তালদিঘিতে ভাসিয়ে দেব – ১১
একাদশ অধ্যায়
খাঁড়াই পথে কয়েক ধাপ নেমে ঢালু পাথুরে দিকটায় হাত রেখে একটু দম নিল আগমনী। তারপর গায়ের জ্যাকেটটা খুলে কৌশিকের হাতে দিয়ে বলল, ‘বুড়ো হয়ে গেছি ভাই।’
একটু আগেই জিপটা ওদের পাহাড়ি রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে গেছে৷ সেখান থেকে একবারে ঢালু রাস্তা চা বাগানের বুক ফুঁড়ে নিচে নেমে গেছে৷ সে পাকদণ্ডী রাস্তার একদিকে চা বাগান আর অন্য দিকে খাদ। আপাতত সেই ঢালু রাস্তা দিয়েই নেমে আসছে ওরা। দূরে কতগুলো অচেনা পাহাড়ের চূড়া দেখা যাচ্ছে। তার পায়ের দিকে জঙ্গল আর আকাশ মিশে ময়ূরকণ্ঠী রং গুলে দিয়েছে। যতদূর চোখ যায় হয় চা বাগান না হয় পাথুরে ঝোপ ঘন হয়ে আছে।
এ রাস্তায় নামার আগে গাড়ি থামিয়ে মোমো খেয়েছিল ওরা দুজন। আগমনী প্রধানত মোমো খায় ঝাল চাটনির মোহে। বেশি ঝাল লেগে গেলে এক চামচ গরম সুপ তুলে মুখে দেয়। তাতে মুখের ভিতরে আবার একটা ল্যাদল্যাদে অনুভূতি হলে আবার ঝাল চাটনির সস্ দেয়। এইভাবে স্বাদ কোরকের সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে খেলতে এগিয়ে যেতে হয়। মাঝে মাঝে আগমনীর মনে হয় মোমো দুনিয়ার একমাত্র খাবার যার সঙ্গে দেওয়া অতিরিক্ত জিনিসগুলো নিয়েই লোকের আগ্রহ বেশি। আসল খাবারটা নিয়ে কারো তেমন মাথা ব্যথা নেই।
‘এই জন্য বলি জিমে যা!’ কৌশিক ওর জ্যাকেটটা কাঁধে নিতে নিতে বাঁকা হাসে।
‘তুই জিমে যাস?’
‘সপ্তাহে চারদিন।’
‘একটা কেজি ষাটেকের মেয়েকে ঘাড়ে নিয়ে হাঁটতে পারছিস না, তোর জিমে গিয়ে লাভ কী হল?’ কথাটা বলে আবার ঢাল বেয়ে নামতে শুরু করে ওরা।
এখন বেলা এগারোটা। ভোরবেলা যখন এসে পৌঁছেছিল তখন ঠান্ডায় রীতিমতো কাঁপচ্ছিল ওরা৷ এখন কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে।
এতক্ষণ ঢালু রাস্তাটা ফাঁকাই ছিল। দূরে তাকিয়ে আগমনী দেখল কতগুলো স্কুল ফেরত পাহাড়ি ছেলেমেয়ে ঢালের উলটোদিক দিয়ে উঠে আসছে উপরের দিকে। সম্ভবত কাছে পিঠের কোনও স্কুলে পড়ে তারা। কেউ কেউ নিজেদের মধ্যে গল্প করতে করতে যাচ্ছে। কেউ আবার হাঁটতে হাঁটতে আপন ছন্দে লাফিয়ে উঠছে। আগমনীর মনটা খুশি হয়ে গেল। পাহাড়ি বাচ্চাদের খুদে চোখ, লালচে গাল আর খোঁচা খোঁচা চুল দেখলে মনটা অকারণেই হালকা হয়ে যায়।
একটা বছর দশেকের মেয়ে এগিয়ে এসেছিল ওর দিকে। আগমনী ব্যাগ থেকে একটা চকলেট বের করে ওর হাতে দেয়। তারপর হাঁটু মুড়ে সামনে বসে পড়ে বলে, ‘হ্যালো! নাম কেয়া হায় আপকা?’
মেয়েটা ভুরু কুঁচকে একবার ওর দিকে দেখে, তারপর ভাঙা ভাঙা বাংলা বলে, ‘আমার নাম আস্মি।’
একটু অবাক হয় আগমনী। এখানকার লোক সাধারণত নেপালি বা হিন্দি বলে। এ মেয়েটা হয়তো টুরিস্টদের সঙ্গে মিশে মিশেই খানিকটা বাংলা শিখে নিয়েছে।
হাত দিয়ে বাচ্চা মেয়েটার মাথার চুল এলোমেলো করে দেয় আগমনী, ‘ইধার নেচার ক্যাম্প হোমস্টে কাঁহা হায়?’
মেয়েটাও হাত বাড়িয়ে আগমনীর চুল এলোমেলো করে দেয়। তারপর নিচের দিকে দেখিয়ে বলে, ‘নিচে জঙ্গলমে…’
‘ইহা সে কিতনা দের লাগেগা?’
মেয়েটা উত্তর দেয় না। তেমনই একটা বোকা বোকা হাসি হেসে চকলেটটা মুখে দেয়। ওর বন্ধুরা একটু এগিয়ে গেছিল। হাত তুলে তারা হাঁক দেয় ওকে। মেয়েটা দুলে দুলে আবার এগিয়ে যায় ওদের দিকে।
কৌশিক সেদিক থেকে মুখ ফিরিয়ে সামনে হাঁটতে শুরু করে, ‘একমাত্র গবেট না হলে কেউ পাহাড়ি বাচ্চাকে সময় জিগ্যেস করে না।’
‘কেন?’
