তালদিঘিতে ভাসিয়ে দেব – ৫
পঞ্চম অধ্যায়
গল্পের মতো
ইশকুল বাড়ি
জমে ওঠা ক্ষত
খেলব না, আড়ি
সে খেলা কানাগলি রোজ চুপিসারে
এবং আগুন ছিল লাস্ট কাউন্টারে
হাওয়ায় হাওয়ায়…
‘এইটাই তো স্যার?’ রেডিয়োটা বন্ধ করে উবার ড্রাইভার। তারপর স্কুল বাড়ির সামনে গাড়িটা থামিয়ে পেছনে না ফিরেই জিগ্যেস করল কথাটা। কৌশিক ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল জানলার কাচ থেকে মুখ বাড়িয়ে সামনের দিকে চেয়ে আছে আগমনী। চোখের মণিটা অস্থির হয়ে উঠেছে তার। ক্রমশ স্থির হয়ে যায় সেটা। ঠোঁটের কোণে একটা হাসি ফুটে ওঠে, ‘হ্যাঁ এটাই…’
সল্টলেকের রাস্তাঘাট সারাদিন ফাঁকাই থাকে। এই বিকেলের দিকে কেবল বিভিন্ন রাস্তাজুড়ে ছুটি হওয়া স্কুলের বাচ্চাদের হেঁটে হেঁটে বাসস্ট্যান্ড অবধি আসতে দেখা যায়। সেটা বাদ দিয়ে মাঝে মাঝে একটা দুটো প্রাইভেট কার কিংবা অটো হুশ করে পাশ কাটিয়ে চলে যায়।
কৌশিক দরজা খুলে নেমে আসে বাইরে। আপাতত দুপুর বিকেলের দিকে গড়াতে শুরু করেছে। আজ সকালেও একবার ফোন করে কনফার্ম করেছে স্কুল কমিটিকে। ওরাই বিকেলের দিকে টাইম দিয়েছে।
পাভেল গোমসের কলকাঠি নাড়ানোতেই যে ব্যাপারটা হয়েছে সেটা আগমনীকে বলেই দিয়েছে কৌশিক। সে বিশেষ আপত্তি করেনি। আপাতত তার মাথায় ছেলেবেলার ভূত তাড়া করার বাই চেপেছে৷ অন্য কিছু নিয়ে যায় আসে না।
খোলা মাঠের প্রায় অর্ধেকটা জুড়ে মোট তিনতলা স্কুল। চারদিকে উঁচু পাঁচিল দেওয়া। সদর দরজার সিংহদ্বারের সামনে দারোয়ান বসে আছে। তার ঠিক পাশেই একটা ঠেলাওলা আচার, ঝালমুড়ি, চিপস, বিস্কুট বিক্রি করছে। একটু আগেই টিফিন হয়ে গেছে বলে প্যাকেট আর কাগজের ঠোঙা ছড়িয়ে আছে এদিক ওদিক।
স্কুল বিল্ডিংয়ের বেশিরভাগটাই জানলা। সেই জানলার কাচের পাল্লা আপাতত হাট করে খোলা। তার ভিতরে আকাশি ইউনিফর্ম পরা সারসার মুখ দেখা যাচ্ছে এখন। থমথমে মুখ দেখে বোঝা যায় সে ক্লাসে টিচার আছে। অন্যগুলোতে উৎসবের মেজাজ। সমস্ত ক্লাসের আলাদা আলাদা চিৎকার মিলেমিশে এক বিচিত্র গুঞ্জন তৈরি করেছে।
দুজনে বেরিয়ে আসে দরজার কাছে। আগমনী বিড়বিড় করে বলে, ‘আগে বিল্ডিংটার ইটগুলো লালচে রঙের ছিল। নতুন করে মেরুন রং করেছে। আর ছাদটা…’
‘তোর সত্যি মনে পড়ছে?’ কৌশিক হাসি মুখে জিগ্যেস করে।
‘একটা ছবি শুধু। কলেজে ওঠার আগে ক্যারেকটার সার্টিফিকেট আনতে এসেছিলাম স্কুলে। তখন এই মাঠটা ছেড়ে আসার আগে শেষ একবার তাকিয়েছিলাম বিল্ডিংটার দিকে। খুব কান্না পেয়েছিল সেদিন। আর বসতে পারব না তো বেঞ্চগুলোতে!’
আগমনী মনে মনে ভাবে, মেয়েদের সারাজীবন কেবল ছেড়ে আসতে আসতেই কেটে যায়। ঘর, বাড়ি, প্রিয় মানুষ, যত্নমাখা হাত। মেয়েদের শহরে কেবল দূরপাল্লার ট্রেনের টাইমটেবিল। সে সব ট্রেন কবে ফিরবে তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। তাও স্কুল ছাড়ার ট্রেনটা সময় হয়ে যাওয়ার অনেক পর অবধি দাঁড়িয়ে থাকে প্লাটফর্মে। অনেকক্ষণ ধরে হুইসল দিয়ে ডাকে নিত্যযাত্রীদের। ট্রেন চলে গেলেও সে হুইসল বেজে যায় আজীবন।
উঁচু ক্লাসের দু’একটা মেয়ে ঘোরাঘুরি করছে। আকাশি শার্টের বদলে নীল সালোয়ার কামিজ তাদের গায়ে। সেই সঙ্গে নেভি-ব্লু বর্ডার দেওয়া ওড়না৷
ওর মনে পড়ে এক সময় একটা বিহারি মোটা কালো লোক এখানে ভুজিয়া বিক্রি করত। এখন তার জায়গায় একটা ছোকরা বসে আছে। ওর ছেলে মনে হয়। দরজার ঠিক ডানদিকে একটা রোগাটে লোক টিফিনের সময় টুথপিক গোঁজা কাটা আমড়া নুন মাখিয়ে বেচত। সে আর নেই।
ঝাঁকড়া চুলের এক দারোয়ান বসেছিল গেটের ভিতরের চেয়ারে। ওদের এগিয়ে আসতে দেখে উঠে দাঁড়ায়, ভারি গলায় জিগ্যেস করে, ‘কী চাই আপনাদের?’
