তালদিঘিতে ভাসিয়ে দেব – ১৫
পঞ্চদশ অধ্যায়
গাড়িটা নিউটাউন ব্রিজ ছাড়াতেই ব্যাক সিটে শরীর এলিয়ে দিল আগমনী। গাড়ি বাইরে কর্পোরেট অফিস পাড়া। এখানে লোকে আসে যায়, সেক্স করে, সিগারেট খায়, রাজনীতি নিয়ে দু-চার কথা বলে স্রেফ একটা ধান্দায়, যাতে দুটো পয়সার আমদানি হয়। সেই নোংরা ঢাকতেই হয়ত মাঝে মাঝে গাছপালা আর কংক্রিটের বাড়িঘর কবিতা টবিতা দিয়ে সাজিয়ে রাখার দায় এখানে বেশি। তার মধ্যে দিয়েই ছুটে চলেছিল অপরাজিতার গাড়িটা। পনেরো বছর আগে হারিয়ে যাওয়া পাঁচটা শৈশবের খোঁজে।
আজ রবিবার। তার ফলে দুটো সুবিধা হয়েছে। এক, মধ্যমগ্রাম অবধি যেতে এবং ফিরে আসতে বেশি সময় লাগার কথা নয়। দুই, অপরাজিতার আজ ছুটি থাকায় ওর গাড়িতে করেই যাওয়া আসার ব্যাপারটা হয়ে যাচ্ছে।
গাড়ি চালাচ্ছে কৌশিকই। তার পাশের সিটে বসে আছে অপরাজিতা। আগমনী এই ক’দিনে একটু চুপচাপ হয়ে গেছে। খানিকটা তার শরীরের কারণে। তবে কৌশিকের মনে হয়েছে ওর ভিতরে কিছু একটা বদলেছে। এর আগের ক’দিন বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় ওর চোখে যে উজ্জ্বল আলোটা ছিল এখন আর সেটা নেই। তার বদলে থেকে থেকে অদৃশ্য একটা হাসি যেন ঠোঁটের উপর রুমালে মুছে যাওয়া লিপগ্লসের মতো ঝকমক করেই হারিয়ে যাচ্ছে।
‘একটা ব্যাপার আমি বুঝতে পারছি না…’ গাড়িটা সিগন্যালে দাঁড়াতে অপরাজিতা বলল, ‘নহর যদি কিডন্যাপিংয়ের পর বদলে গিয়ে থাকে, তাহলে ও নিজে কিছু বলল না কেন? শি ইজ ইন দ্যা গেম?’
‘এখন আর এই নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।’ কৌশিক উইন্ডস্ক্রিনে চোখ রেখেই বলল, ‘শুধু তাই নয়, ওকে রীতিমতো বুঝিয়ে সুঝিয়ে পাঠানো হয়েছিল। প্রথম কয়েকমাস যে ও চুপ করে ছিল তার কারণ আসল নহর জান্নাতের খুঁটিনাটি স্বভাব, চেনা মানুষের খবর ওর কাছে ছিল না। সেটা বুঝে যাওয়ার পর পারফেক্ট রিপ্লেসমেন্ট হতে ওর আর বাধা ছিল না।’
‘কিন্তু এতে ওর লাভ কী?’
সিগন্যাল সবুজ হয়েছে এতক্ষণে। কৌশিক আবার স্টার্ট দিতে দিতে বলে, ‘ডুপ্লিকেট নহর জান্নাতের ব্যাপারে যেটুকু বোঝা যাচ্ছে, তাতে তার জীবনের সব থেকে বড় আজেন্ডা ছিল স্কুলে আসা। আমরা ধরে নিতে পারি এই চারজনের গ্রুপটার মধ্যে আসা। যতদূর মনে হয় ওর উদ্দেশ্য ছিল এই চারজনের সঙ্গে কিছু একটা করা।’
‘সেটা কী?’
‘জানি না। তবে সব থেকে আশ্চর্যের ব্যাপার হল নহরের এই বন্ধু ভদ্রলোক। ইনি মাঝখানে কিছু একটা খেলা খেলেছেন। সেটা ঠিক কী তা বোঝা যাচ্ছে না।’
‘হতে পারে লোকটা কিডন্যাপারদের কেউ। ওই ডপেলগ্যাঞ্জার জোগাড় করে কেসটা থেকে ওদের বাঁচিয়েছিল।’
কৌশিক মাথা নাড়ে, ‘উঁহু, আমার কিন্তু তা মনে হচ্ছে না৷ তাই যদি হত তাহলে স্কুলে উপস্থিত হল কেন? নকল নহরকে বাঁচাল কেন? সব থেকে বড় প্রশ্ন হল…’ কৌশিকের গলা থমথমে শোনায়, ‘এই ডুপ্লিকেট নহর জান্নাত যে মারণরোগে মাত্র বছরদেড়েক পরে মারা গেল, সে আসলে কে?’
পেছন ঘুরে আগমনীর দিকে দেখে অপু, ‘তোর যদি কিছু মনে থাকত তাহলে আর কথাই ছিল না।’
আজ আগমনীর পুরোনো বাড়ি যাওয়ার একটা কারণ আছে৷ বিশ্বজিৎ ব্যানার্জীর সঙ্গে কথা হওয়ার পরেই আগমনীকে ফোন করেছিল কৌশিক, মণি, যেভাবেই হোক আমাদের খোঁজ নিতে হবে ছবিটা কাকিমার কাছে এল কী করে!’
‘এল কী করে মানে? আমারই ক্যামেরায় তোলা হয়েছিল হয়তো।’
‘ছোটবেলায় ক্যামেরা ছিল তোর কাছে?’
‘উঁহু, তবে কারো থেকে ধার নিয়ে থাকতে পারি।’
‘টুয়েলভের পর তুই কতদিন মায়ের সঙ্গে ছিলিস?’
‘কলেজে উঠে থেকে তো হোস্টেলেই থাকতাম। মানে ধর, টুয়েলভের পর মাসখানেক বাড়িতে ছিলাম। তারপর থেকে বাইরে বাইরেই কেটে গেছে।
‘তার মধ্যে এই ছবিটা চোখে পড়েনি?’