‘সময় নিয়ে এত মাথাব্যথা আমাদের সমতলের লোকেদের থাকে। এখানে সময় এতটাই সস্তা যে বড়রাই কেউ ওসব নিয়ে মাথা ঘামায় না তো বাচ্চারা। দুজন মিলে হেঁটে আরও কিছুটা এগিয়ে যায়। একবার পেছন ফিরে তাকায় আগমনী। দেখে মেয়েটা ঢাল বেয়ে উঠতে উঠতে মাঝে মাঝে পেছন ফিরে দেখছে ওদের। তারপর আবার তেমনই নাচের ভঙ্গিতে উঠে যাচ্ছে উপরে। ওরা চলে যাচ্ছে বলে কি খারাপ লাগল মেয়েটার? পাহাড়ি বাচ্চারা এত তাড়াতাড়ি মায়ায় জড়িয়ে ফেলতে পারে কেন কে জানে…
আরও খানিকটা নেমে আসতে রাস্তার ধারেই একটা গাছের সঙ্গে লাগানো একটা সাইনবোর্ড চোখে পড়ে। নেচার ড্রপ ইকোস্টে। পাশে অ্যারো দিকে জঙ্গলের ভিতরে নির্দেশ করা আছে। সাইনবোর্ডের ঠিক পাশ দিয়ে একটা ফুট দেড়েকের সরু রাস্তা চলে গেছে ভিতরে।
ওরা দুজন পিচ রাস্তা ছেড়ে সেই পথে জঙ্গলের ভিতরে ঢুকে আসে। ঢুকতেই ঠান্ডাটা আরও বেড়ে যায়। দু’পাশে ঘন পাইন গাছ আর ঝোপঝাড় ওদের মাথার উপরে যেন ঝুঁকে আসে। বাইরের বেশিরভাগ শব্দ জঙ্গলের ভিতর অবধি আসছে না। পায়ের তলায় শুকনো পাতার আওয়াজ হচ্ছে। নিস্তব্ধ জঙ্গলের ভিতরে একটা ভৌতিক আবহ তৈরি হয়েছে যেন।
হাটতে হাটতে একটা মিটার দুয়েকের কাঠের সাঁকোর কাছে এসে পড়ে ওরা। ছোট ছোট কয়েকটা লম্বাটে কাঠে ফেল ঝরনার উপর সরু রাস্তা করা হয়েছে। সেটা পেরিয়ে যেতেই একটা মিষ্টি শব্দ কানে আসে ওদের।
গিটারের তারের উপর আঙুল বুলিয়ে টুংটাং শব্দ করেছ কেউ। এলোমেলো নয়, ছন্দবদ্ধ সুর। ওরা দুজনে একবার মুখ চাওয়াচায়ি করে।
সামনেই একখণ্ড পাথরের স্তূপ উপরে উঠে গেছে৷ নিচ থেকে উপরে তাকালে জঙ্গলের ভিতরে কয়েকটা ট্রি হাউজ দেখা যায়। সেই দিক থেকেই আসছে আওয়াজটা। মাটির রাস্তা দিয়ে খানিকটা উঠে আসতেই ট্রি হাউজগুলোর কাছে এসে পড়ে ওরা। পাহাড়েরই পাথর কেটে ধাপ করে তার উপরে বানানো হয়েছে ট্রি হাউজ। সব মিলিয়ে গোটা পাঁচেকের বেশি নয়। তার একেবারে মাঝখানে একটা ছাউনিঘেরা উঠোন মতো জায়গা। সেই ছাউনির নিচেই বেঞ্চে বসে গিটার বাজাচ্ছে একটা বছর তিরিশের ছেলে।
সিঁড়িতে পায়ের আওয়াজ শুনে মুখ তুলে ওদের দিকে তাকায় ছেলেটা। একগাল হেসে নামিয়ে রাখে গিটার।
‘কলকাত্তা সে আয়ে হে?’
ব্যাগগুলো উঠোনের এক পাশে নামিয়ে রেখেছিল ওরা। ছেলেটা এগিয়ে এসে হাতে তুলে নেয়। তারপর ভিতরের ঘরের দিকে পা বাড়ায়, ‘আইয়ে, গোরবাবুকা ঘার ইধার হে৷’
তিনজনে মিলে উঠোনের পেছনের দিকে এগিয়ে যায়। এদিকটা আরও খানিক ভাঙাচোরা। একদিকে কয়েকটা কাঠের বস্তা ডাই করে রাখা আছে৷ সেখান থেকে ভিজে কাঠের গন্ধ আসছে।
খানিকটা এগিয়ে এসে জঙ্গলের মধ্যে একটা কাঠের ঘর চোখে পড়ে ওদের। পাইন কাঠের তক্তা দিয়ে বানানো দেওয়াল। তার উপরে গাছের ডাল ঝুঁকে পড়েছে। সেই দেওয়ালের মধ্যে একটা ফাঁকফোঁকরওয়ালা দরজা। বহু আগে সেই দরজার উপরে সাদা রং করা হয়েছিল। এখন সেটা উঠে গিয়ে কেবল কয়েকটা ছোপ রয়ে গেছে।
‘উও গোরবাবুকা ঘার হ্যায়।’ কথাটা বলেই চলে যায় ছেলেটা।
ছোট দরজাটার সামনে গিয়ে কড়া নাড়ে কৌশিক৷
কয়েক সেকেন্ড পর খুলে যায় দরজাটা। একটা তামাটে কাঁচা পাকা চুলে ঢাকা মুখ বাইরে উঁকি মারে, ‘ক্যা?’
