তালদিঘিতে ভাসিয়ে দেব – ৩
তৃতীয় অধ্যায়
কফির কাপটা একহাতে ধরে একটা সিগারেট ধরাল অপরাজিতা। তারপর বারান্দার রেলিং থেকে খানিক সরে এসে বলল, ‘সকালে আমি এসে না পৌঁছালে এতক্ষণে ওর বড়সড় কিছু হয়ে যেত।’
অপরাজিতার ঠিক উলটোদিকেই দাঁড়িয়েছিল কৌশিক। সে কোনও উত্তর দেয় না। ওর কথার দিকে খুব একটা খেয়াল করছে বলেও মনে হল না৷ রেলিঙের বাইরে দিয়ে সতর্ক পায়ে একটা সাদা মেনি বিড়াল হেঁটে যাচ্ছিল। কৌশিক মন দিয়ে তার ল্যাজের দুলুনি দেখতে থাকে।
‘হঠাৎ করে কী হল বল তো মেয়েটার? মণি কি পাগল হয়ে যাচ্ছে?’ অপরাজিতা কপালে ভ্রুকুটি ফুটিয়ে জিগ্যেস করে।
‘হুঁ…’
‘হুঁ কী? তোকে আনলাম কী জন্য?’ ওর পেটে তর্জনী দিয়ে একটা খোঁচা দেয় অপরাজিতা।
কৌশিক এতক্ষণে বিড়ালের দিক থেকে ওর দিকে মুখ ফেরাল, প্রসঙ্গটা একরকম উড়িয়ে দিয়েই বলল, ‘দেখ ভাই, মানুষ পাগল হয়েই জন্মায়, পাগল হয়েই মরে। মাঝখানের এই ষাট-সত্তর বছর স্রেফ পাগলামিটাকে ধামাচাপা দিয়ে রাখার খেলা। একটা বয়স অবধি পড়াশোনার চাপ, তারপর প্রেমের, বিয়ের, রোজগারের, তারপর ছেলেমেয়ের চাপ নিয়ে আসলে পাগলামিটাকে ভুলে থাকা। ও শালার মূল সমস্যা হল ঠিক বয়সে বিয়েটা হয়নি। লাইফে কোনও চাপ নেই; তাই পাগলামিটা বেরিয়ে পড়েছে।’
বিরক্ত হয় অপরাজিতা, ‘তোর বাজে কথা রাখ। আমার জানি না কেন টেনশন হচ্ছে। একা একা থাকে মেয়েটা। কিছু একটা হয়ে গেলে…
তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে মুখ বাঁকায় কৌশিক, ‘কী আর হবে? শরীর খারাপই হবে ম্যাক্সিমাম। চিন্তার কী আছে?’
কৌশিকের পেটে আবার একটা চাপড় মারে অপরাজিতা, ‘উঁহু, সিরিয়াসলি, ওর সমস্যাটা ঠিক কোথায় হচ্ছে বল তো?’
জানলার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে বাইরের দিকে তাকায় কৌশিক। বিড়ালটা এর মধ্যে কোথায় যেন লুকিয়ে পড়েছে। বিড়ালদের এই এক স্বভাব। এই আছে, এই নেই।
‘আমার মনে হয় একধরনের মিডলাইফ ক্রাইসিসে ভুগছে। সারাজীবন এ ঘাটের ও ঘাটের জল খেয়ে এখন জীবনে আর কিছুই পড়ে নেই। তাই স্কুল লাইফটা, আই মিন যখন ছেলেফেলে পটাত সেই সময়টাকে ফ্যান্টাসাইজ করছে।’
নিজের মোবাইলটার দিকে তাকায় অপরাজিতা। টুং টুং করে মেসেজ আসছে সেখানে। আসারই কথা। সাত সকালে অফিস ফেলে হঠাৎ করেই ছুটে এসেছে৷ এখন অফিস থেকে ক্রমাগত ফোন আর মেসেজ আসছে। আপাতত ঘণ্টাখানেক সেগুলো ইগনোর করা ছাড়া উপায় নেই।
কাল রাতে আগমনীর সঙ্গে কথা হওয়ার পর কিছুটা দুশ্চিন্তায় ছিল অপরাজিতা। মেয়েটার কথাবার্তা সকাল থেকেই কেমন যেন অসংলগ্ন। কখন কী বলছে নিজেই বুঝতে পারছে না। আজ সকালে ওর হাউস হেল্প শম্পা ফোন করে অপরাজিতাকে জানায় যে আগমনী নাকি ঘর খুলছে না। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ, ওপাশ থেকে কোনও আওয়াজ আসছে না।
শেষে শম্পা চাবি দিয়ে দরজা খুলে দেখে আগমনী ঘরের মেঝেতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। দিশেহারা হয়ে সে আগে অপরাজিতাকেই ফোন করে। অফিস যাওয়ার জন্যই বেরোচ্ছিল অপরাজিতা। ফোন পেয়ে অপেক্ষা না করেই ক্যাব বুক করে এখানে চলে আসে। আসার সময় কৌশিককে ফোন করে তুলে নেয়।
কলেজ জীবনের শেষের দিকে ওদের তিনজনের একটা হালকা বন্ধুত্ব হয়েছিল। কৌশিকের মতো জাতআনাড়ি ছেলে আর দুটো হয় না। এইচএসের পর খুব খেটেখুটে জয়েন্ট এন্ট্রান্স দিয়ে মেডিকালে চান্স পেয়েছিল। পড়া শুরুও করেছিল। একদিন হুট করেই সেসব ছেড়ে দেয়। কেন ছেড়েছিল ও নিজেও জানে না। বছরখানেক বেকার হয়ে বসেছিল। শেষে আবার পড়াশোনা করে গোয়েন্দা দফতরে সরকারি চাকরি জোগাড় করেছে। অফিস একরকম যায় না বললেই চলে।
শম্পার বয়ান অনুযায়ী অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাওয়ার সময় আগমনীর মাথাটা টেবিলের কোণে ঠুকে গেছে। খানিকটা রক্ত বেরিয়েছে কপালের পাশ দিয়ে। এর মধ্যে ডাক্তার এসে একটা সিডেটিভ দিয়ে গেছেন। বলেছেন, যতক্ষণ ঘুমাচ্ছে ঘুমোক বিরক্ত করার দরকার নেই। আপাতত দিনতিনেকের রেস্ট দরকার। শম্পার সঙ্গে খানিক কথাবার্তা বলে নিশ্চিন্ত হয়েছে অপরাজিতা। তারপরেই দুজনে এসে দাঁড়িয়েছে বারান্দায়।
অপরাজিতার প্রথম থেকেই মনে হয়েছিল আগমনীর সমস্যাটা যতটা না শারীরিক তার থেকে ঢের বেশি মাথার। তবে সেটা আসার সময় কৌশিককে বলেনি। শুধু মাথার সমস্যা হয়েছে বললে, ছেলেটা বিশেষ গা করত না।
এর মাঝে আগমনী একবার চোখ খুলেছিল। আপাতত অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল।
‘ও বলছিল, ওর স্কুল লাইফের স্মৃতি কিছু মনে পড়ছে না। আমার কিন্তু বিশ্বাস হয়নি তেমন।’ অপরাজিতা ভুরু কুঁচকে বলল।
‘বিশ্বাস হয়নি কেন?’
