তালদিঘিতে ভাসিয়ে দেব – ১
প্রথম অধ্যায়
‘ইনহেলার, আমার ইনহেলার…’ নিজের বুক চেপে ধরে হাঁপাতে হাঁপাতে মেঝেতেই বসে পড়ে আগমনী। হৃৎপিণ্ডটা আর একটু হলেই ঝাঁপিয়ে বেরিয়ে যাবে গলা দিয়ে।
শম্পা ভিতরের ঘর থেকে ওকে ওই অবস্থায় বেরিয়ে আসতে দেখে লাফিয়ে ওঠে। তারপর দৌড়ে গিয়ে শোকেসের তাক থেকে ছিনিয়ে আনে ইনহেলারটা। সেটা হাতে নিয়ে মুখের ভিতর খানিক ছড়িয়ে দিতে ধড়ে প্রাণ আসে। মেঝের উপর হাত পা ছড়িয়ে ফ্ল্যাট হয়ে যায় আগমনী, ‘মরে যেতাম, শিওর মরে যেতাম আজকে। এ শালা মানুষ মারার কল!…’
মানুষ মারার কল বলতে ট্রেডমিল। আজ তিনদিন হল আমাজন থেকে ডেলিভারি দিয়ে গেছে। দামড়া মেশিনটা ঘরের এতটা জায়গা জুড়ে থাকবে, সেটা একেবারেই পছন্দ ছিল না শম্পার। একবার মিনমিন করে অনুনয় করেছিল, ‘বলছি দিদি, ওই কিম্ভূত মেশিনটা না কিনে একটু জিম টিমে ভর্তি হয়ে যাও না।’
আগমনী ওমনি তিরিক্ষি হয়ে উঠেছিল, ‘ওই মোটা মোটা কাকিমাগুলো সন্ধেবেলা গিয়ে বরেদের নামে কেচ্ছা করে। ওখানে আমি ভর্তি হব?’
‘তাহলে কাউকে বর বানিয়ে নাও। তারপর তুমিও কেচ্ছা করবে।’
এমন খোঁচা শম্পা হামেশাই মেরে থাকে। আগমনীর গা সওয়া হয়ে গেছে৷ এখন লাইফস্টাইল নিয়ে যাবতীয় সমালোচনার ঝড় ও আরামসে সোল্ডার করে দেয়।
তবে গত সপ্তাহে ডাক্তার দেখাতে গিয়ে ভালোমতো টাইট খেয়েছে। ডাক্তারবাবু কানের গোড়ায় হেঁকে দিয়েছেন, দু-মাসে চার কেজি ওজন বেড়েছে। সঙ্গে সুগার, প্রেশার, কোলেস্টেরল সব উর্ধ্বমুখী। এখন থেকে সেসব চেক না করলে কপালে দুর্গতি নাচছে৷
এমনিতে আগমনী যে তেমন একটা ফুডি, তা নয়। কিন্তু ওর মন খারাপ হলেই খেতে ইচ্ছে করে। আর ফুড ডেলিভারি অ্যাপগুলো পা বাড়িয়েই আছে। বেগতিক বুঝলেই এক্স বয়ফ্রেন্ডের মতো দোরগোড়ায় মিনমিন করে হাজির হয় তারা। সে প্রলোভন সহজে এড়ানো যায় না৷
ইদানীং ও বুঝতে পারে ওর শরীরটা সত্যি ভিতর ভিতর খারাপ হতে শুরু করেছে। শ্বাসকষ্টের সমস্যা ছোট থেকেই। আজকাল সহজেই হাঁপিয়ে পড়ে। দুশ্চিন্তা হলে মাথার ঠিক থাকে না। ক্রনিক ডিপ্রেশনে ভোগে। সেই সঙ্গে অফিসের টেনশন তো আছেই।
সকাল ন’টা থেকে বিকেল সাতটা অবধি অফিসে থাকে আগমনী। পয়সা মন্দ কামায় না, কিন্তু শরীরের সব রস ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের মতো শুষে নেয় হারামজাদাগুলো। আগমনীর মাঝে মাঝে অসহ্য লাগে। সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে ছাদ থেকে একটা কুচো করে লাফ দিলেই ল্যাঠা চুকে যায়।
‘কাল আবার ব্লাড টেস্ট করার ছিল, করেছ?’ দিদি একটু সুস্থ হতে কথাটা বলে উঠে পড়ে শম্পা।
আজ সকালে দেওয়ালে ঝুল পড়েছে দেখেই আঁতকে উঠেছিল আগমনী। এই ওর এক স্বভাব। ঘরের দেওয়ালে দাগ কিংবা ঝুল সহ্য করতে পারে না৷ আর কিছু নিয়ে তেমন মাথাব্যথা নেই, শুধু এই দেওয়াল। নিজেই ফুলঝাড়ু নিয়ে কায়দা করতে গেছিল। শম্পা একরকম জোর করেই তাকে সরিয়ে ঘর পরিষ্কার করতে শুরু করেছে।
আজ সোমবার, আগমনীর ডে অফ। অফিস যাওয়ার তাড়া নেই। ঘামটা মুছতে মুছতে বলল, ‘কী করে করব? কাল একগাদা গ্রসারি আনতে হল, গোটা মাসের বাজার… তার উপরে অফিসের চাপ, তার উপর…’
‘বাজার!’ শম্পা অবাক হয়ে ওর দিকে তাকায়, ‘সেসব তো অনলাইনে করেছ। তার জন্যও সময় লাগে নাকি?’
‘লাগে না?’ কোমরে ভর দিয়ে উঠে আয়নার দিকে সরে আসে আগমনী, ‘এরা সব সাইটগুলো এমন করে বানিয়ে রাখে মনে হয় অদরকারি জিনিসও কিনে ফেলি। তাতেই সময় লেগে যায়।’
‘তো তুমি জানো যখন কেনো কেন?’
‘কোথায় আর কিনি?’
