Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    কপিলাবস্তুর কলস – প্রীতম বসু

    March 23, 2026

    তালদিঘিতে ভাসিয়ে দেব – সায়ক আমান

    March 23, 2026

    কালীগুণীন ও বজ্র-সিন্দুক রহস্য – সৌমিক দে

    March 23, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    তারানাথ তান্ত্রিকের দ্বিতীয় গল্প

    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ভৌতিক গল্প এক পাতা গল্প25 Mins Read0

    তারানাথ তান্ত্রিকের দ্বিতীয় গল্প

    তারানাথ তান্ত্রিকের প্রথম গল্প আপনারা শুনিয়াছেন কিছুদিন আগে, হয়তো অনেকেই বিশ্বাস করেন নাই। সুতরাং তাহার দ্বিতীয় গল্পটি যে বিশ্বাস করিবেন এমন আশা করিতে পারি না। কিন্তু এই দ্বিতীয় গল্পটি এমন অদ্ভুত যে, সেটি আপনাদের শুনাইবার লোভ সংবরণ করা আমার পক্ষে দুঃসাধ্য।

    জগতে কি ঘটে না-ঘটে তাহার কতটুকুই বা আমরা খবর রাখি? দেয়ার আর মোর থিংস ইন হেভেন আর্থ, হেরোশিয়ো— ইত্যাদি-ইত্যাদি। অতএব এই গল্পটি শুনিয়া যান এবং সম্পূর্ণ সত্য বলিয়া, ডিসমিস করিবার পূর্বে মহাকবির ওই বহুবার উদ্ধৃত, সর্বজন পরিচিত অথচ গভীর উক্তিটি স্মরণ করিবেন— এই আমার অনুরোধ।

    তবে যিনি প্রত্যক্ষদৃষ্ট, এই স্থূল জগতের বাহিরে অন্য কোনো সূক্ষ্ম জগৎ, কিংবা ভূতপ্রেত কিংবা অন্য কোনো অশরীরী জীব কিংবা অপদেবতা-উপদেবতার অস্তিত্বে আদৌ বিশ্বাসবান নহেন, তিনি এ-গল্প না-হয় না-ই পড়িলেন।

    ভূমিকা রাখিয়া এখানে গল্পটা বলি—

    সেদিন হাতে কোনো কাজকর্ম ছিল না, সন্ধ্যার পূর্বে মাঠ হইতে ফুটবল খেলা দেখিয়া ধর্মতলা দিয়া ফিরিতেছিলাম। মোহনবাগান হারিয়া যাওয়াতে মনও প্রফুল্ল ছিল না; কী আর করি, ধর্মতলার মোড়ের কাছেই মটস লেনে (নম্বরটা মনে নাই, তবে বাড়িটা চিনি) তারানাথ জ্যোতিষীর বাড়ি গেলাম।

    তারানাথ একাই ছিল। আমায় বলিল— এসো, এসো হে, দেখা নেই বহুকাল, কী ব্যাপার?

    কিছুক্ষণ গল্পগুজবের পরে উঠিতে যাইতেছি, এমন সময়ে ঘোর বৃষ্টি নামিল। তারানাথ আমায় এ-অবস্থায় উঠিতে দিল না। আমি দেখিলাম বৃষ্টি হঠাৎ থামিবে না, তারানাথের বৈঠকখানায় বসিয়া আমরা দু-জনে। বৃষ্টির সময় মনে কেমন এক ধরনের নির্জনতার ভাব আসে— বৃষ্টি না থাকিলে মনে হয় শহরসুদ্ধ লোক বুঝি আমার ঘরে আসিয়া ভিড় করিবে, কেহ না আসিলেও মনের ভাব এইরূপ থাকে, কিন্তু বৃষ্টি নামিলে মনে হয় এ-বৃষ্টি মাথায় কেহ-ই আসিবে না। সুতরাং আমার ঘরে আমি একা। তারানাথের ঘরে বসিয়াও সেদিন মনে হইল আমরা দু-জন ছাড়া সারাকলিকাতা শহরে যেন কোথাও কোনো লোক নাই।

    সুতরাং মনের ভাব বদলাইয়া গেল। এদিকে সন্ধ্যাও নামিল। জীবনের অদ্ভুত ধরনের অভিজ্ঞতার কাহিনি বলিবার ও শুনিবার প্রবৃত্তি উভয়েরই জাগিল। ঘোর বৃষ্টিমুখর আষাঢ়-সন্ধ্যায় আমরা মোহনবাগানের শোচনীয় পরাজয়, ল্যাংড়া আম অতিরিক্ত সস্তা হওয়ার ব্যাপার, চৌরঙ্গির মোড়ে ও-বেলাকার বাস-দুর্ঘটনা প্রভৃতি নানারূপ কথা বলিতে বলিতে হঠাৎ কোনো একসময় নারীপ্রেমের প্রসঙ্গে আসিয়া পড়িলাম।

    তারানাথ বেশ বড়ো জ্যোতিষী ও তান্ত্রিক হইলেও শুকদেব যে নয় বা কোনো কালে ছিল না, এ-কথা পূর্বের গল্পটিতে বলিয়াছি। আশা করি তাহা আপনারা ভোলেন নাই। নারীর সঙ্গে সে যে বহু মেলামেশা করিয়াছে, এ-কথা বলাই বাহুল্য। সুতরাং তাহার মুখ হইতেই এ বিষয়ে কিছু রসাল অভিজ্ঞতার কথা শুনিব, এরূপ আশা করা আমার পক্ষে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ছিল; কিন্তু তাহার পরিবর্তে সে এ-সম্বন্ধে যে অসাধারণ রকমের অভিজ্ঞতার কাহিনিটি বর্ণনা করিল, তাহার জন্য, সত্যই বলিতেছি, আদৌ প্রস্তুত ছিলাম না।

    আর একটা কথা, তারানাথকে দেখিয়া বা তাহার মুখের কথা শুনিয়া আমার মনে হইয়াছিল একটা কী ঘোর দুঃখ মনে সে চাপিয়া রাখিয়াছে, অনেকবার তন্ত্রশাস্ত্রের কথাবার্তা বলিতে গিয়া কী যেন একটা বলি বলি করিয়াও বলে নাই; বুঝিলাম তারানাথের তান্ত্রিক জীবনের অনেক কাহিনিই সে আমার কাছে কেন, কাহারও কাছে বলে নাই, হয়তো সেগুলি ঠিক বলিবার কথাও নহে; কারণ সে-কথা বলা তাহার পক্ষে কষ্টকর স্মৃতির পুনরুদ্ধোধন করা মাত্র। তা ছাড়া আমার মনে হয়, লোককে সেসব গল্প বিশ্বাস করানোও শক্ত।

    বলিলাম— জ্যোতিষী মহাশয়ের এ সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই অনেক আছে— কী বলেন—

    তারানাথ বলিল— অভিজ্ঞতা একটাই আছে এবং সেটা বড়ো মারাত্মক রকমের অদ্ভুত। প্রেম কাকে বলে বুঝেছিলাম সেবার। এখন কিন্তু, সেটা স্বপ্ন বলে মনে হয়। শোনো তবে—

    আমি বাধা দিয়া বলিলাম— কোনো ট্র্যাজিক গল্প বলবেন না, প্রথম প্রেম হল একটি মেয়ের সঙ্গে, সে মারা গেল— এই তো? ও ঢের শুনেছি।

    তারানাথ হাসিয়া বলিল— ঢের শোনোনি। শোনো, কিন্তু বিশ্বাস যদি না-করো তাও আমায় বলবে। এরকম গল্প বানিয়ে বলতে পারলে একজন গল্পলেখক হয়ে যেতুম হে! দু-একজন নিতান্ত অন্তরঙ্গ বন্ধু ছাড়া এ-কথা কারও কাছে বলিনি।

