তালদিঘিতে ভাসিয়ে দেব – ২
দ্বিতীয় অধ্যায়
টিফিনের ঠিক আগের ক্লাসটা অফ ছিল সঞ্জয়স্যারের। সেভেন বি-এর ফাঁকা ক্লাসে ঢুকে পরীক্ষার খাতা দেখা শুরু করেছিলেন। ইউনিট টেস্টের খাতা বাড়িতে নিয়ে যান না সঞ্জয়। স্কুলের কাজ স্কুলেই সেরে যান। কিন্তু টিচার্স রুমে যা হইচই লেগে থাকে তাতে খাতা দেখা বালাই। অগত্যা ক্লাসের মাঝে অফ পেলে একটা ফাঁকা ক্লাসরুম খুঁজে নেন। কাজ এগিয়ে রাখেন।
গোটা কুড়ি খাতা দেখার পর পিঠটা একটু এলিয়ে দিয়েছিলেন। এমন সময় ইলেভেন বি-এর মনিটর সাম্য দৌড়ে এসে প্রায় আছড়ে পড়ল টেবিলের উপরে। সঞ্জয় এমন আচমকা আক্রমণে একটু থতমত খেয়ে গেলেন।
‘খুঁটিকে মেরে ফেলবে স্যার। মাথা ফাটিয়ে দেবে। স্যার খুঁটি…’ সাম্য আটকে থাকা শ্বাসের দাপটে বাঁশপাতার মতো কাঁপতে থাকে৷
‘কে মেরে ফেলবে?’
খুঁটির ভালো নাম ঋতবান সেন। সাম্য আর খুঁটি দুজনেই সঞ্জয়স্যারের প্রাইভেট কোচিংয়ে পড়ে। খুঁটি পড়াশোনায় মোটামুটি। কুড়ির আশেপাশে ঘোরাফেরা করে রোল নম্বর। তবে বাপের কাঁচা পয়সা আছে বিস্তর। ফলে সময়মতো মাইনে এবং মাস গেলে এটা-ওটা সুবিধা পান। ছেলেটার উপর তাই একটা আলাদা স্নেহ আছে তার।
উলটোদিকে সাম্যজিৎ ঘোষ বরাবর এক থেকে দশের মধ্যে থাকে। লম্বাটে, মিষ্টি চেহারা। ওর বাড়ির লোক মাঝে মাঝেই সঞ্জয়স্যারের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। ছেলের নামে তেমন বাজখাঁই অভিযোগ না পেলে মুখ চুন করে ফিরে যান। অভিযোগ পেলে ছেলেকে পারলে টিচার্স রুমে ফেলেই চাবকে দেন। গায়ে-হাতে-পায়ে কালশিটে নিয়ে স্কুলে আসে ছেলেটা। সঞ্জয় এটুকু বুঝেছে বাড়ির লোক সাম্যকে ভয়ঙ্কর রকম শাসনে রেখেছে। ফলে স্কুলের বাইরে বেরোলেই জুবুথুবু হয়ে থাকে ও। খানিকটা দয়ামায়া করেই ওকে মনিটর বানিয়ে দিয়েছেন সঞ্জয়স্যার।
‘অ্যাঁ, কী হয়েছে?’ সঞ্জয় জিগ্যেস করেন।
কোনওরকমে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে সাম্য, ‘নতুন একটা মেয়ে স্যার। একটু আগে খুঁটির সঙ্গে ঝামেলা লেগেছিল। ওর মাথাটা ধরে ঠুকে দিচ্ছে জানলায়।’
সঞ্জয় বুঝতে পারেন ব্যাপারটা গুরুতর। ক্লাসরুমের মধ্যে একটা গোলমাল লেগেছে। সাম্যর মুখ দেখে খানিকটা দুশ্চিন্তাই হয় তার। কোনওক্রমে খাতা দেখা বন্ধ করে দ্রুত ছুটে যান ইলেভেন বি-এর দিকে৷
ক্লাসে পৌঁছে সঞ্জয় দেখেন ততক্ষণে পরিস্থিতি গরম হয়ে উঠেছে। ছেলেপিলের দল ভিড় করে আছে ডায়েসের কাছে। জটলার ভিতর থেকে তীব্র হুঙ্কারের শব্দ ভেসে আসছে।
উঁকি মেরে সঞ্জয় দেখেন ইলেভেনে নতুন ভর্তি হওয়া একটা মেয়ে খুঁটির চুলের মুঠি ধরে দাঁড়িয়ে আছে। খুঁটির সমস্ত মুখ লাল, চোখদুটো প্রায় ঢুলুঢুলু। এমনিতেই সে কঞ্চির মতো রোগা, তার উপরে মার খেয়ে নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম হয়েছে৷ নীল টি-শার্টের বেশ কয়েকটা বোতাম ছিঁড়ে গেছে। জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে।
খানিক নিশ্চিন্ত হন সঞ্জয়। তেমন বড় কিছু ব্যাপার নয়। খুঁটির মাথা ফাটেনি। বড়জোর দু-একটা চড় চাপাটি পড়েছে।
‘হচ্ছেটা কী এখানে? ‘গমগমে গলায় চেঁচিয়ে ওঠেন সঞ্জয়। স্যারের রুদ্রমূর্তি দেখে মেয়েটা থেমে যায়। চুলের মুঠি থেকে হাতটা আলগা হয়। মৃতপ্রায় হরিণ শাবক খুঁটিকে ছেড়ে দেয় সে। তারপরে হাতের তালু দিয়ে ঠোঁটটা মুছে নেয়।
ধস্তাধস্তিতে খুঁটির চশমা খুলে পড়েছে মেঝেতে। মেয়েটা সেটা তুলে একরকম ছুড়ে দেয় ওর দিকে। ফোঁসফোঁসানিটা কমে আসে।
‘যে যার নিজের জায়গায় গিয়ে বসো। যাও!’ শেষ শব্দটায় গলার স্বর আরও কয়েক পর্দা বাড়িয়ে নেন সঞ্জয়। জটলাটা শান্ত হয়ে যায় মুহূর্তে।
সঞ্জয় মেয়েটার সামনে এগিয়ে যান। কোনওরকমে রাগ সংবরণ করে বলেন, ‘ওকে মারছিলে কেন? তুমি জানো না মাথা ঠুকলে মানুষ মরে যেতে পারে?’
