তালদিঘিতে ভাসিয়ে দেব – ৪
চতুর্থ অধ্যায়
‘বিকাশদা, একটা হাচের এগারো টাকার এসএমএস কার্ড দাও তো।’
দোকানের কাঠের দরজা ঠেলে মুখ বাড়ায় আগমনী। বিকাশ দোকানের ভেতরেই বসেছিল। এই সাইবার ক্যাফেটা আপাতত সে নিজেই চালায়। আগে চালাত ওর বাবা। তখন শুধুই এসটিডি বুথ ছিল। তবে সে ব্যবসায় বিশেষ লাভ হচ্ছিল না। আর এখন তো লোকে পটাপট সস্তার ফোন কিনে ফেলছে। তাছাড়া বিকাশের বাবার একটা বিশ্রী স্বভাব ছিল। ভদ্রলোক এসটিডি বুথে ফোন করতে আসা লোকের কথা শুনতে ভারি ভালোবাসতেন। অন্যের ফোন কলের মধ্যে যে প্রাইভেসি বলে একটা ব্যাপার থাকতে পারে তা ভদ্রলোক কিছুতেই জানতেন না। ফলে পকেটমানি জমিয়ে প্রেমিকাকে কল করতে আসা ছেলেছোকরা রিসিভারে ঠোঁট ঠেকিয়ে চুমু দিতে উদ্যত হলেই দেখত বুড়ো কাগজের থেকে মুখ তুলে উৎসাহী চোখে চেয়ে আছেন তাদের দিকে। কতক্ষণ আর চুমু আটকে রাখা যায়? তার উপরে সেকেন্ডে সেকেন্ডে বিল বেড়ে চলেছে৷
ফলে যা হওয়ার তাই হত।
বিকাশ বছরখানেক আগেই বুঝেছে, এসটিডি বুথের দিন ফুরিয়ে এসেছে। এখন বাজার মোবাইল রিচার্জ আর সাইবার ক্যাফের। টেবিলের উপর গোটা তিনেক মোবাইল ফোন সাজিয়ে বসে থাকে। অবসর পেলে এমএস গেমসে সলিটেয়ার খেলে। মাঝে মাঝে মনে হয় ওর নিজের জীবন খানিকটা এই সলিটেয়ার গেমের মতোই। নিস্তরঙ্গ। জিতে গেলে কিছু পাবার নেই, হেরে গেলে কিছু হারাবার নেই। কেবল গেমটা আবার প্রথম থেকে শুরু হয়ে যাবে।
ড্রয়ার টেনে তার ভেতর থেকে একটা হাচের কার্ড বের করে বিকাশ। কোম্পানির নাম বদলে ভোডাফোন হয়ে গেছে বছর তিনেক আগে। তবে ও নামটা কারোরই ভালো লাগে না। এখনও চলতি মানুষ পুরোনো কোম্পানির নামটাই ব্যবহার করে। তারপর সেটাই এগিয়ে দেয়। হাত বাড়িয়ে সেটা টেনে নেয় আগমনী।
এগারো টাকায় একশো দশখানা এসএমএস করা যায় এতে। আগমনীর নিজের অবশ্য ফোন নেই। মায়ের ফোনটা থেকেই একে ওকে এসএমএস করে। ভালো শায়েরি বা চুটকি গোছের কিছু পেলে ফরওয়ার্ড করে। এক দু-লাইনে কিছু বলার থাকলে সেই উর্দু সায়েরির নিচে লিখে দেয়। একশো আশিখানা ক্যারেকটার ধরে একটা মেসেজে। তার মধ্যে একটা আস্ত চুটকি আর ‘ফিজিক্স খাতা ভুলিস না’ ধরিয়ে দেওয়া সহজ কথা নয়।
আগে অবশ্য এসএমএস কার্ড কিনত না আগমনী। রোজ সকালে ব্যালেন্স থেকে এক টাকা করে কেটে নিত হাচ কোম্পানি। তাতে সারাদিন মোট দশটা মেসেজ করা যেত। কিন্তু ইলেভেনে ওঠার পর থেকে দশটা এসএমএসে আর চলছে না।
ছোট ছোট এসএমএস কার্ডগুলো বড় ভালো লাগে আগমনীর। ব্যবহার করা হয়ে গেলে ওগুলো জমিয়ে রেখে দেয়। একসঙ্গে অনেকগুলো এসএমএস কার্ড দেখতে ভারি ভালো লাগে ওর। কার্ডের পেছনে একটা অংশে স্ক্র্যাচ করতে একটা চোদ্দ অঙ্কের নাম্বার বেরিয়ে আসে। সে নম্বরটা ফোনে ডায়াল করতে পারলেই হয়ে যাবে রিচার্জ।
এগারো টাকা বিকাশের হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল আগমনী। কী মনে পড়তেই যেন জিভ কাটে, ‘এই এক টাকাটা ফেরত দাও তো। আমার কাছে খুচরো নেই।’
এক টাকাটা একরকম ছিনিয়ে নিয়ে কার্ডের উপরে স্ক্রাচ করতে থাকে আগমনী।
‘ও তো নখ দিয়েই হয়ে যেত রে…’ বিকাশ হেসে বলে৷
‘ধুর, এত মোটা করে ঢেকে রাখে এরা, উঠে যাবে নখ।
নম্বরটা বের করে খুশি হয় আগমনী। কার্ডটা পকেটে ঢুকিয়ে এক ছুটে বেরিয়ে আসছিল দোকান থেকে। কিন্তু ভিতরের দিকে চোখ পড়তেই থেমে যায়।
দোকানের লাগোয়া সাইবার ক্যাফেতে মোটামুটি গোটা দশেক কম্পিউটার আছে৷ বিকাশ এমন করেই সেগুলো খোপের ভিতর ঢুকিয়ে রেখেছে যাতে দরজা দিয়ে ঢুকে সহজে মনিটরে চোখ না পড়ে। আবার একটু মুখ বাড়ালেই দেখা যায়। বিকাশ প্রাইভেসি হিসেব করে দেয়। ছেলেপুলে জি-টক কিংবা অর্কুটে প্রেমিকার সঙ্গে গল্পটল্প করতেই পারে। কিন্তু ইন্টারনেটের অন্ধকার দিকে ঢুকে পড়লেই মুশকিল।
আপাতত ওই খোপের মধ্যে একটায় যে বছর পনেরোর লম্বাটে গড়নের ছেলেটা বসে আছে, তাকে চিনতে পেরেছে আগমনী।
‘আমি একটু ভিতরে বসছি, কেমন?’ বিকাশকে উদ্দেশ্য করে কথাটা বলে ভিতরের দিকে এগিয়ে যায় আগমনী। বিকাশ আলাদা করে টাকা পয়সা চায় না।
ভিতরে এসে ছেলেটার ঠিক পাশের চেয়ারে বসে আগমনী। ছেলেটা তাকে বিশেষ খেয়াল করে না।
‘মনিটরবাবু মনিটরে মন দিয়েছেন দেখছি।’ বরফ ঠান্ডা গলায় কথাটা বলে একগাল হাসে আগমনী। ছেলেটা চট করে ফিরে তাকায় ওর দিকে৷ প্রায় ভূত দেখার মতো আঁকতে ওঠে। সামনের খুলে রাখা ইন্টারনেট এক্সপ্লোরারটা হুট করেই মিনিমাইজ করে দেয়।
‘সেদিন কী বলছিলি যেন আমার ব্যাপারে?’ গাল চুলকায় আগমনী, ‘ঝগড়াটে, কাকে যেন ধরে মেরেছি…হুঁ?’
