তালদিঘিতে ভাসিয়ে দেব – ১৬
ষোড়শ অধ্যায়
‘মণি…মণি…শুনতে পাচ্ছিস?’
ডাকটা কোথা থেকে ভেসে আসছে আগমনী নিজেও বুঝতে পারে না। নহর ডাকছে কি? কিন্তু তা হয় কী করে? ও তো মারা গেছে।
গভীর রাতে ঘুম ভেঙে আগমনী বিছানার উপর উঠে বসে। চারদিকটা একবার ভালো করে দেখে নেয়। ডাকটা আসছে ছাদ থেকে। ছোটবেলায় লোডশেডিং হলে বাবা আর মা হাতপাখা নিয়ে ছাদে চলে যেত। তারপর ওখান থেকে এমন করেই ডাকত ওকে। আজকের গলাটাও চেনা লাগল যেন।
বাইরে পা বাড়িয়ে সিঁড়ি দিয়ে এক ছুটে ও ছাদে চলে আসে। নাহ্, ছাদেও তো কেউ নেই। অথচ স্পষ্ট শুনেছে কেউ ওকে ডাকছে। আশ্চর্য ব্যাপার তো!
দূরে উঁচু বাড়িগুলোর মাথায় তালগাছের পাতা নড়ে উঠছে৷
বাবা যে আগের মতো মাঝরাতে ছাদ থেকে ডাকতে পারে সেটাতে তেমন অবাক হয়নি আগমনী। তার চেয়ে বেশি অবাক লেগেছে বাবার ডাক শুনে ছাদে চলে এল বলে।
এই ছাদ থেকে ওর ছোটবেলার খেলার মাঠটা দেখা যায়৷ কালীপুজো গেছে কয়েকমাস আগে। ওই সময় পাড়ার ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে গিয়ে ওখানে বাজি পোড়ায়। আগমনী ছোটবেলায় একাই ছাদে বাজি পোড়াত। কখনও হাতে রংমশাল জ্বেলে ছাদের একদিক থেকে আর একদিক ছুটে যেত। আগুনের রঙিন ফুলঝুরি উড়ে পড়ত ছাদের মেঝেতে। তবে তুবড়ি জ্বালানোর সময় বাবার হাত ধরে থাকত। বাবা বলত তুবড়ি ভারি ডেঞ্জার জিনিস, যখন তখন ফেটে যেতে পারে। তখন ওদের বাড়ির পাশের ফুটপাথে জটা পাগলা বলে একটা খ্যাপা লোক শুয়ে থাকত। বাজি ফাটলেই সে চিৎকার করে এন্তার খিস্তি করত বাবাকে বাজির গন্ধে নাকি তার ঘুম হতো না৷
মাঝে মাঝে আগমনীর মনে হয় মানুষের জীবনও ওই তুবড়ির মতো। কেউ দু’চারটে ফুল্কি দিয়েই জ্বলে শেষ হয়ে যাবে, কেউ অনেকক্ষণ আলো দেবে, মিটারখানেক উঁচুতে উঠবে, সরসর করে আগুনের আওয়াজ হবে। কিন্তু সবাই শেষ অবধি ওই ভেঙে চেতরে পড়ে থাকা খোলটা। সবাই অবহেলায় ছাদে গড়াগড়ি খাবে।
আগমনীও কি দিনদিন জটা পাগলা হয়ে যাচ্ছে? বাজির গন্ধ, মানুষের জীবন পুড়ে শেষ হয়ে যাওয়ার গন্ধ ওর একদম সহ্য হয় না আজকাল। পালিয়ে যাবার জায়গাও পায় না। চারিদিকে কালীপুজো…কোথায় লুকাবে?
‘মণি…’ আবার পিছন ফিরে তাকায় আগমনী। এবার সত্যি মা এসে দাঁড়িয়েছে ওর পেছনে। কত রাত হবে এখন? দেড়টা না নিশ্চয়। মায়েরও মনে হয় মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেছে।
‘তুই এত রাতে ছাদে কী করছিস?’
