তালদিঘিতে ভাসিয়ে দেব – ১০
দশম অধ্যায়
বাইকটাকে ক্যাফের সামনে দাঁড় করিয়ে থেকে কায়দা করে হেলমেট খোলে গৌরব। তারপর মুখটা ঘুরিয়ে একবার লুকিং গ্লাসে দেখে নেয়। দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা চিউইংগামে অকারণেই চাপ দেয়। জ’লাইন শক্ত হয়ে ওঠে তাতে। হেলমেটের চাপে সামনের চুলগুলো নুয়ে পড়েছিল। পকেট থেকে চিরুনি বের করে মাথার চুলগুলো ভুট্টার খেতের মতো খোঁচা খোঁচা করে। হ্যাঁ, এইবার খোলতাই লাগছে চেহারাটা। খুশি হয় গৌরব।
গৌরব দেখেছে, মেয়েদের মুখে সুন্দর হওয়ার মতো বিস্তর যন্ত্রপাতি আছে। মেকআপের কলকাঠি নেড়ে নিজেকে ইচ্ছেমতো সাজিয়ে নিতে পারে তারা। ছেলেদের ক্ষেত্রে অস্ত্র মাত্র তিনটে, লম্বাটে চেহারা, খোঁচা হয়ে উঠে থাকা চুল আর একেবারে ছুরির ফলার মতো জ’লাইন। মুশকিল হল এই তিনটেই জন্মগত।
ছবি তোলার সময় গৌরব দাঁতে দাঁত চেপে থাকে। কারো সঙ্গে ডেটে যেতে হলে মুখ টানটান করে থাকে। কথা যত পারে কম বলার চেষ্টা করে। তাতে একটা ভারিক্কি ভাবও আসে, আবার জ’লাইনও বিগড়োয় না৷
বাইকের চাবি বন্ধ করে চারপাশটা দেখে নিল গৌরব। এই গরমের মধ্যেও লেদারের জ্যাকেট পরেছে বলে গায়ে বিশ্রী একটা অনুভূতি হচ্ছে। তবে বাইকের সঙ্গে এই জ্যাকেটটা যায় ভালো। ছোট পকেট থেকে পারফিউমটা বের করে গায়ে বুলিয়ে নেয়। ফার্স্ট ইমপ্রেশন ইজ লাস্ট ইমপ্রেশন। বিজ্ঞাপনে দেখা যুবরাজ সিং-এর মতো এক মানুষ পা তুলে বাইক থেকে নেমে আসে ও। তারপর কোমর দুলিয়ে ঢুকে যায় ক্যাফের ভেতরে। মেয়েটা কি ইতিমধ্যে এসে গেছে? ক্যাফেতে ঢুকেও মেয়েটাকে দেখতে পায় না গৌরব। পা বাড়িয়ে কাচের দেওয়ালের ধারে একটা সিটে গিয়ে বসে পড়ে৷
ক’মাস আগে থেকেই ব্যাদা দিয়া সেন, দিয়া সেন করে একরকম মাথা খারাপ করে দিচ্ছিল। এই মুহূর্তে বেদান্তের জীবনে মোট দুটো টার্গেট। এক দিয়া সেন, আর দুই একটা গান শোনার এমপিথ্রি প্লেয়ার। সাম্য একবার দোকানে গিয়ে সে জিনিসের দামদস্তুরও করেছিল। কিন্তু দাম দেখে ছিটকে পালিয়ে এসেছে। এই বর্ষায় একবারও অনলাইন হয়নি মেঘা। ফলে সাম্যর মন এমনিতে খারাপই থাকে। তার উপর কানের কাছে ব্যাদার টিকির টিকির আর সহ্য হচ্ছিল না।
মাসখানেক আগেই ইলেভেন পাস করে টুয়েলভে উঠেছে ওরা। নহর ওর শরীর খারাপের ব্যাপারটা আগমনী আর সাম্যকে জানাতে বারণ করেছিল। বলেছিল ওরা দুজন নাকি মনের দিক থেকে একটু নরম। অকারণে বেশি মন খারাপ করবে।
বেদান্ত কথা চেপে রাখতে পারে ভালো৷ এমনকী সাম্য অবধি ওর পেটের ভেতর থেকে এই গোপন খবরটা বার করতে পারেনি। তবে এ বছর বেচারার পরীক্ষার রেজাল্ট আগেরবারের মতো ভালো হয়নি। সেটা নিয়ে অবশ্য ওর খুব একটা চিন্তাও নেই। ট্রয়লেভ পাস করে কোনওরকমে একটা টিউশনি ফট করে জোগাড় হয়ে গেলেই হল। বাদবাকি ও নিজে বুঝে নেবে।
ইলেভেনের ফাইনাল পরীক্ষার পর মাসখানেক আর তেমন দেখা হয়নি ওদের। তবে নহর আর আগমনী মাঝে মধ্যেই নিজেদের মধ্যে দেখা করেছে। ওরা দুজনেই মেয়ে বলে রাস্তায় কেউ দেখে ফেলে সন্দেহ করার ভয় নেই।
আগমনী নহরকে ওর মায়ের গল্প শোনায়, ওর তালদিঘির গল্প শোনায়। ওর বাবার কথা যেটুকু মনে পড়ে শোনায়। পুরোনো স্কুলের কথা বলে কখনও। নহর চুপ করে শুনে যায় সব। কখনও শুনতে শুনতে অন্যমনস্ক হয়ে কী যেন ভাবে। তবে আগমনী লক্ষ করেছে, নহর নিজের ব্যাপারে খুব বেশি কথা বলতে চায় না। জিগ্যেস করলে মিটিমিটি হাসে, কখনও তেমনই হাসির ফাঁকে বলে, ‘ধরে নে পরে বলব।’
‘আর কবে বলবি? এক বছরও নেই হাতে। তারপর তো স্কুল ছেড়ে দেব!’
