Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    রঙ্কিণীর রাজ্যপাট এবং অন্যান্য – নবনীতা দেবসেন

    August 30, 2025

    আনা ফ্রাঙ্ক-এর ডায়েরি

    August 30, 2025

    আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ১ (অনুবাদ : নচিকেতা ঘোষ)

    August 30, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • 🔖
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    Subscribe
    সাইন ইন
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    তারানাথ তান্ত্রিক – তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়

    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এক পাতা গল্প232 Mins Read0

    ০৬. আকাশে মেঘ করে এলে

    কবি কালিদাস বলে গিয়েছেন আকাশে মেঘ করে এলে মানুষের চিত্ত আকুল হয়ে ওঠে। আমি কবি নই, তবে আকাশে মেঘ ঘনিয়ে এলে আমার তারানাথের কাছে যেতে ইচ্ছে করে বটে। বর্ষার দিনে মুড়ি আর গরম গরম তেলেভাজার মত তারানাথের গল্পও একটা আবশ্যিক ব্যাপার।

    আজ ছুটির দিনটা সকাল থেকেই মনে হচ্ছিল হয়তো বা বৃষ্টি হবে। আকাশ ঘোলা, রোদুরের তেমন তেজ নেই। দুপুরের পরেই কালো মেঘে চারদিক অন্ধকার হয়ে এল। এমন সময়ে বাড়িতে বসে থাকার কোন মানে হয় না। বিশেষ করে কোলকাতায় বৃষ্টি মোটেই একটা উপভোগ্য জিনিস নয়। আলনা থেকে একটা শার্ট টেনে নিয়ে গায়ে চাপিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ভেবেছিলাম বৃষ্টি এসে পড়ার আগে হয়তো তারানাথের বাড়িতে পৌঁছতে পারবো না। কিন্তু মট লেনের মুখে পৌঁছে দেখলাম তখনো মেঘ আকাশে থমকে আছে। গলির মোড়ের সিগারেটের দোকান থেকে তারানাথের জন্য এক প্যাকেট পাসিং শো নিচ্ছি, পেছন থেকে কে বলে উঠল—এই যে, তুমিও এসে পড়েছ দেখছি!

    তাকিয়ে দেখি কিশোরী। সে একগাল হেসে বলল—যাই বলো ভাই, লোকটার গল্প বলার একটা দারুণ কায়দা আছে। একেবারে নেশা ধরিয়ে দিয়েছে, কি বলো?

    বললাম—তুমি তো তারানাথের গল্প বিশ্বাস করো না, তাহলে আসো কেন?

    —কে বলল বিশ্বাস করি না?

    –গল্পের মধ্যে কেবল বাগড়া দাও, আজেবাজে প্রশ্ন করো—

    -আরে, ওসব তো তারানাথকে উসকে দেবার জন্য। চটে গেলে ওর ভালো ভালো গল্পগুলো বেরিয়ে আসে। চল, চল—আর দেরি নয়। ওই দেখ, জল এসে পড়ল বলে—

    প্রায় দৌড়ে তারানাথের বাড়িতে ঢোকবার সঙ্গে সঙ্গেই বড় বড় ফোটায় বৃষ্টি পড়তে শুরু করল। সারাদিনের গুমোট ভাবটা কাটিয়ে এলোমেলো ঠাণ্ডা বাতাস বইতে আরম্ভ করল। বসবার ঘরে ঢুকে দেখি তারানাথ আমাদের দিকে পেছন ফিরে জানালার সামনে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছে। কলকাতার গলি, সেদিকে অবশ্য দেখবার কিছুই নেই, হাততিনেক তফাতেই ঠেলে উঠেছে পাশের বাড়ির দেয়াল। তবু তারানাথ দেখলাম বিভোর হয়ে বাইরে তাকিয়ে রয়েছে।

    আমাদের পায়ের শব্দে সে পিছন ফিরে বলল—এই যে তোমরা এস এস, বোসো। ভাবছিলাম তোমরা হয়তো এসে পড়বে। এমন দিনটা–

    সবাই মিলে সেই নড়বড়ে তক্তাপপাশে বসলাম। কিশোরী আমার হাত থেকে নিয়ে সিগারেটের প্যাকেট তারানাথের সামনে রাখল। অন্যমনস্কভাবে একটা সিগারেট ধরিয়ে তারানাথ বলল—খুব ছোটবেলার কথা মনে পড়ছিল, জানো? এইরকম মেঘ করে এলে গ্রামের সব ছেলেমেয়ে মিলে দৌড়াতাম আমবাগানে। ঝড়ের প্রথম ঝাপটা আসার সঙ্গে সঙ্গেই ঢ়িবঢ়াব আম পড়তে শুরু করত। আম কুড়তে কুড়োতে আসত বৃষ্টি। এক কোচড় আম নিয়ে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখতাম। এই আজকের মত বড় বড় ফোটায় বৃষ্টি পড়ত, সোদা মাটির গন্ধ উঠত চারদিক থেকে। বৃষ্টি থামলে বাড়ি গিয়ে তেল নুন দিয়ে কাচা আম জরিয়ে খাওয়া। আর কিছু না, শুধু কাচা আম তাই যেন কি মধুর মত লাগত। নাঃ, সে-সব দিন আর ফিরবে না।

    কিশোর দেখল তারানাথের কবিত্বের চোটে যে গল্পের জন্য আসা সেটাই বুঝি মারা যায়! সে বলল—আপনার পুরনো অভিজ্ঞতা থেকেই আজ একটা গল্প বলুন না—

    -বলবো, বলবো। আগে একটু চা হোক—

    তারানাথ উঠে ভেতরে গিয়ে চায়ের কথা বলে এল। তারপর তক্তাগপাশে জমিয়ে বসে বলল—কলকাতায় বর্ষার রূপ তোমরা দেখতে পাও না। আমরা গ্রামের ছেলে, বুঝলে? খালবিল ভাসিয়ে একনাগাড়ে তিন-চারদিন বাদলা হওয়ার পর কখনো গামছা দিয়ে কই মাছ ধরতে বেরিয়েছ? আমরা যেতাম। তারপর বাড়ি ফিরে একবাটি নুন নিয়ে বসে সারা গা থেকে জোঁক ছাড়াতাম। মা এসে বকুনি দিতেন বৃষ্টি মাথায় করে বাইরে বেরুনোর জন্য। আঃ, আবার শিশু হয়ে মায়ের সেই বকুনি খেতে ইচ্ছে করছে। জীবনে অনেক দুঃখকষ্ট আছে, বুঝলে হে? তবু মোটের ওপর জীবনটা বেশ ভালই কেটেছে। যদি সুযোগ পাই তাহলে আবার ফিরে আসব পৃথিবীতে। আবার আম কুড়োতে যাব ঝড়ের দিনে, খেলা করব মায়ের কোলে—সুখ-দুঃখ সহ্য করতে করতে বড়ো হয়ে উঠব—

    কিশোরী স্পষ্টত উসখুস করতে লাগল। বাইরে ঝঙ্কম বৃষ্টি নেমেছে, ঘরের ভেতরে ঘন হয়ে উঠেছে ছায়া। মনে হচ্ছে যেন আমরা তিনটে প্রাণী ছাড়া জগতে আর কেউ কোথাও নেই। এখন কি আর দার্শনিক তত্ত্বের আলোচনা ভালো লাগে?

    এই সময়েই ভেতরবাড়ি থেকে চা নিয়ে এল তারানাথের মেয়ে চারি। চায়ে চুমুক দিয়ে তারানাথ বলল—তোমাদের গল্প চাই, না? আচ্ছা, আজ একটা অদ্ভুত ঘটনা তোমাদের শোনাচ্ছি। আমারই পরিবারের একটি মেয়ের জীবনে ঘটেছিল। একদিনের ব্যাপার নয়, অনেকদিন ধরে একটু একটু করে ঘটেছে। পান খাবে? না? যাক, গল্পটা শোন তবে।

    পাসিং শো ধরিয়ে তারানাথ গল্প শুরু করল।

    তোমরা তো জানো আমি একান্নবর্তী পরিবারে মানুষ হয়েছি। দুবেলা আমাদের বাড়িতে প্রায় পঞ্চাশখানা পাত পড়ত। আপন কাক-জ্যাঠারা তো ছিলেনই, বাবার এক দূর সম্পর্কের ভাইও আমাদের সংসারে থাকতেন। আমরা ভাইবোনেরা তাকে রাঙাকাকা বলে ডাকতাম। রাঙাকাকা লেখাপড়া বিশেষ জানতেন না, বোধ হয় ক্লাস থ্রি কি ফোর অবধি পড়েছিলেন। কিন্তু খুব পরিশ্রম করতে পারতেন। সকাল থেকে দেখতাম তিনি কোদাল হাতে বাড়ির পেছনের জমি কুপিয়ে লাউ-কুমড়োর চারা বসাচ্ছেন, নয়তো কুড়ল নিয়ে সংসারের জ্বালানী কাঠ চিরে দিচ্ছেন। তীর অবসর সময় বলে কিছু ছিল না, সব সময়েই কিছু না কিছু করছেন। সবাই রাঙাকাকাকে ভালবাসত তার মধুর ব্যবহারের জন্য।

    আমার ছোটবেলাতেই রাঙাকাকার বিয়ে হয়। তখনকার দিনে পাত্রের বড় চাকুরে বা ব্যবসায়ী হবার দরকার হত না, যাহোক খাবার সংস্থান থাকলেই চলত। তাছাড়া বাবা-কাকারা বোধ হয় কয়েক বিঘে জমি রাঙাকাকার নামে লিখে দিয়েছিলেন। তার ফসলে দুটি প্রাণীর না চলার কথা নয়।