‘আমরা কলকাতা থেকে আসছি, একটু কথা ছিল আপনার সঙ্গে।’
‘নেহি হোগা।’
দরজাটা সপাটে বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগেই হাত বাড়িয়ে সেটা ধরে নেয় কৌশিক। তারপর পকেট থেকে আইডিটা বের করে সামনে ধরে, ‘হোগায় ঢুকিয়ে দিলেই সব নেহি ফেহি বেরিয়ে যাবে। খোল দরজা…’
কার্ডটা দেখে হালকা ঘাবড়ে যায় লোকটা। রোমশ ভুরুটা উপরে উঠেই আবার নিচে নেমে আসে। আকর্ণ হাসি হেসে দরজা থেকে সরে দাঁড়ায়।
বিশ্বজিৎ ব্যানার্জী আগেই সতর্ক করেছিল কৌশিককে। গোরাচাঁদের ভালোবাসা হল মদ আর ভয় হল ক্ষমতা। পুলিশের লোকজনকে এড়িয়ে চলে। কৌশিক যে র্যাঙ্কে চাকরি করে তাতে ওকে একপ্রকার পুলিশ বলা চলে। তবে আইপিএসের কার্ডটা নকল। গোরাচাঁদ অত প্রুফ চেকের ধার ধারবে না। তবে আচরণের মধ্যে ঢিলে দিলেই গোরাচাঁদ পেয়ে বসবে। সেটা কিছুতেই হতে দেওয়া যাবে না। কার্ড দেখেই লোকটার চোখমুখ পালটে যাওয়ায়, কৌশিক বুঝল বাকি কাজটা খুব একটা কঠিন হবে না।
ঘরটা কাঠের হলেও মজবুত। ভেতরে আলো কম। বেশিরভাগটা জুড়ে একটা দড়ির খাটিয়া পাতা। তাতে একটার বেশি লোকের পক্ষে বসা সম্ভব নয়।
মেঝের উপর একদিকে কিছু বাসন-কোসন উলটে পড়ে আছে। দেখে বোঝা যায় সেগুলো কালেভদ্রে মাজা হয়। একদিকের দেয়াল জুড়ে একটা দড়ি টাঙানো। তাতে আপাতত মশারি এবং কিছু ছেঁড়া পুরোনো জামাকাপড় ঝুলছে। গোটা ঘরময় একটা পোকামরা গন্ধ। সেটা বেশিক্ষণ নাকে গেলে অস্বস্তি শুরু হয়।
ঘরের মধ্যে লোকটার চেহারাটা বেশ মানিয়ে যায়। লম্বায় খুব একটা বেশি নয়। গায়ে ঢিলা ঢালা হাফপ্যান্ট আর একটা মরচে ধরে যাওয়া গেঞ্জি। গেঞ্জির গলার ফাঁকটা বহু ব্যবহারে বেড়ে গেছে। সেখান দিয়ে হাত ঢুকিয়ে লোমশ বুকে মাঝেমধ্যে চুলকে নিচ্ছে লোকটা।
পিঠের ব্যাগ থেকে বের করে স্কচের বোতলদুটো মাটিতে নামিয়ে রাখে কৌশিক। সেটা দেখে একটা বিচিত্র হাসি হাসে গোরাচাঁদ বিশ্বাস। তারপর ঝুলন্ত দড়ি থেকে একটা গামছা পেড়ে নিয়ে দড়ির খাটিয়াটা ঝেড়ে পরিষ্কার করে দেয়।
আগমনীকে সেখানে বসায় কৌশিক। লোকটা কালক্ষয় না করে মদের বোতল খুলতে যাচ্ছিল, কৌশিক তার আগেই সেটা টেনে নিয়ে ছিপি খুলে স্টিলের গ্লাসে মদ ঢালে। তারপর সেটা এগিয়ে দিয়ে ইশারা করে, ‘খা…’
কোঁক করে মুরগির মতো আওয়াজ করে পেগটা মেরে দেয় গোরা। তারপর আবার সেই দেঁতো হাসি হেসে মুখ তুলে তাকায়৷
‘দেখ, তোর ভয়ের কিছু নেই। আমরা জাস্ট কয়েকটা কথা জানতে এসেছি, ব্যাস।’
লোকটা উত্তর দেয় না। পরের পেগটাও গলায় ঢেলে কবজির উলটো দিক দিয়ে মুখটা মুছে নেয়।
‘ষোলো-সাতেরো বছর আগের কেস। সব কথা মনে থাকা সম্ভব নয়। তাও ফার্স্ট ক্রাইম…’ কথা না থামিয়েই আবার পেগ বানিয়ে এগিয়ে দেয় কৌশিক, ‘সাহিন আলিকে তো আগে থেকেই চিনতিস, তাই না?’
উপরে নিচে মাথা দোলায় গোরা, ‘তখন আমাদের একটা গানের দল ছিল স্যার। কলকাতার ক’টা ছেলে মিলে খুলেছিলাম। কিন্তু সেটা চলেনি। যে প্রডিউসারের কাছে যাই সেই এক গাদা করে টাকা চায়। আমরা পুরো মরিয়া হয়ে উঠেছিলাম স্যার!’
‘তারপর ঠিক করলি কিডন্যাপ করবি?’
গোরা লাজুক হাসি হাসে, ‘তাছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না। আমার সঙ্গে আরও দুজন ছিল, হারু আর ক্ষেদো৷ ও শালারা জাত ক্রিমিনাল। এখন গাঁজা কেসে জেলে পচছে৷ কিন্তু ওদের আরও অনেক ক্রাইম আছে স্যার।’
‘সাহিন আলিকে চিনলি কী করে?’
‘ওর এক আত্মীয়র বিয়েতে আমরা গান গাইতে গেছিলাম৷ সেখানেই পরিচয় হয়। আমাদের গান পছন্দ হয়েছিল। ফোন নম্বর নিয়ে রেখেছিল। কিন্তু পরে আর যোগাযোগ করেনি। কিন্তু আমরা চোখে চোখে রেখেছিলাম। পয়সাওয়ালা লোক। পনেরো বছরের মেয়ে আছে বাড়িতে…’
‘কিডন্যাপের আইডিয়াটা তোর ছিল?’
‘না স্যার, ওদের দুজনের। আমি প্রথমে রাজিই ছিলাম না। কিন্তু ওরা আমাকে মদ খাইয়েছিল স্যার। হেব্বি মদ খাওয়াল। আর…’ পরের কথাটা বলতে গিয়ে আটকায় গোরা। ঢোক গিলে মদ পেটে চালান করে বলে, ‘পেটে মদ থাকলে আমি পুরো শুয়োরের বাচ্চা হয়ে যাই স্যার। গু, মুতের বাছবিচার থাকে না।’
‘কিডন্যাপটা কীভাবে করলি?’
‘তখন পয়সাকড়ির হেব্বি চুস্তা কন্ডিশন। মেজাজ গরম থাকে বলে গানবাজনাও করতে পারি না। আমরা গোরাবাজারের কাছে একটা আনফিনিশড বিল্ডিংয়ের দোতলায় কুত্তার মতো থাকি। সারাদিন মদ খেয়ে কাটিয়ে দিই। অসুবিধা হয় না…মদ খেলে আসলে আমার…’ আবার দেতো হাসি হাসে গোরা৷
‘জানি, তারপর বল।’
‘একদিন সন্ধের দিকে টিউশনি থেকে ফেরার সময় গাড়ি করে তুলে নিয়ে আসলাম মেয়েটাকে। সঙ্গে একটা গার্ড ছিল, আমরা আসছি দেখে সে মেয়েটাকে ফেলেই পালিয়েছিল। মেয়েটা হেব্বি কাঁদছিল। আমরা গাড়িতে ঢোকালাম। একটা ইঞ্জেকশন পুশ করলাম, নিয়ে চলে এলাম…আসলে আমি স্যার মদ খেয়েছিলাম। আর মদ খেলে আমার…’
‘তারপর?’