‘হেডস্যারের সঙ্গে একটু প্রয়োজন ছিল। অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে৷ বললেই বুঝতে পারবেন।’ আগমনীই বলে।
ভিতরে ঢুকে একবার চারপাশটা দেখে নেয়। জায়গাগুলো আবছা মনে পড়ে ওর। মাঝে একটা বড় দালান আছে। সেখানে টিফিনের সময় কিছু ছেলে ফাঁকা প্লাস্টিকের বোতল নিয়ে ফুটবল খেলত। তারই একদিকে ফেব্রুয়ারি মাসে সরস্বতী পুজো হত। তার আগে সারারাত জেগে ছেলেমেয়েরা পুজোর জোগাড়যন্ত্র করত।
দালানটাকে ঘিরেই দুটোতলা জুড়ে ক্লাসরুমগুলো সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে৷ সকালে স্কুলে ঢুকেই এই দালানেই প্রেয়ার হত—’আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে, বিরাজ সত্য সুন্দর…. সেই গানের সুর এখনও ভেসে আসে ওর কানে। মনটা অকারণেই হালকা হয়ে যায়। তখন কি স্কুলটাকে আরও বড় মনে হত? আরও জবরদস্ত কিছু? এখন যেন বেশ খানিক ছোট মনে হচ্ছে ওর।
ঝং ঝং করে ধাতব শব্দ হয়ে ক্লাস শেষ হল। আর একটা ক্লাস বাকি। বিকেলের রোদ একটু একটু করে মরে আসছে। আগমনীর চিরকাল মনে হয় ছুটির সময় হয়ে এলে স্কুলবাড়ির দেওয়ালগুলো আরও বিষণ্ণ দেখায়।
হেডস্যারের রুমটা একতলাতেই। সেখানে ঢুকে টেবিলের সামনে রাখা চেয়ারে বসতে বসতে আগমনী বলল, ‘আমার নাম আগমনী ভট্টাচার্য। ইলেভেন টুয়েলভ এখানেই পড়েছি।’
হেডস্যার কেতকী শর্মা একটু হাসলেন, ‘আমার এখানে চাকরির পাঁচ বছর হল। আমার চেনার কথাও নয়…’
একটু ইতস্তত করল আগমনী, কৌশিকের দিকে একবার নজর ঘুরিয়ে নিয়ে একটু লাজুক হেসে বলল, ‘আসলে আমি একটা সমস্যা নিয়ে এসেছি। আপনি ব্যস্ত মানুষ…’
‘না, না। বলুন না৷’
আগমনীর অস্বস্তিটা বেড়ে উঠছিল ক্রমশ। কৌশিক সেটা বুঝতে পেরেই চেয়ারটায় বসে পড়ে বলল, ‘আসলে ওর একটু মানসিক সমস্যা হচ্ছে ক’দিন ধরে। ওর মনে হচ্ছে এই স্কুলে পড়ার দু’বছরের স্মৃতি ও ভুলে গেছে।’
‘সে কী! আপনার তো এমন কিছু বয়স হয়নি।’ কেতকী শর্মা ওর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন, ‘অন্য সব মনে আছে কিন্তু স্কুলের স্মৃতি ভুলে গেছেন?’
‘খানিকটা সেই জন্যেই মনে হচ্ছে এখানে কিছু একটা ঘটেছিল। রিসেন্টলি ওর কয়েকটা এপিসোড…’
‘কোনও পুরোনো বন্ধু…’
‘ওর কারো সঙ্গে যোগাযোগ নেই আসলে। তাই ভাবছিলাম যদি এখানে এসে কারো সঙ্গে…’
‘কোন ইয়ার ছিল আপনার?’ হুট করেই প্রশ্ন করেন ভদ্রলোক।
‘দু’হাজার আট, মাধ্যমিক।’
টেবিলের উপর পড়ে থাকা ডাস্টারটা হাতে তুলে কবার ঘুরিয়ে নিলেন কেতকী। তারপর খানিক ভেবেচিন্তে বলেন, ‘দেখুন, এতদিন আগের ব্যাপার তো, স্কুলের কাছে জেনারেলি অ্যাডমিট কার্ড এক কপি করে রাখা হয়। প্লাস একটা খাতাতেও এক্স স্টুডেন্টদের নামধাম লিখে রাখা হয়। কিন্তু পনেরো বছর পরে সেই খাতা খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা…’
‘তাহলে আপনাদের কাছে কোনও রেকর্ড নেই?’
হাত ওলটান কেতকী শর্মা, ‘টেকনিকালি আপনারা একটা কাজ করতে পারেন। এখান থেকে বিকাশ ভবন কাছে৷ ওখানে গেলে ডেটা পাওয়ার একটা সম্ভবনা আছে। তবে সরকারি অফিস, বুঝতেই পারছেন। আপনাদের এন্টারটেইন করার সম্ভবনা কম। অন্য কারো ডেটা শেয়ার করা আমি যতদূর জানি আইনবিরুদ্ধ।’ কৌশিকের অসহায় লাগে। মাত্র পনেরো বছরের পার্থক্যে সামান্য একটা ব্যাচের সম্পর্কে তথ্য জোগাড় করা এতটা কঠিন হবে। ওদের টিন এজটায় ইন্টারনেট আর ডেটাবেস জিনিসটা সদ্যজাত শিশু ছিল। সে শিশুকে গ্রামের বাড়িতে দেখা দুঃসম্পর্কের পিসির নাম জিগ্যেস করলে বলবেই বা কী করে?
‘ওই ব্যাচের কাউকে চেনে এমন কেউ নেই?’