কাঁধ ঝাঁকায় আগমনী, ‘কী জানি, মনে হল কেউ ডাকছে৷’
মা ধীর পায়ে ওর পাশে এগিয়ে আসেন। চোখ রগড়ে ঘুম মুছতে মুছতে বলেন, ‘তোর মনটা ভালো নেই, নারে?
‘তোমারও তো মন মাঝে মাঝে ভালো থাকে না। আমি আর কখন জানতে পারি, বলো?
আগমনী জানে মা ইচ্ছা করেই নহরের কথা আর জিগ্যেস করে না ওকে। বাবার কথাও জিগ্যেস করে না। এক এক করে আর কারো কথাই জিগ্যেস করা যাবে না ওকে।
‘সব সময় সবকিছু বলতে হয় না৷ এই যে তুই আমার সঙ্গে থাকিস, রাতে আমার পাশে ঘুমাস, এটাতেই আমার মন ভালো হয়ে যায়।’
‘আমি না থাকলে কে থাকবে?’ কঠিন শোনায় মেয়ের গলা। অমৃতা একটু চমকে যান। হেসে বলেন, ‘এই প্রশ্নটা তো আমি করব তোকে, তুই আমাকে করবি কেন?
‘কেন করব না? ‘
‘উঁহু, ছেলেমেয়েরা এই প্রশ্নটা বাবা-মাকে করতে পারে না৷’
আগমনীর মনে হয় দূরে আবার কালীপুজো শুরু হয়েছে। কারা যেন আবার রংমশাল হাতে মাঠময় ছুটে বেড়াচ্ছে। তার গন্ধ বয়ে আসছে এতদূর। ‘আমি আর তোমার সঙ্গে থাকব না মা৷’
‘থাকবি না মানে?’ অমৃতা অবাক হন।
‘জানি না, কয়েকটা কলেজ শর্টলিস্ট করেছি। চান্স পেলে হস্টেলের ব্যবস্থা হয়ে যাবে।’
তুই বাইরে পড়তে যেতে চাইলে আমি তোকে বাধা দেব না৷ কিন্তু আমার সঙ্গে থাকবি না কেন?’
আগমনী কথাটার উত্তর দেয় না। বাজির গন্ধ কেন ভালো লাগে না সেটা যারা বাজি পোড়ায় তাদের কী করে বোঝানো যায়? ভয়ের কি কোনও মাপকাঠি হয়? আশঙ্কায় পালিয়ে যেতে চাওয়া মানুষদের কাপুরুষত্বের ওজন আছে কোনও?
‘আমার জন্য তোমার কষ্ট হবে মা?’
হুট করেই মণি ঘুরে তাকায় মায়ের দিকে। চোখটা ছলছল করে ওঠে একবার।
অমৃতা হাসেন, ‘এ দুনিয়ায় সব সম্পর্কের একটা মজা আছে জানিস। তুমি যেই হও না কেন, যত বড় মানুষই হও না কেন, সব সম্পর্কের দুটো দিকে একদিন না একদিন তোমাকে বসতেই হবে। দুটো চরিত্রের মেক আপ মুখে লাগিয়ে অভিনয় করতে হবে। শুধু মাঝখানে কিছুটা সময় থাকবে। যদি একসঙ্গে দু’দিকে বসা যেত তাহলে পৃথিবীতে কেউ কাউকে ছেড়ে চলে যেত না।’
‘তোমাকে আমি কোনওদিন দুঃখী দেখতে চাইনি মা৷’ আগমনী মায়ের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
‘আর আমি তোকে কোনওদিন দুঃখী মা দিতে চাইনি মণি…’ মেয়ের মাথায় হাত রেখে দূরে ঘুমন্ত মফস্বলের দিকে আঙুল দেখিয়ে অমৃতা বললেন, ‘ভালোবাসা যেমনই হোক, মা-মেয়ে, দাদা-বোন, স্বামী-স্ত্রী যাই হোক, ভালোবাসা শুধু আর একটা মানুষকে যতটা সম্ভব কম দুঃখ দিয়ে একসঙ্গে থাকার খেলা। আমি তোর আর নিজের জীবনটা যতটা কম সম্ভব দুঃখ রেখে কাটিয়ে এসেছি এতদিন…’
দু’হাতে মাকে জড়িয়ে ধরে মায়ের বুকে মাথা রাখে আগমনী। ওর চোখ জলে ভরে আসে।
‘আমি তোমার সঙ্গে আর থাকব না মা…’ অমৃতার শাড়ির আঁচলে মুখ ঢেকে যায় মেয়েটার। গলা বুজে আসে।
অমৃতা হাসেন, ‘মা বিড়াল বড় হলে বাচ্চাকে ছেড়ে দেয়। পরে কোথাও দেখা হলে আর চিনতেই পারে না। আমিও তেমন করে নাহয় চিনতে পারব না তোকে, কেমন?’