‘যতদূর মনে পড়ছে ইলেভেন টুয়েলভ নিয়ে মা খুব একটা কথা বলত না আমার সঙ্গে। সত্যি বলতে মায়ের সঙ্গে তেমন একটা কথা হত না৷ তবে হ্যাঁ, মায়ের একটা অ্যালবাম ছিল। তাতে সমস্ত ছবি-টবি জমিয়ে রাখত। সেটা মাঝে মধ্যেই খুলে দেখতাম। তবে সেখানে এই ছবিটা দেখেছি বলে তো মনে পড়ে না।’
‘কারণ তুই যতদিন বাড়িতে ছিলিস ততদিন ছবিটা বাড়িতে আসেনি। তুই বাড়ি ছাড়ার পরে ওটা পাঠানো হয় কিছু একটা কারণে। এবং যে পাঠিয়েছিল সে সম্ভবত এই চারজনের মধ্যেই কেউ একজন।’
‘কিন্তু হাউ ডাজ দ্যাট ম্যাটার? এতদিনে তাকে খুঁজে বের করা সম্ভব নাকি?’
পরের উত্তরটা দিতে গিয়ে কৌশিকের গলা হালকা কেঁপে যায়, ‘তোর মনে আছে, তুই বলেছিলি কাকিমার সব পুরোনো জিনিস সামলে রাখার একটা বাতিক ছিল, বিশেষ করে খাম?’
‘হ্যাঁ!’ বাকি কথাটা আগমনীই শেষ করে, ‘মানে তুই বলতে চাইছিস ছবির সঙ্গের খামটা কোনওভাবে মায়ের কালেকশনে থেকে গেলেও যেতে পারে এবং সেই খাম থেকে ওদের একজনের নাম ঠিকানা পাওয়া যাবে, তাই তো?’ কৌশিকের মুখে হাসির রেখা ফোটে, পরক্ষণেই মিলিয়ে যায় সেটা, কিন্তু তাতেও দুটো সমস্যা। অত জিনিসপত্রের মধ্যে সে খাম কোথায় আছে খুঁজে বের করা সহজ হবে না। আর দুই অত খামের মধ্যে কোনটা ছবির সঙ্গে এসেছিল সেটা বের করা মুশকিল। অবশ্য ফোন কলটা যেহেতু বেলঘরিয়ার কাছাকাছি কোথাও থেকে করা হয়েছিল, ঠিকানাটাও ওর আশেপাশেরই হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তুই চলে আসার পর কাকিমার সঙ্গে কে থাকত?’
‘মাসি, তিনিও বছরতিনেক হল মারা গেছেন। তাছাড়া আমাদের বাড়ির একতলায় ভাড়াটে থাকে দু’ঘর। শম্ভুনাথ বলে একটা লোক ভাড়া থাকে তাও বছর দশেক হল। মায়ের ছোটখাটো কাজ সেই করে দিত। আর অন্যজনের কথা আমি এত ডিটেলে জানি না।’
‘তাদের কাছে আদৌ খোজ থাকবে বলে তো মনে হয় না। আমাদেরই খুঁজে বের করতে হবে!’
ওরা দুজনেই যাবে বলে স্থির করেছিল। শেষে আগমনী নিজেই ফোন করে অপরাজিতাকে জানায়। তার অবশ্য গোটা ব্যাপারটা বুঝতে একটু সময় লাগে। সমস্ত শুনে অপুর মুখটা থমথমে হয়ে যায়, ‘ওই ছবিটাই যত ঝামেলার মূল। ওটা থেকেই…’
‘রাবিশ!’ কৌশিক খানিক কর্কশ গলাতেই বলে, ‘আমি এসব বিশ্বাস করি না। আমার যতদূর মনে হয় আগমনীর সমস্ত ব্যাপারটা মনস্তাত্বিক। ওই ছবিটা দেখলে ওর কোনও ঘটনার কথা মনে পড়ে…
‘তাহলে জানলার হাতের দাগটা? শম্পা যা যা এক্সপেরিয়েন্সের কথা বলল সেগুলো হল কী করে?’
‘তুই একটা শিক্ষিত মেয়ে হয়ে এইসব বিশ্বাস করছিস!’ কৌশিক ভর্ৎসনা করেছিল ওকে।
‘যা দেখেছি তাই বিশ্বাস করছি। তাছাড়া আমার কাছে ওর ভালো থাকার থেকে শিক্ষিত হওয়াটা বড় নয়।’
ওদের মধ্যে ঝামেলা শুরু হতে চলেছে দেখে আগমনীই থামিয়েছিল দুজনকে, ‘আহ্, কেন ফালতু ক্যাচাল করছিস বল তো? আমরা বিশ্বাস করি বা না করি এই চারজনের মধ্যে কেউ একজন করত। সে-ই যোগাযোগ করেছিল ব্যানার্জীর সঙ্গে। তন্ত্র মন্ত্র সত্যি করেছিল কিনা বা কাজ করে কিনা সেটা পরে ভাবলেও চলবে। আপাতত খামটা উদ্ধার করা দরকার।’
মধ্যমগ্রামের ভিতরে আগমনীদের পুরোনো বাড়িটার সামনে পৌঁছাতে ওদের ঘণ্টাখানেকের বেশি লাগল না। ছোট্ট দোতলা বাড়ি। ওপর তলাতে আগমনীর মা থাকতেন। একতলাটা দুভাগ করে ভাড়া দেওয়া হয়। সেই ভাড়াটেদের অংশেরই একদিকে একটা লম্বা বারান্দা। বারান্দা বরাবর টাঙানো দড়ি থেকে দুটো পুরোনো গামছা, একটা শাড়ি আর কয়েকটা রংচটা টি-শার্ট মেলা আছে।
চাতালের উপরে রোদ এসে পড়েছিল। সেই রোদের মধ্যেই বসেছিলেন বছর পঁয়তাল্লিশের শম্ভুনাথ। লোকটার মাথাজোড়া টাক। বুক জুড়ে সাদা চুলের পুরু আস্তরণ। পা ছড়িয়ে বসে মাথায় হাত দিয়ে কী যেন ভাবছিলেন। আগমনী যে আজ আসছে সে কথা শম্ভুনাথকে আগেই ফোন করে জানিয়ে রেখেছিল। ওদেরকে ঢুকতে দেখেই এগিয়ে এলেন তিনি। চাবির গোছা আগমনীর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে একগাল হেসে বললেন, ‘এই নিন আপনার চাবি। ‘
আগমনী এগিয়ে গিয়ে তার হাত থেকে চাবির গোছাটা নিয়ে বলে, ‘এরা আমার বন্ধু। ওর নাম কৌশিক, আর ও অপরাজিতা।’