    ঠিক সেইসময় বাড়ির ভিতর হইতে তারানাথের বড়ো মেয়ে চারু ওরফে চারি দু-পেয়ালা গরম চা ও দু-খানি করিয়া পরোটা ও আলুভাজা আনিল। চারি দশ বছরের মেয়ে, তারানাথের মতোই গায়ের রং বেশ উজ্জ্বল, মুখ-চোখ মন্দ নয়। আমায় বলিল— কাকাবাবু, লেসের কাপড়ের ছবিটা আনলেন না? চারির কাছে কথা দিয়া রাখিয়াছিলাম, ধর্মতলার দোকান হইতে তাহার উল বোনার জন্য একটা ছবির ও প্যাটার্নের নকশা কিনিয়া দিব। বলিলাম— আজ ফুটবলের ভিড় ছিল, কাল এনে দেবো ঠিক।

    চারি দাঁড়াইয়া ছিল, তারানাথ বলিল— যা তুই চলে যা, দুটো পান নিয়ে আয়—

    মেয়ে চলিয়া গেলে আমার দিকে চাহিয়া বলিল— ছেলেপিলের সামনে সে-সব গল্প…চা-টা খেয়ে নাও, পরোটাখানা— না না, ফেলতে পারবে না, ইয়ং ম্যান তোমরা এখন— খাওয়ার বেলা অমন— ওই বৃষ্টির জলেই হাত ধুয়ে ফেলো—

    চা পানের পরে তারানাথ বলিতে আরম্ভ করিল।

    মধুসুন্দরীদেবীর আবির্ভাব…

    বীরভূমের শ্মশানের যে-পাগলির অদ্ভুত কাণ্ড সেবার গল্প করেছিলাম, তার ওখান থেকে তো চলে এলাম সেই কাণ্ডের পরেই।

    কিন্তু তন্ত্রশাস্ত্রের প্রতি আমার একটা অত্যন্ত শ্রদ্ধা হয়ে গেল তারপর থেকে। নিজের চোখে যা দেখলুম, তা তো আর বিশ্বাস না-করে পারি না। এটা পাগলির কথা থেকে বুঝেছিলুম, পাগলি আমায় ইন্দ্রজাল দেখিয়েছিল নিম্ন তন্ত্রের সাহায্যে। কিন্তু সে তো ব্ল্যাক-ম্যাজিক ছাড়া উচ্চ তন্ত্রের কথাও বলেছিল। ভাবলাম, দেখি না কী আছে এর মধ্যে? গুরু খুঁজতে লাগলুম।

    খুঁজলে কী হবে, ও পথের পথিকদের দর্শন পাওয়া অত্যন্ত দুর্লভ।

    এই সময়ে বহুস্থান ঘুরে-বেড়িয়ে আমার দু-টি মূল্যবান অভিজ্ঞতা হল। প্রথম, ধুনি-জ্বালানো সাধুদের মধ্যে শতকরা নিরানব্বই জন ব্যাবসাদার, ধর্ম জিনিসটা এদের কাছে একটা বেচা-কেনার বস্তু, ক্রেতাকে ঠকাবার বিপুল কৌশল ও আয়োজন এদের আয়ত্তাধীনে। দ্বিতীয়, সাধারণ মানুষ অত্যন্ত বোকা, এদের ঠকানো খুব সহজ, বিশেষত ধর্মের ব্যাপারে।

    যাক ও-সব কথা। আমি ধুনি জ্বালানো ব্যাবসাদার সাধু অনেক দেখলুম, ইনসিওরেন্সের দালাল দেখলুম, দৈবী-ঔষধের মাদুলি বিক্রেতাকেও দেখলুম, সাধুবেশী ভিক্ষুক দেখলুম— সত্যিকার সাধু একটাও দেখলুম না।

    এ-অবস্থায় বরাকর নদীর ধারে শালবনের মধ্যে একটি ক্ষুদ্র গ্রামের সীমায় এক মন্দিরে একদিন আশ্রয় নিয়েছি। শীতকাল, আমি বনের ডালপালা কুড়িয়ে আগুন করবার জোগাড় করতে যাচ্ছি, এমন সময়ে একজন শ্যামবর্ণ ঋজু ও দীর্ঘাকৃতি প্রৌঢ়-সাধু দেখি একটা পুঁটুলি বগলে মন্দিরে ঢুকছেন। আমি গিয়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলুম।

    সাধুটি বেশ মিষ্টভাষী, বললেন— তুই যে দেখছি বড়ো ভক্ত! কী চাস এখানে? বাড়ি ছেড়ে দেখছি রাগ করে বেরিয়েছিস!

    আমি বিনীত প্রতিবাদের সুরে বলতে গেলুম— রাগ নয় বাবাজি, বৈরাগ্য— সাধুজি হেসে বললেন— ওহে ছোকরা, সাধু হব বললেই হওয়া যায় না। তোর মধ্যে ভোগের বাসনা এখনও পুরোমাত্রায় রয়েছে। সংসার-ধর্ম করগে যা।

    কথাটি পাগলিও বলেছিল!

    মন্দির থেকে কিছু দূরে ছাতিম গাছের তলায় সাধুর পঞ্চমুণ্ডির আসন— পাঁচটি নরমুণ্ড পেতে তৈরি। সাধু রাত্রে সেখানে নির্জনে সাধনা করেন তাও দেখলুম। মনে ভারি শ্রদ্ধা হল, সংকল্প করলুম এ-মহাপুরুষকে ছেড়ে কোথাও যাচ্ছিনে এবার!

    কিছুদিন লেগে লইলাম তাঁর পিছনে। তাঁর হোমের কাঠ ভেঙে এনে দিই, তিন মাইল দূরের কুসুমবনী বলে গ্রাম থেকে তাঁর চাল-ডাল কিনে আনি। গ্রামের সকল লোকের মুখে শুনলুম, সাধুটি বড়ো একজন তান্ত্রিক। অনেক অদ্ভুত ক্রিয়াকলাপ তাঁর আছে। তবে পাগলির কাছে যেতে লোকে যেমন আমায় ভয় দেখিয়েছিল, এখানেও তেমনি ভয় দেখালে। বললে— তান্ত্রিক সাধু-সন্নিসিদের বিশ্বাস কোরো না বেশি। ওরা সব পারে, একটু সাবধান হয়ে চলো। বিপদে পড়ে যাবে।

    শীঘ্রই ওদের কথার সত্যতা একদিন বুঝলুম।

    গভীর রাত্রে আমার ঘুম ভেঙে গিয়েছে, সেদিন শুক্লপক্ষের রাত্রি, বেশ ফুটফুটে জ্যোৎস্না। মন্দির থেকে ছাতিম গাছের দিকে চেয়ে দেখি সাধু বাবাজি কার সঙ্গে পঞ্চমুণ্ডির আসনে বসে কথা বলছেন। কৌতূহল হল, এত রাত্রে কে এল এই নির্জন নদীতীরে জঙ্গলের মধ্যে?

    কৌতূহল সামলাতে না-পেরে এগিয়ে গেলুম। অল্প দূর গিয়েই যা-দেখলুম তাতে আর এগিয়ে যেতে সংকোচ বোধ হল এবং সঙ্গেসঙ্গে রীতিমতো আশ্চর্য হয়ে গেলুম।

    সাধু বাবাজি এত রাত্রে একজন মেয়েমানুষের সঙ্গে কথা বলছেন! গাছের আড়ালে মেয়েমানুষটিকে খানিকটা স্পষ্ট খানিকটা অস্পষ্টভাবে দেখে আমার মনে হল মেয়েটি যুবতী এবং পরমাসুন্দরী।

    এত রাত্রে গুরুদেব কোন মেয়ের সঙ্গে কথা বলছেন, সে-মেয়েটি এলই বা কেমন করে একা এই নির্জন জায়গায়?

