তালদিঘিতে ভাসিয়ে দেব – ১২
দ্বাদশ অধ্যায়
খুঁটিদের পাড়ার পুজো প্যান্ডেলের সামনে দাঁড়িয়েছিল তিনজন। পুরোহিত মশাই একটু আগে ঘণ্টা নেড়ে পুজো করে গেছেন। কাটা ফল আর ধুনোর গন্ধ মম করছে। গাঁদা ফুলের হলদে আর কমলা রঙে ভরে আছে জায়গাটা। সরস্বতী ঠাকুরের পায়ের কাছে বসা রাজহাঁসটাকে দেখলে মনে হচ্ছে যেন চোখ টেরিয়ে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। অঞ্জলি টঞ্জলি না দিয়ে শাড়ি পাঞ্জাবি পরে প্রেম করতে বেরিয়ে পড়েছে যারা তাদের ঠারেঠোরে চিনে রাখছে।
খুঁটির আসতে মিনিট দশেক সময়ে লাগে। সাদা পাঞ্জাবি আর নীল জিনস পরেছে আজ। পাঞ্জাবিটা অবশ্য দুর্গাপুজোর সময় কেনা। তখন পরা হয়নি। আগের বছরের জন্মদিনে বাবা একটা খয়েরি ব্যান্ডের ঘড়ি কিনে দিয়েছিল। কিন্তু সেটার ব্যাটারি ফুরিয়ে গিয়ে বন্ধ হয়ে গেছে। উপায়ন্তর না দেখে সেটাকেই পরে নিয়েছে খুঁটি। পাঞ্জাবির সঙ্গে ঘড়ি যায় ভালো, সবসময় অত নাই বা চলল।
‘সাম্য এল না?’ ওকে হনহন করে হেঁটে আসতে দেখেই নহর জিগ্যেস করে।
হতাশ হয়ে দুদিকে মাথা নাড়ে খুঁটি, ‘ওর বাপ আসতে দেয়নি। বলেছে ছেলে নাকি এদিক-ওদিক ঘুরে প্রেম করবে। তাই বাড়ি থেকে বের হতে দেবে না।’
বেদান্ত নাক সিঁটকোয়, ‘আমাদের বাপ মায়েরা এসব বেকার আইডিয়া কোথা থেকে পায় কে জানে। রাতে বাড়ির বাইরে থাকলেই ছেলেমেয়েরা নাকি চুমু খেয়ে ফেলবে। এদিকে জিগ্যেস করে দেখ, ছেলেছোকরা সবাই দিনেরবেলা চুমু খেয়ে বসে আছে।’
‘তুই কখন খেয়েছিস?’ খুঁটি পাঞ্জাবির হাতা গোটাতে গোটাতে জিগ্যেস করে।
বেদান্ত শার্টের পেটের কাছ থেকে ধুলো ঝাড়ে, ‘রোড রাশ খেলে।’
‘অ্যাঁ!’ আগমনী অবাক হয়, ‘তুই গেম খেলে চুমু খেয়েছিস!’
ব্যাদার গলা ভাবুক শোনায়, ‘দেখ ভাই, সেই ছেলেবেলায় রোড রাশ সবাই খেলেছে। সেখানে মাঝে মাঝে রেসে ফার্স্ট হলে একটা মেয়ে লাল লিপস্টিক পরে হেলমেটে চুমু খেয়ে যেত। যে যাই বলুক, সেটাই আমাদের সবার প্রথম চুমু।
শীতকাল পড়লে ওরা সবাই সিগারেট খায়। অন্তত মুখ দিয়ে ধোঁয়া বেরোনো দেখলে তাই মনে হয়। যারা সত্যিকারের সিগারেট খায় না তারা খামোখাই মুখ হাঁ করে ধোঁয়া বের করে। নহর মাঝে মাঝে কাচের উপর অমন ধোঁয়া দিয়ে বাস্প তৈরি করে। তারপর সেই বাস্পের উপরে নিজের হাতের ছাপ দেয়। অন্যরা সেই ছাপের উপরে নিজেদের হাত রাখে। নহর বলেছে, যারা এরকম একে অপরের হাতের উপরে হাত রাখে তাদের বন্ধুত্ব কখনও ভাঙে না। আগমনীর অবশ্য আজকাল ভয় লাগতে শুরু করেছে। স্কুল জীবন শেষ হয়ে আসছে ধীরে ধীরে। টুয়েলভে আর ক’দিনই বা ক্লাস হয়…
প্যান্ডেলের সামনে দাঁড়িয়ে একবার কপালে হাত ছোঁয়ায় ওরা। একটা লোক কী যেন লিফলেট বিলি করছিল। ওরা হাতে নেয়। কিন্তু পড়ে দেখে না। তারপর হেঁটে আরও কিছুদূর এগিয়ে আসে। নহরের দিকে ভালো করে তাকায় আগমনী, সত্যিই আশ্চর্য সুন্দর দেখাচ্ছে ওকে। পাট ভাঙা বাসন্তি রঙের শাড়ি ঝালরের মতো আগলে রেখেছে লম্বাটে শরীরটাকে। কোঁকড়া চুলের ঝাঁক পিঠ থেকে গালের দু’পাশ অবধি ভরিয়ে রেখেছে। ঠোঁটের নিচে ছোট করে ফুটে থাকা তিলটা হালকা মেক আপ করেছে বলে আরও বেশি করে ফুটে উঠেছে।
‘তোকে শাড়ি পরা কে শিখিয়েছে রে?’ আগমনী মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে জিগ্যেস করে।
‘তোকে যে শিখিয়েছে৷ মা।’
‘ধুর, আমি নিজেই শিখেছি। তাই অত ভালো দেখায় না।’
প্যান্ডেল থেকে খানিক দূরেই চোঙের গায়ে মাইক বাজছে। সেখানে একটু আগে পুরোহিত মশাই সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে হেঁকে গেছেন। তারপর পাড়ার ফচকে ছেলেরা মৃদু স্বরে হিন্দি ফিল্মের গান চালিয়েছে, ছোড় আয়ে হাম উও গলিয়া৷
ব্যাদা হাঁটতে হাঁটতে মন দিয়ে শুনছিল গানটা, খুশি হয়ে বলে, ‘তোদের মনে আছে, ছোটবেলায় টিভি খুললেই শোনা যেত এই গানটা…’
‘হ্যাঁ, আমিও শুনেছি।’ খুঁটি এতক্ষণে মন দেয় গানের লাইনগুলোতে, ‘সেই যে বরফের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গাইছিল।’
‘বাবা!’ ব্যাদা অবাক হয়, ‘তুই টিভিতে গান শুনতিস? আমি তো ভাবলাম শুধু এফ টিভি দেখে বড় হয়েছিস।’
খুঁটি ক্ষুণ্ণ হয়, ‘আমাদের শালা এফ টিভি আসত না। পাড়ার বুড়োরা লোকাল কেবলের অফিসে গিয়ে ঝামেলা করে বন্ধ করে দিয়েছিল।’