হাত তুলে ওদের নমস্কার জানান শম্ভুনাথ। ওরা তিনজন সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠছিল। হঠাৎ কী মনে হতে পিছু ডাকলেন শম্ভুনাথ, ‘বড়দিভাই প্রথমদিকে খুব তোমার কথা বলত। মরার আগে ভেবেছিল, একবার তুমি আসবে…’
সিঁড়ি থেকে নেমে আসে আগমনী। শান্ত চোখে তাকায় শম্ভুনাথের দিকে, ‘মায়ের মরে যাওয়াটা দেখব না বলেই অতদূরে পালিয়ে গেছিলাম শম্ভুদা…’
‘আর তোমার মা যে তোমায় বাঁচতে দেখল না দিদি।’ শম্ভুনাথের মুখ মাটির দিকে নেমে আসে, ‘সবার ভাগে প্রিয়জনের মৃত্যু দেখার দুঃখ থাকে, আর প্রিয়জনের মাঝে মরে যাওয়ার আনন্দ। তুমি মাকে ভাগটা দিলে না…’
আগমনী খানিকক্ষণ চুপ করে থাকে। কৌশিক এগিয়ে এসে ওর পিঠে একটা হাত রাখে। তারপর শম্ভুকে বলে, ‘আপনিও আসুন না আমাদের সঙ্গে। অন্য ভাড়াটেদের সঙ্গেও আলাপ করে নেওয়া যাবে।’
শম্ভু হাসেন, হাতজোড় করে বলেন, ‘আসলে আমায় একটু বেরোতে হবে। আপনারা আসবেন বলে চাবি নিয়ে বসেছিলাম।’
সিঁড়ির দিকে এগিয়ে আসে তিনজনে। অন্য ভাড়াটের সঙ্গে অবশ্য সিঁড়ির মুখেই দেখা হয়ে গেল। ভদ্রলোকের নাম বিপ্লব বসুরায়। পেশায় অধ্যাপক। স্থানীয় কোনও একটা কলেজে ফিজিক্স পড়ান। গায়ে একখানা জ্যাকেট। মাথার চুল ব্যাকব্রাশ করে আঁচড়ানো। তবে ভদ্রলোক খুব বেশিদিন এসেছেন বলে মনে হল না। ছাদে পাখিদের দানা খাওয়াবেন বলে সিঁড়ি দিয়ে উঠছিলেন। আলাপ হয়ে যেতে ওদের সঙ্গেই দোতলায় উঠে এলেন।
দরজা খুলে ঘরে ঢুকে এক সেকেন্ডের জন্য একটু ভেবলে গেছিল কৌশিক। ঘরটা এমন যত্ন করে সাজানো, যে দেখে মনে হয় এ ঘরে এখনও লোক থাকে। জানলার গরাদের ঠিক পাশে কয়েকটা ছোট ফুলের টব রাখা। তার উপরেই একটা সাদা ঘড়ি৷ ঘরে আসবাব বলতে দুটো আলমারি, একটা পুরোনো দিনের পালঙ্ক, আর একটা বেশ বড় ড্রেসিংটেবিল আছে। কোনও আসবাবই নতুন নয়। তা সত্ত্বেও প্রত্যেকটা কোনায় নিপুণ হাতের যত্নের ছাপে জীবন্ত মনে হচ্ছে ঘরটাকে।
সেদিকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে অপরাজিতা বিড়বিড় করে বলল, ‘কাকিমা যথেষ্ট গুছানো মানুষ ছিলেন দেখছি।’
‘না-হলে পনেরো বছর একা থাকা সম্ভব ছিল?’ আগমনী হাসে।
বিপ্লব বসুরায় ওদের পেছনেই দাঁড়িয়েছিলেন। এগিয়ে এসে অন্য দিকের জানলাটা খুলে দিলেন তিনি। ঘরটা বন্ধ থাকায় কয়েক দিনের জমাট বাতাস ভারী হয়ে আছে। দু-একবার শুকনো কাশি হল আগমনীর। কাশির দমক সামলাতে সামলাতেই দরজার দিকে পা বাড়াল। তারপর পেছন ঘুরে বলল, ‘আমি একটু পুকুর পাড়ে গিয়ে দাঁড়াচ্ছি। তোরা দেখ কিছু পাস কিনা।’
কৌশিক অবাক হয়, ‘যা শালা! তোর জন্য এতদূর এলাম আর তোর নিজেরই আগ্রহ নেই!
আগমনী হাসে, ‘আগ্রহ নেই কে বলল? তোরা খুঁজছিস, তোদের উপরে ভরসা আছে।’
কৌশিকের খুঁতনিতে আঙুল রাখে আগমনী, ‘আমার এখানে ভালো লাগছে না গেদু। প্লিজ…’
মাঝে মাঝে আগমনী কী ভাবে কৌশিক বুঝতে পারে না। ক’দিন আগে অবধি বেশ সহজ স্বাভাবিক মনে হত ওকে। যত দিন যাচ্ছে যেন দুর্বোধ্য হয়ে পড়ছে। যেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করছিল, সেটা হুট করেই মূল্যহীন হয়ে যাচ্ছে ওর কাছে। বিশেষ করে মাথায় চোট পাওয়ার পর থেকে খানিকটা শ্লথ হয়ে পড়েছে। দ্রুত বুড়িয়ে যাচ্ছে কি?
এখন শীতকাল। বাতাসে হিমভাব খোলা জানলা দিয়ে এসে ওদের গায়ে পরশ বুলিয়ে যাচ্ছে। এ বাড়ির লাল সিমেন্টের মেঝেতে পা রাখলেই শিউরে উঠতে হয়। তবে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে বলে পায়ের তলাটা অভ্যস্ত হয়ে গেছে। আগমনী বেরিয়ে যেতে বিল্পব বসুরায় কৌশিকের দিকে এগিয়ে আসেন, ‘আপনারা কী খুঁজছেন বলুন তো?’
‘একটা খাম, এই ধরুন বছর পনেরো আগে এসেছিল। উনি পুরোনো চিঠিপত্র কোথায় রাখতেন আপনি জানেন?’
দু’পাশে মাথা নাড়েন বসুরায়, ‘আমি বেশিদিন দেখিনি ওনাকে। আমার সঙ্গে তেমন একটা কথাবার্তা বলতেন না। তাছাড়া, চিঠিপত্রের ব্যাপারে বাইরের লোককে বলতেই বা যাবেন কেন?’
