তালদিঘিতে ভাসিয়ে দেব – ১৪
চতুর্দশ অধ্যায়
‘স্যার, আমাদের একটা ছবি তুলে দেবেন?’
গাছের ফাঁকে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাওয়ার উপক্রম করেছিলেন সঞ্জয়স্যার। এমন সময় পেছন থেকে মেয়েলি গলার ডাক শুনে ফিরে তাকালেন। ক্যামেরা বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা ক্লাস টুয়েলভের মেয়ে। মুখে হাসি। মেয়েটাকে চেনেন সঞ্জয়।
‘হ্যাঁ, কেন দেব না? দে…’
ক্যামেরাটা স্যারের হাতে দিয়ে বাকি চারজন বন্ধুর সঙ্গে গিয়ে দাঁড়াল মেয়েটা। সঞ্জয় ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রেখে অন্য চোখ বন্ধ করতে যাচ্ছিলেন। গলা তুলে বললেন, ‘মুখগুলো গম্ভীর করে আছিস কেন? হাস সবাই। ভালো ছবি উঠবে।’
মুখে মেকি হাসি ফুটিয়ে তুলল পাঁচজন। সঞ্জয় সাটার টিপে দিতে ছবি উঠে গেল।
‘থ্যাঙ্ক ইউ…’ বলে মেয়েটা ক্যামেরা নিয়ে চলে গেল ওর হাত থেকে। মাসখানেক আগে নোটিস দিয়ে জানানো হয়েছিল স্কুল থেকে পিকনিকে নিয়ে আসা হবে। এই বছরটায় ওদের স্কুলে শেষ বছর। সাম্য বহু ঝামেলা ঝঞ্ঝাট করে শেষে অনুমতি পেয়েছে।
ভলভো বাস ভাড়া করে কল্যাণীর একটা বড়সড় পার্কে নিয়ে আসা হয়েছে ওদের। গোটা পার্কে ঘোরাঘুরি অবশ্য নিষিদ্ধ। একটা বিশেষ জায়গায় উনুন করে রান্নাবান্না হচ্ছে। স্যার আর ম্যাডামেরা মাঝে মাঝে তদারকি করছেন সেখানে। কেউ কেউ আড়ালে দাঁড়িয়ে টান দিচ্ছেন সিগারেটে।
পার্কটার এক জায়গায় দাঁড়ালে শুরু শেষ বোঝা যায় না৷ আধা খয়েরি আর সবুজ গাছে ঢেকে আছে চারিদিক। যেন জঙ্গলের ছবি আঁকতে আঁকতে সবুজ রং শেষ হয়ে যাওয়ায় মন খারাপ করে গাছের গায়ে ধূসর রং বুলিয়ে দিয়েছে কেউ। নরম মাটি ঢেকে আছে হলদে ঝরা পাতায়। একদিকে একটা লম্বাটে ঝিল আছে। তার ধার দিয়ে সরু সরু গাছের সার। তবে এখানে এসেই ঝিলের ধারে কাছে যাওয়ার ব্যাপারে কড়া গলায় মানা করে দেওয়া হয়েছে।
গোটা পার্ক জুড়েই ঘুরে বেড়াচ্ছে ছেলেমেয়ে দল। সবার গায়েই ইউনিফর্ম। কেউ কেউ খানিকটা ফাঁকা জায়গা খুঁজে নিজেদের মধ্যে ব্যাডমিন্টন খেলছে। দূরে দাঁড়িয়ে গল্প করছে কেউ কেউ।
বাকি ছেলেমেয়েদের থেকে ওরা পাঁচজন একটু আলাদা হয়েই বসেছিল। বিগত কয়েক মাসে ওদের জীবনটা অনেকখানি পাল্টে গেছে৷ কলকাতায় আসার পর মেঘার সঙ্গে আরও বারদুয়েক দেখা হয়েছে সাম্যর। আরও বেশি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই ঘটনার পর ওর বাড়িতে কড়াকড়ি আরও বেড়ে গেছে। সেই সঙ্গে মারধোরের পরিমাণও। মেঘা বলেছিল ওকে হাওড়া স্টেশনে সিঅফ করতে যেতে। সাম্য হাতে লেখা চিঠি দিয়ে এসেছে ওর হাতে। তাতে সিরিয়াল নম্বর লেখা আছে। বলেছে প্রতি পনেরোদিন অন্তর একটা করে খুলতে।
মেঘা সে চিঠিগুলো হাতে পেয়েই আগে গুনে নিয়েছে, ‘এই, এখানে সতেরোটা চিঠি আছে৷ কিন্তু আমি তো ছয়মাস পরে ফিরে আসব। বাকি চিঠিগুলো কীসের জন্য?’
‘কয়েকটা সাদা পাতা আছে৷’
‘সাদা পাতা!’ অবাক হয়েছে মেঘা, ‘কেন?’
‘মন খারাপ হলে আমাকে চিঠি লিখবি বলে। মন খারাপ হলে আমাকে বলতে হবে সেটা বারবার আমি মনে করিয়ে দেব কী করে বল?’