    যাই হোক আর বেশি দূর অগ্রসর হলেই ওরা আমায় টের পাবে। মনে কেমন ভয়ও হল, সেদিন চলে এলুম। তার পরদিন রাত্রে আমি ঘুমুলাম না! গভীর রাত্রে উঠে পা টিপে টিপে বাইরে গিয়ে গাছের আড়াল উঁকি মেরে দেখি, কাল রাতের সে-মেয়েটি আজও এসেছে। ভোর হবার কিছু আগে পর্যন্ত আমি সেদিন গাছের আড়ালে রইলাম দাঁড়িয়ে। ফরসা হবার লক্ষণ হচ্ছে দেখে আর সাহস হল না; মন্দিরে নিজের বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।

    পরদিন রাত্রেও আবার অবিকল তাই।

    একদিন আর-একটি জিনিস লক্ষ করলাম। যে-মেয়েমানুষটির সঙ্গে কথা হচ্ছে, তার পরনের বস্ত্রাদি বড়ো অদ্ভুত ধরনের। সে যে কোন দেশের বস্ত্র পরেছে, সেটা না-শাড়ি, না-ঘাঘরা, না-জাপানি কিমোনো, না-মেয়েদের গাউন!— অজানা যদিও, ভারি চমৎকার মানিয়েছে বটে।

    সেদিন আর একটা কথা আমার মনে হল।

    মেয়েমানুষটি যেই হোক, সে জানে আমি রোজ গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওর দিকে চেয়ে থাকি। কী করে আমার একথা মনে হল তা আমি বলতে পারব না, কিন্তু এই কথা আবছাভাবে আমার মনের মধ্যে উদয় হওয়ার সঙ্গেসঙ্গে মনে কেমন একটু ভয়ও হল।

    সরে পড়ি বাবা, দরকার কী আমার এ-সবের মধ্যে থেকে?

    কিন্তু পরদিন রাত্রে এক সময়ে আর শুয়ে থাকতে পারলাম না নিশ্চিন্ত মনে— উঠেই যেতেই হল। সেদিন আর একটি জিনিস লক্ষ করলাম— মেয়েমানুষটি যখন থাকে, তখন এক ধরনের খুব মৃদু সুগন্ধ যেন বাতাসে পাওয়া যায়। এ-কদিনও এই গন্ধটা পেয়েছি; কিন্তু ভেবেছিলুম কোনো বন্য ফুলের গন্ধ হয়তো। আজ বেশ মনে হল এ-গন্ধের সঙ্গে ওই মেয়েটির উপস্থিতির একটা সম্বন্ধ বর্তমান।

    এইরকম চলল আরও দিন দশ-বারো। তারপর সাধুর ডাক এল বরাকর না কোডার্মার এক গাড়োয়ালি জমিদার বাড়িতে কী শান্তি স্বস্ত্যয়ন করবার জন্যে। সাধুজি প্রথমে যেতে রাজি হননি, দু-দিন তাদের লোক ফিরে গিয়েছিল; কিন্তু তৃতীয় বারে জমিদারের ছোটো ভাই নিজে পালকি নিয়ে এসে সাধুকে অনেক খোশামোদ করে নিয়ে গেলেন।

    মনে ভাবলুম এ আর কিছু নয়, সাধুজি সেই মেয়েটিকে ছেড়ে একটি রাত্রিও বাইরে কাটাতে রাজি নন।

    কিন্তু নিকটে কোথাও বস্তি নেই, মেয়েটি আসেই-বা কোথা থেকে? আর সাধারণ সাঁওতাল বা বিহারি মেয়ে নয়; আমি অনেকবার দেখেছি সেটিকে এবং প্রত্যেকবারই আমার দৃঢ় বিশ্বাস হয়েছে এ-কোনো বড়ো ঘরের মেয়ে— যেমনি রূপসী, তেমনি তার অদ্ভুত ধরনের অতি চমৎকার এবং দামি পরন-পরিচ্ছদ।

    হঠাৎ আমার মনে দুষ্টবুদ্ধি জাগল। আমার মনে হয়েছিল মেয়েটিকে সাধুজির হয়তো খবর দেওয়ার সুযোগ হয়নি, দেখাই যাক না আজ রাত্রে সে আসে কি না! তখন ছিল অল্পবয়স, তোমরা যাকে বলো রোমান্স, তার ইয়ে তখন যে আমার যথেষ্ট ছিল, এতে তুমি আমাকে দোষ দিতে পারো না।

    নির্দিষ্ট সময়ের কিছু আগে রাত্রে সেদিন আমি নিজেই গিয়ে পঞ্চমুণ্ডির আসনে বসে রইলাম। মনে ভয়ানক কৌতূহল, দেখি আজ মেয়েটি আসে কি না। কেউ কোনো দিকে নেই, নির্জন রাত্রি, মনে একটু ভয়ও হল— এ ধরনের কাজ কখনো করিনি, কোনো হাঙ্গামায় আবার না-পড়ে যাই!

    তখন আমি অপরিণতবুদ্ধির নির্বোধ যুবক মাত্র। তখন ঘুণাক্ষরেও যদি জানতাম অজ্ঞাতসারে কী ব্যাপারের সম্মুখীন হতে চলেছি, তবে কী আর ছাতিমতলায় একা পঞ্চমুণ্ডির আসনে বসতে যাই?

    তাও নয়, ও আমার অদৃষ্টের লিপি। সে-রাত্রির জের আমার জীবনে আজও মেটেনি। আমার মনের শান্তি চিরদিনের জন্যে হারানোর সূত্রপাতটি ঘটেছিল যেই কালরাত্রে— তা কী আর তখন বুঝেছিলাম!

    যাক ও-কথা।

    রাত ক্রমে গভীর হল। পুব দিকের গাছপালার আড়াল থেকে চাঁদ উঠতে লাগল একটু একটু করে। আমার ডাইনেই বরাকর নদী, দুই পাড়েই শিলাখণ্ড ছড়ানো, তার ওপর জ্যোৎস্না এসে পড়ল। সেই নদীর পাড়েই ছাতিমতলা ও পঞ্চমুণ্ডির আসন— আমি যেখানে বসে আছি। আমার বাঁ-দিকে খানিকটা ফাঁকা ঘাসের মাঠ, তারপর শালবন শুরু হয়েছে।

    হঠাৎ সামনের দিকে চেয়ে আমি চমকে উঠলুম। আমার সামনে সেই মেয়েটি কখন এসে দাঁড়িয়েছে এমন নিঃশব্দে, এমন অতর্কিতভাবে যে আমি একেবারেই কিছু টের পাইনি। অথচ আগেই বলেছি আমার এক দিকে বরাকর নদীর জ্যোৎস্না ওঠা শিলাবিস্তৃত পাড় আর এক দিকে ফাঁকা মাঠ। আসনে বসে পর্যন্ত আমি সতর্ক দৃষ্টিও রেখেছি— মাঠের দিকে। নদীর দিকে থেকে আমার কাছে কারও আসা সম্ভব নয়, মাঠের দিক থেকে কেউ এলে আমার দৃষ্টি এড়ানোর কথা নয়। মেয়েটি যেখানে দাঁড়িয়ে, সেখানে আধ সেকেন্ড আগেও কেউ ছিল না আমি জানি, আধ সেকেন্ড পরেই সেখানে জলজ্যান্ত একটি রূপসী মেয়ের আবির্ভাব আমার কাছে সম্পূর্ণ ইন্দ্রজালের মতো ঠেকল বলেই আমি চমকে উঠলাম। সঙ্গেসঙ্গে সেই মৃদু মধুর সুগন্ধ। আমার সারা দেহ-মন অবশ, আচ্ছন্ন হয়ে উঠল। আমার জ্ঞানও বোধ হয় ছিল তার পর আর এক সেকেন্ড। তার পরে কী ঘটল আমি আর কিছু জানি না।

    যখন আমার আবার জ্ঞান ফিরে এল তখন ভোর হয়েছে। উঠে দেখি সারারাত সেই পঞ্চমুণ্ডির আসনেই আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিলাম। নৈশ-শীতল বায়ুতে বাইরে সারারাত পড়ে থাকার দরুন গায়ে ব্যথা হয়েছে, গলা ভার হয়েছে। উঠে ধীরে ধীরে মন্দিরে চলে এলাম। এসে আবার শুয়ে পড়লাম। আমার মনে হল আমার জ্বর হবে, শরীর এত খারাপ।