কেতকী শর্মার মুখ অসহায় দেখায়, ‘আনফরচুনেটলি সে সময়ের বেশিরভাগ লোকজনই এখন আর নেই। মাঝে সরকার চেঞ্জ হওয়ার ফলে বুঝতেই পারছেন, এদের পরিচালন সমিতির লোকজন বদলে গেছে। স্টাফেদের মধ্যেও ড্রাস্টিক চেঞ্জ এসেছে। তবে আমি একবার…’
কেতকী কথাটা বলতে গিয়েও থেমে গেলেন। ডাস্টারটা আচমকাই টেবিলের উপরে রেখে দিয়ে বললেন, ‘এমনিতে আমাদের প্রফুল্লদা সব থেকে পুরোনো। আগে পার্ট টাইম ছিলেন, এখন পার্মানেট হয়েছেন। উনি একবার টিচার্স রুমে গল্প করছিলেন। ওই ধরুন দু’হাজার নয় কি দশ সালে কিছু একটা হয়েছিল এখানে। তবে সেটা ঠিক কী, তা আমার এখন মনে পড়ছে না।’
‘ওনাকে কোথায় পাব?’ ঝট করে প্রশ্ন করে আগমনী।
‘ক্লাস নিচ্ছেন মনে হয়। হয়ে গেলেই ডেকে দিচ্ছি।’
খুশি হয় আগমনী। চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে বলে, ‘আমি ততক্ষণ স্কুলটা একটু ঘুরে দেখতে পারি? আসলে এত বছর আসা হয়নি তো।’
‘অভিয়াসলি।’ হেসে জবাব দেন কেতকী, ‘আপনি প্রাক্তনী, স্কুলের উপর একটা অধিকার তো আছেই আপনার। তবে ক্লাস চলছে তো, ওদের কোনওরকম ডিস্টার্ব না হলেই…’
রুম থেকে বেরিয়ে দোতলায় ওঠার সিঁড়ির কাছে চলে এল আগমনী। দুটো অল্পবয়সি মেয়ে নিজেদের মধ্যে গল্প করতে করতে নেমে আসছিল উপর থেকে। ওকে দেখতে পেয়ে একটু থমকে যায়। ওর গায়ে একটা ব্লু শার্ট আর জিন্স। সম্ভবত নতুন টিচার ভেবেই এক ঝলক দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে নীচের দিকে নেমে যায় ওরা।
মুখে এক ঝলক হাসি মেখে উপরে উঠে আসে আগমনী। মেয়েগুলোকে কি খানিকটা ওর মতোই দেখতে? হতে পারে।
ল্যান্ডিং পেরিয়ে আর একধাপ সিঁড়ি উঠতে যাচ্ছিল আগমনী, ঠিক এই সময় হঠাৎ করেই মাথাটা ঘুরে যায় ওর। গা’টা গুলিয়ে ওঠে। মনে হয় এক্ষুনি পড়ে যাবে মেঝের উপরে। ঘাম দিতে থাকে৷
‘দেখে ওঠ মণি, পড়ে যাবি তো!’ পাশ থেকে একটা আকাশি স্কুল ড্রেস পরা কেউ যেন কথাটা বলে উপরের দিকে উঠে যায়। মুহূর্তে নিজেকে সামলে নেয় আগমনী। কে বলল কথাটা?
একটা ছেলে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠছে। হাতে একটা জলের বোতল। এক তলার অ্যাকোয়াগার্ড থেকে জল ভরতে গেছিল সে। আগমনী নিজেকে সামলে নিয়ে উঁচু গলায় পিছু ডাকে ছেলেটাকে, ‘তুমি কিছু বললে আমাকে?’
ছেলেটা অবাক হয়ে পেছনে ফিরে তাকায়, ‘কই, না তো!’
আগমনী আর কিছু বলে না। দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। কে বলল ওকে কথাটা? সত্যি কেউ বলেছে? নাকি পুরোনো স্মৃতি? ও কি পড়ে গেছিল এই সিঁড়ি থেকে? ধাক্কা দিয়েছিল কেউ?
আগমনীর মনের ভিতরে একটা হালকা খেয়াল চেপে বসে। ও কোনও একদিন নির্ঘাত পড়ে গেছিল এই সিঁড়ি থেকে৷ কিংবা পড়ার আগে কেউ ধরে নিয়েছিল।
গা গোলানিটা কমেছে এতক্ষণে। কপাল থেকে ঘামটা মুছে নিয়ে দোতলায় উঠে আসে আগমনী। এখানে এসে মনটা বদলে যায় ওর। এক ঝলক ছেলেবেলা মনে পড়ে যায়।
বেশিরভাগ ক্লাসরুমেই এখন ক্লাস হচ্ছে। দরজা দিয়ে তাকালে পেছনের বেঞ্চে কয়েকটা ছাত্রকে দেখা যায়। বারবার বইয়ের পাতা উলটে কী যেন দেখে নিয়ে খাতায় লিখে রাখছে তারা। আগমনী জানে, ওদের দেখে পড়াশোনা করছে বলে মনে হলেও, ওরা আসলে বুক ক্রিকেট খেলছে। ভালো করে কান পাতলে বোঝা যায়, বেঞ্চ বাজিয়ে গান গাইছে কিছু ছেলে। আগমনী মন দিয়ে গানটা শোনার চেষ্টা করে।
দিল খুদগর্জ হ্যায় ফিসলা হ্যায় য়ে
ফির হাথ সে কল উসকা রহা
অব হ্যায় তেরা
ইস রাত সে
একটু অবাক হয় ও। এখনকার ছেলেরাও এই গানটা শোনে? শুধু তাই নয়, স্কুলের বেঞ্চে তালু ঠুকে বাজায়? ওর ঠোঁটের দুটো কোণ চওড়া হয়ে যায়।
ও মেরি জান…
একযোগে চিৎকারে ভরে ওঠে ক্লাসরুম। কৌতূহল হতে শব্দ লক্ষ করে সেদিকে এগিয়ে যায় আগমনী। দোতলার একদম কোণের একটা ঘর থেকে ভেসে আসছে আওয়াজটা। বারান্দা থেকে টিচারের দাঁড়ানোর ডায়াসটা দেখা যায়। সেটা খালি। সেই জন্যেই গানটা ভেসে আসছে অবশ্য।
কয়েক পা বাড়িয়ে ক্লাসরুমের ভিতর উঁকি দিতেই থেমে যায় ও। ক্লাসরুম খালি। ফাঁকা বেঞ্চ সার বেঁধে পড়ে আছে ঘরের মধ্যে। তার উপরে জানলা দিয়ে শেষ বিকেলের আলো এসে পড়েছে। বাইরে বকুল গাছের পাতা দুলছে। সেই সঙ্গে বুনো ফুলের গন্ধ। আর কোথাও কিচ্ছু নেই।
কিছুক্ষণ সেভাবেই দাঁড়িয়ে থাকে আগমনী। ভিতরে ঢুকতেই ব্ল্যাকবোর্ডের উপরে চোখ পড়ে ওর। অপরিচ্ছন্ন হয়ে আছে সেটা। সম্ভবত শেষ যিনি ক্লাস নিয়েছিলেন, তিনি বোর্ডটা ভালো করে মুছে দিয়ে যাননি। বড়সড় কিছু লিখে ডাস্টার দিয়ে শব্দগুলো এলোমেলো করে দেওয়া হয়েছে কেবল। আগমনী ভালো করে তাকায় সেদিকে। বাংলার ক্লাস হয়েছে বোঝা যাচ্ছে। সন্ধির যোগ চিহ্ন আর দু’একটা শব্দের টুকরো চেনা যায়।
হঠাৎ একটা জায়গায় চোখ আটকে যায় ওর। বোর্ডে লেখা একটা গোটা বাক্যের কিছুটা মোছা হয়েছে। বাকিটা জেগে আছে এখনও। ভুরু কুঁচকে লেখাটা উদ্ধার করে আগমনী, ফিরে এলি?