নহর কেমন রহস্যময় হেসে বলে, ‘তারপরেই বলব বলে জমিয়ে রাখছি সব।’
মাঝে মাঝে নহরের কথার মানে বুঝতে পারে না আগমনী। তবে এটুকু বোঝে নহর শুধু শুধু কোনও কথা বলে না। ওর কথার আলাদা কিছু মানে আছে। কেবল সেটা বোঝার মতো বুদ্ধি এখনও হয়নি আগমনীর।
তবে দিয়া সেনের দাদাকে খুঁজে বের করার এক অভিনব পন্থা বের করেছিল সাম্য। ব্যাপারটা হুট করেই ওর মাথায় আসে। ওদের ইলেভেনের টেস্ট চলার ঠিক আগেই ওর বাবা একটা নতুন এলআইসি পলিসি শুরু করেন। সেটার জন্য ভোটার কার্ডের নম্বর দরকার ছিল। এদিকে বাবা ক’দিন হল ভোটার কার্ড খুঁজে পাচ্ছেন না। এক অনলাইন থেকে ভোটার কার্ডের নম্বর বের করা ছাড়া আর উপায় নেই। কিন্তু সে উপায় জানা নেই বাবার। সাম্য একদিন সাইবার ক্যাফে থেকে ফেরার পথে একরকম কৌতূহলের বশেই বিকাশকে জিগ্যেস করেছিল, ‘আচ্ছা বিকাশদা, ভোটার কার্ড হারিয়ে গেলে নম্বর বের করা যায়?’
‘যাবে না কেন? নিজের আর বাপের নাম জানলেই হবে।’
সাম্যর কৌতূহল আরও বেড়ে উঠতে বিকাশ ওকে সবটা বুঝিয়েছিল। সিইও ওয়েস্ট বেঙ্গল বলে একটা সাইটে গিয়ে নিজের নাম আর বাবার নাম দিয়ে সার্চ করলেই ভোটার লিস্টে নিজের নাম আর ছবি চেক করা যায়। খুশি মনে বাড়ি ফিরে বাবাকে ভোটার নম্বর বের করে দিয়েছিল সাম্য।
এবং তার পরেই বন্য আইডিয়াটা মাথায় আসে। বেদান্তর যখন দিয়া সেনের দাদা আর বাবার নাম মনে আছে তখন তাদের বাপের ভোটার কার্ডও বের করা যাবে। আর সেখান থেকে তাদের ছবি আর ঠিকানা। দিয়া সেনের অবশ্য আঠারো হয়নি, কিন্তু তার দাদার নির্ঘাত হয়েছে।
আর দেরি করে না সাম্য। পরের দিন সাইবার ক্যাফেতে গিয়ে খানিক খোঁজাখুঁজির পর মোট গোটাচারেক শাশ্বত সেনের ছেলে গৌরব সেন বের করে সাম্য। তাদের ঠিকানা আর ছবি মিলিয়ে মোট চারটে গৌরব সেনের অরকুট প্রোফাইল বের করে। ছবি মিলিয়ে বেদান্তকে একবারও জিগ্যেসও করেছিল, ‘হ্যাঁ রে, তোর এই দিয়া সেনের দাদাকে কেমন দেখতে?’
ব্যাদা একটুও না ভেবে উত্তর দিয়েছিল, ‘পাক্কা শুয়োরের বাচ্চার মতো।’
সাম্য হতাশ হয়ে উপায়ান্তর না দেখে বেদান্তকেই টেনে এনেছিল সাইবার ক্যাফেতে। তার মধ্যে ‘বাইকার গৌরব’কে দেখেই টেবিলের উপর ঘুষি মেরেছিল বেদান্ত, ‘এই তো শুয়োরের বাচ্চাটা, দেখলেই মনে হয় কেলিয়ে দিই।’
কিন্তু ছেলেটার ছবি দেখে খানিক ঘাবড়েছিল সাম্য। দেখেই বোঝা যায় জিমফিম করে। তাছাড়া কোনও একটা বাইকার গ্যাং-এর মেম্বার। হাঁক দিলে আরও পাঁচটা এরকম গুমসো ছেলে তেড়ে আসবে। ওকে রাস্তাঘাটে বাংলা মার দেওয়া যাবে না।
সাম্য অন্য একটা পন্থা নিল। আগমনীর একটা অর্কুট প্রোফাইল খোলা হল। তারপর ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানো হল বাইকার গৌরবকে। সুন্দরী মেয়ের পাঠানো ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট সঙ্গে সঙ্গে অ্যাকসেপ্টেড।
কিছুদিন ধরে ছেলেটাকে খেলায় আগমনী। তার সঙ্গে একটা আধো প্রেম প্রেম টাইপের রসালাপ করে। সেই করতে করতে মাঝে মাঝে মেজাজ গরম হয়ে যায় আগমনীর। হচ্ছে, করছে, যাচ্ছে, সবেতেই এইচ-এর বদলে ছয় লেখে। এত ছয় চার শেহওয়াগকেও মাঠে মারতে দেখেনি আগমনী।
একদিন বিরক্ত হয়ে ব্যাদাকে বলেই বসে, ‘এরকম আতাক্যালানে ছেলে জীবনে দেখিনি মাইরি। সারাদিন লং রাইডে যেতে চায় আর উইলির গল্প শোনায়।’
‘উইলি আবার কী?’
‘ওই যে বাইক চালাতে চালাতে একটা চাকা উপরে তুলে দেয়।’
ব্যাদা মুখ বাঁকায়, ‘তাতে অত বড়াই করার কী আছে? আরে কুত্তাও তো মোতার সময় একটা পা উপরে তুলে দেয়, অহঙ্কার করতে দেখেছিস? তুই ওর বোনের কেসটা বোঝার চেষ্টা কর। কোনও বয়ফ্রেন্ড টয়ফ্রেন্ড হয়নি তো?’
‘আগে প্রেম করে ওই লেভেলের ক্যালানি খেলে কেউ দাদার কাছে আবার গিয়ে প্রেমের গল্প শোনায়? তবে একটা ঝামেলা হয়েছে বুঝলি?’ ‘কী?’
‘ছেলেটা বলছে বুকের বাঁদিকে আমার নামে ট্যাটু করবে।’
‘তাতে তোর কীসের সমস্যা?’