    পরদিন সারাদিন কিছু না-খেয়ে শুয়েই রইলাম, আর কেবলই রাত্রের কথাটা ভাবি।

    মেয়েটি কে? কী করে অমন নিঃশব্দে অতর্কিতে এখানে এল? এ তো একেবারে অসম্ভব! অসামান্য রূপসী সে মেয়েটি, অজ্ঞান হয়ে পড়বার পূর্বে ওই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তা আমি দেখে নিয়েছিলুম। আমি অজ্ঞান হয়ে পড়লামই-বা কেন, এরও তো কোনো যুক্তিসংগত কারণ খুঁজে পেলাম না। অথচ সেই কথা নিয়ে মনের মধ্যে তোলাপড়া করাও সারাদিন আমায় ঘুচল না। বিকেলের দকে সাধু বাবজি গাড়োয়ালি জমিদারবাড়ি থেকে ফিরলেন। আমার জন্যে লাড্ডু, কচৌড়ি এবং একটা মোটা সুতি-চাদর এনেছেন; তাঁর নিজের জন্যে জমিদারবাড়ি থেকে ভালো একখানা পশমি আলোয়ান দিয়েছে।

    আমায় বললেন— শুয়ে কেন? ওঠো জিনিসগুলো রেখে দাও—

    অতিকষ্টে উঠে সাধুর হাত থেকে পুঁটলিটা নিলাম। তিনি আমার দিকে চেয়ে বললেন— কী হয়েছে? অসুখ-বিসুখ নাকি?— কিছু জবাব দিলাম না।

    সাধু স্নান করতে গেলেন এবং এসে জমিদার বাড়ির কাণ্ড কীরকম তারই সবিস্তার বর্ণনা করতে লাগলেন। আমায় বললেন— তোমার কী হয়েছে বলো তো, অমন মনমরা ভাব কেন? বাড়ির জন্যে মন কেমন করছে বুঝি? বলছি তো, বাবা, তোমরা ছেলে-ছোকরা, এ পথে কী নামলেই নামা যায় রে বাপু! বড়ো কঠিন পথ!

    সেই রাত্রে আমার খুব জ্বর হল। কতদিন ঠিক জানি না, অজ্ঞান-অচৈতন্য রইলাম। জ্ঞান হলেই দেখতাম সাধু শিয়রে বসে আছেন। বোধ হয় তাঁরই যত্নে এবং দয়ার সেবার ক্রমে সেরে উঠলাম।

    সেরে উঠে একদিন গাছতলায় বসেছি দুপুরের পরে, সাধু বললেন— ছেলে-ছোকরা কি না, কী কাণ্ডটা বাধিয়ে বসেছিলে বাপু? এবার তো বাঁচতে না, অতিকষ্টে বাঁচাতে হয়েছে? আচ্ছা বাপু, পঞ্চমুণ্ডির আসনে কী জন্য গিয়েছিলে সেদিন রাত্রে?

    আমি তো অবাক! কী করে জানলেন ইনি? আমি তো কোনো কথাই বলিনি। হঠাৎ আমার মনে হল, সেই অদ্ভুত মেয়েটির সঙ্গে নিশ্চয়ই সাধুর ফিরে এসে দেখা হয়েছে, সে-ই বলেছে।

    আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে বললেন— ভাবছ আমি কী করে জানলাম, না? আরে বাপু, কত টুকুই-বা তোমরা বোঝো, আর কত টুকুই-বা তোমরা জানো? তোমাদের দেখে দয়া হয়!

    ভয়ে ভয়ে বললাম— আপনি জানলেন কী করে?

    সাধু হেসে বললেন— আরে পাগল, তুমিই তোমার জ্বরের ঘোরে বলছিলে ওই সব কথা; নইলে জানব কী করে? যাক, প্রাণে বেঁচে গিয়েছ এই ঢের। আর কখনো অমন পাগলামি করতে যেও না।

    আমি চুপ করে রইলাম। তাহলে আমিই বিকারের ঘোরে সব ফাঁস করে দিয়েছি? সেইদিন মনে মনে সংকল্প করলাম দু-এক দিনের মধ্যেই এখান থেকে চলে যাব— শরীরটা একটু সুস্থ হয়ে উঠলেই।

    কিন্তু আমার ভাগ্যলিপি অন্যরকম। সাধুবাবাজিকে তার পরদিন পাহাড়ি বিছেতে কামড়াল, তিনি তো যন্ত্রণায় অজ্ঞান হয়ে গেলেন। আমি পাঁচ মাইল দূরবর্তী মিহিজাম থেকে ডাক্তার ডেকে আনি, তাঁর সেবা করি দিন-রাত জেগে, তিন দিন পরে তাঁকে সারিয়ে তুলি।

    দিন দশেক পরে আমি একদিন বললুম— সাধুজি আমি আজ চলে যেতে চাই।

    সাধু বিস্মিত হয়ে বললেন— চলে যাবে? কোথায়?

    —এখানে থেকেই-বা কী হবে? আমার তো কিছু হচ্ছে না, মিছে বসে থাকা আর মন্দিরের প্রসাদে ভাগ বসানো। দু-টি পেটের ভাতের লোভে আমি তো এখানে বসে নেই!

    সাধুজি চুপ করে গেলেন, তখন কোনো কথা বললেন না।

    সন্ধ্যার কিছু আগে আমায় ডেকে তিনি কাছে বসালেন। বললেন— ভেবেছিলাম এ-পথে নামাব না তোমায়। কিন্তু তুমি দুঃখিত হয়ে চলে যাচ্ছ, সেটা বড়ো কষ্টের বিষয় হবে আমার পক্ষে। তুমি আমার যথেষ্ট উপকার করেছ, নিজের ছেলের মতো সেবা করেছ। তোমাকে কিছু দিতে চাই। একটা কথা আগে বলি, তোমার সাহস বেশ আছে তো?

    বললুম— আজ্ঞে হ্যাঁ। এর আগেও আমি বীরভূমের এক শ্মশানে তন্ত্রসাধনা করেছি।

    তারপর আমি সেই শ্মশানের পাগলি ও তার অদ্ভুত ক্রিয়াকলাপের কথা বললাম; এতদিন পরে আজ প্রথম সাধুকে পাগলির কথা বললাম।

    সাধু অবাক হয়ে বললেন— সে পাগলিকে তুমি চেন? আরে, সে যে অতি সাংঘাতিক মেয়েমানুষ! তুমি তার হাত থেকে যে অত সহজে উদ্ধার পেয়ে এসেছ সে কেবল তোমার পূর্বজন্মের পুণ্য! ওর নাম মাতু পাগলি, মাতঙ্গিনী। ও নিম্ন শ্রেণির তন্ত্রে ভয়ানকভাবে সিদ্ধ। ওর সংস্পর্শে গিয়ে পড়েছিলে, কী সর্বনাশ! ওকে আমরা পর্যন্ত ভয় করে চলি— কীরকম জানো? যেমন লোকে খ্যাপা শেয়াল কুকুর কী গোখুরা সাপকে ভয় করে, তেমনি। ও সেই জাতীয়। অসাধারণ ক্ষমতা ওর নিম্ন তন্ত্রের। ওর ইতিহাস বড়ো অদ্ভুত, সে একদিন বলব। কতদিন ওর সঙ্গে ছিলে?

    —প্রায় দু-মাস।

    সাধুজি ভেবে বললেন— যখন ওর সঙ্গে ছিলে, তখন কিছু কিছু অধিকার হয়েছে তোমার। তোমাকে আমি মন্ত্র দেবো। কিন্তু তুমি যুবক, তোমার মনের ভাব আমি জানি। তুমি কী জন্যে রাত্রে পঞ্চমুণ্ডির আসনে গিয়েছিলে বলো তো?