‘এই বুড়োগুলো এক একটা হাড়হারামি।’ ব্যাদার গলা রাগত শোনায়, ‘খালি গল্পের বইতেই ঠাকুরদার ঝুলি, ঠাকুমার ঝুলি থেকে গল্প বেরোয়। বাস্তবের বুড়োদের ঝুলি থেকে শুধু অন্যের পেছনে লাগার জন্য কাঠি বেরোয়।’
আজ কাকভোরে স্কুলে এসেছিল নহর আর আগমনী। দুজন মিলে আলপনা দিয়েছে, ফল কেটেছে। সাদা ফুলের মালা তৈরি করেছে এক ঝুড়ি। সেখান থেকে আর বাড়ি ফেরার সুযোগ হয়নি ওদের। ভেবেছিল পাঁচজনে মিলে বেরোবে। কিন্তু সাম্যর বাপ বেঁকে বসেছে। সাম্য মাঝে মধ্যেই বাড়িতে মার খায়। বিশেষ করে ওর বাপ এমন পিশাচের মতো মারে যে গায়ে হাত পায়ে দাগ থেকে যায়।
বেদান্তরও যাওয়ার ইচ্ছা ছিল না। দিয়া সেনের ব্যাপারটার পর থেকেই কেমন মুষড়ে পড়েছে ব্যাটা। আগমনী জোরজার করতে একবার মিনমিন করে বলেছিল, ‘তোরা যা ভাই, আমার তো আর কেউ নেই…’
সাম্যর দিকে আঙুল তুলে দেখিয়েছিল খুঁটি, ‘আরে, তুই চিন্তা করছিস কেন? সাম্য তোকে মেয়ে খুঁজে দেবে।
সাম্য চুপচাপ একদিকে বসে আমপাচক খাচ্ছিল। ফুঁসে উঠে বলেছিল, ‘আমি কী করে খুঁজে দেব? ম্যাপ পয়েন্টিং-এ সুয়েজ ক্যানেল খুঁজে পাই না, আর মেয়ে…’
আগমনী হাত বুলিয়েছিল ওর মাথায়, ‘তোর এত চাপ নেওয়ার কী আছে ভাই? সরস্বতী পুজোয় কত মেয়ে মিষ্টি করে সেজে রাস্তায় বেরোয়। কাউকে একটা পছন্দ হয়েই যাবে।’
‘হ্যাঁ,’ মুখ বেঁকিয়েছিল ব্যাদা, ‘তারপর পরদিন সকালবেলা মুখ ধুলে আর পছন্দ হবে না। তখন কী করব?
সাম্য আমপাচক খাওয়া থামিয়ে গম্ভীর গলায় বলেছে, ‘এই জন্যেই মনে হয় হেমন্ত মুখার্জি বলেছেন, আমি দূর হতে তোমারেই দেখেছি, আর মুখ ধুয়ে চোখে চেয়ে থেকেছি। মানে মুখ ধুয়ে কাছে গেলে আর চেয়ে থাকা যেত না। দূরে থেকে দেখছে বলেই চেয়ে আছে…’
‘আহ্!’ নহর সংশোধন করে দেয়, ‘ওটা মুগ্ধ চোখের কথা বলা হয়েছে। মুখ ধোয়ার কোনও ব্যাপার নেই।’ তারপর ব্যাদার দিকে চেয়ে বলেছে, ‘দেখ ভাই, আমি তোকে মেয়ে খুঁজে দেব। তুই একটা কালো পাঞ্জাবি পরে বেরোবি শুধু। আর হালকা দাড়ি থাকবে। ব্যস…’
‘থাকবে মানে?’ সাম্য উথলে ওঠে, ‘দাড়ি কি ওর বাপের চাকর নাকি যে হাঁক দিলেই চলে আসবে?’ বলে কাঁধ ঝাঁকায়, ‘এখানে পাঁচজনের মধ্যে একমাত্র আমারই দাড়ি আছে৷’
অপমানটা হজম করে না ব্যাদা, ‘শুধু দাড়ি থাকলেই হয় না, তার যত্ন নিতে হয়। ওই নোংরা খোঁচা দাড়ি দেখে মেয়ে আসে না, শুধু উকুন আসে। আর ডাল লেগে থাকে।’
সাম্য তেড়ে গেছিল ওর দিকে। বাকি তিনজন মিলে কোনওরকমে নিরস্ত করে ওদের।
তবে সরস্বতী পুজোতে আসতে রাজি হলেও পাঞ্জাবি পরতে চায়নি ব্যাদা৷ একটা লম্বাটে ধরনের কুর্তা আর জিনস পরে আছে। বাকি তিনজনের সঙ্গে একেবারেই মানাচ্ছে না ওকে।
আজ রাস্তাঘাটে বয়স্ক লোকেদের বিশেষ দেখা যাচ্ছে না। যেদিকেই চোখ যায় কেবল রংবেরঙের পাঞ্জাবি আর শাড়ির মেলা বসে গেছে। কোনও পাঞ্জাবি পরা হাত পাশে হাঁটতে থাকা প্রেমিকার হাতের আঙুল খুঁজে নিচ্ছে অজান্তেই। পরক্ষণেই কেউ দেখে ফেলার ভয়ে শাড়ির আঁচল দিয়ে দুটো হাতই ঢাকা দিয়ে দিচ্ছে মেয়েটা। কখনও সেই হাত ছাড়িয়ে মাটিতে বসে শাড়ির কুচি ভাঁজ করে দিচ্ছে কেউ। পায় হাত লেগে গেলে প্রেমিকের মাথায় হাত ঠেকিয়ে নিজের কপালে ঠেকাচ্ছে। ছেলেটা উঠে দাঁড়ানোর সময় প্রেমিকার মুখের দিকে চেয়ে লাজুক চোখে মৃদু হাসছে। পুরস্কার হিসেবে হয়তো তার গাল টিপে দিচ্ছে মেয়েটা।
ইলেভেনের সরস্বতী পুজো অবধি ছেলেদের জীবন মোটামুটি নিস্তরঙ্গ কাটে। তারা বড়জোর সৌরভ গাঙ্গুলী মাঠে নামলে ইডেনকে পালটে যেতে দেখেছে, কালবৈশাখী মাঠে নামলে কাঠফাটা গ্রীষ্মের দুপুরকে পালটে যেতে দেখেছে, কিন্তু হেলাফেলা করা প্রেমিকাকে শাড়ি পরে বাসস্টান্ডে অপেক্ষা করতে দেখার মতো পালটে যাওয়া আগে দেখেনি। বিস্ময়ের ঢেউ শাড়ির আঁচলে ঝুলতে থাকা সুতোয় বেঁধে নেয় তাদের। ওই মুগ্ধতার চিটকোডের কাছে হেরে যাওয়ার রেওয়াজ সেখান থেকেই শুরু। তারা জানে আর হাফভলি বল এলেও স্টেপ আউট করতে পারবে না। এলএইচএস ইকুয়ালসটু আর এইচএস লিখে দেওয়ার পরেও ‘প্রমাণিত’ লিখতে ভুলে যাবে। হ্যাং হয়ে যাওয়া গেমেও অল্ট-কনট্রোলডিলিট একসঙ্গে টিপে রিস্টার্ট মারতে পারবে না।