আগমনীর কানে কথাটা গেছে কিনা বোঝা যায় না। আগের কথাটাই আবার ফিরে আসে তার মুখে, ‘আমি তোমার সঙ্গে আর থাকব না মা।…’
অমৃতা বুঝতে পারেন কথাটা মুখস্ত করে ফেলতে চাইছে আগমনী। শব্দগুলোর যন্ত্রণা ভুলতে চাইছে বারবার উচ্চারণ করে। ও জানে এর থেকে ভালো যন্ত্রণা ভোলার জায়গা আর নেই কোথাও। ভাঙাচোরা জীবনের যেটুকু সম্বল হাতের মুঠোয় আগলে রেখেছিল মেয়েটা সেটুকু ছেড়ে দিতে গিয়ে মুঠো বন্ধ করে ফেলছে বারবার।
মেয়ের সামনে হাঁটু মুড়ে বসে পড়েন অমৃতা, দু’গালে হাত রাখেন ধীরে, ‘ওই কথাটা মুখস্ত হয়ে গেলে সত্যি কথাটা বলবি একবার? মুখস্ত করার জন্য না। আর কোনওদিন বলতে পারবি না বলে…’
‘আমার তুমি ছাড়া আর কেউ নেই মা…।’
হুট করেই মায়ের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে কেঁদে ফেলে আগমনী। বারুদের, বাজির গন্ধটা বেড়ে ওঠে ভয়ানক। আগমনীর মনে হয় ওর নাক বন্ধ হয়ে আসবে। মরে যাওয়ার আগে খড়কুটো আঁকড়ে ধরার মতো মায়ের শরীর আঁকড়ে ধরে ও।
মাকে জড়িয়ে ধরলে মানুষের শরীর থেকে মৃত্যুর গন্ধ মুছে যায়। তবে পৃথিবীর অন্য সব সম্পর্কের মতো মা আর মৃত্যু নিজেদের মধ্যেও জায়গা বদলে নেয় ক্রমাগত। লড়তে লড়তে একসময় একে অপরকে জড়িয়ে ধরে…
ক্লাস টুয়েলভের রেজাল্ট বেরোনোর পর যখন বাবা প্রথম বলল, কলেজের খোঁজ খবর করতে তখন প্রথম একটা ব্যাপার বুঝতে পেরেছিল সাম্য। ছোটবেলার দিনগুলো রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া আচারওয়ালার গাড়ির মতো। সে ভরদুপুরে অনেকক্ষণ ধরে গাড়ি ঠেলতে ঠেলতে চিৎকার করে, ‘আমের আচার…কুলের আচার…চালতার আচার…’
গৃহস্থ তখন সবে থালায় দুপুরের ভাত বেড়েছে। খাওয়া থেকে উঠে আচারের পেছনে ছোটার ইচ্ছা থাকে না তার। আচারওয়ালাও খাঁচার মতো কাচের গাড়ি নিয়ে হেঁটে চলে যায় তপ্ত রাস্তা দিয়ে৷
খাওয়া শেষ করেই গৃহস্থের মনে হয় খাওয়া-দাওয়ার পর খানিক চালতার আচার হলে মন্দ হত না। সত্যি তো একটু আগেই এক আচারওয়ালা হেঁকে গেছে বাড়ির পাশ দিয়ে। সে ওমনি ভিতর ঘর থেকে বারান্দায় ছুট লাগায়। তারস্বরে চিৎকার করে ডাকতে থাকে, ‘আচার, ও আচার, শুনছ? ‘
কিন্তু ততক্ষণে আচারওয়ালা তার কাচের গাড়ি নিয়ে বহুদূর হেঁটে চলে গেছে। গৃহস্থের আর চালতার আচার খাওয়া হয় না। অগত্যা মন খারাপ করে সে পাশবালিশ জড়িয়ে ভাতঘুম দেয়।