‘আরে, আমি তো ওর বোনকে তোর সঙ্গে সাল্টে দিয়ে হাওয়া হয়ে যাব। তখন ট্যাটুটার কী হবে?’
ব্যাদার মুখ রাগত দেখায়, ‘ওই চামড়া কেটে এনে প্র্যাক্টিকাল খাতায় স্টিকার করে লাগাবি। শালা, তোর ওই মালটার জন্য এত সহানুভূতি কেন ভাই?’
আগমনী হাসে, ‘আসলে আমার একবার শখ হয়েছিল ট্যাটু করানোর। কারো নাম-ফাম নয়, আঙুলের পাশে কালো তরোয়াল। মাকে ভয়ে বলতেই পারিনি।
ব্যাদা কী যেন ভাবে। তারপর ব্যাগ থেকে কালো মার্কার পেন বের করে এনে বলে, ‘দে, হাতটা দে।’
আগমনী হেসে ফেলে, বাঁ-হাতের বুড়ো আঙুলটা বাড়িয়ে দিতে দিতে বলে, ‘করে লাভ কী? স্নান করলেই উঠে যাবে তো।’
ব্যাদা ওর হাতে তরোয়াল আঁকতে আঁকতে ভারিক্কি গলায় বলে, ‘আবার পরের দিন এঁকে দেব, একেবারে এটার মতোই হবে। দেখে বোঝা যাবে না৷ চিন্তার কী আছে?’
‘আর কলেজে ওঠার পর?’
ব্যাদা প্রশ্নটায় তেমন আমল দেয় না, ‘যারা ট্যাটু করায়, তাদের দেড় বছরের বেশি এক ট্যাটু আর ভালো লাগে না। তখন অন্য কিছু এঁকে নিস।’
আগমনীর মনে অবশ্য এই প্রশ্নটা হামেশাই আসে। এখন ওদের রোজ দেখা হচ্ছে। স্কুলের পরেও এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়িয়ে বেশ খানিকটা সময় কাটায়। কিন্তু স্কুল শেষ হয়ে গেলে কলেজ তো আর এক হবে না। তখন কি যোগাযোগ কমে আসবে ওদের? একদিন খানিক চিন্তিত হয়েই খুঁটিকে জিগ্যেস করেছিল, —ভাই, তুই কোন কলেজে পড়বি?’
খুঁটি অনেক খতিয়ে ভাবার পর পট করে উত্তর দিয়েছিল, ‘মৌসুমি যে কলেজে পড়বে।’
কপাল চাপড়েছিল আগমনী, ‘শালা, এই পাগল প্রেমিকে নিয়ে আমি যাই কোথায়? ‘সাবজেক্ট এক না হলে কী করবি?’
খুঁটি না ওঠা দাড়ি চুলকে গম্ভীর গলায় বলেছিল, ‘সাবজেক্টের মিলটা বড় কথা নয় মণি। মনের মিলটা…’
ছেলেটা দিনদিন কেমন হ্যাল খেয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে বিরক্তি লাগে, আবার কখনও হাসিও পায়। এসব বিনোদন নিতে নিতেই বাইকার গৌরবের সঙ্গে চ্যাট করে আগমনী। ছেলেটা একেবারে বাপুজি কেকের থেকেও সস্তার ফ্লার্ট করে, ‘আজ বাইক চালাতে চালাতে তোমার কথা মনে পড়ছিল খুব। আহ্, তুমি যদি সামনে থাকতে…’
আগমনী ঘাবড়ে যায়, ‘সেকী! অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে উড়ে যেতাম তো!
‘আহা, পেছনে বসার কথা বলছি৷’
আগমনী দেখেছে কারো বাইকের পেছনে বসে তার পেটে কাতুকুতু দেওয়ার একটা উগ্র ভয়ঙ্কর ইচ্ছা থেকে থেকেই ওর মনে জাগে। স্বেচ্ছায় নিজের সর্বনাশ করার এমন ইচ্ছার সঙ্গে একমাত্র প্রেমে পড়ার ইচ্ছার তুলনা চলে। সেই জন্যেই মনে হয় সদ্য প্রেমে পড়া ছেলেরা প্রেমিকাকে বাইকের পেছনে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।
ছেলেটা ‘অনেকদিন ধরেই দেখা করার কথা বলছিল। আগমনী শেষে একদিন সম্মতি জানায়। ওদের স্কুলের মাঠের ঠিক সামনেই কিছুদিন হল একটা ক্যাফে খুলেছে। প্ল্যান হল সেখানেই ছেলেটার সঙ্গে দেখা করবে আগমনী। তারপর কিছু একটা লোভ টোভ দেখিয়ে সন্ধের দিকে স্কুলের মাঠে টেনে আনবে। সেখানে আগে থেকে নহর, খুঁটি, সাম্য আর ব্যাদা দাঁড়িয়ে থাকবে অস্ত্র হাতে অতর্কিতে পেয়ে ফেলে বাংলা মার দেওয়া হবে ছোকরাকে।
সব কিছু ঠিকঠাক হলে আগমনী মিনমিন করে একটা মেসেজ পাঠায় তাকে, ‘শোনো না, তোমার বোনকেও সঙ্গে নিয়ে এসো।’
‘বোন!’ বাইকার গৌরব অবাক হয়, ‘প্রথম দিন দেখা হচ্ছে। ও কেন যাবে?’
‘ওমা! তোমার বোন মানে তো আমারও বোন। দেখতে ইচ্ছা করতে পারে না?’