জানলার দিকে সরে আসে ও। জং ধরে যাওয়া গ্রিলের উপর একবার আঙুল রাখে। জানলার ঠিক উলটোদিকের বকুল গাছটার ঝাঁকড়া ডালের ফাঁকে দুলছে একটা শালিকের বাসা। কিচিরমিচির করে ডাক ভেসে আসছে সেখান থেকে।
সেদিকে ভালো করে তাকাতেই ও খেয়াল করে পাখির বাসার ঠিক পাশের ডালেই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা শালিক। অবাক চোখে চেয়ে আছে ওর দিকে। স্থির, নিশ্চল। পাখিটা কি মন দিয়ে দেখছে ওকে?
নিজের মনের ভাবনায় নিজেরই হাসি পায় আগমনীর। পাখির কতরকমের খেয়াল হতে পারে। হয়তো এই ক্লাসেরই কোনও বাচ্চা ক্লাসের ফাঁকে ঠিক অমন করেই চেয়ে থাকে গাছটার দিকে। টিফিনের সময় ওকে পাউরুটি খেতে দেয়। পাখিটা ওকে নিশ্চয়ই সেই বাচ্চাটা বলেই ভুল করছে।
জানলাটা দিয়ে পাশের মাঠটা দেখা যায়। সবুজ ঘাসে ঢেকে আছে মাঠটা। সেদিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকে। হুট করেই একটা বিচিত্র খেয়াল চেপে ধরে ওকে। ওর কেবল মনে হতে থাকে এক্ষুনি এই মাঠের উপর দিয়ে কেউ একটা পার হবে। একটা চেনা কেউ।
ভাবনাটা মাথার ভিতর পাখার রেগুলেটারের মতো বেড়ে ওঠে। অস্বস্তি শুরু হয়ে ভিতরে। চোখের মণি কাঁপতে থাকে। নিঃশ্বাসের শব্দ বেড়ে ওঠে। হাত দিয়ে জানলার গ্রিল চেপে ধরে আগমনী। কে যেন একটা মাঠের উপর এসে দাঁড়িয়েছে না? মাথার উপর অদ্ভুত একটা যন্ত্র ধরা। ওর দিকে পেছন করে হাঁটছে লোকটা। তার দীর্ঘ ছায়া পড়েছে মাঠের উপর। হাঁক দিচ্ছে লোকটা, ‘শীল কাটাউউউ…
চমকে ওঠে আগমনী। লোকটা পেছন ফিরছে ধীরে ধীরে। কাঁধ থেকে যন্ত্রটা নামিয়ে হাতছানি দিয়ে ডাকছে ওকে। হাসছে…লোকটার ঠোঁটের কোণে একটা চেনা হাসি…
‘উফ তুই এখানে!