শম্পা মুখ বাঁকায়, ‘যেভাবে চুল পড়ছে তোমার, অনলাইনে কোথাও চুল পাওয়া যায় কিনা দেখো…’
কথাগুলো মন্দ বলেনি শম্পা। এই ক’দিন আগমনী নিজেও কয়েকবার মেঝে ঝাঁট দিতে গিয়ে দেখেছে, যত না ধুলো তার থেকে বেশি বেরিয়েছে ঝরে যাওয়া চুল। এমনিতে চুল ঝরতেই থাকে ওর, কিন্তু গত ক’মাসে যেন মাথায় মড়ক লেগেছে। ঘরময় মৃত চুলের লাশ পড়ে থাকে।
আগমনীর মনে হয় এভাবে চললে দুম করে একদিন নেড়া হয়ে যাবে সে। ক’দিন হল বুক ধড়ফড় শুরু হয়েছে। হাইপারটেনশন। একবার ব্লাড টেস্টটা না করালেই নয়।
আয়নায় নিজেকে দেখতে দেখতে আগমনী বলে, ‘হ্যাঁ রে, আমাকে নেড়া হয়ে গেলে কেমন দেখাবে বল তো?’
‘না হয়েই বা কী লাভ হচ্ছে? বত্রিশ বছর হতে চলল এখনও বিয়ে হল না।’
আগমনী ফুঁসে ওঠে, ‘তার সঙ্গে চুলের কী সম্পর্ক? আমি কি লম্বা চুল নামিয়ে ছেলে তুলব? রাপুঞ্জেল আমি?’
দেওয়াল ছেড়ে মন দিয়ে স্লাইডিং জানলার কাচটা মুছতে লাগল শম্পা। ওদিকে একটা বড় রাস্তা আছে, ফলে একদিন না মুছলেই ধুলোয় ঝাপসা হয়ে যায়।
‘ওসব জেল ফেল জানি না বাবা, আজ একটা বর থাকলে তোমাকে জোর করে ব্লাড টেস্ট করাত।’
‘সেই সঙ্গে রক্ত চুষেও নিত। ছেলেরা উকুনের মতো। মাথায় চুল থাকলে আসে, পড়ে গেলে রক্ত খেয়ে চলে যায়। ওর থেকে নেড়া হয়ে যাওয়া অনেক ভালো।’
উত্তরে কিছু বলতে যাচ্ছিল শম্পা। থেমে গেল। জানলার কাচের উপরে একটা হাতের ছাপ৷ সেটা মন দিয়ে দেখে সে। এই ফ্ল্যাটে আগমনী ছাড়া আর কেউ থাকে না। শম্পা ভোরবেলা আসে, বেলার দিকে চলে যায়। ও জানলায় হাত রাখেনি সারাদিন, আর ছাপের যা সাইজ তাতে সেটা আগমনীর হওয়াও সম্ভব নয়। বাইরে থেকে চারতলায় উঠে কারো পক্ষে হাতের ছাপ দিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। কাল কি তবে কেউ এসেছিল? কিন্তু কেউ এলে ঘরে তার ছাপ থাকত, দু-একটা বাসন বেশি পড়ত।
‘কাল কি কেউ এসেছিল দিদি?’ ইতস্তত করে প্রশ্নটা করেই ফেলে শম্পা।
‘কাল।’ দ্রুত উত্তর দেয় আগমনী, ‘কই না তো, আমারই ফিরতে দেরি হয়ে গেছিল, এসেই বিছানা নিয়েছি। কে আবার আসবে?’
ছাপটা অদ্ভুত। শম্পা ভালো করে তাকায় সেদিকে। বুঝতে পারে সেটা জানলার ভিতরে নয়, বাইরের দিকের মিহি ধুলোর পরতের উপরে পড়েছে। কিন্তু বাইরে থেকে যদি বেয়ে বেয়েও কেউ উপরে ওঠে তাহলে তার দুটো হাতের ছাপ পড়ার কথা। এটা দেখে মনে হচ্ছে কেউ ইচ্ছা করেই যেন এখানে একটা হাত রেখে চলে গেছে৷ কী মনে হতে আর কোনও প্রশ্ন করে না শম্পা। কী লাভ দিদিকে ভয় দেখিয়ে…
‘বেশ, তাহলে অনলাইনে একটা ছেলে পাও কিনা দেখো৷’ হালকা রসিকতা করার চেষ্টা করে সে।
‘পেয়েছি তো, সারাদিন টুংটুং করে মেসেজ আসে দেখিস না?’
শম্পা ফিরে তাকায় ওর দিকে, ‘সত্যি দিদি?’
‘আমার জন্য না, তোর জন্য।’ আয়নার দিকে তাকায় আগমনী; তোয়ালেটা ড্রেসিং টেবিলে ফেলে দিয়ে নিজের মুখটা দেখার চেষ্টা করে ভালো করে। স্কুলে পড়ার সময়ে হ্যারি পটারের ফ্যান ছিল ও। তখন ‘প্রিজনার অফ আজকাবান দেখে হ্যারির মতো চশমা পরার শখ বাসা বেঁধেছিল মনের ভিতর। শেষে ক্লাস এইটে উঠে চোখে যখন পাওয়ার এল, তখন থেকে ওরকম একটা ডিমের মতো চশমা পরে ও।
সেই চশমাটা চোখে গলাতেই আয়নায় একটা দৃশ্য চোখে পড়ল। বেডরুমের খোলা দরজা দিয়ে ডাইনিঙের কিছুটা অংশ দেখা যায়। ওখানে ডাইনিং টেবিলের উপরে একটা দশাসই বাক্স রাখা।
‘এটা আবার কখন এল?’ কাজল দিয়ে চোখ আঁকতে আঁকতে পেছন ফিরে প্রশ্ন করে আগমনী। চোখদুটো কি এখনও আগের মতো আছে? নাকি বয়সের কুদৃষ্টি পড়েছে সেখানেও?
‘আজ সকালে এসেছিল, তুমি ঘুমোচ্ছিলে তখন। বাপ রে বাপ! কী ওজন!’
‘আমি তো কিছু অর্ডার করিনি!
