তালদিঘিতে ভাসিয়ে দেব – ১৩
ত্রয়োদশ অধ্যায়
নর্থ বেঙ্গল থেকে ফিরে আর দিন তিনেক অফিসে যেতে পারেনি কৌশিক। পাহাড়ে হাঁটার সময় পড়ে গিয়ে মাথায় চোট লাগে আগমনীর। খানিক রক্তপাতও হয়। ইনজুরি তেমন বেশি কিছু নয়। তবে শরীরের থেকেও মনের অবস্থা দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে মেয়েটার। ঘরের আশেপাশে সারাক্ষণই কী যেন খুঁজে চলেছে। দিনের পর দিন না ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিচ্ছে। ঘুমানোর চেষ্টা করলেই কীসের ভয়ে যেন ধড়ফড় করে জেগে উঠছে। মাঝে ব্ল্যাকআউট হয়েছে কখনও কখনও। ওর চেহারার হাল দেখে খানিক দুশ্চিন্তাই হয় কৌশিকের। এর মধ্যে কয়েকজন সাইকিয়াট্রিস্ট বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল কৌশিক। তারা ওষুধ বলে দিয়েছে, কিন্তু তাতে লাভ হয়নি কিছু।
সন্ধেবেলা অফিস থেকে ফিরতে একটু দেরি হয় কৌশিকের। ফেরার পথে রোজই আগমনীর খবর নেয়। খানিকক্ষণ বসে গল্পগুজব করে। মাঝে মাঝে অপরাজিতাও আসে।
আজও তেমনি ফেরার পথে আগমনীর ফ্ল্যাট থেকে চুঁ মেরে এসেছে। কিছুটা মন খারাপ নিয়েই ফিরেছিল। অনেকক্ষণ আগে ওর মোবাইলটা চার্জ শেষ হয়ে সুইচড অফ হয়ে গেছে। এর মধ্যে যা ফোন এসেছে কোনওটাই ধরতে পারেনি।
বাড়ির দরজার কাছে অচেনা একজোড়া জুতো দেখেছিল কৌশিক। বাইরে থেকে কেউ এসেছে মনে হয়। ঠাম্মার সঙ্গে সাধারণত কেউ দেখা করতে আসে না। অর্থাৎ ওর সঙ্গেই দেখা করতে এসেছে কেউ।
ঠাম্মার ঘরে ঢুকতেই লোকটাকে দেখতে পেল ও। বয়স মোটামুটি বছর পঁয়শট্টির কম হবে না। চেহারায় শিক্ষাদীক্ষার ছাপ আছে। চোখে একটা দড়ি বাধা চশমা ঝুলছে। খাটের একদিকে বসে ঠাম্মার সঙ্গে গল্প করছিলেন। কৌশিককে দেখেই উঠে দাঁড়ালেন।
‘এই তো, আপনার অপেক্ষাই করছিলাম। ফোনে পাইনি বলে চলে যাচ্ছিলাম, আপনার ঠাম্মা বললেন আপনি চলে আসবেন। তাই দাঁড়িয়ে গেলাম।’
কৌশিক একগাল সৌজন্যের হাসি হাসে, ‘হ্যাঁ, বেশ করেছেন।
‘আমার নাম বিশ্বজিৎ ব্যানার্জী। আপনার সঙ্গে কথা হয়েছিল।’
এতক্ষণে কৌশিক চিনতে পারে লোকটাকে। এর কাছ থেকেই গোরাচাঁদের খোঁজটা পেয়েছিল। লোকটা বলেছিলেন, ওর নাকি কৌশিকের সঙ্গে আলাদা করে কিছু কথা ছিল। কৌশিক নিজেই আর তেমন গুরুত্ব দেয়নি। মাঝে দু-একবার ফোনও করেছিলেন, কৌশিকের আর ধরতে ইচ্ছা করেনি। উনি যে বাড়ি খুঁজে এতদূর চলে আসবেন সেটা ধারণা করতে পারেনি ও।
‘আমার আসলে আপনাকে কিছু কথা বলার আছে। তবে সেটা একটু পার্সোনাল….’
‘বেশ আমার ঘরে আসুন।’ কৌশিক দরজার দিকটা দেখিয়ে দেয়। লোকটা পা বাড়াতে ও ঠাম্মার কপালে হাত রাখে একবার। সকালে হালকা জ্বর ছিল। এখন সেটা নেই। ও একটু নিশ্চিন্ত হয়৷
‘লোকটাকে আমি চিনি গেদু…’ বিশ্বজিৎ ব্যানার্জী ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে সাবিত্রী বলে ওঠেন।
‘কী করে?’
‘তুই যখন ছোট ছিলি তখন ওর লেখা বইগুলো খুব নাম করেছিল। খুব চলত সেই সময়…তারপর…’
‘সব ওষুধ খেয়েছ?’ কৌশিক ঠাম্মাকে থামিয়ে দিয়ে জিগ্যেস করে। মাথা নাড়েন তিনি। কৌশিক পিঠের ব্যাগ খুলে একটা উলের বল বের করে ঠাম্মার সামনে রাখে। আবার কপালে হাত রেখে নিজের ঘরের দিকে চলে যায়।
বিশ্বজিৎ ব্যানার্জীর চেহারা লম্বাটে। মাথার সাদা চুল লম্বা হয়ে কানের দু-পাশে ঝুলে রয়েছে। মুখময় কাঁচা পাকা দাড়ি। ভারী চশমার আড়ালে উজ্জ্বল চোখ দেখে বোঝা যায় জীবনে সফলতার সময় গত হলেও প্রচ্ছন্ন ভারিক্কি ভাব এখনও রয়ে গেছে।
তিনি নিজেই একটা চেয়ার খুঁজে নিয়ে বসেছিলেন। কৌশিক উলটোদিকের চেয়ারে বসতে বসতে বলল, ‘আপনার ভাগ্য ভালো ঠাম্মার সঙ্গে আমার আগে দেখা হয়ে গেল।’
‘কেন বলুন তো?’