পেছন থেকে ভেসে আসা শব্দে ওর চারপাশের পরিবেশটা যেন দ্রুত বদলে যায়। কৌশিক এসে দাঁড়িয়েছে। বুকে হাত রেখে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে আগমনী।
‘কখন থেকে রিং করছি, শুনতে পাসনি!’ রাগত গলাতেই বলে কৌশিক।
ওর দিকে ফেরে আগমনী, ‘কৌশিক, এই ক্লাসটায় আমি বসেছি। আমাদের ক্লাস হত এখানে।’
‘তা হতেই পারে, তাতে…’
আগমনীর মুখ উদ্ভ্রান্ত দেখায়, ‘এই জানলাটার কাছে বসতাম আমি ৷ আর…ওই মাঠের উপর দিয়ে একটা শীল কাটাওলা হেঁটে চলে যেত। ওই রাস্তাটা দিয়ে একটা আইসক্রিমওয়ালা গাড়ি নিয়ে হেঁটে যেত। ওকে কিছু দেওয়ার ছিল আমার। কিন্তু দেওয়া হয়নি…কিন্তু…’ নিজের মাথা চেপে ধরে আগমনী। জানলার গ্রিলেই হেলান দিয়ে চোখ বোজে।
কৌশিকের মুখে নরম হাসি খেলে যায়, ‘তোর সত্যি মাথা খারাপ হয়েছে। শীল-ফিল এখন আর কেউ কাটায় না ভাই। ওসব আমাদের ছেলেবেলায় হত। আর পনেরো বছর ধরে আইসক্রিমওয়ালা একই রাস্তায় হেঁকে যাচ্ছে? নিচে চল, প্রফুল্লবাবু এসেছেন।’
প্রফুল্ল ব্যানার্জীর বয়স প্রায় সত্তরের কাছাকাছি। রিটায়ারমেন্ট নিয়ে নিয়েছেন অনেকদিন। তবে এখনও ভলেন্টিয়ারি ক্লাস নেন। ভদ্রলোকের মুখটা গোলগাল। মাথার চুল পাতলা আর সাদা হয়েছে, তবে টাক পড়েনি এখনও। কপালের বাঁদিকে একটা নিরীহ টিউমার আছে, মুখের দিকে তাকালে সবার আগে সেদিকেই চোখ পড়ে যায়। মুখ দেখে খুব একটা খিটখিটে বলে মনে হয় না৷
‘আপনি ওনাকে চিনতে পারছেন প্রফুল্লদা? টু থাউজেন্ড টেন এইচএস ব্যাচ।’ আগমনীকে উদ্দেশ্য করে জিগ্যেস করলেন কেতকী।
ভদ্রলোক মুখ তুলে তাকালেন একবার। তারপর মুখ নামিয়ে নিলেন, ‘না, আসলে বয়স হয়েছে তো।’
কেতকীর মুখে একটা বেদনার হাসি খেলে গেল। ডাস্টারটা আবার হাতে নিয়ে বললেন, ‘একদিন বলছিলেন না, দু’হাজার নয় কি দশের দিকে, কী যেন একটা ঘটেছিল। ওইটা আর একবার বলতে পারবেন?’
প্রফুল্লবাবু এবার যেন একটু চমকালেন। ইতস্তত করে বললেন, ‘সে তো অনেকদিন আগের কথা। গল্পের ছলে বলেছিলাম। তাছাড়া বাইরের লোকের সামনে এসব কথা…’
‘ওটা কোনও ব্যাপার না।’ হেসে উঠে হাত নাড়ালেন কেতকী, ওরা ভেতরের লোকই ধরে নিন। আপনি বলুন না, কোনও অসুবিধা নেই।’
মাথার সাদা চুলে একবার আঙুল চালিয়ে নিলেন প্রফুল্ল ব্যানার্জী। তারপর চেয়ারে পিঠ এলিয়ে দিয়ে বললেন, ‘তখন কত সাল হবে, টু থাউজ্যান্ড নাইন মেবি। সে সময় অংকের মাধববাবু দোর্দণ্ডপ্রতাপ ছিলেন। বাঘা বাঘা বদমাইশ ছাত্র তার সামনে কেঁচো হয়ে যেত। ক্লাসের সামনে দিয়ে হেঁটে গেলে ক্লাসরুম শ্মশানের মতো নিস্তব্ধ হয়ে যেত। তো একদিন ক্লাস এইটের একটা ছাত্রকে তিনি কোনও কারণে টিচার্স রুমে ডেকে পাঠান। ছাত্রটি খুব একটা সুবিধার ছিল না। তার ফ্যামিলি ছিল এ অঞ্চলের নাম করা মাফিয়া। ছেলেটিও সেই কালচারেই মানুষ। বছর বছর ফেইল করে পয়সা টয়সা খাইয়ে উঁচু ক্লাসে উঠত। ছেলেটিকে টিচার্স রুমে ডেকে মাধববাবু কী কারণে যেন দু’ঘা মারধোর করেন। ছেলেটি তার বদলে স্যারকে একটা ভীষণ নোংরা খিস্তি দিয়ে বসে…’
থেমে গিয়ে একবার ঢোঁক গিললেন প্রফুল্ল ব্যানার্জী, ‘ভদ্রলোক রেগেই ছিলেন, তার উপর সেই রাগের আগুনে ঘি পড়ে। এত বড় সাহস! বাহ্যজ্ঞানশূন্য হয়ে ছেলেটির কানপাটায় সজোরে একটা চড় হাঁকড়ে দেন। আলপটকা মারার জন্য ছেলেটা সেখানেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। আর ওঠে না। খবর পেয়ে আমরা বাকি স্যারেরা ছুটে গিয়ে তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই। সে সেরেও ওঠে। কিন্তু তারপরই আসল ঝামেলাটা শুরু হয়!’
‘কী ঝামেলা?’ আগমনী উদ্বিগ্ন গলায় প্রশ্ন করে।
‘সেই ছেলের বাড়ির লোকজন একরকম জোর করে স্কুলে ঢোকে। জনাদশেক লোক হবে তাদের হাতে লাঠিসোঁটা অবধি ছিল। মাধববাবু তখন ইলেভেন কি টুয়েলভে ক্লাস করাচ্ছিলেন। কেউ বাধা দেওয়ার আগেই ওরা ক্লাসের ভিতর ঢুকে স্যারকে মারধোর শুরু করে। ক্লাসের ভিতর হুলুস্থুল পড়ে যায়। কেউ কেউ স্যারকে বাঁচাতে ছুটে যায়। তবে বেশিরভাগই ক্লাস থেকে বাইরে বেরিয়ে যায়। বাড়ির লোকেরাই এক সময় ক্লাসরুমের দরজা বন্ধ করে দেয়। তারপর কী হয় কেউ জানে না।’
‘জানে না মানে!’