মেঘা হেসে ওর গাল টিপে দিয়েছে। তারপর মাথার গোল টুপিটা খুলে পরিয়ে দিয়েছে ওর মাথায়। ট্রেনের সময় হয়ে এলে প্লাটফর্ম ছেড়ে বেরোতে গিয়েও আবার এক দৌড়ে ফিরে এসেছে মেঘার জানলার কাছে।
‘তুই আবার কবে আসবি মেঘা?’ ট্রেন ছাড়ার আগে আচমকাই জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে ওর হাতটা ধরে ফেলেছে সাম্য। অন্য হাত দিয়ে ছেলেটার চোখের জল মুছিয়ে দিয়েছে মেঘা৷
‘তুই হাত ধরে থাকলে আমি যেতেই পারব না৷’
‘তাহলে আমি হাত ছাড়ব না।’ কাঁদো কাঁদো গলায় বলেছে সাম্য। চোখ আবার ভিজে এসেছে ওর।
‘ওরকম করে না পাগল ছেলে…’ হেসে ওকে শান্ত করার চেষ্টা করেছে মেঘা।
‘আচ্ছা, প্রমিস কর, তুই এখানকার কলেজে পড়বি? এখানকার বাড়িতেই থাকবি…’
সজোরে হুইসল দিয়ে উঠেছে ট্রেনটা। আলতো করে সাম্যর হাতে ঠোট ছুঁইয়ে দিয়েছে মেঘা, ‘যেখানকার কলেজেই পড়ি…’ একটা আঙুল ওর বুকের উপরে রেখে বলেছে, ‘এখানকার বাড়িতেই থাকব…’
তারপর হুইসল দিতে দিতে ওকে নিয়ে চলে গেছে ট্রেনটা। অনেক দূর থেকে সে আওয়াজ শুনতে পেয়েছে সাম্য। তারপর আবার বাস ধরে ফিরে এসেছে বাড়ি। না বলে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য আবার মার খেয়েছে।
সাম্য জানে মেঘার সঙ্গে খানিক বাড়াবাড়িই করে ফেলেছে ও। অন্য সময় হলে হয়তো করত না। কিন্তু ইদানীং ওর মনটা সারাক্ষণই একটা দমচাপা কষ্টে ভরে থাকে। বিশেষ করে নহরের মুখের দিকে চাইলেই আর কিছু ভালো লাগে না।
বেশিরভাগ দিন মেয়েটা প্রায় ধুঁকতে ধুঁকতে স্কুলে আসে। তবে স্কুলে আসার বাইরে তাকে খুব একটা বাড়ি থেকে বেরোতে দেওয়া হয় না। আগমনী কখনো কখনো ফোন করেছে ওকে। নহর একদিন ওকে বলেছিল, ‘আমার আর বাড়িতে থাকতে ভালো লাগে না মণি…’
‘তাহলে কোথায় থাকবি বল?’
‘তোর বাড়িতে গিয়ে থাকলে চাপ হবে?’
আগমনী একটু ভেবে বলেছিল, ‘উঁহু, চাপ কীসের? তবে মাকে জিগ্যেস করতে হবে একবার।’
মা সমস্ত শুনে আর আপত্তি করেননি।
মাসতিনেক ধরে মাঝে মধ্যেই সন্ধের দিকে আগমনীর বাড়ি চলে আসে নহর। এখন আগমনী ওপরের তলায় শিফট করেছে। দুজনে সারা সন্ধে গল্পগুজব করে রাতে এক বিছানাতেই শুয়ে পড়ে। মাথার কাছে আগমনীর জানলাটা খোলা থাকে। সেদিকে চেয়ে অনেকক্ষণ জেগে থাকে দুজনে। সারারাত গল্প করে ওরা। ওর রোজকার দিনের কথা, কখন জ্বর এল, কখন ছেড়ে গেল, কখন ভোরের আলো চোখে এসে পড়ে ওর ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছে৷ আরও কত রকম গল্প৷
এক একদিন বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কোথায় যেন হারিয়ে যায় নহর। কাঁচের জানলার বাইরে জমাট বাঁধা রাতের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে ‘মাঝে মাঝে মায়ের জন্য খুব মন কেমন করে, জানিস?’
আগমনী পাশে ফিরে ওর দিকে তাকায়, ‘কাল সকালেই তো চলে যাবি বলে, বাড়ি।’
‘মাঝে মাঝে বাড়ি গেলেও মাকে পাওয়া যায় না।’
নহরের কথায় ধাঁধা লাগে আগমনীর। মেয়েটা মাঝে মাঝে এমন সব উদ্ভট কথা বলে যে মাথামুন্ডু কিছুই বোঝা যায় না। জানলার বাইরে কুয়াশা জমে একটু একটু করে। ঘন হয় সেই কুয়াশা। তারপর একসময় কেটেও যায়। ঘুমন্ত নহরের পাশে শুয়ে আগমনী ভাবতে থাকে নহর চলে যাওয়ার পরেও এমন কুয়াশা জমবে ভোরে, নহর চলে যাওয়ার পরেও কুয়াশা কেটে সকাল নেমে আসবে। অথচ আজ ওই কুয়াশা আর ভোরটাকে কী অবাস্তব মনে হচ্ছে! একটা বন্ধু মরে গেলে কি দুপুরের কাক ডাকে না? বিশ্বকর্মা পুজোর দিন আকাশে একটা ঘুড়ি কমে যায়? বাপুজি কেকের দাম বেড়ে যায়? ক্লাস ফাইভের বাচ্চা বাসের টিকিট জমানো ছেড়ে দেয়?
নাঃ, এসব কিছুই হয় না বোধহয়। একটা বন্ধু মরে গেলে স্রেফ একটা বন্ধু মরে যায়। আমাদের উঠোনে তার শব রেখে যায় না কেউ৷
নহরের মুখের দিকে তাকিয়ে ভয় করে আগমনীর। আর কোনোদিন কি ওর এমন কোনও বন্ধু হবে, যার পাশে ঘুমিয়ে এমন নিশ্চিন্ত লাগবে। গল্প করতে করতে কখন রাত কেটে যাবে বুঝতেই পারবে না? জীবনের বাকি একটা ফাঁকা ঘরে শুয়ে দিনের পর দিন ঘড়ির শব্দ শুনে কাটবে না তো? বড় হওয়াটা এতটাও ভয়ের নয় তো?