কাচ মোছা হয়ে গেছিল শম্পার। সে জানলার পাল্লাটা টেনে দিয়ে বলল, ‘অর্ডার নয় দিদি, বাড়ি থেকে এসেছে৷ তোমার মা…’
আগমনীর মুখের রঙে কোনও হেরফের হয় না। সেটা আড়চোখে লক্ষ করে শম্পা। একটু অবাক হয়, ‘তোমার কিছুই যায় আসে সনা!
‘যায় আসলে কাজল ঘেঁটে যাবে।’
শম্পা বলবে না বলবে না করেও বলে ফেলে কথাটা, ‘দেখো, এবার যেটা করেছ সেটা কিন্তু আমি বাড়াবাড়িই বলব।’
‘আমি কী করলাম?’
‘তোমার মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো নাই থাকতে পারে। কিন্তু তাই বলে মা চলে গেলেও একবার গিয়ে দাঁড়ালে না?’
‘মানুষ বেঁচে থাকতে গিয়ে দাঁড়ানোর দরকার থাকতে পারে, মরে গেলে আর থাকে না।’
একটু অবাক হয় শম্পা। এই ফ্ল্যাটে ও কাজ করছে তাও নয় নয় করে বছরতিনেক হতে চলল। আগমনী ওকে নিজের বোনের মতোই ভালোবাসে। ওর দায়িত্বেই ঘর ফেলে অফিস চলে যায় মাঝে মাঝে। আত্মীয় স্বজন কারো সঙ্গে তেমন যোগাযোগ নেই বলেই হয়ত ওকে একরকম জোর করেই বোন পাতিয়ে ফেলেছে আগমনী। অবসরে গল্পের ছলে দু-একটা মনের কথাও বলে ফেলে মাঝেমধ্যে। তবে সেসব নিতান্তই কাজকর্ম আর নিত্যদিনের সাংসারিক ছেঁদো কথা।
এই বয়সেই কেমন বৈরাগ্য এসে গেছে ওর মধ্যে। প্রেম ভালোবাসা বিয়ে হলে হবে, না হলে না হবে—কেমন একটা আলগোছ ভাব। মধ্যে মধ্যে ওকে একটা দুটো ছেলের সঙ্গে কথাও বলতে দেখেছে শম্পা, কিন্তু তার বেশি কিছুই এগোয়নি।
তাও এই ক’বছরে আগমনীকে কোনওদিন ঘর ছাড়া গরু মনে হয়নি শম্পার। রান্নাবান্নায় চৌকশ, নিখুঁত সাজগোজের জ্ঞান, কার সঙ্গে কোন কথাটা বলতে হয় সেসব ব্যাপারে আগমনীর মতো দক্ষ মেয়ে আর হয় না। কিন্তু তাও যেন ইচ্ছা করেই এমন সন্ন্যাস নিয়েছে।
শুধু ওই একটা ব্যাপারেই খটকা লাগে শম্পার। এত বছরে মায়ের সঙ্গে একবারও কথা
বলবার ইচ্ছা হল না মেয়েটার? বাড়ি যেতে ইচ্ছে করল না? ওদের বাড়ি মধ্যমগ্রামে। নিউটাউনের এই ফ্ল্যাট থেকে গাড়িতে ঘণ্টাখানেকের বেশি লাগে না। শম্পাও গেছে একবার। আগমনীকে জোরও করেছে। কিন্তু ও এটা সেটা কারণ দেখিয়ে শেষ অবধি যায়নি।
গত মাসের শেষের দিকে আগমনীর মা মারা গেছেন। বয়স সত্তর হয়েছিল। হসপিটালে ভর্তি হওয়ার সময়ই ডাক্তার বলেছিল, এবার আর ফেরার আশা নেই। আগমনীর কাছে ফোন এসেছিল। কিন্তু তাতেও তার কিছু এসে যায় না।
মা মারা যাওয়ার দিন দুপুরবেলা গোঁজ হয়ে বসেছিল। দু’হাতা ভাত মনে হয় কম খেয়েছিল। আর পাড়ার খয়েরি লোমের কুকুরটাকে দুপুরে মাছভাত মেখে দিতে ভুলে গেছিল।
পরের সপ্তাহে আগমনীর কাছে একটা আননোন নম্বর থেকে কল আসে। ওরই মাসির মেয়ে নম্বর জোগাড় করে কল করছিল। মেয়েটির বক্তব্য, তার মাসি মারা যাওয়ার আগে মেয়ের উদ্দেশে একটা বাক্স রেখে গেছেন। বলে গেছেন মায়ের মৃত্যুসংবাদ শুনেও যদি সে নিজে এসে না নিতে চায় তাহলে কারো মারফত বাক্সটা যেন ওর কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আগমনীর কিছু জিনিসপত্র নাকি মায়ের কাছে গচ্ছিত রাখা আছে, সেটা তাকে পৌঁছে দিতে পারলেই তার আত্মার শান্তি হবে।
আজ সকালে সেই বাক্সটাই এসে পৌঁছেছে। কার্ডবোর্ড দিয়ে মজবুত করে প্যাক করা। গায়ে আগমনীর নাম ঠিকানা লেখা। শম্পা কয়েকবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে আবার আগের মতোই রেখে দিয়েছে বাক্সটা।
ছুটির দিন বলে দেরি করে ঘুম থেকে উঠেছে আগমনী। তার মধ্যে শম্পার রান্নাবান্না শেষ। অন্যদিন দিদি অফিসে বেরিয়ে গেলে ঘরের কাজকম্ম সেরে চাবি দিয়ে শম্পাও বেরিয়ে যায়।
তবে অফিস না থাকলে বাইরের ফাঁকা রাস্তাটার দিকে মাঝে মাঝে চেয়ে থাকে আগমনী। কখনও মোবাইলে নতুন গেম খুঁজে নিয়ে সেটাতেই মনোনিবেশ করে। দিনের বেলা ওর ফ্ল্যাটটা আলোতে ভরে থাকে। বিশেষত বারান্দার গ্রিল ভেঙে বেলার রোদ এসে পড়ে ডাইনিঙের মেঝেতে। শম্পা বেরিয়ে গেলে ওই খোপখোপ রোদের ভিতর চু-কিতকিত খেলে। তবে সাবধানে। উলটোদিকের ফ্ল্যাট থেকে কেউ দেখে ফেললে আবার প্যাঁক ফ্যাঁক দিতে পারে। ওকে ছেলেমানুষ ভাবলে তেমন আপত্তি নেই। কিন্তু চু-কিতকিত খেলে যে বেড়ে যাওয়া তিন কেজি ওজন ঝরিয়ে ফেলতে চলেছে, আগমনী সেটা কাউকে জানতে দিতে চায় না৷