ভদ্রলোক সরাসরি উত্তর দেন না, ‘এইসব ঝামেলার মধ্যেই আমরা পুলিশে ফোন করি। সে সময় যোগাযোগ এত উন্নত হয়নি। পুলিশের আসতে বেশ খানিকটা সময় লাগে। তার আগেই ছেলেটার বাড়ির লোক স্কুল থেকে বেরিয়ে যায়। যারা যারা ভেতরে আটকা পড়ে তাদের মধ্যে জনাদুয়েক মেয়েও ছিল। তাদের অভিযোগ, দরজা বন্ধ করে তাদেরকে মোলেস্ট করা হয়েছে। ছেলে কয়েকটা বাধা দিতে গিয়েছিল কিন্তু তাদেরকেও মারধর করা হয়। তাদের সবারই গা হাতে পায়ে আঘাতের চিহ্ন ছিল। এতদূর অসুবিধার কিছু ছিল না৷ কিন্তু পুলিশে রিপোর্ট লেখাতে গিয়েই ঝামেলা হয়।’
‘কী ঝামেলা?’ কেতকী নিজে থেকেই জিগ্যেস করেন এবার।
‘ভেতরে ঠিক কী ঘটেছে, সে ব্যাপারে পুলিশ আটকে পড়া ছেলেমেয়েদের জিজ্ঞাসাবাদ করে। সেখানেই একটা মুশকিলে পড়ে তারা।’
‘কী মুশকিল?’
‘তাদের একজনের সঙ্গে আরেকজনের বয়ান মেলে না। কেউ বলে কাউকে মারধোর করা হয়নি, কেউ বলে ছেলেরা নিজেরাই নাকি ওদের মেরেছে। কেউ বলে দরজা নাকি প্রথম থেকে শেষ অবধি খোলাই ছিল, কেউ বলে ঘরে কোনও মেয়ে ছিলই না। এই ধরনের আজগুবি কথা…সব থেকে বড় কথা কেউ কেউ বলে, ওখানে তারা নাকি একজন মেরুন টি-শার্ট পরা মাঝবয়সি লোককে দেখেছে।’
‘তাতে কী হয়েছে?’ কৌশিক জিগ্যেস করে।
‘ওখানেই যত সমস্যার মূল। বাড়ির লোক যারা ঢুকেছিল, আই মিন গুন্ডাবাহিনী, তাদের কারো গায়ে মেরুন টি-শার্ট ছিল না। এমনকী ছাত্রদের বয়ানে লোকটার যে চেহারার বিবরণ ছিল সেরকম কেউ ছিলও না ওদের মধ্যে। ওরা স্কুলে ঢোকার বা বেরোনোর সময় আমাদের দারোয়ান ভালো করে দেখেছিল। ওরকম লোক ওদের মধ্যে কেউই ছিল না।’
প্রফুল্লবাবু বলে চললেন, ‘যারা ঢুকেছিল তাদের আমরা নিজেদের চোখে দেখেছিলাম। সেই সময় এই নিয়ে ঝামেলা হয়েছিল বলে আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে…’
আগমনীর কপালে ভাঁজ পড়ে, ‘তারপর?’
‘এরকম উলটোপালটা বয়ানে পুলিশ সন্দেহ করে যে সম্ভবত ক্লাসরুমের ভেতরে ছাত্রছাত্রীরা গোটা ব্যাপারটাকে সাজিয়েছে। প্রথমে কেস নিতেও চায়নি। আমরাই জোর করায় সবার বয়ান মিলিজুলি করে শেষে কেস নেয়। তবে ছেলেটার বাড়ির লোকের ঠিক কী হয়েছিল, সেটা এখন আর মনে নেই আমার।’
‘যারা ভিতরে ছিল তাদেরকে মনে আছে আপনার?’ আগমনী প্রশ্নটা করে। বুকের ভিতরটা ছমছম করে ওঠে। অজান্তেই ওর মনে হয় ছবিতে দেখা ওই চারটে বন্ধুর ভীষণ কাছাকাছি এসে পড়েছে ও।
‘আবছা। পুলিশ ওদের আজগুবি কথা বলার জন্য ধমকধামক দেয়। তবে তারপর থেকেই এ স্কুলে মারধোরের ব্যাপারটা…’
প্রফুল্ল ব্যানার্জী চুপ করতে কয়েক সেকেন্ড কেউ কোনও কথা বলে না। কেতকী এতক্ষণে ঘড়ির দিয়ে তাকিয়েছেন বেশ কয়েকবার। এবার বড় করে দম নিয়ে বললেন, ‘ছুটির সময় হয়ে এল, বুঝলেন। স্কুলের এক্সদের হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপ আছে যতদূর সম্ভব। সেখানে আপনাকে অ্যাড করে নিতে বলছি। আশা করি, কাউকে পেয়ে যাবেন। আজ আসলে…’
কেতকী কথা শেষ করার আগেই দূর থেকে ভেসে আসা রিংরিং শব্দ জানিয়ে দিল স্কুল ছুটি হয়েছে।
ওরা দুজনে যখন স্কুল থেকে বেরোলো তখন বিকেল প্রায় শেষ। একটু আগেই ছুটি হয়ে গেছে। স্কুলচত্বর থেকে ছেলেপুলের দল ফিকে হতে শুরু করেছে। ইতস্তত ছড়িয়ে আছে জনাকয়েক। সবারই ব্যাগসুদ্ধ কাঁধ ঝুঁকে পড়েছে৷ মুখে তামাটে ক্লান্তির ছাপ।
দরজার বাইরে বেরিয়ে কৌশিক একটা সিগারেট ধরাল। আগমনী ঠোঁটে একটা বিচিত্র ভঙ্গি করে বলল, ‘ধুর, লাভের লাভ কিছু হল না শালা৷’
‘একেবারে হল না তা নয়। কেস হয়েছিল যখন তার মানে পুলিশের কাছে কিছু একটা রেকর্ড আছে। অবশ্য পনেরো বছর আগের কেস….পাভেলকে একবার জিগ্যেস করে দেখতে হবে।’ কথাটা বলে ফোন বের করে কী যেন খুটখুট করে টাইপ করতে লাগল কৌশিক।
ব্যাপারটায় বিশেষ আগ্রহ পেল না আগমনী। শরীরটা ক্লান্ত লাগছে৷ এক্ষুনি উবারে উঠতে ইচ্ছা করছে না।
‘চ, একটু মাঠে গিয়ে বসি। বাড়ি ফিরেও তো কোনও কাজ নেই।’
মাঠের পা বাড়াল দুজনে। মাঠের ভিতরে কতগুলো নিচু ক্লাসের বাচ্চা এখন খেলা করছে। তাদের ছুটোছুটি আর চিৎকারের শব্দ মাঝে মাঝে ভেসে আসছে দূর থেকে।
গেট পেরিয়ে মাঠের ভেতর ঢুকে আসে ওরা। ঢুকেই ডানদিকের শিমুলগাছের ডালে একটা দোলনা চোখে পড়ল আগমনীর। একটা বাচ্চা ছেলে দোল খাচ্ছিল তাতে। স্লিপের দিক থেকে ভেসে আসা বন্ধুর ডাক শুনে দুলন্ত দোলনা ফেলে তির বেগে ছুটে গেল সে৷
দোলনাটা হাত দিয়ে থামিয়ে তার উপরেই বসে পড়ল আগমনী। দোলনার একদিকের খাম্বাতে হেলান দিয়ে দাঁড়াল কৌশিক। পুরোনো দোলনা দোলার সঙ্গে সঙ্গে কিচকিচ করে শব্দ হয়। ঠান্ডা হাওয়ার বেগ বেড়ে ওঠে। মজা লাগে আগমনীর। উড়ন্ত চুলগুলো সামলিয়ে বলে, ‘এক সময় এই বেঞ্চটায় দুলেছি। আমি শিওর।’
‘হতে পারে।’
দুলতে দুলতে কয়েক সেকেন্ড কৌশিকের দিকে চেয়ে রইল আগমনী। হুট করেই প্রশ্ন করল, ‘তুই হঠাৎ আমার জন্য এত কিছু করছিস কেন বল তো? ধান্দাটা কী?’
