তালদিঘিতে ভাসিয়ে দেব – ১৮
অষ্টাদশ অধ্যায়
‘আসলে টাকা এনেছিলাম, কিন্তু টাকাটা…’
‘হারিয়ে ফেলেছিল। আমি খুঁজে পেয়েছি…’ কথাটা আগমনীর ঠিক পাশ থেকে ভেসে এসেছে। একটা হাত এগিয়ে এসে খুচরো টাকা এগিয়ে দেয় জগেনকাকার দিকে। সেদিকে তাকিয়ে নহরকে দেখতে পায় ও। মুখে একটা নরম হাসি লেগে আছে মেয়েটার। চেহারায় এতক্ষণ স্কুল করার ক্লান্তির কোনও ছাপ নেই। বরং মিহি লাবণ্য খেলা করছে সেখানে।
টাকাটা দিয়ে চলে যাচ্ছিল নহর, আগমনী খপ করে ওর হাত চেপে ধরে, ‘এই, ওটা আমার টাকা ছিল না, তুই নিজে থেকে…
‘ধরে নে আমার অনেক ধার আছে তোর কাছে৷ না হলে পরে দিয়ে দিস। চিন্তার কী আছে? স্কুলের বন্ধু তো পালিয়ে যেতে পারে না। নহর জান্নাত…’
‘আগমনী ভট্টাচার্য।’ ওর দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় আগমনী।
নহরের হাতে হাত স্পর্শ করতেই শরীরে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয় আগমনীর। মাথাটা টলে যায় একবার। দুজনে গল্প করতে করতে মাঠের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে৷
সেদিন ছুটির পর অনেকক্ষণ গল্প করে সবাই মিলে। ততক্ষণে মিহি সন্ধে নামতে শুরু করেছে। সাম্যর বাড়ি ফেরার তাড়া আছে। খুঁটির ইংলিশ কোচিং আছে, সেখানে রীতিমতো সেজেগুজে যায় সে। তাও এখনও হাতে আধঘণ্টা মতো গুলতানি করার সময় আছে। সে সময়টুকু ওরা নষ্ট করতে চায় না৷
‘তুই শালা আমার টিকিটটা আর জোগাড় করে দিলি না।’
গলন্ত সূর্যের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে কী যেন ভাবনায় ডুবে গেছিল আগমনী। অকারণেই মন খারাপ করছিল। সাম্যর ধাক্কায় সম্বিত ফিরল ওর, ‘হ্যাঁ? কী?’
‘সেই যে মুসৌরির টিকিটটা দেওয়ার কথা ছিল!’
‘ওহ্…’ আগমনী হাসে, ‘অত তাড়াহুড়ো করলে হবে না চাঁদ।’
সাম্য হাত নাড়ে, ‘আরে না না, তাড়াহুড়ো তো ব্যাদার বাপের ছিল। লাইব্রেরির মধ্যেই…’
ব্যাদা কটমট করে কী যেন বলতে যায়। কিন্তু দিয়া সেনের ব্যাপারটা মনে পড়তেই চুপ করে যায়। আপাতত ক’দিন ছেলেটাকে একটু সমঝে চলাই ভালো। এদিক ওদিক থেকে খুঁজে পেতে দিয়া সেনের সন্ধান যদি জোগাড় করে দিতে পারে তাহলে অমন দু’চারটে অপমান সহ্য করে নেওয়াই যায়।
এই ক’দিন খুঁটি খেয়াল করেছে আগমনী মাঝে মধ্যেই কেমন যেন উদাস হয়ে যায়। ব্যাকারণের বোরিং ক্লাসে যেমন গালে হাত রেখে বসে থাকতে থাকতে খেলার মাঠের কথা মনে পড়ে মন খারাপ হয়ে যায়, তেমনই মন খারাপ করে বসে থাকে আগমনী।
ও মেয়েটার কাঁধে একটা হাত রাখে, ‘তোর কী হয়েছে বল তো?’