‘দেখ…আমি আসলে তোকে…’ সাম্য কিছু বলার চেষ্টা করেও পারে না।
‘স্যারকে বলব নাকি? বেপাড়ার সাইবার ক্যাফেতে এসে পানু ফানু চালিয়ে…’
‘মাক্কালি বলছি ভাই, আমি পানু দেখিনি। এখানে পানু খোলে না।’ মনিটরের দিকে মুখ বাড়িয়ে দেয় আগমনী। সাম্য উইন্ডোটা আবার ম্যাক্সিমাইজ করে, ‘দেখ, অর্কুট করছিলাম।’
অর্কুটের নাম আগেও শুনেছে আগমনী। তবে নিজে তেমন ব্যবহার করেনি। অচেনা লোকজনের সঙ্গে কথা বলার ব্যাপারটা ওকে তেমন একটা টানেনি। অর্কুটের বন্ধুদের স্ক্র্যাপ বলে এক বিচিত্র জিনিস পাঠানো যায়। সেও অনেকটা ওই এসএমএসের মতো। কেবল সে জিনিস পাঠাতে পয়সা লাগে না৷ আর অন্য যে কেউ এসে যার খুশি প্রোফাইলে ঢুকে স্ক্র্যাপবুক খুলে দেখে ফেলতে পারে।
আগমনী চেয়ে দেখে মেঘা সরকার নামে একটা মেয়ের স্ক্র্যাপবুক খুলে বসে আছে সাম্য। নিজের খুঁতনিতে হাত রাখে সে, ‘পানু কেস না, জানু কেস… হুম!’
‘ফালতু নিজেদের মধ্যে ক্যাচাল করে লাভ নেই ভাই।’ সাম্য ধরা গলায় বলে, ‘তুই আমার এই কথাটা চেপে যা, আমি তোর একটা কথা চেপে যাব।’
‘আমার কী কথা জানিস তুই?’
চারপাশটা ভালো করে দেখে নেয় সাম্য, তারপর ফিচকে গলায় বলে, ‘তুই অনেক বড় বয়স অবধি বিছানায় হিসি করতিস।’
আগমনী সোজা হয়ে বসে। অবাক চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বলে, ‘তুই শুধু মুখ দেখে এসব জানিস কী করে ভাই?’
সাম্য উত্তর দেয় না। অর্কুটের নীলচে সবুজ থিমটার দিকে চেয়ে থাকে। আগমনী হাল ছেড়ে দেয়, ‘ঠিক আছে, এইসব কথা বলব না কাউকে। কিন্তু মেয়েটার কেসটা কী বল তো?’
একটা ঢোঁক গিলে গল্পটা গুছিয়ে নেয় সাম্য, তারপর বলতে শুরু করে, ‘ক্লাস এইটে পড়তে আমি প্রথম অর্কুট করা শুরু করি। তখন তেমন কিছু বুঝতাম না। জনা পঁচিশেক ফ্রেন্ড ছিল। ইচ্ছা করেই খুব বেশি অ্যাড করি না। বিরক্তিকর লাগে। আমি একটা কমিউনিটি বানিয়েছিলাম। সেখানেই একটা মেয়েকে ভুল করে অ্যাড করেছিলাম। পরে মনে হল অনুমতি না নিয়ে করাটা উচিত হয়নি। সরি বললাম। সে উত্তর দিল, শুধু সরি বললে হবে? দশবার কান ধরে উঠবোস করো। তারপর ধীরে ধীরে মেয়েটার সঙ্গে কথা শুরু হয়। ওর প্রোফাইলে কোনও ছবি ছিল না। শুধু একটা প্রোফাইল পিকচার ছিল। একটা বিদেশি সোনালি চুলের বাচ্চা ঘাসের উপর খেলছে। একদিন কথা বলে বুঝলাম, ও বাঙালি, কিন্তু কলকাতায় থাকে না। থাকে মুসৌরিতে। ওখানকার একটা বোর্ডিং স্কুলে পড়ে৷ শীত আর বর্ষার ছুটিতে কলকাতা এলে কম্পিউটার হাতে পায়। তখন অর্কুট করে।’
‘আর তুই তখন সাইবার ক্যাফেতে এসে ওর সঙ্গে কথা বলিস?’
‘উঁহু, বেশিরভাগ দিন আসি ও এসেছে কিনা দেখতে। কলকাতায় এলে তো অনলাইন আসেই। কিন্তু মাঝে মাঝে বোর্ডিং-এ থাকতেও কম্পিউটার হাতে পায়। সে মাসে এক ঘণ্টা হয়তো। দু-একদিন একই সময় অনলাইন ছিলাম, কথা হয়েছিল…মানে ওই স্ক্র্যাপ চালাচালি আর কী!’