মেসেজটা দেখে এক চোট হেসে উঠেছিল সাম্য, ‘ওর ক্যালানিটা তোর ক্যালানি বলে খেয়ে নে। আমাদের ঝামেলা একটু কমে আর কী।’
তবে শেষ পর্যন্ত বোনকে নিয়ে আসতে রাজি হয়েছে গৌরব। কথা ছিল শুরুতে ওরা দুজনে বসে গল্প করবে ক্যাফেতে। বোন এসে ঢুকবে খানিক পরে।
মিনিটকুড়ি পরে ক্যাফের কাচের দরজাটা শব্দ করে খুলে যায়। আর সঙ্গে সঙ্গে গৌরবের মনটা তেল ভরা বাইকের ট্যাংকির মতো ভুটভুটিয়ে ওঠে। হ্যাঁ, এই মেয়েটাকেই তো অর্কুট ডিপিতে দেখেছে। এর সঙ্গেই তো রোজ কথা হয়। তবে দেখা করতে রাজি হলেও মেয়েটা এখনও অবধি ওকে ফোন নাম্বার দেয়নি৷ বাড়ির লোক কড়া, সব নাকি মেসেজ চেক করে।
গৌরব আর একবার ফোনের স্ক্রিনে নিজের মুখটা দেখে নেয়। স্পাইকটা একটু ঘেঁটে গেছে কি? মুখ টেনে চোয়াল শক্ত করে নেয় সে। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে হাতটা মেয়েটার দিকে লক্ষ্য করে বাড়িয়ে দেয়, ‘হাই! আমি গৌরব।’
লাজুক হাসে আগমনী। কাচের বাইরে একবার উঁকি মেরে দেখে নেয়৷ ক্যাফের ঠিক উলটোদিকের পাঁচিলের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে চারজন। মাঝে মাঝে উঁকি মেরে ভিতরের দৃশ্য দেখে নিয়েই আবার মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। আগমনী হাতের ইশারায় তাদের নিশ্চিন্ত করে। তারপর চেয়ারে বসে জলের গ্লাস থেকে খানিকটা জল খেয়ে আবার হাসে।
‘কী খাবে বলো?’ দাঁতে দাঁত চেপেই একটা অদ্ভুত স্বরে প্রশ্ন করে গৌরব।
‘তুমি যা খাবে…’ লাজুক হাসিটা মুখে মেখেই বলে আগমনী।
‘তুমি যা চাইবে, আমি তাই খাব…’
‘ক্যালানি।’ বিড়বিড় করে বলে আগমনী। ছেলেটা ভালো করে শুনতে পায়নি। মুখ তুলে বলে, ‘কী বললে?’
আগমনী ম্যানেজ দেওয়ার চেষ্টা করে, ‘না না, আসলে জ্যাকেটে ভালো লাগছে তোমাকে, বেশ একটা ইয়ে ইয়ে…’
জ’লাইন ভেঙে ছেলেটার মুখে একগাল হাসি ফোটে, ‘সত্যি? কী মনে হচ্ছে আমাকে দেখে?’
‘শুয়োর।’
‘অ্যাঁ!’
‘আই মিন পর্ক। পর্ক স্যান্ডুইচটা ভালো বানায় এরা। টেস্ট করে দেখতে পারো।’
ছেঁদো গল্প করতে করতে আগমনীর মাথাটা ভিতরে ভিতরে গরম হয়ে যায়। ঘাড়ের পেছন চুলকাতে শুরু করে। থেকে থেকে রাস্তার দিকে চেয়ে সিগানালের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে ও। মাঠ ঠিকঠাক অন্ধকার না হলে ছেলেটাকে সেখানে নিয়ে যাওয়া যাবে না। তাছাড়া মারধোর করলে আশপাশের লোক দেখতে পেলে সমস্যা হতে পারে।
মিনিট কুড়ি সেভাবেই মাথা গরম করার পর অবশেষে সিগনাল পায় আগমনী। মুখের ভিতরে পর্ক স্যান্ডুইচ চিবোতে চিবোতে বলে ওঠে, ‘ইয়ে, আমার তোমার সঙ্গে কিছু পার্সোনাল কথা ছিল।’
‘পার্সোনাল?’ ছেলেটার হাসি চওড়া হয়, ‘বলো না!’
চারদিকে একবার তাকায় আগমনী, ‘আসলে এখানে এত লোকজন, মন খুলে কিছু বলা…’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, চলো না একটু ফাঁকায় যাই।’
স্যান্ডুইচের ভিতর থেকে এক খণ্ড পর্ক টেনে নেয় আগমনী, তারপর গভীর চোখে সেদিকে চেয়ে বলে, ‘এই শুয়োরটাকে কাটার আগেও এটাই বলা হয়েছিল মনে হয়…’ গলা তুলে বলে, ‘সামনেই একটা মাঠ আছে৷ লোকজন আসে না, চলো…’
দুষ্টু হাসিতে ভরে যায় গৌরবের মুখ। ক্যাফের বিলফিল মিটিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে সে।
আগমনীকে ছেলেটার সঙ্গে মাঠের দিকে আসতে দেখেই ক্যাফের বাইরে থেকে মাঠের দিকে হাঁটা দেয় চারজন। এতক্ষণে মাঠ একেবারে ফাঁকা হয়ে গেছে। সন্ধের অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। ফাঁকা স্লিপটার গা বেয়ে সারাদিনের ধুলো ঝরে পড়ছে নিচে।
এর আগে কোনওদিন ছুটির দিনে স্কুলটাকে দেখেনি ওরা। একবার দেখলেই মনে হয় গোটা স্কুল বাড়িটা বুঝি মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে আছে। নহরের ইচ্ছা করে বাড়িটার গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে। ওর কানে কানে গিয়ে বলতে, ‘কাল আসব রে, চিন্তা করিস না।’
নহর জানে একদিন আর বলতে পারবে না কথাটা। একদিন শেষবারের মতো আসবে স্কুলে। তারপর আর কোনওদিন আসা হবে না।