‘নাহলে আমার তৈরি চা খেতে হত আর সে জিনিস আপনি মুখে তুলতে পারতেন না।’
বিশ্বজিৎ হাসেন। চশমাটা চোখ থেকে খুলে একবার মুছে নিয়ে বলেন, ‘আমিও ব্যাচেলর, বুঝলেন তো, আগে পয়সা ছিল যখন তখন হুইস্কি ছাড়া আর কিছু নিয়েই অত বাছবিচার ছিল না। এখন সব চলে।’
‘আপনি বাচ্চাদের বই লেখেন না?’
বিশ্বজিৎ খানিক ক্ষুণ্ণ হয়ে বলল, ‘তাই আপনি ভেবেছিলেন শুধু হরলিক্স চলে?’ কথাটা বলে কৌতুকের হাসি হাসেন, ‘দেখুন আমার বইয়ের লোভ দেখিয়ে যাদের হরলিক্স খাওয়ানো হত তারা এখন হুইস্কি ধরেছে, আর আমার পকেটের যা হাল তাতে দুটোর কোনওটাই এখন অ্যাফোর্ড করতে পারি না।’
লোকটার চেহারার হাল দেখে খানিক মায়া লাগে কৌশিকের। কাঁধ ঝুলে এসেছে প্রায়। কপালে লাচ্চা পরোটার মতো সার সার ভাঁজ। গলার আওয়াজেও ধোঁয়াটে ভাব। হাসতে হাসতেই হাতের ব্যাগটা খুলে একটা বই বের করে কৌশিকের দিকে এগিয়ে দেয় সে। লাজুক মুখে বলেন, ‘এই হল আমার বই। আপনি হয়তো পড়েওছেন, কিন্তু লেখকের নাম মনে থাকার কথা নয়। আসলে আপনার ছোটবেলায় এই বইগুলো খুব পপুলার ছিল।’
কৌশিক বইটা হাতে নিয়ে উলটেপালটে দেখে। রূপকথার বই, লেখার থেকে আঁকার সংখ্যা বেশি। লেখকের নাম চিত্রকল্প। এটাই সম্ভবত বিশ্বজিৎ ব্যানার্জীর ছদ্মনাম। সেকালের বইতে বেশি ছবি থাকার চল ছিল না বলে এই বইগুলো জনপ্রিয় হয়েছিল। পাতায় পাতায় রঙিন ছবি দিয়ে আকর্ষণীয় করে তোলা হয়েছে বইটাকে। কোথাও একটা আগুনে ড্রাগন শহরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে, আবার কোথাও বিশাল হাত উঠে আসছে মাটি ফুঁড়ে। এ কালের হলিউড সাইফাই মুভির মতো কিছু সিন। তবে ছবিগুলো রঙিন আর রীতিমতো ডিটেইল্ড। বইটা চট করে পড়ে ফেলার একটা আগ্রহ জন্মাল কৌশিকের মনে। বইয়ের নামটা খেয়াল করল ও, পিশাচ গ্রামের চারভাই ও বিরজুনাথ।
‘এইসব বই আমি আর লিখি না। সত্যি কথা বলতে, কম্পিউটার গেম আর সিনেমা চলে আসার পরে এসব দাম দিয়ে আর কেউ কিনতে চায় না। তবে আপনাদের ছোটবেলায় এসব মুড়ি মুড়কির মতো বিক্রি হতো। এখনও কলেজ স্ট্রিটের রাস্তাঘাটে বা পুরোনো বইয়ের মার্কেট খুঁজলে কয়েকটা পাওয়া যেতে পারে।’
‘হুম৷’ বইটা পাশে রেখে মুখ তুলল কৌশিক, প্রসঙ্গটা বদলে বলল, ‘আপনি গোরাচাঁদের খোঁজ কী করে পেলেন বলুন তো?’
‘সে সময়ে আমার সাংবাদিক মহলে কিছু চেনাজানা ছিল। গোরাচাঁদের দুই সঙ্গী ওই ঘটনার মাসখানেক পরেই অন্য একটা ক্রাইমে ধরা পড়ে জেলে ঢোকে। এইসব পাতি ক্রিমিনালরা আটঘাট বেঁধে কথা বলতে জানে না। ফলে কোনও একটা ইনমেটকে ব্যাপারটা বলে ফেলে। সেখান থেকে আমার সাংবাদিক বন্ধুর কানে যায়। আমি তখন এই কেসটা নিয়ে খোঁজখবর করছিলাম। ফলে সেই আমাকে ব্যাপারটা জানায়।’
‘কিন্তু আপনি হঠাৎ এই কেসটা নিয়ে খোঁজখবর করছিলেন কেন? মানে গোরাচাঁদের সঙ্গে তো আপনার পারসোনালি কথা হয়নি কোনওদিন। তাই না? বিশ্বজিতের মুখে একটা বিচিত্র হাসি খেলে যায়, সোজা হয়ে বসে বলেন, ‘খানিকটা সেই কথা বলতেই আপনার কাছে আসা, তাছাড়া আপনার থেকে একটা জিনিস জানারও আছে।’
‘বেশ তো, বলুন না?’
‘আপনারা হঠাৎ এই নহর জান্নাতকে নিয়ে খোঁজখবর করছেন কেন? মানে ওকে চিনলেন কী করে?’