ওর এই ভয়টা নহর কী করে বুঝতে পারে কে জানে, মাঝে মাঝে প্রশ্ন করে, ‘মরে যেতে আমার ভয় করে না মণি, কিন্তু তোর কথা ভাবলে মন কেমন করে।’
‘আমার কী হল আবার?’
‘আমার তো একদিন, তোর যে সারাজীবন আমার জন্য মন কেমন করবে…. সারা জীবনের মতো এই ঘরে শুতে কষ্ট হবে!’
বাইরে থেকে চোখ সরিয়ে এনে ওর মুখের দিকে তাকায় নহর, ‘কারো চোখে জল রেখে চলে যেতে খুব কষ্ট হয় মণি, আমি সবার চোখে জল রেখে চলে যাব, আমার খুব কষ্ট হবে…’
আগমনীর মনে হয় কষ্ট একটা আদুরে বিড়াল হয়ে ওদের জানলার কার্নিশে ঘুমিয়ে থাকে মাঝে মাঝে। ইচ্ছা হলে সে জানলা ডিঙিয়ে আসে, খানিক আদর খায়, ঘরের এখানে ওখানে লোম ছড়িয়ে, আচড়কামড় দিয়ে নিজের মতো ছেলেখেলা করে আবার কার্নিশে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। তাকে তাড়ানোর চেষ্টা করে লাভ নেই। সে ঠিক অন্য কোনও কার্নিশ ডিঙিয়ে, অন্য কারো জানলার শিকল গলে আবার ঘরের ভিতর চলে আসবে অবলীলায়।
বসন্তের হলুদ পাতা ঝরবে ইচ্ছা মতো। পূজাবার্ষিকীর ছেঁড়া কমিক্সের পাতা উড়ে বেড়াবে ঘরময়। ফেলে দেওয়া ফাটা বল নারকেলের মালার মতো বুকে জল নিয়ে পোকামাকড়ের জন্ম দেবে। বিছানার উপর এসে পড়া রোদ খেলা করবে। আর সেই বিড়ালটা রোদে ল্যাজ দুলিয়ে থাবা চাটবে। গৃহস্থকে ওই বিড়ালটার উপস্থিতি মানিয়ে নিতে হয়। তাকে ভালোবেসে ফেলতে জানতে হয়…
আজকাল আগমনীও ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে শিখে গেছে৷ জেনে গেছে তার কোথায় হাত দিলে সে চোখ বুজে গায়ে মাথা ঘষবে। পেটের ঠিক কোন জায়গায় হাত দিলেই সে আঁচড়ে কামড়ে খতবিক্ষত করে দেবে। কেবল ও যখন নহরের ক্লান্ত রুগ্ন চোখের দিকে চেয়ে থাকে তখন বিড়ালটা থাবা চাটা ফেলে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। বিড়ালটা রাগ দেখেছে, ঘৃণা দেখেছে, জল ছিটিয়ে দেওয়া দেখেছে, কেবল উপেক্ষা দেখেনি কোনোদিন। বিড়ালের উপেক্ষা দেখার অভ্যাস নেই।
‘প্রথম প্রথম তোকে আমার সত্যি প্রিন্সেস মনে হত, জানিস?’ নহরের মাথায় হাত রেখে কোনোদিন বলেছে আগমনী।
‘এখন মনে হয় না কেন? রোগা হয়ে গেছি বলে?’
আগমনী ঠোঁট কুঁচকে হেসেছে, ‘আমার এখন নিজেকে প্রিন্সেস মনে হয়। যার কাজ তোকে বাঁচানো…
খিলখিল করে হেসে ফেলেছে নহর, ‘তাই নাকি? কী করে বাঁচাবি?’
‘কী জানি, ব্যাদা বলছিল ও নাকি কীসব উপায় খুঁজে বার করবে।’
‘ব্যাদা তাহলে বাতেলাবাজির প্রিন্স নিশ্চয়ই…’
দুজনেই হেসে ফেলেছিল। আগমনীর অবশ্য এখনও মনে হয় নহরের মধ্যে কিছু একটা আছে। ও ঘুমের মধ্যে হাত তুলে যখন চোখের উপর রাখে তখন সত্যি টিভিতে দেখা ওয়ান্ডার ওম্যানের মতো দেখায় ওকে। শুধু তাই নয়, সন্দেহটা বেড়ে ওঠার একটা কারণও আছে।
মাসতিনেক আগে ওদের স্কুলে একটা বিচিত্র কাণ্ড ঘটে। একজন স্টুডেন্ট এবং স্যারের মধ্যে কিছু একটা বিষয় নিয়ে ঝামেলা হয়। এবং সেই ঝামেলা থেকেই স্টুডেন্টদের বাড়ির লোকজন দলবল নিয়ে ওদের স্কুলে হামলা করে। সেদিন ঘটনাচক্রে নহর ছাড়া ওদের পাঁচজনের কেউই স্কুলে যায়নি। স্যার ক্লাস করাচ্ছিলেন। গুন্ডাগুলো ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। ভেতরে মারপিট শুরু হয়। তারপর যখন গুন্ডারা বেরিয়ে আসে তখন দেখা যায় স্যার অজ্ঞান হয়ে বেঞ্চে পড়ে আছেন। ছাত্রছাত্রীদের কারো কারো গায়ে আঘাতের চিহ্ন। একমাত্র নহরের গায়ে কোনও আঁচড় পড়েনি।
আগমনী নহরকে একবার জিগ্যেস করেছিল, ‘হ্যাঁ রে, ভিতরে ঠিক কী ঘটেছিল বল তো?’