‘কেন মানে? এ আবার হয় নাকি? অন্য সব কিছু মনে থাকল, পার্টিকুলারলি দেড়-দু’বছর গায়েব?’
মাথা নাড়ায় কৌশিক, ‘অসম্ভব কিছুই না। তুই ক্লাস সেভেন আর এইটের কথা আলাদা করে মনে করতে পারবি? মানে কোন ক্লাসে কে তোর বেস্ট ফ্রেন্ড ছিল, কোন ক্লাসে একশোয় একশো পেয়েছিলি, কোন ক্লাসে প্রথম কেউ প্রপোজ করেছিল…’
একটু ভাবে অপরাজিতা, ‘উঁহু, সব একসঙ্গে জট পাকিয়ে যাচ্ছে।’
একটু হাসে কৌশিক, ‘কারণ আমাদের ব্রেন দৃশ্য দিয়ে মনে রাখতে পছন্দ করে। শব্দ, গন্ধ, স্বাদ এসবের পেছনেও সে একটা দৃশ্য অ্যাটাচ করে রাখে। চেনা গন্ধ বা শব্দ পেলে ব্যাটা সেই দৃশ্যটাকে টেনে আনে৷ স্কুলের সমস্যা হল এখানে সব দৃশ্য প্রায় একইরকম। সবাই একই জামা পরে আছে, একই দেওয়াল, একই রঙের বেঞ্চ, একই ব্ল্যাকবোর্ড, একই সময়ে শুরু একই সময়ে শেষ। ফলে স্কুলের স্মৃতি মনে রাখতে গিয়ে মগজ একরকম গড়বড় করে ফেলে৷ তাই স্কুলের স্মৃতি সব থেকে গোলমেলে।
ব্যাপারটা ভাবিয়ে তোলে অপরাজিতাকে, সে মাথা নেড়ে বলে, ‘তার উপর আমাদের স্কুল লাইফটা এমন একটা সময় যখন লোকে কথায় কথায় পঞ্চাশটা ছবি তুলে ফেলত না। এখন তো ছবি দেখেই বলে দেওয়া যায় কোনটা কোন বয়সের।’
রেলিঙের দিকে আবার সেই বেড়ালের উঁচিয়ে থাকা ল্যাজটা দেখতে পায় কৌশিক। মুখ দিয়ে মিউমিউ আওয়াজ করে সেদিকে এগিয়ে যায়। অপরাজিতার গলা যেন দূর থেকে ভেসে আসে, ‘এতগুলো জেনারেশন, এতগুলো মানুষের ছেলেবেলা আর কয়েক বছর পর অতলে চলে যাবে। তাদের শৈশব, স্কুল, প্রথম সিগারেট, প্রথম প্রেম, ঘুড়ি লাটাই আর অ্যান্টেনার গল্প শুধু কয়েকটা ফ্ল্যাশ ক্যামেরায় তোলা ছবি রেখে হারিয়ে যাবে।’
‘খুঁজছে…’ অন্যমনস্ক গলায় বলে কৌশিক।
‘কে? মণি?’
কার্নিশ থেকে মুখ সরিয়ে নেয় কৌশিক, ‘না না, বিড়ালটা প্রেগন্যান্ট। বাচ্চা দেওয়ার জন্য একটা ভালো জায়গা খুঁজছে। ভারি আশ্চর্যের ব্যাপার!
‘এর মধ্যে আশ্চর্যের কী আছে?’