খানিকটা না বুঝেই সেই বিপদের দিকে পা বাড়িয়েছিল খুঁটি। ওদের এলাকার গোটা পাঁচেক স্কুল মিলে সরস্বতী পুজোর দিন একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। পাঁচটা স্কুলের আগ্রহী ছাত্র ছাত্রীরা অংশ নেয় তাতে। গান, নাচ, আবৃত্তি, তাৎক্ষণিক বক্তৃতা, যে যা পারে তাই করে। বাকিদের জন্য সামনে গোটা পঞ্চাশেক চেয়ার পেতে দেওয়া হয়। আপাতত সেদিকেই পা বাড়িয়েছে ওরা।
অন্যবারও অনুষ্ঠান দেখতে যায়। কিন্তু এবার খুঁটির বিশেষ উদ্দেশ্য আছে৷ স্কুলে ওদের সেকশন থেকে ওকেই অনুষ্ঠানের কাজকর্মের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেখানে নাচের লিস্টে মৌসুমির নাম দেখতে পেয়েছে ও। অর্থাৎ আজ মৌসুমি স্টেজে নাচবে। ফলে অন্যবারের থেকে এবারে মাঞ্জাটা একটু বেশিই দিয়েছে৷
সল্টলেকেরই একটা সরকারি মাঠে ছোটখাটো স্টেজ বানানো হয়েছে৷ সকাল থেকেই অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে৷ ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে স্টেজটা। তার উপরে মাইক হাতে দাঁড়িয়ে একটা অল্পবয়সি ছেলে কী যেন ঘোষণা করছে। সামনে রঙিন জামাকাপড় পরা ছেলেমেয়ে গিজগিজ করছে। তাদের চিৎকার চেঁচামিচিতে দুপুরের রোদও বুঝি শান্ত হয়ে পড়েছে।
ভুরুর উপর হাত রেখে দেখার চেষ্টা করে নহর, ‘কোথায় ভাই, তোর মৌসুমির নাচ তো দেখা যাচ্ছে না?’
খুঁটিও খানিক হতাশ হয়। তাও ওদের শান্ত করার চেষ্টা করে, আরে, মৌসুমি শোলের হেমা মালিনি নাকি যে বললেই নাচবে। এখন তাৎক্ষণিক বক্তৃতা আছে, তারপর ওর নাচ…’
আগমনী বেদান্তর মুখের দিকে দেখে নিরুত্তাপ গলায় বলে, ‘বক্তৃতা শোনার জন্য আবার এখানে কেন, বখতিয়ার খিলজি তো আমাদের সঙ্গেই ছিল।’
ব্যঙ্গটা গায়ে মাখে না ব্যাদা। কাঁধ ঝুঁকে পড়ে তার, ‘ধুর শালা, তোর মৌসুমির নাচ দেখতে গিয়ে স্কুলের খিচুড়ি বেগুনিটা মিস হয়ে গেল। কী দরকার ছিল এত তাড়াতাড়ি আসার?’
এপাশ-ওপাশ তাকিয়ে মৌসুমির মাকে দেখতে পায় না খুঁটি। খানিকটা নিশ্চিন্ত হয় সে। চারজনে স্টেজের কাছাকাছি একটা জায়গা খুঁজে নিয়ে বসে পড়ে।
একটা ক্লাস সেভেনের মেয়ে বক্তৃতা দিচ্ছে। কী সব হাবিজাবি বলে চলেছে যেন। ওদের কানে ঢোকে না সেসব। আগমনী অন্যমনস্কভাবে সেদিকে চেয়ে থাকতে থাকতে নহরের দিকে সরে আসে, ‘এ বছর স্কুলে থাকতে শেষ সরস্বতী পুজো।’
‘কেন? পরের বছর হবে না? ‘
‘হবে, কিন্তু এই সময় এইচএস থাকবে। আমাদের ইয়ারটা আসতে পারবে না। আমার ভালো লাগছে না, জানিস?’
‘কেন?’
‘স্কুল শেষ হয়ে গেলে আর এরকম দেখা হবে না। ওদেরকে বলেছিলাম, পাত্তাই দিল না!’
নহর হাসে, ‘এদিকে দেখ, আমরা এখানে সবে এক বছর পড়েছি। ওরা বারো বছর পড়েছে।’
আগমনী ওর দিকে ঘুরে বসে, ‘আমার কী মনে হয় জানিস ইনা, আমি আমার বয়সের থেকে হুট করেই অনেকটা বড় হয়ে গেছি। আমার বয়সি কেউ বুঝতে পারছে না কিন্তু আমি বুঝতে পারছি যে এই সময়টা আমার জীবনে আর ফিরে আসবে না৷’
‘কোনও সময়ই ফিরে আসবে না।’
‘কিন্তু এই সময়টা আমি চাইব, সবসময় চাইব ফিরে আসুক। এই আদুরে সময়টা থেকে যাক চিরকাল।’
হাত বাড়িয়ে ওর হাতটা ধরে নেয় নহর। ওর ঘোলাটে মায়াবি চোখদুটো কোন গভীরতায় টেনে নিয়ে যায় ওকে, ‘কোনও কিছুই চিরকাল থাকে না মণি।’
মণি হাসে, ‘তবু ইচ্ছে হয়। মানুষ মরে গেলেও তার ইচ্ছে থেকে যায় চিরকাল। আমাদের পৃথিবীতে কোথাও একটা লুকানো তালদিঘি আছে জানিস। আমার মা বলে সব ইচ্ছেকে নৌকো বানিয়ে ওই দিঘিতে ভাসিয়ে দিতে হয়। আমি আমার এই ইচ্ছেটাকেও ভাসিয়ে দেব ওখানে।
‘কী হবে তাতে?’
‘কিচ্ছু হবে না। কিছুদূর গিয়ে টুপ করে ডুবে যাবে। জলের তলায় তলিয়ে যাবে।’
‘তাই?’ অদ্ভুত একটা হাসি হাসে নহর, ‘লাভ কী তাতে?’
‘আমি জানব, আমার ইচ্ছেটা স্রেফ ডুবে গেছে। মরে যায়নি।’
আচমকা হাততালির আওয়াজে চমক ফেরে ওদের। খুঁটির চোখমুখ দেখে বুঝতে পারে মৌসুমি স্টেজে উঠছে। লাল পাড় সাদা শাড়ি পরেছে মেয়েটা। কপালের ঠিক উপরে একটা মুকুট। তার নিচেই বড় লাল টিপ। ভারি মিষ্টি দেখাচ্ছে মেয়েটাকে।
মৌসুমি স্টেজে উঠতেই এতক্ষণ উৎসাহে থাকা খুঁটি কেমন যেন থমথমে হয় যায়। নহর খোঁচা মারে তাকে, ‘কী রে, হলটা কী তোর?