মেয়েটা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকে। ধীরে সুস্থে বলে, ‘মাথা না, কপাল ঠুকছিলাম স্যার। মাথা যত সহজে ফেটে যায়, কপাল ফাটানো তত সহজ নয়। কপাল মাথার মতো গোল নয়, ফলে ফ্ল্যাট সারফেসে ট্রমা…’
‘সাট আপ! অন্যায় করে মুখে মুখে তর্ক। ওকে মারছিলে কেন সেটা জিগ্যেস করেছি।’
মেয়েটা একটা আঙুল তুলে দেখায়, ‘ওই জানলাটার পাশে আমি বসি। আজ ও বসবে বলে জেদ করছিল।’
সাম্য পেছনেই দাঁড়িয়েছিল, সঞ্জয় সেদিকে মুখে তুলে তাকান, ‘বেঞ্চ রোটেশন চালু আছে না? এক জায়গায় একই রোল নম্বর দিনের পর দিন
বসে?’
সাম্য হাঁ-হাঁ করে ওঠে, ‘হয় তো স্যার, কিন্তু ওকে বললেও শোনে না। ও রোজ ওখানেই বসবে।’
রাগের মধ্যেই একটা বিচিত্র ভাবনা মাথায় আসে সঞ্জয়ের, মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘গোটা ক্লাস রোটেশন হচ্ছে যখন তখন এক জায়গায় বসে থাকলে তোমার বন্ধু হবে কী করে?’
মেয়েটা এতক্ষণে মুখ তোলে, ‘বন্ধু লাগবে না স্যার। আমার জানলা হলেই চলবে।’
সাম্য এই সুযোগে আগুনে ঘি ঢালে, ও ওরকম রগচটা স্যার। কথায় কথায় একে ওকে মেরে দেয়! সবাই জানে।’
সঞ্জয় ধমক দেন, ‘তোমরা হাই স্কুলে পড়ছ না নার্সারিতে?’
কারো মুখে কোনও উত্তর নেই। কিছুক্ষণ সেভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন সঞ্জয়স্যার। তারপর গলায় পুরোনো রাগটা ফিরিয়ে এনে বলেন, ‘তোমার বাবার নম্বর দাও তো। ছুটির পর দেখা করতে বলছি।’
নম্বর দিয়ে দেয় মেয়েটা, ‘অপরেশ ভট্টাচার্য।’
নম্বরটা নিজের ফোনে সেভ করে নেন সঞ্জয়। তারপর মনিটরকে বলেন, ‘আজ থেকে ও জানলার পাশে বসবে না। রোটেশনে এলেও না। ও…’ চারদিকে চেয়ে একটা গোবেচারা দেখতে মুখ খুঁজে নেন সঞ্জয়, ‘ব্যাদা, ব্যাদার পাশে বসবে।’ কথাটা বলে খুঁটির দিকে তাকান, ‘তুমি আমার সঙ্গে এসো।’
গটগট করে ক্লাস থেকে বেরিয়ে যান সঞ্জয়। খুঁটি একবার মেয়েটার দিকে হিংস্র দৃষ্টি হেনে সে পথে পা বাড়ায়। ক্লাসরুম জুড়ে ছড়িয়ে পড়া শান্ত ভাবটা আবার গুঞ্জনে বদলে যায়।
‘শালা ছোটলোক।’ বিড়বিড় করে গালি দেয় আগমনী, তারপর হাত দিয়ে কপালে জমে থাকা ঘাম মুছে নেয়। এলোমেলো হয়ে যাওয়া ওড়নাটা ঠিক করে নিয়ে ব্যাদার পাশে এসে ব্যাগটা আক্রোশে বেঞ্চের উপর আছড়ে ফেলে।
ব্যাদার ভালো নাম বেদান্ত। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, একমাথা কাকের বাসার মতো চুল সারাক্ষণ মাথার উপর ঝুঁকে রয়েছে। গোলগাল চেহারা। তবে দেখতে গোবেচারা হলেও ক্লাসের সকলে জানে সে আদতে রাম সেয়ানার এক সেয়ানা।
বেদান্তর ব্যাপারে স্কুলে কিছু গুজব চালু আছে৷ লোকে বলে ব্যাদার বাপ মায়ের দেখা হয়েছিল লাইব্রেরিতে। তবে কথা হয়েছিল অনেক পরে। কারণ লাইব্রেরিতে কথা বলা মানা। বইয়ের উপর দিয়ে দুজন দুজনের দিকে চেয়ে বসে থাকত। এরকমই একদিন লাইব্রেরির পুরোনো বইয়ের ঘরে দুজন মিলিত হয়। বেদান্তর মায়ের মুখ দিয়ে পাছে শীৎকার বেরিয়ে যায়, তাই ওর বাপ হাতের কাছে আর কিছু না পেয়ে লাইব্রেরিরই ক’টা গল্পের বইয়ের পাতা ছিড়ে ওর মায়ের মুখে গুঁজে দেয়। সেই গল্পের বইয়ের পাতা মুখে নিয়ে সেক্স করার ফলে বেদান্তর জন্ম হয়। ফলে স্বাভাবিক নিয়মে সে ছেলে বড় হয়ে গল্পের বইতেই মজে থাকে সারাক্ষণ। গল্পের বইয়ের ফাঁক দিয়ে টেরিয়ে টেরিয়ে সেয়ানা চোখে দুনিয়াকে দেখে সে।
ব্যাদার পেছনে সচরাচর কেউ লাগে না। কেবল স্কুল চত্বরে ওকে বই মুখে বসে থাকতে দেখলেই, ‘ব্যাদা মুখে নিয়েছে’ বলে কারা যেন ছুটে পালিয়ে যায়।
তবে ক্লাস ইলেভেনে ওঠার পর থেকে খানিকটা প্যাঁক খাওয়ার যন্ত্রণাতেই ব্যাগে বই নিয়ে আসা কমে গেছে ব্যাদার। ক্লাসরুমের ছেলেরা বলে, ও নাকি মাঝেমধ্যে ব্যাগে লুকিয়ে লুকিয়ে মোবাইল নিয়ে আসে। তবে ব্যাদা মোবাইলে ঠিক কী করে তা রহস্য রয়ে গেছে।
আগমনী ব্যাগটা আছড়ে ফেলতে কেঁপে উঠল ব্যাদা। নাকের ডগাটা চুলকে নিল একবার। তারপর ওকে জায়গা দিয়ে একটুখানি সরে বসল। জমিয়ে বসতে বলতে ছেলেটাকে একবার আপাদমস্তক জরিপ করল আগমনী। হাতের দিকে ইশরা করে বলল, ‘আজ হাতে নিসনি?’
ব্যাদা মাথা কাত করল, ‘হুম, নিয়েছিলাম। ঝামেলা শুরু হতেই ঢুকিয়ে রেখেছি ব্যাগে।’
‘কেন?’
‘তোদের অকারণ ক্যাচাল দেখতে বেশ মজা লাগছিল।’
‘অকারণ!’ আগমনীর একটু আগের রাগটা ফিরে আসার উপক্রম হয়, আমি এই জানলাটার পাশে ছাড়া বসি না, সেটা ও জানে না?’