ভদ্রলোক বেশিক্ষণ দাঁড়ালেন না। বোধহয় ওদের উপর আগ্রহ হারিয়েই সরে পড়লেন, ‘আমি চলি, বুঝলেন, পাখিগুলোকে খেতে দিতে হবে। তারপর আবার পুকুরে মাছেদের খাওয়ানোর ব্যাপার আছে, আসি।’
কৌশিক আর অপরাজিতা গা থেকে জ্যাকেট খুলে খোঁজাখুঁজি শুরু করল। খামগুলো খুঁজে পেতে বেশি বেগ পেতে হল না। ড্রেসিংটেবিলের ড্রয়ারের ভেতরেই দুটো খামের বান্ডিল খুঁজে পেল অপরাজিতা। সে দুটো দেখতে দেখতে কৌশিকের কাছে নিয়ে এসে বলল, ‘দু’খানা বান্ডিল আছে দেখছি, একটা অফিসিয়াল চিঠিপত্র আর একটা পারসোনাল। অফিসিয়ালগুলো বেশিরভাগই ব্যাংকের চিঠি। ওগুলো দেখে লাভ নেই।
হাত বাড়িয়ে পার্সোন্যাল চিঠিগুলোই হাতে তুলে নিল কৌশিক। অন্তত গোটা পঞ্চাশের চিঠি। তার মধ্যে দু’হাজার নয় থেকে দশের মধ্যে আসা চিঠিগুলো দু ভাগে ভাগ করে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল ওরা। একটা একটা করে চিঠি উলটে গেল ওরা।
অপরাজিতা নিরাশ গলায় কৌশিককে বলল, ‘সেরকম কিছু পাচ্ছি বলে তো মনে হচ্ছে না৷’
কপাল থেকে ঘাম মোছে কৌশিক, ‘দেখ, যদি চিঠিটা হাতে করে দেওয়া হয়ে থাকে তাহলে খাম থাকার কথা নয়। আমরা অন্ধকারে ঢিল ছুড়ছি, না লাগলে অদৃষ্টকে দোষ দেওয়া ছাড়া কিছু করার নেই।
দোতলায় মোট দুটো ঘর। সম্ভবত পাশের ঘরটাতে আগমনী থাকত। দুজন মিলে দুটো ঘর প্রায় ওলটপালট করে ঘণ্টাখানেক খোঁজাখুঁজি করল। চাদরের তলায়, আলনার পেছনে, আলমারির ভিতর সব জায়গা খুঁজল। কোথাও কিছু না পেয়ে হতাশ হয়ে আবার আগের ঘরের মেঝেতে বসে হাঁপাতে লাগল দুজনে। কৌশিকের থেকে ছবিদুটো নিয়ে তিলের ব্যাপারটা একবার মিলিয়ে দেখল অপরাজিতা। আলাদা করে আর কিছু বুঝতে পারল না। আরও এক প্রস্থ খোঁজাখুজির পর ঠান্ডা মেঝের উপরেই লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল।
‘নাহ্, ওই খামটা ফেলে দিয়েছে মনে হচ্ছে।’ বড় শ্বাস নিতে নিতে বলল অপরাজিতা।
‘এতদূর আসাই মাটি।’ কৌশিকের নিজেরও বিরক্ত লাগতে শুরু করেছে। সামান্য একটা সম্ভাবনার পেছনে দৌড়ে এতদূর আসার মানেই হয় না। অপরাজিতার পাশে হাঁটুর উপর কনুই রেখে বসে পড়ল ও।
দুজনের সমস্ত শরীরে পুরোনো ধুলোর দাগ। মাথার চুল অবধি ঝুলে ভরে গেছে। সেগুলো হাত দিয়ে ঝাড়তে লাগল কৌশিক। এতক্ষণে অপরাজিতা দু’হাত পেছনে রেখে তাতে ভর দিয়ে উঠে বসেছে। খানিকটা দম নিয়ে সামনে ঝুঁকে পড়ে বলল, ‘দেশলাই আছে তোর কাছে?’
গরাদ লাগানো জানলা দিয়ে শীতের রোদ এসে বিছানার উপর পড়ছে। বিছানার উপর ভাঁজ করা কম্বলে মিহি ধুলো ঘুমিয়ে রয়েছে। সমস্ত ঘরটা অসম্ভবরকম নিশ্চল। যেন চুপ করে বসে ওদের অকারণ খোঁজাখুঁজি করে হয়রান হয়ে যাওয়াটা উপভোগ করছে প্রাণ ভরে।
কৌশিক ওর দিক না তাকিয়েই দেশলাই বের করে এগিয়ে দিল। জামার হাতায় কপাল মুছল।
দেশলাই দিয়ে একটা সিগারেট ধরাল অপু। কৌশিক মাটি থেকে ঝাড়া দিয়ে উঠতে যাচ্ছিল। কিন্তু উঠতে পারল না। উঠে দাঁড়াতে গিয়ে অপরাজিতার হাতের উপর চোখ পড়েছে ওর। আর চোখ পড়তেই বুকের ভিতর ছ্যাঁত করে উঠেছে।
একটু আগে দেশলাই দিয়ে সিগারেট ধরায়নি অপু। তার বদলে ওর দুই আঙুলের ফাঁকে ধরা আগমনীর স্কুলের ছবিটাতে আগুন ধরিয়েছে৷ কৌশিক লাফিয়ে পড়তে যায় ছবিটার উপর। কিন্তু তার আগেই সেটা সরিয়ে নেয় অপরাজিতা।
‘কী করছিস তুই!’ হাঁপাতে হাঁপাতেই আবার জ্বলন্ত ছবিটা ধরতে যায় কৌশিক৷
‘যেটা তোর আগেই করা উচিত ছিল। এই ছবিটার জন্যেই আগমনীর এই অবস্থা। এইটাকে পুড়িয়ে ফেললেই…’
‘তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে।…’ ঘর কাঁপিয়ে গর্জে ওঠে কৌশিক, ‘ওই ছবিটা ওর শিকড় ছিল অপু। ওর ছোটবেলার দিন…’
‘এমন আনন্দের দিন যার কথা ও নিজেই ভুলে গেছে!’ অপরাজিতা চকিতে ওর নাগালের বাইরে সরিয়ে নেয় ছবিটা। ছবির শুকনো রং আর কাগজ শীতের মধ্যে যেন উষ্ণতা ছড়ানোর চেষ্টা করে ঘরের মধ্যে…
‘শালা, শুয়োরের বাচ্চা…’ কৌশিক বিদ্যুতের মতো হাত চালায়। লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
জ্বলে খাঁক হয়ে যাচ্ছে ছবিটা। পুড়ে যাচ্ছে আগমনীর বন্ধুদের মুখ। কৌশিক অপুর জামা খামচে ধরে, ‘প্লিজ অপু, ওটাকে পুড়িয়ে ফেলিস না। ও খুব কষ্ট পাবে।…’