    রাঙাকাকীমা বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই বাড়ির সকলের মন জয় করে নিলেন। কোন অহঙ্কার ছিল না চরিত্রে, সবার কাজ আগবাড়িয়ে করে দিচ্ছেন, সর্বদা হাসিমুখ। উঁচু গলায় কথা বলতে জানেন না। এমন মানুষকে কে না ভাল বাসবে? বাংলাবিহারের একেবারে প্রান্তে একটি ছোট্ট শহরে তার বাপের বাড়ি। বোধ হয় দূরে ভিন্ন পরিবেশে মানুষ হয়েছিলেন বলেই পাড়াগার সংকীর্ণতা রাঙাকাকীমার মধ্যে ছিল না। সবচাইতে তিনি ভালবাসতেন আমার ছোট ভাইঝি বিরাজবালাকে। বিরাজ তখন খুবই ছোট, বছর পাঁচ-ছয় বয়েস হবে। সেও কাকীমার বিষম ভক্ত হয়ে পড়ল। কাকীমার কাছে খায়, তার সঙ্গেই দুপুরবেলা শুয়ে গল্প শোনে। সারাদিন কাকীমার আঁচল ধরে পেছন পেছন ঘোরে। কাকীমা বলতেন—বিরাজ আরজন্মে আমার মেয়ে ছিল—

    এর বছর দুই তিন পর থেকে বিরাজকে কেন্দ্র করে আমাদের পরিবারে কতগুলো অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে থাকে। বিরাজের মধ্যে যে কোনো বিশেষ অলৌকিক ক্ষমতা আছে এমন ধারণা কারো মনে আসেনি কোনো দিন–আসবার কথাও নয়। পাড়াগায়ের নিতান্ত স্বাভাবিক আরপাঁচটা মেয়ের মতই তার চালচলন। কিন্তু বিরাজের আট-ন বছর বয়েসের একটা ঘটনায় আমাদের হঠাৎ খটকা লাগে। প্রথমটা অবশ্য ঠিক বোঝা যায়নি, কারণ সব অলৌকিক ব্যাপারেরই নানারকম ব্যাখ্যা হতে পারে। কিন্তু পর পর তেমন ঘটতে থাকলে তাকে আর যুক্তি দিয়ে বা কাকতালীয় ব্যাপার

    বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

    বিরাজ আমার ছোটকাকার মেয়ে। একদিন ছোটকাকীমা ঠাকুরের আসনের সামনে বসে পুজো করছেন, বিরাজ বসে রয়েছে পাশে। কাকীমা পুজো আরম্ভ করবার আগে বিরাজ একবার বলল—মা, আমার না খুব তালের বড়া খেতে ইচ্ছে করছে, বিকেলে করে দেবে মা?

    কাকীমা রাগ করে বললেন—বকিস নে তো! যা ওঠ এখান থেকে—বসে পুজো করছি, আর মেয়ের এটা খাবো সেটা খাব—পুজোর সময় বুঝি অমন বলে?

    ধমক খেয়ে বিরাজ চুপ করে মায়ের পাশে বসে রইল। পুজো হয়ে যাবার পর ছোটকাকীমা যখন গলায় আঁচল দিয়ে প্রণাম করে উঠেছেন, তখন বিরাজ আবার বলল—হাঁ মা, দেবে তো বিকেলে তালের বড়া করে?

    —সে দেখা যাবে, এখন যা–মেয়েদের খাইখাই করতে নেই।

    ঠাকুরঘর ছেড়ে আসবার সময় হঠাৎ কাকীমার খেয়াল হল গৃহদেবতা শ্যামসুন্দরের মূর্তির সামনে শ্বেতপাথরের বড় গেলাসের জল আজ বদলে দিতে ভুলে গিয়েছেন। মনে মনে জিভ কেটে কাকীমা জল বদলাবার জন্য গেলাসটা নামিয়ে পাথরের ঢাকনাটা খুললেন।

    এ কি! জল কই? গেলাসটা ভর্তি তালের বড়া! সদ্য ভাজা, তখনো গরম রয়েছে।

    এ নিয়ে সেদিন খুব হৈ-হৈ হয়েছিল। হবারই কথা। বন্ধ ঠাকুরঘর, কাকীমাই সকালে প্রথম খুলে পুজো করতে ঢুকেছেন, সেই বন্ধঘরে গেলাসের মধ্যে তালের বড়া আসবে কোথা থেকে? কেউ কেউ বলল—বিরাজই হয়তো আগে থেকে গেলাসে বড়া লুকিয়ে রেখেছিল মজা করবে বলে। সে যুক্তিও পুরোপুরি খাটে না। প্রথমত অত সকালে তাকে তালের বড়া ভেজে দেবে কে? দ্বিতীয়ত ঠাকুরের আসনে হাত দেবার সাহস তার হবে না। সেযুগে এসব মানামানি খুব ছিল, জানো তো? সবারই মনে কেমন একটা খটকা লেগে রইল।

    এর মাসখানেক বাদে হল আর এক কাণ্ড।

    সেদিন সকালে বিরাজ হঠাৎ বায়না ধরল—ও মা, আজ দুপুরে আমি আলু ভাতে দিয়ে ভাত খাব।

    আজকাল শুনতে হয়তো একটু অদ্ভুত ঠেকবে, আলুভাতে এমন কি একটা জিনিস, যার জন্য বায়না করতে হবে? কিন্তু তখনকার দিনে পাড়াগায়ে আলু রীতিমত দুপ্তপ্রাপ্য তরকারী হিসেবে গণ্য ছিল। লোকের বাড়িতে সব সময় মজুত থাকত না, অনেকে খেতও না। হাটের দিনে কেউ কেউ শখ করে কিনে আনত।

    কাকীমা বললেন—এখন তো ঘরে আলু নেই মা, ভাতও চড়ে গিয়েছে। ও-বেলা হাট থেকে রামু এনে দেবে এখন, রাত্তিরে খেয়ো—

    মায়ের বকুনির ভয়ে বিরাজ চুপ করে গেল। কিন্তু একটু পরেই রান্নাঘর থেকে রাঙাকাকীমা এসে আঁচলে হাত মুছতে মুছতে ছোটকাকীমাকে বললেন—বাবাং, এতক্ষণে একটু সময় পাওয়া গেল। ভাত নামিয়ে ফেন গালতে দিয়ে এলাম। আচ্ছা ছোড়দি, ভাতে আজ অত আলুসেদ্ধ কে দিয়েছে বলতে পারো? কে খাবে?

    ছোটকাকীমা অবাক হয়ে বললেন—আলুসেদ্ধ? ভাতে? আমি তো দিইনি!

    —সে কি! তাহলে কে দিল? হাতা দিয়ে ভাত নাড়ছি, দেখি ভাতের মধ্যে গিজগিজ করছে আলু। তা, দশ-বারোটা তো হবেই।

    আবার হৈ-চৈ হল। এবারেও কর্তারা অনেক যুক্তিসহ ব্যাখ্যা দিলেন। কিন্তু মনের ধাঁধা কারোরই ঘুচল না। বাড়িতে আলু ছিল না, হাট অন্তত দুমাইল দূরে। মেয়েটা আলু পাবে কোথায় যে ভাতের হাড়িতে ফেলবে?

    এর পরের ঘটনার কিন্তু আর কোন ব্যাখ্যা দেওয়া চললো না। সবারই মনে হল। বিরাজের একটা কিছু অপ্রাকৃত ক্ষমতা আছে বটে।

    ছোটকাকা বৈষয়িক কি কাজে সদরে গিয়েছিলেন। দুতিনদিন উকিলের বাড়ি থেকে কাজ সেরে ফিরবেন। কাক সদরে যাবার দুদিন বাদে এক বিকেলে খুব ঝড়বৃষ্টি হল। ঝড় থেমে গিয়েও বৃষ্টি চলল রাত প্রায় নটা পর্যন্ত। বেশ ঠাণ্ডা বাতাস দিতে লাগল, বাড়ির সবাই তাড়াতাড়ি খাওয়াদাওয়া সেরে শুয়ে পড়লেন। বিরাজ সে রাত্তিরে শুয়েছিল রাঙাকাকীমার কাছে। অনেক রাত্তিরে, তখন বোধ হয় একটা কি দেড়টা হবে, রাঙাকাকীমা হঠাৎ জেগে গিয়ে দেখলেন, বিরাজ বিছানা থেকে নেমে যাচ্ছে। কাকীমা অবাক হয়ে বললেন—এই বিরাজ, যাচ্ছিস কোথায়?

    বিরাজ প্রথমটা উত্তর দিল না, মশার তুলে বিছানা থেকে নেমে গিয়ে দরজার কাছে চলে গেল। রাঙাকাকীমা দৌড়ে গিয়ে পেছন থেকে ধরলেন।

    -এই কি হয়েছে তোর? কথা বলছিস না কেন?

    বিরাজের চোখ ঈষৎ বিস্ফারিত, যেন কিছু দেখতে বা শুনতে পাচ্ছে না। কাকীমা জোরে বাকুনি দিয়ে বললেন—কি হয়েছে বল?

    সেইভাবেই শক্ত হয়ে তাকিয়ে থেকে বিরাজ বলল—দরজা খুলে দাও, বাবা এসেছে–

    বিরাজের রকম-সকম দেখে ভয় পেয়ে রাঙাকাকীমা চিৎকার করে ছোটকাকীমাকে ডাকলেন। সেই ডাকে বাড়ির প্রায় সবাই উঠে এল। সবাইয়ের একই প্রশ্ন—কি হয়েছে? আমন করছিস কেন?

    বিরাজ কেবল বলে—দরজা খুলে দাও, বাবা দাঁড়িয়ে থাকবে নাকি?

    শেষে বাবা বিরক্ত হয়ে বললেন—চল দেখি কেমন তোর বাবা এসেছে—বাবা এলে ডাকত না?