কৌশিক কিছু উত্তর দিতে যাচ্ছিল। শম্পাকে বারান্দায় ঢুকতে দেখে মুখ তুলে তাকাল।
‘দিদি উঠে পড়েছে, তোমাকে খুঁজছে৷’
ওরা দুজন বারান্দা থেকে পা বাড়িয়ে ভিতরের ঘরে ঢুকে এল। আগমনীকে ওর বেডরুমে শোয়ানো হয়নি। পাশের ঘরের বিছানায় আপাতত উঠে বসে মাথার দুটো রগ চেপে ধরে আছে। ওর মুখ চোখে একটা আচ্ছন্ন ভাব। পায়ের আওয়াজ পেয়ে মুখ তুলে তাকায় সে।
‘শম্পা বলছিল তুই…’ কথাটা শেষ করে না আগমনী। তার আগেই ওর ঠিক পেছনে কৌশিকের দিকে চোখ পড়ে। এবং পড়তেই ওর চোখ মুখের ভাষা পালটে যায়।
‘ও এসেছে কেন এখানে?’ ক্লান্ত কিন্তু গনগনে গলায় প্রশ্ন করে আগমনী।
একটু খাবি খায় অপরাজিতা। কলেজ জীবনে মোটামুটি ভালোই বন্ধুত্ব ছিল তিনজনের। কৌশিককে দেখে আগমনী এমন খেপে উঠতে পারে ও স্বপ্নেও ভাবেনি।
‘কেন আবার আসবে? আমি ডেকেছি তাই এসেছে।’
‘মাথা খারাপ হয়েছে তোর?’ এবার বিছানা থেকে প্রায় ছিটকে আসে আগমনী, কৌশিকের দিকে আগুন চোখে তাকায়, ‘বেরো শুয়োরের বাচ্চা, বেরিয়ে যা এখান থেকে।’
অপরাজিতা পেছনে তাকিয়ে দেখে কৌশিক মাথা হেঁট করে দাঁড়িয়ে আছে। কেমন যেন একটু আগে দেখা বেড়ালটা মতোই ভাব চোখেমুখে। কেবল বাচ্চা দেওয়ার বদলে লুকানোর জায়গা খুঁজছে।
‘দুশ্চরিত্র লম্পট কোথাকার। ছোটলোকের বাচ্চা! বলেছিলাম না ভুলেও এ পাড়া মাড়াবি না?’ প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়তে চায় আগমনী।
‘আরে, হলটা কী? উত্তেজনা তোর শরীরের পক্ষে ভালো নয়।’
কোনওরকমে আগমনীকে শান্ত করে বিছানার উপর বসায় অপু৷ হিংস্র বাঘিনীর মতো ফুঁসতে থাকে সে। একবার কৌশিকের মুখের দিকে তাকায় অপরাজিতা। কিছু একটা আন্দাজ করতে পারে।
উঠে এসে দ্রুত কৌশিককে নিয়ে দরজার বাইরে বেরিয়ে আসে অপরাজিতা। প্রায় দেওয়ালের সঙ্গে ঠেসে ধরে ওকে, ‘কী ব্যাপার বল তো? কী করেছিস ওর সঙ্গে?’
‘প্রেম, ওই ধর বছর দেড়েক।’ খাবি খেতে খেতে কৌশিক বলে৷
‘তো সেটা আমাকে আগে বলিসনি কেন?’ অপরাজিতার, গলার উত্তাপ বাড়ল।
‘কেন, তুই জয়েন্ট এন্ট্রান্স নিতিস?’
দেওয়ালের উপরেই একটা চাপড় মারে অপরাজিতা, ‘অন্তত আজকে এখানে আসার আগে তো বলতে পারতিস।’
‘বলে লাভ কী হত?’ পালটা ফুঁসে ওঠে কৌশিক, ‘তুই যেভাবে বললি ক্রিটিকাল কন্ডিশন আমি ভাবলাম মরে টরে গেছে।’ অপরাধবোধে মাথা নত হয়ে আসে ছেলেটার, ‘ওর হোয়াটস অ্যাপে আমার কিছু পুঙ্গা পুঙ্গা ফটো আর সেক্স চ্যাট…’
‘তোরা সেক্স চ্যাটও করেছিলি? আর আমি এদিকে কিছুই জানি না!’
‘আজব তো!’ এবার ওকে মৃদু ধাক্কা দেয় কৌশিক, ‘জানলে কি প্রুফরিড করে দিতিস?’
দু’সেকেন্ড নিজের মাথার চুল খামচে দাঁড়িয়ে থাকে অপরাজিতা, তারপর বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘দেখ, মেয়েটা অসুস্থ। এখানে তোকে দেখে আরও খচে গেছে। ভিতরে গিয়ে যদি আর একটা আলপটকা কথা বলেছিস তোর সব পুঙ্গা পুঙ্গা ফটো আমি টেনে বের করব।’
কথাটা বলে ওর জামায় একটা টান দিয়ে ভিতরে নিয়ে আসে অপরাজিতা। আগমনী এখনও সেইভাবেই বিছানার উপরে বসে আছে। তবে মুখের রং খানিক ফিকে হয়ে এসেছে। প্রাথমিক রাগটা এতক্ষণে একটু প্রশমিত হয়েছে। একটু আগে আগমনীর চিৎকারে শম্পা ছুটে এসেছিল রান্নাঘর থেকে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখে আবার রান্নাঘরে ফিরে যায়।
গুটিগুটি পায়ে আগমনীর কাছে গিয়ে বসে অপরাজিতা। তারপর ওর হাতের উপর একটা হাত রেখে বলে, ‘দেখ, ওর তো এই ব্যাপারে একটা এক্সপার্টিজ আছে…’
‘বালের এক্সপার্টিজ আছে।’ আবার তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে আগমনী, ‘অর্ধেক সেক্স করে বাচ্চা আর অর্ধেক পড়ে ডাক্তার হয় না! ওকে ঘাড় ধরে বের করে দে।’
অপরাজিতা ঢোঁক গেলে, ‘সেটা কি উচিত হবে? অতিথি নারায়ণ। তাছাড়া আজকে যখন এসেই পড়েছে একেবারে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া মনে হয় না খুব একটা ভালো হবে।’
আগমনী কোনও উত্তর দেয় না। স্থির চোখে বিছানার দিকে চেয়ে থাকে৷ অপরাজিতা আবার চেষ্টা করে, ‘দেখ, তোদের মধ্যে কী হয়েছে, আমি জানি না। কিন্তু আমরা তো একসময় বন্ধু ছিলাম, তাছাড়া তোরা ভালোবাসা…’
‘ভালোবাসা? বালের ভালোবাসা। ওটাকে ভালোবাসা বলে না অপু৷’
‘ইয়ে…তাহলে বন্ধুত্ব ধরে নে, সেক্স চ্যাট করা বন্ধুত্ব। সেটার কথা ভেবে আজ অন্তত ওকে…’
‘সেটা পাভেলকে কিস করার আগে ভাবা উচিত ছিল।’
নিরুত্তাপ মুখে একটু পিছিয়ে আসে অপু। কৌশিকের দিকে না তাকিয়েই জিগ্যেস করে, ‘পাভেল কে?’