অপরাজিতা জ্বলন্ত ছবিটা ওর থেকে দূরে সরিয়ে নেয়। মুখ চোখ শাস্ত দেখায় ওর, ‘জানি পাবে, তারপর ঠিক হয়ে যাবে। ফেলে আসা অতীতকে এভাবেই পুড়িয়ে দিতে হয় গেদু।’ এক হাত দিয়ে কৌশিককে ধাক্কা মেরে সরানোর চেষ্টা করে অপু, ‘ও একটা ভুল সময়ে পড়ে আছে। কিছু অচেনা মানুষ, অচেনা সময়ের মোহে পড়ে আছে। সেখান থেকে যে করেই হোক ওকে বার করে আনতে হবে আমাদের।’
‘ওটা পুড়িয়ে ফেলিস না অপু, ওর আর কিছু নেই…’ শরীরের সমস্ত শক্তি একত্র করে লাফিয়ে আবার ছবিটা ধরতে যায় কৌশিক। জ্বলে প্রায় শেষ হয়ে এসেছে সেটা। অপরাজিতা ছবিটা ছুড়ে দেয় ওর নাগালের বাইরে। আলমারির তলায় গিয়ে ঢোকে পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া ছবিটা। কৌশিক সরীসৃপের মতো হামাগুড়ি দিয়ে গিয়ে সেটা টেনে বের করার চেষ্টা করে। উত্তেজনায় তার নাক মুখ দিয়ে অসহায় নিঃশ্বাস পড়তে থাকে৷
‘ওটার আর কিছু বাকি নেই গেদু, ভুলে যা।’ অপরাজিতাটা গলাটা অসম্ভব ঠান্ডা শোনায়।
‘তুই…তুই কী করলি অপু…ওর বন্ধুরা…’ আলমারির তলায় হাতড়ে ছবিটা বের করার চেষ্টা করে কৌশিক। ওর হাতটা আলমারির তলার জমাট ধুলোয় শৈশব খোঁজে। বুকের ভিতর অজানা তরল ক্ষরিত হয়। এই ঠান্ডাতেও শরীর ঘেমে স্নান করে যায়। ছবিটা পুড়ে এতই ছোট হয়ে গেছে যে তাকে খুঁজে পাওয়া সহজ নয়।
‘ওর বন্ধুরা…’
অপু হাঁপাতে হাঁপাতে ওর পাশে বসে পড়ে, ‘তুই ওর বন্ধু নোস গেদু? তুই এনাফ নোস ওর জন্য?’
‘ওর ছবিটা…’ কৌশিক উদ্ভ্রান্তের মতো আলমারির নিচের জমাট অদৃশ্য ধুলো ঘাঁটতে থাকে।
‘শি নিডস ইউ কৌশিক। তোর কাজ ছিল ওকে নিজের করে নেওয়া৷ তার বদলে তুই ওর পাগলামিটাকে নিজের করে নিয়েছিস। প্লিজ এটা বন্ধ কর… প্লিজ…’
হঠাৎ আলমারির তলা থেকে হাতটা বের করে আনে কৌশিক। ঠোঁটটা তিরতির করে কাঁপছে ওর। সমস্ত হাত জুড়ে লেগে আছে ছবি পোড়া কালো ঝুল। সেখান থেকে চোখ সরিয়ে ওর হাতের নীচটায় তাকাতেই ভুরু কুঁচকে যায় অপরাজিতার।
‘কী ওটা?’
কৌশিকের হাতের একটা সাদা কাগজ বেরিয়ে এসেছে৷ কাঁপা কাঁপা হাতে সেটা চোখের সামনে মেলে ধরে কৌশিক। একটা খাম…
ধুলো আর ঝুল সরাতে খামের উপরের লেখাগুলো পরিষ্কার হয়। তিনজন প্রেরক একই ঠিকানা থেকে পাঠিয়েছে ছবিটা। শ্যামদাশ রোড, বেলঘরিয়া।
অপরাজিতার চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, ‘এটা তো সেই খামটা মনে হচ্ছে ঠিকানাও দেওয়া আছে।’
গায়ের ধুলো ঝেড়ে বিছানার উপর উঠে বসে কৌশিক। একটু আগের উত্তেজনাটা দ্রুত মুছতে থাকে মুখ থেকে, ‘এই তিনজন তার মানে ওর তিন বন্ধু… কথাগুলো উচ্চারণ করতে করতে ওর গলা কেঁপে যায়।
নামগুলো খুঁটিয়ে দেখে দুজনে। ঠিকানাটা মনে মনে মুখস্ত করে নেয়। নাহ্, বেশিদূর হবে না। সব থেকে বড় কথা ঠিকানাটা একটা বাড়ির। নাম জানা আছে যখন সেখানে গিয়ে খুঁজে বের করা কঠিন হবে না৷
অপরাজিতার মুখে এতক্ষণে হাসি ফোটে, ‘শালা, আমি ছবিটা না পোড়ালে খামটা উদ্ধারই হত না।’ এবার সত্যি সত্যি দেশলাই দিয়ে সিগারেট জ্বালায় অপু ‘এই জন্যেই বলি গল্পে হিরোর থেকে ভিলেন বেশি ইম্পরট্যান্ট।’
সদ্য আবিষ্কৃত ধুলোয় ঢাকা খামটা উলটেপালটে দেখছিল কৌশিক। অপরাজিতার দিকে চেয়ে মুখ ফিরিয়ে নিতে যাচ্ছিল। হঠাৎ কী মনে হতে তার চোখের পাতা অস্থির হয়ে ওঠে। বিছানা থেকে উঠে মেয়েটার দিকে এগিয়ে যায় সে, ‘কী বললি? হিরোর থেকে ভিলেনের ইম্পরট্যান্স বেশি, তাই না?’
কৌশিকের মুখটা হঠাৎ করে পালটে যেতে একটু ঘাবড়ে যায় অপু। কথাটার মধ্যে আশ্চর্যের কী আছে সে বুঝতে পারে না, ‘তোর কী হল বল তো হঠাৎ করে?’
দ্রুত পকেট থেকে মোবাইলটা বার করে বিশ্বজিৎ ব্যানার্জীকে কল করে কৌশিক। ওপাশ থেকে রিসিভ হয় ফোনটা। কোনও প্রশ্ন করতে না দিয়ে ও নিজেই আগে জিগ্যেস করে, ‘আচ্ছা, আপনার বইতেই কালরাক্ষসের কথা বলা হয়েছে। এই কালরাক্ষস কে বলুন তো? ‘
ব্যাপারটা বুঝতে একটু সময় লাগে বিশ্বজিৎ ব্যানার্জীর, খানিক ভেবে চিত্তে বলেন, ‘দেখুন, বাচ্চাদের বইতে তো আর অত ইল্যাবরেটলি লেখা যায় না। তবে আমি যা বোঝাতে চেয়েছি, সেই অনুযায়ী কালরাক্ষস আসলে মহাকাল।’
‘মহাকাল? মানে শিব?’