‘কৌতূহল।’
উত্তরটা বিশ্বাস হয় না আগমনীর, ‘শুধুই কৌতূহল?’
‘একটা পুরোনো শখ বলতে পারিস।’
‘কীরকম শখ?’
‘সত্যি বলব?’ কৌশিক একটু ইতস্তত করে৷
আগমনী অভয় দেয়, ‘প্রেম থাকলে লোকে বলতে ইতস্তত করে, ব্রেক আপের পর আর ভয়ের কী আছে?’
কৌশিক জামার এলোমেলো হয়ে যাওয়া হাতা গোটাতে গোটাতে বলে, ‘তোর সঙ্গে প্রেম করে আমি খুব একটা খুশি ছিলাম না। খালি মনে হত আমি একটা খিটখিটে হতাশ মানুষের সঙ্গে প্রেম করছি। সবকিছু নিয়ে তার জীবনে খালি হতাশা, বিরক্তি, রাগ, নেগেটিভিটি। টাকা পয়সা নেই, চুল পড়ে যাচ্ছে, অল্প খেয়েও মুটিয়ে যাচ্ছি, অফিস কলিগ চুগলি করছে, এর বাইরে আর কোনও কথা নেই।’
আগমনী হেসে ফেলে, ‘তোকে আমি শুধু এইসব কথাই বলতাম। তাই না?’
‘আমাদের প্রেম শুরুই হয়েছিল এসব বলতে গিয়ে। রোজকার জমা অভিযোগগুলো শেয়ার করতে করতে।’
‘মানুষ দুঃখ বলার জন্যই প্রেম করে। না রে?’
কৌশিক হাসে। তারপর পাশের দোলনাটায় বসে পড়ে, ‘আমার মাঝে মাঝে মনে হয় দুঃখ জিনিসটা ছোটবেলার একটা এক্সক্লিউসিভ ফিলিং। জ্যামিতি বক্সের মতো। বড়বেলায় আর কেউ ওটা গিফট করে না৷ বড় হয়ে আমাদের মেইনলি হয় ফ্রাস্ট্রেশন। অমুক কাজটা টাইমে হচ্ছে না, কাজ করেও স্যালারি পাচ্ছি না, বয়ফ্রেন্ড টাইম দিচ্ছে না, একা একা লাগছে; ফ্রাস্ট্রেশন আর বিষণ্নতার নানারকম ভ্যারিয়েশন হয় কেবল। ছোটবেলায় ক্রিকেট খেলতে গিয়ে ঝোপের মধ্যে বল হারিয়ে গেলে যে দুঃখটা হত, সেরকম দুঃখ বড় হয়ে কোথায় হয়?’
‘মানে। বলছিস আমাকে হারিয়ে ফেলে তোর দুঃখ হয়নি?’
একটা বল এসে পড়েছিল কৌশিকের পায়ের কাছে৷ সেটা তুলে নিয়ে হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেগুলোর দিকে ছুড়ে দেয় কৌশিক, ‘আমাদের কত সুন্দর মুহূর্ত ছিল। এদিকে দেখ মাঝে শুধু রাগ পড়ে আছে। দুঃখ কোথায়?’
আবার দুলতে শুরু করে আগমনী, ‘আমার তোর উপর রাগ হয় না।’
‘হয় না? কেন?’
‘কারণ আমি জানতাম, আমাদের রিলেশন টিকবে না। দুজন দুই মেরুর মানুষ। চাহিদা আলাদা, লক্ষ্য আলাদা…’
‘তাহলে প্রেম করেছিলি কেন?’