    বাইরের দরজা খুলে দেখা গেল কেউ কোথাও নেই। রাত্তির ঝিমঝিম করছে। ততক্ষণে বিরাজেরও সেই ভাবলেশহীন শূন্যদৃষ্টি কেটে গিয়ে সে একটু স্বাভাবিক হয়েছে। সবাই মিলে তাকে বকবকি করে দরজা বন্ধ করতে যাবে, হঠাৎ দেখা গেল বাড়ি থেকে কিছু দূরে আমবাগানের মধ্যে কিসের আলো। কাদের যেন গলার আওয়াজও শোনা যাচ্ছে। বাবা হেঁকে বললেন—কে? কে আসে রে?

    ছোটাকাকার গলায় উত্তর এল—দাদা, আমি–

    ছোটকাকাই বটে। সদর থেকে রওনা দিয়ে মাঝপথে ঝড়বৃষ্টিতে পলাশপুরের মোড়লের বাড়ি আশ্রয় নিয়েছিলেন। তারা না খাইয়ে ছাড়েনি। সঙ্গে লোকও দিয়েছে।

    বাড়ির সবাই জড়ো হয়েছে দরজার কাছে, তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে ছোটকাকা বিস্মিত কণ্ঠে বললেন—কি হয়েছে দাদা? এত রাত্তিরে সবাই জেগে যে?

    বাবা বললেন-কিছু না, তুই ভেতরে আয়—

    এবারে কিন্তু বেশি আলোচনা হল না। বিরাজের ক্ষমতার ব্যাপারটা বাড়ির লোকেরা একরকম মেনেই নিল। হয়ত পর পর কয়েক মাস কিছুই না, হঠাৎ একদিন বাবা বাড়ি থেকে বেরুচ্ছেন—যাবেন আমার জ্যাঠতুতো বোনের বিয়ের বাজার করতে, তাকে বিরাজ বলল— জেঠু, আজ তুমি কোথাও যাবে না

    -কেন রে, কেন যাব না?

    –না, তুমি যাবে না!

    বাবা অবশ্য তা সত্ত্বেও বেরুচ্ছিলেন, মা আটকে দিয়ে বললেন–থাক, আজকের দিনটা থেকেই যাও। বিরাজের ব্যাপারটা তো জানোই।

    অগত্যা বাবা থেকে গেলেন। দুদিন পর খবর পাওয়া গেল যে ট্রেনে বাবার যাওয়ার কথা ছিল সে ট্রেন বর্ধমান ছাড়িয়ে কি একটা ছোট স্টেশনে ঢোকার মুখে উলটে গিয়েছে। বহু লোক হতাহত হয়েছে।

    বাবা একবার বিরাজকে আলাদা ডেকে জিজ্ঞেস করেছিলেন—হ্যাঁরে, এই যে তুই। অনেক কথা আগে থেকে বলে দিতে পারিস, কি করে জানতে পাস বল তো?

    বিরাজ চুপ করে ছিল। শেষে বাবা এক ধমক লাগাতে সে কেঁদে ফেলে বললআমি সত্যি কিছু জানি না জেঠু। আমি কিছু বলি না, আমার মুখ দিয়ে কে যেন অমনি বলে—

    বিরাজ কেঁদে ফেলায় বাবা একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললেন-আচ্ছা আচ্ছা, যা এখন কাঁদছিস কেন? কাঁদার মত কি বলেছি?

    এর কিছুদিন পরে খবর এল রাঙাকাকীমার বাবা মারা গিয়েছেন। কাকীমার মা ছিলেন না, ছোটবেলা থেকে বাবার কাছেই মানুষ। যে ভদ্রলোক খবর দিতে এসেছিলেন তিনি বললেন মারা যাবার আগে উইল করে কাকীমার বাবা তার সম্পত্তি ছেলেমেয়েদের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছেন। কাকীমার ভাগে পড়েছে বসতবাড়িটি। ছেলেরা দূরে দূরে নানা জায়গায় কাজকর্ম করে। তারা কোন দিনই আর দেশে ফিরবে বলে মনে হয় না। এ অবস্থায় মেয়ে-জামাইয়ের এখুনি গিয়ে বাড়ির দখল দেওয়া উচিত, নইলে বেদখল হয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে।

    রাঙাকাকা সবার সঙ্গে পরামর্শ করলেন। ঠিক হল ওই বাড়ি বিক্রি করে দিয়ে সেই টাকায় রাঙাকাকা এখানে কিছু জমিজমা কাকীমার নামে কিনবেন। তবে উইলের প্রােবেট নেওয়া, খদের যোগাড় করা এবং বাড়ি বিক্রির ব্যবস্থা করা ইত্যাদির জন্য কাকা-কাকীমাকে হয়ত দুতিন মাস সেখানে গিয়ে থাকতে হবে।

    আমাদের বাড়িতেই কাকীমা চতুর্থীর শ্রাদ্ধ করলেন। তারপর রাঙাকাকা তাকে নিয়ে চলে গেলেন শ্বশুরবাড়ি। যাবার আগে রাঙাকাকীমা বিরাজকে কোলে নিয়ে আদর করে গেলেন, বললেন—লক্ষ্মী হয়ে থাকবি, কেমন? আমি ক’দিন বাদেই চলে আসব, তোকে কত গল্প বলব—

    রাঙাকাকা আর কাকীমাকে বাড়ির সবাই খুব ভালবাসতো, সেকথা তো আগেই বলেছি। তাদের এই সম্পত্তিপ্রাপ্তির ঘটনায় সবাই খুশি হল।

    মাসদেড়েক পর একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আমরা ভাইবোনেরা দুধ-মুড়িগুড় দিয়ে জলখাবার খাচ্ছি রোয়াকে বসে, এমন সময় বিরাজ আমার মাকে বলল— জেঠিমা, কাল রাত্তিরে রাঙাকাকীমা কখন এসেছে? দেখছি না তো?

    মা অবাক হয়ে বললেন—কই, সে তো আসেনি। কে বলল তোকে?

    —কেউ বলেনি, আমি দেখেছি।

    মায়ের মুখ শুকিয়ে গেল। বিরাজকে আর কোনো কথা না বলে সোজা বাবাকে গিয়ে জানালেন। বাবা ভেতরবাড়িতে এসে বিরাজের গায়ে হাত বুলিয়ে আদরের স্বরে বললেন-কি হয়েছে মা? রাঙাকাকীমার ব্যাপারে কি বলছিলি?

    কাল রাত্তিরে রাঙাকাকীমা এসেছিল তো! আমার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল, দেখলাম কাকীমা ঘরে ঢুকে আমার দিকে তাকিয়ে হাসল, তারপর আবার বেরিয়ে গেল। আমার সঙ্গে কথা বলল না কেন জেঠু?

    -তুই স্বপ্ন দেখেছিস, বৌমা তো আসেনি

    বিরাজ আপত্তি করে বলল—না জেঠু, স্বপ্ন না! আমি যে পরিষ্কার দেখলাম। কেমন সুন্দর লালপাড় নতুন শাড়ি পরেছিল, আর কি সিঁদুর দিয়েছে মাথায়, বাব্বাঃ! চুল সব সিঁদুরে মাখামাখি!

    বাবা হঠাৎ কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গিয়ে বললেন—এই চুপ চুপ–কি দেখতে কি দেখেছিস ঘুমের ঘোরে—বাজে বকিস না।

    বিরাজের কথাটা কিছুক্ষণের মধ্যে বাড়ির মধ্যে রাষ্ট্র হয়ে গেল। মা-কাকীমারা উদ্বিগ্নমুখে পরামর্শ করতে বসলেন। একজন পুরুষমানুষ কেউ গিয়ে খোজ করে এলে। ভাল হয়। সবাই ভাল আছে নিশ্চয় ঠাকুরের কৃপায়, তবু দেখে এলে ক্ষতি কি?

    পরদিন বিকেলে মেজকাকা যাবেন বলে প্রস্তুতি নিতে লাগলেন। কিন্তু তাকে আর রওনা দিতে হল না, পরের দিন সকালবেলা রাঙাকাকা স্বয়ং এসে উপস্থিত হলেন। শেষরাত্তিরের ট্রেনে নেমে হেঁটে এসেছেন। চুল উসকোখুসকো, পা খালি, গালে খোচা খোচা দাড়ি—চোখ বসে গিয়েছে গর্তে। বাড়ির দাওয়ায় বসে দু’একবার ফ্যালফ্যাল করে এদিক-ওদিক তাকিয়ে হঠাৎ তিনি চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন—দাদা, আপনার বৌমাকে রেখে এলাম।

    মাত্র তিনদিনের জ্বরে মারা গিয়েছেন রাঙাকাকীমা—আজ থেকে এক সপ্তাহ আগে। কয়েকদিন আচ্ছন্নের মত ছিলেন রাঙাকাকা, একটু ধাতস্থ হয়ে গতকাল রওনা দিয়েছেন।

    আরও শোনা গেল। পুজোয় পরবেন বলে কাকীমাকে একখানা ভাল লালপাড় শাড়ি কিনে দিয়েছিলেন রাঙাকাকা। শেষযাত্রার সময় সেইটে পরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পাড়ার মেয়েরা এসে সিঁদুরের কৌটো উপুড় করে দিয়েছিল মাথায়। বাংলার সীমান্তে একটি অখ্যাত শহরের ক্ষুদ্র নদীর তীরে রাঙাকাকীমার নশ্বর দেহ ছাই হয়ে গিয়েছে।

    কাকীমার মৃত্যুতে আমাদের বাড়ির সকলে প্রকৃতই শোক পেলেন। কিছুদিন সবারই মুখ বিষণ্ণ, বাড়িতে কেউ উঁচু গলায় কথা বলে না, হাসে না। কিন্তু সব শোকের তীব্রতাই সময় চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে কমে আসে। পৃথিবীর নিয়মই এই যাকে না হলে জীবন কাটানো অসম্ভব বলে মনে হয়, সে সরে গেলে হঠাৎ আবিষ্কার করা যায় তাকে বাদ দিয়েও দিব্যি চলে যাচ্ছে! একদিন আবার সংসারের চাকা ঠিকঠাক চলতে শুরু করল, মাঝে মাঝে হাসির শব্দও শোনা যেতে লাগল।

    একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেলেন কেবল রাঙাকাকা। যে মানুষ হাতে কাজ না থাকলে ছটফট করত, সে সারাদিন বসে আছে ঘরের রোয়াকে। চোখ দুটো উদাস, দীপ্তিহীন। মুখে একটাও কথা নেই। খাওয়ার সময় জোর করে ডেকে নিয়ে যেতে হয়। সংসারের কোনো ব্যাপারে কোনো উৎসাহ নেই। বাবাই তোড়জোড় করে রাঙাকাকীমার বাপের বাড়িটা বিক্রি করে টাকা নিয়ে এসে কাকাকে জিজ্ঞাসা করলেন—এ টাকা দিয়ে কি করতে চাও?