‘জানে, কিন্তু তুই জানিস না।’
‘কী জানি না?’
উত্তরটা দেবার আগে একবার ভালো করে আশপাশ দেখে নেয় ব্যাদা৷ তারপর অবস্থা ভরে সামনে মুখ ঘুরিয়ে বসতে বসতে বলে, খুঁটি শালা বড়লোক বাপের লাল্টু ছেলে। কালো হয়ে যাওয়ার ভয়ে চামড়ায় রোদ লাগায় না৷ ও আজ অবধি কোনওদিন জানলার ধারে বসেনি।’
একটু অবাক হয় আগমনী, ‘তাহলে আজ বসতে চাইল কেন?’
‘আমি কী করে জানব? নিশ্চয়ই কোনও ছকবাজি আছে৷’ কথাটা বলে বেদান্ত ব্যাগ থেকে আবার একটা বই টেনে বের করল। ঝামেলা থেমে গেছে বলে তার বিনোদনও শেষ। আবার বইয়ের পাতায় মন দেয় ও। আগমনী মুখ ফিরিয়ে নিতে গিয়ে বলে, ‘তোকে দেখে বোঝা যায় না, তুই এত নজর রাখিস চারদিকে।’
‘রাখি না, রাখতে বাধ্য হই। এ শালারা ক্লাসে এমন গাধার বাচ্চার মতো চেঁচায় যে কিছুতে মন দেওয়া যায়?’
ওর পিঠে একটা শক্ত চাপড় মারে আগমনী। মুখ ভেঙচে বলে, ‘বাধ্য হও, তাই না? ন্যাকা! আমি দেখিনি ভেবেছিস?’
‘কী দেখলি তুই?’
‘তুমি বইয়ের ফাঁক দিয়ে ওই সেকেন্ড বেঞ্চের মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকো কেন চাঁদ?’
বেদান্ত থতমত খায়, ‘সে কী! কোন মেয়ে?’
‘ন্যাকা সাজলে শালা কানের গোড়ায় দেব। কোন মেয়ের কথা বলছি জানো না?’
এতক্ষণ একটু নড়েচড়ে বসে ব্যাদা। গলকণ্ঠটা একবার উপরে উঠে ঝট করে নিচে নেমে আসে। হাতের বইটা ধীরেসুস্থে বন্ধ করে চাপা গলায় বলে, ‘আমি দেখি৷ কিন্তু বিশ্বাস কর, আমার কোনও খারাপ ইয়ে নেই!’
‘আরে ধুর মরা, মেয়ে কি এফটিভি নাকি যে দেখা যাবে না? দেখ, যদি সেটিং ফেটিং করার থাকে…
ব্যাদা আর কিছু বলে না৷ কী ভেবে নিয়ে দ্রুত হাতে ব্যাগ থেকে আরেকটা গল্পের বই টেনে বের করে পাতা ওলটাতে থাকে। আগমনী বিরক্ত হয়, ‘আরে, বলবি তো!’
‘উফ, দাঁড়া…’ ঝটাঝট পাতা উলটে একটা ইলাস্ট্রেশনে এসে থামে ব্যাদা। আগমনী চেয়ে দেখে বইটা ছোটদের রূপকথার বই। ভগন মণ্ডলের মেয়ে আর কালরাক্ষস। ছোটবেলায় ওর নিজেরও একটা এরকম চটি বই ছিল। সম্ভবত জন্মদিনে কিনে দিয়েছিল কেউ। তারপর কালের নিয়মে হারিয়ে গেছে। এ বইটায় যত না লেখা তার থেকে বেশি পাতায় পাতায় ছবি। রংচঙে ছবিগুলো দেখলেই পড়ে ফেলতে ইচ্ছা করে বইটা। তারই একটা পাতা খুলে ওর দিকে এগিয়ে দেয় ব্যাদা।
‘এই ছবিটা দেখ।’
ব্যাদা যে ছবিটার উপরে আঙুল রেখেছে সেটা তেমন আহামরি কিছু না। একটা বিশাল থ্যাবড়ামুখো রাক্ষসের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে একটা বছর পনেরোর মেয়ে। তার হাতে একটা লম্বাটে তরোয়াল। ঠোঁটের কোণে লেগে আছে নরম হাসি। ছবি থেকে মুখ তুলে তাকায় আগমনী, ‘হ্যাঁ, তো কী হয়েছে?
‘ভালো করে দেখ।’ চোখের মোটা পাওয়ারের চশমাটা একবার ঠেলে উপরে তোলে ব্যাদা। ওর গোলগোল চোখগুলো উজ্জ্বল দেখায়। ছবির মেয়েটার মুখের দিকে আবার আঙুল নির্দেশ করে, ‘এই মেয়েটাকে অবিকল ওই মেয়েটার মতো দেখতে না?’
কথাটা শুনেই আবার ব্যাদার পিঠে একটা চাঁটি মারতে যাচ্ছিল আগমনী, কিন্তু থেমে যায়। ছবির মেয়েটার মুখের দিকে স্পষ্ট চোখ পড়েছে ওর। আর তাতেই ও থেমে গেছে৷
আগমনী বইটা হাতে তুলে ধরে। বইয়ের ঠিক পাশ দিয়ে দেখা যাচ্ছে সেকেন্ড বেঞ্চে বসে থাকা মেয়েটাকে। ক্লাসের হইহল্লার মধ্যে চুপ করে বসে আছে মেয়েটা। মাথার কোঁকড়া চুল ক্লিপ দিয়ে বাঁধা আছে বলে মুখের অনেকটা অংশ দেখা যাচ্ছে পেছনে থেকে। ওর সামনেও একটা বই খোলা। আগমনী অবাক হয়ে দেখে এই রূপকথার বইয়ের ছবির মেয়েটার সঙ্গে সেকেন্ড বেঞ্চের মেয়েটার মুখের কোনও পার্থক্য নেই। একমাথা কোঁকড়া চুল। অদ্ভুত মোহময়ী চোখ। ঠোঁটের পাশে তিলটা অবধি মিলে গেছে৷ যেন ওকে দেখেই এই মেয়েটাকে আঁকা হয়েছে। বইয়ের আঁকার সঙ্গে কারো মুখ মিলে যেতেই পারে, কিন্তু এতটা নিখুঁত সাদৃশ্য কল্পনা করা যায় না। আশ্চর্য!