কৌশিক চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে, ‘আমার এক বান্ধবী ওর স্কুলের বন্ধু ছিল। ওর কিছু মানসিক সমস্যা হচ্ছে…’
‘কীরকম সমস্যা?’
‘ওর মনে হচ্ছে সামহাউ দ্যাট গার্ল ইজ ট্রায়িং টু টেল হার সামথিং। বারবার স্বপ্ন দেখছে…এমনকী নিজের বাড়িতেও…’ কথাগুলো বলতে বলতে থেমে যায় কৌশিক, ‘আমি জানি আপনি এসব বিশ্বাস করবেন না৷’
‘করব।’ বিশ্বজিৎ ব্যানার্জীর গলা আচমকাই পালটে যায়, ‘কারণ আমারও আপনাকে কিছু বলার আছে যেটা আপনি বিশ্বাস করবেন না।
একটু অবাক হয় কৌশিক। লোকটার উজ্জ্বল চোখদুটো এখন আগের থেকেও বেশি তেজে জ্বলছে। যেন এই মাত্র ঘরের ভিতর নতুন দুটো আলো জ্বেলে দিয়ে গেছে কেউ। ঠোঁটের কোণে একটা আলগা হাসির রেখা। এর মধ্যে কখন বদলে গেল মানুষটা!
‘বেশ তো, বলুন না…’
‘বলছি, তবে তার আগে আপনাকে আর একটা বই দেখাই। আমারই, লেখা… বিশ্বজিৎ ব্যানার্জী ব্যাগ খুলে আর একটা বই বের করে ওর হাতে তুলে দেয়। কৌশিক দেখে এই বইটা আগেরটার থেকে খুব একটা আলাদা নয়। এটার নাম ভগন মণ্ডলের মেয়ে আর কালরাক্ষস।
একবার গলা খাকরে নেন বিশ্বজিৎ ব্যানার্জী, তারপর শান্ত গলায় বলতে শুরু করেন, ‘আমি গল্প লিখতে আর আঁকতে শুরু করি আমার বারো বছর বয়স থেকে। গল্প লেখার ইচ্ছা আমার প্রথম থেকে ছিল না। আমি ছবি আঁকতাম। একদিন রাতে ঘুমিয়ে একটা বিচিত্র স্বপ্ন দেখেছিলাম, সেটাই এঁকে ফেলেছিলাম খাতায়। আমার মা প্রথম সেই ছবি দেখেন এবং দেখে হাঁ হয়ে যান। বারো বছরের কোনও ছেলে ভালো আঁকতেই পারে, কিন্তু আমার ছবির মধ্যে একটা গল্প ছিল। সে গল্প বারো বছরের ছেলের পক্ষে কল্পনা করা সম্ভব নয়। সেই থেকে আমার আঁকা আর গল্প লেখা শুরু।’
‘স্বপ্ন দেখে?’ কৌশিক জিগ্যেস করে।
‘আজ্ঞে হ্যাঁ৷ আজ অবধি মোট গোটা চল্লিশেক বই আমি লিখেছি, সবই বাচ্চাদের রূপকথার গল্প, কিন্তু আমি নিজে জানি তার খুব অল্পই আমার নিজের বানানো। বেশিরভাগই স্বপ্নে দেখা…’
‘শুনেছিলাম কোলরিজ আফিম খেয়ে স্বপ্ন দেখে কুবলা খান কবিতাখানা লিখেছিলেন। আপনার ব্যাপারটাও অনেকটা সেইরকম।’
‘মাঝে মাঝেই ওরকম কিম্ভূত স্বপ্ন দেখতাম আমি। আর ঘুম থেকে উঠে সেগুলোই এঁকে ফেলতাম। স্বপ্নগুলো ভারি স্পষ্ট হত। মানুষের মুখ, বীভৎস সব জন্তুদের মুখ, তাদের বলা শব্দ, তাদের নাম, সব ডিটেলে দেখতাম।’
কথাটা বলে কৌশিকের হাতে ধরা বইটার দিকে আঙুল তুলে দেখান বিশ্বজিৎ ব্যানার্জী, ‘এই বইটা আমি লিখেছিলাম আমার কুড়ি বছর বয়সে। মানে ধরুন তখন সত্তরের দশক। একদিন রাতে স্বপ্ন দেখলাম একটা বছর পনেরোর মেয়ে বিশাল এক রাক্ষসের সঙ্গে লড়াই করছে। পাহাড়ের মতো বড় সেই রাক্ষস, সমস্ত শরীরে লক্ষ লক্ষ কালো আগুনের শিখা। মেয়েটা কী একটা অস্ত্র নিয়ে তেড়ে যাচ্ছে সেই আগুনের দিকে…তার মধ্যে কারা যেন চিৎকার করে দুটো নাম ধরে ডাকছে, নহর আর ইনা।’
‘নহর!’ কৌশিক আচমকাই সোজা হয়ে বসে।
‘সব স্বপ্নেই প্রায় কোনও না কোনও নাম শুনতে পেতাম আমি…’
হাতের বইটা খুলে দেখতে শুরু করেছিল কৌশিক, কয়েকটা ছবিতে চোখ পড়তেই সে চমকে ওঠে, ‘অবিকল এক মুখ! যেন ওই মেয়েটার মুখই…
চেয়ার থেকে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়েন লোকটা, ‘এই জন্যেই নহর জান্নাতের কেসটা আমাকে ভাবিয়ে তোলে। ওই কিডন্যাপিংয়ের ঘটনার পর কাগজে ওর একটা ছবি বেরিয়েছিল। সেটা আমার চোখে পড়ে। নাম আর মুখ দেখে আমি অবাক হয়ে যাই। এই মেয়েটাকে আমি স্বপ্নে দেখেছি। ওর জন্মের প্রায় কুড়ি বছর আগে…একটা মানুষ জন্মানোর বহু আগে তাকে স্বপ্নে দেখতে পেয়েছিলাম আমি!’