    আমি লজ্জায় মাথা নীচু করে রইলাম। মনের গোপন পাপ নেই, যদি পঞ্চমুণ্ডির আসনে বসে থাকি; তবে সেই অপরিচিতা নিশাবিহারিণী রূপসীর টানে যে— এ কথা গুরুস্থানীয় ব্যক্তির কাছে স্বীকার করব কেমন করে!

    সেইদিন সাধু অতি অদ্ভুত ও গোপনীয় কথা আমায় বললেন।

    বললেন— কিন্তু একটা কথা তুমি জানো না, সেটা আগে বলি। তুমি সেদিন যাঁকে রাত্রে ছাতিমতলায় বসে দেখেছিলে, তিনি তোমার আমার মতো দেহধারী মানুষ নন।

    শুনে তো মশাই আমার গা শিউরে উঠল— দেহধারী জীব নয়, বলে কী রে বাবা! তবে কি ভূত-পেত্নি না কি?

    সাধুজি বললেন— তোমায় একথা বলতাম না, যদি না শুনতাম যে তুমি মাতু পাগলির সঙ্গে ছিলে। আচ্ছা শুনে যাও। আমার গুরুদেব ছিলেন ;কালিকানন্দ ব্রহ্মচারী, হুগলি জেলায় জেজুড় গ্রামে তাঁর মঠ ছিল। মস্ত বড়ো সাধক ছিলেন, কুলার্ণব আর মহাডামর এই দুই শ্রেষ্ঠ তন্ত্রে তাঁর সমান অধিকার ছিল। মহাডামর তন্ত্রে একটি নিম্ন শাখার নাম ভূতডামর। আমি তখন যুবক, তোমারই মতো বয়স; স্বভাবতই আমার ঝোঁক গিয়ে পড়ল ভূতডামরের ওপর। গুরুদেব আমার মনের গতি বুঝতে পেরে ও-পথ থেকে ফেরাবার যথেষ্ট চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাই কী হয়, অদৃষ্টলিপি তবে আর বলেছে কাকে? এই তোমার যেমন—

    আমি বললাম— ও-পথ থেকে আপনাকে ফেরাতে চেষ্টা করেছিলেন কেন?

    ও-পথ প্রলোভনের পথ, বিপদের পথ। ভূতডামর মন্ত্র নানাপ্রকার অশরীরী উপদেবীদের নিয়ে কারবার করে। তন্ত্রের ভাষায় এদের সাধারণ নাম যোগিনী। জপে ও সাধনায় বশীভূত হয়ে এদের মধ্যে যে-কেউ, যার সাধনা তুমি করবে, সে তোমার আপন হয়ে থাকতে পারে। নানাভাবে এদের সাধনা করা যায়; কিঙ্কিনীদেবীকে মাতৃভাবে পেতে হয়, কনকবতীদেবীকে পাওয়া যায় কন্যাভাবে;; কিন্তু বাকি সব যোগিনীদের যেকোনো ভাবে সাধনা করা যায় এবং যেকোনো ভাবে পেতে পারা যায়। এইসব যোগিনীদের কেউ ভালো, কেউ মন্দ। এঁদের জাতি নেই, বিচার নেই, ধর্ম নেই, অধর্ম নেই— কোনো গণ্ডি বা বাধ্যবাধকতার মধ্যে এঁরা আবদ্ধ নন। ভূতডামরে এই সাধনার ব্যাপার বলে দেওয়া আছে। ভূতডামরের প্রথম শ্লোকই হল

    অথাতঃ সংপ্রবক্ষ্যামি যোগিনী সাধনোত্তমম।

    সর্বার্থসাধনং নাম দেহীনাং সর্বসিদ্ধিদম

    অতিগুহ্যা মহাবিদ্যা দেবানামপি দুর্লভা।

    তুমি সেদিন যাঁকে দেখেছিলে, তিনি এইরকম একজন জীব। তোমার সাহস থাকে, সে-মন্ত্র আমি তোমায় দেবো। কিন্তু আমার যদি নিষেধ শোনো তবে এ-পথে নেমো না।

    এতটা বলে সাধুজি ভালো করেননি, আমার কৌতূহল বাড়িয়ে দিয়ে তিনি আমায় আর কী সামলে রাখতে পারেন? আমি নাছোড়বান্দা হয়ে পড়লাম মন্ত্র নেব-ই।

    সাধুজি বললেন— তবে কনকবতীদেবী সাধনার মন্ত্র নাও, কন্যাভাবে পাবে দেবীকে—

    আমি চুপ করে রইলুম।

    তিনি আবার বললেন— তবে কিঙ্কিনী-সাধনার মন্ত্র?

    আঃ, কী বিপদেই পড়েছি বুড়ো-সাধুটাকে নিয়ে! অন্য যোগিনীদের দেখতে দোষ কী?

    সাধু আমায় চুপ করে থাকতে দেখে বললেন— বেশ, আমি তোমাকে মধুসুন্দরীদেবী-সাধনার মন্ত্র দিচ্ছি। এঁকে কন্যাভাবে, ভগ্নীভাবে বা ভার্যাভাবে পেতে পারো। তবে আমার কথা যদি শোনো, কখনো ভার্যাভাবে পেতে চেও না। এর বিপদের দিক বলি। ভার্যাভাবে সাধনা করলে তিনি তোমাকে প্রণয়ীর মতো দেখবেন; কিন্তু এঁরা মহাশক্তিশালিনী যোগিনী, সাধারণ মানবী নয়— এঁদের আয়ত্তের মধ্যে রাখা বড়ো শক্ত। হয় তোমাকে পৃথিবীর মধ্যে সর্বাপেক্ষা সুখী মানুষ করে রাখবেন, নয়তো একেবারে উন্মাদ করে ছেড়ে দেবেন। সামলাতে পারা বড়ো কঠিন।

    সাধুজি আমায় মন্ত্র দিলেন এবং বললেন— বাবা, এ-জায়গা থেকে তোমায় চলে যেতে হবে। তোমায় এখানে আমি আর রাখতে পারি না। এক জায়গায় দু-জন সাধকের সাধনা হয় না।

    বেশ, ভালো। আমি চাইনে। আমার ভয় ছিল, হয়তো সাধুজিও মাতু পাগলির মতো হিপনটিজম জানে এবং খানিকটা অভিভূত করে যা-তা দেখাবে আমায়। তারপর—

    আমি তারানাথের কথায় বাধা দিয়া বলিলাম— কেন, আপনি যে স্বচক্ষে পঞ্চমুণ্ডির আসনে কী মূর্তি দেখেছিলেন; তখন তো সাধু সেখানে ছিলেন না?

    —তারপর আমার টাইফয়েড জ্বর হয়— বলিনি? হয়তো পঞ্চমুণ্ডির আসনে যখন বসি, তখনই জ্বর আসছে, সে-সময় জ্বরের পূর্বাবস্থায় অসুস্থ মস্তিষ্কে কী বিকার দেখে থাকব, হয়তো চোখের ধাঁধা। জ্বর ছেড়ে সেরে উঠে এ-সন্দেহ আমার হয়েছিল, সত্যি বলছি।

    যাক সে কথা। তারপরে ওখান থেকে চলে গেলাম বরাকর নদীর ধারে আর একটা নির্জন জায়গায়। ওখান থেকে পাঁচ-ছয় মাইল দূরে। একটা গ্রাম ছিল কিছু দূরে, থাকতাম গ্রামের বারোয়ারি ঘরে। গ্রামের লোকে যে-যা দিত তাই খেতাম, আর সন্ধের পরে নদীর ধারে নির্জনে বসে মন্ত্রজপ করতাম।

    এইরকমে এক মাস কেটে গেল, দু-মাস গেল, তিন মাস গেল। কিছুই দেখিনি। মন্ত্রের ওপর বিশ্বাস ক্রমেই যেন কমে যাচ্ছে। তবুও মনকে বোঝালাম, ছ-মাস পরে পূর্ণাহুতি ও হোম করার নিয়ম বলে দিয়েছিল সাধুজি। তার আগে কিছু হবে না। ছ-মাসও পূর্ণ হল। সাধুজি যেমন বলে দিয়েছিল, ঠিক সেইসব নিয়ম পালন করলাম।

    পদ্মাসনং সমাস্থায় মৎস্যেন্দ্রনাথসম্মতম।

    আমিষান্নৈঃ পুপসূপৈঃ সংপুজ্য মধুসন্দরীম।

    বরাকর নদীর তীরে বসে ভাত রাঁধলুম, কই মাছ পোড়ালুম, আঙট কলার পাতায় ভাত ও পোড়া মাছের নৈবিদ্যি দিলাম। ডুমুরের সমিধ দিয়ে বালির উপর হোম করে ‘ওঁ টং ঠং ঋং ইঁ ক্ষং মধুসুন্দর্যৈ নমঃ’ এই মন্ত্রে আহুতি দিলাম। জাতি ফুলের মালা নিতান্ত দরকার, কত দূর থেকে খুঁজে জাতি ফুলের মালা এনেছিলাম; তার মালা ও চন্দন আলাদা কলার পাতায় রেখে দেবীর উদ্দেশ্যে নিবেদন করে ধ্যানে বসলাম— সারারাত কেটে গেল।

    বলিলাম— কিছু দেখলেন?