    রাঙাকাকা চুপ করে রইলেন।

    –চুপ করে থাকলে তো চলে না বিশু। কপালে যা ছিল তো হয়েছে। এ ন্যায্যত তোমার টাকা, তোমাকেই ব্যবস্থা করতে হবে।

    রাঙাকাকা মাথা নিচু করে আস্তে আস্তে বললেন—টাকা দিয়ে আমি আর কি করব? আপনি যা ভালো বোঝেন করুন। আপনি যা করবেন তাতে আমার কোনো অমত থাকবে না—

    -তাহলে আমি বলি কি, এ টাকা তুমি বৌমার নামে কোনো হাসপাতালে বা আশ্রমে দান করো—বৌমার আত্মা তৃপ্তি পাবে।

    শাস্তভাবে রাঙাকাকা বললেন–বেশ তো, তাই করুন।

    সব বিলিব্যবস্থা হয়ে যাবার পর একদিন সকালে উঠে দেখা গেল রাঙাকাকার ঘরের দরজা খোলা, তিনি নেই!

    এমন একটা কিছু ঘটবে সবাই আন্দাজ করতে পেরেছিল। কিছুদিন ধরে। খোঁজাখুঁজি চলল, বাবা বোধ হয় কাগজে বিজ্ঞাপনও দিয়ে থাকবেন, কিন্তু রাঙাকাকা আর কোনোদিন ফিরে এলেন না।

    বছর ঘুরে এল। রাঙাকাকা আর কাকীমার স্মৃতি পরিবারের সবার মনে একটা বেদনার চিহ্ন হিসেবে রয়ে গিয়েছে। দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর মেয়েদের মজলিশে প্রায়ই এ প্রসঙ্গ ওঠে। বাড়ির মাঝখানের উঠোনের পশ্চিমদিকে রাঙাকাকার ঘরখানা কেউ ব্যবহার করে না। বন্ধই পড়ে আছে।

    এই উঠোনের মাঝখানে ছিল ইট দিয়ে বাঁধানো তুলসীমঞ্চ। কোনোদিন মা, কোনোদিন কাকীমাদের মধ্যে কেউ সন্ধ্যেবেলা তুলসীমঞ্চে প্রদীপ জ্বালিয়ে দিয়ে আসতেন। একদিন কিভাবে গল্পে গল্পে কারো আর প্রদীপ দেবার কথা মনে পড়েনি। অন্ধকার বেশ গাঢ় হতে হঠাৎ মেজকাকীমা বললেন—ওই যাঃ, তুলসীতলায় আলো দেখানো হয়নি তো! আমার আবার হাত জোড়া। যা তো মা বিরাজ, একটা প্রদীপ জ্বেলে তুলসীতলায় দিয়ে আয়

    একটু পরেই বাইরে উঠোন থেকে বিরাজের গলার চিৎকার ভেসে এল, পর পর দুবার। কাকীমারা দৌড়ে গেলেন, বারবাড়ি থেকে কাক-জ্যাঠারা ছুটে এলেন। তুলসীমঞ্চের কাছে দাঁড়িয়ে ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপছে বিরাজ। পায়ের কাছে মাটিতে প্রদীপটা পড়ে আছে, তেল ছড়িয়ে পড়েছে উঠোনে।

    -–কি রে, কি হয়েছে? আমন চেঁচিয়ে উঠলি কেন?

    বিরাজ কাঁপা-কাঁপা আঙুল তুলে রাঙাকাকার ঘরের দিকটা দেখিয়ে বললরাঙাকাকীমাকে দেখলাম। ওইখানটায় দাঁড়িয়েছিল—

    সবাই চুপ। বিরাজ মিথ্যে বলবে না, আর তার বিশেষ অপ্রাকৃত ক্ষমতার ব্যাপারটা এখন প্রায় একটা প্রমাণিত সত্য। তবু বাবা একবার বললেন—যাঃ কি যাতা বলছিস? অন্ধকারে ভুল দেখে থাকবি

    —না জেঠু, আমি ঠিক দেখেছি। সাদা কাপড় পরা ছিল। ঘর থেকে বেরিয়ে এসে আমার দিকে তাকিয়ে কি যেন বলল, তারপর আবার ঢুকে গেল ঘরে—

    -ঘর থেকে বেরিয়ে এল? বাবা এগিয়ে গিয়ে রাঙাকাকার ঘরের দাওয়ায় উঠে। দরজায় লাগানো তালা টেনে দেখলেন তা কি করে হবে? এই তো তালা বন্ধ রয়েছে।

    বুঝিয়েসুঝিয়ে বিরাজকে ঠাণ্ডা করে ভেতরে নিয়ে আসা হল। তখনকার মত চাপা পড়ে গেলেও এরপর থেকে বিরাজ ঘন ঘন রাঙাকাকীমাকে দেখতে শুরু করল। কখনো একেবারে পরিষ্কার দিনের বেলায়। কাকীমা যেন বিরাজকে কি বলছেন। মা জিজ্ঞাসা করেছিলেন—কি বলে কিছু বুঝতে পারিস?

    –না জেঠিমা। মুখ নাড়ছে দেখতে পাই, কথা কানে আসে না। তবে একটা জিনিস–

    –কি?

    –কাকীমার খুব কষ্ট বলে মনে হয়।

    –কি করে বুঝলি? কথা তো শুনতে পাস না—

    -মুখ দেখতে পাই যে! খুব ব্যথা পেলে যেমন মুখ হয় সেইরকম—

    ছোটকাকা গিয়ে কোথা থেকে এক ভূতের রোজা ডেকে আনলেন। লোকটাকে দেখে আমার আদেী শ্ৰদ্ধা হল না। তখন আমি একটু বড় হয়েছি, গ্রামে সাধুসন্ত এলে সেখানে ধরনা দিয়ে পড়ে থাকি, লোক চেনবার ক্ষমতা সামান্য হয়েছে। ভূতের রোজা ঘণ্টাদুয়েক ধরে উঠোনে নানান বিচিত্র ক্রিয়াকলাপ করল, মাটিতে খড়ি দিয়ে নকশা একে তার ওপর শ্বেতসরষে আর আতপচাল ছিটিয়ে চিৎকার করে মন্ত্র পড়তে লাগল। কিন্তু ওই পর্যন্তই—সে দক্ষিণা নিয়ে বিদায় হবার পর সেদিন বিকেলেই বিরাজ আবার রাঙাকাকীমাকে দেখতে পেল। দালানের একদিকে রান্নাঘর, সেখানে মা উনুনে আঁচ দিচ্ছেন আর বিরাজ মেঝেতে বসে বিকেলের তরকারীর জন্য কুটনো কুটছে, এমন সময় বিরাজ দেখল লম্বা দালান বেয়ে কাকীমা হেঁটে চলে যাচ্ছেন। বিরাজ চেঁচিয়ে উঠল—ওই, ওই যে কাকীমা যাচ্ছে!

    মা কাজ ফেলে ছুটে এসে দেখলেন বিরাজ একদৃষ্টে দালানের দিকে তাকিয়ে রয়েছে— দেখতে পাচ্ছ না জেঠিম? ওই তো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে! হাতে আবার একটা কি জিনিস রয়েছে। ওমা, একটা ডলপুতুল!

    মা, বলা বাহুল্য, দালানের দিকে তাকিয়ে কিছুই দেখতে পেলেন না।

    —হাতে কি রয়েছে বললি?

    —ডলপুতুল। সেই ছোটবেলায় যেমন তুমি আমাকে কিনে দিয়েছিলে।

    —ডলপুতুল হাতে কোনো এক মৃতার প্রেতাত্মা বারান্দা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে একথা কল্পনা করা কষ্টকর, কিন্তু বিরাজ কিছু একটা দেখতে পাচ্ছে ঠিকই—নইলে হাতে পুতুল থাকার মত সুক্ষ্ম মিথ্যা বিরাজের পক্ষে আবিষ্কার করা সম্ভব নয়।

    এরপর ছোটকাকা আর একজন ভাল রোজা আনবার প্রস্তাব করেছিলেন, কিন্তু এবার বিরাজ নিজে বারণ করল—না বাবা, গুণিন এনে না—

    —কেন রে?

