা বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কোনোকিছু বুঝতে পারিনি। তার কণ্ঠস্বর একটা ঘন্টাধ্বনির মতো আর মরুভূমির বালুর ঢিবির উপর উড়ে বেড়ানো পাখির মতো ভেসে উঠলো। সমুদ্রতীরের পাথরের গায়ে ঝড়ের মতো আছড়ে পড়লো, আর উঁচু সিডার গাছের শাখায় হাওয়ার ঝাঁপটার মতো শোনাল।
প্রথম কয়েকটা স্তবক বলেই সে সকলকে মোহাবিষ্ট করে ফেললো।
তার শব্দচয়ন ছিল অপূর্ব। এমনকি আমি নিজেও হয়তো তেমন করতে পারতাম না। তার সময়জ্ঞান আর বর্ণনা ছিল দুর্নিবার। জলদগম্ভীর স্বরে সে নীলনদের বন্যার পানির মতো সবকিছু ধুয়েমুছে নিয়ে চলেছে।
যখন আমি হাইকসো ভণ্ড বিওনকে তিনটি তীর ছুঁড়ে মেরে ফেড়ে ফেলেছিলাম, সেই তিনটি তীর ছোঁড়ার ঘটনার বর্ণনা দেবার সময় মিসরের সমস্ত সভাসদ আসন ছেড়ে লাফিয়ে উঠে উল্লাসে হর্ষধ্বনি দিয়ে উঠলেন। আর ফারাও এমন জোরে আমার বাহু চেপে ধরলেন যে, এরপর অনেকদিন তার দাগ রয়ে গিয়েছিল।
বাকি সবার সাথে আমি নিজেও হাসি আর কান্নার মাঝে রইলাম আর সবশেষে উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিলাম।
সমাপ্তিতে পৌঁছার সময় সে বিশাল প্রবেশ পথের দিকে ঘুরে দুই হাত দুই দিকে মেলে ধরে বলতে লাগলো।
তারপর মহান তায়তা মিসরের সমস্ত দেবতা আর ফারাও ত্যামোসের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে কেঁদে বলতে শুরু করলেন, এটা কেবল সামান্য একটি নমুনা আমি আপনার জন্য অর্জন করেছি। সেই সম্পদের কেবল এক হাজার ভাগের একভাগ আমি আপনার সামনে হাজির করেছি। হে ফারাও ত্যামোস, আপনার প্রতি আমার ভালোবাসা আর কর্তব্যের এটি একটি প্রমাণ।
বাইরে মরুভূমিতে একটি মাত্র ঢাক বাজতে শুরু করলো আর তাঁবুর প্রবেশ পথ দিয়ে শিরস্ত্রাণ আর বর্মপরা দশজন সৈন্য ভেতরে ঢুকলো। ওরা একটা কাঠের তক্তা বহন করে নিয়ে এলো, যার উপর কতগুলো চকচকে রূপার বাট পিরামিড আকারে সাজিয়ে রাখা হয়েছে।
সবাই একযোগে উঠে দাঁড়িয়ে প্রশংসা আর হর্ষধ্বনি করতে লাগলো।
ওরা চিৎকার করে বলে উঠলো, জয় হোক ফারাও রাজার! সকল প্রশংসা তায়তার!
জারাসের বলা শেষ হওয়ার পর তাকে ওরা যেতে দিচ্ছিল না। ফারাও কয়েকমিনিট তার সাথে কথা বললেন। পুরুষেরা তার সাথে হাত মেলালো আর কেউ কেউ তার পিঠ চাপড়ালো। আর কয়েকজন মহিলা যারা মদ পান করেছিল তারা ফিক ফিক করে হেসে তার গায়ের সাথে বেড়ালের মতো নিজেদের গা ঘসতে লাগলো।
যখন সে আমার সামনে এলো, আমি তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে তার প্রশংসা করে বললাম, খুব ভালো লিখেছ আর চমৎকার বলেছো, জারাস। তুমি একজন যোদ্ধা আবার একজন কবিও বটে।
সে উত্তরে বললো, আপনার মতো একজন বিখ্যাত কবির কাছ থেকে একথা শুনে আমার খুবই আনন্দ হচ্ছে। আন্তরিকভাবে তার এই কথা বলাটা আমার মন ছুঁয়ে গেল। তারপর সে সমবেত দর্শকশ্রোতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চললল। সবশেষে রাজকুমারি তেহুতির সামনে এসে মাথা ঝুঁকিয়ে দাঁড়াল।
ওরা তাঁবুর অন্য প্রান্তে আমার কাছ থেকে বেশ দূরে ছিল। তবে কারও ঠোঁট নাড়া দেখে আমি তার কথা বুঝতে পারি, যেরকম একটা প্যাপিরাস থেকে পড়তে পারি।
তেহুতির প্রথম কথাটা ছিল, ধিক আপনাকে ক্যাপ্টেন জারাস! আপনার কবিতা শুনে আমার কান্না পেয়েছিল। তার এই কথার সাথে সাথে জারাস তার সামনে হাঁটুগেড়ে বসে পড়লো। তার মুখ আমি দেখতে পাচ্ছিলাম না, তাই তার কথাও বুঝতে পারিনি। তবে তার কথা শুনে তেহুতি হেসে উঠলো।
আপনি একজন বীর, ক্যাপ্টেন। তবে এক শর্তে আমি আপনাকে ক্ষমা করতে পারি। তাহল, কথা দিতে হবে যে আরেকদিন আপনি আমাদেরকে গান গেয়ে শোনাবেন। একথার উত্তরে জারাস হয়তো সম্মতি জানিয়েছিল, তাই তেহুতি আবার বললো, তাহলে এই কথাই রইল। এরপর জারাস উঠে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত সম্মান দেখিয়ে পেছন দিকে হটলো।
হায় ঈশ্বর! আমি ভাবলাম! হায় রে বোকা ছেলে, ফিরে এসো ওখান থেকে। তুমি ওদের সমকক্ষ নও। যুদ্ধের ময়দান থেকেও ভয়ঙ্কর বিপদে তুমি এখন পড়েছ। কিন্তু তেহুতি আবার তাকে থামাল।
আমি ওর ঠোঁট নাড়া দেখে কথাগুলো বুঝতে পারলাম, কী ঝামেলা হল। আমার আংটিটা মনে হয় মাটিতে পড়ে গেছে। একটু আগেই এটা আমার আঙুলে ছিল। দয়া করে একটু খুঁজে দেখুন না ক্যাপ্টেন জারাস?
একাজ করার জন্য সে এক পায়ে খাড়া ছিল। তেতির সামনে আবার মাটিতে ঝুঁকে সে আংটিটা খুঁজতে শুরু করলো আর প্রায় সাথে সাথে ওটা পেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে এক হাত সামনে বাড়িয়ে ধরে বললো, এটাই কি আপনার হারানো সেই আংটি, মহামান্য? এবার সে আমার দিকে একটু ঘুরে দাঁড়াতে আমি তার ঠোঁট নাড়া পড়তে পারছিলাম।
হ্যাঁ, এটাই তো। একজন বিশেষ মানুষ আমাকে এটা উপহার দিয়েছেন। যার প্রশংসা আজ সন্ধ্যায় আপনি করেছেন। তবে সে সাথে সাথে আংটিটা জারাসের হাত থেকে ফেরত নিল না।
আপনি প্রভু তায়তার কথা বলছেন?
সে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বললো, অবশ্যই! আপনার হাতে ধরা আংটিটার পাথরটার দিকে তাকিয়ে দেখুন তো। দেখুন কী স্বচ্ছ।
কাছাকাছি একটা মশালের কাছে আংটিটা নিয়ে সে সায় দিয়ে বললো, পানির মতো পরিষ্কার। তেহুতি তাকে বাধ্য করলো আংটিটা খুঁটিয়ে দেখতে, তারপর সে হাত বাড়িয়ে বললো।
ধন্যবাদ, ক্যাপ্টেন জারাস। তারপর জারাস আংটিটা তেহুতির বাড়ানো হাতে তুলে দিতেই তেহুতি তার মুঠো বন্ধ করলো।
আমি মনে মনে ভাবলাম, আংটিটার মধ্যে কোনো যাদু না থাকলেও, রাজকুমারি তেহুতি, তোমার হাসিতে যে জাদু আছে তাতে মেমফিস আর থিবসের দেয়াল দুপাশ থেকে চেপে পিষ্ট করে ফেলতে পারবে। জারাসের মতো একজন অপরিপক্ক যুবক কী করে তোমার ছলনা ঠেকাতে পারবে?
.
এখন সবচেয়ে প্রথম আর জরুরী কাজটি হল, কোনো ধরনের চিহ্ন না রেখে এই বিশাল তিনটি ক্রেটান তিনতলা জাহাজ গায়েব করে ফেলা। সর্বাধিরাজ মিনোজের মনে যেন বিন্দুমাত্র সন্দেহ না থাকে যে, হাইকসো বিওনই তার রত্নভাণ্ডারসহ জাহাজগুলো চুরি করেছে। ক্রোধে সে উম্মুক্ত হয়ে যাবে যখন জানবে যে, তার কথিত মিত্ৰই আসল অপরাধী।
প্রথমে ভাবলাম জাহাজ তিনটা পুড়িয়ে ছাইগুলো নীলনদে ভাসিয়ে দিই। যাতে এগুলো অদৃশ্য হওয়ার রহস্যটা চিরকালের জন্য মুছে যায়। তারপর আবার বিপুল পরিমাণে কাঠ বিনষ্ট হওয়ার বিষয়টা বিবেচনা করলাম।
মিসরে বনাঞ্চল খুব বেশি নেই। আমাদের কাছে কাঠ, সোনা রূপার মতোই মূল্যবান। এই বিপুল পরিমাণ কাঠ থেকে কতগুলো যুদ্ধ জাহাজ আর রথ তৈরি করা যাবে, এই বিষয়টা ভাবতেই এরকম দামি জিনিস পুড়িয়ে ফেলার চিন্তা থেকে নিজেকে বিরত রাখলাম।
বিষয়টা নিয়ে ফারাও আর আমাদের সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক প্রভু কাটাসের সাথে আলোচনা করলাম।
ক্রাটাস বললো, কিন্তু তায়তা, মিসরের কোথায় তুমি এতো কাঠ লুকিয়ে রাখবে? এই কথাটা কি ভেবে দেখেছো?
ফারাও আমার পক্ষ নিয়ে বললেন, একটা বিষয় আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন, ক্রাটাস। সেটা হল তায়তা নিশ্চয়ই তা ভেবে রেখেছে। তায়তা সবসময় সবকিছু ভেবে নিয়ে বলে।
আমি বিড়বিড় করে বললাম ফারাও আমার প্রতি অতি দয়াশীল। তবে আমি যথাসাধ্য বিনীতভাবে চেষ্টা করি। একথা শুনে ক্রাটাস হাসিতে ফেটে পড়লো।
ফারাও ঠিক বলেছেন। এ-বিষয়টা নিয়ে আমার কিছু চিন্তাভাবনা আছে। তবে আসল কথা হচ্ছে রূপারর্বাটগুলো পাহারা দেবার জন্য আপনার দেবত্বপ্রাপ্ত বাবা প্রয়াত ফারাও ম্যামোজের শূন্য সমাধিতে পুরো এক পল্টন সৈন্য রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। আর এই সৈন্যদেরকে দুই কাজে ব্যবহার করা যাবে।
এবার ক্রাটাসও মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনতে লাগলো।
ফারাও বললেন, বলে যাও।
দেখুন, আমি সমাধিকক্ষের পাশের কামরাগুলোর আয়তন আবার মেপে দেখেছি।
তিনতলা জাহাজগুলো ভেঙে যে কাঠের তক্তা পাওয়া যাবে সেগুলো সবই এই মাটির নিচের কুঠরিগুলোতে লুকিয়ে রাখা যাবে। তারপর সুবিধামতো যুদ্ধের প্রয়োজনে এগুলো আবার ব্যবহার করা যাবে। তারপর আমি ক্রাটাসের দিকে তাকিয়ে একটু টিটকারির সুরে বললাম, হয়তো প্রভু ক্রাটাসের এ-বিষয়ে আরও ভালো কোনো প্রস্তাব থাকতে পারে। তিনি হয়তো কাঠের তক্তাগুলো শুধু তার মুখের কথার ভারে লোহিত সাগরের নিচে ডুবিয়ে রাখতে পারবেন।
কিন্তু ক্রাটাস হাসতে হাসতে গর্জন করে বললো, তায়তা, তুমি আমার সাথে ভালোই রসিকতা করলে।
অর্ধেক পল্টন সৈন্যের কয়েক সপ্তাহ খাটুনির পর জাহাজগুলোর সমস্ত তক্তা খুলে প্রতিটার গায়ে সংখ্যা দেওয়ার পর মাটির নিচের কামরাগুলোয় সাজিয়ে রাখা হল। শেষপর্যন্ত আমার কৌশল কাজে লেগে গেল, বিশাল জাহাজগুলো সম্পূর্ণরূপে গায়েব হয়ে গেল।
এতে অবশ্য অতিরিক্ত একটা ঝামেলা এড়ানোর কাজের সুবিধা পেলাম। ফারাওকে দিয়ে আমি জারাসকে এই জাহাজ ভাঙার কাজের নেতৃত্বের ভার দিয়েছিলাম। কড়া নির্দেশ ছিল সম্পূর্ণ কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে এই সমাধি এলাকার মধ্যেই থাকতে হবে। কাজেই যখন দুই রাজকুমারি, তেহুতি আর বেকাথা তার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলো তখন আমি ভালোমানুষের মতো বলতে পারলাম যে, ফারাও তাকে একটি গোপন সামরিক অভিযানে পাঠিয়েছেন। তার ফিরতেও আরও বেশ কিছুদিন লাগবে।
হাইকসো যুদ্ধক্ষেত্রের চেয়েও থিবসের রাজপ্রাসাদ জারাসের জন্য অনেক ভয়ঙ্কর। আমি রাতে শুয়ে আমার অনুগ্রহভাজন এই ছেলেটির কথা ভেবে আতঙ্কে ঘামতে লাগলাম। তাকে আমি একজন বিশ্বস্ত বন্ধু ভাবতাম, যে আমার প্রাণ বাঁচিয়েছে, এছাড়াও সে ছিল একজন অকুতোভয় সেনানায়ক, একজন শিক্ষিত মানুষ আর এখন নিজেকে একজন কবি হিসেবে পরিচিত করেছে। আমাদের দুজনের মধ্যে অনেক মিল রয়েছে। তবে তার সমবয়সী অন্যান্য যুবকের মতো তার মধ্যেও কিছু দুর্বলতা রয়েছে যা সে এড়াতে পারে না।
আমি এটাও জানতাম একজন যুবতি মেয়ের কামনা তাকে কী রকম নির্মম আর বেপরোয়া করে ফেলে। তাকে প্রথম দেখার সাথে সাথে আমার আদরের তেহুতির দেহ-মনে আগুন জ্বেলেছে। এই আগুন নেভাবার আর কোনো পথ আমি ভেবে পেলাম না।
৩. একের পর এক পরিস্থিতি
থিবিসে ফেরার এরপরের দিনগুলোতে পর একের পর এক পরিস্থিতিতে আমি নিজেকে জড়িয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।
হাইকসো আর সর্বাধিরাজ মিনোজের মধ্যে যে রাজনৈতিক ঝড় বয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনা করার জন্য ফারাও সর্বক্ষণ আমাকে তার কাছে থাকতে বাধ্য করলেন।
পরিস্থিতির গুরুত্ব আর বিপদ বিবেচনা করে এটন আর আমি একমত হলাম যে, আমাদের সমস্ত গোয়েন্দা অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলোর এখন নিজেদের মধ্যে যুদ্ধবিরতী ঘোষণা করে সাময়িকভাবে একে অন্যের সহযোগিতা করতে হবে। নিজেদের বাঁচামরা আর মিসরের অস্তিত্ব রাখার প্রয়োজনে আমাদের এটা করতে হবে।
উত্তর দিক থেকে তথ্য আর খবরাখবর বয়ে নিয়ে আসা নাম না জানা বিভিন্ন নারী পুরুষ সারারাত আমাদের আলাদা আলাদা দরজা দিয়ে ঢুকে আবার অন্য দরজা দিয়ে বের হয়ে যেতে লাগলো। এছাড়া সংবাদবাহক কবুতরও সংবাদ নিয়ে আসতে লাগলো।
এটন আর আমি গোয়েন্দাদের কাছ থেকে পাওয়া প্রতিটা তথ্য সাবধানে পরীক্ষানিরীক্ষা করার পর ফারাও আর তার নিজস্ব কর্মকর্তাদের কাছে পাঠাতাম।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল রাজা বিওনের শবদাহ করার খবরটি। আমি তীর ছুঁড়ে তাকে মেমফিসের একটু আগে নীল নদীতে মেরে ফেলেছিলাম। বর্বর হাইকমোরা তাদের নিহত বীরদের দেহ আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে ফেলতো, ওরা আমাদের মতো উন্নত আর সভ্য জাতির মত মৃতদেহ মমি করতো না।
আর একই সাথে ওরা তাদের দানবীয় দেবতা শেঠকে খুশি করার জন্য নরবলিও দিত। এটন আর আমি জানতে পারলাম ওরা একশো বন্দী মিসরীয় যোদ্ধাকে জীবন্ত অবস্থায় রাজা বিওনের চিতায় ছুঁড়ে পুড়িয়ে মেরেছে। তারপর বিওনের পরবর্তী জীবনের আনন্দের সঙ্গী হিসেবে আরও একশো কুমারীকেও একই চিতায় পুড়িয়ে মেরেছে।
থিবসে একমাত্র আমিই প্রথম খবর পেলাম যে বিওনের শবদাহ সম্পন্ন করার পর তার ভাই গোরাব হাইকসোদের নতুন রাজা হয়েছে।
গোরাবের প্রথম চিন্তা ছিল তার বড়ভাইয়ের মৃত্যু প্রতিশোধ নেওয়া। শেখ আবাদা আর আসিউতের মাঝের সীমান্তে মিসরীয় বাহিনীর মুখোমুখি অবস্থান করা তার প্রথম সারির সেনাবাহিনী থেকে সে দশ হাজার সৈন্য প্রত্যাহার করে নিল। গোরাবের এই সিদ্ধান্ত মিসরের জন্য আনন্দের বিষয় ছিল। সম্পূর্ণ সীমান্তে ফারাওকে সবসময় ব্যস্ত থাকতে হয়েছিল। এখন পর্যন্ত বিওনের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হলেও মিসরীয় পক্ষেও কম প্রাণহানি হয়নি।
এখন ফারাওয়ের উপর থেকে চাপটা কমে যাওয়াতে তিনি তার অবস্থান সুসংহত করার সুযোগ পেলেন আর এদিকে গোরাব তার একচতুর্থাংশ সেনাকে উত্তরে তামিয়াতে আমার ফেলে আসা অক্ষত ক্রেটান সেনাবাহিনীর উপর আক্রমণ করার নির্দেশ দিল।
গোরাব তার ভাইয়ের হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী ছিল। সেসময়ে সে রাজকীয় বজরায় রক্ষীবাহিনীর অধিনায়ক ছিল। সে দেখেছে কীভাবে ক্রিটের তিনটি তিনতলা জাহাজ তাদের উপর চড়াও হয়েছিল আর সে এও লক্ষ্য করেছিল মিনোয়ান সেনাবাহিনীর পোশাক পরা সেনাকর্মকর্তা আর সৈন্যরা সেই অকারণ আর বিশ্বাসঘাতক হামলা চালিয়েছিল।
গোরাব দেখেছে যখন তার বড়ভাই পানিতে ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছিল, তখন একজন ক্রেটান তিরন্দাজ তার নিরস্ত্র ভাইকে তিনটি তীর ছুঁড়ে মেড়েছিল। তারপর সে তীরবিদ্ধ রাজা বিওনের মৃতদেহ পানি থেকে তুলে এনে চিতায় মশাল দিয়ে আগুন দেবার সময় কাঁদছিল। এরপর সে নিজহাতে হাইকসো রাজমুকুট মাথায় পরে ক্রিটের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল।
ক্রিটের বিরুদ্ধে গোরাবের যুদ্ধ ঘোষণা করার কথা শুনে এটন আর আমি উল্লসিত হলাম। গুপ্তচরদের কাছ থেকে আমরা জানতে পারলাম, আমি যে ছোট জাহাজটি তামিয়াতে রেখে এসেছিলাম, তাতে করে ক্রিটের উচ্চপদস্থ কয়েকজন সেনাকর্মকর্তা ক্রিটে ফিরে গিয়েছে। ছোট জাহাজটিতে চল্লিশজনের বেশি মানুষের জায়গা না হওয়ায় বাকিরা তামিয়াতেই রয়ে গিয়েছিল। জাহাজটি ক্রিটে পৌঁছার পর তাদের অধিনায়ক তামিয়াত দুর্গে হাইকসোদের অতর্কিত হামলা আর পুরো সম্পদসহ তিনটি বিশাল জাহাজ লুট করে নিয়ে যাওয়ার কথা সর্বাধিরাজ মিনোজের কাছে সবিস্তারে খুলে বললো। সে আরও জানালো জলদস্যুরা তাদের পরিচয় গোপন করার কোনো চেষ্টাই করেনি। তারা পুরোপুরি হাইকসো সেনা-পোশাক পরেছিল আর সে তাদেরকে হাইকসো ভাষায় কথা বলতে শুনেছে।
সর্বাধিরাজ মিনোজ সাথে সাথে তামিয়াতে আটকে পড়া বাদবাকি দুই হাজার ক্রেটান সৈন্য উদ্ধার করতে একটি রণতরী-বহর তামিয়াতে পাঠালেন। তবে জাহাজগুলো অনেক দেরিতে সেখানে পৌঁছালো।
তার আগেই রাজা গোরাব তার দশ হাজার সৈন্য নিয়ে সেখানে পৌঁছে গিয়েছিল। ক্রেটানরা প্রাণপণ চেষ্টা করলো বাধা দিতে, কিন্তু গোরাব অধিকাংশ ক্রেটান সেনা হত্যা করলো। যারা বেঁচে ছিল তারা আত্মসমর্পণ করলো, গোরাব তাদের সবার মাথা কেটে নিয়ে কাটা মুণ্ডগুলো দিয়ে একটা পিরামিড বানিয়ে দুর্গের নিচে জেটিতে সাজিয়ে রাখলো। গোরাব চলে যাবার পর ক্রেটান রণতরীগুলো সেখানে পৌঁছে দেখতে পেল পিকৃত মানুষের মাথাগুলো রোদে পঁচছে আর শকুন সেগুলো ঠোকড়াচ্ছে। ওরা ফিরে গিয়ে সর্বাধিরাজ মিনোজকে সংবাদটি জানাল।
সর্বাধিরাজ মিনোজ তার দেবতার বেদিতে দাঁড়িয়ে এর প্রতিশোধ নেবার প্রতিজ্ঞা করলেন। তারপর যুদ্ধ জাহাজ পাঠিয়ে পুরো উত্তর আফ্রিকার উপকূল জুড়ে সমস্ত হাইকসো বন্দর আর নৌঘাটির উপর হামলা চালিয়ে সবকিছু তছনছ করতে লাগলেন।
এদিকে রাজা বিওনও উত্তর মিসরে তার অধীনস্থ এলাকায় বসবাস করা সকল মিনোয়ানদের উপর হামলা চালিয়ে প্রতিশোধ নিতে শুরু করলো। মিনোয়ানরা পরিশ্রমী এবং বুদ্ধিমান জাতি। এরা সবধরনের শিল্পকর্ম আর ব্যবসা বাণিজ্যে পটু ছিল। তবে ওরা অন্যান্য ব্যবসায়ীদের চেয়ে অনেক উন্নত ছিল। যেখানেই কোনো লাভের সুযোগ সেখানেই ওরা এসে হাজির হত।
এছাড়া আর কীভাবে ক্রিটের মতো ছোট্ট একটি দ্বীপের অধিবাসীরা মধ্য সাগরের চতুর্দিকের স্থানগুলোতে প্রধান শক্তি হতে পেরেছিল?