    —কা কস্য পরিবেদনা। ঘি, চন্দন, মিষ্টি কিনতে কেবল কতকগুলো পয়সার শ্রাদ্ধ হয়ে গেল। ধ্যান-জপ-হোমে কিছুই ফল ফলল না। রাগ করে টান মেরে সব নৈবিদ্যি ফেলে দিলাম নদীর জলে। বেটা সাধু বিষম ঠকিয়েছে! কোনো ব্যাটার কোনো ক্ষমতা নেই— যেমন মাতুপাগলি তেমনি এ-সাধু! মন্ত্র-টন্ত্র সব বাজে, খানিকটা হিপনটিজম জানে, তার বলে মূর্খ গ্রাম্য লোক ঠকিয়ে খায়।

    এ-সব ভাবি বটে, জপটা কিন্তু ছাড়তে পারিনি, অভ্যেস মতো করেই যাই, ওটা যেন একটা বদ-অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।

    এভাবে আরও মাস চার-পাঁচ কেটে গেল।

    একদিন সন্ধ্যার পরেই, রাত তখন শুরু হয়েছে সবে, আধ ঘণ্টাও হয়নি। আমি একটা গাছের তলায় বসে জপ করছি, অন্ধকার হলেও খুব ঘন হয়নি তখনও— হঠাৎ তীব্র কস্তুরীর গন্ধ অনুভব করলাম বাতাসে। বেশ মন দিয়ে শুনে যাও। এক বর্ণও মিথ্যে বলিনি। যা-যা হল একটার পর একটা বলছি, মন দিয়ে শোনো। কস্তুরীর গন্ধটা যখন সেকেন্ড চার-পাঁচ পেয়েছি, তখন আমার সেদিকে মন গেল। ভাবলুম এ-দেখছি অবিকল কস্তুরীর গন্ধ! বাঃ, পাহাড়ে-জঙ্গলে কত সুন্দর অজানা বনফুলই আছে!

    তারপরেই আমার মনে হল আমার পেছনে অর্থাৎ যে গাছটার তলায় বসে ছিলাম তার গুঁড়ির আড়ালে কে একজন এসে দাঁড়িয়েছে। আমি পেছন থেকে দেখতে পাচ্ছিনে বটে, কিন্তু অনেক সময় লোকের উপস্থিতি চোখে না-দেখেও এভাবে ধরা যায়। আমার সমস্ত ইন্দ্রিয় তখন যেন অতিমাত্রায় সজাগ ও সতর্ক হয়ে উঠেছে।

    বাতাস যেন বন্ধ হয়ে গেল, সমস্ত শরীর দিয়ে যেন গরম আগুনের হলকা বেরুচ্ছে মনে হল। আবার অজ্ঞান হয়ে যাব না কি? ভয় হল মনে। ঠিক সেইসময় আমার সামনে দেখলাম একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে। আধ সেকেন্ড আগেও তিনি সেখানে ছিলেন না। ঠিক সেই পঞ্চমুণ্ডির আসনে বসার রাত্রের সেই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি। কিন্তু এবার মনে মনে দৃঢ় সংকল্প করলাম, জ্ঞান হারাব না কখনই।

    মেয়েটি দেখি ঈষৎ ভ্রূকুটির সঙ্গে আমার দিকে চেয়ে রয়েছে।

    জিজ্ঞাসা করিলাম— নিজের চোখে এমন এক মূর্তি দেখলেন আপনি?

    আমার কথার মধ্যে হয়তো একটু অবিশ্বাসের গন্ধ পাইয়া তারানাথ উগ্র প্রতিবাদের সুরে বলিল— নিজের চোখে! সুস্থ শরীরে! বিশ্বাস করো না-করো সে আলাদা কথা; কিন্তু যা দেখেছি তাকে মিথ্যে বলতে পারব না।

    —কীরকম দেখলেন? কেমন চেহারা?

    —ভারি রূপসী যদি বলি কিছুই বলা হল না। মধুসুন্দরীদেবীর ধ্যানে আছে—

    উদদ ভানু প্রকাশাতা বিদ্যুৎপুঞ্জনিভা সতী

    নীলাম্বরপরিধানা মদিবিহ্বললোচনা

    নানালঙ্কারশোভাঢ্যা কস্তুরীগন্ধমোদিতা

    কোমলাঙ্গীং স্মেরমুখীং পীনোত্তুঙ্গপয়োধরাম।

    অবিকল সেই মূর্তি। তখন বুঝলাম দেবদেবীর ধ্যান মন-গড়া কথা নয়, সাধকে প্রত্যক্ষ না-করলে এমন বর্ণনা দেওয়া যায় না।

    —আপনি কোনো কথা বললেন?

    —কথা! আমার চেতনা তখন লোপ পাবার মতো হয়েছে— তো কথা বলছি! পাগল তুমি? সে তেজ সহ্য করা আমার কর্ম? সাধারণ মানবীর মতো তার কোনো জায়গাই নয়। ওই যে বলেছে মদবিহ্বললোচনা— ওরে বাবা, সে চোখের কী ভাব! ত্রিভুবন জয় হয় সে-চোখের চাউনিতে।

    আমি অধীর হইয়া বলিলাম— বর্ণনা রাখুন। কী কথা হল বলুন।

    —কথাবার্তা যা হয়েছিল সব বলার দরকার নেই।

    মোটের ওপর সেই থেকে মধুসুন্দরীদেবী প্রতি রাত্রে আমায় দেখা দিতেন। নদীতীরের সেই নির্জন জায়গায় তাঁকে চেয়েছিলাম প্রিয়ারূপে— বলাই বাহুল্য, সাধুর কথা কে শোনে? তখন শীতকাল, বরাকর নদীর জল কম হয়েছে অনেক, জলের ধারে জলজ লিলিগাছ শুকিয়ে হলদে হলদে হয়ে এসেছে, আগে যেখানে বালির ওপর অভ্রকণা জ্যোৎস্নারাত্রে চকচক করে, বরাকর নদীর দু-পাড়ে শালবন পাতা ঝরিয়ে দিচ্ছে। আকাশ রোজ নীল, শুক্লপক্ষের জ্যোৎস্নার বড়ো মনোরম শোভা। সেই সময় থেকে তিনটি মাস দেবী প্রতি রাত্রে দেখা দিতেন। সত্যিকার বাঁচা বেঁচে ছিলুম ওই তিন মাস। এসব কথাও বলা এখন আমার পক্ষে বেদনাদায়ক! কত বেদনাদায়ক তুমি জানো না, আমার জীবনের যা সর্বশ্রেষ্ঠ আনন্দ তা পেয়েছিলুম ওই তিন মাসে। দেবীই বটে, মানুষের সাধ্য নেই অমন ভালোবাসা, অমন নিবিড় বন্ধুত্ব দান করা— সে এক স্বর্গীয় দান। সে তুমি বুঝবে না, তোমায় কী বোঝাব, তুমি আমায় অবিশ্বাস করবে— মিথ্যাবাদী, না-হয় পাগল ভাববে; হয়তো ভাবছো এতক্ষণ। তুমি কেন, আমার স্ত্রী-ই আমার কথা বিশ্বাস করে না, বলে, আমায় তান্ত্রিক সাধু পাগল করে দিয়েছিল গুণজ্ঞান করে।