ধীর হাতে বইটা নামিয়ে রাখে আগমনী। ব্যাদা ততক্ষণে বলে চলছে, ‘এই বইটা ছোট থেকে রয়ে গেছে আমার কাছে৷ জানি না কেন, অন্য সব ছোটবেলার জিনিস হারিয়ে গেছে, শুধু এইটা হারাতে চায় না। আর এই ছবিটা… এই মেয়েটার ছবিটা…মনে হয় ওকে যেন আগে কোথাও দেখেছি। কিন্তু…’
‘একটা ছবি মিলে যেতেই পারে। তাতে কী?’ কথাটা শেষ করে না আগমনী। পরের পাতায় আবার একটা ছবি। এবার একটা আয়না হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে হাসছে মেয়েটা। এই হাসিটাও অবিকল সেকেন্ড বেঞ্চের মেয়েটার মতো৷ ঝটপট পাতা ওলটাতে থাকে ও। নাহ্, কোনও সন্দেহ নেই। যতগুলো ছবি আছে বইতে তার সবক’টায় ওই মেয়েটাকেই আঁকা৷
অদ্ভুত ব্যাপারটায় অস্বস্তি হয় আগমনীর। প্রসঙ্গটা পাল্টানোর চেষ্টা করে, ‘সেটা তো তোর এতদিনে সয়ে যাওয়ার কথা। আজও তাকিয়ে বসে আছিস কেন?’
‘মনে হয়, ও যেন রোজ একটু একটু করে পালটে পালটে এই মেয়েটা হয়ে যাচ্ছে!’
পাশের ক্লাসে মনে হয় টিচার এসে ঢুকেছে। সেদিক থেকে ভেসে আসা চিৎকার হুট করেই থেমে যায়। জানলা দিয়ে একটা দমকা হাওয়া ভেসে আসে। তাতে সামনে খুলে রাখা বইটার পাতা উলটে একটা বিশেষ জায়গায় স্থির হয়ে যায়। সেই পাতাটায় কিছু চোখে পড়ে আগমনীর। হাত বাড়িয়ে বইটা তুলে নিয়ে আবার চোখের সামনে ধরে।
খুব ধীরে ধীরে জানলা দিয়ে আসা সূর্যের আলোয় ধরে বইটা। ছবিটা যে পাতায় আঁকা হয়েছে তার ঠিক পেছনে ছবিটার একটা হালকা আউটলাইন ফুটে আছে। সেই আউটলাইনের মাঝে ভালো করে তাকালে কয়েকটা ক্ষীণ হয়ে যাওয়া কালির দাগ লক্ষ করা যায়। আগমনী বইটা আরও কাছে এনে লেখাটা পড়ার চেষ্টা করে। হ্যাঁ…একটা নাম লেখা হয়েছিল এখানে। এমন সময় দুম করেই সমস্ত ক্লাসে নিস্তব্ধতা নেমে আসে।
ম্যাথের স্যার আশিসবাবু ক্লাসে ঢুকছেন।
স্কুলের পাশে ধুলোয় ঢাকা একটা মাঠ। সকাল থেকে রোদ ঝিমিয়ে থাকে তার উপর। মাঝে মাঝে কোথা থেকে যেন উত্তাল হাওয়ার ঢেউ আসে। মাঠের চারদিকে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকা ঝাঁকড়া গাছের মাথায় সরসর করে আওয়াজ ওঠে। গাছের হলদে ফুলের রেণু খয়েরি মাঠের উপর এসে পড়ে। সারাদিন ধরে জমে থাকা রেণুও মাঠের ধুলোর সঙ্গে মিশে ঘুমিয়ে পড়ে। তারপর একসময় টিফিনবেলায় ছেলেমেয়েদের হল্লা আর বুটের ছোটাছুটিতে ধরা পড়ে যাওয়া আলিঙ্গনরত প্রেমিক প্রেমিকার মতো তারা উড়ে পালায়। স্কাই-ব্লু স্কুল ড্রেসে ভরে যায় মাঠটা। ঠিক আধ ঘণ্টা পর বুট আর স্কুল ড্রেস মাঠ ছেড়ে চলে গেলে উড়ন্ত ধুলোরা আবার আগের মতো একা পড়ে থাকে। হলদে রেণুগুলো কোথায় গিয়ে পড়ে কেউ জানে না।
আজও মাঠে নিচু ক্লাসের কিছু বাচ্চা ক্রিকেট খেলছে দল বেঁধে। তাদের হইহল্লার আওয়াজ ভেসে আসছে মাঝে মধ্যে। আগমনীর মনে পড়ে প্রাইমারি স্কুলে পড়তে ও পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলত। অল্প বয়সে সব মেয়েরাই অমন একটু খেলে থাকে। বন্ধুবান্ধবের জোরাজুরিতে আগমনী একবার বাবাকে ব্যাট কিনে দেওয়ার জন্যও বায়না করেছিল। বাবা রাজি হয়নি। শেষে মাকে গিয়ে ধরায় কাজ হয়। মা হাসতে হাসতে বলেছিল, ‘মেয়েমানুষ ক্রিকেট খেলার শখ হয়েছে, কিনে দাও। ক’দিন পর নিজে থেকেই চলে যাবে।’
তবে ব্যাট কিনে বিশেষ লাভ হয়নি। আগমনী আগে ব্যাটিং পেত বটে, কিন্তু ওকে সিরিয়াসলি নেয়নি কেউ। মেয়েরা ক্রিকেট খেললে ছেলেরা ইচ্ছা করে লুজ বল দেয়। জেনে বুঝে একটা দুটো ক্যাচ মিস করে। সেই লুজ বল খেলতে খেলতে মেয়েদের ধারণা হয় যে ক্রিকেট বোধহয় লুজ বলেরই খেলা। তাই একসময় আর আগ্রহ থাকে না৷
ব্যাপারটা মনে পড়লে হাসি পায় আগমনীর। ছেলেরা বৃথাই বলে থাকে যে মেয়েরা রহস্যময়, তাদের নাকি বোঝা যায় না। এদিকে মেয়েদের জীবনে সব থেকে বড় সমস্যা হল তাদেরকে সবাই আগে থেকে জেনে বুঝে বসে আছে।
‘কী দেখিস জানলা দিয়ে?’ মাঠের ধারের পাঁচিলে আগমনীর পাশে বসেই টিফিনবক্স থেকে ম্যাগি খাচ্ছিল বেদান্ত। চামচে একদলা নুডলস জড়িয়ে মুখে তুলতে তুলতে প্রশ্ন করল।
‘একটা শালিক পাখির বাসা আছে। আর একটা ফেরিওয়ালা মাঠ দিয়ে হেঁটে পার হয়ে যায় টিফিনের একটু আগে। ওদের না দেখলে আমার মন কেমন করে।’
কথাটা তেমন বিশ্বাস হয় না ব্যাদার। মেয়েটাকে কেমন ন্যাকা মনে হয় ওর, ‘বাড়িতে জানলা নেই তোর?’