নহর তেমন ভেঙে বলতে চায়নি, শুধু বলেছিল, ‘লোকগুলো আমাকে মারতে এসেছিল। একজন আমাকে একটা বেঞ্চের উপর চেপে ধরে। আমি খুব ছটফট করছিলাম…’
‘তারপর? তারপর কী হল?’
নহর হেসে কাঁধ ঝাঁকিয়েছিল, ‘তারপর আর কী, লড়াই করলাম।’
‘অতগুলো লোকের সঙ্গে তুই একা লড়াই করলি।’
‘ওমা! আমি একা কেন, বন্ধুরা ছিল তো…’
আগমনীর ব্যাপারটা বিশ্বাস হয়নি। ওই দুবলা জনাদশেক স্কুল ছাত্রের পক্ষে ওরকম পেশাদার গুন্ডাদের সঙ্গে লড়াই করা প্রায় অসম্ভব। তাছাড়া সাম্য, খুঁটি, ব্যাদা কেউই সেই সময় ক্লাসের ভেতর ছিল না। বাকিদের নহরকে গুন্ডাদের হাত থেকে বাঁচানোর কোনও দায় পড়েনি। আগমনীর মাঝে মাঝে মনে হয়েছে ও নিজেই কোনওভাবে লোকগুলোকে শায়েস্তা করেছে। ওর কি সত্যিই কোনও বিশেষ ক্ষমতা আছে নাকি?
আজ পার্কে আসার পর প্রথম প্রথম স্যারেরা হম্বিতম্বি করছিলেন। এদিকে যাবে না, ওদিকে গেলে গার্জেন কল হবে, ওখানে হাত দেবে না, ইত্যাদি ইত্যাদি। খানিকটা সময় যেতেই সেসব নিয়মের রাশ আলগা হয়ে গেছে। আপাতত যে যেদিকে পেরেছে ছড়িয়ে গেছে। স্যার ম্যাডামরা আপাতত রান্নায় জায়গায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন, কেউ কেউ সাইড হয়ে গিয়ে টান দিচ্ছেন সিগারেটে।
‘ছোটবেলায় আমি খুব ভালো ব্যাডমিন্টন খেলতে পারতাম জানিস…’
পার্কের একদিকে ব্যাডমিন্টন খেলছিল কয়েকটা ছেলেমেয়ে। সেদিকে চেয়ে থাকতে থাকতে বলেছিল নহর। জমির উপরে লুটিয়ে পড়ে থাকা একটা গাছের কাণ্ডের উপরে বসেছিল ওরা। খুঁটি বসেছিল ওর পাশে। ঠোঁট দিয়ে একটা শব্দ করে সে, ‘তো তুই এখন বড় হয়ে গেছিস নাকি?’
‘দেখছিস না একটু চলতে গেলেই হাঁপিয়ে যাচ্ছি…’
সাম্যই ছুটে গিয়ে জোগাড় করেছিল র্যাকেট। তারপর নেট ছাড়াই দুটো দলে ভাগ হয়ে ব্যাডমিন্টন খেলেছিল ওরা। সাম্য খানিক লম্বা হওয়ার জন্য ওর খেলতে সুবিধা হয়। ওর দলে ছিল নহর। উলটোদিকে আগমনী আর খুঁটি। বেদান্ত খেলতে চায়নি। ওর মধ্যে গত মাসখানেক হল একটা বদল এসেছে৷ সারাক্ষণ গল্পের বই নিয়ে পড়ে থাকা ছেলেটা এখন ক্লাসের ফাঁকে সময় পেলেই ছবি আঁকে। অদ্ভুত সব ছবি। আর ওটা মোটা গল্পের বইয়ের বদলে গ্রোগ্রাসে গিলতে থাকে রূপকথার বইগুলো। একবার সাম্য জিগ্যেস করেছিল, ‘তুই আজকাল কী করিস বল তো সারাক্ষণ?’
বেদান্তর মেজাজ মনে হয় খিঁচিয়েছিল তখন, বই থেকে মুখ না তুলেই বলেছিল, ‘তুই জেনে কী করবি?’
সাম্য ফিরে আসছিল। বেদান্ত পিছু ডেকে জিগ্যেস করেছিল, ‘হ্যাঁ রে, তুই পিকনিকে যাচ্ছিস তো?’
‘জানি না, বাড়ির লোক ঝামেলা তো করবেই। কিছু একটা ব্যাবস্থা করতে হবে।’
‘গেলে একটা ক্যামেরা নিয়ে যাবি। তুই না নিয়ে গেলেও অন্য কাউকে নিয়ে যেতে বলবি, দরকার আছে।’
‘কীসের দরকার?’