গোটা পাঁচেক পেগ পেটে পড়তেই লোকটার চোখমুখ পাল্টাতে শুরু করেছে। কথা অসংলগ্ন হয়ে যাচ্ছে মাঝে মাঝে। মুখের সামনে থেকে হাত দিয়ে কী যেন সরাতে চাইছে।
‘তারপর…’ গোরা স্মৃতির ভিড়ে খাবি খায়।
কৌশিক সপাটে একটা চড় মারে তার গালে, মাটিতে ছিটকে পড়ে গোরার শরীরের উপরিভাগ, ‘এই শুয়োরের বাচ্চা। তারপর কী হল বল?’
‘মদ…’
আর এক পেগ গলায় পড়তেই বমি করতে যাচ্ছিল গোরা। মুখে হাত চাপা দিয়ে নিজেকে সামলে নেয়। নিজের জামা খামচে ধরে বলে, ‘তারপর মেয়েটার জ্ঞান ফিরল। খেতে চাইছিল। খাওয়ার জন্যও বায়না করল স্যার… বায়না…’
‘বেশ, তারপর কী হল?’ কোনওরকমে তার কলার খামচে ধরে কৌশিক৷
নিজেকে এক হাতে সামলে নিয়ে বলতে থাকে গোরা, ‘দেবার মতো খাবার কিছু ছিল না। আমি ভাত রাঁধলাম, ওরা খেলো…’
মাটির উপর পড়ে যায় গোরা। কৌশিক তার চুলের মুঠি খামচে ধরে, ‘খেলো, তারপর কী হল?’
‘তারপর…তারপর…ওরা খেলো… লোকটার চোখ ঘোলাটে হয়ে এসেছে। মুখের ভিতর থেকে ঘন মদের রেখা বমি হয়ে বেরিয়ে মেঝে ভিজিয়ে দিচ্ছে।
‘ভাত খাবার পরে কী হল, সেটা বল হারামজাদা!’ সজোরে চড় মেরে জিগ্যেস করে কৌশিক।
‘ভাত!’ মদের নেশার মধ্যেও ককিয়ে ওঠে গোরা, ‘ভাতের কথা কখন এল আবার। ভাত তো আমি বানাচ্ছিলাম, ওরা তো মেয়েটাকে খেলো…’
গোরার জামাটা ছেড়ে দেয় কৌশিক৷ হাত দুটো নিথর হয়ে যায় ওর। অবাক চোখে গোরার দিকে চেয়ে থাকে সে। লোকটা তরল অবসন্ন গলায় বলে চলেছে, ‘আমি বাধা দিয়েছিলাম স্যার, কিন্তু ওরা তাও খেলো। ভাত খেল না শালারা। এদিকে পয়সা নেই। ভাত খাবার পয়সা নেই…এদিকে মেয়েটাকে…’
‘তারপর?’ খাটিয়ার উপর থেকে আগমনীর গলা ভেসে আসে।
ঢুলুঢুলু চোখে আগমনীর দিকে দেখে গোরা, ‘তারপর আবার চিৎকার করল মেয়েটা। ইঞ্জেকশনে যতটা করেছিল তার থেকে অনেক বেশি। কুত্তার বাচ্চাগুলো মেয়েটাকে অনেকক্ষণ ধরে ইঞ্জেকশন দিল পালা করে। আমাকে মনে হয় মদ খাইয়ে দিয়েছিল। মদ খেলে আমার আবার…’ বলেই আচমকা দেওয়ালে ভর দিয়ে উঠে বসে গোরা, ‘আপনারা আমার কথা বিশ্বাস করছেন তো? বিশ্বাস করুন, ইতিহাস সাক্ষী আছে, গোরা মদ ছুঁয়ে মিথ্যে কথা বলে না।’
ওরা দুজন কোনও কথা বলল না। গোরা বিশ্বাস বলে চলল, ‘মেয়েটাকে খেয়ে ওরা হাতও ধুলো না, চানও করল না। কীরম পিশাচ ভাবুন স্যার। এদিকে আমার তখন ফাটছে। কিডন্যাপ করে আনা মাল, পয়সা দিলেই ছেড়ে দিতে হবে। ঝোঁকের বশে খেয়ে ফেলল। এবার এঁটোকাঁটা মেয়ে বাড়িতে দিতে গেলে আর ফেরত নেবে! মেরে দিল শালারা…’ ঘর কাঁপিয়ে চেঁচিয়ে উঠল গোরা বিশ্বাস, ‘মেয়েটাকে মেরে দিল…একদম বাজারের মুরগির মতো। বঁটি দিয়ে কুচ করে কেটে দিল। গলা কাটা মুরগির বডি ছটফট করতে দেখেছেন স্যার? আমি দেখেছিলাম। প্যাটকা বেরিয়ে গেছিল একেবারে…তারপর ওখানেই জ্বালিয়ে দিল মেয়েটাকে…লাশটা ওরা কোথায় গায়েব করেছিল আমি জানি না৷ ব্যাস…খেলা শেষ…’
একটা বোতল শেষ করে অন্য বোতলের দিকে হাত বাড়ায় গোরা। ওর বুকে সপাটে একটা লাথি মারে কৌশিক। তারপর গোটা মদের বোতলটা খুলে ওর মাথায় ঢেলে দেয়।
আচমকা প্রিয় তরলে স্নান করে ভেবলে যায় লোকটা। কৌশিক একটা দেশলাই জ্বালিয়ে তার সামনে ধরে। দাঁতে দাঁত চিপে বলে, ‘মেয়েটা যদি মরে গিয়ে থাকে তাহলে বাড়ি ফিরল কে?’