উত্তর মিসরে কয়েক হাজার মিনোয়ান বসবাস করতো। রাজা গোরাব সমস্ত শক্তি আর নিষ্ঠুরতা নিয়ে স্থানীয় অধিবাসীদের উপর চড়াও হল। ওরা মিনোয়ানদের ঘর থেকে টেনে বের করে আনলো। নারী আর এমনকি কমবয়সী মেয়েদেরকেও ধর্ষণ করলো। তারপর নারী, পুরুষ, শিশু নির্বিশেষে সকলকে মিনোয়ান মন্দিরে আটকে রেখে আগুনে পুড়িয়ে মারলো।
কেউ কেউ দেশ থেকে পালাতে চেষ্টা করেছিল, কিন্তু খুব কমসংখ্যক মিনোয়ান সফল হল। যারা মধ্য সাগরের উপকূলের কাছাকাছি শহর আর বন্দরগুলোতে বসবাস করতো, তাদের মধ্যে সৌভাগ্যবান কিছু মিনোয়ানকে সর্বাধিরাজ মিনোজের জাহাজ উদ্ধার করলো। অন্যান্য যারা বেশি ভেতরে থাকতো তারা আরও ভেতরে মিসরের চারপাশের মরুভূমিতে পালিয়ে গেল। সেখানে পিপাসায় কাতর হয়ে আর নৃশংস বেদুঈনদের হামলায় ওরাও মারা গেল।
যাইহোক কয়েকশো মিনোয়ান পরিবার দক্ষিণের মেমফিস আর আসিউত থেকে পালিয়ে হাইকসো রথ এড়িয়ে আমাদের যুদ্ধ সীমান্তরেখা পর্যন্ত পৌঁছলো। সেখানে সেনাপতি ক্রাটাসের নির্দেশে আমাদের লোকজন শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে সদয় ব্যবহার করলো।
এই খবর শোনার সাথে সাথে আমি ঘোড়ায় চড়ে যত দ্রুত সম্ভব হাইকসোদের মুখোমুখি আমাদের সীমান্ত বাহিনীর কাছে গেলাম।
এই বাহিনীর কয়েকজন পদস্থ সেনাকর্মকর্তাকে আমি অনেক আগে থেকে চিনতাম। ওরা আমার কাছেই বিজ্ঞান, যুদ্ধবিদ্যা শিখেছিল আর আমার সুপারিশেই ওরা বর্তমান সামরিক পদবী লাভ করতে পেরেছিল।
এদের মধ্যে সেনাপতি রেমরেমকে থিবসের যুদ্ধ ক্ষেত্রেই ফারাও সম্মানিত করেছিলেন আর এখন সে সর্বাধিনায়ক জেনারেল ক্রাটাসের অধীনে একটি পল্টনের অধীনায়কত্ব করছে।
আমি যখন হুইকে পাকড়াও করি তখন সে ছিল একজন অপরাধী আর এখন সে পাঁচশো রথীর এক ঊর্ধ্বতন অধিনায়ক। পুরোনো এইসব বন্ধু আর পরিচিতরা আমাকে তাদের শিবিরে পেয়ে খুব খুশি হল, এমনকি সেই তিরষ্কারযোগ্য অত্যন্ত দুশ্চরিত্র বুড়ো সর্বাধিনায়ক ক্রাটাসও। সন্ধ্যায় জেনারেল ক্রাটাস আমাকে মদ খাইয়ে মাতাল করার চেষ্টা করলো। পরে আমিই তাকে কোলে করে তার বিছানায় নিয়ে গেলাম আর যখন সে বমি করে সব বের করছিল তখন আমিই তার মাথা ধরে রেখেছিলাম।
পরদিন সকালে সে আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে তার অধীনস্থ এক কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিল যেসব শরণার্থী রাজা গোরাবের কবল থেকে বেঁচে পালিয়ে এসেছে, তাদেরকে আমার সামনে হাজির করার জন্য।
হতভাগ্য এই চল্লিশজন মানুষ কোনোমতে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসেছে, সাথে কিছুই আনতে পারেনি। তাদের পরিবারের কাউকে না কাউকে হাইকসোরা হত্যা করেছে।
সারিবদ্ধ লোকগুলোকে পর্যবেক্ষণ করলাম, সম্মান দেখিয়ে মাঝে মাঝে দুএকটা প্রশ্ন করলাম।
সারির একেবারে শেষ মাথায় তিনজনের একটি পরিবার জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পরিবারটির কর্তা আমিথায়ন থেমে থেমে মিসরীয় ভাষায় কথা বললো। তিন সপ্তাহ আগে সে মেমফিসে শস্য, মদ আর চামড়ার ব্যবসা করতো। সফল এই ব্যবসায়ীর নাম আমিও এতদুর থেকে আমার লোকজনের কাছে শুনেছিলাম। হাইকমোরা তার বাড়িঘর আর গুদাম পুড়িয়ে ফেলে আর তার স্ত্রীকে তার চোখের সামনেই ধর্ষণ করেছিল। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মহিলাটি সেখানেই মারা যায়।
তার উনিশ বছর বয়সি ছেলেটির নাম ইকারিওন। তাকে দেখার সাথে সাথেই আমার ভালো লাগলো। লম্বাচওড়া বলিষ্ঠ গড়ন। ঘন কালো কোঁকড়ানো চুল আর সুন্দর মুখ। এতে ঘটনার পর তার বাবার মতো সে এতোটা ভেঙে পড়েনি।
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি নিশ্চয়ই তোমার নিজের হাতে বানানো ডানায় ভর করে উড়ে এসেছো?
ইকারিওন হেসে উত্তর দিল, অবশ্যই। তবে আমি সূর্য থেকে অনেক দূরে ছিলাম প্রভু। তার নাম নিয়ে আমার রসিকতা করাটা সে ঠিকই বুঝেছিল।
তুমি কি লেখাপড়া জান ইকারিওন?
হ্যাঁ জানি। তবে আমার বোনের মত তেমন পছন্দ করি না।
আমি মেয়েটির মুখের দিকে তাকালাম, সে তার বাপভাইয়ের পেছনে দাঁড়িয়েছিল। মেয়েটি দেখতে বেশ সুন্দর। লম্বা কালো চুল আর বুদ্ধিদীপ্ত উজ্জ্বল মুখ। তবে আমার রাজকুমারিদের মতো সুন্দর নয়। অবশ্য সুন্দর চেহারা আজকাল খুব একটা দেখা যায় না।
প্রায় তেহুতির সমবয়সী মেয়েটি বললো, আমার নাম লক্সিয়াস, বয়স পনেরো। পরিষ্কার মিসরী ভাষায় সে কথাগুলো বললো, যেন সে জন্মসুত্রে একজন মিসরী।
তুমি কি লিখতে পার লক্সিয়াস?
হ্যাঁ পারি প্রভু। প্রাচীন পারসিক কুনিলিপি, মিসরীয় গূঢ়লিপি আর মিনোয়ন লিপি–তিন পদ্ধতিতেই লিখতে পারি।
তার বাবা আমিথায়ন মাঝখান থেকে বলে উঠলো, সে আমার ব্যবসার হিসাবপত্র আর চিঠিপত্র লেখার কাজ করতো। খুবই বুদ্ধিমতি।
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি আমাকে মিনোয়ান ভাষা শেখাতে পারবে?
কয়েকমুহূর্ত ভেবে সে বললো, পিরবো, তবে এটা নির্ভর করবে আপনার শেখার ক্ষমতার উপর প্রভু তায়তা। মিনোয়ান সহজ ভাষা নয়। আমি লক্ষ্য করলাম সে আমার পুরো নাম আর উপাধি ব্যবহার করেছে। এতে বোঝা গেল মেয়েটি আসলেই বুদ্ধিমতি।
আমি তাকে আহ্বান জানিয়ে বললাম, একবার আমাকে পরীক্ষা করে দেখো। মিনোয়ান ভাষায় কিছু একটা বল।
সে রাজি হয়ে বললো, ঠিক আছে। তারপর সে মিনোয়ান ভাষায় দীর্ঘ একটা বাক্য উচ্চারণ করলো।
আমি তা পুনরুক্তি করলাম। শব্দ শুনে মনে রাখার আমার একজন। সংগীতশিল্পির মতো কান ছিল। যেকোনো মানুষের কথা শুনলে আমি তা সহজেই নকল করে বলতে পারি। এই ক্ষেত্রে আমি কী বলছি সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা ছিল না তবে যা আমি বলেছিলাম তা সঠিকভাবেই বলেছিলাম। ওরা তিনজনেই আমার দিকে হতবাক হয়ে তাকাল আর লক্সিয়াসের মুখ বিরক্তিতে লাল হল।
সে আমাকে বললো, আপনি আমার সাথে তামাসা করছেন প্রভু তায়তা। আমার আপনাকে শেখাবার প্রয়োজন নেই। আপনি আমার মতোই বলতে পারেন। কোথায় শিখেছেন এই ভাষা? আমি কোনো উত্তর না দিয়ে একটা রহস্যময় হাসি হেসে চলে এলাম।
হুইয়ের কাছ থেকে চারটি ঘোড়া ধার নিয়ে আমরা চারজন সেদিনই দক্ষিণে থিবসের পথে রওয়ানা দিলাম। ছোট এই পরিবারটির জন্য আমি শহরের দেয়ালের বাইরে মেশির নামে যে নতুন ভূ-সম্পত্তি লাভ করেছি তার একটি ছোট গ্রামে থাকার ব্যবস্থা করে দিলাম।
প্রতিদিন কয়েকঘন্টা লক্সিয়াসের কাছে মিনোয়ান ভাষা শেখা শুরু করলাম। কয়েক মাসের মধ্যেই লক্সিয়াস বললো, আমাকে আর শেখাবার। মতো তার কাছে আর কিছু নেই।
ছাত্র তার শিক্ষকের চেয়ে বেশি জেনেছে। আমার মনে হয় আপনি বরং আমাকে কিছু শেখাতে পারেন প্রভু তায়তা।
আমার দুই রাজকুমারী আমার মতো এতো আগ্রহী ছাত্রী ছিল না। প্রথমে ওরা দুজনেই গোঁ ধরে জানাল, মিনোয়ান ভাষার মতো এমন একটি নীরস আর গেঁয়ো ভাষার প্রতি তাদের কোনো আগ্রহ নেই। তাছাড়া একটা মিনোয়ান চাষির মেয়ের সাথেও তাদের কোনো কাজ-কারবার নেই। ওরা জানাল এটাই ওদের দুজনের শেষ কথা। তেহুতি বলে চললো আর বেকাথা পাশে দাঁড়িয়ে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে চললো।
আমি ওদের বড় ভাই ফারাও ত্যামোসের সাথে এ-বিষয়ে কথা বলতে গেলাম। আমি তাকে জানালাম আমাদের মিসরীদেরকে ক্রিটের সাথে সদ্য বেড়ে ওঠা সম্পর্ক থেকে সুবিধা নিতে হবে। আর এর অনেক কিছুই নির্ভর করছে আমাদের দুই রাজকুমারীর সর্বাধিরাজ মিনোজ আর তার রাজদরবারের সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করার উপর। তারপর তাকে জানালাম তার বোনদের বিষয়ে আমি কী পরিকল্পনা করেছি।
ফারাও তার দুই বিদ্রোহী ছোট বোনকে ডেকে অনেকক্ষণ তাদের সাথে বিতর্ক করলেন। অবশ্য এই একতরফা বিতর্ক এমন কড়াভাবে করলেন আর এমন ভয় দেখালেন যে আমি দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম যে তিনি হয়তো আসলেই তা করবেন। রাজকুমারীরা এরপর তাদের শেষ সিদ্ধান্ত পাল্টালো। তবে এরপর বেশ কিছুদিন আমার সাথে মুখভার করে রইল।
তবে বেশিদিন এই মুখভার রইল না, যখন আমি ওদের জন্য একটা পুরষ্কার ঘোষণা করলাম। প্রতি সপ্তাহ শেষে তাদের নতুন ভাষা শিক্ষক লক্সিয়াসের মতে যে বেশি উন্নতি করবে তাকে এই পুরষ্কার দেওয়া হবে। পুরষ্কারগুলো ছিল মেয়েদের কাছে আকর্ষণীয় জিনিস। এমিথায়ন শহরের বাজার থেকে আমার জন্য এগুলো খুঁজে আনতো।
কিছুদিনের মধ্যেই ওরা পরিষ্কার মিনোয়ান ভাষায় বক বক আর তর্কবিতর্ক শুরু করলো। আর লক্সিয়াস ওদেরকে সরাইখানা আর বস্তির উপযোগী কথ্য ভাষা শেখাল। কয়েক মাস পর এই তিনকন্যা এই সমস্ত কথা শব্দ উচ্চারণ করে আমাকে অবাক করে দিতে শুরু করলো।
এরপর ঐ ত্রিমূর্তি পরস্পরের এমন ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠলো যে ওদের সাথে থাকার জন্য রাজকুমারীরা লক্সিয়াসকে রাজকীয় হেরেমে নিয়ে এলো।
.
মেশির জমিদারির মালিকানার পাওয়ার পর মাঝে মাঝে আমি রাজপ্রাসাদ থেকে মুক্তি নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে ইচ্ছামত ঘুরে বেড়াতাম। সাথে দুই রাজকুমারী আর তাদের সর্বক্ষণের সঙ্গী লক্সিয়াসও থাকতো। আমি ওদেরকে দুই পা দুইদিকে ঝুলিয়ে ঘোড়ায় চড়া শেখালাম। এটা যেকোনো মিসরী নারী পুরুষের জন্য একটা কৃতিত্বপূর্ণ কাজ, বিশেষত ফারাওয়ের বোনদের জন্যতো বটেই।
এছাড়া আমি তিনকন্যার জন্য ওদের সামর্থ্য অনুযায়ী ধনুক বানিয়ে দিলাম। তীর ছোঁড়া শিখে নেবার পর ওরা ধনুকের ছিলা ঠোঁট পর্যন্ত টেনে আনতে পারতো আর একশো পা দূরত্বে ওদের জন্য যে লক্ষ্য আমি স্থির করে দিয়েছিলাম, সেই লক্ষ্যে তিনটির মধ্যে দুটো তীর লাগাতে পারতো। তীর ছোঁড়ার খেলায় আমি ওদের উৎসাহ যোগাতাম আর দিনের শেষে সবচেয়ে চৌকশ নারী তিরন্দাজের জন্য ভালো পুরস্কারের ব্যবস্থা করলাম।
আমার লোকেরা যখন জমিতে ফসলের বীজ বুনতো তখন ঝাঁকে ঝাঁকে বন্য পাখি এসে বীজগুলো খেয়ে ফেলতো। তীর ছুঁড়ে শিকারের জন্য প্রতিটি পাখি বাবদ আমি মেয়েদেরকে অতিরিক্ত উপহার দিতে শুরু করলাম। শিঘ্রই ওরা প্রত্যেকে দক্ষ শিকারীতে পরিণত হল।
আমি জানতাম ঘোড়ায় চড়া আর তীর ছোঁড়ার দক্ষতা পরবর্তী জীবনে ওদের খুব কাজে আসবে।
যথাসাধ্য চেষ্টা করলাম আমার দুই রাজকুমারীর সাথে ভালো সময় কাটাতে কেননা একবার রাজপ্রাসাদে ফিরে গেলে ফারাওয়ের কাজে আমাকে খুব ব্যস্ত থাকতে হত। এমন কোনো দিন ছিল না যে কোনো না কোনো সমস্যা সমাধানে কিংবা কোনো বিষয়ে তাকে আমার উপদেশ কিংবা মতামত না দিতে হত। আমার কোনো মতামত তিনি প্রত্যাখান করলে আমি কিছুই মনে করতাম না, কেননা আমি জানি একটু পরেই একই বিষয়ে আমার মতকেই তিনি তার নিজের মত হিসেবে চালাবেন।
.
এসময়ে আমি আরেকটি সমস্যার সম্মুখিন হলাম। তামিয়াত দুর্গ থেকে ফারাও ত্যামোসের জন্য যে সম্পদ এনেছিলাম তার যথাযথ ব্যবহার কীভাবে করা যায় সে বিষয়ে চিন্তা করে এখনও কোনো উপায় বের করতে পারিনি।
ফারাও অবশ্য এই সম্পদ তার প্রজাদের কল্যাণে ব্যবহারের জন্য উগ্রীব ছিলেন। তবে আমি ক্রিটের সর্বাধিরাজ মিনোজের ছাপ মারা রূপার বাঁট দিয়ে জাতীয় ঋণ পরিশোধ করা থেকে তাকে বিরত রেখেছিলাম।
আমি তাকে বললাম, হে মহান ফারাও, আপনি আর আমি দুজনেই জানি মিনোয়ান গুপ্তচরেরা আমাদের মিসরের প্রত্যেক নগরে রয়েছে। ওদের যে কারও খুব বেশি সময় লাগবে না ক্রিটে খবর পাঠাতে যে থিবসের প্রতিটি দোকান আর সরাইখানায় ক্রিটের ষাঁড়ের প্রতাঁকের ছাপমারা রূপার বাঁটে ছেয়ে গেছে।
ফারাও আঙুল তুলে তার বাবার সমাধিক্ষেত্রের দিকে নির্দেশ করে তিক্ত স্বরে বললেন, তাহলে তুমি বলতে চাচ্ছ যদি কোনোভাবে মিনোয়ানরা এই সম্পদের কথা জেনে ফেলে সেক্ষেত্রে এই কোষাগারের সম্পদ আমি কখনও খরচ করতে পারবো না?
আমাকে মার্জনা করুন মহামান্য মিসর অধিপতি। আপনি মিসরীয় জাতির পিতা। এই সম্পদ আপনার, যেভাবে ইচ্ছা আপনি এটা খরচ করতে পারেন। তবে তার আগে এর চেহারা এমনভাবে বদলে নিতে হবে যেন, জীবিত কোনো মানুষ বিশেষত সর্বাধিরাজ মিনোজ যেন এটা চিনতে না পারে।
এবার তিনি একটু সুর নরম করে বললেন, সেটা কীভাবে সম্ভব তায়তা?
আমাদেরকে প্রতিটা রূপার বাট ভেঙে অর্ধেক ডেবেন সমান ওজনের ছোট ছোট মুদ্রার টুকরা তৈরি করতে হবে। তারপর প্রতি টুকরা মুদ্রার উপর আপনার মুখের ছবির ছাপ মারতে হবে।
এবার ফারাও বিড়বিড় করে বললেন, হুমম! তাহলে তা আমার এই রূপার নতুন মুদ্রার নাম কী হবে? আমি জানতাম তার নিজের ছবি রূপার ছোট টুকরাগুলোর উপর থাকার কথা শুনে ফারাও খুশি হবেন।
ফারাও অবশ্যই একটি নতুন নামের কথা ভেবে থাকবেন। তবে আমার একটা ধারণা এই মুদ্রাগুলোর নাম রূপার মেম দেওয়া যেতে পারে।
এবার তিনি খুশি হয়ে মৃদু হেসে বললেন, আমার মনে হয় এটাই সঠিক হবে তাতা। আর নতুন এই রূপার মুদ্রায় অপর পিঠে কী ছবি থাকবে?