    কিন্তু সে-সুখের প্রকৃতি ভীষণ তেজস্কর মদিরার মতো। আমাকে তার নেশা দিনে দিনে কেমন যেন অপ্রকৃতিস্থ করে দিতে লাগল। কিছু ভালো লাগে না। কেবল মনে হয় কখন সন্ধ্যা নামবে বরাকর নদীর শালবনে, কখন দেবী মধুসুন্দরী নায়িকার বেশে আসবেন। সারারাত্রি কোথা দিয়ে কেটে যাবে স্বপ্নের মতো, নেশার ঘোরের মতো! আকাশ, নক্ষত্র, দিকবিদিকের জ্ঞান লুপ্ত হয়ে যাবে কয়েক প্রহরের জন্যে— কয়েক প্রহরের জন্যে সময় স্থির হয়ে নিশ্চুপ স্থাণুর মতো অচল হয়ে থেমে থাকবে বরাকর নদীতীরের বনপ্রাঙ্গণে।

    একদিন ঘটল বিপদ।

    একটি সাঁওতালি মেয়ে রোজ নদীর ঘাটে জল নিতে আসে— সুঠাম তার দেহের গঠন, নিকটে বস্তিতে তার বাড়ি। অনেক দিন থেকে তাকে দেখছি, সেও আমায় দেখছে।

    সেদিন সে জল নিয়ে ফিরে যাচ্ছে। আমায় তাদের বাঁকা বাংলায় বললে— ছেলে হয়ে হয়ে মরে মরে যায়, তার মাদুলি আছে তোমার কাছে সাধুবাবা?

    এমনভাবে করুণ সুরে বললে, আমার মনে দয়া হল। মাদুলি দিতে জানি একথা বলিনি, তবে তার সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করেছিলাম। তারপর সে চলে গেল।

    মধুসুন্দরীদেবীকে সেদিন দেখলুম অন্য মূর্তিতে। কী ভ্রূকুটি-কুটিল দৃষ্টি, কী ভীষণ মুখের ভাব! সে-মুখের ভাব তুমি কল্পনা করতে পারবে না। চণ্ডিকাদেবীর রোষকটাক্ষে যেমন লোলজিহ্ব, করালিনী, প্রচণ্ডা-কালভৈরবী মূর্তির সৃষ্টি হয়েছিল— এও যেন ঠিক তাই।

    সেদিন বুঝলুম আমি যার সঙ্গে মেলামেশা করি, সে মানুষ নয়— মানুষের পর্যায়ে সে পড়ে না। মানবী রাগ যতই করুক সে করালিনী হয় না, পিশাচী হয় না— মানবীই থেকে যায়।

    ভীষণ পূতিগন্ধে সেদিন শালবন ভরে গেল। প্রতিদিনের মতো কস্তুরীর সুবাস কোথায় গেল মিলিয়ে। তারপর এলেন মধুসুন্দরী দেবী। দেখেই মনে হল এরা দেবীও বটে, বিদেহী পিশাচীও বটে। এদের ধর্মকর্ম নেই, সব পারে এরা। যে হাতে নায়িকার মতো ফুলের মালা গাঁথে, সেই হাতেই বিনা দ্বিধায়, বিনা অনুশোচনায় নিমেষে ধ্বংস করতে এরা অভ্যস্ত।

    আমার ভীষণ ভয় হল।

    পিশাচী মধুসুন্দরী তা বুঝে বললে— ভয় কীসের?

    বললুম— ভয় কই? তুমি রাগ করেছ কেন?

    খল-খল অট্টহাস্যে নির্জন অন্ধকার ভরে গেল। আমি শিউরে উঠলাম।

    পিশাচী বললে— শব চিনতে পারবে? অন্ধকার রাত্রে সাঁওতালদের কোনো বউয়ের শব তোমার সামনে দিয়ে যদি জলে ভেসে যায়, চিনতে পারবে? তুমি যদি বা চিনতে পারো, দু-টি শবে জড়াজড়ি করে ভেসে থাকলে অন্য লোকে সকালে নিশ্চয়ই চিনবে।

    হাত জোড় করে বললুম— দেবী, তোমায় ভালোবাসি। ও-মূর্তি আমায় দেখিও না। আমায় মারো ক্ষতি নেই, কিন্তু অন্য কোনো নিরপরাধিনী স্ত্রীলোকের প্রাণ কেন নেবে? দয়া করো!

    বহু চেষ্টায় প্রসন্ন করলুম। তখন আবার যে-দেবী, সেই-দেবী।

    বললেন— সেই সাঁওতালের মেয়ের মূর্তিতে আমায় দেখতে চাও? সেই মূর্তিতে এখনি দেখা দেব।

    বলতে বলতে দেখি, সেই সাঁওতালদের মেয়েটি আমার সামনে দাঁড়িয়ে। বরং আরও নিটোল গড়ন শরীরের, মুখের ভাব আরও কমনীয়।

    বললুম— ও চাই না— তোমার মূর্তি দেখাও দেবী!

    সেই রাত্রি থেকে বুঝলুম কালসাপ নিয়ে খেলা করছি আমি। গুরুদেব বারণ করেছিলেন এই জন্যেই। হয়তো একদিন মরব এর হাতেই। সাপুড়ে সাপ খেলায় মন্ত্রে, আবার বেকায়দায় পড়লে সাপের ছোবলেই মরে। এ-ভাব বেশিদিন কিন্তু ছিল না। কিছুদিন পরে পিশাচী মূর্তি ভুলে গেলুম দেবীর অনুপম প্রেমে ও মধুর ব্যবহারে। তাতেও বুঝলুম এ সাধারণ মানবী নয়— অমানুষিক ধরনের এদের মন। মানুষের বিবর্তনের জীব এরা নয়। হয় তার ওপরে, নয় তার নীচে।

    একদিন দেবী আমায় বললেন— আর কিছুদিন যাক, তোমায় বহু দূর নিয়ে যাব—

    —কোথায়?

    —সে বলব না এখন।

    —কত দূরে? কোন দিকে?

    —এত দূরে, এমন দিকে, যা তুমি ধারণা করতে পারবে না। তবে, তোমার ভাগ্যে আছে কি তা?

    সব ভুলে গেলাম আবার। পিশাচিনী মধুসন্দরী তখন কোথায় মিলিয়ে গেছে— আমার সামনে হাস্য-লাস্যময়ী, যৌবন-চঞ্চলা, মুগ্ধস্বভাবা অপরূপ রূপসী এক তরুণী নারী। দেবীই বটে।

    আমি আবার কীসের নেশায় অভিভূত হয়ে পড়লুম, মাথার ঠিক রইল না। একদিন বললেন— বিপদ আসছে তোমার, তৈরি হও।

    —কী বিপদ?

    —তা বলব না।

    —প্রাণ সংশয়ের বিপদ?

    —তাও বলব না।

    —তুমি অভয় দিলে বিপদ কীসের?