জ্বলন্ত দেশলাইটা দেখে এক ধাক্কায় নেশা কেটে যায় গোরাচাঁদ বিশ্বাসের। আঁতকে উঠে পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে সে। দু হাত তুলে বলে, ‘আমি মারিনি স্যার, ছুঁইনি অবধি মেয়েটাকে। আপনারা ক্ষেদো আর হারুকে জিগ্যেস করলেই…’
‘বাড়ি কী করে ফিরল মেয়েটা?’ আগমনীর থমথমে পাথরের মতো গলার আওয়াজ ভেসে আসে।
‘আমি কী জানি!’ মেঝের উপর চাপড় মারে গোরা বিশ্বাস, ‘মেয়েটা খাল্লাস হয়ে যেতে যখন বসে বসে ভাবছি কী করব, ওদের দুজনকে খিস্তাচ্ছি। এমন সময় ওর বাড়ি থেকে ফোন করে জানাল মেয়েটা নাকি বাড়িতে পৌঁছে গেছে।’
‘সেটা কী করে সম্ভব?’ কৌশিকের ভুরু কুঁচকে যায়৷
‘কী করে সম্ভব তা আপনি বুঝুন। আমি নিজের চোখে দেখের মেয়েটাকে পুড়তে। ফোন পেয়ে প্রথমে ভেবেছিলাম ঘাপলা কেস। আমাদের কেউ ফাঁসাতে চাইছে। কিন্তু পরদিন খবরের কাগজে অবধি বেরিয়েছিল!’
মিনিট কয়েক পর গোরাচাঁদের ঘর থেকে বেরিয়ে এল ওরা। মদের নেশায় চুর হয়ে আপাতত ঘুমিয়ে পড়েছে গোরাচাঁদ। ওর থেকে আর কিছু উদ্ধার করা সম্ভব নয়।
হোমস্টের উঠোনে এসে বসল কৌশিক। শরীরটা ঝিমিয়ে আসছে ওর মাথার ভেতরটা ভনভন করছে। আগমনীর দিকে ভালো করে তাকাতে পারেনি এখনও।
গিটার বাজানো ছেলেটা চা রেখে গেল ওদের সামনে। সেটা পড়েই থাকল।
দুপুরের রোদ মরে আসতে শুরু করেছে। জঙ্গলের পাতার ফাঁক দিয়ে ছেঁড়া ছেঁড়া আলো এসে গড়িয়ে পড়ছে ওদের পায়ের কাছে। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই একসময় ঘাড় সোজা করে মাথার চুল খামচে ধরে কৌশিক, ‘গোরাচাঁদ মিথ্যে বলছে না। ক্ষেদো আর হারু সত্যিই নারকটিক কেসে ভেতরে আছে। কিন্তু তাই যদি হয়…
গাছের পাতার ফাঁক গলে নিচে নামতে থাকা সূর্যটার দিকে দেখছিল আগমনী। ও কোনও উত্তর দেয় না। চোখ দুটো হলদে রোদে নরম হয়ে এসেছে। ভালো করে দেখলে মনে হয় জল জমে গেছে।
কৌশিক নিজেই বলে, ‘আচ্ছা, এরকমও তো হতে পারে। কোনও ডপেলগাঙ্গার টাইপের কাউকে শিখিয়ে পড়িয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল…’ কথাটা বলেই ভুরু কুঁচকে যায় তার, ‘কিন্তু গোটা ব্যাপারটা তো প্ল্যান করে হয়নি। খুন যে হবে সেটা আগে থেকে কেউ জানত না। তাহলে?’
আগমনীরও মাথাটা ধরেছে এখন। চাদরটা গায়ে ভালো করে জড়িয়ে বলল, ‘দেখ, এরা মদ টদ খেয়ে সে রাতে কী করেছিল নিজেরাই ঠিক করে বলতে পারছে না। আমার যতদূর মনে হচ্ছে মেয়েটা ওদের হাত থেকে কোনওভাবে পালিয়ে এসেছিল। গোটা ঘটনাটার ট্রমায় প্রথম মাসখানেক সেভাবে কথাবার্তা বলতে পারেনি। তারপর আস্তে আস্তে নিজের মধ্যে ফিরেছে।’
‘মানে বলছিস, গোরা সমস্ত ব্যাপারটা হ্যালুসিনেট করেছে?’
‘মদ পেটে পড়লে কী অবস্থা হয়, সে তো নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছিস। হারু আর ক্ষেদো আমাদের হাতে নেই। এর কথা আমার অন্তত বিশ্বাস হচ্ছে না।’
‘কিন্তু মেয়েটাকে যেভাবে রেপ করা হয় তাতে ওর বডিতে চোট আঘাত থাকার কথা।’
‘মেয়ে ফিরে এসেছে দেখে বাবা-মা সেটাকে হাইড করতে পারে৷ ধরে নেওয়া যায় সোশ্যাল ফ্রেঞ্জির ভয়ে…’
বড় করে নিঃশ্বাস নেয় কৌশিক, ‘আমার মনে হয় নহর জান্নাতকে নিয়ে আর এগিয়ে লাভ নেই। শি লিভড অ্যান্ড ডায়েড, তোর স্কুল জীবনে যাই ঘটে থাক না কেন ওর থেকে আর কিছু জানা যাবে না। বাকি তিনজন … পকেট থেকে বের করে ছবিটার দিকে তাকায় কৌশিক, ‘মুশকিল একটাই। নহর জান্নাতের নামটা জানা গেছিল। এদের তো সেটাও জানি না।’
দূরে পাহাড়ের গায়ে টিমটিম করে আগুন জ্বলতে দেখা যাচ্ছে। মাটির গা বেয়ে শীত উঠে আসছে। খোলা জায়গায় বসে থাকতে থাকতে গায়ের রোমকূপগুলো শিউরে ওঠে মাঝে মাঝে। দূর পাহাড়ের গায়ে জমাট অন্ধকারের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে আগমনীর মনে হয় ওর মাথার ভিতরটা হালকা হয়ে আসছে ধীরে ধীরে। এত কাঠখড় পুড়িয়ে যদি আদৌ কোনও লাভ না হয় তাতেই বা কী যায় আসে? বন্ধুগুলোকে খুঁজে পেলেই বা কী করবে ও? ছোটবেলায় পাঁচজন মিলে যাই করে থাকুক না কেন, আজকের জীবন কি বদলে যাবে তার জন্য?