‘টেনশন হচ্ছে।’
‘ন্যাকা’, হেসে সামনে তাকায় নহর।
স্টেজের দু’পাশে রাখা মাইকে গান বেজে ওঠে, ‘যখন প্রথম ধরেছে কলি আমার মল্লিকাবনে।’ ছোট মিটার পাঁচেক প্রস্থের স্টেজের উপর নাচতে শুরু করে মেয়েটা। সামনের সিট থেকে জনাপঞ্চাশেক ছেলেমেয়ে চেয়ে থাকে সেদিকে৷
মিনিটখানেক চলার পরেই নহর আবার খোঁচা মারে খুঁটিকে, ‘এই ভাই, এ তো স্টেপ ভুলে যাচ্ছে।’
ব্যাপারটা খুঁটিও লক্ষ করেছে। ভুরু কুঁচকে গেছে তার। অন্ধকার নেমেছে চোখে মুখে। দু-একটা স্টেপ করেই তাল কেটে যাচ্ছে মেয়েটার। খুঁটি বিড়বিড় করে, ‘মনে হয় টেনশনের ঠ্যালায় স্টেপ ভুলে যাচ্ছে। প্রথমবার স্টেজে উঠে চাপ খেয়ে গেছে!’
আগমনী সরে আসে ওদের দিকে, ‘এরকম করে ছড়ালে তো প্যাঁক খাবে ভাই!’
‘কী করব?’ খুঁটি দাঁত দিয়ে নখ কাটে।
‘কী আর করবি? এখন থামাতে গেলেও লজ্জাজনক ব্যাপার হবে। যা হচ্ছে হতে দে।’
অস্থির হয়ে নিজের কোলের উপরেই বার তিনেক হাত ঠোকে খুঁটি। তারপর হুট করেই উঠে পড়ে সিট থেকে৷
‘আসছি একটু, তোরা বস…’ বলেই হনহন করে স্টেজের দিকে হেঁটে কোথায় যেন মিলিয়ে যায় সে।
একটু ভয়ই পেয়ে যায় নহর, ‘গেল কোথায়? মাইকের তার-ফার খুলে দেবে নাকি?’
বেদান্তকেও চিন্তিত দেখায়, ‘তার খুলতে গিয়ে ধরা পড়লে ছেলেরা ওর বীরবল খুলে হাতে ধরিয়ে দেবে।’
তিনজনে চুপ করে বসে থাকে কিছুক্ষণ। আগমনী দু’একবার এদিক-ওদিক চেয়ে দেখে আশপাশের কয়েকটা ছেলে থেকে থেকেই নহরের দিকে চোখ বুলিয়ে যাচ্ছে। সত্যি দুপুরের রোদ ওর নরম মুখের উপর পড়ে পিছলে যাচ্ছে।
আগমনীর মজাই লাগে। নহরকে চেষ্টা করেও একটুও হিংসা করতে পারে না ও। মাঝে মাঝে খুঁটিকে হয় অবশ্য। এই যে কাউকে এত প্রাণ ঢেলে ভালোবাসতে পারা, এটা ও চেষ্টা করেও পারে না। বা যতটা পারে ততটা দেখাতে পারে না।
এলোমেলো ভাবনা ভাবতে ভাবতে হুট করেই আবার স্টেজের দিকে চোখ চলে যায় ওর। নাচ এখনও শেষ হয়নি। অবাক হয়ে আগমনী দেখে মৌসুমির মধ্যে একটু আগের জড়তা উধাও। গোটা স্টেজ জুড়ে ঘুরে ঘুরে নেচে চলেছে সে। এক একটা স্টেপে মাঝেমধ্যেই দর্শক আসন কাঁপিয়ে হাততালির ঝড় উঠছে। একটু অবাকই হয়ে যায় ও।
নহর পরমুহূর্তেই খোঁচা মারে ওর হাতে, ‘এই শালা, হল কী বল তো মেয়েটার? এখন তো তুমুল নাচছে!
‘আমিও তো তাই দেখছি।’ কথাটা বলেই ব্যাদার কাঁধে টোকা মারে আগমনী, ‘আয় তো ভাই, দেখি কী করেছে মালটা।’
ব্যাদা কথা বাড়ায় না। নাচ ভালো হচ্ছে না খারাপ সে নিয়ে তেমন মাথাব্যথা নেই। কিন্তু বসে থাকতে আর ভালো লাগছে না৷
ব্যাকস্টেজে যাওয়ার জন্য খানিকটা সিঁড়ি করা আছে স্টেজের একধারে। অনুষ্ঠানের কর্মকর্তা ছাড়া আর কারো সেখানে যাওয়া মানা। একটা হোমরাচোমরা গোছের ছেলে সেখানে সিগারেট হাতে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছিল।
নহর এগিয়ে গেল তার দিকে, মিষ্টি করে হেসে ন্যাকা গলায় বলল, ‘আমরা একটু ভিতরে যেতে পারি দাদা? আসলে আমাদের বন্ধু স্টেজে…’
ছেলেটা গলে পড়ল প্রায়। আমুদে নরম গলায় পথ দেখিয়ে দিল সে, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ যাও না, কী আছে…’
পর্দা সরিয়ে স্টেজের এন্ট্রির জায়গাটায় আসতেই চমকে গেল ওরা। এখান থেকেও মৌসুমির নাচ দেখা যাচ্ছে, তবে সাইড অ্যাঙ্গেলে। সাইড স্টেজের যে অংশটা পর্দা দিয়ে ঢাকা সেখানে দাঁড়িয়ে আছে খুঁটি। তবে শুধু দাঁড়িয়ে নেই। মাঝে মধ্যে হাত পা নেড়ে কীসব যেন ইশারা করে চলেছে।
ব্যাপার কী?
ভালো করে খেয়াল করতেই বুঝতে পেরে চোখ কপালে উঠল ওদের। মৌসুমি নাচতে নাচতে স্টেপ ভুলে গেলে হাত নেড়ে অঙ্গভঙ্গি করে স্টেপটা ওকে দেখিয়ে দিচ্ছে খুঁটি। ঠিকঠাক মুদ্রা হচ্ছে না বলাই বাহুল্য, কিন্তু সেইটুকু ইশারা থেকেই মৌসুমি বুঝে নিচ্ছে পরের স্টেপটা কী হবে। আগে থেকে স্টেপ দেখতে পাওয়ায় নাচে তেমন অসুবিধা হচ্ছে না ওর।
নহর এগিয়ে গিয়ে পিঠে খোঁচা মারে, ‘এ ভাই, করছিসটা কী?’