টুয়েলভ পাস করার পর সাম্যর মনে হয় ওর ছোটবেলাটাও চালতার আচারের গাড়ি করে অনেক দূর হেঁটে চলে যাচ্ছে। দূর থেকে তার ডাক ভেসে আসছে এখনও, কিন্তু শত ডাকাডাকি করেও তাকে আর ফিরিয়ে আনতে পারবে না ও।
এই মুহূর্তে আগমনীর সঙ্গে আর ওদের তিনজনের তেমন যোগাযোগ নেই। ওর এইচএসের রেজাল্ট কেমন হয়েছে সেটাও ওরা জানে না৷ রেজাল্ট বেরোনোর পর ওরা ঠিক করেছিল, তিনজন মিলে একবার নহরের কবরটা দেখে আসবে।
এর আগে কবরস্থান দেখেনি ওরা। যেমন সাম্যর এখনও পাহাড় দেখা হয়নি, খুঁটির এখনও জিটিএ ফোরের সিডি কেনা হয়নি, তেমনি কবরস্থানও কেবল ফেলুদার গল্পে আর সিনেমায় দেখেছে ওরা। সেখানে গেলেই আজব সব ঘটনা ঘটে, কেউ না কেউ পেছন পেছন আসে। গাছের মগডাল থেকে কারা যেন হাঁক দিয়ে ঘাড়ের কাছে স্পর্শ বুলিয়ে যায়। এসব গল্পের বইতে পড়েছিল বেদান্ত। আসলে কবরস্থানে এসব কিছুই হয় না। বড় হলে মৃত্যুও নিজের রূপকথা গুটিয়ে নেয়।
কবরস্থানের ভিতরে এসে খানিক খোঁজাখুঁজি করতেই নহরের সমাধিটা খুঁজে পেল ওরা। মাটির উপরে খানিকটা জায়গা মাটি দিয়ে ঢিপি মতো করা আছে। তার মাথার দিকে একটা সমাধি ফলক বসানো। সেখানে বড় করে নহরের জন্ম তারিখ মৃত্যুদিন আর নাম লেখা আছে। তারই একদিকে একটু জায়গা খুঁজে নিয়ে বসে পড়ে ওরা তিনজন।
জায়গাটা অসম্ভব রকমের শান্ত আর নিস্তব্ধ। গোটা কবরস্থান জুড়ে অচেনা গাছপালার সার। তার ফাঁক দিয়ে ছেঁড়া ছেঁড়া রোদ এসে পড়েছে। মাটির গন্ধ চারদিকে। ঝিরঝির করে একটা ঝিঁঝি মাটির মধ্যে লুকিয়ে একটানা ডেকে চলেছে। বেদান্তর মনে হয় যেন নহরকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে ওই ঝিঁঝিটাকে কেউ রেখে গেছে। ব্যাপারটা ভালো লাগে না ওর। নহর যদি থাকত কতরকম কথা বলতে পারত, কত নতুন নতুন ঘটনা ঘটত, ওর উপর রাগ করা যেত, খিল্লি করা যেত, খোলা মাঠের উপর অকারণ দৌড়াদৌড়ি করা যেত। তার বদলে এই ঝিঁঝিটা কেবল তিরতির করে শুধু ডাকতেই পারে।
সমাধির উপর থেকে একটা মাটির ঢেলা নিয়ে হাওয়ায় ছুড়ে দেয় ব্যাদা৷
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে ওর বুক থেকে, ‘মণির কী খবর রে?’ সাম্য ঘাড় নাড়ে, ‘ফোন করলে আর উত্তর দেয় না। কী হয়েছে জানি না। আমি একবার দুবার ফোন করেছিলাম, ধরেনি।’
‘আর তোর মেঘা সরকার?’
মাটির দিকে চেয়েই ঠোঁট ওলটায় সাম্য, ‘মুসৌরি গিয়ে থেকে কোনও খবর নেই। আজকাল তো লোকে অর্কুট আর ইউজ করছে না তেমন। মনে হয় বন্ধ হয়ে যাবে। ফেসবুক ফেসবুক করে মাতামাতি করছে সব।’
‘সেটা কী?’
‘ওই ওরকমই, কেমন যেন সাদাটে সাদাটে। আমি একবার খুলেছিলাম, ভালো লাগে না শালা।’ মাটির উপর থেকে ঘাস ছিঁড়ে নেয় সাম্য, ‘জয়েন্টের র্যাঙ্ক ভালো এসেছে। বাবা বলল, পয়সা খরচ করে কোনও একটা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হয়ে যেতে।’
‘তুই ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বি?’
‘হ্যাঁ, স্কোপ বেশি। তাছাড়া সল্টলেকের আশেপাশে অনেকগুলো কলেজ আছে…তবে সেমেস্টার ফি অনেক। সিগারেট ফিগারেট ছেড়ে দিতে হবে ভাই।’
‘আর মেঘার কী হবে?’
সাম্য কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে, একসময় মুখ তুলে বলে, ‘কলেজে উঠলে একটা ফোন কিনে দেবে বলেছে বাবা৷ ওখান থেকে ওর সঙ্গে যোগাযোগ করে নেব। ফোন নম্বর তো নেই আমার কাছে। তোর মৌসুমির কী হল?’
মাথা নাড়ে খুঁটি, ‘ও কোন কলেজে ভর্তি হবে জানি না। মাঝে দু’একদিন মেসেজে কথা হয়েছিল, কাটিয়ে দিয়েছি।’
বেদান্ত কোথায় যেন শুনেছিল মানুষকে নাকি ছ’ফুট মাটির তলায় কবর দেওয়া হয়। সাম্য যে হারে লম্বা হচ্ছে তাতে ও একদিন না একদিন ঠিক ছ’ফুট হয়ে যাবে।
চারপাশটা একবার ভালো করে দেখে নেয় ও। বেশিরভাগ কবরের উপরেই সমাধিফলক নেই। একসময় হয়তো ছিল, তারপর অযত্নে ভেঙে কোথায় হারিয়ে গেছে। মানুষ বলতে যে শরীরটা আমরা বুঝি, রক্ত মাংসের ডেলাকে ছুঁয়ে দেখি তা ক্ষয়ে যেতে শুরু করলেই তার উপর জমাট বাঁধা অনুভূতি মুছতে শুরু করে। দোর্দণ্ডপ্রতাপ অনুভূতিরা তখন কেবল মাটি হয়ে অন্য মাটির সঙ্গে মিশে যায়।
পকেট থেকে একটা ছবি বের করে খুঁটি। ওদের পাঁচজনের ছবি। সাম্যর ক্যামেরাতে তোলা। সবার কাছেই এক কপি করে আছে, কেবল ব্যদা নিজেরটা কাউকে দেখাতে চায় না৷ কীসব নাকি করে রেখেছে ছবিতে। সমস্ত ব্যাপারটা ওরা বোঝেনি। কেবল ওই ছবির উপর আঙুল ফুটো করে এক ফোঁটা রক্ত ফেলতে হয়েছে ওদের। তবে কেউ আপত্তি করেনি। অজ্ঞান ব্যাঙের পেটে ছুরি চালাতে গিয়ে হাত কাঁপার দিন পেরিয়ে এসেছে ওরা।
ছবিটা সমাধির উপরে রেখে দেয় খুঁটি। বিড়বিড় করে বলে, ‘আমাদের পাঁচজনের আর একসঙ্গে হওয়া হবে না, না রে?’
‘চারজনেরই হওয়া হবে কিনা জানি না৷ স্কুল লাইফ শেষ ভাই। যে যার নিজের মতো ছড়িয়ে যাব।’
ফটোতে হাসিখুশি পাঁচটা মুখের দিকে চেয়ে ছিল সাম্য। একে অপরের কাঁধে হাত রাখা। নহরের স্পর্শের মধ্যে একটা উষ্ণতা ছিল। দ্রুত মন ভালো হয়ে যেত সকলের।
‘আমার কী মনে হত জানিস?’ ব্যাদা ছবির দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে বলে।
‘কী?’
‘নহর আর জ্যোতি বসু কোনওদিন মরবে না। দুজনেই শালা মৃত্যুর একেবারে দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু মুখ দেখে মনেই হত না দুনিয়ায় মৃত্যু ফিত্যু বলে কিছু আছে৷ অথচ দেখ, দুজনেই কেমন পট করে একই বছর মরে গেল।’
উঁচু হয়ে থাকা মাটির উপর ধীরে ধীরে হাত বোলাচ্ছিল সাম্য, একসময় হঠাৎ করেই মুখ তুলে বলে, ‘আমার মা বলে কবরের পাশে গিয়ে মানুষকে ডাকলে সে শুনতে পায়। তবে সাড়া দিতে পারে না…’
‘বলে দেখ, যদি শুনতে পায়।’
সাম্য শুকনো হাসি হাসে। তারপর নিচু হয়ে মুখ নিয়ে যায় মাটির উঁচু হয়ে থাকা স্তূপটার উপরে, ‘ইনা, শুনছিস?’
ছ’ফুট মাটির তলা থেকে কোনও শব্দ আসে না।
সাম্য মুখ তোলে, ‘কিন্তু কী বলব?’
‘যা বলতে ইচ্ছা করছে বলে ফেল।’ ব্যাদা বলে।
সাম্য মনে মনে কী যেন ভেবে নেয়। একবার মাথা চুলকায়, তারপর ধীরে ধীরে বলে, ‘তোর কুকুরটাকে আমি এই ক’দিন খেতে দিয়েছি ভাই। কিন্তু আর দিতে পারব না৷ স্কুল ছেড়ে দিচ্ছি তো, হয়তো অন্য কেউ দেবে। তুই চিন্তা করিস না।’
সাম্য মুখ তুলে সরে এসে খুঁটিকে ইশারা করে। সে আগে থেকেই ভেবে রেখেছিল, এবার সে মুখটা কবরের কাছে নিয়ে আসে ধীরে ধীরে, ‘তুই পেত্নি হয়েছিস না শাকচুন্নি কে জানে, কিন্তু যদি গাছের দরকার হয় আমাদের বাড়ির পাশেই একটা শ্যাওড়া গাছ আছে…’
‘ওখান থেকে জানলা দিয়ে তোকে জাঙিয়া পাল্টাতে দেখা যায়, প্লিজ, অন্য কোথাও ব্যবস্থা কর!’
কটমট করে ব্যাদার দিকে তাকায় খুঁটি, আবার কবরের দিকে মুখ করে, ‘আর কিছু করিস না করিস, এই হারামজাদাটার ঘাড় মটকে দে।’
‘সদ্য মেয়েটা মারা গেছে, তাকেও ঘাড় মটকানোর সুপারি দিচ্ছিস। নির্লজ্জ!’ ব্যাদা ধমকে ওঠে।
‘বেশি বকবক করলে তোর সুপারি মটকে দেওয়ারও সুপারি দেব শালা৷ চুপ কর…’
ব্যাদা আর কথা না বাড়িয়ে চুপ করে যায়। খুঁটি জামার হাতায় মুখ মুছে আবার মাটির কাছে ঠোঁট নামিয়ে আনে, ‘শোন, তোর জন্য খুব মন কেমন করে…’
ঝিঁঝিটা এখনও আগের মতোই ডেকে চলেছে৷ যেন গোটা পরিবেশটাকে একার দায়িত্বে সে নিস্তব্ধ হতে দিচ্ছে না।
‘স্কুলের বেঞ্চে বসতে গেলে এখনও মনে হয় তুই দরজা দিয়ে ঢুকে পাশে এসে বসবি, স্কেল আনতে ভুলে যাবি, তারপর হেসে আমার দিকে চেয়ে হাত বাড়িয়ে বলবি, ‘তোর স্কেলটা দে না খুঁটি…’ তোকে ছাড়া ভালো লাগছে না…’
খুঁটি একটু সরে বসতে সাম্য আবার মুখটা কবরের কাছে নিয়ে যায়, ‘আচ্ছা গেছিস ঠিক আছে, তবে মাটির তলায় ভালো মেয়ে থাকলে খোঁজ দিস তো। আমাদের ব্যাদা তো উপরে কিছু সুবিধা করতে পারল না… ‘
‘এই শালা…’ বেদান্ত দুঃখ দুঃখ মুখ করে বসেছিল, এবার সে খেপে ওঠে, ‘মাটির তলায় তোর শ্বশুর থাকে বে, চাষিরা মাটি থেকে যে আলু তুলে আনে সেটা তোর শ্বশুরের পচা আলু…’
খুঁটি হাত তোলে, ‘আহ্, সাম্য চুপ কর…’
ব্যাদা ভর্ৎসনা করে, ‘কবরস্থানে এসেও খিল্লি করছে শুয়োরটা।’
সাম্য মুখ বাঁকায়, ‘হুঁ, লাইব্রেরিতে সেক্স করা লোকের ব্যাটা আবার কবরস্থান নিয়ে জ্ঞান দিতে এসেছে।’
এবার ব্যাদা তেড়ে যায় ওর দিকে, ‘শালা আমার বাপ লাইব্রেরিতে সেক্স করেছে কে বলেছে তোকে? নিজের চোখে দেখেছিস?’
‘ছ্যাঃ…’ সাম্য ঘেন্নায় শিউরে ওঠে, ‘তোর বাপকে সেক্স করতে দেখার আগে হাতির শুঁড় কড়িকাঠে ঝুলিয়ে গলায় দড়ি দেব।’
রাগ সপ্তমে ওঠে ব্যাদার। হাতের কাছে একটা মাটির ঢেলা খুঁজে পায় সে, সেটা তুলে নিয়েই ছুড়ে দেয় সাম্যর দিকে। ঢেলাটা ওর গায়ে লেগে ধুলো হয়ে যায়। সাম্য সাবধান করে, ‘দেখ, ওটা নহরের মাটি। দিয়া সেনের দাদার ভয়ে তোর খসে যাওয়া বীরবল নয়, যে একে ওকে ছুড়ে মারবি!’
খুঁটি মাটি ছেড়ে উঠে পড়ে৷ হাত বাড়িয়ে ব্যাদার হাতটা ধরে ফেলে দাঁত কিড়মিড় করে, ‘আহ্, তখন থেকে বলেছি এটা একটা শান্তির জায়গা…’ নরম গলায় বাকি কথাটা খুঁটি শেষ করে, ‘শান্তির ছেলের নয়…’
ব্যাদা চুপ করে যাচ্ছিল। দুম করে তার মুখটা ঘুরে যায় খুঁটির দিকে। প্রচণ্ড রাগে মুখ লাল হয়ে যায়, ওর উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পড়তে বলে, ‘তুই আমায় নোংরা কথা বললি খুঁটির বাচ্চা!’
সাম্য উৎসাহে চিৎকার করে ওঠে, ‘বেশ করেছে বলেছে। ওর মুখে তো তোর বাপ গল্পের বইয়ের পাতা গুঁজে দেয়নি যে চুপ করে থাকবে। দু’হাতে আবার নহরের কবর থেকে মাটির ঢেলা তুলে দুজনের দিকে ছুড়ে দেওয়ার চেষ্টা করে বেদান্ত। কিন্তু দুজনকে একসঙ্গে টিপ করায় লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। সাম্য ছুটে কিছুদূর পালিয়ে যায়। ব্যাদা ওকে তাড়া করে।
কবরস্থানের উপর কিছুক্ষণ একটা ছোটখাটো ঝড় বয়ে যায়। মাটির ঢেলা এদিক থেকে ওদিক উড়ে যায়। কখনও গাছের ডালপালা ঝরে পড়ে। যেসব কবরের উপরে কেউ যত্নে ফুল রেখে গেছিল সেগুলো পায়ের তলায় থেঁতো হয়ে যায়।
ফাঁকা কবরস্থান ওদের চিৎকার চেঁচামিচিতে ভরে ওঠে। গাছের ডাল বেয়ে দুপুরের ভাতঘুম সেরে বেরিয়ে আসা কাঠবিড়ালি কাণ্ড দেখে সুড়সুড় করে আবার গর্তে ঢুকে যায়।
ধুলো কাদা মেখে ক্লান্ত হয়ে আবার যখন নহরের সমাধির কাছে ফিরে আসে ওরা তখন কারো জামাকাপড়ই আর আস্ত নেই। সাম্যর কানের পাশে গাছের পাতা ঘামে লেপ্টে আছে। বুকের কাছে একটা বোতাম ছেঁড়া। খুঁটির মুখময় ব্যাদার নখের দাগ। বেদান্তর জামার মাঝ বরাবর কাদা লেপে দিয়েছে কেউ। হাতের বেশ কয়েক জায়গায় ছড়ে গেছে।
তিনজনে ক্লান্ত হয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে আবার আগের জায়গায় এসে বসে পড়ে। খানিকক্ষণ সেইভাবে হাঁপানোর পর ওদের শরীর ঠান্ডা হয়ে আসে। ওরা জামার হাতায় মুখের ঘাম মুছে নেয়।
ব্যাদা হাত বাড়িয়ে নহরের সমাধির মাটিতে হাত বুলায়, বুকের দমটা চেপে জামার ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে বলে, ‘ধুর শালা, তোদের ছাড়া আর ভালো লাগছে না ভাই।’
‘আমারও…’ সাম্য সামনে ঝুঁকে পড়ে বলে৷
‘পাঁচজনের গ্রুপ ছিল, তার মধ্যে দুজন চলে গেলে আর কী থাকে বল তো?’ খুঁটির স্বর কাতর শোনায়।
বেশ কিছুক্ষণ সেভাবেই বসে থাকে ওরা। সূর্যের আলো আগের থেকে বেড়ে উঠেছে এখন। কোথা থেকে যেন হালকা স্বরে আজানের শব্দ ভেসে আসছে। প্রিয় বন্ধুর সমাধির পাশে বসে ছোটবেলার শেষ রেলগাড়ির কুঝিকঝিক শব্দ শুনতে পায় ওরা। ধীরে ধীরে মিলিয়ে আসছে আওয়াজটা। এক জীবনের মতো…চিরকালের মতো…
‘আমরা সবসময় বন্ধু থেকে যাব নহর…ঠিক আছে?’ সাম্য মুখ নামিয়ে বলে।
ব্যাদা হাত বাড়িয়ে পিঠের ব্যাগটা টেনে আনে। ওর এমপিথ্রি প্লেয়ারটা বার করে নহরের সমাধির উপরে রেখে চালিয়ে দেয়। আস্তে আস্তে একটা গান চলতে শুরু করে তাতে। বহুদিন আগের এক বিকেলের মতো নহরের পাশেই শুয়ে পড়ে ওরা তিনজন। তারপর মাথার নিচে হাত রেখে ছেঁড়া ছেঁড়া আকাশের দিকে চেয়ে এক মনে শুনতে থাকে সেই গান…
বুড়ো মাঝির নৌকায়
বসে সারাটা দুপুর
যুবরাজের ঘোড়া
আর রাজকন্যার নুপুর।।
চলে গেল স্রোতে ভেসে
জানি না কোন দূর দেশে…
সাম্য, খুঁটি আর বেদান্ত বুঝতে পারে ওদের শরীরের থেকে ঠিক ছ’ফুট নিচে ঠিক ওদেরই মতো একটা সতেরো বছরের মেয়ে শুধু ঘুমিয়ে নেই, ওদের শৈশব আর কৈশোরকেও কেউ মেয়েটার সঙ্গে মাটির তলায় সযত্নে শুইয়ে দিয়ে গেছে। মেয়েটার মতো তারও কিছুদিন রক্তমাংসের শরীরটা থাকবে। তারপর ক্ষইতে ক্ষইতে শুধু হাড় পড়ে থাকবে। তারপর সেটাও তলিয়ে যাবে কালের অতলে।
নিজেদের শৈশবের সমাধির উপরে চিত্ হয়ে শুয়ে ওরা আকাশের দিকে চেয়ে থাকে শূন্য দৃষ্টিতে….