একবার আগমনী বলেছিল, ‘অন্য কাউকে ছেড়ে আসা আর স্কুল ছেড়ে আসার মধ্যে বিস্তর ফারাক। খেলার মাঠ, প্রিয় মানুষ, প্রিয় খেলনা নিয়ে আমরা শেষ কবে খেলছি নিজেই বুঝতে পারি না। তারা হারিয়ে যাওয়ার অনেকদিন পরে বুঝতে পারি চলে গেছে। কিন্তু স্কুল ছেড়ে যাওয়ার একটা নির্দিষ্ট দিন থাকে। সেদিন শেষবারের মতো স্কুল ছেড়ে আসার সময় আমরা জানি আর কোনওদিন ফেরা হবে না। এই ইউনিফর্ম পরে ক্লাস করা হবে না। প্রেয়ার করা হবে না, প্লাস্টিকের বোতল নিয়ে ফুটবল খেলা হবে না…এ যন্ত্রণা একদম আলাদা।’
আপাতত সেই বিষণ্ণ স্কুল বাড়িটা পার করে মাঠের বেঞ্চগুলোর কাছে চলে আসে ওরা।
আগমনী আর গৌরবের এগিয়ে আসা ছায়াদুটোর দিকে চেয়ে চাপা গলায় নির্দেশ দেয় খুঁটি, ‘ওরা আসছে, কভার নে সবাই।’
নহরের পিঠ ব্যাগ থেকে চারটে হনুমান টুপি বের হয়। চারটেই সাম্য এদিক-ওদিক থেকে জোগাড় করে এনেছে। গরমের মধ্যে বিরক্ত মুখে সেই হনুমান টুপি পরতে পরতে সাম্য বলে, ‘লোকে বলে প্রেমে পড়লে মানুষ অন্ধ হয়ে যায়। তাই যদি হত তাহলে আজ আমাদেরকে হনুমান টুপি পরে ঘামতে হত না।’
নহর ওর মাথার পেছনে খোঁচা মারে, ‘ছেলেরা প্রেমে পড়লে এমনিতেই সারা বছর বাঁদর নাচ নাচে। তুই এখন থেকে প্র্যাকটিস কর।’
নিজের হাতের টুপিতে হালকা হাত বোলায় ব্যাদা, কিন্তু সেটা পরতে গিয়েই খুলে ফেলে, নাক সিটকে বলে ‘এহ্ কী দুর্গন্ধ! কাচিসনি নাকি?’
সাম্য সেদিকে কাঁচুমাচু চোখে তাকায়, ‘ওটা আমার দাদুর টুপি। দাদু গুড়াকু দিয়ে দাঁত মাজে তো, সেই রস গড়িয়ে গড়িয়ে টুপিতে পড়ে একটু-আধটু…’
ব্যাদা রেগে ওঠে, ‘এই দুর্গন্ধ মাল দিয়ে দাঁত মাজে। একটা ভালো টুথপেস্ট কিনে দিতে পারিস না?’
‘আহ্, ওটা একটা নেশা। গুড়াকু না পেলে দাদুর মন খারাপ হয়৷
‘বড় হওয়ার কী সুবিধা মাইরি…’ বিড়বিড় করে ব্যাদা, ‘আমরা দাঁত না মাজলে শুধু দাঁতে পোকা হত।’
ব্যাদা আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল। সাম্য হাত তুলে থামিয়ে দেয়। দুটো ছায়া এখন প্রায় কাছে চলে এসেছে। আগমনী একটু পিছিয়ে হাঁটছে। ছেলেটা কী যেন বকবক করতে করতে এগিয়ে আসছে।
‘তোরা ব্যাকআপে থাক। আমি কল দিলেই চলে আসবি।’ কথাটা বলে এগিয়ে যায় খুঁটি, ‘হাতের সব তাস একেবারে খেলে দিতে নেই।
ব্যাদা ঠোঁটের নিচে বিড়বিড় করে, ‘আমাদের হরতনের টেক্কাটা জোরে হাওয়া দিলেই না উড়ে যায়!’
গৌরব বেঞ্চের দিকে আরও কিছুটা এগিয়ে এসেছিল। হঠাৎ হনুমান টুপি পরে একটা অল্পবয়সি ঢ্যাঙ্গা ছেলেকে এগিয়ে আসতে দেখে একটু অবাক হয়। পাশ কাটিয়েই যাচ্ছিল। এমন সময় হঠাৎ করে দাঁড়িয়ে পড়ে ছেলেটা, দুহাতে আচমকা একটা ধাক্কা দেয়। অতর্কিত হামলার জন্য প্রস্তুত ছিল না গৌরব। সে দু-এক পা পিছিয়ে যায়, একটু ভেবলে গিয়ে বলে, ‘কী রে ভাই!’
ছেলেটা আবার ধাক্কা দিতে যায় ওকে। তার আগেই দুটো হাত ধরে নেয় গৌরব, ‘শালা, তুই গরমে হনুমানটুপি পরে আছিস কেন রে? পাগল ছাগল নাকি?’
‘তোর চোদ্দগুটি ছাগল…’ জোর গলায় কথাটা বলেই একবার পেছন ফিরে জিভ কাটে খুঁটি, আবার সামনে ঘুরে বলে, ‘ইয়ে…বোন বাদে৷ বোন ভালো…’
‘চাইটা কী তোর?’
‘কিছু পুরোনো হিসেব মেটানোর আছে তোর সঙ্গে।’
ছেলেটা কী যেন ভেবে ওর হাতদুটো নামিয়ে রাখে। ভুরু কুঁচকে বলে, ‘তোর বাবার কি পানবিড়ির দোকান আছে নাকি? তা হনুমান টুপি পরে নাচনকোঁদন করলে কি পয়সা আদায় হবে?’ কথাটা বলে আগমনীর দিকে ঘোরে সে, ‘চলো, আজ ফালতু ঝামেলা করার মুড নেই আমার…’
আগমনীর হাত ধরে পেছনে ঘুরতে যাচ্ছিল গৌরব। খুঁটি আবার ধাক্কা মারার চেষ্টা করে। কিন্তু তার আগেই ঘুরে দাঁড়ায় ছেলেটা। হাতটা হাওয়ায় সাপের মতো বাঁকিয়ে সপাটে একটা চড় মেরে দেয় গালে। খুঁটি চোখে অন্ধকার দেখে। পা টলে যায় ওর। শরীর থরথর করে কেঁপে ওঠে।
খুঁটিকে চড় খেয়ে কাঁপতে দেখে গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে ব্যাদা, ‘কল দেবে বলেছিল শালা। থাপ্পড় খেয়ে নিজেই ভাইব্রেশন মোডে চলে গেছে।’
ওর দেখাদেখি বাকি দুজনও বেরিয়ে এসে গৌরবের সামনে দাঁড়ায়। গৌরব একটু অবাক হয়, আগমনীর দিকে চেয়ে বলে, ‘এ তো দেখছি বানরসেনা নিয়ে এসেছে!’