‘ছিল, আমার ঘরেই একটা ছিল। চাপা দিয়ে দিয়েছে।’
‘যাচ্চলে। খামোখা জানলা চাপা দিল কেন?’
আগমনী মুখ দিয়ে ব্যঙ্গসূচক একটা শব্দ করে, ‘কোনও বাস্তু বিশেষজ্ঞ মাকে বলেছে, পশ্চিমদিকে জানলা থাকা নাকি অশুভ। মা ওসব হেব্বি বিশ্বাস করে, তাই দেওয়াল তুলে একেবারে আটকে দিয়েছে।’
‘তোর মা এসব বিশ্বাস করে?’
‘আমাকে ছাড়া মা সব কিছুতেই বিশ্বাস করে।’
‘যেমন?’
‘যেমন মায়ের ধারণা আমি সিগারেট খাই। অথচ আজ অবধি আমার ঘরে প্যাকেট পায়নি, মুখে গন্ধ পায়নি। তাও…’
হাসে বেদান্ত, ‘মানে তুই সিগারেট খাস?’
‘আমার জায়গায় থাকলে তুইও খেতিস।’
বেদান্তর ম্যাগি শেষ হয়েছে। ও টিফিনবক্স হাতে নিয়ে উঠে পড়ে। এখন এপ্রিল মাস, রোদের তেজ চড়া। ওরা যেখানে বসেছিল, সেখানে এখন রোদ এসে পড়েছে। দূরে গাছের ছায়ার দিকে এগিয়ে যায় দুজনে।
দুজনের গায়ে মাঠের উড়ন্ত ধুলো জমে। নেভিব্লু প্যান্টের ফোল্ডে ঢুকে জমে থাকে। বাড়ি গিয়ে প্যান্ট ছাড়ার সময় খসে পড়বে সেই ধুলো। তখন মাঠের এই সময়টার কথা মনে পড়ে যাবে হুট করে। ছোটবেলায় যারা মাঠে খেলেছে তাদের সবার প্যান্টের ফোল্ডেই অমন খানিকটা ধুলো রয়ে গেছে। বড় হওয়ার পরও থেকে থেকে চলকে পড়ে সেসব। শেষ হয় না।
‘সিগারেট খেতাম কিনা জানি না, কিন্তু তোর জায়গায় থাকলে আমি একটা কাজ করতাম।’ বেদান্ত হাঁটতে হাঁটতেই অন্যমনস্ক গলায় বলে৷
‘কী করতিস?’
‘ওই যে, যেই দেওয়ালে একটা জানলা বুজিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেখানে একটা বুকসেলফ করতাম।’
‘কেন?’
‘জানলা আর বুকশেলফ সেম থিং, একই কাজ করে।’
বইয়ের কথায় খানিক উদাস হয়ে যায় আগমনী। একমনে সামনের দিকে হাঁটতে থাকে। তার গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে ব্যাদা বলে, ‘তুই কী ভাবছিস বল তো?’
‘ওই মেয়েটার কথা। যত সময় যাচ্ছে, মনে হচ্ছে একদম যেন ওকে দেখেই আঁকা হয়েছে ছবিটা! আচ্ছা…’ মুহূর্তে ওর দিকে ফিরে তাকায় আগমনী, ‘এমনও তো হতে পারে ছবিটা যে এঁকেছে সে মেয়েটার কেউ হয়।’
বেদান্ত ঠোঁট ওলটায়, ‘ছদ্মনামে লেখা। ‘চিত্রকল্প’ বলে কেউ একজন নিজেই লেখে আর নিজেই আঁকে। লোকটা ওরকম রূপকথার বই আরও অনেকগুলো লিখেছে। হেব্বি সেল।’
আগমনী একটু ভাবে, ‘এমনও তো হতে পারে এই চিত্রকল্প আসলে মেয়েটার বাবা কিংবা আত্মীয়।’
‘উঁহু’, দুদিকে মাথা নাড়ায় ব্যাদা, ‘সেটা হওয়া সম্ভব না। বইটা বাবা সেকেন্ড হ্যান্ড কিনে এনেছিল আমার জন্য। সামনের পাতায় দেখেছি উনিশশো আশিতে ছাপা হয়েছিল এই এডিশনটা। তখন তো মেয়েটার জন্মই হয়নি।’
‘সেকেন্ড হ্যান্ড…’ আরও কয়েক সেকেন্ড চুপ করে কী যেন ভাবে আগমনী, তারপর বলে, ‘আচ্ছা বইটা তো ছোটদের। ওই বয়সে মানুষ নিজে নিজের বই তো কিনতে পারে না৷ মানে বড় কেউ কিনে উপহার দিয়েছিল। ওটার সামনের পাতায় কিছু লেখা টেখা ছিল না?’
থমকে দাঁড়িয়ে যায় বেদান্ত। কয়েক মুহূর্ত গালে হাত দিয়ে কী যেন ভাবে। তারপর বলে, ‘যতদূর মনে পড়ছে, কিছু লেখাও ছিল। কিন্তু ওই পাতাটা ছিঁড়ে গেছে।’
‘ধুর!’ হতাশ হয় আগমনী।
সেটা লক্ষ করেই ওকে অভয় দেয় ব্যাদা, ‘তবে খুঁজলে পাওয়া যেতে পারে।’
জিভ দিয়ে শব্দ করে আগমনী, ‘ধুর, ছেলেবেলায় হারিয়ে যাওয়া জিনিস খুঁজলে আর পাওয়া যায় না। আমার একটা টেট্রিস ছিল, জানিস? লম্বাটে দেখতে যন্ত্র। উপরে একটা ছোট স্ক্রিন থাকত আর নিচে চার পাঁচটা হলদে বাটান…’
ব্যাদা নরম হাসি হাসে, ‘আমিও বায়না করেছিলাম। বাবা কিনে দিতে পারেনি, পয়সা ছিল না। হারিয়ে ফেলেছিস?’
‘বহুদিন। সব থেকে খারাপ লাগে শালা কবে হারিয়ে ফেললাম বুঝতেই পারলাম না। এত পছন্দের গেম ছিল, এত যত্ন করে রাখতাম, ঠিক কবে থেকে আর যত্ন করলাম না…কবে যন্ত্রটা বুঝতে পারল ওকে নিয়ে আমি আর খেলব না? তারপর একদিন হারিয়ে গেল…কবে?’
কাঁধ ঝাঁকায় বেদান্ত, ‘কালকের খেলনা আজ হারিয়ে গেছে, আজকের খেলনা কাল হারিয়ে যাবে।’
‘আমার কী মনে হয় জানিস?’
‘কী?’