আমি মাথা ঝুঁকিয়ে বললাম, অবশ্যই ফারাও সে সিদ্ধান্ত নেবেন।
তিনি একমত হয়ে বললেন, অবশ্যই আমি তা নেব, তবুও তোমারও একটা মতামত আছে, তাই না?
আমি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললাম, আপনার জন্মক্ষণ থেকে আমি আপনার সাথে আছি তাই না মহামান্য?
হ্যাঁ, দেবতা হোরাস জানেন তুমি কতবার একথা আমাকে শুনিয়েছ। যখনই তুমি বর্ণনা কর প্রথম যে কাজটি আমি করেছিলাম, তা হল আমি তোমার উপর পেচ্ছাব করে দিয়েছিলাম, তখন ভাবি কেন আমি তখন আরও জোরে আর অনেকক্ষণ ধরে পেচ্ছাবটা করলাম না।
আমি তার কথার শেষাংশটা না শোনার ভান করে বললাম, আমি সবসময় আপনার কাছাকাছি আর পেছনে বিশ্বাসী এবং অনুগত ছিলাম। আমার মনে হয় এই ঐতিহ্য বজায় রাখাই মঙ্গলজনক। একথা বলে আমি থামলাম কিন্তু ফারাও আমাকে কথাটা শেষ করতে বলে বললেন, বলে যাও। তবে আমি মনে হয় বুঝতে পারছি তুমি কোন দিকে যাচ্ছ।
আমি অত্যন্ত বিনীতভাবে বলছি, হয়তো সবদিক বিবেচনা করে ফারাও রূপার মেম মুদ্রার পেছনে আহত বাজপাখির ছবি লাগাবার নির্দেশ দিতে পারেন। আমার কথা শেষ হতেই ফারাও জোরে হেসে উঠলেন।
সত্যি তুমি কখনও আমাকে হতাশ করোনা তাতা। তুমি প্রথম থেকেই সবকিছু ভেবে রেখেছিলে! একটিা ভাঙা ডানাসহ বাজপাখির ছবি আমার ব্যক্তিগত গূঢ়লিপি।
রাজানুকূল্যে আর কঠোর গোপনীয়তা বজায় রেখে আমি ম্যামোজের সমাধিক্ষেত্র এলাকায় একটি টাকশাল বসালাম। এই রূপার টুকরাগুলো বর্ণনা করার জন্য আমি মুদ্রা নামে একটি নতুন শব্দ ঠিক করলাম। ফারাও সাথে সাথে এর অনুমোদন দিলেন।
এই মুদ্রা ব্যবস্থাটি ছিল আমার আরেকটি অর্জন যা আমাদের মিসরের উন্নতি আর অগ্রগতির জন্য অসাধারণ একটি সহায়তা হিসেবে প্রমাণিত হল। একটি সুষম মুদ্রানীতি আজকাল সরকার পরিচালনা আর ব্যবসা-বাণিজ্যের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি হাতিয়ার। এটা ছিল মিসরের প্রতি আমার অন্যতম একটি উপহার আর এটিই অন্যতম প্রধান একটি কারণ যেজন্য আমরা সবসময় পৃথিবীর সবচেয়ে অগ্রগণ্য জাতি হয়ে থাকবো। অবশ্য এরপর থেকে অন্যান্য জাতিও আমাদের অনুকরণ করেছে আর রূপার মেম এখন এমন একটি মুদ্রা যা পৃথিবীর সব দেশে স্বীকৃত এবং সানন্দে গৃহীত হয়েছে।
আমার কনুইয়ের মৃদুস্পর্শ পেয়ে ফারাও তার পিতার সমাধিক্ষেত্রের নাম পরিবর্তন করে রাজকীয় টাকশাল নাম দিলেন। এরপর ফারাও আমাকে এই প্রতিষ্ঠানের প্রশাসক নিযুক্ত করলেন। এটা আমার অন্যান্য দায়িত্বের বাইরে বাড়তি আরেকটি দায়িত্ব। তবে যে কোনো দায়িত্ব পালনে আমি কখনও অনুযোগ করি না।
প্রশাসক পদে আসীন হওয়ার পর আমার প্রথম কাজটি ছিল জারাসকে রাজকীয় টাকশালের অভিভাবক ও কোষাধ্যক্ষ নিযুক্ত করা। এ দায়িত্ব পালনে সহায়তার জন্য জারাসকে অধিনায়ক করে তার অধীনে এক পল্টন সেনা দিতে আমি ফারাওকে অনুরোধ জানালাম। অবশ্য এতে জারাস পুরোপুরি আমার অধীনে চলে আসবে।
রাজকুমারী তেহুতি কৌশল করে জারাসকে তার হীরার আংটিটি পরীক্ষা করতে বাধ্য করেছিল আর এতে তার উদ্দেশ্য আমার কাছে পরিষ্কার হয়েছিল। তাই আমি অত্যন্ত সাবধানে তাকে নীলনদের পশ্চিম তীরে পৃথক করে রাখার ব্যবস্থা করেছিলাম। আমি জানি আমার আদরের রাজকুমারী যখন কোনোকিছু করতে মনস্থির করে তখন সেখান থেকে তাকে সরানো খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
আমার শুধু একটাই চিন্তা ছিল যতক্ষণ তার যথোপযুক্ত নিয়তি নির্ধারণ করতে না পারি ততক্ষণ রাজকুমারী তেহুতি আর জারাসের মাঝে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখতে হবে। এটা পরিষ্কার, তার নিয়তি হচ্ছে একজন রানি এবং পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক ব্যক্তির সঙ্গিনী হওয়া। একজন সাধারণ সৈন্য সে যতই সুন্দর আর ভালো হোক না কেন, তেহুতি তার খেলার সাথী আর তাঁবুর সহগামি হতে পারে না।
একটা বিষয় আমি জানতাম যে, রাজরক্তের সুন্দরী নারীর প্রতি সর্বাধিরাজ মিনোজের বিশেষ অনুরাগ আছে। তবে সত্যি বলতে কী কথাটা প্রমাণিত সত্য নয়। এটা আসলে একটা গুজব যা বার বার রটানোর ফলে সত্যে পরিণত হয়েছে।
তবে আমার বিশ্বাস ছিল যে, এই অসীম শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব আমার দুই রাজকুমারীর অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ নিশ্চয়ই এড়াতে পারবেন না। আর এর মাধ্যমে আমি মিনোয়ানদেরকে আমার আর মিসরের মঙ্গলের কাজে লাগাত পারবো। নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দিলাম যে, রাজসিংহাসনে আসীন হওয়া আর এই বর্বর হাইকসোদের হাত থেকে আমাদের প্রিয় মিসরকে রক্ষা করার চেয়ে অধিক সম্মানিয় আর উচ্চতর আর কোনোকিছুই তেহুতি আশা করতে পারে না। এটা যখন সে বুঝতে পারবে তখন জারাসের মতো সাধারণ মানুষের প্রতি তার আকর্ষণ হারিয়ে ফেলবে।
তবে ইতোমধ্যে এই চমৎকার যুবকটিকে রাজকীয় টাকশালের কাজে সমাধিক্ষেত্রের এলাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে রাখতে হবে যাতে সে নদী পার হয়ে রাজকীয় হেরেমের চারপাশে ঘুর ঘুর করার কোনো সুযোগ না পায়।
.
এ যাবত ফারাও আর রাজপরিষদের সমস্ত সদস্য সর্বাধিরাজ মিনোজ আর হাইকসো রাজা গোরাবের মাঝে বেড়ে উঠা সংঘর্ষের প্রতি খুবই আগ্রহ নিয়ে পর্যবেক্ষণ করছিলাম। আর যতদূর সম্ভব তাদের দুজনের মাঝে এই শত্রুতায় ইন্ধন যুগিয়ে যাচ্ছিলাম। দুর্ভাগ্যবশত তা যথেষ্ট ছিল না। ক্রিট অনেক দূরে অবস্থিত আর এর শাসকের সাথে আমাদের কোনো যোগাযোগ ছিল না।
তেহুতি আর বেকাথাকে এই কাজে লাগাবার যথোপযুক্ত সময়ের জন্য অপেক্ষা করার সময় আমি ক্রিট আর সর্বাধিরাজ মিনোজ সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে চেষ্টা করলাম। একাজে এমিথাওন আর তার মেয়ে লক্সিয়াস আমাকে ঐ দ্বীপরাষ্ট্রের ইতিহাস, জনগণ, প্রাকৃতিক সম্পদ আর বিশেষত এর শাসকদের সম্পর্কে অত্যন্ত মূল্যবান তথ্য জানিয়ে সহায়তা করলো।
ক্রিটের রাজা ছিল চারজন, আর সর্বাধিরাজ মিনোজ তার পদবী অনুযায়ী অন্য তিন রাজার উপর কর্তৃত্ব করতেন। তারা আলাদা আলাদা প্রাসাদে থাকতেন তবে এগুলো কুনুসসে প্রধান রাজপ্রাসাদের সাথে মার্বেল পাথরে ছাওয়া রাস্তার মাধ্যমে সংযুক্ত ছিল। মিসরে আমরা এদেরকে সাতরাপ কিংবা গভর্নর বলতাম, রাজা বলা হত না।
আমার প্রশ্নের উত্তরে এমিথাওন জানাল সর্বাধিরাজ মিনোজের নগরদুর্গ কুনুসসের দেয়ালের বাইরে তিনলিগ দূরে একটি গ্রামে তার জন্ম হয়েছিল। তার বাবা রাজপ্রাসাদের একজন কর্মকর্তা ছিলেন আর ছোটবেলায় সে মিনোজের বিভিন্ন উৎসব আর শোভাযাত্রা দেখেছে। এ-যাবত যাদের সাথে আমি এ-বিষয়ে কথা বলেছি তাদের মধ্যে সেই প্রথম ব্যক্তি যে মিনোজকে সচক্ষে দেখেছে।
এমিথাওন জানাল তিনি একজন জাঁকজমকপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, যিনি জনসমক্ষে বের হবার সময় মুখোশ পরে থাকতেন। ষাড়ের মাথার আকৃতিতে তৈরি মুখোশটি ছিল খাঁটি রূপার। প্রজারা কখনও তার মুখ দেখেনি।
এমিথাওন জানাল, তিনি অমর। সেই আদিকালে যখন এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তখন থেকেই তিনি শাসন করে আসছেন।
আমি মাথা নেড়ে ভাবলাম, তার প্রজারা কেউ যদি তার মুখ নাই দেখে থাকে তাহলে কীভাবে ওরা জানবে যে, একই ব্যক্তি এতোকাল শাসন করেছেন? আমার মনে হল দায়িত্বে থাকা একজন সর্বাধিরাজ মিনোজ মারা যাবার পর তার উত্তরাধিকারী রূপার ষাঁড়ের মুখোশটি পরে শাসনকাজ চালায়।
এমিথাওন বলে চললো, তার একশো স্ত্রী রয়েছে। কথাটা শুনে আমি অবাক হবার ভান করলাম। সে আবার বলতে শুরু করলো, এজিয়ান সাগরের বিভিন্ন দ্বীপে অবস্থিত নগর রাষ্ট্রগুলো থেকে সর্বাধিরাজ মিনোজ স্ত্রী পেয়ে থাকেন। বছরে চারবার ঋতু পরিবর্তনের সময় যে উৎসব হয়, তখন উপঢৌকন হিসেবে এদের পাঠানো হয়।
সর্বাধিরাজ মিনোজের কয়টি করদ রাজ্য আছে এমিথাওন?
সে বললো, হে প্রভু, তিনি একজন পরাক্রমশালী শাসক। ক্রিট দ্বীপের তিনটিসহ তার অধীনে মোট ছাব্বিশটি করদ রাজ্য আছে।
ক্রিট দ্বীপের ভৌগলিক বিবরণ আর এর লোকসংখ্যা সম্পর্কে এমিথাওন আমাকে অনেক কিছু জানাল। আমার কাছে এই দ্বীপের বেশ কয়েকটা মানচিত্র ছিল, কিন্তু প্রত্যেকটি ছিল ভিন্ন ভিন্ন। এমিথাওন এই মানচিত্রগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো, তারপর বিভিন্ন ভুল বিবরণ সংশোধন করে সঠিক একটি মানচিত্র বানাতে সহায়তা করলো। পূর্ণাঙ্গ এই মানচিত্রটিতে বিভিন্ন নগর, গ্রাম, বন্দর, জেটি, রাস্তাঘাট আর ক্রিটের পর্বতের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া গিরিপথগুলো দেখান ছিল।
পারিবারিক সম্পর্ক থাকার কারণে এমিথাওন আমাকে মিনোয়ান সেনা আর নৌবাহিনী সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য পরিসংখ্যান জানাতে পারলো।
পদাতিক সৈন্য ছিল প্রচুর। তবে এদের বেশিরভাগই ছিল অন্যান্য হেলেনিয় দ্বীপ, মেডেস এবং পূর্ব এশিয়ার ভাড়াটে আর্য সৈন্য। সে জানাল ক্রিট দ্বীপটি পার্বত্য এলাকা হওয়ার কারণে হাইকসো কিংবা মিসরের ফারাওয়ের তুলনায় মিনোয়ানদের রথের সংখ্যা খুব বেশি নয়।
মনে হচ্ছে এই অভাব মেটাবার জন্য সর্বাধিরাজ মিনোজ একটি শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ে তুলেন যা, মধ্য সাগরের যেকোনো নৌবাহিনীর তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল। এমিথাওন এই নৌবাহিনীর বিভিন্ন ধরনের জাহাজের সংখ্যা আমাকে জানাতে পারলো।
তবে এমিথাওন জাহাজের সংখ্যাটি এতো বেশি বলেছিল যে, আমার মনে হল সে অনেক বাড়িয়ে বলেছে। আবার ভাবলাম যদি আমার ভুল হয়ে থাকে আর এমিথাওনের কথিত সংখ্যাটিই সঠিক হয়, তাহলে বুঝতে হবে আসলেই সর্বাধিরাজ মিনোজ অত্যন্ত শক্তিশালী একজন শাসক।
.
এইসব খবরা-খবর সংগ্রহ করার পর আমি ভাবলাম এখন আমাদের সময় হয়েছে, মিনোয়ন আর হাইকসোদের মধ্যেকার এই লড়াইয়ে ক্রিটের পক্ষে সক্রিয় অংশগ্রহণ করা। আর এতে হয়তো আমরা যথেষ্ট চাপ প্রয়োেগ করে বর্বর হাইকসোদেরকে পরাস্ত করে আমাদের মাতৃভূমি থেকে তাদেরকে বিতাড়িত করতে পারবো।
এটন আর আমি যেসব তথ্য আমাদের গুপ্তচরদের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছিলাম তা সমস্ত একত্রিত করে পরীক্ষানিরীক্ষা করলাম। আমার গবেষণা কর্মের বিশালতা দেখে সে খুবই অভিভূত হল, কেননা তার নিজেরগুলোর চেয়ে আমার তথ্য অনেক বেশি ছিল।
অনেক তর্কবিতর্কের পর আমরা সবাই একমত হলাম যে, এখন সবচেয়ে ভালো হবে মিনোয়ানদের সাথে সরাসরি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা। আর ওদের সাথে একটি কার্যকর মৈত্রি চুক্তি করার দিকে এগিয়ে যাওয়া যাতে, এই
দুই জাতি মিলে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী একটি শক্তিতে পরিণত হয়, যে শক্তিকে হাইকসোরা কখনও চ্যালেঞ্জ করার আশা করবে না।
ঠিক তখনই উৎসাহের আতিশয্যে আমি একটা ভুল করে ফেললাম। এটনকে বললাম, আমার যদূর মনে পড়ে হাইকমোরা আকস্মিকভাবে মিসরে : হামলা করার আগে আমরা সবসময় ক্রিটের সাথে মোটামুটি একটি কূটনৈতিক সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলেছিলাম। যাইহোক হাইকসোরা উচ্চ মিসর দখল করে নেওয়ার পর আমাদের দেশের দক্ষিণাংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এতে ক্রিটের সাথে আর যোগাযোগ বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। হাইকসোরা আমাদের মাঝখানে ঢুকে দুটি দেশকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে।
আমার কথা শুনে এটন কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকাল। আমি থামার পরও সে কোনো কথা না বলে চুপ করে রইল। আমি বাধ্য হয়ে তাকে বললাম, তোমার কী মতামত এটন? আমার কথাটি কি তোমার মনঃপুত হয়নি?
সে আমার প্রশ্নের কোনো সরাসরি উত্তর না দিয়ে বরং আমার প্রথম কথাটায় ফিরে গিয়ে বললো, আমি কি ঠিক শুনেছি তায়তা? তুমি কি আসলেই একথা বলেছে যে, হাইকসোদের মিসর আক্রমণের আগের কথা তোমার মনে আছে?
আমার বয়স নিয়ে আমি সাধারণত খুবই সাবধানতা অবলম্বন করি। এমনকি এটনের মতো যারা আমার কাছের মানুষ তারাও আমার আসল বয়সের চেয়ে অনেক কম জানে। যদি আসল বয়সটা ওদের জানাতাম, তাহলে ওরা আমাকে একজন পাগল মানুষ কিংবা খুব বেশি হলে একজন মিথ্যাবাদী মনে করতো। হাইকমোরা প্রায় নব্বই বছর আগে মিসর আক্রমণ করেছিল আর ঘটনাটা আমার স্পষ্ট মনে আছে। কিন্তু এখন ভুলটা আমাকে শোধরাতে হবে।
প্রশ্নটা উড়িয়ে দিয়ে বললাম, কথাটা বলতে গিয়ে আমি একটু ঘোট পাকিয়ে ফেলেছিলাম। আসলে আমি বলতে চাচ্ছিলাম যতটুকু আমি পড়েছি আর শুনেছি, হাইকমোরা মিসর আক্রমণ করার আগে ক্রিটের সাথে আমাদের বন্ধুত্বমূলক সম্পর্ক ছিল। তারপর তাড়াতাড়ি বললাম, এখন যদি আবার তাদের সাথে বন্ধুত্বমূলক সম্পর্ক ফিরিয়ে আনতে চাই কিংবা কোনো ধরনের পারস্পরিক প্রতিরক্ষামূলক চুক্তি করার উদ্যোগ নিতে চাই, তাহলে তা সরাসরি করাটা খুবই শক্ত হবে। তুমি কি এতে একমত এটন?
সে সাথে সাথে কোনো উত্তর দিল না। কেবল অদ্ভুতভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আমার গলা থেকে নিয়ে লেখার টেবিলের উপর রাখা দুইহাত খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে লাগলো। এটন জানে বয়সের রেখা একজন মানুষের এই দুই জায়গার উপর বেশি পড়ে।
তবে এ-বিষয়ে আমি ব্যতিক্রম। থুতনিতে এখনও দাড়ি উঠেনি এমন একজন বালকের মতো আমার সারাদেহের চামড়া মসৃণ আর দাগহীন। সেখানে এটন আমার আসল বয়সের কোনো আলামত খুঁজে পেল না। সে চিন্তিত ভাবে মাথা নাড়তে নাড়তে আবার আমাদের পূর্বের আলাপের বিষয়ে ফিরে এলো।
এবার গলার সুর নরম করে সে বললো, বর্তমান পরিস্থিতির বিষয়ে তুমি যা বলছে তা একেবারে সঠিক তায়তা। এখন সরাসরি মিনোজের সাথে যোগাযোগ করা প্রায় অসম্ভব। সমস্যাটা তুমি ঠিকই ধরেছো, এখন বল সমাধান কীভাবে করা যাবে।
তুমি নিশ্চয়ই জানো আক্কাদ আর সুমের-এর রাজা নিমরদের রাজধানী ব্যবিলনে সর্বাধিরাজ মিনোজের একটা দুতাবাস আছে।
এটন সায় দিয়ে বললো, অবশ্যই জানি। কিন্তু ব্যবিলনে ক্রিট রাষ্ট্রদূতের সাথে যোগোযোগ করার জন্য আমাদের দূত পাঠাতে চাইলেও, সেই সফরও তোমার সেই তামিয়াত দুর্গ আক্রমণ করার চেয়েও অনেক দুর্গম হবে।
ঠিকই বলেছ এটন। এর দূরত্ব প্রায় দ্বিগুণ আর খুবই বিপজ্জনক আর অনিশ্চিত হবে। আমাদের দূতকে পূর্বদিকে লোহিতসাগর উপকূলের দিকে যেতে হবে। তারপর সাগর পার হয়ে বিশাল আর দুর্গম আরব মরুভূমি পাড়ি দিতে হবে। এটি এমন একটি জায়গা যা সমস্ত দয়ালু দেবতারা ত্যাগ করেছেন, এখানে বৈরী বেদুঈন গোষ্ঠিরা ঘুরে বেড়ায় আর বিচারের হাত এড়িয়ে চলা গলাকাটা দস্যু আর সমাজতাড়িত লোকজনদের বিচরণ রয়েছে। থিবস থেকে ব্যবিলনের দূরত্ব দেড় হাজার লিগেরও বেশি। আর সমস্যার এখানেই শেষ নয়।
কেন নয় তায়তা? আমরাতো জানি ব্যবিলনে মিনোজের একটি দুতাবাস আছে?