    -রাঙাকাকীমা আমাকে কত ভালবাসত, মরে গিয়ে কি আমার ক্ষতি করতে চাইবে? হয়ত আমাকে ভুলতে পারেনি বলে আমার কাছে আসে

    দিন কাটতে লাগল! মাস দুই-তিন হয়ত কিছু হল না, আবার একদিন বিরাজ কাকীমাকে দেখতে পায়। মানুষের মন বড় বিচিত্র জিনিস, কালে সবই খাপ খেয়ে যায়। বিরাজের রাঙাকাকীমাকে দেখতে পাওয়াটাও একটু একটু করে সকলের গাসওয়া হয়ে এল।

    প্রথম যৌবনে পা দিয়েই আমি বাড়ি থেকে পালালাম গুরুর খোজে, সে গল্প কিছুটা তোমরা জানেনা। তান্ত্রিকসাধনার দিকে খুব মন গিয়েছিল। প্রকৃত গুরুর সন্ধানে কোথায় কোথায় না ঘুরেছি। মাঝে মাঝে বাড়ি ফিরে আসি, আবার কিছুদিন পরে উধাও হই। এই সময়েই মাতু পাগলীর সঙ্গে আমার পরিচয়। সে বড় সাংঘাতিক মেয়েমানুষ, আমাকে দীক্ষা দেয়নি বটে, কিন্তু কতগুলো ক্ষমতা দান করেছিল। তারপর বরাকর নদীর ধারের শালবনে সেই মধুসুন্দরী দেবীর আবির্ভাব। তিনিও আমাকে বীজমন্ত্র এবং কতগুলি শক্তি দান করেন। তারই প্রসাদে জীবনে কখনো বড় কোনো বিপদে পড়তে হয়নি, ডালভাত খেয়ে যাহোক করে চালিয়ে দিয়েছি। আমি বড়দরের সাধক হতে পারিনি হে, কয়েকটা সাধারণ সিদ্ধাই পেয়েছিলাম মাত্র!

    একবার বাড়ি ফিরে দেখলাম, বিরাজের বিয়ের তোড়জোড় হচ্ছে। ভাল একটা সম্বন্ধ এসেছে গোয়াড়ী-কৃষ্ণনগর থেকে। ছেলের বাপ-মায়ের বিশেষ দাবি-দাওয়া কিছু নেই, মেয়ে দেখে তাদের খুব পছন্দ হয়ে গিয়েছে। এখন কেবল দিনক্ষণ ঠিক করবার যা দেরি। বিরাজ দেখতেও সত্যি খুব সুন্দর হয়েছে। মাথায় বেশ লম্বা, ফর্সা ধপধপ করছে গায়ের রঙ, একঢাল কালো কোকড়ানো চুল, টানা টানা চোখ-এ মেয়ের বিয়েতে খরচ না হবারই কথা।

    আমি থাকতে-থাকতেই একদিন পাত্রপক্ষ এসে বিরাজকে আশীর্বাদ করে পাকা কথা দিয়ে গেল। পাত্রের বাবা মানুষটি ভারি অমায়িক, গোলগাল চেহারা, মুখে সব সময় হাসি লেগে রয়েছে। গ্রামদেশে পাত্রের বাবার সাধারণত একটা দাম্ভিক চালচলন থাকে, এ ভদ্রলোকের সে-সব নেই। বেশ হেসে হেসে গল্প করলেন, বিরাজকে পাশে বসিয়ে মা আমার যেন লক্ষ্মী বলে গায়ে হাত বুলিয়ে দিলেন। আশীর্বাদ করলেন দশভরির সেকেলে পাকা সোনার সুষনিপাতা হার দিয়ে। কথা রইল এক বছর পর সামনে বৈশাখে বিয়ে হবে। ওঁদের কি পারিবারিক আচার অনুযায়ী পাত্রের বয়েস জোড়সংখ্যক বছরে না হলে বিয়ে হয় না। সামনের বছর ছেলের বয়েস হবে চব্বিশ।

    আশীর্বাদ সেরে পাত্রপক্ষের লোকেরা বিকেলবেলা চলে গেলেন, তারা সন্ধ্যের ট্রেন ধরবেন। সঙ্গে আমাদের বাড়ি থেকে লোক দেওয়া হল স্টেশন অবধি পৌঁছে দেবার জন্য।

    সেইদিনই রাত্তিরে বিরাজের ঘর থেকে কান্নার আওয়াজ পেয়ে মা আর বাবা উঠে দেখতে গেলেন। ছোটকাকীমার পাশেই শুয়েছিল বিরাজ। কাকীমা জেগে বসে অবাক হয়ে বিরাজেরদিকে তাকিয়ে আছেন, আর বিরাজ আঝোর ধারায় কাঁদছে।

    মাঝরাত্তিরে ঘুম ভেঙে বিরাজ নাকি দেখতে পায় মশারীর ঠিক বাইরে রাঙাকাকীমা দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে কি বলবার চেষ্টা করছেন, কিন্তু প্রাণপণ। চেষ্টাতেও তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। কি করুণ, বিধ্বস্ত মুখ রাঙাকাকীমার–বিরাজ কেঁদে ফেলে বলে—কেন বার বার আসছ রাঙাকাকী? কি বলবে? কি কষ্ট তোমার?

    উত্তরে রাঙাকাকীমা দুহাতে ধরে রাখা কি একটা জিনিস সামনে বাড়িয়ে দেন।

    সে-হাতে ডলপুতুল। কি সুন্দর। ঠিক যেন একটা সত্যিকারের বাচ্চা।

    এই সময়ে ছোটকাকীমা জেগে উঠতে রাঙাকাকীমার শরীর যেন গুড়ো গুড়ো হয়ে ঝরে পড়ে গেল।

    পরদিন সকালে বাবারা সব ভাই মিলে পরামর্শ সভা বসালেন। আলোচনার বিষয় ছিল এই—বিরাজের বিয়ে হতে চলেছে। বিয়ের পরেও যদি সে এরকম রাত-বিরেতে চেঁচামেচি করে, তাহলে তার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা কি ভাববে? পরে এ নিয়ে মহা অশাস্তির সূত্রপাত হতে পারে। আবার কি একজন রোজা ডাকা হবে? আর কি করা যেতে পারে?

    সবার মতামতই রোজা ডাকার দিকে যাচ্ছে দেখে আমার বড় খারাপ লাগল। প্রেতবিতাড়নী মন্ত্র অবশ্যই আছে, কিন্তু বেশির ভাগ পাড়াগেয়ে বুজরুকের দল তার কিছুই জানে না। আমি জানি, কিন্তু রাঙাকাকীমাকে আমরা সবাই খুব ভালোবাসতাম—তাকে তাড়াবার জন্য কোন ক্রিয়া-অনুষ্ঠান করতে কেমন যেন বাধাবাধো ঠেকতে লাগল। তাছাড়া ওই মন্ত্র পাঠ করবার সময় যে আত্মাকে তাড়ানোর জন্য অনুষ্ঠান করা হচ্ছে তার খুব কষ্ট হয়। সে যন্ত্রণার মধ্যে রাঙাকাকীমাকে ফেলতে মন চাইল না। অবশ্য একটা কাজ করা যায়, বিরাজকে একটা কবচ করে দিতে পারি। সেটা হাতে ধারণ করলে কোনো আত্মা ইচ্ছে করলেও ওকে দেখা দিতে পারবে না। যা যা লাগবে যোগাড় করতেও বিশেষ অসুবিধে হবে না। বামাবর্ত শঙ্খের চুর্ণ আর তিনটে কাকের বাসা আছে এমন নিমগাছের শেকড়ের অংশ চাই। তার সঙ্গে মেশাতে হবে—না, তোমাদের কাছে এসব বলা বৃথা! ওই যে কিশোরী হাসছে—

    কিশোরী তৎক্ষণাৎ গম্ভীর হয়ে বলল—না না, আমি অবিশ্বাস করে হাসছি না মোটেই। আসলে আপনি মাঝে মাঝে এমন সব জিনিসের নাম করেন, যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে একেবারেই অপরিচিত—শুনলে হাসি পেয়ে যায়। আচ্ছা একটা কথা জিজ্ঞাসা করি, বিরাজের এই ব্যাপারটা সম্বন্ধে আপনার কি মত?

    তারানাথ বলল—বিরাজ খুব ভাল মিডিয়াম ছিল। তখন ততটা বুঝতে পারি নি, এখন আন্দাজ করতে পারি। তুলা রাশি, চন্দ্র প্রবল—এমন জাতিকার এটা হতে পারে। হবেই যে এমন কোন কথা নেই—এর ভেতর আরো অনেক প্রভাব কাজ করে, তবে হওয়া সম্ভব। এদের কাছে মৃত আত্মারা সহজেই দৃশ্যমান হয়। ডামরতন্ত্রের নিয়মানুযায়ী কবচ করে দিলে জাতক বা জাতিকার এই গুণ সাময়িকভাবে লোপ পায়। আর বিরাজ যে মিথ্যে বলছে না বা এটা ওর মনের কিংবা চোখের ভুল নয়, তা আমি সহজেই বুঝতে পেরেছিলাম। কারণ তোমরা তো জানো, আমি প্রেতাত্মার অস্তিত্ব টের পাই। বিরাজের সঙ্গে মৃত আত্মার যোগাযোগ আমি বুঝতে পেরেছিলাম।

    বললাম—কি করে বোঝেন? দেখতে পান?

    —দেখতে তো পাই-ই, তবে সব সময় দেখবার প্রয়োজন হয় না। আমি গন্ধ দিয়ে বুঝতে পারি—

    –কি রকম?