আগমনীর মনে হয় একটা দুর্গম পাহাড়ের মাথায় কোনও যাত্রী দলের গেঁথে যাওয়া ছেঁড়া পতাকার মতো আটকে আছে ওর জীবন। হয়তো যত্নের, হয়তো গর্বের, হয়তো একসময় তাকে ঘিরে নাচতে নাচতে উৎসব করেছিল অনেকে। তারপর আবার চলে গেছে নিজের পথে। হাওয়ায় ছেঁড়া কাপড়ের মতো খুঁটি ছেড়ে সে পতাকা উড়ে গেলেও আর কারো কিছু যায় আসবে না…
রাতের খাওয়া সেরে নিজের ট্রি হাউজে এসে সবে লেপ মুড়ি দিতে যাচ্ছিল কৌশিক। দরজায় টোকা পড়ল। দরজা খুলে দেখল আগমনী দাঁড়িয়ে আছে।
‘আয়, বোস…’ ওকে ভিতরে ডাকল কৌশিক।
‘মনটা ভালো লাগছে না, একটু হাঁটতে যাই চল।’
চা’টা হাতে নিয়েই বেরিয়ে আসে কৌশিক, ‘ছোকরা বলছিল, এখানকার জঙ্গলে নাকি রাতে লেপার্ড বেরোয়।’
আগমনীর মুখে করুণ হাসি খেলে যায়, ‘আমরা ক্ষেদো আর হারুর মধ্যে থেকে মানুষ হয়েছি। লেপার্ডের ভয় পাই না, চল।’
ট্রি-হাউজ থেকে বেরিয়ে অন্ধকার পাহাড়ি পথ ধরে ওরা এগোতে থাকে। একটু দূরে জোসেফ বলে ছেলেটা গিটারে কী একটা যেন নেপালি গান গাইতে শুরু করেছে। জঙ্গলের মিহি হাওয়ায় খেলা করছে সেই গান। পাখপাখালির ডাক নেই এখন। তার বদলে পোকামাকড়ের গুঞ্জন উঠেছে। গাছপালার ফাঁক দিয়ে ভেসে আসা হাওয়ায় আগমনীর চাদর উড়ে যাচ্ছে। আবার টেনেটুনে ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিল সেটা।
দূরে জঙ্গলের গাছপালার ফাঁক দিয়ে গোল চাঁদটাকে দেখা যাচ্ছে। সেদিকেই হাঁটতে লাগল ওরা।
আগমনী বলে, ‘জানিস, তোর সঙ্গে প্রেম করার সময় আমার খুব ইচ্ছা ছিল আমরা একসঙ্গে একবার পাহাড়ে ঘুরতে আসব।’
‘কেন?’
‘কোথায় যেন শুনেছিলাম, যেসব কাপল একসঙ্গে পাহাড়ে যায় তাদের আর ব্রেক আপ হয় না।’
‘তাহলে পাহাড়ি লোকেদের আর ব্রেক আপ হতো না।’
কী যেন ভেবে দাঁড়িয়ে পড়ে আগমনী, ‘তোর জানতে ইচ্ছা করে না তোর সঙ্গে ব্রেকআপ হওয়ার পর আমি কারো সঙ্গে সেক্স করেছি কিনা?
‘তোকে একটা সিক্রেট বলি?’ ফোনের আলোয় একটা গুল্মলতাকে সরিয়ে দিয়ে বলে কৌশিক, ‘ব্রেকআপ হওয়ার পর প্রথম প্রথম ছেলেরা এইটা ভেবেই বেশি কান্নাকাটি করে। আমার গার্লফ্রেন্ড বোধহয় অন্য কারো সঙ্গে সেক্স করে ফেলছে। তারপর মোটামুটি বছরখানেক কাটার পর ধরেই নেয় শুয়ে না পড়ুক কারো সঙ্গে মন খুলে গল্প করেছে, কাউকে ম্যাগি করে খাইয়েছে, কারো চ্যাটবক্স খুলে রেখেই ঘুমিয়ে পড়েছে।’
‘মানে, এই নিয়ে তোর এখন টেনশন! আমি কার চ্যাট খুলে ঘুমিয়ে পড়ছি?’
‘বিশ্বাস কর, একটা সময় পরে ছেলেরা আর সব ছেড়ে দিতে পারে। শুধু ওই ঘুম পাড়ানোর নেশাটা ছাড়তে পারে না।’
অনেক দূর থেকে কোনও জংলি প্রাণীর ডাক ভেসে আসছে৷ আগমনীর একটু ভয়ই লাগে। কৌশিকের দিকে সরে এসে হাঁটতে শুরু করে এবার। কৌশিক ওর কাঁধে একটা হাত রেখে বলে, ‘আফসোস শুধু একটাই। বড় বয়সের প্রেম তো, যেমন চুপচাপ শুরু হয়েছিল, তেমনই শান্তভাবে নিভে গেল। কোনও চিৎকার চেঁচামিচি, ঝামেলা ক্যাচাল হল না!’
আগমনী পাইন গাছের গায়ে জমা নরম শ্যাওলায় হাত বোলায়, ‘জানিস, আমি যখন ছোট ছিলাম আমাদের তিনতলার ছাদে পায়রা থাকত। একটা পায়রা ভীষণ সুন্দর দেখতে ছিল। সবুজ, নীল আর সাদা মেশানো ঘন পালক ছিল পায়রাটার। ডাকটাও মিষ্টি। দুপুরে একদিন পড়তে পড়তে দেখলাম, পায়রাটা নিচের লনে এসে বসে আছে। উড়ছে না। স্রেফ বোকার মতো লনে চুপ করে বসে আছে। খানিক পরে বুঝলাম বেচারা কোনওভাবে ডানা ভেঙে ফেলেছে। উড়তে না পারলে কী করতে হয় কেউ শিখিয়ে দেয়নি ওকে। মুখটা দেখে ভারি মজা লেগেছিল, গম্ভীর মহাজ্ঞানী মার্কা মুখ। বোধহয় খানিক রূপের অহঙ্কারও ছিল পায়রাটার।
খুব কষ্ট হল আমার। বুঝলাম বেশিক্ষণ বাঁচবে না পায়রাটা। আমাদের নিচের লনেই একটা কুকুর শুয়ে থাকে। আমি পৌঁছানোর আগেই ও খেয়ে ফেলবে পায়রাটাকে। নিচে নেমে দেখলাম যেখানে ছিল সেখানে নেই পায়রাটা। খেয়াল করতে দেখলাম, একটু দূরে রক্তমাখা সাদা আর নীল পালক ছড়ানো৷ শুধু মাংসপিণ্ড হয়ে শরীরটা পড়ে আছে। আমি আগেই জানতাম এটা হবে। তাই আলাদা করে এটার জন্য কষ্ট হয়নি। কষ্টটা কী নিয়ে হয়েছিল জানিস?’