কৌশিক জবাব দেয়, ‘আমার বন্ধু। আমার চেয়ে উঁচু র্যাঙ্কে আছে।’
‘তাকে তুই কিস করেছিলি কেন?’
‘মহা মুশকিল তো! আমি কেন কিস করতে যাব? ও আমাকে করেছিল।’
অপরাজিতার বুকের ভিতরটা ছমছম করে ওঠে, ‘তুই বাই সেক্সুয়াল? দেখে তো মনে হয় না!’
কৌশিক বিড়বিড় করে, ‘বাই সেক্সুয়াল হলে কি টু-ইন-ওয়ান আইসক্রিমের মতো দেখতে হবে ভেবেছিলি?’
হাতের উলটোদিক দিয়ে কপালের ঘাম মুছে নেয় অপরাজিতা। তারপর আগমনীর পাশে গিয়ে আবার বসে পড়ে। গলাটা আরও খানিক নরম করে বলে, ‘বাদ দে ওর কথা, রাতে তোর ঠিক কী হয়েছিল বল তো?’
আগমনী মনে করার চেষ্টা করে। ধীরে ধীরে বলে, ‘মাঝরাতে ভেঙে গেছিল ঘুমটা। চোখ খুলেই দেখলাম জানলা দিয়ে চাঁদের আলো আসছে৷ মনে হল কিছু স্বপ্ন দেখেছি। কিন্তু কী স্বপ্ন মনে পড়ছে না। ভীষণ ডিস্টার্বড লাগছিল। ঘাম দিচ্ছিল খুব। বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম, নিচে তাকিয়ে একটা ঘুমন্ত ভিখারিকে দেখতে পেলাম। চাদর মুড়ি দিয়ে থাকায় মুখটা দেখতে পাইনি। জল খেলাম, শুয়ে পড়লাম। তারপর থেকেই মাথাটা কেমন ঘুরতে লাগল। একবার মনে হল, আমি বিছানা থেকে উঠে পড়েছি। দেয়ালে কী সব যেন লিখছি। তারপর আর কিছু মনে নেই!’
‘দেওয়ালে কী লিখছিলি, সেটা মনে আছে?’
এক হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরে আগমনী, ‘আমি লিখছিলাম কিনা মনে পড়ছে না। তবে আমি একা ছিলাম না…’
‘তাহলে আর কে ছিল সঙ্গে?’
‘কতগুলো বাচ্চা ছেলেমেয়ে। খানিকটা আমি লিখেছি, খানিকটা ওরা আমার খালি মনে হচ্ছিল ওরা কিছু বলতে চাইছে আমাকে। বিশেষ করে একটা মেয়ে…মেয়েটার নাম…নাম…’
‘নহর?’
চমকে ওর দিকে তাকায় আগমনী, ‘হ্যাঁ, তাই হবে। কিন্তু তুই কী করে জানলি?’
উত্তর দেয় না অপরাজিতা, উলটে প্রশ্ন করে, ‘তারপর কী হল?’
‘তারপর আর কিছু মনে নেই।’ আগমনীকে উদ্ভ্রান্ত দেখায়।
‘মাঝরাতে যখন উঠেছিলি তখন ক’টা বাজে?’
আগমনী ভেবেচিন্তে কিছু উত্তর দিতে যাচ্ছিল। তার আগেই পেছন থেকে কৌশিক বলে ওঠে, ‘জিগ্যেস করে লাভ নেই। বলতে পারবে না।’
অপরাজিতা রাগত চোখে তাকায় ওর দিকে, ‘তোকে কে বলেছে বলতে পারবে না?’
‘কেউ বলেনি। বুঝতে পারছি।’
‘কী বুঝেছিস?’
‘মাঝরাতে ও যে উঠেছিল, সেটা ওর স্বপ্নেরই পার্ট। আর স্বপ্নে মানুষ সময় মনে রাখতে পারে না।’
‘ওটা স্বপ্নের অঙ্গ ছিল তোকে কে বলেছে?’
একটা পায়ের উপর আরেকটা পা তুলে বসে কৌশিক, ‘ঘুম ভেঙেই ও দেখে জানলার দিকে মুখ করে শুয়ে আছে। কিন্তু আমি জানি, ও জানলার দিকে মুখ করে শোয় না। তাছাড়া বলল, ঘরের ভিতরে চাঁদের আলো আসছিল। ও ঘরের বিছানায় শুয়ে জানলা দিয়ে বাইরে তাকালে আকাশে চাঁদ দেখতে পাবার কথা নয়, তাছাড়া…’
‘ও জানলার দিকে মুখ করে শোয় না কে বলল?’