‘সেটা হিন্দু পুরাণ। বৌদ্ধতন্ত্রে মহাকাল হল কিপার অফ টাইম। সে সময়কে রক্ষা করে। মহাকাল যেখানে প্রকট হয় সেখানে তিনটে প্রাণীকে দেখা যায়, কালো কুকুর, কাক আর শিয়াল।’
‘সময়কে রক্ষা করে বলতে?’
একটু গলা খাকড়ে নেন বিশ্বজিৎ ব্যানার্জী, ‘সময়ের কিছু পারটিকুলার রুল আছে। যেমন ধরুন, একই মানুষ একই সময়ে দু’জায়গায় উপস্থিত থাকতে পারে না। কী আউটকাম হবে সেটা আগে থেকে জেনে আপনি কিছু করতে পারবেন না৷ আরে বিদেশি সাইয়েন্স ফিকশন দেখেননি? সময় এইসব নিয়মের বাইরে যেতে পারে না। যাতে না যায় সেটা দেখার দায়িত্ব মহাকালের। আপনাকে ইলাবরেটলি আমি বলতেই পারি…কিন্তু ফোনে…
‘বলতে হবে না। জাস্ট এটা বলুন যে আপনার বইতে ইনা কালরাক্ষসের বিরুদ্ধে লড়াই করে, তাই তো?’
‘উঁহু…’ বিশ্বজিৎ ব্যানার্জীর গলায় আত্মবিশ্বাস, ‘ওটা প্রথমদিকে মনে হয় ঠিকই, কিন্তু শেষে গিয়ে একটা টুইস্ট আছে। শেষে দেখা যায় কালরাক্ষস ইনার বিরুদ্ধে লড়াই করছিল না। সময় কারো বিরুদ্ধে কিছু করতে পারে না। কারো ক্ষতি করাও তার কাজ নয়। সে শুধু মানুষকে বুড়ো করে দিতে পারে, ইচ্ছা মতো স্মৃতি ভুলিয়ে দিতে পারে। ইনার কাজও কালরাক্ষসকে হারানো নয়। বরং তাকে দিয়ে নিজের ইচ্ছাপূরণ করা।’
‘ইচ্ছাপূরণ! মানে?’
‘দেখুন কালরাক্ষস কোনও রাক্ষস নয়। জাস্ট লাইক টাইম, হি ইজ দেয়ার টু সাস্টেইন ক্রিয়েশন। আপনার ভালো খারাপে তার কিছু যায় আসে না। ইটস জাস্ট ওয়ান ফোর্স অফ নেচার!’
‘কিন্তু সে ইচ্ছাপূরণ করবে কী করে?’
ওপাশ থেকে উত্তর আসতে সময় লাগে, ‘আপনি দুর্গাপুজোর সকালে যে অঞ্জলি দেন, রোজ স্কুলে গিয়ে যে প্রেয়ার করেন, সেও তো একরকম ইচ্ছাপ্রকাশই, তাই না? হিন্দু ধর্মে যে কোনও দেবতাই হল ফোর্স অফ নেচার। তার কাছে প্রেয়ার করা মানে ফোর্স অফ নেচারের কাছে এটা সেটা দাবি করা। ভগবান তো মাঝে মধ্যে আপনার ইচ্ছাপূরণ করতেই পারে।
ফোনটা রেখে দেয় কৌশিক। অপরাজিতা এগিয়ে এসে ওর পাশে বসে৷ জানলার বাইরে থেকে রিকশার হর্নের আওয়াজ আসছে। ছাদের দিক থেকে একটা কাক ডেকে চলেছে তারস্বরে। সেই শব্দেই কৌশিকের মাথার মধ্যে একটা চিনচিনে ব্যথা শুরু হয়। বুড়ো আঙুল আর তর্জনী দিয়ে সেই ব্যথাটাকেই বুঝি চেপে ধরার চেষ্টা করে সে, ‘অপু…’
‘কী? ‘
‘কাক, শিয়াল আর কুকুর এই তিনটে প্রাণীর নাম আমি আগেও শুনেছি, কার মুখে যেন…’
‘নহর জান্নাতের স্বপ্নে। মণি বারবার এই তিনটে প্রাণীর নাম করত!’
‘তার মানে…’ ওর দিকে চেয়ে কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে যায় কৌশিক। কয়েক পলক মাটির দিকে চেয়ে থেকে ওর দিকে মুখ তুলে চায়, ‘আমরা প্রথম যখন ছবিটা দেখেছিলাম তখন কী মনে হয়েছিল?
অপরাজিতার ঠোঁটের ডগাতেই ছিল উত্তরটা, ‘নহর আর আগমনীকে অনেকটা একরকম দেখতে। ঠিক যেন একই মায়ের পেটের যমজ বোন।
চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে কৌশিক। জানলার কাছে গিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে সে, পরের কথাগুলো স্বগক্তির মতো শোনায়, ‘আমরা বারবার ভাবছিলাম নহর এল কোথা থেকে। … আসলে ও এসেছিল অন্য একটা সময় থেকে…কারো একটা ইচ্ছাপূরণ হয়ে…’
‘মানে তুই বলছিস পাস্ট থেকে টাইম ট্রাভেল করে কেউ পাঠিয়েছিল ওকে?’
অপরাজিতার দিকে ঘুরে তাকায় কৌশিক। বাইরে কাকের ডাকটা অকারণেই বেড়ে ওঠে, কিন্তু সেটা আর কানে আসছে না ওর, ‘অতীত থেকে নয় অপু।
‘তার মানে ফিউচার! কিন্তু…’
ধীরে ধীরে দু’দিকে মাথা নাড়ায় কৌশিক, ‘ওরা একই মায়ের পেটের দুই বোন নয়…’
বাড়ি থেকে বেরিয়ে পেছনের পুকুরটার কাছে পৌঁছাতেই আগমনীর মনটা হালকা হয়ে যায়। পাড়ে কোনও অজানা কারণে সারাক্ষণই মৃদু হাওয়া দেয়। কেবল ছোটবেলায় যখন এই জায়গাটা এতটা মফস্বল হয়ে ওঠেনি তখনও ভোরবেলা জলের উপর কুয়াশা জমে থাকত। অনেক ভোরে ঘুম ভেঙে গেলে এসে কুয়াশার মধ্যে চেয়ে থাকত আগমনী। ওর মনে হত ওপাড় থেকে কেউ বুঝি ঠিক ওর মতোই চেয়ে আছে এদিকে….