খুঁটি বিরক্ত হয়, ‘দেখতে পাচ্ছিস না হেল্প করছি। যা তো এখন। গোলমাল হয়ে যাবে।’
ব্যাদা গিয়ে দাঁড়ায় ওর পিছনে। চাপা গলাতেই বলে, ‘কিন্তু তুই নাচ শিখলি কী করে?’
‘দেখে দেখে…’ নির্বিকার গলায় উত্তর দেয় খুঁটি।
‘দেখলি কোথায়?’
বিরক্ত হয় খুঁটি, ‘কেন ওর নাচের স্কুলের সামনেই তো খেলতে যাই। দেখতে দেখতে মোটামুটি স্টেপ শিখে গেছি।’
আগমনী হাঁ হয়ে যায়। বিড়বিড় করে বলে, ‘মেয়ে দেখতে দেখতে নাচ শিখে গেলি তুই।’
ব্যাদাও খানিক অবাক হয়েছিল, সে ভাবটা মুখ থেকে মুছে নিয়ে বলে, ‘ও শালা মৌসুমির পেছনে যা বনবন করে ঘুরেছে তাতে আর একটু হলে শক্তিমান হয়ে উড়ে যেত। নাচ আর কী…’
মৌসুমির অনুষ্ঠান হয়ে যেতে স্টেজে নতুন কন্টেসট্যান্ট উঠবে। ওরা চারজনে স্টেজ ছেড়ে বেরিয়ে এসে আবার নিজেদের সিটে বসে পড়ে৷ নাচ গানের মধ্যে দিয়ে খানিকটা সময় কেটে যায়। ব্যাদার মুখটা গোটা সময়টাই ব্যাজার হয়ে থাকে। খুঁটি স্টেজের আশেপাশে উঁকিঝুঁকি মারতে থাকে। নহর আর আগমনী নিজেদের মধ্যে গুজুর গুজুর করতে থাকে কীসব।
অনুষ্ঠান শেষ হতে হতে বিকেল হয়ে যায়। মৌসুমি সেকেন্ড হয়েছে নাচে। ওর নাম ঘোষণা হতে হাততালির ঝড় ওঠে দর্শকদের মধ্যে। কেবল খুঁটি হাততালি দেয়নি। ও অবাক হয়ে দেখছিল মৌসুমিকে। পুরস্কার নিতে মেক আপ মুছে স্টেজে উঠেছিল সে। চোখের নিচে কাজল ঘাটা দাগ। শাড়ির কয়েক জায়গায় বাঁধন আলগা হয়ে গেছে। আলুথালু হয়ে গায়ে লেগে আছে সেটা৷ সমস্ত মুখে ক্লান্তির ছাপ, তাও কী অদ্ভুত আদুরে দেখাচ্ছে মেয়েটাকে। খুঁটি হাঁ হয়ে চেয়ে থাকে। এতদিন পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেলে মন ভালো হয়েছে ওর, সতেরো বলে পঞ্চাশ করে নিজেকে শচিন তেন্ডুলকার মনে হয়েছে, পাশের পাড়ার গনাইদের ঘুড়ি মাঝ আকাশে কুচ করে কেটে দিয়ে তারস্বরে ভোকাট্টা বলে চিৎকার করেছে, কিন্তু এই প্রথম অন্য কাউকে সেঞ্চুরি করতে দেখে খুঁটির মনে হল ওর ব্যাট ধরা হাতটাই হাওয়ায় উঠে আসছে ধীরে ধীরে…প্যাভেলিয়ানের দিকে তাকিয়ে নিজের হেলমেটটা খুলে হাওয়ায় ঘুসি চালাচ্ছে ও৷
সেইভাবে কিম্ভূতের মতো কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে চেয়ে থাকে খুঁটি। মৌসুমি স্টেজ থেকে নেমে ওর চোখের সামনে এসে দাঁড়াতে সেই ঘোর ভাঙে। মৌসুমির মুখে স্মিত হাসি। খুঁটি হতচকিত হয়ে কী করবে ভেবে না পেয়ে সোজা দাঁড়িয়ে পড়ে…
‘তুই দাঁড়িয়ে পড়লি কেন? ক্লাসে স্যার ঢুকেছে নাকি?’ নহর পাশ থেকে বিড়বিড় করে বলে।
ব্যাদা একবার সেদিকে চেয়ে তাচ্ছিল্যে মুখ ঘুরিয়ে নেয়, ‘ওকে দেখলেই ওরকম স্টিফ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। ওটা ওর ক্রাশ না জাতীয় সঙ্গীত কে জানে!’
‘থ্যাঙ্ক ইউ…’ একগাল হেসে ওর দিকে একটা হাত বাড়িয়ে দেয় মৌসুমিতুই না থাকলে আমি পারতাম না।’
খুঁটি মিনমিন করে। আদৌ কিছু বলে কিনা বোঝা যায় না। নহর ওকে ঠেলা দেয়, ফিসফিস করে বলে, ‘আরে কিছু তো বল…’
খুঁটির মুখে বাকি ফোটে না। নিজের রোগা শরীরের আশপাশে একটা কচ্ছপের খোলসের অভাব বোধ করে।
‘তোর জন্য একটা জিনিস আছে আমার কাছে…’ কথাটা বলে শাড়ির আঁচলে মুড়ে আনা একটা ভাঁজ করা কাগজ এগিয়ে দেয় খুঁটির দিকে। তারপর এক সেকেন্ড সেখানে দাঁড়িয়ে আবার আগের মতো পা চালিয়ে চলে যায় দূরে।
খুঁটি বসে না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই কাঁপা কাঁপা হাতে কাগজটা খোলে। একটা পেনসিলে আঁকা ছবি। সে ছবিতে মাঠের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে একটা বছর ষোলোর ছেলে। কাঠির মতো চেহারা ছেলেটার। নিজের খেলার মাঠ থেকে সে উঁকি ঝুঁকি মারার চেষ্টা করছে নাচের স্কুলের ভিতরে….
খুঁটি হেসে ফেলে। নহর একবার মুখ বাড়িয়ে দেখার চেষ্টা করতেই কাগজটা গুটিয়ে ফেলে সে।
‘দেখি, দেখি কী দিল তোকে…’ আগমনী ওর হাত থেকে প্রায় ছিনিয়ে নিতে যায় কাগজটা।
‘ভাগ, দেব না…
ওরা চেপে ধরার আগেই ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড় মারে খুঁটি। ফাঁকা মাঠের উপর দিয়ে বাতাসের মতো উদ্দেশ্যহীন ভাবে দৌড়াতে শুরু করে। পেছন পেছন ওকে ধাওয়া করে ওর তিন বন্ধু।
‘দাঁড়া খুঁটি, আরে, দেখাবি তো কী দিল!’ পেছন থেকে ওদের চিৎকার ভেসে আসে।
ছুটতে ছুটতে মাঠ পার করে আসে ওরা। খুঁটির পায়ের বেগ তাও কমে না। আজ মাতাল হাওয়ার প্রেতাত্মা ভর করেছে ওর উপর।
বিধু মণ্ডলের পুকুরের ধার দিয়ে দৌড়ে খুঁটিকে ধাওয়া করছিল ওরা। হঠাৎ করেই মাটির উপর সজোরে আছড়ে পড়ল নহর। নিজের মাথাটা চেপে ধরে ছটফট করল কয়েকবার। তারপর স্থির হয়ে গেল। মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা জাতীয় কিছু বেরিয়ে এসে মিশে গেল ঘাসের মধ্যে।
নহর পড়ে যেতেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিল ওরা দুজন। খুঁটি খানিক এগিয়ে গিয়েছিল। সে পেছন ঘুরে নহরকে পড়ে থাকতে দেখে দৌড় থামিয়ে পিছিয়ে এল।
ঘাবড়ে গিয়ে ওর শরীরের উপর ঝুঁকে এসে পড়ল ওরা, ‘এই ইনা, কী হল তোর? পড়ে গেলি নাকি?’
‘কী হল রে, এই…’
নহরের স্থির হাতটা সচল হল একটু একটু করে। ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে ছেঁড়া ছেঁড়া কয়েকটা শব্দ বেরিয়ে এল, ‘আমি…আমি…’
বাকি কথাগুলো আবার হারিয়ে গেল। একদিকে হেলে পড়ল মাথাটা।
‘পড়ে গিয়ে মাথায় লেগেছে বোধহয়।’ খুঁটি মুখ তুলে বলল, ‘বরফ লাগবে। এখানে কাছাকাছি কোল্ডড্রিঙ্কসের দোকান…’ আগমনী সেদিক লক্ষ্য করে দৌড়াতে যাচ্ছিল। বেদান্ত ওকে থামিয়ে দেয়, ‘লাভ নেই। ওর মাথায় চোট লাগেনি।’
‘তাহলে কী হয়েছে?’ আগমনী জিগ্যেস করে।
‘ওর মাথায় কিছু একটা রোগ আছে। নাম জানি না, তবে বলছিল বেশিদিন বাঁচবে না।’
আগমনী হাসার চেষ্টা করে, ‘ইয়ার্কি মেরেছে তোদের সাথে। আমি ওর বেস্টফ্রেন্ড আর আমাকে বলবে না?’
‘বেস্টফ্রেন্ড বলেই বলেনি হয়তো৷’
দূরে মাইকের আওয়াজ হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যায়। সামনের রাস্তা দিয়ে বিকট শব্দে হর্ন বাজাতে বাজাতে একটা বাস চলে যায়। মাছ খুঁজতে পুকুরে নেমেছিল যে সাদা বকগুলো তারা সেই শব্দে ডানা ঝাপ্টে কোথায় যেন পালিয়ে যায়।
নহরের শরীরটা পুকুরের ধারে রেখেই কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে ওরা তিনজন। কী করবে কেউই বুঝতে পারে না। নহরের বুকটা ওঠানামা করছে ধীরে ধীরে। যত্ন করে পরা শাড়ি আলুথালু হয়ে ঘেঁটে গেছে। চোখদুটো নিপুণ তুলির রেখার মতো বন্ধ হয়ে আছে৷ একটু একটু করে ডুবে যাচ্ছে বিকেলের সূর্যটা। শীতের পরশ এসে লাগছে ওদের গায়ে।
‘লিফলেটগুলো দে তো… বেদান্তের দিকে হাত বাড়িয়ে বলে আগমনী।
‘কী করবি?’
‘আগে দে না, পেনও লাগবে।’
পকেট থেকে বের করে লিফলেট আর পেন ওর দিকে বাড়িয়ে দেয় বেদান্ত। আগমনী তার মধ্যে থেকে তিনটে লিফলেট তুলে নিয়ে হাত দিয়ে ভাঁজ করে চারটে নৌকা বানায়। তারপর দুটো এগিয়ে দেয় ওদের দিকে।
‘কী হবে এগুলো দিয়ে?’
‘ওর ওপর লেখ—ইনার রোগটা যেন সেরে যায়।’
খুঁটি নৌকাটা কোলের উপর রেখে ঘাড় নাড়ে, ‘আমি ইন্টারনেটে সার্চ করে দেখেছি, ও রোগ সারে না।’
আবার কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে তিনজন। আগমনী নৌকার গায়ে বড় বড় করে লেখে, ‘ইনা যতদিন থাকে, যেন খুব ভালো থাকে, সব থেকে ভালো থাকে —মণি, ব্যাদা, খুঁটি।’
তিনটে নৌকা নিয়ে তিনজন গিয়ে বসে বিধু মণ্ডলের পুকুরের ধারে। তারপর আলতো হাতে জলের উপর রেখে দেয় নৌকাগুলো। জলে অল্প ঠেলা দিতেই ভাসতে ভাসতে কিছুদূর এগিয়ে যায় নৌকাগুলো।
‘উঁহু, কোথায় ডুবে গেল দেখতে নেই।’ পেছন ঘুরে হাঁটতে হাঁটতে বলে আগমনী।
নহরের শরীরটা এখনও আগের মতোই পড়ে আছে ঘাসের উপরে। ছোট কপাল আর মুখে গমের মতো রং খেলা করছে। ওকে ঘিরেই বসে পড়ে ওরা তিনজন।
‘ওকে সারিয়ে দেওয়ার মতো কিছু নেই আমাদের কাছে, না রে?’ ডুবন্ত সূর্যের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে জিগ্যেস করে খুঁটি।
‘ইচ্ছে…শুধু ইচ্ছে ছাড়া আর কিচ্ছু নেই আমাদের কাছে৷’
‘এই সাম্য, তোর গালটা অমন লাল হয়ে আছে কেন রে?’
আজ সাইবার ক্যাফে থেকে বেরোতে যেতেই বিকাশদা আটকে দিল। পয়সা দিয়ে বেরিয়ে আসার সময় ব্যাপারটা ধরা পড়ে যাবে সে খেয়াল করেনি।
‘কীসের দাগ ওটা? ‘
‘আঙুলের।’ ছোট উত্তর দিয়ে সাম্য বেরিয়ে আসার চেষ্টা করে।
‘বাড়িতে মার খেয়েছিস নাকি? মারল কেন?’ বিকাশদা যেন একটু মজাই পেয়েছে দাগটা দেখে। একটা টুয়েলভে পড়া ছেলে গালে চড় খেয়ে দাগ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ব্যাপারটা ফোনে আড়ি পেতে চুমু শোনার থেকে বেশি রোমাঞ্চকর।
‘সকালে বাড়ি থেকে বেরোতে চেয়েছিলাম, তাই…’
‘সরস্বতী পুজোর দিনে বাড়িতে বসে থাকবি নাকি? ধন্যি তোর বাপ-মা!’ সাম্য আর কিছু বলে না। এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে তেমন ভালো লাগে না ওর। আসার সময়ে গালে সাবান লাগিয়ে এসেছে, তাও ফুটে আছে দাগটা। নেহাত আজ মন এতটা খারাপ না হলে জোর করে বাড়ি থেকে বেরোত না।
সাম্য ওর বাবা-মায়ের উপর কথা বলার সাহস করে না। তাও আজ সকালে মুখে মুখে খানিক তর্ক করেছিল। বইপত্র সব ঠাকুরের কাছে জমা দিয়ে, বাড়িতে পুজোর কাজ যা ছিল সব সকালেই করে দিয়েছে। বছরে একটা দিন বন্ধুদের সঙ্গে বেরোয়, তাও বাড়ি থেকে বেরোতে দেবে না কেন? নতুন পাঞ্জাবিটা পরে গায়ে ডিও মেখে বেরোতেই যাচ্ছিল। ঠিক তখনই বাবা এসে দাঁড়িয়েছিল পেছনে, ‘এত সেজেগুজে কোথায় যাচ্ছিস রে?’