    —যেখানে ঘন ঘন আত্মার আবির্ভাব হয় সেখানকার আবহাওয়ায় একটা অদ্ভুত গন্ধ থাকে। অনেক দিনের বন্ধ ঘরের ভেতর যেমন একটা ছাতাধরা ভ্যাপসা গন্ধ পাওয়া যায় সেই রকম। সেই সঙ্গে সমস্ত শরীরে-মনে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়— এটা অবশ্য আমি তোমাদের ভাষা দিয়ে ঠিক করে বোঝাতে পারবো না।

    কিশোর বলল—যাই হোক, গল্পটা বলুন। তারানাথ আবার শুরু করল।

    –কবচের কথা তুলতেই বাবা বললেন—তুই? তুই আবার কি কবচ দিবি? না না, সে কাজ নেই–

    আসলে বাড়ির লোকেরা আমাকে একেবারেই হিসেবের বাইরে রেখেছিল। অপদার্থ, বাড়িপালানো ছেলে, আমাকে দিয়ে কোনো কাজের কাজ হওয়া সম্ভব নয়— এই ধারণা প্রত্যেকেরই।

    বললাম—একবার দেখই না, ফল না হলে খুলে ফেলে দিয়ো।

    তাও বাবা বোধ হয় রাজি হতেন না, কিন্তু ছোট কাকীমা বললেন—আচ্ছা, ও দিক কবচ, বিশ্বাসেও তো ফল হয়। অনেকে অনেক কিছু করল, একবার ওরটা করে দেখি—

    তিন-চার দিনের মধ্যে কবচ তৈরি করে বিরাজের হাতে পরিয়ে দিলাম।

    এরপর মাস দুই সেবার বাড়িতে ছিলাম, তার মধ্যে বিরাজ আর কখনো রাঙাকাকীমাকে দেখেনি। বাবা পর্যন্ত বলতে বাধ্য হলেন—নাঃ, ছেলেটা কিছু বিদ্যে শিখেছে বটে—

    গ্রামাঞ্চলে এসব খবর খুব দ্রুত রটে। আমার দেওয়া কবচের গল্প কিছুদিনের মধ্যেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। একদিন বাবা এসে বললেন—দুজন লোক তোকে ডাকছে, বাইরে বসিয়ে রেখেছি। যা—

    বাবা দেখি কেমন প্রশংসামিশ্রিত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন।

    বাইরের ঘরে এসে দেখি দুজন গেয়ে চেহারার লোক চৌকিতে সঙ্কুচিত হয়ে বসে আছে। ময়লা ধুতি, ফর্সা জামা—তাতে আবার কাচবার সময় বেশি নীল পড়ে গিয়েছে।

    বললাম—কি চাই?

    —আজ্ঞে আমরা চালতেপোতা থেকে এসেছিলাম—

    —বেশ। কি দরকার?

    —আজ্ঞে আপনি একজন গুণী লোক। আমাদের ওদিকে আপনার খুব নাম রটে গিয়েছে। আপনি ইচ্ছে হলে সব করতে পারেন–

    –কি বিপদ! আপনারা কি চান তাই বলুন না—

    তাদের প্রার্থনা অতি সরল। ভদ্রাসন নিয়ে তারা তাদের খুড়তুতো ভাইয়ের সঙ্গে জোর মামলা লড়ে যাচ্ছে। আমি কি মামলায় জেতবার জন্য তাদের একটা কবচ করে দিতে পারি? এজন্য তারা দুশো টাকা অবধি খরচ করতে প্রস্তুত আছে।

    ধমক দিয়ে তাদের তাড়িয়ে দিলাম বটে, কিন্তু বুঝতে পারলাম, এই সবে শুরু মাত্র। এবার দলে দলে লোক আসতে আরম্ভ করবে। ক’জনকে তাড়াব? কাজেই পরদিন শেষরাত্তিরে পোটলা-পুটলি গুছিয়ে বাড়ি থেকে সরে পড়লাম।

    কিশোর জিজ্ঞাসা করল—কিন্তু এ ধরনের কবচ তো আপনি দিয়ে থাকেন, তাহলে ওদের তাড়ালেন কেন?

    তারানাথ বিষণ্ণভাবে হেসে বলল—সে অনেক পর থেকে দিতে শুরু করি। ওই সময় আমার প্রথম যৌবন, মনে আশা সিদ্ধসাধক হব। টাকার জন্য মামলার কবচ, গরু হারানোর মাদুলি দেওয়া—ওসব ভাবতেই পারি না। তারপরে বিয়ে–থাওয়া করলাম, সন্তনাদি হল— সংসারের পেষণে দৈবওষুধ থেকে বশীকরণ হোম—সবই শুরু করলাম। সেই থেকে পতনের আরম্ভ

    একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তারানাথ গল্পে ফিরে এল।

    ন’দশ মাস এদিক-সেদিক ঘুরে বিরাজের বিয়ের কিছুদিন আগে বাড়ি ফিরে এলাম। আমাকে দেখে আর কেউ তেমন না হোক মা খুশি হলেন।

    –যাক, বিরাজের বিয়ের কথাটা মনে রেখেছিস তাহলে! তুই না এলে আমার ফাকা-ফাকা লাগত–

    অপ্রস্তুতভাবে একটু হাসলাম কেবল। কি আর বলার আছে? মাই কেবল শেষদিন অবধি নিঃস্বার্থ ভালবাসা দিতে পারে সন্তানকে। অন্য কেউ খুব আত্মীয়তা বোধ না করলে তাদের দোষ দিতে পারি না। আমিই বা কি দায়িত্ব পালন করেছি বাড়ির লোকেদের প্রতি? ভালবাসা তো আকাশ থেকে পড়ে না।

    রাত্তিরে খাওয়ার সময় বাবা বললেন—তুমি যে কবচ দিয়ে গিয়েছিলে বিরাজকে তাতে খুব কাজ হয়েছে। তারপর থেকে বিরাজ আর ভয়টয় পায়নি–

    কিছুক্ষণ চুপচাপ খেয়ে যাবার পর বাবা বললেন—এই যে একটা বিদ্যা শিখেছিস, এটাও তো বাড়িতে থেকে ব্যবহার করতে পারতিস। টাকার জন্য না হয় নাই হল, মানুষের উপকারের জন্যও তো করতে পারিস? বাড়িতে তোর মন বসে না কেন?

    চুপ করে রইলাম। আমার মনের গড়ন এমন হয়ে গিয়েছে যে, বাড়িতে আর কোনোদিন মন বসবে না। বাবাকে সেকথা বলে লাভ নেই।

    নির্ঞ্ঝাটে বিরাজের বিয়ে হয়ে গেল। বরযাত্রীদের খাইয়েদাইয়ে মুখুজ্যেদের বড় বাড়ির হলঘরে ঢালা বিছানা পেতে শুইয়ে দেওয়া হল। গোধূলিলগ্নে বিয়ে, রাত এগারোটার ভেতর বিয়েথাওয়া, কুশণ্ডিকা সব শেষ। একতলার কোণের ঘরে মেয়েরা বাসর জাগবার আয়োজন করেছিল, রাত দেড়টা দুটো অবধি বাসরঘর থেকে হাসি আর গানের শব্দ পাচ্ছিলাম। আস্তে আস্তে বাসরের কোলাহল থেমে এল, ছেলেমানুষেরা আর কত রাত্তির জাগবে! শরীর খাটাখাটুনি করে ক্লান্ত, আমিও কখন ঘুমিয়ে পড়েছি টের পাইনি।

    ঘুম ভাঙল শেষরাত্তিরে বাবার ডাকাডাকিতে। তাকিয়ে দেখি বাবা পাশে দাঁড়িয়ে ধাক্কা দিচ্ছেন—ওঠ ওঠ! ব্যস্ত হয়ে উঠে বসে বললাম—কি হয়েছে বাবা? বাবা পাংশুমুখে বললেন—বিরাজ আবার ঐরকম করছে।

    —সে কি! এমন তো হবার কথা নয়!

    –কি জানি! তুই কবচ দেবার পর আর কখনো তো হয়নি। বাসরেও তো সবাই মিলে আমোদ-আহ্লাদ করেছে—তারপর বুঝি একটু ঘুমিয়ে পড়েছিল। এই একটু আগে চিৎকার করে জেগে উঠেছে। জামাই খুব ভয় পেয়ে গিয়েছেন—তুই একবার চল—

    ততক্ষণে আমি নাকে একটা সোদা-সোদা ছাতাধরা, ভ্যাপসা গন্ধ পেতে শুরু করেছি। এবার এসে অবধি এ গন্ধটা আর পাইনি।

    বিছানা ছেড়ে দাঁড়িয়ে উঠে বললাম—আমার সঙ্গে এসো তো—

    সিড়ি দিয়ে নিচে না নেমে সোজা এগিয়ে যাচ্ছি দেখে বাবা বললেন—ওদিকে কোথায় যাচ্ছিস? বিরাজ তো নিচে বাসরঘরে—

    বললাম–এসোই না। ছোটকাকীমার ঘরের সামনে এসে থামলাম। দরজা খোলা, সবাই নিচে গিয়েছে বিরাজকে সামলাতে। ঘরে ঢুকে বাতিটা উসকে দিয়ে দেরাজগুলো খুলে দেখতে শুরু করলাম। বাবা অবাক হয়ে বললেন—তোর কি মাথাখারাপ হল নাকি? এখানে কি করছিস?

    ওপর থেকে তিন নম্বর দেরাজে ছিল জিনিসটা। আমার ধারণাই ঠিক। বাবার বিস্মিত দৃষ্টির সামনে বাড়িয়ে ধরলাম বিরাজকে দেওয়া আমার কবচখানা।

    –এ কি! এটা এখানে এল কি করে?