‘কী নিয়ে?’
‘কুকুরটা পায়রাটাকে যেভাবে মেরেছিল সেটা নিয়ে। অত সুন্দর লোমগুলো সব ছড়িয়ে পড়েছিল নোংরা হয়ে। একটা বীভৎস মাংসের ডেলা হয়ে গেছিল অত সুন্দর পাখিটা। তারপর থেকে জীবনে একটা জিনিস বুঝেছি, যে জিনিসটাকে একদিন খুব সুন্দর বলে মনে হয়েছে, তাকে দরকার হলে ছেড়ে আসব, কিন্তু কুৎসিত করে ফেলব না। একটা সুন্দর সম্পর্ক ভেঙে গেলে যত্ন করে ঘাড় মটকে ফেলে দেব পুকুরের জলে। কাঠ সাজিয়ে আগুনে ঝলসে ছাই করে দেব। তাও এক একটা করে ডানা ছাড়িয়ে নখ দাঁত দিয়ে বীভৎস একটা মাংসপিণ্ডে পরিণত করব না৷’
দুজনে বুঝতে পারে হাঁটতে হাঁটতে ক্রমশ জঙ্গলের গভীরে ঢুকতে শুরু করেছে ওরা। এখান থেকে হোমস্টের আলো দেখা যাচ্ছে না। ঝোঁকের মাথায় এতদূর চলে এল। এবার ফিরতে অসুবিধা হবে কিনা কে জানে।
‘তোর সঙ্গে প্রেম করে গান্ডুগিরি করেছিলাম ঠিকই, তবে তোকে আমি একটা কমপ্লিমেন্ট দিতে পারি… হাসি মুখে বলে আগমনী।
‘দে৷’
‘প্রেমে তোর তেমন ক্যালমা না থাকলেও তোর চলে যাওয়াটা ভারি সুন্দর। মানে আমি কবি হলে বিরহে কবিতা ফবিতা লিখে ফেলতে পারতাম। বেশ এস্থেটিক গুড বাই।’
কৌশিক এক পলকের জন্য হাঁটা থামায়। তারপর আবার পা বাড়িয়ে বলে, ‘মাঝে মাঝে মনে হয় আমি মানুষ না ফানুশ।’
‘ফানুশ কেন?’
‘লোকে আমায় যত্ন নিয়ে তৈরি করে, দোকানে সাজিয়ে রাখে, এন্তার পয়সা খরচ করে কিনে আনে। তারপর একদিন সন্ধ্যায় ছাদে নিয়ে গিয়ে বুকে আগুন জ্বেলে উড়িয়ে দিয়ে তাকিয়ে আমার উড়ে চলে যাওয়া দেখে। ছোট হয়ে আসা দেখে। আমি বুঝতে পারি না কেন, আমি তো হাতেই ছিলাম, ঘরের এককোণে পড়ে ছিলাম। আমাকে উড়িয়ে দেওয়ার আনন্দ কি আমাকে আগলে রাখার আনন্দের থেকে বেশি?’
স্বর ক্ষীণ হয়ে আসে ছেলেটার, ‘আমার চলে যাওয়াটা দেখতে সুন্দর বলেই আমাকে যে কোনও সন্ধ্যায় উড়িয়ে দেওয়া যায়?
হঠাৎ অনেকদিন পর কৌশিক ওর পাশে হাঁটছে বলে খানিকটা নিশ্চিন্ত লাগে আগমনীর। যা হবে দুজন মিলে বুঝে নেওয়া যাবে। এই জনশূন্য আদিম পাহাড়ি অরণ্যে ছেলেটার উপস্থিতি ওর মনের মধ্যে শান্তির পরশ বুলিয়ে যায়। একটা হাত বাড়িয়ে ওর হাত ধরে নেয় আগমনী।
‘এই গেদু, তোর ভয় করছে না তো?’
কৌশিক হেসে তাকায় ওর দিকে, ‘করছে, তবে লেপার্ডে নয়।’
‘তাহলে কীসে?
‘এই ধর, আপাতত তোর মনে হচ্ছে আমার সঙ্গে পাহাড়ে হাঁটা যায়, গল্প করা যায়, কাল দুম করে এটা তোর ভালো নাও লাগতে পারে। সেইটার ভয় পাচ্ছি।’
‘তোর আমাকে খামখেয়ালি মনে হয়?’ অভিমানী গলায় প্রশ্ন করে আগমনী।
‘তুই খামখেয়ালি নোস?’
‘উঁহু, একদম না।’
‘যদি না হতিস তাহলে অন্তত একবার মায়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াতিস।’ শান্ত নিরুত্তাপ গলায় বলে কৌশিক। জঙ্গলের গভীরে ওর গলার আওয়াজ যেন প্রতিধ্বনিত হয়। কয়েক মুহূর্তের জন্য চাঁদের আলো ঢেকে দেয় পাইন গাছের পাতা। ভারি বাতাস এসে চেপে ধরে ওদের।
ধীরে ধীরে চোখ তুলে কৌশিকের দিকে তাকায় আগমনী, ‘এসব ব্যাপারে তুই কিছু জানিস না৷ ডোন্ট গেট মি স্টার্টেড।’
হঠাৎ কী মনে করে দাঁড়িয়ে পড়ে কৌশিক, ওর দিকে এগিয়ে যায়, ‘কর, স্টার্ট কর। করব করব বলে ভয় দেখিয়ে চেপে দিস না। মাকে নিয়ে কী সমস্যা তোর?’
‘হাউ ডেয়ার ইউ ব্রিং দিস হিয়ার। আমি কীসের মধ্যে দিয়ে গেছি তুই জানিস?’