আজও তেমন একটা ইচ্ছাই ছিল ওর মনে। কিন্তু বাক্সটার দিকে আবার চোখ পড়তেই মনের ভিতরটা খচখচ করে উঠল। বাক্সটায় আছেটা কী? ওর তেমন কোনও জিনিস মায়ের কাছে ছিল বলে তো মনে পড়ছে না।
আর একটু বেলা হলে কাজকম্ম শেষ করে শম্পা বেরিয়ে যায়। আগমনী একবার ঘড়ির দিকে তাকায়। আজ কয়েকটা সিনেমা দেখা যেতে পারে। কিন্তু সেসব শুরু করার আগে বাক্সটা খুলে দেখবে একবার…
দরজাটা বন্ধ করে টেবিলের দিকে সরে আসে আগমনী। বাক্সের উপরটা যত্ন করে সেলোটেপ দিয়ে বন্ধ করা। পুরোনো জিনিস জমিয়ে রাখার একটা বাতিক আগমনীর মায়ের চিরকালই ছিল। বিশেষ করে, ডাকে আসা চিঠি আগ বাড়িয়ে নিজে খুলে দেখাটা একরকম অবসেশনে পরিণত করেছিলেন তিনি। হয়তো এই বাক্সের মধ্যে সেই ধরনেরই কিছু পুরোনো জিনিসপত্র আছে।
কী মনে হতে রান্নাঘর থেকে ছুরি এনে বাক্সের ধার ঘেঁষে লাগানো সেলোটেপগুলো মাঝবরাবর চিরে ফেলে। ফ্ল্যাপগুলো সরাতেই ভিতরে একটা পুরোনো শাড়ি উঁকি দেয়। ওর মুখে একটা নরম হাসি ফুটে ওঠে। মায়ের এই শাড়িটা একসময় ওর ভীষণ পছন্দ ছিল। স্কুলে সরস্বতী পুজোয় অনেকবার পরে যাবে বলে বায়না করেছে। কিন্তু মা কিছুতেই দিতে রাজি হয়নি। বলেছিল, কলেজে উঠলে দেবে। আগমনী কলেজে উঠে উঠে হোস্টেলে থাকতে শুরু করে। ফলে শাড়িটা আর পরা হয়নি।
পুরোনো শাড়িটা নাকের কাছে এনে একবার বুক ভরে গন্ধ নেয়। বুকের উপরে আঁচলটা ধরে সামনের আয়নার দিকে তাকায় একবার। মনটা হতাশ হয়ে যায় ওর। রংটা কি মানাচ্ছে না? সত্যি কেজি চারেক ওজন বেড়ে গিয়ে বিশ্রী লাগতে শুরু করেছে। কিছুক্ষণ থ হয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর টেবিলের উপরে নামিয়ে রাখে শাড়িটা।
বাক্সের ভিতরে হাত ঢুকিয়ে একটা ওয়েস্টার্ন ড্রেস বের করে আনে। ওর মুখের হাসিটা চওড়া হয়। স্কুলে পড়ার সময় মায়ের থেকে লুকিয়েই পয়সা জমিয়ে কিনেছিল। মা এসব পরা একেবারেই পছন্দ করত না। এটার উপর ফুলহাতা শার্ট জড়িয়ে একবার বেরিয়েছিল। তার সপ্তাখানেক পরে কোথায় হারিয়ে গেছিল জামাটা। উলটে পালটে দেখে ড্রেসটা শাড়ির উপরেই চালান করল।
একটা গালছেঁড়া পুতুল, একটা পুরোনো ডায়েরি, একটা ভাঙা অচল মোবাইল ফোন, পেনসিল বক্স, আরও হাবিজাবি জিনিস ভিড় করে আছে বাক্সের ভিতরে। সেগুলো দু’হাতে ধরে একবারেই বের করে আনল আগমনী।
খালি বাক্সটা বারান্দায় ফেলে ফিরে আসতে গিয়ে থমকে গেল। হালকা বাক্স বলে ছুড়েই ফেলেছিল এককোনায়। সেই ফাঁকেই কিছু একটা বেরিয়ে এসেছে বাক্সের ভিতর থেকে। এগিয়ে গিয়ে জিনিসটার উপরে চোখে রাখে। একটা সাদা হাফ ইঞ্চি পুরু খাম। এমনভাবে বাক্সের দেওয়ালের ভেতর ঢুকে ছিল যে ও খেয়ালই করেনি।
নিচু হয়ে ও হাতে তুলে নেয় খামটা। ধরেই বুঝতে পারে খামের ভেতরে শক্ত কিছু আছে। সম্ভবত পুরোনো ছবি। একটা নয়, এক গোছা। মনে হয় ছোটবেলার অ্যালবাম থেকে কিছু ছবি হবে। মনটা খুশি হয়ে যায় আগমনীর। ওর বান্ধবীরা সবাই ফেসবুকে অ্যাক্টিভ। তারা মাঝেমধ্যেই ছোটবেলার ছবি শেয়ার করে। ফলোয়ারের দল এসে লাভ আর কেয়ার রিয়াক্টে ভরিয়ে দেয়। এতদিন ছবির অভাবে ও নিজে সেসব পোস্ট করতে পারেনি।
খামটা খুলে ভেতরের ছবিগুলো উলটে পালটে দেখতে থাকে ও। একটু একটু করে মুখের হাসিটা ফিরে আসে। খালি গায়ে একটা স্টিলের গ্লাস মুখে দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার ছবি, বিছানায় ডিগবাজি খাওয়ার ছবি। বিছানার চাদরটা মনে পড়ে যায় ওর। ফুলকাটা ডিজাইনের বিছানার চাদর। আগমনী অনেক বড় বয়স অবধি বিছানায় হিসি করেছে৷ মা অয়েল ক্লথ পেতে দিত। চাদরটার জন্য মন কেমন করে ওঠে ওর। কে জানে এখন ছেড়া কাপড়ের টুকরো হয়ে কোন ভাগাড়ে পড়ে আছে।
ডাইনিঙের মেঝেতে রোদের খোপ এসে পড়েছে। আনমনে তার উপর গিয়ে মৃদু পায়ে চু-কিতকিত খেলতে শুরু করে আগমনী। এ খেলায় হার জিতের বালাই নেই। ফলে খেলার দিকে খেয়াল না রেখেই খেলা যায়৷