    সেটা অবশ্য আমিও পরিষ্কার জানতাম না। তবে বিরাজ যে কবচটা খুলে রেখেছে। এবং তার ফলেই এই বিপত্তি তা বুঝেছিলাম। আর খুলে রাখতে হলে সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা নিজের ঘরের দেরাজ। বোধ হয় হাতে অতবড় একটা কবচ থাকলে স্বামী অবাক হতে পারে বা শ্বশুরবাড়ির লোকজন নানা সন্দেহ করতে পারে এই ভয়ে বিয়েতে বসবার আগে বিরাজ ওটা খুলে রেখে গিয়েছিল। আট-দশ মাস নিরুপদ্রবে কাটায় সে ভেবেছিল কাকীমা হয়ত আর দেখা দেবেন না। লজ্জা করা অসঙ্গতও নয়। কবচটা চৌকো তক্তির মত, বেশ বড়। অতবড় জিনিসটা কারো-না-কারো চোখে পড়তেই পারে।

    বাবার হাতে কবচটা দিয়ে বললাম—যাও, আড়ালে ডেকে পরিয়ে দাও। জামাইয়ের সামনে করবার দরকার নেই–

    জামাই ছেলেমানুষ, তাকে যাহোক বুঝিয়ে দেওয়া কঠিন হল না। বিরাজকে সাবধান করে দেওয়া হল, আর কখনো যেন সে কবচ খুলে না রাখে।

    বিকেলে মেয়ে-বিদায়ের সময় এল। ভেতরবাড়ির দালানে আসন পেতে মেয়েজামাইকে আশীর্বাদ করা হচ্ছে, বাইরে খোদাবক্সের ঘোড়ার গাড়ি দাঁড়িয়ে, রওনা দেবার সব আয়োজন সমাপ্ত। জিনিসপত্র যা সঙ্গে যাবে তা বেঁধে তুলে দেওয়া হয়েছে ঘোড়ার গাড়ির ছাদে। কেবল বর-বউয়ের জামাকাপড় আর গয়না যাবে একটা লাল রঙের স্টীলের ট্রাঙ্কে, সেটা বিরাজের ঘরে রয়েছে। যাবার সময় সে নিয়ে যাবে।

    মেয়ে-জামাই বিদায় হবার সময় বাড়ির মেয়েরা তো কান্নাকাটি করলেনই, এমন। কি বাবা আর মেজকাকা অবধি দেখলাম বারান্দায় এক কোণে দাঁড়িয়ে চোখ মুছছেন। ছোটকাকাকে তো খুঁজেই পাওয়া গেল না, আশীর্বাদ করেই তিনি কোথায় গিয়ে লুকিয়ে বসে আছেন।

    আশীর্বাদের পর্ব মিটে গেলে মেয়ে-জামাইকে নিয়ে যাওয়া হল ছোটকাকীমার ঘরে, সেখানে লক্ষ্মীর আসনের সামনে ওদের প্রণাম করিয়ে নিয়ে তারপর গাড়িতে তুলে দেওয়া হবে।

    ঘরে ঢোকবার মুখে চৌকাঠের কাছে থমকে দাঁড়ালেন মা, এ কি! এগুলো এমন করল কে?

    ঘরের সামনে চৌকাঠের বাইরে কে যেন বিরাজের লাল ট্রাঙ্কটা টেনে বার করে ভেতরের জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে একাকার করেছে। মুখে মাখবার নতুন পাউডারের কোটোটা ঢাকনা খোলা অবস্থায় পড়ে, তার থেকে মুঠো মুঠো পাউডার চারদিকে ছড়িয়ে কেউ খেলা করেছে যেন।

    মা তাড়াতাড়ি ট্রাঙ্কের ভেতরে হাতড়ে দেখলেন। না, জামাইয়ের শালের নিচে গয়নার বাক্স ঠিক আছে। তাহলে এর মানে কি? চোর হলে গয়নার বাক্সই তার লক্ষ্য হবে। কোনো শিশুর দুষ্টুমি বলে মনে করা যেত, কিন্তু তত ছোট শিশু বাড়িতে কেউ নেই।

    মা আর ছোটকাকীমা জিনিসগুলো গুছিয়ে আবার বাক্সে ভরে দিয়ে ট্রাঙ্কের ডালা বন্ধ করতেই যারা কাছাকাছি দাঁড়িয়েছিল তারা অস্ফুট বিস্ময়সূচক শব্দ করে উঠল।

    ট্রাঙ্কের লাল রঙের ডালার ওপরে পাউডারমাখা ছোট ছোট হাতের ছাপ! একটি শিশু যেন হাতে পাউডার মেখে মনের আনন্দে ছাপ দিয়েছে।

    কিন্তু অত ছোট বাচ্চা তো কেউ নেই আমাদের বাড়িতে। ছাপগুলো খুবই ছোট ছোট হাতের, প্রায় সদ্যোজাত শিশুর মত। এত ছোট বাচ্চা কি নিজে বসে খেলা করতে পারে?

    ব্যাপারটা রহস্যই রয়ে গেল। বিরাজ আর তার স্বামী রওনা হয়ে যাবার পর এ নিয়ে অনেক আলোচনা হল বটে, কিন্তু কেউ কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারল না।

    এর কিছুদিন পর আমিও আবার বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম। কত ঘুরলাম সমস্ত বাংলাদেশের শ্মশানে-মশানে, সিদ্ধপীঠে। প্রকৃত সাধকের দেখা পাবার পিপাসা মনের মধ্যে উদগ্র হয়ে উঠেছে তখন। সারাদিন পথ হাটি, সন্ধ্যেবেলা কোনো মন্দিরে কি বাঁধানো গাছের তলায় রাতের আশ্রয় নিই। রান্না করে খেতাম না কখনো। হাতে পয়সা থাকলে দোকান থেকে চিড়েমুড়ি কিনে নিতাম, কখনো বা পুণ্যলোভী গ্রামবাসীরা খাবারদাবার উপহার দিয়ে যেত। জীবনের এই সময়টা খুব ভাল কেটেছে, জানো? এখন এই বদ্ধতার ভেতর বসে মনে করলে রোমাঞ্চ হয়। কেমন মুক্ত আনন্দে পথে পথে বেড়ানো, মাথার ওপরে খোলা আকাশ, পথেরও কোনো সীমা নেই। কত বিচিত্র মানুষের সঙ্গে পরিচয়, কত আশ্চর্য অভিজ্ঞতা। এখন মাঝে মাঝে মনে হয় সাধনার জন্য নয়, বোধ হয় এই পথের নেশাতেই ঘরছাড়া হয়ে পড়তাম।

    এইভাবে ঘুরতে ঘুরতে বাংলা আর বিহারের সীমান্তে একটা ছোট শহরমত জায়গায় গিয়ে পড়েছি, সেখানকার মুদির দোকানে চিড়ে আর গুড় কেনবার সময় মুদিকে জায়গাটার নাম জিজ্ঞাসা করলাম।

    মুদি বলল—ছোট রামপুর বাবুজী।

    আমি চমকে উঠলাম—কি বললে? ছোট রামপুর?

    —জী। কেন বাবু?

    —না, কিছু না।

    মনটা খারাপ হয়ে গেল। এই ছোট রামপুরেই ছিল রাঙাকাকীমার বাপের বাড়ি। এখানেই কাকীমার মৃত্যু হয়।

    পুরনো স্মৃতি ভিড় করে এল মনে। শৈশবে দেখা কাকীমার সেই হাসিমাখা মুখ, কোদাল হাতে রাঙাকাকা বাগানের জমি কোপাচ্ছেন, কাকীমার মৃত্যুতে রাঙাকাকার সেই কান্না।

    ছোট রামপুরের প্রান্ত দিয়ে বয়ে গিয়েছে ভীমা নদী। বিশেষ চওড়া নয়, স্রোতও কম। কিন্তু নদীর দুপাড়ে অনেক দূর অবধি বসতি না থাকায় ভীমা একটা অপূর্ব নির্জনতা লাভ করেছে। নদীর ধারেই রামপুরের শ্মশান। উঁচু-নিচু লালমাটির প্রান্তরের মধ্যে কেবলমাত্র শ্মশানযাত্রীদের জন্য তৈরি একটা চালাঘর দাঁড়িয়ে আছে। আমি যখন পৌঁছলাম, তখন দিনের আলো নিভে এসেছে বটে, কিন্তু সেদিন সম্ভবত শুক্লপক্ষের নবমী—কাজেই রাত্তিরে জ্যোৎস্নার শোভা উপভোগ করা যাবে। শ্মশানে কাটানো আমার অভ্যেস আছে, ভয় পাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

    ভীমার তীরে বসে চড়ে গুড় দিয়ে রাত্তিরের খাওয়া সেরে নদীতে নেমে জল খেলাম। ততক্ষণে দিনের আলো সম্পূর্ণ মুছে গিয়ে রুক্ষ ভূমিত্রীর ওপর ফুটে উঠেছে। শুক্লপক্ষের জ্যোৎস্না। নদীর ধারের সাদা বালি চিকচিক করছে চাদের আলোয়। অমন দৃশ্য তোমরা দেখনি হে, শহর-বাজার অঞ্চলে তোমরা পূর্ণিমা বা অমাবস্যা টের পাও না। শহরে জীবন নেই।

    শরীর খুব ক্লান্ত ছিল, ভাবলাম আর জেগে না থেকে ঘুমিয়ে পড়া যাক। সামনে চালাঘরটা যখন আছে তখন আর খোলা জায়গায় ঘুমোই কেন? এই ভেবে শ্মশানযাত্রীদের ঘরটার দিকে এগুলাম।

    বাইরে জ্যোৎস্না থাকলেও ঘরের মধ্যে তা পৌঁচচ্ছে না। অন্ধকারে তাকিয়ে যতদূর মনে হল ঘরটা একেবারে ফাকা, কেবল একদিকে কতগুলো খড়ের আঁটি পড়ে আছে। ভালই হল, আমি খড়ের আঁটিগুলো বিছিয়ে একটু গদিমত করে চেপে বসলাম।

    বিড়ি ধরাতে গিয়ে দেশলাইয়ের আলোয় প্রথম চোখে পড়ল লোকটাকে। এতক্ষণ বুঝতেই পারিনি, ঘরে আর একজন মানুষ আছে। কখন থেকে বসে আছে লোকটা? খালি গা, আধময়লা ধুতি পরনে, লম্বা চুল–মুখে দাড়িগোঁফের জঙ্গল। হঠাৎ আলো জুলায় মুখের সামনে হাত দিয়ে আড়াল করে আছে।

    পোড়া কাঠির টুকরোটা ফেলে দিলাম। বিড়ি ধরে গিয়েছিল, গোটাদুই টান দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম—তুমি কে? এখানে কি করছ?