সেখানে বসে কতক্ষণ কেটেছে ওর খেয়াল ছিল না। দূর থেকে ভেসে আসা একটা ডাকে চমক ভাঙল ওর। চেয়ে দেখল বাড়ির দিক থেকে কৌশিক আর অপু দৌড়ে আসছে। ভাব দেখে মনে হল কিছু একটা খুঁজে টুজে পেয়েছে। উঠে দাঁড়িয়ে ওদের দিকে খানিক এগিয়ে গেল আগমনী।
কৌশিকই আগে এসে পৌঁছল ওর কাছে, হাওয়ায় উড়তে থাকা ওর গলার আওয়াজ শোনা গেল, ‘মণি… মণি…’
ওকে ডাকছে কৌশিক। ও কান পেতে শোনার চেষ্টা করল, কৌশিকের হাতে ধরা কাগজটা হাওয়ায় উড়ছে, ‘তোর…তোর তিন বন্ধুর নাম…’
কাছে এসে আগমনীর হাতে কাগজটা গুঁজে দিল সে, ‘বলেছিলি তোকে বন্ধু খুঁজে দিতে, নে…দিলাম…’ দুপুরের জ্বলজ্বলে রোদের ছটায় ছেলেটার মুখ উজ্জ্বল দেখায়। সারা গায়ে ধুলো লেগেছে আছে ওর। চুলে জড়িয়ে থাকা মাকড়সার জালটা আগমনীয় আঙুল দিয়ে তুলে ফেলে দেয়।
‘সাম্যজিৎ ঘোষ, ঋতবান সেন, বেদান্ত চৌধুরী… কাগজটা হাতে দিয়ে নিজেই বলে কৌশিক, ‘ঠিকানাও দেওয়া আছে এতে। খুঁজে বের করা যাবে। ফেসবুকে এদেরকে খুঁজলে…’
কাগজটা যত্ন করে মেলে ধরে আগমনী। ওর মুখে একটা হাসি ফোটে। খামের কাগজটা হাওয়ায় ঝেড়ে নিয়ে নামগুলোর উপরে আঙুল বোলায়। মোটা শক্ত কুরিয়ারের কাগজ বলে এতদিনে ছিঁড়ে যায়নি। উলটে বেশ পাকাপোক্ত আছে।
‘তুই খুশি হয়েছিস তো?’ হাঁপাতে-হাঁপাতেই ওকে জিগ্যেস করে কৌশিক।
‘খুব…’ আগমনীর গলাতেও উচ্ছ্বাসের ছাপ পড়ে। অপরাজিতা এসে দাঁড়িয়েছে ওর ঠিক পাশে। বান্ধবীর কাঁধে হাত রাখে সে।
‘আমি বলি কী, আর দেরি করা ঠিক হবে না। আজই গিয়ে খুঁজে বের করি, চল…’ কৌশিক পুকুর পাড় থেকে ফিরতি পথে পা বাড়ায়, ‘গাড়ি আছে যখন…’
‘কোথায় যাব? ধুর…’ আগমনী হাওয়ায় একবার হাত চালায়। তারপর আবার আগের মতো ফিরে তাকায় জলের দিকে। জলে বিশেষ ঢেউ নেই, তাও একটা কলকল আওয়াজ আসছে সেখান থেকে। হাওয়ায় ওর চুল উড়ে যায়। গায়ের চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে নেয় সে৷
‘যাবি না মানে? ওদের খুঁজে বের করবি না?’ অবাক চোখে মেয়েটার দিকে চায় কৌশিক। আগমনীর হঠাৎ হল কী? কেমন যেন নিরুত্তাপ নিস্পন্দ দেখাচ্ছে মেয়েটাকে। যেন নামগুলো খুঁজে বের করেই কাজ শেষ হয়ে গেছে। এরপর আর কোথাও যাওয়ার নেই।
‘তোর হল কী মণি? চাইছিসটা কী?’ অপরাজিতা অবাক হয়ে জিগ্যেস করে।
হাতের খামটা তুলে ধরে আগমনী, ‘এইটা। আর কিছু নয়…’
‘মানে ওদের সঙ্গে দেখা করবি না?’ অপুর মুখও হাঁ হয়ে যায়৷
‘তোদের কি মনে হয়, আমি ওদের সঙ্গে দেখা করার জন্য ওদের খোঁজ করছিলাম?’ আগমনীর গলায় মিহি হাসির রেশ লাগে। উড়ন্ত চুল গুটিয়ে এনে কানের পেছনে রাখে সে। আগের মতো শান্ত গলাতেই বলে, ‘আমার যারা বন্ধু ছিল তারা এই মানুষগুলো নয় অপু। পনেরো বছর পরে কেউ আর এক মানুষ থাকে না, সময় থাকতে দেয় না। ওদের খুঁজে বের করে কতগুলো অচেনা অপরিচিত মানুষকে খুঁজে পাব আমি…’
কৌশিক এগিয়ে যায় ওর দিকে। ওর কাঁধে আলগা ধাক্কা মারে একটা, ‘তাহলে তুই এদের নাম বের করলি কেন?’
আগমনী উত্তর দেয় না। তার বদলে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে জলের ধারে হাতে থাকা খামের কাগজটার উপর আর একবার হাত বুলিয়ে নেয়। তারপর সেটা সযত্নে ভাঁজ করতে থাকে৷
কৌশিক আর অপরাজিতা বুঝতে পারে কাগজ ভাঁজ করে একটা নৌকা বানাচ্ছে আগমনী। মুখে গুনগুন করে কী একটা যেন সুর গাইছে। শান্ত জলের উপর মৃদু হাওয়ায় ভেসে ছড়িয়ে যাচ্ছে সেই সুর। কৌশিক অবাক হয়ে চেয়ে থাকে ওর দিকে। কী চাইছে মেয়েটা?