ছবিগুলো একটা একটা করে উলটে দেখছিল একটা ধপধপে সাদা বিড়ালের ছবি চিনতে পারে। এই বিড়ালটা ছোটবেলায় ওর পায়ের কাছে বসে থাকত। গম্ভীর মুখে সারাদিন কী যেন জটিল অঙ্ক ভাবত। মাঝে মাঝে উত্তর মিলে গেলে খুশি হয়ে ওর পায়ে মাথা ঘষে দিত। বিড়ালটারও এতদিন বেঁচে থাকার কথা নয়। কে জানে কবে মারা গেছে…ও খেয়াল রাখেনি। বিড়ালরা নাকি মরে যাওয়ার আগে প্রিয় মানুষের থেকে দূরে চলে যায়। মানুষের সময় হয়ে এলে মনে হয় ও এমনি এমনিই চলে যায়…
উলটে উলটে কয়েকটা স্কুল জীবনের ছবি দেখতে পায় ও। ক্লাস ফাইভ সিক্সে পড়ত মনে হয়। চশমা নেই মানে এইটের আগে। কিছু কিছু মুখ চেনা লাগে, মাঠের মধ্যে এক দঙ্গল ছেলেমেয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে। গায়ে একটা লালচে সোয়েটার। কখনও গ্রুপ ফটো। ঝাপসা উঠেছে ছবিটা। সেকালে চাইলেই এক পোজে আঠেরোটা ছবি উঠত না। ছবি ঝাপসা উঠলে আজীবন ওই স্মৃতিটা ঝাপসাই থেকে যেত।
একটা ব্যাপার খেয়াল করে আগমনী। সেকালে ক্যামেরার ক্ষমতা তেমন জোরদার ছিল না বলে উজ্জ্বল আলো কিংবা রোদের মধ্যেই ছবি তুলতে হত। ফলে সব ছবিতেই মানুষকে হাসিখুশি লাগত। সবই যেন হাসতে খেলতে আনন্দের দিনে তোলা। এখন মানুষ অল্প আলোয় আর রিলের চিন্তা না করেই ছবি তুলতে পারে বলে দুঃখটাকেও ধরে রাখতে পারে।
পরের ছবিটা উলটে দিতে যাচ্ছিল। কী মনে হতে থেমে যায়। হাতে ধরা ছবিটার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে য় থাকে। আস্তে আস্তে ওর ভুরু কুঁচকে যায়।
ছবিটা একটা মাঠ কিংবা পার্কের। সম্ভবত স্কুল থেকে কোনও পিকনিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। চারদিকে খয়েরি গাছপালার সার। ছবির একেবারে মাঝখানে পাঁচজন ছেলেমেয়ে একে অপরের কাঁধে হাত রেখে হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে। হাসিটা যে মেকি, সেটা একবার দেখলেই বোঝা যায়। সবার গায়ে নীল ইউনিফর্ম। তার মধ্যে একেবারে বাঁদিক থেকে দু’নম্বরে দাঁড়ানো নিজেকে চিনতে পারে আগমনী। কিন্তু বাকি চারজন!…
একটা অদ্ভুত ভাবনা খোঁচা দিতে থাকে আগমনীর মাথায়। যেভাবে কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে, তাতে মনে হচ্ছে ওর এককালের অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিল এরা। কিন্তু আগমনীর এদের কারো মুখ মনে পড়ছে না। যেন আদো কে আদৌ কোনওদিন দেখেইনি এদের। আশ্চর্য!
‘আজব তো!’ ঠোঁটের কোণে মিনমিন করে উচ্চারণ উচ্চারণ করে আগমনী ‘তোদের একদম মনে পড়ছে না কেন বল তো?’
চু-কিতকিত থামিয়ে মনে মনে হিসেব করে আগমনী। স্কুলড্রেস দেখে বোঝা যায় ছবিটা ক্লাস ইলেভেন বা টুয়েলভের। তাই যদি হয় তাহলে ছবিটা মাত্র বছর পনেরো আগের। এর মধ্যে এত অন্তরঙ্গ বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো স্মৃতির ছিটেফোঁটাও মাথার মধ্যে থাকবে না!
সম্ভবনাগুলো খতিয়ে দেখে ও। তাহলে কি এরা তেমন ভালো বন্ধু ছিল না? সেটা ভাবতে গিয়েও খোঁচা খায়। নাহ্, ওর মাথার মধ্যে লুকিয়ে কেউ ক্রমাগত উলটো কথা বলছে ওকে। এদেরকে ও চেনে, ভীষণ ভালো করে চেনে।
বাকি ছবিগুলোও এক ঝলক দেখে নেয় আগমনী। স্কুলের ছবি আর নেই। ইলেভেন, টুয়েলভ—এই দু-বছরের ছবি বলতে এই একটাই। আগে পরে আর কিচ্ছু নেই।
ছবিটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে ও। ছবির পেছনদিকটা উলটে দেখে। সেখানে কালচে মোটা আস্তরণের একটা ছোপ আছে। সেই সঙ্গে পেনের কালিতে খুদে খুদে অক্ষরে যে ক্যামেরায় ছবিটা তোলা তার নাম লেখা আছে।
সে সময়ে যে স্টুডিও থেকে ছবি ডেভেলপ করা হত, তারা আইডেন্টিফিকেশনের সুবিধার জন্য মাঝে মাঝে প্রিন্টেড ছবির পেছনে ক্যামেরার নাম লিখে রাখত।
সারদাময়ী দেবী উচ্চ বিদ্যালয়। এই স্কুলেই ও ইলেভেন টুয়েলভ পড়েছে। পিওর সাইন্স, বায়োলজি অপশনাল সাজেক্ট। প্রথম যেদিন স্কুলে গেছিল সেদিনের কথা এখনও স্পষ্ট মনে আছে। প্রথম ইউনিট টেস্টে ফিজিক্সে চল্লিশে বাইশ পেয়েছিল, সেটাও মনে পড়ছে। কিন্তু তারপর থেকে…
একবার ঘড়ির দিকে তাকায়। মনের ভিতর অস্বস্তিটা বেড়ে ওঠে সেই সঙ্গে। ওভারথিঙ্ক করছে কি? হাইপারটেনশন থেকে হচ্ছে ব্যাপারটা?