‘তারপর কী হল?’
একটু যেন লাল রং লাগে সাম্যর মুখে। লাজুক হেসে বলে, ‘আমার না, কেমন ভালো লাগে মেয়েটাকে…’
‘ভালো লাগে বলতে? ওর ছবিও তো দেখিসনি।’
‘ছবি দেখার কী দরকার? কথা বলতে ভালো লাগে।’
‘হ্যাঁ সেই…’ মুখ বাঁকায় আগমনী, ‘পেচ্ছাপ পায়খানার হিসেব বলে দিতিস আবার…’
সাম্যর গলা যেন সাইবার ক্যাফের বাইরে বেরিয়ে দূরে কোথাও ছুটে যেতে চায়, ‘ও যখন মুসৌরির কথা বলে তখন ভালো লাগে। ওখানে বিশাল সবুজ মাঠ, নীল নীল খোলা আকাশ, সাদা ঘন মেঘ আর…’ সাম্যর মুখ উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে, ‘আর একটা লেক আছে, জানিস? মাঝে মাঝেই লেকের ধারে গিয়ে বসে থাকে। আর আমাকে লেকের গল্প বলে। আমি ইন্টারনেটে দেখেছি লেকটা… ওদের স্কুল, ওদের স্কুল ড্রেস, ওদের পাহাড়…
মুখ নিভে আসে ছেলেটার, ‘কিন্তু বেশিদিন কথা হয় না। এখানে এলে ওই ধর সাতদিন। তারপর আবার কবে আসবে কোনও ঠিক থাকে না৷ আবার দিন গুনতে থাকি। দিন দশ বারো অন্তর টাকা পয়সা জমিয়ে সাইবার ক্যাফেতে আসি। প্রায় রোজই ও অনলাইন আসেনি দেখে মন খারাপ হয়ে যায়। তখন গেম টেম খেলে বাড়ি চলে যাই।’
‘লাস্ট কী মেসেজ করেছে?’
সাম্যর মুখে লাজুক হাসিটা ফিরে আসে। মাউস নাড়িয়ে স্ক্র্যাপবুক খুলে শেষ মেসেজটা দেখায় ও, ‘এবার কলকাতায় ফিরলে দেখা করব তোর সঙ্গে।’
আগমনীর দিকে ফিরে তাকায় সাম্য, ‘হ্যাঁ রে, টালিগঞ্জ কী করে যায় তুই জানিস?’
‘মেট্রো করে যায় মনে হয়।’ আগমনী ভেবে বলে, ‘মাকে বলতে শুনেছি।’
‘ধুর…’ সাম্যর মুখ ব্যাজার হয়ে যায়, ‘ওর বাবার অনেক পয়সা, মেট্রো করে দেখা করতে এসেছি শুনলে এলেবেলে ভাববে। গাড়ি করে যাব।’
‘গাড়ি কোথায় পাবি?’
‘খুঁটির বাপের গাড়ি আছে। একদিন ধার চাইব। তবে যা হারামি লোক শালা, দেবে বলে তো মনে হয় না। তবে…’ একটা উপচে পড়া হাসি খেলে সাম্যর মুখে, ‘সেরকম টাকা পয়সা জমালে না শালা আর অপেক্ষা করব না৷ একেবারে টিকিট কেটে চলে যাব।’
‘মুসৌরি?’
‘হ্যাঁ। আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি ভাই, তেমন কিছু ব্যাপার না।’ আগমনী হাসে, ‘আর চিনবি কী করে?’
অজান্তেই সাম্যর একটা হাত আগমনীর কাঁধে চাপড় মারে, ‘আমার কী মনে হয় জানিস, ওর সঙ্গে আমার দেখাটা না, জাস্ট ক্যাজুয়ালি হবে না। বৃষ্টি ফ্রিস্টি পড়বে। দূরে কেউ গিটার বাজাবে, ট্রেনে ওঠার তাড়া থাকবে, তার মধ্যে আমি দূর থেকে হেঁটে আসতে আসতে দেখব ও রাস্তায় একা দাঁড়িয়ে ভিজছে, একটা পাহড়ি রাস্তায়…’
‘আর ফিরবি কী করে?’
‘অ্যাঁ?’ কল্পনার জগৎ থেকে দুম করে নেমে আসে সাম্য, ‘ধুস শালা! ফিরবে কে?’ ওর কাঁধে চাপড় মারে সাম্য, ‘জীবনে আর যাই করি, একবার না একবার মুসৌরি যাবই…ভালোবাসলে ফেরার চিন্তা অত মাথায় আসে না।’
কম্পিউটার স্ক্রিনের একপাশে একটা মুসৌরির ছবি খোলা আছে, সেদিকে চেয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সাম্য, ‘খালি একটাই ভয় লাগে জানিস?’
‘কী?’
‘আমি তো ওর ফোন নাম্বার জানি না। হুট করে অর্কুটটা একদিন যদি বন্ধ হয়ে যায়, ওর সঙ্গে যোগাযোগ করব কী করে?’
‘ততদিনে অন্য কিছু চলে আসবে। আরও ভালো কিছু…আচ্ছা ভালো কথা, তুই কি বলেছিস ওকে ভালোবাসিস?’
আঁতকে উঠে কাঁধ ঝাঁকায় সাম্য, ‘মাথা খারাপ নাকি! ভালো লাগলেই বলে দেওয়া যায় নাকি? আগে বিড়ির মতো কানের কাছে নিয়ে…’ বলতে গিয়ে থেমে যায় সাম্য। মুখ ফসকে আর একটা সিক্রেট বলেই ফেলেছিল।
দুজনে চুপ করে বসে থাকে। আগমনীকে ওদের পাঠানো পুরোনো স্ক্র্যাপ দেখায় সাম্য। কোনওদিন বাবার কাছে বেল্ট পেটা খেয়ে এসে বলেছে মেঘাকে কোনওদিন একা গলি ক্রিকেটে সাতাত্তর করে ম্যাচ জিতিয়ে দিয়েছিল, সেটা ফলাও করে বলেছে। মেঘা ওকে জিগ্যেস করেছে কলকাতার কথা। কতটা বৃষ্টি হচ্ছে, কচুপাতার উপর জল পড়ে ছিটকে এসে ওর মুখ ভিজিয়ে দিয়েছে…এই সব এলোমেলো কথা…
এক ঘণ্টা হয়ে গেছে ওর। এবার বসে থাকলে আরও পয়সা চাইবে বিকাশদা। একটা বুক ভরা দম নিয়ে সাম্য বলে, ‘চল, বাইরে যাই। কথা আছে৷’
দশ টাকা বিকাশের হাতে ধরিয়ে সাইবার ক্যাফে থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে ওরা দুজনে। ইচ্ছা করেই বাড়ি থেকে এত দূরের সাইবার ক্যাফেতে আসে সাম্য। এ জায়গাটা একেবারে গলির ভিতরে। সামনে একটু দূরেই একটা পানাপুকুর আছে। এমন একটা গ্রাম্য নিরিবিলি জায়গায় সাইবার ক্যাফে আছে লোকে সহজে ধরতেই পারে না। ওর বাবার কিছু বন্ধু মাঝে মধ্যে অফিস থেকে এদিক দিয়ে ফেরে বটে, কিন্তু কাচের ভিতরে তাদের লক্ষ্য করার কথা নয়৷
সাইবার ক্যাফে থেকে বেরিয়ে ফাঁকা পিচের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে থাকে দুজনে। গরমকালের দুপুর। একটু আগেই মনে হয় বৃষ্টি হয়ে গেছে। পিচের উপর চটি ঘষার আদুরে শব্দ হচ্ছে একটা।
‘তোর কাছে একটা ইনফো নেই মনে হয়।’ আগমনী একটা নরম হাসি হেসে বলে।
‘কী?’
‘আমার মা রেলে চাকরি করে।’
‘তাতে কী হয়েছে?
‘চাইলে তোকে একটা টিকিট আমি জোগাড় করে দিতে পারি। মানে ঝামেলা আছে, কিন্তু চেষ্টা করলে…’
‘সত্যি?’ সাম্যর মুখ চোখে বুঝি সমস্ত রোদ এসে ভিড় করে।
‘দেখ, আমার বাড়িতেও চাপ আছে। তবে তোর মতো না, চলে যাওয়াটা আমি চাইলে ম্যানেজ করে দিতে পারব। কিন্তু ওখানে গিয়ে তো আর ফিরে আসতে পারবি না। অন্তত একটা দিন থাকতে হবে…তার জন্যও টাকাপয়সা…
আবার চোখ মুখে হতাশা নামে সাম্যর। কী যেন মনে হতে পকেট থেকে একটা কাগজের ঠোঙা বের করে সে। সেটা আগমনীর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, ‘সিগারেট খাবি?
‘দে…’
একবার আগমনীর মুখের দিকে চেয়ে নেয় সাম্য। তারপর ইনসিগনিয়াটা তুলে ওর দিকে বাড়িয়ে দেয়, ‘এটা খেয়ে দেখ, সলিড খেতে।’
গদ গদ মুখে সেটা ধরায় আগমনী, তারপর কয়েক পা সামনে হেঁটে বলে, ‘আচ্ছা, তুই ওই হিসি করার ব্যাপারটা জানলি কী করে বল তো?’
সাম্য শয়তানি হাসি ফোটায় মুখে। বলে, ‘আন্দাজে…লজ্জাজনক কিছু একটা বলতে হত তাই…’
‘বয়ফ্রেন্ড আছে বলতে পারতিস, পেচ্ছাপই কেন?’
সাম্য তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে হাসে, ‘তোর মুখ দেখে। তুই বড় বয়স অবধি কেন, এখনও বিছনায় মুতিস এটা কল্পনা করে নিতে পারি। কিন্তু তোর বয়ফ্রেন্ড। অসম্ভব!’
আগমনী হেসে ফেলে। সাম্য ছেলেটাকে মন্দ লাগেনি ওর। এতক্ষণে এটুকু বুঝতে পেরেছে ছেলেটার স্নেহ একটু ভিন্ন প্রকৃতির। ওর স্নেহ যার প্রতি যত বাড়ে, তাকে নিয়ে সস্তার হাসিঠাট্টাও তত বাড়তে থাকে।
আরও কিছুদূর হেঁটে এসে প্রশ্ন করে আগমনী, ‘ভালো কথা, তুই তো সবার ব্যাপারে এত জানিস টানিস, একজনের ব্যাপারে কিছু ইনফো দিতে পারবি?’
‘কার?’
‘নহর জান্নাত। সুন্দর দেখতে মেয়েটা…’
‘তুই লেবু নাকি?’ অবাক চোখে ওর দিকে চায় সাম্য৷
‘আরে ধুর, এমনি জাস্ট ইন্টারেস্ট।’
খানিকক্ষণ চুপ মেরে কী যেন ভাবে সাম্য। তারপর বলে, ‘তেমন কিছু জানি না, আগে নর্থ বেঙ্গলের কোনও স্কুলে পড়ত। মাধ্যমিকের ঠিক পরে ওকে কারা যেন কিডন্যাপ করে নেয়।’
‘সে কী! কিডন্যাপ! তারপর?’
‘বাপ-মার কাছে ফিরিয়েও দিয়ে যায়। ওকে তেমন একটা কথাবার্তা বলতে দেখিনি কারো সঙ্গে। তবে একটা কানাঘুষো শুনেছি, যদিও সত্যি কিনা জানি না।’
‘কী শুনেছিস?’
‘মাঝে মাঝে ও উধাও হয়ে যায়।’ স্বাভাবিক গলাতেই কথাগুলো বলে সাম্য। কিন্তু ফাঁকা পিচের রাস্তায় যেন প্রতিধ্বনিত হয় কথাটা। আগমনী দাঁড়িয়ে থাকে কয়েক সেকেন্ড। অবাক চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বলে, ‘মানে?’
‘মানে…’ সাম্যকে চিন্তিত দেখায়, ‘মানে ধর, তোরা একই কোচিংয়ে পড়িস। একসঙ্গে গেটের বাইরে বেরিয়েছিস। ও হয়ত একটু আগে বেরিয়ে গেল। তুই গেটের বাইরে বেরিয়ে দেখলি ও কোত্থাও নেই। জাস্ট হাওয়া!’