বেদান্ত উত্তর দেয়নি। তবে আজ সকালে বাসে চাপার আগে ক্যামেরাটার খোঁজ নিয়েছিল। সেটা আছে জানতে পেরে আগমনীকে বলেছিল, ‘আজ অবশ্যই আমাদের পাঁচজনের একটা ছবি তুলবি।’
‘সে তো তুলব। কিন্তু কেন বল তো? ‘
‘প্রিন্ট করানো হয়ে গেলে আমাকে দিবি ছবিটা, মনে থাকবে?’ আগমনী ব্যাপারটা তেমন বুঝতে পারেনি। চোখের সামনে একটু একটু করে নহরের শরীরটা ভেঙে পড়তে দেখে ব্যাপারটা জানার পর থেকে শুর হাবভাব কেমন যেন পালটে গেছে আগের থেকে। আগমনী জানে ওদের পাঁচজনই আর মাধ্যমিক পাস করা ইলেভেনের বাচ্চা নেই। হয়ত আরও কয়েক বছর পরে বড় হতো ওরা। কিন্তু মৃত্যুর পায়ের শব্দ, তার গায়ে লেগে বয়ে আসা হাওয়া, মানুষকে বুঝি হুট করে এক ধাক্কায় বড় করে দেয় অনেকটা।
ব্যাডমিন্টন খেলতে খেলতে হাঁপিয়ে পড়ছিল নহর। মাঝে মধ্যেই কোমরে ভর দিয়ে নিচু হয়ে লম্বা লম্বা নিঃশ্বাস নিচ্ছিল। সেভাবেই নিচু হতেই হঠাৎ ওর খেয়াল হল এতক্ষণ বেদান্ত যে বেঞ্চে বসে ছবি আঁকছিল সেই জায়গাটা ফাঁকা। তাতে অবশ্য আশ্চর্য হওয়ার মতো কিছু নয়। পার্কে এসে কে-ই বা এক জায়গায় বেশিক্ষণ বসে থাকে?
মুখ ঘুরিয়ে নিতে গিয়েও একটু খটকা লাগল ওর। এত দূর থেকে দেখা যাচ্ছে ব্যাদার খাতাপত্রগুলো তেমনই বেঞ্চের উপরে খোলা পড়ে আছে৷ কেবল মানুষটা নেই।
কেমন যেন সন্দেহ হয় ওর। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সাম্যর পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। একবার জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে ক্লান্ত গলাতেই বলে, ‘হ্যাঁ রে, ব্যাদা কোথায় গেল?’
‘ওই তো বেঞ্চের উপরে…’ কথা শেষ না করেই সাম্যও চোখ তুলে তাকায় বেঞ্চের দিকে। ওর ভ্রুটা কুঁচকে যায়, ‘যাঃ শালা…’
র্যাকেটটা হাতে ধরেই সেদিকে এগিয়ে যায় সাম্য। বাকি তিনজনও ওকে অনুসরণ করে।
বেঞ্চের কাছে এসে উলটে পড়ে থাকা বইপত্রগুলো দেখে অদ্ভুত লাগে ওদের। ব্যাদার আঁকার খাতাটা খোলা অবস্থায় পড়ে আছে বেঞ্চের উপরে। মৃদু হাওয়ায় সে খাতার পাতা নিজে থেকেই উলটে যাচ্ছে মাঝে মাঝে। আগমনী এগিয়ে গিয়ে কয়েকটা পাতা উলটে দেখে পরপর বেশ কয়েকটা ছবি এঁকেছে বেদান্ত। ছবিগুলো ভারি অদ্ভুত। বেশিরভাগই হলদে স্কেচ পেনে আঁকা। এক নজরে দেখলে মনে হয় উপপাদ্যর ছবিগুলোই উলটে পালটে এঁকেছে। তার মধ্যে মধ্যে সরু সরু হাত পাওয়ালা মানুষ দেখা যাচ্ছে। তারা হেঁটে হেঁটে একদিক থেকে অন্য দিকে চলে যাচ্ছে।
সেদিক থেকে মুখ তুলে বিড়বিড় করে খুঁটি, ‘মালটা আঁকার খাতায় অঙ্ক করছিল নাকি?’
বাকি তিনজন উত্তর দেয় না। আগমনী আবার পাতা ওলটায়। আলগা হাতের টানে কয়েকটা মুখ আঁকা সেখানে। নহরের মুখটাও চোখে পড়ল। পরের পাতায় কালো স্কেচ পেন দিয়ে গোল গোল দাগ। স্পষ্ট করে মানে বোঝা গেল না কিছু৷
সাম্য খাতাটা হাতে তুলে একবার উলটেপালটে দেখে, ‘কী এঁকেছে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না…’
‘কিন্তু ও গেল কোথায়?’ নহরের মুখে অস্থিরতার ছাপ। নজর বুলিয়ে গোটা পার্কের যতটা দেখা যাচ্ছে ততটাই একবার দেখে নেয় ও। নাহ্, কোত্থাও নেই…
‘সিগারেটও তো খায় না, তাহলে…’ কথাটা বলতে গিয়েও থেমে যায় আগমনী। ওর চোখ গিয়ে আটকেছে মাটির উপরে। সেখানে হলদে ঝরা পাতার উপর পড়ে আছে কালচে রঙের কিছু একটা। জিনিসটা চিনতে পারে ও। একটা মোটা ফ্রেমের চশমা। বেদান্তর চশমা৷
কাছে গিয়ে চশমাটা কুড়িয়ে নেয় ওরা। খুঁটির মুখটা থমথমে দেখায়, ‘চশমা ফেলে চলে যাবে…’