মোবাইলটা বের করে একটা নাম্বার ডায়াল করে আগমনী। ওপাশ থেকে রিং হওয়ার কিছুক্ষণ পরেই এক মহিলার গলা শোনা যায়, ‘হ্যাঁ মণি, বল।’
মণি আগমনীর ডাকনাম। ওর স্কুল আর কলেজ জীবনের বেশিরভাগ বন্ধুই ভালো নামের বদলে ওকে ডাকনামে চেনে৷
‘আচ্ছা আমার ক্লাস ইলেভেনে পড়ার সময়কার কোনও ছবি আছে তোর কাছে?’
প্রশ্নটা শুনে ওপাশের মানুষটা খানিক থমকে যায়। তারপর ভেবেচিন্তে বলে, ‘তোর ছবি আমার কাছে থাকবে কেন?’
‘মানে ধর, আমরা একসঙ্গে কোথাও ঘুরতে গেছিলাম, বা ধর…’
‘ঘুরতে।’ ওপাশের মানুষটা এবার একটু অভিমানের গলায় বলে, ‘ক্লাস টেনের পর আমার সঙ্গে আদৌ দেখা করেছিস তুই?
‘করিনি?’
‘কেন তোর মনে নেই? প্রথম কয়েকমাস কাকিমার নম্বরে ফোন টোন করতাম। তারপর তোর কী যেন হল, যোগাযোগই রাখতিস না। স্কুল পাল্টানোর আগে কত বড় বড় ডায়ালগ দিয়েছিলি, নতুন স্কুলে গিয়ে সব ভুলে গেলি হারামি!’
আগমনী কোনও উত্তর দেয় না। ওপাশ থেকে এবার প্রশ্ন ভেসে আসে, ‘কিন্তু এতদিন পরে তুই ছবি দিয়ে কী করবি?’
‘একটা জিনিস হঠাৎই খেয়াল করলাম জানিস…’
‘কী?’
‘ইলেভেন, টুয়েলভ এই দুটো ক্লাসের কোনও বন্ধুর স্মৃতিই ঠিকঠাক মনে পড়ছে না আমার। ওই সময়ের কোনও বন্ধুর নামও মনে নেই। স্ট্রেঞ্জ না?’
ওপাশের মানুষটার গলায় তাপ-উত্তাপ দেখা যায় না, ‘সে হতেই পারে। দু’বছরে কতই বা আর বন্ধু হয়। তাছাড়া ইলেভেনে উঠে হঠাৎ করে পড়ার চাপ বেড়ে যায়। তার উপর তোর তো সায়েন্স ছিল।’
‘উঁহু, বন্ধু ছিল, স্মৃতি ছিল, আরও কিছু একটা ছিল। কিন্তু আমার কিচ্ছু মনে পড়ছে না!’
ফোনটা কেটে টেবিলের উপরে রেখে দিয়ে কিছুক্ষণ মাথার রগ ধরে বসে থাকে আগমনী। ঝিমঝিম করে মাথাটা। বাইরে থেকে এখন ট্রাফিকের আওয়াজ আসছে। অফিসে বেরোনোর সময় পেরিয়ে যেতে শুরু করেছে। ফাঁকা ঘরের ভিতর থেকে যেন এই মাত্র কেউ বেরিয়ে গেল। আরও খালি হয়ে গেল ঘরটা।
আবার ফোনটা হাতে তুলে নেয় আগমনী। কল লিস্টের পেছন দিকে গিয়ে অপরাজিতার নম্বরটা ডায়াল করে।
‘অফিসে বেরিয়ে গেছিস?’
‘হ্যাঁ, এই ঢুকব। কেন তুই তো আসবি না?’
‘না, ডে অফ।’ চিন্তিত গলাতেই বলে আগমনী, ‘শোন, আমি না একটা ঝামেলায় পড়েছি। আমার মাথাটা…’
‘শরীর খারাপ লাগছে নাকি তোর?’ অপরাজিতার গলায় উদ্বিগ্নতার ছাপ পড়ে। ক’দিন হল মেয়েটার শরীর ভালো যাচ্ছে না। হাঁপানিটা বেড়েছে। কলেজ জীবনের রুমমেট এই মেয়েটা এখন ওর অফিস কলিগ। তবে ইদানীং আগমনীকে নিয়ে দুশ্চিন্তাই হয় অপরাজিতার। মেয়েটা একটু খ্যাপাটে গোছের। মাঝে মধ্যেই মাথায় বিচিত্র হুজুক চাপে৷
‘না, শরীর নয়। কিন্তু আমার মেমোরিটা…’ আগমনীর গলা উদ্ভ্রান্তের মতো শোনায়।
‘কী বলতে চাইছিস?’
নিজেকে একটু গুছিয়ে নেয় আগমনী। চেয়ারের উপরে সোজা হয়ে বসতে বসতে বলে, ‘মা মারা যাওয়ার আগে আমাকে একটা ছবি পাঠিয়েছে। ছবিটার কথা আমার এতদিন মনেই ছিল না।’
‘তাতে কী হয়েছে?’