এই ‘রে’ শব্দটাকে কতটা কর্কশভাবে বলা যেতে পারে সেটা বাবার থেকেই শিখেছে সাম্য৷
‘খুঁটিরা সব স্কুলে যাচ্ছে, আমাকেও ডাকল…?’
‘ডাকলেই চলে যাবি?’ বাবার গলার পর্দা বাড়তে থাকে, ‘ওরা মরতে গেলে তুইও যাবি?’
‘পুজোর দিনে খারাপ কথা বলো কেন?’
‘তো কী করতে হবে পুজোর দিনে? কতগুলো বস্তির লাথখোর ছেলেমেয়ের সঙ্গে ফস্টিনস্টি করতে হবে? ওই মেয়েগুলোর পেছন পেছন কেন ঘুরিস আমি জানি না ভেবেছিস?’
সাম্য হাত থেকে চিরুনিটা নামিয়ে রাখে, ওর মুখে কোনও কথা ফোটে না। আয়নায় একবার নিজের অসহায় মুখটা দেখে। চোখের মণিটা তিরতির করে কেঁপে ওঠে।
‘বাড়ি থেকে এক পা বেরিয়ে দেখ শুধু, তোর ওই বন্ধুদের সামনেই কুকুরের মতো মেরে পিঠ ভেঙে দেব।’
‘বেশ।’ সাম্য নীরবতা ভাঙে, ‘দিও, অন্তত বন্ধুদের সামনে অপমান হবে। অপদার্থ বাপ-মায়ের সামনে তো হবে না৷’
এই কথাটা সাম্যর মুখ থেকে বেরোতে পারে ওর বাবা কল্পনা করতে পারেনি। কয়েক সেকেন্ড সেইভাবেই থ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। তারপর এগিয়ে এসে সজোরে একটা চড় হাঁকড়ে দেন ওর গালে, ‘কুত্তার বাচ্চা! তোর এত সাহস কী করে হয় রে?’
চড় খেয়ে সাম্যর মুখে তেমন পরিবর্তন হয় না। বাবা বেরিয়ে যেতে যেতে বলেন, ‘একে আজ ছিটকানি দিয়ে রেখে দাও, বুঝলে। আমি সন্ধেবেলা ফিরে এর ব্যবস্থা করছি।’
সাম্য সারাদিন আর পাঞ্জাবিটা খোলেনি। দ হয়ে শুয়ে ছিল বিছানায়। সারা দুপুর জানলা দিয়ে পাশের পাড়ার পুজোর মাইকের আওয়াজ ভেসে এসেছে। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া ছেলেমেয়েদের হাসি আর খুনসুটির আওয়াজ কানে এসেছে। দুপুরে মা টেবিলের উপর খাবার রেখে গেছিল। সেটা তেমন ভাবেই পড়ে আছে। ওকে কেউ দ্বিতীয়বার এসে খেতে বলেনি। তবে খাবারটা পেয়ে একটা লাভ হয়েছে৷ মা যাওয়ার সময় ছিটকানিটা দিতে ভুলে গেছিল।
বিকেলে টিপটিপ করে বৃষ্টি শুরু হতে উঠে পড়েছিল সাম্য। তবে বন্ধুদের সঙ্গে আর যোগাযোগ করেনি। করার উপায়ও নেই। খুঁটির বাড়ির সামনে সকালে দাঁড়ানোর কথা ছিল। এখন তারা কোথায় আছে ও জানে না৷
ড্রয়ারটা টেনে দেখে সেখানে কয়েকটা খুচরো পয়সা পড়ে আছে। ও গুনে দেখে সাড়ে সাতটাকা। নাহ, দশটাকার কমে হবে না৷
খোলা দরজা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে ধারেকাছে মাকে দেখতে পায় না৷ চারদিক দেখেশুনে এক ছুটে বাইরে বেরিয়ে এসেছিল সাম্য। তারপর তেমন করেই খানিক দৌড়ে খানিক হেঁটে বিকাশদার সাইবার ক্যাফের সামনে পৌঁছায়। বিকাশদা ধার দেয় না। পয়সা কম থাকলে অন্য ব্যবস্থা আছে। বিকাশদার কোনও লোকাল কাস্টমার পেশায় লেখক। খাতায় গল্প লিখে তিনি বিকাশদাকে পাঠিয়ে দেন। বিকাশদার কাজ হল সেই খাতার লেখাকে কম্পিউটারে টাইপ করে ফেলা৷ সেই লেখা পাঁচপাতা লিখে দিলে বিকাশদা একটাকা দেয়।
আজ পনেরো পাতা টাইপ করেছে সাম্য। তাতে আধঘণ্টা মতো সময় লেগেছে। মোট কথা ওর একঘণ্টার অর্কুট চেক আজকের মতো হয়ে যাবে। তবে অর্কুট খুলে হতাশ হয়েছে বেচারা। ওদিক থেকে কোনও উত্তর আসেনি। বর্ষা পেরিয়ে গেছে অনেকদিন, শীতকালও এখন যাই যাই করতে শুরু করেছে। তাও এল না মেঘা। অথচ আজ ওকে দরকার ছিল। সব থেকে বেশি দরকার ছিল।
বিকাশদা কিশোর কুমারের ফ্যান। আজ সরস্বতী পুজো বলে সামনের স্পিকারে গান চালিয়েছে। সেটা কানে আসতেই মন আরও খারাপ হয়ে যায় সাম্যর। বিচ্ছিরি লাগছে গানটা। খানিকটা রাগই হয় ওর।
কাটবে প্রহর তোমার সাথে
হাতের পরশ রইবে হাতে,
রইব জেগে মুখোমুখি
মিলন আগ্রহে,
বেশ খানিকক্ষণ হাঁ করে বসেছিল সাম্য। ইন্টারনেটে এটা সেটা চেক করেছে। বন্ধুদের অর্কুট প্রোফাইলে গিয়ে কয়েকবার ঢুঁ মেরে এসেছে। শেষে বিরক্ত হয়ে মিনিট পনেরো আগেই উঠে পড়েছে৷
কাচের দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে সাম্য দেখল একটু আগের বৃষ্টিটা টিপটিপ করে আবার পড়তে শুরু করেছে। বেরোনোর আগে বিকাশদা নিজেই ছাতা ধরিয়ে দিয়েছে ওকে। এমনিতে বাড়ি ফিরে কপালে জুতোপেটা নাচছে৷ তার উপরে ভিজে ফিরলে আর রক্ষা থাকবে না।
এই বনেরই মিষ্টি মধুর
শান্ত ছায়া ঘিরে,
মৌমাছিরা আসর তাদের
জমিয়ে দেবে জানি…
ছাতাটা খুলতে যেতেই রাস্তার উলটোদিক থেকে একটা চিৎকার ভেসে এল সাম্যকে লক্ষ্য করে, ‘তুই এখানে কী করছিলি?’