সাম্য গর্জে ওঠে, ‘মুখ সামলে কথা বল শুয়োরের বাচ্চা। তুই জানিস
আমি কোন ফ্যামিলির ছেলে?’
ব্যাদা বিড়বিড় করে, ‘যে ফ্যামিলির দাদু গুড়াকু দিয়ে দাঁত মাজে।
পরিস্থিতি হাত থেকে পিছলে যাচ্ছে দেখে নহর চেঁচিয়ে ওঠে, ‘এই শালা, মায়ের দুধ খেয়ে থাকলে সামনে আয়।’
সাম্য ওর কাঁধে চাপড় মারে, ‘সামনেই তো আছে ভাই…তাছাড়া মায়ের দুধ কি মদ নাকি যে হেঁটে সামনে আসতে গেলে টলে পড়ে যাবে?’
এতক্ষণে চারজনের উৎপাতে বিরক্ত হতে শুরু করেছে গৌরব। নাক টেনে বলে, ‘দেখ ভাই, সঙ্গে গার্লফ্রেন্ড আছে বলে কিছু বলছি না। একা থাকলে তোদের মতো জোকারদের দেখে নিতাম।’
‘এহ্’, নহর মুখ ভেংচায়, ‘দেখে নিতাম! হনুমান টুপিটা কি আমরা শুভদৃষ্টি করার জন্য পরেছি?’
এইসব বাকবিতণ্ডার মধ্যে খুঁটির দিকে খেয়াল ছিল না কারো। সে আচমকা উঠে দাঁড়িয়ে ছেলেটার গলায় আক্রমণ করার চেষ্টা করে। কিন্তু তার আগেই গৌরবের হাতটা আবার সচল হয়ে ওঠে। আর একটা হাই ভোল্টেজ চড় খেয়ে আবার মাটিতে খসে পড়ে ডুকরে চিৎকার করে ওঠে খুঁটি।
সাম্যর কানে বিড়বিড় করে ওঠে নহর, ‘ওকে সামলা ভাই। নাহলে মৌসুমি বিয়ের আগেই বিধবা হবে।’
সাম্যও বুঝতে পারে ছেলেটার গায়ে অসুরের মতো জোর। ওরা চারজন মিলে ডবলু ডবলু এফ লেভেলের ফাইট দিলেও এর কাছে কুপোকাত হয়ে যাবে। দু’পা পিছিয়ে দাঁড়ায় সাম্য। তারপর মাথা নিচু করে এগিয়ে গিয়ে খুঁটির হাত ধরে টান দেয়, ‘ভাই, চল পালাই…’
খুঁটির মাথার আলুর মতো ফুলে গেছিল। সারা গায়ে ধুলোর পরত লেগেছে। হাত-পা ছড়ে গেছে জায়গায় জায়গায়। তাও সে গা ঝাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করে, ‘পালাব? বীর কখনও যুদ্ধ ছেড়ে পালায় না।’
সাম্য ধমক দেয়, ‘আর একটা চড় খেলে বীরের বিরবল দুটো থলি ছেড়ে পালিয়ে যাবে ভাই, চল।’
খুঁটি তাও প্রত্যাঘাতের প্রস্তুতি নেয়, ‘ছো, তোরা এখনও চিনিসনি আমাকে…’
ব্যাদা ওর পা ধরে টান দেয়, ‘আর একটু ক্যাল খেলে এমনিও তোর থোবড়া আর চেনা যাবে না, চল।’
বানরসেনা ল্যাজ গুটিয়ে পিছিয়ে যেতেই অল্প হেসে মুখ ঘুরিয়ে নেয় গৌরব। একটা বাঁকা হাসি হেসে প্রেমিকার দিকে তাকায়, ‘কী ঝামেলায় ফেললাম বলো দেখি তোমাকে।’
প্রেমিকা ততধিক গদগদ দৃষ্টিতে তাকায় ওর মুখের দিকে, ‘ইস, মুখটা একেবারে ঘেমে গেছে তোমার, কই দেখি…’
হাতের ব্যাগ থেকে রুমাল বের করে গৌরবের মুখটা মুছিয়ে দেয় আগমনী গৌরবের মনে হয় ও আনন্দে অজ্ঞান হয়ে যাবে। পরমুহূর্তে হয়েও যায়।
চোখে অন্ধকার দেখে গৌরব। কাটা ঘুড়ির সুতোর মতো মাটিতে খসে পড়ে কয়েক সেকেন্ডে।
ছেলেটাকে পড়ে যেতে দেখে ওরা চারজন আবার এগিয়ে আসে। অত বড় খোদার খাসির মতো পালোয়ানটাকে মাঠের ধুলোয় গড়াগড়ি খেতে দেখে খুঁটির বিগড়ে যাওয়া মুখেও হাসি ফোটে। আগমনীর দিকে চেয়ে উৎসাহী গলায় বলে, ‘ক্লোরোফর্ম! তুই পেলি কোথায়?’
আগমনী হাতের উলটোদিক দিয়ে মুখের ঘাম মোছে, ‘হিন্দি সিনেমা থেকে শুধু সস্তার ডায়ালগই কপি করতে শিখেছিস। জানতাম, লাভের লাভ কিছুই করতে পারবি না তোরা…’
‘কিন্তু তুই পেলি কোথায়?’ নহর জিগ্যেস করে।
‘কেমিস্ট্রি ল্যাবে।’ কথাটা বলে গৌরবের মুখের উপর ঝুঁকে পড়ে আগমনী, ‘এবার এই আধদামড়া মালটাকে নিয়ে কী করবি? এ তো লাশ হয়ে পড়ে আছে এখানে…’
‘অজ্ঞান হয়ে আছে যখন মারধোর করাটাও উচিত হবে না।’ সাম্যকে চিন্তিত দেখায়।
‘মুখে জলফল ছিটিয়ে জ্ঞান ফিরিয়ে এনে ক্যালালে হয় না?’ খুঁটি হাঁপাতে হাঁপাতে বলে।
‘কিন্তু এখানে জল কোথায় পাব?’