‘আসলে আমরা খেলনা নিয়ে খেলি না। খেলনারা আমাদের নিয়ে খেলে। আমাদের আশেপাশে ঘুরে ফিরে বেড়ায়। আনন্দ দেয়, মন খারাপ ভুলিয়ে দেয়, কিছুক্ষণের জন্য নাড়াচাড়া করতে দেয়। তারপর স্মৃতি রেখে অজান্তেই একদিন হারিয়ে যায়। আমাদের খালি মনে হয়, এই যাহ্, কবে যেন হারিয়ে গেছে। আসলে হারিয়ে যায়নি, ওরা যেমন ছিল তেমনই থেকে গেছে, কেবল আমরা যত্ন নিইনি আর। আমরাই বদলে গেছি।’
ব্যাদার দিকে কয়েক পলক চেয়ে থাকে আগমনী, তারপর হেসে বলে, —তুই যখন কথা বলিস মনে হয় গল্প থেকে পড়ে বলছিস।’
খানিকটা হেঁটে ছায়ার মধ্যে এসে দাঁড়ায় ওরা দুজনে। হলদে রেণু উড়ে এসে পড়ে ব্যাদার গায়ে, ‘লিখতে পারলে তো সব কিছুই গল্প হয়ে যায়। আমাদের আজকের দুপুরটাও একদিন গল্প হয়ে যাবে।’
আগমনী খেয়াল করে মাঠের উলটোদিকের প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে সেই সেকেন্ড বেঞ্চের কোঁকড়া চুলের মেয়েটা। অদ্ভুত মেয়ে। ক্লাসে দু’একজন ছাড়া কারো সঙ্গেই বিশেষ মেলামেশা করে না। ছুটির পরে শুধু কালো কুকুরটাকে আদর করে রোজ। কুকুরটাও যেন ওকে ছাড়া স্কুলের আর কারো সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চায় না।
কোঁকড়া চুল ছড়িয়ে আছে পিঠ জুড়ে। রোদ পড়ে শরীর থেকে বুঝি উজ্জ্বল আভা বেরিয়ে আসছে তার। যেন সত্যি গল্পের বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসেছে।
বেদান্তের শেষ কথাটাই ওর কানে বাজতে থাকে। আমাদের আজকের দুপুরটাও একদিন গল্প হয়ে যাবে…
এর মধ্যে নিজের মোবাইল ফোনে নাম্বারটা কয়েকবার ডায়াল করেছেন সঞ্জয়স্যার। কিন্তু বারবার ওই একই উত্তর। ফোন সুইচড অফ। মেয়েটা কি ইচ্ছে করে ভুলভাল নম্বর দিল?
মাথাটা গরম হয়ে গেল সঞ্জয়স্যারের। একটা মানুষ ভর দুপুরবেলা ফোন সুইচড অফ করে রাখবে কেন?
ফোনটা পাশে নামিয়ে রেখে আবার খাতা দেখার দিকে মন দিলেন সঞ্জয়। এর মাঝে ঘণ্টা দেড়েক পেরিয়ে গেছে৷ ইলেভেন বি-এর খাতার অর্ধেকটা দেখা হয়ে গেছে। একটা খাতা সরিয়ে পরেরটা তুলতে যাবেন, এমন সময় পাশ থেকে আওয়াজটা শুনতে পেলেন সঞ্জয়।
‘স্যার…’
খুঁটি এসে দাঁড়িয়েছে। কোনওরকমে হাতল ধরে পাশের চেয়ারটায় বসল সে। সঞ্জয় নিজেই তখন ওষুধ লাগিয়ে দিয়েছিলেন ওকে। চোট তেমন গুরুতর নয় বলে তক্ষুনি বাড়িতে খবর দেননি।
‘শরীর খারাপ লাগছে?’ ওর ক্লান্ত চোখমুখের দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করেন সঞ্জয়।
‘মাথাটা ঝিমঝিম করছে স্যার, আর গা বমি বমি।’
ঋতবানের চোখের দিকে একবার ভালো করে তাকান সঞ্জয়। সত্যিই কেমন যেন ঘোলাটে লাগছে চোখদুটো। সকালেই বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া উচিত ছিল। মাথায় লেগে যাওয়াটা মোটেই ভালো কথা নয়। ওর মাথায় হাত রাখেন সঞ্জয়, ‘আর তো একটা ক্লাস বাকি, বাড়ি চলে যাবে?’
‘না স্যার, আমি ক্লাস করে নিতে পারব। শুধু…আপনি স্যার ওকে কিছু বলবেন না।’
‘কাকে?’
‘ওই মেয়েটা, মানে ওর বাড়িতে মনে হয় কিছু প্রবলেম আছে স্যার। ওরকম একটু আধটু মারপিট কোনও ব্যাপার নয়।
‘সেটা আমার ব্যাপার। তোমাকে এত পাকামি করতে হবে না।’
‘বেশ, আমি তাহলে…’ কথাটা বলেই উঠতে যাচ্ছিল খুঁটি। হঠাৎই গাছ থেকে ফুলের মতো মাটির উপর খসে পড়ে সে। দু-হাতে মাথা চেপে ধরে মৃদু আর্তনাদ করে ওঠে।
‘একী! কী হল তোমার?’