‘স্কুল লাইফের ছবি। আমার সঙ্গে আরও চারটে বন্ধু। প্রবাবলি এক্সকারশনে গেছি। আমার মন বলছে, এই চারজন বন্ধুর সঙ্গে আমার কিছু মূল্যবান স্মৃতি জড়িয়ে আছে। কিন্তু কী স্মৃতি সেটা কিছুতেই মনে পড়ছে না!’
‘পাসিং ফেস হয়ত। স্কুল লাইফের ওরকম কত বন্ধু ছিল…’
‘না রে, আমার মন খালি বলছে একসঙ্গে একটা বড়সড় কিছু করেছিলাম আমরা। অসম্ভব কিছু। কিন্তু সেটাকে কেউ যত্ন করে মাথা থেকে মুছে দিয়েছে।’ আগমনীর গলাটা এই ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই যেন বদলে গেছে। নিজের মনের উপর একটু একটু করে নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেও।
‘কী করেছিলি?’
টেবিলে ঘুসি মারে আগমনী, ‘সেটাই তো মনে পড়ছে না ভাই। মনে করতে চাইলেই মাথার ভিতরটা ঝিমঝিম করে উঠছে।’
‘আই অ্যাম শিওর, তুই কাল রাতে স্বপ্নে স্ট্রেঞ্জার থিংস বিঞ্জ করেছিস। এখন যেটা হচ্ছে সেটা স্বপ্নদোষ৷’
‘আহ্, আমি ইয়ার্কি মারছি না অপু!’
অপরাজিতার গলা ঘন হয়ে আসে, ‘আচ্ছা একটা কথা বল, শুধু এই চারজনের কথাই মনে পড়ছে না, নাকি ওই দু’বছরের কিছুই মনে নেই?’
একটু সময় নেয় আগমনী, তারপর বলে, ‘এই পার্কে যাওয়ার কথা হালকা মনে পড়ছে। স্কুলটাও স্পষ্ট মনে আছে৷ বিল্ডিংটার রং লাল ছিল। ভিতরে সাদা সাদা দেওয়াল। বাইরে গার্ডওয়াল। প্রথম দিন স্কুলের গেট দিয়ে ঢুকছি, স্কুল থেকে ফিরে আলু পোস্ত দিয়ে মেখে ভাত খাচ্ছি। নাহ্, বাকি সব মনে আছে। কিন্তু এই চারজন…’
অপরাজিতা অফিসের গেট পেরিয়ে ভিতরে ঢুকছে, চারপাশের আওয়াজ কমে এসেছে। এতক্ষণ গলা তুলে কথা বলছিল ও, এবার আর তার দরকার পড়ে না, ‘দেখ, আমি শুনেছিলাম আমাদের ব্রেন ইচ্ছা করেই অনেক কিছু ভুলে যায়। বিশেষ করে এমন কিছু মেমোরি যা আমাদের মনকে যন্ত্রণা দেয়। হতে পারে এই চারজনের সঙ্গে তোর এমন কিছু স্মৃতি আছে যেটা তোর মাথা ইচ্ছা করে ভুলে গেছে। তোর ইলেভেন টুয়েলভের কোনও বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ নেই?’
‘উঁহু…’
‘কোনও স্যার বা ম্যাম?’
‘নাহ্…’ খানিক ভাবে আগমনী, ‘বছরখানেক আগে হোয়াটস অ্যাপে স্কুলের গ্রুপে অ্যাড করেছিল কেউ। একগাদা মেসেজ আসত বলে আমিই সেখান থেকে লিভ করে গেছি৷ তাছাড়া সেখানে আমাদের ব্যাচের লোক কম। পনেরো বছর আগে পাস করে স্কুল থেকে বেরিয়ে গেছি।’
‘তুই নিজের একটু যত্ন নে বরং। কাল তো আসছিস। সামনাসামনি কথা বলা যাবে এই নিয়ে।
আগমনীর সেদিন আর সিনেমা দেখা হয় না। সারাটা দিন একটা বিচিত্র ঘোরের মধ্যে কেটে যায়। কাজকর্মের ভিড়ে ফিরে এসে মাঝেমধ্যেই উলটে পালটে ছবিটা দেখে। উলটোপিঠেও কিছু লেখা নেই। ছবিতে দূরদূরান্ত অবধি আর কোনও মানুষও দেখা যাচ্ছে না৷
কিন্তু…একটু একটু করে মুখগুলো চেনা লাগতে শুরু করেছে কি? যেন স্মৃতির মাঝখানে একবার করে ভেসে উঠে আবার মুখে দেওয়া হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো হারিয়ে যাচ্ছে।
ছবিতে দাঁড়িয়ে থাকা চার বন্ধুর দিকে আবার একবার তাকায় আগমনী, মুখগুলোর উপর হাত বুলাতে বুলাতে অস্ফুটে বলে, ‘নাম কী বল তো তোদের?’
ছবিতে ওর ঠিক ডানপাশে দাঁড়িয়ে আছে একটা ছেলে। একটু গোলগাল গড়নের। চোখে মোটা পাওয়ারের চশমা। চুলগুলো কপালের উপর ঝুঁকে পড়েছে। পড়াকু গোছের এক ধরনের ছেলে হয় না, এ এক্কেবারে তাই।
বাঁদিকে আবার পরপর দুটো ছেলে। তাদের একজনের চেহারায় যত্নের ছাপ। দেখে বোঝা যায় অবস্থাপন্ন বাড়ির ছেলে। তবে ভয়ঙ্কর রোগা। এরও চোখে চশমা, কিন্তু চৌকো স্টাইলিস ফ্রেমের। খানিক কায়দা করে মাথার চুলগুলো স্পাইক করার চেষ্টা করেছে। সরু খুঁতনি।
পাশের ছেলেটা অস্বাভাবিক রকম লম্বা। মিষ্টি চেহারা। মুখের মধ্যে বুদ্ধির ছাপ আর মিহি দাড়ির রেখা আছে।
একেবারে ডানদিকের মেয়েটার মুখটা ভারি অদ্ভুত। হাসি মুখে ক্যামেরার দিকে চেয়ে আছে সে। মুখটা লম্বাটে গড়নের। মাথা ভর্তি কোঁকড়ানো চুল। চোখের দৃষ্টিতে কেমন মায়াবি ঘোলাটে ভাব। যেন ওইভাবে আগমনীর দিকে অনেক কাল ধরে তাকিয়ে আছে ও।
পাঁচজনের মধ্যে একটাই মিল। এরা সবাই ক্যামেরার দিকে চেয়ে হাসছে। তাতে অস্বাভাবিক কিছু নেই। কিন্তু…
এর মাঝে একবার কলেজের বান্ধবী শ্রীতমাকে ফোন করে আগমনী, ‘হ্যাঁরে, তোকে আমি কখনও আমার স্কুলের কথা কিছু বলেছি?’