আগমনীর মুখে বিকেলের আলো একটা বিচিত্র হাসি ফুটিয়ে তোলে, ‘ছোটবেলায় আমরা ক্লাসে বসে খাতার পিছনে কাটাকুটি খেলতাম। মনে আছে? জানতাম খেলে আদৌ লাভ হবে না। কেউ জিতবে না, কেউ হারবে না। তাও খেলতাম, কারণ আমাদের কাছে হারাজেতাটা বড় ছিল না। ওই যে ক্লাসের মাঝখানে নিষিদ্ধ কিছু, ছকভাঙা কিছু করে ফেললাম, ওটাই আনন্দ। তোর সঙ্গে থাকলে আমি গতানুগতিক জীবনকে কিছুটা ভুলে থাকতাম। ওটাই আমাদের কাটাকুটি খেলা। নিজেও তলায় তলায় জানতাম, টিকবে না।’
আলো একটু একটু করে মরে আসছিল। এতক্ষণে মাঠ খালি হতে শুরু করেছে। মাঠের মাঝখানে যে ছেলেপুলের দল ক্রিকেট খেলছিল তারাও উইকেট গুটিয়ে নিয়েছে। কেমন যেন ফাঁকা শুনশান হয়ে যাচ্ছে স্কুল চত্ত্বরটা। বড় হওয়ার মতো।
‘চল, উঠি এবার। বাড়ি ফিরতে হবে।’ মনটা খারাপ হয়ে যায় আগমনীর। কথাটা কৌশিকের দিকে না তাকিয়েই বলে ও। কৌশিকও উঠতে যাচ্ছিল। ঠিক এরকম সময় ফোনটা বেজে ওঠে। পকেট থেকে বার করে মুখের সামনে ফোন ধরে কৌশিক। পাভেল ফোন করেছে।
‘তোর কী ব্যাপার বল তো? এতদিনের আগের এই মামুলি কেস…’ পাভেলের গলায় কৌতুকের ছোঁয়া।
‘আসলে আমার একটা…’
‘আসল নকল তোর পকেটে রেখে দে। টাইম ছিল, কাজ সালটে দিয়েছি। কেস ডায়েরির ডিজিটাল কপি তোকে পাঠিয়ে দিয়েছি। হার্ড কপি বললে কিন্তু পুরো সেঁকে যাব মাইরি!’
‘না না, ওতেই হবে।’
হোয়াটস অ্যাপে একটা ছবি পাঠিয়েছে পাভেল। ডিজিটাল কপি বলেই হয়ত এখনও রক্ষা পেয়েছে ডকুমেন্টটা। দুজনে মিলে তাতে ভালো করে চোখ বোলায়। সম্ভবত যাদের যাদের বয়ান নেওয়া হয়েছিল তাদের নামের লিস্ট, যোগাযোগের ঠিকানা। উপরে কেসের বর্ণনা। ছবিটা মুখের সামনে ধরে জুম করে কৌশিক। আগমনীর নাম নেই সেখানে।
লিস্ট ধরে আরও কিছুটা নীচে নামতে গিয়ে থমকে যায় দুজনে। লিস্টের একেবারে শেষের নামটা, নহর জান্নাত। পাশে তার গার্জেনের নাম, সাহিন আলি। মাথা চুলকায় কৌশিক, ‘শালা, এবার সাহিন আলিকে খুঁজে পাব কী করে?’
‘কোনও ঠিকানা দেওয়া নেই?’
‘উঁহু, এখানে অন্তত কিছু উল্লেখ নেই। হতাশ হয় আগমনী। সারাদিনের ক্লান্তিটা ঘিরে ধরে ওকে। একজনকে খুঁজতে গিয়ে আর একজনের খোঁজ পাওয়া গেল বটে, কিন্তু তাকে খুঁজে বের করা আরেক হ্যাপা।
ছবিটার দিকে মন দিয়ে দেখছিল কৌশিক। দাড়িতে হাত ঘষতে ঘষতে কী যেন ভাবছিল। হুট করেই ওর চোখ চিকচিক করে ওঠে, ‘বুঝলি, সাহিন আলি নামটা রিসেন্টলি কোথাও দেখেছি আমি। অবশ্য নামটা তেমন রেয়ার কিছু নয়…কোথায় যেন…কোথায়…’
হঠাৎ করেই লাফিয়ে ওঠে কৌশিক, ‘হ্যাঁ, কাকু! সেই ফেসবুক গ্রুপের গোঁফওয়ালা কাকু…সে-ই তাহলে নহরের বাপ!’
মুহূর্তে ফেসবুক খুলে সেই অ্যাকাউন্টটা বের করে। মেসেজ বক্সে গিয়ে টাইপ করে, ‘স্যার, আপনার সঙ্গে একটু জরুরি দরকার ছিল, এটা আমার ফোন নম্বর। একবার কল করে নেবেন। আর্জেন্ট!’
উবারে করে অনেকটা দূর চলে এসেছিল ওরা। এতক্ষণে কেউ কোনও কথা বলেনি। আগমনী বুঝতে পারছে কৌশিকের মনের ভিতর একটা ঝড় উঠেছে। নহরকে কি তাহলে সত্যিই এত সহজে খুঁজে পাওয়া যাবে?
গাড়িটা এয়ারপোর্ট পেরোতেই বেজে ওঠে কৌশিকের ফোনটা৷ সেটা আগমনীর দিকে বাড়িয়ে দেয় সে, ‘আননোন নম্বর। মনে হয় সাহিন আলি। টক টু হিম।’
‘কে বলছেন?’ আগমনী ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে একটা বয়স্ক ফিনফিনে গলা ভেসে আসে।
‘আপনি চিনবেন না আমাকে। আমি আসলে নহরের বান্ধবী। ওর…’
‘কার বান্ধবী?’
‘নহরের। আসলে ওর নাম্বারটা হারিয়ে ফেলেছিলাম তো, আপনার নামটা কেবল মনে ছিল। তাই ফেসবুকে…’
‘ওর নম্বর হারিয়ে ফেলেছিলে?’ কেটে কেটে উচ্চারণ করল লোকটা। ফিনেফিনে গলাতে এতক্ষণে রাগ এসে মিশতে শুরু করেছে, ‘তুমি কি মজা করতে ফোন করেছ? মতলবটা কী?’
‘আপনি কী বলতে চাইছেন বলুন তো?’ আগমনী কাতর গলায় প্রশ্ন করে। ওর একটা হাত অজান্তেই কৌশিকের কবজি খামচে ধরেছে।
ওপাশ থেকে কেটে যায় ফোনটা। কাটার আগে একটা মাত্র বাক্য উচ্চারিত হয়। বিরক্তি মেশানো গলার সেই কয়েকটা শব্দ আগমনীর কপাল থেকে পা অবধি ঠান্ডা করে দেয়, ‘আজ থেকে পনেরো বছর আগে নহর মারা গেছে। যত্তসব…’