কৌশিকের কপালে কয়েকটা ভাঁজ পড়ে, মন দিয়ে ছবিগুলো দেখতে থাকে সে, তারপর?’
‘গল্পে আমি চরিত্রটার নাম রাখি ইনা। নহর নামটাও বইতে আছে, তবে সেটা সহজে চোখে পড়বে না…এই দেখুন…’ বইয়ের একটা পাতা খুলে আলোর মধ্যে তুলে ধরেন বিশ্বজিৎ ব্যানার্জী। কৌশিক ভালো করে সেদিকে চেয়ে দেখে পাতার মধ্যে সাদা অংশে খুব হালকা কালির দাগে একটা নাম লেখা আছে। পুরোনো দিনের ছাপা, তার উপর এত হালকা লেখাটা যে আলোয় ধরে রীতিমতো কষ্ট করে পড়তে হয়—নহর।
‘কেন জানি না মনে হয়েছিল নামটা স্বপ্নে শুনেছি যখন ওটা বইয়ের কোথাও একটা থাকা দরকার। তো আমি ছবির সঙ্গেই হালকা কালিতে লিখে দিয়েছিলাম নামটা।’
বইয়ের পাতা থেকে মুখ তোলে কৌশিক, ‘মানে আপনি বলতে চাইছেন, নহর বলে ঠিক ওইরকম একটি মেয়ে জন্মাবে সেটা আপনি আগে থেকে স্বপ্নে দেখেছিলেন, তাই তো?’
বিশ্বজিৎ ব্যানার্জী উত্তর দেন না৷ এতক্ষণ কথা বলে সম্ভবত হাঁফিয়ে গেছিলেন তিনি। ব্যাগ থেকে বোতল বের করে খানিকটা জল ঢালেন গলায়।
‘আপনি যা বললেন, তার সমস্তটা যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে ব্যাপারটা সত্যিই আশ্চর্যের। কিন্তু আমি এখানে কীভাবে ইনভলভড, সেটা…
‘বলছি…’ বোতলটা ব্যাগে ঢুকিয়ে মুখ মোছে বিশ্বজিৎ ব্যানার্জী, ‘এত দূর অবধি যে ঘটনা ঘটেছে তা সবই আমি আগে থেকে জানতাম। আপনাকে আর নতুন করে বলে আমার কিছু লাভ হত না। কিন্তু আলি সাহেব আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু, উনি বললেন, যে আপনারা ওদের একটা ছবি দেখিয়েছেন। পাঁচ বন্ধুর ছবি। যার মধ্যে এই নহর জান্নাত বলে মেয়েটিও আছে, তাই তো?’
‘হ্যাঁ, কেন বলুন তো?
‘সেই সময় নহর জান্নাতের একজন বন্ধু আমার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে।’
কৌশিকের চোখে ঝিলিক খেলে যায়, ‘সত্যি? নাম মনে আছে আপনার?’
‘উঁহু, নাম বলেনি। কথা শুনে যতদূর মনে হয়েছিল স্কুল স্টুডেন্ট। সম্ভবত কোনও এস্টিডি বুথ থেকে ফোন করেছিল। তবে ছেলেটির গলা শুনে আমার ভয়ানক ডেস্পারেট মনে হয়েছিল। খানিকটা ভয়ও লেগেছিল বলতে পারেন…’
‘ডেস্পারেট বলতে?’
একটু সময় নিয়ে বিশ্বজিৎ বলেন, ‘দেখুন, এই পনেরো থেকে সতেরো বছরের বয়সটা ভারি বিচিত্র। এর আগে অবধি আমরা একটা স্বপ্নের জগতে বাস করি। যারা খুব বেশি কল্পনাপ্রবণ হয় তারা গল্পের বইতে বিশ্বাস করে, মায়ের মুখে শোনা গল্পে বিশ্বাস করে, ম্যাজিকে বিশ্বাস করে। আবার ওই বয়স থেকেই এই যত্নলালিত রূপকথার দেওয়ালগুলো ভাঙতে শুরু করে। বিচ্ছেদ আসে, বিষণ্ণতা আসে, প্রিয়জনের মৃত্যু আসে। এদিকে বাস্তব তখনও তাদের লড়াই করার মতো শক্ত করে তোলেনি। ভয়ঙ্কর রকম ভালনারেবিলিটি আসে… ছেলেটির সঙ্গে কথা বলে আমার মনে হয় সে দুটো ভালনারেবিলিটিতে ভুগছে সেই মুহূর্তে। এক, প্রিয় বন্ধুর আসন্ন মৃত্যু, দুই স্কুল ছেড়ে যাচ্ছে বলে পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে পাকাপাকি বিচ্ছেদ।’
‘এ জিনিসটায় আমরা সকলেই অল্পবিস্তর ভুগি, তাই না?’
‘কে নিজের বিষণ্ণতা নিয়ে কতটা ভালনারেবল হবে সেটা কেই বা বলতে পারে মিস্টার সেনগুপ্ত? ওরা হয়তো ওদের ছেলেবেলাটাকে আঁকড়ে রাখতে চেয়েছিল। সেটা না পারার যন্ত্রণাটা ওদের ক্ষতবিক্ষত করছিল…’
উপরে নিচে মাথা নাড়ায় কৌশিক, ‘বেশ, তারপর?’