    অন্ধকারে লোকটাকে দেখা যায় না, সে যেখানে বসে আছে আন্দাজে সেদিকে। তাকিয়ে প্রশ্নটা করলাম!

    প্রথমে খানিকক্ষণ চুপচাপ, তারপর কেমন যেন ভাঙা, খসখসে গলায় উত্তর এল— এই শ্মশানেই থাকি।

    মড়া পোড়াতে সাহায্য করা যাদের জীবিকা, এমন একশ্রেণীর লোক প্রায় সব শ্মশানেই থাকে। আমি আন্দাজ করে নিলাম এ তাদেরই একজন। জিজ্ঞাসা করলাম—থাকো মানে কি? কি করো? মড়া পোড়াও?

    না।

    —তাহলে?

    —শুধু থাকি। আর শ্মশানে ঘুরে বেড়াই।

    নিজের অভিজ্ঞতা থেকে জানি এ ধরনের লোকেরা কথা কম বলে, আর নিজেদের সম্বন্ধে কিছু বলতে চায় না। কাজেই প্রসঙ্গ বদলে বললাম—বিড়ি খাবে?

    না।

    ভাল মজা। আমি একটু গল্প জমাতে চাইছি, কারণ চিরদিনই আমার শহুরে পালিশ করা মানুষের চাইতে এইসব হাটে-মাঠে-ঘুরে-বেড়ানো চরিত্রদের বেশি ভাল লাগে তা এ দেখছি বাক্যব্যয়ে একেবারেই অনিচ্ছুক। লোকটার গলাই বা অমন ভাঙা ভাঙা কেন? ঠাণ্ডা লেগেছে নাকি?

    একটু চুপ করে থেকে ভাবলাম কি প্রসঙ্গে কথাবার্তা চালানো যায়, তারপর মনে হল ওর জীবনের সঙ্গে মিল আছে এমন কথা জিজ্ঞাসা করাই ভাল। ঘরের কোণে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বললাম—তুমি কতদিন আছ এইখানে?

    —অনেকদিন।

    —অদ্ভুত কিছু দেখনি? বা এমন কোনো ঘটনা, যা তোমার মনে রয়ে গেছে?

    এইবার লোকটার অনিচ্ছুক কষ্ঠে প্রথম প্রাণের স্পর্শ লাগল। সে বলল—কেন। দেখব না? এমন একটা ঘটনা দেখেছি যা কোনদিন ভুলতে পারবো না—

    একটু বিস্মিত হয়ে বললাম—কি ঘটনা?

    কিছুক্ষণ স্তব্ধতা। তারপর অন্ধকারের ভেতর থেকে আবার সেই মানুষটির গলা ভেসে এল—অনেক বছর আগে এই শ্মশানে একজন লোক তার স্ত্রীকে দাহ করতে নিয়ে এসেছিল। অল্পবয়েসের বৌ, লালপাড় শাড়ি পরিয়ে, মাথার সিঁদুর দিয়ে তাকে নিয়ে আসা হয়েছিল। নদীর পাড়ে ওই যেখানে রাঙামাটি টিবি মত উঁচু হয়ে আছে, দেখতে পাচ্ছ? বাইরে তো চাঁদের আলো? ঠিক ওইখানে লোকটা বসে কাঁদছিল একা। বৌকে খুব ভালবাসতো কিনা।

    আমি নড়েচড়ে সোজা হয়ে বসলাম। এ ঘটনা যেন বড্ড চেনা-চেনা লাগছে। তাহলে কি এই লোকটা রাঙাকাকীমার দাহকার্যের সাক্ষী?

    -ক’দিনের জন্য এসেছিল তারা, কাজ শেষ করে ফিরে যাবার কথা ছিল। বৌয়ের আর ফেরা হল না। আকাশে মেঘ ঘন হয়ে আসছিল, পাছে বৃষ্টি এসে পড়ে এই ভয়ে ডোমেরা বাঁশ দিয়ে চিতা খুঁচিয়ে দিচ্ছিল তাড়াতাড়ি কাজ সারবার জন্য। এখানেই জন্ম হয়েছিল বৌটার, আবার এখানে এসেই মরল—

    আমার আর কোন সন্দেহ ছিল না, রাঙাকাকীমার শেষ কাজের কথাই বলছে বটে লোকটা!

    আশ্চর্য যোগাযোগ তো! আমি জীবনে আজ প্রথম এখানে এলাম, তাও না জেনে, আর এসেই লোকটার সঙ্গে আলাপ!

    বললাম—খুবই দুঃখের কথা বটে, কিন্তু মানুষ তো মরেই। বিশেষ করে এই ঘটনাটা তোমার মনে আছে কেন?

    আবার একটু স্তব্ধতা। লোকটার শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দও শুনতে পাচ্ছি না। মানুষ এমন চুপ করে বসে থাকতে পারে?

    লোকটা বলল—মনে রাখবার কারণ আছে। বৌটার পেটে বাচ্চা ছিল।

    আমি চমকে উঠে বললাম—কি বলছ তুমি? এ কথা কেউ জানতো না?

    —না। বৌটা ভেবেছিল আর কিছুদিন বাদে স্বামীকে বলবে। তার সময় পায়নি। কিন্তু বাঁশ দিয়ে খোচাবার সময় ডোমেরা বুঝতে পেরেছিল। তারা বলেছিল মানুষটাকে। পেটে সন্তান থাকলে তাকে আলাদা করে দাহ করতে হয়, জানো তো? নইলে দুজনের কারোই মুক্তি হয় না। আহা, বৌটার বড় শখ ছিল একটা সস্তানের সে শখও মিটল না, মুক্তিও হল না। মুক্তি না হওয়ার কি যন্ত্রণা তা কেবল বদ্ধ আত্মাই জানে। তাই বুঝি নিজের যন্ত্রণার কথা জানাবার জন্য সে বার বার বিরাজের কাছে গিয়ে

    এতক্ষণ মেরুদণ্ড টান করে শুনছিলাম, এবারে লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বললাম—সে কি! তুমি বিরাজের নাম কি করে জানলে? কে তুমি?

    কোনো উত্তর নেই। ঘরে স্তব্ধতা।

    দেশলাই জালালাম, কেউ নেই কোথাও।

    দরজার বাইরে নদীর চরে অপার্থিব জ্যোৎস্না ফুটেছে। ঘরে যে ছিল সে দরজা দিয়ে বেরুলে আমি নিশ্চয় দেখতে পেতাম। দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে এসে চারদিকে তাকালাম। শূন্য লালমাটির প্রান্তর চাদের আলোয় স্বপ্নের দেশ বলে মনে হচ্ছে। জনপ্রাণী নেই কোথাও। কোথায় গেল সে?

    ঠিক এই সময়েই একঝলক বাতাসে ভেসে এল একটা সোদা, গুমো, ভ্যাপসা গন্ধ-অচেনা বক্তার পরিচয় প্রকট করে দিয়ে গেল।

    ভেবে দেখলাম সব ঘটনাই একসূত্রে গাঁথা বটে। রাঙাকাকীমার যন্ত্রণাকাতর আত্মার বার বার ফিরে আসা, লাল ট্রাঙ্কের ওপরে ছোট ছোট হাতের ছাপ, কাকীমার হাতে ডলপুতুলের মত সদ্যোজাত শিশু দেখতে পাওয়া। বিরাজ ভাল মিডিয়াম ছিল, দেখতে পেত। কিন্তু কোন কারণে কথা শুনতে পেত না। শুনতে পেলে অনেক আগেই। গোলযোগ মিটে যেত।

    রাত্রি ক্রমে গভীর হতে লাগল। একা বসে রইলাম ভীমা নদীর পাড়ে।

    পরের দিন সেখান থেকে রওনা হয়ে সোজা গয়ায় এসে রাঙাকাকীমা এবং তার অজাত সন্তানটির মুক্তিকামনায় পিণ্ডদান করি। পুরোহিত মশায় যখন কাজের জিনিসপত্র সব গোছাচ্ছেন, হঠাৎ আমার একটা কথা মনে পড়ে গেল। জিজ্ঞাসা করলাম—আচ্ছা, এই সঙ্গেই কি আরো একজনের নামে পিণ্ড দেওয়া যাবে? একসঙ্গে করে দিতে পারবেন?

    পুরোহিত বললেন—কেন হবে না? কিছু মূল্য ধরে দেবেন এখনকার নামে হবে? কি গোত্র? পুরোহিতকে রাঙাকাকার নামটা বললাম।

    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleকাজল – তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    Next Article অলাতচক্র – তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়

    Related Articles

    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়

    অলাতচক্র – তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 22, 2025
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়

    কাজল – তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 22, 2025
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়

    তৃতীয় পুরুষ – তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 22, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Demo
    Most Popular

    রঙ্কিণীর রাজ্যপাট এবং অন্যান্য – নবনীতা দেবসেন

    August 30, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    রঙ্কিণীর রাজ্যপাট এবং অন্যান্য – নবনীতা দেবসেন

    August 30, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Our Picks

    রঙ্কিণীর রাজ্যপাট এবং অন্যান্য – নবনীতা দেবসেন

    August 30, 2025

    আনা ফ্রাঙ্ক-এর ডায়েরি

    August 30, 2025

    আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ১ (অনুবাদ : নচিকেতা ঘোষ)

    August 30, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2025 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    Sign In or Register

    Welcome Back!

    Login below or Register Now.

    Lost password?

    Register Now!

    Already registered? Login.

    A password will be e-mailed to you.