হ্যাঁ, তা আছে। তবে ক্রিট আর থিবসের মধ্যে একটা মৈত্রী চুক্তি করার মতো আলাপ আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা সেই রাজদূতের থাকার কথা নয়। সে বড়জোর একটা বার্তাসহ আমাদের দূতকে ক্রিটে সর্বাধিরাজ মিনোজের রাজদরবারে পাঠিয়ে দিতে পারবে। সেক্ষেত্রে আমাদের দূতকে মধ্য সাগরের একেবারে পুবপ্রান্তে গিয়ে টায়ার কিংবা সিডন বন্দরে গিয়ে একটা জাহাজ খুঁজতে হবে। তারপর সেই জাহাজের ক্যাপ্টেন নিতে রাজি হলেও তাকে শীতকালীন ঝড়, জলদস্যু আর হাইকসো যুদ্ধ জাহাজ এড়িয়ে মধ্য সাগরের অর্ধেক পর্যন্ত যেতে হবে। তারপরই সে ক্রিট দ্বীপের কুনুসসে সর্বাধিরাজ মিনোজের দুর্গে পৌঁছতে পারবে।
এতে কত সময় লাগতে পারে বলে তোমার ধারণা তায়তা?
ভাগ্য ভালো হলে আর দেবতা সহায় হলে প্রায় একবছর লাগবে আর নয়তো এর দ্বিগুণ সময় লাগবে।
এটন একটু চিন্তা করে বললো, দুই বছরে অনেককিছু ঘটে যেতে পারে।
আমি বললাম, এখানেই শেষ নয়। ফারাওয়ের কাছ থেকে বার্তা পাওয়ার পর সর্বাধিরাজ মিনোজ তার মন্ত্রণাপরিষদের সাথে বিষয়টা নিয়ে পরামর্শ করবেন, তারপর তার উত্তর নিয়ে একই পথে দূতকে থিবস ফিরতে হবে। পুরো সফরটা শেষ করতে প্রায় তিনচার বছর লেগে যাবে।
এটন বললো, না! এতোদিন আমরা অপেক্ষা করতে পারি না। এর মধ্যে তো রাজা গোরাব তার এক লক্ষ হত্যাকারী দস্যু সৈন্য নিয়ে থিবস আক্রমণ করে বসবে। অন্য কোনো সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।
তুমি ঠিক বলেছ প্রিয় বন্ধু এটন। এ-বিষয়ে তোমার মনে আর কোনো ভাবনা আছে? আমি সমস্যাটা আবার তার কাছে ফিরিয়ে দিলাম।
বোকার মতো মুখ করে সে মৃদু হেসে বললো, তোমার মতো এই সমস্যাটা নিয়ে আমি ভাবিনি। আমার মনে হয় তোমার মনে কোনো পরিকল্পনা আছে, তাই না?
আচ্ছা ধর, ফারাও একজন মিসরীয় রাষ্ট্রদূতকে নিয়োগ দিয়ে তার সাথে এমন একটি বিশাল বাহিনী দিলেন যা তাকে দ্রুত লোহিত সাগর আর এরপরের মরুভূমির দস্যুদল আর বেদুঈন গোষ্ঠীদের এড়িয়ে নিরাপদে সফর করতে সহায়তা করবে। আর যদি এই রাষ্ট্রদূতকে যথেষ্ট পরিমাণ রূপা দেওয়া হয়, যা দিয়ে সে টায়ার বন্দর থেকে বেশ বড় আর দ্রুতগামি একটা জাহাজ ভাড়া করতে পারবে। তারপর এই দ্রুতগামি জাহাজে সাগর পাড়ি দিয়ে জলদস্যু আর হাইকসো যুদ্ধ জাহাজকে এড়াতে পারে, তাহলে কেমন হয়?
এবার এটনের চোখ উজ্জ্বল হল, সে বললো, হ্যাঁ ঠিক!
আর এই চমৎকার জাহাজটি যদি সোজা ক্রিটের কুনুসসে পৌঁছাতে পারে? আর এই রাষ্ট্রদূতের কাছে যদি এমন উপঢৌকন থাকে যা সর্বাধিরাজ মিনোজ খুবই পছন্দ করেন? তারপর একদিকে মাথা হেলিয়ে চোখ সরু করে বললাম, তোমার কী কোনো ধারণা আছে কী ধরনের উপহার মিনোজের সবচেয়ে পছন্দ?
এবার এটন হেসে বললো, মনে হয়, আছে বন্ধু। আমি যতদুর শুনেছি মিনোজের এমন এক জোড়া অণ্ডকোষ আছে যা আমাদের দুজনের মিলিয়ে নেই। অর্থাৎ যা থেকে আমরা বঞ্চিত হয়েছি তার চেয়ে ওগুলো কয়েকগুণ বেশি ওজনে ভারি। আর যে জিনিস নিয়ে আমরা মাথা ঘামাই না তার প্রতি তার তৃপ্তিহীন ক্ষুধা রয়েছে।
তার কথা শুনে আমিও হাসলাম, যেন হাসা দরকার তাই। তবে আমার এই দৈহিক অসম্পূর্ণতার বিষয়টি আমার কাছে খুব একটা রসিকতা করার মতো বিষয় মনে হয় না।
কিন্তু তায়তা এতে আমাদের কী লাভ বল? রাজা গোরাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এটা আমাদের কি কাজে আসবে? মিসরের সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব থিবসে ফারাওয়ের হাতেই থাকবে। তার প্রতিটা নির্দেশ এতো দূরে জানাতে হবে, যে কথা আমরা দুজনে এতোক্ষণ আলোচনা করলাম।
আমি তার কথার উত্তরে মন্তব্য করলাম, আবারো তুমি সমস্যাটির ঠিক আসল জায়গায় হাত দিয়েছ। যাইহোক এ-বিষয়েও আমার কিছু চিন্তা আছে। যদি ফারাওয়ের এই রাষ্ট্রদূত রাজকীয় সীলমোহর বহন করে, তাহলে সে সময় নষ্ট না করে ক্রিটে মিনোজ আর তার সভাসদদের সাথে মিলে যুদ্ধে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রায়ই যুদ্ধে জয় এনে দেয়।
এটন খুব জোরে জোরে মাথা নাড়তে নাড়তে বললো, কখনও না! যাকে তিনি সন্দেহাতীতভাবে বিশ্বাস করেন, তাকে ছাড়া আর কারও হাতে ফারাও সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব আর যুদ্ধ পরিচালনা করার ক্ষমতা তুলে দেবেন না।
আচ্ছা বলতো এটন! তোমার কি মনে হয় মিসরে কি এমন কেউ নেই যাকে ফারাও ত্যামোস নিঃসন্দেহে বিশ্বাস করেন?
না, আমার বিশ্বাস তেমন কেউ নেই। তারপর হঠাৎ কথা থামিয়ে সে আমার দিকে অবজ্ঞাভরে তাকিয়ে বললো, এই তায়তা! তুমি নিশ্চয়ই একথা বলছো না যে রাজকীয় সীলমোহরসহ ফারাও তোমার হাতেই মিসরীয় সেনাবাহিনীর উত্তরাঞ্চলের পুরো কর্তৃত্ব তুলে দেবেন? তুমি তো একজন সৈনিক নও তায়তা! যুদ্ধের কী জান তুমি?
তুমি যদি আমার লেখা যুদ্ধের কলাকৌশল গ্রন্থটি না পড়ে থাক তাহলে এ-বিষয়ে আমার যোগ্যতা নিয়ে তোমার কিছু বলার অধিকার নিয়ে আমি প্রশ্ন তুলতে পারি। সেনা মহাবিদ্যালয়ের প্রতিটি ছাত্রকে এ-বিষয়ে সর্বশেষ জ্ঞান হিসেবে এই গ্রন্থটি পড়ানো হয়।
আমি স্বীকার করছি এটা আমি কখনও পড়িনি। তোমার এই বিখ্যাত গ্রন্থটি খুব বেশি বড় আর এই বিষয়ে আমার তেমন আগ্রহও নেই; কেননা আমার মনে হয় না আমাকে কখনও কোনো সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিতে হবে। তবে আমি যা বলছি, তাহল পার্চমেন্ট কাগজে কিছু হিজিবিজি লেখা আর প্রকৃত যুদ্ধক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়াটা একরকম ব্যাপার নয়। তোমার কি কোনো সেনাবাহিনীকে সরাসরি নির্দেশ দেবার অভিজ্ঞতা আছে?
এবার আমি গলার স্বর নরম করে বললাম, বেচারি এটন, তুমি আমার সম্পর্কে কত কম জান। এ-বিষয়ে কথা শেষ করার আগে আমি তোমাকে শুধু জানাচ্ছি আমাদের সেনাবাহিনীর প্রথম রথটি আমিই বানিয়েছিলাম। আর থিবসের যুদ্ধে ফারাও ত্যামোসের রথের চালকও ছিলাম আমি। আর যুদ্ধ চলাকালে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেবার সময় ফারাও আমার পরামর্শের উপর নির্ভর করতেন। যুদ্ধে আমার বিশেষ অবদানের জন্য ফারাও আমাকে সাহসিকতা আর প্রশংসার সোনার পদক দিয়েছিলেন। সেদিন তার জীবন রক্ষার দায়িত্ব তিনি আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। আবারও তা করতে পারেন।
আমি এতোকিছু জানতাম না তায়তা। আমার ধৃষ্টতা ক্ষমা করো বন্ধু। তুমি সত্যি অনেক গুণের আঁধার।
আমি অনেক সময় বিভিন্ন বিষয়ে এটনের নিজের অবস্থানটা তাকে মনে করিয়ে দেওয়াটা প্রয়োজনবোধ করতাম। তবে ক্রিট অভিযানের বিষয় নিয়ে ফারাওয়ের কাছে পেশ করার জন্য যে প্রতিবেদন তৈরি করতে যাচ্ছিলাম সে বিষয়ে তার সাহায্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। একবার সঠিক পথটা জানিয়ে দিলে সে খুঁটিনাটি সবকিছু খুব ভালো বুঝতে পারে।
.
এটনের মতো ফারাও আমার যোগ্যতা সম্পর্কে কোনো অবজ্ঞা দেখালেন না। বিশেষত তামিয়াত দুর্গে আমার সাম্প্রতিক সাফল্যের পর তিনি বরং ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। পুরো দুই দিন মিনোজের সাথে আমার যোগাযোগের পরিকল্পনাটির বিভিন্ন দিক নিয়ে আমার সাথে কথা বললেন। মাঝে মাঝে দুএকটা বিষয়ে প্রশ্ন তুললেন, তারপর আলোচনা শেষে বললেন, আমি তো তোমার পরিকল্পনায় কোনো খুঁত দেখতে পাচ্ছি না তাতা। তবে আমার মনে হয় জেনারেল ক্রাটাস আর তার সহকর্মীরা কোনো কোনো বিষয়ে আপত্তি করতে পারে।
ফারাও আর তার পূর্ণ সভাসদদের উপস্থিতিতে আমি জেনারেল ক্রাটাসের সামনে আমার পরিকল্পনা তুলে ধরলাম। আমার কথা শোনার পর ক্রাটাস রেগেমেগে মুখ লাল করে লাফ দিয়ে উঠে পুরো রাজদরবারে দাপাদাপি করে বেড়াতে লাগলো। আমার নাকের সামনে আঙুল নেড়ে টেবিলের উপর ঘুসি মেরে চিৎকার করে সমস্ত দেবতাদের উদ্দেশ্যে সে ভবিষ্যৎ বিপদাশঙ্কা আর সর্বনাশের সতর্কবাণী উচ্চারণ করতে লাগলো। প্রকৃতিগতভাবে ক্রাটাস একজন নিষ্ঠুর ব্যক্তি হলেও সে একজন ভালো যোদ্ধা।
চিৎকার, দাপাদাপি, দেবতাদের উদ্দেশ্যে শপথ ইত্যাদি করতে করতে মুখে ফেনা তুলে যখন সে আর কথা বলতে পারছিল না, ততক্ষণ আমি অপেক্ষা করলাম। তারপর আমি শান্তকণ্ঠে বললাম, একটা কথা আমি বলতে ভুলে গিয়েছিলাম জেনারেল ক্রাটাস। হুই আর রেমরেমকে আমি আমার সাথে ক্রিটে নিয়ে যেতে চাই। আমার দৃঢ় বিশ্বাস আপনি তাদের বদলি উপযুক্ত সেনাকর্মকর্তা খুঁজে নিতে পারবেন।
ক্রাটাস বাকরুদ্ধ হয়ে কিছুক্ষণ আমার দিকে রইল, তারপর হঠাৎ সে হাসতে শুরু করলো। হাসির দমকে তার সারা শরীর কেঁপে উঠলো, টলতে টলতে পিছু হটে তার বিশাল বপু নিয়ে সে ধপাস করে চেয়ারে বসে পড়লো। এই চেয়ারটা বিশেষ করে তার জন্যই তৈরি করা হয়েছে আর সে যেখানেই যায় এটা সাথে নিয়ে যায়। কিন্তু এখন তার ওজনের ভারে চেয়ারের জোড়গুলো শব্দ করে প্রায় আলগা হয়ে যাবার জোগাড় হয়েছে।
যেভাবে সে হঠাৎ হাসতে শুরু করেছিল, ঠিক সেরকমভাবে হঠাৎ হাসি থামিয়ে নিচু হয়ে পোশাকের ঘের উঠিয়ে মুখ মুছতে লাগলো। এতে তার পুরুষাঙ্গ পুরোপুরি অনাবৃত হয়ে সবার চোখের সামনে উন্মুক্ত হয়ে পড়লো। এরপর টিউনিকের ঘের হাঁটুর কাছে নামিয়ে দিয়ে সে স্বাভাবিক কণ্ঠে ফারাওকে উদ্দেশ্যে করে বলতে শুরু করলো, মহামান্য, তায়তার পরিকল্পনায় কিছু ভালো দিক দেখা যাচ্ছে। একমাত্র সে এই পরিকল্পনার কথা ভাবতে পারে এবং সভাসদদের সামনে তুলে ধরার মতো বুকের পাটা একমাত্র তারই আছে। তারপর সে গভীর অনুশোচনার ভান করে নিজের কপাল খামচে ধরে গভীরভাবে বললো, আমাকে ক্ষমা করুন ভদ্রমহোদয়গণ, আমি হয়তো ভুল রূপক ব্যবহার করে ফেলেছি। তারপর আবার সে হাসিতে ফেটে পড়লো।
আমার বিশেষ অঙ্গটির অভাবের দিকে ইঙ্গিত করে তার রসিকতা করা সত্ত্বেও আমি ভাবলেশহীন চেহারা করার চেষ্টা করে বললাম, তাহলে আমি মনে করতে পারি যে, হুই আর রেমরেম আমার সাথে ক্রিট যাচ্ছে?
নিয়ে যাও তায়তা। সামরিক যশ অর্জনের প্রতি তোমার উচ্চাভিলাষ প্রশংসার যোগ্য। আমার আশীর্বাদসহ আমার সর্বশ্রেষ্ঠ লোকদুজনকে নিয়ে যাও। হয়তো তোমাকে তোমার হাত থেকে ওরা রক্ষা করতে পারবে। যদিও আমার সন্দেহ কেউ হয়তো তা পারবে না।
.
ব্যবিলন যাত্রার প্রস্তুতি শেষ করতে প্রায় দুইমাস লেগে গেল।
আমার বেশি দুশ্চিন্তা ছিল দুই রাজকুমারী আর তাদের সফরসঙ্গীদের স্বাচ্ছন্দ্য আর নিরাপত্তা নিয়ে। তাদের নিত্যকার প্রয়োজন মেটাবার জন্য ক্রীতদাস আর ভৃত্যের ৮৩ জনের একটি দল ছিল। এদের মধ্যে ছিল পাঁচক, রান্নাঘরের দাসী, শয়ন কক্ষের পরিচারিকা, পোশাকভাণ্ডারের কত্রী, প্রসাধন ও কেশপরিচর্যাকারী, শরীর মালিশকারী, বাদকদল এবং অন্যান্য পেশাদার আনন্দদানকারী। এছাড়া একজন গণক আর তাদের আধ্যাত্মিক প্রয়োজন মেটাবার জন্য মেয়েরা আনন্দ, ভালোবাসা আর মাতৃত্বের দেবী হাথোরের তিনজন নারী পুরোহিত নেবার জন্য বায়না ধরলো। আমার আপত্তি সত্ত্বেও ওদের বড়ভাই তাদের কোনো আবদারই বিফলে যেতে দিলেন না।
ফারাওয়ের ধনভাণ্ডার এখন উপচে পড়ছে আর তিনি অকৃপণভাবে টাকা ঢালতে লাগলেন। এতোবছর হিসেব করে চলার পর এখন ইচ্ছামতো খরচ করতে পেরে তার বোনদের চেয়েও তিনি বেশি উপভোগ করছেন।
এতে মেয়েরা উৎসাহিত হয়ে তাদের পোষা বেড়াল, বানর, পাখি আর শিকারী কুকুরের পরিচর্যা করার জন্য আলাদা লোক নিল। এগুলো ছিল রাজকীয় আস্তাবল থেকে যে বিশটি ঘোড়া বেছে নেওয়া হয়েছিল তার সহিস আর অন্যান্য লোকবলের অতিরিক্ত।
আমি চেয়েছিলাম মেয়েদের পোশাকপরিচ্ছদ যেন সবচেয়ে উৎকৃষ্ট মানের হয়, যাতে ক্রিটে পৌঁছাবার পর সর্বাধিরাজ মিনোজ আর তার রাজদরবারের অমাত্যদের সামনে ওদের খুবই সুন্দর দেখায়। এ-বিষয়ে ফারাও আমাদের সাথে পরামর্শ করলেন, তারপর আমি দুই রাজকন্যার প্রত্যেকের জন্য যে চমৎকার পোশাকগুলো নকশা করেছিলাম, সেগুলো কাটা আর সেলাই করার জন্য মিসরের সর্বশ্রেষ্ঠ দর্জিদের নিয়োগ দেওয়া হল।
মেয়েদেরকে সাথে নিয়ে আমি থিবসের বাজারের বিভিন্ন দোকান ঘুরে। প্রচুর চোখধাঁধানো গহনা কিনে নিয়ে এলাম। এগুলো দেখলে মিনোজ আর তার সভাসদরা আমাদের রাজ্যের সম্পদ আর গুরুত্ব বুঝতে পারবে। থিবস থেকে যাত্রা শুরু করার এক সপ্তাহ আগে তেহুতি আর বেকাথা একে একে সমস্ত পোশাক আর গহনা পরে ফারাও আর আমার সামনে এসে দাঁড়াল। আমি ওদের দেখে সন্তুষ্ট হয়ে ভাবলাম, যে কোনো মানুষ, সে রাজা হোক আর সাধারণ মানুষ হোক এদের দুজনের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারবে না।
সফরের প্রস্তুতির এ-পর্যায়ে এসে মেয়েদুটোর উৎসাহ উদ্দীপনা বেড়ে গেল। তাছাড়া লক্সিয়াস যখন ওদেরকে ক্রিট দ্বীপের বর্ণনা দিল তখন ওরা আরও উত্তেজিত হয়ে পড়লো। ওরা জীবনে কখনও সমুদ্র দেখেনি আর সমুদ্র পাড়িও দেয়নি। উঁচু পর্বত কিংবা উঁচু গাছের ঘন জঙ্গলও দেখেনি। ওরা কখনও সেই পর্বত দেখেনি যার মুখ দিয়ে ধূঁয়া আর আগুন বের হয়। ওরা আমাকে আর লক্সিয়াসকে এসব বিষয়ে রাতজেগে একের পর এক প্রশ্ন করে যেতে লাগলো।
পশ্চিমতীরে অবস্থিত রাজকীয় টাকশাল রাত দিন কাজ করে একশো বড় ক্রেটান রূপার বাট ভেঙে কয়েকগাড়ি রূপার মেম মুদ্রা তৈরি করা হলো। এগুলো দিয়ে আমাদের সফর আর ক্রিট আর বিদেশের অন্যান্য জায়গায় অবস্থানের খরচ জোগানো হবে।
ব্যবিলন পর্যন্ত আমাদের কাফেলা পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য নীল কুমির রক্ষীদলের দুটো অশ্বারোহী পল্টন গঠন করা হল। এটি ছিল মিসরীয় সেনাবাহিনীর সবচেয়ে চৌকশ পল্টন। ফারাও প্রত্যেক সৈন্যকে বর্মসহ নতুন সমরসাজ, উঁচু চূড়াওয়ালা শিরস্ত্রাণ আর ঘোড়াসহ হাঁটুতে পরারও বর্ম দিলেন। এছাড়া অস্ত্র হিসেবে ওরা নিল বাঁকা ধনুক, তৃণ, তরবারি এবং ঢাল। এসব অস্ত্র আর বর্ম তৈরির খরচ পড়লো দুই হাজার রূপার ডেবেনেরও বেশি। যাইহোক এই জাঁকালো অস্ত্রশস্ত্র ইত্যাদি দেখার পর যে কেউ চমকে যাবে।
আমি খরচের কথাটা বলার পর ফারাও বললেন, আমাদের মিসরের অস্তিত্বের খাতিরে এটি সামান্য খরচ। এ-বিষয়ে আমার সাথে এখন অভিযোগ তুলে লাভ নেই। এগুলো সব তোমার পরিকল্পনা তায়তা। এরপর আমি আর কোনো কথা বলতে পারলাম না।
সফরের প্রস্তুতি এতো সুন্দরভাবে চলছিল যে, আমি বিন্দুমাত্র টের পাইনি যে রাজকুমারী তেহুতি এতে গভীরভাবে নিজেকে জড়িয়েছিল আর সেকারণেই সবকিছু এতো সুন্দরভাবে হচ্ছিল।
.
এপিফি মাসের শেষ দিনে আমি থিবস থেকে যাত্রা শুরু করতে চেয়েছিলাম, কেননা এই মাসটি সবসময় আমার জন্য শুভ ছিল। যাইহোক মল ত্যাগ করার পর সদ্য ত্যাগ করা মলের সামান্য নমুনা যখন আমি একটি পাত্রে আমার পছন্দের ভবিষ্যদ্বক্তার কাছে দিলাম, তিনি এটি পরীক্ষা করে সাবধান বাণী উচ্চারণ করে বললেন যে, এই তারিখটি শুভ নয়। এটা এড়াতেই হবে।
তিনি আমাকে মেসোর মাসের প্রথম দিন পর্যন্ত যাত্রা বিলম্বিত করতে উপদেশ দিলেন। এ-যাবত তার ভবিষ্যদ্বাণী সবসময় বিশ্বাসযোগ্য ছিল। তাই আমি তার উপদেশ মতো আমার দুই রাজকুমারীসহ কাফেলার সকলকে সফর পিছিয়ে দেয়ার কথা জানিয়ে দিলাম।
কোনো খবর না দিয়েই এক ঘন্টার মধ্যেই দুই রাজকুমারী ঝড়ের বেগে প্রাসাদে আমার বাসস্থানে এসে হাজির হল। দলনেতা ছিল তেহুতি আর সবসময়ের মতো বেকাথা একনিষ্ঠভাবে তার বড়বোনের অনুগামি হিসেবে হাজির হল।
তুমি কথা দিয়েছিল তাতা! আর এখন কীরকম নিষ্ঠুরভাবে আমাদের আনন্দ মাটি করতে পারলে তাতা? কত যুগ ধরে আমরা এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করেছিলাম। তুমি কি আমাদেরকে আর ভালোবাসো না?
আমি দুর্বলচিত্ত নই, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমি ইস্পাত কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারি, তবে আমার দুই রাজকুমারীর ক্ষেত্রে অবশ্যই নয়। ওরা যখন একত্রে আক্রমণ করে, তখন কোনো মানুষের পক্ষে তা প্রতিহত করা সম্ভব নয়, এমনকি আমিও পারি না।
পরদিন ভোর হতেই আমি নীলনদ পার হয়ে ঘোড়ায় চড়ে রাজকীয় টাকশালের দিকে চললাম। রাজকুমারীদের দাবীমতো আমি সেখানে যাচ্ছিলাম সফরের পেছানো তারিখটা জারাসকে জানাতে আর তাকে বলতে যে সফর শুরুর আগেই যেন সে শেষ দশ বস্তা রূপার মেম মুদ্রা রাজপ্রাসাদের রাজকীয় ভাণ্ডারে জমা দেয়।
সফরের জন্য আমরা দশ লাখের বেশি রূপা নিয়ে যাচ্ছিলাম। এপরিমাণ রূপা দিয়ে একটি রণতরী-বহর আর ভাড়াটে সেনার পুরো একটি বাহিনী গড়ে তোলা যায়।
টাকশালে ঢোকার পর দেখলাম একটা কামারশালার মতো ভেতরে ভীষণ গরম আর প্রচণ্ড শব্দ হচ্ছে। কামারের হাপরের আগুনের শিখার গর্জন আর হাতুড়ির শব্দে কানে তালা লেগে যাচ্ছে।
জারাসকে মেঝেতে দেখতে পেলাম। খালি গায়ে সে মাথার উপর একটা ব্রোঞ্জের হাতুড়ি তুলে ঘুরাচ্ছে। পেশিবহুল বাহু ঘামে চকচক করছে আর মুখ গাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। এই ছেলেটি এমন চরিত্রের যে, কোনো কাজ থাকলে তা না করে অলস বসে থাকতে পারে না। একজন উচ্চ পদস্থ সামরিক পদধারী হওয়া সত্ত্বেও সে টাকশালের একজন সাধারণ শ্রমিকের মতো মনেপ্রাণে পরিশ্রম করছে।
তাকে দেখে আমি খুশি হলাম। বেশ কয়েক সপ্তাহ তার সাথে দেখা হয়নি আর আমি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম যে, তামিয়াতে অভিযানে একসাথে থাকার সময় আমি তার কতটা ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ আমার মনে দুঃখ হল যে ব্যবিলন আর কুনুসসের দীর্ঘ অভিযানে তাকে আমার ডান হাত হিসেবে নিতে সাহস পাচ্ছি না।
জারাস আমাকে দেখেই আমার দিকে তাকাল। তারপর হাতুড়িটা পাথরের মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে হাত উঁচিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হাসলো।
দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব থাকা সত্ত্বেও আমাকে তার স্বাগত জানাবার আন্তরিক ভঙ্গি দেখে আমি অবাক হলাম। সে সামনে এগিয়ে এসে বললো, আমি ভেবেছিলাম তুমি আমাকে ভূলে গিয়েছ আর এখানে পঁচতে ফেলে রেখে গেছ। তবে আমার জানা উচিত ছিল যে, তোমার মতো একজন মানুষ কখনও তার বন্ধুকে ভুলে যেতে পারে না। আমি আমার বর্ম পলিশ করে রেখেছি আর তরবারিও ধার দিয়ে রেখেছি। এখন তুমি হুকুম করলেই আমি যাওয়ার জন্য প্রস্তুত।
আমি হতবুদ্ধি হয়ে পড়লাম আর অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে তাকে সাথে না নেওয়ার কথাটা সরাসরি বলতে পারলাম না।
একটু হাসার চেষ্টা করে বরলাম, আমিও তোমাকে কম আশা করিনি। কিন্তু তুমি কী করে জানলে… আর কোনো কথা বলতে পারলাম না, কেননা আমার নিজেরই কোনো ধারণা নেই সে কি বলতে চাচ্ছে।
আজ সকালেই যুদ্ধ পরিষদ থেকে আর্দালি নির্দেশটা নিয়ে এসেছিল। তবে আমি জানতাম তুমি নিশ্চয়ই আমাকে নেবার কথা বলেছে। তারপর একটু হেসে আবার বললো, উপরের মহলে তুমি ছাড়া আমারতো আর কোনো বন্ধু নেই।
নির্দেশে কার সীলমোহর ছিল জারাস?
নামটা জোরে উচ্চারণ করতে সাহস পাচ্ছি না, তবে… তারপর চারপাশে তাকিয়ে বেশ গোপনীয়তা নিয়ে সে তার কোমরের পেছনে ঝুলানো থলিটা থেকে সাবধানে একটা ছোট প্যাপিরাস কাগজ বের করলো। তারপর খুব যত্ন আর সম্মানের সাথে কাগজটা আমার হাতে দিল।
কাগজটার উপর সীমাহরটা দেখেই চিনতে পেরে আমি চমকে উঠলাম। ফারাও? আমি অবাক হলাম যে এতে সামান্য বিষয়ে ফারাও নিজেকে জড়িত করেছেন।
আর কে? এই কথা বলে জারাস আমার দিকে তাকাল, আমি কাগজটির ভাঁজ খুলে পড়লাম। পরিষ্কার আর বেশ ছোট একটি নির্দেশ।
এখনি প্রভু তায়তার সরাসরি অধীনে নিজেকে উপস্থিত কর। এরপর থেকে তিনি তোমাকে যেসব নির্দেশ দেবেন, শেষ নিঃশ্বাস থাকা পর্যন্ত তা নিসংকোচে পালন করবে।
এবার জারাস গলা নামিয়ে প্রায় ফিসফিস করে বললো, এবার আমরা কোথায় যাচ্ছি তায়তা? আর সেখানে গিয়ে কী করবো আমরা। নিশ্চয়ই জোর লড়াই হবে তাই না?
আমি দৃঢ়ভাবে মাথা নেড়ে বললাম, সময় হলেই এই প্রশ্নের উত্তর দেব। এমুহূর্তে এর বেশি কিছু বলতে পারবো না। তবে প্রস্তুত থেক।
সে হাতমুঠো করে আমাকে অভিবাদন করলো। তবে দাঁত বের করা হাসিটা থামালেও চোখদুটো চকচক করছিল।
মুদ্রা সরবরাহের বিষয়ের আলাপটা শেষ করার পর দ্রুত প্রাসাদে ফিরে গেলাম। আমাকে এখুনি ফারাওয়ের সাথে দেখা করে জারাসকে দেওয়া তার নির্দেশটা বাতিল করাতে হবে। তবে আগাম খবর না দিয়ে আমিও সরাসরি রাজার সামনে যেতে পারি না। যেকোনো লোকের ফারাওয়ের সাথে সাক্ষাত করার একটি কঠোর নিয়ম পালন করা হয়।
রাজপ্রাসাদে ফারাওয়ের প্রাসাদকক্ষের পাশের একটি কামরায় বেশ কয়েকজন লেখক মাটিতে বসে তুলি দিয়ে ঈজেলের উপর বিভিন্ন রাজকীয় বার্তা আর নির্দেশ লিখছিল। প্রধান লেখক আমাকে দেখেই চিনতে পেরে
এগিয়ে এলো, তবে সে কোনো সাহায্য করতে পারলো না।
ফারাও ভোরেই প্রাসাদ থেকে বের হয়ে গেছেন। কখন ফিরবেন কেউ জানেনা। আমি জানি এখানে থাকলে তিনি অবশ্যই আপনার সাথে কথা বলতেন প্রভু তায়তা। আমার মনে হয় আপনি একটু অপেক্ষা করে দেখতে পারেন।
একথার উত্তরে কিছু বলার আগেই করিডোরের শেষ প্রান্ত থেকে ফারাওয়ের কণ্ঠস্বর শোনা গেল। পেছনে একদল রাজকর্মকর্তা আর অমাত্য নিয়ে ফারাও দৃঢ়পদক্ষেপে লেখার কামরায় ঢুকলেন। আমাকে দেখেই কাছে এসে আমার কাঁধে এক হাত রেখে বললেন, তোমাকে এখানে পেয়ে ভালোই হল। আবার তুমি আমার মনের কথা টের পেয়েই এসেছ তাতা। আমি নিজেই অবশ্য তোমাকে আসার জন্য খবর পাঠাতাম। এসো আমার সাথে। কাঁধে হাত রেখেই তিনি আমাকে ভেতরের কামরায় নিয়ে গিয়ে কতগুলো জটিল বিষয় নিয়ে আলাপ শুরু করলেন। তারপর হঠাৎ আমার সাথে কথা শেষ করার পর তার সামনে নিচু একটি টেবিলের উপর রাখা কতগুলো কাগজের দিকে মনোযোগ ফেরালেন।
আমি আপনার সাথে একমুহূর্ত কথা বলতে চাই মেম। তিনি কাগজ থেকে মাথা তুলে আমার দিকে তাকালেন। ক্যাপ্টেন জারাস আর তার প্রতি নির্দেশের বিষয়টা…
ফারাও একটু হতবুদ্ধি হয়ে তাকিয়ে বললেন, কে? কিসের নির্দেশ?
ক্যাপ্টেন জারাস, যে আমার সাথে তামিয়াত গিয়েছিল।
এবার তিনি উত্তর দিলেন, ওহ, সেই লোক! হ্যাঁ, যাকে তুমি ক্রিটে তোমার সাথে নিয়ে যেতে চেয়েছ। আমি বুঝলাম না তাকে সাথে নেবার জন্য আমার অনুমতির কি প্রয়োজন আর তুমি নিজেই বা কেন এ-ব্যাপারে আমার সাথে সরাসরি কথা বললে না। আমার বোনদেরকে কোনো বিষয়ে মধ্যস্থতা করার জন্য বলাতে তোমার চরিত্র নয়। তারপর আবার কাগজের দিকে নজর ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, যাইহোক কাজটা হয়ে গেছে। আশা করি তাতা তুমি সন্তুষ্ট হয়েছ, তাই না?
আমি অবশ্যই সন্দেহ করেছিলাম এই নির্দেশের পেছনে কে আছে, তবে আমার রাজকুমারীদের বুদ্ধিমত্তা আর কূটকৌশল নিয়ে বেশি মাথা ঘামায় নি। এবারই সে প্রথম সামরিক নির্দেশের শৃঙ্খলায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছে। এখন আমাকে তড়িৎ যে কোনো একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে, হয় কাপুরুষের মতো আত্মসমর্পণ করতে হবে আর নয়তো রাজকুমারী তেহুতির সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়তে হবে, যে কোনোদিন নিজ স্বার্থে তার উচ্চ রাজকীয় ক্ষমতা ব্যবহার করেনি। কাজেই আমি মাথা নোয়ালাম।
যা অনিবার্য তা মেনে নিয়ে বললাম, আপনি সত্যি মহান, হে মিসরাধিপতি, আমি সত্যি কৃতজ্ঞ।
.
সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়ে যাবার পর কাফেলা থিবসে থেকে যাত্রা শুরু করার জন্য প্রস্তুত হতেই আমি এটনকে একটা বার্তাবহ কবুতর ছাড়তে বললাম। এটি এর জন্মস্থান ব্যবিলনে মিসরীয় দূতাবাসের উদ্দেশ্যে উড়ে যাবে। এতে আমি আমাদের রাষ্ট্রদূতকে অনুরোধ জানিয়ে বার্তা পাঠালাম, যেন তিনি আক্কাদ আর সুমেরের রাজা নিমরদকে খবর দেন যে, রাজকুমারীরা একটি কূটনৈতিক সফরে তার রাজধানীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছেন। আর ফারাও ত্যামোস অত্যন্ত খুশি হবেন যদি মহামান্য রাজা নিমরদ রাজকুমারীদেরকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান।
চারদিন পর আরেকটি কবুতর ব্যবিলন থেকে রাজা নিমরদের বার্তা নিয়ে থিবসে ফিরে এলো।
দুই দেশের মাঝে সুসম্পর্কের কথা মনে করিয়ে দিয়ে রাজা জানিয়েছেন তিনি অবশ্যই রাজকুমারীদের সাদর অভ্যর্থনা জানাবেন এবং আশা করছেন যে, রাজকুমারীরা নিশ্চয়ই এখানে তাদের অবস্থান উপভোগ করবেন।
এই বার্তা পাওয়ার সাথে সাথে আমি জারাসকে একটি শক্তিশালী অগ্রগামী দল নিয়ে থিবস থেকে লোহিত সাগরের সবচেয়ে কাছের উপকূল পর্যন্ত পথটি নিষ্কন্টক করার জন্য পাঠালাম। অজুহাত দেখালাম যেন আমাদের পথে কোনো দস্যুদল হামলা করার জন্য ওঁত পেতে নেই তা নিশ্চিত করতে যাচ্ছে। তবে আসল উদ্দেশ্যে ছিল তাকে আমার প্রিয় তেহুতির কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা।
আমি বুঝতে পারলাম না তেহুতি কী করে আমার সব পরিকল্পনা জেনে ফেলে। সবজায়গায় তার গুপ্তচর আছে আর হারেম হচ্ছে ষড়যন্ত্র আর গুজবের একটি উর্বর ক্ষেত্র।
অগ্রগামী দল নিয়ে যাবার জন্য জারাসকে সকালেই নির্দেশ দিয়ে আমি বাগানে বসে এককাপ চা খেতে খেতে গতকালের বিভিন্ন কাজের খতিয়ান নিয়ে ভাবছিলাম। ঠিক তখনই একটা ছায়ার মতো নীরবে সে আমার পেছন দিয়ে এসে দুই ঠাণ্ডা হাত দিয়ে আমার চোখ ঢেকে কানের কাছে ফিসফিস করে বললো, কে বলতো?
আমি বলতে পারবো না কে এটা মহামান্য।
ওহহ! তুমি নিশ্চয়ই উঁকি দিয়ে দেখেছ! সে প্রতিবাদ করে উঠলো তারপর আমার কোলে বসে দুই হাত দিয়ে আমার গলা জড়িয়ে ধরে বললো, আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি তায়তা। তুমি যা বল তাই আমি করতে পারি। এবার আমার একটা কথা রাখবে?
অবশ্যই রাখবো, রাজকুমারী। যে কাজে তোমার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় আর মিসরের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হয়, সে কাজ ছাড়া আর যেকোনো কাজ আমি করতে রাজি।
আমার এ-ধরনের কথা শুনে সে আতঙ্কিত হয়ে বললো, না না, এরকম কোনো ধরনের অনুরোধ আমি কখনও করবো না। যাইহোক এই ভয়ঙ্কর মরুভূমি উপর দিয়ে সুমের আর আক্কাদ যেতে অনেক সময় লাগবে। কোনো ধরনের আনন্দ না পেয়ে আমার বোন আর আমার খুবই একঘেয়ে লাগবে। তবে খুব মজা হতো যদি একজন কবি সাথে থেকে আমাদের গান আর কবিতা শোনাতো।
এজন্যই কি তুমি ক্যাপ্টেন জারাসকে এই অভিযানে নেবার জন্য তোমার ভাই ফারাও ত্যামোসকে বলেছিলে?
সে চোখ বড় বড় করে অবাক হয়ে বললো, ক্যাপ্টেন জারাস! তিনিও কি আমাদের সাথে যাচ্ছেন? কি চমৎকার তাই না? তিনি তো একজন জন্মগত কবি আর কী চমৎকার তার গানের গলা। আমি জানি তুমি তাকে পছন্দ কর। তিনি তো আমার আর বেকাথার সাথে দিনের বেলা ঘোড়ায় চড়ে যেতে যেতে আমাদের গান আর কবিতা শোনাতে পারেন, তাই না?
প্রথম কথা হল ক্যাপ্টেন জারাস একজন প্রথম সারির সেনাকর্মকর্তা এবং যোদ্ধা, কোনো ভ্রাম্যমাণ চারণ কবি নন। আমাদের কাফেলায় একদল পেশাদার গায়ক-বাদক, অভিনেতা-অভিনেত্রী, ভাড়, যাদুকর, আর একটি ভল্লুকসহ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অন্যান্য পশুও আছে। জারাস আমাদের কাফেলার আগে আগে অগ্রগামী দলের দায়িত্বে থাকবে। সে আমাদের সবার নিরাপত্তার স্বার্থে সামনের পথে কোনো বাধা বিপত্তি থাকলে তা দূর করবে। বিশেষত তোমার আর তোমার ছোট বোনের নিরাপত্তার স্বার্থেই তা করবে।
এবার তেহুতির ঠোঁট থেকে মন গলানো হাসিটা মুছে গেল। সে একটু পেছনে হেলে শীতল দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, কেন এমন করছো আমার সাথে তায়তা? আমি তো সামান্য একটা আবদার করেছি।
আমি তার ডান হাতটি উপুড় করে ধরে হিরার আংটিটার দিকে দেখিয়ে বললাম, এটাই আমার কারণ, রাজকুমারী।
সে এক ঝটকা মেরে হাতটা সরিয়ে নিয়ে পেছনে লুকাল। আমরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
বুঝা গেল সে যুদ্ধের সীমানা মেলে ধরেছে আর তার রূপক ছুরিও বের করেছে। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে একবারও পেছন না ফিরে চলে গেল।
.
মেসোর মাসের প্রথম দিনে জারাস অগ্রগামী দলটি নিয়ে লোহিত সাগরের তীরে সাগাফা বন্দরে পৌঁছলো। সেখানে পৌঁছেই সে একটা কবুতর উড়িয়ে দিয়ে খবর পাঠাল যে, সাগরের তীরে ধাউ আর বজরার একটি বহর সে খুঁজে পেয়েছে। এগুলো আমাদের পুরো কাফেলাটি সাগর পার করে দেবার জন্য প্রস্তুত হয়ে রয়েছে। এই খবর পাওয়ার সাথে সাথে আমি সামনে এগোবার নির্দেশ দিলাম।
কাফেলার একেবারে সামনে থেকে ফারাও ঘোড়ায় চড়ে আমাদের সাথে চললেন। নীল নদীর কাছে পাহাড়টির কাছে পৌঁছেই সবাই ঘোড়া থেকে নেমে পড়লো।
ফারাওয়ের দুই পাশে কুশন লাগানো টুলে দুই রাজকন্যা বসলেন। সভাসদ আর উচ্চপদস্থ রাজকর্মকর্তারা এই তিনজনকে ঘিরে একটি বৃত্ত তৈরি করলো। তারপর ফারাও আমাকে ডাকতেই আমি তার কাছে এসে হাঁটুগেড়ে বসলাম। তিনি আমার সামনে দাঁড়িয়ে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন।
আমি আমার সকল প্রিয় এবং অনুগত প্রজাদেরকে এই অনুষ্ঠানের সাক্ষী হতে আহ্বান জানাচ্ছি।
তেহুতি আর বেকাথাসহ সকলে বলে উঠলো, ফারাওয়ের জয় হোক! তার ইচ্ছাকে সম্মানিত আর মান্য করা হোক!