‘নহরের সঙ্গে আমার আঁকা ছবির মিল লক্ষ্য করে আর বইতে ওর নামটা আবিষ্কার করেই আমার সম্পর্কে ওদের আগ্রহ জন্মায়। সে-ই আমাকে জিগ্যেস করে নহর জান্নাতকে আমি আগে থেকে চিনলাম কী করে। আমি ওদের স্বপ্নের ব্যাপারটা গোটাটাই জানাই। ছেলেটি বিশ্বাস করে কিনা জানি না তবে তারপর সপ্তাখানেক আর ফোন করে না…’
‘মানে তারপর করেছিল?’
উপর নিচে মাথা নাড়ান বিশ্বজিৎ ব্যানার্জী, ‘তবে এবার আর কোনও প্রশ্ন করেনি, একটা অনুরোধ করেছিল। ওরা আমাকে জানায় মেয়েটি কোনও মারণ রোগে ভুগছে। আর বছরখানেক বড় জোর আয়ু ছিল তার। এমন কোনও ব্যবস্থা করতে হবে যাতে মেয়েটি আজীবন ওদের সঙ্গে থাকতে পারে।’
‘মানে, আপনি কী করে করবেন সেটা?’
বিশ্বজিৎ ব্যানার্জীর মুখে হাসি ফোটে, ‘আমি যে পারি সেটা আমি তখনও জানতাম না।’
‘কখন জানতে পারলেন?’
‘একটু আগে। আপনার বান্ধবীর ব্যাপারটা শুনে…’
‘মানে?’
ব্যাগ থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরালেন বিশ্বজিৎ। তারপর ঘন ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, ‘আপনার বান্ধবী যে এখনও চারপাশে বন্ধুদের অস্তিত্ব অনুভব করেন, তার খানিকটা কারণ আমি মিস্টার সেনগুপ্ত। আমারই শেখানো মন্ত্রে ওই ছবিটাকে মন্ত্রপূত করা হয়েছিল সম্ভবত… নহরের ব্যাপারটা মিলে যাওয়ার পর ছেলেটির কোনওভাবে ধারণা জন্মায় যে আমার দেখা স্বপ্নগুলো শুধুমাত্র স্বপ্ন নয়। সেগুলো বিভিন্ন সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে যাওয়া ঘটনার একটা বিমূর্ত রূপ। আই মিন সত্যি ঘটনাকে পাল্প ফিকশন হিসেবে কল্পনা করা। আমার নিজেরও খানিকটা তাই মনে হত। এই ব্যাপারটা আবিষ্কার করার পর থেকে ছেলেটা আমার বইপত্র নিয়ে খানিকটা অবসেসড হয়ে পড়ে। আমার যেখানে যত বই ছিল সব গোগ্রাসে পড়ে ফেলে। সেখান থেকেই একটা বিশেষ বই তার মনে দাগ কেটে যায়।’
কৌশিক প্রথম যে বইটা হাতে নিয়েছিল, সেই বইটাকে নির্দেশ করে বলেন বিশ্বজিৎ, ‘ওই বইটা। ওই গল্পে পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে এক ভাইয়ের ফাঁসির হুকুম হয়। ফাঁসির দিন সকালবেলা পাঁচ ভাই ঠিক করে যে তারা কিছুতেই এক ভাইকে হারাতে দেবে না। এদিকে রাজার হুকুম যখন হয়েছে, তখন ফাঁসি হবেই। পাঁচজন এক সাধুর কাছে যায়। সেই সাধু ওদের একটা সলিউশন দেয়। নিদান অনুযায়ী পাঁচজনকে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে একটা ছবি আঁকাতে হবে। এবং সেই আঁকা ছবির গায়ে পাঁচজনের রক্ত মিশিয়ে একটা বিশেষ মন্ত্র পড়তে হবে। তাহলে ছবি যতদিন থাকবে ততদিন ছবির মালিক বাকি চার ভাইয়ের অস্তিত্ব অনুভব করতে পারবে।’
‘সে তো ছবির মালিক পারবে। বাকি ভাইদের কী হবে?
‘সেটাই ক্যাচ। ওই এক প্রক্রিয়া দুবার করা যাবে না। ছবি একজনের কাছেই থাকবে। সে বাকিদের অস্তিত্ব অনুভব করতে পারবে। ছবিটার মালিক চারজনের যে কেউ হতে পারে।’
‘বুঝেছি…’ হাত তুলে বিশ্বজিৎ ব্যানার্জীকে থামিয়ে দেয় কৌশিক, ‘এই গালগল্প পড়ে ছেলেটির মনে হয়েছিল ওদের পাঁচ বন্ধুকে একসঙ্গে টিকিয়ে রাখার এ ছাড়া আর অন্য কোনও উপায় নেই…’ কথাটা বলে হাসে কৌশিক, ‘কিন্তু এসব কি আদৌ সম্ভব?’
বিশ্বজিৎ ব্যানার্জী হাসেন, ‘সতেরো বছরের কিশোর। প্রিয় বন্ধুর মৃত্যু যন্ত্রণার সঙ্গে লড়াই করতে কল্পনার আশ্রয় নেবে এইটাই তো স্বাভাবিক, তাই না? তার থেকে খুব বেশি ম্যাচিওরিটি আপনি আমি কী করেই বা আশা করি বলুন?’
‘ওরা আপনার কাছে ঠিক কী চেয়েছিল?’