‘সে কী!’
‘তারপর ধর এক সপ্তাহ পড়তে আসে না। এদিকে স্কুলে যায়। ওর বাড়ির লোককে ফোন করলে বলে অসুস্থ। মনে হয় কিছু একটা বড় রোগ আছে। মেয়েটা কেমন যেন বিচিত্র। আর…’ কথাটা শেষ না করেই হেসে ফেলে সাম্য।
‘আর কী?’
‘এসব সব শোনা কথা, বুঝিসই তো। আসলে মেয়েটা অতিরিক্ত চুপচাপ আর গোলমেলে গোছের। এদিকে আবার দেখতে এত মিষ্টি। তাই হয়তো এসব গুজব।’
হাঁটতে হাঁটতে গলিটার মুখে পৌঁছে গেছিল দুজনে। এবার যেন একটু সতর্ক হয় সাম্য। এ জায়গাটা আগের মতো নিরিবিলি নয়। বাড়ির লোক দেখে ফেলতে পারে।
‘চলি রে…’ ওর দিকে তাকিয়ে কথাটা বলে আগমনী। সাম্য মুখ না ঘুরিয়েই চাপা গলায় বলে, ‘চলি কী রে…বাড়িতে ঝাড় খাবি তো…’
‘কেন?’ মুখের সামনে থেকে চুল সরিয়ে ফিরে তাকায় আগমনী।
‘সিগারেট খেয়ে ঘরে ঢুকবি মুখে গন্ধ পাবে না?’ ঠোঙা থেকে বের করে ওর দিকে একটা ছোট চিউইংগামের প্যাকেট এগিয়ে দেয় সাম্য। ক্লোরোমিন্ট।
হাসি মুখে সেটা নিয়ে সামনের দিকে পা বাড়াচ্ছিল আগমনী। হঠাৎই ওকে পিছু ডাকে সাম্য, ‘এই আর একটা কথা মনে পড়ছে মেয়েটার ব্যাপারে, এটা অবশ্য শোনা কথা নয়। নিজের চোখে দেখেছি।’
‘কী বল তো?’
তুই অন্যমনস্ক থাকলে মেয়েটা কেমন সাপের মতো তোর দিকে চেয়ে থাকে। আর হাসে…’
আগমনীর মাথা থেকে পা পর্যন্ত একটা ঠান্ডা স্রোত খেলে যায়।
কোচিংয়ে ঢোকার মুখেই পিঠটা আর একবার চিড়বিড়িয়ে ব্যথা করে ওঠে খুঁটির। একটু দাঁড়িয়ে পড়ে সে। হাত দিয়ে পিঠের মাঝখানটা ছোঁওয়ার চেষ্টা করে। পিঠে বেকায়দায় মারলে শিরদাঁড়া মট করে ভেঙে যেতে পারে। কিন্তু বাবার ওসব কাণ্ডজ্ঞান নেই। একবার মাথায় রাগ উঠলে হাতের সামনে জুতো, বেল্ট, পুরীর লাঠি যা পান তাই দিয়ে চাবকে দেন।
আজ ওর ব্যাটটাই পড়েছিল সামনে। সেই দিয়েই পিঠে ক’ঘা বসিয়ে দিয়েছেন। মা প্রথম প্রথম উস্কানি দিচ্ছিল। শেষে ব্যাটের ঘায়ের আওয়াজ শুনে নিজেই এসে শান্ত করেছে৷ কিন্তু ততক্ষণে ও মাটিতে পড়ে কাতরাচ্ছে।
আপাতত পিঠে হাত দিয়েই ককিয়ে উঠল খুঁটি। কী কুক্ষণে যে বাবার পকেট মারতে গেছিল! মাত্র একশোটা টাকা, তার জন্য…
পকেট থেকে ছোট চিরুনি বের করে চুলটা একবার সেট করে নেয় খুঁটি। তারপর ব্যাগে রাখা ছোট্ট আয়নায় মুখটা ভালো করে দেখে নেয়। মোটামুটি একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে আসে। এখানেই মধুসূদন স্যারের ব্যাচে কেমিস্ট্রি পড়ে ও।
স্যারের দরজার ঠিক বাইরে অন্তত গোটা কুড়ি জুতোর পাটি খোলা৷ এরা সবাই পড়তে এসেছে আজ স্যারের কাছে। তারই মধ্যে এক জোড়া হলদে পাম্পশু দেখতে পেয়ে ওর মনটা খুশি হয়ে যায়। একটা পাটি উলটে পড়েছিল, সেটা কায়দা করে নিজের খোলা জুতোর পাশে রেখে দেয়। মুখের হাসিটা চওড়া হয় ওর। পাশাপাশি দু’জোড়া জুতোর উপর একবার আরামের চোখ বুলিয়ে নিয়ে দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে আসে খুঁটি।
মেঝেতে জনাকুড়ি ছেলেমেয়ে গোল করে বসে আছে। তার মধ্যে থেকে সাম্যকে খুঁজে নেয়। সাম্যর পাশে ফাঁকা জায়গাটায় এসে বাবু হয়ে বসে পড়ে।
মধুসূদন স্যার পড়ানো শুরু করে দিয়েছেন। ওকে ঢুকতে দেখে একটু বিরক্ত গলাতেই বলেন, ‘তুমি আগে তো এত দেরি করে আসতে না ঋতবান! দিনদিন ফাঁকিবাজ হচ্ছ নাকি?’
খুঁটি অপরাধী মুখ করে একবার সাম্যর দিকে দেখে। এই কোচিংয়ে ও তাড়াতাড়িই আসতে চায়। কিন্তু সাম্যর কড়া নির্দেশ, যেসব ছেলেরা কোচিং শুরু হওয়ার আগে থেকে এসে হাঁ করে বসে থাকে তাদের মেয়েরা একেবারেই পছন্দ করে না। সিনেমায় হিরোর এন্ট্রি হয় অনেক পরে। সেইজন্যেই ইচ্ছা করে দেরি করে আসতে হয় খুঁটিকে। ততক্ষণ ওর বুকের মধ্যে একটা হাঁকুপাঁকু চলে। মৌসুমিকে এ সপ্তাহের মতো একবার দেখার ছটফটানি।
সাম্য একটা হাত রাখে খুঁটির পিঠে। সঙ্গে সঙ্গে ককিয়ে ওঠে ও৷ সাম্য ঘাবড়ে গিয়ে চাপা গলায় বলে, ‘আরে। হল কী তোর?’