ফারাও দুই হাত দিয়ে শিকারী বাজপাখির ছোট্ট একটি সোনার মূর্তি মাথার উপর তুলে ধরলেন।
এটা আমার বাজপাখির সীলমোহর আর আমার প্রতীক। এর বহনকারী ঈশ্বর-প্রদত্ত আমার সকল অধিকার নিয়ে কথা বলবে। উপস্থিত সকলে এটি লক্ষ্য করুন আর আমার ক্ষমতা আর আমার ভয়ানক রোষ সম্পর্কে সতর্ক হোন।
তখনও হাঁটু গেড়ে বসা অবস্থায় থেকে আমি দুই হাত পেতে সামনে ধরতেই ফারাও ঝুঁকে বাজপাখির সীলমোহরটা আমার হাতে দিলেন।
বিচক্ষণতার সাথে এটা ব্যবহার করুন সম্মানিত তায়তা। আবার পরবর্তী সাক্ষাতের সময় এটা আমাকে ফেরত দিন।
আমি পরিষ্কার কণ্ঠে চেঁচিয়ে বললাম, হে মিসরাধিপতি, আপনার আদেশ শিরোধার্য।
তিনি আমাকে ধরে দাঁড় করিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, হোরাস এবং মিসরের অন্যান্য সকল দেবতার শুভ দৃষ্টি আপনার উপর বর্ষিত হোক।
তারপর তিনি ঘুরে তার বোনদেরকে বিদায় জানালেন। এরপর তিনি ঘোড়ায় চড়তেই দেহরক্ষীর দল তাকে ঘিরে দাঁড়াল। তারপর ঢাল বেয়ে নেমে দ্রুত দলবলসহ নীলনদের তীরে থিবসের দেয়ালের দিকে চললেন। কাফেলার শেষ অংশটুকু পার হয়ে দূরে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
টিলার উপরে ক্রীতদাসেরা আমাদের বসার জন্য উটের লোমের তৈরি আসন বিছাল আর রোদ থেকে ছায়া দেবার জন্য মাথার উপর চাঁদোয়া টাঙাল। আমরা নিচে দূরে ফারাও আর তার সভাসদদের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলাম। ইতোমধ্যে কাফেলার অগ্রভাগ আমাদের কাছে এসে পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়ে চললো।
প্রথমে ছিল কুমির রক্ষীদলের একটি পল্টন। তাদের ঠিক পেছন পেছন চলেছে পঞ্চাশটি উট আর এগুলোর আরব চালক। প্রতিটা উটের পিঠের কুঁজের দুই পাশে দুটো করে চারটি পানিভরা বিশাল চামড়ার মশক ঝুলছে। এগুলোর উপর নির্ভর করেই আমাদেরকে আরবের বিশাল মরুভূমি পাড়ি দিতে হবে।
পানির মশকবহনকারী উটের সারির পেছনেই ঘোড়ায় চড়ে চলেছে কুমির রক্ষীবাহিনীর আরেকটি পল্টন। এরা পানির সরবরাহটি রক্ষা করবে আর যদি আমাদের উপর কোনো শত্রুর হামলা হয় তখন প্রয়োজন পড়লে পেছনে রাজকুমারীদের নিরাপত্তার কাজে সহায়তা করবে।
যদিও আমি সিনাই উপদ্বীপ থেকে অনেক দূরে দক্ষিণ আর পূর্ব দিকে দিয়ে আমাদের যাত্রাপথ পরিকল্পনা করেছিলাম, তারপরও আমি কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি নই। হাইকসোরা এই জায়গাটি তাদের অধীনস্থ এলাকা মনে করে আর গোরাব কোনোভাবে আমাদের পরিকল্পনা জানতে পারলে তার রথিবাহিনী পাঠিয়ে আমাদের যাত্রায় বাধা দিতে পারে।
এই দুই রক্ষীবাহিনীর পেছনে আরও পঞ্চাশটি উট তাঁবু, আসবাবপত্র আর অন্যান্য সরঞ্জাম বয়ে নিয়ে চলেছে। যাত্রাপথে প্রতিটি বিশ্রাম নেবার জায়গায় তাবু গাড়তে এগুলো প্রয়োজন হবে।
এর পেছনে পায়ে হেঁটে চলেছে তবু অনুসরণকারী, ভৃত্য আর ক্রীতদাসের দল। কাফেলার পরের অংশে রয়েছে আরও বিশটি এক কুঁজওয়ালা উট। এগুলো রূপার মুদ্রার ভারী বস্তাগুলো বহন করছে।
সবার শেষে ছিল কাফেলাকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়া কুমির রক্ষীবাহিনীর তৃতীয় পল্টন, অতিরিক্ত ঘোড়া, উট আর মালবাহী গাড়ি। আমরা যেখানে বসেছিলাম তার সমান সমান এগুলো আসতেই আমি আমাদের তবু গুটিয়ে নিতে নির্দেশ দিলাম।
ঘোড়ায় চড়ে সামনে এগিয়ে আমরা মরুভূমির উপর দিয়ে চলা এক লিগ দীর্ঘ এই মিছিলের ঠিক মধ্যখানে আমাদের নির্দিষ্ট জায়গায় এসে পৌঁছলাম। বেয়াড়া রকম আকৃতির আর ধীর গতিতে চলা মানুষ আর পশুর এই দীর্ঘ মিছিলটি দশ দিন পর লোহিত সাগরের পশ্চিম তীরে পৌঁছল।
.
সাগাফা বন্দর থেকে ঘোড়া ছুটিয়ে এসে জারাস আমাদের সাথে দেখা করলো। সে আর তার প্রহরী ঘোড়ায় চড়ে কাফেলার পেছন দিকে একটু পিছিয়ে রাজকীয় দলের কাছে পৌঁছতেই দুই রাজকুমারীকে দেখতে পেয়ে ঘোড়া থেকে নামলো।
তেহুতির সামনে এক হাঁটুগেড়ে বসে সে এক হাত মুষ্টিবদ্ধ করে তাকে অভিবাদন জানাল। প্রত্যুত্তরে তেহুতিও তার দিকে তাকিয়ে একটি প্রাণোচ্ছল হাসি দিল।
ক্যাপ্টেন জারাস, আমি খুবই খুশি যে, ব্যবিলন পর্যন্ত সফরে আপনাকে আমরা পাবো। তামিয়াত দুর্গ থেকে আপনি আর প্রভু তায়তা ফেরার পর, আবৃত্তির ঢঙে সেখানে অভিযানের যে চমৎকার ধারা বর্ণনা আপনি দিয়েছিলেন, তা আমার ভালো মনে আছে। আমি খুব খুশি হবো যদি আপনি আমাদের সাথে আজ নৈশভোজে অংশ নেন আর কবিতা আবৃত্তি করে শোনান। আর ব্যবিলন পর্যন্ত সফরের বাকি অংশের বিষয়ে আমার ইচ্ছা এবং নির্দেশ যে, আপনি কাফেলা পাহারা দলের নেতৃত্বের দায়িত্ব অন্য কর্মকর্তার হাতে দিয়ে সরাসরি আমার বোন আমার নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবেন।
আমি তাকে শোনাবার জন্য বেশ জোরে একটা নিঃশ্বাস নিলাম কিন্তু সে আমার চাপা প্রতিবাদ পুরোপুরি উপেক্ষা করে সমস্ত মনোযোগ জারাসের দিকে দিল। জারাসকে বেশ অপ্রস্তুত দেখাচ্ছিল আর উত্তর দিতে গিয়ে সে একটু তোতলাতে লাগলো। এই প্রথম তাকে এরকম করতে দেখলাম।
মহামান্য রাজকুমারী, আপনার নির্দেশ শোনা মানেই তা পালন করা। তবে অনুগ্রহ করে আমাকে ক্ষমা করবেন। আমাকে এখুনি প্রভু তায়তার কাছে হাজির হতে হবে, যার হাতে ফারাও এই কাফেলার নেতৃত্ব দিয়েছেন আর যাকে রাজকীয় বাজপাখির সীল মোহর দিয়ে বিশ্বাস করেছেন।
আমার প্রতি জারাসের বিশ্বস্ততা আর কার হাতে পূর্ণ কর্তৃত্ব রয়েছে, তা তেহুতিকে মনে করিয়ে দেবার চেষ্টা করতে দেখে আমি খুশি হলাম। সে বেচারা এখন তেহুতির কাছ থেকে পালিয়ে আসার জন্য ছটফট করছে।
তার মাথার উপর আঘাত হানা এই রাজকীয় ঝড়ের তাণ্ডব থেকে তাকে উদ্ধার করার চেষ্টা থেকে আমি নিজেকে বিরত রাখলাম। তার কোনো নির্দেশ অমান্য হোক, তেহুতি তা মোটেই সহ্য করে না। তবে সে আবার আমাকে অবাক করলো। জারাসকে থামিয়ে না দিয়ে সে বরং মৃদৃ হেসে মাথা নেড়ে বললো, অবশ্যই তাই করুন ক্যাপ্টেন জারাস। একজন সৈনিক হিসেবে আপনার দায়িত্ব আর সবকিছুর ঊর্ধ্বে।
জারাস আমার পাশে আসতেই আমি একটু পিছিয়ে রাজকুমারীদের কাছ থেকে একটু দূরে সরে এলাম, যাতে ওরা আমাদের কথা শুনতে না পারে। টিলার নিচেই সাগরের তীরে সাগাফার দালানকোঠাগুলো দেখা যাচ্ছে।
আমার ইঙ্গিত পেয়ে জারাস গলা নামিয়ে জানাল যে, আমাদের জন্য অপেক্ষা করার সময় সে সুযোগ পেয়ে একটি দ্রুতগামি ধাউ নিয়ে দূরের সাগর সৈকতে এলো–কুম জেলে পল্লীতে গিয়েছিল। সেখানে গিয়ে সে নিশ্চিত হতে চাচ্ছিল যে, আমাদের বেদুঈন পথপ্রদর্শক আমাদের নির্দেশ পেয়ে তার লোকজন নিয়ে আমাদেরকে আরব মরুভূমি পার করাবার জন্য অপেক্ষা করছে কি না।
সে একই লোক আল-নামজু, যে আমাদেরকে সিনাই উপদ্বীপ পার করে মধ্য সাগরের তীর আর তামিয়াত দুর্গে নিয়ে গিয়েছিল।
জারাস খুশি হয়ে বললো, আপনি জেনে খুশি হবেন যে, আমাদের আসার খবর পাওয়ার পর গত দুই মাস ধরে আল-নামজু এখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। তার সাথে তার দুই ছেলেও রয়েছে। তবে সে তাদেরকে সামনে কাফেলা চলার পথে পানির উৎস আর মরুদ্যানগুলো দেখতে পাঠিয়েছে।
আমি তাকে বললাম, শুনে আস্বস্ত হলাম। তারপর এক পাশে তাকিয়ে আবার বললাম, বলে যাও জারাস। মনে হয় তোমার আরও কিছু বলার আছে। সে একটু চমকে তাকাল।
তারপর বললো, আপনি কী করে জানলেন… তার কথা থামিয়ে দিয়ে আমি বললাম, আমি কীভাবে জানলাম? আমি এজন্য জেনেছি যে, আমি জানি তুমি কোনো কথা লুকিয়ে রাখতে পারো না। এটাকে একটা দোষের চেয়ে বরং আমি গুণ বলবো।
সে মাথা নেড়ে বললো, আমরা অনেকদিন ধরে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছি প্রভু। আমি ভুলে গিয়েছিলাম কীভাবে আপনি মানুষের মনের ভাবনা পড়তে পারেন। তবে আপনার কথাই ঠিক। আমি আরেকটি বিষয় আপনাকে বলতে যাচ্ছিলাম, তবে ভয়ও পাচ্ছিলাম, হয়তো আপনি মনে করতে পারেন যে, আমি শুধু শুধু আতঙ্কে ভূগছি।
আমি তাকে নিশ্চিত করে বললাম, তোমার কোনো কথাই আমাকে এ ধরনের ধারণা করতে দেবে না।
তাহলে বলছি শুনুন, যখন আমরা আল-নামজুর শিবিরে ছিলাম, তখন তিনজন শরণার্থীকে মরুভূমি থেকে সেখানে নিয়ে আসা হয়েছিল। ভীষণ আহত আর পিপাসায় কাতর লোকগুলো খুবই দুর্দশাগ্রস্ত ছিল। সত্যি বলতে কী আল-নামজুর তাঁবুতে আনার কিছুক্ষণের মধ্যেই একজন মারা গেল, আর আরেকজন কথা বলতে পারছিল না।
আমি বললাম, কেন? কী হয়েছিল ওদের?
প্রথমজনের সারা শরীরে গরম তলোয়ারের হ্যাঁকার দাগ ছিল। তার সারা শরীর পুড়ে গিয়েছিল। মরতে পেরে বরং সে দারুণ কষ্ট থেকে মুক্তি পেয়েছে। অন্য লোকটির জীব কেটে ফেলা হয়েছিল, সে একটা পশুর মতো গোঙাছিল।
আমি জারাসকে বললাম, দয়াশীল হোরাসের দিব্যি, কী হয়েছিল ওদের?
তৃতীয় লোকটির তেমন যখম হয়নি। সে জানাল, সে ছিল একটি কাফেলার প্রধান ব্যক্তি। পঞ্চাশটি উট আর সমসংখ্যক নারীপুরুষসহ সে তুরক নগর থেকে লবণ আর তামা নিয়ে আসছিল। পথে দস্যু জাবের আল-হাওয়াসাঈ তাদের উপর হামলা করে। এই লোকটি শেয়াল নামেই পরিচিত।
আমি বললাম, আমি তার কথা শুনেছি। আরবের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর লোক সে।
তাকে ভয় করার অনেক কারণ আছে। শুধু খেলাচ্ছলে সে কাফেলার অন্যান্য নারীপুরুষদের খাসী করে আর নাড়িভুড়ি বের করে ফেলে। অবশ্য এই শেয়াল আর তার লোকেরা বন্দীদেরকে হত্যা করার আগে নারীপুরুষ সবার। উপর যৌন নির্যাতন চালায়।
এই শেয়াল এখন কোথায়? এই লোক কী জানে সে কোথায় গেছে?
না। সে আবার মরুভূমির বুকে হারিয়ে গেছে। তবে একটা বিষয় নিশ্চিত যে, সে কাফেলার পথে ওঁৎ পেতে থাকবে।
ঠিক সেই মুহূর্তে তেহুতি ঘোড়ায় চড়ে সেখানে উপস্থিত হয়ে জিনে বসে ঘুরে আমাদের দিকে তাকিয়ে বললো, এতো মনোযোগ দিয়ে তোমরা দুজন কী আলাপ করছো? এখানে এসে আমার আর বেকাথার পাশাপাশি চল। আর যদি তুমি জারাসকে গল্প শুনিয়ে থাক তবে আমরাও তা শুনবো।
তার কথা আমিও দুবার না মেনে পারি না।
আমরা দুজনেই ঘোড়া নিয়ে দুই রাজকুমারীর পাশাপাশি চলতে শুরু করলাম। বেশ কৌশল করে তেহুতি আমার আর জারাসের মাঝে তার ঘোড়াটা নিয়ে এলো, যাতে আমরা তাকে না শুনিয়ে কোনো আলোচনা করতে না পারি। সেই মুহূর্তে এবড়োথেবড়ো পাথুরে পথটি একটি পাহাড়ের চূড়ায় এসে শেষ হতেই তেহুতি ঘোড়ার রাশ টেনে ধরে খুশিতে চেঁচিয়ে উঠলো।
দেখো! ঐ যে তাকিয়ে দেখো! এতো চওড়া আর এতো নীল কোনো নদী কখনও দেখেছ? শিংওয়ালা দেবতা হোরাসের দিব্যি, এটা আমাদের নীলনদের চেয়ে একশো গুণ বেশি চওড়া হবে। আমি তো এর অন্য পারও দেখতে পাচ্ছি না।
জারাস তাকে জানাল, এটা নদী নয় মহামান্য। এটি লোহিত সাগর।
তেহুতি সোৎসাহে বললো, কী বিশাল। জারাস তাকে ভালোভাবে চেনে, সে বুঝতে পারেনি যে তেহুতি না জানার ভান করছে। এটি নিশ্চয়ই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাগর?
জারাস তার ভুল সংশোধন করে অত্যন্ত সম্মানের সাথে বললো, না রাজকুমারী। এটা সমস্ত সাগরের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। মধ্যসাগর সবচেয়ে বড় আর জ্ঞানী ব্যক্তিরা অনুমান করে বলেছেন, বিশাল অন্ধকার মহাসাগর, যার উপর পৃথিবী ভাসছে তা আরও বড়।
তেহুতি চোখ বড় বড় করে প্রশংসার দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে, ক্যাপ্টেন জারাস, আপনি তো অনেক কিছু জানেন, প্রায় প্রভু তায়তার মতো। আপনাকে প্রতিদিন কয়েক ঘন্টা বেকাথা আর আমার সাথে ঘোড়ায় চড়ে এসব বিষয় জানাতে হবে।
তেহুতিকে এতো সহজে তার মত থেকে ফেরানো সম্ভব নয়।
.
আরব মরুভূমি পাড়ি দেওয়া গত বছরের তামিয়াত দুর্গের অভিযানের চেয়ে অনেক কষ্টকর আর দুর্গম প্রমাণিত হল। সেবারের অভিযানে দুশো জনের চেয়ে কম লোক নিয়ে দ্রুত কম লটবহর নিয়ে গিয়েছিলাম। মিসর আর সিনাই উপদ্বীপের মাঝে কেবল সুয়েজ উপসাগর পার হতে হয়েছিল। সেটা পঞ্চাশ লিগের চেয়ে কম চওড়া ছিল।
এবার আমাদেরকে সিনাই উপদ্বীপে না ঢুকে যতদূর সম্ভব দক্ষিণ দিক দিয়ে যেতে হচ্ছে। সিনাই উপদ্বীপে ঢুকলে গোরাব তার রথি বাহিনী পাঠিয়ে আমাদেরকে বাধা দিতে পারতো।
বাধ্য হয়েই আমাদেরকে লোহিত সাগরের মূল অংশের সবচেয়ে চওড়া জায়গা দিয়ে পার হতে হচ্ছে। পঞ্চাশটি ভোলা ধাউয়ে এক হাজারের বেশি মানুষ আর পশু নিয়ে প্রায় দুশো লিগের চেয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে। ছোট নৌকাগুলোতে এক সাথে কেবল দশটা উটের জায়গা হয়। এতে বেশ কয়েকবার পারাপার করতে হবে।
সমস্তু কিছু বিবেচনা করে আমি ধারণা করেছিলাম পুরো কাফেলা আরবে নিতে আমাদের কমপক্ষে দুইমাস লাগবে।
রাজপরিবারকে মিসরীয় তীরে রেখে কাফেলার মূল অংশ সাগর পার হতে শুরু করলো। অভিজ্ঞতা থেকে আমি জানতাম রাজকুমারীদেরকে যাতে একঘেয়েমিতে পেয়ে না বসে সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে, কিংবা ওদের হাতে বেশি অবসর সময়ও দেওয়া যাবে না।
রাজপরিবারকে কাফেলার বাদবাকি অংশ থেকে আলাদা করে রাখা হয়েছিল। আমাদের কাফেলাটি আকারে একটি ছোট গ্রামের মত হলেও এখানে একটি বড় শহরের সবধরনের সুবিধা আর আরাম আয়েশ ছিল।
কয়েকদিন পর পর রাজকুমারীদের নিয়ে আমি শিকারে যেতাম। আমরা মরুভূমির চ্যাপ্টা পায়ের ছোট হরিণ শিকার করতাম কিংবা পাহাড়ে উঠতাম, যেখানে দীর্ঘ বাঁকানো শিংয়ের পাহাড়ি বুনো ছাগলের বিচরণ ছিল। এগুলোতে বিরক্তি ধরে গেলে মেয়েরা সাগরতীরে ঝাঁক বেঁধে থাকা অসংখ্য বুনো হাস আর রাজহংসির উদ্দেশ্যে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিকারি বাজ উড়িয়ে দিত।
অনেকসময় ছোট দ্বীপে বনভোজনের আয়োজন করতাম। মেয়েরা সেখানে সাঁতার কাটতে কিংবা পানির নিচে প্রবাল জঙ্গলে তলোয়ার মাছ আর বড় সামুদ্রিক মাছের উপর বর্শা ছুঁড়ে শিকার করতো।
তবে সকালে আমি ওদেরকে পড়াশুনা করতে বাধ্য করতাম। কাফেলার সাথে দুজন পণ্ডিত নিয়ে এসেছিলাম, যারা ওদেরকে লেখা, গণিত আর জ্যামিতি শেখাত। শ্রেণীকক্ষের কঠিন অধ্যয়নের ফাঁকে ফাঁকে আমোদ ফুর্তি আর মেয়েলি হাসি ঠাট্টাও চলতো। সারাদিনে এটাই ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় সময়। ওরা লক্সিয়াসের সাথে মিনোয়ান ভাষায় আড্ডা দিত। আমাকে বাদ দিত যেন আমি এই ভাষার একটি শব্দও বুঝি না। তিন জনের মধ্যে বয়সে লক্সিয়াস সবচেয়ে বড় হওয়ায় সে ওদের মেয়েলি নিষিদ্ধ আলাপগুলোতে সবজান্তা ভূমিকা পালন করতো। তবে পরিষ্কার বোঝা যেত তার সমস্ত বিদ্যা ছিল পুঁথিগত, তাই বিশদ বিবরণগুলো সে বানিয়ে বানিয়ে বলতো।
এইসব আলোচনার মধ্য দিয়ে আমি ওদের মনে কী ভাবনা চলছে তা জানতে পারতাম।
ওরা ওদের ভালোবাসার গল্প বলতো। লক্সিয়াস রেমরেমকে পছন্দ করতো। তবে তার সামনে হাজির হলে সে একেবারে পাথরের মূর্তির মতো হয়ে যেত। চোখ নামিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে লজ্জায় লাল হয়ে যেত, মুখে কোনো কথা যোগাত না। আমার মনে হয় রেমরেম রাজকীয় পরিষদের একজন সম্মানিত-সদস্য আর সে নিজে একজন সাধারণ মানুষ এবং বিদেশি, এই সত্যটুকু তার মনে সম্ভ্রম মিশ্রিত ভয় জাগিয়ে তুলতো। তবে রেমরেম যে বয়সে তার চেয়ে দ্বিগুণ বড়, তিনটে বউ আছে আর তার অস্তিত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসিন এতে সে কিছু মনে করতো না।
এদিকে বেকাথা বিখ্যাত ঘোড়সওয়ার আর রথি হুইয়ের প্রতি আকৃষ্ট ছিল। সে মোটেই জানতো না যে, যখন তাকে আমি বন্দী করেছিলাম, তখন সে কুখ্যাত অপরাধি বস্তির রক্তের সম্পর্কের ভাই ছিল। আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করে তাকে সভ্য করে তুলেছিলাম। কিন্তু তারপরও অনেক সময় সে বর্বরোচিত আচরণ করতো, বিশেষত কৌতুক করার সময়। বেকাথা তার সাথে রথে চড়তে ভালোবাসতো। যখন সে এবড়োথেবড়ো জমির উপর দিয়ে রথ চালিয়ে নিয়ে যেত, তখন সে দুহাত দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে প্রচণ্ড জোরে চিৎকার করতো। ওরা অনেক সময় বিভিন্ন ধরনের অর্থহীন রসিকতা করে হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়তো। আর অনেক সময় ভোজ টেবিলে বসে খাওয়ার সময় বেকাথা তার দিকে রুটির টুকরা কিংবা ফল ছুঁড়ে মারতো।
তেহুতি এসমস্ত থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতো আর কেউ এ বিষয়ে তাকে চাপাচাপি করতো না।
সন্ধ্যায় আমরা বিভিন্ন রকম ধাঁধা, কবিতা, গান গেয়ে আর বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে সময় কাটাতাম।
এভাবেই আমার তত্ত্বাবধানে থাকা এই তিন বালিকাকে আমি বিপজ্জনক কোনো কিছু করা থেকে বিরত রেখেছিলাম। শেষ পর্যন্ত মূল কাফেলা সাগর পার হওয়ার পর আমাদের যাওয়ার সময় এলো।
আথির মাসের পনেরোতম দিনে সূর্য উঠার আগে আমরা সাগর সৈকতে সমবেত হলাম। তেহুতি আর বেকাথার সাহায্যে তিন নারী-পুরোহিত হাথোর দেবীর উদ্দেশ্যে একটি সাদা ভেড়া বলি দিল।
দেবীর কাছে আমরা প্রার্থনা করলাম–যদি তিনি আমাদের প্রতি সদয় হোন এবং নিরাপদে সাগর পার করে দেন তাহলে আমরা তার উদ্দেশ্যে একটি উট বলি দেবো। এই মানতের পর আমরা ধাউয়ে চড়ে রওয়ানা হলাম।
দেবী নিশ্চয়ই আমাদের প্রার্থনা শুনেছেন মিসরের দিক থেকে একটি দমকা হাওয়া পালে লেগে আমাদের নৌবহরকে দ্রুত ভাসিয়ে নিয়ে চললো। সূর্য অস্ত যাওয়ার আগেই আফ্রিকা আমাদের পেছনে ঢেউয়ের নিচে মিলিয়ে গেল।
অন্ধকার হতেই প্রতিটি জাহাজের মাস্তুলের ডগায় একটা করে তেলের প্রদীপ জ্বালিয়ে দেওয়া হল, যাতে একে অপরকে দেখতে পারি। আকাশের তারা দেখে পথ ঠিক রেখে আমরা পুবমুখি চলতে লাগলাম। ভোর হতেই দূরে পরিষ্কার নীল আকাশের বিপরীতে আরবের তটরেখা নজরে পড়লো। সারাদিন দাঁড় বেয়ে চলার পর যখন সূর্য পশ্চিম দিগন্তের এক হাত উপরে এসে দাঁড়িয়েছে, তখন কুমিররক্ষীবাহিনীর পঞ্চাশজন সদস্য হাঁটু পানিতে নেমে ধাউগুলো টেনে সৈকতের শুকনো বালুভূমিতে নিয়ে তুললো। মেয়েরা তাদের সুন্দর ছোট ছোট পা না ভিজিয়ে এশিয়ার মাটিতে পা রাখতে পারলো। আমাদের অভ্যর্থনা জানাবার জন্য আমার পূর্বনির্দেশ মতো রাজকীয় শিবির উঁচুভূমিতে স্থাপন করা হয়েছিল।
তবে এখানে বেশি দেরি করলাম না, কেননা প্রতিদিন প্রচুর মূল্যবান সুপেয় পানি খরচ হচ্ছিল।
মূল কাফেলাটি আর মালপত্র বেশ কয়েকদিন আগেই চলে গেছে। ইতোমধ্যে ওরা নিশ্চয়ই একশো লিগেরও বেশি দূরত্ব পার হয়েছে। আরবভূমিতে নামার পরদিন আমরা ঘোড়া আর উটে চড়ে রওয়ানা দিলাম।
.