‘ওই মন্ত্রটা। সত্যি কথা বলতে, যে স্বপ্নটা দেখে এই গল্পটা লিখেছিলাম সেই স্বপ্নে ওই মন্ত্রটা আমি শুনেছিলাম। কী মনে করে সেটা বইতে লিখিনি। অন্য একটা কাগজে লিখে রেখেছিলাম। ছেলেটা সেই মন্ত্রটা চেয়েছিল…আমি ব্যাপারটাকে অত গুরুত্ব না দিয়েই সেটা লিখে পাঠিয়েছিলাম ওকে। নিজের যন্ত্রণা ভুলতে যদি এসব করে শান্ত থাকতে চায় তো থাকুক। হাজার হোক আমি এইসব পাল্প ফিকশন বেচেই পেট চালাই।’
বড় করে শ্বাস নেন ব্যানার্জী, ‘তারপর থেকে আর আমাকে বিরক্ত করেনি ছেলেটা।’
হুট করে কী যেন মনে পড়ে যায় কৌশিকের, উত্তেজনায় প্রায় লাফিয়ে উঠে বলে, ‘ওই ছবিটার পেছনে একটা কালচে মোটা দাগ ছিল। সেটা সম্ভবত একই জায়গায় পাঁচজনের শুকনো রক্তের দাগ। মানে সত্যি ওরা এসবে বিশ্বাস করেছিল!’
কৌশিক চুপ করে খানিকক্ষণ বসে থাকে। বিশ্বজিৎ ব্যানার্জী আবার বলেন, ‘ব্যাপারটা একরকম আমি ভুলেই গেছিলাম। হঠাৎ করে সেদিন আলিদা যোগাযোগ করে বলেন যে আপনারা এরকম কিছু একটা সমস্যায় পড়েছেন। আমার মাথায় এই ঘটনাটা কেন জানি না ধাক্কা দেয়। আমার কোনওদিন মনে হয়নি মন্ত্রটা আদৌ কাজ করতে পারে বলে, কিন্তু এখন কেন জানি না মনে হচ্ছে…’
কিছুক্ষণ গুম হয়ে সেভাবেই চেয়ারে বসে থাকে কৌশিক। মাথার ভেতরটা ভারী হয়ে আছে ওর। লোকটা এতক্ষণ একটানা যা বলে গেল তার সত্যিই কোনও গুরুত্ব আছে বলে ওর মনে হয় না। ছবিটা আসার পর থেকেই আগমনীর মাথার মধ্যে সমস্যাগুলো শুরু হয়েছে বটে, কিন্তু সেটা সম্ভবত ছবিটা দেখে ওর কিছু পুরোনো স্মৃতি মনে পড়ে যাওয়ায় ফলে ঘটেছে৷ গোটা ব্যাপারটাই মনস্তাত্ত্বিক৷
‘বেশ, আমি তাহলে উঠি। কোনও দরকার হলে অবশ্যই যোগাযোগ করবেন আমার সঙ্গে।’ চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েন বিশ্বজিৎ ব্যানার্জী। কৌশিক উঠে দাঁড়িয়ে হাত জোড় করে, ‘আপনি অলরেডি যা হেল্প করেছেন, মনে হয় না আর তেমন কিছু দরকার হবে বলে। তবে…’ নরম হাসি হাসে কৌশিক, ‘আপনার বইগুলো বাজারে না পেলে কিন্তু আপনার সঙ্গেই যোগাযোগ করব।’
বিশ্বজিৎ ব্যানার্জীর মুখে একটা করুণ হাসি খেলে যায়, কাঁধ ঝুঁকে আসে তার, ‘একসময়ের জনপ্রিয় লেখককে, এখন কেউ পুঁছেও দেখে না। তাই মাঝে মধ্যে একটু ভ্যালিডেশন খুঁজি। লিখে পয়সা কড়ি যা কামিয়েছিলাম সব মদ খেয়েই উড়িয়ে দিয়েছি। মাঝে মাঝে মনে হয় এত যে পপুলার হলাম, এত বই বিক্রি হল তার থেকে আমার কাছে পড়ে রইলটা কী? সেই জন্যেই বোধহয় এই রূপকথার ছায়া দেখে বেড়াই চারিদিকে…’ সামনে ফিরতে গিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়ান তিনি, ‘আচ্ছা ভালো কথা, আমি ভুলে গেছিলাম। ছেলেটি আমাকে পরে আর একবার ফোন করেছিল।’
‘তাই নাকি! কবে?
‘নহর জান্নাত মারা যাওয়ার মাস পাঁচেক পরে সম্ভবত।’
‘কী বলেছিল ফোন করে?’
প্রবীণ শিল্পীর চোখ ঘোলাটে হয়ে আসে, ‘যতদূর মনে পড়ছে ও একা ফোন করেনি। সঙ্গে আরও দুই একজন বন্ধু ছিল। তবে গলার স্বর আগের মতো ডেসপারেট ছিল না। বরঞ্চ কথা শুনে মনে হচ্ছিল ওরা যেন এই গোটা এপিসোডটা ভুলে যেতে চাইছে। আমাকে ফোন করে বলেছিল, ছবিটা নাকি সত্যিই কাজ করে। আই মিন ওরা আশেপাশে বন্ধুদের অস্তিত্ব অনুভব করতে পারে।’
‘বেঁচে থাকা বন্ধুরও?’
হাত ওলটান বিশ্বজিৎ ব্যানার্জী, ‘সেটা আমি কী করে বলি বলুন তো? ইটস জাস্ট আ ড্রিম আই হ্যাড।’
‘হুম, আপনি বিশ্বাস করলেন এসবে?’
হাসেন বিশ্বজিৎ ব্যানার্জী, ‘আমি বিশ্বাস করতে চাইনি। তবে প্রতিবাদও করিনি তেমন। ওরা বলেছিল, ছবিটা নিজেদের কাছে রাখবে না। নহর জান্নাতের যে বেস্টফ্রেন্ড ছিল, তার কাছে পাঠিয়ে দেবে।’
‘কী আশ্চর্য ব্যাপার, না? যে পাঁচ বন্ধু একসঙ্গে থাকবে বলে এত ডেস্পারেট ছিল, একবার ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পরে তারা কেবল নিজেদের জীবনে এগিয়ে যেতে চাইল!’