‘মাথাটা ঘুরে গেল। জল…একটু জল…’ কাতর গলায় ডুকরে ওঠে খুঁটি। আশেপাশে তাকান সঞ্জয়। জলের বোতলটা কোথায় রেখেছেন মনে পড়ে না।
‘একটু দাঁড়াও, আমি আসছি৷’ বলেই দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে যান সঞ্জয়। সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ গতিতে মাটি থেকে উঠে দাঁড়ায় খুঁটি। পকেট থেকে অর্ধেক ভাঁজ করা একটা আনসার শিট বের করে আনে। তারপর টেবিলের উপর রাখা খাতার বাঞ্চের মধ্যে জায়গা মতো ঢুকিয়ে দেয় সেটা। তারপর আবার ফিরে আসে মাটির ওপর। চেপে ধরে মাথাটা।
জিনিসটা এত দ্রুত ঘটে যায় যে ঘরের টিকটিকিটাও টের পায় না৷
প্রায় মিনিট পনেরো পর ঘর থেকে বেরিয়ে এসে সিঁড়ি দিয়ে ছাদে চলে আসে খুঁটি। এমনিতে স্কুলের ছাদে ছাত্রছাত্রীদের আসা বারণ। তবে ইলেভেনে ওঠার পর খুঁটি বুঝেছে স্কুলের বেশিরভাগ নিয়ম ওই ক্লাস টেন অবধি। তারপর থেকে অত নিয়ম না মানলেও চলে।
ছাদে ঢোকার মেইন দরজা বন্ধ। কিন্তু পাশ দিয়ে ঢুকে একটা বাঁকানো সিঁড়ি পেরোলে লাফ দিয়ে ছাদে পৌঁছানো যায়। খুঁটি সেভাবেই আজ ছাদে পৌঁছল। লাস্ট ক্লাসটা অপশনাল সাবজেক্টের। না করলেও কোনও মাথাব্যথা নেই।
ছাদে পৌঁছে খুঁটি দেখল সাম্য আগে থেকেই বসে আছে সেখানে৷ হাতে একটা কাগজের ঠোঙা। ছাদে কেউ আসছে বুঝতে পেরেই সেটা লুকিয়ে ফেলছিল। খুঁটিকে দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে সামনে বের করে এগিয়ে দিল সেটা। তারপর সারাদিন স্কুল করা ক্লান্ত মুখে নরম হাসি হাসল।
কাগজের ঠোঙায় অন্তত গোটা আষ্টেক নানান রকমের সিগারেট। সঙ্গে এক বান্ডিল বিড়ি। যখন যেমন হাতখরচ পায়, সেই অনুযায়ী সিগারেট কিনে জমিয়ে রাখে সাম্য। যখন একেবারে পায় না তখন বিড়িই ভরসা।
খুঁজে খুঁজে একটা গোল্ড ফ্লেক তুলে নেয় খুঁটি। এটা ওর বাবা খায়। গোল্ড ফ্লেক খেলে নিজেকে কেমন বাবার মতো মনে হয় ওর। পরক্ষণে মনে পড়ে সাম্যর হাতে এখন বিশেষ পয়সা নেই। গোল্ড ফ্লেক তুলে নিলে ওর নিজের খাওয়া হবে না। বান্ডিল থেকে একটা বিড়ি নিয়ে লাইটার দিয়ে তাতে অগ্নি সংযোগ করে খুঁটি। নাকমুখ দিয়ে মৃদু ধোঁয়া ছাড়ে। কাশি হয়।
‘হল?’ জিগ্যেস করে সাম্য।
খুঁটি সরাসরি কোনও উত্তর দেয় না, ঠোঁট উলটে বলে, ‘একটা ব্যাপারেই খারাপ লাগছে শালা। আমাদের চক্করে মেয়েটা বেকার কেস খেল।’
‘তাতে কী? তোকেও তো চটকে দিয়েছে ভালো মতো।’
‘ফেল করলে বাবা আরও চটকে দিত। হ্যাঁ রে, মৌসুমির কেসটা বুঝলি কিছু?’
মৌসুমি ওদের ইংলিশ কোচিং-এ পড়ে। অন্য স্কুল। ভারি মিষ্টি একটা হাসি আছে মেয়েটার। কথা বিশেষ বলে না। কেবল মাঝে মাঝে চোখ তুলে খুঁটির দিকে চায়। খুঁটি ফি রবিবার সকালবেলা মায়ের হাতের লুচি-টুচি খেয়ে নন্টে-ফন্টে দেখে গোরক্ষবাসীর মাঠে পকাইদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলতে যায়। মৌসুমি তখন সেই মাঠের পাশেই একটা নাচের স্কুলে বাবার সাইকেলে চেপে নাচ শিখতে আসে। জানলা দিয়ে নাচের দিদিমণির নির্দেশ মতো নাচতে দেখা যায় তাকে। খুঁটি ব্যাট করলে ইচ্ছা করে তাড়াতাড়ি আউট হয়ে যায় তখন। তারপর মাঠের এককোণে দাঁড়িয়ে ল্যাং বাড়িয়ে উঁকিঝুঁকি মেরে তাকে দেখার চেষ্টা করে।
নাচ ভালো হলে হাততালি দেন দিদিমণি। মৌসুমি তখন মুখ নামিয়ে ফিক করে একটা লাজুক হাসি হাসে। খুঁটি ইলেভেনের ইউনিট টেস্ট অবধি এই তিনমাস সেই হাসির দিকে চেয়ে চেয়েই কাটিয়ে দিয়েছে। কথা বলে উঠতে পারেনি।
খুঁটির থেকে কাউন্টার নিয়ে ধোঁয়া ছাড়ে সাম্য, ‘শালা বিশেষ কারও সঙ্গে কথা বলে না। বাবার আদুরে মেয়ে। ফোন নম্বর জোগাড় করা চাপ আছে ভাই।’ ‘তাহলে সোজা বলে দেব?’ খুঁটি নিরুপায় হয়ে বলে। বিড়ির দূষিত ধোঁয়ায় কেশে ওঠে খুঁটি।
কাগজের ঠোঙা থেকে বিড়ির বান্ডিল তুলে আনে সাম্য, তারপর একটা বিড়ি সামনে তুলে ধরে বলে, ‘এই যে ধর বিড়ি, যারা সেই লেভেলের বিড়িখোর তারা আগুন দেওয়ার আগে বিড়িটা নিয়ে কানের কাছে ঘোরায়, কেন জানিস?’
‘কেন?’ কাশতে কাশতে জিগ্যেস করে খুঁটি।
‘আওয়াজ শুনে বোঝার চেষ্টা করে ভিতরের মিক্সচারের মধ্যে হাওয়া আছে কিনা, ঠিকঠাক মিশেছে কিনা৷ একটা পছন্দ হয়ে যাওয়া মেয়ে অনেকটা বিড়ির মতো। তাকে আগে তুলতুলে হাতে কানের কাছে ঘোরাতে হয়, শব্দ শুনতে হয়, বুঝতে হয়। না বুঝে আগেই আগুন ধরালে কাশিই হবে শুধু।
কাশির দমক সামলে ওর পিঠে একটা হাত রাখে খুঁটি। এই অদ্ভুত এক গুণ সাম্যর। যে বিপদেই পড়ুক না কেন, সাম্যর কাছে সেখান থেকে বেরোনোর একটা না একটা রাস্তা আছে। এবার যেমন খুঁটি শিওর জানত ইউনিট টেস্টে ফেল করবে। তাই সকালের নাটকটা করে কিছুক্ষণের জন্য খাতা হাতিয়ে ফলাও করে সব লিখেটিখে আবার জায়গা মতো চালান করে দিয়েছে।
বুদ্ধি ছাড়াও সাম্যর আরও একটা গুণ আছে। সবার নাড়ি নক্ষত্রের খবর কোনও না কোনওভাবে ওর হাতে এসে যায়। কলকাতার যে কোনও কোচিং-এর, যে কোনও স্কুলের যে কোনও ছাত্র-ছাত্রীকে সাম্য চেনে। কার সঙ্গে কে প্রেম করছে, কার দিকে ভূগোল ক্লাসের ফাঁকে কে তাকিয়ে থাকে, কার বাড়ির লোক কেমন সাম্য সব জানে। তবে এত গুণ থাকতেও ওর একমাত্র দাড়ি ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে অহঙ্কার নেই।
সমস্যা একটাই। সাম্যর নিজের বাড়ির লোক ওকে ভয়ঙ্কর চাপে রাখে। মায়ের ফোনে ভুল করেও হাত দিতে দেয় না। স্কুল আর কোচিং-এর চত্বর থেকে বাইরে বেরোলে সাম্য একেবারে ফার্স্টবয় মার্কা হাঁদাগোবিন্দ। তবে খুঁটিকে ছাড়া সে সচরাচর কোথাও নড়তে চায় না।
‘ওকে আমি কানের কাছে নাড়াব কী করে?’ খুঁটি বোকা বোকা স্বরে প্রশ্ন করে।
‘আহ্…’ সাম্য বিরক্ত হয়, ‘ওটা কথার কথা। আগে মেয়েটার ব্যাপারে ডেটা কালেক্ট করতে হবে।’
একটু নিশ্চিন্ত হয় খুঁটি, ‘তা তোর কাছে কী ডেটা আছে?’ বিড়িটাকে একেবার দাঁতের ফাঁকে কামড়ে ধরে সাম্য, ভারিক্কি গলায় বলে, ‘চন্দ্রবিন্দুর গান শোনে, নাচতে ভালোবাসে। রাহুল দ্রাবিড়ের ফ্যান। ফরসা ছেলে পছন্দ করে।’
‘এইটা তুই কী করে জানলি?’