আগমনীর গলায় আচমকাই একটা কর্কশ ভাব এসে মেশে।
‘কীসের মধ্যে দিয়ে গেছিস? তোর মা তোকে নিজের রক্তে ভেসে যাওয়া মেঝেতে বসে কাঁদতে বাধ্য করেছে? নাকি একটা লোকের সঙ্গে প্রেম করে তোকে ফেলে পালিয়ে গেছে? আর পাঁচটা মা তার মেয়ের সঙ্গে যা করে তার বাইরে তোর মা কী করেছে?’
আগমনী উত্তর দেয় না। দূরে চাঁদের আলোয় ভেসে যাওয়া পাইন গাছের দিকে একমনে চেয়ে থাকে।
উত্তর না পেয়ে ওর কাঁধে একটা ধাক্কা মারে কৌশিক। হঠাৎ করেই কেমন আক্রমণাত্মক হয়ে পড়েছে ছেলেটা, ‘চুপ করে গেলি যে? এই তো স্টার্ট করার ভয় দেখাচ্ছিলি। ধরে নে, আমি তোর মায়ের উকিল। টেল মি, হোয়াট ডিড শি ডু টু ডিজার্ভ দিস যে নিজের মেয়ে তার ডেথবেডে অবধি আসবে না?’
‘আই উইশ শি ডিড সামথিং … হুট করেই ওর দিকে ঘুরে তাকায় আগমনী। এই আধো অন্ধকারেও ওর চোখ দেখতে পায় কৌশিক৷ জল নয়, চাঁদের আলো চিকচিক করছে সেখানে। চোয়ালটা অদ্ভুতরকমের শক্ত হয়ে গেছে মেয়েটার। রাতের হাওয়ায় ওর গায়ের চাদর উড়ছে। এখন আর সেটাকে টেনে জড়িয়ে নিচ্ছে না ও।
‘আই উইশ আমার মা এমন কিছু করত যাতে আমি মায়ের থেকে দূরে চলে যাওয়ার একটা রিজন পেতাম।’ আগমনী এক পা এগিয়ে আসে ওর দিকে, ‘একদিন ফোন করে খিস্তি করত, একদিন লোকজনের সামনে দুটো চড় মারত, জোর করে কারো সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিত, আমি নিজেকে এটা বুঝিয়ে নিতাম যে আমার মা খারাপ ছিল। আমার সঙ্গে অমুক অমুক খারাপ করেছিল তাই আমি একা থাকি। তাই আমার ইস্যু আছে, আমার কমপ্লেক্স আছে, ইন্সসিকিওরিটি আছে…কিন্তু আমার মা এসব কিচ্ছু করেনি। শি ওয়াজ ওয়ান হেল অফ আ গ্রেট মাদার…’
‘তাহলে তুই মাকে ছেড়ে চলে এলি কেন?’ কৌশিকের গলা নরম হয়ে আসে।
কয়েকটা সেকেন্ড নিস্পন্দ কেটে যায়। গাছের পাতার ঘষা লাগার শব্দ হয়। পায়ের কাছে থেকে কিছু সরে যায় ঝট করে।
‘আমি চাইনি গেদু…’ আগমনীর স্বরে বাষ্প মেশে। হাহাকারের মতো শোনায় ওর গলার আওয়াজ, ‘আমি মাকে ছেড়ে আসতে চাইনি। কিন্তু আমি কাউকে এটাও বোঝাতে পারিনি যে আমার ভিতর একটা মানুষ থাকে—যে খুব ভীতু। তুই ভাবতেও পারবি না আমি এত ভীতু। বাবা চলে যাওয়ার পর থেকে সে সারাক্ষণ শুধু ভয় পেয়ে থাকত। বাবার মতো মাও চলে যাবে আমাকে ছেড়ে! সে কোনওদিন মাকে বলতে পারেনি। বলতে গিয়ে ফিরে এসেছে, আর আমাকে না বলেই এক-পা এক-পা করে দূরে চলে গেছে মায়ের থেকে। হারিয়ে ফেলার ভয় আমাকে মায়ের থেকে দূরে নিয়ে চলে গেছে…
ওর হাত চেপে ধরে মেয়েটা, ভীষণ অসহায় দেখায় তাকে, ‘আমার মা বলত মায়েদের গ্রামের বাড়িতে তালদিঘি বলে নদী আছে৷ আমরা জলের উপর কোনও অসম্ভব ইচ্ছা লিখে নৌকা ভাসালে সেই সব নৌকা ওই তালদিঘিতে চলে যায়। আমি অনেক বড় বয়স পর্যন্ত খালি এই ইচ্ছেটা লিখে নৌকা পাঠাতাম যে আমি যেন মায়ের আগে মরে যাই।’
কৌশিক হাত রাখতে যায় ওর মাথায় কিন্তু হাতের ঝাপটায় ওকে দূরে সরিয়ে দেয় আগমনী, ‘আরও আরও আরও, অসংখ্য খামখেয়ালি ইচ্ছা সব নৌকো করে ভাসিয়ে দিতাম তালদিঘিতে। এই আঠাশ বছর বয়স অবধি আমি সব ইচ্ছাকে নৌকা করে ভাসিয়ে দিয়েছি তালদিঘিতে। কিন্তু না গেদু, আমার কোনও অসম্ভব ইচ্ছা পূরণ হয়নি। আমাকে নিজের ফ্ল্যাটে বসে কাপুরুষের মতো মায়ের মৃত্যুসংবাদ শুনতে হয়েছে।’
কথাগুলো বলতে বলতে কয়েক পা পিছিয়ে গেছিল আগমনী। ওর গলার আওয়াজ এখন অনেকটা চাপা শোনায়, ‘আর কী আছে বল আমার? মা? বাবা? বন্ধু? ছেলেবেলা? প্রেম? আমার জন্য কে অপেক্ষা করছে বল? কাউকে আঁকড়ে ধরতে গেলে ভয় ছাড়া আর কী পাবার কথা আমার?’
হঠাৎই পা’টা টলে যায় আগমনীর। মাথার ভিতরটা তরল লাভার মতো গলতে থাকে যেন। পাহাড়ি অন্ধকারের ভিতর তুলিয়ে যেতে থাকে ওর শরীরটা। কৌশিক এক লাফে ওকে ধরতে যায়। আগমনী বিড়বিড় করে বলতে থাকে….
‘নহর…নহর আমায় ডাকছে…’