‘ওদের দোষ দিয়ে কী লাভ মিস্টার সেনগুপ্ত? আমরা কেই বা ফেলে আসা সময় নিয়ে বেঁচে থাকি, বলুন?’
গেট অবধি ভদ্রলোককে ছেড়ে দিয়ে আসে কৌশিক। জুতো পরতে পরতে কী মনে হতে একবার বলেন, ‘ও হ্যাঁ, এই শেষ ফোনটা ওরা কোথা থেকে করেছিল সেটা আমার মনে আছে। অবশ্য জেনে আপনাদের তেমন লাভ হবে বলে মনে হয় না। আর এখন…
‘কোথা থেকে?’
‘বেলঘরিয়া সম্ভবত।’
‘আপনাকে বলেছিল?’
দু’দিকে মাথা নাড়েন ভদ্রলোক, ‘উঁহু। ততদিনে আমার ল্যান্ডলাইনে এলসিডি বসেছে। প্রথম তিনটে ডিজিট দেখেই বুঝেছিলাম ওটা বেলঘরিয়া এলাকা। কিন্তু সে তো আর ছোট জায়গা নয় যে খুঁজে বের করে ফেলবেন। বিশেষ করে নাম জানেন না যখন…’
বিশ্বজিৎ ব্যানার্জী বেরিয়ে যেতে একবার আগমনীকে ফোন করে কৌশিক। কিন্তু ফোন রিং হয়ে কেটে যায়। সম্ভবত ঘুমিয়ে পড়েছে। উপায়ন্তর না দেখে অপরাজিতার নম্বর ডায়াল করে কৌশিক৷ গোটা ঘটনাটা বুঝতে খানিকটা সমস্যা হয় তার। শেষে বোধগম্য হতে কৌশিক নিজেই জিগ্যেস করে, ‘তুই কী ভাবছিস?’
‘ছবিটা আসার পর থেকেই ওর মাথাটা বিগড়েছে, তাতে সন্দেহ নেই।’ অপরাজিতার গলা থমথমে শোনায়।
‘তুই এসব বিশ্বাস করছিস নাকি?’ সন্দেহের গলায় জিগ্যেস করে কৌশিক৷ ‘আমি ওর জানলায় হাতের ছাপ দেখেছি গেদু, ওর বাড়ির আশেপাশে…’ ‘জাস্ট স্টপ ইট…’ কথার মাঝেই ওকে থামিয়ে দেয় কৌশিক, ক’টা টিনেজার বাস্তবের আঘাত মেনে নিতে না পেরে এইসব অংবং জিনিস বিশ্বাস করলে সেটা মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু তুই একটা শিক্ষিত মেয়ে হয়ে এসব উলটো পালটা ছেলেভোলানো গল্পে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিস? ওকে একটা ভালো সাইক্রিয়াটিস্ট দেখানো দরকার।’
‘তুই তো এতদিন চেষ্টা করলি, দেখাতে পেরেছিস?’
‘সেটা পারিনি বলে যা ইচ্ছা তাই বিশ্বাস করে নেব?’ কৌশিকের গলার আওয়াজ গড়গড়ে শোনায়, ‘কয়েকটা অল্পবয়সি ছেলেমেয়ে একটা গল্পের বই পড়ে তন্ত্র মন্ত্র করে ছবির মধ্যে নিজেদের আত্মার কপি বন্দী করে রেখেছে? রিয়ালি?’
‘শম্পা বলছিল, ওই বাক্সটা বাড়িতে আসার পর থেকেই বাড়িটা কেমন যেন হয়ে গেছে। ঘরে ঢোকার আগে সারাক্ষণই মনে হচ্ছে অন্য কেউ আছে৷ ঘরে ঢুকে দেখছি ফাঁকা!
‘সেগুলো মনের ভুল ছাড়া আর কিছু নয়।’
এবার অপরাজিতার গলা বিরক্ত শোনায়, ‘দেখ গেদু, আমি জানি না তোর শিক্ষা দীক্ষা কী বলে, কিন্তু আমার মনে হয় এবার তোদের এসব পাগলামি বন্ধ করা উচিত। নর্থ বেঙ্গল ঘুরে আসতে ইচ্ছা করেছে, এসেছিস। কিন্তু এবার বন্ধ কর।’
‘কী বন্ধ করব?
‘যা করছিস। ওর মনে হল স্কুল জীবনের মেমোরি সব ভুলে গেছে, সেটা উদ্ধার করতে না পারলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে আর তুই ওকে কাঁধে নিয়ে হিল্লি দিল্লি করে বেড়াতে শুরু করলি? লাভ কী হচ্ছে এতে?’