‘ও তো চশমা ছাড়া দেখতে পায় না…’ নহর হাত রাখে আগমনীর কাঁধে।’
‘ব্যাদা, এই ব্যাদা…’ চিৎকার করে ওঠে খুঁটি। চারদিক থেকে একটু আগে ছেলেমেয়েদের হইহল্লা যেমন ভেসে আসছিল তেমনই আসতে থাকে। বেদান্তর কোনো চিহ্ন পাওয়া যায় না। ওদের মনের ভিতরে আশঙ্কার মেঘ জমে।
‘মণি, তুই নহরকে নিয়ে এখানে বস। আমি আর সাম্য খুঁজে আনছি ওকে…’ খুঁটি সাম্যকে নিয়ে পা বাড়ায়।
খানিক দূর হেঁটে আসে ওরা। খয়েরি বাকলওঠা গাছের ফাঁক দিয়ে কিছু দূর অবধি স্পষ্ট হচ্ছে। তারপর অন্য কোনও গাছ এসে ঢেকে দিচ্ছে দৃষ্টি। তাও ভালো করে চারিদিকে চোখ বুলিয়ে হাঁটতে থাকে ওরা।
‘ব্যাপার কী বল তো? কেউ কি ধরে নিয়ে চলে গেল নাকি?’ খুঁটি সতর্ক দৃষ্টি বোলাতে বোলাতে জিগ্যেস করে।
‘কিডন্যাপ?’ সাম্য মাথা নাড়ায়, ‘ও শালাকে কিডন্যাপ করে কার লাভ আছে? মনে হচ্ছে নিজেই কোথাও চলে গেছে।’
‘তাও হতে পারে।’ খুঁটিকে চিন্তিত দেখায়, ‘ক’দিন ধরে ওর মাথাটা ঠিক নেই।
‘আমাদের কারোরই নেই। কিন্তু যদি কোনওভাবে ঝিলের দিকে গিয়ে থাকে…’ দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয় সাম্য, ‘চল, জলের দিকটা একবার দেখে আসি।’
খুঁটিও সায় দেয়, ‘চল, কিন্তু সাবধানে, স্যারেরা দেখতে পেলে আবার গাতন দেবে।’
ঝিলের দিকেই ঘুরতে যাচ্ছিল সাম্য। ঠিক এই সময়ে একটা বিচিত্র ব্যাপার ঘটে যায়। ও পিছনে ঘুরতেই মনে হয় উলটো দিক থেকে হেঁটে আসা কারো সঙ্গে যেন ধাক্কা লাগবে ওর। লোকটাকে জায়গা দিতে সাম্য একটু বাঁ পাশে সরে যায়। ওর জামায় কীসের যেন স্পর্শ লাগে। সঙ্গে সঙ্গে পেছন ঘুরেই অবাক হয়ে যায় সাম্য। কই, পেছন কেউ নেই তো। অথচ ওর চোখের দৃষ্টি বলছে এই মাত্র ওকে পাশ কাটিয়ে ওর পেছন দিকে হেঁটে গেছে কেউ। আচমকা তাহলে গেল কোথায় লোকটা?
সাম্য কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময় খুঁটি চিৎকার করে ওঠে, ‘ওই তো, ওই তো ব্যাদা…’
সাম্য তাকিয়ে দেখে ঝিলের ধারে বসে আছে ব্যাদা। শরীরের সামনের অংশটা ঝুঁকে পড়েছে সামনের দিকে। এক নজর দেখলে মনে হয় যেন পুকুর ধারে বসে কিছু ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছে ছেলেটা। পেছন থেকে একটা টোকা দিলেই গড়িয়ে পড়বে নীচে।
‘শালা। এখানে বসে আছে কেন?’ খুঁটিই বিড়বিড় করে প্রশ্ন করে, ‘স্যারেরা দেখতে পেলে হালুয়া টাইট করে দেবে।’
‘ছবি আঁকছে মনে হয়…’ সাম্য ওর দিকে এগোতে থাকে।
খুঁটি ওর দিকে অবিশ্বাসের দৃষ্টি ফেরায়, ‘চশমা না পরে?’
‘ব্যাদা… এক ছুটে ওর কাছে এগিয়ে যায় সাম্য। ঝরা পাতার উপর ওর পায়ের আওয়াজ শোনা যায়। তাতেও পেছন ফিরে তাকায় না বেদান্ত। সেইভাবেই ঝিলের দিকে চেয়ে বসে আছে ছেলেটা। চোখ দুটো খোলা। হাত দুটো পায়ের উপর জড়ো করা।
কাছে গিয়ে ওর পিঠে ঠেলা দেয় সাম্য, ‘এই ব্যাদা…’
সাম্যর মনে হয় ছেলেটা যেন ঘুমিয়ে পড়েছিল। হুট করে ঘুমের ঘোর কেটে যেতেই ওর দিকে ফিরে তাকায় সে, আচমকা ধাক্কায় চমকে ওঠে, ‘হ্যাঁ… হ্যাঁ…ক-কী, কোথায় ছিলি তুই?’
‘আমি! তুই এখানে বসে আছিস কেন?’ সাম্য রাগত মুখে জিগ্যেস করে।
ব্যদার চোখ মুখ দেখে মনে হল ছেলেটা কেমন যেন ভেবলে গেছে৷ যেন আশপাশের কিছুই সহজে ঠাহর করতে পারছে না। একটু ধাতস্থ হয়ে বলে, ‘আমি…আমি তো ছবি আঁকছিলাম।’
‘তারপর এখানে চলে এলি কী করে?’ খুঁটি জিগ্যেস করে। এগিয়ে দেয় চশমাটা। সেটা চোখে পরে নেয় ছেলেটা।
‘কী করে বল তো?’ ব্যাদার চোখে অবোধের দৃষ্টি।
‘তোর মনে নেই?’
‘মনে? হ্যাঁ…আছে…একটা লোক…’
‘কোন লোক?’