মাথা নামিয়ে নেয় কৌশিক, ‘ও ভূতে ভয় পায় ছোট থেকে। যারা ছোটবেলায় ভূতে ভয় পায় তারা জানলার দিকে মুখ করে শোয় না। পরে বড় হয়ে ভূতের ভয়টা কেটে গেলেও মনের ভেতর সেই ডিফেন্স মেকানিজমটা রয়ে যায়। জানলার দিকে মুখ করে শুতে অস্বস্তি হয়।’
কয়েক সেকেন্ড কেউ কোনও কথা বলে না। মিনিটখানেক পরে অপু একটু গলা খাঁকরে বলে, ‘বেশ, সেটা না হয় হল। বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ানোটা স্বপ্নের পার্ট হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু তাতে আলাদা করে কী প্রমাণ হয়?’
‘ঘরে ওর গরম লাগছিল, আবার একটা ভিখারি চাদর চাপা দিয়ে শুয়েছিল। দুটো একসঙ্গে সত্যি হতে পারে না। অর্থাৎ স্বপ্নটা ও একদিন দেখেনি। বেশ কয়েকদিন দেখেছে। আর যে স্বপ্ন আমরা বারবার দেখতে থাকি, সেটা আমাদের আসলে কিছু বলতে চায়।’
‘তুই হাফ ডাক্তার না সাইকিয়াট্রিস্ট সেটা ঠিক করে নে আগে।’ অপরাজিতা ধমকের সুরে বলে, ‘একমাত্র পানু ভিডিয়োর হিরো ছাড়া আমি কাউকে এত তাড়াতাড়ি পেশা বদলাতে দেখিনি।’
কৌশিক কিছু একটা উত্তর দিতে যাচ্ছিল। থমকে যায়। বুঝতে পারে এখানে মুখ খোলা ঠিক হবে না। এই ব্যাপারটাতে মজাই লাগছে অপরাজিতার। কৌশিক এমনিতে বেশ বাঁকাচোরা কথা বলতে পারে। বেশ একটা অ্যাংরি ইয়ং ম্যান গোছের ভাব আছে। কিন্তু আগমনীর সামনে কোনও কারণে কাঁচুমাচু হয়ে যাচ্ছে বারবার। মেয়েটার দিকে তাকায় অপরাজিতা, ‘একটু মনে করে দেখ তো, আর কী দেখেছিস স্বপ্নে?’
‘লাভ নেই।’ নরম গলাতেই বলে কৌশিক, ‘রিয়েলিটির সঙ্গে স্বপ্নের পার্থক্য হল, আমরা ব্রেন স্টরমিং করে ভুলে যাওয়া রিয়েলিটির কিছু মনে করতে পারি। অজেক্টের সঙ্গে রিলেটেড মেমোরি মনে পড়ে যেতে পারে। কিন্তু স্বপ্ন একবার ভুলে গেলে আর মনে করার কোনও উপায় থাকে না৷’
চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে কৌশিক, ‘খুব অর্ডিনারি স্বপ্ন। বারবার দেখে চলেছে মানে ওর মনের গভীরে এক্সট্রা অর্ডিনারি কিছু লুকিয়ে রয়েছে। যেটা বারবার ওভারলুক করে যাচ্ছে ও।’
অপরাজিতা এতক্ষণে বিরক্ত হয়ে যায়, ‘এসব হাবিজাবি কথা নিজের কাছে রাখ তুই। এখন কী করব সেটা বল।’
‘একজন সাইকিয়াট্রিস্ট কনসাল্ট করা দরকার। এভাবে ব্যাপারটা বাড়তে বাড়তে…’
‘তোরা দুজন মিলে কি আমায় পাগল প্রমাণ করতে চাইছিস?’ এতক্ষণ চুপ করেছিল আগমনী। এলোমেলো হয়ে থাকা চুলগুলো রাগের চোটে মুখের সামনে চলে আসে। হাত দিয়ে সেগুলো সরিয়ে দেয়৷
কৌশিক বিড়বিড় করে, ‘নতুন করে প্রমাণ করার কী আছে?’
‘ঠিক যেমন তুই লম্পট প্রমাণ করতে আমার দু’মিনিট সময় লাগবে না৷ দে তোর ফোনটা দে একবার!’
বিপদ বুঝে অপরাজিতা আবার শান্ত করার চেষ্টা করে। কিন্তু লাভ হয় না। আগমনী গজগজ করতে থাকে, ‘একটা হাফ ডাক্তার হয়ে ফোন ভর্তি শুধু পানু আর পানু। লজ্জা করে না তোর?’
কৌশিক এতক্ষণে মুখ খোলে, ‘ডাক্তারির সঙ্গে পানুর কী সম্পর্ক। দেখ, আমাদের ভ্যাসেক্টমি শুধু পড়ানো হয়, করে দেওয়া হয় না।’
‘মানুষের শরীর তোদের কাছে একটা মন্দির, সেটা নিয়ে নোংরা চিন্তা করতে তোর লজ্জা করে না?’
কৌশিক এতক্ষণে ফুঁসে ওঠে, ‘বেশ তো, আরশোলাদের পর্নহাবের লিঙ্ক দে। এক্ষুনি খুলে দেখছি। যতসব, পাগল ছাগলের পাল্লায় পড়েছি।’ ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় অপরাজিতার দিকে চেয়ে গর্জে ওঠে সে, ‘একে নিয়ে গেলে মাথার ডাক্তারও পাগল হয়ে যাবে।’
‘জাস্ট শাট আপ!’ ভর্ৎসনা করে অপরাজিতা, ‘ওর চোখ মুখের অবস্থা দেখেছিস? মায়া লাগছে না তোর?’
কৌশিক হাত ওলটায়, ‘দেখ ভাই, আমি হাফ ডাক্তার হতে পারি, হাফ বয়েল ডিম নই যে কথায় কথায় গলে যাব…ওকে পাগলের ডাক্তারের কাছে ভর্তি করে দে, ব্যস!’