নৌকা তৈরি করে আর একবার নামগুলোর উপর হাত রাখে আগমনী। বিড়বিড় করে কিছু বলে। মাটিতে হাত রেখে ঝুঁকে পড়ে আলতো হাতে নৌকাটাকে রেখে দেয় জলের উপর। তারপর হাত চালিয়ে মৃদু ঢেউতে ভাসিয়ে দেয় নৌকাটাকে।
‘যাও আমার স্বপ্নের ছেলেবেলা, ভাসিয়ে দিলাম তোমায়…’ আগমনীর গলার শব্দ শোনা যায় এতক্ষণে। কাগজের নৌকাটা জলে ভেসে টলমল করে এগোতে শুরু করে।
কৌশিক একমনে চেয়েছিল সেদিকে। উঠে দাঁড়িয়ে মুখ ফিরিয়ে ওর দিকে তাকায় আগমনী। তারপর এগিয়ে এসে একটা হাত রাখে ওর চোখে, ‘উঁহু, কাউকে ভাসিয়ে দিয়ে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে নেই।
ওর পিঠে দুটো হাত রাখে কৌশিক। ধীরে ধীরে বুকে টেনে নেয় আগমনীকে। ভেবেছিল ওর বুকের কাছটা ভিজে যাবে। কিন্তু ভেজে না৷ কৌশিক বুঝতে পারে আগমনী হাসছে৷ ছেলেবেলার ভুলে যাওয়া রঙিন দিনকে ভাসিয়ে দিয়ে আগমনী হাসছে। ঠিক যেমন মায়ের আঁচল ভাসিয়ে দিয়ে হেসেছে, বাবার বুকে শুয়ে নিশ্চিত ঘুম ভাসিয়ে দিয়ে হেসেছে, দিদার হাতে বোনা উলের জামা, প্রিয় বিড়ালের মাথার গুঁতো, রাফ খাতা, চুলের ফিতে, ফেলে আসা ভালোবাসার হাত ভাসিয়ে দিয়ে যেমন হেসেছে, তেমন করে জীবনের সব থেকে আদুরে দিন ভাসিয়ে দিয়ে আগমনী খিলখিল করে হাসছে…
নিস্পন্দ কয়েকটা মুহূর্ত কেটে যায়। অপরাজিতা এসে হাত রাখে ওর পিঠে। হাওয়ার বেগ বেড়ে ওঠে। দূর থেকে কারো হেঁটে আসার আওয়াজ পাওয়া যায়। সেদিকে চোখ যায় না ওদের।
‘আর একজনের কথা ভুলে গেলি?’ কৌশিক দুহাতে বুক থেকে আগমনীর মুখটা তুলে নিয়ে বলে।
‘কে?’ ঝিকমিক করে ওঠে আগমনীর চোখ।
‘নহর…ওকে ভাসিয়ে দিতে পারবি না?’
‘কেন?’ আগমনী অবাক হয়ে চায় ওর দিকে।
কৌশিকের মুখে একটা রহস্যময় হাসি খেলে যায়, ‘কারণ ও এখনও আসেনি তোর কাছে…ওকে পাঠানো হয়নি…’
কথাটার মানে বুঝতে পারে না আগমনী। তেমনই অবোধ চোখে চায়, ‘পাঠানো হয়নি মানে? কে পাঠাবে?’
‘আপনি…’ কথাটা কৌশিক বলেনি। বিপ্লব বসুরায় কখন যেন এসে দাঁড়িয়েছেন ওদের ঠিক পেছনে। মুখে আকর্ণ একটা হাসি খেলা করছে তার। হাতে ধরা চালের দানাগুলো পুকুরের দিকে ছুড়ে দেন তিনি, ‘ভাবলাম আপনাদের সঙ্গে দেখা করে যাই।
কৌশিক আর অপরাজিতা ফিরে তাকায় ওর দিকে। গায়ের জ্যাকেটটা খুলে ফেলেন বিপ্লববাবু। কৌশিক অবাক চোখে তাকিয়ে দেখে একটা মেরুন রঙের টি-শার্ট পরে আছে লোকটা। হেসে ওদের দিকে এগিয়ে আসেন, ‘দুপুরবেলা এসব পরে থাকা একটা হ্যাপা, কী বলেন মিস্টার সেনগুপ্ত?’
লোকটার হাবভাব কেমন সন্দেহজনক।
‘কে আপনি? কী চান?’ কৌশিক আক্রমণাত্মকভাবে ঘুরে তাকায় ওর দিকে।
বসুরায়ের মুখে একটা নরম হাসি খেলে যায়, ‘কেন, ভদ্রলোক বলল শুনলেন না? আমি কারো ক্ষতি করি না, কারো ভালো মন্দ বিচার ফিচারের দায় নেই আমার। যেমন চলছে তেমন চলতে দেওয়াই আমার কাজ। আমি কেবল…’ এক মুঠো চাল পুকুরের দিকে ছড়িয়ে দেন লোকটা, ‘যাতে সবকিছু নিয়মমতো চলে তার ব্যবস্থা করতে কাউকে কিছু ভুলিয়ে দিতে পারি।’
লোকটার মুখের হাসি আরও চওড়া হয়, ‘বাদ দিন ওসব। এই দেখুন আপনার সঙ্গে হ্যান্ডশেকটা ডিউ রয়ে গেছিল, কই দিন হাতটা…’
এতক্ষণ খেয়াল করেনি ওরা৷ কখন যেন একটা কাক ডাকতে শুরু করেছে পুকুরের আশেপাশে। অপরাজিতা বুঝতে পারে ওর হাত পায়ের উপর নিয়ন্ত্রণ নেই। আশেপাশের সমস্ত দৃশ্য একটু একটু করে গুলিয়ে যেতে শুরু করেছে ওদের চোখের সামনে।
কৌশিকের হাতটা নিজে থেকেই এগিয়ে যায় উলটো দিকে। তারপর বিপ্লব বসুরায়ের হাতের সঙ্গে ওর হাতটা জড়িয়ে যায়। পরমুহূর্তে মাথার ভেতর একটা অন্ধকার নেমে আসে। পায়ের তলাটা একবার দুলে উঠেই স্থির হয়ে যায়।
ঘোর কাটতে একটু টলে যায় কৌশিক। ঘুম ভাঙার মতো জেগে ওঠে ও। চারপাশ খেয়াল করে বুঝতে পারে একটা দিঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে ওরা। বোকার মতো আগমনীর দিকে তাকায়। ওর চোখেও হতবাক দৃষ্টি।
‘আমরা এখানে কী করছি?’ আগমনী অবাক গলায় জিগ্যেস করে, ‘এটা তো আমাদের বাড়ি বলে মনে হচ্ছে, এখানে কখন এলাম?’
পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা অপরাজিতার দিকে তাকায় ও। তার মুখেও কথা ফুটছে না। তিনজন মিলে ওদের বাড়ির পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু কেন? এসেছিলই বা কেন? আগমনীর মাথাটা গুলিয়ে ওঠে…
কৌশিক উত্তর দেয় না। ওর মাথাটাও ঠিকমতো কাজ করছে না। জায়গাটা অচেনা লাগছে৷ সদ্য দেখা স্বপ্নের মতো ধীরে ধীরে কিছু একটা ভুলে যাচ্ছে ও। গাছের কোটরে উধাও হওয়া কাঠবিড়ালির মতো স্মৃতির লেজের রেখাটুকু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মিলিয়ে যায় ওদের মাথা থেকে…
পাশেই পুকুরটার দিকে তাকিয়ে একটা জলে ভেজা চুপসে যাওয়া কাগজের নৌকো চোখে পড়ে ওদের৷ তিরতির করে কাঁপতে কাঁপতে টুপ করে জলের তলায় তলিয়ে যায় সেটা…