নহর কিছু বলতে যাচ্ছিল। তার আগেই থেমে যায়। এখান থেকে ক্যাফেটা দেখা যাচ্ছে। তার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটা মেয়ে। মেয়েটাকে দেখে একটু থেমে যায় নহর, বিড়বিড় করে উচ্চারণ করে, ‘দিয়া সেন…’
বেদান্তর চোখটা সেদিকে ফিরে যায়। কয়েক সেকেন্ড সেইভাবেই দাঁড়িয়ে থাকে সে। তারপর ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে শুরু করে সেদিক লক্ষ্য করে। সন্ধের আলো জ্বলতে শুরু করেছে একটা একটা করে। সাদা আলো জ্বলছে ক্যাফের সামনে। সেইদিক লক্ষ্য করে ছুটে যায় বেদান্ত। ওর পেছন পেছন ধাওয়া করে নহর, ‘আরে দাঁড়িয়ে যা, কী বলবি শোন… ‘
কিন্তু ব্যাদা শোনে না। হরিণের গতিতে দ্রুত মাঠটা পেরিয়ে যায়। এক ছুটে গিয়ে দাঁড়ায় ক্যাফের সামনে। মেয়েটা আপাতত ওর দিকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে। ব্যাদা কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে মেয়েটার দিকে সন্ধের পল্কা হাওয়ায় ইতস্তত উড়তে থাকে চুলের ফিতে। কতদিন ওর টেস্ট পেপারে মেয়েটার হাতের স্পর্শ লাগেনি। কতদিন ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসা গলার আওয়াজ ওকে জিগ্যেস করেনি, ‘এই পড়তে আসবি আজ? তুই না গেলে কিন্তু আমিও যাব না।’
সেই গলার আওয়াজ। সেই পরিচিত চোখের লাজুক দৃষ্টি। সেই ঠান্ডা হাওয়ার মতো স্নিগ্ধ হাতের স্পর্শ…
কয়েক সেকেন্ড পর এগিয়ে গিয়ে মেয়েটার পিঠে সে, ‘দিয়া…’
দিয়া ফিরে তাকায়। এতদূর ছুটে আসার জন্য ব্যাদার সমস্ত মুখ ঘামে ভিজে আছে। একটু আগের ধস্তাধস্তিতে ধুলো লেগে নোংরা হয়ে আছে জামাকাপড়। কিন্তু মুখে চওড়া হাসি খেলে যায় তার। দিয়া সেন অবাক হয়ে তাকায় ওর মুখের দিকে, ‘ব্যাদা, তুই এখানে কী করে…’
মেয়েটার মুখ এখনও আগের মতোই আছে। এখনও সেই চোখের দিকে চেয়ে কেঁপে উঠল ব্যাদার বুকের ভিতরটা। বুকের ভিতর আটকে থাকা দমকা বাতাস জোলো হাওয়া হয়ে ঘিরে ধরল ওকে।
‘কত খুঁজেছি আমি তোকে…’ ব্যাদা কথাটা শেষ করতে পারে না৷
নহর এসে দাঁড়িয়েছে ওর পেছনে। সে আর ডাকে না ওকে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। কী যেন একটা গান চলছে ক্যাফের ভিতর। এতদূর থেকে ভেসে আসে সেই চেনা গানের শব্দ।
‘আসলে আমার দাদার আসার কথা ছিল এখানে…’
ওর সামনে এগিয়ে গিয়ে দু’গালে হাত রাখে ব্যাদা, ‘তোকে কত খুঁজেছি আমি দিয়া…তুই কোথায় হারিয়ে গেছিলি! তোকে ছাড়া আমার আর কিচ্ছু ভালো লাগে না!’
দিয়া সেন কয়েক পলক স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। বিড়বিড় করে বলে, ‘বাবা মা যখন অত মেরেছিল আমাকে, তোকে খুঁজেছিলাম আমি। তুই ছিলি না ব্যাদা…’
‘আমি ভীতু ছিলাম…’ ব্যাদার গলা ধরে আসে, ‘আমি আর ভীতু নেই দিয়া…ব্যাদা আর ভীতু নয়…’
দিয়া সেন কিছু একটা উত্তর দিতে যাচ্ছিল। একটা বাইক এসে দাঁড়ায় একটু দূরে। বাইকের দিকে একবার তাকিয়েই ওর হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় দিয়া। চোখের জলটা সামলে নিতে নিতে বলে, ‘রকি ছাড়তে এসেছে আমাকে। আমার বয়ফ্রেন্ড। পরে কথা হবে, কেমন?’