‘হ্যাঁ, সেই তো!’ ছুটে ওর কলার ধরতে যায় আগমনী, ‘এখন তো আমি পাগল হবই। কিন্তু আমাকে পাগলের ডাক্তার কবে দেখানো উচিত ছিল বল তো? যখন তোর সঙ্গে প্রেম করেছিলাম! এখন ব্রেক আপ হয়ে গেছে মানে মাথা ঠিক আছে।’
‘আহ, কী ছেলেমানুষের মতো ক্যাচাল করছিস বল তো?’ অপরাজিতা হাত তুলে থামিয়ে দেয় দুজনকে। উত্তেজনার চোটে হাঁপানি শুরু হয়েছিল আগমনীর। ড্রয়ার থেকে বের করে ইনহেলার নেয়। কৌশিকও চুপ করে যায়।
তিনজনে কিছুক্ষণ গুম হয়ে বসে থাকে। শান্ত হয়ে আগমনী পা বাড়িয়ে বিছানা থেকে নামার চেষ্টা করে। হাত দিয়ে মাথা ঘষতে ঘষতে বলে, ‘দেখ, তোরা এখন আয়। আমার শরীরে বিশেষ কোনও সমস্যা নেই। মাথার সমস্যা তো একেবারেই নেই।’
‘আয় আমার সঙ্গে, উপর হাত রেখে মৃদু টান তোকে একটা জিনিস দেখানোর আছে।’ ওর হাতের দেয় অপরাজিতা, ‘পাশের ঘরে আয়।’
‘আগমনী বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে। ওকে নিয়ে অপরাজিতা বেরিয়ে আসে বাইরে। পাশের ঘরের দরজাটা ভেজানো ছিল। সেটা হাতের ঠেলা দিয়ে খুলে ফেলে।
ভিতরে ঢুকে ঠাহর করতেই আঁতকে ওঠে আগমনী। জানলা দিয়ে আপাতত দুপুরের রোদ এসেছে। ঘরের টাইলসের মেঝেতে রিফ্লেক্ট করে আরও উজ্জ্বল হয়েছে সেই আলো। আর তাতেই দেখা যাচ্ছে গোটা ঘরের দেওয়াল জুড়ে ফুটে উঠেছে অসংখ্য সরু সরু লেখা৷ কাঁপা কাঁপা হাতে রংবেরঙের চক দিয়ে কয়েকটা লাইন লিখে রেখেছে কেউ। মধ্যে মধ্যে ছবি আঁকারও চেষ্টা করেছে।
কিছুক্ষণ থ হয়ে সেদিকে চেয়ে থাকে আগমনী, তার ঠোঁটদুটো কেঁপে ওঠে অল্প, ‘এগুলো আমি লিখেছি? কাল রাতে?
পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন কোনও উত্তর দেয় না। আগমনী ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় লেখাগুলোর দিকে। রঙিন দাগের উপরে আঙুল রাখে। বারবার একটাই কথা নানারকম হাতের লেখায় লিখে গেছে ও।
‘তোকে আমি ফিরিয়ে দেব নহর…’
কখনও লিখতে লিখতে শব্দগুলো হারিয়ে গেছে। কোথাও আগে পরে হয়ে গেছে। তাও এই একটাই লাইন উপর থেকে নিচ অবধি লিখে গেছে আগমনী। সেই সঙ্গে অস্পষ্ট একটা মুখ আঁকার চেষ্টা।
‘নহর কে?’ পেছন থেকে জিগ্যেস করে অপরাজিতা।
‘আমি…আমি জানি না। আমার কিছু মনে পড়েছে না।’ আবার হাত দিয়ে নিজের মাথা চেপে ধরে আগমনী।
জামার পকেট থেকে ছবিটা বের করে আনে অপরাজিতা, সেটা চোখের সামনে ধরে বলে, ‘এই ছবিতে তুই ছাড়া যে মেয়েটা আছে, সেই কি?’
আগমনীকে উদ্ভ্রান্ত দেখায়, ‘আমি জানি না, আমি…আমি…’
ওকে হাত তুলে থামিয়ে দেয় অপরাজিতা, ‘কাল ছবিটা পেলি আর কাল রাতেই কাণ্ডটা করলি, মানে দুটোর কিছু একটা লিঙ্ক আছে। ছবির মেয়েটার মুখটা এখনও চেনা লাগছে না তোর?’
‘না।’ লেখাগুলোর দিকে চেয়ে থাকতে থাকতেই বলে আগমনী, ‘নামটা কেন লিখলাম!…
কিছুক্ষণ তেমন ভাবেই থম মেরে লেখাগুলোর দিকে চেয়ে থাকে ও। বাইরে দুপুরের ট্রাফিকের প্যাঁপোঁ আওয়াজ ভেসে আসে। একটা লম্বাটে চেহারার স্কুল বাস হর্ন দিতে দিতে রাস্তার মাঝখান দিয়ে চলে যায়৷
‘তোরা আমাকে একটু একা থাকতে দিবি?’ কথাটা বলে দেওয়ালের একেবারে সামনেই বাবু হয়ে বসে পড়ে আগমনী। আগের মতোই ঠায় চেয়ে থাকে সেদিকে।
কৌশিককে একটা চোখের ইশারা করে অপরাজিতা। ওরা দুজন বাইরে বেরিয়ে আবার বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। আগের হালকা হাওয়াটা আর বইছে না। ভিতরে রান্নাঘর থেকে মশলার ঝাঁঝালো গন্ধ আসছে। ভারি অস্বাস্থ্যকর হয়ে আছে পরিবেশটা।
একটু আগের বিড়ালটাকে রেলিঙে দেখতে পায় অপরাজিতা। ভুরু কুঁচকে বলে, ‘বিড়ালটার কথা কী বলছিলি?’