‘এসব আবার জানতে হয়! সব মেয়েই পছন্দ করে। তুই সিনেমায় কালো হিরো দেখেছিস?’
‘অজয় দেবগণ?’
‘আরে সে তো অনিল কাপুরেরও বুকে চুল আছে৷ তা বলে তুই দেখিয়ে ঘুরে বেড়াবি? ওটা একসেপশন।’
খুঁটি সাম্যকে ভরসা করলেও মাঝে মাঝে সন্দেহ হয় ওর। অন্য ব্যাপারের মতো মেয়েঘটিত ব্যাপারে সাম্যর তেমন আইডিয়া আছে বলে মনে হয় না৷ এতদিন বয়েস স্কুলে ওর কাজটা যতটা সহজ ছিল, এখন কোয়েড স্কুল হয়ে গিয়ে বেচারা খবর রাখতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে।
‘ভাই…’ খুঁটি খোলা আকাশের দিকে চেয়ে বলে।
‘বল।’ বিড়িতে টান দেয় সাম্য।
‘কলেজে উঠলে কী হবে বল তো?’
‘কী হবে?’
দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে খুঁটির বুক ফুঁড়ে, ‘ও তো পড়াশোনায় ভালো। ভালো কলেজে উঠবে। ভালো ভালো ছেলে বন্ধু হবে। আমাকে আর কেন পাত্তা দেবে?’
সাম্য ধীরেসুস্থে বলে, ‘পড়াশোনায় ভালো হলেই ভালো বন্ধু জুটবে, তার কোনও মানে নেই।’
‘তুই কী করে বুঝলি?’
‘কারণ আমি পড়াশোনায় ভালো৷’ কথাটা বলে খুঁটির পিঠে দুবার চাপড় মেরে হাতে বিড়ি ধরিয়ে উঠে পড়ে সাম্য। তারপর এগিয়ে যায় সিঁড়ির দিকে।
খুঁটি দুম করে রেগে যায়।
‘হারামজাদা!’ বলে সাম্যর দিকে বিড়িটা ছুড়ে মারে।
ছুটির সময় স্কুল থেকে বেরোনোর মুখেই সঞ্জয়স্যারের মুখোমুখি হয়ে যায় আগমনী। একটু ঘাবড়েই যায় সে। খানিকটা ভয় ভয় মুখে চুপ করে দাঁড়িয়ে পড়ে।
সঞ্জয় এগিয়ে যান ওর দিকে। হাতের ফোনটা তুলে ধরে বলেন, ‘তুমি কার নাম্বার দিয়েছ?’
‘আপনি যার নাম্বার চেয়েছিলেন স্যার। আমার বাবার।’ ‘উনি কি বাড়ি নেই?’
‘না স্যার।’
‘কবে ফিরবেন?’
আগমনী একটু ইতস্তত করে, ‘ফিরবেন না স্যার। মানুষ মরে গেলে আর ফেরে না তো…’
‘তোমার বাবা মারা গেছেন?’ কথাটা হজম করতে একটু সময় লাগে সঞ্জয়স্যারের। মেয়েটার প্রতি একটু মায়াই লাগে। ফিরে আসতে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ কী মনে পড়তে থেমে গিয়ে বলেন, ‘তোমাদের ক্লাসের একটা মেয়ের শরীর খারাপ করেছে। ক্লাসের মধ্যেই মাথা ঘুরে পড়ে গেছে। মেয়েদেরকে বলেছি ওর কাছে থাকতে। আমরা বাড়ির লোক ডাকছি। তুমিও যাও।’
‘কোন মেয়ে?’ জিগ্যেস করে আগমনী।
‘নহর জান্নাত। চেনো?’
দুদিকে মাথা নাড়িয়ে ক্লাসের দিকেই যাচ্ছিল আগমনী। হঠাৎ কী মনে হতে ফিরে আসে।
‘স্যার, ওই মেয়েটার নাম কী বললেন? যার শরীর খারাপ হয়েছে?
‘নহর…কেন?’
চোখটা দ্রুত চঞ্চল হয়ে ওঠে আগমনীর। কী একটা মনে পড়তেই সে ক্লাসের দিকে না গিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসে।
স্কুল থেকে হেঁটে বাসস্ট্যান্ড অবধি আসে বেদান্ত। তারপর বাস ধরে। আগমনী দৌড়ে তাকে রাস্তার উপরেই ধরে ফেলে। তারপর নিজে থেকেই হাত বাড়িয়ে ওর ব্যাগের চেন খুলতে শুরু করে।
‘হল কী তোর?’ বেদান্ত অবাক হয়ে জিগ্যেস করে।
‘ওই ছবির বইটা…বইটা…’ ব্যাগ থেকে বইটা ছিনিয়ে বের করে একটা বিশেষ পাতা খোলে আগমনী। সকালে যেটা দেখতে গিয়েও দেখা হয়নি, সেই পাতার পেছনে হালকা কালির দাগে লেখা নামটা নরম সূর্যের আলোয় ধরে।
হ্যাঁ, একটা নাম লেখা হয়েছিল ছবিটার ঠিক উলটোদিকে। এখন পেন্সিলের কালিটা হালকা হয়ে গেছে। তবে ভালো করে লক্ষ্য করলে এখনও খেয়াল করা যায় নামটা, ‘নহর!