‘কী হবে?’ কাঁধ ঝাঁকায় আগমনী।
সাম্য ওকে খোঁচা মারে, ‘দেখ, মন খারাপ হওয়াটা কোনও খারাপ ব্যাপার নয়। ব্যাদার মতো চরিত্র খারাপ হলে আলাদা কথা ছিল।’
ব্যাদা এবার খেপে গিয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, নহর ওকে থামিয়ে দেয়, ‘তোরা একটু চুপ কর। খালি সারাক্ষণ পেছনে লাগা।’ বলে কনুই দিয়ে গুঁতো মারে আগমনীকে, ‘আমিও দেখেছি ক’দিন ধরে তুই মন খারাপ করে থাকিস। বল না, কী কেস?’
‘মাঝে মাঝে মন খারাপ করে কেন বুঝতে পারি না। কীসের যেন ভয় লাগে। মনে হয় হারিয়ে ফেলব সব…’
নহর হাসে, ‘ও তো আমারও হয়।’
‘কী করিস তখন?’
নহর হাসে, ‘মাকে বলতে ইচ্ছা করে।’
‘মা সামনে না থাকলে?’ আগমনী জিগ্যেস করে।
নহর অদ্ভুত দৃষ্টিতে ওর দিকে চায়, ‘মা সবসময় থাকে…’
ব্যাদা খুঁটি আর সাম্য সরে আসে ওর দিকে। দু’দিক থেকে ওর কাঁধে হাত রাখে তিনজনে। আগমনীর মনটা খুশিতে ভরে যায়।
সন্ধে হয়ে আসছে৷ ফিরতে হবে এবার। বিকেল ফুরিয়ে সন্ধে হয়ে যাওয়ার সময়টায় কেমন বিষণ্ণতা চেপে ধরে ওদেরকে। একটা গোটা দিনের হইচই শেষ হয়ে এল। ঠিক একটা আস্ত জীবনের মতো…এবার শান্ত হয়ে যাবে চারিদিক। ঝিঁঝি ডাকবে, ফাঁকা রাস্তার উপর দিয়ে একটা দুটো গাড়ি হুশ করে ছুটে যাবে একদিক থেকে ওদিকে। পুরোনো গৃহস্থের বাড়িতে শাঁখ বাজবে। মাঠ থেকে ফিরে হাত পা ধুয়ে পড়তে বসবে কেউ কেউ। মন বসবে না পড়ায়। খেলার মাঠ ডাকবে, পুরোনো বন্ধুরা ডাকবে, স্কুলবাড়ি ছাতছানি দেবে…ঠিক একটা আস্ত জীবনের মতো। আগমনীর মন খারাপ হতে শুরু করে আবার…
‘ওই দেখ, ওই আইসক্রিমওয়ালাটা…’ খুঁটি হঠাৎ করেই লাফিয়ে ওঠে। দূরে মাঠের ধার দিয়ে আইসক্রিমের গাড়ি ঠেলতে ঠেলতে পার হয়ে যাচ্ছে আর একটা আইসক্রিমওলা। এও একটা বুড়ো লোক। বাকি চারজন এক ঝলক সেদিকে তাকায় তারপর লাফিয়ে ওঠে, ‘হ্যাঁ, এই লোকটাই তো…’
‘আইসক্রিমওয়ালা, ও আইসক্রিমওয়ালা…’
‘আরে দাঁড়াও…এই খুঁটি…’
‘ও আইসক্রিমওওওয়ালা…’
পাঁচজন মিলে উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে যায় আইসক্রিমের গাড়ি ঠেলে নিয়ে যাওয়া লোকটার দিকে। দৌড়াতে দৌড়াতে বিকেলের মাঠে ছোট হয়ে আসতে শুরু করে ওরা…
ওই লোকটাই কি ওদের দেখা সেই আইসক্রিমওয়ালাটা? যাকে আইসক্রিম খেয়ে ওরা পয়সা দিতে পারেনি? আর তারপর খুব মন খারাপ করেছিল? নাকি অন্য কেউ?
ওরা ভেবে দেখেনি। কী যায় আসে কার কাছে কী পাওনা রয়ে গেছে, কাকে কিছু দেওয়া বাকি থেকে গেছে? কার থেকে ভালোবাসা নিয়েছি, ঘৃণা নিয়েছি? কার কাছে যন্ত্রণা, কার কাছে যত্ন পড়ে আছে? সে বোঝার বয়স ওদের হয়নি।
ওরা কেবল বিকেলের মাঠে উন্মাদের মতো ছোটাছুটি দৌড়দৌড়ি করে ধুলো মাখতে শিখেছে। মুঠো মুঠো রোদের কণা বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে সেই হলদে রেণুতে স্নান করতে শিখেছে। প্রথম প্রেমের কাছে হাঁটু মুড়ে বসতে শিখেছে, প্রথম অপেক্ষার কাছে জলের দামে সময় বিক্রি করতে শিখেছে…
ওদের কিছুতে কিছু যায় আসে না…
.