‘এটুকু অন্তত জানতে পেরেছি এই পাঁচজনের মধ্যে একজন ওর কাছের বন্ধু ছিল। অসুস্থ শরীর নিয়েও স্রেফ বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হবে বলে রোজ স্কুলে আসত মেয়েটা।’
‘অ্যান্ড নাও শি ইজ ডেড ফর ফিফটিন ইয়ার্স। প্লানচেট করে তার আত্মা নামিয়ে কি লুকোচুরি খেলতে হবে এবার?’ কথাটা বলে অপরাধবোধে ভোগে অপরাজিতা। গলা নরম করে বলে, ‘দেখ আমি তোদের দুজনের কারো খারাপ চাই না। বাট শি নিডস মেডিকাল হেল্প। তোরা কেউ ব্যাপারটা সিরিয়াসলি নিচ্ছিস না কেন বুঝতে পারছি না।’
কৌশিক কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে, মাথার চুল খামচে ধরে। তারপর ধীরে সুস্থে বলে, ‘আমি তোর পয়েন্টটা বুঝতে পারছি। আমাদের কাছে কোনও ফলো করার মতো এন্ড নেই। এমনিতেও আর কিছু খোঁজখবর করা সম্ভব নয়। ওর তিন বন্ধু কমপ্লিটলি আনট্রেসেবল। এই অবস্থায় ওর পক্ষেও আর জেদ করা সম্ভব নয়।’
‘গ্রেট। দেন ডু অ্যাকর্ডিংলি। তুই আগে ওকে একটা ডাক্তার দেখানোর ব্যবস্থা কর।’
অপরাজিতার ফোনটা রেখে দিয়ে কিছুক্ষণ ঘরের ভিতরেই পায়চারি করে কৌশিক। ইদানীং এইসব নিয়ে ভাবতে বসলেই ওর মাথাটা ভনভন করতে শুরু করে। স্কুলে যে লোকটাকে সবাই দেখেছিল, সেই সম্ভবত নহরের বন্ধু। সে কোনওভাবে নহরকে সাহায্য করত। কিন্তু নহর মরে যাওয়ার পর লোকটা গেল কোথায়? ওর স্কুলেই বা কী করছিল লোকটা? গুণ্ডাদের হাত থেকে ওকে বাঁচাচ্ছিল? কিন্তু কেন?
হঠাৎ একটা ব্যাপার মনে পড়ে ওর। সেদিন নহরের মায়ের থেকে পাওয়া ছবিটাতে কিছু একটা অসংগতি চোখে পড়েছিল। অনেক ভেবেও ব্যাপারটা বার করতে পারেনি।
ছবিদুটো এখন আপাতত কৌশিকের কাছে৷ আগমনী নিজেই রাখতে দিয়েছে৷ সামনে থাকলে নাকি সারাদিন ওই ছবিটাই খুলে দেখতে থাকে। কৌশিক ওর ড্রয়ার থেকে বার করে আনে ছবি দু’খানা। তারপর ছবি দুটো পাশাপাশি রেখে সেগুলোর দিকে চেয়ে থাকে বেশ কিছুক্ষণ।
হাতে নিয়ে উলটেপালটে দেখতে গিয়ে হঠাৎ ছবির পিছনে একটা জিনিস চোখে পড়ে। এ ব্যাপারটা আগেও লক্ষ করেছিল, কিন্তু তখন তেমন গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়নি। ছবির পেছনদিকে ছোট করে ক্যামেরার ইনফো লেখা আছে৷ অর্থাৎ যে ক্যামেরায় সেটা তোলা তার ক্রিপ্টিক ডিটেইল।
এককালে ফটোগ্রাফি নিয়ে কিছু পড়াশোনা করেছিল কৌশিক। তখন বেশ কিছু পুরোনো ক্যামেরা ঘাঁটাঘাঁটি করেছিল। যে ক্যামেরা দিয়ে স্কুল ড্রেস পরা ছবিটা তোলা সেটা কোডাকের ক্যামেরা। ওদের ছোটবেলায় ভারি পপুলার ছিল এই ক্যামেরাগুলো। ভিউ নিয়ে শাটার টানলে ছবি উঠে যেত।
অন্য ছবিটার পেছনেও ক্যামেরার নামটা লেখা আছে। তবে এটা কোডাক নয়। ভিশন। ভিশন কোম্পানিটার কথা ছোটবেলায় শুনেছিল কৌশিক। কলকাতায় মাত্র মাসখানেকের জন্য ব্যবসা করে উঠে গেছিল কোম্পানিটা। এদের ছবির সব থেকে বড় সমস্যা ছিল এরা ক্যামেরায় মিরর ব্যবহার করত না। অর্থাৎ যে ছবি আসত সোজাসুজি সেই ছবি দেখিয়ে দিত। অনেকটা এখনকার সময়ের সেলফি ক্যামেরার মতো। ফলে ডানদিক হয়ে যেত বাঁদিক, বাঁদিক হত ডানদিক।
দুটো ছবি পাশাপাশি রেখে এক পা পিছিয়ে আসে কৌশিক। হাতের আঙুলগুলো আর একবার কেঁপে ওঠে ওর৷ দ্রুত ফোন খুলে আবার অপরাজিতার নম্বরটা ডায়াল করে।
‘হ্যাঁ বল, কী হল আবার?’
‘অপু, আমাদের কাছে আপাতত নহর জান্নাতের দুটো ছবি আছে। দুটোতে তিলটা মিলিয়ে দেখ একবার…
অপরাজিতা কথাটার অর্থ বুঝতে পারে না, খানিক ভেবে চিনতে বলে, ‘ঠিকই তো আছে, দুগালের একই জায়গায় তিল আছে।’
কৌশিকের গলা কেঁপে যায়, ‘সেখানেই সমস্যা অপু। দুটো মুখের এক জায়গায় তিল থাকার কথা নয়। পালটে যাওয়ার কথা।’
‘তুই কী বলতে চাইছিস?’
‘রোজ ও গালের একই দিকে তিল আঁকত। কেবল একদিন ভুল দিকে লাগিয়ে ফেলে…’ কৌশিকের গলা বরফের মতো ঠান্ডা শোনায়, গোরাচাঁদ আমাদের মিথ্যে বলেনি। যে নহর জান্নাত কিডন্যাপ হয়েছিল আর যে ফিরে এসেছিল তারা দুজনে এক মানুষ নয়…