‘মেরুন রঙের জামা পরেছিল। গাছের আড়াল থেকে দেখছিল আমাকে…. অনেকক্ষণ ধরে…তারপর আমার পাশে এসে বসল।’
‘তারপর?’
‘তারপর…তারপর…গল্প করল অনেকক্ষণ…কত কত গল্প বলল…’
ছেলেটার পাশে বসে পড়ে সাম্য। এতক্ষণের বক্তব্যের মধ্যে অন্তত দুবার অনেকক্ষণ বলেছে বেদান্ত। ওরা ব্যাডমিন্টন খেলেছে বড়জোর পনেরো থেকে কুড়ি মিনিট। তার মধ্যে দুটো অনেকক্ষণের জায়গা হয় না বললেই চলে।
‘তারপর কী হল?’ সাম্য কৌতূহলী গলায় জিগ্যেস করে, ‘এখানে এলি কী করে?’
‘আমায় ডাকল তো…বলল এখানে এলে আমাকে কীসব নাকি বলবে। কিন্তু বলল না…শুধু…’
‘শুধু কী?’
‘মাথায় হাত রাখল একবার…তারপর…তারপর…’ বেদান্তর মুখে আর কথা ফুটল না। সে সমস্ত স্মৃতি নিংড়েও হতাশ হল, ‘তারপর…আমার কিছু মনে পড়ছে না কেন বল তো?’
সাম্য জলের দিকে চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর কী মনে পড়তে ওর দিকে খাতাগুলো এগিয়ে দেয়, ‘তুই এগুলো কী আঁকছিলি খাতায়?’
তেমনই বোকা বোকা চোখে আঁকার খাতার পাতা ওলটায় বেদান্ত, মুখের রেখায় কোনও বদল আসে না তার, ‘আমি আঁকছিলাম?
‘হ্যাঁ, এগুলো আঁকতে আঁকতেই উঠে গেছিলি…’
পাতা উলটে নহরের মুখটা আসতেই বেদান্তর চোখে একটা ঝিলিক খেলে মিলিয়ে যায়, ‘এটা তো ইনা। ওকে…ওকে নিয়েই মনে হয় কিছু ভাবছিলাম। এমন সময়…’
‘এমন সময় কী?
‘লোকটাকে গাছের আড়ালে দেখতে পেলাম। তারপর থেকেই আর কিছু মনে নেই…’
সাম্য বুঝতে পারে খাতার পাতায় আঁকা আর লেখাগুলোর মানে বেদান্ত নিজেও আর বুঝতে পারছে না। চোখদুটো ঘোলাটে হয়ে আসছে ওর। আপাতত ওকে কিছু জিগ্যেস করে আর লাভ নেই। তার বদলে ফেরা দরকার। ওরা টেনশন করছে।
‘চলে আয়…’ ওর দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় সাম্য।
সেদিন বিকেল পর্যন্ত গল্প করেছিল ওরা। ওদের জীবনে একটানা পাঁচ জনে মিলে অতক্ষণ গল্প তার আগে অবধি কখনও হয়নি। আসার সময় রোল কল হয়েছে, যতজন পার্কে এসেছিল তাদের মধ্যে সবাই ফিরে যাচ্ছে কিনা যাচাই করতে।
সেই রোলকলের সময় খুঁটির মনে হয়েছিল যতজন এসেছিল সবাই ফিরে যাচ্ছে বটে, কিন্তু যারা এসেছিল তাদের কেউ কেউ আর ফিরে যাচ্ছে না। এই দুপুরটুকুনিতেই ধূসর হয়ে যাওয়া গাছে ঢাকা পার্কটা ওদেরকে পালটে দিয়েছে৷ ওদের সেই আপনভোলা মুখগুলো পড়েই আছে পার্কের আনাচে-কানাচে। বাস ছাড়ার আগে কাচের জানলা দিয়ে দেখতেও পেয়েছিল খুঁটি। অন্ধকারের পেটে চলে যাওয়া গাছের আড়াল থেকে ওদের ফেলে আসা ছায়াগুলো চিৎকার করে বলছে, ‘আমরা তো এখনো এখানেই রয়ে গেছি, আমাদের নিয়ে যাও।’
শক্তিমান আর শাকালাকা বুম বুম কবে শেষ হয়ে গেছিল খুঁটির মনে নেই। শেষ এপিসোডে ঠিক কী হয়েছিল কে জানে। অনেক পরে কী খেয়াল হতে একবার ইউটিউবে সার্চ করে দেখেছিল। দেখতে দেখতে ওর মনে হয়েছিল আমাদের জীবনের খুশির দিন আর ছেলেবেলার লাস্ট এপিসোড দেখার কথা কারো মনে থাকে না। টিভি স্ক্রিনে সন্ধের খবর আর শেয়ার মার্কেট শুরু হওয়ার আগে কোনও হোস্ট এসে মিষ্টি গলায় বলে যায় না যে বাকি জীবনে হাজার আঁচলের স্পর্শের মধ্যে কোনওদিন মায়ের আঁচলের গন্ধ থাকবে না, যন্ত্রণাময় রাতে কাচের গ্লাসে সোনালী মদ থাকবে, কান্না ভেজা বালিশ থাকবে না, লাটাই ছেঁড়া ঘুড়ির মতো আদুরে ছেলেবেলা এ গাছ ও গাছে আটকাতে আটকাতে একদিন মরা মাছরাঙার পালকের মতো এঁদো পুকুরে মিশে যাবে।
কিন্তু সেদিন বাস ছাড়ার আগে জানালা দিয়ে তাকিয়ে নিজেদের ছায়াগুলোকে দেখে ওর মনে হয়েছিল এক মুহূর্তের জন্য গাছগুলো যেন সেই হোস্ট হয়ে দাঁড়িয়ে বলছিল, ‘যাও, আর ফেরা হবে না কোনওদিন। এক জীবনের ছোটবেলা তোমাদের মুক্তি দিল।