শেষ
রাখাল ছেলের সঙ্গে ধেনু চরাব আজ বাজিয়ে বেণু,
মাখব গায়ে ফুলের রেণু চাঁপার বনে লুটি। আহা, হাহা, হা।।
‘মা…’ গানের মাঝখানেই মাকে থামিয়ে দেয় মণি। কী একটা ভাবনা তাকে ভাবিয়ে তুলেছে।
‘কী হয়েছে আবার?’ অমৃতা জিগ্যেস করেন।
‘রাখাল ছেলেরা বিকেল হলে বাড়ি চলে যায় কেন?
অমৃতা হেসে মেয়ের মাথায় হাত রাখেন, ‘কারণ তোর যেমন বাড়ি আছে তেমন রাখাল ছেলেদেরও বাড়ি আছে। সেখানে তাদের জন্য তাদের মা-বাবা অপেক্ষা করে।’
‘মা-বাবা অপেক্ষা না করলে রাখাল ছেলেরা আর বাড়ি ফিরবে না?’
অমৃতা কয়েক পলকের জন্য গম্ভীর হয়ে যান। আবার মুখে হাসি ফুটিয়ে বলেন, ‘মা বাবা অপেক্ষা না করলে বন্ধুরা করে। বন্ধুদের জন্যও ফিরতে হয়।’
‘বন্ধুরাও যদি অপেক্ষা না করে?’
‘তাহলে নিজের জন্য ফিরতে হয় মা। মোট কথা রাত হয়ে গেলে রাখাল ছেলেদের আর বাড়ির বাইরে থাকে নেই।’
মণি চিন্তায় পড়ে যায়। নিজের জন্য কে বাড়ি ফেরে? নিজে তো এমনিতেই নিজের কাছে থাকে। তার কাছে আবার আলাদা করে ফিরতে হয় নাকি? তাহলে কি নিজের ভিতর আর একটা ‘নিজে’ থাকে? না অনেকগুলো ‘নিজে থাকে?
‘আর নিজেও যদি অপেক্ষা না করে?’
অমৃতার ঘুম পেতে শুরু করেছিল, অত ভাবনা চিন্তা না করে একটা উত্তর দিয়ে দেন, ‘তাহলে সেই রাখাল ছেলে খুব দুঃখী। তাকে বাঘে খেয়ে নেবে।’
মণির মনটা খারাপ হয়ে যায়। রাখাল ছেলে কী এমন দোষ করল যে তাকে বাঘের পেটে যেতে হবে? সে তো শুধু এটুকু চেয়েছিল তার জন্য ও কেউ অপেক্ষা করুক। মা-বাবা, বন্ধু, পোষা বিড়াল, খেলার মাঠ, ইশকুল বাড়ি, ছেঁড়া পুতুল…এটুকু চেয়েছিল কেউ বিকেল হলে তার পথের দিকে চেয়ে থাকুক…
মন খারাপ করে পরদিন পুকুরের ধারে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল মণি। কিছুক্ষণ ছলছল চোখে জলের দিকে চেয়ে থেকে কাগজের উপরে ট্যারাবাঁকা হাতের লেখায় লিখেছিল, ‘শোনো, যেসব দুঃখী রাখাল ছেলের জন্য কেউ অপেক্ষা করে নেই, তুমি তাদের বাঘের হাত থেকে বাঁচিও, কেমন?’
তারপর কাগজটা নৌকা বানিয়ে ভাসিয়ে দিয়েছিল জলে। দুলতে দুলতে সেই নৌকা জলের উপর কিছুদূর ভেসে গেছিল। তারপর কী হয়েছিল মণি জানে না। সত্যি বাঘের হাতের থেকে রাখাল ছেলেদের কেউ বাঁচিয়েছিল কিনা তাও জানে না। মণি জানে, ডুবন্ত নৌকার দিকে তাকিয়ে থাকতে নেই…
***