ওর হাত ছাড়িয়ে বাইকের দিকে এগিয়ে যায় দিয়া সেন। বেদান্ত দু’পা পিছিয়ে আসে। এখনও ক্যাফের ভিতর থেকে গানটা ভেসে আসছে৷ এখনও ধুলো লেগে আছে ওর সমস্ত শরীরে। শুধু বাতাসটা আর আগের মতো ঠান্ডা নেই। বাতাসটা কখন বদলে গেছে ও নিজেও বুঝতে পারেনি।
নহর ওর কাছে এগিয়ে আসে। কবজি দিয়ে নিজের চোখটা মুছে নেয় ব্যাদা, ‘চল, ওরা কী করছে দেখি।’
বেদান্ত মুখে কিছু বলে না। চশমার কাচটা আরও মোটা দেখায়। মাথার জমাট চুলের রাশি আরও বেশি করে ঝুঁকে পড়ে কপালের উপর। দুই বন্ধু চুপ করেই হাঁটতে থাকে মাঠের দিকে।
ওর কাঁধে হাত রাখে নহর। তারপর ধীরে সুস্থে এগোতে থাকে মাঠের দিকে। এতক্ষণে পুরোপুরি সন্ধে নেমে গেছে। আড়াল থেকে একটানা ঝিঁঝি ডেকে চলেছে।
বাকি তিনজন তখনও গৌরব সেনের বডির পাশেই বসেছিল। ওদের পাশে গিয়ে বসে পড়ল দুজনে।
‘কী হল ওখানে?’ জিগ্যেস করল সাম্য।
‘দিয়া সেনের বয়ফ্রেন্ড আছে।’ নহর হতাশ গলায় বলল।
খুঁটি বিরক্ত হয়, ‘তো আমরা এতক্ষণ গো-অ্যাজ-ইউ-লাইক খেলছিলাম নাকি? দিয়া সেনকে সেই বয়ফ্রেন্ড অবধি টেনে আনার জন্যেই তো এতকিছু…’
‘ধুর বাবা! ব্যাদার কথা বলছি না। অন্য বাইক চালানো বয়ফ্রেন্ড আছে ওর।’
পাঁচ জনের মধ্যেই একটা নীরবতা নেমে আসে। বেদান্ত হাঁটুর উপর হাত রেখে নিজের কোলে মাথা গুঁজে দেয়। কান্নার দমকে পিঠটা ফুলে ফুলে উঠতে থাকে বারবার।
বাকি চারজন একবার নিজেদের মধ্যে চোখ চাওয়াচায়ি করে। এ রকম বিচিত্র অবস্থায় ওরা আগে পড়েনি কখনও। প্রপোজ করলে উলটোদিকের মেয়েটা হয় মিষ্টি করে হেসেছে, না হয় বাবাকে ডেকে এনেছে৷ আগে ভালোবাসত, এখন অন্য কাউকে ভালোবাসছে, এ ব্যাপারটা ওদের কাছে খুব একটা পরিচিত নয়। ব্যাদাকে এই মুহূর্তে কী বলা উচিত কেউই ভেবে পায় না। শেষে খুঁটিই ভেবেচিন্তে এগিয়ে আসে। ওর পিঠে হাত রেখে বলে, ‘আরে ভাই, আবার কান্নাকাটির কী হল? ওই বয়ফ্রেন্ড বাইক চালাতে পারে সেটা কোনও বড় কথা নয়, তুইও তো কত ভালো মুখ চালাতে পারিস, সেটা!’
সাম্য এগিয়ে এসে ওকে পাশ থেকে জড়িয়ে ধরে, ‘আচ্ছা কাঁদবি যখন দিয়া সেনের দাদার মুখের উপর কাঁদ। মালটা জলের ছিটে পেয়ে উঠে গেলে গুছিয়ে ক্যালানো যাবে।’
‘আহ্, তোরা একটু চুপ কর তো।’ ওর পাশে এসে বসে আগমনী, ‘ছেলেটা কাঁদছে আর তোরা…’
বেদান্তর এসব ভালো লাগছিল না। হাঁটুর ফাঁকে মুখ গুঁজে রেখেই একবার হাত দিয়ে নাক মুছল সে।
একটা গানের সুর ভেসে আসতেই চমকায় ব্যাদা। ওর ঠিক সামনে থেকেই ভেসে আসছে আওয়াজটা। চন্দ্রবিন্দুর গান। ও চকিতে মুখ তুলে তাকিয়ে দেখে ওর ঠিক সামনেই বসে আছে নহর। আর তার পায়ের কাছে রাখা সিডি প্লেয়ার থেকে বেরিয়ে আসছে গানটা।
‘এটা কোথায় পেলি?’ চোখ মুছে জিগ্যেস করে ব্যাদা।
নহর হাত রাখে ওর মাথায়, ‘আমরাই চাঁদা দিয়ে কিনেছিলাম। ভেবেছিলাম তোদের আশীর্বাদে গিফট করব। বিয়ে যখন হচ্ছে না এখনই দিয়ে দিলাম।’
চার বন্ধুর মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকায় ব্যাদা। ওর ভেজা চোখ আবার জলে ভিজে যায়। চোখ থেকে চশমাটা খুলে নিয়ে আবার জল মুছতে যায় ও। তার আগেই চারজনের সজোরে জড়িয়ে ধরে ওকে।
খানিক পরে মাঠে ঘাসের উপরেই শুয়ে পড়ে ওরা পাঁচজন। তারপর ফুল ভলিউমে গান চালিয়ে দেয়।
সেদিন অনেকক্ষণ পাঁচ জনে চুপ করে সেভাবেই শুয়ে থাকে মাঠের নরম ঘাসে। যে ঘাসে এতদিন টিফিনবেলায় ছুটে বেড়িয়েছে ওরা। পড়ে গিয়ে হাঁটু ছড়ে গেছে, রাগ হলে কাঠির ডগা দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে যে মাটির বুকে ক্ষত এঁকে দিয়েছে, যে মাঠের বুকে আর বেশিদিন দৌড়ানো হবে না ওদের, সেই মাঠের বুকে কিছুক্ষণ মিশে থাকে ওদের শরীর…
ব্যাদার মনে হয়, ওর এই পনেরো বছর বয়সে পাওয়া প্রথম ব্যথা ঠিক সারিয়ে দেবে মাঠটা। মানুষ যে মাঠে, যে স্কুলে, যে নদীর ধারে, যে কাঁচা রাস্তায় ছোটবেলা কাটায় সেই মাঠ, স্কুলের রাস্তা—অনেক অনেকদিন পরেও সারিয়ে দিতে পারে মানুষকে। সেই স্নেহের স্পর্শে সেরে ওঠার একরকম আরাম আছে।
নহরের দিকে ফিরে তাকায় ব্যাদা। অদ্ভুত গলায় অর্থহীন একটা প্রশ্ন করে বসে, ‘হ্যাঁ রে, তোকে এই মাটি সারিয়ে দিতে পারবে না?’
নহরের চোখ ছলছল করে ওঠে, ‘না, মানুষ মরে গেলে আর মাটি তাকে সারিয়ে দিতে পারে না। তখন সে মাটি হয়ে যায়, আর অন্য কাউকে সারিয়ে দেয়।’