সাগর থেকে যতই দূরে এগিয়ে চললাম, ততই সূর্য মাথার উপর প্রচণ্ড তাপ ছড়াতে শুরু করলো। দূপুরের রোদে চলা খুবই কষ্টকর হয়ে দাঁড়াল। এরপর থেকে আমরা শেষ বিকেলের দিকে যখন সূর্যের তাপ কমে আসে তখন চলতে লাগলাম। সারারাত চলার পর ঘোড়া আর উটগুলোকে পানি দেওয়ার জন্য মধ্যরাতে কেবল এক ঘন্টা থামলাম। মূল কাফেলা থেকে পথের পাশে এগুলো আমাদের জন্য রেখে দেওয়া হয়েছিল। তারপর আবার ভোরে সূর্য ওঠার পর চলতে লাগলাম। এরপর যখন দুপুরের দিকে সূর্যের তাপ অসহনীয় হয়ে উঠলো, তখন আবার সেখানেই তাঁবু গেড়ে ছায়ার নিচে শুয়ে ঘামতে লাগলাম। সূর্য অস্তাচলে নামতেই আবার যাত্রা শুরু করতাম। এভাবেই চক্রাকারে চলতে লাগলো।
পনেরো দিন আর রাত এভাবে চলার পর, শেষ পর্যন্ত মূল কাফেলার কাছে এসে পৌঁছলাম। ইতোমধ্যে চামড়ার পানির মশকগুলো অর্ধেকেরও বেশি খালি হয়ে এসেছে। শুধু তলানিতে কয়েক গ্যালন সবুজ রঙের কটু স্বাদের পানি পড়ে রয়েছে। আমি জনপ্রতি প্রতিদিন বাধ্যতামূলক চার মগ পানি বরাদ্দ করলাম।
এবার আমরা আসল মরুভূমিতে ঢুকেছি। সামনে একের পর এক অসংখ্য বালিয়াড়ি যতদূর দেখা যায় চলে গেছে। আমাদের ঘোড়াগুলোর মধ্যে নিদারুণ যন্ত্রণার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। পিঠে খুব হালকা ভার নিলেও নরম বালিতে পা ডেবে গিয়ে ঘোড়াগুলোর চলতে খুব কষ্ট হচ্ছে। আমি ঘোড়াগুলো আরোহী মুক্ত করে অন্যান্য মুক্ত ঘোড়ার দলের সাথে কাফেলার সামনের দিকে পাঠিয়ে দিলাম। আর কয়েকটি শক্তিশালী উট বেছে নিয়ে মেয়েদেরকে আর দলের অন্যান্যদেরকে তাতে চড়তে বললাম।
আল-নামজু আমাকে নিশ্চিত করলো সামনের পানির উৎসটি আর মাত্র কয়েকদিনের পথ। কাজেই আমি মেয়েদেরকে নিয়ে জারাস আর তার দলের লোকদের সাথে নিয়ে পানির কাছে পৌঁছাবার জন্য মূল কাফেলা ছেড়ে আগে আগে চলতে শুরু করলাম।
আমাদেরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবার জন্য আল-নামজু তার বড় ছেলে হারুনকে সাথে দিয়েছিল। মূল কাফেলা থেকে দ্রুত এগিয়ে আমরা সারারাত চললাম, তারপর ভোরের প্রথম আলো দেখা দিতেই হারুন বিশাল একটি লাল ইট রঙা বালিয়াড়ির উপরে এসে থেমে দাঁড়াল। তারপর সামনের দিকে হাত তুলে দেখাল।
সামনেই একটা পাহাড়ের চূড়া দেখা গেল। লম্বা লম্বা দাগযুক্ত পাহাড়টির অনুভূমিক স্তরগুলো ছিল বিভিন্ন রংয়ের, সোনালি থেকে শুরু করে চকের মতো সাদা তারপর লাল, নীল আর কালো। কয়েকটি স্তর বাতাসে ক্ষয়ে গিয়ে অন্যান্য স্তর থেকে আরও গাঢ় রং ধরেছে। এগুলো কতগুলো ঝুল বারান্দা আর গভীর দীর্ঘ গুহা তৈরি করেছে, যা দেখে মনে হচ্ছে যেন একজন উন্মাদ স্থপতি এগুলো তৈরি করেছে।
হারুন জানাল, এর নাম ময়াগুহা। আরবি এই নামটি অনুবাদ করে আমি বুঝলাম এর নাম, পানির গুহা।
হারুন আমাদেরকে এই খাড়া পাথুরে দেয়ালের নিচে নিয়ে গেল। একেবারে গোড়ায় এক পাশে একটা নিচু ছাদওয়ালা ফাটল চলে গেছে। একজন লম্বা মানুষ বাঁকা না হয়েও ঢুকতে পারবে, তবে একশো কদমের বেশি চওড়া আর গভীর। আর এমন অন্ধকার যে, আমি উপর থেকে দেখে বুঝতে পারলাম না এটা কতদূর পর্যন্ত চলে গেছে।
হারুন বললো, এই গুহার নিচে পানি রয়েছে। রাজকুমারীরা আর লক্সিয়াস তাদের উটগুলোকে হাঁটু গেড়ে বসিয়ে কাঠের বাকা জিন থেকে লাফ দিয়ে নিচে নামলো। আমি ওদেরকে গুহামুখ দিয়ে ভেতরে নিয়ে চললাম। আর জারাস তার লোকজনসহ বাইরেই অপেক্ষামান থাকলো।
আমাদের পায়ের নিচে পাথরের মেঝেটি ক্রমান্বয়ে ঢালু হয়ে নেমে গেছে, আর যতই আমরা নিচে নামলাম ততই দিনের আলো কমতে লাগলো আর বাতাস ঠাণ্ডা হয়ে এল। একসময় বাইরের সূর্যের তাপের তুলনায় তাপমাত্রা এমন কমে গেল যে আমরা কেঁপে উঠলাম।
এবার আমি পানির গন্ধ অনুভব করলাম, আর পানি পড়ার ঝির ঝির শব্দও শুনতে পেলাম। আমার গলা পিপাসায় কাঠ হয়ে রয়েছে, ঢোক গিলতে পারছিলাম না। মুখে কোনো লালা নেই। মেয়েরা আমার হাত ধরে টেনে আমাকে নিচের দিকে নিয়ে চললো।
সামনেই বিরাট একটা জলাধার দেখা গেল। গুহা মুখ থেকে আসা আলো পানির উপর পড়ে প্রতিবিম্ব সৃষ্টি করেছে। সেই আলোর কারণে মনে হল পানির রং একদম কালো। আর ইস্ততত না করে কাপড়চোপড় আর স্যান্ডেলসহ আমরা সবাই পানির উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। আমি হাঁটু গেড়ে বসে পানির কাছে চিবুক নামিয়ে নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পেলাম আর দেখলাম পানির রং কালো তো নয়ই বরং তেহুতিকে যে হীরাটি দিয়েছিলাম, সেই হীরার মতো টলটলে পরিষ্কার। মুখ ভরে পানি নিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিলাম।
মেয়েরা জলাধারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমার আর ওদের পরস্পরের গায়ে পানি ছিটিয়ে উল্লাসে আর ঠাণ্ডায় চেঁচিয়ে উঠলাম। ওদের চেঁচামেচি শুনে জারাস ওর লোকজনসহ ঢালু মেঝে বেয়ে নিচে নেমে এলো। চিৎকার করে হাসতে হাসতে ওরাও অন্ধকার পানিতে নেমে পড়লো।
পেটপুরে পানি খাওয়ার পর জারাসের লোকেরা সাথে যে পানির মশক নিয়ে এসেছিল, সেগুলো ভরে বাইরে উটের জন্য নিয়ে গেল।
.
হারুন হিসাব করে আমার সাথে একমত হল যে, মূল কাফেলার এখানে আসতে আরও তিনদিন লাগবে। এতে আমি খুব একটা উদ্বিগ্ন হলাম না, কেননা ক্লান্ত মেয়েরা একটু বিশ্রাম নিয়ে শক্তি সঞ্চয় করতে পারবে।
তবে আমার আসল দুশ্চিন্তা ছিল এই জায়গাটির অরক্ষিত অবস্থানটি নিয়ে। চারপাশের একশা লিগের মধ্যে যেসব বেদুঈন গোষ্ঠি রয়েছে তাদের সবার নিশ্চয়ই এই পানির গুহার অবস্থান জানা আছে। আমাদের দলটি ছোট হলেও, সাথের পশু, অস্ত্রশস্ত্র আর বর্মগুলো বেদুঈন গোষ্ঠিদের কাছে খুবই দামী, বিশেষত দস্যুদের কাছে অবশ্যই আকর্ষণীয়। ওরা যদি জানতে পারে আমরা এই পানির গুহার কাছে রয়েছি আর আমাদের দলটি ছোট, তাহলে বেশ বিপদের সম্ভাবনা আছে। আমাদেরকে খুবই সতর্ক থাকতে হবে যেন কেউ অতর্কিতে আক্রমণ করে বসতে না পারে।
জারাস তার লোকজনসহ পানি থেকে উঠে এলে আমি চতুর্দিকে পাহারা বসালাম।
তারপর জারাস আর হারুনকে নিয়ে চারপাশে সম্প্রতি কোনো মানুষজনের আনাগোনা হয়েছিল কিনা তার চিহ্ন দেখতে বের হলাম।
আমরা তিনজনেই অস্ত্র নিলাম। আমি এক কাঁধে আমার লম্বা ধনুকটি আর অন্য কাঁধে ত্রিশটি তীরভর্তি তূণ ঝুলিয়ে নিলাম। আর ডান কোমরের খাপে ব্রোঞ্জের তরবারিটাও নিলাম।
সবচেয়ে কাছের বালিয়াড়ির মাথায় পৌঁছে আমরা আলাদা হলাম। তবে ঠিক করলাম, এক ঘন্টা পর সূর্য যখন মধ্য গগনে আসবে তখন আবার সবাই ময়াগুহায় ফিরে আসবো। জারাসকে উত্তরদিকে চক্রাকারে ঘুরে আসতে পাঠালাম। হারুন গেল উপত্যকার নিচে যে কাফেলা পথটি রয়েছে সেটা পরীক্ষা করতে। আর আমি দক্ষিণে উঁচু বালিয়াড়িগুলোর দিকে চললাম।
চারদিক খোলা, লুকাবার কোনো জায়গা নেই। তারপরও আমি চেষ্টা করলাম এমনভাবে চলতে যাতে দূর থেকে কোনো শত্রু দেখতে না পায়।
চারপাশের দৃশ্য দেখে আমি মুগ্ধ হলাম, রুক্ষ হলেও প্রকৃতি খুবই সুন্দর। শান্ত সাগরের বোবা ঢেউয়ের মতো একের পর অন্তহীন বালিয়াড়ি চলে গেছে। বাতাসের ঝাঁপটায় বালুর ঢেউয়ের এই চূড়াগুলো ক্ষয় হয়ে আমার চোখের সামনেই আকৃতির পরিবর্তন ঘটছে। কোনো মানুষের পায়ের ছাপ কিংবা পশুর ক্ষুরের চিহ্ন থাকলে দ্রুত মুছে যাবে।
বেশ কিছুক্ষণ ঘুরেও সাম্প্রতিক কোনো মানুষ কিংবা পশুর আসার চিহ্ন এই অন্য জগতে দেখতে পেলাম না। হঠাৎ পায়ের কাছে চোখে পড়লো বালুর ভেতর থেকে রোদেপোড়া একটা হাড়ের টুকরা চকচক করছে। নিচু হয়ে হাড়টা বালু থেকে বের করে দেখলাম সোয়োলোর মতো একটা রাতের পাখির মাথার খুলি আর হা করা ঠোঁট। বাতাস নিশ্চয়ই অনেক দূর থেকে উড়িয়ে নিয়ে এসেছে।
আমি আবার ঘুরে বালিয়াড়ির একপাশ দিয়ে গড়িয়ে নামলাম। নিচে নেমে ভূগর্ভস্থ পানির গুহাটির কাছাকাছি আসতেই ভেতর থেকে মেয়েলি গলার হাসাহাসির চিৎকার শুনতে পেলাম।
জারাস আমার আগেই ফিরে এসেছে। সে আর তার লোকজন উটের পিঠ থেকে নেমে পশুগুলোকে গুহামুখের কাছেই প্রাকৃতিক ঝুলবারান্দার নিচে ছায়ায় বেঁধে রাখলো। তারপর ওরা উটগুলোকে দানাপানি দিতে শুরু করলো। আমি জারাসকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম,
কিছু পেলে?
না, কিছুই নেই।
হারুণ কোথায়? সে এখনও ফেরেনি?
সে উত্তর দিল, এখনও আসেনি। শিঘ্রই হয়তো এসে যাবে। আমি গুহামুখটার কাছে দাঁড়িয়ে একটু ইতস্তত করলাম। সবকিছু একেবারে স্বাভাবিক আর মনে হচ্ছে ঠিক আছে। তারপরও বুঝতে পারলাম না কী কারণে আমার মন অস্থির হয়ে উঠেছে, আর কোনোমতেই এই উদ্বেগের ভাবনাটা মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছিলাম না।
গুহায় না ঢুকে পাহাড়ের একপাশ দিয়ে ঘুরে বিপরীত দিকে চললাম। গুহা মুখের কাছ থেকে সরে আমি পেছন দিকে এমন একটা জায়গায় এলাম যেখানে খাড়া পাহাড়ের গায়ে আরেকটি ফাটল দেখা গেল। এই ফাটলটা আগে দেখিনি। এক মুহূর্ত এটা পরীক্ষা করে ভাবলাম পাহাড়ের চূড়ায় উঠে দেখা যাক অন্য পাশে কী আছে। হাত বাড়িয়ে সামনে পাহাড়ের গায়ে হাত রাখলাম।
সূর্যের তাপে পাহাড়ের পাথর এতো গরম হয়ে রয়েছে যে, মনে হল জ্বলন্ত কয়লার উপর হাত রেখেছি। তাড়াতাড়ি ছ্যাকা লাগা হাতটা সরিয়ে নিতেই হাত থেকে পাখির মাথার খুলিটা নিচে পড়ে গেল। ছ্যাকা লাগা আঙুলটা চুষতে চুষতে পাখির মাথার খুলিটা নেবার জন্য হাত বাড়িয়েই থেমে গেলাম।
একটা পায়ের ছাপ, তবে আমার মেয়েদের কারও পায়ের ছাপ নয়। মসৃণ চামড়ার তলিওয়ালা স্যান্ডেল পরা একজন বড় পুরুষ মানুষের পায়ের ছাপ। এখনও পেছন থেকে মেয়েলি গলার আওয়াজ আর হাসিঠাট্টা আর জারাস আর তার লোকজনের কথা বলার অস্পষ্ট শব্দ শোনা যাচ্ছে। ঘুরে দাঁড়িয়ে এমন একটি জায়গায় দাঁড়ালাম, যেখান থেকে গুহামুখের সামনে দাঁড়ান আমাদের লোকদের দেখা যায়। এক ঝলক তাকিয়েই যা জানতে চেয়েছিলাম, তা নিশ্চিত হলাম। আমাদের সব লোকেরা সামরিক বিধিসম্মত পিতলের গজালখচিত তলিওয়ালা স্যান্ডেল পরে রয়েছে।
তার মানে আমাদের মাঝে একজন আগন্তুক রয়েছে।
আমার পরবর্তী চিন্তা হল মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে। ঘাড় ফিরিয়ে গুহার ভেতর থেকে মেয়েদের কথা বলার আওয়াজ শুনতে চেষ্টা করলাম। দুটো কণ্ঠ সাথে সাথে চেনা গেল, তবে তৃতীয়টি চিনতে পারলাম না। লোকদেরকে কিছু বুঝতে না দিয়ে ওদের পাশ কাটিয়ে গুহায় ঢুকলাম। পিছল পাথরের মেঝে বেয়ে দ্রুত জলাধারের কাছে পৌঁছলাম। অন্ধকার সয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটু অপেক্ষা করে তাকিয়ে দুটো মেয়ের ফ্যাকাশে রমণীয় শরীর আবছা দেখতে পেলাম। ওরা পানি নিয়ে খেলছে। তবে শুধু দুজনকে দেখা গেল।
আমি চিৎকার করে উঠলাম, বেকাথা! তেহুতি কোথায়?
পানি থেকে মাথা তুলে সে বললো, সে শেঠ দেবতার কাছে অর্ঘ্য দিতে গিয়েছে, তাতা! লাল-সোনালি চুলগুলো তার মুখে লেপ্টে রয়েছে।
দৈহিক নিত্যকার ক্রিয়াকর্ম অর্থাৎ মলমুত্র ত্যাগ করার কথা বলতে গিয়ে ওরা এ-ধরনের মেয়েলি ভাষা ব্যবহার করতো।
কোন দিকে গিয়েছে?