‘পিঠে ব্যথা৷ বাপ কেলিয়েছে।’
‘যাহ্ শালা! কেন?’
‘পয়সা মেরেছিলাম বলে।’
‘হঠাৎ পয়সা মারতে গেলি কেন?’
ওর দিক থেকে মুখ সরিয়ে নেয় খুঁটি। তারপর ব্যাগের সামনের চেনটা হালকা ফাঁক করে ভিতরে ইশারা করে। সাম্য উঁকি দিয়ে দেখে তার ভিতরে পেন, লাটাইয়ের সুতো আর ভাঙা বেব্লেটের সঙ্গে একটা সাদাটে ট্যাংরা মাছ সাইজের জিনিস রাখা আছে।
‘কী ওটা ভাই?’ সাম্য জিগ্যেস করে।
‘ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি।’
‘হ্যাঁ? কী হবে ও দিয়ে!’
‘তোর দাদুর শ্রাদ্ধ হবে শুয়োর। মেখে এসেছি। ফরসা লাগছে দেখছিস না?’
এতক্ষণ খুঁটির মুখের দিকে তাকায়নি সাম্য। এইবার সে খেয়াল করে ছেলেটার মুখটা আজ একটু বেশিই চকচকে দেখাচ্ছে। হাসিটা কান অবধি ছড়িয়ে পড়ছে।
‘এই মাল কিনতে তুই বাপের টাকা গেঁড়িয়েছিস?’ সাম্য চাপা গলায় বলে।
‘এই, তোমাদের সব সময় এত কথা কী? হ্যাঁ! আর একবার গুজগুজ করতে দেখলে বিয়ে দিয়ে দেব তোমাদের! মধুসূদন স্যার ধমক দিয়ে ওঠেন।
ধমক খেয়ে চুপ করে যায় ওরা দুজন। খুঁটির একটু অপদস্থ লাগে। ওর ঠিক উলটোদিকে বসেছে মৌসুমি। মেয়েটা সারাক্ষণ কী যে করে নিজের খাতার উপর ঝুঁকে! তবে মাঝে মাঝে স্যার কিছু বললে, এক সেকেন্ডের জন্য মুখ তোলে। তারপর আবার মুখ নামিয়ে আনার সময় এক সেকেন্ডের কয়েক ভগ্নাংশের জন্য চারপাশের দিকে দৃষ্টি বুলিয়ে নেয়। সেই ভগ্নাংশেরও ভগ্নাংশ পরশ বুলিয়ে যায় খুঁটির দিকে। আর ওই মিলি সেকেন্ডের মধ্যেই খুঁটি বাপের ক্যালানি ভুলে যায়। বারো জোড়া করটিক স্নায়ুর অর্ডার আগুপিছু হয়ে যায়, ক্ষুদ্রান্ত নিজের প্যাঁচ খুলে কাতুকুতু দেয় পেটের দেওয়ালে। অক্সিজেনের বোঝা বইতে বইতে ক্লান্ত রক্ত হাত পা ছুড়ে লাফাতে লাফাতে এসে জমা হয় গালে৷
মিনিটখানেকের মধ্যে খুঁটির ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি মাখা চকচকে গালে ঘাম জমে। কানের পাশ দিয়ে গরম হাওয়া বয়। যখন সেই ঘোর কাটে ও দেখে স্যার কীসের একটা ছবি আঁকতে দিয়ে কোথায় যেন গেছেন। সাম্য মন দিয়ে পেনসিল চুলছে, আর মৌসুমি ইতিমধ্যে আঁকা শেষ করে পাশের বান্ধবীর সঙ্গে কী নিয়ে যেন হাসাহাসি করছে। খুঁটি কান পেতে ব্যাপারটা শোনার চেষ্টা করে। ছেঁড়া ছেঁড়া শব্দ কানে আসে ওর। সিনেমা নিয়ে কথা হচ্ছে মনে হয়।
মৌসুমির পাশের মেয়েটা ক’দিন আগেই হলে ‘যাব উই মেট’ সিনেমাটা দেখে এসেছে। সেই নিয়েই ফলাও করে কীসব বলে চলেছে। মৌসুমি এতক্ষণ চুপ করেই বসেছিল, হুট করে তার মুখের কথা কানে আসে খুঁটির, ‘ধুর, আমার ওরকম চকলেট বয় ভালো লাগে না। হিরো হবে ঋত্বিকের মতো। টল ডার্ক অ্যান্ড হ্যান্ডসাম! আমার কিন্তু…’
খুঁটির কান গরম হয়ে ওঠে। পাশে ফিরে সাম্যের পেটে কনুই দিয়ে একটা ধাক্কা মারে ও, ‘এই শালা, তুই বলেছিলি ফর্সা ছেলে পছন্দ করে। ডার্ক মানে তো কালো!’
‘অ্যাঁ?’ সাম্য ব্যাপারটা আন্দাজ করতে একটু সময় নেয়, ‘তা আমি কী করব?’
সাম্যর হাতের পেনসিলটার মতোই ওকে ছুঁলে দিতে ইচ্ছা করে খুঁটির ‘শুয়োর কোথাকার! আন্দাজে বলে বাপের হাতে ক্যালানি খাওালি আমাকে। তোর উপর ভরসা করাই ভুল হয়েছে আমার!’
সাম্য ব্যাপারটা ম্যানেজ করার চেষ্টা করে, ‘তুই এত চোটে যাচ্ছিস কেন বল তো? ফর্সা হতে গেলে পয়সা খরচ করতে হয়। কালো হওয়া একদম পাতি কাজ। টিফিন টাইমে আধঘণ্টা রোদে দাঁড়িয়ে থাকবি…ব্যাস।’
‘আর টল? সেটা কী করে হব?’