চকিতে চোখ তুলে তাকাতেই বাবাকে দেখতে পায় সাম্য। বাবার পাশে তার দুজন বন্ধুও দাঁড়িয়ে রয়েছে। তিনজনের মুখেই বুনো হায়নার মতো হিংস্র দৃষ্টি। সাম্য বুঝতে পারে ওকে ঘরে না পেয়ে বন্ধুদের নিয়ে খুঁজতে বেরিয়েছিল বাবা। বন্ধুদের কেউ হয়তো খোঁজ দিয়েছে এই সাইবার ক্যাফেটার।
‘আমার ছেলে হয়ে সাইবার ক্যাফেতে এসে নোংরামি করবি তুই।’ দূর থেকেই চিৎকার করে বাবা, ‘সামনে আয় একবার কুত্তার বাচ্চা, আজ শেষ করে দেব তোকে…’
টিপটিপ বৃষ্টিটা জোরে শুরু হয়েছে। বাবা আর তার বন্ধুরা এগিয়ে আসতে থাকে ওর দিকে। সাম্য বুঝতে পারে আজ বাড়িতে ফিরে একটা হাড় অন্তত ভাঙবে ওর। সেই সঙ্গে খিস্তির স্রোতে ভেসে যেতে হবে।
গুঞ্জরনের নীড়ে আসর
জমিয়ে দেবে জানি….
কিন্তু তাও এই দোকানের সামনে মার খেতে চায় না ও। এগিয়ে আসা তিনটে লোকের দিকে একবার দেখে নিয়ে কোনওরকমে ছাতাটা মাথার উপর ধরে দিকশূন্য হয়ে সামনের দিকে দৌড়াতে শুরু করে সাম্য।
‘দাঁড়া, দাঁড়া জানোয়ার! আমার পয়সায় খেয়ে, আমার পয়সায় পড়ে শেষে…আজ মেরেই ফেলব তোকে…’ বাবার চিৎকার শুনতে পায় সাম্য। সেসব কানে মেখেই ও ঘন বৃষ্টির মধ্যে হরিণের মতো পা চালায়।
কিন্তু দৌড়াতে গিয়ে উলটোদিক থেকে হেঁটে আসা একটা লোকের সঙ্গে ধাক্কা খায় সাম্য। কোনওরকমে নিজেকে সামলে নেয়। ‘সরি’ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেই লোকটা ধরে নেয় ওর হাত। পাশ থেকে একটা মেয়েলি স্বর ভেসে আসে, ‘উঁহু, শুধু সরি বললে হবে না। দশবার কান ধরে উঠবস করতে হবে।’
অভিসারের অভিলাষে
রইবে তুমি আমার পাশে …
সাম্য থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। এই কথাটা ও আগেও শুনেছে৷ না, পড়েছে। অর্কুটে। কিন্তু এখানে তো তার আসার কথা নয়…
ঘুরে তাকায় সাম্য। বৃষ্টির ধারা এসে পড়ে ওর মুখে। হলদে পাঞ্জাবি অল্প ভিজতে থাকে৷ গালে আঙুলের দাগটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
‘মেরে শেষ করে দেব আজ… বাবার পয়সা ধ্বংস করে…’
রাস্তার উলটোদিক থেকে ভেসে আসা শব্দগুলো আর কানে ঢোকে না সাম্যর। ওর সামনে ঘাড় ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা নরম চোখে চেয়ে আছে ওর দিকে। তার চোখের পাতায় আর ঠোঁটে জল জমেছে। সবুজ ফিনফিনে ওড়না দোল খাচ্ছে ঠান্ডা জোলো হাওয়ায়…মেয়েটার হাতে কয়েকটা বাক্স আছে৷ মনে হয় স্টেশন থেকে বাড়ি না গিয়ে সবার আগে এখানেই এসেছে৷
‘তুই…আসলে…আমি…এখানে…’ হতবাক হয়ে যাওয়া সাম্যর মুখে কথা ফুটতে গিয়েও হারিয়ে যায়। মেঘা হাসে। ওর গালের লাল দাগটায় হাত রাখে। বিকাশদার সস্তা স্পিকার থেকে কিশোর কুমার ঘোষণা করেন…
জীবন মোদের যাবে ভরে
রঙের সমারোহে…
‘আমি…মানে…এভাবে…’ সাম্যর থতমত মুখে আরও জড়িয়ে যায় কথার ঢেউ, ‘এতদূর…তুই…কী করে…’
হাতের ব্যাগগুলো ধীরে ধীরে মাটির উপর নামিয়ে রাখে মেঘা। আচমকা ওর পিঠে হাত রেখে সাম্যকে নিজের দিকে টেনে নেয়। তারপর ওর চুলগুলো আঁকড়ে ধরে এক নিঃশ্বাসে ঠোঁট বসিয়ে দেয় ওর ঠোঁটে।
এই তো হেথায় কুঞ্জ ছায়ায়
স্বপ্ন মধুর মোহে,
এই জীবনে যে কটি দিন পাব….
বাজ পড়ে কাছেই কোথাও। কখন যেন সাম্যর হাতের ছাতা উড়ে যায়। গাছের ভিজে পাতা, বাবার চিৎকার, আকাশে জড়ো হওয়া ঘন মেঘ, বন্ধুদের এসএমএস মুহূর্তে প্লাবনের জলে ভাসিয়ে নিয়ে যায় ওকে। ওর ছড়িয়ে থাকা হাতদুটো মেঘার কোমর জড়িয়ে ধরে অজান্তে…বৃষ্টির তোড়ে নিঃশ্বাস নিতে ভুলে যায় সাম্য। কেবল ওর হারিয়ে যাওয়া অনুভূতির স্রোতে কিশোর কুমারের গান আর মেঘার নরম স্পর্শ মিশে যেতে থাকে…
তোমায় আমায় হেসে খেলে,
কাটিয়ে যাবো দোঁহে
স্বপ্ন মধুর মোহে।