আমি দেখিনি। সে শুধু জানাল সে এটা করতে বাইরে যাচ্ছে।
তেহুতি একটু খুঁতখুঁতে স্বভাবের মেয়ে। আমি জানি এ-ধরনের শারীরিক ক্রিয়াকর্ম করার জন্য সে গোপন জায়গায় যাবে। এজন্য নিশ্চয়ই তার গুহার ভেতরে থাকার কথা নয়। নিশ্চয়ই বাইরে মরুভূমিতে গিয়েছে। আমি গুহামুখের কাছে ছুটে গেলাম। জারাস তার লোকজনসহ গুহামুখের বামদিকে জটলাবেঁধে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বাইরে পৌঁছেই আমি চিৎকার করে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, রাজকুমারী তেহুতিকে গুহা থেকে বের হতে দেখেছ?
না, প্রভু।
আর কেউ দেখেছে? তোমরা কেউ তাকে দেখেছ? সবাই মাথা নাড়লো।
তেহুতি হয়তো ওদেরকে এড়িয়ে গেছে, মনে মনে ভাবলাম। ঘুরে পেছন দিকে যেখানে নতুন পায়ের ছাপটা দেখেছিলাম সেদিকে ছুটলাম।
মিনতিভরে দেবতার কাছে প্রার্থনা করলাম, হে হোরাস, দয়া কর আমাকে! তারপর মনপ্রাণ দিয়ে দেবতার কাছে প্রার্থনা করতে শুরু করলাম, আমার চোখ খুলে দাও, হে হোরাস। আমাকে দেখিয়ে দাও। হে আমার প্রিয় দেবতা, আমাকে দেখতে দাও!
কয়েকটি মুহূর্ত শক্ত করে চোখ বন্ধ করে রইলাম। তারপর যখন চোখ খুললাম, আমার দৃষ্টিশক্তি উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। মহান দেবতা হোরাস আমার প্রার্থনা শুনেছেন। আমি আমার অন্তর্চক্ষু দিয়ে দেখতে লাগলাম। চারপাশের রঙ আরও পরিষ্কার হল, আকৃতিগুলো আরও ধারালো হয়ে উঠলো।
পাহাড়ের দেয়ালের নিচের দিকে তাকিয়েই আমি তাকে দেখতে পেলাম। এটা তেহুতি নয়, তবে একটু আগে যেখানে সে ছিল এটা তার স্মৃতি। অনেকটা তার নিজের প্রতিধ্বনি কিংবা ছায়া। উজ্জ্বলতার পাশে একটু ময়লা দাগ, ধরা-ছোঁয়া যায় না এমন একটি ছোট মেঘ। এমনকি একজন মানুষের আকৃতিও নয়, কিন্তু আমি জানি এটা সে। নেচে নেচে দূরে চলে যাচ্ছে।
হঠাৎ আমার মনে হল তাকে কেউ তাড়া করছে, আর সে বিপদ থেকে বাঁচার জন্য চেষ্টা করছে। আমার বুকের মাঝে তার আতঙ্ক আমি অনুভব করতে পারলাম।
গর্জে উঠলাম, জারাস, অস্ত্র হাতে নাও! পাঁচজনকে বেকাথা আর লক্সিয়াসের পাহারায় রেখে বাকিদের নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে আমার পিছু পিছু এস!
জানি জারাস আমার কথা শুনেছে, তাই আর পেছন দিকে না তাকিয়ে সোজা তেহুতির যে ছায়া অনুভব করেছিলাম, সেদিকে ছুটলাম।
হঠাৎ আমার দুই পায়ে যেন পাখনা গজাল। আমি দ্রুত থেকে দ্রুততর বেগে ছুটতে লাগলাম। কিন্তু ছোট্ট মেঘটিও আমার দৌড়ের সাথে পাল্লা দিয়ে আমাকে এর পথে গ্রাস করে নিয়ে চলেছে। হঠাৎ সামনে যেখানে রেখাঙ্কিত দেয়ালটা ঘুরেছে সেখানে এটা অদৃশ্য হয়ে গেল।
উজ্জ্বল দীপ্তিটা আমার চোখ থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল। আমার পা ভারী হয়ে চলার গতি কমে এলো। যে জায়গাটি থেকে সে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল খুব চেষ্টা করে সেখানে পৌঁছলাম। সেখানে পৌঁছেই দম নিতে লাগলাম।
পাগলের মতো চারপাশে তাকিয়ে কিছুই দেখতে পেলাম না।
তারপর নিচে মাটির দিকে তাকাতেই বালুর উপর তার খালি পায়ের ছাপ চোখে পড়লো। দেয়ালঘেরা জায়গায় বাতাস পায়ের ছাপটি উড়িয়ে নিতে পারেনি। ছাপটা অনুসরণ করে সামনে তাকাতেই দেখলাম আরেকটু সামনে এগিয়েই ছাপটা আবার মুছে গেছে, তবে এবার বাতাসে মুছে যায় নি। বালুর উপর পুরুষ মানুষের স্যান্ডেলের মসৃণ তলির একাধিক ছাপ তার উপর পড়ে ছাপটা মুছেছে। বুঝা গেল না কতজন লোক, তবে মনে হল ১০/১২ জনেরও বেশি। এটা পরিষ্কার যে, এই লোকগুলো তেহুতিকে তাড়া করছে। যখন ওরা তাকে ধরবার চেষ্টা করেছিল, তখন সে নিশ্চয়ই লড়াই করেছিল। রেগে গেলে তেহুতি বন্য বেড়ালির মতো হয়ে যায়, তবে শেষ পর্যন্ত ওরা নিশ্চয়ই তাকে কাবু করে ফেলেছিল।
তাকে টেনে পাহাড়ের এই প্রান্ত পর্যন্ত নিয়ে আসে। এখানে পাহাড়ের চূড়ার গায়ে আরেকটা ফাটল দেখা গেল, তবে এটা আগেরটার মতো বেশি চওড়া কিংবা এতো খাড়াও নয়।
এটা অনেকটা একটা সিঁড়ির মতো, চিমনির মতো নয়। আমি সহজেই এটা বেয়ে উঠতে পারবো, তবে চূড়ায় উঠতে হলে উটের অন্য পথ খুঁজতে হবে। পেছনে তাকিয়ে দেখলাম জারাস প্রথম উটে চড়ে আমার কাছাকাছি এসে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে চিৎকার করলো, কী হয়েছে তায়তা? আমাদের কী করতে হবে?
তেহুতিকে ধরে নিয়ে গেছে। ওরা হয়তো এখানে ওৎ পেতে ছিল। তেহুতি বাইরে ঘোরাফেরা করতেই ওরা তাকে তুলে নিয়ে যায়। তারপর উপরের দিকে চূড়ার ফাটলটার দিকে দেখিয়ে বলো, ঐখানে টেনে নিয়ে গেছে, আমাদের উটগুলো ওখানে উঠতে পারবে না।
এরা কারা? কোথা থেকে এসেছে?
জানি না জারাস। নিরর্থক প্রশ্ন করো না। পাহাড়ের নিচ দিয়ে গিয়ে উপরে উঠার একটা পথ খুঁজে বের করো। আমি এদিক দিয়ে সোজাসুজি ওদের পেছনে যাচ্ছি।
আমি আমার অর্ধেক লোক আপনার পিছু পিছু পাঠাব। আর অন্যদেরকে নিয়ে বিকল্প পথ দিয়ে উপরে উঠে আপনার সাথে দেখা করবো।
তার কথার কোনো উত্তর না দিয়ে আমি উপরে উঠতে শুরু করলাম। শুনতে পেলাম পেছনে জারাসের লোকেরা আসছে। ওরা আমার চেয়ে বয়সে তরুণ হলেও আমি ওদের আগে আগে চলতে লাগলাম।
দেয়ালটি অর্ধেক চড়ার পর উপর থেকে মানুষের গলার আওয়াজ শোনা গেল। কয়েক সেকেন্ড থেমে শুনতে চেষ্টা করলাম। আরবি ভালো বলতে না পারলেও, কী বলছে তার সারাংশ বুঝতে পারি।
উপরের লোকগুলো বেদুঈন, ওরা দ্রুত চলার জন্য একজন আরেকজনকে তাড়া দিচ্ছে। তারপর তেহুতির অস্ফুট অর্তনাদ শুনতে পেলাম। যে কোনো পরিস্থিতিতে এই কণ্ঠস্বর আমি চিনতে পারি। : আমি চিৎকার করে উঠলাম, তেহুতি, ভয় পেওনা! আমি আসছি, জারাসও তার লোকজনসহ আসছে।
তার গলার আওয়াজ আমাকে তাড়না যোগাল। পূর্ণশক্তিতে আমি উপরের দিকে উঠতে শুরু করলাম। তারপর উপর থেকে ঘোড়ার জেষা ধ্বনি, মাটিতে খুরের শব্দ আর লাগামের টুংটাং শব্দ শুনতে পেলাম। লোকগুলো তাকে ঘোড়ার পিঠে চড়াচ্ছে।
তেহুতি আবার চিৎকার করে উঠলো, তবে আরবদের চেঁচামেচিতে তার কথা বুঝা গেল না। তারপর ঘোড়ার পিঠে চাবুক মারার শব্দ শোনা গেল। ঘোড়ার ফোঁস ফোঁস নিঃশ্বাস আর নরম বালুতে খুরের থপথপ শব্দ শোনা গেল।
বুঝতে পারলাম দস্যুরা এখানেই তাদের ঘোড়াগুলো বেঁধে রেখে গিয়েছিল। ওরা জানতে এখানে ওরা দ্রুত ফিরে আসতে পারবে, অথচ উটে চড়ে অন্য পথ দিয়ে আসতে আমাদের অনেক সময় লাগবে।
শেষ কয়েক গজ হুমড়ি খেয়ে চললাম, তারপর চূড়ার কিনারায় পৌঁছে। একটু থেমে পরিস্থিতিটা বুঝার চেষ্টা করলাম।
আমার সামনেই রোদে পোড়া ধূলিময় পোশাক আর মাথায় কেফায়া পরা ত্রিশ চল্লিশ জন আরব বেদুঈন দাঁড়িয়ে রয়েছে। বেশিরভাগই ইতোমধ্যে ঘোড়ায় চড়ে বসেছে আর অন্যান্যরা ছুটে চলেছে। বন্য চিৎকারে ওরা একে অন্যকে বিজয়ীর সুরে তাড়া দিচ্ছে।
একজন দস্যু তখনও তেহুতির সাথে ধস্তাধস্তি করছিল। সে তেহুতিকে ঘোড়ার জিনের সামনে উপুড় করে শুইয়ে নিজে তার পেছনে উঠেছে। শক্তিশালী দেহের অধিকারী লোকটির কালো কোঁকড়ানো দাড়ি। শেয়াল ওরফে ডাকাত আল-হাওয়াসাঈর চেহারার যে বর্ণনা আল-নামজুর কাছ থেকে শুনেছিলাম, তার সাথে এর চেহারা বেশ মিলে যায়। তবে আমি নিশ্চিত হতে পারলাম না, এই সেই লোক কি না।
তেহুতি দুই পা ছুঁড়ে চিৎকার করছিল, তবে লোকটি বেশ সহজেই এক হাত দিয়ে তার দুই হাত ঘোড়ার জিনের উপর চেপে রেখেছে। দেখলাম তার। পোশাক আর চুল তখনও জলাধারের পানিতে ভেজা।
পেছনে তাকিয়ে সে চূড়ার কিনারায় আমাকে দেখতে পেল আর সাথে সাথে আশায় তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। আমি তার ঠোঁট নাড়া দেখে বুঝতে পারলাম সে আমার নাম উচ্চারণ করছে।
তাতা! আমাকে বাঁচাও!
মুক্ত হাতে ঘোড়ার লাগাম ধরে দস্যুটি ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে পেটে গুঁতো দিয়ে ঘোড়াটিকে পাথুরে পথের উপর দিয়ে ছুটাতে শুরু করলো। একবার পেছন ফিরে আমার দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে বিজয়ীর হাসি দিল। এখন আমি নিশ্চিত হলাম এই লোকই শেয়াল। আমার কেন জানি মনে হল সে আগে থেকে জানতো যে, আমরা ময়াগুহায় আসবো।
তার দলটি চতুর্দিক দিক থেকে ঘিরে তাকে অনুসরণ করলো। আমি গুণতে পারলাম না ওরা কজন। এভাবে ওদেরকে চলে যেতে দেখে রাগে আমার সারা শরীর জ্বলে উঠলো।
দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে কাঁধ থেকে লম্বা ধনুকটা নামিয়ে হাতে নিলাম। তিনটি দ্রুত প্রক্রিয়ায় ধনুকের গুণ টেনে সোজা করে তূণীর থেকে একটা তীর বের করে নেবার জন্য পেছনে হাত বাড়ালাম।
লক্ষ বস্তুটি দ্রুত সরে যাচ্ছিল। আমি জানি আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তেহুতি আর দস্যুটি ধনুকের তীরের আওতার বাইরে চলে যাবে। বাম কাঁধ সামনে এগিয়ে লক্ষ্য স্থির করে, তীর ছোঁড়ার জন্য সঠিক ভঙ্গি নিয়ে প্রস্তুত হলাম। দিগন্তের উপরের দিকে চোখ তুলে আন্দাজ করতে চেষ্টা করলাম, তীরটি কতটুকু উঁচু করে ছুঁড়লে শেয়াল দস্যুর কাছে পৌঁছবে।
বুঝতে পারলাম তেহুতি আর আমার মাঝে শেয়ালের দেহটি তেহুতিকে আড়াল করে রেখেছে। অর্থাৎ তার অজান্তে তীরের আঘাত থেকে বাঁচার জন্য সে তার দেহটিকে তেহুতির জন্য ঢাল করে রেখেছে। এবার আমি নির্ভয়ে তেহুতিকে আঘাত না করে তীর ছুঁড়তে পারবো। গুণ টেনে ঠোঁটে ছোঁয়ালাম। আমার বাহু আর দেহের উপরের প্রতিটি পেশি গুণটানা ধনুকের প্রচণ্ড ওজনের ভারে টান টান হয়ে রয়েছে। খুব কম লোকই আমার ধনুকটি পুরোপুরি টানতে পারে। এটা শুধু পাশবিক শক্তির বিষয় নয়। এর জন্য দরকার সুনির্দিষ্ট ভঙ্গি, সঠিক ভারসাম্য আর ধনুকের সাথে একাত্ম হওয়ার মতো অনুভূতি অর্জন করা।
যখন আমি ধনুকের গুণ ধরে থাকা তিনটি আঙুল ছেড়ে দিলাম, এটা ঝটকা মেরে পেছন দিকে আমার বাহুর ভেতরের দিকে কেটে বসলো। সাথে সাথে ক্ষত স্থানটি থেকে রক্ত ঝরতে শুরু করলো। আমি আঘাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য চামড়ার হাতবন্ধনী লাগাবার সুযোগ পাইনি।
কোনো ব্যথা অনুভব করলাম না। বরং উড়ে যাওয়া তীরের পিছু পিছু আমার হৃদয়ও ছুটে চললো। বুঝলাম নিখুঁতভাবে তীরটি ছুঁড়েছি। আমি জানি যে কুকুরটি তেহুতিকে অপহরণ করে নিয়ে যাচ্ছে সে এখুনি মরবে।
তারপর হঠাৎ হতাশ হয়ে প্রচণ্ড আক্রোশে চিৎকার করে উঠলাম। লক্ষ্য করলাম লক্ষ্যবস্তুর ঠিক পেছন পেছন ছুটে চলা ঘোড়সওয়ারটি হঠাৎ লাইন থেকে সরে গেল। দেবতা হোরাস জানেন কেন সে এটা করলো, সম্ভবত পথে কোনো গর্ত এড়াবার জন্য সে এটা করেছে। কারণ যাই হোক সে আমার লক্ষ্যবস্তুকে আড়াল করে দিয়েছে। তাকিয়ে দেখলাম আমার তীরটা একটা ছো মারা বাজপাখির মতো তার পিঠের উপরের অংশে আঘাত করলো। সে পেছন দিকে মাথা ঘুরিয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠলো। হাত বাড়িয়ে তীরের ফলাটা ধরবার চেষ্টা করতে লাগলো। তবে এখনও সে আমার লক্ষ্যবস্তুকে আড়াল করে রেখেছে।
আরেকটি তীর ছুঁড়লাম এই আশায় যে, হয়তো আহত লোকটি ঘোড়া থেকে পড়ে যাবে আর আলহাওয়াসাঈর দেহ উড়ন্ত তীরের আওতায় এসে যাবে। তবে আহত আরব লোকটি লাগাম আঁকড়ে ধরে ঘোড়ার পিঠেই বসে রইল। তারপর দ্বিতীয় তীরটি তার ঘাড়ের পেছনে আঘাত করার পর তার নিশ্চল দেহ ঘোড়ার পিঠ থেকে মাটিতে পড়ে ধূলায় গড়াগড়ি খেতে লাগলো।
ইতোমধ্যে আল-হাওয়াসাঈ তীরের আওতার বাইরে চলে গেছে। আমি তার দিকে আরেকটি তীর ছুঁড়লাম, যদিও জানি এটা তাকে স্পর্শ করার সুযোগ পাবে না। নিজেকে আর সমস্ত অন্ধকারের দেবতাদের অভিসম্পাত করতে শুরু করলাম, যারা আল-হাওয়াসাঈকে আমার তীরের লক্ষ্য থেকে বাঁচিয়েছে। তীরটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে তার ঘোড়ার বিশ কদম পেছনে মাটিতে পড়ে গেল।
আমার দুটো তীর বেঁধা মাটিতে পড়ে থাকা লোকটির দিকে আমি দৌড়ে গেলাম। সে মরার আগে তাকে দুএক ঘা দিয়ে তার কাছ থেকে তথ্য বের করতে হবে। কপাল ভালো থাকলে হয়তো যে লোকটি তেহুতিকে অপহরণ করেছে তার আসল পরিচয় আর কোথায় তাকে খুঁজে পাবো তা জানা যাবে।
তবে তা হল না। আমি পৌঁছার আগেই নামহীন লোকটি মারা গেল। একটা চোখ উল্টে শুধু সাদা অংশটা দেখা যাচ্ছে, আর অন্য চোখটি প্রচণ্ড আক্রোশে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তারপরও আমি দুইতিনবার লাথি কষালাম। তারপর লোকটির পাশে বসে হাথোর, ওসিরিস আর হোরাস দেবতার কাছে আকুল প্রার্থনা করতে লাগলাম যেন, আমি পৌঁছা পর্যন্ত তেহুতি নিরাপদ থাকে।
দেবতাদের বিষয়ে যে জিনিসটা আমি অপছন্দ করি তা হল যখন তাদের খুব প্রয়াজন হয় তখন তাদেরকে হাতের কাছে পাওয়া যায় না।
সেখানে বসে জারাসের জন্য অপেক্ষা করতে করতে মৃত দস্যুটির দেহ থেকে আমার তীরটি কেটে বের করলাম। পুরো মিসরে আমার তীরের ফলার মতো আর কোনটি নেই।
.
প্রায় এক ঘন্টা পর জারাস পৌঁছল। বেদুঈন দস্যুদলটি ইতোমধ্যে দিগন্তের ওপারে অদৃশ্য হয়ে গেছে। সাধারণত যে কোনো বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে আমি আমার আবেগ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি। এটা বলতে আমি বুঝাচ্ছি কোনো শহরকে ধ্বংস করা, শত্রু সেনাদলকে নিশ্চিহ্ন করা এ-ধরনের পরিস্থিতি ইত্যাদি। তবে তেহুতিকে হারিয়ে আমি ভীষণভাবে রেগে রয়েছি, আমার সারা শরীর কাঁপছিল। যত দেরি হচ্ছে ততই আমার আবেগ উথলে উঠে টগবগ করে ফেটে পড়ছে।
আমার সম্পূর্ণ রাগ জারাসের লোকদের উপর ঝাড়তে লাগলাম। ওরা ভিতু, কাপুরুষ, প্রয়োজনের সময়ে কোনো সাহায্য করতে পারলো না, এসব বলে চিৎকার করলাম।
তারপর দূরে জারাসের উটগুলো আসতে দেখে আর দেরি না করে ছুটে তার দিকে গিয়ে চিৎকার করে তাকে দ্রুত আসতে তাগাদা দিলাম।
সে কাছে আসতেই তিক্তকণ্ঠে তাকে তাড়াতাড়ি করতে বললাম, আবার সেও সমানভাবে চিৎকার করে তেহুতি কোথায় আছে, বেঁচে আছে কি না জানতে চাইল।
ঠিক তখনই আমি বুঝতে পারলাম এই দুই তরুণ হৃদয়ের মাঝে যা চলছে, তা সাময়িক কোনো ধরনের মোহ নয় এটা অন্য কিছু। এটি সেই একই ধরনের আবেগ আর ভালোবাসা যা আমি তেতির মা রানি লস্ট্রিসের ক্ষেত্রে অনুভব করতাম। আমি দেখলাম তেহুতিকে হারিয়ে জারাস যে-রকম শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েছে, সে রকম আমিও এককালে তার মায়ের জন্য শোকাগ্রস্ত হয়েছিলাম।
ঠিক সেই মুহূর্তে আমি বুঝলাম আমাদের তিনজনের জন্য এই পৃথিবী বদলে গেছে।