‘উহু…..
একটা জিনিস ধীরে ধীরে উপলব্ধি করে আগমনী। এই দেড় বছর ও প্রায় কারো সঙ্গেই তেমন যোগাযোগ রাখেনি। নতুন স্কুলে ভর্তি হয়ে মাসখানেক পরে সবাইকেই যেন ভুলে গেছিল।
আগমনী যখন ক্লাস ফাইভে পড়ে তখনই ওর বাবা মারা যায়। একমাত্র মা কিছু জানলেও জানতে পারত। কিন্তু তার কাছেও এখন কিছু জিগ্যেস করার উপায় নেই।
—তুই স্কুলের কথা কিছু বলতে চাইতিস না।’ ওপাশ থেকে শ্রীতমার গলা শোনা যায়, ‘মাঝেমধ্যে মনে হত তুই আদৌ ইলেভেন টুয়েলভে পড়িসনি। টেন থেকে একেবারে লাফ মেরে কলেজে উঠেছিস।’
চট করে হিসেব করে নেয় আগমনী। ইলেভেন টুয়েলভ মানে দু’হাজার নয় আর দশ। ইন্টারনেটে সার্চ করে দেখে দু’হাজার ন’য়ে ‘থ্রি ইডিয়েটস’ রিলিজ করেছিল। আগমনীদের লোকাল কেব্ল চ্যানেলে হল প্রিন্ট ভার্সনটা চালিয়েছিল একটা রবিবার। নাহ্, সে বছরের অন্য স্মৃতি ওর মনে আছে। শুধু স্কুল আর এই ক’জন বন্ধুর স্মৃতি ম্যাজিকের মতো গায়েব হয়ে গেছে…
মাঝরাতে ঘুমটা ভেঙে যায় আগমনীর। ওর মনে হয় কাচের জানলায় এইমাত্র হাত রেখে কেউ ওকে ডাকার চেষ্টা করছিল। ও ঘুম থেকে উঠবে না ভেবে ফিরে গেছে।
কথাটা মনে হতেই জানলার দিকে মুখ তুলে তাকায় আগমনী। ঘরের ভিতরে এসি চলছিল বলে স্লাইডিং জানলার কাচে বাস্প জমা হয়েছে। সেই দিকে তাকিয়ে দেখে সত্যি সত্যি জানলার কাচে একটা হাতের ছাপ। যেন এইমাত্র কেউ ওখান থেকে হাত সরিয়ে নিয়েছে।
অবাক হয় আগমনী। বিছানা থেকে উঠে গিয়ে জানলার সামনে একবার দাঁড়ায়। কোথাও কিছু নেই। কেবল দূরে রাতের শহর ঘুমিয়ে রয়েছে। ওর ফ্ল্যাটের ঠিক নিচে একটা আপাদমস্তক চাপা দেওয়া ভিখারির পাশে একটা কুকুর নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। এত দূর থেকেও বুঝি তার নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যায়। অকারণেই মনটা বিষণ্ণ হয়ে যায় আগমনীর। মনের ভুল তাহলে। কেউ ডাকেনি ওকে।
বিছানার উপর থেকে রিমোট নিয়ে এসিটা বন্ধ করে দেয় ও। তারপর ঘরের বাইরে পা ফেলে বারান্দায় বেরিয়ে আসে।
বারান্দার ভেতর বেখেয়ালি হাওয়া খেলা করছে। মৃদু চাঁদের আলো ঝলসে উঠছে থেকে থেকে। হঠাৎ আগমনীর মনে হয় রাস্তা থেকে কেউ বুঝি তাকিয়ে আছে ওর বারান্দাটার দিকে। ঠিক যেমন করে ছোটবেলার বন্ধুরা বিকেল হলে তাকিয়ে থাকত ওর বাড়ির দরজার দিকে।
‘মণি, চল খেলতে যাই…’ কেউ কি ডেকে উঠল?
ওই তো…একটা স্কুল ড্রেস পরা বাচ্চা ছেলে শিস দিতে দিতে রাস্তা দিয়ে চলে গেল না? দূর থেকে কলিং বেলের আওয়াজ হল? নাকি ক্লাস শেষের ঘণ্টার শব্দ ওটা?
বারান্দায় দাঁড়াতে আর ভালো লাগে না। পা চালিয়ে ঢুকে আসে ঘরের ভিতর। কীসের যেন তাড়া লেগেছে ওর।
স্টাডি টেবিলের ড্রয়ারে হাত চালিয়ে দেয় আগমনী। কয়েকটা রং পেন্সিল বার করে আনে। তারপর মোহগ্রস্তের মতো এগিয়ে যায় দেওয়ালের দিকে।
আনমনে কী যেন লেখে দেওয়ালে। একটা লাইন, দুটো লাইন, তিনটে… দেওয়ালের নানা জায়গায় একটার পর একটা শব্দ লিখে যেতে থাকে আগমনী।
ব্ল্যাকবোর্ডের উপর চকের মতো খসখস আওয়াজে পরিষ্কার দেওয়ালে লিখেই চলে। ফাঁকা ক্লাসরুমে, কোনও অস্তিত্বহীন ছাত্র-ছাত্রীরা পেছন থেকে এক মনে চেয়ে থাকে তার দিকে।