    —আমি ঠেকাতে পারব না। কেউ ঠেকাতে পারবে না। যা আসছে, তা আসবেই।

    কথা খেটে গেল শিগগির, খুব বেশি দেরি হয়নি।

    তিন মাস পরে আমার বাড়ি থেকে লোকজন সন্ধানে সন্ধানে সেখানে গিয়ে হাজির। গ্রামের লোক তাদের বলেছে কে একজন পাগল, বোধ হয় বাঙালিই হবে, অল্পবয়েস, বরাকর নদীর ধারে শালবনে সন্ধ্যা বেলা বসে থাকে, আর আপন মনে বিড়বিড় করে বকে। আমার এ-অবস্থায় গাঁয়ের অনেকেই নাকি দেখেছে।

    তাই শুনে বাড়ির লোকে আমায় গিয়ে খুঁজে বার করলে। ছেঁড়া-ময়লা কাপড় পরনে, গায়ে খড়ি উড়ছে— এই অবস্থায় নাকি আমায় ধরে। বাড়ি ধরে আনবার জন্যে টানাটানি, আমি কিছুতেই আসব না ওরাও ছাড়বে না। আমার তখন সত্যিই জ্ঞান নেই, সত্যি আমি ক্ষিপ্ত, উন্মাদ। ওরা হয়তো, আমায় আনতে পারত না; কিন্তু যে-দেবীকে পেয়েছিলাম প্রণয়িনী রূপে, তিনি নিরুৎসাহ করলেন।

    —কী রকম?

    ওরা ধরে নিয়ে গিয়ে নিকটবর্তী গ্রামের একটি গোয়াল ঘরে আমায় বেঁধে রেখেছিল। গভীর রাত্রে বাঁধন ছিঁড়ে ওদের হাত থেকে লুকিয়ে-পালিয়ে মধুসুন্দরীদেবীর সঙ্গে দেখা করেছিলাম। দেবীকে বললাম— আমি এই নদীতীরের তীর্থস্থান ছেড়ে কোথাও যাব না। তিনি নিষ্ঠুর হাসি হেসে বললেন— যেতে হবেই, এই তোমার অদৃষ্টলিপি। অদৃষ্টের বিরুদ্ধে তিনি এতবড়ো শক্তিশালিনী যোগিনী হয়েও যেতে পারেন না। তিনি জানেন, এই রাতের পরে জীবনে তাঁর সঙ্গে আর কখনো দেখা হবে না। আগে থেকে তৈরি করে রাখতে চেয়েছিলেন এইজন্যেই।

    দেবী ত্রিকালজ্ঞা, তাঁকে জিজ্ঞেস করিনি কী করে তিনি এ কথা জানলেন। হলও তাই, বাড়ি আসার পরে সবাই বললে, কে কী খাইয়ে পাগল করে দিয়েছে। দিন কতক উন্মাদের চিকিৎসা চলল। বছর খানেক পরে আমার বিয়ে দেওয়া হল। সেই থেকেই আমি সংসারী।

    আমি জিজ্ঞাসা করিলাম— আর কখনো মন্ত্র জপ করে তাঁকে আহ্বান করেননি কেন?

    —বাপ রে! এ কি ছেলেখেলা? মারা যাব শেষে! অন্য নারী জীবনে এলে তিনি দেখা দেবেন? সে-চেষ্টা কখনো করিনি। সে কতকাল হয়ে গেল, সে কী আজকের কথা?

    —আচ্ছা, এখন আর তাঁকে দেখতে ইচ্ছে হয় না?

    বৃদ্ধ তারানাথ উৎসাহে, উত্তেজনায় বুকে বালিশ দিয়া খাড়া হইয়া উঠিয়া বসিল— ইচ্ছে হয় না কে বলেছে? বললাম তো, ওই তিন মাসই বেঁচে ছিলাম। দেবী এসেছিলেন মানুষ হয়ে। এদিকে ষড়ৈশ্বর্যশালিনী শক্তিরূপিণী যোগিনী, তেজে কাছে ঘেঁষা যায় না; অথচ কী মানব-ই হয়ে যেতেন, যখন ধরা দিতেন আমায়! প্রিয়ার মতো আসতেন কাছে; অমনই মিষ্টি, অমনই ঠোঁট ফুলিয়ে মাঝে মাঝে অভিমান, বরাকর নদীর ধারের শালবন রাত্রির পর রাত্রি তাঁর মধুর হাসিতে জ্যোৎস্নার মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠত— এমনি কত রাত ধরে! এক এক সময় ভ্রম হত তিনি সত্যিই মানুষিই হবেন।

    বিদায় নিয়ে যাবার রাতটিতে বললেন— নদীতীরের এই তিনমাসের জীবন আমিও কী ভুলব ভেবেছ! আমাদের পক্ষেও এ-সুলভ নয়, ভেবো না আমরা খুব সুখী। আমাদের মতো সঙ্গীহারা, বন্ধুহারা জীব কোথায় আছে? প্রেমের কাঙাল আমরাও। কতদিন পরে একজন মানুষ আমাদের সত্যিকার চায়— তার জন্যে আমাদের মন সর্বদা তৃষিত হয়ে থাকে। কিন্তু তাই বলে নিজেকে সহজলভ্যা করতে পারিনে, আগ্রহ করে যে না-চায় তার কাছে যাইনে, সে আমার প্রেমের মূল্য দেবে না, নিজেও আনন্দ পাবে না, যা কি না পাওয়া যায় বহু চাওয়ার পরে। কিন্তু আমাদের অদৃষ্টলিপি, কোথাও চিরদিন থাকতে পারিনে— কী না কী ঘটে যায়, ছেড়ে চলে যেতে হয় অনিচ্ছা সত্ত্বেও। ক-জন আমাদের ডাকে? ক-জন বিশ্বাস করে? সুখী ভেবো না আমাকেও।

    বলিলাম— এত যদি সুখের ব্যাপার, তবে আপনি ভয়ংকর বলছিলেন কেন আগে?

    —ব্যাপার ভয়ংকর এইজন্য যে আমার সারাজীবনটা মাটি হয়ে গেল ওই দিন মাসের সুখভোগে। কোনো দিকে মন দিতে পারিনে; মধ্যে তো দিন কতক উন্মাদ হয়েই গিয়েছিলাম বিয়ের পরেও। তার পর সেরে-সামলে উঠে এই জ্যোতিষের ব্যাবসা আরম্ভ করি যা হয় একরকম— সেও দেবীরই দয়া। তিনি বলেছিলেন, জীবনে কখনো অন্নকষ্টে পড়তে হবে না। পড়তে কখনও হয়নি; কিন্তু ওতেই কি আর আনন্দ দেয় জীবনে?

    .

    তারানাথ গল্প শেষ করিয়া বাড়ির ভিতরে যাইবার জন্য উঠিল। আমিও বাহির হইয়া ধর্মতলার মোড়ে আসিলাম। এই অদ্ভুত অবাস্তব জগৎ হইতে বিংশ শতাব্দীর বাস্তব সভ্যতার জগতে আসিয়া যেন হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচিলাম। যতক্ষণ তারানাথ গল্প বলিয়াছিল, ততক্ষণ ওর চোখমুখের ভাবে ও গলার স্বরে সত্যতা সম্বন্ধে অবিশ্বাস জাগে নাই; কিন্তু ট্রামে উঠিয়াই মনে হইল—

    কী মনে হইল তাহা আর নাই বলিলাম।

    আশ্বিন ১৩৪৫, প্রবাসী

    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleতারানাথ তান্ত্রিকের গল্প
    Next Article তিরোলের বালা

    Related Articles

    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    বিপিনের সংসার – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    January 8, 2026
    ছোটগল্প বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    কাদা kada

    August 11, 2025
    ছোটগল্প বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    অসাধারণ | Ashadharon

    April 3, 2025
    ধীরেন্দ্রলাল ধর ভৌতিক গল্প

    তান্ত্রিক

    March 13, 2025
    উপন্যাস বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    আরণ্যক – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    February 27, 2025
    উপন্যাস বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    চাঁদের পাহাড় – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    February 27, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    কপিলাবস্তুর কলস – প্রীতম বসু

    March 23, 2026

    দোকানির বউ

    January 5, 2025
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    কপিলাবস্তুর কলস – প্রীতম বসু

    March 23, 2026

    দোকানির বউ

    January 5, 2025
    Our Picks

    কপিলাবস্তুর কলস – প্রীতম বসু

    March 23, 2026

    তালদিঘিতে ভাসিয়ে দেব – সায়ক আমান

    March 23, 2026

    কালীগুণীন ও বজ্র-সিন্দুক রহস্য – সৌমিক দে

    March 23, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }