তালদিঘিতে ভাসিয়ে দেব – ১৭
সপ্তদশ অধ্যায়
সিটি স্ক্যানের ক্রশ সেকশন রিপোর্টটা টেবিলের উপর ফেলে মাথা তুললেন ডঃ বিশ্বাস। এই পেশায় নয় নয় করে চল্লিশ বছর কাটতে চলল। তাও বাপ মায়ের সামনে মেয়ের মৃত্যু পরোয়ানা ঘোষণা করতে এখনও গলা বসে যায় তার। মাথার উপর ঝুলন্ত বিপজ্জনক পাথরের মতো ঝুলে থাকা এসিটা ঘরের তাপমাত্রাকে অকারণে অতিরিক্ত নামিয়ে এনেছে৷ এর থেকে আগের মতো পাখা থাকলে সুবিধা হত। গলার আওয়াজ এতটা পরিষ্কার শোনা যেত না। একবার ঢোঁক গিললেন ডাক্তার বিশ্বাস।
‘দেখুন আপনাদের মিথ্যে বলে সান্ত্বনা দেওয়া আমার কাজ নয়। আপনাদের মেয়ে ঠিক নেই মিস্টার সেনগুপ্ত। ইটস আউট অফ আওয়ার হ্যান্ড।’
ডাক্তার বিশ্বাসের সামনে বসে থাকা বছর পঞ্চাশেকের লোকটার শরীর ঝুঁকে এসেছে। মুখভর্তি কাঁচাপাকা দাড়ির জঞ্জাল। চোখদুটো চামচ দিয়ে উপড়ে নিয়েছে যেন কেউ। সেই অন্ধকার গর্ত থেকে বুঝি দুটো ইঁদুর চেয়ে আছে৷ একবার দেখলেই ভয় লেগে যায়৷
‘এসব আমরা আগেও শুনেছি ডাক্তারবাবু। আমি জাস্ট জানতে চাই আপনারা এতটা শিওর কী করে হচ্ছেন?’ লোকটার মিনমিনে গলার স্বর শোনা যায়।
‘এক্সপেরিয়েন্স।’ ডাক্তার বিশ্বাস জোর দিয়ে বলেন, ‘আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে, এসব কেসে পেশেন্ট হার্ডলি দু’বছর সারভাইভ করে। তার কম বই বেশি নয়। দেখুন, আপনাদের মনের ভেতর কী চলছে আমি বুঝতে পারছি…একটা পনেরো বছরের মিষ্টি মেয়ে এইভাবে…’
সামনের লোকটা উত্তর দেয় না। গলকণ্ঠটা ওঠানামা করে তার। রুমাল বের করে মুখটা মুছে নেয়। ডাক্তার বিশ্বাসের মাথার ঠিক পাশেই দেওয়ালে গাঁথা আছে একটা ডিজিটাল ক্যালেন্ডার। তাতে আজকের তারিখটা দেখা যাচ্ছে। তার ঠিক পাশেই ডিজিটাল ঘড়ি। সে ঘড়ি চলার সময় টিকটিক আওয়াজ হয় না। নৃশংস খুনির মতো নিঃশব্দে এগিয়ে চলে।
‘ভালো কথা, আপনার স্ত্রী কেমন আছেন?’ জিগ্যেস করলেন ডাক্তার বিশ্বাস।
‘ভালো না। অসুস্থ হয়ে পড়ছে মাঝে মাঝে। ভুল বকছে। মাথার সমস্যাও হচ্ছে কখনও কখনও।’
‘মাথার সমস্যা বলতে?’
‘ডিলিউশনাল। হ্যালুসিনেট করছে কন্টিনিউয়াসলি। কতবার বোঝালাম তুমি এরকম করলে মেয়েটার জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। কিন্তু…’
কথা শেষ না করেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে লোকটা। ডাক্তার বিশ্বাসের খানিকটা মায়াই লাগে। অসুস্থ মেয়েটাকে উনি নিজেও দেখেছেন কয়েকবার। একমাথা কোঁকড়া চুল, ভরাট কৌতূহলী চোখ। কথা বার্তায় বুদ্ধির ছাপ, এদিকে বয়সেই মাথার ভিতর মারণ রোগ বাসা বেঁধেছে৷
‘বাড়ি গিয়ে আগে মিসেসকে সামলান মিস্টার সেনগুপ্ত। আপনার মেয়ের এখন সবার আগে তার মাকে দরকার। সেটা না পেলে…’
কাঁধ ঝুঁকে পড়া লোকটার মুখে করুণ হাসি খেলে। ও কাজটা আজ তিরিশ বছর ধরে করে আসছে ও, সামলানো। এখন আর আলাদা করে এটাকে কাজ বলে মনে হয় না।
কথা না বাড়িয়ে উঠে পড়ে কৌশিক সেনগুপ্ত। ডাক্তার বিশ্বাসের চেম্বার ছেড়ে বেরিয়ে আসে সে।
গত কয়েকমাস ধরে নিজের স্ত্রীকে আমূল বদলে যেতে দেখেছে কৌশিক। হাসিখুশি প্রাণবন্ত মেয়েটাকে রাতারাতি বুড়িয়ে যেতে দেখেছে। আগমনীর চোখের দিকে আর তাকানো যায় না। সারারাত জেগে থাকে। এর মধ্যে দুবার সুইসাইড অ্যাটেম্পটও করেছে। কৌশিক কোনওরকমে সামলেছে।
বিয়ের সতেরো বছর হয়ে গেল ওদের। দু’বছরের মাথায় ইনা আগমনীর গর্ভে আসে। মেয়েটা ছোট থেকেই মায়ের বেশি ন্যাওটা। আগমনীও প্রেগনেন্সির পর থেকে আর অফিস কাছারি করতে চায়নি। কৌশিক একরকম জবরদস্তি করেছিল, কিন্তু লাভ হয়নি তাতে। সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত মেয়েকে নিয়েই মেতে থাকত আগমনী। এমনকী প্রথম কয়েক বছর কৌশিকের সঙ্গেও তেমন প্রাণ খুলে কথাবার্তা বলত না৷
ইনা বড় হতে কৌশিকের চাকরি বদলায়। আগের ফ্ল্যাট ছেড়ে নতুন ফ্ল্যাটে উঠে আসে। মা মেয়েতে মিলে বারান্দায় বাগান করে। একসঙ্গে কার্টুন দেখে, বিকেলে পার্কে গিয়ে গেম খেলে। রাতে আগমনী মেয়ের কাছেই ঘুমায়। ইনার মাকে ছাড়া সহজে ঘুম আসতে চায় না৷
মাসখানেক আগে হঠাৎ অসহ্য মাথাব্যথা হওয়ায় মেয়েকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায় কৌশিক। তিনি কিছু একটা সন্দেহ করেই সিটি স্ক্যান করতে বলেন। তার রিপোর্ট আসতে দেখা যায় মেয়েটার ব্রেনের পিনিয়াল গ্ল্যান্ডের মধ্যে একটা ছোট টিউমার গজিয়ে উঠেছে। ডাক্তার আগেই বলেছিলেন ভালো কিছু আশা করা বৃথা। কৌশিক আগে এসব কথা আগমনীকে জানায়নি।
কিন্তু এক ডাক্তার থেকে আর এক ডাক্তার, সেখান থেকে বিস্তর পয়সা খরচ করে বিদেশে চিকিৎসা। কোনও কিছুতেই লাভ হয়নি। কৌশিক জানে লাভ আর কিছু হওয়ারও নয়৷
অপরাজিতা একদিন বলেছিল, ‘দেখ, ডাক্তারদের যতদূর করার করবে। কিন্তু আপাতত যতদিন মেয়েটা আছে ওকে ভালো রাখতে হবে তোদের। সব থেকে ভালো সময়টা উপহার দিতে হবে। তোরা আর কীই বা করতে পারিস, বল?’
কিন্তু কৌশিক অপরাজিতাকে বোঝাতে পারেনি মৃত্যুপথযাত্রী মেয়ের বাবামার পক্ষে ভালো সময় উপহার দেওয়া সহজ কথা নয়। তাদের নিজের ঝুলিতেই ভালো সময় শেষ হয়ে গেছে। নিজের কাছে না থাকা জিনিস অন্য কাউকে দিতে গেলে যে অভিনয়টা করতে হয় সেটা ওদের স্বামী-স্ত্রী কেউই শেখেনি কোনওদিন।
তাও স্ত্রীকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল কৌশিক। লাভ হয়নি তাতে। ও লক্ষ করেছে আগমনী দিনদিন কেমন যেন উদাসীন হয়ে পড়ছে মেয়ের ব্যাপারে। সেভাবে আর কথা বলে না ইনার সঙ্গে। কাছে গিয়ে বসে না অবধি। এই আগমনীকে চেনে কৌশিক। বহু আগে থেকে চেনে। ও জানে, আগমনীর ভিতরের একটা ভীতু মানুষ ওকে মেয়ের থেকে দূরে নিয়ে চলে যাচ্ছে ক্রমাগত। যত দিন যাবে মেয়েটা ভালোবাসার বদলে শুধু অবহেলা পাবে…
পার্কিং-এ এসে কৌশিক স্টার্ট দেয় গাড়িতে। বাড়িতে ওর বউ মেয়ে একা আছে। আগমনীর শরীর মনের যা অবস্থা, ওকে একা রেখে আসা কোনওভাবেই সুরক্ষিত নয়। বাড়ির উদ্দেশ্যে জোরে গাড়ি ছুটিয়ে দেয় কৌশিক….
সোফায় বসে টুডি কার্টুন স্ক্রিন করছিল মেয়েটা। দরজায় বেল বাজতে ছুটে গেল সেই দিকে। বাবা সেই কখন বেরিয়েছে এখনও ফেরেনি। মায়ের সঙ্গে একা থাকতে ইদানীং কেমন অস্বস্তি হয় ওর। মা কীসব অদ্ভুতুড়ে কথা বলে৷ সব থেকে বড় কথা কিছুতেই ওর কাছে আসতে চায় না। মাঝে মাঝে মন কেমন করে ওর। কিন্তু মাকে সে কথা বলতেও পারে না৷
‘কে?’ দরজার কাছে গিয়ে হাঁক পাড়ে ইনা।
‘দরজাটা একটু খুলবে?’ ওপাশ থেকে একটা অপরিচিত কিন্তু নরম গলা শোনা যায়, ‘তোমার মায়ের সঙ্গে একটু দরকার ছিল।’
‘কে আপনি?’
‘আমি বন্ধু।’ আগের মতো নরম উত্তর আসে ওপাশ থেকে৷
ইনা এত নরম গলার আওয়াজ আগে শোনেনি। একটু ভেবে নিয়ে জিগ্যেস করে, ‘কার? আমার না মায়ের?’
ওপাশের গলাটায় হাসির রেশ মেশে, ‘দুজনেরই। মাকে একটু ডেকে দাও না।’
ল্যাচ-কি টেনে দরজা খুলে দেয় ইনা৷ যা ভেবেছিল ঠিক তাই। লোকটার মুখটা ভারি আদুরে। তামাটে গায়ের রং। তিরিশের আশেপাশে বয়স হবে। গায়ে একটা মেরুন শার্ট আর কালো ট্রাউজার। মাথায় কুচকুচে কালো ঘন চুল যত্ন করে আঁচড়ানো। লক্ষ করে লোকটার হাতে পায়ে কয়েক জায়গায় কতগুলো বিচিত্র ট্যাটু করা আছে। তাদের মধ্যে কাক আর কুকুরটাকে ও চিনতে পারে।
‘মা ভিতরের ঘরে আছে, ঘুমাচ্ছে।’
‘বেশ, আমি জাগিয়ে নেব। তুমি চিন্তা কোরো না।’ মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে পাশের ঘরে নিঃশব্দে ঢুকে আসে লোকটা। ও আবার স্ক্রিনের সামনে গিয়ে বসে পড়ে। টম অ্যান্ড জেরি চলছে স্ক্রিনে। সোফার উপরে পা তুলে সেটাই দেখতে থাকে৷
পাশের ঘরে বিছানার উপর পাশ ফিরে ঘুমাচ্ছিল আগমনী। মাথার চুলগুলো উসকোখুসকো হয়ে ছড়িয়ে আছে বালিশের উপর। মোটা ফ্রেমের চশমাটা রাখা বালিশের পাশে সাদা। বুক অবধি টানা চাদর, সেদিকে ভালো করে তাকালে চাদরের ভাঁজে বুড়িয়ে ছোট হয়ে যাওয়া শরীরটা বোঝা যায়। এক নজরে দেখলে মনে হয় কঙ্কালের উপরে মরা মানুষের শুকনো চামড়া জড়িয়ে রেখেছে কেউ। ঘরে ঢোকার ঠিক মুখে দরজার উপর একটা শ্রীকৃষ্ণের বাঁশি হাতে ছবি ঝুলছে। সেটা হাওয়ার ধাক্কায় দুলে উঠছে মাঝে মাঝে।
লোকটা তেমনই নির্লিপ্তভাবে গিয়ে তার পা স্পর্শ করে, ‘মিসেস সেনগুপ্ত, মিসেস সেনগুপ্ত, শুনছেন?’
চোখটা খুলে যায় আগমনীর। চারপাশটা একবার ঠাহর করে উঠে বসতে গিয়ে আতঙ্কিত হয়ে ওঠে সে, আগন্তুককে দেখতে পেয়ে গলার শির ফুলিয়ে চিৎকার করে একবার, ‘এ কী! কে আপনি! ভিতরে এলেন কী করে? বাবাই… বাবাই…’
লোকটা হাত তুলে ওকে আশ্বস্ত করে, ‘আহা, ওকে ডাকতে হবে না। টিভি দেখছে মন দিয়ে। কেন খামোখা বিরক্ত করবেন?’
‘কে আপনি?’ হিসহিস করে ওঠে আগমনী। গলার উপরে চাপ পড়ায় ফুসফুস ঠেলে কাশির দমক উঠে আসে তার। একটা হাত বুকে চেপে ধরে কাশতে শুরু করে আগমনী। লোকটা টেবিলের উপরে রাখা জলের গ্লাসটা এগিয়ে দেয় ওর দিকে, ‘নিন, খেয়ে নিন জলটা।’
কোনওরকমে হাত বাড়িয়ে ঢকঢক করে জল খায় আগমনী। বুকের ভিতর ধড়ফড়ানিটা কমে আসে। সেই সঙ্গে মাথাটাও শান্ত হয়।
এতক্ষণে হাসি ফোটে আগন্তুকের মুখে। তেমনই অমায়িক গলা শোনা যায়, ‘আপনার সঙ্গে আমার পরিচয় অনেকদিনের। শুধু মুখ চেনেন না। অবশ্য চেনার কথাও নয়… অপরিচিত লোকটার হাসির মধ্যে অদ্ভুত একটা স্নিগ্ধতা আছে। মুহূর্তে বিশ্বাস করে ফেলা যায় তাকে৷
‘আসলে আপনার একটা জিনিস আছে আমার কাছে… সেটার জন্যেই আজ…’
‘কী জিনিস?’ মুখের উপর হাত চালিয়ে নিজেকে প্রকৃতিস্থ করার চেষ্টা করে আগমনী।
ট্রাউজারের পকেট থেকে একটা পুরোনো ভেজা কাগজ বের করে লোকটা। প্যান্টের কাপড়ে মুছে নেয় একবার। তারপর এগিয়ে দেয় ওর দিকে। সেটা হাতে নিতে অবাক হয় আগমনী। একটা জলে ভেজা কাগজের নৌকা। লিফ্লেট ভাঁজ করে এককালে কেউ বানিয়েছিল নৌকাটা। পেনের কালিতে কী একটা লেখাও আছে নৌকাতে। কিন্তু জলে ভিজে এতই ঝাপসা হয়ে গেছে যে পড়া যাচ্ছে না।
‘এটা কী?’ অবাক হয়ে জিগ্যেস করে আগমনী।
‘ইচ্ছে।’
‘কার ইচ্ছে?’
লোকটার মুখে রহস্যময় হাসি খেলে যায়, ‘আপনার। অনেক বছর আগে আপনিই ভাসিয়েছিলেন নৌকাটা।’
আগমনীর চোখ থেকে ঘোর কাটতে চায় না, নিজেকে খানিক সামলে নিয়ে বলে, ‘অনেকদিন আগে…’ অক্ষম স্মৃতি হাতড়ে ও মনে করার চেষ্টা করে, ‘হ্যাঁ…আমার মা এসব উদ্ভট গল্প বলত। নৌকা ভাসানো, ইচ্ছাপূরণ। একটা বয়স অবধি আমি গবেটের মতো বিশ্বাসও করতাম। কিন্তু এটা কোনওদিন…’
‘মনে পড়ছে না৷ জানি, পড়ার কথাও নয়…কিন্তু কী জানেন মিসেস সেনগুপ্ত…’ লোকটা জামার হাতায় মুখ মুছে ওর পাশে এসে বসে পড়ে, মাঝে মাঝে এক আধটা অসম্ভব ইচ্ছা পূরণ হয়েও যেতে পারে। তালদিঘিতে যেসব নৌকা ভেসে যায় তার সবক’টার ভরাডুবি হয় না।’
‘আপনি কী বলছেন আমি বুঝতে পারছি না!’
আগমনীর হাত থেকে নৌকাটা নিয়ে সেটা ভালো করে খুলে দেখায় লোকটা। তারপর ধীরে ধীরে বলে, ‘আমি চাই আপনার ইচ্ছাপূরণ করতে। দেখুন কী লেখা আছে…
লোকটা একবার ভেজা কাগজটায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দেয়৷ ওমনি ফাঁকা চোখে চশমা পরার মতো উজ্জ্বল আর স্পষ্ট হয়ে ওঠে লেখাটা, ‘ইনা যতদিন থাকে, যেন খুব ভালো থাকে, সব থেকে ভালো থাকে…
ওর চোখ থেকে অবাক দৃষ্টিটা মোছে না৷ সেটা লক্ষ করেই লোকটা আবার বলে, ‘আজ থেকে বত্রিশ বছর আগে আপনি চেয়েছিলেন একটা মানুষ তার বাকি জীবনটা সুখে থাক। আমি আপনার সেই ইচ্ছাটা পূরণ করতে এসেছি।’
‘কীভাবে?’ হতবাক হয়ে প্রশ্ন করে আগমনী।
‘আসুন আমার সঙ্গে।’
লোকটা উঠে দাঁড়ায়। তারপর ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে ডাইনিংয়ে চলে আসে। ইনা এখনও মন দিয়ে কার্টুন দেখে চলেছে। ওকে বিরক্ত না করেই তার পাশে গিয়ে বসে পড়ে সে। একবার আদর করে হাত রাখে মাথায় । আগমনী এসে দাঁড়ায় তার পেছনে। লোকটা মেয়েটার মুখের দিকে তাকায়, ‘ইনা, শরীর কেমন আছে তোমার?’
‘ভালোই আছে, মা শুধু শুধু চিন্তা করে।’
আগমনী মেয়ের অন্যপাশে বসে পড়ে৷ খুঁতনিতে হাত রেখে বলে, ‘মা হলে চিন্তা করতে হয় বাবাই। আমার মাও আমাকে নিয়ে করেছে। তোর মাও তোকে নিয়ে করছে।’
‘কই, আমার বন্ধুরা তো করে না।’ মেয়েটা টিভি থেকে চোখ না সরিয়েই বলে, ‘কত গল্প করে, মজা করে। মা-ই শুধু মন খারাপ করে বসে থাকে।’
‘মা-ও তো একটা বন্ধু, তাই না বাবাই?’ আগমনীর গলায় বাষ্প মেশে হঠাৎ।
মেয়েটা সজোরে দু’দিকে মাথা নাড়ায়, ‘উঁহু, তুমি একদম বন্ধুর মতো না। তুমি শুধু মা৷’
আগমনী কিছু বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই লোকটার গলা শোনা যায়, ‘আর মা যদি বন্ধু হয়?’
কথাটা যেন একটু বেশিই জোরে শোনায়। ঘুরে বেড়ায় ঘরময়। টিভির আওয়াজ ছাপিয়ে যায় শব্দটা।
‘ধুর…’ মেয়েটা কাঁধ ঝাঁকায়, ‘মা কী করে বন্ধু হবে?’
লোকটা আর একটু ওর দিকে সরে আসে, ফিসফিসে গলায় বলে, ‘ইচ্ছে, তুমি ইচ্ছে করলেই হবে।’
ইনার মুখে হাসি খেলে যায়। উজ্জ্বল চোখে লোকটার দিকে তাকায়, ‘তাহলে তো আমি খুব খুশি হব।’
‘ভালো থাকবে?’
‘সব থেকে বেশি ভালো থাকব।’
লোকটা আবার ইশারা করতে আগমনী মেয়ের পাশ থেকে উঠে পড়ে৷ ওকে অনুসরণ করে নিজের ঘরে ফিরে আসে। মাথাটা ধীরে ধীরে ঘুরতে শুরু করেছে ওর। ক্রমশ বাস্তব অবাস্তব সমস্ত কিছু গুলিয়ে যাচ্ছে। কৌশিক আর অপরাজিতা ক’দিন থেকেই বলছে ও নাকি কিছু মানসিক সমস্যায় ভুগছে। এটাও কি তাহলে সত্যিই একটা মানসিক রোগ? লোকটা কি আদৌ এসেছে ওর বাড়িতে? নাকি সমস্তটাই ওর ভ্রষ্ট মনের কল্পনা। কৌশিককে ফোন করবে একবার? আচ্ছা, লোকটা যা বলছে তা কি বিশ্বাস করা উচিত? অন্য কোনও ধান্দা নেই তো?
মাথাটা ঠান্ডা করে নিজেকে একটু শান্ত করার চেষ্টা করল আগমনী। বিছানার একদিকের কোণে বসতে বসতে বলে, ‘আপনি ঠিক কী বলতে চাইছেন?’
লোকটা বড় করে শ্বাস নেয়। তারপর চেয়ার টেনে নিয়ে বসে বলে, ‘আমার মনে হয় আপনার মেয়ে আপনার কাছেই ভালো থাকবে মিসেস সেনগুপ্ত৷ তবে আজকের আপনার কাছে নয়। আজ থেকে বত্রিশ বছর আগের আপনার কাছে।’
আগমনী কিছু বলে না। এখন আর নিজের অল্প বয়সের কথা মনে পড়ে না ওর। দিন দিন সব কিছু যেন ভুলে যেতে শুরু করেছে। ছোটবেলায় কি ভালো ছিল ও? সহজে বন্ধু হয়ে যেতে পারত? মিশতে পারত মানুষের সঙ্গে? ছেড়ে চলে আসার বাতিকটা তখনও পঙ্গু করে দেয়নি ওকে?
কে জানে। কৌশিক বলতে পারবে এসব। কিংবা তারও আগের কোনও বন্ধু। নিজের খুব পুরোনো বন্ধুর কথা মনে করার চেষ্টা করে ও। কারো মুখ মাথায় আসে না। তাহলে কি একটা গোটা জীবন বন্ধুত্ব ছাড়াই কাটিয়ে দিল? ও কি একাই ভুগেছে এই রোগে? নাকি অনেকেরই হয়?
‘মানুষ মানুষকে ভালোবাসলে সবথেকে বড় কোন জিনিসটা দিতে পারে, আপনি জানেন মিসেস সেনগুপ্ত?’
আগমনী উত্তর দেয় না। লোকটা নিজেই আবার বলে, ‘নিজেকে। বা আরও পরিষ্কার করে বলতে গেলে নিজের বেস্ট ভার্সনটা। নিজের বন্ধুত্বটা। যে মানুষটা আপনি আজ থেকে অনেকগুলো বছর আগে ছিলেন, সেই মানুষটা৷ আমি তার কাছেই রেখে আসব ওকে।
এতক্ষণে মুখ তুলে লোকটার দিকে চায় আগমনী, ‘কিন্তু যে সময়টা আমি কাটিয়ে এসেছি সেই সময়টায় ও যাবে কী করে?’
আগন্তুকের মুখে এবার বিচিত্র একটা হাসি খেলে যায়। চোখ, কান, ঠোঁট, স্পর্শ করে সমস্ত মুখে ছড়িয়ে পড়ে সেই হাসি, ‘অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ, এসবে সময়কে ভাগ করার দায় আপনার থাকতে পারে মিসেস সেনগুপ্ত। সময়ের নিজের এরকম কোনও দায় নেই। যতক্ষণ না তার নিয়মে কোনও অসঙ্গতি আসছে সে কোনও কিছুরই পরোয়া করে না।’
‘নিয়ম বলতে?’
হুট করেই উঠে দাঁড়ায় লোকটা, ‘নিয়ম কেবল একটাই। আপনার মেয়ে মারা যাওয়ার পর, আপনার পনেরো থেকে সতেরো, অর্থাৎ ওকে প্রথম ও শেষ দেখা অবধি ওর কোনও স্মৃতি আপনার থাকবে না। ওর সঙ্গে কাটানো সমস্ত মুহূর্ত, যে সব মুহূর্ত মনে থাকলে ও আপনার স্মৃতিতে থেকে যাবে, তার সমস্তটা আপনি ভুলে যাবেন। শুধু আপনি কেন আপনার সঙ্গে আরও যারা মনে রাখলে আজকের সিদ্ধান্তটা আপনি নিতে পারবেন না, তারা সবাই ভুলে যাবে।’
আগমনী ব্যাপারটা মন দিয়ে ভাবার চেষ্টা করে, ‘কিন্তু ভুলে যাব কেন?’ লোকটা হাত উলটে ঘড়ি দেখে, ‘কারণ মনে থাকলে আপনি আজকের এই মানুষটা হতে পারবেন না। আপনাকে প্রশ্নের উত্তর জেনে পরীক্ষা দিতে দেওয়ার মতো বোকামি তো আমি করতে দিতে পারি না, তাই না?’
‘আমি কিছু বুঝতে পারছি না।’ আগমনীকে উদভ্রান্ত দেখায়। চোখের মণি অস্থির হয়ে কাঁপতে থাকে ওর।
লোকটা আগের মতো মিহি হেসে হাত রাখে ওর মাথায়, ‘এ জগতে প্রাণ সৃষ্টি হওয়ার অনেক আগে, বোধ সৃষ্টি হওয়ার অনেক আগে সময় সৃষ্টি হয়েছিল। তাকে বোঝা এত সহজ নয় মিসেস সেনগুপ্ত। এই মুহূর্তে অতটা দরকারও নেই। পরে মন দিয়ে ভাববেন না হয়…কেমন?’
কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে আগমনী। একবার নিজের গালে হাত রাখে। মুখ তুলে হঠাৎ প্রশ্ন করে, ‘ও ভালো থাকবে তো? সব থেকে বেশি ভালো থাকবে?’
আগমনীর মনে হয় ও আবার হ্যালুসিনেট করছে। কাজ করছে না ওর মাথাটা। আজ শোয়ার আগে ট্যাবলেটটা খেয়েছিল কি? কৌশিককে এসব বলতে গেলে ধমক দেবে না তো?
লোকটা ওর ঠিক সামনে এসে দাঁড়ায়, ‘সব থেকে বেশি ভালো থাকবে। ঠিক যেমন আপনি চেয়েছিলেন।
‘আমি ভালো মা হতে পারিনি, না?’
ওর একটা হাত নিজের হাতে তুলে নেয় লোকটা। আগমনীর মনে হয় ধীরে ধীরে অসীম শূন্যে প্রবেশ করেছে হাতটা।
‘তা তো জানি না, তবে আপনি মা হতে চেয়েই ভুল করেছেন। বন্ধু হলে আর ভালো হওয়ার দরকার হতো না। শুধু বন্ধু হলেই হতো৷’
নিস্পন্দ কয়েকটা মুহূর্ত কেটে যায়। ওপাশের ঘর থেকে টম অ্যান্ড জেরির শব্দ ভেসে আসে। ইনার হাসির আওয়াজ ভেসে আসে। আগমনী মন দিয়ে শোনে সেটা৷
‘আমি যদি রাজি না হই আপনি কি জোর করে নিয়ে যাবেন ওকে?’
এবার ফিক করে হেসে ফেলে মানুষটা, ‘আমি একটা সতেরো বছরের মেয়ের ইচ্ছাপূরণ করতে এসেছি মিসেস সেনগুপ্ত। জোর করে তাকে দিয়ে কিছু করাব কেন?’
‘ও কেমন আছে আমি জানব কেমন করে? ওর কোনও ক্ষতি হলে?’
দু’দিকে মাথা নাড়ে লোকটা, ‘ওর যখন যা হওয়ার তখন তাই হবে। তার আগে কেউ ওর ক্ষতি করতে পারবে না। আমার উপর বিশ্বাস রাখুন।’
আগমনী আশ্বস্ত হয় কিনা বোঝা যায় না, ‘ওকে আর আমি দেখতে পাব না?’
‘এই প্রশ্নটা করেই মুশকিলে ফেললেন…’ লোকটা খিলখিল করে হাসতে থাকে, ‘কী উত্তর দিই বলুন দেখি?’
হাসতে হাসতেই হাতঘড়ির দিকে আর একবার চেয়ে নেয় সে, আগমনীর ঘর থেকে বেরোনোর মুখে শ্রীকৃষ্ণের ছবিটা ঝুলছে। কৌশিকই একবার এনে লাগিয়েছিল। সেটার সামনে গিয়েই পেছন ঘুরে তাকায় মানুষটা, ‘আমাকে আর কখনও আপনি দেখতে পাবেন না। তবে হ্যাঁ, অনুভব করতে পারবেন। আপনার কাছে এসেছিলাম একদিন জন্ম নিয়ে। তারপর শৈশব, কৈশোর, ভালোবাসা, দুঃখ, আনন্দ, শোক, বার্ধক্য আমিই নিয়ে এসেছিলাম। একদিন আপনার মৃত্যুকে নিয়ে আসব। ততদিন আমাকে আর দেখতে পাবেন না৷’
লোকটা দরজার দিকে অনেকটা এগিয়ে গেছে। আগমনী পেছন থেকে চিৎকার করে জিগ্যেস করে, ‘আমাকে কী করতে হবে?’
‘রেখে আসবেন।’
‘কোথায় রেখে আসব?’
‘যেখানে ইচ্ছাগুলোকে রেখে আসতেন…’
‘দেখ, তুই তাড়াতাড়ি বাড়ি ফের গেদু, আগমনী ফোন করেছিল। আমার ব্যাপারটা সুবিধার ঠেকছে না।’
‘কী বলছে?’
‘জানি না। বলছিল কে নাকি ইনাকে নিয়ে চলে যেতে চেয়েছে।’
‘চলে যেতে চেয়েছে! মানেটা কী?’
‘জানি না৷ অন্য কোনও সময়ে…’
গাড়ি চলাতে চালতেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কৌশিক। মাথাটা ভার হয়ে আসে ওর। আগমনীকে এক্ষুনি একটা ডাক্তার দেখানো দরকার।
‘তুই আমার বাড়ি আয়, আমি আধা ঘণ্টায় ঢুকছি।’ এক্সেলেটরে চাপ দেয় কৌশিক। আরও জোরে ছুটিয়ে দেয় গাড়িটা
‘কেমন আছে ও এখন?’ কৌশিক দরজা খুলতে সবার আগে এই প্রশ্নটাই ছুড়ে দেয় অপরাজিতা। তারপর খোলা দরজা দিয়ে ঢুকে আসে ঘরের ভিতরে।
‘মা মেয়ে দুজনেই আপাতত ঘুমোচ্ছে।’ আমি একটা ওষুধ দিয়েছি। আপাতত সেটাই খেয়ে…’
ভিতরের ঘরটা একবার দেখে আসে অপরাজিতা। মেয়েকে বুকের কাছে নিয়ে জড়সড় হয়ে ঘুমাচ্ছে আগমনী। নিঃশ্বাসের ধাক্কায় ওর বুকটা ফুলে উঠছে বারবার। নীল আলোতে ভরে আছে ঘরের ভিতরটা। সেই সঙ্গে একটা ওষুধের গন্ধ। দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে আসে অপু। ডাইনিং-য়ে টিভি চলছিল। সেটা বন্ধ করে সোফায় বসে পড়ে দুজনে।
‘কী ব্যাপার বল তো, দিনদিন এতটা খারাপ কন্ডিশন হয়ে যাচ্ছে!’ অপরাজিতার গলায় দুশ্চিন্তার ছাপ।
এক হাতে নিজের চুল খামচে ধরে কৌশিক, ‘আমার হাতে কিছু নেই অপরাজিতা। আই অ্যাম সো ফাকিং টায়ার্ড অফ দিস!’
‘তুই একটু শান্ত হ ভাই। এই অবস্থায় দুজনেই যদি ভেঙে পড়িস, মেয়েটার কী হবে বল তো? আজ ডাক্তারের কাছে গেছিলি না? কী বলল?’
‘কী আবার! যা বলেছিল তাই রিপিট করল। উইথ এমফ্যাসিস।’
ঘরের চারিদিকে একবার তাকাল অপরাজিতা। দেওয়ালের গায়ে কোথাও বাচ্চা মেয়ের মোম রঙে আঁকা ভূতের মুখ। কোথাও গলা ছেঁড়া পুতুল, কোথাও ক্লাস এইটের জীবন বিজ্ঞান বইয়ের ছেঁড়া পাতা। বাচ্চা মেয়ের বেড়ে ওঠার চিহ্ন বহন করছে ফ্ল্যাটটা। একদিকের দেয়ালের গায়ে কৌশিক আর আগমনীর বিয়ের সময়কার ছবি ঝুলছে। ছবির মানুষটার সঙ্গে এখনকার আগমনীর মুখের কোনও মিল নেই। অন্তত পনেরো কেজি ওজন কমেছে তার। কণ্ঠার হাড় বেরিয়ে পড়েছে বিশ্রীভাবে। বয়স আর মানসিক যন্ত্রণা মানুষটাকে ধীরে ধীরে একটা কঙ্কালে পরিণত করেছে।
সেদিকে তাকিয়ে অপরাজিতার চোখ ভিজে যাচ্ছিল। চোখটা ঘষে নিয়ে বলল, ‘তুই চাইলে ওকে কয়েকদিনের জন্য আমার ফ্ল্যাটে পাঠিয়ে দিতে পারিস। আমি যতক্ষণ থাকি…’
‘বাদ দে ওসব।’ টেবিলের নিচ থেকে হুইস্কির গ্লাসটা উপরে তুলে আনে কৌশিক, তাতে ঠোঁট ডুবিয়ে দিয়ে বলে, ‘মেয়ে ওকে ছেড়ে থাকতে চায় না। এদিকে ও আজকাল কেমন একটা যেন উদাসীন হয়ে গেছে৷’ কথাটা বলে টেবিলে ফাঁকা গ্লাস নামিয়ে রাখে কৌশিক, ‘ভাগ্যটা খারাপ আসলে। সবকিছু আগের মতো চললে ওর মতো মা অনেক ভাগ্য করে পেয়েছিল মেয়েটা। রোজ স্কুল থেকে নিয়ে আসা, কোলে করে ঘুম পাড়ানো, মেয়ের পছন্দের খাবার…’
অপু মুখ ঘুরিয়ে নেয়, ‘ভালো মা, ভালো স্ত্রী, ভালো বোন, সময় আমাদের কোথায় ভালো হতে দেয় বল তো?’
‘সময় না থাক, আমার মেয়েটার কাছে একটা মা তো ছিল। সেটাও দিনদিন…’
চেয়ার ছেড়ে উঠে আসে অপরাজিতা, খোলা বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। কৌশিকদের ফ্ল্যাটটা বিল্ডিংয়ের একেবারে উপরে বলে এখানে এসে দাঁড়ালে কলকাতা শহরের ব্যস্ত রাস্তা চোখে পড়ে। মিহি যানবাহনের শব্দ কানে আসে। সেদিকে চেয়ে থাকতে থাকতে বলে, ‘আমরা বুড়ো হয়ে গেলাম, বল গেদু? দেখতে দেখতে ছোট থেকে বড় হয়ে গেলাম। আমাদের খামখেয়াল, আমাদের হাসি, কান্না, ছেলেবেলা, স্কুল, জয়েন্ট ফ্যামিলি সব কোথায় হারিয়ে গেল!’
কৌশিক ওর পাশে এসে দাঁড়ায়। নিচের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে বলে, ‘একটা সময় ঠাম্মাকে নিয়ে খুব টেনশন হত। ভয় লাগত একদিন ঠাম্মাও আমাকে ছেড়ে চলে যাবে। কিন্তু জানিস যেদিন সত্যি চলে গেল সেদিন খুব একটা কষ্ট হল না। অনেক বছর ধরে ভুগছিল। বিছানা থেকে উঠতে পারত না। গোটা গায়ে বেডসোর হয়ে গেছিল। ডাক্তার এসে যখন বলল আর বেঁচে নেই আমার কষ্ট হল না। নিশ্চিন্ত হলাম…যাক, আর তো ভুগতে হল না!’ মদের গ্লাসে আবার চুমুক দেয় কৌশিক, ‘এখন ইনার জন্য মনটা খারাপ হয়ে থাকে সব সময়। কে বলতে পারে একদিন হয়তো ও এত কষ্ট পাবে যে চলে গেলে মন খারাপের থেকে শাস্তি হবে বেশি!’
গ্লাসটা বারান্দার রেলিংয়ের উপর রেখে ওর দিকে তাকায় কৌশিক। চোখদুটো আরও বেশি যেন কোটরের ভিতর ঢুকে গেছে ওর, ধীরে ধীরে বলে, ‘সময় আজ যা যা কেড়ে নিয়েছে তার সবকিছুর জন্য ওকে ক্ষমা করে দিতে পারতাম অপু, বিশ্বাস কর। ক্ষমা করব না শুধু আমাদের অনুভূতিগুলোকে সস্তা করে দিয়েছে বলে…’
অপরাজিতা বেরিয়ে যেতে আগমনীর ঘরে আসে কৌশিক। মা মেয়ের ক্লান্ত নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে ঘরময়। সেই সঙ্গে তীব্র ওষুধের ঝাঁঝালো গন্ধ। আগমনীর ওষুধের পাতাটা একবার হাতে নিয়ে দেখে কৌশিক৷ হ্যাঁ, আজ মনে করে খেয়েছে।
নীল রাতবাতির আলোয় আগমনীর শুকিয়ে যাওয়া শরীরটা, গল্পের বইতে পড়া শীর্ণ দাঁতভাঙা চুলওঠা ডাইনির মতোই দেখাচ্ছে। খুব সন্তর্পণে মনিকে একহাতে জড়িয়ে পাশে দলা পাকিয়ে বিড়ালের মতো শুয়ে পড়ে কৌশিক। মৃদু গলায় ডাকে, ‘মণি, মণি ঘুমাচ্ছিস?’
ঘুমন্ত রুগ্ন মানুষটা উত্তর দেয় না। বুকটা ধীরে ধীরে ওঠানামা করতে থাকে কেবল। ছোট মেয়েটার মুখে চাঁদের আলো এসে পড়েছে৷ ভারি নরম দেখাচ্ছে মুখটা। ঘুমন্ত স্ত্রী মেয়েকে একহাতে আগলে কৌশিকও চোখ বোজে।
ইনাকে নিয়ে আহিরীটোলা ঘাটের ধারে এগিয়ে আসে আগমনী। একটু দূরেই অটো থেকে নেমেছে ওরা দুজনে। শীতকাল পড়তে শুরু করেছে। আগমনী নিজের গায়ে আলুথালু করে একটা খয়েরি চাদর জড়ানো। তার নিচে সোয়েটার। আজকাল রাস্তাঘাটে একটু হাঁটতে গেলেই হাঁফ লেগে যায় ওর। ইনা নাচতে নাচতে দ্রুত এগিয়ে চলে। ওর সঙ্গে তাল রাখতে গেলে আগমনীর বুক ধড়ফড় করে।
এখন বিকেল নামতে শুরু করেছে। আকাশের বুক ফুঁড়ে মাঝে মাঝে উড়ে যাচ্ছে সটান ডানার কয়েকটা বাদুড়। তাদের ছায়া সরে যাচ্ছে মাটির উপর দিয়ে। দূর থেকে লঞ্চের আওয়াজ ভেসে আসছে। ইনার মন বারবার সজাগ হয়ে যাচ্ছে সেদিকে। একবার মুখ তুলে মায়ের দিকে আর একবার গঙ্গার দিকে চাইছে সে। লঞ্চে উঠতে ভীষণই ভালো লাগে তার। বছরখানেক আগে একবার লঞ্চে উঠিয়েছিল বাবা। তারপর থেকে আর ওঠা হয়নি। মা খুব একটা বাড়ি থেকে বেরোয় না অবশ্য। ইনা ছোট থেকেই দেখে আসছে বছরের বেশির ভাগ সময় মা কেমন যেন দুর্বল হয়ে থাকে। সারাদিন এক গুচ্ছের ওষুধ খেতে হয়।
‘আমরা লঞ্চে করে কোথায় যাচ্ছি মা?’ ঘাটের ধারে এসে প্রশ্ন করে ইনা।
‘খুব সুন্দর একটা জায়গায়…তুই খুব ভালো থাকবি এমন একটা জায়গায়।’
ইনার মুখ দেখে মনে হয় সে খুশি হয়েছে, ‘তুমিও যাবে তো আমার সঙ্গে?’
ওর মা দু’দিকে মাথা নাড়ায়, ‘আমাকে যেতে হবে না। আমি ওখানেই থাকব।’
‘আমি একা যাব?’ অবাক চোখে ওর দিকে তাকায় মেয়েটা, ‘একা গেছি জানলে বাবা রাগ করবে না?’
ঠোঁটের উপর আঙুল রাখে আগমনী, ফিসফিস করে বলে, ‘তোর বাবা জানলে তবে তো রাগ করবে। তোর ভয় করবে নাতো?’
দুপাশে মাথা নাড়ে ইনা। তারপর কী যেন ভেবে নিয়ে বলে, ‘তুমি ওখানে আমার আগেই পৌঁছে যাবে?’
মা হাসে। কোনও উত্তর দেয় না। ওর জামার কলারটা ঠিক করে দেয়। গালের উপরে হাত রাখে একবার। বিকেলের কমে আসা আলোয় মায়াবি দেখাচ্ছে মেয়েটার মুখটা। একমাথা কোঁকড়া চুল ঝুঁকে আছে পিঠের উপরে। নরম দু’খানা চোখ ঘুরতে যাওয়ার খুশিতে জ্বলজ্বল করে উঠছে। তবে এই ছোট ঘাটখানাতে মা হঠাৎ এসে দাঁড়িয়েছে কেন সে বুঝতে পারছে না। এই ঘাটে তো লঞ্চ আসে না। তাহলে?
‘মায়ের কাছে থাকতে ভালো লাগে না তোর?’ মেয়ের মাথায় হাত রাখে আগমনী।
‘খুব ভালো লাগে। তোমার কী হয়েছে মা?’ একটু দুশ্চিন্তার ছাপ পড়ে মেয়েটার মুখে।
‘বয়স, বয়স হয়েছে রে মা…’ হতাশ ভঙ্গিতে ঠোঁট উলটে বলে আগমনী, ‘তোর মা বুড়ি হয়ে গেছে। যত বয়স দেখায় তার থেকেও বেশি বুড়ি হয়ে গেছে। কিন্তু জানিস বাবাই, তোর মা সবসময় এরকম ছিল না। এরকম বিচ্ছিরি, ঘ্যানঘ্যানে, ভয় পাওয়া একটা মানুষ ছিল না। মনে সাহস ছিল, পায়ে জোর ছিল। সবথেকে বড় কথা…’ একটু অন্যসময় জলের দিকে তাকায় আগমনী, ‘এটা বিশ্বাস করত যে তেমন করে চাইলে অসম্ভব ইচ্ছাও পূরণ হয়…’ কী যেন ভেবে আবার বলে, ‘তোকে আমার খুব হিংসা হচ্ছে, জানিস?’
‘কেন?’ ইনা অবাক হয়।
‘তোর একটা নিষ্পাপ শৈশব থাকবে, কৈশোর থাকবে, স্কুল থাকবে, ছোটবেলার বন্ধু থাকবে, অথচ বুড়ি হয়ে যাওয়া থাকবে না, হেরে যাওয়া থাকবে না, সবাইকে অসহ্য মনে হওয়া থাকবে না, প্রিয় মানুষের মরে যাওয়ার ভয় থাকবে না…তুই আমার মতো হয়ে যাবি না কোনওদিন!’
দূর থেকে একটা শব্দ ভেসে আসে। লঞ্চের আওয়াজ। গঙ্গার ওপার থেকে এদিকেই ভেসে আসছে একটা লঞ্চটা। সেটা দেখে খুশি হয় ইনা, ‘ওটাতে করেই যাব আমি?’
আগমনীর চোখ জলে ভরে আসে। উপরে নিচে মাথা নাড়ে সে। তারপর সজোরে মেয়েকে বুকে চেপে ধরে। মেয়েটা কিছু বুঝতে পারে কি? না মনে হয়।
‘আমি তোকে ছেড়ে থাকতে পারব না রে মা।’ আগমনীর গলার স্বর কেঁপে যায়। দূরে লঞ্চের আওয়াজ আরও এগিয়ে আসে। ঘাট বেয়ে জলের গন্ধ উঠে আসে। মেয়েটা বুঝতে পারে ওর জামার কাঁধের কাছটা ভিজে যাচ্ছে জলে।
মেয়েটা ওর বুক থেকে মুখ তোলে, ‘তাহলে আমি না থাকলে কী করবে তুমি?’
হাত দিয়ে চোখের জলটা মুছে নেয় আগমনী, ‘আবার একটা ইচ্ছার নৌকা ভাসিয়ে দেব জলে। কে জানে, যদি আবার কখনও সেই ইচ্ছা পূরণ হয়ে যায়….’
কথাটা বলে উঠে দাঁড়ায় আগমনী, ‘তুই একটু দাঁড়া। আমি আসছি।’ মেয়েটা মিষ্টি করে হাসে, ‘আচ্ছা, তাড়াতাড়ি ফিরো কিন্তু। আমার একা একা থাকতে ভয় করে।’
ঘাটের দিকে পা বাড়ায় আগমনী, ‘আমি থাকতে তুই একা হবি না কোনওদিন।
পনেরো বছরের মেয়েটাকে গঙ্গার ধারে দাঁড় করিয়ে পেছন ফেরে আগমনী। তারপর সজোরে পা চালায়। সিঁড়ি বেয়ে বেশ খানিকটা উপরে উঠে আসে। গঙ্গার দিক থেকে হাওয়া বয়ে এসে লাগে ওর পিঠে। যেন পিছু ডাকতে চায়। উপর থেকে আইসক্রিমওয়ালা হাঁক কানে আসে। মন্দিরে ঘণ্টা বাজার শব্দ হয়। অল্পবয়সি ছেলেমেয়েদের কলকাকলি শোনা যায়৷
‘মা…’ পেছন থেকে কি ডাকল কেউ?
মনটা কেঁপে ওঠে আগমনীর। এটা কী করছে ও!
‘না, না আমি ওকে নিয়ে যেতে দেব… উন্মাদের মতো চিৎকার করে কথাগুলো বলে চকিতে পেছন ফেরে আগমনী। আবার তাকায় জলের দিকে।
নাহ, আর কেউ দাঁড়িয়ে নেই জলের ধারে। খাঁখাঁ করছে গঙ্গার ঘাট। কোথায় লুকিয়ে থেকে যেন একটা কাক কর্কশ গলায় ডেকে যাচ্ছে ক্রমাগত। একটা কালো কুকুর লেজ গুটিয়ে শুয়ে আছে নীচের ধাপে।
আর কেউ কোত্থাও নেই।
ঘাটের রেলিং ধরে কিছুক্ষণ ঠায় সেই দিকে তাকিয়ে থাকে আগমনী। সূর্যটা ঠিক সেই সময়ে ডুবে যায় দিগন্তের ওপারে। রাস্তার উপর দিয়ে ছুটে আসে।
যাওয়া কোনও অল্পবয়সি শিশুর খিলখিল হাসির আওয়াজ কানে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে ওঠে আগমনী। ওর রুগ্ন ক্লান্ত শরীর লুটিয়ে পড়ে মাটির উপরে। ঘাটের উপর ঝুঁকে থাকা গাছের একটা শুকনো পাতা ঝরে পড়ে সেই রুগ্ন দেহের উপর।
ঘাটের উপর চিত হয়ে শুয়ে দু’হাতে মুখ ঢেকে হাউ হাউ করে কাঁদতে থাকে আগমনী…