সাম্য কাঁধ ঝাঁকায়, ‘ওটা কোনও ব্যাপার নয়। মৌসুমির বয়ফ্রেন্ড জানতে পেলে এমনিই তোকে জুতিয়ে লম্বা করে দেবে।’
এবার জ্বলে ওঠে খুঁটি, ‘ওর বয়ফ্রেন্ড আছে সেটা তুই আজ বলছিস আমাকে?’
সাম্যর মুখ হুট করেই নিরুত্তাপ হয়ে যায়, ‘এই যে বললি আমার উপর ভরসা করবি না, এখন করছিস কেন?
অগত্যা খানিকক্ষণ থম মেরে বসে থাকে খুঁটি। মৌসুমির চুল এখন আবার ওর মুখের উপর পর্দার মতো পড়ে আছে। সেদিকে একবার তাকিয়ে হতাশ হয়ে চোখ ফিরিয়ে নেয় খুঁটি। সাম্য আদৌ সত্যি কথা বলছে বলে ওর বিশ্বাস হয় না।
ব্যাগের ভিতর থেকে একটা সযত্নে ভাঁজ করা কাগজ বের করে আনে। তারপর সেটা এগিয়ে দেয় সাম্যর দিকে। সাম্য খুলে দেখে যত্ন করে তাতে একটা কবিতা লেখার চেষ্টা করেছে খুঁটি। অবশ্য সে কবিতা খুঁটির নিজেরও পছন্দ হয়নি। মহালয়ার কাকভোরে ঘুম চোখে মহিষাসুরমর্দিনী শুনতে শুনতে তথ মনে হয়েছে, এমন দাঁতভাঙা সংস্কৃতেই একমাত্র মৌসুমির জন্য কিছু একটা লিখে ফেলা যায়। তার গুটি প্রাণপণে বাংলা ভাষার লজঝড়ে সাইকেলে প্যাডেল করেছে-
‘একটা মেয়ের নরম দুটি ওষ্ঠ
একটা মেয়ের বুকের ভিতর কষ্ট
একটা মেয়ের হরিণ চোখের দৃষ্টি
একটা মেয়ের খোঁপায় নামে বৃষ্টি…’
এতদূর পড়েই বেশ বিরক্ত লাগে সাম্যর। কাগজটা নামিয়ে রেখে বলে, ‘শালা, এটা কবিতা না লেডিস কামরা? একটার পর একটা মেয়ে খালি … তাছাড়া প্রথমেই এই ওষ্ঠ ফোস্ট নিয়ে হ্যালহ্যালানি মেয়েরা একদম পছন্দ করে না।’
খুঁটি হতাশ হয়, ‘তাহলে এখন কী করব?
ঠোঁটে পেনসিল রেখে ভাবে সাম্য, ‘অন্য কাউকে দিয়ে লিখিয়ে নিতে হবে।’
‘তুই লিখে দে!’ খুঁটির গলায় কাতর আকুতি।
‘ধুর মড়া, আমি লিখতে পারলে তো হয়েই যেত।’ সাম্যর চোখ দুটো হুট করেই উজ্জ্বল দেখায়, ‘একটা কাজ করা যায়। তোর সঙ্গে ব্যাদার আলাপ আছে?’
‘মুখে নেওয়া ব্যাদা? তেমন একটা নয়। কেন?’
‘ও শালা সারাদিন মুখে বই নিয়ে বসে থাকে যখন লিখতেও পারে মনে হয়। ওকে একবার বললে হয় না?’
‘হতে পারে। কিন্তু ও এমনি এমনি লিখে দেবে কেন?’
খুঁটির হাঁটুর উপর একবার চাপড় মারে সাম্য, ‘আমি থাকতে ওসব নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে না তোকে৷’ কথাটা বলে অভয় দিয়ে আবার পেনসিল ছোলার দিকে মন দেয় সাম্য।
খুঁটি সামনের দিকে তাকায়। অদ্ভুত ঠান্ডা একটা জোলো হাওয়া ভেসে আসছে জানলা দিয়ে। সেই হাওয়ায় মৌসুমির ক্লিপ দিয়ে বাঁধা চুল উড়ব উড়ব করেও উড়ছে না। বড্ড সিরিয়াস দেখাচ্ছে এখন মেয়েটাকে। মেয়েরা খুব সিরিয়াসলি মন দিয়ে কিছু করলে তাদের হাসির থেকেও বেশি সুন্দর দেখায়।
আচ্ছা মৌসুমি পড়াশোনায় এত ভালো, ভুরু কুঁচকে স্যারের পড়া শোনে, নাচের মুদ্রা মুখস্ত করে, এদিকে ওর দিকে যখন তাকায় তখন এতটা সিরিয়াস থাকে না কেন? এতটা মন দিয়ে বোঝার চেষ্টা করে না কেন?
ধুস্। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে খুঁটি। মৌসুমি অস্ট্রেলিয়ার মতো ব্যাট করে আর ও উলটোদিকে কেনিয়ার মতো মার খায়। মৌসুমি কালবৈশাখীর মতো বয়ে যায় ওদের পাড়ার উপর দিয়ে আর ও ছাদে শুকোতে দেওয়া কাসুন্দির জারের মতো টং করে উলটে পড়ে ভেঙে যায়। মেয়েটা নাচ, গান, আবৃত্তি জানে, দেখতে কত সুন্দর! আর খুঁটির বড় করে বিগ বাবুল ফোলানো ছাড়া আর কোনো গুণই নেই…
নাহ্, মৌসুমি হয়ত ভিনদেশী তারা হয়েই থেকে যাবে চিরকাল…..
বিকেল নামতেই টিপটিপ করে বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। খুঁটিদের কোচিং যখন ছুটি হয় ততক্ষণে ঝমঝমিয়ে নেমেছে। খুঁটি ছাতা আনে না। সাম্যর বাড়ি সামনেই। সে একরকম দৌড়েই বেরিয়ে গেল ওকে ফেলে। আজব ছেলে!