‘বিড়ালটা ওর পোষা, তাও বাচ্চা দেওয়ার জন্য নতুন জায়গা খুঁজছে!’
অপরাজিতার মুখের রেখাগুলো আরও খানিকটা কালো হয়ে আসে। একটা সিগারেট ধরিয়ে বলে, ‘ওকে যেভাবেই হোক একটা সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানো দরকার।’
ঠোঁট ওলটায় কৌশিক, ‘লাভ নেই। একবার বলেছে যখন কারো বাবার ক্ষমতা নেই, ওকে দিয়ে অন্য কিছু করাবে।’
‘আমার কিন্তু চিন্তাই হচ্ছে। একা একা থাকে…’
‘ফেসবুকে ওদের আলুমনিদের কোনও গ্রুপ আছে কিনা দেখ তো। ওদের ব্যাচের কাউকে যদি পাওয়া যায়…’
ফোনটা বের করে স্কুলের নাম লিখে সার্চ করে অপরাজিতা। সারদামণি দেবী উচ্চ বিদ্যালয় নামে একটা গ্রুপ পাওয়া যায়। তবে সেটার পোস্ট দেখে হতাশ হয়, ‘গ্রুপ তো হানাবাড়ি মনে হচ্ছে ভাই। দু-একটা গোঁফওয়ালা কাকা পোস্ট লাইক করেছে শুধু।
‘তাও একটা পোস্ট করে রাখ।’
অপরাজিতা গ্রুপে পোস্ট করে, দু’হাজার নয়ের ব্যাচের কেউ আছিস? থাকলে পিং কর। আর্জেন্ট।
সেদিকে একবার তাকিয়ে কৌশিক বলে, ‘এতে কোনও লাভ না হলে স্কুলে গিয়ে সেই সময়কার কোনও স্যার বা ম্যাডামকে খুঁজতে হবে।’
‘তারা এন্টারটেইন করবে কেন আমাদের?’ কথাটা বলে কৌশিকের দিকে ফিরে তাকায় অপরাজিতা, ‘এই তোর সেই পাভেল না কী পুলিশের বড় র্যাঙ্কে আছে বলছিলি, তাকে দিয়ে একবার রেকমেন্ড করালে হয় না? আই মিন নিজেরা গেলে যদি পাত্তা না দেয়!’
কৌশিককে ভাবুক দেখায়, ‘তাও হয়। কিন্তু বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করাটাই সহজ উপায়। এক কাজ কর, ছবিটাই গ্রুপে পোস্ট করে দে। দেখ কেউ চিনতে পারে কিনা।’
‘তাতে লাভ হবে কী? ও যেরকম মেয়ে খুব একটা কারো সঙ্গে মিশত বলে তো মনে হয় না।’
কৌশিক একটা মিচকে হাসি হাসে। কিছু বলে না৷
‘হাসছিস কেন শালা?’
কৌশিক বাইরে তাকায়, ‘তুই কবে ফার্স্ট প্রেম করেছিলি অপু?’
‘স্কুলে, ক্লাস এইট মনে হয়। কেন?’
জানলার গ্রিলে রাখা স্নেক প্লান্টের পাতায় হাত রাখে কৌশিক, ‘মেয়েরা যখন কিশোরবেলায় প্রথম প্রেমে পড়ে, তখন একটা আলাদা মানুষ থাকে। ফুলের বাগানে উড়ে বেড়ানো রঙিন প্রজাপতির মতো গায়ে বৃষ্টির গন্ধ থাকে, হাতে নরম ঘাসের স্পর্শ থাকে, পাহাড়ি ঝরনার মতো…তারপর সেই প্রেম ভেঙে যায়, নতুন প্রেম আসে। জীবনে সেকেন্ড, থার্ড, ফোর্থ প্রেমিক তার প্রেমিকার সেই পুরোনো রূপটাকেই খুঁজে যায় বারবার। সেই বৃষ্টি, ঘাস, ঝরনা…কিন্তু ততদিনে সে কেমন একটা পাথরের মতো হয়ে যায়…’
‘তোর ওকে পাথরের মতো মনে হত?’
কাঁধ ঝাঁকায় কৌশিক, ‘কী জানি, তবে ওর সঙ্গে যে ক’টা দিন ছিলাম আমার মনে হত মণি একটা আলাদা মানুষ ছিল ছোটবেলায়। মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছা হত ওর পুরোনো খেলনা নিয়ে বসে থাকি কিছুক্ষণ। ওর স্কুলের মাঠে হাঁটি, ওর প্রথম প্রেমিকের সঙ্গে গল্প করি, ওর ব্যাগের কোনায় পড়ে থাকা প্রেমপত্রগুলো পড়ি, ওর মায়ের খুন্তির বাড়ি খাই পিঠে…সেই মেয়েটাকে হয়তো সেভাবেই ছুঁয়ে ফেলব কিছুটা…’
‘চেষ্টা করিসনি?’