ওখান থেকে ফিরে আসার পর বেশিরভাগ দিন পড়াশোনা শেষ হয়ে গেলে বোবা হয়ে বিছানায় শুয়ে থাকত খুঁটি। বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছা করত না। বন্ধুদের কাউকে ফোন বা মেসেজ করতে গেলেই নহরের কথা মনে পড়ে যেত। মেয়েটার চোখটা দিনদিন কেমন ফিকে হয়ে আসছে। শরীরটা পাকিয়ে যাচ্ছে দড়ির মতন। প্রথম প্রথম খুব কান্না পেত ওর। এখন আর পায় না। এখন এরকম বোবা হয়ে ও শুয়ে থাকে।
এর মাঝে একদিন একটা আননোন নম্বর থেকে মেসেজ আসে, ‘হাই, কেমন আছিস খুঁটি, আমি মৌ…’
খুঁটি একবার নিরুৎসাহ চোখে তাকিয়েছিল মেসেজটার দিকে। তারপর হাতের চাপে ডিলিট করে দিয়েছিল।
ওরা জানতে পারেনি ওদের পাঁচ বন্ধুর আর কোনোদিন দেখা হবে না৷ একসঙ্গে স্কুলের ছাদে বসে সিগারেটের ধোঁয়া মাখা হবে না। একে অপরকে ছেড়ে যাওয়ার যন্ত্রণার মুখে দাঁড়িয়েছিল ওরা। ওরা জানত জীবনের হেরো খেলায় ‘ছেলেবেলা’ নামের একটা সোনালি দিনকে কাঁধে চাপিয়ে শ্মশানঘাট অবধি নিয়ে যেতে হবে ওদের। কেউ মানতে পারছিল, কেউ পারছিল না, দুই দলের মধ্যে মিল ছিল একটাই—দুই দলকেই মানতে হয়েছিল।
নহর যেদিন মারা যায় সেদিন ওরা কেউ জানতেও পারেনি। শেষ একমাস একটা হসপিটালে ভর্তি ছিল। চিকিৎসাও চলছিল। আগমনীর রূপকথার রাজকন্যা মৃত্যুর আগে ভয় পেয়েছিল কিনা, যন্ত্রণায় কাঁপতে কাঁপতে বিছানায় পেচ্ছাপ করে ফেলেছিল কিনা, কিংবা শেষবেলায় কাঁদতে কাঁদতে ওদের কারো নাম ধরে ডেকেছিল কিনা কেউ জানে না।
মারা যাওয়ার পরদিন সকালবেলা ওর বাড়ির লোক আগমনীকে ফোন করে জানায়। বাড়ির বারান্দায় মৃতদেহ রাখা ছিল। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। আগমনী যায়নি। সারাদিন বিছানায় উলটো হয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়েছিল। জানলাটা খুলে দিয়েছিল হাট করে। কার্নিশের বিড়ালটা লাফিয়ে এসে শুয়েছিল ওর বুকের কাছে। ওর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বুঝতে পেরেছিল বিড়ালটা আর ওকে ছেড়ে যাবে না৷
সাম্য বেদান্ত আর খুঁটি জানতে পেরেছিল সেদিনই রাত্রিবেলা। পরেরদিন ওদের স্কুল ছুটি দেওয়া হয়েছিল। তারপরের দিন স্কুল যাওয়ার পথে রাস্তার উপর সেই কুকুরটাকে গোল হয়ে লেজ গুটিয়ে হয়ে শুয়ে থাকতে দেখেছিল ওরা।
ওদেরকে দেখেই হাঁপাতে হাঁপাতে লেজ দুলিয়ে ছুটে এসেছিল সে। কিছুক্ষণ হাঁ করে থেকে জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে তিনজনের মুখের দিকে পালা করে চেয়েছিল। নহরকে দেখতে পায়নি বলে কুঁইকুঁই করে অভিযোগ করেছিল কয়েকবার। সাম্য নিজের টিফিনবক্স খুলে খাবার দিয়েছিল কুকুরটাকে। তারপর তিনজন মিলে কুকুরটাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিল খুব।
যেসব প্রাণীরা মৃত্যুর অর্থ বুঝতে পারে, তাদেরকে মৃত্যু প্রথমে সজোরে স্পর্শ করে, তারপর একটু একটু করে ছেড়ে চলে যায়। আর যেসব অবলা প্রাণীরা মৃত্যুর অর্থ বুঝতে পারে না তাদেরকে সে প্রথমে একটু একটু করে স্পর্শ করে চিরকালের মতো জড়িয়ে ধরে…
নহর উচ্চ মাধ্যমিক দিয়ে যেতে পারেনি। ওরা স্কুল করেছিল আরও মাসতিনেক। ওদের মধ্যে আর তেমন কথা হতো না। ছাদে গিয়ে বসত না কেউ। মাঝে মাঝে ছুটির পর স্কুল থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একবার পেছন ফিরে স্কুল বাড়িটার দিকে তাকালে বিকেল মুছে যাওয়া খোলা জানলার অন্ধকারের দিকে চেয়ে চোখ জলে ভরে আসত ওদের…