একদল ছেলেমেয়ে স্যারের বাড়ির একতলার শেডের নিচে জড় হয়েছে। অনেকেই ছাতা আনেনি। তাদের আপাতত দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। খুঁটির বৃষ্টিতে ভিজতে মন্দ লাগে না। তবে ব্যাগে দামি বই আছে৷ বাবা এমনিতেই খচে আছে। তার উপরে ও নিজে ভিজে বাড়ি ফিরলে বাবা আর আস্ত রাখবে না।
ভয়ে ভয়ে শেডের আরও ভিতরের দিকে সরে এসে আড়চোখে একবার মৌসুমির দিকে দেখে নিল খুঁটি। মুখ থেকে চুল সরিয়ে একবার আকাশের দিকে তাকাল মেয়েটা। তারপর ব্যাগ থেকে ছাতা বের করে বৃষ্টির মধ্যে হেঁটে চলে গেল। ওর ছপছপ পায়ের আওয়াজ হারিয়ে গেল একটু দূরে।
খুঁটি মুখ সরিয়ে নিতেই যাচ্ছিল, তার আগেই একটা জিনিস চোখে পড়ে গেল। ছাতা বার করার ফাঁকে মৌসুমির ব্যাগ থেকে কিছু একটা মাটিতে এসে পড়েছে।
এগিয়ে এসে জিনিসটা হাতে তুলে নিল খুঁটি। একবার বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে নিয়েই একছুটে বেরিয়ে পড়ল বাইরে।
খানিকটা এসেও মেয়েটাকে দেখতে পেল না খুঁটি। অবশ্য অস্বাভাবিক কিছু নয়। ওর চোখে মোটা পাওয়ারের চশমা। সেটা আপাতত জলে ভিজে ঝাপসা। ভালো করে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। এতক্ষণে বৃষ্টির জোরও বেড়েছে।
মনে মনে ভগবানের নাম করে সামনে পা বাড়াল খুঁটি, আর সঙ্গে সঙ্গে কীসে যেন হোঁচট খেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল রাস্তার উপর। একটা দাঁড় করিয়ে রাখা সাইকেল। চোখ জোড়া জল নিয়ে সেটাকেই পাঁচিল মনে হয়েছিল খুঁটির। ভর দিতে গিয়ে উলটে পড়েছে।
মাটি থেকে উঠতে গিয়ে খুঁটি বুঝল, পা থেকে খুলে গেছে চটিটা। হাতড়ে হাতড়ে চটি দুটো খুঁজে নিল খুঁটি। ও দুটো আর পরা যাবে না। কিন্তু সামনের রাস্তাটা হেঁটে যাবে কী করে?
ভারি অসহায় লাগল খুঁটির। এক হাতে ছেঁড়া চটি অন্য হাতে নীল রুমাল নিয়ে মাঝরাস্তায় অন্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে কাঁপতে লাগল। নাহ্, বেকুবের মতো কাজ হয়েছে। সাম্যটা শালা হারামজাদা। আগে থাকতে বেরিয়ে…
‘বাড়ি থেকে ছাতা আনতে কী হয় তোর?’ কাঁধে একটা হাতের স্পর্শ পায় খুঁটি। গলাটা ও চেনে। ফিরে তাকিয়ে মেয়েটাকে কিন্তু দেখতে পায় না ও তার বদলে জলে ভেসে যাওয়া একটা অবয়ব। খানিকটা মেয়েটার শরীরের জল,খানিকটা ওর চশমার কাচে জমা জল। ঠিক ছোটবেলায় আঁকা জলছবির মতো দেখাচ্ছে মেয়েটাকে। ঝাপসা, কিন্তু নরম, আর কচি কলাপাতার মতো স্নিগ্ধ সবুজ।
‘আমি…মানে তোর রুমালটা…’ মৌসুমির দিকে রুমালটা বাড়িয়ে ধরে খুঁটি।
খুঁটির মনে পড়ে ওর মুখের ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি বৃষ্টির জলে উঠে গেছে। মাথার স্পাইক করা চুল নেতিয়ে এসেছে কপালের উপরে। মাটিতে পড়ে গিয়ে গলা আর গায়ের বেশ কিছু জায়গাতে নোংরা কাদাজল মাখামাখি হয়েছে। পায়ে চটি না থাকার জন্য স্বাভাবিকের থেকে হাফ ইঞ্চি বেঁটে দেখাচ্ছে তাকে আর সেই অবস্থাতেই মেয়েটা তাকিয়ে আছে ওর দিকে।
‘ছাতার ভিতরে ঢুকে আয়, ভিজে যাচ্ছিস।’ মৌসুমি এগিয়ে এসে ছাতাটা বাড়িয়ে দেয় ওর দিকে৷
জলের উপর দিয়ে ছপছপ করে হেঁটে যায় ওরা। খুঁটি খুব একটা ভালো দেখতে পায় না। কিন্তু মৌসুমির ছাতার ছায়াটা আন্দাজে ও বুঝতে পারছে। ও জানে এই ছাতার তলায় তলায় গেলে আর কিছুতে ধাক্কা খাবে না।
সেদিন ওই ভাবেই অনেকক্ষণ মৌসুমির পাশে পাশে হেঁটেছিল খুঁটি। ঝমঝম করে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছিল ছাতার কাপড়ে। শরীরের অর্ধেক ভিজছিল বৃষ্টির তোড়ে। সেদিন খুঁটির মাথায় ছাতা ধরে হাঁটছিল এক জলছবির মেয়ে। এক ঝাপসা হয়ে যাওয়া বিকেল পেরিয়ে যাচ্ছিল ওকে নিয়ে।
এরপর আর কিছু ঘটেনি। গোটা রাস্তাটা কোনও কথা বলেনি দুজনে৷ হাতের স্পর্শ হয়নি, ফোন নম্বর চালাচালি হয়নি, খুঁটি একবার চন্দ্রবিন্দুর একটা গান গাইবে ভেবেও গাওয়ার সাহস করতে পারেনি। সেকালে এত কিছু হতও না।
তবে বাকি জীবন এই বিকেলটা রয়ে গেছিল খুঁটির মনের ভিতর।
সেদিন ও মৌসুমির পাশে অনেকক্ষণ হেঁটেছিল। সেদিন মৌসুমি অনেকক্ষণ ওর পাশে হেঁটেছিল!