‘করেছিলাম। লাভ হয়নি। একটা পাথর দিয়ে যেন সুড়ঙ্গমুখ আটকে রেখেছিল ও।’
‘আর আজ আমাদের সেই সুড়ঙ্গটাই খুলতে হবে।’ কথাটা বলে নোটিফিকেশন চেক করে অপরাজিতা। একটা গোঁফওয়ালা কাকা কেয়ার রিয়াকশন দিয়েছে অকারণে। প্রোফাইলটা এক নজর দেখে নেয়, সাহিন আলি। নিউটাউনের কোন একটা গ্রামে থাকে যেন। বিরক্ত হয়ে কৌশিকের দিকে তাকায় অপরাজিতা। ছেলেটার চোখটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। অদ্ভুত ছেলে। মনের ভিতরে কী চলছে মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই।
‘তুই হঠাৎ ওর সঙ্গে প্রেমটা করতে গেলি কেন?’ হাসির ছলেই প্রশ্নটা করে বসে অপরাজিতা।
‘করতে চাইনি। কিন্তু…’ বারান্দার অন্য দিকে সরে আসে কৌশিক, ‘বাবা মারা যেতে সারাক্ষণ খুব ভয় লাগত।’
‘ভয়। কীসের?’
‘মৃত্যু জিনিসটা অদ্ভুত, জানিস। যতক্ষণ না তোর কাছের কেউ মারা যাচ্ছে মনে হয় মৃত্যু মঙ্গলগ্রহে থাকে। সে কোনওদিন তোর ধারে কাছে আসতেই পারে না। ওই সিনেমা টিনেমায় দেখা যায় বড়জোর। তারপর হুট করে একদিন এসে কাউকে টেনে নিয়ে চলে গেলে আর তাকে এলিয়েন ভাবা যায় না৷ তারপর রোজ তার সঙ্গে ঘর করতে হয়। মাঝরাতে কাউকে কাশতে শুনলে সে পেছনে এসে দাঁড়ায়, দু’দিনের ভাইরাল ফিভার হলে সে পাশে শুয়ে থাকে, সারাক্ষণ একটা বিচিত্র ভয়…’
কয়েক সেকেন্ডের জন্য থামে কৌশিক, ‘একদিন রাতে ভয় লাগছিল খুব। ঠাম্মা আমার পাশে শুয়ে ঘুমাচ্ছিল। নিঃশ্বাসের আওয়াজটা খুব দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল। মনে হচ্ছিল থেমে থেমে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। ঘুম আসছিল না। অনলাইন আছি দেখে ও পিং করল। বলল, ‘ফোন ধরে রেখে ঘুমিয়ে পড়, ঠাম্মার নিঃশ্বাসে কিছু গোলমাল হলে আমি ফোন কেটে রিং ব্যাক করে জাগিয়ে দেব।’
‘ব্যস? তাতেই প্রেমে পড়ে গেলি? ‘
মিহি হাসে কৌশিক, ‘না, আশ্রয়ের নেশায় পড়ে গেলাম। শান্তিতে ঘুমানোর নেশায় পড়ে গেলাম। একটা বয়সের পর ওর থেকে বড় বদভ্যাস আর হয় না।’
অপরাজিতার মনটা নরম হয়ে আসে, ধরা গলায় বলে, ‘কে জানে, এখন তোর উপর যতটা রাগ দেখায় ততটা আছে কিনা…
আশেপাশে তাকিয়ে কী যেন দেখার চেষ্টা করে কৌশিক, তারপর বলে, ‘আগে এখানে অনেকগুলো পাখি আসত, জানিস? ও নিজে হাতে খাঁচা বানিয়ে রেখেছিল। এক একটা পাখির ছবি তুলে দেখাত আমাকে৷ নাম দিত তাদের। এখন বেড়াল ঘুরে বেড়ায় মানে পাখিগুলো আর আসে না।’
‘মণি পালটে গেছে, না?’
‘কাউকে আশ্রয় দেওয়ার ইচ্ছাটাও একটা অভ্যাসের মতো৷ পাখি হোক, কি মানুষ। এতদিনে ও মনে হয় সেটা কাটিয়ে ফেলেছে।’
বারান্দার বাতাসটা যেন থমকে আছে অনেকক্ষণ। ঘরের ভিতর আগমনী এখন কী করছে কে জানে। তবে এই মুহূর্তে তাকে বিরক্ত করা উচিত হবে না।
‘ও যদি স্কুলে যায়, তুই যাস ওর সঙ্গে। ওখানে গিয়ে কিছু মনে পড়ে গেলে আবার হাইপারটেনশনে ভুগবে…’ অপরাজিতা মুখ তুলে বলে।
‘রাজি হবে না।’
‘রাজি করানোর দায়িত্ব আমার। শুধু একটা কন্ডিশন আছে।’
‘কী?’
‘আগের কোনও কথা তোলা যাবে না। প্রেম, চুমু, পাভেল, পানু, কোনও এক্সপ্ল্যানেশন, কিচ্ছু না। এটুকু তুই করলে আমি ওকে রাজি করাতে পারি।’
কৌশিক কিছু বলে না। পকেটে ফটোটা ঢুকিয়ে রেখেছিল কিছুক্ষণ আগে। এতক্ষণে সেটা বের করে মুখের সামনে ধরে। কিছুক্ষণ এক মনে চেয়ে থাকে সেদিকে। হঠাৎ কী একটা দেখে ওর ভুরু কুঁচকে যায়। অপরাজিতার দিকে সরে এসে প্রশ্ন করে, ‘অপু, তুই ভালো করে দেখেছিস ছবিটা? ‘
ছবিটা হাতে নিয়ে আবার দেখে অপু, গুনগুন করে বলে, ‘ভালো করে বলতে দেখেছি আর কী! কিন্তু…’
‘আলাদা করে কিছু চোখে পড়েনি?’
‘কী?’ অপু ছবিটা কাছে এনে ভালো করে দেখে। ধীরে ধীরে ওর ভুরুদুটো কুঁচকে গিয়ে আবার সোজা হয়ে যায়। বিড়বিড় করে বলে, ‘অদ্ভুত তো, ব্যাপারটা এত সহজে বোঝা যাচ্ছে, কিন্তু ও দেখতেই পেল না।’
